০৭. গেলাম, গেলাম, পড়ে গেলাম

গেলাম, গেলাম, পড়ে গেলাম, কিছুতেই রেলওয়ে ব্রীজের কাঠের স্লীপার ধরে আর বলতে পারছি না, দাঁত মুখ চেপে, তলপেট সিঁটিয়ে, সমস্ত শরীরটাকে শক্ত করে, কিছুতেই শূন্যে ঝুলে থাকতে পারছি না। অনেক অনেক উঁচু ব্রীজ, অনেক নীচে নদী, কিন্তু পড়লে, ও বাবা, পড়তে পড়তেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাব, জলে পড়বার অবসর পাব না, আর পড়লে কোথায় তলিয়ে যাব অথচ স্লীপারে এন্‌জিনের তেল পড়ে পড়ে এমন পেছলা হয়ে গিয়েছে, ক্রমেই হাতটা সরে আসছে, আঙ্গুলের শক্তি কমে যাচ্ছে, তার ওপরে। এই সিঙল লাইন, গাড়িটা ক্রমেই এগিয়ে আছে, যে কারণে, আমি স্লীপার ধরে ঝুলে পড়েছিলাম, পাশে দাঁড়াবার জায়গা ছিল না, ভেবেছিলাম গাড়ি চলে গেলে আবার উঠে দাঁড়াব, কিন্তু থাকতে পারছি না, আমার গা কাঁপতে শুরু করেছে, এখনই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আর ব্রীজের ওপরে এসে পড়া গাড়িটার ভাইব্রেশন, আমার হাতকে আরো জোরে খসিয়ে দিচ্ছে। আমি একবার ওপরের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলাম, উঃ, কী ভয়ংকর ঝকঝকে নীল আকাশ, চোখটি ধাঁধিয়ে গেল—কিন্তু পড়ে যাচ্ছি—না না না….উ-ই-আ, খুলে গেল হাত, পড়ে যাচ্ছি, পড়ছি… জল, নিশ্চয়ই জল…

হঠাৎ সমস্ত শরীরটা থপাস্‌ করে এক জায়গায় পড়ল, ঝাঁকুনি আর খিচুনি, একসঙ্গেই লেগে, চোখ মেলে তাকালাম। অন্ধকার, কিন্তু হাত পা নাড়তে ভয় লাগছে, অনড়, নিশ্চল হয়ে পড়ে আছি, বুকের ভিতরটা ধক্‌ধক্‌ করছে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ, এবং কয়েক মুহূর্ত সেইভাবে থাকতে থাকতেই, আচমকা একটা নিঃশ্বাস পড়ল, আর আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, যাঃ শালা স্বপ্ন মাইরি। তারপরে দেখলাম, বিছানার চাদরটা দু হাতে মুঠো করে ধরে আছি, আর গলার এবং ঘাড়ের কাছ ঘেমে উঠেছে। উল্লুক! স্বপ্নটাকেই বললাম বা নিজেকে, তা ঠিক জানি না, কিন্তু একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল, এবং পাশ ফিরে শুলাম। ব্রীজ থেকে পড়ে যাওয়ার স্বপ্নটা আর একবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল, ‘উরে ফাদার’ মনে মনে, বললাম, হাপিস হয়ে যাচ্ছিলাম তারপরে বেশ গুটিশুটি হয়ে শুতে শুতে ভাবলাম, মালের খোয়ারি এর থেকে ভাল, শয়তানটার আর স্বপ্ন ছিল না নাকি। যদিচ শয়তানটাকে আমি চিনিই না, যে স্বপ্নের আমদানি করে। যাকগে, এতক্ষণে নীতার ঘরটা বোধই…নাঃ চোখ জুড়ে যাচ্ছে, ঘুম আসছে আবার।

আরে, আশ্চর্য, এসব জায়গা জলে ডুবে গিয়েছে কবে, বা কী করে, আমার কোন ধারণা নেই, অথচ আমি প্রত্যেকটা জায়গাই চিনতে পারছি, যদিচ সবই জলে তলায়, আর আমি যেন একটা মাছের মাতে, জলের তলা দিয়ে চলেছি। ঠিক যে ভয়ে ভয়ে চলেছি, তা নয়, বরং একটা গা শিউরনো, ঘিনঘিনে ভাব নিয়ে, পচা হলদে জলের তলা দিয়ে, যেমন ডুব সাঁতার দিয়ে চলে, তেমনি ভাবে, কখনো কাত হয়ে, কখনো উপুড় হলে, গা বাঁচিয়ে চলেছি, কারণ ডুবে যাওয়া কলকাতার এইসব এঁদো রাস্তায়, হলদে রং-এর অনেক শুকনো পাতা, গাছের ডাল পড়ে রয়েছে, এবং এখানে সেখানে কেঁচো বা বিষহীন সব সা দলা পাকিয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে শাদা কৃমির দলাও কিলবিল করছে, সেগুলো, যেন এই ধারের নদ নর্দমায় ছোট ছোট ছেলেলেয়েদের পেট থেকেই এককালে বেরিয়েছিল, কারণ নর্দমাগুলো আমি পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছি, এবং সেই মস্তবড় গাছের গুঁড়িটা, যার ধার ঘেঁষেই সেই একটা মন্দিরের রক, যে রকের পলেস্তরা এক এক জায়গায় খসে গিয়েছে, লাল ইঁট দেখা যাচ্ছে। জলটা, কী বলব, যাকে বলে, ‘পঙ্কিল’ সেই রকম, হলদে আর পচা পচা গন্ধ, এবং আমার ডুবে ডুবে যাওয়ার জন্যে, জল নাড়া খাওয়া, হলদে পাতাগুলো মাটি থেকে উঠে আসছে, আমার গায়ে লেগে যেতে চাইছে। কিন্তু যাতে না লাগে, আমি সেই চেষ্টায় তাড়াতাড়ি পার হয়ে যাচ্ছি, এবং একরকম পার হতে গিরে কেঁচো সাপ কৃমি যদি হঠাৎ গায়ে লেগে যায়, সেই ভয়ে খুব সাবধানে চলতে হচ্ছে, যদিচ, ওরা ওদের মনেই আছে, আমার গায়ে এসে পড়ার কোন চেষ্টাই ওদের নেই। জলে কোন স্রোত নেই, তাই ওদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না, সবই যেন স্থির, সবই পরিস্কার দেখা যায়, আর একেবারে চুপচাপ, যাকে বলে নিঃশব্দ, ঝিঁঝিও ডাকছে না, এবং সবই মিলিয়ে, এটা একটা কেমন ব্যাপার, তা আমি জানি না, বা আমি যে কোথায় চলেছি, জলে ডুবে যাওয়া আমার চেনা রাস্তা দিয়ে, আমি কিছুই জানি না, কেবল এই টুকুই আমি জানি, আমি যেন লুকিয়ে একটা জায়গা পার হয়ে চলে যাচ্ছি। অবিশ্যি, এটা জানি না, আমার লুকিয়ে যাবার জন্যেই এসব রাস্তাঘাট জলে ডুবে গিয়েছে কি না, এবং জলে ডোবা এসব গলিগুলোর বাড়ির কোন দরজাই আমার চোখে পড়ছে না… চলেছি, চলেছি, তারপরে সবই অন্ধকারে হারিয়ে গেল, আমার আর কিছুই খেয়াল রইল না, আমি যেন কোথায় ডুবে গেলাম।

তারপরেই হঠাৎ, আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম রাসবিহারী এ্যাভিন্যুর ওপরে, ট্রাম লাইনের ধারে, কারণ, অনেক লোক হৈ হৈ করে একটা লোকের পিছনে ছুটছে, আমার দৃষ্টি সেই লোকটার দিকে, যাকে সবাই তাড়া করছে, বেশ লম্বা শক্ত চেহারার এক জন যুবক, ময়লা পায়জামা আর সার্ট তার গায়ে, চুলগুলো ঝাঁকড়া, এবং সত্য বলতে কি, এই যে কী বলে, আজানুলম্বিত বাহু লোকটাকে দেখে আমার সেইরকম মনে হচ্ছে, এমন কি, এ কথাও হনে হল, ওই লোকটাকে অর্জুনের পার্ট দিলে মানাবে, যদিচ, কেন এ কথা আমার মনে হল, তা জানি না, কারণ ও ধরণের ভীম অর্জুন ইত্যাদি সেজে থিয়েটার করা বা দেখা, কোনটাই আমার কোষ্ঠিতে নেই, কিন্তু এমনও হতে পারে, কার আঁকা ছবি যেন আমি দেখেছিলাম, ফুল ফোটা ঘাস বনে, অর্জুন উপুড় বা কাত হয়ে এলিয়ে পড়ে আছে, আর তার সামনেই, কী যে বলে আবার তাকে, হ্যাঁ, স্খলিত বসন চিত্রাঙ্গদা যেন এখন আলস্যে খোয়ারি কাটাচ্ছে। সেই ছবিটার অর্জুনই বোধহয় আমার চোখে ভেসে উঠল, তাড়া খাওয়া লোকটাকে দেখে। লোকটা লরীর ড্রাইভার, সে যেন কাকে চাপা দিয়েছে, এবং তারপর মারমুখী জনতার কয়েক ঘা খেয়েই সে দৌড়ুতে আরম্ভ করেছে নিজেকে বাঁচাবার জন্যে। তার কানের পিছন থেকে রক্ত পড়ছে, সকালের রোদে আমি তা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, এবং আমিও যেন দাঁতে দাঁত চেপে লোকটার সঙ্গে দৌড়ুচ্ছি, যদিচ এক জায়গাতেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি, বুকের মধ্যে ধকধক করতে আরম্ভ করেছে, ঘামতে আরম্ভ করেছি, আর লোকটার সঙ্গে দৌড়চ্ছি, এবং একটা বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। যদিচ লোকটাকে এখন আর আমি দেখতে পাচ্ছি না, তবু সে যে ফ্ল্যাট বাড়িটার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উঠছে, তা যেন আমি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি, দোতালা, তেতালা পার হয়ে, হঠাৎ আর কোন পথ না দেখতে পেয়ে, সামনের দরজা খোলা বাথরুমে সে ঢুকে পড়ল দরজাটা বন্ধ করল, কিন্তু এই মেরেছে, ভিতর থেকে বন্ধ করার কোন হুড়কো বা ছিটকিনি নেই, ওদিক রাস্তার মারমুখী লোকেরা, বাড়ির বাসিন্দারা, সবাই উঠে আসছে চীৎকার করতে করতে, ওই যে শালা, ও দিকে, শুয়োরের বাচ্চাকে ধরা গেছে মাইরি, হিঃ হিঃ হিঃ যেন রাগে ঘৃণায় আর খুশিতে সবাই ফেটে পড়ছে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাথরুমের দরজার ওপরে, আর লোকটা শবীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজাটা চেপে ধরেছে। আমিও যেন লোকটার সঙ্গে দরজা চেপে ধরলাম, জোরে, আরো জোরে, আরো…ব্যাস্‌, সুতো থেকে, ঘুড়ি কেটে যাওয়ার মত আমি কোথায় যেন ছিঁড়ে গেলাম, অন্ধকারে তলিয়ে গেলাম, কিছুই আর আমি দেখতে পেলাম না, আমি নিজেকে নিজেই হারিয়ে ফেললাম।…

তারপরেই, কে অচেনা মেয়েটির গায়ে হাত দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার এক হাত তার কোমরে, আর এক হাত কাঁধে–কাঁধের হাতটার কনুই মেয়েটির বুকে ঠেকে আছে, আর মেয়েটি বুকে ঠেকে আছে, আর মেয়েটি লজ্জা লজ্জা মুখে হাসছে, চোখের দৃষ্টি নিচের দিকে। জায়গাটা কোথায়, মেয়েটাই বা কে, তা আমি কিছুই জানি না, কেবল এই টুকুই দেখছি মেয়েটির বয়স বাইশ-চব্বিশের মধ্যেই, চেহারাটি বেশ ভালই, শরীর-টরীর, যাকে বলে, বেশ উচ্চ মাগে তুলে দেবার মতই, মনে হল আমার, আমি তাকে চুমো খেলাম। সে আমার দিকে তাকাল, ঠোঁট তুলে, যাকে বলে প্রতিদান, তাই দিল, এবং আমি তাকে চিনতে পারলাম না, অথচ আমাদের যে পরিচয় আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই, আর আমরা যে একটা উদ্দেশ্যেই এরকম মিলেছি, তাও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, যে কারণে, তাকে আমি বুকে নিলাম, সে আমার গলা জড়িয়ে ধরল, এবং সত্যি বলতে কি, আমার শরীরে যেমন শক্তি নেই, মেয়েটাকে জব্বর ভারী মনে হল, বিছানা পর্যন্ত নিয়ে যেতে রগ ছিঁড়ে যাবে মনে হল, তবে একবার নিয়েছি, তখন ফেলে দেওয়া যায় না, যদিচ মেয়েটির মুখে হাসি, আমার কষ্ট সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নেই বা মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মনে হল, আমি খাইনি। মেয়েটিকে বিছানায় নিয়ে আমি যখন প্রেমে লিপ্ত হলাম, তখন দেখলাম, মেয়েটা নীতা। অথচ তাতে যে অবাক হলাম, তা নয়, যেন আমি নীতার সঙ্গেই প্রথম থেকে রয়েছি, এবং নীতা যেন ঢেউয়ের মত ফুলে ফুলে উঠছে, পাগলের মত আমার সারা মুখে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে, আর আশ্চর্য, আমি যেন কেঁদে ফেলব, এইরকম মনে হল …তারপরেই আমি যেন কোথায় কোন, অন্ধকারে ডুবে গেলাম, কোন সুখের স্রোতে নাকি কিসের মধ্যে হারিয়ে গেলাম, তবে একটা, যাকে বলে, উন্মত্তের মত মিলনের সুখে ডুব গিয়ে, কোথায় তলিয়ে গেলাম।…

আমি একটা দেয়ালের পাশে লুকিয়ে রয়েছি, এবং একটুও অবাক না হয়ে দেখছি, আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা, আমার থ্যাতলানো শরীরটা পড়ে রয়েছে। অনেক লোক, সেখানে জমা হয়েছে অনেক মেয়ে আর পরুষ, তারা সব জানারকমের কথা বলাবলি করছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, কিন্তু আমি মিটিমিটি হাসছি। এটা যেন একরকমের খেলা, সকলেরই এরকম হয়ে থাকে। এমনি একটা স্বাভাবিক ঘটনার মতই, মানুষের সমাজে একটি সাধারণ লুকোচুরি খেলার মত খেলা করছি, যেন সকলেই নিজের মৃত্যু দেখে থাকে, নিজের শব দেখে থাকে, এবং আমার মত এমনি করে লুকিয়ে দেখে থাকে, একমাত্র বৈশিষ্ট্য হল কে কী ভাবে মরছে, যে কারণে এখন লোকেরা ভিড় করে আমার শব দেখছে। সকলেরই চোখে মুখে যেন একটা ঘৃণা আর ভয়ের ভাব। সেটা কেন, বিশ্রী দেখতে আমার শবের জন্যে, নাকি আমাকে পিটিয়ে মরে ফেলার কথা ভেবেই, তা আমি জানি না, কেনই বা আমাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, তাও আমি জানি না, কেবল খুব অস্পষ্টভাবে এইটুকু মনে পড়েছে, আমি গর্তের মধ্যে ছিলাম, সেখান থেকে যেই বেরিয়েছি, তখনই আমার মাথায় ডাণ্ডা পড়ল, কারা যেন আমাকে পিটতে লাগল, আমি কোন প্রতিবাদ করলাম না। অথচ আমি তো বেঁচেই রয়েছি, সকলেই তাই থাকে, যেন সকলেই এক একবার এক এক রকম করে মরে, এবং এসব মোটেই খুব অদ্ভুত লাগল না। তারপরেই হঠাৎ পিঠে চিমটি মেরে ফিরে দেখি নীতা, ঠোঁট ফুলিয়ে চোখ পাকিয়ে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে, বলল, ফাজিল, খুব মজা লাগছে দেখতে, না? আমি হেসে উঠলাম এবং তারপরেই আবার অন্ধকারে হারিয়ে গেলাম, কোন চেতনা রইল না।

দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ শুনে আমার ঘন ভেঙে গেল, এবং প্রথমেই মনে হল আমি যেন কোথায় কোথা ঘুরছিলাম, তাদের সঙ্গে কী সব করছিলাম। একমাত্র নীতাকে বুকে নিয়ে শোয়া ছাড়া আর আমার কিছুই মনে পড়ল না, কারণ আমি বোধহয় নানারকম স্বপ্ন দেখছিলাম, (নির্ঘাত পেট গরম বা উর্ধ্ব বায়ু যাকে বলে।) এবং দুই একটি স্বপ্নের চিহ্নই, আমার সব কিছুতেই রেখে গিয়েছে। অথচ সারাটা রাত্রি যে অনেক ঘটনার মধ্য দিয়া কেটেছে, সেটা, যাকে বলে খুবই স্তিমিত ভাবে আমার মনে পড়ছে। ঘুম ভাঙার প্রথম চমকটা কাটবার পরেই, আমি ঘরের চারপাশে তাকালাম, এবং তৎক্ষণাৎ আমার নজর চলে গেল ঘরের মেঝের দিকে, যেখানে জামাটা পুড়িয়েছিলাম, দেখলাম, সেখানে কোন দাগ নেই। খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বেলা বোঝবার চেষ্টা করলাম। ঠিক বুঝতে না পারলেও, রোদ দেখে অনুমান করলাম, একটু দেরী হয়েছে উঠতে, আর দেরী হলেও, অনেক ঠাকুর বা বিদিশা কিংবা মা দরজায় ধাক্কা দেয়। আমি শুয়েই জিজ্ঞেস করলাম কে?

আমি খুকু, আটটা বাজে।

আমি কোন জবাব দিলাম না, বিদিশাও নিশ্চয় দাঁড়িয়ে নেই, কেবল জাগাবার প্রয়োজনেই ও এসেছিল, যদিও অন্যান্য দিন দরজার কড়া নাড়ার শব্দে আমি এতটা চমকাই না এবং শুধু তাই নয়, ঘুমিয়ে ওঠার পর যেরকম একটা ভার ভার আমেজ থাকে, আমার সেরকম মোটেই হচ্ছে না, যেন এই মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আর এইমাত্রই উঠলাম। অবিশ্যি, তাতে আমার কোন শারীরিক অস্বস্তি আছে বলে মনে হল না, কেবল যে আমেজটা থাকলে ঘুমিয়ে উঠেছি বলে মনে হয়, সেরকম বোধ হচ্ছে না। তবে কাল রাত্রের থেকে, এখন আমার শীতটা বেশী লাগছে। তাই ঘাড় কুঁকড়ে উঠে, আগেই টেবিলের সামনে গিয়ে ঘড়ি দেখলাম, পৌণে আটটা। সত্যি, অনেক বেলা হয়েছে, পৌনে নটা থেকে নটার মধ্যেই শুয়োর চেঁচানোর মত জীপের হর্ণ শোনা যাবে, যদিও একবারই বাজবে, এমন নয় যে ভাড়াটে যাত্রীকে তাড়া দেবার জন্যে ঘন ঘন বাজবে, তবু এখনই মিঃ চ্যাটার্জির মুখটা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে। লোকটাকে আমি কোনদিন দেখিনি যে, জীপ গিয়ে পৌঁছুবার পর দু চার মিনিট দেরি হয়েছে, বরং কোন কোন দিন বাড়ির গেটের সামনেই লম্বা লোকটা ধবধবে সাদা চোখে, (এত সাদা যে, মনে হয় এক ফোটা রক্ত নেই কৃমিতে সব খেয়ে ফেলেছে।) গোঁফদাড়ি কামানে। তৈলাক্ত গম্ভীর মুখে (নির্ঘাত গাদা সরষের তেল মাখে।) দাঁড়িয়ে আছেন। বেশ বোঝা যায় লোকটা অসুখী তো বটেই, আর সেই অ-সুখের কথাই মনে মনে চিন্তা করেছেন এবং রাত্রে যে ঘুম হয়নি, যতই গম্ভীর হয়ে থাকুন, আর দাড়ি কামান, সেটা ঠিকই চোখের কোলের গর্তে ধরা পড়ে যায়, সব মিলিয়ে, কী বলা যাবে, একটি বিক্ষুব্ধ পৌঁঢ় অথচ কার ওপরে যে শোধ নেবেন, তা ঠিক করে উঠতে পারছেন না বলেই যেন, বয়সের ভারে, শান্ত থাকবার চেষ্টা করেছেন। যদিও শান্ত নন একেবারেই, যেটি বোঝা যায়, অনবরত চোয়াল নাড়া, আর বুড়ো আঙুলের ডগা ঘষায়।

মুখটা মনে পড়তেই ড্রয়ার থেকে টুথব্রাশ পেস্‌ট টেনে নিলাম। (বাথরুমের ভিড়ে রাখতে ঘেন্না করে, তাই ড্রয়ারে।) কারণ আর একটুও সময় নেই, আর এ সময়ই আবার দরজায় ধাক্কা লাগল। খুলে দেখলাম, ঠাকুর চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চায়ের কাপটা নিতে গিয়েই, এর দিকে আমি একবার ভাল করে তাকালাম, তার তাকালেই গেঁয়ো মেয়েদের মত ও যেমন চোখ নামিয়ে নেয়, সেভাবেই চোখ নামিয়ে নিল। নিয়ে তাড়াতাড়ি আমার সামনে থেকে চলে গেল। ওর ভাবভঙ্গিগুলো এমন মেয়েলি, চেহারাটাও প্রায় তাই। আমার ধারণা, আমার এই মনোভাবটা জানে বলেই চোখ তুলে তাকাতে পারে না, তা ছাড়া এমনি, মাতাল বলে ভয় তো আছেই, যদিও কোনদিনই আমাকে মাতাল দেখতে পায়নি, মুখে গন্ধ আর চোখ লাল দেখেছে কেবল। ওর এই ভয়, সঙ্কোচ, লজ্জা, এসবই আমার বেশ ভাল লাগে, যাকে বলে, বেশ এনজয় করি, কারণ ঠিক যে কারণে একজন দুর্বল অসহায়কে দেখলে তাকে করুণা করতে ইচ্ছে করে, করুণা করতে ভাল লাগে, এ অনেকটা সেই রকমেরই, কিংবা অনেকটা বোধহয় পোষা পশুপাখি নিয়ে খেলা করার মতই আনন্দ উপভোগ করি।

বাসি মুখে চা গিলেই, পেস্‌ট মাখানো ব্রাশটা মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। ব্রাকেট থেকে তোয়ালেটা টেনে নিয়ে, বাথরুমে ছুটলাম। যখন বেরিয়ে এলাম, তখন সাড়ে আটটা। আবার দরজা বন্ধ, জামা কাপড় পরা। যাকে বলে টাই-টু-টো, পুরোপুরি সাহেব সাজা। হ্যাঁ, মুখে একটু স্নো পাউডারের ব্যাপারও আছে, সব কিছু শেষ হতে না হতেই শুয়োরের চেঁচানি শোনা গেল। খাবার ঘরের দিকে ছুটতে ছুটতে চাকরকে বললাম, ড্রাইভারকে অপেক্ষা করতে বল, খেয়ে আসছি।

খাওয়া মানে, জলখাবার, ব্রেকফাস্ট যাকে বলা যায়। বিদিশাকে দেখা গেল খাবার ঘরে, ঠিক আমার জন্যই নয়, অন্যাদের ব্যবস্থার জন্যেও নিশ্চয়। আর সম্ভবত মা এখন আসবে না, কারণ, এখনো জেগে আছে, এটা আমাকে জানানো দরকার, অন্যথায় অন্যান্য দিন মা-ই থাকে, বিদিশা থাকে নিজের তালে। তাল মলে বেকার মেয়ের, সবাইকে (প্রেমিকদের) সামলানো যা যা চিন্তা ভাবনা, কাকে ফোন করবে, কোন সময় দেবে, কী বলবে, যদিও খবরের কাগজটা হাতে থাকবে, এবং খবরের চেয়ে প্রসাধন পোশাকে সিনেমার বিজ্ঞাপনের দিকেই লক্ষ্য থাকবে, এসব নিয়েই সকালটা কাটে। অন্তত যতক্ষণ বাড়ির অন্যান্য ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে বেরিয়ে না যায়, ওর সে-পাঠ দুবছর হল চুকেছে। শী ইজ গ্রাজুয়েট যাকে বলে। খবরের কাগজটা বাড়ির সবাই পড়ো যতদূর মনে পড়ে, বছর দুয়েক আগে আমিও পড়তাম, তারও আগে, খবরাখবর নিয়ে ভীষণ যাকে বলে, চিন্তিত উত্তেজিত (কী নয়।) হয়ে উঠতাম। বাবা, বিদিশা, সকলের সঙ্গেই তর্ক পর্যন্ত করতাম, যা ভাবলে এখন হাসি পারি। এখন প্রায় ভুলেই যেতে বসেছি, খবরের কাগজ বলে একটা জিনিস আছে, পৃথিবীর খবর যাতে থাকে, যা জানবার জন্য একদা প্রচুর কৌতূহল ছিল, এখন আর চিহ্নই নেই আমার মনের মধ্যে। কোন কোন সময় যে চোখের সামনে তুলে ধরি না, তা নয়। অনেক সময় খানিকটা অভ্যাসবশেই, আবার অনেক সময়, শুধুমাত্র কোন অনাহূতকে ব্যস্ততা বা ব্যস্ত অন্যমনস্কতা বোঝাবার জন্যেই, কিংবা কোন অপরিচিত বিরক্তিকর পরিবেশে মুখটা আড়াল করার নেই। কিন্তু সংবাদ বা বিজ্ঞাপন (একমাত্র ভাল কোন মেয়ের ছবি ছাড়া) কিছুই চোখে পড়ে না। অনেকটা, কী বলব, অনেকটা হাঁপিয়ে পড়ার মত মনে হয়। ক্লান্ত হয়ে পড়া যাকে বলে, যদিচ সংবাদপত্রই একমাত্র প্রতিদিনের বিরক্তি কাটাবার জন্যে, একঘেয়েমি নষ্ট করবার জন্যে, কিছু নতুন ঘটনা হাজির করতে পারে। তাও যেন আমার কাছে নতুন বলে বোধ হয় না, তার কারণ নতুন কী-ই বা থাকতে পারে, যুদ্ধ? শান্তি? শান্তি যে কেউ চায় না, সে তো খবরের কাগজ দেখলেই বোঝা যায়, যে শান্তির কথটা নেহাৎ না বললে নয়, আর যুদ্ধ করবার মুরোদ ও বিশেষ কারুর নেই, তাই শান্তির কথা বলতে হচ্ছে, অথচ যুদ্ধের প্রস্তুতি সবাই চালিয়ে যাচ্ছে। খবরের কাগজে আমি এমন একটা দেশের কথাও পড়িনি, যারা যুদ্ধের প্রস্তুতি চালাচ্ছে না। আর এটাও ঠিক, নিশ্চয় চোর তাড়াবার জন্যে কোন দেশ সামরিক প্রস্তুতি চালাচ্ছে না, আসলে সবাই প্রস্তুত থাকতে চাইছে, (গরম ফুলকো লুচি গিলছি বটে, আবার না পেট কামড়াতে আরম্ভ করে।) কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, সবাই যে যার তাল সামলাচ্ছে। এদিকে লড়াই লাগাবার মুরোদ কারুর সত্যি নেই। কারণ, ওই যে কী একটা কথা আছে না, মুরোদ বড় মান, তার ছেঁড়া দুটো কান, সব কান-কাটারাই জানে, আগে বাবা নিজের জান, কেন না, জানে, যুদ্ধ তো কইরবে মোড়ল, বেহ্মাস্ত্র থেকে বাঁচার উপায় যে নাই, তবু সবাই উতর চাপড়াচ্ছে, আর বলছে, স্‌সান্তি, স্‌সান্তি স্‌সান্তি। এই একই কথা থাকবে কোন না কোন দেশের, তারপরে পার্লামেণ্ট, অ্যাসেম্বলি, মন্ত্রিসভা, বিরোধীদল, চাল-ডাল-কাপড়-সরষের তেল, এ বলে হম সাচ্চা ও বলে হম সাচ্চা অথচ যা হবার তা হয়েই যাচ্ছে। অনেকটা পেটের ছেলের মত, কেউ রোধ করতে পারছে না, যে কারণে, এমন খবরের পাশেই নির্ঘাত বাজার অগ্নিমূল্য, গোলায় ধান নাই, তেত্রিশ লক্ষ সাইকেল বিক্রী, ফিল্‌ম স্টার বিলেত চলল গোঁফ কামতে, বিলেত থেকে একদল নাচতে এসেছে, তারপরে, নিদেন একটা মার্ডার (নীতার কথাও আমার মনে আছে, সেটাও খবরের কাগজে উঠবে, তবে হিসেব করে দেখেছি, আজ তা ওঠা সম্ভব না, কারণ পুলিশ আসবে, দেখবে, বুঝবে; খবরের কাগজকে খবর দেবে কি না ভাববে। এবং যদি দেয়, তখন এত দেরি হয়ে যাবে, গত ভোর রাত্রের মধ্যে সে খবর ছাপা অসুবিধা। বরং আগামীকালের কাগজে বেরুবার সম্ভাবনা আছে, আর যা বেরুবে, তাও আমার জানা আছে, অতএব) কিছু চুরি জোচ্চরি মারামারি, আবহাওয়া, ব্যবসা, ওফ্‌, টায়ার্ড! অথচ এক সময়ে খবরের কাগজ ঘুম ভেঙে না পেলেই, যাকে বলে কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবার অবস্থা হয়ে উঠত, প্রাকৃতিক কর্মটর্ম, অর্থাৎ পাইখানায় যাওয়া মাথায় উঠে যেত, যেটা এখনো পিতৃদেবের আছে, নিশ্চয় খবরের কাগজটি হাবড়ে নিয়ে বসে আছেন ঘরে।) ভাই-বোনেরাও তাই। ওরাও খবরের কাগজের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, স্পোর্টস আর ফিলম আর কে জানে, বার ক্যাবারের দিকেও নজর যার কি না, (আমার যেত।) এমন কি মাতৃদেবীও চোখে চশমাটি এঁটে একটি শীট নিয়ে বসে যান, (তিনিই বা পেছিয়ে থাকেন কেন!) কী খৈ পড়েন তা আমি জানি না, বা কেন পড়েন, আজ পর্যন্ত তা বুঝতে পারিনি, আর আমি (কী বলা উচিত আমাকে, এ ক্ষেত্রে, একটি ভূষি মাল!) প্রায় ভুলেই গিয়েছি খবরের কাগজ বলে একটা জিনিস আছে, যেটা রোজ খাবার পরবার মতই, অথচ কোন কৌতূহলই আমার নেই তার সম্পর্কে।

বিদিশা জিজ্ঞেস করল, তোমাকে আর লুচি দিতে বলব?

শেষ গরাস আমার মুখে, মাথা নেড়ে জানালাম, চাই না, এবং ঘড়ি দেখলাম, সেকেণ্ডের কাটাটা আরবী ঘোড়ার মত ছুটছে, আর সেই সাদা চোখ, তেলতেলে মুখ মিঃ চ্যাটার্জি (শ্যালকটি) দাঁড়িয়ে আছেন। কোনরকমে জল গিললাম, (দোহাই, এখন যে আর বাথরুমে ছুটতে না হয়।) তারপরেই চা, জলের চেয়ে বেশী গরম নয়। ঢক ঢক করে গলায় ঢেলেই ছুটে গেলাম নিজের ঘরে, ড্রয়ার থেকে গগলসটা বের করে পরলাম, দেখলাম আয়নার দিকে। দেখতে দেখতে একটা সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে ধরলাম, দ্যাটস, ফাইন উম্‌? হম্‌, পেটটা ঠিক আছে, চেহারাটা ঠিক আছে, এবার একটা পাক খেয়ে নেওয়া যাক, এবং দুবার কোমর দোলানি, একটু চোখ টেপা, তারপরে, কাম, দেয়ার ইজ দি লেনে্‌লি বীচ, ভেতর থেকেই গুনগুনিয়ে উঠল, যদিচ, কেন নির্জন সৈকতে যাবার কথা মনে পড়ল তা জানি না, চলেছি তো জনারণ্যে, মনে হলেই গা ঘলিয়ে উঠতে চায়, বেশী মানুষ দেখলেই, শরীর খারাপ করতে আরম্ভ করে যেন অনেকটা নাকে পৌঁছুবার মত। তা ছাড়াই কাকেই বা ডাকছি যাবার জন্যে, আমার এই মুহূর্তে কারুর কথাই মনে পড়ছে না, কেবল নীতার কথাটা এই মাত্র, কিন্তু (ওরে সালো।) দেরি হচ্ছে, বেরিয়ে পড়া দরকার। অথচ মনে করতেই পারছি না, কী কাজ করার আছে। আছে হয়তো কিছু, অফিসে না ঢুকলেই কিছুই মনে পড়তে চায় না, কারণ কাজটাকে তো কাজ বলেই মনে হয় না, নেহাত না গেলে টাকা, ঠাট, ঘুষ, দলবল, যা নিয়ে থাকতে হয় আর কি, সে সবগুলো হবে না, যাকে বলে জীবিকা। টাকা মানেই জীবিকা, না নইলে এক মুহূর্তও চলে না, এমন কি এখন যে ঘরটায় আছি, টাকা না আনতে পারলে, তার দরজাও বন্ধ হয়ে যাবে, এমন কি, ওরে বাবা, সব র‍্যালা রপোটই ডকে উঠে যাবে, মাল খাওয়া আর প্রেম করা (যত বেশী টাকা তত বেশী প্রেম।) আর যত খাতির পীরিত, সব হওয়া হয়ে যাবে। চাকরিটা যে কোনভাবেই রক্ষা করতে চাই। কিন্তু সত্যি বলতে চাকরিটা যেন অনেকটা ছেনালের মত, যে প্রথম দর্শনে খাঁটি প্রেমিকার মত ডাক দিয়েছিল, না ডাক নয়, ওটাকে কী বলে, আহ্বান করেছিল আমাকে বিরাট পবিত্র দায়িত্ব পালন, উন্নতি ও সুখ ও দেশের সেবা, জীবনের ভূত-ভবিষ্যৎ, যেমন খাঁটি প্রেমের, অর্থাৎ পিরিত পেরেম-এর অনেক সব থাকে, জীবনকে মহৎ পবিত্রতা দান করা ইত্যাদি, তার পরে দেখা যায়, সব মাল, সবাই সমান, সবাই এক। ঠিক মত বলতে গেলে বলতে হয় নীতার মতন, নিষ্পাপ পবিত্রতা নীতার মতন। প্রথম প্রথম সেই রকমই মনে হয়েছিল, (কিন্তু আর দেরী নয়, উল্লুকটা বেরিয়ে পড়।) এমন এক বিরাট কাজ, এমন একটা দায়িত্বের কী। বলা যার—সম্মানজনক পদ, (সিঁড়ি দিয়ে নামার আগে, একবার পিতৃদেবের ঘরের দরজার দিকে চোখ পড়ল যদিচ যাবার আর কোন প্রশ্নই নেই, গতরাত্রে বাথরুম এপিসোড বাঁচিয়ে দিয়েছে।) আমাকেও তাই জীবনের এই পরম পবিত্র সুযোগকে, যাকে বলে কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। গিয়েছিলামও তাই, (মাইরি! দুরু দুরু বুকে, অনেকটা জীবনের নতুন বাসরে যেমন করে ঢোকে, (নতুন বাসর, কী হয় ওখানে, জান না জাদু?) আমার ভবিষ্যৎ সুখ পবিত্রতা এবং সমাজের মঙ্গলার্থে দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম। আর প্রথম ফাইলের খাতটা খোলা মানেই তো প্রথম ঘোমটা খোলা, আর প্রথম সই করা মানেই তো, প্রথম চুম্বন রেখা আঁকা যাকে বলে, মনে হয়েছিল, যাঃ শালা, রাজা হয়ে গেছি একেবারে। তারপরে, ওরে বাবা! হাতী তলিয়ে যাবার গর্ত মা, (ড্রাইভারটা সেলাম করল, আমি উঠে বসতেই শুয়োরের মত একবার চেঁচিয়ে উঠে, গোঁ গোঁ করে ছুটতে আরম্ভ করল।) কোথায় এসেছ চাঁদ একবার ভাল করে দেখ, হ্যাঁ, মিথ্যে যদি না বলতে পার, দিনকে যদি রাত না করতে পার, ঘুষ যদি না খেতে পার, তাহলে কেটে পড়। তা নইলে সব প্রেম ফসকা গেরো, প্রাণ হাট্‌কে দেখ, রস নেই, স্‌সুধা নেই, বুলি কপচাতে হয় ময়দানে চলে যাও। তাই কখনো যাই? যা শুনে এসেছি বরাবর, নেহাত উল্লুক বলে, সেসব আবার বিশ্বাসও করে বসেছিলাম, তাই যাকে বলে হকচকিয়ে যাওয়া, তাই গিয়াছিলাম, তারপরেই হাবড়ে পড়ে রইলাম, কারণ তাই কখনো যাওয়া যায় নাকি, জীবিকা না? ঠিক মত বলতে গেলে, চাকরিটাও যেন আমার কাছে এক রকমের নীতা হয়ে উঠল, এবং ঠিক মত ভাবতে গেলে, ব্যাপারটা তাই নয় কি? সেই প্রথম প্রেমের মত, যখন ভাবছিলাম, পেয়েছি অর্থাৎ জীবনধারণ যাকে বলে, জীবনে করবার মত কাজ পেয়েছি একটা, যা আমাকে কী বলে এটাকে—কর্মোন্মাদনার মাতিয়ে রাখবে, পবিত্র কর্ম—তারপর দেখা গেল, কর্মের মন্দিরে ওসবের বালাই নেই। পূজাপাট সব অন্য রকম, ফেল কড়ি মাখ তেলের মতই, সবাই যা পারছে খিচে নিয়ে যাচ্ছে। সকলেরই এক পূজা দাও আর নিয়ে যাও। আর ছাড়বার মুরোদ নেই, সব ছাড়তে পারি, শুধু একে কখনোই নয়, এখানে খুটি বাঁধা, অনেকটা নীতাকে ছাড়তে না পারার মতই, সব জারিজুরি খতম, অথচ সবটা মিলিয়ে, চাকরিটাকে মনে হয় দুহাতে সামলে তুলে নিয়ে এসে গায়ে থুথু দিয়ে দিই। এক এক সময়, সত্যি বলতে কি, এত ঘেন্না করে, আর রাগ হয়, মনে হয় গলা টিপে খতম করে দিই। চাকরিটাকে আবার তা কেমন করে দেওয়া যায়, জানি না। সবই আমার সেই মামদোবাজী, তবু আমার কাছে ব্যাপারটা সেই রকমই, যে নাকি আমাকে দু হাত ভরে টাকা দেয়। তার সঙ্গে আবার ইজ্জতও, কারণ আমি তো অফিসার, কিন্তু আমাকে তার সব মর্জিই মেনে চলতে হয়, তা নইলে টাকা আর ইজ্জত সবই হাপিস। আর তার মর্জি মানে, সত্যি-মিথ্যের কোন ব্যাপার নেই, যেন সেও অনেকটা, কী বলে, অসহায়, কারণ চাকরি মেয়েটা, চাকরিটাকে এভাবে স্ত্রী-লিঙ্গে দেখলেই, ঠিক দেখা হয় বলে আমার ধারণা) তার চারদিকে সবাই যে রকম মন্দা ময়ূরের মত পেখম মেলে ঘাড়ে চাপবার জন্যে হন্যে হয়ে আছে, নিজেকে তার বাঁচিয়ে চলার উপায় নেই,। কারণ তারও সুড়সুড়ি লাগে, যাকে বলে শৃঙ্গার হয়, অতএব, সেও তোমার কাছে মর্জি করবে বইকি। আর তার মর্জি মানেই প্রচুর মিথ্যে কথা বলা (ছলা কলা করা যাকে বলে, যেমন পীরিতের বেলায় করতে হয়।) কুকুরের মত ভয়ে ভয়ে থাকা, কতগুলো শুয়োরের বাচ্চা জাতীয় প্রার্থীর কাছে প্রায় হাত জোর করে দাঁত বের করে হাসা, এ সবই করতে হয়। কিন্তু যেহেতু, যাকে বলে, মান-আহার-মৈথুন সে যোগায়, (পবিত্র কর্ম ও সহজ সেবা, ওসব তো সে অনেক আগেই ইউরিনালে বিসর্জন দিয়েছে) যেহেতু সে তোমাকে বেঁধে রেখেছে, সেইহেতু আমি তাকে ছাড়তে পারি না। তাই চাকরিটাও, আমার কাছে সেই আসক্তি ও অনাসক্তি, (আবার সেই মামদোবাজী) যাকে বলে, খুবই চাই, অথচ ভয়ংকর ঘৃণা করি, এবং বিশেষ করে যখন মনে হয় যে, এই চাকরির মধ্যে এমন সব, যাকে বলে মহৎ পরিণতির বিষয়বস্তু রয়েছে তাই এর জন্যে আমার গর্ব করার আছে, আছে ভেবে সুখী হই, অথচ পরমুহূর্তেই দারুণ ঘৃণায় প্রস্রাব করে দিতে ইচ্ছে করে, কারণ মহৎ পরিণতিগুলো ঠিক যে বেশ্যার মত আমাকে কাজ সেরে বিদায় নিতে বলে, যার মানে দাঁড়ায়, তার পরিণতি তা-ই; তুমি তো ভাসলে বড় বড় কথার মারপ্যাঁচে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে টাকা লুটতে এসেছ, লুটে নিয়ে চলে যাও। তার মানে, সেই তুমোও যা, আমুও….।

কিন্তু এতক্ষণে মাত্র শিয়ালদহের কাছে, বলতে গেলে সব থেকে জঘন্য জায়গাটাতে ট্রাফিক পুলিশের হাত যেখানে একবার উঠলে, যজ্ঞের মত বিকল হয়ে যেন দাঁড়িয়েই থাকে, আর রাশি রাশি পোকার মত মানুষ, (মানব-সাধারণ ওহো, সবার উপরে মানুষ সত্য এখানে এলেই বোঝা যায়, পবিত্র মানব-জন্ম কী অপূর্ব সার্থকতা।) এপার ওপার করছে, কারণ এ তো আর শুধু-শহরের মানুষ নয়, বাইরের মানুষরা আসছে, যাদের ঠিক বমি করার মত, লোকাল ট্রেনগুলো ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এর মধ্যেই আমার ঠিক লক্ষ্য পড়ছে ভাগলপুরী গাইয়ের মত, নিতম্বিনী মেয়েটি পাস করছে, নিতম্বিনী! তার মানে কি, পাছা তো সকলেরই আছে, যেমন হাত পা পিষ্ঠ সকলেরই থাকে, এবং তার জন্যে নিশ্চয় কাউকে হাতওয়ালী, পাওয়ালা, পিঠওয়ালী এ সব বলা যায় না, তবু পাছাওয়ালী (নিতম্বিনী যাকে বলে!) বললেই যেন একটা বিশেষ ছবি ফুটে ওঠে, যে কারণে অনেক সময়েই ভাগলপুরী গাইয়ের কথাটা অনেকে বলে থাকে। মন্থরগামিনী পশুটিকে দেখলে একটু দুলে দুলে আস্তে আস্তে চলা, স্বাস্থ্যবতী মেয়ের ছবি মনে পড়ে যান। অবিশ্যি হাতীর তুলনা আমাদের চৌদ্দপুরুষ আগের লোকেরাই দিয়ে গিয়েছে, গাজেন্দ্রগামিনী, আমরা হাতী থেকে গরুতে নেমেছি, তবে ভাগলপুরটা তার সঙ্গে জুড়েছি, তফাতটা হল এই, যারা হাতীর তুলনা দিয়েছে, তারা সব কবি, আর আমরা যারা ভাগলপুরী তাই বলেছি, তারা সব রকবাজ খচ্চর। জানি না গাভীগালিনী বললে কি হত।

কিন্তু ওফ্‌, ট্রাফিক পুলিশের হাতটা বোধ হয় স্ক্রু আটকে গিয়েছে, আর কোনদিন নামবে না, এবং মানব-সন্তানেরা দৌড়ে লাফিয়ে হেঁটে, (আঃ বুলেট! একটা মেয়ে) পার হয়ে চলেছে, ভাবটা যেন এই মোড়টা পার হতে পারলেই জন্ম সার্থক, একেবারে জীবনের নন্দনকাননে (ভাগাড়ে নয়) গিয়ে পৌঁছুবে। এদিকে ঘড়িতে সোয়া নটা, চাটুয্যে মশাই হাঁপিয়ে উঠছেন, বাইরের দিকে তাকাচ্ছেন ঘনঘন শুয়োরের চীৎকার শোনবার জন্যে কান পেতে আছেন, আর আমার মুখটা মনে হতেই, ওর মুখটা কুঁচকে উঠেছে, যেন আমি একটি তেতো বিষের বড়ি, কারণ লোকটার তো ধারণা, আমিই দেরী করছি। বিশেষ করে ছোকরা দেখলেই মিঃ চ্যাটার্জির মেজাজ খারাপ, যেহেতু ওর ছেলে ছোকরা, তাই দুনিয়ার সমস্ত ছোকরা হল শয়তান, যার বয়সের তেজে বিমাতাকে ছেড়ে কথা কয় না। হয়তো নিজের ছেলে ওরকম না হলে, অর্থাৎ ওর তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে, (ছুঁড়িটা আমার দিকে তাকিয়ে দেখে গেল। আশ্চর্য, ভাবাই যায় না যে, কাল রাত্রে একটা মেয়ে, আমার হাতেই–) লটঘট না হলে, মিঃ চ্যাটার্জির কাছে আমি হতাম, যাকে বলে পুত্রপ্রতিম স্নেহের পাত্র, কিন্তু লোকটা তা তো পারলেই না এমন কি নিজেকে সব সময়ে ছোট রাখবার জন্য আমাকে কোনদিন তুমি বলতে পারলেন না, যদিচ, অন্যান্য বিগ বস-এরা আমাকে তাই বলেন, এমন কি যাকে বলে স্নেহ করে খিস্তিও করেন, কি হে ছোকরা, কেমন চালাচ্ছ?

আঃ হাত নেমেছে, জীপ ছুটেছে, এবং আমার আবার নীতার কথা মনে পড়ে গেল, নীতা এখন কি করছে, অর্থাৎ এখন ও কি অবস্থায় আছে, কে জানে। পুলিশ এসে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে কি না, পোস্ট মর্টেমের জন্যে পাঠিয়েছে কি না, আর পোস্ট মর্টেমে গেলে ডাক্তার নিশ্চয় ওকে কেটেকুটে দেখবে, ইস, মাইরি, তখন যদি থাকতে পারতাম, তাহলে ওর ভেতরটা দেখতে পেতাম। আচ্ছা, ডাক্তার নিশ্চয় এটাও বুঝতে পারবে, মেয়েটা খুন হওয়ার আগে, কোন পুরুষের সঙ্গে শুয়েছিল, কিন্তু এটাও কি বুঝাতে পারবে, পুরুষটা ওকে ধর্ষণ করেনি, স্বইচ্ছাতেই শুয়েছিল। আচ্ছা, নীতার কে কে আছে, মানে ওর বাবামায়ের কথা বলছি, এ সব খবর পুলিশ কী করে জানতে পারবে, কে জানে। শুনেছি নীতার বাপ-মা সবাই বর্তমান, এমন কি ভাই-বোনও নাকি আছে, তবে বাংলাদেশে নয়, বিহারের কোন অঞ্চলে। এক সময়ে নাকি, ওর বাপ-মা কলকাতায় এসে কিছুকাল ছিল, সে সময়ে কলকাতার সঙ্গে নীতার পরিচয় হয়েছিল, এবং ও কলকাতার কলেজে পড়েছে, কলকাতার সঙ্গে এমন জ ভিরে গিয়েছে, আর ছেড়ে যেতে পারেনি। কিন্তু যা খুশী তাই হোক গে, আমি কিছুই জানি না, কনুইটা যত নষ্টের গোড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *