১৬. অনুরাগ—আত্ম প্রতি

অনুরাগআত্ম প্রতি

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। ধানশী ।।

হিয়ার মাঝারে,                যতনে রাখিব,
বিরল মনের কথা।
মরম না জানে,                ধরম বাখানে,
সে আর দ্বিগুণ ব্যথা।।
যারে না দেখি,                 জনম স্বপনে,
না দেখি নয়ন কোণে।
অবুধ সে জানি,                দিবস রজনী,
সদাই পড়িছে মনে।।
হাম অভাগিনী,                পরের অধিনী,
সকলি পরের বশে।
সবাই এখনি,                পরাণ পোড়নি,
ঠেকিনু পিরীতি রসে।।
অনুক্ষণ মন,                 করে উচাটন,
মুখে না নিঃসরে কথা।
চণ্ডীদাসের মন,                অরুণ নয়ন,
ভাবিতে অন্তরে ব্যথা।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। গান্ধার ।।

কেন বা পিরীতি কৈনু কালা কানুর সনে।
ভাবিতে রসের তনু জারিলেক ঘুণে।।
কত ঘর বাহির হইব দিবা রাতি।
বিষম হইল কালা কানুর পিরীতি।।
না রুচে ভোজন পান কি মোর শয়নে।
বিষ মিশাইল মোর এ ঘর করণে।।
ঘরে গুরু দুরজন ননদিনী আগি।
দু আঁখি মুদিলে বলে কাঁদে শ্যাম লাগি।।
আকাশ যুড়িয়া ফাঁদ যাইতে পথ নাই।
কহে বড়ু চণ্ডীদাস মিলিবে হেথাই।।

————–

ঘর করণে – অদ্যপি লোকে “ঘরকরণা” শব্দ প্রয়োগ করিয়া থাকে।
হেথাই – হেথায়; এখানে।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সুহই ।।

ধরম করম গেল গুরু গরবিত।
অবশ করিল কালা কানুর পিরীত।।
ঘরে পরে কি না বলে করিব হাম কি।
কেবা না করয়ে প্রেম আমি সে কলঙ্কী।।
বাহির হইতে নারি লোক চরচাতে।
হেন মনে করে বিষ খাইয়া মরিতে।।
একে নারী কুলবতী অবলা বলে লোকে।
কানু পরিবাদ হৈল পুড়িয়া মরি শোকে।।
খাইতে নারি যে কিছু রহিতে নারি ঘরে।
ভাবিতে ভাবিতে ব্যাধি সাঁধাইল অন্তরে।।
জ্বারিলেক তনু মন ব্যাপিল শরীর।
চণ্ডীদাস বলে ভাল হইবে সুস্থির।।

————–

বাহির হইতে – পাঠান্তর–“বাহিরে বেড়াতে”–প্রা, কা, সং।
হেন মনে করে বিষ খাইয়া মরিতে – পাঠান্তর–“এমতি করয়ে মন বিষ খাই জীতে”–প্রা, কা, সং।
একে নারী কুলবতী অবলা বলে লোকে। কানু পরিবাদ হৈল পুড়িয়া মরি শোকে।। – পাঠান্তর–“একে নারী কুলবতী পুড়ে মরি শোকে। তাহে কানু পরিবাদ দেয় পাপ লোকে।।”–প্রা, কা, সং।
সাঁধাইল – প্রবেশ করিল।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। তুড়ি ।।

কি হৈল কি হৈল মোর কানুর পিরীতি।
আঁখি ঝুরে পুলকেতে প্রাণ কাঁদে নিতি।।
শুইলে সোয়াস্তি নাই নিদ গেল দূরে।
কানু কানু করি প্রাণ নিরবধি ঝুরে।।
নবীন পানীর মীন মরণ না জানে।
নব অনুরাগে চিত ধৈরজ না মানে।।
এ না রস যে না জানে সে না আছে ভাল।
হৃদয়ে রহিল মোর কানু প্রেম শেল।।
নিগূঢ় পিরীতি খানি আরতির ঘর।
ইথে চণ্ডীদাস বড় হইল ফাঁফর।

————–

নবীন পানীর মীন – নূতন জলের মাছ।
ধৈরজ – পাঠান্তর–“নিষেধ”–প্রা, কা, সং।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। ধানশী ।।

সেই হইতে মোর মন,
নাহি হয় সম্বরণ,
            নিরন্তর ঝুরে দুটি আঁখি!
একলা মন্দিরে থাকি,
কভু তারে নাহি দেখি,
            সে কভু না দেখে আমারে।
আমি কুলবতী বামা,
সে কেমনে জানে আমা,
            কোন ধনী কহি দিল তারে।।
না দেখিয়া ছিনু ভাল,
দেখিয়া অকাজ হলো,
না দেখিলে প্রাণ কেন কান্দে।
চণ্ডীদাস কহে ধনি,
কানু সে পরশমণি,
            ঠেকে গেলা মোহনিয়া ফান্দে।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। গান্ধার ।।

জনম গোঙানু দুখে,                     কত বা সহিব বুকে,
কানু কানু করি কত নিশি পোহাইব।
অন্তরে রহিল ব্যথা,                     কুলশীল গেল কোথা,
কানু লাগি গরল ভখিব।।
কানু দিনু তিলাঞ্জলি,                     গুরু দিঠে দিনু বালি,
কানু লাগি এমতি করিনু।
ছাড়িনু গৃহের সাধ,                     কানু কৈল পরিবাদ,
তাহার উচিত ফল পাইনু।।
অবলা না গণে কিছু,                     এমতি হইবে পিছু,
তবে কি এমন প্রেম করে।
ভাল মন্দ নাহি জানে,                     পর মুখে যেবা শুনে,
তেঁঞিত অনলে পুড়ে মরে।।
বড়ু চণ্ডীদাসে কয়,                     প্রেম কি আনল হয়,
শুধুই সে সুধাময় লাগে।
ছাড়িলে না ছাড়ে সেহ,                    এমতি দারুণ লেহ,
সদাই হিয়ার মাঝে জাগে।।

————–

গোঙানু – কাটাইলাম। তেঁঞিত – সেইত।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। ধানশী ।।

কাহারে কহিব,                       মনের মরম,
কেবা যাবে পরতীত?
হিয়ার মাঝারে,                       মরম বেদনা,
সদাই চমকে চিত।।
গুরু জন আগে,                       দাঁড়াইতে নারি,
সদা ছিল ছিল আঁখি।
পুলকে আকুল,                       দিক নেহারিতে,
সব শ্যামময় দেখি।।
সখীর সহিতে,                       জলেরে যাইতে,
সে কথা কহিবার নয়।
যমুনার জল,                       করে ঝল মল,
তাহে কি পরাণ রয়? (১)
কুলের ধরম,                       রাখিতে নারিনু,
কহিলাম সবার আগে।
কহে চণ্ডীদাস,                       শ্যাম সুনাগর,
সদাই হিয়ায় জাগে।।

————–

 (১) এখানে যমুনার জলের সহিত শ্রীকৃষনের রূপের তুলনা করা হইয়াছে এবং সেই জন্য শ্রীরাধিকা যমুনার জল ঝলমল করা দেখিয়া এত অস্থির।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সুহই ।।

আনিয়া অমিঞা পানা দুধে মিশাইয়া।
লাগিল গরল যেন মীঠ তেয়াগিয়া।।
তিতায় তিতিল দেহ মীঠ হবে কেন।
জ্বলন্ত অনলে মোর পুড়িছে পরাণ।।
বাহিরে অনল জ্বলে দেখে সর্ব্ব লোকে।
অন্তর জ্বলিয়া উঠে তাপ লাগে বুকে।।
পাপ দেহের তাপ মোর ঘুচিবেক কিসে?
কানুর পরশে যাবে কহে চণ্ডীদাসে।।

————–

অমিঞা – অমিয়া।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সুহই ।।

একে কাল হৈল মোর নয়লি যৌবন।
আর কাল হৈল মোর বাস বৃন্দাবন।।
আর কাল হৈল মোর কদম্বের তল।
আর কাল হৈল মোর যমুনার জল।।
আর কাল হৈল মোর রতন ভূষণ।
আর কাল হৈল মোর গিরি গোবর্দ্ধন।।
এত কাল সনে আমি থাকি একাকিনী।
এমন ব্যথিত নাই শুনয়ে কাহিনী।।
দ্বিজ চণ্ডীদাস কহে না কহ এমন।
কার কোন দোষ নাই সব এক জন (১)।।

————–

নয়লি – নূতন।
(১) শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ করিতেছেন।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সুহই ।।

কেন বা কানুর সনে পিরীতি করিনু।
না ঘুচে দারুণ লেহা ঝুরিয়া মরিনু।।
আর জ্বালা সৈতে নারি কত উঠে তাপ।
বচন নিঃসৃত নহে বুকে খেলে সাপ।।
জন্ম হইতে কুল গেল ধর্ম্ম গেল দূরে।
নিশি দিশি প্রাণ মোর কানু গুণে ঝুরে।।
নিষেধিলে নাহি মানে ধরম বিচার।
বুঝিনু পিরীতির হয় স্বতন্ত্র আচার।।
করমের দোষে এ জনমে কিবা করে।
কহে বড়ু চণ্ডীদাস বাশুলীর বরে।।

————–

বচন নিঃসৃত নহে – বাক্য সরে না।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

যাহার সহিত,                   যাহার পিরীতি,
সেই সে মরম জানে।
লোক চরচায়,                   ফিরিয়া না চাই,
সদাই অন্তরে টানে।।
গৃহ কর্ম্মে থাকি,                  সদাই চমকি,
গুমরে গুমরে মরি।
নাহি হেন জন,                   করে নিবারণ,
যেমত চোরের নারী।।
ঘরে গুরুজনা,                  গঞ্জয়ে নানা,
তাহা বা কহিব কি।
মরণ সমান,                   করে অপমান,
বন্ধুর কারণ সে।।
কাহারে কহিব,                   কেবা নিবারিবে,
কে জানে মরম দুখ।
চণ্ডীদাস কহে,                  করহ ঘোষণা,
তবে সে পাইবে সুখ।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। গান্ধার ।।

ধিক রহুঁ জীবনে যে পরাধীন জীয়ে।
তাহার অধিক ধিক পরবশ হয়ে।।
এ পাপ কপালে বিধি এমতি লিখিল।
সুধার সাগরে মোর গরল হইল।।
অমিয়া বলিয়া যদি ডুব দিনু তায়।
গরল ভরিয়া যেন উঠিল হিয়ায়।।
শীতল বলিয়া যদি পাষাণ কৈনু কোলে।
এ দেহ অনল তাপে পাষাণ সে গলে।।
ছায়া দেখি যদি যদি তরুলতা বনে।
জ্বলিয়া উঠয়ে তনু লতা পাতা সনে।।
যমুনার জলে যদি দিয়ে হাম ঝাঁপ।
পরাণ জুড়াবে কি অধিক উঠে তাপ।।
অতএ সে এ ছার পরাণ যাবে কিসে।
নিচয়ে ভখিমু মুই এ গরল বিষে।।
চণ্ডীদাস কহে দৈব গতি নাহি জানে।
দারুণ পিরীতি মোর বধিল পরাণে।।

————–

ধিক রহুঁ জীবনে যে পরাধীন জীয়ে – পরের অধীন হইয়া যে বাঁচিয়া থাকে তাহার জীবনে ধিক।
অতএ – অতএব।
নিচয়ে ভখিমু মুই – আমি নিশ্চয় খাইবে।
দারুণ পিরীতি মোর বধিল পরাণে – পাঠান্তর–“দারুণ পিরীতি সেই ধরয়ে পরাণে”–প, ক, ত।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

কালিয়া কালিয়া,                    বলিয়া বলিয়া,
জনম বিফল পাইনু।
হিয়া দগদগি,                    পরাণ পোড়নি,
মনের অনলে মৈনু।।
মরিনু মরিনু,                    মরিয়া গেনু,
ঠেকিনু পিরীতি রসে।
আর কেহ জানি,                    এ রসে ভুলে না,
ঠেকিলে জানিবে শেষে।।
এ ঘর করণ,                    বিহি নিদারুণ,
বসতি পরের বশে।
মাগো এই বর,                    মরণ সফল,
কি আর এ সব আশে।।
অনেক যতনে,                    পেয়েছি সে ধনে,
তাহা জানে চণ্ডীদাসে।
এখনি জানিলে,                    আর কি জানিবে,
জানিবে পিরীতি শেষে।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সুহই ।।

পিরীতি লাগিয়া দিনু পরাণ নিছনি।
কানু বিনু দোসর দুকাণে নাহি শুনি।।
মনোদুখে হৃদয়ে সদাই সোঙরিয়ে।
কানু পরসঙ্গ বিনু তিলেক না জীয়ে।।
যাহার লাগিয়া আমি কাঁদি দিবা রাতি।
নিছিয়া লৈয়াছি তারে কুলশীল জাতি।।
আর যত অভিমান দিনু বঁধুর পায়।
বড়ু চণ্ডীদাস কহে যেবা যারে ভায়।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। গান্ধার ।।

যদি বা পিরীতি সুজনের হয়।
নয়ানে নয়ন,                   হইল মিলন,
তবে কেন প্রেম ফিরিয়া না লয়।।
যে মোর পরাণে,                  মরম ব্যথিত,
তারে বা কিসের ভয়?
অতি দুরন্তর,                   বিষম পিরীতি,
সকলি পরাণে সয়।।
অবলা হইয়া,                   বিরলে রহিয়া,
না ছিল দোসর জনা।
হাসিতে হাসিতে,                   পিরীতি করিয়া,
পরাণ উপরে হানা।।(১)
যেন মলয়জ,                   ঘসিতে শীতল,
অধিক সৌরভ ময়।
শ্যাম বঁধুয়ার,                   পিরীতি ঐছন,
দ্বিজ চণ্ডীদাস কয়।।

————–

 (১) পাঠান্তর–
“হাসিতে হাসিতে                  গীতের ঝমরু,
এ বড় সুগড় পনা।”
– প্রা, কা, সং।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সিন্ধুড়া ।।

এমত ব্যাভার,                         না জানি তাহার,
পিরীতি যাহার সনে।
গোপত করিয়া,                         কেনে সে রাখিলে,
বেকত করিলে কেনে।।(১)
মনের মরম জানিবে কে।
সেই সে জানে,                         মনের মরম,
এ রসে মজিল যে।।
চোরের মা যেন,                         পোয়ের লাগিয়া,
ফুকরি কাঁদিতে নারে।
কুলবতী হৈয়া,                         পিরিতি করিলে,
এমতি শঙ্কট তারে।।
কে আছে ব্যথিত,                         যাবে পরতীত,
এ দুখ কহিব কারে।
হয় দুখ ভাগি,                         পাই তার লাগি,
তবে সে কহি যে তারে।।
পর কি জানয়ে,                         পরের বেদন,
সে রত আপন কাজে।
চণ্ডীদাস কহে,                         বনের ভিতরে,
কভু কি রোদন সাজে?

————–

 (১) পদকল্পতরুতে এই পদটি পাওয়া যায়। অন্য গ্রন্থে পাওয়া যায় না।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। গান্ধার ।।

যত নিবারিয়ে তায় নিবার না যায় রে।
আন পথে যাই সে কানু পথে ধায় রে।।
এ ছার রসনা মোর হইল কি বাম রে।
যার নাম নাহি লই লয় তার নাম রে।।
এ ছার নাসিকা মুই কত করু বন্ধ।
তবুত দারুণ নাসা পায় তার গন্ধ।।
সে না কথা না শুনিব করি অনুমান।
পরসঙ্গে শুনিতে আপনি যায় কাণ।।
ধিক রহুঁ এ ছার ইন্দ্রিয় মোর সব।
সদা সে কালিয়া কানু হয় অনুভব।।
কহে চণ্ডীদাসে রাই ভাল ভাবে আছ।
মনের মরম কথা কাহে জানি পুছ।।

————–

করু – করি।
তবুত দারুণ নাসা পায় তার গন্ধ – পাঠান্তর–“তবু ত দারুণ নাসা পায় শ্যাম গন্ধ”।-প, ক, ত।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

কোন বিধি সিরজিল কুলবতী নারী!
সদা পরাধীন ঘরে রহে একেশ্বরী।।
ধিক রহুঁ হেন জন হ’য়ে প্রেম করে।
বৃথা সে জীবন রাখে তখনি না মরে।।
বড় ডাকে কথাটী কহিতে যে না পারে।
পর পুরুষেতে রতি ঘটে কেন তারে।।
এ ছার জীবনের মুঞি ঘুচাইনু আশ।
চণ্ডীদাস কহে কেন ভাবহ উদাস?

————–

রতি – আশক্তি।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। বিহাগড়া ।।

ধাতা কাতা বিধাতার কপালে দিয়াছি ছাই।
জনন হৈতে একা কৈল দোসর দিল নাই।।
না দিল রসিক মূঢ়, পুরুষের সনে।
এমতি আছয়ে ত এ পাপ বিধানে।।
যার লাগি প্রাণ কাঁদে তার নাই দেখা।
এ পাপ করমে মোর এমতি লেখা জোকা।।
ঘর দুয়ারে আগুণ দিয়া যাব দূর দেশে।
আরতি পূরিবে কহে দ্বিজ চণ্ডিদাসে।।

————–

ধাতা কাতা বিধাতার কপালে দিয়াছি ছাই – পাঠান্তর–“ধাতা কাতা বিধাতার বিধানে দিয়াছি ছাই”।-প, ক, ত।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

কাহারে কহিব দুঃখ কে জানে অন্তর?
যাহারে মরমী কহি সে বাসয়ে পর।।
আপনা বলিতে বুঝি নাহিক সংসারে।
এত দিনে বুঝিনু সে ভাবিয়া অন্তরে।।
মনের মরম কহি জুড়াবার তরে।
দ্বিগুণ আগুণ সেই জ্বালি দেয় মোরে।।
এত দিনে বুঝিলাম মনেতে ভাবিয়া।
এ তিন ভুবনে নাহি আপন বলিয়া।।
এ দেশে না রব একা যাব দূর দেশে।
সেই সে যুকতি কহে দ্বিজ চণ্ডীদাসে।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। ধানশী ।।

শিশুকাল হৈতে,                     শ্রবণে শুনিনু,
সহজে পিরীতি কথা।
সেই হইতে মোর,                     তনু জর জর,
ভাবিতে অন্তর ব্যথা।।
দৈবের ঘটিতে,                    বন্ধুর সহিতে,
মিলন হইবে যবে।
মান অভিমান,                     বেদের বিধান,
ধৈরজ ভাঙ্গিবে তবে।।
জাতি কুল বলি,                     দিলাম তিলাঞ্জলি,
ছাড়িনু পতির আশ।
ধরম, করম,                     বলি দেয় গালি,
গুরু পরিজন মেলি।
কাতর হইয়ে,                     আদর কইয়ে,
লইনু কলঙ্কের ডালি।।
চোরের মা যেন,                     পোয়ের লাগিয়া,
ফুকরি কান্দিতে নারে।
কুলবতী হয়ে,                     পিরীতি করিলে,
এমতি ঘটিবে তারে।।
মুঞি অভাগিনী,                     কেবল দুখিনী,
সকলি পরের আশে।
আপনা খাইয়া,                     পিরিতি করিনু,
লোকে শুনি কেন হাসে।।
চণ্ডীদাস বলে,                     পিরীতি লক্ষণ,
শুন গো বরজ নারী।
পিরীতি ঝুলিটি,                     কান্ধেতে করিয়া,
পিরীতি নগরে ফিরি।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

কালার পিরীতি,                    গরল সমান,
না খাইলে থাকে সুখে।
পিরীতি অনলে,                    পুড়িয়া মরে যে,
জনম যায় তার দুখে।।
আর বিষ খেলে,                    তখনি মরণ,
এ বিষে জীবন শেষ।
সদা ছটফট,                    ঘূরুণি নিপট,
লট পট তার বেশ।।
নয়নের কোণে,                    চাহে যাঁহা পানে,
সে ছাড়ে জীবনের আশ।
পরশ পাথর,                    ঠেকিয়া রহিল,
কহে বড়ু চণ্ডীদাস।।

————–

নিপট – নিতান্ত।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সিন্ধুড়া ।।

যে জন না জানে,                      পিরীতি মরম,
সে কেন পিরীতি করে?
আপনি না বুঝে,                      পরকে মজায়,
পিরীতি রাখিতে নারে।।
যে দেশে না শুনি,                      পিরীতি মরম,
সেই দেশে হাম যাব।
মনের সহিত,                      করিয়া যতন,
মনকে প্রবোধ দিব।।
পিরীতি রতন,                      করিয়া যতন,
পিরীতি করিব তায়।
দুই মন এক,                      করিতে পারিলে,
তবে সে পিরীতি রয়।।
কহে চণ্ডীদাসে,                      মনের উল্লাসে,
এমতি হইবে যে।
সহজ ভজন,                       পাইবে সে জন,
সহজ মানুষ সে।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সিন্ধুড়া ।।

পিরীতি বিষম কাল।
পরাণে পরাণ,                       মিলাইতে জানে,
তবে সে পিরীরি ভাল।।
ভ্রমরা সমান,                       আছে কত জন,
মধু লোভে করে প্রীত।
মধু ফুরাইলে,                       উড়ি যায় চলি,
এমতি তাদের রীত।।
হেন ভ্রমরার,                       সাধ নহে কভু,
সে মধু করিতে পান।
অজ্ঞানী পাইতে,                       পারয়ে কি কভু,
রসিক জ্ঞানীর সন্ধান।।
মনের সহিত,                       যে করে পিরীতি,
তারে প্রেম কৃপা হয়।
সেই সে রসিক,                       অটল রূপের,
ভাগ্যে দরশন পায়।।
মনের সহিতে,                       করিয়া পিরীতি,
থাকিব স্বরূপ আশে।
স্বরূপ হইতে,                       ও রূপ পাইব,
কহে দ্বিজ চণ্ডীদাসে।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। বরাড়ী ।।

কেনে কৈনু পিরীতের সাধ!
পিরীতি অঙ্কুর হৈতে,                   যত দুখ পাইনু চিতে,
শুনিলে গণিবে পরমাদ।।
মুঞি যদি জানিতুঁ এত,                  তবে কেন হব রত,
না করিতুঁ হেন সব কাজ।
ভুলিনু পরের বোলে,                  কুলটা হইনু কুলে,
জগৎ ভরিয়া রইল লাজ।।
যখন পিরীতি কৈল,                   আনি চাঁদ হাতে দিল,
পুন হাতে না পাই দেখিতে।
কি করিতে কি না করি,                   ঝুরিয়া ঝুরিয়া মরি,
অবশেষে প্রাণ চায় নিতে।।
পিরীতি আখর তিন,                   যাহার হৃদয়ে চিন,
কিবা তার লাজ কুল ভয়।
কহে দ্বিজ চণ্ডীদাস,                   যে করে পিরীতি আশ,
তার বুঝি এই সব হয়।।

————–

চিন – চিহ্ন।
তার বুঝি এই সব হয় – পাঠান্তর–“তার বুঝি এই দশা হয়”।-লী, স।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

পিরীতি বলিয়া,                       এ তিন আখর,
এ তিন ভুবন সার।
এই মোর মনে,                       হয় রাতি দিনে,
ইহা বই নাহি আর।।
বিধি এক চিতে                       ভাবিতে ভাবিতে,
নিরমাণ কৈল “পি”।
রসের সাগর,                      মন্থন করিতে,
তাহে উপজিল “রী”!
পুনল যে মথিয়া,                       অমিয়া হইল,
তাহা ভিয়াইল “তি”।
সকল সুখের,                       এ তিন আখর,
তুলনা দিব যে কি?
যাহার মরমে,                       পশিল যতনে,
এ তিন আখর সার।
ধরম করম,                       সরম ভরম,
কিবা জাতি কুল তার।।
এ হেন পিরীতি,                       না জানি কি রীতি,
পরিণামে কিবা হয়।
পিরীতি বন্ধন,                       বড়ই বিষম,
দ্বিজ চণ্ডীদাসে কয়।।

————–

বিধি এক চিতে – বিধি এক মনে।
উপজিল – উৎপত্তি হইল।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

পিরীতি পিরীতি,                         মধুর পিরীতি,
এ তিন ভুবনে কয়।
পিরীতি করিয়ে,                       দেখিলাম ভাবিয়ে,
কেবল গরল ময়।।
পিরীতেরি কথা,                       শুনিব হে যেথা,
তথাতে নাহিক যাব।
মনের সহিত,                       করিয়া পিরীত,
স্বরূপে চাহিয়া র’ব।।
এমতি করিয়া, সু                       মতি হইয়া,
রহিব স্বরূপ আশে।
স্বরূপ প্রভাবে,                       সে রূপ মিলিবে,
কহে দ্বিজ চণ্ডীদাসে।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

শ্যামের পিরীতি,                       মূরতি হইলে,
তবে কি পরাণ ফলে!
পরাণ পিরীতি,                      সমান করিলে,
কে তারে জীয়ন্ত বলে?
যদি হায় শ্যাম,                      বঁধু লাগি পাউ,
তবে সে এ দুখ দুটে।
আন মত গুণি,                      মনের আগুণি,
ঝলকে ঝলকে উঠে।।
পরাণ রতন,                      পিরীতি পরশ,
জুকিনু হৃদয় তুলে।
পিরীতি রতন,                      অধিক হইল,
পরাণ উঠিল চুলে।।
জাতি কুল বলি,                      দিনু জলাঞ্জলি,
আর সতী চরচাতে।
তনু ধন জন,                      জীবন যৌবন,
নিছিনু কালা পিরীতে।।
হিয়ায় রাখিব,                      কারে না কহিব,
পরাণে পরাণ যোড়া।
কি জানি কি ক্ষণে,                      কি দিয়া কি কৈল,
মরিলে না যায় ছাড়া।।
তিলেকে মরিয়ে,                      যদি না দেখিয়ে,
শয়নে স্বপনে বন্ধু।
কহে চণ্ডীদাস,                       মরমে রহল,
পিরীতি অমিয়া সিন্ধু।।

————–

পাউ – পাই।

পরাণ রতন, পিরীতি পরশ – পাঠান্তর–“পরাণ সমান, পিরীতি রতন”।-প, ক, ত।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। তিওট, বিহাগরা ।।

বিধির বিধানে হাম আনল ভেজাই।
যদি সে পরাণ বঁধু তার লাগি পাই।।
গুরু দুরজন যত বঁধুর দ্বেষ করে।
সন্ধ্যাকালে সন্ধ্যামুনি তার বুকে পড়ে।।
আপন দোষ না দেখিয়া পরের দোষ গায়।
কাল সাপিনী যেন তার বুকে খায়।।
আমার বন্ধুকে যে করিতে চাহে পর।
দিবস দুপরে যেন পুড়ে তার ঘর।।
এতেক যুবতী আছে গোকুল নগরে।
কে না বঁধুরে দেখে বুক ফেটে মরে।
বাশুলী আদেশে দ্বিজ চণ্ডীদাস ভণে।
তোমার বঁধু তোমার আছে গালি পাড়িছ কেনে?

————–

বিধির বিধানে হাম আনল ভেজাই – বিধির বিধানে আমি আগুন দিই।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

এ ছার দেশে বসতি নৈল নাহিক দোসর জনা।
মরমের মরমী নহিলে না জানে মরমের বেদনা।।
চিত উচাটন সদা কত উঠে মনে।
ননদী বচনে মোর পাঁজর বিঁধে ঘুণে।।
জ্বালার উপরে জ্বালা সহিতে না পারি।
বঁধু হইল বিমুখ ননদী হৈল বৈরী।।
গুরুজন কুবচন সদা শেলের ঘায়।
কলঙ্কে ভরিল দেশ কি করি উপায়?
বাশুলী আদেশে কবি চণ্ডীদাসের গীত।
আপনা আপনি চিত করহ সম্বিত।।

————–

চিত উচাটন সদা কত উঠে মনে – পাঠান্তর–“রহিতে না পারি ঘরে চিত উচাটনে”।-প্রা, কা, সং।
সম্বিত – সম্বরণ।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

পিরীতি পিরীতি,                   সব জন কহে,
পিরীতি সহজ কথা!
বিরিখের ফল                   নহেত পিরীতি,
নাহি মিলে যথা তথা।।
পিরীতি অন্তরে,                   পিরীতি মন্তরে,
পিরীতি সাধিল যে।
পিরীতি রতন                   লভিল যে জন,
বড় ভাগ্যবান সে।।
পিরীতি লাগিয়া,                   আপনা ভুলিয়া,
পরেতে মিশিতে পারে।
পরকে আপন,                   করতে পারিলে,
পিরীতি মিলয়ে তারে।।
পিরীতি সাধন                   বড়ই কঠিন
কহে দ্বিজ চণ্ডীদাস।
দুই ঘুচাইয়া                   এক অঙ্গ হও
থাকিলে পিরীতি আশ।।

————–

বিরিখের ফল – বৃক্ষের ফল।
মন্তরে – মন্ত্রে।

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

পিরীতি বলিয়া,                      এ তিন আঁখর,
বিদিত ভুবন মাঝে।
তাহে কি পশিল,                    সেই সে জানিল,
কি তার কুল ভয় লাজে!
বেদ বিধি পর,                    সব অগোচর,
ইহা কি জানে আনে।
রসে গর গর,                    রসের অন্তর,
সেই স মরম জানে।।
দুহুঁক অধর,                    সুধারস বাণী,
তাহে উপজিল পি।
হিয়ায় হিয়ায়,                    পরশ করিতে,
তাহার তুলনা কি।।
কহে চণ্ডীদাস,                    শুন বিনোদিনি,
পিরীতি রসেতে ভোর।
পিরীতি করিয়া,                    ছাড়িতে নারিবে, আ
আপনি হইবে চোর।।

————–

অনুরাগ।–আত্ম প্রতি ।। সুহিনী ।।

পিরীতি পিরীতি,                   কি রীতি মূরতি,
হৃদয়ে লাগল সে।
পরাণ ছাড়িলে,                   পিরীতি না ছাড়ে,
পিরীতি গড়ল কে?
পিরীতি বলিয়া,                   এ তিন আখর,
না জানি আছিল কোথা?
পিরীতি কণ্টক,                   হিয়ায় ফুটল,
পরাণ পুতলী যথা।।
পিরীতি পিরীতি,                  পিরীতি অনল,
দ্বিগুন জ্বলিয়া গেল।
বিষম অনল,                  নিভাইলে নহে,
হিয়ায় রহল শেল।।
চণ্ডীদাস বাণী,                   শুন বিনোদিনি,
পিরীতি না কহে কথা।
পিরীতি লাগিয়া,                   পরাণ ছাড়িলে,
পিরীতি মিলয়ে তথা।।

————–

অনুরাগ—আত্মপ্রতি ।। শ্রীরাগ ।।

পিরীতি নগরে,                   বসতি করিব,
পিরীতে বাঁধিব ঘর।
পিরীতি দেখিয়া,                 পড়শী করিব,
তা বিনু সকলি পর।।
পিরীতি দ্বারের,                 কবাট করিব,
পিরীতে বাঁধিব চাল।
পীরিতি আসকে,                  সদাই থাকিব,
পিরীতে গোঙাব কাল।।
পিরীতি পালঙ্কে,                  শয়ন করিব,
পিরীতি শিথান মাথে।
পিরীতি বালিসে,                 আলিস করিব,
থাকিব পিরীতি সাথে।।
পিরীতি সরসে,                 সিনান করিব,
পিরীতি অঞ্জন লব।
পিরীতি ধরম,                 পিরীতি করম,
পিরীতে পরাণ দিব।।
পিরীতি নাসার,                 বেসর করিব,
দুলিবে নয়ণ কোণে।
পিরীতি অঞ্জন,                 লোচনে পরিব,
দ্বিজ চণ্ডীদাসে ভনে।।

———————-
তা বিনু—তাহা বিনে। আসকে—আশক্তিতে। শিথান—মাথার বালিস। আলিস—আলস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *