১৩. প্রশান্ত কম্পাউনডারের ভবিষ্যদ্বাণী

প্রশান্ত কম্পাউনডারের ভবিষ্যদ্বাণী শিরোধার্য করে ফুলজানের বেটা বেঁচেই থাকে। সারা শরীরের রক্ত চুষে পিলেটা তার নাদুসনুদুস হয়, তার পেট মনে হয় রোজই একটু একটু করে ফোলে। ইনজেকশন তাকে দেওয়া হয় নি। করিম ডাক্তারের কাছেও যাওয়া হচ্ছে না। আবদুল আজিজের ছেলে হুমায়ুন মারা যাওয়ার পর কাদের কয়েকটা দিন মনমরা হয়ে পড়ে রইলো ঘরেই, সপ্তাহখানেক পর গা ঝেড়ে উঠে লীগের কাজে এতোটাই জড়িয়ে পড়েছে যে তার নিশ্বাস নেওয়ার সময়টুকু নাই। সাইকেলে করে আজকাল তাকে যেতে হয় অনেক দূরের গ্রামে গ্রামে। টাউনেই যেতে হচ্ছে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন। তার কেরোসিন তেলের বিক্রিও বেড়ে গেছে অনেক বেশি। এই ইউনিয়নে কেরোসিন আর কোথাও মেলে না, কয়েক গাঁয়ের মানুষ কেরোসিন তেল কিনতে ভিড় জমায় তার দোকানের সামনে। দোকানে গফুর কলুর দাপট, গফুর তেল বেচে আর পাকিস্তানের ভাষণ ছাড়ে। লোকের না শুনে উপায় নাই। আর মানুষ দিনরাত খালি এইসব গল্পেই মেতে থাকে। কাদেরের সঙ্গে ফুলজান ছেলেকে নিয়ে একটু দেখা করার সুযোগ পায় না।

ইনজেকশন সম্বন্ধে তমিজ একটু আধটু খবর রাখে; উঁচু একবার ঢোকালে শরীর। থেকে সেটা যে ফের বের করা যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। এ ছাড়া তমিজ ব্যস্তও তো কম নয়। চারপাশে আমন কাটার ধুম পড়ে গেছে। এদিকে আমনের চাষ তো আগে ছিলোই না। বছর তিনেক হলো একটু উঁচু ডাঙা জমি কেউ আর খালি রাখে না, রোপা আমন লাগায়। শরাফত মণ্ডলের গিরিরডাঙার সব জমিতে আমনের ফলন বেশ ভালো। এখানে তার আধিয়ার হামিদ সাদিকার নিজেও মাঝারি গেরস্থ; তার নিজের জমি বেশিরভাগই দোপা বলে আমন সে তেমন সুবিধার করতে পারে নি। কিন্তু শরাফতের জমিতে ধান সে তুলেছে মেলা। নিজের বাড়ির পালান পেরিয়ে বিঘা চারেক জমি শরাফত মণ্ডল কখনো বর্গা দেয় না, চাষ করায় তার বছর কামলাদের দিয়ে। ধান রোপা থেকে শুরু করে কাটা এবং কাটার পর মাড়া এবং তারও পর গোলায় তোলা পর্যন্ত সব সে দেখে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। সেখানে সবচেয়ে উঁচু জায়গাটায়, তা বিঘা দেড়েক তো হবেই, শালি ধানের চাষ করেছে মণ্ডল। কালিজিরা শালি ধানের চাষ এবারেই সে প্রথম করলো। কী করবে?–বেটার বৌয়ের বাপের বাড়ি টাউনের ধারে, চাঁদে চাঁদে তারা পোলাও খায়; বলতে কি, বড়ো বেটা আর বেটার বৌয়ের হাউসেই এই ধান বোনা হলো। সারাদিন ওই ধান কেটে তমিজের নাকে মুখে সারা গায়ে পোলাওয়ের চালের সুবাস।

তমিজের জমিতেও ধান এবার ভালো। কাৎলাহার বিল থেকে নালা কেটে সেঁউতি দিয়ে পানি সেঁচে সেঁচে তমিজ তার জমির চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। কার্তিকে জমিতে যে চিড় ধরেছিলো, তা সম্পূর্ণ ঝুঁজে গিয়ে মাটি সেখানে এই পৌষেও কালো কুচকুচ করে। অথচ দেখো, পাশেই রাস্তার মাটির রঙ সেখানে হাড়ের মতো ময়লা সাদা। জমিতে ধানের গোছা তার বেশ ভারি, শীষের ভারে ধান গাছ নুয়ে পড়ে। ধানের রঙও দিন দিন হচ্ছে পাকা সোনার মতো। পাশ দিয়ে যে-ই যায়, সে বাপু যতো ঝানু চাষাই হোক, কিছুক্ষণ দাঁড়াবেই। আলের ওপর দাঁড়িয়ে শমশের পরামাণিক সেদিন আর চোখ ফেরাতে পারে না। খুশিতে সে ডগমগ, মাঝির বেটা, তুই কী করিছু রে? তোর হাতের বরকত আছে বাপু। তাও তো শীষের ছড়া ছাড়া শমশের আর কিছুই দেখে নি। পাকা শীষ মাথায় করে কালো মাটির দিকে মাজা একটু হেলে দাঁড়ানো পুরুষ্টু উঁটিগুলোকে দেখে শুধু তমিজ নিজে। ধানখেত কিন্তু নিজের রঙকে কখনোই সম্পূর্ণ করে দেখায় না; ভোরে শিশিরে এটা টলটল করে, দুপুরবেলা ধানের শীষ থেকে রঙ নিয়ে রোদের তেজ বাড়ে, রোদকে দিয়ে থুয়ে ধানের রঙ হয় একটু ফ্যাকাশে। আবার পৌষের বেলা তাড়াহুড়া করে হেলে পড়লে এই জমিতেই পড়ে হালকা ছায়া, শীষগুলো তখন তাকিয়ে থাকে নিজের ছায়ার দিকে। তারপর সন্ধ্যায় কুয়াশার ভেতর মাথা গুঁজলে ধানখেতটাকে চেনা যায় না, এটা তখন কার কবজায় বোঝা দায়!

ভোরবেলা শীত পড়ে। পিরানের ওপর একটা কথা জড়িয়েও তমিজের জাড় করে। ধানগাছও একটু একটু কাঁপে। তখন নিজের শিরশির করা আর ধানগাছের কাঁপুনির কোনটা কার তমিজ ফারাক করতে পারে না।

দিনমান শরাফতের অন্য কোনো জমিতে ধান কেটে কিংবা ধান কাটার তদারকি করে হুরমতুল্লা সন্ধ্যার আগে আগে মরিচ খেতে এসে নিড়ানি দেয়, মরিচ গাছের গায়ের ময়লা সাফ করে। বেলা ডোবার পর এদিকে মানুষজন থাকে না, মোষের দিঘির ওপারে। হুরমতের বাড়ি থেকে ধোঁয়া ওঠে। হুরমত কিন্তু জমি থেকে ওঠে না। কোনো কোনো দিন হুঁকায় কল্কে সাজিয়ে আনে ফুলজান। একেক দিন তার হাতে থাকে পোড়া মিষ্টি আলু। বাপকে আড়াল করে এক-আধ টুকরা আলু সে এগিয়ে দেয় তমিজের দিকে। কোল থেকে বেটাকে নামিয়ে কুলগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসিয়ে রেখে সে জমিতে। হাত লাগায় বাপের সঙ্গে। ঠাণ্ডায় ছেলেটা তার হি হি করে কাঁপে। তমিজ তখন তাকে কোলে নিয়ে নিজের শরীরের ওম দেওয়ার চেষ্টা করে। ফুলজানের বেটা আরামে মাথা ঠেকিয়ে দেয় তমিজের বুকে। বুকটা তমিজের ভার ভার ঠেকে;—এটা কি এই পেট-ফোলা ছেলেটার শরীরের ভারে কি-না সে ঠিক ঠাহর করতে পারে না। মরিচখেতের হালকা কুয়াশার ভেতর থেকে ফুলজান তার বেটা কোলে বসে-থাকা তমিজকে দেখতে পায় কিনা সন্দেহ। দেখলে ভালোই হয়!

হুরমতুল্লার বড়ো বেটির সবই ভালো। সুযোগ পেলেই তমিজের হাতে পোড়া আলুটা, চালের আটার রুটিটা কিংবা ঠাণ্ডা একটা ভাপা পিঠা গুঁজে দেয়। আবার বাপ অন্যমনস্ক থাকলে তমিজকে জমিতে সাহায্য করতেও তার আপত্তি নাই। মেয়েমানুষের নিড়ানির হাত যে এতো ভালো না দেখলে বিশ্বাস হবে না।—সবই ভালো। দোষ তার একটাই। তমিজকে সে মাঝির বেটা বলে বড়ো হেলা করে। আর একটা দোষ।–কী?—ওই যে শিশির ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিতে তমিজকে আট আনা পয়সা দিয়েছিলো সেটা সে এক ঘড়ির জন্যেও ভুলতে পারে না। তমিজ তো সেখান থেকে কিছু খরচও করে ফেললো। না, নিজের জন্যে নয়।-বৈকুণ্ঠকে দিয়ে টাউনের কালীবাড়ি থেকে পাদোদক এনে দিয়েছে দশ পয়সা খরচ করে। দশ পয়সা আর বৈকুণ্ঠ পান খেতে নিয়েছে দুটো পয়সা। টাউনের কালীবাড়ির জবাফুল ধোয়া মায়ের পাদোদক ভক্তি করে খেতে পারলে মরা মানুষও লাফ দিয়ে ওঠে। ফুলজানের বেটার কিছু হলো না। হবে কী করে?—সব নষ্ট করলো ওই শালা কলুর বেটা গফুর। গোলাবাড়ি হাটে একদিন হুরমতুল্লাকে সে শুনিয়ে দিয়েছে, মাঝির বেটা তোমার বেটির পয়সা আর ফেরত দিছে! আবার হিন্দুর ঠাকুরের পানি লিয়া আসিছে? আরে, হিন্দুর ঠাকুর, তাই মোসলমানের বালামুসিবত আসান করবি কিসক? এটা শুনে ফুলজানের মনটা বিষিয়ে উঠেছে, পাদোদকে তার আর ভক্তি রইলো না। বেটার ব্যারাম সারে কী করে? এরপর থেকে পয়সা ফেরত পাবার জন্যে ফুলজান খালি ঘ্যানঘ্যান করে। তমিজ কতোবার বলেছে, ধান কাটলেই কড়ায় ক্রন্তিতে সব শোধ করবে। তো শোনে না।

কিছু পয়সা তমিজ এখনি যে দিতে পারে না তা নয়। মানুষের জমিতে জমিতে ধান কেটে কামাই তার মন্দ নয় এখন। বাড়িতে রাত্রিবেলা রোজ ভাত জুটছে, সকালে পান্তা কি কড়কড়া না খেয়ে বাপ বেটা ঘর থেকে বেরোয় না। এ ছাড়াও এদিক ওদিক থেকে কিছু কিছু আসছে। এই তো, আবদুল কাদের সেদিন গোলাবাড়ি হাটে লীগের ছেলেদের খাওয়াবার জন্যে জিলিপি আর পান বিড়ি কিনতে তমিজকে পুরো একটা টাকার নোটই দিলো, খরচ হলো সাড়ে বারো আনা, বাকি পয়সাটা পরদিন পর্যন্ত তমিজের কাছেই ছিলো। সে নিজে থেকে দুই আনা ফেরত না দিলে আবদুল কাদের মনেও করতে পারতো না। পুরো চোদ্দটা পয়সা রেখে দিলেই ভালো হতো। সোমবার হাটের দিন মুকুন্দ সাহার আড়তে আদার বস্তা উঠিয়ে দিতে তাকে ডেকে নিলো বৈকুণ্ঠ গোরুর গাড়ি থেকে বারোটা বস্তা নামিয়ে দোকানে উঠিয়ে দিলো সে আর বৈকুণ্ঠ। বস্তা ওঠাবার পর আড়ালে ডেকে বৈকুণ্ঠ তার হাতে তিন আনা পয়সা গুঁজে দিলো। বাবুর কাছ থেকে নিশ্চয়ই আরো বেশি নিয়েছিলো। তা নিক। তিন আনা পয়সাই বা কম কী? সেখান থেকে খামাখা দুই আনা দিয়ে ট্যাংরা মাছ না কিনে ফুলজানকে দিলেও তার ধারের পরিমাণটা একটু কমে যেতো।

আবার হাটবারের একদিন পর নিজগিরিরডাঙায় কামারপাড়ায় শরাফত মণ্ডলের জমিতে ধান কাটা হলো। আধিয়ার যুধিষ্ঠির কামার। হায়রে, কামারের বেটা নিজের জমি নিজেই বর্গা চাষ করলো। আকালের সময় যুধিষ্ঠিরের বাপ ধান নিয়েছিলো জগদীশের কাছ থেকে, সুদে আসলে যা হয়েছিলো তাই শোধ করতে জমি বেচলো সে শরাফতের কাছে। শরাফতের হাবভাব বোঝা দায়। কামারের বেটাকে তার নিজের জমি বর্গা দাও, ভালো কথা, কিন্তু তমিজের বাপের ভিটার সাথে লাগোয়া জমিটা তমিজকে দিতে দোষ কী? তমিজ কি তার বাপ কি আর গোলমাল করার লোক? যুধিষ্ঠির তো মেলা গাইগুই করলো। কী সমাচার?–না, আঁটি কোবান দিয়েই ধান সে একবার তুলতে চায় মণ্ডলের গোলায়। আঁটি খুলে গোরু দিয়ে মাড়িয়ে খড় দেবে পরে। মণ্ডল রাজি নয়। ভিজে ধান সে নেবে না। আর ধান-ছাড়ানো আঁটি কামারের বাড়ি রেখে এলেই কামারের বেটা পরে ওখান থেকে মেলা ধান বার করবে। হোক সেটা ঘোলানো ধান, তার দাম যতোই কম হোক, শরাফত নিজের ন্যায্য ভাগ ছাড়বে কেন? যুধিষ্ঠিরকে শেষপর্যন্ত জোতদারের কথাই মানতে হয়। কিন্তু এই নিয়ে মণ্ডলের সঙ্গে ছোঁড়া একটু বেয়াদবিই করে এসেছে। আবার মণ্ডলবাড়ির শিমুলগাছের সাদা বকের কয়েকটা নাকি যুধিষ্ঠিরের ওপর উড়ে উড়ে ওদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিলো। এতে মণ্ডল আরো রেগে গেছে। বকের ঝাক তো এসেছিলো কামারপাড়া থেকেই, যুধিষ্ঠির কি আবার তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে তুকতাক করছে নাকি? কিন্তু তমিজের বাপ সেদিন রাতে জড়িয়ে জড়িয়ে। তমিজকে বলছিলো, নেমকহারাম বকের ঝাক আসলে গিয়েছিলো কামারবাড়ির খুলিতে মণ্ডলের ধানের পরিমাণ দেখে আসতে।।

তা বাপু, যুধিষ্ঠির আর মণ্ডল যা ইচ্ছা করুক, তমিজের তাতে কী? যুধিষ্ঠির মানুষটা ভালো। কামলাপাটকে পয়সা যা দেওয়ার দিয়েছে, খাওয়া দিয়েছে ভালো। ওখানে ধান কেটে তমিজের পয়সা যা মিললো, তাতে ফুলজানের পয়সা মিটিয়েও মেলা থাকতো। তবে, পয়সা জমানো দরকার। পয়সা এলো, আর একে ওকে দিয়ে আর মাছ কিনে আর। বাতাসা কিনে সব উড়িয়ে দিলো, তো গোরু কিনবে কী করে? তবে ফুলজানের চটাং চটাং কথা শুনে একেকবার ভাবে, দুত্তোরি দিয়েই দিই। কিন্তু ফুলজান তখন তার কাছে আর চাইবে কী?

মাঝির বেটা তমিজের সঙ্গে বেটির এইটুকু মেলামেশায় হুরমতুল্লা তেমন গা করে। হাজার হলেও বেটির তার স্বামী আছে একটা, মানুষ কতো দূর আর বলতে পারবে? নবিতনের ব্যাপারে বুড়া কিন্তু টনটনা, ওর কাছে তমিজকে ঘেঁষতে দেওয়া যাবে না। তবে নবিতন তো একটু ফুটানিওয়ালি, রাতদিন কাঁথা সেলাই নিয়ে থাকে, কিছুদিন বাদে বাদে কাপড় খারে দেয়, চুল আঁচড়ায় রোজ কাকই দিয়ে। এইসব মাঝি আর কলু, ঘরের পুরুষমানুষকে সে মোটে আমলই দেয় না। সেদিক থেকে হুরমতুল্লা নিশ্চিত। আর তমিজের সঙ্গে হুরমতুল্লা অতো ঠাস ঠাস করে কথাও কয় না। ছোঁড়াটাকে দিয়ে তার উপকার তো কম হলো না। বিল থেকে নালা কাটার কাজটা তমিজ করলো বলতে গেলে একলাই। হুরমতুল্লার মরিচের খেতে ফলন এবার আল্লায় দিলে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো হবে। মরিচের যেমন বাড়, তাতে ফাল্গুনেই মরিচ তোলা যাবে। মুকুন্দ সাহা মণ্ডলকে মরিচের দরও মনে হয় ভালোই দেবে।–তমিজ সব ধরতে না পারলেও কিছু কিছু তো আঁচ করতে পারেই। তমিজ দেখে মরিচের খেতে নিড়াতে নিড়াতে হুরমতের চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে আসে। এখন সেটা মণ্ডলের মরিচের লাভের কথা ভেবে খুশির আবেশে না নিজের খাটনির ক্লান্তিতে তা সে বুঝতে পারে না।

তমিজের চোখ খামাখা ঝুঁজে আসে না, জেগে থাকলে চোখজোড়া তার খোলাই থাকে। কিন্তু আজ শমশের পরমাণিকের জমির ধান কেটে তার বাড়ির নিকানো উঠানে আঁটিগুলো ফেলতে ফেলতে তার বুকটা হঠাৎ ধক করে ওঠে। বুকে অমন ধাক্কা দিলো কে, কেন দিলো কিছু বোঝা যায় না। এরকম আলগা ব্যারাম তো তার কখনো হয় না। কারণটা সে বুঝতে পারলো বাড়ি থেকে ফিরে সন্ধ্যাবেলা ভাত খেতে বসে।

ক্যা গো, মানষের জমির ধান কাটো, তোমার লিজের ধান তুলবা কুনদিন? কুলসুমের এই সাদামাটা প্রশ্নে তার সারাদিনের কাঁপুনির কারণ বুঝলো তমিজ। তবে ধান কাটতে তার দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো? হুরমতুল্লা বলে, দেরিতে রোপা হয়েছে, আরো সপ্তাহ খানেকের আগে তার জমির ধান কেটে লাভ নাই। বুড়াকে বিশ্বাস কী? সময় চলে গেলে ধান কেটে খন্দের সর্বনাশ। তার মানে মাঝির বেটাকে বর্গা থেকে উচ্ছেদ করিয়ে ওই জমি হুরমতুল্লা নিয়ে আসবে নিজের চাষে। বুড়া কি কম শয়তান?-তমিজ সারাদিন পর হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে : জমি ভরা ধান, আর আজ একবারের জন্যেও সে জমিতে যায় নি। সেখানে কার না কার নজর লাগলো, সেখানে কী না জানি হয়ে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে তার ঘুম আসে না। কিংবা ঘুমের পাতলা পর্দার নিচে ছটফটট করে। তার বাপ ঘুমায় পাশের ঘরে। ভেতরের উঠানের দিকের ঝাপ খুলে চৌকাঠে বসে একটানা গুনগুন করছে কুলসুম। আধধা আধো ঘুমে অথবা তন্দ্রায় অথবা জেগে থেকেও হতে পারে, তমিজ কুলসুমের একঘেয়ে সুরের গীত শোনে,

সুরুজে বিদায় মাঙে শীতেতে কাতর।
ধান কাটো ফাটে ভরা শীষের অন্তর।।

একঘেয়ে সুরেই তমিজের মাথার জট খোলে, বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে নেমে পড়ে উঠানে। কুলসুম ওখানে বসে থেকেই বলে, এই জাড়ের মধ্যে তুমি কুটি যাও? তোমার বাপের ব্যারাম ধরলো?

ইগলান ব্যারাম হামার হয় না ফকিরের বেটি। উগলান ফকিরালি ব্যারাম, তোমার দাদা দিয়া গেছে হামার বাপোক। হামার বলে ধান দেখা লাগবি না?

এই জাড়ের মধ্যে যাবা পাথারের মদ্যে? গাওত খালি একটা পিরান, জাড় করবি না?

যাওয়াই লাগবি গো। তামা ন দিন আজ যাবার পারি নাই।

সে সামনে পা বাড়াতেই তার পিঠে পড়ে কুলসুমের সুতি চাদর। কুলসুম চাদর দিয়ে বলে, গাওত দিয়া যাও।

এই চাদর এবার পাওয়া গেছে আবদুল কাদেরের দৌলতে। পাউডার দুধ, সুতির র‍্যাপার, উলের সোয়েটার, কুইনাইন ট্যাবলেট আর দেশলাই নিয়ে এসেছিলো রেড ক্রসের দল। দলের সর্দার আবার কাদেরের জানাশোনা মানুষ। মুসলিম লীগের টাউনের নেতা। কাদের বলে, শিক্ষিত মানুষ, আগে ছাত্রনেতা ছিলো। এখন টাউনে বাপের বাড়িতে আসিছে। লোকটার বয়স কম, তিরিশ বত্রিশও হবে না। কিন্তু জুলফিতে পাক ধরেছে এখনই। শ্যাম বর্ণের লম্বা মানুষটির গায়ে বোতাম লাগানো লম্বা মোটা পিরান। কাদের বলে, এর নাম আচকান। সেই কালো আচকান আর সাদা পায়জামাপরা। লোকটির মুখে প্রায় সবসময় সিগ্রেট থাকলেও তার গলার স্বর ভারী গম্ভীর ও ভিজে ভিজে বলে তার কথা শুনতে ভালো লাগে। সবার সঙ্গেই হেসে হেসে কথা বলতে পারে, এমন কি এই রিলিফ দেওয়ার সময়েই একদিন সে মুকুন্দ সাহাকে ডেকে বলে, এই যে সাহামশায়, কলকাতায় আমার নামে কম্পেইন করেছেন। আমাকে বললেই তো হতো! নালিশ মুকুন্দ সাহা করে নি, তার নাম দিয়ে করেছে টাউনের কংগ্রেস নেতা নলিনাক্ষবাবু। তো নালিশটা কী?গোলাবাড়িতে রেড ক্রসের রিলিফ দেওয়া হচ্ছে মুসলিম লীগ অফিস থেকে। কাদেরের দোকানে লীগের সাইনবোর্ড। রেড ক্রসের মাল, নাম হবে মুসলিম লীগের। এটা কেমন কথা? এই নালিশ সম্বন্ধে মুকুন্দ সাহা কিছু বলার আগেই রেড ক্রসের ওই লোক বলে, বেশ তো আপনার ঘরে জায়গা দিন না! আপনি কংগ্রেস, মহাসভা যার সাইনবোর্ড টাঙান আমার আপত্তি নেই। আমতলি থানার কাছে ধীরেনবাবুর ঘরটা চাইলাম, সেখানে তো কংগ্রেসের আখড়া। আমার কোনো আপত্তি নেই, লোকে রিলিফ পেলেই হলো। তো ধীরেনবাবু রাজি হলেন না। এখানে কাদেরের দোকানে জায়গা পেলাম। বাধা দেবেন, অথচ জায়গাও দেবেন না, এ কেমন কথা?

মুকুন্দ সাহা সুরসুর করে সরে গেলে কিছুক্ষণ পর আসে বৈকুণ্ঠ গিরি এবং তার জন্যে সুপারিশ করে কাদের, ইসমাইল ভাই, সাহার আড়তে কাজ করলে কী হবে, এই চ্যাংড়াটা ভালো। ইসমাইল হোসেন তাকে সুতির চাদর আর একটা উলের সোয়েটার তো দেয়ই, তার বাবুর জন্যেও পাঠিয়ে দেয় একটা ভালো সোয়েটার। পাউডার দুধ নিয়ে বৈকুণ্ঠ রেখে দিলো কাদেরের দোকানেই, বাবু আবার বিলাতি দুধ দেখ্যা কী বা কয়! সুতির চাঁদরের ওপর সোয়েটার চড়িয়ে বৈকুণ্ঠ হাটময় টহল দিয়ে বেড়াতে লাগলো। সোয়েটার কিন্তু তমিজকে দেওয়া হলো না। কাদের বলে, সোয়েটার পরলে এসব মানুষের গা কুটকুট করবে। দুধের টিনটাও রেখে দিলো কাদের, ইগলান বিলাতি দুধ, খাবার পারবি না। তুই বরং দুইটা চাদর লে। একটা তোর বাপকে দিস। বাপকে সবুজটা দিয়ে নিজের খয়েরি চাদরটা তমিজ দিয়ে দিলো কুলসুমকে। একদিন গায়ে দিয়ে কুলসুম সেটা রেখে দিয়েছিলো এ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ির ভেতর।

আজ সেই চাদর গায়ে জড়িয়ে কালাহার বিলের উত্তর সিথান ঘুরে তমিজ নিজের জমিতে পৌঁছুলো, গিরিরডাঙায় তখন অনেক রাত্রি। চারদিকে ধানের জমি, বেশিরভাগ জমিতে ধান কাটা হয়ে গেছে। এর ফাঁকে ফাঁকে মরিচের খেত। চারদিকে ফসল, না হয় ফসল কাটার চিহ্ন। মোষের দিঘি থেকে পানি খেয়ে ছুটে পালিয়ে গেলো বিলের উত্তর সিথানের কয়েকটা শেয়াল। মুনসির তাপে এরা রাতে বিলের পানিতে মুখ লাগাতে পারে না। শেয়ালগুলো চলে গেলে তমিজ একেবারে একা।

দিঘি, এদিকে মাঠের পর মাঠ, ওপরে আকাশ পর্যন্ত কুয়াশা জড়ানো চাঁদের আলো। তমিজের জমিতে পাতলা কুয়াশা টাঙানো রয়েছে মশারির মতো, মশারির ভেতরে ঢুয়ে-পড়া আলোয় তার ধানগাছগুলো ঘুমিয়ে রয়েছে মাথা ঝুঁকে। চাঁদের আলো। এই ধানখেতে ঢুকে আর বেরোয় না, ধানের শীষে গাল ঘষতে ঘষতে ধানের রঙ চোষে চুকচুক করে। আবার আলো পোয়াতে পোয়াতে ঘুমায় সারি সারি ধানগাছ।

নয়ন ভরে নিজের জমি দেখতে দেখতে হঠাৎ করে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়, ধানখেতে তার নজর লাগলো না তো? কিন্তু মরিচের খেতে নজর পড়তেই তমিজের সারা শরীর থমকে গেলো, আবার শরীরটাকে স্থির রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে, বুকের ভেতর থেকে হিম বাতাস বেরোয়, ভয়ে তমিজ তার শিসটা পর্যন্ত শুনতে পায় না। এই চাঁদনি রাতে হুরমতুল্লার মরিচের খেতে হানা দিতে এসেছে সে কোন জীব?

বিলের উত্তর থানের মুনসি কি তার মাছেদের আধার জোগাড় করতে এখানে এসে হাজির হয়েছে নিজেই। তমিজ তো ওইদিক দিয়েই এখানে এলো। কৈ কিছু তো মনে হলো না। পাকুড়গাছের নিচে নিয়ে এলে হয়তো চোখে পড়তো। পাকুড়গাছের তলায় তো সে যায় নি, দেখবে কোত্থেকে? পাকুড়তলা আরো উত্তরে। গাছটা কি তমিজ কখনো দেখেছে? তার মনে পড়ে না বলে ভয় আরো বাড়ে, হুরমতুল্লার জমির ওই প্রাণী তা হলে মুনসির কেউ না-ও হতে পারে। আরো অপরিচিত, একেবারেই অচেনা কোনো কিছুর ভয়ে তমিজ যখন চোখ বন্ধ করে ফেলেছে তখন তাকে উদ্ধার করে হুরমতুল্লার কাশির আওয়াজ।

এই শীতের রাতেও বুড়ার চোখে ঘুম নাই। এখন সে এসেছে জমির তদবির করতে বুঝতে পেরেই তমিজের মনে পড়ে, কার্তিক মাসে এভাবেই সে পানি টেনে দিয়েছিলো তার জমি থেকে। তখন তো তার সঙ্গে ছিলো ফুলজান। এখন সে আসে নি? আসে নি কেন? নিজের ধানখেত ও হুরমতুল্লার মরিচখেতের মাঝখানে আলের ওপর দাঁড়িয়ে সে এদিকে ওদিক দেখে। আল্লার কী কাম, ঠিক সেই সময়েই এসে হাজির হলো ফুলজান। মোষের দিঘির ধারে এসেই সে বাপজান বলে হাঁক দেয়। তার ডাক কেঁপে কেঁপে ওঠে, তমিজকে ছায়ার মতো ঠেকছিলো বলে সে হয়তো একটু ভয়ই পেয়েছে। কুয়াশা ও চাঁদনিতে তার কালো গতরটা সাদাটে কালো দেখায়, বলতে কি তার গায়ের রঙ এখন ফর্সার ধার ঘেঁষে।।

কাছে এসে তমিজকে দেখে ফুলজান খুব অবাক, তবে তার বিস্ময়কে ছাপিয়ে ওঠে তার বদ খাসলত, ক্যা, গো, হামার পয়সাটা দিলা না? ধান কাটিচ্ছে সারা মুলুক জুড়া, পয়সা তো ভালোই কামাচ্ছো। খালি হামার হাওলাতটা শোধ করতে তোমার পাছা কামড়ায়, না?

এইসব শুনেও তমিজের পাছা কেন, কোনো অঙ্গই একটুও কামড়ায় না। বরং তাকে পুরো আট আনা, আট আনাও নয়, বারো আনা পয়সা দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। একটু তাড়াহুড়া করেই সে বলে, কাল দেমো। কালই দেমে। সুদও না হয় দেমো।

মাঝির কথার কোনো ঠিক ঠিকানা আছে? বলতে বলতে ফুলজান বাপের দিকে এগুলে হুরমতুল্লা বলে, আর অল্প এ্যানা জায়গা সাফ করা উঠিচ্ছি। কততক্ষণ লাগবি? পাঁচুন দিয়ে জমির আগাছা তুলতে তুলতে সে আপনমনে বলে, চাঁদের আলো যখন আছে তখন কাজ করতে আর আপত্তি কী? আল্লা সুরুজ দিয়েছে মানুষের চাষবাসের সুবিধা হবে বলেই তো। আর যেসব রাতে আল্লা চাঁদ জ্বালিয়ে দেয় সেসব হলো কাজের রাত্রি, চাঁদনি রাতে রাতভর কাম করো।-আল্লার প্রতি শোকরানা গুজার তার চাপা পড়ে হঠাৎ কাশির দমকে।

ফুলজানও হঠাৎ বাচাল হয়ে ওঠে, গোঁ ধরার মতো করে বলে, না বাপজান, ঘরত যাও। কাল বেনবেলা বেলা ওঠার আগেই যাওয়া লাগবি গিরিরডাঙা, মণ্ডলবাড়ি থাকা মানুষ আসিছিলো।

আল্লা চাঁদটাকে নিভিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত হুরমতুল্লা উঠবে না বলে স্থির করেছিলো। কিন্তু ফুলজান তার পাশে বসে হাত থেকে পাঁচুনটা টেনে নিয়ে বলে, এখন ওঠো।। তোমার না আজ বেনবেলা জুর আসিছিলো। কাল ব্যায়না পান্তা খায়ো না। কড়কড়া আছে, ত্যাল মরিচপোড়া দিয়া নবিতন ম্যাখ্যা দিবি, তাই খায়া যায়। তুমি যাও। তোমার পাঁচুন হুঁকা আর হোঁচা হামি লিয়া আসিচ্ছি।

বড়ো মেয়ের এরকম আদুরে কিসিমের হুকুম হুরমতুল্লা জীবনে শোনে নি, বাপের ঠাণ্ডা লাগায় এমন উদ্বিগ্ন হওয়া কি আর এই মেয়ের ধাতে আছে? এ রকম সোয়াগের কথা বলে তার মেজোমেয়ে নবিতন। হুরমতের কাশি তো সবসময় লেগেই থাকে, আবার শীত বাড়ার সাথে সাথে ঘুসঘুসে জ্বরও তার নতুন কিছু নয়। ফুলজানের ঘ্যাগ। থেকে গলা হয়ে বেরুনো এরকম আদরে সোয়াগে হুরমতুল্লার কাছে তার নিজের শরীর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সত্যি সত্যি সে উঠে দাঁড়ায়। তাড়তাড়ি আয়। বলে হুরমতুল্লা রওয়ানা হলে তার টলোমলো পা দেখে বোঝা কঠিন, সে কি আসন্ন জ্বরে কাঁপছে, না-কি ফুলজানের আদরে বিচলিত হয়ে পড়েছে।

ফুলজান কিন্তু পাঁচুন হোচা গুছিয়ে নিয়েও ওঠে না। হুরমতুল্লা তার দিকে পেছন ফিরে তাকালে সে ফের ওইরকম আদুরে হুকুম ছাড়ে, তুমি যাও। হামি আসিচ্ছি। মেয়ের আদরের ঠেলায় কিংবা একবার কাজ ছেড়ে ওঠায় জ্বর তার হয়তো চেপে এসেছে বলে হুরমতুল্ল টলতে টলতে বাড়ির দিকে চলে যায়। ফুলজান আর একটু জায়গার আগাছা সাফ করতে নিড়ানি শুরু করে।

পাঁচুন দিয়ে ঘাস আগাছা কাটার কুচকুচ আওয়াজে ঘোড়ার ঘাস খাবার আভাস পেয়ে তমিজের পায়ের পাতা তিরতির করে কাঁপে এবং এই চাপা গতি দিয়ে সে যে কী করবে ঠিক বুঝতে পারে না। তার এক পাশে মরিচ খেত, মরিচ খেত ঢাকা রয়েছে পাতলা কুয়াশার মশারিতে, এর ভেতরে ঢুকে পড়ে চাঁদের রঙ আটকা পড়েছে অন্যরকম রঙে। এর সঙ্গে তার ধানখেতের ফারাক অনেক। মরিচ খেতে ঢুকে জ্যোৎস্না হয়ে গেছে হলদেটে সবুজ। ছোটো ছোটো ঝোপে জবুথবু হয়ে বসে জ্যোৎস্না অতি ধীরে তার বেগ সামলায়। এই অতি অল্প বেগে সবুজ সবুজ মরিচ একটু করে বাড়ে, সেই বাড়া এতোই ধীর যে এক মরিচ ছাড়া তা দেখার সাধ্যি আর কারুর নাই। তবে হুরমতুল্লা হয়তো টের পায়। বাপের কাজ থেকে সেটা টের পেতে শিখেছে হয়তো ফুলজান। ঘাস আগাছা কাটার কুচকুচ বোলে মরিচগুলো আরাম পায়, তারা বাড়ে আরেকটু তাড়াতাড়ি। তমিজের হাউস হয়, কুয়াশার মশারির মধ্যে ঢুকে সে-ও এই নিড়ানিতে ফুলজানের শরিক হয়। মশারিটা ভালো করে গোঁজা আছে, সে ঢুকলেও চাঁদের আলো এর ভেতর থেকে সহজে বেরুতে পারবে না। তার ধানখেতের আলো যদি মিশে যায় এই মরিচের খেতের সাথে তো রাতভর দুজনে খালি জমির খেদমতই করবে। এখানে এক সাথে কাজ করলে ধান কাটার পরও ফুলজান তার পাশে পাশেই থাকতো। তমিজের জমিতে কাজের কী আর অভাব হবে? আমন উঠলে তমিজ তো আরও জমি বর্গা নিচ্ছে। তার ফসলের ফলন দেখে মণ্ডল কি তাকে জমি বর্গা না দিয়ে পারে?—তাকে জমি দিতে পারলে মানুষ বর্তে যাবে গো! দুই তিনটা খন্দ করতে পারলেই ভিটার লাগোয়া জমিটা মণ্ডলের কাছ থেকে কিনতে না পারুক, খাইখালাসি তো নিতে পারবে। ভিটার জমি, বাড়ির পেছনে বেরোলেই পা পড়ে সেই জমিতে। ফুলজান তখন আসতে পারে, পানি নিতে পারে, নিড়ানি তো দেবেই।-চাঁদ ও কুয়াশায় তার বাড়ি ও হুরমতুল্লার বাড়ি এবং কুলসুম ও ফুলজান সব মিলিমিশে যাচ্ছে। মেয়েটা তার যখন এততাই করবে। তো আর মরিচখেতে তমিজ কি একটু হাত লাগাতে পারে না?

কিন্তু আলের ওপর তমিজ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই মরিচের খেতের সব জ্যোৎস্না গলগল করে বাইরে আসার সুযোগ করে দিয়ে কুয়াশার মশারি তুলে বেরিয়ে আসে ফুলজান। তার বাঁ হাতে বাপের হুঁকা ও পাঁচুন এবং ডান হাতে ঘাস আগাছা ফেলার হোঁচা। সে তো এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি জিনিস বয়ে নিয়ে হেঁটে বাড়ি যায়। তাহলে হয়তো শীতে সে নুয়ে নুয়ে পড়ছে, এখন নুয়ে একটু কাঁপতে কাঁপতে ফুলজান আল ধরে হাঁটতে লাগলো। মরিচ খেতের এখন সবটাই আন্ধার, ফুলজান খেত থেকে বেরুতে চাঁদনির সবটাই বার করে দিয়েছে। কিন্তু এই আল, আল পেরিয়ে মোষের দিঘির উঁচু পাড় সব চাঁদের আলোয় ফকফক করে। কেউ যেন চালের আটা গুলে ঢেলে দিয়েছে তামাম পাথারে, সবই দেখা যায়, কিন্তু চোখে ক্যাটক্যাট করে লাগে না।

সবই ভালো। হুরমতুল্লার বেটিরও সব ভালো, কিন্তু তমিজের কাছে তার কয়েক আনা পয়সার দাবি তুলছে না, একেবারে চুপচাপ হাঁটছে বলে তমিজ উসখুস করে। আগামীকাল পয়সা ফেরত পাবার ওয়াদা পেয়েই কি তার উদ্বেগ শেষ হয় গেলো? তমিজ আস্তে আস্তে বলে, পয়সাটা আর কয়েদিন বাদে লেওয়া যায় না? ১ কয়টা দিন বাদে? বলে ঠোঁটে একটুখানি বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ফুলজান তমিজের দিকে কেবল একবার তাকায়। তার চোখজোড়ার চেয়ে বাঁকা ঠোটটাই তমিজের চোখে সেঁটে থাকে অনেকক্ষণ, বলতে গেলে সারা রাত জুড়ে। তমিজ বোঝে চারদিকের এই চালের আটা গোলা আলো আসলে আসে ওই ঠোট থেকে। আসমানের চাঁদের সাধ্য কি এই ফকফকা আলোয় দুনিয়া ভাসিয়ে দেয়? আকাশের দিকে তাকিয়ে তমিজ দেখে। সেখানে চাঁদের চিহ্নমাত্র নাই। তাহলে এতো আলো কি এমনি এমনি আসে? মেয়েটাকে তার একটু ভয় ভয় লাগে, আবার তার পাশ থেকে তার সরতেও ইচ্ছা করে না। তমিজ তাই আস্তে আস্তে বলে, ধানটা উঠলেই দিমু। না হয় কয়টা পয়সা বেশিই দিমু।

ঠোঁটে চাঁদ জ্বালিয়ে রেখেই ফুলজান ফের হাসে, উগলান ঢঙের কথা থোও মাঝির বেটা। পয়সা হামার দরকার, বোঝো না? ছছালেক লিয়া হামি ডাক্তোরের কাছে যামু। বলতে বলতে ফুলজান আরো কাপে, চারদিকের আলোও কেঁপে কেঁপে ওঠে।

ফুলজানের বেটার রোগের কথায়, না-কি তার কাঁপুনিতেই কে জানে, তমিজের বুকের ভেতরে তোলপাড় করে ওঠে। নিজে ঠিক ধরতে না পেরে তোমার খুব জাড় করিচ্ছে, না? বলে সে তার গায়ের সুতির ব্যাপারটা ফেলে দেয় ফুলজানের পিঠে। ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে ফুলজান চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বলে, ছোল বুঝি হামার বাঁচে না গো! তার কথায় একটু ফেঁপানিও থাকে, আজ সাজবেলাত মুখোত ভাত তুললো না। একটা নওলা ভাতও যদি খাবার পারে!

শুনে ফুলজানের ছেলের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধে তমিজের মাথা ভারী হয়ে আসে। আবার ওই ভারী মাথায় তার ফুরফুরে হাওয়া খেলে যায় : আবদুল কাদেরকে তার এতো তোয়াজ করার দরকার কী? সে নিজেই না হয় ফুলজানের বেটাকে নিয়ে যাবে ছাইহাটার। করিম ডাক্তারের বাড়িতে। তার জমির ধানটা কাটা হয়ে যাক। এইতো দুই ক্রোশ আড়াই ক্রোশ রাস্তা। সোজা চলে যাবে খুতিতে পাঁচটা টাকা নিয়ে। সে হাঁটবে এক পা আগে, পিছে পিছে চলবে ফুলজান, কোলে বেটা।

এখন অবশ্য ফুলজান চলছে তার পাশ ঘেঁষে। খয়েরি রঙের চাঁদরে শরীরের সবটা জড়িয়ে নেওয়ায় তার হলুদ ঘোমটা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। তার কপালে এসে পড়েছে তার ঠোঁটের আলো।-আহা। বিমারি একটা বেটাকে এর কোলে ফেলে পাষণ্ড স্বামীটা কোথায় উধাও হয়ে গেলো, লোকটার কি একবার এর কথা মনেও পড়ে না? বিমারি ছেলেকে নিয়ে সে এখন রাত নাই দিন নাই খেটে মরে বাপের বাড়িতে। তার ছেলের চিকিৎসা করলে সে একটু আরাম পায়। আবার ওই পাষাণহিয়া হারামজাদাটকে ভালো একটা কোবান দিতে পারলেও এর জানটা ঠাণ্ডা হয়। এই দুটো কাজ করতেই তমিজ প্রস্তুত। এই সংকল্প মনে দৃঢ়ভাবে পোষণ করতে না করতেই ছয় ক্রোশ দূরের যমুনা নদীর সাত স্রোত উনপঞ্চাশ ঢেউয়ের ভেতর থেকে পাক খেয়ে বেরিয়ে বাতাসের একটা ঘূর্ণি উড়তে উড়তে বাঙালি নদীতে ভিজে একটু দুর্বল হয় এবং ভাঙায় খানিকটা আর্দ্রতা ঝেড়ে ফেলে ঝাপটা মারে নিজগিরিরডাঙার মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে এবং সেই ঝাপটায় তমিজ তো বটেই, এমন কি রেড ক্রসের চাদর গায়ে জড়ানো ফুলজানও হিহি করে কাপে। এ ছাড়াও পেট-মোটা, সরু হাত পা এবং হলুদ চোখে নিভু নিভু মণি ছেলেটির ভাবনাতেও তারা কাঁপতে পারে। তমিজ এতোটাই কাঁপতে শুরু করে যে, তার এই শরীর আর নিজের দখলে থাকে না। তার হাত থেকে পড়ে যায় ফুলজানের বাপের হোঁচাটা এবং ওই হাতটাই হয়তো কাঁপতে কাপতেই পড়ে গিয়ে ফুলজানের পিঠে। নিজের ঢ্যাঙা কালো শরীরটার সবটা নিয়েই সে পড়ে যাচ্ছিলো। তবে তার আগেই সে জড়িয়ে ধরে ফুলজানকে। ফুলজানের ঠোট থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে জ্যোত্সা। এমন কি জ্যোৎস্নার পেছনে আগুনের শিখায় আঁচ লাগে তমিজের সারা মুখে। সাদা কেরোসিন পাওয়া যায় না, ফুলজানের ঠোঁটের আলো জ্বলে লাল কেরোসিনে, তার ঝাঁঝে তমিজের মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে ওঠে। তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফুলজানের উঁচু বুক তার বুকে ঠেকলে সে বেশ আরাম পায় এবং ফুলজানের বুকের বেদনা অথবা তার স্তনজোড়া কিংবা দুটোই তমিজের গোটা শরীর জুড়ে প্রবল কোলাহল তুলতে থাকে। ফুলজানের আলো-জ্বলা ঠোঁটে তার ঠোট লাগাবার চেষ্টা করলে ফুলজান মুখ সরিয়ে নেয়, তখন তমিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা গালে লাগে ফুলজানের ঘ্যাগ। এতে তার শরীরের কোলাহল কিছুমাত্র কমে না। ঠোঁটের আলো চুমুক দিয়ে সে নিতে পারে নি বটে, তবে এর মানে বোধহয় এ নয় যে, ফুলজান তাকে ফিরিয়ে দিলো। কারণ তার ঘ্যাগে তমিজের প্রবল চাপে মুখ ও গাল ঘষায় সে কৈ, কোনো আপত্তি করলো না তো। তমিজের শরীরের উত্তাপ, উত্তেজনা ও উৎসাহ বাড়তে থাকে সমান তালে। ধানখেতের কয়েক হাত তফাতে মোষের দিঘির উঁচু পাড়ের পুব দিকের ঢালে তমিজ তাকে জড়িয়ে ধরে শোবার উদ্যোগ নিলে কোনোরকম জোর না খাটিয়ে ফুলজান যে কীভাবে তার হাতের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেলো তমিজ কিছুই বুঝতে পারলো না। বেরিয়ে পড়েই সে যেন মিলে গেলো পাথারের ভেতর। সে কি জ্যোত্ম হয়ে মিশে গেলো জ্যোৎস্নার মধ্যে?

মাঝির বেটা, আসমানেত ছ্যাপ ফালাবার হাউস করিস কোন সাহসে? ফুলজানের গলায় এই কথা সে শুনতে পায়, তবে সেটা তমিজের হাতের ভেতর সে থাকতে থাকতে না হাত থেকে গলিয়ে যাবার পর, তার খেয়াল নাই।আরো ব্যাপার আছে।-ফুলজানের এই ছিছিক্কার মোষের দিঘির ধার থেকে তার কানে বাজে অনেকক্ষণ পরে। মোষের দিঘির পাড়ে ফুলজান হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেলে হাঁপাতে হাঁপাতে টলোমলো পায়ে তমিজ ঢুকে পড়ে নিজের ধানখেতে। সারা গায়ে তখন তার অবসাদ, হাতপা সব ঝিমঝিম করছে, তার সর্বাঙ্গে তখন ঝি ঝি ধরেছে। ধানের জমিতে ধপ করে বসে পড়ারও বেশ কিছুক্ষণ পর ফুলজানের কথা মরিচখেত হয়ে কচি মরিচের ঝাল মেখে নিয়ে তার দুই কানে দুটো চড় লাগালো। এতে তমিজের অবসাদটা কাটে, হাতে পায়ে ঝি ঝি কেটে গিয়ে সারা শরীর জ্বলতে লাগলো। তার অস্থির হাতের মুঠিতে গোছা গোছা ধানের শীষ ঢুকেও পিষে যায় না। গোছা ধরে ধানের শীষ তার খেউরি-না করা গালে ঘষতে সে বেশ আরাম পায়। তবে কয়েকটা শীষের মধ্যে থেকে ধানের দানা পড়ে গেলে তার ভয় হয়, ধান কাটতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো?

বিলের উত্তর সিথান এড়াতে কিংবা নৌকায় বিল পাড়ি দিতে তমিজ রওয়ানা হয় দক্ষিণের দিকে। কিন্তু মণ্ডলের কোষা নৌকাটা বিলের ওপারে ফকিরের ঘাটে বাঁধা। তাই তাকে হাঁটতে হয় বিলের দক্ষিণ ধার ঘেঁষে। কিন্তু তার চোখ বিলের ওপারে। হাঁটতে হাঁটতে দেখে, একটি ছায়া চলেছে তার সঙ্গে সঙ্গে। গোটা বিল পার হয়ে তার ছায়া পড়বে বিলের ওপারে—এটা কি কখনো হতে পারে? না, ওই ছায়াটি তার নয়। ছায়া ছায়া মানুষটির ঘাড়ে তৌড়া জাল। ছায়া চলেছে উত্তরের দিকে। ভয়ে ও খানিকটা আশায় ভালো করে ঠাহর করলে তমিজ বোঝে, ওটা ছায়া নয়, লোকটি তমিজের বাপ। বাপ তার ঘুমের মধ্যে হেঁটে চলেছে উত্তরের দিকে। বিলের ওপারে তমিজের বাপ সুরা পড়ার মতো বিড়বিড় করে কী বলে; আর বিলের রুই কালা, পাবদা ট্যাংরা, খলসে পুঁটি, কৈ মাগুরের নিশ্বাসে প্রশ্বাসের বুদবুদে টাটকা হয়ে বিলের পানিতে ড়ুবসাঁতার দিয়ে সেইসব কথা এসে ভেড়ে বিলের পূর্ব তটে। পঁড়িয়ে একটু মনোযোগ দিলেই

তমিজ তার বাপের সব কথা শুনতে পায় :

সুরুজে বিদায় মাঙে শীতেতে কাতর।
শীষের ভিতরে ধান কাঁপে থরথর।।
পশ্চিমে হইল রাঙা কালা পানি অচিন ডাঙা
ফকিরে করিবে মেলা রাত্রি দুই পহর।
ধানের আঁটি তোলো চাষা মাঝি ফেরো ঘর।

জীবনে কখনো শুনেছে কি-না মনে করতে না-পারা এই লম্বা শোলোকের প্রতিটি অক্ষরের ঠেলায় ঠেলায় তমিজ বাড়ি পৌঁছে গেলো বেশ তাড়াতাড়ি। তার বাপের ঘরের দরজা খুলে দিয়ে কুলসুম একটু সরে দাঁড়িয়ে বলে, এতে আতেত তুমি কোটে গেছিলা গো? তোমার বাপের ব্যারাম তোমাক ধরিছে? দরজায় বাঁশের উঁশা লাগাতে লাগাতে সে হাসে, আজ তুমি কোটে কোটে ঘোরো আর তোমার বাপ নিন্দ পাড়ে ঘরের মদ্যে।

চোপসানো বুকে তমিজ ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ করে, তাঁই ঘরত?

তো?

ঘরের ভেতর দিয়ে ভেতরের বারান্দায় গিয়ে তমিজ তখন ঢুকছিলো নিজের ঘরে। কুলসুমের কথা শুনে বাপের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো, মাচার ওপরে বাপ তার শুয়ে রয়েছে কাঁথা মুড়ি দিয়ে। তাহলে? বিলের ধারে ধারে তৌড়া জাল কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে তাহলে শ্লোক বলছিলো কে? বাপকে তমিজ এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখায় এবং শোলোকের একটি কথাও মনে করতে না পারায় তার সামনে থেকে ছোট্টো উঠানের জ্যোৎস্না নিভে যায়। সে তখন ঢুকে পড়ে নিজের ঘরের ভেতর। তারপর কাঁথা গায়ের ওপর দিয়ে শুয়েছে কি শোয় নি, কুলসুম হঠাৎ জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, হামার গিলাপ? গায়ের লয়া কাপড়খান হামার কুটি ফালায়া আসিছো?

কুলসুমের ব্যাকুল জিজ্ঞাসার জবাবে তমিজের মাথা পড়ে যায় তেলচিটটিচে বালিশের ওপর। আর নতুন সুতির র‍্যাপার নিয়ে উদ্বেগ ও আক্ষেপ জানাতে জানাতে কুলসুম করে কী, তমিজের মাথার কাছে নাক দিয়ে খুব টেনে টেনে নিশ্বাস নিতে থাকে। যতটা তীব্রভাবে পারে, নিশ্বাস নিয়ে তমিজের মাথার গন্ধে গন্ধে নতুন গিলাপের হদিস সে করে ছাড়বে। তমিজের মাথায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, এটা কী? সেই ছোঁয়ায় তার চোখ বুজে আসে। একটু-আগে-শোনা ও এখন ভুলে-যাওয়া শোলোক, সুর করে শোলোক বলতে বলতে তার বাপের উত্তরের পানে যাওয়া এবং সেই বাপেরই আবার কোথাও না গিয়ে ঘরের মাচায় ভেঁস ভোঁস করে ঘুমানো,-এতোসব এলোমেলো কাণ্ড এড়াতেই সে হয়তো চলে যাচ্ছে ঘুমের আড়ালে। কিন্তু ঘুমের একটা পরত পেরিয়ে পরের পরতটিতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে মরিচখেতের মশারি খুলে গলগল করে বেরিয়ে আসে চালের আটা গোলানো চাঁদনি, সেটা আবার দপ করে জ্বলে ওঠে মোষের দিঘির পুব পাড়ে। সেখান থেকে তৌড়া জালে জড়িয়ে নিয়ে তাকে ফেলে দেওয়া হয় কালাহারের গভীর নিচে। মস্ত একটা বেড় জাল গোটা বিল সেঁচে উত্তরদিকে গোটাতে শুরু করলে তার ঘুম বারবার ছিড়ে যায়। কী জ্বালা! তমিজ তখন পাশ ফিরে শোয় একটা হাত তার গালের নিচে রেখে।

হাতের চাপে তার কয়েকদিন না-কামানো দাড়ি গালে লাগে। তার গালে ধানের শীষ তখন খোঁচা খোঁচা চুমু দেয়। তার চোখ জুড়ে নামে রাজ্যের ঘুম। নতুন র্যাপারের হদিস জানতে কুলসুম আরো অনেকক্ষণ তার মাথার গন্ধ শুকেছে কি-না সে টের পায় নি। হয়তো শুকেছে। তবু সে ঘুমায়। কিংবা হয়তো এই জন্যেই ঘুম নামে তার দুই চোখ ঝেঁপে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *