০৯. শীতের বেলা পাঁচটায় যখন বাইরে এলাম

শীতের বেলা পাঁচটায় যখন বাইরে এলাম, তখন অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। আমার চিন্তার ব্যাপারটা এতই শূন্য বোধ হচ্ছিল যে, অর্থাৎ কিছুই ভাবতে না পারার দরুন আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা শুঁড়িখানায় গিয়ে ঢুকে পড়লাম, এবং হুইসকি চাইলাম। পাত্র যখন এল, তখন দেখলাম, আমার সামনের চেয়ারে একটা লোক এসে বসল, আর আমার দিকে তাকাতেই চিনলাম, মাল সেই তুম্‌বোমুখো ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ইনভেস্টিগেটর। বলল, আপনাকে দেখলাম ঢুকছেন, তাই এলাম।

বেশ করেছেন, একটু চলবে?

না, না, বেশ আছি, ওসব পোষায় না মশার। আপনাকে অনেকবার ফোন করেছিলাম অফিসে, কিন্তু বারে বারেই শুনলাম, সাব নহী হ্যায়।

গেলাসে চুমুক দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, বেয়ারাটাকে সেই রকমই বলে রেখেছিলাম। লোকে বড় জ্বালাতন করে।

তুম্‌বো মুখ একটু বিস্ফোরিত হল, বলল, ঘরেই ছিলেন? আশ্চর্য, আপনি একজন ব্যস্ত অফিসার, জনসাধারণকে নিয়ে আপনাকে সব সময় চলতে হয়, আর এরকম ফোন রিসিভ না করে বসে থাকতে পারেন।

পারলাম তো দেখছি (এখন কী বলবে বল তো চাঁদ, তারপরে কাটো। কোথায় একটু শান্তিতে বসতে এলাম, তা নয়, উনি এলেন উপদেশ দিতে।)

আবার সেই খোকন-চোখে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং প্রশ্ন আপনি মনে করতে পারলেন, কাল ও সময়ে কোথায় ছিলেন?

আমি আবার নিজেকে দেখলাম, আমার সেই গর্তে প্রাণপণে ঢোকবার চেষ্টায় আছি, সেখান থেকেই বললাম, না। কে জানে, হয়তো এখানেই ছিলাম।

না, এখানে ছিলেন না, সেটা খবর পেয়েছি। প্রায় দুটা অবধি আপনি এবং আর একজন রঞ্জন বার-এ ছিলেন।

কথাটা মিথ্যে নয়, অনেক সংবাদই সংগ্রহ করেছে দেখছি। তবে আর আমার মুখ থেকে শোনবার কী দরকার বাবা, নিজেরাই খুঁজে পেতে বের করে নাও না। কষ্ট করবে না, খুনী ধরবে, মাইনেটি মারবে, খালি এই চিন্তা করলে কি হয়? বললাম, তাই নাকি, তা হবে বোধহয়।

লোকটা আবার বলল, কাল দশটার পর, কি তার কাছাকাছি সময়, মরিয়ানা মিডনাইট বার-এ আপনি গিয়েছিলেন।

বাঃ শুঁড়িখানার খবর তো লোকটা একেবারে যাকে বলে যথার্থ পেয়েছে, টু দি পাই। বললাম, তা হতে পারে। এই তো করি মশাই।

কিন্তু সত্যি, আপনার মত একজন দারিত্বশীল অফিসার, ইয়ং ম্যান, রেসপেকটেবল বাড়ির ছেলে যদি সন্ধেবেলার থেকেই এ বার ও বার করে ঘুরে বেড়ান, সেটা ভাল দেখায় না।

কাদের পক্ষে সেটা ভাল দেখায় বলতে পারেন?

যাদেরই হোক, আপনার নয়। বেশ তো বড় বড় হোটেল, যেখানে সাধারণের বিশেষ যাতায়াত নেই, কিংবা নিজেদের কোন আড্ডায়—

জাপনি কলকাতার টপ গ্রেডের লোকদের কথা বলছেন তো? আমার চেয়ে বেশী দায়িত্বশীল, ভোররাত্রে যাদের চ্যাংদোলা করে, হোটেল থেকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আমি অতটা বড় নই। আপনি যাদের কথা বলছেন, আমি তাদের মত রইস নই যে প্যারিসে বা ন্যু-ইয়র্কে ফুর্তি করতে যাব, সত্যি বলতে কি, পেটে মাল পড়লে এখনও নিজের মা বোনকে চিনতে পারি, মাইরি! রোজ রাত্রে মদ মেয়েমানুষের পেছনে টাকা খরচ করার একটা সীমা আছে আমার, সেটা নিশ্চই বোঝেন। যা করি সবই তো মশাই ঘুষের টাকায়।

ঘুষ? আপনি ঘুষও খান নাকি?

আপনি খান না?

আপনার কথাবার্তা অত্যন্ত খারাপ। আমি কোন অফিসারের মুখে এ রকম কথাবার্তা শুনিনি।

তা হবে। এখন আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।

শান্তি কি আপনার আছে?

আপনার থেকে বেশী আছে।

যাই হোক, কাল, সন্ধ্যা ছটা থেকে দশটা পর্যন্ত রাত্রে কোথায় ছিলেন, একটু মনে করুন।

আপনাকে তো আগেই বলেছি, মনে করতে পারছি না।

তার মানে, আপনার এ্যালিবাই অসমি প্রমাণ করতে পারছেন না।

না, ও সম্পর্কে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।

আপনি জানেন, আপনাকে এরেস্ট করা যায়?

করুন, তাতে যদি খুনের কিনারা হয়, নিশ্চয় করবেন।

কিন্তু আপনি একজন অফিসার–।

আইনের চোখে কি তার কোন মাপ আছে?

লোকটা চুপ করে রইল। আমি আবার বললাম, ক্ষেত্র বিশেষ অনেক কিছুই হয়, কী বলেন। আচ্ছা আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?

নিশ্চয়ই।

আচ্ছা বলতে পারেন, আমি আপনি, আমরা কেন জেলের বাইরে?

তার মানে?

তার মানে আমরা সকলেই বেশ বদমাইস নয় কি? আপনি নিশ্চয়ই এ কথা বলবেন না, ওপরওয়ালার ইকুম মেনেই চলতে হবে, আপনার চাকরিটা তো যাকে বলে, সমাজের অপরাধীদের ধরা, বিন্তু সত্যি কি আপনি তা ধরেছেন? সে স্বাধীনতা কি আপনাকে দেওয়া হয়েছে? আপনি কি জোর করে বলতে পারেন, আপনি কোন অপরাধ করেননি, যেমন ধরুন আমি ঘুষ খাই, তেমনি কি বলতে পারেন, আপনি সংবিধান আইন সব নিক্তিতে মেনে চলছেন। আমাদের সব কিছু দেখে কি তাই মনে হয়। এই দেশটাকে দেখে, আর এই দেশের মানুষের অবস্থা দেখে? তা যদি না হয়, তা হলে আপনার আমার মত, আমাদের থেকেও বড় বড় মানুষে কি জেলখানা ভরে যাওয়া উচিত নয়?

লোকটার লাল টকটকে জিভ এই প্রথম দেখলাম, ঠোঁট চাটল, (পাকস্থলীটা সত্যি ভাল।) বলল, আপনার নেশা বোধহয় জমে উঠছে।

না উলেও উঠবে এবার।

তবে এখন চলি, মনে করার চেষ্টা করবেন।

হ্যাঁ, আসুন।

শালুক চিনেছে…। বেশ কয়েক পেগ খাবার পর আমার বেরুতে ইচ্ছে করল, কিন্তু কোথায় যাব, তা বুঝতে পারছি না। এবং আশ্চর্য, একজন চেনাশোনা বন্ধুকেও আজ পেলাম না এখানে, সেটা অসম্ভব ব্যাপার প্রায়। এখানে কেউ না কেউ আসেই, এবং এর সঙ্গে রোজ গাঁজাই, যে, গাঁজানি তারপরে রোজই অর্থহীন মনে হয়, তবু সন্ধ্যের পরে পাখীগুলো কানা হয়ে যায় বলে যেমন আস্তানায় ঢুকে পড়তেই হয়, অনেকটা সেইভাবেই কানার মতই চলে আসি, (দিব্যদৃষ্টি লাভের জন্য, আহা কী রোশনাই, ফুলঝুরি একেবারে!) মদ খাই আর কী বলি, তা নিজেও জানি না, কেবল এই টুকু মনে থাকে, মাঝে মাঝে নীতার কথা মনে হয়, অথচ নীতার কাছে যাওয়া চলবে না, ওর দেখা পাওয়া যাবে না, এইসব ভাবতে ভাবতে, অনেকটা কী বলব, বজ্জাত গাড়ির এঞ্জিনের মত, ভেতরটা গোঁ গোঁ করতে থাকে গোঁ ওঁ ওঁ ওঁ…গোঁ ওঁ ওঁ ওঁ… অথচ চলে না, তারপরে গদাম, করে এক লাথ, (কে যে মারে, টের পাই না।) এবং লাথ খেয়েই লক্কর গাড়ির মত ছুটতে থাকি। কোথায় আর কোন সঙ্গিনীর বা গাড়িতে নিজের বিছানায়। কিন্তু আজ কেউ আসেনি কেন, নীতার মরার সংবাদে নাকি? কেননা, যারা আসে, তারা অনেকেই নীতারও পরিচিত, এবং আজ তারা কেন আসেনি, শোকে না ভয়ে, তা আমি বুঝতে পারছি না। এ সময়েই চোখে পড়ল, একটা মেয়েকে, দোতালার দিকে চলে যাচ্ছে, আমার দিকে চোখ পড়তেই হাত নাড়ল, আমি ওকে ডাকলাম। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ওপরে ওর কোন পুরুষ আছে নাকি, এবং না বলাতে আমার সঙ্গে ওকে আসতে বললাম। জানতে চাইল, কোথায় যেতে চাই, ওর বাড়িতে, না কোন হোটেলে, কোথায়। আমি জানালাম, ট্যাক্সি করে একটু ফাঁকায় বেড়াতে, কারণ শহরের, বিশেষ এই শীতের সন্ধ্যার ধোঁয়াটে দমবন্ধ শহরে থাকতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েটা রাজী হওয়াতে বেরিয়ে পড়া গেল, কারণ ওর একটা লোক পাকড়ানো নিয়ে কথা, সেটা যখন পাওয়া গেল, একটু বেড়াতে যেতে আপত্তি কি। ট্যাক্সিতে উঠে, মেয়েটার গায়ে টায়ে হাত দিলাম, জরিয়ে ধরে বসে রইলাম, কিন্তু মাথার পেছনটা এমন বিশ্রী ব্যথা করছে ঠিক যেন কিছু ভাল লাগছে না। গায়ে টায়ে হাত দিলে যেরকম হওয়া উচিত, সেরকম কিছু বোধ হচ্ছে না কেন, কে জানে, মাথার পিছন দিকের ব্যথাটা কিসের, প্রেসার হয়েছে, না নার্ভের গোলমাল, অথচ এখন বেশ রমরমে ঘোরের মধ্যেই থাকার কথা। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে, এত দিনের মেজাজী ঘোরটা ছিঁড়ে গেল কী করে, মানে কী যে একটা ছিঁড়েছে মনে হচ্ছে, কী আমি তা বুঝতে পারছি না, কিন্তু না, চব্বিশ ঘণ্টাই কি না কে জানে, (এখন আর ঘড়ি দেখতে ইচ্ছা করছে না।) গতকাল এ সময়ে আমি তো একটা ট্যাক্সিতে ছিলাম, নীতার গায়ের সঙ্গে… এ কথা মনে হতেই, আমি মেয়েটাকে আর একবার টের পাবার চেষ্টা করলাম, যে কারণে ও আমাকে হাত বেড় দিয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু কিছুই যেন টের পেলাম না। এটা কী ধরনের ব্যাপার আমি জানি না, আমি কী টের পেতে চাইলাম, তা বুঝতে পারছি না, কেবল মেয়েটা উঃ আঃ করে উঠল, বলল, আমার লাগছে।

লাগছে?

হ্যাঁ, আপনি ভীষণ জোরে চিমটি কাটছেন।

ওঃ সরি—

কী হয়েছে আপনার শরীর খারাপ নাকি?

হুম,—কী জানি!

বেশী খেয়েছেন?

না তো? আচ্ছা, তোমার নাম কী?

মেয়েটা হাসল, বলল, যতবারই আপনার সঙ্গে মীট করেছি, ততবারই নাম জিজ্ঞেস করেন, মনে থাকে না?

না।

সাবিত্রী।

স্‌সাবিত্তিরী! আচ্ছা, তুমি হুলহুপ কর না কেন?

উঃ আপনি আবার লাগিয়ে দিচ্ছেন আমাকে। কিন্তু হুলহুপ করব কেন?

বড্ড চর্বি জমে গেছে। আচ্ছা, তুমি পুরো না হাফগেরস্ত।

পুরোই বলতে পারেন।

বিয়ে-টিয়ে হয়েছিল?

তা একটা হয়েছিল।

সেই সত্যবানটি কোথায়, মরে গেছে?

এ সব কথা তো আপনি কোনদিন জিজ্ঞেস করেন না।

আজ করছি, মানে করতে ইচ্ছে করছে।

পালিয়ে গেছে।

মরে যাওয়াই বলে ওকে, অ্যাঁ।? আচ্ছ, আজ পর্যন্ত কতগুলো লোক তোমার কাছে গেছে?

মেয়েটা আবার হাসল, বলল, তা কি মনে আছে নাকি?

কাউন্টলেস, না? আচ্ছা, তাদের তুমি কী ভাব?

কী আবার?

শুয়োরর বাচ্চা না?

ছি, ছি, কিন্তু—

খদ্দের লক্ষ্মী, অ্যাঁ?

তা, হ্যাঁ, কিন্তু দেখুন, আমার লাগছে, আজ আপনার কী হয়েছে? আপনি এরকম করছেন কেন?

কী রকম বল তো?

আপনি সেটের পাশে জানাটাই বোধহয় ছিঁড়ে ফেললেন।

ওঃ সরি…। চল তোমার ঘরেই যাই।

তাই চলুন।

গাড়ি ঘোরাতে বললাম, তারপরে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা সীতা—

মেয়েট বলে উল, সীতা নয়, সাবিত্রী।

একই তো তোমাকে আমি একটা হুলাহুপ-এর রিঙ, কিনে দেব। আচ্ছা… একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করল ভাবলাম, মনে করতে পারছি না।

আপনি আজ অন্যরকম হয়ে গেছেন, আপনার সেই বদ মেজাজ।

কথাটা হারিয়ে গেল, আর শুনতে পেলাম না, তার বদলে, আমার নিজের গলাতেই আমি একটা গান শুনতে পেলাম, না গাইতে গাইতে নয়, কখনো কোথায় যেন গেয়েছিলাম, সেইটাই শুনতে পেলাম, আই লকড, মাই হার্ট এ্যাণ্ড, থ্রু ভার দি কী!…তার মানে, হৃদয় বন্ধ করে চাবি ফেলে দিয়েছি? তার মানে কী, পেরাণে কুলুপ এঁটে, কাটিটি হাপিস, যাঃ বাবা, তাও কি হয় নাকি? গায়ক আর কথা খুঁজে পেল না? ঘণ্টাখানেক পরে ফিরে এসে মেয়েটার ডেরায় গেলাম, যা হওয়া উচিত, তাই হল, তারপর বাড়ি ফিরে এলাম। সেই বিদিশার প্রেমিক আর বিদিশা ইত্যাদি, সব কিছুই কি রয়েছে, কেবল ওপরে উঠতেই মা ভয় পাওয়া গলায় বলল, অফিসের ঘটনা নাকি সবই পিতৃদেবের কানে এসেছে, নীতার খুনের খবরও, যে কারণে পুলিশ আমার পিছনে ঘুরেছে, সব খবরই এসে পৌঁছেছে। পিতৃদেবের সঙ্গে দেখা করার জন্যে মা বলল, কিন্তু আমি জানালাম, এখন ঘুম ছাড়া আর কিছুই পারব না, যদিচ আজও ঠিক গতকালের মতই গা ঘুলোতে লাগল, মনে হচ্ছে, লিভারটা কলাপোড়া খেয়ে গিয়েছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *