আলা অল-দিন আবু সামাতের কাহিনী

দুশো পঞ্চাশতম রজনী :

নতুন কাহিনী বলতে শুরু করে সে।

কোনও এক সময়ে কায়রো শহরে এক সদাশয় সম্রান্ত সওদাগর বাস করতো। শহরের সমস্ত সওদাগররা তাকে খুব মান্য করে চলতো। তার সরলতা সততা বিনম্র ব্যবহার সকলকে মুগ্ধ করেছিলো।

এক জুম্মাবারে নামাজ-এর আগে সে হামামে গিয়ে গোসলাদি সেরে নাপিতের কাছে গিয়ে ক্ষৌরকর্ম সেরে নিলো। মাথা ন্যাড়া করে, গোঁফ চেছে ফেলে সে শাস্ত্ৰাচার পালন করতো সদা সর্বদা। নাপিতের কাছ থেকে আর্যশী নিয়ে মাথামুণ্ডু সব ভালো করে নিরীক্ষণ করে দেখলো, যথারীতি কমানো হয়েছে কিনা। প্রায় সাদা লম্বা দাডির দিকে নজর পড়তে মনটা বড় খারাপ হয়ে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ মনে ভাবতে থাকে; বয়স বিকেল হতে চলেছে। এখনও, খুঁজলে কাঁচা দাডিও পাওয়া যাবে অনেক। কিন্তু আরও কিছুকাল পরে, চেষ্টা করেও হয়তো আর কাঁচা দাড়ি খুঁজে বের করা যাবে না। পালিত কেশ বাৰ্দ্ধক্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর বার্ধক্যই মৃত্যুকে কাছে টেনে আনতে থাকে। সে ভাবে, হায় বেচারী সামস-আল-দিন, দিন ফুরিয়ে এলো, সন্ধ্যা হতে চললো। এখন কবরে শয্যা নিতে হবে। অথচ জীবনে কী তুমি পেলে? সারা জীবন ধরে যদি একটা ছেলে-মেয়েরই মুখ না দেখলে তবে কার জন্যে এই বিত্ত-বৈভব রেখে যাচ্ছে? কে খাবো! মোমের শিখার মতো জ্বলতে জুলতে একদিন তুমি নিঃশেষ হয়ে যাবে। বাস সেখানেই তোমার জমানার ইতি হয়ে গেলো। আর কেউ মনে রাখবে না তোমাকে। কেউ বইবে না তোমার বংশের ধ্বজা।

বেদনা বিধুর চিত্তে সে-দিনের মতো সে মসজিদে নামাজ সারে। তারপরবাড়ি ফিরে আসে। বিবি বসেছিলো তার প্রতীক্ষায়। যথারীতি সে খানা-পিনা বানিয়েছে। এক সঙ্গে বসে দু’জনে খাবে। স্বামীর পায়ের শব্দ পেয়ে সে ছুটে যায়। হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলে, আজ এত দেরি হলো কেন, গো?

সওদাগর বিবির উচ্ছলতায় সাড়া দিতে পারে না। গভীর মুখে বলে, কী হবে অত তাড়াহুড়া করে। আমার জীবনে আনন্দ বলতে আর কী আছে? যে-কটা দিন বাঁচি, কোনওরকমে দিনগত পাপক্ষয় করে কাটানো ছাড়া আর কি বা গতি আছে।

সওদাগর বিবি স্বামীর এই উদাস-বিবাগী কথায় কেমন যেন ঘাবড়ে যায়। বলে, তোমার কী হয়েছে গো, হঠাৎ এইরকম কথাবার্তা বলছে কেন?

—কেন বলছি? জান না? তুমিই তো আমার সব দুঃখের একমাত্র কারণ। প্রতিদিন আমি বাজারে যাই, দেখি আমারই সমব্যবসায়ীরা তাদের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে আসে দোকানে। কত আনন্দ স্মৃর্তি করে। আমার বুকের মধ্যে হু হু করে যায়। মনে হয়, আমার এই নিঃসন্তান জীবন উষর এক মরুভূমি। এই ভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো।

সওদাগর বিবি সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে, ওসব নিয়ে মন খারাপ করতে নাই। আল্লাহ যাকে যে ভাবে রাখেন তাতেই সুখী থাকতে হয়। এসো, টেবিলে খানা সাজিয়েছি। হাত মুখ ধুয়ে খাবে চলে।

সওদাগর প্রায় চিৎকার করে ওঠে, আল্লাহর দোহাই, আমাকে বিরক্ত করো না। আমার কোনও ক্ষিদে তেষ্টা নাই। আর তাছাড়া তোমার মতো আঁটকুড়ির হাতে আমি খেতেও চাই না। আজ আমি নিঃসন্তান—সে শুধু তোমার কারণে। শাদীর পর চল্লিশটা বসন্ত বয়ে গেলো। একটা ছেলে বা মেয়ে বিয়াতে পারলে না তুমি। আর একটা বিবি আনবো ঘরে, তাতেও তুমি সব সময় বাদ সেধেছি। আমি নরম প্রকৃতির মানুষ। তোমার বারণ আমি ঠেলতে পারিনি। তুমি বরাবরই আমাকে ধোঁকা দিয়ে এসেছ, ‘আর কিছু দিন সবুর কর, আল্লাহ নিশ্চয়ই মুখ তুলে চাইবেন।’ কিন্তু তুমি জন্মাবধি বন্ধ্যা। আল্লাহ কি করে মুখ তুলে চাইবেন! সব জেনে শুনেও তুমি আমাকে অন্য মেয়ে ঘরে আনতে দিলে না। তোমার কি উচিৎ ছিলো না-আমার মুখে হাসি ফোটানো? তুমি কি নিজে থেকেই বলতে পারতে না—না। আর কোনও আশা নাই, এবার তুমি আর একবার শাদী কর। আজ থেকে কসম খাচ্ছি, তোমার সঙ্গে আর শোব না। সহবাস করবো না। তার চেয়ে বরং লিঙ্গটা কেটে ফেলব। তোমাকে ছুঁতে আমার ঘেন্না হয়। তুমি আর আমার সামনে এসো না। তোমার। মতো বাজা-মেয়ের মুখ দেখলেও পাপ হয়।

সওদাগরের এই অপমানকর কথায় তার বিবি রণমূর্তি ধারণ করলো, মুখ সামলে কথা বলো, বলে দিচ্ছি। নিজের মুরোদে কুলায় না, সব দোষ আমার বাঁধ ঘাড়ে চাপাতে লজ্জা করে না তোমার! তুমি একটা ধ্বজভঙ্গ ক্লীব। আমার জীবনটা ছারখার করে দিয়েছ। একটা দিনের জন্য মিলনের আনন্দ দিতে পোরনি। আজ তুমি আমাকে বাঁজা আঁটকুড়ি বলে গালাগাল দিচ্ছ। কিন্তু কেন আমি বাঁজা, কেন আমি আজ নিঃসন্তান, সে কথা ভেবে দেখেছি কখনও। সে সবই তোমার হীন বীর্যতার কারণে। আমার কোনও দোষ নাই। তোমার যদি ক্ষমতা থাকতো, সন্তান আমি পেটে ধরতাম। মুখে লম্বা লম্বা বাত ছাড়ার আগে নিজের চিকিৎসা কর। শুক্রসঞ্জীবনী দাওয়াই এনে খাও। হয়তো অসুখ সেরেও যেতে পারে। যদি সারে, যদি বীর্যে জীয়ন্ত বীজ বেরোয়, তাহলে দেখে নিও, আমি মা হতে পারি কি না।

বিবির বচনে সওদাগর চুপসে গেলো! আমতা আমতা বললো, হ্যাঁ, তা কথাটা নেহাৎ মিথ্যে বলিনি বোধ হয়! হয়তো আমারই দোষ। মনে হয় আমার বীর্যের তেজ মরে গেছে। তুমি কি জান বিবিজান, তেমন কোনও দাওয়াই কোথাও পাওয়া যায়। কিনা, যা খেলে শরীর চনমান করে ওঠে, এবং বীর্য দৃঢ় হয়?

বিবি পরামর্শ দেয়, তুমি হেকিমের কাছে যাও। সে-ই তোমাকে বাৎলে দিতে পারবে।

এই সময়ে রাত্রি শেষ হয়ে আসতে থাকে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

 

দুশো একান্নতম রজনীতে আবার সে শুরু করে :

–খোদা হাফেজ, সওদাগর বলে, কাল সকালেই আমি দাওয়াখানায় যাবো। দেখি কোনও দাওয়াই পাই কিনা।

পরদিন সকালে দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে সওদাগর এক দাওয়াখানায় এসে দাঁড়ালো। তার হাতে একটা চিনে মাটির বাটি—ওষুধ নেবে বলে নিয়ে এসেছে। দোকানের মালিক সালাম আলেকুম জানিয়ে বললো, আজ সকালে আপনিই আমার প্রথম খদের হতে এলেন, কী আমার সৌভাগ্য! তা সওদাগর সাহেব, কী দাওয়াই দেব?

সওদাগর তার চিনে মাটির বাটিটা পাশে রেখে বললো, আমি এমন একটা দাওয়াই চাই—যা খেলে শরীরে তাগাদ আসে, বাচ্চা পয়দা করার ক্ষমতা জন্মায়।

দোকানী সওদাগরের মুখে এ ধরনের কথা শুনবে কল্পনা করতে পারেনি। তার মতো ধর্মানুরাগী ভাব-গভীর ব্যক্তির মুখে একি কথা। না, এই সকলে তিনি রসিকতা করতে এসেছেন? ঠিক আঁচ করতে পারে না সে। যাইহোক, একটা লাগসই জবাব দিতে হবে। দোকানী বলে, ইস, আপনি যদি কালকেও আসতেন, সওদাগর সাহেব। কাল পর্যন্ত অনেকখানি ছিলো, অনেকগুলো খদ্দের এসে সবটুকু নিয়ে গেছে। দাওয়াইটার চাহিদা খুব বেশি। আপনি বরং এক কাজ করুন, পাশের দাওয়াখানায় দেখুন, হয়তো পেয়ে যাবেন।

সওদাগর আর একটা দাওয়াখানায় গেলো। কিন্তু সে-ও ঠিক একই কথা বলে অন্য দোকানে খোঁজ করতে বললো। এই ভাবে এক এক করে বাজারের সব কয়টা দাওয়াখানাতেই সে খোঁজ করলো। কিন্তু সবাই মুচকী হেসে একই কথা বলে বিদায় করলো তাকে।

খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে ব্যর্থ মনে সে তার নিজের দোকানে এসে বসে। কিছুক্ষণ পরে সামসাম নামে এক দালাল এলো তার কাছে। লোকটা মদ গাঁজা ভাঙ্গ আফিং চরস খেয়ে সব সময় চুর হয়ে থাকে। এবং লোচ্চামীতে গুরুদেব। কিন্তু সামস আল-দিনকে সে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। তার সঙ্গে কখনও, ভাড়ামী বা বেলেল্লাপনা কিছু করতো না। তার সদাশয় বিনম্র ব্যবহার-এ সে মুগ্ধ না হয়ে পারতো না। কিন্তু আজকের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে সওদাগরের মেজাজ ঠিক নাই। কেমন যেন তিরিক্ষিভাব, কোনও কথারই ভালো করে জবাব দিচ্ছে না। নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটেছে। সামসাম জিজ্ঞেস করে, আজ আমন মন মরা হয়ে বসে আছেন কেন সওদাগর সাহেব?

সওদাগর বলে, আমার পাশে এসে বস সামসাম, শোনো আমার দুঃখের কাহিনী। আমি শাদী করেছি আজ চল্লিশ বছর। কিন্তু এমনই দুৰ্ভাগ্য, একটা সন্তানের মুখ দেখলাম না। আজ পর্যন্ত। আমার বিবি বলে, সব দোষ নাকি আমার। আমার বীর্যের দোষ আছে। সস্তান পয়দা করার ক্ষমতা নাই। আজ সারাটা সকাল সমস্ত দাওয়াখানায় খুঁজেছি, কিন্তু কোনওখানেই সেই দাওয়াই পেলাম না। সবাই বলে কাল ছিলো, আজ ফুরিয়ে গেছে। তাই খুব বিষাদ মনে বসে আছি। কিছুই ভালো লাগছে না।

সওদাগরের কথা শুনে সামসাম অবাক হলো না, মজাও পেলো না। গভীরভাবে বললো, কিছু চিন্তা করবেন না, দাওয়াই আমার বিলক্ষণ জানা আছে। আপনি আমাকে একটি দিনার দিন। আমি মালমসলা কিনে এনে নিজে হাতে বানিয়ে দিচ্ছি।

—ইয়া আল্লা, সওদাগর প্রায় চিৎকার করে ওঠে, তাও কি সম্ভব? আল্লাহর নামে হলফ করে বলছি, তুমি যদি সত্যিই আমাকে সন্তানের বাবা করে তুলতে পার তাহলে তোমার ভাগ্য আমি ফিরিয়ে দেব, শেখ। ঠিক আছে একটা কেন, এই নাও দুটো দিনার দিলাম। মশলা পাতি নিয়ে এসো। বানাও দেখি কেমন সে ধন্বন্তরী দাওয়াই!

চিনে মাটির বাটিটা আর দুটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে সামসাম বেরিয়ে গেলো। লোফার সামসাম নিজেকে ভাবে সে একটা দিগগজ হেকিম। যা যা মসলাপত্ব মনে করলো, কিনে নিয়ে ফিরে এলো সে সওদাগরের দোকান। তারপর চললো তার দাওয়াই বানানোর পর্ব :

একটার সঙ্গে আর একটা মশাল সে মিশিয়ে ফেলে। পিষে গুড়ো করলো। সব শেষে খানিকটা মধু দিয়ে মেড়ে এক রকমের থাক-থকে খানিকটা গোলা বানালো। দাওয়াই-এর বাটিটা সওদাগরের হাতে তুলে দিয়ে বললো, এই নিন একেবারে মোক্ষম জিনিস। খেলেই আবার নতুন যৌবন ফিরে পাবেন। রাতে শুতে যাবার ঠিক দুঘণ্টা আগে একমাত্রা খাবেন। কিন্তু তার আগে তিনদিন আপনাকে রোজ একটা করে পায়রার দৌপিয়াঁজী খেতে হবে। বেশ ঝাল মসলা দিয়ে বানাতে বলবেন। আর খাবেন পাকা পোনার কালিয়া, ভেড়ার অণ্ডকোষ ভাজ। এর পর যদি আপনার শের-এর মতো তাগাদ না আসে, যদি বাচ্চা পয়দা করার ক্ষমতা’ না জন্মায়, আপনি আমার এই দাড়ি উপড়ে ফেলবেন—আমার মুখে থুথু দেবেন।

এই বলে সামসাম বিদায় নিলো। সওদাগর ভাবলো, লোকটা মদ ভাং খেয়ে আর মেয়ে-মানুষ নিয়েই সারাটা জীবন কাটাচ্ছে। এ ব্যাপারে তার ওপর ভরসা রাখা যায়। নিশ্চয়ই সে আনতাবডি কিছু একটা বানিয়ে দেয় নি। হয়তো কাজ হলেও হতে পারে। আর দেরি না করে সে তক্ষুণিবাড়ি চলে এলো। বিবিকে সব কথা বললো! আগের রাগ সব জল হয়ে গেছে। আবার তারা এক সঙ্গে বসে খানাপিনা করলো। এক শয্যায় রাত কাটালো।

সামস আল-দিন যথাযথভাবে সমস্যামের নির্দেশ মেনে চলতে থাকলো। পায়রার দোপিয়াজী, পাকা পোনার কালিয়া, ভেড়ার অণ্ডকোষ ভজা-প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এই কয়টি খনাই প্রধান হয়ে উঠলো। তিনদিন পরে সে শোবার দুঘণ্টা আগে একমাত্ৰা দাওয়াই খেলো। বেশ সুস্বাদু। কিছুক্ষণের মধ্যে শরীর গরম হয়ে উঠলো। যেন সে আবার তার হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে। ধী করে বয়সটা তার চল্লিশ বছর কমে গেছে। সেদিন তার বিবি প্রথম বুঝতে পারলো যৌবনের স্বাদ। লোকটা যেন একটা বীর পুরুষ-শোরের মতো, তার শরীরটা থাবার মধ্যে পুরে নিলো। সেই রাতে সওদাগর বিবি সত্যিই সন্তান সম্ভবা হলো। কিন্তু নিঃসংশয় হলো মাস তিনেক বাদে-সে যখন দেখলো, পরপর তিনটি মাস তার মাসিক ধর্ম আর হলো না।

যথা সময়ে সওদাগর বিবি একটি পুত্র-সন্তান প্রসব করলো। ছেলেটি এমন হৃষ্টপুষ্ট চেহারার হলো, ধাই তো দেখে অবাক। বললো, সারা জীবন এই করে আসছি, কিন্তু এমন তাগড়াই বাচ্চা কারো হতে দেখিনি। দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না-সদ্য হয়েছে। মনে হয়, বছরখানেক বয়স হবে।

বৃদ্ধ ধাই আল্লাহর নামগান করতে করতে বাচ্চাকে ধোয়ালো মোছালো। তারপর মায়ের কোলে দিয়ে বললো, ছেলেকে মাই খাইয়ে ঘুম পাডিয়ে দাও। :

তিনদিন তিন রাত পরে পাড়াপাড়শীর সকলকে মিঠাই বিতরণ করা হলো। বৃদ্ধ ধাই ইনাম নিয়ে চলে গেলো। সাতদিনের দিন ঘরে নুন ছড়ানো হয়। সওদাগর ঘরে এসে বিবিকে বললো, কই গো ছেলের মা, দেখাও, আল্লাহর আশীৰ্ব্বাদটা একবার নয়ন ভরে দেখি।

সওদাগর বিবি ছেলেকে তুলে ধরে। মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকে সওদাগর। —ইয়া আল্লাহ, কী সুন্দর! যেন আসমানের চাঁদ নেমে এসেছে আমার ঘরে। আর দেখ, বিবিজান, কত বড়টা হয়েছে! আচ্ছা, ছেলের কী নাম রাখবে?

—যদি মেয়ে হতো, সওদাগর বিবি বলে, তাহলে আমি একটা-নাম দিতাম। ছেলের নাম তুমিই দাও।

বাচ্চাটার বা উরুতে একটা ছোট্ট তিল দেখে সওদাগর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।—আমরা একে আল। অলদিন আবু সামাত বলে ডাকবো, কেমন?

সেই থেকে ছেলের নাম আলা-অলদিন আবু সামাতই হয়ে গেলো। কিন্তু নামটা বেশ বড়সড় বলে সকলে ওকে আবু সামাত বলেই ডাকে। চার বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেকে দুটো ধাই আর তার মা বুকের দুধ খাওয়ালো। ঐ বয়সে সে তাগড়াই সিংহ শাবকের মতো লাফাতে থাকে। পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বনিতা তাকে দেখে মুগ্ধ হয়। ভালোবাসে। কারণে অকারণে সওদাগরেরবাড়ি এসে তারা ভিড় জমায়। ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করতে চায়। কিন্তু ঐ শিশু সামাতের ওসব বিলকুল পছন্দ নয়। কারো কোলেই সে থাকতে চায় না। কারো আদর চুম্বনই সে বরদাস্ত করতে পারে না। সওদাগর আর তার বিবিও পাড়া-পড়শীদের এই আদর-সোহাগ ভালো চোখে দেখে না। সওদাগর বলে, সামাতকে সামলে রাখবে। অন্য লোকের নজর লাগাতে পারে।

সেইদিন থেকে আবু সামাতকে আর সকলের সামনে বের করা হলো না। অন্দরের এক নিভৃত কক্ষে রাখা হলো তাকে। আদর যত্নের কোনও ত্রুটি রাখলো না সওদাগর। একটা ছেলের জন্য পাঁচটা বাঁদী চাকরের ব্যবস্থা করা হলো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করে। নামজাদা মৌলভীর হাতে তার শিক্ষা দীক্ষার ভার দেওয়া হয়। যথা সময়ে সে কোরান এবং নানা বিদ্যায় বিশারদ হয়ে ওঠে। শুধু লেখাপড়া নয় খেলাধূলাতে সে বেশ চৌকস হতে লাগলো। কিন্তু সবই তার এক একা—সবই লোক চক্ষুর আড়ালে—সেই নিভৃত কক্ষে।

এই ভাবে চৌদ্দটা বছর কেটে গেছে। আবু সামাতের গোঁফের রেখা ফুটছে। একদিন চাকর খানা সাজিয়ে দিয়ে চলে গেছে। যাওয়ার আগে ঘরের দরজায় শিকল তুলতে সে ভুলে গিযেছিলো। দরজা খোলা পেয়ে সামাত এক পা এক পা করে ঘরের বাইরে আসে। এই নিভৃত বন্দী জীবন তার আর ভালো লাগে না। সে চায় মুক্ত আলো হাওয়া-মানুষের সাহচর্য।

এঘর ওঘর করতে করতে এক সময় সে চলে আসে তার মা-এর ঘরে। সেখানে তখন তার মা পাড়ার কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে খোশ গল্পে মশগুল। মেয়েগুলোও তন্ময় হয়ে গল্প শুনছিলো। হয়তো কারো বেশ-বাস অসংবৃত হয়েও থাকতে পারে। হঠাৎ এক উঠতি বয়সের ছেলেকে ঘরে ঢুকতে দেখে সকলে সম্বিত ফিরে পায়। ক্ষিপ্র হাতে যে যার মতো বোরখা টেনে নিয়ে দেহ মাথা মুণ্ড ঢেকে ফেলে।

—ইয়া আল্লাহ, কী বে-শরাম বে-ইজতের কথা। বলা নাই কওয়া নাই, হুট করে মেয়েদের ঘরে ঢুকে পড়লো!

আবু সামাতের মা বলে, এ আমার ছেলে, আমার চোখের মণি। একে লজ্জা করার কী আছে? এতদিন সে দাসদাসীদের পরিচর্যায় মানুষ হয়েছে। বাইরের কোনও ছেলে মেয়ের সঙ্গে মিশতে দিইনি।

এই কথা শুনে মেয়েরা নাকাব সরিয়ে দেয়, তাই বলুন। তা এতদিন তো আপনার ছেলেকে দেখিনি কখনও। আপনার মুখে তার কথা শুনিওনি কোনওদিন।

সওদাগর বিবি উঠে গিয়ে ছেলেকে আদর করে চুমু খায়। বলে, বেটা, এখন তোমার ঘরে যাও।

বান্ধবীরা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে দেখে ছেলেকে তার ঘরে পাঠিয়ে দিলো।-ওর বাবা, ওকে বাইরে বেরুতে দেয় না। বাদ ছেলেদের সঙ্গে মিশে খারাপ হয়ে যেতে পারে, এই তার ভয়। তাই সে একা একাই মানুষ হচ্ছে। ঘরের মধ্যেই তার নাওয়া খাওয়া খেলাধূলা লেখাপড়ার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। যতদিন না সে বড় হয়-দাড়ি গোঁফ গজায়, ততদিন সে এইভাবেই মানুষ হবে-এই আমাদের ইচ্ছা। ছেলের যা রূপ তাতে ভাই সত্যিই ডর লাগে, হয়তো কোন খারাপ মেয়ের পাল্লায় পড়ে নিজেকে নষ্ট করে ফেলবে। আজই এই প্রথম দেখলাম। সে আমার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছিলো। হয়তো ঘরের দরজায় শিকল তুলে দিতে ভুলে গেছে। চাকরগুলো।

সওদাগর বিবির বান্ধবীরা বিদায় নেবার সময় ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বললো, খুব সুন্দর ছেলে হয়েছে। আপনার। চাঁদের মতো দেখতে। আহা-চোখ জুড়িয়ে যায়। আল্লাহ তাকে শতায়ু করে বাঁচিয়ে রাখুন।

কিছুক্ষণ পরে আবু সামাত আবার মা-এর কাছে ফিরে আসে। বাইরের আঙ্গিনায় সে দেখতে পায়, একটা খচ্চরের পিঠে জীন লাগাম পরাচ্ছে চাকরেরা।

-আচ্ছা মা, আবু সামাত প্রশ্ন করে, এই জানোয়ারটাকে ঐভাবে সাজাচ্ছে কেন ওরা?

—তোমার বাবাকে বাজার থেকে আনতে যাবে। তার ফেরার সময় হয়ে এসেছে কিনা, তাই। আমার বাবা কী করেন মা, কীসের ব্যবসা তার?

মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে, তোমার বাবা মন্তবড় সওদাগর–সারা কইরো শহরে তার খুব নাম ডাক। আরবের সুলতান এবং নানা দেশের রাজা বাদশাহদের সঙ্গে তার কারবার। একটা মোটামুটি ধারণা কর : কোনও ছোটখাটো খদ্দের তার কাছে সোজাসুজি সওদা করতে পারে না। কমপক্ষে এক হাজার দিনারের লেন দেন না হলে দালাল ধরে যেতে হয় তার কাছে। তা যদি নশো নিরানব্বই দিনারও হয়—তবু! তোমার বাবা সওদাগর সমিতির প্রধান। তার কথা ছাড়া কইরোর কোনও সওদাগরই শহরের বাইরে বাণিজ্য করতে যেতে পারে না। আল্লাহর দোয়ায়, তোমার বাবা শহরের সেরা ধনী। সবাই খুব মান্য গণ্য করে।

–খোদা মেহেরবান, তিনি আমাকে সম্রান্ত সওদাগরের ঘরে জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু মা, আমি ঐ ঘরে বন্দী হয়ে আর কতকাল কাটাবো। আমার জীবন হাঁফিয়ে উঠেছে। কাল থেকে আমি বাবার সঙ্গে দোকানে গিয়ে বসবো।

—ঠিক আছে বাবা, অধৈৰ্য হয়ে না, তোমার বাবা ফিরলে আজ সন্ধ্যাবেলা তার সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলবো আমি।

সন্ধ্যাবেল খেতে বসে সওদাগর বিবি কথাটা পেশ করলো, দ্যাখ, ছেলেটা বড় হচ্ছে, এভাবে তাকে আর ঘরে আটকে রাখা ঠিক না। তুমি বরং সঙ্গে করে দোকানে নিয়ে যাও তাকে। নিজের ব্যবসা বাণিজ্য নিজে দেখে শুনে বুঝে নিতে হবে তো।

—কিন্তু আবু সামাতের মা, সওদাগর বলে, তুমি তো জান, চারপাশের মানুষের কি শকুনের দৃষ্টি। ছেলেটা যদি কারো কুনজরে পড়ে!

সওদাগর বিবি বলে, কিন্তু তাই বলে ছেলেটাকে এইভাবে বন্দী করে রাখাও কি ঠিক?

—তুমি কি কিছুই খোঁজ রাখ না, বিবি? ওপাড়ার একটি ছেলে একটা ডাইনীর বিষ নজরে পড়ে সেদিন মারা গেছে। যতগুলো বাল বাচ্চা মারা যায়। তার প্রায় সবই এই একই কারণে।

সওদাগর বিবি বাধা দিয়ে বলে, তাই বলে ছেলেকে তুমি বাইরে বেরুতে দেবে না। সবাই নিজের নিজের ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। শিকল দিয়ে বেঁধে খাঁচায় পুরে রাখলেই কি নিয়তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়? নসীবের লেখা পালটানো যায় না। যা হবার তা হবেই। ও নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি করে কোনও ফায়দা নাই। এইভাবে তাকে যদি সবারই কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রোখ তাহলে আখেরে তার কী ভালোটা হবে, শুনি? তুমি বুড়ো হয়েছ। মরতে একদিন হবেই। তোমার মরার পর এই বিশাল ব্যবসা বাণিজ্যের একমাত্র মালিক হবে সে। কিন্তু সারা কইরো শহরে তোমার চেনাজানা বন্ধু-বান্ধব সম-ব্যবসায়ী কেউই তোমার ছেলের সুরৎ দেখেনি। হঠাৎ দুম করে সে যদি তোমার অবর্তমানে দোকানে গিয়ে বসতে চায় কেউ তাকে স্বীকার করবে? তোমার দোকানের কর্মচারীরাও যদি বলে বসে, কে সে, তাকে তারা জানে না, তখন? আর তাছাড়া এত বড় ব্যবসা-কী তার হালচাল, কী তার তারিকা কিছুই তার জানা থাকবে না। কেমন করে সে চালাবে তখন? তুমি বলবে, আমি তো আছি। আমিই সবাইকে বলবো, ‘এই হচ্ছে সওদাগর সামাস অল-দিনের একমাত্র সন্তান—তার ব্যবসার একমাত্র উত্তরাধিকারী। কিন্তু আমার কথা শুনবে কেন তারা? আমি বানিয়েও বলতে পারি। তারা হয়তো অবিশ্বাস করতে পারে-আবু সামাত তোমার ঔরসের সন্তান নয়। তখন? তখন কী হবে? সরকারের ফৌজদার এসে তোমার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি আটক করে নিয়ে যাবে। তোমার ছেলে আর আমি তখন কি আঁটি চুসবো? আমি যদি শহরের পাঁচজন সম্ভ্রান্ত লোককে সাক্ষী মানতে যাই– বেহজ্জৎ হয়ে যাবো। তারা বেমালুম বলে দেবে, ‘কই সওদাগর সাহেবের কোনও সন্তানাদি ছিলো বলে তো আমরা শুনিনি কখনও!’ সে-অবস্থায় তাদেরও দোষ দেওয়া যাবে না। সত্যিই তো তারা কখনও শোনেনি তোমার ছেলের কথা। বা চোখেও দেখেনি কখনও?

বিবির কথায় সওদাগরের চৈতন্য উদয় হয়। হাঁ, ঠিক সাচ্চা বাত বলেছে বিবি। অতটা তো সে টীব তলিয়ে দেখেনি। হাজার হলেও মেয়েমানুষের সম্পত্তি জ্ঞান টনটনে হয়।

—খোদা হাফেজ, তুমি ঠিক বলেছ, বিবিজান। আমি কাল থেকে আবু সামাতকে সঙ্গে করে দোকানে নিয়ে যাবো। চেনা জানা সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করিয়ে দেব। নাঃ, তুমি যথার্থ কথা বলেছ। বিষয় সম্পত্তির ব্যাপার! আর আমার শরীর স্বাস্থ্যের কথাও কিছু বলা যায় না। তাছাড়া এখন থেকে কেনা বেচার তরিকাগুলো না শেখালে পরে ব্যবসাই বা চালাবে কি করে?

তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে সামস আল-দিন বললো, বেটা, কাল থেকে তুমি আমার সঙ্গে দোকানে বেরুবে। কথাটা শুনে হয়তো পুলকে প্রাণ নেচে উঠছে তোমার কিন্তু বাবা, খুব সাবধান, দুনিয়ায় দুষ্ট লোকের অভাব নাই। মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। সেই ধূর্ত শয়তানদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাই সব চেয়ে কঠিন কাজ। এতদিন ধরে তুমি তোমার গুরুর কাছে যে বিদ্যা শিখেছ, তা এবার কাজে লাগাতে হবে। মানুষের সঙ্গে সব সময়ই সদ্ব্যবহার করবে। আর নজর রাখবে কে তোমার অনিষ্ট সাধনে সচেষ্ট। তাকে সযত্নে পরিহার করে চলবে।

এমন সময় প্রভাত হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

 

দুশোচুয়ান্নতম রাতে আবার সে বলতে শুরু করে।

পরদিন সকালে সামস আল-দিন ছেলেকে নিয়ে হামামে গোসল করতে যায়। খুব ভালো করে। স্নানাদি শেষে সম্রান্ত সওদাগরের সাজ-পোশাকে সাজগোজ করে দুজনে। নাস্তা পানি সেরে খচ্চরের পিঠে চাপে সামস আল-দিন, আর ছেলেকে পিছনে বসায়। রাস্তার লোক সামাতকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এমন সুন্দর চেহারা সচরাচর চোখে পড়ে না! যেন একেবারে পূৰ্ণ চাঁদের হাট। কে বটে ছেলেটা-এর আগে তো কখনও দেখিনি। মোট কথা যেই দেখে, প্রশংসায় উচ্ছসিত হয়ে ওঠে।

দোকানের কাছে আসতে সেই মদ ভাঙ্গ আফিঙ চরস খোর বেহেড মাতাল সমস্যামের সঙ্গে দেখা হয়। লোকটা তখন তুরীয় মার্গে বিচরণ করছিলো। সওদাগরের সঙ্গে আবু সামাতকে নামতে দেখে চোখ দুটো কপালের ওপর টেনে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করে ঠোঁট বাঁকিয়ে এক বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী করে বলে, কে বাবা, আসমানের চাঁদ-মাটিতে নেমে এলে?

সারা রাত ধরে গাজা চরস-এ দম দিতে দিতে সব কিছু তার তালগোল পাকিয়ে গেছে। এখন আর লঘু গুরু কোনও জ্ঞান নাই। যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছে। সব ভুলে মেরে দিয়েছে, সে-ই একদিন মহা তোড়জোড় করে সওদাগরকে এক মোক্ষম দাওয়াই বানিয়ে দিয়েছিলো। এবং সেই দাওয়াই-এর কল্যাণেই আজ সে চাঁদের মত ফুটফুটে ছেলেকে পেয়েছে। বৃদ্ধ সওদাগরের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে সে তামাশা করতে থাকে, দেখ, দেখ সবাই, অমাবস্যায় চাঁদের উদয় হয়েছে। বুড়োর চুল দাড়ি সব সফেদ হলে কি হবে, শরীরে এখনও মজবুত জোয়ানের মত তাগাদ আছে তা নাহলে, হাঁ হাঁ বাবা, এই বুড়ো হাড়ে ভেন্ধী খেলাতে পারে?

গাঁজা চরসের পাজী নেশা। একটা কথা মুখে এলে, বারবার সেই কথাটা নিয়েই সে নাড়াচাড়া করতে থাকে। সমস্যামের অবস্থা তখন তাই। যাকে সামনে পায় তাকেই ডেকে ডেকে বলে, দেখ, দেখ তোমরা, অমাবস্যায় পূৰ্ণচাঁদের উদয় হয়েছে। বুড়ো হাড়ে বসন্ত জেগেছে।

নিজের কাঁচা রসিকতায় নিজেই সে হাসতে থাকে। কিন্তু কথাটা মাতালের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতে পারলো না সকলে। চারদিকে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো নিমেষে।

প্রধান-সওদাগররা এক জায়গায় জড়ো হয়ে আলোচনায় বসে। ব্যাপারটা বিষদভাবে খতিয়ে দেখতে চায় তারা। সত্যিই তো এতদিন তারা বৃদ্ধ সওদাগর সামস অল দিনের কোনও সন্তানাদির সংবাদ জানে না; আজ হঠাৎ একটা ছেলেকে সঙ্গে এনে নিজের ছেলে বলেই বা পরিচয় দিচ্ছে কেন? তারা সামসামকে ডেকে পাঠালো।

সমবেত সওদাগরের সামনে সামসাম ঠাট্টা বিদ্রািপ ভরা কণ্ঠে বলতে থাকে? আমি আমাদের মাননীয় সভাপতি সাহেবকে ছোট করে দেখতে চাই না। তার মান-ইজত খোয়া যাক, মরে গেলেও তেমন কথা আমার মুখ দিয়ে বেরুবে না। কিন্তু আপনারাই বিচার করুন সাহেব, হঠাৎ একটা চোদ্দ বছরের ছেলেকে তিনি পেলেন কোথায়? আমার মনে হয়, এইরকম একটা অসৎ লোক এই সভার সভাপতি হয়ে থাকার অযোগ্য। তাকে বরখাস্ত করে অন্য কাউকে এই ভার দেওয়া হোক, এই আমার আর্জি।

সামাসামের অকাট্য-যুক্তি কেউ খন্ডন করতে পারলো না। সকলে একবাক্যে স্বীকার করে নিলো, না, এরকম অসৎ-লোককে এইরম দায়িত্বশীল পদে রাখা উচিৎ নয়।

দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু বান্ধব এবং সমব্যবসায়ীরা প্রতিদিন এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে যায় সামস আল-দিনকে। কিন্তু আজ এতটা বেলা হলো কেউ এদিক মাড়াল না। সামস অল-দিন ভেবে পায় না, হঠাৎ আজ কেন এমন হলো। একজনের পর একজন চেনা লোক দোকানের সামনে দিয়ে সটকে পড়ে। কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে না, কথা বলে না। দালাল সামসামও দোকানের দিকে পিছন ফিরে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সামস অল দিন আর চুপ করে থাকতে পারে না। বেশ একটু চড়া গলাতেই হাঁক দিলো। ও ভাই সামসাম, এদিকে শোনো না?

সামসাম এই ডাকার অপেক্ষাতেই ধীর কদমে চলছিলো। এবার সে মুখ ফিরিয়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়।

—কী ব্যাপার, সামসাম, তোমরা সব পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে কেন? রোজ সকালে সকলে এসে আমাকে ফতিয়াহ শুনিয়ে যায়। আজ কেউ এলো না কেন?

সামসাম খুক খুক করে কাশে, হুম, আমি তো কিছুই জানি না। সাহেব। কিন্তু সারা বাজারে একটা চাপা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। কান পেতে শোনা যায় না–এমন নচার সব কথা! আজি সকালে বাজারে এক সভা ডাকা হয়েছিলো, আপনি জানেন না, কী সব জঘন্য নোংরা কথাবার্তা আপনার নামে উঠেছিলো। আমি তো তাজ্জব বনে গেছি, আপনার মতো সদাশয় ধর্মপ্ৰাণ মানুষকে ওরা বাতিল করে দিয়ে নতুন সভাপতি ঠিক করে ফেলেছে!

সামস-অল দিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কিন্তু মুখের কথায় কোনও চাঞ্চল্য প্রকাশ না করে বলে, আচ্ছা সামসাম, কারণ-টা কী বলতে পার। কী আমার গোস্তাকি।

সামসাম কোমরটা ঈষৎ হেলিয়ে সওদাগরের কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে, আমার কাছে তো আপনার কোনও লুকোচাপা কিছু নাই, সাহেব, আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো এই চাঁদের মতো ফুটফুটে সুন্দর ছেলেটাকে আপনি এই দোকানে এনেছেন কী কম্মে? ওকে দিয়ে মাছি তাড়াবেন, তা তো কেউ বিশ্বাস করবে না। মনে রাখবেন সাহেব, ওদের এই নোংরা কথার আমি ভীষণভাবে প্রতিবাদ করেছি। মনে করুন। ঐ এক ঘর ব্যবসাদারের সভায় একমাত্র আমিই ছিলাম। আপনার পক্ষে। আর সবাই আপনার কুৎসায় মেতে উঠেছিলো। আমি ছাড়িনি, বলেছি-ওদের জোর গলায় বলেছি সাহেব, যদি সওদাগর সামস আল-দিন এই বুড়ো বয়সে কোন অল্প বয়সের কচি ছোকরায় আসক্ত হয়ে থাকে–সে খবর সবার আগে আমিই জানবো তো? কারণ কায়রো শহরে যে-সব বুড়ো কতাঁর এই রোগ আছে তার দাওয়াই-পত্ব তো আমিই দিয়ে থাকি। আমি ছাড়া অল্পবয়সের সুন্দর চেহারার লোড়কা জোগাড় করে দেবে কে? আপনি কিছু ভাববেন না। সাহেব, আমি তাদের আচ্ছা করে ঠুকছি। বলেছি, ছেলেটি নিশ্চয়ই তাঁর বিবির কোনও নিকট আত্মীয় হবে। অথবা বাগদাদ কিংবা তাঁতার শহরের কোনও বন্ধু বান্ধবের ছেলেও হতে পারে। তবে আপনার রুচির প্রশংসা না করে উপায় নাই, কর্তা। দারুণ ছেলে জোগাড় করেছেন। আপনি। লাখে একটা মেলে।

এই সময় রজনী অতিক্রান্ত হতে চলেছে দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

 

দুশো পঞ্চান্নতম রজনী :

আবার সে বলতে থাকে। —চুপ কর বেয়াদপ, সওদাগর গর্জে ওঠে, ওহে চরসখের তুমি কি ভুলে গেছ সব কথা। তুমি না একদিন আমাকে ছেলে পয়দা করার দাওয়াই বানিয়ে দিয়েছিলে।

সামসাম বলে, কিন্তু এই চোদবছরের লোড়কা এতদিন ধরে কি মায়ের গর্ভেই ছিলো, সাহেব? আগে তো কখনও দেখিনি একে?

—শোনো সামসাম, তোমার দাওয়াই খাওয়ার পর আমার বিবি এই ছেলের জন্ম দেয়। তারপর এই চৌদ্দটা বছর ধরে তাকে ঘরের মধ্যে আমি কয়েদ করে মানুষ করেছি। আমার শুধু ভয় হতো, না জানি কোন দুষ্ট মানুষের কুনজর পড়ে তার ওপর। সেইজন্যে তাকে বাইরে বের করিনি। আজ এতদিন বাদে তাকে দোকানে নিয়ে এসেছি-এই প্রথম। ব্যবসা-বাণিজ্য তাকে শেখাতে হবে তেঁ। আমার এতবড় ব্যবসার এ-ই তো একমাত্র মালিক। তোমাকে এতদিন বলার তেমন সুযোগ হয়নি। যাক, এই নাও তোমার ইনাম। রাখি, এই এক হাজার দিনার।

সামসামের সব মনে পড়ে। আর কোনও সংশয় নাই, এ ছেলে এই বৃদ্ধ সওদাগরেরই। তাড়াতাডি সে ছুটে গিয়ে বাজারের সব দোকানে আগাগোড়া সব বৃত্তান্ত খুলে বলে। দোকনীরা বুঝতে পারে, অনুতপ্ত হয়। সওদাগর সামস-অল দিনের কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, তাদের ভুলের জন্য তারা লজ্জিত। সওদাগর-সন্তানের দীর্ঘায়ুকামনা করে। বলে, তা এমন সুন্দর ছেলের বাবা হলেন আপনি, আমাদের মিষ্টিমুখ করাবেন না?

—নিশ্চয়ই করাবো। একশোবার করাবো। শুদু আসিদার মধুই না, পেটপুরে ফলার খাওয়াবো সকলকে। কাল সকালে আপনারা সবাই আসুন আমার বাগান বাড়িতে। সেখানেই খানাপিনার ব্যবস্থা করছি আমি।

সামস-অল দিন আর দেরি না করে ছেলেকে সঙ্গে নিয়েবাড়ি ফিরে আসে। পরদিন সকালে অভ্যাগত অতিথিরা আসবে তার বাগান বাড়িতে। তারই তোড়জোড় করতে থাকে। চর্কিওলা তাগড়াই ভেড়া কেনা হয়। জাইনি গলির মিঠাইওলাকে মুখরোচক মিঠাই মণ্ডার বায়না দেওয়া হয়। ঝুডি ঝুডি শব্জী, ফল আসে। সারা বাড়িতে উৎসবের ধূম পড়ে যায়।

পরদিন সকালে সওদাগর পুত্র আবু সামাতকে সঙ্গে নিয়ে বাগানবাড়িতে চলে যায়। সেখানে দাস দাসী চাকর নফররা আগে থেকেই হাজির ছিলো। বাবুর্চিখানা পাকাতে ব্যস্ত। খানসামারা খাবার জায়গা ঠিক করছে। এলাহী ব্যব্যাপার।

যথাসময়ে অভ্যাগতরা আসতে থাকে। সওদাগর বয়স্কদের আপ্যায়ন করে বসায়। আর ছোট ছোট ছেলেদের তদারকির ভার পড়ে আবু সামাতের উপর।

সবাই বেশ আনন্দ করে খানা পিনা করলো। গান বাজনায় জমে উঠলো আসর। আতর আর ধূপের গন্ধে ভরপুর হয়ে গেলো চারদিক! খানা শেষ হয়ে গেলো, চাকররা শরবতের গেলাস বাড়িয়ে দিলো নিমন্ত্রিতদের সামনে।

এইসব অভ্যাগতদের মধ্যে সামস-অল দিনের এক বিত্তশালী খাদেরও এসেছিলো। তার নাম

মাহমুদ।

রাত্রি প্রভাত হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

 

দুশো ছাপান্নতম রাতে আবার সে কাহিনী শুরু করে :

মাহমুদ কিশোর আবু সামাতকে দেখে মুগ্ধ হয়। আবু সামাত তখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছুটাছুটী খেলায় মেতে উঠেছে। আজ চৌদ্দটা বছর সে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়েছিলো।

মাহমুদ তাকে ইশারায় কাছে আসতে বলে। সামাত খেলা বন্ধ করে সামনে এসে দাঁড়ায়। মাহমুদ বলে, ইস, কী-সব মজাদার কিসসা আমরা বলছিলাম, তুমি শুনতে পেলে না?

আবু সামাত সপ্রশ্ন নয়নে তাকায়, কিসের কিসসা?

–আঃ সে বড় চমৎকার। দামাসকাস, আলেপ্পা, বাগদাদের সব কাহিনী। তোমার বাবা তো বহুৎ বড় সওদাগর। তার সঙ্গে নিশ্চয়ই অনেক দেশ ঘুরেছ? দু একটা কিসসা আমাদের শোনাও না।

–আমি? আপনারা বোধ হয় জানেন না, জন্মের পর থেকে আমার মা বা আমাকে ঘরের বাইরে বেরুতে দেননি। কোনও মানুষের সঙ্গে মিশতে দেন নি। এই সবে দুদিন হলো আমি বাইরে বেরুবার অনুমতি পেয়েছি। তাও শুধুমা-এর জন্যে সম্ভব হয়েছে। বাবা আসলে কিছুতে দোকানে নিয়ে যেতে রাজী ছিলেন না। শুধুমা-এর চাপে পড়ে বাধ্য হয়েছেন।

–বেচারী! এই দুনিয়ার এত রূপ রস গন্ধ, সব থেকে তোমাকে বঞ্চিত করে রেখেছিলো তোমার বাবা? ঘর চেড়ে বাইরে না বেরুলে কি করে বুঝবে বেড়াবার কি আনন্দ!

আবু সামাত বলে, হয়তো আপনার কথা ঠিক, তবু ঘরেরও তো একটা আলাদা আকর্ষণ আছে।

—তুমি কুয়োর ব্যাঙ-এর মতো কথা বলছো। তারা ভাবে ঐ কুয়োর সীমানা ছাড়া আর বুঝি কিছুই নাই। আর তাছাড়া তোমার বোধহয় ভয়, বাইরের নানা দেশের নানারকম জল-হাওয়ায় তোমার এই মেয়েলী ধাঁচের মাখনের মতো শরীর হয়তো গলে যাবে। শুধু মেয়েরাই ঘর ছাড়া পাখীর মতো নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা ভাবতে পারে না।

আবু সামাতের পৌরুষে আঘাত লাগে। তৎক্ষণাৎ সেবাড়ি চলে আসে। মা-এর কাছে ছুটে যায়। ছেলের সেই উদ্রান্ত চেহারা দেখে মা উৎকণ্ঠিত হয়। বলে, কী হয়েছে বাবা? কেউ তোমাকে কিছু বলেছে নাকি?

আবু সামাত তখন ঐ সব ঠাট্টা-তামাসার কথা বলে। —মা, এ-রকম খাঁচায় পোরা বন্দীজীবন আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তোমরা আমাকে দুনিয়ার সব কিছু সুন্দর রূপ-রস-গন্ধ থেকে বঞ্চিত করে রেখেছি। আমি আর তোমার আঁচলের তলায় থাকবো না। তোমরা যদি বাধা দাও, নিজের বুকে নিজেই আমি ছুরি বসিয়ে দেব।

মা কাঁদতে কাঁদতে  বলে, আমন আলুক্ষণে কথা মুখে আনতে নাই, বাবা। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবে। তোমার বাবাকে বুঝিয়ে বলবো সব। তিনি তোমা-অন্ত-প্ৰাণ-হয়তো চোখের আড়াল করতে রাজি হবেন না। তবু আমি কথা দিচ্ছি, বাবা, তোমার বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা আমি করবো। আমার নিজের পয়সা দিয়ে তোমার সওদাগরি সামানপত্র কিনে দেব। তুমি বড় হয়েছো, এখন তোমাকে ঘরে বন্ধ করে রাখলে চলবে কেন? যেখানে প্ৰাণ চায়, যাবে।

আবু সামাত বলে, ঠিক আছে, বাবা ফিরে আসুন, দেখি কি বলেন।

মা বললো, তিনি যা-ই বলুন আমি তোমার যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।

তারপর বাড়ির চাকরীদের ডেকে বলো, গুদোম ঘরটা খোলো। যে-সব কাপড়-পত্র আছে বের কর।

চাকররা ঘর থেকে অনেকগুলো কাপড়ের গাঁট আঙ্গিনায় বের করলো।

এদিকে অভ্যাগত অতিথিরা বিদায় নিলে বৃদ্ধ সামস আল-দিনবাড়ি ফেরার আগে ছেলে আবু সামাতের খোঁজ করলো। কিনতু যখন শুনলে, অনেক আগেই সেবাড়ি চলে গেছে, চিন্তিত হয়ে পড়লো। একা এক পথ চলা অভ্যাস নাই, না জানি রাস্তা ভুল করে অন্য কোনও দিকে হারিয়ে গেলো। কিনা। আর তিল মাত্র না দাঁড়িয়ে একটা খচ্চরে চেপে পিঠে চাবুক কষলো। খচ্চরটা রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতেবাড়ি এসে পৌঁছয়। সামস আল-দিন সদর দরজার কাছে একটা চাকরকে পেয়ে জিজ্ঞেস করে, হ্যারে, আবু সামাত ফিরেছে?

—জী হাঁ। ভিতরে গিয়ে দেখুন না, গুদোম থেকে কাপড়ের গোট বের করাচ্ছে। ছোট সাহেব নাকি বাণিজ্যে যাবেন।

সামস আল-দিন হন।হন করে বাড়ির অন্দরে ঢোকে। তবে তো চাকরিটা ঠিকই বলেছে। আঙিনার চারপাশে অনেকগুলো কাপড়ের গোট দাঁড় করানো হয়েছে।

-কই গো, ছেলের মা, কোথায় গেলে?

আবু সামাতের মা বেরিয়ে আসে।

—কী, ডাকছো কেন?

—বলি এ সব কী?

এই সময়ে রাত্রি অবসান হতে থাকে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

 

দুশো সাতান্নতম রাত্রে আবার সে কাহিনী শুরু করে :

সওদাগর বিবি বলে, তোমার ছেলে লায়েক হয়েছে। এখন সে আর ঘরে কয়েদ হয়ে থাকতে চায় না। সে বাণিজ্যে যাবে। তাই আমি সামান-পত্ব বের করতে বলেছি।

–কোথায় যেতে চায়?

–আলেপ্পা, দামাসকাস, বাগদাদের পথে যাবে সে। সওদাগর মাথা নেড়ে বলে, না না, এ হতে পারে না, বিবি। আমি তাকে যেতে দেব না। আমি তাকে বুঝিয়ে বলবো, এই বয়সে বিদেশ বিভুই-এ যাওয়া তার উচিত হবে না।

আবু সামাতকে ডেকে সে বোঝাতে চেষ্টা করলো, বাছা, তোমার মনে হয়তো বিদেশ বেড়াবার বাসনা হয়েছে। কিন্তু আমি তোমাকে বারণ করছি সামাত, এসব খেয়াল তুমি ছাড়া। আমাদের পয়গম্বর বলেছেন, যে মানুষ তার জন্মভূমিতে বাস করে সুখের সন্ধান করে সে-ই প্রকৃত সুখ পায়। স্বদেশ ছেড়ে এক পা-ও বাইরে যাওয়া উচিৎ নয়। আশা করি এর পরে তুমি মত পাল্টাবে।

আবু সামাত বলে, আপনি হয়তো আমাকে অবাধ্য সস্তান ভাববেন, কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নাই। একবার আমি যখন ভেবেছি বিদেশে যাবো, যাবোই। তাতে যদি আমাকে কপর্দক শূন্য অবস্থায় এক বস্ত্ৰেবাড়ি থেকে বেরুতে হয়, সেও ভালো।

ছেলের এক গুয়োমী দেখে সওদাগর চিন্তিত হয়। ভাবে, আর বাধা দিয়ে লাভ নাই। ফল ভালো হবে না।

—ঠিক আছে, যাবে যাও। আমি তোমাকে পঞ্চাশটা কাপড়ের গোট সঙ্গে দিচ্ছি। পঞ্চাশটা উঠের পিঠে চাপিয়ে তুমি রওনা হয়ে যাও। কোন শহরে কি ধরনের কাপড় বিকেবে, আমি তোমাকে বলে দেব। যে সওদা আলোল্লার বাজারে বেচা সহজ হবে, দামাসকাসের বাজারে তার কোনও চাহিদাই নাই। আবার দামাসকাসে মানুষ যা লুফে নেবে বাগদাদে তার কদর, হবে না। আমার এই কথাগুলো মনে রেখে বাণিজ্য করলে তোমার বেশ লাভ হবে। যাও বাবা দেখে শুনে পথ চলবে, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। চলার পথে সব দিকে সতর্ক চোখ রাখবে। মরুভূমির মারাত্মক কুকুরগুলো প্ৰাণ-সংশয় করে তোলে। আর সাবধান থাকবে, বাদাবী ডাকাতদের হাতে পড়ে যেন ধন-প্ৰাণ সব খোয়া না যায়। ওরা বড় সাংঘাতিক। দয়ামায়া বলে কিছু জানে না।

আবু সামাত বলে, ঠিক আছে আব্বাজান, আপনার উপদেশ আমি মনে রাখবো। তবে শয়তানের শাস্তি আল্লাহই দেন। আমার কাজ আমি করে যাব; ফল যা দেবার তিনিই দেবেন।

ছেলের এই দার্শনিক কথাবার্তায় সওদাগর মুগ্ধ হয়।

সওদাগর বিবি কিন্তু তার হাজার দফা নামাজ শেষ করার আগে ছেলেকে রওনা হতে দেয় না। গরীব মানুষদের দান-ধ্যান করে। একশো ভেড়া পোড়ান হয়। হাজীদের ডেকে খাওয়ায়। তারা আবু সামাতের বিদেশীযাত্ৰা নিৰ্ভয় নিরাপদ হোক।-এই কামনা করে। মা ছেলেকে সঙ্গে করে পীর আবদ আল-কাদির-এর দরগায় নিয়ে যায়। তার দোয়া মেঙে আনে।

মা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ছেলেকে বিদায় দিলো। উট চালকদের সর্দার-কামালকে বললো, আমার বুকের কলিজাকে, তোমার হাতে ছেড়ে দিচ্ছি, তুমি ওকে চোখে চোখে রেখা। আল্লাহ ভরসা, পথে যেন তোমাদের কোনও বিপদ-আপদ না ঘটে।

তারপর ছেলেকে উদ্দেশ করে বললো, বাবা, কামালের কথা শুনো। বাবার মতো মান্যি করো তাকে।

ছেলের হাতে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা তুলে দিয়ে মা বলে, এই দিনারগুলো যত্ন করে রেখ, সময় অসময়ে খরচ করো। যদি দেখ, বাজার মন্দা, বিক্রিবাটা সুবিধের হচ্ছে না, তখনই এই টাকায় হাত দেবে। তাই বলে, ঠিক মতো দাম না পেলে সওদা বিক্রি করবে না।

আবু সামাত মা বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কইরো শহরের সীমানা পার হয়ে যায়।

এদিকে মাহমুদ খবর পেয়েছিলো, আবু সামাত বিদেশ সফরে বেরুচ্ছে। তাড়াতাডি সে নিজেকে তৈরি করে নিয়ে আবু সামাতকে অনুসরণ করে। কাইরো থেকে ক্রোশ তিনেক দূরে তার দেখা পায়। মাহমুদ সঙ্গে নিয়েছে খচ্চর, উট আর ঘোড়ার এক বাহিনী। চলতে চলতে নিজের মনেই স্বগতোক্তি করে, ওহে মাহমুদ, এই মরুপ্রাস্তরে কেউ তোমাকে বাধা দিতে আসবে না। কেউ আডি পেতে দেখবে না তোমার গতিবিধি। তুমি এখন স্বাধীন মুক্ত বিহঙ্গের মতো যেদিকে প্রাণ চায় উড়ে চলবে। সঙ্গে তোমার এক শান্ত সুবোধ বালক। তাকে নিয়ে যত খুশি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাক, কে কি বলতে পারবে।

এক জায়গায় এসে আবু সামাত প্রথম তাঁবু গাড়লো। মাহমুদও তার পাশেই তাঁবু ফেললো। আবু সামাতের বাবুর্চিকে ডেকে বললো, দেখ, তোমাদের আর উনুন জ্বালাবার দরকার নাই। আমার লোক যা পাকবে তাই আমরা সবাই মিলে।খাবো, কেমন? তোমাদের সুহেবকে একবার আমার তাঁবুতে আসতে বলো না?

আবু সামাত এলো। কিন্তু একা নয়। সঙ্গে এলো সেই কামাল—উট চালকদের সর্দার। মাহমুদ অস্বস্তি বোধ করলো প্ৰাণ-খুলে আবু সামাতের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারলো না। পরদিনও ঠিক একই ঘটনা ঘটলো। এইভাবে প্রতিদিন তাঁবু ফেলে তারা। প্রতিদিনই মাহমুদ আবু সামাতকে তার নিজের তাঁবুতে আমন্ত্রণ জানায়। আবু সামাত আসেও। কিন্তু কোনও সময়ই এক নয়। সব সময় ছায়ার মতো আসে কামাল। মাহমুদ মুখে কিছু বলতে পারে না। বুকের ব্যথা বুকেই চেপে মামুলী কথাবার্তায় সময় কাটায়।

এই ভাবে একদিন তারা দামাসকাসে এসে পৌঁছয়। কইরো, আলেপ্পা, দামাসকাস এবং বাগদাদে মাহমুদেরবাড়ি আছে। মাঝে মাঝে বন্ধু-বান্ধবদের এই সব বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে এসে দেদার আনন্দ স্ফুর্তি করে সে।

দামাসকাস শহরের উপান্তে আবু সামাত তাঁবু গাড়ে। মাহমুদ ওঠে তার নিজের

বাড়িতে। চাকর দিয়ে খবর পাঠায়, আবু সামাত যেন একা আসে তার বাড়িতে। এক সঙ্গে খানা-পিনা করবে।

সামাত বলে, তুমি একটু দাঁড়াও, আমি আমাদের বুড়ো সর্দার কামালকে জিজ্ঞেস করে আসি একবার;

একটু পরে আবু সামাত তীবু থেকে ফিরে এসে মাহমুদের লোককে বলে, না, আমার যাওয়া হবে না। তুমি মাহমুদ সাহেবকে বলো, কামাল আমাকে একা ছাড়বে না।

দামাসকাসে বেশিদিন না কাটিয়ে আবু সামাত আবার পথে বেরিয়ে পড়ে। আলেপ্পার পথে বেরিয়ে পড়ে। আলেপ্পাতে এসেও মাহমুদ একই নিমন্ত্রণ জানায় আবু সামাতকে। কিন্তু বুড়ো সর্দার কামাল বলে, না বেটা, আমি তোমার মা-র কাছে জবান দিয়েছি-এক কোথাও ছাড়বো না।

আবু সামাতেরও ব্যাপারটা ভালো লাগে না। বারবার লোকটা তাকেই বা কেন ডেকে পাঠায়। মাহমুদের লোককে বলে, না, আমি যেতে পারবো না। তুমি মাহমুদ সাহেবকে গিয়ে বলো, কামাল আমাকে একা যেতে দেবে না।

বারবার প্রত্যাখ্যানে মাহমুদেরও রোখি চেপে যায়। আলোপ্লা ত্যাগ করার পর প্রথম যেখানে তাঁবু ফেলা হয়, মাহমুদ নিজে আবু সামাতের তাঁবুতে এসে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলো। হয়তো কোনও দ্বিধা ছিলো, কিন্তু মাহমুদ নিজে আসায় মুখ ফুটে ‘না’ সে বলতে পারলো না। মাহমুদ বললো, বহুৎ কিসিমের মজাদার খানা পাকানো হচ্ছে। আজ তোমাকে যেতেই হবে। আমি কিছুতেই ছাড়বো না।

আবু সামাত হাসলো, বেশ তো, যাবো।

সাজ-গোজ সেরে মাহমুদের তাঁবুতে যাবার উদ্যোগ করছে সামাত; এমন সময় কামাল বললো, তুমি বড় অবিবেচক, বেটা। আমি তোমাকে বারবার বারণ করছি কেন, তা একবার ভেবে দেখলে না? ঐ মাহমুদ লোকটার কি মৎলব তা কি জান? ওকে কইরোর সবাই হাড়ে হাড়ে চেনে। লোকে ওকে ‘দুমুখো’ বলে ডাকে।

—কিন্তু, আবু সামাত বলে, আমি জবান দিয়েছি, তার নিমন্ত্রণ মেনে নিয়েছি, এখন না। যাওয়াটা কথার খেলাপ হবে না? লোকে ওকে যে নামেই ডাকুক আমাকে তো সে গিলে ফেলবে না। তবে অত ডর কিসের।

কামাল বলে, কে বলে গিলে ফেলতে পারবে না? এর আগে আরও অনেককে সে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে, তা জান?

আবু সামাত হো হো করে হেসে ওঠে। তার হাসির তোu৬ কামালের কথা তলিয়ে যায়। হয়তো সে আরও কিছু বলতে চেয়েছিলো, আরও বিশদ ভাবে বোঝাতে চেয়েছিলো কিন্তু আবু সামাত সেদিকে কৰ্ণপাত করলো না। এক রকম প্রায় ছুটেই মাহমুদের তীবুর দিকে এগিয়ে গেলো।

খানসামারা যে তাঁবুতে খানা-পিনা সাজিয়ে অপেক্ষা করছিলো সামাতকে সঙ্গে নিয়ে মাহমুদ সেই তাঁবুর ভিতরে এসে দাঁড়ায়। ধবধবে সাদা কাপড় বিছানো হয়েছে। তার উপর সদ্য পাকানো নানা রকম খানা সাজানো। একপাশে সরাবের পাত্র-সম্ভার।

খুব পরিতৃপ্তি করে দুজনে পেটপুরে পানাহার সারলো। মদের গোলাবী নেশায় তখন দুজনেই মাতোয়ারা। হঠাৎ মাহমুদ আবু সামাতের গোলাপী গাল দুটো দু’হাতে ধরে মুখটা বাড়িয়ে ঠোঁটে চুমু খেতে যায়। কিন্তু সামাতের নেশা হলেও জ্ঞান বেশ টনটনে ছিলো। তাছাড়া কামাল ওর মনে যে সন্দেহের চারা পুঁতে দিয়েছিলো তাতে সে সব সময়ই বেশ সতর্ক ছিলো। এক ঝটিকায় মাহমুদের হাত দু’খানা ছুঁড়ে দিতে দিতে বলে, এসব কী?

মাহমুদ তখন মত্ত। এক হাতে আবু সামাতের ঘাড় বেষ্টন করে আর এক হাত দিয়ে তার দেহটাকে কাছে টেনে আনতে চেষ্টা করে। আবু সামাত প্রায় চেঁচিয়েই বলতে থাকে, কী ব্যাপোর? কী চান। আপনি?

আবু সামাত এক রকম প্রায় জোর করেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসে। কামাল দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বসেছিলো।

–আল্লাহর কসম খেয়ে বলো বেটা, কি হয়েছে?

—না, কিছুই হয়নি তো! কিন্তু আর দেরি নয়, এখুনি তাঁবু গোটাও। আমরা বাগদাদে রওনা হবো। ঐ লোকটার সঙ্গে আর যেতে চাই না। লোকটার মতিগতি আমার ভালো লাগলো না।

কামাল বলে, আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম বেটা। কিন্তু তুমি যে বলছো কিছুই হয়নি। যাই হোক, ওকে এখানে রেখে একা এক পথ চলা আমাদের ঠিক হবে না, ছোট সাহেব। এই মরুবৃমির পথটা বড় খারাপ। বাদাবী ডাকাতের ভীষণ হামলা। ঐ খুনী ডাকাতগুলো কোথায় ওৎ পেতে বসে আছে কে জানে।

কিন্তু আবু সামাত সে-কথায় দমলো না। সেই রাতেই তারা বাগদাদের পথে রওনা হয়ে গেলো। সারা রাত সারা দিন পথ চলার পর তারা বাগদাদের প্রায় ছয় ক্রোশ দূরে এসে যখন পৌঁছল তখন সূর্য পাটে বসেছে। সামাত বললো, আর নয়, আজকের রাতটা এখানেই কোথাও তাঁবু গেড়ে কাটানো যাক। কাল সকালে আবার যাত্রা করা যাবে।

কামাল বললো, কিন্তু জাgগাটা সুবিধের নয়। আমি বলি কি, তাঁবু না ফেলে একটু কষ্ট করে আজ রাতেই বাগদাদে পৌঁছে যাই। তারপর একটানা বিশ্রাম নিলেই হবে। এই জায়গাটায় কুকুরের ভীষণ হামলা হয়। আর ঐ মানুষ-খেকো কুকুরগুলোর মুখে পড়লে কারো নিস্তার নাই। নিৰ্ঘাৎ মৃত্যু। তাই বলছি, একটু হাঁকিয়ে চললে শহরের সদর দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই আমরা বাগদাদে পৌঁছে যেতে পারবো।

এই পরামর্শ আবু সামাতের ভালো লাগলো না। —খোদা মেহেরবান, এই গভীর রাতে আমি কিন্তু বাগদাদ শহরে ঢুকবো না, চাচা। বরং কাল সকালে বাগদাদের সূর্য ওঠা প্ৰাণ-ভরে দেখতে চাই। আজকের রাতটা আমরা এখানেই কাটাবো। অত তাড়াহুড়ো করার কি আছে, আমরা তো আর বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যেই আসিনি। এসেছি দেশ দেখতে। আনন্দ পেতে। জীবনে যে সৌন্দর্য দেখিনি তাই দেখবো বলে পথ বেরিয়েছি।

কামাল আর কিছু জোর করে না। হাজার হলেও সে তার মনিব।

সে রাতে আবু সামাত হাল্কা একটু খানাপিনা সেরে তাঁবুর বাইরে মুক্ত বাতাসে এসে পায়চারি করতে থাকে। চাকর নফররা তখন যে যার মতো শুয়ে পড়েছে।

আবু সামাত পায়ে পায়ে বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে যায় মরুভূমির মাঝে একখণ্ড শস্য সবুজ প্রান্তর। একটা ঝাকড়া গাছের তলায় গিয়ে বসলো। চাদিনী রাত। ঝিরঝির করে দখিনা হাওয়া বইছে। প্ৰাণে বসন্তের ছোঁয়া লাগে। হৃদয় কাব্যময় হয়ে ওঠে :

ইরাকের রাণী ওগো,
বাহারী বাগদাদ,
এসেছি দুয়ারে তোমার
পেতে শুধু–
রূপে-রাসে-গন্ধে ভরা যৌবনের স্বাদ

হঠাৎ একপাল ঘোড়ার চিহিহি। রবে সামাতের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধেয়ে আসছে বাদাবী ডাকতের একটা দল। সামাত দেখলো পলকের মধ্যে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো তার তীবুগুলোর উপর। এলোপাথাড়ী চালাতে লাগলো তরোয়াল। প্ৰাণ ভয়ে পালাবার চেষ্টা করলো। চাকর নফররা। কিন্তু হয়, কেউই রক্ষণ পেলো না। খুনী বাদাবী ডাকাতের হাতে প্রাণ হারালো সবাই। তাঁবুগুলো ভেঙ্গেচুরে ছত্বখান হয়ে পড়লো। ডাকাতগুলো যখন বুঝতে পারলো। আর একজনও জীবন্ত নাই। খচ্চর, ঘোড়া উটগুলোকে তাডিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে গেলো তারা।

এতক্ষণ আবু সামাত গাছের তলায় বসে বসে অসহায়ভাবে নিরীক্ষণ করছিলো এই মর্মম্ভদ দৃশ্য। এবার সে তীবুর কাছে এগিয়ে এলো। না, একজনও বেঁচে নাই। তার বৃদ্ধ সহচর কামালও মরে পড়ে আছে। আবু সামাত আর চোখমেলে চেয়ে দেখতে পারে না। এই নারকীয় দৃশ্য। কান্নায় চোখ ফেটে জল আসে।

যাই হোক, আর এখানে অপেক্ষা করা সমীচীন নয়, হয়তো আবার কোনও ডাকাতের দল হানা দিতে পারে। সামাত ভাবলো, এই রাতেই সে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে যাবে। পরনের দামী সাজপোসাক সে খুলে ফেললো। শুধু রইলো একটা কামিজ আর ইজের। দীনহীন দারিদ্র্যের ছাপ ফোটানো দরকার। নইলে হয়তো পথের মধ্যে আবার কারো নজরে পড়ে যেতে পারে। জামাটাকে মাঝে মাঝে ছিঁড়ে ধুলো বালি মাখিয়ে নোংরা করলো। মাথার চুল এলোমেলো উস্কো খুস্কো করে দিলো। একেবারে ভিখিরির সাজ।

সারা রাত ধরে পথ চলার পর ভোরবেলা সে বাগদাদে এসে পৌঁছয়। ক্লাস্ত অবসন্ন দেহ এলিয়ে পড়তে চায়। শহরের প্রবেশ দ্বার দিয়ে ঢুকতেই একটা ছোট বাগিচা। তার মধ্যে একটা জলের ফোয়ারা। আবু সামাত ফোয়োরর জলে হাত মুখ ধুয়ে পাশের একটা শান বাঁধানে চবুতরার ওপর শুয়ে পড়ে। এবং নিমেষের মধ্যে সে ঘুমে গলে যায়।

মাহমুদও সেই রাতেই তাদের পিছু ধাওয়া করেছিলো। অন্য একটা পথ ধরে সে বাগদাদে আসতে থাকে। এই পথটায় যেতে পারলে আরও কম সময়ে বাগদাদে পৌঁছন যায়। কিন্তু বিদেশীদের এ পথ অজানা। মাহমুদ সব পথই জানে। সে আবু সামাতকে ধরবে বলে এই পথে জোরিকদমে চলে এসেছে। বাদাবী ডাকাতরা এই পথটা এডিয়ে চলে। কারণ মালকডিওলা বিদেশীরা এপথে চলে না। তাই মাহমুদ নির্বধায় বাগদাদে এসে পৌঁছল। আবু সামাতের একটু পরেই। শহরে ঢুকে সব লোকই এই ছোট্ট বাগিচার ফোয়ারার জলে হাতমুখ ধুয়ে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নেয়। মাহমুদও বাগিচায় ঢুকে পড়ে। হঠাৎ তার নজরে এলো, কে যেন শুয়ে আছে ওপাশের চবুতরায়। কাছে যেতেই আনন্দে লাফিয়ে ওঠে সে, আরে, এযে দেখি সেই যদুমনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাহমুদ ভাবে, ছেলেটার এই হাল হলো কি করে। নিশ্চয়ই রাহাজানি হয়েছে। হয়তো সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেছে। তা একদিক থেকে ভালেই হয়েছে। এবার নিশ্চয়ই সে একা। সেই গাব্দীমুখো সর্দারটা আর আড়াল করে দাঁড়াবে না। তাছাড়া এই বিদেশ বিভূঁই-এ দাঁড়াবার মতো আশ্রয় তো চাই। মাহমুদের এখানেবাড়ি আছে। সামাত তা জানে। সে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলে নিশ্চয়ই সে আপত্তি করবে না। কারণ অন্য কোনও উপায় তো নাই।

মাহমুদ এই সব যখন ভাবছে, আবু সামাত চোখ মেলে তাকালো। কি একটা স্বপ্ন দেখে ঘুমটা তার কেটে গেলো। মাহমুদ আরও কাছে এসে কুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার? কী হয়েছে? এখানে এই অবস্থায় শুয়ে আছে কেন?

সামাত তখন গত রাতের সব ঘটনা বললো তাকে। মাহমুদ বললো, যাক, যা নসীবে ছিলো তাই ঘটেছে। ও নিয়ে হাহুতাশ করে লাভ নাই। তোমার সামান-পত্র যা গেছে, তার জন্য ভেবো না। আমি তোমাকে তার অনেক বেশি দামের সওদা দেবো। চলো, আমার বাড়িতে চলো। সামাত কিন্তু কিন্তু করছিলো, কিন্তু মাহমুদ আর কোনও সুযোগ দিলো না।

সামাতকে তার পিছনে বসিয়ে বললো, শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকবে, জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দেবো।

বাড়িতে পৌঁছে প্রথমেই আবু সামাতকে সে হামামে নিয়ে যায়। আচ্ছা করে নিজে হাতে তার সৰ্ব্বাঙ্গ ডলাইমলাই করে সাফ করে। গামলা গামলা জল ঢেলে গোসল করায়। দামী সাজপোশাক-এ সুন্দর করে সাজায়। তারপর সঙ্গে করে বসার ঘরে নিয়ে যায়। নানারকম মুখেরোচক খাবার আর দামী সরাবে খানাপিনা জমে ওঠে। ঢুলু ঢুলু নেশায় দুজনেরই চোখ ছোট হয়ে আসতে থাকে। মাহমুদ হেড়ে গলায় গান ধরে। খিস্তিখেউড়ের গান! আবু সামাত সহ্য করতে পারে না। লোকটা কী ভীষণ নোংরা। সারা দেহ মন রিরি করে ওঠে। না, আর এক মুহুৰ্তও এখানে নয়। পালাতে হবে। সামাত উঠে দাঁড়ায়। মাহমুদ হাঁ হাঁ করে ওঠে। ধরতে যায়। কিন্তু ততক্ষণে সামাত ছুটে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে হন হন করে হাঁটতে শুরু করেছে।

সারাদিন ধরে শহরের পথে পথে ঘুরে ঘুরে সামাত ভীষণ ক্লান্ত। এবার সে একটু বিশ্রাম চায়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, রাতের মতো একটা আস্তানা জোগাড় করতে হবে। উপায়স্তর না দেখে সামনের একটা মসজীদের আঙ্গিনায় ঢুকলো সামাত। পায়ের চটি খুলে মসজীদের ভিতরে গেলো। একটু পরে দুটি লোক লণ্ঠন হাতে ঢুকলো। তাদের পথ করে দেবার জন্য সে একটু সরে বসতে যায়। কিন্তু অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ লোকটি সামাতের কাছেই এগিয়ে এসে সালাম জানায়, খোদা হাফেজ; সালাম আলেকুম। সামাতও আলেকুম সালাম জানায়। দুজনেই সামাতের পাশে বসে পড়ে। বৃদ্ধটি জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বেটা, তুমি কি মুসাফীর?

—জী-হাঁ। আমি কইরো থেকে আসছি। আমার বাবা সওদাগর সামস অল দিন কাইরোর বণিক সমাজের সভাপতি।

বৃদ্ধ তার সঙ্গীটির দিকে মুখ ফিরিয়ে খাটো গলায় বলে, খোদা বোধহয় মুখ তুলে চাইলেন। এত তাড়াতাডি এরকম এক বিদেশীকে পাওয়া যাবে আশা করিনি।

এই সময়ে রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

 

দুশো একষট্টিতম রাতে আবার সে শুরু করে :

আবু সামাতের আরও কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বৃদ্ধ। —মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের জন্যেই তোমাকে এই শহরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তোমার কাছ থেকে একটু অনুগ্রহ চাই, বাবা। একটা কাজ তোমাকে করে দিতে হবে। অবশ্য বিনি। পয়সায় নয়। তার জন্যে পাঁচ হাজার নগদ, এক হাজার মোহরের সওদাপত্র আর এক হাজারী একটা ঘোড়া তোমাকে আমরা ইনাম দেবো।

আবু সামাত অবাক হয়। এই বিদেশে আজ সে কপর্দক শূন্য। পয়সার তার প্রচুর প্রয়োজন। কিন্তু তার মতো একটি আনাড়ী অনভিজ্ঞ ছেলেকে দিয়ে কি এমন কাজ করিয়ে নিতে পারবে তারা, যার বিনিময়ে এত ইনাম পাওয়া যাবে? সামাত বলে, কিন্তু আপনি ভুল করেছেন। আমার কোন কাজের অভিজ্ঞতা নাই। আমি আপনার কোনও উপকারে আসতে পারবো না। টাকা পয়সার খুব দরকার আছে, কিন্তু আমাকে দিয়ে কাজ না হলে শুধু শুধু দেবেন কেন?

বৃদ্ধ বলে, ও নিয়ে তোমাকে কোনও মাথা ঘামাতে হবে না, বাবা। আমি দেখেই বুঝেছি, তোমাকে দিয়েই আমাদের কাজ উদ্ধার হবে। তা হলে শোনো বাবা, বলি :

তুমি তো জান, মুসলমান ধর্মের বিধান-বিবিকে একবার তালাক দিলে তিন মাস বাদে আবার তাকে ঘরে নেওয়া যায়। দ্বিতীয়বার তালাক দিলেও বিধিসম্মত সময়ের ব্যবধানে আবার সে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু তিন-তালাক হয়ে গেলে আর তাকে ফিরে পাওয়া যায় না। তবে শাস্ত্রে তারও ব্যবস্থা দেওয়া আছে। সে ক্ষেত্রে যদি বয়ান-তালাক দেওয়া বিবিকে আবার ফিরে পেতে ইচ্ছা হয়, তবে সেই বিবির অন্য করে সঙ্গে শাদী হওয়া দরকার। শাদার পরে অন্তত একটি রাত্রি তার সঙ্গে সহবাস করতে হবে। তার পর সে যদি তাকে তিন-তালাক দিয়ে দেয়, তখন সে আবার তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে নিকা করতে পারে।

এখন, এই কদিন আগে আমার মেয়ের সঙ্গে এই ছেলের খুব ঝগড়া-ঝাঁটি হয়। এই ছেলেটির সঙ্গে তার শাদী দিয়েছিলাম। রাগের মাথায় বাবাজীবন আমার মেয়েটিকে এক সঙ্গেই তিন-তালাক দিয়ে দেয়। মুসলমান ধর্মে জবানই সার। মুখ দিয়ে একবার বের করলেই হলো, আমি তোমার সঙ্গে আর ঘর করবো না। আজ থেকে তুমি আমার আর কেউ না। এই দিলাম এক তালাক-দুই তালাক-তিন তালাক। বাস সব খতম। এর পর তো আমার মেয়ে বোরখার সারা শরীর ঢেকে ফেললো। কারণ তখন তার স্বামী তার কাছে পরপুরুষ। সেইদিনই সে তার দেনমোহর নিয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে। এদিকে বাবাজীবনের মাথা যখন ঠাণ্ডা হলো, তখন সে মাথায় হাত দিয়েকাঁদতে  লাগলো। আর তো কোনও উপায় নাই। এখন সে দিন রাত হাহুতাশ করছে। কীভাবে তাকে আবার নতুন করে নিকা করা যায় তার ফিকির খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমিও বুঝতে পারছি, ব্যাপারটা রাগের মাথায় ঘটেছে। আদতে ওদের দুজনের ভালোবাসা ঠিকই ছিলো। না হলে বয়ান-তালাক দেওয়া মেয়েকে কেউ আবার ফিরে পেতে চায়?

এখন বাবা, তুমিই ভরসা, জানি পথে যখন বেরিয়েছ, পয়সার তোমার দরকার আছে। তুমি বিদেশী, পথ চলতে চলতে একটা রাতের জন্য যদি একটি খুবসুরৎ লেড়কী আর তার সঙ্গে কিছু স্বর্ণমুদ্রা মিলে যায় নেবে না কেন? তোমাকে তো কোন বন্ধনে আটকাতে চাই না। পথ চলতে ঘাসের ফুলের মতো পথেই ফেলে চলে যাবে তুমি। শুধু বাড়তি লাভ টাকা পয়সাগুলো নিয়ে যাবে।

দারিদ্র্য এমনই বস্তু, তার চাপে পড়ে অনেক শুভবুদ্ধির বলি দিতে হয়। বাধ্য হয়ে সামাত তাদের এই অ-মানুষিক প্রস্তাবে রাজি হলো।

—তা হলে আমি পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, এক হাজার দিনারের সামানপত্র এবং এক হাজার দিনার দামের মতো একটা তেজী ঘোড়া পাবো তো?

—আলবৎ পাবে।

এর জন্যে আমাকে এক রাতের জন্য আপনার কন্যাকে শাদী করতে হবে। এবং সারা রাত তার সঙ্গে সহবাস করতে হবে। এই তো?

—ঠিক এই। এর বেশী আর কিছু করতে হবে না, বেটা। পরদিন সকালে উঠে যে দিকে তোমার খুশি চলে যাবে। বাস। আর পিছনে তাকবার কোনও দরকার নাই। কোনও দায় দায়িত্ব, কোনও ঝঞঝাট তোমাকে পোয়াতে হবে না।

সামাত বলে বেশ আমি রাজি। আপনারা সব ব্যবস্থাপত্র করুন।

এবার বৃদ্ধের পাশে বসে-থাকা ছেলেটি মুখ খুললো; আপনি আমাদের কত বড় মুসকিল আসান করলেন কি আর বলবো। এ ঋণ শুধু কিছু পয়সা দিয়ে শোধ করা যায় না। আমি আমার বিবিকে প্ৰাণাধিক ভালোবাসতাম। কিন্তু রাগের মাথায়, হঠাৎ কি হয়ে গেলো, একেবারে তিনতালাক দিয়ে দিলাম তাকে। মুখ থেকে জবান বেরিয়ে গেছে। সাচ্চা মুসলমানের বাচ্চা। কথা তো আর উলটানো যায় না।

ছেলেটি একটুক্ষণের জন্য দম নিয়ে আবার বলতে থাকে, আমি সবই বুঝতে পারছি, আপনি বিদেশী পথিক। আজ এখানে কাল সেখানে করে চলতে থাকবেন। কিন্তু তুবুও আমার মন থেকে ভয় যেতে চায় না। ধরুণ সবই কথাবার্তা পাকা হলো, কিন্তু মানুষের মন, কিছুই তো বলা যায় না, শাদীর পর সকালে হয়তো আপনার মতিগতি পালটে গেলো! সদ্য শাদী করা বিবির রূপে গুণে আপনি মুগ্ধ হয়ে পড়লেন। মায়ামোহ কখন কাকে কিভাবে জড়িয়ে ফেলে কেউই বলতে পারে না। তাই বলছিলাম, শাদীর আগে একটা চুক্তিনামা করে নিলে আপনার কি আপত্তি আছে?

সামাত বুঝতে পারে না, কেমন চুক্তি?

–ধরুন আপনি যদি শাদীর পর আর তাকে না ছাড়েন। ফিরিয়ে না দেন। সেই জন্যে আপনাকে একটা খেসারত দিতে হবে। শর্তভঙ্গের সাজা বলতে পারেন। দশ হাজার দিনারের খেসারতনামা সই করে দেবেন। শর্ত না মানলে, বিবিকে না ছাড়লে আমি ঐ টাকা আপনার কাছে দাবী করে আদায় করবো।

সামাত হো হো করে হেসে ওঠে, ও, এই কথা! আমি একশোবার রাজি। শর্ত ভাঙলে তো সাজা-তা ওপথে যাবে না। এ মর্কেল।

তখনি তিনজনে কাজীরবাড়ি গেলো। শাদী-নামার সঙ্গে খেসারৎ নামার চুক্তিপত্রও তৈরি করা হলো। সই-সবুদও হয়ে গেলে বৃদ্ধ তার নতুন জামাতা সামাতকে সঙ্গে নিয়েবাড়ি ফিরে এসে মেয়েকে বললো, বেটি তোমার জন্যে এক নওজোয়ান ছেলেকে পছন্দ করে নিয়ে এসেছি। আমার বিশ্বাস, সে তোমাকে সুখী করতে পারবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আজকের শুভরাত্রি তোমাদের সুখের হোক। তবে শুধু আজকের রাতের জন্যেই তার সহবাস তুমি পাবে। কাল সকালেই সে আবার চলে যাবে।

এর পর মেয়ের মা এবং বাবা দুজনে এসে সামাতকে প্রচুর আব্দর আপ্যায়ন করলো। বৃদ্ধ বললো, তুমি একটু অপেক্ষা কর বাবা, মেয়ে এখুনি আসবে তোমার ঘরে।

এই বলে তারা অন্দরে চলে গেলো। সামাত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে।

এদিকে মেয়েটির আসল স্বামী দারুণ হিংসায় জ্বলছে। তার বিবিকে অন্য লোকে ভোগ করবে। কিছুতেই প্রবোধ মানে না মন। সে একটা ডাইনী বুড়িকে বকশিসের লোভ দেখিয়ে নিযুক্ত করে। তাকে খুব আদর সোহাগ জানিয়ে মাথায় তুলে বলে, বুড়িমা, তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমার ঘরের বিবিকে অন্য লোক নিয়ে শোবে এ কেমনতর কথা, বুড়িমা। তুমি এর একটা মতলব বের কর। যেমন করেই হোক, ওদের দুজনের লন্দকালদকী বন্ধ করতেই হবে।

বুড়িটা বলে, তুমি কিছু ভেব না, আমি সব ভণ্ডুল করে দিচ্ছি।

এই সময়ে রাত্রি শেষ হয়ে আসছে দেখে শাহরাজাদ চুপ করে বসে থাকে।

 

দুশো বাষট্টিতম রজনীতে আবার সে শুরু করে :

সারা শরীর বোরখায় ঢেকে সে বৃদ্ধেরবাড়ি আসে। এদিকে ওদিক উঁকি ঝুঁকি মেরে টুক করে আবু সামাতের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সামাত তখন শয্যায় অর্ধশায়িত হয়ে তার সদ্য-শাদী করা বিবির প্রতীক্ষা করছিলো। বুড়িটা জিজ্ঞেস করে, যে মেয়েটাকে তার স্বামী তালাক দিয়েছে সে কোন্‌ ঘরে আছে বলতে পার, বাবা? আমি তোজ তার শরীরে দাওয়াই মালিশ করতে আসি। যদিও জানি, দাওয়াই দিয়ে কুষ্ঠব্যাধি সারানো যায় না, তবু কি করবো, তার মা-বাবাকে বোঝানো দায়।

আল্লাহ রক্ষা করুন, সামাত আঁৎকে ওঠে, বলো কী? মেয়েটার কুষ্ঠব্যাধি আছে নাকি? আজ রাতে যে তার সঙ্গে আমার সহবাস করার ওয়াদা আছে! সর্বনাশ, জেনেশুনে তো এ-কাজ আমি করতে পারবো না।

বুড়িটা না বোঝার ভান করে, কেন? সহবাস করতে হবে কেনো?

সামাত বলে, তার আগের স্বামীর সঙ্গে সেইরকমই চুক্তি হয়েছে আমার। সে আবার তার তিন তালাক দেওয়া বিবিকে ঘরে নিতে চায়। তাই এক রাতের জন্য তাকে আমি শাদী করেছি, শাস্ত্রমতে একটা রাত তার সঙ্গে সহবাস করতে হবে। তারপর কাল সাকালে তাকে আমি বয়ান তালাক দিয়ে চলে যাবো।

—সে কি বাবা, অমন কাজটি করো না। কুষ্ঠ দুরারোগ্য ছোঁয়াচে ব্যারাম। একবার ধরলে আর সারে না। আর যাই কর তাকে স্পর্শ করো না। তোমার এই সুন্দর নতুন জোয়ান বয়স। এইভাবে নষ্ট করো না।

বুড়িটা আর তিলমাত্র অপেক্ষা না করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এবার সে মেয়েটার ঘরে ঢোকে। বলে, সাবধান, মা, তোমার বাবা ঘাটের মড়া কুড়িকুষ্ঠে ভরা একটা ছেলেকে ধরে নিয়ে এসেছে। ভুলেও তার সঙ্গে কিছু করো না। শরীরে বিষ পুরে দিয়ে চলে যাবে।

আবু সামাত অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো, কিন্তু মেয়েটি ঘরে আসে না। চাকর-বাকররা এসে খানা পিনা সাজিয়ে দিয়ে গেলো। একা একাই সে রাতের খানাপিনা সেরে নেয়। ঘুমাতে যাবার আগে নিত্যকার অভ্যাসমতো সে সুর করে কোরান পাঠ করতে থাকে।

মেয়েটি পাশের ঘর থেকে তার সুরেলা কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হয়। এমন মধুর গলার স্বর তো কোনও অসুস্থ মানুষের হতে পারে না! খোদা ভরসা, যা ঘটে ঘটুক, আমি তাকে স্বচক্ষে পরীক্ষা করে। দেখবো। মনে হচ্ছে, শয়তান বুড়িটা বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে গেছে।

ঘরের এক পাশে গান বাজনার যন্ত্রপাতি ছিলো, একটা হিন্দুস্তানী তানপুরা তুলে নিয়ে সে গান ধরে। অপূর্বকণ্ঠ। মুগ্ধ বিস্ময়ে ভাবে সামাত, এতো কোনও কুণ্ঠরোগীর গলা দিয়ে বেরুতে পারে না। বুড়িটা কি তাকে ধোঁকা দিয়ে গেলো?

আবু সামাত, মেয়েটির গান শেষ হলে, একটি আড়-খেমটা গাইতে শুরু করে। চোখে দেখতে না পেলেও, পরিস্কার সে বুঝতে পারলো, পর্দার ওপারে। ওঘরে সে ঘুঙুর বাজিয়ে গানের তালে তালে নেচে চলেছে। এবার সে নিঃসন্দেহ হয়, যে-কুণ্ঠ রুগী সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারে না, সে আবার নাচতে পারে নাকি? ডাহা মিথ্যে কথা বলে গেছে শয়তান বুড়িটা।

গান থামলে, মেয়েটি নাচ থামিয়ে পর্দা ঠেলে সামাতের ঘরে ঢোকে। সামাত চমকে ওঠে। এক ঝলক বিজলী যেন হঠাৎ থেমে গেছে তার সামনে। তার কুসুম পেলাব দেহলতা সামাতের চিত্তে চঞ্চলতা জাগায়। এত রূপ, এত লাবণ্য, এমন লাস্য সে এই প্রথম প্রত্যক্ষ করলো। যেন এতক্ষণ ঘরখানা অন্ধকার কালো মেঘে আচ্ছন্ন ছিলো, হঠাৎ মেঘ সরে গিয়েচাঁদ বেরিয়ে আলোয় আলোময় হয়ে উঠেছে।

-কী গো, আমন হাঁ করে কী দেখছো, ঘরে চলো, শোবে না।

ঘাড় বাঁকিয়ে ভুরু নাচিয়ে এমন ঢং-এ মেয়েটি তাকে ডাকে, সামাতের সারা শরীরে আগুন ধরে যায়। বলে, কোথায় যেতে হবে, চলো।

মেয়েটি এমন ভাবে পোছ দুলিয়ে দুলিয়ে চলতে থাকে, দেখলে ধ্বজভঙ্গও যৌবন ফিরে পাবে। সামাতের মনে কোনও সংশয় ছিলো না, তবু সহবাসের আগে তার দেহটা একবার পরীক্ষা করে দেখার ইচ্ছে হলো। কিন্তু মুখে বলে কি করে সে কথা। মেয়েটি কিন্তু আঁচ করতে পারে, ও, বুঝেছি, সেই ডাইনী বুড়িটা তোমার ঘরেও চুকেছিলো। আচ্ছা তোমার সন্দেহ নিরসন করে দিচ্ছি।

এক এক করে সে তার বেশবাস খুলে ফেললো।–এই দ্যাখো, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খুব ভালো করে দ্যাখো, সারা গায়ে গোটা কয়েক তিল ছাড়া কোথাও একটা ফুস্কড়ী বা কাটা ছেঁড়ার কোনও দাগ ফাগ আছে কিনা।

সামাত দেখলো তার সর্বাঙ্গ মাখনের মত নরম। কোথাও কোনও অসামঞ্জস্য নাই। সুন্দর নিটোল মসৃন একটি কচি শালের গুড়ি।

সামাতের সুপ্ত পৌরুষ জেগে ওঠে। কিন্তু আনাড়ী তরুণ বুঝতে পারে না, কিসে কি হয়। সারা শরীরে অসহ্য এক যন্ত্রণা অনুভব করে; ভাবে মেয়েটি তো সেয়ানা, ও নিশ্চয়ই বাৎলে দেবে, শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে। কিন্তু কাছে এগোতেই মেয়েটি ছিটকে সরে যায়। চোখে মুখে তার আতঙ্ক।

—তোমার শরীরে যদি সত্যিই কুষ্ঠের বিষ থাকে। তাহলে আমি যে সারা জীবন পঙ্গু হয়ে থাকবো। আমাকে ধরার আগে তুমি বাপু কাপড়-চোপড় খুলে শরীরটা দেখাও। জানি আমি কুণ্ঠরুগীর চেহারা এমন চেকনাই লালটুস হয় না, তবু বলা তো যায় না।

আবু সামাত হাসে, সে তো খুব ভালো কথা, যাকে দেহ দেবে, তার দেহটা একবার চোখে দেখবে না-সে কি হয়?

একেবারে নগ্ন হয়ে দাঁড়ালো তার সামনে। মেয়েটির চোখে অপার বিস্ময়। নিরন্তর নিবার জল-প্রপাতের মধ্যে যেন একখণ্ড প্রস্তর শিলা। ছুটে গিয়ে স্বামীকে বাহুপাশে বেঁধে ফেলে সে। প্রায় এক রকম বুকে জড়িয়েই এনে ফেলে পালঙ্কে। তারপর প্রতি পলকে প্রলয় কাণ্ড ঘটতে থাকে। মেয়েটি বাঘিনীর মতো গোঙায়, তুমি না পুরুষ! কই, চালাও তোমার সিংহের থাবা। চিরে শেষ করে দাও আমাকে। প্রমাণ কর, তুমিও তোমার বাবার মতো আর এক সিংহ শিশুর জন্মদাতা।

একটি সুখের রাত্রির অবসান হয়। মেয়েটির বাহুপাশে আবদ্ধ সামাত-এর ঘুম ভাঙ্গে। রাত্রে সে জেনে নিয়েছে, মেয়েটির নাম জুবেদা। সামাত বলে, জুবেদা, আমার দুঃখ তোমাকে বোঝাতে পারবো না। আমি শর্তে আবদ্ধ। এখুনি তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে। অথচ, মাত্র একটি রাতের মধ্যে আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, তুমি ছাড়া আমি বাঁচবো না।

জুবেদা আকুলভাবে তার হাত চেপে ধরে, সে কি কথা? কেন চলে যাবে? তা হয় না।

—তুমি কি জান না, কি শর্তে আমি সই করেছি। তোমার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু একটি রাতের জন্য। তোমার আগের স্বামী তোমাকে ফিরে পেতে চায়। আর সেই পথটা পরিষ্কার করার জন্যে আমার সঙ্গে তোমার শাদী দেওয়া হয়েছে। এবার আমি তোমাকে তিন-তালাক দিয়ে গেলে সে আবার তোমাকে নিকা করে ঘরে নিতে পারবে। আমি যাতে বিশ্বাসঘাতকতা না করতে পারি। সে জন্য তোমার আসল স্বামী আমাকে দিয়ে চুক্তি করিয়ে নিয়েছে। চুক্তি না মানলে আমার কাছ থেকে দশ হাজার দিনার খেসারত আদায় করবে। দশ হাজার দিনার তো অনেক দূরের কথা, দশটা দিরহামিও আমার জেবে নাই। সে ক্ষেত্রে, আমি যদি তোমাকে তালাক না দিই তোমার স্বামী আমার নামে মামলা দায়ের করবে। মামলায় আমি নিৰ্ঘাৎ হরবো। তার পরিণাম কি জান? দশ হাজার দিনার আক্কেল সেলামী দিতে হবে। আর তা দিতে না পারলে, দিতে যে পারবো না তা তো জান, হাতে কাতকড়া পড়বে। ফাটক খাটতে হবে।

জুবেদা কি যেন একটুক্ষণ ভাবলো। তারপর সামাতের হাতে চুমু খেয়ে বললো, সামাত আমার সোনা, কালকে রাতের সুখ স্মৃতি সারা জীবনে আমি ভুলবো না। তোমার মতো পৌরুষ কটা পুরুষের থাকে? আমি তোমাকে ছাড়তে পারবো না। সারা জীবন ধরে তুমি আমার আকাশে ধ্রুব তারার মতো জুলবে। আমি কথা দিচ্ছি, একটা উপায় আমি বের করবোই। মুসকিলের আসান হবেই। তোমাকে ছাড়া এ যৌবন অন্য কারো হাতে তুলে দেবার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়, সোনা।

সামাত ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন করে, কিন্তু কীভাবে তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে? আমি যে সই করে দিয়েছি।

জুবেদা বলে, ঘাবড়াও মাৎ, আমি তোমাকে ফিকির বাতলে দিচ্ছি। একটু বাদে আমার বাবা তোমাকে কাজীর কাছে নিয়ে যাবে। শাদী নামা বাতিল করে বয়ান তালাকের কাগজপত্রে সই সাবুদ করার জন্য তোমাকে যেতে হবে সেখানে। তুমি গিয়ে কাজীর কানে কানে বলবে, ‘আমি আমার বিবিকে তালাক দিতে চাই না।’ সে কথা শুনে সে অবাক হয়ে বলবে, ‘কী বললে? পাঁচ হাজার সোনার মোহর এক হাজার দিনারের জিনিসপত্র এক হাজার দিনার দামের তেজী ঘোড়া-সব ছেড়ে দেবে সামান্য একটা মেয়েছেলের জন্য?’ তখন তুমি বলবে, ‘তার একগাছি চুলের দাম দশ হাজার দিনার!’ কাজী তখন গম্ভীর হয়ে বলবে, বেশ, যা ভালো বোঝ, কর। আমার আপত্তির কি থাকতে পারে। কানুন তোমার পক্ষে আছে। শাদী করা বিবি আইনত তোমার সম্পত্তি। না ছাড়লে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ফাঁসবে তুমি অন্য রাস্তায়। শর্ত করেছ, চুক্তি না মানলে দশ হাজার দিনার খেসারত দিতে হবে। তা দেবে, পয়সা যদি তোমাকে কামড়ায় দশ হাজার দিনার ছুঁড়ে দেবে তার আগের স্বামীর নাকের ডগায়। পয়সা দিয়ে দিলে তোমাকে আর সাজা দেবে কার সাধ্য। তবে হ্যাঁ, গুণে গুণে দশটি হাজার দিনার দিতে হবে। নইলে ফাটক—একেবারে সোজা শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে।

জুবেদা বলতে থাকে, শোনো, কাজী লোক ভালো। শিক্ষাদীক্ষণ জ্ঞান গরিমোয় চমৎকার—শুধু একটাই তার দোষ-সুন্দর সুন্দর অল্প বয়েসী ছোকরা দেখলে আর ঠিক থাকতে পারে না।

—যাঃ বাবা, কাজীও দুমুখো নাকি?

সামাত আঁৎকে ওঠে। তাই দেখে জুবেদার কি হাসি। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে আর কি।

–তুমি ঠিক ধরেছ তো। কেন আগের কোনও অভিজ্ঞতা আছে নাকি?

আবু সামাত বলে, খুব আছে। এর আগে এক দুমুখোর পাল্লায় পড়েছিলাম আমি। কোনও রকমে পালিয়ে বেঁচেছি। কিন্তু এখন ভাবছি। এক দুমুখের খপ্পর থেকে ছিটকে এসে আর এক দুমুখের খপ্পরে পড়তে চলেছি। না না, সে আমি পারবো না, তুমি বরং অন্য ফিকির বাতিলাও। আমি বুড়ো কাজিটার নোংরামী সহ্য করতে পারবো না।

জুবেদা বললো, আগেই অধৈর্য হয়ে না। দাঁড়াও, দেখ কি হয়? কাজী যখন তোমাকে বলবে, ‘তাহলে খেসারতের দশ হাজার দিনার দিয়ে দাও, তখন তুমি শুধু মুচকী হাসবে। ওর গা ঘেষে দাঁড়াবে। আব্দার করে বলবে, ‘এখন আমি দিতে পারবো না, আমাকে কিছু সময় দিন।’ দেখবে কাজ হবে। কাজী তোমাকে সময় দেবে। তারপর আল্লাহ একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করবেন।

আবু সামাত বলে, এটা মন্দ বলো নি।

এই সময় চাকর এসে বললো, মালকিন, বাইরে আপনার বাবা অপেক্ষা করছেন, এই সাহেবকে নিয়ে তিনি কোথায় বেরুবেন।

আবু সামাত চটপট নিজেকে তৈরি করে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।

জুবেদার কথাই ঠিক। কাজী আবু সামাতের ব্যবহারে বিগলিত হয়ে দশ দিনের সময় দিয়ে বললো, এই দশ দিনের মধ্যে যদি টাকা জোগাড় করতে না পোর, চিস্তা করো না, আমি দিয়ে দেব। সে-টাকা।

আবু সামাত কৃতজ্ঞ চিত্তে কাজীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিবির কাছে ফিরে এলো।

জুবেদা শুনে আনন্দে নেচে ওঠে। সামাতের হাতে একশোটা দিনার দিয়ে বলে, আজ রাতে জোর খানা-পিনার ব্যবস্থা কর। সারা রাত ধরে মৌজ করবো দুজনে।

আবু সামাত নিজে কেনাকাটা করে নিয়ে আসে। সরাবের নেশায় মাতোয়ারা হয়ে নাচ-গান হাসি-মস্করার মধ্যে কাটাতে থাকে।

রাত তখন গভীর। হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দে সামাত উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতে যায়।

খালিফা হারুন অল-রাসিদ। সেই রাতে পারসীক দরবেশের ছদ্মবেশে বাগদাদের পথ পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলো উজির জাফর, দেহরক্ষী মাসরুর আর সভাকবি আবু নসাব। খলিফা জাফরকে বললেন, বুকের ভিতরটা কেমন ভার ভার মনে হচ্ছে, চলতো, জাফর, খোলা হাওয়ায় একটু ঘুরে আসি।

জাফর বললো, জো হুকুম জাঁহাপনা—

চারজনে চলতে চলতে এক সময় জুবেদা আর সামাতের গান-বাজনা শুনে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়ে।–বাঃ তোফা মাইফেল চলছে তো!

দরবেশদের একজন জুবেদার দরজায় কড়া নাড়ে। দরজা খুলে আবু সামাত দেখলো, চারজন ফকির। সাদরে তাদের অভ্যর্থনা করে অন্দরে এলো সে। পাশের ঘরটায় বসালো। সামাত খানাপিনা এনে সাজিয়ে দিলো তাদের সামনে। তারা কিন্তু সবিনয়ে প্রত্যাখান করে বললো, খোদা মেহেরবান, আমরা একাহারী, খানাপিনার কোনও প্রয়োজন নাই। যদি গান শোনাও খুশি হবো। বাইরে থেকে তোমাদের গানের কলি কানে ভেসে আসছিলো। বড় সুন্দর সুরেলা গলা তোমাদের। মনে হয়, যেন কোনও নামজাদা গাইয়েরা গাইছিলো!

সামাত বলে, না, আমরা কেউই পেশাদার গাইয়ে নই। মনের আনন্দে গাই, এই আর কি! আমার বিবি সত্যিই ভালো গায়।

এরপর কথায় কথায় আলাপ পরিচয় জমে ওঠে। সামাত যে এদেশের বাসিন্দা নয় তা ওরা আগেই বুঝেছিলো। কি করে সে বাগদাদে এলো, তারপর কি বিচিত্র তার অভিজ্ঞতা-সব আগাগোড়া খুলে বললো সামাত। সে-সব বিবরণের পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নাই।

দরবেশের প্রধান—অর্থাৎ খলিফা—আবু সামাতের কথা-বার্তায় আদব কায়দায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন।

শোনো বাবা, দশ হাজার দিনারের ভাবনায় মন খারাপ করো না। ব্যবস্থা একটা হবেই। আমি বাগদাদ শহরের সমস্ত দরবেশদের প্রধান। মোট আমরা চল্লিশজন। তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করে তোমার দেনা আমরা শোধ করে দেবী। যাক, ওসব টাকা পয়সার তুচ্ছ কথা, এখন তোমার বিবিকে একবার অনুরোধ জনাও, আমরা তার দু-একটা গান শুনতে এসেছি। তিনি যদি খুশি মনে শোনান, আমরা ধন্য হবো। কারো কাছে সঙ্গীত সুসম খাদ্য সমান, কেউবা সঙ্গীতকে দাওয়াই মনে করে, আবার কেউ ভাবে সঙ্গীত সময় কাটানোর উৎকৃষ্ট উপায়। যে যে-চোখে দেখে, যে যেভাবে ভাবে। কিন্তু আমাদের কাছে সঙ্গীতই সব। তা দিয়ে ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়, ওষুধেরও কাজ দেয়, আর সময় কাটানো—তা তো হবেই।

জুবেদা দরবেশের গান শুনিয়ে মাত করে দিতে পারলো। বাকী রাতটা কোন দিক দিয়ে কিভাবে কখন পালিয়ে গেলো, কেউ টেরই পেলো না। যখন তন্ময়তা কাটলো, তখন ভোর হতে চলেছে। সদলবলে প্রস্থান করার আগে খলিফা একশো স্বর্ণমুদ্রার একটি তোড়া তাকিয়ার নিচে রেখে গেলেন।

দুপুরবেলা সামাত বাজারে যাবার জন্য তৈরি হয়। খলিফা যে মোহরের তোড়াটা ফেলে। গিয়েছিলেন তাই দিয়ে কিছু কেনাকাটা করবে-এই রকম ইচ্ছে। দরজা খুলতেই সে অবাক হয়। পঞ্চাশটা খচ্চর-এর পিঠে দামী দামী সামান পত্র। আর একটা খচ্চরে চেপে এসেছে আবু সিনিয়ার এক সুদৰ্শন বান্দা। ছেলেটি লাফিয়ে নেমে এসে সামাতের হাতে একখানা চিঠি দিয়ে বলে, আমি কইরো থেকে আসছি। আপনার বাবা আমাদের পাঠিয়েছেন। আপনার বিবির জন্য পঞ্চাশ হাজার দিনারের দান সামগ্রী পাঠিয়েছেন।

সামাত চিঠিখানা খুলে পড়তে থাকে।

‘প্রাণ প্রতিম পুত্র আলা। অল-দিন আবু সামাতের প্রতি তার পিতা সামস অলদিনের আশীর্বাদ পত্র :

বাবা, তোমার বিপদের কথা শুনলাম। ডাকাতের হাতে সর্বস্ব খুইয়ে আজ তুমি কিভাবে দিন কাটাচ্ছে জানি না। তোমার কষ্টের কথা ভেবে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।

যাই হোক, এই সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার দিনার মূল্যের দান সামগ্ৰী পাঠালাম। তোমার মা তার পুত্রবধুর জন্য নিজে হাতে তৈরি করা মূল্যবান পোশাক-আশাক এবং স্বর্ণালঙ্করাদি পাঠালেন। আশা করি এসব তার অপছন্দ হবে না।

আমরা শুনে আহত হলাম, তুমি নাকি অর্থাভাবে কোনও তালাক দেওয়া মেয়েকে শাদী করে আবার তার স্বামীর হাতে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি। এ কাজ সম্রাস্ত লোকে করে না। যাইহোক, শাদীর পর সে তোমার আইন সম্মত বিবি। তুমি না ছাড়লে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে এই অ-মানুষিক কাজ তোমার শোভা পায় না। তোমার যদি পছন্দ হয়, সে বিবিকে তুমি কিছুতেই তালাক দিও না। আমি সালিমের সঙ্গে যা পাঠালাম তার মূল্য পঞ্চাশ হাজারের অনেক বেশী। প্রয়োজন বোধ করলে, এর থেকে খেসারতের টাকা পরিশোধ করে দিয়ে শাদী বিবিকে সসম্মানে ঘরে আনবে।

আমি এবং তোমার মা কুশলে আছি। সত্বর ঘরে ফিরে আসবে। আল্লাহ তোমার সহায় থাকুন। ইতি—

তোমার আব্বাজান

আবু সামাতের আনন্দ আর ধরে না। ছুটে গিয়ে জুবেদাকে সব বলে, চিঠিখানা দেখায়, আর কী ভাবনা, এবার আমি তোমার আগের স্বামীর নাকের ডগায় ছুঁড়ে মারবো দশ হাজার দিনার। টাকার জন্যে তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে! ভারি তো দশ হাজার দিনার-তার আবার কথা। তোমার একগাছি চুলের দাম তার চেয়ে ঢের বেশি।

স্বামীর মুখে তোয়াজ প্রশংসা শুনলে কোন মেয়ে না খুশিতে ডগমগ হয়। জুবেদা গলে গেলো। স্বামীকে সোহাগ করে বলে, ওগো আমার গুল বাগিচার মালি, তোমায় আমি ছাড়বো না-ছাড়বো না। এমন করে ঢালতে পোর পানি-আমার চৈত্র মাসের ঝরা পাতার মরা ডালে আবার নতুন করে গজায় কুড়ি।

এমন সময় জুবেদার বাবা এবং তার আগের স্বামী ঘরে ঢুকলো। বাবা বলে, বেটা সামাত, আমি তোমার কাছে একটা আজি নিয়ে এসেছি।

–বলুন।

—তুমি বাবা, আমার এই আগের জামাই-এর ওপর একটু করুণা কর। গরীব বেচারী, রাগের মাথায় বিবিকে বয়ান তালাক দিয়ে ফেলেছিলো। তা সে আর সত্যি সত্যি তাকে মন থেকে মুছে ফেলতে চায়নি। জুবেদাকে তুমি ছেড়ে দাও বাবা, এই আমার ভিক্ষে। আল্লাহর কৃপায় তোমার অনেক আছে। আজ তোমার বাবা যা পাঠিয়েছে তা দিয়ে তুমি অনায়াসে বাঁদী বাজারের সেরা মেয়েকে কিনে আনতে পোর। তা যদি পছন্দ না হয়, হাঁ করলেই আমির ওমরাহর সুন্দরী মেয়েকে বিবি করতে পারবে। কিন্তু আমার এই গরীব ছেলেটা জুবেদাকে ফিরে না পেলে আত্মঘাতী হবে। তুমি ওকে ফিরিয়ে দাও। সারা জীন্দগী সে তোমার কেনা গোলাম হয়ে থাকবে।

আবু সামাত বাধা দিয়ে বলে, আহা-হা ওকি কথা। কে কার গোলাম হয়ে থাকবে। ও কথা রাখুন, আল্লাহ আমাকে অনেক মূল্যবান সওদাপত্ব পাঠিয়েছেন। এখন আমার আর কোনও অভাব নাই। তাই জুবেদার স্বামীকে খেসারতের পরিমাণটা আরও অনেক বাড়িয়ে দিতে চাই। ঐ পঞ্চাশটা খচ্চর সৃদ্ধ সামান পত্র সব আমি তাকে দিচ্ছি—সেই সঙ্গে ঐ বান্দা সলিমকেও দেব। আর যদি জুবেদা বলে, সে তার আগের স্বামীর সঙ্গেই ঘর করবে, আমার কোনও অমত নাই। এক কথায় সব ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। জুবেদাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন সে কি বলে—সে কি চায়।

জুবেদার বাবা এবার মেয়ের মত চায়, মা, তুমি বলো, কার সঙ্গে ঘর করতে চাও। তোমার জন্য তোমার আগের স্বামী খানা-পিনা বন্ধ করে পাগলের মতো হয়ে গেছে। আমি বলি কি মা, আমন রাগের মাথায় বেফাঁস কথা সবার মুখেই বেরোয়। তাই নিয়েজিদ করে বসে থাকলে সংসার চলে না।

জুবেদা বলে, জিদের কথা নয়। বাবা, লোকটা একেবারে অপদার্থ। একটা দিন সে তোমার মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। মেয়ে হয়ে এর বেশি আর কি বলবো তোমাকে। আর এই যে আমার নতুন স্বামী-কি তার যৌবন-পৌরুষ। আমার গুল বাগিচায় সে বাহার এনে দিয়েছে। জীবনে এত সুখ এত আনন্দ আছে—আগে বুঝিনি। আমার ঐ আগের স্বামী চলতে চলতে মাঝপথেই পা পিছলে পড়ে যেত।–আর সে উঠতে পারতো না। না বাবা, আমার এই নতুন জীবনে আমি খুব খুশি হয়েছি। তুমি ওকে অন্য পথ দেখতে বলো।

জুবেদার এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামীটা গোঁ গো করতে করতে ধুপ করে মাটিতে পড়ে গেলো। আর উঠলো না।

আবু সামাত তার সুন্দর সহচরী জুবেদা বিবির সঙ্গে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর সংসার করতে লাগলো। প্রতিটি রাত্রি তারা খানা পিন্যায়, নাচে গানে মধুর করে তোলে। জীবনের সুধাপাত্র কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে।

শাদীর পর নটা দিন কেটে গেছে। দশ দিনের দিন আবু সামাত তার বিবি জুবেদাকে বললো, দেখছো, কান্ডাখানা। সেই দরবেশ প্রধান কি রকম ধাপ্লাটা দিয়ে গেলো। তার আশায় চুপ করে বসে থাকলে তো আমাকে ফাটকের খানা খেতে হতো। আবার যদি বাছাধনের দেখা পাই, আচ্ছা করে। শুনিয়ে দেব।

সন্ধ্যাবেলা যথারীতি গান বাজনার আসর, বসলো। একটুক্ষণ, পরে কড়া নাড়ার শব্দে সামাত উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। সেই দরবেশগুলো আবার এসেছে। আবু সামাত-এর মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠে।—আসুন আসুন, মিথ্যের বাদশাহরা, ভিতরে আসুন। আহা, আমন করে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? ভিতরে আসুন? আল্লাহর কৃপায় আপনাদের খয়রাতি ছাড়াই আমার বিপদের সুরাহা হয়ে গেছে। যদিও আপনারা ডাহা মিথুক এবং শঠ, তবু তো আমার মেহেমান, তাই বিনীত অনুরোধ ভিতরে আসুন।

দরবেশরা নীরবে ঘরের ভিতর ঢুকে একপাশে বসে। আবু সামাত পর্দার ওপারে। ওঘরে জুবেদাকে বলে, বিবিজান, সেই মেহেমানরা এসেছেন তোমার গান শুনতে। খুব ভালো করে গান শোনাও।

জুবেদা খুব রগরগে নাচ-এর সঙ্গে ততোধিক রগরগে গান গাইলো।

নাচগান থামলে প্রধান দরবেশ কি একটা কারণে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেতেই সভাকবি আবু নসাব সামাতকে বলে, আচ্ছা সাহেব, কি করে তুমি ভাবলে, কইরো থেকে তোমার বাবা পঞ্চাশটা খচ্চর আর ঐ সব দান-সামগ্ৰী তোমাকে পাঠিয়েছে? এখান থেকে কাইরো কত দিনের পথ? কম করে হলেও পয়তাল্লিশ দিনের আগে পৌঁছান যায় না। কি? তইতো??

কবি বলে, কইরো থেকে বাগদাদ আসতেও নিশ্চয়ই ঐ রকম সময়ই দরকার?

-সে তো একশো বার।

—তবে? তবে এটা কি করে সম্ভব, বলে? মাত্র দিন দশেক আগে তুমি ডাকাতের হাতে সর্বস্ব খুইয়েছ! এই সংবাদ এত অল্প সময়ের মধ্যে তার কাছে পৌঁছল কি করে? খবর যেতে লাগবে দেড় মাস এবং সেখান থেকে কোনও কিছু আসতেও লাগবে দেড় মাস। তাই না?

–ইয়া আল্লাহ, আবু সামাত চিৎকার করে ওঠে, তাইতো। একথা তো আমার মাথায় ঢোকেনি-ঐ সব সামান পত্র আর বাবার চিঠিখানা দেখে আনন্দে আমি আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। তখন আর খতিয়ে দেখিনি, এত অল্প সময়ের মধ্যে কইরো থেকে কি করে বাবা এসব পাঠাতে পারেন! আমার মনে হচ্ছে, আপনি সব জানেন। কে পাঠিয়েছে। ঐ সব সামান পত্র, বলুন তো?

কবি বললো, আবু সামাত, তোমার রূপের মতো গুণটা যদি থাকতো তা হলে তোমার জুড়ি খুঁজে পাওয়া যেত না। তুমি খলিফার উজির হয়ে তার পাশে বসতে। এখানে যাঁরা উপস্থিত। আছেন তাদের মধ্যে ইনি খলিফা হারুন অল রসিদের উজির জাফর অল বারম্যাকী, তার দেহরক্ষী মসরুর, আর এই অধম তীর সভাকবি আবু নসাবি। স্বয়ং খলিফা একটু আগে বাইরে গেলেন।

আবু সামাত বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে।

–আচ্ছা কবি সাহেব, বলতে পারেন, আমার মধ্যে এমন কি বস্তু তিনি দেখেছিলেন যার জন্য তার এই বদান্যতা?

কথাগুলো বলতে বলতে সামাতের গলা কেঁপে যায়। সারা শরীর ঘেমে ওঠে।

আবু নসাব স্মিত হেসে বলে, তোমার সুন্দর চেহারা আর আদব কায়দায় মুগ্ধ হয়েছিলেন খলিফা।

এই সময়ে খলিফা আবার ঘরে ঢুকলেন। আভুমি আনত হয়ে কুর্নিশ জানিয়ে আবু সামাত বলে, ধর্মাবতার, আপনার অপার মহিমা। আমি দীনহীন অসহায় অবোধ, না জেনে অনেক কটুকথা বলেছি-আমার গোস্তাকি মাফ করুন, জাঁহাপনা। আপনি অনুগ্রহ করে আমাকে যে-সব বকশিস পাঠিয়েছেন তার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ঐরকম বিপদের মুহূর্তে আপনি আমাকে সাহায্য করে বাঁচিয়েছেন। এ ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারবো না।

খলিফা মৃদু হাসলেন। আবু সামাতের চিবুক ধরে আদর করে বললেন, কাল তুমি আমার প্রাসাদে আসবে।

এই বলে জাফর অল বারম্যাকী, মসরুর আর আবু নসাবকে সঙ্গে নিয়ে খলিফা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আবু নসাব সামাতের কানে কানে বলে গেলো, ইয়াদ থাকে যেন, কাল অবশ্যই খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।

পরদিন সকালে আবু সামাত খলিফা সন্দর্শনে যাবার উদ্যোগ আয়োজন করতে থাকে। খলিফা সেদিন সালিমের হাতে এক প্রস্থ মূল্যবান সাজপোশাক পাঠিয়েছিলেন আবু সামাতের জন্য। খুব পরিপাটি করে, সেই সাজপোশাক তাকে পরিয়ে দিলো জুবেদা। খলিফার পাঠানো দানসামগ্রীর মধ্য থেকে সবচেয়ে সুন্দর কাজ করা একটা উপহার সে বেছে বের করলো। ছোট একটা বাক্সে ভরে সলিমের হাতে দিয়ে বললো, চলো এবার রওনা হওয়া যাক।

খলিফা তখন দরবারে সিংহাসনে বসেছিলেন। আবু সামাত যথাবিহিত কুর্নিশ জানিয়ে খলিফার পায়ের কাছে বাক্সটা রেখে বললো, এই সামান্য ভেট গ্রহণ করে আপনার এই অধম। নফরকে ধন্য করুন, জাঁহাপনা।

তরুণের এই বিনয়াবনত বাক্য-ব্যবহারে খলিফা প্রসন্ন হয়ে বললেন, তোমার দেওয়া শুধু বাক্সটা পেলে তো আমার চলবে না, আবু সামাত। তোমাকেও আমি চাই। তুমি আমার প্রাসাদে এসো, তোমাকে একটা ভালো পদে বহাল করবো আমি। এবং আজ থেকেই।

খলিফা তখন দরবারে ঘোযণা করলেন, আজ থেকে এই তরুণ আবু সামাতকে আমি সওদাগর সভার সভাপতি পদে বহাল করলাম। বাগদাদের পথে ঘাটে গঞ্জে। বাজারে এই বার্তা সকলকে জানিয়ে যাও।

সুলতানের হুকুম মাফিক সারা শহরে তক্ষুণি ঢাড়া পিটে সেই ঘোষণা জানিয়ে দেওয়া হলো। সেই দিন থেকে খলিফা একদিনও আবু সামাতকে কাছ ছাড়া করতেন না। সুতরাং আবু সামাত-এর মনের বাসনা মনেই শুকিয়ে যেতে থাকলো। সে ভেবেছিলো, বাজারে একটা দোকান নেবে। সওদাগরি সামানপত্ব সাজিয়ে বসবে। কিন্তু তা আর হলো না। খলিফা তাকে বণিকসভার সভাপতির ফল পদে বহাল করলেন। কয়েক দিন পরে প্রাসাদের প্রধান সরোবজী মারা গেলো। সুলতান এবার যথাযোগ্য মর্যাদায় আবু সামাতকে সেই পদে বরণ করলেন। পরদিন দরবার কক্ষে প্রবেশ করে এক সরকারী কর্মচারী জানালো, প্রাসাদের প্রধান সচিব আজ মারা গেছে। সুলতান সামাতকে বললেন, আজ থেকে তোমাকে আমার প্রাসাদ-এর পূর্ণ দায়িত্ব দিলাম। তুমি যা মাসোহারা পাচ্ছিলে, এখন থেকে তা দুগুণ হবে।

এই সময়ে রাত্রি প্রভাত হয়ে আসছে দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

 

দুশো সাতষট্টিতম রজনীতে আবার গল্প শুরু হয় :

আবু সামাত সারাদিন প্রাসাদের কাজকর্ম দেখাশুনা করে। এবং রাত্ৰিবেলায় বিবির কাছে চলে যায়। দুজনে মিলে মৌজ করে খানাপিনা করে। দরবারের গল্প শোনায়। খলিফা একদিন বললেন, আজ নাচগানের মাইফেল বসানো হোক। জলসাঘরে ঝাড়বাতি জ্বালানো হলো। ফুল আন্তর ধূপের গন্ধে মন্দির হলো সারা ঘর। পর্দার ওপারে খলিফার এক সুন্দরী বাঁদী রক্ষিতা এসে গান ধরলো। গানের মুর্ছনায় সকলেই তখন তন্ময়। খলিফা এক সময় সামাতের কানে কানে বললেন, তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে বন্ধু, আমার বাদীর রূপে তুমি মজেছা!

-জাঁহাপনা মজলে বান্দাও মজিবে, এই তো নিয়ম।

–উহুঁ, সে কথা বলে পাশ কাটালে হবে না। আমি আমার পিতৃপুরুষের নামে হলফ করে বলছি, আজ থেকে এই বাঁদী তোমার।

খোজাকে ডেকে বললো, ‘দিল কা পেয়ারা’র যা কিছু ধনদৌলত আছে–সব এই সাহেবেরবাড়ি পৌঁছে দাও। আর তাকেও তার চল্লিশজন দাসী বাদীর সঙ্গে ওখানে রেখে এসো।

কিন্তু আবু সামাত করুণভাবে মিনতি জানায়, অমন কাজটি করবেন না জাঁহাপনা, একেবারে মরে যাবো। আমি তাকে স্পর্শও করতে পারবো না। সুলতানের ভোগের পাত্রী আমি ভোগ করবো, সে কথা মনে আনাও মহাপাপ।

হারুন অল রসিদ থামলেন, আমি বুঝেছি তোমার ভয় কোথায়। তারই নাকের ডগা দিয়ে আর একটা মেয়েকে ঘরে তুললে সে সহ্য করতে পারবে না। হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে, তাই না?

–না। হুজুর সে-ভয় আমার নাই।

আবু সামাত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। খলিফা জাফরকে বললেন, জাফর বাদীবাজার থেকে হাজার দশেক দিনার দিয়ে একটা বহুৎ খুব সুরৎ বাঁদী কিনে নিয়ে এসো। আমি সামাতের বাড়িতে পাঠাবো। তার কাজে খুশি হয়ে আমি তাকে ইনাম দিতে চাই।

জাফর আবু সামাতকে সঙ্গে নিয়ে বাঁদীবাজারে যায়। বলে, দেখেশুনে পছন্দ করা। দামের এটা জন্য ভাববে না।

কোতোয়াল আমির খালিদও সে-দিন বাঁদীবাজারে এসেছে। উদ্দেশ্য তার একমাত্র পুত্রের জন্য একটা বাঁদী কেনা। ছেলেটি সবে চৌদ্দয় পা দিয়েছে। দেখতে বড় কুৎসিৎকদাকার। বাঁদরের মতো মুখাবয়ব, খুদে খুদে গোলাকৃতি দুটি চোখে জুলজুল করে মেয়েছেলের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। ঘৃণায় সব মেয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়। সুতরাং বাদীবাজার থেকে মেয়ে কেনা ছাড়া আর কি উপায়? এই বামন সদৃশ বাঁদরমুখো ছেলেটার নাম বড়ফট্টাই।

গত রাত্রে তার মা লক্ষ্য করেছে, ছেলের দেহে পুরুষত্ব এসেছে। তার বিছানার চাঁদরে দাগ দেখে সে বুঝেছে, ছেলের স্বপ্নদোষ হচ্ছে। তাই সে স্বামীকে বলেছে, ছেলে লায়েক হয়ে গেছে, আর দেরি নয়, এই বেলা তাকে একটা মেয়ে এনে দাও। বিবির পরামর্শে তাই, আমিরাসাহেব ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে এসেছে।

দালালরা ফর্সা, কালো, শ্যামলা নানা রঙের নানাজাতের বাঁদী এনে দেখাতে থাকে। ছেলেকে নিয়ে আমির, আর আবু সামাতকে নিয়ে জাফর সেই-সব আনকোরা মেয়েমানুষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। কিন্তু কোনটিই কারো পছন্দ হয় না। এমন সময় দালাল সর্দার একটি মেয়েকে এনে হাজির করলো। মেয়েটির রূপের তুলনা হয় না। যেন রমজানের চাঁদ। মেয়েটিকে দেখামাত্র বড়ফট্টাই কামাতুর চোখে জ্বলজ্বল করে তাকায়। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে থাকে। অর্থাৎ তার খুব পছন্দ। বাবাকে বলে, এই হচ্ছে আসলি মাল, এইটাই আমি নেব, বাবা।

এদিকে জাফর আবু সামাতকে বলে, দেখ, চলবে?

সামাত বলে, তোফা, খুব চলবে।

–আচ্ছা বাদীমেয়ে, জাফর জিজ্ঞেস করে, তোমার নাম কী?

মেয়েটি জবাব দেয়, আমার নাম যুঁই, মালিক।

জাফর দালালকে যুঁই-এর দাম জিজ্ঞেস করলো, কত নেবে?

দালাল বলে, পাঁচ হাজার দিনার, হুজুর।

তৎক্ষণাৎ বড়ফট্টাই দুম করে বলে, আমি ছয় হাজার দেব। আবু সামাত সঙ্গে সঙ্গে বলে, আমি আট দেব।

বড়ফট্টাই চিৎকার করে ওঠে, আমি আট হাজার এক দেব।

সামাত বলে, নয় হাজার এক।

জাফর বললো, পুরো দশ হাজারই রইলো।

দালাল হাঁকতে লাগলো, দশ হাজার দিনার-বাদী যুঁই দশ হাজারে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে—আর কেউ আছেন? তাড়াতাডি বলুন। মাত্র দশ হাজার, দশ হাজার-দশ হাজার। ডাক শেষ।

দশ হাজারে আবু সামাত যুঁই-কে কিনে নিলো। দালাল তাকে সামাতের হাতে তুলে দেয়। বড়ফট্টাই মাটিতে পড়ে দাপাতে লাগলো। আমির তার ছেলের এই বেয়াদপি সহ্য করতে পারে না। ছেলেটা একেবারে অকালকুম্মাণ্ড হয়েছে। শুধু বিবির বায়না ঠেলতে না পেরে সে সঙ্গে করে বাজারে নিয়ে এসেছে। না হলে এমন ছেলেকে সে ঘরের বাইরে নিয়ে আসতো না। ছিঃ ছিঃ কি কেলেঙ্কারী কাণ্ড!

জাফরকে অনেক সুক্ৰিয়া জানিয়ে আবু সামাত যুঁইকে সঙ্গে নিয়েবাড়ি চলে আসে। জুবেদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়। জুবেদা স্বামীর পছন্দ করা বাঁদীকে অনাদর করতে পারে না। কাছে ডেকে বসায়। নাম ধাম জিজ্ঞেস করে।

জুবেদার ব্যবহারে সামাত মুগ্ধ হয়। বাঁদীকে সে তার দ্বিতীয় বিবির আসন দেবে। জুবেদা যুঁইকে সাজিয়ে গুজিয়ে সে রাতে সামাতের ঘরে পাঠায়। সামাতের সহবাসে সেই রাতেই যুঁই অন্তঃসত্ত্বা হলো।

বড়ফাট্টাই-এর বাবা ছেলেকে আর কিছুতেই বাগে আনতে পারে না। অবশেষে তাকে মিথ্যে স্তোক দিয়েবাড়ি নিয়ে আসতে পারলো। ছেলে ঘরে এসে বিছানায় আছড়ে পড়ে।–ঐ বাঁদী না পেলে আমি আত্মঘাতী হবো।

মা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো, ওগো আমার কী হবে গো, আমার ছেলে আর বাঁচবে না গো।

এমন গলা ফাটিয়ে এমন কাণ্ড শুরু করলো, পাড়াপাড়শীরা ছুটে এলো। অনেকেই ছেলের দুঃখে হাহুতাশ করলো, আহা দুধের বাছা, তার মুখের খাবার কেউ ঐভাবে কেড়ে নেয়?

যারা সমবেদনা জানাতে এসেছিলো তাদের মধ্যে সিঁদেল চোর আহমদের বুড়ি মা মহা শয়তান। বললো, কিছু ভাবনা কর না বাছা, তোমার ছেলের মনোবাঞ্ছা আমি পুরণ করে দেব। আমার ছেলে আহমদ-এক্কেবারে পাকা চোর। তার অসাধ্যি কিছু নাই। মালিকের নাকের ডগা দিয়ে তার বাড়ির দরজা জানলা খুলে নিয়ে আসে সে। তাকে ধরবে, তেমন মরদ আরবে নাই। সে এমন যাদু জানে, ঘরের মালিক জেগে আছে, তার চোখের সামনে সিদ কেটে সে তার ঘরে ঢুকে সর্বস্ব চুরি করে নিয়ে আসে—কিছু করতে পারে না।

বড়ফট্টাই-এর মা বুড়িকে আদর করে বসায়। বলে, যেমন করেই হোক, তোমার ছেলেকে দিয়ে বাঁদী যুঁইকে চুরি করিয়ে এনে দিতেই হবে। না হলে আমার ছেলে বাঁচবে না।

বুড়ি বলে, কিন্তু কি করে সে কাজ সে করবে বাছা। তাকে তো তোমার স্বামী হাতে পায়ে বেডি পরিয়ে কয়েদ করে রেখে দিয়েছে।

বড়ফট্টাই-এর মা জিজ্ঞেস করে, কেন?

—অতি তুচ্ছ কারণে মা, অতি তুচ্ছ কারণে। বাছা আমার সামান্য কটা দিনার জাল করেছিলো-এই তার অপরাধ।

আমির বিবি বলে, ঠিক আছে, ছেলের বাবা ঘরে আসুক, আজই আমি এর বিধি-ব্যবস্থা করছি।

সন্ধ্যা বেলায় কোতোয়াল ফিরে এলে, খানাপিনা শেষ হলে তার ঘরে এলো আমির বিবি। পরণে বাহারী সাজপোশাক, প্রসাধন-প্রলেপে মুখখানা ডাগর মেয়ের মতো ঢলঢলে হয়েছে। চোখে সুর্ম কাজল পরেছে কচি মেয়েদের মতো করে। গায়ে ছিটিয়েছে দামী আন্তর। ভুরভুর করে গন্ধ বেরুচ্ছে। এই মোহিনী বেশে সামনে এসে দাঁড়াতেই খালিদের চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। বিবিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে পালঙ্কের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ছলনাময়ী নারী নিজেকে শক্ত করে রাখে, না, আগে বলো, আমি যা বলবো, শুনবে।

খালিদের রক্তে তখন নাচন শুরু হয়েছে বলে, আল্লাহ কসম, যা চাইবে তাই দেব, যা বলবে তাই করবো, এবার চলো।

আমির-বিবি স্বামীকে সোহাগ করতে করতে বলে, আহমদের মা মৃত্যু শয্যায়। ছেলের শোকে সে অন্ধ হয়ে গেছে। যেভাবেই হোক, তাকে খালাস করে দিতে হবে।

ততক্ষণে খালিদের দেহের ক্লেদ নির্গত হয়ে গেছে। আলস্য-অবসাদ জডিত কণ্ঠে কোনরকমে সে বলতে পারলো; জবান যখন দিয়েছি নিশ্চয়ই তাকে খালাস করে দেব।

পরদিন সকালে আমির কয়েদখানায় এসে আহমদকে জিজ্ঞেস করে কী? আর করবে। কখনও জালিয়াতী?

-জী না, আর ককখনো করবো না, খোদা কসম; আমার অনেক আক্কেল সেলামী হয়েছে।

এবারে একটু মানুষের মতো বাঁচতে চাই। আমি তামাম দুনিয়াকে চিৎকার করে জানাতে চাই, অপরাধ করে সুখ শাস্তি কিছুই পাওয়া যায় না।

কোতোয়াল তাকে সঙ্গে করে খলিফার সামনে নিয়ে যায়। সুলতান তো দেখে অবাক, এত নির্যাতনের পরেও লোকটা বেঁচে আছে? আমি তো ভেবেছি প্যাদানীর চোটে কবে অক্কা পেয়ে গেছে।

আহমদ বেডিসুদ্ধ হাতখানা মাথার উপরে তুলে বলে, খোদা মেহেরবান, আপনি ধর্মাবতার, কিন্তু শয়তানের কলিজা বড় কঠিন বস্তু।

খলিফা হো হো করে হেসে উঠলেন, বাঃ, তোফা কথা বলেছ তো, হে।

খালিদকে উদ্দেশ করে বললেন, ওকে কামারের কাছে নিয়ে যাও। কড়া বেডি সব খুলে দাও। লোকটাকে কাজে লাগাতে হবে। কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলবো। চোর ডাকাতদের এ যতটা জানে আর তো তেমন কারো পক্ষে জানা সম্ভব না। তাদের গতিবিধি ঘোৎঘাৎ আড়ডা—সবই এর নখ-দপণে। আজ থেকে একে আমি প্রধান কোতোয়ালের পদে বহাল করলাম।

আহমদ আঙুমি আনত হয়ে খলিফাকে কুর্নিশ জানায়।

আজ তার আনন্দের সীমা নাই। শুধু কয়েদখানা থেকে ছাড়া পাওয়া নয়, একেবারে প্রধান কোতোয়ালের চাকরী মিলে গেলো। একেই বলে বরাত।

ইহুদী ইব্রাহিমের মদের দোকানে গিয়ে ঢাকাঢ়ক করে কয়েক পাত্র গলায় ঢেলে দিলো। আঃ, কী মজাদার সরাব। কতকাল সে মদ খেতে পায়নি। আজ আর কোনও কথা নয়, প্ৰাণ ভরে খাবে। যত পারে।

নেশায় টং হয়েবাড়ি ফেরে। মা কেঁদে আকুল। এত মদ খেয়েছিস কেন, বাবা?

—খাবো না? কতদিন ফটকে আটকে ছিলাম, এক ফোটা জিভেয় ঠেকাতে পারিনি।

বুড়ি বলে, কিন্তু আমার যে একটা কাজ করে দিতে হবে, বাবা।

—বলো মা, কি করতে হবে। তোমার জন্যে আমি সব করতে পারি।

তখন বুড়ি আবু সামাত, বাঁদী যুঁই আর বড়ফট্টাই-এর সব বৃত্তান্ত খুলে বলে তাকে।

—এখন বড়ফট্টাই নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছে। যুঁইকে তার চাই-হুঁ। তোর অসাধ্য কোনও কাজ নাই। তুই চেষ্টা করলে যুঁইকে তার কাছে এনে দিতে পারিস, বাবা।

আহমদ বলে, এ আর এমন শক্ত কী? তুমি নিশ্চিন্ত থাক, আমি সব ব্যবস্থা করছি।

সে-দিন মাসের পয়লা। যথারীতি ফি মাসে এই তারিখে খলিফা তার প্রধান বেগমের ঘরে যান। তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন, খানাপিনা সারেন। তারপর রাত্ৰিবাস করেন।

সন্ধ্যা হতেই খলিফা বেগমের মহলে আসেন। বেগমের শোবার ঘরের এ পাশে একটি ছোট বসবার ঘর। সেই ঘরের একটি মেজ-এর উপর খলিফা খুলে রাখলেন। তার গলার রত্নহার, তার বাদশাহী মোহর এবং হীরা বসানো একটা সোনার রোশনাই। বাতি। এই হীরাটার দ্যুতি অন্ধকার-এ জ্বল জুল করে। ঘরের অন্ধকার কেটে যায়।

এ-সব আহমদের জানা। প্রাসাদের নফরচাকর সব ঘুমিয়ে পড়লে দড়ির মই বাধিয়ে তরতর করে প্রাচীরের উপরে উঠে যায় সে। তারপর টুক করে নিচে লাফিয়ে পড়ে। বেগমের বসার ঘর থেকে খলিফার খুলে রাখা জিনিসগুলো বগলদাবা করে। আবার সে যেভাবে এসেছিলো সেইভাবে সন্তপণে সটকে পড়ে।

আবু সামাতের বাড়ির দিকে ছুটে চলে আহমদ। নিঃশব্দে ফটকের তালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পড়ে। ঘরের পিছনের দিকের দেওয়ালের একখানা শ্বেতপাথরের থান তুলুে ফেলে। শাবল দিয়ে খানিকটা গর্ত করে তার মধ্যে খলিফার ঐ রত্নহার। আর মোহরখানা ভরে আবার যথারীতি পাথরের থানখানা এটে লাগিয়ে দিয়ে চুপিসারে কেটে পড়ে। তারপর ইবরাহিমের দোকানে এসে সারারাত ধরে তাডি খেতে থাকে।

সকালবেলা বেগমের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খলিফা হতবাক হয়ে যায়। তার ব্যবহারের জিনিসে কেউ হাত দিতে পারে।–ভাবতে কষ্ট হয়। এত বড় দুঃসাহস কর হতে পারে!

সঙ্গে সঙ্গে সারা প্রাসাদ তোলপাড় হতে লাগলো। কী সৰ্ব্বনাশ, প্রাসাদের হারেমে চোর ঢুকেছিলো! খোজাদের তলব করা হলো। সবাই পাংশু বিবৰ্ণ মুখে বললো, কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। খলিফা সিংহনাদ করে উঠলেন, আজ কারো নিস্তার নাই। সবাইকে আমি শেষ করে ফেলবো।

হন হন করে তিনি দরবারে এসে সিংহাসনে বসলেন। সারা মুখে চাপা ক্ৰোধ, চক্ষু রক্তবর্ণ। চারপাশে উজির আমির অমাতারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। কারো মুখে কোনও ভাষা নাই। খলিফাও নির্বাক। সমগ্র দরবারে তখন কবরের নীরবতা।

হঠাৎ খলিফা হুঙ্কার ছাড়লেন, জাফর, রক্ত যে টগবগ করে ফুটছে।

জাফর শান্তভাবে বলে, আল্লাহ শয়তানকে শায়েস্তা করবেন।

এই সময়ে কোতোয়াল খালিদ আহমদকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলো। খলিফা বললেন, এই যে আমির খালিদ, এদিকে এসো, আমার সামনে দাঁড়াও।

কোরবানীর খাসীর মতো খালিদ এগিয়ে যায়।

—তোমার শহর এলাকার হালচাল কী রকম চলছে?

—খুব ভালো জাঁহাপনা, চুরি ছিনতাই একদম নাই। আমি সব ঠাণ্ডা করে দিয়েছি।

—হুঁ, তাই নাকি। কিন্তু আমি তো গরম হয়ে গেছি, কোতোয়াল। আমাকে ঠাণ্ডা করবে কি দিয়ে?

-জাঁহাপনা-

-তুমি একটা মিথ্যেবাদী, উজবুক।

—জী হুজুর। কোথাও তো কিছু ঘটেনি।

–চোপরও।

উজির জাফর ফিসফিস করে খালিদের কানের কাছে বললো, কাল রাতে বেগমের ঘর থেকে স্বয়ং ধর্মাবতারের জিনিসপত্র চুরি গেছে—সে খবর রাখ?

সুলতান বললেন, শোনো খালিদ, যে জিনিসগুলো খোয়া গেছে তা আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং মূল্যবান। সারা সাম্রাজ্যের বিনিময়েও তার ক্ষতিপূরণ হতে পারে না। সুতরাং, যেভাবেই হোক, সেগুলো আমার ফেরৎ চাই-ই চাই। তা যদি না পোর, তোমার গর্দান যাবে। আজকের দিন সময় দিলাম, তার মধ্যে তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে সেই চোরকে। নইলে কাল সকালে, এই প্রাসাদের ফটকের সামনে তোমার কাটা-মুণ্ডু, ঝুলবে, বুঝলে?

বড়ফট্টাই-এর বাবা আমির খালিদের অবস্থা তখন কাহিল। এত বড় শহরে কোথায় সে-চোর গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে আছে, কি করে সে জানবো? নাঃ, আর কোনও বাঁচার পথ নাই। প্ৰাণটা গেলো। হঠাৎ তার মাথায় ধী করে একটা বুদ্ধি এলো, হুজুর, আপনি তো কাল থেকে এই আহমদকে প্রধান কোতোয়ালে বহাল করেছেন। এখন তো সব দায়দায়িত্ব তার-আমি তার আজ্ঞাবহ মাত্র। যদি চুরির মাল না পাওয়া যায়। তবে সাজা পেতে হলে তারই পাওয়া উচিত।

এবার আহমদ সামনে এগিয়ে আসে।-ধর্মাবতার, চোরকে খুঁজে বের করা শক্ত হবে না। হুজুরের কাছে প্রার্থনা, আপনি আমাকে শহরের যে কোন বাড়ি, ঘর দোকানপাঠ তল্লাসী করার উটব ফরমান দিন। আমার অবাধ গতি থাকবে সর্বত্র। তা সে উজির জাফর অল বারমাকীর প্রাসাদই হোক, বা কাজী বা জাঁহাপনার একান্ত প্রিয়পাত্র আবু সামাতের বাড়িই হোক। আমার যেখানে প্রয়োজন আমি যাবো, যাকে খুশি জিজ্ঞাসাবাদ করবো, যে কোন জায়গা খানাতল্লাসী চালাবো।

খলিফা বললেন, অতি উত্তম কথা। আমি এক্ষুণি এইমৰ্মে ফরমান দিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবে আহমদ, গর্দান চাই-হুঁ। তা সে তোমারই হোক, বা সেই চোরেরই হোক। তাকে ধরতে পারলে তোমারটা বাঁচবে তারটা যাবে। না পারলে তোমার–

আহমদ বিচলিত হলো না।–তাই হবে জাঁহাপনা। আমি আপনার বিচার মাথা পেতে নিলাম। এই আমি আমার বাপ ঠাকুরদা-চৌদ্দ পুরুষের নামে কসম খেয়ে বলছি-চোর আমি ধরবোই। তা সে যদি আমার নিজের ঔরসের ছেলেও চুরি করে থাকে-রেহাই পাবে না সে। আপনার দরবারে হাজির করবো তাকে।

আহমদ সুলতানের ফরমান এবং কাজীর দুজন আর কোতোয়ালের দুজন সিপাইকে সঙ্গে নিলো। প্রথমে সে গেলো, উজির জাফরের প্রাসাদে। সারা প্রাসাদ খানাতল্লাসী করলো। কিন্তু না, কিছুই পেলো না। তারপর গেলো কোতোয়াল আর কাজীর বাড়ি। সেখানেও কিছু মিললো না। সব শেষে এলো সে আবু সামাতের বাড়ি। তখনও এত সব কাণ্ড কারখানার কিছুই খবর রাখে না। আবু সামাত।

আবু সামাত বাইরের ঘরে বসেছিলো। আহমদের এক হাতে সুলতানের ফরমান অন্য হাতে একখানা মস্ত শাবল। আবু সামাতকে সে তার আসার কারণ বুঝিয়ে বললো।

—আপনি সুলতানের প্রিয়পাত্র, আপনাকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করার কারণ থাকতে পারে না। তবু কর্তব্য বড় কঠিন বস্তু, তল্লাসী আমাকে করতেই হবে। আশা করি আপনি কিছু মনে করবেন না।

সামাত হাসি মুখে বলে, না না, সে কি কথা? আপনি কর্তব্যের দাস। আমি মনে করবো কি? যেমন ভাবে খুশি সারাবাড়ি তল্লাসী করে দেখুন, আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই।

আহমদ বিড় বিড় করে বলে, শুধু নিয়ম রক্ষার জন্যে-তাছাড়া কোনও দরকার ছিলো না।

তারপর ঘরের বাইরে আঙিণায় এসে দাঁড়ায়। হাতের শাবলটা দিয়ে এখানে ওখানে ঠুকতে থাকে। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ চালাবার পর এক জায়গায় এসে আহমদ দাঁড়িয়ে পড়ে।

উহুঁ, এই আওয়াজটা তো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

আর একবার সে ঐ জায়গাটা শাবল দিয়ে ঠুকে। আওয়াজটা সত্যিই যেন কেমন কেমন। সামাত বলে, খুলে ফেলুন তো পাথরখানা।

আহমদ বলে, নিশ্চয়ই ভেতরটা ফাঁপা—

সাবলের ডগা দিয়ে চা দিতেই পাথরখানা খুলে যায়। ভেতরটায় একটা ছোট্ট গর্ত। গর্তের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে আহমদ টেনে বার করে খলিফার ব্যবহারের সেই জিনিসগুলো।

সামাতের মুখ সাদা হয়ে যায়। মাথা ঘুরতে থাকে। কোনও রকমে সে মাটির ওপরে বসে পড়ে।

একটা কাগজে উদ্ধার করা জিনিসগুলোর বিবরণ লিখে তখুনি সে কাজী এবং কোতোয়ালের কাছে পাঠায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই খলিফা কাজীকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে পড়েন। সিপাইরা চ্যাংদোলা করে সামাতকে কাঠগড়ায় নিয়ে গিয়ে হাজির করে।

খলিফা সাক্ষ্য প্রমাণে নিঃসন্দেহ হয়ে অবাক হয়ে ভাবতে থাকেন। শেষকালে সামাত-তার একান্ত প্রিয় পাত্র সামাতের এই কাণ্ড! কিছুতেই তিনি হিসাব মেলাতে পারেন না। এইভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে বসে ভাবতে থাকেন। তারপর এক সময় রায় দেন, একে নিয়ে যাও, ফাঁসীতে ঝোলাও।

হাবিলদার সারা শহরে ঢ্যাড়া পিটিয়ে জানিয়ে দেয়, আজ সন্ধ্যায় সামাতের ফাঁসী হবে। তারপর সামাতের সব বিষয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তার দুই বিবিকেবাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসে। সোনাদান টাকাকডি যা পাওয়া গেলো।—খাজাঞ্চীখানায় জমা করে দেয়। বাঁদী যুঁই আর বিবি জুবেদাকে নীলামের ডাকে তোলে। বাঁদী যুঁইকে বড়ফট্টাই-এর বাবা খালিদ কিনে নিয়ে চলে যায়। আর জুবেদাকে হাবিলদার নিয়ে যায় তার নিজের বাড়িতে।

এখানে বলে রাখা দরকার, এই সদাশয় হাবিলদারটি সামাতকে খুবই স্নেহ করতো। সামাতও তাকে বাবার মতো ভক্তি শ্রদ্ধা জানাতো। হাবিলদার সামাত-এর চরিত্র খুব ভালো ভাবেই জানে। তার পক্ষে এই জঘন্য কাজ কিছুতেই করা সম্ভব না। নিশ্চয়ই এর পিছনে অন্য কোনও মতলব আছে। হাবিলদার বুঝতে পারে না—কি সে মতলব! যাই হোক, সুলতানের হুকুম সামাতকে ফাঁসী। দিতে হবে। উপায় নাই। কিন্তু হাবিলদারের মন কিছুতেই সায় দেয় না। একটা নিরপরাধ ফুলের মতো নিষ্পাপ পবিত্র ছেলে প্ৰাণ হারাবে!

আর দেরি করা চলে না। আজ সন্ধ্যাতেই আবু সামাতের ফাঁসী দিতে হবে। হাজার হাজার লোক জড়ো হচ্ছে প্রাসাদের সামনে।

হাবিলদার কয়েদখানার সচিবের কাছে গিয়ে বললো, জনা চল্লিশেক ফাঁসীর কয়েদী আছে আপনার ফাটকে। আমি ওদের সবাইকে পরীক্ষা করে দেখবো।

ফাঁসীর আসামীদের এক এক করে দেখতে দেখতে একজনকে দেখে মনে হলো, এই প্রথম লোকটার সঙ্গে সামাতের চেহারার অনেকটা মিল আছে। লোকটাকে সে বাইরে বের করে আনলো। যথা সময়ে সেই নকল সামাতের গলায় ফাঁসীর দড়ি পরানো হলো। লোকে হায় হায় করতে থাকলো। সেই উদ্বেলিত জনতার সমক্ষে সে-দিন সন্ধ্যায় নকল সামাতের ফাঁসী হয়ে গেলো।

এর পর প্রায় মাঝ রাতে আসল সামাতকে ফাটক থেকে বের করে হাবিলদার তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। সামাতকে সে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বাবা, সত্যি কথা বলতো কেন এই কাজ করলে?

হাবিলদারের এই কথা শুনে সামাত আবার মুছিত হয়ে পড়ে। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে। শেষে আপনিও আমাকে এই মিথ্যা সন্দেহে জড়াতে চাইছেন, বাবা। আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আমি এর বিন্দু বিসর্গ জানি না। এ সবই এক জঘন্য চক্রান্ত।

হাবিলদার বলে, আমি জানি বেটা, তোমার মতো সাচ্চা মুসলমানের পক্ষে এধরনের অসৎ কাজ করা কিছুতেই সম্ভব না। যাই হোক, তুমি ভেব না, দোষী একদিন ধরা পড়বেই। এই মুহূর্তে তা প্রমাণ করা শক্ত। তোমার নিজের নিরাপত্তার জন্যে এখন আপাততঃ কিছুদিন এ শহর ছেড়ে অন্য কোথাও গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে তোমাকে। কারণ চারিদিকে শত্রুর চর ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার সন্ধান পেলে তোমার গর্দান যাবে, আমার গর্দান যাবে। আর দেরি নয়, আজই তোমাকে পালাতে হবে। লবন সমুদ্রের ওপারে আলেকজান্দ্ৰিয়া—সেখানে গিয়ে কিছুদিন থাকে। তারপর সময় হলে আমি তোমাকে নিয়ে আসবো। এখন তোমার বিবি জুবেদা আমার বাড়িতেই থাক। তার আদর যত্নের কোনও ত্রুটি হবে না।

আবু সামাত বলে, কিন্তু আমি তো পথঘাট কিছুই চিনি না।

–তার জন্যে কোনও ভাবনা করো না। আমি তোমার সঙ্গে যাবো। তোমাকে রেখে আমি ফিরে আসবো। আলেকজান্দ্ৰিয়ার শোভা বড় মনোহর। যে দিকে তাকাও, শুধু সবুজের মেলা। দেখে দু’ চোখ জুড়িয়ে যায়।

তডিঘডি তারা বেরিয়ে পড়লো। যাবার আগে জুবেদার সঙ্গে একবার দেখাও করে আসতে পারলো না। সামাত। চুপিসাবে নিঃশব্দ পায়ে পথ হেঁটে তারা বাগদাদের শহর সীমানা পার হয়ে যায়। চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সামাত। পায়ে হেঁটে আর কত দূর যাওয়া সম্ভব! উষর মরুভূমির উত্তপ্ত বালি। বঁটা বঁটা করা রোদ। ক্রমশই গতি মন্থর হয়ে আসে।

এই সময়ে, হাবিলদার লক্ষ্য করলো, দুজন রক্তচোষা ইহুদী সুদখোর ঘোড়ায় চেপে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। লোক দুটো কাছে আসতে হাবিলদার হুকুম করলো, নামো, তোমাদের তল্লাসী করবো।

ঘোড়া থেকে নামতেই তরোয়ালের দুই কোপে দুজনের মাথা মাটিতে নামিয়ে দিলো সে। সামাত বললো, লোক দুটোকে মারলেন কেন, বাবা। ওরা তো কোনও দোষ করেনি।

হাবিলদার বলে, লোকগুলো সুদখোঁর শয়তান। ওদের ছেড়ে দিলে বাগদাদে পৌঁছে টাকার লোভে আমাদের কথা খলিফাকে জানিয়ে দিত।

হাবিলদার তখন ইহুদী দুটোর টাকাকডি বের করে নিয়ে সামাতকে বললো, নাও, ঘোড়ায় চাপে। এতটা পথ হেঁটে হেঁটে যাওয়া তো সম্ভব না।

জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে বন্দরে এসে পৌঁছয় তারা। একটা সরাইখানায় ঘোড়া দুটো রেখে তারা একটা নৌকার সন্ধানে বের হয়। বেশীক্ষণ খুঁজতে হলো না, একটু এগোতেই নজরে পড়লো, একখানা নৌকা ছাড়বো ছাড়বো করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, নৌকাটা আলেকজান্দ্ৰিয়াতেই যাবে। আবু সামাতের হাতে সোনা দানা ইহুদী দুটোর দেহ তল্লাসী করে যা পাওয়া গিয়েছিলো, তুলে দিয়ে হাবিলদার বলে, আলেকজান্দ্ৰিয়াতে গিয়ে তুমি আমার খবরের প্রত্যাশায় বসে থাকবে। সময়ের চাকা একদিন ঘুরবেই, তখন আমি নিজে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।

নৌকা ছাড়ার সময় হয়ে আসে। হালিদারের দু চোখ জলে ভরে ওঠে। হাত নেড়ে সে বিদায় জানায়।

বাগদাদে ফিরে এসে সে যা শুনেছিলো তা এইরকম :

নকল সামাতকে ফাঁসী দেওয়ার পরদিন সকালে খলিফা অস্থিরভাবে পায়চারী করছিলেন। কাল সাররাত তিনি ঘুমাতে পারেননি। এখনও তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না, সামাত-এর দ্বারা এই কাজ হতে পারে। ছেলেটি বড় ভালো ছিলো, তার স্বভাবচরিত্র আদব কায়দা পলকেই সবারই মন কেড়ে নেয়। জাফরকে তলব করতেই সে এসে হাজির হলো।

—উজির, কালকের ব্যাপারে আমি বড় ভেঙ্গে পড়েছি। দুনিয়ায় কাউকেই কি বিশ্বাস করতে পারা যাবে না। ছেলেটাকে বাইরে থেকে কত ভালো মনে হয়েছিলো, কিন্তু ভেতরটা যে ঐরকম কদাকার তা কি করে বুঝবো!

জাফর বলে, ধর্মাবতার, রহস্যের কিনারা না পাওয়া পর্যন্ত সবই দুর্বোধ্য মনে হয়। কিছুতেই ভাবা যায় না কি করে অসম্ভব সম্ভব হলো। কিন্তু আসল কারণ যেদিন জানা যায় সেদিন সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যাই হোক, আবু সামাত মিশরের এক সম্রাস্ত সওদাগর বংশের ছেলে। তার চেহারা চরিত্র আদব কায়দার মধ্যে একটা খানদানী ছাপ আছে। এখনও আমার ধারণা, এর মধ্যে অন্য কোনও ব্যাপার নিহিত আছে।

খলিফা, চুপচাপ বসে বসে ভাবতে থাকেন। সত্যিই কি তিনি কোনও নিরপরাধীকে ফাঁসী। দিলেন? সে তো মহা অধৰ্ম, মহাপাপ!

—জাফর, আবু সামাতের লাশটা একবার দেখবো, চলো। দুজনে ছদ্মবেশ ধারণ করে বধ্যভূমিতে এসে দাঁড়ালেন। তখনও কফিনে ঢাকা সামাতের লাশটা ফাঁসী কাঠেই ঝুলছিলো। জাফর ঢাকাটা সরিয়ে দিতেই নকল সামাতের লাশটা দেখে চমকে ওঠেন খলিফা।

-এই সেই সামাত? কিন্তু সে তো আরও লম্বা চওড়া ছিলো।

জাফর বলে, মরার পরে মানুষ সিটিকে যেতে পারে। তাতে লম্বা মানুষকেও খাটো মনে হওয়া সম্ভব।

খলিফা বলেন, কিন্তু জাফর, তার গালে দু’খানা তিল ছিলো, এর গালে কোন তিলের বালাই নাই।

-জাঁহাপনা, এই অস্বাভাবিক মৃত্যুতে মুখের যে বিকৃতি ঘটে তাতে অনেক কিছুই পালটে যেতে পারে। সুতরাং ও-সব দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না।

খলিফা বললেন, তা ঠিক। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করে দেখ, এই ছেলেটার পায়ের পাতায় উল্কি কাটা আছে। আর ঐ উল্কিতে দুই শেখের নাম লেখা—এতো সিয়া সম্প্রদায়ের চিহ্ন। কিন্তু আমি ভালো করে জানি, আবু সামাত সুন্নি ছিলো।

জাফর বলে, একমাত্র আল্লাহই এ রহস্যের কিনারা করতে পারেন।

দুজনে প্রাসাদে ফিরে আসেন। খলিফা হুকুম দিলেন, আবু সামাতের লাশটা কবর দিয়ে দাও।

এর পর থেকে আবু সামাতের সমস্ত স্মৃতি খলিফা হারুন অল রসিদের মন থেকে মুছে যেতে থাকে।

এবার আমরা আবু সামাতের দ্বিতীয় বিবি বাঁদী যুঁই-এর দিকে চোখ ফেরাচ্ছি :

আবু সামাতের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পর হাবিলদার তার দুই বিবিকে নীলামে তুলেছিলো। প্রথম বিবি জুবেদাকে সে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। আর দ্বিতীয় বিবি বাঁদী যুঁইকে কিনে নেয় বড়ফট্টাই-এর বাবা কোতোয়াল খালিদ।

যুঁইকে বাড়ি নিয়ে এসে খালিদ ছেলে বড়ফট্টাই-এর ঘরে ঠেলে দেয়। বড়ফট্টাই-এর কামাতুর চোখ দুটো নেচে ওঠে। ছুটে এসে সে যুঁইকে জাপটে ধরতে যায়। কিন্তু যুঁই-এর গা রিরি করে ওঠে। এক ঝটিকায় সে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বড়ফট্টাই এর দুম্বার মতো দেহটা। কপট ক্রোধে সে কোমর থেকে ছুরি বের করে ভয় দেখায়, ফের যদি আমার গায়ে হাত দিতে আসবে তো জবাই করে ফেলবো।

বড়ফট্টাই-এর মা ছুটে আসে, তোমার তো বড় সাহস বাঁদী! আমার ছেলেকে শাসাচ্ছো! দাঁড়াও, তোমাকে মজা দেখাচ্ছি। বেয়াদপি বজাৎ মেয়ে কোথাকার।

যুঁই রাগে গর্জে ওঠে, মুখ সামলে কথা বলো, এমন বেআইনি কথা কে শুনেছে—এক স্বামীর ঘর করতে করতে আর একজনের সঙ্গে কোন মেয়ে সহবাস করে? তোমরা কি জািননা, আমি আবু সামাতের বিবি? তোমার ছেলের বামন হয়ে চাঁদ ধরার শখ কেন? সিংহীর গুহায় কুকুর ঢুকলে তার কী দশা হয়, জান না?

বড়ফট্টাই-এর মা আস্ফালন করতে থাকে, বড় বড় বেড়েছে, না? কেমন করে তোমাকে শায়েস্তা করতে হয়, দেখ। খাটিয়ে তোমার গতির শেষ করে দেব।

যুঁই বলে, ঐ বাঁদরটাকে দেহ দান করার আগে আমি নিজেকে খতম করে দেব। আমার এই দেহ যৌবন ভালোবাসা সবই আমার স্বামীর জন্য। তা সে জিন্দাই থাক। আর মারাই যাক।

বড়ফড্রাই-এর মা যুঁই-এর সাজপোষাক এবং অলঙ্কারাদি জোর করে খুলে নিয়ে অতি সাধারণ ঝি চাকরাণীর পোশাক পরতে দেয়। বলে, রসুইখানায় যাও, ওখানেই তোমাকে থাকতে হবে। উনুন ধরাবে খানা বানাবে-এই তোমার কাজ।

যুঁই বলে, তোমার ঐ বাঁদর-মুখে কুঁজে বামন ছেলের সুরৎ দেখার চেয়ে এসব খাটুনি খাটাও ঢ়ের ভালো।

এর পরে রান্না ঘরেই তার জায়গা হলো। বাড়ির অন্যান্য ঝি চাকররা এই ব্যাপারটা ভালো নজরে দেখতে পারলো না। যুঁই-এর মতো সুন্দরী বাঁদী রান্না ঘরের কালি ধোঁয়ার মধ্যে দিন কাটাবে! সবাই তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিলো। বলতে গেলে কোনও কাজই তাকে করতে দিত না। বললে, আহা, ঐ সোনার মতো হাতে কি কয়লার ছাই শোভা পায়। তোমাকে কিছু করতে হবে না। মালকিন, আমরা সবাই মিলে হাতে হাতে তোমার কাজগুলো ভাগাভাগি করে সেরে দেব। তুমি চুপটি করে বসে থাকে।

আপনারা শুনে খুশি হবেন, বড়ফট্টাই সেই–যে বিছানা নিলো আর উঠলো না।

আর হয়তো আপনাদের স্মরণে আছে, বাঁদী যুঁই-এর গর্ভে সামাতের সন্তান ছিলো। কয়েক মাস পরে একটি পুত্র-সন্তান প্রসব করলো সে। ছেলের বাবা সামাত আজ নাই, থাকলে সে-ই তার নামকরণ করতো। চোখের জল ফেলে যুঁই-ই ছেলের নাম রাখলো আসলান।

ঝি চাকরাণীদের চত্বরে আসলান শুধু মায়ের দুধ খেয়ে মানুষ হতে থাকে। বড়ফট্টাই-এর মা বা বাবা কেউই তার খোঁজখবর নেয় না। বাচ্চাটা কি খায় অথবা অনাহারে কাটায়, সে দিকে কারো ভ্রূক্ষেপ নাই।

ছেলেটি কিন্তু শুধুমাত্র মাতৃস্তন্য পান করেই সিংহ শাবকের মতো তাগড়াই, তড়বড়ে হয়ে উঠতে থাকে। চেহারাখানা অবিকল সামাতের মতো, ধবধবে ফর্সা, ফুটফুটে সুন্দর। সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটু একটু হাঁটতে শিখেছে।

একদিন বাঁদী যুঁই কি একটা দরকারে রসুইখানার ওপরতলায় গিয়েছিলো, এমন সময় আসলান পা পা করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে খালিদের বসার ঘরে চলে যায়। খালিদ তখন তসবী জপ। করছিলো, বাচ্চাটার দিকে নজর পড়তেই খালিদের দু চোখ জলে ভরে আসে। সামাতের শাস্ত সীেম্য চেহারাখানা ভেসে ওঠে। একেবারে খুদে সামাত। সেই চোখ মুখ নাক কান—সব-সব একেবারে সামাতের মতো।

—এসো বেটা, এসে। আসলানকে সে দু হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নেয়। কোলের ওপরে বসিয়ে আদর করতে থাকে। — খোকন সোনা, চাঁদের কনা

একটুক্ষণ পরে যুঁই নেমে এসে দেখে, আসলান নাই। প্ৰাণ উড়ে যায়। ডাইনী বড়ফট্টাই-এর মা-এর নজরে পড়লে তো আর রক্ষা নাই। নির্ঘাৎ সে বাছাকে বিষ খাইয়ে দেবে। এঘর-ওঘর। ছুটাছুটি করে খুজতে থাকে সে। খালিদের বসার ঘরে গিয়ে ধড়ে প্রাণ ফিরে পায়! খালিদের কোলে বসে সে খুব ভাব জমিয়েছে। যুঁইকে দেখে খালিদ জিজ্ঞেস করে, তোমার ছেলে?

—জী হাঁ।

–এর বাবা কে, চাকরিবাকিরদের কেউ?

যুঁই আহত হয়। বলে, আপনি তো জানেন, আবু সামাত আমাকে শাদী করেছিলো; তার সঙ্গে আমি কিছুকাল ঘর করেছিলাম। আপনি যখন আমাকে এখানে নিয়ে আসেন, আমি তখন কয়েক মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম—

খালিদ মাথা নাড়ে, ঠিক বটে, ঠিক। দেখতেও বেটা, একেবারে আবু সামাতের মতো হয়েছে।

যুঁই বলে, আজ থেকে আসলনি আপনারই ছেলে। আপনি একে মানুষের মতো মানুষ করে তুলুন, এই আমার একমাত্র সাধ।

খালিদ-এর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ঠিক বলছো, মা, আমাকে দিয়ে দিলে? আমি ওকে লেখাপড়া শেখাবো, মস্ত বড় নামজাদা আমির বানাবো। আমি একে দত্তক নিলাম। শুধু তোমার কাছে আমার অনুরোধ, কারো কাছে এর আসল পরিচয় ফাঁস করে দিও না। লোকে জানবে, আসলান আমারই ঔরসের সন্তান।

যুঁই বলে, তাই হবে। ওর ভালোর জন্য আমি আপনার সব কথাতেই রাজি।

খালিদ যুঁই-এর ছেলেকে নিজের শাদী করা বিবির গর্ভজাত সন্তানের মতো করে লালন-পালন করতে থাকে। খুব যত্ন করে তার লেখা-পড়া শেখানোর ব্যবস্থা হয়। নানা ভাষা বিশারদ এক মহাপণ্ডিত মৌলভীকে মাইনে করে রাখা হলো। নামজাদা হস্তলিপি বিশারদ হিসাবেও তার দেশ জোড়া নাম ছিলো। যথা সময়ে, কোরান, কাব্য, অঙ্ক বিজ্ঞান দর্শনে এবং হস্তলিপিতে পারদর্শী হয়ে ওঠে আসলান। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলাধূলা, অস্ত্রবিদ্যা ঘোড়ায় চড়াতেও বেশ পটু হয়ে ওঠে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার হিসাবে আসলানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। খলিফা তাকে আমিরের উপাধিতে ভূষিত করেন।

একদিন নিয়তির বিধানে, ইহুদী ইব্রাহিমের সুডিখানার সামনে আহমদ-এর সঙ্গে দেখা হয় আসলানের। আহমদের পীড়া-পীডিতে আসলান দোকানে গিয়ে বসে। খুব মৌজ করে মদ্যপান চলতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আহমদ নেশায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। আসলান বলে, অনেক হয়েছে, আজ আর খেয়ে কাজ নাই। চলুনবাড়ি ফেরা যাক।

দুজনে দোকানের বাইরে আসে। অন্ধকার রাত। আহমদ কামিজের জেব থেকে ছোট একটা সোনার চিরাগ বের করে। ঢাকনাটা খুলতেই হীরের আলোয় পথের অন্ধকার কেটে যায়। আসলানের অবাক লাগে। এমন আজব চিরাগ-বাতি সে কখনও দেখেনি। —দেখি দেখি, কেমন জিনিস! বাঃ চমৎকার তো। তেল না মোম না, অথচ জ্বলে? আমাকে দেবেন?

আহমদ বলে, তাই কি দেওয়া যায়। এতো আর সাধারণ চিজ নয়। এর পিছনে কত কাণ্ড-কারখানা ঘটে গেছে। একটা নিরীহ নিরপরাধ মানুষের জান খতম হয়ে গেছে এর জন্যে।

-কী রকম? আসলোন কিছুই বুঝতে পারে না? আহমদ তখন আবু সামাতের ফাঁসীর কাহিনী আদ্যোপোন্ত খুলে বলে তাকে। আসলান বিষাদ বিষণ্ণ মুখেবাড়ি ফিরে আসে। ভাবে, ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য মানুষ এত নীচ হয়! মা-এর কাছে সব খুলে বলে আসলান!

ছেলের কথা শুনে যুঁই অস্ফুট আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এই সময় রজনী অতিক্রান্ত হতে চলেছে দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

 

দুশো উনসত্তরতম রজনীতে আবার সে বলতে শুরু করে :

যখন জ্ঞান ফিরে আসে, যুঁই ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলে, বাবা, এতদিনে আল্লাহ বুঝি মুখ তুলে চাইছেন। পাপ কখনও চাপা থাকে না। যা সত্যি তা একদিন না একদিন ফুটে ওঠেই! এতদিনের চাপা রহস্যের কিনারা পাওয়া গেছে। আমি আর কোনও কথা গোপন রাখবো। না। বাবা, আমির খালিদ তোমার জন্মদাতা পিতা নন। তিনি তোমাকে আমার কাছ থেকে দত্তক নিয়ে প্রতিপালন করেছেন মাত্র। তোমার বাবা আমার স্বামী আবু সামাত। সুলতানের প্রাসাদের চুরির মিথ্যা দায়ে তার ফাঁসী হয়। আর দেরি নয়, এক্ষুনি তুমি তোমার বাবার বিশিষ্ট বন্ধু বৃদ্ধ হাবিলদারের সঙ্গে দেখা করে সব কথা খুলে বলে তাকে। এবং খোদার নামে কসম খেয়ে তার সামনে হলফ করে এসো, যেভাবেই হোক, তুমি তোমার বাবার হত্যাকারীর প্রতিশোধ নেবে।

আসলানের মুখে সব শুনে বৃদ্ধ হাবিলদার উল্লাসে ফেটে পড়ে।—খোদা হাফেজ, তিনিই সব রহস্যের পর্দা ছিঁড়ে আলোর সন্ধান করে দিয়েছেন। তাঁর ওপরই ভরসা রাখ, তিনিই শয়তানের সমুচিত শাস্তি বিধান করবেন।

বৃদ্ধের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো। সেইদিন পোলো খেলার আসরে এই নাটকের শেষ অঙ্ক অভিনীত হলো। খলিফা তার দলবল নিয়ে পোলো খেলায় মেতেছেন। সুলতানের দল এবং প্রধান কোতোয়ালের দলের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে। আসলান খেলছে। সুলতানের দলে।

খেলা বেশ জমে উঠেছে। বিপক্ষজনের একজন খেলোয়াড় সপাটে বল ঘুরিয়ে মারলো হারুন-অল-রাসিদের দিকে। আর একটু হলেই খলিফার একটা চোখ কানা হয়ে যেত। কিন্তু আসলান অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় বলটা রুখে দিতে পারলো। খলিফা বাহবা দিয়ে ওঠেন, সাবাস! এরপর আসলান এমন জোরে একটা বল মারলো, সেই খেলোয়াড়টার পিঠের শিরদাঁড়ায় লেগে হাড়টা ভেঙ্গে গেলো।

খলিফা চিৎকার করে ওঠেন, বাঃ চমৎকার মার মেরেছি। ত, খালিদের ছেলে!

এইখানেই সেদিনের খেলার ইতি হয়। সবাই খলিফার সামনে এগিয়ে এলো। খলিফা তখন আসলানের খেলার তারিফ করছেন।

—আমি খুব খুশি হয়েছি, তোমার খেলায়। কি ইনাম চাও, বলে।

—তোমার বাবা? তোমার বাবাতো সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে—আমির খালিদ।

—না হুজুর, উনি আমার বাবা নন। আমাকে দত্তক নিয়ে প্রতিপালন করেছেন। আমার বাবা আবু সামাত—যাকে আপনি মিথ্যা চুরির দায়ে ফাঁসী দিয়েছেন?

—সে কি! কী করে বুঝলে, সে চুরি করেনি?

—এখুনি আমি আসল চোর কে-প্রমাণ করে দিচ্ছি। ঐ যে আহমদ—ওর দেহ আপনি খানা-তন্নাসী করান। ওর কাছে আছে। আপনার সেই আজব চিরাগ বাতি।

আসলানের এই কথায় খলিফা অবাক বিস্ময়ে আহমদের দিকে তাকান। আহমদ তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো। খলিফা গর্জে ওঠেন, লোকটাকে তল্লাসী করা।

সঙ্গে সঙ্গে আহমদকে তল্লাসী করে তার কামিজের জেব থেকে খলিফার সেই সোনার চিরাগ বাতি পাওয়া গেলো।

খলিফা হুঙ্কার ছাড়েন, এটা কোথায় পেলে?

–কিনেছি হুজুর।

–কিনেছো! এ জিনিস হাটে বাজারে কিনতে পাওয়া যায়? মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাওনি। এই-কে আছিস, চাবুক লোগা।

চাবুকের ঘায়ে জর্জরিত হয়ে যায় আহমদের সর্বাঙ্গ। দরদর করে রক্ত ঝরে পড়তে থাকে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে আহমদ। কিন্তু আসল কথা কবুল না করা পর্যন্ত চলতেই থাকে চাবুক।

অবশেষে সে স্বীকার করলো। হ্যাঁ, সে-ই বেগমের বসার ঘর থেকে খলিফার ব্যবহারের জিনিসগুলো চুরি করে সামাতের বাড়ির দেওয়ালে রত্নহার। আর মোহরখানা পুরে রেখেছিলো। আজব চিরাগ বাতির লোভ সে সামলাতে পারেনি। ওটা নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলো। তারই হঠকারিতায় সামাতের ফাঁসী হয়ে গেছে।

খলিফা আসলানের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার তুমি তোমার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিজের হাতেই নাও, আসলান। তুমি নিজের হাতে লোকটাকে ফাঁসী দাও।

আসলান এবং হাবিলদার মিলে আহমদকে উপস্থিত সকলের সামনে ফাঁসীর দডিতে ঝুলিয়ে দিলো।

খলিফা আসলানকে সস্নেহে কাছে ডেকে বললেন, বলো, আর কী করলে তোমার ইচ্ছা পূরণ হবে?

আসলান বলে, জাঁহাপনা, আপনি আমার বাবাকে ফিরিয়ে এনে দিন, শুধু এইটুকু হলেই আমি খুশি হবো।

–কিন্তু, খলিফা হারুন অল-রসিদ অসহায়ের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তাকে আমি কি করে ফেরৎ দেব, বাবা? তুমি তো শুনেছো, ভুল বিচার করে আমি তার ফাঁসী দিয়েছি!

আসলান বলে, যদি অভয় দেন। তবে একটা কথা বলি।

—তুমি নিৰ্ভয়ে বলো, বাবা।

—আমার বাবা আবু সামাত এখনও বেঁচে আছেন।

—আবু সামাত বেঁচে আছে? তা কি করে সম্ভব? আমি যে তাকে ফাঁসী দিয়েছি, আসলান। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমার কিছুটা সন্দেহ রয়ে গেছে। সামাতের ফাঁসীর পরদিন আমি আর জাফর তার লাশ পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। লাশটা দেখে কিন্তু সেদিন আমি নিঃসন্দেহ হতে পারিনি-সামাতের দেহের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য সেই লাশে আমি খুঁজে পাই না। যাই হোক, এ মনোবাঞ্ছা আমি পূর্ণ করবো।

খলিফার কথা শুনে বৃদ্ধ হাবিলদার এগিয়ে এসে আভুমি আনত হয়ে কুর্নিশ জানিয়ে বলে, ধর্মাবতার আপনি আমাকে অভয় দিন, আমি সব বলবো।

খলিফা বললেন, তোমার কোন ভয় নাই, বলে।

–হুজুর, আবু সামাত জীবিত আছে। আপনার হুকুম সেদিন আমি তামিল করিনি, আমার গোস্তাকি মাফ করুন, জাঁহাপনা!

–তবে কাকে ফাঁসী দিয়েছিলে?

অন্য একজন ফাঁসীর আসামীকেই ফাঁসী দিয়েছিলাম, হুজুর।

—আর আবু সামাত?

—তাকে আমি রাতের অন্ধকারে বাগদাদ পোর করে আলেকজান্দ্ৰিয়ার নৌকায় তুলে দিয়ে এসেছি। এখনও সে সেখানেই আছে। সেখানে সে একটা জাহাজী যন্ত্রপাতির দোকান করেছে।

হারুন অল-রাসিদ আনন্দে, উল্লাসে ফেটে পড়লেন, খোদা মেহেরবান। এক্ষুণি আলেকজান্দ্ৰিয়াতে চলে যাও। যত তাড়াতাডি পার তাকে এখানে নিয়ে এসো।

জাফরকে উদ্দেশ করে খলিফা আবার বললেন, হাবিলদারকে দশ হাজার মোহর সঙ্গে দিয়ে এখুনি আলেকজান্দ্ৰিয়া পাঠাবার ব্যবস্থা কর।

আল্লাহর ইচ্ছায় আবার আমরা আবু সামাতের কাহিনী শুনবো।

নৌকায় চেপে আবু সামাত যখন আলেকজান্দ্ৰিয়ায় পৌঁছয়, সেখানকার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে তার দুচোখ জুড়িয়ে যায়। শহরের ভিতরে ঢুকে সে খবর পায়, সম্প্রতি এক দোকানের মালিক মারা গেছে। দেখাশুনার লোকের অভাবে দোকানটা বিক্রি হবে। দীরদাম করে আবু সামাত দোকানটা কিনে নেয়। জাহাজী যন্ত্রপাতির দোকান। ভালো লাভের ব্যবসা। নানা রকম হাল, দঁড়ি, কাছি, বস্তা, বাক্স, প্যাটরা—প্রভৃতিতে দোকানটি ভরা। বিদেশের বাজারে এখানকার এইসব সওদার। ভীষণ চাহিদা। দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের ব্যবসায় সে বেশ মোটা অঙ্ক লাভ করেছে। পুঁজি বেড়ে আজ দশগুণ হয়ে গেছে।

আবু সামাতের নিঃসঙ্গ জীবন আর ভালো লাগে না। সে ঠিক করে ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে সে এখান থেকে চলে যাবে। আস্তে আস্তে গুদামজাত জিনিসপত্র বেচে দিতে থাকে। খদ্দের পেলে সে গোটা দোকানই বেচে দেবে।

এইভাবে দোকানটা ক্রমে ক্রমে খালি হয়ে আসে। একদিন সে সামানপত্র ঝাড়াই বাছাই করতে করতে তাকের এক পাশে একটা হারের সঙ্গে একটা রঙিন পাথরের তক্তি দেখতে পায়। পাথরটা নিশ্চয়ই কোনও দৈব গ্রহরত্ন হবে। এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে থাকে। কিন্তু কিছুই অনুমান করতে পারে না।

এমন সময় দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো জাহাজের এক কাপ্তেন। পাথরের তক্তিটার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে। আবু সামাত জিজ্ঞেস করে, কি দেখছো, সাহেব?

কাপ্তেন বলে, ঐ পাথরটা বিক্রি করবে?

—কেন—করবো না! দোকানের যা দেখছো, সব বিক্রি করে দেব-মায় দোকানটা পর্যন্ত। তা কত দাম দেবে?

কাপ্তেন বলে, আশী হাজার দিনার নাও!

ইয়া আল্লাহ, আবু সামাত অবাক হয়ে ভাবে, এত দাম দিতে চায় কেন সে? নিশ্চয়ই আরো অনেক বেশি দাম হবে। হেসে বলে, ভালো রসিকতা করতে জান তো, সাহেব। আমি তোমাকে এক লক্ষ দিনার দিচ্ছি, এনে দাও তো এই রকম একখানা পাথর!

ঠিক আছে, কপ্তেন বলে, আরও দশ হাজার বেশি দেব।

সামাত রাজি হয়ে যায়। কাপ্তেন বলে, কিন্তু অত টাকা তো আমার সঙ্গে নাই। তোমাকে কষ্ট করে আমার জাহাজে যেতে হবে একবার। পাথরটা সঙ্গে নাও, এক হাতে দাম দেব এক হাতে পাথরটা নেব।

আবু সামাত বলে, খুব ভালো কথা, চলো, তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।

সামাতকে সঙ্গে নিয়ে কাপ্তেন জাহাজে এসে বলে, তুমি এখানে বসো, আমি আমার কামরা থেকে মোহরগুলো নিয়ে আসি।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে, সেই যে কাপ্তেন ভিতরে চলে গেলো আর ফিরে এলো না। হঠাৎ আবু সামাত কুলের দিকে তাকিয়ে দেখে, জাহাজটা তীর ছেড়ে মোঝ দরিয়ার দিকে চলেছে। আবু সামাতের আর বুঝতে বাকী রইলো না, সে ঠগের পাল্লায় পড়েছে। এখন আর নিস্কৃতি পাওয়ার পথ নাই। কাপ্তেনের কত্তজায় সে এখন বন্দী! যেদিকে তাকায়, জল আর জল। কোনও দিকে কোনও জাহাজ বা নৌকার চিহ্ন নাই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কাপ্তেনের আবির্ভাব হলো, কী আবু সামাত, কেমন মালুম হচ্ছে? তুমিই তো সেই আবু সামাত-তোমার বাবা কায়রোর নামজাদা সওদাগর। এক সময়ে তুমি বাগদাদের খলিফার খুব প্রিয়পাত্র কর্মচারী ছিলে না? তোমাকে এখন জেনেভায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর দেখো, তোমার নাসীবে কী লেখা আছে।

আবু সামাত মুখ বুজে বসে থাকে। কাপ্তেন অদ্ভুত এক হাসি হেসে অদৃশ্য হয়ে যায়।

জাহাজটা জেনেভা বন্দরে এসে নোঙর করে। দুজন প্রহরী সঙ্গে নিয়ে এক বৃদ্ধ এসে উঠলো। জাহাজে। বৃদ্ধার ইশারায় আবু সামাত তাকে অনুসরণ করে এক মঠ সন্নিহিত গীর্জায় এসে পৌঁছয়। এবার বৃদ্ধা মুখ খোলে, এখন থেকে তুমি এই গীর্জায় আর মাঠে নফরের কাজ করবে। কি কি কাজ তোমাকে করতে হবে, ভালো করে মন দিয়ে শোনো : খুব সকলে ঘুম থেকে উঠবে। কুঠার নিয়ে জঙ্গলে যাবে-কাঠ কেটে আনবে। কাঠ কেটে ফিরে এসে এই গীৰ্জা আর মঠের চত্বর বারান্দা খুব ভালো করে জল দিয়ে ধুয়ে সাফ করবে। সতরঞ্চ, মাদুরগুলো সব ঝাড়বে। দুটো বাড়িই ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করবে। গম পিষে ময়দা করে রুটি বানাবো। চাকীতে ডাল ভেঙ্গে রাঁধবে। এইভাবে তিনশো সত্তরজন পাদরীর খাবার তৈরি করবে। প্রত্যেক পাদরীর ঘরে ঘরে সেই খাবার যথাসময়ে পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিদিন। এর কোনওরকম ব্যতিক্রম হলে তার পরিণাম খুব খারাপ হবে। তাদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলেই সেই তিনশো সত্তরখানা থালা ঝকঝকে করে মেঝে ধুয়ে রান্না ঘরে সাজিয়ে রাখবে। এর পর তোমার কাজ, বাগানে গাছের গোড়ায় জল দেওয়া। চারটে ফোয়ারার চৌবাচ্চার জল পালটানো। তারপর দেওয়ালের ধারে। ধারে যে-সব জলের পিপেগুলো বসানো আছে, ওগুলো ভরতে হবে। এসব তোমাকে দুপুরের মধ্যেই শেষ করতে হবে। তারপর বিকেলের কাজ শোনো : বিকালে তুমি গীর্জার বাইরে গিয়ে দাঁড়াবে। পথচারীদের প্রার্থনা শুনতে আসার জন্যে জোর জবরদস্তি করবে। তাতেও যদি তারা আসতে নারাজ হয়, তবে এখানে একটা পোল্লায় ভারি গদা আছে। সেই গদা দিয়ে তাদের পেটাবে। কারণ, আমরা চাই না, এই খ্রীস্টান শহরে কোনও বিধমী বাস করুক। এ শহরে যারা থাকবে, পাদরীদের আশীর্বাদ নিয়েই তাদের থাকতে হবে। সব শুনলে, আর এক মুহূর্ত দেরি না। করে কাজে লেগে যাও। যা বললাম, ঠিক ঠিক মনে থাকে যেন।

আড়চোখে পিটপিট করে তাকাতে তাকাতে বৃদ্ধ চলে গেলো। আবু সামাত ভাবতে থাকে, হায় আল্লাহ, এ কি বেঘোরে পড়লাম। কি করে এ থেকে পরিত্ৰাণ পাওয়া যাবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।

গীর্জার ভিতরে ঢুকে একটা কাঠের তক্তপোষের উপর বসে হাপুসা নয়নে কাঁদতে থাকে। সে। ঘন্টাখানেক বাদে এক নারী কণ্ঠের আওয়াজে চমকে ওঠে। থামের আড়াল থেকে এক মধুর কণ্ঠের সঙ্গীত ভেসে আসছে। এমন সুরেলা কণ্ঠ সে শোনেনি কখনও। নিমেষের মধ্যে তার হৃদয়ের সকল সন্তাপ মুছে যায়।

আবু সামাত উঠে দাঁড়ালো। মেয়েটিকে দেখতে হবে! একটু এগোতেই সে দেখতে পেলো, বোরখা ঢাকা একটি মেয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় সে বললো, আবু সামাত; আমি তোমার দেখা পেলাম। এবার তুমি আমাকে গ্রহণ করা।

আবু সামাত অবাক বিস্ময়ে বলে, আল্লাহ, তুমিই একমাত্র সত্য, তুমি ছাড়া আর কিছু জানি না। একি! আমি স্বপ্ন দেখছি নাকি? আমি কি আমার আলেকজান্দ্ৰিয়ার সেই দোকানে শুয়ে ঘুমাচ্ছি?

মেয়েটি বলে, না না, তা কেন হবে? তুমি তো জেগেই আমার সঙ্গে কথা বলছো। আর এ শহরটির নাম জেনেভা। জাহাজের কাপ্তেনকে দিয়ে কীেশল করে আমিই এখানে আনিয়েছি তোমাকে। আমার বাবা এখানকার সম্রাট। আমার নাম রাজকুমারী হুসন মরিয়াম। ছোটবেলায় আমি যাদু বিদ্যা শিখেছিলাম। মন্ত্রবলে আমি তোমার অপূর্ব রূপ আর যৌবন প্রত্যক্ষ করেছিলাম। সেই থেকে তোমায় ভালোবেসেছি। আমার সাধ ছিলো তোমাকে স্বচক্ষে দেখবো। এই দ্যাখো, আমার গলায় সেই দৈব পাথরখানা। আমার হুকুমেই ঐ জাহাজের কাপ্তেন তোমার দোকানে এই হারটা লুকিয়ে রেখে এসেছিলো। কি যে এর দৈব ক্ষমতা, হাতৃে হাতে তা বুঝেছি! যাই হোক, এতকালের সাধনার পর তোমাকে যখন কাছে পেলাম, এবার তুমি আমাকে বিয়ে করা। তারপর আমি তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করবো-যা চাও।

–রাজকুমারী, তুমি কি আমাকে কথা দিতে পার-আমি আবার আলেকজান্দ্ৰিয়া ফিরে যাবার অনুমতি পাবো?

-কোন পাবে না? নিশ্চয়ই পাবে।

তক্ষুণি পাদরীকে ডাকা হলো! আবু সামাত আর মরিয়ামের বিয়ে দিয়ে দিলো সে।

মরিয়াম বললো, বিয়ে তো হয়ে গেলো, এবার তুমি কি আলেকজান্দ্ৰিয়ায় ফিরে যেতে চাও?

–খোদা হাফেজ, হাঁ, এখনই আমি চলে যেতে চাই।

তখন মরিয়াম তার গলার সেই দৈব পাথরখানা সূর্যের দিকে তুলে ধরে। হাতের বুড়ো ট্রীয় স্থাঙ্গুল দিয়ে ঘষতে ঘষতে বিড় বিড় করে মন্ত্র আওড়ায়, সুলেমানের নাম স্মরণ করে

বলছি, শোনো রক্তমুখী মণি, আমি তোমাকে হুকুম করছি, এই মুহূর্তে আমার জন্যে একখানা উড়ন্ত শয্যা নিয়ে হাজির হও।’

মুখের কথা শেষ হতে না হতে তাদের সামনে একখানা উড়ন্ত-শয্যা নেমে এলো। মোটা গদি আঁটা চারদিক ঘেরা। দুজনে উঠে বসলো। এবার মরিয়াম পাথরখানাকে ঘুরিয়ে আবার ঘষতে ঘষতে আওড়াতে থাকলো, রক্তমুখী মণি, এবার তুমি আমাদের নিয়ে সোজা আলেকজান্দ্ৰিয়া উড়ে চলো।

তৎক্ষণাৎ উড়ন্ত-শয্যা তরতর করে শূন্যে উঠে যেতে থাকলো। উঠতে উঠতে মেঘের ওপরে গিয়ে তীর বেগে চললো। কয়েকটি মুহূৰ্তমাত্র, তারপর আবার সে শো শোঁ করে নিচে নেমে এলো। আবু সামাত তাজ্জব হয়ে দেখে, আলেকজান্দ্ৰিয়াতে পৌঁছে গেছে তারা।

শয্যা ছেড়ে মাটিতে পা রাখলো দুজনে। আবু সামাত দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাগদাদের সেই বৃদ্ধ হাবিলদার। সামাত কি স্বপ্ন দেখছে। বিস্ময়ে রুদ্ধবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এক মুহূর্ত। তারপর হাবিলদারকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। হাবিলদার সামাতকে সান্ত্বনা দেয়, দুঃখের দিন শেষ হয়েছে বাবা। আসল চোর ধরা পড়েছে।

সামাতকে সব খুলে বললো সে।

–খলিফা তোমাকে যত তাড়াতাডি সম্ভব বাগদাদে নিয়ে যেতে বলেছে।

আবু সামাত বলে, আগে আমাকে কইরো যেতে দিন, কতকাল মা বাবাকে দেখিনি। তাদের সঙ্গে নিয়ে খলিফার সঙ্গে দেখা করবো আমি।

হাবিলদারকে সঙ্গে নিয়ে ওরা তিনজন উড়ন্ত শয্যায় উঠে বসে। চোখের পলকে উড়ে চলে যায় কইরোয়—সওদাগর সামস অল-দিনের বাড়ির দরজায়। কড়া নাড়তেই সওদাগর বিবি দরজা খুলে দাঁড়ায়, কে?

আবু সামাত আকুল হয়ে ছুটে যায়, আমি, মা, আমি তোমার ছেলে আবু সামাত।

বৃদ্ধ মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। সামস আল-দিনও ছুটে বেরিয়ে আসে। এতকাল পরে ছেলেকে পেয়ে মুছিত হয়ে পড়ে সে।

কইরোতে তারা তিনদিন বিশ্রাম নিলো। তারপর সামাত মা বাবাকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচজনে উঠে বসলে উড়ন্ত শয্যায়। এবার সোজা চলে এলো বাগদাদে। সামাতকে পেয়ে খলিফা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন। যেন মনে হলো, বহুকাল বিদেশে কাটানোর পর নিজেরই সন্তান ঘরে ফিরেছে। তিনি সামস অল দিন, আবু সামাত ও আসলানকে হুকুমতের উচ্চ পদে বহাল করলেন।

আবু সামাত ভেবে দেখলো, তার এই ভাগ্য বিবর্তনের একমাত্র নায়ক মাহমুদ। অনেক অনুসন্ধানের পর তার খোঁজ পাওয়া গেলো। প্রাসাদে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এলো সামাত। এবং প্রধান কোতোয়ালের পদে বহাল করলে তাকে।

এর পর আবু সামাত তার পুত্র আসলান, তিন বিবি জুবেদা, যুঁই ও মরিয়ামকে নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটিয়েছিলো।

গল্প শেষ করে শাহরাজাদ। চুপ করে বসে রইলো। এতক্ষণ সুলতান শাহরিয়ার রুদ্ধ নিঃশ্বাসে শুনছিলো। এবার সে উল্লাসে উচ্ছসিত হয়ে উঠলো, সত্যিই শাহরাজাদ তোমার এই আবু সামাতের কিসসার তুলনা হয় না। দুমুখো মাহমুদ আর সামসামকে ভোলা যায় না।

Share This