১৭. আজ দীপান্বিতা অমাবস্যা

বুড়োশিবতলার ঘাটে আজ দীপান্বিতা অমাবস্যা। ওপারে হালিসহরের শ্যামাসুন্দরীর ঘাটে মন্দিরে মন্দিরে ছাদে ছাদে প্রদীপ দিয়েছে মেয়েরা। এদের প্রাচীন ঘাটের রানায় পুষ্প নিজের হাতে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বেলেচে। গঙ্গাবক্ষ অন্ধকার, দু-একটা নৌকোর ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্চে–ছ ছ দাঁড়ের শব্দও পাওয়া যাচ্চে।

পুষ্প বল্লে–এসো যতীনদা, আমরা আমাদের ছেলেবেলার কথা ভাবি বসে বসে। মনে পড়ে কেওটা-সাগঞ্জের দিন? আমি পিদিম দিচ্চি, তুমি এক পয়সার কুচো গজা কিনে আনলে–

কুচো গজা না জিবে গজা–

–না, কুচো গজা। বেশ মনে আছে ময়রা বুড়ীর দোকান থেকে। নিতাইএর ঠাকুরমা, মনে আছে?

–খুব। বটতলায় দোকান ছিল। আহা, সে তো কতদিন মরে এসেচে এখানে–তাকে কখনো দেখিনি!

–তারপর সেদিন দুজনেই মার খেলুম বাড়ী ফিরে। অত রাত পৰ্য্যন্ত তুমি আর আমি ঘাটে বসে ছিলুম পিদিম দেওয়ার পরে। মনে পড়ে যতীনদা?

–খুব। আমি মার খাইনি! মাসীমা তোকে মারলেন। আমিই বরং উত্তরের কোঠায়–যতীন হঠাৎ খাড়া হয়ে উঠে বসলো। বল্লে–পুষ্প আমি এখুনি কলকাতায় যাবো

পুষ্প বিস্মিত হয়ে বল্লে–কেন?

–তোর বৌদিদির কিছু হয়েছে। একটা আর্তনাদ শুনলাম তার। গলার। দেখে আসি–পুষ্প, সত্যি বলচি, ও আমায় শান্তি দিলে না। তুই যতই চেষ্টা করিস, আমার ভাগ্য ওর সঙ্গে বাঁধা। চল্লাম আমি

–বা-রে, আমিও বুঝি বসে থাকবো? দাঁড়াও

মনে মনে পুষ্প বড় হতাশ হোল। তারও জীবন যেন কেমন। কিছুতেই কি কিছু সুরাহা হয় না? সব সময় দেওয়ালের ওপর দিয়ে কোন বিকটমূৰ্ত্তি কঙ্কাল উঁকি মারে, অমঙ্গল ভরা দৃষ্টিতে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এত কষ্ট করে আজ সে দীপান্বিতা অমাবস্যার সন্ধ্যাটিকে প্রাণপণে সাজালে–সব বৃথা!

নামবার পথে পুষ্প বল্লে-কলকাতায় আসতে পারিনে, কষ্ট হয়। উঃ দেখে কেমন কালো কালো কুয়াসার মতো জিনিস! মানুষের অর্থলোভ, বিলাসিতা–নানারকম খারাপ চিন্তা-সকলের ওপর, লোভ এই সব এক ধরনের কালো কুয়াসা সৃষ্টি করেচে। ওর মধ্যে দিয়ে আসতে দম বন্ধ হয়ে যায় যেন–সব বড় শহরেই এরকম দেখেচি এখানে মানুষ সব ভুলে শুধু ভোগ নিয়ে আছে।

সেই বাসাবাড়ী–যতীন এর আগেও দুবার লুকিয়ে এসে দেখে গিয়েছিল আশাকে। পুষ্প তা জেনেও কিছু বলেনি। যতীনদা ভাবে পুষ্প পোড়ারমুখীকে লুকিয়ে কোনো কিছু করা যায়। যতীনদার বয়স হয়েছে বটে কিন্তু ছেলেমানুষি ঘোচেনি।

আশার অবস্থা ভাল নয়। নেত্যনারায়ণ ওকে ফেলে আজ মাস চার পাঁচ হোল চলে গিয়েছে দেশে। নিজের গ্রামে গিয়ে সে মুদির দোকান খুলেছে–কিন্তু আশার ফেরবার মুখ নেই। বাড়ীওয়ালীর দয়ায় এবং হাতের দু’একগাছি সোনার চুড়ি বিক্রির টাকায় এতদিন যা হয় চললো। কিন্তু তার মধ্যে বাড়ীওয়ালী নানারকম উপার্জনের ইঙ্গিত করেছে।

এক মারোয়াড়ী লোহাওয়ালা তাকে দেখেচে দোতলার ছাদ থেকে আশা যখন ওদের বাসার তেতলার ছাদে কাপড় তুলতে গিয়েছিল। বেলঘরে না সোদপুরে তার বাগানবাড়ী, মস্ত বাগান–ইত্যাদি।

তাকে সদুপদেশও দিয়েচে–এই তো বয়েসখানা চলে যাচ্চে গো–আর দুটো বছর। তারপর কেউ ফিরে চাইবে? না বাপু। বলে, মেয়েমানুষের রূপ আর জোয়ারের জল। হ্যাঁ, দেমাক থাকতো যদি সোয়ামী পুতুরে থাকতো। নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখে একবার?

আশা একা ঘরে ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে আছে–তার মনে যে নিরাশার। অন্ধকার ছেয়েছে, কোনোদিন তা ফুটে আলো বেরুবার সম্ভাবনা আছে। কি? হাতের পয়সা ফুরিয়েচে, আর বড়জোর দশটা দিন। তারপর?

গভীর রাত্রি কলকাতায়। আশা এখনও ঘুমোয়নি–দুশ্চিন্তায় ঘুম। নেই চোখে।

যতীন আকুল হয়ে ওর শিয়রে বসে ডাকলে–আশা, আশা লক্ষ্মীটি– আমি এসেছি আশা–

পুষ্পও বসলো পাশে। পুষ্প যে ভবিষ্যৎ দেখচে, যতীন তা দেখবার শক্তি রাখে না। পুষ্প খুব দুঃখিত হোল। কৰ্ম্মের অচ্ছেদ্য বন্ধনে আশা-বৌদির সঙ্গে যতীনদার গাঁটছড়া বর্জ-আঁটুনিতে আঁটা। দুঃখ হয়, কিন্তু সে জানে, কিছু করবার নেই তার। সে এখানে গাড়ীর পঞ্চম চক্রের মত অনাবশ্যক। সে না থাকলেও কর্মের রথ দিব্যি চলবে।

যতীন বল্লে–পুষ্প, আমায় সাহায্য করো–

–ভাবচি।

–কি ভাবছো?

–ভাবচি তোমার অদৃষ্ট যতীনদা–

–এখন কি হেঁয়ালি উচ্চারণ করবার সময় পুষ্প?

হায়! সে যা বলতে চাইছে, যতীনদাকে যদি কেউ তা বুঝিয়ে দিতে পারতো। যতীনদা চিরকাল তাকে ভুল বুঝে আসছে, এখনও বুঝবে তা সে জানে। কিন্তু কি করবে সে, এ তারও অদৃষ্টলিপি।

পুষ্প দুঃখিত সুরে বল্লে–তা বলিনি। তুমি বল্লে বুঝবে না আমার কথা। আশা বৌদির এ অবস্থা দেখে আমি মেয়েমানুষ–আমার কষ্ট হচ্চে না তুমি বলতে চাও? কিন্তু কিছু সাহায্য করতে পারবো না তুমি আমি। আশা বৌদিদির কৰ্ম্মফল–এক ভগবান যদি বাঁধন কাটেন তবেই কাটে। তোমার আমার দ্বারা হবে না।

–এই রকম অবস্থায় ফেলে রেখে যাই কি করে তোর বৌদিদিকে– বল, পুষ্পতা পারি?যতীনের কাতর উক্তিতে পুষ্পের চক্ষুদুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো–আশালতার দুরবস্থার জন্যে নয়, অন্য কারণে। সে বল্লে–পৃথিবীতে থাকতে, উপকার করতে পারতে। এ অবস্থায় আমি তো কোনো উপায় দেখচিনে। আচ্ছা–দেখি-একটু ভাবতে দাও–

পুষ্প একটু পরে বল্লে–এখানে থাকবে না। চলো যতীনদা। এখান। থেকে যেতেই হবে। নইলে তোমার আসন্ন বিপদ।

যতীন বল্লে–তুমি বড় ভয় দেখাও, পুষ্প। চলো করুণাদেবীর কাছে যাই, তাঁকে সব বলি।

-বলবে কি, তিনি অন্তরের কথা জানতে পারেন। ওঁরা হোলেন। উচ্চ স্বর্গের দেবদেবী। স্মরণ করলেই বুঝতে পারেন–কিন্তু সময় না হলে আসেন না। বৃথা দেখা দেন না। তা ছাড়া কলকাতার এই বিশ্রী পাড়ায় তাঁকে আমি এনে এর সঙ্গে জড়াতে চাইনে।

সারারাত যতীন ও পুষ্প আশার শিয়রে বসে রইল। পাশের একটা বাড়ীর খোলা জানালা দেখিয়ে বল্লে–দ্যাখো যতীনদা, ওখানে ওরা কি করচে! দেখে এসো না?

–কি?

-তুমি গিয়ে দেখে এসো, অমন জায়গায় যাবে না। দম বন্ধ হয়ে আসে।

যতীনের কৌতূহল হোল, সে গিয়ে দেখলে, কয়েকটি ভদ্রলোক, সাজে পোশাকে বেশ অবস্থাপন্ন বলেই মনে হয়–একটি ঘরে বসে তাসের জুয়ো খেলচে। পাশের টেবিলে একটি বোতল, কয়েকটি গ্লাস–এক টিন সিগারেট, দুচারটি শূন্য চায়ের কাপ ডিশ–একটা বড় প্লেটে খানকতক অর্ধভুক্ত পরোটা ও অন্য একটা পাত্রে কিছু ডালমুট। সিগারেটের ছাই ও ডালমুট ঘরের মেজের দামী কার্পেটের। ওপর ছড়ানো–যদিও সিগারেটের ছাই ফেলবার পাত্র টেবিলের ওপর রয়েছে কিন্তু আধপোড়া সিগারেট আর সিগারেটের ছাইতে পাত্রটা বোঝাই। ওরা ছোট ছোট তাকিয়া পাশে রেখে একমনে খেলেই চলেচে। বিছানার পাশে রাশীকৃত দশটাকার নোট একটার পর আর একটা হিসেবে সাজানো, ওপরে একটা পেপারওয়েট চাপানো। ওরা মাঝে মাঝে বোতল থেকে ঢেলে মদ খাচ্চে, সিগারেট ধরাচ্চে, মাঝে মাঝে একখানা কাগজে পেন্সিল দিয়ে হারজিৎ-সূচক হিসেব রাখচে। এদের মধ্যে একজনের বয়স পঞ্চাশ উত্তীর্ণ হয়েছে, দেখলেই বোঝা যায়, মাথার চুলে কালো রং খুঁজে বের করা কঠিন। ফুলফোর্সে মাথার ওপর ইলেকট্রিক পাখা ঘুরচে, দেওয়ালের ঘড়িতে রাত দেড়টা বাজে।

একজন ডেকে বল্লে–প্রমীলা,-টুসু-খাবার দিয়ে যাও।

দু’তিনবার ডাকের পর একটি সুন্দরী রমণী ঘুমু-ঢলঢল চোখে একটা বড় প্লেটে কতকগুলো কাটলেট নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে বল্লেনাও সব–রাত কম হয়নি, আমার ঘুম পেয়েছে–কাল আবার হাসপাতালের ডিউটি সকাল থেকে শুরু–

একজন বল্লে–সোড়া ফুরিয়েছে–টুসু। লক্ষ্মীটি, একটা সোডা আমাদের যদি দিয়ে যাও

আর একজন বল্লে–অমনি ওই সঙ্গে গোটাকতক পান–

সুন্দরী মেয়েটি রূপে ঘর আলো করেচে। ওর পরনে দামী সিল্কের শাড়ী, কাজ করা ব্লাউজ, অনাবৃত কণ্ঠদেশ, বক্ষঃস্থলে জড়োয়ার কাজ করা নেকলেস্ চিক্ চিক্ করচে। সে যেতে যেতে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কৌতুক-মিশ্রিত সুরে বল্লে–পারবো না এত রাত্রে পান সাজতে বসতে

পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের সেই লোকটি কপট মিনতির সুরে বল্লে–আমার। দু’হাত বন্ধ, মুখের সিগারেটটা ধরিয়ে যদি দিয়ে যেতে টুসু–

যতীন সেখানে আর দাঁড়ালো না। পুষ্পকে এসে বল্লে–তাস খেলচে। তাসের জুয়ো–টাকা জিতচে।

পুষ্প বল্লে–একবার দেখে এসেচি জানালা দিয়ে। ওরা অবস্থাপন্ন ভদ্রলোক দেখে মনে হয় টাকার ভাবনা নেই–অথচ টাকার এমন নেশা?

–তুমি এসব বুঝবে না পুষ্প। টাকার নেশা নয়, জুয়োর নেশা–

–ঐ হোল। ওই মেয়েটি কে?

–মেয়েটি টুসু। ভাল নাম যেন প্রমীলা–

পুষ্প হেসে বল্লে–তা তো বুঝলাম, ওদের কে? কি সম্বন্ধ ও বাড়ীর সংসারে?

যতীন কিছু বল্লে না, সরলা পুষ্প কত কথা জানে না সংসারে। ওর নিষ্পাপ মনে–দরকার কি?

পুষ্প আপন মনেই যেন বল্লে–কিন্তু ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি ওর মধ্যে কেন? ওঁকে দেখে কষ্ট হয়। এখনও ভোগের নেশা এত! পরকালের চিন্তা করবার সময় হয়নি আজও?

–তোমার মত সবাই হবে? বাদ দাও না, বাজে কথা বলো কেন?

পুষ্প দুঃখিত কণ্ঠে বল্লে–আমার বাবার মত দেখতে। সত্যিই কষ্ট হোল। ভগবানের দিকে মন দেবার ওঁর সময় যে পার হয়ে গেল!

–তোমার তাতে কি? বড় বাজে কথা তোমার পুষ্প–

–আশাবৌদি ঘুমিয়ে পড়ছে।

–কি হবে ওর পুষ্প? সত্যি কথা বল। তুই আমার চেয়ে অনেক বেশি দেখতে পাস্।

–দেখতে পাই কে বলেছে?

–আমি সব জানি–

পুষ্প গম্ভীর সুরে বল্লে–কেউ কিছু নয়। মানুষের মিথ্যে অভিমান। তিনি যা করবেন, তাই হবে। তাঁর কাছে প্রার্থনা করি এসো দুজনে।

–এখানে?

–এখানেই। তাঁর নামে সব পবিত্র হয়ে যাবে। তিনি এখানেই কি নেই? কে বলেচেন নেই? তিনি তাঁর অসীম কৃপা ও করুণায় এই হতভাগিনী আশাবৌদির মঙ্গল করুন।

করুণাদেবীর বিনা সাহায্যেও আজকাল পুষ্প মহর্লোকের সর্বত্র যাতায়াত করতে পারে, এমন কি আরও উৰ্দ্ধতর লোক পর্যন্ত। যতীনকে অত উচ্চস্তরে কোনো শক্তিমান আত্মার বিনা সাহায্যে নিয়ে। যাওয়া সম্ভব নয় বলে পুষ্প অনিচ্ছাসত্ত্বেও একাই মাঝে মাঝে যায়। সে বলে এতে অনেক কিছু সে দেখে, শোনে ও শেখে। অনেক ভাল ভাল আত্মার সংস্পর্শে এসে মানসিক ও আত্মিক শক্তির প্রসার হয়।

সেদিন যতীন ছাড়লে না, বল্লে–আমি যদি উচ্চস্তরে অজ্ঞান হয়ে পড়ি তুমি সেখানে আমাকে ফেলে যেও। যতদূর জ্ঞান থাকে ততদূর নিয়ে যাও না? আমিও বেড়িয়ে দেখতে, জানতে ভালবাসি না কি ভাবছো? রেলভাড়ার টিকিট তো লাগছে না।

–দ্যাখো যতু-দা, এখনও পৃথিবীর ওই উপমা ও চিন্তার ধরনটা ছেড়ে দাও। তোমায় এই জন্যেই বারণ করি বার বার পৃথিবীতে যেতে। ওখানে নানা আসক্তি, ইচ্ছা, ভোগপ্রবৃত্তি সৰ্ব্বত্র ছড়ানো রয়েছে পৃথিবীর আকাশে বাতাসে। স্থূল দেহ ভিন্ন ওই সব ইচ্ছা পূরণ করা যায় না। স্থূল জগতের স্থূল প্রবত্তি সূক্ষ্ম দেহে কি করে চরিতার্থ করবে? কাজেই ওই সব আসক্তি যেমন তোমার মনে আসন গেড়ে বসবে, তখনই তোমাকে ভুল দেহ ধারণ করতে বাধ্য করবে। সুতরাং আবার পুনর্জন্ম।

–তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই তোমার মত।

–সে আমি জানি। সেজন্যেই তো তোমার জন্যে ভয় হয়–চলো তোমাকে মহর্লোকে নিয়ে যাই

ওরা ব্যোমপথে অনেক ঊর্ধ্বে উঠে এমন এক স্থানে এল, যেখানে উচ্চলোকের জ্যোতির্ময় অধিবাসীদের যাতায়াতের পথ। তার পরেই এক অদ্ভুত সুন্দর দেশ; অতি চমৎকার বনপৰ্ব্বতের মেলা, বনকুসুমের অজস্রতা। অথচ এখানে কোনো অধিবাসী নেই, অনেকদূর গিয়ে একটা নীল হ্রদ, চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা। পুষ্প বল্লে–চলো যতুদা, ওই হ্রদের ধারে বনের মধ্যে একটি গ্রাম আছে, অনেক জ্ঞানী মেয়ে পুরুষ একসঙ্গে বাস করেন–তোমায় দেখিয়ে আনি।

বনবীথির অন্তরালে শুভ্র স্ফটিকসদৃশ কোনো উপাদানে তৈরী একটি বাড়ী, দেখতে অনেকটা গ্রীক মন্দিরের মত। হ্রদের নীলজলের এক প্রান্তে কুসুমিত লতাবেষ্টিত এই সুন্দর গৃহটি যতীনের এত ভাল লাগলো! এমন সুন্দর পরিবেশ আর্টিস্টের কল্পনায় ছাড়া যতীন অন্তত পৃথিবীতে কোথাও দেখেনি। আপন মনেই সে বলে উঠলো–কি সুন্দর!

একজন সৌম্যমূৰ্ত্তি পুরুষ ঘরের মধ্যে বসে। কিন্তু ঘরের আসবাবপত্র সবই অপরিচিত ধরনের। পৃথিবীতে ব্যবহৃত কোনো আসবাব সে ঘরে যতীন দেখলে না। লোকটিকে দেখেই মনে হোল অনেক উচ্চ অবস্থার আত্মা ইনি। ওদের অভ্যর্থনা করে বসিয়ে তিনি বল্লেন– তোমরা কোথা থেকে আসছো?

যতীন বল্লে–ভুবর্লোকের সপ্তম স্তর থেকে।

তিনি বিস্মত হয়ে বল্লেন–না, তা কেমন করে হবে? তা হোলে তো আমাদের এই জনপদ, এই ঘরবাড়ী বা আমাকে কিছুই দেখতে পেতে না? নিশ্চয় তোমরা উচ্চতর স্তরের অধিবাসী।

যতীন বল্লে–এটা কোন্ লোক?

–মহর্লোকের প্রথম স্তর। ভুবর্লোকের অধিবাসীদের পক্ষে এখানকার বাড়ীঘর, মানুষ, বন, পৰ্বত সব অদৃশ্য। আমার অবস্থার আত্মা না হোলে আমার এ গৃহে আমাকে পাবেই না। মহর্লোক কোনো একটা স্থানও বটে, বিশেষ একটা অবস্থাও বটে। স্থান ও অবস্থার একত্র যোগ না ঘটলে এ লোকে চৈতন্য জাগরিতই হবে না যে। তা নয়, তোমাদের মধ্যে একজন কেউ উচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত হয়েচ, নইলে এখানে। আসতে পারতে না।

–সে এই মেয়েটি। আমি নই–

পুরুষটি হেসে বল্লেন–আমিও তা অনুমান করেচি।

পুষ্প সলজ্জ প্রতিবাদের সুরে বল্লে–আমি কি-ই বা-ওঁর জন্যেই—

যতীন বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলে–আপনি পৃথিবী চেনেন তো স্যার?

–আমি আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীর অধিবাসী ছিলাম। সেই আমার শেষ জন্ম। সেবার ছিলাম গ্রীসে, তাঁর পূর্বে দুই জন্ম ভারতবর্ষে ও একজন সুপ্রাচীন মিশরে কাটাই।

–তার পূৰ্ব্বে?

–তার পূৰ্ব্বে পৃথিবীতে ছিলাম না। অন্য গ্রহে সৌর-জগতে বহু জন্ম নিয়েচি। কত অদ্ভুত গ্রহ আছে, অদ্ভুত জীবকুল আছে। বিচিত্র লীলা ভগবানের।

হঠাৎ পুষ্প বল্লে–আপনি ভগবানকে দেখেছেন, দেব?

–না?

–আপনি বিশ্বাস করেন তিনি দেখা দেন?

–না।

–আশ্চর্য্য! ভগবানে বিশ্বাস করেন না?

–তাঁর কোন রূপে আমার বিশ্বাস নেই, এই কথা বলছি। ভগবানকে তোমরা যে চোখে দ্যাখো, আমরা সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখি। তিনি অচিন্ত্যনীয় মহাশক্তি, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সর্বত্র বিরাজমান। দেহধারী হয়ে দেখাও দেন, আমার এই গ্রামের একটি মেয়ে প্রায়ই তাঁর দেখা পায়।

পুষ্প আশ্চর্য হয়ে বল্লে–তবুও আপনি বিশ্বাস করেন না?

–যে যেভাবে কল্পনা করে, তাকে সেইভাবেই তিনি দেখা দেন। এতে আমি বুঝি, এই তোমরাই আমার ভগবান হতে পার। নিত্যমূর্তি কি আছে তাঁর? সবই তাঁর মূর্তি–এই গাছপালা, এই বনভূমি, এই তুমি মেয়েটি–ঐ অনন্ত আকাশ, ব্রহ্মাণ্ডকুল–

কথা বলতে বলতে ভক্তি, জ্ঞান ও পবিত্রতার জ্যোতিতে তাঁর মুখের শ্রী হোল অপূৰ্ব্ব, তীক্ষ্ণ নীল আলোক বড় বড় চোখ দিয়ে কখনো ঠিকরে বেরুতে লাগলো–কখনো শান্ত হয়ে আসতে লাগলো। ভগবানের কথায় তাঁর কণ্ঠস্বর ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে এল।

পুষ্প তার ভাল বুঝে বল্লে–আমায় ক্ষমা করুন দেব, আমি বুঝতে পারিনি আপনাকে আপনি তাঁকে ভক্তি করেন।

যতীন বল্লে–পৃথিবীতে বহুদিন যান নি?

–পৃথিবীর বসন্তকালে পাহাড়ে পাহাড়ে বনে বনে ফুল ফোটে, সেই সময় পৃথিবীর মহাঅরণ্যে পৰ্বত-সানুতে নদীতীরে বেড়িয়ে দেখে আসি। কখনো কোনো অসহায়া নারীর দুঃখ দেখি কোনো জনপদে, তার দুঃখ মোচন করবার চেষ্টা করি। নীলনদীর জ্যোৎস্নারাত্রে নির্জনতটে বসে ভগবানের ধ্যান করি। শুধু পৃথিবী নয়, বহু গ্রহে এমনি আমাদের যাতায়াত।

–আপনি যা করছেন, শুধু আপনাদের মত উচ্চলোকের অধিবাসীরাই তা করতে পারেন। আচ্ছা, পৃথিবীর মানুষের কর্তব্য কি?

–প্রেম–এক ওর মধ্যেই সব।

–আপনি একথা পৃথিবীতে প্রচার করেন না কেন?

-কতবার প্রচার করা হয়েছে। আমার চেয়ে উচ্চতর ও শক্তিধর দেবতারা মানুষের দুঃখে পৃথিবীর শত কষ্টের মধ্যেও দেহ ধরে একথা বলতে গিয়েছিলেন। স্বয়ং ভগবান অবতার গ্রহণ করে নেমে গিয়েছেন বলতে। প্রেম–একটি কথা। কেউ শোনেনি।

–তাহোলে কি আপনারা হাল ছেড়ে দেবেন?

–অদ্ভুত চরিত্র ভগবানের। বার বার সুযোগ দেন। বিরক্ত হন। না। অপূৰ্ব্ব তাঁর ধৈৰ্য্য, অপূৰ্ব্ব তাঁর ক্ষমা। অন্য কেউ হোলে আর সুযোগ দিত না–কিন্তু নাছোড়বান্দা তিনি। আবার লোক পাঠান অদ্ভুত ধৈর্য্যের সঙ্গে। তোমাদের পৃথিবীতে ভগবানের তুল্য অবহেলিত প্রাণী আর কে? কেউ তাঁর কথা ভাবে না।

এই পর্যন্ত বলেই অপূৰ্ব্ব ঈশ্বরীয় প্রেমে মহাপুরুষের চোখ দুটি নক্ষত্রের মত জ্বল জ্বল করতে লাগলো। পুষ্প শ্রদ্ধায় উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়ে বল্লে–আপনি ঠিক বলেচেন দেব, পৃথিবীতে কেউ ভাবে না ভগবানের কথা। যে ভাবে সেও টাকা চায়, যশ চায়, সাংসারিক সুখ চায়। প্রেমভক্তি দুর্লভ হয়ে পড়েছে।

মহাপুরুষ বল্লেন–প্রেমভক্তি ছেড়ে দাও। ও অনেক উঁচু কথা। অতি সাধারণ ভাবে ক’জন ভগবানের চিন্তা করচে। আমি পৃথিবীতে যাই, জনপদে বা তোমাদের বড় বড় নগরে যাই না। দুর্নিবার লোভ, অর্থাসক্তি, ঐশ্বৰ্য-কামনা, নারী, সুরা, কাম, হিংসা-দ্বেষ বাতাসে ছড়ানো ঘন ধোঁয়ার মত। ভাই ভাইএর বুকে ছুরি বসাচ্চে। সত্য বিদায় নিয়েছে। পৃথিবীর এখনকার দর্শন হচ্চে খাওয়া-পরার দর্শন। কিসে ভাল খাব, ভাল পরবো। আমি আপন মনে মরুভূমিতে বেড়াই জ্যোৎস্নারাত্রে, হিমালয় কি অন্য কোন পর্বতচূড়ায় বসে থাকি, নীল নদ বড় ভালবাসি তার-তীরে একা বসে থাকি। অথচ এক কথা– প্রেম, এই যদি ওরা শিখতো,–জীবে প্রেম, ভগবানের প্রেম!

তিনি এই পর্যন্ত বলে চুপ করতে পুষ্প বল্লে–বলুন দেব, অমৃতের মত বাণী আপনার।

–আমার? আমার কিসের কন্যা? এ বাণী স্বয়ং ভগবানের। তিনি অনেক উঁচু তাই মানুষের দেহ ধরে পৃথিবীতে গিয়ে একথা বলে। এসেছিলেন। কেন না মানুষের দেহ ধরে না গেলে মানুষের সাধ্য কি যে অসীমকে গ্রহণ করে? একবার নয়, বার বার গিয়েছিলেন। ক্লান্তিহীন তাঁর আশীৰ্বাদ। কিন্তু কে শুনচে? ধনজনের মোহে, বিলাসের মোহে–স্কুল ভোগের মোহে সবাই উন্মত্ত। একবারও যদি নির্জনে। উচ্চতর সত্যের ধ্যান করতো মানুষে।

যতীন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। আজ এখানে আসা তার সার্থক হয়েছে বটে। সে বল্লে–তবে কি তাদের উদ্ধার নেই, দেব?

–একটা কথা মনে রেখো। জোর করে মানুষের ওপর কোনো সত্য, কোনো বাণী চাপানো যায় না। মানুষে তৈরী না হওয়া পর্যন্ত ভগবানের বাণী অন্তরালে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে। বুদ্ধিহীন বা স্থূলবুদ্ধি ভোগাসক্ত মন হঠাৎ ভগবানকে গ্রহণ করতে পারে না। পারলেই যে মুক্তি–যে ভগবানকে ভালবাসে, সে ভগবানের সমান হয়ে যায়। এত সহজে তা হবে কোথা থেকে? কাজেই মহাযুগ মন্বন্তর চলে যায় স্বাভাবিক নিয়মে মানুষের মুক্তি পেতে। স্বারোচিষ মন্বন্তরে যারা মানুষ হয়ে জন্মেছিল পৃথিবীতে সর্বপ্রথম–এইবার তারা মানব আবৰ্ত্ত কাটিয়ে দেবযান-পথে মহর্লোকে যেতে শুরু করচে! ওদের এতদিন পরে পৃথিবীতে গতাগতি শেষ হোল।

–এর চেয়ে আগেও হয়?

–তুমি বুঝলে না–এ তো হোল স্বাভাবিক নিয়মে, লক্ষ্য বৎসর পরে। এক জন্মেই মুক্তি হয়–যদি সত্যের জন্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে, ভাগবৎপ্রেমে বহ্নিশিখা জলে ওঠে মনে। এদের জন্যে ভগবান কত সাহায্যের ব্যবস্থা করেছেন, তা যদি জানতে! যে সত্যকে জানতে চায়, ভগবান তাকে জানবার সব রকম সুযোগ দেন। চলো তোমাদের একটা জিনিস দেখিয়ে আনি।

–ক’দিন থেকে আমি দেখছি তোমাদের পৃথিবীতে–

যতীন ও পুষ্পকে নিয়ে সেই উচ্চলোকের পুরুষটি চক্ষের নিমিষে পৃথিবীতে নেমে এলেন। সুন্দর জ্যোৎস্নারাত্রি পৃথিবীতে, ভারতবর্ষে। যে নদীতীরে এসে ওঁরা দাঁড়ালো, সে নদীটি খরস্রোতা, তীরে শস্যক্ষেতের মধ্যে একজায়গায় বড় একটা গাছ। পুষ্প ও যতীন নদীটি চিনতে পারলে না। বৃক্ষের তলে একটি তরুণ যুবক ধ্যানমগ্ন। যুবকের রং টকটকে গৌর মুখের চেহারা লালিত্যপূর্ণ বেশ বড় বড় চোখ–কিন্তু এই অল্প বয়সেই সে দাড়ি রেখেচে রেশমের মত নরম, চকচকে দাড়ি। যতীনের মনে হোল যীশুখ্রীষ্টের ছবির মত মুখোনা ওর দেখতে।

পুষ্প জিজ্ঞেস করলে–এ কি নদী দেব?

–এ রাভি নদী। এটি ভারতবর্ষের পাঞ্জাব প্রদেশ। ছেলেটির বাড়ী ওই জনপদে, সবাই ঘুমলে গভীর রাত্রে নদীতীরে বৃক্ষতলে ও রোজ একা এসে ভগবানের চিন্তা করে, গান করে আপন মনে। ওই দেখো ওর মা খাবার দিয়ে যায় এ সময়–আসছে–

একটি মেয়ে মেয়েটি প্রৌঢ়া বটে, কিন্তু সুন্দরী–দূরের গ্রাম থেকে একটা পাত্রে খাবার নিয়ে এসে ছেলেটির সামনে রাখলে। জিজ্ঞেস করলে–বাড়ী যাবি?

ছেলেটি বল্লে–তুমি যাও মা, আমি এক ঘণ্টা পরে যাবো।

–ঠাণ্ডা লাগানে বেশি, বাচ্চা।

ওর মা সস্নেহে ছেলের দিকে দু’তিন বার চেয়ে যে-পথে এসেছিল সেই পথে চলে গেল এবং অতি অল্পক্ষণ পরে এক অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়লো যতীন ও পুষ্পর। আকাশপথ আলো হয়ে উঠলো ক্ষণকালের জন্যে এবং সেই আলোর রেখা ধরে এক দিব্য জ্যোতির্ময় পুরুষ নেমে এসে ওই ধ্যানরত যুবকের পাশে দাঁড়লেন। আগন্তুক দেবতার রূপে ও দেহজ্যোতিতে স্থানটি যেন আলো হয়ে উঠলো, যদিও যুবকটি তার কিছুই বুঝতে পারলে না।

পুষ্প ও যতীন সবিস্ময়ে বল্লে–উনি কে?

–উনি সত্যলোকের প্রাণী। পৃথিবীতে ওঁরা তো দূরের কথা, আমাদেরই আসতে কষ্ট হয়, অথচ দ্যাখো ওই সত্যপ্রিয় ভগবদ্ভুক্ত যুবকটিকে প্রেরণা দিতে নিজে এসেছেন। যেখানে ভগবানের নামগান হয় সেখানে ভগবান স্বয়ং আসেন–এ তোমরা অবিশ্বাস করো না।

তারপরে ওরা তিনজনেই দূর থেকে সত্যলোকের সেই মহাপুরুষকে প্রণাম করলে। তিনি ওদের দিকে চেয়ে সদয় হাস্য করলেন ও দুটি আঙুল ওপর দিকে তোলার ভঙ্গিতে আশীৰ্বাদ করলেন। পুষ্পর চোখে জল এল। কি সুন্দর রূপ দেবতার।

পরক্ষণেই তিনি অন্তর্হিত হয়ে গেলেন।

পুষ্পদের সঙ্গী পুরুষটি বল্লেন–দেখলে? নীলনদের তীরে বহু হাজার বৎসর পূৰ্ব্বে যাপিত আমার একটি গোপন রাত্রির কথা আজও আমার মনে হয়। একা ছিলাম সে রাত্রে। বসন্তকাল ছিল, পুষ্পিত হয়ে ছিল নদীতলের ওষধি ও বনতরুরাজি–ক্ষুদ্র একটি পৰ্ব্বতের চূড়ায় নদীর অপর পারে আমি জ্যোতির্ময় আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করি। আমার সারাজীবন পরবর্তিত হয়ে যায়–দশ জন্মের প্রগতি একজন্মে সাধিত হয়। ভগবানের কৃপা নইলে হয় কি? কিন্তু তার জন্য ক্ষেত্র তৈরী হওয়া দরকার। পরকে ভালবাসো, জীবকে সেবা করো। আসক্তি ত্যাগ করো। ভগবানে মন দাও। মনের কুয়াশা না কাটলে সত্যের আলোকপাত কি হয়?

–আপনারা দয়া করুন পৃথিবীর জীবকে–তাহোলেই হবে।

–আমার ইচ্ছা আছে, আর একবার পৃথিবীতে দেহধারণ করবো। যা পারি প্রচার করে করে আসি।

–পৃথিবীতে গিয়ে ভুলে যাবেন না?

–দেহ ধরলেই বিস্মৃতি আসে। তবে তার ব্যবস্থা আছে। অন্য দিব্য পুরুষেরা গিয়ে আমায় বাল্যে ও যৌবনে নানাভাবে মনে করিয়ে। দেবেন। ওঁরা দেখা দিতে পারেন আমায় স্বপ্নে কি বা রাত্রিকালে, নয়তো ঘটনার এমন যোগাযোগ ঘটাবেন যে আমার আত্মা ক্রমশ জেগে উঠে বুঝতে পারবে পৃথিবীতে সে কেন এসেচে; ভোজ খেতে, নারী ও সুরা নিয়ে আমোদ করতে আসেনি। ভগবানের বিশ্বে এসবের। ব্যবস্থা আছে–যে ভাল কাজ করতে চায়, তাকে সাহায্য দেওয়া হয়। তিনি যে বিরাট মহাশক্তি, সেই শক্তিকে তুষ্ট করতে পারলে জীব পলকে প্রলয় করতে পারে, অসাধ্য সাধন করতে পারে, মহাশক্তির সদয় সাহায্য সে পায়। এ রহস্য কে বোঝে? পৃথিবীতে সবাই অর্থ নিয়ে ব্যস্ত, সৰ্ব্বত্র অনুপ্রবিষ্ট এই করুণাময়ী মহাশক্তির রহস্যভেদ করতে ব্যস্ত ক’জন?

পুষ্প বল্লে–প্রভু, আপনি বলছিলেন আপনার গ্রামে একটি মেয়ে ভগবানের দেখা পায়–সে কি রকম?

–সে উচ্চ অবস্থার মেয়ে। তার শেষ জন্ম হয় পৃথিবীতে, সাতশো বছর পূর্বে। মানবআবৰ্ত্ত আমি জানি ভগবানের এসব মায়িক রূপ। তাঁর রূপের কি কোনো সীমা আছে? ভগবানকে যে আন্তরিকভাবে ডাকে, তিনি তার কাছে যাবেনই। যে রূপে চায়, সে রূপেই যাবেন। এ একটা অমোঘ নিয়ম। যেমন চুম্বকের কাছে লোহা ছুটে যাবেই– তেমনি। ভগবান যাবেনই ভক্তরূপ চুম্বকের কাছে। তাঁকে টেনে নেবে আকর্ষণ করে। ভগবান লোহা, ভক্ত চুম্বক। এ ওকে টানচে ও একে টানচে। পৃথিবীর লোককে এ সকল কথা বিশ্বাস করানো কঠিন। বিশ্বাস করলে তো মানুষ আর মানুষ থাকে না, ভগবান হয়ে যায়।

ওরা সব মহর্লোকের সেই গ্রামটিতে ফিরে এল। তারপর তিনি ওদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন আবাস-বাটী দেখালেন জনপদের। পাহাড়ের গায়ে স্তরে স্তরে নানা রঙের ফুল, কোনো স্থানে কোনো অপার্থিব পশুর মূৰ্ত্তি, স্ফটিকে তৈরি। কোথাও বড় বড় বৃক্ষশ্রেণী সরোবর। দূর দূর এইসব বনবীথি ও উদ্যানের মধ্যে মধ্যে অতি সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ ও অট্টালিকা। শুভ্র স্ফটিক প্রস্তর ছাড়া অন্য কোনো উপাদান এই প্রাসাদ নিৰ্ম্মানে ব্যবহৃত হয়নি। গাছে গাছে কুসুমিত লতা মালার আকারে জড়িয়ে, আরতির পঞ্চপ্রদীপের শিখার মত কোনো কোনো রক্তবর্ণ পুষ্প ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ফুটে আছে। জনপদের কিছুদূরে নিভৃত অরণ্য শিলাবাঁধানো পথের দুপাশে, অথচ সে সব অরণ্যে জুই, গোলাপ, কাঞ্চন ফুলের মত দেখতে আলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মণ্ডলীর আকারের সুগন্ধি বনকুসুম অজস্র ফুটে আছে। পাহাড়ের কোলে গুহা ও প্রস্তরনির্মিত মন্দির যেন বহুঁকালের বলে মনে হয়।

ওদের সঙ্গী বল্লেন–ওই সব গুহাতে মহর্লোকের প্রাচীন সাধুরা ভগবানের চিন্তাতে নিমগ্ন থাকতেন। এখন বহুদূর পথে, অনেক ঊর্ধ্বলোকে তাঁরা চলে গিয়েছেন, পৃথিবীর হিসেবে হাজার হাজার বছর আগেকার কথা। এখন ওগুলি তীর্থস্থান হিসেবে বিদ্যমান আছে, তবে। ওই বনস্থলী, নিভৃত গিরিগুহা ও মন্দিরগুলিতে বসলেই আত্মা স্বভাবত অন্তর্মুখী ও আবৃতচক্ষু হয়ে নিজের হৃদয়কন্দরের অন্ধকার গহনে ডুব দিয়ে নিজের স্বরূপ বুঝতে উন্মুখ হয়ে ওঠে।

যতীন বল্লে–আচ্ছা, আপনাদেরও কি ধ্যানধারণা সাধনার প্রয়োজন। হয়?

–আমরা তো অনেক নিম্নলোকের জীব! সত্যলোকের উজ্জ্বস্তরের দিব্য মহাজ্যোতির্ময় ব্রহ্মম্বরূপ জীবেরাও ধ্যান ও সাধনা দ্বারা আত্মশক্তি উদ্বুদ্ধ করেন। ভগবানের সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগ সাধিত করেন। আমরা ধ্যান-ধারণা দ্বারা জন, তপঃ ও সত্যলোকের অধিবাসীদের সঙ্গে আদানপ্রদান চালাই। তাঁদের অদৃশ্য সাহায্য প্রার্থনা করি।

–তাঁরা কি আপনাদের কাছেও অদৃশ্য?

–সম্পূর্ণ। বিনা ধ্যান-ধারণায় তাঁদের মত উচ্চ জীবদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ সম্ভব নয়। আমাদের চোখে তাঁরা সম্পূর্ণ অদৃশ্য।

–তাঁদেরও ঊর্ধ্বের লোক আছে?

–আছে, অনেক আছে। সত্যলোকেরই ঊর্ধ্বতন স্তরের জীবেরা ঐ লোকের নিম্ন স্তরের জীবের নিকট অদৃশ্য। তাঁর উর্ধ্বে ব্রহ্মলোক তাঁর উদ্ধা সৰ্ব্বলোকাতীত পরব্রহ্মলোক বা গোলক। তারও ঊর্ধ্বে নির্গুণ ব্ৰহ্মলোক–কিন্তু সেখানকার খবর কেউ দিতে পারে না–কেউ জানে। না। এসব লোকের তত্ত্ব অত্যন্ত গুহ্য–সাধারণ জীবেরা এর খবর রাখে না বা তাদের কোনো আবশ্যকও নেই এসবে। তবে আমারও এইসব লোক সম্বন্ধে কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই–কারো থাকে না। ঊর্ধ্বলোকের কোনো কোনো দেবতা দয়া করে দেখা দিয়ে যেমন বলেছেন, তেমনি জানি।

–গ্রাম নগর বেঁধে বাস করেন কেন?

–আমরা বহুযুগ পূৰ্ব্বের আত্মা। আমাদের সমসাময়িক আত্মা এ লোকে আর নেই। আমরা পরস্পরের সাহায্যে পরস্পরে উন্নতিলাভ করচি। নিজেদের মনের সাহায্যে এই জনপদ নিৰ্মাণ করে একত্রে বাস করি, ভগবানের উপাসনা ধ্যানধারণা করি–সাধ্যমত পৃথিবীতে বা অন্য গ্রহে গিয়ে স্থূল জগতের জীবদের উপকার করবার চেষ্টা করি। পৃথিবীতে যেমন গ্রাম জনপদ, সূক্ষ্ম জগতের এই সব জনপদ, বনবীথি, উদ্যানেরই প্রতিচ্ছায়া মাত্র সে সব। তাদের বিকার আছে, এদের বিকার নেই।

পুষ্প বল্লেভগবানকে স্বামী রূপে পেয়েছে সেই মেয়েটিকে একবার দেখাবেন না? ওঁর ভাগ্য অদ্ভুত তো!

দেবতা হেসে বল্লেন–ও সব হোল নারীর সাধনা। প্রেমভক্তির সাধনা–ভগবানের মায়িক রূপে দেখা পায়। তুমিও দেখা পেতে পারো কন্যা, যদি তোমার প্রেম জন্মে থাকে তাঁর প্রতি। ভগবান কল্পতরু স্বরূপ, যথার্থ পিপাসু ও আকুল ব্যক্তিকে নিরাশ করেন না। তবে আমি ওগুলোকে পুতুলখেলা বলে বিবেচনা করি। নারীর ধৰ্ম্ম, পুরুষের নয়। পুরুষ হবে জ্ঞানী, বীর, ত্যাগী।

পুষ্প বল্লে–কিন্তু মনে রাখবেন দেব, ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগাবতার শ্রীকৃষ্ণ এই প্রেমভক্তির সাধনা শিখিয়েছেন

–জ্ঞানেরও, কর্মেরও। তাঁতে তিনেরই অপূৰ্ব্ব সমন্বয়।

শ্রীকৃষ্ণকে আপনি যাই বলুন, তিনি প্রেমের দেবতা। প্রেমময়, ভাবময়, সৌন্দর্য্যময়–এই তাঁর আসল রূপ।

-তুমি নারী, তোমার পক্ষে ওই ভাবই স্বাভাবিক বটে। তবে জেনে রেখো, জগতের বহু গ্রহে বহু জীবকুল বাস করে। ভগবান প্রত্যেক গ্রহে অসীম বিশ্বের সমস্ত জীবকুলের সম্মুখে তাদের ভাবানুযায়ী মায়িক রূপে নিয়ে দেখা দেন। তিনি অসীম, অনন্তরূপী, তাঁর কোনো শেষ নাই! কত লক্ষ শ্রীকৃষ্ণ আছেন, কত লক্ষ রামচন্দ্র আছেন তোমাদের পৃথিবীর তাঁর মধ্যে–একথা মনে রেখো।

–তাতে কি সসীম মানুষ তাঁর কোটি কোটি মায়িক রূপ ধারণা করতে পারবে না। একটিমাত্র সুন্দর রূপের ধ্যানে সিদ্ধিলাভ করুক। তাহোলেই তাঁকে পাবে তো?

–নিশ্চয়। এ তো হোল সহজ পথ। ভক্তির পথ সহজ পথ, নারীর পথ। জ্ঞানের পথ বীরের পথ, পুরুষের পথ–সে কথা তোমাকে তো আগেই বলেচি। ভগবানকে পাবে–ও পথেও, এ পথেও।

পুষ্প বল্লে–সেই সহজ সুন্দর পথের সহজ সুন্দর দেবতা শ্রীকৃষ্ণ যদি আমার মনের গোপন মন্দিরে বিরাজ করেন, তবে আমার জন্মমরণ। ধন্য হবে, দেব। জীবনের এপারে বা ওপারে আর কিছুই চাইনে।

এই সময়ে একটি সুন্দরী নারী সেখানে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ অপূৰ্ব্ব দিব্যভাব পরিপূর্ণ। অঙ্গাকান্তি তরল জ্যোৎস্নারমত, বড় বড় চোখ দুটিতে অসীম সারল্য ও অন্তমুখিতা। মহাপুরুষ পুষ্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বল্লেন–এই সেই কন্যা। এর নাম সুমেধা ভারতবর্ষেরই কন্যা

পুষ্প প্রণাম করে বল্লে–দেবি, ভগবানের সম্বন্ধে কথা হচ্ছিল।

নারী হেসে বল্লেন–আমি সব শুনেচি-তাঁর স্বরূপ কি শুনবে? আমি খুব ভাল করে দেখেচি। তিনি বালকস্বভাব, পথের বাঁকে বসে থাকেন উৎসুক হয়ে, ধরা দেবার জন্যে। কিন্তু তাঁর পেছনে ছুটতে গেলে তিনি বালকের মত হেসে ছুটে দূরে পালিয়ে যান

যতীন অভিভূত ও মুগ্ধভাবে বলে উঠলোবাঃ মা, বাঃ, কি সুন্দর অনুভূতির কথা!

পুষ্পও মুগ্ধদৃষ্টিতে সেই অনিন্দ্যসুন্দরী লাবণ্যময়ী ভাবময়ী নারীর দিকে চেয়ে রইল। রুদ্ধনিশ্বাসে বল্লে–তারপর? তারপর?

–তারপর কি জানো? সেই সময় যদি তুমি হতাশ হয়ে ছুট দেওয়া বন্ধ করো–তবে ভগবান নিরাশ হবেন, দাঁড়িয়ে যাবেন, বালকের মত। তিনি চান জীব তাঁর পেছনে পেছনে খানিক ছোটে, হাঁপায়। ভগবান জীবের সঙ্গে বালকের মত খেলা করেই মহাখুশি। না থেমে তবুও ছুটলে ভগবান শেষে অকারণেই আবার ফিরে আসবেন, হাসতে হাসতে ধরা দেবেন। অতএব ভগবানকে নিরাশ কোরো না, তাঁকে একটু জীবকে নিয়ে খেলা করতে দাও–তিনি বড় একা—

দেবীর চোখ স্নেহে ও প্রেমে ছলছল করে উঠলো।

পুষ্প বল্লে–চমৎকার! আজ অতি সুন্দরভাবে বুঝলাম, সহজভাবে বুঝলাম। আপনার অনুভূতি সহজ বলেই সহজভাবে বুঝেছেন তাঁকে।

যতীনের মন পুষ্পের এ কথায় সায় দিলে।

ওদের সঙ্গী কিন্তু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলেন উদাসীনের মত–যেন তিনি এসব ভাবালুতার বহু ঊর্ধ্বে জ্ঞান ও তপস্যার দৃঢ়ভূমির উপর স্বপ্রতিষ্ঠ।

যতীন ও পুষ্প তাঁকেও প্রণাম করে বিদায় প্রার্থনা করলে।

মেয়েটি ওদের হাসিমুখে বল্লে–আবার এসো তোমরা। আমি এখানে শীগগির উৎসব করবো-বনকুসুম-উৎসব। জনলোকের অনেক নারীপুরুষ আসে, সবাই বনফুলের মালা দেন আমার বিগ্রহের গলায়। আমি তোমাদের নিমন্ত্রণ পাঠাবো।

পুষ্প বল্লে–দেবি, কল্প-পৰ্ব্বতের সঙ্গীত শুনতে যান আপনি? আবার তো সেদিন আসছে। আপনার সঙ্গে দেখা হবে?

–আমি প্রতিবারই যাই। আমাদের গ্রামের সকলেই যায়। ভগবানের প্রতি অনুরাগ জন্মায় ওই সঙ্গীত শুনলে–ওত্যন্ত সূক্ষ্ম অনুভূতির দরজা খুলে যায় বলে অনেক উচ্চস্তরের নরনারী আসেন সেদিন। যেও সেখানে–আমিও যাবো।

গ্রামের প্রান্তে বনবীথির অন্তরালে একটি শুভ্র স্ফটিকের মন্দিরে মেয়েটি ওদের দুজনকেই নিয়ে গেল। সেখানে পা দিয়েই পুষ্প বুঝতে পারলে এ অতি পবিত্র স্থান–দেবতার আবির্ভাব দ্বারা এর অণু-পরমাণু ধন্য ও কৃতার্থ হয়ে গিয়েছে, এখানে এসেই তার মনে হোল এখানে। নির্জনে বসে ভগবানের চিন্তা ও ধ্যান করি। রঘুনাথ দাসের আশ্রমের মত এর পুণ্যময় প্রভাব।

মেয়েটি হঠাৎ বল্লে–সমুদ্র দেখবে ভাই?

পুষ্প অবাক হয়ে বল্লে–কোথায়?

–ওই দ্যাখো–

পুষ্প সত্যই দেখলে, সেই বনবীথির ওপারে বিশাল সুনীল মহাসাগর ঢেউ এর ওপর ঢেউ তুলে বহুদূরে দিগন্তে মিশে গিয়েছে– কোনো কূল নেই, কিনারা নেই। তার অনন্ত জলরাশির ওপর নীল মহাব্যোমের প্রতিচ্ছায়া–সে এক অদ্ভুত দৃশ্য, সমুদ্রতীরে এক শিলাখণ্ডে বিশালবৃক্ষতলে মেয়েটি ওর হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসালে। পুষ্পের মনে হোল ওর সমস্ত সত্তা এই আনন্দ মহাসমুদ্রের কূলরেখা ধরে বহুদূর অনন্তে বিলীন হয়ে যাচ্চে, জগৎস্বপ্ন যেন লয় হয়ে যাচ্চে স্বসংবেদ্য আত্মানুভূতির শান্ত গভীরতার। মেয়েটি খিল খিল করে। হেসে উঠলো মুখে আঁচল দিয়ে। কি মধুর হাসি তার সুন্দর মুখের। বল্লে–কেমন ঠকিয়েচি ভাই?

পুষ্প বল্লে–সমুদ্র কোথা থেকে এল এখানে? আমিও তাই ভাবছি।

–সমুদ্রতীরে এই গাছতলায় বসলে তাঁর কথা বড় মনে হয়–তাই তৈরি করে রেখেচি।

–সব সময় থাকে?

–সব সময়। তবে অন্য কেউ আমার মনের ভূমিতে না পৌঁছুলে দেখতে পায় না। আমার কাছে সৰ্ব্বদাই সত্যি–অন্যের কাছে অবাস্তব।

–এ গ্রামের অন্য লোকের কাছেও?

–আমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না। তুমি ভাই ভালবাসবে বলে তোমাকে আমার ভূমিতে নিয়ে এসে দেখালাম। বলো ভালো?

–আপনাকে আমি কি বলে ধন্যবাদ দেবো জানিনে দেবী। কত ভালো যে লাগচে এই বন, এই পাথরের বেদী, এই নীল সমুদ্র এখানে ভগবানের আসাযাওয়ার পায়ের চিহ্ন আছে।

–আছেই তো। উনি যে আসেন লুকিয়ে আমার কাছে। জানো না ভাই?

মেয়েটির গলার সুরে পুস্পের মমতা জাগলো। শ্রদ্ধাও। এই শিলাস্তৃত সমুদ্রবেলায় দেবতার শুভঙ্কর আবির্ভাবের কথা লেখা রয়েছে। পুতুলখেলা হয়তো। হোক পতুলখেলা। সে নারী, এই তার ভাল লাগে।

সে হঠাৎ একটা প্রশ্ন করলে–আচ্ছা, একটা কথা বলুন। মেয়েরা কি খারাপ? পৃথিবীতে কেন একথা সাধু-মহাজন বলে এসেচেন?

–মেয়েরা সাধনপথের বিঘ্ন, তাই।

-কেন?

–বিভ্রান্ত করে দেয় পুরুষের মন। প্রকৃতির কাজ করবার জন্যে মায়ার সৃষ্টি করে। পুরুষেরা মজে অতি সহজেই। সখি, তোমার এই মুখোনি নিয়ে এই মহর্লোকেই একবার পরীক্ষা করে দ্যাখো না?

–সত্যি আমরা কি এতই হেয়?

–হেয় বা খারাপ এমনি হয়তো কিছু না, বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া। যে। ভগবানকে পেতে চায়, যে জ্ঞানের সাধনা করতে চায়, ভক্তির সাধনা। করতে চায়–সে নারী থেকে দূরে থাকবে এই বিধান। অন্য লোক যত খুশি মিশুক–কে বারণ করচে? সাধনার পথের পথিক যারা নয়। তাদের কি বাধা আছে নারীসঙ্গের? নারী প্রেমের সাধিকা হয় অতি সহজে, পুরুষে তা পারে না। নারী পাপের পথেও নিয়ে যায়, কল্যাণের পথেও নিয়ে যায়। কারণ চিত্তনদী উভয়তেমুখী, বহতি পাপায়, বহতি কল্যাণায়। খুব সাবধানে না চললে সৰ্ব্বনাশ আসে ওদের থেকে। সাপ খেলাতে সবাই জানে না। আনাড়ি সাপুড়ে সাপের হাতে মরে।

–স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধ কি চিরকালের?

–যেখানে প্রেম থাকে। নয়তো কিসের সম্বন্ধ? যেখানে প্রেম আছে, প্রেমের দেবী মিলিয়ে দেন। স্বামী-স্ত্রী না হোলেই বা কি। প্রেম নিয়ে বিষয়–কিন্তু এ ধরনের প্রেম সাধনালব্ধ বস্তু। দেহের বা রূপের মোহ এ প্রেমের জন্ম দিতে পাড়ে না। রূপজ প্রেম দিয়ে প্রকৃতি তার কাজ করিয়ে নেয় মাত্র।

–আপনি কি করে এসব জানলেন?

মেয়েটি হেসে হেসে বল্লে–কত যে ঠকেচি ভাই কত শত জন্ম ধরে। কত নেমে গিয়েছিলাম, কত ভুগেছিলাম–জন্মজন্মান্তরের সে সব স্মৃতি ও সংস্কার আমাকে জ্ঞানী করেছে। একজন্মে দুজন্মে সাধু হওয়া যায় না ভাই–মহর্লোকেও আসা যায় না–

–আবার আপনি জন্মাবেন?

–পৃথিবীতে আমার শেষ জন্ম হয় বহুঁকাল আগে–পৃথিবীর সে। হিসেব ভুলে গিয়েচি। আর সেখানে যাবো না। ভগবান আমায় দয়া করেছেন।

–যদি আপনার মত মেয়ের দরকার হয় পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার?

–সে অবস্থায় ভগবানের নির্দেশ পাবো। জীবের সেবা করবার ভার–সৌভাগ্যের কথা সে। তিনি যদি আমায় না ছাড়েন ভাই, নরকে যেতেই বা কি? উনি হাত ধরে নিয়ে গেলে নরক আর বলি কোথায়! কিসের স্বর্গ কিসের নরক? থাকুন তো উনি আমার সঙ্গে।

মেয়েটির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো দর-দর ধারে।

পুষ্প অবাক হোল ওঁর অনুভূতির তীব্রতায়। শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে ভ’রে উঠলো তার মন।

মেয়েটি আবার বল্লেভগবান এই আলোর কমল বিশ্বজগৎ হয়ে ফুটে আছেন। তাঁর করুণার আলো। কাউকে তিনি ভোলেন না, অবহেলা করেন না ভাই–তাঁর মত প্রেমিক কে? যে ডাকে, যে তাঁর শরণ নেয়, তিনি তারই দোরে ছুটে যান, পাপী-পতিত মানেন না। কিন্তু ভাই, কেউ কি তাঁকে চায়?

সমুদ্রতীরের বিশাল বৃক্ষতলে নীল ঊর্মিমালার দিকে চেয়ে ওরা দুজন দাঁড়িয়ে। মেয়েটি সুন্দর ভঙ্গিতে হাত তুলে দূরে দেখিয়ে বল্লে– ওই মহাসমুদ্রের মত অন্তহীন তাঁর করুণা! কেউ বুঝতে পারে না, বলে তাঁকে নিষ্ঠুর। তিনি দু’তিন জন্মের মঙ্গল করেন একজন্মের কৰ্ম্মক্ষয় করে। পৃথিবীর লোকে সদ্য সদ্য ফল চায়। বোঝে না তিনি। কি করতে চাইছেন। ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে অনেক সময় আসে তাঁর করুণা। কাজেই অবুঝের গালাগালি তাঁকে সহ্য করতে হয়।

পুষ্প বল্লে–আপনি দেবী, কি আনন্দ হোল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে। আমার সঙ্গী মহর্লোকে বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না, জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। আজ আমি যাই

–আবার এসো ভাই, আসবে ঠিক? আমার পায়ে হাত দেওয়া কি ভাই? তুমিও তো কম নও। আমি তোমাকে চাই। এসো–আনন্দে থাকো ভাই।

মেয়েটির অব্যর্থ আশীৰ্বাদ। সত্যিই এক অপূৰ্ব্ব আনন্দের প্রসন্ন। হিল্লোল বয়ে গেল পুষ্পের মনে। এ জগতে ভয় নেই, অমঙ্গল নেই–মেয়েটি বলেছে, ভগবানের আশীৰ্বাদ রয়েছে বিশ্বের ওপরে।

ফিরে এসে বুড়োশিবতলার ঘাটে বসে সেদিন সন্ধ্যায় পুষ্প যতীনকে ওই অদ্ভুত মেয়েটির গল্প শোনালে।

সেদিন ফিরে আসবার পর আরও কিছুকাল কাটলো। বুড়োশিবতলার ঘাটে যে সংসার পেতেছিল পুষ্প, তাতে যেন ভাঙন ধরেচে। আজ সাত বছর আগে প্রথম যেদিন যতীন এখানে আসে, সেদিনটি থেকে পুষ্পের কত সাধ, কত আনন্দ, ছেলেবেলার সেই প্রিয় সাথীকে নিয়ে এখানে সংসার পাতবে। তাই অনেক আশা করে সাজিয়েছিল বুড়োশিবতলার ঘাটের সংসার।

ওপরের শ্যামাসুন্দরীর মন্দিরে আরতি-ঘণ্টাধ্বনি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্প আগে নিজেদের ঘরে প্রদীপ দেখায়, গৃহদেবতার সামনে সুগন্ধি ধূপ জ্বালিয়ে ফলফুলের অর্ঘ্য নিবেদন করে, মনে মনে দেবদেবীকে স্মরণ করে। রঘুনাথদাস ওকে একটি সুন্দর স্ফটিক-বিগ্রহ এনে দিয়েচেন, তিনি বলেন একজন শিল্পী মননশক্তি দ্বারা ভুবর্লোকের পদার্থে ইচ্ছামত রূপান্তর ঘটিয়ে এই সব দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করেন–এই লোকেরই চতুর্থ স্তরে কোথায় তিনি থাকেন। পুষ্প বলেছিল একদিন সেখানে গিয়ে দেখে আসবে।

কিন্তু কি জানি পুষ্পের ভাগ্যে কোথায় যেন কি গোলমাল আছে। সব মিথ্যে হয়ে যায় কেন? হঠাৎ আশা বৌদিদি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেচে।

সেই মুহূর্তেই পুষ্প টের পেয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যতীন। তার কিছুই জানে না। যতীনের মুখের দিকে চেয়ে ওর কষ্ট হোল। আশা প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ফলে ভুবর্লোকের কোন নিম্নস্তরে হয়তো ঘুরচে যতীনদার সঙ্গে দেখা হওয়া সম্ভব নয় এ অবস্থায়, পুষ্প এ সত্য বুঝেচে।

সুতরাং মিছিমিছি কেন যতীনদাকে আশার মরণের কথা জানিয়ে কষ্ট দেওয়া। পৃথিবীতে থাকলেও তারা যেমন কোনো সাহায্য করতে পারেনি, এখানেও ঠিক তেমনি অবস্থা দাঁড়াবে। এ-লোকেও নিম্নস্তরের অধিবাসী আশার কাছে সে ও যতীনদা যেমনি অদৃশ্য ছিল পৃথিবীতে থাকতে, তেমনিই থাকবে।

কিন্তু আশা কোথায় আছে একবার দেখা দরকার।

সেদিন সে রঘুনাথদাসের কাছে গেল, যতীনকে কিছু না জানিয়ে। দেখা পাবে কিনা সন্দেহ ছিল, কারণ এ সব মহাপুরুষ নিজের খেয়ালে থাকেন, আজ আশ্রম আছে, কাল নেই। সর্বপ্রকার মায়াবন্ধনের অতীত এঁরা। ভগবানের দেহে লয় না হয়ে ভক্তিসেবার জন্যে চিন্ময়। আশ্রমে চিন্ময় বিগ্রহ স্থাপন করে সেবামৃত আস্বাদ করছেন মাত্র। আজ আছেন কাল হয়তো নাস্তি। দেখাই যাক।

রঘুনাথদাস আচার্য্যকে তার বড় ভাল লাগে। প্রেমে স্নেহে বালকস্বভাব। বৃদ্ধ সাধু ঠিক যেন তার বাবার মত। আজ তার মনে হোল এ বিপদে এরই আশ্রয় নিতে হবে। অতি উচ্চস্তরে সাধুর আশ্রম, সেখানে পৌঁছানো তার পক্ষে সব সময় সহজও নয়–তবে ভগবানের কৃপা ভরসা।

আশ্রমটি একটি বিশেষ মণ্ডলের মধ্যে অবস্থিত। সাধুর আবাসস্থানের মাহাত্ম্যে দূর থেকেই পুষ্পের মনে এক অদ্ভুত ভাবের উদয় হোল–এ ভাব সে পূৰ্ব্বেও এখানে আসবার সময় গাঢ় ভাবেই অনুভব করেছে। সেই অপূৰ্ব আনন্দরস..বার বার জন্মমৃত্যুর আবৰ্ত্ত থেকে মুক্ত, কোন্ লীলাময়ের অনন্ত লীলারাজ্যে সে নিত্য অভিসারিকা চিরিযৌবনা প্রেমিকা…জগমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি হিরণ্যগর্ভের পার্শ্বচারিণী।

সেই শ্বেত স্ফটিকের দুগ্ধধবল গোপাল-মন্দিরটি দূর থেকে দেখেই পুষ্প উদ্দেশে প্রণাম করলে। মন্দিরের চারিপাশের পুষ্পবাটিকাতে কত ধরনের ফুল ফুটে আছে, পূৰ্ব্বপরিচিত এই সুন্দর লতাকুঞ্জটিতে রঘুনাথদাস বসে নামগান করছেন। এবার তিনি একা নন, দুটি বালক ও দুটি উদ্ভিন্নযৌবনা সুন্দরী কুমারী সেখানে বসে তাঁর সঙ্গে হাততালি দিয়ে গানে যোগ দিয়েচে। কেমন চমৎকার সুগন্ধ এখানকার! সেবারও এখানে আসতেই পুষ্প পেয়েছিল–অগুরু, চন্দন, সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া, কত কি ফুলের সুবাস মিলে এই স্বর্গীয় সুগন্ধটার সৃষ্টি করেছে। আশ্চর্য, কোনো পার্থিব ধরনের বাসনা একেবারে থাকে না এই সুমধুর গন্ধময়, নিস্তব্ধ, চিরশান্তিময় পরিবেশের মধ্যে।

ওকে দেখে রঘুনাথদাস বল্লেন–এসো মা। আমি তোমার কথা ভাবছিলাম, বোসো।

পুষ্প ওঁকে প্রণাম করতেই আচার্য্য বল্লন–অপুনর্ভব হও।

বিস্ময়ে পুষ্প শিউরে উঠে বল্লে–কি বল্লেন আচার্য্যদেব! ওকি কথা?…জানেন–

তিনি হেসে বল্লেন–ঠিক বলেচি মা।

–আপনি তো জানেন, আমার বাসনা কামনা কিছুই এখনো যায়নি, পৃথিবীতে আমার যাতায়াত বন্ধ হোলে কি করে চলবে? বলুন আপনি। জন্ম এখন থেকেই বন্ধ হবে?

রঘুনাথদাস পুষ্পের গায়ে সস্নেহে হাত বুলিয়ে অনেকটা যেন আপনমনে সুর করে বল্লেন–

কিয়ে মানুষ জনমিয়ে পশুপাখী, অথবা কীটপতঙ্গে
করমবিপাকে গতাগতি পুনপুন মতি রহু তুরা পরসঙ্গে।

এমন দিব্য মধুর সুরের সে গান, বিদ্যাপতির বাণী যেন মূর্ত হয়ে উঠলো সুগায়ক রঘুনাথদাসের কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে।

তারপরে পুষ্পকে বল্লেন–যাও, গোপালকে দেখা দিয়ে এসো। বড় অভিমানী–সামলে রাখতে হয়।

পুষ্প হেসে বল্লে–ওসব আপনার সঙ্গে, কই আমাদের সঙ্গে তো কোনোদিন একটা কথাও–

–হবে। দেখতে পাচ্চি মা, দেখতে পাচ্ছি। গোপালের চিহ্নিতা সেবিকা তুমি। সাধে কি বলেচি অপুনর্ভব হও। আমার মুখ দিয়ে মিথ্যা বার হয়নি।

–আপনি বুড়ো দাদু হয়ে বসে আছেন, দিন দিন ছেলেমানুষ হচ্চেন কেন? ও রকম বল্লে মায়ের অপরাধ হয় না?

বৃদ্ধ প্রসন্নমুখে বলেন–ঠিক মা ঠিক। যাও দেখে এসো–

একটু পরে পুষ্প আবার এসে তাঁর কাছে বসলো। এখানে সে কিজন্যে এসেছিল, তা যেন ভুলে গিয়েছে। এ পবিত্র আশ্রমে বসে কি করে ঐ সব কথা বলবে! হয়তো শেষ পর্যন্ত বলতে পারতো না, কিন্তু রঘুনাথদাসই বল্লেন–তোমাকে অন্যমনস্ক বলে মনে হচ্চে কেন?

–আপনি অন্তর্যামী, সব জানেন। লজ্জা করে আপনাকে মুখে বলতে–

রঘুনাথ কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসে রইলেন চোখ বুজে। তারপর গম্ভীরভাবে বল্লেন–কি চাও মা?

–সেই হতভাগীর সঙ্গে দেখা করতে বড় ইচ্ছে হয়। কি ভাবে আছে, যদি কোনো উপকার করতে পারি।

–সেই মেয়েটি প্রেতলোকে রয়েছে। তার চোখ খোলেনি, মনও অপরিণত। তার ওপর আত্মহত্যা-রূপ মহাপাপের ফলে প্রকৃতি একটা প্রতিশোধ নেবে।

–-একবার দেখা হয় না?

–সে কোথায় আছে জানি না? ভুবর্লোকের নিম্নস্তর, যাকে সাধারণত নরক বলে থাকে পৃথিবীর ভাষায়–সে অনেক বড় জায়গা। তারও আবার অনেক স্তর আছে–চলো দেখি–

–প্রভু আমার সঙ্গে তার একভাবে খানিকটা যোগ আছে, সুতরাং আমি গেলে তাকে বার করা সহজ হবে।

–ওসব না। সে মেয়েটি পৃথিবীর যে গ্রাম থেকে এসেছে–তারই নিকটবর্তী কোনো নিম্নলোকে ভ্রাম্যমাণা। স্থূল ধরনের বাসনা কামনা নিয়ে পৃথিবীর আকর্ষণ ছেড়ে ঊর্ধ্বলোকে ওঠা অসম্ভব।

একটু পরে পুষ্প রঘুনাথদাসকে নিয়ে প্রথমে এল কুড়লে বিনোদপুর, সেখানে কোন সন্ধান না পেয়ে গেল আশার বাপের গ্রাম রসুলপুরে। কয়েকটি নিম্ন শ্রেণীর ধূসরবর্ণের আত্মা গ্রামের বাঁশবনে, তেঁতুলগাছের ডালে, মাঠের মধ্যে বাবলা গাছে পা ঝুলিয়ে বসে হাওয়া। খাচ্চে। একটি দুষ্ট আত্মা গ্রামস্থ ব্রাহ্মণপাড়ার পুকুরপাড়ের এক নোনা গাছে বসে স্নানরতা স্ত্রীলোকদের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। প্রায় তুরীয় অবস্থায়। পুষ্প মনে মনে হেসে বল্লে–দ্যাখো পোড়ারমুখোর কাণ্ড! ইচ্ছে হয় গালে এক চড় বসিয়ে দিয়ে আসি-হাঁ করে যেন কি গিলচে–হি-হি–

অবিশ্যি ওই সব নিম্নস্তরের আত্মার কাছে তারা অদৃশ্যই রইলো।

রঘুনাথদাস বল্লেন–চলো, এখানকার কাছাকাছি নিম্নলোকে– এখানেই আছে।

অল্প পরেই ওরা এক বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তরের ন্যায় ঊষর স্থানে এসে পড়লো। তার চতুর্দিকের চক্রবাল-রেখা ধূমবাষ্পে সমাচ্ছন্ন–যেন মনে হয় কাঁচা বনে লতাপাতা পুড়িয়ে অজস্র ধূমসৃষ্টি করে দাবানল জ্বলচে। অথচ অগ্নিশিখা দৃশ্যমান নয়–শুধুই মরুময় ধূ ধূ প্রান্তর, মাঝে মাঝে বৃক্ষলতাহীন প্রস্তরস্থূপ। ওরা সেই জনহীন মরুদেশের ওপর দিয়ে শূন্যপথে ধীরগতিতে যেতে যেতে দেখলে সে রাজ্য সম্পূর্ণরূপে জনহীন, জলহীন, বৃক্ষলতাহীন। সেখানকার আকাশ নীল নয়, ঘোলাটে ঘোলাটে শুভ্র লঘু বাষ্পে ঢাকা। পুষ্পের মনে হোল ভাদ্র মাসের গুমটের দিনে পৃথিবীর আকাশে যেমন সাদামেঘ জমে থাকে–অনেকটা তেমনি।

পুষ্প বল্লে–এই জায়গাটা যেন কেমন বিশ্রী–

রঘুনাথদাস বল্লেন–এই সব ভুবর্লোকের নীচু স্তর, পৃথিবীতে যাকে নরক বলে। এ অনেকদূর ব্যেপে রয়েছে হাজার হাজার ক্রোশ চলে। যাও, পৃথিবীর ঠিক ওপরে পৃথিবীর চারিপাশ ঘিরে এ রাজ্য বর্তমান। অথচ পৃথিবীর লোকের কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। এখানকার বাসিন্দারা। আবার ভুবর্লোকের কোনো উচ্চ স্তর দেখতে পায় না।

–হাজার হাজার ক্রোশ! এমন জনহীন!

–তারও বেশি। যতদূর চলে যাও, এ অদ্ভুত লোকের আদি-অন্ত পাবে না। বহু হাজার ক্রোশ চলে যাও, এমনি। এ কোনো বাইরের অবস্থা নয়। এখানকার বাসিন্দাদের মানসিক অবস্থা-প্রসূত। এরাও অনেক সময় যতদূর যায়–এ জনহীন মরু-পাথরের দেশের আদি অন্ত পায় না খুঁজে, অন্য কোন প্রাণীকেও দেখতে পায় না। চন্দ্র নেই, সূৰ্য নেই, তারা নেই–এই রকম চাপা আলো–কখনো কালো হয়ে আসে, ঘোর কালো, পৃথিবীর অমাবস্যার মত। উপনিষদে এ লোকের কথা বলে গিয়েছে–অসূৰ্য্যা নাম তে লোকা অন্ধেন তমসাবৃতা–এই সে ভীষণ অন্ধ-তমিস্রা লোক–একশো বছর পর্যন্ত হয়তো টিকে যায়। সেই অন্ধকার কোন কোন পাপী আত্মার কাছে। সে হতভাগ্য আশ্রয় ও আলো খুঁজে, সঙ্গী খুঁজে হয়রান হয়ে পড়ে।

পুষ্প শিউরে উঠলো। অস্পষ্ট-স্বরে বল্লে–একশো বছর ধরে অমাবস্যা!

রঘুনাথদাস হেসে বল্লেন–কন্যা, জন্ম-মরণ-ভীতি-ভ্রংশী শ্রীকৃষ্ণমুরারির শরণ নাও–যেন এখানে কোনদিন আসতে না হয়। এ হোল হিরণ্যগর্ভদেবের রাজ্য, তিনি এখানে শাসক ও পালক।

–তিনি কে?

–ব্রহ্মের তিন রূপ–স্থূলরূপে বিরাট, সূক্ষ্মরূপে হিরণ্যগর্ভ, কারণ স্বরূপ ঈশ্বর।

–প্রভু, পৃথিবীর গ্রহদেব বৈশ্রবণ কে?

–তিনি পূৰ্ব্বকল্পের মহাপুরুষ। পৃথিবীর প্রজাপতি।

–তবে আপনার গোপাল কে?

রঘুনাথদাস প্রসন্ন হাস্যে বল্লেন–গোপাল সব। আমি ওকেই জানি। ওই ব্রহ্ম, ওই আত্মা, ওই ভগবান। আমি আর কারো খবর রাখিনে। ব্রহ্মের সাকার রূপ, জ্ঞানচক্ষে দেখলে মায়িক রূপ বটে। কিন্তু আমার চোখে গোপাল ব্রহ্মাণ্ড পরিপূর্ণ করে রেখেছে। আমার আর কোনো তত্ত্বে দরকার কি। ভক্তির চোখে ভাবের চোখে দেখতে শেখো ভগবানকে। তাঁর ঐশ্চৰ্য্য ভুলে যাও। তাঁকে বন্ধু ভাবো, পতি ভাবো–এমন কি দাস ভাবো।

পুষ্প বিস্মিত হয়ে বল্লে–দাস ভাববো? কি বলেন ঠাকুর!

রঘুনাথ চীৎকার করে বল্লেন–কেন ভাববে না? দাবি করে ভাবো। প্রেমের সঙ্গে দাবি করে ভাবো। তিনি ভক্তের দাসত্ব করেচেন–করেন। নি? তিনি যে প্রেমের কাঙাল–তাঁকে যেভাবেই ডাকো, ডাকলেই সাড়া দেবেন। তবে প্রেমের সঙ্গে ডাকা চাই। ভয় করে ডেকো না। ভয় করবার কিছু নেই তাঁকে।

পুষ্প মেয়েমানুষ, এ সব কথায় ওর চোখ দিয়ে দরদর ধারে জল গড়িয়ে পড়লো। যুক্তকরে নমস্কার করে বল্লে–আপনার আশীৰ্বাদ, ঠাকুর। নরকে এ কথা বল্লেন, নরক যে পুণ্যস্থান হয়ে উঠলো!

এমন সময় পুষ্প দেখতে পেলে আশাকে। একটা কালো পাথরের অনুব্বর টিলার ওপর সে মলিনমুখে চুপ করে বসে আছে।

রঘুনাথদাস বল্লেন–তুমি যাও মা। আমি এখানে থাকি।

–কিন্তু আমাকে যে ও দেখতে পাবে না?

–পাবে, যাও। কিন্তু একটা কথা মা–

–কি?

-–ওই কন্যাটির এখনও জ্ঞান হয়নি।

পুষ্প বিস্মিত হয়ে বল্লে–সে কি প্রভু! ও তো দিব্যি জেগেই বসে। আছে।

-–ও মেয়েটি ধূম্রযান দক্ষিণমার্গের পথিক। ওর গতির পথ বেঁকে আছে ধনুকের মত পৃথিবীর দিকে। তুমি দেখতে পা চ না মা! ও অল্পদিন হোল পৃথিবী থেকে এসেচেতার ওপর স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যু হয়নি। আত্মহত্যা করেচে। ওর মৃত্যু সম্বন্ধে ধারণাই হয়নি। যাও, কাছে গিয়ে বুঝতে পারবে।

পুষ্প কাছে যেতেই আশা বল্লে–তুমি আবার কে গো? হ্যাঁগো, এটা কি আলিপুরের বাগান?

পুষ্প সস্নেহে বল্লে–কেন বৌদি? এটা কি বলে মনে হচ্চে?

–বাড়ীওয়ালী মাসী বলেছিল আলিপুরের বাগান দেখাতে নিয়ে যাবে? সেখানে একটি কি বাবুর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেবে। আমি বলি, ছি ছি কি ঘেন্না, বলি–নেত্যদার সঙ্গে চলে এসেছিলাম সে আলাদা কথা। অল্প বয়েসে বিধবা হয়েছিলাম, কে খেতে পরতে দেয় সংসারে…না হ্যাঁ, সত্যি কথা বোলবো। মা বুড়ো হয়েছেন, তার ঘাড়ে আমার আর একটি বিধবা দিদি…আচ্ছা, মাহেশের রথতলা এখান থেকে কতদূর? তুমি কে?

পুষ্প ওর পাশে গিয়ে বসলো। ওর দিকে সস্নেহ দৃষ্টিতে চেয়ে। বল্লে–আমি তোমাকে চিনি। তুমি আমার বৌদিদি হও।

–তা এখানে কি মানুষ নেই? এটা কোন্ জায়গা? খিদে-তেষ্টা পেয়েছে কিন্তু একখানা খাবারের দোকান নেই। মহেশের রথতলাতে আমার এক দূর সম্পর্কের ভগ্নীপতি থাকে। সেখানে যাবার খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু এই অবস্থায় যেতে লজ্জাও করে–

–তুমি এখানে এলে কার সঙ্গে?

–এলাম কার সঙ্গে তা মনেই পড়ে না। একদিন বাড়ীওয়ালী মাসী বল্লে– তোমায় আলিপুরের বাগানে নিয়ে যাবো–সেখানে একটি বাবু তোমার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চায়। ঘরে সেদিন কিছু খাবার। নেই। বাড়ীভাড়া কুড়ি টাকার জন্যে তাগাদা করে করে বাড়ীওয়ালী তো আমার মাথা ধরিয়ে দিতে লাগলো। রাত্রে ঘরে খিল দিয়ে শুলাম, তারপর যে কি হোল, আমার ভাল মনে হচ্চে না।

–বাড়ীওয়ালী তোমায় আলিপুরে নিয়ে গিয়েছিল?

–কি জানি ভাই, তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। এখানে। আজ ক’দিন আছি তাও মনে নেই। খিদে-তেষ্টা পেয়েছে–অথচ খাবার পাইনে। না আছে একটা লোক, না আছে একটা দোকান-পসার। আচ্ছা, এর বাজারটা কোন দিকে?

পুষ্প কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বল্লে–আশা বৌদি, যতীনদাকে মনে পড়ে?

আশা কেমন যেন চমকে উঠে ওর দিকে অল্পক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে বল্লে–তুমি তাঁকে কি করে জানলে?

–জানি আমি। দেশের লোক যে গো! একগাঁয়ে বাড়ী।

আশার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। হাত দিয়ে মুছে বল্লে– তিনি স্বগ্‌গে চলে গিয়েছেন, তাঁর কথা আর আমার মুখে বলে কি লাভ?

–সে কথা বলচিনে বৌদি, সত্যি কথা বলো তো আমার কাছে, তাঁর কথা তোমার মনে হয় কি না?

আশা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বল্লে–হয়। যখন হয় তখন বুকের মধ্যে কেমন করে উঠে–

-–কেন বৌদি?

–আমি হতভাগী তাঁকে একদিনও সুখ দিইনি। তখন ছেলেমানুষ ছিলাম, বুঝতাম না।–কেবলই বাপের বাড়ী এসে থাকতাম শ্বশুরবাড়ী থেকে–

–কেন?

–শ্বশুরবাড়ীতে খাওয়া-দাওয়ার বড় কষ্ট পেতাম। ছেলেমানুষ তখন–

-–তোমার একথা সত্যি নয় বৌদি। আমার কাছে সব খুলে বলো ভাই?

আশা চুপ করে নখ খুঁটতে লাগলো। এ কথার কোনো জবাব দিলে। পুষ্প বল্লে–বলবে না ভাই?

আশা বল্লে–কি হবে শুনে সে সব কথা। আমার বুদ্ধির দোষেই যা কিছু সব হয়েছে। আমি আমাদের গ্রামের মজুমদার-পাড়ার একটা ছেলেকে ভালবাসতাম।

–বিয়ের আগে থেকে, না বিয়ের পরে?

–বিয়ের আগে নয়, কিছুদিন পরে।

–বিয়ের পরে অন্য কারো সঙ্গে ভাব করতে গেলে কেন? এটা খুব অন্যায় হয়েছে তোমার বৌদিদি। হিন্দুর মেয়ে, দ্বিচারিণীর ধর্ম কে শেখালে?

আশা চুপ করে রইল। পুষ্পের কড়াসুরে বোধহয় একটু ভয় খেয়েই গেল।

–কথার উত্তর দিলে না যে?

–আমার অদেষ্ট ভাই। ও কথার কি উত্তর দেবো?

-কিন্তু আমি তোমায় বলচি তুমি এখনও সেই লোকটাকেই ভালবাসো। যতীনদার ওপর তোমার কোনো টান নেই। আমি সব বুঝতে পারি ভাই। আচ্ছা, তোমার ঘেন্না হয় না? যার জন্যে এত কষ্ট, যে তোমাকে ফেলে চলে গেল, যার জন্যে তোমাকে আফিং খেয়ে মরতে হোল, আবার সেই ইতর লোকটার জন্যে এখনও ভাবনা? যতীনদা দেবতার মত স্বামী তোমার, তাকে একদিন দেখলে না মরবার সময়ে, তার কুলে কালি দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে এলে–

আশার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। সে বল্লে–আফিং খাওয়ার কথা তো কেউ জানে না–তুমি কি করে জানলে? আমি তো–

-আফিং খেয়ে তুমি মারা গিয়ে বৌদি। তুমি বেঁচে নেই–মরে প্রেতলোকে এসে কষ্ট পাচ্চ–

আশা এবার যেন খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললে। এটা তাহলে ঠাট্টা! তবুও আফিং খাওয়ার কথা এ কি ভাবে জানলে। পরক্ষণেই একথা ওর মনে হোল–কে এ মেয়েটা, গায়ে পড়ে আলাপ করতে এসেছে? এত হাঁড়ির খবরে ওর কি-ই বা দরকার? ওর গলা ধরে কে কাঁদতে গিয়েচে তা তো জানি নে। সে যা খুশি করেছে, তার জন্যে। ওর কাছে এত কৈফিয়ৎ দেবার বা কি গরজ। শ্বশুরবাড়ীর লোক বোধ হয়, ওই গাঁয়েরই মেয়ে–তাই এত গায়ে ঝাল।

মৃদু হেসে বল্লে–তা যাই বলো ভাই–মরে ভূত হওয়াই বই কি এক রকম–

পুষ্প দৃঢ়কণ্ঠে বল্লে–তা নয়। আমি ঠাট্টা করিনি। মারা তুমি গিয়ে। আফিং খেয়ে ঘরে খিল দিয়ে শুয়ে ছিলে কলকাতার বাসায়, মনে নেই? তারপর তুমি মরে যাও, মরে এই প্রেতলোকে এসেচ।

আশার মুখে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস ও সন্দিগ্ধতার চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখে ও বল্লে–এখনও বিশ্বাস হোল না বৌদি? আচ্ছা, তোমায় বিশ্বাস করবো। চলো–তোমাদের গাঁয়ে তোমাদের বাড়ী যাবো?

আশা কিছু না ভেবেই ঝোঁকের মুখে বল্লে–সেখানে আর কি মুখ নিয়ে যাবো

–গেলেও কেউ টের পাবে না। সত্যি-মিথ্যে চলো চট করে পরীক্ষা করে নিয়ে আসি। তোমার প্রেতদেহ হয়েছে। এ দেহ পৃথিবীর মানুষের চোখে অদৃশ্য।

পুষ্পের কথার ভাবে ও সুরে আশা কি বুঝলে যেন, ওর হঠাৎ ভয়ানক আতঙ্ক হোল। কি সব কথা বলে এ! যদি সত্যিই তাই হয়? সে যদি সত্যিই মরেই গিয়ে থাকে?

ঠিক সেই সময় একটি নিম্নশ্রেণীর প্রেত দুটি অল্পবয়সী মেয়েকে একাকী দেখে পূৰ্ব্বসংস্কার বশত ওদের দিকে ছুটে এল। মুখে দু একটি অশ্লীল কথাও উচ্চারণ করলে, ঘোর কামাসক্তিতে তার চোখ ও মুখের অবস্থা উন্মত্ত পশুর মত।

ওর বিকট হাবভাব দেখে আশা ভয়ে পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে চীৎকার করে বল্লে–ওই দ্যাখো ভাই কে একটা আসচে—মাগো–

পুষ্পও ভয় পেয়েছিল, সেও প্রথমটা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল কিন্তু হঠাৎ একটা আশ্চৰ্য্য কাণ্ড ঘটলো, লোকটা ওদের কাছে এসে পড়ে পুষ্পর দিকে চেয়েই জড়সড় হয়ে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল। তারপর দিগ্‌বিদিগ জ্ঞানশূন্য ভাবে ছুট দিলে সোজা।

হঠাৎ আশা ভয়ে ও বিস্ময়ে পুষ্পের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বল্লেওকি! তোমার কপাল দিয়ে আগুন বেরুচ্চে যে!…এ কি! ওমা– কি সৰ্ব্বনাশ।

পুষ্প অবাক হয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে দেখতে গেল। সে আবার কি! পরক্ষণেই ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো দরদর। করে। সে হাত দিয়ে মুছে বল্লে–ভাই বৌদি–

আশার ভয় ও বিস্ময় তখনও যায়নি। সে দূর থেকেই আপন মনে বললে–বাবাঃ–কি এ! আর দেখা যাচ্ছে না। কি আগুন!…

তারপর সে ছুটে এসে পুষ্পের পা দুখানা জড়িয়ে ধরে বল্লে–কে আপনি? আমায় বলুন কে আপনি? আপনি তো সহজ কেউ নয়। স্বগগো থেকে দেবি এসেছেন আমায় দয়া করতে?

আশার মুখ দিয়ে অজ্ঞাতসারে একটা বড় সত্য কথা বেরুলো।…

যতীন সব শুনলে। আশার এই পরিণতি! সেই আশা। কি জানি কেন শুধুই মনে পড়ে ওদের কাঁটালগাছের দিকের ঘরের সেই ফুলশয্যায়। বৃষ্টিধারামুখর রাত্রিটি, সেই সব দিনের কথা আজও যেন মনে হয়। কাল ঘটে গেল। কেন এমন অসারতা সংসারে, কেন এমন মিথ্যার উৎপাত! যা ভালো বলে মনে হয়, জীবন যাতে পরিপূর্ণ হোল মনে। হয়–তা কেন দুদিনও টেকে না? অমৃত বলে যা মনে হয়, তা থেকে বিষ ওঠে কেন?..

এই ঘোর বিষাদের দুর্দিনে যতীন সবদিক থেকে সব আলো একেবারে হারিয়ে ফেললে। কালো কালিতে সব লেপে একাকার হয়ে গেল। কেবল পুষ্প তাকে কত করে বুঝিয়ে রাখতো।

যতীন বলে–জীবনে আর কি রইল আমার? ওর সঙ্গে দেখাটা করিয়ে দাও

-–তোমাকে ও দেখতে পাবে না।

–তবে তোকে দেখতে পেলে যে?

–সে রঘুনাথদাস ঠাকুরের মহিমায়। তুমি কষ্ট পাবে। বৌদির সে কষ্ট তুমি কি করে দেখবে?

তখনকার মত যতীন বুঝে গেল। পুষ্পও কিছু নিশ্চিত হোল। একটা অন্য ঘটনাতেও যতীনের মন একটু অন্যদিকে চলে গেল। ওদের গ্রাম কুড়লে বিনোদপুরের রায় সাহেব ভরসারাম কুণ্ডুর বড় ছেলে রামলাল কুণ্ডুকে একদিন ও খুব বিষণ্ণ অবস্থায় দ্বিতীয় স্তরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখলে। একটা গাছের তলায় সে বসে আছে। গালে হাত দিয়ে, যতীন দেখে ওকে চিনতে পেরে তখনই ওকে দেখা দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করলে–নয়ত ওর দেহ রামলালের নিকট অদৃশ্যই থাকবে।

রামলাল ওকে দেখতে পেয়ে আশ্চর্য হয়ে হাঁ করে ওর দিকে চেয়ে রইল। বল্লে–যতীন না?

–হ্যাঁ। তুমি কবে এলে?

–আসা-আসি বুঝিনে, এ জিনিসটা কি বল তো? বাড়ী যাই, সবাইকে দেখি–বাবা, মা, বৌকেউ কথা বলে না। আমি মরে গিয়েচি বলে আমার নাম নিয়ে সবাই কাঁদছে।

–ঐ তো তুমি মরে এখানে এসেচ। এ জিনিসটাই মৃত্যু।

–আমারও সন্দেহ হয়েছিল, বুঝলে? কিন্তু ভাল বুঝতে পারিনি।

–কেন, তোমাকে কেউ নিয়ে আসেনি?

–আমার ঠাকুরদাদা এসেছিল, এখনও মাঝে মাঝে আসে। বড় বক বক করে, আমার পছন্দ হয় না।

রামলাল যতীনের বয়সী, বড়লোকের ছেলে। সুরা ও নারীর পেছনে গত দশ বছরে লাখখানেক টাকা উড়িয়ে দিয়েছে। অত বড় ব্যবসা ওদের, কখনো কিছু দেখতো না, বৃদ্ধ বাপ দোকান আগলে বসে থাকতো, রামলাল দোকান বা আড়তের ধারেও যেতো না। যতীন এসব জানে।

তারপর রামলাল হি-হি করে হেসে বল্লে–ঠাকুরদাদা কি করে জানো? রোজ দোকানে গিয়ে বাবার পাশে বসে থাকে, বেচাকেনা দেখে। বাবা হাত-বাক্সের সামনে যেখানে বসে না? ঠিক ওর পাশে। রোজ ঠাকুরদা গিয়ে দুঘণ্টা তিনঘণ্টা করে বসে। মানে, ঠাকুরদাদার নিজের হাতে গড়া আড়তটা, ওর মায়া বড় বেশি।

-বলো কি! উনি তো মারা গিয়েচেন আজ কুড়ি বাইশ বছর। তখন আমি কলেজে পড়ি, বেশ মনে আছে। এখনও রোজ তোমাদের আড়তে গিয়ে বসেন?

রামলাল আবার হি-হি করে হাসতে লাগলো। বল্লে–আচ্ছা ভাই, সেকথা যাকগে। এখানে কেমন করে মানুষ থাকে বলতে পারো? আজি কতদিন এসেচি ঠিক মনে নেই, তবে মাস দুইএর বেশি হবে না। একটা মেয়েমানুষের মুখ দেখতে পাইনি এর মধ্যে! এক ফোঁটা মাল পেটে যায়নি–ফুর্তি করবার কিছু নেই। ছ্যাঃ, নিরিমিষ জায়গা বাপু, যা বলো। মানুষ এখানে ট্যাঁকে?

পরে চোখ টিপে বল্লে–বলি, সন্ধানে-টন্ধানে আছে?

যতীন ওর পাশে বসলো। মনে মনে ভাবলে–A wasted life আমার নষ্ট হচ্চে যেজন্যে, তা আমার নিজের দোষ নয়, কিন্তু এ নিজে জীবনটাকে বিলিয়ে দিয়ে এসেচে নিজের হাতে!

রামলাল বল্লে–আছ কোথায়?

–এখানেই।

–মাঝে মাঝে এসো। বড় একা পড়ে গিয়েচি। আচ্ছা, হরিমতিকে দেখতে পাও? বুঝতে পেরেচ? –গাঙু গোসাইএর মেয়ে হরিমতি। তাকে এসে পৰ্য্যন্ত খুঁজচি–এক সময়ে তার সঙ্গে ছিল কিনা!

যতীন একটু অবাক হয়ে গেল। গাঙু গোসাঁই এর যে মেয়ের কথা এ বলছে, তাকে নিষ্ঠাবতী বৈষ্ণবী হিসেবে সে জানতো। তবে সে যুবতী এবং সুন্দরী ছিল বটে। আশালতা যেবার বাপের বাড়ী চলে গেল, সেই বছর সে কি জানি কেন গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায়। হরিমতির চরিত্র ভালো ছিল বলেই তার ধারণা আছে এ পর্যন্ত।

যতীন বল্লে–না, ওসব দেখিনি। তুমি এখন ওসব ছাড়। মরে। চলে এসেচ পৃথিবী ছেড়ে। মদ মেয়েমানুষ এখানে কি কাজে লাগবে। তোমার? হরিমতিকে তা হোলে তুমিই নষ্ট করেছিলে, তোমার জন্যে তাকে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হয়?

-না ভাই। তোমার পা ছুঁয়ে বলতে পারি। সে ভালো চরিত্রের মেয়ে গোড়া থেকেই ছিল না। অঘোর কুণ্ডুর সঙ্গে তার গোলমাল হয় তা আমি জানি। জানাজানি পাছে হয় তাতেই সে গলায় দড়ি দিয়ে মরে। আমায় অত খারাপ ভেবে না। ফুৰ্ত্তিটুৰ্ত্তি করতাম বটে, তা বলে–

–বেশ, তবে ও পথ একেবারে ছেড়ে দাও, নইলে যেমন কষ্ট পাচ্চ এমনি কষ্ট পাবে।

যতীন সেইদিন থেকে প্রায়ই রামলালের স্তরে গিয়ে তাকে বোঝাতো। রামলাল বাড়ীঘর পায়নি, গাছতলাই তার আশ্রয়স্থান। যতীন তাকে উপরের স্বর্গের কথা বলতো, ভগবানের কথা বলতো কিন্তু রামলাল। নিম্নস্তরের আত্মা, অতি স্থূল আসক্তিতে ওর মন বাঁধা। সে-সব ও কিছুই বোঝে না, ভালও লাগে না।

একদিন রামলালের ঠাকুরদাদা কেবলরাম কুণ্ডুর সঙ্গে দেখা! কেবলরাম ঘুঘু ব্যবসাদার, সামান্য অবস্থা থেকে বিখ্যাত ধনী ও আড়তদার হয়েছিল। ওকে দেখে বল্লে–আরে, তুমি ভবতারণের ছেলে। খুব মনে আছে তোমায়। আহা-হা, অল্প বয়সে তোমরা সব চলে এলে, বড্ড দুঃখের কথা। আমার নাতির দেখো না, ভরসারাম মরে গেলে অত বড় ব্যবসাটা গেল। কে দেখবে? এই তো সন্দে পর্যন্ত। আড়তে বসে ছিলাম। রোজ গিয়ে দেখি। বড় মায়া ঐ আড়তটার ওপর। ভরসারাম তো বাঁধা আসরে গাইলে। কষ্ট কাকে বলে তা তো জানলে না। একলক্ষ আশি হাজার টাকা ক্যাশ রেখে আসি ব্যাঙ্কে, উইলে দুভাইকে সমান ভাগে ভাগ করে–

যতীন বল্লে–কুণ্ডু মশাই, এখন ওসব ছেড়ে দিন। আপনি আজ কুড়ি বছর এসেছেন, আজও দোকান আড়ত নিয়ে আছেন কেন? আপনি না গলায় তুলসীর মালা দিতেন? হরিনাম করতেন?

–সে এখনও করি। তা বলে–

–আচাৰ্য্য রঘুনাথদাসের নাম জানেন?

কুণ্ডু মশাই দুহাত জোড় করে প্রণাম করে বল্লে–কে তাঁর নাম না জানে? আমরা তাঁর দাসানুদাস

–আপনি যদি আড়ত দোকানে যাওয়া ছেড়ে দিতে পারেন, তবে সেখানে নিয়ে যাবো। তাঁর কাছে।

কেবলরাম কথাটা বিশ্বাস করলে না। ভাবলে এ একটা কথার কথা বুঝি। উচ্চ স্বর্গের অনেক কথা যতীন সুতরাং ওকে বোঝাতে বসলো। পুষ্পের সঙ্গে একদিন দেখা করিয়ে দিলে। কেবলরাম হাত জোড় করে প্রণাম করে বল্লে–তুমি কে মা?

পুষ্প হেসে বল্লে–তোমার নাতনী, দাদু

কেবলরাম কেঁদে ফেললে। বল্লে–আমি পাপী, নরাধম। আমার সে ভাগ্যি কি আছে মা?

–মা নয়, আমায় দিদি বলে ডাকো দাদু-পুষ্প আবদারের সুরে বল্লে।

কেবলরাম সেদিন থেকে পুষ্পের ক্রীতদাস হয়ে গেল। পুষ্প ম্যাজিক জানে নাকি? যতীন এক এক সময়ে ভাবে। পুষ্প কেবলরামকে ভরসা। দিলে, এক দিন উচ্চ স্বর্গের বৈষ্ণব ভক্তদের লোকে ওকে নিয়ে যাবে। কেবলরাম মানুষটা সরল। বলে–দিদি, তুমিই তো দেবী, তুমি কম নও। ব্রাহ্মণের মেয়ে, তার ওপর আগুনের মতো আভা তোমার রূপের। আমি আর কোথাও যেতে চাইনে–তুমি দাদু বলে ডাকলে এই আমার স্বর্গ হয়ে গেল। আমরা কীটস্য কীট।

আত্মা ওঠে ভালবাসায়! ভালবেসে, ভালবাসা পেয়ে। পুষ্প পিতামহের। সমান বৃদ্ধ কেবলরামকে পৌত্রীর মত ভালবেসে ওকে তোলবার চেষ্টা করচে–যতীন বুঝতে পারলে। যতীনের শত লেচারেও এ কাজ হোত না। যতীন ভাবে–নাঃ, এসব কাজ পুষ্প পারে। পতিত-উদ্ধার কাজ আমার নয়। আমার নিজের কুকুর পথ্যি করে কোথায় তার ঠিক নেই।

কিন্তু রামলালের সাহায্য পুষ্পকে দিয়ে হবে না। পুষ্প অতি সুন্দরী নারী। রামলালের আসক্তি এখনও নিম্নমুখী, মোহে পড়ে যাবে, রামলালের মন গরে ওঠতে অনেক দেরি। অন্যভাবে ওকে সাহায্য করতে লাগলো যতীন।

রামলালের দেখা পেয়ে যতীনের খানিকটা ভাল লাগে। হাজার হোক, দেশের লোক, সমবয়সীও বটে। দুটো পৃথিবীর কথাবার্তা বলা যায়। দেবদেবীর মধ্যে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। শুধু বড় বড় কথা আর কাঁহাতক শোনা যায়–পুষ্পের মুখেই, বা অন্য যেখানে মাঝে দু দশবার গিয়েছে সেখানেই কি? পুষ্প বোঝে সব, বুঝে দুঃখিত হয়। রামলালের সঙ্গে অত মেলামেশা সে পছন্দ করে না।

যতীন রামলালের কাছে এসে বলে–রামলাল-দা, কি তোমার ইচ্ছে করে?

–একটা ইচ্ছে আছে, অন্য কিছু হোক না হোক, একটা সিগারেট যদি খেতে পারতাম, একেবারে কিছু নেই–ছ্যাঃ, এখানে মানুষ থাকে কি করে?

তোমার স্ত্রীকে তো রেখে এসেচ, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে না?

রামলাল ইতস্তত করে বল্লে–হ্যাঁ–তা–হ্যাঁ–সে তো প্রায়ই দেখছি।

–যাও সেখানে?।

–হ্যাঁ, তা–যাই। যাবে–চলো না গাঁয়ে একবার।

যতীন গেল কুড়লে-বিনোদপুরে। পুষ্পের বারণ আছে এসব জায়গায় আসবার। এলেই পার্থিব আসক্তি ও তৃষ্ণা আত্মাকে পুনরায় জড়িয়ে ধরে। রামলাল ওর নিজের বাড়ীর দিকে চলে গেল, যতীন নিজের বাড়ী এল; ওর ছেলেমেয়ে আছে শ্বশুরবাড়ীতে, কিন্তু তাদের ওপর একদিন যতীনের কোনো বিশেষ মায়া ছিল না, এখানে এসে তাদের জন্যেও মন কেমন করে উঠলো। ওদের বাড়ীটা একদম ভেঙে চুরে জঙ্গল হয়ে পড়ে আছে এই সাত আট বছরে। ঐখানে ঐ ঘরে সে আর আশা থাকতো, আশার হাতের চুনের দাগ এখনও ইট-বের করা দেওয়ালের গায়ে এক জায়গায়। ওখানে বসে আশা পান সাজতো, ষোল বছর আগের চুনের দাগ, কি তারও আগের হবে।

বিয়ের পরে প্রথমে আশা খুব পান খেতো এবং ওইখানটিতে বসে রোজ সকালে এক বাটা পান সাজতো সমস্ত দিনের মত। গুজব উঠলো এই সময়, পানে একরকম পোকা হয়েছে, অনেক লোক মারা যাচ্চে পোকা-ধরা পান খেয়ে, যতীন আর বাজার থেকে পান আনতে

না পাঁচ ছ’মাস। আশা বলতো–তুমি না খাও, আমার জন্যে এনো, না। হয় মরে যাবো পান খেয়ে, তোমার আবার বিয়ে বাকি থাকবে না। পান না খেয়ে থাকতে পারিনে–লক্ষ্মীটি–

কাল যেন ঘটে গিয়েছে সে সব দিন। আশা, আশালতা। স্বপ্ন… বহুদূর অতীতের স্বপ্ন আশালতা।

সন্ধ্যা হয়েছে। বোষ্টম বৌ ছাগল নিয়ে যাচ্ছে বাড়ীতে তাড়িয়ে আহা, বুড়ো হয়ে পড়েচে বোষ্টম বৌ। তা তো হবেই, আট বছর হয়ে। গেল। আচ্ছা তাকে যদি এখন দেখে বোষ্টম বৌ তো কি না জানি ভাবে!

হঠাৎ পেছন থেকে কে বলে উঠলো–তুমি কখন এলে গো?

যতীনের অন্তরাত্মা পর্যন্ত বিস্ময়ে শিউরে চমকে উঠলো সে পরিচিত কণ্ঠের ডাকে। সে পেছন ফিরে চাইলে, আশা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার পেছনে। পরনে লালপাড় শাড়ী, ঠিক যেমনটি পরতো কুড়লে বিনোদপুরের এ ঘরে; বয়েস তেমনি, চোখে না বুঝতে পারার বিস্ময়ের মূঢ় দৃষ্টি।

–আশা! তুমি এখানে! কি করে এলে।

আশা অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে আছে। যেন এখনো ভালো করে। বিশ্বাস করতে পারছে না।

যতীন ওর দিকে এগিয়ে গেল হাত বাড়িয়ে। বল্লে–আশা, চিনতে পারচো না আমায়?

আশা ওর মুখের দিকে তখনও চোখ রেখে বল্লেখু-উ-ব।

–তুমি কোথা থেকে এলে?

–কি জানি কোথা থেকে যে এলুম। আজকাল কেমন হয়েছে আমার, সবই যেন কি মনে হয়। কোনটা সত্যি কোটা স্বপ্ন বুঝতে পারিনে। সব ওলট-পালট হয়ে গিয়েচে কেমনতর। হ্যাঁগো, তুমি ঠিক তো?…

পরে ব্যস্ত হয়ে বল্লে–দাঁড়াও, একটা প্রণাম করে নিই তোমায়

প্রণাম করে উঠে বল্লে–কতকাল দেখিনি। ছিলে কোথায়? সংসার যে ছারেখারে গেল, বাড়ী ঘরদোরের অবস্থা এ কি হয়েছে! আমি এতকাল আসিনি। বাপের বাড়ী থেকে আমাকে আনলেও না। নিজেও ভবঘুরে হয়ে বেড়াচ্চ। ছেলেমেয়ে দুটোর কথাও তো ভাবতে হয়।

যতীন সস্নেহ কণ্ঠে বল্লে–ঠিক, ঠিক। তুমি ভাল আছ আশা?

–আমি ভাল নেই।

–কেন, কি হয়েছে? আশা, আমায় খুলে বলো সব

–মাথার মধ্যে সব গোলমাল। কিছু বুঝতে পারিনে। সব স্বপ্ন বলে মনে হয়। কত কি যে ঘটে গেল জীবনে, বুঝিনে কোনটা স্বপ্ন কোনটা সত্যি। এই তুমি দাঁড়িয়ে আছ সামনে, আমার যেন কেমন মনে হচ্চে। যেন মনে হচ্চে কে বলেছিল, তুমি-না ছিঃ সে কথা বলতে নেই।

–আশা, আবার ঘর সংসার পাতাই এসো–

–পাতাতেই হবে। আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েচে–এক জায়গায়। ছিলাম, মরুভূমি আর পাহাড়, লোক নেই জন নেই, কি ভয়ানক জায়গা। সেখানে যেন এক দেবীর সঙ্গে দেখা হোল, তাঁর কপাল দিয়ে আগুনের মত হকা বেরুচ্চে। কি তেজ! বাবাঃ–কি রকম সব ব্যাপার। ও সব স্বপ্ন, কি বলো?

–নিশ্চয়ই, আশা।

-তুমি এলে ভালই হোল। ঘরদোর ঝাঁটপাট দিই। উনুনগলা ভেঙে জঙ্গল হয়ে গিয়েছে। চড়ই পাখীর বাসা হয়েছে কড়িকাঠে। হাটবাজার করে এনে দাও। সেই মরুভূমির মত জায়গা থেকে কে যেন আমায় এখানে টেনে নিয়ে এল। থাকতে পারলাম না।

পরে কাছে এসে অপরাধীর সুরে বল্লে–হ্যাঁগো, আমায় বাপের বাড়ীতে ফেলে রেখেছিলে কেন এতদিন? রাগ করেছিলে বুঝি?

যতীন স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইল, সে দৃষ্টিতে গভীর অনুকম্পা, অতলস্পর্শ অনুকম্পা–সৰ্ব্ববাসনাশূন্য উদার ক্ষমা…কোনো কথা বল্লে না।

আশা মুগ্ধদৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে হাসি হাসি মুখে বল্লে–বেশ চেহারা হয়েছে তোমার।

হঠাৎ আশা চীকার করে উঠলো–একি! ওমা, একি হোল! কোথায় গেলে গো? এই যে ছিলে? ওমা এ সব কি!

যতীন বুঝলে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েচে আশার কাছে। পৃথিবীতে কতক্ষণ সে থাকবে, পৃথিবীর আসক্তি ও চিন্তায় তার দেহ স্থলস্তরের দর্শনযোগ্য হয়েছিল অল্প সময়ের জন্যে, ওর চিন্তার প্রবল আকর্ষণ। নরক থেকে আশাকে এনেছিল এখানে। আশাও আর থাকতে পারবে না। এখুনি ওকে চলে যেতে হবে। উভয় স্তরে জীবের কোন যোগাযোগ নেই।

রামলাল পর্যন্ত এসে যতীনকে আর দেখতে পেলে না। যতীনের দেহ আবার তৃতীয় স্তরের মত হয়ে গিয়েছে।

রামলাল বল্লে–কোথায় গেলে, ও যতীনদা? থাকো থাকো, যাও কোথায়? ও যতীনদা–

ততক্ষণে নরকের প্রবল আকর্ষণে আশাও তার নিজের স্তরে নীত হয়েচে।

যতীন দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে। এ জগতের এই নিয়ম!

আশা সত্যিই বলেচে, কোটা স্বপ্ন কোটা আসল তা বোঝবার যো নেই।

সে কোন্ দেবতা, যাঁর শরণ সে নিতে চায়, এ স্বপ্নের শেষ করতে চায়। করুণাময় এমন কে মহাদেবতা আছেন, যাঁর কৃপাকটাক্ষে আশা তো আশা, কত মহাপাপী উদ্ধার হয়ে যায় চোখের এক পলকে, মহারুদ্রের জ্যোতিস্ত্রিশূলের এক চমকে অনন্ত ব্যোম ঝলমল করে ওঠে পুণ্যের আলোয়, পাপতাপ পুড়ে হয় ছারখার, অবাস্তব স্বপ্নের অবসানে। হে অনন্তশয়নশায়ী নিদ্রিত মহাদেবতা, জাগো, জাগো!

ওদের বাড়ীর পেছনের বাঁশবনে কর্কশস্বরে পেঁচা ডাকচে। শীতকালে রাধালতায় থোকা থোকা ফুল ফুটেচে বেড়ার ঝোঁপজঙ্গলে। ঝিঁঝি ডাকচে ডোবার ধারে। মনে হয় চাঁদ উঠেচে পূৰ্ব্বদিকের আকাশে। আকাশের নক্ষত্রদল পাৎলা হয়ে এসেচে। বোধ হয় পৃথিবীর কৃষ্ণা প্রতিপদ কিংবা দ্বিতীয়া তিথি।

পুষ্প করুণাদেবীর দেখা পায়নি বহুদিন।

তিনি নানা ধরনের কাজে সৰ্ব্বদা ব্যস্ত থাকেন, পুষ্প সেজন্যে তাঁকে তেমন ডাকে না। আজ অনেকদিন পরে পুষ্পের মনে হোল, করুণাদেবীর একবার খোঁজ করা দরকার। সে ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্যে উচ্চস্বর্গে উঠে গেল, তাঁর সেই ক্ষুদ্র গ্রহটিতে, সেই কুসুমিত উপবনে। যখনই সে এখানে আসে তখন কি এক বিস্ময়কর আবির্ভাবের আশায় সৰ্ব্বদা সে থাকে, কি সৌন্দর্য্য ও শান্তির লীলাভূমি এই পবিত্র দেবায়তন। সুগন্ধ কিসের সে জানে না, কোন্ ফুলের সে সুগন্ধ তাও জানে না–কিন্তু অন্তরাত্মা তৃপ্ত হয়, সারা মন খুশি হয়ে ওঠে হঠাৎ। মহারূপসী দেবী ওকে হাসিমুখে হাত ধরে একটি বিশাল বনস্পতিতলে স্ফটিকবেদীতে নিয়ে গিয়ে বসালেন। পুষ্প চেয়ে চেয়ে। অবাক হয়ে ভাবলে–এ গাছ তো এত বড় দেখিনি, এত বড় গাছই তো ছিল না।

করুণাদেবী মৃদু হেসে বল্লেন–কি ভাবচ, গাছটার কথা? ও তৈরি করেচি। বনস্পতিতে ভগবানের প্রত্যক্ষ আবির্ভাব। তাই দেখি সারা সময় চোখের সামনে।

–কি গাছ?

–পৃথিবীতে ছিল না কোনোদিন, নাম নেই।

–আমি আপনার কাছে কোনো অপরাধ করেছিলাম কি? দেখা দেননি কতদিন। আমার কষ্ট তো জানেন সব। আপনি একবার চলুন, যতীনদা বড় কাতর হয়ে পড়েছে, আশা-বৌদি নরকে। আত্মহত্যা করেছিল।

করুণাদেবী অদ্ভুত ধরনের হাসি হাসলেন। বল্লেন–সব জানি। আমার পৃথিবীর ছেলেমেয়েদের সন্ধান রাখিনে আমি! আমিই যতীনের ব্যাকুলতা দেখে তার সঙ্গে ওর স্ত্রীর দেখা করিয়ে দিই। নইলে নরক থেকে পৃথিবীতে গিয়ে দেখতে পেতো না যতীনকে। এই দেখাতে আশার উপকার হবে–

–যতীনদা সেই থেকে কিন্তু পাগলের মত হয়েচে–

–যতীন অজ্ঞান।

–আপনি ভাল বোঝেন সব, দেবী। আপনি যতীনদা’কে সুখী। করুন। ওর কষ্ট দেখতে পারিনে। আশা বৌদির ভাল হয় কিসে?

করুণাদেবী ওকে কাছে টেনে নিয়ে ছোট্ট মেয়েটির মত ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে ওর গালে হাত বুলিয়ে অতি ধীর শান্ত সুরে বলতে লাগলেন–পুষ্প তোকে ভালবাসি বড়। মনে আছে সব। ভাল হবে শেষে, কিন্তু লক্ষ্মী, পুষ্প–

–কি দেবী?

করুণা দেবীর চোখে জল! পুষ্প অবাক হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে কেমন। মায়া হোল এই রাজরাজেশ্বরীর মত রূপবতী মহাশক্তিধারিণী দেবীর ওপর, কোলে শায়িতা ছোট্ট খুকী যেন তার মেয়েটির মত। ভগবান এমন ভাবেই বোধ হয় মানুষের কাছে ধরা দেন ঐশ্চৰ্য্য লুকিয়ে। সে নিজের অজ্ঞাতসারে অসীমস্নেহে করুণাদেবীর চোখের জল মুছিয়ে দিলে নিজের বস্ত্রাঞ্চলে।

দেবী বল্লেন–তোকে বড় দুঃখ পেতে হবে।

পুষ্পের বুকের মধ্যে দুরু দুরু করে উঠলো। কেন, কিসের দুঃখ? কি কথা বলতে চাইছেন দেবী?

দেবী আবার বল্লেন–যতীন ও তোমাকে এক জায়গায় যেতে হবে আমার সঙ্গে। তার দরকার আছে। তুই চলে যা পুষ্প, আমি যাবো তোরই বাড়িতে একটু পরে। তারপর আমার সঙ্গে তোদের পৃথিবীতে একবার যেতে হবে।

–দেবী, গ্রহদেবের দেখা পাবো?

–সময় পাবে পুষ্প। তিনি কিছু পূৰ্ব্ব এখানে ছিলেন।

উচ্চস্বর্গে দেবলোকের প্রেমিক-প্রেমিকা। পুষ্প যতই এঁদের দুজনকে দেখে, ততই আনন্দে ও শান্তিতে মন পূর্ণ হয়ে ওঠে।

পুষ্প ও যতীনকে সঙ্গে নিয়ে করুণাদেবী একটি পুরাতন শহরে এলেন।

বাড়ীঘর সব পুরোনো ধরনের, পাশ দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেচে, রাস্তাঘাট সেকালের ধরনের সরু সরু। একটা পুরোনো বাড়ী গলির মধ্যে, সেই বাড়ীর পাশে ছোট্ট একটা বাগান। বেলা গিয়েচে, সন্ধ্যার কিছু আগে। বাড়ীটার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পুষ্প ও যতীন দুজনেরই মনে হোল, এখানে ওরা যেন এর আগে এসেচে। যেন কতকাল আগে, ঠিক মনে করতে পারছে না।

হঠাৎ যতীন বল্লে–এটা কোন্ জায়গা দেবী, আমি এ বাড়ী চিনি। বলে মনে হচ্চে–

তার মন আজ আনন্দে পূর্ণ, কারণ বহুদিন পরে আজ সে করুণাদেবীর দেখা পেয়েছে। এ যে কত সৌভাগ্যের কথা, এতদিন এখানে থেকে সে ভাল বুঝেচে।

দেবী বল্লেন–বেশ, বাড়ীর ভেতর যাও–

যতীনের মনে হোল এ বাড়ীর ভেতরের উঠোনে একটা পেয়ারার গাছ আছে, সে কতকাল আগে সেই গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খেতো। বাড়ীর মধ্যে ঢুকতেই একটি ছোট ঘর। একটা কুলুঙ্গির দিকে চাইতেই যেন বহু পুরোনো দিনের সৌরভের মত কোথাকার কত হারানো। দিনের বহু অস্পষ্ট স্মৃতির সৌরভ এল কুলুঙ্গিটা থেকে। এক সুন্দরী নববধূর মুখ যেন মনে পড়ে, ঐ কুলুঙ্গিতে সে তার মাথার কাঁটা রাখতে শোবার আগে, এই ঘরের সঙ্গে যেন এক সময়ে কত সম্পর্ক ছিল। ওর। বাড়ীটাতে অনেক ছেলেমেয়ে চলাফেরা করচে, দুটি মধ্যবয়সী স্ত্রীলোক রান্নাঘরে কাজকর্ম করচে। ঐ তো সেই পেয়ারা গাছটা। ওর তলায় বসে সে কত খেলা করেছে একটি মেয়ের সঙ্গে–মেয়েটিকে সে বড় ভালবাসতো। আজও যেন তার মুখ মনে পড়ে–কোথায় যেন। চলে গিয়েছিল মেয়েটি।

পুষ্প ওর পেছনে পেছনে এসে বাড়ীর মধ্যে ঢুকচে। সে বল্লে– যতীনদা, ওই সেই পেয়ারা গাছ–

–কোন্ পেয়ারা গাছ–

–মনে পড়চে ওর তলায় তুমি আর আমি খেলা করতাম, অনেক কাল আগে–স্পষ্ট মনে হচ্চে–

–তুই তবে সেই মেয়ে পুষ্প–আমারও সব মনে পড়েছে। তুই মরে গিয়েছিলি আমার আগে। সে সব দিনের দুঃখুও যেন মনে আসছে।

-তুমি মারা গিয়েছিলে যতীনদা। আমায় ওই বলে গালাগালি দিও না, বালাই ষাট, আমি মরবো কেন?

–দেবী সঙ্গে নেই তাই তোর বাড় হয়েচে, তুই যা তা বলছিস আমায় পুষ্প! আচ্ছা, বল তো, এক জায়গায় এ বাড়ীতে এক বুড়ো লোক বসে থাকতো, তার কি যেন হয়েছিল, বসেই থাকতো। মনে পড়চে তোর?

–মনে হয়েচে, দেওয়ালের গায়ে বালিশ ঠেস্ দিয়ে।

যতীনের মনে হচ্ছিল যেন সে একটি সুপরিচিত স্থানে বহু, বহু কাল পরে আবার এল। এ বাড়ীর সব ঘরদোর সে চেনে, অনেক কাল আগে এ বাড়ীতে সে বেড়িয়েছে প্রত্যেক ঘরদোরে। বহু প্রিয়জনের দূরাগত স্মৃতি যেন একটি গুরুভার বেদনার মত বুকে চেপে বসেচে।

বাড়ীর ছেলেমেয়েরা রান্নাঘরে খেতে বসেচে। খুব গোলমাল করচে নিজেদের মধ্যে। ওদের প্রতি এমন একটি স্নেহ হয়েচে যতীনের, এরা অতি আপনার জন, কতদিনের সম্বন্ধ এদের সঙ্গে। যতীন দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। ছেলেমেয়েদের খাওয়া হয়ে গেল, ওদের মা এবার হাতায় করে দুধ পাতে পাতে দিচ্ছে। অনেক পুরোনো হয়ে গিয়েচে বাড়ীটা, তার জানা বাড়ী এর চেয়ে ভাল, নতুন ছিল। সে সব বুঝতে পেরেচে, করুণাদেবী তাদের কেন এখানে এনেছেন।

পুষ্প বল্লে–যতুদা, আমাদের পূৰ্ব্বজন্মের দেশ। কোন্ গ্রাম এটা বলতে পারো? তুমি আমি এখানে জন্মেছিলাম।

–তুই মরে গিয়েছিলি আমার আগে-রাগ করিনি বলচি বলে।

–আমার মনে পড়েছে।

–গত জন্মেও তাই। এই রকমই হচ্চে জন্মে জন্মে। তুই মারা যাচ্ছিস, আমি তোর পেছনে যাচ্ছি। কিন্তু আর একটি মেয়ের কথা বড় মনে পড়ছে। তাতে আমাতে কিছুদিন এখানে ছিলাম। তারপর সেও কোথায় গেল চলে।

ওরা বাইরে এল। করুণাদেবী বল্লেন–মনে পড়লো?

কিন্তু এ যে অদ্ভুত মনে পড়া। কত নিবিড় বর্ষারাতের টিপ টিপ জলপতনের সঙ্গে, কত বসন্তের প্রথম রোদে পোড়া মাটির গন্ধের। সঙ্গে জীবনের মস্ত বড় যাত্রাপথ একসুরে বাঁধা, আনন্দে নিবিড় স্মৃতি সেখানে বেদনার সঙ্গে এক হয়ে গিয়েচে–গভীর বেদনা, যা শুধু জন্মজন্মান্তরের হারানো প্রিয়জনের বার্তা বহন করে আনে অন্তরতম অন্তরে। মনে হয়, সবই কি তবে মিথ্যে, সবই স্বপ্ন?

যতীনের দিশেহারা বিষণ্ণ দৃষ্টিতে ওর মনের কথা পরিস্ফুট হোল। করুণাদেবী বল্লেন–ওই জন্যে তোমাদের এনেচি। এখানে তোমাদের। ঠিক এবারকার জন্মের আগের জন্মভূমি।

পুষ্প বল্লে–এ কোন্ গ্রাম দেবী? নাম মনে নেই।

–ত্রিবেণী। গঙ্গার তীরে। ঐ গঙ্গা–

-তা হোলে গত দুই জন্মে আমরা কাছাকাছিই ছিলাম, গঙ্গারই ধারে। এবার তো হালিসহরের এ পার সাগঞ্জ-কেওটায়।

–স্থানের আকর্ষণ অনেক সময় এমন হয় যে গত জন্মের ভূমিতে কোনো না কোনো সময় আসতেই হবে। তবে জন্মান্তরীণ স্মৃতি সব আত্মার থাকে না পৃথিবীর স্থূলদেহে। কখনো কেউ জাতিস্মর হয়। জাতিস্মর হওয়া উচ্চ অবস্থার লক্ষণ।

যতীন চুপ করে ছিল। তার মন ভাল নেই। জগৎ ও জীবন দেখচি সব ভেলকির মত। কোনটা সত্যি? কোন্টা মিথ্যে? বাজে জিনিস সব। বাঁচা মরা কিছুরই মধ্যে কিছু নেই। কেন এ বিড়ম্বনা?

সে জিজ্ঞেস করলে–দেবী, এরা আমার কে? এখন যারা আছে।

–তোমার পৌত্রের পৌত্র।

–আর পুষ্পের?

–পুষ্প অবিবাহিত অবস্থায় মারা যায়। আশা এ বাড়ীতে তোমার। প্রথমা স্ত্রী ছিল। সে অল্পবয়সে তোমায় ছেড়ে চলে যায় এবারের মত। আমিই তোমাদের মিলিয়ে দিয়েছিলুম তিনজনকে আবার এ জন্মে। কিন্তু কর্মের ফল আমি খন্ডন করতে পারিনি তোমাদের চেষ্টা করলাম, কিন্তু কর্মশক্তি নিজের পথ ধরল ঠিক।

যতীন হতাশ সুরে বল্লে–আপনি যখন পারলেন না, তখন আর কি উপায় দেবী। আপনি স্বয়ং যখন

করুণাদেবী বল্লেন–কৰ্ম্মের বন্ধন স্বয়ং ভগবান কাটাতে পারেন চোখের পলকে। তিনি ছাড়া আর কে পারে।

-আমি কি করেছিলাম দেবী, কেন আমার এ দুর্ভাগ্য দুই জন্ম ধরে?

–এরও আগের জন্ম দেখবে? কিন্তু ছবি দেখাবো। সামনের আকাশে চাও–সে স্থান এখন আর নেই, প্রাচীন গৌড়ের নিকটবর্তী ক্ষুদ্র গ্রাম। সে জন্মে প্রথম স্ত্রীর মনে কষ্ট দিয়ে দুবার বিবাহ করেছিলে। সে তোমায় বড় ভালবাসতো। সেজন্যে তাকে আর আপনার করে পেলে না পর পর দু’জন্মেও। সতী লক্ষ্মীর মনে বড় কষ্ট দিয়ে ত্যাগ করেছিলে।

–সেও কি আশা?

–না।

–তবে সে কে দেবী? বলুন দয়া করে–সে কি অন্যত্র চলে গিয়েছে?

–সে এই তোমার পাশেই দাঁড়িয়ে। সতীলক্ষ্মী তোমায় ছাড়েনি, কিন্তু তোমার কৰ্ম্মফলে তুমি ওকে পাচ্ছ না। আমি পর পর দু’জন্ম চেষ্টা করচি, কিন্তু পেরে উঠচি কই!

পুষ্প অবাক হয়ে দেবীর মুখের দিকে চেয়ে রইল। এ সব কথা তার মনে নেই।

করুণাদেবী বল্লেন–তারও পূৰ্ব্ব জম্মে তোমার কৰ্ম্ম আরও খারাপ। যাক এ সব কথা। তোমাকে তিন জন্মের কথা জানতেই হবে, এর কারণ আছে। পুষ্প, তুই কষ্ট পাবি আমি জানি। আমি চেষ্টা করবো সে দুঃখ দূর করতে। যতীনকে ওর পূর্বজন্ম দেখালাম, কারণ ওর আত্মার প্রয়োজন হয়েছে।

পুষ্প বিবর্ণ মুখে বল্লে–কেন দেবী?

করুণাদেবী ওর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চেয়ে বল্লেন–যতীনকে পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হবে।

পুষ্প জানে। সে জানে তার প্রশ্ন নিরর্থক। সে অনেকদিন থেকে বুঝতে পেরেছে। এই ভয়ই তার মন করছিল।

যতীন চমকে উঠলো। এত অল্পদিনে আবার পুনর্জন্ম কেন? কোথায় রইল আশা, কোথায় রইল পুষ্প-কার কাছে যাবে সে পৃথিবীতে?

তখনি তার মন বলে উঠলো–কেন, মায়ের কাছে। যার কোল আঁধার করে সে চলে এসেচে।

করুণাদেবী বল্লেন–যতীন, তোমার অন্তরাত্মা চাইচে ঐ দুঃখিনী মায়ের কোলে আবার ফিরে যেতে। তোমার মায়ের অন্তরাত্মা কাঁদচে তোমার জন্যে। সেখানে যেতে হবে তোমাকে। এ বাঁধন এড়াবার যো নেই। মাতৃশক্তি জগতের মধ্যে খুব বড়। তা ছাড়া আশার জন্যে তোমাকে যেতে হবে ভূলোকে। ভুবর্লোকের কোন উচ্চস্তরে ও যেতে পারবে না-বেচারী! গ্রহদেবকে আমি বলেছি, আশার অন্তরাত্মা কাঁদচে, অনুতাপে সব পাপ মোচন হয়। আশাকেও আবার পৃথিবীতে পাঠাবো। তুমি জন্মগ্রহণের কিছু পরে। এই পাঁচ ছ’বছর ওকে নরকেই থাকতে হবে। তার আত্মা তাতে উন্নতি করবে। নিজের ভুল ক্রমশ বুঝবে। এই জন্মে আমি আবার তোমাদের মিলিয়ে দেবো। বোধ হয় তোমাদের প্রারব্ধ ও জন্মে কেটে যাবে।

পুষ্প পাষাণমূর্তির মত দাঁড়িয়ে সব শুনলে। আকাশ পৃথিবী তার কাছে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। জন্ম জন্মান্তর যে জীবনের মাস, ঋতু ও বৎসর মাত্র, তাও যে শূন্য অন্ধকার। ভূমা নয়, অল্পেই তার সুখ ছিল।

করুণাদেবী সব জানেন। পুষ্পকে তিনি বুঝিয়ে বল্লেন। আশার জন্যে ও স্বার্থত্যাগ তাকে করতে হবে, যতীনের জন্যেও। এই জন্মে আশার সব ভুল মুছে দেওয়ার চেষ্টা তিনি করবেন। আচাৰ্য রঘুনাথদাস আশার আত্মার জন্যে তাঁর ইষ্টদেবকে জানিয়েছিলেন।

ভক্তের ক্ষমতা বড় তুচ্ছ নয়। গ্রহদেবের আসন টলেচে।

পুষ্প বল্লে–বুঝেচি। তিনি মহাপুরুষ, সেদিন যখন নরকে নিয়ে গেলেন আমায়, তখনই আমার মনে হোল নরক পবিত্র হোল! আপনারও আসন টললো–আমি ডাকলে আপনি ছাই আসেন!

করুণাদেবী বালিকার মত সকৌতুকে খিল খিল করে হাসলেন। বল্লেন–তুই আমার ওপর রাগ করলি বুঝি? ছিঃ–লক্ষ্মী দিদি

পুষ্পের অভিমান তখনও যায়নি। সে দুষ্টু মেয়ের মত ঘাড় বেঁকিয়ে। চুপ করে রইল।

দেবী বল্লেন–তোকে আমার কাছে নিয়ে যাবো পুষ্প–

–না। আমাকেও পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন না, দিন না দয়া করে। সত্যি বলচি। স্বর্গে আমার দরকার নেই।

পৃথিবীতে পাঠিয়ে কি হবে? এবার যে চেষ্টা করবো ওদের দুজনকে মিলিয়ে দিতে। পৃথিবীর মিলন না হোলে আশার প্রারব্ধ কিছুতেই কাটবে না। এ আত্মত্যাগ তুই করতে পারবি আমি জানি। ওরা জন্ম নিলেই তো সব ভুলে যাবে, কোন কথা মনে থাকবে না এ জন্মের। আমি আবার দেখা করিয়ে দিই, যে যাকে চায় মিলিয়ে দিই। নতুবা জীবের কি সাধ্য?

পুষ্প বল্লে–আমাকেও পাঠিয়ে দিন, সব ভুলে থাকি।

করুণাদেবী ওকে কাছে নিয়ে এলেন আদর করে। পুষ্পের দেহ শিউরে উঠলো, কি অপূর্ব সুগন্ধ দেবীর সারাদেহে, কি অপূৰ্ব্ব

স্পর্শসুখ! সে মেয়েমানুষ, তবুও এই রূপসী দেবীর স্নিগ্ধস্পর্শে ওর সারাদেহে যেন তড়িৎসঞ্চার হোল। অমৃতস্পর্শে আত্মা যেন নিজের অমরত্ব, অনন্তত্ব অনুভব করলে এক মুহূর্তে।

সস্নেহে বল্লেন–পুষ্প, তোকে পৃথিবীতে আর জন্ম নিতে হবে না। শুক্লা গতির পথে তোর অনাবৃত্তি লাভ ঘটেচে। ওরা এখনও অপরিণত, শেখবার বাকি আছে, কৰ্ম্ম এবার নষ্ট হয়ে যাবে হয়তো। পৃথিবীর জীবন বেশিদিনের নয়। আত্মার পক্ষে চোখের পলক মাত্র। আমি এবার যাই পুষ্প।

পুষ্প বল্লে–আমায় পৌঁছে দিয়ে যান–

–নিশ্চয়, চল যাই–

যাবার সময় করুণাদেবী বলে গেলেন, তাঁকে স্মরণ করলেই তিনি। আসবেন।

যতীন একা বসে ছিল বাড়ীতে। পৃথিবীতে আবার জন্ম নিতে হবে। শত সুখদুঃখের বন্ধনে আবার জড়ানো, মন্দ কি? সেই গরীব ঘরের বৌটির কোল আলো করে আবার শিশু হয়ে কত বাল্যলীলা করবে, নতুন আস্বাদ, আবার আসবে আশা-হতভাগিনী আশা–নববধূরূপে তার ঘরে, আবার কত বর্ষারাত্রি, কত বসন্তপ্রভাত ওর সাহচর্য্যে। কাটবে। পৃথিবীতে যেতে তার কষ্ট নেই, মধুর সেখানকার শৈশব, মধুর কৈশোর মধুর যৌবন। চিরযৌবনের হাওয়া যেন বয় তার অমর আত্মায়, পৃথিবীতে মাস যাবে মাস আসবে, নতুন ধানের গন্ধ বেরুবে ক্ষেতে ক্ষেতে, ক্ষুধায় বনের মেটে আলু তুলে নুন দিয়ে পুড়িয়ে খাবে, তার মা যখন বৃদ্ধা হয়ে যাবে তাকে খাওয়াবে, আশা সংসার পাতবে নতুন লক্ষ্মীর হাঁড়িতে ধান দিয়ে।…

কেবল কষ্ট হয় পুষ্পের জন্যে। এতদিন ওর সঙ্গে থেকে কি মায়াই হয়েচে ওর ওপরে। কেন এমন বিচ্ছেদ? কি কষ্ট পাবে পুষ্প, তা সে জানে। আশা যদি কষ্ট না পেতো, যতীন কিছুতেই যেতো না।

পুষ্প এসে ওর হাত ধরে বল্লে–যতীনদা!

–কি পুষ্প?

–আমার ভুলো না।

–আচ্ছা, পুষ্প–তুই বলতে পারিস, কেন আমাদের জীবনে এ দুর্ভাগ্য, কেন বার বার তোকে হারাচ্চি? তোর বৌদিদিকে হারাচ্চি?

–আমায় নিয়ে যাও সঙ্গে–

–ছিঃ পুষ্প। দেবী যা বলেন তাই তোমার আমার পক্ষে শুভ। ওঁর কথা শোনো।

–আমি কারো কথা শুনবো না, আমি যাবো।

–কি, এবারও একসঙ্গে খেলা করবি পুষ্প? তেমনিধারা সাগঞ্জ কেওটার ঘাটে? বেশ–অদ্ভুত সে সব দিন।

যতীন চোখ বুজে ভাবতে লাগলো। পুষ্প ওর হাত ধরে বসে রইল, বল্লে–তাই তো সাগঞ্জ-কেওটার বুড়োশিবতলার ঘাট এ লোকেও ভুলতে পারিনি। জন্মান্তরের স্মৃতিতেও অক্ষয় যেন হয়। তোমার যাওয়ার পথে দেবতারা ফুল ফেলুন যতুদা–আমি হতভাগিনী চিরকাল একাই থাকবো। এই আমার ভাগ্য।

যতীন ওর মুখের দিকে চেয়ে বল্লে–আমার মুক্তিতে দরকার নেই, কোনো কিছুর দরকার নেই। সমাধি-টমাধি, দেবী-টেবী সব বাজে। তোকে ছেড়ে যাবো না।

–আশা?

–তার অদৃষ্টে যা হয় হবে পুষ্প।

–ঠিক কথা যতুদা?

–প্রাণের সত্য কথা বল্লাম। এখন আমার অন্তর যা বলচে। সব। তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে আমার কাছে–তুই থাক্‌ পুষ্প আমার!

–জগতের, বিশ্বের বহুদূর সীমানায় চলে যাও যতুদা, তোমায় মুক্তি দিলাম। ভালবেসো, ভুলো না।

–ওসব থিয়েটারী ধরনের কথা কোথায় শিখলি রে? তোদের দোহাই, মুক্তি-টুক্তির কথা আমায় আর শোনানে। চল্ তুই আর আমি পৃথিবীতে যাই, ছোট্ট নদীর ধারে কুঁড়েঘরে সংসার পাতবো। সেই আমাদের স্বর্গ, সেই আমাদের সব।

পুষ্পের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো ঝরঝর করে। সে কোনো কথা বল্লে না।

সেদিনই যতীনের মনে হোল কে যেন কোথায় তাকে ডাকছে…সব সময় তার প্রাণের মধ্যে কিসের যেন মোচড় দিচ্ছে…আশা, অভাগিনী আশা, ভুবর্লোকের নীচের স্তরে অসহায় একাকিনী পড়ে আছে, কেউ নেই তাকে দেখবার।

সত্যি আশা তাকে ডাকচে। তার অন্তরাত্মা শুনতে পেয়েচে অভাগিনীর ডাক।

সে পুষ্পকে কথাটা বল্লে।–তোর বৌদিদি বড় কাঁদছে পুষ্প। সেদিন কুড়লে-বিনোদপুরের বাড়ীতে হঠাৎ দেখা হওয়ার পর থেকে ওর ডাক প্রায়ই শুনি।

–আমি যাই সেখানে যতুদা, তুমি যেও না। দেখে আসি।

–কিছু ভাল লাগে না ওর জন্যে।

–কেন তোমাকে যেতে বারণ করি, ও সব নীচের স্তরে তোমায়। যেতে দিতে আমার মন সরে না।

–তুই তো যাস্ দিব্যি।

–আমি গিয়েছিলাম আচাৰ্য্য রঘুনাথের কৃপায়। মহাপুরুষদের বিশেষ দয়ায় বিশেষ শক্তি হয়। নয়তো ওই সব স্তরে নানান রকমের নিম্নশ্রেণীর শক্তি খেলা করচে সৰ্ব্বদা, মহাপুরুষদের কৃপায় বিশেষ শক্তি লাভ করে সেখানে গেলে ওই সব দুষ্ট শক্তি কোনো অনিষ্ট করতে পারে না। নয়তো বিপদ পদে পদে–এই জন্যেই তোমাকে ওখানে যেতে দিতে চাইনে যতুদা। চলো দেখি কি উপায় হয়।

রঘুনাথদাসের আশ্রমে যাবার পথে কবি ক্ষেমদাসের সঙ্গে দেখা। তিনি আপন মনে একটি বৃক্ষতলায় চুপ করে বসে; অতি সুন্দর নির্জন স্থানটি, বনপুষ্প ফুটে আছে ঝর্ণার ধারে। ওরা কাছে গিয়ে দেখলে পৃথিবীর দিকে তিনি একদৃষ্টে চেয়ে কি যেন দেখছেন। ওদের দেখে সস্মিত মুখে সম্ভাষণ করলেন। যতীন ও পুষ্প দুজনেই ওঁকে প্রণাম করে পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

ক্ষেমদাস বল্লেন–কোথায় যাচ্ছ তোমরা?

পুষ্প বল্লে-রঘুনাথদাসের আশ্রমে। বড় বিপদে পড়ে যাচ্ছি। আপনিও শুনুন দেব–যদি কিছু উপায় হয়। তারপর সে আশার কাহিনী সব খুলে বল্লে।

ক্ষেমদাস সব শুনে ধীরভাবে বল্লেন–এই দুঃখ সনাতন। আত্মা নিরন্তর সাধনা করচে নিজেকে জানবার। আমার নিজের জীবনেও এমনি হয়েছিল। আমি তাই এখানে বসে বসে ভাবছিলাম, আবার পৃথিবীতে পূর্ণিমার জ্যোৎস্না উঠেচে যেমন উঠতো পাঁচশো বছর আগে, অনাদ্যন্ত মহাকাল নিজের কাজ করে চলেচে যেমন করতো হাজার বছর কি দু-হাজার বছর আগে–আমি পৃথিবীতে একটি মেয়েকে কত ভালবাসতাম, আমাদের গ্রামের সদানন্দী মাঠের ফুলবাগানে কত বেড়াতাম দুজনে এমনি জ্যোৎস্নারাত্রে–লুকিয়ে লুকিয়ে,–এখন সে। কোথায়?

অনেকটা অন্যমনস্ক ভাবেই কবি মাথা দুলিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লেন–সত্যি তাই ভাবি, কোথায় সে?

পুষ্প অবাক হয়ে বল্লে–কেন, আপনি তাঁর দেখা পাননি আর?

–না। বিশ্বের ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেল। দ্যাখো, আমরা কবি, জগতে রূপরসের উপাসক। এঁকেই বড় করেচি জীবনে। যাঁরা বলেন। সব মায়া, তাঁদের কথা বুঝি না। মায়া লয় হোলে এই রূপরসের জগৎটাও লয় হয়। তা আমরা চাইনে–তাই দুঃখ পাই, কিন্তু দুঃখের মধ্যেও জানি ভগবানই সৃষ্টি করেছেন এই জগৎ। সবই তিনি। কষ্ট পেলেও জানি তাঁর হাতে কষ্ট পাচ্ছি। প্রেমময়ের তাড়নায় কষ্ট কি? সব মুখ বুজে সহ্য করি। এটাও মানি, এই রূপরসের সাধনার মধ্যেই আমাদের সিদ্ধি। এ পথেও তাঁকে পাওয়া যায়। চলো, নরকে আমি নিজে যাবো, খুঁজে বার করি তোমাদের সেই মেয়েটিকে। তার দুঃখ আমি কবি আমি বুঝি–

যতীন বল্লে–প্রভু, আমার পুনর্জন্ম ঠিক হয়ে গিয়েছে সেই মেয়েটিকে নিয়ে। করুণাদেবী জানিয়েছেন–

ক্ষেমদাস বল্লেন–তিনি যা করেছেন, তোমাদের মঙ্গলের জন্যেই। তিনি পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী মহাদেবী–তাঁকে তোমরা করুণাদেবী বল, দুর্গা বল, লক্ষ্মী বল, সীতা বল, সরস্বতী বল–সবই এক। তবে এখন মেয়েটির কাছে যাবার কোনো প্রয়োজন নেই। উপায় হয়ে গিয়েছে।

যতীন আশ্চর্য হয়ে গেল শুনে। অত বড় বড় পৌরাণিক দেবীর। সঙ্গে সে করুণাদেবীকে এক আসনে বসায়নি। উনি যদি দুর্গা হন, কালী হন, সীতা হন, লক্ষ্মী হন–তবে তার আর জন্মমরণের ভয় কিসের? আশারই বা ভয় কিসের? হাসিমুখে সে মহাগৌরবে নরকে যেতে প্রস্তুত।

ক্ষেমদাস ওর মনের ভাব বুঝে বল্লেন–জন্ম নিতে দুঃখ কিসের? পৃথিবীর রূপরস আবার আস্বাদ করে এসো। সেই জ্যোৎস্না, সেই বনবিতান, কোকিলের কুহুতান, সেই মায়ের কোলে যাপিত একান্তনির্ভরতার শৈশব, প্রথম যৌবনে প্রিয়ার প্রথম দর্শন–যাও যাও, ওরই মধ্যে ভগবানে মন রেখো–কৰ্ম্ম যতদিন না কাটে।

কিয়ে মানুখ জনমিয়ে পশুপাখী অথবা কীটপতঙ্গে
করমবিপাকে গতাগতি পুন-পুন মতি রহুঁ তুয়া পরসঙ্গে।

মেয়েটির কাছে যাবার কোনো দরকার নেই। দেবী যখন তার ব্যবস্থা করেচেন, তখন আমাদের সেখানে যাওয়া ধৃষ্টতা হবে। দেবী সৰ্ব্বমঙ্গলা তাকে শ্রেয়ের পথে চালিত করবেন।

ঠিক সেই সময়ে একজন জ্যোতির্ময় মহাপুরুষের আবির্ভাব হোল বৃক্ষতলে। যতীন তাঁর দিকে চেয়েই চমকে উঠলো, ইনি সেই সন্ন্যাসী, যিনি একদিন স্পর্শদ্বারা তার মধ্যে সবিকল্প সমাধির অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছিলেন। সেই যোগী পুরুষই-নীল বিদ্যুতের মত আভা বেরুচ্চে, সারা দেহ থেকে ওঁর।

যতীনের দিকে চেয়ে তিনি মৃদু হেসে বল্লেন–মনে আছে?

যতীন তাড়াতাড়ি পায়ের ধূলো নিলে, পুষ্পও তাই করলে ৷ ক্ষেমদাস চুপ করে বসে রইলেন।

তিনি আবার বল্লেন–মনে আছে? বলেছিলাম সময় পেলে দেখা দেবো। এই সেই মেয়েটি বুঝি? এঁর তো খুব উচ্চ অবস্থা দেখচি। ক্ষেমদাসের দিকে চেয়ে বল্লেন–কবি যে! কি করচ বসে বসে?

ক্ষেমদাস বল্লেন–তোমাদের মত সমাধির চেষ্টায় আছি

–ও তোমাদের অনেক দূর। মায়িক-জগতের বন্ধন এখনও তোমাদের কাটেনি। আবার এদেরও মাথা খাচ্চ কেন ও কথা বলে?

–আমিও ঠিক ওই কথাই তোমায় বলতে পারি। অদ্বৈত-ব্রহ্মজ্ঞান ট্যান এই সব কচি কচি ছেলেমেয়ের মাথায় ঢোকাচ্চ কেন।

সন্ন্যাসী হেসে ক্ষেমদাসের কাছে এসে দাঁড়িয়ে সস্নেহ সুরে বল্লেন– তুমিও ঐ দলেরই একজন। কবি কিনা, মিথ্যা কল্পনার রাজ্যে বাস। করো।

পুষ্প সময় বুঝে বল্লে–প্রভু, জানেন এঁর প্রতি পুনর্জন্মের আদেশ। হয়েছে!

সন্ন্যাসী বল্লেন–নয়তো কি ভেবেচ ইনি মায়ার অতীত হয়ে যাতায়াতের চক্রপথ এড়িয়ে ব্রহ্মত্ব লাভ করেছেন? আত্মানং বিধি আত্মাকে জানো–আত্মাকে না জানলে যাতায়াত বন্ধ হবে না–

ক্ষেমদাস বলে উঠলেন–বয়েই গেল। ক্ষতিটা কি?

-বাজে কথা বলো না কবি। তোমার ক্ষতি না হতে পারে। তোমার মত চোখ আর মন নিয়ে ক’জন পৃথিবীতে যাবে? সাধারণ লোক গিয়ে অর্থ, যশ, মান, নারী নিয়ে উন্মত্ত থাকবে। প্রকৃতির সৌন্দর্য্য মায়ার খেলা হোক–তবুও স্বীকার করি, দেখতে জানলে তা দেখেও সৃষ্টিকর্তা হিরণ্যগর্ভের প্রতি মানুষের মন পৌঁছতে পারে। ও যে একটা সোপান। কিন্তু তা ক’জনের চোখ থাকে দেখবার? আর্তের সেবা করে কজন? কাজেই মানুষের দুঃখ যায় না। মনে আনন্দ পায় না; ভোগ করতে করতে একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করে জরার অধিকার শুরু হয়েছে। তখন মৃত্যুভয়ে বলির পশুর মত জড়সড় হয়ে থাকে। তা ছাড়া আছে। শোক, বিচ্ছেদ, বিত্তনাশ, অপমান, আশাভঙ্গের যন্ত্রণা। কোথায় সুখ বলো?

–দুঃখের মধ্যেই আনন্দ হে সন্ন্যাসী–দুঃখ ভোগ করতে করতেই আত্মা বড় হয়ে ওঠে, বীতস্পৃহ হয়, বীতম হয়, বীতশোক হয়। ভগবানের দিকে মন যায়। জন্মে জন্মে আত্মা বললাভ করে, জন্ম জন্মান্তরের চিয়ার আগুনে পুড়ে সে ক্রমশ নিৰ্ম্মল, শুদ্ধ, জ্ঞানী হয়ে ওঠে। ভগবানেরই এই ব্যবস্থা–এ তুমি অস্বীকার করতে পারো? ক’জন তোমার মত নর্মদাতীরে সারাজীবন তপস্যা করে ভগবানের দর্শন পেয়েছে? বহু ভুগে, বহু ঠকে, বহু নারী, সুরা, অর্থ বিত্ত ভোগ। করে মানুষ ক্রমশ বিষয়ভোগ থেকে নিবৃত্ত হয়ে আসে–বহু জন্ম ধরে এমন চলে–তখন জন্ম-জন্মান্তরীণ স্মৃতি তাকে বলে আবার কোনো নতুন জন্মে–ও থেকে নিবৃত্ত হও, ও পথ তো দেখলে গত কত শত জন্ম ধরে, আবার সেই একই ফাঁদে পড়ো, সেই রকম কষ্ট পাবে। ভোগের দ্বারা আত্মাও তখন অনেকটা বীতস্পৃহ হয়ে উঠেচে–তখন। সে ভোগ ছেড়ে ত্যাগের পথ খোঁজে।

-–হ্যাঁ, তোমার কথা কাটি কি করে? তুমি কবি, অন্য পথে গিয়ে সত্যদৃষ্টিলাভ করে। কিন্তু একটা কথা বোঝো–যদি এক জন্মেই হয়। তবে ভগবানের ওপর বোঝা চাপিয়ে শত শত জন্ম ধরে এ অনাগত চক্রে ঘোরাঘুরি কেন?..

ক্ষেমদাস সুকণ্ঠে গেয়ে উঠলেন হাত দুটি সুন্দর ভঙ্গিতে নেড়ে–

কিয়ে মানুখ জনমিয়ে পশুপাখী অথবা কীটপতঙ্গে
করমবিপাকে গতাগতি পুন-পুন মতি রহুঁ তুয়া পরসঙ্গে–

সন্ন্যাসী বিরক্তির সুরে বল্লেন–আঃ, ও সব ভাবুকতা রাখো। আমার কথার উত্তর দাও।

ক্ষেমদাস বল্লেন–কীৰ্ত্তনাদেব কৃষ্ণস্য মুক্তবন্ধঃ পরং ব্রজেৎ কলিতে বহুদোষ, কিন্তু একটা গুণ এই যে, কৃষ্ণনাম কীৰ্ত্তন করলেই পরা মুক্তি। তাই বলেচে–

এই পর্যন্ত বলেই আবার সুর করে কি বলতে যাচ্ছিলেন, সন্ন্যাসী ধমক দিয়ে বল্লেন–আবার ওই সব! গান আসচে কিসে এর মধ্যে? তা ছাড়া আমি তোমাদের ওই কৃষ্ণদৃষ্ণ মানিনে জানো? ওসব মায়িক কল্পনা–ভগবানের আবার রূপ কি!

-তুমি শুষ্ক পথে ভগবানের সঙ্গে নিজের সত্তা মিলিয়ে অদ্বৈতজ্ঞান। লাভ করে। ভক্তিপথের কিছুই জানো না। প্রেমভক্তি এখনও বাকি তোমার।

–মরুগ গে। আমার কথার উত্তর দাও

–উত্তর কি দেব? ভোগ না হোলে নিবৃত্তি হয় না। ভগবান তা জানেন, তাই শত জন্মের মধ্যে দিয়ে জীবকে তিনি ভোগ আস্বাদ করিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবারই হবে তবে বিলম্বে।

সন্ন্যাসী শান্ত ভাবে বল্লেন–হাঁ ঠিক।

–তুমি মেনে নিলে?

–নিলাম। কিন্তু তুমি আমার কথার ঠিক উত্তর দিলে কৈ? যদি এক জন্মে হয় তবে হাজার জন্মের মধ্যে দিয়ে দিশাহারা হয়ে ছুটি কেন?

ক্ষেমদাস হেসে বল্লেন–তার কারণ, সবাই তোমার মত মুক্তিকামী নয়, তোমার মত জ্ঞানী নয়–গত জন্মে তুমি যে উচ্চ অবস্থা নিয়ে জন্মেছিলে, যে জন্ম-জন্মান্তরীণ স্মৃতির ফলে তোমার মন মুমুক্ষ হয়েছিল, সংসারের আসক্তির বন্ধন কাটিয়েছিল–তুমিই বলো না, সে কি তুমি একজন্মে লাভ করেছিলে? তুমি তো যশ্বৈৰ্য্যশালী–মুক্ত পুরুষ–তোমার অজানা তো কিছুই নেই–বলো তুমি?

সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বল্লেন–তা ঠিক। গত জন্মের পূর্ধ্ব তিন জন্মেও আমি যোগী ছিলাম। আমার সে সময়ের গুরুভ্রাতা এখনও হিমালয়ের দুর্গম শিখরে তুষারাবৃত গুহায় দেহধারী হয়ে বাস করচেন। প্রায় আটশো বছর বয়েস হোল। লোকালয়ের কিছুই জানেন না। গত সাতশো বছরের মধ্যে তিনবার নীচে নেমে গিয়েছিলেন ভারতের লোকালয়ে। একবার নেমে শুনলেন শঙ্করাচার্য্য ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম পুনঃপ্রতিঠিত করেছেন। দ্বিতীয়বার নামলেন অনেকদিন পরে; নামতে নামতে শুনলেন যবনেরা ভারতে প্রবেশ করেচে-শুনে আর না নেমে গিয়ে উঠে নিজের আসনে চলে গেলেন, অনেকদিন আর নামেন নি।

পুষ্প ও যতীন রুদ্ধকণ্ঠে শুনছিল। পুষ্প অধীর কোইতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞেস্ করলে–আর একবার কখন্ নেমেছিলেন?

–আমি তখন এ জন্মের পরেও দেহত্যাগ করেচি–এই সেদিন, পৃথিবীর হিসেবে বড়জোর সত্তর আশি বছর হবে। বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ভারতব্যাপী, আমরা অনেকে দলবদ্ধ হয়ে নেমে যাই ভারতে যদি কোন প্রতিকার করতে পারি। ওঁকেও নিয়েছিলাম আমাদের সঙ্গে। কুম্ভমেলা সেবার প্রয়াগে। উনি মেলা দর্শন করে দশদিন থেকে ওপরে উঠে যান–সেই শেষ, আর লোকালয়ে যান নি।

ক্ষেমদাস প্রশ্ন করলেন–এখনও দেহে রয়েছেন কেন?

–যোগ-প্রক্রিয়ায় দেহ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গিয়েছে, তাই দেহ ধারণ করেই আছেন। বাসনাকামনা-শূন্য মুক্তপুরুষ তিনি, দেহে থাকাও যা, দেহে না থাকলেও তা। তাঁর পক্ষে সব সমান। স্বেচ্ছাক্রমে বিশ্বের সৰ্ব্বত্র তাঁর অবাধ গতি, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত। আমিও তাঁকে বলেছিলাম– আর দেহে কেন? উনি বল্লেন–হাম্ তো আত্মানন্দ আত্মারাম, হামারা ওয়াস্তে যো হ্যাঁয় ব্রহ্মলোক, সো মেরা হিমবান, মেরা আসন। এহি পর। পরমাত্মা বিরাজমান হ্যাঁয়। লোকালোক তো মায়া

ক্ষেমদাস বল্লেন–হ্যাঁ, ওসব অনেক উচ্চ অবস্থার কথা। আমাদের জন্যে নয় ওসব। আমরা ভগবানের সৃষ্টির মধ্যে আনন্দ পাই, এই অপূর্ব সৌন্দৰ্য্যরসের আস্বাদ করবে কে আমরা ছাড়া? তোমরা তো ব্রহ্ম হয়ে বাড়ি ছুঁয়ে বুড়ি হয়ে বসে আছ।

পুষ্প কুণ্ঠার সঙ্গে প্রশ্ন করলে–প্রভু, আমাদের একবার সেই সাধুর কাছে নিয়ে গিয়ে দেখাবেন?

সন্ন্যাসী বল্লেন–না মা। তিনি লোকের ভিড় পছন্দ করেন না। তবে চলো আমার পূৰ্ব্বজন্মের আর একটি গুরুভগ্নীর কাছে তোমায় নিয়ে যাবো–তিনিও আজ পর্যন্ত দেহে আছেন। গভীর বনের মধ্যে গুপ্তভাবে থাকেন–প্রায় সময়ই সমাধিস্থ থাকেন। চলো হে কবি, সমাধি দেখলে তোমার জাত যাবে না–

ক্ষেমদাস বল্লেন–না হে, আমি, যাবো না। তুমি এদের নিয়ে। যাও–আমার ও ধর্ম নয়। কবির ধর্ম স্বতন্ত্র।

সন্ন্যাসী হেসে হেসে ক্ষেমদাসের হাত ধরে বল্লেন–ভগবানের মহিমা সৰ্ব্বত্র। কেন যাবে না? চলো–

–বেশ, তাহলে তুমি কথা দাও আমার সঙ্গে ভক্ত বৈষ্ণবের আশ্রমে। যাবে? যদি শ্রীকৃষ্ণকে দেখাতে পারি সেখানে? প্রেমভক্তি নেবে?

দাসী পুনরায় হেসে বল্লেন হবে, হবে। আচ্ছা যাবো, কথা দিলাম। প্রেমভক্তি নিই না নিই স্বতন্ত্র কথা। তোমাকেও তো আমি ষটচক্রভেদ করে অদ্বৈতজ্ঞান পাইয়ে দিচ্চি না জোর করে?

কিছুক্ষণ পরে ওরা সবাই সন্ন্যাসীর পিছু পিছু পৃথিবীর এক স্থানে। নেমে এল। স্থানটি দেখেই ওরা বুঝলে, লোকালয় থেকে বহু দূরে কোনো এক নিবিড় অরণ্যের মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে। সম্মুখে একটি পার্বত্য নদী, কিন্তু নদীগর্ভে কোথাও মাটি বা বালি নেই–সমস্তটা পাষাণময়, চওড়া সমতল, মসৃণ। প্রায় একশো হাত পরিমিত স্থান কি তার চেয়ে বেশি এমনি আপনা-আপনি পাথর-বাঁধানো। তারই মধ্যভাগ। বেয়ে ক্ষুদ্র নদীটি ক্ষুদ্র একটি জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে মর্মর-কলতানে বয়ে চলেছে। উভয় তীরে নিবিড় জঙ্গল, মোটা মোটা লতা এ-গাছ। থেকে ও-গাছে দুলচে; গভীর নিশিথকাল পৃথিবীতে, আকাশে ঠিক মাথার ওপরে চাঁদ, গভীর নিঃশব্দতার মধ্যে পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নালোকে সমস্ত অরণ্যভূমি মায়াময় হয়ে উঠেছে।

ওরা মুগ্ধ হয়ে অপূৰ্ব্ব অরণ্য-দৃশ্য দেখেছে, এমন সময়ে বনের মধ্যে বাঘের গর্জন শোনা গেল, দ্বিতীয়বার শোনা গেল আরও নিকটে। যতীন সভয়ে বলে উঠলো–ওই! চলুন পালাই

অল্প পরেই ওপারের বনের লতাপাতা নিঃশব্দে সরিয়ে প্রকাণ্ড রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হাঁড়ির মত মুখ নদীজলে নামতে দেখা গেল এবং তার জল খাওয়ার ‘চক চক’ শব্দ বনের ঝিল্লীরবের সঙ্গে মিলে। এই গম্ভীর রহস্যময় রজনীর নৈঃশব্দ্য মুখর করে তুলতে লাগলো।

পুষ্প বল্লে–ভয় কি যতীনদা তোমার এখন বাঘের?

ক্ষেমদাস মুগ্ধ দৃষ্টিতে এই অপূৰ্ব্ব শোভাময় জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নির্জন বনকান্তারের দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। দুহাত জুড়ে নমস্কার করে। বল্লেন–সুন্দর! নমস্কার হে ভগবান, ধন্য তুমি, আদি কবি তুমি জগৎস্রষ্টা! কর্ণামৃতে ঠিকই বলেচেঃ–মধুগন্ধি…

সন্ন্যাসী বল্লেন–ব্রহ্মই জগৎ হয়ে রয়েছেন, য ওষধিষু যো বনস্পতি–তিনিই সৰ্ব্বত্র। সামনে যা দেখচো এও তিনি, তাঁর বিশ্বরূপের এক রূপ– তবে অত ভাবুকতা আমাদের আসে না, ইনিয়ে-বিনিয়ে বর্ণনা করা আসে না।

ক্ষেমদাস হেসে বল্লেন–আসবে কি হে! তাহোলে তো তুমি উপনিষদ তৈরী করে বসতে। তোমার সঙ্গে উপনিষদের কবিদের তফাৎ তো সেইখানে। তাঁরা ব্ৰহ্মজ্ঞ ছিলেন, আবার কবিও ছিলেন। তোমার মত নীরস ব্রহ্মবিৎ ছিলেন না। ভগবানও কবি। উপনিষদে কি বলেনি। তাঁকে, কবিৰ্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভু?

সন্ন্যাসী বল্লেন–চলো চলো, যে জন্যে এসেচি। উপনিষদে কবি বলেছে যিনি দ্রষ্টা তাঁকে। যিনি প্রজ্ঞার আলোকে এক চমকে ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান দর্শন করেন, চিন্তা দ্বারা যাঁকে বুঝতে হয় না, তিনিই কবি।

যতীন বল্লে–প্রভু, এ কোন্ জায়গা পৃথিবীর?

–এ হোল বাস্তার রাজ্য, মধ্যভারতের। এই নদীর নাম মহানদী, উড়িষ্যার মধ্য দিয়ে সমুদ্রে পড়েছে। এখানে নদীর শৈশবাবস্থা দেখচ, সবে বেরিয়েচে অদূরবর্তী পাহাড়শ্রেণী থেকে। এখন এসো আমার সঙ্গে—

নদীর ওপারে কিছুদূরে ঘন বনে একটি পর্ণ-কুটীরের কাছে ওরা যেতেই একটি সন্ন্যাসিনী তাড়াতাড়ি বার হয়ে এসে ওঁদের অভ্যর্থনা করলেন। বল্লেন–আসুন আপনারা। আমার বড় সৌভাগ্য আজ—

যতীন ও পুষ্পর মনে হোল ইনি যেন ওদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। সন্ন্যাসিনীকে দেখে যতীন অবাক হয়ে গেল, সন্ন্যাসী বলেচেন ওঁর পূর্বজন্মের গুরুভগিনী–অথচ ইনি তো কুড়ি বৎসরের তরুণীর মত সুঠাম, সুরূপা, তন্বী। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, রূপ যেন ফেটে পড়েছে, মাথায়। একটাল কালো চুলের রাশ।

সন্ন্যাসী বল্লেন–ভাল আছ ভগ্নী?

সন্ন্যাসিনী হেসে হিন্দীতে বল্লেন–পরমাত্মা যেমন রেখেছেন। এঁরাও তো দেখচি বিদেহী আত্মা। এঁদের এনেচ কেন?

পুষ্প ও যতীন সন্ন্যাসিনীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। ক্ষেমদাস যুক্তকরে নমস্কার করলেন।

সন্ন্যাসী বল্লেন–এরা এসেছেন তোমায় দেখতে। ইনি বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি ক্ষেমদাস–

সন্ন্যাসিনী বল্লেন–আইয়ে মহারাজ, আপকা চরণধূলিসে হামারা আশ্রম পবিত্র হো গিয়া–পরমাত্মাকি কৃপা।

ক্ষেমদাস বল্লেন–মা, আপনি দেবী, আপনার দর্শনে আমরা পুণ্যলাভ করলাম।

সন্ন্যাসিনীর সুন্দর মুখের লাবণ্যময় হাসি অরণ্যভূমির জ্যোৎস্নাস্নাত সৌন্দৰ্য্যকে যেন আরও বাড়িয়ে তুলেচে। কুটীরের দ্বারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বল্লেন–এহি নদীমে আজ পূর্ণিমাকী রাতমে স্বৰ্গসে উতার কর অপ্সরীলোগ্‌ নতে থে। হাম বহুৎ বরষসে দেখতে হেঁ। আপকো মালুম হ্যাঁয়?

ক্ষেমদাস বল্লেন–না মা, আমরা তো জানি না। আমাদের দেখাবেন?

–আপ দেখনে মাংতা?

–হাঁ মা, দেখালেই দেখি!

সন্ন্যাসী বল্লেন–এর বয়েস কত বল তো যতীন?

যতীন সঙ্কুচিত ভাবে বল্লে–আমি কি বলবো? দেখে তো মনে হয়। কুড়ি-বাইশ।

সন্ন্যাসিনী খিল্ খিল করে হেসে উঠলেন বালিকার মত।

সন্ন্যাসী বল্লেন–তুমি তোমার জ্ঞান-মত বলেচ, তোমার দোষ নেই। তোমার ধারণা নেই এ বিষয়ে।

সন্ন্যাসিনী বল্লেন–তুম ক্যা বোলতা হ্যাঁয় রে বাচ্চা? হামারা তো এহি আসন পর পঁচিশ বরষ বীত গিয়া–ইসকা পলে পঞ্জাবমে রাভি নদীকী তীরমে করিব সত্তর বরষ আসন থা। গুরুজীকা অনুজ্ঞাপর এহি বনমে মহানদীকে কিনারপর আশ্রম বনায়া।

যতীন মনে মনে হিসেব করে বল্লে–তা হোলে আমার প্রপিতামহীর চেয়েও আপনি বড়–

সন্ন্যাসী বল্লেন–ওঁর বয়েস দেড়শো বছরের কাছাকাছি–বরং কিছু। বেশি হবে তো কম, নয়।

ক্ষেমদাস বল্লেন–মা, দেহধারী হয়ে আছেন যে এখনো?

সন্ন্যাসিনী হেসে বল্লেন–বহুং নেতি ধৌত কিয়াইসিসে শরীর বন। গিয়া। আভি ধ্বংস নেহি হোগা কোই পান্ ছ’ শো বরষ। কোই হরজ নেহি, রহে তো রহে।

যতীন আপন মনে ভাবলে–বাবাঃ, এই দুর্গম বনের মধ্যে উনি। একা কি করে থাকেন। বাঘের ভয় করে না? এ তো বাঘের আড্ডা দেখে এলাম।

সন্ন্যাসিনী ওর মন বুঝেই যেন বল্লেন–যখন সমাধিতে থাকি তখন বাঘ আসে, বিষাক্ত সাপ এসে মাথায় ওঠে। গায়ে বেড়ায়। সমাধি ভাঙলে ওদের যাতায়াতের চিহ্ন দেখে বুঝতে পারি।

সন্ন্যাসী বল্লেন–আজকাল কি আহার ছেড়েচ?

–না। কন্দমূল খাই, বেলগাছ আছে আশ্রমের পেছনে অনেক, বেল। খাই। সামান্যই আহার।

ক্ষেমদাস বল্লেন–মা, তুমিও কি প্রেমভক্তির বিপক্ষে? তুমিও নীরস অদ্বৈতবাদী?

সন্ন্যাসিনী হেসে বল্লেন–মাৎ পুছিয়ে। প্রেমভক্তি বহুৎ কৃপাসে লাভ হোতা হ্যাঁয়–হামারা তো তিন যুগ গুজার গিয়া, ও বস্তু নেহি মিলা। কাঁহা মিলেগা বাৎলাইয়ে মহাত্মা কৃপা কর। আপ দিজিয়ে হামকো!

ক্ষেমদাস বল্লেন–আমার শক্তি নেই মা। আমি কবি, এই পৰ্য্যন্ত। ও সব দেওয়া নেওয়ার মধ্যে আমি নেই। তবে তোমাকে আমি ঊর্ধ্বলোকে বৈষ্ণবাচাৰ্য্যদের আশ্রমে নিয়ে যেতে পারি, তাঁদের কাছে উপদেশ পেতে পারো। তবে দরকার কি মা? তোমরা তো প্রতিক্ষণে সমাধি-অবস্থায় ব্রহ্মকে আস্বাদ করচো–কি হবে প্রেমভক্তি?

–আমার কাছে গৃহস্থদের নানা দেবদেবী আসেন, নানা দেশ থেকে আসেন–একা থাকি বলে মাঝে মাঝে সঙ্গ দিতে আসেন। লম্বদামোদর, গোপাল, উগ্রতারা, মৃন্ময়ী, শ্যামরায়, অষ্টভুজা–আরও কত কি নাম। এসে গল্পগুজব করেন, সুখদুঃখের কথা বলেন। সেদিন এক ঠাকুর এসে হাজির আপনাদের বাংলাদেশের মুরশিদাবাদ জেলার কি গ্রাম থেকে–নাম শ্যামসুন্দর। আমায় এসে ছলছল চোখে বল্লেন–যে গ্রামে আছেন, সেখানে নাকি গৃহস্থেরা অনাদর করচে, ঠিকমত ভোগ দিচ্চে না, খেতে পান না–এই সব। তা আমি বল্লাম–আমার কাছে কেন। তুমি? আমি তোমাদের মানিনে। যারা মানে তাদের কাছে গিয়ে প্রকট হও, তোমার নালিশ জানাও, আমাকে বলে কি হবে? বালক বিগ্রহ, ওর চোখে জল দেখে কষ্ট হোল–পাষণ্ডী গৃহস্থেরা কেন সেবা করে না। কি জানি। ওই সব দেখে আমার মন কেমন করে, মনে হয় প্রেমভক্তি হোলে এঁদের নিয়ে আনন্দ করতাম।

সন্ন্যাসী হেসে বলেন–মায়া, মায়া, নির্বিকল্প ভূমি থেকে নেমে এসে তুমি আবার ঐ সব মায়িক ঠাকুরদেবতার সঙ্গে সম্বন্ধ পাতাতে চাও?

ক্ষেমদাস বলেন–মা, তোমাকে প্রেমভক্তি দেবার জন্যই ওই সব দেবদেবী আসেন–আরও আসেন তুমি মেয়েমানুষ বলে–হাজার অদ্বৈতবাদী হোলেও এখন তোমাদের মন, এই এঁদের মত কঠোর, নীরস, শুষ্ক হয়ে ওঠেনি। তাই তোমার কাছে আসেন, কই এঁর কাছে তো আসেন না? এলে আমল পাবেন না বলেই আসেন না। ভগবানও প্রেমভক্তির কাঙাল, যে ভক্ত তারই কাছে লোভীর মত ঘোরেন। যে। প্রেমভক্তি দিতে পারবে না, তার কাছে তো তিনি–

সন্ন্যাসী বাধা দিয়ে বিরক্তির সুরে বলেন–আঃ, তোমার ওই সব অসার, ফাঁকা ভাবুকতাগুলো রাখবে দয়া করে? ওতে আমার গা ঘিন। ঘিন করে সত্যি বলছি। যত খুশি প্রেমভক্তি বিলোও গিয়ে তোমার সেই বৈষ্ণবাচার্য্যের আখড়ায়–আমাদের আর শুনিও না–যত খুশি কাব্যরচনা কর বৃন্দাবন আর চাঁদের আলো আর কদম্বমূল নিয়ে সেখানে বসে।

ক্ষেমদাস বল্লেন–তোমাকেও একদিন ভক্তির ক্ষুরে মাথা মুড়তে হবে হে কঠোর জ্ঞানমার্গী সন্ন্যাসী। আমার নাম যদি ক্ষেমদাস হয়–

সন্ন্যাসী বল্লেন–আচ্ছা, এখন বন্ধ করো। তুমি আমাকে বলচো নীরস। তোমাকে আমি এমন এক জ্ঞানীর কাছে নিয়ে যাবো যিনি সম্পূর্ণ নাস্তিক, জড়বাদী। পঞ্চভূতের বিকারে এই বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে বলেন। ঈশ্বর মানেন না, সৃষ্টিকর্তা মানেন না; আত্মাকে বলেন পঞ্চভূতের বিকার, জড়ের ধৰ্ম্মে আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়েছে, আপনা-আপনিই একদিন লয় হবে–এই মত পোষণ করেন।

–কে? লোকায়ত দর্শনের কর্তা চার্বাক?

–চাৰ্ব্বাক নন, তাঁর প্রভাবান্বিত কোনো শিষ্য?

–কি অবস্থা লাভ করছেন?

–স্থাণুবং অচলাবস্থা। খুব উচ্চস্তরেই আছেন, পুরুষকারের বলে উন্নতভূমি লাভ করেচেন, কিন্তু মুক্তি হয়নি। এর মধ্যে দুবার পৃথিবী ঘুরে এসেছেন। বলেন, এও জড়ের ধৰ্ম্ম! মুক্তি বলে নেই। ঈশ্বর মিথ্যা। কাকে তিনি উপসনা করবেন? পুনর্জন্মে দুঃখিত নন। জন্মান্তরীণ স্মৃতি জ্বলজ্বল করচে মনে।

-কি অবলম্বনে আছেন?

–জড়ের ধর্ম পরীক্ষা করেন। তরুণ শিষ্যদের মধ্যে প্রচার করেন। পৃথিবীতে বহু তরুণদলকে যুগে যুগে প্রভাবান্বিত করচেন জড়ধৰ্ম্মের প্রতিপাদনের জন্য। ব্যাসক্তি শূন্য, উদার পুরুষ।

-মৃত্যুর পরে দেহধ্বংসে আত্মা থাকে দেখেও জড়বাদী?

–হাঁ। বলেন, ওটাও জড়ের ধর্ম। গুটিপোকা দেহত্যাগ করে। প্রজাপতি হচ্চে এও তো দেখা যায়। আবশ্যক কি ঈশ্বরকে টেনে আনবার?

ক্ষেমদাস কানে আঙুল দিয়ে বল্লেন–ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু, শুনতে নেই এসব কথা।

–কেন শুনতে নেই? এই দ্যাখো তোমাদের অনুদারত্ব। আমরা বলি, ব্রহ্মই জগতের সব হয়ে আছেন। নাস্তিক যিনি তিনি ব্রহ্মের বাইরে নন। ব্রহ্মের মধ্যে থেকে তিনি একথা বলছেন। এমন একদিন আসবে, ব্ৰহ্মজ্ঞান তিনি লাভ করবেন। বাদ পড়বেন না।

সন্ন্যাসিনী বল্লেন–আমারও তাই মত।

ক্ষেমদাস অধীরভাবে বল্লেন–বেশ, বেশ। ওসব আলোচনা এখন। থাক। চলে যাওয়া যাক। রাত্রি প্রভাত হয়ে এল–জ্যোৎস্না ম্লান হয়ে আসচে। ওই শোনো ময়ূর ডাকচে বনে।

সন্ন্যাসিনীকে পুনরায় বন্দনা করে সকলে সেই গভীর বন পরিত্যাগ করলেন। কুটীরের আশেপাশে অনেক বন্য দেবকাঞ্চন ফুল ফুটে আছে ম্লান জ্যোৎস্নালোকে। আদরের শৈলচূড়া শেষরাত্রের হিমবাষ্পে অস্পষ্ট দেখাচ্চে। বন্য কুকুটের রব রজনীর শেষ যাম ঘোষণা করচে।

ক্ষেমদাস আকাশপথে বল্লেন–কি সন্ন্যাসী, যাবে তো রঘুনাথদাসের আশ্রমে?

সন্ন্যাসী রাজী হওয়াতে ওরা চক্ষের নিমেষে বৈষ্ণবাচার্য্যের আশ্রমের সামনে এসে পড়লো। ওরা সকলে রঘুনাথদাসের আসনের দিকে গেল– পুষ্প গেল গোপাল-বিগ্রহ দেখতে ও তার প্রাণের ব্যথা গোপালের পায়ে নিবেদন করতে। নীল স্ফটিকের অপূৰ্ব বিগ্রহের মুখে যেন করুণার। হাসি লেগেই আছে। পুষ্প বাইরে এসে দাঁড়ালো, ঐ বিরাট অনন্ত বিশ্ব, আকাশের পটে কোটি কোটি নক্ষত্ররাজি (বৈষ্ণবাচাৰ্য্য আশ্রমে এখন রজনীর প্রথম যাম)–সেই যে সেদিন মহাপুরুষ উপনিষদের বাক্য উচ্চারণ করে শুনিয়েছিলেন–অস্য ব্রহ্মাণ্ডস্য সমন্ততঃ স্থিতানি এতাদৃ শান্যনন্তকোর্টিব্রহ্মাণ্ডানি সাবরণানি জ্বলন্তি–এই ব্রহ্মাণ্ডের আশেপাশে আরও অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ড জ্বলচে-সব ব্রহ্মাণ্ডের যিনি অধীশ্বর, সেই বিরাট দেবতা কেন এখানে ক্ষুদ্র বিগ্রহে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন কিসের টানে কে বলবে?

পুষ্প প্রণাম করলে সাষ্টাঙ্গে। সে বিরাটের কতটুকু ধারণা করতে পারে, মেয়েমানুষ সে। সে অতি ক্ষুদ্র নারী মাত্র। দয়া করে মধুরূপে ধরা না দিলে সে ক্ষীরোদসাগরশায়ী মহাবিষ্ণুর কিংবা তাঁর চেয়েও এককাটি সরেশ নিরাকার পরব্রহ্মের কি ধারণা করতে সমর্থ? মন্দির প্রনাম করে উঠে ব্যাকুল কণ্ঠে প্রার্থনা করলে–হে ঠাকুর, আশা বৌদিদিকে কৃপা কর। এবার যতীনদা ও আশার জন্ম তোমার আশীর্বাদে যেন সার্থক হয়ে অঠে। আর যেন আশার কুপথে মতি না হয় হে ঠাকুর। ওর প্রারব্ধ কৰ্ম্ম এবার যেন ক্ষয় হয়। ওকে দয়া কর।

মন্দিরের নিভৃত কুঞ্জতলে অপূৰ্ব্ব পুস্পবাস। যেন বহু জাতী, যূথী, মালতী, হেনা নাগকেশর একসঙ্গে প্রস্ফুটিত হয়েছে। সন্ন্যাসী ও ক্ষেমদাস শ্বেতপ্রস্তরের চত্বরে বৃক্ষতলে বসে রঘুনাথদাসের সঙ্গে আলোচনা করচেন।

রঘুনাথদাস বলছেন–আপনি আমার বিগ্রহটি দর্শন করে আসুন। আপনার ভক্তি হবে। উনি ভক্তি আকর্ষণ করেন। আপনার আগমনে। আমার আশ্রম আজ ধন্য হয়ে গেল। কিছুকাল এখানে থাকুন।

সন্ন্যাসী বল্লেন–আপনি মহাপুরুষ, আপনার নিকটে থাকবো এ তো পরম সৌভাগ্য। তবে এবার নয়, আমি ঘুরে আসবো। বিগ্রহ দর্শন। করে আসি।

বিগ্রহ দর্শন করে একটু পরেই ফিরলেন। বল্লেন–আপনার বিগ্রহ দেখচি বড় বিপজ্জনক বস্তু–সত্যিই আমাকে উনি আকর্ষণ করছেন। আমায় বল্লেন–আমায় কেমন লাগছে? আমি বল্লাম–আমি তোমাকে মানি না। একরকম জোর করে চলে এসেচি–

বলে আপন মনেই হাসতে লাগলেন।

রঘুনাথদাস বল্লেন–আমার গোপাল আপনার ভক্তি আকর্ষণ করতে চাইচেন। আপনি দেবেন না?

–ক্ষমা করবেন আচার্য্যদেব। আমার সংশয় যেদিন ছিন্ন হবে। সেদিন এসে আপনার আশ্রমে দীক্ষা নেবো প্রেমভক্তির। এখন ওসব আমি পুতুল-পূজোর সমান মনে করি।

রঘুনাথদাসের প্রশান্ত মুখমণ্ডলে মৃদুমন্দ হাসি ফুটলো। ঈষৎ দর্পভরে বল্লেন–আমার গোপালের ক্ষমতা থাকে, আপনাকে তিনি ভজাবেন। পুতুল কি কথা বলে? আপনি ব্রহ্মবিৎ, ভেবে দেখুন। আপনার মত ভক্ত উনি চাইচেন। ব্রহ্মভূমি থেকে নেমে এসে ভগবানের লীলাসঙ্গী হয়ে থাকুন।

–আপাতত আমার একটি গুরুভগ্নী প্রেমভক্তির জন্যে ব্যাকুলা। তাকে দিন দয়া করে।

–কোথায়?

–সম্প্রতি দেহে বৰ্তমান আছেন, মহানদীর তীরের বনমধ্যে তাঁর আসন। পরমাত্মার দর্শন পেয়ে ধন্য হয়েচেন। বহুঁকাল থেকে দেহধারিণী। আপনি আহ্বান করলে তিনি এখানেই আসবেন।

–আমি অকিঞ্চন। আমার কি সাধ্য প্রেমভক্তি দিই। গোপাল দেবেন–

পুষ্প এই সময়েই হঠাৎ জানু পেতে বসে করজোড়ে বিনীত কণ্ঠে বল্লে–ওই সঙ্গে আমাকেও দিন আচাৰ্য্যদেব। আমার একমাত্র অবলম্বন।

ক্ষেমদাস উৎসাহে হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন–সাধু! সাধু!

রঘুনাথ পুষ্পের মাথায় হাত দিয়ে বল্লেন–আমি কে মা? গোপালের কাছে চাও। আমি আশীৰ্বাদ করি তুমি পাবে।

পুষ্প যতীনকে দেখিয়ে বল্লে–এঁকে আশীর্বাদ করুন। ইনি শীঘ্র পুনর্জন্ম গ্রহণ করবেন। আদেশ হয়ে গেছে।

রঘুনাথ যতীনের দিকে ভাল করে চেয়ে বল্লেন–পুনর্জন্ম হচ্চে? খুব ভাল। ভগবানে মন যেন থাকে আশীর্বাদ করচি। পুনর্জন্মে ভয় কি, যদি কৃষ্ণপদে মতি থাকে।

যতীন পুষ্প ভিন্ন উপস্থিত সকলের পাদস্পর্শ করে প্রণাম করলে।

পুষ্প বল্লে–প্রভু, আবার আপনাদের দেখা ইনি পাবেন?

সন্ন্যাসী বল্লেন–নিশ্চয়, দেহ অন্তে। আমরা আর কোথায় যাচ্চি।

রঘুনাথ বল্লে–ইচ্ছা করে প্রভু, আর একবার পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে ভক্তিধৰ্ম্ম প্রচার করে আসি। জীবের বড় কষ্ট। দেখে শুনে বড় কষ্ট পাই। জীবের মঙ্গলের জন্য প্রয়োজন বুঝলে একবার ছেড়ে শতবার যেতে প্রস্তুত আছি। সেদিন মহাপ্রভুকে বলেছিলাম, উনি বল্লেন–এখন পৃথিবীতে অন্য সময় এসেছে, লোকজনের অন্যপ্রকার মতি। এখন আমাদের পূর্ধ্বতন পন্থায় কাজ হবে না। গ্রহদেব বৈশ্রবণ এ বিষয়ে সেদিন মহাপ্রভু ও আরও ঊর্ধ্বলোকের কয়েকটি মহাপুরুষের সঙ্গে পরামর্শ করেচেন! তাঁরা বলেন, পৃথিবী এখনও তৈরী হয়নি। গ্রহদেব বৈশ্রবণ কয়েকজন শক্তিমান আত্মা পাঠাচ্ছেন পৃথিবীতে, এরা ধ্বংস ও দুর্দৈব আনবেন পৃথিবীতে গিয়ে। পৃথিবী আলোড়িত হবে–লোকের দৃষ্টি ঊর্ধ্বমুখী হবে। ভোগবাদ ও জড়বাদের অবসান না হোলে জীবের মঙ্গল নেই। ঢেলে সাজাতে হবে গোটা পৃথিবীটাকে। আপনিই তো ইচ্ছা করলে করতে পারেন।

সন্ন্যাসী মৃদু হেসে চুপ করে রইলেন।

যতীন অসর্তক মুহূর্তে সবিস্ময়ে বলে উঠল–কে? ইনি!

ক্ষেমদাস বল্লেন-হাঁ, ইনি। অসাধারণ শক্তিশালী পুরুষ, ওঁরা গ্রহদেবের সমান। ইচ্ছামাত্র সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় ঘটাতে পারেন। ব্রহ্মসূত্রে বলেচে-সংকল্পাদেব তৎশ্রুতেঃ। মুক্তপুরুষের সমস্ত ঐশ্বৰ্য্য সংকল্পমাত্র উদয় হয়।

সন্ন্যাসী হেসে বল্লেন–ঝোঁকের মাথায় একটু বেশি বল্লে কবি। ভোগমাত্ৰমেম্ অনাদিসিদ্ধেশ্বরেণ সমান–শঙ্করাচাৰ্য্য কি বলেচেন প্রণিধান কর। মুক্তের ভোগ ঈশ্বরের সমান হয়, শক্তি কি তাঁর সমান। হয়?

–আমি ঈশ্বরের কথা বলিনি, গ্রহদেবের কথা বলেছি।

–গ্রহদেব শক্তিমান বটে কিন্তু ঈশ্বরের বিনা অনুজ্ঞায় তিনি কিছুই। করতে পারেন না।

–সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করতে সমর্থ কি না?

–হ্যাঁ। কিন্তু ঈশ্বরের অনুমতিক্রমে।

–আপনি?

–না। আমার ওপর সে ভার ন্যস্ত নেই। আমি আদার ব্যাপারী, সৃষ্টি স্থিতির খোঁজে আমার দরকার কি? সৃষ্টি বলচোই বা কাকে? নির্গুণ ব্রহ্ম যখন দেশ ও কালের সীমার মধ্যে নিজেকে প্রসারিত করেন, তখন তাকে বলে সৃষ্টি–ঊর্ণনাভ যেমন নিজের দেহনিঃসৃত রস তন্তুরূপে প্রসারিত করে।

রঘুনাথদাস বল্লেন–মহাপুরুষ, ক্ষেমদাস ঠিকই বলেছেন। আপনি পারেন সব, অসাধারণ শক্তি আপনাদের। সেই শক্তি নিষ্ক্রিয় অবস্থায়। কোনো কাজে আসছে না। ভগবানের দাসভাবে ভক্তভাবে তাঁকে সেবা করে সেই শক্তির সদ্ব্যবহার করুন। কিংবা পৃথিবীর বা অন্য গ্রহলোকের জীবকুলের সেবা করুন। জীবের সেবায় স্বয়ং ভগবান তাঁর পার্শ্বচরদের নিয়ে সৰ্ব্বদা নিযুক্ত। আপনি মহাজ্ঞানী, আপনাকে আমি কি উপদেশ দেব?

সন্ন্যাসী বিনীতভাবে নমস্কার করে বল্লেন–আপনার আদেশ শিরোধার্য্য।

যতীন অবাক হয়ে ভাবলে, এত বড় লোক, কিন্তু কি অদ্ভুত বিনয়। এদের। সত্যি, বড় ভাল লাগচে।

ক্ষেমদাস হঠাৎ বলে উঠলেন–বৃন্দাবনে আরতি হচ্চে গোপাল মন্দিরে। আমি আর থাকতে পারবো না। চল।

আজও পৃথিবীতে সুন্দর জ্যোৎস্না। বৃন্দাবনের বনপথে আলোছায়ার খেলা দেখে ওরা সবাই মুগ্ধ। শহরে ইলেকট্রিক আলো জ্বলচে, মোটর যাচ্চে ধুলো উড়িয়ে, লোক গিজগিজ করছে। চানাচুরওয়ালা সুর করে মোড়ে দাঁড়িয়ে সওদা ফিরি করচে। গোপালের মন্দিরের আরতির সময়ে কত অশরীরী ভক্ত, কত জ্যোতির্ময় আত্মা সেদিনকার মত মন্দিরের মধ্যে উপস্থিত। অনেকে স্বর্গীয় পুষ্প বিগ্রহের অঙ্গে বর্ষণ করতে লাগলেন আরতির সময়ে।

পুষ্প চেয়ে দেখতে দেখতে এঁদের মধ্যে করুণাদেবীকে দেখে চমকে উঠলো। আরও একটি দেবী আছেন ওঁর সঙ্গে। দুজনে মন্দিরের এক কোণে সাধারণ গৃহস্থঘরের নারীদের মত শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আরতি দর্শন করছেন। পুষ্পকে তাঁরা ডাকতেই সে কাছে গেল। পুষ্প দেখলে, অপরা দেবীটি তারই পুৰ্ব্বপরিচিতা প্রণয়দেবী।

প্রণয়দেবী বল্লেন–অনেকদিন তোমায় দেখিনি। আরতি শেষ হয়ে যাক, বাইরে চলো, কথা আছে।

সঙ্গে সঙ্গে পুষ্পের মনে পড়লো কেবলরাম কুণ্ডুর কথা। প্রণয়দেবীর ‘অনেকদিন দেখিনি’ এই কথাতে ওর মনে পড়লো। সেই নিম্নস্তরের বিষয়াসক্ত আত্মাকে সে দাদু বলে ডেকেচে। অথচ অনেকদিন তার কাছে যাওয়া হয়নি বটে। তাকে আজ এখুনি বৃন্দাবনে এনে। গোপালমন্দিরে আরতি দেখাতে হবে। ধন্য হয়ে যাবে কেবলরাম– স্বর্গ-মর্ত্যের মিলনদৃশ্য এভাবে দেখার সৌভাগ্য আর তার হবে না।

আচ্ছা, আশা-বৌদিকে আনলে হয় না? ধন্য হয়ে যায়, উদ্ধার হয়ে যায় একদিনে সে।

করুণাদেবীকে সে কথাটা জিজ্ঞেস করলে। দেবী বল্লেন–আশার আধ্যাত্মিক বুদ্ধি এখনও সুপ্ত। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে, দেখেও দেখবে না এ সব। অত সহজে পাপী উদ্ধার হয় না পুষ্প, তাহোলে আমরা বসে থাকতাম না-নরক উজাড় করে পাপী হাজারে হাজারে নিয়ে এসে ফেলতাম।

পুষ্প লজ্জিত হোল। প্রণয়দেবী বল্লেন–তোমাদের তিনজনের ওপর আমার দৃষ্টি বহু জন্ম আগে থেকে রেখেচি। এখনও অনেক গতাগতি বাকি ওদের দুজনের। পুনর্জন্ম ভিন্ন আশার আত্মা কিছুতেই কৰ্ম্মক্ষয় করতে পারবে না। তুমি ব্যস্ত হয়ো না পুষ্প, যা করবার তিনিই করবেন। আমরা তাঁর দাসী মাত্র।

পুষ্প ওঁদের অনুমতি নিয়ে চক্ষের নিমিষে কেবলরামের স্তরে এসে দেখলে, বৃদ্ধ সেখানে নেই। তবে বোধহয় আবার কুড়লে-বিনোদপুরে ওর ছেলেদের আড়তে গিয়ে বসেচে। কিন্তু একা যেতে পুষ্পের বড় ভয় করে। পৃথিবীর স্থূলস্তরে নিম্নশ্রেণীর দুষ্ট আত্মাদের উপদ্রব বড় বেশি, এরা অনেক সময় দেহধারী ও বিদেহী সকলকেই বিপদে ফেলবার চেষ্টা করে। বৃন্দাবনে ছিল এতক্ষণ, পৃথিবীর হোলেও সে একটা পবিত্র দেবস্থান, ওখানে প্রেতযোনির উপদ্রব খুব কম।

ভগবানের নাম স্মরণ করে সে কুড়লে-বিনোদপুরে কুণ্ডুদের গদিতে এসে দেখে বৃদ্ধ কেবলরাম তার বড় ছেলে বিনোদের পাশে হাতবাক্স সামনে বসে আছে। সন্ধ্যার সময়, হাটুরে খরিদদারের ভিড় দোকানে। বিনোদের দুই কর্মচারী হেঁকে বলেচে–দুজোড়া ফুলন শাড়ী, ছনং–

বিনোদ খাতায় টুকতে ঢুকতে মাথা তুলে বলচে–টাকা না লোট?

খরিদ্দার বলচে–আজ্ঞে লোট কুণ্ডু মশায়। দু’মণ পাট ব্যাচলাম রাম। তেলির আড়তে–সব লোট দেলে। লোট এখন ক’নে ভাঙাতি যাই আপনাদের দোকান ছাড়া? বাবু, কিছু কম নেন্ দামটা।

বিনোদের কিছু বলবার পূর্বেই তার পার্শ্বোপবিষ্ট কেবলরাম বলে। উঠলো–ওতে লাভ নেই এক পয়সাও! তুমি পুরোনো খদ্দের বলে শুধু কেনা-দামে দেওয়া।

পুষ্প বুঝতে পারলে, এ অতি কপটকথা। বৃদ্ধের মন বলচে জোড়াপিছু দেড় টাকা লাভ হয়েছে এই পাড়াগাঁয়ে মূর্খ খদ্দেরের কাছে। এই সময় বিনোদ বল্লে–যাও, দু’আনা কম দাওগে জোড়ায়, তুমি পুরোনো খদ্দের, তোমার সঙ্গে অন্যরকম।

কেবলরাম পুত্রের ওপর চটে উঠে বল্লে–তবেই তুমি ব্যবসা করেচ! খদ্দেরের এককথায় অমনি জোড়ায় দু’ আনা ছাড়!

অবিশ্যি ওর কথা দোকানদার বা খরিদ্দার কেউ শুনতে পেল না! পুষ্প ওর পাশে গিয়ে ডাকলে–ও দাদু। পুষ্পের কণ্ঠস্বর শুনে বৃদ্ধ চমকে উঠে ওর দিকে চাইলে। পুষ্প হাসিমুখে বল্লে–আচ্ছা, কেন এই সন্দেবেলা বসে-বসে মিথ্যে কথাগুলো বেমালুম কইচ দাদু? ছিঃ–

কেবলরাম অপরাধীর ন্যায় উঠে দাঁড়ালো। পুষ্প বল্লে–আবার তুমি এই দোকানে এসে বসে আছ। পৃথিবীর আসক্তি তোমার গেল না? কি হবে তোমার দোকানপসার আর খদ্দেরে? টাকার লাভলোকসানেই বা তোমার কি হবে?

কেবলরাম বিষণ্ণভাবে বল্লে–যাই কোথায় দিদি বলো? এই গদি আর আড়ত ছাড়া গত পঞ্চাশ বছর আর কিছু চিনিনি। কোথাও ভাল। লাগে না। এখানটাতে এলে পুরোনো অভ্যেসের বশে আড়তের কাজ করে যাই। নইলে কি করি বলো? তুমিই তো দিদি দর্শন দাওনি কতদিন।

–আচ্ছা এখুনি চলো আমার সঙ্গে..দেরি করো না, বেরিয়ে এসো।

মুহূর্তের মধ্যে কেবলরামকে নিয়ে পুষ্প গোপাল-মন্দিরে এল। ধূপধূনার সুগন্ধি ধূমে মন্দিরের গর্ভগৃহ ভরে গিয়েছে, আরতি তখনও পূৰ্ব্ববৎ চলচে-পাঁচমিনিটের জন্য মাত্র পুষ্প অনুপস্থিত ছিল। কেবলরাম পুষ্পের কৃপায় সজ্ঞান অবস্থায় আছে, জ্যোতির্ময়। মহাপুরুষদের সে দেখে ভয়ে সম্ভ্রমে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। সন্ন্যাসীর তেজঃপুঞ্জ দেহকান্তির দিকে আড়ে আড়ে চেয়ে দেখলে। আরতির শেষে যখন সবাই মন্দির-দ্বারপথে বেরিয়ে আসছে, তখন একজন বিদেহী ভক্ত ক্ষেমদাসকে জিজ্ঞেস্ করলে–প্রভু, শুনেচি বৃন্দাবনে যমুনাতীরে জ্যোৎস্নারাত্রে শ্রীকৃষ্ণের নিত্যলীলা হয়–আমি কি দেখতে পাবো? আমি এখানে নতুন এসেচি।

ক্ষেমদাস বল্লেন–আপনি গিয়ে দেখতে পারেন। লোকে দেখে অনেকে, ভাগ্যবান ভক্ত হওয়া চাই।

কেবলরাম অবাক হয়ে পুষ্পকে বল্লে–এটা কোন্ জায়গা দিদি?

ক্ষেমদাস বল্লেন–তুমি চিনতে পারলে না? এটা বৃন্দাবন, গোপাল মন্দির।

পুষ্প বল্লে–আর ইনি বৈষ্ণব কবি ক্ষেমদাস–

কেবলরাম থতমত খেয়ে ক্ষেমদাসের পায়ে সাষ্টাঙ্গ হয়ে প্রণাম করলে। তারপর করুণাদেবীর সামনে ওকে এনে ফেলতেই ও আরও আড়ষ্ট ও কাঁচুমাচু হয়ে গেল। করুণাদেবী রহস্য করে বল্লেন–তোমার নানীর দৌলতে স্বর্গ পাবে তুমি।

কেবলরামের চোখ ধাঁধিয়ে গেল এই দুই দেবীর অপরূপ রূপের জ্যোতিতে। সে হাতজোড় করে বল্লে–স্বর্গ তো এখানে। আমার মত পাপী যে বৃন্দাবনে এসে আরতি দেখেচে আপনাদের মত দেবী, এঁদের মত মহাপুরুষের দেখা পেয়েছে–আর তো কিছু বাকি নেই স্বর্গের।

পুষ্প ধমক দিয়ে বল্লে–এখন ছেড়ে দিলে আবার কুড়লে বিনোদপুরের দোকানে গিয়ে বসবে তো? আর মিথ্যে কথা বলবে।

কেবলরাম জিভ কেটে বল্লে–আর না।

–ঠিক?

–হঠাৎ ছাড়তে পারবো না মিথ্যে কথা বলে কি হবে। কোথায়। যাই বলো তো সন্দেবেলাটা।

–কেন, এই গোপাল-মন্দিরে এসে আরতি দেখবে রোজ। কবি ক্ষেমদাস রোজ এখানে এ-সময় থাকেন, তোমায় যত্ন করবেন দাদু।

–কেউ কিছু বলবে না?

–না, দেবমন্দিরে সবারই অধিকার। যখনই তোমার দেবদর্শনে স্পৃহা জেগেচে, বুঝতে হবে, তখনই তুমি উচ্চতর স্তরের জীব হয়ে। যাবে! ইচ্ছামাত্রেই সিদ্ধি। চলো যমুনার ধরে দাঁড়িয়ে দেখো–

ওরা চীরঘাটের কাছে যমুনার তীরে এসে জ্যোৎস্নালোকে কিছুক্ষণ বসলো। ওদের সঙ্গে সঙ্গে করুণাদেবী ও প্রণয়দেবীও এলেন। কেবলরাম সরল লোক ওর মনে কেমন একধরনের ভক্তির উদয় হোল। যমুনার দিকে চেয়ে ওর দুচোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো। করুণা দেবীকে বল্লে–মা, আমার কি পুণ্য ছিল পূর্বজন্মের? বৃন্দাবন, যমুনার তীর, আপনাদের মত দেবীর দেখা পাওয়া–আজ আমার হোল কি তাই ভাবছি।

করুণাদেবী বল্লেন–কেবলরামকে রেখে এসে পুষ্প, তারপর আমাদের পৌঁছে দেবে–

পুষ্প হেসে বক্রদৃষ্টিতে অদ্ভুতভাবে চেয়ে বল্লে–আমি পৌঁছে দেবো আপনাদের! কেন ঠাট্টা করেন বলুন।

ফেরবার পথে কেবলরাম বল্লে–তোমায় কি যে বলি দিদি। তুমি সাক্ষাৎ দেবী, নইলে এত দয়া! যেখানে নিয়ে গিয়েছিলে, আমার চৌদ্দপুরুষের ভাগ্যি নেই সেখানে যাই। একটা কথা দিদি বলছি। আমার নাতি রামলাল আজ দুবছর হোল এখানে এসেছে পৃথিবী। থেকে। তোমায় বলতে লজ্জা হয়, সম্প্রতি রসুলপুরের এক বাগদী। মাগীর পিছু পিছু ঘুরচে ছ’মাস। সে যদি জল আনতে যায়, ও তার পিছু পিছু যায়; সে যদি রান্নাঘরে রাঁধে, ও তার পাশে বসে থাকে। অন্য সময় সেই মাগীর বাড়ীর উঠোনে এক তেঁতুলগাছে দ্যাখো দিনরাত বসে। কত ধমক দিলাম–কথা শোনে না। একটা উপায় করো তুমি লক্ষ্মীটি। সে মাগী ওকে দেখতে পায় না, ওর ঘরেই সুখ। এ কি বন্ধন বলে দিকি দিদি? ওই তো নরক। তুমি দেবী, ওকে তুমি বাঁচাও এ নরক থেকে।

গভীর রাত্রিকাল। পুষ্প এক সন্ন্যাসিনীর আশ্রমে দেখা করতে গেল। ওকে দেখা পৰ্য্যন্ত কি এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করচে ওঁর প্রতি! না দেখা করে যেন ও থাকতে পারছে না। সন্ন্যাসিনী ওকে দেখে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন। বল্লেন–আপনি সেদিন এসেছিলেন না?

–হ্যাঁ, মা। আপনার দর্শনে পুণ্য, তাই দেখতে এলাম।

সন্ন্যাসিনীর প্রজ্ঞানেত্র উদ্ভাসিত, সুতরাং পুষ্পকে স্থল আবরণে। নিজ দেহকে আবৃত করতে হয়নি। সন্ন্যাসিনী বল্লেন–আপনি বিদেহী, পৃথিবীর ফলমূল নিয়ে অতিথিসৎকার করতে পারলাম না। ত্রুটি মাজ্জনা করবেন।

পুষ্প লজ্জিত হয়ে বল্লে–ওকথা বলে আমায় অপরাধী করবেন না। মা। আমি কত ক্ষুদ্র।

সন্ন্যাসিনী হেসে বল্লেন–আপনি ক্ষুদ্র কে বল্লে–আপনি এখানে। আসবেন আমি সমাধিতে জেনেছি। আপনি আমার প্রেমভক্তি শিক্ষার উপায় করবেন।

পুষ্প সবিস্ময়ে বল্লে–আমি!

–বিশ্বের ভগবান কাকে দিয়ে কি কাজ করান, তা তো বলা যায়। না।

–মা, আপনার বাড়ী কোথায় ছিল? পিতামাতা কে ছিলেন? জানবার বড় কৌতূহল হচ্চে।

–আমার দেশ ছিল পাঞ্জাবে। অল্পবয়সে আমি দীক্ষা নিই, বিবাহ হয়নি, চিরকুমারী। নানাস্থানে ঘুরে অযোধ্যায় আসি। সেখানে সে সময়ে মাঠের মধ্যে গাছের তলায় এক সিদ্ধ মহাপুরষ বাস করতেন– সকলে তাঁকে পাগলা বাবা বলতো। পাগলের মত থাকতেন। তিনি আমায় দয়া করে যোগদীক্ষা দেন। যে সন্ন্যাসীর সঙ্গে সেদিন আপনারা এসেছিলেন, ওঁরও গুরু তিনি।

–তিনি আছেন কোথায় এখন?

-প্রায় পঞ্চাশ ষাট বছর হোল তিনি দেহ রেখেছেন। তিনি যে কত কালের লোক কেউ জানতো না। আমি কখনো সে প্রশ্ন করিনি। এখন বিদেহী অবস্থায় ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হয়েছেন। জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ ছিলেন। মাঝে মাঝে এখনও দেখা দেন। তিনিই বলেছিলেন, তুমি নারী, তোমাকে প্রেমভক্তি শিখতে হবে। অদ্বৈতভূমি থেকে নেমে তোমাকে লীলারস আস্বাদ করতে হবে। তাই অপেক্ষায় আছি। আপনি যে আসবেন তাও তিনি বলেছিলেন।

পুষ্পের চোখ বেয়ে দর দর ধারে জল পড়লো। মনে মনে ভাবলে– ভগবানের কি খেলা! আমার মত নিতান্ত দীনহীনা, অতি সামান্য মেয়েমানুষের ওপর তাঁর কি অসীম অনুগ্রহ। এ কি অদ্ভুত কাণ্ড, কখনো তো এমনি ভাবিনি।

ও বল্লে–আপনার কাছে সেই ঠাকুরেরা আর এসেছিলেন?

–হ্যাঁ দেখুন, ওই এক কাণ্ড। কেন আমার কাছে? মৃন্ময়ী বলে এক দেবী সেদিন এসেছিলেন, কোন্ গ্রামে ভাঙা মন্দিরে থাকেন–কতক্ষণ গল্প করে গেলেন। তাঁর সাধ নতুন মন্দিরে কেউ প্রতিষ্ঠিত করে। আমি বল্লাম, কোনো ধনী গৃহস্থকে স্বপ্ন দিন। আমার কি হাত? আমি কি করতে পারি?

–ওদের কি আপনি এমনি স্থূলচক্ষে দেখেন?

–না, সমাধি অবস্থায় দেখা দেন। আমি বলি, আমি তোমাদের মানি না, চলে যাও। ততই আমার কাছে ভিড়। দেখুন তো মুশকিল!

–এও ভগবানের কৌশল আপনাকে প্রেমভক্তি শিক্ষা দেওয়ার। নীরস অদ্বৈতজ্ঞানী মনকে সরস করবার আয়োজন।

–আমি ওসব মানি না।

–তবে প্রেমভক্তি কি করে লাভ হবে?

–সাকার উপাসনা মায়িক। যে মৃন্ময়ী দেবীর পূজা করবে, সে দেবীকে নিয়েই মশগুল থাকবে; যে শ্যামসুন্দরের পূজা করবে, সে তাঁর দর্শন পেয়েই খুশি থাকবে। ও সব এক প্রকারের বন্ধন। ওতে বন্ধ হয়ে থাকলে আরও উচ্চভূমিতে উঠে ব্ৰহ্মদর্শন তার হবে না, নিজের আত্মাকে ব্রহ্মে সে লীন করতেও পারবে না। মায়া তাকে আবদ্ধ করবে।

-আপনি যা জানেন, আমি তা জানিনে দেবী। তবে আমি এইটুকু জানি প্রকৃত ভক্ত যে, সে মুক্তি চায় না, ব্রহ্মত্ব চায় না। ভগবানের দাস হয়ে থাকতে চায়, রস আস্বাদ করতে চায়। ভক্তির পথেই সে সমাধিলাভ করে, ব্ৰহ্মদর্শনও তার হয়। তবে এসব আমার শোনা কথা–আমি অজ্ঞান, কি জানি বলুন। আমার সঙ্গে বৃন্দাবনে চলুন, গোবিন্দ-মন্দিরে আরতির সময় কত ভক্তের দর্শন পাবেন। তাঁরা সব বলে দেবেন।

–যাবো, আমায় নিয়ে যাবেন। একটি গৃহস্থের বৌ আছে, বড় উচ্চ অবস্থা। একপাল ছেলেমেয়েছেলেকে কোলে নিয়ে হয়তো আদর করচে–অমনি সমাধিস্থ হয়ে পড়ে। সেদিন আমার কাছে সূক্ষ্মদেহে এসেছিল। সেও প্রেমভক্তি চায়–তাকেও নিয়ে যাবো।

–কি করে বিনা দীক্ষায় এমন উচ্চ অবস্থা পেলে সংসারে থেকে?

–পূৰ্ব্বজন্মের অবস্থা ভাল ছিল। কর্মবন্ধনে আটকে পড়ে এ জন্মে সংসার করতে হয়েছে। সামান্য কর্ম ছিল, এ জন্মে শেষ হয়ে যাবে। তার বাড়ী এই জঙ্গলের বাইরে এক লোকালয়ে। আহীর জাতের। মেয়ে। ওর অবস্থা দেখে আমি পৰ্য্যন্ত অবাক হয়ে গেছি। আমার কাছে এসে কত কাঁদে।

পুষ্প বিদায় নিয়ে চলে এল। মানুষেই দেবতা হয়ে গিয়েচে এ যে। সে কত প্রত্যক্ষ করলে এই জগতে এসে! যে মূল বাসনা আসক্তি ত্যাগ করে শুদ্ধ মুক্ত হয়েছে–সে-ই দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছে, ভগবান তাকেই কৃপা করেচেন। দৃষ্টি উদার ও স্বচ্ছ না হলে কেউই উচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত হয় না, অথচ মানুষকে দেবত্বে নিয়ে যাবার জন্যে ঊর্ধ্বলোকে কত ব্যবস্থা, কত আগ্রহ। তবুও কেন অন্ধত্ব ঘোচে না মানুষের, কেন রামলালের মত আশা-বৌদিদির মত জীবেরা ভুবর্লোকের অতি স্কুল আসক্তির বন্ধনে দেবত্বের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত আছে।

বুড়োশিবতলার ঘাটে যতীন এক চুপ করে বসেছিল। পুষ্পকে দেখে খুব খুশি হোল। বল্লে–যত দেখছি, আমিও অবাক হয়ে যাচ্চি, পুষ্প। আমার চোখ খুলে যাচ্চে। তুই কিছু ভাবিসনে, পৃথিবীতে জন্ম নেবো কত বছরের জন্যে? ষাট সত্তর কি আশি? অনন্ত জীবনের তুলনায় ক’দিন? কিসের জন্য মৃত্যু? সব ছায়া, মায়া–একমাত্র আমি অমর, অনন্ত, শাশ্বত। আমাকে কেউ কোনদিন ধ্বংস করতে পারবে না। আজকাল তোর সংসর্গে থেকে আমার চোখ খুলে গিয়েছে।

পুষ্প ওকে রামলালের কথা বল্লে। যতীন সব শুনে হাসতে লাগলো। আজকাল এই শ্রেণীর লোকের জন্যে তার গভীর অনুকম্পা জাগে। পথ দেখিয়ে দেবার কেউ নেই তাই এমনি হয়েছে–ওদের দোষ নেই।

পুষ্প বল্লে–তুমি ওর জন্যে কিছু করো। আমি সেখানে যাবো না, গেলেও তার উপকার হবে না। এক মোহ থেকে আর এক মোহে পড়ে যাবে–

–তোর সাহায্য ছাড়া হবে না পুষ্প, আমি অবিশ্যি গিয়ে দেখছি।

যতীন রামলালকে খুঁজে বার করলে। সে একটি নীচজাতীয়া মেয়ের বাড়ীর উঠানে বসে ছিল। মেয়েটি উেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানচে। তার বয়স ত্রিশ-বত্রিশের কম নয়, কালো ও অত্যন্ত কৃশকায়। সম্ভবত মাঝে মাঝে ম্যালেরিয়াতে ভোগে। মুখোনা নিতান্ত মন্দ নয়, চোখ দুটো বড় বড়–সমস্ত দেহের মধ্যে চোখ দুটোই ভালো।

রামলাল যতীনকে দেখে বল্লে–যতীনদা যে! তোমাকে কে সন্ধান দিলে হে? বুড়োটা নিশ্চয়ই। বেঁচে থাকতে জ্বালিয়েচে আবার মরেও যে একটু ফুর্তি করবো তার যো নেই। হাড় ভাজা ভাজা করলে। সেদিন এসেছিল, আমি হাঁকিয়ে দিয়েচি। বল্লাম–আমি যা ইচ্ছে করবো, তোমার বিষয়ের ভাগ তো পিত্যেশ করিনি যে তোমায় ভয় করবো। এখন আমি স্বাধীন।

যতীন হেসে বল্লে–বুড়োর দোষ নেই। সে তোমার ভালোর জন্যেই সন্ধান দিয়েছে। এই ভাবে বাঁশগাছে তেঁতুলগাছে কতদিন কাটাবে?

–দিব্যি আছি। দোহাই তোমার, তুমি আর লেকচার ঝেড়ো না।

–কিন্তু এতে তোমার লাভটা কি? কেন এর পেছনে পেছনে ঘুরচো–

–আমার দেখেই সুখ। ওর নাম সোনামণি। সোনামণি ধান ভানে, আমি ঐ খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি; আমতলার পুকুরঘাটে নাইতে যায় একা একা–আমি সঙ্গে যাই, যতক্ষণ না নাওয়া হয়, আমি নোনাগাছে বসে বসে দেখি। রাত্রে ও রাঁধে-আমি রান্নাঘরের কোণে চুপ করে বসে থাকি। বেশ চমৎকার দেখতে সোনা, অমন। চেহারা ভদ্দরলোকের ঘরে হয় না। শরীরের বাঁধুনি কি!.আমি তো কোনো অনিষ্ট করচিনে কারো, বসে থাকি এই মাত্র।

–নিজের অনিষ্ট নিজেই করচো। ওপরে উঠতে পারবে না। পৃথিবীর বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে।

–থাকি থাকবো। বেশ ফুৰ্ত্তিতেই আছি–আমি ওপরে উঠতে চাইনে, নীচেও নামতে চাইনে। স্বগে টগুগে তোমরা থাকো গিয়ে। আর ওই বুড়োটা যে দোকানের গদিতে বসে আছে দিনরাত, তাতে বুঝি দোষ হয় না? ওটাকে পারো তো তোমাদের স্বগে নিয়ে যাও টেনে। আমাকে ছেড়ে দিয়ে যাও এখানে, বেশ আছি। কেন আর জ্বালাও দাদা, বেঁচে থেকে এমন আনন্দে থাকিনি। বেঁচে থাকতে এমন করলে আমায় ওর স্বামী লাঠি নিয়ে তাড়া করতো–এ বেশ আছি, কেউ টের পায় না।

–চলো আমার সঙ্গে একজায়গায়, তোমায় নিয়ে যাবো

–আমায় মাপ করো ভাই। সোনামণিকে ফেলে আমি পাদমেকং ন। গচ্ছতি–

–থাক আর দেবভাষাকে ধ্বংস করে লাভ নেই। এখন আমার সঙ্গে চলো–যাবে?

রামলাল যতীনের ইঙ্গিতে সোনা বাগদিনীর বাড়ীর উঠোন থেকে অল্পদূরে একটা বাঁশঝাড়ের তলায় গিয়ে দাঁড়ালো। কতদিন পরে শীতের দিনে ঝরা শুকনো বাঁশপাতার ধুলোভরা গন্ধ আজ যতীনের নাকে এসে লাগচে। যেন সে দেহেই বেঁচে আছে–পৃথিবী মায়ের বুকের দুলাল। বনমূলোর গাছ কুচি কুচি সাদা ফুলে ভর্তি–দুচারটে বাঁশঝাড়ের পরেই দিগন্তব্যাপী ধানের ক্ষেত, সবে ধান কাটা হয়ে। গিয়েচে অঘ্রাণের শেষে। শুকনো ধানের গোড়া এখনো ক্ষেতের সর্বত্র।

যতীন বোধ হয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, রামলাল অধীর ভাবে বল্লে–কি বলছো বলো যতীনদা।

যতীন বল্লেও কি? আবার ও পাড়ার পুকুরঘাটের দিকে চাইচো কেন? কে আছে এখানে?

রামলাল দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লেনাঃ–বামুনের মেয়ে।

–আবার কি?

-ওই যে সাদা কোঠাবাড়ীটা–ওই বাড়ী থেকে রোজ বেরিয়ে পুকুরঘাটে নায়। বামুনবাড়ী।

–তাই হয়েছে কি?

–ষোল সতেরো বছর বয়েস। দেখবে?..এসো, এসো–এতক্ষণ নামচে জলে। নামটি বেশ, সন্ধ্যারাণী। ফর্সা, একরাশ চুল, একটু পরে ভিজে কাপড়ে নেয়ে বাড়ী ফিরবে। মুখোনি বড় চমৎকার। ছিপছিপে লিকলিকে সরু বেতের মত হেলে পড়ে পড়ে। মুক্তোর মত ঝক্ঝক্‌ করে দাঁতগুলো যখন হাসে। সব্দদাই হাসছে।

–তাতে তোমার কি?

–আমার কিছু না। বামুনের মেয়ে। ওরা মুখুয্যে।

–মরে গিয়েচ যখন আবার বামুন শুদুরই বা কি? ওতে কি তোমার লাভ?

রামলাল জিভ কেটে দুহাত তুলে নমস্কার করে বল্লে–বাপূরে! ও কথা বলতে নেই। বামুন জাত! আমরা হলাম তেলি তালী। আমি শুধু চোখে দেখেই খুশি। আমার ও সব উঁচু নজর নেই দাদা। সোনামণির হেঁসেলে বসেই আমার সব। ওকে পেয়েই আমার বেশ চলে যাচ্ছে।

–পেলে আর কি করে তা তো বুঝলাম না।

–ওরই নাম পাওয়া। দেহে নেই, কি করবো বলো। সত্যি, একটা কথা দাদা। পৃথিবীতে জন্মাবার কৌশলটা বলে দিতে পারো? দেহ ধরলে কোনো সুখ নেই। মেয়েদের ভালো করে পাইনি জীবনে। ওদের না পেয়ে জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে আমার।

–কেন, তুমি তো বিয়ে করেছিলে?

রামলাল বিরক্তির সঙ্গে মুখ খিঁচিয়ে বল্লে–আরে দূর, বিয়ে!–সে ওই বুড়োটার পাল্লায় পড়ে। নাতবৌএর মুখ না দেখে নাকি মরবে না! আমার ঘাড়ে যা তা একটা চাপিয়ে দিয়ে বুড়ো তো পটল তুলো। আজকাল কেমন সব স্কুলে কলেজে পড়া মেয়ে দেখিচি কলকাতায়। তাদের শাড়ী পরবার কায়দাই আলাদা। কথাবার্তার ধরনই আলাদা। না সত্যি যতীনদা, তুমি আমার যথার্থ উপকার করবে, আমায় জন্ম নেওয়ার কৌশলটুকু বলে দাও দাদা। মেয়েমানুষের সঙ্গে দুদিন প্রাণভরে ভালবাসা করে মিলেমিশে আসি দুনিয়াতে ফিরে। আমার বুকের ভেতরটা সৰ্ব্বদা হু হু করে দাদা। ও জিনিসটা আমি জানিনি– সত্যিকার মেয়েমানুষ পাইনি। স্বগে টগগে তোমরা যাও–আমি তো কারো কোনো অনিষ্ট করতে চাইচিনে ভাই। আমার নেয্য অধিকার চাইচি। সবাই দিব্যি কত ফুর্তি করচে–আমি অল্পবয়সে মরে গেলুম, যে বয়সে ভোগ করার কথা সেই বয়সে। আমার একটা হিল্লে করো, তোমার পায়ে পড়ি দাদা। মেয়েমানুষ না পেলে স্বগৃগে গিয়ে আমার কোনো সুখ হবে না। বুড়োটার সঙ্গে দেখা হোলে তাকেও বোলো। তিনি এখন আসেন আমায় উপদেশ দিতে! তুমি জানো, বিয়ের আগে বন্ধু পালের মেয়ে সরলার সঙ্গে আমার একটু ভাব হয়েছিল। মেয়েটা কেষ্টনগরে মেয়ে-ইস্কুলে পড়তো। দুবার আমার সঙ্গে লুকিয়ে আলাপ করেছিল! টাকা পাবে না বলে ঐ বুড়ো সেখানে আমার বিয়ে দিতে চাইলে না! সেও দিব্যি মেয়ে ছিল।

–এখন সে কোথায়?

–কেষ্টনগরে বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ী থাকে। আমি সেদিন গিয়ে একবার দেখে এসেছি। কষ্ট হয় বলে যাইনে। তার চেয়ে আমার সোনামণিই ভালো। কি চমৎকার একটি তিল ওর নাকের বাঁ-দিকে– দেখনি?..চল্লে? তাহলে–শোনো শোনো–তোমাদের তো অন্তর্ধান হোতে সময় লাগে না একমিনিটও। এই আছো এই নেই। তোমরা হলে স্বগগের মানুষ। তাহলে–আমার একটা উপায়–

যতীন ততক্ষণে বুড়োশিবতলার ঘাটে এসে পৌঁছেচে। পুষ্পের প্রশ্নের উত্তরে বল্লে–হোল না। একেবারে বুভুক্ষু আত্মা। ওকে পুনর্জন্মে পাঠাবার ব্যবস্থা করো পুষ্প। মেয়েমানুষের কথা বলতে অজ্ঞান। ভোগ না করলে ওর নারীতে আসক্তি যাবে না।

পুষ্প হেসে বিজয়িনীর মত দর্পিত সুরে গ্রীবা বাঁকিয়ে বল্লে–স্বর্গে মেয়েমানুষের অভাব? যদি বলো আজই তাকে দেখিয়ে দিয়ে আসি কাকে মেয়েমানুষ বলে! করুণাদেবীকেও নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিই– মূর্ছা হয়ে পড়ে যাবে তক্ষুনি।

যতীন মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর বিদ্যুল্লতার মত অপূৰ্ব্ব কান্তির দিকে চেয়ে বল্লে–তুমিই যথেষ্ট। আর তাঁকে নিয়ে যেতে হবে কেন। মূচ্ছা তো দূরের কথা, একদম পাগল হয়ে ক্ষেপে যাবে। কিন্তু তার দরকার নেই। বিভ্রান্ত করে দেওয়া হবে, উপকার কিছু হবে না তাতে।

পুষ্প কৃত্রিম রাগের সুরের রেশ তখনও টেনেই বল্লে–না, আমার রাগ হয়েছে শুনে যে, সে মূর্খ বলে স্বর্গে নারী নেই! নারীকে খুঁজতে যেতে হবে পৃথিবীতে।

–তোমরা চোখ ধাঁধিয়ে বেচারীকে পাগল করেই দিতে পারো, কিন্তু সে যা চায় তা দেবে কোথা থেকে? ওকে পাঠিয়ে দাও পৃথিবীতে। একজোড়া আগ্রহভরা কালো ভ্রমরচোখের চাউনি ওর দরকার হয়েছে।

–আচ্ছা, যতুদা, আমি যদি ওকে একেবারে আজন্ম ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী করে দিতে পারি?

–জন্ম নেওয়ার পরে?

পুষ্প হাসি হাসি মুখে বল্লে–হ্যাঁ। নয়তো কি, এখানে?

–কিলিয়ে কাঁটাল পাকানো দরকার কি? আত্মাকে তার স্বাভাবিক পথে তার স্বাভাবিক গতিতে যেতে দাও।

–এই কথাটিই আশা-বৌদির বেলা তুমি এতদিন বুঝতে চাইতে যতুদা। অপরের বেলাতে বেশ তো বুঝলে।

যতীন চুপ করে রইল।

ওপারের হালিসহরের শ্যামাসুন্দরীর মন্দিরে সন্ধ্যার আরতিধ্বনি শোনা গেল। গঙ্গার বুকে সান্ধ্য আকাশের প্রতিচ্ছবি।

সেদিন আশা একা পাথরের ওপরে বসে খুব কাঁদছিল।

একজন বিকটাকৃতি সাধুপুরুষের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল একদিন এই মরুভূমির ও পাহাড়ের দেশে। তিনি ওকে বলেচেন–পৃথিবীর মৃত্যুর পরে সাত লোক, প্রত্যেক লোকে আবার সাতটা স্তর। প্রত্যেক বার মানুষকে মরে নতুন দেহ ধরে নতুন স্তরে জন্ম নিতে হয়–ইত্যাদি। আশার মাথায় ওসব জটিলতা ঢোকে না–এক এক সময়ে সে বেশ বুঝতে পারে। সে মরেই গিয়েছে বটে। কিন্তু মরেও তো নিস্তার নেই, দুবার তো মরা যায় না–না হয় আবার চেষ্টা করে দেখতো। কোথায় গেল মা, বাবা, স্বামী, ছেলেমেয়ে–এ কি বিশ্রী জীবন, না আছে আশার আলো, না আছে আনন্দ, না আছে ভালবাসা, স্নেহ, দয়া। কেন মিছে বেঁচে থাকা? অথচ মরতেও তো পারে না। এ কি বন্ধন!

সেই যে একদিন স্বামীকে সে দেখলে, যেন তার পুরানো শ্বশুরবাড়ীর ঘরে সে গেল–কথাবার্তা বল্লে স্বামীর সঙ্গে। কি অদ্ভুত আনন্দে দিনটা কেটেছিল–যত অল্প সময়ের জন্যেই দেখা হোক না কেন। নাঃ কোথায় কি যে সব হয়ে গেল ওলটপালট। সংসার গেল ভেঙে। সে হোল অল্পবয়সে বিধবা। কত আশার স্বপ্ন দেখেছিল সে বিয়ের রাত্রে–সব মেয়েই দেখে। কেন তার ভাগ্যে এমন হোল! এই এক জায়গা–এমন ভয়ঙ্কর স্থান সে কখনো দেখেনি। মাঝে মাঝে ওর চারিধারে অন্ধকার ঘিরে আসে, মাঝে মাঝে আলো হয়। গাছ নেই। পালা নেই–পাথর আর বালি। চারিধারে উঁচু উঁচু পাথরের ঢিবিমত। যতদূর যাও, কেবল এমনি। মানুষ নেই, জন নেই।

মাঝে মাঝে কিন্তু অতি বিকট আকারের দু-একজন লোক দেখা যায়। অসহায় স্ত্রীলোককে একা পেতে তাদের মধ্যে দুবার দুজন। আক্রমণ করতে ছুটে এসেছিল। একবার কে এক দেবী (–কোথা থেকে এসেছিলেন, তাঁর নাম পুষ্প–বৌদিদি বলে ডেকেছিলেন তার মত সামান্য মেয়েকে) তাকে উদ্ধার করেন। আর একবার কেউ রক্ষা করতে আসেনি–একা ছুটতে ছুটতে সে এক পাহাড়ের গুহায় ঢুকে গেল। আশ্চর্যের বিষয়, যে তার পিছু পিছু ছুটে আসছিল–সে। তাকে আর খুঁজে পেলে না।

গৃহস্থের মেয়ে, গৃহস্থঘরের বৌ–একি উৎপাত তার জীবনে!

কি জানি, সেদিন শ্বশুরবাড়ীতে কি ভাবে যে সে স্বামীকে দেখেছিল… সেই থেকে তার মন অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। কেবলই সাধ হয় আবার সেই শ্বশুরবাড়ীর ভাঙা কোঠার ঘরে সে তার ছোট্ট সংসার পাতবে, বাঁশবাগানের দিকের রান্নাঘরটিতে বসে বসে কত কি রান্না করবে। ডাল, মোচার ঘণ্ট, সুকুনি (উনি সুকুনি বড় ভালবাসেন), কই মাছের ঝোল মানকচু দিয়ে…

উনি এসে বলবেন–কি গো বৌ, রান্না কি হয়ে গেল?

–এসো…হয়েচে। হাত পা ধুয়ে নাও–জল গরম করে রেখেচি। বড্ড শীত আজ।

মাটির প্রদীপ জ্বলচে রান্নাঘরের মেজেতে কাঠের পিলসুজে। তালপাতার চেটাই পেতে স্বামীকে আশা বসতে দিলে। মুখ দেখে মনে হোল উনি খুব ক্ষুধার্ত।-হ্যাঁগা, একটু চা করে দেবো?

–তা দাও, বড্ডই শীত।

-কাপগুলো সব ভেঙে ফেলেচে খোকা। কাঁসার গেলাসে খাও– ওবেলা দুটো কাপ কিনে নিয়ে এসো না গা কুড়লের বাজার থেকে।… চা খেতে খেতে উনি কত রকম মজার গল্প করছেন। সে বসে বসে শুনচে একমনে। সুন্দর দিনগুলি স্বপ্নের মত নেমেছিল তার জীবনে! আনন্দ…অফুরন্ত আনন্দ…সে সতী, পবিত্র, সাধ্বী। স্বামী ছাড়া কাউকে জানে না!

হঠাৎ আশা চমকে উঠলো। সে কার মুখের দিকে চেয়ে আছে? কে তার সামনে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছে? তার স্বামী নয়–এ তো নেত্যনারায়ণ! কুড়লে বিনোদপুরের বাড়ী নয়–এ কলকাতার মাণিকতলার সেই বাড়ীউলি মাসীর বাড়ী, সেই রান্নাঘর, তাদের ছোট্ট কুঠুরিটার সামনে ফালিমত রান্নাঘরটা। ওই তো রান্নাঘরে তার হাতে তৈরী সেই দড়ির শিকে, হাঁড়িকুড়ি ঝুলিয়ে রাখবার জন্যে সে নিজের হাতে ওটা বুনেছিল মনে আছে। ওই তো সেই তাদের ঘরখানা, জানালা দিয়ে একটুখানি দেখা যাচ্চে, মুগের ডালের হাঁড়ি, বিছানার কোণটা।… উঃ! বিছানাটা দেখে ওর গা কেমন ঘিন ঘিন্ করে উঠলো। এই যে খানিকটা মাত্র আগে সে নিজেকে সতী সাধ্বী, স্বামী-অনুরক্তা, পরম পবিত্রা, আনন্দময়ী রূপে বর্ণনা করে মধুর আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল, কোথায় গেল ওর সে আত্মপ্রসাদের পবিত্রতা ও নির্ভরশীলতা! সে ঐ বিছানায় একসঙ্গে শোয়নি নেত্যদার সঙ্গে? এই পুরু ঠোঁটওয়ালা, চোখের কোণে কালি ইন্দ্রিয়াসক্ত নেত্যদা, যার মুখ দিয়ে এই মুহূর্তে এখনি মদের গন্ধ বার হচ্চে–যার অত্যাচারে তাকে আফিং খেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে মরতে হয়েছিল। ওই তো সেই তক্তপোশ, যার ওপরে সে ছটফট করেছিল আফিং খেয়ে।

আশা চমকে শিউরে উঠতেই নেত্যনারাণ দাঁত বার করে বল্লে– বলি, আর একটু চা দেবে, না একেবারে গরম গরম ভাতই বাড়বে? বড় রাত হয়ে গেছে। খেয়ে-দেয়ে চলো শুয়ে পড়া যাক্। যে শীত পড়েচে!

আশা কাঠ হয়ে বসে রইল। এ কোথা থেকে কোথায় সে এসে পড়ল। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস এ!

নেত্যনারাণ বল্লে–সত্যি, আমিও যে দিনকতক তোমায় খুঁজে খুঁজে বেড়িয়েছি কত।

তারপর–

আশার মুখ দিয়ে আপনা-আপনিই বেরুলো–কি তারপর?

–তারপর কে যেন টেনে নিয়ে এল আমায় এখানে। উঃ সে কি আকর্ষণ! আমি বলি কোথায় যাচ্চি–তারপরেই দেখি আমি একেবারে বাড়ীউলি মাসীর বাড়ীতে মাণিকতলায়। একেবারে তোমার কাছে। চল গিয়ে শুইগে যাই। রাত হোল অনেক।

বিরক্তি, ভয়, হতাশা ও অপবিত্রতার অনুভূতিতে আশার সৰ্ব্বশরীর। যেন জ্বলে উঠলো আগুনের মত। সে যে এইমাত্র তার শ্বশুরবাড়ীর সেই পবিত্র কোঠাবাড়ীতে তার স্বামীর সঙ্গে ছিল–প্রথম বিবাহিত জীবনের সেই স্মৃতিমধুর রাত্রির ছায়ায়; কেন এই অপবিত্র কলঙ্কিত শয্যাপ্রান্তে তার আহ্বান? এ কি নিষ্ঠুরতা।

ও বলে উঠলো–আমি যাবো না। তুমি তো আমায় ফেলে বাড়ী পালিয়ে ছিলে? কেন আবার এলে তবে? আমার ছেড়ে দাও। আমি যাবো না ঘরে।

নেত্যনারায়ণ ঝাঁঝালো সুরে বল্লে–যাবে না শুতে? তবে কি সারারাত এখানে বসে থাকতে হবে নাকি?

–আমি আর মাণিকতলায় নেই–আমরা মরে গিয়েচি। তুমি আর আমি দুজনেই। চলে যাও তুমি আমার কাছ থেকে–তুমিও মরে। গিয়েছে।

নেত্যনারাণ অবাক হয়ে বল্লে কি যে বলো তুমি। ঠাট্টা করচো নাকি? এই দ্যাখো সেই মানিকতলায় আমাদের ঘর, চিনতে পারচো না? যাবে কোথায় নিজেদের আস্তানা ছেড়ে? ক্ষেপলে নাকি? চলো– চলো–

আশা কলের পুতুলের মত ঘরের মধ্যে গিয়ে বিছানাটিতে শুয়ে পড়লো। ওর সব্বশরীর ঘৃণায় রি রি করছে, বমি হয়ে যাবে যেন এখনি। সমস্ত দেহ মন যেন অপবিত্র হয়ে গিয়েচে ওর, সকালে উঠে গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে না এলে এভাব যেন যাবে না। যাবে সে। গঙ্গাস্নানে–ভোরে উঠেই যাবে বাড়ীউলি মাসীকে নিয়ে।

নেত্যনারাণ ঘরে ঢুকে দোরে খিল বন্ধ করে দিলে।

আশা অসহায় আর্ত সুরে বলে উঠলো–ওকি! খিল দিলে যে?

নেত্য ওর দিকে চেয়ে কড়া, নীরস কণ্ঠে বলে উঠলো–কী ন্যাকামী করচো সন্দে থেকে! সরে শোও, ওপাশে যাও!

আশা বিদ্রোহিণীর ভঙ্গিতে বিছানাতে উঠে বসে বল্লেখিল খুলে দাও বলছি। আমি থাকবো না এ ঘরে। আমি তোমার সঙ্গে থাকবো না এক ঘরে-বাড়ীউলি মাসীর সঙ্গে শোবো

নেত্যনারায়ণ ভীষণ রেগে আশার চুলের মুঠি ধরে বিছানায় ঘুরিয়ে ফেলে দিয়ে বাজখাঁই সুরে বল্লে–তোর মেয়েমানুষের না নিকুচি করেছে–ভালো কথার কেউ নও তুমি! যত বলচি রাত হয়েচে শুয়ে পড়। তোমার হাড় ভেঙে চূর্ণ করবো বেশি নেকুগিরি যদি করবি। ভুলে গিইচিস্ নেত্যনারাণকে হাত ধরে একদিন বেরিয়ে এসেছিলি মনে নেই? সেদিন কে আশ্রয় দিত তোকে, আমি যদি না এখানে। আনতাম! কোন্ বাবা ছিল তোর সেদিন?

–খবরদার, বাবা তুলো না বলচি–আমি চলে যেতে চাই এখান। থেকে।

–তবে রে বেইমান মাগি তোকে মজা না দেখালে

কথা শেষ না করেই নেত্যনারাণ আশাকে আথালি-পাথালি কিলচড় মারতে লাগলো। খাট থেকে মেজের ওপর ফেলে দিলে তলপেটে লাথি মেরে—

কেউ নেই কোনো দিকে। আশা মেজের ওপর গড়িয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো, আৰ্ত্ত অসহায় সুরে–ওর বেদনার্ত পশুর মত চাপা রুদ্ধ চীৎকারে মাণিকতলার বাড়ীউলি মাসীর বাড়ীটা কেঁপে কেঁপে উঠেছিল যেন। কেন এমন হোল? সে যে ভাল হোতে চেয়েছিল, সে যে সব ভুলতে চেয়েছিল, সে যে শ্বশুরবাড়ীতে গিয়েছিল প্রথমযৌবনের বিবাহিত দিনের স্মৃতিমধুর অবকাশে…সেই মাধবী রাত্রির শুভ আহ্বান কেন এ কলঙ্কিত বাড়ীর কলঙ্কিত শয্যাপ্রান্তে উপপতির নিষ্ঠুর আহ্বানে পরিণত হোল? হা ভগবান!

পরদিন সকালে উঠে আশা ছুট দিলে বাড়ী থেকে বেরিয়ে।

কেউ ওঠেনি বাড়ীতে। বাড়ীউলি মাসী ঘুমুচ্ছে, পাশের ঘরে পাল মশাই এরা ঘুমুচ্চে…এই ফাঁকে খিল খুলে আশা পালাচ্চে সুপ্ত কলকাতা শহরের রাস্তা দিয়ে। সে কোথায় যাচ্ছে, কি বৃত্তান্ত কিছুই জানে না। গতরাত্রির অপবিত্র স্মৃতিতে ওর গা ঘিন ঘিন করচে…না, আর এসব নয়। তাঁকে ভালো হতে হবে। সে চায় না এ পাপ সঙ্গ। উপপতির আসঙ্গলিপ্সা তার মন থেকে মুছে ধুয়ে গিয়েচে কবে, বমি হয় সে কথা। ভাবলে, মরার পরেও যেন গা বমি বমি করে। যতদূর হয় চলে যাবে, গঙ্গাস্নান করে শুদ্ধ হবে, এ পাপপুরীর ত্রিসীমানায় আর সে আসবে না। ভগবান তাকে রক্ষা করুন। সে বেঁচে নেই, যেখানে খুশি সে। যেতে পারে। কলকাতা শহর অনেকদূরে মিলিয়ে গেল।

পৃথিবীর পাপস্মৃতি আর তাকে কষ্ট দেবে না। অনেকদূরে সে চলে এসেচে বাড়ীউলি মাসীর কাছ থেকে। এ তার শৈশবের নিষ্পাপ দিনগুলিতে সে ফিরে গিয়েছে।

সে যেন তাদের গ্রামে মুখুয্যেদের পুকুরপাড়ে নিতাই ভড়দের বাড়ী নিতাই ভড়ের মেয়ে সুবির সঙ্গে খেলা করতে গিয়েচে। ঐ তাদের। পাড়ার পুকুরপাড়ের সেই বড় তেঁতুলগাছটা। ওই নিতাই ভড়ের বাড়ীর উঠোনের ধানের গোলা। নিষ্পাপ, সুন্দর শৈশবকাল। এখানে শুধু তার মাকে সে জানে, কোনো স্মৃতি তার মনে নেই–হেমন্তের প্রথম শিশিরার্ড গ্রাম্য মাঠে নব ধান্যগুচ্ছের আন্দোলনের মত তার জীবনের আনন্দে চঞ্চল, ঝরা শিউলিফুলের সুবাস সুরভিত জীবনের অতি মধুর প্রভাত।

-সুবি–ও সুবি–খেলবিনে আজ, বাইরে আয় ভাই–

সুবি বাইরে এসে বল্লে হাসিমুখে–আশাদি, কোথায় ছিলি রে? ক’দিন খেলতে আসিসনি–

আশা খুশি হোল। এ তার সত্যিকার শৈশব। সে বেঁচে গেল। এই তার সুন্দর, মধুর আশ্রয়। তার মা–এখুনি তার মা ডাকতে আসবে। তাকে। খুশির সুরে পরম নির্ভরতার সঙ্গে আশা ডাকলে সুবিকে। সুবি ছুটে এল, ওর হাতে একটা পেঁপের ডাল।

–কি হবে রে পেঁপের ডাল?

–বাজাবো। এই দ্যাখ

সুবি পেঁপের ডালের ফুটোতে মুখ দিয়ে পোঁ পোঁ করে বাজাতে লাগলো।

আশা হাততালি দিয়ে হেসে উঠলো খুশি হয়ে। কি মজা! কি মজা!

সুবি বললে–চল, মুখুয্যেদের নন্দিনী দিদি শ্বশুরবাড়ী থেকে এসেচে–দেখে আসি।

–না ভাই, মা বকবে।

–বাড়ীতে বলে আয় না? নন্দিনী দিদিকে দেখেই চলে আসবো

–চল তবে। কিন্তু ভাই দেরি করা হবে না–

ওরা কত জায়গায় খেলা করে বেড়ালে। বনমূলো-ফুলের বড়া ভেজে খাওয়ার অভিনয় করলে।

শৈশবের অতিপরিচিত সব খেলার জায়গা। নন্দিনী দিদি কত বড়, ওদের মায়ের বয়সী, এদের দুজনের আর কি বয়সটা? নদীর ওপর। মেঘ আসছে, কতদূর থেকে অকালবর্ষার মেঘ, ভেসে আসচে আকাশ ভরে। হেমন্তে কাশ ফুলের শোভা।

সুবি বল্লে–বেলা বেশি হয়েছে–বাড়ী ফিরি–

–হ্যাঁ চুল ভাই-মা বকবে–

মা তাকে বকবে সে জানে। টক কাঁচা তেঁতুল খাওয়ার জন্যে বকবে, এতক্ষণ বাইরে থাকার জন্যে বকবে। তারপর রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে ওকে খাইয়ে দেবে। উত্তরের ঘরে ওর জন্যে মাদুর পেতে অন্নপূর্ণা দিদি ছেলেমেয়ে নিয়ে শুয়ে আছে। খেয়ে গিয়ে অন্নপূর্ণা দিদির পাশে ও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।

সুবি বল্লে–আমাদের বাড়ী দুটি ভাত খাবি আশা?

–দূর, তোরা জেলে। জেলের বাড়ী বুঝি বামুনের মেয়ে খায়?

–নুকিয়ে?

সুবি হাসলে। ওর বড় বন্ধু সুবি। কষ্ট হয় সুবির মনে দুঃখু দিতে। তবু সে বল্লেনা ভাই সুবি, কিছু মনে করি নি। আমার বাড়ীতে ভাত তো হয়েইচে–

-বড়ি ভাতে ভাত খাবিনি আমার সঙ্গে? মা নতুন বড়ি দিয়েছে–

–দূর, বড়ি বুঝি এখন দেয়? বড়ি দেয় সেই মাঘ মাসে। নতুন। কুমড়ো নতুন কলাইএর ডাল উঠলে। মিথ্যে কথা বলিনি সুবি।

–মিথ্যে বলিনি। পুরোনো ডালের বুঝি বড়ি হয় না? চল আমার সঙ্গে

আশা বাড়ী ফিরচে। বেলা অনেক হয়ে গিয়েচে। মুখুয্যেদের পুকুরঘাটে আর কেউ নাইচে না, সবাই নেয়ে বাড়ী চলে গিয়েছে। তেঁতুলের ডালে মোটা মোটা কাঁচাতে তেঁতুল ঝুলচে দেখে ওর জিবে জল এল।

দুটো তেঁতুল পাড়লে হোত। কিন্তু কি করে পাড়ে? সুবিকে বল্লে হোত, সে অনেক রকম বুদ্ধি ধরে, একটা কিছু উপায় করতে পারতো।

পুকুরপাড়েই সরু রাস্তা ধরে খানিকদূরে গিয়ে ওদের বাড়ী। সারি সারি পেঁপে গাছ। একটা ধানের গোলা। তাদের মুচিপাড়ার ধানের ক্ষেত থেকে বছরের ধান এসে গোলা ভর্তি হয়। এখুনি সব চোখে পড়বে।

কিন্তু একটু যেন অন্যরকম।

পেঁপে গাছের সারি নেই। ধানের গোলা নেই। তাদের বাড়ীর চটা ওঠা ভাঙা পাঁচিলটা নেই। এ কোথায় সে যাচ্ছে? তাদের বাড়ীটা নয়। আতঙ্কে ওর বুকের মধ্যে যেন ভেঁকির পাড় দিতে লাগলো। বাড়ীউলি মাসীর বাড়ীর সেই দোরটা। মণিকতলার বাড়ীউলি মাসী। আশা চীৎকার করে পেছন ফিরে পালাবার চেষ্টা করতেই নেত্যনারাণ দোর খুলে বের হয়ে এসে বল্লে–কোথায় ছিলে এতক্ষণ চাঁদ? কাল দু’এক ঘা দিয়েছিলাম, বলে রাগ হয়েছে বুঝি?

তারপরেই সে আশার মুখের কাছে হাত নেড়ে নেড়ে ইতরের ভঙ্গিতে গাইলে তুড়ি দিতে দিতে–

দুটো কথা কি তোমার প্রাণে সয় না?
একঘরে ঘর করতে গেলে ঝগড়া কি, প্রাণ, হয় না?

দুটো কথা কি–

এসো এসো শোবে এসো বেলা হয়ে গিয়েছে।

ব্যাধবিদ্ধা হরিণীর মত আশা ছটফট করতে লাগলো নেত্যনারাণের হাতে।

তারপর সে দুম দুম করে নিষ্ঠুরভাবে মাথা কুটতে লাগলো ঘরের চৌকাঠে। সে আজ মরে যাবে। এ কলঙ্কিত জীবন সে রাখতে চায় না। ব্যথা লাগচে, রক্তারক্তি হচ্চে–কিন্তু সে মরতে পারবে না। সে অমর। অনন্তকাল ধরে সে মাথা কুটলেও মরবে না।

নেত্যনারাণ তাকে হাত ধরে ওঠাতে লাগলো। বলতে লাগলো–কি পাগলামি করো, ক্ষেপলে নাকি? চলো শুই গিয়ে–

সন্ধ্যাবেলা উনুনে আঁচ দিয়েচে ঘরে ঘরে। নেত্যনারাণ বাড়ী নেই, কোথায় গিয়েচে। ও এসে বাড়ীউলি মাসীর দরজায় দাঁড়ালো। কোথায় সে পালাবে তাই ভাবচে। এ কি ভয়ানক নাগপাশের বন্ধনে তাকে পড়তে হয়েছে। আর সে এ বাড়ীতে থাকতে পারবে না। ঐ ঘরে কত রাত্রে কুলবধূর জীবন কলঙ্কিত হয়েছে। তারপর ঐ ঘরের ঐ তত্ত্বপোশে বিষ খেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তার সে শোচনীয়। মৃত্যু! আবার সে বেরিয়ে পড়লো।

এই কলকাতা শহরের সর্বত্র তার স্মৃতির বিষ ছড়ানো। কালীঘাট? কালীঘাটে কি করে যাবে, নেত্যদা সেখানেও একবার তাকে নিয়ে গিয়ে সেখানে বিষ ছড়িয়ে এসেচে। আবার সে ছুটে চলে যাবে কুড়লে বিনোদপুরে স্বামীর ঘরে। সেখানে যেতে পারলে সে বাঁচে।

কিন্তু একদিন কেমন করে হঠাৎ গিয়ে পড়েছিল–সেইদিন গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখাও হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাবার পথ সে জানে না। চিনে আজ আর যেতে পারবে না। ভুলে গিয়েছে সে পথটা।

তার এক সই এর বাড়ী আছে সুবর্ণপুর। সেখানকার রজনী ডাক্তারের মেয়ে। কুমারী জীবনের বন্ধু। রজনী ডাক্তারের বাড়ীর পাশে ছিল ওর। বড়দিদির শ্বশুরবাড়ী, যে বড়দিদি বিধবা হয়ে ইদানীং ওদের সংসারে ছিলেন। জামাইবাবুর সঙ্গে একবার দিদির ওখানে বেড়াতে গিয়ে সুবৰ্ণপুরে রজনী ডাক্তারের মেয়ে বীণার সঙ্গে আলাপ হয়।

তাদের কাঁটালতলায় দুর্গাপিঁড়ি পাতা দেখে আশা বলতো–ভাই সই, কাঁটালতলায় দুর্গাপিঁড়ি কেন?

বীণা বলতো–দুর্গাপিঁড়ি ঘরে তুলতে নেই আমাদের। বাপঠাকুরদার আমল থেকে কাঁটালতলাতেই থাকে–

সইএর বিয়ে হয়েছিল কাঁচরাপাড়ার কাছে বাগ বলে গ্রামে। বাগের দত্তদের বাড়ী, তারা ওখানকার নামকরা জমিদার। সই যদি তাকে আশ্রয় দেয়, সেই পবিত্র কুমারীজীবনে সে লুকুতে পারে। কলকাতার বাড়ীউলি মাসীর বাড়ী থেকে সে চলে যাবে সোজা-সুবর্ণপুর গ্রামের সেই কাঁটালতলায়, সেইখানে সইদের দুর্গাপিঁড়ি পাতা থাকে সারা বছর।

উনুনের আঁচের ধোঁয়ায় অন্ধকারে অস্পষ্ট সিঁড়ির পথ বেয়ে সে নেমে এল রাস্তায়। কি জানি কেন, বাড়ীটা থেকে সামান্য একটু দূরে চলে এলেও ও নিজেকে পবিত্র মনে করে। মনের সব গ্লানি কেটে যায়…সে নিৰ্ম্মল, শুদ্ধ, অপাপবিদ্ধ আত্মা…এতটুকু পাপের বা মলিনতার ছোঁয়াচ লাগেনি তার সারা দেহমনে।

হঠাৎ কেমন করে সে রজনী ডাক্তারের কোঠাবাড়ীটার উঠোনে নিজেকে দেখতে পেলে সেই কাঁটালতলায়।

–ও সই!

–ও মা–কত কাল পরে এলি তুই? ভাল আছিস্ সই?

বীণার বিয়ে হয়নি, সিঁথিতে সিঁদুর নেই। বীণা এসে ওকে জড়িয়ে ধরলে কত আদরে।

আশা আনন্দে ও উৎসাহে অধীর হয়ে উঠলো। বীণাকে বল্লে–সই, তুই আমাকে ধরে রাখৃ ভাই। কোথাও যেতে দিস্‌নি।

–না, থাক্‌ এখানে। কোথাও যেতে দেবো না–

–ভাই, এ সত্য না স্বপ্ন?

–কেন রে?

–আজকাল আমার কি যে হয়েছে, কোটা স্বপ্ন, কোটা সত্যি বুঝতে পারিনে। দুটোতে কেমন যেন জড়িয়ে গিয়েছে।

–না ভাই। ওই সেই দুর্গাপিঁড়ি-পাতা কাঁটালতলা। আমাদের ইতুপূজোর ঘট ওখানে সাজানো আছে। এখন সন্দেহ গেল রাজকুমারী?

–ঠাট্টা করিস নি। আমার ভয়-ভয় করে সর্বদা। কি হয়েছে আমার। বলতে পারিস?

–তোর মাথা হয়েছে। নে, আয় দুটো মুড়ি আর ফুট কলাই ভাজা খা। তুই ভালবাসিস্–মনে আছে?

-খুব।

সারাদিন দুই সইএ কত গল্পগুজব কতকাল পরে। সব ভুলে গিয়েছে আশা–সে পবিত্র, পবিত্র। সামনে তার সুদীর্ঘ জীবন পড়ে আছে। সইএর সঙ্গে গল্পে কত ভবিষ্যৎ জীবনের রঙীন স্বপ্ন আঁকে সে রজনী ডাক্তারের বাগানের বাতাবীলেবুতলার ছায়ায় বসে। শ্বশুরবাড়ী হবে পাড়াগাঁয়ে বড় গেরস্থ ঘরে, আট দশটা ধানের গোলা থাকবে বাড়ীতে, সে বাড়ীর বৌহিসেবে সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখাবে গোলার সামনে। বেদীতে…ধান মেপে মেপে গোলায় তুলবে। স্বামী হবে উঁকিল বা ডাক্তার। সারাদিন পরে খেটেখুটে এসে বলবে–ও বড় বৌ–আলো দেখাও–

বীণা হাসে। সেও তার মনের কথা বলে।

গ্রামের একটি ছেলেকে সে ভালবাসে। যদি তার সঙ্গে বিয়ে হয়–

ও সব কথা কেন? ও কথা সে শুনতে আসেনি। তবুও সে জিজ্ঞেস করলে–কে ভাই ছেলেটি?

–ব্রাহ্মণ। সত্যনারাণ চাটুয্যের মেজছেলে। তাকে দেখাবো একদিন।

যতক্ষণ সে সইএর বাড়ী রইল, সে হয়ে গেল একেবারে ঠিক তেরো চোদ্দ বছরের সরলা মেয়েটি। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে এল। কাঁটালতলায় ছায়া পড়লো, রাঙা রোদ একটু একটু দেখা যায় গাছের তলায়। এ সময়ে আশাকে বাড়ী ফিরতে হবেই।

সইকে বল্লে–আমার সঙ্গে একটু এগিয়ে চল না আমাদের বাড়ী পৰ্য্যন্ত সই।

–চল এগিয়ে দিয়ে আসি

বাঁশবাগানের তলা দিয়ে অন্ধকার সন্ধ্যার পথে দুই সইএ চলেছে। ওই জামাইবাবুদের বাড়ীটা। বড়দি এতক্ষণ চা করে নিয়ে বসে আছে। ওর জন্যে।

বীণা বল্লে–ওই তোদের বাড়ীর দরজাটা–আমি চলি সই। এর পরে একলা যেতে পারবো না

বীণা চলে গেল অন্ধকার বাঁশবনের পথটা দিয়ে একা একা। আশা সইএর অপস্রিয়মাণ মূৰ্ত্তির দিকে চেয়ে রইল–তারপর যখন আর দেখা গেল না তখন সামনের দিকে চেয়েই ভয়ে ওর বুক কেঁপে উঠলো কি ওখানে?

ও চীৎকার করে ডাক দিলেও সই–ও বড়দি–

ওর সামনে বাড়ীউলি মাসীর দরজা, যে দরজাটা খুলে সকালে আজই পালিয়ে গিয়েছিল লুকিয়ে। ওর চীৎকার শুনে দরজাটা খুলে নেত্যনারাণ দুপাটি দাঁত বের করে এগিয়ে এসে বল্লে–বাপরে! কি তোমার কাণ্ড! কোথায় গিয়েছিলে সারাদিন?…

তার পর ওর হাত ধরে টানতে টানতে বলে–চলো, চলো, রাত হয়ে গিয়েছে–শোবে এসো, শোবে এসো…

কতকাল যে কেটে গেল মানিকতলার বাড়ীউলি মাসীর সেই বাড়ীটাতে। তার কোন হিসেব নেই, কোনো লেখাজোখা নেই–আশার মনে হয় বাল্যকাল থেকে তার বিবাহের সময়, তারপর তার সমস্ত বিবাহিত জীবন নিয়ে যতটা সময়ের অভিজ্ঞতা তার আছে–তেমনি কত বাল্যজীবন, কত বিবাহিত জীবন, কত বৈধব্যজীবন এবং কত মানিকতলার জীবন তার কেটে গেল–সে কিন্তু সেই এক ভাবেই রইল একই জায়গায় স্থাণুবৎ অচল।

নেত্যদা তাকে ছাড়ে না। কতবার সে পালিয়ে গিয়েছে–জীবনের। কত জানা অজানা কোণে। কত বছরের ব্যবধান রচনা করচে সে বর্তমান জীবনের ও সেই সব অতীত দিনের শান্তি ও পবিত্রতামণ্ডিত অবকাশের।

কিন্তু কোনো ব্যবধান টেকে না।

সব এসে মিশে যায় বর্তমানের এই কলকাতা মাণিকতলার বাড়ীউলি মাসীর বাড়ীর দরজায় এই ঘরটাতে, ওই তক্তপোশটাতে।

এখন যেন মনে হয়–এসব যা ঘটেছে, এ আসল নয়, সব যেন। অবাস্তব, স্বপ্নবৎ…এ সব ছায়াবাজি জীবনটাই যেন একটা মস্ত ছায়াবাজি হয়ে গেল তার…

সই, মা, ভাই, বোন, স্বামী, ছেলে-মেয়ে কিছুই নিত্য নয় তার জীবনে… আসে আবার চলে যায়…বাড়ীউলি মাসীর এ বাড়ীটাই কি এদের মধ্যে একমাত্র সত্যি? আর নেত্যদা, আর এই সরু রান্নাঘরটা… আর ওই ছোট ঘরের ছোট তক্তপোশটা? এর কি কোনো শেষ হবে না, এ দিনের এই সব টিকে থেকে যাবে চিরকাল?

কোটা সত্যি, কোটা স্বপ্ন আজকাল সে বুঝতে পারে না। যেটাকে সত্যি ভেবে হয়তো আঁকড়াতে যায়–সেটাই মিথ্যে হয়ে স্বপ্ন হয়ে যায়। তার কি কোনো রোগ হোল? এমন সাধের, এমন আদরের এমন আশা-আনন্দের জীবনের শেষকালে এ কি ঘটলো? কোথায় চলে গেল স্বামী, কোথায় গেল বাপের ভিটে, শ্বশুরের ভিটে, এ কিভাবে পাগল বা বুদ্ধিহীন কিংবা রোগগ্রস্ত অবস্থায় সে পড়ে রইল?

নেত্যনারাণ এসে বল্লে–রান্না করবে না আজ? বসে আছ যে–

–আমি জানিনে। তুমি আমায় বিরক্ত করতে এসো না

–কেন, আজ আবার রাজরাণীর কি মেজাজ হোল?

–তুমি চলে যাও এখান থেকে

নেত্যনারাণ ওর কাছে এসে বল্লে–বড় ঠাট্টা কর তুমি মাঝে মাঝে। কোথায় যাই বল তো? এখন আমি চলে গেলে তুমি খাবে কি? রূপের ব্যবসা যে খুলবে, সে আর হবে না। আয়নাতে চেহারাখানা দেখেচো এদানিং?

আবার কি-সব যাচ্ছেতাই কথা। অনবরত অপবিত্র অশ্লীল ধরনের এই সব কথা কেন তাকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সৰ্ব্বদা শুনতে হয়। ও ভেবে ভেবে বল্লে–আমরা তো মরে গিয়েচি–খাবার আর দরকার

নেত্যনারাণ ওর দিকে চেয়ে বল্লে–মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? তবে খাচ্চ কেন? রোজ রোজ রান্নাবান্না করছো কেন? বাজার করচি কেন?

–কেউ খাচ্চে না। কেউ বাজার করছে না। সব মিথ্যে, সব স্বপ্ন!

কিন্তু নেত্যনারাণের চোখের বিস্ময়ের দৃষ্টি এত অকপট যে, নিজের বিবেচনার ওপর আশা আস্থা হারালে। নিজে যা বলতে চাইছিল, শেষ করতে পারলে না। মিনতির সুরে বল্লে–আচ্ছা নেত্যদা, তোমার কি মনে হয়? এমন কেন হচ্চে বলতে পারো? এ সব কি? সত্যি না স্বপ্ন?

–তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

-–তাই বলে কি তোমার বিশ্বাস?

–নইলে আবোল-তাবোল বকবে কেন? স্বপ্ন কিসের? আমি রইচি, আমি হাটবাজার করচি, খাচ্চি দাচ্চি–সব স্বপ্ন হোল কি ভাবে? এই ঘরবাড়ী দেখতে পাচ্চ না?–বাড়ীউলি মাসী, ও বাড়ীউলি মাসী–শুনে। যাও এদিকে। কি বলচে শোনা ও!

বাড়ীউলি মাসী বল্লে–কি গা?

-–ও বলচে এ সব নাকি মিথ্যে। তুমি ঘরবাড়ী, এই বিছানা–সব স্বপ্ন!

কি জানি বাপু, ও সব তোমরা বসে বসে ভাবো। আমাদের খেটে খেতে হয়, শখের ভাবনা ভাববার সময় নেই। বেলা হোল দুপুর, উনুনে আঁচ পড়েনি। পালেদের বৌ সেই কোন্ সকালে একবাটি চা খাইয়েছিল ডেকে। যাই–

নেত্য ওর দিকে চেয়ে বল্লে–শুনলে?

আশা বোকার মত শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে হতাশ ভাবে বল্লে–কি জানি। বাপু! আমার যেন এক এক সময় মনে হয় এই স্বপ্ন দেখচি তুমি আর আমি। এ ঘর নেই, বাড়ী নেই, খাট নেই, বিছানা নেই–ওই রাস্তা, লোকচলাচল সব মিথ্যে, সব স্বপ্ন। কেবল তুমি আর আমি আছি– আর এই যে সব দেখচি সব স্বপ্ন দেখচি আমরা দুজনে।

-বা রে, বাড়ীউলি মাসী এলো, কথা বলে গেল, ও-ও কিছু নয়?

পরে বিভ্রান্তকে বোঝাবার সুরে সদয়ভাবে বল্লে–এ সব তোমার। মাথার ভুল। সব সত্যি–দেখচো না বাড়ীউলি মাসী এসে কি বলে গেল। একবার তোমাকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খাওয়াতে হবে। রাত্তিরে ভাল ঘুম হচ্চে না, না কি?

আশা বল্লে–তবে মাঝে মাঝে পাই আবার হারাই কেন?

অনেকটা অন্যমনস্ক সুরে কথাটা বলে ফেলেই ও চাপতে চেষ্টা করলে। বল্লে–কি জানি, যা বলচো, তাই বোধ হয় হবে। আচ্ছা আমরা এখানে কতকাল থাকবো? চলে যাবো এখান থেকে।

–কেন যাবো? বেশ আছি।

–আমাকে আমার গাঁয়ে রেখে এসো–লক্ষ্মী?…

নেত্য রেগে উঠে বল্লে–মেরে হাড় গুঁড়ো করবো। সেই শম্ভু বাঁদরটার জন্যে মন কেমন করচে বুঝি? আমি সব জানি।

–না না, সত্যি না নেত্যদা। তোমার দুটি পায়ে পড়ি। আমার এখানে থাকতে ভাল লাগছে না। ভয় হচ্চে। মনে হচ্চে যেন এমন জায়গায় এসে পড়েচি, এখান থেকে বেরুবার পথ নেই। এই ছোট্ট ঘরটা, ওই তক্তপোশটা…এ বাড়ীর যেন চারিদিকে দেয়াল দিয়ে আমাদের কে আটকেচে। এখান থেকে কেউ বেরুতে দেবে না। এ সবও সত্যি নয়, এ সব মিথ্যে, সব ছায়াবাজি। যা এই সব দেখচি না?…সব ভুল।

নেত্য ব্যঙ্গের সুরে বল্লে–আবার আবোল-তাবোল বকুনি? মাথা কি একেবারে গেল?

আশা আপন মনেই বলে যাচ্ছিল–এ থেকে তোমার আমার কোনোদিন উদ্ধার নেই। জানো, আমি অনেক চেষ্টা করেচি পালাবার, বাইরে যাবার। কিন্তু পারিনি–কে আবার এই সবের মধ্যে আমায় এনে ফেলেচে। অথচ আমি চাই উদ্ধার পেতে এ সব থেকে, এখান থেকে অনেক দূরে চলে যেতে–যেখানে এসব নেই। কেন পারিনে। জানো? অনেক চেষ্টা করেছি আমি পালাবার-পারিনি।

আশা অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়লো। নেত্য না-বোঝার দৃষ্টিতে ওর। দিকে চেয়ে রইল উদ্বিগ্নভাবে।

নেত্য নানারকম অত্যাচার শুরু করলো ক্রমে ক্রমে আশার ওপর। ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রাখে, মারধর তো করেই। বাড়ীউলি মাসী যোগ দিয়েচে নেত্যদার দিকে। ওকে বলে–বল্লম, এক মারোয়াড়ী বাবু জুটিয়ে দিচ্ছি–তা হোল না। লোকে কি যার সঙ্গে বেরিয়ে আসে, তার সঙ্গেই ঘর করে চিরকাল? কত দেখুন আমার এ বয়সে। ওই যে পাশের বাড়ীর বিন্দি, আপন দেওরের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল, তা কই এখন? কোথায় গেল সে রসের নাগর দেওর? নোয়াওলা খোট্টা বাবু রাখেনি ওকে? কেমন ছাপর খাট, গদি, এক পিরুস্তুত রূপোর বাসন! দুপয়সা গুছিয়েছে–

কি ঝকমারি করেচে আশা। এই কথাবার্তা তার গাঁয়ে ছুঁচের মত বেঁধে আজকাল। কেউ ভাল কথা যদি বলতো দুটো এখানে। কাল ঢেলে ঢেলে তার সারা গায়ে কালি মাখিয়ে দেয় এরা।

কিন্তু কাটলো বহুঁকাল। অনেক দিন, বৎসর, মাস–অনেক জীবন, জন্ম মৃত্যু যেন জড়িয়ে এক হয়ে গিয়েছে। সত্যিতে স্বপ্নতে জড়িয়ে এক হয়ে গিয়েচে। এক শক্ত হয়ে পাক জড়িয়ে গিয়েছে এবং আরও যাচ্ছে দিন দিন যে, কেউ খুলতে পারবে না। একদিন সে আফিং আনিয়ে নিল পালেদের ছেলের হাত দিয়ে। সেদিন নেত্যনারাণ কোথায় বেরিয়েছে–ভালোই হয়েছে, একেবারে সব যন্ত্রণার অবসান সে আজ করবে। ঘরে খিল দিয়ে শুয়ে রইল আফিং খেয়ে–তারপর ক্রমে ঝিমিয়ে পড়লো। পেটে কোথায় যেন ভীষণ বেদনা করচে সব যন্ত্রণার। আজ একেবারে শেষ হবে। সকলের মুখে অশ্লীল কথা শুনতে হবে। কিন্তু কোথা থেকে নেত্যনারাণ ফিরে এসে ওর ঘরের দোর ভেঙে খিল খুলে ওর মাথার চুল ধরে সারা বারান্দা হাঁটিয়ে বেড়াতে লাগলো। কিছুতেই ওকে বসতে দেয় না, গালে চড় মারে–বলে–বসতে চাও? ন্যাকামি করে আবার আফিং খাওয়া হয়েছে–ওঠো বেঁচে, তারপর তোমার হাড় আর মাস–

বাড়ীউলি মাসী কোন্ ফাঁকে কাছে এসে চুপি চুপি বলে–বন্ধু বাপু, দিব্যি মাড়োয়াড়ী বাবু জুটিয়ে দিচ্চি। অমন কত হচ্চে আজকাল। কেন মিছিমিছি আফিং খেয়ে কষ্ট পাওয়া?…দিব্যি সুখে থাকবে। ওই পাশের বাড়ীর বিন্দি। ছাপর খাট, কলের গান, বাসনকোসন। ও যে। আপন দেওরের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল–

ওর মন আর পারে না। অবসন্ন, ক্লান্ত মন যেন বলে ওঠে–ভগবান, আমি আর পারিনে। আমায় বাঁচাও–এ থেকে উদ্ধার করো–

কে যেন ওর কথা শোনে। আশার স্বপ্নাচ্ছন্ন, অবসন্ন মন বোঝে না কে সে। অনেক দূরের, অনেক আকাশের পারের কোন দেশ থেকে সে যেন উড়ে আসে পাখায় ভর করে। একবার আশার মুগ্ধ দৃষ্টির। সম্মুখে যেন এক অনিন্দ্যসুন্দরী, মহিমময়ী দেবীমূৰ্ত্তি ভেসে ওঠে। বরাভয়করা স্মিতহাস্যমধুরা…অপরূপ রূপসী জ্যোতির্ময়ী নারী। আর মনে আছে এক সাদা বড় পাহাড়ের ছবি, সবাই মিলে, তাকে ছুঁড়ে যেন সেই সাদা পাহাড় থেকে বহুদূরে নীচের দিকে ফেলে দিচ্চে।

দেবী যেন হাসিমুখে বল্লেন–যাও, ভাল হও–ভুল আর কোরো না।

কে যেন প্রশ্ন করলে–আশা-বৌদির স্বামীর সঙ্গে মিলবে কি করে? ও তো সব ভুলে যাবে।

দেবী বল্লেন–আমি সব মিলিয়ে দিই। ওরা তো নতুন মানুষ হয়ে চললো, ওদের সাধ্য কি?

তারপর গভীর অতলস্পর্শ অন্ধকার ও বিস্মৃতি। অন্ধকার…অন্ধকার।

পুষ্প একদিন সেই নির্জন গ্রহটিতে একা গেল। ওর বড় কৌতূহল। হয়েছিল বনকান্তার, অরণ্যাণী ও শৈলমালায় পরিপূর্ণ ওই ছায়াভরা। গ্রহের জীবনযাত্রা দেখতে।

এবার রাত্রি নেমেচে গ্রহটিতে।

জীবকুল সুপ্ত। অপূৰ্ব্ব সুন্দর দেশ। বোধহয় ঐ গ্রহে তখন বসন্ত ঋতু। সেই দিদিশাহীন অরণ্যে কান্তারে নাম-না-জানা কত কি বন কুসুম-সুবাস। বনে বলে ছাওয়া সারা দেশ। বনের গাছপালার মধ্যে দিয়ে বেঁকে এসে ওর সাথী তারার নীল জ্যোৎস্না পড়েছে। নৈশ কচিৎ পক্ষ-বিধূনন।

গ্রহের দিকবিদিক সে চেনে না। পৃথিবীতে গেলে তবে উত্তর দক্ষিণ দিক বুঝতে পারে। এ গ্রহের লোকে কাকে কোন দিক বলে কে জানে? কিন্তু এর মাঝামাঝি থেকে একটু বাঁ দিক ঘেঁষে এক উত্তুঙ্গ শৈলশ্রেণী বহুদূর ব্যেপে চলে গিয়েছে, অনেক ছোট বড় নদী এই শৈলগাত্র থেকে নেমে চলেচে নীচেকার বনাবৃত উপত্যকায়। দু-একটি বড় জলপ্রপাত বনের মধ্যে।

ওর আকাশে বাতাসে বনে বনানীতে কেমন একটি শুদ্ধ, অপাপবিদ্ধ আনন্দ। এর বাতাসে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যে নেবে, সে-ই যেন হয়ে উঠবে। আনন্দময় ব্ৰহ্মদর্শী ভক্ত, ধীর ও নির্লোভ, তৃষ্ণাহীন ও উদার। এর বনতলে জীবের অমরত্বের কথা লেখা আছে, লেখা আছে এ বাণী যে এই বনতলে তাঁর আসন পাতা। উচ্চ জগৎ বটে।

হঠাৎ ও দেখলে একটি বনপাদপের তলে শিলাসনে স্বয়ং কবি ক্ষেমদাস বসে।

ও দেখে বড় খুশি হয়ে কাছে গেল। ক্ষেমদাস বল্লেন–এসো এসো, যিনি আদি কবি, বিশ্বস্রষ্টা, তাঁর বিষয়ে আমি কবিতা রচনা করছি।

–আপনি এ গ্রহ জানেন?

–কেন জানবো না? এ রকম একটা নয়–দীর্ঘ বনফুলের মালার মত একসারি গ্রহ আছে বিশ্বের এ অংশে। আমি জানি। তবে এখানে। আসতে হয় যখন এ গ্রহে রাত্রি।

-কেন?

–এখানকার লোক উচ্চশ্রেণীর জীব। ওরা আমাদের দেখতে পাবে। দিনের আলোয়। এখন ওরা সুপ্ত। ব’সো ওই শিলাসনে। বেশ লাগে। এখানে। লোকালয় এ গ্রহে খুব কম। বনে হিংস্র জন্তু নেই। কেমন। নীল জ্যোৎস্না পড়েচে দেখেছো? বড় ভালবাসি এ দেশ।

–আপনি এখানে আসেন কেন?

–একটি তরুণ কবি আছে এ গ্রহে, তাকে প্রেরণা দিই। ভগবদ্ভুক্ত। এই শিলাসনেই সে খানিক আগেও বসে ছিল। প্রতি রাত্রে নির্জনে এসে বসে। সৃষ্টির এই সৌন্দর্য্যের স্তবগান রচনা করে। ওই তার উপাসনা। তুমি জানো আমারও ওই পথ। তাই তার পাশে এসে দাঁড়াই।

–তিনি দেখতে পান আপনাকে?

–না। আমাকে বা তোমাকে দেখতে পাবে না। তোমার সঙ্গী। যতীনকে দেখতে পেতো। সে এখন কত বড় ছেলে।

পুষ্প সলজ্জভাবে বল্লেন’বছরের বালক।

ক্ষেমদাস হেসে বল্লে–আবার নব জন্মলীলা। বেশ লাগে আমার। আবার মাতৃক্রোড়ে যাপিত শৈশব। চমৎকার!

পুষ্প হেসে বল্লে–সন্ন্যাসী এখানে উপস্থিত থাকলে আপনার কথা মেনে নিতেন?

–জানি, সে বলে বার বার দেহ ধারণ করা মুক্তির পথে বাধা। সে বলে, ও থেকে উদ্ধার নেই। সেই একই জীবনের পুনরাবৃত্তি, চক্রপথে উদ্দেশ্যহীন গতাগতি। সেই একই লোভ, তৃষ্ণা, অহঙ্কার নিয়ে বার। বার অসার জন্ম ও মরণ। এই তো?

–কথাটা কি মিথ্যে?

–না। মানি। কিন্তু সে কাঁদের পক্ষে? যারা জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পায়নি বা ভগবানের দিকে চৈতন্য প্রসারিত করেনি তাদের পক্ষে। যারা জানে না স্থূল দেহের পরিণাম ধূমভস্ম নয়, জন্মের পূৰ্ব্বেও সে ছিল, মৃত্যুর পরেও সে থাকবে, ভূলোকে শুধু নয়, ব্রহ্ম থেকে জীবে নেমে আসতে যে সাতটি চৈতন্যের স্তর আছে, এই সাত স্তরের প্রত্যেকটি স্তরে এক একটি লোক, সে এই সব লোকেরই উত্তরাধিকারী, ভগবানের সে লীলা-সহচর। যারা এ কথা জানে না, জানবার চেষ্টা করে না, জেনেও গ্রহণ করে না বিষয়ের মোহে–তাদের। পক্ষে সন্ন্যাসীর কথা পরম সত্য। কিন্তু আমার পক্ষে নয়।

পুষ্প একমনে শুনছিল। এই পবিত্র গ্রহের তপোবনসদৃশ অরণ্যকান্তারে এ দেশের ঋষিকবিরা যেখানে নিদ্রাহীন গভীর রাত্রে ভগবানের স্তবগাথা রচনা করেন–এ গ্রহের উপনিষদ জন্ম লাভ করে তাঁদের হাতে–এই স্থানই ক্ষেমদাসের উপদেশ উচ্চারিত হবার উপযুক্ত বটে। পুষ্প ব্যগ্ৰসুরে বল্লে–বলুন, দেব, বলুন–উপযুক্ত বটে। পুষ্প ব্যগ্ৰসুরে বল্লে–বলুন, দেব, বলুন–

ক্ষেমদাস আবার বল্লেন–তমেব বিদিত্বাতিমৃতুমেতি–যে তাঁকে জেনেচে সে দেহধারণ করেও মুক্ত, যেমন দেখেছিলে সন্ন্যাসীর গুরুভ্রাতাকে, বন-মধ্যস্থ সেই সন্ন্যাসীকে। যাঁদের চৈতন্য জাগ্রত হয়েচে, দেহ থেকেও তাঁরা জীবন্মুক্ত। ভগবানকে যারা ভালবাসে মনপ্রাণ দিয়ে, দেহধারণ করেও তাঁরা জীবন্মুক্ত। তাঁরা জানেন এই বিশ্বের সমস্ত গ্রহ, সব তারা, সব বসন্ত, সব জীবলোক আমার। আমি এদের মাধুৰ্য্য উপভোগ করবো। তাঁর সৌন্দর্য্যের স্তবগান রচনা করে যাবো। আমি তাঁর চারণ-কবি। আমি ছাড়া কে গান গাইবে এই বিশ্বদেবের অনন্ত সৌন্দৰ্য-শিল্পের? তাঁর গান গেয়েই যুগে যুগে অমর অজর হয়ে আমি বেঁচে থাকবো। শত জন্মের মধ্যেও যদি তাঁর সেবা। করে যাই আর আসি আমার তাতে ক্ষতি কিসের?

ক্ষেমদাস চুপ করলেন।

পুষ্প বল্লে–এ দেশের সেই কবিকে দেখা যায় না?

–এতক্ষণ সে ছিল এখানেই। সেও ভগবানের চারণকবি। এই প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের সে স্তবগীত রচনা করে। সে এখন ঘুমিয়েছে।

-–বিবাহিত?

–এ দেশের নিয়ম বুঝি না। স্ত্রীলোকদের অদ্ভুত স্বাধীনতা এখানে। তারা যার ঘরে যতদিন ইচ্ছা থাকে। আবার যেখানে সত্যকার প্রেম আছে, সেখানে পৃথিবীর স্বামী-স্ত্রীর মত আজীবন বাস করে। আমাদের কবির সঙ্গে তিন-চারটি নারী থাকে–কিন্তু তারা কেউই পৃথিবীর তুলনায় সুন্দরী নয়। এদেশের মেয়েরা সুশ্রী নয়। অবশ্য নারী তিনটির সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক জানি না। এদেশে হয়তো তাতে দোষ হয় না। যে দেশের যে নিয়ম।

ওরা কিছুদূরে গিয়ে দেখতে পেলে বনের মধ্যে গাছতলাতে দু তিনটি লোক নিদ্রিত। ক্ষেমদাস বল্লেন–ওই দ্যাখো কবি শুয়ে। ঐ পাশেই তিনটি নারী।

পুষ্প আশ্চর্য হয়ে বল্লে–গাছতলাতে কেন সবাই?

–এখানে লোকের ঘরবাড়ী নেই পৃথিবীর মত। ওদের দেহ অন্য ভাবে তৈরী। রোগ নেই এখানে, হিংস্র জন্তু বা সর্প নেই। দেহের কোনো ক্ষতি হয় না। অল্প আয়ু বলে ঘরবাড়ী করে না কেউ।

–তবে মরে কিসে?

–এদের স্বেচ্ছামৃত্যু। জ্ঞানী ও নিস্পৃহ আত্মা কিনা! নির্দিষ্ট সময় অন্তে যেদিন হয় এরা মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হবে। মন যেদিন এদের তৈরী হবে সেদিন স্বেচ্ছায় দেহত্যাগ করবে। মৃত্যুতে এরা শোক করে না। এরা জানে মৃত্যু দেহের পরিবর্তন মাত্র।

–পুনর্জন্ম?

–এখানে যারা জন্ম নেয়, তারা অনেক জন্ম ঘুরে এসেছে। পৃথিবীতে বহু জন্ম কেটেচে এদের। শেষ জন্ম এখানে কাটায়। তার পরেই মহর্লোকে চলে যায় একেবারে, আর ফেরে না। কিন্তু তুমি একটা কথা বোধ হয় জানো না–পৃথিবীর চেয়ে নিকৃষ্টতর গ্রহও অনেক আছে। নিম্ন শ্রেণীর আত্মাদের পুনর্জন্ম অনেক সময় ওই সব নিকৃষ্টতর। লোকে হয়।

–সে সব স্থান কি রকম?

–একটাতে তোমাকে এখুনি নিয়ে যেতে পারি। চোখেই দেখবে, না কানে শুনবে?

তবে একটা কথা। সে সব দেখে কষ্ট পাবে। মেয়েমানুষ তুমি, সে সব গ্রহলোক দেখলে তোমার মনে হবে ভগবান বড় নিষ্ঠুর।

চক্ষের পলকে ওরা একস্থানে এসে পৌঁছলো। সে স্থানটির সর্বত্র ঊষর মরুভূমি ও কৃষ্ণবর্ণের বস্তুর স্তূপ। কিন্তু সে স্থূপ প্রস্তর নয়–তা কি, পুষ্প জানে না। উলঙ্গ বিকটদর্শন অর্ধমনুষ্যাকৃতি জীব দু’একজনকে সেই কৃষ্ণবস্তু স্তূপের ওপর বসে থাকতে দেখা গেল। মাঝে মাঝে তারা উঠে মাটির মধ্যে হাত দিয়ে গর্ত খুঁড়ে কি বার করচে ও পরম লোলুপতার সঙ্গে মুখে পুরচে।

ক্ষেমদাস বল্লেন–চলো এখান থেকে। ওরা কীটপতঙ্গ খুঁজে খাচ্চে। ওই ওদের আহার। ওই ওদের আহার সংগ্রহ রীতি। একজনের বস্তূপে আর একটি জীব যদি আসে, তবে দুই জীবে মারামারি করবে। এ ওকে মেরে ফেলবার চেষ্টা করবে। এ জগতে স্নেহ, প্রেম, ভক্তি, ভালবাসা, দয়া, সেবা, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, সংগীত কিছু নেই। আছে কেবল দুর্দান্ত আহার-প্রচেষ্টা। জীবে জীবে কলহ।

পুষ্প বল্লে–চলুন এখান থেকে। হাঁপ লাগচে। কি জড় পদার্থে গড়া এ দেশ, প্রাণ যেন কেমন করে উঠলো। এও কি ভগবানের রাজ্য?

ক্ষেমদাস হেসে বল্লেন–এখনও দেখোনি। চলো আরও দেখাই–এর চেয়েও ভয়ানক স্থান দেখবে। যেখানে পিতামাতা পুত্রকন্যার সম্বন্ধ পৰ্য্যন্ত নেই। যেখানে–না সে তোমাকে বলব না।

পুষ্প অধীর ভাবে বল্লে–কেন আমাকে এখানে নিয়ে এলেন? উঃ–বলেই সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললে। হাত জোড় করে বল্লে– আমার একমাত্র সম্বল ভগবানে ভক্তি, আর আমার কিছু নেই জীবনে। দেব, দয়া করে সেটুকুও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবেন না–কৃপা করুন–আমি নিতান্ত অভাগিনী!

ক্ষেমদাস হেসে বল্লেন–পাগল! সেই অনন্ত মহাশক্তির এক দিকই কেবল দেখবে? রদ্রদেবের বাম মুখ দেখলেই ভক্তি চটে যাবে অত ঠুনকো ভক্তি তোমার অন্তত সাজে না। তুমি আমি তাঁর উদ্দেশ্যের কতটুকু বুঝি? চলো ফিরি। ওই জন্য আনতে চাইনি তোমাকে এখানে। এতেই এই, এর চেয়েও নিকৃষ্ট লোকে নিয়ে গেলে

-–না দেব। আমায় পৃথিবীতে অন্তত নিয়ে চলুন। আমাদের। পৃথিবীতে–চলুন গঙ্গাতীরে–

মহাশূন্য বেয়ে সেই মুহূর্তে ওরা এসে পৃথিবীতে একস্থানে বৃক্ষতলে দাঁড়ালো। বর্ষাকাল পৃথিবীতে, ভীষণ বৃষ্টি হচ্চে। স্থানটা পাহাড়ে ঘেরা, পাহাড় ঝাঁপসা হয়ে গিয়েচে বৃষ্টির ধারায়।

ক্ষেমদাস বল্লেন–নিয়ে এলাম গঙ্গাতীরে। ওই অদূরে গঙ্গা–

–এটা কোন্ স্থান?

–হরিদ্বার।

পুষ্পের চোখ জুড়িয়ে গেল ধারামুখর অপরাহ্নের বহুপরিচিত, অতি প্রিয় শোভায়। তার মন বলে উঠলো–এই তো আমাদের পৃথিবী, আমাদের স্বর্গ। ভগবান এখানে কত ফুলে ফলে নিজেকে ধরা দেন, কত জ্যোৎস্নার আলোয়, কত অসহায় শিশুর হাসিতে। আজ চিনলাম। তোমায় ভাল করে, আমাদের মাটির স্বর্গকে, আর চিনলাম মানুষকে। মানুষই মাটি দিয়ে গড়া দেবতা–দুদিন পরে সত্যিকার দেবতা হয়ে যাবে। জয় নীলারণ্য-কুন্তলা-অতল-সাগর মেখলা চিরন্তনী সুন্দরী পৃথিবীর। জয় জয় মানুষের। জয় বেণুরবশিহরিতা দিগন্তলীনপ্রান্তর শোভিতা ভূতধাত্রী মাতার।

ক্ষেমদাস বল্লেন–এবার তোমার মন শান্ত হয়েছে। বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। এখন একটা কথা বলি। কি দেখে অস্থির হয়ে উঠলে?

পুষ্প সলজ্জ হেসে চুপ করে রইল। ক্ষেমদাস বল্লেন–না, বলো, বলতেই হবে। ভগবান কি নিষ্ঠুর–এই ভেবেছিলে। না?

–হাঁ।

–তিনি কি নিষ্ঠুর–ওঃ! এই তো?

পুষ্প হাসি-হাসি মুখে নির্বাক।

ক্ষেমদাস বল্লেন–তোমার মত মেয়েরও বিস্মৃতি? তোমার ভুল? একেই বলে মাহিনী মায়া। মায়ায় কে না ভোলে। ব্রহ্মা বিষ্ণু তলিয়ে যান।

–কেন দেব, বলুন!

-না, তাই দেখচি। নতুবা তোমারও ভুল।

–থাক আমার ব্যাখ্যা। আমি তৃণের চেয়েও হীন। আপনি কি উপদেশ করচেন তাই করুন না?

ক্ষেমদাস হাসিমুখে বল্লেন–ভগবান কার উপর নিষ্ঠুর হবেন? সবই তো তিনি। নিজেই নিজের লীলায় তন্ময় হয়ে আছেন বিভিন্ন রূপে। তিনিই সব। সে জ্ঞান যেদিন হবে সেদিন এই নিকৃষ্ট লোকের নিকৃষ্ট জীব দেখেও বলে উঠবে আনন্দে–তেজো যৎ তে কল্যাণতমং তত্তে পশ্যামি, যোহসাবসৌ পুরুষঃ সোহহমস্মি–

ক্ষেমদাস চলে গেলেন। যাবার সময় বল্লেন–বৃন্দাবন থেকে ঘুরে আসি। তোমার সঙ্গে আবার শীঘ্রই দেখা করবো–একদিন চলো সেই সন্ন্যাসিনীর কাছে যাবো।

পুষ্প স্থির ভাবে বসে রইল শৈলশিখরে। এখানে তার যতুদা আছে, কত জন্মের প্রিয় সাথী সে। তাকে ফেলে কোথায় কোন লোকে গিয়ে সুখ পাবে সে? একটি গোয়ালার মেয়ে দুধ দুয়ে নিয়ে আসছে বাজারে। নরনারী প্রদীপ ভাসাচ্চে গঙ্গাবক্ষে। দূর থেকে আলো দেখা যাচ্চে জলের ওপর।

বুড়োশিবতলার পুরানো ঘাটের সামনে গঙ্গাবক্ষে পালতোলা। নৌকোর দল চলেচে। গোধূলির আবছায়া আকাশে শুভ্রপক্ষ বকের দল উড়ে চলেচে ওপারে হালিসহরের শ্যামাসুন্দরীর ঘাটের দিকে। প্রাচীন দেউলমন্দিরের চূড়া সান্ধ্য দিগন্তের বননীল-রেখায় এখানে ওখানে যেন মিশে আছে।

পুষ্প ঘাটের রানায় বসে ক্ষেমদাসের সঙ্গে কথা বলছিল।

ক্ষেমদাস বৃন্দাবন থেকে এইমাত্র ফিরেছেন। জ্যোৎস্নারাত্রে যমুনাতীরে কিছুক্ষণ বসে ছিলেন চীরঘাটের কাছে। আরতি দর্শন। করবার পরে। মন ভূমানন্দে বিভোর।

পুষ্প বল্লে–কবি, স্ফটিকের কথা কি বলছিলেন?

ক্ষেমদাস গঙ্গার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বল্লেন–ওই দ্যাখো, রাঙা আকাশের ছায়া পড়েছে জলে। জল যদি ঘোলা হোত, আকাশের ছায়া পড়তো না। স্ফটিককে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিৰ্ম্মল হতে হবে, তবে আলো তার মধ্যে দিয়ে আসবে।

–অর্থাৎ?

–অর্থাৎ আত্মাতে যদি এতটুকু ত্রুটি থাকে কোথাও, তবে ভগবানের আলো তার মনে, নামে না। সম্পূর্ণ নিৰ্ম্মল স্ফটিক হাওয়া চাই এতটুকু খুৎ থাকলে চলবে না।

–ভগবানের দাবি এত বেশি কেন?

–উপায় নেই। ভগবানের আলো যদি মনের দর্পণে ঠিক অখন্ড ভাবে পেতে কেউ চায়, তার জন্যে এই ব্যবস্থা। লোকে মুখে বলে সাধুতা ও পবিত্রতার কথা। কিন্তু জেনো এ দুটি বস্তু অতি ভীষণ, ভয়ঙ্কর।

পুষ্প বল্লে–বুঝতে পারছি কিছু কিছু। নিজের জীবনে দেখচিনে। কি? তবুও বলুন।

–সাধুতা, পবিত্রতা–শুনতে খুব ভালো। কিন্তু এদের আবির্ভাব বিষয়ী লোকের পক্ষে কষ্টকর। কামনাকলুষিত আধারে ভগবানের জ্যোতি অবতরণ করবে কি ভাবে? এ জন্যে আধার-শুদ্ধির প্রয়োজন। যাকে ভগবান কৃপা করেন, শুদ্ধ আধার করে নিতে তার সব কিছু ভোগ কামনার জিনিস ধ্বংস করে তাকে নিঃস্ব, রিক্ত করে দেন। ভগবানের কৃপা সেখানে বজ্রের মত কঠোর, নিৰ্ম্মম, ভয়ঙ্কর। সৰ্ব্বনাশের মূর্তি ধরে তা আসে জীবনে, ধ্বংসের মূর্তিতে নামে। সে রকম কৃপার বেগ সামলাতে পারে ক’জন?

পুষ্প চুপ করে রইল। এর সত্যতা সে নিজের জীবনে বুঝচে।

ক্ষেমদাস বল্লেন–দ্যাখো, আমি ভক্তিপথের পথিক, তুমি জানো। সন্ন্যাসী যে নির্ণ। ব্রহ্মের কথা বলে, তাঁকে বুঝতে হোলে জ্ঞানের পথ দরকার। জ্ঞান ভিন্ন ব্রহ্মকে উপলদ্ধি করা যায় না। আমি সাকারের উপাসক, মধুর ভাবে মধুর মূৰ্ত্তিতে তাঁকে পেতে চাই–তাই আমি বৃন্দাবনে গিয়ে সেই রস আস্বাদ করি। সন্ন্যাসী বলে, ও অপ্রাকৃত মূৰ্ত্তির উপাসনা কর কেন? আমি বলি, তোমার নিয়ে তুমি থাকো, আমার নিয়ে আমি, থাকি। ও বলে, ব্রহ্ম আবরিত হতে হতে জীব হয়েচে, জীব হয়ে স্বরূপ ভুলে গিয়েচে। ব্রহ্ম দেশ-কালের মধ্যে ধরা দিয়ে জীব হয়েছে। কেন হয়েছে? লীলা। আমি বলি, বেশ, এক যখন বহু হয়েচেন লীলার আনন্দকে আস্বাদ করতে, তখন আমিও তাঁর লীলাসহচর তো? আমাকে বাদ দিয়ে তাঁর লীলা চলে না। এই তো প্রেমভক্তি এসে গেল। কেমন?

পুষ্প বল্লে–বনের সেই সন্ন্যাসিনী কিন্তু প্রেমভক্তির কাঙাল। আমি সেবার রঘুনাথদাসের আশ্রমে নিয়ে গিয়েছিলাম, বৃন্দাবনে নিয়ে গিয়েছিলাম–সেই থেকে গোপাল-বিগ্রহের ভক্ত হয়ে উঠেছেন।

–সে যে মেয়েমানুষ। শুষ্ক জ্ঞানপথে সে তৃপ্তি পায় না–লীলারস আস্বাদ করতে চায়। আমি চল্লাম খুকি, তুমি আজ তো বৃন্দাবনে গেলে না, কাল এসে নিয়ে যাবো। সন্ন্যাসী তোমাকেও কি বলেছিল না?

-বলেছিলেন, এখনও অপ্রাকৃত লোক আঁকড়ে আছে কেন? তোমার। তো উচ্চ অবস্থা, উচ্চস্তরে চলো।

পৃথিবীর হিসাবে আজ কয়েক বছর হোলো পুষ্প এই স্বরচিত বুড়োশিবতলার ঘাটে সম্পূর্ণ একা। করুণাদেবীও ওকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তত উচ্চস্তরে গমন করলে আর। সে পৃথিবীতে যাতায়াত করতে পারবে না বলেই এই গঙ্গার ঘাট আঁকড়ে পড়ে আছে। এই তার পরম তীর্থ–তার মহর্লোক, জন লোক, তপোলোক, সত্যলোক, ব্রহ্মলোক–লোকাতীত পরমপকারণ। পরব্রহ্মলোক। কোথাও পোষাবে না তার। কত সহস্র স্মৃতিতে ভরা এই প্রাচীন ভাঙা ঘাটটি।

কেউ নেই আজ এখানে।

যতীনদা চলে গিয়েচে আজ দশটি বছর।….

ঊর্ধ্বে যতদূর দৃষ্টি যায়–আজ এতকাল পরে তার কাছে শূন্য অর্থহীন!

এক এক সময়ে মনে হয় সেই ভ্রাম্যমাণ বহূদক দেবতা যদি আসেন! তাঁর মুখে বহু জগতের, বহু নক্ষত্রলোকের, বহু বিশ্বের গল্প শোনে। নিজে তিনি বেড়িয়ে দেখছেন, এখনও দেখছেন–শেষ করতে পারেন নি।

সন্ন্যাসী এসে প্রায়ই বলেন–মহর্লোকে তোমার আসন, এখানে কি নিয়ে পড়ে আছ কন্যে? সেই পৃথিবীর গঙ্গা, পৃথিবীর হালিসহর সাগঞ্জ, নৌকো–এসব মায়িক কল্পনা তোমার সাজে না। ছি ছি

পুষ্প সকৌতুকে বলেছিল–নিয়ে যান না তার চেয়ে উচ্চতর লোকে, যাচ্চি এখনি।

সন্ন্যাসী বলে–জ্ঞান থাকবে না বেশিক্ষণ। কারণ এসব লোক আত্মিক অবস্থা মাত্র। কোনো স্থান নয়। সে উচ্চতর চৈতন্য জাগ্রত হোলে পৃথিবীতে জড়দেহধারী হলেও তুমি সত্যলোকের অধিবাসী। যেমন দেখেছিলে আমার সেই গুরুভ্রাতাকে। চিদানন্দময় আত্মা সেখানে। আপনার অস্তিত্বের আনন্দে বিশ্বের সঙ্গে এক সুরে গাঁথা। মুখে বলা যায় না সে অনুভূতির কথা।

পুষ্প বল্লে–বুঝবার ক্ষমতা নেই আমার দেব। তবে শুনলাম বটে। আপনার দয়া।

–বিধাতৃপুরুষদেরও উচ্চস্তরের দেবতাদের দেখা পাওয়ার জন্যে তপস্যা করতে হয় জানো তো? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাতজন বিধাতৃপুরুষ আছেন, এদের ওপর ঈশ্বর। বিধাতৃপুরুষেরা ইচ্ছা করলেই ভগবানের লোকে যেতে পারেন না–গেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এজন্যে তপস্যা দ্বারা শক্তি অর্জন করতে হয়–তবে সেই সাময়িক তপস্যার সাময়িক শক্তি নিয়ে ঈশ্বর সমীপে যেতে পারেন। অথচ বিধাতৃপুরুষেরা সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করছেন।

–ভগবান তবে কি করছেন, তিনি কি ঠুটো জগন্নাথ?

–তাঁর ইচ্ছাতেই সব হচ্চে, কন্যে। একটা তৃণও নড়ে না তাঁর ইচ্ছা না হোলে।

–তিনি দয়ালু? ডাকলে সাড়া দেন?

–এখনও এ সন্দেহ? এইজন্যে আমি বলি, প্রর্থনা করো না তাঁর কাছে কিছু। প্রার্থনা করলেই তিনি মঞ্জুর করেন। তিনি পরম করুণাময়। জীবের দুঃখ দেখে থাকতে পারেন না। হয়তো এমন অসঙ্গত প্রার্থনা করে বসলে, যা মঞ্জুর হোলে তোমার আত্মার অমঙ্গল। এইজন্যে কিছু চাইতে নেই তাঁর কাছে–তিনি আমাদের মঙ্গলের দিকে দৃষ্টি রেখে সব কিছু করে যাচ্চেন বা বিধাতৃপুরুষদের কৰ্ম্মে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছেন। এইজন্যে অনেক সময় ভগবানকে নিষ্ঠুর বলে মনে হয়। জীবের কল্যাণের জন্যে তিনি ব্যবস্থা করছেন, আমাদের তা মনঃপুত হচ্চে না।

–ক্ষেমদাস তাই বলেন।

–কে? আমাদের কবি? ওর কথা বাদ দাও। আজ এত বছরেও ওর ভাবালুতা ওকে ছেলেবেলার ওপরে উঠতে দিলে না! গোপাল। আর বৃন্দাবন, আর আরতি, আর চোখের জল–আর চাঁদের আলো।

সন্ন্যাসী সেদিন বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। পুষ্পের হাসি পায় ওঁর সব কথা ভেবে। মেয়েমানুষের মনের কথা এরা কি করে জানবে? শুদ্ধ, বুদ্ধ আত্মা ওরা–ব্রহ্মের মত হয়ে গিয়েছে। শত স্নেহ প্রেম প্রীতির। বাঁধনে যে মেয়েমানুষের মন বাঁধা। এও সেই বিধাতৃপুরুষদেরই গড়া নিয়ম তো, সৃষ্টিছাড়া কিছু নয়।

পৃথিবীতে কি সন্ধ্যা হয়ে এসেছে?

পুষ্প একবার নীচের দিকে চেয়ে দেখলে, তারপর পৃথিবীর সন্ধ্যায় দেহ মিলিয়ে নেমে এল কোলা-বলরামপুর গ্রামে। যতীনের মা রান্নাঘরের মধ্যে ভাত চড়িয়ে উনুনের পাশে বসে আলুবেগুন কুটচে। সে আর ঠিক তরুণী নয় এখন, বিগত-যৌবনের চিহ্ন সারা দেহে পরিস্ফুট। নতুন ধান এসেছে সামনের উঠানে, শীতের সন্ধ্যা, পাশের বাড়ীর আমতলায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আগুন জ্বেলে পোয়াচ্চে।

যতীনের মা রান্নাঘর থেকে বল্লেও অভয়–কোথায় গেলি?

পাশের বাড়ীর আমতলায় সে সব ছেলেমেয়ে আগুন পোয়াচ্চে, তাদের ভেতর থেকে একটি আট-ন’ বছরের বালক উত্তর দিলে– কেন, কি হয়েছে?

–ঠাণ্ডা লাগাস নি বাইরে। ঘরের মধ্যে আয়।

বালকের এখন সম্পূর্ণ অনিচ্ছা সমবয়সীদের মজলিস ছেড়ে এসে। রান্নাঘরে ঢুকতে। সে বল্লে–আমি বাইরে বসে ধান চৌকি দিচ্চি যে–

–না, তোমায় ধানচৌকি দিতে হবে না। চলে আয় ঘরে। এই উনুনের পাড়ে বসে আগুন পোয়া। ছেলের লেগেই আছে সর্দি কাসি– আবার রাত পজ্জন্ত বাইরে বসে থাকা–

আর একটি ছেলে ওকে বল্লে–যা, কাকিমা বকবে–

অভয় মুখ ভার করে মায়ের কাছে উনুনের পাশে এসে বসলো। ওর মা বল্লে–সেই গরম জামাটা আজ গায়ে দিস্ নি?

–আহা হা–সে তো ছেঁড়া!

–তা হোক, নিয়ে আয়, বড্ড শীত পড়েছে।

–না মা।

অভয়ের মা ছেলের গালে এক চড় কষিয়ে দিয়ে বল্লে–তোমার একগুঁয়েমিগিরি ঘুচিয়ে দেবো আমি একেবারে। দুষ্টু ছেলে–এখুনি বলবেন, মা আমার জ্বর এয়েছে–তখন নিয়ে এসো সাবু, নিয়ে এসো ওষুধ–যা নিয়ে আয় জামা, মাঝের ঘরের আনলায় আছে–

পুষ্প খিল খিল করে হেসে উঠে বল্লেও যতুদা, কেমন মজা? এ আমি নয় যে একগুয়েমি করে নিস্তার পাবে–

পুষ্প এই সময়টা মাঝে মাঝে এখানে এসে কাটায়। অভয়ের মা। ছেলেকে খাওয়ায়, কাছে বসে পড়ায়–প্রথমভাগ, ধারাপাত–পুষ্প বসে বসে দেখে। বেশ লাগে ওর।

স্বপ্নের মত মনে হয় সংসারের জীবনমৃত্যু…সন্ন্যাসীই জ্ঞানী, সব মায়া আর স্বপ্ন।

আশা বৌদিকেও একদিন সে দেখে এসেচে। সে এখন বহু দূর মুরশিদাবাদ জেলায় এক মাঝারি গোছের গেরস্তবাড়ীর ছোট একবছরের খুকি।

সে করুণাদেবীকে বলেছিল সেদিন–এরা মিলবে কি করে দেবী? কি করে জানবে এরা?

দেবী হেসে উত্তর দিয়েছিলেন ওদের সাধ্য কি? আমরা সে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেবো সময় এলে। দেখতেই পাবি, পুষ্প।

অভয়ের মা ছেলেকে খাইয়ে দাইয়ে পাশের ঘরে ঘুমুতে পাঠায়। পুষ্প এসে সেই সময় খোকার শিয়রে এসে বল্লেখোকা ঘুমুল পাড়া জুড়ল, ঘুমোও যতুদা, ঘুমোও–দুষ্টুমি করলে মায়ের হাতের চড় মনে। আছে তো?

অভয় ঘুমিয়ে পড়লে হয়তো এক একদিন কোনো রূপসী দেবীর স্বপ্ন দেখে, মায়ের মত স্নেহে তার শিয়রে বসে ঘুম পাড়াচ্চে। মায়ের মতই বলে মনে হয় তাকে।

নৈশ আকাশ দিয়ে তারপর পুষ্প উড়ে চলে যায় তার নিজ লোকে। অগণ্য জ্যোতিৰ্ম্মণ্ডল অগণ্য ব্রহ্মাণ্ড মহাব্যোম সৰ্ব্বত্র ছড়িয়ে,–অগণ্য জীবকুল, অগণ্য জীবনমৃত্যুর প্রবাহ।

পুষ্পের মন বলে ওঠে–কোথায় আছ হে কারণার্ণবিশারী মহাবিষ্ণু, মহাদেবতা, মুখের আবরণ অপসারণ কর–অপবৃণু, অপবৃণু, আমরা তোমার স্বরূপ দেখি–ধন্য কর আমাদের জন্মমরণ, দয়ালু দেবতা!

স্বর্গ ও মর্তের সেই মোহনায় পুষ্প এসে দাঁড়ালো।

ওর কিছুদূরে নীল শুন্যে আগুনের লেখা এঁকে বিরাট এক ধুমকেতু অগ্নিপুচ্ছ দুলিয়ে নিজের গোঁ ভরে চলে গেল।–সে মুহূর্তের হিসেব নেই। ওদের পায়ের তলায় কোন গ্রহের এক নদীতীর, হয়তো বা পৃথিবীরই–শান্ত অপরাহ্ন, একদল সাদা বক মেঘের কোলে কোলে উচড়ে নলখাগড়া বনের ঊর্ধ্বে আকাশে।

আজ পুষ্প যেন দেখতে পেলে সেই দেবতাকে–নক্ষত্রজ্যোৎস্নায় ভাসানো এই অপূৰ্ব্ব জীবন-উল্লাসের স্রোতে সে জন্ম থেকে জন্মান্তরে ভেসে চলেচে যে মহাদেবতার ইঙ্গিতে। কোথায় যেন তিনি মহাসুপ্তিমগ্ন, তাঁর অপূর্ব সুন্দর মুখোনি, সুন্দর চোখ দুটি। পুষ্প বল্লে–উনি উঠবেন কখন? চরণ বন্দনা করি।

পুষ্পের মনের মধ্যে থেকে প্রশ্নের উত্তর এল–উনি ওঠেন না। অনন্ত শয্যায় অনন্ত নিদ্রায় মগ্ন উনি। এক এক নিশ্বাসে যুগযুগান্ত কেটে যায়। তুমি ওঁর চরণ বন্দনা করবে? ওঁর উপাসনা হয় না। কে করতে পারে ওঁর উপাসনা? উনি কাউকে দেখেন না, কারো উপাসনা গ্রহণ করেন না। বিশ্বজগৎ ওঁর স্বপ্ন–উনি ঘুম ভেঙে জেগে উঠলে জগৎস্বপ্ন লয় হয়ে যাবে যে! সৃষ্টি অন্তর্হিত হবে। কিন্তু তা হয় না–সৃষ্টিও অনন্ত, ওঁর সুপ্তিও অনন্ত। উনিই বিশ্বের আদি কারণ– সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম। ক্ষীরোদশয়নশায়ী মহাদেবতা ব্রহ্মাণ্ডের। তুমি আমি, স্বর্গ নরক, জন্ম মরণ, দেব দেবী, ঈশ্বর, পাপ পুণ্য, দেশ ও কাল– সবই তাঁর স্বপ্ন। সব তিনি। তিনি ছাড়া আর কিছু নেই–কে কার উপাসনা করবে? ওঁর স্বপ্ন ছাড়া আর উনি ছাড়া আর কি আছে?

ভক্তিভরে প্রণাম করলে পুষ্প। উপাসনা হয় না তো হয় না।

ঘন ঘুমে অচেতন সেই দেবদেবের সুন্দর চোখ দুটি, স্বর্গ ও মর্ত্যের দূরতম প্রান্তে, শুকতারার অস্তপথে, ছায়াছবির মত মিলিয়ে গেল।

(সমাপ্ত)

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *