২.০২ শাশ্বতী কাঁদছিল না

শাশ্বতী কাঁদছিল না। সোনার দিনটির পরে কালো হয়ে আসা সন্ধ্যাটার কথা ভাবছিল শুধু। এখন গিয়ে ড্রয়িংরুম আলো করতে হবে, হাই চেপে-চেপে হাসতে হবে। আর ভয়ে-ভয়ে থাকতে হবে, পাছে ভুল জায়গায় হেসে ফেলে। যিনি আসছেন, ইকনমিক্সে তার মতো পরিষ্কার মাথা দেশে আর দ্বিতীয় নেই—মানে, হারীতের তা-ই মত। বন্ধুদের প্রশংসায় সর্বদাই পঞ্চমুখ সে। আর সত্যিও, কত খবর রাখে তারা, কত জানে, কত পড়ে, আর কী-কথাটাই বলতে পারে এক-এক জন! সেসব কথা কিছুই বোঝে না শাশ্বতী। এমনকি তাদের ঠাট্টা-তামাশায় পর্যন্ত তারা নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া অন্য কারো হাসি পায় না। আরো মুশকি এই যে দলে কয়েকজন অবাঙালিও আছে। তারা কেউ এলে কথাবার্তা ইংরেজিতেই চলে, আর শাশ্বতী যদিও সসম্মানে বি.এ. পাশ, তবু ইংরেজিতে কথা বলতে খুবই অসুবিধে হয় তার। দুটো-চারটে বাঁধা বুলির পরেই হাঁপ ধরে। ভদ্রলোকেরা সস্ত্রীক এলেও একরকম, মেয়েদের আলাদা হয়ে গল্প করা নিয়ম হিসেবে নিষিদ্ধ হলেও নিশ্বাস তো ফেলা যায় মাঝে-মাঝে। কিন্তু কত দিন এমন হয় যে প্যান্ট-পরা-পরা পুরুষদের মধ্যে সে একটামাত্র মেয়ে। উঠে এলে স্বামীর মান যায়, আর বসে থাকতে তার নিজের প্রাণ। সে ইংরেজি বলতে পারে না, ফাসিস্ট রাক্ষসরা কোথায় কীকী মন্দ কাজ করেছে আর করছে, তার লিস্টিটা মুখস্তই হল না মোটে। তারই দোষ এ-সব, লজ্জা করে মনে-মনে, চেষ্টা করে প্রাণপণ, কিন্তু পরীক্ষার পড়া-তৈরির মতো এই পরিশ্রম ভাল লাগে নাকি বারো মাস? হারীত আবার আড্ডা ছাড়া টিকতে পারে না। হয় তাদের কেউ আসছে, নয় তারা কোথাও যাচ্ছে, প্রত্যেকটি সন্ধ্যা এ-রকম। এই দুবছরের মধ্যে, হোক বৃষ্টি, হোক অসুখ, এমন একটা সন্ধ্যা মনে করতে পারে না শাশ্বতী, যে সন্ধ্যা তারা দুজনে নিরিবিলি কাটিয়েছে। প্রথম-প্রথম অভিমান হত তার, রাগ হত, কষ্ট হত। সেসব পালা পার হয়ে এসে এতদিনে ইচ্ছেটাই মরে গেছে তার। এখন শুধু মনে হয় কেউ আসুক, অন্য কেউ, কোনো মেয়ে, এমন কোনো মেয়ে যার সঙ্গে আর-একজন মেয়ে মন খুলে দুটো কথা বলতে পারে। স্বাতীটার দৌড় তো এখনো নভেল পর্যন্তই, ওর বিয়ে হলে বেশ হয়। কিন্তু বিয়ের পরে আবার কী রকম হবে কে জানে! আজ বড়দির কাছে একটা জীবন পেয়েছিল সে। পরিষ্কার, নিষ্প্রাণ, বিমর্ষ সিঁড়ি দিয়ে তেতলার ছোট্টো ফ্ল্যাটে উঠতে-উঠতে দুবার তার নিশ্বাস পড়ল।

******

পরের দিন সকালে হারীত বলল—যাবে নাকি ও-বাড়িতে? শাশ্বতী উদাসভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।

কী-মুশকিল! কী-টাকে খ-র মতো উচ্চারণ করে বলে উঠল হারীত —আমিও তো কিছু আশা করতে পারি তোমার কাছে। আফট্রল, তুমি আমার স্ত্রী তো! নাও ওঠো।

তোমাকে যেতে হবে না। আমি একাই পারব।

তোমার বড়দি অবশ্য আমাকে যেতে বলেননি, কিন্তু…যাই একটু। শাশ্বতী অবাক হল হারীতকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরতে দেখে।

দিনের যে-কোনো সময়ে রোজই আসে শাশ্বতী, আর রাত দশটার আগে যে-কোনো সময়ে হারীত এসে তাকে নিয়ে যায়। বাড়ির দিন-রাত্রির চেহারা বদলে গেল। স্বাতীর মনে হল তার সুখের ছেলেবেলাই বুঝি ফিরে এল আবার। এমন কি দাদা পর্যন্ত অনেক বেশিক্ষণ বাড়ি থাকে। জামাইবাবুর সঙ্গে ঘন-ঘন গোপন পরামর্শ তার, এক-একবার কথা শেষ করেই বেরিয়ে গিয়ে সে নিয়ে আসে কোনো নাটকের কি সিনেমার এক গোছা টিকিট। দুই ট্যাক্সি বোঝাই হয়ে বাড়িসুদ্ধ হৈ-হৈ করে শ্যামবাজারে থিয়েটারে যাওয়া। কী কাণ্ড! আস্ত একটা রো ভরে ফেলেছে তারাই! আর সিনেমা? বাংলা আর হিন্দি তো বাকি রইল না একটাও। হারীতের অনারে একদিন মেট্রোতেও যাওয়া হল, আর তারপর অবশ্য কলকাতার তখন-তাজ্জবতম লাইটহাউসও বাদ গেল না। এরপর যেদিন আলগোছে আবার একটা নাটকের নাম করল বিজু, হারীত শুনে ফেলে চট করে বলল—বিজন, জামাইবাবুকে একবারে ফতুর না করে ছাড়বে না?

আহা এটুকুতেই—আর মুখ-চোখের ভঙ্গিতে মনের ভাব ব্যক্ত করল প্রমথেশ। এ-কদিন শুধু আমোদ-প্রমোদে যা খরচ করলেন—হারীত হিসেব করল—তাতে অনেকে এক মাস সংসার চালায়। অনেকে মানে সেই ভাগ্যবান শতকরা চার কি পাঁচজন, যাদের অত বেশি উপার্জন। তা..তা… আমতা আমতা করে প্রমথেশ হঠাৎ একটা যুক্তি খুঁজে পেলনাটক-সিনেমা যারা করে, তাদেরও তো সংসার চলা চাই।

সে-তো ঠিকই! হারীত বাঁকা ঠোঁটে হাসল–বড়োলোক তার সুখের জন্য প্রচুর বাজে খরচ করে বলেই না গরিবরা দু-বেলা দুমুঠো খেতে পায়!

সুখের জন্য হলে আর বাজে খরচ কেন? প্রমথেশের কথাটা শোনাল যেন মাস্টারমশাইয়ের কাছে সুবোধ ছাত্রের প্রশ্ন। টাকা তো সুখের জন্যই, না?

সুখ ভাল, কিন্তু তার চেয়েও ভাল একটু রাশ টেনে চলা। গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে হারীত বলল কথাটা, আর বলেই এক ঝলক তাকাল স্ত্রীর দিকে। কিন্তু শাশ্বতী বিজনের সঙ্গে বসে নিচু মুখে দেখছে পারিবারিক ফোটোগ্রাফের অ্যালবাম। কথাটা তার কানে পৌঁছল না। অন্তত পৌঁছল বলে বোঝা গেল না। একটু রাগ হল হারীতের, কেননা শাশ্বতী যেন ঠিক শিক্ষাটা নিতে পারছে নানা পলিটিক্সে, না ডমেস্টিক ইকনমিতে। এইতো সেদিন তার কাছে এই অদ্ভুত প্রস্তাব করেছিল যে ও-বাড়ির সবাইকে নিয়ে তারা যদি একদিন কোনো সিনেমা-টিনেমায়…। কথা অবশ্য শেষ করতে পারেনি, হারীত আদ্ধেকেই কেটে দিয়েছিল পাগল বলে, কিন্তু শাশ্বতী প্রশ্ন করতেও ছাড়েনি—পাগল কেন?

আমার কি অত টাকা আছে?

কত আর লাগে—তবু তর্ক করেছিল স্ত্রী—আর এত যাচ্ছি জামাইবাবুর সঙ্গে।

তাহলে আমি বলব না-যাওয়াই তোমার উচিত ছিল। নিজের অবস্থা তো জান।

কেন, অবস্থা এমন মন্দ কী আমাদের?

তোমার ইচ্ছেমতো চললেই মন্দ হবে। এর উত্তরে শাশ্বতীর আর কথা ফোটেনি। আহত হয়েছিল শাশ্বতী। কিন্তু উপায় কী? নিয়মটা ঠিক-ঠিক মেনে নিলেই এসব মনজুলুনি আর হয় না। মাইনের সিকি ভাগ নির্ভুল নিয়মে জমিয়ে যাচ্ছে হারীত। মাসের শেষে টানাটানি হলে দশটা টাকা বরং ধার করে, কিন্তু ব্যাঙ্কে হাত দেয় না। পাছে হঠাৎ খামকা কিছু খরচ হয়ে যায়, সে-ভয়ে চেকবইই আনে না বাড়িতে। প্রমথেশের খরচের হাত দেখে তার ভিরমি লাগবার দশা।

একটু রাশ টেনে…না? কথাটা যেন মনে লাগল প্রমথেশের।–আমিও তো ভাবি তা-ই, কিন্তু হয়ে ওঠে না হে। দ্যাখো তো ছেলেপুলে—এত বড়ো সংসার… দু

র্দিন আসছে, ঘোর দুর্দিন!–হারীতের মুখ-চোখের চেহারা এমন হল যে দেখে প্রায় ভয় করে—কেন? উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইল প্রমথেশ। কেন! জিজ্ঞেস করছেন কেন! উঃ, এমন মানুষও আছে এখনো। আর আছে বলেই তো দেশের এ দুর্দশা! সংক্ষেপে উত্তর দিল হারীত–যুদ্ধ।

যুদ্ধ তো কত হাজার মাইল দূরে, তাতে আমাদের কী? হারীত দাঁতে দাঁত চেপে বলল—সেটা আমার মুখে না-শুনে বোমার আওয়াজেই শুনবেন শিগগির।

অ্যাঁ!—প্রমথেশের চোখ কপালে উঠল। বোমা! অত দূর থেকে বোমা ফেলবে হিটলার! তা হবে—হিটু আমাদের সব পারে। কী-পিটুনিটাই পেটাচ্ছে আমাদের কর্তাদের-অ্যাঁ! খুশিতে প্রমথেশের পান-খাওয়া রঙ-ধরা দাঁত প্রত্যেকটি বেরিয়ে পড়ল। ফাসিস্ট! পুরো ফাসিস্ট। হারীত আঁৎকে লাফিয়ে উঠল চেয়ার ছেড়ে। কিন্তু প্রমথেশ কিছুই বুঝল না। হাসতে-হাসতেই আবার বলল—তা কথাটা তুমি ঠিক বলেছ হারীত। দিনকাল ভাল না।

আপনাদের কী! কী রকম একটা প্রতিহিংসার রঙে হারীতের মুখ লাল হয়ে উঠল—জমিদার মানুষ।

আর জমিদারি! প্রমথেশ নিশ্বাস ছাড়ল—ও এখন গেলেই বাঁচি। কিন্তু কথাটা কী, অভ্যেস ফেরানো তো সোজা না! আর আছে যদ্দিন, খরচ-টরচ করেই যাই। ভাল লাগে তাতে তো সন্দেহ নেই।

******

তাতে আর সন্দেহ কী! শুধু কি নাটক-সিনেমা, বাজার নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে রীতিমতো একটা প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিয়েছে প্রমথেশ। রাজেনবাবু বাঁধাকপি এনেছেন, প্রমথেশ আনল বড়বাজার থেকে এক ঝুড়ি ফুলকপি। এইটুকু-টুকু, টাকা-টাকা দাম। মুরগি আনলেন রাজেনবাবু, পরের দিনই প্রমথেশের আনা চাই হগসাহেবের বাজারের সব-সেরা মটন। সঙ্গে টাটকা সবুজ মটরশুটি আর আপেলের মতো বড়ো-বড়ো টুকটুকে লাল টম্যাটো। রাজেনবাবু কি ঢাকাই অমৃতি এনেছেন? তাহলে আর কথা কী—প্রমথেশ ছুটল শেয়ালদার কাছে কোন-এক খাশ-ঢাকাই ময়রার কাছে পাঁচ সের প্রাণহরার ফরমাশ নিয়ে। কিন্তু কালীপুজোর দিন একেবারে বাজি মাৎ করে দিল সে। যখন বেলা বারোটার সময় ঘামতে-ঘামতে হাঁপাতে-হাঁপাতে বাড়ি ফিরল, আর তার চাকর এনে রান্নাঘরের সামনে নামাল পায়ে-দড়ি-বাঁধা মস্ত একটা চিৎ-হওয়া কচুপ। দেখে স্বাতীর চক্ষুস্থির! ছুটে কাছে গিয়ে, কিন্তু বেশি কাছে না গিয়ে, বলল—ও মা! এটা কী? কচ্ছপ-ঘাড় মুছতে-মুছতে প্রমথেশ বলল।–কচ্ছপ দ্যাখোনি কোনোদিন?

কচ্ছপ! কেন? কী হবে?

কী হবে? প্রমথেশ হাসল একটু–খাব।

খাব! স্বাতী তাজ্জব বনল। –খাওনি বুঝি কোনোদিন? কী করেই বা খাবে! কলকাতায় সব পাওয়া যায়, কিন্তু এ-জিনিস না! মাঝে মাঝে কাছিম ওঠে তা-ই নিয়েই হুলুস্থুল। আরে কাছিমের মাংস তো বাতের ওষুধ, ও আবার মানুষে খায় নাকি! এ একেবারে আসল কচ্ছপ, কালীকচ্ছপ, আমরা বলি কাউঠা, নাম শোনেনি কলকাতার বাবুরা। মুরগি-মটন যা-ই বল, এরকম মাংস আর হয় না। কচ্ছপের বিবরণ শেষ করে এঞ্জিনের মতো হাঁপাতে লাগল মস্ত মোটা প্রমথেশ। পেলে কোথায়?—জিজ্ঞাসা করলেন রাজেনবাবু। বিজয়ীর হাসি খেলে গেল প্রমথেশের চোখে-মুখে—তা একটু চেষ্টা না করলে কি হয় এসব! আমার এক প্রজা আছে বৈঠকখানার বাজারে, তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার নবিনগরে। তাকে পাঠিয়ে…

অ্যাঁ! কুমিল্লায় তোক পাঠিয়েছ এ জন্য।

ভাল তো! তারও শ্বশুরবাড়ি বেড়ানো হল, আমাদেরও কলকাতায় বসে কার্তিক মাসের নবিনগরি কাউঠা খাওয়া…মন্দ কী!

পারও তুমি, প্রমথেশ! রাজেনবাবু মুখে হাত চেপে হাসতে লাগলেন। শ্বশুরের দিকে মিটিমিটি এক তাকিয়ে প্রমথেশ বলল—আমারও অনেকদিন খাওয়া হয় না, আর আপনিও ভালবাসেন।

বেশ… বেশ করেছ— কচ্ছপের পর্যবেক্ষণ শেষ করে শ্বেতা বলল এতক্ষণে। খুব ভাল… খুব ভাল তেল হবে। অনুকূল, মারতে পারবি তো রে? প্রমথেশের খাস-চাকর অনুকূল হাতে হাত ঘষে জবাব দিল-খুব পারব মা, ঠিক পারব, আপনি ভাববেন না।

ইশশশ! স্বাতী শব্দ করে উঠল—ওকে মেরে খাব আমরা! কী বিশ্রী!

আর সব মাছ-মাংস বুঝি না মেরেই খাও? প্রমথেশ হাসল। আহাশ্বেতা তাড়াতাড়ি বলল–তাই বলে চোখের উপর দেখতে-তো খারাপ লাগে! আর যা করে মারতে হয় এদের-কচ্ছপের সাদা-কালো অসহায় বুকটায় সস্নেহে একটু হাত বুলোলো শ্বেতা। অনুকূলের দিকে তাকিয়ে বলল—বাইরে থেকে মেরে আনবি, বুঝলি? হুকুম পেলে অনুকূল তক্ষুনি কাজে লেগে যায়। কিন্তু হারীতের আবার আপিস খুলে গেছে, তাই অপেক্ষা করতে হল পরের রবিবার পর্যন্ত। প্রমথেশ নিজে দাঁড়িয়ে কচ্ছপ-বধের তদারক করতে লাগল; আর শ্বেতা রান্না করল বেশ একটু সমারোহ করেই। কিন্তু খেতে বসে স্পেশাল নিমন্ত্রিতটি হাত গুটিয়ে নিল।

–খাও।

–না।

–আরে খাও, খাও! প্রমথেশ ওকালতি করল। কাছিম না–কচ্ছপ, কাউঠা। আসল কাউঠা। খেয়েই দ্যাখো।

নাও, খাও! বাটির গায়ে হারে উল্টো পিঠ ঠেকিয়ে তাপ অনুভব করল শ্বেতা। একটু ঠেলে দিয়ে বাটিটা ঠেকিয়ে দিল হারীতের থালায়।

আঃ, চমৎকার! কী তেল! কী ডিম! আর রান্নাও খুব ভাল হয়েছে। প্রমথেশ উচ্ছ্বসিত। একটু খেয়ে দেখলে পার, রাজেনবাবুর মৃদু মিনতি।

ঝকঝকে কাঁসার বাটিতে তেলে-ঝোলে টুকটুকে লাল পদার্থটার দিকে তাকিয়ে হারীত আবার সুদৃঢ় সুস্পষ্ট একটি না উচ্চারণ করল।

একটু, একটু মুখে দিয়ে দ্যাখো। যদি ভাল নালাগে আর খেয়োনা—একটু!শ্বেতা উপুড় হয়ে পড়ল পাতের উপর। পারলে আঙুল দিয়ে তুলে মুখে গুঁজে দেয়। দু-তিন মিনিট ধরে একটা লোকুলি চলল রীতিমতো। খেলে না তো কিছুতেই! শেতা ফেল হয়ে কেঁদে ফেলল প্রায়।

খুব তো তোমার মনের জোর হে! এত করে বললাম সবাই তার কাউঠার এই অভাবনীয় অবমাননায় একটু আঘাত লাগল প্রমথেশের মনে।

সবরকম জানোয়ার কি খাওয়া যায়? বাঁ হাতে প্লেট ধরে টম্যাটোর চাটনি একটুখানি ঢেলে নিল হারীত।

সে-তত ঠিকই। প্রমথেশ মাথা নেড়ে তক্ষুনি সায় দিল। আচ্ছা, বিলেতে নাকি ব্যাং-ট্যাং খায়? সত্যি?

সে আলাদা এক রকমের এডিবল ফ্রগ—উত্তর দিল বিলেত ফেরত।—এটাও তত বেশ এডিবল মনে হচ্ছে আমার। একটু মাংস, একটু ডিম আর খানিকটা চর্বি একসঙ্গে মুখে দিল প্রমথেশ। এ গাল থেকে ও গালে বদলি করে বলল—বুঝলে হারীত, মাংস আমি প্রায় কিছুই বাকি রাখিনি। শুধু ঐ ব্যাংটা চেখে দেখা হল না। এই একটা আপসোস রয়ে গেল হে। ভাল? তুমি খেয়েছ? সে-কথার জবাব না দিয়ে হারীত বলল–আপনার কিন্তু মাছ-মাংস বেশি খাওয়া ঠিক না।

–মাছ-মাংস বাদ দিলে আর রইল কী?

—তা ব্লাড পেশার বাড়লে খাওয়া কমাননা ছাড়া আর উপায় কী?

আরে ও-সব ডাক্তারদের বুজরুকি। ওদের কথামতো চলতে হলে না খেয়ে মরতে হয়। তার চেয়ে খেয়ে মরাই ভাল। বাটির বাকি মাংসটুকু প্রমথেশ চেঁছে-পুছে ঢেলে নিল। —তোমার হয়ে গেল হারীত? সত্যি, তোমার সঙ্গে বসে খেতে লজ্জাই করে আমাদের। শাশ্বতী, মাংস খেলে? স্বাতী, কেমন লাগল?

খুব ভাল। সোৎসাহে জবাব দিল স্বাতী। হারীতদা যখন কিছুতেই মাংস খাবেন না, তখন বড়দির জন্য কষ্টই লাগছিল তার। জামাইবাবুর জন্যও—তার জন্যই বেশি। বেশ মানুষ, যদিও অবিকল কার্তিকের মতো গোঁফ আর মাঝখান দিয়ে সিঁথি করা ঘন কোঁকড়া চুল। আর যদিও জামা খুলে হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে বসেন, আর খাবার সময় বড়ো শব্দ করে চিবোন, তবু বেশ, কেমন আপন লাগে, কেমন মমতা হয়। খাবার পর স্বাতী জামাইবাবুর কাছেই বসল। তার ডিবে থেকে পান খেল। কবে একবার দশ বছর আগে তিনি গারো পাহাড়ে শিকারে গিয়েছিলেন, তার গল্প শুনল যতক্ষণ না তিনি নাক ডাকাতে লাগলেন। তারপর উঠে এল বসবার ঘরে। সেখানে মেঝেতে পাটি পেতে বড়দি শুয়েছেন তাঁর কোলেরটিকে নিয়ে, আর বাবা ইজিচেয়ারে ঝিমোচ্ছন।

সে ঘরে ঢুকতেই বড়দি বললেন—স্বাতী, তোর চিঠি। বালিশের তলা থেকে একটি ঘন-নীল খাম বের করে হাতে দিলেন তার। স্বাতী দেখল খামের উপর সুন্দর হাতের লেখায় জুলজুল করছে তার নাম। এ-লেখা সে কি চেনে? কে লিখল? খাম খুলে স্বাতী আগে দেখে নিল চিঠির তলায় নামটা সত্যেন রায়। একটু লাল হয়ে উঠল মুখ, আর সেটা বুঝতে পেরে কাগজটা মুখের সামনে মেলে চিঠি পড়তে লাগল। পড়া হল না, শুধু উপর-উপর একবার দেখে নিয়ে বলল—বাবা, সত্যেনবাবু চিঠি লিখেছেন।

ঘুম-ঘুম গলায় রাজেনবাবু জবাব দিলেন-কী লিখেছে?

এই যে দ্যাখো–স্বাতী চিঠি-ধরা হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু রাজেনবাবু বললেন—কী? ভাল আছে তো?

হ্যাঁ। তোমার কথাও লিখেছেন–।

কে রে সত্যেন রায়?–জিজ্ঞেস করল শ্বেতা।

–আমার এক প্রোফেসর।

প্রোফেসর! প্রোফেসররা চিঠি লেখে তোকে, আর চিঠিও লম্বা। তাদের সমান-সমানই হয়েছিস বুঝি বিদ্যায়? বালিশে কনুই চেপে, হাতের উপর মাথা রেখে, বাচ্চাকে বুকের দুধ দিতে-দিতে, সস্নেহে, সগর্বে বোনের দিকে তাকাল শ্বেতা। বড়দির কথা! স্বাতী একটু এঁকে-বেঁকে সেখান থেকে পালাল। এসে বসল বাড়ির ভিতরদিকের বারান্দায় সিঁড়িতে। চুপচাপ। রান্নাঘরের বিকেলের পাট শুরু হয়নি এখনো। ঠান্ডা-ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে কার্তিক মাসের বেলা-চারটের। কপালের চুল সরিয়ে চোখ নিচু করল কাগজে–

স্বাতী,

খুব ঘুরলাম। দশমীতে নৌকো চড়লাম কাশীর গঙ্গায়, পূর্ণিমায় তাজমহল, দিল্লিতে দেয়ালি। আর ফাঁকে ফাঁকে ফতেপুর সিক্রিতে একবেলা, জয়পুরে দুদিন, লক্ষ্মৌ, এলাহাবাদ, পাটনা—সব শেষ করে ফিরতি পথে এসেছি শান্তিনিকেতনে। কাগজে দেখলাম রবীন্দ্রনাথের খবর। সোজা চলে এলাম, না-এসে পারলাম না। কঠিন পীড়া–দেখা হবার আশা নেই। সোনার তরী ভেসে চলেছে আলোর নদী বেয়ে অন্ধকারের দিকে। কিন্তু সেটাই হয়তো আরো বড়ো আলোর সমুদ্র।

কবি যদিও দেহযন্ত্রণায় বন্দী, তবু তেমনি সুন্দর শরৎকালের শান্তিনিকেতন। একটু নিষ্ঠুর লাগে না? কিন্তু এই-তো ঠিক, এর গানই তো কবি গেয়েছেন জীবন ভরে। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, সব কবি, পৃথিবীর সব কবি। পৃথিবী সুন্দর, জীবন ভাল। এ ছাড়া আর কী কথা আছে, বলো তো?

নানা দেশ ঘুরে, নানা দৃশ্য দেখে এখানে এসে কীরকম লাগছে, জানো? যেন জমকালো নেমন্তন্ন খেয়ে নিজের ছোট্টো ঘরটিতে ফিরে শুয়ে পড়েছি। শান্তিনিকেতনে এলেই বাড়ি-বাড়ি লাগে আমার, এখানে আমি স্কুলে পড়েছি। মাস্টারিও করে গেছি তিন মাস। এখন ছুটির সময় কেউ নেই বলে তুমি কি ভাবছ অভ্যর্থনায় ত্রুটি হয়েছে কোনো? না! আকাশ নীল, কাশবন সাদা, সারাদিন রোদুর, আর সন্ধেবেলা একটু-উঁকি চাঁদ, আর চাঁদের পরে হাজার-তারা হাজির। যত রাত বাড়ে, তত তাদের আলো ছড়িয়ে পড়ে অতি সূক্ষ্ম ধুলোর মতো। এসব আশ্চর্য দৃশ্য দেখবার জন্য রাত কাটাতে হয় রেলের স্টেশনে, দিন কাটাতে হয় না টাঙ্গায়। শুধু একটুখানি চুপ করে থাকতে হয়। সেই চুপ করে থাকাটা নিজের মধ্যে বানিয়ে নিতে পারলে আর ভাবনা কী? কিন্তু কজন পারে তা! বাইরেটা চুপ না-হলে নিজেরা চুপ হতে পারি না আমরা। তাই মাঝে-মাঝে আমাদের আসতেই হয় এইরকম কোথাও, যেখানে চারদিক খোলা, চারদিক চুপ–আশ্চর্য চুপ। এত শব্দহীন, প্রজাপতি ওড়ার শব্দ শুনতে পাব মনে হয়। তাই বলে কি সবই চুপ? না তো। গাছের তলায় স্টেজ খাটিয়ে এইমাত্র হো-হো করে করে লাফিয়ে পড়ল একজন বাচ্চা তীরন্দাজ-চেঁচিয়ে উঠল ডালপালা, গাছের ঝুঁটি ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল উত্তুরে হাওয়া, শীতের চিঠি এসে পৌঁছল। ঐ দ্যাখো, নিজের ভাললাগার মধ্যেই ড়ুবে আছি। এই ভাললাগা শিখেছি যার কাছে, তার রোগশয্যায় আমার দিন তো মলিন হল না একটুও। মানুষ ভারী স্বার্থপর কী বল? বসে থেকে এক-এক সময় ঝিমুনি আসে। তখন মনে করবার চেষ্টা করি যে এ-ই সব নয়। কলকাতা আছে, কাজ আছে, যুদ্ধের খবর আছে, টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখা আছে। হঠাৎ একটু খারাপও লাগে মনটা। পৃথিবীর কাছে আমার যা পাওনা, আমি তার বেশি আদায় করে নিচ্ছি না তো? এই যে পাকা ফলের মতো এক-একটি দিন সূর্যের সোনার গাছ থেকে ঝরে-ঝরে পড়ছে, এ কি আমার জন্য? আমি তো কবি নই, আমি তো ফিরিয়ে দিতে পারি না। কিন্তু সে কথাই বা কেন? আমার যে ভাল লাগে, তার কি কোনো মূল্য নেই? বলতে পারি না বলে আমার ভালবাসা কি মিথ্যে?

তুমি কেমন আছ, কী করছ? নিশ্চয়ই খুব ভাল আছ, নিশ্চয়ই খুব আনন্দেই কাটালে ছুটিটা? গিয়ে সব শুনব। তার আগে একটা চিঠি লিখতে পার ইচ্ছে করলে এখানে আছি আবো কটা দিন–আর কি, ছুটি তো হয়ে এল। তোমার বাবাকে আমার কথা বোলো।

সত্যেন রায়

পড়া শেষ করে চিঠিখানার দিকে তাকিয়ে রইল স্বাতী। একটি বড় কাগজের এপিঠ-ওপিঠ লেখা। শেষের দিকে অক্ষরগুলোর ঘেঁষাঘেঁষি। কাগজ যেই ফুরোল, অমনি চিঠিও শেষ। আহা, আর একটা পাতা যেন আর লেখা যেত না। কাগজটা উল্টিয়ে আবার পড়তে লাগল আস্তে-আস্তে, মনটা যেন কেমন হয়ে গেল তার। এতদিনের মধ্যে একবারও তত আর মনে পড়েনি সত্যেন রায়ের কথা। যাবার আগে যে-বই কখানা উনি রেখে গিয়েছিলেন তাও তেমনিই পড়ে আছে। বড়দি আসার আনন্দে আর সবই ভুলে গিয়েছিল। তা উনিও তো মন্দ আনন্দে নেই। খুব তো দিল্লি-হিল্লি করলেন, তারপর শান্তিনিকেতনে এসে চঁাদ-তারার দৃশ্য দেখছেন। ওখানে কিনা লোকজন কেউ নেই, কিছু করবার নেই, তাই নেহাত খানিকটা সময় কাটাবার জন্য চিঠি লিখলেন একখানা! রাগ হল স্বাতীর, হিংসে হল সত্যেন রায়কে কেমন ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে—কী স্বাধীন, কী সুখী। আর নিজের কথা সাত-কাহন লিখে শেষটায় শুকনো একটা ভাল আছ তো! আছিই তো, খুব ভাল আছি, খুবই আনন্দে আছি। সকলের আনন্দ তো একরকম নয় পৃথিবীতে। একরকম নয়, কিন্তু—আর এটাই স্বাতীর খারাপ লাগল সবচেয়ে—সত্যেন রায়ের চিঠিতে সে যেন এ-কথাই পড়ল যে সে যা নিয়ে মেতে আছে, এই সব খাওয়া-দাওয়া, সিনেমা-থিয়েটর, হাসিগল্প, এগুলি ভালই…কিন্তু ছেলেমানুষি ভাল। কেন, ছেলেমানুষি কেন? আর সে কি এখনো ছেলেমানুষ? নীল কাগজটি কোলের উপর ফেলে স্বাতী ভাবতে লাগল—আমি কি এখনো ছেলেমানুষ? তাকিয়ে দেখল, দুটো কাক বসেছে রাস্তায় গাছের ডালে। ভারি সুন্দর তো! সবুজের মধ্যে কালো, আর ফাঁকে-ফাঁকে রোদের হলদে-মানিয়েছে। এখানেও তো আকাশ নীল, গাছ সবুজ, রোদের রং সোনার মতো… তাহলে আর অন্য কোথাও যাওয়া কেন? অন্য কোথাও! অন্য কোথাও মানে তো অন্য দেশ নয়, অন্য-এক..কী কী, তা জানে না, শুধু মনে হয় যে খেয়ে, সেজে, বেড়িয়ে, ফুর্তি করে সবচেয়ে বেশি যা ভাল লাগতে পারে, তার চেয়েও অনেক বেশি ভাললাগা আছে সেখানে। সে ভাললাগার যেন শেষ নেই—কিন্তু সে ছেলেমানুষ, সে তার কী জানে? জানে না? যখন গান শোনে, যখন আশ্চর্য কোনো বই পড়ে, যখন হঠাৎ তাকিয়ে দ্যাখে সবুজের ফাঁকে সোনা, আর সবুজের মধ্যে কালো?

******

কী করছিস রে, স্বাতী?

তাকিয়ে দেখল, ছোড়দি। এইমাত্র উঠে এল ঘুম থেকে মুখ ফোলা-ফোলা, ঢিলে-ঢালা কাপড়, পিঠে ললাটানো এলোমেলো চুল সুগন্ধ দিচ্ছে। পাশে বসে পড়ে শাশ্বতী বলল—চিঠি নাকি? কার? স্বাতী জবাব দিল—আমার।

লিখেছে কে?

তোমাকে বলেছিলাম না সত্যেন রায়ের কথা—স্বাতী চিঠিটা ভরতে লাগল। সেই প্রোফেসর? সে লিখেছে? দেখি!—স্বাতীর কোল থেকে খপ করে খামটা তুলে নিল শাশ্বতী।—স্বাতী, এক কাজ কর না, একটু তেঁতুলের আচার নিয়ে আয় বড়দির ঘর থেকে..বসে আছিস কেন? যা! স্বাতী উঠল, যোগান দিল ছোড়দির ঘুম-ভাঙা জিভ-নাড়ার। ডান হাতের আঙুলে পুরু করে আচার লাগিয়ে যথোচিত শব্দ করে-করে খেতে-খেতে বাঁ হাতে চিঠিটা হাঁটুর উপর চেপে ধরল শাশ্বতী। স্বাতী উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকল ছোড়দির হাতের দিকে। এই বুঝি এক ফোঁটা আচার পড়ল চিঠির গায়ে! চিঠি ফেরৎ দিয়ে শাশ্বতী বলল—এ-সব ভাবের কথা তোকে লিখেছে কেন?

তবে আর কাকে লিখবেন—গম্ভীরভাবে জবাব দিল স্বাতী।—কেন রে? শাশ্বতী হাসল। আর কেউ নেই এর চিঠি লেখার?

আছে হয়তো, কিন্তু এসব ভাবের কথা ভাল লাগবে কি আর কারো? স্বাতী হাসল।-ওরে বাবা! খুব ভালো আচারটা, না রে? বড়দি পারেও! তুই খাচ্ছিস না?

ছোড়দি। বড্ডো চিটচিটে হয়ে যায় আঙুল।

যা বোকা। স্বাতীর এই বোকামি শাশ্বতী যেন হাসিমুখেই মেনে নিল। বিনা সাহায্যেই সবটুকু আচার তুলে দিল কয়েক মিনিটে।

সন্ধের পরে, আবছা অন্ধকার, সেই বারান্দাতে পাটি পেতে বসে শ্বেতা গুনগুন করে কথা বলছিল বাবার সঙ্গে। আর স্বাতী বসে ছিল চুপ করে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে। শাশ্বতী চলে গেছে, প্রমথেশ বেরিয়েছে আত-তাতা-ছোটনকে নিয়ে টাকায় আটখানা ছবি তোলাতে। অনেক হৈ-চৈ, অনেক ফুর্তির পর হঠাৎ কেমন-একটা ঘুম-ঘুম ঠান্ডা নেমেছে বাড়িতে। যেন কারোরই কিছু আর করবার নেই। আর সত্যিও তাই।ও বেলা এত রান্না হয়েছিল যে এ বেলা উনুন ধরাতে হল শুধু দুটো ভাত ফোঁটাবার জন্য। বড়দির নেহাৎ-বাচ্চাটি, যে রোজ এই সময়টাকে চেঁচিয়ে সরগরম রাখে, সে নিজে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ ফাঁক পেয়ে রামের-মা এখনই বিছানা করে রেখেছে ঘরেঘরে, যেন ঘরে-ঘরে হাতে ধরে এগিয়ে আনছে রাত্তিরটাকে। সন্ধেবেলাটা যেন মন-কেমনকরা—এমনিতেই স্বাতীর মনে হয় যেন মন-খারাপ-করা; যখন আলো নিবে যায়, আবার অন্ধকারও ফোটে না, সেই ছাইরঙের ছায়া-ঝরা সময়টায় কে যেন কাকে ছেড়ে চলে যায় চিরকালের মতো। একলা থাকলেই কান্না পায় স্বাতীর। তবু ভাগ্যিস ইলেকট্রিক আললা আছে, আকাশ ভরা ছায়ার কান্নাকে ঘর থেকে ঝেটিয়ে বের করে দেয় আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। কিন্তু বারান্দায় আলো জ্বালা হয়নি। পরদার ফাঁক দিয়ে ঘরের আলো একটি-দুটি লাইন টেনে দিয়েছে বাবার পায়ের কাছে। আর স্বাতী যেদিকে মুখ করে বসেছে, আকাশের ঠিক সেখানটায়, ঠিক তার চোখের সামনে দপদপ করছে মস্ত সবুজ একলা একটা তারা–এই সন্ধেতারা? পৃথিবীর এত লোকের মধ্যে যেন তারই দিকে তাকিয়ে আছে আকাশের পলক-না-পড়া চোখ। মানুষের চোখ যখন জলে ভরে-ভরে ওঠে, এ তারা যেন সেই রকম, এত পরিষ্কার যে জল দিয়েই বানানো মনে হয়, ঠিক যেন আকাশের গায়ে লেগে নেই, একটু সরে এসেছে, এক্ষুনি গলে পড়ে যাবে। যেমন চোখের জল উপচে পড়ে মানুষের চোখ থেকে মুখে …হঠাৎ, সে বুঝল না কেমন করে, কী হল জানল না, খুব সহজে, একটু কষ্টনা দিয়ে দুটো জটা পড়ল স্বাতীর চোখ থেকে। কী রকম চুপচাপ, আর ঝাপসা কুয়াশা। কেমন একটা ঠান্ডা রং-ছাড়া মন-মরা সন্ধ্যা, ঠিক যেন শীত। তা শীত তো এল, আর শীত এল বলে মন খারাপ করবার কী আছে, কাঁদবার হয়েছে কী। নিজেরই হাসি পেল স্বাতীর ভাগ্যিস অন্ধকার, কেউ দেখতে পায়নি… আর আকাশের ঐ তারাটা কী মজার দেখাচ্ছে চোখের জলের ভিতর দিয়ে! আঁচলে মুছে চোখ ফিরিয়ে আনল স্বাতী, কান পাতল কথাবার্তায়। বাবা বলছেন—তোরা তাহলে শুক্কুরবারেই যাবি?

হ্যাঁ বাবা, কোর্ট খুলে গেছে ওঁর, আর অনেক দিন তো থাকা হল। বড়দি চলে যাবে? এই শুক্কুরবারেই?…বাঃ, যাবে না? যেতে তো হবেই। হবেই? হ্যাঁ, হবেই তো!… কেমন লাগে নাজানি। প্রথম ছেড়ে যেতে কেমন লাগে? আর তারপরে? আরো তারপরে? কী অদ্ভুত মেয়েদের এই দুই জীবন, তারা জন্ম নেয় ছেড়ে যাবার জন্য, আর ঐ ছেড়ে যাওয়াটাই তাদের সব পাওয়া। বড়দির নিশ্চয়ই খুব খারাপ লাগছে যেতে, আরো খারাপ লাগছে বাবার। কিন্তু তাই বলে বড়দি তো বললেন না, আচ্ছা থাক, আরো কদিন থেকে যাই। বড়দি বললেন—পেনশনের আর কত দেরি তোমার?

দেরি আর কোথায়? একটা বছর কোনওরকমে কাটাতে পারলেই হয়ে যায়।

কত কাল চাকরি করলে–-অ্যাঁ!..কী-রকম একটা গলিতে আমরা ছিলাম না একবার?

মনে আছে তোর শাঁখারিপাড়ার কথা? তখন তো তুই এক-ফোঁটা!

আমার যেন আবছা-আবছা মনে পড়ে তুমি আপিশে যেতে, আর রোজ আমি মোর সঙ্গে যাবার জন্য কাঁদতাম।… একদিন পড়ে গিয়েছিলাম সিঁড়ি দিয়ে, না?

বাবাঃ! খুব-তো মনে আছে তোর! একটু চুপ করে থেকে বড়দি বললেন–জীবন ভরে কম তো করলে না! এবারে পেনশন নিয়ে কিন্তু একেবারে ছুটি।

নাকি?

নাকি মানে? আর তোমাকে কিছু করতে দেব না আমরা। প্রথমেই আমার কাছে গিয়ে থাকবে কয়েক মাস।

বে–শ।

শুধু বললে হবে না—সত্যি গিয়ে থাকতে হবে। এর মধ্যে বিজুকে কোনো কাজে-কর্মে ঢুকিয়ে দাও একটু চেষ্টা করে।

দেখি।

পড়াশুনো ওর হল না বলে আর যে কিছু হবে না তা কি বলা যায়? বাবাকে উৎসাহ দিলেন বড়দি। হলেই ভাল। বেশি উৎসাহ লাগল না বাবার গলায়।

আর একটা কথা তোমাকে বলি, বাবা-বোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখ টিপে একটু হাসলেন বড়দি—স্বাতীর আর দেরি কোরো না।

কীসের? বাবা যেন চকিত হলেন।

ওর এবার বিয়ে হওয়াই তো ভাল। বাবা জবাব দিলেন না। ছায়া পড়ল তার মুখে, স্বাতী অন্ধকারেও দেখতে পেল।

কী রে? স্বাতী? বড়দি মুখ ফেরালেন তার দিকে। ঠিক না? স্বাতী ঠোঁট কামড়ে উঠে দাঁড়াল। বড়দি ঠাট্টা করলেন—আরে বোস, বোস। অমন এলোকেশে উদাস চোখে চলে যেতে হবে। এখন কি আর সে-দিন আছে নাকি যে…। কিন্তু স্বাতী শেষপর্যন্ত শোনবার জন্য দাঁড়াল, ঘরে চলে গেল। কঁপা-কঁপা পরদার দিকে তাকিয়ে শ্বেতা বলল-এ-মেয়ে তোমার সুন্দরী হয়েছে…।

আমার সব মেয়েই সুন্দরী—রাজেনবাবু অস্পষ্ট একটু হাসলেন। কী যে বল তুমি, ওর মতো নাকি আমরা কেউ! শ্বেতা খুশিতে ছলছল করে উঠল, তারপর গম্ভীর হয়ে বলল–সত্যি, আর দেরি না। পেনশনের আগেই এটা করা চাই। তারপর আর ভাবনা কী তোমার—একেবারে ঝাড়া হাত-পা।

সে তো ঠিকই—রাজেনবাবু ক্ষীণস্বরে বললেন। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মনের মধ্যে একটা কষ্ট হল শ্বেতার। তবু… তাই আবার বলল, আর ওদের বিয়ে তো আমাদের মতো না। আর বাবার মনে ফুর্তি আনবার চেষ্টা করল শেতা–যদি কলকাতাতেই থাকে, তবে আর কথা কী? কিন্তু রাজেনবাবু চুপ করেই রইলেন, আর শ্বেতাও যেন আর কথা খুঁজে পেল না। হঠাৎ কী রকম একটা চুপচাপ নামল, রাত যেন গভীর, যেন অন্ধকারে মাঠের মধ্যে একটা ছোট্টো স্টেশনে গাড়ি এসে দাঁড়াল, আর সেই অন্ধকারে কে যেন কোথায় চলে যাচ্ছে বাড়িঘর ছেড়ে।

******

ঘরে এসে স্বাতী তার পড়ার টেবিলে বসল। ঠিক চোখের সামনে পড়ে আছে সত্যেনবাবুর চিঠিখানা, হাতে নিয়ে পড়ল আরো একবার। উত্তর দেওয়া উচিত? কিন্তু দেবার কী আছে? একটা চিঠি লিখতে পার ইচ্ছে করলে।—তার মানে বেশি গরজ নেই। তা ওর গরজ না থাক, আমার তো ভদ্রতা আছে। আচ্ছা, একটা লেখা যাক তাহলে।…এখনই ভাল, চুপচাপ আছে বাড়িটা, কাল নিশ্চয়ই আর সময় হবে না। স্বাতী কাগজ-কলম নিয়ে তৈরি হল। কিন্তু পাঠ লিখবে কী? আত্মীয় নয়, আবার তার সমবয়সী কোনও মেয়েও নয়, এমন কোনও মানুষকে সে আর চিঠি লিখেছে কবে! কী লিখবে? শ্রীচরণেষু—যা-উনি কি বুড়ো নাকি যে শ্রীচরণেষু? বা রে, বুড়ো না হলে বুঝি আর শ্রীচরণেষু হয় না? বিদ্যা আছে না? আর আমার প্রোফেসর তত.. বয়সেও আমার বড়ো… আর… যাকগে, অত আর ভেবে কী হবে শ্রীচরণেষু দিয়েই লিখে ফেলি—

শ্রীচরণেষু,
আপনার চিঠি খুব ভাল লাগল। কত আপনি বেড়ালেন, কত দেখলেন, আর তারপর কী সুন্দর শান্তিনিকেতন। কিন্তু চিঠিটা ভাল ওসবের জন্য না, নিজে নিজেই ভাল। আপনি শীতের কথা লিখেছেন না—এখানেও ঠিক আজ সন্ধে থেকেই শীত শীত ভাব। খুব সম্ভব কদিন ধরেই হচ্ছে এরকম, কিন্তু আজকের কথা আগে মনে হয়নি। শীতটা বেশ, কিন্তু প্রথম যখন আসে, একটু মন-খারাপ লাগে, না?

মন-খারাপ মানুষের কখন লাগে আর কেন লাগে তার কি কোনও নিয়ম আছে? কিছুর মধ্যে কিছু না—সব ঠিক আছে—হঠাৎ শ্রীযুক্ত মনখারাপ এসে হাজির হলেন—

আর কথা কী! যেন জীবনে আর নড়বেন না এখান থেকে। তা লোক কিন্তু উনি তত খারাপ নন—মানে, মন-খারাপ হওয়াটাই যে খারাপ তা কিন্তু ঠিক নয়। আমার তো বেশ ভালই লাগে এক-এক সময়।

ভাল লাগে, কিন্তু মন-খারাপ হওয়ার ভাললালাগাটাকে অন্যের কাছে বলা যায় না, ভালোলাগার ভালোলাগাটাই বলা যায়। না, তাও না–ভালোলাগার ভালোলাগাটা বলতেই হয় না, সেটা এমনিই ছড়িয়ে পড়ে। আর মনখারাপের ভালোলাগাটাই বলতে হয়–মানে, বলতে চায় মানুষ, কিন্তু বলতে পারে না। আর পারে না বলেই কি গান বানায়, কবিতা লেখে? কতদিন কত মনখারাপই হয়েছে  রবীন্দ্রনাথের, যাতে ঐ রকম সব গান বানিয়েছেন—তা-ই না? জিজ্ঞেস করবেন দেখা হলে।

আমি কেমন আছি? ভাল আছি। কী করছি? কিছুই করছি না। মানে, যা করছি তাকে কিছু করা বলে না। আর যাকে কিছু করা বলে, আমি কি তা পারি নাকি?

স্বাতী

পরের দিন চিঠি ডাকে পাঠাবার সঙ্গে-সঙ্গেই আবার উত্তরের আশা জাগল স্বাতীর মনে। আর কি লিখবেন? আসবারই তো সময় হল। কিন্তু তা-ই যদি, তাহলে আমারই বা লেখবার কী হয়েছিল? কোনো দরকারের জন্য তো আর চিঠি না, কোনো খবর তো দেবার নেই–তবে? কেন? কীসের জন্য?

তারপর পরের দিন সকালে চা খেতে-খেতে স্বাতীর মনে হল–এতক্ষণে আমার চিঠি পৌঁছেছে। কথাটা যেই মনে হল, যেই সে মনের চোখে দেখল সত্যেনবাবু খাম খুলে তার চিঠি পড়ছেন, অমনি তার এমন লজ্জা করল যে মুখ নিচু করে পেয়ালার চায়ের দিকেই তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, পাছে বড়দি জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে রে! আর তার পরের দিন তার মনে হল—আজ কি উত্তর আসবে চিঠির?

উত্তর এল না, নিজেই এলেন সত্যেন রায়। তখন এগারোটা বেলা। রান্না চুকিয়ে বড়দি তার মেজো দুটিকে স্নানের তাড়া দিচ্ছেন–আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তারা ধেই-ধেই লাফাচ্ছে আর গলা ছেড়ে ঠ্যাচাচ্ছে–সেটাই নাকি নাচ আর গান! বড়দিকে সাহায্য করবার জন্য স্বাতী তাদের ধরতে গেছে, তারা ছুটছে, আর স্বাতীও ছুটছে পিছনে। ছুটতে ছুটতে বসবার ঘরে এসে দ্যাখে, দরজার ধারে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছেন সত্যেন রায়।

স্বাতী থমকে গেল। অচেনা মানুষ দেখে বাচ্চা দুটিও থমকাল। আর সত্যেন রায় বললেন–কী, ভাল তো? ঝা-ঝ করতে লাগল স্বাতীর মুখ, কানে যেন ভাল শুনছে না, গলা পর্যন্ত নেমে এল মুখের জ্বলুনি। ছুটে পালিয়ে যেত পারলে, এদিকে পা-ও নড়ে না।

ছাত্রীর এ-রকম উশকোখুশকো উভ্রান্ত চেহারা সত্যেনবাবু আগে কখনো দেখেননি। মুখ টুকটুকে লাল, ঠোঁটে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম, ছোটো ছোটো চুল কপালে লোটাচ্ছে। একটু তাকিয়ে থেকে আবার বললেন—কেমন আছ? ভাল? স্বাতী এবার মনস্থির করল। পিঠের উপর দিয়ে আঁচলটা ঘুরিয়ে এনে সোজা হয়ে মুখ তুলে দাঁড়াল। চেষ্টা করে বলল—কবে এলেন আপনি?

—কাল রাত্তিরে। শুনে আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না স্বাতীর। সারা রাত ঘুমিয়ে তারপর সারা সকাল গড়িমসি করে পরিপাটি বাবুটি সেজে এতক্ষণে সময় হল আসার! তাতা! ছোটন! ছেলেমেয়েকে নাম ধরে ডাকতে-ডাকতে শ্বেতা এল ও-ঘরে। এই যে, বাবা, হয়রান করে দিলি তোরা আমাকে।বলতে বলতে হঠাৎ একটু অপ্রস্তুত হয়ে থেমে গেল।

ইনি আমার বড়দি—স্বাতীকে এবার কথা বলতেই হল। আর ইনি-ইনি সত্যেনবাবু, আমাদের কলেজের প্রোফেসর।

প্রোফেসর মাথা নিচু করে নমস্কার জানালেন। একটু বেশিই নিচু করলেন মাথাটা। স্বাতীর গা জ্বলে গেল। তুই তো বেশ, স্বাতী মাথার কাপড় টেনে দিয়ে শ্বেতা আবছা হাসল—বসতেও বলিসনি এঁকে!

না, না, আমি আর বসব না… বেরোচ্ছিলাম, ভাবলাম একবার…আর আপনাদেরও স্নান-খাওয়ার সময় এখন-শ্বেতার দিকে তাকিয়েই সত্যেনবাবু বললেন।

ও বেরোচ্ছেন! তাই ট্রামের পথে একবার! দেড় মাস পরে কলকাতায় ফিরে প্রথমেই আড্ডা দিতে হবে সারা শহর ঘুরে, তবে তো! টেবিলে-পা-তোলা ঐ ধ্রুব দত্তের সঙ্গে দেখা না হলে ভাল লাগবে কেন, আর-তো নেই কথা বলবার যোগ্য মানুষ!

তুই কী রে? ঘরে এসে শ্বেতা বলল—ভদ্রলোক এমনি এমনি চলে গেলেন, কিছু বললি না! এমনি-এমনি মানে? একটু ঝাঁঝ স্বাতীর গলায়।

আহা-পুজোর পরে এলেন—একটু মিষ্টি-টিষ্টি—

হ্যাঁ! স্বাতী মাথা ঝাঁকাল–বয়ে গেছে ওঁর এখন তোমার মিষ্টি খেতে! দিব্যি ডাত-টাত খেয়ে আড্ডা দিতে বেরোচ্ছেন। শ্বেতা হেসে ফেলল বোনের কথায়, কথা বলার ভঙ্গিতে। একটু পরে বলল—তোর প্রোফেসর তো ছেলেমানুষ রে!

তুমি তবে কী ভেবেছিলে?

ইনিই চিঠি লিখেছিলেন তোকে?

হ্যাঁ–কেমন একটু ছটফট করে স্বাতী চলে গেল নাইতে। স্নান করেও ছটফট ভাবটা কমল না। উনুনে আঁচ ধরবার আগে যেমন ধোঁয়া হয়, তেমনি একটা অবস্থার মধ্যে কেটে গেল দিন। আমি একটা মানুষ, আমার আবার চিঠি, আর সে-চিঠির কথা আবার মুখে বলতে হবে! উনি লিখেছিলেন, ওঁর তখন ভাব উথলেছিল। ছোড়দি ঠিকই বলেছিল, ওসব ভাবের চিঠি আমাকে কেন? তা সত্যি-তো আর আমাকে না, যেকোনো একজনকে পাঠালেই হত, মাসিকপত্রে ছাপিয়ে দিলেই বা দোষ কী—ওতে চিঠির কী আছে? আমিও বোকা, আবার জবাব লিখতে গিয়েছিলাম। না হয় লিখেছিলাম, ডাকে না-দিলেই হত…না কি পাননি? তা-ই যেন হয়, হে ঈশ্বর, তা-ই যেন হয়। কিন্তু কী করে জানব পেয়েছেন কি পাননি?

******

সন্ধ্যেবেলা শ্বেতা বলল–বাবা, কাল আমি খাওয়াবো তোমাদের।

এই এক মাস ভরেই তো খাওয়াচ্ছিস-হাসতে গিয়ে কেমন করুণ হল রাজেনবাবুর মুখ। রান্নার কামাই তো একদিনও দিলি না রে!

একদিনও যখন হয়নি, তখন আর একদিনই বা হয় কেন—প্রমথেশ হা-হা করে হেসে উঠল—আর কালই তো শেষ।

তা, তোমাদের ফেয়ারওয়েল পার্টি তো আমারই দেওয়া উচিত—রাজেনবাবু লাজুকভাবে তাকালেন জামাইয়ের দিকে। না, না, আর…আপনার মেয়ের যখন শখ হয়েছে প্রমথেশ মুখে-মুখে ভোজ্য-তালিকা তৈরি করতে লেগে গেল, পারলে তক্ষুনি বাজারে ছোটে। সত্যি, প্রমথেশের উৎসাহ! রাজেনবাবু হাসলেন। শ্বেতা থাকতে থাকতে তোর প্রোফেসর ফিরল না, স্বাতী, তাহলে তাকে বলতে পারতিস।

সে তো এসেছিল আজ! বলে উঠল শ্বেতা।

, বাবা, না! স্বাতী দু-হাত তুলে আপত্তি জানাল।

কেন রে? আমি তো কবে থেকেই ভাবছিলুম…চমৎকার মানুষ— শ্বেতার দিকে তাকিয়ে রাজেনবাবু কথা শেষ করলেন—আর একা-একা থাকে…

একা কেন? শ্বেতার প্রশ্ন। কেন, তা তো জানি না, তবে একাই তো দেখি উত্তর দিলেন রাজেনবাবু। বিয়ে করেনি!-শ্বেতা যেন অবাক।-পাশ করেছে, চাকরি পেয়েছে, বিয়ে করেনি। রাজেনবাবু শব্দ করে হেসে উঠলেন তার কথা শুনে। প্রমথেশ চোখ বড় করে বলল—আপনার মেয়ের কথা আর বলব কী…কেউ বিয়ে করেনি শুনলে উনি আর টিকতে পারেন না। ঘটকালিতেও বেশ হাতযশ হয়েছে এর মধ্যে।

হবেই! রাজেনবাবু চোরা হাসি হাসলেন একটু—নিজে সুখী হলে অন্যকেও…

বাবার কথা! —শ্বেতা মুখ ফিরিয়ে নিল।

******

স্বাতী, চল—পরের দিন সকালে রাজেনবাবু উদ্যােগী হলেন। চল তোর প্রোফেসরকে বলে

আসি।

আমি যাব না।

আহা চল না—

কেন, একা যেতে পার না তুমি?

তুইও চল।

না! ওঁকে বলবারই বা কী হয়েছে আমি তো জানি না।

একটু চুপ করে থেকে রাজেনবাবু বললেন—স্বাতী, তোর হয়েছে কী?

সঙ্গে-সঙ্গে মেয়ের মাথা নিচু হল। জবাব দিল না।

এত বিরক্ত কেন? এবারেও কথা বলল না স্বাতী।

থাক তবে, আমি যাই। জামা পরে রাজেনবাবু আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। আর রাস্তায় এসেই দেখলেন স্বাতী তার পাশে।

এই শাড়িটা পরেই—

তাতে কী? স্বাতী হাসল—বেশ ভাল তো শাড়িটা।

আমার উপর খুব তো তম্বি, আর নিজে এ রকম থাকিস কেন?

ও মা! কী-রকম আবার থাকি?

সকালে উঠে চুলটাও বুঝি আঁচড়াতে হয় না?

ও ঠিক আছে–স্বাতী হাত দিয়ে কপালের চুল উল্টিয়ে দিল।

ইজিচেয়ারে আধ্যে শুয়ে খবর-কাগজ পড়ছিলেন সত্যেনবাবু। ভঙ্গিটা এমন আরামের, এমন এলানো অমস যে দেখামাত্র আবার চিড়বিড় করে উঠল স্বাতীর মাথার মধ্যে। আর তাদের দেখামাত্র সত্যেনবাবু উঠলেন, উঠে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রায় হাত-জোড়-করা বিনীত ভঙ্গিতে। তাতে চিড়বিড়ানি কমল না, উল্টে বেড়েই গেল। একটা কথা বলতে এলাম আপনাকে রাজেনবাবু কোনো ভূমিকা করলেন না—আজ রাত্রে আমাদের ওখানে একবার..মানে, একেবারে খেয়ে-দেয়ে আসবেন আরকি।

বাবা-যে কী! কোনও কথা যদি গুছিয়ে বলতে পারেন।

নিশ্চয়ই…নিশ্চয়ই…নিশ্চয়ই—তিনবার নিশ্চয়ই বলার পর হঠাৎ প্রোফেসরের মুখে অন্য কথা

যোগাল—তা উপলক্ষ্যটা কী?

কিছু না…এমনি।

কিছুই না? কিছু-একটা শোনবার আশায় মুখের দিকে তাকালেন সত্যেনবাবু। না, উপলক্ষ্য কিছু না।—রাজেনবাবু কিন্তু একেবারে নিরাশ করলেন।

না…তা হঠাৎ থেমে, স্বাতীর দিকে তাকিয়ে একেবারে অন্যরকম সুরে সত্যেনবাবু বললেন— ঠিক কথা! তোমার চিঠি—

ঢিপ করে উঠল বুকের মধ্যে। কাল সন্ধেবেলা পেলাম। ওরা পাঠিয়ে দিয়েছিল ঠিকানা কেটে। ভাগ্যিশ—

ভাগ্যিশ? ঈশ! আপনার মেয়ে লেখে বেশ–প্রোফেসর ফিরলেন বাপের দিকে। বেশ? পরীক্ষার খাতা না কি যে বেশ? স্বাতীর ইচ্ছে হল ঐ অলক্ষ্মী চিঠিটাকে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে এক্ষুনি ওঁর চোখের সামনেই। চিঠি কি ফেরৎ চাওয়া যায়?

মাঝখান থেকে এই হল যে রাত্তিরের ফুর্তিটাই মাটি হল স্বাতীর। সে শুয়ে থাকল, এ-ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়াল, একবার বসল ছোড়দির কাছে, তক্ষুনি আবার উঠে গিয়ে গল্প জুড়ল আতাতাতার সঙ্গে, কিছুতেই যেন মন নেই। সত্যেন রায় যখন এলেন, রাজেনবাবু তাকে অভ্যর্থনা করে বসালেন। তারপর ভিতরে এসে স্বাতীকে খুঁজে বের করে বললেন—সত্যেন এসেছে রে–

এসেছে তো আমি কী করব?

বাঃ!-বেচারা রাজেনবাবুর এর বেশি কথা মোগাল না। একা বসে আছেন ভদ্রলোক—প্রমথেশ ব্যস্ত হল—তাহলে তো…আচ্ছা, আমি বরং আলাপ করি গিয়ে—

জামাইবাবু, একটা পাঞ্জাবি–স্বাতী চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল। আরে এতেই হবে-হাসতে গিয়ে গেঞ্জির ৩য় নেচে উঠল প্রমথেশের সুগোল হুঁড়িটি। না, কখনো না!—চড়া গলা চাপতে গিয়ে স্বাতীর গলা কাঁদো-কাদো শোনাল।

কোথায় আবার এখন জামা-টামা—

থাক তাহলে। কারো দিকে না-তাকিয়ে, দুমদাম পা ফেলে স্বাতী সোজা চলে এল বসবার ঘরে। শান্ত, নিশ্চিন্ত, পরিচ্ছন্ন সত্যেন রায় বসে আছেন জানালার ধারে চেয়ারে। তাকে দেখে একটু হেসে বললেন—কী স্বাতী, এখনও কি তোমার মন খারাপ? স্বাতী মাথা নিচু করে চুপ। তোমার প্রশ্নটা আমি রবীন্দ্রনাথের কাছে পেশ করতে পারিনি, কিন্তু এর উত্তর তিনি হয়তো গানেই দিয়েছেন, দেখো-তো খুঁজে, পাও কিনা-বলে সত্যেন রায় বাড়িয়ে দিলেন ব্রাউন কাগজে জড়ানো একটা প্যাকেট।

কী?

গীতবিতান। রবীন্দ্রনাথের গান তো শুধু কান দিয়ে শোনবার নয়, মন দিয়েও পড়বার। স্বাতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মোড়ক ছাড়িয়ে বের করল দু-খণ্ড গীতবিতান। ভিতরে লেখা, স্বাতীকে— সত্যেন রায়। কেন আনলেন? যেন জবাবদিহি চাচ্ছে, এইরকম শোনাল প্রশ্নটা।

কেন আবার, তুমি পড়বে বলে! একটু পরে সত্যেন রায় আবার বললেন—তোমার জন্মদিনের উপহারও মনে করতে পার।

ও মা! জন্মদিন কীসের? স্বাতী হেসে ফেলল। না বুঝি? তা হতেও তো পারত।

কী আশ্চর্য! আপনি তা-ই ভেবেছেন?

তা না-ই বা হল জন্মদিন। নতুন বই পেতে যে-কোনো দিনই ভালও লাগে। আর এমন বই। এক্কেবারে সোনার বোম লা সিল্কের পাঞ্জাবি পরেই প্রমথেশ এল ঘরে। আর সঙ্গে-সঙ্গে বাইরে থেকে এল হারীত, ফিকে নীল শার্টের উপর টকটকে লাল নেকটাই। স্বাতী পরিচয় করিয়ে দিল। সত্যেন রায়ের নমস্কারের উত্তরে প্রমথেশ বিগলিত হাসল, আর হারীত সোজা একটি হাত তুলল কপালের কাছে, যেন খাপ থেকে উঠল তলোয়ার। বসে বলল—কদ্দূর? প্রমথেশ হাঁটু দোলাতে-দোলাতে বলল—আরে এই তত এলে, আর এসেই–।

কী করি…কাজ! উঁচু দরের একটু হাসি ফুটল হারীতের ঠোঁটে।–খাওয়াতে আর খাওয়ানোতে এত সময় যায় বাঙালীর যে কাজ করবে কখন! হারীত তাকাল সত্যেন রায়ের দিকে। ঠিক বোঝা গেল না সমর্থনের আশায়, না ভালমানুষ চেহারার শিক্ষকটিকে শিক্ষিত করতে।–চীনেদের শুনেছি আরো বেশি—সত্যেন রায় বলল।—সে জন্যই তো এই অবস্থা চীনের, জাপান ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাচ্ছে। তা মার খেয়ে বুদ্ধি খুলেছে এতদিনে, যুদ্ধ করতেও শিখেছে। বুদ্ধি মানেই যুদ্ধ করা? জানতে চাইল ক্ষীণবুদ্ধি প্রমথেশ। হারীত একটু নড়েচড়ে বসল। নাঃ, বোকাঁদের সঙ্গে কথা বলে কিছু হয় না, শুধু সময় পণ্ড, শুধু মেজাজ নষ্ট। এদিকে শ্বশুরবাড়ি, না -এসেও পারা যায় না…মুশকিল!—চীনেরা যখন ছ-ঘণ্টা ধরে রাঁধত আর দু-ঘণ্টা ধরে খেত–সত্যেন মৃদুস্বরে বলল–তখন কিন্তু কবিতা লিখত খুব ভাল।

কবিতা!–সঙ্গে-সঙ্গে হারীত ঘোড়ার মতো টগবগ করে উঠল।–পায়ে পা তুলে বসে একটু একটু করে চীনে কবিতা চাখতে মন্দ লাগে না। কিন্তু চীনকে, চীনের কোটি-কোটি মানুষকে কি তা বাঁচাতে পারল?

সকলকে বাঁচাতে পারেনি বলেই তো মনে হয়—সত্যেন সায় দিল কথায়। চামড়া-কোট-পরা চীনে যুবক মেঝেতে লাথি ঠোকে তাদের পুরোনো ল্যাণ্ডস্কেপকে লক্ষ্য করে, এবার শান্তিনিকেতনে শুনলাম নন্দলালের কাছে।

ঠিক করে। কী হবে আর ওসব দিয়ে! এই তো হারীত হাত বাড়িয়ে খ করে ধরল টেবিলে রাখা গীতবিতানের একটি খণ্ড। স্বাতীর মনে হল যেন একটা বেড়াল লাফিয়ে পড়ল ইঁদুরের ঘাড়ে-রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই বা কী হবে আর?

সে কী! স্বাতীর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—রবীন্দ্রনাথ আবার কী-দোষ করলেন?

এই দোষ–তৈরি জবাব হারীতের মুখে।–যে তাঁর লেখা পড়ে, কেউ যোদ্ধা হতে পারে না। নিজেই নিজের ভুল বুঝেছেন এতদিনে। এই-তো লিখেছেন সেদিন—একই সুরে, গড়গড়ে গদ্য করে, কমা-টমা সব উড়িয়ে দিয়ে আউড়িয়ে গেল শান্তির বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস… বিদায়ের আগে ডাক… দিয়ে যাই দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে। খেতে-খেতে দাঁতে কঁকর পড়লে যেমন হয়, সেই রকম একটা শিউরানি সহ্য করে নিয়ে সত্যেন বলল—বোধহয় শান্তির ললিত বাণী আর বোধহয় বিদায় নেবার আগে তাই। ও একই কথা… একই কথা। আসল কথাটা এই যে ওসব শান্তি-ফান্তি দিয়ে এখন আর কিছু হবে না—এখন যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ!-বলে হারীত বীরদর্পে পাইপ ঠুকল চেয়ারের হাতলে। হারীতের কথা শুনতে-শুনতে হাঁ হয়ে গিয়েছিল প্রমথেশের মুখ। হুশ করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল—তা যুদ্ধ তো হচ্ছেই।

যুদ্ধের এখন কী! ওৎ পেতে আছে না বনবিড়ালি জাপান!—হারীত আরো কিছু হয়তো বলত, কিন্তু হঠাৎ প্রমথেশ স্বাধীনভাবে একটা মন্তব্য করে ফেলল–ওদিকে রাশিয়াও তো…ফিনলন্ড নাকি লণ্ডভণ্ড…সত্যি?

আত্মরক্ষার জন্য ওরকম করতেই হয়—ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল হারীত। আপনার বাড়িতে ডাকাত পড়লে আপনি কী করেন? প্রমথেশ ভেবেই পেল না ফিনলন্ড কবে ডাকাতি করতে গিয়েছিল রাশিয়ায়। কী জানি—সে খবরও বেশি রাখে না, বোঝেও না কিছু। আর এসব যুদ্ধ-টুদ্ধ কেনই বা করে মানুষ, মিলেমিশে সুখে থাকলেই তো পারে। মনের কথাটা মুখেই বলে ফেলল–যা-ই বল বাপু, যুদ্ধটা বড়ো বিশ্রী। মানুষই তো মানুষকে মারে—অ্যাঁ! ঐ আঁটা হারীতের কানে শোনাল ভ্যার মত। ভেড়ার পাল সব! প্রোফেসরটিকেও তো দিব্যি ভেড়-ডেড়ু লাগছে—দেখা যাক! সত্যেনের দিকে ফিরে তর্ক তুলল—আপনি কী বলেন? আর্ট যদি এখন হাতিয়ার না হয়, তবে আর সে আছে কী করতে?

কীসের? ভীরু প্রশ্ন সত্যেন রায়ের।

কীসের আবার! শিকল ভাঙার হাতিয়ার।

কীসের শিকল? ক্ষুধার, দুঃখের, দাসত্বের শিকল! এতটা বোঝাতে হল বলে হারীত একটু অবজ্ঞার হাসিতে ঠোঁট বাঁকাল।

ক্ষুধা, দুঃখ, দাসত্ব–মানে?

মানে—হারীত আশা করেনি প্রশ্নটা, কিন্তু ওস্তাদ খেলোয়াড়ের মতো লুফে নিয়ে তক্ষুনি আবার ফেরৎ পাঠাল—এর মানে কি ঠিক কথায় বোঝানো যাবে? যদি কেউ আপনাকে হাত-পা বেঁধে অন্ধকারে ফেলে রাখে, আর দিনের পর দিন খেতে না দেয়, হয়তো তাহলে আস্তে আস্তে বুঝবেন। হারীত চেষ্টা করল খোশমেজাজি ধরনে হাসতে, তাতে আরো ধার হতো ঠাট্টায়। কিন্তু তা ঠিক হল না, ঘোঁৎ করে খেঁকিয়ে উঠল তার হাসিটা। আর সেই রাগি আওয়াজের সামনে যেন ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করল সত্যেন—ও, খাওয়া-পরার কথা। আমি ভাবছিলাম আপনি আর্টের কথা বলছেন।

হ্যাঁ, খাওয়া-পরার কথা! হারীত গর্জন করল এবার–তা-ই চায় মানুষ-খাওয়া-পরা চায়, চায় কাজ, বিশ্রাম, স্ত্রী। আর ওসব পায় না যারা, তারা দেখছি ভারি বেয়াদব হয়ে উঠেছে আজকাল! বড়োই চ্যাঁচামেচি করছে পৃথিবী ভরে-ঋষিদের ধ্যানভঙ্গ হয় আর কি! কথাটা শেষ করে হারীত জ্বলজ্বলে চোখে তাকাল, যেন বলতে চায়—এইবার? কিন্তু মাস্টারটি আর, জবাব দিল না। থাকলে তো দেবে! হারীত চট করে একবার দেখে নিল প্রমথেশের আর স্বাতীর মুখ, দু-জনকেই একটু নিস্তেজ লাগল। তাহলে কাজ হয়েছে তার কথায়। একটু পরে যখন খাবার ডাক এল, সে সকলের আগে উঠে দাঁড়িয়ে বেশ মোলায়েমভাবেই বলল—চলুন, সত্যেনবাবু। অন্ধকার থেকে আলোর পথে এদের একটুখানিও এগিয়ে আনতে পেরে মনটা বেশ খুশি লাগল তার! তাছাড়া কথাবার্তা বলে খিদেটিও পেয়েছে চনচনে।

হারীত-শাশ্বতী চলে গেল খাওয়ার পরেই, সত্যেন একটু বসল। যাবার সময় বার-বার বিদায় নিল শ্বেতার কাছে—কালই চলে যাচ্ছেন আপনারা?

যাচ্ছি তো।

আমিও ফিরে এলাম আর আপনারাও চললেন।

তবু-তো দেখা হল—কত ভাল লাগল। একটু চুপ করে থেকে, খুব নরম সুরে সত্যেন বলল–আর বুঝি থাকা যায় না কিছুতেই? শ্বেতা হেসে বলল—আবার আসব।

আসবেন তো?—সত্যেন যেন চোখ ফেরাতে পারল না শ্বেতার মুখ থেকে।

বড়ো ভাল তো ছেলেটি—সত্যেন চলে যাবার পর শ্বেতা বলল তার বাবাকে। তোর হাতে একবার যে খেয়েছে, শ্বেতা-রাজেনবাবু হাসলেন—সে কি আর ভুলতে পারে তোকে? ছেলেটির কেউ নেই বুঝি? স্বাতীর যেন ভাল লাগল না কথাটা; বাঁকা সুরে বলল-আ–হা, একজন বড়োসড়ো পুরুষমানুষ, তার আবার কে থাকবে! তবে যে বলেছিলি মা-বাবা-ভাই-বোন নেই? তার মানেই বুঝি কেউ নেই হল? আহা—স্বাতীর শেষ কথাটা লক্ষ্য করল না শ্বেতা—এখানে তবু একটা বাড়ির স্বাদ পেল। পুরুষমানুষ… কত যুদ্ধ সারাদিন…কিন্তু সারাদিনের পর একটা বাড়ি তো চাই। হঠাৎ শ্বেতাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে স্বাতী বলল-বড়দি, তুমি যেয়ো না। শ্বেতা হাত রাখল বোনের মাথায়।

না…যেয়ো না..সত্যি গলা বুজে এল। কাঁদতে লাগল দিদির কাঁধে মুখ লুকিয়ে। সে কী! কাঁদছিস নাকি?…এই! বোকা মেয়ে! ঠেলা দিল বোনের মাথায়, তার ঝাপসা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—আচ্ছা বোকা তো! কাঁদবার হয়েছে কী..চল, শুবি চল! উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে স্বাতীকেও কোমর ধরে টেনে তুলে আবার বলল তোর আর কী…কাঁদলেই হল। এদিকে আমার যে তাতে কষ্ট হয়, সে কথা ভাবিস? থাম এক্ষুণি, নয়তো আমিও কিন্তু কেঁদে ফেলব। এমন মজার মুখভঙ্গি করে বলল যে স্বাতী ভিজে চোখে হেসে ফেলল।

******

সে-রাত্রে সে বড়দির কাছে শুল, ফিশফিশে গলায় একটু-একটু গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। এমন আরামে কতকাল যেন ঘুমোয়নি। উঠতে বেলা হল পরের দিন—বড়দি এর মধ্যেই বাঁধাছাদা নিয়ে ব্যস্ত। স্বাতীও লেগে গেল কাজে, খুঁজে খুঁজে জড়ো করল সারা বাড়িতে ছড়ানোছিটানো বাচ্চাদের জামা-জুতো, শাড়ি ভঁজ করতে লাগল মেঝেতে হাঁটু ভেঙে বসে। শ্বেতা যা এনেছিল তার চাইতে নিয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি। কাপড়চোপড় কত কেনা হল, বুদ্ধি করে বাচ্চাদের শীতের জামাও কিনে ফেলেছে প্রমথেশ। এখন ধরানোই মুশকিল। বড়ো সুটকেসটি এমন আকণ্ঠ হল যে তালা কিছুতেই বন্ধ হয় না। দু-বোন দুদিক থেকে চাপ দিয়ে-দিয়ে নামিয়ে আনে এক-একবার, কিন্তু যেই আটকাতে যায়, অমনি ছিটকে উঠে যায় কটু করে। আর একসঙ্গে হেসে ওঠে দুজনে। শেষটায় স্বাতী চেপে বসল স্যুটকেসের উপর, তারপর দুজনে একসঙ্গে বসে নিচু হয়ে চেষ্টা করল দু-দিকে–কিন্তু ডালাটা বড়ো অবাধ্য। আর যত অবাধ্যতা করে, তত বেড়ে যায় শ্বেতা-স্বাতীর ফুর্তি। এরই মধ্যে রাজেনবাবু এলেন বড়ো একটা শীলবোর্ডের বাক্স হাতে করে। শ্বেতার সামনে নামিয়ে একটু দূরে আলগোছে বসলেন খাটের উপর। মেঝেতে হাঁটু তুলে বসে, হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে শ্বেতা আস্তে আস্তে বের করল আলতা, সিঁদুর, পাউডার, সেন্ট, মাথার তেল, চুলের কাটা, চুলের ফিতে, সাবান, হেজলিন স্নো আর একবাক্স ডিম–সন্দেশ। কিছু বলল না, একটু দেখল তাকিয়ে, তারপর একটি একটি করে প্রত্যেকটির গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আবার তুলে রাখল সেই কাগজের বাক্সে। দোকানেরই সুতো দিয়ে বেঁধে ফেলে এতক্ষণে বাবার দিকে চোখ তুলল। রাজেনবাবু উঠে চলে গেলেন অন্য ঘরে। এর পরে দিনটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। বাবা আপিশে গেলেন, আর আপিশ থেকে ফিরলেন–মাঝখানকার সময়টা যেন বোঝাই গেল না। দিনের গাড়ি হুশ করে চলে গেল রওনা থেকে পৌঁছনোয়। শাশ্বতী এল, আবার হাসাহাসি গল্প খানিকক্ষণ, আজ যেন হাসিটা কিছু। বেশি ফাঁকে ফাঁকে এরই মধ্যে কত কাজের কথা মনে পড়ল শ্বেতার। অনুকূল কতবার ছুটল দোকানে, ঐ দম বন্ধ-বন্ধ স্যুটকেস খোলা হল দু-তিন বার। বিছানা বাঁধবার সময় বিজু এগিয়ে এল আস্তিন গুটিয়ে। প্রমথেশ দিবানিদ্রার আশা ছেড়ে দিয়ে কেবলই পান-জরদা খেতে লাগল। হঠাৎ এক সময় দেখা গেল বাঁধাছাদা সব শেষ। ভরতি-ভরতি দুটো টিফিনকেরিয়ার কাঠের। খাপে বসানো কুঁজোর পাশে দাঁড়িয়ে, বাচ্চারা ফিটফাট ঘুরে বেড়াচ্ছে নতুন জুতোয় খটখট শব্দ করে। রাজেনবাবু শ্বেতার কাছে এসে বললেন—এখন আবার পান সাজতে বসেছিস? ওঠ, সময় হল।

স্বাতী, বাবার ডিবেটা।

অত পান দিয়ে আমার কী হবে–রাজেনবাবু বললেন। প্রমথেশের জন্য বেশি করে নে, পথে ঘাটে। ওঁরটা নিয়েছি-শ্বেতা উঠে গা ধুয়ে পরে নিল খয়েরি রঙের খদ্দরের শাড়ি, গাড়িতে ময়লা হবে না। সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দিল শাশ্বতীকে, নিজেও পরল, তারপর এসে বসল বারান্দার সিঁড়িতে। শাশ্বতী বলল-কী একটা স্যান্ডেল পরেছো বড়দি! সেদিন না বাবা তোমাকে নতুন এনে দিলেন?

হ্যাঁ—ঐ লাল টুকটুকে নতুন স্যান্ডেল নষ্ট করি আর কি পথে ঘাটে পরে। এটা খারাপ কী–বেশ তো।

শ্বেতা—রাজেনবাবু মিটিমিটি হাসলেন—এখনো তোর ইচ্ছে করে নাকি রে নতুন জুতো নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে?

ইচ্ছে করলেই পারি নাকি বড়ো মেয়েটার যন্ত্রণায়? আমার জুতোগুলো পরে পরে ছারখার করে দেয় না? প্রমথেশ গলা-খাকারি দিল—তাহলে বিজু ভাই, একটা ট্যাক্সি…না, দুটো… শাশ্বতীও যাবে স্টেশনে, তুমি ফেরবার সময় পৌঁছিয়ে দিতে পারবে না ওকে?

নিশ্চয়!—বিজু চটপট বেরিয়ে গেল।

হারীত এলো না রে? শ্বেতা জিজ্ঞেস করল।–কথা তো ছিল–ক্ষীণ উচ্চারণ করল শাশ্বতী। সময় পায় না, কত কাজ করে কত দিকে, আর কী কথা বলে, বাঃ!—প্রমথেশ তারিফ করে মাথা নাড়ল। আমাদের মত তো নয়, শুয়ে বসে আইঢাই।

বাবা, সত্যেন তো এল না আজ একবারও–।

সে আর আসে কোথায়-ক্কচিৎ এক-আধদিন।

নাকি? কাছেই থাকে না? তা—যা লাজুক…আমার ওখানে একবার আসে তো বেশ হয়। ওকে বলিস, স্বাতী, কেমন? শাশ্বতী বলল—স্বাতী, তুই যাবি না? স্বাতী চুপ করে বসেছিল গালে হাত রেখে, যেন চমকে উঠে বলল—কোথায়?

স্টেশনে যাবি না আমাদের সঙ্গে?

স্বাতী মাথা নাড়ল।

কেন, চল না।

ন্‌না—

বিজু এসে মোটা গলায় বলল-ট্যাক্সি এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল সব কটি মানুষ। আর ঠিক যেন সেই মুহূর্তটিতে পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামল। যেদিন সত্যেন রায়ের চিঠি পেয়েছিল, আর বসে বসে দেখেছিল জ্বলজ্বলে জল-ভরা সন্ধ্যাতারা, ঠিক সেইরকম লাগল স্বাতীর। আবার সেই বুকভাঙা সন্ধ্যা, ছাইরঙা ছায়াভরা, কুয়াশায় ঝাপসা, আকাশ আর পৃথিবী ভরে সেই অসহ্য বিদায় নিঃশব্দে মাল তুলল দুজন চাকর, নিঃশব্দে রাজেনবাবু একবার দেখে এলেন সব ঠিকমত উঠল কিনা। একবার ঘুরে এলেন ঘরগুলি, দরকারি কিছু পড়ে রইল না তো? ছায়া ছড়াল, ঘনাল, আর ছায়ার মতোই স্বাতী দেখল বড়দি প্রণাম করলেন বাবাকে। প্রণাম করার পরিশ্রমে জামাইবাবু হাঁপাতে লাগলেন ছড়িতে ভর দিয়ে। তারপর বড়দি এসে হাত রাখলেন তার পিঠে, গাল রাখলেন গালে। আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে সবাই এল রাস্তার ধারে, ট্যাক্সিতে ঢুকতে গিয়ে জামাইবাবু সরে এলেন। মুখ ফিরিয়ে হঠাৎ বললেন–স্বাতী, তাহলে যাই?…এত আনন্দ শিগগির করিনি, আবার কবে… যাই, কেমন? বলে হাসলেন, বড়ো বোকার মতো সেই হাসিটা। একটু পরে সেই শূন্য, স্তব্ধ, মরে-যাওয়া বাড়িটার মধ্যে রাজেনবাবু এসে স্বাতীর কাছে বসলেন স্বাতী, কাঁদিস কেন? উপুড় হয়ে, বালিশকে কামড়ে ধরে, স্বাতী ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল।

আর কাঁদে না। লক্ষ্মী, সোনা, আমার স্বাতী-সোনা, আর কাঁদে না।

কিন্তু কান্না তো থামে না স্বাতীর। কী করে থামবে? কে চলে গেল এই বাড়ি ছেড়ে? বড়দি? না, না আমি—স্বাতী গলা ফাটিয়ে চীৎকার করল মনে মনে—এ তো আমি। রোজ সন্ধেবেলা সমস্ত আকাশ কাঁদিয়ে যে চলে যায়, সে তো আমি। আবছা অন্ধকারে, শূন্য মাঠে, ছোট্রো ইস্টিশনে রেলগাড়ি যাকে নামিয়ে দিয়ে যায়, সেও তো আমি! বাবা, আমি যাব না। বাবা, আমি যাব না! কিন্তু এ-কথা শোনেই-বা কে, আর তেমন করে বলতেই-বা পারে না কেন? আর পারে না বলেই তো আরো কান্না পায়।–স্বাতী…স্বাতী-স্বাতী রে..

স্বাতী চোখ খুলল না, মুখ তুললো না। বাবা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন মেয়ের বালিশজড়ানো সুগোল সাদা হাতের দিকে, কালোচুল-ছড়ানো কেঁপে-কেঁপে ওঠা পিঠের দিকে…তাহলে ওর এমন দুঃখও আছে যা আমি বুঝি না। তাহলে ওর এমন কান্নাও হয়েছে যা আমি থামাতে পারি না। চুপ করে পাশে বসলেন। আর ডাকলেন না, নড়লেন না, ছুঁলেন না। বসে বসে কত কথা মনে পড়ল, কত কথা মনে হল। কোনোখানে কোনো শব্দ নেই, চুপচাপ বুক-ফাটা বাড়িটার মধ্যে ঠেলে-ঠেলে উঠতে লাগল স্বাতীর বুকের ভিতর থেকে কান্নার হাওয়া। আর জানলা দিয়ে ঝিরিঝিরি কোঁকড়া হাওয়া মাঝে-মাঝে গায়ে তুলে গেল প্রথম শীতের শিউরানি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *