০১. খাটো ধুতি

অনন্ত দ্রাঘিমা – অনিল ঘড়াই

০১.

খাটো ধুতি হাঁটুর উপর চড়ানো, চুনারাম বাঁধের উপর উঠে এসে পিছন ফিরে তাকাল। যার হড়বড়িয়ে চনমনে ফড়িংয়ের মতো উড়ে বেড়ানোর কথা সেই রঘুনাথ হাঁপু ধরা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে চুনারামের দিকে। আজকালকার ছেলেপুলেদের গায়ে তেমন জোর নেই, বালিছাতুর চেয়ে পলকা ওদের গতর, চুনারাম মোটা ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে কিছুটা নেমে এসে হাত বাড়িয়ে দিল, ধর দাদু, উঠে আয়। হা-দেখ, বেলা কেমন বাড়ছে। কখুন পৌঁছাব ক’ তো? চিন্তাটা চুনারামের একার নয়, এর সঙ্গে দুর্গামণির ভাবনাটাও দুধে-ঘোলে মিশে আছে। গুয়ারাম মাসের উপর ঘরছাড়া। গাঙ পেরিয়ে সে চলে গিয়েছে চাষের কাজে। প্রথম বর্ষায় এই ঝুঁকি নিয়ে ঘর ছাড়া তার উচিত হয়নি। শুধু দুর্গামণি নয়–চুনারামও বুঝিয়েছিল, যাসনি বেটা। মাটি হারালে দুঃখু বাড়ে। কথাটা মনে রাখিস। গরিবের কথা বাসি হলে কাজে লাগবে। বরাবরই একগুয়ে গুয়ারাম। নিজে যা বুঝবে সেটাই মক্কা-মদিনা, ছোট বড়কে তত বিশেষ পাত্তা দেয় না। দুর্গামণি অভিমান করে-মুখ ফোলায়, অত জেদ ভালো নয় গো, জেদ বুনো-মানুষকে ঝোড়-জঙ্গলে খেদিয়ে নিয়ে যায়। মাথা সামলাও, না হলে ঠকবে।

–মেলা খ্যাচরম্যাচর করো না তো, ভাল লাগে না। গুয়ারামের সব কথাতেই বিরক্তি। এই সংসারের কোনো কিছুই বুঝি তার ভালো লাগে না। মন মতো কথা না হলে বিরক্তিতে সে চাপানদী। মুখটা কুয়াশার গভীরে ঢুকে যায়। ধুতি সামলে পানসে হেসে চুনারাম রঘুনাথের দিকে তাকাল, কিরে, উঠে আয় দাদু। বেলা চড়ছে, সে খেয়াল কি তুর আচে। সময়ে ঘর না গেলে তুর মা কি বলবে বল তো!

 কি আর বলবে, খেতে টুকে দেরি হবে। চোখ নাচিয়ে রঘুনাথ রগড় করে হাসল। ওর সারা গায়ে ধুলোভর্তি, তবু রোদ যেন পিছলে যায় ওর মাগুর মাছের গতর থেকে। ঝাঁকড়া মাথায় কুঁকড়ে আছে ওর মোটা মোটা কুচকুচে চুলগুলো। একেবারে দুর্গামণির মুখটা যেন বসানো, হাসিটাও ছাঁচের সন্দেশের মতো! চুনারাম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, হতাশায় প্যানপেনিয়ে উঠল গলা, তুর জন্যি আর পারি না, আমারই ভুল হয়েচে তুরে সাথে করে নিয়ে আসা। এবার রাগে ফেস করে উঠল রঘুনাথ, নিয়ে এসেচো মানে? আমি কি তুমার ঘাড়ে চেপে এসেচি নাকি? আমি এসেচি-নিজের পায়ে। চরণবাবুর ট্যাকসি বোঝো? কিছু বোঝো না তুমি! বুড়া মানুষ…ছ্যা…!

হ অ। আমি বুঝিনি, তুই সব বুঝিস? তাচ্ছিল্যে ঠোঁট বেঁকে গেল চুনারামের, তবু বেশ ভালো লাগছিল তার। একমাত্র নাতি বলে কথা। লোকে বলে আসলের চাইতে সুদ মিষ্টি। কথাটা মন্দ বলে না। কত মানত করার পর রঘু এল। গুয়ারামের খুশি আর ধরে না। দৌড়ে এসে খবর দিল, খোকা হয়েছে বাবা, যাক এবার আটকুড়া অপবাদটা ঘুচল! চুনারামও খুশি হয়েছিল সে দিন। দোক্তা পান মুখে পুরে সে বিভোর হয়ে গিয়েছিল সুখে। ছেলের সুখ মানে তো তার সুখ। এই বয়সে এর চেয়ে আর কি চাই? শুধু লজ্জাবতীর জন্য দুঃখ হয়। সে এসব দেখে যেতে পারল না। তার ভাগ্যটাই ফোপরা, পোকায় কাটা, খরার আকাশ। রঘুর সাথে লড়তে খারাপ লাগে না চুনারামের। আর রঘুও সব সময় ওর পেছনে লেগে আছে। দাদু, এটা করে দাও, সেটা করে দাও। হেন-তেন সাত-সতেরো ফরমাশ। ঘরটা আলো করে আছে ছেলেটা। চুনারামের মান-অভিমান সব কিছু এখন এই নাতির উপর। রঘু সেটা বোঝে কিনা কে জানে। চুনারাম বাঁধের ঢালু পথ বেয়ে নেমে গেল সরসরিয়ে, রঘুনাথের হাত ধরে বলল, আর খুপড়িটা তেতিয়ে দিস নে, এবার চল। হা-দেখ কেমন চড়া রোদ উঠেচে, মনে হচ্ছে মাথার ঘিলু শুকিয়ে দেবে। চুনারাম খটখটে আকাশের দিকে তাকাল। চারদিকে কড়া রোদের হিলহিলানো সাপ নাচছে। গায়ে ছ্যাঁকা দেওয়া ফোঁসফোঁসানী হাওয়া! সেই বিষে চড়বড় করে চামড়া, গলা শুকায়, টান ধরে পেটে।

আর জেদ ধরে থাকা উচিত নয়! রঘুনাথ দু’হাতে ধুলো জেবড়ে উঠে দাঁড়ায়। এই সামান্য চড়াই উঠতে তার কিছু যায় আসে না। শুধু বুড়াটাকে তাতানোর জন্য তার এই মনগড়া নাটক। রঘুনাথ চুনারামকে খুশি করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ধরো গো! আর পারচি নে। বয়স হল, মাজা পড়লো-আর কতকাল এই শরীলটাকে ঠেলব?

মারব দুই থাপ্পড়, ইরকি হচ্ছে? চুনারামও নাটকে ওস্তাদ, ডান হাত উঠিয়ে সে ভঙ্গি করে দাঁড়ায়। রঘু তার ভঙ্গি দেখে বাঁধের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগাঙের মতো খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। এক দমে জগৎখালি বাঁধের উপর উঠে এসে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে ঠাট্টা করে বলে, দেখলে তুমারে কেমন ঘাবড়ে দিলাম। আমার সাথে লড়তে এসো না, হেরে যাবে।

হঅ, হঅ। হারবা তো হারবা। চুনারাম বুক হালকা করে শ্বাস ছাড়ল, এবার চল দেখি ঝটপট। নালফুল তুলতে হবে। তুই পারবি তো দাদু?

–পারব না মানে, ঢের পারব।

–আমি কিন্তু জলে নামবনি। কাল আমার ঘুসঘুসিয়া জ্বর এয়েছিল। রাতভর জ্বরের ঠেলায় কুঁকড়ে-মুকড়ে পড়ে ছিলাম। ভোরের আলো ফুটতে শরীরটা টুকে হালকা হল। চুনারাম রঘুনাথের পাশাপাশি হাঁটছিল। নাতির মন পাওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু অন্যপ্রান্ত অসাড় দেখে তার কথা বলার ইচ্ছেটাই শ্মশানমুখো হয়ে গেল।

এ সময় বাঁধের ধারটা বেশ জমজমাট, ধুলো মেখে ঝোপঝাড়গুলো বেশ স্ফুর্তিবাজ, সেই সঙ্গে রোদের সাথে মালাম লড়ায় ব্যস্ত। চাপড়াঘাসের শেষ যেখানে সেখান থেকে শুরু হয়েছে টলটলে জল, এখন স্রোতহীন বুড়িগাঙ লম্বা-দিঘির গতর নিয়ে চিতিয়ে-কেতিয়ে আকাশ দেখে হরদম। অথচ বর্ষার মাঝামাঝি এর দাপট, চোটপাট, গতি-গর্জন দেখলে শুকিয়ে যায় কলজে, ভয়-তরাসে বুকটা গেছো ব্যাঙের মতো লাফায়। এই বুড়িগাঙ তখন দশ গুণ চেহারা নিয়ে ভাঙতে আসে ঘর, শুধু ঘর ভাঙে না জলের তোড়ে কাঁদিয়ে ছাড়ে চারপাশ। এখন গো-বেচারা, বুঝি ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না।

বুনো পাড়ার মুড়োতে ঝাঁকড়া অশোত্থ গাছের ছায়া। গেল বছর এখানে একটা সবজে রঙের টিউকল বসিয়েছে সরকার। তার আগে বেশির ভাগ বুনো পাড়ার লোকে জল খেত বুড়িগাঙের, যাদের ভাগ্য ভালো তারা যেত গাঁয়ের বারোয়ারি কুয়োটায় জল আনতে। দড়ি-বালতি সেখানে ধপাস করে ফেলে দিয়ে জল তোল। খ্যাচাকলের ঘটাং ঘটাং শব্দ, পেশির টানে জলভরা বালতি উঠবে উপরপানে, কষ্ট বলতে চরম কষ্ট। তবু দুর্গামণি যেত মাটির কলসী নিয়ে, লাইন দিয়ে জল আনত। পাড়ার বউ-ঝিউড়িদের টীকা-টিপ্পনী কানে আসত তার। ভালো লাগত না পরনিন্দা পরচর্চা শুনতে। বেশি বয়সে মা-হওয়ার সুখ যেমন জ্বালাও কম নয়। দু-চার শব্দ কানে বোলতার হুল ঢোকায়। তা-ও নেই নেই করে দেখতে-দেখতে রঘুর বয়স ষোল ছাড়াল। চুনারাম সেবার কথায় কথায় বলছিল, আমাদের ঘরের রঘুটা তো গায়ে-গতরে হয়েছে, এবার ওর বিয়ে-থা দিয়ে লেটা চুকিয়ে দাও। আমারও বয়স হচ্ছে, কবে ফুট করে চলে যাব শিবের বাপও টের পাবে না। যেতে তো হবেই, তার আগে মনের বাসনা মিটিয়ে যাই না হলে যে সঙ্গে গিয়েও সুখ পাব না।

দুর্গামণি বুড়োর কথা শুনে অবাক হয়নি, এ বংশের এমনই ধারা। এর মধ্যেই ছেলেটার জন্য মেয়েঘর থেকে লোক আসতে শুরু করেছে। রঘুর এতে ঘোর আপত্তি। বিয়ে মানে বে মতলব জড়িয়ে যাওয়া। হাঁড়িকাঠে গলা বাড়িয়ে দেওয়া। রঘু চোটপাট করেছে দমতক। তাতেও কাজ হয়নি দেখে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে দুদিন। শেষে আবার গুয়ারাম তাকে খুঁজে আনল দেবগ্রাম স্টেশন থেকে।

সকাল থেকে ঘরে আজ আনাজ বাড়ন্ত। শাক-লতায় মন ভরতে চায় না দাদু-নাতি কারোরই। জলখাবারের মুড়ির বাটি দিতে এসে দুর্গামণি মনে করিয়ে দিয়েছিল কথাগুলো, আজ কিন্তু ভাতের সাথে তরকারি দিতে পারব না। ঘরে কিছু নেই। যা ছিল সব সাঁঝবেলায় করে ফেলেছি।

-কেনে কচুর ডাঁটি, সেগুলো কি সব ফুরিয়ে গেল? চুনারামের জিজ্ঞাসায় দুর্গামণি ঘাবড়ায়নি, না, ফুরোবে কেনে? কিন্তু হররোজ কি কচু মুখে সুয়োদ লাগে? তাছাড়া বুনো কচু কুটকুটায়। তেঁতুল দিয়ে ঠিক করে জব্দ না করলে ওরা দাঁত বসাতে ছাড়ে না।

–তাহলে কি করতে হবে? চুনারামের ফাপড়ে পড়া চোখ-মুখ।

 দুর্গামণি তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, তাহলে যাও না কেনে বামুন পুকুরে। ওদিকে কাঠ-কুড়োতে গিয়ে দেখেছিলাম নালফুলে ভরে আছে পুকুরের জল। আজ কচুডাঁটির বদলে নালফুলের ডাঁটা-চচ্চড়ি রেঁধে দেব।

প্রস্তাবটা মন্দ নয়। গুয়ারাম যতদিন ঘর না ধরছে ততদিন এ সংসারের দায়-দায়িত্ব তো সব ওর। ছেলেটার সব কাজে হড়বড়ানো। দু-চার দিন বৃষ্টি দেখেই সে চাষ কাজে চলে গেল। তার এই যাওয়াটা উচিত হয়নি। আষাঢ়ের মেঘ সবসময় যে ঢালবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দিতে পারে না। হলও তাই। দুদিন ঝরেই ঝোর বন্ধ করে দিল মেঘ দেবতা। কিন্তু তার আগে বাবুর পুটলি বাঁধা সারা। ধার-উধার করে ছেলেটা দলের সঙ্গে গাঙ পেরিয়ে চলে গেছে। এদিকে কে কি খাবে পরবে সে চিন্তা তার নেই।

অশোথতলা ছাড়িয়ে এলেই হাঁপু লাগে চুনারামের, গা ভিজিয়ে ঘাম নামে দরদরিয়ে। একটু যে জিরিয়ে নেবে তার জো নেই। রঘুর মুখ চলবে ক্ষুরের মতো। খড়খড়ে হাতে ঘাম মুছে চুনারাম রঘুর দিকে তাকাল, বুঝলি কিনা, তোর বাপের দুড়ুম করে চলে যাওয়াটা উচিত হয়নি।

 রঘুনাথ ঢোঁক গিলল। সামান্য বিরক্তি ওর চোখে-মুখে, না গেলে ঘর চলবে কি দিয়ে? এ গায়ে কাজ কুথায়? এখানে তো খরা চলচে।

-যা বলেছিস। হাজার কথার এক কথা। চুনারাম উৎসাহিত হল, সেইজন্যিই তো বলছিলাম ওর এভাবে যাওয়াটা বিবেচকের কাজ হয়নি। আরে যাবি যখন তখন ধার-উধার করে কিছু টাকা ঘরে দিয়ে যা। তা না, কেবল ফক্কা!

-থাকলে তো দেবে। বাপের নিন্দে সহ্য হয় না রঘুর, শুধু মুখ দেখে কেউ টাকা উধার দেয় না। থালা-গেলাস তো সব গিয়েছে। বন্ধকের মাল ফেরত পাওয়া ঝামেলার।

-তা যা বলেছিস। সুদের সুদ বেড়ে ন’ মাসের পোয়াতি হয়ে যায়। চুনারাম হতাশ গলায় বলল, ছেলেটারে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। ঠা-ঠা খরায় দেশ-গাঁ জ্বলচে। সবখানে পাতা পোড়ার বদঘ্রাণ। চোত-বোশেখের মতো ধুলো এখন দামাল। কে বলবে আষাঢ় মাস পেরিয়ে গেল। কবে যে শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে যাবে বুড়িগাঙ? তখন সারা বুনোপাড়া জুড়ে জলকষ্ট। দল বেঁধে যেতে হবে সেই অশোথ তলার চাপা কলে। সে চরমদিন আসার আগে হড়হড়িয়ে ছেরাক মেঘ। আর ভাল লাগে না। সারা গায়ে বিজবিজানো ঘামাচি ফুটেছে চুনারামের, গা-গতর গোসাপের চামের মতো খসখসে। রাতে ঘুম নেই, দুপুরেও তাই। এভাবে চললে বর্ষা খুন হয়ে যাবে, বীজতলা ঝাঁকিয়ে কাঁদবে। বিধবার সাদা শাড়ির মতো দেখাবে মাঠঘাট।

সাবধানে নামবু। সামনে ধুলো চুবানো ঢালুপথ। রঘুকে সতর্ক করে চুনারাম। শুধু চ্যাটচেটে কাদা নয়, ধুলোও পেছল কাটায় ওস্তাদ। বেকায়দায় ব্যাঙ ঠিকানো ঠিকরে গেলে ধুলো ঢুকে যাবে চোখে-মুখে। এ ধুলো ভূত সাজাতে ভালোবাসে। রঘু নিজে সতর্ক হয়ে বুড়ো মানুষটাকে হুঁশে ফেরায়, আমার জন্যি ভাবতে হবেনি। তুমি ঠিকঠাক নামো তো।

-নামছি রে, নামছি। গলা ঘড়ঘড় করল চুনারামের। ঘর থেকে বেরনোর সময় হড়বড়িতে ভুল হয়ে গিয়েছে। হাতের লাঠিটা ভুলে ফেলে এসেছে সে। লাঠি থাকলে শুধু পায়ের নয় মনেরও জোর বাড়ে। ঢালুপথে লাঠি, সাইকেলের ব্রেকের মতো কাজ করে। এখন নিজের ভুলের জন্য নিজেই আফসোস করে চুনারাম। কিন্তু মুখ ফুটিয়ে রঘুকে সে কিছু বলে না, রঘুই তার নড়বড়ে চেহারা দেখে খিঁচিয়ে ওঠে, সেদিন যে বেবুর ডালার লাঠিটা এনে দিলাম, সেটা কুথায়?

-ঘরে আচে। চুনারাম হালকা করতে চাইল প্রসঙ্গ।

রঘু রাগে লাল হয়ে বলল, ঘরে থাকলে চলবে? লাঠি দিয়ে কি ঘরে ঠেকো দেওয়া হবে?

-বললাম তো ভুল হয়ে গিয়েছে। চুনারামকে অসহায় দেখাল, বয়স হলে সব কথা কী ঠিকঠাক মনে থাকে রে। তাছাড়া আমার হাজার চিন্তা। তোর বাপ যে কুথায় গিয়েছে কে জানে। সে না ফেরা তক আমার চোখে নিদ আসবে নি।

–ফি-বছর তো যায়, এবারের ক্ষেপটা নিয়ে এত ভাবছো কেন?

–ও তুই বুঝবি নে, বয়স হোক, তারপর সব বুঝবি! চুনারামের কথাটায় রঘুর ভেতরটা ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল। সে এখন যা বুঝতে পারে না ঠিকঠাক-বয়স হলে কি সব বুঝতে পারবে সে? তার তো ঢের বয়স হয়েছে, গোঁফের রেখা ফুটেছে তাহলে সে কেন বুঝতে পারবে না। চুনারামের কথাগুলোই রহস্যে মোড়া। এই হেঁয়ালি সে প্রায়ই বুড়োধুড়োদের মধ্যে লক্ষ্য করে। তার ভালো লাগে না। তার মনে হয়-এরা বুঝি কিছু লুকোতে চায় যা ওদের অক্ষমতা, কমজোরি।

 বাঁধের গাঁ-ছোঁয়া ঢালুপথ সাপের চেরা জিভের মতো দুফাঁক হয়ে দুদিকে চলে গিয়েছে। একদিকে জমজমাট গ্রাম, অন্যদিকে বামুন পুকুরয়াড়। ছায়ায় ছায়ায় পথটা বেশ আরামদায়ক। খুব বড়ো-সড়ো গাছ চোখে পড়ে না, মাঝারি মাপের গাছগুলোই এখানকার শাসনকর্তা। কতবার যে এখানে ছুতোনাতায় পালিয়ে এসেছে তা রঘুনাথ নিজেও জানে না। পথের ধুলোয় ভরে আছে চুনারামের গোড়ালির নিচটা, ধুলো সোহাগে গায়ের বর্ণ বোঝা দায়, শরীরও ধুলোছোঁয়ায় গিরগিটির মতো রঙ বদলায়। ক’ পা হেঁটে এলেই ঝোপ-ঝাড়ে ঠাসা হয়ে যায় এলাকা, টাক তাতানো রোদের বুক ছুঁয়ে পাখির ডাক ভেসে আসে। হা-করে দাঁড়িয়ে পড়ে রঘু। জুলজুলিয়ে আশেপাশে তাকায়। চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে আশ্চর্যবোধ। নজর এড়ায় না চুনারামের, অমন করে ভ্যালভেলিয়ে কী দেখচিস? হ্যাঁ রা, তুর কি হলো বল তো?

এ সময় ঢিলি কাকিকে দেখবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে। মেয়েমানুষটার কি গরম-টরম লাগে না? লু’ কে জব্দ করে কিভাবে। ছাতিতে দম আছে বলতে হবে। চোখ ডলে নিয়ে রঘু আপন মনে বলল, হা দেখো দাদু, ঢিলি কাকি বনের ভেতর কি করছে দেখো। ওর জানে কি ভয়-ডর নেই?

হাসল চুনারাম, ম্যায়াঝিটার মাথাটা গিয়েচে। টুকে গরম পড়লে ঘিলু গলে লাড়িয়া তেল হয়ে যায়। যাদের মাথার দোষ, তাদের এই সময়টাতে ঘরে এটকে রাখা দায়। লুলারামের বৌ-ভাগ্যটা পুকায় কাটা। এ আর ভালা হবার নয়।

 জ্ঞান পড়ার পর থেকে রঘুনাথ ঢিলিকে দেখছে টো-টো কোম্পানী হয়ে ঘুরে বেড়াতে। গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো সবাই জানে তার মাথার গণ্ডগোল। এ রোগ সহজে সারে না। কবিরাজ, ফকির, বৈদ্য, পীরবাবার থান, মনসাতলা, ঢিলবাঁধা, সুতো বাঁধা…সব বৃথা গেল, হত্যে দেওয়াও বিফলে গেল, ঢিলি কোনো কিছুতেই ভালো হল না, তার চঞ্চল চোখ, অসহিষ্ণু চোখের তারা সব সময় কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়। পাড়ার লোকে বলে লুলারামের চরিত্র দোষ, ভিকনাথের বউয়ের সঙ্গে তার নাকি লটখট চলছে। অনেকেই দেখেছে ওদের আড়ালে-আবডালে কথা বলতে। ঢিলির কানে গিয়েছে কথাগুলো। শোনার পর থেকে তেতে গিয়েছে মাথা। পাগল বলে সে তো দেখতে শুনতে মন্দ নয়। দেখে-শুনে লুলারাম তাকে বউ করে এনেছিল ঘরে। তখন চাঁদের সাথে, নালফুলের সঙ্গে তুলনা করত তার। দুই মেয়ের পরে সে এখন আকাশের ঘুরঘুট্টিয়া আঁধার। ঘরে থাকলেও লুলারাম তাকে পুছেও দেখে না, ক্ষেপি, বদমেজাজী বনবেড়াল ভেবে এড়িয়ে চলে। ঢিলি মরমে মরে, মনে মনে কাঁদে। ঝারির কথা সে দুর্গামণির কাছে ফলারের চিড়ের মতো চটকে দেয়, জানো তো দিদি, সে ঢেমনিটা তুমার ঠাকুরপোকে বশ করেচে। বেহায়া মরদটা তার আঁচলের চাবিগোছা হয়ে ঝুলচে। আমি কোথায় যাই বলদিনি। তাদের তো লাজ-লজ্জা নেই। এদিকে আমি যে লাজে মুখ দেখাতে পারচি নে।

–তুমি বেশি ভেবো না বুন। তুমার তো শরীল তত বিশেষ ভালো নেই।

কে বলল ভালো নেই? ঢিলি প্রতিবাদে মুখর হল, আমার শরীল দিব্যি ভালো আচে। শরীলের দোহাই দিয়ে তোমরা কেউ পার পাবা না। আমি কাউরে ছাড়বো না। সব্বাইকে টানতে-টানতে পাকুড়তলার বিচার সভায় নিয়ে যাব। ছাড়ব না। মার দিব্যি দিয়ে বলচি–কাউরে ছাড়ব না।

হাট ছাড়ি দিব, পরনের কাপড় ছাড়ি দিব তবু ভাতার ছাড়ব না। ঢিলি মুখের দুপাশে গাজরা ছড়িয়ে হাঁপায়। চোখের গুলি দুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসতে চায়, এক অসহনীয় জ্বালা তার বুকের ভেতরটাতে নারকেল কোরার মতো কুরতে থাকে। ঘরে আর মন বসে না ঢিলির, বাইরের উন্মুক্ত প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ঢিলি বাঁধের ধুলোয় উঠে আসে, দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে সে কার সঙ্গে কথা বলে, বিড়বিড় করে, কখনও কাঁদে, কখনও হাসে। কখনও বা জলের দিকে তাকিয়ে সে একনাগাড়ে ধারাভাষ্য দেয়, সারাদিনের ঘটনাগুলোকে সে হুড়মুড়িয়ে আউড়াতে থাকে, যেন এ পৃথিবীর সমাজ সংসারের সব কিছু তার মুখস্থ, স্বয়ং মা সরস্বতী তার কণ্ঠে যেন ভর করেছেন, এতকিছুর পরেও ঢিলির কোনো ক্লান্তি নেই, সে বুনোপাড়া ছাড়িয়ে অনায়াসে চলে যায় বাবুপাড়ায়, বাবুপাড়া ছাড়িয়ে চোখের নিমেষে পৌঁছে যায় অশোথ তলায়, সেখান থেকে বামুনপুকুর কিংবা মোকামপাড়ার বিলে। মন ভালো থাকলে সে উচ্চস্বরে গান গায়, হাসিতে বাতাস ফালাফালা করে নিজের অস্বস্তিকে ভাসিয়ে দেয়।

ঢিলিকাকিকে দেখে রঘুনাথের অবাক হওয়ার ঘোর বুঝি আর কাটে না, সে ভাবতে থাকে এত চড়া রোদে বউ-মানুষটা এখানে এল কী ভাবে? তাহলে পাড়াপড়শিরা যা বলে তা সব সত্যি। ঢিলিকাকি পাগলী, তার মাথার দোষ আছে, হরিনাথপুরের বুড়োমা তলায় মানত করেও সে আর ভালো হবে না। লুলারাম কাকা আবার আর একটা বিয়ে করবে, ঝারি বা তার চেয়ে সুন্দরী কাউকে। ঢিলিকাকির দু’ মেয়ে নূপুর আর নোলক চোখ ভাসিয়ে কাঁদবে, কাকার হাতে-পায়ে ধরেও তার মন গলাতে পারবে না। লোকে বলে লুলারাম কাকার নাকি পাথরের মন, মুনিরাম দাদুর ডাকাতের রক্ত তার শরীরেও বইছে। রক্তের দোষ যাবে কোথায়?

ঝোপঝাড় ঠেলে ভর দুপুরে এলোমেলো শরীরে ধুলো পথের উপর এগিয়ে এল ঢিলি। ঘাড় বেঁকিয়ে রঘুনাথ আর চুনারামকে এক ঝলক দেখে নিয়ে সে ক্ষিপ্রপায়ে এগিয়ে গেল ঘাটের দিকে। রঘুনাথ ভয় পাচ্ছিল, ঝোঁকের মাথায় ঢিলি কাকি আবার বামুনপুকুরে ঝাঁপ দেবে না তো? পাগলের মন বোঝা দায়, কখন কি করে আগাম বলা মুশকিল। ভয় আর উত্তেজনায় চোখের তারা কেঁপে উঠল রঘুনাথের, চুনারামের দিকে সে অসহায় চোখে তাকাল। চুনারাম তাকে ভরসা দিয়ে বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই রে। ও ম্যায়াঝি মরবে না। পুরো ঘর-সনসার জ্বালাবে, তারপর যদি কিছু হয় তো হবে।

 রঘুনাথ খুশি হল, কেমন থতমত খাওয়া চোখে তাকাল, তুমি অমন করে কেনে বলচো গো দাদু? কাকির উপর তুমার দেখচি কুনো মায়া দয়া নেই।

না, নেই। যেন হ্যাটাবাঘের গলায় গর্জে উঠল চুনারাম, ও আটকুড়ীর বেটি রাজোয়ার বংশের মুখে চুনকালি লেপবে, তুই জানিস নে দাদু, ওর জন্যি আমাদের কত দুর্নাম, লোকে টি-টি কার দেয়। সব কতা তো কানে আসে, শুনি। বুঝি না কেন যে ডুবে মরতে জল জোটে না ওর।

রঘুনাথ স্পষ্টত বুঝতে পারে ঢিলি কাকির উপর চুনারামের কেন গোখরো ক্ষরিস রাগ। বুনো পাড়ায় ঘর হলেও লুলারামের রমরমা অবস্থা, গেল সনের আউড়গাদাই বলে দেবে ক’ বস্তা ধান উঠেছিল জলজমি থেকে। এখনও বাড়িঘরে ধানের গন্ধ ম-ম করে। ঘর-বাড়ি সবখানে মা লক্ষ্মীর উপচে পড়ার ছাপ আছে। লুলারাম কাকারা বড়লোক, ওদের পয়সাকড়ি আছে–এ কথা ভেবে মনে মনে সুখ পায় রঘুনাথ। তবে সে জানে–পরের সোনা নিয়ে গর্ব করা ভালো নয়, কেন না ফি-কথায় দুর্গামণি বলে–পরের সোনা দিও না কানে, খুলে নেবে হ্যাঁচকা টানে।

উবু হয়ে ঢিলি দু-হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে বুনো জল-শ্যাওলা। পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনো লক্ষ্মণ তার আর নেই। বেশ বোঝা যায় পাগলামীর উগ্রতায় সর পড়েছে। ঢিলি আঁজলা ভরে জল খায় পশুর মতো। কাপড়-চোপড় এমন কী বুকের কাছটা তার ভিজে সপসপে দেখায়। চুনারাম হা করে দেখছে। শুধু চোখ নয়, মুহূর্তে কঠিন হয়ে ওঠে তার মেটে রঙের পুরু ঠোঁট দুটো, দেখলু, আমি বলছিলেম না ও ম্যায়াঝি মরবে নি। ও হল গিয়ে সাধের পাগল, সেয়ানা পাগল। সবার চোখে ধুল দিলেও আমার চক্ষে তা ছিটোতে পারবে নি। আরো বাব্বাঃ, বয়সে আমার মুচ পেকেছে, রসে পাকেনি রে! হুঁস করে খাস ভাসিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেল চুনারাম। ঘরের বউ না যাওয়া অবধি সে ঘাটে যাবে কি করে? খুড়শ্বশুর বলে কথা। ধর্ম মান ভাসিয়ে দিয়ে তো লোকালয়ে বাঁচা যাবে না। একটা মাঝারি মাপের পিটুলিগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে খুট থেকে ডিবা বের করে বিড়ি ধরাল। বিড়ির পেছনে লম্বা টান দিয়ে আয়েসী চোখে সে দূরের দিকে তাকাল। এখন আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি তবু রোদের কী তেজ দেখো। মনে মনে সে যেন নিজেকেই শোনাতে চাইল ভাবনাগুলো। গুয়ারামের উপর আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে সে কেমন ময়দা-লেচির মতো লতলতে হয়ে গেল স্নেহ-মায়ায়।

জল খেয়ে, মাথা ভিজিয়ে পাড়ে উঠে এল ঢিলি। রঘুনাথ লক্ষ্য করল ঢিলিকাকির পরনের কাপড় চোপড়ের কোনো ঠিক নেই। ঢিলাঢালা পোশাকটা কোনোমতে লজ্জা স্থানগুলোয় ঢাকা দেওয়া। জোরে বাতাস এলে তা পুরনো, হলদেটে পাতার মতো খসে গিয়ে মহালঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দিতে পারে। নপুর, নোলক বড়ো হয়েছে। ওরাও তো এদিকটা দেখভাল করতে পারে। নাকি লোকমুখে শুনে শুনে ওরাও হাল ছেড়ে দিয়েছে। মেয়ে দুটোর এই অমনোযোগী মনোভাব মন থেকে মেনে নিতে পারল না রঘুনাথ। কোথা থেকে কষ্ট এসে তার মনটাকে সাঁতিয়ে গেল। মনে মনে সে ভাবল ঘরে ফিরে গিয়ে সে নূপুর আর নোলকের দুয়ারে যাবে। ওদের বোঝাবে। ওরা যদি না বোঝে তা হলে লুলারাম কাকাকে দিয়ে ওদের গাল খাওয়াবে। সে যে ওদের থেকে বড়ো–এটা আজ সে প্রমাণ করে ছাড়বে।

বামুনপুকুরে চ্যাটপেটে কাদা নেই, বেশির ভাগই বালি, ফলে ঘাটের কাদা পায়ে জড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগই থাকে না। এ তল্লাটের সব চাইতে বড়ো পুকুর বামুনপুকুর। বর্ষাকালে এই পুকুর যেন মোকামপাড়ার বিলটাকে শরীর ফুলিয়ে হুঁশিয়ার করে দেয়, গর্বে গালভরিয়ে বলে, দেখো, বিলকুমারী আমি তুমার চাইতে কোনো অংশে কম নই। তুমার শরীল পেচিয়ে শুধু ভ্যাদা লতা, জলা-শ্যাওলা। আর আমাকে দেখো-কেমুন লাল শাপলা আর সাদা শাপলায় সেজেচি দেখো। আমার জলো-লতার ফুলগুলো নাকছাবি, মন হলে আমি পাল্টে পাল্টে পরি। সাজতে যে আমার বড়ো ভালো লাগে। তুমি বিলকুমারী হলে আমি হলাম জলকুমারী, রাজকুমারী।

চোখ ভরে দেখার মতো পুকুর বটে বামুনপুকুর। চারধারের পাড় বাঁধানো জল বুড়ো-মা মেলায় বেচতে আসা কাচ বাঁধানো ফ্রেমের মত, একবার দেখলে চোখ ফেরান যায় না, বট আঠায় লটকে যাওয়া বনিপাখির মতো লটপটায়। ভালো লাগার রেণুগুলো মথের গায়ে জড়িয়ে থাকা রেশমী ধুলোর মতো মনের আনাচে কানাচে ভেসে বেড়ায়, মনটাকে চোখের পলকে বানিয়ে দেয় ফুলের বাগান। এই মুগ্ধতাকে দু’হাতে ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে উড়িয়ে দেয় ঢিলি, রঘুনাথের মুখোমুখি এসে সে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, রঘু না? এখানে মরতে কী করতে এয়েচিস? যা ঘর যা। চড়া রোদে তুর মাথার চুল উঠে চাঁদ পড়ে যাবে। তখন ব্যা-থা হবে না, মেয়েঘরের বাপ বলবে ছেলে তুমাদের টাকলা। কথা শেষ হল না হাসি সংগতের মতো বেজে উঠল দুই ঠোঁটে। অবাক হয়ে তা দেখতে থাকল রঘুনাথ। ঢিলি কাকির বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছে তবু এই বয়সে তার চেহারাটা বামুনপুকুরের চেয়েও ভরাট। তার শরীরে ঢেউ ওঠে সর্বদা, চঞ্চল চোখের মণি দুটোয় ক্ষ্যাপাটে এক দৃষ্টি বুনো বাতাসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভালো লাগার ডালপালা ছড়িয়ে ঢিলিকাকি যেন বলে–আমাকে দেখ। আমি গাঁয়ের বউ তবু শহরের কারোর চাইতে কম নয়। বুনো ঘরের বউ বলে নয় ঢিলি বরাবরই সুন্দর! রঘুর মনে হল সব পাগলই সুন্দর, ওদের মনের স্বচ্ছতা সুন্দর করে তোলে বাঁধনহীন, তোয়াক্কাহীন মনটাকে।

 ঢিলি কাকির কথায় রঘুনাথ তাই অবাক না হয়ে পারে না, কি বলছ গো কাকি? আমার আর কত বয়স, আমাকে কেনে বিয়ে সাদীর কথা বলছো?

-তোকে বলব না তো কি গাছকে বলব? ঢিলি বিড়বিড়িয়ে উঠল, যা বাপ কথা না বাড়িয়ে গা ধুয়ে আয়। এক সাথে ঘর ফিরব।

আমার ফিরতে দেরি হবে। রঘুনাথ ঢিলির চরকাটা চোখের দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলল, তুমি যাও গো। আমি নাল ফুলের ডাঁটি তুলব। মা বলেছে–ঘরে শাকপাতা নেই। আজ নালফুলের ডাঁটি চচ্চড়ি হবে।

–অঃ। তুর মায়ের যেমন বুদ্ধি। নালফুলের ডাঁটায় কি আচে রে, কিছু নেই। শুধু ভুসভুসিয়া জল। টুকে আঁচ লাগলে জল কাটে, লোহার কড়াই হয়ে যায় বুড়িগাঙ। ঢিলি রহস্যভরা চোখে হাসল, তুর মা বাপু সুবিধের মেয়েমানুষ নয়। ওর মনে ভারি গর্ব। আমার ছিমুতে হাত পাততে শরমায়। আরে বাবা, আমার কাছে লাজে রাঙা হওয়ার কি আছে, আমি কি পর নাকি?

-মা বরাবরই ওইরকম। শুকোবে, শুকিয়ে সুপুরি হয়ে যাবে তবু হাত পাতবে না। রঘুনাথের গলায় দৃঢ়তা ফুটে উঠল।

পানসে হেসে ঢিলি বলল, তুর মা’র মতো তুর বাবার মাথাতে গোবর পুরা। ড্যাং-ড্যাং করে জন-ঘাটতে ভিন দেশে চলে গেল। গিয়ে কি লাভ হল, কিছু না! চারদিকে এখন খরা চলছে। তুই দেখে নিস এবছর ঠিক আকাল হবে। ঢিলি বেশ গুছিয়ে কথাগুলো বলে তৃপ্তি পেল। এরকম ভালো ভালো কথা সে প্রায়ই বলে থাকে। যখন সে এসব বিবেচনার কথা বলে তখন তাকে পাগলি বলে মনেই হয় না। এই জন্যই বুঝি চুনারাম তাকে সেয়ানা পাগলা বলে আখ্যা দিল। চুনারামের কথার সঙ্গে রঘুনাথ একমত নয়। তার নজরে ঢিলি কাকির আলাদা সম্মান আছে। ওরা শুধু বড়োলোক বলে নয়, বড়ো মন আছে ওদের। বুনোপাড়ায় একমাত্র ঢিলিকাকিদের মাটির দোতলা ঘর, ঘরের মাথায় সোনাখড়ের টাইট চাল। সেই চালের মাঝখানে বিশেষ কায়দায় লাগানো আছে মুখোমুখি দুটো টিনের ময়ুর, মিস্ত্রি যত্ন নিয়ে বানিয়েছে। হাওয়া দিলে সেই পাতলা টিনের ময়ূর ঝনঝনিয়ে কেঁপে যায়, ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে ওরা যেন উড়তে চাইছে খোলা আকাশে। ওরা টিনের নয়, যেন সত্যিকারের ময়ুর।

.

০২.

বয়সকালে খারাপ দেখতে ছিল না ঢিলিকাকি, রাতে ফোটা পদ্মফুলের মতো চনমনে ছিল তার মেজাজখানা। লুলারাম খুড়া তার রূপে মোহিত হয়ে ঘুরঘুর করত তার চারধারে। তার তখন কাজে কম্মে মন ছিল না। ঢিলিই ঠেলে-ঠেলে পাঠাত কাজের জন্য। অভিমানে মুখ ফোলাত, ঘরে বসে কি সুখ পাও জানি না গো…। তুমার জন্যি লোকে আমাকে দশ কথা শোনায়। নিন্দে করে।

-কি কথা আমি কি শুনতে পারি?

–শুনে হজম করতে পারবা তো? সব খাবার সবার পেটে হজমায় না।

–বলে তো দেখো। লুলারাম কাকার কণ্ঠস্বরে জেদ।

হাসতে হাসতে ঢিলির কাঁচা হলুদ শরীরে ঢেউ উঠত, সব্বাই বলে–আমি তুমারে নাকি জাদু করেছি। আমার নজরে নাকি আটা আচে। আমার শরীরটা নাকি শ্যাওড়াগাছের চেয়েও ভয়ের। বলদিনি, এসব শুনে কার মন ভালো থাকে?

-কে বলেছে এসব কথা, বলো। আমি তার জিভ উপড়ে নেব। লুলারাম হাঁপাতে থাকে। তার বুকের ভেতর পাঁচ-ঘোড়ার ইঞ্জিন চলে, এ গাঁয়ের কাউকে না হলে আমার চলে যাবে কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমার এক পল চলবে না। আমি পাগল হয়ে যাবেখন।

-কেন? দিঘল চোখে আঠা বেছায় ঢিলি।

-সত্যি কথা বলব? শুনে তুমার হাসি পাবে। ভেজা বেড়ালের মতো চোখে ঢিলির দিকে তাকাল লুলারাম, আগে বুঝিনি-এখন বুঝেচি গো, বউ হল মায়ের চেয়েও বড়। বউকে সুখে রাখলে আমার দশদিক সুখে থাকবে।

–এ কথা তুমি মন থিকে বলতে পারলে? তুমার জিভ উল্টালো না? ঢিলির নিরীহ শান্ত চোখ থেকে আগুন ঠিকরে বেরল, খবরদার তুমি আমারে ছোঁবে না। শরীলের নেশায় তুমি পাগল হয়ে গিয়েচ। তুমি আমাকে ভালোবাসো না, শুধু আমার এই নাদুসনুদুস গতরটাকে ভালোবাসো। যতদিন আমার রূপ যৌবন থাকবে ততদিন তোমার ভালোবাসা টাটকা থাকবে। রূপ ফুরোলে তুমিও ফুড়ুত করে উড়ে যাবে।

–মিচে কথা। লুলারাম চোখের নিমেষে তার খড়খড়ে হাতটা চেপে ধরে ঢিলির বাসনা তেল চুবানো মাথায়, মা’র দিব্যি, শুতে-বসতে আমি তুমার মুখ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাই নে। আমি যা বলেছি তা সত্যি গো! কেন বলেচি-জানো? মা’র জন্য আমার কুনোদিন মন খারাপ করে না। এমনকী মা’র কথা আমার একদম মনে পড়ে না। তুমার সঙ্গে আমার একহপ্তাও হয়নি, অথচ তুমার জন্যি আমার বুক টাটায়। আমার চোখে নিদ আসে না।

.

এই অনুগত লুলারাম এখন লোহার মোটা শিক, বাঁকানো যায় না। রাত-বেরাতে সে ঢিলিকে বিছানায় ফেলে বাহ্যি করার নাম করে ঝারির ঘরে ঢুকে যায়। ভিকনাথের খাটা গতর মড়ার মতো ঘুমোয়। তেল-টিনের দরজায় টোকা পড়লেই ঝারি এলোমেলো শাড়িতেই বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। দরজায় শেকল তুলে সে আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে চলে আসে জগৎখালির বাঁধ-ধারে। শরীরের দাবি মিটিয়ে ভোর রাতে সে ফিরে যায় নিজের ঘরে। ওরা ভাবে–এসব কেউ টের পায় না। অথচ হাওয়া-জল-গাছ সব জানে। মরা চাঁদে জানে, তারা জানে। ঝারি ভয়ে ভয়ে বলে, পেট বেঁধে গেলে কি করব গো? তখুন ডুবে মরতেও যে জলা জুটবে না।

-ভয় কি, প্রভা বুড়ির শেকড়বাটা খাইয়ে দেব। পচা লাউজালির মতো কখন পেট খসে যাবে, ভিকনাথ তো ছেলেমানুষ, ওর বাপও টের পাবে না। লুলারামের কণ্ঠস্বরে অশ্বত্থের ছায়া ঢলে পড়ে, তুমি চিন্তা করো না তো! আমি তো আছি, আমি তো মরে যাইনি। আমার যা জমিজমা আছে তুমি বসে খেয়েও শেষ করতে পারবে না।

ঝারির কাজলটানা চোখে স্বপ্ন ঝিলিক দিয়ে ওঠে, সত্যি বলছো, আমাকে ছুঁয়ে বলো।

লুলারাম তাকে ছোঁয়, শুধু ছোঁয়া নয়–বুকের যাঁতায় পিষতে থাকে বুক, ঝারির শরীর কাদামাছের মতো মোড়া মারে উত্তেজনায়, কথা জড়িয়ে যায়, উঃ, আমি মরে যাবো গো, আর পারচি নে! ছাড়ো, ছাড়ো! আলো ফুটচে চারধারে। ভিকনাথ জেনে গেলে আমারে গলা দাবিয়ে মেরে দেবে। ইবার আমাকে যেতে দাও।

–ও শালাকে আমি ছাড়ব ভাবছো? ওর মরণ আমার হাতে। বেশি তেড়িবেড়ি করলে গলায় হেঁসুয়া চালিয়ে দেব। লুলারামের লুললুলে শরীর পাকানো দড়ির মতো শক্ত হয়ে উঠল, কঠিন চোয়াল নড়ে উঠল, তুমারে রাজরানী করে রাখব। আগে পাগলীটার গতি করি, তারপর

-যা করার তাড়াতাড়ি করো। আমার তর সয় না। ফি-রাতে পেলিয়ে আসতে মন করে না। খালি ভাবি–আমি কি রাতচরা গোরু?

গোরু কেনে হবে গো, তুমি আমার হরিণী! আহা কী রূপ, কী রূপ! লুলারামের পিছল জিভ চুকচুক শব্দ করে ওঠে শঙ্খ লাগা সাপের মতো।

এসব ভাবলে তার মনটা চৈত্রের রোদে ফাটা জমির মতো ফেটে চৌচির, আর সেই ফাটলের মধ্যে লুকিয়ে-ছাপিয়ে বসে থাকে রাগের ফণাধারী সাপ, তার শুধু ফোঁসফোঁসানী, ওই দুটা তিলে খচ্চর মানুষকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য মনটা শীতকাতর কুকুরছানার মতো যন্ত্রণায় কুঁইকুঁই করে। সব খবর ঢিলির কানে আছে, মনে আছে। লোক ভাবে সে পাগল। হ্যাঁ পাগল। লুলারামই তাকে পাগল করে ছেড়েছে। শুধু খেতে-পরতে পেলে কি একটা বৌয়ের সব পাওয়া হয়ে যায়, আর কিছু কি দরকার হয় না জীবনভর। লুলারামের ভালোবাসাটা এখন খরায় ঝলসে খড়খড়ে ঘাস; প্রাণ নেই, টান নেই-যা আছে শুধু অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের ধুলো ওড়া। এর শাস্তি ওকে পেতে হবে। মাথায় খাঁ খাঁ রোদ নিয়ে ঢিলি শক্ত হয়ে দাঁড়াল, নিজের অজান্তে হাতের মুঠি শক্ত হয়ে এল তার, মাথাটা চোখের নিমেষে বুমবুমিয়ে উঠল, নাক ছাপিয়ে নেমে এল গাঢ় নিঃশ্বাস। এমন অস্বস্তিবোধ হলে সে বুঝতে পারে মাথার অসুখটা বাড়ছে, এবার সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে, নিজেকে আর ধরে রাখার কোনো ক্ষমতা থাকবে না ওর। ঢিলি কী ভেবে আবার পুকুরঘাটের দিকে দৌড়ে গেল, এবার আর ধীর পায়ে নামল না, ডাঙা থেকে ব্যাঙের মতো ঝাঁপ দিল পুকুরে। তার ছিপছিপে সুন্দর শরীরটা মৃগেল মাছের মতো ঢুকে যেতে লাগল জলের গভীরে। প্রায় মিনিট খানেক পরে কালবাউস মাছের মতো চুলভর্তি মাথা ঠেলে জলের উপরভাগে উঠে দু-হাত থাবড়াতে লাগল ঢেউওঠা জলের উপর। পাড়ে যে দু-জন পুরুষমানুষ দাঁড়িয়ে আছে তখন তার সে খেয়াল নেই। প্রায় একরকম ভয় পেয়ে রঘুনাথ চিৎকার করে উঠল, ও কাকি, উঠে আসো গো… উঠে আসো। আমার বড্ড ভয় করছে।

 কথাটা কানে গিয়েছিল ঢিলির, ভয় কি রে বেটা, ভয় কি? জল আমার সই রে, আগুন আমার মিতে। তুর কুনো ভয় নেই বেটা, আমাকে কেউ মারতে পারবে না। আমি হলাম মা বুড়োমার বেটি। মা চণ্ডীর বেটি। আমার ক্ষতি করবে কিনা ওই ভিকনাথের বউটা! ছ্যাঃ!

জল দাপিয়ে পাড়ে উঠে এল ঢিলি, ওর চুল বেয়ে জল নামছে খড়ের চাল বেয়ে জল নামার মতো, পুরো মুখখানার মলিনতা ধুয়ে গিয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে বর্ষার কদমফুলের মতো। অনেক দূরে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিল চুনারাম, সে আর থাকতে না পেরে সামনে এগিয়ে এসে মুখ নিচু করে দাঁড়াল। মনে মনে ভাবল খুড়শ্বশুরকে দেখে ঢিলি নিশ্চয়ই লাজ পাবে, শরমে চোখের আড়ালে চলে যাবে। চুনারাম যা ভেবেছিল তাই হল। ঢিলির সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল উভয়ে। লজ্জায় গুটিয়ে গেল ঢিলি, লম্বা হাতের চাপাকলি আঙুল দিয়ে সে ঘোমটা দিল সযত্নে। ঠাণ্ডা জলে তার মাথাটা বুঝি ঠাণ্ডা হয়েছে, সে আর আশেপাশে না তাকিয়ে বিড়বিড় করতে করতে সোজা চলে গেল বাঁধের দিকে। বুক থেকে পাথর নেমে যাওয়ার সুখ অনুভব করল রঘুনাথ, পরমুহূর্তে ঢিলিকাকির জন্য তার কষ্ট হল, বুকের ভেতর গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল, পুরো মুখটা নিমেষে বিষাদছায়ায় ভরে উঠল। চুনারাম বিড়ি ধরিয়ে এবার একটা বিড়ি রঘুনাথের দিকে এগিয়ে দিল, নে ধরা। বাপের ছিমুতে খাস আর আমার ছিমুতে খাবি নে তা কি হতে পারে?

ভালো না লাগলেও হাত বাড়িয়ে দিল রঘুনাথ, দাও। মাথাটা ধরে আছে। ধোঁয়ায় যদি চিন্তার ধোঁয়া ওড়ে।

-তুর এত চিন্তা কিসের? গলায় ধোঁয়া আটকে চুনারাম খুকখুক করে কাশল, আজ দিনটার দফারফা সেরে দিয়ে গেল লুলার বউটা। কুন কুক্ষণে যে ওর সাথে দেখা হল হে ভগবান। দেখা না হলে কখুন আমরা ঘর ধরে যেতাম।

আয়েশ করে বিড়ি টেনে রঘু পুকুরের দিকে তাকাল, দাদু গো, এবার আমি তাহলে কইফুল তোলা শুরু করি।

-হ্যাঁ হ্যাঁ, তা আর বলতে। চুলরাম পুকুরের চারধারে, এমনকী স্থির হয়ে থাকা দৈত্যের মতো জলটাকে নিবিড় চোখে দেখল, যা দাদু। ঝেঁপিয়ে পড়। আর দেরি করা উচিত হবে না। বেলা তো টিকলিতে উঠে গিয়েচে। আমাদের ফিরতে দেরি দেখে তুর মা নিশ্চয় খুব ভাবচে।

-তা ভাববে বইকি। জলের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথের চোখ ছোট হয়ে এল, মনের ভেতর ভয় হামাগুড়ি দিলেও বাইরে সে তা ভুল করেও বুঝতে দিল না, পায়ে পায়ে পুকুরয়াড়ির মুড়োয় গিয়ে দাঁড়াল সে। চুনারাম বিড়ির শেষটুকু ফেলে দিল জলে, তার চোখের তারায় সামান্য হলেও ভয়ের কাঁপুনী ছড়িয়ে পড়ল, বেশি দূর যাবি নে, যা তোলার ধারে-ধারে তুলে চটপট উঠে পড়বি। পুরনা পুকুর আর ছোকরা বাঘের গোঁ বোঝা দায়।

এই বয়সে সাঁতার কাটায় রঘুনাথ হয়ে উঠেছে ওস্তাদ। এ গাঁয়ের কোনো ছেলে ছোকরা তার সাথে ডুবসাঁতার-চিৎসাঁতারে পারে না। ভরা বর্ষায় রঘুনাথ গাঙ পেরিয়ে চলে যায় ভিন পাড়ে, তার হাঁপু ধরা তো দূরে থাক, সামান্য বড়ো করেও শ্বাস ছাড়ে না। লুলারাম তার সাঁতারের বহর দেখে বলেছিল, রাজোয়ার বংশের মান রাখবি তুই। তুর যদি মন চায়, আমার বিদ্যেটাও শিখতে পারিস। তোর মতোন চ্যালা পেলে আমি শরীল নিংড়ে দু-হাত উজাড় করে সব দিয়ে যাব। কি রে নিবি? লুলাখুড়ার কথা শুনে হাঁ-হয়ে গিয়েছিল রঘুনাথ। চট করে তার মুখে কোনো ভাষা আসে নি। সেদিন প্রস্তাবটা শুনে ভয়ে তার গলা জড়িয়ে গিয়েছিল। লুলারাম এ তল্লাটের নাম করা ডাকাত। এ বিদ্যায় তার বুদ্ধি প্রখর। নিজের গাঁয়ে কিংবা তার আশেপাশে সে কোনো কাণ্ড করে না। কিন্তু ভিন গাঁয়ে তার দাপট নোনা অঞ্চলের বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর। গ্রামের প্রায় মানুষ এ সংবাদ জানলেও ভয়ে কেউ মুখের উপর কিছু বলে না। তবে মাঝে মাঝে থানার জিপ আসে কালীগঞ্জ থানা থেকে। ওরা বেশির ভাগ আসে মাঝ রাতে। পাকুড়তলায় জিপ দাঁড় করিয়ে ওরা হেঁটে আসে লুলারামের দোতলা ঘর অবধি। পাড়ার কুকুরগুলো তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে, চিল্লিয়ে–চিল্লিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় গেরস্থের। ঘুম চোখে রঘুনাথ অনেকদিন শুনেছে খিস্তি-খেউড়। চোখ ডলে নিয়ে লুলারাম কাকা হাতজোড় করে দাঁড়িয়েছে থানার মেজবাবুর সামনে, আজ্ঞে বাবু, ছি-চরণের ধুলো যখন পড়েছে তখন টুকে ভেতরে আসুন। কিচু না হোক এক গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে যান।

মেজবাবুর চোখ আগুন উগরায় আঁধারে, মারব এক লাথ, মেরে সার গাদায় ফেলে দেব। হারামীর বাচ্চা, থানার হাজিরা কি তোর বাপ দিতে যাবে? যদি শুনি ফের বিলা করেছিস-তোর চ্যাং মাছ কেটে তোকেই ভেজে খাইয়ে দেব। আমাদের সব সময় তোর উপর নজর আছে। চরকুঠিয়া-হাটাগাছার কেসটার এখনও ডিসিশন হয়নি। যদি প্রমাণ হয় ডাকাতিতে তুই ছিলিস তা হলে পেঁদিয়ে তোর পেছনের হাড়-মাংস আলাদা করে দেব।

মেজবাবুর ধমকানীতে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপে ঢিলি। থানার মেনিমুখো মানুষগুলো কি যে বলে তার মগজে তিলমাত্র ঢোকে না। তবে লুলারাম লতপতে চোখে তাকায়, তার দৃষ্টিতে ভয় তো নেই উল্টে বদলা নেবার বাসনা। রঘুনাথ ঘুমশরীরে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে সব শোনে, শোনামাত্র ভয়ে গা-হাত-পা কাঠ হয়ে যায়, দুর্গামণি ভয়ে ফিসফিসায়, আতঙ্কে কালো হয়ে যায় তার মুখ, এ ব্যাটা, ঘর চ। কার ঢিল কার গায়ে লাগবে ঠাকুর জানে। ছিঃ ছিঃ, ঠাকুরপোর চরিত্র আর শুধরালো না! এ সব দেখাও পাপ, শোনাও পাপ। চ, ব্যাটা ঘর চ।

লুলারাম খুড়ার কথাগুলো এখনও মনের ভেতর ঘাই দেয়। সৎ-পথে তার মাটির দোতলা ঘরখানা ওঠে নি। এই ঠাঁটবাট, চলা ফেরা এসবের জন্য টাকা-পয়সা দরকার। এ সব খরচা আসে কোথা থেকে? চুনারাম পেছনের চামড়ার খড়ি উসকে বলে, উৎপাতের ধন চিৎপাতে যাবে, তুই দেখে নিস দাদু। চাঁদ-সূয্যি এখনও আলো দেয় রে, তুই দেখে নিস দাদু, ওদের ভালো হবেনি। যারা পরের ধনে পোদ্দারী করে তাদের সেই ধন খসে যায়।

নাল ফুলের ডাঁটায় বাঁ-হাতের বেড় ভরে গিয়েছে রঘুনাথের। জলজ ডাঁটাগুলো থেকে অদ্ভুত একটা সুঘ্রাণ আসছে, টাটকা ফুলগুলোও কম যায় না, সুগন্ধ গায়ে মেখে ওরা সব যেন জলকুমারী। রঘুনাথ ওদের নরম শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে, আদর করে। মন ভরে যায়। এতক্ষণ জলে থাকার মেহনতটা সুদে আসলে উঠে যায়। ডাঙার কাছে সাঁতরে গিয়ে সে চুনারামকে ডাকে, দাদু, ধরো। জলে ভেসে গেলে আর আমি জড়ো করতে পারব না। হেঁপসে গিয়েচি।

হাঁটুজলে নেমে নালফুলের ডাঁটিগুলো যত্ন নিয়ে ডাঙায় ছুঁড়ে দিচ্ছিল চুনারাম। বার বার জল থেকে ডাঙায় ওঠা সময় সাপেক্ষ কাজ, সময় বাঁচাতে চুনারামের বুদ্ধিটা মনে মনে তারিফ করল রঘুনাথ। মনে মনে সে ভাবল আজ ঘরে ফিরলে দুর্গামণির আঁধার মুখে আলো ঝরে পড়বে। অনেক দিন পরে মায়ের খুশি মুখটা দেখতে পাবে সে। গুয়ারাম খাটতে যাবার পর থেকে কেমন মেঘলা হয়ে আছে দুর্গামণির মনটা। রঘুনাথ আড়চোখে দেখেছে। তারও মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। অভাবই এই মন খারাপের জন্য দায়ী–একথা বুঝতে আর বাকি নেই রঘুনাথের। আর একটু বড়ো হয়ে অভাবের টুঁটিটা সে টিপে ধরবে। লুলারাম কাকার কথাগুলো সে আজও মন থেকে মুছে ফেলতে পারে নি। কথাটায় দম আছে; মদের মতো নেশা হয় শুনলে। পরের ধন চুরিয়ে যারা বাঁচে তারাও তো মানুষ। তাদের কেউ ডরে, কেউ ঘেন্না করে। তবে তারা বেশ ঠাটবাট নিয়ে থাকে। তাদের কাছে নিজ-হাত জগন্নাথ। কোনো কাজই তো পাপের নয়। বিধান যদি এই হয় তাহলে পাপের কোনো প্রশ্ন ওঠে না। রঘুনাথ অন্যমনস্ক হয়ে গেল ভাবতে-ভাবতে। জলে গা-ভাসাতে আর ভালো লাগল না তার। উড়ুলমাছের চেয়েও জোর-গতিতে সাঁতার কেটে সে ডাঙার কাছাকাছি এল। চুনারামকে বলল, তুমি ডাঙায় ওঠো, আমি একদিকটা সামলে নিচ্ছি।

-পারবি রে দাদু?

-না পারার কি হল? রঘুনাথের গলায় ছোকরা হয়ে ওঠার জেদ ঝরে পড়ল। নাল ফুল আর ডাঁটাগুলোকে নিয়ে সে জল সাপড়ে ডাঙায় উঠে এল। ডাঙায় উঠে বাঘ দেখার মতো চমকে উঠল সে, বুকের মধ্যে চলতে থাকল আটাচাকির মেসিন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীলাক্ষবাবু কোঁচা সামলে সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন। ভরদুপুরে এদের পুকুরয়াড়িতে দেখতে পাবেন আশা করেন নি; তিনি অবাক হলেন, কি ব্যাপার, তোমারা এখানে কী করছ?

 চুনারাম ভেজা হাত পরনের খাটো ধুতিতে মুছে নিয়ে হাসল, এই যে বাবু, নালফুল তুলছিলাম। পেটের ধান্দায় কুথায় না যেতে হয় গো!

-তা বলে যাওয়ার আর জায়গা পেলে না? শেষ পর্যন্ত আমার এই পুকুরটাই তোমাদের নজরে পড়ল? বলিহারি দিই তোমাদের চোখকে। নীলাক্ষবাবুর গলা চুঁইয়ে ঘৃণা আর বিস্ময় পাশাপাশি ঝরে পড়ল, তিনি এক দৃষ্টিতে নালফুলগুলোর দিকে তাকালেন, এগুলো তুললে যে, অনুমতি নিয়েছ?

 অসহায় ঘাড় নাড়ল চুনারাম, জলের মুফুতে জিনিস, কত লোকে তো নেয় বাবু, আমি না হয় দুটো ডাঁটা না বলে তুলে নিয়েছি।

কেন নিলে? আমার জলের ফসল আমার, মানো তো কথাটা? রাগে লাল দেখাচ্ছে নীলাক্ষবাবুর চোখ দুটো। সেই অগ্নিবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ ম্যাদামারা হয়ে গেল চুনারামের, তার ভাবখানা এমন, সে যেন টানাজাল ফেলে সব মাছ ধরে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এখন ধরা পড়ে যাওয়াতে কাঁচুমাচু মুখ। তাকে দেখে হুঁকরে উঠলেন নীলাক্ষবাবু, জান, আমি তোমাকে থানায় ঢুকিয়ে বেধড়ক মার খাওয়াতে পারি।

-জানি, সে ক্ষেমতা আপনার আচে, বাবু! আপোসের পথে হাঁটতে চাইল চুনারাম, এবারকার মতো ছেড়ে দিন গো, বেলা বাড়চে ঘর যাই। তাছাড়া ভোখও লেগেচে জব্বর। পেটের ভেতর খিদে ভাবটা কুকুরের নখ হয়ে আঁচড় কাটচে।

অনেকক্ষণ পরে নীলাক্ষবাবুর নজর রঘুনাথের উপর পড়ল, তোমার সাথে এটা কে?

–আজ্ঞে, গুয়ারামের ব্যাটা।

-ওঃ। তা এখন থেকে ওকে হাত ধরে সব শেখাচ্চো বুঝি? নীলাক্ষবাবু ঠোঁট বেঁকাল, রক্তের দোষ আর যাবে কোথায়? কালকেউটের ছা তো কালকেউটেই হয়। কেউ হেলে সাপ হলে ওরা তাকে মেরে ফেলে।

–দুটো ডাঁটার জন্যি এত কতা বলা কি নেয্য হয়, বাবু? চুনারামের কথায় হোঁচট খেলেন নীলাক্ষবাবু। তিনি আগের মতো উত্তেজিত হলেন না, শুধু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, তোমাদের সাহস দেখে আমার খুব অবাক লাগছে। দিনে দিনে আর কত কী যে দেখতে হবে।

দেখার তো সবে শুরু। মুখ ফসকে রঘুনাথের গলা ঠেলে বেরিয়ে এল কথাগুলো। নীলাক্ষবাবু অবাক চোখে তাকালেন, তুমি চুপ করো হে ছোকরা? সেদিনের ছেলে, নাক টিপলে দুধ বেরয়, তার আবার বড়ো বড়ো কথা।

 এখন তো ছোট মুখে বড়ো কথা শোনা যায়। রঘু কথাগুলো বলেই মাঝ পুকুরের দিকে তাকাল, নালফুলগুলো আমরা না নিলে ও গুলান পচে যেত। জল নষ্ট হোত ওতে। বদঘেরাণ ছাড়ত, সেটা কি ভালো হোত?

 ভালো-মন্দ যা বোঝার আমি বুঝব, তুমি আগ বাড়িয়ে কথা বলার কে? নীলাক্ষবাবুর চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। রাগে ফুঁসছিলেন তিনি। ছেলেটার স্পর্ধা দেখে তিনি বিস্মিত। ছোটলোকদের এই বাড় কোনোমতে সহ্য করা যাবে না, ফলে গায়ে গরম তেল ছিটিয়ে পড়ার যন্ত্রণা শুরু হল নীলাক্ষবাবুর, তোমার বাবার নাম কি আমি জানতে পারি?

-শ্রীগুয়ারাম রাজোয়ার! রঘুনাথ ঘাবড়াল না।

 নীলাক্ষবাবু দাঁত দিয়ে দাঁত ঘষলেন, হালকা হলেও সেই ঘর্ষণের শব্দটা তার কানে বোলতার ভোঁ-ভোঁ আওয়াজের মতো বিশ্রী শোনাল, দরকার হলে আমি আজই থানায় যাব। আজ পুকুরে নালফুল তুলছে, কাল সুযোগ পেলে মাছ ধরবে। এটা কি মামার বাড়ি? যা খুশি তাই করবে। থানার বড়বাবু আমার চেনা-জানা। দেখি শেষ পর্যন্ত কী করা যায়। নীলাক্ষবাবু উবু হয়ে ডাঁটাগুলো খামচে ধরলেন, তারপর সক্রোধে ছুঁড়ে দিতে চাইলেন জলের দিকে। চুনারাম কালবিলম্ব না করে বাবুর পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল, এ কাজ করবে নি বাবু, বড়ো আশার জিনিস। ঘরে কুনো বাজার নেই। এগুলান নিয়ে গেলে চচ্চড়ি হবে। কত আশা করে নাতিটা পুকুর থিকে তুলেছে।

-ঠিক আছে, আজকের মতো নাও। পরে যদি দেখি ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। নীলাক্ষবাবু গা থেকে ক্রোধ ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। যাওয়ার সময় তিনি কড়া চোখে রঘুনাথের দিকে। কটমট করে তাকালেন, শোন ছোকরা, তোমার সাথে আমার আবার দেখা হবে। আজকের দিনটার কথা মনে রেখো, তাতে দু’পক্ষের মঙ্গল। রঘুনাথ গুরুত্ব দিল না নীলাক্ষবাবুর কথাকে, অবজ্ঞায় শক্ত হয়ে উঠল তার ঠোঁট, আমিও চাইচি-চটজলদি আবার দেখা হোক। যত দেখা হবে তত সম্পর্ক আরও ভালো হবে।

ওরা দু-জন দুদিকে ছিটকে গেল।

ফেরার পথে চুনারামের মুখে কোনো শব্দ নেই। খাঁ-খাঁ রোদের ভেতর সে একমনে হাঁটছিল। রঘুনাথ তাকে তাতানোর জন্য বলল, কি গো দাদু, ভয়ে কি দম এটকে গেল নাকি?

পায়ের গিঁট ফুটিয়ে চুনারাম ভয়ার্ত চোকে তাকাল, বাবু লোক ভালো নয়, হারামীর হদ্দ। আশেপাশের গাঁ-গুলাকে জ্বালিয়ে মারচে। ভয় তো হবেই। খরিস সাপের লেজে পা দেওয়া তো মুখের কথা নয়।

-মিচিমিচি ভয় পেওনি তো? রঘুনাথ দম নিল, এই তো দেখলে লাঙল যার জমি তার নিয়ে কত লড়াই হয়ে গেল। কারা জিতল? সে তো তুমি নিজের চোখে দেখলে! ফলে বাবুদের অতো ফটফটানী থাকবে না। তবে সময়ের সাথে ওরা যদি না বদলায় তাহলে পরে মুখ থুবড়ে পড়বে।

-তুই এসব কতা শিখলি কুথা থেকে?

–কেসনগর থিকে মাস্টুর আসে, সে আমাদের আখ খেতে কেলাস নেয়।

–আগে বলিস নি তো?

–মাস্টুর মানা করেছে।

-মাস্টুর আর কী কী বলেচে? আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ল চুনারাম। তার ভয়-ভয় করলেও সে কথাগুলো শুনতে চায়।

রঘুনাথ উৎসাহিত হয়ে হাতের মুঠি পাকাল, তারপর গলার রগ ফুলিয়ে ডান হাত মুঠো করে ছুঁড়ে দিল শূন্যে, লড়াই-লড়াই লড়াই চাই। লড়াই করে বাঁচতে চাই। বুঝলে দাদু, লড়াই ছাড়া এদেশে কিছু হবার নাই। কুশলবাবু বলেচে-সে আসছে রোববার আসবে। এবার গাঙধারে মিটিং হবে। হলদেপোঁতা ধাওড়া থেকে শুরু করে বসন্তপুর ধাওড়া থিকেও লোক আসবে। ইবারের মিটিংটায় খাস জমি দখল নিয়ে কথা হবে।

-খাস জমি যে দখল নিবি–জমিটা কুথায়? চুনারাম খ্যা-খ্যা করে কালো দাঁত দেখিয়ে হাসল, বাবুদের বোন্দুক আচে, তুই বাপু ওসব ঝুটঝামেলায় যাবি নে। গুয়া যদি জানে তো লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে ছাড়বে। ওর রাগ তো জানিস, দিবে ঘর থেকে বের করে। কথায় কথায় বেলা ঢলে পড়ে, অশ্বত্থের ডালে হাজার-কিসিমের পাখি এসে জড়ো হয়েছে। ওদের ছোট-বড়ো চিৎকারে বাতাস পুলকিত হয়ে হিল্লোল তুলেছে তেলা পাতায়। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল রঘুনাথের, টিউকলটার দিকে তাকিয়ে সেই শুকনো ভাবটা খরার মাটির চেয়েও খড়খড়ে হয়ে উঠল।

দাদু, তুমি টুকে দাঁড়াও। রঘুনাথ ছুটে গেল কলের দিকে। সরকারি এই কলের জল যেন চিনি পাতা সরবত। খরানী দিনে এর শীতল জল যেন পাতাল থেকে স্বেচ্ছায় উঠে এসেছে মানুষের সেবায়। এই শেষ-দুপুরেও কলপাড়ে ভিড়ের কোনো শেষ নেই। নূপুর মাটির কলসী নিয়ে এসেছে জল নিতে, ওর বেণী করা তেল জবজবে চুল শিরদাঁড়ার দু’দিকে ঝুলে আছে কালো রঙের সাপের মতন। টিউকলের হ্যাণ্ডেলে চাপ দিলে ভসভসিয়ে জল উঠছে পাতাল ছুঁড়ে। নূপুর অবাক হয়ে দেখছে সেই স্ফটিকস্বচ্ছ জল। রঘুনাথ গিয়ে সেখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল, এই সর বলছি। তেষ্টা পেয়েচে। ভরপেট জল খাবো। এই বুন, কল দাবিয়ে দে নারে।

 আব্দারের কথায় নূপুর বেজে উঠল খুশিতে, নে। তবে মুখ লাগাবি নে। জানিস রঘুদা, এই ধাওড়াপাড়ার টিউকলে কত বাবুলোকে তেষ্টা মেটায়।

 রঘুনাথ খুশি হল না কথা শুনে। কলসীতে জল ভরে নূপুর তার ছোট্ট কোমরের খাঁজে আটকে নিল। অমনি কলসী চুয়ানো জলে তার হলদে রঙের পুরনো ফ্রকটা ভিজে রঙবদল করে ফেলল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নূপুর বলল, রঘুদা, তুর খোঁজে সেই বামুনপাড়ার ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা এসেছিল। জেঠি বসতে বললে সে বসল না। যাওয়ার সময় বলল, সে কালীগঞ্জ থিকে বিকেলবেলায় ফিরবে। তোকে ঘরে থাকতে বলেছে। কী যেন দরকার।

রঘুনাথ চুপ করে থাকল। সূর্য সময়-অসময়ে এখন ঘরে আসে। দশ বছর আগেও তার বাপ-ঠাকুরদা এদিকের ছায়া মাড়াত না। তবে কি সময় ঢলছে? নাকি নতুন করে সূর্য উঠবে আবার।

.

০৩.

বিকেলবেলায় লাখুরিয়ার ওদিক থেকে একখণ্ড মেঘ কালো দৈত্যের চেহারা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধাওড়াপাড়ার মাথার উপর, চক্কর কেটে চতুর চিলের মতো ওড়ে, উড়তে উড়তে হুস করে মানিকডিহির ঘাটের কাছে গিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়, তাকে আর দেখতে পায় না চুনারাম। শুধু বুক ফুঁড়ে উঠে আসা একটা বড়োশ্বাস বুকের পাকা লোম কাঁপিয়ে সরসরিয়ে নেমে যায় পায়ের গোড়ালির দিকে। চুনারাম অস্ফুটে বলে ওঠে, আজও ভাগলো, আজও ঠকালো। শালা আকাশটাও কেমুন হারামী হয়েচে দেখো, ঢালব ঢালব করেও ঢালচে না। মানুষগুলার সাথে ধ্যাসটুমু মারাচ্চে। চুনারাম আর নিজেকে নিজের ভেতর ধরে রাখতে পারে না, চাপা রাগটা ক্ষরিস সাপের মতো ফণা তুলতে চায় প্রকৃতির বিরুদ্ধে। দেশ-গাঁ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলে এখন তার অত চিন্তা নেই, তার যত চিন্তা শুধু গুয়ারামকে নিয়ে। ছেলেটা বুনোপাড়ার দলের সঙ্গে মুনিষ খাটতে মানিকডিহির ঘাট পেরিয়ে নয়াগ্রামের দিকে চলে গিয়েছে। ওদিকটায় বর্ধমান, শুনেছে সেখানে নাকি চাষকাজের লোকের বড্ড অভাব, টাকা ছড়ালেও কাজের লোক পাওয়া যায় না, ফলে মাঠকাজে সেখানে বরষার দিনে ভীষণ অসুবিধে। বৃষ্টি না হলে ছেলেটা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে বিদেশ বিভুঁইয়ে, যা সাথে করে নিয়ে গিয়েছে তা-ও আঁজলা চুয়ানো জলের মতো নিঃশেষ হয়ে যাবে, আসলে বসে খেলে সসাগরা পৃথিবীটাকে চিবিয়ে খেতে মানুষের বেশিদিন লাগবে না। দুলাল আর ইন্দুবালার ঘর আসার কথা শুনেছে সে, তবে ওরা এবার বসন্তপুর ধাওড়া হয়ে আসবে, সেখানে দুলালের বড় মেয়ে বিন্দুর বিয়ে হয়েছে, তাদের সংসারে কী সব অশান্তি, তা মিটমাট করে না এলে বিদেশে-বিভুঁইয়ে গিয়েও শান্তি নেই দুলালের। দুলাল এই আসে ওই আসে বলে চুনারামের ভেতরটাতে অপেক্ষার ট্যাক গজিয়ে গিয়েছে, এখন একটা উন্মনা অস্থিরতা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে হরসময়। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকতে বেলা গড়ে যায় পশ্চিমে, রোদের তেজ মরে আসে শুকনো তেজপাতার মতো, আর ঠিক তখনই রঘুনাথকে দুলালের ঘরে বলে কয়ে পাঠাল চুনারাম। রঘুনাথের যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, বিশেষ করে খাওয়ার পরে তার একটু গড়িয়ে নেওয়ার দরকার, এটা এখন এক প্রকার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তবু চুনারামের অনুরোধকে ঠেলতে পারল না রঘুনাথ, আর সেই সঙ্গে দুর্গামণিও চাইছিল রঘুনাথ যেন দুলালের ঘরে যায় এবং খোঁজ নিয়ে আসে। মায়ের দুঃখী মুখের কথা ভেবে রঘুনাথ দুলালের ঘরে গিয়েছিল, এবং সেখানে দুলালের বুড়ি মা ভূষণী ছাড়া আর কেউ নেই। ভূষণী বুড়ি খনখনে স্বরে যা বলল তার অর্থ করলে দাঁড়ায়, সে ছেলে এখুন আসবে না গো। আসা কি মুখের কথা? এ তো লাখুরে-হলদেপোঁতা ধাওড়া নয়, পথ যে অনেকটা, এট্টা নদী পেরতে হয়, তাপ্পর হাঁটা পথে ক’ ক্রোশ আমি ঠিক জানি নে বাবু। ছেলেটারে আগে ঘর ধরতে দাও, ঘর এলে আমি তারে তুমাদের ঘরে পেঠিয়ে দেবো। চিন্তা করো না।

ভূষণীবুড়ি এই বয়সে একা আছে, ঘর সামলায়, স্বপাক খায়। শরীর ভালো বুঝলে সে ভিখ মাঙতে যায় পাড়ায়-পাড়ায়। দশ ঘরের চাল ফুটিয়ে না খেলে তার খিদে মরে না। আসলে অভ্যেস, স্বভাব দোষ যাবে কোথায়। দুলালের বাপ গত হবার পর ভিক্ষাই ছিল তার একমাত্র জীবিকা, এত দিনের অভ্যাসকে সে তাই ভুলতে পারেনি, কেউ বাধা দিলে সে ফোকলা মাড়ি বের করে বলবে, ভিখ মাঙাটা অক্তে ঢুকে গিয়েচে গো, ঘরে হাত মুড়িয়ে বসে থাকলি পরে শরীলটা ম্যাজম্যাজ করে, সুখের ভাত হজমাতে চায় না। শুনলে হাসবে-ভিখ মাঙতে না গেলে রাতে আমার নিদ হয় না।

রঘুনাথ বেজার মুখে ঘর ফিরে এসে চুনারামকে কথাটা উগলে দিয়ে আর দাঁড়াল না, এক ছুটে টেরি বাগিয়ে বাঁধের গোড়ায় গিয়ে কদমছায়ায় দাঁড়াল। সূর্যর আসার সময় হল, সে গেলে সাইকেল ঠনঠনিয়ে এ পথ দিয়ে যাবে, এবং অবশ্যই তার সঙ্গে দেখা করে যাবে। সূর্য লাখুরিয়ার হাই ইস্কুলে পড়ছে, অথচ রঘুও ওই ইস্কুলে পড়তে পারত, কিন্তু তার বাবার জন্য বড় ইস্কুলে শেষঅব্দি পড়া তার হল না। প্রধান বড়ো মুখ করে বলেছিল, বুনোঘরের কোনো ছেলে যদি পড়তে চায় তার সবরকম খরচাপাতি তিনি সরকার থেকে পাইয়ে দেবেন। কথাটা গুয়ারামের কানে পৌঁছেছিল। কিন্তু গুয়ারাম রাজি হল না, ওর সাহসেও কুলাল না কেন না এর আগে সে এরকম বড়ো বড়ো কথা শুনেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই তাদের কপালে জোটে নি। ছেলেকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিতে সে রাজি নয়, তার চেয়ে নিজের কাজে লেগে যাক। দু-পয়সা কামাক, তা সংসারের দায়ে-অদায়ে লাগবে। মায়ের সঙ্গে পাড়ার সব গোরু নিয়ে চরাতে যেত রঘুনাথ, দুর্গামণির কেঁচড় ভর্তি মুড়ি, যার জন্য ভরদুপুরেও ঘর আসত না তারা, বুড়িগাঙের জলে মুড়ি বাঁধা গামছা ভিজিয়ে পাটালি কিংবা ভেলিগুড় দিয়ে দুপুরের আহারটা সেরে নিত তারা। গোরু চরানোয় যে এত সুখ আগে জানত না রঘুনাথ, পরে যত দিন অতিবাহিত হল–এই সুখ একদিন নেশায় পরিণত হল, সেই সঙ্গে খুলে গেল মনের জানলা-দরজা। বাবুদের গোরু চরাতে এসে কৃষ্ণনগরের কুশল মাস্টারের সাথে তার পরিচয়। এত ভালো মানুষ তাদের আশেপাশের দশ-গাঁ ঘুরে এলেও পাওয়া যাবে না। কুশল মাস্টারের কথায় জাদু আছে যে জাদু হরিনাথপুরের কদবেলতলা ধাওড়াপাড়ার বিদুর রাজোয়ারের আছে। শুধু বিদুর নয়, তার স্ত্রী লাবণি রাজোয়ারও কম যায় না, ওরা এখন সব ধাওড়াপাড়ায় গিয়ে মিটিং-সভা করে বেড়াচ্ছে, বিচারসভার গাঁওবুড়োকে ওরা কোনো পাত্তাই দিতে চায় না। ওদের কথা মন দিয়ে শুনলে গায়ের খুন গরম হয়ে যায় রঘুনাথের। একা থাকলে সেসব কথা মনে পড়ে ওর, মাছ ঘাই দেওয়ার মতো তোলপাড় করে দেয় মন, বাবুদের তখন মনে হয় কালীপুজোর তুচ্ছ শ্যামাপোকা, ওদের ভয় করে কি হবে, ওদের না আছে হুল, না আছে তেজ-বিষ। ওরা টোড়া সাপেরও অধম, শুধু চেহারায় দশাসই রাবণ। ওদের সাথে মিশে বাবুদের আর ভয় পায় না রঘুনাথ, বাবুরা উল্টা-সিধা বললে সে মুখের উপর জবাব দিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে মনের ভেতর আনন্দ এসে জড়ো হয়, আর সেই অন্তর্গত আনন্দটা জিয়োল মাছের মতো রক্তের পুকুরে বেঁচে থাকে ঢের দিন। এখন সময় পেলেই সে হাঁটতে হাঁটতে কদবেলতলার ধাওড়াপাড়ায় চলে যায়। বিদুর আর লাবণির সঙ্গে গল্পগুজব করে ফিরে আসে সাঁঝের বেলায়। দুর্গামণি বকাঝকা করলে সে দাঁত বের করে হাসবে, ও তুমি বুঝবে না মা। সব কতা সবার মগজে কি ঢোকে গো।

-আমার ভয় করে বাপ। শুনেছি ওরা মানুষ ভালো নয়, সুযোগ পেলে মানুষ খেপায়, মানুষ তাতায়। হাসি মিলিয়ে যায় দুর্গামণির শুকনো মুখের। ভয় এসে রাতচরা বাদুড়ের মতো খামচায় মুখের চামড়া।

গুয়ারামের কথা ভেবে চুনারামের রাতের ঘুম উধাও। গুয়ারাম ভিন গাঁয়ে গিয়ে কী খাচ্ছে, কোথায় শুচ্ছে এই নিয়ে যত চিন্তা। বাপকে নিয়ে রঘুনাথের কোনো মাথাব্যথা নেই, সে জানে তার বাবা যেখানে থাকবে ভালো থাকবে। মানুষের ঘাড়ে দায়িত্ব না চাপলে সে ভার বইতে পারে না, এমনকী সিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সেদিক দিয়ে দুলাল যা করেছে ভালো করেছে, অন্তত কটা দিন ওই কুঁড়ে মানুষটা কাজের মধ্যে থাকতে পারবে যা তার নিজের জন্য মঙ্গল তো বটে, পুরো সংসারের জন্যও সুখের।

চুনারাম বিকেলের দিকে ঘর ছাড়লে হাতে একটা বেতের লাঠি আঁকড়ে ধরে। আজ সে যে লাঠিটা নিয়েছে সেটা তার দাদুর আমলের। শুনেছে এই লাঠিটা দেবগ্রামের গোরুর হাট থেকে কেনা, এই তেলতেলা লাঠিটার বয়স শ’বছরের কম হবে না। লাঠি হাতে নিয়ে হাঁটলে শুধু শরীরের নয়, মনের বয়সও বেড়ে যায়। তখন বাঁধের ধার দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগাঙের চেয়েও নিস্তেজ মনে হয় নিজেকে। অথচ এই লাঠিটা আঁকড়ে ধরলে শরীরে একটা টগবগে স্ফুর্তি আসে, আত্মবিশ্বাস প্রজাপতির মতো ফুরফুর করে ওড়ে মনের বাদাড়ে।

এখন আলোর রঙ সর্ষেফুলের চেয়েও নজরকাড়া। লাখুরিয়া থেকে উড়ে আসা মেঘটা ছুটে চলে গিয়েছে গাঙের দিকে। ফাঁকা বাঁধের উপর দাঁড়ালেও মেঘের রংটা বোঝা যায় না। এবছরটা খরা জ্বালাবে গাঁ। নামসংকীর্তনের দল খোল-করতাল বাজিয়ে গ্রাম ঘুরবে ভোরবেলায়। ললিত রাগিণীর সুর ভাসবে বাতাসে, হারমোনিয়ামের ব্লো টেনে কৃষ্ণনামের সুর ভাসবে সারা গাঁ-ময়। চুনারাম শুনেছে আজ থেকে দু’ক্ষেপে হবে নামগান। ভোরবেলা আর সাঁঝবেলায়। গাঁওবুড়া গ্রামসভা ডেকে বলেছে, তুলসীমঞ্চে ঝারা বাঁধো সব্বাই। মা তুলসী শেতল হলে পুরা ধরণী শেতল হবে। নামগানের জোরে মেঘ ঝরবে, এছাড়া কুনো গত্যন্তর নেই।

গাঁওবুড়ার কথা মেনে নিয়েছে সবাই। সেই সঙ্গে সবাই একবাক্যে বলেছে, গাঁয়ের ধুলোয় পাপ মিশেছে। যে পাপ করছে সে ভেবে দেখুক বারবার। একার পাপে হাজার কেন কাঁদবে। কথা শেষ হলে পুরো সভা মুনিরামের দিকে তাকিয়েছে। আর তাতেই চমকে উঠেছে কুষ্ঠরোগী মুনিরাম। বারবার ঢোঁক গিলে সে খড়খড়ে গলায় বলেছে, আমাকে দোষ দিও নি গো, আমি আর সাতে-পাঁচে নেই। ওসব কু-বিদ্যে আমি ছেড়ে দিয়েছি বহুৎ দিন হল। আমি এখন আমার মতো করে বাঁচি।

-তুমার কথা বলচি নে মুনি। সভার সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটি মুনিরামের দিকে তাকিয়ে কাশল, সন্দেহ পাকমোড়া মারছে তার পুরো শরীরে, মুনিভাই তোমার কথা হচ্ছে না, হচ্ছে তুমার ছেলে লুলার কথা। ওর চলন-বলন ভালো ঠেকছে না আমাদের। খবর আছে ফি-রাতে ও ঘরে থাকে না।

মুনিরাম তেনা জড়ানো শরীর হেলিয়ে খুক খুক করে কাশল, আমি যত দূর জানি ব্যাটা আমার কু-কাজ করতে বেরয় না। সে এখন ঘরেই থাকে। আমার ঘরের বউটা তাকে রাত-বেরাতে যেতে দেয় না। বউয়ের কোল ছেড়ে লুলা আমার কেন যাবে বলো? ওপরওয়ালার দয়ায় আমার কি খাওয়া-পরার অভাব আচে? সে সব তো তুমরা নিজের চোখে দেখচো।

–দেখচি বলেই তো এত কথা বলা। সভা গমগমিয়ে উঠল, লুলার স্বভাব-চরিত্তির ভালো নয়। ভিকনাথের বউটার সাথে লটঘট চলছে। অনেকে ওদের আঁধার রাতে বাঁধের ধারে ঘুরঘুর করতে দেখেচে। বল, এসব তো ভালো নয়। এটাও তো সেই অনাচারের মধ্যে পড়ে। কী বলো?

মুনিরামের মুখে যেন এঁটেল মাটির কাদা লেপে দেয় গ্রামসভা। কথা হারিয়ে বুড়োটা ভ্যালভ্যাল করে তাকায়। বুকের ভেতরটা তার টিসটিস করে ভয়ে। যৌবনে তার সামনে এমন কথা বলার হিম্মোত কেউ রাখত না। তখন ঘোড়ায় চেপে বাঁধের ধারে টহল দিত মুনিরাম। তার কালো ঘোড়াটা হাওয়ার গতিতে ছুটত, দেবগ্রাম পৌঁছোতে সময় নিত বিশ মিনিটেরও কম। এ গ্রামের মানুষ সেই প্রথম আরবী ঘোড়া দেখে। মুনিরাম ঘোড়াটা কিনেছিল পলাশী মনুমেন্টের এক সাহেবের কাছ থেকে। কালো রঙের তেল চুয়োনো ঘোড়াটা সাহেবের বিশেষ পছন্দের ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার সময় ঘোড়া নিয়ে তো উড়োজাহাজে চড়া যাবে না, তাই জলের দামে বেচে দেওয়া। সাহেবঘোড়ার মেজাজ ছিল সাহেবের মতো, ছোলা ভুষি গুড় কচিঘাস ছাড়া সে আর কিছু খাবে না। যে কেউ তাকে ছুঁলেই পেছন পা দিয়ে লাথ ছুঁড়ে দিত সজোরে, চিঁ-হিঁ-হিঁ শব্দে পিলে চমকানো ডেকে উঠত তার অনিচ্ছা জানিয়ে। সেই জাঁদরেল ঘোড়াকে শেষ পর্যন্ত বশে এনেছিল মুনিরাম। চাবুকের ভয় পশুরও আছে। এক টানা দশ মাইল দৌড়ে ঘোড়াটাকে জব্দ করেছিল সে। পরে এই ঘোড়া তার অবস্থা ঘোরাতে সাহায্য করে। অমাবস্যা রাতে গাছপুজো সেরে মুনিরাম চলে যেত পরের দোরে ডাকাতি করতে। তার ঘাড়ে চামড়ার প্লেটের সাথে টাইট করে বাঁধা থাকত ছররা বন্দুক। কাজ শেষ করে ওই বন্দুক সে লুকিয়ে রাখত খড়গাদায়। থানা থেকে পুলিশ এলে টের পেত না কোনো কিছু। চোরাই মাল পুকুরে বস্তায় বেঁধে রেখে আসত মুনিরাম। জলের তলায় মাসের পর মাস পড়ে থাকত বাসন-কোশন সোনা দানা। তখন ছিল সুখের সময়, তখন চোখ টাটাত মানুষজন। আজ কত বদলে গেছে হলদেপোঁতা ধাওড়াপাড়া, তবু মানুষের মন থেকে ঈর্ষার কঠিন আঁচড় মুছল না। লুলারামের পেছনে লেগেছে সবাই। ছেলেটার বদনাম করতে পারলে ওরা আর কিছু চায় না। ভিকনাথের কচি বউটাকে নিয়ে এসব গল্পকথার কোনো মানে হয়? কষ্টে বুক ভেঙে যেতে থাকে মুনিরামের, তবু সে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। পরক্ষণে তার মনে হয় লুলারামকে তার বিশ্বাস নেই। যৌবন গঙ্গার পাড় ভাঙা ঢেউয়ের মতো, উপর থেকে কিছু বোঝা যায় না, তলায় তলায় চাকু শানায়। দশ লোকে যে কথা বলে তা কি আর ভুল হবে? যা রটে তা কিছু না কিছু বটে। এবার থেকে চোখে-চোখে রাখতে হবে ছেলেটাকে। বউটা আর পেরে ওঠে না, ওরও তো মাথার কোনো ঠিক নেই, গরম চড়লে ঘিলু গলে যায়, শুরু হয় পাগলামী। ইংরেজি দাবাই করিয়ে এ রোগের কোন সুরাহা হবে না, আয়ুর্বেদ কিংবা তুকতাক ঝাড়ফুঁকে একে জব্দ করার ওষুধ আছে। মুনিরাম তার বিশ্বাস নিয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর। ঢিলি গাছগাছড়ার ওষুধ খায়, কিন্তু কোনো সুফল পায় না। প্রভাবুড়ি রোজ সকালে এসে তাকে ঝাড়ফুঁক করে যায়, সেই সঙ্গে মন্ত্রণপাড়া জল খাইয়ে যায় কিন্তু এতেও কোনো ফল হয় না। আসলে বিধি মারলে ওষুধ মেলা ভার। ঢিলি তাই বুনো হাওয়ার মতো দৌড়ে বেড়ায়, তার রাত-বেরাত নেই, খরা-বর্ষার ধার ধারে না। সে স্বাধীন জলের ধারা। তাকে ঠেকানো যায় না, আটকানোও যায় না।

 সভা শেষ হলে মুনিরাম একা হয়ে যায়, কানের ভেতর ঝাঁ-ঝাঁ বোলতার কামড় নিয়ে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে সে পাড়ায় ফিরে আসে। ধারে-কাছে সে লুলারামকে দেখতে পায় না। ঢিলি মাটিতে পা-থেবড়ে বসে খোলামকুচি দিয়ে আঁচড় কাটছিল। মুনিরাম তার দিকে এগিয়ে গেলে সে চিল্লিয়ে ওঠে, খবরদার, এদিক পানে আসবে না। আমি ঝারির পুতুল গড়িয়েচি গো। ওর বুকে আমি হলাবান মারব। ওকে আমি নাগবান মেরে বিষ ঢালব। ও মাগী আমার সব খেল গো। ওর জন্যি আমি আজ ভাতার ছাড়া।

মুনিরাম কী বলবে কথা খুঁজল। সে কিছু বলার আগেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল ঢিলি, ধুলো হাতটা ছাপা শাড়িতে মুছে সে ছাতা ধরা দাঁত বের করে খ্যা-খ্যা করে হাসল, বুড়ার আবার মরণ দেখো, ছেলের হয়ে বলতে এয়েচে। ছ্যা- ছ্যা! ও আবার ছেলে নাকি? ওতো ছেলি–প্যাঠা। বদা গো, বদা! বুঝেনি। হা-হা-হা! থুতু ছিটিয়ে হাসি ছড়াল ঢিলি। লাঠিতে ভর দিয়ে কিছুটা তফাত-এ দাঁড়াল মুনিরাম, লুলারে দেখেচো, সে কুথায় গেল বলতে পারো?

-পারি গো সব পারি। কেনে পারব নাই। ঢিলি বুক দুলিয়ে হাঁপাচ্ছিল, বেধুয়ার বেটা বেধুয়া হবে এ আর বড়ো কি কথা! এতদিন নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে বুড়া এখন এয়েচে ছেলের খোঁজ করতে। মরতেও দড়ি জোটে না। রাগে শরীরটা তেতে উঠলেও মনিরামের এখন কিছু করার নেই। অসুখ তার ক্ষমতায় থাবা মেরেছে, মানুষের অভিশাপ তাকে আজ অক্ষম করেছে, সারাজীবনের পাপকাজে তার পাপের ডিঙা ভরে গিয়েছে, সে এ জনমের শাস্তি শেষ জীবনে পেয়ে গিয়ে নিজের প্রতি বড়ো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। গাঁয়ের লোক আড়ালে আবডালে বলে, মুনিরাম কুনোদিন মুনিও হবেনি, রামও হবেনি। যে মানুষটা আগাগোড়া শয়তান সে দেবতার সাজ পরলেও মানুষ ঠিক তাকে চিনতে পারে। পাপের বদঘেরাণ যে দুনিয়া ছাড়া! অত মানুষের চোখের জল কি বেথা যাবে।

 মাঝে মাঝে দগদগে ঘাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিয়ে হিসাব কষে মুনিরাম। বামুনপাড়ায় ডাকাতি করতে গিয়ে সে সোনাদানা ছিনিয়ে নিয়েছিল বিধবার। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে তুলে দেবে মা। সেই মায়ের স্বপ্ন আর পূরণ হতে দিল না মুনিরাম। জোর করে ছিনিয়ে নিল আঁচলের চাবিগোছা। টিনের বাক্স খুলে বের করে আনল স্যাকরার দোকানে গড়ানন বালা বাউটি চুড় চন্দ্রহার। পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছিল বিধবা-মা, চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল দুঃখিনীর হৃদয়-সমুদ্র, ওগুলো নিও না গো, এর চেয়ে আমার জান নিয়ে নাও। এই ফালগুনে আমার মেয়েটার বিয়েঘর। ওর বাবা নেই। আমি বহু কষ্টে এগুলো জমিয়ে রেখেছি। এগুলো নিয়ে গেলে আমি পঙ্গু হয়ে যাব, খালি হাতে আমার মেয়েকে কেউ ছোঁবে না গো।

কেউ না নিক, আমি নেব। রানী করে রাখব। দেবে তো বলো।

তোর ওই মুখে পোকা পড়ুক। আমিও বামুনের মেয়ে। কোনোদিন পাপ আমাকে ছোঁয়নি। তোকে আমি শাপ দেব।

–তবে রে মাগী। চিৎ হয়ে শো। আজ রস গোটাব। হাত ধরে বউটাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিয়েছিল মুনিরাম। তারপর সে পশু হয়ে গেল নিমেষে। ধুতি সামলে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, যা এবার তোকে পাপ ছুঁয়ে গেল। এবার তুই প্রাণভরে আমাকে শাপশাপান্তি দে। আমি জানিরে–শকুনের শাপে গোরু মরে না। এলোমেলো শাড়িতে লজ্জাস্থান ঢেকে বিধবা মা’টি কাঁদছিল, তোকে আমি শাপ দেব, হ্যাঁ, হাজার বার দেব। যার মা-বোন জ্ঞান নেই সে বেঁচেও মরার মতো বাঁচবে। যে হাত দিয়ে তুই আমাকে ধরলি–সেই হাতে তোর কুঁড়িকুষ্ঠি হবে। খসে খসে পড়বে তোর হাত-পা। তুই নুলো হবি, তুই কৃমিকীট হবি। সবাই তোকে দেখে নাক কুঁচকাবে। তোর মুখে থুতু দেবে। পরের দয়া নিয়ে তুই বাকি জীবনটা বাঁচবি। আমি যদি সতী হই, আমার শাপ তোর ঠিক লাগবে।

মাত্র তিন বছরের মাথায় কুঁড়িকুষ্ট ফুটল মুনিরামের শরীরে। অসাঢ় হয়ে গেল শরীরের নিম্নাঙ্গ। তখন সত্যবতী বেঁচে, যৌবন কইমাছের মতো ছড়ছড়াচ্ছে অথচ তার কিছু করার নেই, শুধু পূজ-রক্ত নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া। বামুনবাড়ির বিধবা বউটার কথা মনে পড়েছে মুনিরামের, ভয়ে আঁতকে উঠেছে সে, পাপের ডোবায় সে তখন ডুবে যেতে গিয়ে নিজেকে বাঁচাবার উপায়গুলো হারিয়ে ফেলে। এক ঘনঘোর আচ্ছন্নতা, আত্মধিক্কার, অপরাধবোধ সেদিন থেকে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, এর থেকে নিষ্কৃতি সে আজও পায় নি।

হাঁটতে হাঁটতে বাঁধের গোড়ায় চলে যাবার ইচ্ছে হয়েছিল চুনারামের কিন্তু অতটা খাড়াপথ লাঠিতে ভর দিয়ে উঠতে তার শরীর সায় দিল না। পিটুলিগাছটাকে পাশ কাটিয়ে সে ঘরের সামনের পথটায় এসে দাঁড়াল, ধুলোয় থিকথিক করছে পথটা, পা ফেললেই পায়ের চেটো ধুলোর বিছানায় ডুবে যায়, সারা পায়ে ধুলো জড়িয়ে নিজের পাটাকে আর চেনা যায় না। ধুলোভরা পা দুটো যেন অন্য কারোর।

কঞ্চির বেড়ার উপর ফড়ফড় করে উড়ছে রাজফড়িং; কিছু দূরে একটা কালো কুচকুচে ফিঙে হা-করে দেখছে ফড়িংগুলোর গতিবিধি, একটু সুযোগ পেলেই ফিঙে পাখিটা উড়ে এসে খাবলা মেরে ধরে নেবে রাজফড়িং তারপর উড়ে গিয়ে কোঁত করে গিলে নিয়ে আবার অপেক্ষায় থাকবে দ্বিতীয় শিকার ধরার জন্য। আগড় সরিয়ে চুনারাম গলা খেঁকারি দিয়ে মুনিরামের উঠোনে ঢুকে এল। এ সময় ঢিলির ঘরে থাকার কথা নয়, যথারীতি সে ছিল না, শুধু নূপুর এগিয়ে এল তার গলার আওয়াজ পেয়ে, দাদু, আসো গো।

পথ দেখিয়ে নূপুর সরে দাঁড়াল, নুপুরের ব্যবহারে মুগ্ধ চুনারাম হাঁ-করে তাকাল, ভাই কইরে? নূপুর কিছু না বলে উঁচু জায়গাটা দেখিয়ে দিল, বহু বছর আগে মুনিরাম মাটির ঘর তুলেছিল, ভয়ঙ্কর বন্যায় তা গলে যায়, হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে মাটির ঘরখানা। সেই থেকে জায়গাটা উঁচু হয়ে আছে, ছাগলছানা তিড়িং বিড়িং লাফায় সেই উঁচু ভাঙা কাঁথ দেওয়ালে। শীতকালের সকালে রোদ উঠলে মুনিরাম ওই উঁচু ঢিবি জায়গাটায় গিয়ে বসে, পিঠে রোদ লাগিয়ে সময় কোথা দিয়ে কেটে যায়, সে নিজেও টের পায় না। বছরের অন্য সময়গুলোতে রোদ সরে গেলে কিংবা রোদের তেজ কমলে মুনিরাম বোরা বিছিয়ে ওখানে বিশ্রাম নেয়। খিদে লাগলে ওখানে বসেই মুড়ি চেবায়, নূপুর পেতলের ঘটিতে জল দিয়ে যায়, বুড়োটা ঢকঢক করে খায় তারপর মুখ মুছে নিয়ে নূপুরকে আশীর্বাদ করে, তুই রাজরানী হবি। তোর মন অনেক উঁচা হবে। তোর মনে দয়া-মায়া উপচে পড়বে। তুই তোর বাপ-মায়ের মান রাখবি। সেদিক থেকে ভাগ্যবান লুলারাম। ওর ছেলে নেই ঠিকই, কিন্তু মেয়ে দুটো ছেলেকেও ছাপিয়ে যায়, সংসারের কাজে ওরা দশভুজা, ক্লান্তি নেই, সারাদিন মেশিনের মতো খাটছে তো খাটছে ফলে ঢিলির অভাবটা কাজের মাধ্যমে পুষিয়ে দিয়েছে ওরা। লুলারাম তাই শান্তিতে ঘোরাফেরা করতে পারে, শুধু বাজারহাট করে দিয়ে সে খালাস। লোকজন হাঁড়ি খুন্তি সব সামাল দেয় ওই দুটি মেয়ে। মুনিরাম চোখের সামনে অষ্টপ্রহর সব দেখে তাই কেউ কিছু ওদের নামে বললে ওর পিত্তি জ্বলে যায়, রাগে মুখ দিয়ে আজেবাজে কথা বের হয়ে আসে।

পড়ন্ত রোদে চুনারাম খাটো ধুতি গুছিয়ে মুনিরামের মুখোমুখি বসল। পাশাপাশি ঘর তবু অনেক দিন হল এদিকটায় তার আসা হয়নি, এমনকি খোঁজ খবরও নেওয়া হয়নি। অসুস্থ ভাইয়ের উপর চুনারামের একটা চোরাটান আছে যা সে কখনও কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। বাপ ঢুলিরাম গত হবার সময় তার হাত ধরে বলেছিল, আমার সময় হয়েছে বাছা, ইবার আমাকে যেতে হবেখন। তোর ভাই থাকল, তারে তুই দেখিস। বড় ভাই তো বাপের সমান।

 ঢুলিরামের কথাগুলো আজও মাঝে মাঝে মনে পড়ে চুনারামের, তখন মনটা কেমন কঁকিয়ে ওঠে, ব্যথায় নীল হয়ে যায়। দেশ-দুনিয়া, এ জগত কিছু ভালো লাগে না, মুনিরামের ঘেয়ো শরীরটা যেন তার শরীরের ভেতর ঢুকে যায়, কিছুতেই এই ব্যাধিটাকে ঠেলে বের করে দেওয়া যায় না। কালীগঞ্জ হাসপাতালের মোটা টিকাদারবাবু মুনিরামকে দেখে বলেছিলেন, ঘরে বসে থাকলে এ অসুখ সারবে না। হাসপাতালে যেও, ডাক্তারবাবু ওষুধ দিয়ে দেবেন। হাসাপাতালে এ রোগের চিকিৎসা হয়।

-পাপরোগের চিকিৎসা হয়? যেন আকাশ থেকে পড়েছিল মুনিরাম। সেদিন পাশে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল চুনারাম। টিকাদারবাবু মুনিরামকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, পাপরোগ বলে কোনো রোগ হয় না। কুষ্ঠ কোনো অভিশাপ নয়, ওটা একটা রোগ। যে-কারোর হতে পারে। সব কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়। নিয়ম করে দেখালে এ অসুখ সেরে যায়, এ রোগটাকে ভয় পাবার বা লুকোবার দরকার নেই। জ্বরজ্বালা, মাথা ব্যথার মতো এটাও একটা অসুখ।

তবু টিকাদারবাবুর কথায় ভরসা রাখতে পারে নি চুনারাম আর মুনিরাম। ওই মাঝ বয়েসী মানুষটা বলে কি! এমন কথা কি বিশ্বাস করা যায় যে কুষ্ঠরোগটা কোনো বিধির অভিশাপ নয়? পাপের ফল নয়? গ্রামসমাজের চাপে পড়ে মুনিরামকে আলাদা করে দিয়েছে লুলারাম। তার জন্য আলাদা একটা ঝুপড়ি বানিয়ে দিয়েছে পণ্ডিতবিলের ধারে। চাপা গলায় সতর্ক করে বলেছে, এদিকপানে এসো না, গাঁয়ের কেউ দেখে নিলে আমার ঝামেলা হয়ে যাবেন। তুমার যখন যা দরকার হবে আমাকে বলবে–আমি দিয়ে আসব।

 দুকুরবেলায়, সাঁঝবেলায় তাহলে কুথায় খাবো? মুনিরামের গলা বুজে এসেছিল কান্নায়। বাঁশপাতার মতো কাঁপছিল সে।

–আঃ, মন খারাপের কী আছে? আমরা তো তুমার পাশে আছি, শুধু ঘরটা যা আলাদা। লুলারাম ধমক দিল।

 নিজের হাতে বানানো ঘরে নিজে থাকতে পারব না! ওঃ, এ যে কী মা শীতলা বুড়ির মহিমা কিছু বুঝতে পারি না। এর চেয়ে শ্মশানঘাটে চলে গেলে ভালো হত। ওখানে সমাজের লাল চোখ নেই। কোঁকড়া চুলগুলো সজোরে চেপে ধরে হা-হুতোশ করে মুনিরাম। খড় আর ছিটে বেড়ায় বানানো ঝুপড়িটাকে সে মন থেকে মেনে নিতে পারে না, কষ্ট হয়, বুক মোচড় দিয়ে ওঠে, চোখের কোণে থিকথিক করে জল, বুঝতে পারে সে এ সংসারে এখন একটা এঁটো পাতা ছাড়া আর কিছু নয়। তবু চুনারাম আসে, মাঝে মধ্যে তার খোঁজখবর নিয়ে যায়, ভালো-মন্দ কিছু হলে সে ছোটভাইটার জন্য পাঠিয়ে দেয়। একা খেতে মন সায় দেয় না। বাবার কথাটা মনে পড়ে, বড়ো ভাই তো বাপের সমান।

আজ দাদাকে দেখে মুনিরাম উৎসাহিত বোধ করল, আয়, ছিমুতে সরে আয়। কদিন পরে এলি বল তো? আমি তো পথের দিকে হাঁ-করে চেয়ে থাকি। বুড়াটার খোঁজ নিতে কেউ আসে না। আর আমার কাছে আসবেই বা কেন? মধু যা ছিল সব আমি যে নিংড়ে দিয়েছি।

-চুপ কর ভাই। চুনারামের চোখে ব্যথার সর পড়ল, কেউ না আসুক–আমি সময় পেলে ঠিক আসব। তুই ভাববি নে। তা এখুন কেমুন আচিস ভাইরে…?

-ভালো নেই, ভালো নেই রে! ডানে-বাঁয়ে নিয়ন্ত্রণহীন ঘাড় দোলায় মুনিরাম, ক্ষয়ে যাওয়া, ঘেয়ো হাতটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটায় ডানা ভাঙা প্রজাপতির মতো ফড়ফড় করে, খুব কষ্ট হয় রে, এবার চলে গেলে বুঝি ভালো হত। শীতলাবুড়ির কবে যে দয়া হবে কে জানে। আমি তো হররোজ দু-বেলা তারে ডাকচি।

–সব ঠিক হয়ে যাবেখন। চুনারাম মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাইল।

 দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুনিরাম ভাবুক হয়ে গেল, আর ভালো হবে না রে, যা হবার তা হয়ে গিয়েছে। এবার পুটলি বাঁধার সময় হয়েছে। আর তা ছাড়া, আমিও আর বাঁচতে চাইনে। এ জীবনটার ওপর ঘেন্না ধরে গেছে, হাঁপসে গেছি আমি, আর ভাল লাগে না ভাই, আর ভাল লাগে না। মুনিরাম থামল, চোখ রগড়ে নিয়ে নির্লিপ্ত তাকাল, লুলাটাকে নিয়ে আর পারিনে। বউটারে সে ভেষণ জ্বালাচ্ছে। ভিকনাথের বউটার সাথে সে নাকি ঢলাচ্ছে। ছিঃ, ছি, আমি কুন দিকে যাই বলদিনি। এই বয়সে এসব কি মানায় রে। শরীলটা এট্টু জুঁৎ হলে আমি ভাবছি বউটার সাথে টুকে দেখা করব। ওরে বুঝিয়ে বলব। দেখি কুনো কাজ হয় নাকি?

-প্রেমবোগ কুঠরোগের চেয়েও খতরনাক। খবরদার তুই ওই রাড়ুয়া ম্যায়াঝিটার কাছে যাবি নে। আমি শুনেচি–সে বড়ো মুখরা। তুর মান-সম্মান রাখবে নি। চুনারাম বোঝাবার মতো করে বলল কথাগুলো। মুনিরাম মন দিয়ে শুনে শুধুমাত্র ফুঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, তারপর কেমন হাওয়া বেরনো বেলুনের মতো চুপসে গেল।

.

 কালীগঞ্জ থেকে ইস্কুল সেরে সাইকেল নিয়ে ফিরছিল সূর্যাক্ষ, রঘুনাথ তাকে পাকুড়তলায় ধরে ফেলল। সূর্যাক্ষ সাইকেল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল, গালে টোল ফেলে হাসল সে, কোথায় থাকিস রে রঘু, তোর যে আর টিকির নাগাল পাওয়া যায় না। ভুলে গিয়েচিস-আজ ফুটবল ম্যাচ আছে। যাবি না?

 রঘুনাথ উৎসাহিত হল, যাব না মানে? সেই কখুন থিকে আমি ঘুর ঘুর করচি তুর জন্যি। যাক, দেখা হয়ে ভালো হল। রঘুনাথ এগিয়ে গিয়ে সূর্যাক্ষের সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে হাত রাখল, দে, সাইকেলটা আমাকে দে। মাঠ অব্দি আমি চালিয়ে নিয়ে যাবো। তুই পেছনে বসবি।

তুই পারবি? সূর্যাক্ষের চোখে সন্দেহ, পড়ে গেলে আর রক্ষে থাকবে না। সে দিন একটা চালকারবারী সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে বাঁধের নিচে গড়িয়ে গিয়েছিল। ওর অন্ডকোষে লেগেছে। হাসপাতালে ভর্তি আছে। শুনেছি অবস্থা নাকি ভালো নয়।

অত ভয় পেলে চলবে? রঘুনাথ সাহসী হয়ে উঠল, যা হবার হবে। সবাইকে একদিন তো পটল তুলতে হবেই। দে সাইকেলটা দে।

একরকম জোর করে সূর্যাক্ষের সাইকেলটা কেড়ে নিল রঘুনাথ, তারপর কিছুটা দৌড়ে ধপাস করে সে সাইকেলের সিটে চড়ে বসল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকল, এই সূর্য, বসে পড়, দেখ, বেলা কুথায় চলে গিয়েছে। খপখপ কর। আজ তুই দেরিতে এসে সব কিছু এলেবেলে করে দিলি।

সূর্যাক্ষ বই আঁকড়ে ধপাস করে ক্যারিয়ারে বসে পড়ল, তারপর পাছায় জোরসে চিমটি কেটে বলল, মেয়েদের মতো চালাস নে, জোরে-জোরে চালা। এমন শামুকের মতো চললে কখন পৌঁছাবি?

 বাঁই-বাঁই করে সাইকেল ছুটল বাঁধের ধুলো উড়িয়ে, সারা শরীরে স্ফুর্তি এসে গেল রঘুনাথের, সে শিস দিয়ে গান ধরল দুরের দিকে তাকিয়ে। এ সময় বাঁধের ধার অপরূপ সাজে সেজে ওঠে। এই আলোটাকে লোকে বলে কনে দেখা আলো। কিছুটা আসার পর সূর্য গাঙধারের ঝাউগাছগুলো দিকে তাকাল, দেখ গাছগুলোকে কেমন বড়ো দেখাচ্ছে। রোজ দেখি আর মনে হয় ওরা কত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছে।

রঘুনাথ সাইকেলের হ্যাণ্ডেল জোরসে ধরে প্যাডেলে জোরে চাপ দিয়ে থামল, গাঙধারের বাতাসে গাছপালার বড় বেশি হয়। গাঙের ঘোলাটে জলে পলি থাকে। সেই পলি হাড়গুড়া সারের কাজ করে। আমার দাদু বলে, ঘোলা জলে আয়ু বাড়ে মাছেদের, আর গাছ বাড়ে চড়চড়িয়ে।

 সূর্যাক্ষের মধ্যে একটা ভাবুক মন সর্বদা হাডুডু খেলে, কোনোসময় তাকে দুঃখ এসে ছুঁতে পারে না। তার মা তাকে শিখিয়েছে, হাসি হল মানুষের শরীরের একটা মোক্ষম ওষুধ। এই ওষুধে সব রোগজ্বালা ভালো হয়ে যায়, মানুষের কোনো কষ্ট থাকে না।

 কথাটা মনে ধরেছে রঘুনাথের, তার খুব ইচ্ছে করে সূর্যাক্ষের বাড়ি গিয়ে ওর মায়ের সাথে গল্প করতে। দুর্গামণির সঙ্গে সূর্যাক্ষের মায়ের বুঝি তুলনাই চলে না। রঘুনাথ তার মায়ের কথা ভেবে মনে মনে কেমন গুটিয়ে যায়, দু’মায়ের ফারাকটা তার দৃষ্টির বাইরে চলে যায়।

সূর্যাক্ষের খোলা হাওয়ার মতো মন, তা না হলে বুনোপাড়ায় আসতে তার বয়ে গেছে। গাঁয়ে মাত্র ক’ঘর বামুনের বাস, তার মধ্যে ওরা বেশ সম্পন্ন। সূর্যাক্ষের মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরে, জলঙ্গী নদীর ধারে। বিকেলে সেখানে খোলা বাতাস দৌড়-ঝাঁপ খেলে বেড়ায়, সেই বাতাসের গায়ে থাকে হিমেল সুবাস, জলকণার মিহি আদর। গরমের দিনে জলঙ্গী নদীর বাঁধের উপর দাঁড়ালে শরীর একেবারে জুড়িয়ে শীতল হয়ে যায়, আরামে চোখ বুজে আসতে চায় ঘুমে। কতদিন সূর্যাক্ষের মামার বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনি, তার মা বলেছে–আগে ভালো মতো পাশ কর, তারপর তাকে নিয়ে যাবো। বারোদোলের মেলায় ভিড় বেশি। সে সময় গেলে বেশ আনন্দ হয়।

সাইকেল ঢালু পথ বেয়ে নেমে এল মাঠের উপর। সবুজ ঘাসের উপর রোদ পড়ে চিকচিক করছে মাঠখানা। ঠিক গোল-পোস্টের পিছনে একটা বুনো জামগাছ। বুড়োটে পাতা শুকনো তেজপাতার মতো ছড়িয়ে আছে মাঠের ভেতর, পাতাগুলো সাতভায়া পাখির মতো উড়ছে হাওয়ায়। সেদিকে হা-করে তাকিয়ে আছে সূর্যাক্ষ। আর একটু পরে খেলা শুরু হবে, তার প্রস্তুতিতে মাঠ সেজে উঠছে। সূর্যাক্ষ আর রঘুনাথকে দেখে এগিয়ে এল তারক। খুব অবাক হয়ে সে শুধোল, তোদের দু জনের এত আসতে দেরি হল যে।

রঘুনাথ কিছু বলার আগেই সূর্যাক্ষ বলল, কালীগঞ্জ থেকে ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল। মোকামপাড়ার কাছে এসে সাইকেলের হাওয়া কমে গেল। ওই অত দূর থেকে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে আবার ফিরে গেলাম বাজারে। বাজার ছাড়া তো সাইকেল সারানোর কোনো দোকান নেই জানিস তো। তবে রঘু ধাওড়াপাড়ার কাছে আগে থেকেই দাঁড়িয়েছিল। হেঁটে এলে রঘু আগে পৌঁছে যেত কিন্তু ও-যে আমাকে ছাড়া আসবে না।

 রঘু তোর চামটুলি। গলা ফাড়িয়ে হাসল তারক। তার সেই দরাজ হাসি সংক্রামিত হল রঘুনাথের শরীরে। সেখান থেকে হাসি রাজহাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল সূর্যাক্ষের কণ্ঠ। ওরা তিনজন হা-হা শব্দে হাসতে লাগল।

এক সময় হাসি থামিয়ে সূর্যাক্ষ বলল, আজ রঘু ব্যাকে খেলবে। ওকে আমি সাহস দিয়েছি। ওর কোনো অসুবিধা নেই।

ব্যাকে খেলার জন্য রঘুর গায়ের জোরটাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সূর্যাক্ষ। ওর গাট্টাগোট্টা চেহারায় যে শক্তি লুকিয়ে আছে তা একটা চামড়ার বলকে শাসন করার পক্ষে মাত্রারিক্ত। রঘুনাথ খেলার খ’ না জানলেও এই লুকিয়ে থাকা শক্তি ওকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। বল খেলার প্রস্তাব সূর্যাক্ষ প্রথম দিতেই রঘুনাথ আকাশ থেকে পড়েছিল, ওসব বল পেটাপেটি খেলা আমার দ্বারা হবে নি।

-কেন হবে না, আলবাত হবে, চল। রঘুনাথের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সূর্যাক্ষ পাকুড়তলায়। তারপর বুঝিয়ে বলেছিল, বল খেলা খুব সহজ রে, একটু বুদ্ধি ঘিলুতে থাকলে যে কেউ খেলতে পারে।

রঘুর তবু আড়ষ্টতা কাটে না, ছোটবেলায় বাতাবীলেবু নিয়ে বহু খেলেচি। সে খেলা ছিল মজার খেলা। মাঠে নেমে খেলতে যাওয়ার মানে দশ লোক হা-করে দেখবে। খেলা ভালো হলে হাততালি দেবে, খেলা খারাপ হলে গালমন্দ। আমার এমনি-তে মাথা গরম, কার সাথে ঝুট-ঝামেলা হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমি মাঠের বাইরে থাকবখন, সেটা আমার জন্যি ভালো হবে।

তোর ভালো-মন্দ তোর বুঝে কাজ নেই। যা বোঝার আমরা বুঝব। বুঝলি? সূর্যাক্ষের দাবি রঘুনাথ ঠেলতে পারে নি। বামুনবাড়ির এই ছেলেটাকে তার মন্দ লাগে না, ওর মধ্যে কোনো উপরচালাকি নেই, পুরনো কুয়োর জলের চাইতে ঠাণ্ডা এবং উপাদেয়। এমন মনের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায় অনায়াসে। এরপর সূর্যাক্ষ রঘুনাথের বন্ধু হয়ে গেল। ইস্কুল যাওয়া আসার পথে রোজ ওদের দেখা হয়, রঘুনাথ বেলা দশটা বাজলে সূর্যাক্ষর জন্য দাঁড়িয়ে থাকে কদবেল তলায়। দুর্গামণি তার এই পাগলামী দেখে সতর্ক করে বলছিল, বুঝে-শুনে মিশবি বাপ। বাবুঘরের ছেলে মেয়েরা বড্ড চালাক হয়। ওরা সুযোগ পেলে তুর সব নিয়ে, তাপ্পর ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তাই বলচি বাপ, হিসেব করে পা ফেলিস। গড়বড় হলে নড়বড়ে হয়ে যাবে তুর জেবন, তখন কেঁদেকেটে কুনো পথ পাবি না। মায়ের কথা সবসময় যে সত্যি হয় তা নয়। সূর্যাক্ষের মন তার চেয়েও ভালো। প্রায় সে চরানীমাঠে দেখা করে রঘুনাথের সঙ্গে। তার গলায় অবুঝ আব্দার, চল তোকে আজ বাড়ি নিয়ে যাবো। আমার মা বলেছে তোকে ঘরে নিয়ে যেতে।

-ধ্যাৎ, তুর ঘরে গিয়ে কী হবে?

-কেন থাকবি খাবি গল্প কবি। সূর্যাক্ষর কণ্ঠস্বরে বন্ধুত্ব উছলে ওঠে, আমার মা যে কত ভালো তা তুই নিজের চোখে দেখতে পাবি। ওখানে একবার গেলে তোর আর আসতেই মন করবে না।

–যাব, সময় করে ঠিক যাবো।

–না, আজই চল। আজ মা পায়েস রেঁধেছে। তুই খাবি। সূর্যাক্ষ জেদ করল।

-ধুর, পায়েস আমরা হররোজ খাই। রঘুনাথ অবাক হল না মোটে, জাউভাতে গরম দুধ ঢেলে দিলে পায়েসভাত হয়ে যায়। আমার মা বলে পায়েস ভাত খেলে গতরে শক্তি আসে। তখন ভালো মুনিষ খাটা যায়। বাবুরা খুশি হয়ে দু-পাঁচ টাকা বকশিস দেয়। রঘুনাথ নিজের বিশ্বাসে অনড় থাকে। তাকে বোঝাবার ক্ষমতা সূর্যাক্ষের নেই, সে শুধু অবাক হওয়া চোখে তাকায় আর বোকার মতো হাসে। মানুষ এখনও কোথায় পড়ে আছে ভাবলে অবাক হয় সূর্যাক্ষে। তার বাবা কপোতাক্ষ বলেন, মানুষকে অন্ধকার থেকে টেনে তুলতে হবে। সবার চোখে শিক্ষার আলো দিতে হবে। স্বাধীনতার চব্বিশ বছর পরেও মানুষ অন্ধকারে ডুবে আছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা ওদের গ্রাস করছে। ওদের সচেতন করার দায়িত্ব তোমাদের নিতে হবে সূর্য। শুধু পাঠ্যপুস্তক পড়ে তোমাদের এ শিক্ষা পূর্ণ হবে না। চোখ-কান খোলা রেখে মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে তোমাদের। ধনী দরিদ্র ছোট বড়ো সবাইকে কাছে টেনে নিতে হবে। তবেই আমাদের এই মহান দেশ প্রগতির পথে অগ্রসর হবে।

মাঠের মধ্যে রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে সূর্যাক্ষ চঞ্চল হয়ে উঠল; এই রঘু, যা করার তাড়াতাড়ি কর। দেখ, মোকামপাড়ার দল আগে-ভাগে মাঠে নেমে গিয়েছে। ওরা গা-ঘামাচ্ছে। তুই ঝটপট ড্রেস করে নে। আজ ওদের ছাড়ব না, গো হারা হারাবো। তারক রঘুনাথের বরাদ্দ সাদা কালো জার্সিটা এগিয়ে দিল, জামগাছের আড়ালে গিয়ে এটা পরে আয়। আর হ্যাঁ, প্যান্টের নীচে তোর জাঙ্গিয়া আছে তো?

রঘু ঘাড় নাড়ল, জাঙ্গিয়া কি সে জানে না, ঘোর কাটিয়ে সে তাকাল, প্যান্টের নীচে ল্যাঙ্গোট পরে এয়েচি।

–তুই এই বয়স ল্যাঙ্গোট পরিস? সূর্যাক্ষ হাসি আটকাতে পারছিল না, ল্যাঙ্গোট তো রামনগর সুগারমিলের বিহারী দারোয়ানগুলো পরে। ওরা ল্যাঙ্গোট পরে রোজ সকালে মালাম লড়ে। আমি বাবার সাথে গিয়ে দেখেছি।

তারক তার কথাকে সমর্থন করল, হ্যাঁ, সূর্যর কথাটা ঠিক। আমিও ল্যাঙ্গোট পরা কুস্তিবীর দেখেছি। জানিস ওরা গায়ে কত্তো তেল মাখে!

রঘুনাথের এসব কিছু দেখা হয়নি, সে ধাওড়াপাড়া ছেড়ে পলাশী সুগারমিলের দিকে কোনোদিনও যেতে পারেনি। গুয়ারাম তাকে যেতে দেয় না, বেশি জেদ ধরলে বলে, হারিয়ে যাবি বাপরে। গাঙের ধারে ছেলেধরা ঘোরে। লালগুলার ওদিক পানে টেরেন যাওয়ার লোহার পুল হচ্ছে, সেখানে নরবলি না দিলে পুল খাড়া হবে নি। তাই ছেলেধরা বড়ো বোরা নিয়ে ঘুরচে ছেলে ধরতে। ওদের হাতে লাল গুলাপফুল থাকে। সেই গুলাপফুল মন্ত্ৰপুড়া। একবার নাকে শুঁকিই দিলে একেবারে রামছেলির মতুন হয়ে যাবি। অমনি খপ করে বোরায় ঢুকিয়ে নিবে তুরে, মা বলে চেঁচাতেও সময় পাবিনে। গুয়ারামের কথায় ভয়ে গায়ের নোম চেগে উঠত রঘুনাথের, মাকে জড়িয়ে ধরে শুলেও ভয় কাটত না, চোখ বুজলেই সেই জাদুকর আলখাল্লা পরা ছেলেধরাকে দেখতে পেত সে, ভয়ে হিম হয়ে যেত শরীর, কথা আটকে গিয়ে ঘড়ঘড় করত গলা।

 বুনো জামগাছের আড়ালে হাফ-প্যান্টুলুন ছেড়ে কালো প্যান্ট আর রঙচঙে জার্সি পরে নেয় রঘুনাথ। পোশাকটা পরার সাথে সাথে তার মনে হয় সে যেন জাতে উঠে গেল। এই পোশাক পরা অবস্থায় তার মা যদি একবার দেখতে পেত তাকে তাহলে পুত্রগর্বে বুক ভরে যেত মায়ের। মনে মনে সে ভাবল খেলা শেষ হয়ে গেলে এই পোশাকটা সে চেয়ে নেবে। গোল-পোস্টের সামনে চুন দিয়ে দাগ কেটে রেখেছে ক্লাবের ছেলেরা অনেক আগেই। শুধু গোল-পোস্টের সামনে নয়, খেলার মাঠের চারধারে চুনের দাগ লম্বা হাড়ের মতো শুয়ে আছে। গাঁ-ভেঙে লোক এসেছে খেলা দেখতে। আজকের খেলাটায় যে জিতবে সেই দলকে একটা কাপ আর সের পাঁচেক ওজনের খাসি উপহার দেওয়া হবে। যারা হারবে তারা খাসি পাবে না, শুধু পাবে ছোট একটা রানার্স কাপ। সূর্যাক্ষ এসব কথা পাখি পড়ানোর মত করে শিখিয়েছে রঘুনাথকে, ভালো করে খেলবি, আজ জিতলে রোববারে ফিস্ট হবে ক্লাব ঘরে। সেদিন খাসি কাটা হবে। তোরও নেমতন্ন থাকবে।

 খাওয়ার কথায় গায়ের জোর ফিরে পায় রঘুনাথ। সে খেলার কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝে নিয়েছে–বল কোনোমতে গোলের দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। যে আসবে বল নিয়ে তাকে ক্ষামি করে ফেলে দিতে হবে ফলে তার আর সাহস হবে না পুনরায় বল নিয়ে তার সামনে দাঁড়াবার। গায়ের জোরে সে যে এদের হারিয়ে দেবে-এ ব্যাপারে সে একশ ভাগ নিশ্চিত। সূর্যাক্ষ কেন ক্লাবের অনেক ছেলেই তার পায়ের শট পরীক্ষা করে দেখেছে। রঘুনাথের এক শটে বল চলে গিয়েছে বাঁধের ওপিঠে, যা অবিশ্বাস্য এবং চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়। যার শটে এত জোর সে কি মামুলি খেলোয়াড় নাকি। রঘুনাথের কদর বেড়ে গিয়েছে সেই থেকে।

 উৎসাহীদের ভিড় বাড়তেই খেলা শুরু হয়ে গেল রেফারির বাঁশি বাজার সাথে সাথে। সূর্যাক্ষ সেন্টার ফরোয়ার্ড খেলছে, ওর ডান পায়ের কাজ নিখুঁত, লক্ষ্যভেদ করতে পারে প্রতিকূল পরিবেশেও।

ব্যাক পজিশনে দাঁড়িয়ে সূর্যাক্ষের খেলা দেখছিল রঘুনাথ, হঠাৎ ওর পা গলে বল এসে পড়ল পেনাল্টি লাইনের কাছাকাছি, তাই দেখে শরীর নিয়ে কটাশের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল রঘুনাথ, গায়ের জোরে সে লাথ কষাল বলের মাঝখানে, ঘাস ছিলে গেল সেই শটের জোরে, বল গিয়ে পড়ল অন্য প্রান্তের গোলরক্ষকের হাতে। হাততালিতে ফেটে পড়ল দর্শকমহল। ওদের আনন্দ ভাসিয়ে নিয়ে গেল রঘুনাথকে।

খেলা শেষ হল দুই শূন্য গোলে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই সূর্যাক্ষ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল রঘুনাথকে, কী দারুণ খেললি রে তুই! আজ তোর উপর অসুর ভর করে ছিল।

.

০৪.

তারকের বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি, রঘুনাথ সবাইকে দেখিয়ে দিল ফুটবল কীভাবে খেলতে হয়। উরিব্বাস; ও যে ভাবে খেলল–তা কেবল স্বপ্নেই ভাবা যায়! রঘুর পিঠ চাপড়ে দিল তারক, আমাদের ক্লাবের সেক্রেটারি মদনদা রঘুকে দেখা করতে বলেছে। ও আজকের খেলার সেরা প্লেয়ার পুরস্কার পাবে। আঃ, যা লাগছে না আমার! তারক আর একবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। ওর যে ব্যস্ততার শেষ নেই। পুরস্কার বিতরণী সভা শেষ হতেই সাঁঝ নেমে এল বাঁধের ধারে। ধাওড়াপাড়ায় একা একা ফিরে যেতে হবে রঘুনাথকে, আজকে আর সূর্যাক্ষদের বাড়ি যাওয়া হবে না কোনো মতে। রাত করে ঘর ফিরলে দুর্গামণি ঘর-বার করবে, চুনারাম লাঠি হাতে অন্ধকারে বাঁধের উপর উঠে এসে ছানিপড়া চোখে দুরের গাঁখানার দিকে তাকাবে।

 খাড়া পথ বেয়ে বাঁধের উপর রঘুনাথ উঠে এল। বেশ ফুরফুরে লাগছে মনটা। বিরাট কোনো কিছু করে ফেলেছে এমন একটা অনুভব তার স্নায়ুতন্ত্রকে টান টান করে মেলে ধরতে চাইছে। ভালো লাগার অনুভূতিগুলো খ্যাপলা জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের রক্তজলে। এ সময় গাঙধারের ঝাউবনগুলোর দিকে তাকানো যায় না, মনে হয় ওরা গাছ নয়, এক একটা ঝাঁকড়া মাথার আগোলদার। ওদের হাতে লাঠি, কোমরে ফেট্টি দেওয়া ধুতি। পায়ের দশ আঙুল শেকড়ের মতো ছড়িয়ে আছে মাটির ভেতর।

রঘুনাথ ভাবছিল সূর্যাক্ষর সঙ্গে যাওয়ার সময় দেখা হলে ভালো হোত। ও যে কোথায় চলে গেল ওকে আর দেখতে পায় নি সে। মনটা খারাপ লাগছিল রঘুনাথের। আর ঠিক তখনই ফিকে আঁধারে সূর্যাক্ষ দৌড়াতে দৌড়াতে তার সামনে এসে হাজির হল, কী ব্যাপার তুই যে চলে যাচ্ছিস?

রঘুনাথ শান্ত চোখে তাকাল, ঘর তো যেতেই হবে। ঘর না গেলে মা খুব ভাববে। তাছাড়া বাবা ঘরে নেই। দাদু রাতে ভালো চোখে দেখে না। আমাকে যেতে হবে।

-যাবি মানে? আজ মা তোর জন্য রাঁধবে! আজ তুই আমাদের ঘরে যাবি। মাকে সেইমতো বলে এসেছি। সূর্যাক্ষ অবুঝ হয়ে উঠল।

রঘুনাথ মিনমিনে গলায় বলল, বললাম তো ঘরে যেতে হবে, ঘরে না গেলে মা চিন্তে করবে।

–ঠিক আছে, আমিও তোর সাথে যাবো।

–মিচিমিচি কেনে যাবি? রঘু বোঝাতে চাইল, পরে একদিন তোদের ঘরে যাব। আজ বাদ দে।

-তুই দাঁড়া, আমি আসছি। সূর্যাক্ষ রকেটগতিতে মাঠে নেমে গিয়ে সাইকেলটা বেল বাজাতে বাজাতে মাঠে নিয়ে এল, ওঠ।

–আমাকে চালাতে দিবি নে বুঝি? রঘুনাথ প্রশ্ন করল।

সূর্যাক্ষ আদেশের ভঙ্গিতে বলল, তোর এখন আরামের দরকার। চুপচাপ সাইকেলের পিছনে গিয়ে বসে পড়। তুই কি করে ভাবলি আমি তোকে একলা ছেড়ে দেব অন্ধকারে। যদি তোর কিছু হয়ে যায়?

–আমার কিছু হবে নাই। আঁধারে আমার চোখ জ্বলে। রঘু দাঁত বের করে হাসল। কিছুটা আসার পর মাঠ-পালানো হাওয়া আছড়ে পড়ল তার গায়ের উপর, সেই হাওয়া সারা গায়ে বুলিয়ে দিল শীতলতার চাদর। ধবধবে খড়ি ফোঁটা চালকুমড়োর মতো চাঁদ ফুটেছে আকাশে, ধীরে ধীরে অপসারিত হচ্ছে সাঁঝবেলার অন্ধকার, পোকামাকড়ের আজব ডাকে চেনা পৃথিবীটা জেগে উঠছে চোখের সামনে। আঁশশ্যাওড়া ঝোপের ভেতর থেকে একটা শেয়াল মোটা লেজ ফুলিয়ে মাঠের দিকে চলে গেল। রঘুনাথ বুঝতে পারল শেয়ালটা আখখেতের আল ধরে সোজা চলে যাবে বুড়ি গাঙের ধারে, ওখানের কাঁকড়ার গর্তে লেজ ঢুকিয়ে কাঁকড়া ধরে খাবে। মরা-কাঁকড়ার খোলা পায়ে লাগলে কেটে যায়, রক্তপাত ঘটতে পারে, তাই খালি পায়ে বুড়িগাঙের ধারে গেলেও রঘুনাথ খুব সতর্ক হয়ে চলা ফেরা করে।

পাকুড়তলায় এ সময় বুড়োথুড়োদের জটলা হয়, বিড়ির ধোঁয়ায় তৈরি হয় কৃত্রিম মেঘ, তার অনেকক্ষণ পরে রঘুনাথের ভেতরটা বিড়ি ফুঁকবার জন্য পুলিয়ে ওঠে। খুব ছোটবেলা থেকে সে নেশা-ভাং করছে, চুনারাম খুশি হয়ে তার মুখে মদ ঢেলে দিত, পাঁচুই ঢকঢক করে খাইয়ে দিয়ে বলত, খা দাদু, খা। হাড় শক্ত হবে।

 বিড়ি খাওয়াটা এখন আর রঘুনাথের কাছে কোনো সমস্যা নয়। সে খুড়া, দাদু, এমন কি বাপের সামনেও বিড়ি টানে। দুর্গামণিরও বিড়ির নেশা জব্বর, আগে সে চাষ-কাজে যেত মাঠে তখন গোটা দশেক লাল সুতোর বিড়ি না হলে কাজে তার মন বসত না। গুয়ারাম সতর্ক করত, অত খাসনে রে বউ, ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। নেশা রঘুনাথের জীবনে বুড়িগাঙের জলের মতো ছুঁয়ে আছে, এর থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় নেই, নেশা যেন পাখি ধরার ফাঁস হয়ে চেপে বসেছে গলার উপর।

পাকুড়তলায় আর দাঁড়াল না সূর্যাক্ষ, তার তাড়া আছে, রঘুনাথকে সঙ্গে নিয়ে তাকে আবার গাঁয়ে ফিরতে হবে, না হলে চিন্তায় ভেঙে পড়বে মীনাক্ষী। কপোতাক্ষ সাধারণত ঘরে খুব কম থাকে, বাঁধে-বাঁধে সাইকেল নিয়ে তিনি চলে যান কদবেলতলা ধাওড়া, হলদেপোতা, কমলবাটি আর বসন্তপুর ধাওড়া। মানুষগুলোর প্রতি যত দিন যাচ্ছে তার দায়িত্ব বাড়ছে। সূর্যাক্ষকে তিনি বলেছেন, তৈরি থাকো। শ্ৰেণী-সংগ্রাম আবশ্যক। আমাদের লড়াই করে সুখ-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে হবে। ব্রিটিশ পরবর্তী সামন্তপ্রভুরা আমাদের হাতে ভালোবেসে ক্ষীরের সন্দেশ তুলে দেবে না।

কপোতাক্ষর কথাগুলো বড়ো অস্পষ্ট আর ধোঁয়াশা লাগে সূর্যাক্ষর। সংগ্রাম কথাটার অর্থ সে সঠিক জানে না। কদবেলতলা ধাওড়ার বিদুর রাজোয়ার গলার রগ ফুলিয়ে বলে, এ অত্যাচার বঞ্চনা বেশি দিন চলতে পারে না। আগে আমরা এক গালে চড় খেয়ে অন্য গাল বাড়িয়ে দিয়েছি। এখন যুগ পাল্টাচ্ছে। চড়ের বদলে লাথি মারতে হবে ওদের। আমি লেনিন পড়িনি, মার্ক পড়িনি। ওরা কে আমি জানি নে। জানার দরকারও নেই। আমি শুধু জানি-লাঙ্গল যার, জমি তার। যে ভাগের জমি কেড়ে নিতে আসবে তার কাটামুণ্ডু জমির আলে শুইয়ে দেব আমরা।

 বুনোপাড়ার ঘরগুলোয় টিমটিম করে বাতি জ্বলে। বেশির ভাগই লম্ফো, ডিবিরি, সলতে পাকানো তেলের প্রদীপ। একমাত্র লুলারামের ঘর ছাড়া আর কারোর ঘরে হ্যারিকেন নেই। ফলে একটু বেশি হাওয়া বইলে বাতি নিভে যায়, ঘুরঘুটি অন্ধকার হামলা চালায় বিনা বাধায়। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে। এখনও কারোর কেরোসিন তেল কেনার সামর্থ হল না। দারিদ্রসীমার অনেক নীচে বাস করে ওরা। মাঝে মাঝে রঘুনাথের এসব দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে না, তার মাথায় বিষপোকা কামড়ে দেয়, বড়ো বড়ো শ্বাস ছেড়ে সে দুর্গামণির মুখের দিকে তাকায়, কথা আটকে যায় তার মুখগহ্বরে।

সাইকেলটা উঠোনে ঢুকিয়ে বড়ো করে শ্বাস ছাড়ল সূর্যাক্ষ। তার কানে ভেসে এল ঢিলির এলোমেলো গানের স্বরলিপি। গরমটা আজ একটু কম তবু ঢিলির গানের কোনো বিরাম নেই।

এসব এড়িয়ে রঘুনাথ মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, হাঁ দেখ মা, কী এনেচি তুর জন্যি।

–হায় বাপ, কুথায় পেলিরে এমুন বাবু জিনিস? বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল দুর্গামণির।

রঘুনাথের মোটা ঠোঁটে গর্বিত হাসি, বল খেলতে গিয়েচিলাম, বাবুরা দেলে গো! রঘুনাথ হঠাৎ করে সূর্যাক্ষর দিকে তাকাল, ওকে বসতে না বলার জন্য মনে মনে অনুতপ্ত হল সে। এক সময় নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, মারে, আজ আমি ঘরে খাবনি। সূর্য আমারে লিতে এয়েছে। আমি ওর ঘরে গিয়ে খাবো।

–সে তো মানলাম কিন্তু অত রাতে আসবি কী করে? দুর্গামণির কপালে চিন্তার রেখাগুলো নেচে উঠল।

সূর্যাক্ষ এদের আলোচনায় অংশ নিল, কাকিমা, রঘু আজ ফিরবে না। খেয়ে-দেয়ে রঘু আর আমি এক সাথে ঘুমিয়ে যাবো।

-রঘু যে যাবে তুমার মা জানে?

-হ্যাঁ, মা-ই তো বলেছে রঘুকে নিয়ে যেতে। সূর্যাক্ষ বোঝাল, রঘু না গেলে মা মন খারাপ করে বসে থাকবে।

একটা অস্বস্তি দুর্গামণির গলায় ঘোঁট পাকাচ্ছিল, তার থেকে মুক্তি পেতে সে নির্দ্বিধায় বলল, তুমি খাটে শুয়ে, আমার ঘরের রঘুরে নীচে বিছানা করে দিবে।

-তা কেন হবে? আমরা তো এক সাথে ঘুমোবো। ঘুমাতে ঘুমাতে কত গল্প হবে। সূর্যাক্ষ যেন সব দেখতে পেল।

-কী জানি বাবা, আমার ডর লাগে। দুর্গামণি পানসে হাসি দিয়ে নিজের ভয়টাকে লুকাতে চাইল। যুগ বদলেছে কিন্তু তার কোনো আলো ওদের পাড়ার উপর পড়ে নি। এখনও গাঁওবুড়ো রাজ করে চলেছে। চাপা কলটা খারাপ হয়ে গেলে সারাবার লোক আসে না বিডিও অফিস থেকে। অনেকেই গায়ে ছোঁয়া লাগলে ঘেন্নায় নাক কুঁচকায়, দিলি তো ছুঁয়ে, এখন আমাকে ফিরে নাইতে হবে।

এখনও পাল-খেদানোর মুড়ি দেয় গেরস্থ। এমনভাবে দেয় যাতে ছোঁয়া না লাগে শরীরে। দুর্গামণি সব বুঝলেও মুখে তার কোনো ভাষা নেই, শুধু চোখের জল আগুনের অক্ষর হয়ে ঝরে পড়ে!

আঁচলে চোখের জল মুছে নিয়ে দুর্গামণি উদাস হয়ে গেল, তুর দাদুরে বলে যাবিনে? ঘরে এসে বুড়ামানুষটা কি ভাববে বল তো? শেষবেলায় আমাকে গাল মন্দ করবে।

দাদু কুথায়? রঘুনাথের প্রশ্নে দুর্গামণি আঁধার পথের দিকে তাকাল, সে গিয়েছে দুলাল ঠাকুরপোর ঘরে। তার সাঁঝবেলায় আসার কথা। তুর বাপের খপর না পেলে বুড়াটা মনে হয় পাগল হয়ে যাবে।

–পাগল হওয়ার কি আছে, মা? রঘুনাথের অবাক চোখে প্রশ্ন বিছিয়ে গেল।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কষ্ট করে হাসল দুর্গামণি, ও তুই বুঝবিনে বাপ, বড় হ, তারপর বুঝবি। এট্টা ধানে যে এট্টা চাল হয়–এ হিসাবের মতো জেবনটা অত সহজ নয়। বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চুনারাম, আঁধারে সে সাহস করে বেরিয়ে ফেঁসে গেছে। রাতকানা মানুষের এই এক সমস্যা।

 চুনারামকে দেখে রঘুনাথ জলের মাছের মতো স্মৃতিতে টগবগে হয়ে উঠল, দাদু, আজ আমি নতুন-গাঁয়ে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে সূর্য আচে।

কে সূর্য? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল চুনারাম।

 বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে রঘুনাথ মিষ্টি করে হাসল, নতুন গাঁয়ে ঘর। তুমি ওকে দিনের বেলায় দেখেচো। ওর বাপের নাম কপোতাক্ষ। পার্টি করে। কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘোরে গো!

.

০৫.

অন্ধকারের হাজার রূপ। আঁধার রাতে রঘুনাথের বুঝি চোখ জ্বলে, সে সাঁই সাঁই করে সাইকেল হাঁকায়, এঁড়ে গোরুর মতো হাঁপিয়ে ওঠে তবু ক্লান্তির কথা সে মুখ ফুটিয়ে সূর্যাক্ষর কাছে বলে না। সাইকেল চালানো এখন তার কাছে নেশার চাইতেও বেশি কিছু। সূর্যাক্ষ তার এই অতিরিক্ত আগ্রহকে ভয় পায়, বলা যায় না কখন কি হয়, তখন বিপদে পড়ে যাবে ওর পরিবার।

গাঁয়ে ঢোকার আগেই আলোর ফুটকিগুলো নাচতে লাগল চোখের তারায়। একটা পেঁচা গোমড়া মুখ নিয়ে উড়ে গেল পিটুলিগাছের মাথা থেকে। ঢালু বলে সাইকেল থেকে নেমে পড়েছে সূর্যাক্ষ আর রঘুনাথ। ধুলো পথে ওরা পাশাপাশি হাঁটছে। দুপাশে বাঁশবন আর ছোট ছোট ঝোপঝাড়। ঝিঁঝি পোকার ডাকের ভেতর থেকে আলো ছুঁড়ে দিচ্ছে অসংখ্য জোনাকি পোকা। আলোগুলো জ্বলছে, নিভছে বেশ ছন্দোবদ্ধ, চোখে রাতের আবেশ বুলিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। ধুলোভরা পথের শরীর এখন নরম হয়ে আছে, এদিককার ধুলোর রূপ ভারী সুন্দর, বড়ো ঘরের ফর্সা টুকটুকে মেয়ের মতো তার ঘি-বর্ণ গায়ের রঙ, মোলায়েম, নরম একেবারে ধূলিচন্দনের চেয়েও সুন্দর। এই ধুলো পথ দু একবার বৃষ্টি হলেই মাখা ময়দার মতো চ্যাটচ্যাটে হয়ে যাবে, তখন কাদায় ভরে যাবে সারা পথ, হাঁটা চলায় মানুষের রাজ্যের অসুবিধা।

আজ আকাশে ফ্যাকাসে একটা চাঁদ উঠেছে, হাওয়া বইছে মৃদুমন্দ। আশেপাশের ঝোপ থেকে ভেসে আসছে রাতফুলের ঘ্রাণ। বেশ উগ্র সেই সুগন্ধ। সূর্যাক্ষ হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল, দাঁড়া তো। আঃ, কী সুঘ্রাণ রে! মনে হচ্ছে কাঁঠালীচাঁপা ফুল ফুটেছে। গন্ধটা চিনতে পারছিল না রঘুনাথ, সূর্যাক্ষ নির্দিষ্ট করে বলাতে সে মনে মনে মিলিয়ে নিল গন্ধটা, দুইয়ে-দুইয়ে চার হয়ে যেতেই তার পুরু ঠোঁটেও খুশি গড়িয়ে পড়ল, ঠিক বলেছিস সূর্য, এ ঘ্রাণ কাঁঠালীচাঁপা ফুলের ছাড়া অন্য কোনো ফুলের হতে পারে না। দিনের বেলায় হলে এক ছুটে গিয়ে তোকে ফুল পেড়ে দিতাম।

 সূর্যাক্ষর কমনীয় কণ্ঠস্বর, জানিস রঘু, মা কাঁঠালীচাঁপা ফুল ভীষণ পছন্দ করে। আমাকে প্রায় বলে ফুল এনে দিতে। কিন্তু রাস্তার ধারে গাছ, কখন ফোটে, কে তুলে নিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না।

–আমাদের পাড়ায় একটা মস্ত কাঁঠালীচাঁপা গাছ আছে। ওর পাতাগুলান এই খরার দিনেও তেলতেলে। রোদ পড়লে দেবদারু পাতার মতো চকচক করে। জানিস, আগে আমার মায়ের মুখ ওই কাঁঠালীচাঁপা পাতার চেয়েও চকচকে ছিল। এখন খাটতে গিয়ে খসখসে ডুমুরপাতা। মাকে দেখলে আমার ভেতরটা কষ্টে মোচড় দিয়ে ওঠে। আমার আর তখুন বেঁচে থাকতে সাধ যায় না। রঘুনাথের গলার স্বর আর্দ্র হয়ে উঠল, তুই দাঁড়া, আমি দেখচি কাঁঠালীচাঁপা ফুল পাওয়া যায় কিনা। আমি ঘেরাণ শুঁকে ফুলের কাছে পৌঁছে যেতে পারি।

-না। খবরদার যাবি নে। সূর্যাক্ষ চেঁচিয়ে উঠল ভয়ে, ওখানে সাপ আছে। কাঁঠালীচাঁপা ফুলের গন্ধে বিষধর সাপ আসে। দিনেরবেলায় এ গ্রামের বহু মানুষ তা দেখেছে।

-সাপ আমার কি করবে রে, সাপকে আমি থোড়াই ডরাই! আমি বুনো ঘরের ছেলে, সাপ-পোকামাকড় আমার কুনো ক্ষতি করতে পারবে না। রঘুনাথ কথা না শুনে রাস্তা থেকে নেমে ঝোপের দিকে চলে গেল। কাঁঠালীচাঁপা গাছটা অন্ধকার গায়ে জড়িয়ে সাঁওতাল যুবতীর মতো শুয়েছিল আকাশের তলায়। রঘুনাথ হাতড়ে হাতড়ে আন্দাজে ঠিক পৌঁছে গিয়ে ছুঁয়ে দিল গাছের সরু ডাল। মনে মনে ভাবল চাঁদ যদি আর একটু জ্যোৎস্না দিত তাহলে কত ভালো হত। তবু সে দমল না। হাত বাড়িয়ে একসময় খুঁজে নিল ফুলটা। পৃথিবী জয় করে আসার আনন্দ তার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল। কাঁঠালীচাঁপা ফুলটা সূর্যাক্ষর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, যাক মনে বড়ো শান্তি হচ্ছে। যদি ফুলটা পাড়তে না পারতাম তাহলে মনে মনে এট্টা দুঃখ হোত।

 সূর্যাক্ষ চুপ করে থাকল। আর ক’পা এগোলেই বুড়ো নিমগাছটাকে দেখতে পাবে সে। এখানে মাচা বেঁধে বয়স্করা তাস পেটায়। হাজার কথার ফোয়ারা ছোটে সন্ধের পর থেকে। দীনবন্ধু নতুন রেডিও কিনেছে কালীগঞ্জ বাজার থেকে। সেই রেডিওটাকে গোল করে ঘিরে থাকে প্রায় জনা দশেক মানুষ। ওরা খবর শোনে, গান শোনে। যাত্রা বা নাটক হলে এই ভিড়টা আরও বেড়ে যায়, তাদের হল্লা থামাতে দীনবন্ধু মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে, এই তোরা থামবি, যদি না থামিস তাহলে রেডিও আমি ঘরে দিয়ে আসব। ঘরে মেয়েরা শুনবে, তখন বুঝবি মজা।

রেডিও চলে যাওয়া মানে আসরের প্রাণ চলে যাওয়া ফলে হৈ-হট্টগোল থেমে যায় চোখের পলকে। মানুষের আগ্রহ-কোলাহল ফুটরসের গুড়ের মতো জুড়াতে থাকে। রাত বাড়লে এই আসর ভেঙে যায়, তখন যে যার মতো ঘরে ফিরে যায় বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে। গ্রামসমাজে বিড়ির প্রভাব অনস্বীকার্য। দীনবন্ধু রসিকতা করে বলে, কেঁদুপাতা আমাদের কাঁদিয়ে ছাড়বে গো! ধোঁয়া গিলতে গিলতে আমাদের ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। তবু আমাদের হুঁশ নেই।

প্রভাত মজা করে বলল, বিড়িকে বিড়ি বললে অপমান করা হয় দাদা। লাখুরিয়া গিয়ে শুনে এলাম–ওরা বিড়ির এট্টা আলাদা নাম দিয়েছে। শুনবা? মাজায় দড়ি, খাকি চেহারা। মেজাজ কড়া। সাদা কাঠি ওর কাছে পাত্তা পায় না। বিড়ি হলে গিয়ে গাঁ-ঘরের বুনো বাউরির বিটি, আর সাদা কাঠি মানে সিগারেট হলো গিয়ে বাবুঘরের ঝিউড়ি, দেখতে ভালো, কিন্তু খাটতে পারে না। আর স্বাদেও মন ভরে না। নেশা হওয়া তো দূরে থাক নেশা চটকে যায়। তোমরা এ ব্যাপারে কি বলো হে?

নিমতলার মাচায় গবেষণার শেষ নেই। এ বছর ফলন মেন হবে, কার মেয়ে কার সাথে পালাল, পেট ধসাল সব। তবু এই নিমতলা সূর্যাক্ষর বুকের মধ্যে কাঁপুনি তোলে। এখান দিয়ে যাওয়া-আসার সময় ওর চোখ চলে যায় পুরনো, ছিরিছাঁদ হীন, নোনাধরা ঘরখানার দিকে। ওই হুমড়ে পড়া জরাজীর্ণ পাকা ঘরটাকে তার মনে হয় তাজমহলের চেয়েও সুন্দর। ওখানে যে দ্বীপী থাকে। দ্বীপীর কথা রঘুকে বলা হয়নি তার। সেই সুযোগও আসে নি। তবে সময় করে সব বলতে হবে ওকে।

নিমতলার বাঁক পেরিয়ে এলে সূর্যাক্ষদের পাকা দোতলা বাড়িটা চোখে পড়বে। দোতলা অবধি লতিয়ে উঠেছে মাধবীলতার গাছ, থোকা থোকা ফুল বছরের সব সময় ফুটে থাকে, বিশেষ করে রাতের দিকে সুগন্ধ উজাড় করে ঢেলে দেয়, ঘরের পরিবেশ পুরোপুরি পাল্টে যায়, মনের অন্তঃস্থলে ভালোলাগার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো টান টান হয়ে ওঠে। মাধবীলতার গাছটা ছাড়া ওদের ঘরের সামনের বাগানটায় শোভা পাচ্ছে হাসনুহানা গাছটা। হাসনুহানার সবুজ সংসারটা বেশ গোছানো। কাতার দড়ি দিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া ডালপালাকে বেঁধে দিয়েছে সূর্যাক্ষ, বেঁধে না দিলে ওরা মাটিতে লুটায়, যেন ওদের কেউ দেখার নেই এ সংসারে। গরমের সময় গাছটাতে কুঁড়ি ভরে যায়, রাতে ফুলগুলো ওদের ছোট্ট শরীর দেখিয়ে হেসে ওঠে, অমন সাদা হাসি ফুল আর শিশু ছাড়া আর কেউ হাসতে পারে না। হাসনুহানার উগ্র সুবাস বাতাসকে মাতাল করে তোলে। দ্বীপী বেড়াতে এলে গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে, অমন একাগ্র দৃষ্টিতে ও কী যে দেখে তা অনুমান করা যায় না। সূর্যাক্ষ কোনো প্রশ্ন করলে নিরুত্তর হাসে। দ্বীপীর এই হাসি সূর্যাক্ষকে পাগল করে দেয়। সে দ্বীপীর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর শরীর থেকে হাসনুহানার সুবাস চুরি করে নেয়। টোকা মেরে বলে, গাছটা তোর পছন্দ? নিবি?

 দ্বীপীর ডাগর ভাসা চোখের দৃষ্টি থেকে হাসির রেশ মেলায় না, তুই আমাকে এই গাছটার চারা এনে দিবি, কোথায় পাবি?

-সে যেখানেই পাই, তুই নিবি কিনা বল?

–নেব তো বললাম।

-রোজ জল দিতে হবে কিন্তু। সূর্যাক্ষর কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে এল, আর একটা কথা। গাছটা আমরা দুজনে মিলে লাগাব। কি রাজি আছিস তো?

-হঠাৎ এমন শখ? দ্বীপী তরল করে হাসল।

-না, তেমন কিছু নয়। মনে হল তাই বললাম। অবশ্য রাজি হওয়া না হওয়া সব তোর উপর নির্ভর করছে। এ তো জোর করার জিনিস নয়। সূর্যাক্ষ কথাগুলো যেন দ্বীপীকে নয়, নিজেকে শোনাল।

দ্বীপী অবাক হল না, সে স্বতঃস্ফূর্ত স্বরে বলল, এতে রাজি না হওয়ার কি আছে। সমরবাবু আমাদের গাছ লাগাতে বলেছেন। গাছ লাগালে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা পাবে। ছায়ায় ভরে যাবে আমাদের গ্রাম।

 সমরবাবু যে গাছ লাগানোর কথা বলেছেন সে তো ফুলগাছ নয়। তাছাড়া ফুলগাছের আয়ু কম। একটা হাসনুহানা গাছ আর কত বছর বাঁচে। সূর্যাক্ষর এ সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হয়, মা যদি পাল্টা কোনো প্রশ্ন করে।

একটা হ্যারিকেন টানা বারান্দার মাঝখানে বসানো থাকে। হলদেটে আলো ঢেকে দেয় বারান্দার অন্ধকার। এদিকটায় এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। আগামী বিশ বছরে আসবে কিনা সন্দেহ আছে কপোতাক্ষ’র। এ বিষয়ে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা দরকার। গম পেষাতে এখানকার মানুষকে যেতে হয় লাখুরিয়া কালীগঞ্জ। ওখানে ডায়নোমো চলে, গলগল ধোঁয়া আর বিকট ভট ভট শব্দ। সেই ডাইনোমো আটাকলের মেসিন ঘোরায়, গম পিষে গিয়ে সাদা আটা বাতাসে ওড়ে। সের প্রতি পেষাই খরচ গুণে নেয় চাকির মালিক।

সূর্যাক্ষ বাইরে দাঁড়িয়ে মা’ বলে ডাকতেই ভেতর থেকে সাড়া দিলেন মীনাক্ষী। ব্যস্ত পায়ে তিনি দরজা খুলে শুধোলেন, এত দেরি হলো যে। আমি তো ভাবছিলাম কি হল আবার।

-কী আবার হবে, রঘুর জন্য দেরি হয়ে গেল। সূর্যাক্ষ বলল, ওর আসার কোনো ঠিক ছিল না। বল খেলার পর ও বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। আমি ওর মাকে বলে জোর করে নিয়ে এলাম।

মীনাক্ষী হ্যারিকেনের বাতিটা উসকে দিলেন, সামান্য উঁচুতে হ্যারিকেনটা উঠিয়ে ধরে তিনি রঘুর দিকে নিবিষ্ট চোখে তাকালেন, ঘরে এসো বাবা। সূর্যের মুখে আমি তোমার অনেক গল্প শুনেছি। আজ আসতে পেরেছ, বেশ ভালো হল। আসা-যাওয়া না থাকলে সম্পর্ক স্থায়ী হয় না।

রঘুনাথ কি বলবে ভাবছিল, তার ভেতরে অস্বস্তির আস্তরণটা ক্রমশ মোটা হচ্ছিল। এমন পরিবেশে আসা তার জীবনে এই প্রথম। এরা কি জানে না তার বুনোপাড়ায় ঘর, ছোট জাত বলে গ্রামের অনেকেই তাদের ঘৃণার চোখে দেখে। সব জেনে শুনেও এমন আদর আপ্যায়ন তাকে বিস্মিত করল। ঘটনাটা সে ঘরে গিয়ে চুনারামকে বললে সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইবে না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মোচ নাচাবে, ওসব হল গিয়ে বাবু ভদ্দর লোকদের ভান। ও ফাঁদে পা দিস নে দাদুরে, ভুসভুসিয়ে সার গাদার মতো তলিয়ে যাবি, শ্বাস নিতে পারবি নে। এই অবিশ্বাস এক দিনের নয়, বহু জন্মের। এ এক অভিশাপ।

সূর্যাক্ষ কি শাপমুক্ত করতে তার জীবনে উদয় হয়েছে? রঘুনাথের সংশয় তখনও কাটে না। সে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে আছে মীনাক্ষীর মুখের দিকে। এমন সুন্দর মেয়েমানুষ সে কালীগঞ্জে কালীপুজোর সময় দেখেছে। সচরাচর এরা ঘরের বাইরে আসে না, উৎসব পার্বণের কথা আলাদা।

 মীনাক্ষী রঘুকে বললেন, তুমি বসো। আমি তোমাদের জন্য জলখাবার করে আনি। রঘুর খিদে পাচ্ছিল তবু সে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, জলখাবারের দরকার হবে নি। রাতে আমি ভিজে ভাত খাই। মা আলু মাখা দেয়। আলু মাখা আর পেঁয়াজ দিয়ে ভিজে ভাত খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। ভিজে ভাতে খিদে মরে।

মীনাক্ষীর ঠোঁটে রঘুর সরলতার সমর্থনে হাসি ফুটল, আজ আর ভিজে ভাত খেতে হবে না, আজ গরম ভাত খেও। আমি তোমাদের জন্য ভাত রেঁধেছি। পুকুরে জাল ফেলা হয়েছিল। পুকুরের রুই মাছের ঝোল রেঁধেছি।

রঘুর জিভে জল এলেও নিজেকে সংযত করল সে। ভালো খাওয়া তার কপালে জোটে কোথায়? বাবুদের ঘরে মোহৎসব থাকলে সেদিনটা ভোজ খাওয়ার দিন। শালপাতায় ভাত, কুমড়োর ঘন্ট আর ডাল খেতে কী যে আনন্দ। টমাটোর চাটনি যদি তার সঙ্গে হয় তাহলে তো আর কথা নেই। রাত্রিকালে মহোৎসব খেতে গেলে টায়ার ধরিয়ে নেয় রঘু, পুরনো টায়ার পোড়ে চড়বড়িয়ে, হালকা লালচে আলোয় পথ দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না। সেই খুশির দিন বুঝি সূর্যাক্ষ তাকে ফিরিয়ে দিল। রঘুর চোখ করকরিয়ে ওঠে দুর্বলতায়, তার সামাজিক অবস্থানের কথা বিচার-বিবেচনা করে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিজেকে তখন আর ছোট মনে হয় না, মনে হয় সেও এই এলাকার একজন, তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে সবার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। ফলে আর গুটিয়ে থাকা নয়, এবার থেকে তার নিজেকে মেলে ধরার সময়।

খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকতে রাত্রি হল। রঘুনাথের জীবনে এই প্রথম এত ভালো ভালো খাবার খাওয়া। খাওয়ার সময় দুর্গামণির কথা তার খুব মনে পড়ছিল। বার দুই বেদম কাশিতে কাহিল হয়ে পড়েছিল তার মা, শেষে কালীগঞ্জ হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে সে ভালো হল। হাসপাতালের বড়ো ডাক্তার বলেছিলেন, যা খাবে পেট ভরে খেতে হবে। দিনভর মাঠেঘাটে খাটতে গেলে খাওয়ার দরকার। বুকের রোগ ধরে গেলে তখন আর বাঁচানো যাবে না।

 বুকের রোগ মানে যক্ষ্মা। আতঙ্কিত গুয়ারাম সেদিন গালে হাত দিয়ে বসেছিল। দুর্গামণির কিছু হয়ে গেলে সে-ও পঙ্গু। এ সংসার টানবে কে। আর এই বয়সে ফের ঘরের চালে চড়ে বিয়ের নাটক করা যাবে না। সেদিন থেকে দুর্গামণির মাঠে খাটতে যাওয়া বারণ। এমন কী নেশার জিনিস সে কু নজরে দেখবে, সাধ হলেও ছুঁয়েও দেখবে না।

ভালো-মন্দ খাওয়ার সময় রঘুনাথের হাত আর মুখের কাছে উঠতে চায় না। যেন শিরায় খিঁচ ধরেছে হঠাৎ এমনভাব। মনটা কোথায় যেন উড়ে পালায়, কিছুতেই আর স্বাভাবিক হতে চায় না।

 মীনাক্ষী বলেন, খেয়ে নাও, কী ভাবছো?

-না, কিছু না। রঘুনাথ নিজেকে আড়াল করে নিজের গভীরে। শামুক লুকানো বিদ্যা সে বুঝি শিখে ফেলেছে।

সূর্যাক্ষ তার অস্থিরতা অনুমান করে নিজেই কেমন অস্থির হয়ে উঠল, কী ব্যাপার রঘু, খাচ্ছিস যে! মা’র রান্না বুঝি ভালো হয়নি? সংকোচে রঘুনাথ যেন মাটিতে মিশে যেতে চায়, না, না, তা নয়।

–তাহলে কি?

–মার কথা খুব মনে পড়ছে। মা তো এত ভালো খাবার কুনোদিন খায়নি। রঘুনাথ ছুঁয়ে দেওয়া লাজবন্তী লতার মতো কুঁকড়ে গেল।

–তুই খেয়ে নে। কাল যাওয়ার সময় মাসীমার জন্য পাঠিয়ে দেব। সূর্যাক্ষ ওর মায়ের দিকে তাকাল। মীনাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তুমি কিছু ভেব না বাবা। আমার মাথায় থাকবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। ঘন করে কলাই ডাল মীনাক্ষী রেঁধেছেন নারকেল কোরা দিয়ে। এক হাতা ডাল রঘুনাথের পাতে দিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকালেন, কী আশ্চর্য, এখনও মানুষটা ঘরে ফিরল না!

-বাবা কোথায় গিয়েছে মা? সূর্যাক্ষও অবাক।

 মীনাক্ষী গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, তোর বাবা কোথায় যায় আমাকে কি বলে যায়? আমাকে বলে যাওয়ার তার সময় কোথায়? দেশোদ্ধারের কাজ করতে গিয়ে ঘরটাকে ভুলতে বসেছে। আমার আর ভালো লাগে না হাঁপিয়ে উঠেছি। সূর্যাক্ষ কার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে ভেবে পেল না। এ সময় চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ঘরে উঠে এল ওরা। আগে থেকে বিছানা পাতাই ছিল। কী সুন্দর ফুলছাপা একটা চাদর ঘরটায়। চেহারাই বদলে দিয়েছে জ্যোৎস্না রাতের মতো। কোথায় একটা পেঁচা ক্রাঁও ক্রাঁও শব্দে ডেকে উঠল। তারপরে চুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল শুকনো বাঁশপাতার উপর। পাশের বাঁশবাগান থেকে ইঁদুর আর কালপেঁচার ঝটপটানির শব্দ এল! শিরদাঁড়া টান টান করে খাটের একপাশে বসে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকল রঘুনাথ। পেঁচা ধাওড়া পাড়াতেও আছে, এখানকার পেঁচাগুলো বুঝি বেশি হিংস্র।

সূর্যাক্ষ নীরবতা ভঙ্গ করল, পান খাবি?

পান আমার ভালো লাগে না। রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল।

–তাহলে মৌরি?

–ওসব আমার অভ্যেস নেই। রঘুনাথ উসখুশিয়ে উঠল।

সূর্যাক্ষ দুম করে বলে বসল, তাহলে কী খাবি? আমি তো খাওয়ার পরে একটা নাম্বার টেন সিগারেট খাই। না খেলে আমার ঘুম পেয়ে যায়। পরীক্ষা থাকলে দু-চারটে তো খেতেই হয়, নাহলে পাশ করতে পারব না যে।

–তুর বাবা-মা জানে না? বিস্ময়ের বাঁধ ভেঙে গেল রঘুনাথের।

সূর্যাক্ষ দরাজ গলায় হেসে উঠল, বাবা একদিন দেখে ফেলেছিল তবে বকেনি। শুধু বলল-তোমার এখন সিগারেট খাওয়ার বয়স হয়নি। খাচ্ছো যখন বেশি খেও না। ওষুধের মতো পরিমাপ করে খেও।

তার মানে?

–মানেটা বুঝলি না? সূর্যাক্ষ বেশ মজা করে বলল, বাবা বলেছে–একটা দুটো খেতে। তার বেশি যেন না হয়। আসলে গরিব পার্টি করে তো। গরিব মানুষের দামি জিনিস বেশি খাওয়া ভালো নয়।

-তোর কাছে বিড়ি আচে? রঘুনাথ সাহস নিয়ে বলে ফেলল কথাটা, কালীপুজোর রাতে থাকা দেখতে গিয়েচিলাম। সেদিন প্রথম বাঁধের ধারের দুকান থিকে সিকারেট কিনে খাই। বড়ো কড়া মাল। গলায় ধুয়ো আটকে গিয়েচিলো। তামুকটা তিতা-তিতা, জিভে লাগলে চড়বড় করে জ্বলে।

 সূর্যাক্ষ উঠে গিয়ে বইয়ের তাকটার কাছে দাঁড়াল। বই ভর্তি তাকের ভেতর থেকে সে বিড়ির বান্ডিলটা বের করে আনল। একটা রঘুনাথকে দিল, নে ধরা।

-দেশলাই না দিলে কি হাওয়ায় বিড়ি ধরে?

–ও হো। ভুল হয়ে গিয়েছে। সর্যাক্ষ বিছানার তলা থেকে লুকোনো দেশলাইটা বের করে দিল। শুধু রঘুনাথ নয়, সে নিজেও একটা বিড়ি ধরিয়ে মৌজ করে টান দিয়ে বলল, বিড়ি হল গিয়ে আয়ুবর্ধক ধূম্র টনিক। যে খেয়েছে সেও পস্তায়, আর যে খায়নি সে-ও পস্তায়। এ হল গিয়ে শাঁখের করাত। যেতে কাটে, আসতে কাটে। দুনিয়া ঘুরে এলে এর তুলনা পাওয়া ভার।

 রঘুনাথ অর্ধেক কথা না বুঝে বোঝার মতো মুখ করে তাকাল। তখনই নীচ থেকে ডাক ভেসে এল মীনাক্ষীর। উদ্বেগ ভরা গলা। ব্যস্ত হয়ে উঠল সূর্যাক্ষ, এই রে, মা ডাকছে। মৌরির কৌটোটা কোথায় রাখলাম? বিছানার উপর তো রেখেছিলাম। বিছানার উপরে মৌরির কৌটো ছিল না, ওটা ছিল বইয়ের তাকে। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেতেই গুচ্ছের মৌরি মুখে পুরে দিল সূর্যাক্ষ, তুই বস। আমি আসছি।

দক্ষিণ খোলা ঘর, হাওয়া এসে অবাধে হাডুডু খেলছে ঘরের ভেতর। পাতলা পর্দা তিরতির করে উড়ছে সেই হাওয়ার আদরে। পাশের বাঁশবন থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে কোঠরা ব্যাঙের ডাক। আশেপাশে কোথাও বুঝি চামচিকির বাসা আছে, বিদঘুঁটে গন্ধে নাক কুঁচকে যাচ্ছে রঘুনাথের।

মিনিট দশেক পরে কাঠের সিঁড়ি কাঁপিয়ে ফিরে এল সূর্যাক্ষ, মা এখনও খায়নি। বাবার ভাত আগলে বসে আছে। আমি কত বললাম খেয়ে নিতে। কিছুতেই খাবে না। পতিভক্তির জ্বলন্ত উদাহরণ। পেটে জ্বালাপোড়া শুরু হলে বুঝবে!

–তুর বাপ কি সবসময় অমন দেরি করে?

সূর্যাক্ষ অন্যমনস্ক হয়ে গেল, বাবার এই এক দোষ। সময়জ্ঞান থাকে না। হঠাৎ বাইরের গেট খোলার শব্দ হল। ঘড়িতে পেন্ডুলাম মাথা ঠকল বারো বার। সূর্যাক্ষ ঢিল ফেলা পুকুরের মতো চঞ্চল হয়ে উঠল, এই বাবা এল। যাক, বাঁচা গেল। নাহলে এত রাতে মা আমাকে খুঁজতে পাঠাত।

-তুর বাপ যে এয়েচে কি করে বুঝলি? রঘুনাথ নিজেকে চালাক ভেবে প্রশ্ন করল। সূর্যাক্ষ বলল, বাবার গেট খোলার কায়দাটাই আলাদা। গেট খোলার শব্দ শুনে আমি বলে দিতে পারি কে এসেছে।

–ভারী মজার তো! রঘুনাথ সুতোর কাছাকাছি আগুন এসে যাওয়া বিড়ির টুকরোটা নিভিয়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল। সূর্যাক্ষ কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে তার মুখোমুখি বসল, তোকে একটা কথা বলা হয়নি।

-কী কথা? রঘুনাথ আগ্রহ প্রকাশ করল না।

–থাক, কাল বলব।

 রঘুনাথ বইয়ের তাকটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে শুধোল, এই তাকে সব বই তুর? অ্যাতো বই তুই পড়িস কী করে? এত মোটা মোটা বইতে ছবি থাকে না?

-থাকে। তবে সেই ছবি তোর ভালো লাগবে না। সূর্যাক্ষ এড়িয়ে যেতে চাইল।

-ওই মোটা বইটা দেখব? পড়তে তো পারব না, অন্তত ছুঁয়ে দেখি। রঘুনাথের মোটা ঠোঁটে হিলহিলিয়ে উঠল মলিন হাসি। বইটা টেনে বাইরে আনতে গিয়ে হাত থেকে ঠিকরে পড়ল। বেশ শব্দ হল। বই ছিঁড়ল না কিন্তু বইয়ের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা সাদা-কালো মেয়ের ছবি। অপ্রস্তুত সূর্যাক্ষ ছবিটা চিলের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলতে চাইল গেঞ্জির ভেতর। রঘুনাথের মনে দোলা দিয়ে উঠল রোমাঞ্চ, ওটা কি রে? আমাকে দেখাবি না বুঝি? ঠিক আছে, ওটা আর লুকোস নে, ঠিক জায়গা মতো রেখে দে। পড়া-লিখার জিনিস, হারিয়ে গেলে তুর ক্ষেতি হবে। রঘুনাথ কিছু আন্দাজই করতে পারেনি, সে বোকার বোকা, হদ্দবোকা। এবার বন্ধ জানালাটা খুলে দিল সূর্যাক্ষ। সাদা-কালো ছবিটা বিছানার উপর ছুঁড়ে দিয়ে সে বলল, নে দেখ। আমার লাভার। আমি একে ভালোবাসি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *