শীত পড়ে এল পৃথিবী ভরে মন-খারাপ ছড়িয়ে। কী মন-মরা রঙ-ঝরা সন্ধ্যা, আর বিকেলটা ছোট্টো একটুখানি, যেন রোগা, সরু, ভীরু, কোনওরকমে একবার ঝিলিক দিয়েই অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এই তো সেদিনও কত রঙ ছিল বিকেলে—বেগুনি আর বাদামি আর সবুজ, হলদে আর সবুজ আর সোনালি। এক-একদিন সন্ধেবেলাটাকে মনে হত গোলাপি সমুদ্র। টুকরো মেঘগুলি, সোনালি গাছ, আর সমুদ্রের তলে সোনালি ঘাস, সোনালি গাছ—দেখতে-দেখতে সব মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যার সিঁদুর-রঙ হল ইঁদুর-রঙ, আকাশটা যেন বিধবার কপাল। ঝিঝির, শিরশির করে শীত এল, স্বাতী দেখল একা বসে বসে। রোজ একটু-একটু করে কাছে ঝরে পড়ল মন-খারাপ, গাছের গা থেকে একটি-একটি করে পাতার মতো। ঠান্ডা জল শান্তি আনল, আর সকালবেলা স্নানের পর নরম নীল রোদুরের দিনটি যেন পৃথিবীর হাতে ধরা এক আশ্চর্য উপহার। আশ্চর্য লাগল স্বাতীর—আশ্চর্য এইজন্য যে শীতও সুন্দর, আকাশ এত শান্ত আর দিন এত নরম তো আর কখনও হয় না—তবে কি যা-কিছু হয় তা-ই ভাল, আর যা কিছু আছে তা-ই সুন্দর? কত সুন্দর, তা কি লোকে জানে? কই তাদের মুখ দেখে মনে হয় না তো! রাস্তায় বেরোলে, কি একটা ট্রামে উঠলে, কীরকম সব মুখ চোখে পড়ে? হোমরা মুখ, গোমড়া মুখ, ছোকরারা ফুর্তিতে ফাজিল, কেউ চোখাচোখা, কেউ বোকা-বোকা, কিন্তু কোনো মুখেই একথা লেখা নেই যে… কী? একটু থমকাল স্বাতীর মন, সন্ধের পর আলো-জুলা টেবিলে লজিকের বইয়ের পাতায় আঙুলের চাপ পড়ল একবার। তারপর মনের চোখে সে দেখল সত্যেন রায়ের মুখ-মুখশ্রী। প্রথম যখন দেখেছিল মনে হয়নি মানুষটা সুন্দর, মনে হওয়াটাও…যদি তখন এ নিয়ে ভাবত…সম্ভব মনে হত না। কিন্তু হ্যাঁ, সুন্দরই তো। যা সুন্দর, তা সুন্দর লাগে ওঁর চোখে—আর তাই ওঁর চোখের তাকানো…

হাতের চাপ পড়ল কাঁধে। স্বাতী ফিরে তাকাল চমক-লাগা বড়ো চোখে। শাশ্বতী হেসে বলল–বাঃ-বাঃ! অমন আত্মহারা হয়ে ভাবছিলি কী? স্বাতী উঠে দাঁড়াল—কখন এলে?

এক্ষুনি এলাম, আবার এক্ষুনিই যাব। ছোড়দির সাজগোজের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে স্বাতী বলল—নেমন্তন্ন বুঝি কোথাও?

পিরোজপুরের রাজবাড়িতে একটু থেমে—অনেক লোকজন, খাওয়ার দেরি আছে, তাই ভাবলাম একবার ঘুরে যাই, কাছেই তো। শাশ্বতী নড়ে-চড়ে শাড়ির জেল্লা তুলল ইলেকট্রিক আলোয়। তারপর স্বাতী কিছু বলল না দেখে আবার বলল–ঐ যে সাদার্ন-এভিনিউতে বিরাট গোলাপি রঙের বাড়িটা। ছোড়দিকে নিরাশ করতে খারাপ লাগল স্বাতীর। মুখে-চোখে ভান করল যেন সে জানে সাদার্ন-এভিনিউতে পিরোজপুরের রাজবাড়ি কোনটা। জিজ্ঞেস করল–হারীতদা এলেন না?

না, যা আজ্ঞা জমেছে! রাজার ছেলে বন্ধু কিনা হারীতের–মাত্র একটুখানি চেষ্টা করে খুব সহজেই নামটা উচ্চারণ করে ফেলল শাশ্বতী।–বিলেতে আলাপ ওঁদের। পাঁচ বছর বিলেতে কাটিয়ে আমেরিকা চীন জাপান ঘুরে এই সেদিন ফিরেছেন মকরন্দ মুখুয্যে। তোকে বলব কী— শাশ্বতীর মুখের ভাঁজে-ভাঁজে খুশি ফুটল—অত্ত বড়োলোক, অথচ কী ভদ্র! কথাটা নিয়ে একটু যেন ভেবে স্বাতী বলল–বড়োলোকেরা ভদ্রলোক বুঝি হয় না? কথাটা গ্রাহ্য না করে, কিংবা লক্ষ্য না করে শাশ্বতী একটা বড়ো খবর দিল–জানিস, জাপান নিশ্চয়ই যুদ্ধে নামবে! নাকি?

তাহলে আর রক্ষে নেই আমাদের—গলা নামিয়ে, প্রায় কানে-কানে শাশ্বতী বললভীষণ বদ জাপানিরা। স্বাতী আবার বলল—নাকি?

কিছুই তো জানতে পারি না আমরা, চীনদেশে যা কাণ্ড-পিরোজপুরের রাজপুত্রের মুখে এইমাত্র যা শুনে এসেছে—সেগুলি গরম-গরম উগরে তুলল শাশ্বতী। আর স্বাতী শুনল যেন হারীতই কথা বলছে, কথার উচ্চারণ পর্যন্ত সে রকম হয়ে যাচ্ছে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল ছোড়দিকে। কত মোটা হয়েছে, ফুটফুটে ফর্সা, টুকটুকে লাল, সুন্দরী বলবে সবাই, কিন্তু সুন্দর…? কী রে? জাপানি জন্তুর বর্ণনার মধ্যে হঠাৎ শাশ্বতী সচেতন হল। কী দেখছিস? নেকলেসটা? খুশি হয়ে, অথচ একটা লজ্জার ভঙ্গিতে নিজের গলার দিকে চোখ নামাল ঘাড়ে স্পষ্ট দুটো রেখা ফুটিয়ে। কেন, এটা পরে এসেছি তো আগে—আমার শ্বশুর দিয়েছিলেন, বিয়ের সময়। মোহরের মতো গোল-গোল চাকতি বসানো লাল সোনার ফসটিকে শাশ্বতী মোটা-মোটা আঙুল দিয়ে চুল একবার—সুন্দর না? স্বাতী ক্ষীণস্বরে বলল–ছোড়দি, সুন্দর কাকে বলে?

নাঃ! শাশ্বতী হা-হা করে হেসে উঠল যেমন করে পুরুষরা হাসে। তুই বড়ো ভাবুক হয়ে উঠছিস দিন-দিন, তা তোর বয়সে ওরকম একটু হয়ে থাকে। কোনো-কোনো মেয়ের, আবার সেরেও যায়—চোখে একটুখানি হাসি চিকচিক করে উঠল, বিশুদ্ধ মেয়েলি হাসি এবার— সময়মতো। বাবার সঙ্গে মিনিটদশেক গল্প করেই শাশ্বতী উঠল। রাজেনবাবু মেয়েকে এগিয়ে দিলেন প্রায় রাজবাড়ির গেট পর্যন্ত, স্বাতীও গেল সঙ্গে। ফেরবার পথে বলল–-বাবা, লেকের ধারে একটু বসবে?

—বেশ! কৃষ্ণপক্ষের রাত, তার উপর ঠান্ডাও পড়েছে একটু। লেকের ধারে লোক কম, কিন্তু যতটা কম হতে পারত তার চেয়ে বেশি। একেবারে খালি বেঞ্চি একটাও নেই। একটু ঘোরাঘুরি করে স্বাতী বলল—এসো বাবা, ঘাসেই বসি। কদিন একেবারেই ঘর থেকে বেরোয়নি, আজ দৈবাৎ রাস্তায় পা দিয়ে খোলা হাওয়ায় আকাশের তলায় ভাল লাগছিল তার। জুতো থেকে পা বের করে, ভিজে ঘাসের গায়ে একবার ঠেকিয়ে রাজেনবাবু বললেন—না রে।

এমন সময় জলের ধারের বেঞ্চি থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল—আপনারা এখানে বসুন। আপনি!–স্বাতী বলে উঠল একটু জোরেই। বোসস স্বাতী—সত্যেন রায় এমন সুরেই কথা বললেন, যেন এটা তার বাড়ির বসবার ঘর আর স্বাতী নিমন্ত্রিত। স্বাতী বসল ধারে। আর রাজেনবাবু তার পাশে বসতে-বসতে বললেন—তিনজনেই তো বসা যায় এখানে।

আমিও বসছি–বেঞ্চির আর-এক ধার দখল করলেন সত্যেন রায়। হাঁটুতে কনুই আর হাতে থুতনি রেখে সামনের দিকে মুখ বাড়িয়ে স্বাতী বলল-আপনি যে লেকে?

কেন, আসতে নেই?

লেকে তো সবাই আসে।

তাতে কী?

সবাই যায় বলেই আপনার যেতে ইচ্ছে করে না বলছিলেন।

কবে বলেছিলাম?

স্বাতী ঠিক বুঝতে পারল না এ রকম কথা সত্যেন রায় কি সত্যিই বলেছিলেন, না কি সে-ই নিজের মনে ভেবে নিল এইমাত্র। আর এই একটু চুপ-থাকার ফাঁকে—তা এসেছিলাম বলেই তো তোমার সঙ্গে দেখা হল—বলে পিঠ-টান করে বেঞ্চিতে হেলান দিলেন তিনি। আহা! দেখা করতে চাইলে আবার..দুমিনিট দূরে তো থাকেন। অনেক কথা টগবগ করে উঠল স্বাতীর মনের মধ্যে। কিন্তু কোনো কথাই কি বলা যায় ছাই! শুধু বাজে কথা বলেই জীবন কাটাতে হয়। স্বাতী হাত সরাল না থুতনি থেকে, কনুই আরো শক্ত করল হাঁটুর উপর, টনটনে পিঠে তাকিয়ে রইল তারার আলোয় ঝিলিমিলি জলের দিকে। এক-এক জায়গায় ইলেকট্রিকের আলো যেন কালো জলের ছাল ছাড়িয়ে নিচ্ছে, অথচ জল যেন চলে না, আর সেইজন্য সমস্তটা কেমন মরা-মরা। এতখানি জল, জলের মধ্যে ঘন গাছের দ্বীপ, আবার দূরে একটা সাঁকো। তবু সবটাই যেন সাজানো, বানানো, যেন সত্যি নয়—বাঃ, বানানো জিনিস তো বানানোই হবে। যা-কিছু বানানো তা-ই বুঝি এ রকম, আর যা নিজে নিজে হয় তা-ই সুন্দর? কিন্তু কবিতাও তো বানানো, তবু বানানো যে লাগে না? সোজা হয়ে বসে বাবার পিঠের উপর দিয়ে প্রোফেসরের দিকে তাকিয়ে স্বাতী বলল—আপনি কোনো লেক দেখেছেন?

এই-তো দেখছি।

না–সত্যি লেক, হ্রদ?

তাও দেখেছি।

কেমন?

কেমন? সত্যেন রায় মুখ তুললেন সামনের দিকে। মনে হল বেশ বিস্তৃত একটা বর্ণনা দেবেন, কথা ভাবছেন মনে-মনে, কিন্তু মিনিট দুই ধরে মন আর কান এক করে ফেলেও আর-কিছু শুনতে না পেয়ে স্বাতীর যখন তেমনি অপ্রস্তুত লাগছে, যেমন লাগে গুরুজনের সভায় বালকের হঠাৎ গম্ভীরভাবে এমন কিছু বলে ফেলে যেটা একটু পরেই সে বুঝতে পারে বোকামি বলে, তখন, যেন অনেক ভাবনার পরে, সত্যেন রায় আস্তে বললেন—পৃথিবীর সবই সুন্দর। স্বাতী আবার হেলান দিল বেঞ্চিতে, কথাটা যেন শুনলই না। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চেষ্টা করল দূরের দ্বীপটাকে প্রকাণ্ড পাহাড় আর ঝোপ-ঝাপ গাছগুলোর ঘোর-কালোকে ভীষণ জঙ্গল বলে কল্পনা করতে। আর হঠাৎ একটা মোটরগাড়ির হেডলাইট আলো ফেলল ঠিক তার মুখের উপর, চোখে হাত চাপা দিল সে, কিন্তু দরকার ছিল না, আলো দূরে সরে গেছে তক্ষুনি। চুপচাপের মধ্যে জোর আওয়াজে হেঁচে উঠলেন রাজেনবাবু। হাতের উল্টো পিঠ ঠোঁটে বুলিয়ে বললেন–যাবে নাকি এখন বেশ ঠান্ডা।

হ্যাঁ বাবা, চলো।-–স্বাতী উঠল, জলের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়াল, আর তার পিছনের জল আর আকাশ থেকে সত্যেন রায়ের চোখ আস্তে আস্তে সরে এল তার মুখের উপর। ঠান্ডা হাওয়ায় একটু যেন কেঁপে উঠে স্বাতী হঠাৎ বলল—আচ্ছা, সুন্দর কাকে বলে? একটু চুপ করে থেকে, একটু হাসির সুরে, আর খুব মৃদু স্বরে প্রোফেসর জবাব দিলেন-সে-কথা এখন ভাবতে হবে না তোমাকে, এখন পরীক্ষা সামনে। তারপর উঠে দাঁড়ালেন রাজেনবাবুর দিকে ফিরে–লেকের ধারের রাস্তায় কেন-যে গাড়ি চলতে দেয়। বাড়ি ফেরার পথে আর একটি কথাও বলল না স্বাতী। হঠাৎ ক্লান্ত লাগল তার, ক্লান্ত, ফাঁকা-ফাঁকা, কঁপা-কাঁপা।

******

বেশ-তো; তাহলে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার জন্যই তৈরি হওয়া যাক। জানুয়ারি থেকে কলেজ ছুটি হল। সারাদিন বাড়ি বসে পড়াশুনো ছাড়া করবারও কিছু নেই। কিন্তু পরীক্ষার পড়া কতটুকুই বা। বাকি সময় নানারকম বই পড়ে, দুপুরে খেতে-খেতে ভাবে, খাওয়ার পর রোদুরে পিঠ দিয়ে বসবে আরম্ভ করা কোনো বইটি নিয়ে, বইয়ের তো অভাব নেই সত্যেন রায় থাকতে। পড়তে-পড়তে রোদ সরে আসে তার পিঠ থেকে মাথায়, রোদের বাঁকে বাঁকে বেতের চেয়ারটি ঘুরিয়ে নেয়। তারপর ঘর থেকে রোদ যখন চলে যায়, অথচ ঘরভরা তাতটুকু থাকে, তখন ছাপার অক্ষরগুলো একটার গায়ে আর একটা লাফালাফি করে তার চোখের সামনে। একটুখানি ঘুমিয়ে পড়ে হয়তো–কিন্তু তক্ষুনি টান করে চোখ মেলে কল্পনার জগৎ ছেড়ে বাইরের দিকে তাকায়। সামনের ছোটো রাস্তাটি ফাঁকা, রা নেই পাড়ায়, কর্পোরেশনের বাচ্চা-গাছটার সঙ্গে শীতবিকেলের সোনারোদের একা-একা খেলা।

এইরকম সময়ে বিজু একদিন এসে বলল—স্বাতী, কী করছিস? দাদাকে দেখে স্বাতী খুশি হল। হেসে বলল–কী আর করব?

তুই দেখি নভেল পড়েই দিন কাটাস। পরীক্ষার পড়া?

তাও পড়ি।

নিজের মনে কী পড়িস না-পড়িস তুই ছাড়া কেউ জানে না।

আমি ছাড়া আর কে জানবে-আর জানবার দরকারই বা কী?

আহা, এমনি-এমনি পড়া এক কথা, আর পরীক্ষার জন্য পড়া আর—দু-বার ফেল করার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিজন বলল। ঠিক হচ্ছে কিনা সেটা জানা তো চাই। আর তোর তত সুবিধেই আছে মস্ত।

কী?

সত্যেনবাবুকে বলতে পারিস মাঝে-মাঝে এসে…

ও মা! স্বাতী বাধা দিল কথায়। এর জন্য নাকি আবার…

কেন? উনি প্রোফেসর, ওঁর কাজই তো পাশ করানো। চাই কি হয়তো কোশ্চেনও বলে দিতে পারেন।

সে কী? পরীক্ষার কোশ্চেন নাকি কেউ কাউকে বলে!

বলে না!–বিজন হাঃ হাঃ করে হাসল একটু দিন-রাত বলে! ম্যাট্রিকে তত দু-বারই আমি এসে-টা জেনে গিয়েছিলুম–

—তাতে সুবিধে হয়েছিল কিছু? বিজু গম্ভীর হয়ে বললতা, বলতে হলে নিজে তো জানা চাই। সত্যেন রায় বাচ্চা-মাস্টার, উনি আর কোথেকে জানবেন?

বেশ রঙ তোর শার্টটার-স্বাতী কথা বদলাল। ভাল?—বিজন চোখ নামিয়ে দেখল একবার। তারপর হেলাফেলার মতো ভাব করে বলল–করালাম কয়েকটা নতুন। কাজ বাগাতে হলে কাপড়চোপড়ের চটকটা চাই সকলের আগে। ফিকে-ছাই রঙের পাৎসুন আর শাদা-কালো জুতোর দিকে তাকিয়ে স্বাতী জানতে চাইল–চটক হলেই কাজ বাগানো যায়?

দেখবি, দেখবি—বিজন একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল সিগারেটের। ঘরের মধ্যে ঘুরতে-ঘুরতে বোনের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলল—শোন, সত্যেন রায়কে বলবি আমাকে দুটো চিঠি ড্রাফট করে দিতে? বুঝলি না, ইংরিজিটা তো আমার তেমন—

চাকরির অ্যাপ্লিকেশন?

আরে না। চাকরির অ্যাপ্লিকেশন হবে কেন? বিজনেস লেটর। গবর্মেন্টে লিখতে হবে কি না, তাই একটু ভাল করে—বলবি সত্যেন রায়কে?

আমি কিছু বলতে টলতে পারব না। এ-উত্তরটাই বিজন আশা করেছিল, আর এতে চটবে না এটাও আগেই স্থির করা ছিল তার। তক্ষুনি বলল–আচ্ছা থাক, থাক, ও আমি চালিয়ে নিতে পারব। আর বিদ্বান উনি হতে পারেন খুব, কিন্তু কমার্শল করেসপনডেন্সের কী জানেন? কমিশন বানান কী রে? স্বাতী মুখে আঁচল চেপে হেসে উঠল। হাসবার কী আছে? পাৎলুনের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বিজন বুকটাকে চেতিয়ে দিল একটু—ভীষণ নটখটে ওটা। কত মুখস্থ করেছিলুম কমিশন-অমিশন, তবু লিখতে গেলেই সর্ষে ফুল। একটা এম, দুটো এস, না রে? না একটা এস, দুটো এম?

******

তা বানানের জন্য কি আর কাজের লোকের কাজ ঠেকে থাকে? কদিন পরেই দেখা গেল, জমকালো একটি লেটর-বক্স শোভা পাচ্ছে বাড়ির দরজায়। তার গায়ে গোটা-গোটা সাদা অক্ষরে লেখা— B.JOHN & Co. দেখে রাজেনবাবু হকচকালেন। তবে কি তার বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিল অন্য কেউ, আর তিনিই জানলেন না? ঘরে এসে স্বাতীকে বললেন—ব্যাপার কী রে!

কী?

লেটর-বক্সটা কাদের?

কাদের আবার! আমাদেরই। দাদা লাগিয়েছে সেদিন।

কী কোম্পানি লেখা দেখলাম যে?

ও মা! বুঝলে না তুমি? B. JOHNE–মানে বিজন।

ও-হোঃ-হোঃ! হেসে উঠলেন রাজেনবাবু। এমন গলা ছেড়ে, আর এতক্ষণ ধরে হাসলেন অনেকদিন পরে। তা বুদ্ধিটা মন্দ বের করেনি–স্বাতী দাদার পক্ষ নিল।–হ্যাঁ, খুব বুদ্ধি! আবার কোম্পানিও!

রাজেনবাবু হাসির ধাক্কায় মাথা হেলিয়ে দিলেন পিছন দিকে। স্বাতী বলল-দাদা কিছু-একটা করছে ঠিকই–কী-রকম সুন্দর চিঠির কাগজ ছাপিয়েছে সবুজে আর কালোতে। আর বিলটিল কত-কী—

–ওঃ! তাহলে আর কী! স্বাতী চোখ দিয়ে হাসল বাবার সঙ্গে, কিন্তু মুখে বলল—অত ঠাট্টারই বা কী হয়েছে। জানো, মাঝে-মাঝে চিঠিপত্রও আসে বি-জন কোম্পানির নামে, খাকি রঙের খামে। একটা এসেছিল ও. এইচ, এম, এস, ছাপানো—জানো?

ভাল।

স্বাতী একটু ভাবল, তারপর আবার বলল-নিশ্চয়ই দাদা কিছু করছে এবার—টাকাও পাচ্ছে খুব।

বলেছে বুঝি তোকে?

বলতে হবে কেন, দেখে বোঝা যায় না? কত নতুন কাপড়-চোপড় করাচ্ছে, আর দাড়ি কামাবার ব্লেড যে কত কিনেছে তোমাকে বলব কী বাবা।

কী বললি? ব্লেড কিনেছে!

ক–ত্ত! একটা বিস্কুটের টিন ভরতি!

হাসি মিলিয়ে গিয়ে এবার রেখা পড়ল কপালে। শেষটায় কি উন্মাদ হয়ে গেল ছেলেটা? না স্বাতীরই ভুল?—তুই দেখেছিস? রাজেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।–লুকিয়েই রাখে সুটকেসে কাপড়ের তলায়। সেদিন বের করে গুনছিল, আমি হঠাৎ গিয়ে পড়েছি তখন ওর ঘরে। দেখে বললুম-অত ব্লেড দিয়ে কী হবে রে? বলল, জমাচ্ছি। ক দিন পরে তো আর পাওয়া যাবে না। বলে হাসতে লাগল খুব। সত্যি নাকি, বাবা, ব্লেড আর পাওয়া যাবে না একেবারেই? দাড়ি রাখতে হবে সবাইকে? মা গো, কী কুচ্ছিৎ!

গভীর হল কপালের রেখা, ফ্যাকাশে হল মুখের রঙ। মিনিটখানেক চুপ করে থেকে আপনমনেই বললেন—টাকা পায় কোথায়?

বাঃ! স্বাতী বাবার দুশ্চিন্তা দূর করল—আমি বললুম না তোমাকে, ও টাকা পাচ্ছে খুব। আমাকে বলল—এখানে কত টাকার ব্লেড বল তো? আমি অনেক ভেবে, অনেক বাড়িয়ে-টাড়িয়ে বললুম পঁচিশ। হো-হো করে হেসে উঠল শুনে। —দু-শো টাকার ব্লেড কিনেছি। আরো কিনব। অনেক টাকা না থাকলে কি দুশো টাকার ব্লেড কিনতে পারে কেউ? তা ভালই করল দাদা। যখন আর পাওয়া যাবে না, আমাদের চেনাশোনা সকলকে দিতে পারব তো বলতে-বলতে স্বাতীর চোখের সামনে ফুটল সত্যেন রায়ের পরিষ্কার কামানো গালের নীলচে আভা। — ও বাবা, আমার কথা শুনছ না তুমি বাবার মুখে ঠেলা দিল স্বাতী।–হাঃ, মস্ত এক ভাবনা ঘুচল। রাজেনবাবু হাসলেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে।

বিজুর সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন মনেমনে। বাপ যখন বাড়ি থাকেন, ছেলে তখন প্রায়ই থাকে না, সুযোগ ঘটতে তাই দেরি হল। আর দেরি হল বলে রাজেনবাবুর উদ্বেগ যেমন বাড়ল, তেমন আবার কোথায়-যেন একটু আরামও পেলেন। কিছু বলতে গেলেই তো রুখে উঠবে, চ্যাঁচাবে, আর স্বাতী যদি কিছু একটা বলে ফেলে তবে-তো আর রক্ষে নেই, পদ্মা-পার করে ছাড়বে মেয়েটাকে। অথচ না বলেই বা কী করি, কার টাকা নিয়ে কী পাগলামি করছে, সেটা আমাকে জানতে তো হবেই। দেখা হয়ে গেল পরের রবিবার বিকেলবেলা। দ্যাখ তো আমার নতুন স্যুটটা কেমন— বলতে বলতে ঘরে এসে বিজন দেখল স্বাতী তার চেয়ারটিতে বসে নেই। বাবা চশমা এঁটে কী যেন হিসেব লিখছেন সেখানে। থমকে দাঁড়াল। পলকের জন্য রাজেনবাবুর মনে হল, এখন থাক। কিন্তু তক্ষুনি আবার জোর করলেন মনে, হাতের পেন্সিলটা নামিয়ে, খুকখুক কেশে, একটু লাল হয়ে বললেন–বিজু, তোর সঙ্গে একটা কথা—

আমার সঙ্গে? গটগট করে বিজু এগিয়ে এল। এই সপ্রতিভ স্বচ্ছন্দ ভাবটার পিছনে কতখানি চেষ্টা আছে তা বুঝতেই দিল না। ঝকঝকে নাবিক-নীল স্যুট-পরা ফ্যাশনেবল যুবকটির দিকে নিষ্প্রভ বুড়ো-চোখ মেলে একটু তাকালেন রাজেনবাবু। তারপর মিনমিন করে বললেন—কথাটা হচ্ছে.. মানে… কী করছিস-টরছিস আজকাল–

ওঃ! বিজন অস্ফুট অধৈর্যের আওয়াজ করল… হ্যানো-ত্যানো পঞ্চাশ কথা এখন। তার চেয়ে একেবারেই সব বলে দেওয়া ভাল…মানে, যতটা বলা যায়। মুখে একটু হাসি এনে বেশ স্পষ্ট করে লল—বিজনেস-এর খুব একটা সুবিধে পেয়েছি বাবা। বি-জন কোম্পানি নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে যারে, তুমি দেখো।

আর কাকে নিয়ে কোম্পানি?

আর-তে কেউ না, আমি একাই। পার্টনার হতে অনেকেই চাচ্ছে অবশ্য, বোলচাল দিচ্ছে খুব, কিন্তু আমি ওতে ভুলি না। আমি একাই পারব, একাই পারব।

কী পারবি? কী করবি?

বিজন মুচকি হাসল তুমি কি ভুলে যাচ্ছ বাবা, যে পৃথিবীতে একটা যুদ্ধ চলছে? রাজেনবাবু একটু অবাক হলেন। এ রকম করেও বলতে শিখেছে বিজু? তা হবে, কত কাল তো ওর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলি না, আর নেহাত ছেলেমানুষ তো নেই আর।—তা…তা-আমতাআমতা করলেন তিনি-যুদ্ধ বলেই তো আরো ভাবনা। দুর্দিন।

দুর্দিন না সুদিন দেখা যাক। তারপর বাপের চোখের চকিত প্রশ্নের উত্তরে বলল—এ নিয়ে খামকা তুমি ভেব না বাবা, ঠিক আছে সব।

টাকা পেলি কোথায়?

টাকা কিছু পেলাম বলেই তো—

কোথায় পেলি?

আমাকে দিয়েছে একজন।

কে? দু-বার চোখের পলক ফেলে বিজন উত্তর দিল-নাম বলতে পারব না।

মুখ-কান গরম হয়ে উঠল রাজেনবাবুর। একটু চুপ করে থেকে বললেন–কত টাকা দিয়েছে? বিজন এ-প্রশ্নের জেনো উত্তর দিল না। বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিতে লাগলেন রাজেনবাবু, খক করে কেশে উঠলেন একবার। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন—এ-সব ছাড়। টাকাটা ফিরিয়ে দে, চাকরি কর।

চাকরি আমি করব না, বাবা। আর টাকাটা ফিরিয়ে দেবার কথা ওঠে না। আমাকে ধার দেয়নি, দিয়েই দিয়েছে। শুনে রাজেনবাবু হাপরের মতো হাঁপাতে লাগলেন। ঘরে এল স্বাতী, ধুপ করে খাটের উপর বসে পড়ে বলল-ক-টা গেঞ্জি নিয়ে এলুম বাবা, তোমার জন্য। সব তো ছিঁড়ে গেছে। বোনের সওদায় দুটি অভিজ্ঞ আঙুল ন্যস্ত করে বিজু একটু নিচু গলায় বলল—বাজে। আমারও তা-ই মনে হচ্ছিল— স্বাতী তাড়াতাড়ি বলল-এই মনোহর স্টোর্স দোকানটাই বাজে, কিন্তু পাড়ায় তো নেই আর। তুই শহরে নানা জায়গায় যাস, নিয়ে এলেই পারিস।

—আনব। বাবার দিকে আর না তাকিয়ে বিজন বেরিয়ে গেল একটু-যেন তাড়াহুড়ো করেই। স্বাতী বলল-স্যুটটায় বেশ মানিয়েছে দাদাকে, না বাবা? রাজেনবাবু চুপ।

গেঞ্জিগুলো কি খুব খারাপ? স্বাতী যেন আপন মনেই বলল—তবে না হয় ফিরিয়ে দিয়ে আসি। কীসের!–প্রতিবাদটা স্বাতীর মনে হল বাবার পক্ষে বড়োই প্রবল খুব ভাল! খুব সুন্দর! এত ভালো গেঞ্জি আমি পরেছি নাকি কোনোদিন।

বাবা, স্বাতী হাসল—তুমি বড্ডো খুশি-করা কথা বল। রাগ ধরে। তা—একটু থেমে, একটু ভেবে আবার বলল—কথাটা এমন মিথ্যেই বা কী, নিজে কিনলে সবচেয়ে শস্তাটার উপর আর উঠতে নাকি তুমি?

নিজে তো করে-কর্মে ভাসিয়ে দিচ্ছেন–রাজেনবাবু গজর-গজর করলেন—আর অনন্যরটা বাজে।

ও মা! এর জন্য দাদার উপর রাগ করছ তুমি? স্বাতীর ঠোঁটের ফাঁকে ফাঁকে দাঁতের সারি চিকচিক করে উঠল।–যুদ্ধে বড়লোক হবেন! তীব্র একটা নড়াচড়া হল রাজেনবাবুর শরীরে। যত! তাহলে রাগের অন্য কারণ আছে? বাবার কুঁচকানো কপালের দিকে তাকিয়ে স্বাতী বলল-কী হয়েছে, বাবা?

যুদ্ধে বড়লোক হবেন তোর দাদা। রাজেনবাবু আর মনের ধোঁয়া চাপতে পারলেন না—দেখছিস না প্যান্ট-কোট পরে গটমট।

তাতে কী! বড়লোক হওয়া তো ভাল।

যুদ্ধে বড়লোক হয় কারা? যারা ঠকায়। বলতে-বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, স্বাতী অবাক হল বাবার উত্তেজনা দেখে দেখেছি না আগের বারের যুদ্ধ? চোরে-জোচ্চোরে মিলে সোজা লুঠ করেছে গবর্নমেন্টের তহবিল।

হারীতদা তো বলেন সব বড়লোকই চোর কিংবা ডাকাত–স্বাতী বাবাকে জানাল—হয় সে নিজে, নয় তার বাপ-ঠাকুরদা কেউ আর বলতে-বলতে তার মনে পড়ল ছোড়দির মুখে শোনা মকরন্দ মুখুয্যের কথা—হারীতদার বন্ধু। তা মুখে তো লোকে কতই বলে, তা বলে সত্যি-সত্যি ছেলেটা চোর হবে, চোর?—দম বন্ধ হয়ে গলা আটকাল রাজেনবাবুর। ঘন-নীল সুট-পরা চুল-ওল্টানো দাদাকে স্বাতী কিছুতেই চোর বলে ভাবতে পারল না। চোর! সে-তো নোংরা, বিচ্ছিরি কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যায় রাস্তা দিয়ে, আর ছোটো ছেলে হাততালি দেয় পিছনে। তা ছাড়া আবার চোর হয় নাকি? সত্যি, বাবার বড়ো বেশি-বেশি সবটা নিয়ে। চোর না আরো কিছু!

টাকা পেল কোথায়? রাজেনবাবু বিড়বিড় করলেন। কীসের টাকা, বাবা?

ঐ গেঞ্জি একটা দে তো। গেঞ্জির কথায় স্বাতী খুশি হল, কিন্তু তার উপর পাঞ্জাবি পরতে দেবে বলল—বেরোচ্ছ নাকি বাবা?

হ্যাঁ, ঘুরে আসি একটু। আর কথা না বলে রাজেনবাবু বেরিয়ে পড়লেন।

এলেন ভবানীপুর, ভবানীপুর থেকে বালিগঞ্জ। পরের তিন-চার দিন সারলেন অন্য সব পাড়া কোথায় বেহালা, কোথায় মৌলালি, আর কোথায় মানিকতলা-হাঙ্গামা কি সোজা! আত্মীয় বলা যায়, বন্ধু মনে করা যায় এমন একজনকেও বাদ দিলেন না। বিজু কি কোনও টাকা নিয়েছে তোমার কাছ থেকে? বিজুকে আপনি কোনও টাকা দিয়েছেন? না! না তো! বিজু কেন টাকা নেবে? কেন, হয়েছে কী? চেনাশোনা কেউ বাদ পড়ল কিনা ভাবতে গিয়ে রাজেনবাবু চমকে উঠলেন। আরে! বিজুর দিদিরা! নিজের মেয়েদের কথাই তার মনে পড়া উচিত ছিল সকলের আগে—তা তো নয়, এদিকে রাজি তল্লাশ করে হয়রান! ওকে আর কে টাকা দেবে যদি না তার দিদিরা কেউ দেয়? দিদিদের মধ্যে কে? শাশ্বতীকে প্রথমেই সরিয়ে দিলেন মন থেকে কেননা হারীতের মুঠো একটু আঁটো, আর শাশ্বতীর সাধ্যি নেই লুকিয়ে দেয়। আর তিন জনের মধ্যে কোনজন? মহাশ্বেতা? সরস্বতী? একজন রেঙ্গুনে, একজন দিল্লিতে। এত দূর থেকে শুধু চিঠিপত্রে এ রকম একটা ঘটে গেল, আর আমি কিছুই জানলাম না?…না, এ শ্বেতারই কাণ্ড। এই যে সেদিন এসেছিল, এর মধ্যেই বিজু মন গলিয়েছে বড়দির–আর মন তো ওর গলেই আছে, ওকে জল করতে কতক্ষণ!.তা-ই! নিশ্চয়ই শ্বেতা। রাজেনবাবু নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচলেন যেন—যাক, তবু-যে বাইরের কারো কাছে নেয়নি কি অচেনা কাউকে ঠকাতে যায়নি। শ্বেতাকে চিঠি লিখলেই জানা যাবে, আর জানতে পারলেই ফিরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন।

তিন মেয়েকেই চিঠি লিখলেন রাজেনবাবু। উত্তর এল সকলের আগে সরস্বতীর!…বাবা তোমার চিঠি পেয়ে অবাক হলাম। তোমাকে না জানিয়ে বিজুকে আমি টাকা দেব ব্যবসার নামে নষ্ট করার জন্য, তুমি কি আমাকে এইরকম ভাব? আমি তো তোমাকে কবে থেকেই বলেছি, ওকে শাসন করো, নয়তো বুড়ো বয়সে নাকাল হতে হবে তোমাকেই। দেখলে তো এখন! এখন যদি… এর পরে অনেকখানি আক্ষেপ আর উপদেশ। মহাশ্বেতা কত কালের মধ্যে আসে না, ভাইয়ের উপর তার বিশ্বাস তাই বেশি, আর ব্যবসায় তার ভক্তি তো থাকবেই। সে অল্প কথায় জানাল যে টাকা সে দেয়নি, দেবার কথাও হয়নি কোনো, কিন্তু এ নিয়ে এত দুশ্চিন্তারই বা কী আছে, ব্যবসা করা তো ভালই। বিজু যে পারবেই না, সেটা প্রথম থেকেই ধরে নিয়ে লাভ কী—হয়তে পারবে। শ্বেতার চিঠি এল সবশেষে, যদিও তার রাস্তাই সব-কাছের। চিঠির উত্তর দিতে দেরি হল, ছেলেপুলের তাড়নায় পাঁচটা মিনিট সময় পাই না, বাবা। বিজুকে আমি তো টাকা দিইনি। আমার কি আলাদা টাকা আছে নাকি? দিলে তোমার জামাই-ই দেবেন। তা ওঁকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বললেন—পাগল নাকি! কথায়-কথায় আরো বললেন যে এবার বিজু ওঁকে প্রায়ই বলত ব্যবসা করার কথা। ওর মন যখন ঝুঁকেছে ওদিকে, দেখা যাক না। তোমার বাবাকে লিখে দাও—উনি বললেন—এ নিয়ে মিছিমিছি অস্থির হয়ে উনি যেন শরীর খারাপ না করেন। আমি তা-ই ভাল মনে করি বাবা। তোমার এত ভাবনার কী আছে বলো তো আমরা থাকতে?

******

মহাশ্বেতার আশ্বাস, সরস্বতীর উপদেশ, শ্বেতার সান্ত্বনা, কিছুই কোনো কাজে লাগল না। মাঝে একটু উপশম হয়েছিল বলেই দুশ্চিন্তায় দ্বিগুণ কালো হল মন। তবে কোথায় পেল? আর টাকাও তো নেহাৎ অল্পস্বল্প হবে না—যা সাজপোশাকের ঘটা—আর দুশো টাকার ব্লেড! কে সেই পণ্ডিত, যে বিজুকে বিশ্বাস করে টাকা দিল? আবার বলে ফেরৎ দিতে হবে না। আর কিছু না, টাকাটা নিয়ে ও যা ইচ্ছে তা-ই করুক—ওড়াক, পোড়াক, হারাক—যার টাকা, তাকে ফেরৎ দিতে পারলেই বাঁচি। কোনো বিধবাকে ফতুর করেনি তো? তেমন কি কেউ আছে আত্মীয়ের মধ্যে, জানাশোনার মধ্যে? কই, না। ভেবে-ভেবে দিশে পান না, আরো ভাবেন। দিনে-রাত্রে কাটার মতো বিধে রইল কথাটা। পান-চিবোনো অবসরটুকু ফুটো হয়ে গেল, চিড় ধরল রাত্তিরের গভীর ঘুমে।

বিজু—আবার একদিন সুযোগ পেয়ে তিনি বললেন—শুধু এইটে বল যে কার টাকা আর কত টাকা। আর তোকে কিছু বলব না আমি।

কেন বলো তো এ-নিয়ে এত ভাবছ?— বিজু হাসিমুখে বলল। সত্যি, কেন? শ্বেতাও তা-ই লিখেছে, আর মহাশ্বেতাও। সত্যি তো, আমার কী? নিজের উপরেই রাগ হল রাজেনবাবুর, নিজেকে যখন বলতে শুনলেন—বল না, আমি তাকে ফিরিয়ে দিই টাকাটা।

বলেছি তো, ফেরৎ দিতে হবে না।

হোক, তবু আমি দেব। ফেরৎ দিতে হলে আমিই দেব—বিজু গম্ভীর। বল না, বলপ্রায় হাতে ধরে মিনতি করলেন বাবা। যদি মরে যাই, এই একটা অশান্তি… কী বাজে!বিজু অস্ফুটে উচ্চারণ করল। তারপর মাথা উঁচু করে সোজা বাপের দিকে তাকিয়ে বলল–আচ্ছা, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি যে তার টাকা আমি ফিরিয়ে দেব—অনেকগুণ দেব। হল–তো? উঃ! উনি আমাকে কথা দিচ্ছেন! কী কথা-দেবার মানুষটা! রাজেনবাবুর বুকের মধ্যে কেমন যন্ত্রণা হল ছেলের ভাবভঙ্গি দেখে। চোখ নামিয়ে নিলেন, যেন তিনিই অপরাধী। ছেলে তার হাত-সাফাইয়ের হাতে-খড়ি কার উপর করল, সেটা জানবার আশা ছেড়ে দিতে হল। তা ছাড়া আর উপায়ই বা কী!…রাজেনবাবুর সমস্ত ছুটোছুটি, লেখালেখি, পীড়াপীড়িকে টিটকিরি দিয়ে বাড়ির দরজায় বুক ফুলিয়ে রইল বি.জন কোম্পানির লেটর-বক্সটা। একেবারে বেকারও না, চিঠিপত্র সত্যি পড়ে মাঝে মাঝে।

*****

স্বাতীর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা যতদিনে শেষ হল, ততদিনে দেখা গেল বিজুর কাছে লোকজনও আসছে, কেউ-কেউ আবার গাড়িতে। তারা বিজুকে বলে মিস্টার মিটু, জনে-জনে সিগারেটের টিন তাদের হাতে, দরজা-বন্ধ ঘরে নিচু গলায় তাদের পরামর্শ। রাজেনবাবুকে দেখলে তারা যেন দেখতেই পায় না, স্বাতীর সামনে পড়লে অসাধারণ সৌজন্য দেখিয়ে সরে দাঁড়ায় টানটান বুকে। ক্লাইভ স্ট্রীটের সিঙ্গি-বাঘের পিছন পিছন এরা ঘুরে বেড়ায়, প্রসাদ পায় গণ্ডারভাণ্ডারের, আর মাঝে মাঝে স্বাধীনভাবে ছোটো শিকার মারে—এক পলকেই ঠিক চিনলেন রাজেনবাবু। একদিন স্বাতীকে বলেই ফেললেন মুখ ফুটে বিজু আর যা করে করে, ওসব বাজে লোকদের বাড়িতে আনে কেন? বলিস তো ওকে।

বললেই যেন শুনবে।

ব্যবসা করতে হয় তো আপিশ-পাড়ায় বসুক-রাজেনবাবু চোখের চামড়া কুঁচকোলেন— বাড়িতে আবার কোম্পানি লটকায় কে? স্বাতী তখন আর কিছু বলল না। কিন্তু বিকেলে বাবা আপিশ থেকে ফেরামাত্র ছুটে এসে দুহাতে গলা জড়িয়ে বলে উঠল—বাবা!

কী রে? কী?

আজ যা অবাক করে দেব তোমাকে! বাবা দম নিয়ে বললেন–পরীক্ষার রেজাল্ট বুঝি বেরিয়েছে?

সে কী! এখনই!

আর তো কিছু ভেবে পাচ্ছি না—আপিশের পোশাকেই খাটে লম্বা হলেন রাজেনবাবু।

এই নাও– স্বাতী ছুটে গেল টেবিলের ধারে, হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া খুলেই–আরে, কী হল?— বলে টেনে আনল তার তলা থেকে ভানুসিংহের পদাবলী। আর তার ভিতর থেকে তক্ষুনি বেরোল পাতলা নীলচে-সবুজ একশো টাকার নোটখানা। বাবার কাছে এসে হাত বাড়িয়ে বলল-নাও।

কী রে? নাও না! দ্যাখো না!–মেয়ের খুশি উপচে-পড়া মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থাকলেন বাবা। তারপর তার হাতের দিকে তাকালেন—টাকা? পেলি কোথায়?

দাদা দিয়েছে তোমাকে বলে স্বাতী নোটটা বাবার হাতের মধ্যে গুঁজে দিল।–কেমন? তুমি তো ভাবছিলে দাদার সবই বাজে! এখন? নোটটা হাতে ধরে রাজেনবাবু উঠে বসলেন। আস্তেআস্তে বললেন কেন? আমাকে দিয়েছে কেন?

বাঃ, তোমাকে দেবে না তো কাকে দেবে? মুখখামুখি তো লজ্জা করে, তাই আমার হাতে দিয়ে বলল, বাবাকে এটা দিস, কেমন?—ও তোমাকে খুব ভালবাসে, বাবা।

ভালবাসার টাকাই বুঝি প্রমাণ?

নাঃ, তুমি যে কী, সত্যি! স্বাতী ভাষা পেল না মনের ভাব বলবার। রাজেনবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন–ওর টাকা দিয়ে আমার কোনো দরকার নেই। ওকে দিয়ে দিস, এই নে। কিন্তু স্বাতী হাত বাড়াল; অবাক হয়ে বললো তুমি নেবে না? ফিরিয়ে দেবে? যার কাছে টাকা নিয়েছে তাকেই ফেরৎ দিতে বলিস– বলতে বলতে রাজেনবাবু খাট ছেড়ে উঠে টেবিলের উপর নোটটি রেখে দিলেন বই চাপা দিয়ে। টাকা আবার কার কাছে নিয়েছে? কথাটা শোনাল প্রশ্নের মতো না, প্রতিবাদের মতো।

তা যদি জানতাম তবে তো–হঠাৎ থেমে গিয়ে বললেন–বলিস ওকে এ-কথা। যার টাকা নিয়েছে তাকে যেন ফিরিয়ে দেয়। স্বাতী সারা দিন ধরে আশা করেছিল। কত খুশি হবেন বাবা! দাদা-যে সত্যি অপদার্থ না, সত্যি যে কাজে-কর্মে মন গেছে এবার—ভেবেছিল বাবা বলবেন— বিজু তাহলে একজন হয়ে উঠল!—আর তার এই মন-বানানো রঙিন ছবির গায়ে কালি ঢেলে দিয়ে বাবা কিনা টাকা ফিরিয়ে দিলেন! কেমন লাগবে দাদার? কত উৎসাহ করে দিয়ে গেছে। দাদার সঙ্গে তুমি এ-রকম কর কেন, বাবা? স্বাতী না-বলে পারল না।

কী করি?

কী আবার, এই-তো টাকাটা নিলে না। আমি যদি দিতাম আর তুমি যদি না-নিতে, জীবনে কি আর তোমার সঙ্গে কথা বলতাম?

তা বিজু যদি বলে বাবার সঙ্গে আর কথা বলব না, তাহলে খুব তফাৎ হবে তোর মনে হয়? বাবা, না! কোন না-টাকে হ্যা করতে চায়, তা নিজেই ভাল বুঝল না। শুধু ভিতর থেকে একটা প্রতিবাদ উঠতে লাগল।

তা ছাড়া, রাজেনবাবু সান্ত্বনার সুরে বললেন—আমার তো টাকার দরকার নেই কোনো, যদ্দিন আছি, আমারটা আমিই চালাতে পারব।

শুধু দরকারের জন্যই বুঝি টাকা?

থাম তো পাকা বুড়ি! –বাবা উড়িয়ে দিলেন মেয়ের কথা।

কী আর করা, একশো টাকার নোটটা ফিরিয়েই দিতে হল দাদাকে। স্বাতী কথাটা বলল ভয়েভয়ে, অনেক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, মোলায়েম করে। কিন্তু কী আশ্চর্য! একটুও মর্মাহত মনে হল না দাদাকে, দুঃখিতও না। দিব্যি হাসিমুখে চামড়া-বাঁধানো পকেট বইয়ে নোটটি ভরে নিয়ে বলল–থাক, ভালই হল।…তোর চাই কিছু টাকা?

ওমা? আমি টাকা দিয়ে কী করব?–স্বাতী হেসে উঠল।

ভাল! ভাল! যদ্দিন টাকার দরকার না হয় তদ্দিনই ভাল–বলে ফুর্তিতে গুনগুন করতেকরতে প্রস্থান করল বিজন। স্বাতী অস্ফুটে বলল, দাদাটা কী রে!—সত্যি-তো বাবার আর দোষ কী, দাদাটাই বাজে। ছেলেবেলা থেকেই তা-ই, এখনো সারল না। কী রকম চলে, আর কী যে বলে…সত্যি! বসে-বসে যত ভাবল, ততই রাগল মনে-মনে। কিন্তু পরের দিন রাগ জল হয়ে গেল তার, অনুশোচনায় ভিজে গেল মন, যখন বিজন এসে তার টেবিলে রাখল। আটটি-দশটি চকোলেটের পাতা।

নেসলে! স্বাতী চেঁচিয়ে উঠল খুশিতে। ইশ—এই লাল-পাতাগুলি আজকাল আর চোখেই দেখি না! পেলি কোথায়?

আছে! আছে! বিজন মুখ টিপে হাসল—কী চাই তোর বল না।

স্বাতী আর কথা বলল না। একটা পাতা খুলে প্রথমে একটুখানি ভেঙে মুখে দিল। তারপর সমস্ত মুখে অনেকদিনের ভুলে-যাওয়া সুখের ছড়িয়ে-পড়া অনুভব করতে-করতে একটি পাতা শেষ করেই ফেলল আস্তে-আস্তে। হঠাৎ বলল—দাদা খা!

, আমার ও-সব ভালো লাগে না।

আমারও আর তত না— স্বাতী তাড়াতাড়ি বলল। সত্যি, ছেলেবেলায় কী ভালই বাসতুম চকোলেট! তুই একটুও খাবি না, দাদা?

তুই আর একটা খা।

মা গো! একটা খেয়েই ঢিশটিশ! বলে স্বাতী আর-একটি পাতার কাগজ ছাড়াল দু-আঙুলে। বোনের জন্য এটা-ওটা উপহার বিজন মাঝেমাঝেই আনতে লাগল। ডিমের ছাঁদের নীল-বাক্সে প্যারিসের সেন্ট, সোনালি-বাক্সে চিকরি-চিকরি কাগজে ঢাকা বিলেতি সাবান। স্বাতী ভেবেছিল এসব আর পাওয়াই যায় না, আর দাদা কিনা বলে কত চাস? কাণ্ড! আর কোনোদিন তো হাতে করে কিছু আনেনি আমার জন্য কারো জন্যই আনেনি…সেই টাকাটা তো নেননি বাবা। মুখে না-বলুক, মনে কি আর না লেগেছে?–তাই আমাকে এসব দিয়েই…স্বাতীর হৃদয় দ্রব হল কথাটা ভেবে। তারপর, পরীক্ষার খবর যখন জানা গেল, ঐ একটা পাশের ছুতোয় দাদা এনে দিল টিয়ে-রঙের শাড়ি। হাতে দু-খানা দশ টাকার নোট দিয়ে বলল—খুব-তো পাশ করলি, এবার একটু খরচ কর স্বাধীনভাবে।

স্বাতী একটু লাল হয়ে বলল—পাশ করেছি তো কী হয়েছে, পাশ আবার কে না করে?

কেন, আমি! বিজন খোশমেজাজে হাসল—শাড়িটা কেমন রে?

খু–ব সুন্দর রং।

আমি তো শাড়ি-টাড়ির কিছু বুঝি না—মজুমদার পছন্দ করে দিয়েছে।

সে আবার কে?

আমার কাছে আসে মাঝে-মাঝে-সেই লম্বামতো—

স্বাতী কিছু বলল না।

মজুমদার বলল তোকে খুব মানাবে রঙটায়।

সে কী! আমাকে দেখল কবে?

কেন, তুই কি অসূর্য-অসূর্য —ঐ হল আরকি—তুই কি তা-ই?

স্বাতীর ভাল লাগল না কথাটা। মজুমদারকে চিনল মনে-মনে—আগে কখনো দ্যাখেনি ওরকম পালিশ-করা জুতো। এসব বাজে লোকদের ডাকিস কেন বাড়িতে? বাবাও পছন্দ করেন না, জানিস?—কথাটা উঠে এল ঠোঁটে, কিন্তু বলতে গিয়ে থেমে গেল। থাক, শখ করে এই একটা জিনিস আনল-এক্ষুনি আবার—এখন থাক আর একদিন কথা উঠলে ছাড়বে না! কুড়ি টাকায় স্বাতী দুখানা কাচি ধুতি কিনে আনল বাবার জন্য। কিছু বাঁচল—তা দিয়ে আরকিছু ভেবে না পেয়ে নতুন রবীন্দ্র রচনাবলী কিনল পাড়ার দোকানে। বিকেলে শাড়ি, ধুতি, বই একসঙ্গে বাবার সামনে রাখল।

দ্যাখো, বাবা! তারপর বাবা কিছু বলবার আগেই ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল—ধুতি দুটো তুমি পরবে কিন্তু!

মস্ত বহর—হোঁচট খাব রে।

আগেই জানি তুমি এ-কথা বলবে। কিন্তু কী করবে, ছেলে যখন দিয়েছে পরতেই হবে। বইটা বুঝি সত্যেনের জন্য? এ-প্রশ্নটা স্বাতীর একেবারেই ধারণার বাইরে। যেন ধাক্কা খেয়ে বলে উঠল–কেন?

তা-ই উচিত না?

হ্যাঁ—? কপালে-পড়া এক গোছা চুল আঙুলে জড়াতে-জড়াতে স্বাতী বলল—এ-বই কিনতে এখনো ওঁর বাকি আছে কিনা!

তাতে তোমার কিছু না, তোমার ভাগ তুমি দেবে। সে-তো কত বই দিয়েছে তোমাকে। পাশটাশ করলে, এখন–

আ-হা? যেন আরো কিছু বলতে গিয়ে স্বাতী হঠাৎ থেমে গেল। রাজেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন— সত্যেন আছে কেমন? অনেকদিন দেখা হয় না আমার সঙ্গে।

আমার সঙ্গেই যেন হয়!

আসে না মাঝে-মাঝে?

ক-ই! হাসির মত সুরে স্বাতী বলল—পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর দু-দিন এসেছিলেন—না, তিন দিন।

এবার ওকে একদিন খেতে-টেতে বল।

ঐ তুমি এক জানো, বাবা! কেবল খাওয়া! ওঁর অত সময় নেই নেমন্তন্ন খাবার—ভালও বাসেন ও-সব।

শ্বেতার খাওয়ার দিন তো মনে হল না। তুই এখন শেখ এসব, লোককে খাওয়ানো, যত্ন-টত্ন করা—

আমি ওসব পারি না।

পারবি, পারবি! রাজেনবাবুর চোখের স্নেহ মেয়েকে স্পর্শ করল।

বড়দিও বলেছিলেন ঠিক এই কথাই। পারব, আমিও পারব? বড়দির মতে, মার মতো?… মার কথা যেন আস্তে-আস্তে আবছা হয়ে আসছে মনে, বাবারও তা-ই? বাবা কখনও বলেন না মার কথা, কিন্তু সেই না-বলাই সবচেয়ে বেশি বলা নয় তো? এটাই কি সত্যি যে মার কথা বাবা কখনো বলেন না, না কি যে-কথাই বলেন সে-কথাই মার কথা? ওকে একদিন খেতে-টেতে বল–মা থাকলে এ-কথা বলতেও তো হত না। ছেলেবেলার ছবি ফিরে এল মনে। কত দিকের কত আত্মীয়, বাবার কত বন্ধুরা সস্ত্রীক, কত রান্না-খাওয়া-হাসি-গল্প-আনন্দবড়দি বইয়েছিল ঠিক সেই ছেলেবেলার হাওয়া। বড়দি চলে গেল, বাবা আবার যে একা সেই একা। মা মরবার পরে লোকজনের আসা-যাওয়া অনেক কমে গেছে বাড়িতে। এখন দেখে মনে হয় বাবার আত্মীয় নেই, বন্ধু নেই, কেউ নেই। তিনি সকালে উঠে বাজার করবেন, আপিশ করবেন সারাদিন, তারপর সন্ধ্যেবেলায় হয় কিছু কিনতে-টিনতে ছুটবেন আবার, নয়তো বসে থাকবেন আলো নিবিয়ে চুপ করে–এ ছাড়া আর কিছু নেই তার জীবনে।—কেন, আমি আছি…আমি? প্রশ্নের তীক্ষ্ম চিহ্নটা বুকে বিঁধল স্বাতীর, যেন দম নিতে পারল না মুহূর্তের জন্য। এই সেদিন পর্যন্ত ছোড়দিও তো ছিল। আর এখন? বড়দি চলে যাবার পর কদিন এসেছে ছোড়দি?

স্বাতী উঠে এল বাবার কাছ থেকে। হঠাৎ তার মনে হল যে বাবা তার সমস্ত ইচ্ছার অফুরন্ত পূরণ করে চলেন, সে তো বাবার ইচ্ছেমতো কিছুই করে না। বাবার ইচ্ছা সত্যেন রায়ের খোঁজ-খবর নেন মাঝে মাঝে। মা থাকলে সবই হত—কিন্তু মা থাকলে যা হন্তু এখন কি তা কিছুতেই হবে?… তা আমিও তো ওঁকে আসতে বলি না, এলেও বেশিক্ষণ বসতে বলি না। বাঃ, আমি কেন বলব—আমি ছাড়া আর বলবেই বা কে—আমার চেনাতেই তো বাবা ওঁকে চেনেন, বাবার তো উনি কিছু না। সত্যি-তো, আমাকে উনি যেরকম—যেরকম—মানে, আমার সঙ্গে ভদ্রতা যেরকম করেন, আমি তো তার তুলনায়—যাঃ, ওরকম হিসেব করে কেউ বুঝি কিছু করে? স্বাতী চুপ করে বসে ভাবল একটু। মনে হল, এখনই একবার যায় সত্যেন রায়ের কাছে, ঐ রচনাবলীটা দিয়ে আসে। কথাটা মনে হতেই একটু সুখের ছলছলানি বয়ে গেল তার বুকের মধ্যে। দিতে যত ভাল লাগে নিতে কি তত?…কিন্তু রাত হয়ে গেছে—রাত কোথায়, ভাল করে তো সন্ধেও হয়নি এখন গিয়ে হয়তো পাবে না, কি হয়তো দেখবে আড্ডা দিচ্ছেন বন্ধুদের নিয়ে। কিন্তু যদি থাকেন, যদি ধর, একলাই বসে থাকেন ঘরের মধ্যে? আবার খোঁচা লাগল প্রশ্নের। এত প্রশ্ন কখনো ছিল না স্বাতীর মনে, এত কাটা ছিল না মনে-মনে ভাবায়। অবাধ ছিল সে। কে কেড়ে নিল তার স্বাধীনতা! সহজ ছিল, কে তাকে নিয়ে এল এই আঁকাবাঁকায়। এপ্রিলের রেশমি-সন্ধ্যা মখমলের রাত হল আস্তে আস্তে। আর স্বাতীর মনও সেই অনুপাতেই ভারি হয়ে উঠল।

*****

এর দু-এক দিন পরে সত্যেন রায়ই এলেন। স্বাতী ঘরে এসে দাঁড়াতেই বললেন—কেমন আছ, স্বাতী? এর মধ্যে যে কদিনই দেখা হয়েছে, প্রথম কথাই এই কেমন আছ, স্বাতী? আর স্বাতীও ঠিক-ঠিক জবাব দিয়েছে—ভাল আছি। কিন্তু আজ আর না বলে পারল না—রোজই এ কথা জিজ্ঞেস করেন কেন? রোজ?

রোজ দেখা হয় নাকি তোমার সঙ্গে?

স্বাতী জবাব দিল—আপনার ইচ্ছে!

তাছাড়া, এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে স্বাতীর কথাটাকে টপকে পার হলেন সত্যেন রায়—

আমি সত্যি জানতে চাই তুমি কেমন আছ?

তা বুঝি এক কথায় বলা যায়?

অনেক কথাতেই বলল।

অত কথা শোনবার সময় হবে না আপনার।

এতই কথা?

স্বাতী জবাব দিল না। শুনি না!

স্বাতী একটু পরে বলল—এবার যাচ্ছেন না কোথাও ছুটিতে?

যাচ্ছি।

যাচ্ছেন! বলেই লজ্জা পেল স্বাতী কেননা তার নিজের কানেই ধরা পড়ল যে সে উল্টো উত্তরটা আশা করেছিল।

কেন, যেতে নেই? একটু-যেন ঠাট্টার সুর সত্যেন রায়ের কথায়। যেন ছুটিতে বাইরে যাওয়ার পরামর্শ চাচ্ছেন স্বাতীর কাছে। আর স্বাতী যদি না বলে তাহলেই তিনি আর নড়েন না। মনে-মনে স্বাতীর কেমন মাথা নিচু হল, গলা বুজে এল, কিন্তু সেই সঙ্গে তার আঠারো বছর তাকে ঠেলে এগিয়ে দিল সাহসের সীমান্তে। যেন ঠাট্টার উত্তরে ঠাট্টা করেই বলে ফেলল— ছুটি হলেই বাইরে বুঝি যেতেই হবে?

যেতে হবে না এমন কোনো কারণ কি আমার আছে? সত্যেন রায়ও প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করলেন, কিন্তু প্রশ্নটা স্বাতীকে নিশ্চয়ই নয়, যেন নিজেকেই, যেন জানালার পরদা-ফাঁকে দেখা চিলতে-রোদটুকুর কাছে জেনে নিচ্ছেন নিজের অদৃষ্ট। তক্ষুনি চোখ সরে এল, চোখ পড়ল স্বাতীর চোখে, যেন একটা দম-আটকানো মিনিটকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে খুব ভালমানুষের মতো বললেন—তুমিও তো কোথাও ঘুরে এলে পার একবার।

আমি আর কোথায় যাব, স্বাতীও স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল।

কেন, তোমার বড়দির কাছে সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিলেন সত্যেন রায়।

বড়দি আপনাকে একবার যেতে বলেছিলেন।

তোমাকে বলেননি?

আমাকেই তো বলে গিয়েছেন আপনাকে বলতে।

তোমাকে যেতে বলেননি?

আমাকে আবার আলাদা করে বলতে হবে নাকি? স্বাতী হাসল।

তাহলে—

বাবার তো ছুটি নেই, তাই—

নিতে পারেন না ছুটি?

কী জানি!

তোমার বড়দি তো আসতে পারেন আবার?

তারও আসা কি সোজা! আপনার মতো স্বাধীন তো নয় সবাই।

স্বাধীন মানে?

স্বাধীন মানে স্বাধীন।

স্বাধীন হওয়া খুব ভাল বুঝি? মনে-মনে নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করে সত্যেন বলল। আমি কী করে বলব! সত্যেন রায় আবার তাকালেন জানলা-ফাঁকের চিলতে-রোদের দিকে, আর সেদিকে চোখ রেখেই উঠে পড়লেন। খাপছাড়া লাগল, বড়ো হঠাৎ মনে হল উঠেপড়াটা। যাচ্ছেন? এখনই যাবেন? একটু বসুন না?—কোনটা বললে ভাল হয়, কী রকম করে বলল ভাল শোনায়, না কিছু না বলাই ভাল—এই দুর্ভাবনার হাত থেকে স্বাতীকে উদ্ধার করলেন আপিশ-ফেরৎ রাজেনবাবু ভারি পায়ে ঘরে ঢুকে। সত্যেনকে দেখে তার ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটল–এই যে, কতক্ষণ? স্বাতী বলল—উনি এইমাত্রই এলেন, এইমাত্রই চলে যাচ্ছেন।

কেন? একটু বোসো–আমি আসছি।

একটু বসছেন তাহলে? বাবা ভিতরে যাবার পর স্বাতী বলল। এত সহজে রাজি হওয়াটা ভাল লাগল না তার। একটু পরে আবার বলল—আজ আপনার তেমন তাড়া নেই মনে হচ্ছে? কীসের তাড়া?

বলুন তো কীসের?

আমি কি তাড়াহুড়ো করি সব সময়?

সব সময়ের কথা জানি না।

তবে?

আমি যতটুকু দেখি, তা-ই তো দেখি।…যা-ই হোক, অন্তত বাবার কথাটা যে রাখলেন— কথা রাখতে খুব ভাল লাগে আমার।

সকলের কথাই?

কারো-কারো কথা।

কার-কার?

তোমার বাবার কথা তো নিশ্চয়ই। স্বাতী একটু চুপ করে থাকল; তারপর বলল—তাহলে মুখের কথাই আপনার কাছে কথা?

ঠিক মুখের কথাই নয়।

কিন্তু মুখ ফুটে না-বললেও তো হয় না।

সেটাই তো ভাল।

সেটাই সাধারণ।

তুমি বুঝি সাধারণ ভালবাস না?

আপনি কি বাসেন?

সাধারণ হতে বেশ ভাল লাগে।–স্বাতী আবার একটু ভাবল–আমার মনে হয়–। একটু অপেক্ষা করে সত্যেন রায় বললেন–কী মনে হয় তোমার? স্বাতী অন্য দিকে তাকিয়ে বলল–আমি চা নিয়ে আসি, বাবা?

ধুতি-গেঞ্জি পরা রাজেনবাবুকে দেখে সত্যেনের মুখের ভাবটা যেন সহজ হল, যেন আরো আরাম করে বসল চেয়ারে। রাজেনবাবু বললেন–কেমন আছ? ভাল? সত্যেন জবাব দিল মৃদু হেসে।

কোনো…কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো?

অসুবিধে? কেন? খোঁজখবর নিতে পারিনি অনেকদিন। তা—ভাল আছ বেশ?

ভাল আছি। দুজন দূর-বয়সী লাজুক মানুষের কথাবার্তা এখানেই ঠেকে গেল। এর পরে দুজনে বসে রইল দুদিকে তাকিয়ে, যতক্ষণ না চা এল, আর চা শেষ করেই রাজেনবাবু পালালেন। প্রায় সন্ধ্যে ততক্ষণে, কিন্তু রাত নামতে দেরি তখনো, বৈশাখের সবচেয়ে সুখের সময়টি শহর ভরে ছড়িয়ে পড়ছে।

সত্যেন রায় বললেন—বল, স্বাতী, কী মনে হয় তোমার? চায়ের বাসনগুলি ট্রের উপর সাজিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল স্বাতী। তার পিছনের নীল রঙের পরদায় আর ঘরের আবছা আলোয় তাকে অসাধারণ ফর্সা লাগল সত্যেনের চোখে। অনেকটা লম্বাও, আর বয়সের চেয়ে বড়ো।

কী, বলো।

কী?

কী মনে হয় তোমার, বল।

কী আবার মনে হয়।

কী বলতে-বলতে থেমে গেলে তখন—

নাকি?

স্বাতী দেখল, সত্যেন রায় মুখে হাত বুলোলেন একবার। রুমাল বের করলেন পকেট থেকে, কিন্তু রুমালের কোনো ব্যবহার না করে আবার ফিরিয়ে রাখলেন। তারপর আস্তে আস্তে উঠলেন, দু-পা কাছে এসে আস্তে বললেন—স্বাতী, চলি। স্বাতী সঙ্গে-সঙ্গে এল দরজা পর্যন্ত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সত্যেন রায় সিঁড়ি তিনটে নামলেন, ছোট্টো জমিটুকু আস্তে পার হলেন, ঘুরে দাঁড়িয়ে নিচু ফটকটায় হুড়কো লাগালেন, তারপর হাঁটতে লাগলেন তাড়াতাড়ি, মিলিয়ে গেলেন মোড় নিয়ে। আর সেই সন্ধ্যার ছায়া আনন্দ হয়ে নামল স্বাতীর মনে। বৈশাখের সমস্ত হাওয়া আনন্দ হয়ে তার বুকের মধ্যে বয়ে গেল।

******

চিঠি এল কদিন পরে সিলেট থেকে। ছোট্টো চিঠি–উঠেছি এক বন্ধুর বাড়িতে…সুন্দর শহর… কিন্তু এ শুধু খিদে-জাগানো শুক্তো, ভোজ আরম্ভ হবে যখন রওনা হব শিলং।–পড়তে পড়তেই জবাব জন্মাল মনে, কিন্তু লিখবে কী করে, চিঠি আর চিঠির খাম উল্টে পাল্টে ঠিকানা মিলল না কোথাও। ফোশ করে উঠলো রাগ, কিন্তু তক্ষুনি তাকে পোষ মানাল—রাগ কার উপর? মানে, রাগ জানাতে না পারলে রাগ করে লাভ? আবার যখন চিঠি এল তিন দিন পরে, খাম দেখেই স্বাতী বলল—না, লিখব না। কিন্তু মুখ গম্ভীর করে, এমনকি খামটা দুতিন মিনিট না খুলে ফেলে রেখেও, নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারল না যে চিঠি না পেলেও ক্রমাগত লিখতেই থাকবেন সত্যেন রায়। আর খাম খুলে পড়বার আগেই শুধু কোঁকড়া কালো হাতের লেখায় ভরা চওড়া কাগজটা চোখে দেখেই তার এত ভাল লাগল যে প্রথম বারে সব কথা পড়াই হল না। শুধু এটুকু বুঝল যে শিলং পৌঁছেছেন, আর সিলেট থেকে শিলঙের রাস্তায় দৃশ্য দেখতে-দেখতে দম বন্ধ হয়।…চিঠি রেখে দিয়ে ঘুরিয়ে পরে নিল শাড়ি, খামকা খানিকটা ঘুরে এল বাইরে। রাস্তায় দেখা কলেজ-বন্ধু চিত্রার সঙ্গে, তত বোকা আর লাগল না—বেশ ভালই তোর ফিরে এসে আবার পড়ল, বিকেলে আরো একবার, আর যতক্ষণ পড়ল না, ততক্ষণ চিঠির কথাই ভাবল, আবার যখনই নিজের কাছে তা ধরা পড়ল তখনই ধমক দিল নিজেকে। অন্য-কোনো ভাবনাকে ধাওয়া করল-বড়দি, হারীতদা, কদিন পরে বি এ ক্লাসে ভরতি হওয়া কিন্তু মন পেছিয়ে পড়ল একটু পরেই, ফিরে এল ঠিক সেখানেই আর তারপর যেন হাসি পেল এই খেলায়, মেনে নিল মনের বায়না। যেমন প্রথমে বিরক্ত হলেও খানিক পরে আমাদের ভালই লাগে দুষ্ট কোনো মিষ্টি ছেলের আবদার।…রাত জেগে জেগে জবাব লিখল, আবার চিঠি, আবার জবাব। লম্বা জ্বলজ্বলে গ্রীষ্মের গুনগুন-দিনগুলির অনেকখানি ভরে গেল চিঠি পাওয়ায় আর চিঠি লেখায় আর চিঠি ভাবায়।

সে দিন দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। জেগে উঠে দ্যাখে ঘড়িতে চারটে; তবু দুপুর, আস্ত দুপুর, মস্ত দিন রাজার মতো জুড়ে আছে, উজাড় করে দিয়েও ফুরোয় না। একা বাড়িতে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরল একটু, জানলা-বন্ধ বসবার ঘরটায় তাত যেন হাতে ছোঁয়া যায়—স্বাতী পাখা, খুলতে গিয়ে সরে এল, খুলে দিল সামনের দরজা, সঙ্গে-সঙ্গে হৈ-হৈ হাওয়া পরা উড়িয়ে ঝলসে দিল চোখ-মুখভাল লাগল, ভাল লাগল আঁ-আঁ রোদ, ঝাপসা ধুলো, কাকরের চরকি, ভাজা-ভাজা সিঁড়ির আগুন-গরমে পা কুঁকড়ে গেল, তবু চেপে ধরল ইচ্ছে করে, জোর করে পা থেকে মেরুদণ্ডে, মেরুদণ্ড থেকে মগজে তাপের পিন ফুটল ঝিমঝিম—সেটাও ভাল লাগল। বাইরের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে পা সরাল, ফিরল ঘরের দিকে, ফিরতেই চোখ ঠেকল বি-জন কোম্পানির চিঠি-বাক্সটায়, চোখে পড়ল কাচের খোপে চিঠি, বোদ-রঙের সাদা একটি খাম স্বাতীর নাম দেখিয়ে শুয়ে আছে নিশ্চিন্তে। দাদার আজকাল নতুন এক ফ্যাশন হয়েছে, চিঠি-বাক্সে তালা, সুটকেসে তালা, এমনকি বেরিয়ে যায় ঘরে তালা দিয়ে চাবি পকেটে নিয়ে।…উপায়? কিছু উপায় নেই, চুপ করে বসে থাকতে হবে যতক্ষণ না দাদা দয়া করে বাড়ি ফেরে, হোক সন্ধ্যেবেলায় কি রাত দুপুরে, কি কাল সকালে। সাদার উপর কালোতে আঁকা খামটিকে অনেকক্ষণ ধরে দেখল স্বাতী। একবার এদিক থেকে, একবার ওদিক থেকে–কিন্তু মিছিমিছি রোদে পুড়ে কী হবে, চিঠি কি পাখি যে উড়ে আসবে, আর পাখি হলেও কি ঐ খাঁচা থেকে বেরোতে পারতো?…ঘরে এসে জানালাগুলি খুলে দিল, বসল চুপ করে, বসেবসে শুনল দূরে রাস্তায় জল-দেবার শব্দ, দূর থেকে আস্তে-আস্তে কাছে আর তারপর—কতক্ষণ পর সে ঠিক বুঝল না-দাদাকে ঘরে ঢুকতে দেখে, সব দিনের চাইতে অনেক আগে বাড়ি ফিরতে দেখে, সে একটুও অবাক হল না। বরং তার মনে হল, সে-ই দাদাকে ধরে এনেছে তার ইচ্ছার অসীম লম্বা দড়ি দিয়ে টেনে।

কী রে? উশকো-খুশকো হয়ে বসে আছিস এখানে?

স্বাতী বলল—চিঠির বাক্সের চাবিটা দে। বিজন চাবি দিল না, বাক্স খুলে চিঠি নিয়ে এল। স্বাতীর হাতে দেবার আগে একটু তাকিয়ে বলল—কে লিখেছে রে? যেন প্রশ্ন করার কারণ দেখিয়ে আবার বলল—বেশ ভারি। চিঠি হাতে নিয়ে স্বাতী বলল—সত্যেন রায় লিখেছেন। ও! তোর সেই বাচ্চা-প্রোফেসর! চাকরি গেছে বুঝি?

মানে?

তবে-যে কলকাতার বাইরে।

গ্রীষ্মের ছুটি না এখন? শিলং গেছেন বেড়াতে–স্বাতীকে বোঝাতে হল।

ও, ছুটি! বিজন ঠোঁট বাঁকাল। ওসব ছুটি-ফুটির কথা মনেই থাকে না আমাদের! তা এই কলেজের মাস্টাররা আছে মন্দ না—মাইনেতে ছক্কা হলেও ছুটিতে টেক্কা। যদিও এত ছুটি কী করে কাটায় আমি সত্যি-বলতে ভাবতেই পারি না।

কী করেই বা পারবি-দাদাকে যেন সান্ত্বনা দিয়ে স্বাতী চলে এল তার ঘরে। খানিক পরে বিজনও এল—হল চিঠি পড়া? বোনের সঙ্গে আলাপ জুড়ল ঠোঁটে একটু হাসি টেনে। চিঠিটা খামে ভরে রেখে স্বাতী বলল-বাড়ির চিঠিও তোর কোম্পানির বাক্সে দিয়ে যায়—চাবিটা আমার কাছে রাখিস। পিয়নকে বলে দিলেই হয়।

তা বলে দেব, তবু চাবিটা আমার কাছেই থাকা ভাল— স্বাতী চোখ তুলল দাদার দিকে। বিজন পাতলুনের পকেট থেকে চাবির রিং বের করল, উঁচু করে চোখের সামনে ধরে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখল একটু, দু-আঙুলে টিপে টিপে একটা ছোট্টো চাবি খুলে নিয়ে—ড়ুপ্লিকেটটা রাখ তবে বলে এমনভাবে স্বাতীর হাতে দিল যেন বোনের মন যোগাতে গিয়ে নিজের একটি মহামূল্য সম্পত্তি হাতছাড়া করল। তারপর, এদিক-ওদিক তাকিয়ে, যেন বেছে বেছে ভেবেচিন্তেই বসল কুশন-আঁটা বেতের চেয়ারটিতে। পিঠ এলিয়ে, সিগারেট ধরিয়ে, আয়েসি ধরনে বলল–মজুমদারকে একদিন চা-এ বলব ভাবছি। স্বাতী কথা বললো না। সিগারেটের মাথার ছোট্টো ছাইটুকুতে চোখ রেখে বিজন আবার বলল—বিজনেসে যদি দাঁড়িয়ে যাই তো মজুমদারেরই জন্য। ওকে মাঝে-মাঝে খাওয়ানো-টাওয়ানো উচিত।

বেশ তো। হোটেলে নেমন্তন্ন কর।

হোটেলে? ওঃ, হোটেল পচে গেছে! আর তাছাড়া–বিজন একটু থামল, যেন ভাবল—তাছাড়া বাড়িতে বললে খুশি হয়।

কে খুশি হয়?

কে আবার! আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছিস না তুই?

তা—বাবাকে বলিস, বাবা যদি মত করেন—

হোঃ! এর জন্য আবার বাবাকে বলতে হবে?

উচিত তে।

উচিত কেন? আমার একজন বন্ধুকে খাওয়াতে পারি না ইচ্ছে করলে?

বন্ধু! স্বাতী হেসে ফেলল।

হাসলি যে?

ঐ চল্লিশ বছরের ঢেঁকিটা তোর বন্ধু!

চল্লিশ? এবার হাসল বিজন।–চল্লিশ কী রে, এই… তিরিশ-বত্রিশ হবে। চমৎকার মানুষ, আর পয়সাও করেছে খুব।

সেজন্যই চমৎকার?

তা যা-ই বলিস, বিজন কবুল করল পয়সা করতে হলে মাথা চাই, আঠা চাই কাজে। কিছু ছিল না মজুমদারের, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়িয়েছে। এক্কেবারে সেলফ-মেইড ম্যান! বিয়ে করেনি, বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক নেই, দিনরাত কাজ, কাজ, আর কাজ! বন্ধুগৌরবে প্রদীপ্ত হল বিজন।

বাঃ! তাহলে ইনিই তোর আদর্শ পুরুষ এখন?

মন্দ আদর্শটা?

তুই-ই জানিস।

আমার জন্য কেন-যে মজুমদার এত করে তা ভেবেই পাই না—বিজন যেন আপনমনেই কথাটা বলল। ওর কাছে কত লোক এসে ধন্না দেয় রোজ, কিন্তু আমাকে বলতেও হয়নি কিছু, শুধু দেখেই—

দেখেই তোক চিনেছে–দাদার কথা শেষ করল স্বাতী।

তা-ই বোধহয়—বিজন আড়মোড়া ভেঙে উদাসভাবে উঠে দাঁড়াল। বোনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল—তুই এত শ্যাবি থাকিস কেন রে?

আজ বড্ডো ইংরিজি বলছিস, দাদা!

এ আর কী, যা ইংরিজি বলে বিজনেস সার্কল-এ–Blast your bile! Oh my left foot! শুনেছিস কখনো? ঘরে বসে-বসে বই গিললে কী আর…তা এরকম বিচ্ছিরি থাকিস কেন বল তো? ভাল শাড়ি-টাড়ি নেই?

ও মা! স্বাতী তার আঁচলের বাড়তি অংশটা দু-হাতে টান করে সামনে ধরল। এ শাড়িটা নাকি মন্দ! কী সুন্দর ধনেখালি শাড়ি। একটু ময়লা হয়েছে, তা একটু-ময়লাই তো পরে আরাম। রটন! যা সব বম্বে-প্রিন্ট উঠেছে আজকাল— আরো কী বলতে গিয়ে হঠাৎ যেন থেমে গেল বিজন। পাতলুনের পকেটে হাত দিয়ে চাবি আর খুচরোয় রিনঝিন আওয়াজ করে বলল–তাহলে শনিবার বলব মজুমদারকে–খাবার-টাবার কিছু তৈরী রাখিস।

আমি পারব না।

কেন? পারবি না কেন?

নে আবার কী—পারব না জেনে রাখ।

বিজন চোখ সরু করে একটু তাকিয়ে রইল বোনের দিকে। যেন মনস্থির করতে পারছে না, এরপর কী বলবে। তার চোখের চকচকানির দিকে তাকিয়ে স্বাতীর মনে লাফিয়ে উঠল বাবার কথাটা। ফশ করে বলে ফেলল তোর ব্যবসার দলবল বাড়িতে আনিস কেন?

ও, এই কথা! এতক্ষণের চেপে-রাখা রাগ এবার ফেটে পড়ল। —এই কথা!

বাবা পছন্দ করেন না, জানিস? ও-সব বাজে লোক—

বাজে! বিজন এক লাফে এগিয়ে এল কাছে। স্বাতীর মুখের সামনে হাতের মুঠি নেড়ে নেড়ে বলতে লাগল—এত আস্পর্ধা তোর! এত অসভ্য হয়েছিস তুই! তা বাপ যে রকম, মেয়ে তো সেইরকমই হবে–!

ছেলে সেরকম হলে তো বাঁচা যেত— বিজনের তোড়ের মধ্যেই বলে উঠল স্বাতী।

হ্যাঁ, পুরুষরা সব ভেড়া বনলে তোদের খুব সুবিধে, না?

যত খুশি তুই চ্যাঁচাতে পারিস, কিন্তু তোর ও-সব আড্ডা চলবে না বাড়িতে।

চলবে না? কার কথায় চলবে না, শুনি?

যার বাড়ি তার কথায়।

বাড়ি কি তোমার?

তোমারও নয়।

নিশ্চয়ই আমার।

ঈশ!

শোন, স্বাতী, তোর সঙ্গে আর তর্ক করব না, শুনে রাখ এ বাড়ি আমার। এখানে আমি যা ইচ্ছে তাই করব, পছন্দ না হয় আমাকে বলুক না এসে রাজেন মিত্তির, তোর কাছে গুজগুজ করে কেন?

করে এইজন্য যে তুই একটা ষাঁড়, আর তোর সঙ্গে কোনও ভদ্রলোক কথা বলতে পারে না।

ভদ্রমহিলা তো খুব পারে!

পারতেই হয়। আমি যদি বাবার দিকে না দেখি, তাহলে তুই তো বাড়ি থেকে তাড়াবি বাবাকে! চুপ! বিজন সত্যিই ষাড়ের মতো চাচাল এবার আর একটা কথা বলবি তো তোকে তাড়াব বাড়ি থেকে—এই এমনি করে—ঘাড়ে ধরে। হাতের আঙুলগুলিকে সাপের ফনার মতো ছড়িয়ে স্বাতীর ঘাড়ের কাছে নিয়ে এল—এমনি করে, বুঝলি? ঘাড় ধরে রাস্তায় বের করে দেব–হাঁ করে তাকিয়ে দেখবে রাজেন মিত্তির। আমার বন্ধুদের নিয়ে এত তার জ্বলুনি, আর হতদন্ত হয়ে পঞ্চাশবার নেমন্তন্ন করতে ছোটেন তোর ঐ মিনমিনে মেয়েলি মিরকুট্টে সত্যেন রায়কে! ছাইয়ের মতো হল স্বাতীর মুখ, তারপর গনগনে কয়লার উনুনের মতো হল। কথা বলতে গিয়ে বেধে গেল গলায়, বড়ো-বড়ো চোখে তাকিয়ে দেখল, দাদার মুখটা বদরাগি বেড়ালের মতো হয়ে গেছে, আর…একটু পরে বিজন যখন আবার কথা বলল, তখন তার গলার আওয়াজটাও শোনাল ফ্যাশফেশে, ঘেঁড়া-ছেড়া, বেড়াল-মতোবাবা একটা হাবা, কিন্তু আমি তোমার অসভ্যতা ঢিট করে ছাড়ব! বিজনের লিকলিকে আঙুলটা স্বাতীর নাকের একেবারে কাছে এসে কেঁপে কেঁপে সরে গেল, স্বাতীও পিছনে সরল একটু, আরো একটু, কিন্তু চোখ সরাল না দাদার মুখ থেকে। আর বিজন দাতে দাত ঘষে বলতে লাগল—টিট করে ছাড়ব! শুধু তোকে না—ঐ পুঁচকে প্রোফেসরটাকেও। চিঠি লেখার আর লোক পান না! রাস্কেল! আসুক এবার, মেরে তাড়াব এই পাড়া থেকে। সরতে সরতে স্বাতী দাঁড়িয়েছিল তার পড়ার টেবিলে ঠেশ দিয়ে। চোখের কোণ দুটি লাল, চোখের তলায় একটি শিরা উঁচু, একটু খোলা ঠোঁটে আর একটু-ফোলা নাকে নিশ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। বিজনের কথা শেষ হবার পরেও চুপ করেই থাকল, কিন্তু বিজন আবার যেই মুখ খুলল আরো কিছু বলবে বলে, তক্ষুনি লম্বা সাদা হাতে ছুঁড়ে মারল ঠিক তার মুখের উপর শক্ত একটা মোটা বই। শব্দ হল বেশ জোরেই, আর বইটা যখন পাতা-খোলা কাৎ হয়ে মেঝের উপর পড়ে গেল, তখন স্বাতী বলল–বেরো! বিজন ডান হাতটি একবার গোল করে ঘুরিয়ে আনুল মুখের উপর, চুল উল্টিয়ে দিল বাঁ হাতে। বইটার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে জুতো-পরা পায়ের এক লাথিতে পাঠিয়ে দিল একেবারে ঘরের বাইরে। তারপর বুক টান করে উঁচু মাথায় বেরিয়ে গেল নিজে। যাবার সময় বলে গেল— তোরও একদিন ঐ-দশা হবে।

Share This