৫. বৈশালীতে শিবামিশ্রের গৃহ

রাত্রিকাল। বৈশালীতে শিবামিশ্রের গৃহ। একটি কক্ষে প্রদীপ সম্মুখে রাখিয়া শিবামিশ্র অজিনাসনে বসিয়া আছেন, যেন প্রতীক্ষা করিতেছেন।

দ্বারে শব্দ হইল। শিবামিশ্র সেই দিকে ফিরিলেন। অন্ধকারে একটি হাত তাঁহার হাতে একটি কুণ্ডলিত লিপি দিয়া অপসৃত হইল। শিবামিশ্র লিপিটাকে ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিলেন, তারপর জতুমুদ্রা ভাঙ্গিয়া পাঠ করিলেন। পাঠ করিতে করিতে তাঁহার অধরে ক্রুর হাসি দেখা দিল। তিনি মনে মনে বলিলেন—

চণ্ড মরেছে—একটা ঋণ শোধ হল। আর একটা বাকি

লিপি পাকাইয়া তিনি প্রদীপশিখার উপর ধরিলেন। লিপি মশালের মত জ্বলিয়া উঠিল, তারপর ভস্মে পরিণত হইল।

***

প্রভাতের রবিকরোজ্জ্বল আকাশ। চঞ্চল-মধুর যন্ত্রসঙ্গীতের শব্দে বাতাস পরিপূর্ণ। রাজার পক্ষী-ভবন। দীর্ঘ অলিন্দের মত একটি কক্ষ, তাহার দুই ধারে সারি সারি গবাক্ষ। প্রত্যেক গবাক্ষে একটি করিয়া সুন্দর পাখি ঝুলিতেছে, কেহ দাঁড়ে, কেহ খাঁচায়। একটি দীর্ঘ-পুচ্ছ ময়ুর সোনার দাঁড়ে বসিয়া আছে।

মহারাজ সেনজিৎ পক্ষীগুলিকে একে একে সন্দর্শন করিতেছেন। কাহাকেও ফল বা ধান্যশীর্ষ খাইতে দিতেছেন; শিস্ দিয়া কাহাকেও শিস্ দিতে শিখাইতেছেন। কিন্তু তাঁহার মন পক্ষীতে নিবিষ্ট নয়, অবরোধের দিক হইতে যে চঞ্চল সঙ্গীত ভাসিয়া আসিতেছে তাহার তাঁহার মন আকৃষ্ট করিয়া লইয়াছে। তিনি মাঝে মাঝে সঙ্গীতের সঙ্গে করতালি দিয়া তাল দিতেছেন, আবার সচেতন হইয়া পক্ষীদের পরিচয় আত্মনিয়োগ করিতেছেন। মনে হয় তাঁহার মন ও ইন্দ্রিয়গুলি সঙ্গীতের অনুসরণ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে।

সঙ্গীতধ্বনি আসিতেছিল অবরোধের সরোবর-তীর হইতে। উল্কা ও বাসবী আবক্ষ জলে নামিয়া জল-ক্রীড়া করিতে করিতে স্নান করিতেছিল; তিনটি সখী ঘাটের পৈঠায় বসিয়া বীণা মৃদঙ্গ সহযোগে বসন্তরাগের চচা করিতেছিল।

সেনজিৎ অবশ্য পক্ষী-ভবন হইতে এ দৃশ্য দেখিতে পাইতেছিলেন না, বাতায়নপথে কেবল অবরোধ-প্রাচীরের পরপারে তরুশীর্ষগুলি দেখিতে পাইতেছিলেন।

একটি গবাক্ষে শুকপক্ষীর দাঁড় ঝুলিতেছিল। সেনজিৎ বিমনাভাবে তাহার নিকটে গিয়া দাঁড়াইলেন; হরিদ্বর্ণ পাখিটার মুখের কাছে একটি ধান্যশীর্ষ ধরিতেই সে হঠাৎ ভয় পাইয়া ঝটপট করিয়া উঠিল। তাহার পায়ের শিকলি কোনও ক্রমে খুলিয়া গিয়াছিল, সে উড়িয়া গিয়া অবরোধ-প্রাচীরের ওপারে অদৃশ্য হইয়া গেল।

সেনজিৎ উদ্বিগ্নভাবে গবাক্ষের বাহিরে চাহিয়া আছেন এমন সময় পক্ষী-ভবনে বটুক ভট্টের আবিভাব হইল। তিনি রাজাকে গবাক্ষ-পথে অবরোধের পানে চাহিয়া থাকিতে দেখিয়া ঠোঁট বাঁকাইয়া হাসিলেন।

এহুম–জয়োস্তু মহারাজ–জয়োস্ত। এই সুন্দর প্রভাতকালে বাতায়ন থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য বড়ই রমণীয়-না বয়স্য?

সেনজিৎ ফিরিয়া ঈষৎ সন্দিগ্ধভাবে তাকাইলেন

আমার শুক পাখিটা শিকলি কেটে উড়ে গেছে।

বটুক ভট্ট অবহেলাভরে বলিলেন—যাক গে, আরও অনেক পাখি আছে। বনের পাখি বনে উড়ে গেছে তাতে দুঃখ কি!

সেনজিৎ বলিলেন—বনে উড়ে যায়নি, অবরোধের ঐ আমলকী গাছটায় গিয়ে বসেছে!

বটুক ভট্ট বলিলেন-বাঃ! ভারি রসিক পাখি তো! তোমার পাখি এত রসিক হল কি করে তাই ভাবছি।

সেনজিৎ হঠাৎ বটুক ভট্টের স্কন্ধে হাত রাখিয়া বলিলেন

ঠিক হয়েছে—তুমি যাও, পাখিটাকে ধরে নিয়ে এস।

বটুক ভট্ট পশ্চাৎপদ হইলেন—

অ্যাঁ! পাখি আমলকী গাছে বসেছে, আমি তাকে ধরব কি করে! আমি কি কাষ্ঠ-মাজার-কাঠবেড়ালি—যে গাছে উঠব।

সেনজিৎ বলিলেন—তুমি যে ভাবে সিংহাসনের শিকল ধরে ওঠা-নামা করতে পারো কাঠবেড়ালি তোমার কাছে দুগ্ধপোষ্য শিশু। যাও যাও, আর দেরি কোরো না, এখনি হয়তো পাখিটা কোথায় উড়ে যাবে।

বটুক ভট্ট বিপাকে পড়িয়া বলিলেন—আঁ—কিন্তু আমি

নিতান্তই যদি গাছে চড়তে লজ্জা করে, উদ্যানপালিকাকে বোলো, সে ধরে দেবে। যাও।

সেনজিৎ বটুক ভট্টের পৃষ্ঠে লঘু করাঘাত করিতে করিতে তাঁহাকে দ্বারের দিকে প্রচালিত করিলেন। বটুক ভট্টের ভাবগতিক দেখিয়া মনে হইল তাঁহার যাইবার একটুও ইচ্ছা নাই। তিনি বলিলেন

অবশ্য রাজার আদেশ অলঙ্ঘনীয়, কিন্তু অনাহুতভাবে রাজ-অবরোধে প্রবেশ করা কি উচিত হবে? লোকে যদি নিন্দা করে

কেউ নিন্দা করবে না, তুমি যাও।

অকলঙ্ক-চরিত্র ব্রাহ্মণ-সন্তানকে সর্বদা সাবধানে থাকতে হয়—

সেনজিৎ ঘাড় ধরিয়া বটুক ভট্টকে নিজের দিকে ফিরাইলেন।

তোমার এত ভয়টা কিসের?

এঁ—এঁ–যদি আবার তীর ছোঁড়ে!

সেনজিৎ উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিলেন—

ভয় নেই রসিকতা করতে যেও না, তাহলেই আর কোনও বিপদ ঘটবে না।

মানে–যেতেই হবে।

হ্যাঁ–রাজার আদেশ।

গভীর নিশ্বাস মোচন করিয়া বটুক ভট্ট দ্বারের দিকে চলিলেন, আপন মনে বিড়বিড় করিতে লাগিলেন–

এই জন্যেই তো প্রজারা মাৎস্যন্যায় করে সামান্য একটা টিয়া পাখির জন্যে

দ্বার পর্যন্ত গিয়া বটুক ফিরিয়া দাঁড়াইলেন।

বয়স্য, আমি বলি, তুমিও আমার সঙ্গে চল না! দুজনে থাকলে বিপদে আপদে দুজনকে রক্ষে করতে পারব।

সেনজিৎ তাঁহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন।

মুর্খ, আমিই যদি যাব তাহলে তোমাকে পাঠাচ্ছি কেন?

বটুক এবার ব্যাকুলভাবে হাত জোড় করিলেন।

বয়স্য, ক্ষমা কর, আমাকে একলা পাঠিও না। ঐ—ঐ বিদেশিনী যুবতীটাকে আমি বড় ভয় করি। মিনতি করছি, তুমিও চল।

সেনজিৎ একবার একটু ইতস্তত করিয়া বলিলেন—না, তুমি একাই যাও, আমি যাব না।

বটুক ভট্ট এবার ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়িলেন। বলিলেন-কেন, তোমার এত ভয় কিসের?

সেনজিৎ ক্রুদ্ধ বিস্ময়ে বলিলেন-ভয়! কোন্ পাষণ্ড এ কথা বলে! আমি কি তোমার মত শিখা-সর্বস্ব ব্রাহ্মণ!

বটুক ভট্ট নীরবে মিটিমিটি চাহিতে লাগিলেন। সেনজিৎ তখন অধীরস্বরে বলিলেন—

বেশ, একলা যেতে ভয় পাও আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। নারী-ভয়ে মুক্তকচ্ছ ব্রাহ্মণকে রক্ষা করাও সম্ভবত রাজধর্ম।

সেনজিৎ বটুকের বাহু ধরিয়া টানিতে টানিতে লইয়া চলিলেন। চলিতে চলিতে এক সময় বটুকের গলা হইতে চাপা হাসির মত একটা শব্দ বাহির হইল। রাজা সন্দিগ্ধভাবে চাহিলেন, কিন্তু বটুকের মুখে হাসির চিহ্নমাত্র দেখিতে পাইলেন না।

***

অবরোধের সরোবর-তীরে উল্কা ও বাসবী স্নান সারিয়া বেশ পরিবর্তন করিয়াছে। বাসবী গা-মোছা দিয়া চুলের জল ঝাড়িতেছে; উল্কা একটি রক্ত কুরুবক বৃক্ষের কাছে দাঁড়াইয়া অর্ধ-বিকশিত কুরুবকের কলি কানে পরিতেছে। অন্য সখীরা জলে নামিয়া স্নানের উপক্রম করিতেছে।

সহসা বাসবী বাহিরের দিকে তাকাইয়া গলার মধ্যে অস্ফুট শব্দ করিল –ও মা! উল্কা শুনিয়া ফিরিয়া চাহিল।

অনতিদূরে এক আমলকী বৃক্ষের নিকটে সেনজিৎ আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন এবং অঙ্গুলি-নির্দেশ করিয়া বৃক্ষের একটা শাখা দেখাইতেছেন। বটুক ভট্ট সঙ্গে আছেন। স্নানের ঘাটের দিকে তাঁহাদের দৃষ্টি নাই।

এদিকে সখীরা উল্কার কাছে ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়াছে। উল্কার চোখে বিদ্যুৎ। সে হ্রস্বকণ্ঠে সখীদের বলিল—

তোরা যা

বাসবী ও সখীরা চুপি চুপি অপসৃত হইল। উল্কা সেনজিতের উপর চক্ষু রাখিয়া নতজানু হইল, হাতের কাছে নূপুর পড়িয়াছিল, নিঃশব্দে দুই পায়ে পরিল, কয়েকটি ফুল ঝরিয়া পড়িয়া ছিল, সেগুলি কুড়াইয়া লইয়া আবার উঠিয়া দাঁড়াইল। উল্কার মুখ দেখিয়া মনে হয় সে নিজের সঙ্গেই যেন ষড়যন্ত্র করিতেছে।

উল্কার দিকে প্রায় পিছন ফিরিয়া সেনজিৎ ও বটুক ভট্ট আমলকী বৃক্ষে পক্ষী অনুসন্ধান করিতেছিলেন, রিমঝিম্ নূপুরের শব্দে চকিতে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। উল্কাকে সেনজিৎ পূর্বে স্ত্রীবেশে দেখেন নাই; যাহা দেখিলেন তাহাতে তাঁহার মাথা ঘুরিয়া গেল। বটুক ভট্টও ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিলেন।

নূপুরের ছন্দে বরতনু লীলায়িত করিয়া উল্কা রাজার দিকে অগ্রসর হইল; রাজা মোহগ্রস্তের ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিলেন। উল্কা হাসিমুকুলিত মুখে তাঁহার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল, ফুলগুলিকে অঞ্জলিবদ্ধ হস্তে রাজার দিকে বাড়াইয়া দিয়া গদ্গদ কণ্ঠে বলিল—

প্রভাতে রাজদর্শন পেলাম—আজ আমার সুপ্রভাত। দেবপ্রিয়, দাসীর অর্ঘ্য গ্রহণ করুন।

সেনজিৎ নির্বাক চাহিয়া রহিলেন।

বটুক ভট্ট ব্যস্ত হইয়া বলিলেন—দেখছ কি বয়স্য? আশীর্বাদ কর-জয়োস্তু জয়োস্তু—প্রজাবতী হও—চিরায়ুষ্মতী হও। ইতি বটুকভট্টঃ।

বলিতে বলিতে বটুক ভট্ট পিছু হটিয়া অন্তর্হিত হইলেন। সেনজিৎ ঈষৎ সচেতন হইয়া একটি ফুল উল্কার অঞ্জলি হইতে তুলিয়া লইলেন, সংযত স্বরে বলিলেন—

স্বস্তি। আয়ুষ্মতী হও।

উল্কা বলিল—মহারাজ! এতদিনে বিদেশিনী আশ্রিতার কথা মনে পড়ল! রাজকার্য কি এতই গুরু?

সেনজিৎ একটু অপ্রতিভ হইলেন। প্রশ্নের উত্তর না দিয়া বলিলেন—আমার একটা টিয়া পাখি উড়ে এসে এই আমলকী গাছে বসেছে—তাকে ধরতে এসেছি।

উল্কা কলহাস্য করিয়া উঠিল—

সত্যি! টিয়া পাখি ধরতে এসেছেন! কই, আসুন তো দেখি কোথায় আপনার পাখি।

দুইজনে আমলকী বৃক্ষের আরও নিকটে গেলেন।

উল্কা জিজ্ঞাসা করিল—আপনার পাখির নাম কি মহারাজ?

সেনজিৎ বলিলেন—বিম্বোষ্ঠ।

উল্কা আনন্দে করতালি দিয়া বলিল—বিঘোষ্ঠ! কি সুন্দর নাম। আমারও একটি টিয়া পাখি আছে, কিন্তু

সেনজিৎ প্রশ্ন করিলেন—তুমি টিয়া পাখি কোথায় পেলে?

উল্কা বলিল—কঞ্চুকী মশায় আমাকে দিয়েছেন। পাখি এরই মধ্যে আমার নাম ধরে ডাকতে আরম্ভ করেছে; কিন্তু তার নিজের এখনও নামকরণ হয়নি। কি নাম রাখি আপনি বলুন না মহারাজ।

সেনজিৎ বলিলেন—বাচাল নাম রাখতে পার।

উল্কা আবার কৌতুক বিগলিত কণ্ঠে হাসিল। সেনজিৎও একটু হাসিলেন; তাঁহার অনুসন্ধানী দৃষ্টি আমলকী বৃক্ষের চূড়ায় বিম্বোষ্ঠকে অন্বেষণ করিতে লাগিল।

ওদিকে বটুক ভট্ট অবরোধ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতেছিলেন। দেখিলেন কঞ্চুকী হন্তদন্তভাবে ভিতরে আসিতেছে।

বটুক ভট্ট জিজ্ঞাসা করিলেন—হন্ হন্ করে চলেছ কোথায়?

কঞ্চুকী ব্যস্তসমস্তভাবে প্রশ্ন করিল–মহারাজ নাকি অবরোধে পদার্পণ করেছেন।

বটুক ভট্ট বলিলেন—তা করেছেন কিন্তু তাই বলে তুমি এখন ওদিকে পদার্পণ কোরো না।

কঞ্চুকী বলিল—সে কী! আমি না গেলে মহারাজের পরিচর্যা করবে কে?

বটুক ভট্ট দৃঢ়ভাবে কঞ্চুকীর বাহু ধরিয়া বাহিরের দিকে প্রচালিত করিলেন। বলিলেন—পরিচর্যা করবার লোক আছে, তোমাকে ভাবতে হবে না। মহারাজ এখন ব্যস্ত আছেন। তিনি আর ঐ বৈশালীর মহিলাটি—দুজনে মিলে পাখি ধরছেন। ইতি বটুভট্টঃ।

বটুক গম্ভীরভাবে চোখ টিপিলেন।

বৃক্ষতলে উল্কা ও সেনজিৎ পাশাপাশি দাঁড়াইয়া ঊর্ধ্বমুখে পক্ষী অন্বেষণ করিতেছেন। সহসা উল্কা একহাতে সেনজিতের হাত চাপিয়া ধরিয়া উত্তেজিত চাপা সুরে বলিয়া উঠিল—

ঐ যে। ঐ দেখুন আপনার ধুর্ত পাখি পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে। ঐ যে! দেখতে পেয়েছেন?

সেনজিৎ দৃষ্টি নামাইলেন, উল্কার হাত হইতে ধীরে ধীরে নিজের মণিবন্ধ ছাড়াইয়া লইলেন। ভ্রূকুটি করিয়া আবার ঊর্ধ্বে চাহিলেন।

ধমকের সুরে বলিলেন—বিম্বোষ্ঠ। নেমে আয়।

পাখিটা পত্রান্তরালে বসিয়া ফল খাইতেছিল, রাজার স্বর শুনিয়া চকিতে ফল ফেলিয়া দিল, সতর্কভাবে ঘাড় বাঁকাইয়া নীচের দিকে তাকাইল, তারপর পাশের দিকে সরিয়া গিয়া এক শাখার আড়ালে লুকাইবার চেষ্টা করিল। উল্কা কপট ভ্রূকুটি করিয়া পাখিকে ডাকিল

ধৃষ্ট পাখি। এত সাহস তোর, মহারাজের আদেশ লঙ্ঘন করিস। এখনও নেমে আয়, নইলে দুই পায়ে শিকল দিয়ে খাঁচায় বন্ধ করে রাখব।

পাখি কিন্তু উল্কার শাসনবাক্য গ্রাহ্য করিল না।

সেনজিৎ বলিলেন—বিম্বোষ্ঠ …না, ডাকলে আসবে না। কী করা যায়।

উল্কা কপোলে তর্জনী রাখিয়া চিন্তা করিল। সহসা তাহার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল—

এক উপায় আছে। একটু অপেক্ষা করুন

উল্কা অন্তঃপুর-ভবনের দিকে কয়েক পা গিয়া ডাকিল

বাসবী! ইন্দ্রসেনা। আমার পাখি নিয়ে আয়—পাখি।

বাসবী ছুটিয়া ভবন হইতে বাহির হইয়া আসিল, আবার ছুটিয়া চলিয়া গেল।

সেনজিৎ ঈষৎ বিস্ময়ে বলিলেন—পাখি কি হবে?

উল্কা গূঢ় হাসিল—এখনি দেখতে পাবেন মহারাজ।

বাসবী ফিরিয়া আসিল; তাহার মণিবন্ধে বসিয়া আছে একটি টিয়া পাখি। উল্কা আগাইয়া গেল, টিয়া পাখিটা উল্কাকে দেখিয়া উল্কা উল্কা বলিয়া তাহার মণিবন্ধে আসিয়া বসিল। বাসবী উল্কার পানে অর্থপূর্ণ হাসি হাসিয়া ফিরিয়া চলিয়া গেল। উল্কা রাজার কাছে প্রত্যাবর্তন করিল। পাখি দেখিয়া সেনজিৎ উল্কার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তিনি ভ্ৰ তুলিলেন।

পাখি দিয়ে পাখি ধরবে?

উল্কা হাসিয়া ঘাড় বাঁকাইল।

হাঁ। কেন, তা কি অসম্ভব?

সেনজিৎ শুষ্কস্বরে বলিলেন—জানি না। চেষ্টা করে দেখতে পার।

উল্কা তখন বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া কুহক-মধুর স্বরে ডাকিল–আয় আয় বিম্বোষ্ঠ! তোর সাথী তোকে ডাকছে। আয় আয়।

গাছের উপর বিম্বোষ্ঠ কৌতূহলীভাবে নীচের দিকে তাকাইল, ঘাড় ফিরাইয়া ফিরাইয়া নিরীক্ষণ করিল। তারপর উড়িয়া আসিয়া উল্কার স্কন্ধে বসিল।

উল্কা বিজয়দীপ্ত চক্ষে চাহিয়া বলিল—দেখলেন মহারাজ।

সেনজিৎ নীরসকণ্ঠে বলিলেন—দেখলাম। এবার আমার পাখি আমাকে দাও—আমি যাই।

বিম্বোষ্ঠের পায়ে শিকলির ছিন্নাংশ লাগিয়া ছিল, সেনজিৎ কাছে আসিয়া শিকলি ধরিবার জন্য হাত বাড়াইলেন। অমনি উল্কার পাখি ঝটপট্‌ করিয়া উড়িয়া গেল ৷ বিম্বোষ্ঠ উড়িয়া পালাইবার চেষ্টা করিল কিন্তু সেনজিৎ শিকলি ধরিয়া ফেলিলেন। ভয় পাইয়া বিম্বোষ্ঠ সেনজিতের বুকের ওপর গিয়া পড়িল। তাহার তীক্ষ্ণ নখ রাজার উন্মুক্ত বক্ষে কয়েকটা আঁচড় কাটিয়া দিল। সেনজিৎ শিকলি ছাড়িয়া দিলেন, বিম্বোষ্ঠ উড়িয়া গেল।

দেখিতে দেখিতে রাজার বক্ষে রক্ত-চিহ্ন ফুটিয়া উঠিল। দুই বিন্দু রক্ত সঞ্চিত হইয়া ধীরে ধীরে গড়াইয়া পড়িল। উল্কা সত্রাসে বলিয়া উঠিল—

সর্বনাশ! মহারাজ, এ কি হল! (ফিরিয়া) ওরে কে আছিস, অনুলেপন নিয়ে আয়—মহারাজ আহত হয়েছেন। বাসবী! বিপাশা!

সেনজিৎ লজ্জায় রক্তবর্ণ হইয়া প্রায় রূঢ়স্বরে বলিলেন-এ কিছু নয়, সামান্য নখক্ষত মাত্র।

উল্কা ব্ৰস্তভাবে বলিল–সামান্য নক্ষত! মহারাজ কি জানেন না, পশুপক্ষীর নখে বিষ থাকে!-কই, কেউ আসে না কেন? বিলম্বে বিষ যে শরীরে প্রবেশ করবে-বাসবী! ইন্দ্রসেনা!

কেহ আসিল না। তখন উল্কা হঠাৎ যেন পথ খুঁজিয়া পাইয়া বলিয়া উঠিল।

মহারাজ, আপনি স্থির হয়ে দাঁড়ান, আমি বিষ টেনে নিচ্ছি—

উল্কার অভিপ্রায় মহারাজ ভাল করিয়া হৃদয়ঙ্গম করিবার পুর্বেই উল্কা তাঁহার একেবারে কাছে গিয়া দাঁড়াইল, দুই হাত তাঁহার স্কন্ধের উপর রাখিয়া ক্ষরণশীল ক্ষতের উপর অধর স্থাপন করিল। মহারাজ ক্ষণকাল স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন, তারপর দ্রুত পিছু সরিয়া দাঁড়াইলেন।

উল্কার অধরে মহারাজের বক্ষ-শোণিত, সে অর্ধস্ফুট বিস্ময়ে বলিল

কি হল?

সেনজিৎ ঘৃণাভরে বলিলেন—স্ত্রীলোকের পুরুষভাব আমি ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু নির্লজ্জতা অসহ্য।

উল্কার প্রতি আর দৃকপাত না করিয়া সেনজিৎ দ্রুতপদে প্রস্থান করিলেন। উল্কা স্থির নেত্রে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তাহার চোখে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলিতে লাগিল। তারপর সে সজোরে দাঁত দিয়া অধর দংশন করিল।

সেনজিতের বিশ্রামগৃহ। রাজা একাকী কক্ষের এ-প্রান্ত হইতে ও-প্রান্ত পদচারণ করিতেছেন, তাঁহার অশান্ত মুখে অন্তর্দ্বন্দ্বের ছবি প্রতিফলিত। একবার পরিক্রমণ করিতে করিতে তিনি একটি সোনার দর্পণ তুলিয়া লইলেন, নিজের বক্ষস্থলে পাখির নখাঙ্কিত আঁচড়গুলি দেখিলেন। তারপর দর্পণ রাখিয়া দিলেন।

আরও কিছুক্ষণ পরিক্রমণ করিবার পর তাঁহার মনে হইল বদ্ধ ঘরে নিশ্বাসরোধ হইয়া আসিতেছে। তিনি একটি গবাক্ষ উন্মোচন করিয়া বাহিরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন।

দেখিলেন, অদূরে বলভির উপর কপোত-মিথুন প্রণয়লীলায় নিমগ্ন, চঞ্চ-চুম্বনের অবসরে কুজন করিতেছে। সেনজিৎ আবার গবাক্ষ বন্ধ করিয়া দিলেন।

অন্তঃপুরে উল্কার শয়নকক্ষ। বাতায়ন বন্ধ, তাই কক্ষটি ঈষদন্ধকার। উল্কা উপাধানে মুখ খুঁজিয়া শয্যায় শুইয়া আছে।

বাসবী দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল; তাহার পিছনে অন্য সখীগণ। সকলের মুখে-চোখে উৎকণ্ঠা। তাহারা নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করিয়া শয্যাপাশে দাঁড়াইল।

বাসবী কুষ্ঠিতস্বরে বলিল-প্রিয়সখি, কী হয়েছে?

উল্কা তড়িদ্বেগে উঠিয়া বসিল; তাহার চক্ষু রক্তবর্ণ, মুখ ক্রোধে বিকৃত। সে তীব্রস্বরে বলিল—কী—কি চাও তোমরা? যাও আমার সুমুখ থেকে-যাও

সখীরা উল্কার মূর্তি দেখিয়া পিছু হটিল, উল্কা আবার শুইয়া পড়িল এবং উপাধানে মুখ ঢাকিল। সখীরা শঙ্কিত মুখে পা টিপিয়া টিপিয়া বাহিরে গেল।

কিছুক্ষণ পরে উল্কা আবার উঠিয়া বসিল; মুখের উপর হইতে স্খলিত কুন্তল সরাইয়া জ্বরাক্রান্ত চোখে শুন্যে চাহিয়া রহিল। তারপর শয্যা হইতে নামিল।

কক্ষের একটি প্রাচীরে অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত ছিল। চর্ম অসি ছুরিকা ইত্যাদি। উল্কা সেইখানে গিয়া দাঁড়াইল। কিছুক্ষণ অস্ত্রগুলি নিরীক্ষণ করিয়া ছুরিকাটি হাতে তুলিয়া লইল। তীক্ষ্ণাগ্র শলাকার ন্যায় ছুরি; উল্কা তাহা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়া বাম করতলের উপর তাহার তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করিল। উল্কার কঠিন মুখ আরও কঠিন হইয়া উঠিল। সে ঘাড় ফিরাইয়া পাশের দিকে তাকাইল।

পাশের দেয়ালে কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র রহিয়াছে, বীণা বংশী মৃদঙ্গ। উল্কা সেখানে গিয়া দাঁড়াইল, বীণার তন্ত্রীতে মৃদু অঙ্গুলির আঘাত করিল। তন্ত্রীর ঝঙ্কার শুনিয়া তাহার কঠিন মুখ একটু কোমল হইল, অধরে তিক্ত-তীক্ষ্ণ হাসি ফুটিল। সে ডাকিল

বাসবী—

বাসবী সাগ্রহ সশঙ্ক মুখে প্রবেশ করিল।—প্রিয়সখি—

উল্কা বাসবীকে জড়াইয়া ধরিল, বাসবী গলিয়া গেল।

উল্কা বলিল—তোরা আমার উপর রাগ করিসনি?

বাসবী বলিল—না না কিন্তু কি হয়েছে প্রিয়সখি? মহারাজ কি?

কিছু হয়নি-বসন্ত-পূর্ণিমা কবে জানিস?

বসন্ত-পূর্ণিমা। সে তো আর তিন দিন আছে। কঞ্চুকী মশাই বলছিলেন।

উল্কা নিজ মনে বলিল—তিন দিন যথেষ্ট।

কী বলছ কি যথেষ্ট?

উল্কা বাসবীর মুখের পানে চাহিয়া দৃঢ়স্বরে বলিল—বাসবী, আজ থেকে তিনদিনের মধ্যে-বসন্ত-পূর্ণিমার চাঁদ অস্ত যাবার আগে-মহারাজ সেনজিৎ আমার কাছে আসবেন—আমার প্রেম-ভিক্ষা করবেন। এ যদি না হয়, আমার নারী-জন্মই বৃথা।

প্রভাত কাল। মধুর স্বননে বংশী বাজিতেছে। পাটলিপুত্রের নগর-উদ্যানে গাছে গাছে ফুল ফুটিয়াছে, অশোক চম্পা কর্ণিকার কিংশুক; ফুলে ফুলে ফুলময়।

বেলা বাড়িয়া চলিল। পাটলিপুত্রের গৃহে গৃহে পুষ্প-কেতন উড়িতেছে, দ্বারে দ্বারে আম্রপত্রের মালিকা। নাগরিক নাগরিকগণ দল বাঁধিয়া পথে বাহির হইয়াছে। গান গাহিতে গাহিতে তাহারা চলিয়াছে, পথিকদের গায়ে কুঙ্কুম ছুঁড়িয়া মারিতেছে। বংশীর কলিত কলস্বনের সহিত যুবতীদের কলহাস্য মিশিতেছে।

চতুষ্পথের মাঝখানে মদন-মন্দির। মন্দিরের প্রাচীর নাই, পঞ্চস্তম্ভের উপর ছাদের চূড়া উঠিয়াছে। মন্দিরের অভ্যন্তরে ধনুর্ধর দেবতার মূর্তি দেখা যাইতেছে। একদল যুবতী নাচিতে নাচিতে মন্দির পরিক্রমা করিতেছে ও প্রতিমার অঙ্গে পুষ্প-নিক্ষেপ করিতেছে। ইহারা নগরের বারনারী। নাচিতে নাচিতে রসে-ভরা যৌবনের গান গাহিতেছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *