১৫. নিউটনের ঈশ্বর

নিউটনের ঈশ্বর

বাংলাদেশে আজ ডেভিডের তৃতীয় দিন। সে এতদিন ক্যান্টিনে খাওয়ার বায়না করে যাচ্ছিল; কিন্তু গতরাতে আমার কাছে ক্যান্টিনের বিখ্যাত-সব গল্প শুনে পারলে তো সে বমি করে বসে। তাকে বলছিলাম ক্যান্টিনগুলোর ঐতিহ্যবাহী গল্পগুলো। গল্প বলা শেষ হলে সে খক খক করে বলে উঠল, আসলেই কি তরকারিতে মশা-মাছি পাওয়া যায়?

আমি জোর দিয়ে বললাম, শুধুই কি মশা-মাছি? কপাল ভালো হলে জুট মিলের রশিও পাওয়া যেতে পারে। কপাল আরেকটু ভালো হলে নেংটি ইদুরের বাচ্চা, এমনকি তেলাপোকার সন্ধান লাভেও বিস্ময়ের কিছু নেই।

 আমার কথা শুনে সে আবার খক খক করে ওয়াশ রুমের দিকে দৌড় দিল। সাদা চামড়ার আমেরিকানের কাছে এসব বিদঘুটে লাগতেই পারে; কিন্তু বাঙালি ছাত্রদের কাছে এই ব্যাপারগুলো এখন একপ্রকার ঐতিহ্যের মতো হয়ে গেছে। ক্যান্টিনে খেতে এসেছে অথচ কোনোদিন এরকম ঘটনার সাক্ষী হয়নি, এমন ছাত্র খুজে পাওয়াই ঢের মুশকিল হবে। আর আমাদের ক্যান্টিনের বিখ্যাত ডাল-কাহিনির কথা তো বাদই দিলাম।

নীলনদের পানিকেই সবচেয়ে স্বচ্ছ পানি বলে জানতাম; কিন্তু যেদিন প্রথম ক্যান্টিনের ডালের চেহারা দেখেছি, সেদিনই ভুলটি ভেঙে গেছে। আমাদের ক্যান্টিনের ডালের পানির চেয়ে স্বচ্ছ আর কোনোকিছু থাকতেই পারে না।

এসব গল্প শোনার পরে ক্যান্টিনে খাওয়ার সব-আশা ডেভিড জলাঞ্জলি দিয়ে দিল। কিচেন থেকে তিন কাপ চা নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলো সাজিদ। ডেভিড আর আমার হাতে চা দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল সে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ডেভিডের উদ্দেশ্যে সাজিদ বলল, আচ্ছা ডেভিড, ড্যান ব্রাউনের লেখা তোমার কেমন লাগে?

ড্যান ব্রাউনের কথা শুনেই ডেভিড মুখ খিচিয়ে বলল, জঘন্য লাগে। ডেভিড মুখের যে এক্সপ্রেশন নিয়ে জঘন্য লাগে শব্দদ্বয় উচ্চারণ করল তা ছিল দেখার মতো। সাজিদ বলল, জঘন্য লাগার কারণ? ভদ্রলোক তো খুব ভালো লেখে। নিউ ইয়র্ক টাইমস কি বলল শোনোনি তাকে নিয়ে? হ্যারি পটারের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল ড্যান ব্রাউন। ভাবা যায়? কেউ কেউ তো আরও কয়েক কাঠি সরেস তার ব্যাপারে। একজন তো বলেই ফেলেছিল যে ড্যান ব্রাউন হচ্ছে ইতিহাসের সেই রাজপুত্রের মতো যে এলো, দেখল এবং জয় করে নিল।

ডেভিড তার মুখের অবস্থার কোনোরকম পরিবর্তন না করেই বলল, আই সী…! লোকটি যতখানি না লেখক তারচেয়ে বেশি হলো ধর্মবিদ্বেষী। ক্রিশ্চিয়ানিটি নিয়ে তার মধ্যে বেশ ভালো রকমের এলার্জি আছে। আমার কী মনে হয় জানো সাজিদ? আমার মনে হয় লোকটি নিজেই একজন ইলুমিনাতির সদস্য।

হেসে উঠল সাজিদ। বলল, হতেও পারে। দুনিয়ার কে যে কোনদিকে ইলুমিনাতি হয়ে বসে আছে তা আমরা কেউই টের পাই না। এমনও হতে পারে, তুমি নিজেই একজন ইলুমিনাতির সদস্য এবং আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে বেড়াচ্ছ।

সাজিদের কথা শুনে ডেভিড তার মুখটি আরও শক্ত করে বলল, আর ইউ কিডিং? হোয়াই শুড আই বি অ্যা মেম্বার অফ দ্যাট বুলশিট ইলুমিনাতি?

এই আমেরিকান যে কেবল ড্যান ব্রাউনের ওপরেই খেপে আছে তা নয়, গুপ্ত সংস্থা ইলুমিনাতির ওপরেও সে দেখছি ভীষণরকম বিরক্ত! সাজিদ বলল, তা, ড্যান ব্রাউনকে তোমার ধর্মবিদ্বেষী বলে মনে হয় কেন?

ধর্মবিদ্বেষী নয় তো কী? লোকটি জোর করে প্রমাণ করতে চায় যে ক্রিশ্চিয়ানিটি হলো বিজ্ঞানবিরোধী ধর্ম। আদিকাল থেকেই চার্চ নাকি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এসেছে। তুমিই বলো সাজিদ, এসব কথার কি কোনো ভিত্তি আছে আদৌ? পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীরা খ্রিষ্টান ছিলেন। বিজ্ঞানী নিউটনের কথাই ধরো। তিনি তো আগাগোড়া একজন ধার্মিক খ্রিষ্টান লোক ছিলেন। কই, চার্চ কি কখনো তার বিজ্ঞানচর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিই যার হাতে গড়া, আজীবন তিনি নিজেই ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ খ্রিষ্টান। ক্রিশ্চিয়ানিটি যে বিজ্ঞানবিরুদ্ধ কোনো ধর্ম নয়, এই প্রমাণ তো স্বয়ং নিউটনই, তাই না?

ডেভিডের লজিক শুনে সাজিদ বলল, তা বেশ বলেছ তুমি। নিউটন অবশ্যই একজন খাঁটি খ্রিষ্টান ছিলেন বটে।

সাজিদের মুখে খাঁটি খ্রিষ্টান কথাটি শুনে ডেভিড সন্দেহের চোখে তার দিকে তাকাল। বলল, হোয়্যাট ডু ইউ মিন বাই খাঁটি খ্রিষ্টান?

খাঁটি খ্রিষ্টান মানে তিনি একচুয়াল খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস করতেন যে—ধর্মের প্রচার করেছিলেন জিসাস ক্রাইস্ট। আরও সহজ করে বলতে গেলে, নিউটন মনেপ্রাণে অবিকৃত খ্রিষ্টধর্মকেই অন্তরে লালন করতেন। বিকৃত হয়ে যাওয়া ক্রিশ্চিয়ানিটিতে তার বিন্দু পরিমাণও বিশ্বাস ছিল না। বলতে গেলে, বিকৃত ক্রিশ্চিয়ানিটির বিরুদ্ধে নিউটন একপ্রকার কলমযুদ্ধ চালিয়েছিলেন।

সাজিদের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। নিউটনকে তো আমরা স্রেফ একজন পদার্থবিজ্ঞানী বলেই চিনি। তিনি আবার ক্রিশ্চিয়ানিটির বিরুদ্ধে লড়াইতে কবে অংশ নিয়েছিলেন? সাজিদের কথা শুনে ডেভিডও অবাক হলো। বলল, তোমার কথা আমি বুঝতে পারিনি সাজিদ। তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে—ক্রিশ্চিয়ানিটি একটি বিকৃত ধর্ম?

সাজিদ বলল, অনেকটাই।

তোমার এরকম মনে হবার কারণ?

তোমাকে তো সেদিন দেখিয়েছিলাম যে—প্যাগানদের উৎসব কীভাবে ক্রিসমাস ডে হিশেবে পালন হয়। এটি কি বিকৃতি নয়, ডেভিড?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডেভিড বলল, কিন্তু এটি তো নির্দিষ্ট কিছু খ্রিস্টানের দোষ, তাই না? ক্রিশ্চিয়ানিটি বা বাইবেলের দোষ তো নয়।

শুধু তো ক্রিসমাস ডে নয়, এরকম আরও অনেক কিছু খ্রিষ্টধর্মে ঢুকে পড়েছে, যা আদৌ ক্রিশ্চিয়ানিটিতে ছিল না, এবং সেগুলোর বিরুদ্ধেই মূলত বিজ্ঞানী নিউটনের। অবস্থান ছিল।

যেমন?, প্রশ্ন করল ডেভিড।

সাজিদ বলল, এই যেমন ধরো ত্রিত্ববাদ।

ত্রিত্ববাদের কথা শুনে ডেভিডের পুরো চেহারা মুহূর্তেই গুমোট আকার ধারণ করল। সে বলল, তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে—ট্রিনিটির ধারণাও ক্রিসমাস ডের মতো প্যাগানদের কাছ থেকে ধার করা?

আমি তা বলছি না। আমি বলতে চাইছি যে—ট্রিনিটির সাথে মূল ক্রিশ্চিয়ানিটির কোনো সম্পর্ক নেই। ট্রিনিটি বলে ঈশ্বর হলো তিনজন; কিন্তু আদি ক্রিশ্চিয়ানিটিতে ঈশ্বর ছিলেন কেবলই একজন। আদি ক্রিশ্চিয়ানিটিতে জিসাস ক্রাইস্টকে কখনোই। ঈশ্বর হিশেবে দেখানো হতো না; বরং তাকে ঈশ্বরের দূত হিশেবে দেখানো হতো; কিন্তু কালের পরিক্রমায় ক্রিশ্চিয়ানিটিতে ট্রিনিটি তত্ত্ব ঢুকে পড়ে এবং একজন ঈশ্বরের জায়গা দখল করে বসে তিন তিনজন ঈশ্বর; কিন্তু বিজ্ঞানী নিউটন এই ট্রিনিটি তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না। তিনি একজনকেই ঈশ্বর হিশেবে বিশ্বাস করতেন।

ডেভিড বলল, তার মানে নিউটন জিসাস ক্রাইস্টকে স্বীকার করত না?

অবশ্যই স্বীকার করত। নিউটন জিসাস ক্রাইস্টকে কেবল ঈশ্বরের একজন দূত হিশেবে বিশ্বাস করত, ঈশ্বর হিশেবে নয়। নিউটন ঈশ্বর হিশেবে তাকেই বিশ্বাস করত, যিনি জিসাস ক্রাইস্টকে দূত বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। তাদের আলোচনায় আমি বেশ মজা পাচ্ছি। ড্যান ব্রাউন ইলুমিনাতির গোপন কোনো সদস্য কি না এই রহস্যের চেয়ে বিজ্ঞানী নিউটন ট্রিনিটিতে বিশ্বাস করত কি না সেই রহস্যই এখন বেশি জমে উঠেছে। ডেভিড জানতে চাইল, নিউটন যে-ট্রিনিটিতে বিশ্বাস করত না তার প্রমাণ কী? সাজিদ হাসল। হেসে বলল, আমার এই দাবির প্রমাণ রয়েছে নিউটনের সেই বারোটি সূত্রে।

নিউটনের বারোটি সূত্র?, মুখে বিড়বিড় করে বলল ডেভিড। নিউটনের গতির তিন সূত্রের কথা জানি এবং বইতে পড়েছি; কিন্তু নিউটনের বারো সূত্র নামে তো কোনোকিছু পড়িনি কখনো। সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বললাম, নিউটনের বারো সূত্র আবার কী জিনিস?

এবার সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আজকে তাকে এতবার হাসতে দেখে আমি হালকা অবাক হচ্ছি। আমার প্রশ্নের উত্তর হিশেবে সে বলল, আমরা বেশির ভাগই বিজ্ঞানী নিউটনকে চিনি; কিন্তু আমরা অধিকাংশই ধর্মীয় স্কলার নিউটনকে চিনি না।

সাজিদের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না আমি। বললাম, ধর্মীয় স্কলার নিউটন মানে কী? নিউটন নামে কোনো ধর্মীয় স্কলার ছিলেন নাকি?

বিজ্ঞানী নিউটনই হলো ধর্মীয় স্কলার নিউটন।

অবাক হলো ডেভিড। অবাক হলাম আমিও। বললাম, আশ্চর্য! এমন কঠিন করে কথা বলছিস কেন তুই? যা বলতে চাচ্ছিস সহজ করে বলে ফেল। একেবারে জলবৎ তরলং করে। বিজ্ঞানী নিউটন আর ধর্মীয় স্কলার নিউটন, এসব টার্ম ব্যবহার করে ধোঁয়াশা তৈরি করবি না একদম।

সাজিদের একটা বদভ্যাস হচ্ছে সে সবকিছুতেই দার্শনিকতা কপচাতে শুরু করে। সহজ ব্যাপারকে কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে জটিল করে তোলে। আমার কথাকে সে আমলে নিয়েছে বলে মনে হল না। সে আগের মতোই বলে যেতে লাগল, স্যার আইজ্যাক নিউটনকে আমরা বিজ্ঞানী হিশেবেই চিনি তার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডগুলোর জন্যে। কিন্ত বিজ্ঞানী পরিচয়ের বাইরেও তার বিশাল একটি পরিচয় আছে। সেটি হলো তিনি ছিলেন একজন ধর্মীয় পণ্ডিত। সারা জীবন তিনি বিজ্ঞান নিয়ে যত কাজ করেছেন, ধর্ম নিয়ে কাজ করেছেন তার তিন গুণ। বিজ্ঞানের জন্য সারা জীবনে তিনি যত শব্দ লিখেছেন, ধর্মের জন্য লিখেছেন তার পাঁচ গুণ; কিন্তু কোনো এক আশ্চর্য কারণে নিউটনের ধার্মিকতা আর ধর্ম নিয়ে তার গবেষণার ব্যাপারটি আমাদের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়।

স্যার আইজ্যাক নিউটন একজন ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন এই কথা শুনে মনে হলো আমি আকাশ থেকে ধপাস করে মাটিতে এসে পড়লাম। তিনি একজন আস্তিক ছিলেন সেটি আমি জানতাম; কিন্তু তিনি যে ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন, ধর্মের জন্য লেখালেখি পর্যন্ত করেছেন, সেসব কোনোদিনও শুনিনি। ডেভিডের অবস্থাও আমার মতো। স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্মীয় পণ্ডিত হওয়ার ব্যাপারটি তার কাছেও বেশ আশ্চর্যের। ডেভিড় বলল, তিনি কি সত্যিই ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে। লেখাজোখা করেছেন?

সাজিদ বলল, হুম।

হুম বলার পরে সাজিদ আবার বলল, আচ্ছা ডেভিড, পদার্থের গতির অবস্থা বোঝাতে নিউটন কয়টি সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন জানো?

ডেভিডের হয়ে আমি উত্তর দিলাম, তিনটি।

আমার কথায় ডেভিড মাথা ঝাঁকালো। সাজিদ আবার বলল, রাইট। পদার্থের গতির অবস্থা বোঝাতে নিউটনকে আবিষ্কার করতে হয়েছে তিনটি সূত্র। আর ঈশ্বরের অবস্থা বোঝাতে নিউটনকে কয়টি সূত্র দিতে হয়েছিল তুমি জানো? না, জবাব দিল ডেভিড।

গুড। আমি বলছি। ঈশ্বরের অবস্থা বোঝানোর জন্য নিউটনকে আবিষ্কার করতে হয়েছে সর্বমোট বারোটি সূত্র। একটি দুটি নয়, গুনে গুনে বারোটি…।

আমাদের বিস্ময়ের পারদ যেন পালা দিয়ে বেড়েই চলেছে আজকে। বিজ্ঞানী নিউটনের বাইরে গিয়ে ধর্মীয় পণ্ডিত নিউটনের অজানা এক অধ্যায়ের আবেশ যেন আমাদের ঘিরে রেখেছে চারদিক থেকে।

ডেভিড জানতে চাইল, সেই বারোটি সূত্র কী কী?

সাজিদ গলা খাঁকারি দিল। একটু নড়েচড়ে বসে বলতে শুরু করল, সেই বারোটি সূত্র খুব সুন্দর এবং একই সাথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিউটনের ধর্মকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা এবং ক্রিশ্চিয়ানিটির ব্যাপারে তার অবস্থান জানতে এই বারোটি সূত্রকে খুব ভালোভাবে জানতে হবে আমাদের। ঈশ্বরকে জানার জন্য নিউটন প্রথম যে-সূত্রটি দিয়েছিলেন of CCTThere is one God the Father (everliving), Omnipresent, Omniscient, Almighty, the maker of heaven & earth, and one Mediator between God & Man, the man Christ Jesus.

অর্থাৎ নিউটন বলেছেন, ঈশ্বর হলেন একজন। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বজ্ঞানী এবং সর্বশক্তিমান। তিনি হলেন আসমান এবং জমিনের স্রষ্টা। মানুষ এবং ঈশ্বরের মাঝে সম্পর্কস্থাপনকারী মাধ্যম হলেন যিশু।

দ্বিতীয় সূত্রে তিনি বলেছেন, The Fater is invisible God whom no eye hath seen or can see. All other things are sometimes visible.

অর্থাৎ ঈশ্বর হলেন অদৃশ্য। কোনো দৃষ্টি তাকে দেখেনি অথবা দেখতে পারে না। তিনি ব্যতীত অন্য সব দৃশ্যমান।

তৃতীয় সূত্রে বলেছেন, The Father hath life in himself & hath given the son to have life in himself.

অর্থাৎ ঈশ্বর নিজেই নিজের ভেতর জীবন্ত এবং তিনি নিজের মধ্যে থেকেই নিজ ক্ষমতাবলে বান্দাদের জীবন দান করেন।

সূত্র তিনটি শুনে আমার মাথা ওলটপালট হবার জোগাড়। সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে একজন বিজ্ঞানীর এত দূরদর্শী চিন্তা সত্যিই অবাক করার মতো। সাজিদ বলে যেতে লাগল,

চতুর্থ সূত্রে তিনি বলেছেন, The Father is omniscient & hath all knowledge originally in his own breast. And (He) communicates knowledge of future things to Jesus Christ. None in heaven or earth or under the earth is worthy to receive knowledge of future things immediately from the Father except the Lamb. (And therefore, the testimony of Jesus is the spirit of Prophey & Jesus is the word or Prophet of God)

মানে হলো, নিউটন বলতে চেয়েছেন, ঈশ্বর হচ্ছেন সর্বজ্ঞানী। তার অন্তরেই রয়েছে সকল জ্ঞান। তিনিই যিশুর কাছে ভবিষ্যৎ-বিষয়ক সকল জ্ঞান প্রেরণ করেন। ঈশ্বরের দূতগণ ব্যতীত আসমান কিংবা জমিনে এমন কেউ নেই, যারা সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারে। এ কারণেই যিশু হলেন ঈশ্বরের ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত এবং তিনি হলেন ঈশ্বরের দূত।

পঞ্চম সূত্রে কী বলেছেন? পঞ্চম সূত্রে বলেছেন, The Father is immoveable. No place being capable of becoming emptier or fuller of him then it is by the eternal necessity of nature. All other being are moveable from place to place

অর্থাৎ ঈশ্বর হলেন অবিচল। জগতের কোনো স্থানই তার অনুপস্থিতিতে শূন্য কিংবা তার উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না; বরং তার উপস্থিতিই হলো প্রকৃতির অনন্ত অপরিহার্যতা। তিনি ব্যতীত অন্য সবকিছু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করে থাকে।

ষষ্ঠ সূত্রে বলেছেন, All the worship whether of prayer praise or thanks giving was due to the Father before coming of Christ is still due to him. Christ came not to diminish the worship of his Father.

অর্থ হলো, যিশুর আগমনের পূর্বেও সব ধরনের প্রার্থনার একচ্ছত্র হকদার ছিলেন কেবল ঈশ্বর, এবং এখনো তা-ই আছেন। যিশু ঈশ্বরের প্রার্থনা কমাতে দুনিয়ায় আগমন করেননি।

সপ্তম সূত্রে বলেছেন, Prayers are most prevalent when directed to the Father in the name of son

মানে হলো, প্রার্থনাগুলো তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন সেগুলোতে ঈশ্বরের মনোনীত দূতের নামের মাধ্যমে করা হয়।

অষ্টম সূত্রে নিউটন বলেছেন, We are to return thanks to father alone for creating us & giving us food, raiment & other blessing of this life and whatsoever we are to thank him for or desire that he would do for us we ask of him immediately in the name of Christ.

অর্থ হলো, আমরা কেবল ঈশ্বরের কাছেই কৃতজ্ঞ; কারণ, তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের খাদ্যের জোগান দিয়েছেন, পরনের বস্ত্র এবং জীবনের অন্যান্য কল্যাণ প্রদান করেন তিনিই। যিশুর নামের বদৌলতে আমরা ঈশ্বরের কাছে যা-ই চাই, তিনি আমাদের তা দিয়ে থাকেন।

নবম সূত্রে বলেছেন, We need not pray to Christ to intercede for us. If we pray the Father aright, hell intercede.

অর্থ, মধ্যস্থতা বা সুপারিশের জন্য যিশুর প্রার্থনা করার কোনো দরকার নেই। আমরা যদি সঠিকভাবে ঈশ্বরের প্রার্থনা করি, তাহলে যিশু এমনিতেই আমাদের জন্য ঈশ্বরের কাছে সুপারিশ করবেন।

দশম সূত্রে আইজ্যাক নিউটন বলেছেন, It is not necessary to salvation to direct our prayers to any other than the Father in the name of the son.

অর্থাৎ তিনি বলেছেন, পরিত্রাণের জন্য যিশুর নাম নিয়ে ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রার্থনা করার কোনো দরকার নেই।

এগারোতম সূত্রে বলেছেন, To give the name of God to angels or kings is not against the first commandment. To give the worship of the God of the Jews to angels or kings is against it. The meaning of the commandment is- Thou shalt worship no other Gods but me.

অর্থাৎ কোনো ফেরেশতা বা রাজা বাদশাহকে ঈশ্বরের গুণবাচক উপাধিতে ভূষিত করলে সেটি প্রথম আদেশের বিপরীতে চলে যায় না; কিন্তু কোন ফেরেশতা বা রাজা বাদশাহকে যদি ঈশ্বরের মতো ইবাদত করা হয়, তখনই সেটি প্রথম আদেশের বিরুদ্ধে চলে যায়। প্রথম আদেশ হলো, তোমরা আমি ছাড়া অন্য কারও পূজা কোরো না।

বারোতম সূত্রে বলেছেন, To us there is but one God the Father of whom are all things (And we of him); And one Lord Jesus Christ by whom are all things & we by him. That is, we are to worship the Father alone as God Almighty [১]

অর্থাৎ আমাদের কাছে ঈশ্বর হলেন এক এবং একক। তিনি আমাদের এবং অন্য সকল বস্তুর প্রভু, এমনকি তিনি যিশুরও প্রভু।

সাজিদ একনাগাড়ে নিউটনের বারো সূত্র বলা শেষ করল। আমি বললাম, লোকটি তো ক্রিশ্চিয়ানিটির ধারণাই পাল্টে দিতে চেয়েছে।

সাজিদ বলল, তা নয়; বরং বলা উচিত তিনি ক্রিশ্চিয়ানিটির সত্য রূপ বের করে আনতে চেয়েছেন। তিনি কখনোই যিশুকে ঈশ্বর হিশেবে মানতেন না; বরং তিনি বলতেন যে, যিশু কেবল ঈশ্বরের একজন দূত। তিনি তিন ঈশ্বর তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন ঈশ্বর কেবল একজন এবং আমাদের তার কাছেই প্রার্থনা করা উচিত। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন মুক্তি মিলবে কেবল সেই এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরের আরাধনাতে। বলা যায়, ত্রিত্ববাদের ধারণার মূলেই আঘাত করেছিলেন তিনি। সাজিদের কথাগুলো আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। শুনছিল ডেভিডও। সাজিদ বলল, কাহিনির কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ডেভিড।

ডেভিড বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও। তুমি আবার বলে বসো না যে—বিজ্ঞানী নিউটন ইলুমিনাতির সদস্য ছিলেন।

আমি আর সাজিদ এবার খলখলিয়ে হেসে উঠলাম। হাসি থামিয়ে সাজিদ বলল, না, তা বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, যিশুকে নিয়ে বিজ্ঞানী নিউটনের যে-ধারণা ছিল, ইসলামে যিশুর অবস্থানও অনেকটাই সে-রকম।

মানে?, প্রশ্ন করল ডেভিড।

মানে, আমরাও বিশ্বাস করি স্রষ্টা কেবল একজন। আমরা বিশ্বাস করি যিশু কখনোই স্রষ্টার পুত্র ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন স্রষ্টার মনোনীত একজন রাসূল তথা বার্তাবাহক। আমরাও বিশ্বাস করি যাবতীয় প্রার্থনা তথা ইবাদত একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলারই প্রাপ্য। নিউটনের ঈশ্বর-ধারণার সাথে আমাদের ধারণার খুব কম পার্থক্যই রয়েছে।

সাজিদের কথা শুনে ডেভিড বিড়বিড় করে বলে উঠল, হলি কাউ!

ডেভিডের মুখে হলি কাউ শব্দদ্বয় শুনে আমি আর সাজিদ আবারও হেসে উঠলাম। আমার ধারণা এবারের বাংলাদেশ সফরের কথা ডেভিড সারা জীবন মনে রাখবে।

————-
১ Transcription & Commentry Isaac Newtons Twelve articles on God & Christ, Keynes MS 8, Kings College, Cambridge.

1 Comment
Collapse Comments
Md। Biplob Hossain December 23, 2023 at 2:33 am

Love it

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *