৮১.

আমরা মন্ত্রিসভায় যোগদান না করে পার্টি গঠনের কাজে মন দিলাম। শহীদ সাহেব করাচিতে ফিরে গেলেন। তার স্বাস্থ্যও খারাপ হয়ে পড়েছে অত্যধিক পরিশ্রমে। হক সাহেব করাচিতে বেড়াতে গেলে কেন্দ্রীয় গণপরিষদের পূর্ব বাংলার সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তারা পদত্যাগ করবেন কি না, তিনি তার উত্তরে বলেছিলেন, তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন নাই, আর তাদের করতে হবে কেন?” যদিও যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি পাটির প্রথম সভায় দ্বিতীয় প্রস্তাবে তাদের পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। করাচিতে মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ নেতারা তাঁর সাথে যোগাযোগ করে তাকে জানিয়ে দিল, তাঁদের রাগ আওয়ামী লীগারদের বিরুদ্ধে; হক সাহেবকে তাঁরা সমর্থন করবেন এবং যাতে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন তার চেষ্টা করবেন। শুধু আওয়ামী লীগকে যেন দূরে সরিয়ে রাখেন। গোপনে গোপনে আওয়ামী লীগ থেকে সদস্য ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল, কিন্তু উপায় ছিল না। কেউই দলত্যাগ করতে রাজি না। যাদের মনের মধ্যে মন্ত্রিত্বের খায়েশ ছিল তারাও জনমতের ভয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। হক সাহেবকে তার দলবল ধোকা দিয়েই চলেছে। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বলতা পেলেই যে ঝাঁপিয়ে পড়বে এ সম্বন্ধে সন্দেহ ছিল না, কারণ তারা জানত আওয়ামী লীগের সমর্থন ছাড়া সরকার চলতে পারে না। সংসদ সদস্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগুরু। সকল দল মিলেও আওয়ামী লীগের সমান হতে পারবে না।

করাচি হতে ফিরবার পথে হক সাহেব কলকাতায় দু’একদিনের জন্য ছিলেন। সেখানে তার বক্তৃতা বলে কথিত কয়েকটা সংবাদ সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাপানো হয়েছিল।৭ সুযোগ বুঝে মোহাম্মদ আলী বগুড়া ও তার দলবলেরা হক সাহেবের বিরুদ্ধে তাই নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। হক সাহেব মহাবিপদে পড়লেন। এই বিপদের মুহুর্তে আওয়ামী লীগ নেতা বা কর্মীরা হক সাহেব ও তার দলবলের বিরুদ্ধাচরণ করলেন না। তারা জানিয়ে দিলেন যে, তারা হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করবেন। হক সাহেব এই অবস্থায় আওয়ামী লীগারদের সাথে আলোচনা করে পুরা মন্ত্রিসভা গঠন করতে আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। এই সময় হক সাহেবের আর এক ভাগিনেয় জনাব মাহবুব মোর্শেদ বার এট ল (পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হন) হক সাহেবের সাথে পরামর্শ করে আতাউর রহমান খান ও মানিক মিয়াকে অনুরোধ করলেন যাতে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় যোগদান করে। তাকে সাহায্য করছিলেন ঢাকার কফিলুদ্দিন চৌধুরী সাহেব ও মির্জা আবদুল কাদের সর্দার। শহীদ সাহেব তখন করাচিতে ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তার পক্ষে ঢাকায় আসা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

আমি ও মওলানা সাহেব জনসভা করতে মফস্বলে বের হয়ে গেছি। আমাদের প্রোগ্রাম জানা ছিল অফিসের। হক সাহেব আতাউর রহমান খান ও মানিক ভাইকে বলেছেন যে, আমাকে মন্ত্রী করতে চান। মওলানা সাহেব ও আমি টাঙ্গাইলে এক কর্মী সম্মেলনে বক্তৃতা করছিলাম। এই সময় টাঙ্গাইলের এসডিও একটা রেডিওগ্রাম নিয়ে সভায় হাজির হলেন। আমাকে জানালেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে ঢাকায় যেতে অনুরোধ করে রেডিওগ্রাম পাঠিয়েছেন। আমি মওলানা সাহেবের সাথে পরামর্শ করলাম। মওলানা সাহেব বললেন, “দরকার হলে তোমাকে মন্ত্রিসভায় যোগদান করতে হবে। তবে শহীদ সাহেবের সাথে পরামর্শ করে নিও—এ সময় এইভাবে মন্ত্রিত্বে যাওয়া উচিত হবে কি না? বোধহয় হক সাহেবের দল কোনো মুশকিলে পড়েছে, তাই ডাক পড়েছে।“

আমি সন্ধ্যার দিকে ঢাকায় ফিরে এলাম। বাসায় যেয়ে দেখি রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে গতকাল ঢাকায় এসেছে। সে এখন ঢাকায়ই থাকবে, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বন্দোবস্ত হওয়া দরকার। আমি খুশিই হলাম, আমি তো মোসাফিরের মত থাকি। সে এসে সকল কিছু ঠিকঠাক করতে শুরু করেছে। আমার অবস্থা জানে, তাই বাড়ি থেকে কিছু টাকাও নিয়ে এসেছে। আমি হক সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলে তিনি বললেন, “তোকে মন্ত্রী হতে হবে। আমি তোকে চাই, তুই রাগ করে না বলিস না। তোরা সকলে বসে ঠিক কর, কাকে কাকে নেওয়া যেতে পারে।” আমি তাকে বললাম, “আমাদের তো আপত্তি নাই। শহীদ সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তার অনুমতি দরকার। আর মওলানা সাহেব উপস্থিত নাই, তার সাথেও আলোচনা করতে হবে।” আমি ইত্তেফাক অফিসে মানিক ভাই ও আতাউর রহমান খান সাহেবকে নিয়ে বসলাম। একটু পরে মোর্শেদ সাহেব, কাদের সর্দার সাহেব, কফিলুদ্দিন চৌধুরী সাহেব আসলেন। আলোচনা করে শহীদ সাহেবের সাথে ফোনে আলাপ করতে চেষ্টা করলাম, তিনি কথা বলতে পারলেন না। তার জামাতা আহমেদ সোলায়মান কথা বললেন, তার মারফতে তিনি জানিয়ে দিলেন তার কোনো আপত্তি নাই।

আমি আপত্তি করলাম, মওলানা সাহেবেরও মতামত প্রয়োজন, কারণ অনেক পানি এর মধ্যে ঘোলা করা হয়েছে। শহীদ সাহেব, ভাসানী সাহেব যদিও কয়েকজনের নাম পূর্বেই ঠিক করে রেখেছিলেন, তবু আবারও আলোচনা করে মতামত নেওয়া উচিত। এদিকে কৃষক শ্রমিক দল কফিলুদ্দিন চৌধুরী সাহেবকে তাদের পার্টি থেকে মন্ত্রিত্ব দিতে রাজি নন। আমরা জানিয়ে দিলাম, দরকার হয় তিনি আমাদের দলের পক্ষ থেকে মন্ত্রী হবেন। সত্য কথা বলার জন্য তাকে আমরা শাস্তি পেতে দিতে রাজি নই। রাত এগারটায় হক সাহেবের সাথে পরামর্শ করে দুইখানা জিপ গাড়ি নিয়ে আতাউর রহমান সাহেব, মোর্শেদ সাহেব, কফিলুদ্দিন চৌধুরী সাহেব, আবদুল কাদের সর্দার ও আমি টাঙ্গাইলের পথে রওয়ানা করলাম। রাস্তা খুবই খারাপ, তখনকার দিনে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌঁছাতে ছয় ঘণ্টা সময় লাগত। চারটা খেয়া পার হতে হত। আমরা খুব ভোরে টাঙ্গাইল পৌঁছালাম। মওলানা সাহেব আওয়ামী লীগ অফিসের দোতলায় আছেন। আমরা তার সাথে পরামর্শ করলাম। তিনি খুব ক্ষেপে গিয়েছিলেন। পরে মোর্শেদ সাহেবের ওকালতিতে তিনি রাজি হলেন। আতাউর রহমান সাহেব তাকে নামগুলি দেখালেন। আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান, হাশিমউদ্দিন আহমদ ও আমি। কফিলুদ্দিন চৌধুরী সাহেব সম্বন্ধে তারা যখন আপত্তি করছে তখন তিনিও আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে মন্ত্রী হবেন। হক সাহেব ছাড়া মোটমাট বারজন মন্ত্রী হবেন। পরে দেখা গেল, আরও কয়েকজন বেড়ে গেল রাতারাতি।

 

৮২.

১৯৫৪ সালের মে মাস। আমরা সকলে শপথ নিতে সকাল নয়টায় লাটভবনে উপস্থিত হলাম। আমাদের যখন মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়া শেষ হল, ঠিক সেই সময় খবর এল আদমজী জুট মিলে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভীষণ দাঙ্গাহাঙ্গামা শুরু হয়েছে। ভোররাত থেকে সৈয়দ আজিজুল হক সেখানে উপস্থিত আছেন। রাতেই ইপিআর ফোর্স ও পুলিশ বাহিনী সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকার দু’একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের কর্মচারীরাও উপস্থিত আছেন। আমরা যখন শপথ নিচ্ছি ঠিক সেই মুহূর্তে দাঙ্গা শুরু হওয়ার কারণ কি? বুঝতে বাকি রইল না, এ এক অশুভ লক্ষণ! হক সাহেব আমাদের নিয়ে সোজা রওয়ানা করলেন আদমজী জুট মিলে। তখন নারায়ণগঞ্জ হয়ে লঞ্চে যেতে হত। সোজা রাস্তা হয়েছে, তবে গাড়ি তখনও ভালভাবে চলতে পারে না। ট্রাক ও জিপ কষ্ট করে যেতে পারে। সকলেই রওয়ানা হয়ে গেছেন। আমাকে লাভবনের সামনে জনতা ঘিরে ফেলল এবং আমাকে নিয়ে শোভাযাত্রা তারা করবে বলে ঠিক করেছে। তাদের বুঝিয়ে বিদায় নিতে আধ ঘন্টার মত দেরি হয়ে গেল।

নারায়ণগঞ্জ যেয়ে শুনলাম, হক সাহেব আমার জন্য অপেক্ষা করে ঢাকা রওয়ানা হয়ে গেছেন। একটা লঞ্চ রেখে গেছেন। আমি পৌঁছালাম এবং সাথে সাথে যেখানে দাঙ্গা তখনও চলছিল সেখানে উপস্থিত হলাম। আমাকে একটা পুলিশের জিপে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দাঙ্গা তখন অল্প অল্প চলছিল। যেদিকে যাই দেখি রাস্তায় রাস্তায় বস্তিতে বস্তিতে মরা মানুষের লাশ পড়ে আছে। অনেকগুলি আহত লোক চিৎকার করছে, সাহায্য করার কেউই নাই। ইপিআর পাহারা দিতেছে, বাঙালি ও অবাঙালিদের আলাদা আলাদা করে দিয়েছে। গ্রাম থেকে খবর পেয়ে হাজার হাজার বাঙালি এগিয়ে আসছে। অবাঙালিদের ট্রাকে করে মিলের বাইরে থেকে মিলের ভিতরে নিতেছে। আমার বড় অসহায় মনে হল। আমার সাথে মাত্র দুইজন আর্মড পুলিশ। এই সময় আরও কয়েকজন পুলিশের সাথে আমার দেখা হল। তাদের কাছে আসতে হুকুম দিলাম। এক গাছতলায় আমি আস্তানা পাতলাম। মিলের চারটা ট্রাক আছে, একটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু সংখ্যক লোক পাওয়া গেল, তাদের সাহায্যে যারা মরে গেছে তাদের রেখে আহত লোকগুলিকে এক জায়গায় করে পানি দিতে শুরু করলাম। আমার দেখাদেখি কয়েকজন কর্মচারীও কাজে হাত দিল। এই সময় মোহন মিয়া সাহেব এসে উপস্থিত হলেন। আমার মনে বল এল। তিনটা ট্রাক হাজির করা হল। ড্রাইভাররা ভাগতে চেষ্টা করছিল। আমি হুকুম দিলাম, ভাগতে চেষ্টা করলেই গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দিব। আমার মেজাজ দেখে তারা ভয় পেয়ে গেল। ঢাকায় টেলিফোন করা হয়েছে, এ্যাম্বুলেন্স পাঠাবার জন্য। মোহন মিয়া ও আমি সকাল এগারটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় তিনশতের মত আহত লোককে হাসপাতালে পাঠাতে পেরেছিলাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে যে সমস্ত বাঙালি জনসাধারণ জমা হচ্ছিল মিল আক্রমণ করার জন্য তাদের কাছে গিয়ে আমি বক্তৃতা করে তাদের শান্ত করলাম। তারা আমার কথা শুনল। যদি তারা সঠিক খবর পেত তাহা হলে আমার কথা শুনত কি না সন্দেহ ছিল। সন্ধ্যার একটু পূর্বে আমি সমস্ত এলাকা ঘুরে মৃত লাশের হিসাব করলাম একটা একটা করে গণনা করে, তাতে পাঁচশতের উপর লাশ আমি স্বচক্ষে দেখলাম। আরও শ’খানেক পুকুরের মধ্যে আছে, তাতে সন্দেহ নাই।

সামান্য একটা ঘটনা নিয়ে এই দাঙ্গা শুরু হয়। তিন দিন পূর্বে এক অবাঙালি দারোয়ানের সাথে এক বাঙালি শ্রমিকের কথা কাটাকাটি ও মারামারি হয়। তাতে বাঙালি শ্রমিকের এক আঘাতে হঠাৎ দারোয়ানটা মারা যায়। এই নিয়ে উত্তেজনা এবং ষড়যন্ত্র শুরু হয়। দারোয়ানরা সবাই অবাঙালি। আর কিছু সংখ্যক শ্রমিকও আছে অবাঙালি। এই ঘটনা নিয়ে বেশ মনকষাকষি শুরু হয়। মিল কর্তৃপক্ষ অবাঙালিদের উসকানি দিতে থাকে। মিল অফিসে কালো পতাকা ওড়াতে অনুমতি দেয়। মিলে কাজ বন্ধ করে দিয়ে বাঙালিদের বেতন নেবার দিন ঘোষণা করে বলা হয়, বেতন নিতে মিলের ভেতরে আসতে। যখন তারা বেতন নিতে ভিতরে আসে তখন চারদিক থেকে বন্দুকধারী দারোয়ান ও অবাঙালিরা তাদের আক্রমণ করে। এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে বহু লোক মারা যায়। পরে আবার বাঙালিরা যারা বাইরে ছিল, তারা অবাঙালিদের আক্রমণ করে এবং বহু লোককে হত্যা করে। নতুন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা যে সময় শপথ নিচ্ছে সেই সময় বেতন দেবার সময় ঘোষণা করার অর্থ কি? ইপিআর উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও একটা গুলিও করা হয় নাই। ফলে দাঙ্গা করে পাঁচশত লোকের উপরে মারা যায়। পুলিশ কর্মচারীরা পূর্বেই খবর পেয়েছিল, তবু কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই? মন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হক সাহেবকে মিষ্টি কথা বলে মিল অফিসে বসিয়ে রেখেছে। দালা যে মিলের অন্যদিকে শুরু হয়েছে, সে খবর তাঁকে দেওয়া হয় নাই। হক সাহেব ও অন্যান্য মন্ত্রী ঢাকায় চলে এসেছেন, আমি ও মোহন মিয়া উপস্থিত আছি রাত নয়টা পর্যন্ত। জনাব মাদানী তখন ঢাকার কমিশনার এবং হাফিজ মোহাম্মদ ইসহাক সিএসপি তখন চিফ সেক্রেটারি।

আমি যখন মাদানী সাহেবকে বললাম, পাঁচশত লোক মারা গেছে, তারা বিশ্বাস করতে চান নাই। মাদানী সাহেব বললেন, পঞ্চাশ জন হতে পারে। আমি তাকে বললাম, একটা একটা করে গণনা করেছি, নিজে গিয়ে দেখে আসুন। পরে মাদানী সাহেব স্বীকার করেছিলেন। রাত নয়টায় আমাকে ও মোহন মিয়াকে জানান হল, মিল এরিয়া মিলিটারিদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনাব শামসুদ্দোহা তখন পুলিশের আইজি। আমাকে এসে বললেন, “স্যার, সর্বনাশ হয়ে গেছে, মিলিটারিরা সকলে অবাঙালি।” আমি হেসে দিয়ে বললাম, “সর্বনাশের কি আর কিছু বাকি আছে। আপনি যখন পুলিশ ও ইপিআর নিয়ে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারলেন না, তখন আর মিলিটারির হাতে না দিয়ে উপায় কি?” তখন ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) প্রাদেশিক গভর্নমেন্টের অধীনে ছিল। ঢাকায় যেয়ে দেখি কি হয়েছে! চিফ মিনিস্টার নিশ্চয়ই মত দিয়েছেন। আমরা সোজা চিফ মিনিস্টারের বাড়িতে পৌঁছালাম। যেয়ে শুনতে পারলাম, তিনি আমার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। চিৎকার করে সকলের সঙ্গে রাগারাগি করছেন, আমাকে কেন দাঙ্গা এরিয়ায় রেখে সকলে চলে এসেছে। আমি তাঁর কাছে গেলে তিনি আমাকে খুব আদর করলেন। আমাকে বললেন, “ক্যাবিনেট মিটিং এখনই হবে, তুমি যেও না”। রাত সাড়ে দশটায় ক্যাবিনেট মিটিং বসল। ক্যাবিনেট মিটিং শুরু হওয়ার পূর্বে দেখলাম, মন্ত্রীদের মধ্যে দু’একজনকে এর মধ্যে হাত করে নিয়েছেন দোহা সাহেব। আবদুল লতিফ বিশ্বাস সাহেব মিলিটারিকে কেন ভার দেওয়া হয়েছে তাই নিয়ে চিৎকার করছেন। হক সাহেব আসলেন। সভা শুরু হওয়ার পূর্বেই চিফ সেক্রেটারি ইসহাক সাহেবকে কড়া কথা বলতে শোনা গেল। আমি প্রতিবাদ করলাম এবং বললাম, ও কথা পরে হবে। পূর্বে যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে নাই এবং এতগুলি লোকের মৃত্যুর কারণ তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এরপর ক্যাবিনেট আলোচনা শুরু হল। অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়, সে কথা আমার পক্ষে বলা উচিত না, কারণ ক্যাবিনেটে মিটিংয়ের খবর বাইরে বলা উচিত না।

মিটিং শেষ হবার পর যখন বাইরে এলাম, তখন রাত প্রায় একটা। দেখি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভক্ত কলকাতার পুরানা মুসলিম লীগ কর্মী রজব আলী শেঠ ও আরও অনেক অবাঙালি নেতা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা আমাকে বললেন, এখনই ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বের হতে। খবর রটে গেছে যে বাঙালিদের অবাঙালিরা হত্যা করেছে। যে কোনো সময় অবাঙালিদের উপর আক্রমণ হতে পারে। তাড়াতাড়ি রজব আলী শেঠ ও আরও কয়েকজনকে নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভিড় জমে আছে তখন পর্যন্ত। আমি গাড়ি থেকে নেমে বক্তৃতা করে সকলকে বুঝাতে লাগলাম এবং অনেকটা শান্ত করতে সক্ষম হলাম। রাত চার ঘটিকায় বাড়িতে পৌঁছালাম। শপথ নেওয়ার পরে পাঁচ মিনিটের জন্য বাড়িতে আসতে পারি নাই। আর দিনভর কিছু পেটেও পড়ে নাই। দেখি রেণু চুপটি করে না খেয়ে বসে আছে, আমার জন্য।

এই দাঙ্গা যে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এবং দুনিয়াকে নতুন সরকারের অক্ষমতা দেখাবার জন্য বিরাট এক ষড়যন্ত্রের অংশ সে সম্বন্ধে আমার মনে কোনো সন্দেহ নাই। কয়েকদিন পূর্বে এই ষড়যন্ত্র করাচি থেকে করা হয়েছিল এবং এর সাথে একজন সরকারি কর্মচারী এবং মিলের কোন কোন কর্মচারী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। যুগ যুগ ধরে পুঁজিপতিরা তাদের শ্রেণী স্বার্থে এবং রাজনৈতিক কারণে গরিব শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গাহাঙ্গামা, মারামারি সৃষ্টি করে চলেছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আদমজী মিলের মালিক গুল মোহাম্মদ আদমজী এসব জানতেন কি না সন্দেহ।

কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে যে সুযোগ খুঁজতে ছিল এই দাঙ্গায় তা সৃষ্টি করতে সক্ষম হল। মোহাম্মদ আলী মুসলিম লীগ ও পশ্চিমা শিল্পপতিদের যোগসাজশে যে যুক্তফ্রন্টকে ভাঙতে চেষ্টা করছিল আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় যোগদান করায় তা সফল হল না। তাই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ও তাদের দালালদের সাহায্যে চেষ্টা করে হতাশ হয়ে পরে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে লাগল। এ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারত না, যদি প্রথম দিনই যুক্তফ্রন্ট পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করে শাসনব্যবস্থাকে কন্ট্রোল করতে চেষ্টা করত।

যুক্তফ্রন্ট ইলেকশনে জয়লাভ করার পরে বড় বড় সরকারি আমলাদের মধ্যে বাসের সঞ্চার হয়েছিল। অনেকে প্রত্যক্ষভাবে মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার করেছিল। আওয়ামী লীগ প্রথমে মন্ত্রিসভায় যোগদান না করায় তাদের প্রাণে পানি এসেছিল। যোগদান করার পরে তাঁরা হতাশ হয়ে পড়ল এবং ষড়যন্ত্রে যোগদান করল। তবে হাফিজ মোহাম্মদ ইসহাক, চিফ সেক্রেটারি এই পরিবর্তনকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করেছিলেন।

পরের দিন আবার আমি আদমজী জুটমিলে যাই এবং যাতে শ্রমিকদের খাবার ও থাকার কোন কষ্ট না হয় তার দিকে নজর দিতে সরকারি কর্মচারীদের অনুরোধ করি। সেক্রেটারিয়েটে যেয়ে চিফ সেক্রেটারিকে ডেকে তার সঙ্গে আলাপ করলাম। ঐদিকে কাকে কোন মন্ত্রণালয় দেওয়া হবে তাই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানেও ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়েছে। আওয়ামী লীগারদের যেন ভাল দপ্তর দেওয়া না হয় সে চেষ্টা চলছে। এক মহাবিপদে পড়া গেল। মোহন মিয়া সাহেবই হক সাহেবের সাথে পরামর্শ করে উল্টাপাল্টা করতে লাগলেন। আমি হক সাহেবকে বললাম, “এ সমস্ত ভাল লাগে না, দরকার হয় মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যাব।”

পরের দিন দফতর ভাগ করা হল। আমাকে কো-অপারেটিভ ও এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট দফতর দেওয়া হল। এগ্রিকালচার আবার আলাদা করে অন্যকে দিল। জনাব সোবহান সিএসপি, দপ্তর ভাগ বাটোয়ারা করতে মোহন মিয়াকে পরামর্শ দিতেছিল। আমি তাকে ডেকে বললাম, “আপনি আমাকে জানেন না, বেশি ষড়যন্ত্র করবেন না।” আমি হক সাহেবের কাছে আবার হাজির হয়ে বললাম, “নানা, ব্যাপার কি? এ সমস্ত কি হচ্ছে, আমরা তো মন্ত্রী হতে চাই নাই। আমাদের ভিতরে এনে এ সমস্ত ষড়যন্ত্র চলছে কেন?” তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “করবার দে, আমার পোর্টফলিও তোকে দিয়ে দেব, তুই রাগ করিস না, পরে সব ঠিক করে দেব।” বৃদ্ধলোক, তাকে আর কি বলব, তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতে শুরু করেছেন। দরকার না হলেও আমাকে ডেকে পাঠাতেন। তিনি খবরের কাগজের প্রতিনিধিদের বলেছেন, “আমি বুড়া আর মুজিব গুড়া, তাই ওর আমি নানা ও আমার নাতি।” আমি সকলের চেয়ে বয়সে ছোট। আর হক সাহেব সকলের চেয়ে বয়সে বড়। তিনি আমাকে যে কাজই করতে বলতেন, আমি করতে লাগলাম। তার মনটা উদার ছিল, যে কারণে তাকে আমি ভক্তি করতে শুরু করলাম। ষড়যন্ত্রকারীরা যখন তাঁর কাছে না থাকত তখন তিনি উদার ও অমায়িক। খুব বেশি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তাই এদের উপর তার নির্ভর করতে হত। কিন্তু যেভাবে তিনি আমাকে স্নেহ করতে আরম্ভ করেছিলেন আমার বিশ্বাস হয়েছিল এদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করা যাবে। আমি অফিসে যেয়ে ঐ ডিপার্টমেন্ট কি বুঝতে চেষ্টা করলাম, কারণ ডিপার্টমেন্ট সম্বন্ধে আমার বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না। এই সময় মন্ত্রীর সরকারি বাড়িতে উঠে এল, আমিও ঢাকার মিন্টো রোডে সরকারি ভবনে ছেলেমেয়ে নিয়ে উঠলাম।

 

৮৩.

দু’একদিন পরই হক সাহেব আমাকে বললেন, “করাচি থেকে খবর এসেছে, আমাকে যেতে হবে। তুই ও আতাউর রহমান আমার সাথে চল। নান্না, মোহন মিয়া ও আশরাফউদ্দিন চৌধুরীও যাবে, বেটাদের হাভোব ভাল না। আমি প্রস্তুত ছিলাম, কারণ আমাকে যেতেই হত। শহীদ সাহেব অসুস্থ হয়ে আছেন, তাকে দেখতে।

আমরা করাচি পৌঁছালাম। প্রথমেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সাথে আমাদের পূর্ব বাংলার সমস্যা নিয়ে আলোচনা হল। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে আমাদের কি কি সাহায্যের প্রয়োজন তাও জানান হল। পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের বিরুদ্ধে ভীষণভাবে মিথ্যা প্রচার চালানো হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট সরকারই নাকি এই দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে। একথা কেউ কোনোদিন শুনেছে কি না আমার জানা নাই যে, সরকার নিজেই দাঙ্গা করে নিজেকে হেয় করার জন্য! আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মালিক সরকার, সে কেন দাঙ্গা করে বদনাম নিবে? দাঙ্গা বাধিয়েছে যারা পরাজিত হয়েছে তারা। করাচি থেকে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দুনিয়ার কাছে হেয় করতে এই দাঙ্গার সৃষ্টি করা হয়। তারা সুযোগ খুঁজছে কোনো রকমে প্রাদেশিক সরকারকে বরখাস্ত করা যায় কি না? কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের সাথে আলোচনা হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া আমাদের তার রুমে নিয়ে বসতে দিলেন। হক সাহেবও আছেন সেখানে। মোহাম্মদ আলী বেয়াদবের মত হক সাহেবের সাথে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। আমার সহ্যের সীমা অতিক্রম করছিল। এমন সময় মোহাম্মদ আলী আমাকে বললেন, “কি মুজিবর রহমান, তোমার বিরুদ্ধে বিরাট ফাইল আছে আমার কাছে।” এই কথা বলে, ইয়াংকিদের মত ভাব করে পিছন থেকে ফাইল এনে টেবিলে রাখলেন। আমি বললাম, “ফাইল তো থাকবেই, আপনাদের বদৌলতে আমাকে তো অনেক জেল খাটতে হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধেও একটা ফাইল প্রাদেশিক সরকারের কাছে আছে।” তিনি বললেন, “এর অর্থ।” আমি বললাম, “যখন খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেন তখন আপনাকে মন্ত্রী করেন নাই। আমরা যখন ১৯৪৮ সালে প্রথম বাংলা ভাষার আন্দোলন করি, তখন আপনি গোপনে দুইশত টাকা চান্দা দিয়েছিলেন, মনে আছে আপনার? পুরানা কথা অনেকেই ভুলে যায়।” হক সাহেব ও সৈয়দ আজিজুল হক সাহেব দেখলেন হাওয়া গরম হয়ে উঠছে। তখন বললেন, “এখন আমরা চলি, পরে আবার আলাপ হবে।” আমি এক ফাঁকে হক সাহেবের সাথে যে সে বেয়াদবের মত কথা বলেছিল, সে সম্বন্ধেও দু’এক কথা শুনিয়ে দিয়েছিলাম।

আমি অসুস্থ সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দেখতে গেলাম। শহীদ সাহেব বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না, কথা বলতেও কষ্ট হয়। ডাক্তার বাইরের লোকের সাথে দেখা করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমাকে দেখে তিনি খুব খুশি হলেন। বেবী (শহীদ সাহেবের একমাত্র মেয়ে) আমাকে বলে দিয়েছিল, রাজনীতি নিয়ে আলাপ যেন না করি। তিনি আস্তে আস্তে আমার কাছে রাজনীতি বিষয়েই জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। আমি দু’এক কথা বলেই চুপ করে যাই। তিনি শেষ পর্যন্ত বললেন, “বিরাট খেলা শুরু করেছে মোহাম্মদ আলী ও মুসলিম লীগ নেতারা।

হক সাহেব আমাকে বললেন, “গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তার সাথে আমাদের দেখা করতে অনুরোধ করেছেন। আমরা বড়লাটের বাড়িতে উপস্থিত হলাম। তিনি যে কামরায় শুয়ে শুয়ে দেশ শাসন করতেন, সেই ঘরেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। তিনি খুবই অসুস্থ। হাত-পা সকল সময়ই কাঁপে। কথাও পরিষ্কার করে বলতে পারেন না। তিনি হক সাহেবের সাথে আলাপ করলেন। আমার নাম ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, উপস্থিত আছি কি না! হক সাহেব আমাকে দেখিয়ে দিলেন। আমি আদাব করলাম। তিনি আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বসালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “লোকে বলে, আপনি কমিউনিস্ট, একথা সত্য কি না?” আমি তাকে বললাম, “যদি শহীদ সাহেব কমিউনিস্ট হন, তাহলে আমিও কমিউনিস্ট। আর যদি তিনি অন্য কিছু হন তবে আমিও তাই।” তিনি হেসে দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, “আপনি এখনও যুবক, দেশের কাজ করতে পারবেন। আমি আপনাকে দোয়া করছি। আপনাকে দেখে আমি খুশি হলাম।” কথাগুলি বুঝতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, কারণ কথা তিনি পরিষ্কার করে বলতে পারেন না। মুখটাও বাঁকা হয়ে গেছে। হাত-পা শুকিয়ে গিয়েছে। আল্লাহ সমস্ত বুদ্ধি আর মাথাটা ঠিক রেখে দিয়েছেন।

আমরা পরের দিনই খবর পেলাম পূর্ব বাংলায় গভর্নর শাসন দিবে, মন্ত্রিসভা ভেঙে দিবে, এই নিয়ে আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারি জনাব ইসহাক সাহেবকে আদেশ দিয়েছে, যাতে আমরা পূর্ব বাংলায় আসতে না পারিযাতে আমাদের প্লেনের টিকিট করতে না দেওয়া হয়। তিনি অস্বীকার করলেন এই কথা বলে যে, এখনও তাঁরা মন্ত্রী। আইনত তিনি আমাদের আদেশ মানতে বাধ্য। তাঁকে আরও বলা হয়েছিল, তাঁর রিপোর্ট পরিবর্তন করতে। তিনি তাও করতে আপত্তি করলেন। এটা না করার ফল হিসাবে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং অনেক দিন পর্যন্ত ছুটি ভোগ করতে বাধ্য করেছিল। আমি ও আতাউর রহমান সাহেব এ খবর পেয়েছিলাম। তাই হক সাহেবকে যেয়ে বললাম, “আমরা আজই ঢাকা রওয়ানা করব। কারণ, আজ না যেতে পারলে আরও কয়েকদিন থাকতে হবে। প্লেনের টিকিট পাওয়া যাবে না।” হক সাহেবকে অবস্থা বুঝিয়ে বললে তিনিও নান্না মিয়াকে ডেকে বললেন, তিনিও যাবেন। নান্না মিয়াও রাজি হলেন। মোহন মিয়া ও আশরাফউদ্দিন চৌধুরী সাহেব করাচি থেকে তদ্বির করবেন, কোনো কিছু করা যায় কি না।

আমরা টিকিট করতে হুকুম দিয়ে শহীদ সাহেবের কাছে উপস্থিত হলাম। তাঁকে কিছু কিছু বললাম। তিনি অতি কষ্টে আমাকে বললেন, “দু’একদিনের মধ্যে চিকিৎসার জন্য আমাকে জুরিখ যেতে হবে, টাকার অভাব হয়ে পড়েছে।” আমি বললাম, “ঢাকা যেয়ে কিছু টাকা বেবীর কাছে পাঠিয়ে দিব।” মনে মনে দুঃখ করলাম, আর ভাবলাম, যে লোক হাজার হাজার টাকা উপার্জন করে গরিবকে বিলিয়ে দিয়েছেন আজ তার চিকিৎসার টাকা নাই, একেই বলে কপাল!

বোধহয় ২৯শে মে হবে, আমরা রাতের প্লেনে রওয়ানা করলাম। দিল্পি কলকাতা হয়ে ঢাকা পৌঁছাবে বিওএসি প্লেন। আমাদের সাথে চিফ সেক্রেটারি হাফিজ ইসহাক ও আইজিপি শামসুদ্দোহা সাহেব ঢাকা রওয়ানা করলেন। দোহা সাহেব কেন এবং কার হুকুমে করাচি গিয়েছিলেন আমার জানা ছিল না। হক সাহেব পরে আমাকে বলেছেন, তিনিই হুকুম দিয়েছেন। কলকাতা পৌঁছাবার কিছু সময় পূর্বে জনাব দোহা হক সাহেবকে যেয়ে বললেন, “স্যার আমার মনে হয় আপনার আজ কলকাতা থাকা উচিত। কি হয় বলা যায় না, এদের ভাবসাব ভাল দেখলাম না। রাতেই ইস্কান্দার মির্জা এবং এন. এম. খান ঢাকায় মিলিটারি প্লেনে রওয়ানা হয়ে গেছেন। ঢাকা এয়ারপোর্টে কোনো ঘটনা হয়ে যেতে পারে। যদি কোনো কিছু না হয়, তবে আগামীকাল প্লেন পাঠিয়ে আপনাদের নেওয়ার বন্দোবস্ত করব।” হক সাহেব সবই বুঝতেন, তিনি নান্না মিয়াকে ও আমাকে দেখিয়ে দিয়া বললেন, “ওদের সাথে আলাপ করুন।” আমার কাছে দোহা সাহেব এসে ঐ একই কথা বললেন। আমি তাকে পরিষ্কার বলে দিলাম, “কেন কলকাতায় নামব? কলকাতা আজ আলাদা দেশ। যা হয় ঢাকায়ই হবে।” নান্না মিয়াও একই জবাব দিলেন। আমার বুঝতে বাকি থাকল না, কেন তিনি গায়ে পড়ে এই পরামর্শ দিতে এসেছেন। তিনি যে এই পরামর্শ দিচ্ছিলেন তা করাচি থেকেই ঠিক করেই এসেছেন। পাকিস্তানী শাসকচক্র দুনিয়াকে দেখতে চায়, ‘হক সাহেব দুই বাংলাকে এক করতে চান, তিনি পাকিস্তানের দুশমন, তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী। আর আমরা তাঁর এই রাষ্ট্রদ্রোহী কাজের সাথী।

কলকাতা এয়ারপোর্টে নামবার সাথে সাথে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা হক সাহেবকে ঘিরে ফেলল এবং প্রশ্ন করতে শুরু করল। তিনি মুখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর মুখ বন্ধ, আর আমাকে দেখিয়ে দিলেন। প্রতিনিধিরা আমার কাছে এলে, আমি বললাম, “এখানে আমাদের কিছুই বলার নাই। যদি কিছু বলতে হয়, ঢাকায় বলা যাবে।” কলকাতা এয়ারপোর্টে আমাদের প্রায় এক ঘণ্টা দেরি করতে হল। আবার দোহা সাহেব এসে বললেন, “টেলিফোন করে খবর পেলাম, সমস্ত ঢাকা এয়ারপোর্ট মিলিটারি ঘিরে রেখেছে। চিন্তা করে দেখেন, কি করবেন?” আমি তাকে বললাম, “ঘিরে রেখেছে ভাল, আমাদের তাতে কি, আমরা ঢাকায়ই যাব। বিদেশে এক মুহূর্তও থাকব না।” প্লেনে উঠে ভাবলাম, দোহা সাহেব পুলিশে চাকরি করেন, তাই নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান মনে করেন। আমরা রাজনীতি করি, তাই এই সামান্য চালাকিটাও বুঝতে পারি না।।

ঢাকায় এসে দেখলাম, বিরাট জনতা আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা সকলের সাথে দেখা করে যার যার বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। আমৱা হক সাহেবের পিএ সাজেদ আলীকে করাচি রেখে এসেছিলাম। যদি কোনো খবর থাকে তাহলে টেলিফোন করে যেন জানিয়ে দেয়।

 

৮৪.

বাসায় এসে দেখলাম, রেণু এখনও ভাল করে সংসার পাততে পারে নাই। তাকে বললাম, “আর বোধহয় দরকার হবে না। কারণ মন্ত্রিত্ব ভেঙে দিবে, আর আমাকেও গ্রেফতার করবে। ঢাকায় কোথায় থাকবা, বোধহয় বাড়িই চলে যেতে হবে। আমার কাছে থাকবা বলে এসেছিলা, ঢাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ হবে, তা বোধহয় হল না। নিজের হাতের টাকা পয়সাগুলিও খরচ করে ফেলেছ।” রেণু ভাবতে লাগল, আমি গোসল করে ভাত খেয়ে একটু বিশ্রাম করছিলাম। বেলা তিনটায় টেলিফোন এল, কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা জারি করেছে।২৮ মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করা হয়েছে। মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে পূর্ব বাংলার গভর্নর, আর এন, এম, খানকে চিফ সেক্রেটারি করা হয়েছে।

আমি তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে আতাউর রহমানের বাড়িতে এসে তাকে নিয়ে হক সাহেবের বাড়িতে গেলাম এবং তাঁকে অনুরোধ করলাম ক্যাবিনেট মিটিং ডাকতে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অন্যায় আদেশ আমাদের মানা উচিত হবে না এবং এটাকে অগ্রাহ্য করা উচিত। তিনি বললেন, কি হবে বুঝতে পারছি না, অন্যদের সাথে পরামর্শ কর। নান্না মিয়াকে বললাম, তিনি কিছুই বলতে পারছেন না, মনে হল সকলে ভয় পেয়ে গেছেন। আতাউর রহমান সাহেব রাজি ছিলেন, যদি সকলে একমত হতে পারতাম। মন্ত্রীদের পাওয়া গেল না, হক সাহেব দোতলায় বসে রইলেন। আতাউর রহমান সাহেবকে বললাম, “আপনি দেখেন, সকলকে ডেকে আনতে পারেন কি না? আমি আওয়ামী লীগ অফিস থেকে কাগজপত্রগুলি সরিয়ে দিয়ে আসি। অফিস তালা বন্ধ করে দিতে পারে।”

আমি আওয়ামী লীগ অফিসে যেয়ে দরকারি কাগজপত্র সরিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে অন্য পথ দিয়ে পুলিশ অফিসে এসে পাহারা দিতে আরম্ভ করল। আমি আবার নান্না মিয়ার বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে আমাকে জানাল, বড় বড় পুলিশ কর্মচারীরা আমাকে খুঁজতে এসেছিল। বাড়িতে ফোন করে জানলাম সেখানেও গিয়েছিল। আমি রেণুকে বললাম, “আবার আসলে বলে দিও শীঘ্র আমি বাড়িতে পৌঁছাব।” বিদায় নেওয়ার সময় অনেককে বললাম, “আমি তো জেলে চললাম, তবে একটা কথা বলে যাই, আপনারা এই অন্যায় আদেশ নীরবে মাথা পেতে মেনে নেবেন না। প্রকাশ্যে এর বাধা দেওয়া উচিত। দেশবাসী প্রস্তুত আছে, শুধু নেতৃত্ব দিতে হবে আপনাদের। জেলে অনেকের যেতে হবে, তবে প্রতিবাদ করে জেল খাটাই উচিত। সেখান থেকে এসে পথে কয়েকজন কর্মীর সাথে দেখা করতে চেষ্টা করলাম, কাউকেও পাওয়া গেল না। আমি সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে রিকশা ভাড়া করে বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। দেখলাম, কিছু কিছু পুলিশ কর্মচারী আমার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। আমি রিকশায় পৌঁছালাম, তারা বুঝতে পারে নাই। রেণু আমাকে খেতে বলল, খাবার খেয়ে কাপড় বিছানা প্রস্তুত করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব এহিয়া খান চৌধুরীকে ফোন করে বললাম, “আমার বাড়িতে পুলিশ এসেছিল, বোধহয় আমাকে গ্রেফতার করার জন্য। আমি এখন ঘরেই আছি গাড়ি পাঠিয়ে দেন। তিনি বললেন, “আমরা তো হুকুমের চাকর। গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি প্রস্তুত হয়ে থাকুন। আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য বার বার টেলিফোন আসছে। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন ছেড়ে দিলাম। রেণু আমার সকল কিছু ঠিক করে দিল এবং কাদতে লাগল। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। ওদের ওঠাতে নিষেধ করলাম। রেণুকে বললাম, “তোমাকে কি বলে যাব, যা ভাল বোঝ কর, তবে ঢাকায় থাকলে কষ্ট হবে, তার চেয়ে বাড়ি চলে যাও।”

বন্ধু ইয়ার মোহাম্মদ খানকে বলে গিয়েছিলাম, যদি রেণু বাড়ি না যায় তা হলে একটা বাড়ি ভাড়া করে দিতে। ইয়ার মোহাম্মদ খান ও আল হেলাল হোটেলের মালিক হাজী হেলাল উদ্দিন রেণুকে বাড়ি ভাড়া করে দিয়েছিল এবং তখন দেখাশোনাও করেছিল। কিছুদিন পরই ইয়ার মোহাম্মদ খান রেণুকে নিয়ে জেলগেটে আমার সাথে দেখা করতে আসলে তাকেও জেলগেটে গ্রেফতার করে। ইয়ার মোহাম্মদ খান ঢাকা থেকে এমএলএ হয়েছিলেন।

আধা ঘণ্টা পরে গাড়ি এসে হাজির। অনেক লোকই বাড়িতে ছিল, গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে অনেকেই অন্ধকারে পালিয়ে গেছে। আমি গাড়িতে উঠে রওয়ানা করলাম। গোপালগঞ্জের অল্প বয়সের এক কর্মী শহিদুল ইসলাম গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। আমি গাড়ি থেকে নেমে তাকে আদর করে বুঝিয়ে বললাম, “কেন কাঁদিস, এই তো আমার পথ। আমি একদিন তো বের হব, তোর ভাবীর দিকে খেয়াল রাখিস।”

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে আমাকে নিয়ে আসা হল। তিনি বসেই ছিলেন, আমাকে বললেন, “কি করব বলুন! করাচি আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আমরা তো জানি আপনাকে খবর দিলে আপনি চলে আসবেন। জেলের ভয় তো আপনি করেন না। তার কাছে অনেক টেলিফোন আসছিল, আমার আর তার কামরায় থাকা উচিত না। তাকে বললাম, “আমাকে জেলে পাঠিয়ে দেন। খুবই ক্লান্ত, গতরাতেও ঘুম হয় নাই প্লেনে।”

তিনি আমাকে পাশের রুমে নিয়ে বসতে দিলেন। ইদ্রিস সাহেব তখন ঢাকার ডিআইজি। তিনি আসলেন, আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করলেন। সিগারেট বা অন্য কিছু লাগবে কি না জানতে চাইলেন। আমি তাঁকেও বললাম, তাড়াতাড়ি জেলে পাঠিয়ে দিলেই খুশি হব। তিনি চলে যাওয়ার কয়েক মিনিট পরে একজন ইন্সপেক্টর এসে একটা ওয়ারেন্ট তৈরি করতে লাগলেন। একটা মামলা আমার নামে করা হল; তাতে দেখলাম, ডাকাতি ও খুন করার চেষ্টা, লুটতরাজ ও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, আরও কতগুলি ধারা বসিয়ে দিলেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ‘ডিভিশন’ লিখে দিলেন। আমি রাত সাড়ে বারোটা কি একটা হবে, জেলগেটে পৌঁছালাম। দেখি, আমিই একলা আর কাউকেও আনা হয় নাই। কয়েক মিনিট পরে দেখলাম, মির্জা গোলাম হাফিজ আর সৈয়দ আবদুর রহিম মোক্তারকে আনা হয়েছে। তিনজনকে দেওয়ানি ওয়ার্ডে রাখা হল।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিস থেকে আসবার সময় ইদ্রিস সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক প্রফেসর আবদুল হাই সাহেব কোথায় থাকেন?” আমি তাকে বললাম, “জানলেও বলব না। কি করে আশা করতে পারেন যে, আপনাকে বলব?” দশ-পনের দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রায় তিন হাজার কর্মী ও সমর্থক গ্রেফতার করা হল। অন্যান্য দলের সামান্য কয়েকজন কর্মী, আর কয়েকশত ছাত্র, এবং পঞ্চাশজনের মত এমএলএকে গ্রেফতার করা হল। গণতান্ত্রিক দলের কয়েকজন এমএলএকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। ঢাকা জেলের দেওয়ানি ওয়ার্ডে ও সাত সেলে কোরবান আলী, দেওয়ান মাহবুব আলী, বিজয় চ্যাটার্জী, খন্দকার আবদুল হামিদ, মির্জা গোলাম হাফিজ, ইয়ার মোহাম্মদ খান, মোহাম্মদ তোয়াহাকে রাখা হয়েছিল। পরে প্রফেসর অজিত গুহ ও মুনীর চৌধুরীকেও গ্রেফতার করে আনা হয়েছিল। হক সাহেবকে নিজ বাড়িতে অন্তরীণ করেছে।

৬ই জুন তারিখে আবু হোসেন সরকার সাহেবের বাড়িতে যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি পার্টির সভা আহ্বান করা হয়। সামান্য কয়েকজন এমএলএ উপস্থিত হয়েছিলেন। কয়েকজন ভূতপূর্ব মন্ত্রীও এসেছিলেন। পুলিশ এসে সভা করতে নিষেধ করলে সকলে সভা ত্যাগ করে যার যার বাড়িতে রওয়ানা করেন।

পূর্ব বাংলায় গভর্নর শাসন জারি করার দিন প্রধানমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আলী যে বক্তৃতা রেডিও মারফত করেন, তাতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেবকে রাষ্ট্রদ্রোহী’ এবং আমাকে ‘দাঙ্গাকারী’ বলে আক্রমণ করেন। আমাদের নেতারা যারা বাইরে রইলেন, তারা এর প্রতিবাদ করারও দরকার মনে করলেন না। দেশবাসী ৬ই জুনের দিকে চেয়েছিল, যদি নেতারা সাহস করে প্রোগ্রাম দিত তবে দেশবাসী তা পালন করত। যেসব কর্মী গ্রেফতার হয়েছিল তারা ছাড়াও যারা বাইরে ছিল তারাও প্রস্তুত ছিল। আওয়ামী লীগের সংগ্রামী ও ত্যাগী কর্মীরা নিজেরাই প্রতিবাদে যোগ দিতে পারত। যুক্তফ্রন্টের তথাকথিত সুবিধাবাদী নেতাদের মুখের দিকে চেয়ে থেকে তাও তারা করতে পারল না। অনেক কমই চেষ্টা করে গ্রেফতার হয়েছিল। যদি সেইদিন নেতারা জনগণকে আহ্বান করত তবে এতবড় আন্দোলন হত যে কোনোদিন আর ষড়যন্ত্রকারীরা সাহস করত না বাংলাদেশের উপর অত্যাচার করতে। শতকরা সাতানব্বই ভাগ জনসাধারণ যেখানে যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিল ও সমর্থন করল, শত প্রলোভন ও অত্যাচারকে তারা জক্ষেপ করল না-সেই জনগণ নীরব দর্শকের মত তাকিয়ে রইল। কি করা দরকার বা কি করতে হবে, এই অত্যাচার নীরবে সহ্য করা উচিত হবে কি না, এ সম্বন্ধে নেতৃবৃন্দ একদম চুপচাপ।

একমাত্র আতাউর রহমান খান কয়েকদিন পরে একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন। ৯২(ক) ধারা জারি হওয়ার কয়েকদিন পূর্বে মওলানা ভাসানী বিলাত গিয়েছেন। শহীদ সাহেব অসুস্থ হয়ে জুরিখ হাসপাতালে, আর আমি তো কারাগারে বন্দি। নীতিবিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে সাময়িকভাবে কিছু ফল পাওয়া যায়, কিন্তু সংগ্রামের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। দেড় ডজন মন্ত্রীর মধ্যে আমিই একমাত্র কারাগারে বন্দি। যদি ৬ই জুন সরকারের অন্যায় হুকুম অমান্য করে (হক সাহেব ছাড়া) অন্য মন্ত্রীরা গ্রেফতার হতেন তা হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। দুঃখের বিষয়, একটা লোকও প্রতিবাদ করল না। এর ফল হল ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারল যে, যতই হৈচৈ বাঙালিরা করুক না কেন, আর যতই জনসমর্থন থাকুক না কেন, এদের দাবিয়ে রাখতে কষ্ট হবে না। পুলিশের বন্দুক ও লাঠি দেখলে এরা পালিয়ে গর্তে লুকাবে। এই সময় যদি বাধা পেত তবে হাজার বার চিন্তা করত বাঙালিদের উপর ভবিষ্যতে অত্যাচার করতে।

 

৮৫.

এই দিন থেকেই বাঙালিদের দুঃখের দিন শুরু হল। অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়। ঠিক মনে নাই, তবে দুই-তিন দিন পরে আমাকে আবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হল। নিরাপত্তা আইনে বন্দিদের বিনা বিচারে কারাগারে আটক থাকতে হয়। সরকার ভাবল, যে মামলায় আমাকে গ্রেফতার করেছে, তাতে জামিন হলেও হয়ে যেতে পারে; তাই নিরাপত্তা আইনে তাদের পক্ষে সুবিধা হবে আমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা। কি মামলায় আসামি করেছে আমার তা মনে নাই। আমি নাকি কাউকে হত্যা করতে চেষ্টা করেছি বা লুটপাট করতে উসকানি দিয়েছি। খবর নিয়ে জানলাম, জেলগেটে একটা গোলমাল হয়েছিল আমি মন্ত্রী হওয়ার সামান্য কিছুদিন পূর্বে, সেই ঘটনার সাথে আমাকে জড়িয়ে এই মামলা দিয়েছে।

একদিন আমি আওয়ামী লীগ অফিসে ইফতার করছিলাম। ঢাকায় রোজার সময় জেলের বাইরে থাকলে আমি আওয়ামী লীগ অফিসেই কর্মীদের নিয়ে ইফতার করে থাকতাম। হঠাৎ টেলিফোন পেলাম, চকবাজারে জেল সিপাহিদের সাথে জনসাধারণের সামান্য কথা কাটাকাটি হওয়ায় জেল সিপাহিরা গুলি করেছে। একজন লোক মারা গিয়েছে এবং অনেকে জখম হয়েছে। ঢাকা কারাগার চকবাজারের পাশেই। হক সাহেব মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, আমি তখনও মন্ত্রী হই নাই। আমি আতাউর রহমান সাহেবকে টেলিফোন করলাম। তাঁর বাসা চকবাজারের কাছে। তিনিও খবর পেয়েছেন, আমাকে তার বাসায় যেতে বললেন। দরকার হলে একসাথে চকবাজার ও জেলখানায় যাওয়া যাবে। আমি পৌঁছার সাথে সাথে দুজনে দ্রুত চকবাজারে পৌঁছালাম। অনেক লোক জমা হয়ে আছে এবং তারা খুবই উত্তেজিত। আমরা উপস্থিত হলে তারা আমাদের ঘিরে ফেলল এবং সকলে একসাথে চিৎকার করতে শুরু করল। সকলেই একসঙ্গে কথা বলতে চায়, কি ঘটনা ঘটেছে জানাতে। আমরা যখন তাদের অনুরোধ করলাম, এক একজন করে বলতে, তখন তারা একটু শান্ত হল এবং ঘটনাটা বলল। একজন ওয়ার্ডারের সাথে এক পানের দোকানদারের কথা কাটাকাটি এবং পরে মারামারি হয়। এই অবস্থায় দু’চারজন ওয়ার্ডারও হাজির হয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডারের পক্ষ নেয়, আর জনসাধারণ দোকানদারের পক্ষ নেয়। সিপাহিরা একটু বেশি মার খায়। তারা ব্যারাকে ফিরে গিয়ে রাইফেল এনে গুলি করতে শুরু করে। এতে অনেক লোক জখম হয় এবং তিনজন আহত লোককে ধরে জেল এরিয়ার ভিতরে নিয়ে যায়। অনেক লোক তখন জমা হয়েছে। আমরা দুইজনই তাদের শান্ত হতে বলে, জেলগেটের দিকে রওয়ানা করেই দেখতে পেলাম, সৈয়দ আজিজুল হক ওরফে নান্না মিয়া (তখন মন্ত্রী) খবর পেয়ে এসেছেন। তাঁর সাথে একজন বিশিষ্ট সরকারি কর্মচারী আছেন। আমরা একসাথে জেলগেটের ভিতরে পৌঁছালাম। সেখানে জেল সুপারিনটেনডেন্ট ও জেলারের সাথে আলাপ হল। এ সময় আরও দু’একজন মন্ত্রী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ডিভিশনাল কমিশনার এসে হাজির হয়েছেন। জনসাধারণ মন্ত্রীদের ও আমাদের দেখে একদম জেলগেটের সামনে এসে জড়ো হয়েছে। হাজার হাজার লোক চিক্কার করতে আরম্ভ করেছে।

ঢাকা জেলে তখন একজন এ্যাংলো ইন্ডিয়ান সার্জেন্ট ছিল, তার নাম মিস্টার গজ। সত্যি কি না বলতে পারি না, তবে জনতা গজের বিচার চাই, গজ নিজে গুলি করেছে’— ইত্যাদি বলে চিৎকার করতে শুরু করেছে। গজের বাসা জেলগেটের সামনেই। কে যেন বলে দিয়েছে, এটা গজের বাড়ি। জনতা গজের বাড়ি আক্রমণ করে ফেলেছে। যারা উপস্থিত ছিলেন—মন্ত্রী, নেতা এবং সরকারি কর্মচারী তাঁরা আমাকে অনুরোধ করল বাইরে যেতে। এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে, একজন আর্মড পুলিশও এক ঘণ্টা হয়ে গেছে, এসে পৌঁছায় নাই। আমি বাইরে যেয়ে জনতার মোকাবেলা করলাম। নিজের হাতে অনেককে ঠেলা ধাক্কা দিয়ে নিবৃত্ত করলাম। কর্মীদের নিয়ে মি, গজের বাড়ির বারান্দা থেকে উন্মত্ত জনতাকে ফেরত আনলাম। একটা গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করলাম গোলমাল না করতে, শাস্তি বজায় রাখতে। বললাম, সরকার বিচার করবে অন্যায়কারীর। মাইক্রোফোন নাই। গলায় কুলায় নাই। আবার গজের বাড়ির দিকে জনতা ছুটেছে। আবার আমি কর্মীদের নিয়ে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তার বাড়ি রক্ষা করলাম। আওয়ামী লীগের অনেক কর্মীও তখন পৌঁছে গেছে। আমি যখন লোকদের শান্ত করে জেলগেটের দিকে ফেরাই, ঠিক সেই সময় আইজিপি দোহা সাহেব কয়েকজন পুলিশ নিয়ে হাজির হলেন। তিনি আমার হাত ধরে ফেললেন এবং বললেন, “আপনি গ্রেফতার।” আমি বললাম, “খুব ভাল।” জনতা চিকার করে উঠে এবং আমাকে কেড়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। আমি তাদের বোঝাতে লাগলাম। আবার দুই-তিন মিনিট পরে দোহা সাহেব ফিরে এসে বললেন, “আপনাকে অন্ধকারে চিনতে পারি নাই। ভুল হয়ে গেছে। চলুন জেলগেটে যাই।” আমি তার সাথে জেলগেটের ভিতরে পৌঁছালাম এবং বললাম, “প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে গোলমাল শুরু হয়েছে, আপনি এখন পুলিশ নিয়ে হাজির হয়েছেন। এতক্ষণ পর্যন্ত শান্তি রক্ষা আমাদেরই করতে হয়েছে। যা ভাল বোঝেন করেন। আমার কি প্রয়োজন। লালবাগ পুলিশ লাইন থেকে জেলগেট এক মাইলও হবে না, আর আপনার পুলিশ ফোর্স পৌঁছাতে এত সময় লাগল।” আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। জনতা একেবারে জেলগেটের সামনে এসে পড়েছে। আমরা দেখলাম, এখন পুলিশ লাঠিচার্জ বা গুলি করতে আরম্ভ করবে। কেউই জনতাকে বোঝাতে চেষ্টা করছে না। সরকারি পাবলিসিটি ভ্যানও আসতে বলা হয় নাই যে মাইক্রোফোন দিয়ে বক্তৃতা করে লোকদের বোঝানো যায়। খালি গলায় চিৎকার করে কাউকেও শোনানো যাবে না। যারা সুপারিনটেনডেন্ট সাহেবের রুমে বসেছিলেন তাদের বলে জনতাকে নিয়ে এক মিছিল করে রওয়ানা করলাম। আমাদের অনেক কর্মীও বাইরে ছিল। আমি বাইরে এসে জনতাকে বললাম, “চলুন এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করার জন্য মিছিল করা যাক।” আমি হাঁটা দিলাম। প্রায় শতকরা সত্তরজন লোক আমার সাথে রওয়ানা করল। আমি সদরঘাট পর্যন্ত দেড় মাইল পথ এদের নিয়ে এলাম।

আওয়ামী লীগ অফিসে যেয়ে পরের দিন পল্টন ময়দানে এক সভা করব যোবণা করলাম। এটা খুবই অন্যায়, জেল ওয়ার্ডার কেন জেল এরিয়ার বাইরে যেয়ে গুলি করবে? আর কার অনুমতি নিয়েছে? কে ম্যাগজিন খুলে দিয়েছে? ওয়ার্ডারদের কাছে তো রাইফেল সব সময় থাকে না। আমি যখন আওয়ামী লীগ অফিসে বসে আলাপ করছিলাম তখন রাত প্রায় দশটা। আবার খবর এল, জেলগেটে গুলি হয়েছে। একজন লোক মারা গেছে। আমি আর জেলগেটে যাওয়া দরকার মনে করলাম না। আতাউর রহমান সাহেবকে টেলিফোনে বললাম, সভা ডেকে দিয়েছি, তিনি সম্মতি দিলেন।

পরের দিন পল্টন ময়দানে বিরাট সভা হল। আমি বক্তৃতা করলাম, যে দোষী তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত, আর যারা গুলিতে মারা গিয়াছে তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পুলিশ কেন সময় মত উপস্থিত হয় নাই, তারও একটা তদন্ত হওয়া উচিত। এর কয়েকদিন পরে যখন মন্ত্রী হলাম এবং এ ঘটনা সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, না হয়ে থাকলে কি করা উচিত এ বিষয়েও আমরা আলোচনা করেছিলাম। মন্ত্রিসভা বরখাস্ত ও গভর্নর শাসন কায়েম হওয়ার পরে আমাকে ঐ জেলগেট দাঙ্গার কেসে আসামি করা হল এবং মামলা দায়ের করা হল। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এই মামলা চলে। জনাব ফজলে রাব্বী, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে বিচার হয়। অনেক মিথ্যা সাক্ষী জোগাড় করেছিল। এমন কি মিস্টার গজের মেয়েও আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিল। পাবলিক সাক্ষী জোগাড় করতে পারে নাই। জেল ওয়ার্ডের মধ্যে থেকেও কয়েকজন সাক্ষী এনেছিল। তার মধ্যে দুইজন ওয়ার্ডার সত্য কথা বলে ফেলল যে, তারা আমাকে দেখেছে গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতে এবং লোকদের চলে যেতেও আমি বলেছিলাম, তাও বলল। জেল সুপারিনটেনডেন্ট মিস্টার নাজিরউদ্দিন সরকার কি সত্য কথা বললেন না, পুলিশ যা শিখিয়ে দিয়েছিল তাই বললেন। এক একজন সাক্ষী এক এক কথা বলল এবং কিছু কিছু সরকারি সাক্ষী একথাও স্বীকার করল যে, আমি জনতাকে শান্তি রক্ষা করতে অনুরোধ করেছিলাম। তাতে ম্যাজিস্ট্রেট আমার বিরুদ্ধে কোনো কিছু না থাকায় আমাকে বেকসুর খালাস দিলেন এবং রায়ে বলেছিলেন যে আমাকে শান্তিভঙ্গকারী না বলে শান্তিরক্ষকই বলা যেতে পারে। তবে এইবারে বোধহয় আমাকে দশ মাস জেলে থাকতে হল নিরাপত্তা আইনে।

 

৮৬.

আমি জেলে থাকবার সময় কয়েকটি ঘটনা ঘটল—যাতে আমি ও অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিরা খুবই মর্মাহত হয়ে পড়লাম। গৃহবন্দি হওয়ার কিছুদিন পরেই শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেবকে দিয়ে তার সমর্থকরা এক বিবৃতি দিয়েছিলেন। তাতে তিনি অন্যায় স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি যুক্তফ্রন্টের নেতা, তার এই কথায় আমাদের সকলের মাথা নত হয়ে পড়ল। যারা আমরা জেলে ছিলাম তাদের মনের অবস্থা কি হয়েছিল তা লেখা কষ্টকর। খবরের কাগজ দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, তাঁর মনে দুর্বলতা আসতে পারে। যারা বাইরে ছিলেন তাঁরা কি করলেন। সমস্ত জনসাধারণ আমাদের সমর্থন করেছিল। হাজার হাজার কর্মী কারাগারে বন্দি। আমি ও আমার সাথে যারা বন্দি ছিল তারা এক জায়গায় বসে আলোচনা করলাম এবং স্থির করলাম এই কৃষক শ্রমিক দলের সাথে আর রাজনীতি করা যায় না। এদিকে কারাগারে বসেও খবর পেতে লাগলাম যে, কৃষক শ্রমিক দলের কয়েকজন নামকরা নেতা—যাঁরা ১৯৫৩ সালে মুসলিম লীগ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন তারা গোপনে গোপনে মোহাম্মদ আলীর সাথে আলোচনা চালিয়েছেন কিভাবে আবার মন্ত্রিত্ব পেতে পারেন। দরকার হলে আওয়ামী লীগের সাথে কোনো সম্পর্ক তারা রাখবেন না। আদমজী মিলের এতবড় দাঙ্গার সাথে জড়িত সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে মিস্টার ইস্কান্দার মির্জা গভর্নর হয়ে রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

অন্যদিকে মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে গোলমাল শুরু হয়ে গেল। গোলাম মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ আলীর সাথে মনকষাকষি শুরু হয়েছে। এখন আর মোহাম্মদ আলী সুবোধ বালক’ নন। তিনি গোলাম মোহাম্মদের ক্ষমতা খর্ব করে গণপরিষদে এক আইন পাস করে নিলেন। গোলাম মোহাম্মদও ছাড়বার পাত্র নন। তিনিও আঘাত করার জন্য প্রস্তুত হলেন। যে অদৃশ্য শক্তি তাকে সাহায্য করেছিল নাজিমুদ্দীন সাহেবকে পদচ্যুত করতে, সেই অদৃশ্য শক্তি তার পিছনে আছে, তিনি তা জানেন। সেই অদৃশ্য শক্তিই ধাপে ধাপে গোলমাল সৃষ্টি করার সুযোেগ দিচ্ছে। ক্ষমতা দখল করার জন্য এখন খেলা শুরু করে দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে গণপরিষদে আইন পাস করে মোহাম্মদ আলী গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার এক মাস পরে, ২৩ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে গোলাম মোহাম্মদ পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে গণপরিষদ ভেঙে দিলেন। গণপরিষদ ছিল সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই গণপরিষদের সদস্যরা ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দেশে কোনো শাসনতন্ত্র ইচ্ছা করেই দেন নাই। গণপরিষদ একদিকে শাসনতন্ত্র তৈরি করার অধিকারী, অন্যদিকে জাতীয় পরিষদ হিসাবে দেশের আইন পাস করারও অধিকারী। ভারত ও পাকিস্তান একই সঙ্গে স্বাধীন হয়। একই সময় দুই দেশে গণপরিষদ গঠন হয়। ভারত ১৯৫২ সালে শাসনতন্ত্র তৈরি করে দেশজুড়ে প্রথম সাধারণ নির্বাচন দেয়। আবার জাতীয় নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে।

আমাদের গণপরিষদের কতক সদস্য কিছু একটা কোটারির সৃষ্টি করে রাজত্ব কায়েম করে নিয়েছে। পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক নির্বাচনে পরাজিত হয়েও এদের ঘুম ভাঙল না। এরা ষড়যন্ত্র করে পূর্ব বাংলার নির্বাচনকে বানচাল করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করল। মোহাম্মদ আলী জানতেন তাঁর সাথে আর্মি নাই, আর থাকতেও পারে না। গোলাম মোহাম্মদকেই আর্মি সমর্থন করবে। তবুও এত বড় ঝুঁকি নিতে সাহস পেলেন কোথা থেকে? নিশ্চয়ই অদৃশ্য শক্তিই তাঁকে সাহস দিয়েছিল। পাঞ্জাবের যে কোটারি পাকিস্তান শাসন করছিল, তারা জানে, পূর্ব বাংলার এই ভদ্রলোকদের যতদিন ব্যবহার করা দরকার ছিল, করে ফেলেছে। এদের কাছ থেকে আর কিছু পাওয়ার নাই। আর এরাও পূর্ব বাংলার জনমতের চাপে মাঝে মাঝে বাধা সৃষ্টি করতে শুরু করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানীরা যুক্তফ্রন্টের জয়ের পরে এদের অবস্থাও বুঝতে পেরেছে। এরা যে পূর্ব বাংলার লোকের প্রতিনিধি নয় তাও জানা হয়ে গেছে।

মোহাম্মদ আলী তাঁহার সহকর্মীদের ত্যাগ করে আবার গোলাম মোহাম্মদের কাছে আত্মসমর্পণ করে কেয়ারটেকার সরকার গঠন করেন। এবারে তিনি পূর্বের চেয়ে বেশি গোলাম মোহাম্মদ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর হাতের মুঠোয় চলে আসলেন। যদিও তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন, কিন্তু সত্যিকারের ক্ষমতার মালিক ছিলেন চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। আইয়ুব খানকে প্রধান সেনাপতি ও ইস্কান্দার মির্জাকে মন্ত্রী করে দেশটাকে আমলাদের হাতে তুলে দেওয়া হল। আইয়ুব সাহেবের মনে উচ্চাকাক্ষার সৃষ্টি পূর্বেই হয়েছিল। তার প্রমাণ আইয়ুব খানের আত্মজীবনী ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’। তিনি এ বইতে স্বীকার করেছেন যে, ১৯৫৪ সালের ৪ঠা অক্টোবর লন্ডনের হোটেলে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে তাঁর মতামত লিখেছেন। কেন তিনি শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে লিখতে গেলেন? তিনি পাকিস্তান আর্মির প্রধান সেনাপতি, তিনি শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করবেন। সেইভাবে পাকিস্তানের আর্মড ফোর্সকে গড়ে তোলাই হল তাঁর কাজ।

গোলাম মোহাম্মদ আর চৌধুরী মোহাম্মদ আলী যে চক্রান্তের খেলা শুরু করেছিলেন, তারা সাহস কোথা থেকে পেয়েছিলেন? নিশ্চয়ই জেনারেল আইয়ুব খান সকল কিছু বুঝেও চুপ করেছিলেন। রাজনীতিবিদরা নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ করে হেয়প্রতিপন্ন হয় এবং পাকিস্তানের জনগণ তাদের উপর থেকে আস্থা হারাতে বাধ্য হয়। এ অবস্থায় নেতাহীন ও নীতিহীন মুসলিম লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য সুযোগ করে নিতে চেষ্টা করতে লাগল। যখন গণপরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হল তখনই দেখা গেল তথাকথিত লীগ নেতারা অনেকেই আবার মন্ত্রীর গদি অলঙ্কৃত করল। আর মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী আবার মন্ত্রিত্ব পেয়ে দলের ও দেশের কথা ভুলে গেলেন।

মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানকে একটা ব্লকের দিকে নিয়ে গেলেন। দুনিয়া তখন দুইটা ব্লকে ভাগ হয়ে পড়েছে। একটা রাশিয়ান ব্লক বা

সমাজতান্ত্রিক ব্লক, আর একটা হল আমেরিকান রক যাকে ডেমোক্রেটিক ব্লক বা ধনতন্ত্রবাদী ব্লক বলা যেতে পারে—যদিও মরহুম লিয়াকত আলীর সময় থেকেই পাকিস্তান আমেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। ১৯৫৪ সালের মে মাসে পাকিস্তান-আমেরিকা মিলিটারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরে পাকিস্তান সিয়াটো ও সেন্টো বা বাগদাদ চুক্তিতে যোগদান করে পুরাপুরি আমেরিকার হাতের মুঠোর মধ্যে চলে যায়। এই দুইটা চুক্তিই রাশিয়া ও চীনের বিরোধী বলে তারা ধরে নিল। চুক্তির মধ্যে যা আছে তা পরিষ্কারভাবে কমিউনিস্টবিরোধী চুক্তি বলা যেতে পারে। নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানের উচিত ছিল নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। আমাদের পক্ষে কারও সাথে শত্রুতা করা উচিত না। সকল রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুভাবে বাস করা আমাদের কর্তব্য। কোনো যুদ্ধ জোটে যোগদান করার কথা আমাদের চিন্তা করাও পাপ। কারণ, আমাদের বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য সাহায্য করা দরকার, দেশের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও তা জরুরি।

আমাকে গ্রেফতারের পূর্বেই পাক-আমেরিকান মিলিটারি প্যাক্টের বিরুদ্ধে এক যুক্ত বিবৃতি দেই। আওয়ামী লীগের বৈদেশিক নীতি ছিল স্বাধীন, নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। আমাদের বিবৃতি খবরের কাগজে বের হবার পরে আমেরিকানরা আমাদের উপরে চটে গেল। হক সাহেবের সাথে এক আমেরিকান সাংবাদিক দেখা করেন এবং তার সাথে সাক্ষাৎ করে এক রিপোর্ট আমেরিকান কাগজে ছাপিয়ে দেন। সেই রিপোের্টটাও মোহাম্মদ আলী তাঁর বিবৃতির মধ্যে উল্লেখ করেন। বিদেশী একজন সাংবাদিকের রিপোর্টের এত দাম মোহাম্মদ আলীর দেওয়ার কারণ, সেই সাংবাদিক ও তিনি দুজনেই আমেরিকান।

 

৮৭.

গোলাম মোহাম্মদ বেআইনিভাবে গণপরিষদ ভেঙে দিয়েছিলেন। তবু জনগণ এতে খুবই আনন্দিত হয়েছিল। কারণ, গণপরিষদের সদস্যদের হয়ত আট বৎসর পর্যন্ত থাকার আইনত অধিকার থাকলেও ন্যায়ত অধিকার ছিল না। আট বৎসর পর্যন্ত যে গণপরিষদ দেশকে একটা শাসনতন্ত্র দিতে পারে নাই, নির্বাচনে পরাজিত হয়েও যারা পদত্যাগ না করে ষড়যন্ত্র করে নির্বাচিত সদস্যদের বরখাস্ত করে, তাদের উপর জনগণের আস্থা থাকতে পারে না। যদিও গোলাম মোহাম্মদ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ কাজ করেন নাই, করেছিলেন নিজের এবং একটা অঞ্চলের একটা বিশেষ কোটারির স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। অন্যায় জেনেও আমি খুশি হয়েছিলাম এই জন্য যে, এই গণপরিষদের সদস্যরা কোনোদিন শাসনতন্ত্র দিবে না। আর শাসনতন্ত্র ছাড়া একটা স্বাধীন দেশ কতদিন চলতে পারে? গণপরিষদের সদস্যদের লজ্জা না করলেও আমাদের লজ্জা করত। গণপরিষদের অধিকাংশ সদস্যই মুসলিম লীগার। মুসলিম লীগ নেতারা যখন লেজ গুটিয়ে আত্মসমর্পণ করল একমাত্র মরহুম তমিজুদ্দিন খান সাহেব গণপরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসাবে গোলাম মোহাম্মদের এই আদেশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আমরা জেলে বসে খবরের কাগজের মারফতে যেটুকু খবর পাই, তাই সম্বল, তাই নিয়েই আলোচনা করি।

কয়েকজন বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। এখন আমি, ইয়ার মোহাম্মদ খান, দেওয়ান মাহবুব আলী, বিজয় চ্যাটার্জী, অধ্যাপক অজিত গুহ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও কোরবান আলী এক জায়গায় থাকি। দিন আমাদের কেটে যাচ্ছে কোনোমতে। অজিত বাবু আমাদের খাওয়াদাওয়ার দেখাশোনা করতেন। বাবুর্চি তিনি ভালই ছিলেন। অসুস্থ হয়েও নিজেই পাক করতেন। তিনি মুক্তি পাওয়ার পরে তোয়াহা ভার নিল। অজিত বাবুর মত ভাল পাকাতে

পারলেও কোনোমতে চালিয়ে নিত। আমি ও দু’একজন তার পিছু নিতাম। সে রাগ হয়ে মাঝে মাঝে বসে থাকত। আবার অনুরোধ করে তাকে পাঠাতাম। তার রাগ বেশি সময় থাকত না। কোরবান আলীর একটু কষ্ট হত। ভাগে যা পড়ত তাতে তার হত না। শরীরটা বেশ ভাল ছিল, খেতেও পারত।

কোরবানকে একদিন জেলগেটে নিয়ে গেল মুক্তির কথা বলে। আমাদের কাছ থেকে যথারীতি বিদায় নিয়ে মালপত্র সাথে নিয়ে জেলগেটে হাজির হওয়ার পরে একটায় মুক্তির আদেশ এবং সাথে সাথে আর একটা কাগজ বের করলেন একজন আইবি কর্মচারী, তাকে বলা হল, যদি বন্ড দেন, তবে এখনি বাইরে যেতে পারবেন। আর বন্ড না দিলে আবার জেলের মধ্যে ফিরে যেতে হবে। কোরবান ভীষণ একগুয়ে। সে ক্ষেপে গিয়ে অনেক কথা শুনিয়ে আবার জেলের মধ্যে ফিরে আসল এবং আমাদের সকল কথা বলল। অনেক দিন কারাগারে বন্দি থাকার পরে মুক্তির আদেশ পেয়ে, জেলগেট থেকে আবার ফিরে আসা যে কত কষ্টকর এবং কত বড় ব্যথা, তা ভুক্তভোগী ছাড়া বোঝা কষ্টকর। পরের দিন জেল কর্তৃপক্ষকে ডেকে বলে দেওয়া হল আর কোনোদিন যেন এ কাজ না করা হয়। যদি কোনো বন্ড বা মামলা থাকে পূর্বেই জানিয়ে দিতে হবে। মালপত্র নিয়ে জেলগেটে গেলে এবং আবার ফিরে আসতে হলে ভীষণ গোলমাল হবে। রাজনৈতিক বন্দিরা দরখাস্ত করে নাই যে তারা বন্ড দিবে।

কয়েকদিন পরে এক আইবি কর্মচারী আমার সাথে দেখা করতে আসেন। তিনি নিজকে খুব বুদ্ধিমান মনে করেন বলে মনে হল। আমাকে বন্ড দেওয়ার কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না বা লজ্জা করছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, “দয়া করে ঘোরাঘুরি করবেন না। আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকলে আসতে পারেন, তবে লিখে নিয়ে যান আপনার উপরওয়ালাদের জানিয়ে দিবেন, বন্ড আমার দেওয়ার কথাই ওঠে না। সরকারকেই বন্ড দিতে বলবেন, ভবিষ্যতে আর এই রকম অন্যায় কাজ যেন না করে। আর বিনা বিচারে কাউকেও বন্দি করে না রাখে।” ভদ্রলোক হাসতে লাগলেন এবং বললেন, “আপনাকে তো আমি বন্ড দিতে বলি নাই।” আমিও হেসে ফেললাম।

 

৮৮.

কারাগারের দিনগুলি কোনোমতে কাটছিল। খবরের কাগজে দেখলাম, আতাউর রহমান খান সাহেব জুরিখ যাচ্ছেন, শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করতে। সেখান থেকে বিলাত যাবেন, মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করতে। ভাসানী সাহেবের সাথে আরও তিনজন আওয়ামী লীগ কর্মী গিয়েছিলেন। তারাও আর ফিরে আসতে পারেন নাই। প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস আর এডভোকেট জমিরউদ্দিন দেশে ফিরে আসলেই তাদের গ্রেফতার করা হত। কিভাবে তারা সেখানে আছেন ভাববার কথা! খরচ কোথায় পাবেন? অনেক বাঙালি বিলাতে ছিল, তারাই নাকি থাকার জায়গা দিয়েছে আর সাহায্যও করেছে।

করাচিতে আতাউর রহমান সাহেব গোলাম মোহাম্মদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্পাদক ছিলেন তখন করাচির মাহমুদুল হক ওসমানী। তিনিও গোলাম মোহাম্মদের সাথে সাক্ষাৎ করে পূর্ব বাংলায় এসে আতাউর রহমান সাহেব, মানিক ভাই ও আরও অনেকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। বুঝতে পারলাম, কিছু একটা চলছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জড়িয়ে পড়া উচিত হবে না। আমি তো বন্দি, কেইবা আমার কথা শুনবে?

আতাউর রহমান সাহেব, গোলাম মোহাম্মদের কাছ থেকে একটা বার্তা নিয়ে নাকি জুরিখে শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করবেন। কি বার্তা হতে পারে অনেক গবেষণা হল। আতাউর রহমান সাহেবের উচিত ছিল প্রথমে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দাবি করা। যদি গোলাম মোহাম্মদ বা মুসলিম লীগ নেতাদের সাথে কোনো আলোচনা করতে হয়, তবে প্রথমেই মওলানা ভাসানীকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আমাদের মুক্তি দেওয়ার বন্দোবস্ত করা। আতাউর রহমান সাহেব জুরিখ থেকে ফিরে আসলেন। গোলাম মোহাম্মদ সাহেবও কিছুদিনের মধ্যে প্রোগ্রাম করলেন, ঢাকায় আসবেন। পাকিস্তানের বড়লাট ঢাকায় আসবেন ভাল কথা। পূর্ব বাংলায় তখন গভর্নর শাসন চলছে। পূবের সরকার ভেঙে দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত সরকার গঠন করতে দেওয়া হয় নাই। এমএলএরা ও কর্মীরা জেলে। আওয়ামী লীগের সভাপতি বিলাতে, জেনারেল সেক্রেটারি কারাগারে বন্দি। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। এই অবস্থায় কি করে গোলাম মোহাম্মদকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেবার বন্দোবস্ত করার জন্য আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বুঝতে কষ্ট হতে লাগল। আরও দেখলাম, একটা ফুলের মালা নিয়ে আতাউর রহমান সাহেব, আর একটা মালা হক সাহেব নিয়ে তেজগা এয়ারপোর্টে গোলাম মোহাম্মদ সাহেবকে অভ্যর্থনা করার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত গোলাম মোহাম্মদ সাহেবের গলায় দুইজনই মালা দিলেন। কিছুদিন পূর্বের থেকেই আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক দলের মধ্যে মনকষাকষি চলছিল এই অভ্যর্থনার ব্যাপার নিয়ে। এটা পরিষ্কার হয়ে পড়ল। কৃষক শ্রমিক দল আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, একমাত্র হক সাহেবের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করে কিছু সংখ্যক সুবিধাবাদী লোক একজোট হয়েছে ক্ষমতার ভাগ বসানোর জন্য। এদের কোনো সংগঠন নাই, আদর্শ নাই, নীতি নাই। একমাত্র হক সাহেবই এদের সম্বল। তারা গোলাম মোহাম্মদ সাহেবকে কেন মোহাম্মদ আলী (বগুড়া)কেও অভ্যর্থনা করতে পারেন; কিন্তু আওয়ামী লীগ একটা সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান—সেই প্রতিষ্ঠানের নেতারা কি করে এই অগণতান্ত্রিক ভদ্রলোককে অভ্যর্থনা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমার বুঝতে কষ্ট হল! আমি ও আমার সহবন্দিরা খুবই মর্মপীড়ায় ভুগছিলাম। আমাদের দুঃখ হল এজন্য যে, আমাদের নেতারাও ক্ষমতার লোভে পাগল হয়ে পড়েছেন। এতটুকু বুঝবার ক্ষমতা আমাদের নেতাদের হল না যে, যুক্তফ্রন্টের দুই গ্রুপকে নিয়ে খেলা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক দলকে আলাদা আলাদাভাবে তারা যোগাযোগ করছে, যাতে গোলাম মোহাম্মদ সাহেব পূর্ব বাংলায় এসে বিরাট অভ্যর্থনা পেতে পারেন। হলও তাই। কিন্তু তিনি যা করবেন, তা ঠিক করেই রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীকে দিয়ে যে তিনি যুক্তফ্রন্টকে দ্বিধাবিভক্ত করাবেন সে ক্ষমতাও তাকে দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরে শুনেছিলাম, গোলাম মোহাম্মদ ওয়াদা করেছিলেন শহীদ সাহেব জুরিখ থেকে ফিরে আসলেই তাকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে। বড় বড় শিল্পপতিরা ও কিছু সংখ্যক আমলা কিছুতেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে সেটা চাইছিলেন না।

মোহাম্মদ আলী ঢাকায় এসে গোপনে হক সাহেবের দলের সাথে বোঝাপড়া করে ফেলেছেন যে, আওয়ামী লীগকে না নিলে তার দলকে পূর্ব বাংলায় সরকার গঠন করতে দিবে এবং শহীদ সাহেব যে কেউই নয় যুক্তফ্রন্টের, একথা ঘোষণা করতে হবে। তা হলেই শহীদ সাহেবকেও দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হবে। মোহাম্মদ আলী জানতেন শহীদ সাহেবই একমাত্র লোক যে তাঁর প্রধানমন্ত্রীর পদের দাবিদার হতে পারেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে শহীদ সাহেব এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন যে জনগণ তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখতে চায়। চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা জানতেন, হক সাহেবের দলের সাথে আপোস করলে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন না দিয়েও পারা যাবে। তবে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসন ছাড়া আপোস করবে না।

 

৮৯.

শহীদ সাহেব যখন ফিরে আসলেন রোগমুক্তির পরে, করাচিতে—তাঁকে বিরাট অভ্যর্থনা জনসাধারণ জানাল। একমাত্র জিন্নাহ ছাড়া এত বড় অভ্যর্থনা আর কেউ পায় নাই। পূর্ব বাংলা থেকে প্রায় বিশ-ত্রিশজন নেতাও তাকে অভ্যর্থনা দেয়ার জন্য করাচি উপস্থিত হয়েছিলেন। আতাউর রহমান সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ সাহেব সকলেই প্রায় উপস্থিত ছিলেন। শহীদ সাহেব পৌঁছাবার সাথে সাথে কৃষক শ্রমিকের লোকেরা বলে বেড়াতে লাগলেন শহীদ সাহেব যুক্তফ্রন্টের কেউই নয়, হক সাহেবই নেতা। হক সাহেব তাঁকে সমর্থন করেন না, করেন মোহাম্মদ আলীকে। মন্ত্রিসভা গঠনে গোলাম মোহাম্মদ সাহেব শহীদ সাহেবকে বললেন, এ মন্ত্রিসভায় কেউই প্রধানমন্ত্রী নন, এটা কেয়ারটেকার সরকার। শীঘ্রই শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে, তবে এখন আইনমন্ত্রী হয়ে তাকে একটা শাসনতন্ত্র দিতে হবে।

আমাদের নেতারা কি পরামর্শ শহীদ সাহেবকে দিয়েছিলেন জানি না, তবে শহীদ সাহেব ভুল করলেন, লাহোর ও ঢাকায় না যেয়ে, দেশের অবস্থা না বুঝে মন্ত্রিত্বে যোগদান করে। কৃষক শ্রমিক দলের নেতারা যাই বলুক না কেন, ঢাকায় এসে যদি যুক্তফ্রন্ট পার্টির সভা ডাকতে বলতেন এবং সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে তারপর কোনো কিছু করতেন তা হলে কারও কিছু বলার থাকত না। জনগণের চাপে কৃষক শ্রমিক দলের নেতারা তাঁকে সমর্থন করতে বাধ্য হত। জনগণ চারদিকে অন্ধকার দেখছিল। তাদের একমাত্র ভরসা ছিল শহীদ সাহেব দেশে ফিরে আসবেন এবং পাকিস্তানের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব নিবেন। আমরা জেলের ভিতরে বসে খুবই কষ্ট পেলাম এবং আমাদের মধ্যে একটা হতাশার ভাব দেখা দিল। আমি নিজে কিছুতেই তাঁর আইনমন্ত্রী হওয়া সমর্থন করতে পারলাম না। এমনকি মনে মনে ক্ষেপে গিয়াছিলাম। অনেকে আমাকে অনুরোধ করেছিল শহীদ সাহেব রোগমুক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন দেশে, তাকে টেলিগ্রাম করতে। আমি বলে দিলাম “না, কোন টেলিগ্রাম করব না, আমার প্রয়োজন নাই।”

রেণু টেলিগ্রাম পেয়েছে। আব্বার শরীর খুবই খারাপ, তার বাবার আশা কম। ছেলেমেয়ে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা করবে আব্বাকে দেখতে। একটা দরখাস্তও করেছে সরকারের কাছে, টেলিগ্রামটা সাথে দিয়ে। তখন জনাব এন, এম, খান চিফ সেক্রেটারি ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তান হওয়ার পূর্ব থেকেই তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। রাত আট ঘটিকার সময় আমার মুক্তির আদেশ দিলেন। নয়টার সময় আমাকে মুক্তি দেওয়া হল। সহকর্মীদের, বিশেষ করে ইয়ার মোহাম্মদ খানকে, ভিতরে রেখে বাইরে যেতে কষ্ট হল। কারণ, তিনি আমাকে জেলগেটে দেখতে এসে গ্রেফতার হয়েছিলেন। আমি বিদায় নিবার সময় বলে গেলাম, “হয় তোমরা মুক্তি পাবা, নতুবা আবার আমি জেলে আসব।” আমি জেলগেট পার হয়ে দেখলাম, রায় সাহেব বাজারের আমাদের কর্মী নূরুদ্দিন দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বলল, “ভাবী এইমাত্র বাড়িতে রওয়ানা হয়ে গেছেন, আপনার আব্বার শরীর খুবই খারাপ। তিনি বাদামতলী ঘাট থেকে জাহাজে উঠেছেন। জাহাজ রাত এগারটায় নারায়ণগঞ্জ পৌঁছাবে। এখনও সময় আছে, তাড়াতাড়ি রওয়ানা করলে নারায়ণগঞ্জে যেয়ে জাহাজ ধরতে পারবেন। তাকে নিয়ে ঢাকার বাড়িতে উপস্থিত হলাম। কারণ, পূর্বে এ বাড়ি আমি দেখি নাই। আমি জেলে আসার পরে রেণু এটা ভাড়া নিয়েছিল। মালপত্র কিছু রেখে আর সামান্য কিছু নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ছুটলাম। তখনকার দিনে ট্যাক্সি পাওয়া কষ্টকর ছিল। জাহাজ ছাড়ার পনের মিনিট পূর্বে আমি নারায়ণগঞ্জ ঘাটে পৌঁছালাম। আমাকে দেখে রেণু আশ্চর্য হয়ে গেল। বাচ্চারা ঘুমিয়েছিল। রেণু তাদের ঘুম থেকে তুলল। হাচিনা ও কামাল আমার গলা ধরল, অনেক সময় পর্যন্ত ছাড়ল না, ঘুমালও না, মনে হচ্ছিল ওদের চোখে আজ আর ঘুম নাই।

মুক্তির আনন্দ আমার কোথায় মিলিয়ে গেছে। কারণ, আব্বার চেহারা চোখে ভেসে আসছিল। শুধু একই চিত্তা। দেখতে পারব কি পারব না? বেঁচে আছেন, কি নাই! কেবিন ছেড়ে অনেকক্ষণ বাইরে বসে রইলাম। আজ অনেক দিন পরে রাতের হাওয়া আমার গায়ে লাগছে। জেলে তো সন্ধ্যার সময়ই বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেয়। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে রেণু আর আমি অনেকক্ষণ আলাপ করেছিলাম। ভোর রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ি। সমস্ত দিন জাহাজে থাকতে হবে, রাতে বাড়ির ঘাটে পৌঁছাব। কোন খবর কেউ জানে না। নৌকায় দুই মাইল পথ যেতে হবে। বাড়ির থেকে নৌকাও আসবে না। সমস্ত দিন উৎকণ্ঠায় কাটালাম।

পরের রাতে বাড়িতে পৌঁছে শুনলাম, আব্বাকে গোপালগঞ্জ নিয়ে গিয়েছে। দেশে ডাক্তার নাই। নৌকায় আবার চৌদ্দ মাইল পথ, রাতেই রওয়ানা করলাম। পরের দিন বেলা দশটায় গোপালগঞ্জ যেয়ে আব্বার অবস্থা দেখে একটু শান্ত হলাম। আব্বা আরোগ্যের দিকে। ডাক্তার ফরিদ আহমদ সাহেব ও বিজিতেন বাবু বললেন, “ভয়ের কোন কারণ নাই।“ দুইজনই ভাল ডাক্তার। আব্বা আমাকে পেয়ে আরও ভাল বোধ করতে লাগলেন। পরের দিনই টেলিগ্রাম পেলাম, শহীদ সাহেব আমাকে শীত্র করাচিতে ডেকে পাঠিয়েছেন। আতাউর রহমান সাহেব টেলিগ্রাম করেছেন। ঐদিন রওয়ানা করার কোন কথাই উঠতে পারে না।

পরের দিন রাতে আমি খুলনা, যশোর হয়ে প্লেনে ঢাকা পৌঁছালাম। ঢাকা থেকে করাচি রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমি মনকে কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছি না। কারণ, শহীদ সাহেব আইনমন্ত্রী হয়েছেন কেন? রাতে পৌঁছে আমি আর তার সাথে দেখা করতে যাই নাই। দেখা হলে কি অবস্থা হয় বলা যায় না। আমি তার সাথে বেয়াদবি করে বসতে পারি। পরের দিন সকাল নয়টায় আমি হোটেল মেট্রোপোলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, “গত রাতে এসেছ শুনলাম, রাতেই দেখা করা উচিত ছিল। আমি বললাম, “ক্লান্ত ছিলাম, আর এসেই বা কি করব, আপনি তো এখন মোহম্মদ আলী সাহেবের আইনমন্ত্রী। তিনি বললেন, “রাগ করছ, বোধহয়।” বললাম, “রাগ করব কেন স্যার, ভাবছি সারা জীবন আপনাকে নেতা মেনে ভুলই করেছি কি না?” তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন, “বুঝেছি, আর বলতে হবে না, বিকাল তিনটায় এস, অনেক কথা আছে।”

আমি বিকাল তিনটায় যেয়ে দেখি তিনি একলা শুয়ে বিশ্রাম করছেন। স্বাস্থ্য এখনও ঠিক হয় নাই, কিছুটা দুর্বল আছেন। আমি তাঁর কাছে বসলাম। তিনি আলাপ করতে আরম্ভ করলেন। অনেকক্ষণ আলাপ করলেন, তার সারাংশ হল গোলাম মোহাম্মদ জানিয়ে দিয়েছেন যে, মন্ত্রিসভায় যোগাদান না করলে তিনি মিলিটারিকে শাসনভার দিয়ে দেবেন। আমি বললাম, “পূর্ব বাংলায় যেয়ে সকলের সাথে পরামর্শ করে অন্য কাউকেও তো মন্ত্রিত্ব দিতে পারতেন। আমার মনে হয় আপনাকে ট্র্যাপ করেছে। ফল খুব ভাল হবে না, কিছুই করতে পারবেন না। যে জনপ্রিয়তা আপনি অর্জন করেছিলেন, তা শেষ করতে চলেছেন। তিনি আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন এবং বললেন, “কিছু না করতে পারলে ছেড়ে দেব, তাতে কি আসে যায়!” আমি বললাম, “এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আপনার যোগদান করা উচিত হয় নাই, আপনি বুঝতে পারবেন।” তিনি আমাকে পূর্ব বাংলায় কখন যাবেন তার প্রোগ্রাম করতে বললেন। আমি বললাম, “ভাসানী সাহেব দেশে না এলে এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি না দিয়ে আপনার ঢাকায় যাওয়া উচিত হবে না। তিনি রাগ করে বললেন, “তার অর্থ তুমি আমাকে পূর্ব বাংলায় যেতে নিষেধ করছ।” আমি বললাম, “কিছুটা তাই।” তিনি অনেকক্ষণ চক্ষু বন্ধ করে চুপ করে রইলেন। পরে আমাকে বললেন, আগামীকাল আসতে, ঠিক বিকাল তিনটায়। আমি থাকতে থাকতে দেখলাম, আবু হোসেন সরকার সাহেবকে হক সাহেবের নমিনি হিসাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বে গ্রহণ করা হয়েছে। শহীদ সাহেব কিছুই জানেন না। এবার তিনি কিছুটা বুঝতে পারলেন যে খেলা শুরু হয়েছে।

হক সাহেব লাহোরে এক খবরের কাগজের প্রতিনিধির কাছে বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্টের কেউই নন, আমিই নেতা। অথচ আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তফ্রন্টে। হক সাহেব কেএসপি’র দলের নেতা। কেএসপি, নেজামে ইসলাম মিলেও আওয়ামী লীগের সমান হবে না। সোহরাওয়ার্দী সাহেব আওয়ামী লীগের নেতা-হক সাহেব একথা কি করে বলতে পারেন! হক সাহেবের দল গোলাম মোহাম্মদকে বলে দিয়েছে যে, তারা সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী চান না, মোহাম্মদ আলী বগুড়াকে চান, এই জন্যই। শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করা হয় নাই। আর মোহাম্মদ আলী সাহেব বলে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ দলকে বাদ দিয়েই পূর্ব বাংলায় সরকার গঠন করতে হবে। আমি বুঝতে পারলাম, মোহম্মদ আলী বগুড়া হক সাহেবের মাথায় ভর করেছেন। আর চৌধুরী মোহাম্মদ আলী শহীদ সাহেবের মাথায় ভর করেছেন। কেএসপি’র নেতারা তখন অনেকেই করাচিতে। কেউই শহীদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে আসেন না। আমার সাথে কেএসপির নেতাদের দু’একজনের দেখা হলে আমি তাঁদের জানালাম, আপনারা অনেক কিছুই করেছেন। কথা ছিল, শহীদ সাহেবকে আপনারা পাকিস্তানের নেতা মানবেন, আর আমরা হক সাহেবকে পূর্ব বাংলার নেতা মানব, এখন আপনারা করাচি এসে মুসলিম লীগ নেতা বগুড়ার মোহম্মদ আলীকে নেতা মানছেন এবং তাঁকেই সমর্থন করছেন। শহীদ সাহেব যাতে প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন তার চেষ্টা করছেন। আমরাও বাধ্য হব হক সাহেবকে নেতা না মানতে, দরকার হলে যুক্তফ্রন্টের সভায় অনাস্থা প্রস্তাব দেব তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। আমরা হক সাহেবকে ক্ষমতা দেই নাই যে, তিনি যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলী সাহেবকে সমর্থন দেবেন এবং মুসলিম লীগ নেতাকে নেতা মানবেন। কৃষক-শ্রমিক দলের নেতারা কথা পেয়েছেন পূর্ব বাংলায় সরকার তাদেরই দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ দল থেকে কিছু লোক তারা পাবেন, এ আশ্বাসও তারা পেয়েছেন। যদিও শহীদ সাহেবের সাথে তার মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করার ব্যাপার নিয়ে একমত হতে পারি নাই, তবু অন্য কেউ তাকে অপমান করুক এটা সহ্য করা আমার পক্ষে কষ্টকর ছিল। আমি শহীদ সাহেবকে বললাম, “যখন হক সাহেব প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন আপনি যুক্তফ্রন্টের কেউই নন, তখন বাধ্য হয়ে প্রমাণ করতে হবে আপনিও যুক্তফ্রন্টের কেউ। কেএসপি ও নেজামে ইসলামী যুক্তফ্রন্টে থাকে থাকুক। আমরা অনাস্থা দিব হক সাহেবের বিরুদ্ধে। তাতে অন্ততপক্ষে আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে তো কথা বলতে পারবেন এবং আওয়ামী লীগ পার্টি পূর্ব বাংলার আইনসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠ। আওয়ামী লীগ ছাড়া কারও পূর্ব বাংলায় সরকার চালাবার ক্ষমতা নাই।” শহীদ সাহেব বললেন, “যতদিন আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্টে আছে ততদিন তো সত্যই আমি কেউই নই। হক সাহেব যুক্তফ্রন্টের নেতা, তিনি আওয়ামী লীগ, কেএসপি ও নেজামে ইসলাম পার্টির পক্ষ থেকে কথা বলতে পারেন।”

 

৯০.

আমি ঢাকায় ফিরে এসে আতাউর রহমান সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ ও মানিক ভাইকে নিয়ে বৈঠকে বসলাম এবং সকল কথা তাদের বললাম। শহীদ সাহেবের মতামতও জানালাম। ভাসানী সাহেব কলকাতা এসে পৌঁছেছেন খবর পেয়েছি, কিন্তু কোথায় আছেন জানি না। শহীদ সাহেব এন, এম, খান চিফ সেক্রেটারি সাহেবকে টেলিফোন করেছেন রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে। অনেক কর্মীই আস্তে আস্তে মুক্তি পেতে লাগল। কেএসপি দলের নেতারা রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য একটা কথাও বলেন নাই। কারণ, তাদের দলের কেউই জেলে নাই। আওয়ামী লীগ এমএলএ ও কর্মীরা তখনও অনেকে জেলে এবং অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। আতাউর রহমান সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ, মানিক ভাই ও আমি অনেকক্ষণ আলাপ-আলোচনা করলাম। হক সাহেবের নেতৃত্বে অনাস্থা দেওয়া হবে কি হবে না, এ বিষয়ে। হক সাহেবের চেয়েও তার কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গই বেশি তৎপর মুসলিম লীগের সাথে কোনো নীতি, আদর্শ ছাড়াই মিটমাট করার। কোথায় গেল একুশ দফা, আর কোথায় গেল জনতার রায়। তিনজনই প্রথমে একটু একটু অনিচ্ছা প্রকাশ করছিলেন। অনাস্থা সম্বন্ধে কোনো আপত্তি নাই, তবে পারা যাবে কি যাবে না এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। আমি বললাম, না পারার কোনো কারণ নাই। নীতি বলেও তো একটা কথা আছে। শেষ পর্যন্ত সকলেই রাজি হলে আমি ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করলাম। ওয়ার্কিং কমিটির প্রায় সকল সদস্যই একমত, কেবল সালাম সাহেব ও হাশিমউদ্দিন সাহেব একমত হতে পারলেন না। তবে একথা জানালেন যে, তারা ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই মানতে বাধ্য।

আমি ও আতাউর রহমান সাহেব বের হয়ে পড়লাম এমএলএদের দস্তখত নিতে। সতের দফা চার্জ গঠন করলাম। হক সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে কে অনাস্থা প্রস্তাব প্রথমে পেশ করবে, সে প্রশ্ন হল। অনেকেই আপত্তি করতে লাগলেন, আমার নিজেরও লজ্জা করতে লাগল। তাকে তো আমিও সম্মান ও ভক্তি করি। কিন্তু এখন কয়েকজন তথাকথিত নেতা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তাঁকে তাদের কাছ থেকে শত চেষ্টা করেও বের করতে পারলাম না। এদের অনেকেই নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস পূর্বে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে এসেই ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাজিত হয়। ঠিক হল, আমিই প্রস্তাব আনব আর জনাব আবদুল গণি বার এট ল’ সমর্থন করবেন। আমরা তাঁর কাছে সভা ডেকে অনাস্থা প্রস্তাব মোকাবেলা করার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনিও সভা ডাকতে রাজি হলেন। আমরা আওয়ামী লীগের প্রায় একশত তেরজন সদস্যের দস্তখত নিলাম। তাতেই আমাদের হয়ে গেল।

Share This