২১. দুশ্চিন্তার ছাপ

দূর থেকে অমরনাথকে দেখে দীপার মনে হয়েছিল কিছু একটা হয়েছে। দুশ্চিন্তার ছাপ মানুষটিব মুখে বেশ স্পষ্ট গেস্টরুমের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে একটা ছোট্ট রাগ যা এর আগে সে কখনও দেখেনি।

দীপা দাঁড়াতেই অমরনাথ মেয়েকে দেখলেন। তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত থাকায় দৃষ্টিটা বেশীক্ষণ স্থির রাখলেন না। মুখ ঘুরিয়ে বললেন, তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এসেছি। এই ঘরে বসা যাবে?

দীপা মাথা নাড়ল। গেস্টরুমে একমাত্র পিতামাতা এলেই অনুমতি না নিয়ে বসা যায়। সে আগে এগিয়ে গিয়ে বলল, এসো।

অমরনাথ চেয়ারে বসলে দীপা জিজ্ঞাসা করল, মা ঠাকুমা কেমন আছে?

তাদের খবরে তোমার কোন প্রয়োজন আছে?

মানে? চমকে তাকাল দীপা। বাবাকে এমন গলায় কথা বলতে সে কখনও শোনেনি। অমরনাথ তখন ব্যাগটি কোলেব ওপর রেখে পকেট হাওড়াচ্ছেন। তিন চারটি কাগজপত্রের মধ্যে একটি বিশেষ কাগজ বের করে বললেন, এটা পড়ে দেখ।

সামান্য তফাতে দীপা দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ থেকেই ধন্দ লাগছিল খুব। অমরনাথের এগিয়ে ধরা কাগজটা যে একটা চিঠি তা বুঝতে সময় লাগল। ভাঁজ খুলতেই পাকা হাতের লেখায় সম্বোধন চোখে পড়ল, মাননীয় অমরনাথ মুখোপাধ্যায় সমীপেষু, এই চিঠি প্ৰায় বাধ্য হইয়াই আপনাকে লিখিতেছি। আপনার কন্যা দীপাবলী জলপাইগুড়ির হোস্টেলে থাকিয়া কলেজে ভর্তি হইয়াছে। আপনি অনেক দূর স্থানে বাস করেন বলিয়া শহরের কোন সংবাদ নিয়মিত রাখিতে পারেন না বলিয়া বিশ্বাস করি।

আপনার অবগতির জন্য জানাইতেছি যে দীপাবলীর ব্যবহার ও আচরণ সনাতন বঙ্গরমণীর বিপরীত। তাহাকে উচ্ছঙ্খল আখ্যা দেওয়াই সঙ্গত। জলপাইগুড়ি শহর বিলাত আমেরিকা নহে। এখানে ছাত্রীরা অধ্যয়নের বাইরে অন্য জীবনযাপন করে না। কিন্তু দীপাবলী ছাত্রীদের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া ছাত্রদের সঙ্গে দিনরাত মশগুল থাকে। কলেজে তো বটেই, শহরের রাস্তাতেও তাঁহাদের ঢলঢলির দৃশ্য নিযমিত দেখিতে পাওয়া যায়। এই বেলোপনা শহরের যুবকদের কোন পথে নিয়া যাইতেছে তাহা নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারিতেছেন। আশঙ্কা হইতেছে এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া সুকুমারীমতি অন্যান্য ছাত্রীরা যদি একই আচরণ করে তাহলে সমস্ত শহরের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্য গোল্লায় যাইবে।

আমার একমাত্র পুত্র ওই কলেজে দীপাবলীর সহপাঠী। আপনার কন্যার ওই আচরণ দেখিয়া সে নষ্ট হইতে বসিয়াছে। এই অবস্থায় হয় আপনি কন্যাকে সংযত করুন নয় তাহাকে চা-বাগানে ফিরাইয়া নিয়া যান। ইতি, আপনার এক শুভাকাঙক্ষী। চিঠিটা পড়া হয়ে গেলে দীপা মুখ তুলল। তার মুখে নিশ্চয়ই কোন কৌতুকেবা চিহ্ন স্পষ্ট ছিল তাই অমরনাথ সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, তুমি কি চিঠিটা পড়লে? তোমার মুখ দেখে আমি বুঝতে পারছি না।

হ্যাঁ, পড়লাম। দীপা কাগজটা ভাঁজ করে অমরনাথের হাতে ফিরিয়ে দিল।

এটা পড়ার পরেও তুমি হাসছ?

বাবা, যারা চিঠি লেখে। অথচ নাম সই করতেপারে না। তাদের কোন রকম গুরুত্ব দেওয়াটা বোকামি। বেনামী চিঠির লেখকরা মেরুদণ্ডহীন।

তোমার কাছে আমি উপদেশ শুনতে আসিনি। মনে কবো না কলেজে পড়ছ, বলে তোমার চারটে হাত গজিয়েছে। এ চিঠিতে যা লেখা রয়েছে তা সত্যি?

আমি কি বলব?

কি বলার মানে? আমি জানতে চাইছি। সত্যি কি না?

দীপা খুব নীচু গলায় বলল, তোমার কি ধারণা?

আমার ধারণার কথা হচ্ছে না। আমি থাকি চা-বাগানে। তুমি এখানে কি কলছ তা তোমার জানার কথা। তোমার মুখেই সেটা শুনতে এসেছি।

তুমি কি জানতে চাইছ?

কতবার এককথা বলব?

তার আগে তুমি বল বেলেল্লাপনা মানে কি?

নির্লজ্জ আচরণ।

আমি সেটা কোনদিন করিনি।

তাহলে এই লোকটার কি দায় পড়েছিল। পয়সা খরচ করে আমাকে লিখতে?

কোন লোকটা?

ও, বেনামী চিঠি বলে কোন গুরুত্ব থাকবে না। ঘটনা মিথ্যে হয়ে যাবে?

না। নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছিল। যে লিখেছে সে সেটাকে বিকৃত করেছে?

কি ঘটেছিল?

আমার ক্লাসের কিছু ছেলে মেয়েদের বিরক্ত করত। অনেক বছর ধরে চলে আসছিল ব্যাপারটা। মেয়েরা সেটা মুখ বুজে মেনে নিত। আমি মানিনি। কিন্তু ওদের সঙ্গে ঝগড়া না করে আলাপ করেছিলাম। আসলে এখানকার ছেলেদের সঙ্গে কোন মেয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে না বলেই ছেলে বা ওরকম আচরণ করে। আমার মনে হয়েছিল, আমরা একসঙ্গে পড়ি, একই বয়েস, তখন সামান্য কথা বলতে দোষ কি! আর সেটা করতেই ওদের ব্যবহার পাল্টে গেল। এখন যার সঙ্গে ক্লাসের ভেতরে কথা বলি তার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে মুখ ঘুরিয়ে যাওয়া যায়? কলেজে যাওয়া আসার সময় কারো কারো সঙ্গে কথা বলেছি। আমার মনে হয়েছে ওরা যে কোন মেয়ের চেয়ে নতুন বিষয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু হোস্টেলের বড়দি বললেন আমার এই আচরণ নাকি অনেক মেয়ের বাবা মেনে নিতে পারছেন না। ওদের সঙ্গে কথা বললে আমাকে হোস্টেল ছাড়তে হবে। হোস্টেল ছাড়লে আমি পড়াশুনার সুযোগ পাব না। বাধ্য হয়েই আমি ছেলেদের এ সব বলেছি। ওরা আর আমার সঙ্গে কথা বলে না। আমার বয়সের ছেলেরা অনেক বেশী বুঝতে পারে। কথাগুলো বলতে বলতে দীপার। গলার স্বর ভাবি হয়ে এল, চোখ ভিজে উঠল।

তোমাকে কি এখানে প্ৰগতি করতে পাঠানো হয়েছিল?

মানে?

তুমি এসেছিলে পড়াশুনা করতে। তার বাইরে অন্য কোন ব্যাপারে মন দেওয়ার কোন কথা ছিল না। আজ নিশ্চয়ই সারা শহরে এ ব্যাপার নিয়ে কথা হচ্ছে। যে দেশে থাকবে সেই দেশের মানযারা যে আচরণ করে তাই তোমাকে করতে হবে। চা-বাগানে বিশু বাপী খোকনের সঙ্গে মিশতে, আমরা ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, তাও বড় হবার পর তোমার ঠাকুমা মা সেটা অপছন্দ করেছেন। আগুন আর কাঠ পাশাপাশি যদি কোন আড়াল না রেখে থাকে, তাহলে অগ্নিকাণ্ড ক্লাবেই; নিষেধ এই কারণে। ছি ছি ছি, এ তুমি কি করলে?

আমি কিন্তু কিছুই করিনি।

তোমাকে আজকাল আমি বুঝতে পারি না। হয় তুমি বোকা নয় মিথ্যেবাদী।

আমি তোমাকে কি মিথো বলেছি?

অমরনাথ জবাব দিলেন না। কয়েক মুহূর্ত মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। তারপরঅনািরকম গলায় বললেন, এ চিঠি পাওয়ার পর থেকে আমার চোখে ঘুম নেই। তোমার মা বা ঠাকুমাকেও চিঠিটাব কথা বলতে পারিনি। কারণ আমি চাই না। ওরা এই আঘাত পাক। এখন একমাত্র উপায় তোমাকে চা-বাগানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।

না। চিৎকার করে উঠল দীপা।

পয়সা খরচ করে কেউ দুর্নাম কিনতে চায় না।

আমি এমন কিছু করিনি। যাতে তোমার দুর্নাম হয়।

অমরনাথ হাতে ধরে থাকা চিঠিটা নাড়ালেন, এটা পড়েও বলছ?

দীপা দিশাহারা হয়ে গেল। সাঁতা, অমরনাথকে খুব কাহিল দেখাচ্ছে এখন। যদি জলপাইগুড়ি থেকে চলে যেতে হয় তাহলে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানো যাবে না কখনও। সে কথা খুঁজে না পেয়ে বলল, বাবা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করছ না?

অমরনাথের চোযাল শক্ত হল। তিনি কোন জবাব দিলেন না।

বাবা, আমি তো বড়দিকে কথাই দিয়েছি। এই কলেজে পড়ার সময় কোন ছেলের সঙ্গে আর কথা বলব না। তুমি আমাকে আর একবার সুযোগ দাও।

অমরনাথ এবার মুখ খুললেন, ব্যাপারটা শুধু আমার ওপর নির্ভর করছে না। যে ভদ্রলোক দয়া করে তোমার পড়ার খরচ দিচ্ছেন খবরটা নিশ্চয়ই তাঁর কানেও উঠেছে। তিনি যদি সেটা বন্ধ করে দেন তাহলে——।

তিনি তো তোমাকে কিছু বলেননি এখনও।

তা বলেননি–।

যদি কিছু বলেন তাহলে আমি তাঁর কাছে যাব। সব বুঝিয়ে বলব।

চকিতে সোজা হয়ে বসলেন অমরনাথ, না না। ওখানে তুমি যাবে না। মিস্টার রায় সেটা কখনই পছন্দ করবেন না।

অমরনাথের এই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত মানসিক অবস্থা দীপার ছিল না। তার দু গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। অমরনাথ চোখ তুলে মেয়েকে দেখলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, কান্নার কোন দরকার নেই।

চকিতেই বাবার সেই কথাগুলো মনে পড়ল। বাবা বলতেন, রক্তের চেয়ে চোখের জল অনেক বেশী মূল্যবান। কিন্তু আজ সেই কথাগুলো বললেন না।

দীপা আচিলে মুখ মুছল। তারপর কাঁপা গলায় বলল, তুমি যদি চাও তাহলে একবার বড়দির সঙ্গে কথা বলতে পার।

অমরনাথ মাথা নাড়লেন, আমার কারো সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই।

কিন্তু তুমি আমাকে বিশ্বাস করছ না বাবা?

ঠিক আছে। তুমি যা বলছি তা যেন সত্যি হয়, সেইটে দেখো। ব্যাঙ্ক থেকে তোমার নামে টাকা এসেছে? অমরনাথ উঠে দাঁড়ালেন।

হ্যাঁ। অত টাকা আমার দরকার নেই।

যা দরকার তা রেখে বাকিটা তোমার মাকে, দিয়ে দাও।

দীপা ইতস্তত করল একটু। অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, কিছু বলবে?

না। মানে, ওই টাকা তো মিস্টার বায়ের অফিস থেকে আমার পড়াবা জন্যে আসছে। ওঁকে বললে হয় না। কম টাকা পাঠাতে?

উনি মনে করেন অতটাই তোমার দরকার। তোমার প্রয়োজন না থাকলে তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পার। এ বিষয়ে, কথা বলতে গেলে উনি নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হবেন। বড়লোকের খেয়াল বলে কথা।

তাহলে দাঁড়াও, আমি এনে দিচ্ছি। দীপা দ্রুত বেরিয়ে গেল। এখন তাকে অনেক সহজ দেখাচ্ছে। অমরনাথ চিঠিটাকে পকেটে রাখলেন। হাতের লেখা দেখে বোঝার উপায় নেই কে লিখেছে। তবে খামেব ওপর জলপাইগুড়ি পোস্ট অফিসেব ছাপ ছিল। সেইটেই স্বাভাবিক। কিন্তু ওটা পাওয়ার পর থেকেই মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাঁর। এখন মেয়ের পরিবর্তন দেখে একটু ভাল লাগছে। দীপা ফিরে এল প্ৰায় দৌড়েই। তার হাতে বেশ কয়েকটা দশ টাকার নোট। অমরনাথ মেয়েকে বসতে বলে কাগজ কলম বের করলেন। দীপার যা যা প্রয়োজন তা আর একবার হিসেব করা হল। দেখা গেল একশ টাকা হলেই পুরো খরচ মিটে যায়। দীপা বাকি টাকাগুলো অমরনাথের হাতে দিতে তিনি সেটা পকেটে রেখে দিলেন। এবং এই সময় দীপার আনার কথা মনে পড়ল। সে বলল, জানো, এর মধ্যে একদিন আমি খুব চমকে গিয়েছিলাম?

অমরনাথ মুখে কিছু না বলে গম্ভীর মুখে অপেক্ষা করলেন। আসলে সেই মুহুর্তে তিনি এক লজাবোধে আক্রান্ত ছিলেন.। মেয়েকে টাকা দেওয়ার বদলে মেয়ের টাকা তিনি নিচ্ছেন, এইটে বড় খোঁচা দিচ্ছিল। চেক নেওয়া, ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার মধ্যে প্ৰত্যক্ষ প্ৰাপ্তি ছিল না।

দীপা বলল, হঠাৎ আনা নামের সেই কাজের মহিলা এই হোস্টেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।

আনা? অমরনাথ চমকে উঠলেন।

যে আমাকে ওই বাড়ি থেকে পালাতে সাহায্য করেছিল। কি বিরাট চেহারা হয়েছে, মোটাসোটা, কাজের লোক বলে আর চেনাই যায় না।

আনা। এখানে এসেছিল? বিড়বিড় করলেন অমরনাথ।

হ্যাঁ। কিন্তু আমি এখানে আছি তা ও জানল কি করে?

জেনেছে নিশ্চয়ই।

ও এসেছিল তোমার খবর নিতে। তোমার সঙ্গে ওর কি দরকার?

অমরনাথ নার্ভাস বোধ করলেন। আনাব ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে উঠলেন তিনি। তার এখানে আসার কি দরকার ছিল! দীপা দেখল। অমরনাথ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন। সে দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা করল। অমরনাথ সজাগ হলেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ব্যানার্জী মশাই-এর শরীর খারাপ হল কি না কে জানে! আর তুমি যে এখানে আছ তা হরদেব দেখে গিয়েছেন। খবরটা তিনিই দিতে পারেন। তোমার এখানে না এসে আমাকে চিঠি দিতে পারত!

কেন? দীপার মুখে বক্ত জমল, তোমার সঙ্গে কিসের সম্পর্ক? কে অসুস্থ কি না তা তোমাকে জানাতে হবে কেন? ও বাড়ির সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই তা তুমি জান না? আমি ভাবতেই পারি না। এসব। নেহাত ওই কাজের মেয়েটা আমার উপকার করেছিল সেদিন তাই আমি খারাপ ব্যবহার করতে পারিনি।

দ্যাখ মা, সবসময় স্মৃতি আঁকড়ে বসে থাকতে নেই।

তুমি কি বলতে চাইছ?

অতীতে ওঁরা অন্যায় করেছিলেন, আমরাও যোগাযোগ রাখিনি। সম্পর্ক যা ছিল তা শুধু বলার জন্যেই। তোকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে কলেজে ভর্তি হতে হয়েছে ওদের উপাধি নিয়ে। কিন্তু দিন আর নদীর জল সবসময় সমান বহে যায় না। খবর তো আমারও কানে আসে। ব্যানার্জী মশাই পক্ষাঘাতে পঙ্গু এখন, ওঁর স্ত্রী উন্মাদাশ্রমে। সংসার ছাড়খার হয়ে গিয়েছে। এখন বিষ তো দূরের কথা, ছোবলও নেই। অমরনাথ কথাগুলো বলতে বলতে মেয়ের দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু মেয়ের মুখে কোন পরিবর্তন দেখতে পেলেন না।

দীপা বলল, যেমন কর্ম করেছে তেমন ফল পাচ্ছে। কিন্তু তাতে আমাদের কি? তুমি ওদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখবে না বলে দিলাম। আর আমার কাছে যদি কেউ আসে তাহলে আমি মুখের ওপর কথাটা বলে দেব।

দীপা, তুই কি এখনও ব্যাপারটা ভুলতে পারছিস না?

তুমি কি বলছি বাবা? আমি কোনদিন ভুলতে পারব! তোমরা আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছিলে, আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে চেয়েছিলে–

কি বলছিস তুই? আমি জেনেশুনে তোর ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চেয়েছিলাম? এমন কথা তুই উচ্চারণ করতে পারলি? অমরনাথের গলার স্বর পাল্টে গেল।

দীপা মাথা নাড়ল, আমার কি ক্ষতি হয়েছে তুমি জানো না? বন্ধুবান্ধবদের পর্যন্ত ব্যাপারটা বলতে পারি না। সবাই জানে আমি কুমারী। ব্যাপারটা ভাবলেই বমি পায় আমার। আর তুমি এখন ওদের হয়ে নরম নরম কথা বলতে এসেছী। তোমার ওপর আমার রাগ হওয়া অন্যায়? তুমি বল?

অমরনাথ হাসার চেষ্টা করলেন, দ্যাখ। দীপা, রাগ করে দূরে থেকে নিজের কোন লাভ হয় না। আমি প্ৰতিশোধ নিতে চাই। তোর ওপর যে অত্যাচার হয়েছে তার দাম দিয়ে যেতে হবে প্রতুল ব্যানার্জীকে। আমি সেই চেষ্টাই করছি।

দীপা অবাক হয়ে তাকল, দাম? ওই অন্যায়ের কি দাম হতে পারে?

দেখি! অমরনাথ মাথা নিচু করলেন, অনেক চিন্তা করার আছে। ঠিক আছে, ভালভাবে থাকিস। আজ আমি চলি।

অমরনাথ গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির ধাপে পা রাখতেই দীপা পেছন থেকে ডেকে উঠল, বাবা! অমরনাথ মুখ ফেরালেন না।

দীপা এগিয়ে এল, আমার কোন দাম দরকার নেই।

অমরনাথ মাথা নাড়লেন, শুনলাম।

তুমি কি এ কথাটা জানতে না?

জানি। কিন্তু জীবন তো কোন হিসেব মেনে চলে না। আজ যে অত্যন্ত ঘূণ্য শত্ৰু কাল যদি সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে তোর কাছে এক গ্লাস জল চায় তাহলে কি তুই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবি। মানুষ হলে পারবি না। এটাই জীবনের নিয়ম। তোর কিছু চাই না, কিন্তু আমিও তো একইভাবে প্রতারিত হয়েছি, সে জ্বালা মেটাবার সুযোগ পেলে ছাড়ব কেন?

তুমি কি ওদের বাড়িতে যােচ্ছ? দীপা সরাসরি প্রশ্ন করল।

অমরনাথ একটু ইতস্তত করলেন, হ্যাঁ। আনা কেন এসেছিল তা জানা দরকার। হয়তো–! তাছাড়া তাকে নিষেধ করতে হবে, এখানে যেন আর না আসে।

অমরনাথ আর দাঁড়ালেন না। হন হন করে, হোস্টেলের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর যাওয়ার ধরন দেখে দারোয়ান পর্যন্ত অবাক হয়ে গেল। দীপা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল! তার কেবলই মনে হচ্ছিল অমরনাথ সত্যি কথাটা গোপন করছেন। আজ যে মেজাজ এবং চেহারা নিয়ে তিনি চিঠি পেয়ে ছুটে এসেছিলেন তার সঙ্গে চলে যাওয়ার সময় তার চেহারাদ্য কোন মিল নেই। প্ৰথম দিকে তিনি যেভাবে ক্ৰোধ প্ৰকাশ করেছেন শেষ দিকে যেন পালিয়ে গেলে বাঁচেন, এমন মুনে হচ্ছিল। জ্ঞান হবার পর সে অমরনাথকে ওই ভঙ্গী এবং ভাষায় কথা বলতে শোনেনি। আজ এক সম্পূর্ণ অচেনা অমরনাথ হোস্টেল থেকে পালিয়ে গেলেন। হ্যাঁ, বাবার যাওয়াবা ভঙ্গীটাকে পালানো বলাই ঠিক। বাবার সঙ্গে নিশ্চয়ই ওদের যোগাযোগ আছে। এটুকু ভাবতেই শরীর জ্বলতে লাগল। যোগাযোগ আছে বলেই আনা এসেছিল। প্রতুল ব্যানার্জীর পক্ষাঘাত হয়েছে, তার স্ত্রী উন্মাদ–এতে তার কিছু এসে যায়; না। কিন্তু বাবা কেন ওদের বাড়িতে যাওয়া আসা করছে! দীপার ইচ্ছে হচ্ছিল এখনই চা-বাগানে ছুটে যেতে। অঞ্জলিকে সব কথা খুলে বললে বাবার পরিবর্তনেব কারণটা জানা যাবে। কিন্তু তখনই মনে হল, মা যদি তার কাছে লুকিয়ে যান? দীপা ভেবে পাচ্ছিল না কি করা উচিত!

থানার পাশ দিয়ে করলা নদীর ধার দিয়ে ঝোলনা ব্রিজের কাছে পৌঁছে অমরনাথের চেতনা পরিষ্কার হল। এতক্ষণ তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ছুটে আসছিলেন। মেয়ের হোস্টেলে যাওয়ার জন্যে আনাকে কটুকথা বলবেন। পারলে প্রতুলবাবুকেও কথা শোনাতে ছাড়বেন। না। যে সর্বনাশ তাঁরা এককালে করেছেন তার পুনরাবৃত্তি হতে দেবেন না তিনি।

কিন্তু ঝোলনা ব্রিজের ওপর উঠে মনে হল এরকম রাগের কোন মানে হয় না। সাত দিনের বদলে অনেক দিন হয়ে গেল। ব্যাপারটা নিয়ে তিনি অনেক ভেবেছেন। বীরপাড়া চা-বাগানের গুদামবাবুর ভায়রাভাই উকিল। ভদ্রলোক শালির বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। তাঁর সঙ্গে দেখা করে অমরনাথ সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলেছেন। তিনিও বলেছেন, প্রতুল বন্দোপাধ্যায় যদি উইল করে কাউকে দিয়ে না যান তাহলে সমস্ত সম্পত্তির কনম্বব উত্তবাধিকারিণী দীপা। কিন্তু আনা যেখানে আছে সেখানে উইল হবেই। তিনি না গেলে আনা অন্য কাউকে ধরতে পারে। গোডালিতে ফোস্কা পড়ছে বলে কোন মুর্থ বলে না যে সে জুতো ব্যবহার করবে না। আনার দেওয়া প্রতুলবাবুর তৈরীি উইলের খসড়া থেকে সম্পত্তির যে হিসেব পাওয়া গিয়েছিল তাই উকিল ভদ্রলোককে দিয়ে দিয়েছিলেন অমরনাথ। কথা ছিল তিনি সব কিছু লিখে স্ট্যাম্প পেপারে টাইপ করিয়ে রাখবেন। ভদ্রলোকের বাড়ি এই করলা নদীর ধারে জলপাইগুড়ি গার্লস স্কুলের পাশেই।

অমরনাথ পথ পবিবর্তন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে উকিলবাবুর বাড়িতে পৌঁছালেন। ভদ্রলোক তখনও বাইরের ঘরে মক্কেলদের নিয়ে বসে। অমরনাথকে ঢুকতে দেখে মাথা নেড়ে বললেন, বসুন। অমরনাথ কোণাব দিকে একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলেন। মকেলদের সঙ্গে কথাবার্তা সাবতে আধা ঘণটা সময় লাগল; অমরনাথ দেখলেন একজন মক্কেল যাওয়ার সময়। কৃডিটি টাকা দিয়ে গেল। উকিলবাবু ডাকলেন, আসুন আপনি আপনার তো অনেকদিন আগেই আসার কথা। দেবি হচ্ছে দেখে গতকালই আমার ভায়রাভাইকে একটা চিঠি দিয়েছি। কি ব্যাপার মশাই?

নানারকম ঝামেলায় আটকে পড়েছিলাম।

শুনুন, এ যা সম্পত্তি তার তুলনায় কোন ঝামেলাই ইমপটেন্ট হতে পারে না! আচ্ছা, এই আনা মহিলাটিকে অংশ দিতেই হবে?

অমরনাথ অসহায় ভাবে মাথা নাড়লেন।

বুঝুন, বাড়ির ঝি সেবা করে মাথায় উঠছে। কাটানো যায় না?

কি ভাবে?

কাটাতে চান? তাহলে আমার ওপর ছেড়ে দিন।

অমরনাথ দ্বিধায় পড়লেন। আনাকে প্রতারিত করে পুরো সম্পত্তির দখল নিলে লাভ হয় নিশ্চয়ই কিন্তু মন সায্য দিচ্ছে না। তা ছাড়া সইসাবুদ তো আনাই প্রতুলবাবুকে দিয়ে করাবে। ব্যাপারটা জানতে পারলে সে অনর্থ করে ছাডবে। না, কারণ অভিশাপ থাকলে সম্পত্তি থেকে সুখ পারেন না তিনি। অমরনাথ মাথা নাড়লেন, দাবকার নেই, যেমন বলেছি তেমন করুন।

উকিলবাবু হাসলেন, আপনার যেমন ইচ্ছে। কাগজপত্র সব তৈরী করেই রেখেছি। তিনি উঠে আলমারির দরজা খুলে একটা ফাইল টেনে আনলেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন পেন্সিলে টিক দেওয়া জায়গাগুলোয় সই করিয়ে আনুন। বাকি কাজটা আমি করে দেব।

অমরনাথ স্ট্যাম্প পেপারগুলো নিয়ে মন দিয়ে পড়তে লাগলেন। হ্যাঁ, সব ঠিকঠাক আছে। উকিলবাবু টেবিলের উল্টোদিকে বসেছিলেন। পড়া শেষ হলে আচমকা প্রশ্ন করলেন, আপনি হরদেব ঘোষালকে চেনেন? আপনার বেয়াই মশাই-এর বন্ধু!

চমকে উঠলেন অমরনাথ। পরীক্ষণেই মনে পড়ল কোর্ট কাছারিতে ঘোরাঘুরি করা হরদেবের নেশা। একই শহরের লোক সেই সূত্রে পরিচিত হতেই পারে। তিনি মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ।

ভদ্রলোকের কাছে প্রতুলবাবুর কাহিনী শুনলাম। ওই আনা মেয়েটা তো মুঠোয় করে রেখেছে তাকে। খুব সুন্দরী নাকি?

না। তেমন নয়।

তাহলে নিশ্চয়ই স্বাস্থ্য ভাল। হা হা শব্দ করে হাসলেন উকিলবাবু, হরদেব বাবুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি রকম?

আলাপ আছে।

উঁহ, মনে হল আরও বেশী কিছু। যাক, আর দেরি করবেন না।

একটু ইতস্তত করে অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি হরদেবকে এই উইলের কথা কিছু বলেছেন?

না মশাই। সেই বুদ্ধি না থাকলে ওকালতি করে খেতে পারতাম না। লোকটা একটা শেয়াল, খ্যাক শেয়াল বললেও কম বলা হয়। আমার মক্কেল আপনি, সে নয়।

অমরনাথ খুশী হলেন, কত দিতে হবে?

আমাকে? দুলে দুলে নিঃশব্দে হাসতে লাগলেন উকিলবাবু, রাজার সম্পত্তি পেতে চলেছেন। এখনই কিছু দেওয়ার দরকার নেই। তবে পাওয়ার আগে আঙুলগুলো আর মুঠো করবেন না, তাহলেই হবে। পারলে আজই সই করিয়ে আনুন।

তবু যদি একটা আন্দাজ দেন।

আরে মশাই, এখন আপনার পকেটে যা আছে তাতে আমার কোন আসক্তি নেই। আমি আমারটা ঠিক সময়মত আপনার কাছে চেয়ে নেব। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কোর্টে চলে আসবেন। উকিলরা যেখানে বসে সেখানে খোঁজ করলে পেয়ে যাবেন।

ঝোলনা ব্রিজ পেরিয়ে হাকিমপাড়ায় ঢুকলেন অমরনাথ। এত শান্ত এলাকা যে মনেই হয় না শহরে এসেছি। চারপাশে নজর রেখে তিনি এগোচ্ছিলেন। তাঁর ভয় হচ্ছিল পথে হরদেবের সঙ্গে দেখা না হয়ে যায়। কিন্তু প্ৰতুল বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ির গেট পর্যন্ত আসতে কোন বিঘ্ন ঘটল না। বাগানের ভেতরে পা দিতেই গন্ধটা নাকে এল। বাঁ দিকে একটা স্বাস্থ্যবান মাঝারি উচ্চতার গাছে পদ্মের মত সুন্দর ফুল ফুটেছে। একটু চিন্তা করে নামটা মনে করতে পারলেন তিনি, গ্ল্যান্ডিফ্লোরা। গন্ধে বুক ভরে যায়। ফুল ফোটে তার সময়মত শুধু মানুষের সময়টায় কোন হিসেব থাকে না।

সদর দরজা যথারীতি বন্ধ। চট করে মনে হয় কেউ বাস করে না। অমরনাথ দরজায় শব্দ করলেন কয়েকবার কিন্তু সাড়া মিলল না। প্রতুলবাবু নিশ্চয়ই মারা যাননি। এই ছোট্ট শহরে প্রতুলবাবুর মত মানুষ মারা গেলে মুখে মুখে খবর ছড়াতো। হঠাৎ অমরনাথের মনে হল উইলটুইল করার আগেই যদি প্রতুলবাবু চলে যান তাহলে আনাকে এক পয়সাও দিতে হবে না। সমস্ত সম্পত্তি আইনমোতাবেক দীপাই পারে। মরে গেল নাকি? পরীক্ষণেই মাথা নাড়লেন তিনি। কিছু বিশ্বাস নেই, কোথেকে একটা উইল বেরিয়ে পড়বে আর চোখে ধুতরো ফুল দেখতে হবে। যত যাই হোক, কোন মানুষেব মৃত্যু কামনা করা ঠিক নয়।

শেষ পর্যন্ত মনে পড়ল!

গলাটা শুনেই চমকে ফিরে তাকালেন অমরনাথ। বাগানের রাস্তান্য দাঁড়িয়ে আছে আনা। কে বলবে বাড়ির বি। শরীর স্বাস্থ্য যেন আরও ঝকমকে। স্নান করেছে বলে আরও টাটকা দেখাচ্ছে। হাতে ফুলের সাজি। ফুল তুলতে বেরিয়েছিল। পেছনের দরজা দিয়ে।

অমরনাথ আমতা আমতা করলেন, সব কিছু তৈরী করতে দেরি হয়ে গেল!

আমি হনুমান নাকি যে সূর্যকে বগলে আটকে রাখব? এই সময়ে তিনি যদি স্বৰ্গে চলে যেতেন তাহলে ওই তৈরী করা কাগজ আমার কোন কাজে লাগত?

অমরনাথ হাসলেন, শেষ ভাল যার সব ভাল। এখন সব তৈরী।

আসুন। এদিক দিয়ে। সদর খোলা নেই। কথাগুলো বলে আনা বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগল। ওকে অনুসরণ করে প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি অমরনাথ হঠাৎ শিহরিত হলেন। আজকাল অঞ্জলির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক দৈবাৎ হয়। তাঁর বাসনা অঞ্জলির নির্লিপ্তির কাছে চাপা পড়ে যায়। কোথায় যেন পড়েছিলেন, বাঙালি মেয়েদের মন পয়ত্ৰিশের এপাশে চলে এলেই শরীর নিবিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। অথচ আনার বয়স চল্লিশের এদিকে তো নয়ই। কিন্তু হাঁটার ধমকে সমস্ত শরীরে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তার। নিজেকে সংযত করতে প্ৰাণপণে চেষ্টা করছিলেন অমরনাথ। দেশটা বিলেত আমেরিকা নয়। বাঙালি পুরুষ যদি বিবাহিত এবং সন্তানের পিতা হয় তাহলে মনের মধ্যে এক সন্ন্যাসীকে ধরে রাখা অবশ্য কর্তব্য।

পেছনের বারান্দায় পৌঁছে একটা মোড়া এগিয়ে দিল আনা, বসুন। অমরনাথ বসলেন। সাজিটা রেখে দিয়ে এসে আনা বলল, ওমা, আপনার কি শরীর খারাপ  মুখচোখ অমন হয়ে গিয়েছে কেন?

অমরনাথ দ্রুত মাথা নাড়লেন, না, না। কিছু হয়নি।

আনার ঠোঁটে হাসি চলকে উঠল, না হলেই ভাল। কই দিন।

অমরনাথ উকিলবাবুর তৈরী উইল এগিয়ে দিলেন। আনা সেটাকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, চা দেব, না সরবত?

অমরনাথ বললেন, কিছু না। আমি খেয়েই এসেছি।

এসেছেন তো চা-বাগান থেকে। এতক্ষণে সব হজম হয়ে গেছে।

না, না, আমার কিছু প্রয়োজন নেই। প্রতুলবাবু কেমন আছেন?

শালগ্ৰামশিলা।

মানে?

নড়াচড়া করতে পারে না যে তাকেই পুজো করতে হয়। আপনার সঙ্গে এব। মধ্যে হরদেবের দেখা হয়েছিল?

না তো।

আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না। আপনার দেরি হচ্ছে কেন? খোঁজ নিতে মেয়ের কলেজে গিয়েছিলাম। সে তো এখন দিব্যি হয়েছে।

হুঁ! তবে আজকালকার মেয়ে তো, এ বাড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না।

সেটা অ্যাদ্দিন চাইত না। এখন সম্পত্তি পারে, না চাইলে চলে?

ও যে এসব পাচ্ছে তা জানে না।

জানে না মানে?

এ বাড়ির কোনকিছুর সঙ্গে ও যোগাযোগ নেই বলে জানে।

এই যে উনি অতগুলো টাকা দিলেন পড়ার খরচ চালাতে?

অমরনাথ মুখ তুলে তাকালেন। আনার মুখে বিস্ময়। এই মহিলার কাছে প্রতুলবাবু কোন কিছুই গোপন রাখতে শৈষ পর্যন্ত পারেন না। তিনি নিচু স্বরে বললেন, সেটা ব্যাঙ্কে আছে। ব্যাঙ্কই পাঠাচ্ছে। দীপা জানে না!

কদিন ধামাচাপা দিয়ে চালাবেন?

দেখি। অমরনাথ উঠলেন, প্ৰতুলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারি?

দাঁড়ান। উনি এখন উদোম হয়ে পড়ে আছেন। চাদর টেনে দিই তারপর যাবেন। আনা ঘরে ঢুকে গেল। তাজব হয়ে গেলেন অমরনাথ। অসুস্থ একটি মানুষ কেন বিবস্ত্ৰ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকবে? পেচ্ছপ বাহ্যি করাচ্ছিল নাকি? তা তো নয়, আনা তো বাগানে ফুল তুলছিল! ব্যাঙ্কের ব্যাপারটা না বলাই উচিত ছিল।

মিনিট খানেক বাদে প্রতুলবাবুর খাটের পাশে বসেছিলেন অমরনাথ।

চিনতে পারছেন?

না পারার কোন কারণ নেই। প্রতুলবাবুর গলার স্বর মিনমিনে কিন্তু স্পষ্ট। শরীর শুকিয়ে প্রায় দড়ির মত হয়ে গিয়েছে। মুখ এবং বাইরে বেরিয়ে থাকা দুটো হাত দেখে সেটা বোঝা যায়। বাকি শরীর সাদা চাদরে ঢাকা। অমরনাথ অনুমান করলেন সেটি আনা এখনই ঢাকা দিয়েছে। আজ প্রতুলবাবু ঘাড় ঘোরাতে পারছেন না বলে মনে হল। তার মুখ ছাদের দিকে স্থির। চোখ ঘুরছে।

মেয়ে কেমন আছে? সেই অবস্থায় প্রশ্ন করলেন প্রতুলবাবু।

ভাল। কলেজে পড়ছে।

জলপাইগুড়িতেই তো আছে, দেখতে বড় সাধ হয়। প্রতুলবাবুর মুখ থেকে কথাগুলো বেরুতেই আনা বলল, এখন আর সাধ হলে কি হবে।

কি নাম যেন রাখা হয়েছিল? আশা, আশালতা। সেই নাম আর নেয়নি, না?

আনাই জবাব দিল, না।

প্রতুলবাবু বললেন, আমি খুব শিগগির যাচ্ছি না। সে কি আসবে?

দেখি। অমরনাথ বলতে পারলেন।

এবার আনা বুকে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল। প্রতুলবাবু চোখ ঘোরালেন, আমাকে আপনারা ক্ষমা করেছেন?

অতীতের ওইসব ব্যাপার। ভুলে যাওয়াই ভাল।

প্রতুলবাবুর মুখে হাসি ফুটল, একটা কথা রাখবেন?

বলুন।

আমি চলে গেলে আপনি আনুকে একটু দেখবেন।

অমরনাথ মুখ তুলতেই আনার ঠোঁটে হাসি খেলে গেল। প্রতুলবাবু হাত তুলতে চেষ্টা করছিলেন। সাদা চাদরটস সরে যাচ্ছিল। আনা প্ৰায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিক করে দিল সেটা। প্রতুলবাবু বললেন, আর ঢেকে কি হবে। এসেছি যেভাবে যাব সেইভাবে। হাত নেতিয়ে পড়ল শরীরের পাশে।

আনা ইশারা করল বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে। অমরনাথ বললেন, চলি। প্রতুলবাবু সাড়া দিলেন না। চোখের পাতাদুটো বন্ধ হল মাত্র।

বাইরের ঘরে পৌঁছে অমরনাথ ছটফট করতে লাগলেন। উইলটা সই কারাবার কোন চেষ্টাই আনা করল না। লোকটাকে পেছন থেকে ধরে বসিয়ে দিলে নিশ্চয়ই সই করতে পারবে। এখন সই হয়ে গেলে তিনি কোর্টে গিয়ে উকিলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। উইল আইনসঙ্গত করতে কত খরচ পড়বে তিনি জানেন না। আজ না হলে তাঁকে আর একদিন আসতে হবে। এইরকম খুচরো ছুটি পাওয়াও তো মুশকিল।

পায়ের শব্দে মুখ ফেরালেন তিনি। আনা বলল, দাঁড়িয়ে কেন? বসুন।

না, না। যেতে হবে। অমরনাথ ব্যস্ততা দেখালেন।

আনা হাসল, উনি চলে গেলে আমার দায়িত্ব নিতে বললেন আপনাকে, কই, আপনি তো কোন জবাব দিলেন না?

কি বলব? মুখ ঘোরালেন অমরনাথ।

হরদেব ঘোষাল হলে কিন্তু বিশ্বরূপ দেখানোর মত হ্যাঁ করত।

অমরনাথ অস্বস্তিতে পড়লেন। হরদেব নাকি একসময় আনার শরীরের দিকে নজর দিয়েছিল। তাঁকে আর হরদেবকে আনা একই চরিত্রের মনে করছে না কি! আজ হাঁটার ভঙ্গী দেখে কয়েক সেকেণ্ড চঞ্চলত এসেছিল, সেটা কয়েক সেকেণ্ডই। হঠাৎ আনা হাত ঘুরিয়ে বলল, না, বাবা, আমার দায়িত্ব কাউকে নিতে হবে না। অ্যাদ্দিন দেখলাম যখন তখন চিতায় ওঠার আগে ঠিকই টিকে থাকতে পারব।

অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, উইলটা সই করিয়ে নিলে আজই কোর্টে যাওয়া যেত।

আন হাসল, আমি তো ইংরেজি পড়তে জানি না। যাচাই করে নিই। আপনি ঠিকঠাক লিখিয়েছেন কি না। আমার ভাগটা ঠিকমত লেখা আছে কি না। পুরুষমানুষকে আমি বিশ্বাস করি না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *