রাতের তদন্ত

খুব সম্ভব দাঁতকপাটি লেগে গিয়েছিল। আর রাত দুপুরে মাথার ওপর বেমক্কা একটা কাটা মুণ্ডু এসে যদি নাচতে শুরু করে দেয় তাহলে কারই বা দাঁতকপাটি না লাগে? কিন্তু বেশিক্ষণ অজ্ঞান হয়েও থাকা গেল না, কে যেন পা ধরে এমন এক হ্যাঁচকা টান মারল যে, কম্বল-টম্বল। সুদ্ধ আমি আর এক পাক গড়িয়ে গেলুম।

তখনও চোখ বন্ধ করেই ছিলুম। হাঁউমাউ করে চেঁচিয়ে বললুম কাগামাছি কাগামাছি।

—দুত্তোর কাগামাছি। ওঠ বলছি—কোত্থেকে যেন ক্যাবলাটা চেঁচিয়ে উঠল।

উঠে বসে দেখি কাটা মুণ্ডু-টু কিছু নেই ঘরে আলো জ্বলছে। টেনিদা হাঁ করে ওপর দিকে তাকিয়ে আছে। হাবুল সেন গুটিগুটি বেরিয়ে আসছে একটা খাটের তলা থেকে।

টেনিদা বললে–ভূতের কাণ্ড রে ক্যাবলা! কাগামাছি স্রেফ ভূত ছাড়া কিছু নয়।

হাবুল কাঁপতে কাঁপতে বললে–মুলার মতো দাঁত বাইর কইর‍্যা খ্যাঁচখ্যাঁচ কইর‍্যা হাসতে আছিল। ঘাঁক কইর‍্যা একখান কামড় দিলেই তো কম্ম সারছিল।

ক্যাবলা বললে–হুঁ।

আমি বললুম—হুঁ কী? রাত ভোর হোক, তারপরেই আমি আর এখানে নেই। সোজা দার্জিলিং পালিয়ে যাব।

ক্যাবলা বুললে—পালা, যে-চুলোয় খুশি যা। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ওই স্কাইলাইটটা লক্ষ করে দেখ।

—আবার মুণ্ডু আসছে নাকি?বলেই হাবুল তক্ষুনি খাটের তলায় ঢুকে পড়ল। টেনিদা একটা লাফ মারল আর আমি পত্রপাঠ বিছানায় উঠে কম্বলের তলায় ঢুকে গেলুম।

ক্যাবলা ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললে–আরে তুমলোগ বহুত ডরপোক হো। দ্যাখ না তাকিয়ে ও-দিকে। স্কাইলাইটটা খোলা। ওখান দিয়ে দড়ি বেঁধে একটা মুণ্ডু যদি ঝুলিয়ে দেওয়া যায় আর তারপরেই যদি কেউ সুড়ত করে সেটাকে টেনে নেয়—তা হলে কেমন হয়?

টেনিদা জিগগেস করলে—তা হলে তুই বলছিস ওটা—

—হ্যাঁ যদুর মনে হচ্ছে, একটা কাগজের মুখোশ।

হাবুল আবার গুটিগুটি বেরিয়ে এল খাটের নীচের থেকে। আপত্তি করে বললে–না না, মুখোশ না। মুখে মুলার মতন দাঁত আছিল।

–তুই চুপ কর।–ক্যাবলা চেঁচিয়ে উঠলকাওয়ার্ড কোথাকার। শোন, আমি বলছি। যাওয়ার আগে যদি মুলোর মতো দাঁতগুলোকে আঁড়ো করে দিয়ে যেতে না পারি, তা হলে আমার নাম কুশল মিত্তিরই নয়!

—তার আগে ওইটাই আমাগো কচমচাইয়া চাবাইয়া খাইব।

ক্যাবলা গজগজ করে কী বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় দরজা দিয়ে সাতকড়ি সাঁতরা এসে ঢুকলেন।

–ব্যাপার কী হে তোমাদের? রাত সাড়ে বারোটা বাজে—এখনও তোমরা ঘুমোওনি নাকি। আমি হঠাৎ জেগে উঠে দেখি তোমাদের ঘরে আলো জ্বলছে। তাই খবর নিতে এলুম।

টেনিদা চটে বললে–আচ্ছা লোক মশাই আপনি। এতক্ষণে খবর নিতে এলেন। ওদিকে আমরা মারা যাওয়ার জো! বাইরে থেকে দরজা বন্ধ, ভেতরে ভূতের কাণ্ড চলছে, আর আপনি বলছেন ঘুমুইনি কেন।

সাতকড়ি অবাক হয়ে বললেন—কেন, দরজা তো খোলাই ছিল।

–খোলা ছিল। আধঘণ্টা টানাটানি করে আমরা খুলতে পারিনি।

সাতকড়ি ঘাবড়ে গেলেন। একটা চেয়ারে বসে পড়ে বললেন কী হয়েছিল বলে দেখি?

আমি বললুম–বিনামুল্যে ফিলিম শো দেখেছি।

টেনিদা বললে–ঘ্যাঁচা-ঘ্যাঁচা করে কানের কাছে বিচ্ছিরিভাবে হাঁড়িচাঁচা ডাকছিল। এককুঁজো জল তার মাথায় ঢেলে ক্যাবলা তাকে তাড়িয়েছে।

হাবুল বললে–আর চালের থনে অ্যাঁকটা কাটা মুণ্ডু বত্রিশটা দাঁত বাইর কইরা তুরুকরুক লাফাইতে আছিল।

টেনিদা কষে একটা গাঁট্টা বাগাল। দাঁতে দাঁত ঘষে বললে– ব্যাটা নির্ঘাত মেফিস্টোফিলিস। একবার সামনে পেলে এমন দুটো ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেরে দেব যে ইয়াক-ইয়াক হয়ে যাবে।

সাতকড়ি বললে–দাঁড়াও-দাঁড়াও, ব্যাপারটা বুঝে দেখি। তার আগে তোমাদের একটু ভুল শুধরে দিই। মেফিস্টোফিলিস হল শয়তান। পুরুষ-ফরাসী ভাষায় মাসকুল্যাঁ! আর মাসকুল্যাঁ হলে বলা উচিত ল্য গ্ৰাঁ। অর্থাৎ কিনা মস্ত বড়। আর ডি–অর্থাৎ দ্য টা ওখানে–

টেনিদা বললে–থামুন-থামুন। আমরা মরছি নিজের জ্বালায়, আর আপনি এই মাঝরাত্তিরে ফরাসী শোনাতে এসেছেন। আচ্ছা নোক তো!

—আচ্ছা, থাক-থাক। এখন খুলে বলো।

আমি বললুম—আপনি হাঁড়িচাঁচার ডাক শোনেননি?

–হাঁড়িচাঁচার ডাক? না তো!সাতকড়ি যেন গাছ থেকে পড়লেন।

হাবুল বললেন কী মশায়? আপনে কুম্ভকর্ণ নাকি! আমাগো কান ফাইটা যাইতাছিল আর আপনে শুনতেই পান নাই?

ক্যাবলা বললে–আঃ। তোরা একটু থাম তো বাপু। এমনভাবে সবাই মিলে বকবক করলে কোনও কাজ হয়? আমি বলছি শুনুন!

টেনিদা বললে– রাইট।  অর্ডার— অর্ডার।

ক্যাবলা সব বিশদ বিবরণ শুনিয়ে দিলে সাতকড়িবাবুকে। সাতকড়ি কখনও হাঁ করলেন, কখনও চোখ গোল করলেন, কখনও বললেন, মাই ঘঃ—! শেষ পর্যন্ত শুনে একটা হুতোম প্যাঁচার মতো থ হয়ে রইলেন।

টেনিদা বললে–তা হলে—

-তা হলে সেই কাগামাছি! এবার ঘোর বেগে আমাকে আক্রমণ করেছে দেখছি। না, ফরমুলাটা আর বাঁচানো যাবে না মনে হচ্ছে। আমার এতদিনের সাধনা—এমন যুগান্তকারী আবিষ্কার–সব গেল–

আমি বললুম—এত ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে যদি পুলিশে খবর দেন–

—পুলিশ।–সাতকড়ি সাঁতরা কিছুক্ষণ এমন বিচ্ছিরি মুখ করে আমার দিকে চেয়ে রইলেন যে, মনে হল এর চাইতে অদ্ভুত কথা জীবনে কোনওদিন তিনি শোনেননি।

ক্যাবলা বললে–আচ্ছা সাঁতরামশাই, আমাদের পাশের ঘরে কী আছে?

সাতকড়ি বললে–ওটা? ওটা স্ট্যাকরুম। মানে বাড়ির বাড়তি আর ভাঙাচুররা জিনিসপত্র জড়ো করে রাখা হয়েছে ওতে।

—ওর দরজায় চৌকো ফুটোটা এল কী করে? মানে যা দিয়ে এ-ঘরের দেওয়ালে প্রজেকটার দিয়ে ছবি ফেলা যায়?

—চৌকো ফুটো? সাতকড়ি আকাশ থেকে পড়লেনফুটো আবার কে করবে? ফুটোফাটার কথা আবার কেন? কোনও ফুটোর খবর তো আমি জানিনে।

–তা হলে জেনে নিন। ওই দেখুন।

সাতকড়ি উঠে দেখলেন আর দেখেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।

–সর্বনাশ! কাগামাছি দেখছি আমার ঘরে আড্ডা গেড়েছে। এবার আমি গেলুম।-সবুজ দাড়ি মুঠোয় চেপে ধরে তিনি হায় হায় করতে লাগলেন—একেবারে মারা গেলুম দেখছি।

ক্যাবলা বললে–মারা একটু পরে যাবেন। তার আগে ওই ঘরটা খুলবেন চলুন।

—ঘর? মানে ও-ঘরটা? ও খোলা যায় না!

—কেন খোলা যায় না?

সাতকড়ি বুঝিয়ে বললেন—মানে আসবার সময় ও-ঘরের চাবি কলকাতায় ফেলে এসেছি কিনা। আর দুটো পেল্লায় তালা ও-ঘরে লাগানো আছে।

—সে-তালা ভাঙতে হবে!

সাতকড়ি হেসে বললেন—তা হলে দার্জিলিং থেকে কামার আনতে হয়। এমনিতে ও ভাঙবার বস্তূ নয়।

টেনিদা বললে–চলুন, দেখা যাক।

সবাই বেরুলুম। সারা বাড়িতে আলো জ্বলছে তখন। সাতকড়িই জ্বেলে দিয়েছেন নিশ্চয়। পাশের ঘরের সামনে গিয়ে দেখা গেল ঠিকই বলেছেন ভদ্রলোক। আধ হাত করে লম্বা দুটো তালা ঝুলছে। কামারেরও শানাবে বলে মনে হল না—খুব সম্ভব কামান দাগাতে হবে।

টেনিদা বললে– কাল সকালে দেখতে হবে ভালো করে।

ক্যাবলা বললে–এবার চলুন, বাইরে বেরুনো যাক।

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললুম—আবার বাইরে কেন? কোথায় কাগামাছির লোক ঘাপটি মেরে বসে আছে। তার ওপর এই হাড়-কাঁপানো শীত–বরং কালকে–

ক্যাবলা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললে–তবে তুই একলা ঘরে শুয়ে থাক। আমরা দেখে আসি।

সর্বনাশ, বলে কী! একলা ঘরে থাকব! আর কায়দা পেয়ে ওপর থেকে কাটা মুণ্ডুটা ঝাঁ করে আমাকে তেড়ে আসুক! কামড়াবারও দরকার হবে না—আর-একবার দন্ত-বিকাশ করলেই আমি গেছি।

দাড়িটা চুলকে নিয়ে বললুম–না-না, চলো, আমি তোমাদের সঙ্গেই যাচ্ছি। মানে, তোমাদেরও তো একটু সাহস দেওয়া দরকার!

 

বাইরে ঠাণ্ডা কালো রাত। পাইনের বন কাঁপিয়ে হু হু করে বাতাস দিচ্ছে–কুয়াশা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। দূরের কালো কালো পাহাড়ের মাথায় মোটা ভুটিয়া কম্বলের মতো পুরু পুরু মেঘ জমেছে, লাল বিদ্যুৎ ঝলসাচ্ছে তার ভেতরে। সব মিলিয়ে যেন বুকের মধ্যে কাঁপুনি ধরে গেল আমার। এমন রাতে কোথায় ভরপেট খেয়ে লেপ কম্বলের তলায় আরামসে ঘুম লাগাব, তার বদলে হতচ্ছাড়া কাগামাছির পাল্লায় পড়ে-উফ!

সাতকড়ি সঙ্গে টর্চ এনেছিলেন। সেই আলোয় আমরা দেখলুম, ঠিক আমাদের জানালার নীচে মাটিতে খানিকটা জল রয়েছে তখনও, আর তার ভেতর কার জুতোপরা পায়ের দাগ।

ক্যাবলা বললে– হাঁড়িচাঁচা। মাথায় জল পড়তে কেটে পড়েছে।

পাশেই ঘাস। কাজেই জুতোপরা হাঁড়িচাঁচা কোনদিকে যে পালিয়েছে বোঝা গেল না। আরও খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করে আমরা আবার ফিরে এলুম।

সাতকড়ি বললেন—যা হওয়ার হয়েছে এবার তোমরা শুয়ে পড়ো। আজ আর কোনও উৎপাত হয়তো হবে না। যাই হোক আমি রাত জেগে পাহারা দেব এখন।

টেনিদা বললে–আমরাও পাহারা দেব!

-না-না, সে কী হয়। হাজার হোক তোমরা আমার অতিথি। শুয়ে পড়ো, শুয়ে পড়ো। দরকার হলে তোমাদের আমি ডাকব এখন।

আমরা যখন শুতে গেলাম, তখন ঝাউ বাংলোর হলঘরের ঘড়িটায় টং করে একটা বাজল।

শোবার আগে দুটো কাজ করল ক্যাবলা। প্রথমে দড়ি টেনে টেনে সব কটা স্কাইলাইট ভালো করে বন্ধ করল, তারপর ড্রেসিং টেবিলটা টেনে এনে পাশের ঘরের দরজার সামনে দাঁড় করালে যাতে ওখান থেকে কাগামাছি আবার আমাদের দেওয়ালে প্রজেক্টারের আলো ফেলতে না পারে।

তারপর কাগামাছির কথা ভাবতে-ভাবতে আমাদের ঘুম এল, আর সেই ঘুম একটানা চলল সকাল পর্যন্ত। কিন্তু তখন আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি—পরের দিন কী নিদারুণ বিভীষিকা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে।

Share This