কিরীটী অল্পক্ষণের জন্য এবারে একটু থামল। তারপর সহসা চেয়ার ছেড়ে উঠে হাসতে হাসতে বললে, এবার চলুন বন্ধুরা, কুমারসাহেবের মার্বেল প্যালেসের দিকে যাওয়া যাক। অকুস্থানে বসেই আমার রহস্যের ওপর যবনিকা টানব।

তখুনি আমরা গাড়িতে চেপে রওনা হলাম। এবং রাত্রি প্রায় সোয়া বারোটায় আমরা সকলে বেহালায় কুমারসাহেবের মার্বেল প্যালেসের সামনে এসে নোমলাম। একটা সুমধুর হাওইন গিটারে সুরের আলাপ কানে ভেসে এল। চকিত অতীতের অন্ধকারে যেন আলোর রশ্মি এসে পড়ল। এই সুর কোথায় শুনেছি! এ যে বহুকালের চেনা! আশ্চর্য এত রাত্রেও নীচের হলঘরে আলো জ্বলছে দেখতে পেলাম।

ঘরে ঢুকে আরও আশ্চর্য হয়ে গেলাম।

কুমারসাহেব!

অথচ শুনেছিলাম আজই বিকেলে যে, তিনি আজ দুপুরে মধুপুর চলে গেছেন।

একটা সোফার ওপর গা এলিয়ে দিয়ে কুমারসাহেব হাওইন গিটার বাজাচ্ছেন।

কিরীটী ঘরে ঢুকেই উল্লাস ভরা কণ্ঠে বললে, শুভরাত্রি ডাঃ স্যান্যাল।

আমাদের এতগুলো লোককে এত রাত্রে ঘরে ঢুকতে দেখে বাজনোটা হাতেই কুমারসাহেব সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর সহসা কিরীটীর হাতের দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলেন যেন।

হাত তুলুন! কিরীটীর গলা শুনে তার হাতের দিকে চেয়ে দেখি কিরীটীর হাতে চকচক করছে একটা রিভলবার।

সুব্রত, এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারের পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে নাও। আর এই নাও, এই সিন্ধা-কর্ডটা দিয়ে ওঁর হাত দুটো শক্ত করে বেঁধে ফেলো।

আমি এগিয়ে গিয়ে কুমারসাহেবের পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে হাত দুটো কিরীটীর দেওয়া সিল্ক-কর্ড দিয়ে বেঁধে হোেললাম।

এসবের মানে কি কিরীটীবাবু? ক্ষুঃস্বরে কুমারসাহেব বললেন।

বসুন আপনারা সবাই। শুনুন ডাক্তার সান্যাল ওরফে কালো ভ্রমর, ওরফে ছদ্মবেশী কুমারসাহেব। স্যার দিগেন্দ্রনারায়ণ ও প্রফেসর শর্মার হত্যাপরাধে আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করলাম। কিন্তু ডাক্তার, এতখানি জঘন্যতা আপনার কাছে আমি আশা করিনি কোন দিনও। বরাবর একটা শ্রদ্ধা আপনার ওপরে আমার ছিল। আপনারা হয়তো ভাবছেন ওঁকে আমি চিনলাম কী করে, না? মাত্র দুটি কারণে, এক নম্বর ওঁর হাতের লেখা দেখে, যার নমুনা এখনও আমার কাছে আছে। মনে পড়ে তোমাদের, মৃত স্যার দিগেন্দ্রর পকেটে হলুদে রংয়ের তুলট কাগজ গোটা দুই পাওয়া গিয়েছিল? এই দেখ সেই কাগজ। আর এই দেখ এতে ভ্রমর আঁকা। এই চিঠি পেয়েই গতরাত্রে মিঃ মিত্ররূপী স্যার দিগেন্দ্র ওঁকে চিনতে পারেন যে উনি কালো ভ্রমর।

উনি যে কুমার দীপেন্দ্র নন, স্যার দিগেন্দ্র প্রথম দর্শনেই তা টের পেয়েছিলেন, পাঁচ বছর আগে প্রথম যেদিন উনি ভাইপোর পরিচয়ে তার কাছে আসেন। কিন্তু তখন তিনি কোন কথা প্রকাশ করেননি। ইচ্ছা ছিল গোপনে একদিন তিনি একে শেষ করবেন, কিন্তু তার সে চেষ্টা নিস্ফল হয় এবং পাগলা গারদে তাকে যেতে হয়। এরই প্রচেষ্টায়। সেই থেকে তিনি উপায় খুঁজছিলেন কেমন করে সে অপমানের প্রতিশোধ নেবেন! তাঁর ইচ্ছা ছিল একে সরিয়ে টাকা হাতিয়ে সরে পড়বেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য র্তার, যে পরিচয়ে তিনি এখানে এসেছিলেন আমাদের তীক্ষ্ণবুদ্ধি অসাধারণ চতুর ও কৌশলী কালো ভ্রমরের চোখে তা ধরা পড়ে গেল। কিন্তু প্রফেসর শর্মাও এর আসল পরিচয় পাননি। তার ফলেই তিনি একে উৎসাহিত করেছিলেন মিঃ মিত্ররূপী স্যার দিগেন্দ্ৰকে হত্যা করবার জন্যে। তিনি স্যার দিগেন্দ্রর আসল পরিচয় এঁর কাছে বলেছিলেন; এবং এও তার ধারণা ছিল ইনি অর্থাৎ কুমারসাহেব নিজেও আসল কুমারসাহেব নন; এবং সে কথা এক দিগেন্দ্র ও প্রফেসর শর্মা ছাড়া আর কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু কেউই জানতেন না যে ইনি ছদ্মবেশী স্বয়ং কালো ভ্ৰমর। তাহলে হয়তো কেউ এতটা উৎসাহিত বোধ করতেন না। ভেবেছিলেন ইনি সামান্য একজন প্রতারক মাত্র। প্রফেসারের ইচ্ছা ছিল একে দিয়ে স্যার দিগেন্দ্রকে খুন করিয়ে একে হাতে রেখে যখন-তখন blackmail করে প্রচুর, অর্থলাভ করবেন, অথচ নিজে এর মধ্যে জড়াবেন না।

প্রথম থেকেই আমি জানতাম খুনী স্বয়ং কালো ভ্রমর। এবং তিনি ছদ্মবেশী কুমারসাহেব! কিন্তু সেই চিঠি থেকে প্রমাণ হল কী করে ইনি স্বয়ং কালো ভ্রমর! এর হাতের লেখা এদের স্টেটের ফাইলে পেয়েছি, তা ছাড়া গতকাল উনি যে কমিশনার সাহেবকে দশ হাজার টাকা পুরুস্কার ঘোষণা করে ফর্ম সই করে এসেছেন, সেই লেখার সঙ্গে কালো ভ্রমরের চিঠির হুবহু মিল হয়ে গেছে। উনি বর্ময় থাকতেই hashish সিগারেট খেতেন তা আমি জানতাম।

দু নম্বর কারণ সেই ছুরিটা, যেটা আমরা অরুণ করের বাগানে দেখি। সেটা বর্মী অস্ত্ৰ। সেখানকার লোকেরা ঐ ধরনের অস্ত্ৰ খুনখারাপি করতে ব্যবহার করে। কিন্তু কথা হচ্ছে, একে অপরাধী বলে মনে হল কেন? মনে আছে তোমাদের, মৃত স্যার দিগেন্দ্রর আঙুলের নখে একটা জিনিস পাওয়া গিয়েছিল, সে হচ্ছে কালো রংয়ের সার্জের প্যান্টের সুতো। সেই সুতো এর প্যান্টের কাপড়ের সুতোর সঙ্গে অবিকল মিলে গেছে। গতকাল উনি যখন প্রফেসর শর্মাকে খুন করে রক্তাক্ত জামা-কাপড়ে। এখানে ফিরে আসেন, সেই কেট-প্যান্ট উনি সরিয়ে ফেলবার অবকাশ পাননি। হরিচরণ ওঁর শয়ন ঘরের সোফার নীচে পেয়ে নিয়ে গেছে। ওঁর অবর্তমানে ম্যানেজারকে ঘুষ দিয়ে আজ দ্বিপ্রহরে এখানে এসে। সেই প্যান্টের সুতোর সঙ্গে মৃত স্যার দিগেন্দ্রর নখের মধ্যে আটকে ছিল যে সুতো দুটো অবিকল মিলে গেছে।

ট্যাক্সি-ড্রাইভারকে ধরে জানা গেছে সে এই বাড়িতে একজনকে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল কাল রাত্রে। তা ছাড়া সেই বাগানের ছুরিটার হাতলে যে আঙুলের ছাপ ছিল এবং এর আঙুলের ও কালো ভ্রমরের আঙুলের যে ছাপ আমার কাছে আছে, তার সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। তাছাড়া তোমার মনে পড়ে সুব্রত, প্রফেসর শর্মাকে যে ভাবে হত্যা করা হয়েছে, সে সাধারণ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়, ডাক্তার বলেই ওভাবে হত্যা করা এর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল! স্যার দিগেন্দ্ৰ যে মুহুর্তে চিনতে পেরেছিলেন তাঁর ভাইপো আসলে কে, তখনই তিনি প্রাণভয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ইনিও তখন বুঝতে পেরেছেন, জীবনে যে জঘন্য কাজ কোন দিনও করেননি। আজ তাই তাকে করতে হবে। স্যার দিগেন্দ্ৰ যদি একবার হাতের বাইরে চলে যান। তবে তাঁর পক্ষে এই ছদ্ম পরিচয়ে বাঁচা আর সম্ভব হবে না। তাই চির-জীবনের মত স্যার দিগেন্দ্রকে পথ থেকে সরিয়ে দেবার মনস্থ করেছিলেন। এইবার ডাক্তার সান্যাল দয়া করে বলুন, মিঃ মিত্ৰকে কিভাবে খুন করেছিলেন সে রাত্রে? কেননা ও ব্যাপারটা এখনও আমার কাছে রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।

ডাঃ সান্যাল মৃদু হাসলেন, চমৎকার বুদ্ধি আপনার মিঃ রায়! সম্পূর্ণ হার মানলাম আপনার বুদ্ধির কাছে। সত্যিই আমি কালো ভ্রমর, ডাঃ এস. সান্যাল। কুমারসাহেব আমি নই, কোনদিন ছিলামও না। আপনি অনেক কিছু জানেন বা জানতে পেরেছেন, কিন্তু একটা কথা এখনও জানেন না। সেটা হচ্ছে এই, দিগেন্দ্রর অতীত ইতিহাস। এই দিগেন্দ্র। এতকাল এই কলকাতায় থেকে আমারই দলে কাজ করত। সে ছিল আমার কলকাতার দলের প্রতিভূ। সেবার আপনাদের যখন আমি বর্ময় নিয়ে যাই, দিগেন্দ্র তখন সেখানে। সে-ই বনমালী বসু (‘কালো ভ্ৰমর’ দ্বিতীয় ভাগ দ্রষ্টব্য।—লেখক) নাম নিয়ে সনৎবাবুকে তঁদের আমহাস্ট স্ট্রীটের বাসা থেকে চুরি করে আনে। মৃত্যুগুহায়’ সে রাত্রে আমি একজাতীয় বুনো গাছের তৈরী ঔষধ শরীরে ফুটিয়ে পাঁচ ঘণ্টার জন্য অজ্ঞান থেকে আপনার হাত থেকে বাঁচবার চেষ্টা পাই এবং আপনারা আমাকে ইরাবতাঁর জলে ভাসিয়ে দিয়ে আসেন। আমার অন্যতম বিশ্বস্ত অনুচর রামু ইরাবতাঁর মধ্যেই খানিকটা দূরে নৌকো নিয়ে অপেক্ষা করছিল, আমায় তুলে বাঁচায় সে। আমার পরিধানে তখন ছিল রবারের পােশাক। তাই জলে ভেসেছিলাম, ড়ুবিনি। আর ঐ ঔষধটার এমন গুণ ছিল যে, জল মুখে ঢুকলে তার কাজ নষ্ট হয়ে যায়। আমি সব রকম কিছু ভেবে আগে থেকেই সে রাত্রে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম, সবই pre-arranged.

কয়েক দিন পরে একটু সুস্থ হয়ে ধনাগারে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি ধনাগার শূন্য, একটা কপর্দকও নেই। বর্ময় ফিরে এসে দেখি দিগেন্দ্ৰ উধাও। ব্যাপার সব বুঝলাম। প্রতিশোধের হিংসায় জ্বলে।পুড়ে মরতে লাগলুম। তারপর সেখান থেকেই দিগেন্দ্রকে একটা চিঠি দিই, ওই চিঠিটা এইজন্য দিয়েছিলাম, যাতে দিগেন্দ্ৰ জানতে পারে। আমি বেঁচে উঠেছি এবং ভয়ে ধনরত্নগুলো ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু he was clever, তাই চুপচাপ রয়ে গেল, আমার চিঠির কোন জবাবই দেওয়া প্রয়োজন বোধ করলে না।

হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে, আমরা পরের দিন ধনাগারে ধনরত্ন আনতে গিয়ে দেখি ধনাগার শূন্য, কিছুই নেই। কিরীটী বললে।

তখন ডাক্তার আবার বলতে লাগলেন, কিন্তু মুখ সে, তাই আমার কথায় কান দিল না। ওর সব ইতিহাস আমি জানতাম, সুতরাং ওর মৃত ভাইপের পরিচয়ে এখানে এসে ঢুকলাম। বুঝলাম ও আমায় সন্দেহ করেছে, এবং পরে টের পেলাম ও আমাকে মারবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু মারতে এসে একদিন সে ধরা পড়ে গেল, ও নিজেকে সাফাই করবার জন্য পাগলের ভান করলে। কিন্তু আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না।

ধরা পড়ল এবং ওকে গারদে পাঠালাম। কিন্তু আবার গারদ ভেঙে ও পালাল। খুন করা আমি চিরদিন ঘৃণা করি। কিন্তু নরাধম। আমাকে বাধ্য করলে ওকে খুন করতে। কিন্তু প্রফেসর শর্মা একদিন আমাকে এসে বললে মিঃ মিত্রের আসল পরিচয় কী। কিন্তু নির্বোধ জানত না। এ সংবাদ তার ঢের আগেই আমার জানা হয়ে গেছে। আমিও দেখলাম, ও যখন জেনেছে তখন ওকে বাদ দিয়ে কাজ করা তো চলবে না! এইখানেই আমার সব চাইতে বড় ভুল হল। মুর্থ আমাকে পেয়ে বসল। আমিও নিরুপায় হয়ে কিল খেয়ে কিল হজম করতে লাগলাম। প্রায়ই ও আমার কাছ থেকে টাকা নিত। কেননা আমি যে আসল কুমার নই সে ও টের পেয়েছিল। আসল কাজ হবে না ভেবে ওকে টাকা দিয়ে আমি নিরস্ত রেখেছিলাম। ভবিষ্যতে একদিন ওর পাওনা মেটাব বলে। প্রফেসার যখনই জানতে পারে আসল মিঃ মিত্র আমার সেক্রেটারী নয় এবং আসলে যে স্যার দিগেন্দ্র, তখন থেকেই সে উল্লাসে নাচতে লাগল। আমার জন্মোৎসবের রাত্ৰে সকলেই এখানে আমরা উপস্থিত, ছদ্মবেশী স্যার দিগেন্দ্র, আমি, প্রফেসর শর্মা।

এবার হয়েছে, আমাকে বলতে দিন ডাক্তার। কিরীটী সহসা বলে উঠল।

বলুন। ডাক্তার মৃদু হেসে জবাব দিলেন, কিন্তু হাতের বাঁধনটা খুলে দিতে বলুন। ভয় নেই, পালিয়ে বাঁচবার ইচ্ছা আর আমার নেই। পর পর দু-দুটো খুন করে এ জীবনে আমার ঘৃণা হয়ে গেছে। কুমারসাহেব ও আমার নিজের উপার্জিত সমস্ত সম্পত্তি আমি গতকালই উইল করে জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য দান করে দিয়েছি, আর তার অছি নিযুক্ত করেছি কাকে জানেন?

কিরীটী অধীর স্বরে বললে, কাকে?

আমার জীবনের সব চাইতে বড় শত্রু ও সবার বড় বন্ধু আপনাকে ও সুব্রতবাবুকে।

ধন্যবাদ ডাক্তার। কিরীটী বললে।

এর পর ডাক্তারের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হল। মূহুর্তকাল কিরীটী চুপ করে রইল। তারপর আবার ধীরস্বরে বলতে লাগল, তাহলে এঁদের কৌতূহলটা মিটিয়ে দিই। হ্যাঁ শুনুন আপনার সেক্রেটারী অর্থাৎ স্যার দিগেন্দ্ৰ ৮.৫৫ মিনিট পর্যন্ত আপনার খাবার ঘরেই ছিলেন। তারপর সেখান থেকে তিনি বের হয়ে আসেন বোধ করি ঠিক ৮.৫৫ মিনিটে এবং সাড়ে নটার সময় আমাদের ধারণা ও দেখা অনুসারে তিনি প্রাইভেট রুমে ঢোকেন। এই যে ৩৫ মিনিট সময়-এই সময়টা কেউ তাকে দেখতে পায়নি। এই সময় তিনি খাবার ঘর, ড্রইংরুম, হলঘর, শোবার ঘর, লাইব্রেরী ঘর বা নীচে বা সিঁড়িতে কোথাও ছিলেন না। তবে নিশ্চয়ই তিনি ঐ সময় আপনার প্রাইভেট রুমে ছিলেন এবং খাবার ঘর থেকে বের হয়ে সোজা তিনি ঐখানেই গিয়ে ঢুকেছিলেন।

এটাও ঠিক ডাক্তার যে, ৮.৫০-৮.৫২ মিনিটের সময় আপনার ম্যানেজারের সঙ্গে দোতালার সিঁড়িতে আপনার দেখা হয়। তাহলে নিশ্চয়ই ধরা যায় ঠিক ঐ সময়ই মিঃ মিত্ররূপী স্যার দিগেন্দ্র যখন আপনার খাবার ঘর থেকে বের হয়ে আসেন, দোতলার হলঘরে আপনাদের দুজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কেমন কিনা, am I right?

হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক মিঃ রায়। আমি সন্ধ্যার সময়েই ঠিক করেছিলাম মনে মনে, স্যার দিগেন্দ্রকে আজ শেষ করব। কেননা ও যা ভয়ানক লোক, সুযোগ পেলেই আমাকে অনায়াসে খুন করবে। তাই সন্ধ্যার অল্প পরেই আমার নিজ স্বাক্ষরে ওকে চিঠি দিলাম ঃ তোমার সময় উপস্থিত, আজই–প্রস্তুত থাক।-ইতি। ‘কালো ভ্রমর’। সারা বাড়িতে তখন উৎসবের হুল্লোড়ি; নটা বাজবার কয়েক মিনিট আগে ম্যানেজারের কাছ থেকে এসে hashish দিয়ে তৈরী কয়েকটা সিগারেট চেয়ে নিই। কেননা আপনি জানেন আমি বাড়িতে মরফিয়া ইনজেকশন নিতাম। এখানেও ওটা অভ্যাস করে ছিলাম। কিন্তু মাঝে মাঝে মরফিয়া বন্ধ করবার জন্য অত্যন্ত ক্লান্তি বোধ হত। রাতে ভালো ঘুম হত না। প্রফেসর শর্মাকে এ কাজে নিয়েছিলাম, কেননা দুজনে না হলে এতগুলো লোকের চোখে ধুলো দেওয়া যাবে। না। শৰ্মা আমায় বলে গেল, ওকে নিয়ে আমি খাবার ঘরে যাচ্ছি। তুমি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা কর। যখন সে খাবার ঘর থেকে বের হয়ে আসবে ওর সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু সাবধান, তোমাকে যেন কেউ লক্ষ্য না করে।

৮.৫৫ মিঃ কি ৯টার সময় দিগেন্দ্ৰ খাবার ঘর থেকে বের হয়ে এল। ওপরের হলঘরে তখন বড় একটা কেউ ছিল না। যে দু-চারজন ছিল তারা তখন তাঁস খেলায় মত্ত। বাকি অভ্যাগতরা নীচের হলঘরে গান-বাজনায় জমে উঠে। প্রফেসার যখন খাবার ঘরে দিগেন্দ্রকে নিয়ে যায়, আমি সেই ফাকে এক সময় প্রাইভেট রুমে ঢুকে দেওয়াল থেকে তলোয়ারটাকে নামিয়ে সোফার ওপর গদির তলায় রেখে আসি। হলঘরে দাঁড়িয়ে আছি সিঁড়ির কোণায়। দিগেন্দ্র ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ওকে ইশারায় ডেকে প্রাইভেট রুমে গিয়ে ঢুকি, কেউ দেখেনি। আমার মুখে একটা জ্বলন্ত সিগারেট ছিল। একসময় দুজনে কথা বলতে বলতে টুপ করে সেটা মেঝোয় ফেলে দিই। ইচ্ছা করে। দিগেন্দ্র সেটা যেমন কুড়িয়ে নিতে নীচু হয়েছে, চক্ষের নিমেষে গদির তলা থেকে ভারী তলোয়ারটা টেনে নিয়ে তার গলা দু ভাগ করে দিই। তারপর মাথাটা নিয়ে মাঝখানে রেখে দিই। এখন বুঝতে পারছেন আপনারা, মৃতদেহের position ওরকম ছিল কোন!

তারপর ৯.১০ মিনিটের সময় আমি একটা চাদর জড়িয়ে ওঘর থেকে বের হয়ে সোজা শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকি। সেখানে দেড় থেকে দু মিনিটের মধ্যে পোষাক বদলে আপনাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করি। আমি আগেই আপনাকে দিগেন্দ্রর লেখা চিঠি পাঠিয়ে এখানে এনেছিলাম। অত্যধিক অহঙ্কারেই ঐ কাজ করতে গিয়ে এইভাবে ধরা পড়লাম। নাহলে এ জগতে কারও সাধ্য ছিল না। আমাকে ধরে। কিন্তু শর্মাকে যখন বললাম। সে ভয়ে শিউরে উঠল। মনে মনে আমি হাসলাম এবং আমাদের পরামর্শমত ঠিক রাত্রি সাড়ে নটায় আমাদের চোখের সামনে দিয়েই শর্মা প্রাইভেট রুমে গিয়ে ঢুকলো। এবং ঠিক যখন প্রায় সে অদৃশ্য হয়েছে, তখন আপনার দৃষ্টি ওদিকে আকর্ষণ করলাম। এদিকে শর্মা ঘরে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে হলঘরের দরজা দিয়ে বের হয়ে যাবার সময়ে খুব ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চাকরীদের ডাকার ঘণ্টার দড়িটা টেনে, চকিতে খাবার ঘরের দরজার সামনে দিয়ে ঘুরে একেবারে আপনার হরিচরণের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলে। বেয়ারাকে আগে থেকেই শর্মা ওঘরে যাবার জন্য বলে রেখেছিলর

কিন্তু মিঃ মিত্রের পকেট থেকে চাবিটা চুরি করেছিল কে?

আমি। আমিই খুন করে আসবার সময় নিয়ে আসি। শর্মা আমাকে এগুলো নিয়ে আসতে বলেছিল।

তারপর কী হয়েছিল সে চাবি নিয়ে জানেন?

হ্যাঁ, জানি। শর্মা ঐ রাত্রেই মিঃ মিত্রের ওখানে গিয়ে তার সমস্ত কাগজপত্র সরিয়ে ফেলে; আর তার ধারণা ছিল অস্ত্রঘরে আসল মিঃ মিত্রের মৃতদেহ লুকানো আছে, তাই সে অস্ত্ৰঘরের চাবি চুরি করে রেখেছিল।

প্রফেসারকে কেন সন্দেহ করেছিলাম সর্বপ্রথম জানেন ডাক্তার? উনি আমার লোক হরিচরণের কাছে সময়ের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন বলে। হরিচরণকে জিজ্ঞাসা করবার মানেই তার কাজের মিথ্যে সাফাই একটা রেখে দেওয়া। তাছাড়া আপনিই নিজে গিয়ে তিনতলায় অরুণের সঙ্গে ঐ ভাবে দেখা করেছিলেন।

হ্যাঁ, আমিই। আমার ইচ্ছা ছিল এতে যদি ভয় পেয়ে ও শর্মার মত লোকেদের পাপচক্রে আর না ভোলে। বড় ভাল ছেলেটি, দেখলে মায়া হয়।

হলঘরের ঘড়িতে ঢং ঢেং করে রাত্ৰি বারোটা ঘোষণা করল। এক ঝলক হাওয়া খোলা জানালা-পথে ঘরে এসে যেন সবার চোখে-মুখে শান্তির প্রলেপ দিয়ে গেল।

আমরা সকলে নিঃশব্দে বসে রইলাম।

হতভাগ্য শর্মাকে হয়তো আমি খুন করতাম না, কিন্তু ও আস্ফালন দেখালে, আমায় নাকি টিপে মারতে পারে; সে বিনিময়ে চার লক্ষ টাকা চায়। তার টাকার সাধা চিরতরে কাল অরুণ করের বাড়িতে মিটিয়ে এসেছি। ওদের মত জঘন্য প্রবৃত্তির লোক এ দুনিয়ায় যত কম থাকে ততই ভাল, তার জন্য আমি এতটুকুও অনুতপ্ত নই।

ডাক্তার সান্যাল চুপ করলেন।

হলঘরের ঘড়িতে ঢং ঢেং করে রাত্রি পাঁচটা ঘোঘণা করল।

Share This