রাজমহীষীদের অশ্বসঙ্গম

সৃজনশক্তি উৎপাদনের সঙ্গে জীব-মেধ যজ্ঞের যে একটা নিকট ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, তা আমরা বুঝতে পারি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান সমূহ থেকে। অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্বন্ধে অনেকেরই কোন সঠিক ধারণা নেই, যদিও পঞ্চাশ বছর পূর্বে আমি ‘ইণ্ডিয়ান কালচার’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে লিখেছিলাম । সাধারণের ধারণা যে অশ্বমেধ মাত্ৰ সাৰ্বভৌম নৃপতিগণ দ্বারাই অনুষ্ঠিত হত, তা নয় । আপস্তম্ভ শ্রৌতসূত্র (২০।১।১) অনুযায়ী যিনি সার্বভৌম হননি, তিনিও এ যজ্ঞ সম্পাদন করতে পারতেন ।

অশ্বমেধ ছিল বৈদিক যুগের সবচেয়ে বড় যজ্ঞ । বৈদিক গ্ৰন্থসমূহে অশ্বমেধের মহিমা উচ্ছসিত ভাষায় কীর্তিত হয়েছে। ঐতিহাসিক যুগে পুষ্যমিত্ৰ শুঙ্গ দুবার অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। গুপ্তসম্রাট সমুদ্রগুপ্তও অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন । রামচন্দ্র ও যুধিষ্ঠিরও অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন । শত অশ্বমেধকারী রাজা ইন্দ্ৰত্ব লাভ করতেন । সেজন্যই ইন্দ্রের এক নাম শতক্ৰতু। এটা চৈত্রমাসে অনুষ্ঠিত হত । কিন্তু কাত্যায়ন তাঁর শ্রৌতসুত্ৰে (২০।১।২১) বলেছেন যে এটা যে-কোন সময়েও হতে পারত । যজ্ঞের আসল অংশটা তিনদিন স্থায়ী হত, কিন্তু এর প্রস্তুতিপর্ব শেষ করতে এক থেকে দুবছর সময় লগত । এতে অংশ গ্ৰহণ করতেন রাজা ও তার চার মহিষী, ৪০০ জন পারিষদ ও ৪ জন পুরোহিত । কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র (২।১।২১-৩৫) অনুযায়ী প্রাথমিক আচার অনুষ্ঠানের পর এক বৎসরের ( এই এক বৎসর তাকে যৌনমিলন থেকে বিরত রাখা হত) জন্য তাকে দেশের মধ্যে বিচরণ করবার জন্য ছেড়ে দেওয়া হত । তার সঙ্গে থাকত ৪০০ জন সশস্ত্র প্রহরী ও ১০০ জন রাজারাজড়া বা তাদের ছেলে পুলে । অপর রাজ্যের ভিতর দিয়ে যাবার সময় যদি কেউ অশ্বটি অপহরণ করত বা তার গতি প্ৰতিহত করত, তা হলে সংঘর্ষ ও যুদ্ধ হত ও অশ্বটিকে উদ্ধার করা হত । অশ্বটি নির্বিঘ্নে স্বরাজ্যে ফিরে এলে আসল যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হত ।

প্ৰথম দিনে এক অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ করা হত । দ্বিতীয় দিনে যজ্ঞকারী রাজার রাণীরা অশ্বটিকে এক নিকটস্থ জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে তার বিলোপন ও প্ৰসাধনাদি ক্রিয়া সম্পাদন করত। তারপর অশ্বটিকে যজ্ঞস্থানে ফিরিয়ে এনে, একটি ছাগ ও অন্যান্য বধ্য প্রাণীর সঙ্গে যুপকাষ্ঠে বাঁধা হত। তখন ঘোড়াটাকে সংজ্ঞাপন বা শ্বাসরোধ করে মারা হত ।

তারপর প্রধান রাজমহিষী ঘোড়াটার পাশে শুয়ে পড়ত ৷ তাদের ওপর একখানা কাপড় চাপা দেওয়া হত । কাপড়ের আচ্ছাদনের ভিতরে প্রধান মহিষী ঘোড়াটার সঙ্গে মৈথুন কর্মে নিযুক্ত হত, এবং তাকে যৌনকর্মে উত্তেজিত করবার জন্য বাহিরে দণ্ডায়মান পুরোহিত ও উপস্থিত মেয়েরা নানারকম অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করত। ( আপস্তম্ভ শ্রৌতিসূত্র ২০|১৮|৩-৪ ; কাত্যায়ন শ্রেণীতসূত্র ২০|৬|১৫-১৭ ) । তারপর ঘোড়াটাকে কাটা হত, রান্না করা হত ও বিতরণ করা হত । ( নীচে দেখুন ) । যজ্ঞের তৃতীয় দিনকে “অতিরাত্ৰ’ বলা হত । ওই দিন ‘অবভূত” অনুষ্ঠানের পর যজ্ঞের সমাপ্তি ঘটত। অশ্বমেধ যজ্ঞের জন্য চারজন পুরোহিতের প্রত্যেককে দক্ষিণাস্বরূপ ৪৮,০০০ গাভী দান করা হত। ( অশ্বমেধ সম্বন্ধে বিশদ বিবরণের জন্য পি. ই. ডুমোণ্টের L’ Asvamedha, Paris 1927 দেখুন )। বাজসনেয়ী সংহিতায় (২২-২৩) অশ্বমেধের যে বিবরণ আছে, তা থেকে মনে হয় যে অশ্বের পরিবর্তে প্ৰধান পুরোহিতের সাহিতই প্ৰধান রাজমহিষী সর্বসমক্ষে মৈথুন ক্রিয়ায় রত হতেন ।

অশ্বমেধের রান্না মাংস খাবার জন্য ঋষিদের রসনায় জল গড়াত । ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলে (১।১৬২৷১১) বলা হয়েছে–‘‘হে অশ্ব ! অগ্নিতে পাক করবার সময় তোমার গা দিয়ে যে রস বেরোয় এবং যে অংশ শূলে আবদ্ধ থাকে, তা যেন মাটিতে না পড়ে ও ঘাসের সঙ্গে না মিশে যায় । দেবতারা লালায়িত হয়েছেন, তাঁদের দেওয়া হোক ।’ আবার বলা হয়েছে– ‘যে কাষ্ঠদণ্ড মাংস-পাক পরীক্ষার্থে ভাণ্ডে দেওয়া হয়, যে সকল পাত্রে ঝোল রক্ষিত হয়, যে সকল আচ্ছাদন দ্বারা উষ্ণতা রক্ষিত হয়…এরা সকলেই অশ্বের মাংস প্রস্তুত করছে ।’ ( ১।১৬২৷১৩ ) । ঋগ্বেদের এ সকল বর্ণনা থেকে বুঝতে পারা যায় যে, অশ্বের মাংস বেশ রসাল করে ঝোলসহ রান্না করা হত এবং তা ঝলসানোও হত, এবং সে মাংসের জন্য যে মাত্র দেবতাগণই লালায়িত হয়ে উঠতেন তা নয় ; জনসাধারণও সে মাংসের টুকরো পাবার জন্য চারদিকে ভীড় করে থাকত ও রান্নার সুঘ্রাণ গ্ৰহণ করত। কেননা বলা হয়েছে– ‘যারা চারদিক থেকে অশ্বের মাংস রান্না দেখেছে, যারা বলেছে যে গন্ধ মনোরম হয়েছে–এখন নামাও, যারা মাংস পাবার জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের সঙ্গে আমাদের সঙ্কল্প এক হউক । ( ঋগ্বেদ ১।১৬২৷১২) ।

Share This