পুণ্ডরীক কুণ্ডু এবং রহস্যভেদ

ঝাউ বাংলোর কাছাকাছি এসে পৌঁছুতেই একটা কাণ্ড ঘটে গেল। সামনের বাগানের ভেতরে কাস্থ যেন কী করছিল—আমাদের ফিরে আসতে দেখেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপরেই ভেতর দিকে টেনে দৌড়।

টেনিদা বললে–ও কী! আমাদের দেখে কাঞ্ছা অমন করে পালাল কেন!

ক্যাবলা বললে–পালাল না, খবর দিতে গেল!

–কাকে?

ক্যাবলা হেসে বললে– কাগামাছিকে।

হাবুল দারুণ চমকে উঠল।

—আরে কইতে আছ কী! কাঞ্ছা কাগামাছির দলের লোক?

–হুঁ। টেনিদা বললে–আর কাগামাছি লুকিয়ে আছে এই বাড়িতেই!

ক্যাবলা হেসে বললে–হ্যাঁ, সবাই আছে এখানে। কাগামাছি, বগাহাঁচি, দুধের চাঁছি—কেউ বাদ নেই।

টেনিদা গম্ভীর হয়ে বললে–ঠাট্টা নয় ক্যাবলা। ওরা যদি আমাদের আক্রমণ করে?

কী নিয়ে আক্রমণ করবে? ওদের সম্পত্তির মধ্যে তো একটা ভাঙা হুঁকো, একগাছা মুড়োঝাটা আর একপাটি কুকুরে-চিবুনো ছেড়া চটি। সে-আক্রমণ আমরা প্রতিরোধ করতে পারব।

-ইয়ার্কি করছিস না তো?

—একদম না। চলেই এসো না আমার সঙ্গে।

আমরা সিঁড়ি বেয়ে ঝাউবাংলোর দোতলায় উঠে গেলুম। বাড়িতে কোথাও কেউ আছে বলে মনে হয় না। চারদিক একেবারে নিঝুম! কাঞ্ছা পর্যন্ত কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। টেনিদা খোঁড়াচ্ছিল বটে, তবু সেই ফাঁকেই এক কোনা থেকে একটুকরো ভাঙা কাঠ কুড়িয়ে নিলে।

আমি জিগগেস করলুম—ওটা দিয়ে কী হবে টেনিদা?

–ঝাঁটা আর কোর আক্রমণ ঠেকানো যাবে। ক্যা

বলা বললে– কিছু দরকার নেই। অনেক বড় অস্ত্র আছে আমার কাছে। এসো সবাই–

কী যে ঘটতে যাচ্ছে ক্যাবলাই শুধু তা বলতে পারে! আমি মনে-মনে কিছুটা আন্দাজ করছি বটে, কিন্তু এখনও পুরোটা ধরতে পারছি না। দুরু দুরু বুকে ক্যাবলার পেছনে-পেছনে চললুম আমরা। এন্তার গোয়েন্দা বই পড়েছি আমরা রামগড়ের সেই বাড়িতে আর ড়ুয়ার্সের জঙ্গলে। এর মধ্যে আমাদের দুদুটো অভিযানও হয়ে গেছে, কিন্তু এবার যেন সবটাই কেমন বিদঘুটে লাগছিল। আর সাতকড়ি

নিশ্চয় সেই লোক? এখন আর আমার কোনও সন্দেহ নেই। আর ওই হ্যান্ডবিলটা–

ক্যাবলা বললে–এখানে।

দেখলুম সেই বন্ধ ঘরটার সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। যেটায় দুদুটো পেল্লায় তালা লাগানো! সাতকড়ি যাকে বলেছিলেন স্ট্যাকরুম—মানে যার ভেতর বাড়ির সব পুরনো জিনিসপত্র ডাঁই করে রাখা হয়েছে।

ক্যাবলা বললে– এই ঘর খুলতে হবে।

টেনিদা আশ্চর্য হয়ে বললে–এই ঘর? হাতি আনতে হবে তালা ভাঙবার জন্যে, আমাদের কাজ নয়।

ক্যাবলা মরিয়া হয়ে বললে–চারজনে মিলে ধাক্কা লাগানো যাক। তালা না খোলে, দরজা ভেঙে ফেলব।

ভাবছি চারজনে মিলে চার বছর মারো জোয়ান-হেঁইয়োলে ধাক্কা লাগলেও খোলা সম্ভব হবে কি না, এমন সময় কোত্থেকে নেহাত ভালো মানুষের মতো গুটিগুটি কাঞ্ছা এসে হাজির। যেন কিছুই জানে না, এমনি মুখ করে বললে–চা খাবেন বাবুরা? করে দেব?

তক্ষুনি তার দিকে ফিরল ক্যাবলা। বললচা দরকার নেই, এই ঘরের চাবিটা বার করো দেখি।

–চাবি? কাঞ্ছ আকাশ থেকে পড়ল!-চাবি তো আমি জানি না।

ক্যাবলা গম্ভীর হয়ে বললে– মিথ্যে কথা বোলো না কাঞ্ছা, ওতে পাপ হয়। চাবি তোমার প্যান্টের পকেটেই আছে। সুড়সুড় করে বের করে ফেলল।

কাঞ্ছা পাপ-টাপের কথা শুনে একটু ঘাবড়ে গেল। মাথাটাথা চুলকে বললে–জু। চাবি আমার কাছেই আছে তা ঠিক। কিন্তু মনিবের হুকুম নেই—দিতে পারব না।

–তোমাকে দিতেই হবে!

কাঞ্ছা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল!–না, দেব না।

ক্যাবলা বললে–টেনিদা, কাঞ্ছা নেপালীর ছেলে, জান দিয়ে দেবে, কিন্তু মনিবের বেইমানি করবে না। কাজেই চাবি ও কিছুতেই দেবে না। অথচ, চাবিটা আমাদের চাই-ই। তুমি যদি পায়ের মচকানিতে খুব কাতর না হয়ে থাকো—তা হলে

ব্যস, ওইটুকুই যথেষ্ট। টেনিদাকে আর উসকে দেবার দরকার হল না। ডি-লা গ্রান্ডি বলেই তক্ষুনি টপাং করে চেপে ধরল কাকে, আর পরক্ষণেই কাঞ্ছার প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়ে এল চাবির গোছা।

কাঞ্ছা চাবিটা কেড়ে নিতে চেষ্টা করল নির্ঘাত একটা দারুণ মারামারি হয়ে যাবে এবারে এই রকম আমার মনে হল। কিন্তু সে বিচ্ছিরি ব্যাপারটা থেমে গেল তক্ষুনি। কোথা থেকে আকাশবাণীর মতো মোটা গম্ভীর গলা শোনা গেল কাঞ্ছ, চাবি দিয়ে দাও, গোলমাল কোরো না।

চারজনেই থমকে গেলুম আমরা। কে বললে– কথাটা? কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না।

আবার সেই গম্ভীর গলা ভেসে এল লম্বা পেতলের চাবি দুটো লাগাও। তা হলে বেশি পরিশ্রম করতে হবে না।

এবার আর বুঝতে বাকি রইল না। হাবুল রোমাঞ্চিত হয়ে বললে–আরে, সাঁতরামশাইয়ের গলা শুনতাছি যে।

টেনিদা নাকটাকে কুঁচকে সরভাজার মতো করে বললে, মনে হচ্ছে যেন বদ্ধ ঘরটার ভেতর থেকেই।

ততক্ষণে বিদ্যুৎবেগে তালা দুটো খুলে ফেলেছে ক্যাবলা। দরজায় এক ধাক্কা দিতেই–

কে বলে স্ট্যাকরুম! খাসা একখানা ঘর। সোফা রয়েছে, খাটে ধবধবে বিছানা। ও-পাশে যেদিকে আমাদের শোবার ঘর সেদিকের বন্ধ দরজাটার মুখোমুখি ছোট একটা প্রজেক্টার। আর—আর সোফায় যিনি বসে আছেন তিনি সাতকড়ি সাঁতরা স্বয়ং! একদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আমাদের দিকে।

ক্যাবলা বললে–নমস্কার পুণ্ডরীকবাবু। দাড়িটা খুলুন।

বিনা বাক্যব্যয়ে সাতকড়ি একটানে নকল সবুজ দাড়িটা খুলে ফেললেন। আর আমি পরিষ্কার দেখতে পেলুম সেই ভদ্রলোককেই তিন বছর আগে যাঁর শালকিয়ার বাড়িতে অটোগ্রাফ আনতে গিয়েছিলুম আর যিনি উবু হয়ে মোড়ার ওপর বসে বসে তামাক টানছিলেন।

টেনিদা আর হাবুল একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল।

—আরে!–-আরে!

—এইটা আবার কী রে মশায়!

ক্যাবলা বললে–তোমরা চুপ করো। এখনি সব বুঝতে পারবে।–কুণ্ডুমশাই!

গম্ভীর হয়ে সাতকড়ি বললেন–বলে ফেলো।

—আপনার সোফার পেছনে যিনি লুকিয়ে আছেন আর ঢুকেই যাঁর নাকটা আমি একটুখানি দেখতে পেয়েছি, উনিই বোধহয় জগবন্ধু চাকলাদার?

সাতকড়ি–না, না, পুণ্ডরীক কুণ্ডু, ওরফে কুণ্ডুমশাই বললেন—ঠিক ধরেছ। তোমাদের বুদ্ধি আছে। ও জগবন্ধুই বটে।

-সোফার পেছনে ঘাপটি মেরে বসে উনি মিথ্যেই কষ্ট পাচ্ছেন। ওঁকে বেরিয়ে আসতে বলুন।

পুণ্ডরীক ডাকলেন—বেরোও হে জগবন্ধু।

জগবন্ধু সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে উঠল। সেই মিচকে-গোঁফ ফিচকে চেহারা—শুধু গলার মেটে রঙের বিটকেল মাফলারটাই বেহাত হয়ে গেছে। কেমন বোকার মতো চেয়ে রইল আমাদের দিকে। এখন একদম নিরীহ বেচারা, যেন জীবনে কোনওদিন ভাজা মাছটি উলটে খায়নি।

সাতকড়ি বললেন বসে পড়ো হে ছোকরা, বসে পড়ো। ওরে কাঞ্ছা, আমাদের জন্য ভালো করে চা আন। আচ্ছা এখন বলল দেখি, ধরে ফেললে কী করে?

ক্যাবলা বললে–এক নম্বর, আপনার পাইন বনের কবিতা আর কদম্ব পাকড়াশির ছড়া। আপনার কবিতা শুনেই মনে হয়েছিল, ছড়াগুলোর সঙ্গে এর যোগ আছে।

–হুঁ। তারপর?

—দুনম্বর, আপনার অদ্ভুত ফরমুলা। বাড়িতে একখানা সায়েন্সের বই নেই, আছে একগাদা ডিটেকটিভ ম্যাগাজিন—অথচ আপনি সায়েন্টিস্ট? আর ধাঁ করে আপনি থিয়োরি অব রিলেটিভিটির সঙ্গে জোয়ানের আরক মিলিয়ে দিলেন? আমরা অন্তত কলেজে পড়ি, এত বোকা আমাদের ঠাওরালেন কী করে? তখনি মনে হল, আপনি আমাদের নিয়ে মজা করতে চান কাগামাছি-টাছি সব বানান।

–বলে যাও।

–কত বলব? জগবন্ধুবাবুকে নিয়ে দার্জিলিঙে সিঞ্চলে আমাদের ছবি তুললেন সিনে ক্যামেরায়, পাশের ঘর থেকে প্রজেক্টার ফেলে ছবি দেখালেন, কাঞ্ছ না জগবন্ধু কাকে দিয়ে হাঁড়িচাঁচার ডাক শোনালেন কাগজের মুণ্ডু নাচালেন—

জগবন্ধু এইবার ব্যাজার গলায় বললে–হাঁড়িচাঁচার ডাক আমি ডেকেছিলুম। কিন্তু তোমরাই বা মাঝরাতে আমার মাথায় জল ঢাললে কী বলে-হ্যাঁ, এখনও সর্দিতে আমার মাথা ভার, নাক দিয়ে জল পড়ছে।

ক্যাবলা বললে–তবু আপনার ভাগ্যি ভালো যে ইট ফেলিনি! মাঝরাত্তিরে লোককে ঘুমুতে দেবেন না ভেবেছেন কী? তারপর শুনুন কুণ্ডুমশাই! জগবন্ধুবাবুর ধুসো মাফলার টেনিদা কেড়ে নিয়েছিল—তা থেকে একটা লাল পিঁপড়ে হাবুলকে কামড়ে দিয়েছে। তখনই বোঝা গেল, গাছে উঠে কাঁচকলা বেঁধেছিল কে! তারপরে পচা ডিম। কিন্তু এই দেখুন—পকেট থেকে হাবুলের পিঠে লেগে থাকা সেই ভাঙা ডিমের খোলাটা বের করে বললে–দেখুন, এতে এখনও বেগুনে পেন্সিলে-লেখা নম্বর পড়া যায়—৩২। আপনার রান্নাঘরে ডিমের গায়ে এমনি নম্বর দেওয়া আছে, সে আমি আগেই লক্ষ করেছি।

পুণ্ডরীক বললে–শাবাশ। আমি গোয়েন্দা-গল্প লিখে থাকি, তোমরা আমার শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা হীরক সেনকেও টেক্কা দিয়েছ। কিন্তু আমাদের পরিচয় পেলে কী করে?

ক্যাবলা বললে–এটা ভুলে যাচ্ছেন কেন, আপনারা সাহিত্যিক। সবুজ দাড়ি লাগালেও ভক্তরা আপনাদের চিনতে পারে—যেমন প্যালা চিনে নিয়েছে। তা ছাড়া এই দেখুন হ্যান্ডবিল—টেনিদা যখন জগবন্ধুকে চেপে ধরেছিল, তখন ওঁর পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল। আর জানতে কী বাকি থাকে!

পুণ্ডরীক আর জগবন্ধু দুজনেই হাঁড়ির মতো মুখ করে চুপ করে রইলেন। ক্যাবলা বললে–এবার বলুন আমাদের সঙ্গে এব্যবহারের মানে কী? শুনে খাচ-খ্যাচ করে উঠলেন কুণ্ডুমশাই।

–এত বুঝেছ, আর এটুকু মাথায় ঢুকল না যে আমার বই ভালো বিক্রি হচ্ছে না—আমি আর জগবন্ধু—দুজনেরই মন মেজাজ খারাপ। বিলিতি বই থেকে টুকতে যাব, দেখি আমার আগেই যদুনন্দন আঢ্য আর রামহরি বটব্যাল সব মেরে দিয়ে বসে আছে। প্লট ভাববার জন্যেই এখানে এসেছিলুম। জগবন্ধুও আসছিল আমার এইখানেই, পথে তোমাদের সঙ্গে দেখা। দেখে ওর মাথায় মতলব খেলে যায়—তোমাদের কাজে লাগিয়ে একটা সত্যিকারের গোয়েন্দা গল্প বানালে কেমন হয়? একটা কথা বলিকবিতা-বিতা আমার একদম আসে না। জগবন্ধু পাবলিশার হলে কী হয়, মনে-মনে ও দারুণ কবি—ওগো পাইনটাও ওরই লেখা। ও-ই ছড়া লিখে তোমাদের ঘাবড়ে দেয়—আমাকে সবুজ দাড়ি পরায়, সব প্ল্যান করে তকে থেকে আমরা তোমাদের সঙ্গে টাইগার হিলে আর সিঞ্চলে যাই, জগবন্ধু ছবি তোলে আর ছুঁচোবাজি ছাড়ে—তারপর—তারপর তো দেখতেই পাচ্ছ। কিন্তু তোমরা সব ভণ্ডল করে দিলে হে। আর একটু জমাতে পারলে আমার দুর্দান্ত একটা ডিটেকটিভ বই তৈরি হয়ে যেত!

কুণ্ডুমশাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন—আর সত্যজিৎ রায় মশাইকে ধরেটরে যদি সেটাকে ফিল্ম করা যেত—

ক্যাবলা চটে বললে– সত্যজিৎ রায় ওসব বাজে গল্প ফিল্ম করেন না। সে যাক—পচা ডিম ছুঁড়ে যে আমাদের জামা-টামা খারাপ করে দিলেন, ধোয়াবার খরচা এখন কে দেবে?

কুণ্ডুমশাই আবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন আমিই দেব। ওহে জগবন্ধু, একখানা চকোলেট বার করো দেখি, খেয়ে মনটা ভাল করি।

জগবন্ধু বললে– চকোলেট কোথায় স্যার? পকেটে যা ছিল এরাই তো মেরে দিয়েছে।

 

তারপর?

তারপর আবার কী থাকবে? দুপুরে বজ্ৰবাহাদুর গাড়ি নিয়ে এল পুবং থেকে। আমরা সেই গাড়িতে চেপে তার ওখানে বেড়াতে গেলুম। তার বাড়িতে খুব খাওয়া-দাওয়া হল। তার নাম, ভাবভঙ্গি যেমনই হোক, সে ভীষণ ভালো লোক কত যে আদর যত্ন করলে সে আর কী বলব! তারপর সন্ধেবেলায় তারই মোটরে দার্জিলিঙে ফিরে এলুম। সেই স্যানিটারিয়ামে।

কিন্তু আমাদের বোকা বানিয়ে পুণ্ডরীক কুণ্ডু গোয়েন্দা গল্প লিখবেন, তা-ও কি হতে পারে? তাই তিনি তাঁর উপন্যাস ছাপবার আগেই সব ব্যাপারটা আমি সন্দেশে ছেপে দিলুম। তারপরেও যদি কুণ্ডুমশাই বইটা লিখে ফেলেন, তা হলে আমি তার নামে গল্প চুরির মোকদ্দমা করব।

আর তোমরাও তখন আমার পক্ষেই সাক্ষী দেবে নিশ্চয়!

Share This