ধস

ধস

বাইরে অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছিল। গায়ের গরম ব্লাউজটার উপর পাতলা বর্ষাতিটা চাপিয়ে দোরগোড়া পর্যন্ত এগিয়ে গেল কিরণলেখা। তারপর থেমে দাঁড়াল দু-সেকেণ্ডের জন্যে। মুখ না ফিরিয়েই বললে, আমি ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ফিরে আসব।

কেউ সাড়া দিল না, সাড়া পাওয়ার জন্যে অপেক্ষাও করল না কিরণলেখা! এক ঝলক হাওয়ার মতো নিঃশব্দে দরজাটা সামান্য একটু ফাঁক করে সে বেরিয়ে গেল রাস্তায়। নীল বর্ষাতিটা ডুবে গেল নীলচে কুয়াশার আড়ালে।

এক বার সেদিকে তাকিয়ে দেখল কি দেখল না ভবতোষ। বালিশে পিঠ উঁচু করে যেমনভাবে শুয়ে ছিল ঠিক তেমনিভাবে শুয়ে রইল। শুধু তার হাতে খবরের কাগজের একটা পাতা উলটে গেল এক বার। কাগজের খচ খচ আওয়াজটা কেমন তীক্ষ্ণ ঠেকল কানে, এক বারের জন্যে কুঁকড়ে উঠল ভবতোষের কপাল, তারপর জেনেভা বৈঠকে কেন্দ্রিত মনটা অসতর্কভাবে পিছলে পড়ল একটা কোম্পানির রিডাকশন সেলের বিজ্ঞাপনে।

ঘরটা চুপচাপ এইবার। আঙুলের চাপে একটুও খরখর করে উঠল না কাগজটা। বাইরে নিঃশব্দ বৃষ্টি। সব চুপ। কাচের জানলার বাইরে আবছা আবছা পেনসিলের টানের মতো ইলেকট্রিকের তারগুলো, একটা মেঘলা পাইন গাছের চুড়ো, রাস্তার ওপারে একখানা ভাঙা মোটরের হুড—সব কিছু যেন নিঝুম হয়ে গেল একসঙ্গে। আধশোয়া শরীরে একটা স্তব্ধ সমকোণ রচনা করে জুতোর বিজ্ঞাপনে ডুবে রইল ভবতোষ।

আর কী করতে পারে, কী করবার আছে ওর। দেড় বছর যদি চাকরি না থাকে, যদি দৈনিক কয়েকটা সিগারেটের পয়সার জন্যে হাত পাততে হয় স্ত্রীর কাছে, যদি জীবনটা চারদিক থেকে একটা শক্ত থাবার মতো কুঁকড়ে আসতে থাকে—তাহলে? তাহলে তিন দিনের পুরোনো একটা খবরের কাগজকে পরীক্ষার পড়ার মতো লাইনে লাইনে মুখস্থ করা ছাড়া কী করা চলে আর! সিনেমার খবর, জুতোর দাম, পাটের বাজার, জেনেভা বৈঠক আর সুন্দরবনের দুর্ভিক্ষ সমস্ত একাকার হয়ে যায়। শুধু থেকে থেকে গালে দু-দিনের দাড়ি অস্বস্তির চমক দিয়ে ওঠে, মুহূর্তের জন্যে তালগোল পাকিয়ে যায় খবরের কাগজের লাইনগুলো, আর মনে হয় বলা যায় না, ছ-পয়সার একখানা ব্লেডের কথা কিছুতেই বলা যায় না কিরণলেখাকে।

আশি ডিগ্রির বিস্তৃতি থেকে এবার ষাট ডিগ্রিতে নিজেকে সংক্ষিপ্ত করে আনল ভবতোষ। কাগজটা খসে পড়ল মেঝের উপর। আবার খানিকটা খচ খচ খরখর শব্দ। কেমনে যেন কানে লাগল ওর। ভবতোষ আজকাল অদ্ভুতরকম স্পর্শাতুর হয়ে উঠেছে। সেদিন জনালার কাচে ডেঙ্গুর মশার মতো কী-একটা বসেছিল হঠাৎ মনে হয়েছিল ওইটে গায়ে এসে পড়লে অস্বাভাবিক গলায় একটা চিৎকার করে উঠবে সে।

এই কি নার্ভাস ব্রেকডাউন? এরই জন্যে কি মানুষ জেগে জেগে দুঃস্বপ্ন দেখে? এরই জন্যে কি একটা কালো বেড়াল যখন-তখন ঘরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায়, দেওয়ালে নিজের ফোটোটা বদলে গিয়ে একটা মরামানুষের মুখে রূপান্তরিত হয়ে যায়, এই জনেই কি নিজের গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে করে দু-হাতে? একটা বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা জাগিয়ে তুলে নিজেকে বিশ্লেষণ করতে চাইল ভবতোষ।

যে-কারণে একদিন কিরণলেখা তীব্র আকর্ষণে টেনেছিল ভবতোষকে, আজ ঠিক সেই কারণেই নিজেকে বড়ো বেশি পরাভূত মনে হয় ভবতোষের। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটের দেড়শো ছেলের ঈর্ষাভরা দৃষ্টির সামনে কিরণলেখা ভবতোষের জীবনে এসেছিল। ঠিক স্ত্রী হয়ে নয় প্রতিপক্ষের মতো। ভবতোষকে সে মেনে নেবে না—মানিয়ে নিতে হবে। পুরুষের মতো লম্বা শক্ত চেহারা, চোখের দৃষ্টিতে একটা স্তব্ধ উগ্রতা, নিরলংকার কাটাছটা ভাষা। বইয়ের পাতা থেকে মিনিট খানেকের জন্যে চোখ তুলে শুনেছিল বিয়ের প্রস্তাবটা। তারপর একটা লাল পেনসিল তুলে নিয়ে মার্জিনে দাগ দিতে দিতে বলেছিল, আমার আপত্তি নেই। তবে মাস তিনেকের আগে নয়।

ভবতোষ উচ্ছ্বসিত হতে যাচ্ছিল, কিন্তু আর এক বার চোখ তুলে তাকিয়েছিল কিরণলেখা। দৃষ্টিতে একটা নিরুত্তাপ শাসন।

পড়ার সময় আর বিরক্ত কোরো না। কথা তো হয়ে গেল, এবার যেতে পারো।

কিরণলেখার হাত প্রথম মুঠোর মধ্যে নিতে পেরেছিল ভবতোষ রেজিস্ট্রেশন অফিসে। ভবতোষের হাত কাঁপছিল, কিন্তু কিরণলেখার কঠিন আঙুলগুলোতে কোথাও এতটুকু চাঞ্চল্যের ছোঁয়া ছিল না। সেদিনও নয়, তারপরও নয়। তিন বছর ধরে সহজ স্বাভাবিক চুক্তির মতো ঘর করছে দুজনে। ভবতোষ একটা চলনসই চাকরি জুটিয়েছে। মেয়েদের স্কুলে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস হয়েছে কিরণলেখা। সসম্মানে সংসার করছে দুজন, কারও কাছে। কাউকে মাথা নীচু করতে হয়নি।

তারপর চাকরি গেল ভবতোষের। অফিস থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ডালহৌসি স্কোয়ারের রেলিঙে হেলান দিয়ে। অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করতে লাগল জিপিও-র ঘড়ির কাঁটা দুটোর লাফিয়ে সরে যাওয়া। তারপর প্যাকেটের শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হল–এখন? এইবার?

অন্নাভাব হয়তো আসবে না, একটার জায়গায় নাহয় তিনটে প্রাইভেট পড়ানো জোগাড় করে নেবে কিরণলেখা। কিন্তু কোন মর্যাদা নিয়ে এখন দাঁড়িয়ে থাকবে ভবতোষ, দাঁড়াবে আত্মসম্মানের কোন শক্ত ডাঙার ওপরে? এক প্যাকেট সিগারেট, একখানা ব্লেড…

না, চাকরি আর জোটেনি। চাকরি না পাওয়ার একটা স্বাভাবিক ক্ষমতা যাদের আছে, হয়তো ভবতোষ তাদেরই একজন। দু-এক বার মুঠোর কাছাকাছি এসেও হাত পিছলে বেরিয়ে গেছে সুযোগ। শেষপর্যন্ত হাল ছেড়েই দিয়েছে ভবতোষ। কিরণলেখার কাছ থেকেই নিতে হয়েছে সিগারেটের দাম, ব্লেডের খরচ। আর চুক্তি নয়, বশ্যতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, আত্মসমর্পণ। কিরণলেখার শান্ত করুণার ছায়ায় দিনের পর দিন নিভে গেছে ভবতোষ, গভীর স্নায়বিক শ্রান্তিতে সারারাত কান পেতে শুনেছে কতগুলো মড়া সারারাত কেওড়াতলা শ্মশানঘাটে চলে গেল।

এরই নাম নার্ভাস ব্রেকডাউন। টান টান করে বাঁধা পৌরুষের তারগুলো হঠাৎ ছিঁড়ে যাওয়ার এই পরিণাম? এরই জন্যে কি দেওয়ালে নিজের ফোটোগ্রাফটাকে হঠাৎ একটা মড়ার মুখের মতো মনে হয়, এইজন্যেই কি যখন-তখন ঘরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায় একটা কালো বেড়াল, এইজন্যেই কি একটা বিষাক্ত নেশার পীড়নের মতো কখনো কখনো ইচ্ছে হয়…

কিরণলেখা কর্তব্যে ত্রুটি করেনি। এক মাসও বাকি পড়েনি বাড়িভাড়া, বাদ যায়নি এক সপ্তাহের রেশন। যেমন আসত তেমনি করেই মাংস এসেছে প্রত্যেক রবিবারে। হয়তো দুটোর জায়গায় পাঁচটা প্রাইভেট টিউশন নিয়েছে কিরণলেখা-ভবতোষ জানেও না। আগেও যেমন রাত নটার পরে সে বাড়ি ফিরত এখনও তাই ফেরে। হয়তো মাঝখানের ঘণ্টা দুয়েকের বিশ্রামটুকুও বিসর্জন দিতে হয়েছে তাকে।

আর নিজের ভয়াবহ মনোমন্থনের মধ্যে মধ্যে ভবতোষ ভেবেছে তার নিজের অক্ষমতা সংসারে তো এতটুকুও ফাঁকার সৃষ্টি করেনি। এতবড়ো যন্ত্রটার একটা চাকাও কোথাও অচল হয়ে যায়নি তো। এক বারও তো কিরণলেখা মুখ ফুটে বলেনি, সংসারে বড্ড টানাটানি যাচ্ছে আজকাল। তাহলে কি ভবতোষ আদৌ না থাকলেও কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটত না কিরণলেখার? কল্পনা করতেই আহত পুরুষ আর্তনাদ করে উঠেছে বুকের ভেতরে। একটা তীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় চমকে মনে হয়েছে—তাহলে আজ সে শুধুই ভার, একটা অনাবশ্যক বোঝা ছাড়া কিছুই নয়।

শেষপর্যন্ত চোখ পড়েছে কিরণলেখার। ভবতোষের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ডাক্তার এসেছে বাড়িতে।

চেঞ্জে নিয়ে যান। একটা টনিকের সঙ্গে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন।

চেঞ্জে! উচ্চকিত হয়ে প্রতিধ্বনি করেছে ভবতোষ। ফুটবল ম্যাচ দেখা ছেড়ে দেবার পর এত জোরে সে কখনো আর চিৎকার করে ওঠেনি।

চোখের দৃষ্টিতে স্তব্ধ উগ্রতাটাকে উগ্রতর করে তাকিয়েছে কিরণলেখা। শীতল কণ্ঠে বলেছে, সে যা করার আমি করব। তোমাকে ভাবতে হবে না।

ভাবতেও হয়নি ভবতোষের। কোথা থেকে টাকা জোগাড় করেছে, ঘরভাড়া করেছে, তারপর এই গরমের ছুটিতে ভবতোষকে নিয়ে এসেছে দার্জিলিঙে। সেসব কিরণলেখার একার দায়িত্ব। একটা টাকার হিসাব করতে হয়নি, এমনকী পথে কুলির সঙ্গে দরাদরি পর্যন্ত করতে হয়নি ভবতোষকে। চুক্তির পর্ব শেষ হয়ে গেছে, এখন বশ্যতার পালা। আগে নিজের ব্যক্তিত্বকে তলোয়ারের মতো শান দিয়ে রাখতে হত, এখন চলছে কাটা সৈনিকের ভূমিকা। কিরণলেখার স্নেহচ্ছায়ায় এখন তার তিলে তিলে নির্বাণ আর অলস কল্পনায় ইন্ধন দিয়ে দিয়ে ভাবা নিজের সমাধিফলকে উৎকীর্ণ করবার মতো দুটো ভালো কবিতার লাইন কোথায় পাওয়া যেতে পারে?

মেঝে থেকে এক বার খবরের কাগজটাকে কুড়িয়ে নেবার কথা ভাবল ভবতোষ, কিন্তু উৎসাহ পেল না। নিস্তব্ধ ঘরের শীতল অবসাদের মধ্যে সে তলিয়ে রইল, আর তাকিয়ে দেখতে লাগল বাইরের নীলাভ কুয়াশার আবছা রেখায় আঁকা নিস্পন্দ ইলেকট্রিকের তার, একটা পাইন গাছের কালির ছোপ, একটা ভাঙা মোটরের হুড আর…

কিরণলেখা জানত রণজিৎ অপেক্ষা করবে। কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, এমনকী এক বিন্দু আভাস পর্যন্ত দেয়নি কিরণলেখা। তবু লাডেন লা রোডের রেলিং ধরে রণজিৎ দাঁড়িয়ে ছিল। এই অল্প অল্প বৃষ্টি, থেকে থেকে ঘনিয়ে আসা কুয়াশা, কোনো এক কাক-জ্যোৎস্নায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা কবরের মতো নীচের বাড়িগুলো আর দূরের ঝাপসা বিষণ্ণ পাহাড়—এরা এমন কিছু আকর্ষণের বস্তু নয় রণজিতের কাছে। প্রায় নির্জন পথের ওপর রণজিতের মূর্তিটা কুয়াশায় অদ্ভুত দীর্ঘকায় মনে হল। যেন বিরাট কোনো এক সমাধিভূমিতে একটা প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে।

এই বৃষ্টির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন?

কেমন চমকে উঠল রণজিৎ। কেন, কে জানে! হয়তো আগে থেকে কিরণলেখাকে দেখতে পায়নি, সেইজন্যেই; হয়তো কিরণলেখা আসতে পারে এই কল্পনাতেই তদগত হয়ে ছিল সে—এসে পড়ার বাস্তবতাকে ঠিক সহজভাবে মেনে নিতে পারল না।

রণজিৎ বললে, আপনি?

অভিনয়। কিরণলেখা অল্প একটু হাসল। মাছের সন্ধানে বেরিয়েছি। যাব বাজারের দিকে।

মাছ? এই দুপুর বেলায়?

দার্জিলিঙের বাজারে এই সময়েই মাছ আসে। আপনি হোটেলে থাকেন, তাই এসব খবর জানবার দরকার হয় না। কিন্তু এই বৃষ্টির ভেতরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছেন আপনি?

আমি? রণজিৎ কেমন ঘোলা চোখে তাকাল। অথবা ওর চশমার কাচের ওপর রেণু রেণু বৃষ্টি জমেছে বলেই অমন আবছা দেখাল ওর চোখ। দার্জিলিঙে এমনি অল্প অল্প বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে।

অভিনয়? কিরণলেখা এবার আর হাসল না, ফেলল শান্ত বিশ্লেষণের দৃষ্টি।

কিন্তু ঠাণ্ডা লাগতে পারে। জ্বর হয়ে বসতে পারে চট করে।

জ্বর? আজ কুড়ি বছরের মধ্যে এক দিনও আমার মধ্যে ধরেনি। বেশ ভরাট পরিতৃপ্ত গলায় বললে রণজিৎ। আবার খানিকটা কুয়াশা এসে রণজিৎকে আড়াল করে দিলে, আবার তাকে অদ্ভুতরকম দীর্ঘকায় বলে মনে হল কিরণলেখার।

কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হল। হঠাৎ যেন কিরণলেখা অনুভব করল, এখনই দুটো বিশাল বলিষ্ঠ বাহুতে রণজিৎ তাকে তুলে নিতে পারে। তারপর নিছক খেয়ালের প্রেরণায় ছুড়ে দিতে পারে সামনের কোনো একটা অতল শূন্যতার ভেতরে। এবং পরক্ষণেই যেন একটা প্রকান্ড কৌতুকের ব্যাপার ঘটেছে এমনিভাবে ওই কুয়াশা, ওই বাড়িগুলো, দূরের ওই বিষণ্ণ পাহাড় সব কিছুকে চকিত করে দিয়ে হেসে উঠতে পারে হা-হা করে।

কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাইল কিরণলেখাই। আর কতদিন থাকবেন এখানে?

কিছু ঠিক করিনি এ পর্যন্ত। এখনও লম্বা ছুটি রয়েছে হাই কোর্টের। যদি ভালো লাগে হয়তো আরও দু-সপ্তাহ কাটিয়ে যেতে পারি।

পোস্টগ্র্যাজুয়েটের সে-রণজিৎ নয়—কিরণলেখা ভাবল। কোনো মেয়ে কাছে গিয়ে লেকচার-নোটের খাতা চাইলে যে-রণজিতের মুখের রং বদলাত বহুরূপীর মতো, করিডোরে কথা কইতে গেলে যার কপালে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করে উঠত, টেলিফোনে কিরণলেখাকে প্রেমের কথা বলতে গিয়ে যে নিজে তিন-তিন বার কানেকশন কেটে দিয়েছে, সেই লাজুক শান্ত ছাত্রটির সঙ্গে কোনো মিল নেই এই রণজিতের। জীবনের নতুন নাটকে আজ সম্পূর্ণ নতুন ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটেছে তার। এখন সে হাই কোর্টের অ্যাডভোকেট। আত্মবিশ্বাস এসেছে, এসেছে আত্মপ্রকাশের শক্তি। জনশ্রুতি শোনা যায়, ভবতোষের সঙ্গে কিরণলেখার বিয়ের পরে সমানে তিন দিন ধরে বেহালা বাজিয়েছিল রণজিৎ। আজ সেই বেহালার স্মৃতিচিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো এখন রিভলবারের লাইসেন্স নিয়েছে রণজিৎ, হয়তো আজকাল সে গ্রে-হাউণ্ড পোষে বাড়িতে।

কিরণলেখা বলে ফেলল, চলুন, আমাকে এগিয়ে দেবেন বাজার পর্যন্ত।

কথাটা বলেই মনের মধ্যে সংকীর্ণ হয়ে গেল কিরণলেখা। এই প্রস্তাবটা আসা উচিত ছিল রণজিতের কাছ থেকেই। মোলায়েম বিনীত গলায়, কুণ্ঠিত মিনতিতে। তারপর এক মিনিট চুপ করে থেকে প্রস্তাবটা বিবেচনা করার ভঙ্গিতে শেষপর্যন্ত স্মিত হাসিতে কিরণলেখা বলত, বেশ চলুন।

কিন্তু কেমন উলটো হয়ে গেল ব্যাপারটা। কে জানত, পোস্টগ্র্যাজুয়েটের ক্লাসঘরে কুঁকড়ে থাকা অঙ্কুরটা দার্জিলিঙের কুয়াশায় পাইন গাছের মতো মাথা তোলে! তেমনি ঋজু, তেমনি ঊর্ধ্বমুখী!

যে-হাসিটা কিরণলেখার ছিল, নিজের পৌরুষে সেইটে কেড়ে নিয়ে রণজিৎ বললে, চলুন-না, ভালোই তো।

বৃষ্টি থেমে গেছে। এক ফালি মেঘভাঙা রোদ পড়ল চকচকে পথের ওপর। মেঘ আর কুয়াশায় মিলে আকাশ-মাটি ছাওয়া সাদা পর্দাটা ক্রমশ সরে যাচ্ছে দূরে। রণজিৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।

চা খাবেন?

থাক এখন।

থাকবে কেন? আসুন-না। কীরকম কনকনে ঠাণ্ডা দেখেছেন! একটু চা নইলে উৎসাহ বোধ হচ্ছে না।

ঠিক তাই। নিজেকে কেমন স্তিমিত মনে হল কিরণলেখারও। প্রতিবাদ করল না। রাস্তার ডান দিকে এক ধাপ নেমে সাজানো ছোটো একটা রেস্তরাঁ। শোকেসে একখানা অতিকায় পাউরুটি, রংবেরঙের কেক। সবুজ পর্দা-ঢাকা ছোটো ছোটো কেবিন। প্লাস্টিকের বিচিত্র টেবিল ক্লথের উপর রেডিয়োর অনুকরণে অ্যাশট্রে। ফুলদানি থেকে সুইট-পির একটা হালকা আতরের গন্ধ।

দুজনে মুখোমুখি। চা-স্যাণ্ডউইচ।

স্যাণ্ডউইচের একটা কোনা দাঁতে কেটে রণজিৎ বললে, আপনার ওখানে এক দিনও যাওয়া হল না।

টিপটের নল থেকে উঠে আসা বাদামি ধোঁয়াটিকে লক্ষ করতে করতে কিরণলেখা বললে, এলেই তো পারেন।

বিনা নিমন্ত্রণে যাব? রণজিৎ হাসল।

তা বটে। একথা আজকের রণজিৎ বলতে পারে, বলতে পারে অ্যাডভোকেট রণজিৎ। কিন্তু কয়েক বছর আগে কি এ দাবিটা জোর করে করতে পারত সে? সেদিন একটুখানি প্রশ্রয়ের হাসিই ছিল যথেষ্ট, আজ সেখানে আগবাড়িয়ে নিমন্ত্রণ করতে হবে কিরণলেখাকে।

কিরণলেখা জবাব দিল না, কেমন উত্তেজিত হয়ে উঠল মনের ভেতরে। একেবারেই কি সে ফুরিয়ে গেছে, সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে গেছে রণজিতের কাছে? তার কঠিন চোখ, তার পুরুষালি চেহারা, তার কাটছাঁটা বৈষয়িক কথার ভঙ্গি, এরা সবাই মিলে কোনো প্রতিক্রিয়াই আর সৃষ্টি করে না রণজিতের মনে? এত শক্তি কি সত্যিই কোথাও ছিল তার?

বেশ ভালোই আছেন আজকাল? হঠাৎ একটা বেখাপ্পা প্রশ্ন এল রণজিতের কাছ থেকে।

তীব্র প্রতিবাদের ভঙ্গিতে কুঁজো ঘাড়টাকে সোজা করে বসল কিরণলেখা। ধারালো গলায় বললে, খারাপ থাকবার কী কারণ আছে বলুন?

আঘাতটা কি লাগল রণজিৎকে? বোঝা গেল না। একটা চুরুট ধরাতে ধরাতে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে কাঁধটা ঝাঁকাল এক বার, না, এমনিই জিজ্ঞাসা করছিলাম।

ও।

আবার চুপচাপ। টিপটের নল দিয়ে রেশমি সুতোর মতো বাদামি রঙের ধোঁয়া। সুইট-পির গন্ধ। প্লাসটিকের টেবিল ক্লথে বিচিত্র কারুকাজ। রাস্তায় মোটরের হর্ন।

ঠোঁট থেকে চুরুটটা নামিয়ে তার সোনালি লেবেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রণজিৎ। তারপর, টাইগার হিল থেকে সানরাইজ দেখেছেন?

না।

যাবেন কাল? রণজিৎ হঠাৎ ঝুঁকে পড়ল সামনে।

এতক্ষণে নিজের মধ্যে একটা উত্তাপ অনুভব করল কিরণলেখা, এতক্ষণ পরে বুঝি চায়ের প্রতিক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। চশমার কাচের তলায় দেখা যাচ্ছে রণজিতের চোখ। ব্রিফ নয়, হাই কোর্ট নয়, এই মুহূর্তে কি নিজের হারিয়ে-যাওয়া ধূলিধূসর বেহালাটাকে মনে পড়ল রণজিতের?

কাল কখন? চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে কিরণলেখা জানতে চাইল।

অন্তত রাত চারটের মধ্যে বেরুতেই হবে। নইলে দেরি হয়ে যাবে পৌঁছুতে।

অত রাতে?

রণজিৎ হাসল, ভয় করবে?

ভয়! আবার ছাড়িয়ে যেতে চাইছে রণজিৎ, আবার মাথাটা তুলতে চাইছে অনেক ওপরে। কিন্তু বাইরে এখন আর কুয়াশা নেই। হঠাৎ রোদ উঠেছে—তীব্র খরধার রোদ। এই রোদে মনে পড়ে কলকাতাকে। কলেজস্ট্রিট। ডবলডেকার। ইউনিভার্সিটি—লিফট। পেছন থেকে বাংলা ডিপার্টমেন্টের কবি কবি চেহারার হ্যাংলা ছেলেটার ছুড়ে-দেওয়া মন্তব্য। একটা ঘৃণার দৃষ্টি ফেলতেও অনুকম্পা হয়।

বেশ, যাব।

রণজিৎ বললে, ধন্যবাদ। ক-দিন থেকেই প্ল্যান করছি, কিন্তু একা একা যেতে কিছুতেই উৎসাহ হয় না। তাহলে কাল ভোরেই আমি গাড়ি নিয়ে আসব লাডেন লা রোডে। হর্ন দেব। আপনি রেডি হয়ে থাকবেন।

আচ্ছা।

কিন্তু ভবতোষের কথা কেউ তুলল না। রণজিৎ বলল না, মনে করিয়ে দিল না কিরণলেখা। রণজিতের সঙ্গে এই শক্তিপরীক্ষায় কোথাও কোনো ভূমিকা নেই ভবতোষের। এমনকী দর্শকেরও না। শুধু এক বারের জন্যে কিরণলেখা ভাবল, ভবতোষের দাড়িগুলো বড়ো হয়ে গেছে, হয়তো একখানা ব্লেড দরকার ওর। আর দরকার এক টিন সিগারেট, আজকের খবরের কাগজ।

কিরণলেখা বললে, চলুন, ওঠা যাক এবার। আর বেশি দেরি হলে বাজারে ভালো মাছ কিছুই পড়ে থাকবে না।

লেপমুড়ি দিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে ভবতোষ। ঘুমুচ্ছে কি না ঠিক বোঝা যায় না। অথবা রাত্রের ঘুমটাকে দিন-রাত্রির একটা ক্লান্তিকর ঝিমুনির মধ্যে প্রসারিত করে নিয়েছে সে। এক বার ইচ্ছে করল মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় একটুখানি। কিন্তু বাইরে থেকে ঘুরে আসা ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া হয়তো ভালো লাগবে না ভবতোষের।

চা করতে হবে। কিরণলেখা স্টোভ ধরাতে বসল। পাশের ঘরে এক মারাঠি ভদ্রলোক আছেন—এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। তাঁর একপাল ছোটা ছেলে-মেয়ে লাফালাফি করছে সমানে। হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে মশলা-মেশানো রসুনের উগ্র গন্ধ, কী-একটা ভালো জিনিস রান্না হচ্ছে ওখানে। মোটা গলায় ধমক দিচ্ছেন ভদ্রলোকের স্ত্রী। জানালার বাইরে একটু দূরের রাস্তায় ভুটিয়া ঘোড়ায় চেপে চলেছে দুটি অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ছেলে-মেয়ে। স্টোভে পাম্প করতে করতে এক বার ভবতোষের দিকে তাকিয়ে দেখল কিরণলেখা। নিঃসাড় হয়ে এলিয়ে আছে বিছানায়, কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে দু হাতের শীর্ণ আঙুলগুলোকে।

ঘরটা খালি, বিশ্রী রকমের খালি। পাশের ঘরে মারাঠি বাচ্চাগুলোর চিৎকার। ভারি একা একা লাগল কিরণলেখার। স্টোভে কেটলি চাপিয়ে বিছানার পাশে বেতের চেয়ারটায় এসে বসল।

ভবতোষ চোখ মেলল। ঝিমুচ্ছিল? জেগেই ছিল? কে জানে।

কিরণলেখা আস্তে আস্তে বললে, তোমার সিগারেট এনেছি—আর ব্লেড।

আচ্ছা।

আর এই আজকের খবরের কাগজ।

দাও।

হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল ভবতোষ। কিন্তু পড়ার আগ্রহ দেখা গেল না। নিরাসক্ত শান্তিতে মেলে রাখল বুকের ওপর।

এক বার কিরণলেখার মনে হল, কথাটা বলবে ভবতোষকে? বলবে কাল শেষরাত্রে রণজিতের সঙ্গে টাইগার হিলে যাওয়ার প্রোগ্রামের কথাটা? জিজ্ঞাসা করবে তুমিও যাবে নাকি এক বার? রাতদিন তো ঘরেই শুয়ে থাকা, এমন করলে শরীর ভালো হবে কী করে? চলো

ঘুরে আসবে একটু? কিন্তু বলেই-বা কী হবে, কিছুতেই জাগানো যাবে না ভবতোষকে। একটা অতল নির্বেদের মধ্যে সে নিঃশেষিত। সেখান থেকে কিছুতেই উঠে আসতে চাইবে না। এমনকী কাল শেষরাতে রণজিতের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার মধ্যে কুৎসিত কল্পনার যে সুযোগ আছে, তাই নিয়ে এক বারও চঞ্চল হয়ে উঠবে না ভবতোষ। মনে মনেও না।

এক বার হয়তো চোখ মেলে তাকিয়ে দেখবে—হয়তো তাও না। হয়তো লেপটাকে আরও বেশি করে মুখের ওপরে টেনে আনবে। জিজ্ঞাসাও করবে না কোথায় যাচ্ছ, কখন ফিরবে, অথবা আদৌ আর ফিরবে কি না।

একেই কি নার্ভাস ব্রেকডাউন বলে?

শক্ত পুরুষালি চেহারার কিরণলেখা শিউরে উঠল এক বারের জন্যে। ঘরটা খালি—বিশ্রী রকমের খালি। চার বছর পরে বিয়ের চার বছর পরে এই প্রথম ভবতোষের উপস্থিতি অসহ্য লাগল তার কাছে।

পরক্ষণেই নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিরণলেখা, যেন মুক্ত করে নিলে দুঃস্বপ্নের হাত থেকে। চায়ের কেটলিতে জলটা টগবগ করে ফুটছে।

পরদিন কিরণলেখার ঘুম ভাঙল ভোর চারটের আগেই।

চোখ মেলতেই দৃষ্টি পড়ল পাশের টিপয়ের ওপর। ভবতোষের রেডিয়াম ডায়াল ঘড়িটা ঝকঝক করছে ওখানে। কাচের আড়াল থেকে কতগুলো সবুজ অগ্নিবিন্দু হিংস্রভাবে জ্বলজ্বল করছে। রণজিতের আসতে পনেরো মিনিট দেরি আছে এখনও।

সহজ স্বাভাবিক নিশ্বাস পড়ছে ভবতোষের। হয়তো সেই বর্ণহীন ঘুমে তলিয়ে আছে সে। সেখানে আলো নেই, আকাশ নেই, কিরণলেখা নেই—কেউ নেই। শুধু ছায়ার মতো কতগুলো ছাড়া ছাড়া স্বপ্ন আছে অথবা তাও নয়। যাহোক, সেখানে কিরণলেখা নেই—না থাকলেও ক্ষতি নেই।

এক বার রূঢ় একটা ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করল ভবতোষকে, একটা অর্থহীন কান্নায় ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তার চাইতেও সহজ কাজ নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে যাওয়া। কিরণলেখা তাই করল।

ঘরের কোন জিনিসটা কোথায় আছে তার নির্ভুল হিসেব জানে কিরণলেখা। খাট থেকে নেমে তিন-পা বাঁ-দিকে গেলে আলনা, হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে নীলরঙের শাড়িটা। তার পাশেই ঝুলছে ওভারকোট। রিস্টওয়াচটা কোর্টের পকেটেই আছে। ভবতোষের রেডিয়াম ডায়াল ঘড়িটার পাশেই পড়ে আছে হাতব্যাগ। বর্ষাতি রয়েছে দরজার কাছেই। রাত্রে চুল বেঁধে শুয়েছে—তার জন্যেও কোনো ভাবনা নেই। কসমেটিকস সে ব্যবহার করে না—প্রশ্নই ওঠে না তার।

এখন শুধু অপেক্ষা করা, শুধু কান পেতে থাকা রণজিতের মোটরের হর্নের জন্যে। ভবতোষের ঘড়িতে সবুজ অগ্নিকণায় আরও পাঁচ মিনিট বাকি।

নিঃশব্দে দরজা খুলল কিরণলেখা। বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

বাইরের ঠাণ্ডাটা যেন প্রচন্ড একটা আঘাতের মতো চোখে-মুখে এসে পড়ল। ইলেকট্রিকের আলোগুলো যেন হা-হা করে উঠল নিঃশব্দ নিষ্ঠুর হাসিতে। শীতল কালো আকাশ অসংখ্য ভয়ংকর কুটিতে কিরণলেখার মুখের দিকে তাকাল।

তারপরেই চমকে উঠল সে।

কোথা থেকে তীক্ষ্ণ হাওয়ার ঝলক বয়ে এল একটা। পথের ওপাশে দীর্ঘ পাইন গাছটার চুড়ো মর্মরিত হল—যেন একটা অতিলৌকিক ছায়া কেঁপে উঠতে লাগল থরথরিয়ে। ইলেকট্রিকের তারগুলিতে শাঁ-শাঁ করে কান্নার মতো শব্দ বাজল। আর কিরণলেখার মনে হল ইলেকট্রিকের আলোয় রণজিতের দীর্ঘ দেহ কীরকম ছায়া ফেলবে কে জানে! ওইরকম অলৌকিক-ওইরকম বিরাট, আর সঙ্গে সঙ্গে উচ্চকিত আতঙ্কে তার মনে হবে এই মুহূর্তে একটা ছোটো পাখির মতো তাকে মুঠোয় করে তুলে নিতে পারে রণজিৎ—ছুড়ে ফেলে দিতে পারে কোনো অতলস্পর্শ খাদের ভেতরে, আর তারপর হো-হো করে একটা প্রচন্ড কৌতুকের হাসিতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে রাত্রির অন্ধকারকে।

ভয়। এবার আর নিজের কাছে মন লুকোতে পারল না কিরণলেখা। ভয়। শীতল নিষ্ঠুর অন্ধকার, অসংখ্য নক্ষত্রের ভয়ংকর কুটি, পাইন গাছের চুড়োটার অলৌকিক দোলা, আর–আর…

কিরণলেখা ছুটে ঘরের মধ্যে পালিয়ে এল। এক কোণে ছুড়ে দিলে ওভারকোটটা। তারপর পলাতক একটা খরগোশ যেমন করে তার গর্তের মধ্যে এসে লুকোয়, তেমনি করে ডুবে গেল লেপের ভেতরে।

আর আশ্চর্য, এরই জন্যে কি অপেক্ষা করছিল ভবতোষ? সে কি জানত, এমনই একটা কিছু ঘটবে? নইলে আজ দু-বছর পাশে পাশে শুয়েও ঘুমের ঘোরে যে-ভবতোষ কিরণলেখাকে স্পর্শ করেনি, সে কেন তাকে এমন করে জড়িয়ে নিলে বুকের মধ্যে?

বাইরের রাস্তায় একটা মোটর থামল। দু-বার হর্ন বাজল। কিরণলেখা আরও বেশি করে সরে এল ভবতোষের বুকের মধ্যে, ভবতোষের হাতটা আরও বেশি করে সাঁড়াশির মতো শক্ত হয়ে উঠতে লাগল।

তারপর কত বার হর্ন বাজল, কতক্ষণ ধরে অধৈর্য প্রতীক্ষায় বাজতে বাজতে থেমে গেল, কিরণলেখা টেরও পেল না। সমস্ত রাতে বিনিদ্র অস্বস্তির পরে এইবার প্রথম তার চোখ ভরে ঘুম নেমে এল।

কিরণলেখা জানত রণজিৎ ক্ষমা করবে না। একবার যখন দাবি করতে শিখেছে, তখন সহজে সে দাবি ছেড়ে দেবে না কিছুতেই। পোস্টগ্র্যাজুয়েটের নিরীহ নিস্তরঙ্গ রণজিতের মধ্যে একটা উগ্র ক্ষুধার্ত জাগরণের পালা শুরু হয়েছে। আর সে বেহালা বাজায় না, হয়তো রিভলবারের লাইসেন্স নিয়েছে এখন।

দু-দিন ইচ্ছে করেই সে এড়িয়ে গেল লাডেন লা রোড, ম্যাল, দারোগা বাজারের রাস্তা। যে নেপালি কাঞ্ছাটা দু-বেলা বাসন মাজে, ঘরদুয়ার পরিষ্কার করে বাজার করাল তাকে দিয়েই। আধখানা বুনে রাখা স্কার্ফটাকে টেনে খুলে ফেলল, তারপর সকাল-বিকেল বসে গেল সেইটেকে নতুন করে বুনতে।

কী ভাবল ভবতোষ? কিছু কি ভাবল? দাড়ি কামাল, পর পর কয়েকটা সিগারেট খেল, এমনকী নিজেই বেরিয়ে গিয়ে কিনে আনল খবরের কাগজ। বাত্রিতে কিরণলেখার ওই আত্মসমর্পণের মধ্যে কোনো অর্থ কি খুঁজে পেয়েছে ভবতোষ? নিজের ভেতরে কোথাও কি এতটুকু শক্তিকে আবিষ্কার করেছে সে?

দুটো দিন—দুটো তীক্ষ্ণ রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। কোথায় মিলিয়ে গেল কুয়াশা, কোথায় হারিয়ে গেল শীতার্ত বিষণ্ণতার কুহক। পাথর গরম হয়ে উঠল। উদয়াস্ত ঝকঝক করলে লাগল কাঞ্চনজঙ্ঘা, চারিদিকের নানা রঙের বাড়িগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল নিষ্ঠুর নগ্নতায়। এই আলোয় এত প্রখর সূর্যকিরণের মধ্যে কোথায় তলিয়ে গেল রণজিৎ। এই রোদে ঝকঝক করে ওঠে ইউনিভার্সিটির প্রকান্ড সাদা বাড়িটা, হেদুয়ার জল, কলেজস্ট্রিট, কলকাতা। এ আলোয় রণজিতের কুঁকড়ে লুকিয়ে থাকার পালা। আর কিরণলেখার বসে বসে ভাবা–এতখানি প্রশ্রয় কী করে সে দিয়েছিল রণজিৎকে! কেমন করে সে বলতে পেরেছিল, আমাকে এগিয়ে দেবেন বাজার পর্যন্ত?

রণজিৎ এল আরও দু-দিন পরে।

এতটা দুঃসাহস কোথা থেকে এল রণজিতের যে অসংকোচে চলে আসতে পারল সেখানে —যেখানে ভবতোষ আছে? কেমন করে সে দুম দুম করে ঘা দিতে পারল দরজায়? যেন দরকার হলে ভেঙে ফেলবে।

তার কারণ ছিল বৃষ্টি-–অশ্রান্ত বৃষ্টি। উজ্জ্বল তীক্ষ্ণআকাশ পোড়া ছাইয়ের মতো রং ধরেছিল দিনের বেলা, রাত্রির অন্ধকারে তা আলকাতরার মতো কালো হয়ে উঠল। সামনের পাইন গাছটায় আছড়ে পড়তে লাগল ঝোড়ো হাওয়ার ঝলক। শনশন করে আর্তনাদ করে চলল ইলেকট্রিকের তার। আর সেই সময় প্রচন্ডভাবে দরজায় ঘা দিলে রণজিৎ।

হাতের বোনাটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিরণলেখা, যেন ভূত দেখল। বিছানার ওপরে ওঠে বসল ভবতোষ। রণজিতের ওয়াটারপ্রুফ থেকে স্রোতের মতো জল গড়িয়ে পড়ছে কার্পেটের উপর, বৃষ্টিতে চকচক করছে পায়ের কালো গাম বুট। ওয়াটারপ্রুফটাকে এক পাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে শব্দ করে একটা চেয়ারের ওপরে বসে পড়ল। আজ বিনা নিমন্ত্রণেই সে এসেছে।

তারপর সহজ স্বাভাবিক গলায় বললে, অনেক দিন পরে দেখা হল ভবতোষ, ভালো আছ তো?

কী-একটা বলতে চাইল ভবতোষ—বলতে পারল না। শুধু দুটো কোটরে-বসা চোখের ভেতর থেকে স্তিমিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রণজিতের দিকে। সে-দৃষ্টিকে রণজিৎ গ্রাহ্য করল না। কিরণলেখা দেখল, বাঘের মতো দপদপিয়ে উঠেছে রণজিতের চোখ।

রণজিৎ বললে, সেদিন কথা দিয়েও কেন গেলেন না আপনি? প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে মোটরের হর্ন বাজিয়েছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে…

বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ, ইলেকট্রিক তারের গুঞ্জন, পাইন গাছটার আর্তনাদ। কী ভয়ংকর—কী অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব নিয়ে এসেছে রণজিৎ। এই দুর্যোগের পটভূমিতে যেন হিংস্র একটা বন্য শক্তির মতো আবির্ভূত হয়েছে সে। কে জানে তার ওভারকোটের পকেটে একটা রিভলবারও আছে কি না।

হয়তো হাঁটু ভেঙে বসে পড়ত কিরণলেখা, হয়তো বলেও বসত–ক্ষমা করো আমাকে, এমন অপরাধ আমি আর করব না। হয়তো রণজিৎ যদি তখন তার হাত ধরে এই ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যেত, এক বিন্দু প্রতিবাদের শক্তি থাকত না কিরণলেখার।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই বৃষ্টি আর হাওয়ার সমস্ত কলরবকে ছাপিয়ে ভয়ংকর গুরুগুরু শব্দ উঠল একটা। সে-শব্দ আকাশে নয়—মাটিতে। একটা প্রচন্ড ভূমিকম্পের মতো দুলে উঠল ঘরটা।

খাটের ওপর থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল ভবতোষ। ধস নামছে!

আবার সেই গুরুগুরু ধ্বনিটা কানে এল। আরও তীব্র, আরও ভয়াল। দপ করে নিভে গেল ঘরের ইলেকট্রিকের আলোটা। মেঝেটা দুলতে লাগল। পাশের মারাঠি পরিবারের থেকে শোনা গেল আকুল কান্নার শব্দ। মড়মড় করে পাইন গাছটা ভেঙে পড়ল। ঘরের পিছন দিকটা হঠাৎ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে টুকরো টুকরো কাঠের মতো ঢালু বেয়ে গড়িয়ে চলল।

একটা পৈশাচিক আর্তনাদ করে বাইরে লাফিয়ে পড়ল রণজিৎ, কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না। সামনে-পিছনে দু-দিকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে পথের রেখা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। অতল অন্ধকারে দুরে-কাছে ক্রমাগত ধস ভাঙতে লাগল। মানুষের চিৎকার, বুকফাটা কান্না, মৃত্যুযন্ত্রণার গোঙানি, সব একসঙ্গে মিলে একটা বীভৎস নরকের মধ্যে পৌঁছে দিলে রণজিৎকে।

রণজিৎ দাঁড়াতে পারল না। হাঁটুতে এক বিন্দু শক্তি কোথাও অবশিষ্ট নেই। চোখ বুজে বসে পড়ল পথের ওপরে। এই দ্বীপের মতো জায়গাটুকু যেকোনো সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। যতক্ষণ না যায় ততক্ষণ…

ততক্ষণ বাড়িটার ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে কিরণলেখার আর্তনাদ তার কানে এসে ঘা দিতে লাগল— আমাকে ভোলো, আমাকে তোলে এখান থেকে। আমি এখনও বেঁচে আছি।

উঠে দাঁড়াতে চাইল রণজিৎ-সাধ্য কী! সমস্ত শরীর যেন পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গেছে তার। অসহ্য বিষাক্ত যন্ত্রণায় সে কান পেতে শুনতে লাগল কিরণলেখার আকুতি–ওগো কোথায় তুমি? আমি যে এখনও বেঁচে আছি…

চোখ দুটো বোজবার আগে দেখতে পেল রণজিৎ—অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেল। কিরণলেখার কাছে যার কথা শুনেছিল, একটা শবদেহের মতো যাকে পড়ে থাকতে দেখেছিল বিছানায়, সেই ভবতোষ একটা প্রচন্ড দানবের মতো ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে প্রাণপণে। এত শক্তি, এমন অমানুষিক শক্তি কোথায় পেল ভবতোষ? কী করে এমন ভয়ংকরভাবে বেঁচে উঠল সে যে কিরণলেখাকে সে বাঁচিয়ে তুলবেই?

একটা বিদ্যুৎচমকের মতো রণজিৎ অনুভব করল, অনেক বর্ষা, অনেক শরৎ, অনেক সূর্যের আলো আর অনেক অন্ধকার তিলে তিলে এই শক্তি দিয়েছে ভবতোষকে। একটা আকস্মিক আবেগ নয়, একটা উন্মত্ততা নয়; এ শক্তির মধ্যে অনেক প্রতীক্ষা, অনেক সংযম, অনেক নিঃশব্দ প্রস্তুতি। তার মৃত্যু হয়নি, শুধু আত্মপ্রকাশের জন্যে একটা উপলক্ষ্যের প্রয়োজন ছিল। জড়তা ছিল কঠিন, তাই তার আবরণ ভাঙবার জন্যে প্রয়োজন হল এমন ভয়াবহ চরম মুহূর্তের।

আমায় বাঁচাও, আমায় বাঁচাও তুমি…।

উন্মত্ত দানবীয় শক্তিতে কাঠ সরাচ্ছে ভবতোষ। দাম্পত্যজীবনের যে-প্রেম তিলে তিলে সংগ্রহ করেছে সূর্য আর নক্ষত্রের অগ্নিকণা, তাই এখন বজ্রপ্রদীপ হয়ে জ্বলছে ভবতোষের রক্তে। কিরণলেখাকে সে-ই বাঁচাবে, সে-ই শুধু বাঁচাতে পারে। সীমাহীন দীনতায় হাঁটুর মধ্যে মুখ লুকিয়ে রণজিৎ নিশ্চেতনার গভীরে তলিয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *