০৮. অক্টোবর, ১৯৭১

৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ শবেবরাত। গত রাতে শরীফ ১৪০ রাকাত নামাজ পড়েছে–তাছাড়াও দোয়াদরুদ। একটুও ঘুমোয় নি। মা আর জাতীও সারারাতই জেগেছেন বলা যায় মাঝে ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়ে। আমি আরো কম জেগেছি। শরীর এত দুর্বল, রাতদুপুরের পর মাথা ঘুরতে লাগল। মা জোর করে শুইয়ে দিলেন।

আজকের রুটি-হালুয়া তৈরিতে অন্যান্যবারের মত কারুকার্য নেই। শুধু আটার রুটি, সুজির হালুয়া আর গরুর গোশত। পরিমাণে অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি। যত বেশি ফকিরকে দেওয়া যায়।

বাড়ির সবাই রোজা কেবল আমি বাদে।

টেবিলে এফতার সাজাচ্ছি, শরীফ, জামী, মাসুম একে একে ওজু করে এসে জড়ো হচ্ছে, হঠাৎকানে এল একটা শব্দ বুম্মম্। বেশ দূরে শব্দটাহয়েছে, তবে সারা শরীর শিউরে উঠল। বড় পরিচিত শব্দ–গত একমাসে খুব কম শুনেছি এশব্দ। আজ শব্দটা বেশ পরিষ্কার, বেশ জোরালো।

হাসি হাসি মুখ নিয়ে শরীফ এসে বসল একটা চেয়ারে, মৃদুস্বরে বলল শুনলে?

শুনলাম তো। বেশ দূরে মনে হল।

এখন থেকে কাছেও শুনবে।

তার মানে?

নতুন চালান এসেছে।

মা, লালু রান্নাঘরে ছিলেন, দুহাতে খাবারের বাটি নিয়ে তাঁদের আসতে দেখে শরীফ মুখ বন্ধ করে ফেলল।

এরপর ঘণ্টা দুয়েক আর নিরিবিলি কথা বলারই সুযোগ মিলল না। পড়শীদের বাড়ি থেকে রুটি-হালুয়া আসছে, দরজায় ফকিরদের ভিড়, তাদের সুস্থির করে একে একে রুটি-হালুয়া, গোশত বিলি করা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। এরমধ্যে দাদা ভাই, মোর্তুজা ভাই একটি টিফিন কেরিয়ার ভর্তি রুটি-হালুয়া নিয়ে এসে উপস্থিত। ওঁরা আসতেই শরীফ ওদের সঙ্গে বসার ঘরে রেডিও নিয়ে বসল। স্বাধীন বাংলা বেতার অনুষ্ঠানের সময় হলেই আর অন্য কোন কথা নয়, যে যেখানেই থাকুক, রেডিও নিয়ে বসবেই।

রাতে শুতে যাবার সময় শরীফের কাছে শুনলাম মেলাঘর থেকে নতুন গেরিলা দল এসে ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের দিকে ঘাঁটি গেড়েছে। সেই দলের ডেপুটি লিডার বাচ্চু মঞ্জুর হোসেনের আপন ভাগনে। বাঁকার বউ ডলিও মঞ্জুরের এক ভাগনী, সেই সুবাদে বাচ্চু, বাঁকারও শ্যালক হচ্ছে।

ওরা আপাতত ফার্মগেটে আর ফকিরাপুলে দুটো বাড়িভাড়া নিয়েছে। এ সবের খরচ যোগাচ্ছে বাঁকা আর মঞ্জর। পরে সুযোগ বুঝে আরো দুটো জায়গায় বাড়ি ভাড়া করবে। আজ শবেবরাতের রাতে ওদের প্রথম অ্যাকশন করার কথা ছিল। শব্দ শুনে মনে হচ্ছে ওটা ওদেরই অ্যাকশন। কাল পরশু জানা যাবে ঘটনার বিবরণ।

৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

ঝিনুরা বাসা বদল করেছে। আগের বাসাটা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টো দিকে ছিল, আত্মীয়বন্ধু যেতে ভয় পেত। এই বাসাটা পাগলাপীরের বাসার পেছনে হয়েছে। দুই বাসার মাঝের বাউন্ডারি ওয়াল এত নিচু যে, দুপাশে দুটো টুল রেখে দিলে সিঁড়ির মত পা ফেলে যাতায়াত করা যায়।

আজ পাগলা বাবার সাপ্তাহিক মিলাদ শেষ হবার পর ঝিনুদের বাসায় এসেছি নুহেল আর দীনুকে দেখতে। ওদের দুই ভাইয়ের শরীর খুব খারাপ। পূর্ণিমা-অমাবস্যার সময় হলেই ওদের চার ভাইয়ের কোমরে, পিঠে, শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা বাড়ে। কিন্তু এবারে নুহেল আর দীনুর শরীরটা বেশি কাবু হয়ে পড়েছে। নুহেলের পিটুনিটা বেশির ভাগ পিঠে, কোমরে আর মাথায় পড়েছে।

দুতিনটে ইলেকট্রিক তার একত্রে পাকানো, মাঝে-মাঝে একটা করে গিঠ–এই রকম তারের দড়ি দিয়ে বেশির ভাগ সময় নুহেলকে মেরেছে। মেরুদণ্ডের হাড় নড়েচড়ে তো গেছেই, সারা পিঠ ফালা-ফালা, মাথার বিভিন্ন জায়গায় কাটা। দীনুর অবস্থাও সমান খারাপ। তার বা কানের পর্দা ফেটে গেছে এক ক্যাপ্টেনের প্রচণ্ড চড়ে, ডান হাতের কবজির একটু ওপরে হাড় ফেটে গেছে লাঠির বাড়িতে কপাল ভালো একেবারে ভেঙে দুটুকরো হয় নি। নূরজাহানের বোনের স্বামী ডাঃ আশেকুর রহমান মিটফোর্ডে আছেন –দীন তাঁর কাছ থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে মিটফোর্ড গিয়ে–কানের এবং হাতের। ডাঃ আশেকুর রহমান বলেছিলেন হাতটা প্লাস্টার করলে ভালো। হয়। তাড়াতাড়ি সারবে। কিন্তু দীনু ভয়ে হাত প্লাস্টার করতে পারে নি। যদি রাস্তায় মিলিটারি দেখলে মুকুত বলে ধরে। একেইতো তার চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ছিল বলে এম.পি.এ হোস্টেলে খানসেনারা তাকে ইয়ে শালা মুকুত হ্যায় বলে বেশি পিটুনি দিয়েছে। হাত প্লাস্টার না করার ফলে সারতে দেরি হচ্ছে। বাঁ কানটাও খুব কষ্ট দিচ্ছে। এর ওপর সব ভাইয়েরই হাতের আঙুলের গিঠ মচকানো, কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা–এসব। তো আছেই।

জামী বলল, মামা, আমারো কোমরে মাঝে-মাঝে বেশ ব্যথা করে, আরও। তবুও তো আমাদের কাউকে হুকের সঙ্গে ঝোলায় নি, মাথা নিচে দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঘোরায় নি, তাইতেই এই অবস্থা! স্বপন ভাই, উলফাত ভাইয়ের আব্বাদের যে কি খারাপ অবস্থা। ওঁরা তো এখনো নিজে নিজে হাঁটতে পারেন না, ধরে নিতে হয়। তবুতো ওঁদের ছেলেরা বেঁচে গেছে, সেইটাই ওঁদের মস্ত সান্ত্বনা।

জামীকে এভাবে কথা বলতে শুনে আমি ভেতরে ভেতরে চমকে গেলাম। রুমীর গ্রেপ্তার ওকেও কতোখানি কাবু করেছে, বুঝতে পারলাম। ছোটবেলায় দুই ভাই খুব মারামারি করত, কিন্তু একটু বড় হতেই রুমী ওর কাছে হিরো হয়ে উঠেছিল।

একটু পরে জামী আবার বলল, স্বপন ভাই কিভাবে পালিয়েছিল, তোমরা কেউ শুনেছ নাকি? মিলিটারি নাকি বাড়ির সামনের দিকটা ভরে ফেলেছিল, তারই মধ্যে স্বপনের মা ওকে ঠেলে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। ওদের বাড়িটা একতলা ছিল, আর পেছন দিকে কচু বন, ঝোপঝাড়, তারপর বস্তি এই সব ছিল। সামনের বারান্দার জানালা দিয়ে মিলিটারিরা নাকি দেখতে পেয়েছিল স্বপনের মা স্বপনকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছেন। তাইতেই তো মিলিটারিরা আরো বেশি রেগে গিয়েছিল স্বপনের বাবার ওপর।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তুই কার কাছে শুনলি এত কথা?

আমার স্কুলের এক বন্ধু ওই পাড়ায় থাকে। স্বপন ভাইদের বাড়ির খুব কাছে। আজ দুপুরে যে মিষ্টি কিনতে গেছিলাম মরণাদে, সেখানে ওর সঙ্গে দেখা। তখন বলল।

আমি ৩০ আগস্ট ভোরে স্বপনের উদ্ভ্রান্ত চেহারাটা মনে করে বললাম, ইস্, অতবড় বিপদ গেছিল রাতে, তাও সোনামানিক আমার সকালবেলা ছুটে এসেছিল খবর দিতে। আমি যখন বললাম, রুমীরা ধরা পড়েছে, তুমি এক্ষুণি পালাও। তখন কিন্তু একটা কথাও বেরোয় নি ওর মুখ দিয়ে। একেবারে নীরবে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।

বলতে পারল না যে ওর বাড়িতেও সর্বনাশ ঘটে গেছে। আহারে! যেখানেই থাকুক, আল্লা ওকে ভালো রাখুন।

১১ অক্টোবর, সোমবার ১৯৭১

শরীফ বলল, সেই যে মাস খানেক আগে কাগজে পড়েছিলাম ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের কথা, তার সম্বন্ধে আজ শুনে এলাম।

কি শুনে এলে? কোথায় শুনলে?

ডাঃ রাবির কাছে। রাব্বি–জানোততা; আমাদের সুজার ভাস্তে।

শরীফের এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু সুজা সাহেব, তার ভাস্তে ডাঃ ফজলে রাব্বি।

শরীফ বলল, আজ ফকিরের অফিসে গেছিলাম, ওখানে রাব্বির সঙ্গে দেখা। ওর মুখেই শুনলাম মতিউর রহমানের ফ্যামিলি ২৯ সেপ্টেম্বর করাচি থেকে ঢাকা এসেছে। মতিউর রহমানের শ্বশুর গুলশানের এক বাড়িতে থাকেন। সেইখানে ৩০ তারিখে মতিউরের চল্লিশা হয়েছে। রাব্বি গিয়েছিল চল্লিশায়। মিসেস মতিউর নাকি বাংলা বিভাগের মনিরুজ্জামানের শালী।

আমাদের স্যার মনিরুজ্জামানের? তার মানে ডলির বোন? দাঁড়াও, দাঁড়াও এই বোনকে তো দেখেছি ডলিদের বাসায়–মিলি এর নাম।

ডলির কথা মনে পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ডলি, মনিরুজ্জামান স্যার, ওদের কোন খোঁজই জানি না। দুটো বাচ্চা নিয়ে কোথায় যে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে কে জানে। ওপারেও যায় নি, গেলে বেতারে নিশ্চয় গলা শুনতে পেতাম। স্বাধীন বাংলা বেতারে বহু পরিচিতজনের গলা শুনি, তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করে, কিন্তু গলা শুনে চিনতে পারি। প্রথম যেদিন স্বাধীন বাংলা বেতারে সালেহ আহমদের কণ্ঠে খবর শুনি, খুব চেনা-চেনা লেগেছিল, দুএকদিন পরেই চিনেছিলাম–সে কণ্ঠ হাসান ইমামের। ইংরেজি খবর ও ভাষ্য প্রচার করে যারা, সেই আবু মোহাম্মদ আলী ও আহমেদ চৌধুরী হল আলী যাকের আর আলমগীর কবির। গায়কদের গলা তো সহজেই চেনা যায় রথীন্দ্রনাথ রায়, আবদুল জব্বার, অজিত রায়, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, হরলাল রায়। কথিকায় সৈয়দ আলী আহসান, কামরুল হাসান, ফয়েজ আহমদ প্রায় সকলেরই গলা শুনে বুঝতে পারি। নাটকে রাজু আহমেদ, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়–এদের সবার গলাই এক লহমায় বুঝে যাই।

১৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

আজ সারা শহরে হৈচৈ! গতকাল রাতে দুজন মুক্তিযোদ্ধা বনানীতে মোনেম খানের বাড়িতে ঢুকে তাকে গুলি করে পালিয়ে গেছে। ভোররাতে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মোনেম খান মারা গেছে। খবর কাগজে ছবিসহ বেশ বিস্তারিতভাবেই তার হত্যাকাহিনী ছাপা হয়েছে। কাগজে অবশ্য দুষ্কৃতকারী এবং আততায়ী বলা হয়েছে। সন্ধ্যার পর মোনেম খান তার ড্রয়িংরুমে বসে মেহমানদের সঙ্গে কথা বলছিল। মেহমানরা ছিল প্রাক্তন প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন, কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা আর মোনেম খানের জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল। ড্রয়িংরুমের সদর দরজা খোলা ছিল, মোনেম খান দরজার দিকে মুখ করে বসেছিল। বাইরের বারান্দার বাতি নেভানে ছিল। এমনি অবস্থায় দরজার কাছ থেকে কে বা কারা মোনেম খানকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে, গুলি তার পেটে বিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোনেম খানের রক্তাক্ত দেহ সোফা থেকে মাটিতে পড়ে যায়। গুলি ছুড়ে আততায়ী অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়। মোনেম খানকে হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় গুলি তার পেট-পিঠ ছেদা করে বেরিয়ে গেছে। অবস্থা খুব গুরুতর। মাঝরাতে অপারেশনও করা হয় কিন্তু রুগীকে বাঁচানো যায় নি।

আজ ফখরুকে হাসপাতালে দেখতে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু কাগজে মোনেম খানের ঘটনা পড়ার পর ভাবলাম আজ আর হাসপাতালের দিকে না যাওয়াই ভালো। নিশ্চয়ই মিলিটারিতে গিজগিজ করছে জায়গাটা। দাঁতের ডাক্তার ফখরুজ্জামানের কিডনিতে ক্যান্সার ধরা পড়েছে গত মাসে। সে আছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউ কেবিনে। ফখরুর সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্টতা বিশ বছরের। আপন ছোট ভাইয়ের মত। মনটা খুব দমে গেছে খবরটা শুনে। ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগের ছোবল।

ফখরু বিলেতে গিয়ে অপারেশন করাবে, স্থির করেছে। তার যোগাড়যন্তর চলছে।

বেরোব বলে ঠিক করেছিলাম, তাই ঘরে বসে থাকতে মন চাইল না। ভাবলাম নিউ মার্কেটে গিয়ে কিছু ওষুধপত্র কিনে, মিষ্টির দোকান থেকে আজ বিকেলে পাগলাপীরের মিলাদের মিষ্টি কিনে নিয়ে আসি এখনই।

যে দোকানেই যাই, সবখানে চাপা উল্লাস আর ফিসফিস্ কথাবার্তা। মোনেম খান মরেছে–এর চেয়ে সুখবর আর বুঝি কিছু হতে পারে না! বিচ্ছুরা কি রকম অনায়াসে। বারান্দায় উঠে দরজার কাছ থেকে গুলি করে চলে গেল, ঘরভর্তি লোক কেউ কিছু করতে পারল না–এর চেয়ে সফল অ্যাকশন আর বুঝি কিছু হতে পারে না। মিষ্টির দোকানে গিয়ে আমি হতভম্ব। মিষ্টির দোকান সাফ! সকাল থেকে দলে দলে লোক এসে মিষ্টি কিনে নিয়ে গেছে। ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে প্রায় পাশাপাশি দুটো দোকান মরণচাদ আর দেশপ্রিয়। দুটো দোকান থেকে কুচিয়ে-কাচিয়ে জিলিপি পেলাম সের দুয়েক আর রসগোল্লা-কালোজাম-চমচম সব মিলিয়ে সের দেড়েক! আর কিছু নেই দোকানে।

বাসায় ফিরে ভাবতে লাগলাম একটা অত্যাচারী লোকের ওপর কতখানি ঘৃণা থাকলে লোকে তার খুন হবার খবরে এরকম খুশিতে উল্লসিত হয়ে মিষ্টি কিনে দোকান সাফ করতে পারে! এই মোনেম খান–এই বাংলারই কুসন্তান মোনম খান, আইয়ুব খানের আমলে গভর্নর হয়ে বাঙালিদের বুকের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছিল ছয়-সাত বছর ধরে। মানুষ সহ্য করতে করতে শেষে আর না পেরে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে। প্রভু আইয়ুব খানের পতনের আগেই তার বশংবদ তাবেদার মোনেম খানের পতন হয়। তারপর কয়েক বছর মোনম খান বাড়ির ভেতরেই দিন কাটিয়েছে। বাইরে আর বেরোয় নি কিন্তু একাত্তরের মাঝামাঝি আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পাকিস্তানি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কিছু একটা করার তোড়জোড় করছিল।

বিকেলে পাগলাপীরের আস্তানাতেও দেখলাম সমাগত লোকজনের মুখে চাপা উল্লাস। কে একজন ফিসফিস করে বলল, পাগলা বাবার উচিত আজ মিলাদ শেষে ঐ বিচ্ছগুলোর জন্য দোয়া করা।

কিন্তু পাগলাপীরের মুখ আজ অসম্ভব গম্ভীর! মেজাজও বেজায় রুক্ষ! কিছুটা বিচলিতও মনে হচ্ছে। কে জানে কি কারণে!

১৫ অক্টোবর, শুক্রবার ১৯৭১

গতকাল নিউ মার্কেটের ওষুধের দোকান থেকে যেসব ওষুধ কিনেছি, সেগুলো আজ প্যাকেট করতে বসেছি বেডরুমের দরজা বন্ধ করে। জামী তার দাদার কাছে বসে আছে। মা-লালু একটু বাইরে গেছেন। এখন বিভিন্ন বর্ডারে যুদ্ধ খুব জোরেশোরে হচ্ছে। ওষুধের খুব দরকার। ওষুধ কিনে ছোট ছোট প্যাকেট করে রাখি। সুযোগমত বিভিন্নজনের হাতে পাঠাই। শুধু ওষুধই নয়, টাকা, সিগারেট এসবও।

বেশির ভাগ কাটা-হেঁড়ার ওষুধ কিনি–পেনিসিলিন অয়েন্টমেন্ট, টেরামাইসিন অয়েন্টমেন্ট, সালফানিলামাইড পাউডার, জামবাক, ডেটল, টিংচার আয়োডিন, টিংচার বেনজিন, তুলো, গজ। তাছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক –টেরামাইসিন, পেনব্রিটন, ক্লোরোমাইসেটিন। কারো কারো টাইফয়েড়ও হয়ে যেতে পারে।

আমাশয়ের ওষুধেরও খুব চাহিদা। সেগুলোও কিনি–ফ্ল্যাজিল, নিভেম্বিন, অ্যাম্বিকুইন, এন্টারোয়োফর্ম, নিয়োভায়াসেপ্ট।

জ্বর-মাথা ধরার জন্য নোভালজিন, ডিস্পিন। সর্দি-কাশিতে আরামের জন্য ভিকস, ইউক্যালিপটাস তেল। মচকানো ব্যথার জন্য আয়োডেক্স। এছাড়া ছোট কাঁচি ও ব্লেড একটা করে দিয়ে দিই প্রতি প্যাকেটে। এমার্জেন্সির সময় নিজেরাই যেন ব্যান্ডেজ করে নিতে পারে।

১৬ অক্টোবর, রবিবার ১৯৭১

আজ ঝিনুদের বাসায় মিলাদ। নতুন বাসায় আসার মিলাদ। মিলাদ শেষে রাঙামা বললেন, মাগো, একটু বসে যাও। কথা আছে।

ঝিনুর মাকে আমি রাঙামা বলে ডাকি। এই প্রৌঢ় বয়সেও এমন কাচা সোনার মত রং, এমন দেবী প্রতিমার মত রূপ, এমন মধুর স্নেহমাখা ব্যবহার–রাঙামা ছাড়া অন্য কোন ডাক মুখেই আসে না।

লোকজন একে একে চলে গেলে রাঙামা ভেতরের একটা ছোট ঘরে আমাকে নিয়ে গেলেন, সেখানে একটা চৌকিতে দুটো ছেলে বসে ছিল। আমি ঢুকতেই একটি ছেলে উঠে এগিয়ে আমার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে উঠলাম, ইকু।

মান্নানের বড় ভাই বাকি সাহেবের ছেলে ইকু-২৮ আগস্ট শাহাদত আলমের সঙ্গে মেলাঘর চলে গিয়েছিল।

তুমি কবে এসেছ ইকু?

এসেছি এ মাসের প্রথমেই।

ইকুর মুখে শুনলাম ষাটজন গেরিলার বিরাট একটা দলের সঙ্গে ও এসেছে। ক্যাপ্টেন হায়দার অনেক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে এই দলকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন গেরিলা অপারেশন করার জন্য। ওরা গোপীবাগের পেছন দিক দিয়ে ঢাকায় ঢুকেছে। ঢাকার বাইরে ওইদিকে বাইগদা বলে একটা গ্রামে ওদের বেস্ ক্যাম্প সেখান থেকে অল্পে অল্পে অস্ত্রশস্ত্র ঢাকার ভেতর নিয়ে আসছে।

তাদের অস্ত্র আনার পদ্ধতি শুনলাম। ভোরবেলা গ্রাম থেকে লোকেরা ঝুড়িভর্তি শাকসবজি নিয়ে ঢাকায় আসে। তাদের সঙ্গে মিশে সবজিওয়ালা সেজে ঝুড়িতে সবজির তলায় ছোট অস্ত্র লুকিয়ে আনে। বড় অস্ত্রগুলো সাধারণত বস্তার ভেতরে অন্য জিনিসের সঙ্গে ভরে রাত্রিবেলা নিয়ে আসে।

২১ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

সকাল সাড়ে সাতটার সময় তৈরি হয়ে ডাঃ খালেকের সঙ্গে সেক্রেটারিয়েট এসেছি। ফখরুজ্জামানের মেডিক্যাল বোর্ডের অর্ডার হেলথ মিনিস্ট্রি থেকে হাতে হাতে বের করে না নিলে কতোদিন যে লাগবে, কে জানে। এদিক ওর বিলেত যেতে যত দেরি হবে, ওর কিডনির ক্যান্সারও তত বেশি খারাপ হতে থাকবে।

অর্ডার টাইপ হয়ে সই হয়ে হাতে আসতে আসতে বারোটা বাজল। কাগজ নিয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এলাম। এখন এটাতে ডাঃ আলী আশরাফের সই লাগবে। তিনি অপারেশন থিয়েটারের ভেতর। ফখরুর বউ আঙুকে সঙ্গে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে যে ছোট্ট অ্যান্টিরুম আছে, সেইখানে দাড়িয়ে আছি। ওয়ার্ড বয়ের হাতে করকরে দুটো দশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, একটা অপারেশন শেষ করে মুখের মাস্ক খোলামাত্রই যেন ডাঃ আলী আশরাফকে সে বলে যে আমি খুব জরুরি ব্যাপারে তাঁর জন্য এখানে অপেক্ষা করছি। অবশ্যই যেন দুমিনিটের জন্য তিনি এ ঘরে আসেন। একটু দেরি হলেই কিন্তু আর ওঁকে পাওয়া যাবে না।

ডাঃ আলী আশরাফ খুব রাগী মানুষ। এভাবে অপারেশন থিয়েটার থেকে ডেকে আনার স্পর্ধা স্বরূপ ওয়ার্ড বয় তো বকা খাবেই, আমারও কপালে কি আছে, কে জানে। কিন্তু এদিক আর তো সময় নেই। আজ ওঁর সই না হলে ফরেন এক্সচেঞ্জ যোগাড় করতে দেরি হয়ে যাবে। আগামীকাল, পরশু দুদিনই এগারোটা পর্যন্ত ব্যাঙ্ক, তার পরের দিন রোববার ব্যাঙ্ক বন্ধ।

ডাঃ আলী আশরাফ গনগনে মেজাজ নিয়ে এলেন, প্রচণ্ড বকাবকি করলেন আমায়–তাকে এভাবে দুই অপারেশানের মাঝখানে ডেকে পাঠানোর জন্য। আমিও গলা চড়িয়ে বললাম, এছাড়া আর উপায় ছিল না। একটা লোক মরতে বসেছে। দেরি করলে তার আর কোনো চান্স থাকবে না।

বকাবকি করতে করতেই সইটা করে দিলেন ডাঃ আলী আশরাফ। সব ভুলে দাঁত বের করে হেসে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

ফখরুজ্জামানের কেবিনে ঢুকে দেখি ডাঃ ফজলে রাব্বি তাকে দেখতে এসেছেন। শুনলাম ফখরুকে রাব্বি বলছেন, যান, ভালো হয়ে ফিরে আসুন। এসে দেখবেন আমরা হয়তো অনেকেই নেই।

২২ অক্টোবর,শুক্রবার ১৯৭১

আজ থেকে রোজা শুরু হয়েছে। শরীফ, জামী, বুড়া মিয়া তিনজনেই রোজা। মা আর লালু গত পরশুদিন নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন।

রুমির এখনো কোন হদিস বের করা সম্ভব হয় নি। পাগলা বাবা ক্রমাগত আমাদেরকে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন, আমরা ক্রমাগত বাবাকে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে পঞ্চাশ টাকার নোট, পাঁচ-সাত সের মিষ্টি, এক কার্টন ৫৫৫ সিগারেট (বাবা ৫৫৫ ছাড়া খান না) নজরানা দিয়ে যাচ্ছি। যখনই দরকার, তখনই ড্রাইভারসহ গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এখন আর ফজরের নামাজের আগে যাই না, কারণ তিন সপ্তাহ ঝাড়ার পরও যখন লালুর মাইগ্রেন সারার কোন লক্ষণ দেখা গেল না, তখন স্বাভাবিক বুদ্ধি ও সৌজন্যবশতই নিঃশব্দে ভোরে যাওয়া বন্ধ করেছি। কিন্তু গতকাল বাবা আবার বললেন, কাল ভোরে আসিস। তাই আজ ভোরে গিয়েছিলাম। রোজার প্রথম দিন এত ভোরে কোথাও যাওয়া যে কি কষ্টকর। তবু গেলাম। গতকাল সাপ্তাহিক মিলাদের পর আমি বাবাকে চেপে ধরেছিলাম, খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। বাবা তাই বলেছিলেন, তিনি সারারাত হুজরাখানায় আল্লার কাছে এবাদত করবেন, সকালে যেন যাই। খুব একটা আশা নিয়ে সকালে গিয়েছিলাম, কোন সুখবর নিশ্চয় তিনি দেবেন। কিন্তু তিনি শুধু বললেন রোববার পর্যন্ত দেখি, তারপর যা হয় করা যাবে। আটটায় বাড়ি ফিরে আবার গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি–পাগলা বাবার দরকার।

কিছু ভালো লাগছে না, মাথা ধরে উঠছে। কষ্টে, হতাশায়, অক্ষম রাগে চোখ দিয়ে দরদর করে পানি বেরোচ্ছে, ঠেকাতে পারছিনা। মাসুমা গতকাল একটা কাজের ছেলে এনে দিয়েছে–ওসমান। তাকেও কিছু কাজ দেখিয়ে দেওয়া উচিত, তাও পারছি না।

এই রকম পাগল পাগল অবস্থা থেকে রেহাই দিল মোতাহার, রেজিয়া আর মিনি। মোতাহারুল হক, শরীফের এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু, রেজিয়া তার বউ, মিনি তার বড় ভাইয়ের মেয়ে।

রেজিয়া অর্থাৎ বাচ্চু আমার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। ওরও শুধু ছেলে আমার মত, কোন মেয়ে নেই। তাই বোধ হয় মিনিকে প্রায় প্রায়ই ওদের সঙ্গে দেখা যায়। মিনি খুব চমৎকার মেয়ে, হাসিখুশি, মিশুক, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় ভারি সুন্দর। অন্য সময় মিনিকে গান গাইতে বললে বাহানা করে, গা-মোড়ামুড়ি দেয়, আজ বলা মাত্র ও গাইতে শুরু করল। আমার কান্নায় ফোলা লাল চোখের দিকে চেয়ে ও গাইল :

দুঃখ যদি না পাবে তো
দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?
বিষকে বিষের দাহ দিয়ে
দহন করে মারতে হবে।

জ্বলতে দে তোর আগুনটারে
ভয় কিছু না করিস তারে।
ছাই হয়ে সে নিভবে যখন
জ্বলবে না আর কভু তবে।

এড়িয়ে তারে পালাস নারে
ধরা দিতে হোসনা কাতর।
দীর্ঘ পথে ছুটে ছুটে
দীর্ঘ করিস দুঃখটা তোর।

মরতে মরতে মরণটারে
শেষ করে দে একেবারে।
তার পরে সেই জীবন এসে
আপন আসন আপনি লবে।

মিনিরা থাকে রোকনপুরে–ওদের পৈতৃক বাড়িতে। মোতাহাররাও গুলশানের বাড়ি ছেড়ে রোকনপুরের বাড়িতে চলে গেছে। বাচ্চুর বাপের বাড়িও শ্বশুরবাড়ির দুটো বাড়ির পরেই। মার্চে ক্র্যাকডাউনের পর থেকেই আমাদের সকলের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা দিয়েছে আত্মীয়স্বজন মিলে কাছাকাছি একত্রে থাকার। সামরিক জান্তার প্রতিকারহীন নির্যাতনের মুখে অরক্ষিত অসহায় বাঙালি পরিবারগুলো কাছাকাছি থেকে এভাবেই বোধ করি শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করে।

আমার মানসিক অবস্থা দেখেই কি না জানি না, ওরা বহুক্ষণ রইল আমার সঙ্গে। মিনির কাছ থেকে জানতে পারলাম ঢাকার কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধার কার্যকলাপ।

বাচ্চুর বড় বোনের ছেলে জন, বাঙ্গুর বড় ছেলে দোলনের বন্ধুর ছোট ভাই আরিফ, তাদের বন্ধু ফেরদৌস–এরা সব স্কুলের ছাত্র, কিন্তু সবাই দুর্ধর্ষ বিন্দু। জন থাকে নারিন্দায়, ফেরদৌসমগবাজারে, আরিফ ধানমণ্ডিতে কিন্তু এরা সবাই মিনিদের বাড়িতে আসে, খায়, প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে। এদের সঙ্গে সঙ্গে আরো অনেকে আসে–গান গায় যে মাহবুব, যাকে ওরা এল.পি. মাহবুব বলে ডাকে, সে আসে, সোহেল আসে, ফিরোজ আসে। এদের সঙ্গে যোগ রয়েছে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, মানিক এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা। ওরা বিরাট এক দল সাভারের কাছে কোন এক গ্রামে ঘাঁটি গেড়েছে, গ্রামের নাম মিনি জানে না, কিন্তু ওখান থেকে ঢাকা শহরে অস্ত্র আনতে মিনি আর ডালিয়া সালাহউদ্দিনের খালা শাহানা সাহায্য করে। আরিফ গাড়িতে করে মিনি আর শাহানাকে সাভারের কাছাকাছি এক নদীর ধার পর্যন্ত নিয়ে যায়, সেখানে গাড়িতে অস্ত্র ওঠানো হয়। গাড়িতে মহিলা থাকলে সাধারণত মিলিটারিরা চেকপোস্টে গাড়ি সার্চ করে না, কখনো-সখনো শুধু থামিয়ে দুএকটা কথা জিগ্যেস করে ছেড়ে দেয়। সেই জন্যেই মিনি আর শাহানা গাড়িতে বসে থাকে।

বুঝলাম, মিনি যে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর কথা বলছে, সে-ই হচ্ছে মঞ্জুরের ভাগনে বা–যার কথা শরীফ আমাকে আগেই বলেছে। আমি মিনির কাছে ভাঙলাম না যে আমি ওদের কথা আগেই জেনেছি। আমি শুধু মিনির কথা শুনে যাচ্ছি, যত শুনছি, তত আমার বুকের ওপর থেকে চাপ চাপ ভার হালকা হয়ে যাচ্ছে, আমার মনের ভেতর থেকে কষ্ট, হতাশা আর রাগ উবে যাচ্ছে। ২৯-৩০ আগস্টের গ্রেপ্তারের পর মাত্র কয়েকটা দিন ঢাকা শহর নিথর ছিল। তারপরই আবার বিচ্ছুরা কিবিল্ করতে শুরু করেছে। আবার দলে দলে গেরিলারা ঢাকায় ঢুকছে বিভিন্ন দিক দিয়ে, ইউসুফ বাচ্চুরা সাভারের দিক দিয়ে, ইকুরা গোপীবাগের দিক দিয়ে। আরো কতো কতো দল কতো দিক দিয়ে ঢাকায় ঢুকছে, তার সব খবর কি আমি জানি।

এই যে গত পরশু বুধবার দুপুর একটার সময় স্টেট ব্যাঙ্কের ছয়তলায় একটা বাথরুমে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে দুজন পাকিস্তানি কম্যান্ডো মরেছে, যে বিচ্ছুরা এ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তাদের নাম আমি জানি না। তার আগের দিন মঙ্গলবার সকালের দিকে মতিঝিলে ই.পি.আই.ডি.সি, হাবীব ব্যাঙ্ক আর ডেন্সিয়াল বিল্ডিংগুলোর সামনের রাস্তায় বোমা বিস্ফোরিত হয়ে ওখানে পার্ক করা ছয়টা গাড়িনষ্ট হয়েছে, বিল্ডিং তিনটের সামনের দিকের সব জানালার কাচ ভেঙেছে। যে ছেলেরা দিনে-দুপুরে এই অসম সাহসিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তাদের নামও আমি জানি না। তারও দুদিন আগে ১৮ তারিখে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। কে করেছে, জানি না।

কিন্তু নাম না জানলেও এটা বুঝতে পারছি তারা মুক্তিবাহিনীর গেরিলা, তারা আমাদেরই প্রত্যেকটি বাঙালি ঘরের দামাল ছেলে। সেই যে রুমী একটা কবিতা আবৃত্তি করেছিল :

পারলে নীলিমা চিরে বের
করতো তোমাকে ওরা, দিত ডুব গহন পাতালে।
তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া
তুমিতো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।

গেরিলা নামের সেই কবিতাটির কথা এখন আমার মনে পড়ল।

মিনির মুখে এই দামাল ছেলেদের আরো একটা কীর্তির কথা শুনলাম : জানেন চাচী, এবার ১৪ আগস্ট কি হয়েছিল? বেলুনে গ্যাস ভরে বেলুনের সাথে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ আর নৌকো বেঁধে ছেড়ে দিয়েছিল ওরা। জনের বড় দুলাভাইয়ের বেলুনের ফ্যাক্টরি আছে, সেইখান থেকে অনেক বেলুন এনে বাসার মধ্যে লুকিয়ে গ্যাস ভরা হয়েছিল। কায়েদে আজম কলেজের কয়েকটা ছেলে গ্যাস নিয়ে এসেছিল। আমরা সব। কাগজ দিয়ে ছোট ছোট ফ্ল্যাগ আর নৌকো বানিয়েছিলাম। ভোর রাতের দিকে আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে ওগুলো ওড়ানো হয়। নৌকো বাধা একটা বেলুনের সুতো নবাবপুরের একটা ইলেকট্রিক তারে আটকে গিয়ে ঝুলছিল। তাই নিয়ে সেখানে কি হৈচৈ! রাজাকাররা সেইখানে আর কাউকে দাঁড়াতে দেয় না। মোহন চাচা নবাবপুরে বাজার করতে গিয়ে এই দৃশ্য দেখে বাজার-টাজার ভুলে বাড়ি চলে আসেন। এই নিয়ে সেদিন সারা পাড়াতেই টেনসান! কি জানি, যদি পাড়া সার্চ করতে আসে মিলিটারি

এসেছিল?

মিনি ঝরঝর করে হেসে বলল, নাঃ, আসে নি।

২৩ অক্টোবর, শনিবার ১৯৭১

 জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের উপনির্বাচন নিয়ে কদিন খবর কাগজের পৃষ্ঠা সরগরম। কতগুলো আসনে কতজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করছে, তা বেশ ফলাও করে রোজ ছাপা হচ্ছে। কেউ কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে।

ফকির বললেন, এরা তো নির্বাচিত হয়ে গেল, বাকিরাও হয়তো হবে। এরা কি কখনো ভেবে দেখেছে–এরপর এদের অদৃষ্টে কি আছে? শরীফ ভুরু কুচকে বলল, কি আছে?

কাফনের কাপড়, লোবান আর পঞ্চাশ টাকার একটা নোট।

আমি বললাম, পঞ্চাশ টাকার তো নয়, দশ টাকার নোট।

ওটা তো গ্রামের শান্তি কমিটির মেম্বারদের জন্য। হাজার হলেও এরা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, এদের বেলায় দশ টাকা একটু কম হয়ে যায় না ? মর্যাদাহানিকরও বটে।

আজকাল শুনতে পাই মুক্তিযোদ্ধারা নাকি খুব বেশি খারাপ। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, মেম্বার, ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের একটা কাফনের কাপড়, এক প্যাকেট লোবান আর দশটা টাকাসহ একটা চিঠি পাঠিয়ে দেয়–যা খাবার ইচ্ছে হয়, ঐ দশ টাকায় খেয়ে নাও, তোমার দিন শেষ হয়ে আসছে।

আমি বললাম, এতগুলো বাঙালি মনোনয়নপত্র দাখিল করবে, আমি কিন্তু আশা করি নি।

ফকির বললেন, কেন আশা করেন নি ভাবী? সব বাঙানিই যে দেশপ্রেমিক নয়, সে তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি আমরা সবাই।নইলে রুমীর বন্ধু বদি যে সব্বার আগে দুপুরবেলা ধরা পড়েছিল, সে তো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ি থেকে ধরা পড়েছিল। বন্ধুটি যে পাকিস্তানের দালাল ছিল, তাতে তো আর কোন সন্দেহ নেই। বদি দুপুরবেলা আরেক বাঙালি বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়ল বলেই না পরবর্তীকালে এতবড় সর্বনাশ হল। তেমনি অনেক অযোগ্য-অকর্মা বাঙালি, যারা এতদিন কিছুই করতে পারে নি, তারা এই সুযোগে এসেম্বলি মেম্বার হতে পারছে।

শরীফ বলল, তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এতসব ক্যান্ডিডেট নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে দেখে একটা সন্দেহও হচ্ছে। বেশির ভাগ জায়গাতেই বেয়নেটের গুঁতোর ভয় দেখিয়ে ক্যান্ডিডেট খাড়া করা হয়েছে, একটার বেশি পাওয়া যায় নি। তাই কনটেস্টও হয় নি। ক্লাসে একটাই মাত্র ছাত্র, কাজেই ফার্স্ট ক্লাস ফাস্ট।

কেন, বহু জায়গায় তো একের বেশিও মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছে।

মনে হয়, ওগুলো সব লোকের চোখে ধুলো দেবার জন্য বানানো খবর। আসলে একটাই যোগাড় হয়েছে অতি কষ্টে।

২৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ সকালে হঠাৎ চৈতন্য এসে হাজির। চৈতন্য আমাদের অনেকদিনের পুরনো কাঠমিস্ত্রি। খুব সৎ আর পরিশ্রমী। তাই বন্ধুবান্ধব কারো কাঠমিস্ত্রির দরকার হলে আমরা বিনা দ্বিধায় চৈতন্যকে পাঠিয়ে দিই। বেশি সৎ আর সরল বলে চৈতন্য জীবনে তেমন উন্নতি করতে পারল না, মাঝে-মাঝেই অভাব বেশি হলে আমাদের কাছে এসে বলে কোথাও কাজে লাগিয়ে দেন।

এখন ওকে দেখে আমরা হৈহৈ করে উঠলাম, কি চৈতন্য? কেমন ছিলে এতদিন? কোথায় ছিলে? ইন্ডিয়া যাও নি?

চৈতন্যরা সাতপুরুষের ভিটে ফেলে ইন্ডিয়ায় যেতে পারে নি। তাছাড়া বাড়ার ওদিকে ওদের গ্রামে ঠিক সরাসরি মিলিটারির হামলাও হয় নি। কোনমতে লুকিয়ে চুরিয়ে থেকেছে, প্রাণে বেঁচেছে। তবে কাজ-কারবার নেই বললেই চলে। প্রথম কিছুদিন বসে খেয়ে কোনমতে কাটিয়েছে। এখন দুইবেলা উপোষ দেবার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তাই সাহসে ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

আমি বললাম, খুব ভালো সময়েই এসে পড়েছ। এই বাড়িতেই বেশকিছু কাজ জমে রয়েছে তোমাদের জন্য।

মাঝে-মাঝেই একবার করে গুজব ওঠে মিরপুর-মোহাম্মদপুর থেকে বিহারিরা এদিকপানে আসছে সব লুটপাট করতে। তখন পাড়ায় হৈচৈ পড়ে যায়, সবাই নিজের নিজের বাড়ির দরজা-জানালার হুড়কো-ছিটকিনি ঠিক আছে কি না দেখতে থাকে। আমরাও অনেকদিন থেকে ভাবছি–আমাদের সামনের দিকের দরজা দুটোর পাল্লা বদলানো দরকার। পাল্লাগুলো এমন হালকা যে ভয় হয় এক লাথিতেই ভেঙে যাবে। তাছাড়া ডাইনিং রুম আর সিঁড়ির পাশের জানালা দুটোর কাচ বদলে কাঠ লাগিয়ে দেবার কথাও ভাবছি কিছুদিন থেকে। কাচের জানালা বন্ধ করলেও যেন নিরাপদ মনে হয় না। চৈতন্যদের খোঁজ পাচ্ছিলাম না, নিউ মার্কেট থেকে অচেনা কাঠমিস্ত্রি ডেকে কাজ করাননাতেও খুব সায় ছিল না। চৈতন্য নিজে থেকে এসে পড়াতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

চৈতন্য ওর ভাস্তে নিরঞ্জনকে সঙ্গে এনেছে। এর আগে সবসময় চৈতন্যই দরকারমত কাঠ কিনে এনেছে। এবার বলল, আমার দুকানে যাইতে ডর লাগে। কাঠটা যদি সায়েবে কিন্যা আনেন।

চৈতন্যরা যেখানে কাজ করে, সেখানেই থাকে। আগে বাড়ির উত্তরদিকের খালি গ্যারেজটায় থাকত। গেটটা এই গ্যারেজ বরাবর। গলিরাস্তা থেকে দেখা যায়। এবার ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম দক্ষিণদিকের সারভেন্টস কোয়ার্টারের একটা ঘরে। বুড়া মিয়া একটা ঘরে থাকে, পাশের ঘরটা খালি।

চৈতন্যরা সারাদিন কাজ করে, দুপুরবেলা চিনি দিয়ে পাউরুটি খায়, সন্ধ্যায় বাজার করে রান্না করে। এবার চৈতন্য বলল, তাদের বাজারটাও যদি বুড়া মিয়া করে দেয়। তারা বাজারে যেতেও ভয় পায়।

আমি বললাম, ঠিক আছে। তোমাদের নিজেদের রান্না করা লাগবে না। আমাদের সঙ্গেই খাবে তোমরা। কি, আমাদের হাতের রান্না খেলে জাত যাবে না তো আবার?

চৈতন্য লজ্জা পেয়ে হাসল, কি যে বলেন আম্মা। এখন বলে পেরান লয়া টানাটানি–

বাড়ির ভেতরের উঠানে ওরা কাজ করে, দুপুরে-রাতে মাছ-তরকারি-ভাত ওদের ঘরে দিয়ে আসে বুড়া মিয়া। ওরা একদমই বাইরে বেরোয় না।

২৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

নিরঞ্জনের একটা পা খোঁড়া। কিন্তু মুখে কথার খৈ। চৈতন্য কথা বলে কম, হাসে আরো কম, হাঁটে ধীরে। নিরঞ্জন ঠিক উল্টো। খোঁড়া পা নিয়েই তুরতুর করে চলে, অনর্গল কথা বলে, যখন-তখন হাসে।

আমি প্রায় প্রায়ই ওদের কাজ দেখার জন্য মোড়া নিয়ে বসি উঠানের একপাশে, নিরঞ্জন তার কাকার সঙ্গে হাত চালায়, সঙ্গে সঙ্গে তার মুখও চলতে থাকে। গুলশান, বনানী, বাড়ড়া অঞ্চলের সব খবর তার নখদর্পণে।

আজ বলল, দিদিমা, শোনছেন নি, মুনেম খাঁর লাশ নাকি কবর থনে উঠায়া ফেলছে?

আমি চমকে গেলাম! সে কি কথা? শুনি নি তো? কারা করল? কেন? বেশ একটা আত্মবিশ্বাসের ভাব নিয়ে নিরঞ্জন বলল, মুক্তিরা ওঠাইছে। অর মত বেইমানের লাশ নাকি এই দ্যাশে থাকতে দিব না।

চৈতন্য ধমক দিল, কি আজাইরা কথা কস্ নিরঞ্জন! এত কথা কস ক্যান?

আমি বললাম, আহা, বলতে দাও, আমি শুনতে চাই। চৈতন্য, আমার কাছে কোন কথা বলাতে তোমাদের ভয় নেই। আমার ছেলেওতো মুক্তি ছিল। নিরঞ্জন, তুমি মুক্তিদের কথা এত জান কি করে?

নিরঞ্জন উৎসাহ পেয়ে বলল, বারে জানমু না? আমাদের উইদিগে কি কম মুক্তি আছে? হেরা আকন করে, হ্যাগোর হাতে ইশটিনও আমি দেখছি না?

চৈতন্য নিরুপায়ের মত বলল, এই ছ্যারা ডুবাইবো আমারে। এত কথা কয়।

তোমার কোন ভয় নেই চৈতন্য। আমার কাছে বললে কোন ক্ষতি নেই। ওতো বাইরে কোথাও যায় না। হ্যাঁ নিরঞ্জন। তোমাদের গ্রামের মুক্তিদের কথা বল।

আমাগোর গেরামে তো মুক্তি নাই। তবে আশেপাশের গেরামে আছে। আমরা শুনি তাগোর কথা। অনেক পোলা আগরতলা থন টেরনিং লয়া আইছে। আমাগোর উইদিকের এক পোলাই তো মুনেম খারে মারছে। আমি সব জানি।

আমি ভয়ানক কৌতুহলী হয়ে উঠলাম, বল কি? তোমাদের ওদিককার ছেলে? তুমি ঠিক জান যারা মেরেছে, তারা মুক্তিবাহিনীর ছেলে?

হ, তারা আগরতলা থন টেরনিং লয়া আসছে। তাগোর হাতেইশূটিন আছে, তাগো কাছে গিরনেড আছে। একদম আনারসের লাহান দেখতে।

তুমি দেখেছ?

আমি নিজের চখে দেখি নাই। তবে শুনছি।

আচ্ছা নিরঞ্জন, তুমি মেলাঘর বলে কোন জায়গার নাম শুনেছ? ঐ আগরতলার কাছে?

শুনছি মনে লয়। মেলাঘর, আগরতলা, হ,–ঐ পোলারা মেলাঘরের পোলাই বটে।

বল দেখি, কিভাবে মোনেম খুঁকে মেরেছে? কি বৃত্তান্ত শুনেছ?

অগোর মইধ্যে এক পোলা মুনেম খারে মাইরা আসার পর কথাডা চাউর হয়া যায়। গেরামে কোন কথা তো গোপন থাকে না। ঐ পোলা অনেকদিন থেইকাই চেষ্টা করতাছিল–অয় নাকি মেলাঘর থেইকাই মুনেম ধরে মারনের অর্ডার লয়া আইছিল। মুনেম খার বাড়ির গরুর রাখাল অরে সাহায্য করছে। মুনেম খার মেলাই গরু আছিল তো–তার যে রাখাল, হেই রাখাল মুনেম খার উপর সন্তুষ্ট আছিল না। হেরে নাকি বেতন দিত না, বেতন চাইলেই পুলিশের ডর দেখাইত। মুনেম খালোক খুব খারাপ আছিল তো। অই রাখালের লগে কি কইরা যেন ঐ পোলা ভাব কইরা ফালায়। সইন্দা বেলায় রাখাল যখন গরুর পাল লয়া বাড়ির ভিতর ঢুকত, সেই সময় তার লগে ঐ মুক্তিপোলা বাড়ির ভিতর ঢুকে। তাছাড়া তো ঢুকন একদম অসাদ্য। সামনের গেটে বন্দুক হাতে পাহারা, ভিতরে পিস্তল হাতে মুনেম খার বোটিগাড়। ঐ পোলা একদিনে পারে নাই, দুই দিন সন্দায় ঢুকছে কিন্তু সুবিধা করতে পারে নাই, মুনেম খাঁ দুতলায় ছিল, শ্যাষে পিছনের পাচীর টপকায়া পলায় গেছে। তিন দিনের দিন মুনেম খাঁ একতলায় বসার ঘরে বইসা বাইরের লোকের সঙ্গে কথা কইতেছিল, সেই সময় তারে মারছে ইশটিন দিয়া। তারপর পিছনের পাচীর টপকায়া পলাইছে। মুনেম খাঁর সেই রাখালও পলাইছে।

নিরঞ্জনের কথায় আমি চমৎকৃত হলাম, এই সব অল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত গ্রামের কছেলেদের আমরা কতই না অবহেলার চোখে দেখি, অথচ এদের বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতিতু, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, খবর সংগ্রহের তৎপরতায় এরা রয়টারের সংবাদদাতাকেও হার মানায়!

তুমি ওই মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছ? দেখছি, মুনেম খাঁ মরণের পরদিন তো অরে দেখতে আশপাশের গ্রামের অনেকেই যাইতেছিল। আমিও গেছিলাম। দূর থনে দেখছি। অত লোক জানাজানি হইতে অর বাপে কাকায় অরে কই জানি পাঠায়া দিছে।

নাম জান ছেলেটার?

নিরঞ্জন লজ্জিত হাসল, শুনছিলাম তো। ভুইলা গেছি। কেমন জানি খটোমটো নাম, জিব্বার আগায় আইতে চায় না।

আজ শরীফ দুপুরে ফিরল অন্যদিনের চেয়ে অনেক দেরি করে। প্রায় আড়াইটায়। দেখি মুখ লাল, চোখে উত্তেজনা। ঘরে ঢুকেই বলল, জবর খবর! জবর খবর! ডি.আই.টি. বিল্ডিংয়ে বোম ব্লাস্ট করেছে।

তাই নাকি? কখন? এই তো সোয়া একটার সময়। আমাদের অফিসের কাছেই তো। একটুখানি খবরাখবর যোগাড় করে আসতে দেরি হল।

কি সর্বনাশ। ব্লাস্ট শুনেই তো ভেগে চলে আসা উচিত ছিল।

শরীফ হাসতে লাগল, ব্লাস্ট শুনে রাস্তায় নামলে আর দেখতে হত না। মিলিটারিতে কাক করে ধরে নিত। অফিসের ভেতর বসে থাকাই তো নিরাপদ। ফোনে খবরটবর নিলাম। তারপর রাস্তাঘাট একটু ক্লিয়ার দেখে তবে বেরোলাম।

কি রকম ভেঙেছে? কোন কোন তলা?

সাততলায়। টাওয়ারের একদিকে মস্ত একটা গর্ত হয়ে গেছে। আমাদের অফিসের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল–সেই ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। আর ভেতরে আগুন জ্বলছিল।

আমি তাজ্জব। কি সাংঘাতিক কাণ্ড। একতলা নয়, দোতলা নয়, একেবারে সাততলায়? এখন তো শুনেছি, প্রতি তলাতেই সিঁড়ির মুখে আলাদা আলাদা চেকপোস্ট। নিচতলায় বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখে গেটে চেকপোস্ট, বিল্ডিংয়ে উঠতে চেকপোস্ট, তারপরও প্রতি তলায়। এতগুলো চেকপোস্টে এতগুলো মিলিটারির চোখে ধুলো দিয়ে উঠলো কি করে? আর এতবড় বিস্ফোরণ ঘটাবার মত এত বিস্ফোরকই বা ভেতরে নিল কি করে? সত্যি, বিচ্ছুরা দেখাচ্ছে বটে! আমি বললাম, আমারো কিছু জবরখবর আছে।

বলো। তার বদলা আমিও আরো দুটো খবর বলতে পারব।

আমি শরীফকে নিরঞ্জনের খবর বললাম। শরীফ বলল, গতকাল ভোর রাতে মতিঝিল গার্লস হাই স্কুলের হেডমিস্ট্রেসের বাসায় বোমা ছুড়েছে মুক্তিরা। তাতে বিল্ডিংয়ের বেশ ক্ষতি হয়েছে, তিনজন জখমও হয়েছে। আর গতকাল সন্ধ্যা রাতে বিচ্ছুরা খিলগাঁওয়ে একটা জায়গায় রেললাইনের খানিকটা অংশ ধসিয়ে দিয়েছে বোমা মেরে।

খবর শুনে আমি একটু হেসে বললাম, রোজই এই রেটে নতুন নতুন খবর শুনতে পেলে বেশ হয়!

শরীফও হাসল, আশা করি পেতে থাকব।

২৯ অক্টোবর, শুক্রবার ১৯৭১

আজ থেকে ঠিক ষাট দিন আগে, রাত বারোটার সময়, পাক আর্মি আমার রুমীকে ধরে নিয়ে গেছে।

৩০ অক্টোবর, শনিবার ১৯৭১

সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। তারই পরোক্ষ ঝাপটা গতকাল থেকে ঢাকাতেও একটু একটু পাওয়া যাচ্ছে। হিমেল বাতাস দিচ্ছে। সবাই হালকা গরম কাপড় নামিয়ে ফেলেছে।

আজ শরীফের জন্মদিন। গতকাল বায়তুল মোকাররমের ফুটপাতের দোকান থেকে সুন্দর চিকনের কাজ করা সাদা একটা টুপি কিনেছি। আর কিনেছি স্পেশাল একটা তসবি-অন্ধকারে এটা থেকে একটা আলোর আভা দেখা যায়। এ দুটো দিলাম আজ সকালে জন্মদিনের উপহার! বাগানে একটাও ফুল নেই কোন গাছে।

জামী একটু হেসে বলল, তোমার জন্মদিনে বিচ্ছু অ্যাকশানের একটা খবর তোমাকে উপহার দিচ্ছি। তারপর খবর পড়ার ভঙ্গিতে বলল, গতকাল সন্ধ্যায় মর্নিং নিউজ অফিসের গেটে এক মুক্তিযোদ্ধা একটি গ্রেনেড ছুড়েছে। বিস্ফোরণে কেউ হতাহত না হলেও এলাকায় যথেষ্ট ত্রাসের সঞ্চার হয়েছে।

৩১ অক্টোবর, রবিবার ১৯৭১

আজ ফখরুজ্জামান বিলেত রওনা হবে। প্লেন দুপুরের পরে। সকাল নয়টায় আঞ্জকে পরীবাগের শাহ সাহেবের কাছে নিয়ে গেছি ফখরুর জন্য দোয়া চাইতে। তারপর আবার সাড়ে দশটায় ও লালুকে নিয়ে গেছি গুলশানে, ফখরুর সঙ্গে দেখা করবার জন্য। আজুও যাচ্ছে ফখরুর সঙ্গে। ছেলেমেয়েরা দেশেই থাকবে ওর মার কাছে।

দুপুরে শরীফ বাসায় ফিরল মুখ কালো করে, শুনছো, খুব খারাপ খবর। খালেদ মমাশাররফ যুদ্ধে মারা গেছে।

আমার বুক ধড়াস করে উঠল, কি সর্বনাশ! কার কাছে শুনলে?

বাঁকার কাছে। বাঁকা খুব ভেঙে পড়েছে।

আমাদেরও ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। একি নিদারুণ সংবাদ! একি সর্বনাশ হলো! খালেদ মোশাররফ নেই, যুদ্ধে মারা গেছে?

রুমীদের গ্রেপ্তারের ধাক্কা একটু একটু করে কাটিয়ে উঠবার চেষ্টা করছি, ঢাকার বুকে গেরিলাদের বিভিন্ন অ্যাকশান মনের মধ্যে একটু একটু করে আশার সঞ্চার করছে–এর মধ্যে আবার একি বিনামেঘে বজ্রপাত!

আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। দোতলায় গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ভাবতে লাগলাম খালেদেরই কথা।

এই খালেদ–ক্র্যাকডাউনের সময়ই তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে তার পাঞ্জাবি বস তাকে কুমিল্লা থেকে সিলেটে পাঠিয়েছিল, কিন্তু আয়ু ছিল খালেদের, দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধি খাটিয়ে সে নিশ্চিত মৃত্যুর ছোবল এড়ায় সে-যাত্রা। এড়িয়ে, সে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়, পেছনে ঢাকায় পড়ে থাকে তার সুন্দরী তরুণী স্ত্রী, ফুলের মতো ফুটফুটে দুটি মেয়ে। সে জানতও না, ২৫ মার্চের কালরাত্রে পাক বর্বরবাহিনী তার শ্বশুরবাড়ি তছনছ করে দিয়েছিল; শ্বশুর, শাশুড়ি, বড় শালী, ভায়রাভাইকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সে জানত না, তার স্ত্রী ও কন্যারা পাক হানাদারের হাত এড়াতে একেকদিন একেজনের বাড়িতে লুকিয়ে থাকছিল। কিংবা সত্যি কি সে জানত না? সে নিশ্চয় জানত এরকমটাই ঘটবে তার পরিবার-পরিজনদের জীবনে। তা জেনেই সে তাদেরকে পেছনে ফেলে সামনের পথ ধরে চলে গিয়েছিল অনিশ্চয়ের দিকে। সর্বনাশের কিনারায় দাঁড়িয়ে সে পালিয়ে আসা বিদ্রোহী বাঙালি সামরিক বাহিনীর অফিসার জওয়ান আর যুদ্ধকামী শত শত যুবক-কিশোরদের জড়ো করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার দুরূহ কাজে মগ্ন হয়েছিল।

ঢাকা থেকে তার ফ্যামিলির খবর প্রথম সে পায় তার বন্ধুর ছোট ভাই শহীদুল্লাহ খান বাদলের মারফত। বাদল এবং তার তিন বন্ধু আসফাকুস সামাদ (অ্যাসফী), মাসুদ ও বদি ২৭ মার্চেই ঢাকা ছাড়ে, তাদের বিশ্বাস হয় পাক আর্মির এতবড় ক্র্যাকডাউনের পর নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। তারাও যোগ দিতে চায় সেই প্রতিরোধ সংগ্রামে। তারা যুদ্ধের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। তারা তখনও জানত না খালেদ মোশাররফ কোথায় আছে। কিন্তু পথে নানাজনের সঙ্গে দেখা হতে হতে এবং নানা ঘটনা ঘটতে ঘটতে শেষমেষ খালেদ মোশাররফের সঙ্গেই তাদের যোগাযোগ ঘটে যায়।

খালেদ বাদলকে বলে এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হবে। এর জন্য দরকার রেগুলার আর্মির পাশাপাশি গেরিলা বাহিনী। তুমি ঢাকায় ফিরে গিয়ে ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ কর। যারা আসতে চায়, মুক্তিযুদ্ধ করতে চায়, তাদের এখানে পাঠাতে থাক।

খালেদ আরো বলে, যুদ্ধ হবে তিনফ্রন্টে-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সামরিক সামরিক ফ্রন্টের জন্য রয়েছে নিয়মিত সেনাবাহিনী, অন্য দুটি ফ্রন্টের জন্য প্রয়োজন সারাদেশের তরুণ সম্প্রদায়, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, ডাক্তার, সাংবাদিক সকল স্তরের স্বাধীনতাকামী মানুষ। তাদেরকেও এখানে নিয়ে আসতে হবে। এই দিকটা পুরোপুরি সংগঠনের ভার খালেদ মোশাররফ বাদলের ওপরই দেয়। এস.এস.সি ও এইচ.এস.সিতে ফার্স্ট হওয়া অসাধারণ মেধাবী ছেলে বাদল নিজের সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ একপাশে ঠেলে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনিশ্চিত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন কাজে।

খালেদ মোশাররফের পরামর্শ এবং প্রেরণাতেই বাদল বারেবারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা এসেছে। বন্ধু অ্যাসফী সামাদের সহায়তায় সংগঠিত করেছে ঢাকার তরুণদের–যারা যুদ্ধে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে, অথচ পথ পাচ্ছেনা। তাদের কাছ থেকে পথের নির্দেশ নিয়ে একে একে ছোট ছোট দলে ওপারে গেছে কাজী, মায়া, ফতে, পুলু, গাজী, সিরাজ, আনু ও আরো অনেকে। গেছে শাহাদত চৌধুরী, আহরার আহমদ, ক্যাপ্টেন আকবর, ক্যাপ্টেন সালেক, ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের কাদের, এ. আর. খোন্দকার, সুলতান মাহমুদ। গেছে পি.আই.এর পাইলট ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার, ক্যাপ্টেন শাহাব এবং এরকম আরো বহুজন।

এপ্রিলের মাঝামাঝি বাদল খালেদ মোশাররফের স্ত্রী রুবী ও তার মাকে ঢাকা থেকে নিয়ে খালেদের কাছে পৌঁছে দেয় অনেক কষ্ট করে। যাবার সময় পথে ঘোড়াশালে ও ভৈরববাজারে পাক বিমানবাহিনীর বম্বিং ও স্ট্রেফিংয়ের মধ্যে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে উধ্বশ্বাসে দৌড়ে, পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে করতে অবশেষে একদিন রুবী পৌঁছে যায় খালেদের কাছে। কিন্তু মেয়ে দুটি রয়ে যায় ঢাকাতে। রুবীর ভাই দীপুর বন্ধু মাহমুদের বাসায় ছিল মেয়েরা। পাক আর্মি দীপু ও মেয়ে দুটিকে ধরে ফেলে। তারপর সামরিক কর্তৃপক্ষ অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের হেডমিস্ট্রেস মিসেস আনোয়ারা মনসুরের হেফাজতে রেখে দেয় খালেদ মোশাররফের মেয়ে দুটিকে।

মেজর খালেদ মোশাররফের স্ত্রীকে ঢাকা থেকে পার করে দেবার অপরাধে সামরিক সরকার হুলিয়া বের করে বাদলের নামে। তবুও এই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বাদল কিছুদিন পর আবার ঢাকা আসে। এবার তার কাজ খালেদের মেয়ে দুটিকে নিয়ে বাবা-মার কাছে পৌঁছে দেয়া। খুব কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আনোয়ারা মনসুরের বাসা হলো এলিফ্যান্ট রোডের নাশেমন সরকারি ভবনে, তিনতলার ফ্ল্যাটে। সেখান থেকে দুটি বাচ্চা হাইজ্যাক করে আনা বড় সহজ কাজ নয়। বাদলের এ কাজে তার সঙ্গী হলো বদি, কাজী, স্বপন ও চুন্নু। চুলু নিচে গাড়িতে বসে রইল স্টার্ট দিয়ে। বাকি চারজন অস্ত্রসহ তিনতলায় উঠে গেল। কিন্তু দুটি মেয়েকেই নিয়ে আসতে পারল না ওরা। আনোয়ারা মনসুরের সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বাড়ির অন্য কেউ একজনকে টেলিফোনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে স্বপন পিস্তলের একটা ফাঁকা গুলি ছোড়ে দেয়ালে। তারপরই হুলস্থুল লেগে যায়। আনোয়ারা মনসুরের বড় বোন ছুটে আসলে একজন তার পায়ের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি পায়ের চামড়া ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। আনোয়ারা মনসুরের মাথায় স্টেনের বাটের আঘাত লাগে। বড় মেয়ে বেবী বাদলকে চিনত, কিন্তু ছোটটি চিনত না। মিসেস মনসুর ছোট মেয়ে রুপনকে বুকে জাপটে ধরে বসেছিলেন। গুলির পর বাদলরা ওখানে আর বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ মনে করে নি। বাদল বেবীকে তুলে নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে নিচে নেমে আসে। দেখে, গাড়ির কাছাকাছি লোক জমে যাচ্ছে। বদি প্রচণ্ড ধমকে কয়েকজনকে ঘাবড়ে দেয়। ওরা দ্রুত গাড়িতে উঠে উধাও হয়ে যায়। শহরে আর কোথাও দাঁড়ায় নি। গোপীবাগে গিয়ে এক জায়গায় চুলু ওদের নামিয়ে দেয়। বাদল আর কাজী বেবীকে নিয়ে মানিকনগর দিয়ে গিয়ে দাউদকান্দি হয়ে পথে অনেক বিপত্তি পেরিয়ে তারপর খালেদ মোশাররফের ক্যাম্পে পৌঁছায়।

এতসবের মধ্যেও খালেদ মোশাররফ মাথা ঠাণ্ডা রেখে মুক্তিযুদ্ধের কাজ চালিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে দুই নম্বর সেক্টর, মেলাঘর তার হেডকোয়ার্টার্স। নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিরাট গেরিলা বাহিনী। দেশের অন্য সব জায়গা থেকে তো বটেই, বিশেষ করে ঢাকার যত শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান, টগবগে, বেপরোয়া ছেলে, এসে জড়ো হয়েছে এই সেক্টর টুতে। খালেদ মোশাররফ কেবল তাদের সেক্টর কম্যান্ডারই নয়, খালেদ মোশাররফ তাদের হিরো। যতগুলো ছেলে সেক্টরে রাখার অনুমতি ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছেলেকে আশ্রয় দিত খালেদ। নির্দিষ্টসংখ্যক ছেলের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ রেশন দুইগুণ বেশি ছেলেরা ভাগ করে খেত। খালেদ বলত, ঢাকায় গেরিলা তৎপরতা অব্যাহত রাখার জন্য আমার প্রচুর ছেলে দরকার। অথচ আওয়ামী লীগের ক্লিয়ারেন্স, ইউথ ক্যাম্পের সার্টিফিকেট বা ভারত সরকারের অনুমোদন পেরিয়ে যে কয়টা ছেলে আমাকে দেওয়া হয়, তা যথেষ্ট নয়।তাই খালেদ বাদলকে বলত, যত পার, সরাসরি ছেলে রিক্রুট করে সোজা আমার কাছে নিয়ে আসবে। এই যুদ্ধ আমাদের জাতীয় যুদ্ধ। দলমত নির্বিশেষে যারাই দেশের জন্য যুদ্ধ করতে আসবে, তাদের সবাইকে আমি সমানভাবে গ্রহণ করব।

বাদলরা তাই করত। ফলে, খাতায় যত ছেলের নাম থাকত, তার চেয়ে অনেক বেশি ছেলেকে খালেদ ক্যাম্পে রেখে গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে ঢাকা পাঠাবার জন্য তৈরি করত। তিনশো ছেলের রেশন ছয়শো ছেলে ভাগ করে খেত। হাত খরচের টাকাও এভাবে ভাগ হয়ে একেকটি ছেলে পেত মাসে এগারো ইন্ডিয়ান রুপি।

বহু ছেলে যুদ্ধ করার উন্মাদনায় আগরতলা এসেও কোথাও ট্রেনিং নিতে পারছিল, বসে বসে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল। খালেদ মোশাররফ এভাবে ভারত সরকারের নাকের ডগায় লুকিয়ে বেশি বেশি স্বাধীনতাকামী যুদ্ধকামী ছেলেদেরকে তার পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়ে, ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করার পলিসি না নিলে ঢাকার গেরিলা তৎপরতা এত সাফল্য আসত কি না, এরকম অব্যাহত গতি বজায় থাকত কি না, সন্দেহ। ২৯-৩০ আগস্টে এত বেশিসংখ্যক গেরিলা ধরা পড়ার পরও মাত্র দেড় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে। প্রচুর, অজস্র, অসংখ্য গেরিলা ঢাকায় বিভিন্ন দিক দিয়ে শহরে ঢুকছে, অ্যাকশান করছে, পাক আর্মিকে নাস্তানাবুদ করছে, সামরিক সরকারের ভিত্তি নড়িয়ে দিচ্ছে, অবরুদ্ধ দেশবাসীর মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছে–এটাও সম্ভব হচ্ছে খালেদেরই দূরদর্শিতার জন্য। আসলে খালেদ স্বপ্নদ্রষ্টা। খালেদ শক্তিমান, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। বাংলাদেশের জন্য যা ভালো মনে করেছে, তাই কাজে পরিণত করতে দ্বিধাবোধ করে নি। এক্ষেত্রে সে আওয়ামী লীগের বা ভারত সরকারের নির্দেশ বিধিনিষেধের ধার ধারে নি। তার এই সাহস, দুঃসাহস, আত্মবিশ্বাস, ভবিষ্যতের দিকে নির্ভুল নির্ভীক দৃষ্টিপাত করার ক্ষমতা তাকে সেক্টর টুর গেরিলা ছেলেদের কাছে করে তুলেছে অসম্ভব জনপ্রিয়। প্রায় দেবতার মত। খালেদের যে কোন হুকুম চোখ বন্ধ করে তামিল করার জন্য প্রতিটি গেরিলা ছেলে একপায়ে খাড়া। খালেদ মোশাররফ সেক্টর টুর প্রাণ।

সেই খালেদ মোশাররফ যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়েছে। নিঃসন্দেহে তার জন্য গৌরবের মৃত্যু, শহীদের সম্মান পেয়েছে সে। কিন্তু সেক্টর টুর জন্য? মেলাঘরের উদ্দাম, দুঃসাহসী গেরিলা বাহিনীর জন্য? ঢাকায় অবরুদ্ধ আমাদের জন্য? আমাদের জন্য এরচেয়ে বড় সর্বনাশ আর কি হতে পারে?

খালেদের মৃত্যুসংবাদে মনের মধ্যে রুমীর শোক দ্বিগুণ উথলে উঠল। মেলাঘর থেকে ফেরার পরে রুমী কতো যে খালেদের গল্প বলত। খালেদই তো ছেলেদের বলত কোন স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না। চায় রক্তস্নাত শহীদ। তাই কি খালেদ আজ শহীদ? লক্ষ লক্ষ ছেলেকে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে খালেদ কোথায় চলে গেল?

দূরে একটা গ্রেনেড ফাটল। কোন এক রুমী, এক বদি, এক জুয়েল, এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল অপরাহ্নে মৃত্যু-ভয় তুচ্ছ করে কোথাও আঘাত হানল। স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে খালেদ মোশাররফের হাতে গড়া গেরিলারা। ওই ছেলেরা কি জানে, ওদের নেতা আর নেই?

খালেদ নেই, রুমী নেই, বদি নেই, জুয়েল নেই কিন্তু যুদ্ধ আছে–স্বাধীনতার যুদ্ধ।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *