এই রচনায় চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে রাজ্জাক স্যারের সম্পর্কের বিষয়টি আমি বিবৃত করতে চাই। আমার সঙ্গে আকস্মিকভাবে সুলতানের পরিচয় হয়। কী করে কোন পরিস্থিতিতে সুলতানের সঙ্গে আমার পরিচয় হল, সে বিষয়ে এখানে বিশেষ বলার অবকাশ নেই। শুধু এটুকু বলতে চাই, উনিশশো ছিয়াত্তর সালে শিল্পকলা একাডেমীতে সুলতানের আঁকা প্রায় পাঁচশো ছবির একটা প্রদর্শনী হয়। এই প্রদর্শনীতেই প্রথম আমি সুলতানের আঁকা ছবি দেখি এবং অভিভূত হয়ে যাই। পত্রপত্রিকায় সুলতানের বেশভুষা, বৈচিত্র্যময় জীবন, এবং গঞ্জিকাপ্রীতি এসব নিয়ে এন্তার গল্প কাহিনী প্রচারিত হলেও চিত্রশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা সুলতানের আঁকা ছবির উৎকর্ষ বা অপকর্ষ সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে কেউ রাজি ছিলেন না। নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলে একটা ধারণা আমার মনে বদ্ধমূল হয় যে ইংরেজিতে যাকে কনস্পিরেসি অভ সাইলেন্স বলা হয়, সুলতানকে ঘিরেও একটা নীরব ষড়যন্ত্র আর্ট এস্টাবলিশমেন্টের লোকেরা করে যাচ্ছিলেন। নীরব উপেক্ষার মাধ্যমে সুলতানের শিল্পকর্মকে সর্বসাধারণের সচেতন মনোযোগ থেকে আড়াল করে রাখাই ছিল এঁদের অভিপ্ৰায়।

আমি যখন বুঝতে পারলাম, শহরবাসী আর্ট এস্টাবলিশমেন্টের লোকেরা সুলতানের শিল্পকর্মের ব্যাপক পরিচিতি এবং মূল্যায়নের পথে একটা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, তারপর আমি আমার কর্তব্য স্থির করলাম। যে-করেই হোক, সুলতানকে অবশ্যই জনসমক্ষে প্রকাশমান করে তুলতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল আমি নিজে কিন্তু চিত্রশিল্পী নই। চিত্রশিল্পের ব্যাপারে আমার মতামতের কোনো মূল্য নেই। তাই আমি চাইছিলাম, সমানে মান্যতা অর্জন করেছেন এমন কোনো ব্যক্তি যদি সুলতানকে তুলে ধরতে এগিয়ে আসেন। আমার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। অনেকের কাছেই গেলাম। কেউ-কেউ আগ্রহ প্রদর্শন করলেন, কেউ-কেউ শীতলতা। যাহোক, রাজ্জাক স্যারের কাছে গিয়ে সুলতানের ছবি সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বললাম। দেখলাম, চিড়ে ভেজার কোনো সম্ভাবনা নেই। স্যার তখনও শিল্পী বলতে বোঝেন, ওই একমাত্র জয়নুল আবেদীন। চিত্রকলার অনেক লোকের সঙ্গে স্যারের ওঠা বসা, যাওয়া-আসা আছে, কিন্তু প্ৰাণের ভেতর থেকে জয়নুল আবেদীন ছাড়া অন্য কাউকে স্বীকৃতি দিতে চান না।

আমি একটুখানি দমে গেলাম। এই এতদিনে রাজ্জাক স্যারকে অত্যন্ত সংবেদনশীল চরিত্রের মানুষ বলে জেনে গিয়েছিলাম। তার কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া যখন পাওয়া গেল না। সুলতানকে নিয়ে কী করবো স্থির করতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার স্থির ধারণা সুলতান একজন বিশ্বমাপের শিল্পী। সকলে তাকে স্বীকার করে নিতে কুন্ঠা প্রদর্শন করছেন। কারণ তারা একজন আগন্তুককে শ্ৰেষ্ঠত্বের আসনখানি ছেড়ে দিতে নারাজ। আমি মনেমনে এভাবে গোটা ব্যাপারটা চিন্তা করলাম। সুলতানের মতো আমিও গ্রাম থেকে এসেছি। আজকে শহরের লোকেরা সুলতানকে যে উপেক্ষা এবং অবহেলা প্রদর্শন করছে, এই জিনিসটি একদিন আমার বেলায়ও ঘটতে পারে। সুলতানকে যদি ওই নীরব ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বের করে না আনতে পারি, একদিন আমাকেও সুলতানের ভাগ্য মেনে নিতে হবে। আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষিক শামীম শিকদার আমার বন্ধু ছিল। সে ছিল তখন ছাত্রী। শামীম এবং তার বন্ধুবান্ধবেরা আমার ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের কক্ষটিকে অনেকটা তাদের স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করতো। এই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে আমি নিজেও অল্পস্বল্প ছবি আঁকার কলাকৌশল রপ্ত করলাম। খুব গভীরভাবে শিল্পকলা সম্বন্ধে পড়াশোনা করতে আরম্ভ করলাম। অনেকদিন পড়াশোনা করার পর আমার একটা প্রত্যয় জন্মালো যে সুলতানের সম্পর্কে কিছু সাহসী বক্তব্য প্রকাশ করার যোগ্যতা আমার জন্মেছে। আমি সুলতানের চিত্রকর্মের ওপর ‘বাংলার চিত্রঐতিহ্য এবং সুলতানের সাধনা’ শিরোনামে পঞ্চাশ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্ৰবন্ধ লিখে ‘মূলভূমি’ নামাঙ্কিত একটি সাময়িকীতে প্রকাশ করলাম। তারপর প্রবন্ধটা আলাদা একটি পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশ করি এবং সাহিত্যশিল্পের অনুরাগী মানুষদের একটি করে পুস্তিকা কখনো নিজের হাতে অথবা লোক মারফত কিংবা ডাকযোগে পাঠিয়ে দিতে থাকি। একটা পুস্তিকা নিয়ে একদিন রাজ্জাক স্যারের বাড়িতে হাজির হলাম। স্যারকে বিশেষভাবে অনুরোধ করি তিনি যেনো আমার লেখাটি পড়ে দেখেন। স্যার যেনো মনে না করেন আমি একটা উটকো লোকের বিষয় নিয়ে অযথা উৎপাত করছি, সেজন্য দশ পনরোদিন ওমুখো হইনি।

এক সকালবেলা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনলাম কে একজন দরোজায় টোকা দিচ্ছে। চোখেমুখে ঘুম নিয়েই আমি জিগ্‌গেস করলাম, কে? জবাব পেলাম, আমি আবদুর রাজ্জাক।

বজলুর ক্যান্টিনের যে ছেলেটা সকালে নাস্তা খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতো তার নামও আবদুর রাজ্জাক। আমি ভাবলাম ক্যান্টিন—বয় আবদুর রাজ্জাক আমাকে নাস্তা খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছে। আমি ঘুমের ঘোরেই বলে বসলাম, রাজ্জাক মিয়া এখন যাও, পরে গিয়ে নাস্তা খাবো।

ওপার থেকে জবাব পাওয়া গেল, পরে অইলে নাস্তা নাও পাইতে পারেন।

রাজ্জাকের বাড়ি বরিশাল। এই আওয়াজটি বরিশালের নয়। আমি উঠে দরোজা খুললাম। ওমা, দেখি রাজ্জাক স্যার! স্যার ঘরে এসে বসলেন। তার হাতে পুস্তিকাটি। আমাকে বললেন, কামড়া ভালা করছেন। আপনের সুলতান কই?

আমি বললাম, তিনি নড়াইলে থাকেন।

স্যার বললেন, ঢাকায় আইব না?

বললাম, দুচার দিনের মধ্যে আসার কথা আছে।

স্যার বললেন, অইলে একবার দেখা করাইয়া দিয়েন।

সুলতানের প্রসঙ্গ শেষ করার আগে আরও দুটি মজার গল্প আমাকে বলতে হবে। আমি একটা প্রেস করেছিলাম। সেই প্রেস থেকে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। বত্ৰিশ নম্বর তোপখানা রোডে ছিল অফিস। তখন আমি মীরপুরে থাকতাম। একদিন স্যারের বাড়িতে যেয়ে অনুরধ করেছিলাম, তিনি যেনো আমার প্রেসে এসে একবার পায়ের ধুলো দিয়ে যান। পরের দিন অফিসে এসেই আমার প্রেসের ম্যানেজারের মুখে শুনলাম, একজন লুঙ্গি, চাদর এবং পাঞ্জাবি-পরা বুড়োমতো মানুষ বেলা ন’টার সময় এসে অনেকক্ষণ আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করেছেন। স্যার যে পরদিনই প্রেসে চলে আসবেন ভাবতে পারিনি। আমি ম্যানেজারকে জিগ্‌গেস করলাম, আপনি অফিস খুলে বসতে দেননি কেনো? ম্যানেজার আমাকে জানালেন, আমি মনে করেছি প্রেসের মেশিনম্যান কিংবা কম্পোজিটরের চাকুরি চাইতে লোকটা এসেছিলো। আমাদের কোনো মানুষের প্রয়োজন নেই। তাই বলে দিয়েছি আমাদের এখানে কোনো মানুষের দরকার নেই। শুনেই লোকটা চলে গেলো।

আমি ভীষণ শরমিন্দা হয়ে পড়লাম। দুপুরবেলাতেই স্যারের বাড়িতে গেলাম। বাড়িতে সকলে তখন খেতে বসছেন। স্যার আমাকে দেখেই বললেন, এ্যাতো দেরি কইর‍্যা অইলে আপনের ব্যবসা চলব কেমন কইর‍্যা। আমি আমার কর্মচারীর খারাপ ব্যবহারের জন্য মাফ চাইতে যাচ্ছিলাম। স্যার আমাকে মুখই খুলতে দিলেন না। বললেন, হাত ধুইয়া বইয়া পড়েন, অনেকদিন আপনে আমাগো লগে খাইতে আহেন না।

আরেকবার আমার এক জার্মান-প্রবাসিনী পশ্চিমবাংলার বান্ধবী এসেছিল। তাকে নিয়ে গুলশানে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি তখন তার ভ্রাতুষ্পপুত্র আবুল খায়ের লিটুর সঙ্গে থাকতেন। সেদিন দুপুরে আমরা স্যারের ওখানে খাওয়াদাওয়া করেছিলাম। তখন চৈত্রমাস শেষ হতে চলেছে। আমরা খেয়েদেয়ে বাড়ির সামনের উঠানে এসে দাড়িয়েছি, আমার বান্ধবীটি গাছে থরেথরে ঝুলন্ত কাঁঠাল দেখে ভীষণরকম উদ্বেল হয়ে ওঠে। সে স্যারকে জিগ্‌গেস করে বসে, কাকাবাবু, আপনার বাড়ির কাঁঠাল দিয়ে এঁচোড় রান্না করা যায় না?

স্যার বললেন, আপনের এঁচোড় খাইবার খুব ইচ্ছা হয় নিহি?

আমার বান্ধবীটি বলল, সেই কবে ছোটোবেলায় খেয়েছি। আপনার গাছের কাঠাল দেখে এঁচোড়ের কথা মনে পড়ে গেল।

স্যার বললেন, এঁচোড় যে খাইবার চান কী করে রানতে আয় হেইডা জানেন কি না।

আমার বান্ধবী মুখ কালো করে বললেন, না কাকাবাবু, এঁচোড় কী করে রাঁধতে হয় শিখিনি।

স্যার আমাকে বললেন, মৌলবি আহমদ ছফা এক কাম করেন, আপনি কই থাকেন ঠিকানা লেইখ্যা থুইয়া যান। কাইল দুপুরে এঁচোড় রাইন্ধ্যা পাঠাইয়া দিমুনে।

আমি ঠিকানা লিখে চলে এলাম।

পরের দিন আমার বান্ধবীকে কাচপুর ব্রিজের কাছে নদী দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে বেলা হয়ে গেল। ঘরে এসে যখন গোসল করে বসলাম, আমার কাজের ছেলে ইদ্রিসের কাছে কাহিনীটা শোনা গেল।

ইন্দ্রিস বলল, একটা বুইর‍্যা মানুষ এই টিফিন ক্যারিয়ারটা রাইখ্যা গেছে। তখনই মনে পড়ে গেল। রাজ্জাক স্যার বলেছিলেন তিনি এঁচোড় রান্না করে দুপুরবেলা পাঠিয়ে দেবেন। আমি ইদ্রিসকে জিগ্রগেস করলাম, তুমি ভদ্রলোককে খাতির করে ঘরে ডেকে বসিয়েছিলে কি না।

ইদ্রিস জবাব দিল, মানুষটার গায়ে একটা ফাডা ছিড়া পাঞ্জাবি আর ময়লা লুঙ্গি আর ঢাকাইয়া কথা কয়। কই থেকা আইছে যখন জিগাইলাম, কয় সায়েব টিফিন ক্যারিয়ার দেখলেই বুঝতে পারবো নে। আমিও ডাকি নাই। হেই বেডাও বসবার চায় নাই।

এখন সুলতানের কথায় আসি। মাসখানেক পড়ে সুলতান এলেন নড়াইল থেকে। আমি ওনাকে নিয়ে স্যারের বাড়িতে গেলাম। সুলতানের একটা বৈশিষ্ট্য আমি গোড়া থেকেই লক্ষ করে এসেছি। যাঁদের সঙ্গেই তার পরিচয় হয়, সকলে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। স্যারের বেলায়ও তার ব্যত্যয় হল না। স্যার একা নন, তাঁর পরিবারের সকলেই সুলতানের প্রতি মমতাসম্পন্ন হয়ে উঠেছেন। স্যারের ভ্রাতৃবধূ, দুই ভ্রাতুষ্পপুত্রী মায় অতিশিশু নাতিটি পর্যন্ত সুলতানের অনুরাগী হয়ে উঠেছে। এত মিষ্টি করে এমন সুন্দর কথা সুলতানের মতো আর কাউকে বলতে দেখিনি।

সেদিনই বিকেলবেলা সুলতান তাঁর জোব্বাজাব্বা, নিজের হাতে বানানো বাঁশির বোঝা, গাঁজার কন্ধি এবং অন্যবিধ সাজসরঞ্জাম নিয়ে স্যারের বাড়ির নিচতলায় এসে আস্তানা পাতালেন। তার পর থেকে যখনই স্যারের বাড়িতে যাই দেখি আমার সঙ্গে সুলতানের কথা বলার সময় হয় না। কখনো দেখি স্যারের মুখোমুখি বসে গম্ভীরভাবে আলাপ করছেন এবং মাথা দোলাচ্ছেন। অথবা বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে প্রবাসজীবনের গল্প করছেন। স্যারের শ্যামলা নাতি লিটুর ছেলে যার চোখদুটি খুব বড় বড় এবং যে বড়সড়ো খাঁচায় দুটো রাজঘুঘুর বাচ্চা পোষে, তার সঙ্গেও দেখি সুলতানের গলায়-গলায় ভাব। প্রতিদিনই দেখি সুলতান স্যারকে নিয়ে নানা জায়গায় যাচ্ছেন। আমার খুব ঈর্ষা হচ্ছিলো। আমিই সুলতানকে স্যারের কাছে নিয়ে এলাম, এখন দেখতে পাচ্ছি। সুলতান আমাকে হটিয়ে দিয়েছেন।

একদিন সকালবেলা স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখি সুলতান নেই। আমি স্যারকে জিগ্‌গেস করলাম, সুলতান ভাই কই?

স্যার বললেন, সুলতানের লোকরা আইস্যা ডাইক্যা লইয়া গেছে।

আমি বললাম, সুলতানের আবার লোকজন আসবে কোত্থেকে!

স্যার বললেন, তামুক টামুক খাইবার লোকজন আর কি।

আমি বললাম, গাঁজাখোররা আপনার বাড়ির ঠিকানা পেল কেমন করে?

স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ঠিকানা পাওনের কোনো কষ্ট নাই, অরা গায়ের গন্ধেই টের পাইয়া যায়।

তারপর স্যার আসল কথা পাড়লেন। কয়েকদিন থেকে সুলতান নাকি স্যারকে বলছেন তার তিনশোর মতো ছবি সোনার গাঁয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এগুলো যদি ওখান থেকে উদ্ধার করা না যায় ছবিগুলোর কিছুই থাকবে না। সুলতানের ছবি সোনার গাঁয়ে গেল কী করে সে কাহিনীটা বলা প্রয়োজন। উনিশশো ছিয়াত্তর সালে শিল্পকলা একাডেমীতে যখন সুলতানের চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়, সেই সময়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী নূরুল ইসলাম শিশুর বেগম প্রদর্শনীতে ছবি দেখে সুলতানের ছবির প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। ভদ্রমহিলার বোধহয় অল্পস্বল্প আঁকার ঝোঁক ছিলো। তিনি সুলতানকে ছবি আঁকা শিখিয়ে দিতে অনুরোধ জানান। সুলতানও রাজি হয়ে যান। কিছুদিন মন্ত্রীর বাড়িতে সুলতানের নিয়মিত যাওয়া-আসা চলে। সেই সূত্রে নূরুল ইসলাম শিশুর সঙ্গে সুলতানের পরিচয়। একদিন কথায়—কথায় সুলতান মন্ত্রীসাহেবকে জানান, এই প্রদর্শনীর শেষে ছবিগুলো নিয়ে কোথায় রাখবেন ও নিয়ে তাঁর ভয়ানক দুশ্চিন্তা। ঢাকা কিংবা কাছাকাছি কোথাও একটু জায়গা পাওয়া গেলে সুলতান ছবিগুলো সরিয়ে নিয়ে রাখতে পারেন। নুরুল ইসলাম শিশু সাহেব সরকারি ক্ষমতা খাটিয়ে সোনার গাঁইয়ের পানামে একটা পরিত্যক্ত দোতলা বাড়ি সুলতানকে বরাদ্দ করেন। সুলতান শিল্পকলা একাডেমী থেকে ছবিগুলো সে বাড়িতে নিয়ে যান এবং তার বিশ্বস্ত চেলা বাঁটুলকে নিয়ে সে বাড়িতে বাস করতে আরম্ভ করেন। এই জায়গাটি সুলতানের মনে ধরেছিলো, তার পেছনে বোধকরি একটাই কারণ—এই বাড়ির পাঁচ সাত বাড়ি পরে জয়নুল আবেদীন লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপন করেছিলেন। হয়তো সুলতানও ওরকম কিছু একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন।

মাসখানেক থাকার পর অনুভব করলেন, এই দরোজা-জানালাহীন পিশাচের মতো দাঁত-বের—করা লাল ইটের জীর্ণ বাড়িতে সুলতানের পক্ষে বাস করা সম্ভব নয়। তিনি বাঁটুলকে এই বাড়িতে রেখে নড়াইল চলে গেলেন। ছবিগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে, রোদে পুড়তে থাকে। কিছুদিন বাটুল এবং তার মাকে খাওয়া—পরার পয়সা জুগিয়েছিলেন। বাটুল আদি পেশায় ছিল নরসুন্দর। সুলতানের আকর্ষণে জাতপেশা ছেড়েছিল এবং বাটুলের জননী ছিল সুলতানের শিষ্যাদের একজন। অনেকেই হয়তো জানেন না সুলতান ছিলেন নড়াইলে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের কাছে একজন দেবতার মতো মানুষ। তারা গোসাইজ্ঞানেই তাকে শ্রদ্ধা করতো। তার শিষ্য-শিষ্যার সংখ্যাও ছিল অনেক।

সুলতান বাটুলকে সোনার গাঁয়ের বাড়িতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে সেই যে চলে এসেছিলেন সেই বাড়িতে আরেকবার মাত্র পদার্পণ করেছিলেন। জীবনধারণের জন্য বাটুল সে বাড়ির কাছাকাছি একটা সেলুন খুলে বসে। নড়াইল থেকে মা, বউ এবং বাচ্চাদের নিয়ে ওই বাড়িতে বাস করতে আরম্ভ করে। কিছুদিন পর বাটুলের মা ওই বাড়িতে মারা যায়। আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বাঁটুলকে সপরিবারে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে বাড়ি দখল করে বসে এবং এটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি লিখে একটা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়।

বাঁটুল অন্য একটা বাসা ভাড়া করে বাস করতে আরম্ভ করে। সে সময়ে আশা পোষণ করতো একসময়ে সুলতান সেই বাড়িতে গিয়ে বসবাস করবেন। উনিশশো চুরানব্বই সালে সুলতান মারা যাওয়ার পর বাটুল বিশ্বাস করতো এই বাড়িতে সুলতানের কোনো স্মৃতি থাকলো না। বাটুল প্রায়ই আমার কাছে আসতো এবং বলতো সুলতানের মতো একজন মহাপুরুষের স্মৃতি কিছুতেই মুছে যেতে পারে না। সোনার গাঁয়ের সুলতানের স্মৃতিরক্ষার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। বাটুলের এই বিশ্বাস আমার কাছে পাগলামো মনে হত। তবু তাকে সে কথা বলতে পারিনি। উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে স্থানীয় কিছু তরুণদের নিয়ে সুলতানের মৃত্যুদিবস ওই বাড়ির সামনে উদযাপন করার আয়োজন করেছিল। আমার কাছে পাকা কথা আদায় করেছিল। ঠিক দুটোর সময়ে পানামের বাড়িটির সামনে গিয়ে হাজির হই। আমি রত্নেশ্বর নামক তরুণ এবং বন্যা নামের এক তরুণীকে নিয়ে ঠিকই সোনারগাঁয়ে গিয়েছিলাম। ওই বাড়িটির সামনে গিয়ে দেখি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। বাটুলকে অনেক খোঁজ করে বের করতে হলো। বাটুল জানালো সে লজ্জিত। কিন্তু আমাদের সান্ত্বনা দিতে ভুললো না। স্যার, কিছু মনে করবেন না। ফাঁকিজুকি আর ক’দিন চলবে! কতদিন আর দেবতার জায়গা দখল করে রাখতে পারবে! দেখবেন এই বাড়িতেই শিল্পী সুলতানের শিল্পমন্দির তৈরি হবে। এই সোনার গাঁতেই একদিন শিল্পী সুলতানের নামের ডঙ্কা বাজবে।

এরই মধ্যে বাটুল আমার কাছে আরও পাঁচ-সাতবার আসা-যাওয়া করেছে। সে এলে আমি ভারি বিব্রত হয়ে পড়তাম। কোনোরকমে যাওয়া-আসার পথখরচটা দিয়ে রেহাই পেতে চেষ্টা করতাম। তথাপি বাটুলকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। কারণ তার মধ্যে আমি একটা পবিত্র অগ্নিশিখা জ্বলছে, এরকম অনুভব করতাম। দুমাস আগে বাটুলের ন্যাড়ামাথা বড়ো ছেলেটি এসে জানিয়ে গেলো দশদিন আগে তার বাবা মারা গেছে। ছেলেটি জানালো মরবার আগেও তার বাবার মুখে ছিল সুলতান সাহেবের নাম। ছেলেটি দশ পনেরো দিন অন্তর একবার করে আসে। আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় তার একটি চাকুরির প্রয়োজন। এখনও পর্যন্ত আমি তার কিছুই করতে পারিনি। আর আসে প্রফুল্ল। প্রফুল্লের কথাটি বলে আমি আবার রাজ্জাক স্যারের কথায় ফিরে যাবো।

আগুন যেমন পতঙ্গকে আকর্ষণ করে সুলতানের প্রতিও কিছু মানুষ তেমনি আকৃষ্ট হত। প্রফুল্ল তার একজন। প্রফুল্লর বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। পেশাতে সে কাঠমিস্ত্রি। বাড়িতে তার এক বুড়ো দাদা আর তার ছেলেমেয়ে। প্রফুল্লের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। এখনও বিয়ে করেনি। একসময় ঠিকা কাজ করতে সোনার গাঁ এসেছিলো। তখনই সুলতানের সঙ্গে পরিচয়। তার পর থেকেই সে ছবি আঁকতে শুরু করে। গুরু সুলতান। তিনি ভরসা দিয়েছেন, একে যাও, একসময় তুমি নামকরা শিল্পী হবে। গুরুর আশীৰ্বাদ সম্বল করেই প্রফুল্ল এঁকে যাচ্ছে। রঙ নেই, তুলি নেই, কিছু নেই, তথাপি প্রফুল্লের বিরাম নেই। দূর থেকে দেখলে প্রফুল্লের ছবিগুলোকে সুলতানের ছবি বলে ভ্রম হয়। কাছে এলে অবশ্য টের পাওয়া যায়। প্রফুল্লের যদি আরেকটু বিদ্যা থাকত, সে যদি আরেকটু সচ্ছল হত! সুলতানকে কেনো আমি অসাধারণ একজন মানুষ মনে করতাম, এতদিনে তার একটা কারণ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। সুলতান প্রফুল্লের মতো একজন মাঝ—বয়সী অশিক্ষিত মানুষের মনেও শিল্পী হওয়ার বীজ বুনে দিতে পেরেছিলেন। এমন তো আর কাউকে দেখিনি!

এ লেখা যখন লিখছি তার এক সপ্তাহ আগে প্রফুল্ল এসেছিল। জামার পকেট থেকে দুমড়ানো মোচড়ানো একটা পেপারকাটিং বের করে দিয়ে বলল, স্যার পড়ে দেখুন।

আমি বললাম, তুমিই পড়ে শোনাও।

সে পড়ে শোনালো। ভ্যান গ’গ-এর একটি ছবি নীলামে বিক্রি হয়েছে। আমাদের টাকায় দাম উঠেছে আটান্ন কোটি টাকা। প্ৰফুল্ল বলল, স্যার, আটান্ন কোটি অনেক টাকা—তার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো—অথচ লোকটা না খেতে পেয়ে আত্মহত্যা করেছে।

রাজ্জাক স্যারের কথা বলতে গিয়ে সুলতানের কথা বলতে হচ্ছে। সুলতানের কথায় বাটুল এবং প্রফুল্লের কথা ঢুকে পড়েছে। এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। তবু বললাম। হয়তো সুলতানের ওপর আবার লেখার সুযোগ আমার হবে না।

যাহোক মূল বিষয়ে ফিরে আসি। রাজ্জাক স্যার বললেন, সুলতানের ছবিগুলা নিয়া আইবার কথা কইবার লাগছে তিন চার দিন থেইক্যা। হাঁচাই ত এইভাবে পইড়া থাকলে ছবির ত কিছু থাকত না। আমি হুদা সাহেবরে কইয়া একখানা ট্রাকের ব্যবস্থা করছি। কাইল আপনের হাতে যদি সময় থাকে একটু গেলে ভালা অয়। সুলতান সায়েব আপনাভোলা মানুষ। কওনি তো যায় না কখন কী কইর‍্যা বসে। সরকারি গাড়ি পাঁচটার আগে ইডেন বিল্ডিংসের গেরেজে দিয়্যা আইতে অইব। নইলে হুদা সাহেবকে বিব্রত বোধ করতে অইব।

হুদা সাহেবের একটু পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। হুদা সাহেব মানে মির্জা নূরুল হুদা। একসময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন। তারপরে জিয়ার সময়ে বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি রাজ্জাক সাহেবের ছাত্র এবং অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকও ছিলেন।

আমি রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, যাবো।

তার পরের দিন ট্রাক নিয়ে সোনার গাঁ চলে গেলাম। সুলতান সাহেবের নামে বরাদ্দ করা বাড়িটা দেখলাম। চুন বালি ঝরে গেলেও বাড়ির কাঠামোটা এখনও বেশ শক্ত। কিন্তু একটিও দরোজা—জানালা নেই। ড্রাইভার এবং আরেকজন লোকের সাহায্যে ছবিগুলো একে একে ট্রাকে তুলতে লাগলাম। সাধারণত সুলতান খুব বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকতেন। উনিশশো ছিয়াত্তর সালের একজিবিশনের জন্য সুলতান তিরিশ-পঁয়ত্ৰিশটা ছোটো ছোটো ছবি এঁকেছিলেন। একজিবিশনে এই ছোটো ছবিগুলোর দিকে ভালো করে তাকাতে পারিনি। এখন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। একেকটি ছবিকে জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার একেকটি কবিতার সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে হল।

সব ছবি ওঠানোর পর বাধাঁছাঁদা করে সব যখন ঠিক করে ফেলেছি, গোল বাঁধালেন সুলতান স্বয়ং।। গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা দাড়িঅলা একটা মানুষ একতারা-হাতে হাজির হলো। সুলতান দাঁড়িয়ে লোকটির সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তারপর দুজনে গাঁজা টানতে বসে গেলেন। গাঁজার কল্কিতে দম দিয়ে সুলতান মাথা দোলাচ্ছেন আর বুড়োটি শুরু করেছেন একতারা বাজিয়ে গান। সুলতানকে টেনেও ওঠানো যায় না। আমি পড়ে গেলাম মহামুশকিলে।

কাটায়-কাটায় পাঁচটার সময় ট্রাক ইডেন বিল্ডিংসে ফেরত দিতে হবে। তারপর যেতে হবে আমার বন্ধু কুমারশঙ্কর হাজরার বৌভাতের নিমন্ত্রণে। সুলতানকে যতোই বোঝাই, তাঁর একই জবাব—ম্যায় সুলতান হ্যাঁয়, কিসিকা হুকুম সে কোযি কাম নেহি করত। হাম আপনা মার্জি সে হার কাম করতা।

দোসরা লোকটি সায় দিয়ে বলল, বিলকুল ঠিক, আপ তো সুলতান হ্যাঁয়।

এখন বুঝতে পারলাম, রাজ্জাক স্যারের অনুমান কতদূর সত্য।

সুলতানকে কোনোরকমে আসন থেকে টলাতে না পেরে অগত্যা আমি ট্রাকে উঠে বসে ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি স্টার্ট দিন। আমাদের পাঁচটার মধ্যে পৌঁছতে হবে। গাড়ি যেই আওয়াজ করে ধোয়া তুলে চলতে আরম্ভ করে কিছুদূর এগিয়ে এসেছে, পেছন থেকে সুলতানের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ছফা ভাই, আমাকে ফেলে যাবেন না।

ছবিগুলো এনে রাজ্জাক স্যারের বাড়ির নিচের তলায় গুছিয়েগাছিয়ে রাখলাম। একটুখানি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক ছবিগুলো বেঁচে গেলো। মাসখানেক পরে নড়াইল থেকে আবার সুলতান এলেন। এবার দেখলাম তার কণ্ঠস্বর ভয়ানক বদলে গেছে। কার কাছে তিনি শুনেছেন তার অবর্তমানে রাজ্জাক সাহেব তার ছবিগুলো বেচে দিতে পারেন। সুলতান আবার জেদ করতে আরম্ভ করলেন, ছবিগুলো আবার ট্রাকে করে নড়াইলের বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসতে হবে। আমি লজ্জায় স্যারকে মুখ দেখাতে পারছিলাম না। আমি জানতাম স্যার গোপনে সুলতানকে তিরিশ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। সুলতান তার প্রায় সবটা এলিফ্যান্ট রোডের সুরীশ্ৰী থেকে বাদ্যযন্ত্র কিনে খরচ করে ফেলেছিলেন। আর সুলতানের ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। যাহোক, রাজ্জাক স্যারকে আবার ট্রাকের ব্যবস্থা করতে হলো। আড়াই হাজার কি তিন হাজার টাকা ভাড়া ছাড়া কেউ নড়াইল যেতে রাজি ছিলো না। ছবি তো সুলতান সাহেব নড়াইল নিয়ে গেলেন। ছবিগুলোর ভাগ্যে কী ঘটলো সেটাও একটু বলা প্রয়োজন। একবার একটা দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হল। সুলতানের বাড়িতে খাবার নেই। তাঁর জীবজন্তুগুলো অনাহারে ঝুঁকছে। এই নাজুক সময়টিতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হোটেলের মালিক সুলতানের কাছে হাজির হলেন। মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা সুলতানকে নগদে পরিশোধ করে ট্রাকে ভরে ছবিগুলো আবার চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। ওই হোটেল-মালিকের কাছ থেকে চট্টগ্রামের শিল্পপতি এ কে খানের ছেলে পাঁচ-সাতটি ছবি কিনেছিলেন।

উনিশশো সাতাশি সালে গ্যোতে ইনস্ট্যুট সুলতানের ছবির একটা প্রদর্শনী করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমিও তার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। যাঁদের সংগ্রহে সুলতানের ছবি আছে প্রদর্শনের জন্য ধার হিসেবে ছবিগুলো সংগ্রহ করেছিলাম। সকলে সানন্দে তাদের ছবি দিয়েছেন। এ কে খান সাহেবের ছেলের কাছে যখন ছবিগুলো ধার দিতে চিঠি লিখলাম, তিনি জানালেন, দু লক্ষ টাকার ইন্সুরেন্স করতে হবে এবং প্রিমিয়ামের প্রথম ইনস্টলমেন্টের টাকা প্রদর্শনী কর্তৃপক্ষকে শোধ করতে হবে। অনেক ধরাপড়ার পর বিনা ইন্সুরেন্সে ছবিগুলো তিনি নিজের খরচে পাঠিয়েছিলেন এবং ফেরত নিয়েছিলেন। অবশ্য রাজ্জাক স্যারের ভ্রাতুষ্পপুত্র আবুল খায়ের লিটুর সঙ্গে সুলতান ছবি আঁকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সে অনেক আগের ব্যাপার। সে বিষয়ে আমি কিছু বলবো না।

Share This