১৬. কিরীটী বিজনের সঙ্গে

কিরীটী বিজনের সঙ্গে এত তন্ময় হয়ে কথাবার্তা বলছিল যে অদূরে সোফার উপর উপবিষ্ট

সুশান্ত ও শকুন্তলার দিকে তেমন নজরই দিতে পারেনি।

তারর হঠাৎ একসময় বিজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওদের দিকে নজর পড়তেই কিরীটীর ওপ্রান্তে চাপা একটা হাসির বিদ্যুৎ যেন খেলে গেল।

সুশান্ত ও শকুন্তলা পরস্পরের মধ্যে গল্পে তখন একেবারে তন্ময় হয়ে গিয়েছে।

চাপাকণ্ঠে তারা পরস্পরের সঙ্গে কি যেন সব গল্প করে চলেছে। পরস্পরের প্রতি পরস্পরের মুগ্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ হচ্ছে কখনও চকিতের জন্য, আবার সংকোচে সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিচ্ছে পরস্পর পরস্পর থেকে।

নিঃশব্দে কিরীটী সুশান্ত ও শকুন্তলার দিক থেকে দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে নিয়ে বিজনের মুখের দিকে চেয়েই আবার প্রশ্ন করল, আচ্ছা বিজনবাবু, আপনার ছোটমামা বৃন্দাবনবাবু আপনাকে চিঠিতে আর কিছু লেখেননি?

হ্যাঁ, আগামী পরশু অর্থাৎ শুক্রবার ছোটদাদুর উইল নাকি সলিসিটার বোস-চৌধুরীর শচীবিলাসবাবু এখানে এসে পড়বেন, সেইদিন বিশেষ করে উপস্থিত থাকবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

ও, সামনের শুক্রবারেই তাহলে উইল পড়া হচ্ছে?

হ্যাঁ, বোস-চৌধুরীর ফার্ম নাকি সেইমত তাঁকে জানিয়েছে এবং তাদেরই নির্দেশে তিনি আমাকে এখানে উপস্থিত থাকবার জন্য লিখেছেন।

নিশ্চয়ই তাহলে আপনার দাদু আপনাকেও কিছু সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছেন তার উইলে? নচেৎ বোস-চৌধুরী আপনাকে উইল পড়বার সময় উপস্থিত থাকতেই বা বলবেন কেন?

হতে পারে, তবে দাদুর সম্পত্তির কানাকড়ি না পেলেও কোন ক্ষোভ ছিল না।

আপনি তাহলে এ কদিন এখানেই আছেন?

হ্যাঁ, শুক্রবার পর্যন্ত তো আছিই।

আচ্ছা আজ তাহলে উঠি। কিন্তু মধুসূদনবাবু এখনও ফিরলেন না তো!

ডেকে দেব বড়মামাকে?

না, প্রয়োজন নেই। বলবেন, পরে আবার দেখা হবে। কি সুশান্তবাবু, উঠবেন তো?

কিরীটীর ডাকে সুশান্ত যেন চমকে ওঠে। য়্যাঁ! হ্যাঁ–চলুন।

সুশান্ত ও কিরীটী সরকার ভিলা থেকে বের হয়ে এল।

 

রাস্তায় নেমে কিরীটী বললে, চলুন বিমলবাবুর ওখান থেকে একবার ঘুরে যাওয়া যাক।

হ্যাঁ চলুন, চা খাবার জন্য বিকেলে আজ অনুরোধ জানিয়ে গিয়েছিল সে অনেকবার। হয়তো খাপ্পা হয়ে আছে–

তা তো হওয়াই উচিত। আপনি তাকে যাবো বলে কথা দিয়ে গল্পে মেতে বেমালুম সব ভুলে বসে থাকবেন

না, না—এমন কিছু নয়। এমনিই সাহিত্যের ব্যাপার নিয়ে গল্প হচ্ছিল ওঁর সঙ্গে সামান্য। ভদ্রমহিলার দেখলাম খুব পড়াশুনা আছে।

তাই বুঝি! তা সাহিত্যের কোন বিষয় নিয়ে গল্প হচ্ছিল আপনাদের? কাব্য, গল্প, উপন্যাস, নাটক? কিরীটী প্রশ্ন করে।

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে।

ও। আমি ভাবলাম বুঝি নাটক।

মানে?

না, কিছু নয়। তারপর হঠাৎ একসময় আবার চলতে চলতে কিরীটী বলে, তাস খেলতে নিশ্চয়ই আপনি জানেন সুশান্তবাবু?

তাস! মানে কার্ডস?

হ্যাঁ। সাহেব, বিবি, গোলাম, ছক্কা, পাঞ্জা, দুরি, তিরি, টেক্কা-চেনেন নিশ্চয় এগুলো?

চিনি, কিন্তু কতকটা বিস্ময়ই প্রকাশ পায় সুশান্তর কণ্ঠস্বরে।

আচ্ছা বলুন তো, সাহেব বিবি গোলামের মধ্যে কোনটা আপনার বেশী পছন্দ-মানে চেহারার ও নামের দিক দিয়ে বেশ, দেখতেও সুন্দর বা মনে ধরে?

কেন, সাহেব বিবি!

ঠিক বলেছেন। সাহেব বিবি–তবে একটা কথা মনে রাখবেন, সাহেবদের মেজাজ বুঝতে পারা গেলেও বিবিদের মেজাজ কিন্তু সত্যিই অনেক সময় দুর্বোধ্য!

কথাটা একটু স্পষ্ট করে বললে বাধিত হতাম। সবই কি স্পষ্ট করে সব সময় বলা যায়। এই বোধ হয় সামনে থানা, তাই না?

হ্যাঁ।

কিন্তু থানায় গিয়ে বিমল সেনের পাত্তা পাওয়া গেল না।

কি একটা জরুরী তদন্তের ব্যাপারে ঐদিন বিকেলের দিকে সে নাকি মাইল দশেক দূরে একটা গ্রামে গিয়েছে।

কখন ফিরবে কিছু স্থির নেই।

অগত্যা দুজনকে ফিরতেই হল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *