০৮. সংসারে মন

রেখা বললে, তুমি এসব কি শুরু করেছে বলোতো? লোকে শুনলে কি বলবে! তুমি কি কোনোদিন সংসারে মন দেবে না?

আবদুল খালেক বললে, সংসারেই তো আছি।

তা আছে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই একে কি থাকা বলে? সারারাত জেগে ঐ সব লিখে কি ফায়দাটা পাচ্ছো তুমি! বন্ধু কি তোমাকে গাছে চড়িয়ে দেবে। কেন তুমি ভূতের বেগার খাটতে যাবে। একটা চিরকেলে বাজে স্বভাব; যখন যেটা মাথায় ঢুকবে কচলে কচলে তাকে তেতো না করে ছাড়বে না।

মালেক রাগ করবে, অনেকদিন থেকে ওকে ঘোরাচ্ছি! না পেলে এবারে মেরে বসবে—

মালেককে নিয়ে থাকলেই হয়, অতো যখন সম্পর্ক!

কিভাবে যে তুমি কথা বলো—

ঘরের বৌয়ের কথা কারোই মিষ্টি লাগে না। সব বুঝি, এখন তোমার একটা প্রেম করার দরকার হয়ে পড়েছে, তা করলেই তো পারো। পেয়ারে ছাত্রী তো আর নেহাত কম নয় তোমার, মনমতো একটাকে বেছে নিলেই হয়।

আবদুল খালেক দাড়ি কামানো থামিয়ে বললে, কাউকেই দেখছি তুমি বাদ দিতে চাও না!

ছাত্রীরা যেভাবে আসে, তা তো নিজ চোখেই দেখি রোজ। সাজন-গোজন ঠাটবাট দেখে গা জ্বলে যায়, যেন নাগর ধরতে এসেছে। আমরাও তো কলেজে পড়েছি, পড়তে এসে আবার এতো ঢলাঢলি কিসের!

ঢলাঢলিটা দেখলে কোথায়?

কথা তো বলে না, যেন গায়ে উল্টে পড়ে। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে মুখে খৈ ফোটে, আবার আমাদের সামনে এলে ভিজে বেড়ালটি, সাত চড়েও রা কাড়তে চাইবে না–

আবদুল খালেক বললে, তোমার দেখায় অনেক ভুল আছে। রেখা। এভাবে দেখো না। এভাবে দেখা উচিত না। যারা এভাবে দ্যাখে, তারা কেবল নিজের মনের শান্তিই চুরমার করে।

কতো শান্তিতে তুমি আমাকে রেখেছো!

সেটা আলাদা ব্যাপার–আবদুল খালেক সাবানের ফেনার ভেতর থেকে বললে, কতো দূর দূর গ্রাম থেকে এরা আসে, কতো কষ্ট করে আসে। কত আশা এদের সামনেই। নিছক ঢলাঢলির জন্যে এত পরিশ্রমের কি কোনো দরকার আছে?

তোমাদের মতো দরদী বন্ধুদের জন্যেই আসে। লেখাপড়া না ছাই! কেন, কমার্সের আবু তালেব ছাত্রীকে বিয়ে করে নি? ঢিঢিক্কার পড়ে নি?

বিয়ে করাটা দোষের?

আমি তোমার সঙ্গে এঁড়ে তর্ক করতে চাই না–রেগে গিয়ে রেখা বললে, মুদিওলা বলে দিয়েছে আর বাকি দিতে পারবে না, এবার থেকে নগদ পয়সা দিয়ে সওদাপাতি এনো—

সে দেখা যাবে—

কোনো কথাই তো তোমার গায়ে লাগে না। একটা ডিম পচা হয়েছিল বলে পাঠিয়েছিলাম, যা-তা কথা বলেছে। মোমেনাকে ধমকে বলেছে, ইচ্ছে হয় নিবি, না। ইচ্ছে হয় না নিবি, বদল-ফদল হবে না। বলে দিস বাকিফাঁকি আর দিতে পারবো না।

আবদুল খালেক বললে, ওদেরই-বা কি দোষ, কম টাকা তো আর পাবে না?

তোমার ইজ্জতে বাধে না? ঘরের মানুষের কথা শুনলেই তো ছ্যাক করে ওঠো। একটা ছোটোলোক মুখে যা আসে তাই বলবে, আর ঘরে বসে বসে তুমি লেজ নাড়বে, তোমার আত্মসম্মান নেই?

কি করবো, ওর সঙ্গে লাঠালাঠি করবো?

সে ক্ষমতা থাকলে তো!

আবদুল খালেক হেসে বললে, হ্যাঁ এটাই হচ্ছে আসল কথা। আমি শুধু পারি, এই মুহূর্তে খুব ছোট্ট করে তোমাকে একটা চুমু খেতে–

কি যে বেহায়ার মতো ক্যাল ক্যাল করে হাসো—

রেখা আর দাঁড়ায় না। পাকাটি চিবাতে চিবাতে উঠোনের ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছিলো টুকু। হ্যাঁচকা টানে তাকে দাঁড় করিয়ে হিড়হিড়িয়ে পুকুরঘাটের দিকে নিয়ে যায়।

অনেকক্ষণ পর আবদুল খালেক দরোজায় দাঁড়িয়ে রেখাকে ডাকলো। রেখা তখন রান্নাঘরে।

বললে, মাধু ও মাধু মাধুরাণী!

কাত হয়ে দরোজায় গলা বাড়ায় রেখা।

তোমার হাত খালি আছে?

মাছ কুটছি। এনেছো তো গুচ্ছের চুনোমাছ। রোজ রোজ এই একই আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগে না। কি করে আমাকে জব্দ করবে শুধু এই তালে থাকো। অন্য মাছ না পাও খালি হাতে ফিরবে, রোজ রোজ এই ডোগাড়া মাছ কুটতে কুটতে আমার ঘেন্না ধরে গেছে—

আবদুল খালেক বললে, ইচ্ছে করে কি আর আনি, এই ছোট্ট একটা কালকিনির দাম বারো থেকে চোদ্দ টাকা। টাকা-পয়সা যেন ময়লা। এর চেয়ে ঘাস খেয়ে থাকা ঢের ভালো!

একটু পরে হাত মুছতে মুছতে রেখা এলো। বললে, কি বলছিলে বলো।

ভরসা পাচ্ছি না যে—

আমার কাছে কিন্তু কোনো টাকা-পয়সা নেই, আগে থেকেই বলে রাখছি। যাও ছিল কায়দা করে করে তো তার সবই কুঁকে বসে আছ!

পিঠে একটু তেল মালিশ করে দেবে, গা-হাত-পায় বড়ো ব্যথা, এমন টাটাচ্ছে।

চৌকির ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে তেল মালিশ করাতে করাতে আবদুল খালেক বললে, আচ্ছা মাধুরাণী, তোমার হাত এতো মিষ্টি কেন?

ইস!দুম করে একটা কিল দিল রেখা।

আবদুল খালেক বললে, আমি জানি, তোমার হাত দুটো পঞ্চানন ময়রার তৈরি। খাঁটি ছানা আর ভুরভুরে গন্ধ!

রেখা বললে, ইয়ার্কি মারলে আমি কিন্তু মালিশ বন্ধ করে দেবো। গায়ে তো জ্বর–

ওতে কিছু হবে না!

একটু পরে রেখা বললে, আফজাল ভাই বলেছিলো ইস্কুলের পুকুরটার নাকি শিগগির ডাক হবে। তুমি চাইলে আফজাল ভাই তোমাকে সঙ্গে নেবে। কতো টাকারই-বা ব্যাপার! মাছ ছাড়লে ভালো পয়সা পাওয়া যাবে।

দেখি।

তাহলে বলে দাও।

আবদুল খালেক বললে, অসুবিধেটা কি জানো, এইসব টাউটগুলোকে আমার একদম পছন্দ হয় না। জোর করে হিন্দুর সম্পত্তি দখল নিয়েছে লোকটা, তাই দুটো করে খেতে পারছে, তা নাহলে কে পুঁছতো এদের, তোক ভালো না এরা?

তোমার অতো দেখার কি আছে।

আগে দ্যাখো কলেজ টেকে কি না। এখানকার পাটই হয়তো চুকিয়ে দিতে হবে শেষ পর্যন্ত, তুমি তো আর সব কথা জানো না! সামনের মাসে যদি মাইনে পাই, ভাববো বরাতের জোর—ডোনেশনের ওপর কলেজ চলছে। এ্যাফিলিয়েশন হয় নি। টিচার্স বেনিফিট-এর কিছু টাকা তারা পায়। হাবিব ব্যাপারীর ডোনেশন হিসেবে যে মোটা টাকা দেয়ার কথা তা পাওয়া যায় নি।

রেখা বললে, এইসব শুনলে আমার হাত-পা হিম হয়ে আসে। অমন হলে কি করবে?

তখন দেখা যাবে,খামোকা চিন্তা করে কোনো লাভ নেই, আরো জোরে চাপ দাও!

রেখা বললে, তোমার গায়ে সত্যিই জ্বর। আজ আর পানিতে নেমো না। শরীরের দিকে তোমার কোনো নজর নেই!

কোনো কথা না বলে মড়ার মতো নিঃশব্দে কাঠ হয়ে পড়ে রইলো আবদুল খালেক।

কিছুটা পরে রেখা বললে, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি!

না।

চুপ মেরে গেলে যে?

বড়ো আরাম–তুমি আজকাল অমন গুম হয়ে থাকো কেন?

কি বলবো ভেবে পাই না–

কেউ বিশ্বাস করবে একথা?

আর কারো কথা জানি না, তুমি করবে।

অনেক পরে চিৎ হয়ে শুয়ে রেখার একটা হাত বুকের ওপর নিয়ে আবদুল খালেক বললে, আজ থেকে যদি তোমাকে মাধু বলে ডাকি, তুমি কি আপত্তি করবে?

কি বলে? চোখ কুঁচকে রেখা জিগ্যেস করে।

মাধু মাধুরী–

কি জানি বাবা, তোমার কোনো কথাই আমার মাথায় ঢোকে না।

উপুড় হয়ে শুয়ে আবদুল খালেক বললে, আমার খুব ইচ্ছে হয় তোমাকে ঐ নামে ডাকি!

রেখা বললে, মাধুরীটি কে?

তা জানি না। মাধুরী বলে কেউ কোনোদিন বোধহয় ছিল না। কেউ কোনোদিন তাকে দ্যাখে নি, কেউ কোনোদিন তার নাম শোনে নি, বোধহয় এই রকম— আবদুল খালেক বলতে থাকলো, কিন্তু আমার মনে হয় সে আছে, হয়তো তুমিই মাধুরী, আমি চোখ খুলে কখনো দেখি নি, তাই চোখেও পড়ে নি–

কি মানে এসবের?

ঠিক আছে–আহত গলায় আবদুল খালেক বললে, তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি ঐ নামে ডাকবো না, ঠিক আছে। এতে রাগের কিছু নেই।

আমি তা বলি নি। তোমার কি দোষ জানো, কোনো কথা তুমি মন খুলে কখনো বলো না, পরিষ্কার বুঝিয়ে বলা তোমার ধাতে নেই–

আবদুল খালেক বললে, একদিন তোমাকে একটা অনুরোধ করবো, তোমাকে কিন্তু রাখতে হবে, অন্তত চেষ্টা কোরো রাখতে। আমি তো তোমার স্বামী। ধরো স্বামী যদি কখনো সামান্য একটা ভিক্ষা চায়—

রেখা তাকে জড়িয়ে ধরে বললে, তাই বলে তুমি কাঁদবে? কাঁদছো কেন, কি করেছি আমি?

আবদুল খালেক কোনো উত্তর না দিয়ে সেইভাবেই উপুড় হয়ে রইলো।

রেখা নিজেও কেঁদে ফেললে। পাথরের মতো শক্ত আবদুল খালেকর গা ধরে তাকে নড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললে, কাঁদছো কেন, কি করেছি আমি!

তুমি কিছু করো নি, কেউ কিছু করে নি–

কাল রাতেও অন্ধকারে বসে বসে সে কাঁদছিলে। কেন এমন করে কাঁদো, হয়েছে কি তোমার?

আবদুল খালেক বললে, বুঝতে পারি না—

এভাবে কেউ কথা বলে— রেখা আবদুল খালেকের পিঠ ভাসিয়ে দিয়ে বললে, আমার কাছে তোমার জোর নেই? দাবি নেই? অধিকার নেই? ভিক্ষে চাইবে কেন? আমার কষ্ট হয় না!

ঠিকই–আবদুল খালেক নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বললে, এভাবে বলাটা আমার ভুল হয়েছে। দিন দিন নিজের কাছ থেকেও যেন দূরে সরে যাচ্ছি। তোমাকে আমি সব বলবো। আগে নিজে বুঝে নিই। এক একবার মনে হয়, আমি কোনো মানুষই নই। পদার্থ বলে কোনো জিনিসই নেই আমার ভেতর। সবটুকু একটা আস্ত গোঁজামিল। জোড়াতালি।

রেখা বললে, এসব ভাববা কেন! ভেবে কি হয়! কেন তুমি নিজের সঙ্গে এভাবে শত্রুতা করবে

আবদুল খালেক কোনো কথা বলে না। সেই একইভাবে পড়ে রইলো উপুড় হয়ে। তারপর কোনো একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।

দুপুরের দিকে রেখা যখন তার গা ধরে সাড়া দিয়ে জাগালো তখন তার চোখ লাল। তখনো বেশ জ্বর গায়ে। জোর করে একগ্লাস দুধ খাওয়ালো সে।

আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুই? রেখা জিগ্যেস করলে।

টুকু কই?

ঐ তো, ঘুমিয়ে—

শোও তাহলে—

রেখা আবদুল খালেকের গলা জড়িয়ে শোয়।

আবদুল খালেক মুগ্ধ গলায় বললে, তোমার গায়ের গন্ধ ভারি সুন্দর। মনে হয় কখনো কোনো মানুষজন মাড়ায় না এমন একটা চুপচাপ নিস্তব্ধ সরু রাস্তা ধরে হাঁটছি, এক চিলতে রোদ নেই, কেবল সারি সারি বকুল গাছের আদুরে ছায়া—

রেখা বললে, যা সুন্দর করে তুমি বলো, অন্য মেয়েরা শুনলে রোগা হয়ে যাবে—

খুলি?

তোমার ইচ্ছে—

আবদুল খালেক রেখার ব্লাউজের বোতাম খুলে দিয়ে একটা হাত রাখলো সেখানে। বললে, এতো নরম, এতো মায়া!

রেখা বললে, তোমার ভালো লাগে?

মরে যেতে ইচ্ছে করে—

তুমি তো আজকাল দ্যাখোই না। টুকু হবার পর থেকে তোমার যেন আর ভক্তি নেই—

টুকু যখন তোমার কোলে এলো, তোমাকে দেখলাম, গর্ব হলো, তুমি কি সুন্দরই না হয়েছে। যখন কোলে নিয়ে বসে থাকো, নানান ছলচাতুরি করে তোমাকে দেখি। মনে হয় জীবনভর দেখি। আগে দেখতাম শুধু চোখ দিয়ে, এই প্রথম আমার মন দিয়ে দেখতে শেখা—

রেখা বললে, রাতে তোমার হাত গায়ে না থাকলে আমার ঘুম আসে না–

অভ্যেস করেছে বলে হয়তো অমন হয়।

তুমি চাও না আমি ঘুমাই?

একশ বার চাই।

তাহলে অমন কুঁকড়ে হাত-পা মুড়ে শুয়ে থাকো কেন?

তুমি বললেই পারো।

আমাকে বলতে হবে? বলতে যাবো কেন। তোমার যদি ভালো লাগে, জোর করবো কেন। পুরনো হয়ে গেলে মেয়েদের কিইবা এমন থাকে।

আবদুল খালেক বললে, সব থাকে। আমি তো পুরনোই চাই।

রেখা বললে, আমার বুকটা কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন, এতে মন খারাপ হয়।

মন খারাপের কি আছে?

যদি তোমার ভালো না লাগে, যদি ঘেন্না হয়—

আবদুল খালেক বললে, তোমার ওপর আর অত দাবি নেই আমার। অর্ধেক আমি টুকুকে দিয়ে দিয়েছি।

অনেক পরে রেখা বললে, তোমার ইচ্ছে হয়? কিছু—

আজ থাক—

মন ভালো হয়েছে?

বুঝতে পারছো না?

কি জানি! তোমার বানান বড় শক্ত। দাঁতের গোড়া নড়ে যায়—

আবদুল খালেক বললে, এখন আমার খুব ইচ্ছে, তবু লোভটাকে দমন করতে চাই। আমরা কেউ কাউকে এখনো দেখি নি, কেউ কাউকে চিনি না। খুব শিগগির কোনো একদিন আমাদের দেখা হবে। ধরো প্রথম দেখা। দুজনে সারাদিন কাটাবো এক সঙ্গে। সংসারের কোনো কথা হবে না। না ঝগড়াঝাটি, না তর্কাতর্কি, না কোনো কাজের কথা। দেখতে চাই দিনটা কিভাবে কাটে, কেমন লাগে। তারপর হয়তো সবই হবে। কেমন হবে?

খুব ভালো হবে। কিন্তু কোথায় কিভাবে কাটাবে?

ধরো একটা নৌকোয় সারাদিন কাটাবো, পারবে না?

পারবো। খুব আনন্দ হবে—

ঐদিন আমরা দুজন দুজনের কাছ থেকে শুধু সুখ চেয়ে নেবো, শুধু আনন্দ চেয়ে নেবো, পারতো?

তুমি পারলে আমিও পারবো–

আবদুল খালেক রেখাকে বুকের ভেতরে এনে চোখের ওপর একটা গভীর চুমু দিয়ে বললে, এই কথাটাই আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম রেখা, শুধু এইটুকুই।

তাহলে ভিক্ষের কথাটা তুললে কেন?

এখন বুঝে দ্যাখো, কিভাবে তোমাকে দিতে হবে–

অনেক চিন্তা করে রেখা বললে, যদি ভুল হয়ে যায়, বলে দেবে তো?

আবদুল খালেক হেসে বললে, তোমার কখন ভুল হয়?

 

আবদুল খালেক তখন কলেজে, মোমেনাকে দিয়ে নরহরি ডাক্তারকে ডাকিয়ে আনলো রেখা।

সকালের এই সময়টাই ভীষণ ব্যস্ত থাকে নরহরি ডাক্তার। বেলা বারোটার আগেই বাজার ভেঙে যায়, বাজারের সময়টুকুতে রুগীর ভিড় লেগে যায়, তারপর সব ফাঁকা। তালাচাবি বন্ধ করে তখন কলে বেরিয়ে পড়ে।

নরহরি ডাক্তার মোমেনাকে বলেছিল, পরে গেলে চলে না? এতো রুগী ফেলে যাই কি করে—

আপনাকে এখনই যেতে বলেছে।

রেখা মোমেনাকে বলে দিয়েছিল, একদৌড়ে যাবি। ডাক্তার বাবুকে একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে আসবি।

কি ব্যাপার? নরহরি ডাক্তার চিন্তিত মুখে ঢুকে বললে, আবার ট্রাবল দেখা দিয়েছে নাকি?

রেখা বললে, আপনি বসুন। শরীর আমার ভালোই আছে—

নরহরি ডাক্তার রেখার ভেতরে এক ধরনের অস্বাভাবিক চাঞ্চল্য দেখতে পেল। বললে, আমাকে কিন্তু এক্ষুণি উঠতে হবে, বহু রুগী বসিয়ে রেখে এসেছি।

রেখা জড়িয়ে জড়িয়ে, খুব বিব্রতভাবে বললে, আমি খুব অশান্তিতে আছি ডাক্তার বাবু, আপনাকে কিছু বলবো–

নরহরি ডাক্তার বললে, তাহলে হাতে সময় নিয়ে পরে আসি?

রেখা জিদ ধরে বললে, কথাগুলো আমি টুকুর আব্বার সামনে বলতে চাই না। এখানে এমন কেউ নেই, যাকে এসব বলি, এসব বলা যায়। আপনাকে শুনতেই হবে, সেজন্যেই ডেকেছি—

নরহরি ডাক্তার পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাড়গলা মুছলো। বললে, বেশ, বলুন–

রেখা দরোজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে দুঃখিত গলায় বললে, আপনার ওখানেই তো সব সময় ওঠা-বসা করে, কিছুদিন যাবৎ ওনার চালচলন লক্ষ্য করেছেন?

কৈ তেমন কিছু তো দেখি নি।

কারো সঙ্গে তেমন কথাই বলে না, সবসময় কেমন যেন মনমরা, মনমরা, একা একা থাকে, কি যে চায়, আমি বুঝি না—

নরহরি ডাক্তার বললে, তা উনি তো সবসময় একটু উদাসীন ধরনের মানুষ–

আমি তো ওকে চিনি– রেখা জোর দিয়ে বললে, আগে এমন ছিল না। এখন থেকে ও যেন কোনো কিছুতে নেই। দিলে খায়, না দিলে চুপ করে বসে থাকে। রাতভর জেগে জেগে কিসব করে—

নরহরি ডাক্তার বললে, এই রাত জাগাটাই হচ্ছে ওনার কাল। এতে বায়ুর প্রকোপ বাড়ে, এ্যাসিডিটিতেও ভুগছেন। আসলে উনি একটু রোমান্টিক ধরনের। রাত জাগাটা বন্ধ করাতে হবে আপনাকে।

রেখা বললে, রাতে একা বসে বসে কাঁদে—

বলেন কি?

আমার মনে হয় ও কারো প্রেমে পড়েছে!

নরহরি ডাক্তার সাপ দেখার মতো চমকে ওঠে বললে, এসব কি বলছেন আপনি? আমি তো বাজারের লোক, তেমন কিছু ঘটলে আগে আমার কানে আসতো কথাটা। এমন চিন্তা করাও অন্যায়, ওনাকে আমি খুব ভালো করেই চিনি–

আপনারা সবাই আছেন, একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন–রেখা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, হয়তো এখন সময় আছে, ফেরানো যাবে। আমার মন ভেঙে গেছে—

কি আশ্চর্য কথা— নরহরি ডাক্তার বললে, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, কোনো কিছু হয় নি। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, তেমন কোনো কিছু যদি বের হয়, সোজাসুজি আপনাকেই তা জানাবো। ভাবাও অন্যায়, কি চমৎকার একটা মানুষ। আমার তো আর কারো সঙ্গে তেমন জমে না! ওই ওনার সঙ্গেই যা দুটো কথা হয়, তা নইলে এখানে আর মানুষ কোথায়!

রেখা বললে, হঠাৎ কি খেয়াল চেপেছে মাথায়, আমাকে নিয়ে নৌকোয় বেড়াতে চায়—

তা সে তো ভালো কথা!

আমার ভালো লাগছে না—

বেড়ানোর শখ তো ওনার সব সময়–নরহরি ডাক্তার বললে, প্রায়ই আমাকেও তো ধরেন। আমার কাজই হচ্ছে ঘোরাঘুরি, সময় করে উঠতে পারি না বলে যাওয়া হয় না। এই তো সেদিন কথা হলো, খুব শিগগির একদিন রাঢ়িখাল বজ্রযোগিনী এইসব দিকে ওনাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো।

রেখা বললে, আমার মন ভালো বলছে না—

এর ভেতরে আবার কি দেখলেন?

মনে মনে ও একটা কিছু ঠিক করেছে, এ আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। না পারছে গিলতে, না পারছে ওগরাতে। এখন আমি ওর গলায় আটকে আছি। যে-কোনোভাবে ও আমাকে সরিয়ে দিতে চায়। কান্নায় আবার রেখার গলা ভেঙে গেল, বললে, অথচ এক সময় আমি ছাড়া আর কাউকে কখনো চিনতো না, মুখ তুলে তাকাতো না কোনোদিকে। কোনো দুঃখ ছিল না আমার। আর আজ, এই একটা ছেলে নিয়ে, কোথায় দাঁড়িয়েছি!

নরহরি ডাক্তার বললে, এসব কথা আর কাউকে বলবেন না! বলা উচিত নয়। এমনকি আমাকেও বলা উচিত হয় নি। এসব ভেবে নিজের মনের অশান্তি বাড়াবেন না, কি অবস্থায় যে আছেন, খুব ভালো করেই তা বুঝতে পারছি–

নৌকোর ব্যবস্থাটা আপনি করে দেবেন, ভালো করে বুঝিয়ে বলবেন মাঝিকে, পারবেন না?

নরহরি ডাক্তার হো-হো করে হেসে বললে, জয় গোবিন্দ! আপনাকে আমার গুরু মানা উচিত, পাগল হয়ে যাবো, আমি পাগল হয়ে যাবো! সে যাকগে, আমি এখন উঠি, বিশ্বাস আছে তো আমার ওপর?

রেখা বললে, তা না হলে আপনাকে এসব বলবো কেন?

তাহলে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে ওনার সঙ্গে বেড়াতে বেরুবেন, যা যা করতে হয় আমি সব করে রাখব, আপনি শুধু যাবেন। ঐ ট্রিপের যাবতীয় খরচ আমার। এই তো আপনাদের দোষ। কোথাও নড়াচাড়া করবেন না, ঘরের কোণায় গোঁজ হয়ে বসে থাকবেন, মন ভালো থাকবে কোত্থেকে! গায়ে একটু আলো-বাতাস লাগাতে হয়। রোজ অন্তত আমাদের বাড়ির দিক থেকেও তো একবার ঘুরে আসতে পারেন।

নরহরি ডাক্তার ফিরে এসে দেখলো; আবদুল খালেক তারই অপেক্ষায় বসে। জিগ্যেস করলে, কতোক্ষণ?

এই তো মিনিট পাঁচেক হবে। ঘণ্টা দেড়েকের একটা গ্যাপ, ভাবলাম একটু বসে যাই–

বসুন আপনি–সিগ্রেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে নরহরি ডাক্তার বললে, হাতের কাজগুলো একটু হালকা করে নিই। রুগী বিদায় করতে করতে প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে যায়। সামনের দোকানে চায়ের কথা বলে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বললে, খুব দেখালেন সেদিন, আমি তো গিয়ে বোবা–

আবদুল খালেক বললে, ওষুধটা পাই নি।

তা না পান, আমি তো ছিলামই, কি যে করেন আপনি!

এই সময় একটি লোক এসে দাঁড়ায় সামনের খুঁটি ধরে। নরহরি ডাক্তার এক তাড়া মেরে বললে, আবার কি? তুমি তো আজব মানুষ হে? যা করার ছিল করেছি, এখন আর আমার হাতে কোনো চিকিৎসা নেই। খামোকা ফেউ লাগো কেন পেছনে! সোজা ঢাকায় নিয়ে যাও, হাসপাতালে ভর্তি করাও, আর কোনো রাস্তা নেই–

আবদুল খালেকের হাত থেকে দেশলাই নিয়ে নরহরি ডাক্তার বললে, এগুলো একটাও মানুষ না, সব জানোয়ার! ঘরের বউগুলোকে এরা গরুছাগলের বেশি কিছু মনে করে না। এদের আর কি, ভোগান্তি হয় বেচারা বউগুলোর।

আবদুল খালেক জিগ্যেস করলে, কি, হয়েছে কি?

প্রল্যাপস্ অব ইউট্রাস! বিশদিনও হয় নি বাচ্চা বিইয়েছে বৌটা, তাকে পাঠিয়েছে বাড়ি বাড়িতে ঢেঁকিতে পার দিতে, কতো বড় অমানুষ!

আবদুল খালেক বললে, আমাকে নোভালজিন দেবেন। একটু ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো লাগছে—

সে হবেখন, নরহরি ডাক্তার বললে, ভাবী ডেকে পাঠিয়েছিলেন। নৌকো ঠিক করে দেবার জন্যে–

বলেন কি!

আশ্চর্য হবার কি আছে এতে। বললেন, এই বর্ষার পানিতে একদিন নৌকায় করে বেড়াতে চান, অনেকদিনের ইচ্ছে নাকি। বললেন ভালো দেখে একটা নৌকোর বন্দোবস্ত করে দিতে। আপনার ওপর ভরসা নেই আর কি, কি বুঝলেন।

আমিও আপনাকে বলতাম।

তা কবে যেতে চান?

যে-কোনোদিন, তবে বন্ধের মধ্যে হলেই ভালো হয়—

আপনাদের কলেজ তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

আরো হপ্তাখানেক খোলা আছে, তারপর দেড় মাসের ছুটি। কালকের ব্যবস্থাও করতে পারেন, একটা মাত্র ক্লাস, নেবো না দরকার হলে—

কাল যেতে চান?

বন্দোবস্ত হলেই যাই—

ঠিক আছে, আমি সব ব্যবস্থা করে রাখবো। আজ রাতেই মরণ ঢালিকে বলবো। বেরুবেন কখন?

ধরুন সকালের দিকেই—

ঠিক আছে।

একটু পরে নরহরি ডাক্তার বললে, তা ছুটিটা কাটাবেন কোথায়?

আবদুল খালেক বললে, কোথায় আর যাবো, এখানেই থাকবো। ঢাকায় গেলেই খরচ, অতো টাকা কোথায়!

খরচ তো এখানেও আছে, নরহরি ডাক্তার বললে, এই-তো আজ সকালেই, দেড় বিঘত একটা গৰ্মার দাম চাইলো পচিশ টাকা,এসব এক সময় ফেলা যেত।

আবদুল খালেক বললে, জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন—

তবে একটা কথাও আছে, পাহাড় মনে করলেই পাহাড়, তুলো মনে করলেই তুলো, যে যেভাবে নেয়। হিসেব করে দেখলে বুঝতে পারবেন, কত মানুষের চেয়ে আমরা ভালো আছি। কোনো না কোনোভাবে জীবন চলেই, কোথাও দাঁড়িয়ে থাকে না। এখানকার রুগীদের কথাই ধরুন। স্রেফ কারমিনেটিভ আর এ্যালকালি মিক্সচারে তাদের জীবন চলে যাচ্ছে। টিনচার কার্ডকো নেই, পট সাইট্রাস নেই, তাতে কি, ধুমসে কারমিনেটিভ দিয়ে যাচ্ছি, এ্যালকালি দিয়ে যাচ্ছি, ধড়াধড় ভালোও হয়ে যাচ্ছে, একবার ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। যারা দশজনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে চায়, তাদের কথা অবশ্য আলাদা। তার জীবনের ঘাটতি ছাড়া আর কিছুই দ্যাখে না, দেখতে পারে না।

আবদুল খালেকের মনে হলো তার বিশেষ কিছুই বলার নেই। পট সাইট্রাসের অভাবে এ্যালকালি চলে, হয়তো রোগও সারে, কিন্তু তার নিজের কাছে জীবন জিনিসটি এমন, সামান্য একটা অভাব সেখানে সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে। এক একজনের কাছে এক একটা দিক বড়, সেখানে সে কোনো ঘাটতির কথা ভাবতেই পারে না, সুতোর সামান্য একটু টানে সবকিছু যেখানে হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। একটা গৰ্মার দাম একশো টাকায় উঠলে তার কোনো মাথাব্যথা নেই, সে তখন মাছ খাওয়ার অভ্যেসটাকে টুক করে ফেলে দেবে, ভাববে, যাক, বাঁচা গেল। কিন্তু কেউ যদি তাকে হেলাফেলা করে, তাচ্ছিল্য করে, বলে তোমার মতো লোক দুদশটা আমার পকেটে থাকে সবসময়, তখন হয়তো তার আত্মহত্যার কথা মনে হবে। অথচ সে নিজে জানে, সে এমন কোনো মাথাওয়ালা লোক নয়, হাতি-ঘোড়া-বাঘ-ভালুক নয়, পকেটে থাকা জীব, এইমাত্র। বিয়ের আগে সে ভাবতো, প্রেম ছাড়া জীবন অচল, এখন মনে করে ওটা একটা ভোঁতা ধারণা, জীবনে এর কোনো প্রয়োজনই নেই, বরং একটা বিড়ম্বনা। বিড়ম্বনা এই জন্যেই, এর কোনো রয়ে-সয়ে চলার ক্ষমতা নেই, এ শুধু আড়ম্বর চায়, লোক দেখানো বৈভব চায়।

নরহরি ডাক্তার বললে, বাইরে থেকে দেখে আমাকে কি মনে হয়, বেশ ভালো আছে লোকটা, দিব্যি দুটো করে খাচ্ছে, কোনো সমস্যা নেই। ব্যাপারটা কি সে রকম? পরপর দুদিন চুনোপুঁটি দিয়ে দায় সেরেছি, ভেতরে ভেতরে ইচ্ছে, যে দামই হয় মাছ আজ কিনবোই। গোটা বাজারে একটা মাত্রই গর্মা। দাম করছি, পেছন থেকে কেউ একজন টিটকারি মেরে উঠলো, ব্যাটা মালাউনের জন্যে বাজারে মাছ কেনার উপায় নেই, টাকার গরম দেখায়। এর কোনো মানে আছে? ভালো খাওয়ার উপায় নেই, ভালো পরার উপায় নেই, ভালোভাবে থাকার উপায় নেই, অথচ ক্ষমতা আছে, এভাবে মানুষ টিকতে পারে! দুদিন অন্তর ডাকাতি। একবার তো মুখের ওপর তারা বলেই ফেললে, যাও না শালা, পড়ে আছো কেন, তোমার বাপের দেশে যাও। তবু মাটি কামড়ে পড়ে আছি। নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিই, অনেকের চেয়ে ভালো আছি। বেঁচে থাকতে হলে কিছুটা কম্প্রোমাইজ তো করতেই হয়–

আবদুল খালেক বললে, কিছুটা নয়, বোধহয় সবটাই কম্প্রোমাইজ—

ঐ একভাবে চালিয়ে নিতে হয় বেহায়ার মতো। আমার তো ধারণা, বিদ্যাফিদ্যা জ্ঞানট্যান জীবনে কখনো কাজে লাগে না। ওগুলোর জন্যে খামোকা মানুষ নিজেকে অপব্যয় করে। কালকে কলে বেরিয়েছি, পথে খুব ইচ্ছে হলো এক কাপ চা খাই। মাঝিকে বললাম, নৌকো ভেড়াবে চায়ের দোকান পেলে। এক সময় খালের পাশে নৌকো ভিড়িয়ে সে গেল চা আনতে। চুমুক মেরে দেখি অপূর্ব চা, মাঝিকে বললাম, কোন্ দোকান থেকে এনেছে গো, খুব ভালো তো! সে কি বললে জানেন? বললে প্রথমে যে চা দিয়েছিল সে আপনি মুখে দিতে পারতেন না, গরুর চোনাও তার থেকে ভালো বরং। যখন মিথ্যে করে বললাম নৌকোয় ওসি সাহেব আছে, বেরুল স্পেশাল পাত্তি, এখন বুঝুন। মাঝিটা গোমুখ্য, তবু খুব সহজেই সে একটা সমস্যার সমাধান করে ফেললো। জীবনের সবকিছু এই হালকা চালে নিতে পারাটাই ভালো–

আবদুল খালেক উঠে দাঁড়িয়ে বললে, আর বসবো না, ক্লাস নিতে হবে এবার, আপনি নোভালর্জিন দিন!

নরহরি ডাক্তার অসহিষ্ণু হয়ে বললে, এই তো আপনাদের এক দোষ, রোগটা কি না বুঝেই আন্দাজে ওষুধ গেলা কি ভালো? নিজেরা আন্দাগোন্দা নিজেদের ওপর ডাক্তারি চালাবেন না, যেকোনো সময় বিপদ ঘটে যেতে পারে, না-কি মিথ্যে বলছি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *