কখন যেন নিঃসাড়ে চলে গেছে মির্না-উৎপল। ডিকও আর বাড়ির ত্ৰিসীমানায় নেই এখন। মিসেস জোও বিদায় নিতে চেয়েছিলেন, জোনাথন ছাড়েননি। মরমে মরে থাকা মহিলাটিকে আর খাঁড়ার ঘা। দিতে চাননি জোনাথন। নিঃশব্দে মিতিন, পার্থদের হাতে কফির পেয়ালা তুলে দিয়ে তিনি এখন রান্নাঘরে।

জোনাথন কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। এখনও খুবই বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে তাঁকে। বিষণ্ণও। মিতিন তাঁকে গণপতি চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প বলছিল, তিনি যেন সেভাবে শুনছিলেন না ভাল। করে।

আচমকাই একটা বেখাপ্পা প্রশ্ন করে বসলেন, একটা কথা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না প্রজ্ঞাপারমিতা। উৎপল-মির্না হঠাৎ তোমার কাছে ছুটল কেন?

মিতিন একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, উৎপল-মির্নার মনে কী ছিল বলা কঠিন। তবে আমার যা অ্যাসেসমেন্ট, ওঁরা গেছিলেন খানিকটা বাধ্য হয়ে। রাজনাথ সিং-এর কাছে এঁরা ভাগলপুরের বাড়ি দুটো বেচেছিলেন বটে, তবে তখনও উৎপলবাবুরা বুঝতে পারেননি রাজনাথ সিং কতটা বিপজ্জনক। গণপতিবাবুর মাধ্যমে বিক্রি হলে আসল দাম আপনার অজানা থাকবে না, অতএব টাকা মারারও নোচা, শুধু এই কারণেই গণপতিবাবুকে এড়িয়ে রাজনাথের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। মুফতে বারো লাখ এল বটে, তবে এঁরা খপ্পরে পড়ে গেলেন রাজনাথের। এই বাড়িটাও তাকে বিক্রি করার জন্য চাপ তৈরি করতে লাগল রাজনাথ। ব্ল্যাকমেলিং। উপায়ন্তর না দেখে কীভাবে আবার আপনাকে জপানো যায় তাই নিয়ে উৎপল যখন ভাবনাচিন্তা করছেন, তখনই শুরু হল ফার্নিচাররুমে উপদ্ৰব। তার আগে সুরজমল একবার ঘুরে গেছে এবাড়ি থেকে। উৎপলও তো। বুদ্ধিমান লোক, তাঁর সিক্সথ সেন্স বলছিল সুরজমলই কোনও ফাউলপ্লে করছে। উটকো ঝামেলায় তাই একটু দিশেহারাই হয়ে গেলেন উৎপল। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন ভূতের গল্পটা বাড়িতে ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে, আজ নয় কাল আপনি দুর্বল হয়ে পড়তেই পারেন। কিন্তু সুরজমল যদি জমিবাড়ির দখল পায়, রাজনাথ সিং তো উৎপলকে ছেড়ে কথা বলবে না। সুতরাং তাঁকে

প্রথমে সুরজমলকে সিন থেকে আউট করতেই হবে। প্ৰথর

এবং তার জন্য প্রয়োজন অলৌকিক ঘটনার কার্যকারণ নির্ণয়। পার্থ ফস করে বলে উঠল, বিকজ, কীভাবে বন্ধ ঘরে ফার্নিচার নড়ছে তা উৎপলদের ঠিক ঠিক মাথায় ঢুকছিল না।

কারেক্ট। মিতিন ঘাড় নাড়ল, ইতিমধ্যে হঠাৎ আর একটা কাণ্ড ঘটে গেল। পুরনো একটা বাড়ি ধসে পড়ল লেবুতলায়। মারা গেলেন এক বৃদ্ধ। খবরটা দেখে কাঁটা হয়ে গেলেন উৎপলরা। যদি এমন কিছু ইলিয়ট রোডেও ঘটে? যদি সুরজমলই ঘটায়? রাজনাথের স্বরূপটাও তদ্দিনে মোটামুটি চিনে গেছেন উৎপলরা। বুঝেছেন রাজনাথের পক্ষেও একটা মারাত্মক কিছু করে ফেলা অসম্ভব নয়। মিতিন জোনাথনের দিকে ঘুরল, আপনার মেয়ে। জামাইয়ের খুব টাকার লোভ আছে বটে, তবে আপনার কোনও বড়সড় ক্ষতি হয়ে যাক সেটা মির্না কখনওই চাননি। উৎপলও না।

তা ছাড়া আর একটা ভয়ও নিশ্চয়ই ছিল উৎপলের, পার্থ বিজ্ঞের মতো বলল, যদি কোনও অঘটন ঘটে, যদি মিস্টার মাইকেলের কিছু হয়ে যায়, তবে তো পুলিশকে হবেই। আর পুলিশে ঘূলে ছত্রিশ ঘা। তারা ঠিক গঁতিয়ে গুঁতিয়ে আদ্যোপান্ত সব বার করবে। ভাগলপুরের কীর্তিটি প্রকাশ পেলে নিৰ্ঘাত এই কেসেও ওদেরই চক্রান্তকারী ধরে নিয়ে স্ট্রেট পুরে দেবে গারদে।

হ্যাঁ। এটাকেও একটা কারণ বলা যায়।মিতিন শেষ চুমুক দিয়ে কফির কাপ নামিয়ে রাখল, নিজেদের গা বাঁচানোর তাগিদও তো একটা বড় তাগিদ। পাশাপাশি অবশ্য আর একটা উদ্দেশ্যও ছিল। উৎপলদের আদৌ না ছুঁয়ে যদি আমি সুরজমলের চাতুরিটা ধরে দিই, তা হলে মেয়ে-জামাইয়ের ওপর মিস্টার মাইকেলের আস্থা আরও বাড়বে। কত বড় একটা বিপদ থেকে তিনি উদ্ধার পেলেন, এই ভেবেই তিনি আর উৎপল-মির্নার অনুরোধ তখন ঠেলতে পারবেন না। বাড়িটাও সহজেই রাজনাথের হাতে তুলে দেওয়া যাবে।

পার্থ বলল, তা ছাড়া মিস্টার মাইকেলের এই মেগনা যদি সত্যি সত্যি হানাবাড়ি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়, উৎপলের তো মেটিরিয়াল লস। রাজনাথ সিং-এর কাছে এবাড়ির ভাও কমবে। সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধুবরের বখরাও।

বটেই তো। এরকম সাত-পাঁচ ভেবে দোনামোনা করতে করতেই তো উৎপলদের আমার কাছে আসা। ইনিশিয়াল মিশন, ওই যে বললাম, যেন তেন প্রকারেণ সুরজমলকে আউট করা।

কিন্তু এটা তো মানবে, আমার বন্ধুর জহুরির চোখ। পাৰ্থ ঠাট্টা জুড়ল, মিসেস জোন্স যদি ইস্কাবনের বিবি হন তো সুরজমল ইস্কাবনের টেক্কা।

ওটা আন্দাজ করা তেমন কঠিন নয়। যে-বাড়িতে কস্মিনকালে ভূত দেখা যায়নি, সেখানে সুরজমল এল আর অমনি ভূতের নৃত্য শুরু হয়ে গেল? তোমার বন্ধু তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। মিতিন মাথা দোলাল, তবে মিসেস জোসের কথাটা কিন্তু ওঁর মাথাতেই আসেনি।

তুমিই বা মিসেস জোন্সকে কী করে সন্দেহ করলে প্রজ্ঞাপারমিতা? জোনাথন অনেকক্ষণ পর কথা বললেন, আফটার অল শি ইজ সো টেন্ডার, সো অ্যাফেকশনেট, সো লয়াল..?

সত্যি কথা বলতে কী, মিসেস জোন্স এমন একটা কাজে জড়িত থাকতে পারেন, আমিও ভাবতে পারিনি। তবে আর্চের ফাঁক গলে বাচ্চা ঢুকছে, এমন একটা আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করানোর জন্য তিনি যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছিলেন, তাও আমার মোটেই ভাল লাগেনি। বেড়াল থিয়োরি দিয়ে ওঁকে কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। যদিও প্রথম থেকেই বুঝেছি, যে ফার্নিচাররুমে আওয়াজ করছে, সে বাড়িটাকে ভূতের বাড়ি প্রমাণ না করে ছাড়বে না। ঠিক তাই হল। শুরু হল কাচ এপিসোড। আবার সুরজমলকে জড়িয়ে দিতে চাইলেন উৎপল। এদিকে কাচ ভাঙার প্যাটার্ন দেখেই। আমি পদ্ধতিটা বুঝে যাই। তখন আমি হিসেব করতে শুরু করি কাজটা কে করতে পারে? উৎপলই কি? সম্ভাবনা কম। প্রতিদিন বিকেলে এসে ঘরগুলোর নির্দিষ্ট আসবাবে দাগ টেনে যাওয়া তো উৎপলের পক্ষে কঠিন। অন্তত মিসেস জোসের চোখ এড়িয়ে। তখনই প্রথম মিসেস জোসের ভাবনাটাও মাথায় আসে। কথায় কথায় জানতে পারলাম ওঁর স্বামী চাকরি করতেন ফটো বাইন্ডিংয়ের দোকানে। অর্থাৎ যারা নিয়মিত কাচ কাটাকাটি করে। শুধু ফার্নিচারের কাচ ভাঙলে ব্যাপারটা তেমন ভয়াবহ হবে না ভেবে বালব-টিউবের গায়ে অ্যাসিড মাখানোরও আয়োজন করেন। মিসেস জো। সম্ভবত এই সায়েন্টিফিক থিয়োরিটাও তিনি জেনেছিলেন তাঁর স্বামীর কাছ থেকে। তবে তখনও আমার মিসেস জোসের মোটিভ নিয়ে সংশয় ছিল। নিজে করলে তিনি কী উদ্দেশ্যে করছেন? নাকি কেউ তাঁকে দিয়ে করাচ্ছে? এবং সে কে?

অর্থাৎ তখনও তুমি সুরজমলের সঙ্গে মিসেস জোন্সকে যুক্ত করতে পারোনি।

করার উপায়ও ছিল না। সুরজমলের কাছে বুঝতে গেলাম, সুরজমল ব্যাপারটা আরও গুলিয়ে দিল। তার কথায় মনে হল, ডিক এর মধ্যে থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু ডিকও তো বিকেলে বাড়ি থাকে না! ডিকের সঙ্গে কথা বলে মনে হল, সে বড় বেশি আবেগে চলে। ঠাণ্ডা মাথায় অত সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এবং হোলি স্পিরিটের সম্পর্কে তার বিশ্বাসটাও জেনুইন। নইলে সে হোলি স্পিরিটকে দেখার গল্প করে আমাকে সুড়ঙ্গে ঢোকার রাস্তা আবিষ্কারের সূত্রটা জুগিয়ে দিত না। এর পরই আমি যাই মিসেস জোসের বাড়ি। এবং সেখানেই মিসেস জোসের সঙ্গে সুরজমলের আঁতাতটা ধরে ফেলি।

টুপুর বিস্মিত মুখে বলল, কীভাবে?

তামাকের গন্ধে মিস ওয়াটসন।

মানে?

তোকে সেদিন বললাম না, তোর নাক এখনও পাকেনি! এখনও বুঝছি না?

না মানে…

ওরে বোকা, সুরজমলের পাইপ আর মিস্টার জোনসের হাতে পাকানো সিগারেট, দুটোরই তামাক এক। এক গন্ধ।

বা রে, একই ব্র্যান্ডের তামাক দুজনে খেতে পারে না?

অবশ্যই পারে। কিন্তু ওই অতি দামি বিদেশি তামাক কেনা মিস্টার জোন্সের পক্ষে যে একেবারেই অসম্ভব। মিস্টার জোসের বিছানার পাশে যে পাউচটা পড়ে ছিল তার ব্র্যান্ডনেম দেখেছিলি? ওই খাঁটি ভার্জিনিয়া টোব্যাকোর পাউচটির দাম অন্তত চারশো টাকা। ডলার থেকে কনভার্ট করলে ওরকমই দাঁড়াবে। কী বুঝলি?

টুপুর মাথা চুলকোচ্ছে। মিতিন বলল, অর্থাৎ সুরজমল মিসেস জোসের বাড়িতে পদধূলি দেন। তারই বদান্যতায়…। হয়ে গেল দুয়ে দুয়ে চার। এর পর মিসেস জোসের মোটিভ অনুমান করতেও অসুবিধে হয় না। মনে আছে, মিস্টার জোন্স বলছিলেন, সেরে। ওঠার চান্স আমার নেই… অপারেশান করতে গেলে দুলাখ খরচা, অত টাকা আমরা পাব কোত্থেকে…? তোর নোটে কিন্তু এই কথাগুলোও মিস করে গেছি।

টুপুর অধোবদন।

জোনাথনের ধরে ঘোর এখনও কাটেনি। দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, সবই তো বুঝলাম। কিন্তু মিসেস জোসের ফার্নিচার রুমে যাওয়া-আসা করার রাস্তাটা তুমি খুঁজে পেলে কী করে?

ফার্নিচাররুমে যে একটা কোনও রহস্যময় ব্যাপার আছে এটা আমার প্রথম দিনই মনে হয়েছিল। সব আসবাবে থিকথিকে ধুলো, অথচ অয়েলপেন্টিংটার তলার কাঠের চ্যানেল দিব্যি পরিষ্কার। অর্থাৎ ইউজ হয়। হাত পড়ে। ছবিটারও মধ্যিখানে চুলের মতো সরু একটা দাগ। তাও আবার লম্বালম্বিভাবে! সরলরেখায়! ক্যানভাস কি ওইভাবে ফাটতে পারে? আগেকার দিনে প্রায় বাড়িতেই গুপ্তকক্ষ তৈরি করা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা, একথাটাও আমার মাথায় ছিল। এর পরেই ডিকের একটা স্টেটমেন্ট আমায় অনেকটা গাইড করে দিল। ডিক বলল, হোলি স্পিরিট নাকি পেছনের উঠোনের মাটিতে ভুস করে নেমে গেছিল। শুনেই সঙ্গে-সঙ্গে আমি বাড়ির পেছনে গিয়ে ঘাসে চাপা পড়া সুড়ঙ্গের ঢাকনাটা আবিষ্কার করে ফেলি। এবং লুকিয়ে লুকিয়ে ঢাকনা খুলে দেখেও নিই। ওই সময়েই আংটার পাশ থেকে কুড়িয়ে পাই একটা তামার আংটিও। মিসেস জোক্সকে যেটা মাঝের আঙুলে পরতে দেখেছি। বলতে বলতে মিতিন চোখ ঘোরাল, একটা প্রশ্ন কিন্তু আপনারা কেউ করলেন না এখনও। লাস্ট যে কাচের শোকেসটা ভাল, সেটা অমন ছ্যাতরা ফ্যাতরা হয়ে চুরমার হয়েছিল কেন? আর কেনই বা ওভাবে গুঁড়ো গুঁড়ো হল। পুতুলগুলো?

এ তো পাঁচ বছরের শিশুও বোঝে। পার্থ কাঁধ ঝাঁকাল, মিসেস জোক্স কেসটাকে আরও জটিল করে দিতে চেয়েছিলেন।

ঘেঁচু বুঝেছ। মিতিন বুড়ো আঙুল দেখাল, ওই শোকেসটা মিসেস জোনস ভাঙেনইনি।

যাহ বাবা, তা হলে ভাঙলটা কী করে?

সেকেন্ড একজন ভেঙেছে। যে ঘোলা জলে মাছ ধরতে চেয়েছিল। যার গুপ্তধনের বাসনা অতি প্রবল। শোকেসের কাচ ভেঙে পুতুলগুলোকে আছড়ে আছড়ে ফেলে সে দেখে নিতে চেয়েছিল পুতুলের মধ্যেই কোনও হিরে মণিমাণিক্য লুকোনো আছে কি না। ভেবেছিল ওই শোকেস ভাঙাটাও অন্য কাচ ভাঙার ঘটনার সঙ্গে চালিয়ে দেওয়া যাবে।

কে সে?

তোমার বন্ধু। শ্ৰীমান উৎপল ক্রিস্টোফার বিশ্বাস। মিস্টার মাইকেল যখন আওয়াজ পেয়ে এ ঘরে এলেন, উৎপলও তখন এ ঘরে মজুত। মিস্টার মাইকেল ভাবলেন উৎপলও বুঝি আওয়াজ শুনেই ছুটে এসেছেন। অ্যাক্টিংটাও ভালই করেছিলেন উৎপল। তবে তাঁর পরিশ্রম অ্যাক্টিং সবই বৃথা গেল, কিছুই মিলল না।

নেই কিছু তো পাবে কোত্থেকে? জোনাথন সহসা উত্তেজিত, কী বজ্জাত জামাই! কতদিনকার পুরনো পুতুলগুলোকে শেষ করে দিল।

গুপ্তধনটা কিন্তু আছে মিস্টার মাইকেল।

আছে?

অবশ্যই। এবং তার মূল্য হিরে-জহরতের চেয়ে অনেক বেশি।

কী জিনিস সেটা? কোথায় আছে?

আপনার চোখের সামনেই আছে মিস্টার মাইকেল!

জোনাথন তাকাচ্ছেন এদিক-ওদিক। এ-শোকেস ও-শোকেস, এদেওয়াল, ও-দেওয়াল।

মিতিন পার্থকে বলল, ঘরাঞ্চি এনে দেওয়াল থেকে তলোয়ারটা পাড়ো তো।

পার্থ অবাক। মিতিন মৃদু ধমক দিল, আঃ, যা বলছি করো না।

স্টোররুম থেকে ঘরাঞ্চি এনে কষ্ট করে ভারী অস্ত্রখানা নামাল পার্থ। হাতে নিয়ে আলগাভাবে খাপের ধুলো ঝাড়ল মিতিন। তারপর হ্যাঁচকা টানে খাপ থেকে বার করেছে তলোয়ার। ঝকঝকে ইস্পাতের ফলা ঝলসে উঠল বাতাসে।

দুহাতের তেলোয় তলোয়ারখানা কায়দা করে রাখল মিতিন। তারপর বাড়িয়ে দিল জোনাথনের দিকে। নাটুকে ভঙ্গিতে বলল, প্লিজ অ্যাকসেপ্ট দা মোস্ট প্রেশাস পজেশান অফ মিস্টার রবার্ট ম্যাকগ্রেগর। এই তলোয়ার ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ উপহার পাঠিয়েছিলেন মহারাজা কানোয়ার সিং-কে। এর অ্যান্টিক ভ্যালু এখন আর আপনি টাকায় হিসেব করতে পারবেন না মিস্টার মাইকেল।

কাঁপা কাঁপা হাতে তলোয়ারখানা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছেন জোনাথন। প্রায় দেড়শো বছর হয়ে গেছে, এখনও কোথাও এতটুকু মরচে ধরেনি। চকচক করছে, যেন নতুন।

মিতিন বলল, আমি আপনাকে একটা অনুরোধ করব মিস্টার মাইকেল?

জোনাথন অস্ফুটে বললেন, কী?

এই তলোয়ার আপনি মিউজিয়ামকে দান করে দিন।

দিয়ে দেব? এত মূল্যবান একটা জিনিস?

এ তো আপনার বাড়িতে থাকার কথা নয়। মিউজিয়ামই এর যোগ্য স্থান। তা ছাড়া এই লুঠের মাল যথাস্থানে পাঠিয়ে দিলে রবার্ট ম্যাকগ্রেগরের পাপের ভার খানিকটা লাঘব হবে। জোনাথন থম মারা মুখে একটুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তাই হোক।… কিন্তু তুমি কী করে বুঝলে এটাই গুপ্তধন?

গুপ্তধন নয়, মহামূল্য ধন। আপনারাই মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের উইলের ভুল অর্থ করেছেন এতদিন। উনি লিখে গেছিলেন, লিভিং বিহাইন্ড দা মোস্ট প্রেশাস পজেশান অফ মাই লাইফ। হুএভার লক্স ফর ইট শ্যাল গো টু দা গ্রেভ। তার মানে কিন্তু এই নয়, যে মহামূল্য ধনটা চাইবে তাকে মরতে হবে। আসলে তাকে যেতে হবে। রবার্ট ম্যাকগ্রেগরের কবরে। রবার্ট ম্যাকগ্রেগরের সমাধিলিপি থেকে উদ্ধার করতে হবে সম্পত্তিটি কী।

পার্থ অবিশ্বাসের সুরে বলল, যাহ্, কী এমন লেখা ছিল ওখানে? এপিটাফে তো শুধু লেখা ছিল, সামওয়ান হু ওয়ান্স রুলড ডেসটিনি!

ওটাই তো ক্রু। প্রতিটি শব্দের ফার্স্ট লেটারগুলো অতিকায়। কী সেই লেটারগুলো? এস ডব্লু ও আর ডি। অর্থাৎ সোর্ড। তলোয়ার। তুমি এই ঘরে প্রথম দিন ঢুকেই বলেছিলে না, ওই রকম তলোয়ার তুমি কোথাও দেখেছ? মনে আছে, গত বছরের আগের বছর আমরা আগ্রা ঝাঁসি গোয়ালিয়র বেড়াতে গেলাম। ওখানে..

ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো। মনে পড়েছে। পার্থ মিতিনের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিল, ঝাঁসির ফোর্টে দেখেছি। কেল্লার মিউজিয়ামে অবিকল এইরকম হাতলঅলা একটা তলোয়ার রাখা আছে।

ইয়েস। স্বয়ং ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ ওই তলোয়ার ব্যবহার করতেন। এ তারই জুড়ি। কারুকাজ করা বাঁটখানা ভাল করে দ্যাখো, ঝাঁসির রাজবাড়ির ছাপ মারা রয়েছে।

জোনাথনের কাছে গিয়ে তলোয়ারখানা নিরীক্ষণ করল পার্থ। টুপুরও আলতো হাত বোলাল তলোয়ারের গায়ে। সন্তৰ্পণে। পাছে হাত কেটে যায়। হাতলের সূক্ষ্ম কাজটাও দেখল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ছাপটাও।

টুপুর মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছিল এরকমই দুখানা। খোলা তলোয়ার দুহাতে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ব্রিটিশ সেনাপতি হিউজ রোজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চলেছেন লক্ষ্মীবাঈ। সিংহির বিক্রমে গর্জন করছেন, মেরি ঝাসি নেহি দুংগি…

ভাবনার মাঝেই ঘরে ম্ৰিয়মাণ মুখ মিসেস জোন্স। মৃদু স্বরে মিসেস জোন্স জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি লাম্ফ করে যাবে?

মিতিন বলল, না না, আমরা এবার উঠব।

জোনাথন বললেন, খেয়ে যাও না। অসুবিধের কী আছে?

আজ থাক। অন্য একদিন হবে। আপনি মানসিকভাবে একটু থিতিয়ে নিন।

আর থিতোনো!

এত মনখারাপ করছেন কেন? আপনার ছেলেমেয়ে, জামাই কেউ তো আদ্যন্ত শয়তান নয়। লোভে পড়ে অন্যায় করেছে…

আমি তো সবাইকে ক্ষমা করেই দিয়েছি প্রজ্ঞাপারমিতা।

হুম। জানেন তো, ক্ষমাটাও কখনও কখনও খুব বড় শাস্তি। মিতিন কাঁধে ভ্যানিটিব্যাগ ঝুলিয়ে নিল, আজ চলি। দরকার হলে ডাকবেন, অবশ্যই চলে আসব।

জোনাথন বললেন, একটু দাঁড়াও। বলেই পরদা সরিয়ে ঢুকেছেন নিজের ঘরে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ফিরে এলেন, হাতে একটা চেক। বললেন, এটা রাখো।

মিতিন হাতে নিয়ে দেখল চেকটা। বলল, আমায় কিন্তু উৎপলবাবু আগে সাড়ে সাত হাজার দিয়েছিলেন।

দিক। এটা আমি দিলাম।

মিতিন হেসে বলল, ভূত তাড়ানোর মজুরি পঁচিশ হাজার? নাকি এতে গুপ্তধন মিস্ট্রি সম্ভ করারও ইনাম আছে?

দুটোর কোনওটাই নয় মাই ডিয়ার চাইল্ড। জোনাথনের চোখ ছলছল করে উঠল, তোমার ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। ধরে নাও, এটা আমার কাছের মানুষদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্য সামান্য একটু কৃতজ্ঞতা স্বীকার।

রাস্তায় বেরিয়ে টুপুর ঘুরে একবার দেখল বাড়িটাকে। সিপাই। বিদ্রোহের স্মৃতিমাখা এবাড়ির আয়ু এবার বোধ হয় ফুরিয়েই এল।

মিতিন ঘড়ি দেখছে। পার্থকে বলল, পৌনে একটা বাজে, তুমি কি এখান থেকে সোজা প্রেসে যাবে?

গোলি মারো প্রেস। এখন আমার এ-পাড়ায় একটা জরুরি কাজ আছে।

কাজ? এখানে?

ইয়েস ম্যাডাম। এক্ষুনি সিরাজে ঢুকে দুপ্লেট বিরিয়ানি সাঁটাতে হবে। টুপুরকে বলতে হবে কীভাবে কলকাতায় বিরিয়ানি এল।… বুঝলি টুপুর, বিরিয়ানিকে কলকাতায় এনেছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের বাবুর্চি। জানিস নিশ্চয়ই, আঠেরোশো সাতান্ন সালে ব্রিটিশরা ওয়াজিদ আলি শাহকে বন্দি করে ফোর্ট উইলিয়ামে নিয়ে আসে? পরে অবশ্য তাঁকে রাখা হয়েছিল খিদিরপুরের ওপাশটায়। সেখানে তিনি একটা মাটির কেল্লা বানিয়েছিলেন। যার থেকে জায়গাটার নাম মেটিয়াবুরুজ। বুরুজ মানে যে কেল্লা সেটা নিশ্চয়ই তোকে বলে দিতে হবে না? সেই মেটিয়াবুরুজেই বাবুর্চি নিয়ে বেশ ফুর্তিতেই থাকতেন…

ও, আবার তোমার সেই জ্ঞান বিতরণ শুরু হল! মিতিন ঝেঝে উঠল, কোনও লেকচার নয়, বিরিয়ানি খেয়েই সোজা বউবাজার যাবে। টুপুরকেও এখন বাড়ি গিয়েই হোমটাস্ক শেষ করতে হবে। ওর ছুটি কিন্তু ফুরিয়ে এল।

ইস, আবার সেই পড়াশুনো! সেই স্কুল! মেজাজটা মিইয়ে গেল টুপুরের ঠিক এই মুহূর্তে কথাটা না মনে করিয়ে দিলে কি মিতিনমাসির চলছিল না।

Share This