১০. ডিসেম্বর, ১৯৭১

১ ডিসেম্বর, বুধবার ১৯৭১

আজ খুব ভোরে উঠতে হয়েছে। আট-দশদিন হল কেরোসিন উধাও বাজার থেকে। কোন কোন দোকানে নাকি কেরোসিন নিয়ে মারপিটও হয়েছে। সরকার তাই কেরোসিনের জন্য ন্যায্য মূল্যের দোকান খুলেছে। বুড়া মিয়াকে সকালবেলাতেই ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে মিরপুর রোডের ন্যায্য মূল্যের দোকানে পাঠিয়েছি লাইন দিতে। শেষ পর্যন্ত তেল পেলে হয়। আমার আর দুদিন চলার মত তেল আছে।

শরীফ অফিসে যাবে নটায়। আমি ওর সঙ্গে যাব। আমার সঙ্গে যাবে লুলু আর জামী। শরীফকেমতিঝিলে ওর অফিসেনামিয়ে আমরা স্টেডিয়াম-বায়তুল মোকাররমে। কিছু কেনাকাটা করব। আজ ইচ্ছে করেই ড্রাইভারকে আসতে বলা হয় নি। শরীফ অফিস পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যাবে, তারপর সেখানে থেকে আমি। যেতে যেতে গাড়ির ভেতর আলোচনা করে নিলাম কে কিভাবে কি কি কিনব। আমি প্রথমে দুটো সোয়েটার কিনব। তারপর আমি ঢুকল ওষুধের দোকানে। লুলু আর জামী আলাদা হয়ে অন্যদিকে অন্য দুটো ওষুধের দোকানে ঢুকে ওষুধ কিনবে। ওদের দুজনকে দুটো প্রেসক্রিপসান দিলাম। ওরা ওষুধ কেনা শেষ করে দুজনে দুটো আলাদা দোকান থেকে দুটো করে সোয়েটার কিনবে। তারপর গাড়ির কাছে যাবে। গাড়ি থাকবে স্টেডিয়ামে পাবনা। স্টোরের সামনে।

এতসব ষড়যন্ত্রের কারণ গত সপ্তাহে এক সঙ্গে ছটা সোয়েটার কিনতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। জিন্না এভিনিউয়ে লম্বা ফুটপাত জুড়ে ছোট ছোট দোকানীরা চাদর বিছিয়ে তাদের দোকান, সাজিয়ে বসেছে। ওদের কাছ থেকে মোটামুটি সস্তায় হাতকাটা সোয়েটার-মাফলার-মোজা এগুলো কিনতে শুরু করেছি সপ্তাহ খানেক থেকে। আগে শুধু ওষুধ, সিগারেট আর টাকা পাঠাতাম। এখন শীত এসে গেছে। গরম কাপড় দরকার। শরীফ বলেছে খুব ছোট ছোট প্যাকেট করতে। যাতে ছেলেদের নিতে সুবিধে হয়। যাতে কেউ সন্দেহ না করে। তাই আমি খুব ছোট ছোট প্যাকেট করি একটা সোয়েটার, একটা মাফলার, একজোড়া মোজা। অবশ্য মোজা যে খুব কাজে লাগে, তা নয়। বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধার জুতোই নেই। তবু মোজাও কিনি। মোজা দিই। অন্তত নিজেকে তো ভোলানো যায় আমার ছেলেরা এই শীতে জুতো-মোজা পরে যুদ্ধ করছে।

গত সপ্তাহে একসঙ্গে ছটা সোয়েটার দর করছি, এমন সময় ফুটপাতে টহল দিতে দিতে এক মিলিটারি আমার পাশে দাঁড়িয়ে গেল, এনা সুয়েটার খরিদিতা মাজী? কেয়া, জওয়ান লোগোকে লিয়ে?

আমার হৃৎপিণ্ড গলার কাছে লাফিয়ে উঠে এল, তবু মুখে হাসি টেনে বললাম, জি বাবা, আখবার মে বেগম লিয়াকত আলী কহা হ্যায় না–জওয়ান লোগোকে লিয়ে সুয়েটার, টাওয়েল, সাবুন, বিলেড, টফি, চুয়িংগাম–ইয়ে সব খরিদ করকে আপওয়া অফিস মে ভেজনা। আপ জানতে হো, আপওয়া কিস্কা আপিস হ্যায়? উয়ো যো অল পাকিস্তান উইমেন্স এসোসিয়েশান

অল পাকিস্তান শব্দটার ওপর বেশ জোর দিয়ে বললাম। বেটা কি বুঝল জানি না, জরুর জরুর বলে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল।

আমার বুক ধড়ফড় করছিল। তবু ভাগ্যি, কয়েকদিন আগে খবর কাগজে বেগম লিয়াকত আলীর এই খবরটা দেখেছিলাম। আরো ভাগ্যি যে, কথাটা ঠিক সময়ে মনেও পড়েছিল।

সেদিন আমার আর সোয়েটার কেনা হয় নি।

২ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

আজ সারাদিন বেরোই নি। গতকালকার কেনা জিনিসপত্রগুলো দিয়ে ছোট ছোট প্যাকেট বানিয়েছি কিন্তু কেউ আসে নি কিছু নিতে। অবশ্য আজকেই কেউ আসবে, এমন কথাও তো কেউ দিয়ে রাখে নি। তবু ভেতরে ভেতরে কে যেন বলছিল, কেউ আসবে। আমার অনুমান সত্য হল না। আতিকুল ইসলামের সাথে ফোনে কথা হল দুপুরে। ওর কিছু ওষুধের প্যাকেট নিয়ে যাবার কথা ছিল। ও-ও জানাল বেশ কিছুদিন হয় ওর কাছেও কেউ আসছে না। আমি বললাম, অন্তত আমার কাছ থেকে প্যাকেটগুলো নিয়ে তোমার বাসায় রাখ। হঠাৎ এসে পড়লে যাতে দিতে পার।

আচ্ছা বুবু, তাই করব। বলে ফোন রেখে দিল আতিক। কিন্তু আসে নি।

৩ ডিসেম্বর শুক্রবার ১৯৭১

আজকেও কেউ আসে নি। না আসার কারণও একটা অনুমান করছি। দেশের আবহাওয়া বড়ই উত্তপ্ত। চারধারে বর্ডার ঘিরে যুদ্ধও বেশ জোরেশারে লেগেছে। সবগুলো খবর কাগজে মোটা হেডলাইন দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতের আক্রমণের নিন্দাসূচক খবর ফলাও করে বেরোচ্ছে। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার, আকাশবাণী, বিবিসির খবর শুনে সব খবর চালাচালি করে বুঝে নিই মুক্তিবাহিনী কোথায় কতটা এগোচ্ছে, পাকবাহিনী কোথায় কতটা মার খাচ্ছে। শরীফ রোজ ইংরেজি বাংলা চার-পাচটা খবর কাগজের খবর বিশ্লেষণ করে। সেকদিন ধরেই বলে চলেছে, দ্যাখো না, ঢাকাতেও যুদ্ধ বাধলো বলে। রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ফেনী, সিলেট–সব জায়গায় যেভাবে যুদ্ধ চলছে, তাতে মুক্তিবাহিনীর ঢাকায় ঢুকে পড়তে আর দেরি নেই।

শরীর ভালো ছিল না। তাই রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম। আমার দেখাদেখি বাড়ির অন্যরাও। রাত দুটোর দিকে হঠাৎ বিমান-বিধ্বংসী কামানের ট্রেসার মারার ফটাফট শব্দে জেগে গেলাম। কি হচ্ছে, ঠিক যেন বুঝতে পারছিলাম না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি–শূন্যে আলোর ফুলঝুরি। বুঝলাম সারাদিন যে যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা নিয়ে সবাই চনমন করেছে, তাই সত্যি হতে চলেছে। খুব উত্তেজনা বোধ করলাম মনের ভেতরে, সে অনুভূতি যেন ছড়িয়ে পড়ল শরীরেরও পরতে পরতে। আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। উঠেবাবার ঘরে গেলাম, সন্তর্পণে, পা টিপে টিপে। উনি ঘুমাচ্ছেন, জামী জেগে খাটে বসে আছে। আমাকে দেখে নিঃশব্দে উঠে আমার সঙ্গে এ ঘরে এল। দুই ট্রেসারের অগ্নিঝলকের মধ্যবর্তী সময়টা কি নিকষ কালো। হঠাৎ খেয়াল হল, গভীর রাতে ঢাকা তো কখনো এত অন্ধকার থাকে না। রাস্তার বাতির জন্য একটা আবছা আলোময় আভা ফুটে থাকে ঢাকার আকাশে। আজ কি হল? তখন লক্ষ্য করলাম, আমাদের বাসার সামনের বাতিগুলো জ্বলছে না। পেছনের ঘরের জানালা দিয়ে বলাকা বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালাম, সেদিকেও কোন আলোর আভা নেই। তাহলে কি ব্ল্যাক আউট দেওয়া হয়েছে?

বাকি রাতটা আর ঘুম এল না। শরীফ, জামী, আমি তিনজনে বিভিন্ন ঘরের বিভিন্ন জানালা ও বারান্দাতে ঘুরে ঘুরেই কাটিয়ে দিলাম।

ডিসেম্বর, শনিবার ১৯৭১

ছয়টা বাজতে না বাজতে ফকিরকে ফোন করলাম। এসব ব্যাপারে সে গেজেট। তার কাছে জানলাম : গত রাতেই ঢাকা রেডিওতে ব্ল্যাক আউটের কথা ঘোষণা করেছে।

গতকাল বিকেলে সাড়েচারটেয় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোট, চাষ, লাহোর, রহিমইয়ারহীম, পুঞ্জ, উরি সেক্টর এসব জায়গায় স্থল ও বিমান আক্রমণ শুরু করে। সুতরাং পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকেও বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার জন্য ভারতীয় সীমান্তবর্তী স্থানসমূহে পাল্টা আক্রমণ করতে হয়। অল ইন্ডিয়া রেডিও অবশ্য বলেছে, পাকিস্তানই প্রথম আক্রমণ করেছে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। তারা সুলেমানকি, খেমকারান, পুঞ্জ, অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, যোধপুর, আম্বালা, আগ্রা–এসব জায়গায় স্থল ও বিমান হামলা চালিয়েছে।

প্রথম আক্রমণ যেই করে থাকুক না কেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাহলে সত্যি সত্যি যুদ্ধ লেগেছে? প্রমাণও পেয়ে গেলাম সকাল একটু ফুটতে না ফুটতেই। ভয়ানক ক্কড় কড় কড় কড় শব্দে দশদিগন্ত ঝালাপালা করে প্লেন উড়ে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে এয়ার রেইড সাইরেন বাজছে, রেডিওতে নানারকম ঘোষণা, সাবধানবাণী প্রচারিত হয়ে চলেছে।

আজ আর অন্য কোন কাজ নয়, রেডিও, টেলিফোন আর খবর কাগজ। রেডিও শুনছি আর একে ওকে ফোন করছি। একজনের কাছে পুরো খবর পাওয়া সম্ভব নয়। তাই বিভিন্নজনকে ফোন করে টুকরো টুকরো খবর সগ্রহ করছি। কেউ আকাশবাণী শুনেছে, কেউ বিবিসি, কেউ রেডিও অস্ট্রেলিয়া, কেউ রেডিও পাকিস্তান।

গতকাল সন্ধ্যায় ভারতের রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গতকাল মধ্যরাতের কিছু পরে এক বেতার ভাষণে দেশবাসীকে জানান যে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আজ এক বেতার ভাষণে দেশবাসীকে জানিয়েছেন যে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

কে যে কার বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে মতদ্বৈধতা থাকলেও যুদ্ধ যে লেগেছে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। জলজ্যান্ত প্রমাণ : ঢাকার আকাশে ভারতীয় বিমানের কর্ণবিদারী আনাগোনা।

নটার দিকে লুলু এল, উত্তেজিত গলায় বলল মামীকি যে অবাক কাণ্ড! এয়ার রেইড সাইরেন শুনে লোকে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে।

আমি অবাক হলাম, সে কি? সাইরেন শুনে তো সিড়ির নিচে মাথা গুঁজে বসার কথা।

সবাই কি বলছে জানেন? ইন্ডিয়ার প্লেন নাকি সিভিলিয়ানদের ওপর বোমা ফেলবে। ওদের লক্ষ্য কেবল ক্যান্টনমেন্ট আর এয়ারপোের্ট। তাই সবাই যুদ্ধ দেখতে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে।

জামী ছাদে গিয়েছিল, নেমে এসে বলল, কি অবাক কাণ্ড! চারদিকে সবগুলো বাড়ির ছাদে লোক বোঝাই। সবাই প্লেন দেখছে।

লুলু চেঁচিয়ে উঠল, শুনলেন মামী? শুনলেন? যা যা বলেছি, ঠিক কি না? সবাই যুদ্ধ দেখতে ছাদে দৌড়াচ্ছে, রাস্তায় নামছে।

সত্যি, আজব ব্যাপার!আমিও সারাদিন ধরে রান্নাবান্নার ফাঁকে ফাঁকে আকাশযুদ্ধই দেখলাম। শরীফ আর জামী একবার বেরোতে চেয়েছিল, আমি দিই নি। যতই লোকে বলুক যে, ভারতীয় বিমান সিভিলিয়ানের ওপর বোমা ফেলবে না, তবু, অত উঁচু থেকে কি সিভিলিয়ান-মিলিটারি হিসাব করে বোমা ফেলা যায়? আমার একটি ছেলে পাক আর্মির খপ্পরে গেছে, বাকিটাকে আর বোমার ঘায়ে হারাতে চাইনা। যুক্তি দিয়ে ওদের বাইরে যাওয়া বন্ধ করলাম বটে কিন্তু আমার নিজেরই যে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে।

এই প্লেনের কড়কড়ানির মধ্যেই বুড়া মিয়া বাজার করে এনেছে। রান্নাঘরে গেলাম ওকে সাহায্য করতে। ও বেচারা আজ একা পড়ে গেছে। রেণুর মা, রেণু কেউই আসে। নি। বোধ হয় বাড়ি বসে সবার সাথে মজা করে প্লেন দেখছে। শরীফ আর জামী বাইরে যেতে না পেরে আবার ছাদে উঠে গেছে। রান্নার কাজ কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আমিও ছাদে গেলাম। আমার মাকে দেখে জামী উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, মা মা, এমন একটা ডগ ফাইট হয়ে গেল না!

ডগ ফাইট কি?

ডগ ফাইট? ডগ ফাইট হল–মানে–দুটো প্লেন আকাশে একে অন্যের সঙ্গে ফাইট করে। রাস্তায় যেমন দুটো ছেলে মারামারি করে, সেই রকম আর কি! প্লেন দুটো একে অন্যকে জখম করে ফেলে দেবার চেষ্টা করে।

তা আমাকে ডাকলি না কেন?

হুঁ! তোমাকে ডাকতে নিচে যাই আর ডগ ফাইটটা মিস্ করি আর কি!

তা কি হল শেষ পর্যন্ত? কে মরল?

কেউ না। পাকিস্তানি প্লেনটা না পেরে ভয়ে পালিয়ে গেল যে!

এরপর ডগ ফাইট দেখার প্রত্যাশায় আমিও কয়েকবার ছাদে উঠলাম কিন্তু আর চোখে পড়ল না। কারণ ডগ ফাইট তো ঘনঘন হয় না। সব পাইলট করতে পারে না। খুব বেপরোয়া, দুঃসাহসী, জেদী পাইলটরাই জীবনবাজি রেখে ডগ ফাইটে লাগে। কারণ ঐ পাইলটরা জানে–প্লেন জখম হওয়া মানেই প্লেনে আগুন ধরে যাওয়া, আর প্লেনে আগুন ধরে গেলে সব পাইলট যে প্যারাসুট নিয়ে ঝাপিয়ে বের হতে পারবে, তারো কোন নিশ্চয়তা নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্লেনের সঙ্গে পাইলটও ধ্বংস হয়ে যায়।

তিনতলার ছাদে বারবার উঠতে হাঁপ ধরে যায়। শরীফ আর জামী কেমন সকালের নাশতাটা খেয়েই রেডিওটা বগলে করে, গুটিগুটি ছাদে উঠে গিয়েছিল। দুপুরে ভাত খেয়েও তাই করল। আমার তো হাজারটা কাজ–শ্বশুরের দেখাশোনা, তার ওপর বাবে কাগজের টোপর পরাতে হবে–কারণ পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা নগরীতে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত পূর্ণ নিষ্প্রদীপ পালিত হবে। –খবর কাগজে সরকারি নির্দেশ। জানালার কাছে কাগজের ফালি আঠা দিয়ে সটতে হবে, বোমা পড়লে যাতে কাচ ভেঙে ছিটকে ঘরে ছড়িয়ে লোকজন জখম না করে। এসব কাজ কি একা হাতে করা সম্ভব? ওরা নামে না। ওদের স্বার্থপরতায় রাগ হয় কিন্তু বেশিক্ষণ থাকে না।

লুলু এসেছে। ভাত খাবার পর ওকে নিয়েই কাজে ডুবে গেলাম। ও রান্নাঘরে গিয়ে ময়দার লেই বানাল, আমি খবর কাগজের ফালি কাটলাম, তারপর দুজনে মিলে বসার ঘরের জানালার কাচে সাটলাম। দেয়ালে বসানো ব্যাকেট থেকে বাল্বগুলো খুলে শুধু দুটো সিলিং থেকে ঝোলানো বালব রাখলাম। সেখানে পঁচিশ পাওয়ারের বালব লাগিয়ে খবর কাগজের টোপর বানিয়ে পরিয়ে দিলাম। এসব কাজ শেষ হতে হতে দিনের আলো ফুরিয়ে এল। আজ আবার রেডিওতে বলেছে–সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কারফিউ, পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া অবধি। লুলুকে বললাম, এখন বেরোন সেফ হবে না। আজ থেকে যা। লুলু রাজি হল না, না মামী, ভাই-ভাবী তাহলে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যাবে। ফোনও নেই যে জানিয়ে দেব। ভাববেন না, কাছেই তো, ঠিক চলে যাব। এখনো খানিক দেরি আছে অন্ধকার হতে। লুলু প্রায় দৌড়েই চলে গেল। ভূতের গলিতে ওর ভাইয়ের বাসা।

৫ ডিসেম্বর, রবিবার ১৯৭১

বাবা খুব অস্থির হয়ে পড়েছেন। চোখে দেখেন না বলে কানে শোনেন বেশি, অনুভূতি আরো বেশি। গতকাল থেকে বারবার বলছেন, তোমরা কি পাগল? এয়ার রেইড সাইরেনকে এভাবে উপেক্ষা করছ? একতলায় সিঁড়ির নিচে না গিয়ে ছাদে ছুটছ?

সুতরাং আজ সকালেই শরীফকে বললাম, শোননা, আজ রোববার ছুটির দিন। একতলার সিঁড়ির নিচে সবার শোয়ার ব্যবস্থাটা আজই করে ফেলি। এখন তো যুদ্ধ কেবল শুরু, পরে সাংঘাতিক হয়ে উঠতে পারে। আমরা তোদরকার হলে দুদ্দাড় সিঁড়ি নামতে পারব, বাবাকে তো নামানো যাবে না।

অতএব, শরীফ ও জামীকে ছাদের মায়া ছেড়ে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য নিচে কাজ করতে হল। রুমী-জামীর সিঙ্গল খাট দুটো নিচে নামিয়ে পাশাপাশি পাতা হল, সিড়ির নিচে। বেশ চওড়া বিছানা হল, ওপাশে দেয়ালের দিকে বাবা, তারপর শরীফ, এ পাশে আমি থাকব–এই রকম ঠিক হল। বসার ঘরের ডিভানটা টেনে এনে খাটের মাথার কাছে কোণাকুনি পাতা হল–ওটায় জামী।

খাবার টেবিলটা আগে মাঝখানে ছিল, এখন ওটাকে সরিয়ে ঘরের অন্য পাশের দেয়াল ঘেঁষে বসানো হল। আগের সেই তক্তপোশটা সরিয়ে দিয়ে এখানে পাতা হল। বাবার ইজিচেয়ারটা।

এগুলো করতে প্রায় দুপুর। গতকালই দুদিনের মত বাজার করে বুড়া মিয়া সব বেঁধে রেখেছে। গত তিন-চার মাস থেকে এরকমই করা হয়। ফ্রিজে প্রচুর রান্না করা খাবার থাকে। কারণ প্রায় প্রায়ই অনাহূত (কিন্তু অতি-বাঞ্ছিত) অতিথি এসে পড়ে। আমরা জানি, তারা দিনে রাতের যে কোনো সময় এসে পড়তে পারে। এসে পড়লে অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাদেরকে পেটভরে খাইয়ে দেওয়াটা আমাদের কর্তব্য। তাই ফ্রিজে সব সময় রান্নাকরা খাবার মজুত, মিটসেফে বিস্কুট, রুটি, মাখন, পনির।

সিঁড়ির নিচের কাজ শেষ হবার আগেই বলে নিলাম এখন আর ছাদে উঠো না। গোসল করে খেয়ে নাও।

ওরা বিনা বাক্যে আমার কথামত কাজ করল। ওরা আজ আমাকে একটু বেশি মান্য করছে। গতকাল রাত থেকেই আমার মনমেজাজ খুব খারাপ পাড়ার বিহারি পাহারাদারের গাল খেয়ে। গাল সে সবাইকে দিয়েছে। আমার যেন বেশি লেগেছে মনে হচ্ছে। খেতে বসেছি, এমন সময় লুলু এল। এসেই একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। বুড়া মিয়া একটা প্লেট নিয়ে এল। তাকে আজকাল বলতেও হয় না। সে জানে।

খেতে খেতে বললাম, লুলু, কাল যে এত খাটলাম কাজে লাগল না। এই খবরের কাগজে শেডে হবে না। কালরাতে পাহারাদার চেঁচিয়েছে বাতির আলো বোঝা যাচ্ছে দেখে।

লুলু বলে উঠল, ও তো বাতির আলো বুঝবেই। নিয়মটা হল শেড না থাকলে যে আলোটা জানালা গলিয়ে মাটিতে পড়বে সেইটা ঢাকতে হবে। কারণ প্লেন থেকে সেইটা বোঝা যায়। শেডে পরানোর পর বাইরে আলো না পড়লেই হল। জানালার বাইরে মাটিতে দাঁড়িয়ে পাহারাদার বেটা ঘরের ভেতর বাতির আলো বুঝলে ক্ষতি তো নেই।

সেটা ঐ পাকিস্তানের খয়ের খা পাহারাদারকে বোঝাবে কে? কাল বোঝাতে গেছিলাম, বহুত গালমন্দ করেছে। সে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার চায়।

লুলু খানিকক্ষণ নীরবে ভাত খেল, তারপর বলল, নিউ মার্কেটে কালো মোটা ড্রয়িংশিট পাওয়া যায়, কিন্তু দাম যে বড়ো বেশি।

আমি শক্ত মুখে বললাম, হোক বেশি। ঐ কুত্তাদের গাল শুনতে পারব না। খেয়ে উঠে চল নিউ মার্কেটে যাই।

জামী এতক্ষণে মুখ খুলল, অলক্লিয়ার সাইরেন দেয় নি কিন্তু এখনো।

আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, না দিক, আমি এর মধ্যেই বেরোব।

খুব মোটা কুচকুচে কালো ড্রয়িংশিট কিনে আনলাম একগাদা। পুরো একেকটা শিট গোল করে সুইসুতো দিয়ে দুই প্রান্ত সেলাই করে লম্বা চোং বানিয়ে বালবের গলায় ঝুলিয়ে দিলাম। বাতি এবার জানালার বাইরে থেকে বোঝা তো দূরের কথা, ঘরের মেঝেতেই পড়ে কি না সন্দেহ। কাচের জানালাতেওবড় বড় শিট ছোট বোমাকাটা ঠুকে এঁটে দিলাম।

এত মোটা শিট, আঠাতে শানাবে না।

সন্ধ্যার পর জানালা বন্ধ করে বাতি জ্বালালাম। বালুবের ঠিক নিচে মেঝেতে চোঙের মাপে গোলাকার একটা আলোর চাকতি; কিন্তু কালো শিট যেন সব আলো শুষে নিয়েছে। এর চেয়ে মোমবাতি জ্বালে যে বেশি আলো হয়! শরীফ, জামী একে একে বাইরে গিয়ে দেখে এসে রিপোর্ট দিল–একদম আঁধার। এবার পাহারাদারকে আমাদেরই গাল দেওয়া উচিত।

৬ ডিসেম্বর, সোমবার ১৯৭১

সকালে বুড়া মিয়া আর রেণুকে দিয়ে রেশন আনিয়ে দশটায় যেই মার বাসায় যাবার জন্য পা বাড়িয়েছি, অমনি বিপদ সঙ্কেত সাইরেন। শরীফ, জামী পড়িমরি ছাদে ছুটল। বাবা অস্থির হয়ে কি সব বলছেন, কান না দিয়ে আমিও আস্তে আস্তে ছাদের দিকে পা বাড়ালাম। রেণুকে ডেকে বলে গেলাম, অ্যাই রেণু। দাদার কাছে বসে থাক।

একতলায় আসার পরও বাবার অস্থিরতা কমে নি। দোতলায় নিজের বিছানা, নিজের ইজিচেয়ার, পাশেই সংলগ্ন বাথরুম–সব জায়গা মুখস্থ হয়ে গিয়েছে, অনেক সময় একাই দেয়াল ধরে ধরে বাথরুমে যেতে পারেন। আমরা যদিও যেতে দিই না, সব সময়ই কেউ না কেউ ওকে ধরি, তবু উনি যে একা পারেন, সেটাই ওর মস্ত মনস্তাত্ত্বিক জোর। একতলার বাথরুমটা খাবার ঘর পেরিয়ে ভেতরের বারান্দা পেরিয়ে গেস্টরুমের পাশে। প্রতিবারই ওকে হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে যাত্রাপথ ও বাথরুমের অবস্থান বোঝাতে হয়, তবু জায়গাটা ওঁর চেনা হচ্ছে না। এ কারণেই মনে মনে বেশ অস্থির হয়ে রয়েছেন। কিন্তু কি করা? আমাদেরও নিজের ঘর, নিজের বাথরুম ছেড়ে নিচে খুব একটা স্বস্তি লাগছে না। তবে সবকিছু একতলার এই খাবার ঘর ও সিঁড়ির নিচে হওয়াতে একটা সুবিধে হয়েছে, স-ব হাতের কাছে। বেশ কমপ্যাক্ট ভাব। আবার অসুবিধেও আছে। সবরকম আলোচনা করার যে সর্বোকৃষ্ট জায়গা ছিল খাবার টেবিল, সেখানে বসে এখন বাবার কান বাঁচিয়ে কথা বলা যায় না। ফিসফিস করলে সন্দেহ করেন। ওকে আবার সব কথা বলাও যায় না। হাই ব্লাড প্রেসার!

তাই নিচে আসার পর থেকে দেখছি খাওয়া শেষ হতে না হতে বাপবেটা বসার ঘরের দূরতম কোণায় চলে যায়। আমি সবসময় হাতের কাজ ফেলে ওদের সঙ্গে গিয়ে বসতে পারি না। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকেই কান খাড়া করে ওদের আলাপ আলোচনায় অংশ নেবার চেষ্টা করি।

সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার শোনার জন্যও আমরা বসার ঘরে চলে যাই। বাবাকে বলি, মেহমান এসেছে। খুব অল্প ভলিউমে বেতারের কথা শুনি। বাবা অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনে ভাববেন, মেহমানরা কথা বলছে। তখন আমরাও কিছু কথাবার্তা বলতে পারি।

আজ দুপুরে আকাশবাণীর খবরে জানলাম ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

শরীফ দুপুরে অফিস থেকে ফিরেই গত কয়েকদিনের একগাদা খবর কাগজ নিয়ে। খাবার টেবিলে বিছিয়ে বসল। আমি বাবার গোসল, খাওয়া তদারকির ফাঁকে ফাঁকে দেখছি, বাপবেটা গভীর মনোযোগ দিয়ে বিভিন্ন কাগজ উল্টেপাল্টে কি কি যেন দেখছে, তারপর কি সব যেন এক টুকরো কাগজে লিখছে, আবার খবর কাগজ দেখছে, আবার লিখছে।

বাবার খাওয়া শেষ হলে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে খাবার টেবিলের কাছে এলাম, এবার তোমাদের কাগজপত্র গোটাও। খাবার লাগাব, দুটো বাজে। কি করছ এগুলো?

কাগজপত্র গোটাতে গোটাতে শরীফ গলার স্বর নিচু করল, খাবার পর সব বলব।

কোনমতে নাকেমুখে গুঁজে খেয়ে উঠেই ওরা দুজন বসার ঘরের দূরতম কোণে গিয়ে আবার ঐ কাগজপত্রের ওপর ঝুঁকে পড়ল।

আজকাল রেণু, তার মা বারোটা-একটার মধ্যেই আগাম ভাত-তরকারি নিয়ে বাড়ি চলে যায়। আমি টেবিল সাফ করতে করতে ওদের কথাবার্তার দিকে কান খাড়া রাখলাম।

জামীর উত্তেজিত গলা একটু চড়ে গেল, পরিষ্কার শুনতে পেলাম, তাতো বুঝলাম, কিন্তু আর্মস আসবে কোত্থেকে?

আমি কাজ ফেলে ওদিকে চলে গেলাম। শরীফ জামীকে বলছে, আর্মস ঠিক সময়ে এসে যাবে।

আমি ওদের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কিসের আর্মস? কি জন্য? আমাকে একটু বল না।

তোমাকে তো বলতেই হবে। জামী আর আমি হিসাব করছিলাম আর কদিন আন্দাজ লাগতে পারে ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর এসে পৌঁছোতেতখন কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। তখনকার জন্য তৈরি হতে হবে এখন থেকেই।

আমার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেল, রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ?

শরীফ জ্বলজ্বলে চোখে বলতে লাগল, মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক কটা দল বিভিন্ন দিক দিয়ে ঢাকার পানে এগোচ্ছে। কদিনের মধ্যেই তারা ঢাকায় ঢুকবে। তখন আমরা যারা শহরের মধ্যে আছি, আমাদেরকে ওদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। ইয়াং ছেলেরা ওদের সঙ্গে যোগ দেবে স্ট্রিট ফাইটে, আমরা যোগান দেব খাবারের, ওষুধের, চিকিৎসার। তুমি এখন থেকেই চাল, ডাল, আলু, বিস্কুট এসব কিনে রাখতে শুরু কর। একসঙ্গে বেশি কিনবে না, দফায় দফায়, একটু একটু করে–যাতে লোকে সন্দেহ না করে। ওই সঙ্গে টিংচার আয়োডিন, বেঞ্জিন, তুলো, ব্যান্ডেজের কাপড়।

আমি হাসলাম, এসব জিনিস এমনিতেই কম কেনা হয় নি। গেস্টরুমে টাল লেগে আছে। সোয়েটার, মাফলার, মোজা, ওষুধপত্রও তো আর কেউ নিতে এল না। সব পড়ে রয়েছে।

পড়ে থাকবে না, পড়ে থাকবে না। ঢাকায় কতোদিন যুদ্ধ চলবে, কে বলতে পারে? তোমার সোয়েটার, মোজা, মাফলার, ওষুধপত্র সব কাজে লেগে যাবে, দেখো।

হঠাৎ আকাশ থেকে প্লেনের ভীষণ কৃড় কুড় শব্দে বাড়িঘর যেন ঝনঝন করে উঠল। এত নিচু দিয়ে প্লেন যাচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে শরীফও কথা বন্ধ করে আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল। যেন সব আলাপ-আলোচনা শেষ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে জামীও। আমি কোমরে দুই হাত চেপে ওদের দিকে কটমট করে তকিয়ে রইলাম।

৭ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১

বাংলাদেশকে ভারত স্বীকৃতি দিয়েছে।

নয়াদিল্লি, ছয়ই ডিসেম্বর। এপিপি/রয়টার।

ভারত আজ বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

দৈনিক ইত্তেফাকের খবরটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রাইলাম। বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন জাতি। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। রুমী এখন কোথায়? তাকে পাক আর্মি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে, এটা সমর্থিত খবর। কিন্তু তাকে মেরে ফেলেছে কি না এটার কোনো সমর্থিত খবর তো আজো পাই নি। পাগলাপীর বলেন রুমী বেঁচে আছে। পাগলাপীরের কাছে যারাই যায়–মোশফেকা মাহমুদ, মাহমুদা হক, ঝিনু মাহমুদ, রাঙামা, নুহেল-দীনু-খনু-লীনু, শিমুল, জেবুন্নেসা, জাহাঙ্গীর, নাজমা মজিদ সবাইকেই পাগলা বাবা ঐ একই কথা বলেন, আছে, আছে, তোর স্বামী বেঁচে আছে। তোর ছেলে মরে নি। তোর ভাই শিগগিরিই ফিরে আসবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল মামুন মাহমুদ, শাহ আবদুল মজিদ, শামসুল হক, আলতাফ মাহমুদ, রুমী, জাহাঙ্গীর, বদি, জুয়েল, আজাদ, বাশার, বাকের–ওরা আজ কোথায়? সবাই বলে পাগলা বাবা খুব শক্তিশালী পীর, নিশ্চয় তার কথা সত্য হবে। ওরা যদি সত্যি সত্যি বেঁচে থাকে তাহলে যে যেখানে আছে, সেখানে কি গতকাল রেডিওর খবর শুনতে পেয়েছে? আজকের কাগজ দেখতে পেয়েছে? ওরা কি জেনেছে পৃথিবীর অন্তত একটি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে? যাদেরকে গাদ্দার বলে, কাফের বলে, পাকিস্তানিরা পিঁপড়ের মতো পিষে মারছে, তাদেরকেই একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে পৃথিবীর অন্তত একটি দেশ? এটা কি ওরা জানতে পেরেছে? আর যদি ওরা সবাই শহীদ হয়ে থাকে, তাহলে কি ওদের আত্মা জানতে পেরেছে এই খবর? জেনে কি শান্তি পেয়েছে ওদের আত্মা?

কাগজের ওপর মাথা নুইয়ে আমি কি বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম? জামী এসে আমাকে ধরে তুলল। তুলে আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিল, জান মা, আর দেরি নেই। খুব শিগগিরই ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ঢুকবে। তবে যুদ্ধটা বড় সহজ হবে না। ঢাকায় পাক। আর্মির ঘাটি তো কম শক্ত নয়। জান মা আমি আর আলী না, আজিমপুর কলোনির ওখানে ডিউটি পাব। আব্বকে বলেছি, আমাকে আর আলীকে যেন দুটো চাইনিজ স্টেন দেয়। ভাইয়ারা আগস্টে ঢাকায় অ্যাকশান করে বাসায় যে স্টেনগুলো এনেছিল, তোমার মনে আছে মা? কি সুন্দর ঝকঝকে অথচ ছোট্ট দেখতে অস্ত্রগুলো। ওর মধ্যে চাইনিজ স্টেনটাই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল। ভাইয়াও কিন্তু একটা চাইনিজ স্টেনের জন্য পাগল ছিল। ওদের দলের মধ্যে কেবল আলম ভাইয়েরই একটা চাইনিজ স্টেন ছিল, আর কারো ছিল না। ভাইয়া না, সুযোগ পেলেই আলম ভাইয়ের স্টেনটা নাড়াচাড়া করত।

জামীর উদ্দেশ্য সফল হল। আমার চোখ থেকে পানি পড়া বন্ধ হল। বললাম, মায়ের বাসায় যেতে হবে। ওঁদের বাজার নেই। বুড়া মিয়া আজ বাড়ি যাবে, তাই বেশি করে বাজার করিয়েছি।

চল দিয়ে আসি।

রান্নাঘরে গিয়ে বুড়া মিয়াকে বললাম, তুমি রান্না শেষ করতে করতে আমি এসে যাব। মায়ের বাজারটা দিয়ে আসি।

ধানমন্ডি ছনম্বর রোডে মার বাসায় বাজার দিয়ে দুচারটে কথাবার্তা বলে বাড়ি ফিরে আসতে না আসতে এক পশলা আকাশযুদ্ধ হয়ে গেল। এরকম আকাশযুদ্ধ শুরু হলেই রাস্তাতে লোকজন, গাড়িঘোড়া সব দাড়িয়ে যায়। এয়ার রেইড সাইরেন আর অল ক্লিয়ার সাইরেনের তফাৎটাও লোকে ভুলে গেছে মনে হয়। সবাই ঊর্ধ্ব মুখে চেয়ে দেখে।

আজ একটা ব্যতিক্রম দেখলাম। আর্মির লোক রাস্তায় দাঁড়ানো ঊর্ধ্বমুখ লোকজনকে গালাগালি করছে। মনে পড়ল আজকের দৈনিক পাকিস্তানে বিমান হামলাকালে.বাইরে থাকা নিজেদের জন্যই বিপজ্জনক–এই শিরোনামে একটা খবর দেখেছি বটে। আহা, বাঙালিদের জন্য ওদের কি মায়া। ভারতীয় বিমানের বোমায় বাঙালি মরলে ওদের কত যে কষ্ট হবে, তাই রাস্তার লোক পিটিয়ে ওদের নিরাপত্তার সুরক্ষা করছে।

বাসায় এসে বুড়া মিয়াকে ছুটি দিলাম। বারবার করে বললাম, ঠিক দুদিন পরে চলে এসো কিন্তু বুড়া মিয়া। দেখছই তো অবস্থা, এদিকে অন্ধ শ্বশুর, ও বাড়িতে মা একলা।

বুড়া মিয়া তার স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে মৃদুকণ্ঠে বলল, আল্লা ভরসা।

৮ ডিসেম্বর, বুধবার ১৯৭১

আজ আবার রেডিওতে বলল, সন্ধ্যা পাঁচটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কারফিউ এবং ব্ল্যাক আউট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত। ছিলইতো বাপু সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কারফিউ, আবার নতুন করে এত ঘোষণা দেবার কি আছে? সন্ধ্যাও আজকাল পাচটাতেই হয়। এদের দেখছি মাথার ঘায়ে কুকুর পাগলের মতো হয়েছে।

আজ রেণু নিজে থেকেই এখানে রাতে থেকে যাবার কথা বলল। বুড়া মিয়া নেই, রেণুকে থাকবার কথাটা বলব বলব ভাবছিলাম, ছোট মেয়ে থাকতে পারবে কিনা, তাও ভাবছিলাম, এখন ওর দিক থেকেই আগ্রহ দেখে স্বস্তি পেলাম। রেণুর বয়স আট-নয় বছর হলে কি হবে, কাজে ও পনের ষোলদের হারিয়ে দিতে পারে। আমি খুব খুশি মনে আমাদের খাটের পায়ের দিকে আমার বিশ্রাম করার সেই চৌকিটা আবার এনে পাতলাম। রেণুর শোবার জন্য। উঃ। বাচা গেল। রেণু থাকা মানেই বাবার জন্য কোন দুশ্চিন্তা রইল না। আমি যখন-তখন দৌড়ে ছাদে যেতে পারব।

আজ সকাল সাড়ে আটটাতেই একবার আকাশযুদ্ধ হয়ে গেছে।

ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

আমাদের চেনাজানা প্রায় সবাই ব্যাঙ্ক থেকে টাকা উঠিয়ে রাখছে। আর ন্যাশনাল ডিফেন্স সার্টিফিকেট ব্যাঙ্কে জমা রেখে তার বদলে নগদ টাকা ধার নিচ্ছে। সবাই বলছে, কখন কি হয়, শেষে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারি কি না। ব্যাটাদের দিন তো। ঘনিয়ে এল। হয়তো বা যাবার আগে ব্যাঙ্কের সব টাকাও জ্বালিয়ে দিতে পারে, প্লেনে করে ওদিকে নিয়েও যেতে পারে। তার চেয়ে যতটা পারা যায় নগদ টাকা কাছে থাকুক।

কিন্তু এত নগদ টাকা ঘরে রাখাও তো খুব সহজ নয়। যেকোন সময় পাক আর্মি বাসায় ঢুকে সার্চ করে নিয়ে যেতে পারে। বাড়ির চাকরেও নিয়ে পালাতে পারে। তাই অনেকেই টাকা বয়ামে বা কৌটোয় ভরে মাটিতে পুঁতে রাখছে।

শরীফও তার সবগুলোন্যাশনাল ডিফেন্স সার্টিফিকেট ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে টাকা ধার নিয়েছে। তাছাড়াও চার দফায় পাঁচ হাজার করে মোট বিশ হাজার টাকা ব্যাঙ্ক থেকে উঠিয়েছে। দশ হাজার অফিসের সেফ রেখেছে, দশ হাজার বাড়িতে এনেছে। আমি টাকাগুলো ছোট ছোট বান্ডিলে চালের বস্তার ভেতরে, জুতোর বাকসের তলায়–এরকম সব জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি। অন্যদের মতো মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করে পোঁতার হাঙ্গামা আর করতে ইচ্ছে হয় না।

তাছাড়া এসব টাকা তো কয়েকদিন পরে কাজেই লেগে যাবে, রাস্তাযুদ্ধ শুরু হলে।

দুপুরে ভাত খেতে খেতে শরীফ বলল, আজ বাঁকারা ধানমন্ডির বাড়ি থেকে উয়ারী চলে যাচ্ছে।

কেন?

উয়ারীতে মিসেসের এক বোন থাকেন, সেখানে থাকবে। ধানমন্ডির বাড়ির পুরো পেছনটা তো ই.পি.আর-এর এলাকা। ওখানে একটা এন্টি এয়ার ক্র্যাফট গান বসানো আছে।

তার জন্যে?

ওটার জন্যই বাঁকাদের বাড়িটা আমাদের দরকার হবে। তাই ওকে বলেছিলাম অন্য কোথাও সরে যেতে।

জামীর দুচোখ উত্তেজনায় চকচক করছে। সে রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, আব্ব আমাকে আর আলীকে বাঁকা চাচার বাড়িতে

শরীফ হেসে ধমক দিল চো–প! ডিসিপ্লিন ভঙ্গ কছ। তোমরা আজিমপুর। কলোনির তিনতলার ছাদে পজিশন নেবে। যোদ্ধারা কখনো অর্ডার অমান্য করে না।

আমার সারা শরীর শিরশির করছে। কারফিউ মোড়া এই অবরুদ্ধ শহরে ব্ল্যাকআউটের কালো কাগজ মোড়া এই কবরের মত ঘরে বাস করতে করতে, স্বাধীন বাংলা বেতার আর চরমপত্র শুনে শুনে কোনমতে মনোবল খাড়া রাখি। যতই দিন যাচ্ছে মনে হচ্ছে আর পারছি না। এর মধ্যে এ ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতির কথাবার্তা নিঃসন্দেহে সারা শরীরে জীবনীশক্তি প্রবাহিত করে দিচ্ছে।

১০ ডিসেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

বুড়া মিয়ার আজ ফেরার কথা কিন্তু এখনো ফেরে নি। ড্রাইভারকে দিয়ে বাজার করিয়ে রেণুর মাকে কুটতে বসিয়ে দুই হালি ডিম আর এক শিশি গ্লিসারিন নিয়ে মার বাসায় গেছি। সেখান থেকে জুবলীর বাসা হয়ে তার খোঁজখবর নিয়ে বাসায় ফেরার পথে লক্ষ্য করলাম বহু লোক রিকশায়, বেবিতে বোঁচকা-কুঁচকি, সুটকেস নিয়ে চলেছে। অনেকে ঘাড়ে-মাথায়-হাতে পুঁটলি নিয়ে হেঁটেও যাচ্ছে। কি ব্যাপার! আরেকবার লোকজন ঢাকা ছাড়ছে নাকি?

বাসায় ঢুকতেই দেখি ঘর ভর্তি করে মেহমানরা বসে আছেন ফকির, আমীর হোসেন, বাবলু, চাম্মু, হোসেন সাহেব, ডাঃ এ. কে. খান। সবার মুখে একই আলোচনা–গতকাল ও পরশু রাতে তেজগাঁও শিল্প এলাকা ও এতিমখানায় যে বোমা পড়েছে, তা নাকি ইচ্ছাকৃত সেমসাইড।

আমি বললাম, রাস্তায় দেখলাম লোকজন সব ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

এ.কে. খান বললেন, ঢাকায় জোর গুজব, মুক্তিযোদ্ধারা নাকিঢাকার সিভিলিয়ানদের শহর ছেড়ে চলে যেতে বলছে–এখানে নাকি খুব ফাইট হবে?

আমীর হোসেন বললেন, কই, আমি তো শুনিনি…। হোসেন সাহেব জিগ্যেস করলেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কিছু বলেছে এ বিষয়ে? সে রকম ঘোষণার মত করে বলে নি। তবে কথিকায়, চরমপত্রে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে।

ঢাকার অবস্থাও খবু ভালো নয়। কাল থেকে তো সব স্কুল-কলেজ বন্ধ দিয়ে দিয়েছে।

–তাই নাকি?

কেন, আজকের কাগজে দেখেন নি? সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা।

–অবস্থা তাহলে সত্যি কুফা?

আলোচনা চলতেই থাকে। আমি চা বানিয়ে নাশতা ধরি মেহমানদের সামনে। প্রায় দুটো বাজে। কারো ওঠার নাম নেই।

রেণুর মা অস্থির হয়ে উঠেছে বাড়ি ফেরার জন্য। ওর বাড়ি সেই কামরাঙ্গীর চরে। হেঁটে যেতে যেতেই বেলা ফুরিয়ে আসবে।

বসার ঘরে তর্কমুখর মেহমানদের রেখে আমি রান্নাঘরে গেলাম রেণুর মাকে আগাম ভাত বেড়ে দিতে।

১১ ডিসেম্বর, শনিবার ১৯৭১

বুড়া মিয়া আজো ফেরে নি। রেণু একরাত থেকেই আবার বাড়ি চলে গেছে, ফলে কাজের চাপ পড়ে গেছে বড়ো বেশি। শরীফ-জামী আগে ঘরের কাজে বেশ সাহায্য করত, চার তারিখ থেকে ওরা দুজন একদম বদলে গেছে। খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া প্রায় সবসময়ই ছাদে। অফিসে যাওয়ার সময়ও অনিয়মিত হয়ে গেছে চার তারিখের পর থেকে।

বুড়া মিয়া সব সময় কথা ঠিক রেখেছে। এবার আর পারল না দেখছি। যা পরিস্থিতি দেশের, তারই বা কি হয়েছে কে জানে!

আমি রোজই কাজের ফাঁকে ফাঁকে বেরিয়ে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, আটা, চিনি, সুজি, বিস্কুট–অল্পে অল্পে বিভিন্ন দোকান থেকে কিনে কিনে গেস্টরুমটায় টাল করছি।

আজ হঠাৎ বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে কারফিউ! না জেনে নিশ্চিন্তে বাজার করে পৌঁনে চারটেয় বাসায় ফেরার পথে দেখি লোজন, রিকশা উধ্বশ্বাসে ছুটছে।

কি যে উল্টোপাল্টা সব কারবার আরম্ভ হয়েছে। কখন কারফিউ দিচ্ছে আর কখন তুলছে কোনো মাথামুণ্ডু নেই। আর মাথা ঠিক থাকে কি করে? দেশের সবখানে যা অবস্থা! আজকের দৈনিক পূর্বদেশে একটা খবর পড়লাম : লাকসাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হালুয়াঘাট, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও খুলনায় প্রচণ্ড লড়াই।

এটা হল একটা হেডিং। এর চেয়ে ডবল মোটা হেডিং দিয়ে এর নিচেই আবার লেখা: স্থলে জলে অন্তরীক্ষে হানাদার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।

পড়ে খানিকক্ষণ একা একা হাসলাম। এই হানাদার বাহিনী, কোন হানাদার বাহিনী, বুঝতে আর বাকি নেই। তাইতে ওদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

১২ ডিসেম্বর, রবিবার ১৯৭১

আজ সারা দিন কারফিউ ওঠে নি। আজো কিছু কেনাকাটা করতে বেরুবো ভাবছিলাম, তা আর হলো না। এয়ার রেইড সাইরেন অগ্রাহ্য করে রাস্তায় বেরোনো যায়, কিন্তু কারফিউ থাকলে সবাই নাচার।

যেন খুব একটা সুযোগ পাওয়া গেছে, এমন একটা ভাব করে শরীফ-জামীর দিকে। চেয়ে বললাম, এই সুযোগে গেস্টরুমটা গুছিয়ে ফেলি। ওরা রেডিও বগলে সিঁড়ির দিকে মুখ করেছিল, আমার কথায় আবার ঘুরে দাঁড়াল। ওদের নিয়ে আমি গেস্টরুমের তালা খুলে ঢুকলাম। এটা অবশ্য এখন স্টোররুম–কেউ বেড়াতে এসে হঠাৎ যাতে এ ঘরে এত জিনিসপত্র দেখে না ফেলে, তার জন্য তালা। চাল, ডাল, আলু, পেয়াজ ইত্যাদি সব জিনিসই এখনো ছোট ছোট চটের থলে, কাগজের ঠোঙ্গা, পলিথিনের ব্যাগে রয়েছে। তুলো, ব্যান্ডেজ, ডেটল, এম্পিরিন আরো অন্যান্য ওষুধ সব ছোট ছোট বাদামী প্যাকেটে। শরীফ সারা ঘরের ওপর চোখ বুলিয়ে বলল, এসব গুছিয়ে রাখা ঠি নয়। এভাবেই ক্যামাফ্লেজড হয়ে থাকা ভালো, হঠাৎ কেউ ঘরে ঢুকে যেন টের না পায়! বলেই অ্যাবাউট টার্ন করতে উদ্যত হল। আমি খুব শিষ্টি করে তীক্ষ্ণ গলায় বললাম, ঠিক আছে, কিন্তু এমার্জেন্সির সময় চট করে যাতে ঠিক জিনিসটি তুলে নিতে পারি, তার জন্য একটু সিজিল করে রাখা উচিত নয় কি? ধরো গুরুতর জখম একটা মুক্তিযোদ্ধাকে ব্যান্ডেজ করতে হবে, তখন যদি এই একশোটা প্যাকেটের মধ্যে তুললা খুঁজতে পনের মিনিট লেগে যায়…

জামী একলাফে আমার পাশে এসে গলা জড়িয়ে ধরে বলল, প্রমিস করছি মা, সন্ধ্যাবেলা স-ব প্যাকেট সিজিল করে দেব। এখন তুমিও চল ছাদে, কেন ফারফিউ ওঠায় নি আজ, সেটা ছাদে না গেলে টের পাওয়া যাবে না।

আমি ভেঙচে উঠলাম, তুমিও চল ছাদে! দাদাকে একা ফেলে–

জামী বেশ সাহসী আর একটু কুটকচালে হয়ে উঠেছে আজকাল। আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে জড়িয়ে ধরে টেনে খাবার ঘরের দিকে নিতে নিতে গলা চড়িয়ে বলল, দাদা, খানিকক্ষণ একা বসে থাকুন। মাকে ওপরে নিয়ে যাচ্ছি, আলমারি খোলাতে হবে। আল্লু বাথরুমে গেছে। (আব্দু পাশেই দাঁড়িয়ে।)

বাবা চুপ করে খাটের পাশের ইজিচেয়ারে পড়ে রইলেন। তিনিও একয়দিনে বাড়ির সবার হালচাল বুঝে গেছেন। সেদিন ছেলে ও নাতিকে এয়ার রেইড প্রিকশানের কথা বোঝাতে গিয়ে নিজেই যেন অন্যরকম বুঝে গেছেন। আর কাউকে কিছু জিগ্যেস করেন না।

আমি ওদের দুজনের সঙ্গে ছাদে গেলাম বটে, কিন্তু খানিক পরেই নিচে নেমে এলাম। বাবাকে সত্যি সত্যি তো বেশিক্ষণ একা ফেলে রাখা যায় না।

তবু বাবাকে দেখা ও রান্নার কাজের ফাঁকে ফাঁকে আজ বহুবার ছাদে গেলাম।

এয়ারপোর্টের দিকে দেখা যাচ্ছে তিনটে প্লেন বারবার করে নিচে নামার চেষ্টা করছে, আবার ওপরে উঠে যাচ্ছে। আমাদের ছাদের ঘরের উত্তরের জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায়। জাতিসংঘের কর্মচারীদের ঢাকা থেকে অপসারণের জন্য ওই চেষ্টা। কিন্তু ভারতীয় বিমান বোমা ফেলে রানওয়েটা বেশ ভালো জখম করে রেখেছে। সকাল থেকে বিকেল তিনটে পর্যন্ত প্রাণান্ত চেষ্টা করে প্লেনগুলো নামল, খানিক পরে উঠেও গেল। ওরা উড়ে চলে যাবার পরপরই ফটাফট দুটো বোমা রানওয়েতে মেরে দিয়ে গেল ভারতীয় প্লেনগুলো।

আরো ভালো করে দেখার জন্য সিড়িঘরের ছাদের টঙে জামী একবার উঠেছিল। ওখানে উঠলে এলিফ্যান্ট রোডের বুকটাও দেখা যায়। জামী নেমে এসে বলল, আচ্ছা মা, সারাদিন কারফিউ অথচ এ্যাতো মাইক্রোবাস যাচ্ছে কেন রাস্তা দিয়ে? ওগুলো তো মিলিটারি গাড়ি নয়।

১৩ ডিসেম্বর, সোমবার ১৯৭১

আজ আটটা-দুটো কারফিউ নেই। আমার বাজার ও রান্না দুই-ই সারা আছে, তবু শরীফের কথামত আরো চাল ডাল লবণ, তেল, বিস্কুট ইত্যাদি কেনার জন্য বাজারে বেরুলাম। শরীফ গাড়ি নিয়ে অফিসে গেল, জামী বাবার কাছে থাকল, আমি লুলুকে নিয়ে প্রথমে মার বাসায় যাবার জন্য বেরিয়ে দেখি রিকশা পাওয়া মুশকিল। সব। রিকশাই বোঁচকা-কুঁচকি-সুটকেসসহ যাত্রী নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। কোথায় ছুটছে কে জানে। বেশ খানিকটা হেঁটে একটা খালি রিকশা পেলাম। ওটাকে আর ছাড়লাম না।

মার বাসায় গিয়ে দেখি ওর খালি একতলাটায় লালুর বান্ধবী আনোয়ারা সপরিবারে। এসে উঠেছে। ওরা পোস্তগোলার দিকে থাকে, ওখান থেকে ভয় পেয়ে এ পাড়াতে চলে এসেছে। ওদের দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। যাক মার জন্য আমাকে আর অত ভাবনা করতে হবে না।

ওই রিকশা নিয়েই বাজার সেরে বাসায় আসতে আসতে বারোটা। যদিও ফ্রিজে রান্নাকরা মাছ-তরকারি আছে, তবু আরো মাছ-গোশত্ কিনে এনেছি। আবার কখন। চব্বিশ ঘন্টার কারফিউ দেয়, কে জানে। রান্নাঘরে তিনটে চুলো ধরিয়ে গোশত, মাছ আর ভাত বসালাম। একটু পরে শরীফ এলো অফিস থেকে। রান্নাঘরে একবার মাত্র উঁকি দিয়েই ছাদে চলে গেল। দেখেই আমার রাগ হল। চেঁচিয়ে জামীকে ডেকে বললাম, দাদাকে গোসলখানায় নিয়ে যাও। গোসল হলে ভাত খাওয়াও। খবরদার এখন ছাদে যাবে না। খুনোখুনি হয়ে যাবে তাহলে।

দুপুরে টেবিলে খেতে বসে আমি একটাও কথা বললাম না। ওরাও সব চুপ। দেড়টা বেজে গেছে। দুটোয় কারফিউ শুরু। খেয়ে উঠেই লুলু চলে গেল।

আমিদুহাতে ডাল ও গোশতের বাটি তুলে প্যাস্ট্রিতে রেখে আবার এ ঘরে আসতেই দেখি, রেডিও বগলে শরীফ গুটিগুটি সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। তার পিছু পিছু জামী। দিনে দিনে ওদের স্বার্থপরতা বাড়ছে। আগে তবু নিচে থাকত, সাইরেন বাজলে কিংবা প্লেনের শব্দ পেলে তখন দুদ্দাড় উঠে যেত এখন তাও করে না। আগে থেকেই উঠে গিয়ে বসে থাকে। দাঁত কিড়মিড় রাগের মধ্যেই হঠাৎ খেয়াল হল আরে! আমিই তো শরীফকে বলেছি সবসময় অমন দুদ্দাড় করে জোরে সিঁড়ি না ভাঙতে–ভাত খাওয়ার পর তো নয়ই। এতে শরীরের ক্ষতি হতে পারে।

একা একাই হেসে ফেললাম। কি যে ছেলেমানুষের মত রাগ করি। যুদ্ধের টেনশান আমারও মন মাথায় ঢুকে গেছে দেখছি।

তাছাড়া শরীফেরও তো কষ্ট কম নয়। আগস্ট মাসে পাক আর্মি ওর ওপর যে টর্চার করেছিল, তারপর থেকে ওর শরীরটা আর আগের মত নেই। যদিও অফিস করছে, আমার সঙ্গে পাগলা বাবার বাসায় যাচ্ছে, টেনিস খেলছে, শত্রুর নাকের ডগায় বসে বিপজ্জনক কাজ-কারবারের বিলি বন্দোবস্ত চালিয়ে যাচ্ছে, তবু ক্রমাগত ওঁর ওজন কমে যাচ্ছে। আজকে দুপুরে খাবার সময় ওর মুখটা খুব বিষন্ন দেখাচ্ছিল।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে দোতলায় উঠে বাথরুমে ঢুকলাম। দুদিন গোসল করা হয় নি, গোসলটা সেরেই ছাদে রোদে দিয়ে বসবো। যদিও সব ব্যবস্থা নিচেই, তবু নিজের বাথরুমে গোসল না করলে আমার তৃপ্তি হয় না। তাই প্লেনের কড়কড়ানি থাকলেও সেটা খানিকক্ষণের জন্য উপেক্ষাই করি।

বেডরুমে আমাদের ডবল খাটে ছোবড়ার জাজিম উদোম হয়ে পড়ে রয়েছে। ওপরের পাতলা তোষক, চাদর, বালিশ, সব নিচে। আজ ভোরে ফজরের নামাজের পরে আমরা দুজনে খানিকক্ষণের জন্য এই খসখসে ছোবড়ার গদির ওপর এসে শুয়েছিলাম।

গোসল সেরে বেডরুমে পা দিয়েই চমকে গেলাম। শরীফ ছোবড়ার গদির ওপরে এলোমেলোভাবে উবুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। ছুটে ওর কাছে গিয়ে বললাম, কি হয়েছে? এখানে এমনভাবে শুয়ে কেন?

শরীফ খুব আস্তে বলল, বুকে ব্যথা করছে। নিশ্বাস নিতে পারছি না।

পিঠে হাত দিয়ে দেখলাম ঘামে গেঞ্জি-শার্ট ভিজে সপসপ করছে। ওগুলো খুলে গা মুছিয়ে শুকনো জামা পরিয়ে দিলাম। তারপর ফোন তুলে ডাঃ এ. কে. খানকে ডাকলাম। উনি সঙ্গে সঙ্গে ওঁর ডাক্তারি ব্যাগ নিয়ে চলে এলেন।

স্টেথেস্কোপ দিয়ে শরীফকে পরীক্ষা করতে করতে জিগ্যেস করলেন, পা ঝিনঝিন করছে কি? ঘাম হয়েছিল?

শরীফ বলল, পা ঝিনঝিন করছে।

আমি বললাম, ঘামে একেবারে নেয়ে উঠেছিল। এই দেখুন আবার ঘামছে।

এ. কে. খানের মুখ গম্ভীর হলো। ব্যাগ থেকে একটা অ্যামপুল বের করে শরীফকে ইনজেকশান দিলেন। তারপর বললেন, এটা ওর প্রথম হার্ট অ্যাটাক। এটার জন্য যে ওষুধ দরকার, তা আমার কাছে ছিল, দিয়েছি। কারো কারো দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক খুব তাড়াতাড়ি হয়। সে রকম হলে আমার কাছে আর ওষুধ নেই। সুতরাং সময় থাকতে হাসপাতালে রিমুভ করাই ভালো।

বাঁ পাশের বাড়ির প্রতিবেশী ডাঃ রশীদ পিজি-র সুপারিন্টেন্ডেন্ট। ওঁকে ফোন করে পি.জি.তে শরীফের ভর্তির ব্যবস্থা এবং এম্বুলেন্সের জন্য অনুরোধ করলাম।

কে জানে কদিন হাসপাতালে থাকতে হয়। এ. কে. খান বললেন, কিছু কাপড়জামা, বিস্কুট, এক বোতল পানি, মোমবাতি, টচ এগুলো গুছিয়ে সঙ্গে নিন।

শরীফ বলল, বাঁকা আর মঞ্জুরকে ফোন করে খবরটা দাও। বাঁকা কিন্তু উয়ারীতে থাকছে না। ওকে অফিসের তিনতলার ফোনে পাবে।

ফোন ঘুরালাম। মঞ্জুরের ফোন এনগেজড, বাঁকার ফোন কেউ ধরছে না। এম্বুলেন্স এসে গেছে। এ. কে. খানও আমাদের সঙ্গে হাসপাতালে যাবেন বলেছেন। সানু এসে রাতে এ বাড়িতে থাকবে। কারণ বাবা বেশি বুড়ো, অথর্ব। আর জামী ছেলেমানুষ। রাতে আবার যদি কিছু হয়, জামী একা সামাল দিতে পারবে না।

এখন বিকেল পাঁচটা। এলিফ্যান্ট রোডের নির্জন রাস্তা দিয়ে এম্বুলেন্স ছুটে চলেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার দ্রুত চারদিক ঢেকে ফেলেছে। এরই মধ্যে পশ্চিম আকাশের লালচে রঙটা কেমন যেন ভয়াবহ দেখাচ্ছে। চারদিকে ফুটফাট শব্দ হচ্ছে বন্দুকের, গ্রেনেডের। মাঝে-মাঝে ঠাঠাঠাঠা–মেশিনগানের। প্লেনের আনাগোনা কেন জানি খানিকক্ষণ নেই বললেই চলে। মাঝে-মাঝে জীপ বা মাইক্রোবাস হুশ করে চলে যাচ্ছে।

শরীফকে পি.জির তিনতলায় ইনটেনসিভ কেয়ার ওয়ার্ডের সামনে তোলা হয়েছে। ভেতরে বেড রেডি করা হচ্ছে, শরীফ বারান্দার মেঝের স্ট্রেচারের ওপর শুয়ে। তার বা পাশে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে আমি তার হাত ধরে রয়েছি। ডান পাশে দাঁড়িয়ে এ, কে, খান আর পি.জি.র ডিরেক্টর প্রফেসর নুরুল ইসলাম।

প্রফেসর ইসলাম আমাদেরও বেশ ঘনিষ্ঠ পরিচিত। উনি নিজে দাড়িয়ে থেকে বলে দিচ্ছেন : ধোপর ধোয়া চাদর যেন বের করে পাতা হয়, কম্বল যেন পরিষ্কার দেখে দেওয়া হয়। কোনদিক দিয়ে যত্নের যেন ক্রটি না হয়।

ইনটেনসিভ কেয়ার ওয়ার্ডের ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের স্পেশাল কেয়ার নেবার নির্দেশ দিয়ে প্রফেসর নুরুল ইসলাম দোতলায় নেমে গেলেন। দোতলার কেবিনগুলোতে পি.জি.র অনেক ডাক্তার সপরিবারে এসে উঠেছেন। প্রফেসর ইসলামও তার ফ্যামিলি নিয়ে একটা কেবিনে আছেন।

দেখতে দেখতে গোধূলির আবছায়া মুছে রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। ইনটেনসিভ কেয়ার ওয়ার্ডের কাচের জানালাগুলো বিরাট বিরাট–সব দরজার মাপের। কোন কাচে কাগজ লাগানো নেই, পর্দাগুলো টেনে ঠিকমত ঢাকা যায় না। কোনখানে পর্দাও নেই।

শরীফকে তার পরিষ্কার চাদরপাতা বেড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যেও শরীফ আমাকে বলছে, মঞ্জুরকে ফোন করে খবরটাও দাও। এ. কে. খান বলেছেন, শরীফ একদম কথা বলবে না। চুপচাপ রেস্টে থাক।

অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি আমার ব্যাগ থেকে একটা মোমবাতি বের করে জ্বালাতেই পি.জি.র কর্তব্যরত ডাক্তার হাঁ হাঁ করে উঠলেন, বন্ধ করুন। নিচে গার্ডরা দেখলে চিল্লাচিল্লি করবে।

আমি হকচকিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে বললাম, কিছু যে দেখা যাচ্ছে না, কাজ করবেন কি করে?

টর্চ আছে? টর্চ থাকলে দিন। অন্য একজন ডাক্তার বললেন, গার্ডগুলো এমন হারামী না, বাতি দেখলেই ওপর মুখ করে গুলি ছুড়ে বসে।

শরীফ বলল, আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অক্সিছেন…

অক্সিজেন সিলিন্ডার আনতে গেছে। বুঝলেন, অক্সিজেনের একটু ঘাটতি আছে।

এখন প্রায় সাড়ে ছটা বাজে। এখনো অক্সিজেন এল না। শরীফের শ্বাস নিতে খুব। কষ্ট হচ্ছে। ডাঃ এ. কে. খান ওর নাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। শরীফ বলল, অক্সিজেনের। জন্য মঞ্জুরকে ফোন কর। ও যোগাড় করে দিতে পারবে। ডা. এ. কে. খান বললেন, কথা বোলো না। একদম চুপচাপ রেস্টে থাক।

অক্সিজেন সিলিণ্ডার একটা নিয়ে এল ওয়ার্ড বয়। কিন্তু সিলিণ্ডারের মুখের পঁাচটা খোলার রেঞ্চটা আনে নি।

রেঞ্চ কই? রেঞ্চ আনো, শিগগির। একজন ডাক্তার চেঁচিয়ে উঠলেন।

রেঞ্জ তো স্যার দুইতলায় নিয়া গেছে।

হাত দিয়ে সিলিণ্ডারের মুখে প্যাচটা ঘোরাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে কর্তব্যরত ডাক্তার আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, এ ওয়ার্ডের রেঞ্চ কেন দোতলায় দেওয়া হয়েছে? দৌড়াও, রেঞ্চ নিয়ে এস।

অন্ধকারে সাবধানে হোঁচট বাঁচিয়ে ওয়ার্ড বয়টা দৌড়াল।

শরীফ খুব ছটফট করছে। এ. কে. খান তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বারবার মৃদুকণ্ঠে বলছেন, একটু ধৈর্য ধরে চুপচাপ থাকো শরীফ। একদম কথা বলো না, নোড় না। এখনি সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

শরীফ ছটফটানির মধ্যেই আবার জিগ্যেস করল, মঞ্জরকে ফোন করতে পেরেছ?

আমার কান্না পাচ্ছে। এই অন্ধকারে কোথায় ফোন কোনদিকে যাব? আমার আনা টর্চটা নিয়েই ডাক্তাররা কি কি যে করছে, কিছুই বুঝি না।

একজন ডাক্তার হঠাৎ এ. কে. খানকে বলল, স্যার পেশেন্টকে পাশের ছোট ঘরটাতে নিয়ে যাই, ওখানে জানালা নেই, মোমবাতি জ্বালানো যাবে। ওখানে ডিফিব্রিলেটার মেশিনটা আছে।

অতএব, আবার শরীফকে স্ট্রেচারে তুলে টর্চের আলোয় পথ দেখে দেখে পাশের ছোট ঘরে নেওয়া হল। ঘরটা আসলে অন্য একটা ঘরের কিছুটা অংশ পার্টিশন করা–সরু অংশ। একটি মাত্র বেড, বেডের পাশে একটা মেশিন। দুপাশে এত কম জায়গা দুতিনজন তোক কোনমতে দাঁড়াতে পারে। এখানে এসে একটা মোমবাতি জ্বালালাম। শরীফকে বেড়ে তোলা হল। আমি ফোনের খোঁজে দরজা দিয়ে বারান্দায় এসে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার দেখে হতাশ হয়ে আবার ঘরের ভেতর ঢুকে তাকিয়েই আঁতকে উঠলাম। পি.জির কর্তব্যরত ডাক্তার দুজন শরীফের বেডের দুপাশে দাঁড়িয়ে হাতে করে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিচ্ছেন। আমি এ. কে, খানকে জিগ্যেস করলাম, মেশিনটা? মেশিনটা লাগাচ্ছেন না কেন?

শরীফের বুকে হাতের চাপ দিতে দিতে একজন ডাক্তার বললেন, লাগাব কি করে? হাসপাতালের মেইন সুইচ বন্ধ। ব্ল্যাক আউট যে।

হাসপাতালের মেইন সুইচ বন্ধ রেখে ব্ল্যাক আউট? এমন কথা তো জন্মে শুনি নি। তাহলে মরণাপন্ন রোগীদের কি উপায় হবে? লাইফসেভিং মেশিন চালানো যাবে না?

১৪ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১

শরীফকে বাসায় আনা হয়েছে সকাল দশটার দিকে। মঞ্জুর, মিকি–এরা দুজনে ওদের পরিচিত ও আত্মীয় পুলিশ অফিসার ধরে গাড়িতে আর্মড পুলিশ নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটা পিকআপ যোগাড় করে হাসপাতাল থেকে ওকে নিয়ে এসেছেন।

সকালবেলায় প্লেনের আনাগোনা একটু কমই ছিল। আজ কারফিউ ওঠে নি। তবু আমাদের গলিটা কানা বলে, খবর পেয়ে সব বাড়ির লোকেরা এসে জড়ো হতে পেরেছেন। খবর পেয়ে আনোয়ার তার বোর্ড অফিসের মাইক্রোবাসটা অনেক ঝঞ্ঝাট করে নিয়ে এসেছে। সঙ্গে এসেছে শেলী আর সালাম। ওই মাইক্রোবাস পাঠিয়ে মা আর লুলুকে আনা হয়েছে ধানমন্ডির বাসা থেকে। মঞ্জুর তার গাড়িতে কয়েকটা ট্রিপ দিয়ে এনেছেন বাঁকাকে, ফকিরকে, আমিনুল ইসলামকে। ডাব্লিউ. আর. খান যোগাড় করে দিয়েছেন কাফনের কাপড়।

বাড়ির পাশের খালি জায়গাটাতে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন লোক দুপুর সাড়ে বারোটায় জানাজায় শামিল হলেন। চার-পাচটা গাড়িতে করে জনাকুড়ি লোেক গোরস্থানে গেলেন। সানু, খুকু, তার মঞ্জু আমার কাছে রইল। বাবা একেবারে নির্বাক হয়ে তার। ইজিচেয়ারে পড়ে রয়েছেন।

দেড়টা থেকে হঠাৎ প্লেনের কড়কড়ানি বেড়ে গেল। বারেবারে খুব নিচু দিয়ে প্লেন এলিফ্যান্ট রোড এলাকার ওপর ভীষণ শব্দ করে উড়ে যেতে লাগল। যারা গোরস্থানে গেছে তাদের জন্য খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম। দুটোর মধ্যে সবাই ফিরে এলেন। জামীকে পৌঁছিয়ে আমার সঙ্গে দুচারটে কথা বলে যে যার বাসায় চলে গেলেন। আমার দুই ভাগনী ইভা ও সুরত, জামীর বন্ধু আলী, মা আর লুলু এ বাসায় রয়ে গেল।

গত রাত থেকে কিছু মুখে তুলতে পারি নি, আলসারের ব্যথা নিয়ে নিঃসাড়ে বিছানায় পড়েছিলাম। ওধারে মা বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে কাদছেন, লালু বাবার হাত ধরে মৃদুকণ্ঠে তাকে সান্তনা দিচ্ছে। জামী এসে সামনে দাঁড়িয়ে হুহু করে কেঁদে উঠে বলল, মা আমার আর যুদ্ধ করা হল না।

আমি উঠে বসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম, ও কান্নার সঙ্গে চিল্কার করে হাত মাথা ঝাকিয়ে বলতে লাগল, আমি ওদের দেখে নেব। ওরা ভাইয়াকে কেড়ে নিয়েছে,

ওরা আব্দুকে খুন করেছে, ওদের ছেড়ে দেব না।

আলী এসে জামীকে ধরে ওপাশে নিয়ে গেল, মা কান্না থামিয়ে ওর কাছে গেলেন।

হঠাৎ ভীষণ কড়কড় শব্দে প্লেন উড়ে গেল, মনে হল যেন আমাদের বাড়ির ছাদ ধসিয়ে দিয়ে গেল। তার পরপরই ভীষণ আর্তনাদে চারদিক ছেয়ে গেল। আমরা সবাই চকিত হয়ে উঠলাম। কি ব্যাপার! আশপাশে কোথাও বোমা পড়ল নাকি?

সকাল থেকেই বহুজনের মুখে গুজব শুনছি নিয়াজী নাকি এলিফ্যান্ট রোডের একটা হলুদ রঙের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আরো শুনছি, মোহসীন হলে, ইকবাল হলে, সলিমুল্লা হলে পাক আর্মিরা পজিশান নিয়েছে। তাই এ পাড়ায় এত ঘনঘন, এত নিচু দিয়ে ইন্ডিয়ান প্লেন উড়ছে।

একটু পরেই আমাদের দরজায় ঘন ঘন ধাক্কা পড়তে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই ভয়ে শিটিয়ে গেলাম। কিন্তু তামুহুর্তমাত্র। ধাক্কার সঙ্গে বহু কষ্ঠের কান্না ও কথার শব্দ ভেসে আসতেই আমরা সবাই দৌড়ে দরজার দিকে গেলাম। জামী দরজা খুলতেই দেখি বারান্দায় রক্তাক্ত দেহে এলিয়ে পড়ে আছে সামনের বাদিকের বাড়ির আকবর, ওকে ঘিরে ওদের বাড়ির সবাই কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে মাতম করছে। ওদের পাশের বাড়ির আমির হোসেনরাও সবাই ভয়-বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়ে।

কান্না, আর্তনাদ এবং টুকরো কথার ভেতর দিয়ে ঘটনা জানা গেল। আকবরদের বাড়িতে বোমা পড়েছে। ওরা প্লেনের শব্দ শুনেই ছাদে দৌড়েছিল, বোমা পড়বে ভাবতে পারে নি। বোমার আঘাতে আকবরদের বাড়ির পেছনের অংশ এবং আমির হোসেনদের বাড়ির কোণা ধসে গেছে। দুটো ছোট ছেলেমেয়ে ছাদে মারা গেছে, আকবর গুরুতর জখম। ও বাড়ির সবাই আকবরকে তুলে আমাদের বাড়িতে চলে এসেছে।

জামী আর আলী রক্তাক্ত আকবরকে তুলে ভেতরে এনে ডিভানটার ওপর শুইয়ে দিল। বাকিরা কেউ সসাফায়, কেউ চেয়ারে, কেউ মেঝেতে পড়ে কান্নাকাটি করতে লাগল। আমার দুদিনের না-খাওয়া শরীরে কোথা থেকে জোর এল জানি না। বাড়িতে তিনজন সদ্য পাস করা ডাক্তার ইভা, সুরত ও খুকু। আমি ওদেরকে বললাম, তোরা প্রথমে দেখ কার কতটা জখম হয়েছে। আমি মেডিক্যালে ফোন করছি এম্বুলেন্স পাঠানোর জন্য। ভাগ্যক্রমে একবার ডায়াল করেই মেডিক্যাল হাসপাতাল পেয়ে গেলাম। বাসার ঠিকানা ও ডিরেকশান দিয়ে এম্বুলেন্স পাঠানোর জন্য অনুরোধ করলাম।

আকবর ছাড়াও দুচারজনের জখম বেশ গুরুতর। যারা জখম হয় নি তারাই বেশি কান্নাকাটি করছে। এক শিশি ভ্যালিয়াম-টু ইভার হাতে দিয়ে বললাম, প্রত্যেককে পাইকারি হারে দুটো করে খাইয়ে দাও। ওদের একটু শান্ত হওয়া দরকার। খুকু তুমি পানির জগ আর গ্লাস নাও।

ভ্যালিয়াম খাওয়ানো শেষ হলে খুকু, ইভা ও সুরতকে কিছু তুলো, আয়োডিন, ডেটল, ব্যান্ডেজ ইত্যাদি দিয়ে বললাম, যতটা পার ফার্স্ট এইড দাও।

সাড়ে চারটে বাজে। আরেকটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে। আমি, আমির হোসেন, বাবলু, সাজ্জাদ ও আরো কয়েকজনকে বললাম, তোমরা প্লেনের শব্দ কমলেই দৌড়ে বাড়ি গিয়ে রান্নাকরা খাবার, বাচ্চার দুধের টিন, চালের টিন, আটার টিন, এক এক করে নিয়ে এসো। রাতে মেঝেয় শোয়ার মত লেপ-তোষকও নিয়ে এসো।

গেস্টরুমের তালাটা ঠিকমত লাগানো আছে কিনা, একফাঁকে দেখে এলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে রসদ জমিয়েছি, তা কিছুতেই এখন খরচ করব না। তাছাড়া ওদের ঘরে তো আছেই। ওগুলো নষ্ট করার দরকার কি?

পাঁচটার সময় এম্বুলেন্স এল। আকবরসহ বাদবাকি আহত সবাই এবং তাদের দেখাশোনার জন্য সুস্থ কয়েকজন এম্বুলেন্সে চড়ে মেডিক্যাল হাসপাতালে চলে গেল।

দশ মিনিট পরেই আরেকবার ভীষণ শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। এবার মনে হল আমাদের পেছন দিকের গলিতে বোমা পড়েছে। ফট করে কারেন্ট চলে গেল। ফোন তুলে দেখি ওটাও ডেড! ব্যস, এবার মোলকলা পূর্ণ হল। ফ্রিজ চলবে না, পানির পাম্প চলবে না। কেরোসিন ফুরোলে ইলেকট্রিক হিটার দিয়ে কাজ সারা যাবেনা। কারফিউর সময় ফোনটাই ছিল একমাত্র যোগসূত্র। সেটাও গেল। এখন সত্যি সত্যি কবরখানা।

সারা মেঝেজুড়ে বিছানা পাতা হয়েছে। সিড়ির ঠিক নিচে খাটে প্রথমে বাবা, তারপর জামী ও আলী। নিচে মেঝেয় খাট ঘেঁষে আমি, ইভা, সুরত, মা, লালু। আমাদের পরে প্রথমে আকবরের ভাবীর মেয়েরা, তারপর ওদের বাড়ির পুরুষরা। ওদের পরে আমির হোসেনদের বাড়ির পুরুষরা, তারপর ওদের বাড়ির মেয়েরা। ওদের বিছানা ঘরের ওপাশের দেয়ালে খাবার টেবিলের পা পর্যন্ত গেছে।

রাত দুটোর সময় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কারা যেন ডাকাডাকি করছে জামীর নাম ধরে। উঠে টর্চ জ্বালালাম, জামী জানালার কাছে গিয়ে একটা পাল্লা খুলল। আমাদের বাড়ির একদম নাক বরাবর সামনের বাড়ির হোসেন সাহেবের গলা। ওদের পেছনের বাড়ির কোণায় আগুন জ্বলছে। কি করে আগুন ধরেছে কে জানে। কিন্তু এখন যদি ওপর থেকে দেখে কোন প্লেন বোমা ফেলে?

আমি বললাম, জামী আলী বাবলু আর সাজ্জাদ তোমরা গরম জামা পরে নাও। হোসেন সাহেবের বাড়ির ছাদে উঠে দেখবে কিভাবে আগুনটা নেভানো যায়।

মার গলা শোন গেল, এরমধ্যে আবার জামী কেন? ও ছোট ছেলে, ওর যাবার দরকার নেই। বাবলু সায় দিল হ্যাঁ, হ্যাঁ, জামীর যাবার দরকার নেই। আমি ধমকের সুরে বললাম, না, জামী অবশ্যই যাবে।

আমি গেস্টরুম থেকে মোটা দড়ির একটা বান্ডিল আর মাঝারি একটা বালতি এনে রাখলাম। ওরা গরম কাপড় পরে দড়ি-বালতি নিয়ে হোসেন সাহেবের বাড়ি গেল।

১৫ ডিসেম্বর, বুধবার ১৯৭১

আজ হোসেন সাহেব এবং ওঁর নিচতলার ভাড়াটে আসলাম সাহেব সপরিবারে আমাদের বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন ছেলে-বুড়ো মিলে পঁয়তাল্লিশজন লোক আমার বাসায়।

আজ সারাদিন কান ঝালাপালা করে রকেটিং এবং স্ট্রেফিং চলেছে। সারাদিন কানে তুলো, ঘাড়ে লেপ, মাথা বিছানায় গোঁজা।

আজ সাড়ে আটটা–সাড়ে বারোটাকারফিউ নেই। খবর পেলাম গতকাল পেছনের গলির এক বাড়িতে বোমা পড়ে শরীফের বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে মারা গেছে। ঐ বোমার আঘাতেই গতকাল ইলেকট্রিক এবং টেলিফোনের তারও ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে।

আজ সারাদিন কোলকাতা রেডিও খোলা আছে। বারবার শুনতে পাচ্ছি–পাক আর্মিকে সারেন্ডার করার নির্দেশ। এজন্য আজ বিকেল পাঁচটা থেকে আগামীকাল সকাল নয়টা পর্যন্ত আকাশযুদ্ধ বন্ধ থাকবে–বলা হচ্ছে।

এই রকম মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণের মধ্যেই সারা সকাল ধরে এসেছেইলা, বাদশা, আতা ভাই, কলিম, নজলু, হুদা, রেণু, মঞ্জুর, আতিক, হামিদা, জুবলী, রফিক, মাসুমা। সবাই এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর আমি সবাইকে বকছি এরকম স্ট্রেফিংয়ের মধ্যে কেন বেরিয়েছে? মাথার ওপর প্লেনের শব্দ হলেই ওদেরও দুহাতে কান চেপে বিছানায় মাথা গুঁজে বসতে বলছি। মঞ্জুর বললেন যে গভর্নমেন্ট হাউসে হেভি বম্বিং হয়েছে। বাঁকাকে তাই মতিঝিলের অফিস থেকে তুলে ধানমন্ডিতে তার ভাগনে প্রিন্সের বাড়িতে দিয়ে এসেছেন। গভর্নর মালেক হোটেল ইন্টারকনে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ইন্টারকনকে এখন ইন্টারন্যাশনাল জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

লুলু গত দুদিন আসতে পারেনি। আজ এগারোটার দিকে এসে ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না মাত্র দেড় দিনের ব্যবধানে শরীফের হার্ট এটাক, মৃত্যু, জানাজা এবং দাফন পর্যন্ত শেষ! বিছানায় মাথা গুঁজে অবোধ শিশুর মত কাদতে লাগল সে।

এর মধ্যে রান্নাঘরের দিকটাও সামলাতে হচ্ছে। ছয়টি বাড়ির ছয়টি বিভিন্ন পরিবারের পঁয়তাল্লিশজন লোকের রান্নার দায়িত্ব কেউই আগবাড়িয়ে নিচ্ছে না। অগত্যা লক্ষ্মৌয়ি আদব-কায়দা বিসর্জন দিয়ে আমাকেই আগবাড়াতে হল। একেবারে নাম ধরে ধরে ডেকে সকালের নাশতা ও চা বানানো থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের রান্না ও পরিবেশনের ডিউটি বন্টন করে চার্ট বানিয়ে দিলাম।

এই ডামাডোলের মধ্যে বাবার জন্য স্পেশাল রান্না করা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মঞ্জু সমাধান করে দিল এ সমস্যার। ওদের বাসা থেকে বাবার জন্য সকালে নরম রুটি, দুপুরে নরম ভাত, কম মশলার মাছের ঝোল, এসব করে বয়ে এনে বাবাকে খাওয়াচ্ছে।

১৬ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

আজ সকাল নটা পর্যন্ত যে আকাশযুদ্ধ বিরতির কথা ছিল, সেটা বিকেল তিনটে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দুপুর থেকে সারা শহরে ভীষণ চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা। পাক আর্মি নাকি সারেণ্ডার করবে বিকেলে। সকাল থেকে কলিম, হুদা, লুলু যারাই এল সবার মুখেই এক কথা। দলে দলে লোেক জয় বাংলা ধ্বনি তুলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে কারফিউ উপেক্ষা করে। পাকসেনারা, বিহারিরা সবাই নাকি পালাচ্ছে। পালাতে পালাতে পথেঘাটে এলোপাতাড়ি গুলি করে বহু বাঙালিকে খুন-জখম করে যাচ্ছে। মঞ্জুর এলেন তার দুই মেয়েকে নিয়ে, গাড়ির ভেতরে বাংলাদেশের পতাকা বিছিয়ে। তিনিও ঐ এক কথাই বললেন। বাদশা এসে বলল, এলিফ্যান্ট রোডের আজিজ মোটরসের মালিক খান জীপে করে পালাবার সময় বেপরোয়া গুলি চালিয়ে রাস্তার বহু লোক জখম করেছে।

মঞ্জুর যাবার সময় পতাকাটা আমাকে দিয়ে গেলেন। বললেন, আজ যদি সারেণ্ডার হয়, কাল সকালে এসে পতাকাটা তুলব।

আজ শরীফের কুলখানি। আমার বাসায় যারা আছেন, তারাই সকাল থেকে দোয়া দরুদ কুল পড়ছেন। পাড়ার সবাইকে বলা হয়েছে বাদ মাগরেব মিলাদে আসতে। এ.কে. খান, সানু, মঞ্জু, খুকু সবাই বিকেল থেকেই এসে কুল পড়ছে।

জেনারেল নিয়াজী নব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে আজ বিকেল তিনটের সময়।

যুদ্ধ তাহলে শেষ? তাহলে আর কাদের জন্য সব রসদ জমিয়ে রাখব?

আমি গেস্টরুমের তালা খুলে চাল, চিনি, ঘি, গরম মশলা বের করলাম কুলখানির জর্দা রাঁধবার জন্য। মা, লালু, অন্যান্য বাড়ির গৃহিণীরা সবাই মিলে জর্দা রাঁধতে বসলেন।

রাতের রান্নার জন্যও চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ ইতাদি এখান থেকেই দিলাম। আগামীকাল সকালের নাশতার জন্যও ময়দা, ঘি, সুজি, চিনি, গরম মশলা এখান থেকেই বের করে রাখলাম।

১৭ ডিসেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

আজ ভোরে বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলা হল। মঞ্জুর এসেছিলেন, বাড়িতে যারা আছেন, তারাও সবাই ছাদে উঠলেন। ২৫ মার্চ যে ফ্ল্যাগপোলটায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে আবার নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই ফ্ল্যাগপোলটাতেই আজ আবার সেদিনের সেই পতাকটাই তুললাম।

সবাই কাঁদতে লাগলেন। আমি কাঁদতে পারলাম না। জামীর হাত শক্ত মুঠিতে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

গত তিনদিন থেকে জামীকে নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তায় আছি। শরীফের মৃত্যুর পর থেকে ও কেমন যেন গুম মেরে আছে। মাঝে-মাঝেই খেপে ওঠে, চেঁচামেচি করে, ছুটে বেরিয়ে যেতে চায়, বলে পাঞ্জাবি মারবে, বিহারি মারবে, আব্বর হত্যার প্রতিশোধ নেবে। ওকে যত বোঝাই এখন আর যুদ্ধ নেই, যুদ্ধের সময় পাঞ্জাবি মারলে সেটা হত শত্রহনন, এখন মারলে সেটা হবে মার্ডার–ও তত ক্ষেপে ওঠে। কি যে করি! ওর জন্য আমিও কোথাও বেরুতে পারছি না। তাছাড়া এই যে গুষ্ঠি রয়েছে বাড়িতে! গত রাতেই হোসেন সাহেব ও আসলাম সাহেবরা নিজেদের বাড়িতে চলে গেছেন। কিন্তু বাকিরা নড়তে চাইছে না। কি এক দুর্বোধ্য ভয়ে এই ঘরের মেঝে আঁকড়ে বসে আছে।

আত্মীয়-বন্ধু পরিচিতজন কত যে আসছে সকাল থেকে স্রোতের মত। তাদের মুখে শুনছি রমনা রেসকোর্সে সারেণ্ডারের কথা, দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকায় আসার কথা, ইন্ডিয়ান আর্মির কথা, লোকজনের বিজয়োল্লাসের কথা। এরই মধ্যে রক্ত-হিম করা একটা কথা শুনছি। মুনীর স্যার, মোফাজ্জল হায়দার স্যার, ডাঃ রাব্বি, ডাঃ আলিম। চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার এবং আরো অনেকেরই খোঁজ নেই। গত সাত-আটদিনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কারফিউয়ের মধ্যে এদের বাসায় মাইক্রোবাস বা জীপে করে কারা যেন এসে এদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ঝলকের মত মনে পড়ল গত সাত-আটদিনে যখন-তখন কারফিউ দেওয়ার কথা। কারফিউয়ের মধ্যে রাস্তা দিয়ে। বেসামরিক মাইক্রোবাস ও অন্যান্য গাড়ি চলাচলের কথা। এতক্ষণে সব পরিষ্কার হয়ে উঠল।

বিকেল হতে হতে রায়েরবাজারের বধ্যভূমির খবরও কানে এসে পৌঁছল। বড় অস্থির লাগছে। কি করি? কোথায় যাই, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। রুমী! রুমী কি বেঁচে আছে? আমি কি করে খবর পাব? কার কাছে খবর পাব? শরীফ এমন সময়ে চলে গেল? দুজনে মিলে রুমীর জন্য কষ্ট পাচ্ছিলাম, রুমীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এখন। একাই আমাকে সব করতে হবে, একাই সব কষ্ট বহন করতে হবে।

ফোন ও ইলেকট্রিকের লাইন এখনো ঠিক হয় নি। কে ঠিক করবে? সারা ঢাকার লোক একই সঙ্গে হাসছে আর কাঁদছে। স্বাধীনতার জন্য হাসি। কিন্তু হাসিটা ধরে রাখা যাচ্ছে না। এত বেশি রক্তে দাম দিতে হয়েছে যে কান্নার স্রোতে হাসি ডুবে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে।

সন্ধ্যার পর একটা মোমবাতি জ্বেলে ভুতুড়ে আলোয় জামীকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলাম। হঠাৎ দরজায় করাঘাত। তার আগে বাসার সামনে জীপগাড়ি থামবার শব্দ পেয়েছি। উঠে দরজা খুললাম। কাধে স্টেনগান ঝোলানো কয়েকটি তরুণ দাঁড়িয়ে। আমি দরজা ছেড়ে দুপা পিছিয়ে বললাম, এসো বাবারা, এসো।

ওরা ঘরে ঢুকে প্রথমে নিজেদের পরিচয় দিল আমি মেজর হায়দার। এ শাহাদত, এ আলম। ও আনু, এ জিয়া ও ফতে আর এই যে চুল্লু।

হায়দার আর আনু ছাড়া আর সবাইকেই তো আগে দেখেছি।

চুল্লু এতদিন সেন্ট্রাল জেলে ছিল। ওকে জেল থেকে বের করে এনে রুমীর অনুরাগী এই মুক্তিযোদ্ধারা রুমীর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।

আমি ওদেরকে হাত ধরে এনে ডিভানে বসালাম। আমি শাহাদতের হাত থেকে চাইনিজ স্টেনগানটা আমার হাতে তুলে নিলাম। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলাম। তারপর সেটা জামীর হাতে দিলাম। চুলু মাটিতে হাঁটু গেড়ে আমার সামনে বসল। আমার দুই হাত টেনে তার চোখ ঢেকে আমার কোলে মাথা গুঁজল। আমি হায়দারের দিকে তাকিয়ে বললাম, জামী পারিবারিক অসুবিধার কারণে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারে নি। ও একেবারে পাগল হয়ে আছে। ওকে কাজে লাগাও।

মেজর হায়দার বলল, ঠিক আছে জামী, এই মুহূর্ত থেকে তুমি আমার বডিগার্ড হলে। এক্ষুণি আমার সঙ্গে আমার অফিসে চল, তোমাকে একটা স্টেন ইস্যু করা হবে। তুমি গাড়ি চালাতে পার?

জামী সটান এ্যাটেনশনে দাড়িয়ে ঘটাং করে এক স্যালুট দিয়ে বলল, পারি।

ঠিক আছে, তুমি আমার গাড়িও চালাবে।

জামীর পাশেই আলী দাঁড়িয়ে ছিল। জামী বলল, স্যার, আমার বন্ধু আলী—

মেজর হায়দার গম্ভীর মুখে বলল, ইনফ্যাক্ট আমার দুজন বডিগার্ড দরকার তোমার বন্ধুকেও অ্যাপয়েনমেন্ট দেওয়া গেল। কিন্তু ভেবে দেখ, পারবে কি না। এটা খুব টাফ জব। চব্বিশ ঘণ্টার ডিউটি।

পাঁচদিন পর জামী এই প্রথমবারের মত দাঁত বের করে হাসল,

আটচল্লিশ ঘণ্টার হলেও পরোয়া নেই। (সমাপ্ত)

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *