১৬. দেওয়ান-ই-আম

ষোড়শ পরিচ্ছেদ
দেওয়ান-ই-আম

এই ঘটনার দুই তিন দিবস পরে একদিন প্রথম প্রহরের শেষে য়ামিন্‌উদ্দৌলা নবাব আসফ খাঁ হস্তিপৃষ্ঠে দরবার আমে গমন করিতেছিলেন। আসফ্‌ খাঁ নুরজঁহা বেগমের ভ্রাতা, আরজ্‌ মন্দ্‌ বাণু বেগমের পিতা, বাদশাহ শাহজহানের শ্বশুর, তিনি মোগল বাদশাহের দরবারে একজন প্রধান ব্যক্তি। তাঁহার নিজের অশ্বারোহী ও পদাতিক সেনা তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া যাইতেছিল। হস্তীর পশ্চাতে এক শ্বেতবর্ণ সিন্ধুদেশীয় অশ্বপৃষ্ঠে জনৈক গৌরবর্ণ যুবক ধীরে ধীরে চলিতেছিল। হস্তী জুম্মা মসজিদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল, নবাব হস্তী হইতে অবতরণ করিলেন। মস্‌জিদের সম্মুখে আগ্রা দুর্গের প্রধান তোরণ, তোরণের সম্মুখে এক জন পাঁচ হাজারি মনসবদারের শিবির, এই শিবিরের সম্মুখে বাদশাহ অথবা তাঁহার পুত্রগণ ব্যতীত অপর সকলকেই যান পরিত্যাগ করিতে হইত। আসফ্‌ খাঁ যুবকের সহিত ফটকের সম্মুখে আসিলেন, সেই স্থানে একজন তুরাণী মন্‌সব্‌দার পাহারায় ছিল, সে বাদশাহের শ্বশুরকে অভিবাদন করিয়া পথ ছাড়িয়া দিল। ফটকের উপরে নৌবৎ বাজিতেছিল, কারণ বাদশাহ তখন দরবারে, তিনি যতক্ষণ দরবারে থাকিতেন ততক্ষণ আগ্রা দুর্গের দিল্লী ও অমরসিংহ ফটকে নৌবত বাজিত।

আসফ্‌ খাঁ ও যুবক দিল্লী ফটকে প্রবেশ করিয়া প্রথম চকের বাজারে উপস্থিত হইলেন। প্রতিদিন প্রভাতে এই স্থানে বাজার বসিত ও সন্ধ্যা পর্য্যন্ত ক্রয় বিক্রয় হইত, বহুমূল্য মণি মুক্তা ও দূর দূরান্তর হইতে আনীত মহার্ঘ দ্রব্যাদি এই স্থানে বিক্রীত হইত। আমীর ওমরাহ ব্যতীত অন্য কেহ এই বাজারে আসিতে পাইত না। যুবক বাজারের সৌষ্ঠব দেখিয়া বিম্মিত হইল। প্রথম চক পরিত্যাগ করিয়া আসফ্‌ খাঁ ও যুবক দ্বিতীয় চকে প্রবেশ করিলেন। চকের মধ্যে রক্তবর্ণ প্রস্তরনির্ম্মিত পথ, উভয় পার্শ্বে মোগল, আফগান, ইরাণী, তাতার, রাজপুত অথবা ফিরিঙ্গি সেনা দলবদ্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, মুক্ত তরবারি হস্তে মন্‌সব্‌দারগণ সৈন্যশ্রেণীর মধ্যে পথ পরিস্কার করিয়া দিতেছে। আসফ খাঁকে দেখিয়া মন্‌সব্‌দারগণ দুই পদ হটিয়া অভিবাদন করিল; যাহারা উচ্চপদস্থ তাহারা অভিবাদনান্তে নিকটে আসিয়া বাদশাহের শ্বশুরের সহিত কথা কহিল। সকলকেই যথাযোগ্য সম্ভাষণ করিয়া তিনি তৃতীয় চকে প্রবেশ করিলেন। চকের সম্মুখে অম্বর ও যোধপুরের রাজপুত সেনা অপেক্ষা করিতেছিল, দ্বিতীয় প্রহরে নৌবৎ বাজিলে তাহার দেওয়ান আম ও মহলসরার রক্ষণের ভার পাইবে।

তৃতীয় চকের দক্ষিণ দিকে শ্বেতমর্ম্মনির্ম্মিত বিশাল মতি মস্‌জিদ, বাম দিকে রক্তবর্ণপ্রস্তরনির্ম্মিত আগ্রার টাকশালের সম্মুখে শুভ্র ও রক্তবর্ণ প্রস্তরনির্ম্মিত গগনস্পর্শী নাকারাখানা, তাহার উপরে বাদশাহী নাকারা বাজিতেছে। নাকারাখানা তোরণের অভ্যন্তরে হস্তীর অরণ্য, অদ্য বাদশাহের সম্মুখে সহস্র হস্তীর সেলামী হইবে। নাকারাখানার গৃহতল ও দেওয়ান-ই-আমের সমস্ত পথ দুগ্ধফেননিভ মর্ম্মরে আচ্ছাদিত, দরিদ্র তাহাতে পাদস্পর্শ করিতে কুন্ঠিত হয়। নাকারাখানার সম্মুখে বহু পরিচারক দরবারিগণের পাদুকা রক্ষা করিতেছে। এই স্থানের পরেই বাদশাহ ও তাঁহার পুত্রগণ ব্যতীত আর কেহ পাদুকা লইয়া যাইতে পারেন না। দশহাজারি মন্‌সব্‌দার য়ামিন্‌ উদ্দৌলা আসফ্‌ খাঁকে, সামান্য ওমরাহের ন্যায় নাকারখানায় পাদুকা পরিত্যাগ করিতে দেখিয়া, যুবক বিস্মিত হইল।

নাকারাখানার সম্মুখে খাস চৌকির মন্‌সব্‌দার আসফ্‌ খাঁর পুত্র সায়েস্তা খাঁ দাঁড়াইয়াছিল। পুত্র পিতাকে অভিবাদন করিলেন, পিতা পুত্রকে প্রত্যভিবাদন করিয়া অগ্রসর হইলেন। সেই মুহূর্ত্তে সহস্র হস্তী শুণ্ডোত্তোলন করিয়া বাদশাহকে অভিবাদন করিল। যুবক স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইল। নাকারাখানার সম্মুখে রক্তবর্ণপ্রস্তরনির্ম্মিত প্রকাণ্ড চক, চকের চারিদিকে ক্ষুদ্র বারান্দা, প্রতিদিকের বারান্দায় সহস্র হস্ত অন্তরালে এক একটা বারদুয়ারী, ইহা মন্‌সব্‌দারদিগের কাছারী। বাদশাহের নিকটে যে সমস্ত মন্‌সব্‌দার উপস্থিত থাকিতেন, তাঁহাদিগের সেনা দুর্গের বাহিরে থাকিত, কিন্তু তাঁহাদিগকে সমস্ত দিন দেওয়ান আমের চকে অপেক্ষা করিতে হইত। চকের বারান্দায় এক একটি খিলাস এক এক জন মন্‌সব্‌দার পাইতেন এবং সমস্ত দিন এই স্থানে অনুচরবর্গের সহিত উপস্থিত থাকিতেন। পাঁচ হাজারি মন্‌সবদারের নিম্নপদস্থ ব্যক্তি আগ্রা বা দিল্লী দুর্গের পাহারার অধিকার পাইতেন না। ছয় হাজারি, সাত হাজারি ও দশ হাজারি মন্‌সবদারগণ বারদুয়ারিতে স্থান পাইতেন।

সহস্র হস্তী বাদশাহকে অভিবাদন করিয়া অমরসিংহ ফটক দিয়া নির্গত হইল, তখন নাকারাখানার তোরণ দিয়া সহস্র উষ্ট্র প্রবেশ করিতে আরম্ভ করিল। সেই অবসরে আসফ্‌ খাঁ যুবকের সহিত অগ্রসর হইলেন। চকের মধ্যস্থলে তাম্রের রেলিং, তাহার একদিকে রক্তপ্রস্তরনির্ম্মিত দেওয়ান অাম ও অপর দিকে নাগরিকদিগের স্থান। তাম্রের রেলিং এর সম্মুখে পঞ্চশত হস্ত প্রশস্ত স্থান, তাহার একদিকে অশ্বারোহী ও অপর দিকে পদাতিক সেনা দাঁড়াইয়া আছে। খাস্‌ চৌকির মন্‌সব্‌দার প্রতিদিন দিবসের প্রথম দুই প্রহর পঞ্চ সহস্র অশ্বারোহী ও পঞ্চ সহস্র পদাতিক লইয়া দিল্লীশ্বরের প্রকাশ্য দরবারে শাস্তিরক্ষা করিতেন। দুর্গের বাহিরে পঞ্চশতসহস্র অশ্বারোহী ও লক্ষ পদাতিক নিত্য সজ্জিত থাকিত। তাম্রের রেলিংএর অপর পার্শ্বে বাদশাহের শরীররক্ষী সহস্র আহদী শুভ্র পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল। দরবার আমের সিংহাসনের সম্মুখে প্রশস্ত পথ, তাহার উভয় পার্শ্বে নিম্নশ্রেণীর ওমরাহ ও মনসব্‌দার্‌গণ দাঁড়াইয়া আছেন।

আহদীসেনার নায়ক আসফ্‌ খাঁকে অভিবাদন করিয়া যুবকের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। আসফ্‌ খাঁর কথা শেষ হইলে তিনি পুনরায় অভিবাদন করিলেন, আসফ্‌ খাঁ অগ্রসর হইলেন। দেওয়ান-ই-আমের সম্মুখে তিনটি সোপান, সোপানের নিম্নে দাঁড়াইয়া আসফ্‌ খাঁ তিনবার ভূমি স্পর্শ করিয়া অভিবাদন করিলেন। সোপানের উপরে ছাদবিহীন চত্বর, সেই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সুবাদার জমিদার ও ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গ অপেক্ষা করিতেছিলেন। তাঁহাদিগকে বেষ্টন করিয়া সহস্র আহদী সেনা পাহারা দিতেছিল, তাহাদিগের নায়ককে পরিচয় দিয়া আসফ্‌ খাঁ দেওয়ান আমের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। পুনরায় তিনবার অভিবাদন করিয়া আসফ্‌ খাঁ দেওয়ান-ই-আমে প্রবেশ করিলেন। দেওয়ান-ই-আমে তিনটি স্তর আছে, প্রথম স্তরে দশ হাজারি মন্‌সব্‌দার ও সুবাদারগণের স্থান, ইহা রজতনির্ম্মিত রেলিংএর দ্বারা বেষ্টিত। দ্বিতীয় স্তরে প্রধান প্রধান হিন্দুরাজগণের, উজীর বখ্‌শী শিপাহশালার খানসামান, সদর-উস্-সদুর, কাজী উল্‌ কুদ্দৎ ও প্রধানসুবাদারগণের স্থান, ইহা সুবর্ণনির্ম্মিত রেলিং এর দ্বারা বেষ্টিত। তৃতীয় স্তরে বাদশাহের পুত্র, জামাতা ও আত্মীয়গণের স্থান, ইহার চতুর্দ্দিকে আশা, সোটা, দুর্ব্বাস, মহীমরাতবধারিগণ দাঁড়াইয়া আছে। যুবককে দেওয়ান-ই-আমের বাহিরে রাখিয়া আসিফ্‌ খাঁ দরবারগৃহে প্রবেশ করিলেন। নকীব হাকিল, আরজবেগী তাঁহার নাম উচ্চারণ করিলেন। আসফ্‌ খাঁ সুবর্ণের রেলিংয়ের সম্মুখে দাঁড়াইয়া তিনবার অভিবাদন করিলেন, বাদশাহ সিংহাসনে বসিয়া প্রত্যভিবাদন করিলেন। আসফ্‌ খাঁ সিংহাসনের নিয়ে গিয়া দাঁড়াইলেন।

সহস্র উষ্ট্র এবং সহস্র সুসজ্জিত অশ্ব বাদশাহকে অভিবাদন করিয়া চলিয়া গেল। তখন খাস চৌকীর মন্‌সবদারের সেনা বাদশাহের সম্মুখে আসিয়া অভিবাদন করিয়া স্বস্থানে প্রত্যবর্ত্তন করিল। দুর্গের বাহির হইতে দলে দলে অশ্বারোহী ও পদাতিক সেনা নাকারাখানার পথে প্রবেশ করিয়া বাদশাহকে অভিবাদন করিতে আসিল। পঞ্চাশৎ সহস্র অশ্বারোহী ও লক্ষ পদাতিক আসিতে যাইতে দুই দণ্ড সময় লাগিল। এই অবসরে বাদশাহ আর্জী শুনিতে লাগিলেন। সমস্ত সৈন্যের অভিবাদন শেষ হইলে নাকারা থামিল, তখন আসফ্‌ খাঁ অস্ফুটস্বরে বাদশাহকে কি বলিলেন। বাদশাহ সম্মতি দিলেন, একজন চোপদার যুবককে রজতের রেলিংয়ের সম্মুখে আনিল। যুবক আসফ্‌ খাঁর ন্যায় অভিবাদন করিল।

বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, “সাহেব, এই যুবা কে?” আসফ্‌ খাঁ অভিবাদন করিয়া কহিলেন, “ইহার নাম ময়ূখ, ইহার পিতা দেবেন্দ্রনারায়ণ সুবা বাঙ্গালার একজন জমিদার ছিল, জিন্নৎমকানী নূরউদ্দীন জহাঙ্গীর বাদশাহের সময় ইহার পিতা তখ্‌তের বহুৎ খিদ্‌মৎ করিয়াছে।”

বাদশাহ হাসিয়া কহিলেন, “স্মরণ আছে, আমি যখন বিদ্রোহী হইয়াছিলাম তখন উড়িষ্যা ও আক্‌বরাবাদে ইহার পিতা আমার সহিত লড়াই করিয়াছিল।”

“শাহান শাহ্‌ বাদশাহের হুকুমে দেবেন্দ্রনারায়ণ শাহজাদা খুর্রমের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিয়াছিল, ভরসা করি শাহার-উদ্দীন মহম্মদ্‌ শাহ্‌জহান্‌ বাদশাহ লাজী সাহিবি কিরাণমানি সে অপরাধ গ্রহণ করিবেন না।”

এই সময়ে তৃতীয় স্তরে ইফ্‌তিকার্‌-উল্‌-মুলক্‌ আসদ্‌ খাঁ ও দ্বিতীয় স্তরে মনিরুদ্দৌলা শাহ্‌নওয়াজ খাঁ অভিবাদন করিলেন। দেওয়ান-ই-আমের রীতি অনুসারে নকীব হাঁকিল, “রৌশন্‌-উল্‌ মুলক্‌ মুনিরুদ্দৌলা শাহ্‌নওয়াজ খাঁ হয়বৎ জঙ্গ হজরৎ জলালী।” বাদশাহ শাহ্‌নওয়াজ খাঁর দিকে চাহিলেন, বৃদ্ধ নবাব পুনরায় অভিবাদন করিয়া কহিলেন, “শাহান্‌ শাহ্‌, কাফের ফিরিঙ্গি যখন বাদশাহী বন্দর সপ্তগ্রাম আক্রমণ করিয়াছিল তখন এই কাফের যুবা সপ্তগ্রাম রক্ষা করিয়াছিল।” বাদশাহ আসদ্‌ খাঁর দিকে চাহিলেন, নকীব হাঁকিল, “ইফ্‌তিকার-উল্‌-মুলক সৈফ্‌উদ্দৌলা আমীর-উল্‌-বহর আসদ্‌ খাঁ শমসের জহাঙ্গীরী।” আসফ্‌ খাঁ অভিবাদন করিয়া বলিলেন, “জহাপনা, সুবাদার মোকরম্‌খাঁর আমলে সপ্তগ্রামে ফিরিঙ্গির সহিত যে লড়াই হইয়াছিল বন্দা সে সংবাদ পূর্ব্বেই নিবেদন করিয়াছে। ফিরিঙ্গির গোলার ভয়ে ফৌজদার কলিমুল্লা খাঁ পলায়ন করিলে, এই যুবা সপ্তগ্রামের এক বণিকের সেনা লইয়া বাদ্‌শাহী বন্দর রক্ষা করিয়াছিল।”

বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, “সুরাটের ফিরিঙ্গিদিগের দূত আসিয়াছে?”

উজীর কহিলেন, “জনাব আলী, আংরেজ ফিরিঙ্গির দূত নাকারাখানায় হাজির আছে, হুকুম হইলে দেওয়ান আমে উপস্থিত হইবে।”

“নবাব শাহ্‌নওয়াজ খাঁ, আসদ্‌ খাঁ ও ফিরিঙ্গি দূত গোসলখানায় আসিবেন। নবাব সাহেবের সহিত যে কাফের ফকীর আসিয়াছিল সে কি ফিরিয়া গিয়াছে?”

“শাহান্‌ শাহ, বাদশাহের হুকুম অনুসারে সে কাফের মথুরায় আছে।”

“তাহাকে তলব কর। আসদ্‌ খাঁ, নবাব সাহেব, রামিনউদ্দৌলা ও দেবেন্দ্রনারায়ণের পুত্র দেওয়ান-ই-খাসে উপস্থিত হইবেন।”

বাদশাহ, তখ্‌ত পরিত্যাগ করিলেন, নাকারা বাজিয়া উঠিল, দরবার শেষ হইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *