শীতের ছোটো দিন দেখতে দেখতে ফুরোল, সন্ধ্যা নামল। দুটি ঘরের মাঝখানকার দরজায় দাঁড়িয়ে তরুলতা বললেন–সতু, এবার তৈরি হয়ে নে। সত্যেন হাসল। আজ দিনের মধ্যে যতবার মামিমা তাকে সতু বলে ডেকেছেন, ততবার ঐ একটু হাসি ফুটেছে তার ঠোঁটে। ঠাট্টার হাসি, আবার যেন অন্য কিছুরও। ভাবতে কেমন মজাই লাগে যে তাকে তুই বলবার, সতু বলে ডাকবার এখন এই মামিমা ছাড়া বলতে গেলে কেউ নেই। সত্যেন বলল—তৈরি আবার কী! কিরণ বক্সি গম্ভীর চোখে তাকাল–সাজবে না?

সাজবো কেন? আর সেজেই তো আছি।

এই?–সত্যেনের মুখ থেকে নিচের দিকে চোখ নামিয়ে আনন্স কিরণ, আবার উপরে তুলে বলল—তুমি এখনো আলোতে ঠোঙা পরাওনি দেখছি।

কী হবে?

আমিও তাই বলি—কী হবে। কিন্তু আমাদের পাড়ায় এ. আর. পি-র ছোঁড়াগুলোর যা তড়পানি! না হে–কিরণ আর একবার উপরদিকে তাকাল—আলোটা বাইরে যাচ্ছে। জানলাটা বরং ভেজিয়ে দিই।

আরে বোসো বোলো৷ কিরণ উঠে জানলা ভেজিয়ে দিল। ফিরে এসে একটু নিচু গলায় বলল–জাপানিরা নাকি বর্মায় ঢুকে গেছে, রেঙ্গুনে বোমাও পড়েছে কাল। কিরণ প্রশ্নের সুরে কথা শেষ করল, তাই সত্যেনকে বলতে হল—তা হবে।

সুবিধে ঠেকছে না ব্যাপারটা। কিরণ ছোট্টো করে বলল—বর্মা গেল। তা গেলই বা, সত্যেন ভাবল। কী এসে যায়, কী আছে সেখানে? বর্মায় একমাত্র মূল্যবান ছিল স্বাতীর মেজদি, তিনি তো কলকাতাতেই–হেমাঙ্গবাবুও, যা ভাবনাই গেছে কদিন তাঁর জন্য—যাক, এসে গেছেন। তাহলে আর বর্মার জন্য ভাবনার কী রইল? অখিল ভিতর থেকে এসে সত্যেনের পাশের চেয়ারটায় রাখল একটি পাট-না-ভাঙা সিল্কের পাঞ্জাবি। সত্যেন তাকিয়ে বলল—কী?

মা তোমাকে এটা পরতে বললেন—বলে অখিল হাসল। আঁকা-বাঁকা তার দাঁতের সারি, মুখটা রোগা, কিন্তু-সত্যেন ভাবল-চোখ দুটি ভারি সজীব তো, আগে দেখিনি। এই অখিলই একদিন এসেছিল দশটা টাকার জন্য—আজ কত অন্য রকম দেখাচ্ছে। একটু তাকিয়ে থেকে বললখুব তো টেড়ি কেটেছো অখিল? আলতো করে চুলে হাত ছুইয়ে অখিল ঘাড় কাৎ করে লজ্জা পেল। কিরণ বলল—সত্যেন, নখ কেটেছ? আঙুলের দিকে তাকাতে গিয়ে সত্যেনের চোখ পড়ল ডান হাতের কক্তিতে বাধা হলদে সুতো। এটা নাকি পরতেই হবে। একটু পরে নিখিল বলল–আমি ভাবছি গরদের জোড় পরে কেমন দেখাবে তোমাকে!

গরদের জোড় মানে?

বাঃ, কী পরে বিয়ে হয় জানো না?

সে সব নিয়ম আজকালও আছে নাকি?

কিরণ মিটিমিটি হাসতে লাগল, যেন একটা চমৎকার প্রতিশোধ নিচ্ছে সত্যেনের উপর। আস্তে আস্তে বলল-শোনো, চারদিকে লোক…অচেনা লোক…মেয়েরা—সব চোখ তোমার উপর–তার মধ্যে তুমি মূর্তিমান দাঁড়িয়ে আছ। দুজন লোক দু-দিকে একটা কাপড় ধরে তোমাকে ঘিরে দিল, আর তুমি যথাসম্ভব গাম্ভীর্য বজায় রেখে কাপড় ছেড়ে নিলে। ধুতিটা একটু ছোটোই থাকে সাধারণত, ঠিক পা পর্যন্ত পড়ে না, আর উড়ুনিটা—তা তুমি ছিপছিপে আছ, তুমি বেশ ঢেকেঢুকেই বসতে পারবে। সত্যেন বলে উঠল—অসম্ভব!

বললে হবে কী, সুতি পরে তো আর বিয়ে হয় না।

হয় না? সত্যেন আঁৎকানো চোখে এদিক ওদিক তাকাল। খপ করে সিল্কের পাঞ্জাবিটা তুলে নিয়ে বলল—ঠিক? এইটে পরে নিই, তাহলেই হবে। কিরণ অটলভাবে বলল–জামা পরাই বারণ।

পাগল নাকি! ভাগ্যিশ এটা ছিল, আর মামিমাও বুদ্ধি করে। চকিতে জামা বদলে নিল সত্যেন, রুমাল পকেটে নিয়ে বলল—কত হাঙ্গামা অনর্থক। আমি ওঁদের এত করে বললাম রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হোক, ওঁরা কানেই তুললেন না। কিরণ হেসে বলল—কেন তুলবেন? তারপর তুমি যদি একদিন বলে বসো-ব্যস, থাকো এবার, আমি চললাম, তখন? কথাটা বুঝতে একটু দেরি হল সত্যেনের। কিন্তু বুঝতে পেরেই উত্তর দিল-সেইজন্যেই তো। যাবার কোন উপায়ই যদি না থাকে, তাহলে আর না-যাবার মূল্য কী?

উপায় সবটাতেই আছে-কিরণ হালকাভাবে বলল—আমরা উকিলরা নয়তো আছি কী করতে? সত্যেন কথা বলল না। তার মনে পড়ল স্বাতীর কাছেও সে এ-কথা বলেছিল। একবার, দু-বারও না, কয়েকবার। স্বাতী প্রথমে এমন ভাব করেছে যেন শোনেইনি, তারপর কী–! বলে ভুরু কুঁচকেছে, আর তারপর একদিন জ্বলজ্বলে চোখে বলে উঠল কখনো আর এ-কথা মুখে আনবে না।

কেন?

কেন আবার? তুমি কি কখনো ছেড়ে যাবে আমাকে?

না। আর সেজন্যই ইচ্ছা ছাড়া আর বাধ্যতা চাই না।

তুমি না চাইতে পারো, আমি চাই।

তুমি বাধ্যতা চাও? স্বাধীনতা চাও না?

না! তোমাকে ছেড়ে যাবার স্বাধীনতা আমি চাই না।

কেন? এর পরেও সত্যেন বলেছিল—নিজের উপর যথেষ্ট বিশ্বাস নেই তোমার?

—না থাকলে তো তোমার মতোই অনুষ্ঠানকে ডরাতাম বলে স্বাতী একবার তাকিয়েছিল তার দিকে, রানির মত সেই দৃষ্টি। মুহূর্তের জন্য নিজেকে একটু ছোটো লেগেছিল সত্যেনের। বাইরে থেকে নিখিল ঘরে এল, গায়ে গরম কাপড়ের খয়েরি শার্ট, হাতে এক পয়সা দামের টেলিগ্রাফ ভাঁজ করা। ঐ শার্টটা দেখে সত্যেনের ভাল লাগল, তার চেনা ওটা, কত দেখেছে মামার গায়ে–আর দেখতেও অনেকটা মামার মতোই বেশ ছেলে হয়েছে নিখিল। কিরণ বলল-খবর আছে নাকি কিছু?

কিছু না। সকালের কথাই ঘুরিয়ে লিখেছে—নিখিল কাগজটা ছুঁড়ে ফেলল টেবিলের উপর। কিরণ সেটা তুলে নিয়ে তাকাল। তিন দিনে পনের হাজার লোক—

আরো বেশি হবে—বলল নিখিল। ট্রেনে আর ওঠা যাচ্ছে না, দেহাতিরা সব হেঁটে-হেঁটেই ভাগল–

বা!

ওদের আর দোষ কী। ভাল ভাল ভদ্রলোকরাই কিরণ কথা শেষ করল না, ভাবল তার শ্বশুরের কথা। ভদ্রলোক এর মধ্যেই একটা বাড়ি নিয়ে ফেলেছেন রামপুরহাটে মেয়েদের সব পাঠিয়ে দেবেন–অনীতাকেও নাকি যেতেই হবে সেখানে। কী অন্যায় জেদ।

হ্যাঁ—রাস্তায় আর কথাই নেই এ ছাড়া—নিখিল হাসল। এইমাত্র শুনলাম একজন বলছে। সত্যি, কী যে হবে!—কিরণ সত্যেনের দিকে চোখ ফেরাল—তোমার কী মনে হয়? সত্যেন অমায়িকভাবে বলল—কী আবার হবে! তুমি বুঝি ও-বাড়ি থেকে এলে নিখিল? হা। তোমাকে নিতে আসছেন ওঁরা। সত্যেনের হাসি পেল। আজ বুঝি আর নিতে না এলে যেতে পারি না? কী সব নিয়ম! দিদিরা তো কবে থেকেই তাকে তাড়াচ্ছেন—এখন আর দেখোনা না, আর একেবারে বিয়ের সময়। আর তারপর কাল মেজদি-না, সেজদি-সরস্বতী তো সেজদিরই নাম—খুব গম্ভীরভাবে বললেন–সত্যেন, কাল কিন্তু তুমি আর এসোনা, বুঝেছ তো? আর তাই-তো আজ সকাল থেকেই দিনটা ঝাপসা। এই দু-মাসের মধ্যে আজই প্রথম যেদিন সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত স্বাতীর সঙ্গে একবারও তার দেখা হল না। তরুলতা কুলো হাতে ঘরে এলেন, মেঝেতে কুলো নামিয়ে সামনে আলপনা-আঁকা সিঁড়ি পেতে ডাকলেন— সতু, আয়।

আবার কী? সত্যেন ভুরু কুঁচকাল।

আয়। বসতে হয় একবার।

যত বাজে–!

ও-সব চলবে না হে— কিরণ বলল। যে যা বলবে তা-ই করতে হবে আজ। তা-ই তো করছি, সত্যেন ভাবল– আমার আমিত্ব আর কিছুই থাকল না। সকালে হয়ে গেল এক প্রস্থ মামিমা ছাড়লেন না কিছুতেই। পুরুত এল, টিকিওলা পুজুরি বামুন, কলাপাতার ঠোঙা, চালকলা—উঃ! দু-ঘন্টা বসে বসে কী সব বিড়বিড়—আবার প্রপিতামহীর নাম জিগেস করে!—যেন প্রপিতামহীর নাম কোনো জন্মে কেউ শুনেছে প্রহসন! কিন্তু এই প্রহসনের পরপারেই বাস্তব..এসব মিথ্যা তাদের খোলশ ছাড়াতে ছাড়াতেই শেষ সত্যে পৌঁছবে। সে কি জানত এই সত্য, যদি সে রাঁচি চলে যেত সেদিন, দু-মাস আগে প্রথম কুয়াশার সেই সন্ধ্যায়? পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গিয়েছিল তখন, যখন বারান্দার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে স্বাতী বলেছিল। অনেক কথা বলেছে স্বাতী, সে-ও বলেছে। মনে হয় যেন মনের সব কথা, জীবনের সব কথা, মনে হয়েছিল জীবন ভরে বললেও ফুরোবে না। কিন্তু ফুরোল, আর কথা নেই, দু-জনে আবার প্রথম থেকে আরম্ভ না করলে আর কথা নেই—এই সেই আরম্ভ।

বসে রইলে যে? কিরণ তাড়া দিল— ওঠো! সত্যেন উঠল, চিত্রি-করা পিঁড়িতে বসল। সামনে কুলোতে প্রদীপ জ্বলছে, ধানদূর্বা কী কী সব সাজানো। মামিমা উবু-হাঁটু হয়ে তার সামনে বসলেন, তার মাথায় হাত রেখে, ঠোঁট নেড়ে কিন্তু আওয়াজ না করে কী বললেন, হাত সরিয়ে এনে বা হাতের কড়ে আঙুলে চন্দনের ফোঁটা দিলেন তার কপালে। আমিও দিই একটু।— কিরণ এগিয়ে এসে নিচু হল। নানা— দুহাত তুলে কিরণকে ঠেকাতে গেল সত্যেন। রাখো তো! কিরণ মোটা আঙুলে বেশ টিপে টিপে চন্দন দিল সত্যেনের কপালে।—এই একদিনই তো বিয়ে করবে জীবনে। সরে এসে বলল বেশ দেখাচ্ছে। তরুলতা ধানদূর্বা দিলেন তার মাথায়, প্রদীপসুন্ধু কুলোটা একবার কপালে ঠেকালেন, তারপর হঠাৎ তার ডান হাতটি টেনে নিয়ে কড়ে আঙুলে ছোট্টো কামড় দিলেন। সত্যেন তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল।

কিরণ বলল-বাঃ, প্রণাম করলে না মামিমাকে?

থাক, থাক-তরুলতা কুলো সরালেন, পিঁড়ি তুললেন। চটচট করছে–সত্যেন আঙুল তুলল কপালের দিকে।

না, না, মুছো না, ও-থাক–বোঝা যাচ্ছে না। আরে এতে এ রকম করছ তুমি, আর আমাকে যা শাস্তি করেছিলেন কাকিমারা! কিরণ হাসল তরুলতার দিকে তাকিয়ে। আমাদের শ্রীমানের সবটাতেই আপত্তি-তরুলতা ঘরের চেয়ার ঠিক করলেন-তাপপাশের চাঁদরটা টান করে দে তো, নিখিল।

বোঝা যাচ্ছে না ঠিক তো?–উদ্বিগ্ন প্রশ্ন করল সত্যেন। একটু গেলই বা, চন্দনের ফোঁটা তো ভাল, যখন টোপর পরে-ইশ, একেবারে সঙ সাজিয়ে ছাড়ে হে!-কিরণ ফুর্তিতে হেসে উঠল। ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তরুলতা বললেন—স্যাখ তো নিখিল, মহেশ পান আনতে গিয়ে কোথায় লেগে রইল।

আমি দেখছি অখিল ছুটে বেরল। আর যে কেউ এল না এখনো? কিরণ এবার রাস্তার দিকে তাকাল। কোনো উত্তর না পেয়ে আবার বলল-বন্ধু-বান্ধব আর কেউ এল না?

বলেছে নাকি কাউকে? ওর এক কাকা আছেন কলকাতায়, বাবার সাক্ষাৎ জ্যাঠতুতো ভাই–কত বললাম আমি তাকে খবর দিতে—শুনল কি কথা? আমি একা আর কত পারি? তাপপাশের টান-করা চাঁদরটায় আরো দুটো টান দিয়ে তরুলতা পাশের ঘরে চলে গেলেন। একা আর কত পারি! কবার শুনল সত্যেন। কিন্তু কমও তো পারেন না—ঐ টেবিলটাই কতবার গোছাবেন দিনের মধ্যে এত গোছাবার কী যে আছে! সত্যেন একবার তাকাল ঘরের চারিদিকে, সব পরিষ্কার ফিটফাট, নিখুতরকম গুছানো—আর মিথ্যেই বা কী, তার নিজের ঘর তো নেই আর। মামিমাকে নিয়ে আসতে হল দুদিন আগেই। তারপরেই অন্য এক জগৎ জেগে উঠল এই ঘরে। লোকজন, যাওয়া-আসা, লোকজন। আবার ফাঁকা হলেও বিষম কঁকা। আজ দুপুরবেলা স্বাতীদের ফাঁকা বাড়িটাতেই একবার গিয়ে সে–কেউ ছিল না তখন–একটু অবাক লেগেছিল স্বাতীকে ওখানে দেখতে না পেয়ে। ডালিমের খাটটায় শুয়ে শুয়ে সময় কাটিয়েছিল খানিকটা।

সত্যি? কাউকে বলোনি? কলেজের কোলীগরা? তোমার সাহিত্যিকরা? কাউকে না? বাঃ। কিরণের আওয়াজের উত্তরে সত্যেন শুধু আবছা হাসল।

, না, এটা ভাল করোনি। আগে জানলে আমিই বলে দিতাম কয়েকজনকে ভবেশ চন্দ আর ফণী ভট্টাচার্যকে তো নিশ্চয়ই! সত্যেন বলল—তোমার একটু একা লাগছে, বুঝতে পারছি। সেজন্য বলছি না। আর কাউকে না বলে আমাকেই শুধু বলেছ, এটা আমার পক্ষে তো গৌরবেরই। কিরণ একটু অন্য রকম তাকাল সত্যেনের দিকে। সত্যেন সলজ্জ চোখ সরাল। দৈবাৎ সেদিন চায়ের দোকানে দেখা। তা ভালই হয়েছিল, তবু একজনকে মনে পড়ল সেই সময়। আর কিরণ তত ভালই—হ্যাঁ, বেশ ভাল, তখন যাদের সঙ্গে আমি বেশি মিশতাম তাদের অনেকের চেয়েই আসলে ভাল। ছাত্রজীবনে কিরণকে সে তুচ্ছ করেছে, তাকে নিয়ে অন্যদের তামাশাতেও যোগ দিয়েছে, সে সব মনে করে সত্যেনের অনুশোচনা হল।

সতুদা ওঁরা আসছেন। অখিল ছুটে এল।–ম-স্ত গাড়িটা!—আবার ছুটে গেল দরজার বাইরে। একটু চুপ। সত্যেন দেখল, বেশ ভারিক্কি চেহারা করে নিখিল দাঁড়িয়েছে দরজার ধারে, মামিমা তার পিছনে, চেয়ারে কিরণ নড়ে-চড়ে সোজা হয়ে বসল। কেমন করে কেটে গেল দিনটা! একটা দিন সে কিছু করল না, ভাবল না, এতদিনের উথালপাথালের পর আর তার অনুভূতি নেই। স্বাতীর কথা বেশ ভাবতে পারল বুকের মধ্যে কেঁপে না উঠে। আজ সকাল থেকে আবেগ তাকে ছেড়ে গেছে, প্রতীক্ষা মরে গেছে, শুধু একটা অস্তিত্ব ভেসে চলছে সময়ের স্রোতের উপর। দুজনের জগৎ ছিল এতদিন দুজনের নিজত্বের। এখন অন্যদের জগৎ… সকলের… কাবোরই না—এখন বিজ্ঞাপন, ব্যাকরণ, ব্যবস্থা—মিথ্যা সব!

কী!–আস্তে একটি হাত পড়ল তার কাঁধে। সত্যেন মুখ তুলে অরুণবাবুর সুশ্রী মুখটা দেখতে পেল। একটু কালো রঙটাপুরুষের পক্ষে ওটাই ঠিক রঙ-উড়ুউড়ু চুলের কালো রঙ কানের কাছে ফিকে হচ্ছে, আর সেই ধোয়ারডের উপর চশমার মোটা কালো ফ্রেমটা মানিয়েছে বেশ। ঐকে প্রথম দেখেই, শুধু চোখে দেখেই, ভাল লেগেছে তার কথা বলে আরো একটু লাজুক, কেমন আবছা করে কথা বলেন, মিষ্টি শোনায়–প্রথম কবার আপনি বলার পর তাকে তুমি বললেন যখন। অরুণবাবুর চশমার পিছনে বড়ো-দেখানো চোখে একবার চোখ রেখে সত্যেন বলল-কিরণ, ইনি-ইনি অরুণবাবু, আর-কিরণ হাসল।–থাক, থাক, ওতেই হবে। আপনি বসুন–সত্যেনের হয়ে সেই ভদ্রতা করল। সত্যেনের পাশের চেয়ারটায় অরুণ বসল।

তরুলতা কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন—আমাদের বৌমা কেমন আছেন?

আর বলবেন না! অরুণ দু-চোখের কাছে দু-আঙুল ছড়িয়ে হাতটা উপর দিয়ে নামিয়ে আনল। কাঁদছে খুব?

আমি এসে অবধি তো এ-ই দেখছি।

স্বয়ংবরা হয়েও এত কান্না?

আমিও তো তাই বলি! কিন্তু বললে কী হবে—কেঁদে কেঁদে রোগা হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য অরুণের গলা অন্যরকম শোনাল, হাসির ভাবটাও মুছে গেল মুখের। তাপপাশে পা তুলে বসে হেমাঙ্গ তার মিহি গলায় বলল—শুনছ তো সত্যেন, সব কান্না কিন্তু পুষিয়ে দিতে হবে তোমাকে।

সেটা পুষিয়ে যাবে জেনেই তো অত কান্না!-বরপক্ষ সেজে তক্ষুনি জবাব দিল কিরণ। হেমাঙ্গর কথা শুনে সত্যেন একটু হেসেছিল। কিরণের কথা শুনে আবার তাই করল। এটা তার ইচ্ছার হাসি না, অনিচ্ছারও না—অনুপায়ের। আপাতত মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে এটা। এখনকার মতো তার কোন ইচ্ছা নেই, শক্তি নেই, সে থেমে আছে। তাকে ঘিরে অনেক কিছু হচ্ছে, কিন্তু সে কিছু ঘটাতে পারে না, ঠেকাতেও পারে না। সে শুধু দেখবে-শুনবে আর মাঝে-মাঝে ঐ রকম একটু না হেসেই পারবে না। এখন আর শুনছেও না ভাল করে। যাতে তার কোনো অংশ নেই, এ-রকম একটা দৃশ্যের মতো দেখছে মামিমার চলাফেরা, মিষ্টির থালা এনে এনে প্রত্যেকের সামনে রাখছেন তিনি, মহেশ নিয়ে এল ট্রেতে করে অনেকগুলি জলের গ্লাস-বাঃ, মহেশকে বেশ ফিটফাট দেখাচ্ছে তো আজ আর অখিল পানের রেকাবি হাতে নিয়ে ঘরে এল। মামিমা দাঁড়ালেন কিরণের সামনে—একটু খাও।

আমি তো এসেই খেলাম।

যাবার সয় আবার খেতে হয়। ডালিম আর কিছু—? অরুণ ডালিমের দিকে তাকাল—বলে দেব নাকি, ডালিম? দূরে দাঁড়িয়ে ডালিম লাল হল।

মেসোমশাই ডাকবে না কিছুতেই, সত্যেনদা বলে ডাকবে—এই নিয়ে ডালিম রোজ ঝগড়া করে তার মা-র সঙ্গে।

মেসোমশাই কথাটা শুনে সত্যেন শিউরলো, আর লাল-হওয়া মুখে অনেকখানি সপ্রতিভতা এনে ডালিম বলল—মেসোমশাই-টা কী বিশ্রী—বুড়ো!

ঠিক বলেছ, ডালিম।–বলে উঠল হেমাঙ্গ। আমরাই কি আর জন্ম থেকেই মেলোমশাই ছিলাম! বলে চাদির ছোটো টাকে—এমন আর ছোটো কী— হাত রাখল একবার। এ কথাটা শুনে হেমাঙ্গবাবুকে খুব ভাল লেগে গেল সত্যেনের। হ্যাঁ—উনিও খুব ভাল, দেখতে একটু গম্ভীর, কথাও কম বলেন, কিন্তু বলেন বেশ। আর ডালিম—একেবারে টুকটুকে লাল হয়ে গেছে বেচারা—কী মিষ্টি দেখাচ্ছে! তরুলতার দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে হেমাঙ্গ বলল—রাতারাতি এগারোজনের মেলোমশাই। সত্যেনের চোখের পাতা মিটমিট করল, গায়ে পিন-টিন ফুটলে যেমন হয়, আর তরুলতা গম্ভীরভাবেই জবাব দিলেন—আপনাদের মতো বান্ধব পাওয়া ওর ভাগ্যই তোতা… আপনারাও রত্ন পেলেন-ডালিম আর একটা সরের নাড়ু? রাজি হওয়াহওয়া মুখে ডালিম তাকাল নিখিলের দিকে। নিখিল তার গাল দেখিয়ে বলল—পান খাচ্ছি। ঠিক-পানই খাই! ডালিম এমনভাবে বলল, যেন মিষ্টির বদলে পান খাওয়াটা খুব নতুন আর আশ্চর্য প্রস্তাব পান তুলে নিয়ে মুখে দিল। মহেশ থালা-গেলাশ সরাল, অখিল বাঁ হাতে চুল চাপল একবার। ডালিমের নিচের ঠোঁটে ঈষৎ লাল রঙ দেখা দিল। তরুলতা সত্যেনের সামনে এসে দাঁড়ালেন থালায় করে ফুলের মালা নিয়ে। নে, সতু।

কী?

পরে নে।

মালা পরতে হবে? সত্যেন দু-হাত তুলে পিছিয়ে গেল।-না, না, কিছুতেই না, কিছুতেই পারব না!

পারব না কী রকম? আরে মালা ছাড়া যে বিয়েই হয় না! এসো, এসো! বৃথা ছটফটাল সত্যেন, কিরণ বক্সি জোর করেই তাকে পরিয়ে দিল মোটা, সাদা, গন্ধভরা রজনীগন্ধার মালা। অরুণ তাকিয়ে বলল—বাঃ, বেশ দেখাচ্ছে। তা আপনিও নিন একটা।

আমি? আচ্ছা! কিরণ হাসল, ছোটো একটি মালা তুলে হাতে জড়াতে গিয়ে থামল, গোল করে আস্তে পকেটে রাখল রুমালের তলায়। অনীতাকে দিতে হবে রাত্রে। সত্যেন এই ফাঁকে মালা খুলে ফেলছিল গলা থেকে, কিরণ এবার হাঁ-হাঁ করে পড়ল তার উপর। কী ছেলেমানুষি করো সব সময়! রাখো!–এমন ধমক দিয়ে কথাটা বলল যে সত্যেন কেমন মিনিমুখে গলায় মালা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকল চুপ করে। আরো মালা ছিল থালায়। অখিল নিল, নিখিল নিজে নিয়ে ডালিমকেও দিল। হঠাৎ সমস্তটা ঘর রজনীগন্ধার গন্ধে ভরে গেল, আর যেন সেই গন্ধ ভাল করে নেবার জন্য সকলেই চুপ করে থাকল একটুক্ষণ। তারপর হেমাঙ্গ মুখে একটি ছোটো এলাচ দিয়ে বলল-এবার তাহলে।

হ্যাঁ, আর আজ্ঞা না, সত্যেন, চলো-অরুণ কেঁচা ধরে উঠে পড়ল। ডালিম এগিয়ে এল তাড়াতাড়ি। ট্যাক্সি আনব আর একটা? চারদিকে একবার পলকপাত করে হেমাঙ্গ বলল— আর দিয়ে কী হবে? গাড়ি দিয়েই বা কী হবে-সত্যেন ভাবল। এখান থেকে হেঁটেই যাওয়া যায় কত বার। কিন্তু স্বাতীদের বাড়িতে হলেও বোধহয় গাড়িতেই যেতে হত এখন?

দেখুন না অন্যায়টা।–কাঁধের উপর শাল ঠিক করে কিরণ উঠে দাঁড়াল। কাউকে বলেনি, একদম ফাঁকি দিয়েছে সবাইকে। আপনারাই বলুন, একজন বন্ধু নিয়ে বিয়ে করতে যায় কেউ?

সত্যেন আজকাল একজন ছাড়া দু-জন জানে না অরুণ আস্তে-আস্তে বলল, আর কিরণ কথা শুনে হে-হে করে লম্বা হাসল। হাসির শেষ দমটা সরু করে বের করে দিয়ে বললআচ্ছা-হু, বৌভাতের সময় শোধ নেব! সত্যেনের গায়ের কাপড়টা চেয়ারে পিঠ থেকে কাঁধে তুলে দিল অরুণ। সত্যেন ফিরে তাকাল, একটু লাল হল। ওদিকে হেমাঙ্গর মিহি গলা শোনা গেল–আপনি তাহলে অনুমতি করুন। তরুলতা কথা না বলে সত্যেনের দিকে তাকালেন। সত্যেন একটু এগিয়ে এল, হঠাৎই থেমে বলল–আপনি যাবেন না, মামিমা? মামিমার ঠোঁটের হাসি দেখে আবার বলল—যেতে নেই বুঝি?

ও-সব বাজে নিয়ম!—বলে উঠল অরুণ। চলুন আপনি। হাসি এন্টু ছড়াল তরুলতার ঠোঁটে। আমি একেবারে বরণ করে বৌ ঘরে আনব। সত্যেনের পিছনে কিরণ চুপি-চুপি বলল— এ-বাড়িতেই থাকছে বিয়ে করে?

দেখি।

আমাদের পাড়ায় অনেক ফ্ল্যাট খালি যাচ্ছে। বলো তো দেখি একটা নতুন—সত্যেনের মনে হল সমস্তটাই নতুন। সকলেই তার কথা ভাবছে। সকলেই তার ভাল চায়, তার কাজে লাগতে চায় : ঐ তো মামিমা, মুখে দুঃখের শ্রী… চুপচাপ মানুষ, একলা কত কাজ করলেন এসে থেকে, আর নিখিলের যা ছুটোছুটি—সত্যি, খুব অন্যায় করেছে সে এতদিন—এখন থেকে ওদের খোঁজখবর নেবে সবসময় নিশ্চয়ই!—তাহলে যাই আমরা? অনুমতি নেবার সুরে হেমাঙ্গ আবার বলল তরুলতাকে।

চোখ সরল সত্যেনের। মেঝের ছোট্টো জায়গাটুকুতে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে সবাই-এ ঘরে এত লোক সে কখনো দ্যাখেনি। সকলের মুখ ছুঁয়ে এল তার চোখ—সকলেই খুশি, সুখী, মামিমার মুখেও শুধুই সুখ এখন—এত সুখী হবার কী আছে? কিছু না, সকলেই ভাল, তাই সকলেই সুখী। যেতে যেতে চোখে পড়ল মহেশকে কেমন দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে, মনে পড়ল চায়ের দেরির জন্য একদিন বকেছিল তাকে, মনটা একটু খারাপ লাগল মুহূর্তের জন্য। সকলে বাইরে এল। তরুলতা দরজার ধারে দাঁড়ালেন, হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে উলু দিলেন। অনভ্যাসে প্রথম বার আওয়াজ বেরোল না, তারপর আবছা, পরের বার জোর আওয়াজ হল। দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এল দুটি মেয়ে, তাদের পিছনে একজন মোটা গিন্নি, একটু দেখেই দুটি মেয়ের বড়োটি ঘরে চলে গেল সাজতে—তারাও যাবে বিয়েতে। ছোটো রাস্তায়, অন্ধকারে কালো গাড়িটা প্রায় মিশে ছিল। এইবার ভিতরে আলো জ্বলে উঠল, হাত বাড়িয়ে দরজা খুলে দিল ড্রাইভার। সত্যেন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলল—গাড়িটা খুব বড়ো তো!

বিজনের এক বন্ধু আছে মজুমদার—পিছন থেকে অরুণ জবাব দিল। তার গাড়ি, একদম নতুন। মজুমদারকে সত্যেন চেনে না, নামও শোনেনি এর আগে, কিন্তু শুনেই বুঝল এই মজুমদার ভদ্রলোকও খুব ভাল হয়তো নিজের অসুবিধে করেও গাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। একটু অবাক লাগল তার—এত ভাল লোক আছে পৃথিবীতে, অথচ এতদিন সে তার কিছুই জানত না! হেমাঙ্গ বলল-ডালিম, ট্যাক্সিতে যাও।

আমিও ট্যাক্সিতে–বলল নিখিল।

বাকি সকলকেই ধরে গেল মজুমদারের গাড়িতে। গাড়িতে আলো নিবল। ভিতরে অখিল আর কিরণ বসল সত্যেনের দু-পাশে, কিরণের পাশে অরুণ, আর অখিল আর সত্যেনের মাঝখানে থাকল বরের টোপরটা। শোলায় বানানো ঐ বিশ্রী বস্তুটার চকচকে রাংতা হঠাৎ সত্যেনের চোখে ঝিলিক দিল। এটাও?—গাড়ি নড়ে উঠল তখনই, আর সেই মুহূর্তটিতে অন্য সব কথা ভুলে গিয়ে সত্যেন ভাবল-তাহলে সত্যি? সব সত্যি? আলো-জ্বলা দরজায় তরুলতার মূর্তি সরে গেল, পিছনে পড়ে রইল সত্যেনের বইয়ে ঘেরা একতলার ঘর, দোতলার বারান্দা খালি ইল। গাড়ি আস্তে আস্তে গলি পেরোল। অরুণ–তার চোখে তখনো কনট সার্কাসের উজ্জ্বলতার আমেজরসা রোডে পড়ে বলে উঠল, কী অন্ধকারই করেছে! হেমাঙ্গ—সে বসেছিল ড্রাইভারের পাশে ফিরে তাকিয়ে বলল—ব্ল্যাক আউট মাটি করে দিল। খুব আলো-টালো হলে তো বিয়ে বাড়ি!

সুন্দর বাড়িটি কিন্তু। কী করে পেলেন?

কলকাতায় এখন বাড়ি পাওয়া বোধহয় শক্ত না।

তা সত্যি—বলে উঠল কিরণ। যা যাই-যাই রব! আর ঠাকুর চাকর তো আর টেকানো যাচ্ছে না। পিছনের ট্যাক্সিতে নিখিল ডালিমের কাঁধে টোকা দিল—একটা নেবেন?

সিগারেট? ডালিমের চোখ বড়ো হল।–আপনি সিগারেট খান?

পেলে খাই, নিখিল হাসল। একটা দেখুন না—

না, না–ডালিম একটু সরে এল, তার মনে হল মা তাকে দেখছেন।

স্টেট-এক্সপ্রেস! ফাইভ ফিফটিফাইভ! নিখিল এক আঙুলে সিগারেটটাকে আদর করল।

নাকি? যুদ্ধ না থামলে আর কলকাতায় ফিরবেই না? অরুণ আওয়াজ করে হাসল। তা ভালই, বিয়েটাও সুবিধেমত হল, আর আপনিও বেশ বাড়িটি পেয়ে গেলেন রেঙ্গুন থেকে এসেই। আপনি রেঙ্গুন থেকে এলেন?–কিরণ পিঠ সোজা করল। কবে এলেন? খবর কী বর্মার? উনি আর বেশি কী জানবেন উত্তর দিল অরুণ। পার্লহারবারের পরের দিনই উনি জাহাজে! কিরণ বলল–বা! খানিকটা তারিফ করে, খানিকটা নিরাশ হয়ে। নরম গদিতে আরাম করা আবার। অন্ধকারে দেশলাইয়ের আলোয় লাল দেখাল নিখিলের মুখটা। দু-চোখে ভয় আর সম্রম আর ঈর্ষা নিয়ে ডালিম দেখতে লাগল। চোখা ঠোঁটে ধোঁয়া বের করে নিখিল বলল বিজনবাবু মাইডিয়ার মানুষ। দেখা হলেই সিগারেট! অরুণ বলল-ওরা সব আগেই চলে এসেছিল ভাগ্যিশ। সকলকে নিয়ে এখন আসতে হলে বিপদেই পড়তেন আপনি।

বিপদ আর কী? পলকের জন্য হেমাঙ্গর মনে পড়ল তার রেঙ্গুনে চোদ্দ বছর বাস করা বাড়ি, বাড়িভরা ফার্নিচার, শখের জিনিশ, তার মগ চাকর মঞ্চ, এইটুকু বয়স থেকে তার কাছে ছিল–এবারে আসা মানেই যে আসা, তাও কি ভেবেছিলাম!

ভাল তো! এ রকম কিছু হয়ে না পড়লে জীবনেও তো আপনি বর্মা ছাড়তেন না। মহাশ্বেতা খুব খুশি।

সরস্বতী কিন্তু না। কথাটার মানে বুঝে অরুণ বলল—তা লক্ষ্মী-সরস্বতীরা যাই বলুন, পেলে আমি ছাড়ব না।

যুদ্ধে যাবেন?

তবে কি আরুইন হাসপাতালের সেকেণ্ড সার্জন হয়ে জীবন কাটাব? সত্যেনের একটু অবাক লাগল যে অরুণবাবুর মতো একজন চমৎকার মানুষ স্ত্রীকে ফেলে কোথাও চলে যেতে চাচ্ছেন। নিশ্চয়ই ঠাট্টা করে বলছেন এসব। সত্যি কি আর যাবেন? কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু গাড়ি তখনই ঘুরুল। এসে গেছে। রসা রোড থেকে সাদার্ন এভিনিউ যেখানে তীব্র মোড় নিয়ে বেঁকে গেছে, সেখানে আড় করে বসানো একটি দোতলা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল। এ বাড়িটাকে যেতে-আসতে লক্ষ্য করেছে সত্যেন, সুন্দর দেখায় বিকেলের আলোয় কিন্তু—গাড়ির মোটা কাচের ভিতর দিয়ে সে তাকাল। আর ট্যাক্সি থেকে নামার আগে নিখিল অসীম আপশোষে মাত্র কড়-পোড়া জ্বলন্ত স্টেট-এক্সপ্রেসটা ছুঁড়ে ফেলে দিল—ছিঃ! এটুকুতেই চলে আসবে বুঝলে ধরাত নাকি তখন?-কিন্তু এখন একেবারে অন্যরকম, ছাতে ম্যারাপ বাঁধা, গাড়িতে বসেই ভিতরের ভিড় বোঝা যাচ্ছে, উপরের রেলিঙে খুঁকে রঙবেরঙের শাড়ি, নিচের সিঁড়িতে কারা সব-অন্য জগৎ এখন… অন্য, অচেনা, অদ্ভুত জগৎ, অন্যদের, সকলের—অবাস্তব, এ কিছু না, এখনই মিলোবে আর তারপর আবার তার নিজের জগৎ—নতুন পাওয়া নিজের, যদিও কবে যে তা ছিল না এখন আর মনে পড়ে না গাড়ি থেকে নামল সত্যেন, ভিতর থেকে বাজনা বেজে উঠল ঝমাঝম, শাঁখ বেজে উঠল তীক্ষ্ম।

******

মহাশ্বেতা চোখ খুলল, উঠে বসল। দুটোর পর শুয়েছে কাল রাত্রে, আবার ভোর না হতেই গায়ে হলুদ সারাদিন ঝিমঝিম করেছে আর বিকেল থেকেই মাথাটা—কী শরীরই হয়েছে তার! পাছে মাথা ধরে আর সব মাটি হয়ে যায়, এত গোলমালের মধ্যেও জোর করে খানিকক্ষণ শুয়ে ছিল আলো নিবিয়ে। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে এখন—হ্যাঁ, ঠিক। সে ঠিক থাকবে, কিছু বাদ দেবে না, বিয়ের ফুর্তির একটি ফোঁটাও বাদ দেবে না। কতকাল, কতকাল পরে এই জীবন? খাট থেকে নেমে আলো জ্বালাল। মুখোমুখি দাঁড়ানো আলমারির আর ড্রেসিং-টেবিলের দুই আয়নায় আলো ঝলসাল, জোড়াখাটের পিছল গায়ে টাটকা বার্নিশ ঝিলিক দিল। ভাল লাগল মহাশ্বেতার, বার্নিশের গন্ধের খোচা ভাল লাগল, নতুনের গন্ধ, নতুন জীবন—আজ রাত্রে যারা এ-ঘরে থাকবে তাদেরই শুধু নয়, তারও–হ্যাঁ, তারও। মহাশ্বেতা ঘরের দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে গায়ের কাপড় ফেলে মুখে গলায় ক্রিম মাখল, তারপর গোলাপি রঙের পাউডর বুলোত লাগল আস্তে আস্তে। দরজায় টোকা পড়ল।

কে?

আমি সরস্বতী।

আঁচলটা লোটাতে লোটাতে মহাশ্বেতা দরজা খুলে আড়ালে দাঁড়াল। সরস্বতী ভিতরে আসতেই বন্ধ করে দিল আবার।

এতক্ষণে কাপড় পরছিস তুই!

এই তো হয়ে গেল। শুয়ে থাকার জন্য চুলের যা একটু ভাঙচুর হয়েছিল, পাতলা-পাতলা আঙুলে তার মেরামত করে মহাশ্বেতা খোঁপা চাপড়াল দুবার। সরস্বতী বলল—তোর চুল কিন্তু খুব আছে এখন। তার মানে, মহাশ্বেতা ভাবল, ঐ যা একটু চুলই আছে, আর কিছু নেই। কিন্তু চুলই বা কী—লম্বা, কিন্তু শনের দড়ির মতো পাতলা হয়ে গেছে। আর একদম টান-টান। বোনের মাথার কোঁকড়া ঘন পুঞ্জের দিকে একপলক তাকাল, শুকনো একটু হেসে বললচুল, লম্বা এক যন্ত্রণা—খুলতে বাধতে হয়রান! সরস্বতী ঠোঁটের কোণে হাসল-না—সত্যি! পরনের ঢাকাই জামদানিটা ছেড়ে ফেলে মহাশ্বেতা একটু দাড়াল… হাতকাটা বিলেতি শেমিজের উপর দুধ-সাদা সার্টিনের পেটিকোট পরা। সরস্বতী তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল ঘুমোচ্ছিলি?

না— মহাশ্বেতা অস্বীকার করল। সাদা, সরু হাত দুটি ঢুকিয়ে দিল মিশকালো ব্লাউজে, পেটিকোট ঢিলে করে ব্লাউজের তলার কাপড়টা ভিতরে ঢুকিয়ে দড়ি বাধতে-বাঁধতে বলল—শুয়েছিলাম একটু, বর এসে গেছে না?

হ্যাঁ-চল! তোর মাথা ধরা কেমন? মহাশ্বেতা খুশি গলায় বলল-ধরল না শেষ পর্যন্ত। খাটের উপর থেকে তুলে নিল শাড়িটা, যেটা দশ দোকান ঘুরে কদিন আগে কিনেছে। ক্রিমরঙের বেনারসির সাচ্চারুপোর আঁচলটা দেখতে-দেখতে সরস্বতী বলল—এ সব মিটে গেলে তোর শরীরটা সারিয়ে নে ভাল করে। অ্যানিমিয়ার খুব ভাল একটা চিকিৎসা বেরিয়েছে নতুন। আর চিকিৎসা! মহাশ্বেতা ভাঁজ ফেলে-ফেলে কেঁচা জল। ছেলে-পুলে হতে হতে মেয়েদের শরীরের আর থাকে কী! বলে ঝলমলে আঁচলটা কাঁধের উপর দিয়ে নামিয়ে দিল।—ও সব বাজে কথা! অরুণ-ডাক্তারের হালের মতটা উদ্ধৃত করল সরস্বতী।

কাজে তত বেশি কিছু দেখাওনি বাপু। কচ্ছপের ডিমের মতো বড়ো বড়ো মুক্তোর একটি ফাস গলায় এঁটে নিল মহাশ্বেতা।—দুটির পরেই তো চুপচাপ।

তোমারই বা কী? মোটে তো চারজন! সরস্বতী পিঠ-চাপড়ানো হাসল।

পাঁচজন, সরস্বতী শুকনো গলায় জবাব দিল মহাশ্বেতা, মুক্তোর ঝুমকো ঝুলিয়ে দিল দুই কানে। সরস্বতীর মুখের ভাব বদলে গেল। সত্যি, মহাশ্বেতার প্রথম মেয়েটা যে আট মাসের হয়ে মরেছিল সে কথা তার মনেই থাকে না। তাড়াতাড়ি কিছু বলবার জন্যই বলল—বড়দিরও পাঁচজন। বলেই বুঝল, এটা আরো ভুল হল। অথচ, মহাশ্বেতা ভাবল, দিদি কী সুন্দর আছে এখনো। থান পরলেই মানুষকে বুড়ো দেখায়, কিন্তু আমি আর দিদি পাশাপাশি দাঁড়ালে আমাকেই দিদি ভাববে লোকে। কেন আমার এ রকম হল–দিদির তো হয়নি, অনেকের তো হয় না। কেন আমার রক্ত নেই, মাংস নেই—আর হবেও না কোনোদিন। নেতিয়ে পড়া বুকের উপর শাড়িতে ছোটো-ছোটো টান দিতে দিতে বলল— কী কষ্ট এক-একজনকে ধারণ করতে, জন্ম দিতে, বড়ো করে তুলতে। সব শুষে নিয়েছে! আয়নার দিকে তাকিয়ে, নিচু গলায়, যেন নিজের সাদা, বড়ো সাদা মুখটাকে লক্ষ করেই সে কথাগুলি বলল। তারপর সেন্টের ছিপি কয়েকবার ছোঁয়াল কাঁধে, বুকে, গলায়। সুন্দর গন্ধ, দেখি একটু সরস্বতী কথা বদলাবার চেষ্টা করল। বোনের হাতে শিশিটা দিয়ে মহাশ্বেতা বলল-শাশ্বতীটা বেশ আছে কিন্তু। ওর বিয়ে হয়েছে চার বছর হল না? কী করে পারে? সরস্বতী সহজ হল, চোরা হেসে বলল—এখন একটা বাচ্চা হওয়াই ওর ভাল। মোটা হয়ে যাচ্ছে!

সরস্বতীর ছিপছিপে, একটু ভারি শরীরের দিকে, আঁটো, একটু ভারি বুকের দিকে, আর তার তলায় পেটের পাতলা খাঁজটার দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাল মহাশ্বেতা। তা সরস্বতীর তো প্রথম থেকেই জিতের হাত, ওর কপালেই অরুণ ছিল। হঠাৎ বলল—অরুণ নাকি যুদ্ধে যাচ্ছে? সত্যি? আমি জানি না!

তুই জানিস না? মহাশ্বেতা আয়না থেকে সরে এল-বারণ কর।

তুই একবার কথা বলে দ্যাখ না—সরস্বতী গম্ভীরভাবে বলল। বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে মহাশ্বেতা একটু হাসল, কিন্তু কথা বলল বিষণ্ণ গলায়-পুরুষমানুষ—উন্নতি ছাড়া কিছু বোঝে না।

বেশ তো! আমি কি ধরে রাখছি—না কি কেউ কাউকে ধরে রাখতে পারে? শেষের কথাটা মহাশ্বেতার মনের তলার কোনো একটা অংশকে সুখী করল। ভালমানুষের মতো বলল— এটা ঠিক বললি না, অরুণ সরকারি চাকরি পেয়েও নেয়নি তোর মফস্বল ভাল লাগে না বলেই তো?

ওঃ, তখন!—আর এখন! আলমারির লম্বা আয়নায় সরস্বতী তাকাল একটু, আর পিছনে দাঁড়িয়ে মহাশ্বেতা তাকে আয়নার মধ্যে দেখল, লক্ষ করল তার গলায় প্রবালের মালা, মাথার কাপড়ের তলায় ঝিকিমিকি দুল, তার ব্রোকেডের ব্লাউজ, ফ্রেঞ্চ সিল্কের শাড়ি। তারপর নিজেকে আর একবার দেখল, তার সরস্বতী তখন আবার চোখ ফেরাল আয়নার মধ্যে মহাশ্বেতার দিকে। হঠাৎ চোখাচোখি হল দু-বোনে, দ্রুত টোকা পড়ল দরজায়। সরস্বতী দরজা খুলে দিল। ঘরে এল শাশ্বতী, ব্যস্ত-গম্ভীর, ঈষৎ হাঁপ-ধর—বে-শ! দরজা বন্ধ করে দিব্যি গল্প করছ তোমরা। কী করতে হবে? মহাশ্বেতা হাসল।

একটু নড়া-চড়ো! স্বাতীকে সাজানো এখনো আরম্ভই হল না, এদিকে একঘর অচেনা লোকের মধ্যে কী-রকম বেচারা মুখ করে বসে আছে সত্যেন!

তা থাক না। সরস্বতী বলল তুই কী করছিলি?

আমি? আমার কি আর সময় আছে। এই আধ-ঘণ্টার মধ্যে দশবার শুধু উপর-নিচ করলাম। উঃ! স্পষ্ট তৃপ্তি ফুটল শাশীর গলায় বসি। একটু বসে চারদিকে একবার তাকিয়ে বললস্বাতীর ফার্নিচার খুব সুন্দর হয়েছে। হেমাঙ্গদা জিনিস চেনেন।

হ্যাঁ–কাঠ, লোহা, সিমেন্ট, এ-সব খুব চেনেন উনি—বলল মহাশ্বেতা। শাশ্বতী জিগেস করল–তোমার রেঙ্গুনের জিনিসপত্রের কী হবে?

কী আবার হবে! জাপানিরা ভেঙে ভেঙে মশাল জ্বালবে।

কী রকম বল! একটু কষ্ট হয় না তোমার?

নাঃ! কষ্ট কীসের… বর্মা থেকে বেরোতে পেরেছে, আর কী চাই? আসবাব, বাসন, রেডিও, গ্রামোফোন, গাড়ি-সব হবে আবার, কিন্তু জীবনের ঐ বছরগুলি কি আর ফিরে পাবে? নষ্ট জীবনের সবচেয়ে ভাল সময়টা নষ্ট হল বর্মায়, নির্বাসনে, আনন্দ ছাড়া, সঙ্গ ছাড়া, জীবন ছাড়া, শুধু স্বামীর ব্যবসার উন্নতিতে সুখী হয়ে, শুধু সন্তানধারণে আর সন্তানপালনে। চোদ্দ বছর ধরে যে বাড়িটায় তার স্বাস্থ্য আর যৌবন বাজে-খরচ হয়ে গেছে, তার জন্য কষ্ট কীসের! সুন্দর ড্রেসিং টেবিলটা—শাশ্বতী আর একবার তাকাল। সরস্বতী বলল—তোর নিজেরটা বুঝি আর পছন্দ হচ্ছে না এখন?

বাঃ, তা কেন? আলগা শোনাল শাশ্বতীর কথাটা—যাই আমি একবার ওদিকে। কী হচ্ছে দেখি। শাশ্বতীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সরস্বতী বলল–শাশ্বতী খামকা এত ব্যস্ত হচ্ছে। বড়দি থাকতে আর কাজের ভাবনা!

একবার সত্যেনকে দেখে আসি চল—বলে মহাশ্বেতা এগোল। ঘর থেকে বেরোল সরস্বতী মহাশ্বেতা। গলিতে ভিড়, সিঁড়িতে নতুন একদল উঠে আসছে। দু-বোন সরে দাঁড়াল। দলটি চলে যাবার পর সরস্বতী বলল—এরা কারা?

আমি চিনলে তুইও চিনতিস—সিঁড়ি নামতে নামতে মহাশ্বেতা জবাব দিল।

তুই একমাস আগে থেকে আছিস, আর আমি তো মোটে সেদিন এলাম।

পাড়ার বোধহয়। হ্যাঁ—ঐ মোটা গিন্নিকে যেন দেখেছি।

বাবার কাণ্ড! লোকও বলেছেন।

বাবার উপরে বিজু আবার এক কাঠি। স্বাতীর বিয়ে—কেউ যেন বাদ না যায়। সাঁতরাগাছির নেপাল-পিসেমশাইকে বিজুরই তো মনে পড়ল।

বুড়ো মরেনি এখনো! সরস্বতী হাসল। সিঁড়ির শেষ ধাপে ছ-কোণ কাচের চশমা-পরা একটি মেয়ে তাদের দেখে থামল। আপনারা স্বাতীর দিদি? একটু হেসে এই পরিচয় মেনে নিল দু-বোন।

—আপনি বুঝি মহাশ্বেতা? একটুখানি ভুরু বাঁকিয়ে সরস্বতী জবাব দিল—মহাশ্বেতা এঁর নাম। আমি উর্মিলা, প্রবীর মজুমদার আমার মামা। আমরা এই এলাম। সরস্বতী নিপুণ একটি হাসি ফোঁটাল–আচ্ছা, উপরে গিয়ে বোসো তুমি। স্বাতীর, বন্ধুরা আছে।

খুব স্মার্ট তো মেয়েটি–বলল মহাশ্বেতা।

খুব। সরস্বতী সামনের ঘরের দিকে এগোল, দুজন লোক তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল এক ঝুড়ি গেলাশ ধরাধরি করে–বিজুর খুব দেখি এক বন্ধু জুটেছে এই মজুমদার।

আর ঠোঁট দুটোকে কীরকম রক্তের মতো করেছে?

কলকাতায় তো এখনো কম; দিল্লিতে প্রায় সব মেয়েই রঙ মাখে আজকাল।

ছটি-সাতটি বাচ্চা মেয়ে খিলখিল হাসতে-হাসতে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল।

তোর ভাল লাগে?

আ–র! গীতিটাই ওসব ধরেছে এর মধ্যে!

—হংক! সামনের ঘরের দরজার কাছে আসতেই জোরালো গলা শোনা গেল। সরস্বতী বলল—নাঃ, হারীত নন্দীকে নিয়ে আর পারা গেল না। বোমা বিনে গীত নেই ওর। দরজার ধারে দু-বোন দাঁড়াল। হারীত বলল—হংকং ইভ্যাকুট করে ইংরেজরা এখন—

ইভ্যাকুট! পালিয়েছে বলুন। যমের উরে পালিয়েছে—কথাটা বললেন মজবুত চেহারার এক ভদ্রলোক, ঘি-রঙের ফ্ল্যানেলের চুড়িদার-পাঞ্জাবি পরা, টেড়িকাটা চুল মাথায় যেন আঠা দিয়ে ল্যাপটানো। শুনে অনেকে হেসে উঠল। সরস্বতী এগিয়ে এসে বলল-নন্দীর এতক্ষণে সময় হল আসার? তার গলা শুনে অনেকেই তাকাল।

******

সত্যেনও তাকাল। তামাশা মন্দ না—ঘরে পা দিয়েই সে ভেবেছে–দরজায় জুতোর স্তুপ, সাদা ফরাশের উপর হলদে কার্পেট, আর সেটার শেষে ছোটো আর একটা লাল, সেখানে ঘোর লাল মখমলের তাকিয়া, আর লাল, প্রায় কালচে গোলাপের দুটো হোড়া। বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু না—অরুণবাবুরা ঐ লালের রাজ্যেই তাকে নিয়ে এলেন, ডবল-গালিচায় ছেড়ে দিয়ে উধাও হলেন। বসতেই গন্ধে যেন দম আটকাল হঠাৎ—থোবা-থোবা গোলাপ, লম্বা রজনীগন্ধা কত! তা যাই হোক, গলার মালাটা এবার খুলতে পেরে হাঁপ ছাড়ল। তাকিয়ে দেখল, নিখিলঅখিল জড়োসড, কিরণও চুপআর সব অচেনা—একবার শুধু একপলক ছোড়দিকে দেখল-আরো আসছে লেমনেড, চা, প্লেট ভরা-ভরা পান আর সিগারেট-কালো কালো মাথার উপর প্যাঁচালো ধোঁয়া, কথা, হাসি, বাইরে হাঁকডাক চলাফেরা-ঘরের তিনটে দরজায় বাচ্চা-বাচ্চা মেয়েদের উঁকিঝুঁকি— যাক, হারীতবাবু এলেন। যুদ্ধের কথা বলছেন ওঁরা, একটু শুনল–তাই তো, কিছু একটা গোলমাল হলে ভারি অসুবিধে হবে লোকদের–একটা দেয়াল ঘেষে বসতে পারলে পিঠটায় আরাম হত—এই যে।

সত্যেন প্রথম দেখল মহাশ্বেতাকে। অদ্ভুত রোগা, অদ্ভুত ফর্সা, সাদা, প্রায় হলদে-গালের উপর ছোটো একটি নীল শিরা স্পষ্ট-গায়ের রঙে শাড়ির রঙে মিশে আছে, আর কালো ব্লাউজের উপর দিয়ে ঝলমলিয়ে নেমেছে রুপোর পাতের মতো আঁচল। তারপর সরস্বতীকে–সোজা দাঁড়িয়েছে, চোখে হাসি, ঠোঁটে হাসি, কাঁধের উপর মাথাটি চমৎকার বসানো, শাড়িটা নীল— ময়ূয়ের গায়ে যে নীল থাকে, সেইরকম–আর কচুরিপানার ফুলের রঙের জামা। তারপর একসঙ্গে দুজনকে দেখল। সরস্বতী বলল—সব ঠিক আছে কিছু চাই? কথাটা তাকেই বলা, সেটা বুঝতে পেরে সত্যেন বলল—এই তোড়া দুটো কি সরানো যায়?

কেন, ফুল ভালবাসো না? বলল মহাশ্বেতা।

ফুল খুব ভাল, কিন্তু দু-পাশে দুটো তোড়া নিয়ে বসে থাকা–

–থাক না, বেশ তো দেখাচ্ছে। পিছন থেকে ভাঙা-ভাঙা ভারি গলায় একজন বলল—আচ্ছা সরিয়ে দিই। সত্যেন ফিরে তাকাল। বিজনবাবু! কী, সর্দি বুঝি?

হ্যাঁ! বিজন হাসল, দুবার কাশল, নিচু হয়ে ফুলদানিতে হাত দিল। বিজু মহাশ্বেতা বলে উঠল—থাক!

তাহলে আমি কি একটু সরে বসতে পারি?—মহাশ্বেতাকে আবেদন জানাল সত্যেন।

আহা-বসুন না, বললেন ঘি-রঙের ফ্ল্যানেলের পাঞ্জাবি-পরা মজবুত চেহারার ভদ্রলোক। আপনি ভাগ্যবান–আপনাকে দেখি আমরা।

এই যে–আরাম করে বসুন। বিজন তাকিয়াটা সত্যেনের গায়ে ঠেকিয়ে দিল।না, না, তাকিয়া না! ত্ৰস্তে সরে এল সত্যেন। মহাশ্বেতা নিচু গলায় বলল—বিজুর চেহারা বড়ো খারাপ হয়েছে। যা খাটুনি!

আর কান্না। ঐ এক দোষ ওর, বড্ডো কাঁদে।

আবার উপোস না করেও ছাড়ল না!

সত্যি, বিজুটা—সরস্বতী হাসতে গেল, কিন্তু হাসির বদলে খুব ছোটো একটা নিশ্বাস পড়ল তার, সেইসঙ্গে মহাশ্বেতারও।

মেজদি, সেজদি–ইনি প্রবীর মজুমদার। ঘি-রঙের ফ্ল্যানেলের পাঞ্জাবি-পরা ভদ্রলোক হলদে কার্পেটের উপর উঠে দাঁড়ালেন। ইনি সত্যেনবাবুর বন্ধু, কিরণকে দেখিয়ে বিজন বলল— এই আমাদের অখিল আর নিখিলবাবু—আর এঁরা সব—

আমরা চেনা লোক! পিছন থেকে একজন বলে উঠল; আর অন্যেরা বেশির ভাগই দূর সম্পর্কের বিবিধ আত্মীয়—মৃদু মর্মরে সমর্থন জানাল। সত্যেন বলল–আপনার গাড়িতেই এলাম?

আমার সৌভাগ্য—মোটা-মোটা পায়ে আসনপিঁড়ি হয়ে মজুমদার আবার বসল।

অত বড়ো গাড়ি দিয়ে কী করেন?

—কিচ্ছু না। ছোটো গাড়িতেই ঘুরি। কিরণ বলল—ক-টা গাড়ি আপনার? মজুমদার জবাব দিল না, বড়ো বড়ো দাঁত দেখিয়ে হাসল। মজুমদারের হাঁটু ছুঁয়ে হারীত বলল–এখনো হাসছেন আপনারা, কিন্তু জাপানিদের মতলবটা জানেন? গায়ে গরম কোট, জাঁদরেল সাদা গোঁফ শক্তপোক্ত বুড়োমতো একজন বললেন—হংকং কি সত্যি গেল?

এইমাত্র শুনে এলাম রেডিও সায়গঁ, এদিকে ট্যাভয় ধরো ধরো! আর রক্ষে নেই। এই সাংঘাতিক খবরটা বেশ খুশি গলায় ঘোষণা করে হারীত সকলের দিকে তাকাল, কারো কারো মুখে ভয়ের ভাব দেখতে পেয়ে আরো সুখী হল।

কলকাতায় বোমা-টোমা পড়বে নাকি, সত্যি? দূর থেকে শ্লেষ্মভরা গলায় জিজ্ঞেস করল একজন। তার আগে কি আর বাঙালি বাবুদের টনক নড়বে? কিন্তু কথাটা হচ্ছে—ইনি আর কী বলেন তা শোনার জন্য নিখিল কান খাড়া করল, কিন্তু সরস্বতী তখনই বলল-এখন এসব কথা থাক না। আরো তো সময় আছে। হারীত চট করে মুখ ফেরাল সরস্বতীর দিকে, ঘোঁক করে হাসল।

মা–ছোট্টো আওয়াজ হল মহাশ্বেতার পিছনে। ইরুকে দেখে মহাশ্বেতা আবারও যেন অবাক হল। কে বলবে বারো বছরের মেয়ে—আর ঐ টুকটুকে লাল ক্রেপ-বেনারসি পরে কত বড়োই আজ দেখাচ্ছে। ঐ তো গীতি-ওর দুমাসের মোটে ছোটো, দেখায় দু-বছরের; আর চোদ্দ বছরের আতাকে ওর সমান-সমানই লাগে। তিনজনকে আর একবার দেখল মহাশ্বেতা, হঠাৎ সরু করে বলল—ঠোঁটে রঙ মেখেছিস নাকি রে তোরা? সরস্বতী ফিরে তাকাল।

আমাদের ঘণ্টা বাজল এবার—হারীত নিচু গলায় মজুমদারকে জানাল।–প্রিন্স অব ওয়েলস রিপালস যেদিন ড়ুবল, সেদিনই বোঝা গেছে। সরস্বতী, মহাশ্বেতার দিক থেকে চোখ সরিয়ে এনে মজুমদার জোরে একবার মাথা নাড়ল হঠাৎ। আর নিখিল লাল-সবুজ-কমলা রঙের মেয়ে তিনটিকে আর একবার দেখতে গিয়ে হারীতের কথাটা একদম শুনতে পেল না।

ইরু তাকাল আতার দিকে, আতা গীতির দিকে, তিনজনে ফুটফুটে ঠোঁটে হাসল। ইরু তার হাতের খাতাটা দেখিয়ে বলল—মা, এখন বলি?

বলো।

তুমি বলো, মা। মহাশ্বেতা বলল—এরা কী বলতে এসেছে তোমাকে, সত্যেন।

এক সপ্তাহে থাইল্যান্ড, মালয়, ফিলিপাইন… এবার নিখিল মনস্থির করে হারীতের আরো কাছে সরে বসল। সত্যেন দেখল তিনটি মেয়ে তার দিকে আসছে, মাথায় প্রায় সমান-সমান, বাচ্চাও

না, বড়োও না, হালকা, তিনটি রঙিন পালক ঝরেছে হাওয়ায়, টুকটুকে লাল, কমলা-লাল, সবুজ। ইরু বলল-এই খাতাটায় আপনি একটু লিখে দিন।

এখনই? বেগুনি মলাটের অটোগ্রাফ খাতাটার কয়েকটা হলদে-সাদা-গোলাপি পাতা উল্টিয়ে সত্যেন বলল—কিছু তো লেখা নেই দেখছি। গীতি বলল—একটা আছে। হাসির বুড়বুড়ি উঠল অন্য দু-জনের। সামনের দিকে—সতুদার কাঁধের উপর দিয়ে গলা বাড়িয়ে অখিল দেখল খুলে ধরা সাদা পাতাটায় লেখা আছে—স্বাতী মিত্র আর তলায় একটু ছোট করে লেখা—স্বাতী রায়। সত্যেনের চোখ লেখাটার উপর পড়তেই তিনজনের হাসি ছলকাল একসঙ্গে। উঃ, কী মজাই হয়েছিল ছোটোমাসিকে দিয়ে এটা লেখাবার সময়। লেখাটার লেখা দুটোর দিকে সত্যেন একটু তাকিয়ে থাকল। আপনি এ-পাতাতেই লিখুন—বলে ইরু তার হাতে দিল পিছনকালো সরু ছাঁদের কলম।-না—এ পাতাতেই। সত্যেন নিজের নাম লিখে দিল।

তারিখ দিন। হাতে কলম নিয়ে সত্যেন একবার ছবিটি দেখল, তিনটি দাঁড়ানো মেয়ের রঙিন ছবি। হারীত একটু কথা থামিয়ে সদয় আমোদের চোখে ব্যাপারটা দেখছিল, তাড়াতাড়ি প্রম্পট করল পনেরোই ডিসেম্বর—

না, না, বাংলাটা লেখো-কিরণ ব্যস্ত হল। ঊনতিরিশে অঘ্রান।

বলতে হবে না-মজুমদার হাত তুলল—দুটোই ওঁর মুখস্ত।

হৃদয়স্থ বলুন! কিরণ একলাই হাঃ করে হাসল। খাতা হাতে নিয়ে ইরু বলল, চল। তিন জোড়া চোখে হাসি ঝলসাল, কী মজা—সক্কলকে দেখাবে এখন! ছুটে যেতে-যেতে বাপের সঙ্গে কলিশন হল ইর—না, আগে ছোটোমাসিকে।

টোকিও বলছে ক্রিসমাসের মধ্যে… হারীত আবার গলা নামাল। মজুমদার দেখল দরজার ধারে একটি টাক-পড়া মাথা, দু-বোনের মধ্যে যার কালো ভেলভেটের ব্লাউজ, তাকে কী বললেন ভদ্রলোক। ইনিই স্বামী?—তা-ই হবে, নয়তো কথা বলতে একটুও কি মুখের ভাব বদলাতো না? কালো-রাউজ-পরা বোন লাল-মালা-গলায় বোনকে কিছু বলল-দু-জনে ফিরল, চলে গেল।

হারীত স্বাধীন হল। সত্যেনের দিকে তাকিয়ে বলল-খুব সময়মত বিয়েটা হচ্ছে। একেবারে তোপের মুখে! মনে মনে চটপট একটু হিসেব করে কিরণ বলল-অঘ্রানের মাঝামাঝি হলেও এসব গোলমাল কিছু—

দেরিটা আমার জন্যই হল হেমাঙ্গ এগিয়ে এল হলদে কার্পেটে। হাঁ—আপনি প্রায় ভাবিয়ে তুলেছিলেন এদের। হারীত এমনভাবে কথাটা বলল যেন এদের ভাবনাটা নেহাত অর্থহীন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বিজনকে দেখতে না পেয়ে মজুমদার নিজেই আলাপ জুড়ল—আপনিই বর্মা থেকে?

বর্মার খবর কিছু বলুন? কিরণ হাঁটু নাচাল আর শোনার জন্য নিখিল তাকাল হেমাঙ্গর দিকে। আপনার খবর কী? জিগেস করল মজুমদার—ওখানকার কারবার আপনার? হেমাঙ্গ পাতলা হাসল—আপনি মিস্টর মজুমদার? পরে একদিন কথা বলব আপনার সঙ্গে। মজুমদার যেন বাধিত হয়ে মাথা নোওয়াল, মুখ তুলে চওড়া করে হাসল। চোখে-চোখে জ্ঞাতিত্ব স্থাপিত হল দু-জনের মধ্যে, প্রতিযোগিতাও। হেমাঙ্গ বুঝল যে দেখতে বোকা-সোকা হলেও লোকটা কাজে ওস্তাদ, আর মজুমদার বুঝল এই মিহি গলার মেজজামাইটি ফর হয়ে আসেনি, হাতে আছে বেশ, আর কাজেও লেগে যাবে এখানেই… এখনই।

বর্মার খবর? হারীত এ সুযোগে কথার সুতো তুলে নিল আর নিখিল চোখ সরাল হেমাঙ্গ থেকে হারীতের মুখে।

বর্মার যা খবর, তা আমাদেরও খবর হবে দুদিন পরে, যদি না আমরা—

কিন্তু রেঙ্গুনে কি বোমা পড়েছে? শ্লেষ্মভরা গলায় আবার প্রশ্ন হল। হারীত তাচ্ছিল্যে ঠোঁট বাঁকাল। এই বোমা নিয়েই যত ভাবনা এদের যেন কোনোরকমে বোমা থেকে বাঁচলে নিশ্চিন্ত। কী অশিক্ষিত সব! মুখচোখ উদাস করে বলল—পড়লেই হল, কলকাতায় পড়তেই বা বাধা কী? হঠাৎ যেন শীতে কেঁপে উঠে কিরণ হাতে হাত ঘষে হি-হি করে হাসল।—তাই তো! পড়লেই হল! যদি আজই—যদি ধরে আজ রাত্রেই—বলতে বলতে সত্যেনের দিকে ফিরল। আবছা হাসল সত্যেন। বোমা পড়বে? জাপানিরা এসে বোমা ফেলবে ককাতায়? তা না, জাপানিরা কি আর সত্যি অত মন্দ? আর ফ্যালেও যদি, যদি আজই ফ্যালে–তাহলেই বা কী? কিচ্ছু হবে না বোমাতে, কেউ মরবে না, একটি বাড়িও ভাঙবে না—আর যদি ভাঙেও, কি আগুন-টাগুন লেগে যায়, তাতে তার–তাদের কিছু হবে না আর তারা যে কজনকে ভালবাসে তাদেরও কিছু হবে না, সব ঠিক থাকবে। কিরণের হি-হি হাসি শুনে হারীত তার দিকে একটা আগুন-চোখ ছাড়ল, তারপর মজুমদারের দিকে ফিরে একটি পরিপাটি বক্তৃতা আরম্ভ করল–ব্যাপারটা হচ্ছে এই, ধরে নিন জাপান এদেশে আসবেই, ধরে নিন ইংরেজ আপাতত আরো হটে যাবে, এখন আমরা যদি–

চলুন আপনারা? অরুণ দাঁড়াল দরজার ধারে। চলুন, চলুন। তার গলা বেশি চড়ে না। বারবার বলে কথাটা ছড়িয়ে দিল। না-হারীতের একটা কাধ জোরে নড়ে উঠল—বিয়ে বাড়িতে কথা বলা! চশমা চোখে খুশি-মুখের মানুষটিকে দেখে মজুমদার বুঝল ইনি আর এক জামাইসেই লাল-মালা-গলার?–তা-ই হবে, বড়োজন তো বিধবা? বিজনের কাছে শুনে-শুনে সকলেই তার চেনা হয়ে গেছে, কিন্তু সত্যি তো কাউকেই সে চেনে না, মিসেস নন্দীকে ছাড়া আর অবশ্য তাঁর স্ক্র-আলগা-মাথার স্বামীটিকে। হঠাৎ তার মনে হল, না এলেই পারতাম।

ঘরের মধ্যে মৃদু নড়াচড়া আরম্ভ হল।–চলুন, চলুন সবাই। নিখিল, অখিল, এসো। কিরণবাবু—

আপনি কিন্তু বিয়ে পর্যন্ত থাকবেন।

লগ্ন কখন?

দশটার পরে থাকবেন, চলে যাবেন না। হারীতবাবু, আপনিও তো অভ্যাগতর দলেই—দয়া করে উঠুন। হারীত ভদ্রতা করে হাসির মতো ভাঁজ ফেললো মুখে, একটু দাঁত দেখাল। যাক, খেতে-খেতে শেষ করবে কথাটা, মজুমদার আবার ফশকে না যায়। হাতে রাখার জন্য খুব মসৃণ করে বলল—মিস্টর মজুমদার, চলুন তাহলে।

ও, আপনিই!বিজনের বড়ো-গাড়িওয়ালা বন্ধুর দিকে এগিয়ে এল অরুণ—কত সাহায্য করলেন আপনি আমাদের। এখন একটু কষ্ট করে… অরুণ সরে গেল অন্যদের দিকে, আপনারা চলুন—

হ্যাঁ, তেতলায়— সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে–হ্যাঁ, হ্যাঁ, জুতো পরেই যান।

বেশ বাড়িটি পেয়েছিস—আবার দোতলায় উঠতে উঠতে সরস্বতী বলল। ভাল? মহাশ্বেতা অস্পষ্ট স্বরে বলল। বাড়িটাকে আলাদা করে ভাল বলে সে বোঝেনি এখনো; এটা কলকাতা, সে কলকাতায় আছে, থাকবে, আর তাকে কালাপানি পেরোতে হবে না, এইটা বুঝতে-বুঝতেই দিন কেটে যাচ্ছে। ভাগ্যিস যুদ্ধটা বাধিয়েছিল জাপানিরা! তুই বছর পর এলি রে?—সিঁড়িতে মোড় দিয়ে সে জিগেস করল।

–বছর তিন হবে। তুই?

আমি পাঁচ বছর, মহাশ্বেতা সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল–বাবা যেবার বাড়ি করলেন, এসেছিলাম; তারপর এই।

হ্যাঁ, শাশ্বতীর বিয়েতে তোর আসা হয়নি-সরস্বতীর মনে পড়ল।তোর সঙ্গে আমার দেখা হল সাত বছর পরে… সেই যতীন দাস রোডের বাড়িতে—দোতলায় পৌঁছে মহাশ্বেতা একটু দাঁড়াল, দম নিল—আর দিদিকে দেখলাম দশ বছর পর! দশ বছর!

সরস্বতী হাসতে গেল কিন্তু হাসির বদলে নিশ্বাস পড়ল তার। সত্যি বড়দি—কথা শেষ করল না, মহাশ্বেতাও ভাবল—সত্যি! দু-জনে দু-জনের চোখ এড়াল। দরজার পরদা কাপিয়ে মাঝের বড়ো ঘরটি থেকে হাসতে-হাসতে ছুটে বেরোল তিনটি ছিপছিপে মেয়েএকজন টুকটুকে লাল, একজন সবুজ, আর-একজন কমলারঙের। মা, দ্যাখোকালো চোখে আলো ঝলকিয়ে খাতাটা খুলে ধরল ইরু। হাতের লেখা কার বেশি ভাল, মা? গীতি জিগেস করল। ইরু বলল–আলবৎ ছোটোমাসির!

কক্‌খনো না, সত্যেনদার–বলল আতা। মা-মাসির রায় শুনতে দাঁড়াল না তারা, রঙের ঢেউ তুলে চলে গেল। কেমন মজার টান দিয়ে কথা বলে ইরু—সরস্বতী ভাবল, বর্মায় হয় নাকি ওরকম? আর মহাশ্বেতা ভাবল–গীতি ওরকম নেচে নেচে হাটে কেন মেমসাহেবের মতো?—দু-বোন বড়ো ঘরটির দরজার ধারে দাঁড়াল।

কী গো, মহাশ্বেতা-সরস্বতী, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? এসো, সব ঠিক হচ্ছে কিনা দ্যাখো এসে–কথাটা বললেন দূর থেকে তাদের দেখতে পেয়ে এক দিদিমা, তাদের ভূপেশাদুর দ্বিতীয় পক্ষ। গোলগাল আহ্লাদি চেহারার মানুষ, মুখে এক ঢিপি পান, মাত্রই বছর দশ-বারোর বড়ো তাদের। সিরস্বতী চুপি-চুপি বলল–বুড়ো স্বামী নিয়ে আছেন কেশ কুন্দদিদিমা। এগিয়ে এল ঘরের মধ্যে। মহাশ্বেতা কথাটা শুনল না, দেখতেই ব্যস্ত ছিল সে। কিছু আসবাব নেই ঘরটিতে, থাকলে এখন বেশি হতো। মানুষেই ভরা। সব মেয়ে, নানা বয়সের কুমারী আর সধবা। ছড়িয়ে-ছড়িয়ে গল্প করছে দু তিনজন করে, বসবার জায়গা নেই বলে নড়াচড়ার একটা স্রোত চলছে চারদিকে, আর মাঝখানটায় ছোটো একটি দল গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। কারো দিকে চোখ ফেলে, কারো দিকে হাসি ছুঁড়ে সেই গোল দলটিতে ভিড়ল মহাশ্বেতা-সরস্বতী।

এবার ভাল করে চারদিকে তাকাল মহাশ্বেতা। আত্মীয় সব–বাপের বাড়ির, মামাবাড়ির দিকের, যারা তাকে ছোটো দেখেছে, যাদের সে ছোটো দেখেছে। তার সমস্ত ছেলেবেলাটা সশরীরে এই ঘরে হাজির, স্মৃতি বেরিয়ে এসেছে মন থেকে চোখের সামনে। জীবনে এদের আর দেখবে ভাবেনি, অনেককেই ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু দেখেই বুঝেছে কাউকেই ভোলেনি, কেউ কাউকে ভোলে না। সকলেই সকলের সঙ্গে কোনো এক সময়ে আবার দেখা হবার আশায় বসে থাকে। সকলের মুখের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনতে আনতে মহাশ্বেতার শোভার চোখে চোখ পড়ল। শোভা—আগে থেকেই মহাশ্বেতাকে দেখছিল সে—একটু হেসে চোখ সরাল, আর মহাশ্বেতা মন দিয়ে দেখল এই সমবয়সী জ্যাঠতুতো বোনটিকে, চেষ্টা করল তার আগের মুখটা মনে আনতে। নাঃ, বুড়ো হয়ে গেছে শশাভাটা কষ্টে থাকে, অবস্থা ভাল না। মনের মধ্যে একটা আহা উঠেই মিলিয়ে গেল, নিশ্বাস পড়ল অন্যরকম। আমি আমাকেও কি ঐ রকম দেখায়? পাশের মেয়েটি শোভার কানে-কানে বলল—মহাশ্বেতার কঠিটা দেখেছ? দেখেছ মানে? না দেখে উপায় আছে নাকি? কার হাড় এমনি তো ঢাকে না, তাই বড়ো-বড়ো মুক্তো দিয়েই। কিন্তু ঈর্ষা ফণা তুলেই ফিরে গেল, জিতল সুখ। সুখ শোভার মনে… এ-বাড়িতে যখন পা দিয়েছে কাল সকালে, তখন থেকেই সুখ… আর তারপর বেড়েই চলেছে কেবল। আজ রাত্রিটাও সে এখানে, আর আজকের রাত আরম্ভও হয়নি এখনো। দুটো দিন, আস্ত দুটো দিন রাজেনকাকা বাঁচালেন, নেই-নেই আর আর-পারিনা-র সংসার থেকে। সে না-বেঁধেই খাচ্ছে, কিছু না-করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, হাসছে, সাজছে, গল্প করছে ইচ্ছেমতো আর গল্প করার লোকও কত–সকলেই! এত আত্মীয় তার আছে এই কলকাতাতেই—তা যেন আর ভাবতেও পারে না আজকাল। দেখাও হয় না কারো সঙ্গে, মনেও পড়ে না সাত জন্মে, কিন্তু এই তো–কেমন আপন-আপন লাগছে এখানে আবার সকলকে সকলেরই। একটা ছোঁয়াচে ভাললাগা সকলের থেকে সকলের মনে ছড়াচ্ছে-সত্যি, একটা বিয়ের মতো আনন্দের আর কিছু না। আর এর পরেই সবাই যে যার বাড়ি চলে যাবে, যে যার সংসারে ঢুকবে, আবার সবাই তেমনি দুর, তেমনি পর; আবার ভোর থেকে রাত পর্যন্ত না এখন না, এখনো না। শোভা চোখ নামাল। চোখে পড়ল সাদা সুন্দর মেঝেতে সুন্দর সাদা চিকনপাটির উপর সাদা দুটি পা, শাশ্বতীর হাতের তুলিতে লাল হচ্ছে ধারে ধারে, আর বাঁকানো পিঠে ছড়ানো একটাল কালো। পিছনে হাঁটু ভেঙে বসে চিরুনি টানছেন ঊষা-বৌদি। কেমন ছবির মতো বসে আছে স্বাতী, উঁচু করা হাঁটুতে থুতনি রেখে, হাঁটুর নিচেটা দুহাতে জড়িয়ে, চোখ নিচু করে চুপ। তা ওর আর নিচু চোখের দরকার কী, নিজেই নিজেরটা ঠিক করল, আমাদের মতো বোজা-চোখের বিয়ে তো না। চোখেও দেখিনি আগে, কিছুই জানিনি, রাতারাতি সর্বেশ্বর হয়ে বসল একেবারে অচেনা একজন—এই গতানুগতিক চিরাচরিতে শোভা হঠাৎ অবাক হল—তা ওতেও তো বেশ কেটে যায় জীবন আর এতেই কি ভাল হয় সব সময়?

সরস্বতী, কী রকম চুলবাঁধা হবে বলল-টলো!

—আমি তোমাকে বলব ঊষাবৌদি! তুমি হলে চুলাধার ওস্তাদ।

দিল্লির ফ্যাশন বলো দেখি দু-একটা উযাবৌদি খুশি হয়ে ফিতে হাতে নিলেন। না হয় মহাশ্বেতাই বলো। বর্মায় তো খুব খোঁপার বাহার।

বর্মায় না, জাপানে–স্বাতীর পা থেকে চোখ না তুলে শাশ্বতী বলল। কী সব শুনছি রে? বললেন পান মুখে টোপলা গালে কুন্দদিদিমা—আমাদের নাকি জাপানি রাজা হবে এর পরে? জিনিসপত্র সস্তা হবে তো তা হলে?

আর চুলবাঁধা! ঊষাবৌদি ঘাড়ের কাছের চুলটা গোল করে চেপে ধরলেন—এ সব পার্টই থাকবে

কদিন পরে দেশে—আঁটো করে বেঁধে ফেললেন ফিতেটা। কেন? থাকবে না কেন? একটি অল্পবয়সী মেয়ে হাসির সুরে জিগেস করল। সব বব ছাঁট হবে! ঊযাবৌদি তার চোখ দুটিকে ভাসিয়ে দিলেন উপরদিকে, যেন ভবিষ্যৎ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেখানে। মহাশ্বেতার চোখে চোখ পড়ল।

তা মন্দ কী—বড়িখোঁপার চেয়ে ববছাঁটই ভাল! কথাটা বলে নিজের কথা ভেবে নিজেই খুব হাসতে লাগলেন মহাশ্বেতার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের লীলামাসি। যারা শুনল, তারাও যে-যার চুলের দশা ভাবল একটু। ফিতে-বাঁধা মোটা গোছাটায় ঊষাবৌদি আস্তে দুটো চাপড় দিলেন। সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে বললেন—কী চুল ভাই তোমাদের বোনেদের-হিংসে হয় সত্যি! স্বাতী দু একটা কথা-টতা বল!–হাসি-হাসি চোখে তাক করে কুন্দদিদিমা বললেন—কাণ্ডটি তো ভালই ঘটালি—আর লজ্জা কী!

স্বাতী এখন কথার বাজে খরচ করবে না—কোমর থেকে জড়িয়ে-জড়িয়ে চুলগুলি উপরে তুলতে লাগলেন ঊষাবৌদি। সব জমিয়ে রাখছে।

তা বাপু, কিছু তো খরচ হয়ে গেছে আগেই দিদিমা টেনে টেনে বললেন—তা-ই থেকেই দু-একটা নমুনা শুনি আমরা। কী এমন কথা বলিস রে তুই, যা দিয়ে এত বড়ো বিদ্বানকে জয় করলি! হা রে, পৃথিবীর সব বই নাকি পড়ে ফেলেছে?

পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল বইটি পড়তে আরম্ভ করবে এতদিনে— দুহাতে পাকিয়ে-পাকিয়ে ঊষাবৌদি খোঁপা গড়তে লাগলেন। শোভা কথা শুনে হাসল। স্বাতীর মুখ দেখার জন্য তাকাল। কিন্তু মুখের বদলে দেখল একদিকের গালের খানিকটা। একটি চোখের কালো পলক নড়ল। হাতের জড়ানো আঙুলগুলি ছাড়িয়ে নিয়ে স্বাতী যেন চমকে তাকাল। যতবার আওয়াজ হয়েছে ততবার চমকেছে আর যতবার তাকিয়েছে ততবার অবাক হয়েছে। স্বাতী এবারেও অবাক হল তার হাতের দিকে তাকিয়ে-চুড়ি, কঙ্কণ কত!—আর ঐ ঝকঝকে চঞ্চল চুড়িগুলির পাশে হলদে সুতো জড়ানো শাখাটা কী সুন্দর, কী শান্ত সাদা..শাখা পরানো শক্ত নাকি, টিপে টিপে অনেকক্ষণ ধরে পরাতে হয়, পাছে ভেঙে যায়; কিন্তু ছোট্ট শাখাটা যেন নিজে-নিজেই চলে এল তার হাতে, আঙুলের গাঁটে মোটে ঠেকল না। সুলক্ষণ, সবাই বলল। স্বাতী আস্তে বলল— ছোড়দি হল তোমার?

এই হল। শাশ্বতী হাত সরাল, মাথাটি একটু দূরে সরিয়ে দেখল একবার। তারপর হাতে টিপে সরু করে নিল তুলিটা—পা-টা উঁচু কর তো একটু। মেঝেতে গোড়ালি রেখে পায়ের আঙুল উঁচু করল স্বাতী। তুলিটা শুড়শুড়ি দিল আঙুলের ফাঁকে। স্বাতী নড়ে উঠল, তুলি সরে গেল। নড়িস না–হ্যাঁ, এই ঠিক। ঠিক এইভাবে থাক। শাশ্বতী খুব মন দিয়ে আঙুলের গলিতে তুলি বুলোতে লাগল আর স্বাতী তাকিয়ে থাকল তার পায়ের পাতার হলদেমতো রঙের দিকে।

সন্ধেবেলা কাচা হলুদে স্নান, তারপর এই মোটা, কোরা লালপাড়-শাড়িটা পরতে হল—শাড়িটা ওরা পাঠিয়েছে—ওরা—সে-শাড়িটা সে পাঠিয়েছে আমার জন্য। পায়ের পাতার একটু উপরে টকটকে লাল পাড়টার দিকে স্বাতী একবার তাকাল। কাকে নাকি দিয়ে দেবে এটা। এটাই? অন্য শাড়ি দিলে হয় না?

কই গো রাজকন্যারা, কোথায় সব? শাশ্বতী মুখ তুলল, স্বাতীও। দু-বোনে চোখাচোখি হল, দুই জনেই বুঝল একই কথা মনে হয়েছে দু জনের। কথাটা, বলার ধরনটা, এমনকি গলার আওয়াজটাও অনেকটা বাবার মতো সেই আগেকার দিনে যেমন করে বলতেন বাবা বারেবারেই ভুল হয়। বাবার কথা মনে হতেই স্বাতীর বুকের মধ্যে আঁটো কষ্ট মোচড় দিল আবার, আর মহাশ্বেতা-সরস্বতীর মনে পড়ল ছেলেবেলায় এই বোপিসি যখন এসেছেন, তার কাছে শোয়া নিয়ে কত ঝগড়া করেছে তিন বোনে।

এখন আর রাজকন্যা না–কুন্দদিদিমা হাসলেন—সব রাজরানি। শাশ্বতী নিচু গলায় বলল–পা নামা এবার। স্বাতী পা পাতল—প্রত্যেকটি নখে একটি লালের ফোঁটা দিয়ে শাশ্বতী উঠে দাঁড়াল। বেশ হয়েছে। লীলামাসি তারিফ করলেন। সাদা চুলে সিঁদুর নিয়ে বড়পিসি এদিকে তাকালেন, ওদিকে তাকালেন। ভাঙা গালে মিষ্টি হেসে বললেন—পঞ্চকন্যা, একসঙ্গে আবার। রাজুর অনেক দিনের একটা সাধ মিটল।

আমাদেরও–আলগোছে বলে নিয়ে ঊষাবৌদি মস্ত ঘন কালো খোঁপটায় কাঁটা বসাতে লাগলেন।

তা সত্যি। আমাদের মেয়ে কটিও তেমনি তো। রূপে-গুণে এমন আর দেখলাম না। বলতে বলতে নিঃসন্তান বড়োপিসির বেড়ানো গালের ফোকরে-ফোকরে হাসি ঝরল। পিসিমার আর কাণ্ডজ্ঞান হল না, মহাশ্বেতা ভাবল, একঘর মেয়ের সামনে এ রকম বলতে হয়! কথাটা চাপা দেবার জন্য একটা জানা কথাই জিগেস করল—পিসিমা, শাশ্বতীর বিয়েতে এসেছিলে? ও মা! গালে হাত দিয়ে বড়োপিসি অবাক হল—আমার অসুখ না তখন? তোমাদের পিসে তো ভেবেছিল আমি মরেই যাব…হঁ, আমার মরা যেন সোজা–কলেরা-টাইফোট কতই দেখলাম, আমার কাছে সব ফেলটুশ! ঘরে একটা হাসির হাওয়া বইল। স্বাতী ভাবল, বড়দির কথাও অনেকটা এরকম—আর সুখের কুয়াশা আরো ঘন হয়ে ঘিরল শোভাকে, মুখগুলি ঝাপসা দেখল সে, যেন নাক-চোখ কারোরই স্পষ্ট না, শুধু একটা হাসিতে—একই হাসিতে প্রত্যেকটা মুখ সেজে আছে। সকলেই স্বাতীদের আত্মীয়, সে ভাবলো, কিন্তু সকলেই সকলের আত্মীয় না। অনেকে অনেককে চেনেও না ভাল করে, অনেকে অনেককে জীবনেও আর দেখবে না। তবু এখন… এখনকার মত, কেউ কারো দূর নয়, পর নয়, সকলকেই একবাড়ির লোক করে দিয়েছে বিয়েবাড়ি, আর এই সকলের মধ্যে সেও আছে।

স্বাতীর পরবার সোনালি-লাল বেনারসির ভাঁজ খুলতে খুলতে সরস্বতী বলল—যাক, স্বাতীর পয়াতে সকলের সঙ্গে সকলের দেখা হল। কতকাল এরকম হয়নি। কতকাল কেন, মহাশ্বেতা ভাবল, কোনদিন না… কোনদিন হয়নি। একসঙ্গে এদের সকলকে কোনোদিন দেখিনি আমি, আর অনেক সব বৌ জামাই আর ছোটোদের তো এই প্রথম দেখলাম। আর একবার সে চোখ ঘুরিয়ে আনল ঘরের মধ্যে, তারপর বড়োপিসির কুঁকড়োনো মুখে চোখ রেখে ভাল, আমরা সকলেই একসঙ্গে বেঁচে আছি, আমিও আছি সকলের সঙ্গে। কথাটা ভেবে অবাক লাগল তার, ভারি ভাল লাগল। হ্যাঁ, সকলের সঙ্গেই সূকরে–মহাশ্বেতা বলল—কেউ বাকি নেই। কেউ বাকি নেই? একটা বোবা চিৎকার উঠল স্বাতীর মনে—জামাইবাবু! কারো মনে পড়ে না একবার, মানুষটা যে ছিল তাও মনে পড়ে না? এক ঝাপটে ফিরল তার মনে ছোড়দির বিয়ে, পরের দিনের সকালবেলা, খাটের উপর পায়ে পা তুলে সেই হা-হা হাসি, সেই একটুতেই অবাক হওয়া গোল-গোল চোখের অফুরন্ত ভালমানুষি। সব মুছে গেল? এর মধ্যেই? চাপা কষ্ট ছাড়া পেল, ছড়াল, অনেকক্ষণ পর ঠেলে উঠল গলার কাছে। এখন সে আর সে-মেয়ে নয় যাকে সে চেনে না, যার হাতে শাঁখা, পায়ে আলতা, পরনে তার পাঠানো কোরা শাড়ি, আর যাকে ঘিরে সকলের সুখ, আনন্দ–এখন সে আবার স্বাতী… পাঁচ বছরের…এগারো বছরের..পনেরো বছরের স্বাতী… কেঁকড়া চুলের, আঁকড়ে ধরা, কেঁদে কেঁদে না-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া, বৃষ্টি-পড়া রাত্রে জেগে উঠেভয় পাওয়া, লালপাড় শাড়িতে মাঘের সকাল আলো করা— এখন সে আবার তার মা-র শরীর—এখন সে আবার তার বাবার মেয়ে। স্বাতী হাঁটুতে মুখ লকোল। সোনালি-লাল বেনারসিটা হাতে নিয়ে সরস্বতী কাছে এল–স্বাতী ওঠ, শাড়ি পরবি। স্বাতী শাশ্বতী আরো নরম করে ডাকল। সিঁড়িতে শোনা গেল জুতোর শব্দ, একসঙ্গে অনেক, আরো অনেক লোক উপরে উঠছে একসঙ্গে। স্বাতী মুখ তুলে হাতের পাতায় চোখ মুছল। মস্ত কালো খোঁপা-বাঁধা মাথাটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লালচে চোখে তাকাল চারদিকে। দেখল হাসি, শাড়ি, রঙের ছড়াছড়ি, গলার হারে-কানের দুলে রেষারেষি, ধবধবে ইলেকট্রিকের আলোয় মস্ত ময়ূর পেখম ছড়াল, আনন্দ দাঁড়িয়ে আছে তাকে ঘিরে। সকলের আনন্দ। মুখ থেকে মুখে সরলো তার চোখ, কী যেন খুঁজল। শাশ্বতী বলল–কিছু চাই, স্বাতী? খুব ছোট্টো গলায় স্বাতী বলল—বড়দি কোথায়?

বড়দি? বড়দিকে চাই? ডেকে দিচ্ছি শাশ্বতী দরজার দিকে এগোল, জুতোর শব্দ মিলোতে লাগল দোতলা পার হয়ে ছাতের দিকে, সত্যেনকে একবার দেখে আসতে হয় এখন। এই যে বড়দি, তোমার খোঁজেই যাচ্ছিলাম। স্বাতী ডাকছে তোমাকে। শাশ্বতী আর দাঁড়াল না, সিঁড়ির দিকে এগোল। ঐ তো বড়দি, সরস্বতী বলল—এস, তুমি না এলে স্বাতী শাড়ি পরবে না। তোমরা যাও উপরে, বলতে বলতে শ্বেতা কাছে এল-লীলামাসি, তুমি এঁদের নিয়ে যাও। পিসিমা, বলল সকলকে। কুন্দদিদিমা বললেন—পুরুষদের হোক।

আজকাল আর ও সব নেই! বড়োপিসি হাত নাড়লেন—পুরুষদের সঙ্গে সমান-সমান স্ত্রীলোক! আসুন আপনি, তোরা সব চল রে।

দূর দেয়াল থেকে একটা নড়াচড়ার হাওয়া মাঝের দলটি পর্যন্ত পৌঁছল। সিল্কে-সোনায় ঝিলিক দিল, পান্না-চুনি চিকচিকোল। আর ঘরভরা ঐ চপল-সোনা আর মুখর-জড়োয়া আর সিল্কসাটিন-ব্রোকেডের আশ্চর্য নাচের মধ্যে স্বাতী দেখল বড়দিকে.. আরো আশ্চর্য… সাদা থান পরা, তার হাতের চুড়িগুলির পাল শাখাটার মতোই আশ্চর্য সাদা, আর সেইরকমই শান্ত, সুন্দর! কী স্বাতী? স্বাতী চোখ নামাল, শ্বেতা তার পাশে এসে বসল। নিচু গলায় বলল–কিছু একটু খা, কেমন?

না।

একটু নেবুর জল করে আনি—ভাল লাগবে, তেষ্টা তো পায়।

এখন না। একটু বোসো বড়দি।

স্বাতী-সরস্বতী তাড়া দিল।

আচ্ছা, একটু পরেই পরবে। স্বাতীর পাশে বসে তো তাকে এক হাতে জড়াল, তার হাতে পোঁছল স্বাতীর ভিতরকার কাঁপুনি। ঘরের ভিড় কমল… কমে এল… পাটির উপর পড়ে রইল শাড়ি, জামা, ওড়না, গয়না… ছাতে আরম্ভ হল খেতে বসা।

সিঁড়ির মাঝপথে শাশ্বতী দেখল হারীতের সঙ্গে উঠে আসছে প্রবীর মজুমদার। শাশ্বতী থামল, মজুমদারও থামল তাকে দেখে। আগের মতোই হাত জোড় করে অনেকখানি মাথা নোওয়াল, আগের মতোই সমস্ত মুখ ভরে হেসে বলল—মিসেস নন্দী, ভাল আছেন? শাশ্বতী ঘাড় হেলিয়ে বলল—আপনি ভাল?

ভাগ্য আমার—শাশ্বতীর মুখের উপর চোখ রাখল মজুমদার-আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শাশ্বতী হাসল। কী বলবে ভেবে পেল না। সেই যেদিন মজুমদার তার মুখে—তাকেই বলতে হয়েছিল কথাটা—প্রত্যাখ্যানের পাকা খবর নিয়ে ফিরে গিয়েছিল—তারপর শাশ্বতী আর দ্যাখেনি তাকে, ভাবেনি আর দেখবে। স্বাতীর বিয়েতে মজুমদার আসবে তাও ভাবেনি। আসা তো কম কথাই—মজুমদারের বেশ উৎসাহই যেন। উপহার পাঠিয়েছে একেবারে একটা গ্রামোফোন। গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে সারাদিনের জন্য, আর দেখাচ্ছে তাকে আগের মতোই খুশি। মানুষটা কী?—নিঃসাড়? মহৎ? না কি তখন একটা উড়ো খেয়াল হয়েছিল—সত্যিকার কিছু না? আপনার গ্রামোফোনটি খুব সুন্দর শাশ্বতীর মনে হল এ কথাটা বলা যায়, উচিতও বলা। আমার তো না! মজুমদার হাসল। হারীত তাড়া দিল–চলুন!

এই কথাবার্তাটা বাজে লাগছিল তার, কানও দেয়নি, কিন্তু মজুমদার কী রকম বিগলিত! আবার বলল—চলুন। আচ্ছা, খুব ভাল লাগল দেখা হয়ে—মজুমদার বিদায় নিল। আমারও—আবার হাসল শাশ্বতী, মাথার একটু ভঙ্গি করল। শাশ্বতী নামল, মজুমদার উঠল, হারীত একবার ফিরে তাকাল, আর শাশ্বতী যেন সেটা আশা করেই যেতে-যেতে চোখ তুলল। নিজের স্ত্রীকে হঠাৎ খুব সুন্দর দেখল হারীত।

না-মজুমদার ভদ্রলোক, আর কিছু না, যাকে ভদ্রলোক বলে তা-ই। কত ভাল লাগল মজুমদারের এই—এই অসাধারণ ভদ্রতায়-হ্যাঁ, অসাধারণ বইকি! যা হল না সেটাকে কেমন মেনে নিল, সুখী হল সকলের মুখে। শাশ্বতীর সুখ এতে বেড়ে গেল, ভাবল এটা আমার উপরি পাওনা। দিদিরা কেউ জানেই না ব্যাপারটা, স্বাতীর বিয়েতে আমার যতটা, ততটা ওদের কারোরই না। ভাবল, ভুল করেছিলাম তখন, কিন্তু স্বাতী করেনি, সত্যেন ছাড়া কারো সঙ্গেই ওকে মানাত না সত্যি!—ঠিক মানুষের সঙ্গে ঠিক মানুষের দেখা হয়েছে, বিয়ে হচ্ছে, সুখী হবে ওরা, কত সুখী হবে…একটু খুঁত থাকবে না কোথাও। শাশ্বতীর মন সুখে ভরে গেল, যেন আর ধরে না, যেন হাওয়ায় ভেসে ভেসে চলে এল সামনের ঘরটির দরজায়।

******

মেঝে-জোড়া ফরাশের উপর হলদে কার্পেট পড়ে আছে। পানের থালা, ছাইয়ের বাটি ছড়ানো, লাল-কার্পেট থেকে সরে এসে মন্ত ঘরে একলা বসে আছে সত্যেন। তাড়াতাড়ি কাছে এসে শাশ্বতী বলল—বাঃ! সত্যেনের চোখে আভা দিল ম্যাজেন্টা রঙের শাড়ি, হলদে আর সবুজে শোনো জামা, সবুজ আর লাল পাথরে জাল-বোনা নেকলেস। প্রথমে সে ঠোঁট দুটির নড়া দেখল, তারপর কথা শুনল—আপনাকে একা ফেলে চলে গেছে সবাই, বেশ।

অরুণবাবু ছিলেন। আসবেন আবার। আর একা আমার ভালই লাগছিল-সত্যেনের নরম চোখে তাকিয়ে, নরম গলার কথা শুনে শাশ্বতীর মন উচ্ছল হল। এখন ঠিক সুখে না, সুখ ছাপানো অন্য কিছু নতুন বোধ এটা। আর কোনো মানুষের জন্য তার জাগেনি। মনে হল, আমি এর জন্য কী করতে পারি? শাশ্বতী অবাক হয়ে ভাবল, স্বাতীর চেয়েও কি বেশি হল সত্যেন? অবাক হয়ে ভাবল—একেই স্নেহ বলে?

একাই ভাল লাগছিল? তাহলে আমি না এলেই ভাল হত? সত্যেন তাড়াতাড়ি বলল—না,, এটা আরো ভাল। শাশ্বতী হাসল; এদিক-ওদিক চোখ ফেলে বলল—এখানে ফুল ছিল না?

আমি সরিয়ে রেখেছি। আর যদি অনুমতি করেন একবার উঠে দাঁড়াই।

নিশ্চয়ই।

সত্যেন উঠল, তার পিছনে ঝলক দিল লাল গোলাপের তোড়া দুটো। শাশ্বতী বলল—ক্লান্ত লাগছে, না? চা খেয়েছিলেন এসে?

বোধহয়।

বোধহয় মানে?

সত্যেন কার্পেটের উপর কয়েক পা হাঁটল—মানে-সকলকে যখন চা দিচ্ছিল আমাকেও দিয়েছিল এক পেয়ালা, কিন্তু খেয়েছিলাম কিনা ঠিক মনে পড়ছে না। সত্যেনের প্রত্যেকটা কথায় তাকে আরো ভালোবাসল শাশ্বতী—আর একটু খাবেন এখন? অবশ্য উপপাশের উপর বেশি চা খাওয়া ঠিক না।

উপোশ কেন? আমি তো খেয়েছি-টেয়েছি।

বেশ! এদিকে আমাদের মেয়ে কিছু খায়নি সারাদিন।

খায়নি? আমি বলেছিলাম তো খেতে। শাশ্বতীর হাসি পেল কথা শুনে, হাসি চেপে বলল–আমরাও বলেছিলাম, কিন্তু খেল না কিছুতেই। আর একটা দিন না-খেলেই বা কী, আপনি তাহলে—আমি চা নিয়ে আসি, কেমন? এক্ষুনি আসব।

আমি ভাবছিলাম—

কী?

অন্য কোথাও বসা যায় কি?

কেন, এখানে কী হল?

একটা চেয়ার যদি থাকে কোথাও—

ও! শাশ্বতী চোখ দিয়ে হাসল–আচ্ছা আসুন। সত্যেনকে নিয়ে এল ভিতরের দরজা দিয়ে ছোটো একটা ঘরে, সেখানে তিন-পিস ড্রয়িংরুমের আসবাব ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা। সত্যেন একটা চেয়ারে বসে পিঠ জিয়োল। শাশ্বতী জিগেস করল—এখন আরাম হচ্ছে?

খুব, একটু বেশিই।

নীল রঙটা কেমন?

এই চেয়ারের? খুব সুন্দর।

যাক, আপনার অপছন্দ হয়নি? তাহলেই হল।

কথাটা বুঝতে না পেরে সত্যেন বলল— কেন?

বাঃ, আপনার জিনিস—

আমার কেন? সত্যেন একটু পরে আবার বলল—আমি এসব দিয়ে করব কী? আর রাখবই বা কোথায়?

ওসব ভাবো: লোকও তো হল। হাসির একটা ঝলমলানি রেখে শাশ্বতী চলে গেল, একটু পরে ফিরে এসে ধোঁয়া-ওঠা এক পেয়ালা চা রাখল সত্যেনের পাশে হলদে কাচ বসানো টেবিলে। সত্যেন বলল—আপনি একটু বসুন এবার।

না, বসব না। আপনি খান। চায়ে চুমুক দিয়ে সত্যেন বলল, বাঁচলাম। এতক্ষণে বুঝল ভিতরে ভিতরে চায়ের তেষ্টাই পাচ্ছিল তার।

ঠিক হয়েছে? চিনি বেশি হয়নি?

ঠিক, চমৎকার। শাশ্বতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটু সত্যেনকে দেখল, তারপর বলল—একটা কথা বলি আপনাকে।

বলুন!

আমাকে কিন্তু ছোড়দি ডাকতে হবে।

ডাকব।

আর আমি কিন্তু কাল থেকে আপনাকে তুমি বলব।

সত্যেন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—নিশ্চয়ই।

আপনিও আমাকে তুমি বন্সতে পারেন ইচ্ছে করলে।

তা-ই বলব। কাল থেকে তো?

হ্যাঁ, কাল থেকে। আস্তে হেসে উঠল দুজনে একসঙ্গে। অরুণ ব্যস্তভাবে ঘরে এসে বলল–বাঃ, সত্যেনকে এখানে এনে লুকিয়ে রেখেছ, শাশ্বতী! এদিকে আমি ভাবছি কী হল।

আপনাদের ভাবনা তত দেখলাম। মানুষটাকে একলা ফেলে চলে গিয়েছিলেন সব!

উপরটা দেখে এলাম একবার। সত্যেন তৈরি তো? বেশি আর দেরি নেই কিন্তু।

আমিও যাই। ওকে দেখবেন, অরুণদা—হারিয়ে-টারিয়ে না যায়–শাশ্বতী যেতে-যেতে একবার ফিরে তাকাল সত্যেনের দিকে।

সোজা ছাতে এল। মেরাপ-বাঁধা, সামিয়ানা-খাটানো মস্ত হাত, ব্ল্যাক-আউটের আর শীতের জন্য টেনিস লনের মতো মোটা নীল পরদা-ঘেরা, আর একটা পরদা চলে গেছে চিলেকোঠা বরাবর ছাতটাকে ছোটো আর বড়ো দুটো অংশে ভাগ করে দিয়ে। ছোটো দিকটায় বিয়ে হবে আর বড়োটায় খাবার জায়গা-খাওয়া হচ্ছে। সরু-সরু লম্বা টেবিলে মুখোমুখি ডবল সারিতে বসে গেছে সব। পাচটা টেবিল ভরে পুরুষরা। আর তিনটে ভরে মেয়েরা, দেখাচ্ছে বেশ। দু সার পিঠের মধ্যে দিয়ে সরু পথে এগিয়ে এল শাশ্বতী। খয়েরি শার্ট দেখে দাঁড়িয়ে বলল–ভাল করে খাচ্ছো তো নিখিল? এক টুকরো ভেটকি ফ্রাই মুখে তুলতে গিয়ে নিখিল ঘাড় ফেরাল, শাশ্বতীকে দেখতে পেয়ে অনেকখানি লাল হল। শাশ্বতী আবার বলল– কী, কিছু চাই? না, কিচ্ছু না-নিখিল চোখ নামাল টেবিলে পাতা ঘি-রঙের পাতলা কাগজে, ছোটা-বড়ো খুরিতে ঘেরা মাটির লাল থালায়। চাইবার কী আছে? শাক থেকে রসমালাই পর্যন্ত আমিষনিরামিষ-চাটনি-মিষ্টি মিলিয়ে আঠারো রকম খাবার—হ্যাঁ, আঠারো, সে গুণে দেখেছে—একই সঙ্গে সাজানো, সুগন্ধি কেওড়া জল, আলাদা একটি ছোট্টো থালায় লবঙ্গ-বেঁধা একটি পান পর্যন্ত–সঙ্গে, পান যারা খায় না তাদের জন্য একটু সুপুরি, মৌরি আর আস্ত একটি বড়ো এলাচ। বিয়ের যে ছবি নিখিলের মনে আঁকা আছে, ছেলেবেলায় অনেকবার যা দেখেছে তার সঙ্গে কিছুই এর মেলে না। সেই কুশাসন-কলাপাতার ঘেঁষাঘেঁষি, গায়ের জামার নিচের দিকটা ভিজে যাওয়া, বেগুনভাজা পাতে নিয়ে ডালের জন্য বসে থাকা, ঝোলের উপর অম্বল, আর অম্বলের উপর দইয়ের গড়িয়ে যাওয়া, অন্য সব দিয়ে খাওয়া যখন প্রায় শেষ তখন হঠাৎ পোলাও-মাংসের জাঁকালো আমদানি-ঘাম, গন্ধ, পরিবেশনের পরিশ্রম, কিছুই না। আর সবচেয়ে যা ভাল…আশ্চর্য, নিখিলের কাছে নতুন—চঁচামেচি হাঁকডাক নেই, চুপচাপ, যারা খাচ্ছে তাদেরই কথাবার্তার গুনগুনানি শোনা যাচ্ছে শুধু। খাওয়াও হচ্ছে বেশ বেছে-বেছে, আরামে বসে, স্বাধীনভাবে। আর যদিও আঠারো রকম খাবার, তবু সবই বেশ অল্প-অল্প বলে কোনোটাই প্রায় ফেলতে হয় না। ভেটকিটা শেষ করতে করতে নিখিল আশেপাশের কথাবার্তায় কান দিল।

–কথাটা হচ্ছে, আমরা এখন কী করব?

আমরা? গলাবন্ধ লম্বা কালো কোট পরা শৌখিন চেহারার মাঝবয়সী একজন ভদ্রলোক হারীতের দিকে চোখ তুললেন—আমরা আর কী করব! গোলাম আছি, গোলামই থাকব। কেউ কেউ হাসল কথাটা শুনে। হারীতের মুখ লাল হল, তার ছোট্টো হাসি ঘক্ করে উঠল। শাল কাঁধে আর একজন বলল—তাই বা কেন? এই হয়তো আমাদের সুযোগ।

সুযোগ নিশ্চয়ই! তীরের মতো প্রশ্ন ছোটাল হারীত—কিন্তু কীসের?

ছোলার ডালের ছেচকি দিয়ে মটরশুটির কচুরি খেতে খেতে মজুমদার একবার চোখ তুলে দেখল মিসেস নন্দী সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। একটু তাকিয়ে থাকল কিন্তু চোখাচোখি হল

। শাশ্বতী এগোল, জলের জগ হাতে দুজন লোক দুদিকে চলে গেল, দূরে দাঁড়িয়ে রেঙ্গুনি জামাইটি কাকে দেখে হাসলেন, আর অন্য দিকে মেয়েরা যেখানে বসেছে সেখানে একবার ঝলক দিল কালো মখমল-কাঁধের উপর রুপোর মতো আঁচল। না এলেই পারতাম, আবার ভাবল মজুমদার। সত্যি, কেন এসেছি? মনে পড়ল মিসেস নন্দীর কাছে শেষ যেদিন—অনেক কথাই বলবে ভেবেছিল কিন্তু বেশি বলতে হল না… হল না! বিজন তারপর এসেছিল একটা পালকঝরা পাখির মতো চেহারা করে, ফেঁশফোশ গর্জেছিল, তার প্রায় কিছু সে শোনেনি, তার কানে আওয়াজ দিচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে শুধু ঐ কথাটা-হল না। কষ্ট পেয়েছিল? বুক ফেটে গিয়েছিল? না তো! এ অবস্থায় যে রকম বর্ণনা নভেল-টভেলে লেখে সেরকম কিছুই তার লাগেনি। কষ্ট কিছু না; আর কিছু না, শুধু অপমানের বিছের জুলুনি, না-পাবার ধিক্কার। সে পারল না, ফেল হল। সে প্রবীরচন্দ্র মজুমদার, কুচোকেরানির ডালভাত খেয়ে বড়ো হওয়া বড় ছেলে, আজ দেড়শ লোকের মনিব, বড়ো গাড়ি আর ছোটো গাড়ির মালিক, এই প্রথম সে কিছু চেষ্টা করে পারল না। না কি তেমন করে চেষ্টা করেনি, তেমন করে ইচ্ছা করেনি–যেমন করে ষোলো বছর আগে মুঠো চেপে বলেছিল-টাকা আমার চাই।

…কিছু বোঝে না কেউ! আপনি কী বলেন?— হারীত নন্দীর অন্তরঙ্গতা মজুমদারের কান কাড়ল।–আমি? আমি ঠিক…

কথাটা খুব সোজা। আপনি কি ফ্যাসিস্টদের জয় চান? হারীতের মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থাকল মজুমদার। গালের জে-ভজে রিনয় ঝরিয়ে নরম সুরে বলল—আচ্ছা, ফ্যাসিস্ট কাকে বলে? হারীত হাত নেড়ে হেসে উঠল। দয়া করে যদি একটু বুঝিয়ে দেন, মিস্টার নন্দী গম্ভীর মুখে আর নরম গলায় অনুনয় করল মজুমদার—আমি লেখাপড়া শিখিনি, কিচ্ছু বুঝি না।

আমি তো কবে থেকেই ছেলেদের বলছি শ্লেষ্ম-ভরা চড়া গলায় আওয়াজ হল তাদের পিছনে বেশি আর পাশ-টাশ করে কাজ নেই, বাপু, এবার জাপানিটা শেখো! লোকটার চেহারা দেখার জন্য হারীত ক্ষিপ্র ঘাড় ফেরাল আর মজুমদার সেই সুযোগে হাত দিল সর্ষে দিয়ে ভাপানো চিংড়িতে। পারল না, চেষ্টা করে পারল না, আশা মরে গেল, তবু লোভ তাকে ছাড়ল না। এই সেদিন বিজন যখন এল কেমন চোর-চোর মুখে বোনের বিয়ের খবর দিতে নেমন্তন্ন করতে—তাকেই দেখাতে হল খুশি, উৎসাহ-বিজনের কিন্তু কিন্তু ভাবটা তাকেই কাটাতে হল। আর দেখাতে গিয়ে সেটাই যেন সত্যি হয়ে গেল। উপহার পাঠাল চারশো টাকার গ্রামোফোন, উপকার পাঠাল সারাদিনের জন্যে বড়ো গাড়িটা আর নিজেও এল সময়মতো ভাগনিকে নিয়ে মূর্তিমান সৌজন্য সেজে। কেন? কৃতজ্ঞ করতে? মহত্ত্ব দেখাতে? বাজে… যে কোনো সূত্রে, যে কোনো শর্তে একটু সম্পর্ক পাতা, সম্বন্ধ রাখা, এই কি সে চায়? এই কি সে চায় না? এত কাঙাল সে?

…তা পেনশনটা দেবে তো ঠিকমতো? একজোড়া জাঁদরেল সাদা গোঁফের ফাঁক দিয়ে সরু একটি প্রশ্ন পড়ল মজুমদারের ঠিক পিছনে, আর তার মুখোমুখি বসে কিরণ বক্সি রুইমাছের ফুলকপিটি মুখে তুলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল … সত্যি কি এখন কলকাতার বাইরে ফ্যামিলি পাঠানো দরকার? কিরণ বক্সির প্রশ্নটা হারীতকে লক্ষ্য করেছিল, কিন্তু হারীত মুখ তুলে দু-গালের পেশি একবার একটু নাচাল; শুধু হাসতেই চেয়েছিল কিন্তু দেখাল ভেংচির মতো। কিরণের খালি হওয়া গেলাসে জল ঢেলে দিল তার পিছনে দাঁড়িয়ে কোঁকড়া চুলের এক নবযুবক। নিখিল ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল, ডালিম এর মধ্যে আবার পোশাক বদলেছে, ঢোলা-পাঞ্জাবির বদলে এখন তার গায়ে ছাইরঙের ডোরাকাটা সিল্কের শার্ট, আস্তিন গুটোনো, কব্জিতে আবার সোনার ঘড়ি-ঘড়িটা কেন? চোখাচোখি হতে নিখিল বলল—কটা বাজল, ডালিমবাবু? ঘড়ির দিকে তাকাতে গিয়ে ঠাট্টা বুঝে লাল হল ডালিম, এগিয়ে গেল টেবিল-ফাঁকের গলি দিয়ে। …এখন যাদের পেনশন হবোহববা তাদের আর ভাবনা কী, চাইলেই এক্সটেনশন!

নাকি?

বাঃ, এ. আর. পি. সাপ্লাই এই-যে এখানে একটু জল। আঃ, খাশা পোনা! কথাটা শুনতে পেয়ে হেমাঙ্গ ছুটে এল—আপনাকে আর একটু… আর কিছু?

আচ্ছা জাপানিরা কি সোজা প্লেনে এসেই বোমা ফেলবে কলকাতায়, নাকি এয়ারক্রাফট-কেরিয়ার নিয়ে কে-অফ-বেঙ্গলে আসবে? কিরণ বক্সির এই সূক্ষ্ম সামরিক প্রশ্নের উত্তরে হারীত মুখ পর্যন্ত তুলল না, যেন চারদিকে নির্বুদ্ধিতার ভারে নুয়ে পড়ে পোলাওয়ের পেস্তাবাদাম খেতে লাগল খুটে খুঁটে, তারপর হঠাৎ দ্রুত-আঙুলে মাংস মেখে নিয়ে চাল-মন্দ না তো, বেশ। একটু খেয়ে নিয়ে খুব নিচু গলায় আরম্ভ করল—শুনুন, ফ্যাসিস্ট হচ্ছে তারাই, যারা… আপনি এক্সটেনশন নিচ্ছেন নাকি?

নাঃ, “মামি আর..বক্তার মুখের চর্ব পদার্থে বাকি কথা চাপা পড়ল—তবে রাজেন বোধহয়… রাজেন বাবু? তিনি তো পেনশনের দিন গুনছিলেন।

তপাল! তপাল!—এতক্ষণে প্রথম কথা বললেন খুব বুড়ো একজন, রাজেনবাবুর সাক্ষাৎ ভগ্নীপতি… সেই বড়োপিসির… সাদাচুলের লাল-সিঁদুর যার বেঁচে থাকার ইস্তাহার—বড়ো মেয়েটা বিধবা হয়ে…। ডালিম তাড়াতাড়ি সরে গেল অন্যদিকে। শাশ্বতী তাকে দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে ডাকল, আর হারীতের নাছোড় ঘ্যানঘ্যান শুনতে-শুনতে, মানে, না-শুনতে-শুনতে হঠাৎ একবার চোখ তুলতেই সেই হাতনাড়াটুকু মজুমদারের চোখে পড়ল।

তেন রাজেনের পালে এ-রতম? দাঁত-পড়া মুখে ক গুলি সব ত শোনাল, তারপর একটু জোর দিয়ে বলতে গিয়ে স-টা সুদ্ধ ত হয়ে গেল—মানুষটা তৎ, তাই!

তা সত্যি!—সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলেন রেবতী সিংহ, রাজেনবাবুর প্রতিবেশী। অতি সজ্জন রাজেনবাবু! আমাদের পাড়ার মধ্যে–

দে তো আমাকে একটু জল, উঃ এমন ঢেকেছে চারদিকে—

ভাগ্যিশ শীতকাল! ডালিম গম্ভীর গলায় বলল—গরম পড়লে যে ব্ল্যাক-আউটে কী করে… তদ্দিনই থাকবে ব্ল্যাক-আউট? শাশ্বতীর চিন্তা হল—কী যে হাঙ্গামা, সত্যি! তা তুই যে জল নিয়ে? ঐ ওরা সব আছে তো।

আমিও তো আছি—ডালিম মিষ্টি করে হাসল। তারপর হঠাৎ হাতের জগটা নামিয়ে কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটা খুলে পকেটে রাখল।

খুলে রাখলি যে?

অসুবিধে লাগে— ডালিম একটু আবছা করে হাসল।

মানিয়েছিল কিন্তু। জামাইবাবুর ঘড়িটা—না? হাল্কা গলায় একথা বলে শাশ্বতী চলে গেল। মেয়েদের টেবিলের দিকে। ডালিম একটু দাঁড়াল, আলগোছে আবার পরে নিল ঘড়িটা।

…স্বাতীটা, তার বাপের প্রাণ! তাকে বিয়ে দিয়ে এখন—কথা শেষ না করে কুন্দদিদিমা পাতেব দিকে তাকালেন, বেসনে ভাজা চাকতি-বেগুনে কামড় দিলেন এতক্ষণে। ও সবই সয়ে যায়, সবই ঠিক হয়ে যায়—হাসি-হাসি লীলামাসি পোঁছলেন মাছের মুড়ো দিয়ে রাঁধা বাঁধাকপির ডালনায়। চিংড়িটা কী অদ্ভুত ভাল!—শোভার ভরামুখ থেকে উৎসাহ উপচাল। কোনটা না? তক্ষুনি বলে উঠলেন বড়োপিসি—প্রতাপ ঠাকুরের রান্না, এর উপর কি আর কথা আছে? একটু দূর থেকে অনেকটা কমবয়সের একজন মহিলা জিগেস করলেন—বিখ্যাত বুঝি প্রতাপ ঠাকুর?

ও মা! বড়োপিসি গালে হাত দিয়ে অবাক হলেন–প্রতাপ ঠাকুরের নাম শোনেননি আপনি? তার বাপ ছিল বিক্রমপুরের শ্রেষ্ঠ ঠাকুর, সারা দেশেও তো তার মতো…। পিছনে দাঁড়িয়ে মহাশ্বেতা ছোট্ট চিমটি কাটল বড়োপিসির কাঁধে।

বাঃ! জলপাইয়ের টকে এইমাত্র চিকচিকে হওয়া সাদা গোঁফের ফাঁক দিয়ে আওয়াজ বেরল— রাজেন ব্যবস্থাটি করেছে পরিপাটি, তা বলতেই হয়।

হ্যাঁ, উত্তম।

তোফা রান্না!

শেষ মেয়ের বিয়ে, খরচ করেছে খুব। আর জামাইরাও সব যোগ্য—

এটি কিন্তু পয়সায় খাটো হল— একটু নিচু গলায় মন্তব্য করলেন, সোনার চশমা পরা, টাক পড়া প্রৌঢ়, স্বাতীদের প্রভাত মেলোমশাই, লীলামাসীর স্বামী। তা হোক—টম্যাটোর চাটনিতে ভেজানো আঙুলটা মুখ থেকে বের করে রেবতীবাবু মত দিলেন—ছেলে খুব ভাল! এতদিন ধরে দেখছি, আমার বাড়িতেই তো, চোখ তুলে তাকায় না কারো দিকে।

যেখানে তাকাবার সেখানে ঠিক তাকিয়েছে!— শ্লেষ্মভরা চড়া গলার আওয়াজ হল। রুইমাছের লম্বা সাদা কাটাটি থালার ধারে সাজিয়ে চিত্রা বলল—মনে মনে স্বাতীর এই ছিল!

আমি তো কবেই বুঝেছিলাম—অনুপমা হাসল।

কবে বুঝেছিলি?—চিত্রা যেন অবিশ্বাস করল কথাটা।

অনার্স ক্লাসে তো দেখিসনি। সত্যেনবাবু একবারও তাকান না স্বাতীর দিকে, আর স্বাতী কখনো বই থেকে চোখ তোলে না।

মস্ত, বয়স্ক, অত্যন্ত-সাজা, বিয়ে-না-হওয়া, বেমানান ইভা গাঙ্গুলি পুরুষের মতো মোটা গলায় বলল–তা তোমরা যে যা-ই বল, প্রোফেসরের সঙ্গে ছাত্রীর এ রকম..

আস্তে! ঐ যে স্বাতীর ছোড়দি—

আপনি মুগের ডালটা খেলেন না? একদম অচেনা একজনের দিকে ভুরু কুঁচকোলেন বড়োপিসি। কত খাব! লাজুক মহিলাটি নিচু গলায় বললেন। একটু মুখে দিয়ে দেখুন–বড়োপিসির হাসিতে স্পষ্ট এই কথাটা ফুটল যে এমন মুগের ডাল পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম রান্না হল, দ্বিতীয়বার আর হবে না। আপনি তোকই খাচ্ছেন না, শুধু কথাই বলছেন— বললেন লাল পাড় গরদপরা একজন পরিতৃপ্ত প্রৌঢ়া, হারীতের মা। এই যে খাই বড়োপিসি পোলাওয়ে হাত দিলেন। তা-আ-বেশ! মুখ খুলে খুলে সোনা-বাঁধানো দাঁতে মাংস চিবোত চিবোতে বয়সের পক্ষে বেখাপ্পারকম রঙচঙে শাড়ি পড়া এক গিন্নির এই মাত্রই যেন মনে পড়ল নিমন্ত্রণের উপলক্ষটা বেশ বিয়ে হল…যা দিনকাল, তাতে মেয়ের পাত্র জোটানো… যা বলেছেন! বোপিসি খাওয়া থামিয়ে গম্ভীর মুখে তাকালেন—চারদিকেই তা-ই, একটি-দুটি পার করতেই গলদঘর্ম এক একজন, আর আমাদের পাঁচ-পাঁচটি মেয়ে… বড়োপিসির সমস্ত মুখ মধুর একটি হাসিতে উল্লসিত হল, চোখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন-পাচটিরই যেন উড়াল দিয়ে বিয়ে হয়ে গেল—একটার বেশি কথা না—চোখে দেখল কি লুফে নিল। আর জামাইও এক-একটি…।

আঃ! থামো তো তুমি!—মহাশ্বেতার ফিশফিশে গলা অনেকেই শুনল, কিন্তু কথাটা কে বলা তিনিই যেন শুনতে পেলেন না। তা দেখুন, আমাদের মেয়েরা তো আর নিজেরাই বর ধরতে ছোট না— বললেন রেবতী-গিন্নি, টেবিলের একধারে বসে পাশের চেয়ারের পাশের বাড়ির মেজবৌ-এর কানে কানে। মেজবৌ কথা না বলে হাত ওল্টালেন। তার আংটির পাথর থেকে একানা পোলাও ঝরে পড়ল।

স্বাতী নিশ্চয়ই কলেজ ছেড়ে দেবে?

সে তো দিতেই হবে–জবাব দিল ইভা গাঙ্গুলি, তার ভাইসপ্রিন্সিপাল মামার কর্তৃত্বের সুরে। বেশ ছিল স্বাতীটা-একটু বিষাদ লাগল অনুপমার গলায়—মনে আছে সেই এনশেন্ট ম্যারিনারের ক্লাস?

আর সেই যে একদিন ট্রামে ফিরছিলাম, সত্যেন রায় উঠলেন? একসঙ্গে ছোটো নিশ্বাস পড়ল অনুপমার, চিত্রার। সে সব দিন যেন কতদূরে চলে গেছে এরই মধ্যে। সুপ্রীতির চিঠিপত্র পাস?–কই আর? বিয়ে হয়ে গেলে আর বন্ধুরা!

কে যে কার মধ্যে কী দেখতে পায়! ইভা গাঙ্গুলি তার পুরুষের গলা অনেকটা নামাল, কিন্তু তাও বেশ চড়া শোনাল অন্য দুজনের নিচু গলার পরে—সত্যেন রায়ের মতো ব্রিলিয়ান্ট ইয়ং ম্যান, তার আরো…আরো একটু কথা শেষ না করে ইভা গাঙ্গুলি এখনো না-ছোঁওয়া খাবার থেকে চোখ দিয়ে বাছতে লাগল। একটু দূর থেকে তার মুখের উপর পড়ল ছ-কোণ চশমা পরা তীক্ষ্ম চোখ আর এতদিনের মধ্যে এই প্রথম তার মুখে সত্যেন রায় সম্বন্ধে সপ্রশংস কিছু শুনে চিত্রা-অনুপমা অবাক হয়ে তাকাল।

—তার আরো অ্যাম্বিশাস হওয়া উচিত ছিল, টকের খুরি থেকে আলগোছে জলপাইটি তুলে নিয়ে কথা শেষ করল ইভা—মামা তো বলেনই, কেন যে সত্যেন এখানে পড়ে আছে জানি না , কত ভাল চাকরি ওর হতে পারে। ঐ ওর দোষ, অ্যাম্বিশন নেই।

কিছু মনে করবেন না—ঘেঁষাঘেঁষি টেবিলে যতটা সম্ভব এগিয়ে এল ছ-কোণ চশমা পরা রঙমাখা মুখটি—কিছু মনে করবেন না, আপনাদের কাউকে চিনি না, আপনাদের কথার মধ্যে কথা বলছি-আপনারা স্বাতীর বন্ধু তো? আমিও স্বাতীর বন্ধু—আর আমি এ কথা নিশ্চয়ই বলব যে স্বাতী অসাধারণ মেয়ে এবং সত্যেনবাবু অসাধারণ ভাগ্যবান। এই সোচ্চার বক্তৃতাটি শুনে ইভা গাঙ্গুলি সুষ্ঠু হকচকাল আর চিত্রা যেন এতে জোর পেল তার আন্তরিক একটি অভিমত ব্যক্ত করার–সত্যেনবাবু দেখতে কিন্তু ভাল না।

দেখতে ভাল কিনা জানি না, তবে খুব অ্যাট্রাকটিভ—স্পষ্ট উচ্চারণে কথাটা বলে উঠল ছিপছিপে কালো একটি মেয়ে, মাত্রই একটি ঢাকাই শাড়ি পরা, এবার তাদের সঙ্গে নতুন ভরতি হওয়া। এখন আবার বেশি অ্যাট্রাকটিভ হলে বিপদ—ইভা বাঁকা হাসল কালো মেয়েটির দিকে তাকিয়ে। আপনাদের কারো কিছু… আর কিছু?–শাশ্বতী তাদের কাছে এসে দাঁড়াল। উর্মিলা বলল—একটু জল, ছোড়দি। বিজনকে বিজুদা বললেও শাশ্বতীকে এর আগে ছোড়দি বলেনি সে, কিন্তু এখন বলল এইজন্য যাতে অনন্যরা বুঝতে পারে তার সঙ্গে এদের কত ঘনিষ্ঠতা। জল? এই যে এদিক ওদিক তাকাতে শাশ্বতীর চোখাচোখি হল ডালিমের সঙ্গে, চোখ দিয়ে তাকে ডাকল। কর্তব্যপরায়ণ ডালিম বাধ্য হয়ে এগোল। এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে অন্য সব টেবিলের অনেক খালি হওয়া গেলাসেই সে জল দিয়েছে, সযত্নে এড়িয়ে গেছে এই একটি টেবিল। ওখানে যারা বসে আছে, তাদের দিকে দূর থেকে তাকাতে গেলেও চোখের পাতা যেন ভারি হয়ে নেমে আসে। কেন এ রকম? কেন মেয়েরা এত সুন্দর, আর কিছুতেই কেন তাদের কাছে যাওয়া যায় না? শক্ত, গম্ভীর মুখে প্রাণপণে লাল-না-হবার চেষ্টা করতে করতে, উর্মিলার গেলাসে জল ঢালতে লম্বা ডালিম নিচু হল। একটা গন্ধ লাফিয়ে উঠল তার দিকে-কেমন… কেমন-কেমন… নতুন, অদ্ভুত, আশ্চর্য! আমাকে একটু জল দিন তো স্পষ্ট গলায় কথাটা যে বলল, ডালিম তাকে আগেও একবার দেখেছিল, বড়োমাসির কীরকম ননদ যেন আর খানিক আগে সিঁড়িতে একবার ঠিক দ্যাখেনি, ঠিক দেখতে পায়নি, শুধু একটা রূপের আভা, রঙের ঝলক চমকে গিয়েছিল তার চোখের সামনে। টিপিটিপি কয়েক চেয়ার সরল ডালিম, আস্তিন-গুটোনো, ঘড়ি-বাঁধা ফর্সা হাতে জলের জগ উঁচু করল, আর ঠিক তখনই, একেবারে অকারণে রূপসীটি মুখ তুলল। নড়ে উঠল চাকার মতো কানবালা, ঠোঁটের উপর পাতলা গোফে আলো পড়ল। জগটা হঠাৎ ভারি হয়ে গেল ডালিমের হাতে, আর এমন বেয়াড়া হয়ে উঠল যে ডালিম গায়ের জোরে চেপে ধরতে-ধরতেও উপচে পড়ল জল, গেলাস ছাপিয়ে, টেবিলের পাতলা কাগজ ভিজিয়ে, ঝরে পড়ল ঝলমলে বেনারসিতে, গড়িয়ে নামল মখমলের জুতোয়, পোঁছল আশেপাশে ছোট্রো ছিটে হয়ে। মহাশ্বেতার কী-রকম-যেন ননদটি একবার নিচু হয়েই ক্ষিপ্র মুখ তুলে কটমট করে তাকাল ডালিমের দিকে, তার রম্য-ঠোঁটের উপর পাতলা-সোনালি গোঁফ আরো স্পষ্ট দেখা গেল এবার। আশেপাশে হাসি বইল ঝিরঝির, শাশ্বতীর মেজো-জা, যিনি শাশুড়ির সান্নিধ্য এড়াবার জন্য তরুণী-টেবিলেই বসেছিলেন–অবশ্য নিজেও তরুণী, কিন্তু বিবাহিত আর অবিবাহিত মেয়েতে তো জন্মান্তরের তফাৎ–শাশ্বতীর মেজো-জা বেদরকারি ছোটো-ছোটো জলের তেঁাকে হাসি চাপতে চেষ্টা করলেন আর টেবিলের একধারে বসে জলতরঙ্গ বাজনার মতো হেসে উঠল তিনটি ফুটফুটে পরী পাশাপাশি—একজন লাল, একজন সবুজ, অন্যজন কমলারঙের। মুখভরা সন্দেশ খেতে-খেতে গরম লেগেছে বলে খয়েরি শার্টের গলার বোতামটা খোলা, নিখিল হাসির শব্দে ঘাড় ফেরাল। হাসতে গিয়ে তিনজনেই পিছনদিকে হেলেছে, তাই তিনজনকেই এবার একটু স্পষ্ট দেখতে পেল নিখিল আর খুব স্পষ্ট দেখল ডালিমকে। ছিমছাম, সুশ্রী, গ্রে-স্ট্রাইপের দুরন্ত একটি শার্ট পরা, নিচু মাথায় চুলের ঢেউ দেখিয়ে জলের জগ হাতে সেইখানটাতেই দাঁড়িয়ে। নিখিল কিছু জানল না, শুধু দেখতে পেল। তার মনে হল ডালিমের মুখও হাসি-হাসি। হঠাৎ ঈর্ষার একটা ঝাপটা দিল তার মনে, কঁচা-ছানার চমৎকার বরফিটা আটকে গেল গলায়।

কিরণ বক্সি জিগেস করল—তাহলে সত্যি জাপানিরা বোমা ফেলবে কলকাতায়? কাকে জিগেস করল নিজেই জানল না। তাহলেটাও অর্থহীন, কেননা এর আগে তার আরো দুটো সূক্ষ্মতর, গুরুতর প্রশ্নের—কলকাতা ছেড়ে মিনিমম কত মাইল দূরে ঠিক নিশ্চিত বলা যায়? ডিরেক্ট হিট না হলে তো আর কিছু হবে না?—কোনো তরফ থেকে কোনো জবাব পায়নি। খেতেখেতে নিজের ভাবনা ভেবেছে… আর শ্বশুরের গোঁ… তার আসন্ন, অনিশ্চিত, অনীতাহীন অবস্থা—চিরস্থায়ী কলকাতায় এই কল্পনাতীত অঘটন, আর তারই সুতো ধরে-ধরে এইমাত্র পাতে-পড়া পাপড়ভাজা ভাঙতে গিয়ে এই আদি প্রশ্নটাই আবার খুব জরুরি সুরে বেরিয়ে গেছে। তার মুখ দিয়ে।

না, বোমা ফেলবে না–মসৃণ জবাব দিলেন লম্বা কোট পরা, লম্বা জুলপিওলা শেখিন ভদ্রলোকটি—গোলগাল শহরটিকে আস্ত মুখে পুরবে—এইরকম, বলে মুখ উঁচু করে দু-আঙুলে ধরা রসগোল্লাটি একটু দূর থেকে আস্ত ফেলে দিলেন জিভের উপর।—ফিফথ কলাম! সব ফিফথ কলাম! না, সব না, আমরা আছি। লড়ব, রুখব, জিতব আমরা… ছারপোকার মতো টিপে টিপে মারব এক-একটাকে—ভাবতে-ভাবতে হারীতের মুখ হিংস্র হয়ে উঠল, আঙুলগুলি দ্রুত নড়তে লাগল থালার উপর, খামকা কিছু একটা তুলল থালা থেকে। খাওয়া তার হয়ে গিয়েছিল অনেকক্ষণ, আদ্ধেক জিনিসই ছোঁয়নি–চোখে না দেখে চিবিয়ে ফেলল টোম্যাটোচাটনির আদর কুচি—ওঃ ঝাল! আমাকে পাঁপড় না…

জিভের ঝঝে, মনের ঝালে মিশে কথাটা ক্রুদ্ধ শোনাল, উগ্র ধমকের মতো। হারীতের শিসটানা শুনে মজুমদার তার মোলায়েমতম গলায় বলল–কোনটা ঝাল লাগল, মিস্টার নন্দী? উত্তরে হারীত একটু ভালোমানুষি হাসির চেষ্টা করল। একটু মিষ্টি খান, এই এটা বেশ উপাদেয় মনে হচ্ছে—মজুমদার তার পরিষ্কার পাতে খুরিসুষ্ঠু রসমালাই তুলল, একটু একটু পাঁপড়ভেঙে তাই দিয়ে তুলে তুলে খেতে লাগল।—দেখছেন তো পাঁপড়ের সুবিধে, চামচেতে চামচে, খাওয়াতে খাওয়া। কিন্তু আপনি বুঝি পাঁপড় ভালবাসেন না? বলে সারা মুখে হাসি ফুটিয়ে হারীতের দিকে তাকাতে গিয়েই হঠাৎ তার মুখের ভাব বদলাল, চোখ সরে গেল, মাংসল ঠোঁট কমনীয় হল, চোখে ফুটল ঠাট্টার বদলে গভীরতা, চোখাচোখি হল সামনে দিয়ে চলে যাওয়া শাশ্বতীর সঙ্গে।

থাকছেন তো?—ঘাড় হেলিয়ে কথাটা বলে শাশ্বতী একটু তাড়াতাড়ি এগোল। নিচে এখন…এতক্ষণে স্বাতীকে সাজানো বোধহয়… কিন্তু মোড় নিয়ে হঠাৎ থামল বাবাকে দেখতে পেয়ে। দূরে, কোণে, যেখানে আলো একটু কম, সেখানে জলের জালা আর থালা-গ্লাসের স্তুপের কাছে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন হেমাঙ্গদার পাশে। শাশ্বতী যেন অনেকক্ষণ পর বাবাকে দেখল, যেন অন্যরকম দেখল। বাবার মুখটা যেন ছোটো, মানুষটাই যেন ছোটো হয়ে গেছেন আগের চাইতে। রেখা-পড়া মুখ, কুঁকড়োনো চোখ, গলার চামড়া ঢিলে, গায়ে সেই ছাইরঙা আলোয়ানটি কেমন বিষণ্ণতার মত জড়ানো—দূর থেকে, আর বাবা অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন বলে, সবই যেন খুব স্পষ্ট দেখল শাশ্বতী! ফিরল—যদিও নিচে যাবার গরজ তার খুব… টেবিল-কের উজ্জ্বল গলি দিয়ে, যুবকদের চকচকে চুল আর মেয়েদের রঙবাহার শাড়ি-গয়নার ধার ঘেঁষে, পাঁপড় পরিবেশকদের ঝুড়ির ধাক্কা বাঁচিয়ে, দূরের কম আলোর কোণের দিকেই শাশ্বতী যেতে লাগল। বাবাকে বলার কোনো জরুরি কথা যে তার মনে পড়ে গিয়েছিল তা নয়, বাবাকে বলার কিছু কথা যে তার ছিল তাও নয়, কিছু না, শুধু মনে হল একবার যাই।

******

আমাদের দেশের অসুবিধে হচ্ছে যে কোনো পলিটিক্যাল এড়ুকেশন নেই–আদার ঝাল সামলে নিয়ে হারীত তার গাম্ভীর্যে ফিরল। মজুমদার তখন জল খাচ্ছিল কিন্তু জলের গ্লাস নামিয়েই কথা বলল না। নেবুতে কচলে নিয়ে গ্লাশের বাকি জলে ড়ুবিয়ে হাত ধুল, বাঁ হাতে বিলিতি সুতির রুমাল বের করে ঘষে ঘষে হাত মুছল। সেটা দুমড়ে বা পকেটে ফিরিয়ে ডান পকেট থেকে বার করল মস্ত ময়ূরকণ্ঠী সিল্কের রুমাল, সেটি একবার ঠোঁটে বুলিয়ে আস্তে আস্তে বলল—সিল্কের রুমালের অসুবিধে এই যে তাতে ঠিকমতো হাত মোছা যায় না। সেইজন্য বিয়ের নিমন্ত্রণে আসতে হলে আমি দুটো আনতে ভুলি না। হারীতের দিকে একচোখে তাকিয়ে তখনই আবার বলল—কিন্তু আপনার কথা খুব সত্যি। এই দেখুন না, আমি এটা পর্যন্ত জানতাম না যে জাপানিরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে জ্যান্ত গরু কেটে-কেটে খায়! কত শিখলাম আজ আপনার কাছে..। হারীতের মাকের বাঁশি দুটি একটু ফুলে-ফুলে উঠল, মজুমদারের রেশমি রুমাল তাতে উপহার দিল ল্যাভেন্ডারের গন্ধ, হারীত ফোঁশ করে নিশ্বাস ফেলল—না, রাগবে না, রাগলে কিছু হবে না। শত্রুপক্ষকেও কাজে লাগানো চাই, তবে তো! আপাতত লোকটার সঙ্গে জুটতে পারলে এই খেয়ে-টেয়ে আর হাঁটতে হয় না। হারীত অমায়িক তাকাল, যেন ঠাট্টা বোঝেনি কিংবা সেও যোগ দিচ্ছে ঠাট্টায়। আলগোছে বলল—আপনি এখন কোন দিকে?

আমি এখন? মজুমদার থামল… এখন বাড়ি? এখনই? আর কোথায়? কোথাও সুখ নেই— সুখ! যারা কিছুই পেল না, সুখ নামক বিখ্যাত বস্তুটা তো তাদেরই কনসোলেশন প্রাইজ! সে কী করবে সুখ দিয়ে?

যদি আপনার পথে পড়ে আমাকে নামিয়ে দিতে পারেন? হারীত খুলেই বলল কথাটা। মজুমদার ফিরে তাকালআপনি থাকছেন না? অবাক হওয়ার সুর লাগল তার গলায়।

আমি ভাবছিলাম… মানে, কথাটা হচ্ছে, এই বিয়ে ব্যাপারটা এত বোরিং!

কোনটা? অনুষ্ঠানটা না পরের অবস্থাটা?—কিছু মনে করবেন না, আপনি অভিজ্ঞ, আপনার কাছে জেনে নিচ্ছি। কথাটা কিরণ বক্সির বিশ্রী লাগল, সেই জুলপিওলা ভদ্রলোকটি আর আরো দুজন হাসলেন কথা শুনে। কিন্তু হারীত হাসতে গিয়ে থেমে গেল, যেন এইমাত্রই তার মনে পড়ল যে মজুমদার স্বাতীর জন্য সচেষ্ট হয়েছিল। আর হঠাৎ, এমন যে চৌকশ ছেলে হারীত নন্দী, তারও একটু অপ্রতিভ লাগল যেন। আর সুখী শাশ্বতী বাবার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল দৃশ্য দেখতে লাগল। ভাঙবার আগে আসর জমাট। আগের চেয়ে সরব এখন, গলা আরো খোলা, অনেকের খাওয়া শেষ, তারা সোৎসাহে কথা ছিটোচ্ছে আশেপাশে, আর দূরে বসা চেনা লোকের দিকে হাত নাড়ছে। কেউ হেলান দিয়ে পান চিবোচ্ছে আরামে, কেউ টেবিলে হাত রেখে ওঠার জন্য তৈরি, অনেকে গ্লাসের জলে হাত ধুচ্ছে। মেয়েদের আর বুড়োদের টেবিলে মিষ্টি চলছে এখনো, ভূপেশদাদু চোদ্দটা রসগোল্লা খেলেন, সবাই খুব হাসল। চমৎকার খাওয়া হয়েছে, বাবা! খুব ভাল খেয়েছে সবাইশাশ্বতী জ্বলজ্বলে মুখে বাবার দিকে তাকাল। না, না, আপনি থাকবেন না তা কি হয়?— মজুমদার নিচু গলায় বলল হারীতকে কী মনে করবে সবাই? আর মিসেস নন্দী… শাশ্বতী বলল—বাবা, চলো এখন। সিঁড়িতে ভিড় আরম্ভ হলে আর—

আপনাকে থাকতেই হবে–মজুমদার হারীতকে পীড়াপীড়ি করল।

আপনি থাকছেন?

থাকব? মিসেস নন্দী বলে গেলেন না?… আঃ, ও-রকম তো সকলকেই বলে। আর বললেই থাকতে হবে? না… খুব হয়েছে, আর না। নন্দীকেই বা আমি কেন? আমি কে? আমার কী? আর এই হিন্দু বিবাহের পবিত্র পুতুলখেলা দেখার চাইতে আরো অনেক ভাল-ভাল ব্যাপার আছে কলকাতায় শীতের রাত্রে। এই লড়াইখ্যাপা জগাইটাকে সেখানে ধরে নিয়ে গেলে কেমন হয়? মজুমদারের বেজায় হাসি পেল কথাটা ভেবে কিন্তু হাসি চেপে গম্ভীর গলায় হারীতের প্রশ্নের জবাব দিল—আমি? আপনি এখানকার যা আমি কি তা-ই? কথার শেষে বসে-বড়ো দাঁত দেখিয়ে হাসল। হারীত মনে-মনে খুব তারিফ করল লোকটাকে। এরকম বলতে, এরকম হাসতে সেও পারত না।

******

মেয়ের সঙ্গে যেতে-যেতে রাজেনবাবু একবার বয়স্কদের টেবিলে দাঁড়ালেন… শোভা ভাবল নিচে গিয়েই পেটিকোটের দড়িটা ঢিলে করতে হবে..নিখিল ভাবল, ডালিমকে আর দেখছি না কেন…ইভা বলল-কলকাতার ক্রিসমাসটা এবার মাটি হল, তোমরা কোথায়..লীলামাসি ভাবলেন, উনি তো এখনই যেতে চাইবেন, কিন্তু আমি বিয়ে না দেখে… কুন্দদিদিমা একসঙ্গে চারটে পান মুখে পুরলেন… হারীত ভাবল, আচ্ছা তাহলে তামাশাটা…কিন্তু আমরা সব বসে আছি কার জন্যে… শাশ্বতী বাবার জামা ধরে টান দিল… তার মেজো-জা ভাবলেন বাবলাটা উঠে পড়েনি তো এতক্ষণে…উর্মিলা আরো ক-টি এলাচদানা মুখে দিল.. আর মহাশ্বেতা ভাবল মেয়েটির চুল কি ঐরকমই না কলে কোঁকড়ানো… আমরা ছুটি হলেই জামতাড়া, তারপর কী হয় না হয় বলতে-বলতে ইভা উঠল… হারীত উঠল, প্রভাত-মেসো আর রেবতী-গিন্নি উঠলেন, সবাই একসঙ্গে উঠল হু-উ-উশ শব্দে… যুবকরা কেউ-কেউ উঠতে-উঠতেই সিগারেট ধরাল, নিখিল জুটল একতলায় পকেটের স্টেট-এক্সপ্রেসের নিরিবিলি সদগতি করতে… চেয়ার… ঠেলা… চলাফেরা শুরু হল… দাত-পড়া পিসেমশাই কাশলেন… একবাড়ির মেয়ে-পুরুষ পরস্পরকে খুঁজল.. যাক, ট্রামের সময় আছে, এবার তাহলে…হেমাঙ্গ সরে-সরে এল কম আলোর কোণ থেকে বিয়ে হবার দিকটায়… উর্মিলা তার মামাকে বলল…আর গোঁফওলা মেয়েটি বলল মহাশ্বেতাকে… মহাশ্বেতা এগোল সিঁড়ির দিকে..আর তার পাশ দিয়ে ঝলকে চলে গেল লাল-কমলা-সবুজ তিনজন, হালকা নামল সিঁড়ি দিয়ে, হাসতে-হাসতে মাঝপথে ছাড়িয়ে গেল দাদুকে আর মাসিকে, লাফিয়ে নামল দোতলায়… দুম।

*****

দোলায় এসে শাশ্বতী বলল–স্বাতী যা উপহার পেয়েছে, সব তুমি দেখেছ বাবা?

সব দেখিনি—একটু যেন ভেবে রাজেনবাবু জবাব দিলেন। দেখবে? এসো, এসো না একবার-শাশ্বতী বাবাকে নিয়ে এল সেই ঘরে, যেখানে বর আসার সময় মহাশ্বেতা শুয়ে ছিল। টাটক নতুন ড্রেসিং টেবিলে বসে ডালিম খুব নিবিষ্ট হয়ে চুলে চিরুনি টানছিল, ঘরে আওয়াজ পেয়ে তড়াক করে উঠল।

ডালিম এখানে?

আমি? এই… এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম দেখলাম ঘরটায় কেউ নেই, তাই… অনেক সব জিনিস টিনিস তো আছে, খালি ফেলে রাখা কি ঠিক?

মোটেও ঠিক না! ঠোঁট গোল করে, চোখ টান করে শাশ্বতী বলল। আর সবাই তো প্রায় তেতলায় গম্ভীর ডালিম আরো যুক্তি দিল—আমি তাই…

তুই বুঝি কোনো কাজে না লেগে ছাড়বিই না? ডালিম ঘাড় পর্যন্ত রাঙল। তাকে অত লাল হতে দেখে শাশ্বতীর মনে পড়ল সেই জল ঢালার দুর্ঘটনা, যেটা অবশ্য, প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ভুলে গিয়েছিল সে—তবে এক কাজ কর, নিচে তোর নতুন মেসোকে একবার দেখে আয়।

সেজোমাসি, মেসো না।

আচ্ছা, তবে তোর সত্যেনদাকেই নিশ্চয়ই! ডালিম সৈনিকের মতো সোজা হল—কিছু বলতে হবে?

এই—একটু কথা-টথা বলবি আরকি। একাই হয়তো আছে এতক্ষণ। আচ্ছা নিস্তেজ শানাল ডালিমের গলা। এর চেয়ে সেজোমাসি তাকে বললেন না কেন এই আলমারিটা ঘাড়ে করে নিচে নিয়ে যেতে? সত্যেনদার সঙ্গে কী কথা বলবে সে? প্রথমে কী বলবে? না কি ঐ উনিই আগে কিছু বলবেন? চিন্তিত ডালিম এগোল, দরজার ধারে থামল। তেতলার সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। মুখ ফিরিয়ে হালকা গলায় বলল—সেজোমাসি, ঐ তো নেমে আসছে সব…আমি তাহলৈ…কী বলো? সেজোমাসি জবাব দিলেন না, মনে হল না শুনতে পেয়েছেন। তাঁর আঁচলঝরা পিঠের দিকে একবার তাকিয়ে ডালিম সরে পড়ল। —এই টিশুশাড়িটা দিয়েছেন লীলামাসি… সচ্চা রুপো বাবা–থরে থরে শাড়ি সাজানো আলনার কাছে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে দ্রষ্টব্যগুলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে শাশ্বতী বলতে লাগল—আর তপনদা এই ফ্রেঞ্চ শিফন… স্কাই-রু… রাত্তিরে রংটা ঠিক… পরেশ কাকা এই মেরুন-রঙের মুর্শিদাবাদ সিল্ক… আর এই, এই ঢাকাই জামদানিটা… এটা শোভাদি দিয়েছে। শেষের কথাটায় শাশ্বতীর গলা নিচু হল, একটু লজ্জিত যেন, যেন বলতে চায় শোভা তব অবস্থার পক্ষে খুব দিয়েছে। রেশ জামানিটা–

রাজেনবাবু মেয়ের দিকে তাকালেন একবার। হ্যাঁ, খুব ভাল—একটু যেন বেশি উৎসাহ শাশ্বতীর গলায়-ভিটের শাড়ি, টাকা-বারো কি দাম হবে না?.. আর জংলি শাড়িটা দ্যাখো… এ-রকম দুটো হয়ে গেল… আর জানো বাবা, শোভনা-শাড়ি… ঐ যে নতুন একরকম ড়ুরে বেরিয়েছে আজকাল সে রকম পাঁচখানা পেয়েছে।

আচ্ছা আমি–রাজেনবাবু নড়তেই শাশ্বতী তাকে কাঁধের কাছে ধরে বলল–এদিকে… এদিকে একটু দেখে যাও বাবা নিয়ে এল ড্রেসিং টেবিলের ধারে।—ফুলদানি দুটো বেশ নতুন ধরনের, না বাবা?… আর এই গালার কাজ-করা ছোট্টো বাক্সটা কী মিষ্টি.. আর এই জয়পুরি মিনেরটা। আর দ্যাখো—শাশ্বতী দেরাজ ধরে টান দিল—এই কলমটা, নিউ মডেল লেডিজ পার্কার, স্বাতীর বন্ধুরা মিলে দিয়েছে… আর দেখেছ, কত্তগুলো সিঁদুরকৌটো… আমার এই হাতির দাঁতেরটাই সবচেয়ে ভাল লাগে…কিন্তু কী-বা হবে এত দিয়ে। আর এই রুপোর ফ্রেমের আয়নাটা? শাশ্বতী এক দেরাজ বন্ধ করে আর এক দেরাজ খুলল… তারপর আরো একটা কিছু একটা ঘুললা, কোনো একটা তুলে দেখল আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেই নিজের উৎসাহে অনর্গল বলতে লাগল–টয়লেট সেট…টিংকেট বক্স…কাশ্মিরি কাজ…।

কই গো, এ-ঘরে কেউ আছে-টাছে নাকি?দরজার কাছে গিন্নি-গলার ভারি আওয়াজ হল। রাজেনবাবু তক্ষুনি সরলেন মেয়ের পাশ থেকে। দেখি, মেয়ে কী পেল-টেল— বলতে বলতে রেবতী-গিন্নি ঘরে এলেন, রাজেনবাবুকে দেখামাত্র ঘোমটা টেনে চওড়া বপুতে ঈষৎ জড়োসড়ো হলেন। আসুন— শাশ্বতী হেসে এগিয়ে এল, রাজেনবাবু দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন। ঘরে এলেন রেবতী-গিন্নি আর তার পিছনে আরো দুজন, সিঁড়িতে পায়ের শব্দ প্রায় শেষ হল। রাজেনবাবু বেরিয়ে যেতে-যেতে শুনলেন—তোমরা দিদিরা কে কী দিলে সেটা দেখি আগে…

স্বাতী যে-ঘরে আছে সেদিকে রাজেনবাবু তাকালেন না, কোনোদিকেই তাকালেন না। সোজা এলেন সামনের দিকের বারান্দায়, যার রেলিঙে ঝুকে সারি-সারি মেয়েরা বর আসা দেখেছিল। এসেই থমকালেন। বিজু পড়ে আছে তক্তাপোশে হাত ছড়িয়ে উপুড় হয়ে, কাঁধ দুটো ফুলে ফুলে উঠছে, ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত কাঁপছে, বেড়ালের ফোঁশফেঁশের মতো কেমন একটা বিশ্রী আওয়াজের ঝাপটা দিচ্ছে এক-একবার, আর তার মাথার কাছে কুঁকে আছে শ্বেতা, গায়ে হাত বুলিয়ে আস্তে কী বলছে। রাজেনবাবু কাছে গিয়ে বললেন—কী হয়েছে?

আর বলো কেন!—শ্বেতার গলা ফিশফিশে শোনাল–বিজুটা এমন….। রাজেনবাবুর মুখ কঠোর হল, বিরক্তির রেখা ফুটল কপালে। শ্বেতা ডাকল—বিজু, এই… লক্ষ্মী তো, ওঠ… আর সময় নেই।—আর কেঁদেহকেঁদে কী হবে—এইহ–সংসারের এই নিয়ম! রাজেনবাবু ফিরে তাকালেন। তাড়াতাড়ি বারান্দার অন্য দিকে এসে বললেন—কী রে বেলি, খুব কষ্ট? একেবারে ফিকে হয়ে-যাওয়া অস্পষ্ট বয়সের একটি বিধবা মেয়ে বাধোবাধো গলায় কথা বলল—টান উঠলে ফাঁকায় ভাল থাকেন, তাই এই বারান্দায়—

বেশ করেছ, বেশ করেছ–তা আর কিছু কোনো ওষুধ-টষুধ—একটু যদি আরাম হয় কিছুতে–।

নাহ কিচ্ছু না কিচ্ছুতে কিছু হয় নাহ—আমিহ্‌–আমি বিজনকে বলছিলাহ্‌ম..

আর কথা বোলো না দাদা—বলে বিধবা মেয়েটি হাঁটু ভেঙে বসে তালপাখা নিয়ে হাওয়া করতে লাগল। কিন্তু হাঁপানিতে ধুকতে-ধুকতেও নেপালবাবু কথা ছাড়লেন না—বলছিলাম যে এমন দিনেহ্‌—এমন দিনে কিহ্‌—এমন দিনে কি কাঁদতে আছেহ্‌—আর কাঁদবাহ্‌র…

রাজেনবাবু কথাগুলি ভাল শুনতে পেলেন না, এমন মন দিয়ে তিনি মানুষটাকে দেখছিলেন। মেঝেতে বিছানো কম্বলে নেপালবাবু বসে আছেন উব-হাঁটু হয়ে, পাশে পিকদানি, কোমরের কাছে কে জানে-কতকালের বালাপোশটি। চোঙের মতো হাঁটু দুটোর উপর দিয়ে এসে দড়ির মতো হাত দুটো ঝুলছে। ধসা মাটিতে এক আধটা ঘাসের মতো গর্তগালের ফোকরে-ফোকরে দাড়ির কুচি। আর ঘোলা দুটো চোখ যেন তাদের উপরওলা কপালের দিকে তাকাতে সাংঘাতিক সচেষ্ট—রক্তমাংস সব চেটে-পুটে খেয়ে গেছে, তবু জীবন্ত। আর ওরই মধ্যে গলাটা… চামড়ার দেয়ালে ভাগ করা কামরায় মোটা-মোটা শিরা আর পিণ্ডের মতো একটা কণ্ঠমণি নিয়ে গলাটা যেন নিশ্বাস নেবার কোনো আশ্চর্য যন্ত্রের মতো আলাদা করে জীবন্ত। কদবার হয়েছে কীএ তো সুখের—কত সুখেহর—আমি—আমি যখন–যখন সেইহ—সেই নেপালবাবু হয় আর বলতে পারলেন না, নয় কী বলছিলেন ভুলে গেলেন। রাজেনবাবু সেখানে আর দাঁড়ালেন না। তাঁর মনে পড়ল যে ইনিও একদিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন–একটিই মেয়ে, একমাত্র সন্তান তার। মেয়েটা মরে গেল বিয়ের পরে দু-বছর না পুরোতে, নাতনিকে এনে রাখলেন দাদা-দিদি, তারপর তারও বিয়ে দিলেন, বিধবা হয়ে ফিরে এল সে, আর এখন সেই নাতনিকে নিয়েই সাতগাছিতে বেঁচে আছেন ছত্রিশ টাকা পেনশন নিয়ে এই জীর্ণ বিপত্নীক। আর ইনি মারা গেলে বেলিটার…কিন্তু ভাবনা কোথাও এসে থামেই।

পুরুতঠাকুর উপরে গেছেন, সত্যেনকে ডাকতে যাচ্ছে, বিজু শিগগির—বড়দির এই কথায় বিজু বয়লারের স্টিমের মতো আওয়াজ ছাড়ল। রাজেনবাবুর উপরের ঠোঁট নিচেরটির উপর চেপে বসলো। কপাল এমন ঘন হয়ে কুঁচকালো যে চোখ দুটি ছোট দেখাল। ছেলের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে ডাকলেন–বিজু, ওঠ। বিজুর সমস্ত শরীর কাতরিয়ে উঠল একবার, তক্তার কর্কশ ধারটা মুঠোয় আঁকড়ে স্তব্ধ হল। ওঠ-ছোটো, ছোট্টো আওয়াজ হল শ্বেতার। কী? ব্যাপার কী? বিজুর পায়ের দিকটায় দাঁড়াল এসে মহাশ্বেতা-সরস্বতী। শ্বেতা বলল-কিছু না, ওদিকে কদ্দূর?

প্রায় তৈরি, বিজু উঠছে না কেন?

এই উঠবে এবার, একটু শুয়ে নিল–যা খাটুনি যাচ্ছে!

ছোট দু-বোন বিশ্বাস করেছিল দিদির কথা, কিন্তু বিজু উঠে বসতে ব্যাপার বুঝল। চোখ দুটো এমন ফুলেছে যে চেনা যায় না। দুবোন চোখাচোখি করল, সরস্বতী ঠোঁট বাঁকাল আর মহাশ্বেতার ঠোঁটে সেই ভঙ্গিটি প্রতিফলিত হতে-হতে হঠাৎ তার মুখের ভাবই বদলে গেল, আর সেই বদলানো ভাবটা প্রতিফলিত হল সরস্বতীর মুখে। দুজনে দুদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

বিজহ্‌ন–যাওহ্‌-তোমাহ্‌র কাজ—কত সুখেহ্‌র—কতহ্‌–কতহ্‌-খ্‌খ্‌খ্‌খ্‌ক্‌! কোনো পুরোনো কিন্তু শক্ত জিনিসের ফেটে যাওয়ার মতো আওয়াজ হল। নেপালবাবু তার ভিতরকার অফুরন্ত শ্লেষ্মর একটি টুকরো টেনে তুললেন, মাথা ঢলে পড়ল, বিধবা বেলি পিকদানি ধরল মুখের সামনে। সরস্বতী বাঁকা চোখে একবার সেদিকে তাকাল, তারপর বাবার কাছে এসে বলল–বাবা, স্বাতীকে একবার দেখবে চলো–সাজানো বোধহয় ভালই হয়েছে। এতে তার নিজের কারিগরি অনেকটা বলে বিনয় করে বলল।

ওঠ না!—হঠাৎ যেন ধমক দিলেন রাজেনবাবু, অস্বাভাবিক শোনাল তার গলা। কুঁকড়ে বসে থাকা বিজু বাদর দিকে মুখ তুলল, তার ঠোঁট নড়ল, কিছু বলতে গেল বোধহয়, কিন্তু দুটো নাকই বন্ধ আর শসায় একদম আওয়াজ নেই। মুখ দিয়ে জোরে একবার নিশ্বাস ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেল, কারো দিকে তাকাল না। বাবা স্বাতীকে একবার। কিন্তু এবারেও সরস্বতীর কথাটা বাবার যেন কানেই গেল না।

এখানে বিছানা করে কি ভাল করে—একটু ব্যস্তভাবেই তিনি বলতে লাগলেন-বালিশ দিয়ে উঁচু করে দিক, আর নেপালবাবুকে এখানে… অসুস্থ মানুষ… কী যে সব— সব মানে কারা, আর নির্দেশগুলোই বা কাকে দিচ্ছেন তা ঠিক বোঝা গেল না। একটি শীর্ণ হাত নিষেধ জানিয়ে ন্যাতার মতো নড়ল, আর বেলি মৃদুস্বরে বলল—এ-ই বেশ আছে, আপনারা মিছিমিছি…। না-না-তা কি হয়, হেলান দিয়ে উঁচু করে বসাতে হয়—আর একটু নিরিবিলি কেমন অসহায়ের মতো রাজেনবাবু এদিক-ওদিক তাকালেন। সরস্বতী সক্ষমভাবে বলল—আমি দেখছি। লোক ডেকে আনল সে। তারা তজ্ঞাপপাশে পুরু করে বিছানা পাতল, গোটাপাঁচেক বালিশ দিল, কেলির সঙ্গে ধরাধরি করে রাজেনবাবু রোগীকে এনে বসিয়ে দিলেন, পিঠে ঘাড়ে বালিশগুলি অকারণেই নেড়েচেড়ে বললেন—কেমন? ঠিক আছে? এখন ঠিক আছে? বেলি বিব্রত হয়ে বলল—আপনি কেন… আমি… আমি দিচ্ছি সব ঠিক করে।

এই যে রামের মা–তোমাকে এখন আর কিছু করতে হবে না—এখানে বসে থাকো, যদি কিছু লাগে-টাগে—

কিচ্ছু লাগবে না রাজেনদাদু… মিছিমিছি… এমনিতেই কত—মোছা-মোছা বেলির কুণ্ঠিত কথা এর বেশি এগোল না, ঝলমলে দুই বোনের দিকে আদ্ধেক পিঠ ফিরিয়ে দাদার গা ঘেঁষে এমন করে সে বসল যে দেখা যায় কি না যায়। নেপালবাবু আর কথা বলার চেষ্টা করলেন না, কী হচ্ছে তাও যেন বুঝলেন না। তার গোল-গোল ঘোলা চোখ উপরদিকে তাকিয়ে কেমন স্থির হল, ঘেঁড়া জুতোর হাঁ-করা চামড়ার মতো ঠোঁট দুটো খুলে থাকল, মুখের কালো গর্তটা ভরে ভরে হাপরের মতো তিনি হাওয়া টানতে লাগলেন… হাওয়া, শুধু হাওয়া…নিশ্বাস। হয়তো নরম বিছানায় পাঁচ বালিশে হেলান দিয়ে একটু আরাম তার হয়েছিল কিংবা হয়তো তখনকার মতো ড়ুবে ছিলেন সেই নির্বোধ উদাসীনতায়, যা রোগযন্ত্রণার সবশেষের আসান। মহাশ্বেতা সরস্বতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটি দেখল, সরস্বতী চেষ্টা করল বাবাকে চোখে ডাকতে, কিন্তু চোখে চোখ ফেলতেই পারল না। ফিরে যেতে-যেতে ফিশফিশিয়ে বলল—বাবার সবটাই বাড়াবাড়ি!

বুড়ো এখানেই মরবে-টরবে না তো?—একটু উদ্বিগ্ন প্রশ্ন করল মহাশ্বেতা।

আরে না! হাঁপানিতে কেউ মরে না।–এ কথা শুনে মহাশ্বেতার চিন্তা হল নেপালপিসে তাহলে কীসে মরবেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে বলল—একে বিজু না আনলেই পারত।

বিজুর বুদ্ধি!—সরস্বতী থামল কনে-সাজানো-ঘরের দরজায়। নেপালবাবু একটি পা টান করলেন, আর একটা উঁচু হয়েই থাকল, কেলি আস্তে সেটিও টান করে বালাপোশে ঢাকল, আর রাজেনবাবু দাঁড়িয়ে থাকলেন সেখানেই। তার মুখে চিন্তা.. প্রায় দুশ্চিন্তা। কী যেন একটা জরুরি কথা তিনি ভুলে গেছেন, কিছু একটা তার করা উচিত… এখনই করা উচিত, কিন্তু সেটা যে কী তা কিছুতেই মনে পড়ছে না। বেলির দিকে, নেপালবাবুর দিকে চোখ ফেললেন, হঠাৎ মনে হল—এরা কে? এদিক-ওদিকে তাকিয়ে আর কাউকে দেখতে পেলেন না—কোথায় সব? রাজেনবাবু বারান্দা পার হলেন, মুখোমুখি ঘরগুলির মাঝখানের গলি দিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ ডাক শুনলেন—বাবা! কিছু না, মেয়েলি গলায় ঐ ডাক জীবনে লক্ষবার তিনি শুনেছেন, কিন্তু হঠাৎ তার যেন দম বন্ধ হল। একটু পরে বুঝলেন, পরদা-ঢাকা দরজার সামনে শাশ্বতী। বাবা! শাশ্বতী হাসল—তুমি যেন আমাদের চেনোই না আজকাল? রাজেনবাবু কথা বললেন না, হাসির কোনো চেষ্টা করলেন না—এসো একটু এ-ঘরে, শাশ্বতী নিচে যাচ্ছিল বিয়ে আরম্ভ হবার আগে সত্যেনকে আর একবার দেখতে, বাবাকে দেখে থেমেছিল, বাবাকে নিয়ে ফিরল। ভিড় নেই এখন, ঘরের চারিদিকটা ফাঁকা, কিন্তু মাঝের গোল দলটি আগের চেয়ে বড়ো আর আগের চেয়ে নীরব, নিবিষ্ট। সকলেই যেন মন দিয়ে একজনকে দেখছে, কেউ বেশি কিছু বলছে না। বাবা এসো!—শাশ্বতী ঘরে এসে আবার ডাকল—দ্যাখো, কী সুন্দর দেখাচ্ছে স্বাতীকে! তার গলা পেয়ে কেউ-কেউ ফিরে তাকাল। সরস্বতী এগিয়ে এল, উষাবৌদি মাথায় কাপড় টানলেন, বড়োপিসির মুখটা একটু করুণ হল। গোল-দাঁড়ানো মেয়েরা দুটো অংশে ভাগ হয়ে জায়গা করে দিল। শাশ্বতী আর সরস্বতী বাবাকে নিয়ে এল ঠিক মাঝখানটায়… মুখোমুখি। স্বাতী..সাদা সুন্দর মেঝেতে সুন্দর সাদা চিকনপাটির উপর স্বাতী দাঁড়ানো। পায়ের পাতা সোনালি পাড়ে ঢাকা। শুধু আঙুলের ডগাটুকু ফুটে আছে। মাথার চুলও সোনালি পাড়ে ঢাকা, শুধু সিঁথির সরু রেখাটি যেন নতুন ফুটে আছে। স্বাতী! সোনার তারা-জুলা শাড়ি লাল উঠে গেছে ঝিলিক তুলে-তুলে, আবার নেমেছে সোনালি, কালো চুলের উপর দিয়ে সাঁকোর মতো তরুণ ঝিনুকের মতো যে কান দুটি এইমাত্র পান্নার দুলে ভারি হল—তার পাশ দিয়ে অন্তরঙ্গ পদ্মলাল জামার কাঁধে উজ্জ্বল পান্না-চুনি মেশানো নেকলেসটিকে পাশ কাটানো, এখনকার মতো স্বাধীন-শক্তিহীন বান্থটির কম-ফর্সা বাইরের দিকটাকে ছুঁয়ে-না-ছুঁয়ে পড়ন্ত…স্বাতী! তার কপালে যেখানে একটি না একটি চুলের গোছা প্রায় সব সময় অবাধ্য লোটাত, টান করে বাঁধা চুলের তলায় সেই কপালটি এখন নতুন চাঁদের মতো মসৃণ আর চাদের গায়ে দাগের মতো ফোঁটাফোঁটা সাদা চন্দনে সাজানো। আর সেই চুলের গোছা তুলে দিতে যে হাত বারেবারেই উঁচু হত, সে হাত দুটি এখন বেকার ঝুলছে পাশে। বাঁ হাতের আংটি-পরা আঙুলটি বোধহয় অনভ্যাসে বেঁকে আছে, গোলাপি নখটি বোধহয় না জেনেই সোনালি পাড়টিতে পড়েছে। স্বাতী… তার মুখ….সুখদুঃখের ব্যস্ত সেই রঙ্গমঞ্চ–এতদিন পরে একটু যেন বিরতি পেল। আলো জ্বলে আছে, দৃশ্যপট সাজানো কিন্তু কুশীলব নেই। ফাঁকা, চুপ, চোখের উপর ভারি হয়ে নেমেছে একটু ফোলা-ফোলা গোলাপি দুটি পাতা। ভরা-ভরা সজল ঠোঁট দুটি বোজা, নাকের একটি বাঁশির চোখে-না-পড়ার মতো ঈষৎ স্পন্দন ছাড়া সমস্ত মুখে আর ভাষা নেই। রাজেনবাবু এসে দাঁড়াবার পর মিনিটখানেক স্তব্ধ থাকল ঘর, তারপর নতুন করে গুঞ্জন উঠল—সুন্দর..কী সুন্দর দেখাচ্ছে.সুন্দরী সত্যি।

শাশ্বতী নিচু গলায় বলল-শাড়িটায় খুব মানিয়েছে, না বাবা? কিন্তু রাজেনবাবু শাড়ি দেখছিলেন না। সোনালি-লাল উজ্জ্বল সেই শাড়ি, পদ্ম-লাল জামা, পান্নার দুল আর পায়া-চুনির হার, হাতের সাদা শাখার পাশে ঝকঝকে নতুন চুড়ি আর করুণ—এসব কিছুই তাঁর চোখে পড়ছিল না। যাকে ঘিরে এত লোক এখন দাঁড়িয়ে, এত জোড়া চোখ যার দিকে এখন নিবিষ্ট, সেই মানুষকে যেন চোখেই দেখছিলেন না তিনি। কিন্তু তাকেই দেখছিলেন…রাজেনবাবু স্বাতীকেই দেখছিলেন—ফ্রক-পরা হোট্টো, দুরন্ত, অস্থির স্বাতীকে… ছোড়দির সঙ্গে হুলুস্থুল ঝগড়া-করা… মা-র কাছে ধমক খেয়ে কেঁদে-কেঁদে ঘুমিয়ে পড়া… কেঁকড়া মাথাটা বাবার কাঁধে রেখে নাখেয়ে ঘুমিয়ে পড়া। হঠাৎ রাজেনবাবুর চোখের সামনে কুয়াশা নামল… মস্ত ঘর, আলো, লোকজন মিলিয়ে গেল। স্বাতীকে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়ে এইমাত্র শুইয়ে দিলেন তার মার কাছে, আর বিছানায় হাঁটু উঁচু করে বসে রোগা মুখের বড়ো বড়ো চোখে ঘুমন্ত মেয়েকে দেখতে লাগলেন মা। রাজেনবাবু মেয়েকে ভুলে মা-কেই দেখতে লাগলেন… মুখ তুলবে… কিছু বলবে এখনই। কিন্তু রোগা মুখের ক্লান্ত চোখ দুটি নড়ল না… শুধু চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।

শোনো—

রাজেনবাবু কেঁপে উঠলেন। কে কথা বলল? বাবার কানের কাছে সরস্বতী বলল-গয়না সব পরাইনি, বাবা। জবড়জং হয়ে যায়। রাজেনবাবু নিশ্বাস ছাড়লেন। আবার সব স্পষ্ট হল, বাস্তব হল। দেখলেন চোখের সামনে উজ্জ্বল, সুন্দরী, সুদূর স্বাতীকে। কবে বড়ড়া হল? এত বড়ো হল কবে? রাজেনবাবু অবাক হলেন।

স্বাতী, একটু তাকাও তো এদিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ঊষাবৌদি সূক্ষ্ম চোখে সন্দেহ করছিলেন যে সিঁথির ঠিক পাশেই একটা ছোট্টো চুল এর মধ্যেই দলছুট, তাই আবার বললেন—দেখি একটু.. আহা, মুখটা আবার নামালে কেন? কিন্তু স্বাতীর মুখ আরো নিচু হল। মনে মনে বলল বাবা… আজ সারাদিন বাবাকে সে চোখে দ্যাখেনি। আজ কতদিন বাবা তার মুখের দিকে তাকান না—তাকাতে পারেন না। সেও যায় না বাবার কাছে, কাছে গিয়ে দাঁড়ায় না, কিছু বলে না। আবার মনে মনে বলল—বাবা…বাবার আলোয়ানের ফ্যাকাশে রঙ দেখল… জামার হাতা… একটি হাত… তারপর সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হাতটি নিচু হল, তারপর দেখল ধুতির ভাঁজ, কোঁচা, চটি। বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারল না স্বাতী, মেয়ে হয়ে জন্মাবার লজ্জায়, গৌরবে, দায়িত্বে তার চোখ আরো নিচু হল।

******

নিচে তখন অতিথিরা চলে যাচ্ছে, রাস্তা পর্যন্ত সরগরম। বিদায়-ব্যাপারে খামকা দেরি না করে বেশির ভাগ চটপট ছুটেছে ট্রাম ধরতে। ছোটো-বড়ো দলে ভাগ হয়ে, ছুঁচোলো আর ভারি জুতোর শব্দে, সরু-মোটা গলার কথায়, আলো-নেবানো ডর-লাগা কলকাতার শীতরাতের চুপচাপ রাস্তায় হঠাৎ একটা চঞ্চলতার ঢেউ তুলেছে তারা। এদিকে দূরে দাঁড়ানো খানদশেক গাড়ি ঘন-ঘন শিঙে ফুঁকতে-ফুঁকতে পিছু হটে-হটে একে-একে বিয়েবাড়ির ফটকে দাঁড়াচ্ছে। কেউ রাস্তায় এসে ট্যাক্সি খুঁজছে কি রিকশ নিচ্ছে। কেউ বলছে—হেঁটেই যাই চলো, আর পথ-চলা কেউ-কেউ ভিড় বাঁচাতে থামছে, বাড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে বোমাবিব্রত চিত্তে ভাবছে—বাঃ, আবার বিয়ে! ফটকের কাছে দু-জন লোক পিছুহটা গাড়ির তদারকে ব্যস্ত, আর বারান্দায় যেখান দিয়ে সবাই বেরোচ্ছে তার দুদিকে ইরু আর গীতি রুপোর থালায় পান নিয়ে দাঁড়ানো–যদি যাবার সময় আর একটার ইচ্ছে হয় কারো। আর সিঁড়ির প্রথম ধাপটায় হেমাঙ্গ দাঁড়িয়ে অতিথিদের বিদায় দিচ্ছে। বয়স বুঝে, সম্পর্ক বুঝে, চেনার মাত্রা বুঝে প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে একটি করে কথা বলছে সে, আর যারা একেবারে অচেনা, তাদের বলছেআচ্ছা, নমস্কার। তার এই অভিবাদন অনেকে লক্ষ্যই করছে না। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে কিংবা ট্রাম পাবে কিনা ভাবতে-ভাবতে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হেমাঙ্গ যখনই আবার অচেনা কাউকে দেখছে, তেমনি মাথা হেলিয়ে, ঠিক তেমনি করেই আবার বলছে—আচ্ছা, নমস্কার। ভিড় যখন অনেক হালকা, থলথলে গিন্নি আর ভর-বয়সী কুমারী দুটি মেয়েকে নিয়ে রেবতীবাবু বেরোলেন। হেমাঙ্গ এঁকে আগে একবারই একটুখানি দেখেছিল, কিন্তু দেখেই চিনল, মানুষের মুখ তার খুব মনে থাকে। হাতে হাত ঘষে বলল—আপনারা এখনই—

হ্যাঁ, যাইহেমাঙ্গর কথাটা শেষ হবার আগেই রেবতীবাবু জবাব দিলেন—থাকবার তো ইচ্ছে ছিল খুব— এঁদের তো খুবই, স্ত্রীর দিকে মাথা নোয়ালেন তিনি, আবার মহিলাটি যেন এই চপলতায় ক্ষুব্ধ হয়ে শক্ত মুখ ফিরিয়ে নিলেন—তবে আমার শরীরটা তেমন, আবার না ঠান্ডাফান্ডা লেগে…। হেমাঙ্গ তাড়াতাড়ি বলল—তাহলে আপনাকে একটা গাড়ি—

কিছু না! রেবতীবাবু হাত তুললেন— আরে এইটুকু তো পথ, এর জন্য আবার… আচ্ছা, খুব ভাল হল, চমৎকার। বলতে বলতে সপরিবারে সিঁড়ি ক-টা নামলেন। এর পরে দেখা গেল ভাগনির সঙ্গে মজুমদারকে। তাকে দেখে হেমাঙ্গর মুখ প্রথমে হাসি-হাসি হল, তারপর নিরাশ হল–আপনিও যাচ্ছেন?

আপনিও!… কেন, আমি কি বিশেষ কেউ? মজুমদার সংক্ষেপে বলল—যাচ্ছি।

আমরা খুব আশা করেছিলাম আপনি—উর্মিলার দিকে তাকিয়ে হেমাঙ্গ তাড়াতাড়ি নিজেকে শোধরাল—আপনারা থাকবেন।

খুব বেশি আশা করাটা কিছু না মজুমদার হাসল না, এমন করে কথাটা বলল যে প্রায় রূঢ় শোনাল। তারপরেই যেন নিজেই সেটা বুঝে চওড়া হেসে আবার বলল—আজ চলি, আবার দেখা হবে। আপনি তো এখানেই—এই বাড়িতেই? উর্মিলা এই সুযোগে তার মনের ইচ্ছাটা আর একবার ব্যক্ত করল—একটু থাকি না, মামা। মজুমদারের মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল–কঠোর চোখে ভাগনির দিকে তাকাল। মামার এই দৃষ্টি তার চেনা—এটার মানে হচ্ছে যে আমার কথামত ঠিক ঠিক চল তো সব পাবে, আর তা যদি তোমার পছন্দ না হয় তোমাকে অবিলম্বে ফেরৎ পাঠাচ্ছি তোমার মার কাছে নাথুরামপুরে। উর্মিলা কুঁকড়ে চুপ করল। আবার হাসিমুখে মজুমদার হোঙ্গকে বলল–আপনাদের যদি অসুবিধে না হয়, পন্টিয়াকটা নিয়ে যাই? মানে, অস্টিনটা আবার ড্রাইভার ফিরিয়ে নিয়ে গেল কিনা! এমন করে বলল যেন ড্রাইভার নিজের বুদ্ধিতেই এটা করেছে, কর্তার কোনো হাত ছিল না। হেমাঙ্গ মনে-মনে হাসল— ছেলেমানুষ, নতুন গাড়ি কিনেছে নিশ্চয়ই, আপনার গাড়ি আপনি নিয়ে যাবেন তাতে আর কথা কী? আর আমাদের কাজ তো সব হয়েই গেছে। সত্যি, কত উপকার করলেন আপনি আমাদের! হেমাঙ্গ বুঝল যে মজুমদার এটা আরো একবার শুনতে চাচ্ছে, সেইজন্য শেষের কথাটা বলল। মজুমদারের শুনতে ভাল লাগল, কিন্তু সেই সঙ্গে চিড়িক করে উঠল মাথার মধ্যে রাগ। উপকার! পরোপকার কি তার পেশা? মনে পড়ল হারীত নন্দী তার সঙ্গেই উপর থেকে নামছিল—উঃ, বকতেও পারে লোকটা— দোতলায় আসতেই সেই লাল-মালা-গলায় বোন কোত্থেকে বেরিয়ে এসে বলল-নন্দী, যাচ্ছে কোথায়? আরে শোনো—এদিকে এসোর মুহূর্তে যেন ঘোড়ার মতো মানুষটাকে ভেড়া বানিয়ে টেনে নিয়ে গেল, আর এরই মধ্যে তার দিকে একবার মাথা হেলিয়ে, মিলুর দিকে একটু হাসল। নন্দীর হাত থেকে এতক্ষণে রেহাই পেয়ে তখন মজুমদার হাঁফ ছেড়েছিল, কিন্তু মাত্রই কয়েক মিনিট পরে ঘটনাটা মনে করে অপমান লাগল তার। নিজের মনে যতই বুঝল যে অপমানের কোনো কথাই এতে নেই, ততই মাথা আরো গরম হল; ইচ্ছা করল কোনো একটা কড়া কথা শোনাতে, বেশ বিধবে এমন কথা, কিন্তু ভদ্রতা বাঁচিয়ে কী এমন বলা যায় তাও ভেবে পেল না, আর তাকিয়ে দেখল মেজজামাইটি এইমাত্র বেরোনো অন্য এক দলের দিকে মন দিয়েছে। বড় দল, পানের থালা হাতে লাল আর কমলা শাড়ি-পরা মেয়ে দুটির সঙ্গে কথা বলছেন ময়লামতো সুশ্রী এক আধবুড়ো, বয়স কম হলে নন্দীর মতো দেখাত।

ফাইন গার্লস! ফাইন ইয়ং উইমেন! বলে হারীতের উৎসাহী বাবা অস্বাভাবিক সাদা নকল দাঁতে হাসলেন। নিজেদের সম্বন্ধে ইয়ং উইমেন আখ্যা শুনে ইরু আর গীতি সারামুখে চাপা হাসল, তারপর সরে এসে চোখাচোখি করে খামকা হেসে উঠল শব্দ করে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় সিগারেটটি নিঃশেষে টেনে ফিরে আসতে-আসতে সেই শব্দের শেষ তরঙ্গটি পোঁছল খয়েরি ফ্ল্যানেলের পুরোনো শার্ট পরা নিখিলের কানে।

আপনি একটা পান? হেমাঙ্গ ফিরে তাকাল মজুমদারের দিকে। ইরু তাড়াতাড়ি সামনে এসে থালা বাড়াল। টুকটুকে লাল শাড়িপরা ফুটফুটে মেয়েটির দিকে মজুমদার একবার চোখ রাখল, একটু হাসল, একটি পান তুলে নিল। একটু যেন ব্যস্তভাবে হেমাঙ্গ বলল—আমার মেয়ে। হেমাঙ্গর ব্যস্ততা মজুমদার লক্ষ্য করল না, রাগ ভুলে গেল। ঠিক সেখানে সেই মুহূর্তে হালকা ছিপছিপে সুশ্রী কিশোরীটির কাছে এসে দাঁড়ানোয় তার মনের কোনো একটা নরম জায়গায় যেন চাপ পড়ল, হঠাৎ একটি লাবণ্যের রেখা বেরোল তার ঠোঁটের কোণে যখন সে বলল— বুঝেছি। নয়তো কি আর এমন রূপ? একথা শুনে চাদির ছোট্টো টাকে হাত বুলিয়ে হেমাঙ্গ বর্ধন সবিনয়ে হাসল, যেন কন্যার এই রূপের কৃতিত্বটা একান্তই তার। আর তারপরেই আবার এগোল শাশ্বতীর শ্বশুরবাড়ির দলটির দিকে, তারা তখন সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে।

পিছনে সরতে গিয়ে মজুমদার শুনল মিলুর নম্র গলা–মামা, চলো আমরাও…। মিলুর দিকে অর্ধেক ফিরে মজুমদার বলল—আচ্ছা, তুই থাক। তৎক্ষণাৎ উজ্জ্বল হল ছ-কোণ-চশমা-পরা রঙিন মুখ। উর্মিলা অবাক হল না। মামার এই হঠাৎ মতি বদলে সে অভ্যস্ত। বোকা নয়, সে বুঝে নিয়েছে মামা তার অধীনদের নাচাতে ভালবাসেন, নিজের কর্তৃত্ব নানারকম করে চাখতে ভালবাসেন। ঊর্মিলা তখনই একটু চাটনি যোগাতে যাচ্ছিল মামার পছন্দমতো কিছু কথা বলে, কিন্তু সময় পেল না। সুবীরকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দেব ঘন্টাখানেক বাদে মজুমদার ভাগনির দিকে দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করল না, হেমাঙ্গকে সামনে দেখে মাথা নুইয়ে–আচ্ছা চলি, বলেই টপকে সিঁড়ি নামল, নন্দী-পরিবারকে ছাড়িয়ে প্রায় দৌড়ে বেরোল রাস্তায়, অন্ধকারে মিশে থাকা কালো পন্টিয়াকটায় উঠে বসে যেন বন্ধুকে ফিরে পেল। কোথায়…এখন কোথায়?… কোথায় আর বাড়িতেই, সেই বাড়িতে, যেখানে গলা পর্যন্ত আরাম কিন্তু সুখ নেই। সুখ না থাক ঘুম তো আছে, আর তারপরেই আবার দিন, আবার কাজ। কিন্তু এখনই ঘুম? শোওয়ামাত্রই টুপ করে, তবে তো? তাই ক্লান্তি চাই, আরো ক্লান্তি। মজুমদার গিয়ার বদলালো কোথায়? ডন জুয়ানের হুল্লোড়? গীতালি? না কি আজ? না কি বাড়ি ফিরে আপিশের ম্যানেজারকে তলব করে পাঠাবে, লেপের তলা ছেড়ে কাপতে-কাঁপতে ছুটে আসবে বুড়ো মানুষটা। না, কোথাও না, কোথাও কিছু নেই। কেবল খোশামোদ। বাবা সুষ্ঠু হাত কচলে কথা বলেনঘেন্না করে। টাকা না থাকলে কী জঘন্য, আবার টাকা থাকলেও জীবন কী জঘন্য। মা যদি মরে না যেতেন–শ মজুমদার খিস্তি করে ব্রেক কষল। সামনে ওটা গরু? দ্যাখো কাণ্ড, সাধে কি আর গরু বলে! মজুমদার লম্বা হর্ন দিল, কিন্তু মানুষের পিলে চমকানো সেই নিউ-মডেল ইলেকট্রিক হর্নের আওয়াজে গরুটা একটুও বিচলিত হল না, প্রকাণ্ড দামি পন্টিয়াক গাড়িটা তার জন্যই যে থেমে আছে তা বুঝলই না মোটে, দিব্যি নিশ্চিন্তে এক-পা দু-পা সরল, নড়ল কি নড়ল না, যেন কায়ক্লেশে কিঞ্চিৎ পাশে সরে ঠিক গাড়ি যাবার মতো জায়গাটুকু করে দিয়ে ওখান থেকেই গলা বাড়িয়ে সাদার্ন এভিনিউর মাঝখানের জমির শুকনো ঘাস ছিড়তে লাগল আর মজুমদার তার ল্যাজ ঘেঁষে একটা বদমেজাজি মোড় নিয়ে ল্যান্সডাউন রোডে বেঁকল— এই এক ফ্যাঁকড়া হয়েছে ব্ল্যাক আউট-গাড়ি চালিয়েও সুখ নেই।

******

ততক্ষণে বিয়েবাড়ির একতলার কার্পেট-মোড়া বড়ো ঘরটির ভিড় কমে-কমে মাত্রই জন পনেরো পুরুষে ঠেকেছে। নিকট আত্মীয়, কি যারা স্ত্রীর কথা ঠেলতে পারেনি কিংবা যাদের নিজেদেরই উৎসাহ কি কৌতূহল বেশি–বরের কাছাকাছি সরে বসেছে তারা। সংখ্যায় কম, প্রায় সকলেই সকলের চেনা, সকলেই এইমাত্র খুব ভাল খেয়েছে। একটু বেশি বয়স্ক, যাদের এখনই চোখ ঘুম-ঘুম, তাদের বাদ দিয়ে সকলের মুখেই কথার আগ্রহ। এখন আর যুদ্ধের কথা বলছে না কেউ—কিরণ বক্সি সুন্ধু আপাতত বোমা ভুলেছে। হারীতও ওখানে নেই যে মনে করিয়ে দেবে। আজ রাত্রির ঘটনা নিয়েই কথা হচ্ছে এখন, সামনে উপস্থিত নায়কটিকে লক্ষ্য করেও মন্তব্য পড়ছে মাঝেমাঝে। …এইটুকু থেকে দেখে আসছি তো–গোল মুখে সোনার সরু চশমা পরা প্রভাতমেসো বলছিলেন—চমৎকার মেয়ে, চমৎকার বুদ্ধিমতী। রাজেনবাবুর ভারি ভাবনা ছিল এ-মেয়েকে কার হাতে দেবেন। অবশ্য রাজেনবাবুর মুখে এ বিষয়ে কোনো দুর্ভাবনার কথা কখনো তিনি শোনেননি, কিন্তু বলতে দোষ কী— তা মেয়ে নিজেই বাপের ভাবনা ঘোচাল… বেশ, বেশ! বলে সপ্রশংস কৌতুকের কটাক্ষ করলেন সত্যেনের দিকে। আজকাল তো এ রকম বিয়েই বেশি হচ্ছে–বললেন তপনদা, টাটকা বিলেতফেরত ঝকঝকে ব্যারিস্টার। বেশি বেশি কী হে? সমস্ত দেশের মধ্যে ক-টা হয় এরকম? চোদ্দটা রসগোল্লা খাবার পরেও অকাতরে তর্কে নামলেন ষাট-পেরোনো ভূপেশদাদু। না হয় তো হওয়া উচিত—জোরগলায় ঘোষণা করলেন তপনদা, কেননা বিয়ের যোগ্য ছেলেমেয়ে থাকা দূরের কথা, তিনি নিজেই অবিবাহিত। রূপ, গুণ আর বাপের পয়সা-প্রতিপত্তির হিসেব মিলিয়ে-মিলিয়ে দুটি তরুণীর সঙ্গে কিছুদিন ধরে পূর্বরাগ চালাচ্ছেন, এখনো মনস্থির করতে পারছেন না। উচিত কেন? এঞ্জিনিয়ার পরেশকাকা ভূপেশদাদুর পক্ষ নিলেন।

আমাদের এই কনে-দেখা-বিয়েটা একটা বর্বরতা।

অ্যাঁ! বর্বরতা! থুতনি উঁচু করে প্রভাতমেসো হা-হা হাসলেন–দেশসুদ্ধ লোককে বর্বর বলে দিলে?

দেশসুদ্ধ কেন, পৃথিবী ভরেই এই নিয়ম—অকাট্য কথা যে বলে তার গলা যেমন নিচু হয়, তেমনি নিচু গলায় পরেশকাকা বললেন—সব দেশেই বেশির ভাগ মা-বাবাই সব ঠিক করে দেয়, তারপর ঐ একটা নিয়মরক্ষা আরকি।

নাকি? তপনদা বাঁকা চোখে তাকালেন।

অবশ্য ভাল ভাল ঘরের কথা বলছি। সেখানে বিলেত-টিলেতেও কড়াক্কড়–পরম প্রত্যয় ফুটল পরেশকাকার কথায়, কেননা, ইংলন্ড, স্কটলন্ড আর জনির কল-কারখানার এলাকায় প্রায় নির্বিঘ্নেই যৌবন কাটিয়ে এসে গ্লাসগোতে একবার তাকে বিয়ে করতেই হয়েছিল। মেয়েটি, তার নিজেরই মত-মাফিক, ভাল ঘরের অবশ্য ছিল না, কিন্তু ছাড়ান পেতে বেজায় নাজেহাল হয়েছিলেন, আর এখন তার কুড়ি বছর আগের বিয়ে করা কিছু লেখাপড়া-না-জানা বাঙালি স্ত্রী সুষ্ঠু সাহেব-স্বামীর সাবেকি মতে এক-এক সময় চমকায়। ছোকরা ব্যারিস্টরের চোখের ঠাট্টা লক্ষ করে এঞ্জিনিয়র আবার বললেন—দশ বছর ছিলাম ও-সব দেশে, আমি জানি। সে কোন জন্মের কথা! ঠোঁটের ভঙ্গিতে অবজ্ঞা ফোঁটালেন তপনদা—এখন বদলে গেছে সব। বদলে গেছে? এই সেদিন না এডওয়ার্ড দি এইটথকে রাজ্যপাট ছাড়তে হল?

ও, সে কথা! তার কারণ অন্য। কিন্তু—

এ নিয়ে এত বলার কী আছে? প্রতাতমেসো চড়া গলায় বাধা দিলেন—আরে আমাদের সব মা-বাবাই তো বিয়ে দিয়েছিলেন… তা মন্দ কী.. জীবনটা তো কেটে গেল একরকম…হাঃ— মোজা পরা পায়ের পাতায় হাত বুলিয়ে কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত শরীরটি একটু দোলালেন তিনি, সমস্ত গোল মুখটি ভরে নিঃশব্দে হেসে আবার একটু লালও হলেন হঠাৎ। কিন্তু অন্য দুজন লক্ষই করলেন না তার কথা। অন্য সকলকে বাদ দিয়ে প্রায় ভুলে গিয়ে শুধু নিজেদের মধ্যে তখন কথা বলছেন পরেশকাকা আর তপনদা। ইওরোপ বিষয়ে কে বেশি সবজান্তা তাই নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা দাঁড়িয়ে গেছে দুজনের মধ্যে। পরেশকাকার যুক্তি এই যে তিনি ছিলেনও বহুদিন ঘুরেছেনও বিস্তর, অতএব তার কথার উপর কথা বলার এখানে অন্তত কেউ নেই। আর তপনদা বলতে চাচ্ছেন যে যেহেতু তিনি সদ্য গিয়েছিলেন, তাই বিলেত বিষয়ে তিনিই ঠিক ওয়াকিবহাল।

প্রভাতমেসো একটুক্ষণ তর্কটা শুনলেন, কিছুই সুবিধে করতে না পেরে ফিরে তাকাতেই গলা বাড়ানো কিরণ বক্সির সঙ্গে চোখাচোখি হল। কিরণ বক্সি অনেকক্ষণ ধরে কিছু বলি-বলি করছিল। খুব মন দিয়েই কথাবার্তা শুনছিল সে, শুনে অস্বস্তি হচ্ছিল, খারাপ লাগছিল রীতিমত। কী রকম বলছে সব বিয়ের বিষয়ে, যেন ওর উপর কোনো জন্মে কোনো মানুষের হাত আছে। ওটা একটা… একটা কী, তা কিরণ ভেবে পেল না, কথা খুঁজে পেল না, কিন্তু নিজের মনে গভীরভাবে বুঝল। এই তো অনীতা-কদিন বা বিয়ে হয়েছে, এই সেদিনও তার কথা কিছুই জানতাম না, কিন্তু মনে হয় কত কালের, কত জন্মের–এই রকম আরকি। আগে তো কত খোঁজাখুঁজি, কত মেয়েই দেখেছেন মা, আমিও মাঝে-মাঝে.. কিন্তু এখন কি আর অনীতা ছাড়া আর কাউকে কল্পনা করতেও পারি আমি? তেমনি সত্যেনও–আর এই সত্যেনের সামনেই এঁরা কি না—কী যে সব! কিরণ মনে-মনে এসব ভাবছিল আর গলা বাড়িয়ে-বাড়িয়ে একবার এর দিকে, একবার ওর দিকে তাকিয়ে কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল; প্রভাতমেসোর চোখে চোখ পড়তে সে আর দেরি করল না—আমি আপনার সঙ্গে একমত, বলে কথা আরম্ভ করল কিরণ। আমিটায় জোর দিয়ে বলল। মেসোটি অবাক হলেন, বিব্রতও। ভেবেই পেলেন না, কখন তিনি এমন কী বললেন যার সঙ্গে একমত হয়ে বসে আছেন—আর কেউ না, একেবারে জামাইয়ের বন্ধু! ঐ আপনি বিয়ের বিষয়ে যেটা বলছিলেন, কিরণ তাকে মনে করিয়ে দিল সত্যি তো? বিয়েটাই আসল, কেমন করে ঘটল সেটা কিছু না। বক্তা যে তার মতেরই সমর্থক সেটা ভুলে গিয়ে প্রভাতমেসো তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে সায় দিলেন—ঠিক!

এদের কথার কোনো মানে হয় না, কিরণ চোখ দিয়ে অন্যদের দেখল—আসলে… আসল কথাটাকে হঠাৎ খুঁজে পেয়ে যেন আঁকড়ে ধরল সে—আসলে বিয়ে হচ্ছে একটা একটা কিরণ কথা খুঁজতে থামল, কিন্তু তখনই প্রভাতমেস আবার বলে উঠলেন—ঠিক, ঠিক কথা! বলে আরো মাথা নাড়লেন, তারপর জামাইয়ের দিকে ফিরে মোলায়েম মিহি সুরে বললেনতুমি না কোন কলেজে প্রোফেসর? সত্যেন হঠাৎ বুঝল যে তাকে কিছু বলা হচ্ছে। কিন্তু কী? কী বললেন উনি? তার দেরি দেখে কিরণই জবাব দিল তার হয়ে, তার কলেজের নামটা জানিয়ে দিয়ে। বেশ, বেশ—সত্যেনের দিকে তাকিয়ে প্রভাতমেসো আবার বললেন–তা বিলেতটা ঘুরে এসো একবার। দেখছ তো, বিদ্যে তোমার যতই থাক, বিলেতি ছাপ না থাকলে কিছু না। উত্তরে সত্যেন অমায়িক হাসল। আমাদের হারীত কেমন বেশ… আর চাকরিতেও নাকি উন্নতি করেছে এই প্রফুল্ল, সদয়, চশমা-চোখে চমৎকার ভদ্রলোকের আগের কথার সঙ্গে পরের কথার সম্বন্ধ বুঝতে না পেরে সত্যেন আবারও হাসল, এবার একটু বোকার মতোই।বেশ, বেশ! কার বা কোনটার তিনি তারিফ করছেন সেটা প্রভাতমেসো স্পষ্ট করলেন না, অনুমোদনের সুখী চোখে চারদিকেই তাকিয়ে বললেন–তা হারীতকে দেখছি না এখানে? কোথায় সে?

তখন দোতলায় সিঁড়ির চত্বরে দাঁড়িয়ে সরস্বতী অরুণকে বলছে–নন্দীকে নিয়ে যাও। নিজের নামটা কানে যেতে হারীত একবার উদাস চোখে তাকাল। তার এখনকার দুরদৃষ্ট বীরের মতো মেনে নিয়েছিল সে। দেয়াল ঘেঁষে ঢিলে দাঁড়িয়ে ছিল এমন ভঙ্গিতে, যাতে স্ত্রীলোকের আর অনুষ্ঠানের এই বোকা জগৎটার উপর তার মহৎ অবজ্ঞা সারা শরীরে স্পষ্ট ফোটে। তবু আটকে ছিল ওখানেই। নড়তে পারেনি, কেননা হয় সরস্বতী, নয় মহাশ্বেতা, নয় একসঙ্গে দুজনে ফাঁকে, ফাঁকেই আলাপে টেনেছে—বাজে কথা সব—কিন্তু—–আচ্ছা, এঁরা যখন না বলেই ছাড়বেন, তখন শোনাই যাক। সরস্বতীকে ইংরেজিতে একবার একথাও বলেছিল, আপনার বয়স কিন্তু একদিনও বাড়েনি, আর সে-কথা শুনে সরস্বতী যখন হেসেছিল, সেও হেসেছিল সঙ্গে। আর দেরি কোরো না,স্বামীকে তাড়া দিল সরস্বতী। অরুণ তার উড়ু-উড়ু চুলে হাত বুলিয়ে হারীতের সামনে এসে দাঁড়াল-চলুন নন্দী সাহেব।

কোথায়? অন্য কার কী একটা কথা শুনতে-শুনতে সরস্বতী চট করে মুখ ফিরিয়ে বলল— নন্দী যাও। বর নিয়ে এসো।

বর আনব মানে? সে তো কখন এসে বসে আছে! কথাটা শুনে একসঙ্গে গমক দিয়ে হেসে উঠল সরস্বতী, মহাশ্বেতা, আর যাবার আগে আর-একবার-দাঁড়ানো মহাশ্বেতার পাতলা গোঁফওলা রূপসী ননদটি। হারীত লাল হল, ভেবেই পেল না কথাটায় এত হাসির কী আছে। আরে চলুন, চলুন–অরুণ আস্তে হাত ছোঁওয়াল হারীতের কাঁধে, চপলমতি মহিলাদের হাত থেকে তাকে উদ্ধার করে নিচে নিয়ে এল।

পরেশকাকা আর তপনদার তর্ক তখনও চলছে। এঞ্জিনিয়ার একবার তার বয়সের সুবিধে নিয়ে বললেন–তুমি কি জান না হে! ব্যারিস্টার আইনমাফিক জবাব দিলেন–অনেক ভুল না জেনে অল্প ঠিক জানা ভাল। পরেশকাকা আর ফিরে জবাব দিলেন না, তপনদাও আর কিছু বললেন না। দুজনেই বুঝলেন ঠিক সেই সময়টায় ঘরের অন্যেরাও কেউ কিছু বলছে না । তাই তারাও কথা থামালেন। কোনো একটা ঘটনার অপেক্ষায় লোকেরা যখন বসে থাকে, তখন যেমন মাঝেমাঝেই হয়, তেমনি হঠাৎ একসঙ্গে সবাই চুপ হয়ে গেল। ঘরে এল অরুণ আর হারীত, সকলের চোখ তাদের দিকে ফিরল। অরুণ এর মধ্যে মুখে প্রায় ডাক্তারি গাম্ভীর্য এনে ফেলেছে, আর মুখে যেন অনুগ্রহের হাসি ফুটিয়ে পিছনে আসতে আসতে হারীতের চকিতে মনে পড়ল তার নিজের বিয়ের রাত্রিটি। অরুণ এসে সত্যেনের পাশে দাঁড়াল। আগে তাকে তুমি বলেছে, সে-কথা ভুলে গিয়ে বলল–চলুন। সত্যেনের পাশে রাখা মালাটি দু-হাতে তুলে কিরণ বলল—নাও। এবার আর সত্যেন বিদ্রোহের চেষ্টা করল না, মালা হাতে নিল।

আলোয়ানটা আর কেন? বলে কিরণ সত্যেনের কাঁধ থেকে নিজেই সেটা তুলে নিয়ে কাছে দাঁড়ানো নিখিলকে রাখতে দিল। নাও, পরেরা এবার। সত্যেন মালা পরে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতরা প্রায় সকলেই উঠলেন, শুধু ঘুমোচোখ বুড়োরা কেউ-কেউ বসে থাকলেন। কিন্তু বর চলতে গিয়ে থপ করে ব্যাঙের মতো লাফ দিল। অরুণের ডাক্তারি গাম্ভীর্য টিকল না, হেসে ফেলে বলল—কী হল?

ঝিঁঝিঁ ধরেছে—

ঝিঁঝিঁ? হারীত হাসি চাপল—তা ঝিঁঝিঁর দোষ কী, এতক্ষণ একভাবে বসে থাকা।

আমার হাত ধরো না–হয় কিরণ হাত বাড়াল।

না, না ঠিক আছে। বলে একপায়ে আর একটা লাফ দিল সত্যেন, কিরণ ফিশফিশ করে বলল, পা-টা জোরসে বেঁকে নাও একবার।

কিছু লাগবে না!–লাফের বদলে আড় করে পা পেতে-পেতে সত্যেন খুঁড়িয়ে এগোল, তার প্রত্যেক পা-ফেলার তালে মালাটা লাফিয়ে উঠল গলায়। ওরই মধ্যে মুখের ভাবে যথাসম্ভব মান বজায় রাখল সে, কিন্তু কষ্ট আর কষ্ট লুকোবার চেষ্টায় মিশে তার মুখটা দেখাল যেন দুষ্টু ছেলে মাস্টারের কাছে শাস্তি নিতে যাচ্ছে, কিন্তু ক্লাসের সক্কলকে দেখাতে চাচ্ছে ঘোড়াই পরোয়া। সেই মুখ দেখে সত্যেনকে হঠাৎ কেমন ভাল লেগে গেল হারীতের। ঘরের বাইরে এসে বলল–কী, কমল?

কমেছে—বলে সত্যেন জুতো পরতে গেল, কিন্তু অরুণ বলে উঠল-জুতোটা থাক না।

পরেই নিই–পা বাড়াল সত্যেন, কিন্তু তখন ফুলে থাকা বাঁ পা-ট্রা জুতোয় ঢুকল না। দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে কক্সরৎ করল, কিন্তু পা ঢুকল না। কিরণ বলে উঠল–কী মুশকিল! জুতো পরে বিয়ে করবে নাকি?

আচ্ছা, থাক—যেন নিরাশ, দুঃখিত হয়ে সত্যেন খালি পায়েই চলল। তার দুপাশে অরুণ আর হারীত, ঠিক পিছনে কিরণ, কিরণের পরে নিখিল, আর তারপর কন্যাপক্ষের লম্বা, বাঁকা লাইন। সিঁড়ির গোড়ায় তার কাঁধে চাপ দিল কিরণ। সে ফিরে তাকাতে চাপা গলায় বলল–কী? কেমন লাগছে?

কিচ্ছু লাগছে না—সকলের শোনবার মতো ভোলা গলায় তখনই জবাব দিল সত্যেন। হ্যাঁ! কিরণ ঘাড় নেড়ে উড়িয়ে দিল কথাটা, কিন্তু সত্যেন নিছক সত্যই বলেছিল। সত্যি তখন তার কিছুই লাগছিল না কোনো শিহরণ, কোনো নূতনত্বের শিহরণও না। সবই যেন জানা, যেন সে কত আগে থেকেই জেনে রেখেছে ঠিক এই সময়ে ঠিক এরকম এরকম হবেই। ঠিক আজকের তারিখের এই মুহূর্তে এই বাড়ির এই লাল সিঁড়িটায় সে পা রাখবে, তারপর এটাতে। আবেগ আজ সকাল থেকেই নেই। কিন্তু নেই বলে অভাবের আবছা চেতনা ছিল এতক্ষণ, এখন তাও নেই। সেই অভাবের চেতনায় দিনটা ঝাপসা হয়ে ছিল সকাল থেকে, এখন আর ঝাপসাও নেই। এখন সব পরিষ্কার—অর্থাৎ সাধারণ। সাধারণ লাগছে তার, একেবারেই সুস্থ, মাথাঠান্ডা। মনে কোনো কম্পন, কোনো অনুকম্পনও নেই। না আশা, না ভয়, না সন্দেহ, না আনন্দ। যেমন ছাত্রজীবনে কোনো পরীক্ষার আগের রাত্রে উৎকণ্ঠায় সে ঘুমোত পারেনি, কিন্তু পরের দিন পরীক্ষা দিতে যেই বসেছে, প্রশ্ন বিলোবার খশখশে আওয়াজ থেমে গিয়ে যেই স্তব্ধ হয়েছে মস্ত হল, তখনই নিরুৎসুক, নিরুদ্বেগ। স্থির হয়ে গেছে তার মন। তেমনি এখন অর কাছে সব পরিষ্কার, সহজ, এত সহজ যে সাধারণ। নিজেই এতে অবাক হল, কোনো অনুভূতির চেষ্টা করল এমনকি। কিন্তু কিছুই অনুভব করল না, পা-টা এইমাত্র পুরোপুরি ছেড়ে যাবার আরাম ছাড়া। সত্যেন স্বচ্ছন্দে উঠল সিঁড়ি দিয়ে, দোতলা পার হয়ে তেতলার দিকে, শেষ ধাপটার আগে অরুণ হারীতকে হঠাৎ ছাড়িয়ে সকলের আগে একা এগোল আর–সহজ, স্বাধীন, নিশ্চিত—দাঁড়াল আলো-জ্বলা ছাতের দরজায়।

ছাতের বড় অংশে, যেখানে খাওয়া হয়েছিল, সেখানে চুপচাপ। চেয়ারগুলি এর মধ্যেই তুলে ফেলেছে। সারি-সারি শূন্য টেবিল শুধু পড়ে আছে। আর আগে যেখানে দু-চারজনের শুধু চলাফেরা ছিল, সেই ছোটো অংশ এখন ব্যস্ত, শুনগুন ব্যস্ত, হাসি-হাসি রঙিন, আবার গম্ভীরও। আতা এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে বিয়ের সাজে ছোটোমাসিকে দেখছিল, হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে সখী দু জনকে দেখতে না পেয়ে ছুটে ছাতে এল। কই? কিন্তু ইরু-গীতির খোঁজে ঘুরে না বেরিয়ে আতা সেখানেই একটা সুবিধেমতো জায়গা বেছে দাঁড়াল—বিয়েটা প্রথম থেকে দেখা চাই তো। এখন ওরা এসে পড়লেই হয়।

দেরি হল না, একটু পরেই ছোট্টো চড় পড়ল তার পিঠে।

এই তো!—আমি বলছি না নিশ্চয়ই ছাতে! চকচকে সুখী চোখে তাকিয়ে আতা বলল—কোথায় ছিলি তোরা?

আমরা? গীতি এমন করে তাকাল যেন এর মধ্যে কতই রহস্য লুকোনো। ইরুর দিকে ফিরে বলল–তুই ক-টা খেয়েছিস রে?

ছাব্বিশটা।

চালিয়াৎ!

ইরু বলল—তা দশটা-বারোটা তো হবে।

আমি সন্ধে থেকে গুনে-গুনে ঠিক আঠারোটা— বলল গীতি।

পান তো? আতা ঠোঁট ফুলিয়ে চোখ বাঁকাল—ও! তোমরা এই করছিলে এতক্ষণ! লুকিয়ে পান খাচ্ছিলে?

লুকিয়ে কেন? ইরুও ভঙ্গি করল চোখের—প্রকাশ্যে, সর্বসমক্ষে। আমরা সক্কলকে পান দিচ্ছিলাম, আর সকলকে দিতে দিতে নিজেদের মুখে টপাটপ—

আমার জন্য আনিসনি? অভিমানের ঢেউ দিল আতার গলায়। ইরু কথা না বলে আতার ডান হাতটা নিজের বাঁ হাতে ধরল, তারপর ডান হাতের মুঠি খুলে সেখানে রাখল তার হাতের তাপে গরম হওয়া একটি লবঙ্গ-ফোড়া ছোট্টো খিলি। তখন আতা বলল—আমিও ঢের পান খেয়েছি। কত, তার অন্ত নেই, তা তুই এনেছিস এটাও খাই। পান মুখে দিয়ে চোখে হেসে ইরুকে বলল—তোর ঠোঁট বেজায় লাল হয়েছে রে! গীতি তাড়াতাড়ি জিগেস করল–আমার? আতা বলল—তোর ঠোঁট আবার লাল হবে কী! এমনিই তো চিঠির বাক্স করে রেখেছিস! আতার এই মন্তব্য মিথ্যা প্রমাণ করে গীতির রঙ-বোলানো গাল আরো লাল হল। আ-হা–ইরু বুঝি রঙ মাখেনি? বলে কঁধ দিয়ে ধাক্কা দিল ইরুকে।

একটু সরে দাঁড়াও মা লক্ষ্মীরা—তামার থালায় কী সব সাজাতে সাজাতে রোগা পুরুতঠাকুর আশাতীত মোটা গলায় বললেন। ঢেউয়ের মতো সরে গেল লাল-সবুজ-কমলা শাড়ি। মা লক্ষ্মী শুনে ইরু-গীতির বড়ো হাসি পেল, চাপতে গিয়ে গপগপ উপচোল। হাসছিস কেন? হাসির কারণ বুঝে ভুরু বাঁকাল আতা। পুরুতের গায়ে ওটা কী রে? গীতি জিগেস করল কানে কানে। আতা হাসল একবার-এও জানিস না? ওটা তো নামাবলী।

ও! একেই নামাবলী বলে? গীতি গম্ভীর হল, কিন্তু তখনই আবার খুক করে হেসে ফেলল— টিকিটা দেখেছিস? ইরু বলল—টিকটিকি! একথা শুনে আতারও হাসি পেল, সামলে নিয়ে হাসিতে শাসন মেশানো গলায় বলল—কী বাজে—! জানিস, ইনি আজে-বাজে পুরুত না, কোন স্কুলের হেডপণ্ডিত।

যাঃ! পুরুত বুঝি আবার পণ্ডিত হয় বলল গীতি।

বা, আমি জানি যে! আচ্ছা, মামাকে জিগেস করিস—

আতার কাঁধে টোকা দিয়ে ইরু বলল—চুপ! ঐ মামা এলেন। আরম্ভ হবে এবার। তিনজনে আর একটু ঘেঁষাঘেঁষি দাঁড়াল।

******

গরদের চাঁদর জড়ানো বিজন একটু অস্বাভাবিকরকম তাড়াতাড়ি হেঁটে পুরুতের সামনে এসেই ধপ করে বসে পড়ছিল, পুরুত হাত তুলে বাধা দিলেন—ঐ আসন তোমার, উত্তর দিকে মুখ। বিজন উত্তর দিকে মুখ করে কুশাসনে বসল। বসেই কেঁপে উঠল। পুরুত বললেন–স্থির হয়ে বোসা। বিজন স্থির হল। তাকে একটু লক্ষ করে দেখল অনেক জোড়া চোখ—ততক্ষণে আরো অনেকে হাজির হয়েছে সেখানে, মেয়েই বেশি। ইভা গাঙ্গুলি চিত্রাকে জিগেস করল—ইনি কে? মনে হচ্ছে ইনি সম্প্রদান করবেন?

নাকি? ঐটুকু ছেলে সম্প্রদান করবে? কাছে দাঁড়িয়ে উর্মিলা শুনলো কথাটা। চোখের কোণ থেকে একটা দৃষ্টিপাত করে বলল—ইনি স্বাতীর দাদা।

কোণকাটা চশমাটা ইভা চিনল, খেতে বসে লক্ষ না করে উপায় ছিল না। এখন আরো একটু ভাল করে তাকাল মুখের দিকে। একটু চেনা-চেনা হাসল। উর্মিলা তখনই ফিরে হেসে কাছে ঘেঁষল। ইভা জিগেস করল—আপনি বুঝি বাড়ির কেউ?

না, না, বাড়ির কেউ না। বললাম না তখন, আমিও বন্ধু! তবে এক দমকে অনেক কথা বলে ফেলল উর্মিলা। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার সঙ্গে ইভা গাঙ্গুলির সেই বন্ধুতা জন্মাল, যা রেলগাড়িতে আর বিয়েবাড়িতে দুজন মেয়ের মধ্যেই শুধু সম্ভব, আর কোথাও কারো মধ্যে না। পরস্পরের বিষয়ে প্রধান তথ্যগুলি জেনে নেবার পরে উর্মিলা বলল-বিজনদাকে কীরকম বেচারা দেখাচ্ছে ওখানে বসে! স্বাতীর দাদার কথা বলছি। ইভা বলল-উনি তো কিছু করছেন

না, শুধু বসেই আছেন।

না, না, ঠোঁট নাড়ছে দেখতে পাচ্ছেন না?

হ্যাঁ! ইভা হাসল—মন্ত্র-টক্স পুরুতই যা হোক বিড়বিড় করে, অন্যদের ঠোঁট নাড়াই কাজ। উর্মিলাও হাসল-হাঙ্গামাও! সংক্ষেপে সারতে পারে না?

দেখতে কিন্তু মন্দ না—মৃদু মন্তব্য করল অনুপমা।

হ্যাঁ, অন্যদের পক্ষে খুব ভাল—ইভার পুরুষ-গলায় আশেপাশে কেউ-কেউ ফিরে তাকাল–কিন্তু যাদের বিয়ে, তাদের কী কষ্ট!

খুব কি কষ্ট? চিত্রা বলে উঠল ফশ করে। হাসির হাওয়া দুলিয়ে গেল অনুপমা থেকে উর্মিলা পর্যন্ত চারটি পাশাপাশি তরুণীকে। চিত্রার আঁচলে টান পড়ল এমন সময়। বছর দশেকের একটি মেয়ে ফিশফিশে গলায় ডাকল-দিদি–। ফিরে তাকিয়ে মা-কে দেখতে পেয়ে চিত্রার হাসিমাখা মুখটা নিমেষে করুণ হল—এখন যাবে, মা?

হ্যাঁ চল, রাত হল, আবার ব্ল্যাক আউট। তুমিও তো আমাদের সঙ্গে?—বলে চিত্রার মা অনুপমার দিকে তাকালেন। এখনই যাবেন?—অনুপমার কথাটা কাকুতির মতো শোনাল। ইভা বলল—একটু থাকুন না। আমিও যাব একটু পরে, এক সঙ্গেই যাব। কাছেই তো, আর এখান থেকে একজন লোক নিয়ে নিলেই হবে। কিন্তু স্বামী-সংসার নিয়ে বিব্রত চিত্রার মা আর থাকতে রাজি হলেন না। হঠাৎ তার দিকে গলা বাড়িয়ে উর্মিলা বলল—একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না। আমাকে নিতে গাড়ি আসবে খানিক পরে, আপনাদের সকলকেই নামিয়ে দিতে পারব।… কিন্তু ছোটো গাড়ি আসে যদি?… তাহলে দু-বারে যাওয়া যাবে, এমন আর মুশকিল কী! উর্মিলা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার ভদ্রমহিলার দিকে তাকাল—সুবিধে হবে? ঝকঝকে মুখের অচেনা এই মেয়েটির আমন্ত্রণের উপরে চিত্রার মা তখনই কিছু বলতে পারলেন না। থাকবার ইচ্ছে অবশ্য মনে-মনে তারও, কিন্তু ইচ্ছেমতো আর কতটুকু হয় সংসারে! তার দ্বিধার সুযোগ নিয়ে চিত্রা আবার বলল—থাকো না মা।

আচ্ছা–তোর ঘুম পায়নি তো টুন্টি?

না তো! একটুও ঘুম পায়নি–দশ বছরের মেয়েটি খুব বড়ো করে চোখ খুলে তার কথার চাক্ষুষ প্রমাণ দিল। তারপরেই নড়ে উঠে ত্রস্ত গলায় বলল—মা! ঐ তত বর! ছোটো মেয়েটির কথাটা যেন হাওয়ায় ছড়াল, চঞ্চল হল সবাই। বরের সঙ্গে-সঙ্গে, পিছনে, আরো অনেকে এল, সবাই পুরুষ,আর তাদের পিছনে এল পাঁচ থেকে দশ পর্যন্ত বয়সের এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। তাদের মধ্যে দু-চারজন সাহসী অনেকটা কাছে এগিয়ে বসেই পড়ল, আর তাদের কেউ কিছু বলল না দেখে অন্য বাচ্চারাও ঢিপঢিপ বসে পড়তে লাগল।

সত্যেন আলপনা-আঁকা পিঁড়িতে পুব দিকে মুখ করে বসল। তার পাশে খালি থাকল আর একটা পিঁড়ি, একটু ছোটো, আলপনাও তার অন্যরকম। বসে চারিদিকে একবার তাকাল সত্যেন, প্রথমেই চোখ পড়ল লেপটে বসা বাচ্চাদের দলটিতে। ঐ তো—আহা, কী যেন নাম দিল্লির দিদির ছেলের?-হ্যাঁ, দীপু।–আর বর্মার দিদির মাথায় প্রায় সমান-সমান তিন ছেলে পাশাপাশি—আর ছোটন তো সকলের সামনে আসনপিঁড়ি হয়ে কেমন বসেছে দ্যাখোনা, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ফুলবাবু! ওদিকে তাতাও তার দলবল নিয়ে, সব ঝলমলে শাড়ি আজ, সব ঠোঁট পান খেয়ে লাল—আর বাচ্চা হলে কী হবে, মেয়ের দলে আর ছেলের দলে স্পষ্ট আলাদা ভাব। সত্যেন চোখ সরাল সেখান থেকে, হঠাৎ অখিলকে দেখতে পেল তার ছেই। রোগা মুখে উপলক্ষের উপযোগী গাম্ভীর্য এনেছে অখিল, বুকের উপর হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়েছে। সত্যেন আস্তে বলল—অখিল বোসস না! সতুদা বিয়ে করতে বসে তার সঙ্গে কথা বলবেন এত বড়ো সৌভাগ্য অখিল কল্পনাও করেনি। মুহূর্তে তার গাম্ভীর্য ঝরে আঁকাবাঁকা দাঁতের সারি হাসিতে বেরিয়ে পড়ল। সত্যেনের কথাটা শুনতে পেয়ে অখিলের কাঁধে হাত রাখা অরুণ। তুমি এখানেই বোলোবলে তার সতুদার প্রায় গা-ঘেঁষে বসিয়ে দিল তাকে। অখিলেয় আবাম হল। এর আগে অনেকক্ষণ সে বসেনি, কিন্তু সতুদার অত কাছে বসা কি উচিত? খানিকটা সরে বসল সে, কিন্তু বাচ্চাদের দিকে ঘেঁষল নাছি! ঐ পুঁচকেদের সঙ্গে! বেশ, আসল জিনিসই ফেলে এসেছিলে—বলে হেমাঙ্গ পিছন থেকে নিচু হয়ে বরের টোপরটা সত্যেনের একেবারে কোলের উপর নামাল। সত্যেন ভুরু কুঁচকে তাকাল, শশালায় আর রাংতায় বানানো চিকচিকে বিশ্রী বস্তুটাকে আস্তে দু-আঙুলে সরিয়ে কাতর মুখে বলল–এটা পরতে হবে? পুরুত বললেন— মস্তকে স্থাপন করো।

-এখনই? বরের মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে পুরুত বললেন–আচ্ছা, পরে হবে। আর এক কথা, আমি কিন্তু এই জামাটামা পরেই থাকব বলে সত্যেন পুরুতের কঁচাপাকা ঘন ভুরুর তলায় নিষ্প্রভ চোখে চোখ রাখল। ভেবেছিল একথা শুনে পুরুতের তাক লাগবে। কিন্তু সেরকম কোনো লক্ষণই টিকিওলা বামুনের পরিষ্কার কামানো, শীর্ণ মুখে ফুটল না। ঈষৎ স্নান স্বরে বললেন—যথাসময়ে উত্তরীয়ের আচ্ছাদন হলেই চলবে। সত্যেন খুশি হল। কিন্তু এত সহজ সমাধানে তত যেন খুশি হল না, তেমন যেন জিতজিত লাগল না তার।

******

বিয়ে আরম্ভ হল। বিজনের সামনে একটি তামার থালা ধরে পুরুত বললেন—ডান হাতে এক মুঠো তণ্ডুল তোলো। বিজন ডান হাতে এক মুঠো আতপ চাল তুলল।

–এবার বাঁ হাতটি ডান হাতের উপর ন্যস্ত করো। বিজন তা-ই করল। বিজনের বাঁ হাতটি ঠিকভাবে বসিয়ে দিয়ে পুরুত বললেন—এবার ডান হাতে জামাতার দক্ষিণ জানু স্পর্শ করো। শরীরের কোন অংশকে জানু বলে বিজনের তা হঠাৎ মনে পড়ল না। পুরুতের মুখের দিকে তাকাল। পুরুত নিজেই সম্প্রদাতার ডান হাতের একটি আঙুল জামাতার ডান হাঁটুতে ঠেকিয়ে দিলেন। বিজনকে সত্যেনের দিকে অনেকটা হেলতে হল, তার চাঁদর সরে গিয়ে ভিতরকার খোলা গায়ের এক চিলতে চামড়া সত্যেনের চোখে পড়ল। পুরুত থেমে থেমে সংস্কৃত বললেন, আর অস্ফুট, ফিশফিশে, বসে যাওয়া গলায় খানিকটা ঐ রকমই কিছু একটা আউড়িয়ে চলল বিজন। সত্যেনের আঙুল-ঠেকানো-হাঁটু শুড়শুড় করে উঠল, একটু পরে ঠোঁটচাপা হাসি ফুটল মুখে। সেটা লক্ষ করে ঊষাবৌদি বললেন–বর বেশ সপ্রতিভ তো, হাসছে। ঘটনাস্থল থেকে চোখ না সরিয়ে শোভা বলল–হ্যাঁ, খুব! আর কেনই বা হবে না! ভাবতে চেষ্টা করল, আগেই খুব চেনাশোনা থাকলে ঠিক বিয়ের সময়টায় কেমন লাগে, কিন্তু মুহূর্তেই ভাবনা ছেড়ে আবার দেখতেই নিবিষ্ট হল তার মন। বরে হাঁটু থেকে আঙুল সরিয়ে বিজু সোজা হল, পুরুতঠাকুর ঘাড় ফিরিয়ে হেমাঙ্গবাবুকে কী বললেন, হেমাঙ্গবাবু ইশারা করলেন অরুণবাবুকে, অরুণবাবু ব্যস্ত হয়ে ছুটলেন। কাছে-বসা বাচ্চারা ঘাড় বেঁকিয়ে দেখতে লাগল। তাদের মধ্যে, নিজের দুই মেয়েকে চকিতে দেখল শোভা, চকিতেই তার চোখ সরে গেল—চতকাল পরে পাওয়া এই আনন্দের কাছে, তার পক্ষে এই শেষ আনন্দের রাত্রিটিতে সন্তানকেও তার তুচ্ছ লাগল। পিছনে ঠানদি-গলায় কে বললেন—বর যে বসেই রইল! জোড় পরবে না?

—কনে আনতে গেল? অনেকটা কাঁচা গলার আওয়াজ হল সঙ্গে সঙ্গে! কনে আনতে? কনে আসছে? মেয়েদের গুনগুন রব রাস্তার দিকের কার্নিশ থেকে ছড়িয়ে সিঁড়ির চিলেকোঠায় চুপ করল। দোতলাও চুপ। কনে সাজানো ঘরে আর ভিড় নেই। যে কজ আছে তাদের মুখেও কথা নেই। উশকেখুশকো অরুণ হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে বলল—স্বাতী, চলো! কথাটা পড়ল মেঝের উপর সিসের টুকরো। বড়োপিসিমা আর কুন্দদিদিমা চোখাচোখি করলেন, তারপর কুন্দদিদিমা ডাকলেন–স্বাতী, আয় পিঁড়িতে বোস। স্বাতী নড়ল না। তেমনি দাঁড়িয়ে ছিল সে মুখ নিচু, হাত দুটি নিঃসাড়, যেমন তাকে রাজেনবাবু দেখেছিলেন; তবে সাজসজ্জায় তফাৎ হয়েছে। একটি গোলাপি রঙের স্বচ্ছ রেশমি ওড়নায় তার মুখ এখন অর্ধেক ঢাকা, সিঁথিতে বাঁধা শোলার মুকুট, আর পান্না-চুনি সোনালি-লালের উপর দিয়ে নেমে এসেছে গলা থেকে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত মস্ত মোটা, ধবধবে সাদা সুগন্ধি মালা। লীলামাসি আস্তে বললেন—হেঁটেই যাক না।

হেঁটে! শান্ত, একটু বিষণ্ণ চোখে বড়োপিসি স্বাতীকে দেখছিলেন এতক্ষণ, কিন্তু কথাটা শোনামাত্র সারা শরীরে তার ব্যস্ততা জাগল—বিয়ের কনে হেঁটে যাবে? কী যে সব বলে আজকাল, হেসে বাঁচিনে। চোখের ঝলকে কুন্দদিদিমার মুখ থেকে সমর্থন কাড়লেন তিনি। তারপর আড়চোখের দ্রুত দৃষ্টিতে লীলামাসিকে যেন ভস্ম করে দিয়ে একটু ভাঙা-ভাঙা গলায় হাঁক দিলেন—কই, কে কে পিঁড়ি ধরবে এসো। ডোরাকাটা শার্টের আস্তিন গুটিয়ে এগিয়ে এল ডালিম। আর?…

আমি আছি-অরুণ বলল পিছন থেকে। আয় স্বাতী, বোস—বড়োপিসির গলার আওয়াজ বদলে গেল হঠাৎ, নরম হল, ভিজে এল। স্বাতী নড়ল। হলদে, সাদা আর লাল রঙে আঁকা পিঁড়িটায় উঠে দাঁড়াল, বসল পিঁড়িতে আসনৰ্পিীড় হয়ে, রজনীগন্ধার মালার প্রায় অর্ধেকটা গোল হয়ে কোলে পড়ল, লাল বেনারসির উপর সাদা। দিদিরা তাকে ঘিরে দাঁড়াল। মহাশ্বেতা আর সরস্বতীর মাঝখানে শ্বেতাকে দেখাল স্বাতীর গলার মালার মতোই সাদা। শাশ্বতী হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল স্বাতীর পিছনে। পিঠে হাত রেখে কত আস্তে যে ডাকল——স্বাতী! হঠাৎ কান্না পাচ্ছিল তার, নিশ্বাস নিতে পারছিল না তাই অত আস্তে। স্বাতী কেঁপে উঠল। ওড়না-ঢাকা মুখ তুলল, মুখ ফেরাল, সব ঝাপসা দেখাল, ঝাপসা চোখে রড়দিকে দেখল। বোকা মেয়ে! হাসিহাসির ছায়া শ্বেতার ঠোঁটের উপর ভেসে গেলো।… কই, অরুণ–শাশ্বতী উঠল, দিদিরা সরে দাঁড়াল, অরুণ আর ডালিম দুদিকে নিচু হয়ে পিঁড়ি ধরে তুলল। খানিকটা শূন্যি হতেই স্বাতী নাড়ে উঠল, তাড়াতাড়ি দুহাত বাড়িয়ে গলা জড়াল দুজনের। সোজা হয়ে অরুণ বলল–পারবে, ডালিম? ডালিম বুক টান করে বলল–খুব!

না, না, দুজনে হবে না। দাঁড়াও–বলে শ্বেতা তাড়াতাড়ি এল দরজার কাছে, পরদা ধরে দাঁড়িয়ে ডাকল—পরেশকাকা আসুন, পিঁড়ি ধরবেন।

পিঁড়ি ধরব? অল রাইট! হাতের সিগারেট ফেলে পরেশকাকা প্রথমেই দরজার পরদা ধরে টান দিলেন। সরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আলগা-বসানো পরদা পিতলের রডসুষ্ঠু পড়ে গেল। তুলে নিয়ে সরিয়ে রাখল শ্বেতা। এস হে ব্যারিস্টার সাহেব-বেঁটে কিন্তু গাট্টা-জোয়ান পরেশকাকা পা ফেললেন।আমিও? আচ্ছা। তপনদা বাবুমানুষ, আস্তে এগোলেন। তর্কের ঝঝটা তখনো ভুলতে না পেরে ঈষৎ ঠেশ দিয়ে বললেন—আপনি আর কেন, পরেশদা?

কী, ভাবছ পরেশদার বয়েস হয়েছে? আরে এখনো তোমাদের মতো আধডজনকে ধরো! চার জোয়ান চারদিকে পিঁড়ি ধরল। স্বাতী শূন্যে চড়ে যাত্রা করল জীবনের দিকে। শাঁখের ফুঁ উঠল উলুধ্বনি ছাপিয়ে, মেয়ের দল পিছনে এল, বারান্দায় তন্দ্রা-লাগা নেপালপিসে চমকে কেঁপে উঠলেন, বেলি তাকে ফেলেই একটু উঠে এল দেখতে, গলিতে রাজেনবাবুর ছাইরঙের আলোয়ানটা চকিতে দেখা গেল। সিঁড়ির কাছে এসে পরেশকাকা বললেন–সাবধান এবার। ডালিম বলল—ঠিক আছে। স্বাতী সিঁড়ি উঠল, দুপাশে অরুণ আর ডালিম, পিছনে পরেশকাকা আর সামনে তার মুখোমুখি তপনদা। তপনদার কষ্ট কম, কিন্তু অসুবিধে বেশি, কেননা তাকে পিছু হেঁটে সিঁড়ি উঠতে হচ্ছে। অর্ধেক সিঁড়িতে মোড় নেবার সময় কেঁচায় পা বেধে তিনি হোঁচট খেলেন। পিঁড়ি সামনের দিকে ঝুঁকল, বিষম টান পড়ল অরুণ, ডালিমের গলায়। পরেশকাকা দেখলেন স্বাতীর পিঠটা সাঁতারুর মতো বেঁকেছে। চট করে এক হাতে তাকে ধরে ফেলে বললেন–থাক, তুমি ছেড়ে দাও, তপন। আপনি বরং এদিকে আসুন—জবাব দিলেন তপনদা। পরেশকাকা আর তপনদা জায়গা বদল করলেন, কিন্তু এর পরেও ছাদের দরজায় এসে পিঁড়ি একবার ঠেকে গেল। পিঁড়ি আড় করে, নিজেরা কাৎ হয়ে, মুখটাকা নিচুমাথা সোনালি-লাল নতুন স্বাতীকে নিয়ে চারজনে যেই ছাতে পৌঁছল, অমনি আরো জোরে ছড়াল মেয়েলি গলার গুনগুন ঐ যে…কনে এল! স্বাতী!..বাঃ, সুন্দর!…

******

পায়রার ঝাঁক হাওয়ায় উঠল, পাখার শব্দ করে নানা দিকে উড়ল। যেমন নাটকের বড়ো দৃশ্য আরম্ভ হবার আগে এদিকে ওদিকে তাকানো ছেড়ে, ঘরোয়া ভাবনা থামিয়ে, প্রোগ্রামের ভাঁজ মুড়ে সবাই ঠিকঠাক বসে নিয়ে সামনে তাকায়, তেমনি ঝিরঝির চঞ্চলতার গায়ে-গায়ে-ছোঁয়া কয়েকটা ঢেউয়ের মিলিয়ে যাবার পরে সকলে আরো স্থির হয়ে তাকাল। কেউ সরল, কেউ এগোল, সতুদার বেকার আলোয়ান নিয়ে ঈষৎ বিব্রত নিখিল শরীরের ভার এক পা থেকে আর এক পায়ে বদলি করল। অনুপমা হাত রাখল চিত্রার কাঁধে, কিরণ বক্সির ভঁজ-না-ভাঙা শাল বাঁ থেকে ডান কাঁধে ঝুলল, নিখিল মনে-মনে বলল, এখন আর কোনোদিকে তাকাবে না, বাচ্চাদের কয়েকজন ভাল করে দেখার জন্য আসনপিঁড়ি ছেড়ে হাঁটু ভেঙে বসল, শরীরটাকে একটা ঝকানি দিয়ে ঘুম তাড়াল ছোটন। সত্যেন তাকিয়ে দেখল আরো অনেক লোক-হাসিমুখ শাশ্বতী সামনেই দাঁড়িয়ে—জায়গাটা ভরে গিয়ে কেমন অন্যরকম দেখাচ্ছে।

পিঁড়ি নামানো হল। হলদে, সাদা আর লাল রঙের আঁকা সিঁড়ি ছেড়ে স্বাতী এবার বিয়ের পিঁড়িতে বসল সত্যেনের বাঁ পাশে। পুরুত জিজ্ঞেস করলেন কন্যা কি হেঁটে প্রদক্ষিণ করবেন?

না, ঘোরানো হবে–বলে হেমাঙ্গ চচ্চড় শব্দে পাটরঙের পাটকাপড়ের কড়কড়ে উড়ুনিটার ভাঁজ খুলে ফেলল। সত্যেনের কাঁধের উপর সেটা ফেলে বলল—জড়িয়ে নাও! সঙ্গে সঙ্গে শাশ্বতী নিচু হয়ে টোপর পরিয়ে দিল বরের মাথায়। লজ্জায় অপোবদন সত্যেন হাসির শব্দের অপেক্ষা করল; কিন্তু না, কেউ হাসল না, সত্যেন রায়কে বিয়ের টোপর পরতে দেখে ওখানে উপস্থিত অতগুলি মানুষের মধ্যে একজনও হাসল না। সত্যেন রায় একটু অবাক হলেন। পুরুত বললেন—জামাতা দণ্ডায়মান। টোপর-মাথায় মালা-গলায় সত্যেন উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে উড়নিটা জড়িয়ে নিল। নেহাৎ মন্দ লাগল না, একটু যেন শীত-শীত। বিজনবাবুর গায়ে তো জামাও নেই, শীত করছে না তো? বিয়ের পিঁড়ি ধরে আবার স্বাতীকে উঁচু করল ডালিম, অরুণ, পরেশকাকা-চারজনের বদলে তিনজনেই সুবিধে। বাদ পড়ে তপনদা মুষড়ে গেলেন না, বরং খুশি হয়ে সরে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখতে লাগলেন। স্বাতীকে শূন্যি করে সাত-পাক ঘোরাতে ঘোরাতে ডালিমের ফর্সা হাতের শিরা ফুলে উঠল, অরুণের উপরের ঠোঁটটা মুখের মধ্যে ঢুকে গেল, পরেশকাকারও চোখমুখ বেশ শক্ত হল। তিনজোড়া হাতের উপর স্পষ্ট আরো ভারি হতে লাগল স্বাতী, আর যেন ও-তিনজনকে উৎসাহ দিয়ে হেমাঙ্গ চেঁচিয়ে গুনতে লাগল–এক…দুই.চার…।–ভুল হল! এই তিনবার–বলে উঠল চিত্রা। অনুপমা বলল—না ঠিক আছে।

ঈশ, স্বাতীর মুখটা দেখাই যাচ্ছে না।

–দেখা যাবে কী রে? মুকুটটা সুতো দিয়ে বেঁধে দেয় তো ঘোমটা যাতে সরে না যায় সেইজন্যই।

—মুখ তো বরেরও ঢাকা, সামনে একটা কাপড় ধরেছে আবার, রাবিশ—ইভা কটাক্ষ হানল উর্মিলাকে।

বাঃ! বাঁকা হাসল উর্মিলা—শুভদৃষ্টির আগে মুখ দেখতে নেই যে!

ও, শুভদৃষ্টির আগে মুখ দেখতে নেই বুঝি ইভা তার পুরুষগলায় এমন হেসে উঠল যে আশেপাশে অনেকে চমকে তাকাল।

…পাঁচ। পিঁড়ি থেমে গেল। সরু গলায় আরো চেচিয়ে হেমাঙ্গ আবার বলল—পাঁচ-পাঁচ–আর দু-বার! পরেশকাকা বললেন–ডালিমের কষ্ট হচ্ছে?

নাঃ! ফোঁশ করে নিশ্বাস ফেলল ডালিম। চলো– পিঁড়ি আবার চলল। অরুণের উপরের ঠোঁট খুলে গেল, নিচেরটির উপর জিভ বুলিয়ে খুব নিচু গলায় বলল–স্বাতী, আস্তে! কিন্তু স্বাতী বোধহয় কথাটা শুনল না, কি বুঝল না, তেমনি শক্ত করেই গলা আঁকড়ে থাকল। পিঁড়ি এবার ঘুরতেই ইভা গাঙ্গুলির চোখে পড়ল লম্বা ডালিমকে, কোঁকড়া চুলের তলায় এখন অন্য কারণে লাল হওয়া তার কিশোর মুখটা। উর্মিলার কাঁধে টোকা দিয়ে জিগেস করল—স্বাতীকে ঘোরাচ্ছে কারা জানেন?

ঐ চশমা-পরা জন তো জামাইবাবু। অরুণকে আজই প্রথম দেখেছিল উর্মিলা, এ-বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কটা দেখামাত্রই ঠাউরেছিল। কিন্তু কথাটা বলল এমন করে, যেন জামাইবাবুটি তার কতই চেনা। আর অন্যজন? ঐ ফর্সা ছেলেটি? বেঁটেমতো, বুড়োমতো তৃতীয়জনের অস্তিত্বটাই মানল না ইভা। ফর্সা ছেলেটিকেও উর্মিলা আগে দ্যাখেনি, কিন্তু খেতে বসে শাশ্বতীকে শুনেছিল তাকে ডালিম বলে ডাকতে; আর তাদের বাড়িতে অবিরতই যাওয়া-আসা রাখা বিজনের মুখে কবে একবার শুনেছিল এই ভাগনেটির কথা। কোনো খবর, যে কোনো খবর—যতই যেমনতেমন করে বলা হোক—একবার কানে ঢুকলে উর্মিলা ভোলে না, তাই স্বচ্ছন্দে জবাব দিল— ও তো ডালিম, স্বাতীর বড়দির ছেলে। কী কাণ্ড তখন… জল ঢালতে গিয়ে, বেচারা! উর্মিলা হাসল। ঘটনাটা ইভারও মনে পড়ল, কিন্তু হাসি পেল না। বলল–যারা ঘোরাচ্ছে তাদের কী কষ্ট!

এমন আর কী—বন্সল অনুপমা।

কষ্ট না? সব বড়ো-বড়ো মেয়ে আজকাল, তাদের কি আর—

স্বাতীকে কিন্তু ছোট্টো দেখাচ্ছে।

বিয়ের সময় সব মেয়েকেই ছোটো দেখায়— মার মুখে শোনা এই কথাটার সঙ্গে চিত্রা স্বাধীন একটু মন্তব্য জুড়ল—তাই বলে ইভাকে দেখাবে না।

ভাগ্যিশ! ইভা হাসল, বড্ড জোরে। আবার কেউ কেউ ফিরে তাকাল তার দিকে। চিত্রার দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে উর্মিলা কোনো কাগজে পড়া একটা বোল ঝাড়ল-মেয়েরা আজকাল স্বাধীন বলে লম্বাতেও বাড়ছে, আগে…

…সাত! হেমাঙ্গর মিহি গলা তীক্ষ্ম বেজে উঠল। ঢেউয়ের মতো এগিয়ে এল মেয়ের দল, বাচ্চারা উঠেই দাঁড়াল অনেকে, হেমাঙ্গর কাঁধের উপর দিয়ে গলা বাড়াল কিরণ বক্সি, হেমাঙ্গ সরে গিয়ে বরযাত্রীকে খাতির করল, তার পাশে এসে দাঁড়াল শাশ্বতী। অগত্যা-উপস্থিত হারীত নেহাৎ কৌতূহলের চোখেই স্বাতীর দিকে তাকাল। পিঁড়ি দাঁড়াল বরের মুখোমুখি। হেমাঙ্গ বলল—অত উঁচুতে না।

পিঁড়ি নামল।

আর একটু উঁচু। চোখে চোখে ঠিক লেভেল হওয়া চাই—পিঁড়ি উঁচু হল আবার। পরেশকাকা চোখ কুঁচকে হেমাঙ্গর দিকে তাকালেন-দ্যাখো হে, লেভেল হয়েছে? হেমাঙ্গ তাকিয়ে বললএই…আর একটু কাছে হাঁ, ঠিক! পিঁড়ি স্থির হল, বরের মুখের সামনে এতক্ষণ ধরে রাখা কাপড়টা সরে গেল, স্বাতীর দুদিকে দাঁড়িয়ে ঘোমটা সরিয়ে দিল মহাশ্বেতা আর সরস্বতী। কিন্তু স্বাতী চোখ তুলতে পারল না। সরস্বতী বলল—স্বাতী, তাকা! ওদিকে কিরণ বলল-তাকাও, সত্যেন।

কিন্তু সত্যেন তাকিয়েই ছিল। এই স্বাতী! চোখে পড়ল নিচু চোখের লম্বা কালো পলক। এই স্বাতী! চোখে চোখ পড়ল, শাঁখ বাজল। কী কারণে কেউ জানে না, কিন্তু উপস্থিত মেয়েপুরুষ ছেলেবুড়ো প্রত্যেকের মন বিশেষ একটু সুখী লাগল সেই মুহূর্তে। সিঁড়ি মেঝেতে নামল, বরের পিঁড়ির মুখোমুখি স্বাতীকে বসিয়ে এতক্ষণে ছাড়া পেল ডালিম, অরুণ, পরেশকাকা। অরুণ প্রথমেই গলায় হাত বুলোল, ডালিম হাতে হাত ঘষল, পরেশকাকা শুধু তার চওড়া, ব্যায়ামী বুক ভরে নিশ্বাস নিলেন একবার। হেমাঙ্গ বলল—এখন মালাবদল। স্বাতী, দাঁড়াও। সাত-পাক ঘোরার পর দাঁড়াতে পেরে আরাম হল স্বাতীর শরীরে। কিন্তু সেই আরামের বোধ পলকে মুছে গেল। তার সামনে, কাছে, মুখোমুখি দাঁড়ানো সত্যেনকে ছাড়া আর কিছুই সে অনুভব করতে পারল না সেই মুহূর্তে। সে জানল না যে সারাদিনের উপপাসে তার পা এখন কাঁপছে। বুঝল, শাড়ি-গয়নায় জড়ানো তার শরীরের অস্বাচ্ছন্দ্য। ভুলে গেল বাবাকে ছেড়ে যাবার অসহ্য কষ্ট, মুহুর্তের জন্য অন্য কোনো বাধা তার থাকল না শুধু সত্যেনকে অনুভব করল-দেখল না, শুধু অনুভব করল।

মালা হাতে মুখোমুখি দাঁড়াল দুজনে। টোপর-পরা মাথা নিচু হল, সত্যেনের গলা বেয়ে বুকের উপর নামল স্বাতীর গলার সাদা ফুলের মালা। ওড়না-ঢাকা মাথা নিচু হল, স্বাতীর বুকের উপর পড়ল সত্যেনের গলার একটু ছোটো, একটু মলিন হওয়া মালা। কোনো কারণ নেই, কোনো অর্থ নেই এ-সবের। লক্ষ অনুষ্ঠান ব্যর্থ, হৃদয়ে যদি সত্য না থাকে…কিন্তু তখনকার মতো সুখের, আনন্দের, কল্যাণের হাওয়া দিল ঝিরঝির… দিকে দিকে ছড়াল… শোভার বিহ্বল চোখ থেকে হারীতের কৌতুকে-বাঁকানো ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছল। কৌতুকটা যেন মন্দ লাগল না হারীতের। শাশ্বতী মৃদুস্বরে বলল—স্বাতী, বোস এখন। সত্যেনও বসবার জন্য নিচু হল, কিন্তু হঠাৎ বর্ষীয়সী কালো একজন মহিলা তার কাছে এসে বললেন—আগে একবার নিচে চলল তো বাপু!

নিচে, কেন?

আছে, আছে, চলো কালো মহিলাটি চোখ টিপে হাসলেন। সত্যেন কেমন-কেমন চোখে চারদিকে তাকাল, কিন্তু কেউ তাকে কিছু বলল না, কেউ বুঝিয়ে দিল না ব্যাপারটা কী। চলো, কুন্দদিদিমা, আমিও যাই—বলে শাশ্বতী এগোল। সত্যেন অসহায়ভাবে বলল–আমাকেও আসতে হবে?

এসো—গম্ভীর মুখে কাছে এল সরস্বতী-ভয় নেই কিছু।

আমি একাই? সত্যেন ঈষৎ মুখ ফেরাল স্বাতীর দিকে। ফুরফুর হাসি বইল তার প্রশ্নের উত্তরে, তারপর মহাশ্বেতা চোখ টান করে বলল—না, না, না, একা তোমাকে ছেড়ে দেব না। আমরা নিয়ে যাচ্ছি পাহারা দিয়ে, চলো।

তিন দিদি আর কুন্দদিদিমা সত্যেনকে এমনভাবে ঘিরে দোতলায় নিয়ে এল যেন শত্রুপক্ষের খোদ কর্তাকেই পাকড়েছে। এল সেই ঘরে, যে-ঘরে মহাশ্বেতা শুয়েছিল সন্ধেবেলা, যে-ঘরে বাসর হবে। বড়োপিসি অপেক্ষা করছিলেন সেখানে। সত্যেন ঘরে আসতেই বড়োপিসি একটা লাঠি নিয়ে তাকে তাড়া করলেন। সত্যেন একটু অবাক হল, কিন্তু সাদাচুলের মহিলাটি তাকে মারলেন না, লাঠি দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার মাপলেন শুধু। তারপর একবার তাকে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হল, একবার মেঝেতে কয়েক পা হাঁটতে হল, একবার কালো মহিলাটি কী বিড়বিড় করতে করতে তিন-তিনটি টোকা দিলেন তার মাথায়। এরপর অবাক হওয়া ছেড়ে দিল সত্যেন। কী সব দিয়ে সাজানো একটি তামার থালা হাতে করে তার সামনে দাড়ালেন নাদাচুলের মহিলা। জিগেস করলেন–আমার হাতে এটা কী বলো তো?

সত্যেন অবোধ, জবাব দিল—থালা।

—স্বাতী তোমার গলার মালা। সত্যেনের কান পর্যন্ত গরম হল, সারা মুখে পিন ফুটল। আর তার ঐ অবস্থাটা শুধু বড়োপিসি আর কুন্দদিদিমা না, দিদিরাও নিঃশব্দে সহাস্যে উপভোগ করলেন, শাশ্বতী সুষ্ঠু, যদিও শাশ্বতীর সত্যেনের জন্যও খারাপ লাগছিল, আর এ-সব সেকেলে কাণ্ড তারও মোর অপছন্দ।

আচ্ছা, এবার বলো তো এটা কী? কুন্দদিদিমা থালায় রাখা পানের পাতাটি আঙুলে ছুঁলেন। ওটা? সত্যেন থামল। পান? তার মানেই প্রাণ! অতএব—এটা তাম্বুল, বলে বিজয়ী সত্যেন কুন্দদিদিমাকে চোখে বিঁধল। কেমন? শাশ্বতী হাতে তালি দিয়ে হাসল-এবার? কিন্তু একটুমাত্র…একটুখানি দেরি করে কুন্দদিদিমা সগৌরবে বললেন—স্বাতীর যে নিন্দে করে তোমার সে চক্ষুশূল।

রাঃ! বাঃ! তিন দিদি একসঙ্গে হেসে উঠল দিদিমাকে তারিফ করে, সত্যেনের মুখেও হাসি ফুটল।বেশ বলেছে কিন্তু চট করে।

এখন যেতে পারি? সত্যেন সপ্রতিভ, পাকাচুলের মহিলার দিকে তাকাল। বড়ো ব্যস্ত যে! আচ্ছা, এদিকে এসো— মহিলারা তাকে নিয়ে এলেন ঘরের এক কোণে, সেখানে কুলোয় জ্বলছে প্রদীপ। মামিমার কুলোর মতোই, তবে চিত্রি-বিচিত্রি বেশি, জিনিস আরো বেশি সাজানো, তার কোনো-কোনোটা সত্যেনকে ছুঁতে হল, তারপর সেই পানের পাতাটি ঘটে ড়ুবিয়ে তার গায়ে জল ছিটোলেন কালো মহিলা। এখন কপালে কুলো ঠেকানো হবে ভেবে সত্যেন আগে থেকেই ঘাড় বাড়াল কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে সেটা বাদ পড়ল, মহিলারা উঠলেন, পুরো দলটি ছাতে ফিরল তাকে নিয়ে, পাকাচুলের মহিলা সুদ্ধু।

******

ছোটনের পিঠে পিছন থেকে খোঁচা দিয়ে তাতা ডাকল—এই-! ঘুমোচ্ছিস নাকি?

না তো— ঢুলে-পড়া মাথাটা একটানে সোজা করল ছোটন। শুয়ে থাক না নিচে গিয়ে এটুকু দিদিগিরি ফলিয়েই তাতা ফিরল বিজলীর দিকে। শোভার বড়ো মেয়ে বিজলী, এই দু-দিনেই জমাট ভাব হয়ে গেছে দুজনে। এই মাত্র ফিরে আসা বরের দিকে তাকিয়ে বিজলী বললবিয়েতে কিন্তু মেয়েদেরই জিত।

জিত কেন?

কত্ত শাড়ি গয়না পায়! কী মজা না রে?

মজা না হাতি, এদিকে মাকে ছেড়ে থাকতে হয় যে? বাব্বা রে বাবা!

কিন্তু স্বাতীমাসির তো মা নেই—মনে পড়ল বিজলীর।

মা না থাক বাবা তো আছে! ও একই হল।

তাতার চকিতে মনে পড়ল তার নিজের বাবাকে, কিন্তু তখনই আবার বলল—মজা তে। ছেলেদেরই। বলতেই বলে জামাই-আদর। আর শ্বশুরবাড়িতে মেয়েদের?

ছেলেরা তো আর শ্বশুরবাড়িতে থাকে না –বলে উঠল পাশ থেকে আর একটি মেয়ে-জামাই আদর কদিন আর! এই কথাবার্তা শুনতে পেল বুলন, মহাশ্বেতার মেজ ছেলে। ভাবল—চ্ছেঃ! বয়ে গেছে ছেলেদের শ্বশুরবাড়িতে থাকতে। মেয়েগুলো কী রে! খালি বিয়ে-বিয়ে মন! তা ওরা বিয়ে করে করুক–তা ছাড়া আর হবেই বা কী মেয়েগুলোকে দিয়ে, কিন্তু ছেলেরা কেন যে–! আচ্ছা দাদা, মনের কথাটা সে না বলে আর পারল না—ছেলেরা কেন বিয়ে করে? কী বোকার মতো কথা! অমল, তার দেড় বছরের বড়ড়া, ছোটো ভাইয়ের অজ্ঞতায় হাসল। মেকার মতো কেন?

বা রে! বুলনের কথায় বাধা দিল ওট্টু, তার দুবছরের ছোটো—বিয়ে করে বলেই তো লোকেদের ছেলেপুলে হয়।

ওট্টু–তাতা ধমক দিল পিছন থেকে। কী যে অসভ্য ছেলেগুলো…সত্যি! তাতাদির দিকে একটা কঠোর দৃষ্টি ছুঁড়ে ওট্টু চুপ করল, আর বুলন ভাবল, ছেলেপুলে? ছেলেপুলেও তো মেয়েদেরই হয়! তাহলে–আর ঐ ওও…ওওঁ বাচ্চাগুলো যেন হতেই হবে। কিছু বোঝে না ওট্টুটা।

বুলন আরো খানিকটা ভাবল, কিন্তু কিছুই ভেবে পেল না, আবার মন দিল পুরুষ হয়েও বিয়ে করতে রাজি-হওয়া নতুন মানুষটিকে দেখতে। ততক্ষণে সম্প্রদান আরম্ভ হয়েছে। মুখোমুখি বসেছে বর-কনে, আর তাদের মাঝখানে মঙ্গলঘট রেখে তার উপর লম্বা করে কুশ সাজাচ্ছেন পুরুতঠাকুর। হঠাৎ অরুণকে পাশে দেখে কিরণ বক্সি জিগেস করল—বরপক্ষের পুরুত আসেনি?

আবার বরপক্ষের? অরুণ আবছা হাসল। হ্যাঁ–কিরণও হাসল আর সত্যেন যে রকম… কথা শেষ না করে চোখ নামাল। পুরুত বললেন—বরের দক্ষিণ হস্ত এখানে স্থাপন করো। সত্যেন ঘটের উপর উপুড় করে হাত রাখল।

হস্ত উত্তান করো। সত্যেন পুরুতের দিকে তাকাল, পুরুত তার হাতটি হাতে ধরে ঘটের উপর চিৎ করে দিলেন। উত্তান মানে চিৎ?–বাঃ! সুন্দর একটা নতুন কথা শিখে সত্যেন খুশি হল, আর একটু পরেই স্বাতীর ডান হাতটি আস্তে নামল আকাশের তলায় মেলে ধরা তার হাতের উপর। উত্তান হাত, মৃদু, অসীম মৃদু তার…প্রায় স্পর্শহীন। পুরুত একগাছা কুশ দিয়ে দুই হাত বেঁধে দিলেন, তারপর বিজনের মুখোমুখি বসে পুঁথি খুললেন। বিজন এতক্ষণ একভাবে বসে ছিল, নিচু মাথায়, থুতনি প্রায় বুকে ছুঁইয়ে, আবার মন্ত্র শুনে ভিতু চোখে তাকাল। পুরুতের মুখের উপর চোখ রেখে অস্ফুট স্বরে ঠোঁট নাড়ল সে। আর সত্যেন একটু চেষ্টাই করল মা দিয়ে সবটা শুনে নিয়ে স্পষ্ট করে বলতে, যেন এখানেও তার শিক্ষার মানরক্ষা চাই। পুরুত বললেন—এনাং কন্যাং সালংকারাং বিজন আওড়াল-এনাং কন্যাং শঙ্করালাং—

সবক্সাচ্ছাদনাং–

শস্ত্ৰচ্ছেদনাং—

প্রজাপতিদেবতাকাং—

প্রজাপতিদেবাতাতাং—

তুভ্যমহং সম্প্রদদে—

তুমভয়ং সম্প্রদদে।

বরের হাতে ওটা কী দিল রে?—জিগেস করল অনুপমা। কে জানে! চিত্রা ফিরল ইভার দিকে–ঐ মেয়েটিকে দ্যাখ।

কোন?

ঐ বেগনি শাড়ি। নেকলেসটা নতুন রকমের, না?

নতুন আর কী! ঐ তো রেডিও-মালা।

এভিঃ কন্যা ময়া দত্ত রক্ষণং পোষণং কুরু–পুরুতের মোটা গলা ইভার কানে বাজল। হেসে বলল-রক্ষণং পোষণং কুরু! কেন, মেয়েরা বুঝি আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না? বলে ঈষৎ তাকাল উর্মিলার দিকে, কিন্তু এমন একটা মনঃপূত কথার পিঠেও তার নতুন বান্ধবী শুধু চোখের পাতা নেড়ে সায় দিল, কিছু বলল না। বলল না, যেহেতু উর্মিলা তখন একটু বিশেষভাবে ব্যস্ত ছিল। ব্যস্ত ছিল বিজনকে দেখতে। বিজনের মুখটা যেন মার-খাওয়া, ভয়পাওয়া আর সেইসঙ্গে দারুণ গম্ভীর। কিছুই মেলে না তার বিজনদার সঙ্গে, যাকে সে চেনে, যাকে সে মনে-মনে জানে তার দেখন-হাসির এক নম্বর বাজিমাৎ। সেই বোকা..ভাল..সুশ্রী…মজার…সব মিলিয়ে ইচ্ছে করা মুখটার কোনো চিহ্ন কোনো একটু ঝিলিক উর্মিলা তাকিয়েতাকিয়ে খুঁজল। কিছুই পেল না। এমন একটি মুহূর্ত পেল না বিজনের মুখের ভাব যখন বদলাল, এমন একটি মুহূর্ত পেল না যখন বিজন মুখ তুলে চারিদিকে দেখল, তাকে দেখতে পেল অতক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকে আর তারপরে ঘন-ঘন তাকিয়েও, তার বিজনদার সঙ্গে একবার চোখাচোখি করতে পারল না উর্মিলা। শুধু উর্মিলাকে না, তখনকার মতো অন্য সবই ভুলে ছিল বিজন। স্বাতীর সম্প্রদানের ভার যে তারই উপর পড়ল, এর গুরুত্বে সে আজ সকাল থেকে অভিভূত। আচারে-অনুষ্ঠানে একটু ফাঁক সে থাকতে দেবে না, সারাটা দিন ঠায় উপোস করে আছে বেচারা। বিকেলের দিকে বড়পিসি বুঝি একবার বলেছিলেন-স্বাতী একটু ফল মিষ্টি খেয়ে নিক না, ওতে কী আছে? বিজন শোনামাত্র ব্যাকুল বাধা দিল। কী আছে! কে জানে কী আছে? কিন্তু আমরা জানি না বলে যে কিছুই নেই তা-ই বা কে জানে! কিছু না থাকলে নিয়ম থাকবে কেন? আর বোনের বিয়ে দিতে বসে এই অবাক হওয়া কে-জানে কী ভাবটা তাকে ছাড়ছিল না, ওরা যেন দূরে চলে গেছে, গল্পের মানুষ হয়ে গেছে। দীনবন্ধু হাইস্কুলের ষাট টাকা মাইনের হেড-পণ্ডিতের তোবড়ানো মুখটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল মহাপুরুষ, আর সেই মহাপুরুষের কথামতো এই যে সে কোশার জলে হাত ডোবাল, ডান হাতে ত্ৰিপত্ৰ ধরল, আবার সেই ডান হাতের উপর বাঁ হাতটি উপুড় করল আর তারপর এইমাত্র যে সামনের শক্ত, শূন্য মেঝেটায় মাথা ঠেকাল—এর প্রত্যেকটাই খুব আশ্চর্য লাগছিল বিজনের, আশ্চর্য, রহস্যময়… প্রায় অলৌকিক। পুরুত একবার পিঠ সোজা করলেন, গায়ের নামাবলীর ভাঁজ বদলালেন। তারপর অন্য কয়েকটা কোশাকুশি ঠিকঠাক করে সাজিয়ে আবার পুঁথি খুলে বরের দিকে তাকালেন—ওঁ যা অকৃন্তন্নবয়ন্…

হারীত হঠাৎ বলল-আশ্চর্য! সব মন্ত্রই বরের? কন্যার কিছু নেই?

আবার কী? মৃদু টিপ্পনি করলেন তপনদা—মেয়েদের তো শুধু রাজি হওয়ার পার্ট।

তাতে তাদের সুবিধেই— অরুণ একচোখে তাকাল ব্যারিস্টারের দিকে–স্বামীদের দিয়ে সাংঘাতিক সব প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিজেরা দিব্যি নিশ্চিন্ত! অরুণের কথাটা উপভোগ করে কিরণ বক্সি বলল—আর বরের মন্ত্রগুলো? খালি তো খোশামোদ।

পুরুত হঠাৎ থামলেন। স্কুলের ক্লাসে খুব বেশি গোলমাল হলে যেমন করে তাকান, সেইরকম ক্লান্ত…অনিচ্ছুক…মাছের মতো জোলো চোখ তুলে ন্যাকর্তাদের দিকে তাকিয়ে বললেনকন্যার মন্ত্র কি জামাতা বলে দেবেন? হেমাঙ্গ তৎক্ষণাৎ বলল—বেশ।

কেন? কন্যাই বলুন না-বলে উঠল অরুণ। পুরুত সত্যেনের দিকে তাকালেন। সত্যেন বলল—নিশ্চয়ই, কন্যাই বলবেন। পুরুষদের গলার মৃদু হাসি উঠল। হাসির শব্দ মিলোবার পর পুরুত কন্যার দিকে তাকিয়ে আগের চেয়েও আস্তে আস্তে ললেন—ওঁ প্র মে পতিযানঃ পন্থঃ কল্পতাং, শিবা অরিষ্টা পতিলোকং গমেয়। পুরুতের মোটা গলা, আর সংস্কৃতের ছন্দ, স্বাতীর বুকের মধ্যে হঠাৎ যেন গুমগুম আওয়াজ তুলল, স্বাতী বলতে পারল না। খুব নিচু গলায় বিজন বলল—স্বাতী বল। স্বাতী দাদার দিকে চোখ ফেরাল, যেন এতক্ষণে দাদার অস্তিত্ব অনুভব করল তার কাছে..অত কাছে। এতক্ষণে দাদার মুখটা স্পষ্ট দেখল। কিন্তু যে দাদাকে সে চেনে, জন্ম থেকে যে তার একসঙ্গে আর জন্ম থেকেই তার সঙ্গে যার আড়ি—সেই গোঁয়ার-বদরাগি ঝগড়াটে-স্যাঁৎসেঁতে-কাঁদুনি-হিংসুক নিষ্কর্মা-অসত্য দাদাকে একেবারেই দেখতে পেল না। এ যেন অন্য কেউ, অন্য মানুষ। একে সে আগে কোনোদিন দ্যাখেনি। পুরুত আবার বললেনওঁ প্র মে পতিযানঃ পন্থাঃ। স্বাতী বিসর্গ বাদ দিয়ে আস্তে আস্তে বলল—ওঁ প্র মে পতিযান পন্থা কল্পতং, শিবা অরিষ্টা পতিলোকং গমেয়। পুরুষের মোটা গলার পাশে পাশে তার উপোস করা মেয়েলি ক্ষীণ স্বর অদ্ভুত শুনল সত্যেন। অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, স্নিগ্ধ… অসীম তার স্নিগ্ধতা। পুরুত পুঁধি বন্ধ করে দুই হাতের কুশের বাঁধন খুলে দিলেন। যাক, হল। সত্যেন পিঠ টান করল প্রথমে। তারপরেই বাঁ হাতে আলগোছে ধরে ঐ বিশ্রী বস্তুটাকে নামাল মাথা থেকে। ও কী! মহাশ্বেতা বলে উঠল–টোপর খুললে কেন?

আর কী হবে— নিশ্চিন্ত মোলায়েম জবাব দিল সত্যেন। সরস্বতী সংক্ষেপে বলল—আরো আছে, বাচ্চারা সরে বসো তো এবার। ছোটন চোখ টান করে তাকাল, বাচ্চারা এই ফাঁকে একটু সোরগোল করে নিয়ে সরে বসল। বিজন আসন ছেড়ে উঠে হেমাঙ্গর পাশে দাঁড়াল। সামনের ফাঁকা হওয়া জায়গাটুকুতে পুরুত হোমের আগুন জ্বালালেন, স্বাতী উঠল পিঁড়ি ছেড়ে। পিঁড়িটা সরিয়ে আনল শাশ্বতী, স্বাতী আবার বসল সত্যেনের পাশে। কাঁধের কাছে হালকা ছোঁওয়া পেয়ে সত্যেন ফিরে তাকাল–কী?

কিছু না বলে সরস্বতী তার পাটরঙের উড়নিটার একটা কোণ তুলে ধরল, স্বাতীর গোলাপি ওড়নার প্রান্তটা এগিয়ে দিল মহাশ্বেতা। ক্ষিপ্র আঙুলে দুটোয় বেঁধে দিয়ে সরস্বতী আবার বলল—কিছু না।

এইরকম থাকবে? সত্যেনের চোখ বড়ো হল, এতকিছুর পরেও এটা যেন অবিশ্বাস্য লাগল। হাঁ, এইরকমও বলে সরস্বতী টোপরটা তুলে আবার চাপিয়ে দিল তার মাথায়। সত্যেনের মাথা হেঁট হল, শশালার ফুল শুড়শুড়ি দিল কানে। শোভা বলে উঠল—এখনই যজ্ঞ যে?

হলেই হয়— জবাব দিলেন লীলামাসি।না, না, পরের দিন সকালে তো? ঊষাবৌদি বললেন—সে ভাই এক-এক দেশের এক-এক আচার–আমার বাপের বাড়িতেই তো বিয়ের রাত্রেই সব সেরে দেয়।

ভালও তা-ই। যা কষ্ট আবার পরের দিন বেলা দুপুর অবধি—ধোঁয়ায় যা চোখ জুলেছিল এখনো মনে আছে বলে লীলামাসি একটু হাসলেন।

নীলচে ধোঁয়া উঠল সত্যেনের চোখের সামনে। রঘুবংশ মনে পড়ল তার, যজ্ঞের ধোয়ায় লাল হওয়া সীতার চোখ। স্বাতীর চোখও—? তাকাতে যাচ্ছিল, কিন্তু পুরুত তখনই তার হাতে বাচ্চাদের ঝিনুকের মতো কী একটা দিয়ে বললেন–অগ্নিতে অর্পণ করো। সত্যেন প্রথমে ভেবেছিল ঐ ঝিনুকটাকেই বুঝি আগুনে ফেলতে হবে, তারপর দেখলনা, ওতে ঘি আছে। আগুনে ঘি দিল সে, ছ-বার দিতে হত ওরকম। ঘি-খাওয়া আগুন তারো লাল হল, নীল ধোঁয়া ফিকে হল। তারপর মন্ত্র। চলল মন্ত্র পড়া। ঠিকমতো বলার চেষ্টা করতে করতে সত্যেন হঠাৎ একবার ভাবল—কত? কখন ফুরবে? জায়গাটা যেন আগের চেয়ে চুপচাপ, পুরুতের পেশাদার গলা আরো ভারি শোনাচ্ছে। মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক তাকাল সত্যেন। লাল মালা, রুপোলি আঁচল, ছোড়দির হাসিমুখ এখন গম্ভীর ছোড়দি ডাকবে কাল থেকে? একবার বড়দিকে দেখল লোটনকে কোলে নিয়ে, একবার রাজেনবুর ছাইরঙা আলোয়নটা আবছা চোখে পড়ল।

আরে! ছোটন যে ঘুমিয়ে পড়ল এদিকে!

ছোটনকে চট করে তুলে নিয়ে গেল ডালিম। রাত বাড়ল, কিরণের পিছন থেকে সরে নিখিল এসে বিজনের কাছে দাঁড়াল। শীত বাড়ল, সতুদার আলোয়ানটার ভাঁজ খুলে বিজনের পিঠের উপর ছড়িয়ে দিল নিখিল। বিজন সেটা জড়িয়ে নিতে নিতে কিছু না বলে নিখিলের দিকে তাকাল, খানিকটা সময় কেউ যেন কিছু বলল না। চারদিকের চাপা কথার গুনগুনানি থামল। শুধু জাগিয়ে-রাখা আগুন পটপট শব্দে সংস্কৃত বলতে লাগল, অন্য সব চুপ করে থাকার উপর দিয়ে স্মৃতির মতো ভাসতে লাগল সংস্কৃত ছন্দ, প্রতিশ্রুতির মতো মাথা তুলেই ড়ুবে গেল। মহাশ্বেতা-সরস্বতীর মনে পড়ল সেই রাতটির কথা, যখন তারা একই সঙ্গে একই ছাতের দুটো অংশে এইরকম সেজে, এইরকম পিঁড়িতে ঠিক এমনি করেই বসেছিল। দু-বোনে চোখাচোখি তরল। সরস্বতী তাকাল অরুণের দিকে, মহাশ্বেতা হেমাঙ্গর দিকে, তারপর মহাশ্বেতা অরুণের দিকে তাকাল। অনুপমা, চিত্রা ভাবল যে তারাও একদিন এমনি পিঁড়িতে বসবে কবে? কার সামনে? কে?—ভাবতেই লাল হল দুজনে, আর ঠিক তখনই দুজনের চোখাচোখি হল। উর্মিলার হঠাৎ তার মাকে মনে পড়ল…তার ছেলেবেলা…নাথুরামপুর…চোদ্দ বছর বয়সে তার সেই বিয়ের সম্বন্ধ-ছেলেটা লুকিয়ে চলে এসেছিল আড়ে-ঠারে তাকে একটু চোখে দেখবে বলে— প্রায় হয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু বাবা হঠাৎ—যদি বাবা হঠাৎ মরে না যেতেন, যদি চোদ্দ বছর বয়সে লুকিয়ে চোখে দেখতে আসা সেই ইন্দু নাগের সঙ্গেই… নামটা মনে আছে এখনো তার বিয়ে হয়ে যেত, তাহলে এতদিনে কেমন হত? উর্মিলা সেই কথাটা ভাবল একটু। আর ইভা গাঙ্গুলির চোখ কাকে যেন, কী যেন খুঁজে খুঁজে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ভালিমের কোঁকড়া চুলের তলায় ফর্সা মুখের উপর স্থির হল..আহা, বড্ডো ছেলেমানুষ।

ডালিমকে ঠেলে কুলদিদিমা সামনে এলেন হাতে একটা মাটির ভাড়া নিয়ে। এসেই নিচু হয়ে সেই ভাঁড়ে আঙুল ড়ুবিয়ে ড়ুবিয়ে বর-কনের সামনে কোণাকুণি করে সাতটা গোল-গোল পিটুলির দাগ এঁকে ফেললেন, মেঝের উপর। এটা কী রে? জিগেস করল ইরু। আতা জবাব দিল— সপ্তপদী।

সপ্তপদী মানে?

দেখবিই— আতা গম্ভীর মুখে আরো একটু খবর দিল—এটাই তো আসল বিয়ে। বর-কনে উঠল, নড়তে গিয়ে টান পড়ল সত্যেনের পিঠে। ও, সেই বাঁধা আছে এখনো। কতক্ষণ থাকবে? এবার নামো গো পিঁড়ি থেকে কাছে এলেন বড়োপিসি। গাঁটছড়া নিয়ে সন্তর্পণে পা ফেলল দুজনে, সেই গোল-গোল দাণের সামনে পাশাপাশি দাঁড়াল। পিসি বললেন—স্বাতী সামনে আয়। স্বাতীর এগোবার টানে এবার সত্যেনের উড়নিটা প্রায় খসেই পড়ল কাধ থেকে। সরস্বতী পিছন থেকে সেটা ঘুরিয়ে ঠিক করে দিল। স্বাতী সামনে এল, সত্যেন, পিছনে থাকল। স্বাতীর দুপাশ দিয়ে বাড়িয়ে দুহাত অঞ্জলি করে মেলে ধরল সত্যেন আর সেই হাতের উপর স্বাতী তার দুহাত অঞ্জলি করে পাতল। তাদের দুপাশে চট করে দাঁড়িয়ে গেল মহাশ্বেতা আর সরস্বতী, আর শাশ্বতী হাজির থাকল খইয়ের থালা হাতে নিয়ে। বড়পিসি গুনগুন করে বুঝিয়ে দিলেন কী করতে হবে—প্রথমে ডান পা, তারপর বাঁ পা…এক-একবার এক একটা গোল দাগে…আর তুমি স্বাতীর হাত দিয়ে এক-একবার এক-এক মুঠো খই। ঠিক ঈশানকোণে এঁকেছেন তো? পিসি ফিরে তাকালেন ভাড় হাতে কুন্দদিদিমার দিকে। কুন্দদিদিমা জবাবের বদলে মুচকি হাসলেন। হা-এর অণুকোটি তার মুখস্ত, তার ভুল হবে? প্রথম ডান পা, তারপর বাঁ পা, উত্তর-পুব কোণের প্রথম মণ্ডলে পা পড়ল। বাঃ, ঠিক পড়েছে! শাশ্বতী স্বাতীর মুঠো ভরে খই দিল, সত্যেন চোখ দিয়ে একটু তাক করে নিজের হাতটা ঠেলে দিল উপরদিকে। স্বাতীর হাত থেকে বই ছিটোল, মাত্র কয়েকটা আগুনে পড়ল, বেশির ভাগই বাইরে।

ওঁ সখা সপ্তপদী ভব, সখ্যন্তে গমেয়—। পুরুতের গলা উঠল আবার—সখ্যন্তে মা যোষাঃ, সখ্যন্তে মা যোষ্ঠাঃ। হঠাৎ একটু ঝিমুনি এসেছিল হেমাঙ্গর, তার রেঙ্গুনের আপিশের কাঠের সিঁড়িতে উঠতে উঠতে হোঁচট খেল..বিয়ে–কলকাতা, ভাল-মহাশ্বেতার এতকালের ইচ্ছে মিটল, এখন ওর শরীরটা সারলেই—ওর মা যে রকম ভুগে ভুগে শেষটায়—কী বাজে কথা ভাবছি…মুখে একবার হাত বুলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল হেমাঙ্গ, সামনে দেখতে পেল অরুণকে। অরুণ হাসল, কিন্তু হেমাঙ্গর জন্য না, হাসল সেই দিনটির কথা ভেবে, যেদিন দামি চকোলেট এনেছিল বলে শিশিরকণা তাকে বকেছিলেন। ভাগ্যিশ বকেছিলেন, তাই তো সে জানতে পেল ওখানেই তার মন বাঁধা। আর তারপরে ছুটিতে যখন দেশে যাচ্ছে তখন ট্রেনে শুয়ে-শুয়ে কেমন করে যেন জানল যে মহাশ্বেতা খুব ভাল হলেও সরস্বতীর কাছে…কী সব ভাবছে! আর এতকাল পরে মনেই বা পড়ল কেন?

ওঁ সমঞ্জন্তু বিশ্বে দেবাঃ, সমাপ হৃদয়ানি নৌ। সম্মারিশ্যা সং ধাতা, সমু দেন্ত্রী দধাতু নৌ। ঘি পড়ল আগুনে, খই পড়ল আগুনে, মেয়েরা শূন্যে খই ছিটোল…সামনের দিকের এর মধ্যেই ফিকে হওয়া দাগে নতুন করে পিটুলি টানলেন কুন্দদিদিমা। শোভা ভাবল—শেষ, প্রায় শেষ, ছুটি ফুরোল, নটে মুড়োল। আবার সেই—হঠাৎ ভাবল—সে! ও হ্যাঁ, চলে গেছে। কখন গেল? বলে গেল না একবার? বলাবলির আর কী আছে—আর যা মুখচোরা মানুষ—আর যা ভিড়–আর যা খাটুনি সারাদিন–আমিও তো দুদিন ধরে এখানেই, নাকি রাগ করল? এমনিতে সাত চড়ে রা ফোটে না কিন্তু আমার উপর রাগ আছে ঠিক!

ওঁ মম ব্রতে তে হৃদয়ং দধাতু, মম চিত্তমনু চিত্তং তে অস্ত্র। সামনে স্বাতী, পিছনে সত্যেন, হাতে হাতে অঞ্জলি পাতা—সুন্দর, কী সুন্দর মানিয়েছে। বড়োপিসির চোখে জল এল। স্বাতীর পিসে দেখল না? ঘুমুচ্ছে নিচে। ঘুমুচ্ছে তো? ঘুম ভাঙলেই তো জল চাই, পান চাই, পান আবার ঘেঁচে দিতে হবে—ফোলা বুড়োকে নিয়ে জ্বালাতন কি কম! আর এই মানুষই কী ছিল দেখতে, যখন… বড়োপিসির হাসি পেল।

ওঁ অন্নপ্রাশন মণিনা প্রাণসূত্রেণ পৃশ্মিনা… শেষের কাছাকাছি এসে পুরুতের যেন উৎসাহ বাড়ল, গলা চড়ল—বধামি সত্যগ্রন্থিনা, মনশ্চ হৃদয়ঞ্চ তে। মানে কী কথাগুলির?—উষাবৌদি ভাবলেন। শুনতে কিন্তু সুন্দর। উনি নাকি সংস্কৃত পড়েছিলেন কলেজে। তা কী-বা হল ও সব পড়ে-উড়ে-জন্ম ভরে তো রেলের চাকরি, আর চাকরিও বাবা, বারোমাসে চোদ্দ-টুর লেগেই আছে। আসবার কথা তো শুক্কুরবারে—এখন কে জানে—আর এই বিয়ের জন্য দুটো দিন আগে এলেই হত। না, তেমন মানুষই না! চাকরিই প্রাণ!

যদেতদ্ধৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব। হৃদয়! কথাটা হঠাৎ কানে গেল ইরু, গীতি, আতারএকটু কেঁপে উঠল লাল-কমলা-সবুজ শাড়ি। হৃদয়! ওটা এখনো মজার কথা তাদের কাছে, ঠাট্টার কথা, কোনো ছাপা বইয়ে চোখে পড়লে হাসির শুড়শুড়ি লাগে। কিন্তু এখন তারা কাঁপল, কৌতুকে না-কৌতূহলেও না, কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য রোমাঞ্চ হল তাদের। যে যৌবন তাদের ঠিক জাগেনি কিন্তু জাগল বলে, তারই একটু বিদ্যুৎ চকিতে বয়ে গেল তাদের শরীরে, আর নিখিলের হঠাৎ মনে হল কারখানায় পেরেক ঠোকে তাতে কী… কষ্টে আছে তাতে কী… কোনো ভয় নেই, কোনো দুঃখ নেই, সে সব পারে, তার সব আছে। আর কিরণ বক্সি বুঝল, স্পষ্ট বুঝল—যা এর আগে এমন নিশ্চিত বোঝেনি যে অনীতাকে ছেড়ে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব… অসম্ভব। না, দেবে না যেতে। শশুর রাগ করে করুক, মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়া হয় তো হোক। বোমার ভয়ে কলকাতা সুষ্ঠু লোক ভাগলেও অনীতা যাবে না, সেও যাবে না—নয়তো দুজনেই একসঙ্গে যাবে। সেই মালাটা তখন রেখেছিল না পকেটে? হ্যাঁ, আছে…

শেষের গোল দাগটিতে পা পড়ল, আবার খই পড়ল আগুনে, আরো খই, আরো মন্ত্র, শাঁখ…সেই কেমন-কেমন চুপচাপের বেড়া ভেঙে গিয়ে আবার কথা। হাসি, চলাফেরা, সংখ্যায় কমে যাওয়া বাচ্চার দল উঠে পড়ল। প্রভাতমেসো ভাবলেন লীলা কি আর থাকতে চাইবে? বিজনের কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে হেমাঙ্গ বলল তুমি এবার…আর ডালিম নিখিলকে বলল—আপনি ক…আর শাশ্বতীর মুখ থেকে চোখ সরিয়ে ভিড় থেকে সরে দাঁড়াল হারীত। ইশ! কতসময় নষ্ট হল, এতক্ষণ সে ইস্তাহারটা লিখে ফেলতে পারত। আবার সব তার মনে পড়ল–জাপানের কুচক্র, রাশিয়ার বিপদ, নির্বোধ বাঙালি বাবুরা, মনে পড়ল তাদের প্রতিবোধ-সংঘের প্রকাণ্ড দায়িত্ব! কী কাণ্ড… ভুলেই ছিলাম এতক্ষণ! সাধে কি আর আফিং বলেছে? নাঃ…এই মুহূর্তে বাড়ি, হেঁটেই, গিয়েই ধুম, তারপর কাল সকালেই–হারীত গো নিয়ে নেমে গেল সকলের আগে, কিন্তু দোতলায় এসেই থামল। শাশ্বতী কি? না সে তো থাকছে, সে তো বলতে গেলে আজকাল বাপের বাড়িতেই বাঙালি মেয়েদের এই বাপের বাড়ি এক ব্যাপার। আজ থেকে স্বাতীরও বাপের বাড়ি। দোতলা থেকে একতলায় একটু ধীরে নামল হারীত। নামতে-নামতে কেন যে মনে পড়ল সেই যতীন দাস রোডের বাড়ি…এদিকে গাঁটছড়া-বাঁধা স্বাতী-সত্যেনকে মেয়ের দল ঘিরে ফেলল..স্বাতীর জন্মদিনের গানের আসর, সেই প্রথম ও বাড়িতে.. এ বাড়িতে হাঁটি হাঁটি পা-পা বর-কন্যা চললেন… খুব কিন্তু শুনিয়েছিল স্বাতী সেই গাইয়েটিকে. পিছনপিছন সবাই চলল…বাজে ছোকরা…আর শাশ্বতী,সেদিন..আর শাশ্বতী স্বাতীর পিঠে হাত রাখল। বিজন শীতে কেঁপে উঠল একবার… ছাতের দূরের অর্ধেকটা খালি হল আর মহাশ্বেতা স্বাতীর ঠিক পিছনে… প্রথম সিঁড়িতে পা দিয়েই মহাশ্বেতার কেমন ভয় হল যে এখনই তার মাথা ধরবে।

******

কিন্তু বাসরঘরে এসেই মাথা ধরার কথা ভুলে গেল। এই ঘরেই সন্ধেবেলা শুয়েছিল সে? তার মনে হল আলো এখন অনেক বেশি উজ্জ্বল। ঘরটাকে আরো বড়ো লাগল, সজীব লাগল। যেন প্রাণ পেয়েছে এতক্ষণে, যেন তাদের সকলের অচেনা এই হঠাৎ-ভাড়া-করা-বাড়ির এই ঘর ঠিক এরই জন্য তৈরি হয়েছিল। আর তৈরি হবার পর থেকে ঠিক এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল। আলনায় সাজানো শাড়ির রঙবেরঙের আলো চোখাচোখি দেখল মহাশ্বেতা–চোখে চোখে বলছে—এসেছ? এসেছ? আলো ভরা আয়না থেকে পিছল বার্নিশে জবাব ঝরল–এই তো! এই তো! এসেছে! ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস হেসে-হেসে একথা বলল। চারটে সাদা দেয়ালও তা-ই বলল। চারদিক থেকে ফিরল মহাশ্বেতার চোখ, স্বাতী-সত্যেনের দিকে ফিরল, মেঝের বিছানায় বসল ওরা। বসতে গিয়ে ভুল করল… স্বাতী এদিকে আয়। স্বাতী এল সত্যেনের বা দিকে…আমিও একদিন ঐ রকম… কেমন লেগেছিল? কে জানে কেমন? কিছু মনে পড়ে না…কিন্তু এই গন্ধটা যেন চেনা-চেনা—কীসের? কোনো কিছুর না, বাসরঘরেরই গন্ধ এটা…নতুন, নতুনের…নতুনের সূক্ষ্ম-সুন্দর-অদ্ভুত সুবাস। মহাশ্বেতা বুক ভরে সুবাস নিল–মাথাটা হঠাৎ… না। না, মাথা ধরল না মহাশ্বেতার, কি ধরে থাকলেও সে বুঝল না। শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকল, ফুর্তির একটি ফোঁটাও হারাল না। সব দেখল— চাল-খেলা, জলে শোলা-ভাসানন, শাশ্বতীর বেশি বেশি ব্যস্ততা—ভাবটা যেন ও না-থাকলে কিছুই হত না–ব শুনল। ভাঙা গলায় এক-কথা দশবার বলা বড়োপিসি, সরস্বতীর টিপ্পনি, কুন্দদিদিমার মশকরা কতবার যে কারণে-অকারণে হাসল! তারপর প্রভাতমেসো হঠাৎ কোত্থেকে এসে বললেন, আমরা তাহলে…লীলা মাসি নড়লেন, ঊষাবৌদি বললেন আমিও তাহলে..আরো কেউ কেউ নড়ল, উনি এসে বললেন চলুন–গলায় আবার মাফলারটা কেন?—আপনি আর কেন… চলুন… যাই তাহলে…আচ্ছা যাই, যাচ্ছি…ভিড় কমল। গীতির মাথা আতার কাঁধে ঢুলল, কথা কমল। চোখে হঠাৎ ঝাপসা দেখল মহাশ্বেতা, হাসির শব্দ থেমে গিয়ে হাওয়ায় শুধু রেশ থাকল। রেশ কাঁপল, থামল… তারপর হঠাৎ সব চুপ।

ছোট্টো হাই চেপে সরস্বতী বলল—এবার ওদের দুটি দাও কুন্দদিদিমা, ঘুমোক।

সত্যেনের বুঝি ঘুম পেয়েছে? কুন্দদিদিমা কটাক্ষ হানলেন।

তোদের বিয়েতে মহাশ্বেতা? বড়োপিসির মনে পড়ল—দুটোয় লগ্ন তায় আষাঢ় মাস, বাসরেই—

হাঁ, বাসরেই ভোর! মুখের কথা কেড়ে নিলেন কুন্দদিদিমা—মজাই হয়েছিল।

আর কেমন বৃষ্টি নামল বিয়ের মধ্যে, আর ঠিক তখন কিনা বড়োবৌবড়োপিসি বলতে বলতে থামলেন। বড়োবো? মা? মহাশ্বেতা সরস্বতীর দিকে তাকাল। মাকে মনে পড়ল দুবোনের। মনে পড়ল তাদের বিয়ের মধ্যে মা হঠাৎ এমন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন যে ঐ রাত্তিরে আর ঐ বৃষ্টিতে তখনই ডাক্তার ডেকে ইঞ্জেকশন দিতে হয়েছিল তারা শুনেছিল পরের দিন..ঈষৎ বিষণ্ণ লাগল তাদের। সেটা বুঝতে পেরে বড়োপিসি কথা বদলালেন—আর পরের দিন বিয়ে দেখল না বলে স্বাতীর কী কান্না!

মেজদি-সেজদির বিয়েতে স্বাতী অন্য কারণেও কেঁদেছিল—শাশ্বতী মুখ টিপে হাসল, চোখাচোখি করল মেজদি-সেজদির সঙ্গে। দু-বোনের মনে পড়ল আমি অরুণদাকে বিয়ে করব বলে পাঁচ বছরের স্বাতীর খুননাখুনিতিন-বোনের চোখে-চোখে বয়ে গেল অন্যদের না-জানা নিঃশব্দ কৌতুক, কিন্তু মহাশ্বেতাকে এই কৌতুকটা কোথায় একটু খোঁচাও দিল। স্বাতীর দিকে ফিরে শাশ্বতী হাসল–বলে দেব নাকি? অরুণ কাশল। শ্বেতা ঘরে এসে কাছে দাঁড়াল—স্বাতী, আমি এখন যাই রে—

যাচ্ছো দিদি? মহাশ্বেতা তাকাল—থাকো না।

না, যাই— স্বাতীর দিকে সত্যেনের দিকে ফিরে, যেন তাদের সম্মতিটাই আসল, এমনি সুরে শ্বেতা বলল—কাল সক্কালেই চলে আসব, কেমন?

তুমি করলে কী এতক্ষণ? জিগ্যেস করল সরস্বতী।—এই বাচ্চাগুলোকে একটু ঠিকঠাক করে…রণক্ষেত্রের মতো পড়ে ছিল তো সব! আতা, গীতি এবার শুয়ে থাক না গিয়ে—ঘুমে ঢুলছিস তো!

ইরু? মেয়েকে হঠাৎ মনে পড়ল মহাশ্বেতার।

তোর মেয়ে বেনারসি পরেই ঘুমুচ্ছে রে–শ্বেতা হাসল। ঘুমুচ্ছে? গীতির কানে গেল কথাটা। কে? আমি? না, আমি তো জেগে আছি-এই তো! কিন্তু চোখ তখনই আবার জড়াল, ট্রেনের দোলা লাগল শরীরে, ট্রেন…এই টুন্ডলা এল, মা।

শোভা কালই যাবি? লোভর মুখ দেখতে মাথা একটু কাত করল শ্বেতা। শোভা তখন মহাশ্বেতার পিছনে বসে মহাশ্বেতার গলার কচ্ছপের ডিমের মতো মুক্তো খুঁটছিল, চকিতে হাত সরিয়ে সলজ্জ বলল–হ্যাঁ, শ্বেতাদি, কালই যাব।

তোর শাশুড়িকে একটা—আচ্ছা, কাল বলব। শ্বেতা সরে এল স্বাতীর কাছে, নিচু হয়ে তার ঘোমটা-টাকা মাথায় হাত রাখল, সত্যেনের চোখে চোখ ফেলল একবার। সোজা হতে-হতে বলল—বেশি আর জাগিয়ে রেখো না পিসিমা, ওদের আবার না শরীর-টরীর খারাপ হয়। স্বাতীরও তাই নাকি? এবার স্বাতীকে তাক করলেন অক্লান্ত কুন্দদিদিমা। আচ্ছা—স্বাতী-সত্যেনের কাছে আর একবার চোখে বিদায় নিয়ে শ্বেতা ঘরের বাইরে এল। এসেই ডালিমের সঙ্গে দেখা। ডোরাকাটা সিল্কের শার্টের উপর এখন একটা খয়েরি পুলওভার তার গায়ে। ডালিম বলল-রিকশ এনেছি, মা!

বেশ—শ্বেতা চলে যাচ্ছিল, ডালিম তাড়াতাড়ি আবার বলল-আমি… আমি আর না গেলাম, মা।

না, না, তুই যাবি কেন, থাক। আর কিন্তু রাত জাগিস না। মুখোমুখি ঘর থেকে বেরিয়ে এল বিজু। এমন করে আলোয়ান মোড়া যে হাত দুটো সুষ্ঠু ঢাকা। শ্বেতা বলল—বিজু ঘুমোসনি? বিজন ফ্যাশফেশে গলায় জবাব দিল—ঘুমোব কেন? তুমি যাচ্ছ?—হ্যাঁ রে। ট্যাক্সি এনেছে? ডালিম বলল—কোনো ট্যাক্সি আসতে চাইল না, মামা। রিকশ আনলাম।

ভারি নবাব হয়েছে তো ট্যাক্সিওলারা! দেখো বড়দি, লোটনকে ভাল করে ঢেকে-চুকে নিও, আবার ঠান্ডা না লাগে।

হয়েছে, হয়েছে। বিজনের গালে ছোট্ট চড় দিল শ্বেতা। তার গায়ের দিকে তাকিয়ে বলল—কার আলোয়ান রে ওটা?

এটা? এটা সত্যেনের।

ও, সত্যেনের আলোয়ান বুঝি বেশি গরম? বিজন যেন শুনতেই পেল না কথাটা। বাসরঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বলল-ওসব আর কতক্ষণ?

এই শেষ হবে এবার।

কত রাত হল! নাঃ, পিসিমাকে বলি এখন বলতে-বলতে বিজন এল বাসরঘরের দরজায়, ডালিম তার সঙ্গে এল, মামা-ভাগনে বাসরঘরে ঢুকল। দু-সার ঘরের মাঝের গলি দিয়ে শ্বেতা এগোল, এল সামনের বারান্দায়, যেখানে দাঁড়িয়ে সন্ধেবেলা বর আসা দেখেছিল মেয়েরা। ঠান্ডার জন্য একদিকের চিক ফেলে দিয়েছে এখন। তক্তাপোশের বিছানায় নেপাল-পিসেমশাই, চোখ আধ-বোঝা, স্থির, হাঁ-খোলা, ঠোঁট বাঁকা, হঠাৎ দেখলেনা, বালাপোশের তলায় ফাঁপা বুকটা উঠছে পড়ছে—আহা ঘুমোক—বেলিও, ঘুমোচ্ছ মেঝেতে কম্বল-মুড়ে খেয়েছিল কিছু? হ্যাঁ। শ্বেতা সরল, বারান্দার অন্যদিকে দেয়ালঘেঁষা ইজিচেয়ার, ছাইরঙা আলোয়ান, বাইরে চোখ…বাবা।

বাবা—শ্বেতা আস্তে ডাকল। রাজেনবাবু মুখ ফেরালেন।

রিকশ এসেছে, বাবা।

চল—রাজেনবাবু উঠলেন, মেয়ের একটা কাঁধ চোখে পড়ল, মোটা লংক্লথের জামা।

তোর গায়ে গরম কিছু—

আছে, চলো।

রাজেনবাবু চলতে চলতে বললেন—হেমাঙ্গ ফিরেছে?

ফেরেনি এখনো, অনেককে নামাতে হবে তো!

দেরি হচ্ছে না?

দেরি হবে কেন? এই তো খানিক আগে… তোমার ভাবনা হচ্ছে নাকি?

না, না, রাত হল তো, আবার ব্ল্যাক আউট—

কিচ্ছু না! একটু দাঁড়াও, বাবা।

দোতলায় সবচেয়ে বড়ো যে ঘরটিতে স্বাতীকে তখন সাজানো হয়েছিল, সেই ঘর থেকে ঘুমোননা লোটনকে কোলে করে নিয়ে এল শ্বেতা। লোটনকে জড়িয়ে নিয়েছে গোলাপি উলের স্কার্ফে, নিজের পিঠের উপর সাদা একটি স্কার্ফ ফেলা। একটু পরে তো আবার থামল—বাবা, একবার দেখে যাবে নাকি?

******

বাসরঘরের দরজায় রাজেনবাবু থামলেন। সামনে দাঁড়ানো বিজু আর ডালিমের ফাঁক দিয়ে একবার স্বাতীকে দেখলেন, ডালিম আর অরুণের ফাঁকে একবার সত্যেনকে। আতা, গীতিকে ধাক্কা দিয়ে বলল—ওঠ না… সরস্বতী বলল—সত্যেন তাহলে…উজ্জ্বল আলোর সিঁড়ি দিয়ে নামল দুজনে। উজ্জ্বল একতলা পেরোল। কেউ নেই, চুপ। শাশ্বতী বলল–স্বাতী কি…শোভা ভাবল ঘুম। অন্ধকার কলকাতা কালো। রিকশর দুই চোখই উজ্জ্বল। টুংটাং, চুপ…সব চুপ। টুংটাং, আরো কালো মাথার উপর আকাশ, আরো উজ্জ্বল আকাশের তারা… তারা… কত! মহাশ্বেতা বলল শাশ্বতী তুই…কুন্দদিদিমা বললেন সত্যেন, এই প্রদীপ কিন্তু সারা রাত…টুংটাং রিকশ… অন্ধকার। কেউ নেই… চুপ। ঠোঙায় ঢাকা.. মিটমিট আলোর পোকা, বড়ো বড়ো বাড়ি, অন্ধকার। এই রইল খাবার জল, আর এই… আর রাত্রে যদি…কালো গাছগুলি কালো, শূন্য ট্রামলাইন কালো..শূন্য ফুটপাতে একলা বিড়াল। অরুণ বেরিয়ে বলল—কোন ঘরে, বিজন বলল—হেমাঙ্গদা এখন… এই তো হেমাঙ্গবাবু…চলো ডালিম…শ্বেতা বলল–বাবা তোমার শীত… রাজেনবাবু বললেন–লোটন তো খুব…রিকশ টুংটাং, অন্ধকার..অন্ধকারে পাহাড়ের মতো রেল-লাইনের বাঁধ। টালিগঞ্জের ব্রিজ… প্রদীপ-জ্বলা কুলো দেয়াল ঘেঁষে সরিয়ে রাখলেন বড়োপিসি। শোভা ভাবল শেষ, এরপর…বাবু কাহাপর.. শোভার হাই উঠল, শেষ..শাশ্বতী বলল—পিসিমা…কুন্দদিদিমা সরে এসে…রিকশ মোড় নিল, নিঃসাড় পাড়া, ঝলমল জোনাকি, ঝলমল শাড়ি… মহাশ্বেতা-সরস্বতী উঠল। টুংটাং চুড়ি…রিকশ থামল টুং। আচ্ছা, আচ্ছা…চলি। চলি, রাজেনবাবু আগে নেমে লোটনকে কোলে…শ্বেতা নেমে বাবার কোল থেকে মেয়েকে … মহাশ্বেতা-সরস্বতী বোেল … শোভা, শেষ..রাজেনবাবু তিনটি সিঁড়ি উঠলেন… শূন্য। শাশ্বতী… কুন্দদিদিমা যেতে-যেতে ঘরের আলো নিবিয়ে…অন্ধকার, অন্ধকার। বন্ধ… পকেট থেকে চাবি… বড়োপিসি বাইরে এসে দরজা ভেজিয়ে..রাজেনবাবু দরজার সামনে নিচু হয়ে… চুপ… সারা বাড়ি চুপ… পৃথিবী চুপ… শ্বেতা একবার আকাশের দিকে মুখ তুলল…তারা, চুপ। স্বাতী নড়ল না, সত্যেন নড়ল না, চুপ…কুলোর প্রদীপের ছায়া-ছায়া আলল… লুকোনো, লাজুক… বলতে-না-পারা কথা, ভুলতে-না-পারা…দরজা খুলে গেল… অন্ধকার। কেউ বলল না… কেউ ভুলল না… অন্ধকার ঘরে দুজনে। অন্ধকারে দুজনে, পাশাপাশি, কুঁকড়োনো, টান…বলল না…ভুলল না। শ্বেতা দাঁড়াল…রাজেনবাবু দেয়ালে হাত তুলে…টান, দুটো প্রাণ… জীব… হৎপিণ্ড… স্পন্দনের পিণ্ড..চোখ নেই, চোখ খোলা, খালা জানলা কালো…বাইরে কালো, কালে আকাশে তারা… দূরে… পারে… পরপারে… হয়ে-যাওয়া… না-হওয়া… হতে-থাকা… চিরকালের… আকাশ-ভরা স্তব্ধ তারা তাকিয়ে থাকল।

Share This