৩.০১ যবনিকা কম্পমান

যবনিকা কম্পমান
তৃতীয় খণ্ড

বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। নিঃশব্দ, প্রায়-অদৃশ্য বৃষ্টি। অচেনা, ছায়া-ছায়া, ঝাপসা আলোর রাস্তায় গাড়ি মোড় নিচ্ছে এক-একবার, আর হেডলাইটের কড়া কৌতূহলের সামনে ধরা পড়ে যাচ্ছে লম্বা, বাঁকা, সমান্তরাল বৃষ্টিরেখার এক-একটি ঝক। কিন্তু মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার আবছা, আবার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভিতরেও নিঃশব্দ। গাড়ি চলছে প্রায় দশ মিনিট ধরে, আর এই সময়টুকুতে একটা টুকরো কথাও পড়েনি ভিতরকার কাচবন্ধ, মখমল-ঘন অন্ধকারে। নরম, খুব নরম একটা আরামের মতো সেই অন্ধকার, তাতে সবাই ড়ুবে আছে যেন। কেউ যে কিছু বলছে না তাও কেউ জানে না।

একবার একটা মোড় নেবার পর রাজেনবাবু বললেন—খুব বৃষ্টি হচ্ছে। কথাটা পড়ল যেন বালিশের উপর কাচের টুকরো। কোনো রেশ তুলল না। একটু পরে রাজেনবাবুই আবার বললেন—কিন্তু গরম কী–!

ঐ ‘গরম’ কথাটায় স্বাতী জেগে উঠল। সত্যি—কত ইচ্ছার বৃষ্টি, কত আশার আষাঢ়, আর তার প্রথম ঝাপটা কিনা বাজে খরচ হয়ে গেল এই বন্ধু গাড়িতে বসে! রওনা হবার পরে এই যেন প্রথম বুঝল সে কোথায় আছে, কোথায় যাচ্ছে, কোত্থেকে এল। একটু নড়ল, হাত বাড়িয়ে কঁচ নামাল, আর সঙ্গে-সঙ্গে ধাক্কা লাগল বর্ষার। কানে ঝমঝম গান, গায়ে ঠাণ্ডাভিজে হাত—না, হাত না, কোনো হাত অত নরম হয় না। স্বাতী ঝুঁকল বাইরের দিকে, আর বর্ষার আস্ত একটা জগৎ তার দিকে ছুটে এল। কলকাতার বৃষ্টিরাতের কালো, চিকচিকে, আলোপিছল রাস্তা, গাছগুলি আরো কালো, ফুটপাতের ছায়ার নাচ, আর মুখে, শরীরে, মনে এই মাটির ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা—আঃ!

আঃ! ভিতর থেকে শাশ্বতীর গলা উঠল। করছিস কী, শাড়িটা ভিজে গেল! আবার কাচ তুলে দিতে দিতে স্বাতী বলল—বেশ লাগছিল।

যত অদ্ভুত তোর–। কথা শেষ না করে শাশ্বতী হাত দিয়ে টান করতে লাগল হাঁটুর কাছে তার ইট-রঙের জর্জেট।

একটু নামিয়ে রাখলে কিন্তু মন্দ হয় না–রাজেনবাবু চেষ্টা করলেন তার দিকের কাচটা নামাতে। কিন্তু হাতলটা হয় খুঁজে পেলেন না, নয় ঘোরাতে পারলেন না।

আমি দেব, বাবা, নামিয়ে?—স্বাতী ঝুঁকে পড়ল ওদিকে, শাশ্বতীর হাঁটুর উপর দিয়ে হাত বাড়াল, শাশ্বতী সরু গলায় চেঁচিয়ে উঠল–এই!

কী হল? বিজন, ড্রাইভারের পাশে, মুখ ফেরাল।

পাড়টা মাড়িয়ে দিলি বোধহয় বলল শাশ্বতী। বলতে বলতে নিচু হয়ে দু-আঙুলে খুঁটে দেখতে লাগল।

এক শাড়ি দিয়ে সমস্তটা গাড়ি ভরে রেখেছ, কিচ্ছু করা যাবে না।—কিছু করবার চেষ্টা ছেড়ে দিল স্বাতী, বসল আবার ঠিকমতো।

হয়েছে কী? বিজন জানতে চাইল। রাজেনবাবু জবাব দিলেন—কিছু না।

একটু পরে, যেন কিছু বলবার জন্যই, যেন শাড়ি নিয়ে একটু যে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে সেইটে চাপা দেবার জন্যই শাশ্বতী বলল—এটা কোন রাস্তা রে, বিজু?

আমিরালি এভিনিউ-শাশ্বতী সঙ্গে সঙ্গে জবাব পেল। তারপর মুখ না ফিরিয়ে, চোখ না ফিরিয়ে গড়গড় আউড়িয়ে গেল কলকাতার ভৌগলিক–এখনও আমিরালি এভিনিউ, বাঁয়েরটা ব্রাইট স্ট্রট…ঐ ডাইনে রইল স্টোর রোড…এই ওল্ড বালিগঞ্জ রোড় আরম্ভ হল।

এর পরে শাশ্বতী যে কথা বলল, আগেরটার সঙ্গে তার কোনোই যোগ নেই—সত্যি করে বল তো স্বাতী, কেমন লাগল তোর আজ?

সত্যি করে মানে!

মানে… তোর তো কিছুই ভাল লাগে না।

তা নয়, তুমি বলতে চাচ্ছ যে আসলে আমার ভাল লাগে, কিন্তু মুখে বলি, না। কিন্তু না, ও-রকম আমি বলি না কখনো। তাছাড়া ভালোেও আমার লাগে, সবই… প্রায় সবই। নতুন একটা খবর পেলাম আজ—শাশ্বতী ঠাট্টার চেষ্টা করল—তাহলে ধরে নিতে পারি যে আজ তোর ভালই লেগেছে।

আপাতত খুব বেশি ভাল লাগবে, যদি তুমি আপত্তি না কর ঐ কাচটা.. একটা… একটুখানি নামালে।

এবার সহজেই শাশ্বতী রাজী হল বোনের মরজিতে। কিন্তু যতটা সম্ভব বাবার দিকে ঘেঁষে বসল, আর স্বাতীও কাচ নামাল। সবটা না, মাত্র নাক পর্যন্ত। শাড়ি-টাড়ি বাঁচল, আর স্বাতীও বাচল বুকে একটু ঠাণ্ডা হাওয়া আর একটু জলছিটে নিতে পেরে।

বলিনি আমি তোমাকে! দ্রুত ঘাড় ফেরাল বিজন।—আগে যা ছিল। এখন একটু মোটা হয়ে তত স্মার্ট আর নেই।

অনেক অ্যাক্টরের চেয়ে ভাল–শাশ্বতীর মন্তব্য ঠিক যেন বিজনকে লক্ষ্য করল না—ফিল্মে কেন নামেন না, জানি না।

চেহারা আর গান হলেই তো হল না! বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞভাবে, আর একটুখানি তাচ্ছিল্যেরও সুরে বিজন সমস্যার সমাধান করল—অ্যাক্ট করতেও পারা চাই তো!

গান কিন্তু ফিল্মে যা শুনেছি তার চেয়েও ভাল। শাশ্বতী একটু থামল, তারপর সোজাসুজিই লক্ষ্যে তাক করল–না রে স্বাতী?

স্বাতী বসে ছিল সামনে এগিয়ে, নামানো কাচের ধারটুকুতে প্রায় নাক ঠেকিয়ে। তেমনি বসেই জবাব দিল—কিন্তু মানে?

তুই আজ বড়ো মানে জিজ্ঞেস করছিস, স্বাতী! শাশ্বতী হাসল, বিরক্ত হলে মানুষ যেমন হাসে।

আরো কিছু বলবার সময় দিল স্বাতীকে। তারপর একটু চড়া গলায়, একটু বেশি জোর দিয়ে বলল—আমার তো চমৎকার লাগল।

কিন্তু স্বাতী এতেও সাড়া দিল না।

গড়িয়াহাট–রাসবিহারী মোড়! বাস-কণ্ডাক্টরের মতো মোটা গলায় ঘোষণা করল বিজন— তুমি এক্ষুনি পৌঁছে যাবে, ছোড়দি।

এতক্ষণে বাইরে তাকাতে ইচ্ছে করল শাশ্বতীর। পুরোেনো বালিগঞ্জের থমথমে বড়োমানুষি অন্ধকারের পরে ভালো লাগল আলো-দোকান, এখানে-ওখানে বৃষ্টিতে আটকে থাকা ভিড়। নিজের এলাকায় ফিরে আরাম পেল, সহজে নিশ্বাস নিল। গাড়ি ডাইনে ফেরার পরে রাসবিহারী এভিনিউর এই অংশটুকুর অন্তরঙ্গতা, যাতে আর কারো অংশ নেই এখানে, নিঃশব্দে উপভোগ করল, তারপর স্বাতীকে আর আলাপে টানবার চেষ্টা না করে তার অন্য পাশের মানুষটির দিকে ফিরল–বাবা, তোমার কেমন লাগল গান?

ভালো। যেন যথেষ্ট বলা হল না, রাজেনবাবু আবার বললেন–ভালল। বাবার কাছে শাশ্বতী এর বেশি আশা করেনি, তাই দমে গেল না। বরং উৎসাহ চড়িয়ে বলল—কী সুন্দর গান, সত্যি! ভাগ্যিশ মজুমদারের সঙ্গে চেনা হয়েছিল আমাদের, তাই তো শুনতে পেলাম!

বিজনের পিঠটাতেই একটা জাঁকালো ডঙ্গি হল, আর অন্ধকারেও তা বোঝা গেল। রাজেনবাবু ভাবলেন ড্রাইভর শুনল নাকি কথাটা, আর শুনে থাকলে ভাবছে কী? কিন্তু শাশ্বতীকেঅবহিত করে দিতে হলে যতটা দরকার, ততটা গলা নামাতে রাজেনবাবু পারেন না, কোনো পুরুষই পারে না বোধহয়। তাই কথাটা ঘোরাবার চেষ্টা করলেন, হারীত এল না কেন জিগ্যেস করে। —ও এ-সব গান ভালবাসে না। দ্রুত, নিশ্চিন্ত জবাব দিল শাশ্বতী। যেন নিজের সঙ্গে স্বামীর এই রুচিভেদে সে একটুও বিমর্ষ না, বরং খুশি।

আজকাল বুঝি স্বামীকে ও বলে মেয়েরা? রাজেনবাবুর মৃদু প্রশ্ন।

স্বামীরাও তাই বলে যে!–অর্ধেক প্রশ্নের সুর শাশ্বতীর উক্তিতে।

আমাদের সময় স্বামীরাও ‘উনি’ বলতেন।

ও একটা বললেই হল–শাশ্বতী চাপা দিল কথাটা। কিন্তু একটু পরে আবার বলল— আজকালকার মেয়েদের আর তুমি কী জান, আর আমিই বা কী জানি?

কথাটা সে বলল উর্মিলার কথা ভেবে। কী একটা অদ্ভুত খোপা করেছিল! কী অদ্ভুত সাজ, কী কটকটে রং ঠোঁটের, আর গানের পরে যতক্ষণ তারা ছিল, ততক্ষণের মধ্যে একবার থামল

তার চরকি কথার তুর্কিনাচন! বাবা নিশ্চয়ই অনুমোদন করবেন না, তাই তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল সে। কিন্তু তার গভীর মন্তব্যটি রাজেনবাবুর কোনোই প্রত্যুক্তি জাগাল না, আর, সময়ও আর হল না— শাশ্বতী পৌঁছে গেল।

বাইরে হাত বাড়িয়ে বিজন বলল—যাক বৃষ্টিটা ধরেছে। শাশ্বতী এখন অনেকটা পারে। কিন্তু এতগুলি ফ্ল্যাটের মধ্যে তেতলা পর্যন্ত সিঁড়ি… রাত্তিরে একলা তার খারাপ লাগে এখনও। বিজনকে সঙ্গে নিল।

******

স্বাতী এতক্ষণ চুপ করে ছিল বাইরে তাকিয়ে। ছোড়দির নামার সময়ও কিছু বলেনি। কিন্তু গাড়িটা একেবারে একটা ল্যাম্প-পোস্ট ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে বলে সে সরে এল ভিতরের অন্ধকারে। আর চোখ ফিরিয়েই বাবাকে দেখতে পেয়ে এমন খুশি হল যেন সে আশাই করেনি বাবাকে এখানে দেখতে। আরও একটু কাছে সরে নিচু গলায় বলল—আমি কিন্তু ভাবিনি বাবা, যে তুমি সত্যি-সত্যি ওখানে যাবে।

কেন, আমার কি কখনও কোথাও যেতে নেই?

অন্য কোথাও হলেড্রাইভরের ঘাড়ে চোখ রেখে স্বাতী চুপ করল।

আমিও… তোর কথা… ঠিক ঐরকমই ভেবেছিলাম— বললেন রাজেনবাবু।

স্বাতীর মুখ তক্ষুনি ফিরে গেল বাবার দিকে, আবার তক্ষুনি নিচু হল। বাবা তাহলে বোঝেন—

কতটা বোঝেন? তার মনের এ-দুর্দিনের, এ-কদিনের উথালপাতাল বাবা কি জেনেছেন, বুঝেছেন, কিছু না বলে, না শুনে, শুধু তার মুখ দেখে? অস্বস্তি হল স্বাতীর, আর সেই সঙ্গে আশ্বস্তও হল সে। জীবনের যে জটিলতা তার কাছে একেবারে নতুন, আর সেই জন্য দুরন্ত ভয়-দেখানো, তার চেয়ে… হঠাৎ বুঝল, তার চেয়েও ব্যাপ্ত তার প্রথম চেনা পুরোনো সব সরলতা।

নিজের দিকের কাচটা এতক্ষণে ঠিক ঠাওরাতে পেরে রাজেনবাবু নামিয়ে দিলেন আস্তে আস্তে।

ছোট্টো বন্ধ জায়গাটুকুর মধ্যে বর্ষারাতের বাতাস ঝিরিঝিরি দিল।

বৃষ্টি হয়ে বাঁচল!—রাজেনবাবু নিশ্বাস নিলেন। স্বাতী মুখ তুলে বলল—কতকাল পরে আমাদের সঙ্গে তুমি কোথাও গেলে, বাবা!

শাশ্বতী এমন করে বলতে লাগল-রাজেনবাবু তার এই নিয়মভাঙা ব্যবহারের একটা জবাবদিহির চেষ্টা করলেন।

আমি তোমাকে ইচ্ছে করেই বলিনি—স্বাতীর এই উত্তরটাও যেন জবাবদিহি।

আমি কিন্তু তোর জন্যই এলাম।

আমার জন্যে? কেন?

আমার মনে হল… সেটাই ভাল মনে হল।

এ কথাটা আগেরটার চেয়ে ধাক্কা দিল স্বাতীর মনে। মুহূর্তের জন্য চিরচেনা বাবার অন্য এক চেহারা দেখতে পেল সে। সহজ… জল-সহজ বাবা, কোনোদিন কিছুর মধ্যে নেই, সবসময় সবটাতেই রাজি। সেই বাবাও কি তবে গভীর জলের মতোই গভীর, স্রোতের মতোই বাঁকা, চোখ-ঠকানো অজানা? এবার তার অস্বস্তিটা বেশি হল, বাবা যেন আড়ি পেতেছেন তার মনে, যেন বাবাকে সে তার যত কাছের আর যে রকম কাছের মানুষ বলে জানে, তিনি তার চেয়েও তার কাছে, অন্যরকম কাছে। যেন মনে-মনে ভাবনাতেও তার স্বাধীনতা নেই।

বিজন ফিরে এল। ভিতরে জায়গা হওয়া সত্ত্বেও ড্রাইভরের পাশে বসল আবার। স্বাতী সরে এল বাবার পাশ থেকে জানলার ধারে। সত্যি সে চায়নি যে বাবা ওখানে যান। কেননা, প্রথমত, তার মতে বাবার যথোচিত নিমন্ত্রণ হয়নি। যদি হতও… দ্বিতীয়ত… তবু না যাওয়াটাই বাবাকে ঠিক মানাত। আর তৃতীয়ত… আর এটাই আসল, বাবা কাছাকাছি থাকলে নিজেকে একটু ছেলেমানুষ তো লাগেই। একটুও ছেলেমানুষ হতে আজ সন্ধ্যায় সে চায়নি, চেয়েছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। যাতে কোনো সময়ে কোনো একটা কৌশলে কমিনিটের জন্য উর্মিলাকে সে একা ধরতে পারে…তারপর ফিরতে পারে নিশ্চিন্ত হয়ে। যে কথাগুলি মনে-মনে সে তৈরি করেছে তা বলতে হলে সত্যিকার চেয়েও বড়ো হতে হবে তাকে, যেমন সত্যিকার চেয়ে বড়ো করে ছবি আঁকে মানুষের, কিংবা যেমন সিনেমায় প্রকাশ করে দেখায়। আঠারো বছরের ঘরেথাকা, বই-পড়া বাঙালি মেয়ে হলে চলবে না, নিজেকে ছড়াতে হবে, হতে হবে বইয়ের কোনো বানানো মেয়ের মতো, যেমন ধর পোর্শিয়া। কিন্তু গোর্শিয়ার বাবা যদি সেখানে বসে থাকতেন, তাহলে সে পারত নাকি অ্যাটনিওকে জিতিয়ে দিতে? বাবার পাশে বসে ট্যাক্সিতে যেতে-যেতে সারা পথ স্বাতী এই ভাবল যে, যে-কাজে যাচ্ছে সেটা মস্ত, আর সে হোটো। এমনিতেই ছোটো, আরো ছোটো বাবা সঙ্গে বলে। প্রতিকূলতার পুরো হিসেব নিল মনে মনে। অচেনা বাড়ি, অচেনা লোকজন, নিমন্ত্রিত হবার অসুবিধে—আর শুধু কি তাই? বিষয়টা বিশ্রী, উর্মিলা বিশ্রী— ঐ বিশ্রীটাকে ঠেকাতে গেলেও তো হাতে ছুঁতে হবে, ঐ কথাগুলি মুখে আনলেই একটু নোংরা সে নিজেই কি হয়ে যাবে না? আর, যে তার কেউ নয়, তাকে মুখের উপর অপ্রিয় কিছু বলা, এ-ও কি কম কথা? কোনদিন তো বলেনি, কেন বলতে হচ্ছে..বলতে হয়? যে যার মনে থাকলেই তো পারে পৃথিবীতে, তাহলেই তো সুখী হতে পারে সকলেই। কেন একজন অন্যজনকে দুঃখ দিতে গিয়ে দুঃখ পায় নিজেই?

দুঃখ? কথাটা খট করে বিঁধল স্বাতীর কানে, মনের কোণে। ভাল না কথাটা, ওতে আরো দুর্বল করে। তার একটা আবছা-আবছা ধারণা হল যে সংসারে এতরকম লোক আছে, আর তারা এতরকম মতলবে ঘুরে বেড়ায় যে দুঃখ যদি সব-শেষের বেশি-দামের না হয়, তাহলে বেঁচে থাকাই শক্ত। বেঁচে থাকতে হলে, মানে ঠিকমতো, নিজের ইচ্ছেমতো বেঁচে থাকতে হলে একথাই ভাবতে হবে, মেনে নিতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে যে আমাকে কেউ দুঃখ দিতে পারে না। আমি আমার নিজের মনে যত ইচ্ছে মনখারাপ করতে পারি, কিন্তু অন্য কেউ আমাকে একটুও নড়াবে কেন যেখানে আছি সেখান থেকে? ছেলেবেলা থেকে তার খুব চেনা যে মনখারাপ, সেটা স্বাতী এতদিনে বুঝেছিল, সেটা দুঃখ না, দুঃখ বাইরে থেকে আসে, আর মনখারাপটা নিজের মধ্যে জন্মায়, আর নিজের সবই তো আমরা ভালবাসি? তাছাড়া মনখারাপেরও সুখ আছে, ওটা যেন সুখেরই ছড়িয়ে-পড়া চেহারা। সুখ জ্বলজ্বলে রং, সূর্যাস্তের আকাশের মতো, এখানে লাল, ওখানে সোনালি, আরো দূরে হলদে, কিন্তু মাঝে মাঝে ফাঁক, অনেকটাই ফাঁকা। তারপর ওসব যখন মুছে যায় আর সমস্তটা আকাশ জুড়ে কেবল একটা ছায়ারং, ছাইরং, না-রং থাকে, মনখারাপও সমস্ত মন ভরে সেইরকম। আর দুঃখ? যাতে গলা শুকোয়, কথা ফোটে না, ভয় করে। না, দুঃখ কিছুতেই না।

একটি হাতের একটুখানি-মৃদু ভঙ্গিতে স্বাতী যেন জানা, অজানা আর না-জন্মানো সমস্ত দুঃখকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল চলতি ট্যাক্সি থেকে রাস্তায়। হালকা করেছিল মন—এ তো কিছুই না, কোনো নিমন্ত্রণে যাব না বলার মতো। কিন্তু কেউ যদি আমাকে অন্যকেউ ভেবে কথা বলে, তার ভুল শুধরে দেবার মতো। আবার তার যত্নে বানানো বক্তৃতাটি আউড়ে নিল মনে-মনে। বইয়ের শেষ প্রফ পড়ার সময়ে লেখকের মতো প্রত্যেকটির কথা শেষবার ভাবল। এখানে একটা সরাল, এখানে একটু বসাল, কমা-টমাগুলির কড়া পরীক্ষা নিল, বাধ্য হল মানতে যে যতটা সে পারে, ততটাই এটা ভাল। এর চেয়ে ভাল হতে পারে না, এখন পারে না। আর ট্যাক্সি থেকে নামল হালকা, নিশ্চিন্ত, তৈরি—আর ছাপা হয়ে না বেরোনো পর্যন্ত লেখক যেমন থাকে, তেমনি একটু একটু উদ্বিগ্ন।

বেরতে দেরি হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময় পার করে দিয়েছিল বাড়িতেই। শাশ্বতীর তাড়া আর বিজুর ছটফটানিতে রাজেনবাবু জল ছিটিয়েছিলেন এই বলে যে গান-বাজনার ব্যাপারে দেরিটাই নিয়ম। কিন্তু তিনি পুরোনো মানুষ—এযুগের কথা কী জানেন। আর তার অন্যতম প্রতিনিধি শশাঙ্ক দাসের কথা তো কিছুই না। এখনকার গাইয়ে-বাজিয়ে মহলের ভিতরকার খবর যারা রাখে–ততটা ভিতরে বিজুও ঢুকতে পারেনি এখনও–তারা সকলেই জানে যে অন্যান্যরা, যেমনই হোক, শশাঙ্ক দাস কোথাও গাইবে বললে কাটায় কাটায় যায়, আর গিয়েই দেরি-হওয়াদের কারো জন্যই অপেক্ষা না-করে এমনকি গল্পগুজবও এড়িয়ে, পারলে তক্ষুনি আরম্ভ করে দেয় গান। কম কথার মানুষ বলে নাম… বদনাম আছে তার। ভক্তরা পছন্দ করে না তার আঁটোমুখ স্বভাব। বলে—লোকটা মিশুক হলে তার পসার জমত আরো। আবার কেউ বলে ওটা তার ব্যবসার চাল, ঐ গম্ভীর, হামবড়া ভাবটার জন্যই তার রোজগারে নাকি শূন্য বেড়ে যায় ডান দিকে। আর তাই, স্বাতীরা যখন পৌঁছল, তখন তানপুরায় সুর দিয়েছেন শশাঙ্ক। মামা-ভাগনির অভ্যর্থনা খর্ব হল, বসে পড়তে হল আসরের ভিড়ের মধ্যে। হ্যাঁ, রীতিমত ভিড়, আর ঘরটাও প্রকাণ্ড যদিও মজুমদার অন্যরকম বলেছিল, কিংবা সেইজন্যই বলেছিল বোধহয়। কিন্তু মজুমদারের বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবের বৈষম্য ভাল করে লক্ষ করার সময় হল না স্বাতীর। নতুন জায়গা, চারিদিকে নতুন মুখ, দেয়ালে সোনালি-ফ্রেমে সস্তা বিলিতি ছাপা ছবি, দরজা-ধারে জুতোজঙ্গল, সারামুখে হাসি-চোঁওয়ানো মজুমদার, উর্মিলার বুক-দেখানো পোশাক—এই সব সুতীক্ত বাস্তব তানপুরার গুঞ্জনে চাপা পড়ল।

তোমাদের দেরি হল… আমরা ভাবছিলাম… যাক, ঠিক সময়েই এসেছ, এই মাত্রই আরম্ভ হল— তার পাশে বসা উর্মিলার এই কথাগুলি সে যেন কানেই নিতে পারল না। আর এর পরে উনি আজ যা গাইবেন সব একেবারে নতুন গান, ওঁর নিজের সুর, নিজের বানানো—এই আলোর রেখাটিও মুছে গেল তানপুরার ঝমঝম কুয়াশায়। আর এরপর অবশ্য খানিকক্ষণ… কতক্ষণ? আর কিছুই ছিল না কোনোখানে, গান ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

মজুমদার তার জায়গা থেকে মাঝে-মাঝে দেখছিল স্বাতীকে, চোখাচোখিরও চেষ্টা করছিল। কিন্তু বাতীর চোখ বোজা, শরীর স্থির। একেবারে স্থিরও না, কোমরের উপর থেকে একটু-একটু দুলছিল অল্প হাওয়ায় কাঁচা বাঁশের ঝাড়ের মতো। আর তার একটু ফাঁক হওয়া ঠোঁট দুটিতে আর যেন ভাষার চেতনা নেই। আসনপিড়ি হয়ে বসেছে, হাত দুটি কোলের উপর জড়ো করা, তুলে ধরা সম্পূর্ণ মুখটি যে-কোনো ইচ্ছুক চোখের তলায় খোলা। অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য মজুমদার লক্ষ্য করল সেই মুখে—অদ্ভুত আর নতুন, আগে দ্যাখেনি। কোনো ছবির মতো, ধূপের ধোঁয়ায় আবছা দেখা প্রতিমার মুখ, কোনো দূর, উদাসীন, কারো-কোনো-কাজে-না-লাগা সৌন্দর্য, আর তাতে—মজুমদার অনুভব করল, যদিও অনুভূতিকে ভাষা দিতে পারল না-তাতে যে কৌমার্য আঁকা আছে তা যেন কোনোদিন নষ্ট হবে না। মজুমদারের ঠিক ভাল লাগল না, যেন ধাঁধায় পড়ল, ব্যবসার কোনো হাত-সাফাইতে ঠকে যাবার মতো ভাব হল হঠাৎ।

পুরীতে, ঘিঞ্জি শহরের অলিগলির ভিতর দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে হেঁটে হেঁটে, সমুদ্র ভুলে গিয়ে, কোনো এক অচেনা পাড়ায় হঠাৎ এক অচেনা মোড় নিতেই সামনে যখন সমুদ্র খুলে যায়, তখন যেমন লাগে, তেমনি লেগেছিল স্বাতীর। মানে, ভাববার শক্তি যদি তার থাকত তাহলে বুঝত, তার এখনকার অবস্থাটা সেইরকম। এসেছিল পোর্শিয়া সেজে তর্ক করতে, যুক্তি দিয়ে মামলা জেতার ফন্দি নিয়ে। আসামাত্র কোথায় সে পড়ল? প্রথমে ছেলেবেলার জগতে, স্বাধীন, সহজ, অবোধ ছেলেবেলায়—মনে পড়ায় ভরে গেল মন। যতীন দাস রোডের বাড়ি, মা, মেজদিসেজদির বিয়ে, আর শুভ্র—শুভ্রকেও মনে পড়ল। কিন্তু কিছুতেই কোনো আবেগ আর নেই, দুঃখ নেই; দুঃখ না, রাগ না, সুখ না, শুধু স্তব্ধতা। যা কিছু এখন আর নেই, আর নেই বলে কখনো ফুরোবে না, সে সবের স্তব্ধতা। তারপর, আরো গভীর, আরো জটিল সুর যখন উঠল, মনে পড়ায় সেই জাদুকরা জগৎ মিলিয়ে গেল, তখন পটে-আঁকা ছবির শান্ত সীমানার বদলে এবার দিগন্ত, শূন্য, আকাশ, সেই সব অসম্ভব উঁচু-উঁচু আকাশ, সব সমান্তরাল রেখা যেখানে মেলে, আর যেখানে প্রত্যেকটি ইচ্ছা… সেই ইচ্ছারই পূর্ণতা।

এখনও ঝাপসা হয়ে আছে স্বাতীর মন। কী-গান, কেমন গান, রাগিণীর নাম কী, কেউ জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলতে পারবে না। হঠাৎ তাকিয়ে বড়ো কড়া লেগেছিল আলো, আর সকলেই যেন বড়ো চড়া গলায় কথা বলছে। শশাঙ্ক দাস চওড়া বুক দিয়ে আরো একটি গানের পীড়াপীড়ি ঠেকিয়ে দিলেন, আর তিনি উঠতেই সকলে উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে। সভা ভাঙল—কিচিরমিচির কথা, জুতো খোঁজাখুঁজি, দরজায় ঠেলাঠেলি। স্বাতী তাকাল ছোড়দির জন্য, আর তাকিয়েই পাশে দেখল বাবাকে।

বাবা কথা বললেন—চল আমরাও…

না, না, আপনারা এখন যাবেন না—স্বাতীর ঠিক পিছন থেকে উর্মিলা রাজেনবাবুর কথা কেটে দিল। তারপর স্বাতীর পাশে এসে বলল—একটু দেরি করো ভাই, লোকজন চলে যাক, এই প্রথম এলে আমাদের বাড়ি, বসবে তো একটু! ঐ মিসেস ঘোষ যাচ্ছেন, একটু কথা বলে আসি, নয়তো আবার… কী যে মুশকিল এত লোকের মধ্যে সকলের সঙ্গে কথা বলা!

এত বড়মুশকিলের মধ্যে যতটা সম্ভব উর্মিলা স্বাতীর কাছাকাছি থেকে আপ্যায়ন করল, পাহারা দিল, আর ভিড় ভাঙার পর উপরে নিয়ে গেল তাদের। মস্ত বারান্দায় রেস্তোর-মতো ছোটোছোটো টেবিল ঘিরে চেয়ার, খাবার-সাজানো থালা। চা, কফি, আইসক্রীম—যার যেটা পছন্দ। বাছা বাছা ক-জন বন্ধু আর হয়তো বাড়ির লোক, অবশ্য এত লোক জড়ো হবার যিনি কারণ, উর্মিলা তাকে হাত ধরে ধরে আলাপ করিয়ে দিল সকলের সঙ্গে, সকলের আগে শশাঙ্ক দাসের সঙ্গে। অন্যদের ভার নিল মজুমদার—নিজের বন্ধু বলে, আর অসাধারণ একজন মেয়ে বলে তার পরিচয় দিল সকলের কাছে। কিন্তু উর্মিলার বর্ণনার কোনো প্রমাণই স্বাতী দিতে পারল না, যদি না কারো সঙ্গে কথা না বলাটাই অসাধারণ হয়—কথা বলল না বলে বুঝলও না। কখন বেরোবে এখান থেকে—এ ছাড়া আর কথা নেই তার মনে, কখন মন দিয়ে শুনতে পাবে যে গান এখনো তার কানে লেগে আছে। একবার উর্মিলাকে বলতে শুনল–তুমি খাচ্ছ না, কথাও বলছ না, হয়েছে কী? স্বাতী একটু হাসল, আর তক্ষুনি ছুতো বানাল—মাথা ধরেছে। কথাটা শুনতে পেল মজুমদার।

মাথা ধরেছে? খুব? চেয়ার ছেড়ে উঠে এল ব্যস্ত হয়ে।

না, তেমন না আবার হাসতে হল।

অ্যাস্পিরিন দেব? উর্মিলা বলল—আমার ঘরে চল, অ্যাস্পিরিন খেয়ে একটু শুয়ে থাকবে? স্বাতীকে চমৎকার সুযোগ দিয়েছিল উর্মিলা। কিন্তু স্বাতী উঠল না, বাড়ি যাবার অনুমতি চাইল। ভাগ্যিশ বাবা সঙ্গে ছিল, তার উপর মেঘ করে ফেঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল, তাই উঠতে পারল তাড়াতাড়ি। আর গলি থেকে বড়ো রাস্তায় যেই এল, অমনি বৃষ্টি বাড়ল স্বাতীর মনের সুরে ঠিক ঠিক সুর মিলিয়ে। তারও বেশি, বন্ধগাড়িতে নিঃশব্দ বৃষ্টি এমন মিশে গেল তার মনের মধ্যে যে যতক্ষণ না বাবা বিষয়টা উল্লেখ করেছিলেন, ততক্ষণ বৃষ্টিটাকে বাইরের একটা ঘটনা বলে সে যেন বুঝতেই পারেনি। কিন্তু বৃষ্টি শুধু নয়, একটু-নামানো কাচের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টিটাকে শরীরে নিতে নিতে আরো বুঝল অনেক। মনে পড়ল এটা মজুমদারের গাড়ি, মনে পড়ল এতক্ষণে তার উদ্দেশ্য, প্রস্তুতি, প্রতিজ্ঞা, আর প্রতিজ্ঞার ব্যর্থতা।

বার বার করে লেখা, বার বার প্রফ পড়া, সবই হল—বই বেরোল না। কিন্তু স্বাতীর মনে হল, লেখকদের সাধারণত যা মনে হয় না… মনে হল… তাতে কী? আজকের জন্য যা সে চেয়েছিল, তা পেয়েছে। বড়ো হয়েছে, যত বড়ো সে ভাবতে পারেনি। স্বাধীন হয়েছে, মনের কথা মুখে বলতে পারার মতো নিশ্চয়ই, এমন কি না বলতে পারার মতো স্বাধীন। কিছু বলতে যাওয়াটা একরকম বাধ্যতা, প্রতিবাদ মানেই তো সেটা প্রতিবাদের যোগ্য? কিন্তু প্রতিবাদ কীসের? ভালই তো—মজুমদার, উর্মিলা এরা তো ভালই। তার এই বেড়ে ওঠার চূড়া থেকে এদের ভাল হবার বাধা নেই আর। এখন এখান থেকে, এরা কিছু না… কিছুই না… কিছু এসে যায় না। তার গাড়ি হুইসল দিল, আর এরা রইল স্টেশনে পড়ে। এর মধ্যেই কত ছোটো— আর সেই আকাশভরা-গান-জাগানো রেলগাড়িতে বসে বসে তার কষ্টে বানানো যত্নে সাজানো কথাগুলি তুচ্ছ হয়ে গেল সেই সব ফোঁটা-ফোঁটা স্টেশনগুলির মতো। গাড়ি যেখানে দাঁড়ায় না, অথচ গাড়ির চলে যাওয়ার জন্য যাদের তৈরি থাকতে হয়। রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ার আগে, কয়েকবারই তার মনে পড়ল মজুমদারকে, উর্মিলাকে। বোজা চোখে দেখল তাদের মুখের আশা, ইচ্ছা, উৎসাহ। একটু কষ্ট হল দু-জনেরই জন্য।

******

সেই রাত্রে ঘুমোবার আগে আর একজনেরও মনে পড়ছিল মজুমদারকে, কিন্তু তার ভাবটা করুণা থেকে বহুদূর। শাশ্বতীর খুব আনন্দে কেটেছিল সময়টা। ইচ্ছে ছিল আরো থাকার, কিন্তু স্বাতী যে রকম যাই-যাই করতে লাগল, আর বাবা তো স্বাতীর কথাতেই ওঠেন বসেন। গানের চেয়েও বোধহয় বেশি আনন্দের হয়েছিল গানের পরে উপরে গিয়ে বসাটা। সুন্দর জায়গা, চমৎকার চা, জিভের উপর গলে-যাওয়া সন্দেশ, আর তার উপর… সবার উপর…শশাঙ্ক দাসের সঙ্গে এক টেবিলে বসার সম্মান। এই বিশেষ সম্মানটুকু শাশ্বতীকেই দিয়েছিল মজুমদার, নিজেও বসেছিল সেখানে। কথা বলেছিল এমনভাবে যাতে শাশ্বতীও যোগ দিতে পারে। সে অবশ্য বেশি কিছু বলেনি, শুনতেই ব্যস্ত ছিল শশাঙ্কর গম্ভীর-সুন্দর মুখের গম্ভীর-ভারি গলার অল্পঅল্প কথা, আর মজুমদারের জোরালো হাসির ফুর্তি। মজুমদারকে আজকের মতো ভাল আর কোনোদিন তার লাগেনি। আর সবটা মিলিয়ে মনে তো পড়ে না আরো ইচ্ছা জাগানো এমন ভাল শিগগির কোথাও পেয়েছে। কম তো পার্টিতে যায়নি হারীতের সঙ্গে, কতবার অগ্রণীসংঘের নানা ব্যাপারে, নানা রেস্তোরয়, বো-বড়ো বাড়িতে, রাজপুত্র মকরন্দর নিমন্ত্রণে…জমকালো, যাবার সময় উৎসাহ লাগে…কিন্তু কখনও এমন হয়নি যে যাবার আধঘণ্টা পরেই মন চায়নি চলে আসতে, আর তার পরেও অনেকক্ষণ…কতক্ষণ… কোমর টাটিয়ে বসে থাকতে হয়েছে হারীতের কথা আর ফুরোয় না বলে। আজকাল তার সাহস হচ্ছে একটু একটু, কখনও কখনও যায়ও না, হারীতও জোর করে না তেমন, যদি না হোমরাগোছের নতুন কেউ আসেন; তাহলে অবশ্য স্ত্রীকে হাজির করাই চাই। কিন্তু দুজনের আনন্দের জগৎ যদিও হারীত ও-সমস্তকে আনন্দ বলে না, বলে কর্তব্য—আলাদা হওয়ার একটা অসুবিধে হয়েছে এই যে কোনোখানে ভাললাগার খোরাকি পেলেও বাড়ি এসে কথা বলে-বলে সেটাকে হজম করা আর হয় না। যেহেতু আর কোন লোক নেই বাড়িতে, আর এইরকম সময়ে স্বাতীকে, বাবাকে, বিজুকে, বিয়ের আগের সমস্ত জীবনটাকেই কোনোখান থেকে ফিরে-তাদের যতীন দাস রোডের পাটি-পাতা আচ্ছা, স্বাতীর রং-বেরং বর্ণনা, বিজুটার লাফালাফি, চুপচাপ-বাবার নিচু আওয়াজ হাসি—এ সব তার যেমন অসহ্য মনে পড়ে, আর কখনও তেমন না। আজ ফিরতি-পথে গাড়িতে বসে কোনো কথাই প্রায় হল না। যদিও বলবার আর শোনবার অনেক ছিল। ওদের সঙ্গে গেলে হত, খানিকটা বসে, গল্প-টল্প করে কিন্তু এমনিতেই নটা বেজে গেছে, আর বাড়ি ফিরে, স্ত্রীকে না পেলে কি ভাল লাগে কোনো স্বামীর? কিন্তু এখন, অন্ধকারে শুয়ে-শুয়ে, এ নিয়েও শাশ্বতীর মনস্তাপ কম না, কেননা হারীত ফিরল তার প্রায় একঘণ্টা পরে। আর এ ফ্ল্যাটে এই একটি ঘণ্টায় প্রতিটি মিনিট দাঁত বসিয়ে গেল তার মনের মধ্যে।

খেতে বসে হারীত বলল—তোমার কি মনে হয় হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করবে?

আমি কী করে বলব?–শাশ্বতী আজকাল চেষ্টা করে এসব বিষয়ে উৎসাহিত হতে, কিন্তু তখন তার কোনো কথাই মনে পড়ল না, হিটলারের গূঢ় অভিসন্ধি জানে না বলে লজ্জিত হতে হল।

আমি আজ বাজি রেখেছি একজনের সঙ্গে। সে বলছিল আর তিন মাসেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে, যুদ্ধের নাকি কিছুই বাকি নেই। সুখেই আছে বোকারা!

শাশ্বতী বলল–তা সুখে যতক্ষণ থেকে নিতে পারি ততক্ষণই লাভ।

হারীত চোখ তুলল স্ত্রীর মুখে। তার বাঁকা ঠোঁটে যেন ছুরির ফলা ঝিলিক দিল। কিন্তু হঠাৎ অবিশ্বাস আর মিনতির মাঝামাঝি একটা সুর লাগল তার গলায়—সত্যি কি তোমার মনে হয় পৃথিবী জুলুক-পুড়ক যা-ই হোক, তোমার তাতে কিছু না? একবার একটা অদ্ভুত উত্তর দিল শাশ্বতী—আচ্ছা, আমরা তো ও-বাড়িতেই থাকতে পারি।

কোন—

তোমাদের আমাদের ভবানীপুরের বাড়িতে?

হারীত হা করে হেসে উঠল—হঠাৎ আমার মা-বাবাদেরই পছন্দ করলে?

তেমন যদি বিপদের সময়ই আসে তবে তো সকলের একসঙ্গে থাকাই ভাল। আর তাতে খরচও বাঁচে। কিন্তু দ্বিতীয় যুক্তিটাতেও হারীত কান পাতল না–আমিই টিকতে পারি না সেখানে, আর তুমি! হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল এই আজগুবি প্রস্তাব। শাশ্বতী আবার বলল—কেন, আমার তো বেশ ভালই লাগে…

বেড়াতে যেতে–হারীত স্ত্রীর হয়ে কথা শেষ করল। কিন্তু থাকতে হলে? দু-দিনেই পাগল হয়ে যেতে। মানে, আমাকে পাগল করতে। আমি জানি না, একজন মেয়েও কি আছে আজকাল শাশুড়িকে যে বিষের চোখে না দ্যাখে? আর সেটাই তো ঠিক, শাশুড়িরা এবার ফেরৎ পাচ্ছেন হাতে-হাতে তাদের নিজের টাকাই! ইংরেজি বুকনির তর্জমা করে বিষয়টা প্রাঞ্জল করল সে, আর বলতে বলতে চোখ পড়ল স্ত্রীর থেমে-থাকা হাতের উপরতুমি কিছুই খাচ্ছ না!

ওখানে খেয়েছি, আর শাশ্বতী এতক্ষণে সুযোগ পেল, সুযোগ নিল—কী সুন্দর গান শুনলাম! হারীত বলল—অসময়ে খাওয়ানো আর খাওয়া—এই এক দুশ্চিকিৎস্য বদভ্যাস বাঙালির! খাওয়াতে হলে ঠিকমতো একটা করা উচিত, হয় চা নয় ডিনার—লোকে তাহলে বুঝতে পারে, তৈরি হয়ে যেতে পারে। তবু শাশ্বতী আওড়াল-খুব সুন্দর গান। একটু থেমে জুড়ল— তুমি যদি যেতে—

সিনেমার গান? তার তো রেকর্ড আছে, আর রেডিওতে এত বাজায় সেসব যে পথে-ঘাটে অনিবার্যভাবে যা শুনতে হয় তার উপর আবার—তার বিলেতে শেখা অন্যতম বিদ্যে যে কাধনাড়া, হারীত কথা শেষ করল তাইতে।

ঠিক তা নয়—শাশ্বতী আরো একবার চেষ্টা করতে গেল। কিন্তু হারীত উঠে পড়ল খাওয়া সেরে, রেডিওর সামনে বসল শত্রুপক্ষের খবর টুকতে। কিন্তু সেই সময়টিতে মনে হল যুদ্ধে জুলা ইউরোপ ভরে গান-বাজনাই শুধু হচ্ছে, বিরক্ত হয়ে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ল। শাশ্বতী একবার তাকাল তার পাশে শশাওয়া অঘোর-ঘুমোনো মানুষটির দিকে। পাজামা পরে শোয় হারীত, এমনিতেও পরে অনেক সময়, দরজির তৈরি লংক্লথের পাজামা। অনেকবারের পরে আবারও শাশ্বতীর অবাক লাগল যে ওগুলো আরো ঢোলা কেন বানায় না। এ নিয়ে তর্ক তুলেছে সে, তর্কে অবশ্যই হেরেছে। তার মন ফিরে গেল কাটিয়ে আসা সন্ধ্যায়। সেখানে যেন সবই বড়ো মাপের, খানিকটা করে বেশি, আর সেই বেশিটাই অভ্যাস। আরামে আছে মানুষটা ইচ্ছেটাকে যত ইচ্ছে বাড়তে দেয়, খরচের একটা ছুতো পেলেই খুশি। আর ইচ্ছেগুলিও তার বন্ধুদের মতোই ভাল ভাল। আর সত্যি তো, শশাঙ্ক দাসকে বন্ধু বলতে পারে যে, সে তো নিজেও কিছু। তাদের সঙ্গে নামতে নামতে মাঝর্সিড়িতে একটু দাঁড়িয়ে মজুমদার বলেছিল-মিসেস নন্দী, আশা করি আপনাদের কষ্টই শুধু দিলাম না?

খুব ভাল লাগলো এর বেশি জবাব শাশ্বতীর যোগাল না।

সেটা প্রমাণ হবে আবার যদি আসেন।

আবার গান হবে?

শশাঙ্ককে আর কোথায় পাব, তবে অন্য কারো গান যদি আপনার ভাল লাগে..আর–শাশ্বতীর পাশে পাশে আস্তে নামতে-নামতে হঠাৎ এক সিঁড়ি এগিয়ে গেল, ঘুরে দাঁড়াল মুখখামুখি— কখনও যদি আমার এমন সৌভাগ্য হয় যে বিনা গানে শুধু আমাদের জন্যই এলেন!

বেশ তাই আসব আমরা— শাশ্বতী হেসে বলল।

অত সহজে হা বলা মানেই না। কিন্তু আমি আশা ছাড়ব না।

কথা বলতে না পারায় হজম না হওয়া আনন্দ শাশ্বতীকে জাগিয়ে রাখল অনেকক্ষণ। বেশ হত, মজুমদার যদি কোনো আত্মীয় হত তাদের। হতে তো পারত, হতে কি পারে না? পারেনা মানে? এমন হঠাৎ কথাটা মনে লাফিয়ে উঠল যে তার ধাক্কায় সে প্রায় উঠে বসেছিল বিছানায়। তাই তো চায় প্রবীর মজুমদার, প্রাণপণে চায়… তার জন্যই তো তার সব—এই সব। প্রথমে সেটা ঠাট্টা ছিল, আবছা ছিল, কিন্তু এতদিনে, একদিনেই স্পষ্ট সত্য। আর আজ তো পোস্টারের মতো বড়ো বড়ো অক্ষরে রটে গিয়েছে সেটা, সেটাই ছিল মজুমদারের চোখেমুখে, নড়াচড়ায়, স্বাতীকে এড়িয়ে-এড়িয়ে চলায়, আর সিঁড়িতে বলা ঐ কয়েকটা কথায়। আশ্চর্য, এতক্ষণ মনে হয়নি! শাশ্বতীর ইচ্ছে হল স্বামীকে ডেকে তুলে কথাটা বলে। আরো ইচ্ছে হল… স্বাতীর বিয়ে ভাবতে অন্য একরকম উত্তেজনা লাগল তার মধ্যে। সমস্ত শরীরে ফিরে এল হারীতের সঙ্গে তার প্রথম চেনাশোনার দিনগুলি, তারপর বিয়ের পর প্রথম ক-টি মাস। মাত্র কটি মাস? শাশ্বতী পাশ ফিরল স্বামীর দিকে। কিন্তু হারীত আবার উল্টো দিকে ফিরেছে, তাই দেখতে পেল শুধু কাটা গেঞ্জিতে অর্ধেক ঠিকঢাকা প্রশান্ত পিঠ। সেই পিঠের দিকেই সরে এল, ঘাড়ের উপরকার মিহি চুলের উপর দিয়ে আস্তে হাত তুলল আর হাত নামাল। থাক, ডাকবে না, ডাকলেও জাগবে না, বড়ো গভীর ঘুম… আর সত্যি, সারাদিন যা খাটুনি!

******

ঘুমিয়ে পড়ার আগে শাশ্বতী শেষ কথা এই ভেবেছিল যে এখন কি প্রবীরই প্রস্তাব নিয়ে আসবে, কি তাদের দিক থেকে কিছু করা উচিত? সকালে উঠে হারতের কাছে কথাটা পাড়তে গেল দু-তিনবার। যেন মনে হল এ-বিষয়টা তার কথা বলার একেবারে অযোগ্য লাগবে না। কিন্তু আপিশমুখো এই সময়টা হারীত এমন ছটফটিয়ে কাটায় যে শাশ্বতী ঠিক সময় পেল না, কি নিজেই তাড়াহুড়োর মুখে মুক্তো ছিটোতে চাইল না, মোলায়েম সময়ের অপেক্ষা করাই ভালো ভাবল। কথাটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল নিজের মনে। দেখবার বেশি কিছু আছে বলেও মনে হল না, এ নিশ্চয়ই ঠিক। নির্ঘাৎ! এমন কি এও মনে হল এর জ্যান্ত প্রমাণ নিজে নিজেই হাজির হবে শিগগির। কিন্তু কত যে শিগগির শাশ্বতীও তা ভাবতে পারেনি। হারীত বেরোবার প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে, শাশ্বতী তখন বিজুর যোগানো একতাড়া সিনেমা-পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছে শুয়ে-শুয়ে, তাদের চাকর এসে একজন আগন্তুকের খবর দিল—আপনাকে একটু ডাকছেন তিনি।

কে? স্বামীর বন্ধুদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতমর নাম করল শাশ্বতী।

না, বৌদি শ্বশুরবাড়ির পুরোনো চাকর জবাব দিল-এনাকে দেখিনি আগে। সঙ্গে সঙ্গে বাইরের ঘর থেকে মাত্রই একটি পরদা-ঢাকা দরজার আড়াল পেরিয়ে, স্পষ্ট পৌঁছল চড়ানো গলা—আমি প্রবীর মজুমদার, একটা কথা বলতে এলাম…

আরে! শাশ্বতী উঠল, ছুটল। আর তাকে দেখামাত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মজুমদার কথা আরম্ভ করল—নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে করলুম এই সময় হঠাৎ এসে, হয়তো একটু অভদ্রতাও হল নিশ্চয়ই। অন্তত প্রথমদিন, এমন সময়েই আমার আসা উচিত ছিল যখন আপনারা দুজনেই থাকবেন। কিন্তু একটা কথা আমার বলার আছে, কথাটি আপনাকেই বলতে চাই, তাই ইচ্ছে করেই এমন সময়ে এসেছি যখন মিস্টার নন্দী বাড়ি থাকবেন না। হঠাৎ ধক করে উঠল শাশ্বতীর বুকের মধ্যে, মুখের রং লাল হল, পায়ের দাঁড়িয়ে থাকার জোর যেন কমে গেল। তবে কি সে ভুল ভেবেছিল? তবে কি? কিন্তু কোনো কথা, কোনো একটা কথাও তার দুই ঠোঁটে তৈরি হতে পারার অনেক আগেই মজুমদার আবার বলল—কথাটা আপনার বোনের বিষয়ে তাই প্রথমে আপনাকেই শাশ্বতী নিশ্বাস ছাড়ল, সহজ হল, হাসতে গেল। কিন্তু হাসি চেপে গম্ভীর মুখে বলল-বসুন।

মিনিট কুড়ি পরে, কেননা বেশি বলাবলির দরকার হল না, আগন্তুক যখন উঠল, মনে জমানো হাসিটা মুখে খরচ করতে শাশ্বতীর তখন বাধল না। কিন্তু প্রবীর মজুমদারের মুখ, যা শাশ্বতী হাসিহাসি ছাড়া দ্যাখেইনি, সে মুখ আঁটো হয়ে গেছে গাম্ভীর্যে। ছিলে চড়িয়ে প্রথম তীর ছুঁড়েছে, ঠিক বিধেছে, কিন্তু এটা প্রথম, আর এটাই সবচেয়ে কাছের তাক। আরো দূরে ছুঁড়তে হবে, সেটা সহজ না। প্রথম বাজি জেতার আহাদে আখের না ভেস্তে যায়। এখন তাই গম্ভীর, তৈরি। যদি অনুমতি করেন— মজুমদার মাথা নোওয়াল–ও-বেলা এসে আপনাকে পৌঁছিয়ে দিতে পারি ও-বাড়িতে।

তা বেশ তো-ফশ করে কথাটা বলেই শাশ্বতীর মনে পড়ল যে এই মানুষটি এখনও তার ভগ্নীপতি ঠিক হয়নি, তার সঙ্গে একা যাওয়াটা কি… তক্ষুনি তাই ছুতো বানাল–কিন্তু আজ যে এক জায়গায় যাবার কথা আমাদের!

তাহলে?

শাশ্বতী ভাববার ভান করল–আচ্ছা, আমি নিজেই সময় করে যাব একবার।

আজই?

আজ—না হয় কাল।

তাহলে কাল আমি আসব একবার?

এখানে?

যেখানে বলবেন। আমার ভাগ্যের গাড়ির আপনিই এখন ইঞ্জিন।

শাশ্বতী খুশিতে জ্বলজ্বলে হল—আচ্ছা, আসবেন।

কাল?

কাল।

এই সময়ে? শাশ্বতী মাথা নাড়তে গিয়ে থামল-সন্ধেবেলা আসবেন।

তখন…

আমি চেষ্টা করব যাতে আমার স্বামীও সে সময় থাকেন বিবাহিত ভদ্রমহিলার সমস্ত সম্রম প্রকাশ পেল শাশ্বতীর উঠে দাঁড়ানোয় কাছাকাছি আমরাই যখন আছি, বাবা হয়তো তার মতটাও নেবেন। পলকের জন্য শাশ্বতীর মুখের উপর চোখ ফেলে মজুমদার বলল—আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

******

শাশ্বতী টালিগঞ্জে গেল সেদিনই বিকেলে। বাড়ি ফিরে স্বামীকে দেখে সুখী হল। হারীত এসময়টা হয় বাড়ি থাকে না, নয় বাড়িতেই তার বন্ধুরা আসে, কিন্তু এটা একটা শুভলক্ষণ বলে ধরল শাশ্বতী। আজ সে একাও, আবার বাড়িতেও, যেরকম যোগাযোগ শিগগির ঘটেছে বলে মনেই পড়ে না। টেবিলে কয়েকটা চটি বই ছড়িয়ে ফুলস্ক্যাপ কাগজে ঘশঘশ করে ইংরেজিতে কী লিখে যাচ্ছিল হারীত। শাশ্বতী কাছে গিয়ে বলল—তুমি বাড়িতেই আছ? হারীত এই বাহুল্য প্রশ্নের জবাব দিল না।

কেউ আসেনি?

না।

তাহলে তো আমাকে আনতে যেতে পারতে।

এতদিনে বাপের বাড়ি যাওয়া-আসাটা অন্তত একাই তোমার পারা উচিত।

পারি যে না তা নয়, কিন্তু আজ যখন তোমার সময় ছিল—

স্ত্রীর গলায় যেন অন্যরকম একটা আওয়াজ পেয়ে হারীত মুখ তুলে তাকাল—কোথায় সময়? দেখছ না? হাওয়ায় হাতটা ঘুরিয়ে আনল তার প্যালেট আর ফুলস্ক্যাপের উপর দিয়ে। ছোটো ঘর, খাটের মাথা ঘেঁষেই লেখার টেবিল। খাটের ধারে, হারীতের যথাসম্ভব কাছাকাছি বসে শাশ্বতী তাকাল হারীতের হাতের লেখার অক্ষরগুলির দিকে-ওটা কি খুব জরুরি?

খুব।

একটু সময় করে আমার একটা কথা শুনবে? হারীত এবার আরো অন্যরকম গলা শুনল।

আবার চোখ তুলল, একটু তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল—কী হয়েছে?

শোনো… একটা কথা… তোমার লেখা-টেখা রাখো এখন। এটাও জরুরি… ভীষণ…

কী ব্যাপার? শাশ্বতী একটু দম নিয়ে বলল—মজুমদার স্বাতীকে বিয়ে করতে চায়।

কে?

প্রবীর মজুমদার-ঐ যে-বিজুর–

ও! ছোট্টো আওয়াজ করল হারীত, হাল্কা বাঁকা একটি হাসি নামল ঠোঁটে। শাশ্বতী অপেক্ষা করল হারীত আরো কিছু বলবে বলে, কিন্তু তার চোখ ফুলস্ক্যাপেই নামল আবার। শাশ্বতী যেন ব্যথা পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল—কিছু বললে না!

আমি কী বলব?

কেন, স্বাতী কি তোমার কেউ নয়? ওর ভাল-মন্দে তোমার কি কিছু না? খোলা-কলমটিতে টুপি পরিয়ে রেখে হারীত বলল—তা বিয়ে কবে?

শোনো কথা! কিছুর মধ্যে কিছু না… নাঃ পুরুষরা যে কী!

তবে যে বললে—

কী বললাম? একটা দিন কি আমার কথায় মন দিতে পারো না তুমি?

হারীত চটি-বইগুলি সাজাল, ফুলস্ক্যাপের পাতাগুলি গুছোল। আর সেই কয়েকটা সেকেন্ড অসহ্য লাগল শাশ্বতীর। একপাশে সব সরিয়ে রেখে, চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল—বলো।

এ বিষয়ে তোমার কী মত সেইটে আমি জানতে চাই।

হারীত চিন্তা করে বলল—স্বাতীকে বিয়ে করতে চাওয়া যে কোনো পুরুষের পক্ষে খুবই তো স্বাভাবিক মনে হয়। তবে পুরুষটি অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

ওঃ! শাশ্বতী ককিয়ে উঠল–যুদ্ধ আর স্টালিন ছাড়া আর কিছুই কি তোমার মগজে নেই? খোদ মস্কো থেকে টাটকা পৌঁছনো চোরাই কাগজ পড়ে স্টালিনের জন্য দুশ্চিন্তা সে সন্ধ্যায় হারীতের একটু কম ছিল। তাই লঘুমুখে গুরু-নাম ক্ষমা করে বলল—আর স্বাতীও… হ্যাঁ, যাকে বলে বিবাহযোগ্যা, স্বাতী এখন রীতিমতোই তাই বইকি! শাশ্বতী বুঝল না এটা হারীতের আগের কথারই রকমফের। তাই সোৎসাহে সায় দিল—তাই তো! এখন—ঠিক এখনই স্বাতীর বিয়ে হবার সময়। বাবার বয়স হচ্ছে, আর কদিন পরেই পেনশন, বাবারই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কথা। আমার কী! আমি তো আর ও-বাড়ির কেউ নই এখন। আর বাবাই কি না কথাটা কানেই তুললেন না।

হুঁ! একই সঙ্গে স্ত্রীর আর শ্বশুরের প্রতি সমবেদনা ফুটল হারীতের আওয়াজে।

বললেন—পাগল নাকি! দুঃখে শাশ্বতীর গলা বুজল।

তাই তো! হারীত কপালে রেখা ফেলল-বেচারা মজুমদার।

মজুমদার কেন বেচারা হবে? বেচারা আমার বাবা, তারই বুদ্ধির দোষ হয়েছে। ভাবছেন তার স্বাতীর মতো মেয়ে সারা দেশে আর নেই। কিন্তু সত্যি তো তা নয়, সত্যি কি এর চেয়ে সুপাত্র ওর জুটবে কোনোদিন!

সে ভাবনা তোমার বাবাকেই ছেড়ে দাও না। আর তুমিই এক্ষুনি বললে না ও-বাড়ির কেউ আর নও তুমি?

তা-ই তো! শাশ্বতী নিশ্বাস ছাড়ল-এখানেও গঞ্জনা, ওখানেও কেউ না! মেয়েদের জীবনটাই বাজে!

হারীত আরেক চোখে দেখে নিল স্ত্রীকে-অল্পেই যদি এত উত্তেজিত হও—

অল্প! এতক্ষণ ধরে এত বললাম, এত বোঝালাম, আর বাবা ভাল করে উত্তরও দিলেন না—

এটা অন হল!

তুমি কেন? এতক্ষণের মধ্যে এই প্রথম যেন অবাক হল হারীত।

আমি কেন… কী? শাশ্বতী প্রশ্নটা বুঝল না।

তুমি কেন বললে বোঝালে?

আমি ছাড়া আর গরজ কার-আর আছেই বা কে?

কিন্তু মজুমদার নিজেই যখন জবাব নিয়ে গেছে, তারপর আবার—

মজুমদার নিজেই—না তো! সে তো এখনও জানেই না। আমাকে এসে বলল আজ দুপুরবেলা। আগে তোমাকে বলিনি একেবারে সবটাই বলব বলে। আর সময়ই বা কখন! আমার অবশ্য আগেই কাল রাত্রেই মনে হয়েছিল কথাটা—

তোমাকে এসে বলল কেন? হারীত বাধা দিল স্ত্রীর বিবরণে।

মা থাকলে মাকে বলত, মা যখন নেই—

তুমি স্বাতীর মাতৃস্থানীয়া হলে কবে থেকে? হারীত নিচু গলায় হাসল, যেন একটা মজার কথা শুনে। মা না থাকলে বাবাকেই বলতে হয়—আমি তাই বলেছিলাম–আগে অবশ্য তোমাকে। তখন তোমার বাবা যদি অমত করতেন, তুমি তার সঙ্গেই যুঝতে! স্বাতীও তাই করবে। আর আমার তো মনে হয় সে একাই বেশ চালাতে পারবে নিজের পক্ষের লড়াই। এর মধ্যে তুমি কোথায়? শাশ্বতীর কথার তোড় হঠাৎ থেমে গেল। টেবিলের ফিকে ব্রাউন রংটার দিকে চোখ রেখে চুপ করে থাকল একটুখন। তারপর নিচু চোখেই বলল–মজুমদার স্বাতীকে এখনও বলেনি।

আসামী না পাকড়েই উকিল ধরেছে! হারীত হা-হা করে হাসল, চেয়ারের মধ্যে কোমর ছিল দিয়ে টেবিলের তলায় লম্বা করল পা দুটো খুব অদ্ভুত!

অদ্ভুতের কী আছে— কিন্তু শাশ্বতীর প্রতিবাদে তেমন আর জোর লাগল না, যেন জোর করে একটু হাসল।–সবাই কি আর তোমার মত বীর? মানুষটা লাজুক—

আ–হ! ইংরেজ ধরনে বড়ো-হাঁ করে হারীত ইংরেজি আওয়াজ ছাড়ল, হসন্ত হ-টা আস্তে মিলিয়ে গেল নিশ্বাসে। ইংরেজিতেই বলল—একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এতক্ষণ ধরে বিশুদ্ধ বাংলা বলে— এরপর কী শুনব আমরা? এবার আরো বেশিক্ষণ থেমে থাকল শাশ্বতী। আরো মিয়াননা গলায় বলল-না-বলে ভালই করেছিল।

হারীতও একটু দেরি করল আবার কথা বলার আগে। হাতের কাছে শোওয়ানো কলমটি আঙুলে নাড়তে নাড়তে জিজ্ঞেস করল—তোমার কথাটার মানে কি এই যে পাত্রী নিজেই নারাজ? শাশ্বতী জবাব দিল না, তার নিচু করা মুখে এমন একটা ভাব ঘনাল যেন দুদিন আগে তার কেউ মরেছে। আর সেই ভাবটি লক্ষ করতে করতে হারীতের ভুরু বেঁল, কপাল কুঁচকোল। দুহাতে ছোটো একটি তালি দিয়ে বলে উঠল-হে-ভন্স! তাহলে এতক্ষণ আমাকে বকালে কেন? শাশ্বতী মুখ তুলে বলল—কথাটা কি এত সহজেই উড়িয়ে দেবার? স্বাতী যে ভুল করছে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?

তা যেমন নেই, উল্টোটারই বা প্রমাণ কী! ভুল হোক, ঠিক হোক, বিয়ে তো হয় দুজন মানুষের, আর সে দুজনেরই একজন যদি না চায় তাহলে আর কার সঙ্গে কার বিয়ে? তাড়াতাড়ি, এদিকে ওদিকে চোখ ফেলতে-ফেলতে হারীত কথাগুলি বলল। যেন না বললেও চলে কিংবা যেন সে অন্য কিছু ভাবছে। আবার সেইসঙ্গেই, সেইজন্যই সহজ কথাকে পেঁচিয়ে বলল ইচ্ছে করে, কেশ যেন মজা। সামনে সাদা, ফাঁকা, অনেকটা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে শাশ্বতী আপত্তি তুলল—স্বাতী বোঝে কী? ছেলেমানুষ—

ছেলেমানুষ? তুমি যখন বিয়ে করলে তুমি ওর চেয়ে কত বড়ো?

আমি ঠিকই করেছিলাম।

স্বাতীও—হারীত শেষ করল না কথাটা, তার দরকার আছে বলেও ভাবল না। হঠাৎ উঠে দাঁড়াল চেয়ার ছেড়ে, আর তক্ষুনি আবার বসে পড়ে কাছে টেনে নিল তার লেখার কাগজ আর চটি-চটি বই ক-টা। শাশ্বতী উঠে দাঁড়াল–আমি জানতাম তুমি এ-রকমই বলবে। তক্ষুনি, যদিও তার চোখ ফুলস্ক্যাপে লেখা শেষ কথাটির উপর, তক্ষুনি হারীত জবাব দিল—নিশ্চয়ই! তুমি জানবে না তো হঠাৎ মুখ তুলল, হাসল, অন্যরকম সুরে বলল—তুমি যখন আমাকে বিয়ে করবে ঠিক করলে তখন তোমার বাবা যদি চাইতেন অন্য কারও সঙ্গে, ধরো, ঐ যে তোমাদের গোঁফ-গজানো গাইয়েটি ছিল, অভ্র না শুভ্র, তার সঙ্গে—

কী বাজে! শাশ্বতী মুখ ফেরাল, যেন সেখানে আর দাঁড়াবে না। কিন্তু পলক-পরেই ঘুরে দাঁড়িয়ে তর্ক তুলল—কিন্তু স্বাতীর মনের অবস্থা তো আমার যেমন ছিল তেমন না।

হারীত পিঠ সোজা করল, চেয়ারে হেলান দিল, এলিয়েই দিল শরীর। একটু বেশি প্রফুল্ল দেখাল তাকে—তার পক্ষে বেশি—মনটা বেশ হালকা যেন– যেন, তার বিশ্ব-বাঁচাননা কাজ ঠেকিয়েও স্ত্রীর সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপের জন্য সে তৈরি। কিংবা যেন অনেকদিন পর এই দাম্পত্য অন্তরঙ্গতাটুকুই তার মনে ফুর্তি এনেছে। কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা না হলেই তো আর বভ্রুবাহনকে বিয়ে করতে না…আর তাছাড়া স্ত্রীকে সে কিছু বলতে দিল না, তার মুখের রাগের রঙ উপভোগ করতে করতে বলল—স্বাতীর মনেরই বা কতটুকু খবর আমরা রাখি?

ঐ ‘আমরা’টা শাশ্বতীকে কথঞ্চিত সান্ত্বনা দিল। তাহলে এটা হারীত স্বীকার করে যে অন্তত এ বিষয়ে তারা আমরা। একটু একটু কাছে সরে এল, আস্তে আস্তে বসে পড়ল খাটে। ভাল করে শোনা গেল না তার গলা, যখন বলল–তোমার কী, তোমার কাছে হাসিঠাট্টা এসব, কিন্তু আমি যে কী যন্ত্রণায় পড়েছি। হারীতের ফুর্তি যেন চড়ল এতে, চকচকে চোখে বলল–তুমি এমন করে বলছ যেন তোমাকেই কেউ বিয়ে করতে চায়, আর তুমিও তাকেই–আর তোমার বাবা তাতে বাধা দিচ্ছেন।

হঠাৎ গলা ছেড়ে শাশ্বতী বলে উঠল–আমি তোমার স্ত্রী! নিশ্বাস নিতে লাগল জোরে জোরে। সে বিষয়ে কি কোনো সন্দেহ আছে? হারীত স্ত্রীর চোখ এড়াল, কিন্তু লঘুতাটাও বজায় রাখল গলায়। কিন্তু সত্যি—তুমিই বা এত ব্যস্ত কেন আমি জানি না।

শাশ্বতী থেমে থাকল, যতক্ষণ না তার নিশ্বাস স্বাভাবিক হল আবার। তারপর সাধারণ সাংসারিক সুরে বলল—মজুমদার কাল আবার আসবে। কী যে বলব তাকে কিছু না-ই বা বললে। হারীত চট করে বাৎলে দিল—তোমার বাবার কাছেই পাঠিয়ে দিও, চাই কি স্বাতীর সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে সেখানে। এ-কথার সমস্তটা অর্থ বুঝতে একটু সময় লাগল শাশ্বতীর। একবার টোক গিলল, জিভের ডগা বুলিয়ে নিল নিচের ঠোঁটটিতে। আস্তে বলল—আমার সঙ্গে তুমি যা খুশি করতে পার, কিন্তু কারো উপরেই কি দয়া নেই তোমার? হারীত একটু থমকাল, স্ত্রীর মুখে এ-রকম কথা শুনবে সে আশাই করেনি। কিন্তু সেইজন্যই ওটা সে গ্রাহ্য রেল না, যেন শুনতেই পেল না, একটু বাঁকা ঠোঁটে মিটিমিটি হেসে বলল–তুমি বোধহয় বড়ো আশা দিয়েছিলে তাকে? বোধহয় ভেবেও দ্যাখোনি যে শুধু তার ইচ্ছা আর তোমার গরই এখানে চলবে না? শাশ্বতীর কান্না পেল, হাত কামড়াতে ইচ্ছে করল। আর যেহেতু যে কোনো সময়ে যে কোনো অবস্থায় স্বামীর চেয়ে বড়ো বন্ধু বিবাহিত স্ত্রীলোকের হয় না, তাই আবার স্বামীকেই আবেদন জানাল—কাল সন্ধ্যেবেলা তুমি কি বাড়ি থাকতে পারবে?

থাকতেই হবে। কেজো সুর লাগল হারীতের গলায়-আমার কাছে তোক আসবে তখন।–আমি ভাবছিলাম, মজুমদার এলে তুমিও যদি, তোমারই তো বাড়ি, আর তাছাড়া কথাটা বলাও তো…

—আমার কি কোনও দরকার আছে? কথাটা তো ভাল লাগবে না তার, তবু তোমার মুখে শুনলে… আর, তুমি অনেকটা মোলায়েম করেও বলতে পারবে। কিন্তু বসতে দেবে কোথায়? শাশ্বতী না বুঝে ভুরু কুঁচকাল।

সকাল সকাল এসে যায় তো ভাল, নয়তো ওরা সব এসে পড়লে—

এসে পড়লে কী হবে?

আমাদের কথাবার্তার মধ্যে বাইরের লোক থাকতে পারে না তো–হারীত গম্ভীরভাবে জানাল। তার মানে–শাশ্বতী দিশেহারা চোখে তাকাল—ভদ্রলোককে বসতে দিতে পারব না? হারীত স্ত্রীর উৎকণ্ঠা খুব সহজেই দূর করে দিল–কেন? খাবার ঘরে বসতে পারো তোমরা। খাবার ঘরে! ঐ বিন-পাখার খুপরিতে! শাশ্বতীর মনের উপর দিয়ে ভেসে গেল মেট্রো সিনেমার দোতলা, চাং-আন রেস্তোর, কাউফমানের কফি। সেদিন তো হারীতও ছিল, আর যতটুকুই, যতক্ষণেরই হোক, ভালোও তো লেগেছিল তার? স্ত্রীর ফ্যাকাশে মুখে চোখ রেখে হারীত এবার মলম লাগাল—বসতে আরাম হবে না ওখানে, কিন্তু তোমাদেরও তো নিরিবিলি চাই। আগে যদি আমাকে জানাতে—

তোমাকে জিজ্ঞেস না করে এটা করাই ভুল হয়েছে আমার মানতে হল শাশ্বতীকে।

তা এক কাজ করতে পার— আর একটু শুশ্রুষা করল হারীত–বিজুকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে দাও—অন্য সময়ে, কি অন্যদিন।

আর আসবারই বা দরকার কী? বিজুই বলে দেবে। শাশ্বতীর ঠোঁট এঁটে গেল, যেন আর কথা বেরোবে না।

ভগ্নদূত বিজন! স্ত্রীর মুখ থেকে রঙের শেষ চিহ্নটুকু মুছে নেবার কৃতিত্বে হারীত গলা ছেড়ে হাসল।

******

ভগ্নদূত! এত সহজেই? বিজন তাণ্ডব বাধাল। কেন? মজুমদারের দোষ কী? কুচ্ছিৎ, না গরীব? না কি মানুষ মন্দ? বয়স বেশি? পাশ করেনি? ব্যবসা করে? আরেকজন পাশ-না-করা বেশি বয়সের ব্যবসাদারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দাওনি তোমরা? কোন হিসেবে মগমুলুকের টেকোমাথা কাঠখোট্টা বর্ধনের চাইতে প্রবীর মজুমদার খারাপ হল? একটা আজেবাজে মানুষ নাকি? পাঁচজনকে চেনে কলকাতা শহরে, পাঁচটা খোঁজখবর রাখে, গান বোঝে, ফাইন আর্টস-এ ইন্টারেস্ট আছে… একটা ভদ্রলোক। এদিকে পয়সা কত! বালিগঞ্জে তার জমি কেনা আছে, জান? আরেকটা গাড়ি কিনছে, জান?ইনশিওরেন্সের প্রিমিয়াম কত দেয়, জান? কী জান তোমরা তার কথা! সে কি তোমাদের হারীত জামাইয়ের মতো কঞ্জুষ, না কি কলকাত্তাই বাবুদের মতো অর-পরাণি! কত বড়ো হার্ট! এই তো ভাগনিকে এনে রেখেছে, আর চাকরি দিয়ে বাঁচিয়েছে কত গরিব আত্মীয়কে। আর কী অবস্থা থেকে উঠেছে..কিছু ছিল না, নিচ্ছন গরিব… সেই থেকে আজ কোথায়! এটা কি একটা কম কথা? কর্মবীর… একদিন সার আরেন-টারেনই হবে হয়তো। অনেক ভাগ্যি তোমার মেয়ের যে তাকে পছন্দ করেছে এই মানুষ। আর তোমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলে তাকে? কানেই তুললে না কথাটা? কেন, এত ডম্ফাই তোমাদের কীসের?

বেশ তো, বিয়ে দেবে না বুঝলাম, কিন্তু কারণটা শুনতে পাই না? আর তো কিছু না, আমার চেনা, আমার বন্ধু, আমিই তাকে এ-বাড়িতে এনেছি, এই তো তার দোষ? আমি যা বলব ঠিক তার উল্টোটা না করে তো টিকতে পারে না রাজেন মিত্তির! এই কথাই যদি অন্য কেউ বলত, অন্য যে-কেউ, তাহলে এর সঙ্গেই বিয়ে দিতে না নাচতে নাচতে? চিনি না আমি তোমাদের!

সকাল সন্ধ্যায় রাজেনবাবু যখন বাড়ি থাকেন—বিজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক-একবার চিৎকার করে এসে বক্তৃতাটি উগরোতে উগরোতেই ছিটকে বেরিয়ে যায় রাস্তায়। তক্ষুনি ফিরে আসে গোলপোস্টে ধাক্কাখাওয়া ফুটবলের মতো, আবার গলা লোটায়, দম আটকে যেন খুন হয়ে যাবে সেখানেই। ঘেঁষাঘেঁষি পাড়ার পাশাপাশি বাড়িতে পৌঁছয় তার গলা, কথা। কাছাকাছি জানলাগুলিতে মেয়েরা দাঁড়িয়ে যায়, পুরুষরা কেউ কেউ রাস্তায় বেরিয়ে আসে, আর বাড়ির যে দুজন এর লক্ষ্য, তারা দুই আলাদা ঘরে নিঃশব্দে বসে তখনকার মতো বধির হবার প্রার্থনা জানায়। পুনরুক্তির গুণে বাগ্মিতার আরো বিকাশ হয়, আরো তথ্য জোটে, আরো জোরালো যুক্তি। সুচিত্র বর্ণনায়, বিচিত্র বিশেষণে আর মর্মস্পর্শী ইঙ্গিতে বিজন এক-একবার প্রায় প্রতিভার পরিচয় দিয়ে ফেলে।

একবার বিজন বলল—এই যদি তোমাদের মনের কথা আগে মনে ছিল না? বিয়ে যদি নাই দেবে, এগোলে কেন এত দূর! স্বাতী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল—বলছিস কী তুই? এতক্ষণে স্বাতীকে যুদ্ধে নামাতে পেরে বিজনের মুখে হিংস্র হাসির ঢেউ উঠল—ঠিক বলছি! মনে ছিল না নেমন্তন্ন নেবার সময়? ঢলে ঢলে কথা বলার সময়? দুপুরবেলা একলা বাড়িতে একঘণ্টা গল্প করার সময়?

–আস্তে কথা বল!

আস্তে বলব কেন, আমি কি ভয় করি তোকে না তোর বাবাকে? সক্কলে জানুক তোর কেলেঙ্কারি। এই! দরজার ধারে দাঁড়িয়ে রাজেনবাবু একটা চিৎকার দিলেন, যতটা চিৎকার তার পক্ষে সম্ভব।

বিজনের বিক্ৰম কমল না। ফুলে ফুলে বলতে লাগল হ্যাঁ, সকলে জানুক। কেউ কি জানে, বাবাও কি জানে তুই কী একটা! তলে তলে আরেকজনের সঙ্গে, ঐ যে একটা ছিচকে প্রোফেসর, কত চিঠি লেখালেখি, কত রঙ্গরস, তোর কীর্তিকাহিনী সব ফঁস করব না আমি। আর তারপর কি ভেবেছিস কাউকে তুই পাকড়াতে পারবি? হয় তুই মজুমদারকে বিয়ে করবি, নয় কেউ তোকে বিয়ে করবে না। শোন, শুনে রাখ, কেউ না, আর শেষ পর্যন্ত ঐ তাকেই…হ্যাঁ, তবে আমার নাম বিজনচন্দ্র। নিজের বুকে থাপ্পড় মারল সে, শূন্যে লাফ দিল একটা, বেরিয়ে গেল গনগনে একটা কামান-গোলার মতো।

******

স্বাতী কাঁপছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। রাজেনবাবু তার পিঠে হাত রেখে তাকে ঘরে নিয়ে এলেন। খানিকক্ষণ দুজনেই যেন বোবা হয়ে রইল, তারপর যখন বোঝা গেল যে বিজন আপাতত আর ফিরবে না, তখন রাজেনবাবুর গলা দিয়ে অস্ফুট একটা উঃ বোেল। আওয়াজটা আস্তে আস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, কোনো প্রতিধ্বনি জাগাল না। আবার শব্দহীনতার জলে ড়ুবতে ড়ুবতে রাজেনবাবু পায়ের তলায় হঠাৎ মাটি পেলেন। মুখ তুলে নিশ্বাস নিয়ে বললেন—এক কাজ করলে হয়—

স্বাতীও মুখ তুলল কথা শুনতে।

এইরকমই তো যন্ত্রণা করবে তোকে—রাজেনবাবু বিজনের নামটা ছেড়ে গেলেন—আমি তো সারাদিন বাড়ি থাকি না, আর থাকলেও…তার গলা বুজল এখানেই। বাবার জন্য তীব্র একটা কষ্ট হল স্বাতীর।

তুই না হয় একটু থামলেন রাজেনবাবু—না হয় তো বড়দির কাছে একবার… কত খুশি হবে। আমিই দুদিনের ছুটি নিয়ে… নয় তত সরস্বতীর কাছে দিল্লিতে.. যাবি?

স্বাতী বললনা, বাবা, কোথাও যেতে হবে না।

গেলে হয়তো ভালই লাগবে… মনটাও—

স্বাতী আবার বলল—না।

কিন্তু–এবার রাজেনবাবু একটা অস্পষ্ট সর্বনামের সাহায্য নিলেন। কিন্তু ওরা যদি… কী বিশ্রী… বাড়ির মধ্যে একটা তখনকার মতো একটা সম্পূর্ণ বাক্যরচনার শক্তি তাঁর যেন লোপ পেল।

দাদার ভয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে পালাব নাকি?—স্বাতী ঠোঁট বাঁকাল, প্রায় হাসল, আর বাবার চুপ করে তাকানোর উত্তরে আবার বলল-দাদা আমার কী করবে? এরপরে একজনও আর কথা বলল না, একজনও উঠল না সেখান থেকে। স্বাতী, যদিও সে-ই সাহস দিল বাবাকে, তবু বাবার কাছেই বসে থাকতে তার মন চাইল। আর রাজেনবাবু হঠাৎ বুঝলেন, বুকে ধাক্কা দিল কথাটা যে এই আরম্ভ হল, আর এই আরম্ভ মানেই শেষ… শেষ মানে, স্বাতীর নতুন আরম্ভ। সন্ধ্যা তখন, ঘোর নেমেছে ঘরে। হাওয়ায় উড়ছে দেয়ালের ক্যালেন্ডারের পাতা, যেন পরের মাসগুলির জন্য অস্থির। হালকা পায়ের শব্দ হল বাইরে।

শাশ্বতী বোধহয়— বলে রাজেনবাবু উঠে আলো জ্বাললেন।

ঘরে ঢুকে শাশ্বতী একবার বাবার, একবার বোনের দিকে তাকাল। দাঁড়িয়ে থাকল চুপ করে। স্বাতী উঠে বলল-বোসসা, ছোড়দি, আমি স্নান করে আসি। মাঝে কদিন শাশ্বতী আসেনি। তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন—বোস! স্বাতীর ছেড়ে যাওয়া চেয়ারটা যদিও কাছেই ছিল, শাশ্বতী এগিয়ে এসে বসল খাটের ধারে, আড় হয়ে বাবার মুখোমুখি। জিগেস করল–কী হয়েছে? রাজেনবাবু উত্তর দিলেন না।

বাবার শুকননা, কুঁচকানো মুখের উপর চোখ রেখে শাশ্বতী প্রশ্নটির পুনরুক্তি না করে পারল না। রাজেনবাবুকে শেষ পর্যন্ত মুখে আনতে হল–বিজুর যন্ত্রণা–!

বিজু? বিজুর কথা ছেড়ে দাও! কেন যন্ত্রণা, কী রকম যন্ত্রণা, শাশ্বতী যেন নিজেই তা বুঝে নিল।

বুক ভরা গভীর একটা নিশ্বাস ছাড়লেন রাজেনবাবু।

একটু থেমে শাশ্বতী বললো—কিন্তু বিজু মন্দ বলে তুমিও অন্ধ হোয়ো না বাবা। যেন সামনে কিছু ভয়ের দেখতে পেয়ে রাজেনবাবু হঠাৎ চোখ বুজে ফেললেন—শাশ্বতী… থাক… এখন আর

না বাবা, আমি তর্ক করব না তোমার সঙ্গে। শুধু একটা কথা বলে যাব। তারপর তুমি যা ভাল বোঝ, কোরো। রাজেনবাবু অপেক্ষা করলেন, ডাক্তারের ছুঁচের সামনে রোগীর মতো। কথাটা এই শাশ্বতী নড়েচড়ে বসল—বিজুর কথা ভুলে যাও, স্বাতীকেও এখানে এনো না, মনে করো তুমি একজন মেয়ের বাপ-মেয়ের মা নেই—সমস্তটা দায়িত্বই তোমার উপর। শাশ্বতী তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে তার দায়িত্বের কথা, এটা নিঃশব্দে মেনে নিলেন রাজেনবাবু। এখন, মেয়ের যদি বিয়ের কোনো প্রস্তাব আসে, তুমি সেটা নিয়ে ভাববে তো অন্তত একবার? তুমি কি ঠিক জানো যে এই—এই ব্যাপারটা নিয়ে যতটা তোমার ভাবা উচিত ততটাই তুমি ভেবেছ? এবারেও রাজেনবাবু কিছু বললেন না, আর শাশ্বতী যেন উৎসাহ পেয়ে তক্ষুনি আবার বলল—না কি তুমি কিছু না-ভেবেই নেহাৎ হেলাফেলা করে, কি মেয়েকে আরো কদিন কাছে রাখতে চাও বলে—

তোর তাই মনে হয়? রাজেনবাবু হঠাৎ বাধা দিলেন কথায়।

রাখতে চাইলে কিছু দোষের না—বিজুটা যেরকম… আর আমাদের মধ্যে ওকেই তো তুমি সবচেয়ে…

নাকি?

তাই যদি হয় বেশ তো, মজুমদার অপেক্ষা করবে–ছ-মাস—একবছর–এমনকি দু-বছরগিয়েছিল বুঝি তোর কাছে?

তার পক্ষ নিয়ে আমি কিছু বলছি না—সে আমার কেউ না— আমি শুধু এটুকু দেখছি যে মেয়ের জন্য মা-বাপের… সাধারণ যেসব আকাঙ্ক্ষা থাকে, তার সব না হোক অনেকগুলোই সে মেটাতে পারে আর—আর এমনও তো হতে পারে যে স্বাতীর মনই বদলে গেল পরে? বদলাবার ভার তুই নিবি? না সে নিজেই?

শাশ্বতী আরো গম্ভীর হয়ে বলল-না, সে আর আসবে না তোমাদের বাড়িতে, কিছু বিরক্ত করবে না, যদি না… যতদিন না তোমরা তাকে ডেকে পাঠাও।

রাজেনবাবু নিঃশব্দে এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন।

তোমাকে কথাটা জানানো দরকার মনে করলাম–মজুমদারের জন্য না, নিজেদেরই জন্য। আপাতত স্বাতীর মন উঠছে না বলে কিংবা নিজে তুমি ওরকম মানুষ পছন্দ কর না বলে উড়িয়ে দিয়ে না একেবারে, ভেবে দেখো…আর কিছু বলবার নেই আমার।—শাশ্বতী উঠল, আর তখনই নিজের শেষ কথাটার বিরোধিতা করে বলল—মা থাকলে একে অপছন্দ করতেন না। তোমার তিন মেয়ের পাত্র মা-ই তো পছন্দ করেছিলেন?

আর তারপর থেকে অবশ্য তুই করছিস–বললেন রাজেনবাবু।

আমার পছন্দই কী মন্দ? হাসির একটু ঝিলিক দিল শাশ্বতী, আর সঙ্গে সঙ্গে রাজেনবাবুও চিকচিকোলেন–আজ কী? পান্তুয়া না জলতরঙ্গ?

আজ যাই, বাবা।

এখনই?

হাঁ, এখান থেকে আবার ভবানীপুরের বাড়িতে–। একটু থেমে রাজেনবাবু বললেন—বেশ একা-একাই চলাফেরা করিস আজকাল?

ভালই লাগে, আর সবসময় সঙ্গে নিয়ে ঘুরবেই বা কে?

হারীত বুঝি ওখানে?

আপিশ থেকেই ফেরেনি—এতক্ষণে ফিরেছে হয়তো উনি যাবেন তাঁর সময়মতো… আচ্ছা, যা বললাম ভুলো না। হিল-তোলা জুতোর খুটখুট আওয়াজ করতে করতে শাশ্বতী চলে গেল।

হঠাৎ যেন রাজেনবাবুর মনে হল এই ভদ্রমহিলাটিকে তিনি চেনেন না।

স্নানের পরে স্বাতী এসে বলল–ছোড়দি কোথায়?

তাড়া ছিল, শ্বশুরবাড়িতে নেমন্তন্ন আবার… আর শ্বশুর-শাশুড়ি খুব-তো ভালবাসেন ওকে।

রাজেনবাবু দরকারের চেয়ে খানিকটা বেশিই বললেন।

চলে গেল! স্বাতীর মুখ ফুটল না, কিন্তু কথাটা তার সমস্ত মুখে লেখা দেখলেন রাজেনবাবু। আর তখনকার মতো সব কথা যেন ফুরিয়ে গেল তার সঙ্গে স্বাতীর।

স্বাতী একখানা বই হাতে বসবার ঘরে এল। বসবার ঘরের একটা প্রভাব আছে মনের উপর। ওখানেই আমরা বাইরের জগৎকে বাড়িতে ডাকি বাইরের কেউ না থাকলেও, একা থাকলেও ওখানে নিজেকে অন্য অনেকের অংশ মনে হয়। যেটা একান্তই নিজের এলাকা সেটাকে তত যেন প্রকাণ্ড আর লাগে না। স্বাতী অন্তত সেই আশাতেই ও ঘরে এল, তার একলার ভার হালকা হবার আশায়, অন্তত জানলা দিয়ে চারদিককার পৃথিবীর একটু আভাসের আকাঙক্ষায়। কিন্তু আশার চেয়ে বেশি পেল সে, অনেক বেশি, কেননা সে স্থির হয়ে বসবার মাত্র কয়েক মিনিট পরে জানলা দিয়ে একটুখানি আভাস না, খোলা দরজা দিয়ে বাইরের সমস্তটা পৃথিবী একেবারে সশরীরে হেঁটে চলে এল ঘরের মধ্যে।

শুনেছ খবর? শুনেছ? হারীতের চুল উড়ুক্কু, চোখ চকচকে, আর মুখের রোদে-পোড়া চামড়ার তলায় অন্য একটা লালচে রঙের ছটফটানি।

কী? কী-হয়েছে? কী-জানি-কী ভেবে এস্তে উঠে দাঁড়াল স্বাতী। হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেছে। হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেছে! দু-বারই শূন্যে হাত ছুঁড়ল হারীত। শোনোনি এখন? নিরাশ হয়ে, নিশ্চিন্ত হয়ে স্বাতী বসে পড়ল আবার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হারীত ভেরী বাজাল-মরবে! মরবে এবার! ছিন্ন হবে কাস্তেতে, চূর্ণ হবে হাতুড়িতে! এতদিন তো শুধু রিহার্সেল… আসল পালা তো এবার! …..আছ কোথায়, স্বাতী, ভাবছ কী… কী যে হবে দেখতে-দেখতে… লড়তে হবে, সককে লড়তে হবে… সমস্ত পৃথিবী ভরে সকলকে… তৈরি হও, তৈরি হও সব! একটু চুপ করে থেকে স্বাতী বলল—আপনি কে আপিশ থেকে?

তা বলতে পারো–হঠাৎ শরীরটাকে একটা চেয়ারের উপর ছেড়ে দিয়ে হারীত অন্য কম গলায় বলল-খবরটা অবশ্য তোমার কাছে কিছু না—এখন না—কিন্তু বুঝবে একদিন, বুঝিয়ে ছাড়বে।

স্বাতী বলল-ছোড়দি এই একটু আগে চলে গেল।

নাকি?

আপনাদের ভবানীপুরের বাড়িতে গেল এখান থেকে।

ভাল—আমি অবশ্য তোমার ছোড়দির জন্য আসিনি, এসেছিলাম তোমাকেই খবরটা দিতে। আমাকে! স্বাতী হেসে ফেলল। আমাকে এতটা যোগ্য ভাবলেন হঠাৎ? হারীতের মুখের ভাব সহজ হল, ছোট্টো হাসি ফুটল ঠোঁটে—তা আজকাল বেশ যোগ্য হয়ে তো উঠেইছ। বেচারা প্রবীরচন্দ্র মজুমদার। বিশ্ব-কাঁপানো ঘটনা সত্ত্বেও কৌতুকের ক্ষেত্র এখন বেশ প্রশস্ত দেখা গেল হারীতের মনে। স্বাতী তার মুখের ভাবটা বেশ সপ্রতিভ রাখবার চেষ্টা করল। বেচারা!

আশা ছাড়েনি এখনো—শাশ্বতীর কাছে কী যেন ঘ্যানর-ঘ্যানর করছিল কাল। বেচারা! প্রত্যাখ্যাত পাণিপ্রার্থীকে ঐ আখ্যায় বিদ্ধ করে করে হারীতের যেন আশা মেটে না। স্বাতী অবাক হল খবরটা শুনে। ঘ্যানর-ঘ্যানরের সারমর্মটা কী? জিগেস করল না, কিন্তু আশা করল হারীতদা নিজেই বলবেন। সে আশা মিটল না। হারীত এর পরে বলল—তা বেশ, ভালো! আরো গৌরব হোক তোমার, আর কজনের হৃদয় ভাঙো—তবে তো! ফরাসিরা বলে, সে মেয়েই বিয়ে করার যোগ্য যে সাতজনকে অন্তত… কথা শেষ করল না হারীত, হঠাৎ বোধহয় বিশ্ববার্তা মনে পড়ল আবার, মুখের পেশী শক্ত হল, একটানে দাঁড় করাল অনেক-ঘোরা ক্লান্ত শরীরটাকে।

যাচ্ছেন নাকি?

হ্যাঁ, এখন মকরন্দর ওখানে–

চা–

না–হারীত ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজেনবাবুকে দেখতে পেল, আর শ্বশুরের সম্মানে মুখশ্রীতে অমায়িকতার চেষ্টা করল। রাজেনবাবু আরম্ভ করলেন–শাশ্বতী তো…

শুনলাম–হারীত সময় নষ্ট করল না। হ—আজ বুঝি মা-র কী ব্রত-ট্রত… ওসব আবার আছে তো ওঁদের! হারীতের হাসিতে করুণা ফুটল একসঙ্গে নিজের মা আর স্ত্রীর বাবার প্রতি। তুমি ওখানে—

দেখি। এখন যাচ্ছি এক জায়গায়… সেখান থেকে যদি… না শ্বশুরের অনুক্ত অনুরোধের আগাম জবাব দিল সে—এখন আর চা না। যাচ্ছিলাম.. আচ্ছা যাই। ক্ষিপ্র পিছনে ফিরল হারীত, দ্রুত অদৃশ্য হল দরজার বাইরে। রাজেনবাবু বসলেন মেয়ের কাছে। একটু হেসে বললেন—হারীত তোর ছোড়দির জন্যই এসেছিল, তাকে না পেয়ে আর বসল না।

বাবা, স্বাতীও হাসল বাবার উত্তরে। হারীতদা এসেছিলেন আমাকে এই খবরটা দিতে যে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেছে।

নাকি?

হ্যাঁ, সেই জন্যই—

যুদ্ধ তবে ছড়াল! বাবার মুখে এ কথা শুনে স্বাতী থমকাল।–সত্যি কি খুব খারাপ হবে এর পরে? হারীতদা তো হুলুস্থুল করে গেলেন।

আমরা ভেবে কী করব! আর এর চেয়েও বড়ো ভাবনা আমাদের আছে এখন। বাবার শেষ কথাটা শুনে আবার ভারি হল স্বাতীর মন। মিনিটখানেক রাজেনবাবু কিছু বললেন না। তারপর আস্তে আস্তে আরম্ভ করলেন—স্বাতী শোন। তোর মা নেই, তাই তোকেই বলতে হচ্ছে— আর তুইও বুদ্ধিমতী, নিজের ভাল-মন্দ নিজেই তো বুঝিস। স্বাতীর সাদা গালে সরু একটি নীল শিরা একটু স্পষ্ট হল।

আর এতদিনে এটাও নিশ্চয়ই বুঝেছিস— রাজেনবাবুর গলায় যেন একটু হালকা সুর লাগল–যে মানুষের জীবনে মেয়েদের জীবনে বিশেষ করে বিয়েটা একটা মস্ত ব্যাপার, জীবনের অনেকটা সুখেরই কারণ। বলে রাজেনবাবু মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। আর মেয়ে যদিও তার শরীরের প্রত্যেকটি স্নায়ুতে টান পড়ছিল তখন কিছু বুঝতে দিল না বাবাকে। চোখ এড়িয়ে উত্তর দিল–দুঃখেরও। নভেল পড়া কন্যার কথা শুনে একটু অবাক হলেন রাজেনবাবু—কিন্তু ও যদি এতটাই বোঝে, তবে তো আরো ভালো। এই দুরূহ আলাপের পরের ধাপটি মেয়েই যেন যুগিয়ে দিল বাপের মুখে–হ্যাঁ, দুঃখেরও হতে পারে। আর তাই তো এত চেষ্টা আমাদের, এত চিন্তা। দুঃখ তো কেউ চায় না, সুখের চেষ্টাই করে সকলে।

স্বাতী একটু চুপ, তারপর—আগে বলা যায় নাকি?–অদৃষ্ট বলে একটা কথা আছে তো সেইজন্যই।-বলেই রাজেনবাবু বুঝলেন মেয়ের কথার ঠিক উত্তর এটা হল না। তাই আবার বললেন—সে তো যায়ই না। দেখতে যেটা তেমন ভালো না, সেটাই হয়তো সুখের দাঁড়িয়ে যায়। ঐ প্রবীর ছেলেটি তার স্ত্রী হয়তো সুখী হবে খুব। গলার উপর স্বাতীর মাথাটি একটু পিছনে সরল। স্থির হয়ে বলল—হয়তো কেন–নিশ্চয়ই! তারপর হঠাৎ জিগেস করল–ছোড়দি এসে কী বলে গেল তোমাকে?

শাশ্বতীর ইচ্ছে তো জানিসই স্পষ্ট জবাব দিলেন রাজেনবাবু। আমি তোর ইচ্ছেটা জানতে চাই, তাই—

তা কি তুমি জান না? স্বাতী আর পারল না, দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। স্বাতীর বাঁকা বাঁকা কুচকুচে কালো ঘন চুলের উপর রাজেনবাবুর চোখ পড়ল, একটু দেরি করে বললেন—আমি তো তোকে জিগেস করিনি, আগে ধরেই নিয়েছি এ বিষয়ে আমার কথা তোরও কথা। কিন্তু আমার অপছন্দ বলেই তুই যদি—

তুমি আমাকে তা-ই ভাব? স্বাতী মুখ তুলে জ্বলজ্বলে চোখে তাকাল।

আমার যা ভালো লাগে না, রাজেনবাবু আস্তে আস্তে বললেন—সেটা তোরও যাতে ভালো না লাগে, সে রকম চেষ্টাই তো তোর পক্ষে স্বাভাবিক… কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে তুই ভেবে দ্যাখ, তারপর যদি তোর মনে হয়, যদি একটুকুও—

বাবা! রাজেনবাবু কষ্টের কান্না শুনলেন সে ডাকে। মেয়ের মুখে শান্ত চোখের দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন–আমি তোকে এই শুধু বলতে চাই যে আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা ভাবিসনে। তোর ইচ্ছামতোই সব হবে।

তবে আর কী! রং, রস, রক্ত ফিরে এল স্বাতীর মুখে।

তোর ইচ্ছাটা তুই যাতে বুঝতে পারিস—

ইচ্ছা বুঝি বুঝিয়ে দিতে হয় কাকে?

তাও হয়—রাজেনবাবু হাসলেন। ছোটোছেলে কি বুঝতে পারে তার খিদে পেয়েছে?

আমি আর ছোটো নেই, বাবা! স্বাতী উঠে দাঁড়াল, লম্বা, সংবৃত সুন্দর।

কিন্তু যত বড়ো তাকে দেখায় সে কি তত বড়ো? এখনো তো জীবনের কাছে আশ্রয় তার অক্ষুন্ন, প্রশ্রয় প্রচুর। এখনো তো জীবনের অনেকটাই তার খেলা-খেলা, তার দিন-রাত্রি শুধু ভাললাগা আর না-লাগার সাদা-কালোয় আঁকা। বয়স্ক জীবনের ভয়, অনিশ্চয়তা, বাধ্যতা, দায়িত্ব—এ সবের সে কী জানে? একশো রকমের আশ্চর্য জটিলতার কথা সে পড়েছে কিন্তু নিজের জীবন যখন একটুখানিও জটিল হয়ে ওঠার ভয় দেখায়, তার ব্যবস্থা কি স্বাধীনভাবে নিজেই করতে পারে? তখন তোসেই পুরোনো আর প্রথম নিশ্চয়তাই তার নির্ভর? কিন্তু তাও কি ভাঙল আজ? বাবাও কি তাকে ছেড়ে দিলেন এই ভীষণ পৃথিবীতে? খুব তো তখন সাহস দেখাল, কিন্তু রাত্রে বিছানার মধ্যে কুঁকড়ে রইল ভয়ে, বুকের ভিতরটা শুকিয়ে উঠতে লাগল। দাদার সঙ্গে হারীতদার কথার কোথায় একটা মিল দেখল সে, আর বাবাও কি ভাবছেন সে-ই? তবে কি তারই দোষ? প্রথম থেকে সতর্ক হলে, সচেষ্ট হলে, এই ফাঁড়াটা এড়াতে পারত না কি? ফাঁড়া কাটল, কিন্তু কথাটা কি এই দাঁড়াল যে মনে-মনে এটা সে চেয়েইছিল? কিন্তু কেউ যদি তাকে অন্যায়ভাবে চিন্তা করে, সে কী করতে পারে? তাকে কি আজ প্রমাণ করতে হবে যে সেই অন্যায়ে তার কোনো হাত ছিল না। আর সেটা প্রমাণ করার পরেও অপরাধীই থেকে যাবে? কী বিপদ—কী আপদ এসে জুটল তার কপালে!

ভালো ঘুম হল না সে রাত্রে। অনেক বেলায় উঠল পরের দিন, আর সে ওঠবার খানিক পরেই, যেন ঠিক-সময়ের অনেকটা আগেই, বাবা চলে গেলেন আপিশে। স্বাতীর মনে হল, বাবা তাকেই এড়ালেন। স্বাতী চুল খুলল না, স্নান করল না, বই খুলল না। দাঁড়ানো বইগুলির পুটের উপর দিয়ে চোখ চালিয়ে গেল, কোনোখানে থামল না চোখ, কোনো বই তাকে ডাকল না। আজ প্রথম সে বইয়ের কাছে কোনো জবাব পেল না। হয়তো অন্য কোথাও জবাব আছে। ছাপার অক্ষরে, না হাতের লেখায়? দেরাজ থেকে বের করল-চিঠি, একটি নীল আর এক গোছা সাদা খাম। একটু দেখল তাকিয়ে, এখানে ওখানে হাত ছোঁয়াল। তারপর খুলে-খুলে পড়তে লাগল প্রথম নীল খামটি থেকে শুরু করে। কিন্তু এ-ও তো বইয়ের মতো! শেষেরটির, শেষের কটির উপর সে প্রয়োগ করল মনের সমস্ত ইচ্ছা আর ইচ্ছার সমস্ত শক্তি। তন্নতন্ন খুঁজল লেখার ফাঁকে ফাঁকে অন্য কোনো কথা। প্রাণপণ চেষ্টা করল কথাগুলিকে দুমড়ে মুচড়ে জবাব ছিনোতে, এক ফোঁটা নিশ্চয়তা নিংড়ে বের করতে—কিচ্ছু না! শুধুই সারি-সারি কথা, সাজানো কথা, সুন্দর কথা—কিন্তু এ সুন্দর দিয়ে কী করবে সে, এর চেয়েও আরো কত সুন্দর কথা তো ছাপানো আছে বইয়ের পাতায়… পাহাড়ে বেড়াচ্ছেন, আনন্দে আছেন, মাঝে মাঝে চিঠি লিখে সাহিত্যচর্চা করেন—এদিকে ছুটিও আর বেশি নেই, কিন্তু তাতে কী? একেবারে শেষ সম্ভব দিনটি কাটিয়ে তবে তো ফিরবেন। চিঠিগুলি তুলে রাখতে রাখতে স্বাতীর মনে হল সে যেন অনেক, অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে, অথচ কোথাও যাচ্ছে না, স্বপ্নে যেমন পথ আর ফুরোয় না, সেইরকম। আর হঠাৎ যেমন চমক দিয়ে স্বপ্ন ভাঙে তেমনি একটা জেগে ওঠার ধাক্কায় সব তার কাছে সহজ হয়ে গেল, স্বপ্নকে স্বপ্ন বলে চিনল–সোজা দেখতে পেল চোখের সামনে বাস্তবের পরিষ্কার পথ। কাগজ নিল, কলমের টুপি খুলল। প্রথমবার শ্রীচরণেষু লিখেছিল, এখন শ্রদ্ধাস্পদে লেখে, আজ কিছুই লিখল না, শুধু–

কবে আসবেন? ছুটি তো প্রায় শেষ, আর আসতেই তো হবে। চিঠি আর
চাই না, চিঠি আর ভালো লাগে না। এর উত্তরে আসবেন।

নিজের নাম লিখে একটু তাকিয়ে থাকল। দুমিনিট পরে স্বাতী নিজের হাতে সমর্পণ করল ডাকবাক্সের বিশ্বস্ত অন্ধকারে তার জীবন… তার ভবিষ্যৎ… তার অদৃষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *