০৭. সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

১ সেপ্টেম্বর, বুধবার ১৯৭১

বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার এক অবিশ্বাস্য, অমানবিক কাহিনী গতকাল শুনলাম শরীফ, জামী ও মাসুমের মুখ থেকে। শরীফ বরাবরই কম কথা বলে, সে তাদের দুদিন-দুরাত বন্দিদশার একটা সংক্ষিপ্তসার দিল নিজের মত করে। খুঁটিয়ে সমস্ত বিবরণ শুনলাম জামী আর মাসুমের মুখ থেকে।

সেদিন রাতে বাড়ির গেট থেকে রুমী-জামীদের হটিয়ে নিয়ে খানসেনারা মেইন রোডে গিয়ে দাঁড়ায়। শরীফরা দেখে রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটা জীপ আর লরিদাঁড়িয়ে আছে। বাড়ি ঘেরাও করে যেসব মিলিটারি পুলিশ ছড়িয়ে ছিল, তারা আমাদের গলি আর কাসেম সাহেবদের গলি থেকে বেরিয়ে মেইন রোডে এসে জমা হয়। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শরীফদের পাচজনকে রাস্তার পাশে লাইন ধরে দাঁড় করায়। তারপর উল্টোদিকের কােলা হোটেল বিল্ডিংয়ের সামনে থেকে একটা জীপ এগিয়ে এসে ওদের সামনে থেমে হেডলাইট জ্বালে। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম জীপের কাছে গিয়ে জীপে বসা কারো সঙ্গে মৃদুস্বরে কি যেন কথা বলে। তারপর শরীকদের সামনে এসে রুমীর বাহু চেপে ধরে বলে, তুমি আমার সঙ্গে এসো। রুমীকে নিয়ে ওই জীপটাতে তোলে। জামী, মাসুম ও হাফিজকে শরীফের গাড়িতে উঠতে বলে তাদের জীপটাকে ফলো করতে বলে। কয়েকজন মিলিটারিও শরীফদের গাড়িতে গাদাগাদি করে ওঠে। রুমী ও ক্যাপ্টেন কাইয়ুমসহ জীপটা প্রথমে, তারপর শরীফদের গাড়ি, তার পেছনে পেছনে বাকি সব জীপ ও লরি। ক্রমে ওরা গিয়ে থামে এম.পি.এ, হোস্টেলের সামনে। ওখানে যাওয়ার পর রুমীদের পাঁচজনকে নামিয়ে আবার লাইন বেধে দাঁড় করানো হয়, আবার তাদের মুখে গাড়ির হেডলাইট ফেলা হয়। বারান্দায় এসে দাঁড়ায় এক আর্মি অফিসার, বলে ওঠে হু ইজ রুমী? রুমীকে সনাক্ত করার পর সবাইকে বারান্দায় উঠিয়ে দাঁড় করায় এক পাশে। মাত্র কয়েক মিনিট ঐ একসঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়ানোর সময় রুমী ফিসফিস করে বলে, তোমরা কেউ কিছু স্বীকার করবে না। তোমরা কেউ কিছু জান না। আমি তোমাদের কিছু বলি নি।

একটু পরেই কয়েকজন সেপাই এসে রুমীকে আলাদা করে ভেতরে নিয়ে যায়। তারপর আরো কয়েকজন সেপাই এসে শরীফদেরকে একটা মাঝারি ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে সোফাসেট ছিল, তবু ওদেরকে মেঝেয় বসতে বলা হয়।

তারপরই শুরু হয়ে যায় নারকীয় কাণ্ডকারখানা। খানিক পরপর কয়েকজন করে খানসেনা আসে, শরীফ, জামী, মাসুম, হাফিজকে প্রশ্ন করে অস্ত্র কোথায় রেখেছ, কোথায় ট্রেনিং নিয়েছ? কয়টা আর্মি মেরেছ?–এই উত্তরগুলো স্বভাবতই না-সূচক হয় আর অমনি শুরু হয় ওদের মার। সে কি মার! বুকে ঘুষি, পেটে লাথি, হঠাৎ করে আচমকা পেছন থেকে ঘাড়ে রদ্দা–সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে গেল, রাইফেলের বাট দিয়ে বুকে-পিঠে গুঁতো, বেত, লাঠি, বেল্ট দিয়ে মুখে, মাথায়, পিঠে, শরীরের সবখানে মার, উপুড় করে শুইয়ে বুটসুদ্ধ পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাড়ানো, বিশেষ করে কনুই, কবজি, হাঁটুর গিটগুলো থেঁতলানো। আশপাশের ঘরগুলোতেও একই ব্যাপার চলছে, বন্দী বাঙালিদের চিৎকার, গোঙানি, খানসেনাদের উল্লাস, ব্যঙ্গ বিদ্রপ কানে আসছে। বন্দীরা যেন ওদের খেলার সামগ্রী, এতগুলো খেলার জিনিস। পেয়ে ওদের মধ্যে মহোৎসব পড়ে গেছে। একদল আসছে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, মারধর করে চলে যাচ্ছে। কয়েক মিনিটের বিরতি। এর মধ্যে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে তার গায়ে। পানি ছিটিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আরেক দল এসে আবার সেই সর্বনেশে খেলা শুরু করছে।

একটা ব্যাপারে খানসেনারা বেশ হুঁশিয়ার। ওরা কেউ এমনভাবে মারে না যাতে বন্দী হঠাৎ মরে যায়। এমনভাবে মারে যাতে বন্দী অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে। নাকমুখ। দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোয়, হাত-পা, আঙুলের হাড় ভাঙে অথচ মরে না। অজ্ঞান হলে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনে, একটু বিশ্রাম করতে দেয় যাতে খানিক পরে আবার নতুন করে মার সহ্য করার মতো চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

এরি মাঝে একজন করে ডেকে নিয়ে যায় অন্য একটা ঘরে–সেখানে এক কর্নেল বসে আছে–কর্নেল হেজাজী। সে এদেরকে এক এক করে নানা কথা জিগ্যেস করে। শরীফকে নিয়ে যাবার পর প্রথমে তাকে চেয়ারে বসতে বলে, জিগ্যেস করে শরীফ কি করে, কয়টা ছেলেমেয়ে, বাড়িতে কে কে আছে, রুমীর বয়স কত, কি পড়ে–এসব। শরীফ সব কথার উত্তর দেয়, হাফিজ সম্বন্ধে বলে, সে আজকেই মাত্র চাটগাঁ থেকে ঢাকা এসেছে, সে বেচারী ঢাকার কোনো হালহকিকতই জানে না। তাছাড়া ওর চাচা ঢাকার ডি.সি.।

তারপর কর্নেল হেজাজী জিগ্যেস করে রুমী কবে মুক্তিযুদ্ধে গেছে, কোথায় ট্রেনিং নিয়েছে। শরীফ বলে সে এ সম্বন্ধে কিছু জানে না। এতক্ষণ বেশ দ্রভাবেই কথাবার্তা চলছিল, এবার হেজাজী একটু গরম হয়ে বলে, তুমি জান না তোমার ছেলে কি ধরনের বাজে ছেলেদের সঙ্গে মেশে, বাজে কাজ করে? শরীফ বলে আমার ছেলে বড় হয়েছে, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, সে কাদের সঙ্গে মেশে, কি করে–তার খবর রাখা আমার পক্ষে কি সম্ভব? হেজাজী বিদ্রুপ করে বলে, তাহলে তো দেখছি তুমি একজন আনফিট ফাদার। ছেলেকে সৎ পথে গাইড করার কর্তব্য করতে পার নি। শরীফ রেগে গিয়ে বলে, তুমিই কি ঠিক করে বলতে পার তোমার ছেলে কাদের সঙ্গে মেশে, কোথায়। কোথায় ঘোরে?

শরীফকে ফেরত আনার পর হাফিজকে নিয়ে যায়। অফিজের পাঞ্জাবির পকেটে ওর চাটগাঁ থেকে ঢাকা আসার প্লেন-টিকিটের মুড়িটা রয়ে গেছিল; ও সেইটা দেখিয়ে প্রমাণ করতে পারে যে সে সত্যিই ঐ দিনই ঢাকা এসেছে। তারপর একে একে জামী, মাসুম। এরা একেকজন করে যাচ্ছে। বাকিরা মার খাচ্ছে। যারা যাচ্ছে, তারা ফিরে এসে আবার মার খাচ্ছে। এমনি করে করে ভোর হল।

এরপর কয়েকজন সেপাই শরীফদেরকে নিয়ে যায় আরেকটা ঘরে, সেখানে শরীফদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক বিরাট চমক! ছোট্ট একটা ঘর, ছয় ফুট বাই আট ফুট হবে। ঢুকে দেখে চারপাশের দেয়াল ঘেষে, সারা মেঝে জুড়ে এক দঙ্গল লোক বসে আছে–তার মধ্যে বদি আর চুলুকে দেখে শরীফরা চমকে যায়। শরীফরা বাকিদের

চিনলেও খানিকক্ষণের মধ্যে সবার পরিচয় পেয়ে যায়। খানসেনারা একটু পরে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে শেকল তুলে দেয়। অমনি সবাই ফিসফিস করে পরস্পরের সঙ্গে পরিচয় বিনিময় করতে শুরু করে। আলতাফ মাহমুদ, তার চার শালা নুহেল, খনু, দীনু ও লীনু বিল্লাহ, আর্টিস্ট আলভী, শরীফের ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু মান্নানের দুই শালা রসুল ও নাসের, আজাদ, জুয়েল, ঢাকা টি.ভির মিউজিশিয়ান হাফিজ, মর্নিং নিউজের রিপোর্টার বাশার, নিয়ন সাইনের মালিক সামাদ এবং আরো অনেকে। আলতাফ মাহমুদের গেঞ্জি বুকের কাছে রক্তে ভেজা, তার নাকমুখে তখনো রক্ত লেগে রয়েছে, চোখ, ঠোট সব ফুলে গেছে, বাশারের বাঁ হাতের কবজি ও কনুইয়ের মাঝামাঝি দুটো হাড়ই ভেঙেছে। ভেঙে নড়বড় করছে, একটা রুমাল দিয়ে কোনমতে পেঁচিয়ে রেখেছে, সেই অবস্থাতে হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। হাফিজের নাকে মুখে রক্ত, মারের চোটে একটা চোখ গলে বেরিয়ে এসে গালের ওপর ঝুলছে। জুয়েলের এক মাস আগের জখম হওয়া আঙুল দুটো মিলিটারিরা ধরে পাটকাঠির মত মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে।

একটু পরেই দরজা খোলার শব্দ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে সবাই চুপ করে যায় কারণ কথা বলা নিষেধ। কথা বলতে শুনলেই খানসেনারা মারবে। দরজা খুলে খানসেনারা রুমী এবং আরো কয়েকটা ছেলেকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। একজন কেউ বলে। সেপাইজী, বহোত পিয়াস লাগা। যারা পানি পিলাইয়ে। সেপাইরা জবাবে হাতের বেল্ট ও তারের পাকানো দড়ি দিয়ে খানিক এলোপাতাড়ি মেরে আবার বেরিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। একজন ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠে, জল্লাদ। জল্লাদ। পানি পর্যন্ত দেবে না? পানি চাইলে আরো মার?

খানিক পরে দেয়াল ঘেঁষে বসা একজন নড়েচড়ে বসতেই সামনে থেকে আরেকজন বলে ওঠে, আরে! ওই তো একটা পানির কলা দেখা যাচ্ছে। সবাই চমকে দেখে দেয়ালের গায়ে একটা পানির ট্যাপ। এত লোক ঘেঁষাঘেঁষি গাদাগাদি করে বসার দরুন ট্যাপটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তখন সবাই ট্যাপের কাছে গিয়ে হাত পেতে পানি খায়। বাশারকে অন্য একটি ছেলে হাতের তালুতে পানি নিয়ে খাওয়ায়।

আবার ফিসফিস্ করে কথাবার্তা শুরু হয়। জানা যায় কারা কখন কিভাবে ধরা পড়েছে। বদি ধরা পড়ে ২৯ আগস্ট দুপুর বারোটার সময়। ঐদিন সকালে সে রুমীদের সঙ্গে ২৮ নম্বর রোডের বাড়িতে মিটিং করে। তারপর রুমী যায় চুলুর বাসায় গান শুনতে। বদি যায় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফরিদের বাসায় গল্প করতে। সেই বাসা থেকে মিলিটারি তাকে ধরে। সামাদকে ধরে বিকেল চারটেয়। আজাদের বাসায় মিলিটারি যায় রাত বারোটায়। ও বাসায় সেদিন ছিল জুয়েল, কাজী, বাশার, আজাদের খালাতো ভাই, দুলাভাই, আরো কয়েকজন। জুয়েল, বাশার, আজাদসহ খালাতো বোনের স্বামী এবং অন্য দুজন অতিথিকেও মিলিটারিরা ধরে এনেছে, কেবল কাজী হঠাৎ আচমকা ক্যাপ্টেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাতের স্টেন ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করে। ব্যাপারটা এতই আকস্মিক আর অচিন্তনীয় ছিল যে, মিলিটারিরা হকচকিয়ে ঘরের মধ্যেই এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। সেই ফাঁকে কাজী পালিয়ে যায়।

আজাদদের বড় মগবাজারের বাসা থেকে আলমদের বাসা কাছেই। দিলু রোডে আলমদের বাসা, আর্মি যায় রাত দুটোর দিকে। ও বাসা থেকে ধরেছে আলমের ফুপা আবদুর রাজ্জাক আর তার ছেলে মিজানুর রহমানকে। রাত দেড়টার সময় ও বাসায় কাজী যায় একেবারে দিগম্বর অবস্থায়। বলে, একটু আগে আজাদদের বাড়িতে আর্মি গিয়ে রেইড করেছে। আমি ওরি মধ্যে ধস্তাধস্তি করে কোনমতে পালিয়ে এসেছি। আমাকে একটা লুঙ্গি দিন, আর একটা স্টেন দিন। আর্মি নিশ্চয় একটু পরে এ বাড়িতেও আসবে। আমি ওদের ঠেকাব। আলমের মা তাকে লুঙ্গি দিয়ে বলেন, বাবা, তুমি এক্ষুণি এখান থেকে চলে যাও। আমাদের ব্যবস্থা আমরা দেখব।কাজী বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আলমের মা এবং চার বোন আলমের বাবাকে পেছনদিকের নিচু বাউন্ডারি ওয়ালের ওপর দিয়ে ওপাশে পার করে দেয়। এবং তার পরপরই আর্মি এসে বাসা ঘেরাও করে ফেলে। আলমদের রান্নাঘরের মেঝের নিচে পাকা হাউজের মতো বানিয়ে সেখানে অস্ত্র লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা ছিল। আর্মি এসে প্রথমেই জিগ্যেস করে রান্নাঘর কোনদিকে? তখন বাড়ির সবাই বুঝে যায় যে ওরা আর্মস অ্যামুনিশান ডাম্পয়ের কথা আগেই জেনে গেছে। খানসেনারা রান্নাঘরে গিয়ে রান্নাঘরের মেঝে থেকে লাকড়ি সরিয়ে শাবল দিয়ে ভেঙে কংক্রিটের স্ল্যাব তুলে সব অস্ত্র, গোলাবারুদ তুলে নিয়ে গেছে। বাড়িতে যেহেতু পুরুষ মানুষ ছিল আলমের ফুপা আর ফুপাত ভাই, আর্মি ওই দুজনকেই ধরে নিয়ে এসেছে। বেচারীরা কয়েকদিন আগেই খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছে। কিছু না জেনে এবং কিছু না করেই ওরা বাপ বেটা মার খেয়ে মরছে। ওরা বুঝেও পাচ্ছে না কেন ওদের এরকম এলোপাতাড়ি মারধর করছে।

হাটখোলায় শাহাদতদের বাসায় রাত তিনটের দিকে মিলিটারি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কাউকে না পেয়ে শাহাদতের সেজো দুলাইভাই বেলায়েত চৌধুরীকেই ধরে এনেছে। সে বেচারা পি.আই.এ.তে চাকরি করে, দুমাসের ছুটিতে করাচি থেকে দেশে বেড়াতে এসে আর ফিরে যায় নি। গ্রামের বাড়িতেই ছিল, কপালে দুর্দৈব–মাত্র দশ-বারোদিন আগে ঢাকায় এসেছিল। বেচারা সাতেও ছিল না, পাঁচে ছিল না, মুক্তিযোদ্ধা শ্যালকদের বদৌলতে এখন খানসেনার হাতে পিটুনি খাচ্ছে।

চুলুদের বাড়িতে মিলিটারি যায় রাত বারোটা-সাড়ে বারোটার সময়। চুল্লুর ভাই এম, সাদেক সি.এস.পি, এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তার সরকারি বাসভবন এলিফ্যান্ট রোডের এক নম্বর টেনামেন্ট হাউস থেকে চুল্লকে ধরেছে।

স্বপনদের বাসায় আর্মি যায় রাত দেড়টা-দুটোর দিকে। এলিফ্যান্ট রোড থেকে চুলুকে চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে সেই জীপ স্বপনদের বাড়িতে যায়। চোখ বাধা বলে চুলু প্রথমে বুঝতে পারে না কোথায় এসেছে, কিন্তু কানে আসে এক খানসেনার কথা স্বপন ভাগ গিয়া। স্বপনের বাবার গলা শুনতে পায় চুলু। মেয়েদের কান্না শোনে। অনুমান করে স্বপনের বোন মহুয়া, কেয়া, সঙ্গীতার কান্না। স্বপনের বাবা শামসুল হক সাহেবকেও ধরে এনেছে খানসেনারা।

আলতাফ মাহমুদের বাসায় আর্মি যায় ভোর পাঁচটার দিকে। ওদের বাসাটা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টোদিকে আউটার সার্কুলার রোডে। শরীফের বন্ধু মান্নানের পাশের বাসাটা ভাড়া নিয়ে থাকতো ওরা। ওটা মান্নানের বড় ভাই বাকি সাহেবের বাড়ি। কয়েকদিন আগে নিয়ন সাইনের সামাদ গুলি ও বিস্ফোরক ভর্তি একটা বিরাট ট্রাঙ্ক আলতাফ মাহমুদের কাছে রাখতে আনে। মান্নানদের বাড়ির পেছনের উঠানে ওটা পুঁতে রাখা হয়। আর্মি এসেই প্রথমে আলতাফ মাহমুদের বুকে রাইফেলের বাট দিয়ে ভীষণ জোরে মারে, সঙ্গে সঙ্গে তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসে। তারপর তাকে আর সামাদকে নিয়ে উঠান খুঁড়িয়ে সেই ট্রাঙ্ক তোলায়। আর্মি সামাদকে সঙ্গে নিয়েই ওদের বাড়িতে গিয়েছিল। তারপর আলতাফের শালাদের দিয়ে সেই ট্রাঙ্ক গাড়িতে তোলায়। আলভী ওই সময় ওদের বাড়িতে ছিল। খানসেনারা আলভী কৌন হ্যায় বলে খোঁজ করছিল। কিন্তু আলভীর কপাল জোর, ঐ সময়ের মধ্যেই আলতাফ একফাঁকে আলভীকে বলে তোমার নাম আবুল বারাক। তুমি আমার ভাগনে। দেশের বাড়ি থেকে এসেছ। তাই আবুল বারাক নাম বলে আলভী বেঁচে যায়। অবশ্য দলের অন্যান্যের সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে যায় খানসেনারা।

মান্নানের দুই শালা রসুল ও নাসের তাদের মার সঙ্গে বোনের বাড়ির দোতলাটা ভাড়া নিয়ে থাকত। যেহেতু দুটো বাড়িই গায়ে গায়ে লাগানো, ট্রাঙ্কটাও বেরিয়েছে মান্নানদের পেছনের উঠান থেকে, অতএব রসুল, নাসেরকেও ধরে নিয়ে যায় খানসেনারা। ভাগ্য ভালো, মান্নান এ সময় চাটগাঁয়ে, তাই সে বেঁচে গেছে। আলতাফদের দোতলায় ভাড়া থাকেন এক ইনকাম ট্যাক্স অফিসার, তাঁকে, তাঁর ছেলেকে, তার এক ভাগ্নেকেও ধরে নিয়ে গেছে খানসেনারা।

রুমীকে ওই ছোট ঘরটায় আনার পর রুমী শরীফকে বলে, আব্ব এরা আমাকে ধরবার আগেই জেনে গেছে ২৫ তারিখে আমরা ১৮ আর ৫ নম্বর রোডে কি অ্যাকশান করেছি, কে কে গাড়িতে ছিলাম, কে কখন কোথায় গুলি চালিয়েছি, কতজন মেরেছি, সব, স-ব আগে থেকেই জেনে গেছে। সুতরাং আমার স্বীকার করা না করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তোমরা চারজনে কিছুতেই কিছু স্বীকার করবে না। তোমরা কিছু জান না, এই কথাটাই সব সময় বলবে। তোমাদের প্রত্যেককে হয়ত আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তোমরা কিন্তু সবাই সব সময় এক কথাই বলবে। আমি কি করে বেড়াই, তোমরা কোনদিন কিছু টের পাও নি। দেখো, একটুও যেন হেরফের না হয়।

আলতাফ মাহমুদও তার চার শালাকে, আলভীকে, রসুল, নাসেরকে একই কথা বলে, তোমরা সবাই একই কথা বলবে, তোমরা কেউ কিছু জান না। যা কিছু করেছি, সব আমি। যা স্বীকার করার আমি করব।

এমনিভাবে সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। একবার করে খানসেনারা ঘরে ঢোকে এলোপাতাড়ি খানিক পেটায়, গালিগালাজ করে, আবার বেরিয়ে যায়। তখন এরা। ফিসফিস করে কথা বলে। খানিকক্ষণ পর কয়েকজন খানসেনা রুমী, বদি আর চুলুকে বের করে নিয়ে যায়। পরে এক সময় আলতাফ মাহমুদ আর তার সঙ্গের সবাইকে নিয়ে যায়। আরেক সময় শরীফ-জামীদের নিয়ে যায়। এরই মধ্যে সকাল নটার দিকে হাফিজকে ছেড়ে দেয়া হয়, তাও ওরা জানে না। স্থান-কালের কোনো হুঁশ কারো ছিল না। কাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কখন নিয়ে যাচ্ছে সে সম্বন্ধে কেউ কিছু এখন আর সঠিক করে বলতে পারছে না। ওদের শুধু তীক্ষভাবে মনে গেথে আছে খানিক পরপর ওদের ওপর কি রকম টর্চার করা হয়েছে। ওরা দেখেছে স্বপনের বাবা শামসুল হককে দুই হাত বেঁধে ফ্যানের হুকে ঝুলিয়ে তারপর মোটা লাঠি দিয়ে, পাকানো তারের দড়ি দিয়ে পিটিয়েছে। অজ্ঞান হয়ে গেলে নামিয়ে মেঝেতে শুইয়ে পানির ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়েছে। তার ওপর খানসেনাদের বেশি রাগ–তার এক ছেলে স্বপন ওদের হাতের মুঠো ফসকে পালিয়ে গেছে। আরেক ছেলে ডালিম আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে।

মেলাঘরের আরেক গেরিলা উলফাতের খোঁজে তাদের বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে ধরে এনেছে তার বাবা আজিজুস সামাদকেও। একে আমি নামে চিনি। এর স্ত্রী সাদেকা সামাদ আনন্দময়ী গার্লস স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। সাদেকা আপার সঙ্গে অনেক আগে থেকেই আমার পরিচয়। ঢাকার কয়েকটা দুঃসাহসিক অ্যাকশানে উলফাতের অবদান আছে। ছেলেকে পায় নি, বাপকে ধরে এনে অমানুষিক নির্যাতন করছে।

এইদিন সন্ধ্যার পর আমি ফোনে সুবেদার গুল আর জামীর সঙ্গে কথা বলি। জামী। এখন বলল, মা, তোমার ফোন পাবার পর গুল আমাদেরই কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিছু রুটি কাবাব কিনে এনে আমাদের খেতে দেয়।

রাত এগারোটার দিকে এদের সবাইকে অর্থাৎ ২৯ মধ্যরাত থেকে ৩০ সকাল পর্যন্ত যতজনকে ধরেছিল, তাদের সবাইকে–কেবল রুমী বাদে–জীপে উঠিয়ে রমনা থানায় নিয়ে যায়। সেখানে সবার নাম এনট্রি করিয়ে একটা ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। এরা যখন রমনা থানায় আসে, তখন চারদিকটা একদম চুপচাপ ছিল। ঘরে ঢোকানোর পর দেখে মেঝেয় অনেক বন্দী শুয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। এদের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা তালাবদ্ধ করে খানসেনারা যখন জীপে করে চলে গেল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সূচনা হয়। মেঝেয় মরার মতো ঘুমোনো লোকগুলো হঠাৎ সবাই একসঙ্গে উঠে বসে, হৈহৈ করে নতুন বন্দীদের নাম, কুশল জিজ্ঞাসা করে সেবা-যত্ন করা শুরু করে দেয়। কার কোথায় ভেঙেছে, কোথায় রক্ত পড়ছে, কোথায় ব্যথা–খোঁজ নিয়ে কাউকে ব্যান্ডেজ করে, কাউকে ম্যাসাজ করে, কাউকে নোভালজিন খাওয়ায়। প্রথম চোটে সবাইকে পানি খাওয়ায়। যারা সিগারেট খায় তাদের সিগারেট দেয়। তারপর কিছু ভাত-তরকারি আসে,দুচামচ করে ভাত আর একটুখানি নিরামিষ তরকারি। যারা পান খায়, তাদের জন্য পানও যোগাড় হয়ে যায়। এই বন্দীগুলোও দেশপ্রেমিক বাঙালি, এরাও কিছুদিন আগে মিলিটারির হাতে ধরা পড়েছে। এদেরও এম.পি.এ. হোস্টেল পর্ব শেষ করে আসতে হয়েছে। এরা নবাগত বন্দীদের বলে, কাল ভোরে আবার আপনাদের এম.পি.এ, হোস্টেলে নিয়ে যাবে। আরো টর্চার করবে। একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দিই। প্রথমে দুএক ঘা মারার পরেই অজ্ঞান হয়ে যাবার ভান করবেন, চোখ মটকে নিশ্বাস বন্ধ করে থাকবেন। তখন ওরা পানি ঢেলে খানিকক্ষণ ফেলে রেখে যাবে। এতে পিটুনিটা কম খাবেন।

পরদিন সকালে আবার গাড়ির শব্দ পাওয়া যায় সাতটায়। এবার একটা বিরাট বাস। সবাইকে উঠিয়ে বাসের সবগুলো জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়। আবার এম.পি.এ. হোস্টেল। হোস্টেলে খানিকক্ষণ রাখার পর এদেরকে পেছনের আরেকটা বাড়িতে নিয়ে যায়। গেট দিয়ে বেরিয়ে গলি রাস্তা দিয়ে খানিক গিয়ে এম.পি.এ. হোস্টেলের পেছনের দিকে এই বাড়িটা। শোনা গেল এখানে সবাইকে স্টেটমেন্ট দিতে হবে। এ বাড়িতে যাওয়ার পর আরেক নারকীয় ঘটনার অবতারণা হয়।

স্টেটমেন্ট দেওয়া মানে এক এক করে একজন আর্মি অফিসার বন্দীর বক্তব্য শুনবে, তাকে প্রশ্ন করবে, তার জবাব শুনবে এবং সেগুলো কাগজে লিখে নেবে। এই স্টেটমেন্ট দেওয়া ও নেয়ার সময় বন্দীদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করা হয়, তা গত দুদিনের নির্যাতনকে ছাড়িয়ে যায়। অফিসার বন্দীকে প্রশ্ন করে, উত্তর যদি হয় না সূচক, অমনি শুরু হয় তার ওপর দমাদম লাঠির বাড়ি, লাথি, রাইফেলের বাটের গুঁতো। পরপর ক্রমাগত না-সূচক উত্তর হতে থাকলে স্টেটমেন্ট গ্রহণকারী অফিসারের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, সে খানিকক্ষণের জন্য বিরতি দেয়, তখন খানসেনারা ঐ বন্দীকে সিলিংয়ের হুকে ঝুলিয়ে পাকানো দড়ি দিয়ে সপাসপ পেটায়। কাউকে উপুড় করে শুইয়ে দুই হাত পেছনে টেনে পা উল্টোদিকে মুড়ে তার সঙ্গে বেঁধে দেয়–দেহটা হয়ে যায় নৌকার মত। লোকটার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, চিৎকারও দিতে পারে না। বেশি। ত্যাড়া কোন বন্দীর পা দুটো সিলিংয়ের ফ্যানে ঝুলিয়ে জোরে পাখা ছেড়ে দেয়। নিচের দিকে মাথা ঝোলানো লোকটা ফ্যানের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে নাকে-মুখে-চোখে রক্ত তুলে অজ্ঞান হয়ে যায়।

এই রকম নারকীয় কাণ্ডকারখানার ভেতর দিয়ে স্টেটমেন্ট নিতে নিতে বারোটা একটা বেজে যায়। দেড়টার দিকে শরীফদের তিনজনকে আবার এম.পি.এ. হোস্টেলে কর্নেলের রুমে আনা হয়। কর্নেল বলে তোমরা এখন বাড়ি যেতে পার। শরীফ জিগ্যেস করে রুমীর কথা। কর্নেল বলে রুমীকে একদিন পরে ছাড়া হবে। ওর স্টেটমেন্ট নেয়া এখনো শেষ হয় নি।

২ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

শরীফকে কর্নেল বলেছিল রুমী একদিন পরে ফিরবে। কথাটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আমি কি বিশ্বাস করেছিলাম? শরীফের ফিরে আসার খবর পেয়ে পরশু বিকেল থেকে বাসায় আত্মীয়বন্ধুর ঢল নেমেছে। সবাই রুমীর জন্য হায় হায় করছে। হায় হায় করছে কেন? তবে কি রুমীর ছাড়া পাবার কোনো আশা নেই? গতকাল এগারোটায় আমি মঞ্জুরের সঙ্গে আবার এম.পি.এ. হোস্টেলে গিয়েছিলাম। রুমীর কিছু কাপড়-চোপড়ের একটা প্যাকেট করে সেটা তাকে দেবার এবং তার সঙ্গে দেখা করার প্রার্থনা জানিয়ে একটা দরখাস্ত লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যাওয়াই সার। কোনখানে কোন সুরাহা করতে পারলাম না। কেউ রুমীর সম্বন্ধে কোন হদিসই দিতে পারল না। কর্নেল হেজাজীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। তিনি নাকি নেই। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম, সুবেদার গুল তারাও যেন বাতাসে হাওয়া হয়ে গেছে। এম.পি.এ. হোস্টেলটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে না যে এরই অভ্যন্তরে দিবারাত্রি ঐসব নারকীয় অত্যাচার হয়ে চলেছে। এখানে কি সাউন্ড প্রুফ ঘর আছে? নইলে ৩১ তারিখে যখন এগারোটা থেকে একটা পর্যন্ত এখানে দুটো বাড়িতে যাওয়া আসা করেছি, কোথাও কোন চিকার, গোঙানি শুনি নি কেন? অথচ শরীফ, জামী, মাসুমের কাছে যা শুনেছি, তাতে তো ঐ সময়টাতে পেছনের দোতলা বাড়িটার ভেতরে বন্দীদের স্টেটমেন্ট নেয়া চলছিল। নিশ্চয় সাউন্ড প্রুফ ঘর আছে, নইলে একটুও চিৎকার শুনি নি কেন?

বাড়ি ফিরে এসে এই কথাটাই জামী আর মাসুমকে জিগ্যেস করলাম। জামী বলল, সাউন্ড প্রুফ ঘর নেই। তবে এম.পি.এ. হোস্টেলে আর পরের বাড়িটায় পেছন দিক দিয়ে অনেক ঘর আছে। নির্যাতন ঐ পেছনে হয়। সামনের দিকে কিছু অফিসরুম সাজানো আছে। রাতের গভীরে অবশ্য এই অফিসরুমগুলোতেও মারধর করার কাজ চালানো হয়।

বিকেলে মান্নান আর নূরজাহান এসেছে। মান্নান চাটগাঁ থেকে ফিরেছে কাল। নূরজাহানের দুভাই রসুল ও নাসের মঙ্গলবারেই ছাড়া পেয়েছে। ভীষণ মারের চোটে ওদের অবস্থা কাহিল। রসুলের বাঁ হাতের তর্জনী ভেঙে গেছে, পিঠে কোমরে ব্যথা। নাসেরেরও তাই।

আলতাফ মাহমুদের চার শালা আর ভাগনে আবুল বারাক গতকাল ছাড়া পেয়েছে। ওদের অবস্থাও খুব খারাপ। সবাইকেই যথেষ্ট রকম পিটিয়েছে, ওর মধ্যে বড় ভাই নুহেলের ঘাড়ে, পিঠে, কোমরে বেশি চোট লেগেছে, মেজ দীনুর দুই হাত পায়ের আঙুলের গিঁট, হাতের কবজি ভেঙেছে, প্রচণ্ড চড়েবাঁ কানের পর্দা ফেটে গেছে। আলভীর বেঁচে যাওয়াটা প্রায় অলৌকিক মনে হয়। বাসায় আলতাফ একবার তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল সে আলভী নয়, আবুল বারাক, আলতাফের বোনের ছেলে। এম.পি.এ. হোস্টেলের সেই ছোট্ট ঘরটাতে খানসেনারা আবার জিগ্যেস করছিল, আলভী কৌন হ্যায়। আলভী একবার বেখেয়ালে প্রায় হাম হ্যায় বলে দাঁড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস পাশেই লীনু তার জামার পেছন চেপে ধরে থামিয়ে দিতে পেরেছিল। খানসেনারা চলে যাবার পর লীনুদীনুরা আলভীকেমুখস্থকরিয়েছিল আমার নাম আবুল বারাক। বাবার নাম অমুক, মার নাম অমুকঅর্থাৎ আলতাফের বোন আর দুলাভাইয়ের নাম।

ওরা পাঁচজন বেঁচে ফিরেছে, আলতাফ মাহমুদ ফেরে নি।

নূরজাহান, মান্নান থাকতে থাকতেই দাদাভাই, মোর্তুজা ভাই এলেন। শরীফের ফেরার খবর পেয়ে এরা রোজ দুবেলা করে আসছেন। রুমীর জন্য আফসোসের শেষ নেই। মোর্তুজা ভাই বারবার দুঃখ ভারাক্রান্ত স্বরে বললেন, রুমীই ২৫ তারিখের অ্যাকশান করেছিল? যদি একটু জানতাম ভাবী! রুমীকে কিছুতেই ঢাকায় রাখতে দিতাম না। আপনারা তো আমাদের একদম জানতে দেন নি। আমরা যখনই ১৮ নম্বর, ৫নম্বর রোডের অ্যাকশানের কথা বলেছি, আপনারা শুধু চুপ করে শুনেছেন। এমন ভান করেছেন যেন কিছু জানেন না, আমাদের মুখ থেকেই প্রথম শুনছেন। দাদাভাই একরকম তিরস্কার করেই বললেন, রুমী মুক্তিযুদ্ধে জয়েন করেছিল, আমাদের একটু বললে কি হত? আর না হয় নাই বলতেন, রাতের বেলা তো আমাদের বাড়িতে শুতে পাঠাতে পারতেন।

কি জবাব দেব এ কথার? দাদাভাই, মোর্তুজা ভাই নিজের নিজের বাড়ির ছেলেদের সামলে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন, দেখতাম। তার ওপর রুমিকে ওদের ঘাড়ে চাপাবার কথা চিন্তাই করতে পারতাম না।

বাঁকা ফিরেছে চাটগাঁ থেকে। বাঁকা, মঞ্জুর, মিকি, মোর্তুজা, দাদাভাই, ফকির, মিনিভাই–সবাই মিলে নানারকম চিন্তাভাবনা করছেন রুমীকে ছাড়ানোর ব্যাপারে কি উপায় করা যেতে পারে। সবারই কোন না কোন সামরিক অফিসারের সঙ্গে পরিচয়। বা খাতির আছে। সবাই নিজের নিজের মতো করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টায় আছেন।

লালু আর মা ৩০ তারিখে এ বাসায় এসেছিলেন, আর যেতে দিই নি। এখানেই রয়ে গেছেন। মাও তার নিজের মতো করে জায়নামাজের পাটিতে বসে আল্লাহর কাছে দেন। দরবার করছেন রুমীর জন্য।

এইসব ডামাডোলের মধ্যে জামীর জন্মদিন কখন এসে চলে গেছে, কারো খেয়ালই নেই। জামীর নিজেরই হয়তো খেয়াল নেই। আমার হঠাৎ মনে পড়ল সন্ধ্যার মুখে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এসেছিলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একসময় উঠলেন। উনি এমনিতেই কথা খুব কম বলেন। আর এখন তো বলার কিছুই নেই। ওকে বিদায় দিতে বাইরের গেট পর্যন্ত গেলাম! বাগানে চার পাঁচটা গোলাপ গাছে ফুল। ফুটে রয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে বোরহান বললেন, ভারি চমক্কার ফুল তো। বাগান একেবারে আলো করে ফুটে রয়েছে।

আমি বললাম, ফুলগুলোর এতটুকু লজ্জা বা হৃদয় বলে কিছুই নেই। সারাবছর এত খাটি, এত যত্ন করি ওদের জন্য। অথচ আমার এত বড় সর্বনাশেও ওদের কিছু যায় আসে না। কেমন নির্লজ্জের মতো ফুটে রয়েছে।

কেমন এক আক্রোশভরা চোখে চেয়ে রইলাম বনি প্রিন্স, এনা হার্কনেস, সিমোন আর পিসয়ের উজ্জ্বল, সুখী চেহারাগুলোর দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মনে পড়ল রুমী বনি প্রিন্সের একটা আধ-ফোটা কলি উপহার দিয়েছিল আমার জন্মদিনে। আহা,

আমার বনি প্রিন্স আজ কোথায়? কোন জালেমের হাতে শুকিয়ে ঝরছে?

এই ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে গেল আজ জামীর জন্মদিন। আমার আরেকটা বনি প্রিন্স তো রয়েছে। রুমীর শোকে জামীকে ভুলতে বসেছি!

আমি বনি প্রিন্সের ফুলটা ছিঁড়ে নিয়ে জামীর খোঁজে বাড়ির ভেতর গেলাম। একতলায় নেই, দোতলায় নেই। ছাদে গিয়ে দেখি জামী খোলা ছাদের মেঝেতে বসে মাথা নিচু করে সেতার বাজাচ্ছে। কাছে গিয়ে দাড়ালাম। জামী টের পেল না। একটু নিচু হয়ে দেখলাম ও চোখ বুজে বাজাচ্ছে, চোখের পাতা ভেজা। বুকে ধাক্কা লাগল, জামী প্র্যাকটিস করার সময় রুমী তবলা বাজাত। সেই কথা মনে হয়ে কি জামীর চোখে পানি? নাকি ওর জন্মদিনে ওর ভাইয়ার কথা মনে করে চোখে পানি? বাড়ির সবাই ওর জন্মদিনের কথা ভুলে গেছে বলে অভিমানে ওর চোখে পানি?

আমারও চোখ ভরে পানি এল, ফুলটা আলতো করে জামীর গালে ছুঁইয়ে অস্ফুটে বললাম, মেনি মোর রিটার্নস।

৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

আমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কদিন থেকে স্রোতের মতো আত্মীয়, বন্ধু আসছে, রুমীর জন্য মাতম করছে, তা দেখে আমার মনে তো শান্তি হওয়া উচিত। কতোজনের বেলায় শুনি মিলিটারি এসে স্বামী বা ছেলেকে ধরে নিয়ে যাবার পর সে বাড়িতে আত্মীয়বন্ধু ভয়ে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আমার বেলায় উল্টো। তবু হঠাৎ আজ বিকেলে আমি ক্ষেপে গেলাম কেন? তখন বসার ঘর, খাওয়ার ঘর ভর্তি করে বসেছিলেন, বাঁকা, মঞ্জুর, ফকির, মোস্তাহেদ, মিনিভাই, নূরুজ্জামান, দাদাভাই, মর্তুজা ভাই এবং এদের মিসেসরা। শামি খাওয়ার ঘরের চৌকিটায় শুয়েছিলাম, মিসেসরা এদিকে আমার কাছে বসেছিলেন। মিস্টাররা ওদিকে বসার ঘরে।

দুপুরে একটু কেমন যেন হয়েছিল। খুব কান্না পেয়েছিল, কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম ব্যাপারটা আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু থামাতে পারছিলাম না। শেষে হিক্কার মতো উঠে চোখে অন্ধকার হয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল গলার কাছে দমটা আটকে গেছে। শরীফ অফিসে ছিল। মা ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন। সানু, খুকু, মঞ্জু এবং আরেক পড়শী আকবরের মা এসে শুশ্রুষা করেছিলেন। আকবরের মা মাথায় তেলপানি থাবড়ে দিতে দিতে খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন মগবাজারে পাগলাপীর খুব তেজী পীর, ওর পায়ের ওপর গিয়ে পড়তে পারলে রুমীর একটা উপায় হবেই হবে। পীরফকিরে জীবনে কখনো বিশ্বাস ছিল না। এখন রুমীর জন্য পাগলাপীরের কাছে যাব বলে স্থির করেছি। আগামীকাল আকবরের মা আমাকে নিয়ে যাবেন ওর কাছে।

আমার অসুস্থতার কথা শুনেও আরো আত্মীয়বন্ধু দেখতে আসছেন। ডাঃ এ. কে. খান আগেই এসে ব্লাডপ্রেসার চেক করে দেখে এখন ওপাশে শরীফদের সঙ্গে বসে কথা বলছেন। এই মুহূর্তে ঘরে ঢুকল আতিক, বুলু, চাম্মু, হাফিজ, জুবলী। আমি হঠাৎ বলে উঠলাম, আচ্ছা, তোমরা সবাই এত এ বাড়িতে আস কেন? জান না, মেইন রোডে ছদ্মবেশে আই.বির লোক সর্বক্ষণ নজর রেখেছে এ বাড়ির ওপর? তোমাদের সব্বার বিপদ হবে, দেখো।

আমার মন বিকল হবার আরো কারণ ছিল। কাল রাতে মাসুম এক সময় আমাকে একা পেয়ে চুপিচুপি বলে, চাচী, চাচা আমাকে বারণ করেছেন আপনাকে বলতে। কিন্তু না বলে পারছি না। চাচাকেও বেত দিয়ে খুব মেরেছে। পিঠে দাগ পড়ে গেছে। আপনি চালাকি করে এক সময় পিঠটা দেখে নেবেন, তারপর উনাকে জিগ্যেস করবেন। আমি বলেছি তা বলবেন না যেন।

আমি মনে খুব আঘাত পেয়েছিলাম। শরীফকে বেত মেরেছে, সেটা সে আমার কাছে লুকিয়েছে? উঃ! কি মানুষ! কোথায় সব খুলে বলবে, পিঠে তেল বা মলম লাগিয়ে দেব। তা না। তাই দেখি ফিরে আসার পর থেকে একদম জামা খোলে না। গোসলের আগে জামা পরেই বাথরুমে ঢুকে যায়।

আজ সকাল থেকে তক্কে তক্কে ছিলাম। বাথরুমের সঙ্গে লাগানো ড্রেসিংরুম। ড্রেসিংরুমে ঢুকে জামা খুলে বাথরুমে ঢুকতে যাবে, অমনি আমি দরজার কাছে এসে হাজির। একি তোমার পিঠে দাগ কিসের? দেখি দেখি। বলে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেছি। শরীফের তখন স্বীকার করা ছাড়া আর উপায় ছিল না। সে আরো স্বীকার করল, খানসেনারা বুট-পরা পা দিয়ে তার মাথাতেও মেরেছে। ফলে তার মনে হয় সবসময় মাথায় যেন একটা লোহার টুপি এঁটে বসানো আছে।

এই সব বলতে বলতে শরীফ হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। ও আমাকে ধরেই ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও বসতে হল। আমরা দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে রুমী, রুমী বলে ডুকরে ডুকরে কাঁদলাম। আমি জীবনে কখনো শরীফকে কাঁদতে দেখি নি। এই প্রথম ও রুমীর নাম করে কাঁদল।

শলীফ শেভ, গোসল করে নাশতা খেয়ে অফিসে চলে যাবার পরও আমি সুস্থির হতে পারছিলাম না। শরীফের মানসিক অবস্থার কথাই ভাবছিলাম। ও চিরকাল ধীর, স্থির, দায়িত্বসচেতন। ওর মান-অপমান-জ্ঞান অন্য অনেকের চেয়ে বহুগুণে তীক্ষ্ণ। খানসেনাদের বর্বর নির্যাতনে ও শরীরে যত না যন্ত্রণা পেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অপমান বোধ করেছে মনে। এ কয়দিন আমি শুধু দুঃখ বোধেই যেন আচ্ছন্ন ছিলাম, এখন শরীফের মনের ক্রোধ আর অপমান বোধটা আমার মনেও ছড়াতে শুরু করল।

খুব অস্থির হয়ে এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। জামী ডেকে বলল, মা, দেখে যাও। ওর ঘরে গিয়ে দেখি ও গত কয়েকদিনের খবর কাগজ সামনে নিয়ে দেখছে। একটা কাগজ তুলে বলল, এই দেখ।

এই কয়দিনে আমি খবর কাগজের কথা একেবারেই ভুলে গেছিলাম। এখন বসে কাগজটা মেলে দেখলাম অনেক রকম অস্ত্রশস্ত্রের একটা বড় ছবির নিচে লেখা :

শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার : কয়েকজন গ্রেপ্তার।

জামী বলল, মা, মনে হচ্ছে এগুলোই আলম ভাইদের বাড়ির রান্নাঘরের নিচে থেকে বের করেছে।

খবর কাগজের ছবিটার দিকে চেয়ে রইলাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো স্টেনগান, রাইফেল, স্টেনের ম্যাগাজিন, পিস্তল, গ্রেনেড, মাইন, তারের বাণ্ডিল আরো কি কি যেন।

৩১ আগস্টের দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ, পাকিস্তান অবজারভার, পাকিস্তান টাইমস–সব কাগজেই অস্ত্রশস্ত্রের ছবি বেরিয়েছে। সব কাগজে একই খবর ছাপা হয়েছে, গত রোববার রাতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে একাদিক্রমে কয়েকটি সফল অভিযান চালিয়ে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযানগুলো চালানো হয়।

দেশপ্রেমিক নাগরিক! আল্লাহ, এই দেশপ্রেমিক নাগরিকদের জন্য তোমার নিকৃষ্টতম, ভয়াবহতম হাবিয়া দোজখও যথেষ্ট হবে না।

আমার মনের মধ্যে মাথার মধ্যে ক্রোধ আর ঘৃণা দপদপ করে জ্বলতে লাগল।

আমি জামীকে জিগ্যেস করলাম, একটা কথার জবাব দে দেখি। স্ট্রেইট উত্তর দিবি। রুমীকে কি রকম টর্চার করেছে?

জামী হঠাৎ চমকে যেন বোবা হয়ে গেল। আমার মনের মধ্যে রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ, দুঃখ সব যেন একসঙ্গে ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠছিল। আবার বললাম, তোরা তো এসে সবার কথাই বলেছিস, বদিকে কি রকম টর্চার করেছে, আলতাফ মাহমুদের রক্ত বের করে দিয়েছে, হাফিজের চোখ গেলে দিয়েছে, বাশারের হাত ভেঙেছে, স্বপনের বাবা, উলফাতের বাবা, শাহাদতের দুলাভাই, আলমের ফুপা সবাইকে হুকে ঝুলিয়ে পিটিয়েছে, পিঠের ওপর চড়ে পায়ে মাড়িয়েছে,জুয়েলের আঙুল ভেঙে দিয়েছে, চুলুকে আধমরা করে ফেলেছে। রুমীকে কতোখানি টর্চার করেছে, তোরা কেউ বলিস নি কিন্তু। এখন বল আমাকে–

জামী বলতে গেল, মা, মা শোন–

আমি চেঁচিয়ে বললাম, কোন কথা শুনব না। আমি জানতে চাই রুমীকে কতোখানি টর্চার করেছে। বল তুই। দেশপ্রেমিক নাগরিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে মিলিটারি আমার রুমীকে ধরে কতোখানি টচার করেছে, আমি জানতে চাই।

জামী মাথা তুলে আমার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, ভাইয়াকে আমরা শেষ দেখি ৩০ তারিখের দুপুরে। তারপর সেই ছোট ঘরটা থেকে ভাইয়া, বদি ভাই আর চুল্লু ভাইকে নিয়ে যায়। তারপর আর ভাইয়াকে দেখি নি। সকালে ভাইয়াকে যখন ছোট ঘরে আনে, তখন ভাইয়া প্রথমে আমাদের চারজনকে এক সঙ্গে বলে, আমরা যেন সবাই আর্মির কাছে একরকম কথা বলি। একটু পরে ভাইয়া আন্ধুর কাছ থেকে একটু সরে বসে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাদা কথা বলে। ঐ সময় বলেছিল, আমি শুধু নিজে পঁচিশের রাতের ঘটনা স্বীকার করেছি। ওরা আমাকে খুব মেরেছে, আরো অনেকের নাম বলার জন্য। আমি শুধুবদি ছাড়া আর কারো নাম জড়াই নি। সমস্ত ঘটনার দায়িত্ব বদি আর আমি নিয়েছি।আমি বলেছিলাম, ভাইয়া, যদি খুব বেশি টর্চার করে?ভাইয়া বলেছিল, তুইতো জানিস আমি কতো টাফ। ওরাও সেটা বুঝে গেছে। ওরা আমাকে ব্রেক করার জন্য এমনভাবে টর্চার করেছে বাইরে কোথাও কাটে নি, ভাঙে নি। কিন্তু ভেতরটা মনে হচ্ছে চুরচুর হয়ে গেছে! দেখিস, আম্মাকে যেন বলিস না এসব কথা। মা, তুমি জোর করলে, তাই বলে দিলাম। ভাইয়া কিন্তু বারণ করেছিল।

আমি প্রাণপণে নিজেকে শক্ত রেখে বললাম, আমার জানার দরকার ছিল। ভয় নেই, আমার কিছু হবে না। উঠে রুমীর ঘরে গেলাম। বইয়ের আলমারি খুলে বের করলাম একটা বই : হেনরী এলেগের জিজ্ঞাসা। রুমী এটা আমাকে পড়তে দিয়েছিল কিছুদিন আগে। বলেছিল, আম্মা, যার ওপর টর্চার করা হয়, খানিকক্ষণ পরে সে কিন্তু আর কিছু ফিল করে না। পরে যারা শোনে বা পড়ে তারাই বেশি শিউরায়, ভয় পায়। রুমী আরো অনেক কিছু আমাকে বলেছিল : শক্রর হাতে ধরা পড়ার পর কি কি উপায়ে তাদের টর্চার সহ্য করে নেয়া যায়। কি কি পন্থায় টর্চার সহনীয় করে মুখ বন্ধ রাখা যায়। এ সম্বন্ধে সে ইপক্রেস ফাইল এবং আরো কয়েকটা বই আমাকে পড়তে দিয়েছিল।

রুমী। রুমী। তুই কি সত্যিই ওই সব পন্থাতে ওদের সব অত্যাচার সহ্য করতে পারছিস? তুই কি সত্যিই খানিক পরে আর কিছু টের পাস না? আমি কেমন করে কার কাছে তোর খবর পাব?

৪ সেপ্টেম্বর, শনিবার ১৯৭১  

আজ দশটার সময় আকবরের মায়ের সঙ্গে পাগলাপীরের বাসায় যাব। আকবরের মা বলেছেন ওঁর কাছে যেতে হলে কিছু একটা হাতে নিয়ে যেতে হয়। কেউ খালি হাতে গেলে খুব রাগ করেন। তাই আমিরুদ্দিকে পাঠিয়েছি মিষ্টি কিনে আনতে। এই অবসরে গত কয়েকদিনের খবর কাগজে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি। গতকাল তো জামীর ডাকে খবর কাগজ দেখতে গিয়ে রাগে-দুঃখে কেঁদেকেটে একটা কেলেঙ্কারিই বাধিয়ে ফেলেছিলাম।

প্রদেশে এতদিনে বেসামরিক গভর্নর দিয়েছে। নতুন গভর্নর ডাঃ মালিকের হাসিমুখের ছবি ছাপা হয়েছে। নতুন সামরিক আইন প্রশাসকও দেওয়া হয়েছে লেঃ জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী।

একই সঙ্গে গভর্নর আর সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করে অবশেষে টিক্কা খান বিদায় নিয়েছে। গভর্নর হয়েই ডাঃ মালিক ঘোষণা করেছেন শিগগিরই মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে।

সামরিক বাহিনী আরো একটা জায়গায় হানা দিয়ে অনেক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছে। নয়জনকে মেরেছে, একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঢাকা থেকে তিন মাইল দূরে নাসিরাবাদ বস্তির একটা বাড়ি থেকে ১ সেপ্টেম্বর পাক আর্মি এই অস্ত্রশস্ত্র ধরেছে।

এখানেও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস-সংক্ষেপে ইপকাফের একটা দল এই অস্ত্র উদ্ধার করে এবং যাদের মারে তারা হল ভারতীয় এজেন্ট। ভাবছি কোন নয়জন মুক্তিযোদ্ধাকে ওরা মেরেছে? তাদের কেউ কি আমাদের চেনা? যাকে গ্রেপ্তার করেছে, সেও কি সেক্টর টুয়েরই কোন মুক্তিযোদ্ধা? কে জানে? জানবার কোন উপায়ই নেই।

৩১ আগস্টের দৈনিক পাকিস্তানের একটা খবরে চোখ আটকে গেল।

মরতে যখন হবেই, তখন দেশের জন্যই মরি। বিশ বছর বয়স্ক পাইলট রশীদ মিনহাজ গত ২০ আগস্ট পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি বিমানকে জোর করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস ব্যর্থ করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছেন।

এটা আবার কি ধরনের খবর? জোর করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস যিনি করেছেন তার নাম কই? কে তিনি? কি তার পরিচয়?

পরবর্তী দিনগুলোর কাগজ ঘাটতে লাগলাম। তিন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেবল রশীদ মিনহাজের বীরত্বগাথার কাহিনী। বীরত্বের জন্য তাকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব নিশানে হায়দার দেওয়া হয়েছে, তাকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য নির্ধারিত গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে, তার বাপের ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছে, তার চোদ্দগুষ্ঠির কুষ্টি-কুলুজী বর্ণনা করা হয়েছে, অথচ কে বিমান হাইজ্যাক করলেন তাঁর নাম নেই!  

চার সেপ্টেম্বরে এসে নাম পেলাম। রশীদ মিনহাজের অমর বীরত্বগাথা নাম দিয়ে চার কলামজুড়ে এক নিবন্ধে রশীদের বীরত্ব, মহত্ত্ব, ত্যাগের অনেক ধানাই-পানাই করে বলা হয়েছে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এ. কে. এম. মতিয়ুর রহমান বলে আট বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক পাইলট বিমানটা হাইজ্যাক করার চেষ্টা করেন। পরিণামে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে দুজনেই মৃত্যুবরণ করেন।

কে এই মতিয়ুর রহমান? কোন দেশী লোক? কিছুই বলে নি। বোঝাই যাচ্ছে কোন দেশপ্রেমিক বাঙালি পাইলট একটি বিমান হাইজ্যাক করে ভারতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। ভারতের আকাশে পৌঁছেছিল ঠিকই কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং দুজনেই মৃত্যুবরণ করেছে। একজন সর্বোচ্চ বীরের খেতাব পেয়েছে, অন্যজনকে বলা হয়েছে বিশ্বাসঘাতক। এই খবর দৈনিক পূর্বদেশ-এ বিশ্বাসঘাতকের নাম মতিয়ুর রহমান–এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে।

মুক্তিকামী বীর বাঙালি মতিয়ুর রহমান বিশ্বাসঘাতক? যদি কোনদিন পূর্ব বাংলার এই ভূখণ্ড স্বাধীন হয়, তবে মতিয়ুর রহমান সেই স্বাধীন দেশ নিশ্চয় তোমাকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাবে ভূষিত করবে।

এলিফ্যান্ট রোডের যে অংশটা রমনা থানার সামনে দিয়ে ঘুরে আউটার সার্কুলার রোড ক্রস করে ওয়ারলেস কলোনির দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তায় ঢুকে রেললাইন ক্রস করে একটু এগোলোই বাঁয়ে পাগলাপীর বাবার বাড়ি। আগে বোধ হয় টিন ও বেড়া ছিল, এখন সামনের দিকের দুতিনটে ঘর পাকা। সদ্য সমাপ্ত, দেখেই বোঝা যায়। চারদিকে ইট, বালি, লোহা এলোমেলো পড়ে রয়েছে। একটা ঘরে সিমেন্টের বস্তার টাল, পেছন দিকে কাজ চলছে। বাবার কাছে দোয়াপ্রার্থী নারী-পুরুষের ভিড়ে চারদিক থৈথৈ করছে।

আকবরের মা বলেছেন, বাবার খুব ক্ষমতা। দোয়া পড়ে ফুঁক দিয়ে শক্ত শক্ত অসুখ চোখের নিমেষে ভালো করে দেন। ওনার কাছে যে যা আর্জি নিয়ে আসে, তাই কবুল হয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বড়ো বড়ো মেজর, কর্নেল, জেনারেল সবাই ওনার কাছে আসেন দোয়া নিতে। দেখবেন, উনি ঠিক আপনার রুমীর খবর বের করে দেবেন।

সেই আশাতেই তো এসেছি। এই একই আশা নিয়ে পাগলাপীরের কাছে এসেছেন রাজশাহীর ডি.আই.জি, মামুন মাহমুদের স্ত্রী মোশফেকা মাহমুদ, এসেছেন রাজশাহীর এস.পি. শাহ আবদুল মজিদের স্ত্রী নাজমা মজিদ, এসেছেন চট্টগ্রামের এস.পি. শামসুল হকের স্ত্রী মাহমুদা হক, এসেছেন আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী ঝিনু মাহমুদ।

ঝিনু মাহমুদকে দেখে আমি চমকে গেছি। ছোট্টখাট্টো চেহারার সোনারবরণী এক মেয়ে, পুতুলের মতো সুন্দর –কাঁদতে কাঁদতে চোখের কোণে কালি পড়ে গেছে। এইটুকু মেয়ে, কততই বা বয়স, দেখে মনে হয় আঠারো-উনিশ। কোলে আড়াই বছরের মেয়ে শাওন। এই নবীন বয়সে ওর জীবনে এতবড় দুর্দৈব? ঝিনুর সঙ্গে পাগলা বাবার কাছে এসেছেন ঝিনুর মা, তার ছোট বোন শিমুল বিল্লাহ আর চার ভাই নুহেল, খনু, দীনু ও লীনু বিল্লাহ। শরীফ, জামী, মাসুমের কাছে এই চার ভাইয়ের কথা আগেই শুনেছি।

মোশফেকা মাহমুদকে আগে অল্পস্বল্প চিনতাম, তার মুখে শুনলাম, ২৬ মার্চ বাসায়। মিলিটারি এসে মামুন মাহমুদকে ডেকে নিয়ে যায়। সেই যে গেল মামুন, আর ফিরে আসে নি। একই কাহিনী নাজমা মজিদের, মাহমুদা হকের।

এরা কেউ এদের স্বামীর খোঁজ জানে না। আমি জানি না আমার ছেলের খোঁজ। পাগলাপীর বাবা সবাইকে আশ্বাস দিয়েছেন–এরা সবাই বেঁচেবর্তে আছে। উনি ঠিকই সকলের খোঁজ বের করে আনবেন।

৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার ১৯৭১

একটা কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে গত দুদিন থেকে শরীফ আর আমি খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি। রুমীকে কি করে বের করে আনা যায়, তা নিয়ে শরীফের বন্ধুবান্ধবরা নানারকম চিন্তাভাবনা করছে। এর মধ্যে বাঁকা আর ফকিরের মত হল : যেকোন প্রকারে রুমীকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে। বাঁকা আর ফকির মনে করছে–শরীফকে দিয়ে রুমীর প্রাণভিক্ষা চেয়ে একটা মার্সি পিটিশন করিয়ে তদবির করলে রুমী হয়তো ছাড়া পেয়ে যেতেও পারে। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। সেটাও একটা আশার কথা।

রুমীর শোকে আমি প্রথম চোটে তাই করা হোক বলেছিলাম। কিন্তু শরীফ রাজি হতে পারছে না। যে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে, সেই সরকারের কাছে মার্সি পিটিশন করলে রুমী সেটা মোটেও পছন্দ করবে না এবং রুমী তাহলে আমাদের কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবে না। বাঁকা ও ফকির অনেকভাবে। শরীফকে বুঝিয়েছেন–ছেলের প্রাণটা আগে। রুমীর মতো এমন অসাধারণ মেধাবী ছেলের প্রাণ বাঁচলে দেশেরও মঙ্গল। কিন্তু শরীফ তবু মত দিতে পারছে না। খুনী সরকারের কাছে রুমীর প্রাণভিক্ষা চেয়ে দয়াভিক্ষা করা মানেই রুমীর আদর্শকে অপমান করা, রুমীর উঁচু মাথা হেঁট করা। গত দুরাত শরীফ ঘুমোয় নি, আমি একবার বলেছি, তোমার কথাই ঠিক। ঐ খুনী সরকারের কাছে মার্সি পিটিশন করা যায় না। আবার খানিক পরে কেঁদে আকুল হয়ে বলেছি, না, মার্সি পিটিশন কর।

এইভাবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে কেটেছে দুদিন দুরাত। শেষ পর্যন্ত শরীফ সিদ্ধান্ত নিয়েছে–, মার্সি পিটিশন সে করবেনা। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে আমিও শরীফের মতকে সমর্থন করেছি। রুমীকে অন্যভাবে বের করে আনার যতরকম চেষ্টা আছে, সব করা হবে; কিন্তু মার্সি পিটিশন করে নয়

সেপ্টেম্বর, সোমবার ১৯৭১

আজাদের মায়ের কাছে যাবার জন্য মনটা ছটফট করছে। এ কয়দিন তাল করে উঠতে পারি নি। আজ বেলা এগারোটার দিকে গেলাম। আজাদের মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন, বললেন, বইন গো, কি সর্বনাশ হয়া গেল আমাদের। আপনের রুমীরেও তো লয়া গেছে শুনছি।

হ্যাঁ আপা, বাড়িসুদ্ধ সবাইকেই নিয়ে গেছিল। দুদিন-দুরাত পর রুমী ছাড়া বাকিরা ফিরে এসেছে।

বাড়িটার ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে। খাট ভেঙে পড়ে আছে, লোহার আলমারির পাল্লা ছ্যাঁদা হয়ে গেছে বুলেটে, দেয়ালে জায়গায় জায়গায় রক্তের ছিটে শুকিয়ে খয়েরি হয়ে আছে।

জিগ্যেস করে করে পুরো ঘটনাটা শুনলাম আজাদের মার মুখ থেকে।

২৯ আগস্টের রাতে তার বাসাতে অনেক লোক ছিল। বোনের ছেলে জায়েদ, চঞ্চল। এরাতো থাকতোই, তাছাড়াও অন্য জায়গা থেকে বেড়াতে এসেছিল আরেক বোনের ছেলে টগর, বোন-ঝি জামাই মনোয়ার। জুয়েল, কাজী, বাশার এরা তিনজন ছিল। আর কপাল মন্দ সেকেন্দার হায়াত খানের জয়েন্ট সেক্রেটারি এ. আর. খানের ছেলে–আজাদের বন্ধু, সে রাতে এ বাসাতেই ছিল।

রাত দুপুরে ঘুম ভেঙে সবাই দেখে আর্মি সারা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। এঘর-ওঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বোঝা যায় সামনে, দুপাশে, ছাদে সর্বত্র মিলিটারি। ভেবেছিল পেছনদিকে মেথরের রাস্তাটায় নিশ্চয় কেউ নেই, ওইদিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। জায়েদ হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে কোনমতে মেথর আসার চিকন দরজাটার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে খুলতেই গলি থেকে কয়েকজন আর্মি উঠে এসে ঢুকে বাড়িতে। তারা ঘরে ঢুকে সামনের দরজা খুলে দেয়–সেদিক দিয়ে আরো মিলিটারি পুলিশ সব ঘরে ঢুকে পজিসন নিয়ে দাঁড়ায়। জুয়েলের দুটো আঙুলে তখনো একটুখানি ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল, ক্যাপ্টেন সেই আঙুল দুটো ধরে দুমড়ে ভেঙে দেয়। জুয়েল মা-গো বলে একটা প্রাণঘাতী চিৎকার দিয়ে ওঠে। আর তখনি ঘটে যায় সেই কাণ্ডটা। কাজী হঠাৎ ক্যাপ্টেনটার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। ক্যাপ্টেন টাল সামলাতে না পেরে খাটের ওপর পড়ে যায়। কাজী পড়ে তার ওপর। দুজনের আছড়ে পড়ার ভারে খাট ভেঙে যায়। কাজী ক্যাপ্টেনের স্টেন ধরে টানাটানি করতে থাকে। সেপাইরা ভাবতেও পারে নি এই রকম কিছু ঘটতে পারে। তারা ভয় পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। গুলিতে ভীষণ রকম জখম হয় জায়েদ আর টগর। এর মধ্যে ধস্তাধস্তি করতে করতে কাজী পালিয়ে যায় টানাটানির চোটে তার লুঙ্গি খুলে যায়। সেই অবস্থাতেই সে দৌড়ে বেরিয়ে যায়।

কাজীকে ধরতে না পেরে খানসেনাদের সব রাগ গিয়ে পড়ে বাড়ির বাকি লোকদের ওপর। মারের চোটে আজাদের নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে, বাশারের বাঁ হাত কবজি আর কনুইয়ের মাঝে দুটুকরো হয়ে ভেঙে যায়, জুয়েলের আঙুল তো আগেই ভেঙেছিল, এখন নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে, মনোেয়ার, সেকেন্দারও প্রচুর মার খায়।

তারপর গুলিবিদ্ধ, অচেতন জায়েদ আর টগরকে রক্তের স্রোতের মধ্যে ফেলে বাকিদেরকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে খানসেনারা চলে যায়। চোখের সামনে এরকম পৈশাচিক কাণ্ডকারখানা দেখে আজাদের মায়ের হুশ ছিল না বহুক্ষণ। চেতনা ফিরলে দেখেন ভোর হয়ে আসছে। দেখেন রক্তের থৈ-থৈ মেঝেতে দুটি প্রাণী তখনো অজ্ঞান। তিনি পাশের বাসায় গিয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফোন করেন এম্বুলেন্স পাঠাবার জন্য। কিন্তু এম্বুলেন্স আসেনা। তিনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ফোন করেন, কিন্তু এম্বুলেন্স আসে না। এই করতে করতে সকাল আটটা-নটা হয়ে যায়। তখন তিনি নিরুপায় হয়ে রিকশা করে ইন্টারকনের সামনের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আসেন। জায়েদ, টগরকে অনেক কষ্টে ধরাধরি করে ট্যাক্সিতে তোলা হয়। তিনি ড্রাইভারকে মেডিক্যাল কলেজে যেতে বলেন। ড্রাইভার তাকে পরামর্শ দেয় মেডিক্যালে না নিতে। কারণ মেডিক্যালে মিলিটারি ভর্তি। তারা গুলিবিদ্ধ পেসেন্ট দেখলে গুম করে ফেলবে। তখন আজাদের মা হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যান।

হোলি ফ্যামিলিতে জায়েদ, টগর এখনো সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছে। জায়েদ ছয়দিন অজ্ঞান ছিল। আজাদের মা স্টিল আলমারির পাল্লা দুটো খুলে দেখালেন স্টেনের গুলি পাল্লা ফুটো করে পেছনের লোহার পাত ফুটো করে ঘরের দেয়াল গিয়ে বিধেছে। ভাঙা খাট যেভাবে ছিল, সেভাবেই পড়ে আছে। মেঝের চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে, সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা হয় নি। কে করবে? তিনি তো একদিকে নিজের ছেলের শোকে কাতর, অন্যদিকে আহত বোনের ছেলে দুটোর জন্য হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছেন। এই আটদিনে ওর চেহারাও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, চুলে তেল নেই, পরনের কাপড় ময়লা। ঘরের দিকে, নিজের দিকে তাকাবার এক মুহূর্ত ফুসরত নেই ওঁর।

আজাদের মা জিগ্যেস করলেন, রুমীর কোন খবর করতে পারলেন বইন?

আপা, এখনো কোনদিকে কোন সুরাহাই করতে পারছি না। পাগলাপীর বাবা ভরসা দিয়েছেন উনি রুমীকে বের করে এনে দেবেন। আপা, আপনি যাবেন ওঁর কাছে? খুব ক্ষমতাবান পীর উনি। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বড় বড় জেনারেলরা পর্যন্ত ওর কাছে আসে।

না বইন, আমার পীর সাহেব আছেন জুরাইনে, আমি গেছি তেনার কাছে। আল্লায় দিলে আজাদ আমার ছাড়া পায়া যাইব। আমি রমনা থানায় আজাদের লগে দেখা করছি।

আমার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে গলার কাছে চলে এল। আজাদের সঙ্গে দেখা করতে দিয়েছে।

না বইন। অরা দেখা করতে দেয় নাই। রাইতে রমনা থানায় আইনা রাখে, আমাদের চিনা এক লোক সিপাইরে ঘুষ-মুষ দিয়া কেমন কইরা জানি বন্দোবস্ত করছিল, রাইতে লুকাইয়া জানালার বাইরে দাঁড়ায় কথা বলছি।

কি কথা বললেন? কেমন আছে আজাদ?

বইনরে। বড় মারছে আমার আজাদরে। আমি কইলাম বাবা কারো নাম বল নাই তো? সে কইল, না মা, কই নাই। কিন্তু মা যদি আরো মারে? ভয় লাগে যদি কইয়া ফেলি? আমি কইলাম, বাবা, যখন মারবো, তুমি শক্ত হইয়া সহ্য কইরো।

৭ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১

বিকেলবেলা পাগলা বাবার ভেতরের ঘরে খুব মন খারাপ করে বসেছিলাম। আমার চারপাশ ঘিরে বসে ছিল লালু, মা, ঝিনু, শিমুল, ওদের মা, মোশফেকা মাহমুদ, তার মা, মাহমুদা হক, নাজমা মজিদ এবং আরো অনেকে। পাগলা বাবা পাশের ঘরে পুরুষদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি সবাইকে আজাদের মায়ের কাহিনী বলছিলাম। শুনে প্রায় সকলের চোখেই পানি এসে গিয়েছিল। খানিক পরে শিমুলের একটা কথায় ভয়ানক চমকে গেলাম। গত তিনদিন থেকে নাকি আলতাফ মাহমুদ আর বদিকে রাতে রমনা থানায় আনছে না। ওদের তাহলে কি হল? আমি শিমুলকে জিগ্যেস করলাম, কার কাছে শুনলে এ কথা?

চুলু ভাইয়ের ভাবীর কাছে।

চুল্পর ভাবী ইশরাতও পাগলা বাবার কাছে আসে। তার কাছ থেকে আমরা মাঝে মাঝে রমনা থানার ছিটেফোঁটা জানতে পারি। চলুর ভাইয়ের সঙ্গে এক ডি.আই.জি. সাহেবের বেশ ভালো জানাশোনা আছে। তার মারফত রমনা থানার বন্দীদের কিছু কিছু খবর চুলুর ভাই-ভাবী পান।

ঝিনু অঝোরে কাঁদছে। আমার মা তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আমি হুম হয়ে বসে ভাবতে লাগলাম রমনা থানায় না আনার অর্থ কি? শরীফ, জামীরা যখন আলতাফ মাহমুদকে দেখে তখনই তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তবে কি আলতাফ মাহমুদ মরে গেছেন? নাকি ওরা গুলি করে শেষ করে দিয়েছে? বদিরও কি তাই হয়েছে? জামী ফিরে এসে বলেছিল বদি নাকি ভয়ানক উতলা হয়ে থাকত। খালি বলত, আমি আর বাচতে চাই না। আমি আত্মহত্যা করব। একবার সে ঘরের পাগপয়েন্টে আঙুল ঢুকিয়ে ইলেকট্রিক শক খেয়ে মরতে চেয়েছিল। আরেকবার হঠাৎ দৌড় দিয়েছিল এই আশায় যে দৌড়োতে দেখলেই খানসেনারা ওকে গুলি করবে। কিন্তু খানসেনারা খুব সেয়ানা। ওরাবুঝে গিয়েছিল চারধারে এত পাহারার মাঝখানে খালি হাতে দৌড় দেয়ার কি অর্থ। গুলি না করে কয়েকজন খানসেনা তিনদিক থেকে এগিয়ে এসে ওকে ধরে ফেলে।

রুমীকে কখনই রমনা থানায় আনে নি কেন? আনলে তবু তো ছিটেফোটা কিছু খবরও পেতাম। কোথায় রেখেছে তাকে, কিভাবে রেখেছে–ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিয়ে মাথা ঘুরে যায়। কি করব আমি? কেউ কোন খবর বের করতে পারছেনা। পাগলা বাবা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন শিগগিরই তিনি রুমীর খবর বের করে আনবেন। কিন্তু কবে?

পাগলা বাবা ভেতরের ঘরে এলে আমরা তাকে আলতাফ মাহমুদের কথা জিগ্যেস করলাম। ঝিনু কেঁপে তার পায়ের ওপর পড়ল। ঝিনুর মা কাঁদতে লাগলেন। আমরা সবাই নিজের নিজের হারানো প্রিয়জনের কথা মনে করে কাঁদতে লাগলাম। পাগলা বাবা ধমক দিয়ে সবাইকে থামিয়ে দিলেন, বললেন, তোরা কোথা থেকে কি সব ভুল

ভাল আবোল-তাবোল কথা শুনে মাতম করিস! আমি বলছি আলতাফ সহি-সালামতে আছে। শিগগিরই তার খবর পাবি। বাকিরাও সবাই ভালো আছে। তোরা সবাই খবর পাবি ঠিক সময়ে। আমি তো চেষ্টা করে যাচ্ছি প্রাণপণে।

৯ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

প্রতি বৃহস্পতিবারে পাগলা বাবার আস্তানায় মিলাদ-মাহফিল হয়। এখানে আজ সকাল থেকে পাগলা বাবা রুমী, আলতাফ মাহমুদ, মামুন মাহমুদ, আবদুল মজিদ, শামসুল হক, ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর–সকলের জন্য কোরান খতম শুরু করিয়েছেন। মিলাদের জন্য দশ সের অমূতি এনেছি। অন্যরাও ওই রকম পরিমাণ মিষ্টান্ন এনেছে। বাদ আছর মিলাদের সময় প্রচুর লোক হয়। পেছনদিকে বিরাট একটা বেড়ার ঘর আছে–নামাজের জন্য জামাতঘর, সেইখানে পাগলা বাবা নিজে মিলাদ পড়ান। মেয়েরা এদিককার পাকা ঘরে বারান্দায় বসে। বাবা আমাদের সবাইকে বলেছেন তিনি। জায়নামাজে বসে খাস দেলে ধ্যান করে জেনেছেন রুমী, আলতাফ, মামুন–ওরা সবাই বেঁচে আছে। তিনি শিগগিরই ওদের সবাইকে বের করে আনবেন। আমাদের শুধু একটুখানি ধৈর্য ধরতে হবে, আল্লার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, পাগলা বাবার ওপর ভরসা রাখতে হবে।

পাগলাপীরের কথামতই চলছি। সেই সঙ্গে আত্মীয়স্বজন যে যা বলছে তাই করে চলেছি। একজন বললেন, রুমীর নামে একটা খাসি কোরবানি দাও–জানের সদকা। তাই দিলাম। পরশুদিন একটা খাসি কিনে এনে বাড়িতে কোরবানি দেওয়া হল। আকবরের বাবা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে খাসিটা নিজের হাতে জবাই করলেন। কিছু গোশত ফকিরদের বিলানো হল, বাকিটা এতিমখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। ঐদিন দুপুরের পর পাগলা বাবার আস্তানায় খতমের দোয়া ও মোনাজাত করা হল রুমীর জন্য। বাবার নির্দেশে সাত সের অমৃতি নিয়ে গিয়েছিলাম। দুসের আলাদা করে বাবা দোয়া পড়ে দম করে দিয়েছিলেন পাড়ায় বিলোবার জন্য।

ইস্টার্ন ব্যাঙ্কিং করপোরেশনের জি. এম. আমিনুর রহমান সাহেব নিয়মিত পাগলাপীরের কাছে যান। তিনি শরীফ, ফকির এবং মিনিভাইয়ের বন্ধু। ওঁকে ধরে গতকাল পাগলা বাবাকে বাসায় আনিয়েছিলাম। বাবা বাড়িতে এসে দোতলায় রুমীর ঘরে গিয়ে দুরাকাত নামাজ পড়লেন, সালাম ফিরিয়ে খানিকক্ষণ চোখ বুজে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন রইলেন। তারপর বললেন, একটুও ঘাবড়াসনে। সে ভালো আছে। শিগগিরই তাকে বের করে আনব।

মিলাদের পর বেশির ভাগ লোক চলে গেছেন। আমরাও যাবার উদ্যোগ করতে পাগলা বাবা বসতে বললেন। অনেকক্ষণ বসে রইলাম। আরো লোকজন চলে গেলে বাবা আমাকে আর শরীফকে ডাকলেন, বললেন, রুমীকে বের করে আনার একটা ব্যবস্থা তিনি করেছেন। জামাতঘরে একজন পাঞ্জাবি সার্জেন্টকে বসিয়ে রেখেছেন। এর সঙ্গে তিনি আগেই কথাবার্তা বলে নিয়েছেন। সার্জেন্টটি খবর বের করেছে রুমীকে কোথায় রাখা হয়েছে। আমরা দুজন যদি তাকে গাড়িতে উঠিয়ে এখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যাই, তাহলে সে রুমীকে বের করে আমাদের গাড়িতে তুলে দেবে। কথাটা অন্য কাউকে যেন না বলি। কারণ সকলের জন্য এরকম বিশেষ ব্যবস্থা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। রুমীর জন্যই তিনি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই গোপন ব্যবস্থাটা করেছেন।

ব্যাপারটা এতই অপ্রত্যাশিত এবং অবিশ্বাস্য যে শোনামাত্র আমাদের তাক লেগে গেল। সম্বিত ফিরে পেয়ে আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হল–আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলাম, যাবো, এক্ষুণি যাবো। শরীফের প্রতিক্রিয়া হল সম্পূর্ণ উল্টো। সে বলল, এক্ষুণি যাওয়া সম্ভব নয়। একটু অসুবিধে আছে। কাল আপনাকে জানাব। শরীফের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, যাতে আমি আর কোন কথা না বলে চুপ করে গেলাম।

বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতেই শরীফ আমাকে বোেঝাল–এভাবে ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া খুব বিপজ্জনক। ওখানে ঢোকার পর খানসেনারা আমাদের দুজনকে মেরে গাড়িটা গুম করে দিলে আমাদের আত্মীয়বন্ধুরা কোনকালেও খুঁজে বের করতে পারবে নাআমাদের কি হল।

১১ সেপ্টেম্বর, শনিবার ১৯৭১

ভারবাহী গর্দভের মত দিনগুলো টেনে নিয়ে চলেছি। ভোর সাড়ে চারটে-পাঁচটার সময় পাগলা বাবার বাসায় যাই। ঘন্টা দুয়েক পরে ফিরে এসে শরীফ সেভ, গোসল করে নাশতা খেয়ে অফিসে যায়। আমরা সংসারের কাজে লেগে যাই। লালুর সাংঘাতিক এক মাথা ধরার ব্যারাম আছে–মাইগ্রেন। বাবা বলেছেন লালুর মাথা ঝেড়ে তিনি ফুঁক দেবেন ফজরের নামাজেরও আগে। তার জন্যই এই রকম ভোর সাড়ে চারটে-পাঁচটায় যাওয়া।

গতকাল থেকে মা আর আতাভাই আরেক দফা কোরান খতম শুরু করেছেন। আতাভাই এক থেকে পনের পারা, মা ষোল থেকে শেষ পারা পড়বেন। এটা ওরা শেষ করবেন আগামী বৃহস্পতিবার। এই কোরান খতমের শেষে দোয়া পাঠ করানো হবে পাগলা বাবাকে দিয়ে তাঁর সাপ্তাহিক মিলাদের মাহফিলে।

এত ভোরে উঠে শরীফ ক্লান্ত। নিজের হাতে সংসারের সমস্ত কাজ করা–কারণ বারেকও চলে গেছে। বিকেলে আবার পাগল বাবার আস্তানায় যাওয়া। এর মধ্যে নানা ধরনের দোয়া, আমল, খতম। এর মধ্যেও চমক–দেড়টার সময় হঠাৎ আবুর ফোন।

আবু–পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের উইং কমান্ডার মাহবুবুর রহমান–সে তো করাচিতে রয়েছে বলেই জানতাম। তার ফোন পেয়ে অবাক হলাম, তুমি ঢাকায় কি করছ? কবে এসেছ?

বাসায় আছো তো? এসে সব বলছি।

আবু ১৯৪৪-৪৮ সালে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শরীফের সঙ্গে পড়ত। সেই থেকে বন্ধুত্ব। আবুর কোন বড় বোন ছিল না। তাই সে আমার সঙ্গে বুবু পাতায়। সেই থেকে আমি তার সবগুলো ভাইবোনের বুবু।

আবু বাসায় এসে এক চমকপ্রদ, অবিশ্বাস্য কিন্তু খাটি সত্য কাহিনী শোনাল।

গত দুই মাস পাঁচ দিন ধরে ঢাকায় সে সামরিক জান্তার বন্দিশালায় বন্দী জীবনযাপন করেছে। আজকে তাকে ছেড়েছে, আগামীকাল দুপুরের ফ্লাইটে তাকে করাচি যেতে হবে। সেখানে তার বউ-ছেলে-মেয়ে রয়েছে তারা জানে যে, আবু ঢাকায় এয়ারফোর্সের যে ইস্ট ওয়েস্ট কমুনিকেশন নেটওয়ার্ক ইনস্টলেশান আছে, সেটা মেরামত করতে ঢাকা গেছে। ১৯৬৭ সালে আবুই এয়ারফোর্সের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ঢাকায় ঐ মাল্টিচ্যানেল রেডিও–টেলিফোন-টেলিপ্রিন্টার লিঙ্ক ইনস্টল করেছিল। আবুকে করাচিতে বলা হয়, ঢাকায় ঐ লিঙ্ক ইকুইপমেন্ট ঠিকমত চলছেনা। যেহেতু তুমিই ওটা বসিয়েছিলে, অতএব তুমি ছাড়া আর কেউ ওটা ঠিকমত মেরামত করতে পারবে না।

তেজগাঁ এয়ারপোর্টে নামার পর আবুকে জানানো হয় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার অপরাধ সম্বন্ধে বলা হয় সে এবছরের প্রথমদিকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে শেখের কাছে কিছু গোপন খবর দিয়ে লোক পাঠিয়েছিল।

এরপর আবুর ওপর শুরু হয় নির্যাতন। এয়ারপোর্টের উল্টোদিকে যে এয়ারফোর্স অফিসার্স মে, তার পেছন দিকে কাঁঠাল বাগানে একটা জায়গায় আবুকে নিয়ে রাখে। ব্যারাকের মত ঘর, টিনের ছাদ, পাঁচ ইঞ্চি পাকা দেয়াল, চারধারে ডবল কাটাতারের বেড়া। এখানে ওকে রাখে একটা ছোট ঘরে–একদম একা। ওকে বলা হয় আমরা তোমার সম্বন্ধে সব জানি। কিছু গোপন করে লাভ হবে না। যা জান, যা করেছ, সব বলবে।

এখানে তেরদিন নির্জন ঘরে একাকী রাখার পর একরাতে আবুকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায় অন্য একটা জায়গায়–শেরে বাংলা নগরে ফিল্ড ইন্টারোগেশান ইউনিটে। এখানেও কাটে তেরটা দিন। এই তেরদিন আবুকে ঘুমোতে দেওয়া হয় নি, শুতে দেয়া হয় নি, কড়া বাতি চোখের সামনে জ্বালিয়ে অনবরত ইন্টারোগেশান চলেছে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন, এলোপাতাড়ি প্রশ্ন, এলোমেলো প্রশ্ন কয়েক ঘন্টা প্রশ্ন করে, তারপর কাগজ-কলম দিয়ে বলে, লেখ, যা জান সব লেখ। লেখা পছন্দ না হলে নির্যাতন। বেশ খানিক নির্যাতন করে লেখা কাগজ ছিঁড়ে ফেলে আবার লিখতে বলে।

এরপর তাকে এয়ারপোর্টের উল্টো দিকে প্রাদেশিক সংসদ ভবনের কাছে একটা বাড়িতে নিয়ে রাখে কয়দিন, আবার ফেরত নেয় কাঠাল বাগানের ব্যারাকে। সব জায়গাতেই অমানুষিক নির্যাতনের পর শেষমেষ আবুর স্টেটমেন্ট নেওয়া শেষ হয়।

আজ আবুকে ছেড়েছে। প্রথমে সে তার চাচার বাসায় গিয়েছিল। গিয়ে দেখে চাচার বাসায় বিহারি দারোয়ান বন্দুক হাতে পাহারা দিচ্ছে। চাচা পাড়ার পিস কমিটির মেম্বার। সেখানে ঘন্টাখানেকও বসে নি, চলে এসেছে এখানে।

আমি বললাম, তোমার চেহারা একদম খারাপ হয়ে গেছে। খুব লাঠিপেটা করেছে?

না, আমাকে কিন্তু লাঠি দিয়ে তেমন পেটায় নি। সবাইকে ওরা একই রকম টর্চার করে না। ওরা দেখে কার কি রকম স্ট্যামিনা, কার কি রকম সহ্য করার ক্ষমতা, কে অল্পেই ঘাবড়ে যায়, কে নার্ভাস, কে স্টেড়ি। বন্দীর সাইকোলজি বুঝে ওদের টর্চারের হেরফের হয়। তাছাড়া একজন সিনিয়ার মিলিটারি অফিসার হিসেবে আমার ফিজিক্যাল ফিটনেস ছিল পুরোপুরি। তাই ওরা অনেক অত্যাচার করেও আমাকে কাবু করতে পারে নি। তোমরা তো জান আমি চিরকাল যোগ ব্যায়াম করেছি, হেডস্ট্যান্ড করেছি।

জানি না? রুমীকে হেডস্ট্যান্ড করা তুমিই তো শিখিয়েছিলে। রুমী যোগ ব্যায়ামও কো শুরু করে তোমার কাছেই।

ওরা প্রথম প্রথম আমার ওপর কয়েকটা গতানুগতিক অত্যাচার করে দেখে আমার কিছুই হয় না। তখন ওরা অন্যরকম টর্চার করে আমাকে কী করতে চাইল। ফ্যানের সঙ্গে পা বেঁধে মাথা নিচে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখল। আমার হেডস্ট্যান্ড করা অভ্যেস ছিল বলে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে নি। ওরা পরপর তিন রাত–প্রত্যেকবার ঘন্টা তিনেক করে এভাবে ঝুলিয়ে দেখল, আমার কিচ্ছু হয় না, তখন ওরা এটা বাদ দিল। আসলে যেকোন প্রকারে আমার মনোবল ভেঙে দিয়ে আমার কাছ থেকে ওদের ইচ্ছেমত স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নেওয়াই ওদের উদ্দেশ্য ছিল। আমিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম–একদম প্রথমে যা বলেছি, শেষ পর্যন্ত তাই বলে যাব। প্রথম দিন কাগজে যা লিখেছি, শেষ পর্যন্ত তাই লিখে যাব।

অত্যাচারের চোটে আবুর হাতের আঙুলের গিঁঠগুলো মচকে গেছে, কোমরে অসম্ভব ব্যথা। সামনে ঝুঁকতে পারেনা, বসলে উঠতে পারেনা, উঠলে বসতে পারে না। শরীফ, জামী, মাসুম তিনজনেই তাকে এই বলে সান্তনা দিল যে তাদেরও প্রত্যেকের ঘাড়ে, কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা, তাদেরও হাতের আঙুল মুঠ করতে, হাঁটু ভাঁজ করতে বিষম ব্যথা লাগে।

একটা প্রশ্ন অনেকক্ষণ থেকেই গলার কাছে উসখুস করছিল, করব কি করব না করে অনেকক্ষণ গেল, শেষমেষ করেই ফেললাম, এমনকি কোন টর্চার আছে, যাতে শরীরের কোথাও কাটবে না, ভাঙবে না, কিন্তু ভেতরটা চুরচুর হয়ে যাবে?

আছে বই কি, অনেক রকম আছে। যেমন একটা হল সকিং। মোজার মধ্যে বালি ভরে মারলে শরীরে কোথাও দাগ পড়বে না কিন্তু মায়ের চোটে মনে হবে শরীরের সমস্ত মাংস—

জামী চেঁচিয়ে উঠল, মা, আবার? মামা প্লীজ, বলবেন না। মা, ওইসব শুনবে, তারপর কাঁদতে কাঁদতে ফিট হবে।

১২ সেপ্টেম্বর, রবিবার ১৯৭১

মন খুব খারাপ। আবু এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বাসা থেকে গেল এগারোটার দিকে। সকালে উঠে পরটা করে ডিম, মিষ্টি, গোশত ভুনা দিয়ে যতটা সম্ভব ভারি নাশতা খাইয়ে দিয়েছি আবুকে। করাচির প্লেন কটায় ছাড়বে আবু জানে না, তার ওপর নির্দেশ ছিল বারোটার মধ্যে তেজগাঁও এয়ারপোর্ট পৌঁছানোর।

গতকাল বিকেলে আবুকে পাগলাপীরের কাছে নিয়ে গেছিলাম। বাবার পায়ের কাছে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট রেখে সালাম করার কথা আবুকে আগেই বলে দিয়েছিলাম। বাবা আবুকে খুব খাতির করে কথাবার্তা বললেন, দোয়া করলেন, তার কোমরে ফুঁক দিয়ে দিলেন।

কাল রাতে প্রথমে নিচতলায় ডাইনিংরুমের চৌকিটায় আবুর জন্য বিছানা করেছিলাম। খানিক পরে উপলব্ধি করলাম আবু একা একা নিচতলায় থাকার চিন্তায় খুব স্বস্তি পাচ্ছে না। তখন ওকে আমাদের বেডরুমে নিয়ে গেলাম। খাটের ওপর আবু আর শরীফকে দিয়ে আমি মেঝেতে তোষক পেতে শুলাম। কিন্তু ঘুম তেমন হল না। অনেকক্ষণ কথাবার্তা, তারপর নামাজ, কোরান শরীফ পড়া, তারপর শুয়ে শুয়ে আবার কথাবার্তা। ভোরের দিকে অল্প একটুখানি ঘুম।

মাত্র বিশ ঘন্টার জন্য এসে আমাদের দুঃখক্লিষ্ট জীবনে একটুখানি আলোড়ন তুলে আবু চলে গেল তার অজানা, অনির্দিষ্ট ভাগ্যের পথে। কে জানে, করাচিতে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে। আমরা জানি না সামনের দিনগুলোতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে।

১৩ সেপ্টেম্বর সোমবার ১৯৭১

রুমীর কোন খবর নেই। প্রতিদিন পাগলা বাবার কাছে যাচ্ছি, তার পায়ের ওপর পড়ে কান্নাকাটি করছি। তিনি বেশির ভাগ সময় চুপ করে ধ্যানে বসে থাকেন, কোন কথা বলেন না। বেশি চাপাচাপি করলে বিরক্ত হন। তবু আমরা সবাই পাগলাপীরের আস্তানায় ধরনা দিয়ে বসে থাকি–আমি, মা, লালু, মোশফেকা মাহমুদ, তার মা, ঝিনু মাহমুদ, শিমুল বিল্লাহ, তাদের চার ভাই, তাদের মা, নাজমা মজিদ, মাহমুদা হক। ধরনা দিয়ে বসে থাকেন চট্টগ্রামের অ্যান্টিকরাপসান ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ডিরেক্টার নাজমুল হকের স্ত্রী, বরিশালের এ.ডি.সি, আজিজুল ইসলামের স্ত্রী, কুমিল্লার ডি.সি. শামসুল হক খানের স্ত্রী, রাজশাহীর সিনিয়ার রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মহসীন আলীর স্ত্রী, চট্টগ্রামের চীফ প্লানিং অফিসার রেলওয়ে, শফী আহমদের স্ত্রী, পিরোজপুরের এস.ডি.পি.ও. ফরিদুর রহমান আহমদের স্ত্রী, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ৪০ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের সি.ও. লে. কর্নেল জাহাঙ্গীরের স্ত্রী, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ফিল্ড ইনটেলিজেন্সের মেজর আনোয়ারুল ইসলামের স্ত্রী এবং এরকম আরো বহু। এঁদের সকলেরই স্বামী নিখোঁজ। আমরা পরস্পরের দুঃখের কাহিনী শুনি, কাঁদি, দোয়া-দরুদ পড়ি, আবার নিজেদের মধ্যে দুঃখের কথা নিয়ে আলোচনা করি, আবার কাঁদি। এত লোক আসে পাগলাপীরের কাছে! অবাক হই সারা বাংলাদেশের যত ছোবল-খাওয়া লোক–সব যেন আসে এখানে! এতগুলো লোক প্রিয়জন হারানোর দুঃখে মুহ্যমান, এদের মধ্যে বসে নিজের পুত্রশোকের ধারটা কমে যায় অনেকখানি। এক ধরনের সহমর্মিতায় মন আপ্লুত হয়ে ওঠে। সবাইকে মনে হয় আত্মার আত্মীয়, মনে হয় সবাই মিলে আমরা একটি পরিবার। পি.এস.পি, আওয়াল সাহেব আগে থেকে আমাদের পরিচিত, তিনি ও তার স্ত্রী আসেন ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে। আমি জানি, তাদের অন্য তিনটি ছেলে মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে। কিন্তু আমরা ভুলেও তাদের কথা তুলি না। উলফাতের বাবা আজিজুস সামাদ সাহেব ছাড়া পাবার পর সাদেকা সামাদ আপা তাকে নিয়ে পাগলাপীরের কাছে এসেছিলেন। আমরা তাদের কুশল জিগ্যেস করেছি কিন্তু উলফাত, আশফাঁক কেমন আছে–একবারও শুধোই নি। ভয় হয় ফিসফিস করে। শুধোলেও বুঝিবা দেয়াল গুনে ফেলবে, ইশারায় শুধোলেও বুঝিবা আকাশ দেখে ফেলবে। পাগলা বাবার কাছে নিয়মিত আসেন গায়ক আবদুল আলীম, আসেন বেদারউদ্দিন আহমদ, আসেন আরো অনেক শিল্পী। শুধু যে ছোবল খাওয়ারাই আসেন তা নয়। ছোবল যাতে না খেতে হয় তার জন্য দোয়া নিতেও বহুজন আসেন।

ফকির পাগলাপীরের ওপর প্রসন্ন নয়। আমরা পাগলাপীরের কাছে যেতে শুরু করেছি শুনেই প্রথমদিনে মন্তব্য করেছিল : ও বাবা, বহুত এক্সপেনসিভ পীরের কাছে গেছেন। ওর বন্ধু আমিনুল ইসলাম নিয়মিত পাগলাপীরের কাছে যায়, সেটাও ফকিরের পছন্দ নয়। এই নিয়ে আমিনুল ইসলামের সঙ্গে তার প্রায় তর্ক হয়। ফকিরের দৃঢ়বিশ্বাস পাগলাপীর পাক আর্মির দালাল। সেদিন যে তিনি পাঞ্জাবি সার্জেন্টের সঙ্গে আমাদের দুজনকে ক্যান্টনমেন্টে পাঠাতে চেয়েছিলেন রুমীকে আনার জন্য, সেটা ওঁর স্রেফ ভাওতা। আসল উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে বাঘের খোপে ঢুকিয়ে দেওয়া। কিন্তু আমিনুল ইসলাম এবং আমরা কেউই ফকিরের কথায় কান দিই নি এবং পাগলা বাবার ওপর বিশ্বাসও হারাই নি।

শরীফদের আরেক বন্ধু আগা ইউসুফ আগে যখন আর্মিতে ছিলেন, তখন তাঁর বস্ ছিলেন, আজকের সামরিক আইন প্রশাসক লেঃ জেনারেল নিয়াজী। ঐ সময় নিয়াজীর সঙ্গে আগার বেশ হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। আগা ইউসুফ অনেক দিন হয় আর্মি থেকে রিটায়ার করে বর্তমানে আই.পি.বি-র চেয়ারম্যান। লেঃ জেঃ নিয়াজী ঢাকায় আসার পরপরই আগা ইউসুফকে খোঁজ করে তার বাসায় চা খেতে ডেকেছিলেন। শরীফের সঙ্গে আগা ইউসুফের প্রায় দেখা হয় ঢাকা ক্লাবে। শরীফ এবং ফকির তাকে অনুরোধ করেছে–নিয়াজীকে বলে রুমীর খবরটা বের করার চেষ্টা করতে।

১৪ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১

একটা রক্ত হিম করা গুজব কানে এল। চার সেপ্টেম্বর রাতে নাকি অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। পাঁচ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, তা নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে নাকি মতভেদ ছিল। একদলের মত ছিল এই সব দেশদ্রোহী দুষ্কৃতকারী কোনভাবেই সাধারণ ক্ষমা পাবার যোগ্য নয়। এদের ক্ষমা করে ছেড়ে দিলে দেশের সমূহ ক্ষতি। তাই প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা হবার আগের রাতেই তাড়াহুড়ো করে প্রায় শখানেক দেশদ্রোহীকে প্রাণদণ্ড দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে।

গুজবটা শুনে প্রথমে আমরা সবাই স্তম্ভিত বাকহারা হয়ে রইলাম। খবরটার সত্যাসত্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম। তাহলে, শিমুল যে বলেছিল, চার সেপ্টেম্বরের রাত থেকে আলতাফ মাহমুদকে রমনা থানায় আনে নি, সে খবরটার মূল তাৎপর্য এই? তাহলে কি সত্যি সত্যিই ঐ চার সেপ্টেম্বরের রাতেই আলতাফ, বদি, জুয়েল, আজাদ, রুমী–?

আজাদের মার কাছে ছুটলাম। উনি বললেন, আজাদ ধরা পড়ার পর প্রথম সপ্তাহেই মাত্র দুদিন তিনি লুকিয়ে রমনা থানার জানালার বাইরে থেকে আজাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন, তার পর আর সুযোগ পান নি। তিনি জানেনও না, আজাদকে এখনো রমনা থানায় আনে কিনা।

চুল্লুর ভাবী ইশরাতও আর কোন খবর বলতে পারল না। যে ভদ্রলোক এর আগে একটু ছিটেফোটা খবর এনে দিতেন, তাকেও অনেক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে খবর জানতে হত। তারও বোধ হয় কিছু অসুবিধে হয়ে গেছে।

কি করি? কার কাছে যাই? আগা ইউসুফ সাহেব চেষ্টা করবেন বলেছেন। তবে তার অসুবিধে হল নিয়াজী নিজে থেকে তাকে চা খেতে না ডাকলে তিনি নিয়াজীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। শুধু রুমী নয়। আহাদ সাহেব এবং সাইদুল হাসান সাহেবের খবর এনে দেবার অনুরোধও রয়েছে তার কাছে।

পাগলা বাবা কিন্তু ক্রমাগত বলে যাচ্ছেন ও গুজব সত্যি না। ওরা সবাই বেঁচে আছে। কিন্তু পাগলা বাবার কথায় ষোল আনা ভরসা করতে মন যেন আর সায় দিতে পারছে। পাগলা বাবার কাছে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের মনে যেন মাঝে মাঝে কেউ বলছে : রুমী নেই, আলতাফ নেই, জুয়েল নেই, বদি, বাশার, হাফিজ নেই, আজাদ নেই, নেই, নেই, ওরা কেউ নেই।

রুমী নেই? এই নবীন বয়সে–যখন পৃথিবীর রূপ-রস-মধু-গন্ধ উপভোগ করার জন্য সবে বিকশিত হচ্ছিল, তখনই সে নেই? এই সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ থেকে তার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ক্লাস করার কথা। তার বদলে চার তারিখে কোথায় গেল সে?

মনে পড়ল, ডাইনিংরুমের এই চৌকিটার সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েকদিন আগে ২৮ আগস্টে সে বলেছিল, যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না। হয়তো জীবনের পুরোটা তোমাদের মত জানি নি, তবু জীবনের যত রস-মাধুর্য–তিক্ততা-বিষ সবকিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যে পেয়েছি।

সেদিন সেই বিষন্ন বিকেলে রুমী চৌকির সামনে মেঝেতে পায়চারি করতে করতে বলেছিল তার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম-বিরহ-মিলন-বিচ্ছেদের এক অনুক্ত কাহিনী।

একটি পরমা সুন্দরী মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চেয়ে দুএক ক্লাস ওপরে পড়ত, সেই মেয়ে তাকে হাতে ধরে প্রেমের আনন্দ-বেদনার রাজ্যে প্রবেশ করিয়েছিল। শেষমেষ মেয়েটি তাকে ছলনাই করেছিল, রুমী তাতে প্রচণ্ড দুঃখও পেয়েছিল। কিন্তু পরে মেয়েটির ওপর তার আর কোন রাগ ছিল না। কারণ মেয়েটি তখন তার কাছে রক্ত মাংসের কোনো মানবী ছিল না, তখন সে তার মনের মধ্যে হয়ে উঠেছিল বিশুদ্ধ প্রেমের প্রতীক স্বরূপিণী।

ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত পায়চারি করতে করতে সেদিন রুমী রবিঠাকুরের একটি কবিতার কিছু অংশ আবৃত্তি করেছিল :

যা কিছু পেয়েছি, যাহা কিছু গেল চুকে,
চলিতে চলিতে পিছে যা রহিল পড়ে,
যে মনি দুলিল, যে ব্যথা বিধিল বুকে,
ছায়া হয়ে যাহা মিলায় দিগন্তরে,
জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা–
ধূলায় তাদের যত হোক অবহেলা,
পূর্ণের পদ-পরশ তাদের পরে।

১৭ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

রেবা টাট্রুকে নিয়ে করাচি চলে যাচ্ছে আগামীকাল। মিনিভাইয়ের পাশের বাসার পড়শী লেঃ কর্নেল কেরোয়শীর ভাবভঙ্গি ক্রমেই আতঙ্কজনক হয়ে উঠছে। দ্রলোকের পড়শীসুলভ সদ্ভাব বজায় রাখার প্রচেষ্টা ক্রমেই মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মিনিভাইদের বাড়ির সব্বার দেখভাল করার দায়িত্ব যেন ওর কাঁধেই গিয়ে পড়েছে। দুবাড়ির মাঝখানের বাউন্ডারি ওয়াল বেশ নিচু। ভদ্রলোক বিকেলে লনে তো বসবেই, এদিকে মিনিভাইরা কেউ বেরোলেই সে বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে এসে চেঁচিয়ে ডেকে খোশগল্প। জুড়ে দেবে। মিনিভাইদের বাড়িতে কেউ মেহমান এলেই খানিক পরে কোরায়শীও এ বাড়িতে আড্ডা দিতে এসে হাজির হয়ে যাবে। আর জাহির, টাট্রু, সোজন, মিনিভাই রেবার তিন ছেলে যেন তারও চোখের মণি। এই ছেলেদের খবরদারির চোটেই মিনিভাই-রেবার ঘুম হারাম হয়ে উঠেছে। মার্চ-এপ্রিলের দিকে রুমী-জামীকে নিয়ে যখন এ বাসায় একটু বেশি আসতাম, তখন আমার সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল এর। টাট্রু পরীক্ষা দিতে পারে নি দেশদ্রোহী দুষ্কৃতকারীদের জন্য, করাচিতে নভেম্বরে পরীক্ষা হচ্ছে, করাচিতে টাট্রুর বাবার বিজনেস পার্টনার যখন আছেনই, তখন ছেলেকে ওখানে পাঠিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, ছেলের একটা বছর নষ্ট হবে না কোরায়শী সাহেবের এসব সুবুদ্ধির ঠেলায় মিনিভাইরা দিশেহারা।

শেষমেষ ছেলেকে নিয়ে করাচি যাওয়াই ঠিক হয়েছে। রেবা নিয়ে যাচ্ছে আগামীকাল।

২৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

ফকির বলল, ঠেটা মালেকার মন্ত্রীদের তো একেবারে কুফা অবস্থা–

জামী হেসে ফেলল, চাচা, আপনিও দেখি চরমপত্রের ভাষায় কথা বলছেন।

ফকিরও হাসল, শুধু আমি কেন রে বেটা, ঢাকায় প্রায় সবার মুখেই তো এখন এই সব কথাই শুনছি–কুফা, ফাতা ফাতা, ছ্যারাব্যারা অবস্থা, মাদারের খেইল, গুয়ামুরি হাসি, ফুচি মারা-ইঃ।! বাংলা ভাষাকে একেবারে–

ফকিরের মুখের কথা কেড়ে শরীফ পাদপূরণ করল, সমৃদ্ধ করে দিল।

আজ দুপুরে নাকি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে মন্ত্রী মওলানা মোহাম্মদ ইসহাকের গাড়িতে মুক্তিরা বোমা ছুঁড়েছে, মন্ত্রীর হাত-পা দুই-ই জখম, গাড়ির ড্রাইভার ও অন্য দুজন যাত্রীও জখম। ফকিরই খবরটা এনেছে। ২৯-৩০ আগস্ট একগাদা মুক্তিযোদ্ধা গ্রেপ্তার হবার পর ঢাকা শহর কদিন যেন মৃতি হয়ে পড়েছিল, এখন আবার জ্ঞান ফিরে পেয়ে একটু একটু নড়েচড়ে উঠছে। দশ তারিখে বাসাবো এলাকায় একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ওখানকার কদমতলী ফাড়ির পুলিশ আর রাজাকারদের বেশ বড় রকম সংঘর্ষ হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা নদীর ওপারের এক গ্রাম থেকে এসে ফাড়ি ঘেরাও করে রেইড় করে বেশকিছু পুলিশ আর রাজাকার মেরে আবার নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেছে। খবরটা আমাদের কানে আসতে কদিন দেরি হয়েছিল। নিজেদের দুঃখ-ধান্দা নিয়ে বড় বেশি মুষড়ে ছিলাম, খবরটা শুনে একটু চাঙ্গা হয়ে উঠি সবাই।

শরীফ বলল, আচ্ছা কাগজে দেখলাম শেখ মুজিবের বিচার নাকি সমাপ্তঃ মিলিটারি ট্রাইবুনাল শিগগিরই রিপোর্ট পেশ করবে প্রেসিডেন্টের কাছে। কি হবে বলে মনে হয়?

ফকির বলল, কি করে বলব? আগা মাথা কিছুই তো ভেবে পাইনা। শেখকে বাঁচিয়ে যে রেখেছে–এইটাই তো আমার কাছে প্রায় অলৌকিক মনে হয়।

শরীফ বলল, আমার মনে হয় শেখকে মারতে ওরা সাহস পাবে না, এমনিতেই ওদের এখন ছ্যারাব্যারা অবস্থা, এ সময় শেখকে মারলে আরো যে গভীর গাজ্ঞায় পড়বে, সেটুকু বুদ্ধি ওদের আছে।

২৯ সেপ্টেম্বর বুধবার ১৯৭১

আজ থেকে ঠিক তিরিশ দিন আগে তারা আমার রুমীকে নিয়ে গেছে। এই তিরিশ দিনের মধ্যে একবারও কারো কাছ থেকে ছিটেফোটা একটু খবরও পেলাম না রুমী সম্বন্ধে।

খবর নেই অন্যদেরও। পাগলাপীর যদিও সব সময় প্রবল বেগে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন যে তারা সবাই বেঁচে আছে, তবুও আলতাফ, বদি, জুয়েল, বাকের, বাশার, হাফিজ, মামুন, মজিদ, শামসুল হক, জাহাঙ্গীর–কারো সম্বন্ধেই এক ফোটা খবরও কেউ কোনভাবে পাচ্ছে না।

সুফিয়া কামাল আপার বাসায় এসেছি। ঝিনু বলেছিল উনি আমাকে দেখবার জন্য অস্থির হয়ে আছেন।

সুফিয়া কামাল আপা শব্দ করে কাঁদতে পারেননা। বড়বড় নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে যেভাবে কথা বলেন, মনে হয় ওঁর বুকের হাড়-পঁজর সব ভেঙে যাচ্ছে। এর চেয়ে যদি চেঁচিয়ে কাঁদতে পারতেন, বুঝি কষ্ট কম পেতেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে উনি একনাগাড়ে বলে যাচ্ছেন : এই তো মাত্র গেল বছর–আমরা বরিশালে রিলিফে যাব, কুমী এসে বলল, খালা আপনি একটু আম্মাকেবলুন, আম্মা তো যেতে দিচ্ছেনা–আমি তোকে বললাম, তুই বললি, আপা আপনার সঙ্গে যাবে, তাতে আমার আপত্তি কিসের? ওতো আপনারও ছেলে–হায়রে-আমারও ছেলে! কি মায়াতেই যে বেঁধেছিল। যখনি আসত, চুপিচুপি পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমো দিত মেলাঘর থেকে ফিরেই আমার কাছে এসেছিল। লুলু টুলুর সব খবর আমাকে বলে গেল–আর এই যে আলতাফ–আহা, হীরের টুকরো ছেলে–আমিই তো ঝিনুর সঙ্গে ওর বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলাম সেও আমার বুকে শেল হেনে কোথায় গেল–আলভী আহারে, আলভী যখন এল আমার কাছে–তার সারা গায়ে রক্ত–রোগা দুবলা ছেলে কি মারটাই না মেরেছে–আমার ভালোবাসার ধনগুলোকে জালেমরা এমনভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে—

আমি আপার মাথাটা বুকে চেপে বললাম, আপা, চুপ করুন, একটু শান্ত হোন–।

আমি তো শান্তই আছিরে ভাই, দেখছিস না কেমন বুকে পাথর বেঁধে রয়েছি। রান্না করছি, সংসার দেখছি, খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি। এর চেয়ে আর কত শান্ত হয়ে থাকব?

আলভী কবে এসেছিল আপনার কাছে?

যেদিন ছাড়া পায়, সেইদিন রাতেই। রানা নিয়ে এসেছিল। রানাকে চিনিস? লুৎফর রহমানের ছেলে লুৎফর রহমান–ঐ যে কবি গোলাম মোস্তফা সাহেবের ছোট জামাই—

চিনি। উনিই তো নুহেল, আলভীদের এসেম্বলি হাউসের সামনের রাস্তা থেকে তুলে আনেন।

সুফিয়া কামাল আপা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বললাম, নুহেলরা চার ভাই আর আলভী যেদিন ছাড়া পায়, সেদিন এম.পি.এ. হোস্টেলের গেট থেকে মেইন রোড পর্যন্ত ওরা হেঁটে এসেছিল। তারপর এসেম্বলি হাউসের সামনে যে মাটির ঢিপির মত আছে, সেইখানে ওরা পাঁচজন বসেছিল। ওদের শরীর এত খারাপ ছিল যে আর হাঁটতে পারছিল না। সেই সময় ঐ রাস্তা দিয়ে লুৎফর রহমান সাহেব গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। উনি দেখতে পেয়ে ওদের পাঁচজনকে গাড়িতে তুলে বাসায় নিয়ে আসেন। নুহেলদের মুখে শুনেছি এ কথা। ওদের সঙ্গে তো এখন রোজই দেখা হয় পাগলাপীরের আস্তানায়। আলভী এখন কেমন আছে? আর দেখা হয়েছে আপনার সঙ্গে?

হ্যাঁ, আরো দুবার এসেছিল। ও বোধ হয় এতদিনে আবার মেলাঘর চলে গেছে। ওর তো হাঁটবার মত অবস্থা ছিল না। ওর কিছু আর্টিস্ট বন্ধু–দেলোয়ার, কবীর–তারা তাদের বাসাতে লুকিয়ে রেখে ওর চিকিৎসা করিয়েছে। আমি আলভীর সঙ্গে গিয়াসের যোগাযোগ করে দিয়েছি। গিয়াসের ছোটভাই ডাঃরশীদউদ্দিন–সে ওপারে চলে যেতে চায়। আলভী তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ঠিক হয়েছে। অ্যাদ্দিনে চলেও গেছে। মনে হয়।

২৯ সেপ্টেম্বর,শনিবার ১৯৭১

মা বললেন, রুমীর নামে আরেকটা সদকা কোরবানি দাও। আমি বললাম, এবার একটা গরু আনাই। রুমীর সঙ্গে আলতাফ, বদি, জুয়েল ওদের নামেও কোরবানি হোক।

একটা গরু কিনে আনা হয়েছে। সলিমুল্লাহ এতিমখানা কাছেই–আজিমপুরে।

সেখানে নিয়ে গিয়ে কোরবানি দেওয়া হবে। গরু নিয়ে আমিরুদ্দিন ড্রাইভার আর একজন পিওন হেঁটে রওনা হয়ে গেল। ওদের দুজনকে বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া হল–পথে যদি কোন মিলিটারি জিগ্যেস করে গরু কোথায়, কি জন্য নিচ্ছ? শুধু বলবে এতিমখানায় নিয়ে যাচ্ছি। খবরদার কোরবানি দেবার কথা বলবে না। যদি জিগ্যেস করে কোন বাড়ি থেকে আসছ, খবরদার আমাদের বাড়ির ঠিকানা বলবে না। বলবে মোহাম্মদপুর থেকে আসছি।

আধঘন্টা পরে মাসুমের হাতে রুমী, আলতাফ, বদি, জুয়েল, আজাদ, বাশার ও হাফিজের নাম লেখা কাগজ দিলাম। বললাম, কোন বাড়ি থেকে গরু এসেছে, বোলো না।

মাসুম বলল, তাতো হবে না। ওদের তো খাতায় ঠিকানা লিখতে হয়।

তাহলে যাহোক একটা বানিয়ে ঠিকানা দিয়ে দিয়ো–মোহাম্মদপুরেরই দিয়ো। আর ঈমাম সাহেবকে বোলো কোরবানির পর গোশত যেন বেঁধে এতিমদের খাওয়ানো। হয়। চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে কোথাও কোন মিলিটারি দাঁড়িয়ে আছে কিনা। কোরবানি হওয়া মাত্রই সরে পোড়। আর পৌঁছেই আমিরুদ্দিদের চলে যেতে বোলো।

মিলিটারির সম্ভাব্য সন্দেহের হাত থেকে বাঁচবার জন্য এতসব আটঘাট বাঁধা। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সদকা কোরবানি দেবার অপরাধে আবার না ধরে নিয়ে যায়!

বুড়া মিয়াকে খবর দিয়ে আবার আনানো হয়েছে। বাসায় একটা চব্বিশ ঘন্টার বাঁধা কাজের লোক না থাকলে শুধু ঠিকা রেণুর মাকে দিয়ে আর চালানো যাচ্ছে না। তাছাড়া মা, লালুই বা আর কতদিন নিজের বাড়ি ছেড়ে এখানে থাকবে? সামনে রোজা আসছে।

বুড়া মিয়া গত ষোল বছর ধরে আমাদের বাসায় বাবুর্চির কাজ করেছে। আলসারে কাহিল হয়ে এ বছরই জানুয়ারি মাসে বাড়ি চলে ণিয়েছিল। বাবুর্চির কাজ করলেও বুড়া মিয়া খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক। ধবধবে সাদা চুলদাড়ি আর রাশভারী ব্যবহারে ওকে মুরুব্বির মত লাগে। বুড়া মিয়া আসাতে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। বাড়িঘর নির্দ্বিধায় ওর হাতে ফেলে যখন-তখন বেরুনো যাবে। এমনকি দরকার হলে পালানোও যাবে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *