আমাদেরকে যেখানে আটকে রেখেছে সেটা মনে হয় বড় একটা বাসার উপরের তালার একটা রুম। রুমটায় ঢুকিয়ে মানুষগুলো আমাদের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিয়েছে তখন আমরা নিজেরাই চোখের বাধন খুলেছি, মুখের উপর লাগানো টেপটা খুলেছি। আমরা এখন একজন আরেকজনকে দেখতে পাচ্ছি, একজনের সাথে আরেকজন কথা বলতে পারছি। প্রথম কথা বলল ঝুম্পা, “আমি যদি এই হারামজাদাদের ভূঁড়ি ফাঁসিয়ে না দেই তাহলে আমার নাম ঝুম্পা না।”

ফারা একটু অবাক হয়ে বলল, “তুই কেমন করে ভূঁড়ি ফাঁসাবি?”

ঝুম্পা বলল, “জানি না।”

আমি বললাম, “এরা অনেক ক্ষমতাবান। আমাদের কীভাবে ধরে এনেছে দেখেছিস?”

বগা জানতে চাইল, “কেন ধরে এনেছে?”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “সেটা এখনো বুঝতে পারছিস না গাধা কোথাকার? ওরা ধরে এনেছে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চার জন্য।”

“কী করবে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা দিয়ে?”

“কী করবে মানে? তুই দেখছিস না ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা দিয়ে কী করা যায়? আমরা আকাশ থেকে উড়ে এসেছি ছোট বিন্দি একটা ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা দিয়ে আর তুই জিজ্ঞেস করছিস কী করা যায়?”

মিঠুন কোনো কথা না বলে ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখল। একটা টেবিল একটা চেয়ার একপাশে একটা খাট, খাটে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বিছানা। সাথে একটা ছোট হাইফাই বাথরুম। একটা জানালা বাসার ভেতরের দিকে আরেকটা জানালা বাইরের দিকে। সেদিকে তাকালে দেখা যায় দূরে উঁচু একটা বাউন্ডারী ওয়াল। বাউন্ডারী ওয়ালের অন্যপাশে কী আছে আমরা জানি না।

মিঠুনকে কেমন জানি মনমরা দেখাল, এদিক সেদিক দেখে বলল, “শুধু শুধু আমার জন্যে তোদের কতো রকম যন্ত্রণা। আমি মানুষটাই অপয়া। যেখানে হাত দেই সেখানেই সর্বনাশ হয়ে যায়।”

ফারা বলল, “তুই অপয়া হবি কেন? তোর কী দোষ? তুই হচ্ছিস আমাদের সায়েন্টিস্ট।”

মিঠুন একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “এখন আমাদের কী করবে কে জানে! যদি মেরে ফেলে?”

ঝুম্পা বলল, “মেরে ফেলবে? ফাজলেমী নাকী?”

মিঠুন, “আমাদের ব্ল্যাকহোলের বাচ্চাটা আসলে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বেশী।”

মন খারাপ মনে হয় ছোঁয়াচে, মিনি মন খারাপ করে কথা বলা মাত্র আমার সবারই কম বেশী মন খারাপ হয়ে গেল। ঝুম্পা বলল, “আমাদের মেরে ফেলুক আর না ফেলুক আমার জীবন শেষ।”

ফারা জিজ্ঞেস করল, “কেন তোর জীবন শেষ কেন?”

“কতো রাত হয়েছে এখনো বাসায় যাই নাই, মামা মামী কী আমাকে বাসায় ঢুকতে দিবে? দিবে না। বাসা থেকে বের করে দিবে।”

আমি বললাম, “সেইটা নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে, আগে দেখ এখন কী হয়।”

বগা বলল, “খিদে লেগেছে।”

আমরা সবাই অবাক হয়ে বগার দিকে তাকালাম, আমি গরম হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “এরকম সময় তোর খিদে পেয়ে গেল?”

“খিদে পেলে আমি কি করব?”

“চুপ করে বসে থাকবি।”

ফারা বলল, “ব্যাস অনেক হয়েছে, এখন আর নিজেদের মাঝে ঝগড়া করিস না।”

আমরা তখন দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে রইলাম। কী হয় দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি। এর চাইতে কষ্টের কিছু আছে কী না কে জানে।

 

ঘণ্টা খানেক পরে বাইরে পায়ের শব্দ পেলাম, দরজায় একটা শব্দ হল তারপর খুট করে দরজা খুলে গেল। দরজার বাইরে কালো পোষাক পরা একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটার উঁচু চোয়াল সরু ঠোঁট। নাকের নিচে নবাব সিরাজদৌল্লার মত চিকন গোঁফ।।

মানুষটা দরজাটা বন্ধ করে আমাদের দিকে তাকাল। চোখের দৃষ্টির মাঝে কিছু একটা আছে যেটা দেখে কেমন যেন অস্বস্তি হয়, ভয় করে।

মানুষটা ঘরের ভেতর হাঁটল, জানালায় দাড়িয়ে বাইরে তাকাল তারপর আবার হেঁটে টেবিলটার কাছে এসে চেয়ারে পা রেখে টেবিলটাতে বসল। তারপর মিঠুনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “তুমি নিশ্চয়ই মিঠুন।”

মিঠুন কোনো কথা বলল না।

মানুষটা মুখের মাঝে হাসি হাসি ভাব এনে বলল, “যার নামে বিখ্যাত মিঠুনিয়াম তৈরী হবে?”

আমরা চমকে উঠলাম, ব্ল্যাকহোলের বাচ্চাকে মিঠুনিয়াম নাম দেওয়ার কথাটা বলেছিল ঝুম্পা, আমরা তখন ছিলাম আকাশে। এই মানুষ সেই কথা কেমন করে জানল? মানুষটা বলল, “আমার কিন্তু ব্লাকহোলের বাচ্চা নামটাই পছন্দ। এই নামটার মাঝে একটা ক্যারেক্টার আছে। ব্লা-ক-হো-লে-র বাচ-চা।” কথা শেষ করে মানুষটা হা হা করে হাসল। তখন দেখলাম তার মুখের ভিতর অনেকগুলো সোনার দাঁত, দেখে কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। মনে হয় এটা মানুষের মুখ না এটা রাক্ষসের মুখ।

মানুষটা হঠাৎ হাসি বন্ধ করে বলল, “ইউনিভার্সের নাইটি সিক্স পার্সেন্ট আমরা জানি না সেই লাইন্টি সিক্স পার্সেন্টকে টিপে তুমি ব্ল্যাকহোল বানিয়ে ফেলেছ–এটা কী সোজা কথা নাকী? তুমি তো অনেক কামেল মানুষ।”

ঝুম্পা জিজ্ঞেস করল, “আপনি কেমন করে এসব কথা জেনেছেন?”

“আমি সব জানি।” মানুষটা মুখ গম্ভীর করে বলল, “এই দেশের কোথায় কী হয় কে কী কথা বলে কার সাথে কখন কী কথা বলে আমি সব জানি। এটা হচ্ছে আমার চাকরী।”

মিঠুন এই প্রথম একটা কথা বলল, “আপনি আমাদেরকে কেন ধরে এনেছেন?”

“তোমাদেরকে ধরে না আনলে কী এই রকম খোলামেলা কথা বলতে পারতাম?”

“আপনার সাথে তো আমাদের বলার কিছু নাই।”

“আছে।”

“কী কথা?”

“মিনিয়াম নামটা আমার পছন্দ না। আমার পছন্দ হচ্ছে জামশেদিয়াম। বুঝেছ? জামশেদিয়াম। কেন বুঝেছ?”

আমি বললাম, “আপনার নাম জামশেদ”

“হ্যাঁ। আমি মেজর জামশেদ। তোমাদের ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা আসলে বাচ্চা কাচ্চার জিনিষ না। এটা হচ্ছে বড়দের জিনিষ। তাই এটা বড়দের হাতে থাকা ভাল। এটার নামও হওয়া উচিত বড়দের নামে। বুঝেছ?”

আমরা কেউ কোনো কথা বললাম না। জামশেদ নামের মানুষটা গম্ভীর মুখে বলল, “এখন এই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলি। জিনিষটা খুব সহজে কীভাবে করা যায় বল দেখি?”

আমি বললাম, “এটা করা সম্ভব না। এটা মিঠুন আবিষ্কার করেছে এটা সবসময়ে মিঠুনের নামে থাকবে।”

মানুষটা আমার কথা শুনে খুব অবাক হয়েছে এরকম ভাব করে বলল, “ও আচ্ছা! তাই নাকী?”।

আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “হ্যাঁ।”

“তোমার নামটা যেন কী? বগা নাকি ইবু?”

“ইবু।”

“শোনো ইবু–আমি বেয়াদপ ছেলে ছোকড়া পছন্দ করি না। বুঝেছ? এখন থেকে আমি পারমিশান না দিলে কোনো কথা বলবে না। শুধু শুনে যাবে। বুঝেছ?”

আমরা কেউ কোনো কথা বললাম না। জামশেদ নামের মানুষটা বলল, “আমি তোমাদের ফ্লাইং মেশিন তুলে নিয়ে এসেছি। এর ভিতরে আছে তোমাদের ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা। দড়ি দিয়ে বাঁধা এই যন্ত্র খুলে সেই ব্লাকহোলের বাচ্চা বের করতে সময় লাগবে পনেরো মিনিট। কাজেই ধরে নাও ব্ল্যাকহোলের বাচ্চাটা এখন আমার। আমি এখন তোমাদেরকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারি। কেন বের করছি না বল দেখি?”

আমরা কোনো কথা বললাম না। জামশেদ বলল, “ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করছি না কারণ বের হয়েই যদি ইন্দুরের বাচ্চার মত প্যানপ্যানানী শুরু কর? কোনো ফাজিল সাংবাদিকেরা যদি তোমাদের কথা বিশ্বাস করে ফেলে? সেই ছাগল সাংবাদিক যদি তোমাদের কথা বিশ্বাস করে রিপোর্ট করে ফেলে তখন একটা কাজ বাড়বে। রিপোর্টারকে ফিনিস করতে হবে। সেইটা অবশ্যি সমস্যা না, আমি মাসে দুই চারটা সাংবাদিক জুতো দিয়ে পিশে ফেলি।” কথা শেষ করে মানুষটা চেয়ারে তার পা দিয়ে পিষে ফেলার অভিনয় করে দেখাল।

মেজর জামশেদ নামে মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার শরীরটা কেমন যেন শির শির করতে থাকে। সর্বনাশ! কি ভয়ংকর মানুষ।

জামশেদ একটু দম নিল তারপর বলল, “কাজেই আমাকে একটা জিনিষ নিশ্চিত করতে হবে, সেটা হচ্ছে তোমরা এখান থেকে বের হয়ে যেন আলতু ফালতু কথা না বল। বুঝেছ? আমার কথা বুঝেছ?”

তার কথা বুঝতে আমাদের কোনো সমস্যা হল না। কিন্তু আমরা কোনো কথা বললাম না, চুপ করে রইলাম। জামশেদ আরেকটা কী কথা বলার জন্যে তার চকচকে সোনার দাঁত বের করে মুখ হা করল ঠিক তখন তার টেলিফোন বাজল। সে টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন কাচুমাচু হয়ে গেল। টেলিফোনটা ধরে সোজা হয়ে দাড়িয়ে গিয়ে হড়বড় করে বলল, “ইয়েস স্যার। মালিকুম স্যার।”

টেলিফোনের অন্য পাশ দিয়ে কে কী বলছে আমরা শুনতে পেলাম না কিন্তু মনে হল মানুষটা অনেক বড় অফিসার আর সেই বড় অফিসার জামশেদকে একটা ধমক দিল। জামশেদ আরো কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “সরি স্যার। ভুল হয়ে গেছে স্যার। ছেলেমেয়েগুলোকে রিকভার করে ভেহিকেলটা নিয়ে ফিরে আসতে আসতে দেরী হয়ে গেছে স্যার। আই অ্যাম সরি স্যার আমার আরো আগে রিপোর্ট করা উচিৎ ছিল স্যার। আর ভুল হবে না স্যার।”

মনে হল বড় অফিসারটা বলল যে সে আমাদের দেখতে আসবে সেটা শুনে জামসেদ খুব ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না না স্যার। আপনার আসার কোনো দরকার নাই স্যার। কোনো দরকার নাই স্যার। দে আর লাইক স্ট্রীট আরফিন। স্যার, মহব্বতজান স্কুলের ছাত্র তাই বুঝতেই পারছেন চাল চুলো নেই কিছু বদ ছেলে মেয়ে স্যার। নো ডিসিপ্লিন ইন লাইফ স্যার। স্যার, ওদের দেখলে আপনার মন খারাপ হবে স্যার।”

জামশেদ মনে হল তার বড় অফিসারকে খুব ভয় পায়। প্রত্যেকটি বাক্যের আগে এবং পরে স্যার বলছে। তার বড় অফিসার মনে হয় ফ্লাইং মেশিন নিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করল, কারণ জামশেদ মুখ শক্ত কর বলল, “নো স্যার। আকাশে ওড়ার ভেহিকেলটা ইজ নট সায়েন্টিফিক স্যার। এই বদ ছেলেমেয়ে গুলোর মাথায় অনেক বদবুদ্ধি স্যার। একটা ঝুড়ির সাথে। হান্ড্রেডস এন্ড হান্ড্রেডস অফ বেলুন লাগিয়েছে স্যার। গ্যাস বেলুন। এতো বেলুন কোথা থেকে ম্যানেজ করেছে গড় অনলি নোজ স্যার। আমাদের রাডারে বেলুন ধরা পড়েনি, শুধু ঝুড়ি আর ঝুড়ির মাঝে ছেলে মেয়েগুলো ধরা পড়েছে। সেই জন্যে মনে হয়েছে কোনো ধরণের ফ্লাইং মেশিন স্যার। আসলে খুব জোরাস একটা সিচুয়েশন স্যার। স্যার, চরম পাবলিক নুইসেন্স স্যার। যে কোনো রকম একসিডেন্ট হয়ে যেতে পারত স্যার। বদ ছেলেমেয়ে গুলো মারা যেতে পারত স্যার। তাদের খুব কপাল ভাল আমরা তাদের রক্ষা করেছি স্যার।”

আমাদের মনে হল জামশেদের বড় অফিসার এবারে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা নিয়ে কোনো একটা প্রশ্ন করল, জামশেদ তখন হা হা করে হাসার মত একটা শব্দ করল, বলল, “স্যার এটা একটা জোক স্যার। মাইক্রো রাকহোল, মাস এনার্জী কনভারসান এগুলো একেবারেই বাজে কথা স্যার। এই ছেলেমেয়েগুলো এই কথাগুলোর মানে জানা দূরে থাকুক শব্দগুলো। বানানই করতে পারবে না স্যার। নিজেদের ভিতরে এগুলো নিয়ে কথা বলতো, ভাব দেখাতো স্যার। ফাজিল ছেলেমেয়ে তো, কী বলে কী না বলে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই স্যার।”

বড় অফিসার মনে হল জামশেদের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করল না। জামশেদকে অনেকভাবে বোঝাতে হল যে আমরা খুবই ফালতু টাইপের ছেলে মেয়ে একটা ঝুড়ির মাঝে অনেকগুলো গ্যাস বেলুন বেঁধে আকাশে উড়ে গেছি। শেষ পর্যন্ত মনে হয় অফিসারটা জামশেদের কথা বিশ্বাস করল। জামশেদ তখন বলল, “এই ছেলেমেয়েগুলোকে আজ রাত আটকে রেখে কাল ছেড়ে দিব স্যার। স্কুলে বাসায় সব জায়গায় ওয়ার্নিং দিয়ে দেব স্যার। স্যার আপনি কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। আমি সব ব্যবস্থা করব স্যার। এই ছেলে মেয়েগুলো খুবই ফালতু এদেরকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে না স্যার।”

জামশেদ ঠিক যখন টেলিফোনটা রেখে দেবে তখন ঝুম্পা চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যা কথা! সব মিথ্যা কথা।”

জামশেদ সাথে সাথে টেলিফোনে মাইক্রোফোনটা হাত দিয়ে চেপে ধরে যেন ঝুম্পার কথাটা অন্যদিকে শুনতে না পায়। বড় অফিসার শুনতে পেলো কী না বোঝা গেল না জামশেদ টেলিফোনটা কানে লাগিয়ে কিছু একটা শুনল, তারপর টেলিফোনটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টেলিফোনটা পকেটে রেখে ঝুম্পার দিকে তাকিয়ে হিংস্র গলায় বলল, “তোর এতো বড় সাহস?”

ঝুম্পা বলল, “আমি জানি। এইটা আমার বড় সমস্যা।”

“তোর কল্লা আমি ছিড়ে ফেলব।”

“সমস্যা নাই। আমার কল্লা আমার কোনো কাজে লাগে না।”

জামশেদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, ঝুম্পার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল, তারপর তার সোনার দাঁত কিড়মিড় কিড়মিড় করতে করতে ঝুম্পার দিকে এগিয়ে এল। কাছাকাছি এসে খপ করে ঝুম্পার চুল ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু হঠাৎ কী ঘটে গেল বুঝতে পারলাম না, দেখলাম “বাবাগো” বলে জামশেদ তার দুই পায়ের মাঝখানে ধরে মাটিতে পড়ে গেছে। ঝুম্পা প্রচণ্ড একটা লাথি মেরেছে, এমন বেকায়দা জায়গায় মেরেছে যে জামশেদের মতন মানুষ পর্যন্ত কাবু হয়ে গেছে।

জামশেদ চোখ বন্ধ করে কয়েকটা নিশ্বাস নিল, তারপর ডান হাত পকেটে ঢুকিয়ে একটা রিভলবার বের করে আনে। রিভলবারটা সরাসরি ঝুম্পার দিকে তাক করে ঝুম্পাকে অসম্ভব খারাপ একটা গালি দিল, তারপর বলল, “বেজন্ম কোথাকার। তুই জানিস না তুই কী করেছিস? আমাকে তুই চিনিস না?”

জামশেদ কী করত আমরা জানি না। মনে হয় আসলেই গুলী করে দিত, কিন্তু ঠিক তখন জামশেদের পকেটে টেলিফোনটা বেজে উঠে। জামশেদ এক হাতে রিভলবারটা ঝুম্পার দিকে তাক করে অন্য হাতে টেলিফোনটা বের করে নম্বরটা দেখল সাথে সাথে তার মুখের চেহারা পাল্টে গেল। যে টেলিফোনটা নিজের কানে লাগিয়ে চাপা গলায় বলল, “ইয়েস।”

জামশেদ টেলিফোনটা হাত দিয়ে আড়াল করে রেখে চাপা গলায় কথা বলতে থাকে। কথা বলে ইংরেজীতে ইংরেজী আমি ভালো বুঝি না। কী বলছে আমরা ভালো করে শুনতেও পাচ্ছি না, সে কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের এক কোনায় সরে গেল। কথা শুনতে না পারলেও আঁমাদের বুঝতে সমস্যা হল না যে কোনো কিছু নিয়ে দর কষাকষি হচ্ছে, “মিলিওন ডলার” কথাটা মনে হয় কয়েকবার বলা হল। আরেকটা শব্দ শুনতে পেলাম সেটা হচ্ছে “নিউক্লিয়ার বম্ব”।

জামশেদ কথা শেষ করে আমাদের দিকে তাকাল, তার মুখ দেখে মনে হল সে আপাতত ঝুম্পাকে শাস্তি দেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছে। তার চোখে মুখে এক ধরনের অস্থিরতা। রিভলবারটা মিঠুনের দিকে তাক করে বলল, “সাইনটিস্ট! তোকে দশ মিনিট সময় দিচ্ছি। এর মাঝে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা বের করে আমার হাতে দিতে হবে। আয় আমার সাথে।”

জামশেদ একটু আগে আমাদের সাথে তুমি তুমি করে বলছিল, বেকায়দা জায়গায় ঝুম্পার লাথি খেয়ে এখন তুই তুই করে বলছে। জামশেদ রিভলবারটা দিয়ে মিঠুনকে আবার ইঙ্গিত করল, “আয় তাড়াতাড়ি।”

মিঠুন মাথা নাড়ল, বলল, “সম্ভব না।”

জামশেদ মুখ খিচিয়ে বলল, “আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আয়।”

মিঠুন বলল, “ফ্লাইং মেশিন বানাতে কয়েক সপ্তাহ লেগেছে আমি দশ মিনিটে সেটা কেমন করে খুলে ফেলব?”

“পুরোটা খুলতে কে বলেছে? শুধু ব্ল্যাকহোলের বাচ্চাটা খুলে আমাকে দিবি। আয় আমার সাথে।

মিঠুন নড়ল না। জামশেদ তখন রিভলবারটা ঝুম্পার দিকে তাক করল, বলল, “আমি দশ পর্যন্ত গুনব। এর মাঝে যদি না আসিস এই বেজন্মাকে গুলি করে দিব।”

ঝুম্পা বলল, “এর কথা বিশ্বাস করিস না মিঠুন। গুলি করা এতো সোজা না?”

আমরা ঝুম্পার সাহস দেখে অবাক হলাম। ঝুম্পা ঠিকই বলে, এই সাহসটাই তার বড় সমস্যা। জামশেদ গুনতে শুরু করল আর পাঁচ পর্যন্ত যেতেই মিঠুন বলল, “ঠিক আছে আমি চেষ্টা করতে পারি।”

জামশেদ বলল, “আয় তাহলে। অন্য সবাই এই ঘরের মাঝে থাক।”

মিঠুন বলল, “একা আমার পক্ষে সম্ভব না। সবাইকে লাগবে।”

জামশেদ ধমক দিয়ে বলল, “সবাইকে পাবি না। খালি একজনকে নিতে পারবি। কাকে নিবি?”

মিঠুন বলল, “আমার সবাইকে লাগবে। অনেক কিছু খুলতে হবে।”

জামশেদ তখন হাল ছেড়ে দিল, বলল, “ঠিক আছে, সবাই আয় তাহলে। সাবধান কেউ কোনো তেড়িবেড়ি করিব না। খুন করে ফেলব।”

আমরা একে একে ঘর থেকে বের হলাম। জামশেদ কেমন জানি ছটফট করছে, মনে হতে থাকে হঠাৎ করে তার ভেতরে কোনো একটা তাড়া চলে এসেছে। আমাদের মাথার পিছনে রিভলবারটা ধরে আমাদেরকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনে। তারপর বারান্দা দিয়ে আমাদের হটিয়ে নিয়ে গেল। ঘরের শেষ মাথায় হলঘরের মত একটা ঘরের সামনে গিয়ে সে চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকল। সুইচ টিপে আলো জ্বালাতেই আমরা দেখতে পেলাম ঘরের মাঝখানে আমাদের ফ্লাইং মেশিন। জামশেদ কাছাকাছি রাখা ছোট একটা টেবিলের ওপর থেকে একটা টুল বক্স নিয়ে মিঠুনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “নে, খোল।”

মিঠুন টুল বক্সটা মেঝেতে উপুর করে ঢেলে দিল, চারিদিকে স্কু ড্রাইভার, প্লয়ার্স, ফাইল, হ্যাকস, সল্ডারিং আয়রণ এইসব ছাড়িয়ে পড়ল। মিঠুন মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এগুলো দেখল তারপর একটা ডায়াগনাল কাটার নিয়ে কাজ শুরু করে দিল। জামশেদ পা দাপিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।”

মিঠুন ফ্লাইং মেশিনের তলায় ঢুকে কিছু জিনিষ কেটে ফেলল। স্কু ড্রাইভার দিয়ে বেশ কয়েকটা স্কু নিচের অংশটা নামিয়ে আনে। আমরা মিঠুনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইলাম, তার কাজে তাকে সাহায্য করতে লাগলাম। ফ্লাইং মেশিন ওড়ার সময় যে টিউবগুলো দিয়ে আগুনের মত গরম বাতাস বের হয় সেটা খোলার পর মূল ইঞ্জিনটা চোখে পড়ল। স্টেনলেস স্টিলের একটা সিলিন্ডার সেখান থেকে অনেকগুলো তার বের হয়ে এসেছে। মিঠুন সাবধানে সিলিন্ডার আর তার বের করে আনে, তারের এক মাথায় কয়েকটা নয় ভোল্টের ব্যাটারী ঝুলছে।

মিঠুন সব কিছু মেঝেতে রেখে জামশেদকে বলল, “এই যে এখানে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা।”

জামশেদ অধৈর্য হয়ে বলল, “এতো বড় সিলিন্ডার কেমন করে নিব। খুলে বের করে দে যেন পকেটে নেয়া যায়। আমি জানি তুই এটা পকেটে নিয়ে ঘুরিস। তোদের সব কথা আমার রেকর্ড করা আছে।”

কাজেই মিঠুন সিলিন্ডারটা খুলতে শুরু করে, ভেতরে ছোট একটা শিশি যার দুই পাশে এলুমিনিয়ামের ফয়েল লাগানো সেখান থেকে দুটো তার বের হয়ে এসেছে, সেগুলো ব্যাটারীর সাথে লাগানো। তার দুটো একসাথে করলেই বোতল থেকে আগুনের হলকার মত প্লাজমা বের হয়ে আসবে। যদি কোনোভাবে শিশিটা জামশেদের দিকে মুখ করে তার দুটি ছুইয়ে দেয়া যায় তাহলেই জামশেদ পুড়ে কাবাব হয়ে যাবে। কিন্তু একটা মানুষকে পুড়িয়ে মারা মিঠুনের পক্ষে কিংবা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমাদের হাতে এতো বড় একটা অস্ত্র তারপরেও আমরা কিছু করতে পারছি না, জামশেদ আমাদের মাথার পিছনে রিভলবার ধরে রেখেছে, ব্যাপারটা সেও জানে।

মিঠুন বলল, “এই শিশির ভেতরে, ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা আছে।”

“প্রমাণ করে দেখা।”

“খুব ডেঞ্জারাস। একসিডেন্ট হতে পারে।”

“আই ডোন্ট কেয়ার। কানেকশান দিয়ে দেখা ভেতর থেকে এনার্জী বের হয় তা না হলে খুন করে ফেলব।”

আমি বললাম “মিঠুন, আমাকে শিশিটা দে আমি ধরে রাখি। তুই কানেকশান দে।”

“ছেড়ে দিস না যেন। অনেক জোরে ধাক্কা দিবে।”

“ছাড়ব না।”

মিঠুন তখন আমার হাতে শিশিটা দিয়ে তার দুটো এক মুহূর্তের জন্য স্পর্শ করল। আমার মনে হল হঠাৎ করে শিশিটা ধাক্কা দিয়ে পিছনে যেতে চাইছে, আমি শক্ত করে ধরে রাখলাম আর তখন ভেতর থেকে নীল রংয়ের আলোর একটা ঝলকানী বের হয়ে সাপের মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ছাদকে আঘাত করল। ছাদ থেকে কিছু প্যালেস্তারা ঝুরঝুরি করে নিচে খসে পড়ল।

জামশেদের মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে উঠল, জিব দিয়ে সুড়ৎ করে ঝােল টেনে নেয়ার মত শব্দ করে বলল, “চমৎকার। এখন ব্যাটারীর কানেকশন খুলে দে।”

মিঠুন শিশির সাথে লাগানো ব্যাটারী তার এলুমিনিয়াম ফয়েল সবকিছু দেখে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “সময় লাগবে। শিশিটা ভেঙ্গে যেতে পারে এটা এইভাবে খোলা যাবে না।”

“কেন খোলা যাবে না?”

“এটা পুরোপুরি একটা সার্কিট। একটিভ সার্কিট। হঠাৎ করে টেনে খুলে দিলে যদি একটা ভোল্টেজ সার্জ যায় আমরা সবাই উড়ে যাব। ছোটখাট একটা নিউক্লিয়ার বোমা হয়ে যাবে। এটা এভাবেই নিতে হবে, শুধু লক্ষ রাখতে হবে যেন তার দুটো ছুঁয়ে না যায়, কিংবা সার্কিটে হাত না লাগে।”

জামশেদের কথাটা পছন্দ হল না, হুংকার দিয়ে বলল, “আমি এতো কথা বুঝি না। সবকিছু খুলে দিয়ে শুধু শিশিটা দে।”

“সম্ভব না। আপনি সাবধানে নিয়ে যান তাহলেই তো হল

ঠিক তখন বাইরে একটা গাড়ীর শব্দ হল আর সাথে সাথে জামশেদের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকশে হয়ে গেল। জামশেদ বলল, “ওহ নো!”

আমাদেরকে কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু আমরা হঠাৎ বুঝে গেলাম জামশেদের বড় অফিসার নিজের চোখে সবকিছু দেখার জন্যে চলে এসেছেন। জামশেদ হাত বাড়াল, “শিশিটা দে।”

শিশিটা আমার হাতে, আমি বললাম, “দেব না।”

সাথে সাথে জামশেদ রিভলবারটা মিঠুনের মাথায় ধরল, বলল “তোরা এখনো বুঝতে পারছিস না কার সাথে কী নিয়ে ইয়াকী করছিস। খেলতে খেলতে এই জিনিষ তোরা তৈরী করেছিস কিন্তু এখন এটা আর খেলনা না। এটার জন্য সারা পৃথিবীর সবাই ছুটে আসছে। সময় নষ্ট করবি না। দে।”

“দেব না।” মিঠুন বলল, “দিয়ে দে ইবু।”

“সত্যি দিয়ে দেব?”

“হ্যাঁ। দিয়ে দে।”

আমি একটা নিশ্বাস ফেলে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চাটা জামশেদের হাতে তুলে দিলাম। জামশেদ এটা সাবধানে নিল তারপর বুক পকেটে রাখল, তার দুটো সরিয়ে রাখল যেন একটা আরেকটার সাথে ভুলে লেগে না যায়। তারপর রিভলবারটা প্যান্টে গুজে নিয়ে ঘর থেকে বের হল।

আমরাও পিছন পিছন বের হলাম, দেখলাম বাসার সামনে একটা জীপ থেমেছে আর সেখান থেকে মাঝ বয়সী একজন মানুষ নেমে আসছে। মানুষটি জামশেদকে দেখে বলল, “এই যে জামশেদ। আমি তোমাকে খুঁজছি।”

“জী স্যার।” জামশেদ বলল, “জী স্যার ইয়ে মানে আমি স্যার”

“ছেলে-মেয়েগুলো কোথায়? তোমার সাথে যখন কথা বলছিলাম তখন মনে হল পিছন থেকে একটা বাচ্চা–”

“জী স্যার। জী স্যার। বাচ্চা আছে স্যার। জামশেদ হাত দিয়ে সাবধানে বুক পকেটটা ধরে রেখে বলল, “আমি আসছি স্যার।”।

“তুমি আসছ মানে? কোথা থেকে আসছ? আমি ছেলেমেয়েগুলোকে দেখতে চাই।”

“অবশ্যই দেখবেন স্যার।” বলে জামশেদ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতে থাকে। আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সে এক্ষুণি এক দৌড় দিয়ে পকেটে করে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে যাবে। আমি তখন চিৎকার করে বললাম, “ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ধর ধর।”

ধর ধর কথাটাতে একটা ম্যাজিক আছে। যখনই ধর ধর বলা হয় তখনই যাকে বলা হয় সে কেমন জানি ভয় পেয়ে জান নিয়ে পালাতে থাকে। এখানেও তাই হল, হঠাৎ করে জামশেদ চোরের মত পালাতে শুরু করল। আর আমরা ধর ধর বলে তাকে ধাওয়া করতে লাগলাম। সবার আগে ছুটে গেল ঝুম্পা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম সে যে কোনো মুহূর্তে জামশেদকে ল্যাঙ মেরে নিচে ফেলে দিয়ে ঝুম্পা বুকের উপর চেপে বসবে।

তখন যেটা ভয় পাচ্ছিলাম ঠিক সেটা ঘটল। জামশেদ হঠাৎ দাড়িয়ে বলল, “খামোশ।” তারপর প্যান্টে গুজে রাখা রিভলবারটা বের করে আমাদের দিকে তাক করে ধরে বলল, “এক পা এগোলেই শেষ করে দেব।” বলে সে যে ঠাট্টা করছে না সেটা বোঝানোর জন্যে রিভলবারটা দিয়ে উপরের দিকে গুলি করল। গুলির শব্দ শুনে আমরা সবাই কেমন যেন ভ্যাবেচেকা খেয়ে গেলাম।

জামশেদকে হঠাৎ কেমন যেন হিংস্র দেখায় সে রিভলবারটি এদিক সেদিক নাড়তে থাকে তারপর গাড়ীর ড্রাইভারের দিকে তাক করে বলল, “চাবি।“

ড্রাইভার বলল, “চাবি? কেন?”

জামশেদ হুংকার দিল, বলল, “কথা বলবে না, চাবি দাও।”

ড্রাইভার বড় অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার কী করব?”

“দিয়ে দাও। চাবিটা দিয়ে দাও।”

ড্রাইভার পকেট থেকে চাবিটা বের করে জামশেদের হাতে ধরিয়ে দিল।

জামশেদ গাড়ীটার দরজা খুলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করল, ঠিক তখন ঝুম্পা ছুটে গিয়ে চিৎকার করে পিছন থেকে জামশেদের গলা ধরে ঝুলে পড়ল।

সাথে সাথে একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল, জামশেদ ঝুম্পাকে ঝেড়ে ফেলার জন্যে একটা ঝাঁকুনি দিল, কোনো লাভ হল না। ঝুম্পা ঝুলেই রইল। আমরাও ছুটে গেলাম জামশেদকে ধরার চেষ্টা করলাম, আর এই হুটোপুটির মাঝে গাড়ীর ড্রাইভার জামশেদের মুখে একটা ঘুষি মেরে দিল। বগা তার চিকন পা দিয়ে জামশদকে লাথি দিল, আর বারান্দা থেকে বড় অফিসার, “সাবধান! সাবধান! গুলি করে দেবে–গুলি করে দেবে—” বলে চিৎকার করতে করতে নিচে নেমে এলেন।

জামশেদ সত্যি সত্যি কয়েকটা গুলি করল, কিন্তু কপাল ভালো সেটা করো গায়ে লাগল না। ড্রাইভার জামশেদকে আরেকটা ঘুষি দিয়ে তাকে চেপে ধরল, বড় অফিসার এসে জামশেদের রিভলবার ধরে রাখা হাতটা মুচড়ে ধরলেন আর জামশেদ যন্ত্রণার শব্দ করে রিভলবারটা ছেড়ে দিল।

সারাক্ষণ মিঠুন চিৎকার করে যাচ্ছিল, জামশেদকে নিয়ে হুটোপুটির কারণে কেউ তার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিল না, জামশেদকে কাবু করার পর সবাই তার চিৎকার শুনতে পেল সে বলছে, “পকেটে ব্ল্যাক হোলের বাচ্চা পকেটে ব্ল্যাক হোলের বাচ্চা সাবধান!”

জামশেদকে ড্রাইভার এবং আমরা সবাই চেপে ধরে রেখেছি, বড় অফিসারের হাতে রিভলবার। রিভলবার হাতে ধরে রেখে বড় অফিসার জামশেলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন— তারপর বললেন, “তুমি? জামশেদ, তুমি? কী করছ তুমি? কী করছ?”।

জামশেদ মাথা নিচু করে ফেলল। বড় অফিসার গিয়ে তার বুকের কাপড়টা খপ করে ধরলেন, মিঠুন চিলের মত চিৎকার করে উঠল ঠিক তখন জামশেদের পকেটে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা থেকে হুশ করে ভয়ংকর প্লাজমা বের হয়ে সাপের মত এঁকেবেঁকে বের হয়ে এল, জামশেদ একটা গগন বিদারী চিৎকার করে তার মাথা সরিয়ে নিল কিন্তু ততক্ষণে তার একটা কান ঝলসে গেছে, ভুরু মাথার চুল পুড়ে মূহুর্তের মাঝে তাকে অদ্ভুত একটা কাক তাড়ুয়ার মত দেখাতে লাগল।

বড় অফিসার লাফিয়ে পিছনে সরে এলেন, মিঠুন চিৎকার করে বলল, “সাবধান! সাবধান!”

তারপর সে খুব সাবধানে জামশেদের পকেট থেকে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চাটা বের করে আনল। জামশেদ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নড়ল না, অবার হুশ করে প্লাজমা বের হয়ে তার চোখ মুখ ঝলসে দেবে সে তার ঝুঁকি নিল না।

এর মাঝে মিলিটারীর পোষাক পরা আরো কিছু মানুষ চলে এসেছে। তারা জামশেদকে ধরে নিয়ে গেল। মুখের একপাশে ঝলসে গিয়ে তাকে এখন কেমন জানি কার্টুনের মত দেখাতে থাকে। বড় অফিসারটা আরো কিছু ফোন করলেন এবং আমরা তখন বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকলাম। জরুরী কাজকর্ম শেষ করে বড় অফিসার আমাদের দিকে তাকালেন, বললেন, “আমি কর্নেল কায়েস। আমাকে বলবে কী হয়েছে?”

বগা বলল, “খিদে পেয়েছে স্যার।”

ঝুম্পা বলল, “আজকে যখন বাসায় যাব মামী আমাকে খুন করে ফেলবে।”

কর্নেল কায়েস ঝুম্পার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বললেন, “ইয়াং লেডি তোমাকে যেটুকু দেখেছি তাতে মনে হয় না তোমাকে কেউ কখনো খুন করতে পারবে না। তারপরও বলছি, তোমার মামী যেন তোমাকে খুন করতে না পারেন আমি সেটা দেখব। আমার উপর ছেড়ে দাও।”

ঝুম্পা বলল, “বাচা গেল।”

কর্নেল কায়েস তখন টেলিফোনে কোথায় জানি খাবারের অর্ডার দিলেন, বললেন, “কুইক। দশ মিনিটের মাঝে ডেলিভারী চাই।” তারপর আবার আমাদের দিকে তাকালেন, বললেন, “তোমদের ওপর আমার লোকজন যে অত্যাচার করছে আমি সেজন্যে ক্ষমা চাইছি। আই এম রিয়েলী সরি।”

একজন বড় মানুষ গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এভাবে কথা বললে উত্তরে কী বলতে হয় আমরা জানি না, ফারা বলল, “না-না স্যার, আপনি কেন ক্ষমা চাইবেন। আপনার কী দোষ?”

“আমার অফিসার যদি অন্যায় করে তার দায় দায়িত্ব আমার। জামশেদ কিন্তু খারাপ অফিসার ছিল না, কিন্তু তোমরা যেটাকে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা বলছ সেটা নিশ্চই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিষ এর ভেতরে নিশ্চয়ই মিলিওন মিলিওন ডলার আছে তাই লোভের কারণে এটা ঘটেছে। যখন আমরা টের পেয়েছি তোমরা আকাশে ওড়াওড়ি করছ তখন থেকে আমাদের ইন্টেলিজেন্স দিয়ে তোমাদের কথাবার্তা রেকর্ড করেছি তোমাদের ব্যাগে মাইক্রোট্রান্সমিটার বসিয়েছি। আমি অনেক কথা শুনেছি এবং খুবই অবাক হয়েছি। তারপর তো দেখতেই পেলে কী হয়েছে। যাই হোক এখন বল দেখি কী হচ্ছে। তোমাদের মুখ থেকে শুনি?”

আমরা কর্নেল কায়েসকে সবকিছু বললাম, কোনো কিছু গোপন করলাম না। মিঠুন সবকিছুই একটু একটু করে বলে তখন আমাদের সেটা বেশী বেশী করে বলতে হয়। কর্নেল কায়েস সবকিছু শুনে অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে বললেন, “ও মাই গুডনেস! কী আশ্চর্য!”

তারপর বেশ কিছুক্ষণ নিজের মনে কিছু একটা চিন্তা করলেন তারপর বললেন, “তোমরা যেটাকে ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা বলছ সেটা যেহেতু তোমরা আবিষ্কার করেছ কাজেই এটার মালিক তোমরা। কিন্তু তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। এটা থেকে যতখুশী সম্ভব এনার্জী পাওয়া যাবে সে জন্যে নয়, এটা দিয়ে অস্ত্র তৈরি করা যাবে সেজন্যে। এখন আমরা এটাকে তোমাদের কাছে রাখতে দেব কারণ এটাকে সেফলি কীভাবে রাখা যায় সেটা তোমরাই সবচেয়ে ভালো জান। তোমরা ছোট হলেও তোমাদের যথেষ্ট দায়িত্ববোধ আছে।”

আমাদেরকে নিয়ে কেউ কখনো কোনো প্রশংসার কথা বলে না তাই কর্নেল কায়েসের কথাগুলো শুনে আমাদের খুব অস্বস্তি হতে থাকে। আমরা একটু নড়ে চড়ে বসলাম। কী বলব বুঝতে পারলাম না।

কর্নেল কায়েস বললেন, “আমরা পুরো বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা করি তারপর তোমাদের ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা নিয়ে কী করা যায় সেটা নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। যতক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়া না হচ্ছে তোমাদের কাছে রেখো তোমাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই আমি আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে তোমাদের প্রটেকশান দিব।”

বড় মানুষেরা যেভাবে গুরুগম্ভীর আলোচনার পর গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে আমরা সেভাবে মাথা নাড়লাম। তারপর কর্নেল কায়েস তার গাড়ী করে আমাদের সবাইকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যে আমাদেরকে তার গাড়ীতে তুলে নিলেন।

Share This