কিন্তু শাড়িটা রপ্ত করতে আরো অনেকদিন লেগে গেল স্বাতীর। শাড়ি পরে ইশকুলে সে যেতেই পারে না, বন্ধুদের সামনে বেরোতেও লজ্জা করে। তাহলে আর কতটুকু সময় বাকি রইল! কোনো ছুটির দিনে বাথরুম থেকে শাড়ি পরেই বেরিয়ে আসে গম্ভীরভাবে। কিন্তু ভাত-টাত খেয়ে মেঝেতে যখন উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে গল্পের বই নিয়ে, আর পড়তে পড়তে আস্তে আস্তে পায়ের আঙুল ঘষে মেঝেতে, শাড়ি তখন শাড়ির মনে হাঁটুতে ওঠে। আর শাশ্বতী শাসন করে—স্বাতী, পা-টা ঢাক।

এক পায়ের দু-আঙুলের সাহায্যে আর-এক পায়ের শাড়ি নামিয়ে দিয়ে স্বাতী আরো গভীর ড়ুব দিল বইতে।

-কী খালি মেঝেটার উপর গড়াচ্ছিস! ছোটো আছিস নাকি এখনো?

ঠিক যেন মা, স্বাতীর মনে হল। মুখে বলল—কেন, গড়ালে কী হয়?

হবে আবার কী! মেঝেটা নোংরা না?

বেশ পরিষ্কার তো–

ওঠ! উঠে বোস চেয়ারে। না-হয় খাটেই শো।

শাশ্বতী কয়েক মাস আগে কলেজে ভরতি হয়েছে। বেশ পাকাপোক্ত যুবতীর মতো তার চালচলন। স্বাতীর খুব ইচ্ছে করে ছোড়দির মতো হতে, কিন্তু ছোড়দির কয়েকটা অভ্যেস তার একেবারে পছন্দ না। যেমন, বাড়িতে সারাক্ষণ স্যান্ডেল পরে থাকা, রাত্তিরে শশাবার আগে নিয়ম করে চুল বাঁধা–ইত্যাদি।

একটি পায়ের উঁচু-করা গোড়ালির উপর আরেকটি পায়ের বুড়ো আঙুল ন্যস্ত করে সে বলল, এ-ই ভালো।

বিশ্রী স্বভাব–! আর কথা না বলে শাশ্বতী তার অত্যন্ত পরিপাটি করে গুছোনো পড়ার টেবিলে এসে খুলে বসল পেনসিল হাতে নিয়ে ইনডটিভ লজিক, স্বাতীর তুলনায় অনেকটা উঁচু দরের জীব মনে হল নিজেকে। একটু পরে ছোট্টো হাই তুলে পাঠ্যবই মুড়ে রাখল, আর তুলে নিল বন্ধুর কাছে দু-দিনের কড়ারে ধার করা হাল আমলের বাংলা নভেল। বইখানা কোলের উপর খুলে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে চোখ নিচু করল। তারপর কেমন করে বেলা কেটে গেল বুঝল না। এমন সময় বিজু এসে ডাক—ছোড়দি।

উঁ।

ও ছোড়দি।

আঃ! ধ্বনিটা বিরক্তির নয়, নায়িকার প্রতি অনুকম্পার নিশ্বাস। এ-রকম সময়ে কি বই থেকে চোখ তোলা যায়?

শোনো না—

বল না! দু-পা এগিয়ে এসে বিজু বলল–ছোড়দি, শুভ্রবাবু এসেছেন। এমন সুরে বলল যেন মস্ত একটা খবর দিচ্ছে।

শুভ্রবাবু! সে আবার কে?

ও মা! হাফ-প্যান্ট-পরা ঈষৎ গোঁফ-ওঠা বিজু কপালে চোখ তুলল। তারপর, যদিও চীৎকার করে বললেও আগন্তুক ভদ্রলোকের শোনবার সম্ভাবনা ছিল না তবু, খুব নিচু গলায় বললশুবাবু! সেই যে সরস্বতীপূজোর সময় তিনকোণা পার্কে গান করলেন। মনে নেই তোমার?—তা হয়েছে কী? অসহিষ্ণু বিজু মেঝেতে একবার পা ঠুকে বলল–কী-যে তুমি, ছোড়দি! শুভ্রবাবু–কত জায়গায় তিনি গান করেন আজকাল–এই তো কয়েকটা বাড়ি পরেই থাকেন।

ও, শুবু! ঘরের অন্য কোণ থেকে হঠাৎ বলে উঠল স্বাতী।—শুবুকে তো সেদিনও দেখেছি গোল-গোল চশমা পরে এক পাঁজা বই ঘাড়ে করে ইশকুলে যেত। এর মধ্যে গাইয়ে হয়ে উঠেছে! আবার শুভ্র-বাবু! স্বাতীর দিকে কটমট করে তাকিয়ে বিজু বলল-তুই দেখেছিস, না? তোর চেয়ে কত বড়ো, জানিস? শাশ্বতী তাড়াতাড়ি মধ্যস্থ হয়ে বলল—তা বেশ তো, এসেছে কেন?

আমি ধরে নিয়ে এলাম রাস্তা থেকে–বিজু সগর্বে খবর দিল—জানো ছোড়দি, শুভ্রবাবু আমাকে গান শেখাতে রাজি হয়েছেন।

তোকে আর গান শিখতে হবে না, দাদা–স্বাতী ফশ করে বলল—এমনিই তোর গলা দিয়ে সাত সুর বেরোচ্ছে আজকাল।

স্বাতী! চীৎকার করতে গিয়ে সত্যিই তিন-চার রকম আওয়াজ দাঙ্গা বাধিয়ে দিল বিজুর গলায়। আর কোনো প্রতিবাদের চেষ্টা সে করল না। ঘুরে দাঁড়াল মূঢ় মেয়েলি স্পর্ধার দিকে পিঠ ফিরিয়ে এমন একটা ভঙ্গিতে, যেন অগ্রজের গৌরবের আর সমস্ত পুরুষজাতির গাম্ভীর্যের বর্তমানে সে-ই একমাত্র প্রতিনিধি। তা কথাটা এমন মিথ্যেই বা কী! চাপা গলায় ব্যস্তভাবে যে-খবরটা জানাল, সেটা অবশ্য জানা কথাই—ছোড়দি, শুভ্রবাবু বসে আছেন নিচে।

বসে আছেন তো আমি কী করব?

তুমি একবার যাবে না?

যাঃ!

বিজুর মুখ কালি হল। তার এমন যোগ্য কলেজে-পড়া দিদি, দিদির জন্য শুভ্রবাবুর চোখে কত বেড়ে যেত তার সম্মান।

তুই ডেকে এনেছিস তুই যা, গল্প কর গিয়ে।

নিশ্চয়ই! কিন্তু শুভ্রবাবু কি সুখী হবেন শুধু তার সঙ্গে গল্প করে? বাড়ির লোকদের সঙ্গে আলাপ না হলে আর বাড়িতে আসা কেন?

আচ্ছা, একটু চা পাঠিয়ে দিও, কেমন?

* * * * * *

সন্ধেবেলা আরজি পেশ করল বিজু—বাবা, আমি গান শিখব।

গান শিখবি?–রাজেনবাবু একটু চুপ করলেন। যৌবনে তাঁরও ছিল গানের নেশা। কলকাতার মল্লিক, বড়াল, দেবেদের বাড়ির দরোয়ানদের অপমান সহ্য করে কত শুনেছেন বড়ো-বড়ো ওস্তাদ, বাঈজিদের গান। কোনো বাড়িতে একান্তই যখন ঢুকতে পারেননি, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন একটু ভেসে-আসা সুরের প্রার্থনায়। কিন্তু গানের জগৎটা ভাল না। পদ্মের পথে এত কাদা যে পদ্মের আকাঙক্ষাই মরে যায় অনেকের। তাছাড়া তেমন গান কি আর আছে দেশে? বললেন–বড়ো শক্ত রে। ও নিয়েই পড়ে থাকতে হয় দিনরাত।

না তো! সপ্তাহে দুঘণ্টা রেওয়াজ করলেই মডার্ন শেখা যায়–বিজু তার মনোনীত সংগীতশিক্ষকের মত উদ্ধৃত করল।

মডার্ন কী?

মডার্ন জানো না বাবা?–শাশ্বতী ভাইয়ের সাহায্যে এল–রেডিও শোনো না কখনো? আধুনিক গান!—

ও! নাকি-কান্না আবার শিখতে হয় নাকি? বাবার এ কথা শুনে বিজু পালাল, শাশ্বতী গম্ভীর হল, কিন্তু স্বাতী লুটিয়ে পড়ল হেসে। বিজু ধরে পড়ল শাশ্বতীকে—ছোড়দি, লক্ষ্মী-তো, বাবাকে ভাল করে বলো। আমি কথা দিয়েছি শুভ্রবাবুকে, এখন যদি না হয়, ওঁর কাছে আর মুখ দেখাতে পারব না। শাশ্বতী হেসে বলল—তুই কথা দিয়েছিস কী রে? পুঁচকে ছেলে!—অপমান লাগল বিজুর, কিন্তু সেটা চেপে গিয়ে অনুনয় করল-না দিদি, না। তুমি ইচ্ছে করলেই হয়ে যায়। শেষের এই কথাটা মন্দ লাগল না শাশ্বতীর। কর্তৃত্বের সুরে বলল—আচ্ছা, শিখতে থাক তো। শেষ পর্যন্ত কোনোটাতেই তো অমত করেন না বাবা।

* * * * *

তা-ই হল। সপ্তাহে দুদিন আসতে লাগলেন শুভ্রবাবু। বিজু হারমোনিয়ম টিপেটিপে তার চৌদ্দ বছরের মোটা গলায় রজনীগন্ধাকে বার-বার প্রশ্ন করতে লাগল, সে আজ রাত করে ফুটল কেন? এটাই রজনীগন্ধার স্বভাব বলে এর কোনো উত্তর সম্ভব নয়, আর বোধহয় সেইজন্যই প্রশ্নটি করতে হল বার-বার, বড্ডোই বার-বার। শুভ্রবাবু না এলেও মাঝে-মাঝে নিচের ঘর থেকে শোনা যায় বিজুর গীতাভ্যাস। বিজু দেখছি গাইয়ে হবেই—রাজেনবাবু মন্তব্য করলেন একদিন। শাশ্বতী তাড়াতাড়ি ভাইকে আশ্রয় দিল–ওকে কিছু বোলো না বাবা।

মাস্টারটি কে?

কে একজন শুভ্রবাবু–

তা বিজুর কী হবে গান শিখে? তোরা শিখলেই পারিস।

আমি না! স্বাতী বলে উঠল—বাবাঃ! যা বিশ্রী দেখায় দাদাটাকে!

তুই? বাপ তাকালেন শাশ্বতীর দিকে।

ঐ শুবুর কাছে শিখবে কী! সঙ্গে সঙ্গে স্বাতীর জবাব–ও নিজে গাইতে শিখল কবে যে অন্যকে শেখাবে?

অসভ্য মেয়ে! শাশ্বত আস্তে-আস্তে চলে গেল সেখান থেকে।

বিজু মাথা খেয়ে ফেলতে লাগল এই বলে যে বাড়িতে একদিন শুভ্রার গান হোক।

আমি যদি বলি না, তাহলে নিশ্চয়ই একদিন সময় করে—

থাম তো চালিয়াৎ! শাশ্বতী হাসল–তোর শুভ্রদার আবার সময়ের অভাব! বাড়ি-বাড়ি সেধে সেধে গেয়ে বেড়ানোই তো তার কাজ।

জানো তুমি! বিজু মুখ লাল করে বলল—কত নেমন্তন্ন ফিরিয়ে দেন, জানো?

তাহলে আর নেমন্তন্ন করে কী হবে?

না, না! বিজু ডবল উৎসাহে বলল—আমি বললে নিশ্চয়ই গাইবেন এসে। যত শুনতে চাও। শাশ্বতীর মনে হল ছাত্রের চাইতে শিক্ষকের উৎসাহ কিছু কম না। আর ভদ্রলোক যখন এত করে শোনাতেই চাচ্ছেন, তখন নিরাশ করা কি উচিত? রাজেনবাবু সায় দিলেন সানন্দে। কতদিনের মধ্যে কোনো কোলাহল নেই বাড়িতে। শান্ত, ঝিমোননা, চুপচাপ..কত কমে গেছে বাড়ির লোক। যে-তিনজন আছে, তারাও এতটা বড়ো হয়েছে যে নিজেদের মধ্যে তেমন টগবগে ঝগড়াও আর করে না। ছেলেমানুষ, মাঝে-মাঝে একটু আনন্দ-উৎসব না হলে চলবে কেন? বেশ।

একটু লোকজন না হলে গান জমে না, শাশ্বতী বলল দু-চারজনকে। শুভ্রবাবুও সাড়ম্বরে এলেন। সঙ্গে তাঁর নিজের হারমোনিয়ম, বায়া-তবলা, তবলচি, আর জনা-তিনেক বন্ধু বন্ধু মানে পরীক্ষিত ও প্রতিশ্রুত ভক্ত। নিচের ছোটো ঘরটি বেশ ভরা-ভরাই দেখাল। হারমোনিয়মে সুর দিয়ে শুভ্র একবার শ্রোতাদের দিকে তাকাল। শাশ্বতীর কিউটিকুরা পাউডার দু-হাতে মাখিয়ে নিয়ে আস্তিন গুটিয়ে প্রস্তুত হল তবলচি! আর গোছ-গোছ পানের রুপোলি তবক পাখার হাওয়ায় কেঁপে-কেঁপে চিকচিক করতে লাগল খুব যেন খুশি হয়ে।

রাজেনবাবুও এসে বসেছিলেন, শুধুই ছেলেমেয়ের মন-রক্ষার জন্য নয়। কিন্তু প্রথম গানটি হয়ে যেতেই আস্তে উঠে উপরে চলে গেলেন। ছি, একে এরা গান বলে! হচ্ছে কী দিন-দিন! ভেবেছিলেন চুপে-চুপেই উঠে আসতে পেরেছেন, কিন্তু গাইয়ের চোখ এড়াল না। তবে বেচারাচেহারার প্রৌঢ় ভদ্রলোকের অনুপস্থিতিতে শুভ্র মুষড়ে পড়ল না। হারমোনিয়ম নিয়ে দু-চার মিনিট কসরৎ করতে করতে হঠাৎ দ্বিতীয় গানটি ধরল।

লম্বা ছাঁদের মুখ, চুল পিছনে ওল্টানো, ছোট্টো সরু একটু গোঁফও রেখেছে আবার। যে ছেলেকে সে দেখেছে বই ঘাড়ে করে স্কুলে যেতে, তার সঙ্গে একে ঠিক মেলাতে পারল না স্বাতী। মানুষের ছেলেবেলাটা কোথায় পড়ে থাকে, বলো তো? হঠাৎ কি ছেলেমানুষটা মিলিয়ে যায় হাওয়ার মধ্যে, বড়ো একজন তার জায়গায় এসে দাঁড়ায়? আমার এ-আমিটার কী হবে ক-বছর পরে? ছোড়দির মতো হব, তারপর মা যেমন ছিলেন সেইরকম। এখন যা আছি তা তো বেশ লাগছে আমার, তবে কেন এটাকে ছাড়তে হবে? ইশকুলে যাওয়া শুবুটা তো মন্দ ছিল না। হঠাৎ গোঁফ গজিয়ে শুভ্রবাবু হয়ে হারমোনিয়ম বাজিয়ে গান করে লাভটা তার কী হচ্ছে? শুভ্রকে মোটে ভাল লাগছিল না স্বাতীর। এক লাইনের অর্ধেক গেয়ে, প্রশংসার জন্য তাকায় চারদিকে, তারপর বাকি অর্ধেক গায়, বন্ধু তিনজন সজোরে মাথা নাড়ে। কেমন একরকম গোল-গোল চোখে তবলচির দিকে তাকিয়ে হারমোনিয়মের রিডে তিন আঙুলে বাড়ি মেরে মেরে তাল বুঝিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে বেলো ছেড়ে দিয়ে বাঁ হাতটি উপরে তুলে হা-হা করে ওঠে এমনভাবে যেন পাশের লোকের গায়ে ঢলে পড়ে যাবে, গান গাইতে হলে এ-রকম করতে হয় নাকি? ছোটো ছোটো হাসির বুড়বুড়ি উঠছিল স্বাতীর গলায়, কিন্তু আর কারো মুখে সে রকম কোনো লক্ষণ সে দেখতে পেল না। সকলেই গম্ভীর হয়ে শুনছে, বেশ ভালই লাগছে যেন। স্বাতীও চেষ্টা করল নিজেকে গুটিয়ে নিতে, শুভ্রকে চোখ দিয়ে না দেখে কান দিয়ে তার গান শুনতে। পর-পর তিনটি গান গেয়ে শুভ্র থামল। রুমালে মুখ মুছে বলল–এবার আপনারা কেউ। আপনার পরে কে আর গাইবে এখানে–বলে উঠল শাশ্বতীর এক কলেজ-বন্ধুর দাদা, নিজেও পড়ুয়া, বর্তমানে বোনের এসকর্ট। কথাটা অমায়িকভাবে মেনে নিয়ে শুত্র জবাব দিল—তাতে কী। কেউ কিছু করুন। ঘরের মধ্যে একটা নড়াচড়া ঠেলাঠেলির ঢেউ উঠল। চশমার আড়াল থেকে শুভ্রর চোখ একটু ঘুরে-ঘুরে বেড়াল, তারপর স্থির হল স্বাতীর মুখের উপর—তুমি একটা গাও না? স্বাতী মাথা নেড়ে বলল—না।

না কেন? গাও! শুভ্র উৎসাহ দিল।

পারি না।

তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হয় পার—ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েটির সঙ্গে একটু কৌতুক করল শুভ্র। হঠাৎ চোখ তুলে স্বাতী বলল—দেখে তো এ রকম উল্টোউল্টি কতই মনে হয়। দু-একজন হেসে উঠল কথা শুনে। শুভ্র নিজেও হাসল। সেই হাসির রেশটাই টেনে রেখে মুখখানা বেশ মোলায়েম করে নিয়ে চোখ ফেরাল শাশ্বতীর দিকে—আপনি?

না না!—শাশ্বতীর ভাবটা এইরকম যেন কেউ তাকে পেরেক খেতে বলেছে, কি ভাঙা কাচ, কি পাথরের কুচি। বিজু চেঁচিয়ে উঠল কোণ থেকে—বলুন, ছোড়দিকে ভাল করে বলুন। ছোড়দি নিশ্চয়ই গাইবে। ছুটল বিদ্যুতের মতো দৃষ্টি বিজুর দিকে। সে দৃষ্টি কারী-কারো মনে হল পার্থিব রমণীয়তার পরম উদাহরণ।

একটা গান করতে খুব কি কষ্ট হবে আপনার?–মিনতি করল শুভ্র। গাও না শাশ্বতী—পিছন থেকে জোগান দিল কলেজের বান্ধবীটি।

একটা!—শুভ্রর তিন বন্ধুর একজনের নিবেদন।

আপনার গান শুনব বলে কতদিন ধরে মনে-মনে আমার ইচ্ছা-আরো একটু সাহস করল শুভ্র। গাইতে হল শাশ্বতীকে। দ্বিধা-ভরা গলায় একবার সুর আর একবার কথা ভুল করে একটি রবীন্দ্রসংগীত। শেষ হওয়া মাত্র বাহবা রব যা উঠল, তাতে ছোটো-ছোটো পোকার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম নামল শাশ্বতীর মেরুদণ্ড বেয়ে।

শুভ্র আসন নিল আবার। একটি, আর একটি, তারপর সকলের উপরোধে আরো একটি গেয়ে শেষ করে দিল। তারপর সিঙাড়া, সন্দেশ, গল্প, চা, পান। বেশ ভাল লাগল সকলেরই। সকলে চলে যেতেই বিজু আনন্দে একবার গড়িয়ে উঠল পাতা ফরাশেকী গ্র্যান্ড হল ছোড়দি। উঃ, ওয়ান্ডারফুল। দেয়ালের সঙ্গে ঠেকানো সোফায় বসে জানলা-বাইরের টুকরো-কালো আকাশের দিকে তাকিয়েছিল স্বাতী, মুখ না ফিরিয়েই বলল—ওয়ান্ডারফুল বানান কর তো!

-তুই চুপ কর। তোর সঙ্গে কথা বলছি না আমি।

মন্দ না ভদ্রলোকের গান—শাশ্বতী সান্ত্বনা দিল ভাইকে।

-মন্দ না! হুঁঃ, বলো কী! আর কী-রকম প্রশংসা করলেন তোমার গানের। রাস্তায় আমাকে কী বললেন জানো? বললেন, তোমার ছোড়দি যদি ভাল করে একটু মন দেন গানেথাম, থাম—আবার বলল স্বাতী—যেমন বাজে তুই, তেমনি বাজে লোকের সঙ্গে তোর ভাব। কী!—বিজু লক্ষ্য দিয়ে এসে খপ করে চেপে ধরল স্বাতীর চুল।

ঠিক! পান খেয়ে ঠিক একটা বখার মতই দেখাচ্ছে বলে স্বাতী মাথার এক ঝকানিতে চুল ছাড়িয়ে আস্তে-আস্তে উঠে গেল ঘর থেকে। বিজু রাগ করে কথা বন্ধ করল স্বাতীর সঙ্গে, আর সেটা জানাবার জন্য তার গা ঘেঁষে দুমদাম করে চলে যেতে লাগল নাক উঁচু করে। আর সকালে বিকালে তার গানের রেওয়াজ পাল্লা দিতে লাগল রেডিওর সঙ্গে। এটাও স্বাতীর উপর প্রতিশোধ। কিন্তু শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ ঘটিয়ে দিল স্বাতী নিজেই। হঠাৎ একদিন বিজু শুনল স্নানের পরে বেরিয়ে আসতে-আসতে স্বাতী গুনগুন করছে সেই নীল সাগরের গান, শুভ্রদা সেদিন যেটা সর্বশেষে গেয়েছিলেন। প্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়ে সে বলল—স্বাতী! তবে? স্বাতী চোখ দিয়ে একটু হাসল, গুনগুনানি থামাল না। বাঃ! সুন্দর বসেছে রে তোর গলায়! মুহূর্তে সমস্ত শত্রুতা ভুলে গেল বিজু। বোনের গলা জড়িয়ে বলল-আয় না, একটু আয়, আমরা একসঙ্গে গাই বাজনার সঙ্গে।

-যাঃ!

লক্ষ্মী-তো, আয়! ঈশ, স্বাতী, তুই যদি একটু সিরিয়াসলি—

তুই আর ইংরিজি বলিস না তো, দাদা। বিজু রাগল না, বরং আরো গলে গিয়ে বললসত্যি স্বাতী, সত্যি! আচ্ছা আমি গাইব না, তুই-ই ভাল করে গা, আমি শুনি। কিন্তু স্বাতী বসে গেল তার স্কুলের পড়া নিয়ে। বিজু একটু ঘুরঘুর করল, তারপর আর টিকতে না পেরে নিজেই ছুটে গেল হারমোনিয়মের কাছে। সারাটা সকাল হাবুড়ুবু খেতে লাগল নীল সাগরের তরঙ্গে।

বিজুটার পড়াশুনো হলে হয়—আপিস যাবার মুখে কাদো কাদে হারমোনিয়মটা আর যেন সহ্য হল না রাজেনবাবুর। ওর খুব মাথা বাবা–শাশ্বতী তাড়াতাড়ি বলল।

তবে আর ভাবনা কী? তুই-ই তো পড়াতে পারিস ওকে।

স্পষ্ট দমে গেল মেধাবী ভাইকে নিয়ে শাশ্বতীর উৎসাহ। বই নিয়ে বসতেই চায় না—তাকে স্বীকার করতে হল। হারমোনিয়মের দেবীও কি সরস্বতী?—বলে রাজেনবাবু আরেকটি পান মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে রওনা হলেন।

আশ্চর্য! আর মাসখানেকের মধ্যেই দেখা গেল, মানে শোনা গেল, হারমোনিয়ম আর হাঁ করে না। এত বড়ো একটা ঘটনা চট করে বিশ্বাস করা যায় না, আর সে বিশ্বাসের সময় হবার আগেই হঠাৎ এক সন্ধ্যায় নিচের ঘর থেকে কেঁপে কেঁপে উঠে এল আর একটি আর্তস্বর, হারমোনিয়মের চেয়ে অনেক বেশি কান্না-পাওয়া, গায়ে-কাঁটা-দেওয়া, দাঁতে-দাঁত-লাগানো। আপিস-ফেরত শরীরটাকে বারান্দায় পাটির উপর এলিয়ে দিয়েছিলেন রাজেনবাবু। একটু চমকে উঠেই বললেন–এ আবার কী? তারপর নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাব দিলেন—বেহালা। বিজু বেহালা শিখছে?

কী জানি! জানি না তো–বলল শাশ্বতী বা ছোড়দি!—স্বাতী বলে উঠল—সেদিন সুকোমলবাবুকে দেখলে না বেহালা হাতে নিয়ে আসতে?

কী জানি? ও-সব তুই-ই দেখিস! খোঁপায় একবার হাত দিয়ে শাশ্বতী বলল।

শুভ্রর বন্ধু সুকোমল! সেই-যে তোমার গান শুনে বলেছিল—

আচ্ছা থাম! বড়ো বড়ো মানুষদের আর নাম নিয়ে বলতে হবে না তোকে।

রাত্রে খেতে বসে রাজেনবাবু বললেন—বিজু, আবার বেহালা কেন? মধুর একটু হেসে বিজু জবাব দিল–গান আমার হবে না বাবা।

একটাতে যখন হল না, আর একটাতে বুঝি হবেই?

বেহালাটা আমি পারব—বিজু নিশ্চিন্ত। রাজেনবাবু ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে বললেন— একটু যদি পড়িস-টড়িস! উৎসাহে মাথা নেড়ে বিজু জবাব দিল সে আমি ঠিক করে নেব— তুমি কিচ্ছু ভেব না বাবা। একটু চুপ করে থেকে রাজেনবাবু আবার বললেন—বেহালা পেলি কোথায়? মুখ-চোখ উজ্জ্বল হল বিজুর-সুকোমলদাই এনে দিয়েছেন। চল্লিশ টাকা দাম। একসঙ্গে দিতে হবে না। মাসে পাঁচটা করে টাকা দিও, কেমন বাবা? বলে বিজু তাকাল বাবার নিচু-করা মুখের দিকে। বেহালার মতো একটা সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া যায় মাসে মাত্র পাঁচ টাকা খরচে, তবু বাবা সুখী নন! কী যে!…

* * * * * * *

বেহালার তারে জং ধরল বেহালার দাম পুরো শোধ হবার আগেই। অবশ্য গান-বাজনার আবহাওয়াটা রইল বাড়িতে। সুকোমল আসে মাঝে-মাঝে, শুভ্রও আসে, আসে শাশ্বতীর সেই বন্ধু আর তার দাদা, পড়শিনিদের মধ্যে কেউ-কেউ। শাশ্বতীর বন্ধু অনেক, বন্ধুত্বরই বয়স তার এখন, থাকেও অনেকে কাছাকাছি। দোতলার ঘরে শাশ্বতীর সভা যখন বসেছে সন্ধেবেলায়, ঠিক সেই সময়ে বিজু জড়ো করেছে নিচের ঘরে তার সাংগীতিক অগ্রজদের। হাসির ঢেউ গড়িয়ে যায় উপর থেকে নিচে, গানের কলি উড়াল দেয় নিচ থেকে উপরে। দোতলা মাঝে-মাঝে উতলা হয়, একতলা ঘন-ঘন নিশ্বাস ফেলে, আর লাফিয়ে লাফিয়ে পারাপার করে বীর বিজন। তারপর, ঠিক বোঝা গেল না কেমন করে হল, নিশ্চয়ই বিজুরই চেষ্টাতে, কবে উঠল স্বাধীনতার সিঁড়ি, উড়ল সাম্যের নিশান, আর মৈত্রীর তো এমনিতেই অভাব ছিল না। এক-একদিন সন্ধ্যেবেলা রাজেনবাবু যখন ক্লান্ত পায়ে ফেরেন, বাড়িতে পা-দেওয়ামাত্র তাকে অভ্যর্থনা করে নিচের ঘর থেকে ছেলেবয়সের কালোচ্ছ্বাস।

ব্যাপারটা মন্দ লাগল না স্বাতীর। সে-যে গান ভালবাসে, সেকথা এতদিনে বুঝল নিজের মনে। আসরে গাইবার সময় শুভ্রকে বড়ো বোকা-বোকা লাগে। কিন্তু বসে-বসে গুনগুন করে যখন, ভাললাই,তো। স্নানের সময় কিংবা ঘরে যখন একা থাকে, অন্তত দাদার শুনে ফেলবার সম্ভাবনা থাকে না, তখন সেও গুনগুন করে, কথা বাদ দিয়ে কেবল সুর। গানটাকে শুধুই গুনগুনানি মনে হয় তার। হারমোমিয়ম, তবলা, আলো, লোকজন, কিছুই যেন মেলে না তার সঙ্গে, শুধু একটা গুনগুনানি। যেমন পাতা কেঁপে ওঠে হাওয়ায়, যেমন শুয়ে-শুয়ে দেখি চাঁদ তাকিয়ে আছে মুখের দিকে, সেই চুপচাপ তাকিয়ে-থাকাটা যদি কোনোরকমে কানে শুনতে পেতুম! এমন গান কি জানে কেউ? না, কেউ জানে না। তবু যারাই গান গায়, ঐ গানই মনে-মনে ভাবে, যারাই শোনে ঐ গানই শুনতে চেষ্টা করে মনে-মনে।

চুপ করে যদি গান গাওয়া যেত–মনের কথাটা ব্যক্ত না করে পারল না স্বাতী—তাহলে বেশ হত। না, ছোড়দি?

সে আবার কী?

জবাব দিল আঠারো ধরো-ধরো যুবতী।

আচ্ছা ছোড়দি, রেলগাড়িতে যেতে-যেতে কখনো তোমার মনে হয়নি আকাশ ভয়ে কে যেন গান করছে?

ও! শাশ্বতী হাসলরেলগাড়ির আওয়াজ দিয়ে যা খুশি তা-ই বলানো যায়, গাওয়ানো যায়, কে না জানে?

না, আমি তা বলিনি–থাক, আর বলব না। রেলগাড়ির চাকা যতই চ্যাঁচাক, কিছুতেই পারে না সেই গানকে চাপা দিতে। আকাশের গান… স্পষ্ট কানে শুনেছে সে, মাইলের পর মাইল, স্টেশনের পর স্টেশনের ঝলসানি পার হতে-হতে। কিন্তু যেই কোনো বড়ো স্টেশনে গাড়ি ঢুকল, উঠল মানুষের রোল—আর শোনা যায় না। রেলগাড়িতে চড়ে তো সকলেই, আর কেউ শোনোনি? সন্ধ্যেবেলা ছোড়দিকে খুঁজতে-খুঁজতে স্বাতী এল নিচের ঘরে। শুভ্র কী যেন বলছিল নিচু গলায়–শাশ্বতী তাড়াতাড়ি বলে উঠল-আয় স্বাতী। কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

কোথায় আবার থাকব।

একটু বোস? আমি এক্ষুনি আসছি–কেমন-একরকম এঁকে-বেঁকে চলে গেল শাশ্বতী। টেবিলে। ছিল আধ-গেলাশ জল, হাত বাড়িয়ে জলটুকু খেয়ে নিয়ে শুভ্র উঠল।—যাচ্ছেন নাকি? স্বাতী একটু অবাক হল।

হ্যাঁ, আজ যাই। কাজ আছে। শুভ্র চলে গেল। আর কেউ এল না, ছোড়দিও আর কথাবার্তা বলল না বেশি। একটু মন-মরাই কাটল সন্ধেটা।

স্বাতী, শোন—শাশ্বতী ডেকে বলল দিন-দুই পরে—এ বইটা দিয়ে আয় তো শুভ্রবাবুকে। কোথায় দিয়ে আসব?

নিচে এসে বসে আছে, আমার শরীরটা আজ ভাল নেই বলিস।—বইখানা হাতে নিয়ে স্বাতী একটু তাকিয়ে বলল–কালই না দিয়ে গেল? কখন পড়লে?

ও আমার পড়া বই।

ছোড়দি, আর-একদিন রাখো না, আমি পড়ব।

না, দিয়ে আয়।

পারব না। তুমি যেতে পারো না, সত্যি-ততা আর অসুখ করেনি তোমার!

লক্ষ্মী-তো! আচ্ছা, বইখানা আবার আমি আনিয়ে দেব তোকে। এখন দিয়ে আয়, কেমন? দু-আঙুলে কপাল টিপে ধরে শাশ্বতী জুড়ে দিল-উঃ, মাথা যা ধরেছে! স্বাতীর হাত থেকে নিয়েই শুভ্র একবার বইখানা খুলল। সাদাকালো কাগজের গায়ে নীল রঙের একটা খাম ঝিলিক দিল স্বাতীর চোখে। তক্ষুনি বই বন্ধ করে শুভ্র একটু হেসে বলল—ছোড়দি কী করছে? মাথা ধরেছে বোধহয়।

আচ্ছা—শুভ্র উঠল, স্বাতীর সামনে হঠাৎ থেমে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল–তুমি গান শেখো না কেন বলল তো? এত সুন্দর গলা তোমার।

ছোড়দির চেয়েও?—স্বাতীর মুখ দিয়ে যেন বলে উঠল অন্য কেউ। হ্যাঁ, ছোড়দির চেয়েও, তক্ষুনি জবাব দিল শুভ্র—এস না আমার কাছে, খুব ভাল করে শিখিয়ে দেব তোমাকে বলে শুভ্র তিন আঙুলে স্বাতীর গাল টিপে দিল একটু। উপরে এসে স্বাতী সোজা ঢুকল বাথরুমে, জলের ঝাপটা দিল সমস্ত মুখে, সাবান দিয়ে ঘষে-ঘষে লাল করে ফেলল গাল, পারলে চামড়া তুলে নেয় ওখানকার। তারপর তার গোলাপি রঙের অরগ্যান্ডির ফ্রক ছেড়ে ব্লাউজ আর শাড়ি পরল। সাদা, কালো-পাড়ের মিলের শাড়ি। আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে হঠাৎ মনে পড়ল মাকে। এ-দুবছরের মধ্যে এমন করে মনে পড়েনি কোনদিন। কোনোদিন মনে প্রশ্ন ওঠেনি মা কেন নেই। অসুখ দেখে দেখে ধরেই নিয়েছিল যে একদিন থাকবেন না। আজ মনে হল তাই-তো, অসুখ হলেই কি মানুষ মরে যায়, আর না-ও তো অসুখ হতে পারত। কোনোদিন, আর কোনোদিন শাড়ি ছাড়া কিছু পরবে না, মনে-মনে যতবার একথা বলল সে, ততবার তার চোখ জলে ভরে উঠল একা ঘরে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।

******

স্বাতীকে আর দেখা গেল না একতলার সান্ধ্য-সভায়। কী রে?—ক দিন পরে শাশ্বতী জিজ্ঞেস করল–হয়েছে কী তোর?

–কী আবার হবে!

—কী-রকম একা-একা থাকিস।

–না তো!

জানিস স্বাতী—শাশ্বতী চেষ্টা করল বোনের মনে ফুর্তি আনতে—শুভ্রবাবুরা সবাই মিলে একটা গানের স্কুল খুলছেন পাড়ায়। নাচের ক্লাশও থাকবে। ভরতি হবি তুই নাচে?

–না।

–না কেন? ছেলেবেলায় নিজে নিজেই কত নাচতিস, মনে আছে? শিখলে খুব ভাল হবে, এত সুন্দর ফিগার তোর…

চুপ কর, ছোড়দি!—স্বাতী খেঁকিয়ে উঠল। শাশ্বতীর মন বেশ ভাল ছিল সেদিন। বোনের পিঠে হাত রেখে বলল—কী হয়েছে তোর বল তো? সব সময় রাগ? জবাব না দিয়ে আঁচলটা আঙুলে জড়াতে লাগল স্বাতী। শোন, আর দেরি না, তৈরি হয়ে নে—ব্যস্ত ভাব শাশ্বতীর।

–কেন?

–বা! মিতালি-সঙ্ঘে ম্যাজিক না আজ?

—আমি যাব না!

—সে কী রে! সবাই যাচ্ছে আর তুই যাবি না!

–না।

–চল না, খুব ভাল ম্যাজিক, চল—হাত ধরে টান দিল শাশ্বতী।

—আমি যাব না।

—থাক তবে?—স্বাতীর হাতটায় জোরে একটা ঝাকুনি দিয়ে শাশ্বতী চলে গেল সাজতে। তার সময় নেই, এখুনি এসে পড়বে বন্ধুরা।

* * * * * * *

ছাড়া-ছাড়া মেঘ করেছে সেদিন, এলোমেলো হাওয়া। ছাতে পাইচারি করতে-করতে স্বাতী দেখছিল আকাশে চৌরঙ্গির মতো চওড়া ছাইরঙা রাস্তা। আর সেই রাস্তা দিয়ে ছুটে আসা টকটকে লাল দমকলের মত রোদুরের এক-একটি লম্বা-লম্বা লাইন। আর কিছু করবার ছিল না তার। বাড়ির সব বই অন্তত দশবার করে পড়া হয়ে গেছে, ধার-করা বইও কিছু নেই, আর ভুলেও সে একটা গানে টান দেয় না আজকাল। আস্তে আস্তে আলো নিভল আকাশে, মেঘেরা আরো একটু জায়গা জুড়ল, সদ্য-গ্যাস-জুলা আবছা রাস্তা দিয়ে স্বাতী দেখতে পেল বাবা আস্তে আস্তে আসছেন। সেও সিঁড়ি দিয়ে নামল, আর রাজেনবাবুও দোতলায় এসে পৌঁছলেন।–বাবা, এত দেরি তোমার?

চাকরি রে, চাকরি নিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে এলেন রাজেনবাবু। বাবার সঙ্গে-সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে স্বাতী বলল—আর যেন কেউ চাকরি করে না! সবাই তো ফিরেছে সেই কখন!

নাকি!–বাথরুমের দরজার কাছে আলনার ধারে দাঁড়ালেন রাজেনবাবু। বাবার গা ঘেঁষে দাড়িয়ে কোটের বোতামের উঁচু ধারটায় একটি আঙুল গোল করে একবার ঘুরিয়ে এনে স্বাতী বলল–বাবা তুমি গলা-বন্ধ কোট পর কেন? বেশ স্যুট-ট্যুট পরলেই পার। রক্ষে কর।–রাজেনবাবু কোট খুললেন, শার্ট তুললেন।

–তোমার প্যান্টগুলোই বা কী! প্রত্যেকটা ছোটো!

ভাল-ততা। ওতেই সুবিধে লাগে আমার।—জুতোর দশ-ঘণ্টার জেলখানা থেকে পা দুটোকে ছাড়িয়ে নিলেন রাজেনবাবু। না বাবা—স্বাতীর ঠোঁটের কাছটা কেমন একটু করুণ হল-ভাল দেখায় না।

এমনিতেই যারা দেখতে ভাল তাদের কি আর সাজতে হয়—চোখ টিপে রাজেনবাবু ঢুকলেন বাথরুমে, বেরিয়ে এলেন হাত-মুখ ধুয়ে খালিপায়ে, ধুতি আর গেঞ্জি পরে। তোমার পাটি পেতে রেখেছি, বাবা–স্বাতীর চোখে-মুখে হাসি।

আঃ, কী আরাম।–রাজেনবাবু লম্বা। চা এল, সঙ্গে দুখানা তিন ঘণ্টা আগেকার ভাজা নিমকি। বাবা, তুমি কিছু খাও না কেন?—স্বাতীর প্রশ্ন।

—সে কী রে?

–এই যেমন আমরা কত কিছু খাই, তালশাঁস খাই, পেয়ারা খাই, পাটালি খাই, তুমিই তো বাজার থেকে আন সব, কিন্তু তুমি তো খাও না? মেয়ের মুখের দিকে কৌতুকের চোখে তাকিয়ে রইলেন রাজেনবাবু। শুধু কৌতুক?—লিচু খাবে, বাবা, লিচু? হ্যাঁ বাবা, লিচু তোমাকে খেতেই হবে! সম্মতির অপেক্ষা না করে স্বাতী ছুটে গিয়ে নিয়ে এল তার পেন্সিল রাখার বাক্সে লুকোনো চারটি বড়ো-বড়ো ম্যাজেন্টা রঙের লিচু। হাতের কাছে ছড়িয়ে দিয়ে বলল—খাও। লিচু একটা খেতে হল।–কেমন? ভাল না?

–চমৎকার। মেয়ের একটি হাত নিজের হাতে নিয়ে রাজেনবাবু তাতে তুলে দিলেন আর তিনটি। বারান্দার রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু উঁচু করে বসে স্বাতী বলল—রোজ তোমার জন্য লিচু রেখে দেব, কেমন? খাবে তো?

আজ যে তুই বাড়িতে?—রাজেনবাবু জিগেস করলেন।—ও মা? আমি-ততা বাড়িতেই থাকি রোজ।

—আজ একা বুঝি?–প্রশ্নটা শুনে মনে কোথায় একটু ব্যথা লাগল স্বাতীর। কিছু বলল না।–তোদের গান-বাজনা কেমন চলছে? এ-প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে স্বাতী বলল—বাবা, তুমি রোজ আপিস থেকে এসে বাড়িতেই বসে থাক কেন?

—ভাল লাগে বলে, আর অভ্যেস বলে।

–মাঝে-মাঝে একটু বেরোলেও তো পার।

–কোথায় যাই বল তো? দাঁত দিয়ে একটি লিচুর খোশা ছাড়াতে-ছাড়াতে স্বাতী আস্তে আস্তে বলল-বন্ধু-বান্ধবের বাড়ি যেতে পার, কি শনি-রবিবারে সিনেমায়–

–আচ্ছা আচ্ছা ঢের হয়েছে। তা তুই কেন বাড়ি বসে থাকিস সন্ধেবেলা? কোমরের উপর থেকে শরীরটি একটু মুচড়িয়ে স্বাতী বলল—এমনি।

—তোর দিদিটা বেড়ুনি ইয়েছে খুব, আর তোর দাদা তো বিশ্ববন্ধু। তোর বন্ধুরা আসে না কেউ?

আমার কোনো বন্ধু নেই—বলে স্বাতী খোশা-ছাড়ানো নীলচে-সাদা নিটোল লিচুটি একেবারে পুরে দিল মুখের মধ্যে।

*******

সন্ধেবেলাটা সম্প্রতি একটু নির্জনই হয়ে উঠেছিল রাজেনবাবুর। হঠাৎ ভরে উঠল। কত কথা স্বাতীর! রাজেনবাবুর শ্রান্ত শরীরের উপর যেন ফুরফুরে হওয়া বয়ে যায়, আর ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি ঝরে পড়ে। কোনোদিন স্বাতী হয়তো বলল–শোনো বাবা, আমাদের রাস্তা দিয়ে ঝকঝকে কালো নতুন একটা গাড়ি যায়, দেখেছ তুমি?

–নাকি?

–ঐ মোড়ে যে কম্পাউন্ডওলা মস্ত বাড়িটা না, ও-বাড়ির গাড়ি। চারটে গাড়ি ওদের। খুব বড়োলোক ওরা, না বাবা?

–তা হবে।

—কিন্তু চারটে গাড়িতে তো আর একসঙ্গে চড়া যায় না। কী হয় চারটে দিয়ে?

রাজেনবাবু একটু ভেবে বললেন—অনেক লোক বোধহয় বাড়িতে, আর তারা তোর মতো। ঘরে বসে থাকে না কেউ। সকলেই খুব বেড়ায়-টেড়ায়।

—বাবা, তুমি একটা গাড়ি কেনো।

—তাহলে বেড়াবি তুই? স্বাতী মুখ টিপে হাসল।–তা মন্দ কী! বেড়াতে হলে তো গাড়িই ভাল। মেয়েরা যে রাস্তায় হেঁটে-হেঁটে বেড়ায়, একটুও ভাল লাগে না আমার। রাজেনবাবু হাসলেন কথা শুনে। স্বাতী বলল—হাসবার কী আছে, ঠিকই তো! আর গাড়ি হলে বেশ তোমাকেও আর ট্রামে চড়ে আপিশ করতে হয় না।

–কেন, ট্রাম তো ভাল।

বিশ্রী! কী ভিড় আপিশের সময়! হ্যাঁ বাবা, একটা গাড়ি কেনো।

দেখি।

আচ্ছা বাবা—রাজেনবাবুর সিঁথির উপর দিয়ে একটি আঙুল আস্তে টেনে নিতে-নিতে স্বাতী বলল—আমরা তো এর চেয়ে ছোটো একটা বাড়িতে যেতে পারি। দুটো ঘর তো খালিই পড়ে থাকে।

—তোর দিদিরা এলে লাগে না?

–ওঃ, কবে-না-কবে আসবে দিদিরা, তাই জন্যে! আচ্ছা, আর তো দিদিরা কেউ এল না একবারও?

–আসা কি সোজা রে?

-কেন, মা থাকতে তো কতবার…। রাজেনবাবু একটু হেসে বললেন—মা না থাকলে বাবার কাছে কি আর আসে মেয়েরা?

—আসে না? বল কী তুমি!

–আসে নাকি?

বা রে! আমি! আমি বুঝি আর মেয়ে না তোমার!–বলে স্বাতী বাপের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল উপুড় হয়ে। ঘন চুলে ভরা কোঁকড়া কালো মাথাটিকে রাজেনবাবু চোখ দিয়ে চুম্বন করলেন অনেকক্ষণ।

******

আশ্চর্য ঘটনা! অভূতপূর্ব প্রস্তাব! কোনো এক শনিবারে আপিশ থেকে এসেই রাজেনবাবু বললেন—কোথায় গো রাজকন্যারা, সিনেমায় যাবে নাকি আজ? স্বাতী ছুটে এসে বাবাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল—সত্যি বাবা, সত্যি? শাশ্বতী একটু ফাপরে পড়ল। শনিবার গীতায়তনে তার ক্লাস, শুভ্রদের ইশকুল ওটা। এদিকে বাবাকে নিরাশ করতেও অনিচ্ছা, হঠাৎ একটা শখ হয়েছেই যখন! কোনটাতে যাবে?—ঠান্ডা গলায় সে জিজ্ঞেস করল।

—যেটাতে ইচ্ছে তোদর।

বন্দিনীটা মন্দ হয়নি শুনেছি–বিজ্ঞ মন্তব্য শাশ্বতীর।–ছাই! বিজুর সাদা কোঁচাটা দুলে উঠল দরজার কাছে–দেখতে হয় তো প্রতিশোধ, ওঃ, গ্লোরিয়াস!

দেখেছিস নাকি তুই? শাশ্বতী যেন যুদ্ধে আহ্বান করল ভাইকে।

ক–বে!

তাহলে এখন আর যাবি না তো?–বলল স্বাতী।-বয়ে গেছে! ঝিলিক দিয়ে উঠল দরজার আড়ালে বিজুর বীরদর্প—বললেও যেতাম না আমি, রিহার্সেল আছে না আমার! রিহার্সেল! নাটক? সোজা ছেলেকে জিজ্ঞেস না করে রাজেনবাবু শাশ্বতীর দিকে তাকালেন। পাড়ার ছেলেরা বুঝি করছে একটা। আর এ-পাড়ায় কিছু কি হতে পারবে যাতে বিজু নেই! একটু গর্বিতভাবেই শাশ্বতী বলল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিহার্সেলের মায়া কাটাল বিজু। ট্যাক্সি চড়ে সবাই মিলে যাওয়া হল, আর সবচেয়ে দামি টিকিট কিনে বসা হল দোতলায়। শাশ্বতী বসল চেয়ারে ঠেশান দিয়ে অভিজ্ঞ ধরনে, যতক্ষণ না আরম্ভ হল দর্শকদের মধ্যে ঘুরে বেড়াল তার চোখ। আর আরম্ভ হবার পর থেকে বিজু অবিশ্রান্ত কথা বলতে লাগল তার পাশে বসে—এইবার মেয়েটা রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যাবে, ছেলেটার অসুখ করবে, তাই চোখ দুটো ও-রকম। শাশ্বতী এমনকি একটা চড় মারল তার কানের উপর, বেশ জোরেই মারল, কিন্তু বিজু নাছোড়! ফিরতি ট্যাক্সিতেও অবিশ্রান্ত বকবকানি তার–জান ছোড়দি, শিবেনের গানগুলি কিন্তু প্লে-ব্যাক। গেয়েছে আর একজন, ছবিতে শুধু ঠোঁট নেড়েছে।

আচ্ছা হয়েছে, তুই থাম তো এবার। কিন্তু শাশ্বতীর কথার মধ্যেই বলে উঠলেন রাজেনবাবু–সত্যি? ফিল্ম দেখে, মানে, দেখে-শুনে, রীতিমতোই চমকেছিলেন তিনি। সেই কোন জন্মে যোবা বায়োস্কোপ দেখেছিলেন। তখনকার দিনে বায়োস্কোপ বলত। এই প্রথম দেখলেন কথা-বলা ছবি, তাও বাংলা! কী সব কাণ্ড, অ্যাঁ! কী করে করে।

বাঃ, সত্যি না! বাবার উৎসাহে বিজু একেবারে টগবগ করতে লাগল ফুটন্ত জলের মতো–গানগুলি গেয়েছে তো শশাঙ্ক দাশ। ঐ তো মনোহরপুকুরে থাকে, নিউ মডেল স্টুডিবেকার আছে একখানা।

—অনেক তো খবর রাখিস তুই! কথাটা বিজু প্রশংসা বলেই ধরল, আর প্রশংসাটা মেনে নিল একটুমাত্র হেসে-শশাঙ্কর গান কত ফিল্মে যে থাকে আজকাল, আর সত্যি গায়ও খুব ভাল, না ছোড়দি? শুভ্রদাও প্লে-ব্যাক করবেন শিগগির। রাজেনবাবু বিষয়টা নিয়ে একটু যেন চিন্তা করে বললেন—তা যাই বলিস তোরা, গানের সঙ্গে-সঙ্গে ঠিকমতো ঠোঁট নাড়াও কম শক্ত না। আর ছেলেটি দেখতেও…।

কী হ্যান্ডসম—কথা কেড়ে নিয়ে বি,বলল—ও তো সুজিত, এই সেদিন নামল স্বপ্নপুরীতে, আর এর মধ্যেই… হবে না! চেহারাখানা কেমন!

বিশ্রী। এতক্ষণে স্বাতী কথা বলল-ঠোঁট দুটো বোকা-বোকা!

–জানিস! বিজু শাসালো-রূপরঙ্গের ভোটে সুজিত ফাস্ট হয়েছে চেহারায়।

—হোকগে! তার চাইতে ঐ আর একটি ছেলে, ঐ-যে বন্ধু, সে ডে-র ভাল দেখতে। নায়কের বন্ধুর চেহারাটা একটু চেষ্টা করে মনে এনে রাজেনবাবু বললেন—তাকে ভাল লাগল তোর?

—হ্যাঁ বাবা, ও বেশ সুন্দর। একটু-একটু তোমার মতো।

আমার মতো! রাজেনবাবু হেসে উঠলেন—আমি ও-রকম সুন্দর হলে তো কাণ্ডই করেছিলাম! তুমি সুন্দর না? বলে কী!—স্বাতীর আঁটোসাঁটো সারবাঁধা দাঁত ঝকঝক করে উঠল হাসিতে। বাড়ি ফিরেও খানিকক্ষণ চলল সিনেমা প্রসঙ্গ। ছোড়দিকে উপলক্ষ আর বাবাকে লক্ষ্য করে বিজু উন্মুক্ত করে দিল এ বিষয়ে তার অসামান্য জ্ঞানের ভাণ্ডার। স্বাতী চুপ করেই রইল মোটামুটি, যেন অন্যদিকে তাকিয়ে অন্য কথা ভাবছে। আলো-না-জ্বালা বারান্দায় তার আবছা মুখের দিকে তাকিয়ে রাজেনবাবু হঠাৎ বলে উঠলেন—স্বাতী, তোর জন্মদিন তো শিগগির। স্বাতী দ্রুত ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে তাকাল।

বেশ বড়সড় হলি–এবার তোর জন্মদিন খুব ভাল করে করা যাক।

–হ্যাঁ বাবা, হা, শাশ্বতী হাতে তালি দিয়ে উঠল—খুব ভাল হবে, খুব মজা!

গানের আসর যা হবে একখানা!—বিজু লাফিয়ে উঠল। ওঃ! শশাঙ্ক দাসকেই নিয়ে আসব একেবারে। বাড়িতে লোক ভেঙে পড়বে।

বেশ তো গানের আসর হবে। আর? বলবি কাকে কাকে?

শোভাদি, লীলা-মাসি, মিচুদা-বিজু গড়গড় করে আত্মীয়দের নাম বলে গেল।

তা তো হল। আর? তোদের বন্ধুরা?

সে তো—হঠাৎ থেমে বিজু বলল, আচ্ছা ছোড়দি, হারীতবাবু? হারীতবাবুকে বলি?

যত তোর–!

কী রকম বক্তৃতা করলেন সেদিন মিতালি-সংঘে! কী স্মার্ট, না? ঈশ, আর একটু থাকতে যদি, ছোড়দি, তোমার সাথে আলাপ হয়ে যেত!

ও, তুই ছাড়িসনি! শাশ্বতী খুব জোরে হেসে উঠল। রাত্রে শোবার আগে বাবাকে একা পেয়ে স্বাতী বলল–বাবা, শোনো—

কী রে?

জন্মদিন-টন্মদিন কিন্তু কোরো না।

কেন?

না, ভাল লাগে না।

কী ভাল লাগে তোর বল তো?

কী ভাল লাগে? তা কি সে নিজেই জানে? ছুটির দিনের শাঁ-শাঁ দুপুরবেলায় হঠাৎ মাঝে মাঝে কী একটা আশ্চর্য ভাললাগা ছড়িয়ে পড়ে। সিনেমা, বেড়ানো, নেমন্তন্ন, হৈ চৈ, আর কিছুতেই ততা সে রকম হয় না। আর তাই-ই যদি না হল, যত ভালই হোক, কিছুই কি ভাল? আকাশ গান করে তার কানে-কানে। পৃথিবীটাই রেলগাড়ি, স্টেশন নেই, কেবল চলছে। দিনে-রাত্রে কখনো থামে না গান। আমরা শুনি না, কেউ শোনে না… আমি শুধু শুনি। আর শুনি যদি, সবসময় শুনি না কেন?

—বল না কী তোর ভাল লাগে?

বেশ, যা ইচ্ছে কোরো, একটু হেসে স্বাতী চলে গেল শুতে। জন্মদিনের সকালবেলায় চা খাবার পরে রাজেনবাবু বললো –শাশ্বতী, একটু বেরোবি আমার সঙ্গে? স্বাতী তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল। বাবা বললেন, তুমি আজ না, তুমি বাড়িতে থাকো।

হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে স্বাতী দাঁড়িয়ে রইল একটু। তারপর আস্তে আস্তে সরে এল সেখান থেকে। বাবা যে তাকে নিলেন না, তার চেয়েও খারাপ লাগল বাবার মুখের তুমি। মনে পড়ল না আর কোনোদিন বাবা তুমি বলেছেন। জন্মদিন—ততা তার দোষ কী! সিঁড়িতে ফিরে আসার শব্দ হল ঘণ্টাখানেক পরে। ডাকাডাকি শুনে সে জবাব দিল বিরক্ত গলায় ক্যানো? শিগগির আয়! ছোড়দির আর কী, ফুরতি ধরে না! আমি অঙ্ক করছি!—বলে সে দ্রুতবেগে। লিখতে লাগল দশমিকের সংখ্যা। অঙ্ক খুব ভাল, অঙ্ক সবচেয়ে ভাল। মনখারাপ হলে ভুলে থাকতে এমন আর কিছু না।

আয় না!

না, আমি এখন পারব না।–তোপের মত বেরোল স্বাতীর আওয়াজ—এই নে! ঝুপ করে তার টেবিলের উপর কী-একটা পড়ল, আর বিজু পালাল দৌড়ে। দোকানের নাম-ছাপানো মস্ত চৌকো বাক্স একটা। ইশ! এ রকম একটা বাক্স কতদিন মনে-মনে চেয়েছে সে। কী ভারি, আর কী ভাল, কত জিনিস রাখা যায়। দেখেই তার আবার পুতুল খেলতে ইচ্ছে করছে। কোথায় পেল দাদা? আর বড়ো-যে ভালমানুষ, নিজে না রেখে তাকে দিয়ে গেল? পেনসিল রেখে দিয়ে বাক্সটা খুলল স্বাতী। ও মা, শাড়ি! কী সুন্দর সবুজের উপর সোনালি বুটি! আবার ব্লাউজও! আর একটা পাতলা ছোটো বাজে চিকচিকে কাগজের তলায় ঠিক জ্যামিতির ত্রিভুজের মতো ভাজ-করা হলদে, গোলাপি, ফিকে নীল রুমাল। বাইরে ছুটে এল স্বাতী। ফুল, সন্দেশ, নতুন চায়ের পেয়ালা, চকচকে চামচে–কী কাণ্ড!

বাবা বললেন—কেমন? এখন বেশ জম্মদিন-জন্মদিন লাগছে না? বিজু বলল একটু দূরে দাঁড়িয়ে—ভাবিসনে শুধু তোর জন্যই সব এসেছে। এই দ্যাখ আমার ধুতি, আর ছোড়দির শাড়ি। ওঃ, আজ যা হবে! স্বাতী চুপ করে রইল, মুখ তার টুকটুকে লাল। মা থাকতে জন্মদিন হয়েছে তাদের। নতুন ফ্রক-ট্রক এসেছে, পায়েস রান্না হয়েছে, কেউ-কেউ এসেছে কোনো-কোনো বার। কিন্তু এ রকম! এত ফুল! ঘাস-রঙের পেস্তা-বসানো সাদা-সাদা ফোলা-ফোলা ঠাণ্ডা নরম এত সন্দেশ! আর এ-সব তার জন্য! তার জন্মদিন বলে।

রাজেনবাবু বললেন—শাড়িটা কেমন রে? ভাল?

সিল্কের তো—

সিল্ক ভাল লাগে না তোর? চোখ না তুলে, শরীরটি একটু মোচড়াতে-মমাচড়াতে স্বাতী বলল, পুতুলদের যে রকম শাড়ি পরানো থাকে, সে রকম তো—

তা পরবে যে সেও তো পুতুল!

মোটেও না! স্বাতী হেসে ফেলল। ছড়ানো জিনিসগুলির দিকে তাকিয়ে বলল—আচ্ছা বাবা, সকলের জন্যই আনলে, নিজের জন্য তো কিছু আনলে না?

নিজের জন্যই তো সব এনেছি—বললেন রাজেনবাবু।

*******

পরতে হল সবুজ সিল্কের শাড়ি, সাটিনের ব্লাউজ, শাশ্বতী জোর করে ধরে চুলটা নতুন ধরনে উল্টিয়ে দিল ঘাড়ের উপর, কপালে চন্দনের ফোঁটাও বাদ দিল না। দেখে রাজেনবাবুর মনে পড়ল শ্বেতার, মহাশ্বেতার, সরস্বতীর বিয়ের রাতের মুখশ্রী। কত সুন্দর, কত সুখের, আর কত দুঃখে দেখা সেই মুখশ্রী। স্বাতীর কঁচা মুখের সঙ্গে বেশ-ততা মানিয়ে গেছে এই সাজ? একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলেন রাজেনবাবু।

স্বাতীরও নতুন লাগল নিজেকে, যখন সন্ধের পর দোতলার বড়ো ঘরে এসে বসল। সিঁড়িতে কত জুতো, ঘর ভরা লোক, সকলেই ভাল, সকলেই খুশি। শশাঙ্ক দাসকে বিজু অবশ্য ধরতে পারেনি। তা শুভ্র আর তার দলই আসর জমিয়ে রাখল রাত নটা পর্যন্ত। স্বাতীর মনে হল সমস্ত গান ঘুরে-ফিরে এই কথাই বলছে তাকে তুমি ভাল, আমরা তোমাকে ভালবাসি। যত লোক আছে এখানে, সকলে তাকে ভালবাসে। ভাল, খুব ভাল, এই পৃথিবী ভাল, পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব ভাল। তা না হলে মানুষ কেন গায়, নাচে, হাসে, আনন্দ করে। তা না হলে এত আনন্দ কোথা থেকে আসে?

এবার তুমি—বলে শুভ্র হারমোনিয়ম ঠেলে দিল স্বাতীর দিকে। তক্ষুনি সুর কেটে গেল। এতক্ষণের সমস্ত ভালোলাগাকে থেতলে দিয়ে অসম্ভব একটা লজ্জা এসে গলা আঁকড়ে ধরল। স্বাতীর, সকলেই যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে, বাঁকা চোখে দেখছে তাকে, তার শাড়ি পরাটা যেন ঠিক হয়নি, কোথায় কী ভুল বেরিয়েছে। বিশ্রী! উঠতে পারলে বাঁচে, কিন্তু উঠতে গেলেও তো এতগুলো চোখ!

আজ একটা গান শুনবই তোমার-রাত্তিরে বেড়াল-ডাকের মতো শুভ্রর নরম গলা সে শুনতে পেল। হঠাৎ মুখ তুলে, এক মুহূর্ত আগেও কথাটা চিন্তা না করে, এক ঘর লোককে শুনিয়ে সে বলে উঠল–আপনি আমাকে তুমি বলবেন না।

ঘরে উঠল অস্পষ্ট গুঞ্জন। চশমার পিছনে শুভ্রর চকচকে চোখ দুটি দপ করে নিবে গেল, মুখে যতখানি সুখ আর যেটুকু লালিত্য তার ছিল সব মুছে গিয়ে চেহারাটা হয়ে গেল যেন অন্য মানুষের। অনেকেই যেন কিছু বলতে চাচ্ছে, বলতে পারছে না। এইরকম একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে খুব সপ্রতিভ কেউ একজন স্পষ্ট গলায় বলে উঠল—আপনি একটা গান করলে আমরা সকলেই খুব সুখী হই। স্বাতী তাকিয়ে দেখল, কথাটা যে বলল সে বসেছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে। জিন-প্যান্টে ঢাকা হাঁটু দুটো উঁচু করে, খাটো হাতায় আদ্ধেক ঢাকা একটি হাত হাঁটুর উপর, আর এক হাতে উল্টো করা পাইপ ধরা। মনে হল না আগে কখনো দেখেছে একে। না-ই দেখল, মুখে জবাব এল তার গান শুনলে সুখী হন, না আমার গান শুনলে? মনে করুন আপনার গান—পাইপ-ধরার চোখে মুখে কৌতুক। স্বাতীও সকৌতুকে তাকাল কালো রঙের মসৃণ মুখের দিকে। বলল—গান আমি জানি না।

জানেন না? কিন্তু এঁরা কি আগে কখনো আপনার গান শোনেননি? আমিও তো শুনেছি আপনি গাইতে পারেন—ঠোঁটের কাছে একটু বাঁকা করে হাসল পাইপ-ধরা মানুষটি।

আমার গান শোনা বরং সম্ভব, কিন্তু আমি গাইতে পারি একথা শোনা নিশ্চয়ই অসম্ভব–বলে স্বাতী কালো মানুষটির মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। সরু-মোটা গলায় মেশানো হাসি উঠল ঘরে।

কী অসভ্য রে তুই! ছি ছি! বোনের সঙ্গে এক হওয়া মাত্র শাশ্বতী আর সময় নষ্ট করল না।

–অসভ্য কেন?

—ও-রকম করে অপমান করলি শুভ্রবাবুকে!

অপমান?

অপমান না? তোকে ছোট দেখেছে—

তাই বলে এখন তো আর ছোটো না আমি—

স্বাতীর ঝলমলে শাড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে শাশ্বতী বলল—একবার, তুমি বলে আবার নাকি আপনি বলা যায়।

কেন যায় না? একবার আপনি বলে আবার তুমি বলা যায় তো?

অসভ্য! শাশ্বতী লাল হল।

বারবার অসভ্য বোলো না, ছোড়দি।

নিশ্চয়ই বলব। অসভ্য, অভদ্র, উদ্ধত! হারীতবাবুও তোমার ইয়ার্কির পাত্র, না?

ও, ঐ কালো-মূর্তিই তোমাদের বিখ্যাত হারীতবাবু? শাশ্বতী জ্বলে উঠে বলল–মনে কোরো না স্বাতী, পঁচিশ-টাকা দামের শাড়ি পরেই মস্ত বড়ো হয়ে গেছ। বড়দের সঙ্গে সমান-সমান চলবার যোগ্য তুমি এখনও হওনি, মনে রেখো। শাশ্বতীর চোখে-মুখে এ রকম টকটকে রাগ স্বাতী কখনো দ্যাখেনি। ভয় পেয়ে ডাকল-ছোড়দি!

তুমি মনে করেছ পৃথিবীর সব লোকই বাবা। যা করো তা-ই চলবে—না! মনে করেছ তোমার ছেলেমানুষি দিয়েই জিতে যাবে সব জায়গায় না। ভালো হয়ে, নম্র হয়ে যদি চলতে না পার, কেউ তোমাকে দু-চক্ষে দেখতে পারবে না–কেউ না!

ছোড়দি, আমি কী করলাম—আমি কী করেছি…অমন করে বকছ কেন আমাকে? স্বাতী হাত বাড়িয়ে এগোল, থমকাল, কাপল, পেছোল… লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে সোনালি-বুটি–আঁচল। এখন আর নেহাৎ ছেলেমানুষ নও তুমি—নিজেই নিজের কথার বিরুদ্ধতা করে শাশ্বতী আবার

বলল—এখনো যদি তোমার গর্বিত স্বভাব, তোমার দুর্বিনীত ব্যবহার তুমি ছাড়তে না পার— একসঙ্গে এতগুলি শক্ত-শক্ত কথা শুনে স্বাতী প্রায় কেঁদে ফেলল।

আর বোকো না, আর বোকো না আমাকে–কোনোরকমে এগারো হাত শাড়ি সামলে ছুটে গেল সে বাবার কাছে। দু-হাতে জড়িয়ে ধরে ডেকে উঠল-বাবা!

কী রে? বাবার শান্ত সুন্দর আশ্বাসে-ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে স্বাতী কান্না গিলে ফেলল–

না কিছু না।

হয়েছে কী?

কিছু না।

ছোড়দি বুঝি বকেছে?

না।

তবে?–বাবার কাঁধে মুখ রেখে চুপ করে রইল স্বাতী। কোঁকড়া কালো মাথাটায় হাত বুলিয়ে রাজেনবাবু বললেন—বাঃ, কী রকম নতুন ফ্যাশনের খোঁপা করে দিয়েছে ছোড়দি! বাবা—পাঞ্জাবিতে আস্তে আস্তে মুখ ঘষে-ঘষে স্বাতী বলল—বাবা, আমি তোমার কাছেই থাকব। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না, কোনোদিন না।

বেশ-তো। খুব ভালো কথা, খুব সুখের কথা! তাই বলে কান্নার কী আছে? এত বড়ো পনেরো বছরের মেয়ে নাকি কাঁদে!

ও মা! স্বাতী মুখ তুলে জলভরা চকচকে চোখে হাসল—বলো কী বাবা! আজ আমার তেরো পূর্ণ হল না, চোদ্দতে পড়লাম!

Share This