০৯. নিয়মিত স্যার আসেন

নিয়মিত স্যার আসেন; ইংরেজি শিখছে মা। সবকিছুই সেই আগের মতো। ঘরের ভেতর শয়তানের ঠাণ্ডা লাল চোখ। তোশকে ঘুষঘুষে জ্বর। ফরাশে দুঃস্বপ্ন। ফরাশে রক্ত। ফরাশে চৌচির হয়ে নিজের মৃতদেহ দেখতে পায় অনু।

হঠাৎ এ রকম করলো কেন সরুদাসী!

কদিন থেকে ক্রমাগত ভেবেছে সে, কোনো সূত্র কোনো সদুত্তর খুঁজে পায় নি এ যাবৎ। কেবল মনে হয়েছে সরুদাসীর অনেক কিছুই উহ্য, অনুক্ত, সামঞ্জস্যহীন।

কোনোদিন তাকে এমন মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় নি।

সরুদাসীর সেই রুষ্ট ধারালো মুখের ছবির কথা মনে পড়লেই অনু কেন্নোর মতোই কুঁকড়ে যায়। রাগান্ধ গরগরে এক রাক্ষসের তাড়া খেয়ে গহন অরণ্যে বিপন্ন অনু পথ হারিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে রহস্যলোলুপ অনিশ্চিত এক কুহকে।

ব্যাকুল বিস্তীর্ণ দুপুর নিরাকার কষ্টের প্রতিকায় হয়ে বাইরে থেকে জানালার গরাদ ধরে অবসন্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। অনুর মনে হয়। অবসাদ আক্রান্ত এই ছত্রাখান দুপুরের গা থেকে, সরুদাসীর রুক্ষ ভাসমান চেহারা থেকে, রক্তের প্রচণ্ড ভাপ উঠছে। করকর করকর জ্বালা করতে থাকে চোখ, মাথা ভারি হয়ে যায়; ফ্যাকাশে রুগ্নতা কি বিকট মুখব্যাদান করে থাকে!

পকেট বোঝাই রেজগি নিয়ে নিদ্রিত শয়তানের থাবা থেকে পা টিপে টিপে আবার বের হলো সে। মাঝে বন্ধ ছিলো বাইরে যাওয়া; আবার অনিচ্ছা ও জন্মান্ধ শাসনের সারি সারি উদ্ধত বর্শার ফলক টপকে বুক পেতে রাখা ধূলি-ধূসর উদাসীনতায় নেমে এলো।

হাম্মাদের দোকানের পেছনে ফালানি, ফকিরা, গেনদু, মিয়াচাঁন, লাটু, সবাই আছে, কেবল টোকানিকে কোথায় দেখা গেল না।

গেনদু বললে, কই থাহচ, কিরে তরে দেহি নাক্যান?

অনু সংক্ষেপে বললে, জ্বর হয়েছিলো!

ইচ! চ্যারা অক্করে পানিৎ পচা ট্যাংরার লাহান আউলাইয়া গ্যাছে তর। মাজারে হিন্নি দিচস?

না। শাসাব বাইৎ গেচস?

না।

হাতে শুঁয়োপোকা লেগেছিলো গেনদুর, হাতের পাতায় ঘসঘস করে ডুমুরপাতা ঘষতে ঘষতে বললে, তগো এলায় জাইত-ধর্ম কিছুই নাই!

মেথির গূঢ় গন্ধে মৌ-মৌ করছিলো চতুর্দিকে। হাম্মাদের নাক ডাকানি স্পষ্ট কানে আসে। অন্যান্য দিনের মতোই পরম নিশ্চিন্তে অকাতরে ঘুমোচ্ছে হাম্মাদ। দোকানের ভেতরের বাঁশের ঝালিতে রাখা কচুপাতার মোড়ক থেকে পিঁপড়ের একটা বহর বাইরের দিকে বয়ে চলেছে, তাদের মুখে সুজির গুঁড়োর মতো ডিম।

গেনদু বললে, বুঝচস কি অইতাচে? এলায় হাম্মাদের পো হাম্মাদের অক্করে তেরোডি বাইজা গ্যাছে। পিরপাগুলি ক্যামুন ব্যাব্যাক আণ্ডাটি ফিরত লয়া যাইতাচে চায়া দ্যাখ!

ভালো লাগলো না অনুর। হেঁড়া অংশটুকু কিছুতেই অর জোড়া লাগতে চায় না, বিশ্রী একঘেয়ে মনে হয়। তাদের অগোচরে অন্যদিকে সরে পড়লো সে সুযোগমতো।

এমন সব দুপুরে দার্জিলিংয়ের গল্প করতো মা।

সাধারণত যখন খুব গরম, বুকের ছাতি ফাটানো রোদ বাইরে, ঘরের ভেতরেও আগুনের হলকা, মনের রাশ আলগা করে দিতো মা। এইসব গরমের দিনে ফ্রিজ থেকে বের করে আনা বরফ গালে গলায় বুলানোর চেয়ে দার্জিলিংয়ের গল্প তার ভালো লাগতো। কাঞ্চনজঙ্ঘার গল্প তো ছিলোই সেই সঙ্গে বাংলোর বুড়ো দারোয়ান বিজয়বাহাদুর থাপাড়ের রোমাঞ্চকর সব বৃত্তান্ত। বিজয়বাহাদুর যৌবনকালে যখন শেরপার কাজ করতো তখন নাকি সে স্বচক্ষে বরফের ওপর বারোফুটের এক তুষার মানবকে ছুটে যেতে দেখেছিলো।

সব কথা ঠিকমতো মনে পড়ে না এখন।

ধীরে ধীরে গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু, স্বাদহীন হয়ে যাচ্ছে, আগের ক্লাসের বয়ের মতো সব যেন পাণ্ডুর, নিরর্থক।

এখন সে সরুদাসীকে রীতিমতো ভয় পায়। সেধে দেখা করতে যাওয়ার সাহস তার নেই। কেবল একটা ইচ্ছে দুরন্ত ঘূর্ণির মতো বারবার পাক খেয়ে কালো অন্তরালের ছেঁড়াফোঁড়া খেদ, বিবর্ণ ভীতি, যাবতীয় জঞ্জাল, ফরফর করে ওড়াতে লাগলো; ইচ্ছেটা এই—জরাজীর্ণ চিৎপাত দুপুরে তন্নতন্ন করে সরুদাসীকে খোঁজা। নির্দিষ্ট কিছু একটার মধ্যে ডুবে থাকার জন্যেই কতকটা। ঠিক ইচ্ছে নয় তাকে খুঁজে পাবার, মুখোমুখি হবার, অথবা ভাব জমিয়ে কথা বলার। বারবার আকুলভাবে তার মনে হতে থাকলো সরুদাসীর সেই রুক্ষ মলিন চেহারা, ছেঁড়া ময়লা কাপড়, কোমরের কড়িবাঁধা লাল ঘুনসি, ইত্যাদি সব; পরাক্রান্ত দুপুরের লোভী হাত কিভাবেই সে সব গেড়ে ফেলেছে মাটিতে।

হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না সরুদাসীর সঙ্গে। সরুদাসী যেন একটা কি।

দিগন্তজোড়া কোন জালের ভেতর থেকে প্রাণপণে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করে অনু।

একা একা বাগানে ঘোরে।

সব বাগানই এক একটা ছায়াচ্ছন্ন ইচ্ছের প্রতিকৃতি। বিন্যাসের কোনো অভাবই তাকে পীড়া দেয় না। সব বাগানেই মনে হয় কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি গোপন করা আছে। ভরে আছে কমলালেবু, পাকা আলুবোখারা আর স্কোয়শ ফলের গন্ধে।

এক সময় শুনতে পায় অভিশপ্ত ঘুঘুর ডাক আর রৌদ্রদগ্ধ চিলের পিপাসার্ত চিকার। তার নির্জন অন্ধকারে দানা বাঁধতে না পারা সব ধূসর আক্ষেপ-রৌদ্রের হিংসায় ফুঁসে ওঠা তপ্ত বাতাসের হাহাকারে আর দিঘিরটলটলে নীল দুঃখের মতো পাখিদের নির্জন আর্তনাদের দিমণ্ডলে নিঃশব্দে মৃত্যুর মতো পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়।

এখন সরুদাসী এক নির্জন কষ্টের নাম। তার মনে হলো সে যেন দড়াম করে বাজপড়া একটা কালো কুচকুচে প্রচণ্ড শব্দ নিয়ে দিকভ্রান্তের মতো খেলছে; কোনোদিনই পৃথিবীতে সরদাসীকে পাওয়া যায় না। পোড়া ঘাসের আস্তরণে পড়ে থাকা কলাগাছের শুকনো বাসনায়, নোনাধরী পুরোনো পাঁচিলের গায়ে ঘুটের চিমসে গন্ধে, মেচেতা পড়া আকাশে,—তার স্নান নাম লিখে গিয়েছে সরুদাসী। সুচারু আনন্দের গোপন তহবিলগুলো তসরুফ করে সে চিরকালের মতো উধাও হয়ে গিয়েছে।

সারা দুপুর টো-টো ঘুরে, ঘোড়ার মতো গলায় ঝালর দোলানো বাতাসের কাছে, সন্ধানী আলোর কাছে, সে শুধু সেই একফোটা সদাসীকে রুজু করে বেড়ালো।

এক সময় টোকানির সঙ্গে দেখা পথে।

হাতে তুরপুণ আর র‍্যাদা নিয়ে শুকনো মুখে একই পথ ধরে আসছিলো সে। অনু দাঁড়িয়েছিলো ঝুরিওলা গম্ভীর বুড়োবটের নিচে। উপরে শকুন ডাকছিলো বিশ্রীভাবে, আর ঝটপট ঝটপট ডানা ঝাপটানি।

তাকে দেখে টোকানি বললে, খারায়া খারায়া করচ কি? এমনিই দাঁড়িয়ে আছি, তুমি কোথায় যাচ্ছো?

টোকানি মুখ খারাপ করে বললে, বাপ হালায় এগুলি বেচবার দিচে, অহনে কি করি ক-তো, হালায় হিয়ালের পোরা লইবার চায় না, কয়কি চুরি কইরা লইয়াইচস বুবি।

বিক্রি কেন?

টোকানি বিরক্তি উগরে বললে, বাপ এলায় এক হপ্তাথন বেমারিতে পইড়া রইচে, খায়ালয়া বাঁচতে অইবো তো!

অনু খুব অবাক হয়। এই মুহূর্তে টোকানির চোখে-মুখে দুঃখের ময়লা ছাপ সুস্পষ্ট ধরা যায়। তার সারা মুখমণ্ডলে উৎকট বিরক্তি আর যন্ত্রণার ধার অদ্ভুতভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ব্রিং খেলার সময় এইসব মুখচ্ছবি এক অবিশ্বাস্য ইন্দ্রজালে ভিন্ন কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

কি, হয়েছে কি তোমার বাবার?

কী আবার অইবো, যা অওনের তাই, চিকি! হাসপাতালে দাও নি কেন? টোকানি বললে, অইবোটা কি হুনি? হায়াৎ থাকলে এ্যামনেই ফরফরাইয়া চাঙ্গা হয়া উটবো।

অনু সহানুভূতির সুরে বললে, আমার কাছে কিছু পয়সা হবে, লাগলে দিতে পারি।

ঈমানে? তর রহম পোলা দেহি নাই, হচাই, কসম কইরা কইতাছি টোকানি ব্যাকুল হয়ে বললে, আল্লায় তরে হায়াৎ দেউক।

দুটো আধুলি পকেটে রেখে বাকিগুলো সব টোকানির হাতে দিয়ে দিলো। অনু।

টোকানির চোখজোড়া মুহূর্তেই উজ্জ্বল আধুলি দুটোর চেয়েও চকচক করে উঠলো। তার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে বললে, আল্লায় দিলে তগো কিছু কমতি নাই, ঠ্যাকা-বেঠ্যাকা নাই, আমগ য্যামুন ফুডা নসিব, আধুলি দুইডা দিয়া দে বন্দু—কিরা করা কইতাছি গরে এউগা দানাও নাইক্কা!

আধুলি দুটো ওর প্রসারিত হাতে দিয়ে অনু বললে, চলো না, তোমাদের ঘরটা দেখে আসি।

টোকানি খুব খুশি হয়ে বললে, হাচা কইতচিস?

রেললাইন পার হয়ে বেশ অনেকদূর যেতে হয়। জলাভূমির মাঝখানে এখানে-ওখানে উঁচু-উঁচু ঢিবি, পথে তিন-তিনটে বাঁশের সাঁকো। খানা খন্দের পাশে টোকানিদের ঘর। সারি সারি অনেকগুলো খুপরি। সর্বত্রই আবর্জনার স্তুপ আর ভাঙা প্যাকিং বাক্সের পাহাড়। কয়েকটা ন্যাড়ামুড়ো সুপুরি গাছ শূলের মতো আকাশকে বিধছে; বিধ্বস্ত রাজপাটের বধ্যভূমির শেষ চিহ্ন ওগুলো, তাই মনে হয় অনুর।

টোকানির মা তাদের একচালা ঘরের কাদা থুথুকে উঠোনে বসে হিঞ্চা বাছাই করছিলো। সব মিলিয়ে দুটাকা চার আনার মতো দিয়েছিলো অনু টোকানিকে। টোকানি তার মার হাতে পাঁচসিকে পয়সা গুঁজে দিয়ে বললে, কর্জ কইরা আনলাম, ঐগুলি কেউ লইবার চায় না।

ঘরের ভেতর চৌকির ওপর মশারি খাটিয়ে তার ব্যাধিগ্রস্ত বাবা শুয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছিলো। টোকানিকে কি একটা গাল দিলেও স্পষ্ট শুনতে পেলো না অনু। উঠোনের এক কোণে ছোট্ট একটা ঘ্যানঘেনে মেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে চোখ-নাক ভাসিয়ে আপন মনে নাকিসুরে কেঁদে চলেছে।

টোকানি বললে, তুই অহনে যা গিয়া, কাউলকা দেহা অইবো।

কিছুদূর এগিয়ে এসে অনুর কাঁধের ওপর একটা হাত রেখে ভারাক্রান্ত গলায় পুনরায় বললে সে, ট্যাকাটার কথা মনে থাকবো আমার। যহন রিশকা চালান দরুম তগো সবতের সব পসা হিশাব কইরা অক্করে পাইতক দিয়া দিমু!

চালার ভেতর থেকে টোকানির বাবা করকরে গলায় হঠাৎ চিৎকার জুড়ে ওর মাকে উদ্দেশ করে বললে, হড়ি-হাবাইতা পোলার খেতায় আগুন, খেদায়া দাও হালারে, লাশ বানায়া দিমু জুতায়া!

টোকানি মুষড়ে পড়ে বললে, তগো বাপে এ্যামুন কয় নিকি, হালায় হেটের মদে যেমুন ঘুড্ডির মাজা দিয়া লইচে!

কি বলবে অনু, বোকার মতো টোকানির দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

টোকানি ছলছলে চোখে তার একটা হাত চেপে ধরে ধরাগলায় বললে, বহাইতে পারলাম না বন্দু, দেখলাইতো আমাগো সব, নিজেগই দানাপানি নাই তো তরে আর কি খিলামু!

টপটপ করে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো টোকানির চোখ দিয়ে। ঘা খাওয়া গরুর মতো বড় বড় ভিজে চোখজোড়া অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো সে।

দুপুর সরে গিয়ে সেই কখন বিকেল নেমেছে।

এখন কোথায় যাবে!

কোথাও কেউ নেই।

সারা পৃথিবীর মানুষ দরোজা বন্ধ করে এখন ইংরেজি শিখতে গিয়েছে।

তাদের চাকরি চাই।

পালাতে হলে চাকরি চাই।

গেন্দু, মিয়াচাঁন, ফালানি, নেই এরাও। যখন খেলার পাট উঠে যায়, ওরা এক একজন একে অপরকে আড়াল করে ঝোপ-ঝাড়ের নিচে মাটিতে কোথাও ঘুঘুতে ডিম পেড়েছে কিনা তাই ছুঁড়তে বের হয়, কখনো মোহরের ঘড়া পাওয়া যাবে এই আশায়। নিচে মোহরের ঘড়া না থাকলে ঘুঘু কখনো মাটিতে ডিম পাড়ে না ওরা তা জানে; তলে তলে ভাগ্যকে বদলাতে সকলেই উদগ্রীব।

ক্লান্ত হয়ে পড়লো অনু এক সময়। ভালো লাগলো না আর। কি বিস্বাদ সবকিছু, কি তেতো, বিষাদময়; সব আনন্দ সুতোকাটা ঘুড়ির মতো টাল খেয়ে খেয়ে হাওয়ার উজানে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।

ফিরতে ফিরতে সেই একটি বোধই আগের মতো তার মাথার ভেতরে খোলানো শুরু করলো; পৃথিবীতে কোনো কষ্টের বিনিময়েই সরুদাসীকে পাওয়া যায় না। সরুদাসী লামাদের কিংবা তাদের সাজানো বাগানের কোনো ফুলের গর্ভকেশরে মিশে নেই; আপন স্বভাবেরই এক স্বপ্নকমল, যত্নের, কৌতূহলের, সুখ অথবা দুঃখের কোনো কিছুরই অপেক্ষা রাখে না সে; রাত্রি যেমন রজনীগন্ধার, ঠিক তেমনি প্রশান্ত দিবালোকে ফুল হয়ে ফুটে থাকে সরুদাসী, যার স্তবকে স্তবকে স্নিগ্ধ করুণা, যার গর্ভকেশরে অণু পরমাণু হয়ে মিশে থাকে উদ্ভ্রান্ত পাখির সকরুণ গান।

অনুর মনে হয় স্বপ্নের ভেতর থেকে পরিশ্রান্ত পাখির ঝরা পালক উড়ছে আকাশময়।

বিশ্বব্যাপী অপার নিস্তব্ধতা।

কি দুঃখিত কি নিগৃঢ় এই সন্ধ্যা।

 

বাড়িতে ফিরে এই প্রথমবারের মতো অনু মার সামনে পড়লো।

কোন্ চুলোয় যাওয়া হয়েছিলো?

বাইরে—

বাইরে কেন?

সাপ খেলা দেখতে গিয়েছিলুম! ইচ্ছে করেই মিথ্যে বললো সে।

বেশ বেশ, ঐসব করেই বেড়াও। দেখতে না দেখতে বেশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে তোমার পা।

একটু পরে আবার বললে, মন্টু মঞ্জু সবাই তোর জন্যে সেই কখন থেকে হা-পিত্যেশ করে বসে আছে, ঘরে গিয়ে দেখগে যা!

মন্টু মঞ্জু গোর্কি ট্যামবল খুব ঘটা করে শোরগোল বাধিয়ে শ্যাডোজএর রেকর্ড বাজাচ্ছিল। অনুকে দেখে সবাই একযোগে হৈহৈ করে উঠলো। গোর্কি বললে, হাই, কোথায় ছিলি এতোক্ষণ, সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি আমরা।

অনু একথার কোনো জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করলো না, কেবল বাণীখালার কথা জিগ্যেস করলো।

মঞ্জু বললে, মা তো নিচের ঘরে বসে, কখন টিভি শুরু হবে সেই অপেক্ষায় সময় গুনছেন। আজ নাকি ওরা র‍্যাডিশের আচার শেখাবে।

মন্টু সখেদে বললে, ড্যামিট, ইশ, কি পুওর কালেকশন রে বাবা, একটাও যদি পপটপ থাকে!

অনু বললে, সঙ্গে আনলেই পারতিস!

ভপ্‌! খুব বড় বড় কথা আওড়ানো হচ্ছে।

অনু বললে, বাব্‌লগাম!

ইউশাটাপ! মঞ্জু পটাপট জিগ্যেস করা ধরলো, ভিবজিওর সায়েনারার মানে কি, সিন কোনারি কে, বিটলদের চারজনের কার কি নাম, ইত্যাদি।

অনু সবগুলোর জবাব দিয়ে বললে, প্লাটার্স দলের কার কি নাম, হিরোশিমায় পড়া এ্যাটম বমের ওজন কতো ছিলো, এখন বল দেখি!

গোর্কি আর ট্যামবল মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। মন্টু হাঁ হয়ে গভীর আগ্রহে গোল্ডফিশ আর ব্ল্যাকমলির খেলা দেখতে শুরু করলো। একটু পরে বললে, লুক এ্যাট হিয়ার, গাপ্পিটাকে দ্যাখ, কি মিষ্টি!

ট্যামবল বললে, কিউট!

বুঝলাম–অনু বললে, ঠিক আছে স্টাইন দিয়ে দুটো নাম বল।

মঞ্জু বললে, এগুলো কোনো প্রশ্ন হলো—ট্রাশ।

ট্যামবল ঢোক গিলে অতিকষ্টে বললে, আইনস্টাইন, আর একটা যেন কি–

মঞ্জু নিচের ঠোঁট কামড়ে বললে, পেটে আসছে তো মুখে আসছে না—

অনু বললে, আসবে কি করে, বিদ্যেয় জাম হয়ে আছে যে চ্যানেলটা!

নিজে বলো দিকি ম্যান! ট্যামবল অবিশ্বাসের সুরে বললে।

আইনস্টাইন আইজেনস্টাইন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, আরো কতো শুনতে চাস, বাবলগাম বাবলগাম বাবলগাম।

গোর্কি বললে, অলরাইট অলরাইট ম্যান, কতো ধানে কতো চাল নেকস্টটাইম বুঝিয়ে দেওয়া যাবে, এই মাসেই আমরা এগেন হামলা করবো, উড়িয়ে দেবো না তখন।

অনু বললে, পচামার্কা টিভি দেখতে দেখতে তোদের টিবি হয়ে গিয়েছে, এখনো সময় আছে, চিকিৎসা করা। স্রেফ লুসি ডেঞ্জারম্যান আর ফিউজিটিভ দেখে কি আর বুদ্ধি পাকে?

মঞ্জু বললে, তুমি না একেবারে আঁটি পর্যন্ত পেকে গেছ, টুপ করে খসে পড়াটা শুধু বাকি তোমার—ফ্যাগোট!

ঐ পর্যন্তই। বাদানুবাদ আর বেশিদূর গড়ালো না। বুঝতে পারে তার নিজের কাছে এদের আর কোনো আকর্ষণই নেই, ভেতরে ভেতরে কি তীব্র বিরাগই না তার জন্মে গিয়েছে। কোনোমতেই সে সহ্য করতে পারছিলো না ট্যামবলদের। শুধুমাত্র ইস্ত্রিকরা দামি কাপড়ের মড়মড়ে ভাঁজ অতিকষ্টে বজায় রাখার জন্যেই ওরা এই পৃথিবীতে এসেছে। অন্যকে ঠকানো বোকা বানানো কিংবা চমকে দেওয়াটাই ওদের আনন্দ লুটবার একমাত্র রাস্তা; বিকল্প কোনো রাস্তা ওদের কল্পনারও বাইরে। যখন যতোটুকু খিদে থাকে স্বস্তি পায়, ঠিক ততোটুকুতেই যারা তুষ্ট সে তাদের ভালোবাসে—কথাটা আজই এই প্রথম তার মনে উঁকি দেয় চকিতে। এ যেন আপন প্রয়োজনেই প্রায় অগোচরে তৃষ্ণা মিটিয়ে নেওয়া, যা এমন কিছু মহান নয়, কিংবা গল্প নয়; অন্যদের বোকা বানানোর কোনো হীন উদ্দেশ্য থাকে না তাতে। মন্টু মঞ্জু গোর্কি ট্যামবল এরা সবাই যেন কি—

জটিল আচ্ছন্নতায় ক্রমাগত কুণ্ডলি পাকাতে থাকে অনু। অগোচরে, বুঝিবা সম্পূর্ণ নিজের মতো এমন এক নিরাকার হিরন্ময় জগৎ নির্মাণ করতে চায় সে, যেখানে নাম না জানা গোত্রহীন তুচ্ছ কষ্টের আবেদনগুলোও অতি সহজে অঙ্কুরিত হতে পারে।

নিজেকে কিছুতেই সনাক্ত করতে পারে না অনু। কখনো চৈতন্যের প্রখর এক রশ্মি চাবুকের মতো কশাঘাত করে আবার মিলিয়ে যায়। কখনো হেঁয়ালির অন্তর্লোকে দুর্বল অসহায়ের মতো মুঠো পাকাতে থাকে। হাঁসফাঁস হাপরের মতো দিনগুলোর কাছে জমে উঠেছে অপরিসীম ঋণের পাহাড়, স্বরাচ্ছন্নের মতো এইসব মনে হয় অনুর। এই হাঁসফাঁস হাপর থেকে, হানাদার হওয়া থেকে, কালবৈশাখীর কামদ উল্লাস থেকে, কিংবা রক্তাক্ত রত্নাভরণের মতো সন্ধ্যারাত্রি থেকে, বধ্যভূমির হাহাকার ছিনিয়ে নিয়ে তার আপন জগতের সভ্যতাকে নিরন্তর এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় সে; যেন ধরে নিয়েছে বিশাল পৃথিবীর মাঝখানে ঘরজোড়া ঘেরাটোপের নিচে আত্মগোপনের অর্থই হলো টুটি টিপে অন্ধ বধির ঘাতকের মতো নিজেকে হত্যা করা।

বাণীখালা সাধারণত খুব কম আসে, কিন্তু হঠাৎ যেদিন এসে পড়ে সেদিন মনে হয় ফিরে যাবার অভিপ্রায়ে আসে নি।

সে নিচে গিয়ে দেখা করলো।

বাণীখালা মার সঙ্গে কাঠমুন্ডু যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছিলো। বললে, যাসনে কেন, দিন দিন আমাদের কথা ভুলে যাচ্ছিস, বস এখানে!

তারপর পুনরায় সেই কাঠমুন্ডুর প্রসঙ্গ।

আমি ভাবতেও পারি নি ওরা আমাকে এভাবে ঠকাবে। যে স্মোকি টোপাজ দুশো টাকা নিয়েছে এখানেই তার দাম ষাট-সত্তর টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাই মেরেছে তোর সোনার চাঁদ দুলাভাইকে। আমি হাজারবার পৈপৈ করে বারণ করলাম, উনি কানে তুললেন না। বেশি চালাক কিনা, বললেন। দুশো টাকায় ক্যাটসআই পাওয়া যাচ্ছে, হাতছাড়া করাটা নিছক বোকামি। এখন বোঝে, যাবে না টাকাটা গচ্চা। ঢাকায় ফিরে যে কটা জহুরিকে দেখানো হলো সবাই বললে পনেরো থেকে বিশ টাকা দামের মুনস্টোন। লাভ করতে গিয়ে মধ্যে থেকে হড়হড় করে এককাড়ি টাকা বেরিয়ে গেল। বেফায়দা!

অনু মার মুখের দিকে তাকালো। মা হাসছে।

বাণীখালা চটে গিয়ে বললে, বিশ্বাস হলো না বুঝি?

অবিশ্বাসের কি আছে এতে–মা পরিষ্কার গলায় বললে, হাসছি এই জন্যেই যে উচিত শিক্ষাই হয়েছে বেশি লোভ করতে গিয়ে!

তা আর বলতে! দুদিনে ঘুমোতে পারি নি আমি তা জানিস? আমার ননদ ব্যাঙ্কক থেকে প্যাগোডার চূড়ামার্কা প্রিন্সেস রিং আর হ-য-ব-র-ল কি কোথায় সব আনার পর থেকে দেমাকে ফেটে পড়ছে সবসময়, পা পড়ছে আর মাটিতে। ভাবলাম সবাই তো কাঠমুন্ডু গেলে কিছু না কিছু নিয়ে আসে, আমাদের ভাগ্য যে এরকম ফুটো হবে আগে কি আর তা বুঝতে পেরেছিলাম। ঠকেছি ভালোমতোই। তোকে বলতে তো আর কোনো লজ্জা নেই, চারশো টাকা দিয়ে রুবিও এনেছিলাম, শুনলে অবাক হবি ওটাও যাচ্ছেতাই নকল, একেবারে ঠগের মুল্লুক!

মা হেসে বললে, তুমিতো এখানেও কম ঠকো না। ওটা তোমার ধাত। কেন এতোদিন ধরে এই যে বেদেনীদের কাছ থেকে সস্তায় কাঁড়ি কাঁড়ি পিংকপার্ল কিনলে কি কাজে লাগাতে পেরেছো শুনি, নিছক পয়সা নষ্ট না?

তা যা বলেছিস, শুধু লোকসানই দিয়ে আসছি! সখের খেসারত। এবারে কি ভেবেছি জানিস? ওসব হিজিবিজি সখ বাদ দিয়ে বড় দেখে ডায়মন্ড কিনবো, ব্যাস্! এই নাক কান মলা, অন্য কিছুতে আর যাচ্ছিনে বাপু, ঢের সখ মিটেছে, আর নয়!

নিজেকে অপাঙক্তেয় মনে হলো অনুর। সে উপরের ঘরে চলে এলো কিছুক্ষণ পর।

ট্যামবল বললে, আমার এক ফ্রেন্ডের বাড়িতে যে এ্যাঞ্জেল আছে না সেটা দেখলে তুই তোর এই ঘাঁটিগাঁইয়া ছান্দা মাছের মতো এ্যাঞ্জেলকে ছুঁড়ে ফেলে দিবি, সেটা কুইন এ্যাঞ্জেল। তোর সব মাছই কমন। আমার আর এক ফ্রেন্ডের বাড়িতে টেট্রার যে ভ্যারাইটি আছে, ম্যাড হয়ে যাবি দেখলে!

অনু জানালার ধারে দাঁড়ালো।

কি গুমোট আকাশ! প্রচণ্ড গরম। দুদিন ধরে রেডিওতে একনাগাড়ে চিৎকার শোনা যাচ্ছে কক্সবাজার থেকে সাড়ে আটশো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে; এখন বিপদ সঙ্কেত জানাচ্ছে ঘনঘন। ক্রমশ সরে আসছে ঝড়। হাঁপিয়ে উঠলো অনু।

আব্বা ঘরে ফিরলেন এক সময়।

টেলিভিশন শেষ হলো।

সবাই একজোট হয়ে আসর জমালো অনুর ঘরে। অনু নিতান্ত অসহায়ের মতো বসে রইলো একপাশে। তার মনে হলো মিথ্যা চক্রান্ত করে অকারণে জবাবদিহির জন্যে তাকে এ ঘরে ধরে রাখা হয়েছে।

বাণীখানা আব্বাকে উদ্দেশ করে সাগ্রহে বললে, নতুন কিছু শোনান, বহুদিন পর লেজ ধরা গেছে আজ, কখন থেকে আপনার জন্যে বসে আছি–

আব্বা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে তাঁর সেই ধরাবাঁধা গতে শুরু করলেন, যা দিনকাল পড়েছে, ভাবাও যায় না, মনে হয় আমি নিজেও একজন ক্রিমিন্যাল। আসল কথা এই অতি অগ্রসরমান মানুষের কাছে সবকিছু এমন গতানুগতিক এমন শাদামাঠা মনে হচ্ছে যে নতুনত্বের খাতিরে অভিনবত্বের প্রয়োজনে কোনো একটা কিছু না করা অবধি সে তার মনের মুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। নিত্যনতুন ক্রাইমের পেছনে স্বতন্ত্রভাবে মানুষের এই মোটিভ কমবেশি কাজ করছে। এর একটা কারণও আছে, সভ্যতার বিবর্তনের সাথে তাল রেখেই আমাদের ভেতরের সেই অতি পুরোনো পাথুরে বাটিটার আকারও অসম্ভব বেড়ে গিয়েছে। আজ সে আরো বেশি পেতে চায় নিজের মধ্যে, কেননা খোলের ভেতর ধরে রাখবার পরিসরও তার বেড়ে গিয়েছে। আসলে সবকিছুই অতি অগ্রসরমান সভ্যতার সেই ষোলকলায় পূর্ণ বাটির যন্ত্রণা। আমার প্রতিবেশী জেড আহম্মদ সাহেবের শ্যালকের কথাই ধরা যাক না কেন। বেশ কিছুদিন হলো বন্দুকের গুলিতে সুসাইড করেছেন ভদ্রলোক। মোটিভ কি, না ব্যর্থতা! বেচারার ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছিলো তিনি। নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, ব্যাস্। অথচ গাইয়ে হিশেবে যথেষ্ট খ্যাতি ছিলো ভদ্রলোকের। সবসময় লাহোর-করাচি করে বেড়াতেন। পিপলস চায়নায় গেছেন ডেলিগেশনে, রাশ্যায় গেছেন, কি কোথায় সব বিসর্গ চন্দ্রবিন্দু খেতাবও পেয়েছিলেন। পরে জানা গেল সেখানেও ওই একই ব্যাপার। ঐ যে বললাম, যোলকলায় পূর্ণ বাটির যন্ত্রণা।

বাণীখালা বললে, অন্য কোনো কারণও তো থাকতে পারে?

তদন্তের যে রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছে তা থেকেই সব পরিষ্কার ধরা পড়েছে–অনু দেখলো আরামে গা ঢেলে উত্তরোত্তর উৎসাহিত হয়ে পড়ছেন আব্বা—ভদ্রলোক ডায়েরিও মেনটেন করতেন, সেখানা আমি নিয়ে এসেছি ভালোমতো স্টাডি করবো বলে। খুবই ইন্টারেস্টিং। দুএকটা পাতা পড়ে শোনাচ্ছি। আমি আন্ডারলাইন করেছি বিশেষ কতোগুলো জায়গায়, মনোযোগ দিয়ে শুনুন,—তিনি পুনর্বার দেখা দিলেন, কহিলেন, আর কতোকাল দরবারী ভৈরবী মল্লার লইয়া পচিয়া মরিবে, উহাতে আর বিন্দুমাত্র রস অবশিষ্ট নাই, তোমার পূর্বে বহু শতাব্দীব্যাপি নানাজাতের হাহাপুঙ্গব উহার যাবতীয় রস নিংড়াইয়া লইয়াছে,—খেয়াল করে যান ভালো করে। অন্য এক জায়গায় লিখেছেন—ওরে মূখ, রাগাবলীর নিবিড় অলংকরণে অদ্যাবধিও গমকের আশ্রয়ে মিথ্যা সুরের জলাঞ্জলি দিয়া অযথা নিঃশেষিত-প্রায় তুই, অলঙ্কার উহার দুষ্টক্ষত বিশেষ, দেখিতেছ না অলঙ্কারের ভারে লম্পটের রক্ষিতার ন্যায় রাগাবলীর প্রাণ কী ওষ্ঠাগত। যাহারা শক্তিমান, সৃষ্টির নৈপুণ্যে অতুল, তাহারাই কেবল দেহ-মন-প্রাণ দিয়া শিল্পের নবজন্ম যাজ্ঞা করে, তাহাদের ধর্ম তাহাদের কর্ম তাহাদের বর্ম গতানুগতিক প্রবহমানতার ঋজু বলিষ্ঠ বিরুদ্ধাচরণ, অতঃপর তিনি হাপুস নয়নে ক্রন্দন করিতে লাগিলেন, এই দৃশ্য অবলোকন করত আমিও শোকে ভূলুণ্ঠিতা বাল-বিধবার ন্যায় নিদারুণ মর্মভেদী বিলাপে সাতিশয় মগ্নতাপ্রাপ্ত হইলাম। বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না নিশ্চয়ই, তারপর আরো লিখেছেন,—তাঁহার রাগান্ধ রক্তচক্ষুর সম্মুখে আমি বিশুষ্ক তৃণবৎ ভষ্ম হইয়া গেলাম, তিনি সবেগে পদাঘাত করিয়া কহিলেন, নরাধম, তোর গতি নাই, তোর বিকাশ নাই, তোর ব্যাবৃত্তি নাই, অনুগম নাই, আমি চলিলাম, পুনর্বার দর্শনের সৌভাগ্য হইতে রে হতভাগ্য তোকে বঞ্চিত করিলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই তিনি আর কিছুই নয়, সেই ষোলকলার পূর্ণ বাটির যন্ত্রণা। একটু ভালো করে খতিয়ে দেখলেই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়। এই সবেমাত্র আমরা কালার মিউজিকের যুগে পা দিয়েছি, অথচ প্রায় তেইশশো বছর আগে এর সম্ভাবনার কথা বলে গিয়েছেন অ্যারিস্টটল। কই এই তেইশশো বছরের মধ্যে এ ব্যাপারে অত্যুৎসাহী কোনো সঙ্গীত সাধক তো ব্যর্থতার গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে নি। আসলে প্রবৃত্তির প্রবল তাড়নায় ভদ্রলোকের বাহ্যজ্ঞান ভেদজ্ঞান সবই সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়েছিলো। অর্থাৎ এক ধরনের লোভের তাড়নায় তিনি মাত্রাজ্ঞান পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে ফেলেছিলেন। সস্তা হাততালির লোভ নয় ঠিক, বিখ্যাত হবার লোভ। চেয়েছিলেন নতুন কোনো দরোজা উন্মুক্ত করে সঙ্গীতের জগতে কোনো একটা বিপ্লব ঘটাতে। ভদ্রলোকের জন্যে সত্যিই করুণা হয়। বেচারার এগো নির্বিরম বাসনার দোর্দণ্ড প্রতাপে মার খাচ্ছিলো, পথ করে নিতে পারছিলো না নিজের; অথচ দ্বন্দ্বসঙ্কুল এই পৃথিবীতে বাস করতে হলে যতো ব্যথাই সে পাক না কেন যতো কষ্টই সে পাক না কেন নিজের অস্তিত্বের জন্যে সন্তোষজনক একটা রাস্তা তাকে খুঁজে নিতেই হবে। পৃথিবীর আলো-অন্ধকার, দুঃখ-আনন্দ, জরামৃত্যু, শোক, সবকিছুর মাঝখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে এইভাবেই এগিয়ে আসে সুপার এগো। এইভাবে পরিত্রাণ মেলে মানুষের। কিন্তু ঐ ভদ্রলোকের ভাগ্যে তা আর ঘটে নি, আসলেই ভয়ঙ্কর রকম চরমপন্থী। নির্বিকার বুদ্ধিই হলো চৈতন্য আর সবিষয় চৈতন্যই হলো বুদ্ধি; কিন্তু ভদ্রলোক চৈতন্য ও বুদ্ধির কোনো প্রভেদই ধরতে পারেন নি, গুলিয়ে ফেলেছিলেন সব। শেষের দিকে প্রায় উন্মাদই হয়ে গিয়েছিলেন, বেচারা। মানুষের মাথার খুলি দিয়ে নতুন ধরনের বীণা আবিষ্কারের মতলবে গা ঢাকা দিয়ে কবরের মাটি আলগা করতে গিয়ে ধরা পড়ে নাস্তানাবুদ হলেন, আরো কত কি! কখনো জোড়া পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতেন, কখনো গড়াতে গড়াতে এসে রাস্তায় গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতেন, এইসব যা-তা ব্যাপার। আসলে নতুন একটা কিছু সৃষ্টির বাসনা শেষ পর্যন্ত উন্মাদনায় গিয়ে পৌঁছেছিলো আর এর পেছনে ওত পেতে ছিলো নিদারুণ লোভ, তাই ব্যাপারটা এতোদূর গড়াতে পেরেছিলো। কেঁদে ভাসিয়ে দিলেও সেই অভিশপ্ত আর্তিকে গোর দেওয়া সম্ভব নয়। পূর্ণ বাটির এই যন্ত্রণাকেই আমরা খুব সীমিত অর্থে কখনো কখনো যুগ-যন্ত্রণা বলেও সহজে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করি। যার ভেতর কিছু না কিছু চৈতন্যের স্ফুরণ ঘটেছে, এই সর্বনাশা যন্ত্রণা থেকে কিছুতেই তার অব্যাহতি নেই। জানেন, অনেক সময় ক্রিমিনালদেরও তাই ঘৃণা করার কোনো উপায় থাকে  না, ফিরিয়ে দেবার কোনো উপায় থাকে না। তার আগে সেই স্বার্থপর সুন্দর বাটিটাকে চুরমার করে দিতে হয়–

রাখো তোমার বাটি। ঘরের ভেতর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের সামনে ঐসব উদ্ভট গল্পগুলো না জুড়লেই বোধ হয় নয়? তোমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। অনুর মুখ কালো হয়ে গিয়েছে সে খেয়াল করেছো একবার? বিরক্তিতে ফেটে পড়ে মা বললে ওকথা।

তুমি অকারণে এগুলোকে উদ্ভট বলে উড়িয়ে দিচ্ছো কেন? ধরো অনুর কথাই। ও এখনো ছোটো। নিজের কোনো সত্তাই এখনো তৈরি হয় নি। আমাদের ছায়ায় ছায়ায়, আমাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছেয় ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে ও। কিন্তু এরপর বয়েসের এমন একটা দুঃসময় আছে সেখানে পা রাখা মাত্রই নিজের সঙ্গে সাক্ষ্মতিক রকমের বিরোধের সম্মুখীন হতে হবে ওকে। তখন পুরোনো সব অভ্যেস প্রলয়ঙ্করী ঝড় আর জলোচ্ছাসে খড়কুটোর মতো কোথায় যে ভেসে যাবে নিজেও আন্দাজ করতে পারবে না। এমন বয়েস একসময় আমাদেরও ছিলো। দুপুরগুলো ঐ বয়ে: আমার কাছে ঝিনুকের ঝরঝরে ঝরনা মনে হতো, ভাল লাগতো। এক পদ্য লিখিয়ে বন্ধু ছিলো, সে বলতো জল্লাদের জঠরাগ্নি। আমি ওকালতি করছি, আর সে বেচারা মশক নিয়ন্ত্রণের তদারকি করতে করতে সেই জঠরাগ্নিতে প্রায় পরিপাক হয়ে গিয়েছে। নিজের ভেতরে একটা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে নিতে হয়, তার জন্যে চাই সুস্থ প্রতিজ্ঞা, সুনির্দিষ্ট প্রতীক্ষা। অনুর সেই প্রতীক্ষার দিনগুলো যেন নিঃসঙ্গ না হয় সেদিকেই কেবল খেয়াল রাখতে হবে আমাদের।

আব্বাকে দেখে মনে হলো অনুর এতোগুলো কথা বলার পর নিজের কাছে কিছুটা চমকৃত বোধ করছেন এখন। তাঁর চোখে-মুখে এক ধরনের লালচে রঙ ধরে গিয়েছে। মনে হলো পরম পরিতৃপ্ত : নিজের বদ্ধমূল ধারণা অতি সহজেই চালান দিতে পেরেছেন, বিশ্বাসের উপযোগী করে তুলে ধরতে পেরেছেন, এই তার আনন্দ। যাচাই করে দেখার কোনো অভিপ্রায়ই তাঁর নেই, বিতর্কে অনিচ্ছুক, সহজে পরিতৃপ্ত হওয়াটাই যেন চিরাচরিত অভ্যেস।

সহ্য করতে পারছিলো না মা।

মার মুখ কঠিন। বিরক্তি আর অসহনীয়তার আবর্তে পড়ে মাঝে মাঝে দমকা নিশ্বাস ছাড়ছিলো মা।

কথা শেষ হতে বললে, এমনভাবে কথা বলছো তুমি যেন অনু একটা খুনের আসামি, অভ্যেস খারাপ হয়ে গিয়েছে তোমার, ঘর-বার সব এক তোমার কাছে!

মার মুখে এমন ধারালো দৃঢ়তার চিহ্ন দেখতে পেল অনু যে চোখ সরিয়ে নিতে হলো তাকে। এই দৃঢ়তার ফলে কি দুর্বিষহ কাঠিন্যেই না ছায়াচ্ছন্ন মার মুখ। ভেতরের চাপা অস্থিরতা বেপরোয়াভাবে উপর্যুপরি চলকে উঠছিলো সেই চেহারায়; অসন্তুষ্টি কি ভীষণ বদলে দেয় মানুষকে।

বাণীখালারা উঠলো এক সময়। যাওয়ার সময় বাণীখালা বললে, যাওয়া ছেড়ে দিলেন কেন আমাদের ওদিকে?

সময় করে উঠতে পারিনে আজকাল।

মা বললে, আমার সঙ্গেই দেখা করার ফুরসত নেই ওনার, আবার তোমাদের ওখানে যাবে।

বাণীখালা হেসে বললে, সবাইকে নিয়ে যাবেন কিন্তু। আমি বারবার এসে ঘুরে যাবো আর আপনারা যে যার গোঁ বজায় রেখে মাড়ি চেপে বসে থাকবেন সেটি আর হচ্ছে না। আপনারা না গেলে আমি আর এ পথ মাড়াচ্ছিনে, বলে রাখছি আশেই।

আব্বা মাথা নিচু করে হাসতে লাগলেন, সবকিছু লক্ষ্য করে অনু।

মা বললে, আমাকে নিয়ে বের হবেন উনি? তুমি বলছো কি, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে বুবু? আমাকে নিয়ে বের হলে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে না ওঁর। আমাদের মতো চাকরানীদের সঙ্গে নিয়ে কি আর বাইরে যাওয়া যায়।

বাণীখালা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে ফেললে সেটা ঢাকার জন্যেই। বললে, অতশত বুঝিনে বাপু, মোট কথা তোমরা না গেলে আমি আর আসছিনে।

ওরা চলে গেল এরপর। গোর্কিরা শাসিয়ে গেল যথারীতি, আগামীবারের জন্যে অনু যেন প্রস্তুত থাকে, পরাজয়ের যোগ্য উপহারই নিয়ে আসবে তারা।

কিন্তু এসব বিন্দুমাত্র দাগ কাটে না তার মনে; এসব নিয়ে অনুর অতো মাথাব্যথা নেই। আব্বাকে আজ তার কেন যেন অন্যরকম মনে হলো। কি নিষ্প্রভ! কি নিস্তেজ! বিকেলবেলার নুয়ে পড়া নিরুপদ্রব শান্ত আলো মনের কোণে উঁকি দেয়; কতো বুড়ো হয়ে গিয়েছেন। দারুণ ইচ্ছে হয় অনুর সারারাত গল্প শোনার। হঠাৎ ইচ্ছে করে প্রাণভরে ভালোবাসতে। অনুর মনে হয় পৃথিবীর সব বুড়ো মানুষের চেহারা ছবিতে দেখা আইনস্টাইনের মতো হয় না কেন!

বিদায় দিয়ে মা ফিরে এলো।

আব্বা বসেছিলেন আগের মতোই, যথাযথ। মাকে উদ্দেশ করে বললেন, বোসো, আজ কিছু বৈষয়িক আলাপ আছে তোমার সঙ্গে।

বাইরের গুমোট আবহাওয়া আরো ঘনীভূত হয়েছে এখন। সারা শহরের বুকে এক অনড় জগদ্দল বসিয়ে দিয়েছে কেউ। জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখলো অনু। গাছপালা বাড়িঘর সবকিছু থমকে আছে। ঘরের ভেতর নির্বিকার শিলিং ফ্যান ঘুরছে, ভ্যাপসা গরম কোনো রকমেই আর কাটতে চায় না। ভেতরে ভেতরে হাঁপিয়ে উঠে সে। হাঁসফাঁস করতে থাকে। কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই। ধীরে ধীরে দানা বেঁধে উঠছে প্রাণান্তকর অশান্তি। সে গন্ধ পায়, উকট সে গন্ধ; দুর্বিষহ। তার ভেতর থেকে কেউ কানে কানে ফিশফিশ করে বলে দেয়—পালাও অনু, এখানে থেকো না, পালাও, এখানে তুমি মরে যাবে, এরা তোমাকে মেরে ফেলবে, অনু তুমি পালাও!

নীরবতা ভঙ্গ করে আব্বা এক সময় বললেন, রানিকে আমি আমাদের এখানে আনতে চাই!

রানি—অর্থাৎ বাঞ্ছারামপুরের ফুফুর কথা বলছেন।

মা নিরুত্তর।

মার ইচ্ছাকৃত ঔদাসীন্যে টোকা দিয়ে আব্বা আবার বললেন, ও আর গ্রামে পড়ে থাকতে চায় না। ওকেই বা কি দোষ দেবো, আর কতোকাল বেচারি একা একা গ্রামে পচে মরবে।

মা আগের মতোই মুখ নিচু করে বসে রইলো। মার এতে সায় নেই, বুঝতে পারে অনু। মাকে সে ভালো করেই জানে।

তুমি কি বলো। আমার মনে হয় আমাদের কাছে রাখাটাই উচিত কাজ হবে। আমাদেরও তো একটা কর্তব্য আছে, বিশেষ করে আমি ওর বড় ভাই যখন। কর্তব্য তো কিছুই করতে পারলাম না কোনোদিন।

মা বললে, কর্তব্য পালন করো না কেন? কে তোমায় বাদ সেধেছে? নাকি দড়ি দিয়ে হাতপা বেঁধে রেখেছে কেউ?

কথাটা তা নয়, আব্বা নড়েচড়ে বসে বললেন, ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনোদিনই কিছু করতে চাই নি। এতোদিন অনিচ্ছুক ছিলো, এখন মন বদলেছে, এখানে আসতে চায় বলে লিখেছে, এই জন্যেই কথাটা তুললাম।

তোমার পেয়ারের বোন, তুমি যা ভালো বুঝবে তাই করবে, এতে আবার আমাকে নিয়ে টানা-হাচড়া কেন। অন্যদের বেলায় তোমার কখনো কোনো অভাব নেই, যতো অভাব আমার বেলায়। ওসব কথা আমাকে জিগ্যেস করে কি লাভ এমন!

তোমাদের সঙ্গেই যখন থাকতে হবে তাকে, তখন তোমাদের মতামতের প্রয়োজন আছে বৈ কি!

আমার মতামতের তুমি ধার ধারো?

ঠিক বুঝে উঠলুম না কথাটা!

বুঝেও যদি না বোঝার ভান করো।

ভান? ভান আবার কোথায় দেখলে? পরিষ্কার করে বলো যা বলতে চাও। আমি তো আর জোর করে তোমাদের ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছিনে। সেই জন্যেই তো তোমার মতামত জানতে চাইলুম। তুমি গররাজি হলে আসতে বারণ করে দেবো, সোজা কথা, এর ভেতরে আবার ভান দেখলে কোথায়!

তোমার যদি সখ চাগিয়ে থাকে আত্মীয়তার ঢাক পেটানোর, কর্তব্যপালনের ঢোল পেটানোর—তাহলে নিয়ে এসোগে, এসবের ভেতর আমাকে জড়াতে চাও কেন! আমি কি বুঝিনে এসব লোক দেখানো। আমার কোনো মতামত নেই এ ব্যাপারে, নিজে যা ভালো বোঝো তাই করো।

এটা কি কোনো উত্তর হলো?

এর চেয়ে ভালো এর চেয়ে স্পষ্ট উত্তর আমার জানা নেই। খামোকা চটিয়ো না আমাকে।

চটছো তো তুমি নিজেই! শোনো–অনু বুঝতে পারে শেষ দেখতে চায় আব্বা। একটু থেমে খুব শান্ত কণ্ঠে বললেন, ঠাণ্ডা মাথায় একটু চিন্তা করে দেখার চেষ্টা করো। তোমারও তো একটা কর্তব্য আছে। আমরা ছাড়া অন্য কেউ থাকলে সেখানে না হয় একটা কথা ছিলো।

মা বললে, কেন বিধবা হবার পরপরই এখানে এনে তোলার জন্যে তো আর কম কাঠ-খড়-কেরোসিন পোড়াও নি, তখন তো কারো মতের ধার ধারে নি। তখন যখন নিজের দেমাকটাকে অতো বড়ো করে দেখতে পেরেছিলো এখন আবার আসার দরকারটা কি? এসে কি আমাদের একেবারে রাজা করে দেবে তোমার দুলালী বোন?

তুমি ভুল বুঝেছে ওটাকে দেমাক বলী তোমার অন্যায়। তুমি নিজে বুঝতে পারো না, উপায় থাকতে যেচে কেউ কারো গলগ্রহ হতে চায় কখনো, না সেটা উচিত? তখন ওর মনের জোর ছিলো। বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে মানুষমাত্রই এমনধারা ভেঙে পড়ে, দুর্বল হয়ে যায়–

মা বাধা দিয়ে বললে, মনের জোর নয়, বলো রূপের বহর ছিলো, রূপের দেমাক ছিলো, বরং এখানে ওর অসুবিধেই হতো। এখন বোধ হয় ওসবে ভাটা পড়েছে–

আব্বা অপেক্ষাকৃত গম্ভীর হয়ে বললেন, যাকগে ওসব নিয়ে মিছিমিছি তর্ক করে কোন লাভ নেই। তুমি তোমার মতো বুঝে বলছো, আমি আমার মতো বুঝে বলছি। ওর ব্যথাটা যে কোথায় আসলে তুমি আমি কেউ-ই তা বুঝবো না, কেননা আমরা ওর অবস্থায় পড়ি নি–

মা আবার থামিয়ে দিয়ে বললে, বলো আমি বুঝি নি, ব্যথাটা যে কোথায় তুমি ঠিকই বুঝেছিলে, বুঝেছিলে বলেই ছাড়াগরু করে রেখেছিলে, এখনো বুঝছো। এক রসুনের গোড়া তো সব!

তাহলে কি লিখবো বলো? বললাম তো যা বলার—

তোমার তাহলে মত নেই?

আমি কিছুই জানিনে এ ব্যাপারে।

একটা অসহায় মেয়ের জীবনের চাইতে তোমার নিজের জিদটাই তাহলে বড়ো হলো।

অসহায়? অসহায় বলতে তুমি কি বোঝতে চাও? গ্রামের বাড়িতে তো এতোদিন ওনার কোনো অসুবিধেই হয় নি, বেশ তো সুখেই ছিলেন। এতোদিন নিজের মনের মতো করে!

কী আশ্চর্য! এতদিন যা ভালো লেগেছে এখনো তাই ভালো লাগতে হবে এমন কোনো নিয়ম আছে নাকি? এতোদিন গ্রামে পড়ে ছিলো বলে এখনো থাকবে—চিরকালই থাকবে, এটা কোনো যুক্তির কথা? আমাদের কাছে আসতে চায় কেন সেটা একবার ভেবে দেখছো! ও ধরে নিয়েছে আমরা ওকে বোঝা মনে করবো না, আপনজনের মতোই খুশি মনে নিতে পারবো, সেইজন্যেই তো? তুমি কি বলতে চাও এটারও কোনো মূল্য নেই? সবদিক বিবেচনা না করে ঝটাঝট মন্তব্য কোরো না।

আমি তো তা চাই না, এখন তুমি যদি জোর করে আমাকে বলাও আমি কি করবো। আমার কোনো মতামতই কখনো তোমার মনে ধরে নি, সব জানা আছে আমার, ধরবেও না কোনো দিন। আমি তোমার নামে স্ত্রী। যেখানে আমার অমত থাকলেও তুমি তোমার দোলারবিবি প্রাণের বোনকে না এনে পারবে না সেখানে আবার নাটুকেপনা দেখিয়ে এতো জিগ্যেস করাকরির কি আছে!

ধরো তোমার অমত এতে, কিন্তু আমাকে বোঝানোর জন্য তুমি কতোগুলো কারণ দেখাবে না? না তারও কোনো প্রয়োজন নেই?

প্রয়োজন আবার কিসের? আমার সংসারে আমি যদি আগাছা-কুগাছা টেনে আনা ভালো মনে না করি তার জন্যেও কৈফিয়ত দিতে হবে আমাকে, কি আহাদের কথা! সংসার আমার আর যাবতীয় অধিকার তোমার, চাকরানীর চেয়ে বেশি কিছু নই, এই বলতে চাও তো? আমি তোমাকে সাফ সাফ বলে দিচ্ছি, খেয়ালখুশিমতো তুমি যদি নিরন্তর আমার কাঁধে এভাবে জোর খাটানো বোঝা চাপিয়ে দিতে থাকো তাহলে আমি নিজের পথ। নিজে বেছে নেবো। তখন তোমার যা মনে হয় তাই করে বেড়িয়ে, আমি ভুলেও দেখতে যাবো না। নিজের বোনের দিকটাই তোমার কাছে বড়ো, আমাদের দিকটা কিছু নয়। একজন কেপ্টেরও যে অধিকার থাকে তোমার কাছে আমার তা-ও নেই। তুমি শুধু হুকুম করে যাবে আর জীবনভর তাই দাসী-বাদীর মতো মাথা পেতে মেনে যাবো, কি সুখের কথা আমার!

আব্বা নিরুত্তর। এই মুহূর্তে মার মুখের দিকে তাকানোর ক্ষমতা তাঁর নেই, অনু বুঝতে পারে। বুকের উপর মাথা ঝুলে পড়েছে তাঁর। ভেতরের কষ্টকে মানুষ কিভাবে সামলায় অনু সেই কথাই ভাবতে চেষ্টা করে।

অনেকক্ষণ কি কোথায় সব ভাবলেন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, তুমি যদি সবকিছু এইভাবে বিচার করো তাহলে কোনো কথাই বলা চলে না!

আমি এইভাবেই বিচার করতে শিখেছি।

ওটা তোমার ভুল।

আমার ভুল আমার কাছে ভালো–

ভুল কখনো ভালো হয় না, ভবিষ্যতে না পড়লে বোঝা যায় না!

আবার নীরবতা।

আব্বা কাশলেন একবার।

আমার অনুরোধ রানির দিকটা তুমি ভালোভাবে একটু বিবেচনা করে দেখবে। খেয়ালখুশিমাফিক যা ইচ্ছে তাই কিছু একটা বলে দিলে সেটা সত্যিই অন্যায় হবে।

চোখ বড়ো বড়ো করে তীব্রকণ্ঠে মা বললে, তার মানে জোর খাটিয়ে আমাকে রাজি করাবেই তুমি, তার মানে তোমার হুকুমটাই কুকুরের মতো জিভ দিয়ে চাটতে হবে এই বলতে চাও তো তুমি?

আমার সব কথা বুঝেও ইচ্ছে করে অন্য পথে যাচ্ছো তুমি–অনু লক্ষ্য করলে হঠাৎ হেসে ফেলে ওকথা বললেন আব্বা; বললেন, তোমার বিবেক এতে তোমাকে ক্ষমা করবে তো?

বিবেক আবার কি? এক কানাকড়ি দাম আছে নাকি তার? তোমাদের নিজেদের বিবেক এতোদিন কোথায় ছিলো? কেন, রূপসী সতী বিধবা বোনটির সব বৃত্তান্ত কি জানতে না, তবু কানে তুলো দিয়ে চোখে ঠুলি বেঁধে ঘাড় গুঁজে ছিলে কেন এতোদিন, তখন তোমাদের ধােপা কাচানো বিবেক কোথায় ছিলো? আমার একার বেলায় কেন বিবেকের প্রশ্ন? কোন্ বিবেকে। তোমার সতী-সাধ্বী বোন আত্মীয়-স্বজনের মুখে কালি দিয়ে ঘরে জোয়ান ছেলেদের আড্ডা জমতে দিয়েছে এতোদিন, কোন্ বিবেকে আস্কারা দিয়েছে? বিবেক! বোনের শতেক কেচ্ছা শোনার পরও চিরটাকাল হাবা কালার মতো চোখ নাক কান বন্ধ করে পড়ে রইলে কেন, তখন তোমার এতো সাধের কর্তব্যবোধ কোথায় ছিলো, শিকেয় তুলে রেখেছিলে? কোথায় ছিলো তখন বিবেক? বিবেক!

মুখ নিচু করে বসে রইলেন আব্ব। সম্ভবত আহত হয়েছেন। অনুর কাছে পরিস্থিতিটা নিদারুণ মনে হলো। মাকে এতো উত্তেজিত হয়ে পড়তে আর কখনো দেখে নি সে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। একটানা অনেক কথা বলার পর শ্রান্তিতে ভেঙে পড়ছে, বিপুল বেগে দম নিতে হচ্ছে মাকে। সবকিছু মিলে কি প্রাণান্তকর পরিস্থিতি!

তোমার মুখ থেকে কর্তব্য বিবেক এসব বড়ো বড়ো বুলি শুনলে আমার পা থেকে মাথা অব্দি রিরি করে জ্বলতে থাকে। আমার বেলায় তোমার ঐসব কর্তব্য বিবেক চিরকাল বাক্সবন্দী ছিলো। কি পেয়েছি আমি তোমার সংসারে এসে? কি এমন দিয়েছো তুমি আমাকে? কোনোদিন ভুল করেও তো একবার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো নি আমার দিকে; কি আমার ছিলো, কি আমার আছে। আমি তোমার দুচোখের বিষ, তোমার শত্রু; এর বেশি আর কিছু ভাবতে পারো নি কখনো। এটা কি একটা জীবন? প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কি দিতে পেরেছো আমাকে, আর এই নিয়েই আহাদে আটখানা হতে হচ্ছে আমাকে, চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে দেখাতে হচ্ছে কতো সুখে রেখেছো তুমি আমাকে–

তোমার এইসব কথার কোনো মাথামুণ্ডু আমার মাথায় আসে না। মনগড়া দুঃখের কোনো ওষুধ নেই। সবসময়ই দেখে আসছি কোনো দরকারি কথা পাড়লেই চিরাচরিত নিয়মে তুমি এইসব বাক-বিতণ্ডার ঝড় তুলে সবকিছু ঘুলিয়ে ফেলতে থাকো। কিচ্ছু বুঝি না এসবের–

বুঝবে কি করে, বোঝার দরকার থাকলে তবে না!

এ ব্যাপারে আমার আর কিছু বলার নেই।

সে-ই ভালো। নিছক মন রাখবার জন্যে আমার মতামত না নিয়ে করে নিজের মরদতোলানি বোনকে মাথায় নিয়ে ধেই ধেই করোগে যাও! ও আমি আগে থেকেই জানি।

ওর কথা আবার কেন, ওর সম্পর্কে তোমার যা বলার তুমি তো বলেই দিয়েছে, যাতে না আসে সেই কথাই লিখবো!

অনু দেখলো হঠাৎ খুব স্বাভাবিক হয়ে গেলেন আব্বা; অস্বাভাবিক রকম স্বাভাবিক, যেন এইমাত্র মামলায় জিতে হাওয়ার ভেতর দিয়ে ঘরে এসে পৌঁছেছেন।

আমি তা বলতে যাবো কেন, জীবনভর তোমার খোঁটা খাবো বলে?

খোঁটা দেবো কেন–নাছোড়বান্দার মতো কথাগুলো আব্বার মুখ থেকে আদায় করে নিলো মা, তোমার সংসার, দরকার মনে করলে আমাকেও বাতিল করে দেবার অধিকার তোমার আছে! আব্বা হেসে খুব নরোম করে মাকে বললেন, উঠো না, বোসো, আসল কথা এখনো বলা হয় নি। ভাবছি হাটখোলার বাড়িটা এবার বেচে দেবো। দাম পাওয়া যাচ্ছে ভালোই, তাছাড়া শুধু শুধু চেম্বারটা ওখানে ফেলে রাখাও আমার কাছে কাজের কাজ মনে হচ্ছে না। এখানে একবার ওখানে একবার, এ আর ভালো লাগছে না। পেরেও উঠছি না। ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারও অনেক ঝামেলার, ঝক্কি-ঝামেলা লেগেই থাকে বছরভর। ওসবের মধ্যে আর যেতে চাইনে, তুমি কি বলো?

কোনো উত্তর দিলো না মা প্রথমে। তারপর কি ভেবে নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বললে, তোমার বাড়ি তুমি বুঝবে, আমি ওসবের কিছু বুঝি না। থাকলেই বা আমার কি না থাকলেই বা আমার কি, এসব ধ্যাষ্টামি না?

আব্বা দুঃখিত হয়ে বললেন, দূর থেকে গা বাঁচিয়ে কথা বলাটা একটা রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে তোমার। আমি যেন চিরকাল স্রেফ প্রতারণাই করে এসেছি তোমার সঙ্গে, তুমি এমনভাবে কথা বলো। বাড়ির ব্যাপারে কোনো মতামত নেই, রানির কথা জিগ্যেস করলুম, সেখানেও ঐ ধোয়াটে ধোঁয়াটে কথা। তোমার নিজের বোন হলে কি করতে?

নিজের বোন হলে শত দুর্বিপাকেও অন্তত তোমার এই হ্যাংলামুখো সংসারে এনে ভেড়াতুম না। বুড়ো বয়েসে নতুন করে যেন আবার প্রেম চাগিয়ে উঠছে তোমার। বাণীবুকে দেখলে তোমার আর মাথা ঠিক থাকে না, এতো কথাও বলতে পারো, মুখও ব্যথা করে না তোমার। আর ও নচ্ছার মাগীও কম যায় না, থেকে থেকে যেন চাগিয়ে উঠছে, একেবারে জোকের মতো লেগে থাকে–

আব্বা নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন, দ্যাখো, ইডিওসিরও একটা সীমা থাকা দরকার, ছি ছি। এতো নিচ তো তুমি কোনোদিনই ছিলে না!

আর ন্যাকা সাজতে হবে না, তোমায় আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। চোখ বন্ধ করলে এক্ষুনি একটা ডবকা ছুঁড়ি নিয়ে আসবে নাচতে নাচতে। আমি ঢের সহ্য করেছি, আর নয়। তোমাকে শাসন করার যথেষ্ট অধিকার আমার আছে।

অস্বীকার করছিনে, কিন্তু সবকিছুর পিছনে কারণ থাকতে হবে তো?

তুমি কি মনে করো আমি নাকে ভাত পুঁজি? তোমার সব জোছুরি আমার কাছে ধরা পড়ে গেছে। তুমি বর্বর। তুমি ইতর। বাটপাড়। আমার সঙ্গে তোমার জাল জুয়াচুরির সম্পর্ক। তলে তলে বহু কিছু করে বেড়াও তুমি আমাকে না জানিয়ে, হোর নিয়ে পড়ে থাকো, আমি সব বুঝি, লম্পটের সংসারে জ্বলে মরছি আমি।

আব্বা দারুণভাবে হাঁপাতে লাগলেন। বললেন, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? প্লিজ একটু আস্তে কথা বলো, দোহাই তোমার। এসব কি যা-তা কথা বলছো তুমি, কোথেকে পাও এসব? সম্পূর্ণ মিথ্যে, সম্পূর্ণ মিথ্যে! কী আশ্চর্য, আমার সম্পর্কে এই তোমার ধারণা? পনেরো বছরের বিবাহিত জীবন আমাদের, কি করে বললে এসব, ছি ছি! যা বলার মাথা ঠাণ্ডা করে বলো, আমি সব শুনতে রাজি। আমি যদি কোনো অন্যায় ঘটিয়ে থাকি তার জন্যে জবাবদিহিও আমাকে করতে হবে বৈকি–

ওরে আমার রে! মা প্রায় চিৎকার করে বললে, তোমার ঐ পুতুপুতু জবাবদিহি শুনবার জন্যে পেটে খিল মেরে উপোস দিয়ে পড়ে আছি কিনা! তোমাকে এর শাস্তি পেতে হবে, আমি সকলের সামনে তোমার মুখোশ খুলে দেববা!

বেশতো দাও না!

আলবৎ তাই দেবো, একশোবার তাই করবো। নিচ ছোটোলোক।

খামোকা বাজে তর্ক নিয়ে এমন চিকার কোরো না। মানুষের সহ্যেরও একটা সীমা আছে, বুঝলে?

মারবে নাকি? তা তুমি পারো। তলে তলে কারো পেট বানানোও তোমার দ্বারা অসম্ভব কিছু নয়–

থামো।

ভয় করি নাকি তোমার চোখ রাঙানির? নিচ, ছোটলোক! ভালো মায়ের। পেটে জন্ম হলে এমন হয় নাকি?

খবরদার! আব্বা প্রায় গাড়োয়ানের মতো চিৎকার করে উঠলেন, মুখ সামলে কথা বলো। মা তুলে কথা বললে ভালো হবে না, আমি সহ্য করবো। না, কিছুতেই সহ্য করবো না।

মা বললে, কি করবেটা কি শুনি? তোমার মুরোদ আমার জানা আছে। তুমি একটা কুকুর!

আর তুমি একটা পাগলা কুকুর, তোমাকে গুলি করে মারা দরকার, গুলি করে মরা দরকার!

ফ্রাঙ্কেনস্টাইন! অনু চিৎকার করে উঠলো ঘর ফাটিয়ে, তুমি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন–

অনু হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাশের ঘরে ছুটে গেল। পরক্ষণেই আবার ফিরে এলো ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে ক্রিস্টলের একটা ভারি শিশি হাতে নিয়ে। দরোজোর সামনে দাঁড়িয়ে। বিদ্যুৎগতিতে ছুঁড়ে মারলো। কপালে লাগলো। যেন বজ্রাঘাত : কপালে লাগলো এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো। ফরাশে ছিটকে পড়া ভারি শিশিটার লেবেলে ছাপা আইফেল টাওয়ারের উপর টপটপ করে ফোটা ফোটা রক্ত পড়লো। দুহাতে অনুকে আগলে রাখলো মা। আব্বা অনুকে দেখলেন, ক্রুদ্ধ কিংবা দুঃখিত, অনু তাকাতে পারলো না, কি ভয়াবহ! শীতার্ত কুকুরের মতো নিঃশব্দে গা গুটিয়ে নিয়ে দুহাতে কপাল চেপে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে গেলেন। বন্ধ দরোজার ওপারে তাঁর অহো শোনা গেল। অহো ধ্বনিত হলো। অনুর মনে হলো আব্বার ভেতর থেকে বহুদিন——বহুদিন-যুগ-যুগান্তরের পর আজ সে নিজেই ভয়ানক দুঃখে ভয়ানক যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *