প্রথম শাড়ি: প্রথম শ্রাবণ

১.০১

রাজেনবাবু মানুষটি একটু শৌখিন। শৌখিন মানে বাবু নয়। হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে, দু-হাতে দুই ঝুলি নিয়ে বাজার করে আসতে আপত্তি নেই তার, কিন্তু শোবার সময় বালিশে একটু সুগন্ধ চাই। এক জামা পরে সপ্তাহের ছদিন আপিশ করবেন, এদিকে কাচের গেলাসে ছাড়া জল খাবেন না। ঠিকে-ঝি কামাই করলে রাত থাকতে বিছানা ছেড়ে উনুন ধরিয়ে রাখবেন, তারপর বারান্দার ভাঙা তক্তায় খালি গায়ে বসে গুনগুন করবেন— ভৈরবী কি যোগিয়া।

পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে, বাপের বাড়িতে এক বছর কাটিয়ে শিশিরকণা প্রথম যখন স্বামীর ঘর করতে এলেন, স্বামীর এসব ছোটোখাটো শখগুলি তার মনে বিশুদ্ধ কৌতুক জাগিয়েছিল। এমন কি এর কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ও তিনি দিয়েছিলেন বিছানার তলায় অগুরুর শিশি লুকিয়ে রেখে–তার চেয়েও বেশি, ঠিকে-ঝির সাহায্যে সংগৃহীত কয়েকটি পথে-ঝরা বকুল কোনো রাত্রে নিজের আঁচলে বেঁধে নিয়ে। সুগন্ধ ভালো, সুগন্ধের উৎসটা আরো ভালো হতে দোষ কী? কয়েক মাস পরে শিশিরকণা যখন অন্তঃসত্ত্বা হলেন আর রাজেনবাবু বললেন— বেশ হল, ছোট্ট ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে, বেশ—তখন স্বামীর এই নতুন শখটিতে বেশি সুখী না হয়ে তিনি বললেন–কেন, মেয়ে কেন?

—ছেলে হলে তো শুধু হাফপ্যান্ট আর ডান্ডাগুলি। আর মেয়ে? রং-বেরঙের ফ্রক, রিবন, ঝাকড়া-ঝাকড়া, কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল—আর একটু বড়ো হলে তো কথাই নেই। কিন্তু স্বজাতির সংখ্যাবৃদ্ধির সম্ভাবনায় শিশিরকশাকে বিশেষ উৎফুল্ল দেখা গেল না। যে রকম কথা নিজের মার মুখে অনেকবার তিনি শুনেছেন, তারই পুনরুক্তি করলেন এই ভাবী-মা—ফ্রক, রিবন, বাঃ! মেয়ের শিক্ষার ব্যবস্থা তো ভালোই!

তা তুমি যা-ই বলল, একটা মেয়ে থাকলে ঘর আলো।

কয়েক মাস পরে আলো হল ঘর। আর তিন দিন পরে রাজেনবাবু তার শেীখিনতার আর একটি নমুনা দেখালেন। মেয়ের নাম তিনি রাখলেন শ্বেতা।-না বাবা, আঁতুড়ঘরের দরজায় বসে বলে উঠলেন শিশিরকণার বিধবা পিসিমা-সীতা নাম রেখো না, বড়ো দুঃখিনী সীতা। সীতা নয়, শ্বেতা-গম্ভীরভাবে রাজেনবাবু বললেন, তালব্য-শ আর ব-ফলা দুটোই স্পষ্ট উচ্চারণ করে।

ওসব বিলিতি নাম আমাদের মুখে তো আসবে না, তবে হ্যাঁ–মেয়ে তোমার মেমের মতোই রূপসী হবে।–বিলিতি নয় তো-রাজেনবাবুর কথা কেটে দিয়ে আর একটি কণ্ঠস্বর উঠল আঁতুড়-ঘরের ভিতর থেকে—ওঁর কথায় তুমি আবার কান দাও পিসিমা, ওঁর তো ঐরকমই! মেয়ের নাম আমি মঞ্জু রেখেছি। শেষের কথাটি শিশিরকণা একটু চেঁচিয়ে বললেন, যাতে যথাস্থানে নির্ভুলভাবে পৌঁছয়। পৌঁছলো, কিন্তু যথাস্থানটি অবিচলিত। মাসখানেকের মধ্যে একটা নামের লড়াই লেগে গেল বাড়িতে। মেয়েকে বুকে চাপড়ে-চাপড়ে আদর করেন শিশিরকণা-মঞ্জু-মঞ্জুল–মঞ্জুলি-ই। আর রাজেনবাবু ঠিক সুরে সুর মিলিয়ে বলে ওঠেন-মঞ্জু-ঝুমঝুম-লজনচু–ষ! তারপর কাছে এসে মেয়ের গালে একটু আঙুল ছুঁইয়ে ডাকেন-শ্বেতা! চোখের পাতা মিটমিট করেন কন্যা, যেন এই নামই তার পছন্দ। তা হতেই পারে, যা ফুটফুটে ফর্সা!

প্রথম সন্তান যুবক পিতার কণ্টক, এ কথা যাঁরা বলেন, নিশ্চয়ই তারা রাজেনবাবুকে দ্যাখেননি। হাঁটু কেঁকে-বেঁকে মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছেন তিনি, বোতলে দুধ খাওয়াচ্ছেন, কোলে নিয়ে বেড়াচ্ছেন বিকেলে, রাত্তিরে বদলে দিচ্ছেন কথা। প্রথম ছ-মাসের মধ্যে একটি রাত্রিও ঘুমের ব্যাঘাত হল না নতুন মার, বাঙালি পরিবারের পক্ষে যার তুল্য আশ্চর্য কথা আর নেই। কিন্তু এ সুখের একটি দাম দিতে হল। শ্বেতার জামাটা কোথায়-শ্বেতার পাউডারটা দাও—শ্বেতা তো খুব ঘুমোচ্ছ আজ—সব সময় এই শুনতে শুনতে শিশিরকণাও মাঝেমাঝে শ্বেতা বলে ফেলতে লাগলেন। প্রথমে ঠাট্টা করে তোমার শেতা! যেমন—তোমার শেতার তো রূপের খ্যাতি হচ্ছে খুব, কি-শ্বেতা কী রকম হাসে দেখেছ? তারপর শুধুই শ্বেতা। সীতা কিংবা সীতুও নয়, একেবারেই শ্বেতা। মঞ্জু যুদ্ধে হেরে দেশান্তরী হল, রাজেনবাবু মহৎ যোদ্ধার মতো নিজের জয় মেনে নিলেন সবিনয়ে।

দেড় বছর পরে আর একটি মেয়ে যখন জন্মাল, রাজেনব বু তক্ষুনি তার নাম দিলেন মহাশ্বেতা। তৃতীয় কন্যাটি অতদিনও সবুর করল না। মহাশ্বেতার সঙ্গে চোদ্দ-মাসের ব্যবধান রেখে শিশিরকশার কোলে এল সরস্বতী।

থাক, থাক, আর সোহাগ করে নাম দিতে হবে না—শিশিরকণা বলে উঠলেন।

নাম তো একটা চাই—

ছাই!–নিজের অজান্তে শিশিরকণা একটা পদ্য রচনা করে ফেললেন। দ্বিতীয়বারে তাঁর বিশ্বাস ছিল, ছেলে হবে। তবু মহাশ্বেতাকে সহ্য করেছিলেন ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু এবারেও! তিনতিনটে মেয়ে। তার বিরক্তি, তার বিক্ষোভ আর তিনি গোপন রাখতে পারলেন না। রাজেনবাবু বললেন—কী সুন্দর চুল হয়েছে সরস্বতীর!

হয়েছে, হয়েছে, যাও এখন—বলে শিশিরকণা নবজাতার একমাথা কোঁকড়া চুলের দিকে একটু তাকালেন আড়চোখে। কেন, তিনটি সুন্দর সুন্দর মেয়ে, ভালো লাগে না তোমার? ও, এখনো মেয়ের শখ মেটেনি দেখছি! তোমার জন্যই, তোমার জন্যই তো খালি-খালি মেয়ে হচ্ছে আমার, আর মেয়ের নাম মুখেও এনো না। কিন্তু মুখে না আনলে হবে কী, রাজেনবাবুর মনের এই একটি শখ ভালোরকম মিটিয়ে দিতে ভাগ্যবিধাতার আশ্চর্য তৎপরতা দেখা গেল। বছর সাতেক চুপচাপ থেকে শিশিরকণা হঠাৎ আবার উঠে পড়ে লাগলেন। সতেরো বছরের বিবাহিত জীবনে পঞ্চ-কন্যার পিতা হলেন রাজেনবাবু। এক ফাঁকে একটি ছেলেও অবশ্য এসে গেল। বোনদের সঙ্গে তার পার্থক্য একেবারে লাল কালিতে টেনে দিয়ে রাজেনবাবু তার নাম রাখলেন বিজন। সে কী! শিশিকশার চোখ উঠল কপালে–মেয়েদের নামের জাঁকজমকে তো পাড়ার লোক অস্থির, আর ছেলেটা বিজন!

পুরুষের সাধারণ নামই ভালো। কী হবে না হবে জানি না তো, মিছিমিছি একটা লম্বা-চওড়া নাম দিয়ে…

আর মেয়েরাই-বা তোমার কোন রাজকন্যা?

তা আমার মেয়ে যখন, রাজকন্যা তো বলাই যায়।

তাহলে ছেলেই-বা রাজপুত্র নয় কেন?

তা বলে বিক্রমাদিত্য তো নাম রাখা যায় না!

এত কষ্টের, এত দিনের চেষ্টার একটা মাত্র ছেলে, তার সম্বন্ধে স্বামীর এই অবহেলা শিশিরকণার সহ্য হল না। জ্বলে উঠে বললেন—মেয়ে-মেয়ে করে তুমি পাগল, মেয়ের হাতে তোমার অনেক লাঞ্ছনা আছে বলে দিচ্ছি। সত্যি, মেয়েদের সম্বন্ধে রাজেনবাবু একটু বেশিই মুগ্ধ। আর কপালও তার—পাঁচটি মেয়ের যে-কোনোটির দিকে তাকালে চোখ ফেরে না। শিশিরকণা সেকেলে ধরনের সুন্দরী—ফর্সা রং, টানাটানা নাক-চোখ, রাজেনবাবুও দেখতে ভালোই। কিন্তু তাই বলে এত রূপ হবে প্রত্যেকটি মেয়ের, এরকম তো কথা ছিল না। না-ও তো হতে পারত। আর শুধু কি রূপ!

অবশ্য পাঁচটি মেয়েকে একসঙ্গে বাড়িতে পাওয়া রাজেনবাবুর ভাগ্যে ঘটে উঠল না। শ্বেতার বিয়ে হয়ে গেল স্বাতী জন্মাবার আগেই। শিশিরকণার বিয়ে হয়েছিল একটু বেশি বয়সে, তার সময়ের পক্ষে বেশি। স্পষ্ট মনে পড়ে অবিবাহিত অবস্থায় তিনি সুখী ছিলেন না, বিয়ে হয়ে যেন বাচলেন। বড়ো মেয়ে পনেরোয় পড়া মাত্র, তাই তার বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি। রূপের জোরে পাত্র জুটল মৈমনসিং-এর এক ছোটোখাটো জমিদারের পুত্র। ছেলের ফোটোগ্রাফ দেখে শিশিরকণা পছন্দ করলেন। ছেলের বাপ পছন্দ করলেন সশরীরে পাত্রীকে দেখে। বিয়ে হয়ে গেল। স্বাতী তখন মাতৃগর্ভে সাত-মাসের। ঐ অবস্থায় নবজামাতার সামনে লজ্জাই করছিল শিশিরকণার, কিন্তু উপায় কী?

বিজন জন্মেছে দু-বছর আগে। শুধুই কতগুলো বোনের মধ্যে বড়ো হয়ে উঠতে তার ভাল লাগবে না বলে সে-ই ডেকে আনছে একটি ভাইকে, মনে মনে এই রকম যুক্তি প্রয়োগ করেছিলেন শিশিরকণা। খাটল না… আবারও মেয়ে। তেরো বছরের মহাশ্বেতা, বারো বছরের সরস্বতী আর পাঁচ বছরের শাশ্বতী যখন আঁতুড়ঘরের দরজায় ভিড় করল, নেহাতই শোওয়া থেকে উঠতে পারছিলেন না বলে, নয়তো ঠিক ওদের গালে ঠাশ-ঠাশ চড় বসিয়ে দিতেন। রাজেনবাবু বললেন—বেশ হল, এক মেয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি, আরেক মেয়ে এল। শিশিরকণা চোখ বুজে মনে মনে বললেন—হে ঈশ্বর, আর যেন কখনো আমার কিছু না হয়।

ভাগ্যবিধাতার কানে পৌঁছল এই প্রার্থনা। কিন্তু একটু ভুল করে, এরকম ভুল দেবতাটি প্রায়ই করে থাকেন। কিছুটা বেশিই মঞ্জুর করে ফেলেন তিনি। স্বাতীর জন্মের কয়েক মাস পর থেকে একটু একটু করে বোঝা যেতে লাগল যে শিশিরকণা শুধু যে আর নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনতে পারবেন না তা নয়, তাঁর নিজের প্রাণই যেন থরথর করছে ঝরে পড়ার জন্য। মাস কাটল, বছর কাটল, শরীর আর সারে না। ডাক্তারে বিরক্ত হয়ে রাজেনবাবু ছুটি নিলেন দু-মাসের। অনেক খরচ করে মস্ত পরিবারটি নিয়ে মিহিজামে এলেন। শিশিরকণা অনেকটা সেরে উঠলেন, কলকাতায় ফিরেও বেশ ভাল থাকলেন কিছুদিন। আবার আস্তে-আস্তে খারাপ হল, আবার শয্যা নিতে হল। এ অবস্থাতেই কায়েমি হলেন তিনি। মাঝে-মাঝে ডাক্তার আসে, চিকিৎসায় উপকারও হয় তারপর। ডাক্তার যেই বলে—এইবার আপনি ঠিক সেরে উঠছেন, তখনই নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দেয়। মাঝে-মাঝে এমনিতেই বেশ ভাল থাকেন, আবার শুয়ে থাকতে হয় দিন পনেরো। রাজেনবাবু নিয়ম করে বছরে একবার কলকাতার বাইরে যেতে লাগলেন সক্কলকে নিয়ে। সমুদ্র, পাহাড়, শুকনো হাওয়া, দুধকুণ্ডের জল সবই হল, কিন্তু কীসের কী! হঠাৎ একদিন দেখা যায় শিশিরকণা কিছুই খাচ্ছেন না, কেমন চুপচাপ হয়ে আছেন, আবার বিছানা। বিশৃঙ্খলা এল সংসারে, অকুলোন ঘটল। শুয়ে-শুয়ে অসহায় চোখে শিশিরকশা তাকিয়ে দ্যাখেন চাকরদের চুরি, মেয়েদের অপব্যয়, ছেলেটার হতচ্ছাড়া চেহারা। সংসার! দিনে দিনে গড়েছেন একে, তিলে তিলে ভরেছেন, সকল গহ্বর পূর্ণ করেছেন তার শরীর দিয়ে। শরীর ছাড়া আর কী আছে মেয়েদের? পুরুষ কত কিছু পারে তার শক্তি, তার সাহস, তার অর্থ দিয়ে। মেয়েরা যা পারে শুধু শরীর দিয়েই পারে। স্বামীর এই আয় আর কবে থেকে, তারা তো গরিবই ছিলেন, অথচ কখনো একটুকু অস্বাচ্ছন্দ্য কি ঘটতে দিয়েছেন? কখনো কি ওরা একটা ময়লা জামা পরেছে, না খারাপ খেয়েছে, না কি ওঁকেই কখনো শুনতে হয়েছে যে হাতে টাকা নেই?

ক্ষীণ কণ্ঠ যথাসম্ভব চড়িয়ে তিনি ডাকলেন—মহাশ্বেতা! সরস্বতী! মহাশ্বেতা! কী নামই রেখেছে বাপু! কোনো রকমে যে একটু ছোটো করে নিয়ে ডাকব, এত বছরের চেষ্টায় তা পারলাম না। মহাশ্বেতা ঘরে এসে বলল—কেন, মা?

বিজুটা কী রকম নোংরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখিস না তোরা! বাথরুমে নিয়ে গিয়ে দে-না ওকে একটু পরিষ্কার করে।

বাথরুমে সরস্বতী, মা।

তবে নিচে নিয়ে যা কলতলায়। আলমারি খুলে দ্যাখ তো ওর জামা-কাপড় কী আছে। মহাশ্বেতা আলমারি খুলে একটি ভেলভেটের নিকারবোকার বের করল।

বুদ্ধি তোর! এই গরমে—! আর এটা ছোটোও হয়ে গেছে ওর। একটা সাদা প্যান্ট আর একটা গেঞ্জি বের কর। কিন্তু খুঁজে খুঁজে গেঞ্জি পাওয়া গেল না কোথাও। মহাশ্বেতার মুখ লাল হল, কপাল ঘেমে উঠল, একটা টানতে গিয়ে তিনটে ফেলল মেঝেতে। শিশিরকণা অনেক ধৈর্য খাটিয়ে বললেন–ঐ পপলিনের শার্টটা—আঃ, ভাল করে গুছিয়ে রাখ, আর আঁচলটা তোল না গায়ে! ভাইয়ের শার্ট-প্যান্ট নিয়ে মহাশ্বেতা একটু দ্রুত ভঙ্গিতেই বেরিয়ে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে বলল—বিজু আসছে না, মা।

আসছে না আবার কী! জোর করে ধরে নিয়ে যা।

আমি কি ওর সঙ্গে জোরে পারি নাকি?

না, এত বড়ো মেয়ে, ঐটুকু ছেলের সঙ্গে তুমি পার না!

বিজু বড়ো মারে। শিশিরকণা হেসে বললেন–মার না খেলে আর দিদি কী? আর এত বড় মস্ত মা-র মতো দিদি! দুই ঠোঁটে একটা বিরক্তির শব্দ করে মহাশ্বেতা মাথা ঝেকে উঠল। কিছু বললেই এ-রকম করিস কেন রে?

আমি পড়ব না? পরীক্ষা না আমার? মহাশ্বেতার গলা শুনে শিশিরকণা স্তম্ভিত হলেন। মা-র কথার উত্তরে এরকম গলা বের করা যায়, সেটা কল্পনাতীত ছিল তাদের ছেলেবেলায়। চুপ করে একটু তাকিয়ে থেকে বললেন—আচ্ছা যা, পড় গিয়ে। তক্ষুনি অন্তর্হিত হল মহাশ্বেতা। বাঁচল যেন। সেদিনই সন্ধেবেলায় শিশিরকণা স্বামীকে বললেন–রাজকন্যাদের জন্য রাজপুত্র খুঁজতে লেগে যাও এবার।

–হবে, হবে, তুমি সেরে ওঠো তো।

–আমি যা সারব তা জানি! একসঙ্গেই ব্যবস্থা কোরো দুজনের, খরচও বাঁচবে, আমিও বাঁচব।

—এত ব্যস্ত কী! ছেলেমানুষ, ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে পড়বে, আজকাল তো আর সেদিন নেই যে—

সেদিন নেই মানে-মৃদু স্বরে কিন্তু খুব স্পষ্ট করে শিশিরকণা বললেন–মেয়েদের বিয়ে হতে পারছে না, তাই ও নিয়ে কেউ আর কিছু বলছে না আজকাল; কিন্তু যৌবন তো আর দেরি করে আসছে না তাই বলে।

–ও রোগের একমাত্র চিকিৎসা বুঝি বিয়ে? একটু হাসলেন রাজেনবাবু।

ঠাট্টা কী, ঠিকই তো, তোমার মেয়েদের তো আর অন্যদের অবস্থা নয়। রূপ আছে, তরে যাবে। ঠাট্টার সুরটা বজায় রেখে রাজেনবাবু বললেন–তা পাণিপ্রার্থী রাজপুত্রেরাই আসবে কদিন পরে।

—দু-একটি এসে গেছে মনে হচ্ছে। ও ঘরে এত হৈচৈ কীসের?

খুব আড্ডা জমিয়েছে ওরা।

কারা?

কারা আবার। মহাশ্বেতা, সরস্বতী—

আরো কার গলা পাচ্ছি যেন?

ও-তে অরুণ।

অরুণ? শিশিরকণা ভুরু কুঁচকোলেন।

আহা, অরুণকে ভুলে গেলে? শেতার দেও, সেই যে ডাক্তারি পড়ে–

অরুণ এসেছে নাকি? কেন?

প্রায়ই আসে তো।

প্রায়ই আসে? আমার সঙ্গে তো দেখা করে না।

তোমাকে আর বিরক্ত করে না। জানে তো, শরীর ভাল নেই।

তোমার সঙ্গে?

আহা, আমার সঙ্গে আবার আলাদা করে দেখা করবে কী! ছেলেমানুষ সবাই, সন্ধেবেলা একসঙ্গে বসে গল্প-টল্প করে, আমি আর ও ঘরে যাই-টাই না। উঁচু-করা বালিশের ঢালু থেকে শিশিরকণার টানা-টানা ক্লান্ত দুটি চোখ স্বামীর মুখের উপর স্তব্ধ হল।

এতদিন আমাকে বলনি এ-কথা!

আহা, এ আবার একটা—

তুমি কী!—শিশিরকণা সোজা হয়ে উঠে বসলেন—আমি মরে গেলে উপায় হবে কী তোমার?

যত বাজে–!

অরুণকে একটু ডেকে দাও আমার কাছে।

–পাগল নাকি! কুটুম্ব মানুষ—

তা, শিশিরকণা একটু ভাবলেন—শ্বেতার আপন দেওর তো নয়। আর যদি আপনও হত, তাহলেও কী–

–লক্ষ্মী-তো শিশু, মিছিমিছি শরীরটাকে আরো খারাপ কোরো না। ওকে তো দেখেছ। সুন্দর ছেলে, খুব ভাল। ঝড়ের মতো ঘরে এসে বাবার কোলে ঝাপিয়ে পড়ল পাঁচ বছরের স্বাতী—বাবা, শোনো… বলেই প্রকাণ্ড কান্না। কী রে, কী?–কোমরে হাত রেখে বীরের ভঙ্গিতে দাঁড়ানো বিজু পিছন থেকে বলে উঠল—কিছু না বাবা, ছোড়দি কিনা ওর চকোলেটগুলি দেখতে চেয়েছিল একটু..

—না বাবা। চোখের জলে বাপের কোল ভিজিয়ে দিতে দিতে স্বাতী বলল—না বাবা, কেড়ে নিয়েছে আমারটা—

–মিথ্যুক! হিংসুটি! দরজার কাছ থেকে বাবরি দুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল রঙিন ফ্রক-পরা শাশ্বতী–

সবটা নিয়ে কেঁদে হাট বাধানো চাই! তোকে তো আর দেয়নি—

তোমাকেই যেন দিয়েছে–রোদনের রন্ধ্রপথে বেরিয়ে এল স্বাতীর প্রত্যুত্তর। দিয়েছে তো সেজদিকে! –ঠিক বোঝা গেল না, বিজু কোন পক্ষের সৈনিক। বিজুর কথায় শিশিরকণা একটু চমকালেন। বললেন—সেজদিকে একটু ডেকে দিস তো বিজু।

দাও আমার চকোলেট-আনুনাসিক আর্তস্বর বের করল স্বাতী–যাঃ! চাই না একটাও! আহ্লাদি মেয়ে! শাশ্বতীর লম্বা সাদা হাতটা ঝিলিক দিয়ে উঠল, আর মেঝের উপর, ঠিক শিশিরকণার পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়ল চিকচিকে ম্যাজেন্টা আর সবুজ আর রুপােলি রাঙতায় মোড়া কয়েকটা চকোলেট। হঠাৎ বিজুর ছোট্টো শরীরে ডিগবাজি খাওয়ার মতো একটা ভঙ্গি হল, চকিতে সব কটা কুড়িয়ে এক লাফে ঘর পার হল সে, শাশ্বতী চীৎকার করে ছুটল তার পিছনে। স্বাতী অবিশ্রান্ত ঈ-ঈ করে কাদছে। রুগ্ন শরীরে গর্জন করে উঠলেন শিশিরকণা—স্বাতী, চুপ! সঙ্গে সঙ্গে স্বাতীর গলা আর শোনা গেল না, কিন্তু কান্না উদ্বেল হল দ্বিগুণ। চুপ, থামাও কান্না! মেয়েকে কাধের উপর ফেলে রাজেনবাবু তাড়াতাড়ি চলে এলেন বারান্দায়। পাইচারি করতে করতে মেয়ের কোঁকড়া-কোঁকড়া ঘন চুলের মধ্যে আস্তে আঙুল চালাতে-চালাতে গুনগুন করে বলতে লাগলেন—স্বাতী, আমার স্বাতীসোনা, আর কাদে না… লক্ষ্মী-ততা, মণি-তো, আর কাঁদে না… বাঃ, কী-সুন্দর চোখ, দেখি, দেখি একটু..কী সুন্দর হাসি! সত্যি সুন্দর। সরস্বতীর চেয়েও সুন্দর চুল হয়েছে ওর। স্বাতী—বাড়ির ছোটো-ছোটো মানুষগুলির মধ্যে সবচেয়ে ছোটো, পাঁচটি সুন্দরীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, পাঁচটি মধুর নামের মধ্যে সবচেয়ে মধুর নাম। এ নাম তিনি তো ওর কোনো দিদিকেও দিতে পারতেন… সরস্বতীকে, কি শাশ্বতীকে; ভাগ্যিস দেননি, আর কাউকে মানাত না… নিজেরই অজান্তে এ নাম তিনি রেখে দিয়েছিলেন সবশেষের সবচেয়ে ভাললটির জন্য। স্বাতী শান্ত হল, স্তব্ধ হল, মাথাটি ভারি হল কাঁধের উপর! আহা, ঘুমিয়ে পড়ল… সারাদিন ছুটোছুটি দাপাদাপি করে… মার অসুখে কি আর ছেলেমেয়ের কোনো হাল থাকে। আমি আর কতটুকু পারি, সারাদিন তো আপিশ। তাছাড়া বাপকে দিয়ে কি হয় এসব… হয় সব! একটু বেশি আহ্লাদি হয়েছে মেয়েটা, বড়ো আধুট, জেদ—তা হবে না, জন্মে থেকে ও মাকে তো পায়ইনি বলতে গেলে। লুটিয়ে-পড়া চুল মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে ভিজে ভিজে ঠান্ডা নরম ঠোঁটের উপর একবার চুমু খেলেন রাজেনবাবু। তারপর আস্তে ঘরে নিয়ে এসে নিজের খাটে শুইয়ে দিলেন। শিশিরকণা শুয়ে ছিলেন চোখে হাত রেখে আলো আড়াল করে। না-তাকিয়েই বললেন–ঘুমিয়ে পড়ল তো? একদিনও ওর খাওয়া হয় না রাত্রে—

হয়েছে হয়েছে–রাজেনবাবু তাড়াতাড়ি বললেন—আমি ডেকে খাওয়াব এখন।

সারাদিনের খাটুনির পরে এই কর আর কী, ঈশ্বর!

তুমি ওরকম কোরো না তো, শিশু! আমার বেশ ভালই লাগে এসব। চোখ থেকে হাত সরিয়ে ঘমও স্বাতীর দিকে একটু তাকিয়ে শিশিরকশা বললেন–এত যে সোহাগ করলে মেয়েদের নিয়ে, হল কী তাতে? তিনটে টেকি-চেঁকি মেয়ে যে বাড়িতে, সেখানে তোমার ঐ স্বাতী-সুন্দরীও কি আর ওদের চেয়ে ভালো হবে?

কী যে বলো তুমি! আমার মেয়ে মন্দ! কী রে সরস্বতী? ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে সরস্বতী বলল-কী মা? ডেকেছিলে?

অনেক আগেই ডেকেছিলাম। মার কথাটার তাৎপর্য বুঝতে পারল না সরস্বতী। মিষ্টি করে একটু হাসল।

–চকোলেট কে দিয়েছে?

–অরুণদা তো!

–তোকে দিয়েছে?

—আগে একদিন মহাশ্বেতাকে দিয়েছিল কিনা, আজ আমাকে দিয়েছে। তা সকলে মিলেই তো খাই। কী সুন্দর বাক্সটা, দেখবে মা? এক ছুটে সরস্বতী নিয়ে এল কাচের মতো কাগজে মোড়া মস্ত রঙিন বাক্স। মার হাতের কাছে বিছানায় রেখে বলল–দ্যাখো মা। শিশিরকশা গম্ভীর স্বরে বললেন—দেখছি তো। কেন দিয়েছে?

-কেন মানে?

—এ রকম দেয় বুঝি মাঝে মাঝে?

দিলে কী হয়? কী-টাকে অনেকখানি টানল সরস্বতী, একটু আহুদি ধরনে। সুন্দর, সরল, উল মুখে এগিয়ে আসছে আশঙ্কার ছায়া, আবার তাকে হঠিয়ে দিচ্ছে আনন্দের অন্ধ বিলাস। সেইদিকে তাকিয়ে শিশিরকশা হঠাৎ কোনো জবাব দিতে পারলেন না। আর সেই সুযোগে রাজেনবাবু বললেন–কিছু হয় না যা। সরস্বতী মা-র দিকে একবার তাকাল। নিশাস ফেলে শিশিরকশা বললেন—যা। অরুণকে একবার ডেকে দিস আমার কাছে।

সরস্বতী চলে যাওয়ামাত্র রাজেনবাবু ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন—অরুণকে আবার কেন? এই শরীর তোমার, তার মধ্যে—

চকোলেটের বাক্সটার অন্তত দশ টাকা দাম হবে, কী বলো?

পাগল! অত কি আর! আর হলেই বা কী—ভাল লাগে বলেই তো—

এসব ভাললাগা ভাল না।

যত তোমার! ওকে তুমি কিছু বলে বোসসা না কিন্তু।

তুমি ভেবো না, আমি ঠিক কথাই বলব।

শুয়ে শুয়ে শিশিরকণা বুঝলেন অরুণকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে মহাশ্বেতা আর সরস্বতী বিদায় নিল। দরজার বাইরে জুতো ছেড়ে অরুণ একটু কুষ্ঠিতভাবে ঘরে ঢুকল। রোগা, উশকোখুশকো, একটু যেন দিশেহারা। এগিয়ে এসে অনভ্যস্ত আড়ষ্টভাবে প্রণাম করল শিশিরকশাকে। গৃহস্বামীকেও করা উচিত কিনা তা-ই বোধহয় ভাবছিল মনে মনে, রাজেনবাবু তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন—দাঁড়িয়ে কেন, বোসো। ভাল তোক বাড়ির সব ভাল? চেয়ার উপেক্ষা করে বিছানাতেই বসল অরুণ, শিশিরকশার পায়ের কাছে। সলজ হেসে বলল-কেমন আছেন, মাসিমা?

আমি তোমার মামা হই-শিশিরকণা বললেন।

মাঐমা! সে আবার কী? না, না, এটা বিশ্রী, ও আমি ডাকতে পারব না! রীতিমত কাতর শোনাল অরুণের অনুনয়। শিশিরকণা হেসে ফেললেন। অরুণ বিজ্ঞভাবে জিজ্ঞেস করল—

কী অসুখ আপনার?

অসুখ কিছু না, ডাক্তারদের বুজরুকি।

নিশ্চয়ই ডাক্তারদের চান্স দেননি? তক্ষুনি প্রতিবাদ করল ভাবী ডাক্তার।

তুমি ডাক্তার হলে আমাকে সারাতে পারতে বইকি। কিন্তু তুমি যদ্দিনে ডাক্তার হবে তদ্দিনে হয় অসুখ থাকবে না, নয় আমি থাকব না। শিশিরকণার দিকে এক পলক তাকিয়ে বড়োসড়ো ডাক্তারি ধরনেই সান্ত্বনা দিল অরুণ-আমি-তো তেমন-কোনো অসুখ দেখছি না আপনার। শিশিরকণা বললেন—তোমাকে দেখেই কমে গেল যে অসুখ। ভাল ডাক্তার তুমি। আরো দুচারটে কথার পর অরুণ বিদায় নিল। যেসব কথা শিশিরকণা বলবেন ভেবেছিলেন, কিছুই আঁর বলা হল না, বলতে পারলেন না। বাজে। কিন্তু বাজে কেন? ছেলেটি ভালই, কিন্তু বিপদ যারা ঘটায় তারা কি সকলেই মন্দ লোক?

***

শরীরটা নিতান্তই অবসন্ন না লাগলে শিশিরকণা মাঝেমাঝে ডেকে পাঠাতে লাগলেন অরুণকে। কেমন-একটা অন্যমনস্ক এলোমলো ভাব ছেলেটির অথচ কথাবার্তায় বেশ সপ্রতিভ, হঠাৎ না-জেনে এক-একটা মজার কথা বলে ফেলে। শিশিরকণা লক্ষ করলেন যে সে সময়ে মেয়েরা কেউ আসে না ঘরে, শাশ্বতী পর্যন্ত কেমন এড়িয়ে এড়িয়ে চলে, নিশ্চয়ই দিদি দুজনেই অনুকরণে। কোনো-কোনোদিন ইচ্ছে করে এবং নিজের শরীরের উপর অনেকটাই জবরদস্তি করে, অরুণকে ঘণ্টাখানেকও আটকে রাখেন। কিন্তু যুবকটি একটুও চঞ্চল হয় না, কোনো লক্ষণেই এমন বোঝা যায় না যে তার মন অন্য কোথাও পড়ে আছে। মনের অনেক তলায়, অন্ধকার অপ্রকাশিত অংশে ছেলেটার জন্য একটু-একটু দুঃখও হল শিশিরকণার; মেয়ের কাছে পৌঁছবার আশায় ওকে কতই-না পুজো দিতে হচ্ছে মার বিমর্ষ রোগশয্যায়। আর একজন সঙ্গী অবশ্য জুটেছিল। মার ঘরে অরুণদার সাড়া যেই পাওয়া, তক্ষুনি ছুটে আসা চাই স্বাতীর। এসেই মেঝেতে চিত হয়ে পড়তে লেগে যাবে কোনো হেঁড়াখোঁড়া হিজিবিজি কি রাঙা ছবি নয়তো দিদিদের কোনো পরিত্যক্ত খাতার কোনো একটি সাদা কাগজে, ভাঙা পেনসিলে বারবার জিভ ঠেকিয়ে, অত্যন্ত মন দিয়ে ছবি আঁকবে উপুড় হয়ে। অরুণ যদি তার দিকে একবার তাকিয়ে বলল—কী, ছবি আঁকা হচ্ছে? তাহলে আর কথা নেই, খাতার উপর বুক পেতে লজ্জায় মূৰ্ছা গেল।

দেখি না, দেখি না একটু! অল্প একটু সাধ্য-সাধনার পরেই স্বাতী মুখ তুলে বলল–না বিশ্রী হয়েছে। কিন্তু তক্ষুনি খাতাটি নিয়ে এসে দাঁড়াল অরুণদার পিছনে। অরুণ খাতার দিকে তাকিয়ে বলল—তুমি কোনটা এঁকেছ?

এই তো!

ও মা, এটা তোমার আঁকা! আমি ভাবছিলাম তোমার দিদিদের বুঝি! সত্যি তুমি এঁকেছ? এই কলাগাছ, নদী, সূর্য—সব? বাঃ, কী সুন্দর!

মোটেও না! মোটেও না! কোঁকড়া চুল নেচে উঠল স্বাতীর মাথায়, ছোট্টো সুঠাম শরীরটিতে নানারকম ভঙ্গির ঢেউ উঠল, অরুণের মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বলল—সত্যি ভাল হয়েছে?

ভাল মানে? এ রকম আঁকতে পারে নাকি কলকাতার শহরে আর কোনো পাঁচ বছরের মেয়ে? আর কোনো শহরে পারে?

তা তো জানি না—অরুণ অবিচল গাম্ভীর্যে উত্তর দিল, বিলেতে-টিলেতে পারে বোধহয়। বিলেতটা এত দূরে যে সেখানে তার সমকক্ষের সম্ভাবনা স্বাতী হাসিমুখেই মেনে নিল। তার এরপরের প্রশ্ন হল–অরুণদা, তেঁতুলগাছ কী রকম?

তেঁতুলগাছ!

এই কলাগাছের পাশে একটা তেঁতুলগাছ আঁকব, কিন্তু তেঁতুলগাছ কী রকম কিছুতেই মনে করতে পারছি না। মা, আমি তেঁতুলগাছ দেখেছি?

তোর বকবকানি থামা তো রে একটু! এর চেয়ে মোলায়েম কোনো উত্তর মার কাছে আশা করা স্বাতী ছেড়ে দিয়েছে অনেকদিন। মুখ একটুও মলিন না করে আবার বলল—অরুণদা, বলো না তেঁতুলগাছ কী রকম? অরুণ হেসে বলল—আমিও ঠিক মনে করতে পারছি না এখন। কাল বলব তোমাকে।

পরের দিন অরুণ নিয়ে এল কুচকুচে কালো পেইনটিংবক্স আর মস্ত ড্রইংখাতা। হাতে পেয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল স্বাতীর চোখে-মুখে। মেজদি-সেজদি-ছোড়দি চীৎকার করে বিদ্যুতের মতোই সে ছুটে গেল। এ সুযোগ শিশিরকণা হারালেন না। একটু তীক্ষ্ম সুরেই বললেন—এ কী অন্যায় তোমার!

অন্যায়? অন্যায় আমি কী করলাম? ব্যাকুল জিজ্ঞাসা অরুণের।

মিছিমিছি টাকা নষ্ট।

নষ্ট কেন? বাচ্চারা তো সব খেলনাই ভেঙে ফেলে, তাই বলে কি টাকা নষ্ট হয়?

শোনো, অরুণ, তোমাকে একটা কথা বলি। তুমি বাড়ির ছেলের মতো। আসসা, যাও, সে কেশ কথা, কিন্তু তুমি উপহার কিনে কিনে এত টাকা খবচ কর সেটা আমার ভাল লাগে না। অরুণের নিচু-করা মাথার দিকে তাকিয়ে শিশিরকণা বুঝলেন যে তার কাছে এটা একেবারে অপ্রত্যাশিত, বজ্রপাতের মতো। নিষ্ঠুর, নিশ্চয়ই তবু না-বলে পারলেন না টাকা যদি তোমার এতই বেশি হয়ে থাকে, সংসারে গরিব-দুঃখীরও কি অভাব? কয়েকটা অপরিণত মেয়ের উচ্ছ্বলতাকে প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কী! বয়স অনুপাতে তোমাকে খুব বুদ্ধিমান মনে হয়, আমার কথা তুমি বুঝবে নিশ্চয়ই? অরুণ মুখ তুলতে পারল না অনেকক্ষণ। উঠে দাঁড়াল যখন, সে মুখ দেখে শিশিরকণার কষ্ট হল।

খানিক পরে মহাশ্বেতা এসে বলল–মা, অরুণদা কোথায়?

—চলে গেল এইমাত্র।

চলে গেল! কী মুশকিল এখন আমি অঙ্কটা বুঝে নিই কার কাছে।

দুদিন, চারদিন, সাতদিন কেটে গেল–অরুণ আর আসে না। বিকেলবেলা আস্তে আস্তে উঠে মেয়েদের ঘরে এলেন শিশিরকণা। তাকে প্রথম দেখতে পেল স্বাতী-মা! মা এসেছে! কী মজা! ছুটে গিয়ে সে জড়িয়ে ধরল মাকে, মেয়ের আদরের ধাক্কা সইতে না-পেরে মা এলিয়ে পড়লেন পাশাপাশি পাতা তিনটি খাটের প্রথমটিতে। এক লাফে পাশে শুয়ে পড়ল স্বাতী। গলা জড়িয়ে ধরে মুখে মুখ ঘষে বলতে লাগল—মা, তুমি তবে ভাল হয়ে গেছ?…মা, আজ একটু বেড়াতে যাবে আমাকে নিয়ে?…মা, চলো না! শাশ্বতীও এসে বসল বিছানায়, মার কপালের একটি চুল দু-আঙুলে লম্বা করে টেনে বললে ইশ, মা! কত দিন পরে তুমি এলে এ ঘরে। বড়ো দুই মেয়ে এসে কাছে দাঁড়াল। পশ্চিমের ঘর, রোদুর এসেছে লম্বা লম্বা ফালিতে, হাওয়া দিচ্ছে ঝিরিঝিরি। মুহুর্তের জন্য শিশিরকশার মনে হল তিনি সত্যিই সেরে গেছেন।

যাবে না মা, বেড়াতে? ঈষৎ নাকি সুর স্বাতীর।

এই ছোটটাকে কিছুই করতে পারলাম না। মার আকাঙক্ষা মিটল না ওর।

যাবে না? দ্বিগুণ হল অনুনাসিকতা।

আমি কি হাঁটতে পারি রে!

তবে ট্যাক্সিতে চলল। রিকশতে চলল।

আজ থাক, আর-একদিন—

যেদিনই তোমাকে বলি—আজ থাক, আজ থাক!—মার গলা ছেড়ে দিয়ে স্বাতী বিছানায় গড়াল একটু। দুচ্ছাই কিছু ভাল লাগে না—অরুণদা এলেও একটু গল্প-টল্প করতে পারতুম! শাশ্বতী হেসে উঠল কথা শুনে। সত্যি রে! অরুণ যেন আসে না কদিন? কেন?-বলে শিশিরকণা মহাশ্বেতার মুখে চোখ রাখলেন। মহাশ্বেতা লালও হল না, চোখও নামাল না, চুলের বিনুনি করতে করতে উদাসভাবে বলল–কী জানি।

রাগ-টাগ করেনি তো?—শিশিরকণা চোখ সরালেন সরস্বতীর মুখে।–বোধহয় সরস্বতী হাসল।

সেদিন স্বাতী যা চুল ধরে টেনেছিল-উরের্‌-বাপ!

মোটেও না! মোটেও চুল ধরে টানিনি আমি!

বাঃ টানলি না! জোগান দিল শাশ্বতী—টানতে টানতে ফদ্দাফাই করে দিলি!

টেনেছি তো টেনেছি, বেশ করেছি! তোমাদের তো আর পেইনটিংবক্স দেয়নি। আমাকেই তো দিয়েছে। ঝুপ করে খাট থেকে নেমে শাশ্বতীর পড়ার টেবিলের তলা থেকে তার পেইনটিংবক্স বের করে নিয়ে সগর্বে বেরিয়ে গেল স্বাতী।

সুন্দর হাঁটে মেয়েটা–অনেকটা নিজের মনেই শিশিরকণা বললেন। জানো মা–শাশ্বতী বলে উঠল, ও নাচতে পারে। কত নাচে আমাদের সামনে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একা-একাও নাচে। এক দিন দেখবে মা ওর নাচ? শাশ্বতী দুহাতে মার একটি হাতে চাপ দিল-থাক আর নেচে কাজ নেই, শাশ্বতীর উৎসাহে ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে শিশিরকণা আস্তে আস্তে উঠলেন। তিন বোন সাজগোজ করে বেরিয়ে গেল বেড়াতে। ওদের কলকল কথা সিঁড়ির শেষ ধাপটি পর্যন্ত শুনতে পেলেন তিনি। ওরা হাসছে, বেড়াচ্ছে, সন্ধেবেলা নিজেরাই আড্ডা জমাচ্ছে যথারীতি। একটুও তো আঁচড় পড়েনি ওদের মনে। আজকালকার মেয়েগুলো কী? নির্বোধ? না হৃদয়হীন? না কপটতায় ওস্তাদ?

অরুণের না-আসাটা ছোট্ট একটি কাঁটার মতো বিঁধে রইল শিশিরকণার মনে। আরো দিন দুই পরে অরুণ এল। সোজা শিশিরকণার কাছে এসে সলজ্জভাবে বলল কলেজ ছুটি হল; দেশে যাচ্ছি কাল। মুখের দিকে একটু তাকিয়ে শিশিরকশা বললেন—একদিন যে আসনি? ছুটির আগে অনেক কাজ শেষ করতে হল—খুব সহজভাবে উত্তর দিল অরুণ।

ভাল আছ তো?

ভাল আছি, মাসিমা। এই যে স্বাতী, কী খবর?

স্বাতী বেগে ছুটে আসছিল, মাঝপথে থমকে দাঁড়িয়ে শরীর মোচড়াতে লাগল।—এসসা, এসো, লজ্জা কী। একদিন না-দেখেই লজ্জা? তাহলে ছুটির পরে এলে তো চিনতেই পারবে না! স্বাতী একটু কাছে আসতেই অরুণ এক হাত বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, আর সঙ্গে সঙ্গে বিহ্বল হয়ে গা এলিয়ে দিল সে। আরেক হাতে তার চুলে আদর করতে করতে অরুণ কানে-কানে বলল–কটা ছবি আঁকলে? ঠিক তেমনি গোপন, অন্তরঙ্গ সুরে স্বাতী খুব নিচু গলায় জবাব দিল—অনেক।

দেখাবে না আমাকে? স্বাতী মাথা নাড়ল।

নিয়ে এস খাতাটা। স্বাতী ছুটল।

শিশিরকণা একটু হেসে বললেন—এখানে তোমাকে পেলে স্বাতীটা আর ছাড়তে চায় না।

দিদিদের মহলে বিশেষ পাত্তা পায় না তো বেচারা।

বলেন কী, মাসিমা! ওকে পাত্তা না দিয়ে সাধ্যি আছে কারো।

মাথার চুলসুদ্ধ উপড়ে নেয়, কী বলো? স্বাতী, লক্ষ্মী-মা ও ঘরে যাও, অরুণদাকে ছবি দেখাও বসে-বসে। বেশি চ্যাঁচামেচি কোরো না, আমার মাথা ধরেছে বড়ো। আর অরুণ, একেবারে রাত্তিরে খেয়েই যেয়ো এখান থেকে, কেমন? সে রাত্রেই শিশিরকণা স্বামীকে বললেন–তুমি তো পারলে না, এদিকে আমি ঘরে বসেই মেয়ের পাত্র ঠিক করলাম। শশাবার আগের ওষুধ ঢালতে ঢালতে রাজেনবাবু বললেন তোমার সঙ্গে আমার তুলনা!

অরুণ সুপাত্র, সন্দেহ কী। চেনাশোনা বলেই তো মন খুঁতখুঁত করে, তা না হলে কি এতদিন ভাবতুম! কিন্তু আমি ভাবছি—

এই যে, ওষুধ—বহুদিনের অভ্যস্ত নিপুণতায় ওষুধটা একেবারে গেলাস থেকেই কণ্ঠনালীতে চালান করে দিলেন শিশিরকশা-ভাবছি ওর কাকে পছন্দ, মহাশ্বেতাকে না সরস্বতীকে।

বোধহয় দুজনকেই—জলের গেলাস এগিয়ে দিয়ে রাজেনবাবু বললেন—মনস্থির করতে পারছে না। একটা অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে শিশিরকণা বলে উঠলেন—ভাল মেয়ের বাপ!

তুমিই মনস্থির করে ওর হয়ে।

মনস্থির আবার কী। বড়োর আগে তো আর ছোটোর হতে পারে না। তা আর একটি পাত্রের খোঁজ করো তুমি। আর কালই চিঠি লেখ অরুণের বাপকে।

শিশু, এত তোমার তাড়া কেন? মহাশ্বেতার তো আর কমাস পরেই ম্যাট্রিক, এত খেটেখুটে পরীক্ষাটা দিতে পারবে না!

কেন, বিয়ের পরেও তো কত মেয়ে পরীক্ষা দেয়।

তা কি আর হয়ে ওঠে সব সময়?

না-হয় না-ই হল। মেয়েদের জীবনে বিয়েই আসল। একটু কাছে ঘেঁষে বসলেন রাজেনবাবু। একটু চুপ করে থেকে বললেন–সত্যি তো দু-জনেই খুব ছেলেমানুষ এখনো। থাক না আর কয়েকটা দিন। চলে তো যাবেই। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন শিশিরকণা।

কী বলো? শিশিরকণা আস্তে আস্তে বললেন—সবই বুঝি আমি, কিন্তু না, তুমি অমত কোবরা না। বোঝো না, কবে মরে যাই-রাজেনবাবু তার কুড়ি বছরের সঙ্গিনীকে দুহাতে জাপটে ধরলেন। ইশ, মরো তো! মরা অত সোজা! কিন্তু চিঠি লিখে দিলেন পরের দিনই। জবাব এল চটপট। অরুণের বাপ জানিয়েছেন যে রাজেনবাবুর সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধস্থাপন তাদের পরিবারে একবার যখন সুখের হয়েছে, তখন আর একবারও হবে আশা করা যায়। তবে তার পুত্রের ইচ্ছা যে তৃতীয় কন্যাটির সঙ্গেই—

কেমন! বলে উঠলেন শিশিরকণা। রাজেনবাবু বললেন—আশ্চর্য! অরুণের এতটা—এতটা কী তা আর বললেন না। পাত্রীরা কিছুই জানল না। ভূগোল, জ্যামিতি আর মাসিকপত্রের গল্প পড়তে লাগল নিশ্চিন্ত মনে। এদিকে আর একটি পাত্রের সন্ধানে রাজেনবাবু চর লাগিয়ে দিলেন দিগ্বিদিকে। রেঙ্গুনের হেমাঙ্গ বর্ধনকেই শিশিরকণা পছন্দ করলেন। লোহালক্কড়ের ব্যবসা তার। ধনী, ছোটো অবস্থা থেকে নিজের চেষ্টায় উঠেছে। বিয়ে করবার সময় হয়নি এতদিন। এবার এসেছে কলকাতায় বৌ নিয়ে ফিরবে বলে। বয়স একটু বেশি, তা তো হবেই।

*****

দুটি বন্ধু নিয়ে নিজেই পাত্রী দেখতে এলেন বর্ধন। মাত্র আগের দিন খবরটা দেওয়া হয়েছিল মহাশ্বেতাকে। অনেক চ্যাঁচামেচি, কান্নাকাটি করল সে—আমি কি অদ্ভুত একটা জন্তু যে লোকের কাছে দেখানো হবে। আমি কি একটা পুতুল যে সাজিয়ে রাখবে দোকানে!… কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশমানি রঙের একটা মুর্শিদাবাদ শাড়ির উপর লম্বা চুল ছেড়ে দিয়ে আলতাপরা টুকটুকে পায়ে যথাসময়ে সভাস্থলে এসে দাঁড়াল লক্ষ্মী মেয়েটি। সরস্বতীকে পরের ভিতরে লুকিয়ে রাখা হল, পাছে দিদির রূপকে সে নিষ্প্রভ করে দেয়, আর বর্ধনও অরুণের মতেই মত দিয়ে ফেলে। চাঁচাছোলা, পাতলাঠোঁট, ঘাড়ছাঁটা চেহারা, কিন্তু মুখের কোথায় যেন খুব একটা ভালোমানুষিও আছে। বর্ধন প্রায় সমস্ত সময় মাথা নিচু করেই থাকল, কথাবার্তাও বিশেষ বলল না। কিন্তু পরের দিন খবর পাঠাল যে অঘ্রানের প্রথমেই বিয়ে হওয়া চাই।

বলিনি আমি তোমাকে! স্ত্রীর মুখে এরকম হাসি অনেকদিন দ্যাখেননি রাজেনবাবু।

তোমার রূপসী মেয়েদের আবার ভাবনা! আর কী, লেগে যাও কাজে, একসঙ্গে দুটো বিয়ে তো হাঙ্গামা কম না! একসঙ্গে দুটো বিয়ে… একসঙ্গে চলে যাবে দুজন! হঠাৎ কেমন ফঁকা-ফাকা লাগল রাজেনবাবুর বুকের ভিতরটা। সন্ধেবেলা শাশ্বতী বলল স্বাতীকে— জানিস, যে-একজন কাল এসেছিল না, তার সঙ্গে মেজদির বিয়ে, আর অরুণদার সঙ্গে সেজদির। স্কিপিং রোপটা দুহাতে ধরে মাথার কাছে তুলতে গিয়ে স্বাতী থেমে গেল—মোটেই না!

মোটেই না কী রে?

অরুণদার সঙ্গে সেজদির মোটেই বিয়ে না।

নিশ্চয়ই! রেগে উঠল শাশ্বতী—আচ্ছা, বাজি রাখ। বেট! দুবার দড়ি-লাফ দিয়ে, হাত দিয়ে কপালের চুল সরিয়ে, ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে উঠল স্বাতী—অরুণদাকে তো আমি বিয়ে করব। জানো কি? হাসতে-হাসতে, হাতে তালি দিতে দিতে শাশ্বতী চেঁচিয়ে উঠল—এ মা! এ মা! স্বাতী অরুণদাকে বিয়ে করবে! বলে দেব! বলে দেব সব্বাইকে।

স্কিপিং-রোপ ফেলে দিয়ে, দুটি হাত টান করে দুদিকে ঝুলিয়ে, স্বাতী স্থির হয়ে দাঁড়াল। চকচকে চোখে তাকিয়ে বলল করবই তো, নিশ্চয়ই করব।

এ মা! এ মা! কী বলে স্বাতী। ও মেজদি, ও সেজদি, শুনেছ?

এত হাসির কথা কী? বেতের মতো সোজা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল পাঁচ-বছরের স্বাতী। তার ভাব-ভঙ্গি দেখে মুখে আঁচল চেপে লুটিয়ে পড়ল বড়ো দুই দিদি।

হাসছ কেন তোমরা?

না, হাসবে না! ক্যাবলা কোথাকার!

ফুলকি ছড়াল স্বাতীর দুই চোখ, বড় নিশ্বাস পড়ল… বেড়ালের মতো ফুলে-ফুলে উঠল ঘাড়, তারপর হঠাৎ তার ডান হাতটি উঠে এল যেন খাপ থেকে তলোয়ার। ঠাশ করে এক চড় বসিয়ে দিল তার চেয়ে এক মাথা লম্বা, পাঁচ বছরের বড়ো শাশ্বতীর গালে। শাশ্বতী ছাড়ল না, উপযুক্ত উত্তর দিল। তুমুল লেগে গেল দুই বোনে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে যেতে-যেতে রাজেনবাবু শুনলেন চ্যাঁচামেচি। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দ্যাখেন, একেবারে রোলারুলি কাণ্ড। শাশ্বতী দাঁড়িয়ে আছে উশকোখুশকো চুলে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে, স্বাতী লাফিয়ে উঠে উঠে তাকে মারছে। আর বড়ো দুই বোন হেসে গড়িয়ে পড়ছে এ ওর গায়ে, আর মাঝেমাঝে চেষ্টা করছে ওদের ছাড়াতে।

কী হয়েছে রে?-বাবাকে দেখে বড়ো দুজন হাসতে হাসতে মুখ ঢেকে ফেলল।

হয়েছে কী?

দ্যাখো বাবা, শাশ্বতী আরম্ভ করল—স্বাতী বলছিল—

বলেছি তো বলেছি! ঘামে, রাগে, চোখের জলে, গনগনে, গরমলাল, ময়লা-কালো মুচড়নো মুখে গর্জে উঠল স্বাতী—বেশ করেছি! নিশ্চয়ই আমি অরুণদাকে বিয়ে করব, হ্যাঁ, করবই তো, তোমার তাতে কী! রাজেনবাবু তাকালেন এক মেয়ের মুখ থেকে আরেক মেয়ের মুখে। মহাশ্বেতা হাসি বন্ধ করে বলল-শাশ্বতী হেসেছিল, সেইজন্যে। রাজেনবাবু গম্ভীরভাবে বললেন—সত্যি-তো, হাসবার কী আছে এতে। শাশ্বতী, যা মুখ-চোখ ধুয়ে ফ্যাল।

আমাকে যে মারল, তুমি কিছু বললে না বাবা?

আহা, তুমিও যেন মারোনি! যা, আর ঝগড়া করতে হবে না। মার অসুখ না? এগিয়ে এসে ডাকলেন–স্বাতী।

বাবা! স্বাতী নতুন করে আকুল হল কান্নায়। শোন বলে রাজেনবাবু যেই হাত বাড়ালেন, অমনি স্বাতী ছিটকে দূরে গিয়ে উপুড় হয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। রাজেনবাবুর মনে হল, ঠিক যেন নাটকের নায়িকা মূৰ্ছিতা হয়ে পড়লেন রঙ্গমঞ্চে। রাজেনবাবু নিচু হয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন। কান্নার মধ্যে ফুশে উঠে স্বাতী বলল-করব তো! নিশ্চয়ই করব। তাতে কার কী? রাজেনবাবু তাকে মেঝে থেকে তুলে শুইয়ে দিলেন মহাশ্বেতার বিছানায়। বালিশে মুখ চেপে সে এমন করে কঁদতে লাগল যেন এক টুকরো বরফের মতো গলে মিলিয়ে যাবে। স্বাতী! আমার স্বাতীসোনা!

বাবা!–হাত বাড়িয়ে বাবার হাত আঁকড়ে ধরল স্বাতী। রাজেনবাবু চুপ করে পাশে বসে রইলেন। কী রকম, পাগলাটে হল মেয়েটা–এক্কেবারে অবুঝ, না কি বড়ো বেশি বোঝে? অত বড়ো-বড় দিদিদের সঙ্গে প্রচণ্ড রেষারেষি, ছোট্টো বলে একটু কম নেবে না কোনো জিনিস। নিজের চেষ্টায় পড়তে লিখতে শিখে ফেলল শুধু শাশ্বতীর হিংসেয়। দিদির বন্ধুদের নাম ধরে ডাকবে। বরং একা থাকবে, কিন্তু সমবয়সী কোনো মেয়ের সঙ্গে খেলবে না। যখন যেটা চাই, খুন হয়ে যাবে তক্ষুনি সেটা না-পেলে। এত মরজি তার মেনে চলবে কে, এত জেদ রাখবার জায়গা কোথায় পৃথিবীতে? ভাবতে গেলে সত্যি-তো তার দোষ অনেক। দোষ? ঐটুকু তো মানুষ। চুলে-ভরা তার মাথাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন রাজেনবাবু। এত লাবণ্য আর কার মুখে? আর কার চোখের তাকানো এত সুন্দর? রাত্তিরে যে গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমোয়, ঘুমের মধ্যে যে বাবা বলে ডেকে ওঠে, এই তো সে—তার দোষ! তীব্র অভিমান, আত্মসম্মান, ভালবাসায় ভরে দিতে হবে ওকে। মার প্রয়োজন ওরই ছিল সবচেয়ে বেশি। হে ঈশ্বর, এমনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে যদি জীবন কেটে যায় তাও যাক, তবু ওর মাকে তুমি বাঁচিয়ে রাখো, বাঁচিয়ে রেখো।

আর বেশিদিন তিনি টিকবেন না, এরকম একটা ভয় মাঝেমাঝেই রাজেনবাবুর হতো, কিন্তু শিশিরকণা ধিকিয়ে-ধিকিয়ে আরো কয়েক বছরই বেঁচে রইলেন। বড়ো কষ্ট পেয়ে গেলেন শেষের ক-মাস। স্বাতীর বয়স তখন দশ-পেয়োনো। এগায়োর দেরি আছে, কিন্তু দেখায় তেরো। মাথায় সে শাশ্বতীকে প্রায় ধরে ফেলেছে, দৈহিক বিকাশও চোখে পড়ে—এমনকি, চোখে ঠেকে। সেই যেদিন অরুণদাকে বিয়ে করবে বলে কেঁদেছিল, সেদিন থেকে কনিষ্ঠার জন্য উদ্বেগের অন্ত ছিল না শিশিরকণার। মেয়ে কিছুতেই শাড়ি পরবে না, মা-ও ছাড়বেন না, জোর করে পরিয়ে দিতেন নিজের ভালো-ভালো শাড়ি, কিন্তু আধ ঘণ্টার মধ্যেই আবার স্বাতীকে দেখা যেত–নির্লজ্জ ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনুরোধ, ক্রোধ, নতুন-নতুন শাড়ির প্রলোভন, কিছুতেই যখন ফল হল না, তখন ঐ মুমূর্ষ শরীরে উঠে বসে শিশিরকণা কল চালিয়ে সেলাই করলেন মেয়ের জন্য যৌবন-আবরণী অন্তর্বাস। রাজেনবাবুকে তাড়া দিয়ে দিয়ে আনাতে লাগলেন লম্বা-লম্বা ফ্রক,আরো… আরো লম্বা, যে কোনো ফ্রক স্বাতীর ছোটো হয়ে যায় দেখতে-দেখতে, এদিকে তার মাপের ফ্রক কিনতে পাওয়াও দুর্ঘট হয়ে উঠল—শেষটায় কি মেমসাহেবদের গাউন কিনতে হবে। জীবনের একেবারে শেষ মাসটির আগে পর্যন্ত স্বাতীকে বসতে, শুতে, চলতে, বলতে শেখাতে গিয়ে শিশিরকণা তার আয়ুর স্বল্প সম্বলের অনেকটাই খরচ করে ফেলেছিলেন। শেষটা একটু হঠাৎ হল বোধহয় সেইজন্যেই।

*****

তিনটি বিবাহিত মেয়ে, তাদের তিনজন স্বামী আর গোনাগুনতিতে পাঁচটি (কেননা সকলকে আনা হয়নি) ছেলেমেয়ে নিয়ে একে-একে বিদায় নিল শ্রাদ্ধর পরে। রাজেনবাবু চুপ করে বারান্দায় এসে বসলেন। তাহলে অন্য এক জীবন আরম্ভ হল। যখন বিয়ে করেছিলেন, যখন বেলেঘাটার আঠারো টাকা ভাড়ার বাড়িতে শিশু এসে উঠেছিল, তখন যে জীবন আরম্ভ হয়েছিল, তা তো অনেকদিনই চুকেছে। এতদিন তবু জীবন্ত একটা চিহ্ন ছিল তার, তাও মুছে গেল। বেলেঘাটা থেকে শাঁখারিপাড়ার দোতলায় দুটি ঘর, তারপর হাজরা রোডের দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাট-কী ধোঁয়া হত শীতকালে! তারপর, এই তো সেদিন যতীন দাস রোডের এই সত্তর টাকা ভাড়ার আস্ত দোতলা বাড়ি। শ্বেতা এল ছেলে হতে। লেক পর্যন্ত খোলা ছিল তখন, ঝড়ের মতো হাওয়া চৈত্র মাসে, কিন্তু রাত্রে শিশু কাঁদত মশার যন্ত্রণায়।

বাবা—

স্বাতী!… খেয়েছিস তোরা?

খেয়েছি।

বিজু?

ঘুমিয়ে পড়েছে, ছোড়দিও।

তুই একা জেগে আছিস? শুবি না?

তুমি চলো, বাবা।

রাজেনবাবু উঠলেন। বারান্দার অন্ধকার থেকে আলোতে এসে একটু হাসির ধরনে বললেন–স্বাতী, শাড়ি যে?

হ্যাঁ বাবা, এখন থেকে শাড়িই পরব।

Share This