৭. বৃষ্টির মধ্যে

বৃষ্টির মধ্যে হলুদ ফ্রন্ট এন্ড লোডার-এর উঁচু সিটে বসে বাগ গ্রুপটাকে গালিগালাজ করছে ড্যানিয়েল, আবার হাসছে ও, কারণ জানে তার গালাগালির একটা শব্দও ওরা বুঝতে পারছে না। ইতোমধ্যে বৃষ্টির মাত্রা কমে গেছে, তবে পাহাড় চূড়ার মাথায় বিশাল এলাকা জুড়ে কালো আর ভারী হয়ে আছে মেঘ। সত্যিকার অর্থে বর্ষা মরশুম শুরু হয় নি; প্রবল বাতাস বইছে, মেঘগুলো সরে গেলেও যেতে পারে।

তবে নদী উপরে উঠছে। বাতাস থেমে গেলে তুমুল বৃষ্টি শুরু হবে। তখনকার বিপদের কথা ভেবেই বাঁধের উপর গ্যাবিয়ন ফেলে আরো উঁচু করা হচ্ছে ওটা। জালে পাথর ভরা হচ্ছে, বাঘের বাচ্চারা সেগুলো বয়ে এনে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখছে, ড্যানিয়েল সেগুলো তার ট্রাক্টরের ক্রেনে তুলে নিয়ে বাঁধের মাথায় নামাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, নদীর পানিকে কোনোভাবেই বাঁধের মাথায় উঠতে দেওয়া যাবে না। তা যদি একবার উঠতে পারে, এ বাঁধ খড়-কুটোর মতো ভেসে যাবে, কারো সাধ্য নেই ঠেকিয়ে রাখে। আর বৃষ্টি যদি একবার শুরু হয়, নদীকে বশে রাখাও সম্ভব হবে না।

ড্যানিয়েল জানে বিপদ ঘটতে শুরু করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা চলবে না, কারণ তখন নিকোলাসকে খবর পাঠিয়েও কোনো লাভ নেই। বাঁধ ভাঙা পানির সঙ্গে দৌড়ে নিকোলাসের কাছে আগে পৌঁছতে পারবে না। ব্যাপারটা এখন সূক্ষ্ম বিবেচনার। ওর খুব সতর্ক এ। বলছে, নিকোলাসকে সাবধান করার এখনই সময়। টানেল থেকে এখুনি ওদের বেরিয়ে আসা উচিত।

তবে এও ড্যানিয়েল. জানে যে টানেলের ভেতর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে ওরা, সময়ের আগে টানেল থেকে ডেকে নিলে ক্ষতি তো হবেই, তার উপর রেগেও যাবে নিকোলাস।

ড্যানিয়েল সিদ্ধান্ত নিল, নদীর উপর নজর রেখে আরো এক ঘণ্টা অপেক্ষা করবে সে। নদীর কিনারা ঘরে ট্রাক্টর নিয়ে এগুলো, আরেকটা গ্যাবিয়ন নামাবে বাঁধের মাথায়।

*

হানশিত শেরিফ আর তার কয়েকজন লোকের সঙ্গে নিকোলাসও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। গোলকধাঁধার এটা সবচেয়ে নিচের লেভেল, মেঝে থেকে একটা একটা করে তুলে ফেলা হচ্ছে স্ল্যাব বা ফলক। ওগুলোর মাঝখানের জয়েন্ট এতো আঁটসাঁট যে এমন কী ক্রোবার দিয়ে আলাদা করতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। ওরা। সময় বাঁচানোর জন্য নিজেদের তৈরি স্লেজ-হ্যামার দিয়ে ফলকগুলো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে হলো নিকোলাসকে।

শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও, সবারই চোখে-মুখে ভয়ে ছাপ লেগে আছে, কারণ তারা জানে গিরিখাদের মাথায় নদীর লেভেল উপরে উঠতে শুরু করেছে। নিকোলাসের জন্য খারাপ খবর হলো, হানশিত শেরিফের ষোলোজন শ্রমিক। ডিউটিতে আসে নি। সন্দেহ নেই, পালিয়েছে তারা।

টানেলের বাঁক থেকে ফলক ভাঙতে শুরু করেছে ওরা। ভাঙা হচ্ছে বাঁকের দু দিকের মেঝেই। একটা করে ফলক ভাঙা হয়, নিচে কোনো দরজা বা ধাপ দেখার আশায় দম ধরে রাখে নিকোলাস। কিন্তু হতাশ হতে হয়, নিচে নিরেট পাথর ছাড়া আর কিছু নেই।

কাজ থামিয়ে পানি খেতে এসে রোয়েনকে বলল ও, আশা করার মতো কিছু দেখছি না।

রোয়েন উত্তরে কিছু বলার আগেই হানশিতের চিৎকার ভেসে এলো, এফেন্দি, দেখে যান!

হাত থেকে পানির ফ্লাস্কটা ফেলে দিয়ে ছুটলো রোয়েন, খেয়ালই করলো না যে ওটা ভেঙে গিয়ে ওর পা ভিজিয়ে দিল। হানশিতের পাশে এসে দাঁড়ালো সে। হ্যাঁমার উপর তুলে আরেকটা আঘাত করার জন্য তৈরি হানশিত। কী… কী… থেমে গেল রোয়েন, ইতোমধ্যে ওর পাশে চলে এসেছে নিকোলাসও। দুজনেই দেখলাম সদ্য ভাঙা একটা ফলকের নিচে সাধারণ কোনো পাথর নয়, ড্রেস করা আরেকটা ফলক রয়েছে।

তারপর দেখা গেল সাজানো ফলকের আরো একটা স্তর রয়েছে মেঝের নিচে, টানেলের এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলকগুলো চারপাশের পাথরের সঙ্গে জোড়া লাগানো, জয়েন্টগুলো এতো সরু যে প্রায় চোখেই পড়ে না। কিনারাগুলো মসৃণ ও সমান, কোনো রকম খোদাই বা চিহ্ন নেই। কী ব্যাপার, নিকোলাস? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।

বোঝাই যাচ্ছে, আরেকটা স্তর, নিচে হয়তো কোনো ফাঁক আছে। না তোলা পর্যন্ত বোঝা যাবে না।

দ্বিতীয় স্তরের ফলক এতো চওড়া আর শক্ত যে ওদের হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা সম্ভব হলো না। অগত্যা বাধ্য হয়ে প্রথম ফলকের চারধারে জয়েন্ট বরাবর গভীর খাল কেটে আলাদা করতে হলো প্রথমে, তারপর তুলে ফেলা হলো। ভিত থেকে একটা প্রান্ত তুলতে পাঁচজন লোককে হাত লাগাতে হলো।

ফলকটার নিচে একটা ফাঁক আছে। হাঁটু গেড়ে উঁকি দিল রোয়েন। খোলা শ্যাফটের মতো।

একটা ফলক তোলার পর বাকিগুলো তোলার কাজ সহজ হয়ে গেল। অবশেষে চৌকো ফাঁকটার সবটুকু উন্মোচিত হলো। অন্ধকার শ্যাফটের ভেতর ল্যাম্পের আলো ফেললো নিকোলাস। ভেতরের ফাঁক টানেলের এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত, নিচের প্রথম ধাপে পা রাখার পর সোজা হয়ে দাঁড়াতে নিকোলাসের কোনো অসুবিধে হলো না, বাকি ধাপগুলো, পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী বাঁক নিয়ে নেমে গেছে। আরেকটা সিঁড়ি, বলল ও। বোধহয় এটাই সেটা। ভুল পথ দেখাতে দেখাতে এমন কী টাইটাও এততক্ষণে ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা।

শ্রমিকরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, তবে জানে বোনাস হিসেবে অতিরিক্ত সিলভার ডলার পাবে তারা।

আমরা কী এক্ষুনি নিচে নামছি? জানতে চাইলো রোয়েন। জানি ফাঁদ থাকতে পারে, সাবধান হওয়া দরকার; কিন্তু সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে।

ফাঁদ থাকুক আর নাই থাকুক, আজ আমাদের ঝুঁকি নেওয়ার দিন, বলল নিকোলাস।

পাশাপাশি নামছে ওরা। প্রতিবার সাবধানে একটা করে পা ফেলছে। হাতের ল্যাম্প মাথার উপর উঁচু করে ধরেছে নিকোলাস। রোয়েন বলল, নিচে একটা চেম্বার দেখা যাচ্ছে।

মনে হচ্ছে স্টোররুম, ফিসফিস করলো নিকোলাস। দেয়াল ঘেঁষে সাজানো কি ওগুলো? সংখ্যায় কয়েকশো হবে। কফিন, পাথুরে শবাধার? গাঢ় আকৃতিগুলো প্রায় মানুষেরই আদল, কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একের পর এক অনেকগুলো সারি। চেম্বারটা চৌকো।

না, বলল রোয়েন। একদিকে ওগুলো শস্য রাখার বাস্কেট, আমি চিনতে পারছি। আরেকদিকে দুই হাতলঅলা জার, মদ রাখার জন্য। সম্ভত মৃত লোককে দান করা হয়েছে।

এটা যদি সমাধি সম্পদের স্টোররুম হয়ে থাকে, উত্তেজনায় আঁটসাঁট গলায় বলল নিকোলাস, ধরে নিতে হয় সমাধির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা।

হ্যাঁ! চেঁচিয়ে উঠলো রোয়েন। দেখুন-স্টোররুমের শেষ মাথায় একটা দরজা। ওদিকে আলো ফেলুন!

প্রকোষ্ঠের এক প্রান্তে ফাঁকটা দেখা গেল, যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওদের। শেষ ধাপ কয়টা ছুটে পার হলো ওরা। কিন্তু স্টোররুমের লেভেল ফ্লোরে পৌঁছতেই অদৃশ্য একটা বাধা থামিয়ে দিল ওদেরকে। ছিটকে পেছন দিকে পড়লো দু জনেই।

ঈশ্বর! নিজের গলা খামছে ধরেছে নিকোলাস, কর্কশ শোনালো আওয়াজটা। পিছিয়ে আসুন! পিছিয়ে আসুন!

হাঁটুগেড়ে প্রায় ঢলে পড়ার অবস্থা হলো রোয়েনের, বাতাসের অভাবে সে-ও ভুগছে। নিকোলাস! চিৎকার দিতে চাইছে, কিন্তু সমস্ত বাতাস আটকে গেছে ফুসফুসে। বুকে প্রচণ্ড একটা চাপ অনুভব করছে ও। নিকোলাস! আমাকে বাঁচান! দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার অবস্থা হয়েছে ওর, ডাঙার তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছে।

রোয়েনের উপর ঝুঁকলো নিকোলাস, দু হাতে ধরে তুলতে চেষ্টা করলো। পারছে না, সাংঘাতিক কাহিল লাগছে নিজেকে। পা দুটো হাঁটুর কাছে ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে, নিজের ওজনই বইতে পারছে না। ও জানে, দম আটকে মারা যাচ্ছে ওরা। চার মিনিট, ভাবল ও। চার মিনিটের মধ্যে তাজা বাতাস না পেলে মৃত্যু ঘটবে মস্তিস্কের।

রোয়েনের পেছনে দাঁড়ালো নিকোলাস, ওর বগলের তলা দিয়ে গলিতে হাত দুটো এক করর, তারপর আবার ওকে তুলতে চেষ্টা করলো। কিন্তু ওর সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। পেছন দিকে ঢলে পড়ছে ও, ধাপের উপর। সমস্ত মনোবল এক করে নিজেকে স্থির রাখতে চাইছে। আবার রোয়েনকে তুলতে চেষ্টা করলো। কীভাবে পারলো বলতে পারবে না, শুধু খেয়াল করলো ধাপ বেয়ে পিছু হটছে ও, বুকের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে রোয়েন। প্রতিটি পা ফেলতে অবশিষ্ট সবটুকু শক্তি লাগছে। আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে রোয়েন, নিকোলাসের বৃত্তাকার বাহুবন্ধনে ঝুলছে, অসাড় পা দুটো পাথুরে ধাপের উপর ঘষা খাচ্ছে।

চিৎকার করতে চাইছে নিকোলাস, হানশিতকে বলতে চাইছে সাহায্য করো। কিন্তু গলা থেকে কোনো আওয়াজই বের করতে পারলো না। আরো পাঁচ ধাপ উঠে এলো। বুঝতে পারছে, রোয়েনের ভার বহন করা ওর পক্ষে আর সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে এ ও জানে, ওকে যদি এখানে ফেলে গেল নিকোলাস। ধাপের উপর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে শুয়ে আছে, বুকের উপর রোয়েন। শ্বাস নিতে দাও, ঈশ্বর শ্বাস নিতে দাও! গলায় আওয়াজ নেই, শুধু ঠোঁট দুটো নড়ছে। প্লিজ, গড়…..

যেনো ওর প্রার্থনা শুনেই ছুটে এলো তাজা বাতাস, নাক-মুখ গলে ফুসফুসে পৌঁছে গেল। সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা মুক্তি ফিরে এলো। রোয়েনকে আবার জড়িয়ে ধরল নিকোলাস, নিধে হলো টলতে টলতে। এবার সিঁড়ির মাথার দিকে মুখ করে উঠছে নিকোলাস, ফাঁকটার মাথায় পৌঁছে গেল, হানশিত শেরিফের পায়ের কাছে।

কী ব্যাপার, এফেন্দি? কী হয়েছে আপনাদের? উদ্বিগ্ন হানশিত জানতে চাইলো।

টানেলের মেঝেতে রোয়েনকে শুইয়ে দিল নিকোলাস, জবাব দেওয়ার শক্তি নেই। রোয়েনের গালে চাপড় মারলো ও। কথা বলুন, রোয়েন! কথা বলুন!

রোয়েন সাড়া দিচ্ছে না। কাজেই ওর উপর ঝুঁকলো নিকোলাস, মুখটা নিজের মুখ দিয়ে চেপে ধরল, ফুঁ দিল ভেতরে। চোখের কোণ দিয়ে দেখলো, রোয়েনের বুক ফুলছে।

মাথা তুললাম নিকোলাস, তিন পর্যন্ত শুনলো। প্লিজ, ডালিং, প্লিজ! শ্বাস নিন! মড়ার মতো চেহারায় কোনো রঙ ফুটছে না। আবার ঝুঁকলো ও, মুখে মুখ চেপে ফুঁ দিল। রোয়েনের ফুসফুস ভরে গেল আবার, এবার নিকোলাসের নিচে নড়ে উঠলো ও। গুড গার্ল! লক্ষ্মী মেয়ে!

তৃতীয় বার ফুঁ দেওয়ার পর নিকোলাসকে ঠেলে নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিল রোয়েন, আড়ষ্টভঙ্গিতে উঠে বসলো, বোকার মতো তাকালো চারদিকে। নিকোলাসের উপর চোখ পড়তে অবাক হয়ে জানতে চাইলো, নিকোলাস, কি ঘটেছে?

ঠিক জানি না। তবে দু জনেই মারা যাচ্ছিলাম। এখন কেমন লাগছে আপনার?

মনে হচ্ছিল অদৃশ্য একটা হাত আমার গলা চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে পারছিলাম না, তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

গলিপথের লোয়ার লেভেলে কোনো ধরনের গ্যাস আছে। আপনি অজ্ঞান ছিলেন মিনিট দুয়েক।

কপালে হাত দিল রোয়েন। ব্যথা করছে। শুনতে পাচ্ছিলাম আপনি আমার নাম ধরে ডাকছেন। আপনি আমাকে ডালিং বলেছেন… নাকি ভুল শুনলাম?

সামান্য স্লিপ অভ টাং, হাত ধরে রোয়েনকে দাঁড় করালো নিকোলাস। তারপরও টলছে ও, হেলাল দিল নিকোলাসের গায়ে।

ধন্যবাদ, নিকোলাস। ঋণের বোঝা শুধু বাড়ছেই। জানি না কোনোদিন শোধ করতে পারব কিনা।

একটা না একটা উপায় দু জনে মিলে বের করেই ফেলবো। স্মিত হাসি লেগে রয়েছে নিকোলাসের ঠোঁটে।

হঠাৎ রোয়েন খেয়াল করলো, চারপাশের লোকজন ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। নিকোলাসের গা থেকেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ও। কী ধরনের গ্যাস, নিকোলাস? গ্যাস ওখানে এলোই বা কোত্থেকে? আপনার কি ধারণা, এটাও টাইটার আরেকটা চালাকি?

সম্ভবত কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেনও হতে পারে। মিথেনও তো বাতাসের চেয়ে ভারী, তাই না?

এলো কোত্থেকে?

পচা লাশ থেকে তৈরি হতে পারে, বলল নিকোলাস। তবে ওই বাস্কেট আর। জারগুলোকে সন্দেহ হচ্ছে আমার। ওগুলোর ভেতরে কী আছে জানার পর বুঝতে পারব। কেমন লাগছে এখন? মাথার ব্যথাটা কমেছে?

আমি ভালো আছি। এখন আমরা কী করব, নিকোলাস?

চেম্বার থেকে গ্যাস পরিষ্কার করতে হবে, বলল নিকোলাস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

শ্যাফটের গ্যাস লেভেল পরীক্ষা করার জন্য মোমবাতি ব্যবহার করলো নিকোলাস। ডান হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নামছে। নামার সময় হাতের বাতিটা মেঝের দিকে নিচু করলো, প্রতিবার এক ধাপ করে নামছে। ভালোই জ্বলছে বাতি, নাচানাচি করছে শিখাটা। তারপর চেম্বারের মেঝে থেকে ছয়টা ধাপ ওপরে থাকতে, শিখাটা হলুদ হয়ে গেল, নিভে গেল দপ করে। দেয়ালে চক দিয়ে দাগ কাটলো নিকোলাস।

না, মিথেন নয়, বলল ও। কার্বন ডাইঅক্সাইডই।

শ্যাফটের মাথা থেকে রোয়েন বলল, মিথেন হলে বুঝি বিস্ফোরণ ঘটত? হেসে উঠলো ও।

হানশিত, ব্লোয়ার ফ্যানটা নিয়ে এসো, বলল নিকোলাস।

হাতে ফ্যানটা নিয়ে দম আটকালো নিকোলাস, নিচের ধাপটায় নেমে এসে চেম্বারের মেঝেতে রাখলো ওটা। ফ্যান চালু করেই ছুটে ফিরে এলো দেয়ালে দাগ কাটা জায়গাটার ওপরে। রোয়েনের প্রশ্নের উত্তরে জানালো, পনেরো মিনিট পর পর টেস্ট করতে হবে।

গ্যাস সরাতে এক ঘণ্টা লেগে গেল। চেম্বারে নেমে এখন ওরা শ্বাস নিতে পারছে। নিকোলাসের নির্দেশে কিছু জ্বালানি কাঠ নিয়ে এলো হানশিত, চেম্বারের মাঝখানে আগুন জ্বালা হলো। আঁচ পেয়ে বাতাস আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এরপর নাকে নিয়ে বাস্কেটগুলো পরীক্ষা করলো নিকোলাস।

ব্যাটা অতি চালাক! বলল নিকোলাস। নানা জিনিস মিশিয়ে সার তৈরি করে রেখে গেছে।

চেম্বারের আরেক দিকে চলে এলো ওরা, মাটির একটা জার কাত করে খানিকটা পাউডার ঢাললো মেঝেতে। আঙুলে নিয়ে ঘষা দিল নিকোলাস, তারপর শুকলো। লাইমস্টোনের গুঁড়ো। অনেক আগে শুকিয়ে যাওয়ায় গন্ধ হারিয়ে ফেলেছে, তবে টাইটা সম্ভবত কোনো ধরনের অ্যাসিডে ভিজিয়ে রেখেছিল। সম্ভবত ভিনিগার, আবার প্রস্রাবও হতে পারে। এ থেকেই কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়েছে।

তার মানে এটাও তাহলে একটা ফাঁদ ছিল, বলল রোয়েন।

এতো হাজার বছর আগেও টাইটা পচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানত। ওই মিশ্রণ থেকে কী ধরনের গ্যাস তৈরি হবে জানা ছিল তার। ব্যাটাকে বিরাট কেমিস্ট বলতে আমার আপত্তি নেই।

আর বাতাস যেহেতু এখানে স্থির, এ-ও জানত যে চেম্বারের মেঝেতে ভেসে থাকবে গ্যাস, উপরে উঠবে না। আমি ধরে নিচ্ছি এ শ্যাফটের ডিজাইন করা হয়েছে একটা ইউ-ট্র্যাপ-এর আদলে। বাজি ধরে বলতে পারি, ওই প্যাসেজও ক্রমশ উপর দিকে উঠে গেছে… হাত তুলে আরেক প্রান্তের দরজা বা ফাঁকাটা নিকোলাসকে দেখালো রোয়েন। প্রথম ধাপটা এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি আমি।

*

নদীর কিনারায় পাথরের উঁচু স্তূপ তৈরি করেছে ড্যানিয়েল, লেভেল মনিটর করার জন্য। ওগুলোর উপর কড়া নজর আছে তাঁর।

বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর ছয়ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। পাহাড় চূড়ায় মেঘ সরে গেছে, তবে উত্তর দিগন্তে নতুন করে জমা হচ্ছে আবার। ওদিকে, হাইল্যান্ডে, যে কোনো মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে। তা যদি হয়, ড্যানিয়েল ভাবছে, এখানে অ্যাবে গিরিখাদে বন্যার পানি পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে।

ট্র্যাক্টের থেকে নেমে নদীর পাড় ধরে নিচে নামলো সে, স্টোন মার্কার পরীক্ষা করবে। গত এক ঘণ্টায় পানির লেভেল এক ফুটের মতো নেমেছে। তবে নিজেকে খুশি হতে নিষেধ করলো সে-কারণ, নদীর লেভেল এক ফুট উঁচু হতে মাত্র পনেরো মিনিট লেগেছিল। চূড়ান্ত বর্ষণ আসন্ন। অমোঘ নিয়তির মতো, এড়াবার উপায় নেই। নদী ফুলে-ফেঁপে উঠবে। বিস্ফোরিত হবে বাঁধ। ভাটির দিকে ফিরে বাঁধটা দেখলো সে। হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে।

চরম মুহূর্তটা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যতোটুকু তার পক্ষে সম্ভব, করেছে ড্যানিয়েল। বাঁধের পাঁচিল প্রায় চার ফুট উঁচু করেছে সে। পাঁচিলের পেছনে আরেক প্রস্থ অবলম্বন তৈরি করেছে, বাধটাকে আরো খানিক পোক্ত করার জন্য। আর কিছু করার নেই তার। এখন শুধু অপেক্ষা করার পালা।

পাড় বেয়ে উঠে এসে হলুদ ট্রাক্টরের গায়ে হেলান দিল ড্যানিয়েল, শ্রমিকদের দিকে তাকালো। রণক্লান্ত সৈনিকদের মতো লাগছে ওদেরকে। নদীকে ঠেকিয়ে রাখতে আজ দুদিন ধরে খাটছে ওরা, প্রত্যেকেই ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। ওদেরকে আবার কাজ করতে বলাটা হবে অমানবিক। এরপর নদী হামলা করলে পরাজয় মেনে নিতে হবে।

কয়েকজন শ্রমিক আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উঠে বসে উজানের দিকে তাকালো। বাতাসে অস্পষ্টভাবে ভেসে এলো তাদের গলা। কিছু একটা কৌতূহলী ও উত্তেজিত করে তুলেছে তাদেরকে। ট্র্যাক্টরের উপর উঠে কপালে হাত রেখে রোদ ঠেকালো ড্যানিয়েল। ঢালের দিক থেকে ট্রেইল ধরে এগিয়ে আসছে পরিচিত একজন মানুষ। ক্যামো ফেটিগ পরা, হাঁটার ভঙ্গিতে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। মেক নিমুর। তার সঙ্গে দু জন কোম্পানি কমান্ডারও রয়েছে।

কাছাকাছি এসে মেক জানতে চাইলো, ড্যানিয়েল, তোমার বাঁধের খবর কী? পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হতে যাচ্ছে। নদীটাকে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখকে পারবে বলে তো মনে হয় না।

ট্র্যাক্টর থেকে লাফ দিয়ে নেমে মেকের সঙ্গে করমর্দন করলো ড্যানিয়েল। তুমি যেমন নিকোলাসের বন্ধু, আমিও তেমনি। বন্ধুর জন্য যতোটুকু পারা যায় করছি। তবে তোমার কথাই ঠিক, ডানডেরাকে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব না।

আমি শুধু নদীকে নিয়ে চিন্তিত নই, বলল মেক। খবর পেয়েছি সরকারি বাহিনী হামলা করার জন্য পজিশনে চলে আসছে। আমার কাছে তথ্য আছে, ডেবরা মালিয়াম থেকে পুরো একটা ব্যাটালিয়ন রওনা হয়েছে। আরেকটা ফোর্স আসছে সেন্ট ফুমেনটিয়াস মঠের নিচে থেকে উঠে আসছে অ্যাবে নদী ধরে।

সাঁড়াশি আক্রমণ, তাই না?

আমরা সংখ্যায় কম, বলল মেক। আক্রমণ শুরু হলে কতোক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব জানি না। আমার লোকেরা গেরিলা, সেটপিস ব্যাটলে অভ্যস্ত নয়। আমাদের কৌশল হলো হিট অ্যান্ড রান। আমি তোমাকে বলতে এসেছি, নোটিশ পাবার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পালাবার জন্য তৈরি থাকতে হবে।

আমার জন্য তোমাকে বেশি চিন্তা করতে হবে না, ছুটে পালাতে ওস্তাদ আমি। নিকোলাস আর মিস রোয়েনকে নিয়ে চিন্তা করো, টানেলের ভেতর না আটকা পড়ে।

ওদের কাছেই যাচ্ছি, বলল মেক। একটা ফল-ব্যাক পজিশনের ব্যবস্থা করতে চাই। যুদ্ধ শুরুর পর আমরা যদি পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, আবার আমাদের দেখা হবে মঠে লুকানো বোটের কাছে।

ঠিক আছে, মেক-হঠাৎ থেমে গেল ড্যানিয়েল, চারজনই ওরা মুখ তুলে ট্রেইলের দিকে তাকালো। পাড়ের কাছে লোকজনকে উত্তেজিত দেখাচ্ছে। কী ব্যাপার?

আমার একটার পেট্রল ফিরে আসছে। চোখ সরু করলো মেক।

নিশ্চয়ই নতুন কিছু ঘটেছে। তারপরই তার চেহারা বদলে গেল। গেরিলারা একটা স্ট্রেচার বয়ে আনছে। স্ট্রেচারে কাত হয়ে রয়েছে ছোট ও হালকা একটা দেহ।

মেককে ছুটে আসতে দেখে স্ট্রেচারের উপর উঠে বসলো টিসে। স্ট্রেচারটা মাটিতে নামিয়ে রাখলো গেরিলারা। সেটার পাশে হাঁটুগেড়ে বসলো মেক, দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল টিসেকে। কথা না বলে পরস্পরকে অনেকক্ষণ ধরে থাকলো ওরা। তারপর টিসের মুখটা দু হাতের তালুতে ভরে ক্ষতগুলো খুঁটিয়ে দেখলো মেক। গোটা মুখ ফুলে উঠেছে, এরই মধ্যে পুঁজ জমেছে কয়েকটা ক্ষতের মুখে। চোখের পাতায় ফোস্কা পড়েছে।

কে করলো? কার কাজ? নরম সুরে জানতে চাইলো সে।

পোড়া ঠোঁট নাড়লো টিসে, আবেগে আর অভিমানে আহত পশুর মতো দুর্বোধ্য আওয়াজ বের হলো শুধু। তারপর বলতে পারল, ওরা আমাকে সব কথা….

না, কথা বলো না,, বাধা দিল মেক, দেখলো টিসের নিচের ঠোঁট ফেটে গিয়ে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসছে। তোমার দোষ নেই।

বাধা দিয়ো না, আমাকে বলতে হবে, ফিসফিস করলো টিসে। ওরা আমাকে কথা বলতে বাধ্য করেছে। তোমার গেরিলাদের সংখ্যা, এখানে নিকোলাসের সঙ্গে তুমি কী করছ, সব কথা বলে ফেলেছি। দুঃখিত, মেক। আমি তোমার সঙ্গে বেঈমানী করেছি…।

কে দায়ী? কে তোমার এ অবস্থা করলো?

কর্নেল নগু আর পেগাসাসের আমেরিকান লোকটা, হেলম্।

আলতো আলিঙ্গনে আবার টিসেকে জড়ালো মেক, তবে তার চোখ দুটো থেকে আগুন ঝরছে।

*

টানেলের লোয়ার চেম্বার পুরোপুরি গ্রাসমুক্ত হয়েছে। মেঝের মাঝখানে এখনো জ্বলছে আগুনটা, উত্তপ্ত বাতাস সিঁড়ি হয়ে উপরের টানেলে বেরিয়ে গেছে, অক্সিজেন-সমৃদ্ধ পরিবেশের সঙ্গে মিশে গ্যাস তার ক্ষতি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছে রোয়েন, নিকোলাসের পিছু নিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠছেও।

চল্লিশটা ধাপ বেয়ে চেম্বারটায় নেমেছিল ওরা, হুবহু একই রকম আরেক প্রস্থ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। ওদের মাথা চল্লিশতম ধাপের সঙ্গে একই লেভেলে আসার পর হাতের ল্যাম্পটা উঁচু করে সামনে কী আছে দেখার চেষ্টা করলো নিকোলাস। সুবিশাল এক তোরণের ভেতর ছড়িয়ে পড়লো আলো, রঙিন সব বিচিত্র আকৃতি আর নকশায় ধাধিয়ে গেল ওদের চোখ, যেনো বৃষ্টির পর মরুভূমির একটা মাঠে অপরূপ সব ফুল ফুটেছে। গম্বুজ আকৃতির জায়গাটার চারদিকের দেয়ালে বিচিত্র সব পেইন্টিং, এতো সুন্দর আর নিখুঁত যে দম বন্ধ হয়ে এলো।

টাইটা! ভাঙা ও কাঁপা আওয়াজ বের হলো রোয়েনের গলা থেকে। এগুলো তার আঁকা। টাইটার বৈশিষ্ট্যই আলাদা, চিনতে আমি ভুল করি না। তার কাজ যেখানেই দেখি, চিনতে পারব।

উপরের ধাপটায় দাঁড়িয়ে সবিস্ময় তিনদিকে তাকাচ্ছে ওরা। এগুলোর তুলনায় লম্বা গ্যালারির দেয়ালচিত্র ম্লান তো বটেই, অনুকরণ দোষেও দূষিত। এগুলো মহান এক শিল্পীর কাজ, কালজয়ী প্রতিভার, যার শিল্পকর্ম চার হাজার বছর পরও মানুষকে মুগ্ধ বিস্ময়ে স্তম্ভিত করে দিতে পারে।

ওরা খুব ধীর পায়ে সামনে এগুলো, প্রায় একটা ঘোরের মধ্যে। তোরণ পেরিয়ে আসার পর দেখলো দু দিকের দেয়াল ঘেঁষে সারির সারি ক্ষুদে চেম্বার রয়েছে, প্রাচ্যের বাজারগুলোয় যেমন ছোট দোকান-ঘর দেখা যায়। প্রতিটি দোকানের প্রবেশমুখে পাহারা দিচ্ছে লম্বা স্তম্ভ, উঁচু হয়ে ছাদ ছুঁয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভ দেবতাদের একেকটা মূর্তি। মূর্তিগুলোই আসলে গম্বুজ আকৃতির সিলিংটাকে মাথায় করে রেখেছে।

প্রথম দুটো দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস, চাপ দিল রোয়েনের বাহুতে। ফিসফিস করে বলল, ফারাও-এর ট্রেজার চেম্বার। চেম্বার বা দোকানগুলো মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত অদ্ভুত সুন্দর সব জিনিসে ঠাসা।

এগুলো ফার্নিচার স্টোর, বিড়বিড় করলো রোয়েন। চেয়ার, টুল, খাট আর ডিভানের আকৃতি স্পষ্ট চিনতে পারছে ও। কাছের স্টলের সামনে চলে এলো, হাত বাড়িয়ে রাজকীয় একটা সিংহাসন ছুঁলো। একেকটা বাহু পরস্পরকে পেঁচিয়ে থাকা একজোড়া করে সরীসৃপ, ব্রোঞ্জ আর ল্যাপিস ল্যাজুলাই দিয়ে তৈরি। পায়াগুলো সোনা দিয়ে তৈরি সিংহের থাবা। সীট আর পিঠে শিকার ধাওয়া করার দৃশ্য আঁকা হয়েছে। পিঠের মাথায় সোনার তৈরি একজোড়া ডানা।

সিংহাসনের পেছনে সাজানো রয়েছে অসংখ্য ফার্নিচার। জালি দিয়ে ঢাকা একটা ডিভান চিনতে পারলো ওরা, জালিটা আবলুস কাঠ আর আইভরি দিয়ে তৈরি। তবে ডজন ডজন আরো বহু জিনিস রয়েছে, বেশিরভাগই বিভিন্ন অংশ খুলে আলাদা করা, ফলে কোনটা যে কী চেনা গেল না। প্রতিটি অংশ দামি মেটাল আর রঙিন রত্নখচিত, তাকালেই দৃষ্টিবিভ্রম ঘটছে। তোরণের দু পাশে সারি সারি ছোট আকৃতির কুলুঙ্গি দেখা গেল, সেগুলো আশ্চর্য সুন্দর কালেকশনে ভরা। প্রতি জোড়া কুলুঙ্গির মাঝখানে মৃতের পুস্তক থেকে নেওয়া উদ্ধৃতি লেখা হয়েছে, লেখা হয়েছে। তোরণসমূহ পেরিয়ে ফারাও-এর ভ্রমণ কাহিনীর বিবরণ, ট্রেইলে কতো রকমের বিপদ ওত পেতে ছিল, দৈত্য আর দানবরা কীভাবে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

লম্বা গ্যালারির নকল সমাধিতে এ পেইন্টিং ছিল না, নিকোলাসকে বলল রোয়েন। একবার শুধু রাজার মুখে দিকে তাকান। বুঝতে পারবেন উনি সত্যিকার একজন বাস্তব চরিত্র ছিলেন।

ওদের পাশের দেয়ালচিত্রে দেখা যাচ্ছে মহান দেবতা ওসিরিস ফারাও-এর হাত ধরে পথ দেখাচ্ছেন, কাছে সরে আসা দানবদের কবল থেকে রক্ষা করছেন তাঁকে।

ফিগারগুলো দেখুন, সায় দিয়ে বলল নিকোলাস আড়ই কাটের পুতুলের মতো নয়, সব সময় ডান পা বাড়িয়ে রেখেছে। এগুলো বাস্তবে দেখা পুরুষ ও নারী। প্রতিটি ফিগার অ্যানাটমিক্যালি কারেক্ট। শিল্পী হিউম্যান বডি স্টাডি করেছেন, শারীরিক কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল তার।

পাশের দেয়ালের খুপরির সামনে থামলো ওরা। ভেতরে অস্ত্র আর যুদ্ধের সরঞ্জাম দেখা গেল। রথের প্যানেলগুলো সোনার তৈরি পাতা দিয়ে ঢাকা, ফলে চোখ ধাধিয়ে গেল। সাইড প্যানেলে, প্রতিটি লম্বা চাকার পেছনে, সাজানো রয়েছে তীর আর বর্শা। রথের পাশে রয়েছে স্তূপ করা ছোরা আর আইভরির হাতলসহ তলোয়ার, ফলাগুলো চকচকে ব্রোঞ্জ। র‍্যাকে রাখা হয়েছে বলুম। ঢালগুলো ব্রোঞ্জের তৈরি, ঢালের গায়ে যুদ্ধবিজয়ের দৃশ্য, সঙ্গে স্বর্গীয় মামোসের প্রতিকৃতি আঁকা। কুমীরের চামড়া দিয়ে তৈরি হেলমেট আর ব্রেস্টপ্লেট দেখলো ওরা।

পাশাপাশি পাঁচটা ক্ষুদে চেম্বারে রয়েছে পাঁচটা যুদ্ধক্ষেত্রের মডেল। প্রতিটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে শত শত সৈন্য রথ নিয়ে আক্রমণের জন্য তৈরি। সৈনিক, ঘোড়া, রথ, অস্ত্র সবই স্বর্ণের। প্রতিটি মূর্তি বা আকৃতির গায়ে ফারাও-এর নাম খোদাই করা। এ পাঁচটা দোকান বা স্টোর দেখে এতোই বিহ্বল হয়ে পড়লো রোয়েন, নিকোলাসের গায়ে হেলান দিতে বাধ্য হলো, মনে হলো অসুস্থ হয়ে পড়বে। একটা স্টোরে সৈন্য সংখ্যা গুনতে শুরু করলো নিকোলাস, কিছুক্ষণ পর হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, এভাবে সম্ভব নয়, বের করে গুনতে হবে-পরে।

কত ভরি ওজন একজন সৈনিকের? বিড়বিড় করে জানতে চাইলো রোয়েন।

একটা মূর্তি হাতে নিয়ে ওজন পরীক্ষা করলো নিকোলাস। পনেরো থেকে বিশ ভরির কম নয়, বলল ও।

কয়েক হাজার সৈন্য, তাই না? আবার ফিসফিস করলো রোয়েন।

সৈন্য, সেবিকা, ঘোড়া, রথ, অস্ত্র, ঢাল, পানপাত্র-সব মিলিয়ে আনুমানিক ত্রিশ হাজার পিস।

দাম….না, থাক! হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো রোয়েন।

সোনার দাম এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়, বলল নিকোলাস। প্রত্ন নিদর্শন হিসেবে মূল্য ধরতে হবে। প্রতিটি মূর্তিকে খোদাই করা রয়েছে ফারাও-এর নাম ও সীল। একটা মূর্তির জন্য একজন কালেক্টর দশ লাখ ডলার দিতেও হয়তো আপত্তি করবেন না।

নিকোলাসের দিকে অবিশ্বাস ভরা চোখে তাকালো রোয়েন। যাহ্! এতো?

এতোই। কিংবা আরো বেশি। এগুলো আমরা, যুদ্ধ ক্ষেত্রের এ মডেল পাঁচটা, লম্বা ক্রেটে ভবে। আমার ধারণা দুটো ক্ৰেটেই সবগুলোর জায়গা হয়ে যাবে।

চারদিকে চোখ বুলাচ্ছেল রোয়েন, হঠাৎ নিকোলাসের হাত ধরে ঝাঁকালো। নিকোলাস, স্টোরের সারি একটা নয়! দেখুন, প্রথম সারর পেছনে আরো এক সারি স্টোর রয়েছে।

একজোড়া স্টোরের মাঝখানে সরু প্যাসেজ দেখা গেল, তার ভেতর দিয়ে পেছনের সারির স্টোরগুলোর সামনে চলে এলো ওরা। তারপর দেখা গেল, দুই সারি নয়, আসলে তিন সারি স্টোর রয়েছে। প্রতিজোড়া স্টোরের মাঝখানের দেয়ালে চোখ জুড়ানো সব ছবি আঁকা, সবগুলোতেই রাজার জীবনকাহিনীর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো ছবিতে কন্যাদের সঙ্গে খেলছেন বা কৌতুক করছেন, কোনো ছবিতে পুত্রসন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করছেন। মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে মিটিং করছেন বা উপপত্নীদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। ভোজনের দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, পুরোহিতদের সঙ্গে বসে আছেন রাজা। প্রতিটি মানুষকে আঁকা হয়েছে চোখে দেখে, প্রতিটি চরিত্রই বাস্তব থেকে নেওয়া।

বিশাল কামরাটার সেন্ট্রাল প্যানেলগুলোর সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা। একটা প্যানেলের দিকে হাত তুলে রোয়েন বলল, এটা নিশ্চয়ই টাইটার আত্মপ্রতিকৃতি। ওটা একজন খোঁজা ব্যক্তির প্রতিকৃতি।

নিজের চেহারা আঁকতে গিয়ে টাইটা কী পোয়েটিক লাইসেন্স নিয়েছে? নাকি সত্যিসত্যি এতো সুদর্শন ছিল সে? ক্রীতদাসের চেহারায় এতোটা আভিজাত্য থাকতে পারে?

সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়ে টাইটার বৃদ্ধিদীপ্ত চোখ জোড়া। সেই চোখে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী দৃষ্টি। শিল্পীর হাত এতো ভালো, ওরা যে তীব্র দৃষ্টিতে তাকে দেখছে, সে-ও ওদেরকে একই দৃষ্টি ফিরিয়ে দিচ্ছে। ক্ষীণ, স্মিত হাসি লেগে রয়েছে টাইটার মুখে। পেইন্টিংটা বার্নিশ করা, ফলে সুরক্ষিত রয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে গতকাল আঁকা হয়েছে ছবিটা। টাইটার ঠোঁট একটু ভেজা ভেজা, চোখ দুটোয় চকচকে ভাব।

গায়ের রঙ ফর্সা,  মন্তব্য করলো নিকোলাস। চোখ নীল। তবে লাল চুল রঙ–করা হয়েছে হেনা দিয়ে।

কে জানে কোথায় টাইটার জন্ম। স্ট্রোলের কোথাও এ সম্পর্কে কিছু বলেনি টাইটা। গ্রিস বা ইটালি হতে পারে না। জলদস্যু হতে পারে? জার্মান বা ভাইকিং? আসলে টাইটার রুটস কোনো দিনই জানা যাবে না, সে নিজেও সম্ভবত জানত না।

পাশের প্যানেলের দেখা যাচ্ছে তাকে, বলল নিকোলাস।

এ প্যানেলে রাজা ও রানীর সামনে নতজানু হয়ে প্রণাম করছে টাইটা, রাজা ও রানী পাশাপাশি দুটো সিংহাসনে বসে আছেন। হিচককের মতো, বলল রোয়েন। নিজের সৃষ্টির মধ্যে উপস্থিত থাকতে ভালোবাসত টাইটা।

আরো এক সারি স্টোরের সামনে দিয়ে হেঁটে এলো ওরা। এগুলোয় ঠাসা রয়েছে তৈজসপত্র বাসনকোসন, জার, গামলা, পানপাত্র, হাতা-চামচ। বেশিরভাগ সোনা বা রুপার তৈরি। পালিশ করা ব্রোঞ্জ আয়না দেখা গেল। মূল্যবান সিল্ক আর লিনেন-এর রোল রয়েছে, অনেক কাল আগেই পচে গিয়ে নরম ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয়েছে। তারপর, দু সারি স্টোরের মাঝখানের দেয়ালে দেখা গেল হিকসস-এর সঙ্গে যুদ্ধের দৃশ্য, যে যুদ্ধে ফারাও আহত হয়েছিলেন। হিকসসের নিক্ষিপ্ত তীর রাজার বুকে বিঁধে আছে, হাতে সার্জিকাল ইন্সট্রুমেন্ট, রাজার বুকের গভীর থেকে তীরটা বের করে আনছে।

এরপর ওরা সারি সারি কুলুঙ্গির সামনে এসে দাঁড়ালো, ভেতরে কয়েক শো সিডার কাঠের বাক্স বা চেস্ট। বাক্সগুলোর গায়ে রাজার প্রতীক চিহ্ন আঁকা, আর ছবিগুলোতে দেখা যায় রাজা টয়লেটে রয়েছেন, সুর্মা লাগাচ্ছেন চোখে, লাল রঙ দিয়ে রঙিন করছেন চেহারা, নাপিতরা তাঁর দাড়ি কামাচ্ছে, চাকর-বাকরা পরাচ্ছে রাজকীয় পোশাক।

কিছু বাক্সে রাজকীয় প্রসাধনী আছে, বলে উঠলো রোয়েন। বাকিগুলোতে ফারাও-এর কাপড়চোপড়।

পাশের দেয়ালের দৃশ্যগুলোয় দেখা যাচ্ছে রাজা বিয়ে করছেন। কুমারী লসট্রিস, রানী হতে যাচ্ছেন। টাইটা ছিল রানী লসট্রিসের ক্রীতদাস। সে তার কত্রীর অবয়ব আঁকার সময় সমস্ত মেধা ঢেলে দিয়েছে। রানীর চেহারার খুঁটিনাটি সূক্ষ্ম সব বৈশিষ্ট্য এতো নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে, নিষ্পলক তাকিয়ে শুধু দেখতেই ইচ্ছে করে। কোনো সন্দেহ নেই শিল্পী এখানে অতিরঞ্জনের স্বাধীনতা নিয়েছে। নগ্ন স্তন জোড়ার উপর সযত্নে টানা ব্রা শুধু নিখুঁত আকৃতি দেওয়ার কাজ করে নি, যৌন বিশুদ্ধতা ফুটিয়ে তোলারও চেষ্টা করেছে।

টাইটা কতোই না ভালোবাসত রানীকে, বলল রোয়েন, বলার সুরে ক্ষীণ ঈর্ষার ছোঁয়া থেকে গেল। প্রতিটি রেখায় তার প্রমাণ পাবেন আপনি।

মৃদু হেসে, এক হাতে রোয়েনের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো নিকোলাস।

পরবর্তী সারির কুলুঙ্গিতে আরো কয়েকশো কাঠের বাক্স রয়েছে, ঢাকনির উপর : রাজার ক্ষুদে প্রতিকৃতি, সমস্ত অলঙ্কার পরে আছেন। তাঁর আঙুল আর গোড়ালিতে আঙটি ও ঘুঙুর, বুক সোনার মেডেলে মোড়া, বাহু আর কব্জিতে বালা পরানো। একটা প্রতিকৃতিতে দেখা গেল রাজা একত্রিত দুই মিশরীয় রাজ্যের জোড়া মুকুট পরে আছেন। একটা লাল অপরটা সাদা-মুকুটের কপালে শকুন আর গোক্ষুরের মাথা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মুকুট ব্যবহার করতেন তিনি। সব মিলিয়ে বারোটা মুকুট দেখলো ওরা।

ঢাকনিতে যা দেখছি, বাক্সের ভেতরও কী তাই আছে? ফিসফিস করে জানতে চাইলো রোয়েন।

এমন কী নিকোলাসও চিন্তা করতে গিয়ে একটা ঢোক গিলল। রোয়েনের প্রশ্নের উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, এ বিপুল ঐশ্বর্য কল্পনা করা সত্যি কঠিন। কোনো বাক্স না খুলেই ইতোমধ্যে ওরা যা দেখেছে, তার মূল্য বুঝতে হলে কমপিউটার নিয়ে বসতে হবে। পরিমাণে এতো বিপুল প্রত্ন সম্পদ এর আগে কোথাও পাওয়া যায় নি।

আপনার মনে আছে, স্ক্রোলে কী লিখেছিল টাইটা?

এতো বেশি গুপ্তধন কোনো কালে কোথাও এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া হয় নি। ফারাও মামোসের ট্রেজার পুরোটাই আছে এখানে।

পেছনের অর্থাৎ তৃতীয় সারির স্টোরগুলোয় রয়েছে চীনামাটি আর কাঠের মূর্তি–উশব তি। এমন কোনো পেশা বা ব্যবসার লোক নেই যাদের মূর্তি এখানে পাওয়া যাবে না। পুরোহিত, লিপিকার, আইনবিশারদ, চিকিৎসক, কৃষক, মালী, রুটি আর মদ তৈরির কারিগর, নর্তকী, নাবিক, রজকিনী, সৈনিক, সাধারণ শ্রমিক, খোঁজা প্রহরী, রাজমিস্ত্রী, বাজনদার, মুসাফির, ভবঘুরে-সমাজের সর্ব স্তরের সবাই আছে, এমন কী বেশ্যাও। প্রত্যেকের হাতে নিজ নিজ পেশার যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম। এরা সবাই পরলোকে রাজার সঙ্গী হবে, সেবা করবে ফারাও-এর।

তোরণশোভিত বিশাল কামরার শেষ মাথায় এসে পৌঁছল ওরা। সামনে এককালে ছিল কয়েক সারিতে টাঙানো সাদা লিনেন। ওগুলোর রঙ এখন আর সাদা নেই, পর্দাও আর পর্দা নেই। সব পচে গিয়ে রিবনের মতো লম্বা হয়ে ঝুলে আছে, দেখে মনে হচ্ছে নোংরা মাকড়সার জাল অথচ তারপরও পর্দায় লাগানো রত্নগুলো রিবনের সঙ্গে ঝুলছে, জেলের জালে ধরা পড়া চকচকে মাছের মতো। জালের ভেতর আরো একটা দরজা দেখতে পেল ওরা।

ওটা নিশ্চয়ই মূল সমাধিতে ঢোকার পথ, ফিসফিস করলো রোয়েন। রাজা আর আমাদের মাঝখানে এখন শুধু পচা খানিকটা জাল ছাড়া আর কিছু নেই।

কিন্তু দু জনই ওরা পা বাড়াতে দ্বিধায় ভুগছে। সামনে কোনো বিপদ নেই তো? টাইটার তৈরি সবগুলো ফাঁদ কী ওরা পেরিয়ে এসেছে?

*

গেরিলাদের মধ্যে কোনো ডাক্তার নেই, কমান্ডার মেকই আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা করে, তার হাতের কাছে সব সময় একটা মেডিকেল কিটও থাকে। পাথরখনির কাছাকাছি একটা কুঁড়েতে টিসেকে বয়ে নিয়ে এলো গেরিলারা, কুঁড়েটা ঘাসের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ছেঁড়া ট্রাইজার আর শার্ট খুলে টিসের ক্ষতগুলো ডিসইনফেকট্যান্ট দিয়ে ধুলো মেক, তারপর ফিল্ড ড্রেসিং দিয়ে প্রায় সবগুলো ঢেকে দিল। তারপর উপুড় করা হলো টিসেকে, অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য। ব্যথা পেয়ে উফ করে উঠলো টিসে। মেক নরম সুরে বলল, আমার হাত ডাক্তারদের মতো ভালো নয়।

তবু আমার ভাগ্য যে তোমার হাতেই চিকিৎসা পাচ্ছি, বলল টিসে। জানো, মৃত্যু ভয়ের চেয়ে বেশি ভুগেছি তোমাকে আর দেখতে পাব না ভেবে।

নিজের প্যাক থেকে সোয়েটশার্ট আর ফেটিগ বের করে টিসেকে পরিয়ে দিল মেক, কয়েক সাইজ বড় হয়েছে গায়ে। কালচে, ফোস্কা পড়া ঠোঁট নেড়ে টিসে বিড়বিড় করলো, কুৎসিত লাগছে আমাকে, তাই না?

সাবধানে তার গালে আঙুল বুলাল মেক। আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে তুমি, চিরকাল তাই থাকবে।

ঠিক সেই মুহূর্তগুলির আওয়াজ শুনলো ওরা। অনেক দূর থেকে ভেসে এলো, বয়ে নিয়ে এলো উত্তরে বৃষ্টি ভেজা বাতাস। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো মেক। শুরু হয়েছে। কর্নেল নৃগু হামলা করেছেন।

আমার দোষ। আমিই তাঁকে… .

না, দৃঢ় সুরে বলল মেক। তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি কথা না বললে ওরা তোমাকে মেরেই ফেলত। আর হামলা ওরা এমনিতেও করত। ওয়েবিং বেল্ট তুলে কোমরে জড়ালো সে। এবার দূর থেকে ভেসে এলো মর্টার শেলের আওয়াজ। আমাকে এবার যেতে হবে, টিসে।

জানি। আমার জন্য চিন্তা করো না।

তোমার চিন্তাই যুদ্ধ করতে উৎসাহ যোগাবে আমাকে। আমার লোকজন মঠে নামিয়ে নিয়ে যাবে তোমাকে। এক পর্যায়ে সবাই ওখানে জড়ো হব আমরা। যা-ই ঘটুক, ওখানে আমার জন্য অপেক্ষা করবে তুমি। কর্নেল নগুকে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। তাঁর শক্তি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। খুব তাড়াতাড়ি আবার দেখা হবে আমাদের।

তোমাকে ভালোবাসি, ফিসফিস করলো টিসে। তোমার জন্য চিরকাল অপেক্ষা করব।

দরজার কাছে মাথা নিচু করে কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে গেল মেক।

*

পর্দার ফ্রেমে হাত ছোঁয়াতেই জালের মতো রিবনগুলো টাইলের মেঝেতে খসে পড়লো। জালে আটকানো রত্নগুলো মেঝেতে পড়ে জলতরঙ্গের মতো আওয়াজ তুললাম। জালের গায়ে ভেতরে ঢোকার জন্য যথেষ্ট বড় একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। রোয়েনের হাত ধরে পা বাড়ালো নিকোলাস, থামলো ইনার ডোরওয়ের সামনে। দরজা বা ফাঁকটার এক পাশে পাহারায় রয়েছে মহান দেবতা ওসিরিস-এর বিশাল এক মূর্তি, হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করা, এক হাতে বাঁকা লাঠি। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর স্ত্রী আইসিস, মাথায় লুনার ক্রাউন আর শিং। তাঁদের উদাস চোখের দৃষ্টি অনন্ত-অসীমের দিকে প্রসারিত, চেহারায় প্রশান্তির ভাব। বারো ফুট উঁচু জোড়া মূর্তির মাঝখান দিয়ে এগুলো রোয়েন ও নিকোলাস এবং অবশেষে ফারাও মামোসের আসল সমাধিতে পৌঁছে গেল।

ছাদটা গম্বুজ আকৃতির, গম্বুজ আর দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে-ফরমাল ও ক্ল্যাসিকাল। রঙ এখানে আরো গাঢ়, প্যাটার্নগুলো জটিল। যতটা আশা করেছিল ওরা তার চেয়ে আকারে ছোট চেম্বারটা। স্বর্গীয় ফারাও মামোসের বিশাল এ্যানিট কফিনেরই শুধু জায়গা হয়েছে।

কফিনটা বুক সমান উঁচু। সাইড প্যানেগুলো ভিত বা বেদীর সঙ্গে গাঁথা মনে হলো; ফারাও ও অন্যান্য দেবতাদের ছবি খোদাই করা। ঢাকনিতে একা শুধু রাজার চেহারা খোদাই করা হয়েছে, পুরো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ জুড়ে। দেখেই ওরা বুঝতে পারল, ঢাকনিটা এখনো আদি অবস্থানে রয়েছে, পুরোহিতের মাটির সীল পুরোপুরি অক্ষত। এ সমাধিতে কখনো কারো অনুপ্রবেশ ঘটে নি। ফারাও মামোসের মমি চার হাজার বছর ধরে নির্বিঘ্নে শুয়ে আছে এখানে।

তবে ওদেরকে বিস্মিত করলো অন্য দুটো জিনিস। কফিনের উপর পড়ে রয়েছে অদ্ভুত সুন্দর একটা ধনুক। লম্বায় প্রায় নিকোলাসের সমান, স্টক-এর পুরোটা দৈর্ঘ্য ইলেকট্রাম কয়েল দিয়ে জড়ানো-সোনা ও রুপার এ মিশ্রণ পদ্ধতি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

আরেকটা জিনিস, যা কখনই কোনো রাজকীয় সমাধিতে থাকার কথা নয়, দাঁড়িয়ে আছে কফিনের গোড়ার কাছে। পুতুল আকৃতির মানুষের একটা মূর্তি। এক পলক তাকিয়েই জিনিসটার উন্নত মান ও পরিচয় বুঝতে পারলো ওরা, খানিক আগে সমাধির বাইরে এ মূর্তির আঁকা মুখ দেখেছে ওরা তোরণশোভিত কামরাটায়।

টাইটার কথাগুলো, স্ক্রোলে ওরা পড়েছে, মনে হলো সমাধির ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এ মুহূর্তে, জোনাকির মতো জ্বল জ্বল করছে কফিনের উপর

শেষবারের মতো যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম পাথুরে শবাধারের কাছে, সমস্ত শ্রমিকদের দূরে সরিয়ে দিলাম আমি। আমার পরে আর কারো পা পড়বে না এ সমাধিতে। একা হতে কাপড়ের পুঁটুলিটা খুললাম। সেই লম্বা ধনুক-লানাটা বেরুলো ওটা থেকে। আমার মিসট্রেসের নামে ওটার নাম দিয়েছিল ট্যানাস। কেবলমাত্র ওরই জন্য আমি তৈরি করেছিলাম ধনুকটা। আমাদের দু জনের পক্ষ থেকে শেষ এ উপহার ট্যাসের জন্য। সীল করা পাথরের কফিনের ডালার উপরে ওটা রেখে দিলাম।

আরো একটা জিনিস ছিল পুঁটুলিতে। আমার নিজহস্তে খোদাই করা একটা উশব তি পুতুল। শবাধারের পায়ের কাছে রাখলাম ওটা। ওটা খোদাই করার সময় তামার আয়না রেখেছিলাম সামনে–যাতে করে নিজের অবয়ব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি। পুতুলটা ছিল একটা ছোটো টাইটা।

পুতুলের নিচের অংশে কাঠ খোদাই করে লিখেছিলাম —

কফিনের গোড়ায় হাঁটুগেড়ে বসলো রোয়েন, ছোট্ট পতুলটা হাতে নিল। গোড়ায় খোদাই করা হায়ারোগ্লিফিক্স দেখছে। ওর পাশে হাঁটুগেড়ে নিকোলাস বলল, পড়ুন তো দেখি।

নরম সুরে শুরু করলো রোয়েন, ঠিক আছে। আমি টাইটা। আমি একজন চিকিৎসক এবং কবি। আমি একজন স্থপতি এবং দার্শনিক। আমি তোমার বন্ধু। তোমার পক্ষ থেকে আমি জবাবদিহি করব।

তাহলে দেখা যাচ্ছে সবই সত্যি, ফিসফিস করলো নিকোলাস।

ঠিক যেখান থেকে তুলেছে সেখানেই মূর্তিটা নামিয়ে রাখলো রোয়েন। তারপর মুখ তুলে নিকোলাসের দিকে তাকালো।

এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। আমি চাই এ মুহূর্ত যেনো শেষ না হয়।

কখনোই শেষ হবে না, প্রিয়। তোমার আর আমার কেবল শুরু। নিকোলাস বলল ওকে।

*

ওদেরকে আসতে দেখছে মেক। পাহাড়ের নিচের ঢালের কিনারা ঘেঁষে এগুচ্ছে দলটা। ঘন ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর দিয়ে আসছে, বুশ-ফাইটারের তীক্ষ্ণ সৃষ্টি ছাড়া দেখতে পাবার কথা নয়। প্রতিপক্ষ দলের শক্তি-সামর্থ্য উপলব্ধি করে হতাশ হলো মেক। ওরা ক্র্যাক ট্রপস, দীর্ঘ বহু বছর যুদ্ধ করে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। অত্যাচারী মেনজিসটুর বিরুদ্ধে লড়ার সময় এরাও তার দলে ছিল, ওদের অনেককেই সে ট্রেনিং দিয়েছে। পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় এখন ওরা তার সঙ্গে লড়তে আসছে। গোটা আফ্রিকা মহাদেশে এটাই হচ্ছে নিষ্ঠুর বাস্তবতা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সংগ্রামে পুষ্টি যোগায় প্রাচীন উপদলীয় কোন্দল, বর্তমান কালের রাজনীতিকদের লোভ আর দূনীতি।

তবে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করার সময় এটা নয়। নিচের রণক্ষেত্রে কি কৌশল কাজে লাগবে সেটাই এখন তাকে খুঁজে বের করতে হবে। ওরা যারা আসছে তারা অবশ্যই দক্ষ নৈতিক। খুব আর লোককেই দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগই গা ঢাকা দিয়ে আছে। কোম্পানি স্ট্রেংথ, ভাবল সে, তারপর নিজের ছোট্ট ফোর্সের দিকে তাকালো। পাথরের ভঁজে লুকিয়ে আছে চৌদ্দজন গেরিলা। চমকে দেয়ার সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর যতটা সম্ভব জোরালো আঘাত হেনে পিছু হটতে হবে ওদেরকে, কর্নেল নগুর মর্টার শেল ওদের শুয়ে থাকা জায়গায় ছুটে আসার আগেই।

আকাশের দিকে তাকিয়ে মেক ভাবল কর্নেল নগু বিমান হামলাও শুরু করবেন কিনা। আদ্দিসের এয়ার-বেস থেকে রুশ টুপোলেভ বহুবার এখানে আসতে সময় নেবে পঁয়ত্রিশ মিনিট। নাপামের গন্ধটা কল্পনা করলো সে, মনের চোখ দিয়ে দেখতে পেল আগুনের ঢেউ ওদের দিকে দ্রুত গড়িয়ে আসছে। তবে না, বিমান হামলার ঝুঁকি কর্নেল নগু বা তার পে-মাস্টার জার্মান হের ফন শিলার নেবেন না। গিরিখাদে নিকোলাস যা আবিষ্কার করেছে সেসব দখল করাই ওঁদের উদ্দেশ্য, ধ্বংস করা নয়। লুটের মাল আদ্দিসের কাউকে ভাগ দিতেও ওঁরা রাজি হবেন না। অ্যাবে গিরিখাদে এটা তাদের ব্যক্তিগত অভিযান, সরকারকে জানাবার মতো বোকামি তারা করবে না।

ঢালের গা বেয়ে আবার নিচে নেমে গেল মেকের দৃষ্টি। শত্রুপক্ষ পাহাড়ের কিনারা ঘেঁষে ডানডেরা নদীর দিকে এগুচ্ছে, উদ্দেশ্য নদীর পাশে ট্রেইলে অবস্থান গ্রহণ। খানিক পরই ওপরে, এ দিকটার একটা পেট্রল পাঠাবে ওরা, নিজেদের একটা পাশ সুরক্ষিত করার জন্য, তারপরই সরাসরি ওপরে উঠবে। হ্যাঁ, ওই তো ওদেরকে দেখা যাচ্ছে। আট-না, দশজন লোক মুল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, সরাসরি তার নিচে থেকে উঠে আসছে উপর দিকে।

মেক সিদ্ধান্ত নিল, ওদেরকে যতোটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছতে দেবে সে। সব কয়টাকে সাবাড় করতে পারলে ভালো হত, কিন্তু সেটা বেশি আশা করা হয়ে যায়। চার-পাঁচজনকে গায়েল করতে পারলেই খুশি সে, বাকিগুলো ঝোঁপ-ঝাড়ের মধ্যে পড়ে তারস্বরে চিৎকার করুক। যুদ্ধে আহত লোকদের চিৎকার দারুণ উপকারী, সঙ্গী যোদ্ধারা মাথা নিচু করে রাখে, গুলি করার জন্য মাথা তুলতে ভয় পায়।

পাথর ঝড়ানো ঢালে চোখ বুলাল মেক। আরপিডি লাইট মেশিন গান প্রতিপক্ষের অ্যাডভান্ড গ্রুপের দিকে তাক করা হয়েছে। সালিম, তার মেশিন গানার, একজন ওস্তাদ। বলা যায় না, সে পাঁচ-সাতজনকেও ফেলে দিতে পারে। তারপর মেক দেখলো, তার ঠিক নিচেই রিজে একটা ফাঁক রয়েছে। খোলা রিজ পার হওয়ার ঝুঁকি ওরা নেবে না, ভাবল সে। ওপরে উঠবে ওই ফাঁক গলে, একজন একজন করে। তার আগে ফাঁকটার কাছাকাছি জড়ো হবে ওরা। তখনই সুযোগ পাবে তার গেরিলারা।

আবার আরপিডি-র দিকে তাকালো মেক। সালিম তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, অপেক্ষা করছে সঙ্কেত পাওয়ার। ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেল মেকের দৃষ্টি। যা ভেবেছে, লাইনটা এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে। বাম দিকের দীর্ঘদেহী লোকটা এরই মধ্যে পরিজশন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। তার দু পাশের দু জন লোক তির্যক এগোচ্ছে ফাঁকটার দিকে।

ঝোঁপ-ঝাড়ের সঙ্গে কর্নেল নগুর সৈনিকদের ক্যামোফ্রেজ হুবহু মিলে গেছে, তাদের অস্ত্র ক্যামোফ্লেজ নেটিঙে ঢাকা, রোদ যাতে প্রতিফলিত না হয়। ঝোঁপের ভেতর প্রায় অদৃশ্যই তারা, শুধু নড়াচড়া আর গায়ের রঙ ধরা পড়েছে চোখে। তারা এখন এতো কাছে, মাঝে মধ্যে দু একজনের চোখের মণি দেখতে পাচ্ছে মেক। কিন্তু এখনো তাদের মেশিন গানারকে সে দেখতে পাচ্ছে না।

প্রথম এক পশলা গুলিতেই প্রতিপক্ষের মেশিন গান স্তব্ধ করে দিতে হবে। আরে, ওই তো! ডান দিকের লাইনে দেখা যাচ্ছে গানারকে। লোকটা খাটো আর শক্ত-সমর্থ, কাঁধ দুটো ভারী, হাতগুলো লম্বা, লাইট মেশিন গানটাকে অনায়াসে বহন করছে নিতম্বের কাছে। অস্ত্রটা চিনতে পারলো মেক, রাশিয়ায় তৈরি ৭.৬২ আরপিডি। অ্যামুনিশন বেল্ট কাঁধ থেকে ঝুলছে, পিতলের কার্ট্রিজ চকচক করায় ধরা পড়ে গেল লোকটা।

নিচের নামছে মেক, বেসের চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বোল্ডার আড়াল দিচ্ছে তাকে। নিচের একেএম-এর রেট-অব-ফায়ার সিলেক্টর র‍্যাপিড-এর ঠেলে দিল সে, মুখের একটা পাখ ঠেকালো কাঠের স্টকে। জিনিসটা অ্যাসল্ট রাইফেল, তবে কারিগরি ফলিয়ে নিখুঁত করা হয়েছে।

মেক যেখানে শুয়ে আছে যেখান থেকে আরপিডি বহনকারী প্রতিপক্ষ লোকটা আর মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে, উঠে আসছে ঢাল বেয়ে। ডান দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল সে, আরো তিনজন লোক ফাঁকটা লক্ষ্য করে উঠছে-মাত্র এক পশলা গুলি করেই ওদের ব্যবস্থা করতে পারবে সালিম। এরপর আরপিডি মেশিন গানারের পেটে লক্ষ্যস্থির করলো সে, ট্রিগার টানলো তিনবার।

তিনটে বিস্ফোরণ তালা লাগিয়ে দিল কানে, তবে মেক দেখতে পেল বুলেটগুলো টার্গেট মিস করেনি, পেট থেকে গলা পর্যন্ত তিনটে গর্ত তৈরি করেছে। নিচেরটা লেগেছে নাভির কাছে, ওপরেরটা গলায়।

মেকের চারদিক থেকে গেরিলারা গুলি করছে। যে ভাবছে, কে জানে প্রথম দফায় কজনকে ফেলতে পারলে সালিম। না, দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। শত্রুপক্ষের সবাই ঝোঁপের নিচে। পাল্টা গুলিও হয়েছে, নীল ধোয়া দেখা যাচ্ছে ঝোঁপের মাথায়। কয়েক সেকেন্ড পার হয়ে গেল, তারপর শোনা গেল বিকট চিৎকার, আমাকে লেগেছে! আল্লাহর দোহাই, আমাকে বাঁচাও! তার চিৎকার পাহাড়ে লেগে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মেক তার একে এম-এ নতুন ক্লিপ পরালো।

গা, আরো, গান গা! বিড়বিড় করলো সে।

*

নিকোলাস আর রোয়েন তো হাত লাগালোই, কফিন থেকে ঢাকনিটা তুলতে হানশিত শেরিফের আরো আটজন লোকের সাহায্য নিতে হলো। তোলার পর সবার হাত-পায়ের পেশী থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো, খুব সাবধানে তারা সেটাকে সমাধির দেয়াল ঘেঁষে নামিয়ে রাখলো। এরপর কফিনের পাশে এসে ভেতরে তাকালো নিকোলাস ও রোয়েন।

পাথরের তৈরি কফিনের ভেতর আরো একটা কফিন রয়েছে, এটা কাঠের। এটার ঢাকনিতেও খোদাই করা হয়েছে ফারাও-এর আকৃতি। এখানে দেখানো হয়েছে তার লাশের ছবি, হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করা, এক হাতে বাঁকা লাঠি। চেহারায় ফুটে আছে সুখময় প্রশান্তি।

দ্বিতীয় কফিনটা বের করলো ওরা, পাথুরে ঢাকনির চেয়ে এটার ওজন কম। সাবধানে গোল্ডেন সীল আর শুকনো রেজিনের শক্ত স্তরে ফাটল ধরালো নিকোলাস, তা না হলে ঢাকনিটা আলগা করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় ঢাকনি সরাবার পর দেখা গেল ভেতরে আরো একটা কফিন। সেটা খোলার পর আরো একটা। এভাবে সব মিলিয়ে সাতটা কফিন পাওয়া গেল, একটার চেয়ে অপরটা আকারে একটু ছোট, তবে অলঙ্করণের মাত্রা ক্রমশ বাড়লো। সপ্তম কফিনটা পূর্ণ দৈর্ঘ্য একজন মানুষের চেয়ে আকারে সামান্য বড়, এটা তৈরি করা হয়েছে সোনা দিয়ে। পালিশ করা সোনায় ল্যাম্পের আলো পড়তে মনে হলো এক হাজার আয়না ঝলমল করে উঠলো, সমাধির প্রতিটি কোণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো সোনালি আভায়।

অবশেষে সপ্তম কফিন খোলার পর দেখা গেল ভেতরে ফুল রয়েছে। কুঁড়ি আর পাপড়িগুলো শুকিয়ে গেছে, অদৃশ্য হয়েছে রঙও। সুগন্ধও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, রয়েছে শুধু পচা একটা ঝাঁঝ। পাপড়িগুলোর এমন অবস্থা, ছুঁতে না ছুঁতেই খুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে। ফুলের নিচে রয়েছে মিহি লিনেন। এক সময় নিশ্চয়ই বকের পালকের মতো সাদা ছিল, এখন খয়েরি দেখাচ্ছে-পচা ফুলের রস ঝরে পড়ায়। নরম ভাজের ভেতর সোনার চকচকে ভাব দেখতে পেল ওরা।

কফিনের দু পাশে দাঁড়িয়ে নিকোলাস ও রোয়েন লিনেনের জাল ছাড়ালো। ওদের আঙুলের চাপে টিস্যু পেপারের মতো ছিঁড়ে গেল ওগুলো। দু জনেই নিজের অজান্তে বিস্ময়সূচক আওয়াজ করলো ফারাও-এর ডেথ-মাস্ক উন্মোচিত হয়ে পড়ায়। মানুষের মাথার চেয়ে সামান্য একটু বড় ওটা আকারে, তবে সংশ্লিষ্ট মানুষটির হুবহু প্রতিচ্ছবি বলতে হবে মুখোশটিকে। শিল্পীর কাজ এতো নিখুঁত, চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলো এতোকাল পরও অটুট রয়েছে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলো ওরা, স্ফটিকের চোখ দিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছেন ফারাও-ও, সেই চোখে বিষণ্ণ দৃষ্টি, মনে হলো যেনো অভিযোগও আছে। :

মমির মাথা থেকে মুখোশটা তুলতে সাহস সঞ্চয়ের জন্য সময় নিতে হলো ওদেরকে। তারপর যখন তুললাম, আরো প্রমাণ পেল যে প্রাচীন কালে রাজা ও তাঁর জেনারেল ট্যানাস-এর দেহ অদলবদল করা হয়েছে। ওদের চোখের সামনে যে মমিটা পড়ে রয়েছে সেটা পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে কফিনের তুলনায় বেশ বড়। আংশিক আচ্ছাদন মুক্ত অবস্থায় রাখা, অনেকটা গুঁজে ভরা হয়েছে।

রাজকীয় মমির সঙ্গে কয়েকশো তাবিজ আর মন্ত্রঃপূত কবচ থাকবে, আবরণের নিচে, ফিসফিস করে জানালো রোয়েন। এটা বিখ্যাত বা অভিজাত কোনো ব্যক্তির মমি, কোনোমতেই একজন রাজার হতে পারে না।

লাশের মাথা থেকে ব্যান্ডেজের ভেতরে স্তর খুব সাবধানে খুলল নিকোলাস, ফলে মোটা দাড়ির কুণ্ডলি পাকানো জট বেরিয়ে পড়লো। তোরণের ভেতর কামরাটায় ফারাও মামোসের যে প্রতিকৃতি আমরা দেখেছি, তাতে তাঁর দাড়ি ছিল হেনায় রাঙানো, বিড়বিড় করলো ও।

এটা দেখুন। এখানে মমির দাড়ি শুকনো ঘাসের মতো, সোনালি আর রুপার মতো। আর কোনো সন্দেহ নেই, আবার বলল ও। এটা ট্যানাস-এর মমি। ট্যানাস টাইটার বন্ধু ছিলেন, আর রানীর ছিলেন প্রেমিক।

রোয়েনের চোখে জল। হ্যাঁ, বলল ও। লসট্রিসের পুত্রসন্তানের আসল বাবা তিনিই, পরে যিনি ফারাও টামোস হয়েছিলেন, হয়েছিলেন বহু রাজার পূর্ব-পুরুষ। কাজেই ইনিই সেই ব্যক্তি, যার রক্ত প্রাচীন মিশরের ইতিহাস জুড়ে বইছে।

সেই অর্থে যে কোনো ফারাও-এর মতোই মহান ছিলেন তিনি, শান্ত সুরে বলল নিকোলাস।

*

কথাটা প্রথমে খেয়াল হলো রোয়েনের। নদী! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো, গলায় ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ ধার। নদী ফুলে উঠলে সব আবার হারিয়ে যাবে!

তবে সবই যে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারব, তা ভাববেন না। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না এক জায়গায় এতো সম্পদ থাকতে পারে। এ দিকে আমাদের সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, রোয়েন।

তাহলে? চেহারা দেখে মনে হলো কেঁদে ফেলবে রোয়েন।

সবচেয়ে সুন্দর আর গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো ক্রেটে ভরব আমরা, বলল নিকোলাস। আল্লাই জানে সে-সময়ও পাব কিনা।

কাজেই চরম ব্যস্ততার সঙ্গে কাজ শুরু করলো ওরা। পাঁচটা রণক্ষেত্রের সমস্ত স্বর্ণমূর্তি প্রথমে বাক্স বন্দি করা হলো। পাঁচটা লম্বা বাক্স লাগলো ওগুলোর জন্য।

মূর্তি, দেয়ালচিত্র, ফার্নিচার আর অস্ত্রগুলো নেওয়ার কথা ভাবতেই পারা গেল না। পড়ে থাকবে তৈজসপত্র, কাপড়-চোপড় আর কসমেটিক্সও। সোনার তৈরি বিশাল একটা রথও চার হাজার বছর ধরে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই রেখে যাবে ওরা।

ট্যানাসের মাথা থেকে সোনার ডেথ-মাস্ক তুলে নিল ওরা, তবে মমিটা কফিনের ভেতর থেকে গেল। তারপর নতুন প্রধান পুরোহিত মাই মেতাম্মাকে খবর পাঠালো নিকোলাস। তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল প্রাচীন সেইন্টের মরদেহ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে, সেটা গ্রহণ করার জন্য বিশজন সন্ন্যাসীকে নিয়ে চলে এলেন তিনি। ধর্মীয় সঙ্গীত গাইতে গাইতে ট্যানাস-এর কফিন বয়ে নিয়ে গেলেন তারা, মঠের মাকডাস-এর স্থাপন করা হবে।

ইতোমধ্যে পাঁচটা রণক্ষেত্রের সমস্ত মূর্তি বাক্সে ভরার কাজ শেষ হয়েছে। তবে এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে ডেথমাস্ক। একটা ক্রেটের ভেতর অনায়াসে ভরা গেল ওটাকে, পাশে শোয়ানো হলো টাইটার ক্ষুদে মূর্তিটাকে। ক্রেটে ফোম ভরা হয়েছে, ঢাকনির উপর ওয়াটারপ্রুফ ওয়াক্স ক্রেয়ন দিয়ে লেখা হলো-মাস্ক ও টাইটার কাঠের মূর্তি।

বেশিরভাগ গুপ্তধনই ফেলে যেতে হবে, কারণ হাতে সময় নেই। গায়ে ছবি আঁকা কাঠের টেস্টগুলো আর্টিফ্যাক্টস হিসেবে অমূল্য, ভেতরের জিনিসপত্র ছাড়াই। কিন্তু অসংখ্য চেস্টের মধ্যে থেকে কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা নেবে ওরা? শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, চেস্টের ঢাকনি ও গায়ে আঁকা ছবি দেখে বাছাই করা হবে। তার আগে কয়েকটা ঢাকনি খুলে দেখে নিতে হলো ছবির সঙ্গে ভেতরের জিনিসপত্র মেলে কি না। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে ফারাও তার ব্লু যুদ্ধ মুকুট পরে আছেন, সেই মুকুট ভেতরেও পাওয়া গেল। শুধু যে বু ক্রাউন তাই নয়, লাল আর শাদা মুকুট জোড়াও অন্য একটা চেস্টে পেল ওরা। সবগুলোই অক্ষত ও অটুট অবস্থায় রয়েছে।

এরপর শুধু ছোটখাট আর্টিফ্যাক্ট ভরা হলো অ্যামুনিশন ক্রেটে। আকারে যেগুলো বড়, যতোই ঐতিহাসিক মূল্য থাকুক, বাদ দিতে হলো। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, রাজকীয় অলঙ্কার আর মূল্যবান পাথর ভরা চেস্টগুলো ক্রেটের ভেতর জায়গা করে নিতে পারছে, ফলে শুধু পাথর আর অলঙ্কারই নয়, চেস্টগুলোও অবিশ্বাস্য দামে বিক্রি করা যাবে। তারপর বড় আইটেমগুলো, তিনটি মুকুট আর রত্নখচিত কয়েকটা রক্ষাবরণ সহ, সদ্য তৈরি বড় কয়েকটা বাক্সে ভরা হলো।

প্রতিটি অ্যামুনিশন ক্রেট ভরা হয়ে গেছে, তারপরও মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রত্ন সম্পদ নিতে পারছে ওরা। ক্রেটগুলো বয়ে আনা হলো সীল করা ডোরওয়ের বাইরে। লম্বা গ্যালারির আটটা মূর্তিও নিচ্ছে ওরা। ওগুলো বাক্সে ভরার কাজ শেষ হয়েছে, এ সময় সিঁড়ি বেয়ে প্রায় উড়ে আসতে দেখা গেল ড্যানিয়েলকে।

তুমি কি মরতে চাও, নিকোলাস? আর এক মিনিট সময়ও পাচ্ছ না। নদী ফুঁসছে, ফর গডস সেক! বাধটা যে কোনো মুহূর্তে চুরমার হয়ে যাবে।

তোরণের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো ড্যানিয়েল, স্তম্ভিত বিস্ময়ে চারদিকে তাকালো। তবে বিস্ময়ের ঘোরটা কয়েক মুহূর্তে পরই সামলে নিল সে।

মিনিট, নিকোলাস, ঘণ্টা নয়! যিশুর কিরে, বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তাছাড়া, গিরিখাদের মাথায় যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে কমান্ডার মেক। টাইটার পুল থেকে তুমি গুলির আওয়াজও শুনতে পাবে। মিস রোয়েনকে নিয়ে এখুনি আমার সঙ্গে বের হতে হবে তোমার।

ঠিক আছে, ঠিক আছে, বলল নিকোলাস।

ওদিকের সিঁড়ির নিচে, চেম্বারে, ক্রেটগুলো দেখেছ তো? মাথা ঝাঁকালো ড্যানিয়েল। গুড। ওগুলো মঠে নামিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো। তুমিই কাজটা সুপারভাইজ করবে, ঠিক আছে? বাকি সবাইকে নিয়ে ট্রেইলে তোমাকে আমরা অনুসরণ করব।

নিকোলাস দোহাই লাগে, সময় নষ্ট করো না। বিপদ এলে বলতে পারবে না আমি তোমাকে সাবধান করি নি।

তুমি যাও, আমরা আসছি, বলল নিকোলাস। বোটগুলো কোথায় আছে, জানো তো? মঠে পৌঁছেই ওগুলোয় বাতাস ভরার ব্যবস্থা করবে।

ড্যানিয়েল চলে যেতেই ছুটে তোরণের ভেতর ঢুকলো নিকোলাস, রোয়েন যেখানে এখনো ট্রেজার ভরছে ক্রেটে। যথেষ্ট হয়েছে, এবার চলুন!

কিন্তু নিকোলাস, এ সব আমরা ফেলে যেতে পারি না…

বেরোন, এক্ষুনি বেরোন! কঠিন সুরে ধমক দিল নিকোলাস। বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে! কী বলছি, শুনতে পাচ্ছেন, বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে!

আমি কি শুধু…

না, আর কিছুই নিতে পারবেন না। উঠুন! ঝুঁকে রোয়েনের বাহু ধরে টান দিল নিকোলাস।

ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল রোয়েন, ওর হাতে চেস্ট থেকে তোলা এক গাদা সোনার অলঙ্কার। এগুলো ফেলে যাই কী করে! ওগুলো ট্রাউজারের পকেটে ভরতে শুরু করলো।

ঝুঁকলো নিকোলাস, দু হাতে ধরে রোয়েনকে তুলে নিল বুকে, তারপর তোরণ পেরিয়ে এসে ছুটলো।

চেম্বারের দূর প্রান্তের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে হানশিত শেরিফের কয়েকজন লোক, প্রত্যেকের মাথায় একটা করে ক্রেট। এখানে পৌঁছে রোয়েনকে নামালো নিকোলাস, বলল, কোনো রকম পাগলামি করবেন না।

মাথা নাড়লো রোয়েন, মনে হলো কেঁদে ফেলবে। সিঁড়ি বেয়ে নিকোলাসের আগে ছুটলো সে। মাথায় বোঝা থাকলেও, পোটাররা শৃঙ্খলা বজায় রেখে দ্রুতই এগুচ্ছে। তাদের দীর্ঘ এক লাইনের মিছিলের সঙ্গে মিশে গেল নিকোলাস ও রোয়েন, আঁকাবাঁকা গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। প্রতিটি বাঁকে চক দিয়ে আঁকা চিহ্ন থাকার পথ চিনতে কোনো অসুবিধে হলো না। অবশেষে বিধ্বস্ত লম্বা গ্যালারিতে পৌঁছল ওরা। সীর করা ডোরওয়েটা ভেঙে গেছে, ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ড্যানিয়েল। ওদেরকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো সে।

তোমাকে না মঠে গিয়ে বোটগুলো রেডি করতে বললাম? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।

আমার একটা দায়িত্ব বোধ আছে, গম্ভীর সুরে বলল ড্যানিয়েল। তোমাদের নিয়ে যাই কীভাবে?

কথা না বলে তার কাঁধে হালকা একটা ঘুসি মারলো নিকোলাস, তারপর ছুটে অ্যাপ্রোচ টানেল পার হলো, উঠে এলো সিঙ্কহোল-এর উপর ভাসমান সেতুতে। ঘাড় ফিরিয়ে ড্যানিয়েলের দিকে তাকালো ও, হাঁপাচ্ছে, চিৎকার করে জানতে চাইলো, মেক কোথায়? টিসেকে তুমি দেখছ?

টিসে ফিরে এসেছেন, তবে তাঁর অবস্থা খুবই করুণ।

কেন, কী হয়েছে তার? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।কোথায় সে?

ফন শিলারের গরিলাটা ধরেছিল তাকে, মারধর করেছে। মেকের লোকজন মঠে নিয়ে গেছে তাকে। কথা হয়েছে বোটের কাছে অপেক্ষা করবে।

গুড। আর মেক?

কর্নেল নগুর আক্রমণ ঠেকাবার চেষ্টা করছে। সেই সকাল থেকে রাইফেল, গ্রেনেড আর মর্টারের আওয়াজ পাচ্ছি। মেকও পিছু হটে মঠে পৌঁছবে, বোটের কাছে অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য।

টানেলের শেষ কয়েক গজ পানির উপর দিয়ে ছুটলো ওরা। বাইরে বেরিয়ে এসে ক্রল করে টাইটার পুলকে ঘিরে থাকা নিচু পাঁচিলে উঠে পড়লো। ওখান থেকে চলে এলো পাহাড়ের গোড়ায় সরু কার্নিসে। মুখ তুলে নিকোলাস দেখলো হানশিত শেরিফের লোকজন দোলনার মতো দেখতে চওড়া কপিকলে তুলে পাহাড় প্রাচীরের চূড়ায় ক্রেটগুলো ওঠাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা শব্দ ঢুকলো কানে, সঙ্গে সঙ্গে চিনতেও পারল। গান ফায়ার! রোয়েনকে বলল ও।মেক লড়ছে এখনো, তবে পিছু হটে খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

ঝুলন্ত মাচায় উঠে পড়লো ওরা। পাহাড় প্রাচীরের চূড়ায় পৌঁছে চারদিকে তাকালো। মাথার উপর সূর্য, তেতে আগুন হয়ে আছে। সব কয়টা ক্রেট নিয়ে পোটাররা উপরে উঠেছে কিনা চেক করলো নিকোলাস। ঝোঁপ-ঝাড় ঢাকা ট্রেইল ধরে রওনা হয়ে গেল তারা, কলামের মাথায় থাকলো ড্যানিয়েল, গোড়ায় নিকোলাস ও রোয়েন। যুদ্ধের আওয়াজ এতো কাছে চলে এসেছে,ভয়ে কাপ ধরে যাচ্ছে বুকে। মনে হলো গিরিখাদের ভেতর মাত্র আধ মাইল দূরে লড়াই করছে ওরা। অটোমেটিক রাইফেলের আওয়াজ পোর্টারদের ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল,ঝোঁপ ঝাড়ের জঙ্গল পার হয়ে মেইন ট্রেইলে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছতে চাইছে ওরা, কর্নেল নগুর সৈনিকরা পথটা দখল করে নেওয়ার আগেই।

পথের জাংশনে পৌঁছবার আগেই স্ট্রেচার সহ একদল গেরিলাকে দেখতে পেল ওরা। তারাও মঠের দিকে যাচ্ছে। কাছাকাছি এসে নিকোলাস দেখলো স্ট্রেচারে শুয়ে রয়েছে টিসে। তার মুখে ব্যান্ডেজ আর করুণ চেহারা দেখে মোচড় দিয়ে উঠলো বুকটা। টিসে! কে আপনার এ অবস্থা করলো?

অভিমানী শিশুর দৃষ্টিতে নিকোলাসের দিকে তাকালো টিসে। থেমে থেমে, ফোঁপাতে দু একটা মাত্র শব্দ বলতে পারল।

হেলম! চাপা গলায় গর্জে উঠলো নিকোলাস। বেজন্মাটাকে ধরতে পারলে হয়? ওর পাশে এসে দাঁড়ালো রোয়েন, টিসেকে দেখে বিকৃত হয়ে উঠলো ওর চেহারা।

নিকোলাসকে ঠেলে সরিয়ে দিল রোয়েন, বলল, আপনি অন্য দিকে যান, আমি ওর পাশে থাকি।

নিকোলাস এক পাশে সরে এসে স্ট্রেচার বহনকারীদের একজনকে জিজ্ঞেস করলো, মিযরা, কি ঘটছে ও দিকে?

গিরিখাদের পুব দিকে থেকে একটা ফোর্স নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছেন কর্নেল নগু, বলল মিযরা। পাশ দিয়ে এগিয়ে এসেছে ওরা, তাই আমরা পিছু হটছি। এ যুদ্ধে আমরা অভ্যস্ত নই।

জানি, মন্তব্য করলো নিকোলাস। গেরিলারা সব সময় জায়গা বদল করবে। মেক কোথায়?

গহ্বরের পুব পাড় ধরে পিছু হটছেন তিনি, মিযরা যখন উত্তর দিচ্ছে, ওদের পেছন থেকে গোলাগুলির নতুন আরেক দফা আওয়াজ ভেসে এলো। ওই ওখানে উনি! মাথা ঝাঁকালো মিযরা। কর্নেল ন তাকে তাড়া করছেন।

তোমাকে সে কি নির্দেশ দিয়েছে?

ওইজিরো টিসেকে নিয়ে নৌকায় চড়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে।

ঠিক আছে। আমরাও তোমার সাথে যাবো।

*

অ্যাবে গিরিখাদের মাথায় জমাট বাঁধছে ঘন কালো মেঘ। পেগাসাস কোম্পানির জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টার সারি সারি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে উড়ছে। হেলম্ জানে মেক নিমুরের কাছে আরপিডি, রকেট-লঞ্চার আছে, গিরিখাদের ভেতর পাহাড়-শ্রেণীর আড়াল না নিয়ে উপায় নেই তাদের। ডান দিকের সিটে বসেছে যেনো পাইলটের পাশে। পেছনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসেছেন হের ফন শিলার আর : নাহুত গাদ্দাবি, দু জনেই পেছন দিকে ছুটস্ত উপত্যকার দিকে তাকিয়ে আছেন।

কয়েক মিনিট পরপর জ্যান্ত হয়ে উঠেছে রেডিও, কর্নেল নগুর লোকজন মর্টার সাপোর্ট চাইছে কিংবা লক্ষ্য অর্জনের রিপোর্ট দিচ্ছে।

ওরা কী গহ্বরের সেই জায়গায় পৌঁছেছে, জানতে চাইলেন ফন শিলার, হারপার নিকোলাস যেখানে কাজ করছে?

উত্তর পেতে আরো খানিকটা সময় লাগলো। রেডিও থেকে সরাসরি কর্নেল গুমার আওয়াজ ভেসে এলো। আমরা সফল হয়েছি, হের ফন শিলার। সমস্ত পজিশন দখল করে নিয়েছি। কপিকলে চড়ছে আমার লোকজন, গহ্বরের নিচে নামতে যাচ্ছে ওরা।

ফন শিলার পাইলটকে প্রশ্ন করলেন, ওখানে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে?

মিনিট পাঁচেক, স্যার।

পৌঁছবার পর জায়গাটাকে ঘিরে চক্কর মারবেন, সঙ্গে সঙ্গে ল্যান্ড করবেন না।

আকাশে থেমে দাঁড়ালো কপ্টার।

কি হলো? শিলার জানতে চান। কি দেখছো?

বাঁধ, জ্যাক হেল বলে। কুয়েনটন-হারপারের বাঁধ দেখছি। প্রচুর কাজ করেছে ব্যাটা।

বৃষ্টিস্নাত আলোয় বাঁধে আটকে পড়া নীলের জল গাঢ় আর কাদাটে দেখাচ্ছে। লম্বা উপত্যাকায় চারপাশে ফুঁসছে পানি।

পরিত্যক্ত! হেল বলে চলে, ওরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

নদীর তীরে হলুদ মতো ওটা কী? ফন শিলারের জিজ্ঞাসা।

ওটা দিয়ে মাটি সরায়। ওই যে, আমার ইনফরমার বলেছিল।

এখানে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। চলো নিচে গিয়ে দেখি! তর সইছে না ফন শিলারের।

পাইলটের কাঁধে হাত রেখে নির্দেশ দেয় হেলম্।

*

ট্রেইলের জাংশনে অপেক্ষা করছিল ড্যানিয়েল। নদী এখানে নতুন পথ ধরে সগর্জনে উপত্যকা বেয়ে নেমে যাচ্ছে, নামার পথে আদি ট্রেইলের কিছুটা অংশ ডুবিয়ে দিয়েছে। মাথায় ক্রেট নিয়ে পোর্টাররা উঠে যাচ্ছে উঁচু জমিনে।

হানশিত কোথায়? ড্যানিয়েলকে জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। পোটারদের দীর্ঘ লাইনে তরুণ হানশিত শেরিফকে দেখে নিও।

আমিতো জানতাম সে তোমার সঙ্গে আছে, জবাব দিল ড্যানিয়েল।

ফেলে আসা পথের দিকে তাকালো নিকোলাস, ঝোঁপ-ঝাড়ে ঢাকা ট্রেইলে আর কেউ নেই। কে এখন খুঁজতে যায়! মঠে তাকে একাই ফিরতে হবে। ও থামতেই দূর থেকে হেলিকপ্টারের আওয়াজ ভেসে এলো। পেগাসাসের কপ্টার, ভাবল নিকোলাস। আওয়াজ শুনে বোঝা যাচ্ছে সরাসরি টাইটার হ্রদের দিকে যাচ্ছেন ফন শিলার। তার মানে ওরা কোথায় কাজ করছিল, জার্মান ধনকুবের আগে থেকেই তা জানে।

আওয়াজটার দিকে মুখ তুলে রয়েছে রোয়েনও, আশা ঘন কালো মেঘের গায়ে কোথাও হেলিকপ্টারটাকে দেখতে পাবে। শুয়োরের দলটা আমাদের সমাধিতে ঢুকলে পবিত্র একটা জায়গায় মর্যাদা নষ্ট হবে, বলল ও, গলায় রাগ।

হঠাৎ এগিয়ে এসে স্ট্রেচারের পাশে দাঁড়ানো রোয়েনের একটা হাত চেপে ধরল নিকোলাস। ঠিক বলেছেন আপনি! টিসেকে নিয়ে মঠে চলে যান আপনি। আমি একটু পরে আসছি। রোয়েন প্রতিবাদ করার আগেই ছুটে ড্যানিয়েলের সামনে চলে এলো ও।

ড্যানিয়েল, মেয়ে দুটোর দায়িত্ব তোমার উপর থাকলো।

নিকোলাসের পেছনে চলে এলো রোয়েন। কী করতে চাইছেন, বলবেন। আমাকে?

ছোট্ট একটা কাজ আছে। খুব বেশি দেরি করব না।

নিশ্চয়ই আপনি ওখানে আবার ফিরে যেতে চাইছেন না?

আতঙ্কিত দেখালো রোয়েনকে। ধরতে পারলে ওরা আপনাকে স্রেফ খুন করবে…

চিন্তা করবেন না, বলে হেসে উঠলো নিকোলাস, তারপর রোয়েন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর ঠোঁটে পূর্ণ চুমো খেয়ে ঘুরে দাঁড়ালো, ফিরতি পথে ছুটছে। টিসের দিকে খেয়াল রাখবেন।

নিকি! পেছন থেকে বৃথায় ডাকলো রোয়েন।

*

বাঁধের উপর দিয়ে উড়ে এলো জেট রেঞ্জার। বাঁধ পিছিয়ে পড়তে গিরিখাদের আরো গভীরে নামলো কপ্টার। দু পাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়-প্রাচীন, মাঝখানে সরু ফাঁক, তার ভেতর দিয়ে ছুটছে ওরা। গহ্বরটা প্রায় শুকনো এখন, জমে থাকা পানি স্থির। ওই তো! ওই তো ওরা! সরাসরি সামনে হাত তুলল হেলম্। ওদিকে একদল লোককে দেখা যাচ্ছে, গহ্বরের কিনারায়। কর্নেল নগুকে আমি চিনতে পারছি। তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের স্পাই, হানশিত শেরিফ।

ইঞ্জিনের আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠলো তার গলা, পাইলটকে বলল, তুমি ল্যান্ড করতে পারো। ওই দেখো, কর্নেল নগু হাত নাড়ছেন।

হেলিকপ্টারের স্কিড জমিন স্পর্শ করতেই হানশিতকে নিয়ে ছুটে এলেন কর্নেল। নগু। ফন শিলারকে নিচে নামতে সাহায্য করলো ওরা, ঘুরন্ত রোটরের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনল। আমার লোকেরা জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। ডাকাতদের ধাওয়া করেছিলাম, উপত্যকার দিতে সরে যেতে বাধ্য করেছি। তারপর হানশিত শেরিফের পরিচয় দিলেন নণ্ড। হানশিত হারপার নিকোলাসের সঙ্গে সমাধির ভেতর ছিল, টানেলের প্রতিটি ইঞ্চি চেনে।

ইংরেজি বোঝে? জানতে চাইলেন ফন শিলার।

এক-আধটু।

গুড! গুড! হানশিতের দিকে তাকালেন ফন শিলার।

ওহে, সন্ন্যাসী, পথ দেখাও আমাকে। আসুন, নাহুত, আপনিও আমার সঙ্গে আসুন। প্রচুর বেতন দেওয়া হয়েছে আপনাকে, এবার কিছু কাজ দেখান।

পথ দেখিয়ে ওদেরকে পাহাড়-প্রাচীরের কিনারায়, কফিকলের কাছে নিয়ে এলো হানশিত। কিনারা থেকে উঁকি দিয়ে গহ্বরের নিচে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন ফন শিলার। কপিকলের বাঁশের কাঠামো ভঙ্গুর আর নড়বড়ে মনে হলো। পেছন থেকে হানশিত বলল, সমাধিতে নামার এটাই একমাত্র পথ।

চোখ বুজে রশির দোলনায় বসলেন ফন শিলার। একে একে নিচে নামলো ওরা। টানেলটা কোথায়? চারদিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন ফন শিলার।

হাত তুলে পাহাড়-প্রাচীরের গোড়ার ফাঁকটা দেখালো হানশিত। টাইটার পুলকে ঘিরে থাকা নিচু পাঁচিলের উপর দিয়ে সরু কার্নিসে চলে এলো সবাই। হেলম্ আর কর্নেলের দিকে তাকালেন ফন শিলার। হেলমকে নিয়ে আপনি এখানে পাহারায় থাকুন, কর্নেল, বললেন তিনি। হানশিত আর নাহুতকে নিয়ে ভেতরে ঢুকছি আমি। হেলমের দিকে তাকালেন। দরকার হলে তোমাদেরকে আমি ডেকে পাঠাব।

আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারলে খুশি হতাম, বলল হেলম্। আপনার নিরাপত্তার দিকটা….

ভুরু কুঁচকে ফন শিলার বললেন, যা বলছি শোনো। টানেলের মুখে ঢুকে পড়লেন তিনি। নাহুত আর হানশিত তাকে অনুসরণ করলো। এতো আলো। আসছে কোত্থেকে? জানতে চাইলেন ফন শিলার।

হানশিত বলল, একটা মেশিন আছে। তারপর ওরা শুনতে পেল সামনে থেকে জেনারেটরের অস্পষ্ট যান্ত্রিক গুঞ্জন ভেসে আসছে। সিঙ্কহোলের উপর ভাসমান সেতুতে না পৌঁছনো পর্যন্ত ওদের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না।

এখানে পানি কেন? বিড়বিড় করলেন নাহুত। মিশরীয় অন্য কোনো প্রাচীন সমাধিতে পৌঁছতে হলে এ রকম পানি পেরুতে হয়েছে বলে তো শুনিনি।

আপনি বেশি কথা বলেন, ধমক দিলেন ফন শিলার। আগে দেখতে দিন এ লোক আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যায়।

সেতু পার হওয়ার সময় হানশিতের কাঁধে ভর দিয়ে থাকলেন তিনি। এখান থেকে টানেল ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠে গেছে। হাই-ওয়াটার মার্ক ছাড়িয়ে এলো ওরা। টানেলের দেয়ালের দিকে পালিশ করা পাথর, লক্ষ্য করে ফারুকরি মন্তব্য করলেন, নাহ, আমারই ভুল হয়েছিল। টানেলের এ দিকে তো দেখছি মিশরীয় প্রভাব স্পষ্ট।

বিধ্বস্ত গ্যালারির বাইরে ল্যান্ডিঙে পৌঁছল ওরা। এখানে জেনারেটর রয়েছে। ইতোমধ্যে হাঁপিয়ে গেছেন ফন শিলার ও নাহুত, দু জনেই ঘামছেন–যতোটা না ক্লান্তিতে, তারচেয়ে বেশি উত্তেজনায়।

যতো দেখছি ততোই আশা জাগছে বুকে, বললেন নাহুত। এটা কোনো রাজকীয় সমাধি হওয়া বিচিত্র নয়।

এক পাশের দেয়াল ঘেঁষে স্তূপ করা রয়েছে প্লাস্টার সীল, হাত তুলে সেগুলো নাহুতকে দেখালেন ফন শিলার। ওগুলোর সামনে হাঁটু গাড়লেন নাহুত, মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেন।

ফারাও মামোসের সীল, উত্তেজনায় কেঁপে গেল তাঁর গলা। সঙ্গে লিপিকার টাইটার সই। চকচকে চোখ তুলে শিলারের দিকে তাকালেন। এখন আর কোনো সন্দেহ-ই নেই। আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম সমাধিতে নিয়ে আসব, এনেছিও।

কয়েক মুহূর্ত কথা বললেন না ফন শিলার। তারপরই যেনো বিস্ফোরিত হলেন। কিন্তু কি লাভ হলো? সবই তো ভেঙে নষ্ট করা হয়েছে।

না! না! ব্যাকুল সুরে আশ্বস্ত করলো হানশিত। এ দিকে আসুন। সামনে আরো একটা টানেল আছে।

আবর্জনার ভেতর দিয়ে পথ করে এগুলো ওরা, হানশিত ব্যাখ্যা করছে গ্যালারির ছাদ কীভাবে ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর আসল প্রবেশপথটা সেই আবিষ্কার করেছিল, এ কথা জানাতেও ভুলল না। সবশেষে বলল, সামনে রাশি রাশি গুপ্তধন পড়ে আছে, দেখে আপনাদের মাথা ঘুরে যাবে।–ঠিক আছে, বললেন ফন শিলার। সরাসরি সমাধিতে নিয়ে চলো আমাকে। আমার হাতে সময় খুব কম।

গোলকধাঁধা অর্থাৎ বাওবোর্ডের জটিল ছক ধরে পথ দেখালো হানশিত, লুকানো সিঁড়ি বেয়ে ওদেরকে তুলে আনল, তারপর ক্রমশ নিচু টানেল ধরে এগুলো।

অবশেষে তোরণশোভিত কামরার সামনে এসে থামলো ওরা। কামরার ভেতর দেয়ালচিত্র দেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন নাহুত। এতো সুন্দর দেয়ালচিত্র জীবনে কখনো দেখিনি আমি।

এ রকম কিছু আমিও আশা করি নি, ফিসফিস করলেন ফন শিলার। আমি মুগ্ধ, আমি ধন্য!

কামরার প্রতিটি দিক অমুল্য ট্রেজারে ভর্তি, বলল হানশিত। ওখানে এমন সব জিনিস আছে, স্বপ্নেও আপনারা দেখেন নি। হারপার নিকোলাস খুব অল্পই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পেরেছেন, ছোট কয়েকটা বাক্সে ভরে। আর্টিফ্যাক্টের পাহাড় ফেলে রেখে গেছেন তিনি।

কফিনটা…কফিনটা কোথায়? রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলেন ফন শিলার। মমি! মমি!

ওটা ছিল সোনালি একটা কফিনে। হারপার নিকোলাস সেটা প্রধান পুরোহিতকে দান করেছেন। সন্ন্যাসীরা ওটা মঠে দিয়ে গেছে।

কর্নেল নগুকে দিয়ে ওটা আনিয়ে নেব আমরা, বললেন নাহুত। আপনি চিন্তা করবেন না, হের ফন শিলার।

তোরণ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন ওঁরা, তারপর ছুটলেন। প্রথম সারির একটা স্টোরের সামনে এসে দাঁড়ালেন ফন শিলার, শিশুর মতো অবিরাম হাসছেন।

অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য! একই কথা বারবার বলছেন। কাঠের একটা চেস্ট স্তূপ থেকে নামালেন তিনি, কাঁপা হাতে খুলে ফেললেন ঢাকনি। ভেতরের জিনিসগুলো দেখে বোবা হয়ে গেলেন। চেস্টের উপর ঝুঁকে নরম সুরে কাঁদছেন।

*

ড্যানিয়েলের হলুদ ফ্রন্ট-এন্ড ট্র্যাক্টরের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসেছে নিকোলাস। হাইড্রলিক কন্ট্রোল অপারেট করছে গভীর মনোযোগের সঙ্গে, ক্রেনটাকে খাড়া করলো যতটুকু পারা যায়। নদী আক্ষরিক অর্থেই ফুঁসছে, বাঁধের মাথা ছুঁতে আর বেশি সময় নেবে না। বাঁধ ভাঙবেই, তবে সময়টা আরো খানিক এগিয়ে আনতে চেষ্টা করছে ও। ক্রেনের যান্ত্রিক হাত কাজ শুরু করলো, বাঁধের মাথা থেকে জালে আটকানো পাথর একটা একটা করে তুলে ফেলে দিচ্ছে পানিতে।

ওদিকে, উন্মাদের মতো আচরণ করছেন ফন শিলার। চেস্ট খুলে রাজকীয় অলঙ্কার শূন্যে ছুঁড়ছেন, চড়িয়ে দিচ্ছেন চারদিকে, ছুটে এসে এমন জায়গায় দাঁড়াচ্ছেন, ওগুলো যাতে তাঁর মুখ আর মাথায় পড়ে। সেই সঙ্গে অট্টহাসি হাসছেন, পাক খাচ্ছেন লাটিমের মতো, আবার কখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছেন। নাহুতও আবেগে আপ্লুত, তবে তিনি শিলারের আচরণ হাঁ করে গিলছেন।

খানিক পর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ফন শিলার ফিসফিস করলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আর্কিওলজিকাল ডিসকভারি। এখনো তিনি কাঁপছেন, রুমাল বের করে মুখ মুছলেন।

আমাদের সামনে কয়েক বছরের কাজ, ভাবাবেগের লাগাম টেনে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলেন নাহুত। এ অবিশ্বাস্য কালেকশনের ক্যাটালগ তৈরি করতে হবে, তারপর মূল্যায়নের পালা। আবিষ্কারক হিসেবে আপনার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একেই বলে মিশরীয় অমরত্ব, আপনার নাম কেউ কোনোদিন ভুলবে না, হের ফন শিলার।

নিষ্পলক দৃষ্টিতে নাহুতের দিকে তাকিয়ে থাকলেন ফন শিলার। এ চিন্তাটা আগে তাঁর মাথায় ঢোকে নি। অমরত্ব লাভের এ সুবর্ণসুযোগ কেন তিনি হাতছাড়া করবেন? প্রথমে ভেবেছিলেন মামোসের ট্রেজার সবই একা দখল করবেন তিনি, কাউকে কোনো ভাগ দেবেন না। নাহুতের কথা শুনে এখন ভাবছেন, ফারাওদের মতো অমর হতে বাধা কোথায়? মমোসের ট্রেজার সাধারণ লোকের দ্রষ্টব্য বস্তুতে পরিণত হোক, এটা তিনি চান না, অন্তত তাঁর মৃত্যুর আগে নয়। না! নাহুতের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন তিনি। এই গুপ্তধন আমার, একা শুধু আমার! আমি মারা গেলে সব আমার সঙ্গে যাবে। আমি একটা উইল তৈরি করব। আমি মারা যাবার পর কী করতে হবে আমার ছেলেরা তা জানবে। আমার সমাধিতে থাকবে সব। ওটা হবে আধুনিক কালে ফারাও ফন শিলারের রাজকীয় সমাধি।

মানুষটা যে সত্যিকার অর্থে পাগল, আজই প্রথম উপলব্ধি করছেন নাহুত। তবে তিনি জানেন যে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। যা করার পরে মাথা খাঁটিয়ে বের করতে হবে। এ বিপুল প্রত্ন নিদর্শন আরেকটা সমাধিতে হারিয়ে যাবে, তা তিনি হতে দেবেন না। মাথা নত করে আনুগত্য প্রণাম করলেন তিনি, আপনি যা বলেন, হের, ফন শিলার। তবে এ মুহূর্তে আমাদের প্রথম চিন্তা, নিরাপদে সব বাইরে বের করে নিয়ে যাওয়া। হেলম্ আমাদেরকে নদীর কথা বলে সাবধান করে দিয়েছেন। তাকে আর কর্নেলকে এখানে ডাকা দরকার, সমাধি খালি করতে হবে। প্যাক করে ওখান থেকে পাঠিয়ে দেব জার্মানিতে।

হ্যাঁ, ঠিক আছে। হেলম আর কর্নেলকে ডেকে পাঠান। রাজি হলেন ফন শিলার।

হানশিত, কোথায় তুমি? চিৎকার করলেন নাহুত।

খালি কফিনের সামনে হাঁটুগেড়ে প্রার্থনা করছে তরুণ সন্ন্যাসী। উঠে এসে নাহুতের সামনে দাঁড়ালো। যাও, ওদেরকে ডেকে আনো…., হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি, কান পাতলেন। ও কিসের শব্দ?

মাথা নাড়লো হানশিত, ছোটে আঙুল রেখে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিল। শুনুন! শুনুন!

হঠাৎ আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে গেল ফারুকরির চোখ। আওয়াজটা বহুদূর থেকে আসছে, খুবই নরম, বাতাসের দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো।

কিসের শব্দ? জিজ্ঞেস করলেন ফন শিলার।

পানি! ফিসফিস করলেন নাহুত। ছুটন্ত পানির আওয়াজ!

নদী! কর্কশ শোনার হানশিতের গলা। টানেলের ঢুকে পড়ছে নদী! ঘুরলো সে, তারপর কামরা থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল।

আমরা এখানে আটকা পড়ব! চেঁচিয়ে উঠে তার পিছু নিলেন নাহুত।

দাঁড়ান! অপেক্ষা করুন! গলা ফাটালেন ফন শিলারও, পিছু নিলেন ওদের। কিন্তু নাহুত ও হানশিত তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, স্বভাবতই পিছিয়ে পড়ছেন তিনি।

তবে নাহুতের চেয়ে দ্রুত ছুটছে হানশিত, গ্যাস্ট্র্যাপ-এর সিঁড়ি বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।

হানশিত! ফিরে এসো! আমি তোমাকে হুকুম করছি! ছুটতে ছুটতে হাঁক ছাড়ছেন নাহুত, কিন্তু হানশিত থামলো না। টানেলের জটিল গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল।

নাহুত, কোথায় আপনি? পাথুরে করিডরে শিলারের কাঁপা কাঁপা গলা প্রতিধ্বনি তুলছে। নাহুত শুনতে পেলেও সাড়া দিলেন না। ছুটছেন তিনি, তাঁর ধারণা হানশিতকে ঠিকমতোই অনুসরণ করছেন এখনো। খানিক পর মনে হলো সামনে থেকে হানশিতের পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে।

আরো তিনটে বাঁক ঘোরার পর নাহুত উপলব্ধি করলেন, গোলকধাঁধার ভেতর হারিয়ে গেছেন তিনি। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা মনে হলো বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়লেন, চিৎকার করে ডাকলেন, হানশিত! কোথায় তুমি?

উত্তরে পেছন থেকে শিলারের আতঙ্কিত গলা ভেসে এলো, নাহুত! নাহুত! এখানে আমাকে ফেলে যাবেন না! তার ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ ক্রমশ কাছে সরে আসছে।

শাট আপ ধমক দিলেন নাহুত। বোকার মতো চেঁচাবেন না! হাঁপাচ্ছেন তিনি, হানশিতের পায়ের আওয়াজ শোনার আশায় আবার কান পাতলেন। কিন্ত পানির কলকল ছলছল হাসি ছাড়া আর কিছু শুনতে পেলেন না। আওয়াজটা মনে হলো তাঁর চারদিক থেকে ভেসে আসছে।

না! হানশিত, আমাকে ফেলে যেয়ো না! আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ছুটলেন আবার, কোত্থেকে কোথায় যাচ্ছেন নিজেও জানেন না।

*

আঁকাবাকা টানেলের প্রতিটি মোচড় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে হানশিত, মৃত্যুভয় তার পায়ে বিপুল গতি এনে দিয়েছে। কিন্তু মাঝখানের সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে হোঁচট খেলো সে, বাঁকা হয়ে গেল গোড়ালি, ধপাস করে পড়ে গেল সিঁড়ির ধাপে। গড়াতে গড়াতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল শরীরটা, লম্বা গ্যালারির নিচে এসে স্থির হলো।

অনেক কষ্টে, ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে সোজা হলো সে। যদিও ছুটতে গিয়ে আবার পড়ে গেল, মচকানো গোড়ালি বিপদের সময় সাহায্য করতে রাজি নয়। যতোক্ষণ শ্বাস ততোক্ষণ আশ, ক্রল করে এগুল হানশিত। দরজা পেরিয়ে এসে ল্যান্ডিঙে পৌঁছল, জেনারেটরের পাশে। টানেল থেকে সচল পানির আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজটা এখন আর নরম নয়, চাপা গর্জনের মতো শোনাচ্ছে, জেনারেটরের যান্ত্রিক গুঞ্জন প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। ও যিশু, ও মেরী, আমাকে বাঁচাও গো! দেয়াল ধরে সোজা হলে আবার, এক পায়ে লাফাতে লাফাতে হাঁটছে। লোয়ার লেভেলে পৌঁছনোর আগে আরো দু বার হোঁচট খেয়ে পড়লো।

হাঁটুর উপর সোজা হয়ে সামনে তাকালো হানশিত। টানেলের ছাদে ইলেকট্রিক আলো সাজানো রয়েছে, তার আলোয় নিচের সিঙ্কহোলটা দেখতে পেল সে। দেখেও প্রথমে চিনতে পারলো না, কারণ আগের সেই চেহারা আর নেই। পানির লেভেল পালিশ করা মেঝের নিচে নয় এখন। পানিতে বিপুল একটা আলোড়ন উঠেছে। ভাসমান সেতু ভেঙে গেছে, এরইমধ্যে ডুবে গেছে অর্ধেকটা।

সিঙ্কহোলের ওপারের টানেলে, টাইটার পুল হয়ে, ঢুকে পড়েছে পাগলা নদী। সিঙ্কহোল ভরাট হয়ে গেছে, এপারের টানেলে উঠে আসছে পানি সগর্জনে। কিন্তু হানশিত জানে, বাইরে বের হওয়ার এটাই একমাত্র পথ।

এক পায়ে লাফ দিয়ে ভাসমান একটা পন্টুনে পড়লো হানশিত, কিন্তু সেটা এতো দ্রুত ঘুরপাক খাচ্ছে যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। হামাগুড়ি দিয়ে বসলো সে, ওই অবস্থায় এক পন্টুন থেকে আরেক পন্টুনে চলে যাচ্ছে। এভাবে সিঙ্ক হোলের ওপারে পৌঁছল, টানেলের দেয়াল ধরে সোজা হলো আবার, একটা গর্তের ভেতর হাত গলিয়ে ঝুলে থাকলো। কিন্তু নদীর পানি শ্যাফটের ভেতর এখন তুমুল বেগে ঢুকছে, হানশিতের শরীরের নিচের অংশ টানা স্রোতের মধ্যে পড়ে গেল। পানি ঠেলে সামনে এগুতে পারছে না সে, গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে হাতটা।

মাথার উপর টানেলের ছাদে এখনো ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে, টানেলের শেষ মাথায় টাইটার পুলে বেরুনোর চৌকো ফাঁকটা অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে হানশিত। ওখানে একবার পৌঁছতে পারলে কপিকলে চড়ে পাহাড়-প্রাচীরের মাথায় উঠে যাওয়া সম্ভব। শরীরের সব শক্তি এক করে স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলো সে, এক গর্ত থেকে আরেক গর্তে হাত ঢোকাচ্ছে। আঙুলের নখ উপড়ে এলো, তবু এগুচ্ছে হানশিত।

অবশেষে দিনের আলো দেখতে পেল সে, টাইটার পুল থেকে ভেতরে ঢুকছে। আর মাত্র চল্লিশ ফুট এগুতে হবে। এভাবে এগুতে পারলে এ যাত্রা বেঁচে যাবে বলে মনে হলো। কিন্তু তারপরই নতুন একটা শব্দ ঢুকলো কানে। টানেলের বাইরে গহ্বরের ভেতর যেনো প্রলয়কাণ্ড শুরু হলো। কী ঘটছে বুঝতে পারলো হানশিত। বাধটা এবার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, বিপুল জলরাশি জলপ্রপাতের মতো থেমে আসছে টাইটার পুলে। টানেলের বিশাল ঢেউ গ্রাস করে ফেললো, টানেল ভরাট হয়ে উঠলো ছাদ পর্যন্ত।

বিপুল জলরাশির ধাক্কাটা পাথর ধসের মতো লাগলো হানশিতকে, খড়কুটোর মতো ভেসে গেল সে। সিঙ্কহোল নিজের গভীরে টেনে নিল তাকে, পানির প্রচণ্ড চাপ হাড়-গোড় সব গুঁড়ো করে দিচ্ছে। কানের কাছে একটা ড্রাম বিস্ফোরিত হলো, হাঁ করা মুখ দিয়ে ঢুকে ফুসফুস ভরাট করে তুললাম পানি। পানির নিচের গোপন শ্যাফট দিয়ে তীব্রবেগে ছুটলো তার লাশ, পাহাড়ের দূর প্রান্তে প্রজাপতি ফোয়ারায় বেরিয়ে যাবে।

কামানের বিস্ফোরিত গোলার মতো আওয়াজ তুলে বাধের চূড়া ভেঙে পড়লো। মুক্ত পানি উথলে উঠলো আকাশে, দেখতে পেয়েই লাফ দিয়ে ফ্রন্ট-এন্ডের সিট থেকে নিচে নামলো নিকোলাস, পাড় ধরে ছুটছে। কিন্তু মাত্র কয়েক পা এগুতে পারলো ও, আলোড়িত পানি নাগাল পেয়ে গেল ওর। খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ছে, গহ্বরের খোলা মুখ গ্রাস করে নিচ্ছে ওকে।

*

তীব্র স্রোত ট্র্যাক্টরটাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জলপ্রপাতের মাথা থেকে খসে পড়লো ওটা, ওর নিচে শূন্যে ওটাকে এক পলকের জন্য দেখতে পেল নিকোলাস। খসে গহ্বরের নিচে পড়ছে, উপলব্ধি করলো ট্রাক্টরের সিটে থাকলে ওটার নিচে চাপা পড়ত ও। বিশাল মেশিনটা হ্রদের সারফেসে পড়লো, সাদা পানি ছিটিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল গভীরে।

একটু পর ঝুলে পড়লো নিকোলাস, নিচে পা দিয়ে। তীব্র স্রোত আবার ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পানির উপর মাথা তুললাম পঞ্চাশ গজ ভাটির দিকে। চোখ থেকে চুল সরিয়ে দ্রুত চারদিকে দৃষ্টি বুলাল ও।

ওর সামনে, নদীর মাঝখানে, পাথরের ছোট একটা দ্বীপ রয়েছে। অল্প একটু সাঁতরে ওটার উপর উঠলো, ওখান থেকে গহ্বরের দু পাশের খাড়া পাঁচিলগুলোর দিকে তাকালো। শেষবার যখন এখানে আটকা পড়েছিল, তখনকার কথা মনে পড়ে গেল ওর। বাঁধ ভেঙে দিয়ে ফারাও-এর সমাধি ডুবিয়ে দেওয়ার উল্লাস কর্পণের মতো উবে গেল।

ওই পিচ্ছিল পাঁচিল বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়, জানে নিকোলাস। ধরার মতো কোনো গর্ত নেই পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে। গোটা প্রাচীর জুড়েই ফুলে আছে পাঁচিলের গা, পার হওয়া অসম্ভব। সাঁতরে পেছন দিকে, জলপ্রপাতের গোড়ায় পৌঁছনোও সম্ভব নয়।

তারপর লক্ষ্য করলো, জলপ্রপাতের মাথা থেকে যতোটা আশা করেছিল ততো বেশি পানি নামছে না। তার মানে বাধটা পুরোপুরি এখনো ভেঙে পড়েনি, শুধু চূড়ার দিকটা ভেঙে গেছে। তবে চূড়া যখন ভাঙবে, এ নদীতে সাঁতার কাটা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই, যা করার এখুনি করা দরকার। বুট খুলে দ্বীপ থেকে ডাইভ দিয়ে নদীতে পড়লো নিকোলাস। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বিকট আওয়াজ শুনে বুঝতে পারল, অবশিষ্ট বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।

দুনিয়া কাঁপানো গর্জন শুরু হলো, পানির নিরেট পাঁচিল জলপ্রপাতের মাথা থেকে লাফ দিচ্ছে নিচে। গায়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে সাঁতরাচ্ছে নিকোলাস, দ্রুতগতি বন্যার আগে থাকার ইচ্ছা। ধেয়ে আসা ঢেউ-এর গর্জন শুনে কাঁধের উপর দিয়ে পেছন দিকে তাকালো। গহ্বরটা ডুবিয়ে দিয়ে ছুটে আসছে পানির তোড়, পনেরো ফুট উঁচু, চুড়ার দিকটা সাপের মতো ফণা তুলে আছে। ওই চূড়ায় উঠতে হবে ওকে, তলিয়ে যাওয়া চলবে না, সিদ্ধান্ত নিল নিকোলাস। পানিতে থাবা মেরে ঢেউ এর ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা চালালো। অনুভব করলো স্রোতটা ওর নাগাল পেয়ে গেছে, তুলে নিচ্ছে মাথায়। চূড়ায় ওঠার পর পিঠ ধনুকের মতো বাঁকা করলো নিকোলাস, হাত দুটো গুঁজে দিল নিজের পেছনে-ক্লাসিক বডিসাফার পজিশন, ঝুলে আছে ঢেউ-এর মুখে, মাথাটা সামান্য নত, শরীরের সামনের অর্ধেক অংশ পানির উপর তোলা, ভেসে থাকছে শুধু পা ছুঁড়ে। আতঙ্কিত কয়েকটা সেকেন্ড পেরিয়ে যাবার পর উপলব্ধি করলো, ঢেউ-এর মাথায় থাকতে পারছে ও, নিজের উপর খানিকটা নিয়ন্ত্রণ আছে; আতঙ্ক কমে এলো, রোমাঞ্চকর একটা শিহরণ বয়ে গেল শিরায় শিরায়।

 বিশ নট! স্রোত আর নিজের গতি আন্দাজ করলো নিকোলাস, দু পাশের পাহাড়-প্রাচীর এতো দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে যে ঝাপসা লাগলো চোখে। ঢেউটার মাঝখানে থাকতে চেষ্টা করছে ও, পাঁচিলের কাছ থেকে দূরে। নিজেকে প্রায় কিছুই করতে হচ্ছে না, ঢেউই ওকে বয়ে নিয়ে চলেছে। তীব্র গতি আর বিপদের আশঙ্কা উপভোগ করছে নিকোলাস।

গহ্বরের গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় বোল্ডারগুলো ডুবে গেছে, ফলে ধাক্কা খাবার ভয়টা এখন আর নেই। প্রথম এক মাইল পেরিয়ে আসার পর ঢেউ তার আকৃতি বদলাল, কারণ গিরিখাদ এ দিকে চওড়া হয়ে গেছে। আরো খানিক পর দেখা গেল ঢেউটা ওকে মাথায় তুলে রাখতে পারছে না। দ্রুত চারদিকে চোখ বুলালো নিকোলাস। কাছেই বিশাল এক গাছের কাণ্ড ভাসছে, ছুটে চলেছে ঢেউয়ের সঙ্গে একই গতিতে। ভাঙা বাঁধের একটা অংশ এটা, কোনো একটা ফাঁকে খুঁজে রেখেছিল ড্যানিয়েল। কাণ্ড বা লগটা প্রায় ত্রিশ ফুট লম্বা, পিঠ দেখে মনে হচ্ছে তিমি বুঝি। কাঠুরেরা করাত দিয়ে কাটার সময় কাণ্ডের সব শাখা হেঁটে ফেলেনি, ফলে ওটার উপর ওঠার সময় ধরার জন্য শক্ত ডাল পেল নিকোলাস। পানিতে পা ঝুলিয়ে ভাটির দিকে মুখ করে শুয়ে থাকলো, দম ও শক্তি ফিরে আসছে ধীরে ধীরে।

বাঁধ ভাঙা বন্যার আকৃতিতে এখন আর ঢেউ তেমন নেই, তারপরও গহ্বরের ভেতর দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে চলেছে পানি। গতি প্রায় দশ নট, আন্দাজ করলো নিকোলাস। এ গতিতে টাইটার পুল আক্রান্ত হলে সমাধির ভেতর ফন শিলার আর তাঁর সঙ্গী সাথীদের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আগামি চার হাজার বছর ওখানে ওদেরকে থাকতে হবে। আপনমনে হাসলো নিকোলাস, যদিও পরক্ষণেই হাসিটা মুছে গেল। কারণ লম্বা লগটা একপাশে সরে যাচ্ছে, মনে হলো একদিকের পাহাড়-প্রাচীরে ধাক্কা খাবে।

গড়ান দিয়ে লগের আরেক দিকে চলে এলো নিকোলাস, পানিতে ঘন ঘন পা ছুঁড়ছে। বেঢপ ভেলা সাড়া দিল, তীব্র স্রোত থাকা সত্ত্বেও আবার সোজা হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে শিখছে নিকোলাস কীভাবে লগটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওর মনে হলো এটায় চড়ে মঠ পর্যন্ত যাওয়া যাবে। এমন কী এ গতিতে রোয়েন আর মারটিরে চেয়ে আগেও পৌঁছে যেতে পারে।

সামনে তাকিয়ে গহ্বরের এ অংশটুকু চিনতে পারলো নিকোলাস। টাইটার হ্রদের উপর এটা একটা মোচড় বা বাঁক। দু এক মিনিটের মধ্যে ওখানে পৌঁছে যাবে ও। ধারণা করলো, ঝুলন্ত দোলনা আর কপিকলটা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে।

ভারসাম্য ঠিক রেখে লগের মাঝখানে সোজা হওয়ার চেষ্টা করলো নিকোলাস, ঘন ঘন পাতা ফেলে চোখ থেকে পানি সরালো। টাইটার হ্রদের উপর জলপ্রপাতের মাথাটা দেখতে পেল, ওর দিকে ছুটে আসছে, নিচে খসে পড়ার জন্য শক্ত করলো নিজেকে।

ওর সামনে ছুটন্ত, দীর্ঘ, মসৃণ জলরাশি উন্মুক্ত হলো, পানির সঙ্গে শূন্যে লাফ দেওয়ার মুহূর্তে নিচের পাথুরে বেসিনটা এক পলকের জন্য দেখতে পেল নিকোলাস। ওর ধারণা ভুল, ঝুলন্ত মাচাগুলো বন্যার তোড়ে এখনো পুরোপুরি ভেসে যায় নি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিচের অংশটা নেই, তবে ওপরের অংশ মাতালের মতো পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে দোল খাচ্ছে, ছুটন্ত পানি প্রায় ছুঁয়ে। অন্তত দু জন লোক ওই ভঙ্গুর কাঠামোয় আটকা পড়ে গেছে, নড়বড়ে কপিকলের একটা খুঁটি ধরে জ্বলে আছে কোনো রকমে।

পলকের জন্য তামাটে বেরেট-এর নিচে স্টীল-রিম চমশা ঝিক করে উঠতে দেখলো নিকোলাস, বুঝতে পারলো খুঁটির মাথার কাছে লোকটা কর্নেল নগু। নগু খুঁটিটার মাথা থেকে লাফ দিয়ে পাহাড়-প্রাচীরের চূড়ায় উঠলেন, অদৃশ্য হয়ে গেলেন নিকোলাসর দৃষ্টিসীমা থেকে। বিপুল জলরাশির সঙ্গে খসে পড়ছিল নিকোলাস, লগটা গোত্তা খাওয়ার ভঙ্গিতে নিচে নেমে ডুব দিল পানিতে। তারপর ওটার ডিগবাজি খাওয়া শুরু হলো, শক্ত ডাল ধরে মাঝখানে জ্বলে রয়েছে ও। মাত্র দু বার ডিগবাজি খেয়ে সোজা হয়ে গেল লগ। স্রোত আবার ওটাকে পেয়ে বসলো।

টাইটার পুল দেখতে পাচ্ছে নিকোলাস। সমাধির প্রবেশপথ, টানেলের মুখটা, পুরোপুরি ডুবে গেছে-পানির সারফেস থেকে এখন সেটা অন্তত পঞ্চাশ ফুট নিচে। উল্লাস অনুভব করলো ও, এখন আর কারো পক্ষে সমাধির ভেতর ঢোকা সম্ভব নয়। ওর দৃষ্টি পাহাড়-প্রাচীরের গা বেয়ে ওপরে উঠলো। অবশিষ্ট মাচাগুলো ভেঙে পড়ছে, ফোকর থেকে বেরিয়ে আসছে বাঁশগুলো। অপর লোকটা এখনো খুঁটির উপর ঝুলছে, তবে এ খুঁটিটা পাহাড়-প্রাচীরের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছায় নি। পানি থেকে বিশ ফুট উপরে রয়েছে সে, বাতাসে কাত হওয়া উঁচু বাঁশের আগায় বসা বিড়ালের মতো লাগছে তাকে। খুঁটির নিচের অংশ পানিতে ডোবা, স্রোত ওটাকে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। চোখ ফিরিয়ে নেবে নিকোলাস, খুঁটির উপর থেকে ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকালো লোকটা।

হেলম্! জ্যাক হেলম্! লোকটাকে চিনতে পেরে নিকোলাসের শরীরে যেনো আগুন ধরে গেল। কিশোর উপাসক তামেরের কথা মনে পড়ে গেল পাথর ধসে চাপা পড়ে মারা গেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো টিসের ক্ষতবিক্ষত চেহারা। পানিতে পা ছুঁড়ে লগটাকে ঘোরাবার চেষ্টা করলো নিকোলাস, ওই খুঁটির নিচে পৌঁছতে চায়। লম্বা একটা বাঁশ দেখতে পেয়ে তুলে নিল হাতে। বাগিয়ে ধরল ওটা খোঁচা দিল খুঁটির গায়ে ঝুলে থাকা হেলমের নিতম্বে। পাকা আমের মতো খসে পড়লো হেলম, ঝপাৎ করে পানিতে পড়লো।

লগ সোজা করে নিল নিকোলাস, স্রোতের টানে আবার ওটা ছুটছে। হাতের বাঁশটা আবার বাগিয়ে ধরে চারদিকের পানিতে চোখ বুলাচ্ছে ও। ওর একেবারে কাছে পানি থেকে মাথা তুললাম হেলম্, তুলতেই খুলিল উপর বাঁশটা সবেগে নামিয়ে আনলো নিকোলাস।

খুলি নয়, বাঁশটা ফেটে গেল। আবার ডুব দিয়েছে হেলম্। নিকোলাসও বাঁশটা উল্টো করে নিয়ে অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয়বারও কাছাকাছি মাথাচাড়া দিল আমেরিকান কসাই। আবার আঘাত করলো নিকোলাস। এবার কপালে লাগলো। খুলি ফাটার আওাজ পেল নিকোলাস। পানির নিচে তলিয়ে গেল হেলম, ঢিল পড়লো নিকোলাসের পেশীতে। কয়েক সেকেন্ড পর চোখের কোণ দিয়ে দেখলো লগের এক প্রান্তে একজোড়া হাত। ঝট করে সেদিকে তাকালো ও। মাথা আর কপাল থেকে হড়হড় করে রক্ত বের হচ্ছে, তারপরও লগে ওঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে হেলম্। এগিয়ে এসে তার হাতের উপর বাঁশ দিয়ে বাড়ি করছে হেলম। এগিয়ে এসে তার হাতের উপর বাঁশ দিয়ে বাড়ি মারলো নিকোলাস। একটা হাতের কব্জি গুঁড়ো হয়ে গেল। পরবর্তী বাড়িটা আবার পড়লো মাথায়। এবার হলুদ মগজ দেখতে পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল নিকোলাস।

পেছনে ফিরে বলল, শব্দ শুনে মনে হয় টুমা ন জিতে গেছে। ফন শিলার আর শয়তান মিশরীয়টার কী খবর, কে জানে।

সমাধিতে আর ঢোকা হচ্ছে না বাবাজিদের। অবশ্য, আবার বাধা দিলে আলাদা কথা। আচমকা চিন্তাটা এলো তার মাথায়। আরে, যখন নদী খুলে গেল, তখন আবার শিলার সমাধিতে ছিলেন না তো? মুচকে হেসে মাথা নাড়লো নিকোলাস।বেশি আশা করে ফেলছি। এতো ন্যায় বিচার নাও হতে পারে!

মঠের উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে, ব্যথায় কাতড়ে উঠছে থেকে থেকে।

*

টানেলের একটা বাঁক ঘুরে ছুটে এলেন নাহুত গাদ্দাবি, ফন শিলারের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন। বৃদ্ধ কোনো সাহায্যে আসবেন না, এ কথা জানা সত্ত্বেও তার উপস্থিতিতে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করলেন তিনি। হানশিত না থাকায় টানেলের এ গোলকধাঁধা ভৌতিক একটা জায়গা হয়ে উঠেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও পরস্পরকে তাঁরা জড়িয়ে ধরে থাকলের জঙ্গলে পথ হারানো এক জোড়া বালকের মতো।

সামান্য কিছু অলঙ্কার এখনো ফেলে দেন নি ফন শিলার। মামোসের সোনার তৈরি বাঁকা লাঠিটা এখনো তার হাতে। স্যুটের পকেটগুলো ফুলে রয়েছে গহনায়। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধমকের সুরে জানতে চাইলেন, হানশিত কোথায়? আমাকে ফেলে আপনি ছুটছিলেন কেন? ইডিয়েট, বিপদটা বুঝতে পারছেন না? টানেল থেকে বের হবার উপায় কী?

আমি কী করে জানব… রেগেমেগে শুরু করলেও, ফন শিলারের পেছনের দেয়ালে চক মার্ক দেখে থেমকে গেলেন নাহুত। আগেও এগুলো লক্ষ্য করেছেন, তবে তাৎপর্যটুকু ধরতে পারেন নি। চিন্তা করবেন না, হারপার নিকোলাস আমাদের জন্য চিহ্ন রেখে গেছে। আসুন! টানেল ধরে দ্রুত পায়ে এগুলেন তিনি। প্রতিটি বাকে পৌঁছে চক মার্ক দেখে নিচ্ছেন।

এ ভাবে মাঝখানের সিঁড়িতে পৌঁছলেন ওঁরা, তবে হানশিত ওঁদেরকে ছেড়ে যাবার পর ইতোমধ্যে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে লম্বা গ্যালারিতে নেমে এলেন দু জন, নামার সময় শুনতে পেলেন নদীর হিসহিস আওয়াজটা ক্রমশ বাড়ছে মনে হচ্ছে ঘুমন্ত একা ড্রাগন নিঃশ্বাস ফেলছে।

নাহুত ছুটলেন। হোঁটচ খেতে খেতে তার পিছু নিলেন ফন শিলার, প্রাচীন পা দুটো ভয়ে দুর্বল হয়ে গেছে।

দাঁড়ালো! প্লিজ, দাঁড়ান! সুরটা এখন আর ধমকের নয়, করুণা ভিক্ষার; কিন্তু শুনেও শুনছেন না নাহুত। প্লাস্টার-সীলড ডোরওয়ের কাছে পৌঁছে মাথা নিচু করলেন তিনি, দেখলেন ল্যান্ডিঙের উপর জেনারেটরটা এখনো চলছে, সারি সারি বালবও জ্বলছে ছাদের উপর।

ছুটে বাঁক ঘুরলেন নাহুত, তাঁর নিচে টানেলটা ডুবে গেছে বুঝতে পেরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সিঙ্কহোল বা ভাসমান সেতুর কোনো চিহ্নমাত্র নেই কোথাও, পন্টুনগুলো কম করেও পঞ্চাশ ফুট পানির নিচে ডুবে গেছে। ডানডেরা নদী, সহস্র বছরের প্রহরী, আবার তার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। গাঢ় ও দুর্ভেদ্য, সমাধির প্রবেশপথ সীল করে দিয়েছে, ঠিক যেভাবে চার হাজার বছর আগে দিয়েছিল। হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! আমাদের উপর রহম করো! ফিসফিস করছেন নাহুত।

বাঁক ঘুরে এগিয়ে এলেন ফন শিলার, নাহুতের পাশে দাঁড়ালেন। জলমগ্ন শ্যাফটের দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছেন দু জনেই। তারপর পাশের দেয়ালে হেলান দিলেন ফন শিলার। আমরা আটকা পড়েছি, বিড়বিড় করলেন তিনি, শুনে দেয়ালে ঘষা খেয়ে বসে পড়লেন নাহুত। নাকি সুরে প্রার্থনা করছেন, অভিমানী শিশুর কান্নার মতো লাগলো শুনতে।

থামুন! হিসহিস করলেন ফন শিলার। প্রার্থনায় কোনো কাজ হবে না। বাঁকা লাঠিটা দিয়ে নাহুতের পিঠে সজোরে আঘাত করলেন। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলেন নাহুত, ক্রল করে পিছিয়ে যাচ্ছেন। বের হওয়ার কোনো না কোনো রাস্তা নিশ্চয়ই আছে, বললেন ফন শিলার। আসুন, খুঁজে বের করি। কোথাও বাঁক থাকলে নিশ্চয়ই ভেতরে বাতাস ঢুকছে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। ব্লোয়ার ফ্যানটা বন্ধ করুন, বাতাস নিজে থেকে নড়ে কিনা বুঝতে হবে।

শিলারের নির্দেশ পেয়ে ছুটলেন নাহুত, ফ্যানটা বন্ধ করলেন।

আপনার কাছে সিগারেট লাইটার আছে, বললেন ফন শিলার, তারপর নিকোলাসের ফেলে যাওয়া কাগজ আর ফটোগ্রাফগুলো দেখালেন। আগুন জ্বালুন। ধোয়া দেখে বুঝতে চেষ্টা করি বাতাস কোন দিকে বইছে।

পরবর্তী দু ঘণ্টা ধরে সমাধির সবগুলো লেভেলে ঘুরে বেড়ালেন ওঁরা, উঁচু করা হাতে ধরে আছেন জ্বলন্ত কাগজ, ধোয়ার গতিপথের উপর নজর রাখছেন। কিন্তু টানেলের কোথাও বাতাসের কোনো নড়াচড়া নেই। ক্লান্ত হয়ে আবার ওঁরা ফিরে এলেন জলমগ্ন শ্যাফটের কিনারায়।

শান্ত পানির ওপারে তাকিয়ে থেকে ফন শিলার বিড়বিড় করলেন, ওটাই একমাত্র পথ।

হানশিত হয়তো ওইপথেই বেরিয়ে গেছে, সায় দেয়ার সুরে বললেন নাহুত।

কিছুক্ষণ আর কোনো কথা হলো না। সমাধির ভেতর সময় বোঝা যাচ্ছে না। নদী নিজের লেভেলে স্থির হয়ে আছে, টানেলের ভেতর সারফেসে কোনো আলোড়ন নেই। মুদু সিঙ্কহোলের নিচে, স্রোত বইছে, তারই কোমল হিসহিস আওয়াজ ভেসে আসছে কানে। অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙলেন নাহুত, জেরারেটরের ফুয়েল ফুরিয়ে আসছে।

খানিক পর অন্ধকার হয়ে যাবে টানেলগুলো।

আবার কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বললেন না। তারপর অকস্মাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন ফন শিলার। আপনাকে সাঁতরাতে হবে। যেভাবেই হোক শ্যাফটের বাইরে বেরিয়ে লোকজনের সাহায্য চাইতে হবে। আমি আপনাকে অর্ডার করছি!

চোখে অবিশ্বাস, শিলারের দিতে তাকিয়ে থাকলেন নাহুত। দূরত্বটা আন্দাজ করতে পারছেন? টানেলের মুখ একশো গজ দূরে। একশো গজ যদি পার হতে পারি, বাইরে বেরিয়ে বাতাস পাব না-বন্যায় ভরাট হয়ে গেছে নদী।

লাফ দিয়ে সোজা হলেন ফন শিলার, হুমকি দেয়ার ভঙ্গিতে নাহুতের দিকে ঝুঁকলেন। হানশিত ওই পথে বেরিয়ে গেছে। আপনাকেও তাই করতে হবে। সাঁতার কেটে টানেল থেকে বেরিয়ে যাওয়া এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কর্নেল নগু আর হেলকে নদীর পাশেই কোথাও পাবেন। হেলম্ জানে কী করতে হবে। আমাকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করবে সে।

আপনি একটা উন্মাদ! পিছু হটছেন নাহুত।

ফন শিলারও সামনে বাড়ছেন। আমি আপনাকে হুকুম করছি, নাহুত! আপনি আমার বেতন ভোগী কর্মচারী, ভুলে যাবেন না। আমি যা বলব আপনাকে তাই করতে হবে। আমি আপনার মনিব! নামুন, লাফ দিন পানিতে!

বুড়ো বলে কি! টানেলের মেঝেতে ঘষা খেয়ে এখনো পিছু হটছেন নাহুত।

সোনার বাঁকা লাঠিটা অত্যন্ত ভারী, সেটা দিয়ে নাহুতের কাঁধে বাড়ি মারলেন ফন শিলার। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন নাহুত। দ্বিতীয় বাড়িটা লাগলো তাঁর নাকে, নরম হাড় ভেঙে গেল, ফুটো দিয়ে হড়হড় করে রক্ত বের হচ্ছে। চিৎকার করছেন ফন শিলার। মেরে ফেলব। মেরে ফেলব। এখনো কথা শোন, তা না হলে মেরে ছাতু বানিয়ে ফেলব। আক্ষরিক অর্থে বানাচ্ছেনও তাই, একের পর এক আঘাত করে রক্তাক্ত করছেন নাহুতকে।

থাকুন! আহত ঘোড়ার মতো চিচি করছেন নাহুত। না, প্লিজ, থামুন! শুনব, যা বলেন শুনব! দয়া করে আর মারবেন না! মেঝেতে ঘষা থেকে থেকে শিলারের কাছ থেকে সরে যাচ্ছেন, কোমর সমান পানিতে পৌঁছে থামলেন। আমাকে তৈরি হবার সময় দিন, হের ফন শিলার প্লিজ।

লাঠিটা আবার মাথার উপর তুলে এগিয়ে এলেন ফন শিলার। এক্ষুনি! আমার হুকুম, এক্ষুনি যান। আমি জানি চেষ্টা করলে টানেলের খোলা মুখ আপনি খুঁজে পাবেন। আমার ধারণা ওখানে কিছু বাতাস আটকা পড়েছে, শ্বাস নিতে পারবেন। তারপর বেরিয়ে যাবেন বাইরে। যান যান!

আঁজলা ভরা পানি তুলে মুখের রক্ত ধুলেন নাহুত। একটু সময় দিন, কাতর অনুনয় করলেন তিনি। জুতো আর কাপড়-চোপড় খুলতে হবে। আসলে সময়। নিতে চাইছেন তিনি।

কিন্তু পানি থেকে তাকে উঠতে দেবেন না ফন শিলার। যা করার ওখানে দাঁড়িয়েই করুন, নির্দেশ দিলেন, মারমুখো ভঙ্গিতে আবার লাঠিটা তুললেন মাথার উপর।

নাহুত বুঝতে পারলেন সোনার লাঠিটা মাথায় নেমে এলে খুলিটা গুঁড়ো হয়ে যাবে। পানির কিনারায় হাঁটু ডুবে গেছে তাঁর, এক পায়ে দাঁড়িয়ে অপর পায়ের জুতো খুলছেন। তারপর, অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধীরে ধীরে শুধু আন্ডার প্যান্ড ছাড়া সমস্ত কাপড় গা থেকে খুলে ফেললেন। তার কাঁধের চামড়া থেঁতলে গেছে লাঠির আঘাতে, পিঠ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। বুড়ো শয়তান বলে মনে মনে গাল দিচ্ছেন ফন শিলারকে। বুঝতে পারছেন, অন্তত নির্দেশ পালনের ভান না করে কোনো উপায় নেই। পানির নিচে ডুব দেবেন, টানেল ধরে কিছু দূর এগোবেন, পাশের দেয়াল ধরে অপেক্ষা করবেন কিছুক্ষণ, তারপর মাথা তুলে আবার ফিরে আসবেন।

গো! হুঙ্কার ছাড়ছেন ফন শিলার। আপনি আমার সঙ্গে চালাকি করছেন। সময় নষ্ট করে কোনোই লাভ নেই। ভুলেও ভাববেন না পানি থেকে আপনাকে আমি উঠতে দেব।

পানির আরো নিচে নেমে এলেন নাহুত, এবার তার বুক ডুবে গেল। বড় করে নিঃশ্বাস ফেললেন কয়েকবার। তারপর দম আটকে ডুব দিলেন সারফেসের নিচে। কূলের কিনারায় অপেক্ষা করছেন ফন শিলার, গাঢ় পানির নিচে নাহুতকে দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু লক্ষ্য করলেন নাহুতের রক্ত সারফেসের রঙ বদলে দিচ্ছে।

এক মিনিট পার হলো। তারপর হঠাৎ পানির নিচে একটা তীব্র আলোড়ন উঠলো। গাঢ় সারফেসের উপর খাড়া হলো একটা ফর্সা বাহু, হাত ও আঙুল আবেদনের ভঙ্গিতে নড়ছে। তারপর আবার ধীরে ধীরে ডুবে গেল পানির নিচে।

গলা লম্বা করে সামনে এক পা বাড়লেন ফন শিলার। নাহুত! রাগে কাঁপছেন তিনি। আবার চালাকি শুরু করেছেন?

পানির নিচে আরেকটা জোরালো আলোড়ন উঠলো। সারফেসের নিচে আয়নার মতো কী যেনো ঝিক করে উঠলো।

নাহুত! গলা ফাটালেন ফন শিলার।

যেন তার ডাকে সাড়া দিয়েই পানির উপর মাথাচাড়া দিলেন নাহুত। তাঁর ত্বক মোমের মতো হলদেটে দেখাচ্ছে, সমস্ত রক্ত যেনো শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে, মুখটা চিৎকার করার ভঙ্গিতে পুরাপুরি খোলা, অথচ কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। তার চারপাশের পানি টগবগ করে ফুটছে, যেনো বড় আকৃতির মাছের একটা ঝাঁক পানির নিচে ভোজনে মত্ত। ফন শিলার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন, নাহুতের মাথার চারপাশ থেকে গাঢ় একটা ঢেউ জাগলো পানিতে, সেই সঙ্গে লাল গোলাপ পাপড়ির রঙ পেল সারফেস। প্রথম এক মুহূর্ত ফন শিলার বুঝতেই পারলেন না যে ওটা আসলে নাহুতের রক্ত।

তরপর তিনি দেখতে পেলেন সরীসৃপ আকৃতির লম্বাটে প্রাণীগুলো ছুটোছুটি করতে পানির তলায়, মোচড় খাচ্ছে, পেঁচিয়ে ধরছে নাহুতকে, কামড় দিয়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলছে তার মাংস। একটা হাতাবার উঁচু করলেন নাহুত, এবার সেটা শিলারের দিকে লম্বা করলেন, যেনো সাহায্যের আশায়। হাতটা অক্ষত নয়, কয়েক জায়গায় অর্ধচন্দ্র আকৃতির ক্ষত দেখা গেল-মাংস তুলে নেওয়া হয়েছে।

আতঙ্কে চেঁচাচ্ছেন ফন শিলার, পুল থেকে পিছিয়ে আসছেন। নাহুতের চোখ দুটো বিশাল দেখাচ্ছে, দৃষ্টিতে অভিযোগ। শিলারের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি, গলা থেকে উন্মত্ত যে চিৎকারটা বের হচ্ছে সেটাকে মানুষের বলে চেনার উপায় নেই।

বিশাল এক ট্রপিক্যাল ঈল সারফেসের নিচ থেকে মাথা তুললাম, হ্যাঁ করে আছে, ভাঙা কাঁচের মতো দাঁতগুলো চকচক করছে। খোলা চোয়ালে পুরে নিল নাহুতের গলা। কুৎসিত প্রাণীটাকে গলা থেকে ছাড়াবার কোনো চেষ্টাই করলেন না। নাহুত। প্রকান্ড ঈল মোচড় খাচ্ছে, ঘন ঘন কুণ্ডলী পাকাচ্ছে, দাঁত দিয়ে বিচ্ছিন্ন। করতে চাইছে গলার মাংস, আর নাহুতের চোখ জোড়া কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাকিয়ে আছেন শিলারের দিকে।

ধীরে ধীরে নাহুতের মাথা আবার পানির নিচে তলিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ সারফেসের তলায় আলোড়িত হলো পানি, মাঝে মধ্যে দু একটা ঈলের চকচকে ও পিচ্ছিল গা ভেসে উঠলো পানির উপর। তারপর ক্রমশ শান্ত হয়ে এলো পানি, এক সময় আয়নার মতো স্থির ও মসৃণ দেখালো আবার।

ঘুরে দৌড় দিলেন ফন শিলার। টানেল বেয়ে উঠে এলেন ল্যান্ডিঙে, ওখানে জেনারেটরটা এখনো সচল রয়েছে। কোথায় যাচ্ছেন জানেন না তিনি, শুধু জানেন সিঙ্কহোলের কাছ থেকে যতোটা সম্ভব দূরে পালাতে হবে তাঁকে। সামনে খোলা কোনো প্যাসেজ পেলেই হলো, ছুটছেন সেটা ধরে। মাঝখানের সিঁড়িটার গোড়ায় পৌঁছে টানেলের এক কোণে ধাক্কা খেলেন, ছিটকে পড়লেন মেঝের উপর। কপালটা আলুর মতো ফুলে উঠলো।

কিছুক্ষণ পর সোজা হলেন তিনি, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। দিশেহারা ও বিভ্রান্ত, কল্পনার চোখে অবাস্তব সব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। নিজেই বুঝতে পারছেন, পাগল হতে আর বেশি দেরি নেই তার। বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছেন, এক সময় আর উঠে দাঁড়াবার শক্তি পেলেন না। তবু থামছেন না, হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছেন।

খাড়া শ্যাফট বেয়ে টাইটার গ্যাস ট্র্যাপে নামার সময় হড়কে গেল শরীরটা। ধাপ বেয়ে গড়িয়ে নিচে নামলেন। তারপর অনেক কষ্টে দাঁড়ালেন। টলতে টলতে কীভাবে তোরণটার কাছে পৌঁছলেন, নিজেও বলতে পারবেন না। তোরণ পেরিয়ে ফারাও মামাসের সমাধিতে ঢুকলেন তিনি।

তারপরই ম্লান হয়ে গেল বালবের আলো। হলুদ আভা ছড়াচ্ছে শুধু। আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললেন ফন শিলার। এরপর কী ঘটবে জানেন। খানিক পর ঘটলও তাই, নিভে গেল বালব, পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেল সমাধি। আবার তিনি ছুটলেন, তবে কয়েক পা এগুবার পরই ধাক্কা খেলেন কিছু একটার সঙ্গে, ছিটকে পড়লেন।

খুলি ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। পড়ার পর আর নড়ছেন না তিনি। কতক্ষণ পর মৃত্যু আসবে? ভাবছেন তিনি। কয়েক দিন লাগতে পারে, এমন কী কয়েক সপ্তাহ লাগাও বিচিত্র নয়। কিসের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন বোঝার জন্য অন্ধকারে হাতড়াচ্ছেন। গাঢ় অন্ধকার, কাজেই হাত দিয়ে ছোঁয়ার পরও মামোসের পাথুরে শবাধারটা চিনতে পারলেন না। নিরাপদ মনে করে হোক বা অন্য কিছু ভেবে, কফিনটার ভেতর ঢুকলেন ফন শিলার। চুপচাপ শুয়ে থাকলেন তিনি, তাঁর চারদিকে একজন প্রাচীন সম্রাটের সমাধি সম্পদের স্তূপ। ধীর, অনিস্বীকার্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে ফন শিলারের জন্য।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *