পরের দিন রাত্রে।

রাত তখন প্রায় এগারোটা হবে।

ফোনের একটানা ক্রিং ক্রিং শব্দে সর্বপ্রথম কিরীটীর ঘুমটা ভেঙে যায়।

ব্যাপার কি? এত রাত্রে কার ফোন?

পাশের ঘরেই ছিলেন জীবনবাবু-তারও ততক্ষণে ঘুম ভেঙে গিয়েছে। তিনি রিসিভারটা তুলে নিলেন, হ্যালো, কে-মিঃ রামিয়া! কিরীটীকে ডেকে দেব? জরুরী? হ্যাঁ হ্যাঁ, এখুনি দিচ্ছি।

কিরীটী তার নামটা পাসের ঘরে কানে যেতেই শয্যা থেকে উঠে মধ্যবর্তী দরজাটা দিয়ে জীবনবাবুর শয়নকক্ষে এসে প্রবেশ করল, কে ফোন করছে জীবন?

তোমার ফোন। ইনসপেক্টার মিঃ রামিয়া—

কিরীটী এগিয়ে গিয়ে ফোনটা ধরল, কে মিঃ রামিয়া, আমি কিরীটী। কি—কি বললেন?

ওপাশ থেকে তখন মিঃ রামিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বলে চলেছেন, এইমাত্র ডিবরাজের সামনে যে প্রহরীরা প্রহরায় ছিল তারা আমাকে ফোন করেছে-তিনি খুন হয়েছেন

কখন? কি করে হল?

জানি না—আমি সেখানে যাচ্ছি-আপনি কি আসবেন?

নিশ্চয়ই যাব।

তাহলে প্রস্তুত থাকুন, যাবার পথে আমি তুলে নিয়ে যাব।

কিরীটী চটপট প্রস্তুত হয়ে নেয়।

সুব্রত ও রাজুর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ইতিমধ্যে। সব শুনে তারাও বললে যাব। কিরীটী বললে, না, সকলেই আমরা যাব না। তোরা থা—আমি একাই যাচ্ছি। প্রয়োজন হলে তোদর জানাব।

সুব্রত বললে, কিন্তু কিরীটী–

ডাঃ ওয়াং-সেই হলুদ শয়তানের যতটুকু পরিচয় পেয়েছি, তার খরদৃষ্টি নিশ্চয়ই সর্বক্ষণ আমাদের ওপরে আছে। কেবল ডিবরাজকেই হয়ত হত্যা করেনি শয়তানটা, আমার জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে কিনা ইতিমধ্যে সেখানে একটা কে জানে! যদি একটা কিছু ঘটেই দুর্ঘটনা–তোরা বাইরে থাকলে হয়ত কাজে লাগতে পারবি-পুলিস-চীফ মিঃ বন্দরনায়ককে সঙ্গে সঙ্গে জানাবি ব্যাপারটা। নিশ্চয়ই তিনি সবরকম সাহায্যই করবেন।

সুব্রত আর রাজু আপত্তি করল না।

কিরীটী পকেটে একটা শক্তিশালী পেনসিল টর্চ, একটা পাকানো কর্ড, একটা ছুরি ও অ্যানিয়া লোশনের একটা ছোট শিশি নিয়ে নিল।

বাইরে ঐ সময় মিঃ রামিয়ার গাড়ির হর্ন শোনা গেল।

চললাম—অ্যালার্ট থাকিস! কিরীটী বের হয়ে গেল।

 

ঘুমন্ত জনহীনপ্রায় রাস্তা ধরে ভিক্টোরিয়া পার্কটার দিকে মিঃ রামিয়ার গাড়ি পঞ্চাশ মাইল স্পীডে ছুটে চলেছিল।

কিরীটী শুধায়, আপনার প্রহরী আর কোন সংবাদ দিয়েছে?

না।

কিরীটী বললে, দোষটা আমারই মিঃ রামিয়া, আমার আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল। তার আস্ফালন যে নিষ্ফল নয়, দুর্বলের বহ্রারম্ভ নয় জানা উচিত ছিল আমার—তাহলে হয়ত আজকের দুর্ঘটনা ঘটত না।

কিন্তু এ যে সত্যিই এক ভয়াবহ বিভীষিকার সৃষ্টি করল হলুদ শয়তানটা মিঃ রায়! মিঃ রামিয়া বললেন।

হ্যাঁ, তা করেছে। তারপর একটু থেমে বললে, তবে আজকের খেলাই তার শেষ খেলা!

 

বাংলোর মধ্যে গাড়িটা প্রবেশ করতেই পোর্টিকোর সামনে দেখা গেল দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে, তাদেরই একজন ফোন করেছিল মিঃ রামিয়াকে।

লাশ কোথায়? মিঃ রামিয়া জিজ্ঞাসা করলেন।

মিঃ ডিবরাজ তার শয়নঘরেই নিহত হয়েছেন।

কে ফোন করেছিল আমায়?

প্রথম প্রহরী বললে, আমিই।

আর চারজন প্রহরী কোথায়?

দুজন এখনো বাইরে-আমরা তিনজন ভিতরে—

কিরীটী ঐসময় প্রশ্ন করলে, তোমাদের দুজনকেই তো দেখছি, আর একজন কই?

সে ভিতরে মৃতদেহ পাহারা দিচ্ছে।

ওরা ভিতরের দিকে অগ্রসর হল।

পার্লার পার হয়ে অন্দরে পা দিতেই একটা মৃদু কান্নার আওয়াজ কিরীটীর কানে এল। কে যেন গুমরে গুমড়ে কাঁদছে।

কৃষ্ণা কি? কিরীটীর মনে হয়, কৃষ্ণাই হয়ত কাঁদছে। পুওর গার্ল। হ্যাঁ, দেখা গেল আর একটু এগুতেই, ঘরের সামনে বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে বসে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুলে ফুলে কাদছে কৃষ্ণা।

পরনে তার আজ একটা ক্ৰীম-কলারের জর্জেট শাড়ি ছিল। মাথার অপর্যাপ্ত কেশ তার অবিন্যস্ত।

মিঃ রামিয়া ডিবরাজের শয়নঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিরীটী কিন্তু কৃষ্ণার সামনে এসে দাঁড়াল, কৃষ্ণা!

কৃষ্ণা মুখ তুলে তাকাল। দুচোখ-ভরা লোনা টলটলে অশ্রু। কান্না-ভেজা গলায় বললে, মিঃ রায়, ড্যাডি–

আমারই বোধ হয় দোষ কৃষ্ণ—

আপনার দোষ! বিস্ময়ে কৃষ্ণা কিরীটীর মুখের দিকে তাকাল।

হ্যাঁ, আমি-আমি যদি আর একটু সাবধান হতাম-কখন ব্যাপারটা ঘটেছে? কখন টের পেলেন?

ড্যাডি বের হয়েছিলেন সন্ধ্যার পর, তাঁরই পার্সোনাল সেক্রেটারী রাজীবলোচনের একটা ফোন পান অফিস থেকে, বেরুবার সময় বলে যান, ফিরতে যদি রাত হয় তো আমি যেন ডিনার সেরে নিই, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

আর কিছু বলেন নি মিঃ ডিবরাজ?

না। তবে অধস্ফুট ভাবে বলেছিলেন যেন আমার মনে হল-বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে, রাজীবটা একটা অপদার্থ!

আর কিছু?

না।

রাজীব কতদিন আপনাদের এখানে আছেন?

নতুন লোক-বৎসরখানেক এসেছেন।

আগে কে ছিল?

কৃষ্ণাপ্পা।

সে কি কাজ ছেড়ে দিয়েছে?

না, বাবা তাকে বোম্বাইয়ের অফিসে পাঠিয়েছিলেন—সে সেখানেই আছে—

মিঃ ডিবরাজ কি আজ বাড়িতেই ছিলেন?

হ্যাঁ, আজ বাড়ি থেকে বের হননি।

কেউ আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?

না।

এমন কোন ঘটনা কি ঐ সময়ের মধ্যে ঘটেছে, যেটা আপনার মনে আছে?

না, তবে—

বলুন?

বিকেলের ডাকে ড্যাডির নামে একটা ছোট পার্সেল এসেছিল।

পার্সেল? কিসের পার্সেল?

ড্যাডির টেবিল-ক্লকটা হঠাৎ পড়ে গিয়ে টেবিল থেকে দিন-পনের আগে ভেঙে যায়, তাই ড্যাডি লণ্ডনের একটা ওয়া কোম্পানীতে চিঠি দিয়েছিলেন—ঠিক ঐরকম একটি টেবিল-ক্লক পাঠাবার জন্য—বোধ হয় সেটাই–

পার্সেলটা আপনার ড্যাডিকে খুলতে দেখেছিলেন?

না।

বাড়িতে আপনাদের কজন চাকর-বেয়ারা?

দুজন মাদ্ৰাজী ভৃত্য-কৃষ্ণান আর রামনাথন, আয়া কুডি, কুক আব্দুল, ড্রাইভার দেলোয়ার সিং আর দুজন পাঠান দরোয়ান-হামিদ খান আর হবিবুল্লা খান।

এরা সবাই বিশ্বাসী?

সবাই বিশ্বাসী।

কতদিন কাজ করছে এ বাড়িতে ওরা?

অনেক বছর।

আপনার ড্যাডির নতুন সেক্রেটারী রাজীবলোচনকে আপনার কি রকম মনে হয়?

ড্যাডি, তো ওর খুব প্রশংসা করত, বলত লোকটা যেমন স্মার্ট তেমনি কর্মঠ, তেমনি পরিশ্রমী ও বিশ্বাসী।

কত বয়েস হবে তার? তাকে তো দেখিনি আমি!

না, আপনারা যেদিন এসেছিলেন—রাজীব তখন বাংলোতে ছিল না।

এই বাংলোতেই কি সে থাকে?

যা, পারলারের পাশের ঘরটায়।

Share This