১০. ভাদ্র গেলো, আশ্বিন গেলো

ভাদ্র গেলো, আশ্বিন গেলো, কার্তিক আর যায় না। আমনের বাড় এবার ভালোই; কিন্তু মাটি একটু শুকনা, ধানের গোড়ার নিচে নিচে মাটিতে চিকন চিকন রেখা। আশ্বিনের শুরুতে এই উঁচু জমিতে একটু পানি ছিলো। পানি নেমে যাবার আগে এক রাতে হুরমতুল্লা চুরি করে তমিজের আল কেটে পানি টেনে নিয়েছে নিজের জমিতে। বুড়ার জমির মাটি এখনো কেমন কালো কুচকুচে, আলে দাঁড়ালে সোঁদা গন্ধে তমিজের বুকটা ভরেও যায়, একটু জ্বলেও ওঠে। বুড়া তার জমিতে এখন মরিচের আবাদ করে।

এদিকে তমিজের জমিতে চিড় ধরার আভাস; পানির পিপাসায় জমির ঠোট একটু একটু ফাঁক হচ্ছে, ফাঁকটুকু হাঁ হতে আর কততক্ষণ?—হাঁ হলেই ধানের চারাগুলো আস্তে আস্তে হেলে পড়বে। তখন?—তখন?—নিড়ানি দিতে গেলেই তমিজের বড়ো পিপাসা পায়। হুরমতের কাছে বদনা ভরা পানি, তার কাছে পানি চাইলেই সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। তমিজ ঠিকই বোঝে, মাঝির বেটাকে নিজের বদনা থেকে পানি খেতে দিতে বুড়ার বাধো বাধো ঠেকে। পানি খেতে তমিজকে তাই যেতে হয় মোষের দিঘির ধারে। কিন্তু এখন জমির পিপাসায় তমিজের গলা কাঠকাঠ, দিঘির অতো উঁচু পাড়ে ওঠানামা করার ধৈর্য তার নাই। দিঘির পুব ধার দিয়ে হেঁটে চয়ে যায় হুরমতের ঘরের দিকে। ক্যা গো, বাড়িত কেউ আছো? পানি খিলাবার পারো? তমিজ হাঁক দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁসার বদনা হাতে এসে দাঁড়ায় হুরমতের ছোটো মেয়ে। কিন্তু তমিজ ভাবছিলো। বড়ো মেয়েটি আসবে। খুব ভোরে এসে তমিজ রোজ তাকে চুপচাপ জমি থেকে চলে যেতে দেখেছে, তার পেছনটা তমিজের একরকম চেনাই। তা মেয়েটির মুখ দেখার তাগিদ হয়তো তমিজের ছিলো। আবার আশ্বিন মাসে ওর জমি থেকে আল কেটে পানি নেওয়ার সময় বাপের পাশে দাড়িয়ে সেও কোদাল ধরেছিলো; এই সুযোগে তাকে বেশ দুটো কথা শুনিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ছোটো বোনকে দেখে তমিজের এসব আর মনে পড়ে না। তার পানির পিপাসাও তখন হঠাৎ প্রকট হয়, বদনার নল উঁচু করে ধরে সে পানি খায় ঢক ঢক করে।।

তমিজের পেছনে শুকনা কলাপাতা ঝোলানো পর্দা, পর্দার ওপার থেকে কচি কলাপাতায় এক টুকরা গুড় এগিয়ে দিলো একটা কালো হাত। কচি কলাপাতা তমিজ হাতে তুলে নিলো এবং অন্যের জমির আল কেটে পানি-চুরি-করা মন্দা কিসিমের মাগীর পর্দার বাহারকে মনে মনে গাল দিয়ে গোগ্রাসে গিলে ফেললো গুড়ের টুকরা। গুড় মুখে বদনার বাকি পানিটুকু গিলতে তার বড়ো ভালো লাগে, এবার পানির স্বাদ বেড়ে গেছে। শত গুণ। নিজের জমিতে ফিরতে ফিরতে তার ছোটো একটা ঢেকুর ওঠে, এই ঢেকুরে আখের গুড়ের গন্ধের সঙ্গে উগরে ওঠে চিনচিনে হিংসা : কার্তিক মাসে মানুষের ভাত জোটে না, আবার চাষার ঘরে দ্যাখো গুড়ের ফুটানি! বাপটা তো কিপটের একশেষ, জমির আলে কুলগাছতলায় সানকি ভরা পান্তা মরিচ দিয়ে ডলে খেতে খেতে একবার মুখের কথাটাও বলে না, ক্যা গো, খাওয়া দাওয়া হছে? আর এ কঞ্জুসের বেটি গুড়ের ফুটানি মারে। গুড় যখন দিলোই তো পর্দার বাহার দেখাবার দরকারটা কী? রাত্রিবেলা। বাপের সঙ্গে আল কেটে তমিজের জমির পানি চুরি করার সময় পর্দার বাহাদুরি ছিলো কোথায়?–তা দুই বছরের ওপর বাপের বাড়িতে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছে, বাপের জমিতে কাম না করে তার উপায় কী? তমিজ সব খবরই রাখে আকালের বছর হুমতুল্লার জামাই নিজের বৌ, বছর দেড়েকের একটা বেটা আর ছয় মাসের একটা–বেটি শ্বশুরবাড়িতে গছিয়ে রেখে সেই যে ভাগলো,—বেটিটা মরলো বছর না পুরতে, পেটফোলা বেটাটার পেট দিনদিন আরো ফুলছে তো ফুলছেই, তার তামাটে মুখ রোজ রোজ হলদে হয়, চোখের হলুদ ছোপ গাঢ় হয়ে আসছে। আর খেতে না পেয়েও বৌটার পাছা হয়ে উঠছে ধামার সমান।—তা সেই মানুষটার কোনো পাত্তাই নাই। ওদিকে ঐ জামাই বেটার গায়ের আদ্দেকের বেশি মানুষ নাকি আকালে সাফ হয়ে গেছে, যারা ছিলো তাদের বাড়িঘর খেয়ে ফেলেছে যমুনা। কিন্তু হুরমতুল্লার জামাই নাকি বেঁচে থেকেই কোথাও উধাও হয়ে গেছে কেউ বলতে পারে না। হুরমত শুনেছে জামাই তার রংপুর না আসাম না কুচবিহার না জলপাইগুড়ি না দিনাজপুর কোথায় চলে গেছে, কাউকে ঠিকানা দিয়ে যায়নি। সে নাকি আবার গান লেখে; হুরমতুল্লা বলে, তার গানের এতোই চাহিদা যে গান লিখতে তাকে হয়তো কলকাতা না হয় ঢাকা না হয় দিল্লি চলে যেতে হয়েছে। তমিজ এসব বোঝে! ঐ লোকটা নির্ঘাৎ পাড়ি দিয়েছে খিয়ার এলাকায়। কামলার মজুরি ওদিকে বেশি, এই কার্তিক মাসেও সাড়ে পাঁচ আনা ছয় আনার কম নয়। কাজও পাওয়া যায় ওদিকে, মেলা কাম। জমির তদারকি ওদিকে বেশি, জমিতে ওরা মেহনতও করে খুব। খিয়ারে তো নদী একরকম নাই বললেই হয়, বড়ো বড়ো সব দিঘি আছে, দিঘি থেকে নালা কেটে ওরা জমিতে পানি সেঁচে দোন দিয়ে। কামলাপাটের নাকমুখ খুঁজে পান্তার শেষ আমানিটুকু চুমুক দিয়ে খাবার মতো জমি চুপচাপ শুষে নেয় দোনের পানি। এখানে নিজের জমিতে পানি সেঁচতে পারলে কাজ হতো। হুরমতুল্লাকে ভালো করে বোঝাতে পারলে সে-ই শরাফত মণ্ডলকে বলে মোষের দিঘি থেকে নালা কাটাবার ব্যবস্থা করতে পারবে।

কিন্তু বুড়ার কাছে তমিজ কথাটা পাড়ে কীভাবে?—শুরু করা যয় তার পালিয়ে-যাওয়া জামাইকে খোজ করার পরামর্শ দিয়ে।—না, ওসব কলকাতা দিল্লি কিংবা আসাম কি জলপাইগুড়ি দিনাজপুরের কথা বাদ দাও বাপু, জামাই তোমার খিয়ারের দিকেই গেছে।—আরে, হিসাব তো সোজা।–টাউনে গিয়ে ট্রেনে চাপো, তারপর যে স্টেশনেই নামো, চোখে পড়বে খালি ধানখেত আর ধানখেত। বর্গাচাষাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ কোনো জোতদার হুরমতের জামাইকে ঠিক কাজে লাগিয়ে দিয়েছে নিজের খাস জমিতে। আধিয়ারদের হাঙ্গামা বাড়ার পর কামলার মজুরি সেখানে বেড়ে গেছে।—কেন? মজুরি বাড়বে কেন?—কাজে অনেক ঝুঁকি নিতে হয় তো, তাই। বর্গাচাষারা সেখানে একজোট, জোতদারের মানুষদের তারা যে কোনো সময় হামলা করতে পারে। তমিজ তো ঐ এলাকা থেকেই ঘুরে এসেছে এই মাস তিনেক। তিন মাস, কিন্তু মনে হয় কালকের ঘটনা। আধিয়ারদের তাড়া খেয়ে কাটা ধান ফেলে সে দৌড় দিলো। দৌড়, দৌড়, দৌড়। তার গায়ে তীর বিধছিলো একটার পর একটা, তমিজ শুনেছে সাঁওতাল চাষারা নাকি জোতদারদের মারে তীর দিয়ে। তা তীরের খোঁচায় টিকতে না পেরে তমিজ একটা জমির আলে দাঁড়িয়েছিলো বাবলা গাছের নিচে। তা ঐ রোগা বাবলা গাছ তাকে আর আড়াল দেবে কোত্থেকে? উপায় না দেখে তমিজ তখন কাঁটাওয়ালা বাবলাডাল ভেঙে ভেঙে ছুঁড়ে মারতে লাগলো ঐ চাষাদের দিকে। কিন্তু কোন শালা কি মন্ত্র পড়ে দিয়েছে, বাবলাডাল একটার পর একটা গিয়ে লাগে। জোতদারের গায়ে। শরাফত মণ্ডলের গলার ঠিক নিচে বাবলাকাটা লেগে রক্ত বেরুচ্ছে। বাপের পেছনে দাঁড়িয়ে আবদুল আজিজ আবদুল কাদের দুই ভাই। অন্তত আবদুল আজিজের মুখ বরবার কাঁটাওয়ালা মোটা একটা বাবলাল লাগাবার জন্যে তমিজ নানাভাবে চেষ্টা করে, কিন্তু জুত করতে পারে না। তমিজ আরো ডাল ভাঙতে লাগলো। জোতদার শালা ঝাড়েবংশে হারামজাদা, শালার একোটা মাক্কুচোষা। তমিজের এতো কষ্ট, এতো মেহনত, এতো কষ্টের মেহনতের ফসল সব নিয়ে তুলতে হবে শালাদের মোটা মোটা গোলায়।-জমির আলে কুলগাছের ডাল মুঠি করে ধরায় হাতের তালুতে ও আঙুলে কাঁটা ফুটলে মাথা ঝাকিয়ে তমিজ চারদিকে তাকায়; তার পাশের জমিতে মরিচের চারা বুনে চলেছে হুরমতুল্লা। এখানে বাবলা গাছ কোথায়? খিয়ারে কাজ করতে গিয়েও তো তমিজ কখনো বাবলা গাছের ডাল ভাঙেনি। খিয়ারে চাষাদের তাড়া খেয়ে সে আবার রুখে দাঁড়ালো কবে? একদিন কেবল আধিয়ারদের হামলায় পালিয়ে এসে জোতদারের বাড়ির উঁচু ভিটা থেকে সাঁওতালদের তীর ছুঁড়তে দেখেছে। কিন্তু তাই বলে সে-ও তাদের দলে ভিড়ে যাবে কেন? তওবা, তওবা! ছি! ছি! শরাফত মণ্ডল কিংবা তার ছেলেদের গায়ে সে কি কখনো ভুলেও হাত তুলতে পারে? সে কি এতোই নেমকহারাম হয়ে গেলো যে এসব ভাবনা এসে দানা বাঁধে তার মাথায়? আবদুল কাদেরের সুপারিশে আর শরাফত মণ্ডলের মেহেরবানিতে তমিজ দিনমজুর থেকে আজ বর্গাচাষী। অথচ এই ভর দুপুরবেলা মণ্ডলেরই জমিতে দাঁড়িয়ে জেগে থেকে সে এসব কী দেখে? বাপের ব্যারাম কি তার ওপরে ভর করলো নাকি? ব্যাপারটা ভালো করে বোঝবার আগেই সে শুনতে পায় হুরমতুল্লার ডাক, ক্যা গো। ওটি খাড়া হয়া কী তামসা দ্যাখো? নিড়ানি হলো? মাটি বলে শুকনা। বানও এবার জুতের হলো না গো!

হুরমতুল্লার এই কথা ধরেই মোষের দিঘি থেকে নালা কাটার ব্যাপারটা তোলা যায়। কিন্তু একটু আগে দিব্যি জেগে জেগে দেখা বেআক্কেলে খোয়াবটা তার আসল কথাটা ভুলিয়ে দিতে না পারলেও কথার ভনিতাটা গুলিয়ে ফেলেছে। কী কথা দিয়ে যেন শুরু করার কথা ছিলো? কিছুতেই আর মনে পড়ে না। মনে পড়ে কোত্থেকে?–মাথার। ভেতরে তার কেবল দিঘি কাটা নালার পানি বইতে থাকে কুলকুল করে। পানি পেয়ে জমি তার গাঢ় সবুজ রঙের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে আকাশ জুড়ে, তমিজের সর্বাঙ্গ কাঁপে সেই হাওয়ায়। হুরমতের বুড়া গতরে তো কাঁপন উঠবে আরো বেশি। বুড়ার মরিচ খেত প্রথমে হয়ে উঠবে ঘন সবুজ। তারপর সবুজ পাতার ভেতরে পাতার সঙ্গে সবুজ মরিচের লুকোচুরি খেলা। তারও পুর সবুজ আঁচল ফেটে বেরুবে পাকা মরিচের লাল টকটকে শিখা। আহা, পাকা মরিচের সেই আগুনে-হাসি দেখে বুড়ার সব দোষ তমিজ মাফ করে দেবে। আর তখন তমিজের আমন হবে এখানে আউশ যা হয়েছিলো তার আড়াই গুণ। এতো এতো ধান তারা খাবে কততঃ দুর! আমন ধানের চিকন চাল দাঁতের ভেতর কেমন ফস্কে ফস্কে যায়, ভাত খাবার জুত হয় না। খাবার জন্যে আউশ ধানের ভাত কতো ভালো। আর অতো খাবার লালচ কেন? আমন বেচে টাকা যা পাবে সবটা পেটের ভেতরে না সেঁধিয়ে জমিয়ে রাখবে। এক জোড়া গোরু, লাঙল, জোয়াল, মই কিনতে পারলে জমি বর্গা পেতে কষ্ট হয় না। বেশি নয়, বছর তিনেক বর্গা করতে পারলে দুটো দুটো ফসল ঘরে তুলে অন্তত ১৫ শতাংশ জমি কেনার টাকা হয়। নিজেদের ভিটার লাগোয়া জমিটা মণ্ডলের কাছ থেকে ফেরত পাওয়া যায় কি-না একবার চেষ্টা করে। দেখতে ক্ষতি কী? আবদুল কাদেরকে তমিজ একবার বলে দেখবে। মাসখানেক হলো। তো সে রোজই সন্ধ্যাবেলা গোলাবাড়িতে কাদেরের দোকানে যাচ্ছে, লীগের ছেলেদের সঙ্গে এদিকে ওদিক যায়, খুব জোর গলায় স্লোগান হকে। এসব দেখে কাদের নিশ্চয়ই খুশি। কাদের কি আর তার ভিটার জমিটার জন্যে বাপকে একটু বলবে না? মণ্ডল জমি যদি না-ও বেচে তো অন্তত খাইখালাসি দিক। বাপটাকে তমিজ তা হলে ওখানেই লাগিয়ে রাখতে পারে।

বাপ তো তার কামের মানুষ। যেখানেই লাগুক, সে একাই একশো। খালি একটা কথা,কামটা তার জুত মতো হতে হবে। বিলের মধ্যে যেসব ডাঙা ফুটে উঠছে। সেখানে বর্গা করার সুযোগ পেলে তমিজের বাপ কাম দেখাতে পারে। মণ্ডল এই বিল পত্তন নেওয়ার আগে তমিজের বাপ বিলের যেখানে জাল ফেলেছে, মাছ উঠেছে সেখানেই। মানুষটার হাতে জাল ফেললেই মাছ। বিলের স্বভাবচরিত্তির তার চেয়ে ভালো জানে কে? বিলের পানি থেকে ওঠা জমিও তার বশেই থাকবে। এই যে রাতে নিন্দের মধ্যে আন্ধারে মান্দারে মাঠেপাথারে হেঁটে হেঁটে বিলে যায়, সে কি এমনি এমনি? বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছ থেকে মুনসি তাকে যদি একটু কোল দেয় তো বিলের জমিজিরেত কি তার হাতে না এসে পারে?

কিন্তু হুরমতুল্লা হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দৌড়াতে শুরু করলে তমিজের বাপ তো তমিজের বাপ, এই কালাহার বিল আর তার দুই পাশের গ্রামগঞ্জের সবার বাপ মুনসি পর্যন্ত রোদে মিলিয়ে যায়। বুড়ার হলোটা কী? মোষের দিঘির ওপারে নিজের বাড়ির দিকে মুখ করে বুড়া হাত দেখায় বিলের ওপারে পুবের রাস্তার দিকে আর উর্ধশ্বাসে চাঁচায়, ক্যা রে ফুলজান, ক্যা রে নবিতন, ক্যা রে ফালানি, দ্যাখ দ্যাখ কেটা আসিচ্ছে দ্যাখ।

গোলাবাড়ি থেকে দক্ষিণে নেমে কালাহার বিলের পুব দিয়ে মণ্ডলবাড়ি ছুঁয়ে কলুপাড়া পর্যন্ত চলে-যাওয়া রাস্তায় একটা টমটম ছুটছে। টমটমের পেছন পেছন ছুটছে এক দঙ্গল ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে। এদের বেশির ভাগের কোমরে তাবিজ আর কানাপয়সা ঝোলাবার তাগা ছাড়া শরীরের সবটাই খালি। ৪/৫টি মেয়ের পরনে কেবল গামছা, তাদের গলায় অবশ্য তাবিজও ঝুলছে। মাঝে মাঝে টমটমের চাকায় কাঠি ঠেকানোর ফলে টরররররর আওয়াজ উঠছে, ঘোড়ার খুরের শব্দের সঙ্গে সেই আওয়াজ শুনে একটু দূরের ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে বৌঝিরা, তাদের প্রত্যেক্যের কোলে একটা একটা ন্যাংটা শিশু।

টমটমের সওয়ারিকে চিনতে পারলে হুরমতের লাফালাফি ও উত্তেজনার কারণ বোঝা যায়। বিলের ওপারে স্পষ্ট নজর দেওয়া সোজা নয়। তবু টমটমের ওপর কাঁথা পেতে বসা আবদুল আজিজকে সনাক্ত করা গেলো। তার পাশে সবুজ এন্ডির ব্যাপারে জড়ানো বালকটি নিশ্চয়ই আজিজের ছেলে। তাদের উল্টোদিকের মেয়েটি আজিজের মেয়ে ছাড়া আর কে হবে? টমটমের নাগাল পেতে হুরমত দৌড় দিলো বিলের পাড়ে, কোষা নৌকা নিয়ে সে যদি ওপারে যায়ও তো গাড়ি ততোক্ষণে চলে যাবে মেলা দূর। ফিরে এসে হুরমত তাই মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে উঠে যতোটা পারে টমটমটা ভালো করে দেখতে লাগলো।

ওদিকে হুরমতের মেয়েরাও এসে দাঁড়িয়েছে দিঘির পাড়ের ওপর। বড়ো মেয়ের কোলে তামাটে হলুদ ছেলেটি ঘ্যানঘ্যান করে কেঁদেই চলেছে, টমটমের দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে তার মায়ের সবরকম চেষ্টাই একেবারে ব্যর্থ। হুরমতের ছোটো মেয়েটি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে, কিন্তু তার বড় বোেন এক হাতে খামাখা তাকে আটকাতে গেলে ছেলেটি তার কোল থেকে একরকম গড়িয়ে নামে নিচে এবং ওখানেই বসে কাঁদতে থাকে চিষ্কার করে। কিন্তু গলার জোর একেবারেই কম, তার পেটের পিলে মনে হয় তার গলার ভেতরটাও কুরে কুরে খেয়ে ঢাউস হয়ে উঠেছে।

কোলের ছেলে নিচে নেমে পড়ায় হুরমতুল্লার বড়ো মেয়ের মুখ বুক এখন তমিজ স্পষ্ট দেখতে পায়। তামাটে রঙের গোলগাল মুখের নিচে ফুলজানের ঘ্যাগটা একটু বড়োই দেখায়। শরীরটা তার মোটা, তবে কোমর অতোটা মোটা না। সারা শরীরে শক্ত মাংস ঠাসা। এই শরীরের মেয়ে জমিতে কাজ করবে না তো করবে কে? আহাম্মুক স্বামীটা তার বুঝতে পারলো না! নইলে এই বৌকে নিয়ে সে তো জমি বর্গা চাষ করতে পারে কোনো কামলা ছাড়াই।

হাঁপাতে হাঁপাতে জমির আলে কুলগাছের নিচে ফিরে এসে হুরমতুল্লা হাঁপায় এবং হাতের কাছে পানি ভরা বদনা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের দিকে তাকিয়ে চাঁচায়, পানি লিয়া আয়। পরের মুহূর্তেই সে নির্দেশ পাল্টায়, ওটি খাড়া হয়া বেহায়ার লাকান কী দেখিস? যা, ঘরত যা।

তার হুকুম মেয়েরা পালন করলো কি-না না দেখেই হুরমত বলে, মণ্ডলবাড়িত একবার যাওয়া লাগে গো। কিসক আসলো, কী সমাচার শুন্যা আসি। ঘাড়ের গামছা দিয়ে পিঠ ও বুক মুছতে মুছতে সে টমটমের সওয়ারিদের মধ্যে আবদুল আজিজ ছাড়া আর কে কে থাকতে পারে তাই নিয়ে নানারকম অনুমান করে, অনুমানটি নিয়ে সংশয় হয় তার, তখন অনুমান বাতিল করে ও ফের নতুন অনুমানটি জানায়। টমটমে আবদুল আজিজকে বাড়ি আসতে দেখে হুরমতুল্লার এরকম উত্তেজনা তমিজের পছন্দ নয়। কিন্তু এই অপছন্দ জানানো দূরের কথা, এটিকে বেশিক্ষণ পুষে রাখাও তার পোষায় না। হুরর্মত হলো আজিজের পেয়ারের মানুষ। শরাফত মণ্ডলের বাপ এই গ্রাম থেকে বাস উঠিয়ে নেওয়ার আগে হুরমত তাদের পড়শি ছিলো, তাদের মধ্যে আত্মীয়তাও থাকতে পারে। তমিজের এই জমিটাও আজিজ হুরমতকেই বর্গা দিতে চেয়েছিলো। তার কথা, পুরানা আমলের মানুষ। পুরানা চাল ভাতে বাড়ে। কিন্তু শরাফত মণ্ডলের কী হয়েছে, বিল পত্তন নেওয়ার পর থেকে সে জমি বর্গা দিতে। শুরু করেছে মাঝিদের কাছে। এই নিয়ে আবদুল আজিজ বেশি কিছু বলতেও পারে না। হাজার হলেও সে থাকে বাইরে, গাঁয়ের খুঁটিনাটি ব্যাপার সে আর কতোটাই বা জানে? তবে হিসাবনিকাশের কাজে বড়ো ছেলের ওপর মণ্ডলের আস্থা বেশি। ফসল কাটার সময় তাকে তাই ছুটি নিয়ে একবার বাড়ি আসতেই হয়। আবদুল আজিজ মাথার ওপর দাড়ালে আধিয়াররা ফাঁকি দিতে পারে না, তাদের ফন্দিফিকির কিছুই খাটে না। কিন্তু এখন তো ধান কাটার সময় নয়। আবদুল আজিজ হঠাৎ করে বাড়ি এলো কেন? লোকটা কি তবে তাদের জমিতে জমিতে ফসলের সম্ভাবনা অনুমান করতে এসেছে? তমিজ। একটু ভাবনাতেই পড়ে মাঝির বেটা লাঙল ধরে কোথায় কী অকাম করলো তাই তদন্ত করতেই যদি সে গ্রামে এসে থাকে তো তমিজের কপালে দুঃখ আছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *