১৩. প্ৰাপ্তবয়স্কতা শরীরের না মনের

অমরনাথ রিকশাওয়ালাকে থামতে বললো। তিনি লোকটাকে চিনতেই পারছিলেন না। রোগা লম্বা প্রৌঢ় এবং পোশাকে অসাচ্ছল্যর ছাপ স্পষ্ট। কাছে এসে লোকটি দুই হাত যুক্ত করে মাথায় ঠেকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ভুল করেছি কি? আপনি অমরনাথবাবু?

আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনার ভুল হয়নি।

তা যাচ্ছেন কোথায়? সঙ্গে পরিবার রয়েছে দেখছি। এখনই এলেন মনে হচ্ছে।

হ্যাঁ, আমার মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষা। এখানেই সিট পড়েছে, কদিন থাকতে হবে।

মেয়ে? উইটে বুঝি? বাঃ, অনেক বড় হয়ে গেছে। হুম। কোথায় উঠবেন?

বাবুপাড়ায় একটা গেস্ট হাউসে। বাবুপাড়ায় গেস্ট হাউস? তিনটে আছে। রায়দের, মিত্তিরদের আর গুপ্তদের। কোনটায় উঠছেন? ঠিকানা আছে?

মিস্টার এস কে মিত্র ভদ্রলোকের নাম।

বুঝেছি। ঠিক আছে, আর আটকারো না। পরে দেখা হবে।

আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।

পরিচয় দিলেই পারবেন। আমিই যাব দেখা করতে। না, না, পরিবারের সবাইকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না। আসি, নমস্কার।

চলন্ত রিকশায় বসে চিন্তিত হলেন অমরনাথ। লোকটি নিজের পরিচয় এড়িয়ে গেল কেন? কখনও একে দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না। অথচ এমনভাবে কথা বলল যে সব খবর জানে। পেছনের রিকশায় বসে অঞ্জলি দীপাকে বলল, তোর বাবাঙ্গ কাণ্ডটা দেখলি। চেনাজানা নেই একটা উটকো লোককে গড়গড় করে সব কথা বলে গেল। কার মাথায় কি মতলব আছে। কেউ বলতে পারে?

দীপা বলল, বাবা কি এমন বলেছে!

বাঃ, কোথায় উঠব কেন এসেছি বলার কি দরকারী! এমনও তো হতে পারে লোকটা ওদের কোন আত্মীয় কিংবা খুব চেনা। অঞ্জলির কথা শেষ হতেই মুখ থমথমে হয়ে গেল দীপার। জলপাইগুড়িতে আসতে হবে জানার পর থেকেই সেই রাত-দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। দম বন্ধ হয়ে আসে। রাত্রে এসেছিল বলে কিছুই দ্যাখেনি আবার দুপুর পেরিয়ে যখন চোরের মত ফিরে যাচ্ছিল তখন কোনদিকে তাকাবার মত মন ছিল না। এতদিন হয়ে গেল, বাড়িতে কেউ ভুলেও ওই কথা তোলে না। কিন্তু তার আচরণ বিধবাছাপ মেরে নিয়ন্ত্রিত করে রাখা হয়েছে এমন ভাবে যে সেই কথা ভুলে যাওয়ার উপায় নেই। এই লোকটি যদি ওদের লোক হয় তাহলে?

এস. কে. মিত্রের গেস্ট হাউস খুঁজে বের করতে অসুবিধে হল না। সুন্দর ছিমছাম বাগানওয়ালা বাড়িটা করলা নদীর ধারেই। চৌকিদার নিজেই এগিয়ে এল, সে ইতিমধ্যে নির্দেশ পেয়ে গেছে। ঘরদের দেখে অমরনাথ খুশি। রমলা সেনের প্রতি কৃতজ্ঞ হলেন তিনি। আজই একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করলেন। বাড়ি দেখে অঞ্জলির মেজাজ শান্ত হল। নইলে অজানা লোককে সব খবর দেওয়ার জন্যে স্বামীর সঙ্গে তার একপ্রস্থ হয়ে যেত। চৌকিদার চলে গেলে বলল, শোন, তোমাকে একটা কথা বলছি। আমরা এখন শত্ৰুপক্ষের এলাকায় এসেছি। সাবধানে চলবে। সবাইকে আগবাড়িয়ে বিশ্বাস করবে না। ওই লোকটা যদি আসে তাহলে বেশি কথা বলবে না।

দীপা পড়তে বসে গেল। অঞ্জলি ছেলেদের নিয্যে করলা নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বিয়ের পর এই প্ৰথম সে অমরনাথের সঙ্গে বাইরে একা এল। একা শব্দটা ভাবা মাত্র হেসে ফেলল সে। ছেলেদুটোকে কড়া গলায় বলল, সাবধান করে দিচ্ছি, কেউ যেন এই নদীর ধারে খেলতে আসবে না। বড় বড় কুমির আছে। গপ করে গিলে নেবে তোমাদের।

সন্ধের মধ্যে অমরনাথের অনেকগুলো কাজ হয়ে গেল। দীপার যে স্কলে সিট পড়েছে সেখানে যাওয়ার সহজ পথটি দেখে এলেন। বাজার থেকে আহার্য জিনিস কিনলেন। গেস্ট হাউসে ফিরে দেখলেন সত্যসাধনমাস্টার বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন। অঞ্জলি বলল, কি ঝামেলা বাধালে বল তো!

অমরনাথ বললেন, কি হয়েছে?

সেই লোকটা এসেছিল। তুমি নেই শুনে বলেছে ঘুরে আসছে।

লোকটা কে তাই তো বুঝতে পারছি না। মাস্টারমশাই-এবা খবর ভাল?

মন্দ না। এখন পরীক্ষাটা ভালীয় ভালয শেষ হইলেই হয়। একটা কথা কই। এখন দীপারে একদম ডিস্টার্ব কইরেন না। ওর যেমন পড়নের ইচ্ছা তাই পড়তে দিবেন। আর পরীক্ষার অন্তত এক ঘণ্টা আগে নিয়া যাইবেন সেন্টারে।

আপনি নিশ্চিত থাকুন, আপনার ছাত্রীব কোন অসুবিধে হবে না।

সত্যসাধন মুখে হাত বোলালেন একটু। তারপর নিচু গলায় বললেন, দাখেন অমরনাথবাবু, আমি ব্যাকডেটেড মানুষ। কখনও ভাবি নাই মাইয়ামানুষেব মেধা পুরুষদের চেয়ে বেশি। কিন্তু দীপারে দেইখ্যা আমার ভুল ভাঙছে। এই মেয়েটি অনেক উপরে উঠবে; হয়তো ঈশ্ববের বাসনা ছিল না সে সংসাব করে। আজ উঠি।

অঞ্জলি বলল, রোজ যদি একবার এখানে ঘুরে যান মাস্টারমশাই-–

সত্যসাধন বললেন, বলার দরকার নেই। স্বাৰ্থ আমার, আমি আসব।

গেট খুলে যখন সত্যসাধন বেরিয়ে, যাচ্ছেন তখন অঞ্জলি অমরনাথের কিনে আনা জিনিসপত্রের ব্যাগ নিয়ে ভেতরে গেল। একটা ঘর দীপাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ বাড়িতে ইলেকট্রিক আলো আছে। ফলে দ্বিতীয় ঘরটিতে ছেলে দুটো হুটোপুঁটি করছে। ইলেকট্রিক আলোয় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা এই প্ৰথম হচ্ছে ওদের। অঞ্জলি ধমকালো, আস্তে। বাবাংবার বলেছি এই কদিন দিদি বাড়িতে থাকলে গলা তুলে কথা বলবি না।

বারান্দায় চেয়ার পাতা ছিল। অমরনাথ তার একটা য বসলেন। খুব শান্ত এই বাড়িটা। রমলা সেন যেচে যদি ব্যবস্থাটা না করে দিতেন—। অঞ্জলি ভদ্রমহিলাকে কখনই পছন্দ করেনি। কিন্তু এখন আর মুখ ফুটে কিছু বলে না। এক কাপ চা হলে মন্দ হত না। অঞ্জলিকে ডেকে বলতে ইচ্ছে হল না। আজকাল মাঝেমাঝেই ক্লান্তি লাগে চা-বাগানের কাজে এমন একটা অভ্যাস হয়ে গেছে যে তার বাইরের জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না। ছেলে দুটোকে হয়তো মানুষ করে যেতে পাববেন। কিন্তু মেয়েটা?

অমরনাথ নিঃশ্বাস ফেললেন। শেষপর্যন্ত দীপা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে। তাদের বংশে কোন মেয়ে এই অবধি পড়েনি। বংশ! দীপা কি তাঁর বংশের? উত্তাবটা ভাবতেই ভাল লাগে না। যে মেয়েটিকে জন্মের পরই মাকে হারাতে হয়েছে, যার বাবা স্ত্রীর মৃত্যুর পরই সম্পর্ক অস্বীকার করেছে। সেই মেয়েটিকে যখন বুকে তুলে নিতে পেরেছিলেন, তিল তিল করে বড় করে তুলতে পেয়েছিলেন তখন—! অমরনাথ মাথা নাড়লেন। মতিভ্ৰম! মতিভ্ৰম না হলে হরিদাসদার কথা শুনে বিয়েতে তিনি রাজী হয়ে যেতেন না। মনোরমা যদি সেসময় চাপ না দিতেন। এত কিছু করা নষ্ট হয়ে গেল একটা ভুলের জন্যে। এখন তার প্ৰায়শ্চিত্ত কবা। লোকে বলে ছেলে হলে পড়াশুনার পেছনে খরচ করার মানে হয়, মেয়ের পেছনে এত টাকা ঢালছেন কেন? তার ওপর বিধবা মেয়ে। কোন ভবিষ্যৎ নেই। করে বিদ্যাসাগরমশাই বিধবা বিবাহ চালু করেছিলেন। কিন্তু কে মানছে? কেউ না। দেশে লক্ষ লক্ষ কুমারী পড়ে থাকতে সাধ করে কেউ বিধবাকে বিয়ে করে! সুভাষচন্দ্ৰ গত দু-বছরে কলকাতা থেকে অবশ্য একটার পর একটা সম্বন্ধ পাঠিয়ে যাচ্ছে। কেউ দুবার বিয়ে করেছে। কেউ তিন সন্তান নিয়ে বিপত্নীক। দ্বিতীয়বার ভুল করবেন না। অমরনাথ সেই কথা জানিয়েও দিয়েছেন সুভাষচন্দ্ৰকে। স্কুল ফাইনালটা পাস করলে চা-বাগানের স্কুলে একটা কাজ হয়েও যেতে পারে।

অঞ্জলি চায়ের কাপ নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল, কি ভাবছ?

অমরনাথ খুশি হয়ে কাপ নিলেন। কথা বললেন অন্য গলায়, কেমন লাগছে। জলপাইগুড়ি? তোমারও একটু চেঞ্জ হল!

তা হল। আমি ঠিক করেছি। দীপা যখন পরীক্ষা দিতে যাবে তখন বাইরে ঘুরতে যাব। পরীক্ষা শেষ হলে ওকে নিয়ে ফিরব।

তাই হবে।

আর পবীক্ষা যেদিন শেষ হবে সেদিন সবাই মিলে একটা সিনেমা দেখতে যাব। একটু আগে রিকশায় করে মাইকে বলতে বলতে গোল কাল থেকে রূপশ্ৰী সিনেমা হলে উত্তমকুমারের সিনেমা হবে। কুহক।

ভালয় ভালয় পরীক্ষা হোক।

কেউ আসছে। অঞ্জলি গেটের দিকে তাকিয়ে বলল। গেট খুলে যিনি আসছিলেন তিনি খুব জোরেই হাঁটছিলেন। একেবারে কাছে এসে বললেন, নমস্কার মশাই, এই এলেন বুঝি? আমি অবশ্য এর আগে খোঁজ নিয়ে গিয়েছি।

অঞ্জলি চটপট ভেতরে চলে এল। অমরনাথের চা তখনও অর্ধেক। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি কিন্তু এখনও আপনাকে চিনতে পারিনি।

খুব স্বাভাবিক। কয়েক মিনিটের জন্যে দেখা হয়েছিল। আমার আবার মুশকিল হল যাকে ভাল লাগে তাকে কিছুতেই ভুলে যেতে পারি না। তা কি বলব। মশাই, বয়স তো কম হল না, ভাল লাগাব মত মানুষ তো কম দেখলাম না, তাঁরা সবাই মাথার মধ্যে যাকে বলে ঠাসাঠাসি হয়ে থাকেন। আমাকে এখনও বুঝতে পারছেন না? মেয়ের বউভাতে জলপাইগুড়িতে এসেছিলেন। প্রতুলবাবুর বাড়িতে আমি আপনাকে আপ্যায়ন করে বসতে বলেছিলাম। এখন মনে পড়ছে?

অমরনাথ শক্ত হলেন। একটু ভাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই সন্ধ্যায়। এই লোকটিকে দেখেছিলেন। কিনা মনে করতে পারলেন না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নাম?

হরদের ঘোষাল। প্রতুলবাবুর প্রথম জীবনের ব্যবসার পার্টনার ছিলাম। যেই তিনি লাভের মুখ দেখতে লাগলেন অমনি হাত ধুয়ে ফেললেন! তা একটু নিশ্চয়ই বসতে বলবেন। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটু ব্যথা হয়ে গেল।

অমরনাথ ইতস্তত করলেন। যে সম্পর্কটি একেবারেই চুকে গিয়েছে তারই জের ধরে উদয় হয়েছেন। হরদেব। নতুন জায়গায় একেবারে অভদ্র হতেও পারছেন না। চা-বাগান হলে যে ব্যবহার করতেন। এখানে তা পারলেন না। বললেন, বসুন।

আধা-খাওয়া চা সুন্ধু কাপটি মাটিতে নামিয়ে রাখলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, বলুন কি উদ্দেশ্যে এসেছেন?

হরদের আরাম করে বসলেন, এই মেয়ে তো সেই মেয়ে যে বিধবা হয়েছে?

অমরনাথ জবাব দিলেন না। হরদের একটু অপেক্ষা করে বললেন, আমারও তাই মনে হয়েছিল। অবশ্য বিয়েবাড়িতে কনের বেশে দেখেছি, এখন তো ডাগর হয়েছে, মিল তেমন নেই, তবু শুনেছিলাম মেয়েটিকে আপনি পড়াচ্ছেন। তা সে যে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেবার মত উপযুক্ত হয়ে গেছে তা কি করে ভাবব! খুব ভাল, খুব ভাল। পকেট থেকে কৌটো বের করে নস্যি নিলেন হরদেব।

আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন এখনও বললেন না!

বলছি। দেখুন অমরবাবু, প্রতুল ছেলের বিয়ে দিয়ে বউ ঘরে আনল। যে ছেলে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে তার মাধ্যমে বংশধর চাইল সে। আপনার মেয়ে সেদিন পালিয়ে বেঁচেছিল। ছেলেও মরল প্রতুলের। তারপর—

এসব তো আমাদের জানা। পুরনো গল্প। এখন কেন ওসব তুলছেন?

বলছি। আপনার মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রতুল তার পুত্রের মৃত্যু সংবাদ জানিয়েছিল। কেন জানেন? জানিয়েছিল এই জন্যে যার সম্পর্কে সম্পর্ক সে নেই তাই তোমার মেয়েকে আর পাঠিও না। সে ঠিকই করেছিল। কারণ আপনি আর আপনার মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়িতে ফেরত পাঠাননি।

কে কি চেয়েছিল জানি না। আমি পাঠানো উচিত বলে মনে করিনি।

হ্যাঁ। এটাই সে চেয়েছিল। প্রতুলের বিশাল সম্পত্তি। এসবের উত্তরাধিকারী কে বলুন তো! জানেন? জানেন না! আপনার মেয়ে। শেষ শব্দ দুটো নিচু গলায় বললেন হরদের ঘোষাল। অমরনাথের চোখ ছোট হল, কি করে?

পুত্রবধু। ছেলে নেই মেয়ে নেই। অতএর সম্পত্তি তো পুত্রবধূই পারে। হরদের হাসলেন, প্ৰথম ছয়সাত মাস খুব উদ্বিগ্ন ছিল সে। না, না, পুত্ৰশোকে নয়, আপনি যদি খবর পাঠান যে মেয়ে গৰ্ভধারণ করেছে এবং সন্তানসম্ভবা তাহলে কি হবে? শেষ পর্যন্ত তার লোকজন যখন জানাল কিছুই হয়নি তখন নিশ্চিন্ত হল।

কিন্তু আপনি বললেন তিনি উত্তরাধিকারী আনার জন্যে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। সেরকম কিছু হলে তাঁর তো খুশি হবার কথা। অমরনাথ আপত্তি করলেন।

না। একটু চা হবে? আচ্ছা থাক। তিনি খুশি হতেন না। কারণ তিনি ভাল করেই জানতেন যে তাঁর পুত্রের পিতা হবার ক্ষমতা নেই। তবু তিনি বিয়েটা দিয়েছিলেন। কিন্তু যদি তাঁর অনুমান ভুল হয়, পুত্র যদি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে, উদ্বিগ্নতা সেই কারণে!

আপনি যা বলছেন তা আমার কাছে দুর্বোধ্য। আর এইসব কথা কি করে জানতে পারলেন। আপনি? অমরনাথ বিরক্ত হলেন।

জানি। এখন আমি প্রতুলের অনেক নিচের স্তরের। তার অর্থ আছে, নাম হয়েছে, রাজনৈতিক দলে টাকা খাটায়। আমার কিছুই নেই। তার সঙ্গে এক আসনে বসার যোগ্যতা আমার নেই। মাঝে মাঝে দয়া করে সে টাকা দেয়। আমাকে। কেন দেয় জানেন? মানুষ যতই ওপরে উঠুক। তার পাছায় যদি ঘা থাকে তাহলে সে সোজা হয়ে বসতে পারে না। অপকর্মগুলো নিয়ে আলোচনা করার সঙ্গী, বিশ্বস্ত সঙ্গী নেই তার। এখন যারা তাকে চেনেজানে তারা অন্য চেহারা জানে। একমাত্র আমার কাছে তার অতীত বাঁধা। তাই আমাকে দরকার হয় তার। ঘর বন্ধ করে কুমতলব বলে পবামর্শ চায়। আমিও দিই বদলে টাকা নিই। ফেল কড়ি মাখ তেল, আমি কি তোমার পর! হাসলেন হরদের ঘোষাল। তারপর বললেন,  ছেলের বিয়ে ঠিক করছে আমাকে বলেনি। জানতে পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, মেয়েটাকে মারছ কেন? সে বলল, এক পয়সা যৌতুক নেব না, রাজরানীর মত থাকবে এতে মারাটা কি দেখলে? তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল, আমার বংশধর দরকার। এ ছেলে মরে গেলে আর সুযোগ পাব না। আমি চমকে উঠলাম। বিশ্বাস করুন, আমি যোগাড় করে আনলাম এক ধরনের পাউডার যা খেলে শরীরের তেজ বাড়ে। প্রতুলকে রাজী করালাম ছেলেকে খাওয়াতে। প্রতুল রাজী হল কেন জানেন? অন্তত মেয়েটার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা একটা হোক সে চেয়েছিল। কিন্তু তার পরের দিন ছেলে গেল হাসপাতালে। আর বউ গেল পালিয়ে। প্রতুল খবর পেল সন্ধে বেলায়। তখন ঘাট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নইলে যেমন করেই হোক সেই রাত্রে সে বউকে ফিরিয়ে আনত। হয়তো সেই রাত্রে ছেলে না মরলে পরদিন নিজে আপনার বাড়িতে চলে যেত। অমরনাথবাবু, অতুল মরে গিয়ে আপনার মেয়েকে বাঁচিয়ে গেছে।

অমরনাথ চকিতে দ্বিতীয় ঘরের দিকে তাকালেন। মেয়েটা পড়ে চুপচাপ। বাইরে থেকে বোঝা যায় না কখনই। জোরে পড়তে পারে না সে কিছুতেই। এই মুহুর্তে সে কি করছে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু হরদের ঘোষালেব কথাবার্তা যদি তার কানো যায় তাহলে একটা গোলমাল হতে বাধ্য। হয়তো এত কষ্টের পড়াশুনা নষ্ট হয়ে যাবে, পরীক্ষা দিতে পারবেনা মেয়েটা। তিনি সোজাসুজি বললেন, হরদেববাবু, আপনি আমার অপরিচিত। প্রতুলবাবু আপনার বন্ধু। তাঁর ব্যক্তিগত কথা আমাকে বলা অন্যায় হচ্ছে। তাছাড়া ওই সম্পর্কের কথা আমরা ভুল যেতে চাই।

হরদের বললেন, এসব কথা আপনাকে আমি বলতাম না অমরনাথবাবু। আপনার চা-বাগানের বাসায় দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা যায়। কিন্তু আমি তো কখনও যাইনি। কিন্তু সম্প্রতি আমি প্রতুলের দ্বারা চরম অপমানিত হয়েছি। আমাকে সে তার বাড়িতে ঢুকতে নিষেধ করেছে। আমি গরীব, প্ৰতিশোধ নেবার ক্ষমতা আমার সীমিত। কিন্তু মনে রাখবেন সীমিত, একেবাবে যে নেই তা নয়। আপনাকে আজ আচমকা দেখতে পেয়ে মনে হল সেই প্ৰতিশোধ আমি নিতে পারি। আপনি কি জানেন প্রতুলবাবুর স্ত্রী বিকৃত মস্তিষ্ক? পাগল?

না তো। অজান্তেই বলে ফেললো অমরনাথ।

হ্যাঁ। এক বছর হল সে উন্মাদ! প্রতুল তাকে সম্প্রতি উন্মাদাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রথম দিকে পাঠালে হয়তো সুস্থ হতে পারত। কিন্তু এখন কোন সম্ভাবনা নেই। বাড়ির কর্ত্রী হয়ে আছে আনা। আবার নস্যি নিলেন হরদেব।

আনা? শুনেছি। ওদের পরিচারিকার নাম আনা।

সঠিক শুনেছেন। এই রমণীটির সঙ্গে প্রতুলবাবুর দীর্ঘকালের সম্পর্ক। ওঁর স্ত্রীও সেকথা জানতেন। আনা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী রমণী। প্রতুলবাবুর অনেক কুকর্মে সে মন্ত্রণা দিয়েছে। এখন সে বিবাহিতা স্ত্রীর মর্যাদা চায়। প্ৰথমা স্ত্রী উন্মাদিনী, পুত্ৰ মৃত, প্রতুলবাবু নিশ্চয়ই দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু যার বাড়িতে ডি সি-এস পি আসেন, নেতারা আসেন, তিনি কি করে বি-ক্লাসের একটা মেয়েকে বিয়ে করবেন? তার ওপর মেয়েটি যাকে বলে যৌবনের শেষ প্রান্তে। প্রতুল আমাকে বলেছিল আনাকে বুঝিয়ে বলতে। একশটি টাকা নিয়ে আমি রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু আনা আমাকে নাকানি চুবুনি খাওয়াল। সে বলল আপনার মেয়েকে লুকিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে সে নিজে কারণ তার স্বাৰ্থ ছিল। সে যখন জানতে পারল অতুল বাঁচবে না। তখনই তার মাথায় বুদ্ধিটা খেলল। আপনার মেয়েকে  প্রতুলের খপ্পড় থেকে বের করে দিতে পারলে পুরো সম্পত্তি দখল করতে তার কোন অসুবিধে হবে না। কারণ প্রতুলের ঔরসে তার গর্ভে একটি পুত্র সন্তান জন্মেছে। না, না, জলপাইগুড়ির কোন লোক একথা জানে না। ছেলেটি রয়েছে হাওড়ায় আনার গ্রামে। প্ৰতি মাসে প্রতুলবাবু আনার নাম করে তার খরচ পাঠায়। মানি অর্ডারের রসিদগুলো আমায় দেখিয়েছে আনা। এসব খবর নলিনীর অজানা নয়। কিন্তু যেই আনা বিয়ের কথা তুলল অমনি তার মাথা খারাপ হয়ে গেল। আনা বুঝেছে প্রতুল বিয়ে না করলে সে ওই সম্পত্তির অধিকারিণী হবে না। কি বোঝাবো আমি? প্রতুলকে বললাম যা ন্যায্য তাই করতে। আপনার মেয়ের নামে সম্পত্তি লিখে দিতে। সে ক্রুদ্ধ হল। আমাকে অপমান করল প্ৰচণ্ড ভাবে। তারপর থেকে ওই বাড়িতে আমি আর যাই না। কিন্তু জ্বলে যাচ্ছে ভেতরটা। আপনি আমার সঙ্গে হাত মেলান।

কি ভাবে?

প্রতুলের পরিবারে এখন মালিক দুজন। প্রতুল আর তার স্ত্রী। কিন্তু স্ত্রী উন্মদিনী। সে আর কখনও ভাল হবে না। অতএর রইল প্ৰতুল একা। আনা যতই চাপ দিক তার পক্ষে জলপাইগুড়িতে বাস করে ঝিকে বিয়ে করা সম্ভব হবে না। সে জানে তাহলে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। গতকাল শুনলাম সে রক্তচাপে ভুগছে। এই অবস্থায় ওর বিপুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারিণী আপনার মেয়ে।

তাও যদি হয় আপনি কি চাইছেন?

আপনার মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিন।

মানে?

এখন প্রতুলের যা অবস্থা শুনছি তাতে নখ দাঁত খসে পড়তে বেশি দেরি নেই। এইসময় মেয়ে গিয়ে ওখানে কায়েম হলে আনার সাধ্য নেই কিছু হাতিয়ে নেয়। প্রতুল যদ্দিন আছে তদ্দিন একটু সইতে হবে কিন্তু তারপর–!

হরদেববাবু, এবার আপনি আসুন।

মানে?

আমার মেয়ে এখানে এসেছে পরীক্ষা দিতে। আমরা এসব ব্যাপারে মাথা গলাতে চাই না। তা ছাড়া যে সম্পর্ক অস্বীকার করেছি সেখানে আমার মেয়ে ফিরে যেতে পারে না। আপনি এখন আসুন। অমরনাথ উঠে দাঁড়ালেন।

হরদের মাটির দিকে মুখ করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লেন, ভাল। তবে কথাটা মনে রাখবেন। মন পরিবর্তিত হলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কথায় বলে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা, এ তে রাজার সম্পত্তি। হরদেব টুক টুক করে গেট খুলে বেরিয়ে গেলেন।

অমরনাথ ধীরে ধীরে দীপার ঘরের দরজায় পৌঁছালেন। টেবিলে ঝুঁকে বসে মেয়েটা লিখে যাচ্ছে। ওখানে বসলে কি বারান্দায় বলা কথাবার্তা শোনা যায়? বুঝতে পারলেন না তিনি। কিন্তু হঠাৎ তাঁর অস্বস্তি শুরু হল। যে ভঙ্গিতে দীপা লিখে যাচ্ছে তাতে মোটেই ওকে আর কিশোরী মনে হচ্ছে না। ও কি আর কিশোরী আছে? অনেক পোড় খাওয়া লড়াকু মেয়ের আদল এসে গেছে ওই ভঙ্গিতে। অমরনাথ চট করে সরে এলেন। পাশের ঘরে ছেলে দুটো বিছানায় শুয়ে গল্প করছে। দরজার পাশে একটা চেয়ারে পাথরের মত অঞ্জলি বসে। অমরনাথ দাঁড়াতেই চোখাচোখি হল।

অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল চাপা গলায়, ও কি করছে?

লিখছে।

শুনতে পেয়েছে বলে মনে হল?

বুঝতে পারলাম না।

আমি এই ভয় পাচ্ছিলাম।

হয়তো শুনতে পায়নি।

লোকটাকে আর এখানে ঢুকতে দেবে না।

মনে হয় নিজেই আর আসবে না।

 

প্রায় ঝডের মত পরীক্ষার দিনগুলো কাটল। প্রথম দিন দুপুরে খুব লজ্জা পেয়েছিল অঞ্জলি। টিফিনের সময় অমরনাথের সঙ্গে পরীক্ষার হলে গিয়ে দীপার সঙ্গে দেখা করেছিল সে। ঘণ্টা পড়ার আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। আর তখন দেখতে পেয়েছিল ছাত্রীদের বাবা-মা হাতে ডাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল সকাল দীপাকে ভাত খাইয়ে পৌঁছে দিয়েছিল অমরনাথ। এত অল্প সময়ের মধ্যে খিদে পায় না দীপার। কিন্তু মেয়েরা যখন হল থেকে বের হল, গার্জেনরা যখন তাদের হাতে কাটা ডাব তুলে দিয়ে প্রশ্ন করতে লাগল তখন মনে হল খালি হাতে আসা ঠিক হয়নি। একটা পরীক্ষা দিয়েই মেয়ের মুখে ঘাম, চুল উস্কো খুস্কো। আঙুলে কালির দাগ। দুটো কলম দিয়েছিলেন অমরনাথ। অনেককাল আগে কেনা পার্কার কলমটা তোলা ছিল। সেটার সঙ্গে নিত্য ব্যবহৃত কলামটাও নিয়ে এসেছিল দীপা। বোঝা যাচ্ছে পার্কার কলমটা ব্যবহার করেনি। নিশ্চয়ই লিক করছে সস্তার কলম থেকে। অমরনাথ আঙুলটা দেখিয়ে বললেন, আঙুলটার কি অবস্থা করেছিস। পার্কার দিয়ে লিখলে সুবিধে হত না। দীপা মাথা নাড়ল, পুরনো কলমে সুবিধে হয়। লিখে লিখে অভ্যাস হয়ে গেছে তো। মা, আমার না, কি ভয় করছিল যখন খাতা দিল। কোয়েশ্চন পেপার হাতে নিয়ে মনে হল আমি একটা প্রশ্নেরও উত্তর লিখতে পারব না। কিন্তু যেই রোল নম্বরটা খাতায় লিখলাম সব ঠিক হয়ে গেল।

অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, অ্যাডমিড কার্ড দেখে নম্বরটা লিখেছিস তো?

আমার মুখস্থ হয়ে গেছে।

এবার অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল, তুই ডাব খাবি?

ডাব? দীপা মুখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাল। তারপর হেসে বলল, খামোকা ডাব খেতে যাব কেন? আমার কি পেট খারাপ?

অঞ্জলির মনে হল মান বাঁচল। তারপর থেকে এক রুটিন। সকালে অমরনাথ মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে আসে। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে অঞ্জলি দুই ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পরীক্ষার হলে টিফিনের শেষে মেয়ে ঢুকে গেলে ওরা শহর দেখতে বের হয়। দেবী চৌধুরানীর কালীবাড়িটি তার খুব ভাল লেগেছে। পরীক্ষার শেষ দিনে অমরনাথ উত্তমকুমারের কুহক ছবির টিকিট কিনে এনেছেন। পরীক্ষার পর বাড়ি এসে বিছানায় লাফিয়ে উঠে উপুড় হয়ে শূন্যে পড়ল দীপা, আঃ। কতদিন ভাল করে ঘুমাইনি মা।

অঞ্জলি বলল, চা-বাগানে গিয়ে কাল থেকে যত খুশি ঘুমাস। একটু বাদে তৈরি হয়ে নে। আমরা সবাই কুহক দেখতে যাব।

আমার ভাল লাগছে না। মা। তোমরা যাও?

শরীর খারাপ লাগছে তোর?

না। শুধু ঘুম পাচ্ছে।

কমাস ধরে যা পড়া পড়লি। সিনেমাটা উত্তমকুমারের ছিল তাই ভাবলাম দেখি।

সুচিত্রা সেন আছে? মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করল দীপা।

কেন?

থাকলে আমি যাব।

অঞ্জলি জানত যে ছবির নায়িকা অন্য। তবু সে ঠোঁট ওলটালো, জানি না। হয় তো! উত্তমকুমার থাকলেই তো সুচিত্রা সেন থাকে।

দীপা উঠে বসল। বসে হাসল, জানো, অনেকদিন আগে একটা ছেলে আমাকে বলেছিল আমি নাকি সুচিত্রা সেনের মত দেখতে। তারপর অনেক সিনেমা পত্রিকায় আমি তার ছবি দেখেছি। কিন্তু কোন মিলই খুঁজে পাইনি।

কোন ছেলে বলেছিল? অঞ্জলির মুখ গম্ভীর হল।

তুমি চেনো না। অনেক বছর আগে মালবাবুর বাড়িতে এসেছিল।

আমাকে বলিসনি কেন?

আমি কথাটার মানেই বুঝিনি তখন।

এখন বুঝেছিস?

বাঃ, আমি কি আর ছোট আছি?

সিনেমা দেখার পর অঞ্জলির মন খুব ভাল হয়ে গিয়েছিল। ছেলেদের নিয়ে অমরনাথ আগে আগে যাচ্ছিলেন। পেছনে দীপার পাশে অঞ্জলি। অঞ্জলি বলল,  হেমন্তকুমারের গানগুলো কি সুন্দর। শহরের লোকদের কি সুবিধে, ইচ্ছে হলেই সিনেমা দেখতে পারে।

দীপা আঁচল টানল। রিকশার দঙ্গল, সিনেমা ফেরত মানুষেব ভিড় সামলে ওরা হাঁটছিল। অঞ্জলি হাসল, কথা বলছিস না যে। তোর নায়িকা না দেখে মন খারাপ হয়ে গিয়েছে? তারপরেই মনোরমার মুখ মনে পড়ে গেল তার। চাপা গলাফ বললেন, শোন, বাড়িতে গিয়ে ঠাকুমাকে বলার দরকার নেই যে আমারা সিনেমা দেখলাম।

কেন?

বুঝছিস না?

বুঝেছি।

কি?

আমার সিনেমা দেখা ঠিক নয়।

দ্যাখ, কেউ যদি মনে করেন এই করা উচিত ওই করা উচিত আর fতনি যদি বয়স্ক হন এবং বোঝালেও না বোঝেন তাহলে খামোকা সত্যি কথা আগ বাড়িয়ে বলে দুঃখ দিয়ে লাভ কি!

সামনে যারা বাবার সঙ্গে যাচ্ছে তারা যদি বলে দেয়?

ওদের মনে থাকবে না। আর মনে থাকলেও না হয় বলব ভগবানের সিনেমা দেখেছি।

এর চেয়ে না দেখলেই হত। না দেখলে তো কোন ক্ষতি হত না। দীপা খুব নিস্পৃহ গলায় কথাগুলো বলল। অঞ্জলি এবার গম্ভীর হয়ে গেল। আজকাল দীপার অনেক কথাই সে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। বড্ড ধাক্কা দিয়ে কথা বলে সে।

গেস্ট হাউসে পৌঁছাতেই চৌকিদার বলল, এক বাবু আয়া থা মিলনেকে লিয়ে।

অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল, কি নাম বলেছে? মাস্টারমশাই? রোজ যিনি আসেন?

নেহি। ইয়ে দুসর আদমি।

অঞ্জলি অমরনাথের দিকে তাকাল, আবার এসেছিল সেই লোকটা!

দীপা জিজ্ঞাসা করল, কে মা?

অঞ্জলি ভেতরে ঢুকল, তুই চিনবি না। আয়। ওরা চলে গেলে অমরনাথ চৌকিদারের কাছে জানতে চাইলেন, কি রকম দেখতে হে সেই বাবুকে?

বুডডা। গাড়িমে আয়থা।

গাড়িতে এসেছিল? খুব অবাক হলেন অমরনাথ। হরদের ঘোষালকে দেখে কিছুতেই মনে হয় না তার গাড়ি আছে। গাড়ি থাকলে কেউ রাস্তায় হেঁটে বেড়ায় না। তাছাড়া হরদেবকে দেখে সচ্ছল বলে মনেই হয় না। তাহলে কে এল? অমরনাথ ভেবে পেলেন না। চৌকিদারকে জিজ্ঞাসা করেও তিনি নতুন কিছু জানতে পারলেন না। যার গেস্ট হাউস তিনি একবারও আসেননি। আর তিনি তো চৌকিদারের মালিক।

ঘরে এসে অঞ্জলিকে এই কথাগুলো বললেন অমরনাথ। অঞ্জলি বলল, এত ভাবার কি আছে। যে আসে। আসুক। আমরা তো কাল সকালেই চলে যাচ্ছি।

রাত বাড়ল। যিনি এসেছিলেন তিনি আর এলেন না। অমরনাথের ঘুম আসছিল না। কেমন যেন ভয় ভয় করছিল। মানুষেবা ওপর আর বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। যিনি এসেছিলেন তিনি যদি প্রতুলববাবু হয় তাহলে তো ভয়ের কারণ রয়েছে। হরদের ঘোষাল যা বলেছেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে দীপা ওদের পথের কাঁটা। আনা নামক সেই পরিচারিকাটি কি চাইবে দীপা বেঁচে থেকে সম্পত্তি ভোগ করুক! প্রতুলবাবু নিজে থেকে কি দীপাকে সম্পত্তি দিতে চাইবেন? মুশকিল হল এই ধরনের মানুষ এরকম বিশাল সম্পত্তি কোন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে মৃত্যুর পর্ব দান করেও যেতে পারেন না। শেষমূহুর্ত পর্যন্ত নিজে আগলে থাকতে চান। হঠাৎ মনে হল, প্রতুলবাবু তো এতদিন কোন বিরক্ত করেননি তাদের। পুত্রবধূ হিসেরে যে দাবি আছে তাতে তিনি দীপাকে করে নিয়ে যেতে চাইলে কতটা বাধা দিতে পারবেন অমরনাথ। এক্ষেত্রে যদি হরদের ঘোষালের কথা জানিয়ে তিনি যদি প্রতুলবাবুকে লিখে দেন যে তাঁর সম্পত্তির ওপর দীপা কোনদিন দাবি জানাতে যাবে না। তাহলে তো ভদ্রলোককে নিশ্চিত করা যায়। অন্তত কোন আতঙ্কের সম্ভাবনা থাকে না।

অমরনাথ ঘুমন্ত ছেলে দুটোর পাশ থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বারান্দার আলো নিবিয়ে দিয়ে গিয়েছে। চৌকিদার। অথচ দীপাদের ঘরে আলো জ্বলছে। দীপা আর অঞ্জলি শুচ্ছে ওখানে। নতুন জায়গায় আলো না জেলে ঘুমাতে পারে না অঞ্জলি। অবশ্য দীপাও রাত জেগে পড়ত। মাঝেমাঝেই অমরনাথ তাকে সতর্ক করতেন, অনেক রাত হয়েছে। আর পড়তে হবে না, এবার শুয়ে পড়। আজ তো কোন পড়াশুনা নেই।

রাত নিশুতি। শহরের কোথাও কোন শব্দ নেই। চারধার ছায়া ছায়া। বাবুপাড়ার রাস্তার আলো নিস্তেজ। হঠাৎ অমরনাথের মনে হল তিনি অনর্থক চিন্তা করছেন। আজকের রাত তো মধ্য পর্যায়ে। কাল ভোরেই শহর ছাড়ছেন। চা-বাগানে পৌঁছে গেলে কোন দুশ্চিন্তা থাকবে না। তিনি কেন খামোক প্রতুলবাবুকে চিঠি দিতে যাবেন! দেখাই যাক না। ঈশ্বর কার কপালে কি লিখেছেন তা কে জানে! আগ বাড়িয়ে নিশ্চয়ই সম্পত্তি দাবি করতে যাচ্ছেন না। তিনি। কিন্তু যদি জল সেদিকে গড়ায় তাহলে সন্ন্যাসী হয়ে থাকার কোন যুক্তি নেই। গা ঝাড়া দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎই তিনি ডাকলেন, দীপা, ঘুমসনি?

ভেতর থেকে আওয়াজ এল, হ্যাঁ। ঘুমচ্ছি।

কি করছিস?

চিঠি লিখছিলাম।

ও। কাকে।

শিলিগুড়িতে।

খুব ভাল করেছিস। আমি লিখব ভেবেছিলাম, তুই ধন্যবাদ দিয়ে দিস। অমরনাথ নিজের ঘরে ঢুকে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন।

নিজের নাম লিখে মায়ের ঘুমন্ত শরীরটাকে দেখল। দীপা। জলপাইগুড়িতে এসে মায়ের হাবভাব অনেক বদলে গিয়েছে। যেন বয়স কমেছে হঠাৎই। দীপা চিঠির ওপর নজর রাখল, শ্রদ্ধাস্পদেসু আজ আমার পরীক্ষা শেষ হল। কোন প্রশ্নের উত্তব লিখতে আমার অসুবিধে হয়নি। জানি না রেজাল্ট কিরকম হবে। তবে এর চেয়ে ভাল আমি লিখতে পারতাম না।

আজ আমি ভেবেছিলাম। আপনি আসতে পারেন। হয়তো সময় পাননি। কিন্তু আপনাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল আমার।

মা জোর করায় আজ পরীক্ষার পরে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। আমি। ফেরার পথে মা বললেন ব্যাপারটা যেন ঠাকুমাকে না জানাই। এটা আমার খুব খারাপ লেগেছে। নিজেকে বিধবা বলে ভাবতে আজকাল মোটেই ইচ্ছে করে না। যে লোকটা আমাকে বিয়ে করেছিল তার স্মৃতি বলতে হাড়জিডে কগণ নগ্ন শরীর ছাড়া আমার কিছু মনে পড়ে না। ঠিক করেছি। এবার চা-বাগানে গিয়ে এতদিন যা মেনে এসেছি তা আর মানব না। আপনি লিখেছিলেন প্ৰাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত ওটা মানা উচিত। কিন্তু লেখেননি প্ৰাপ্তবয়স্কতা শরীরের না মনের? তাডাতাড়ি চিঠি দেবেন? প্ৰণাম নেবেন। দীপাবলী।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *