০১. দুপুরে অনু একা থাকতে পারে না

দুপুরে অনু একা থাকতে পারে না, ভেবে পায় না কি করবে, কোথায় যাবে।

ঘরের সবগুলো দেয়ালের চেহারা ও হাবভাব আগেই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো; থমকানো এবং শাদা ভয়ের ছাপ মারা এমন সব অনড় আয়না যাতে কখনো কারো প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে না। বাঞ্ছারামপুরের থানে মোড়া রানিফুফুর কথা মনে হয়; এক ফুৎকারে নিভে যাওয়া নির্বিকার মোমবাতি, ঘুমের ঘোরে খিলখিল করে হাসে।

গরম হাওয়ার হলকা চোখে ছোবল মারে বলে এই সময় জানালায় দাঁড়াতেও অনুর তেমন ভালো লাগে না। ঝিমিয়ে পড়া ওলবড়ি গাছ, ঝলসানো কাক, ঘুঘু ও অন্যান্য পাখির ডাক, তপ্ত হাহা হাওয়া, সব কিছু গনগনে উনুনে পোড়া রুটির মতো চিমসে গন্ধে ভরিয়ে রাখে। লামাদের বাগানে বাতাবি লেবুর ঝোপের পাশে আচ্ছন্ন ছায়ায় পাড়া বেপাড়ার দস্যুরা পাঁচিল ডিঙিয়ে এই সময় ব্রিং খেলে, জানালায় দাঁড়ালেই সব দেখা যায়।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে ব্রিং খেলা।

খুচরো খুচরো ঝগড়া, আলগা মারপিট, এইসব শুরু হয় এক এক সময়। কলরব শুনে লামাদের বাছুর-প্রমাণ এ্যালসেশিয়ান গেস্টাপো তুমুল আক্রোশে হুড়োহুড়ি-লম্ফঝম্প শুরু করে কখনো। দিনের পর দিন। সবকিছু প্রায় ধরাবাধা নিয়মে নির্বিবাদে চলতে থাকে।

দেখা যায় লামাদের বাগানের জলেশ্বর মালী আর মালীবৌকে। বাগানের দক্ষিণ কোণে তাদের বাঁশের একচালা ঘর। জানালায় দাঁড়ালে সময় সময় অনেক বিচিত্র ঘটনা চোখে পড়ে। সাধারণত ভরা হাঁ-হাঁ নির্জন দুপুরে আলগা বুকপিঠে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে দুজন। কোনো কোনোদিন মালীবৌয়ের বুকে মুখ গুঁজে নিসাড় টান হয়ে পড়ে থাকে জলেশ্বর মালী। মালীবৌয়ের বুক শাদা ধবধবে। অনেকক্ষণ ধরে ঘুমোয়, যতোক্ষণ পর্যন্ত বেলা পড়ে না আসে——হাতে পাওয়ার মতো গাছের নিচে পাউডার-পাফ কোমল সূর্য ঝুলতে থাকে। অনুর কি কোথায় সব মনে হয়; ওদের ঘরের মেঝে খুব ঠাণ্ডা, গাল পেতে শশায়া যায়, অগোচরে বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া যায়।

জানালার আকর্ষণ উত্তরোত্তর তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, প্রবল প্রলোভন এড়াতে না পেরে সেখানে দাঁড়ায় সে; রৌদ্র পরাক্রান্ত এক শত্রু, ঝনঝনে পিতলের থালা।

ছাদ আরো প্রসারিত।

অনেক বাড়ির অনেক খোলা জানালা—কোথাও নির্লজ্জ কোথাও গুমোট, বুড়ো বটগাছের ডালে লটকানো দুচারটে রঙ-বেরঙের লেজওলা ব্যাঙাচি ঘুড়ি, বরফকলের ঢেউটিনের ছাউনি, কৃষ্ণমূর্তি দানবের মতো পানির ট্যাঙ্ক, ছাদের ওপরে এইসব। ভাঙা মন্দিরের অনুজ্জ্বল চুড়া, মহল্লা সর্দার কাফুল মিয়ার চাঁদ-তারা-নিশান মার্কা বাড়ির ছাদের পেঁপেগাছ, চিলের চেরা চেরা দাগ-লাগা মালীবৌয়ের বুকের মতো নিস্তব্ধ গোল আকাশ, ছাদের উপরে এইসব।

ভালো লাগে ছাদে যেতে, কিন্তু গরমে এমন তেতে থাকে যে পা রাখতে ভয় হয়, পাছে ফোস্কা পড়ে; গালানো লোহা হড়হড় করে ঢেলে রাখে কেউ ছাদে।

সবচেয়ে বড় কথা ছাদে যাওয়া বারণ।

তার অনেক কিছুই ইচ্ছাধীন নয়, আমাদের বাগানে যেতে পারে না বারণ।

রঙ-বেরঙের বহু মার্বেল আছে বহুদিন আগেকার; কিন্তু সে ব্রিং খেলা জানে না। নিজের কাছেই সে বয়েস পার হয়ে গিয়েছে। বয়েমে সাজানো আছে মার্বেলগুলো। অদ্ভুতভাবে আলো ঠিকরে পড়ে কখনো কখনো। আর আছে এ্যাকোয়ারিয়ামে আমাজান সোর্ডের চারপাশে ছড়ানো, সিলভার ডলার এ্যানজেল আর লিওপার্ড কোরিডোরাসের খেলার সামগ্রী।

বারণ—যেন দশমাথাওলা এক রাবণ। লামাদের বাগান—যেখানে আম, গোলাপজাম, পেয়ারা, আমলকী, কাবাবচিনি, ফলসা বা ছোটো বড় হরেক জাতের গাছের সমারোহ, সে যেতে চায় পাখির সন্ধানে। এয়ারগান দিয়ে চড়ুই মেরেছে একসময়, চড়ুই এবং দোয়েল, তুলোর্টাপারি; এখন একটা এয়ারগান বগলদাবা করে ঘোরাঘুরি নেহাতই হাস্যকর। নিজে বুঝতে পারে, খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে সে, বদলে যাচ্ছে সবকিছু।

পাখির শিস ভালো লাগে—নিস্তব্ধ দুপুরে।

রৌদ্রের ঝনঝনে থালা ছুঁড়ে ফেলে নির্মল ছায়া বিধৌত পাখির রাজ্যে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে, মড়ার মাথার মতো নিস্তব্ধ দুপুরে।

ঐসব হাঘরে ইতরদের সঙ্গে তোর অনেক তফাৎ,—একাধিকবার তার মা এইসব বলেছে, তোর সবকিছু সাজে না। ভালো না লাগলে রেকর্ড বাজিয়ে শুনবি। ছবি আঁকা আছে, গল্পের বই পড়া আছে, ঘরে বসে যা ইচ্ছে করতে পারিস, কেবল টো-টো করে ঘোরা চলবে না।

এক সময় সারাদিন মেকানো নিয়ে পড়ে থাকতো সে; মেকানোর পর ডাকটিকিটের অ্যালবাম। ডাকটিকিটের পর এলো বই পড়ার নেশা। তারপর ছবি আঁকা। আফ্রিকার জঙ্গলে, অভিশপ্ত মমি, মিশমীদের কবচ, ছিন্নমস্তার মন্দির খুবই প্রিয় বই ছিলো এই কিছুদিন আগেও। এখন ভালো লাগে আম আঁটির ভেঁপু। বালিশ ভিজে যায়।

বই আসা প্রায় বন্ধ; মধ্যে থেকে রাশি রাশি কমিকের বই জমে পাহাড় হয়েছে। এসব অনুর কাছে খয়েরি তেলাপোকার মতো চকলেট আর চটচটে চিউইংগামের মতোই বেজায় ফালতু মনে হয়। বরং রোডস্ দ্বীপের পিতলের মূর্তির কথা পড়তে ভালো লাগে, জানতে ইচ্ছে করে আলেকজান্দ্রিয়ার নিঃশব্দ আলোকস্তম্ভের কথা, কুফুর পিরামিড কিংবা স্ফিংস-এর বৃত্তান্ত।

ছবি কি সবসময় আঁকা যায়, না আঁকতে ইচ্ছে করে, না ভালো লাগে।

গান ভালো লাগে। বেশি ভালো লাগে বাজনা। বহুদিন থেকেই রেকর্ড কেনা বন্ধ। ছমাসের ভেতর নতুন কোনো রেকর্ড আসে নি বাড়িতে, না গানের না বাজনার। চাঁদের পাহাড় কিংবা আম আঁটির ভেঁপুর মতো কোনো বই তো দূরের কথা, কিছুই আসে নি।

কি যে করা যায়—কাতরতা অঙ্কুরিত হয়। দুপুর আর কাটতেই চায়। কি অবসাদ। কি অসহায়। ঘরের ভেতরে একা একা নিজেকে নিয়তই বন্দী মনে হয়।

ঘুমিয়ে দুপুরবেলা ওড়ানো সম্ভব হলে সমস্যা ছিলো না, কিন্তু ঐ সময় ঘুমোবার কথা ভাবতেও পারে না। খাটের পুরু তোশকে তুলোর গরমে ছাদের শিকারী রৌদ্র ঘাপটি মেরে থাকে। জলেশ্বর মালীর মতো, মালীবৌয়ের মতো খুব ঠাণ্ডা মেঝেয় হাত-পা ছড়িয়ে সটান পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ফরাশ পাতা মেঝের উপরেও শোবার উপায় নেই, মা ক্ষেপে উঠবে। অনেক কিছুই তার সহ্য হয় না, ধাতে পোষায় না। বইয়ের রঙিন মলাটে কালি পড়ে গেলে ক্ষেপে ওঠে, নাকে হাত চেপে না হাঁচিলে ক্ষেপে ওঠে, রঙের বাক্স কালি-কলম-দোয়াত এলোমেলো ছড়িয়ে রাখলে ক্ষেপে ওঠে, অনেক কিছুই মার কাছে অসহ্য। বাঞ্ছারামপুরে বেড়াতে গিয়ে গ্রামের ছেলেদের পাল্লায় পড়ে পুকুরে কলমিলতার ফুল তুলতে গিয়েছিলো সে, তাতেও চটে গিয়েছিলো মা; রাগের চোটে বেড়ানো বাতিল করে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ফিরে এসেছিলো ঢাকায়।

এইভাবে দীর্ঘ অসতর্ক মুহূর্তে নিজের অগোচরে তার ভেতরের যাবতীয় বোবা ইচ্ছেগুলো ধীরে ধীরে ফ্রিজের ঠাণ্ডা বোতলের মতো যখন ঘেমে ওঠে, এবং খাঁখাঁ দুপুরের হাঘরে ছেলেদের মতো ধুলোবালি মাখা হাওয়ার গরগরে শরীর জানালা টপকে এইসব ভিজে ইচ্ছের ওপর নাক ঘষে পরক্ষণেই আবার উধাও হয়ে যায়, তখন অকারণেই সমস্ত আকুলতার ভেতরে মাকে পাবার অদম্য আগ্রহ চিলের আর্তনাদের থরে-বিথরে পালকের মতো ভেসে। বেড়ায়।

গুমরে উঠতে থাকে অনু,—মা কোনো এক মরা নদী। ইচ্ছেরা সব জলেশ্বর মালী। ইচ্ছেরা সব এক একটা চন্দনের পুরানো কৌটো।

এই ধরনের কৌটো মার ট্রাঙ্কে আছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে মা। প্রপিতামহদের আমলে তাদের কেউ গোলকুণ্ডার হীরা রাখতো সেটায়। দাদু রাখতো তার অব্যবহৃত একটি পাথরের চোখ। মা রেখেছে বিষ; যতোদূর মনে পড়ে একদিন চুপি চুপি তাই-ই যেন বলেছিলো।

মস্ত এক বাড়ির খোলের ভেতর আমি,—অনুর এক একবার খুব আচ্ছন্নভাবে মনে হয়, বেদম জ্বরের ঘোরে গ্লাস উপুড় করে তৃষ্ণা মেটানোর পর যেমন ভেতরটা হাঁসফাঁস করে, এও তেমন। সব মিলিয়ে আঠারো কি উনিশটা ঘর, পুরোনো আমলের দোতলা, খড়খড়ির বড়। জানালা, মোটা মোটা কড়ি-বরগা, উঁচু ছাদ। এমন উঁচু ছাদ যে মনে হয়। ওর ওপর আর আকাশ নেই।

কোনো উদ্ৰবও নেই। অতিরিক্ত কোনো শব্দ নেই। নিজের পায়ের শব্দ নিজেকেই ভয় দেখায়; গলা দিয়ে বের হতে না পারা একটা বিশ্রী ঢেকুরের মতো এই মস্ত বাড়িটার বুকের কাছে সে আটকে গিয়েছে। কখনো দরবেশ আলি কিংবা অন্য কেউ হামানদিস্তায় কিছু কুটলে বাড়িটা খুশি হয়, দেয়ালের চেহারা থেকে খুশির এই মেজাজ সহজেই আবিষ্কার করতে পারে সে। এক সময় মা তার সব অভাবই পূর্ণ করতো, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই চিন্তাটাই ক্যাকটাসের কাটার মতো তাকে খুঁড়তে থাকে। সোডা ফাউন্টেন, কখনো বইয়ের দোকান, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কখননা, কখনো ডিজনির ছবি—এক সময় এইসব ছিলো। কখনো যাদুঘরে, কখনো কার্জন হলের বিচিত্রানুষ্ঠানে, মা এক সময় যথেষ্ট সঙ্গ দিয়েছে তাকে। কোথাও যাওয়া না হলে খুব মনোযোগ দিয়ে তার ছবি আঁকা দেখতো, উৎসাহ দিতো কিংবা আগডুম-বাগডুম সব গল্প শোনাতো পুরোনো আমলের; বুড়ো-হাবড়াদের মুখ থেকে শোনা সেসব। তা না হলে দুজনে মিলে এ্যাকোয়ারিয়ামের পানি বদল করা-ধরাবাঁধা এই কাজটা ছিলোই।

এখন ফিল্টার, এয়ার পাম্প, হিটার সবকিছু এসে সেসবের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। মা বলে-ঝক্কি মিটেছে, সাফ করাটা একটা বদখত ঝামেলা। যে-কোনো কাজ একনাগাড়ে করতে গেলেই পানসে হয়ে যায়। তার কোনো মজা থাকে না–

কথাটা মিথ্যে নয়। কিন্তু আগের মতো মেথিলিন ব্লুতে মাছগুলোকে নিয়মিত চোবানো হয় না, কি বিশ্রী ঘেয়ো চেহারা এখন মাছগুলোর, এ যেন মরে যাওয়া সব উৎসাহের এক মর্মান্তিক রূপ। সোর্ডটেল আর ব্ল্যাকলি বাচ্চা পাড়ছে আর গপাগপ গিলছে, এ্যাঞ্জেল ফিশ মরে যাচ্ছে একের পর

এক। সবকিছু ফেলে মা-ই একসময় ফাইটারের ডিম দেওয়া দেখতে ভালোবাসতো একনাগাড়ে সারাদিন ঠায় বসে। ঝক্কি চুকেছে, এখন সেসবের কোনো বালাই নেই।

সবচেয়ে আগ্রহী ছিলো মার মুখ থেকে গল্প শুনতে। শৈশবে কোনো এক সময় দার্জিলিং-এ ছিলো, সেইসব ইতিবৃত্ত এবং আব্বার প্রসঙ্গ।

আব্বার প্রসঙ্গই সাধারণত বেশি থাকতো।

অনু আব্বাকে সহ্য করতে পারে না। শয়তান মনে করে। ঘৃণা করে। যে সময় তিনি ঘরে থাকেন সে ইচ্ছে করে গা বাঁচিয়ে সন্তর্পণে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে নিজেকে আড়াল করে রাখে। প্রথমে ছিলো ভয়। এখন ভয় থেকে ঘৃণা। ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত, কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্যরশ্মি, কমলালেবু আলুবোখারা আর স্কোয়শ ফলের গল্প তার মনে যে আনন্দলোক নির্মাণ করতো তা আবার হারিয়ে যেতো আব্বার প্রসঙ্গ উঠলে। প্রতিনিয়ত মনে হয়েছে মায়ের গলায় কানে দার্জিলিং-এর গোল্ডস্টোনের যে দুল আর পেনডেন্ট দিনরাত ঝকমক ঝকমক জ্বলে তার অন্তরালে আত্মগোপন করে আছে বিধাতার মতো গম্ভীর নিষ্ঠুর হিংসাপরায়ণ কোনো আব্বার রাক্ষুসে অন্ধকার, যার কোনো প্রকাশ নেই, চাকচিক্য নেই, ভয়ঙ্কর গোপন জঘন্য কোপন তার স্বভাব। আর কোনো ভুবন নেই মা ছাড়া। আব্বাকে এড়িয়ে, পাতার আড়ালে পাখির মতো নিজেকে ঢেকে রেখে সে তার আলোর ভুবনে এইভাবে পরিত্রাণ পেতে চায়।

সমবয়েসী ছেলেদের সঙ্গে তার অনেক তফাৎ—অনুর নিজেরই এই রকম ধারণা। নিজের ভেতরে পাথর কেটে কেটে সে নির্জন রাস্তা করে নিয়েছে, ধুলোয় মোড়া সে রাস্তা, ধূম্রজালে ঘেরা, ঘোড়ার পায়ের শব্দ সেখানে বিভীষিকা, এই রাস্তা ধরে নিরাময়ের কল্পলোকে পৌঁছুতে চায়।

মা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। ভাবতে শিখিয়েছে। এখন জানা হয়ে গিয়েছে—ভাবনার ভেতরে কতো রকমেই না মানুষ নিজেকে পায়। ভাবনার ভেতরে নিজেকে সব রকমে যথেচ্ছ পাওয়া যায়। ভয়ঙ্কর যে শত্রু, টলানো যায় তাকেও এবং অতি সহজে। মাকে সবচেয়ে বড় বন্ধু ভেবে তার আনন্দ।

আব্বা অনেক দূরের মানুষ, সুদূর হিমালয়ের ওপার থেকে উড়ে এসে বাড়ির প্রাঙ্গণের ঘোড়ানিম গাছে ভয়ঙ্কর ইচ্ছে নিয়ে জ্বলন্ত বাদুড় ঝুলে থাকলে যেমন মনে হবে। কালো সুটে মোড়া আব্বাকে তার অতিকায় বাদুড় মনে হয়। রাত্রিবেলায় ঘরে ফিরে যখন আলোর তলায় দাঁড়িয়ে চামড়ায় বাঁধানো আইনের বইগুলো টেবিলের ওপর রাখতে থাকেন, যখন জ্বলতে থাকে চশমার পুরু কাচ, তখন দূর থেকে তা দেখে রীতিমতো সে শিউরে ওঠে। তার মনে হয় এই সময় সামনে পড়লে বিদঘুটে অতিকায় বাদুড়টি জ্বলন্ত চোখ আর কালো ডানা নিয়ে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে মার ওপর নিষ্ঠুর উল্লাসে।

হয়তো খুশির ভান করে—অনুর এই রকমই মনে হয় সাধারণত টাইয়ের ফাঁস আলগা করতে করতে মাকে ডেকে বললেন, একটা শক্ত খুনের আসামীকে বেকসুর খালাস করিয়ে এলুম!

ভালো–

এইটুকু বলে চলে এসেছে মা। মা কতো বীতশ্রদ্ধ ওই ছোট্ট একটুখানি ভালো ছুঁড়ে দিয়ে চলে আসা থেকে পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে সে। পরদিন দুপুরে—যখন কেউ কোথাও নেই, কার্নিশে শুধু একটা কাক, কালো পাথরের ভাঙা যিশুখৃস্টের মূর্তির গায়ে ফর্শা টিকটিকি, তখন মা ফিশফিশ করে বলেছে খুনিদের সর্দার। চোর ডাকাত ঠ্যাঙাড়ে গুণ্ডারা তোর আব্বার জোরেই টিকে আছে, কতো টাকা নিয়ে আসে তুই তো আর তা জানিস না। সব লুটতরাজ করা টাকা, মানুষ খুন করা টাকা–

পুলিশে ধরে না কেন?

চুপ, তুলবি না ওকথা। আমরা কেউই রেহাই পাবো না, না আমি, না তুই। জেলে পুরবে সবাইকে যদি জানাজানি হয়। ঘানি টানাবে, আঁতা ঘুরিয়ে পাথর ভাঙাবে। এই নোংরা ডাস্টবিন থেকে পালিয়ে যেতে হবে আমাদের। একদিন না একদিন পুলিশে ধরবেই!

বাড়ি থেকে পালানো কতো আনন্দের, অনু বারবার রোমাঞ্চিত হয়েছে। বনে-পাহাড়ে, পদ্মার নির্জন কোনো কলাগাছ ঘেরা চরে, জেলেদের ছোট্টো কোনো গ্রামে—যার চারপাশে কেবল থৈথৈ পানি—পালালে এইসব জায়গাতেই যাবে। তা না হলে এমন কোথাও যেখানে সকলে চিৎকার করে কথা বলে, ঘাসের বিছানায় ঘুমায়, যেখানে আঠারো কিংবা উনিশটা রাক্ষুসে হাঁ-র মতো ঘর নেই, বিশাল উঁচু ছাদ নেই, যেখানে বৃষ্টি পড়ে ঝমঝম, হু হু হু হু বাতাস বয়ে যায়। মা যদি চিৎকার করে বলে অ-নু-বে-শি-দূ-র-যে ও-না-আ-আ-আ তাহলে সে চিৎকার শাঁ-শাঁ আকাশের দিকে ছুটে যাবে, ধরবে বিদ্যুৎ, তারপর সেই বিদ্যুৎকে চাবুকের মতো হাতে নিয়ে সপাং সপাং মারবে আর পোষ-মানা লোমশ সিংহের মতো বনরাজিঘেরা গ্রাম কেশর নেড়ে নেড়ে খেলা দেখাবে, থেকে থেকে উঠবে গর্জন–

এমনও হয়েছে, সন্দেহ-সঙ্কুল কণ্ঠে মাকে বলেছে,—সে রকম আব্বাকে তো মনে হয় না, মনে হয় কতো ভালো, কি ঠাণ্ডা! লামার আব্বার মতো হাম্বিতম্বি করে ধুম-ধাড়াক্কা মার লাগান না। তোমার সঙ্গে যে ঝগড়া করে তা-ও না!

মা উত্তর দিয়েছে-ঐখানেই তো যতো গণ্ডগোল! কেন ডিটেকটিভ বইগুলোয় পড়িস নি, খুনি-ডাকাত ফন্দিবাজ লম্পটগুলো কি চমৎকার ছদ্মবেশ ধরে সাধারণ মানুষের চোখে বেমালুম ধুলো দিয়ে বেড়ায়, ও হচ্ছে সেই জাতের মানুষ। ভালোমানুষিটা হচ্ছে খোলস, ওটা ওপর ওপর। যে কোনো সময় গলা টিপে মারতে পারে, যে-কোনো সময় বিষ দিতে পারে, সবকিছুই ওর পক্ষে সম্ভব। এখানে থাকলে এমনি করে মরে যাবো, কাকপক্ষীও জানবে না, কেউ কাঁদবে না

নতুন করে আবার সবকিছু ভাবতে হয়।

তোকে আমি কিছুতেই মরতে দেবো না বলতে থাকে মা, অনু চুপচাপ শুনে যায়—তুই জানিস না কি সাঘাতিক তোদের বংশের মানুষরা। তোর দাদা ছিলো ঠ্যাঙাড়েদের সর্দার। চরের মানুষ। কথায় কথায় মানুষ খুন। নিত্য-রোজ গায়ে রক্ত মেখে ঘরে ফিরতো, আর সারা। গায়ে সেই রক্ত নিয়ে মাটির সানকিতে ভাত খেতো। এক চাচাকে তোর সেই দাদী বুকের ওপর চেপে বসে ভোতা কাস্তে দিয়ে পুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জবাই করেছিলো, সে কী চিকার! ঘড়ঘড় করে রক্ত তুলতে তুলতে সকলের চোখের সামনে মরে পড়ে রইলো, ভয়ে কেউ ছুঁলো না পর্যন্ত, গোর দেওয়া তো দূরের কথা। শেষে, দুদিন পর যখন পচে দুর্গন্ধ হয়ে গিয়েছে লাশ তখন শেয়ালে টেনে নিয়ে গিয়েছে একদিকে। পরদিন টেনেহিঁচড়ে খেয়েছে শকুনেও।

আতঙ্কিত অনু আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মা অভয় দিয়ে বলেছে, সেই জন্যেই তো ইংরেজি শিখছি, তোকে নিয়ে আমি কোথাও চলে যাবো, চাকরি করবো। তোর ধুরন্ধর আব্বা টের পাবে না।

স্বস্তি পেয়েছে শুনে। একথায় ভয় কেটে গিয়েছে।

মার মুখে সে একথাও শুনেছে—ঐ যে স্যার যিনি আমাকে রোজ পড়াতে আসেন, উনি কিন্তু আমাদের খুব বিশ্বস্ত বন্ধু। সব জানেন উনি। আমি সব বলেছি ওঁকে। খুব ভালো লোক, উনি সাধ্যমতো আমাদের সাহায্য করবেন। তোকেও খুব ভালোবাসেন।

অনু ভয়ে ভয়ে বলেছে, আর যদি সব ফাঁস করে দেন?

দূর পাগল–মার মুখে আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা দেখতে পেয়েছে সে উনিই তো আমাদের ভরসারে বোকা ছেলে। ইশ, উনি না হলে যে কি হতো অনু, ভাগ্যিস পরিচয় হয়েছিলো! চিন্তায় চিন্তায় বোধ হয় পাগলই হয়ে যেতাম।

মায়ের স্যারকে খুব ভালো লাগে। কি সুন্দর মানুষটি, অনু চমকৃত হয়েছে। তার স্কুলের গিলবার্ট প্রামাণিকের (ক্যাচূচিরিয়াস্স্যার) মতো মাথায় একরাশ অবাধ্য ঝাঁকড়া চুল, হাসি হাসি মুখ, চশমা পরেন না। উনি থাকতে অকারণে ও ঘরে যেতে বারণ আছে, যথেষ্ট ব্যাঘাত ঘটে লেখাপড়ার। ভালোমতো ইংরেজি রপ্ত করতে চায় মা। ইংরেজি না জানলে চাকরি জোটানো কোনোমতেই সম্ভব নয়। চাকরির চিন্তা দারুণ নেশার মতো পেয়ে বসেছে মাকে—অনু জানে। বাঁচতে হবে তাদের। পালাতে হবে। মাত্র একদিনই দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় কাছে ডেকেছিলেন, সেই প্রথমদিকে, প্রায় বছরখানেক আগে।

খুব ভালোভাবে আপাদমস্তক খুঁটি জহুরির মতো নিরিখ করে আনন্দিত হয়ে বলেছিলেন, স্ট্রেঞ্জ! এ যে একেবারে বালক হেরম্ব, আই মিন র‍্যাব। ঠিক তেমনি খাড়া খাড়া ঠাসা চুল, গভীর চোখ, শাণিত দৃষ্টি, যেন জ্যোতি ঠিকরে বেরুচ্ছে, আই ওয়ান্ডার! চুলে বিদ্রোহ, চোখে বিদ্রোহ, চিবুকে বিদ্রোহ, ঠোঁটে বিদ্রোহ

তাকে একপাশে টেনে নিয়ে মা সগর্বে বলেছিলে, ছেলেটি কার দেখতে হবে তো।

পরে আবার জানতে চাইলো হেরম্ব না র‍্যাবর পরিচয়। স্যার উৎসাহিত হয়ে বলেছিলেন, র‍্যাশ্যার একজন রিনাউন্ড পোয়েট, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির স্টাইলের প্রবর্তকও বটে। স্তালিনের আমলে ফিল্মের নোংরা গান লেখার অপরাধে খামোকা গুম করে দেওয়া হয় বেচারাকে!

খুবই প্রানোচ্ছল মায়ের স্যার। ভালো লেগেছিলো। প্রাণের ভেতর থেকে কথা বলেন ভদ্রলোক। যেমন উজ্জ্বল তেমনি চঞ্চল, অসম্ভব হাসতে পারেন।

কিন্তু এই ভয়ঙ্কর দুপুরে কি করবে। তার ইস্কুল সেই সকালে। তারপর বারোটার মধ্যে ছুটি। মা স্যারের কাছে ইংরেজি শিখছে একতলার কোণের ঘরে, কাজ শেষ করে ঘাড়ের নিচে লাল গামছা রেখে দরবেশ আলি অকাতরে ঘুমিয়ে, পচার মা গেঁটে বাতলা পা জোড়া রৌদ্রে ছড়িয়ে গালে পান ভরে বারকোশে জলপাই আর আমের আচারের বয়েম সাজিয়ে হুস হুস শব্দে কাক তাড়াচ্ছে, এই দুপুরে কি এমন করার আছে! টুকরো টুকরো দুর্বল ইচ্ছেগুলোকে মাছির মতো তাড়ানো ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই, মনে হয় অনুর।

মা যেন কী—

ভাবতে গিয়ে কালো অস্থিরতা তোলপাড় করে। আজকাল খোঁজ নিতে একবারও ওপরে আসে না, দুপুর হলেই তার সঙ্গে যেন নিদারুণ শত্রুতার এক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।

শিখছে তো শিখছেই। মার কোনো ক্লান্তি নেই। কতো দূরে সরে গিয়েছে মা। আজকাল প্রয়োজনের বেশি প্রায় কথাই বলে না, দিনের পর দিন অসম্ভব গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত বদলে যাচ্ছে, অনু শঙ্কিত।

আগে তুচ্ছ ভুল-ত্রুটি নিয়ে পচার মাকে নিছক কম গালমন্দ করে নি, দরবেশ আলিও তো বটেই, আজকাল ওদের দিকে ফিরেই তাকায় না, তুলকালাম তো দূরের কথা; দিনের পর দিন সব অভিযোগ ফুরিয়ে যাচ্ছে।

অনু শিউরে ওঠে। বুকের মাঝখানে কাচের নীল পিরিচ ভেঙে খান-খান হয়ে যায়। মার যাবতীয় সুন্দর অভিলাষগুলো নির্দয় পাথরে পরিণত; এই বাড়ি ছেড়ে, শয়তানের এই থাবা থেকে আর কোনোদিন নিরাপদে পালানো যাবে না। ভয় হয়। তবু এতো ভালোবাসে সে মাকে যে প্রতি মুহূর্তেই উৎকর্ণ হয়ে প্রতীক্ষা করে, রাত্রিবেলা মাঝে মাঝে নির্বোধ শিশুর মতো বিছানা হাতড়ে কি যেন খোজে। তার কেবল ভয়, চিরকালের মতো এক দুয়ে অন্ধকারে একে একে সব মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে। মায়ের সব ইচ্ছেগুলো যদি নির্দয় পাথর হয়ে গিয়েও থাকে তবু মনে মনে অনু সেই পাথরটা কেটে টেবিলের ওপরে সাজানো ভাঙা যিশুখৃস্টের মূর্তির চেয়ে অনেক সুন্দর তার রূপ দিতে চেষ্টা করে।

 

লামাদের বাগানে অনেকক্ষণ ধরে হরিয়াল ডাকছিলো। দুম করে বন্দুকের আওয়াজ ফাটলো এক সময়। ঘেউ ঘেউ করে হুঙ্কার ছাড়লো গরগরে গেস্টাপো। অনু এসে দাঁড়ালো জানালায়, বাগানের ঘাসের পাটিতে তার ছোট্ট একটুখানি শরীর নিয়ে পড়ে আছে প্রাণহীন হরিয়ালটি। ক্যাঙ্গারুর মতো জোড়া পায়ে লাফিয়ে লামার মামা সেটা তুলে নিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে দিলো, তারপর ক্রিকেটের বলের মতো দুহাতে লুফে নিয়ে চিৎকার করে উঠলো, হাউজদ্যাট!

লাইটপোস্টের মাথায় কাকের বাসায় আগুন ধরেছে। ওপর থেকে আগুনের ফুলকি ঝরছে ফুলঝুরির মতো।

ময়লা ছেলেরা হৈহৈ করছে।

বাইরে গগনে এক মস্ত আকাশ।

বাইরে ধু-ধু রৌদ্রের মাঝখানে গোল গোল চারকোণা নরম বাগান।

সেইসব গোল চারকোণা নরম বাগানে ছোটবড় অনেক গাছ। ফিকে সবুজ, ঘন সবুজ, নীলচে সবুজ, ধূসর সবুজ সেইসব গাছ অসংখ্য হাত বাড়িয়ে ধরে রেখেছে আকাশ সমুদ্র আর সুবিস্তীর্ণ স্তেপস কিংবা কিরঘিজ প্রান্তরের ছবি, সে রোমাঞ্চিত হয়। সেইসব গাছের পায়ের কাছে পোষ-মানা আদুরে হাতির মতো কান নাড়ছে অঢেল ছায়া। সবুজ উষ্ণীষ জড়ানো সেইসব সাঙ্কেতিক গাছের অসংখ্য বাহুতে বসে নাম-না-জানা সুনীল পাখিরা দিনরাত আকুল সুরে গেয়ে চলেছে।

এইসব বিদীর্ণ দুপুরের মাঝখানে, ধু-ধু রৌদ্রের মাঝখানে, গোল চারকোণা বাগানের চেয়ে, গাছের পাতার চেয়ে, সমুদ্রের চেয়ে, পাখির

গানের চেয়ে, সুন্দর আর ঠাণ্ডা একটি মেঝে পরম নিভৃতে কোথাও আরামে চোখ বুজে অচৈতন্যপ্ৰায় পড়ে আছে জলেশ্বর মালীর মতো। অনুর মনে হলো, জলেশ্বর মালী কতো সুখী!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *