২১-২৫. বঁধু বিধির দেখা পাইলে

বঁধু, বিধির দেখা পাইলে তাহারে শুধাইও
এমন অবলা জন্ম কেন সে কপালে লিখিল?
গৃহের শোভা যৈবতী, তারও শোভা পতি
দেশের শোভা নর ও নারী, বসত ও বসতি
নদীর শোভা নৌকার বহর, খেতের শোভা ধান
আমি কেন খোয়াইলাম সকল জাতি কুল মান?
পরান-পঙ্খি বন্দী হইয়া আছে অন্তরাল
সেইদিকে যাই শাসন লইয়া যৈবন ও আকাল
শয়নে-স্বপনে তুষের আগুনে অন্তর উথলায়
বাসনা কুসুম-কেশর হইয়া শুইয়া যায়
বিধির দেখা পাইলে তুমি তাহারে শুধাইও
এমন বন্দিনী করিয়া সে কেন এ যৈবন গড়িল?

শিকদার নলসিঁড়ির ঘাটে গিয়াছিল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাতের আশায়, সেই সঙ্গে ঘাট-মাস্টারের সাক্ষাতের ইচ্ছাটাও ছিল প্রবল। তাহার সহিত প্রাণ খুলিয়া নানা বিষয়ের আলোচনা করিয়া চতুর্দিকের ভুবনের উপর সন্দেহ দৃষ্টি বুলাইতে বুলাইতে শিকদার বাড়ির পথ ধরিয়াছিল। কিন্তু আপন-বাড়িতে উপস্থিত হইয়া সে চমকিয়া গেল।

তখন পড়ন্ত বেলা। খাল পার হইতে বাড়ির সংকীর্ণ পথটুকুতে নামিয়াই তাহার মনে হইয়াছিল হয়তো বা হতশ্রী গৃহ-পরিবেশে আবারও সমস্ত উৎসাহ-সংকল্প নিভিয়া যাইবে। অথচ চক্ষু তুলিয়া দেখে সম্মুখের উঠান ছিমছাম, ঘরের হাতিনাটাও কেমন ঝকঝক করিতেছে। একটু বিস্ময় লইয়া চতুর্দিকে চাহিয়া মনে হইল হয় কেউ অতি যত্নে সব কিছু গুছাইয়া পরিষ্কার করিয়া সাজাইয়াছে, অথবা আপাতত এই নিবাস ছাড়িয়া অন্যখানে যাইবার সংকল্পেই উলটা একটা মায়া-মমতাই তাহার দৃষ্টিতে রং মাখাইয়া দিতেছে। কিন্তু ঘরে যেন কাহারও সাড়া, উনুনের দিক হইতেও ধোয়া ছড়াইতেছে। মনে মনে একবার ভাবিল, কী তাজ্জব, হোসেনই ঝট-পাট লাগাইতেছে নাকি? সে তো কখনও সেই রকম কিছু করে নাই। পরক্ষণে ঘরে ঢুকিয়া শিকদার অবাক হইয়া গেল। একহাতে একটা খুঁটি ধরিয়া সে নিজেকে সামলাইয়া লইবার চেষ্টা করিল, সাধের দোতারাটাও হেলায়-ফেলায় নামাইয়া দিল পাশে, নিজের চক্ষুকেও যেন তাহার বিশ্বাস হইতেছিল না।

ইতিমধ্যে পাশের পাক-ঘরের খাটাল হইতে রন্ধনরতা অবস্থায় পিছনে সাড়া পাইয়া সে ফিরিয়া তাকাইয়াছে, মাথার ঘোমটা খসিয়া পড়িয়াছিল, তাড়াতাড়ি তা উঠাইয়া সে একধারে আসিয়া দাঁড়াইল। কিছুক্ষণ পরে সে শিকদারের পায়ের উপর ভাঙ্গিয়া পড়িল। শিকদার যেন তখনও পুরোপুরি সম্বিৎ ফিরিয়া পায় নাই, ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিল না, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, জোবেদা না অন্য কেউ, তাহাকে স্পর্শ ঠিক হইবে কি হইবে না। এমনও মনে হইল কাব্যকথার রূপ দিয়া জীবনকে দেখিতে দেখিতে সে যেন তাহার একান্ত বাস্তবতার সীমারেখায়ও আর খেয়াল রাখে নাই।

এক সময় সে কেবল অস্ফুট প্রশ্নে যাচাই করিয়া লইতে চাহিল : তুমি জোবেদা? জোবু? এমন তো আমি স্বপ্নেও দেখি নাই।

জোবেদা ধরা গলায় বলিল : আমারে মাফ করো।

শিকদার তাহাকে উঠিয়া দাঁড়াইতে সাহায্য করিল : কীসের মাফ? কেন মাফ? তুমি কখন আইলা? কার সঙ্গে আইছ?

জোবেদা শাড়ির আঁচলে নাক মুছিয়া বলিল : কেউর সঙ্গে না, আমি একলাই চলিয়া আইছি। তারা আমারে খেদাইয়া দিছে, আমিও আর কোনো কূল পাই নাই। মনে কইল একমাত্র তোমার কাছেই আমার হয়তো কিছু মূল্য আছে। এই দেখো-জোবেদা পিছন ফিরিয়া পিঠের কাপড় সরাইয়া দেখাইল। পিঠে অজস্র আঘাতের চিহ্ন কালো কালো দাগ লইয়া ফুলিয়া রহিয়াছে : গলায় দড়ি দিতে গেছিলাম সব জ্বালা জুড়াইতে। দড়ি লইয়া গাছের ডালে বাঁধিতে গিয়া হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল তোমার কথা, সেই ছোটোকালে তুমি কোথায় হইতে এই দড়ি, এই তক্তা যোগার করিয়া দোলনা বাঁধিয়া দিতা। আমার কিছুতেই তৃপ্তি হইত না, হাওয়ায় উড়িয়া যাইত গায়ের বসন, গুরুজনের শাসনও যেন কেউরই কানে আসিয়া পৌঁছিত না। তারই কাছে আছিল একটা হিজল ফুলের গাছ। তার লাল লাল ফুলগুলান পুকুরের পানির উপর হাওয়ার গতির সঙ্গে ঘুরিয়া ভাসিয়া বেড়াইত। তুমি কখনও কখনও কোচড় ভরিয়া একগোছা সেই ফুল আমার সামনে উজার করিয়া দিতা। আমিও সেই ফুলের লাহান উড়িয়া ভাসিয়া ছড়াইয়া পড়তে চাইতাম। তোমার সেই জোবেদা, আমি যেন লোহার শিকলেই এই এতগুলান বচ্ছর বাঁধা পড়িয়া আছিলাম। মুক্তি খুঁজিয়া আমি তোমার কাছেই আইলাম।

শিকদার একধারে বসিয়া পড়িল, হাত তুলিয়া বলিল : সবুর জোবু, একটু ধীরে ধীরে সব খুলিয়া বলল। আমি অবুঝদার বোকাসোকা মানুষ, এখন যেন আরও সব জট পাকাইয়া যাইতে আছে।

জোবেদা চক্ষু মুছিয়া বলিল : মাপ তো চাইলাম! তোমারেই এই নিদান কালের পুরুষ বলিয়া গণ্য করিয়া তোমার কাছে আইলাম। মনে তো কয় একদিন তুমি আমারে চাইছিলা। এই লও, এখন আমি তোমার। দেশের মানুষ, তামাম দুনিয়ার মানুষ কয় আমার অভাবে, আমার জন্যই তোমার জীবন এমন শূন্য, এমন বিরান হইয়া গেছে। আইজ আমিই আসছি! আমারে আর পায়ে ঠেলিয়া দিও না। তুমি আবার আমারে সব নতুন করিয়া সাজাইতে দেও। তুমি সেই কোন ছোটোকাল হইতে আমারে কত কন্যার কাহিনি শুনাইছ, আর আমিও স্বপ্ন দেখছি এক পুরুষের, যদি কোথাও কেউ না-ই থাকে তবে সেই পুরুষ তুমি হও। আমারে উদ্ধার করো। শিকদার এক সময় মাটির দিক হইতে চক্ষু তুলিয়া জানিতে চাহিল : নিজ বাড়িতে, বলি ভাই-এর বাড়িতে গেছিলা?

জোবেদা মাথা নাড়িল : হ, গেছিলাম। সে কোন মুলুকে গেছে কড়ির শিশু এক যোগাড়ে। তার বউ আর একপাল বাচ্চা-কাচ্চার মধ্যে আমি আর কোনো দিক দিশা না পাইয়াই তোমার কাছে চলিয়া আইলাম।

শিকদার চঞ্চলভাবে বারান্দায় নামিয়া আবারও উঠিয়া আসিল : এমন বুদ্ধিমতী মাইয়া হইয়াও কাজটা তুমি ঠিক করো নাই জোবু, কাজটা ভালো করো নাই। সংসার খেলা কোনো মিছামিছি বিষয় না। ইচ্ছা মতোন সব কিছু করণ যায় না? এখন যে ছি ছি ধিকারে দেশ ভরিয়া যাইবে। আমি সকল বিবাদ-বিসম্বাদ এড়াইয়া এমন আপন একান্তে পড়িয়া রইছি, জগৎ-সংসারের বিচারে আমি অক্ষম-অধম, দীন-দরিদ্র, যতই মাথা উচাইতে চাই, দেখি, আমার কোনো সাধ্য নাই, কোনো সামর্থ্য নাই। জগৎ-সংসার কতকগুলি নিয়মের মধ্যে ঘুরপাক খাইতে আছে। পুকুরের মাছ, গাছের ফল, ঘরের কন্যা যতই সরেস হউক, তার উপর দীন-হীনের কোনো অধিকার নাই। তোমারেও আইজ আমিই মাফ করিয়া দিবার কোনো অধিকার রাখি না। অবুঝ হইও না, আমার তো মনে কয় তোমার ভাই-এর বাড়িতে থাকাটাই ঠিক হইত। তুমি ভুল বুঝিও না, আমি কতদিন তোমারে এমন কাছে দেখি নাই, খুশি-অখুশির কথা না জোবু, মনে কয় কাজটা বড়ো কাঁচা হইয়া আছে।

: হায়রে পুরুষ!-জোবেদা মুখ ফিরাইয়া লইল : আপন প্রয়োজনেও তুমি যে কেন নিজের দাবি ছিনাইয়া লইতে জানলা না, সেই কথা ভাবিয়াও আমি অবাক হইয়া যাই। কোন অধিকারে কোন কন্যার স্বপ্ন দেখো তুমি যদি এমন অত্যাচারের মুখেও রুখিয়া খাড়াইতে পারো? কী সেই গীত-কথা কাব্যের মূল্য যদি আসল জীবনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক না থাকে? ঠিক আছে, আমার কোনো ভাবনাই আর তোমার করিতে হইবে না। শিকদার লক্ষ করিল জোবেদা আবারও কোনো অজ্ঞাতের দিকে পা বাড়াইবার উপক্রম করিতেছে; একটু ইতস্তত করিয়া সে তাহার কাছে গিয়া দাঁড়াইল।

জোবেদা কাঁধের উপর দিয়া সরাসরি তাহার দিকে তাকাইল। সেই দুই চক্ষু যাহার সহিত একদিন শিকদার নীলকমলের তুলনা দিয়াছে, সেই দুই-ঠোঁট যাহার সঙ্গে সে পাকা লঙ্কার উপমা খুঁজিয়াছিল, কণ্ঠের নীচে সেই কাঁপন যাহার মধ্যে সে নিজের হৃৎকম্পনের অভিব্যক্তি দেখিতে চাহিয়াছিল; দৃষ্টি সরাইয়া সে কেবল বলিল : আবারও কোনো হঠকারিতা করিও না। এখন সাঁঝের আন্ধার নামিয়া আসিতে আছে। এখন কোন বেঘোর বেদিশার মধ্যে পড়িয়া যাবা। না হয় কাইল ভোরই ভাই-এর বাড়িতে চলিয়া গেলা। ইতিমধ্যে সব বিষয় একটু ভালোভাবে বুঝ-সুঝ কী বিবেচনা করণ যাইবে। এত পরিচিত দুইটি মানুষ পরস্পরের এমন কাছাকাছি হইয়াও দূরে দূরে সরিয়া গেল আবারও।

শিকদার হাতিনায় বসিয়া রহিল স্তব্ধভাবে। কয়েকবারই ইচ্ছা হইল জোবেদা আরও কিছু বলুক তাহাকে, কেমন করিয়া এই দীর্ঘ বৎসরগুলি কাটাইয়াছে, একরকম নিজ হইতে নির্বাচন করা একটা মানুষকে সে-ই অকস্মাৎ খারিজ করিয়া দিয়া আসিয়াছে, না সে-ই কোনো আপন সুবিধার জন্য তাহাকে তাড়াইয়া দিয়াছে। সে কয়েকবার ঘরের দিকে চক্ষু ফিরাইয়া জোবেদাকে উদ্দীষ্ট করিতে চাহিল, কিন্তু তাহার আর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। ইচ্ছা করিতে লাগিল সেও জোবেদাকে বলে এই পাঁচ-পাঁচটি বৎসর সে কী দুঃসহ অবস্থার মধ্যে দিয়া কাটাইয়া চলিতেছে। অন্য সকলে যখন তাহাদের ঘর-সংসার কর্ম লইয়া ব্যস্ত, শিকদারের বুকের মধ্যে কেবলই যেন জ্বলিয়া চলিয়াছে তুষের অনল, কোনো কর্মে, কোনো ধর্মে সে আর উৎসাহ বোধ করে নাই। আকাশে বর্ষার মেঘ পাকাইয়া গুরু গুরু ডাকে ধাইয়া গিয়াছে কত উৎসব কত কর্মের আহ্বান জানাইয়া, সে তবু নিঃশব্দ গৃহে ততধিক মেঘভার মনে লইয়া বসিয়া রহিয়াছে। খেত পড়িয়া রহিয়াছে, সে কর্মে নামে নাই, বীজবপনে উৎসাহ বোধ করে নাই; শরষ্কালে আর ডোঙা লইয়া বিলের মাছ কিংবা শাপলা তুলিয়া আনারও আগ্রহ দেখাই নাই; হেমন্তে সোনার ধান ভরে নাই তাহারও উটান, কেন না তাহার গৃহে সে নাই, যে গৃহিণী তার ঝাড়িয়া তুষ উড়াইয়া বাছিয়া, সিদ্ধ করিয়া নবান্নের উৎসবকে সার্থক করিয়া তুলিবে, ওই উঠানে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ছড়াইয়া শুকাইয়া গোলা ভরিয়া রাখিবে, ভুবন ভরা এত শ্রীর মধ্যে তাহাদেরও একটি খণ্ডশ্রী উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। শীতে সেও তো পারিত গাছে গাছে উঠিয়া পাটালিগুড়ের উপাদান সংগ্রহ করিতে, সন্ধ্যায় চুলাশালের পাশে বসিয়া সেই গুড়ের ভিয়ান দিতে দেখিয়া তাহারও বুক গর্বে-আনন্দে ভরিয়া উঠিতে পারিত। কিন্তু শিকদার কিছুই বলিল না, কেবল জোবেদার অভাবেই যে এতগুলি বৎসর এই রকমই নিষ্ফলা হইয়া রহিয়াছে সে সম্বন্ধে সে নিজেও হয়তো নিশ্চিত ছিল না! অথচ, তবু ইচ্ছা করিতে লাগিল জোবেদার কাছে উঠিয়া গিয়া ধীরে ধীরে বলে : আমারে ভুল বুঝিও না জোবু। তোমার উপর এমন অত্যাচারের জ্বালা আমি কি নিজেও টের পাইতে আছি না। পুরস্কারের কথা কও, একবার চৌখ মেলিয়া দেখো জগৎ-সংসারের দিকে কত কন্যা এমন দুর্দশার মধ্যে খাবি খাইয়াও কুল পাইতে আছে না। ওই পুরস্কারের আর-এক রেওয়াজ এর উপরে তার, এই জিনিসের উপরে সেই জিনিসের দাবি নির্দিষ্ট করিয়া দেওন। আমার কি সাধ ছিল না। এখনও কি নাই? আইজ যখন বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইলাম মনে কইল সব দিক যেন উজালা হইয়া উঠছে। ওই যে তুমি যেমনভাবে কাজে ব্যস্ত আছিলা পাকের ঘরে, কীসের একটা বিভায় যেন কেবল চুলার আগুন না, তোমার মুখ-চৌখও রাঙিয়া উঠছিল, তার আলোক হলকে আমি আশ্চর্য বোধ করলাম, মুগ্ধ হইয়া গেলাম, মনে হইল, এই মধ্যখানের এতগুলান বচ্ছর যেন একটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু না। আমি কাব্য লইয়া মজিয়া আছি, এখনও তক স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক দেখি নাই, কেবল মনে করছি আমার ধ্যান লইয়া, হ, এইরকমই তো হইবে, কিন্তু বাস্তবে তেমন হয় নাই, বোধ করি কখনও হয় না। তবু, যেমন উচিত তেমন ঘটাইবার, সেইরকম একটা স্বপ্ন মনে জিয়াইয়া রাখন যেন আমার জীবনের একটা না-লেখা দলিল হইয়া রইছে। আমার চিন্তায় ভাবনায় এই মস্তিষ্কে এই দেহের প্রত্যেকটি রক্তের বিন্দুতে প্রত্যেকটি নিশ্বাসে প্রশ্বাসে বুকের কাপনে আমি টের পাই আমার মধ্যে অনেক যুগের মানুষের ব্যথা বেদনা দুঃখ কষ্ট আনন্দ যেন একটা মুক্তি, একটা ব্যাপ্তি খুঁজতে আছে। কিন্তু জোবু, আমি তারে কোনো রূপ দিতে পারি না। এখন, এই এতকাল পরে আমার খেয়াল হইতে আছে আমি জীবনের কথা কইছি, প্রেম-প্রীতি ভালেবাসার কথা কইছি কোনো একটা পোষা তোতা পঙ্খির লাহান কতকগুলি শিখানো কথা আউড়াইয়া, তা আমার মন-মস্তিষ্ক-হৃদয়, এই শরীরের প্রত্যেক রক্তবিন্দু হইতে উচ্চারিত হয় নাই। যা কিছু করিয়া চলিয়াছি তা যেন কেবল নিজেরই প্রতিষ্ঠার জন্য, আনন্দের নামে কী দিতে আছি মানুষেরে তা কী জিনিস, বিষ না মধু? এক একবার আমার নিজেরও মনে হইছে আমিও যেন ওই হাট-বাজারের ভুয়া ধন্বন্তরি ওঝার লাহান কেউ, যেন একটা ফাঁকি একটা ধাপ্পার উপর নিজের ভালাই-গুছাইয়া লওনের পেশায় নামছি। না, জোবু, আমার মন ভরে নাই। ভালোবাসার গীত গাই, অথচ জানি না কেমন সেই ভালোবাসা, জীবনের কথা কই, কই জগৎ-সংসারের কথা, কিন্তুক কতটুকু তার জানি? কেমনই বা ঈশ্বর, কী এ জীবনের আদত লক্ষ্য এই সব ভাবনা-চিন্তায় কক্ষনো কূল পাইতে আছি না। কেনই বা এই সুন্দর ভুবনে এত দুঃখ, এত কষ্ট, এত অভাব তার একটা মীমাংসা না পাইলে আমি যেন কোথায় দিয়া কী শুরু করমু তা বুঝিয়া উঠতে পারতে আছি না। এমন তো আমি ছিলাম না, তবু কেন এমন হইলাম।

কিন্তু সেই সব কোনো কথাই শিকদার বিশেষ গুছাইয়া বলিতে পারিল না। আরও বলিতে চাহিয়াছিল : এখন আমার মন-প্রাণ কী চায় জানো জোবু, একজন সাধারণ খুবই সাধারণ গৃহস্থ হইতে। তুমি বারবার আমারে দেখতে চাইছ খুব বড়ো কেউ হইতে, গণ্যমান্য হইতে, কেচ্ছা-কাহিনির নায়কের লাহান হইতে, কিন্তুক এখন দিনে দিনে বুঝিয়া উঠিতে আছি সেইসব কিছুই আর আমার মন টানতে আছে না; মন কেবলই কইতে আছে, কেউ না আমি নগণ্য হইতে চাই, যেন তা হইলেই সকল প্রীতির সোয়াদ পাওয়া যাইবে। তুমি তো জানোই আমার কোনো লোভ নাই। কোনো উচ্চাশা করি নাই, এখনও নাই। এই যে তুমি এতকাল পরে এমন করিয়া আসলা, এখন কী করিয়া যে সব সুসার করি চিন্তা করতে গিয়া আমি যেন আরও আউল-বাউল হইয়া পড়তে আছি।

সেই সমস্ত কথার অর্ধেকই হয়তো শিকদারের মুখে ভাষাও পাইল না। জোবেদাকে দেখিল হাতিনার একধারে বসিয়া একটা জোনাক জ্বলা ডালিমগাছের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, মুখ ফিরাইয়া একবার শিকদারকে লক্ষ করিয়া আরও যেন কী খুঁজিল তাহার মধ্যে, তারপর নিজ হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজিল।

একটুকাল ইতস্তত করিয়া সহজ হইতে চাহিল শিকদার : ওই দেখো, জীবনের যেইদিকে তাকাইছি কেবলই যেন চৌখে পড়ছে রীত-প্রকৃত-প্রীতের কথা। কিন্তুক এখন কী মনে হইতে আছে জানো? ওই দুই জোনাক জোনাকির একত্র হওনের মধ্যে আরও কোনো গভীর তত্ত্ব আছে। দেহ-মনের ক্ষুধার কি অন্ত আছে। কীট-পতঙ্গ, জন্তু-জানোয়ারের জগতে একে যেন অন্যকে ধ্বংস না করিয়া ক্ষান্ত হয় না, তৃপ্ত হয় না। কিন্তুক মানুষের সমাজে নিশ্চয়ই তা হইতে পারে না। এমন সুন্দর ভুবন সৃষ্টিকর্তা যেন আরও কোনো বড়ো ভালোবাসার জন্য বিছাইয়া রাখছে। কিছুকাল ধরিয়া আমি কেবলই তা তবধ করার চেষ্টায় আছি। জানো, টের পাই, এখন আমার গীত-গানের ধারা, তার রকম-সকম বদলাইয়া যাইতে শুরু করছে।

জোবেদা সেই একইভাবে বসিয়া থাকিয়া তাহার দিকে আরও একবার চক্ষু বুলাইয়া লইল।

: সমস্ত সৃষ্টিটাই তো একখান গীত-এর লাহান। যেন কোনো বড়ো, এমন বড়ো যার ধারণাও আমরা করতে পারি না,-সেই রকম কেউর সৃষ্টি। কত রকম সুর-স্বর কত রঙ্গ, খেলা-লীলা তার মধ্যে। আবার তারই মধ্যে এক একজনের ভুবন, তার আপন আপন গীত-কথা। কিন্তুক যার জীবনে তা নাই, কী কারণে তা নাই তার একটা বুঝ না পাইয়া স্বস্তি পাইতে আছি না। আমার গীত-গান দিয়া এই অপ্রীতির কষ্ট ঘুচাইবার ইচ্ছা জাগতে আছে। মনে কয় আমার লাহান কবির কাম হইবে সেইসব কারণগুলানের মীমাংসা ধরাইয়া দেওয়া। এত সুন্দর ভুবনের মধ্যে কোথায় অন্যায় আছে, কোথায় অসত্য, কোথায় অসুন্দর দৌরাত্মে করতে আছে তা ঠিক ঠিক দেখাইয়া দিতে না পারলে এই সমস্ত গীত-গানেরও কোনো অর্থ হইবে না। কবির কাজ তো ম্যাজিক দেখানো না জোবু, তাতে সত্য দেখাইতে হয়, সুন্দরের দিকে আকৃষ্ট করতে হয়।

জোবেদা উঠানের দিক হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া শিকদারকে দেখিতেছিল, দুই হাতের জোড়ে বাঁধা হাঁটুর উপর মাথা কাত করিয়া। এক সময় যেন চিন্তার মধ্য হইতে অস্ফুটস্বরে জানিতে চাহিল : কোথায় কোন কবি কবিয়ালরে সেই কাম কেউ করতে দেখছে?

শিকদার উৎসাহের সঙ্গে তাহার কাছে গিয়া বসিল : আছে জোবু আছে। বয়স খুবই অল্প আছিল, ঘোরে পড়ছিলাম অন্য প্রকার ধ্যান-জ্ঞানের। সেই কালে ওই দূর সদর শহরের এক কবির আসরে তার গান শুনতে গেছিলাম। তখন একটু আজব মনে হইছিল, সব বিষয় ভালো করিয়া বুঝিও নাই। এখন দিনে দিনে সেই স্মৃতিটা বড়ো উজ্জ্বল হইয়া উঠতে আছে। শোনো, যাত্রাগানের লাহান সেই আসর। বাঁশ পুঁতিয়া, উপরে রঙিন শামিয়ানা টান টান করিয়া বাঁধা যাতে কোনো দুষ্ট হাওয়াও যেন কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে। তার মধ্যখানে বিরাট একটা চৌকি দেখলাম মঞ্চের, একধারে বাদ্যযন্ত্র কোলে লইয়া বসা দোহারের দল, আর এক কবিকে দেখলাম মঞ্চের এই দিকে সেই দিকে বীরদর্পে পা ফেলিয়া তিনি যে গান গাহিতেছিলেন, কখনও কথায়, সুরে তা যেন ভুবন কাঁপাইয়া দিতে আছিল। তার মাথায় পাগড়ি, গায়ে জোব্বা, চৌখে জ্বলন্ত দৃষ্টি। সব কথা তার বুঝিও নাই, শোনারও তেমন বড়ো অবসর ছিল না। তবে কয়েকটা চরণ এখন মনে আছে ‘সইবোনা মোরা এই অপমান’। আর একটা গীতের কথা ছিল ‘স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে, স্বদেশ কারে কয়, এই যমুনা গঙ্গানদী তোদের ইহা হত যদি, পরের পণ্যে পোরা সৈন্যে জাহাজ কেন বয়? কী তেজ বীর্য সেই সব কথায় তখন তাদের নামও শুনছিলাম, তাগো ছোটো ছোটো কবিতা-পত্র গানের বইও বিক্রয় হইছে আশে-পাশে, কিন্তুক সেইখানে যাইতে হইছিলও লুকাইয়া, কোনো রকম প্রমাণাদিও আর সঙ্গে রাখনের সাহস হয় নাই। যাদের গীত তিনি গাইলেন সেই মুকুন্দ দাশ, গোবিন্দ দাশদের দেখার বা শোনার কোনো সুযোগ হয় নাই সত্য, কিন্তু তার অন্য একখান গীতের রকম সকম দেখিয়া যেন একেবারেই চমকাইয়া গেছিলাম। মাথার পাগড়ি আর গায়ের জোব্বা খুলিয়া ফেলিয়া তিনি ধরছেন হালিয়া-চাষার বেশ। খুউব অসন্তোষ আর গোস্বা দেখাইয়া মঞ্চের এইধার সেইধার ঘুরলেন কয়েকবার, তারপর হাতের ইঙ্গিতে সকল বাদ-বাজনা–কোলাহল থামাইয়া তিনি মাথা ঝাঁকাইয়া কইয়া উঠলেন, নাহ এই পিরিতিজ্ঞা করলাম আমি ভূঁইয়া এই হুক্কা-কলকিডায়, জন্মেও আর হাল দিমু না ধানখেতে কি আউখ ভিটায়। সঙ্গে সঙ্গে সব দোহারেরা গলা বাড়াইয়া জানতে চাইল : ক্যান, ক্যান, ক্যান? বিষয়টা কী, কী? গায়ক আবারও ঘুরপাক দিল মঞ্চের উপর বড়ো বড়ো পা ফেলিয়া, তারপর হঠাৎ সকলের দিকে হাত তুলিয়া যেন বিচার চাইল : এই খেত-মজুরের জোরে তিনি চলেন জুড়িগাড়ি হক্কাইয়া আর জোহের কামড় খাইয়া আমি মরি কপাল চাপড়াইয়া। তোমারে কী কমু জোবু, চতুর্দিকে চাইয়া দেখি আসরের সমস্ত মানুষ যেন সেই দুর্ভাগ্যের দুঃখে আচ্ছন্ন হইয়া পড়ছিল। আমারও সেই ধরনের গীত-গানের ইচ্ছা হয় এখন জোবু, কেবল সুন্দর দেখিয়া চৌখ ভরাইলেই হয় না, অসুন্দরের বিরুদ্ধেও খাড়া হইতে হয়।

জোবেদা ধীরস্বরে বলিল : সেই সব তো সমাজপতি-রাজা-বাদশার কার্য, কোন কবি কখন সাধ্য পাইছে?

শিকদার অন্যমনস্কভাবে বলিল : পায় নাই, কিন্তু সাহায্যও তো করতে পারে। অন্যায় শাসন-শোষণের উপর যারা নিজের সুখে ভিত বানায়, তারা দুঃখীর ফরিয়াদরে অন্যমুখী করিয়া দেয়। আর তখন তাগো চাতুর্যও এমন হয় যে দুঃখী মানুষ তার দুঃখমোচনের আদত পথ হাতড়াইয়া পায় না। তারা নিভৃতে কাঁদিয়াই সারা হয়।

শিকদার কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন থাকিয়া উঠিয়া পড়িল : আমারে একটা কামে বাহির হইতে হয় কিছুকালের জন্য। তুমি ঘরে আসো, বাহিরে ঘোরাঘুরি করিও না, আর ঘরের কেওয়ারটাও বন্ধ করিও রাখিও।

জোবেদাও উঠিয়া আসিল, কিন্তু কোনো কথা তুলিল না।

.

২২.

বঁধুর রূপের কথা বলব কী রে
আমার দৃষ্টি নাই
জীব জগতের সব এই আছে
নিজের সৃষ্টি নাই।
সেই অরপ-স্বরূপ জ্ঞানের বলে
প্রীতির উদয়
তার বিরহে সবই মিছা
ভাঙেরে হৃদয়।
প্রীত করে জীব-জগৎ
প্রীতে বাঁধে ঘর
প্রীত জীবনানন্দ, প্রীতে নাই পর
প্রীতিই ঈশ্বর ॥

যে যাহাই বলুক শিকদার অন্ধকারের কখনও গ্রাহ্যে আনিতে চায় নাই। কেবল চাঁদ তারার আলোক নয়, জোনাকিপুঞ্জের আভা নয়, দৃষ্টিশক্তির কথাও নয়, চতুর্দিকের জীবনের সঙ্গে পরিচিতি বোধও তাহাকে কখনও আশ্বস্ত আবার কখনও বা বিক্ষুব্ধ করিয়াছে। ঘর-উঠান, আম-জাম-সুন্দরী বাগানের মধ্য দিয়া দিক-চলাচলের পথও সে অন্ধকারেও চলিতে পারে। কোনোখানে হঠাৎ খাড়া হইয়া বুক ভরিয়া নিশ্বাস লইয়া বলিতে পারে কোন দিকে তাহার দাদির হাতে রোয়া সিঁদুরে আমের গাছটা, কোনখানে দাদা করমালী লাগাইয়াছিল সোনালি ডাবের গাছগুলি, আর কোনখানেই বা তাহার মা-র বট-বড়ইর তলা। কোন গাছে কোন পাখ-পাখালিগুলি রাত্রির আশ্রয় লয় তাহাও অজানা নাই। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই ঘর-বাড়ি গৃহস্থালী কাব্য-কবিতার মতো সাজাইবার স্বপ্ন করমালীও দেখিয়াছে, সেও চাহিয়াছে। কিন্তু এমন একটা সময় আসিয়াছে যখন করমালী আর অগ্রসর হইতে পারে নাই। সকল সমস্যার সমাধান খুঁজিয়াছে সে এমন এক পরিমণ্ডলে, যেইখানে এই ইহজীবন তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়, সংসার এক কষ্টকর পীড়ার মতো ভার, সবই কর্মফল না হয় ললাট-লিখন, যা হইবার তা হইবেই, কেউ তাকে খণ্ডাইতে পারে না। সকল নিয়মের যিনি নিয়ামক তাঁহার ইঙ্গিত ব্যতিরেকে একটি বৃক্ষপত্রও নড়ে না। শিকদারও তাহার সেইরকম বিশ্বাসে নিজেকেও অটল রাখিতে পারিলে সুখী হইত।

হউক অন্ধকার, তবু যেইদিকেই তাকায় শিকদার দেখে বংশ বংশ ধরিয়া মানুষের সমস্ত জীবনাচার একপ্রকার অসহায় বার্ধক্যের প্রান্তে আসিয়া পৌঁছিয়াছে; নদী-খাল, খেত-মাঠ, ঘর-বাড়ি, বন-জঙ্গল, পশু-পাখি, তৃণ লতা, কীট-পতঙ্গের পরিবেশে ভরা প্রকৃতিতেও ক্রমাগত অনেক রকম পরিবর্তন ঘটিয়া চলিয়াছে। তাহা ছাড়া শৈশব দৃষ্টিতে যা দেখিত, পরিণত বয়সে তা অন্যরকমের মনে বাহিরের ও ভিতরের উভয় রকম প্রকৃতিও ক্রমাগত বদলাইয়া চলিয়াছে। একদিন যা মনে হইত পরমকাম্য সুখ, অন্যদিন আবার তা মনে না-ও হইতে পারে। বাহিরের প্রকৃতির মতো চিত্ত চারিত্রের পরিবর্তনও তো জীবনানুগ হইতে বাধ্য। সুতরাং সেই জীবনাচারে সংগ্রাম অপরিহার্য। তাহার পিতা সেই চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু কূল পায় নাই। এক একবার মনে হইয়াছে সমস্ত জগৎ-সংসারও সেইরকম সাফল্য সহ্য করে না। রাত্রিকালে সমস্ত দিক-দিগন্ত গাছপালা শান্ত স্তব্ধ হইয়া আছে, কিন্তু অকস্মাৎ কোনো ঝড় ঝঞ্ঝার মধ্যে আলুথালু হইয়া নৃত্য করিয়া সকল জীব সংসার কি ফল ও ফসল তচনচও করিয়া দিতে পারে। গাঙ তাহার খেয়াল খুশিমতো পাড় ভাঙিয়া আকৃতি বদলায়, মানুষ তাহার অজ্ঞানে-অবহেলায় বদলাইয়া দেয় প্রকৃতি। দুঃখ দৈন্য দুর্দশাও যেন সে স্বয়ং পথ করিয়া বহাইয়া দেয়। ঘন গাছপালায় ঘেরা ছোটোখাটো ঘর-গৃহস্থালী কতরকম আক্রমণ হইতে নিজেদের রক্ষা করিয়া আসিতেছিল যুগ যুগ ধরিয়া, কৃষি কাজের সুসমন্বিত কত ব্যবস্থা গড়িয়া উঠিয়াছিল বংশ-পরম্পরায়, তাহার কার্য-কারণ খেয়াল করিয়াও শিকদার মনে করিয়াছে জীবন-সংগ্রামের রীতি-নীতিগুলির মধ্যেই বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়াছে, মৌল বিষয়গুলির প্রতি যথাযথ আনুগত্যের অভাব আরও দুর্গতির সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে।

প্রতিটি বাড়িয়ালের ঘর-বাড়ি, খেত-মাঠ, গাছ-পালা, পুকুর-নালা খাল, বিন্যস্ত করিবার কালে একের সহিত অন্যের সম্বন্ধ ও পূর্বপুরুষদের খেয়াল ও যত্ন লক্ষ করিয়াও শিকদার মুগ্ধ হইয়াছে, বিস্মিত হইয়াছে, এমনকী একটা গর্ববোধও জাগিয়া উঠিয়াছে বুকে। সামান্য গৃহস্থ-রমণীও জানিয়া আসিয়াছে। কোনখানে কোন সময় কোন গাছ লাগাইতে হয়, তাদের সহ-অবস্থানের সুফল-কুফল, পুকুরে হাঁস পালনের সঙ্গে হেলঞ্চা-মালঞ্চা-কলমিশাক লইয়া দিবারও কী সম্বন্ধ, কোন ফল-মূল লাগাইতে হয় গৃহাবর্জনার ঠাঁই-এর কাছে, কোন সময় কোন কোন গাছের কলম বাঁধিয়া আরও উন্নততর ফল-ফলারির সৌভাগ্য রাখিয়া যাওয়া যায় পরবর্তী বংশধরদের জন্য, কোন লতা-পাতা শাক-সবজি, ফুল-ফলের বাগান প্রতি গৃহে অত্যাবশ্যকীয়, সেই বোধ বুদ্ধি ও জ্ঞানের অভার তাহাকে বিমুগ্ধও করিয়াছে। সে কখনও বুঝিয়াও উঠিতে পারে নাই বড়ো বড়ো গাছগুলির ডালপালার ভাঁজে জন্ম লওয়া ফুলের ঝাড়গুলিকেও মানুষ পরগাছা বলিয়া কেন হিংস্রভাবে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে। রাজ্যরাষ্ট্র ভাঙিয়াছে-গড়িয়াছে, আর এক-একটা ঝড় যেন সমস্ত ঐতিহ্য সমস্ত পূর্বস্মৃতি সমস্ত বিদ্যাবুদ্ধি কৌশলকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিয়াছে। এরও বিরুদ্ধে একটা প্রচণ্ড বিক্ষোভ শিকদারের মনে দানা বাঁধিয়া উঠিতেছিল। তাহার গৃহস্থালীকেও সেও হয়তো সুশোভনভাবে গুছাইয়া লইতে পারিত। শৈশবকাল হইতে জোবেদার সঙ্গে জীবনের যত খুঁটিনাটি লক্ষ করিয়াছে তাহার প্রতি মমতা অথবা বিরাগ অনুভবের মধ্য দিয়াই তাহারা একে অন্যের কাছাকাছি আসিয়াছিল। এখন এতকাল পরে তাহার আবির্ভাব শিকদারকে বিহ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। জোবেদার নিকটে বসিয়া আবারও সে সেই অতীত দিনগুলির মতো তাহার কাছে নিজের নতুন গীত-কথার বিষয় তুলিয়া একটু : সংকুচিতও বোধ করিতে লাগিল। প্রায় তাহাকে বলিতে যাইতেছিল একটা নতুন গানের কথা, জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছিল : এই কয়েকদিন ধরিয়া কতকগুলি পদ কেবলই মনে মনে গুছাইয়া লইবার চেষ্টা করিয়া চলছি, শুনবার ধৈর্য আছে?

ভাগ্যিস, জিজ্ঞাসা করে নাই, কেবল অভিমানের বিষয় নয়, পদগুলি তখনও তাহার মনের মতো হয় নাই। তাহার উপর জোবেদা হয়তো তাহার সেই পরিবর্তন আদৌ পছন্দ করিতে পারিবে না। ইতস্তত পায়চারি করিতে করিতে শিকদার নিজেকে সংযত করিয়া লইতে চাহিল।

কবি কি বাস্তবিকই কখনও অন্যান্যদের মতো গৃহস্থ হইতে পারে, না তাহাকে ক্রমাগতই ডাক দিতে থাকে অন্যতর ভুবনের মায়া? কেন তাহারা চিরকাল কোনো মোহস্তের মতো স্বপ্নই দেখিয়া চলিবে, বাস্তবকেও কেন সকল স্বপ্ন সাধ পূরণের সংগ্রাম করিবে না? তাহার ভাব-ভাবনা বিশিষ্ট হইয়া পড়িতেছে, কিন্তু সে স্বয়ং কি কখনও কোনো ধনী মানী বিশিষ্ট জন হইতে চাহিয়াছিল? তাহার কণ্ঠস্বরের সাধুবাদ শুনিয়া আসিতেছে শৈশবকাল হইতে। অভ্যাসে এবং চর্চায় সেই স্বর কারুকার্যময় করিয়া তুলিতে তাহার প্রায় কোনোই বেগ পাইতে হয় না।

কিন্তু কী হইবে শুধু স্বর লইয়া যদি তাহার সঙ্গে উপযুক্ত রকম প্রাণের কথা না থাকে। সেই রাত্রির অন্ধকারের মধ্যেও মনে হইল তাহার অন্তরের কথাগুলি যেন তখনও সর্বত্র ছড়াইয়া রহিয়াছে; চতুর্দিকের নৈঃশব্দের মধ্যেও কত কত পুরাণ-কথা জোনাকির মতো জ্বলিয়া জ্বলিয়া তাহাকেও আকৃষ্ট করিয়া চলিয়াছে। কোথাও হইতে ‘কোরা’ পাখির ডাক ভাসিয়া আসিল; খালের ধারে নলবনের মধ্যে ডাহুকও হয়তো বাহির হইয়া আসিয়াছে তাহার নিশীথ-অভিসারে। হউক চতুর্দিক অন্ধকার, তবু তাহারই মধ্যে জীবন লীলা অব্যাহতরূপে বহিয়া চলিয়াছে। বাসনা কি কামনার উর্ধ্বে জীবন নাই, কিন্তু কোন কামনা তাহার জীবনে সর্বাপেক্ষা বড়ো সত্য? সে কি কেবলই ওই জোবেদাকে আকাঙ্ক্ষা, না অন্যতর কিছু?

শিকদারে কখনওই মনে হয় নাই কবি হইতে গিয়া তাহাকে এমন বিপুল সব প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হইবে, না কল্পনাতেও ছিল এই নিঃসঙ্গতা। জীবনের সবখানে গতিশীলতা রহিয়াছে ঠিকই, কিন্তু সে-ই ক্রমাগত বিচ্যুত হইয়া পড়িতেছিল। জনতা যে ভাষায় তাহাদের ভাব-ভাবনা প্রকাশ করে শিকদার তা যথাযথ চয়ন করিয়াও দেখিয়াছে কোনোখানে অসঙ্গতি আসিয়া গিয়াছে, তাহার মৌল বিষয়, নানারকম পরম্পরায় এমন কোনো রূপ পরিগ্রহ করিতেছে যার জন্য সমস্ত কথা, কাব্য-কথকতাকে নতুন করিয়া সাজাইয়া লওয়া প্রয়োজন, প্রচলিত রীতি-নীতি এবং বাধা-বন্ধের বাহিরেও পরীক্ষা নিরীক্ষা নিবেদন উপস্থাপন অতি আবশ্যকীয় বলিয়া মনে হইয়াছে।

এক সময় জোবেদা কাছে ছিল, নতুন বাঁধা কোনো গান কোনো গীত তাহাকে প্রথম না শুনাইলে সে তাহার রচনাও সমাপ্ত হইয়াছে বলিয়া মনে করিতে পারিত না। জোবেদা সকল বিষয় বুঝিয়া উঠিতে না পারিলেও ক্রমাগত তাহাকে উৎসাহ যোগাইয়াছে মন দিয়া শুনুক বা না শুনুক, বুঝুক কি না বুঝুক কেবলই বলিয়াছে : ইসস, অনেক মাইয়া ছেইলারা কী হিংসা যে আমারে করে! সকলে মনে করে একদিন তুমি খুব বড়ো কবিয়াল হইবা। তোমার বাড়ি-ঘর-বিষয়-সম্পত্তি রাজ-রাজাগো পুরীর লাহান ঝলমলাইয়া উঠবে।

কেবল শিকদার স্বয়ং তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখে নাই। দেশে দেশে বাড়িতে বাড়িতে সকলের ফরমায়েশি গীত-গান শুনাইয়া ইনাম আনাম সাধুবাদ অবশ্যই জুটিয়াছে, কিন্তু কেবলই তাহার মনে হইয়াছে যে অন্যকে ফাঁকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও ফাঁকি দিয়া চলিয়াছে, মানুষকে তেজ বীর্য লইয়া সংগ্রামী হইতে উদ্দীপ্ত না করিয়া সে তাহাদের বিভ্রান্তিকেই আরও কায়েম করিয়া রাখার ব্যবসায়ে লিপ্ত রহিয়াছে। একমাত্র ঘাট-মাস্টার ব্যতীত অন্য কেউই তাহার গভীর সংকোচ এবং বেদনার কারণ কিছুমাত্র অনুভব করিতে পারে নাই।

এখন সে নিজেকে এমন একটা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করিয়া লইতেছিল যার মধ্যে কোনো কন্যার জন্য আকুলতা-ব্যাকুলতাই আর বড়ো কথা নয়, বরং মুখ্য হইয়া উঠিতে চাহিয়াছে জীবনযুদ্ধে পরাস্ত প্রায় সমস্ত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। তাহাদের মধ্যে আর সখিনা কি জোবেদার মধ্যে পার্থক্য খুবই অল্প। এমন কতকগুলি অবস্থা-ব্যবস্থা সকলের জীবন নিয়ন্ত্রণ করিতেছে যা এমনই পুরাতন এবং অসঙ্গত যে তাহাকে ক্রমাগত মানিয়া চলিবার মধ্যেও বাস্তবিকই কোনো পৌরুষকার নাই।

নতুন ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী বিচিত্রভাবে তাহাকে একটি গীত শোনায়; তারে তারে গম গমাগম ধ্বনি তুলিয়া যে উদাত্ত কণ্ঠে জানায় :

রাজা-রাজ্যের গীত-গানে আছে সর্বজনা
অভাগার কাহিনি কেউ করে না বর্ণনা।
ধুলপতি হালিয়া চাষা কিন্তু জমিজমা নাই

জোবেদা হয়তো জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল : ওইটা কেমন নাম হইল?

শিকদার বেকুব হইবে না, বলিবে : ধনপতি না, গণপতি না, সারা গায় চুল-দাড়িতে ধুল-ধুলাট মাটির কাম খুঁজিয়া বেড়ায় এক কান্দা হইতে আর-এক কান্দা, ধুলপতি নামটাই তো মানানসই। শোনো আবার :

ধুলপতি হালিয়া চাষা, তার জমিজমা নাই
ঠাঁই পায় না জলে-স্থলে বুঝি আসমানেও তাই।

: নাহ জুত শোনাইতেছে না, আবার ধরি :

ধুলপতি হালিয়া চাষা আর তার কলাবতী বউ
খাঁটিয়া খাওয়ার কামও পায় না, সুখে নাই কেউ।
জলে-স্থলে ঠাই নাই, না আছে থির পেশা
রৌদে পড়ে, জলে ভেসে খোঁজে দিক-দিশা।
একদিন সে বাসনা বোনে বউ কোলে নিয়া
হেনকালে নিদান আসে দুই চক্ষু রাঙাইয়া
তোর কর্ম হাল-হালুটি ভোগসুখ সকল আমার
এই নিয়মে বাঁধা আছে সব জগৎ-সংসার।
ধুলপতি কয়, মহামতি, এ কী কথা হইল
এ নসীব বদলাইতে এত রাজ্যরাষ্ট্র গেল।
দাস আর দাস নাই, না দুঃখ ললাট-লিখন
সালাম কইরে কাতারে শামিল হইয়াছি যখন।
মহামতি গোস্বায় আগুন ছড়িল হুংকার
ঠাটায় ফাটাইয়া দিল যেন দিক চরাচর
বটে, বটে, মহামতি কয়, বড়ো বাড় বাড়িয়াছে
আমার মুখের উপর কথা কে কবে বলিয়াছে।
বল ব্যাটা আমি গুরু, আমি প্রভু, পামর বর্বর।
ধুলপতি কয়, ধীরে গরিব কেন বানাইছে ঈশ্বর?
কানু বলে বিধি তো কাঙাল করে না প্রকৃতি
তবু দুঃখ কেন ভোগে এত জনা জনম অবধি?
দেশের শোভা খেতে মাঠে, কারিগরের কাজে
যেই জনা করে সে কাজ তার কি দুঃখ সাজে?
নারীর শোভা যৈবন যেমন দেশ শোভা সুখ
কোন সে পাপে দুঃখী জনায় বিধাতা বিমুখ?
প্রেম গীতি শুনাইতে বলে সদা সর্বজনা
অপ্রেম রহস্য মোচনই এখন কানুর বাসনা।

কিন্তু কয়েকবার আবৃত্তি করিয়াও শিকদারের মনে হইল মনের মতো কিছু হয় নাই; নতুন কোনো ধরনের গীত-গান বাঁধিতে এখন তাহাকে আরও গভীরে যাইতে হইবে, কেবল দূর হইতে দেখা নয়, সেই সব দুঃখ-কষ্ট যন্ত্রণাকে তাহার সর্বেন্দ্রিয় দিয়া অনুভব করিতে হইবে। সেই সংকল্পে জোবেদা কি উৎসাহিতা হইতে পারিবে? কখনও কোনো রমণী কি তেমন হইয়াছে।

শিকদার বড়ো চঞ্চল বোধ করিতেছিল, একবার মনসব সর্দারের উদ্দেশে রওয়ানা হইয়াও থামিয়া গেল। তাহারা সমাজপতি, প্রভুর মনোরঞ্জনের বাহিরে তাহাদের বিশেষ কোনো ভূমিকা লইবার নাই। জোবেদা যে স্বামীর নিকট হইতে তাহারই আশ্রয়ে আসিয়া উঠিয়াছে সে বিষয়টা কেউই ভালোভাবে গ্রহণ করিবে না। অত্যাচারিতকেও আশ্রয় দিতে পারে দেশের রাজা সমাজপতি অথবা বীরবিক্রম পুরুষ। শিকদার গৃহস্থ হইতে পারে নাই, কবি হইতে পারে নাই, না হইতে পারিয়াছে কাহারও দুঃখমোচনের জন্য কোনো উপযুক্ত সঙ্গী-সাথি। একটা গভীর মনোকষ্ট সে যেন আর কিছুতেই দমাইয়া রাখিতে পারিতেছিল না।

.

২৩.

আসমানে জুড়িয়া আছে সেই একই চন্দ্রতারা
জীবনও বহিয়া চলে যেন নদী স্রোতধারা
সর্বসাধের সাক্ষী এই পুরী বাড়িয়াল কূল
চৌদিকে প্রহরী তাল-তমাল-শিমুল-বকুল
যেই দিকে চাই দেখি বিষয়ে বস্তুয়ে মিল
সৃষ্টি ছাড়া সৃষ্টি কখনও করে না নিখিল।
মোর মনে নিশিদিন অন্তর্জালা দন্ধিয়া জ্বলে
ওরে ও ডাহুক এমন পিরিত করো কোন বলে?
জননী মৃত্তিকা গোপনে ফুটাও তৃণ ফুল দল
কার জন্য মেলিয়া ধরো সোনার ফসল?
আসমানে-জমিনে হাওয়ায় ভরাও বাসনা
তার অধিকার সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীব কেন পাইল না?

বারংবার বহু কথা কখনও সংলগ্ন, কখনও অসংলগ্নভাবে শিকদারের মনে এক এক রূপে এক একভাবে ঘুরিয়া ফিরিয়া জাগিয়া উঠিতে লাগিল। আরও খেয়াল করিতে লাগিল সে বাস্তবিকপক্ষে নিজের জীবনকে সুখে ঐশ্বর্যে ভরিয়া তুলিবার কামনা কখনও হয়তো করে নাই। কেবলই কানে বাজিয়া ওঠে দাদা করমালীর সেই গীত কথা :

একদিন এই ভবের খেলা সাঙ্গ হবে
ধন-দৌলত সব পইড়ে রবে
একলা তুমি আসিয়াছিলে
একলা চলিয়া যাইতে হবে রে
মাটির দেহ মাটিতে মিশাইবে–

কেন জীবন-যৌবন এবং জগৎ-সংসারের প্রতি এমন ঔদাসীন্য গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহার মনে? বুদ্ধির তুলনা ছিল না। জীবন জগতের কোনো কোনো ঘটনার সম্মুখে একেবারে অসহায় হইয়া পড়িত। মাঝে-মধ্যে গাঙের বাঁকের কাছে বসিয়া কী এক ঘোর ভাবনায় নিমজ্জিত হইয়া থাকিত। খুশি খুশি হইতে তাহাকে দেখিলে, আদর করিয়া কিশোর শিকদারের ছোটো হাতখানি নিজের হাতে তুলিয়া লইয়া আবারও তাহার ভাবনার মধ্যে তলাইয়া যাইত। সে বারংবারই জানিতে চাহিত : কী এমন দেখো তুমি ওইদিকে চাহিয়া দাদু, আমি তো ওই কাশবনের চূড়াগুলান ছাড়া আর কিছুই দেখি না।

করমালী আরও আদর করিয়া তাহাকে জড়াইয়া লইত প্রায় বুকের মধ্যে; দেখবি, আরও একটু বড়ো হ, তখন দেখবি। এখনও বোধ করি চৌখ ফুটে নাই।

শিকদার একটু গোস্বা করিয়া নিজেকে ছাড়াইয়া লইত : হ, এইটা একটা কথা হইল। আমি আইজও তো গহন পুকুরে ডুব দিয়া মাছ হাতাইয়া উঠাইছি। অন্যেরা মনে করে আমি যেন পানির তলার সবও দেখতে পাই।

করমালী হাসিয়া বলিত : সে তো অন্ধের লাহান হাতড়াইয়া কিছু ধরা। ঠিক ঠিক জিনিস চিনতে হইলে সবরকম দৃষ্টি চাই, যে-জিনিস চাই তার সম্বন্ধে একটা ধ্যান চাই। আসলে আমার মাঝে মধ্যে কী মনে কয় জানো ওই কাশবনের আড়ালে, ওই দূরে দূরে গাঙ যেইখানে আঁকাইয়া-বাঁকাইয়া দূর দিক সীমানার মধ্যে মিলাইয়া গেছে, তার সব কিছুর মধ্যে দেখি একজন অসহায় কন্যার মুখ, ক্যান জানি না, সেই মুখোনি যেন উপবাসে কাতর, নিজ যৈবনের ঐশ্বর্য লইয়া তার বিড়ম্বনারও শেষ নাই।

করমালী আপন মনেই গুন গুনাইয়া উঠিয়াছিল :

আমি এই তারে দেখি রসের পসারি
এই তরে উদাস
এই তার অঙ্গে কুমারী রঙ্গ পলক না ফেলিতে
বৈধব্যের বাস।

কী তোরে বলিরে, একটা পুরা চেহারা যেন কক্ষনোই দেখিয়া উঠিতে পারি না। আমার মা-এর কথা মনে পড়ে। ওই গাঙ ধরিয়া কোথাকার কোন মুলুক হইতে তাহারা ভাসিয়া আসিয়াছিল।

: কোন মুলুক হইতে?-শিকদার বারংবার সেই ইতিহাস শুনিতে চাহিত। পিতামহ করমালী মাথা দোলাইত : জানি নাই, কেউই কখনও জানে নাই। জীবনের কিছু থির নাই রে, মানুষ কি কখনও একই জাগায় একইভাবে বসত করতে পারছে? তামাম দুনিয়ার মানুষ যেন হাজার হাজার বছর ধরিয়া নিজের স্থায়ী ঠাই বানাইতে সবখানে ঘুরিয়া-ফিরিয়া সারা হইতে আছে। আমি আরও কী ভাবি জানিস, কী এই জীবন ধারণ, কষ্টের লাঘব না আনন্দ-উৎসব?

শিকদার তৎক্ষণাৎ হাততালি দিয়া বলিত : উৎসব, উৎসব, আনন্দ-উৎসব?

করমালী ইচ্ছা করিয়াই আর কোনো ভারী ভারী প্রসঙ্গ তুলিত না, তাহার হাত ধরিয়া বাড়ির পথে চলিতে চলিতে বলিত : এইবারে তোমারে এই বৈশাখী-মেলায় লইয়া যামু। দেখিও, শত রকম দুঃখ কষ্টের মধ্যেও মানুষের মনের আনন্দের বাসনাটাও কেমন কাতর হইয়া পড়ছে। এই জগৎ-সংসারে দুঃখ আছে বলিয়াই আনন্দও যেন বৈরী হইয়া রইছে।

এতকাল পরে শিকদারেরও নতুন করিয়া খেয়াল, চতুর্দিকে প্রাণ আছে, চাঞ্চল্য আছে, আছে সর্বকালের সকলপ্রকার গতিময়তা, কিন্তু সহজ স্বতঃস্ফুর্ত আনন্দ নাই। কেন নাই? কখনও কি ঝড়-ঝঞ্ঝার মতো কোনো দস্যু আসিয়া সবদিকের সব জীবের জীয়ন-কাঠি হাত করিয়া নিজ স্বার্থেই এমন করিয়া ফেলিয়া রাখিয়াছে?

পথ অন্ধকার হইলেও শিকদার হোসেনের বাড়ির দিকে পা উঠাইল।

.

২৪.

নিদয় বঁধু আমার পরান তুমি
কোন শুভদিনে দেখা তোমা সনে
পাসরিতে নারি আমি।
যখন দেখিয়ে ও চন্দ্র বদনে
ধৈরয ধরিতে নারি
অভাগীর প্রাণ করে আনচান
দণ্ডে দশ বার মরি ॥
মোরে করো দয়া দেহ পদছায়া
শুনো শুনো পরান-কানু
কুলশীল সব ভাসাইনু জলে
জীয়ব তুয়া বিনু ॥
সৈয়দ মতুর্জা ভনে কানুর চরণে
নিবেদন শুনো করি
সকল ছাড়িয়া রহিল তুয়া পায়
জীবন মরণ ভরি ।।

হোসেন তখনও বাড়ি ফিরে নাই। কয়েকবারই মনসব সর্দার না হয় জোবেদাদের বাড়ির দিকে পা উঠাইয়াও শিকদার থামিয়া গেল। কেবলই মনে মনে পর্যালোচনা করিয়া দেখিল, জোবেদার পাশে খাড়া থাকাই এখন আশু প্রয়োজন। মনসব সর্দারের কথা কড়ার রাখিয়া হয়তো তাহারও সাহায্যে একটা উপায় মিলিয়া যাইবে।

বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, জোবেদা প্রতীক্ষা করিতেছিল, কিন্তু তাহার মুখ অন্ধকার, প্রদীপের আলোর নিকট হইতেও সে দূরে সরিয়া রহিল।

: কই, কী তৈয়ার করলা তুমি, আসো, খাইতে খাইতে কথা হউক। শিকদার নিজেই প্রদীপটি তুলিয়া লইয়া পাক-ঘরের খাটালে বসিল। কবে সেই কোন ছোটেকালে তাহার চড়ইভাত খাওয়ার আমেজটা ফিরাইয়া আনিবার জন্য সে চেষ্টার ত্রুটি রাখিতে চাহিল না। কিন্তু জোবেদাকে যেন প্রায় জোর করিয়াই উঠাইয়া আনিতে হইল। সে তাহার সাধ্যমতো যা কিছু প্রস্তুত করিতে পারিয়াছিল সবই শিকদারের সম্মুখে সাজাইয়া দিল।

: কই, তুমিও বসো।

জোবেদা মাথা নাড়িয়া একটু দূরে বসিল : নাহ্, তায় আমার খিদা নাই। শিকদার তবু আহার্যগুলি একে একে পরীক্ষা করিয়া বলিল : তবু এত পদ তুমি করলা কেমনে করিয়া? আমার ঘরে তো কক্ষনো কিছু থাকে না। এই মলান্দী মাছগুলানও যে সেদিন ধরিয়া কোথায় কোন হাঁড়ির মধ্যে রাখছিলাম তা আর স্মরণেও আছিল না। এমন গৃহিণীর উপরেও যে অত্যাচার করতে পারে, সেইটারে তো মানুষ বলিয়াই মনে হয় না।

জোবেদা কোনো মন্তব্য করিল না। খাটালের উপরে এক হাতে ভর দিয়া সে কাত হইয়া বসিয়াছে, নতমুখ কী ভাবনায় আচ্ছন্ন, দৃষ্টিতেও আর কোনো ঔজ্জ্বল্য নাই।

শিকদারের পক্ষে কোনোক্রমেই বুঝিবার সাধ্য ছিল না যে সেই মুহূর্তে অকস্মাৎ অমন সেই স্বামী আসগরউল্লার আহার-তৃপ্ত মুখ যেন ধক করিয়া বাজিয়া উঠিয়াছিল বুকের মধ্যে। যতই সে অত্যাচারী হউক, এই অতি সামান্য মাছের আহার তাহার মুখ কোনো শিশুর খুশিতে ভরিয়া তুলিত।

: আহা, এত দুশ্চিন্তা করণের কী আছে? ব্যবস্থা একটা হইবেই। কেবল ঝোঁকের মাথায় না, বুদ্ধি করিয়া আউগাইতে হইবে। পুরুষকারের কথা কও, এইরকম একটা বিষয়ে হাউমাউ করার মতো মানুষের কক্ষনোও অভাব হয় না। অথচ আমি তো দেখি কত আসল ঘরে মুষল নাই, বিচার নাই।

জোবেদা হাঁটুর মধ্যে মাথা খুঁজিয়া অস্ফুট গলায় বলিল : আমার মরিয়া যাওনই ভালো আছিল। তোমার জীবনটা নষ্ট করিয়া দিছি বলিয়া শুনছিলাম, এখন আবার আর-এক উৎপাত বিপদের লাহান হাজির হইলাম।

শিকদারের মুখে আহার রুচিল না, একদৃষ্টে সে বেশ কিছুক্ষণ জোবেদার দিকে চাহিয়া রহিল। কিশোরী জোবেদা এখন পরিণতা যুবতী রমণী। তাহার দেহভঙ্গি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দীর্ঘ কেশজাল তেমন স্পষ্ট করিয়া খুঁটিয়া খুঁটিয়া যেন কখনও দেখে নাই। সে মুখে যাই বলুক, এই মুহূর্তে তাহার অন্তরে ও মস্তিষ্কের যে দুশ্চিন্তাই থাকুক, মনে হইতে লাগিল, জোবেদার আকুল-ব্যাকুল দেহটি ভুবন যেন তাহার সমস্ত মায়া-মমতা যত্ন দিয়া গড়িয়া দিয়াছে। শিকদার দৃষ্টি ফিরাইয়া লইল।

: শোনো, তারা কি বাস্তবিকই তোমারে তাড়াইয়া দিলো না তুমিই নিজের ইচ্ছায় চলিয়া আসছ?

জোবেদা মুখ তুলিয়া তাকাইল শিকদারের দিকে, মনে হইল দৃষ্টি জলে ভরা, আর এতটা অসহায়তা যেন বিপদগ্রস্ত শিশুমুখ ছাড়া অন্য কোথায়ও দেখা যায় না।

শিকদার গলা নরম করিয়া আবারও প্রশ্নটা পুনরাবৃত্তি করিল : জবাব দেও জোবেদা, একটা সঙ্গত সমাধান বিচরাইতে হয়। জীবনটা কোনো সংসার সংসার খেলা না, সামান্য ভুলচুকের জন্যও অনেক সময় অনেক বড় মূল্য দিতে হয়, সহ্য করতে হয়। আমার দাদা করমালী কি আমার বাপ-মা-এর সংসারেও আমি কোনোদিন একটানা শান্তি বলিয়া কোনো জিনিস দেখি নাই। মনে কয়, একটু সংসার-সুখ ভোগের জন্য অনেক বড়ো কষ্ট সহ্য করতে হয়।

জোবেদার দৃষ্টিতে এইবার যেন একটা সংশয় ফুটিয়া উঠিল : এই কথার । অর্থ? তুমি কি আমারে আবার ওইদিকে ঠেলিয়া পাঠাইয়া দেওনের বুদ্ধি করতে শুরু করছ?

: আহা, এমন ঝট-চাপট যোগ-বিয়োগ করিও না।-শিকদার তাহাকে আশ্বস্ত করিতে চাহিল। জানোই তো, আমি বোকাসোকা মানুষ। কোনো দিন কোনো সংসার-জ্ঞান রাখি নাই। দেখি মানুষের সংসার, নানান কথা আউলায়, তার কোনো বিষয়ও হয়তো তেমন পরখ করিয়া দেখি নাই। এখন এই যে একটা যোগ্য মীমাংসা তুমি যেমন চাও, তেমন আমিও চাই। তাই কই, একটু খুলিয়া বলল।

জোবেদা তবু সহসা কোনো উত্তর দিল না; শিকদারও বারংবার তাহার মুখ চক্ষু নিরীক্ষণ করিয়া বুঝিয়া উঠিতে চাহিল, কতখানি তাহার আপন প্রয়োজনে, আর কতখানি শিকদারের প্রতি মমতাবশতই এখন এমনভাবে ছুটিয়া আসিয়াছে। শিকদার তখন প্রায় স্থির করিয়া লইয়াছে, সুতরাং আর টলিতে চাহিল না।

: কইলাম তো,-সেই সন্ধ্যার ঘটনা আবারও সংক্ষেপে বলিতে চাহিল জোবেদা, যেন একটা সুযোগ পাইয়াই তারা আমারে এক কাপড়ে সেই গাঙের পাড়ে ফেলাইয়া দিয়া গেল। বনের পশু কী চিল-শকুনেরও খাদ্য হইয়া যাইতাম। কেমন করিয়া যে এই পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছাইলাম, সেই তবধ যেন এখনও আমার পুরা হয় নাই।

শিকদার মন দিয়া শুনিল। তারপর সম্মুখের খাবারের থালা সরাইয়া বলিল : এই শেষ বিষয়টাই আমি ভালো করিয়া বুঝিয়া উঠিতে চাই। এইটা কি কোনো মানুষের কায্য হইছে? তবু বলি, তুমি দশজনের বিচার চাইতে পারতা, দেশের প্রধানগো দরবারে গিয়া নালিশ জানাইতে পারতা। এখন যে অবস্থা তাতে উলটা তো তোমারেই সে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে। সেই রকম কোনো ফাঁক দেওয়ার সুযোগ করা ঠিক হইবে না।

: কী কইতে চাও?-জোবেদা সিধা হইয়া বসিল : রাজ্য-রাজা সাজাইয়া সাজিয়া যারা প্রধান হইয়া বসে তারা কবে কখন কোন ন্যায়-বিচারটা করছে? আমি যা ভালো মনে করছি, তা-ই করছি। আমার সমস্ত অন্তঃকরণ যে পথে আমারে চালাইয়া নিছে সেই পথে আসছি। দোহাই তোমার, তুমিও আমারে আবার গুরুবাক্য শোনাইও না।

শিকদার সহজ হইতে চাহিল : না, সেই কথা না, জোবু। আমি তো মনে করি, তুমি তোমার ভাই-এর বাড়িতে গিয়াই ঠাঁই লও। যতই অসুবিধা হউক, যতই কষ্ট হউক, কিছু সবুর কিছু আনা এখনও করণ দরকার। অনেক অন্যায় হইছে, হইতে আছে। তা শেষ করিয়া দেওনের জন্য বুদ্ধি কৌশলও চাই।

জোবেদা নতমুখে নিজের হাতের দিকে চাহিয়া বলিল : হায়রে পুরুষ। আমি ভুল করিয়া থাকতে পারি, তবু আরোও ভুল বাড়াইবার ইচ্ছা করি না। আমি তো দেখি মরণ ছাড়া গতি নাই।

শিকদার কাছে আগাইয়া তাহার মুখ নিজের দিকে ফিরাইতে চাহিল : জোবু কতো বড়ো হইয়া গেছ তুমি এখন, তবে এইসব কোনো বুদ্ধির কথা হইতে আছে না। আমি তোমার কষ্ট বুঝি। তবে একটা সঙ্গত উপায় বাহির করিতেই হইবে। অস্থির হইলে কোনো সমস্যারই মীমাংসা হইবে না। কিন্তু জোবেদা তাহার হাত ছাড়াইয়া সরিয়া গেল : ঠিক আছে, আমার পথ আমি নিজেই দেখতে পারমু, তোমারে আর ব্যাকুল হইতে হইবে না। শিকদার বুঝিতে পারিল জোবেদা কোনো নিরাপত্তা বোধ করিতেছে না, কিন্তু অধিক কিছু বলা বা করার বিষয়েও সে স্থির নিশ্চিত হইতে পারিতেছিল না। স্বভাবমতো ঘুরিয়া-ফিরিয়া সে আবারও তাহার প্রিয় ঠাঁই, ঘরের সেই বারান্দায় গিয়া বসিল।

বাহিরে ক্রমে ক্রমে আরও গাঢ় হইয়া উঠিতে লাগিল রাত্রির অন্ধকার; চতুর্দিকে অজস্র ঝিঁঝি আর জোনাকির দল ক্রমাগত বাড়াইয়া চলিতে লাগিল তাহাদের রাজ্য-সাম্রাজ্য; একটা কোরা-পাখি কোথাও হইতে মাঝে মাঝে ডাকিয়া ডাকিয়া শ্রান্ত হইয়া পড়িতেছিল।

: জোবু?

ঘরে উঠিয়াও শিকদার জোবেদার আর কোনো সাড়া শব্দ পাইল না। প্রদীপটা ঘরের খাটালে তখনও প্রায় নিবু নিবু অবস্থায় জ্বলিতেছিল; সেইটা উসকাইয়া দিয়াও কোনোদিকে তাহার দেখা পাইল না; অবশেষে একসময় দেখিল ঘরের পিছনে বারান্দার মাটিতে বসিয়া সে একদৃষ্টে সম্মুখের অন্ধকারের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, মুখচক্ষু নিরীক্ষণ করিয়া মনে হইল সে যেন অতি নিদারুণ কোনো সংকল্পের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করিয়া লইতেছিল। শিকদার বাতিটা খাটালের দুয়ারের কাছে নামাইয়া রাখিয়া ডাকিল : জোবু! জোবেদা?

জোবেদা কোনো উত্তর দিল না, হয়তো-বা শিকদারের গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনিয়া সে একটু চকিত হইয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু পরক্ষণেই হাঁটুতে বাহু বাধিয়া সে নিজেকে লুকাইতে চাহিল।

শিকদার আবারও তাহার মুখ উঁচাইয়া নিজের দিকে ফিরাইবার চেষ্টা করিল : জোবু, ঘরে আসো। ঘুমাও তুমি, তোমারে ঘুমাইতে দেখলে আমিও শান্তি পাই। জোবেদা মৃদুস্বরে বলিল : ঘুম আসে না। অনেকদিন ধরিয়া আমার চৌখে আর ঘুম নাই।

শিকদার আরও অপ্রস্তুত বোধ করিল। এমন ঘনিষ্ঠ সে জোবেদাকে কখনও পায় নাই, পাইলেও হয়তো অনুভব করে নাই, ইচ্ছা হইতে লাগিল তাহার দুঃখের সঙ্গে সেও একাত্ম হইয়া যায় নিজেকে নিঃশেষ করিয়া দেয়। জোবেদার কাঁধের উপর হইতে হাত সরাইয়া সে বলিল : কতদিন ধরিয়া আমি কেবলই চেষ্টায় আছি গীত-গানের নতুন কোনো পদ বাঁধিবার, কী যে আকুল-ব্যাকুল হইছি। আর এখন দেখো, এখন এই একটুকাল আগেও কত গান গীত-কথা হইয়া যেন আমায় অস্থির করিয়া তুলছে। কয়েকটা পদ তোমারে বলি।-শিকদার সুর গ্রাহ্যে আনিল না, যেন কোনো তন্ময়তার মধ্য হইতে ধীরে ধীরে আবৃত্তি করিয়া গেল :

ভুবন বরনী কন্যা আইলো আমার পুরে রে
মেঘ উড়াল দিয়া
সে যেন বনের পঙ্খি, কেমনে রাখিবরে
তারে পিঞ্জরে বাঁধিয়া।
দেহ এমন রূপের পিঞ্জর রে
তবু পরান নাহি রয়
কোন সে পিঞ্জরে পুষিয়া রে
পঙ্খি ঘরে রয়।
আউলা-বাউলা বাতাস বয় রে
বাসনা উথলিয়া ধায়
কুয়া-পঙ্খি মতোই কাঁদেরে
এ নিশিও পোহায়।

জোবেদা হঠাৎ তাহার দিকে ঘুরিয়া বসিল : তুমি এই এতগুলান দিন রাত্রি কেবল এইসব তত্ত্বকথা সাজাইয়া কাটাইয়া দিলা? এই এমন আমারে ছাড়া অন্য কোনো কন্যা কি তোমার কক্ষনো মন টানে নাই, মনে ধরে নাই, বাসনায় আসে নাই?

শিকদার অপ্রতিভের মতো হাসিতে চাহিল : যাই দেখছি কেবল তোমারই কথা মনে পড়ছে। কেন জানি না, হয়তো বা কোনো বেয়াধিও হইবে, এই ভুবন, জীবন নারী, শিশু-ফুল ফল জগৎ সংসার কেবলই একটা একাকার রহস্য হইয়া থাকে। তারে যখনই রূপ দিতে যাই, একটা শরীলে বাঁধতে চাই, কোথায় হইতে তোমার স্মৃতিটাই উদয় হইয়া যায়। সব নারী বারংবার কেবল তোমার কথাই আমারে মনে করাইয়া দিছে। এমন তো আমিও চাই নাই।

জোবেদা শিকদারের ঠোঁটের উপর তর্জনী চাপাইয়া তাহাকে বাধা দিল : অথচ অন্য কোনো নারী আসে নাই তোমার দুঃখ সুখের সাথী হইতে, দেয় নাই দেহ সুখ। নারীকে না জানিয়া কীভাবে তুমি এত সহজে বলো জীবনের কথা? কবি তুমি ওই বাতিটা নিভাইয়া দেও, আরও আন্ধার, আরও নিশি গাঢ় হইয়া ঘিরিয়া আসুক চতুর্দিক দিয়া। আকাশে ওই তারা জ্বলুক, সাক্ষী হইয়া থাকুক ওই গাছ-পালা, ফুল-লতা জোনাকির মেলা। এই দেখো, এই আমি যার জন্য এখনও তোমার কাব্য কথার অন্ত নাই, সে আমি সম্পূর্ণ নিরাবরণ করিয়া মেলিয়া ধরলাম, তোমার কাছে। তুমি যতি সত্যই কোনো দৃষ্টির দাবিদার হইয়া থাক, দেখো কী আছে এই দেহে। বলো বাস্তবিকই এর কোনো মূল্য আছে কি নাই। কবি, যদি ইচ্ছা হয় অনুভব করিয়া দেখো, যা-ই ঘটিয়া থাকুক আমার জীবনে, আমি এখন ফুল কলির লাহান নিজেরে দিলাম। তুমি যা-ইচ্ছা করো, তুমি পারো আমার সকল সংশয় সকল যন্ত্রণা হইতে মুক্তি দিতে, পারো তোমার লাহান বিশ্বাসী হইতে। দেখো, আমিও তোমার মধ্যে মিশিয়া যাইতে চাই।

কথাগুলি একই সঙ্গে বলে নাই জোবেদা। অপটু শিকদারের নিকট কোনো শৃঙ্গার কলা দেখাইবার অধীরতাও তাহার ছিল না আর শিকদারও জীবনে সেই প্রথম বারের মতো অনুভব করিল দেহ কত রহস্যে ভরা। কত চপল চটুল নদী ও সমুদ্রে গিরিপর্বত শস্যমালা ক্ষেত্রে, সীমায় নিঃসীমের কোনো রূপে, কোনো বর্ণগন্ধে যেন তাহার তুলনা চলে। কৈশোরে সংসার-খেলার সময় হইতে যে বাসনার বীজটি উভয়ের মধ্যে অঙ্কুরিত হইতে শুরু করিয়াছিল, এই বার যেন ধীরে ধীরে তাহা পত্রেপল্লবে শাখা-প্রশাখায় ফুলে ও ফলে ভরিয়া ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল ভুবনের সকল রঙ্গ রস বর্ণ-গন্ধের মধ্যে। এক সময় নিশি পোহাইল, আর তাহারও সচকিত হইয়া উঠিল।

: নাহ, এইসব ইচ্ছাটাই সব না জোবু, একটা উপায় বাহির করতে হয়। জোবেদাও নিজেকে সংযত করিয়া লইতে চাহিল। শিকদার অন্য কিছুর প্রতি বিন্দুমাত্র লক্ষ না করিয়া সে তাহাকে কোনো পরম শাস্তির মতো ছিন্ন ভিন্ন করিয়া দিলে সে হয়তো বাস্তবিকই খুশি হইতে, যে-সোহাগ তাহার দেহেমনে মাঝে মধ্যে অমন অত্যাচারী আসগরউল্লার জন্যও দেখা দিতে উদগ্রীব হইয়া উঠিতে চায়, সেইরকম কোনো তৃপ্তি সোহাগে শিকদারকেও আচ্ছন্ন করিয়া দিতে পারিলে সে কোনো কিছুকেই আর পরোয়া করিত না। একদিন শিকদারের পৌরুষকারের বিষয় লইয়া কবে কী ব্যঙ্গ করিয়াছিল, অথচ আসগরউল্লাহকে করিয়াছে ঘৃণা; কিন্তু যেইরূপ দয়িতা রমণী সে হইতে চাহিতেছিল, সে সম্বন্ধেও তাহার কোনো স্থিরনিশ্চয়তা ছিল না।

.

২৫.

ভুবন জুড়িয়া দেখি দিবস-নিশীথে
দেহ মন ভাসে রঙ্গে-রীত প্রকৃতিতে
কারে তুমি দুঃখ বলো কারে কও সুখ
পিরিত না জানিলে তারে জীবনও বিমুখ,
এইক্ষণে মৃদু হাস্য, এই ক্ষণে রাগ
কিছু কার্য, কিছু ভাষ্য, আদর-সোহাগ
নরনারী রঙ্গে রসে কাটাইলে নিশি
এই রসে-বশে বাধা আছে জগৎ সংসার
তারে এড়াইতে পারে হেন সাধ্য আছে কার?

ঘটনা জানিয়া মনসব সর্দার তাহার স্বভাবমতো ঠা ঠা করিয়া হাসিয়া উঠিল, শিকদারের পিঠ চাপড়াইয়া বলিল : এইবার সে না একটা কামের লাহান কাম হইতে আছে মর্দ। মনে কয় বিষয়টা সম্বন্ধে আরও অনেক আগে থেকিয়া উদ্যোগ করণ উচিত আছিল। আমি তো তোমারে কইছিলাম, ইশারাও দিছিলাম। তুমিই যেমন কেমন, সাহস লইয়া আউগাইলা না।

শিকদার বিনীতভাবে তাহার কারণ দেখাইতে চাহিল : সর্দার, আপনাগো রাজ-রাজ্যে বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা কই, তাই বলিয়া কখনও কোনো জোর জবরদস্তির মধ্যে নিজেরেও জড়াইতে চাই নাই। আমি তো মনে করি কেবল আমার চাওয়াটাই বড়ো কথা না, অন্যজনও আমারে চায় কিনা তার প্রমাণ না পাইলে আমার পৌরুষ উৎসাহী হয় না।

: আর এখন?-মনসব সর্দার দৃষ্টি নাচাইয়া থামিয়া উঠিলেও প্রসঙ্গটা বদলাইতে ব্যস্ত হইল : তবে একথা অবশ্য ঠিক, চলতি সমাজ-বিধি নিয়মাচারেরও খেলাপ করণ যায় না। এমন বড়ো এস্টাটটা আমার চালাইতে হয়, রাজ-রাজ্যের উপর যাতে কোনোরকম দোষারোপ না পড়ে সেই দিকে চোখ রাখতে হইবে নিশ্চয়। আমি তা ভাইবে বিচারাইয়া বাহির করতে আছি। এখনই। যদিও ঠিকও হইতে আছে না তবু সে এখন আছে তোমার বাড়িতে। থাউক, কেউ জানলো না আর কোনো জানান দেওনেরও দরকার নাই। বড়োমিঞার দরবারে গিয়া ওঠলেও অনেকরকম ফ্যাকড়-ফ্যাচাং-এর বিপদ আছে। দেখি, এখন বিষয়টা কী দাঁড়ায়। তুমি চিন্তা করিও না। কেবল এই কথাটা খেয়াল রাখিও যে, নিজে পরিষ্কার থাকলে কেউরে কিছু ডরানের কারণ নাই। কী বলল, এ?

শিকদার তাহার ব্যস্ততা লক্ষ করিয়াও বলিল : আমার আরও একটা আরজ আছে সর্দার। সেই দিন আপনে ভাটির দেশে বসতের কথা কইতে আছিলেন। আমরা সেইখানে যাইতে পারি না?

মনসব সর্দার একটুকাল অবাকভাবে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল : আরে, এখন সবে একটা ব্যবস্থা সুসার হইয়া উঠতে আছে আর এখনই এই দেশত্যাগের কারণটা কী হইছে?

শিকদার নতমুখে বলিল : দেশত্যাগের বিষয় আদৌ না সর্দার। সব সুসার হইবে কিনা সেই বিষয়েই সন্দেহের কারণ আছে। আমরা বুঝ করিয়া দেখছি তার ওই ভাইর বাড়িতে এমন দীর্ঘকাল সে থাকতে পারবে না।

: দীর্ঘকালের কথা আসে কেন? তার ভাইরে পাইলে ওই ব্যাটারে তলব করিয়া সব ডিশমিশ করিয়া দিমু।-মনসব সর্দার আর সময়ক্ষেপণ করিতে চাহিল না।

: তেমন সহজ না সর্দার। বিধি-বিধানে অনেকরকম বাধা-নিষেধও আছে। আর সেই কথা ছাড়াও আমারও যেন কেন বিশ্বাস হইতে আছে না যেমনটা চাই তেমনই সত্য হইতে পারে। আমি আরও চাই ওই মুলুকের জীবনের মধ্যে গিয়া কিছুদিন বাস করি। অন্তত একটা ঋতু, একটা সন্দের কাল কাটাইয়া আসিয়া নিজেগো মতে বসবাস আর কঠিন হইবে না।

মনসব সর্দার একটু মাথা চুলকাইয়া বলিল : না মর্দ, মাঝে মধ্যে তুমি বড়ো জটিল হইয়া যাও, কোনো রকম ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাও। বেশ তো, সেইরকম যদি চাও, সে ব্যবস্থাও করণ যাইবে। বড়োমিঞার বাড়ির উৎসবের পরে পরেই আরেক বহর রওয়ানা দিবে সেইদিকে, সেইসঙ্গেও যাইতে পারবা-তবে সমূহ বিষয়গুলান আমারে একটু পরিষ্কার করিয়া লইতে দেও। আর হ, আমার কথা যেন মনে থাকে, ওই উৎসবে তোমার গীত-গান এমন হওয়া চাই যাতে আমাগো দেশ-দশের মুখ থাকে হ, সেই কামে ত্রুটি রাখিও না।

অথচ সেই ফরমায়েশটা পূরণ করার বিষয়েও শিকদার বেশ অস্থির বোধ করিতেছিল। কতদিন ধরিয়া সে মনের মতো পদ সাজাইতে চাহিয়াছে, এমন কিছু গাহিতে চাহিয়াছে জীবনের সমস্ত কর্মে সমস্ত আচারে যাহার কোনো অর্থ হয়, সংগ্রাম হইতে মানুষকে বিমুখ করিবার জন্য নয়, বরং সেই সংগ্রামের জন্য আরও উজ্জীবিত আরও উৎসাহী করিয়া তুলিতে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেইরকমও কোনো পদ-রচনাই তাহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। কিন্তু মনসব সর্দারের আশ্বাস পাইয়া সে নিজেকে একটু হালকা বোধ করিল। বাড়ি ফিরিয়া দেখিল জোবেদা তাহার সংসার সাজাইতে ব্যস্ত, কাদায়-গোবরে মাখামাখি হইয়া দুলিয়া দুলিয়া সে আলপনা আঁকিয়া চলিতেছিল বাড়ি ভিতে খাটালে : অন্তত পুথি-পত্রগুলি বারান্দা হইতে নামাইবারও অধিকার সে তখনকার মতো পাইল না।

: কতদিন কেউর হাত পড়ে নাই-জোবেদা বাহু উঁচাইয়া মুখের উপর হইতে কাদামাখা হাত সরাইতে সরাইতে বলিল : এখনও কাঁচা। একটু শুকাইয়া উঠুক তা না হইলে সব পরিশ্রম নিষ্ফল হইয়া যাইবে। সে হাঁপাইতেও ছিল, তাহার আঁটঘাটভাবে শাড়িমোড়া দেহের দিকে শিকদারকে তাকাইতে দেখিয়া সে তাহাকে বেশ একটু ভর্ৎসনা করিয়া সরাইয়া দিল।

: তুমি যাও, ওই আমগাছের তলায় জাল-খালুই বাহির করিয়া রাখছি। কিছু মাছের যোগাড় করো, ঘরে মুখে দেওনের অন্য কিছুই নাই।

যদিও মনে অন্য উদ্বেগ, তবু শিকদার অপ্রসন্ন বোধ করিল না। বরং একটা খুশিই ছড়াইয়া পড়িল সমস্ত দেহমনে, চিন্তায়। ঘর-গৃহস্থালির ছন্দ, চিত্র এবং কাব্য সে নিত্যদিন দেখিতেছে, দেখিয়াছে; এই ইহ-জীবনটাকেও এমন সুসম্বন্ধ ছন্দে ছন্দে সাজাইবার গীত-গান সে কেন উপেক্ষা করিয়া চলিয়াছে?

মনে পড়িল একবার সে সদর-শহরে এক নৃত্যগীতের আসের গিয়াছিল কৌতূহলী দর্শন-শ্রোতা হইয়া। বিরাট কাণ্ড, সব উঁচা উঁচা মহলের ধনী মানীজনের কারবার। মঞ্চের উপর রেশমি পোশাক পরা গায়ক-গায়িকারা ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া শোনাইল, দুম দুম করিয়া মঞ্চ কাঁপাইয়া জেলে নৃত্য দেখাইল, আরও কত কী কী। সেইদিন হইতে শিকদারের মনে একটা ইচ্ছা ক্রমাগত প্রবল হইয়া উঠিতে শুরু করিয়াছিল। যদি সে পারিত একটা প্রকাণ্ড মঞ্চের উপর সেও একটা বিপুল দলবল লইয়া দেখাইত, সদা হাস্য মুখ গুড়ক পান কত দেশের মানুষের অন্তজীবনে কত ছন্দ, কত গীত-গান-নৃত্য তাহাদের প্রতিটি কর্মে-ধর্মে জীবনাচারে। সাহেব-বিবিদের কেবল সেইটুকুই চক্ষে পড়ে যার কথা অন্য কেউ বলিয়াছে,অথবা প্রয়োজনে লাগে। যাহাদের জীবনে সকল ছন্দ সকল সুর আরও বিস্তৃত আরও মনোহরণ হইয়া উঠিবার কথা, তাহার স্বাভাবিক বিকাশও যেন ক্রমাগত বাধাপ্রাপ্ত হইয়া পড়িতেছিল। কোনো কোনো আসরে তাহার ওস্তাদ এবং তাহাকেও পল্লীগীতির গায়ক অথবা পুথিয়াল বলিয়া পরিচয় করাইয়া দেওয়ার মধ্যেও খুব অস্বচ্ছন্দ বোধ করিয়াছে ব্রাজ্যজনদের মতো।

যদি পারিত সে দেখাইত একই সঙ্গে, বিরাট পেটকাটা নৌকার মধ্যে মাল্লারা কী ছন্দে, আগু-পিছু করিয়া দাঁড় টানে, হালের মাঝি বুকে হালের হাতল চাপিয়া দোল খায় নৌকার পিছনে, চাষি যেমন করিয়া পাট ধোয় বুক সমান জলাশয়ের মধ্যে দাঁড়াইয়া, ধান কাটে সারি-সারি বসা কৃষকেরা, কী ছন্দে কেঁকিতে পাড় দেয় কী ধান এলাইয়া দেয় গৃহস্থের বউ-ঝি, ঘরের পিড়া কী বাইরের উঠান লেপে ক্ষীরের মতো কাদামাটি দিয়া, কী ছন্দে কোল দেয় শিশুকে, দোল দেয় প্রতিটি গৃহকর্মে আর তাহার সঙ্গে তাল রাখিয়া একা বৈঠার নৌকা চলায় কেরায়া নায়ের মাঝি, গলুই-এর পাটাতনের উপর বসিয়া জাল বোনে জেলে, কর্মকারেরা করাত টানিয়া অথবা অন্য হাতিয়ার চালাইয়া ক্রমাগত তাহাদের অখণ্ড জীবন-কাব্যকে জিয়াইয়া রাখিয়াছে। কেবল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গীত-কথা নয়, কোনো আত্মবিলাপও নয়, একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন-গীত কথা প্রস্তুত করিতে পারিলে সে যেন বাস্তবিকই সন্তুষ্টি বোধ করিত। কিন্তু আপাতত সেইসব চিন্তা মন হইতে দূর করিয়া দেওয়া ছাড়া তাহার আর অন্য কোনো গত্যন্তর ছিল না। মাছ ধরা শেষ করিয়া আসিয়া সে জোবেদাকেও সেই ইচ্ছাটার কথা বলিবার উপক্রম করিয়াছিল; কিন্তু মাছের খইটার মধ্যে উঁকি দিয়া জোবেদার মুখভাব পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। সে একটু বিব্রত বোধ করিল : কী হইল?

জোবেদা খলুইটা হাতে লইয়া সরিয়া গেল : কী আবার হইবে। আবারও মনে কইলো সেই বাড়ির মলাঙ্গি মাছগুলান যেন এইদিকেও সাঁতরাইয়া আসতে শুরু করছে। তুমি যাও, এখন বারান্দায় উঠিয়া বসতে পারো, আমার অনেক কাজ পড়িয়া আছে, তবে তেমন একটা দেরি লাগবে না।

শিকদার একটু সাফাই দিতে চাহিল যে মনে অন্য চিন্তা ছিল বলিয়া মাছ ধরার বিষয়ে তেমন মনোযোগ দিতে পারে নাই, হউক সেই মাছ ক্ষুদ্র, কিন্তু সেই বাড়িতেও যদি সে এমন চমকার রধিতে পারিয়া থাকিবে, তা হইলে মাছগুলি যেন ইচ্ছা করিয়াই আসিয়া ধরা দিয়াছে। কিন্তু কিছুই বলা হইল না। সে বেশ একটু গৃহস্থ-গৃহস্থভার-ভারিক্কি লইয়া তাহার প্রিয় ঠাঁইটিতে উঠিয়া গেল; কোলে লইল দোতারা, সম্মুখে খুলিয়া বসিল পুথিপত্র, বড়োমিঞার বাড়ির উৎসব আসন্ন, অথচ কোনো কিছু সম্পন্ন করা হয় নাই, যদিও তাহার উপর এখন অনেক কিছুই নির্ভর হইয়া রহিয়াছে। কোনো চেষ্টার নয়, একদিক-সেইদিক কয়েকবার দৃষ্টি বুলাইয়া সে আপন মনেই গুনগুনাইয়া উঠিল :

মনা, তুমি বুঝি আর মান রাখতে পারলানা
আমি সুমুখ দুয়ার খুলিয়া দিলাম
তুমি তখন পাছ দুয়ারে ডাকো
যখন আবার সেই দুয়ারে গেলাম
মনা, তুমি আবার কোনখানে যে ঢাকো।

হঠাৎ সেই অনায়াসে উচ্চারিত পদ গুলির প্রতি সে অধিকতর সচেতন হইয়া উঠিল, দোতারায় বোল বাঁধিয়া সে আরও আগাইয়া যাইতে চাহিল :

মনা, তুমি বুঝি মন জানতে পারলা না।
তুমি কেবল কেবল বাহির দেখো
আর অন্তরে যেই বসত বাড়ি
তার মধ্যে আছে কোন জনা গো
সেই কবিরাজ সেই নাড়ী গো ধরতে পারলা না।।
মনা, তুমি বুঝি আপন মনও জানলা না
তুমি যেইখানে যাও সব ঠমক-ঠমক
কেবল কেবল করছে আপন হারা
চতুর্দিকে চায় আরও চমক-চমক
মনা, কার ফাঁদে যে কারে বাঁধে সেইটা জানলা না।।

কিন্তু চরণগুলি ঘুরাইয়া ফিরাইয়া আবৃত্তি করিয়াও শিকদার সন্তুষ্ট হইতে পারিল না; মনে হয় সবই চটুল-চপল, তাছাড়া সেই নিত্যকালের ভাব বিলাসের কথাবার্তাই আবারও ফুড়িয়া বাহির হইতে চাহিতেছে। সমালোচনা নয়, তিরস্কার নয়, কোনোরকম আত্মবিলাপের কথাও নয়, তাহাকে অতি অবশ্যই নতুন কোনো কথা খুঁজিয়া পাইতে হইবে। কথাও নতুন না হউক, হউক সে হাটে-মাঠে-ঘাটে, জীবনের খণ্ড খণ্ড ভগ্নাংশের মধ্য হইতে বাছিয়া লওয়া শস্যকণা, তাহাকেও ধুইয়া মুছিয়া দেহাতি পিঠার মতো সাজাইয়া লইতে পারিলেও সে অধিকতর খুশি হইবে। তাহার মন বলিতে লাগিল সেই কথা সে এইবার খুঁজিয়া পাইবে, সে কাহারও বিশেষ কথা নয়, জীবনেরই গান গাহিবে। সেই জীবনের কথায় আবার বিশেষ বিশেষ, সামান্য বিশিষ্ট হইবে। শিকদার চক্ষু বন্ধ করিয়া একাগ্রচিত্তে তাহার দোতারায় ক্রমাগত নতুন বোল তুলিয়া নতুন কথা জুড়িয়া দুঃসাধ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন হইয়া রহিল।

জোবেদা একসময় আড়াল হইতে তাহাকে কিছুক্ষণ দেখিল, কিন্তু কিছু বলিল না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *