প্রত্যেকদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ছোটাচ্চুর প্রথম কাজ হচ্ছে তার ওয়েব সাইটে ঢুকে দেখা, কেউ তার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে তার জন্যে কোনো কেস দিয়েছে কি-না। প্রায় দিনই কিছু না কিছু থাকে কিন্তু সেগুলো দেখে ছোটাচ্চুর মেজাজ গরম হয়ে যায়! যেরকম একদিন একজন লিখেছে।

তোমার কামের অভাব হইছে? রংবাজী কর?

ছোটাচ্চু কিছুতেই বুঝতে পারে না, সে যদি একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে তাতে অন্য মানুষের সমস্যা কী? সবচেয়ে বড় কথা প্রশ্নটা যদি সত্যিই সে করতে চায় শুদ্ধ বাংলায় করলে কী দোষ হতো?

আরেকদিন আরেকজন লিখল।

আমার হৃদয় চুরি গিয়েছে। কে আমার হৃদয় হরণ করেছে খুঁজে বের করে দিতে পারবেন?

এটা শুদ্ধ ভাষায় লেখা ছিল কিন্তু তারপরেও ছোটাচ্চুর মেজাজ খুবই খারাপ হল। সবচেয়ে মেজাজ গরম হয় যখন কেউ তার কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করে। যেমন একদিন একজন লিখল।

তুমি ডিটেকটিভ বানান করতে পারবা যে ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলছ?

ছোটাচ্চু অবশ্যি তার এই চিঠিপত্রগুলো কাউকে দেখায় না। যখন বাসার ছেলেমেয়েরা আশে পাশে থাকে তখন বড় বড় কথাবার্তা বলে। তার প্রিয় বক্তৃতাটা সাধারণত এরকম হয় আমরা এখন একটা ক্রান্তিকালে আছি। সবকিছু হবে ভারচুয়াল জগতে সে জন্যেই তো এই অসাধারণ ওয়েব সাইটটা তৈরি করেছি।

তখন ত্যাঁদড় শান্ত বা অন্য কেউ একজন বলে, এটা অসাধারণ কেমন করে হল? দুনিয়ায় সব ওয়েব সাইটই তো এরকম।

ছোটাচ্চু মুখ গম্ভীর করে বলে, তুই জানিস, এই ওয়েব সাইটটা কে তৈরি করেছে?

বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে, কে?

একজন সুপার জিনিয়াস। তাকে গুগলে চাকরির অফার দিয়েছে সে নেয় নাই। ফেসবুক তার পিছনে পিছনে ঘুরে, সে পাত্তা দেয় না। মাইক্রোসফট দিনে দুইবার ফোন করে সে ফোন ধরে না।

যারা ছোট তারা ব্যাপারটা খুব ভালো করে বুঝতে না পারলেও ছোটাচ্চুর গম্ভীর মুখ দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে যাবার ভঙ্গি করে মাথা নাড়ে। শুধু শান্ত বলে, এতো বড় জিনিয়াস হলে সে বসে বসে ওয়েব সাইট কেন তৈরি করে? আমাদের ক্লাসের ফাকুও তো ওয়েব সাইট বানায়।

ফান্ধু নামের স্কুলের একজন ছাত্রের সাথে এতো বড় জিনিয়াসের তুলনা করার জন্যে ছোটাচ্চু খুব রেগে গেল, ধমক দিয়ে বলল, যেটা বুঝিস না সেটা নিয়ে কথা বলবি না।

তখন একজন একটু ভয়ে ভয়ে বলল, ছোটাচ্চু কিন্তু তোমার ওয়েব সাইটের রংটা ভালো হয় নাই। দেখলে মনে হয় ইনফেকশান হয়ে গেছে।

ছোটাচ্চু তখন আরো জোরে ধমক দিয়ে বলে, ইনফেকশান? ওয়েবসাইটের আবার ইনফেকশান হয় কেমন করে?

কেমন যেন ঘা হয়ে গেছে মনে হয়।

ছোটাচ্চু হুংকার দিয়ে বলে, আমার সাথে ইয়ারকী করিস, ওয়েব সাইটের ঘা হয়েছে মনে হয়?

আলাপ আরো এগিয়ে যেতো কিন্তু টুনি পুরো ব্যাপারটাতে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দেয়, আস্তে আস্তে বলে, ওয়েব সাইট ভালো না খারাপ তাতে কিছু আসে যায় না। আসল কথা হচ্ছে কেস আসছে কি-না।

তখন সবাই ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ছোটাচ্চু, কেস কি আসছে?

ছোটাচ্চু তখন একটু আমতা আমতা করে বলে, মানে এখনো সেভাবে আসতে শুরু করেনি। লোকজন খোঁজ খবর নিচ্ছে। ভালো করে একবার প্রচার করতে পারলে তখন দেখবি কেস নিয়ে কুল পাব না।

একজন বলল, তুমি যদি কেস সলভ করো তাহলে প্রচার হবে।

আরেকজন বলল, প্রচার হলে তোমার কাছে কেস আসবে।

জ্ঞানী টাইপের একজন বুঝিয়ে দিল, কেস হচ্ছে মুরগি আর প্রচার হচ্ছে ডিম। মুরগি আগে না ডিম আগে?

যারা হাজির ছিল তাদের অর্ধেক চিৎকার করতে লাগল, ডিম! ডিম! অন্য অর্ধেক চিৎকার করতে লাগল, মুরগি! মুরগি। ছোটাচ্চু তখন দুই দলকেই ধমক দিয়ে তার ঘর থেকে বের করে দিল।

প্রত্যেকদিন মোটামুটি একই রকম ঘটনা, তার মাঝে একদিন একটা অসাধারণ ঘটনা ঘটে গেল, ছোটাচ্চু ঘুম থেকে উঠে তার ওয়েব সাইটে ঢুকে দেখল, একজন সেখানে তার জন্যে একটা লম্বা চিঠি লিখে লিখেছে, যে ফর্মটা রাখা আছে তার সবকিছু ঠিক ঠিক ভাবে পূরণ করেছে। যেখানে ঠিকানা লেখার কথা সেখানে ঠিকানা লিখেছে, যেখানে টেলিফোন নম্বর লেখার কথা সেখানে টেলিফোন নম্বর লিখেছে, যেখানে সমস্যার বর্ণনা দেয়ার কথা সেখানে সমস্যার বর্ণনা দিয়েছে। ছোটাচ্চু একবার পড়ল তারপর দুইবার পড়ল তারপর তিনবার পড়ল তারপর আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ইয়া হু উ উ উ…!

বাসার বাচ্চা কাচ্চারা যে যেখানে ছিল সেখান থেকে ছুটে এল। একজন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ছোটাচ্চু?

ছোটাচ্চু তার বুকে থাবা দিয়ে বলল, তোরা ভেবেছিলি আমার ওয়েব সাইটে কোনোদিন কেস আসবে না। এই দেখ কেস এসে গেছে। হান্ড্রেড পার্সেন্ট খাটি কেস।

একজন জিজ্ঞেস করল, কী কেস ছোটাচ্চু? মার্ডার? সিংগেল না ডাবল?

ছোটাচ্চু বলল, না মার্ডার না। কিন্তু মার্ডার থেকেও জটিল। সবাই জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, কী কে? কী কেস? ছোটাচ্চু বলল, ঠিক আছে, শোন তাহলে, আমি পড়ে শোনাই।

ছোটাচ্চু তখন তার ইনফেকশান ওয়ালা ওয়েব সাইট থেকে চিঠিটা পড়ে শোনাতে আরম্ভ করল।

মহোদয়

আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা, যথেষ্ট উচ্চ পদে আছি। আমি একটা বিশেষ বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। আমাদের দেশে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে আমার জানা ছিল না, জেনে খুব খুশি হয়েছি।

প্রথমে আমার পরিবার সম্পর্কে বলি। আমি, আমার স্ত্রী এবং আমার দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে আমার সংসার।

আমার স্ত্রী একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। আমার মেয়ে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী, আমার ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছে। আমার সমস্যাটি আমার ছেলেকে নিয়ে।

আমার ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই মেধাবী ছাত্রছাত্রী। আমার ছেলে একাধিকবার বিভিন্ন গণিত অলিম্পিয়াডে মেডেল পেয়েছে। গণিত এবং বিজ্ঞান তার খুবই প্রিয় বিষয়। আমি আপনাদের এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করছি আমার ছেলের সমস্যা নিয়ে।

আমি সবসময়েই স্বপ্ন দেখেছি আমার ছেলে একজন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে। একটি ভালো ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্যে সে প্রস্তুতি নিবে। কিন্তু কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় না, সে একজন বিজ্ঞানী হতে চায়। যখন ছোট ছিল আমি ভেবেছি এটা তার একটা ছেলেমানুষী স্বপ্ন। কিন্তু যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ঘোষণা দিল সে ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেবে না, সে বিজ্ঞানী হতে চায় তাই কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হবে। তখন তার সাথে আমার এক ধরনের গোলমাল শুরু হয়। প্রথমে আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, সে বুঝতে রাজি না হওয়ায় আমি বাধ্য হয়ে তাকে শাসন করা শুরু করি। কথাবার্তার এক পর্যায়ে আমি তাকে বলি যেহেতু সে আমার উপার্জনে আমার বাসায় আছে তাই তাকে আমার কথা শুনতে হবে। সে যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চায় তাহলে তাকে আমার বাসা থেকে বের হয়ে নিজের খরচ নিজেকে উপার্জন করতে হবে।

আমি রাগের মাথায় কথাটি বলেছিলাম কিন্তু আমার ছেলে সেটি আক্ষরিকভাবে নিয়েছে এবং দুই সপ্তাহ আগে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। তার নিজের ল্যাপটপ ছাড়া সে আর কিছুই সাথে নেয় নাই।

বাস্তব জীবনে পুরোপুরি অনভিজ্ঞ আমার ছেলে দুই একদিনের মাঝেই চলে আসবে বলে আমার ধারণা ছিল কিন্তু আজ প্রায় দুই সপ্তাহ হল সে ফিরে আসেনি এবং সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সকল জায়গায় তাকে খুঁজে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমি এখন আমার ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে দুশ্চিন্তিত। আমার স্ত্রী খুব ভেঙে পড়েছেন এবং পারিবারিক ভাবে আমি অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত। আমার মেয়েটিও আমার সাথে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

এরকম অবস্থায় ইন্টারনেটে আপনার প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেয়ে যোগাযোগ করছি। অনুগ্রহ করে আমার ছেলেকে খুঁজে বের করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। এ জন্যে প্রয়োজনীয় যে কোনো ফী দিতে আমি প্রস্তুত—

 

ছোটাচ্চু এতোটুকু পড়ে আনন্দে আবার চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তাকে ঘিরে থাকা বাচ্চা কাচ্চারা সেই আনন্দে অংশ নিল না, সবাই শীতল চোখে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল। বাচ্চাদের মাঝে যে একটু বড় সে ঠাণ্ডা গলায় বলল, ছোটাচ্চু। এরকম একটা চিঠি পড়ে তোমার আনন্দ হচ্ছে? তুমি কি গোলাম আযমের ভাতিজা?

ছোটাচ্চু থতমত খেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তখন আরেকজন বলল, আমরা তোমার সাথে আর কোনোদিন খেলব না। তুমি হচ্ছ হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর।

আরেকজন বলল, তোমার বুকে নিশ্চয়ই লোম নাই।

বুকে লোম না থাকা কিংবা গোলাম আযমের ভাতিজা হওয়া এই ব্যাপারগুলোর মাঝে সম্পর্কটা ছোটাচ্চু পুরোপুরি ধরতে না পারলেও বিজ্ঞানী হতে চাওয়া ছেলেটার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার ঘটনাটা শুনে তার আনন্দ প্রকাশ করাটা যে ঠিক হয় নাই সেটা বুঝতে পারল। ব্যাপারটা সামলানোর জন্যে বলল, আহা! আমি কি ছেলেটার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার জন্যে আনন্দ করছি? আমি আনন্দ করছি কারণ এখন আমি ছেলেটাকে খুঁজে বের করে বাসায় নিয়ে আসব, তখন সবাই কতো আনন্দ করবে সেই কথা চিন্তা করে।

ছোট একজন বলল, কচু।

তার থেকে একটু বড় একজন বলল, আলু ভর্তা।

তার থেকে আরেকটু বড় একজন বলল, শুটকি ভাজি।

বড় একজন বলল, আমরা তোমাকে ত্যাজ্য ঢাঢ় করলাম। তোমার সাথে এখন আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারপর সেটা প্রমাণ না জন্যে সবাই লাইন ধরে বের হয়ে গেল। টুনি ছাড়া।

সবাই বের হয়ে গেলে টুনি ছোটাচ্চুর চেয়ারটায় বসে তার চশমাটা একটু ঠিক করে বলল, কাজটা ঠিক হয় নাই, কিন্তু আমি তোমাকে এইবারের মতো মাফ করে দিলাম।

ছোটাচ্চু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, মাফ করে দিলি? তুই? আমাকে?

হ্যাঁ। কেন বুঝতে পারছ তো?

কেন?

তোমার এখন সাহায্য দরকার। তা না হলে তুমি এই কেস সলভ করতে পারবে না।

আমি পারব না?

এইটা তোমার একটা সুযোগ। তাই ছোটাচ্চু, তোমার যদি কোনো সাহায্য লাগে তাহলে আমাকে বল। লজ্জা করো না।

ছোটাচ্চু টুনির কথাগুলো হজম করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ঠিক আছে ম্যাডাম টুনি। আমার যখন সাহায্য লাগবে আমি আপনার কাছে আসব, লজ্জা করব না।

টুনি বলল, থ্যাংকু। তারপর সেও বের হয়ে গেল।

 

ঘণ্টা খানেক পর দেখা গেল ছোটাচ্চু ফারিহার সাথে কথা বলছে, গলার স্বর খুবই নরম আর কাঁচুমাচু। কথা শুরু হল এভাবে

ফারিহা, তোমাকে একটা বিশেষ দরকারে ফোন করছি।

বল। টাকা ধার দিতে হবে?

ছোটাচ্চু বলল, না না। টাকা ধার দিতে হবে না। অন্য একটা দরকার।

বল, কী দরকার।

ছোটাচ্চু কেশে একটু গলা পরিষ্কার করে বলল, আমি আমার প্রথম কেসটা পেয়েছি। আমার ওয়েব সাইটে একজন কেস ফাইল করেছে।

কংগ্রাচুলেশান।

এই ব্যাপারে তোমার হেল্প লাগবে।

ফারিহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, তোমায় কেস সলভ করে দিতে হবে?

ছোটাচ্চু মাথা নেড়ে বলল, উঁহু। কেস আমি নিজেই সলভ করব—কিন্তু পার্টির কাছে যাবার ব্যাপারে হেল্প লাগবে।

গাড়ি দিতে হবে?

ছোটাচ্চু একটু লজ্জা পেয়ে বলল, বুঝতেই পারছ, ক্লায়েন্টের কাছে যদি একটা রিকশা না হয় একটা সি.এন.জি দিয়ে যাই, ক্লায়েন্ট গুরুত্ব দেবে না। অনেক বাসা আছে গাড়ি ছাড়া ঢোকাই যাবে না।

ঠিক আছে। কখন লাগবে বল—আব্দুকে বলে ম্যানেজ করে দিতে হবে। আর কিছু?

গাড়ি হচ্ছে একটা। বলতে পার সোজা বিষয়টা। তোমার আরেকটু সাহায্য লাগবে।

ফারিহা বলল, বল, কী সাহায্য?

বুঝতেই পারছ আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে আমি একা।

তোমাদের টুনি আছে। খুবই স্মার্ট মেয়ে। ছোটাচ্চু এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখল, টুনি তার কথা শুনে ফেলল কি, তারপর বলল, কিন্তু টুনি তো বাচ্চা মেয়ে, তাকে তো আমার কাজে লাগাতে পারি না। তুমি যদি একটু সাহায্য কর।

ঝেড়ে কাশো। পরিষ্কার করে বল।

ছোটাচ্চু এবারে ঝেড়ে কাশল অর্থাৎ পরিষ্কার করে বলল, আমার ক্লায়েন্টের সাথে তুমি যদি একটু কথা বল। ভান করো তুমি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির সেক্রেটারি। টিশ টাশ করে একটু ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কথা বলবে। একটু এপয়েন্টমেন্ট করবে। প্রফেশনাল একটা ভাব দেখাবে–

আমাকে কী দেবে?

তুমি কী চাও?

ফারিহা এবারে হেসে ফেলল, তোমার দেবার মতো কী আছে?

আউল ফাউল কয়টা সিম আছে। লাগলে দিতে পারি।

থাক। আমার নিজের টেলিফোনের যন্ত্রণাতেই বাঁচি না। এখন যদি আউল ফাউল সিমের যন্ত্রণা শুরু হয়, তাহলেই গেছি।

তাহলে কী চাও?

প্রথম বিল পেয়ে আমাকে দোলা খাইয়ে দিও। খুব ভালো একটা দোসার দোকান হয়েছে। ভয় পেয়ো না, বেশি বিল উঠবে না!

ছোটাচ্চু বলল, আমি মোটেই ভয় পাচ্ছি না।

 

সেদিন বিকেলেই ফারিহা ছোটাচ্চুর কাছে চলে এল। ছোটাচ্চু তাকে টেলিফোন নম্বর দিয়ে কী বলতে হবে বুঝিয়ে দিল। ফারিহা নাম্বারটা ডায়াল করে টেলিফোন কানে লাগায়, দুটো রিং হওয়ার পরই কেউ একজন ফোনটা ধরে বলল, হ্যালো।

ফারিহা জিজ্ঞেস করল, মিস্টার হোসেন? আকবর হোসেন?

কথা বলছি।

হায়! আমি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি থেকে বলছি। আমাদের ডাটাবেসে আপনার একটা এনট্রি হয়েছে। আই এম সরি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে দেরি হল। আমরা সাধারণত আরো তাড়াতাড়ি যোগাযোগ করি, আনফরচুনেটলি লাস্ট ফিউ ডেজ হঠাৎ করে কাজের চাপ বেড়ে গেছে।

ওই পাশ থেকে আকবর হোসেন বললেন, ইট ইজ অলরাইট।

ফারিহা বলল, আপনার কেসটা প্রসেস করার জন্যে আমাদের একজন রিপ্রেজেনটিটিভের আপনার সাথে কথা বলা দরকার। কখন আপনি সময় দিতে পারবেন?

এখনই চলে আসতে পারেন। আমরা আসলে খুবই অস্থির হয়ে আছি।

ফারিহা বলল, আমি একটু দেখি আমাদের কেউ ফ্রি আছে কি না। তারপর ছোটাচ্চুর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল একটু খুট খাট শব্দ করল, তারপর বলল, আই এম সরি মি. হোসেন। আজকে কেউ ফ্রি নেই। কাল বিকেলের আগে আসলে কেউ যেতে পারবে না।

ওই পাশের আকবর হোসেন একটু হতাশ হলেন। বললেন, ঠিক আছে তাহলে কাল বিকেলেই।

ফারিহা খুট-খাট শব্দ করে বলল, আমাদের সিস্টেমে যে ঠিকানা দিয়েছেন সেটা আপ টু ডেট তো?

জি। এটা আপ টু ডেট।

ভেরি গুড। কাল বিকেলে একজন যাবে।

কে আসবে? কী নাম?

এক সেকেন্ড, আমি দেখি কাল কে ফ্রি আছে। ফারিহা খুট-খাট একটু শব্দ করে বলল, আপনার কাছে যাবে মিস্টার শাহরিয়ার। এ ভেরি ইয়াং এনার্জেটিক চ্যাপ। অলরেডি সে দুটো কেস সলভ করেছে। আকবর হোসেন অন্য পাশ থেকে বললেন, থ্যাংক ইউ। কাল বিকেলে আমি মিস্টার শাহরিয়ারের জন্যে অপেক্ষা করব।

ফোনটা রেখে দেবার পর ছোটাচ্চু হাতে কিল দিয়ে বলল, ফ্যান্টাস্টিক। ফারিহা, তুমি না থাকলে যে আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির কী হত!

ফারিহা বলল, কথাটা মনে রেখো।

 

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছোটাচ্চু যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে তার হলুদ বইটায় হারানো মানুষ কেমন করে খুঁজে বের করতে হয় সেটা পড়ছে, তখন টুনি এসে হাজির হল। ছোটাচ্চু বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, কী খবর টুনি?

তুমি হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার বাবার কাছে কখন যাবে?

কালকে বিকেলে।

আমাকে নিয়ে যাবে?

তোর নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে। তুই ভাবছিস এটা টুম্পার টিফিন চুরির কেস?

টুনি কথাটা না শোনার ভান করে বলল, তুমি ইন্টারভিউয়ে কী জিজ্ঞেস করবে?

সেটা তোর জানার দরকার নাই।

ছেলেটার ফটো, ই-মেইল এড্রেস, ফেসবুক একাউন্ট এই সব নিয়ে এসো।

তোকে সেটা বলে দিতে হবে না। আমি জানি।

বন্ধু বান্ধবের নাম। ফোন নম্বর।

আমি জানি।

যদি ওর ডাইরি থাকে। চিঠিপত্র সেগুলো।

ছোটাচ্চু মেঘ স্বরে বলল, আমি জানি।

তুমি কেমন করে জান?

ছোটাচ্চু হাতের বইটা দেখিয়ে বলল, এই বইয়ে সব লেখা আছে।

টুনি বলল, বইটা আমাকে পড়তে দিবে।

ইংরেজি বই। পড়তে পারবি?

আস্তে আস্তে পড়ব। ডিকশনারি দেখে দেখে।

ছোটাচ্চু একটু নরম হল, বলল, ঠিক আছে।

টুনি যখন চলে যাচ্ছে ছোটাচ্চু তখন বলল, টুনি, শোন।

কী?

আমার চেহারার মাঝে কি একটা ডিটেকটিভ ডিটেকটিভ ভাব আছে?

না। তোমাকে দেখে স্কুলের বাচ্চার মতো লাগে।

তাহলে?

মোচ রেখে দাও। মোচ থাকলে বয়স্ক লাগে।

ছোটাচ্চু নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কাল বিকালের মাঝে মোচ উঠবে না। তাছাড়া–

তাছাড়া কী?

ফারিহা যে গোঁফ দুই চোখে দেখতে পারে না ছোটাচ্চু সেটা আর বলতে পারল না। কথাটা এড়িয়ে বলল, তাহলে কি একটা টাই পরে যাব?

হ্যাঁ। টাই পরলে বয়স্ক লাগবে। আর চশমা।

আমার চোখ খারাপ না, চশমা কীভাবে পরব?

জিরো পাওয়ারের চশমা পাওয়া যায়।

পরদিন বিকালে ছোটাচ্চু ফারিহার ব্যবস্থা করা গাড়িতে জিরো পাওয়ারের চশমা আর টাই পরে আকবর হোসেনের বাসায় হাজির হল। ছোটাচ্চুর বুক ধুক ধুক করছে কিন্তু মুখের মাঝে একটা গাম্ভীর্য ধরে রেখে সে দরজার বেলে চাপ দিল। যে মানুষটি দরজা খুলে দিল। ছোটাচ্চু অনুমান করল সে নিশ্চয়ই আকবর হোসেন। চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর বয়স চেহারার মাঝে একটা সরকারি অফিসারের মতো ভাব। মানুষটা জিজ্ঞেস করল, শাহরিয়ার সাহেব?

ছোটাচ্চু তার চশমাটা ঠিক করে বলল, জি। আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি থেকে এসেছি। আমাকে একটা এসাইনমেন্টের জন্যে পাঠানো হয়েছে।

আমি আকবর হোসেন, আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি। আসেন। ভিতরে আসনে।

ছোটাচ্চু ভিতরে ঢুকল। ভিতরে একটা সোফা, সেই সোফায় একজন মহিলা বসে আছে। ছোটাচ্চুর ঘরে ঢোকার পর মহিলা ঘুরে তাকাল এবং তাকে দেখে ছোটাচ্চুর রক্ত হিম হয়ে গেল। মহিলাটি ডলি খালা—সেই ফর্সা নাদুস নুদুস চেহারা, সেই সিল্কের শাড়ি, সেই লিপস্টিক। চেহারাটা শুধু অন্যরকম, এখন একটা হিংস্র বাঘিনীর মতো। ছোটাচ্চুকে দেখেই ফেঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দুলাভাই! আমি যেটা সন্দেহ করেছিলাম তাই। এই সেই ছেলে। এর থেকে সাবধান।

ছোটাচ্চু কী করবে বুঝতে পারল না, একবার মনে হল একটা দৌড় দেয়, কিন্তু তার জন্যে দেরি হয়ে গেছে। ডলি খালা বলল, আমাদের জোবেদাবুর ছেলে। জোবেদাবু হচ্ছে ফিরেশতার মতো মানুষ। তার সব ছেলে মেয়ে মানুষ হয়েছে, এইটা ছাড়া (ডলি খালা এই সময় আঙুল দিয়ে ছোটাচ্চুকে দেখাল)। সব ছেলে মেয়ে বড় বড় চাকরি বাকরি করে আর ছোট ছেলের যা হয় তাই হয়েছে। টেনে টুনে পরীক্ষায় কোনোমতে পাস করেছে, কোনো চাকরি বাকরি পায় না তখন এই ডিটেকটিভগিরি শুরু করেছে। আমি যখন প্রথম শুনেছি তখন ভাবলাম ভালোই তো, সব দেশে থাকে আমাদের দেশে থাকবে না কেন? ও মা, খোঁজ নিয়ে আমার মাথা ঘুরে গেছে। বুঝলে দুলাভাই (ডলি খালা এই সময়ে আকবর হোসেনের দিকে তাকাল) এর ডিটেকটিভ এজেসি কী জান? এই ছেলে পকেটে একটা মোবাইল ফোন আর কয়েকটা বেআইনি সিম নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর কিছু নাই, কয়টা মেয়ে বন্ধু আছে তাদের দিয়ে মাঝে মধ্যে ফোন করায়। আমি সোজা সরল মানুষ (ডলি খালা এই সময় নিজের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল। আমার মেয়ের জন্যে জামাই খুঁজছি, এই ছেলেকে বিশ্বাস করে একটু খোঁজ খবর নিতে দিয়েছি। তখন তো বুঝি নাই তার কিছু নাই, ভেবেছিলাম আসলেই বুঝি অফিস আছে, লোকজন আছে, সরকারের পারমিশন আছে। সে আমার সর্বনাশ করে ছেড়ে দিয়েছে। সোনার টুকরা একটা ছেলে, আমেরিকা থেকে দেশে বিয়ে করতে এসেছে, তাকে এমন ভয় দেখালো। সেই ছেলে—(এই সময় ডলি খালার গলা ধরে এলো, ডলি খালা হেঁচকি তোলার মতো একটা শব্দ করল তারপর তার হতে পারতো জামাইয়ের সব ঘটনা স্মরণ করে কেমন যেন শিউরে উঠল।)

ছোটাচ্চু পুরোপুরি ভ্যাবাচেকা খেয়ে ডলি খালার দিকে তাকিয়ে রইল। এখানে যে ডলি খালা থাকবে আর তার এতো বড় সর্বনাশ করবে সেটা ছোটাচ্চু একবারও ভাবেনি। একজন মানুষ যে টানা এতোক্ষণ একভাবে কারো বিরুদ্ধে এতো খারাপ খারাপ কথা বলতে পারে, ছোটা নিজের চোখে না দেখলে সেটা বিশ্বাস করতো না। ছোটাচ্চু একবার ভাবল প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলে, কিন্তু সে বুঝতে পারল বলে কোনো লাভ নেই, সে কখনোই এরকম তীব্র ভাষার বক্তব্যের ধারে কাছে যেতে পারবে না। দেখে কোটি কোটি মানুষ—তাদের ভিতরে একজন তাকে একটা কেস দিতে চাইছে কী কপাল, সেই মানুষটা কি না ডলি খালার পরিচিত। এর থেকে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে! ডলি খালার আক্রমণকে ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। ছোটাচ্চু হাল ছেড়ে দিয়ে ডলি খালার দিকে তাকিয়ে, পরের আক্রমণের জন্যে অপেক্ষা করে রইল।

ডলি খালা ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা নিঃশ্বাস নিল, তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বুঝলে দুলাভাই, যখন খবর পেয়েছি সুম হারিয়ে গেছে তখন আমার বুকটা ভেঙে গেছে। ছোটাচ্চু বুঝতে পারা সুমন নিশ্চয়ই আকবর হোসেনের পালিয়ে যাওয়া ছেলের নাম। আমরা সব জায়গায় সুমকে খুঁজে বেড়াচ্ছি তখন খবর পেলাম তুমি নাকি ইন্টারনেট থেকে ডিটেকটিভ এজেন্সি বের করে তাদেরকে লাগাচ্ছ, তখন আমি পাগলের মতো ছুটে এসেছি তোমাকে সাবধান করার জন্যে। এই ছেলে আমার সর্বনাশ করেছে তোমার যেন সর্বনাশ করতে না পারে। (এই সময় ডলি খালার গলা আবার ধরে এল, চোখ থেকে মনে হল দুই ফোঁটা পানিও বের হল।) ডলি খালা তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি গেলাম দুলাভাই, তুমি পরে আমাকে বলে না যে আমি তোমাকে সাবধান করি নাই। এই ছেলে আজকে গলায় টাই আর চোখে চশমা লাগিয়ে এসেছে, আসলে ভুসভুসে ময়লা টি শার্ট পরে ঘুরে বেড়ায়, চোখে নিশ্চয়ই জিরো পাওয়ারের চশমা। যে গাড়ি তাকে নামিয়ে দিয়েছে খোঁজ নিয়ে দেখো নিশ্চয়ই ভাড়া গাড়ি, না হলে কারো কাছ থেকে ম্যানেজ করেছে।

ছোটাচ্চু এখন এক ধরনের যুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে ডলি খালার দিকে তাকিয়ে রইল। যখন বুঝে গেছে এখানে তার সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে তখন

এই পুরো ব্যাপারটাকে একটা নাটক হিসেবে দেখে উপভোগ করা যেতেই পারে।

ডলি খালা ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ছোটাচ্চু লক্ষ করল চোখ মুছল খুব কায়দা করে যেন চোখের রং ল্যাপ্টে না যায়। একটু পরেই গাড়ির শব্দ শোনা গেল, বোঝা গেল ডলি খালা চলে গেছে।

আকবর হোসেন চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলেন, তারপর এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে বসলেন। ছোটাচ্চুও তাই করল, তখন হঠাৎ মনে হল গলায় টাইটা ফাঁসের মতো আটকে আছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তাই তখন টাইয়ের নটটা প্রথমে একটু ঢিলে করল তারপর খুলেই ফেলল। আকবর হোসেন তখন এক পায়ের উপর তুলে রাখা অন্য পাটা সরিয়ে বসল, ছোটাচ্চুও তার পাটা সরিয়ে নিল। ছোটাচ্চুর তখন মনে হল সবকিছু মনে হয় ঝাপসা দেখা যাচ্ছে তখন জিরো পাওয়ারের চশমাটাও খুলে ফেলল। তার চশমা চোখে দেওয়ার অভ্যাস নেই তাই চশমাটা খুলতেই কানের উপর আর নাকের উপর থেকে চাপটা কমে গেল বলে মনে হল।

আকবর হোসেন একটু কেশে গলা পরিষ্কার করলেন, বললেন, ডলি যা যা বলেছে সব সত্যি?

ছোটাচ্চু কী বলবে একটু চিন্তা করল, তারপর বলল, অনেক কিছু সত্যি কিন্তু যেভাবে বলেছেন সেভাবে সত্যি না।

যদি সত্যি হয় তাহলে আমি তোমাকে দায়িত্বটা দিতে চাই।

ছোটাচ্চুর মনে হল সে কথাটা ঠিক করে শুনেনি। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী বললেন?

বলেছি যে ডলির কথা সত্যি হলে আমি তোমাকে দায়িত্বটা দিতে চাই। তুমি করে বলছি দেখে কিছু মনে করোনি তো। তোমার টাই আর চশমা খোলার পর তোমাকে একটা বাচ্চা মানুষের মতোই লাগছে।

ছোটাচ্চু জোরে জোরে মাথা নাড়ল, বলল, না, না, কিছু মনে করি নাই। তুমি করেই তো বলবেন। আসলে ছোটাচ্চুকে অপরিচিত কোনো মানুয তুমি করে বললে সে খুব বিরক্ত হয়, এখন অবশ্যি অন্য ব্যাপার।

আকবর হোসেন আবার তার একটা পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে বললেন, ডলির কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তোমার এই ডিটেকটিভ এজেন্সি এখন একটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ। আমি আসলে ঠিক এরকমই চাচ্ছিলাম, যে একটু সময় দেবে। আমার মনে হয় একটু সময় দিয়ে ঠিকভাবে খোঁজাখুঁজি করলেই সুমনকে বের করে ফেলা যাবে।

হঠাৎ করে ছোটাচ্চুর ভেতরে হুড় হুড় করে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে শুরু করল। হাতে কিল দিয়ে বলল, অবশ্যই বের করে ফেলব।

আকবর হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পাগল ছেলেটা কেমন যে আছে! আমার মতন হয়েছে, ছেলেটার মাথায় কিছু একটা ঢুকে গেলে আর বের করা যায় না।

আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা—মানে আমি বের করে ফেলব। থ্যাংক ইউ শাহরিয়ার। তুমি কেমন করে অগ্রসর হতে চাও?

প্রথম ঘটনাটা আরেকটু বিস্তারিত বলেন, তারপর তার ঘরটা একটু দেখতে চাই। তার খাতাপত্র ডাইরি যদি থাকে সেগুলো একটা দেখতে চাই। তার বন্ধু বান্ধব যাদের আপনারা চিনেন, তাদের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর যদি থাকে সেগুলো নিতে চাই। আপনাদের আত্মীয় স্বজন যাদের কাছে সে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে তাদের নাম ঠিকানা চাই। মোটামুটি এগুলো হলেই কাজ শুরু করে দিতে পারব।

গুড! আকবর হোসেন সোফায় হেলান দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, আমি তাহলে শুরু করি। আকবর হোসেন তখন সবকিছু বলতে শুরু করলেন। ছোটা খুবই গম্ভীর ভাবে তার নোট বইয়ে মাঝে মাঝে কিছু কিছু কথাবার্তা টুকে নিতে লাগল।

ছোটাচ্চু যখন বাসায় ফিরে এল তখন বাসার সব বাচ্চারা তাকে ঘিরে ধরল, জিজ্ঞেস করতে লাগল, কী হয়েছে ছোটাচ্চু? কী হয়েছে বল।

ছোটাচ্চু মুখ শক্ত করে বলল, তোরা না আমাকে ত্যাজ্য ঢাঢ় করে দিয়েছিস—এখন আবার আমার সাথে কথা বলতে এসেছিস, তোদের লজ্জা করে না?

একজন বলল, আমরা তোমাকে মাফ করে দিয়ে আবার টাচু হিসেবে নিয়ে নিয়েছি।

তোরা নিলেই তো হবে না আমাকেও তো নিতে হবে। আমি এখনো নেই নাই। ছোটাচ্চু তার মুখটা শক্ত করে দাড়িয়ে রই।

বাচ্চারা তখন ছোট ছোট লাফ দিতে দিতে বলতে লাগল, প্লিজ ছোটাচ্চু! প্লিজ।

আগে বল আর কোনোদিন আমাকে গোলাম আযমের ভাতিজা বলে গালি দিবি?

দিব না।

কানে ধর।

সবাই কানে ধরে ফেলল, ছোটাচ্চুর কাছ থেকে এই ধরনের শাস্তি তাদের জন্যে কোনো বিষয়ই না। শুধু একজন মিনমিন করে বলল, আমরা এইগুলো করি তোমাকে লাইনে রাখার জন্যে। এইভাবে তোমাকে শাসন না করলে তুমি বেলাইনে চলে যাও তো—সেইজন্যে।

ছোটাচ্চু হুংকার দিল, আমি বেলাইনে যাই?

সবাই হিহি করে হাসতে লাগল বলে ছোটাচ্চু আর বেশিক্ষণ রেগে থাকার ভান করতে পারল না।

 

ছোটাচ্চু তখন আকবর হোসেনের বাসায় কী হয়েছে সেটা বাচ্চাদের বলল। যেটুকু বলল তার থেকে বেশি অভিনয় করে দেখালো। ডলি খালার নাকি কান্নার অভিনয়টা এতো ভালো হল যে, বাচ্চাদের অনুরোধে সেটা কয়েকবার করে দেখাতে হল।

সব বাচ্চারা চলে যাবার পর টুনি বলল, ছোটাচ্চু।

বল।

তুমি কি ছেলেটার বাসায় দরকারি কিছু পেয়েছ?

কিছু খাতাপত্র পেয়েছি।

ডাইরি কি আছে?

একটা ডাইরি আছে কিন্তু সেটা কোনো কাজে লাগবে না।

কেন?

ডাইরির মাঝে নিজের কোনো কথা নাই, শুধু বিজ্ঞানের কথা।

বিজ্ঞানের কথা?

ছোটাচ্চু বলল, হ্যাঁ। পড়ে আমি কিছু বুঝিও না।

টুনি বলল, তোমার বোবার কথা না। বিত্তানের কি দেখলে তোমার জুর উঠে যায়।

ছোটাচ্চু বলল, শুধু জ্বর না, কেমন যেন এলার্জির মতো হয়। চামড়ার মাঝে লাল র‍্যাশ বের হয়। মাথা ঘোরায়।

টুনি বলল, ঐ ছেলেটার খাতাটা আমাকে একটু দেখাবে?

তুই দেখে কী করবি? তুই কি কিছু বুঝবি?

তোমার থেকে বেশি বুঝব।

ছোটাচ্চু খাতাটা বের করে টুনিকে দিল, টুনি তখন পালিয়ে যাওয়া ছেলেটার ডাইরিটা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ল। ভিতরে নানারকম বিজ্ঞানের প্রশ্ন, যেমন এক জায়গায় লেখা, প্রোটন আর ইলেকট্রন একটা আরেকটাকে আকর্ষণ করে, তাহলে ইলেকট্রন কেন প্রোটনের ভিতরে পড়ে যায় না, কেন চার্জ বিহীন কিছু একটা তৈরি হয় না? কেন হাইড্রোজেন পরমাণু হয়ে থাকে? কেন?

আরেক জায়গায় লেখা, গতিশীল বস্তুর কাছে দৈর্ঘ্যকে সংকুচিত মনে হয়। তাহলে কি আলোর কাছে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সংকুচিত হয়ে একটা দ্বিমাত্রিক সমতল ভূমি হয়ে যায়?

আরেক জায়গায় লেখা, পৃথিবী থেকে কয়টা ইলেকট্রন চাঁদে নিয়ে গেলে চাদ প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে?

খাতার অনেক পাতায় নানা রকম গণিত, গণিতের শেষে মাঝে মাঝে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। মাঝে মাঝে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন। মাঝে মাঝে গোল বৃত্ত একে তার মাঝে হাসি মুখের ছবি। টুনি কিছুই বুঝল না শুধু টের পেল এই ছেলেটা ছোটখাটো একটা বৈজ্ঞানিক এবং তার মনের মাঝে নানা ধরনের প্রশ্ন অনেক প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পেয়েছে, অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়নি।

ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, কিছু বুঝলি?

উঁহু। মনে হচ্ছে এখানে অনেক রকম বিজ্ঞানের প্রশ্ন।

বিজ্ঞানের প্রশ্ন নিয়ে আমার কী লাভ? আমার দরকার তার ঠিকানা। তার নিজের সম্পর্কে তথ্য।

টুনি কিছু বলল না, ভুরু কুঁচকে খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

 

ছোটাচ্চু পরদিন সকাল থেকেই কাজে লেগে গেল। আকবর হোসেনের কাছ থেকে তার পালিয়ে যাওয়া ছেলে সুমনের বেশ কয়েকজন বন্ধুর নাম ঠিকানা ফোন নম্বর নিয়েছিল, ছোটাচ্চু একজন একজন করে তাদের সবাইকে খুঁজে বের করল, তাদের সাথে কথা বলল কিন্তু লাভ হল না। তারা কেউ সুমনের খোঁজ দিতে পারল না। একজন বলল, দুই সপ্তাহ আগে যখন দেখা হয়েছে তখন কথাবার্তা বলছিল না। চুপ করে বসে থাকত। মনে হয় কিছু একটা চিন্তা করত। পালিয়ে যাবে আমাদের কাউকে বলেনি।

আরেকজন বলল, আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ভাত কেমন করে রান্না করতে হয় আমি জানি কি না! আমি বললাম তোর আম্মুকে কেন জিজ্ঞেস করিস না। সুমন বলল, উঁহু, আম্মুকে জিজ্ঞেস করা যাবে না!

আরেকজন বলল, সুমন কোথায় আমি জানি না। কিন্তু আমি যদি জানতামও আমি আপনাকে বলতাম না। সুমনের ফিজিক্স পড়ার এতো সখ অথচ তার আবু তাকে জোর করে ইঞ্জিনি বানাবে! তার আব্দুর একটা শিক্ষা হওয়া দরকার।

কাজেই ছোটাচ্চুর সারাদিন পরিশ্রম করে বেলা মোটামুটি বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে এলো। রাত্রি বেলা ছোটা তার বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করছিল, একম সময় টুনি এসে হাজির হল, ছোটাচ্চু টুনির পায়ের শব্দ শুনে টুনির দিকে ঘুরে তাকাল। টুনি জিজ্ঞেস করল, সুমনের কোনো খোঁজ পেলে?

ছোটাচ্চু মাথা নেড়ে বলল, এখনো পাই নাই। তার বন্ধুরা হয় কিছু জানে না, না হলে আমাকে কিছু বলছে না।

টুনি কিছু না বলে চুপ করে বসে রইল। ছোটাচ্চু আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বুঝলি টুনি, কোনো কেস সলভ করার আগে একটা কু দরকার হয়। সেই কু দিয়ে শুরু করলে সেখান থেকে অন্য কু বের হয়ে আসে। সেখান থেকে অন্য কু। তখন কুতে বুনতে সয়লাব হয়ে যায়। কেস সলভ করা তখন পানির মতো সোজা হয়ে যায়।

টুনি এখনো কিছু বলল না। ছোটাচ্চু তখন আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, সেটা আগেরটা থেকেও লম্বা, তারপর বলল, কিন্তু এই কেসটায় কোনো কু নাই। ষােলকোটি মানুষের মাঝ থেকে একজনকে খুঁজে বের করা কি সোজা কথা? যদি খালি একটা কু থাকত—

টুনি বলল একটা ক্লু তো আছে।

ছোটাচ্চু সোজা হয়ে বসে বলল, কী ক্লু?

সুমন তার ল্যাপটপ নিয়ে গেছে—তার মানে নিশ্চয়ই ইন্টারনেটে হাজির আছে।

ইন্টারনেটে বাংলাদেশের কতো মানুষ আছে, তুই জানিস?

কিন্তু সুমনের তো একটা আলাদা সখ আছে। সেই সখটা তো খুব। বেশি মানুষের নাই।

কী সখ?

বিজ্ঞান! তার মানে ইন্টারনেটে যারা বিজ্ঞান নিয়ে ঘাটাঘাটি করে তার মাঝে নিশ্চয়ই সুমন আছে।

থাকলে আছে। কিন্তু আমি খুঁজে বের করব কেমন করে?

টুনি সুমনের ডাইরিটা হাতে নিয়ে বলল, এই যে এই ডাইরিটা দিয়ে!

এই ডাইরিটা দিয়ে? কীভাবে?

এর মাঝে অনেক প্রশ্ন। তার মানে সুমন এই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করে। তুমি এই প্রশ্নগুলো তোমার নিজের মতো করে ইন্টারনেটে দাও। জিজ্ঞেস কর। তাহলে একদিন যখন সুমনের চোখে পড়বে সে উত্তর দেবে।

সুমনের চোখে যদি না পড়ে?

তোমার পরিচিত একজন আছে না যে এইগুলো খুব ভালো বুঝে, তোমার ইনফেকশানওয়ালা ওয়েব সাইট তৈরি করে দিয়েছে?

ছোটাচ্চু মুখ শক্ত করে বলল, মোটেই ইনফেকশানওয়ালা না।

ঠিক আছে। তুমি সেই ছেলেকে বল সে যেন তোমার প্রশ্নগুলো এমন ভাবে ছড়িয়ে দেয় যেন অনেক মানুষের চোখে পড়ে। সে নিশ্চয়ই পারবে।

ছোটাচ্চুর মুখে প্রথমে একটা তাচিছল্যের ভাব চলে এল, আস্তে আস্তে তাচ্ছিল্যের ভাবটা চলে সেখানে উৎসাহের ভাব চলে আসতে থাকে। তারপর তার চোখ মুখ উত্তেজনায় চকচক করতে থাকে, হাতে কিল দিয়ে বলে, টুনটুনি! তুই একটা জিনিয়াস।

টুনি বলল, তোমার সাথে তুলনা করলে যে কোনো মানুষ জিনিয়াস।

 

ছোটাচ্চু তখন তখনই কাজে লেগে গেল। সে যেহেতু বিজ্ঞানের ব পর্যন্ত জানে না, তাছাড়া বিজ্ঞান নিয়ে তার একটা এলার্জির মতো ভাব আছে তাই সে সুমনের ডাইরিটা নিয়ে গেল তার বিজ্ঞান জানা একজন বন্ধুর কাছে। সে ডাইরি থেকে বেছে বেছে দশটা প্রশ্ন নিয়ে সেটা টাইপ করিয়ে নিল, তারপর সেগুলো নিয়ে গেল তার ইন্টারনেটের এক্সপার্টের বন্ধুর কাছে। সে ব্যবস্থা করে দিল যেন ইন্টারনেটে তার প্রশ্নগুলো অনেকে দেখতে পায়। যারা প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় তাদেরকে উত্তর পাঠাবার জন্যে একটা ই-মেইল ঠিকানা দিয়ে রাখা হল। তারপর ছোটাচ্চু সেই ই-মেইলে উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকল।

প্রায় সাথে সাথেই উত্তর আসতে শুরু করে। বেশির ভাগই বাচ্চা, কেউ কেউ উত্তর হিসেবে কিছু একটা লিখে পাঠিয়েছে, কেউ কেউ জানতে চেয়েছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে ছোটাচ্চু কী করবে। দ্বিতীয় দিনে ছোটাচ্চু সুমনের কাছ থেকে উত্তর পেলো। ই-মেইল ঠিকানা বা চিঠির শেষে কোথাও সুমনের নাম লেখা নেই কিন্তু ছোটাচ্চুর বুঝতে কোনো অসুবিধা হল না এটা সুমন। কারণ এখানে লেখা

এই দশটা প্রশ্ন দেখে আমি খুবই অবাক হয়েছি কারণ এই প্রশ্নগুলো আমারও প্রশ্ন। আমি কয়েকটার উত্তর চিন্তা করে বের করেছি। অন্য প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করার চেষ্টা করছি। তুমি বের করতে পারলে আমাকে জানিও।

চিঠিটা পেয়ে ছোটাচ্চুর উত্তেজনার শেষ নেই। অনেক চিন্তা ভাবনা করে সে উত্তর পাঠালো

তুমি যে প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করেছ, সেগুলো কি আমাকে পাঠাবে?

উত্তরে সুমন লিখল

পাঠালাম।

ছোটাচ্চু লিখল

ফ্যান্টাস্টিক। তুমি কী কর? কলেজ ইউনিভার্সিটির মাস্টার?

সুমন লিখল

হা হা হা। আমি কলেজ ইউনিভার্সিটির মাস্টার না। ইউনিভার্সিটিতে ঢুকব।

 

ছোটাচ্চু অবশ্যি শুধু ই-মেইল চালাচালি করে বসে রইল না, ইউনিভার্সিটির কয়েকজনের সাথে কথা বলে দুইটা প্রশ্নের উত্তর বের করে নিয়ে এসে সুমনকে লিখল

আমি আরো দুইটা প্রশ্নের উত্তর বের করেছি। তুমি কি দেখতে চাও?

সুমন লিখল

অবশ্যই।

ছোটাচ্চু তখন অনেক চিন্তাভাবনা করে লিখল

হাতে লেখা উত্তর। ই-মেইলে কেমন করে পাঠাব?

সুমন লিখল

স্ক্যান করে পাঠাতে পার।

ছোটাচ্চু লিখল

ধারে কাছে স্ক্যানার নাই। তোমার বাসা কোথায়? ধারে কাছে হলে হাতে হাতে দিতে পারি।

সুমন পুরো একদিন এর উত্তর দিল না। তারপরে লিখল

তুমি কে? কী কর?

ছোটাচ্চু তখন বিপদে পড়ে গেল। সে এখন কী লিখবে? যখন চিন্তা করতে করতে ঘেমে গেল তখন টুনি তাকে সাহায্য করল। বলল, লিখ তুমি বিজ্ঞানের একটা বই লেখার চেষ্টা করছ। সেইজন্যে বিজ্ঞানের মজার মজার

প্রশ্ন আর তার উত্তর খুঁজে বের করছ।

ছোটাচ্চু চিন্তিত মুখে বলল, যদি আমাকে বিজ্ঞানের কোনো একটা প্রশ্ন করে বসে?

সামনা সামনি তো তোমাকে পাচ্ছে না! কেমন করে প্রশ্ন করবে? ছোটাচ্চু বলল, তা ঠিক। তারপর সুমনকে লিখল

আমি একটা বিজ্ঞানের বই লিখছি। বই মেলায় বের করার ইচ্ছা। সেই জন্যে মজার মজার প্রশ্ন আর উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছি।

সুমন লিখল

আমার কাছে আরো মজার প্রশ্ন আছে।

ছোটাচ্চু লিখল

আমাকে দিবে?

সুমন লিখল হাতে লেখা প্রশ্ন। আমার কাছেও স্ক্যানার নাই। হা হা হা।

ছোটাচ্চু আবার তার বাসা বের করার চেষ্টা করল।

তোমার বাসা কোথায়? কাছাকাছি হলে হাতে হাতে দিতে পার।

সুমন যেখানেই তার বাসা লিখুক না কেন ছোটাচ্চু লিখবে তার বাসা ঠিক সেখানেই। তারপর সেখানে চলে যাবে। কিন্তু সুমন তাকে বিপদে ফেলে দিল, পাল্টা প্রশ্ন করল।

তোমার বাসা কোথায়?

এখন তার বাসা যদি কাছাকাছি না হয় তাহলে তো বিপদ হয়ে যাবে। টুনি আবার তাকে সাহায্য করল, বলল, ছোটাচ্চু, তুমি তোমার বাসাটা কোথায় লিখ। যদি তার বাসা থেকে দূরে হয় তখন ভান করবে ঠিক সেখানে একটা কাজে গিয়েছ!

ছোটাচ্চু লিখল

আমার বাসা মিরপুর।

সুমন লিখল

আমার বাসা উত্তরা। সরি।

ছোটাচ্চু হাতে কিল দিয়ে বলল, অন্তত বাসাটা কোথায় বের করে ফেলেছি! সুমন উত্তরাতে আছে!

টুনি বলল, এখন তুমি লিখ কাল পরশু তুমি উত্তরা যেতে পার। তখন ইচ্ছে করলে তুমি তাকে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পার, তার প্রশ্নগুলো নিতে পার। বেশি উৎসাহ দেখিও না, তাহলে সন্দেহ করবে।

ছোটাচ্চু লিখল

উত্তরাতে আমার ডেন্টিস্ট এপয়েন্টমেন্ট আছে। আমি কাল উত্তরা যাব। তুমি চাইলে তখন দিতে পারি।

টুনি জিজ্ঞেস করল, এতো কিছু থাকতে ডেন্টিস্ট এপয়ন্টমেন্টের কথা কেন বলছ?

ছোটাচ্চু হা হা করে হেসে বলল, বুঝলি না? ভান করব দাঁতে ব্যথা, কথা বলতে পারছি না। বিজ্ঞানের প্রশ্ন যদি করে ফেলে ধরা পড়ে যাব না?

সুমনকে শেষ পর্যন্ত টোপ খাওয়ানো গেল। সে উত্তরার একটা ফাস্ট ফুডের দোকানের ঠিকানা দিয়ে বলল, সন্ধ্যেবেলা সেখানে গেলে সে তার মজার প্রশ্নগুলো দিয়ে যাবে। সেই ই-মেইলটি পেয়ে সুমন একটা গগনবিদারী চিৎকার দিল এবং সেই চিৎকার শুনে ছোটদের সাথে সাথে বড়রাও চলে এল! বড়রা যখন বুঝল কোনো বিপদ আপদ হয়নি তখন যে যার মতো চলে গেল শুধু বাচ্চারা থেকে গেল।

একজন জিজ্ঞেস করল, পালিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে খুঁজে পেয়েছ?

ছোটাচ্চু বুকে থাবা দিয়ে বলল, ইয়েস। কাল সন্ধ্যায় দেখা হবে!

আরেকজন জিজ্ঞেস করল, কেমন করে খুঁজে বের করলে ছোটাচ্চু?

ছোটাচ্চু গম্ভীর মুখে বলল, এটা একই সাথে বুদ্ধি, মেধা, বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং কঠোর পরিশ্রমের ফসল।

ছোটাচ্চুর গম্ভীর মুখ দেখে বাচ্চারাও মুখ গম্ভীর করে মাথা নাড়ল। শুধু টুনি মুখ টিপে হাসল।

শান্ত জিজ্ঞেস করল, কালকে যখন দেখা হবে, তখন তুমি কী করবে?

ছোটাচ্চু বলল, আমি তখন তার বাবাকে জানাব। বাবা সেই ফাস্ট ফুডের দোকানে অপেক্ষা করবে, আমি যখন সুমনের সাথে কথা বলব তখন তার বাবা এসে ক্যাঁক করে ধরে ফেলবে। ছোটাচ্চু আনন্দে হা হা করে হাসল। বাচ্চারা কেউ তার হাসিতে যোগ দিল না।

টুনি বলল, কালকে তার বাবাকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

কেন?

যদি কোনো কারণে সুমন না আসে তাহলে তুমি লজ্জা পাবে। তুমি যদি তার ঠিকানাটা বের করে আনতে পার, তাহলে সেই ঠিকানাটা পরে যে কোনো সময়ে তার আন্ধুকে দিতে পারবে।

ছোটাচ্চু বলল, ঠিকই বলেছিস। কালকে কোথায় থাকে দেখে আসি। যখন হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর হব, তখন জানাব।

সবাই চলে গেলে টুনি বলল, ছোটাচ্চু।

কী হল?

কালকে তুমি আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যেয়ো।

তোকে? কেন?

তুমি যদি সুমনের পিছনে পিছনে যাওয়ার চেষ্টা কর, সে বুঝে যাবে। তাই তুমি বসে থাকবে। আমি ওর বাসাটা চিনে আসতে যাব।

তু-তুই!

হ্যাঁ। আমি তোমার এসিস্টেন্ট। মনে আছে?

ছোটাচ্চু মাথা চুলকে বলল, তুই যাবি?

হ্যাঁ। সমস্যা কোথায়?

ছোটাচ্চু চিন্তা করে দেখল আসলে সেরকম সমস্যা নেই। রাস্তাঘাটে শতশত মানুষ হাঁটাহাঁটি করে তার মাঝে একটা বাচ্চা মেয়ে তো হেঁটে হেঁটে যেতেই পারে। ছোটাচ্চু তো একেবারে একা ছেড়ে দিচ্ছে না, সে তো আশেপাশেই আছে। সময়টা সন্ধেবেলা যখন সব মানুষজন হাঁটাহাঁটি করে।

 

সন্ধ্যাবেলা ছোটাচ্চু ফাস্টফুডের দোকানে ঢোকার আগে তার মুখে কিছু তুল্য ঢুকিয়ে নিল যেন মুখের বাম পাশটা একটু ফুলে থাকে। ডেন্টিস্টের কাছে যারা যায় তাদের দাঁতে ব্যথা থাকে, মুখ ফুলে থাকে। টুনি কোথায়। অপেক্ষা করবে সেটা আগে থেকে ঠিক করা ছিল না, কিন্তু কপাল ভালো রাস্তার ঠিক উল্টোপাশে একটা বইয়ের দোকান পেয়ে গেল। টুনি সেখানে বই দেখতে দেখতে চোখের কোণ দিয়ে ছোটাচ্চুকে লক্ষ করতে লাগল।

ঠিক সাতটার সময় চোখে চশমা হালকা-পাতলা একটা ছেলে হাতে কিছু কাগজ নিয়ে ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকল। ছোটাচ্চু আর টুনি দুজনেই ছেলেটাকে চিনতে পারল, তার বাবা এই ছেলেটারই ছবি দিয়েছেন। ছেলেটা সুমন।

সুমন ফাস্ট ফুডের দোকানে যারা বসে খাচ্ছে তাদের সতর্ক চোখে লক্ষ করে, বোঝাই গেল বিজ্ঞান লেখককে খুঁজছে। তখন ছোটাচ্চু হাত নেড়ে তাকে ডাকল। সুমন ছোটাচ্চুর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনি কি বিজ্ঞান লেখক?

ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল, বলল, গাবা গাবা গাবা-

দাঁত ব্যথা সেজন্যে মুখ খুলে কথা বলতে পারছে না, এরকম ভান করে অভিনয় করতে গিয়ে কোনো শব্দই বের হল না, অসতর্কভাবে এরকম বিচিত্র কথা বলে ফেলেছে!

সুমন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, বলল, কী বললেন?

ছোটাচ্চু হাত দিয়ে তার মুখ দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল যে তার দাঁতে ব্যথা তাই কথা বলতে পারছে না, অস্পষ্ট ভাবে বলল, আমা দাতা বাথা–কাথা বালতা পারা না।

আপনার দাঁতে ব্যথা? কথা বলতে পারেন না?

ছোটাচ্চু জোরে জোরে মাথা নাড়ল, সুমন বলল, তাহলে কথা বলার দরকার নেই। এই যে আমার প্রশ্ন। বলে সে কাগজগুলো ছোটাচ্চুর দিকে এগিয়ে দিল।

ছোটাচ্চু প্রশ্নগুলো নিয়ে তার কাগজগুলো এগিয়ে দিয়ে আবার দাঁত ব্যথার জন্যে কথা বলতে না পারার কারণে কষ্ট করে কথা বলার অভিনয় করল, তামার পাশার আত্তার।

আমার প্রশ্নের উত্তর? ছোটাচ্চু জোরে জোরে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, চা কাফা খাবা?

সুমন মাথা নাড়ল, না, আমি চা কফি খাব না। আমি যাই। বলে এদিক সেদিক তাকিয়ে ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে কয়েকবার পিছন ফিরে দেখল, ছোটা বের হয়নি তাই সে সন্দেহজনক কি পেল না। টুনি পিছনেই ছিল তাকে সে মোটেও সন্দেহ করল না। একটু সামনেই একট। ছাতলা বিল্ডিংয়ের ভেতর সুমন তাড়াতাড়ি ঢুকে গেল। টুনি বিড়িংটা পার হয়ে গিয়ে আবার ঘুরে এলো।

ছোটাচ্চু ততক্ষণে ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে বের হয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে। টুনিকে দেখে জিজ্ঞেস করল, বাসাটা দাখা আসাছাস?

টুনি বলল, তোমার এখন আর দাঁত ব্যথার ভান করতে হবে না। ঠিক করে কথা বলতে পার।

ছোটাচ্চুর হঠাৎ করে সেটা মনে পড়ল, তখন মুখের ভিতর থেকে তলাটা বের করে আবার জিজ্ঞেস করল, বাসাটা দেখে এসেছিস?

হ্যাঁ। কাছেই ছয়তলা বিল্ডিং। বাসার নম্বর তেতাল্লিশ!

গুড! ফ্যান্টাস্টিক। আয় বাসায় যাই।

টুনি কথা না বলে ছোটাচ্চুর সাথে হাঁটতে থাকে।

ছোটাচ্চু হাতে কিল দিয়ে উত্তেজিতভাবে বলল, আকবর হোসেনকে ফোন করে বলতে হবে তার ছেলের খোঁজ পেয়েছি। অসাধারণ!

টুনি কোনো কথা বলল না।

ডলি খালার কেসটা গুবলেট হয়ে গিয়েছিল। এইটা হয় নাই।

টুনি এবারেও কোনো কথা বলল না। ছোটাচ্চু বলল, কতো টাকা বিল করা যায় ঠিক করতে পারছি না। কম করা যাবে না আবার বেশিও করা যাবে না। প্রতি ঘণ্টার একটা হিসাব দিতে হবে। কী বলিস?

টুনি এবারেও কোনো কথা বলল না। ছোটাচ্চু উৎসাহে টগবগ করতে থাকে হাতে আরেকটা কিল দিয়ে বলল, বাবাটা কতো খুশি হবে!

টুনি ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, সুমনের বাবা এখন কী করবে ছোটাচ্চু?

ধরে বাসায় নিয়ে যাবে।

তারপর কী করবে?

বাপটা একটু কঠিন টাইপের মানুষ মনে হল। ধরে পিটুনি দিতে পারে।

তারপর?

তারপর নিশ্চয়ই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি করে দিবে?

তার মানে সুমন আর বৈজ্ঞানিক হতে পারবে না?

মনে হয় পারবে না। বাবাটা খুবই কঠিন মানুষ।

টুনি একটা নিঃশ্বাস ফেলল।

 

বাসায় পৌঁছানোর সাথে সাথে টুনি কয়েক সেকেন্ডের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। ছোটাচ্চু যখন বাথরুমে হাত মুখ ধুয়ে আকবর হোসেনকে ফোন করার জন্যে ফোনটা নিয়েছে তখন হঠাৎ তার ঘরে সব বাচ্চা কাচ্চা হাজির হল। তাদের মুখ থমথম করছে। ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, তোদের কী হয়েছে?

বাচ্চাদের ভিতরে বড় একজন বলল, ছোটাচ্চু তুমি ফোনটা রাখ।

ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, ফোনটা রাখব? কেন?

টুনি বলল, তোমার সাথে কথা আছে।

কথা থাকলে কথা বলবি। এখন বিরক্ত করিস না। যা সবাই। ভাগ।

বাচ্চাগুলো যাবার কোনো লক্ষণ দেখাল না বরং আরেকটু এগিয়ে এল। শান্ত বলল, আমাদের কথা আছে ছোটাচ্চু।

ফোনটা করে নিই। জরুরি ফোন।

উঁহু। ফোন করার আগে কথা। আমরা তোমাকে ফোন করতে দিব না।

ছোটাচ্চু এবারে সত্যি সত্যি রেগে গেল, আমাকে ফোন করতে দিবি? এটা কি মগের মুলুক নাকি?

টুনি বলল, তোমার নিজের ভালোর জন্যে বলছি।

আমার নিজের ভালোর জন্যে?

হ্যাঁ।

কী রকম?

তুমি এখন সুমনের আব্বকে ফোন করতে যাচ্ছ। তাই না?

হ্যাঁ।

ফোন করে তুমি ঠিকানাটা দিবে। তাই না?

হ্যাঁ।

তুমি ঠিকানাটা জান?

জানব না কেন? তুই পিছন পিছন গিয়ে দেখে এসেছিস মনে নাই? তেতাল্লিশ নম্বর ছয় তলা বিল্ডিং।

আমি তোমাকে সত্যিকারের ঠিকানাটা বলি নাই।

ছোটাচ্চু চোখ কপালে তুলে বলল, কী বললি?

তুমি শুনেছ আমি কী বলেছি?

ছোটাচ্চু রাগের চোটে কথাই বলতে পারছিল না। কোনোভাবে বলল, তু-তু-তুই?

বাচ্চাদের ভিতরে যে বড় সে গম্ভীর গলায় বলল, আমরা সবাই সুমনের পক্ষে। আমরা সুমনকে তার বাবার হাত থেকে রক্ষা করব।

ছোটাচ্চু রাগের চোটে তোতলা হয়ে গেল, বলল, র-র-র-ক্ষা করবি? বাবা-বাবার হাত থেকে?

হ্যাঁ।

ছোট একজন বলল, আমরা সুমন ভাইয়ার জন্য টাকা তুলতে শুরু করেছি, এর মাঝে সাতাইশ টাকা উঠে গেছে।

আরেকজন বলল, বিশ্বাস না করলে তুমি গুনে দেখো। একজন ছোটো একটা কৌটা তার দিকে এগিয়ে দেয়, সত্যি সত্যি তার ভেতরে দুমড়ানো মোচড়ানো কিছু টাকা।

ছোটাচ্চুর টাকাগুলো গুনে দেখার ইচ্ছে আছে বলে মনে হল না। চোখ পাকিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে রইল। শান্ত বলল, আমরা সবাই চাই সুমন ভাইয়া বৈজ্ঞানিক হোক। বৈজ্ঞানিক হয়ে এমন যন্ত্র আবিষ্কার করুক যেইটা দিয়ে স্বৈরাচারী বাবাদের শাস্তি দেওয়া যায়।

একজন শুদ্ধ করে দিল, বাবা আর মা।

আরেকজন, যার লেখাপড়া করার বেশি উৎসাহ নাই, বলল, এমন একটা যন্ত্র আবিষ্কার করবে যেটা দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে না, মাথার মাঝে নিজে নিজে লেখাপড়া ঢুকে যাবে।

টুনি বলল, তাই তুমি এখন সুমন ভাইয়ার বাবার পক্ষে কাজ করতে পারবে না। সুমন ভাইয়ার পক্ষে কাজ করতে হবে।

ছোটাচ্চু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, বলল, যদি না করি?

শান্তর মুখে একটা ফিচলে হাসি ফুটে উঠল, বলল, তুমি করবে ছোটাচ্চু।

তোর কেন সেটা মনে হচ্ছে?

তার কারণ তুমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাও যে জিনিসটাকে আমরা সেইটা ধরে এনেছি!

ভয় ডর নেই সেইরকম একজন দেখালো ডান হাতে সে গোবদা একটা মাকড়শা ধরে রেখেছে। মাকড়শাটা জীবন্ত এবং ছুটে যাবার জন্যে কিলবিল করে নড়ছে। সে মাকড়শাটা ধরে রেখে ছোটাচ্চুর দিকে এগিয়ে যাবার ভান করল। ছোটাচ্চু ভয়ে আতংকে চিৎকার করে লাফ দিতে গিয়ে চেয়ারের সাথে ধাক্কা খেয়ে টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে পানির গ্লাসটা নিচে ফেলে একটা তুলকালাম কাণ্ড করে ফেলল।

ভয় ডর নেই সেই ছেলেটার হাতে আটকা পড়া মাকড়শাটা কিলবিল করে নড়ছে সেই দৃশ্য দেখে ছোটাচ্চুর প্রায় হার্টফেল করার মতো অবস্থা হল। ছোটাচ্চু গড়িয়ে ঘরের এক কোনায় গিয়ে দুই হাত সামনে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, না, না, না, না–

ছেলেটা থমথমে গলায় ভয় দেখিয়ে বলল, তুমি যদি সুমন ভাইয়ার জন্যে কাজ না কর তাহলে এই মাকড়শাটা আমি তোমার গায়ে ছেড়ে দিব।

শান্ত বলল, মাকড়শাটা এখনো জ্যান্ত, সেটা তোমার শরীরের উপর দিয়ে তিড় তিড় করে হেঁটে যাবে।

আরেকজন বলল, হয়তো তোমার কানের ফুটো দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করবে।

আরেকজন বলল, আমাদের রান্নাঘরে এর চাইতে বড় একটা মাকড়শা আছে। পেটে বিস্কুটের মতো একটা ডিম। এরপরে সেইটাও ধরে আনব।

ছোটাচ্চু দুই হাত জোড় করে বলল, প্লিজ! প্লিজ! প্লিজ! মাকড়শাটা সরিয়ে নিয়ে যা। তোরা যা বলছিস সব শুনব। সব শুনব।

মাকড়শা হাতে ভয় ডরহীন ছেলেটা বলল, বল, খোদার কসম।

ছোটাচ্চু বলল, খোদার কসম।

এতো আস্তে বলছ কেন? জোরে বল।

ছোটাচ্চু প্রায় চিৎকার করে বলল, খোদার কসম!

তখন মাকড়শা হাতের ছেলেটা তার হাতটা নামিয়ে একটু পিছিয়ে আসে। ছোটাচ্চু ভাঙা গলায় বলল, প্লিজ সোনামণি মাকড়শাটা বাইরে ছেড়ে দিয়ে হাতটা ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেল। প্লিজ!

তুমি আগে বল কীভাবে কী করবে। তার পরে।

ছোটাচ্চু ভাঙা গলায় বলল, আমাকে বিশ্বাস কর। আমিও সুমনের পক্ষে। আয় সবাই মিলে ঠিক করি কী করা যায়। আগে মাকড়শাটা ফেলে দিয়ে আয়। প্লিজ।

ঠিক তো?

ঠিক।

ভয় ডর হীন ছেলেটা মাকড়শাটা বাইরে ছেড়ে দিতে গেল আর ছোটাচ্চু ভয়ে ভয়ে তার বিছানায় উঠে বসন।

শান্ত বলল, এখন বল তুমি করবে।

ছোটাচ্চু মাথা চুলকে বলল, আমার নে হয় ইয়ে মানে–

টুনি বলল, তুমি ফারিহা আপুকে ফোন কর। ফোন করে তার কাছ থেকে বুদ্ধি নাও। ফারিহা আপুর মাথায় চিকন বুদ্ধি। তোমার বুদ্ধি মোটা।

সবাই মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ ফারিহা আপুর মাথায় চিকন বুদ্ধি।

ছোটাচ্চু বলল, ঠিক আছে আমি তাহলে ফারিহার সাথে কথা বলব।

টুনি বলল, এখনই বল। সবার সামনে বল। ছোটাচ্চু বলল, তোরা আমাকে বিশ্বাস করছিস না? করছি। কিন্তু আমরা ফারিহা আপুকে আরো বেশি বিশ্বাস করি।

ছোটাচ্চু তখন মুখটা একটু ভোতা করে ফারিহাকে ফোন করল। প্রায় সাথে সাথে ফোন ধরে ফারিহা বলল, কী খবর? কেস সলভ হয়েছে?

হ্যাঁ হয়েছে।

কংগ্রাচুলেশন। তুমি তাহলে সত্যি ডিটেকটিভ হয়ে যাচ্ছ। ওয়ান্ডার ফুল। বাংলাদেশের শার্লক হোম।

ছোটাচ্চু বলল, কেস সলভ হওয়ার পর একটা নতুন কেস হয়েছে।

নতুন কেস? সেটা কী রকম?

ছোটাচ্চু ইতস্তত করে বলল, আমাদের বাসার বাচ্চা কাচ্চাদের তো তুমি জান। তারা সবাই এসে আমাকে ধরেছে আমি যেন সুমন ছেলেটিকে তার বাবার কাছে ধরিয়ে না দেই।

ঠিকই তো বলেছে। আমিও কখনো চাইনি এই রকম একটা বাবা জোর করে তার ছেলের উপর সবকিছু চাপিয়ে দিবে।

ছোটাচ্চু বলল, বাচ্চারা সবাই চাইছে তোমার সাথে কথা বলে আমরা বাবার হাত থেকে ছেলেটাকে রক্ষা করি।

তাই চাইছে?

হ্যাঁ। এরা সুমনের জন্যে একটা ফান্ডও তোলা শুরু করেছে। এর মাঝে সাতাইশ টাকা উঠে গেছে।

ওদেরকে বলো আমি তাদের ফান্ডে আরো সাতাইশ টাকা দিয়ে দিলাম। সাতাইশ প্লাস সাতাইশ ইকুয়েল টু চুয়ান্ন।

বলব। এখন কী করা যায় বল।

ফারিহা বলল, ছেলেটার ঠিকানা যেহেতু আমরা পেয়ে গেছি এখন সেইটা দিয়েই তার বাবাকে টাইট করা যাবে।

কীভাবে?

একশ একটা উপায় আছে। কাল বিকালে চল তার বাবার বাসায় যাই।

তুমিও যাবে?

কেন নয়। মহৎ কাজে আমাকে কখনো পিছিয়ে যেতে দেখেছ?

ছোটাচ্চু বলল, তা দেখি নাই। কিন্তু তুমি যেগুলো কাজকে মহৎ কাজ বল তার সবগুলিও মহৎ কি না সেটা নিয়ে আলোচনা করা যায়।

ফারিহা বলল, ঠিক আছে।

ফোনটা রাখার পর বাচ্চারা আনন্দের শব্দ করল। টুম্পা বলল, ছোটাচ্চু তোমার মুখটা একটু নিচে নামাবে?

কেন?

তোমার গালে আদর করে একটা চুমু দিয়ে দিই। তুমি খুবই সুইট।

সবাই মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ ছোটাচ্চু। তুমি খুবই সুইট। আসাধারণ। পৃথিবীর বেস্ট ছোটাচ্চু। ছোটাচ্চু মুখটা নামাল, তখন শুধু টুম্পা নয় তার সাথে সাথে অন্য সবাইও তার গালে ধ্যাবড়া করে একটা চুমু দিয়ে দিল।

 

ছোটাচ্চু আর ফারিহা গাড়ি থেকে নেমে আকবর হোসেনের দরজায় বেল বাজাল। প্রায় সাথে সাথেই আকবর হোসেন দরজা খুললেন, ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বললেন, এসো শাহরিয়ার। তুমি বলেছ খবর আছে, আমরা

খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।

ছোটাচ্চু বলল, এ হচ্ছে ফারিহা। ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক। আজকে আমার সাথে জোর করে চলে এল।

সাংবাদিক শুনে আকবর হোসেন কেমন যেন থিতিয়ে গেলেন, দুর্বল গলায় বললেন, আসেন, ভিতরে আসেন।

দুইজন ভিতরে গিয়ে বসার আগেই সুমনের মা আর বোন ঘরে ঢুকল। সুমনের মা এক ধরনের ব্যাকুল গলায় বললেন, আমার ছেলেটার খোঁজ পেয়েছ বাবা?

ছোটাচ্চু বলল, জি বলছি। আপনি বসেন।

ভদ্রমহিলা বসলেন, তার মেয়েটি মাকে ধরে পাশে বসে পড়ল। আকবর হোসেনও বসলেন, তার মুখে কেমন যেন অপরাধী অপরাধী ছাপ ফুটে উঠেছে।

ছোটাচ্চু বলল, আমার ধারণা আপনাদের ছেলেকে আমরা খুঁজে বের করতে পেরেছি-

ভদ্রমহিলা ব্যাকুল গলায় বললেন কোথায় আছে? কোথায়? কেমন আছে?

মেয়েটা চিৎকার করে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল।

ছোটাচ্চু বলল, বলছি, কিন্তু এই কেসটা নিয়ে আমি একটা সমস্যায় পড়ে গেছি।

আকবর হোসেন জিজ্ঞেস করলেন, কী সমস্যা?

আমার কাজের জন্যে সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। সাংবাদিকেরা এটার খোঁজ পেয়ে গেছে, এখন তারা এটা নিয়ে একটা স্টোরি করতে চায়। পজিটিভ স্টোরি করলে আমার কোনো সমস্যা ছিল না, কিন্তু স্টোরিটা নেগেটিভ, আমি যখন আমার ডিটেকটিভ এজেন্সিটাকে দাঁড়া করতে চাইছি এই সময়ে যদি নিগেটিভ স্টোরি করে–

ফারিহা এই সময় ছোটাচ্চুকে থামিয়ে বলল, আমি বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। স্টোরি নেগেটিভ হয় না, পজিটিভও হয় না। স্টোরি হয় সত্যি। কাজেই আমরা সত্যি কথাটা বলতে চাই। সত্যি কথা হচ্ছে একটা মেধাবি ছেলে বিজ্ঞানকে ভালোবাসে কিন্তু তার পরিবার তাকে বিজ্ঞান পড়তে দিবে না। তাকে বলা হয়েছে যদি তাকে বিজ্ঞান পড়তে হয়, নিজের উপার্জনে পড়তে হবে। ছেলেটি বিজ্ঞানকে এতো তীব্রভাবে ভালোবাসে যে, সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে নিজে নিজে উপার্জন করে পড়ছে। আমরা এই সত্যি কথাটা বলতে চাই। যে পরিবার তাকে ঘর ছাড়া করেছে—

সুমনের মা তীব্র গলায় চিৎকার করে বললেন, মা, তুমি পরিবার বল না। আমরা কিছু করিনি, সবকিছু করেছে সুমনের বাবা- আঙুল দিয়ে আকবর হোসেনকে দেখিয়ে বললেন, এই বাবা। আমরা কতো বোঝানোর চেষ্টা করেছি। বুঝে নাই। ছেলেটাকে ঘর ছাড়া করেছে।

ফারিহা ব্যাগ থেকে একটা নোট বই বের করে দ্রুত লিখতে থাকে, মুখ গভীর করে বলল, তাহলে বাবার একার ইচ্ছা? এখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের মতামতের কোনো গুরুত্ব নাই?

আকবর হোসেন অস্বস্তিতে নড়ে চড়ে বললেন, আমি ঠিক এই সব ব্যক্তিগত তথ্য পত্র পত্রিকায় দেখতে চাই না।

ছোটাচ্চু বলল, আমিও চাই না। কিন্তু এখন সাংবাদিকেরা খবর পেয়ে গেছে। আমার পিছনে চিনে জোঁকের মতো লেগে গেছে—

ফারিহা হুংকার দিয়ে ছোটাচ্চুকে বলল, আপনি কী বললেন? আমাকে চিনে জোঁক বললেন?

ছোটা বলল, না মানে ইয়ে—আক্ষরিক ভাবে বলি নাই। কথার কথা বলতে গিয়ে—

ফারিহা আরো জোরে হুংকার দিল, কথার কথা বলতে গিয়ে আপনি অপমান সূচক কথা বলবেন? আপনি এই মুহূর্তে কথাটা প্রত্যাহার করেন তা

হলে আপনার বিরুদ্ধে, আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিব।

ফারিহার অভিনয় দেখে ছোটাচ্চু মুগ্ধ হল। সেও অভিনয়ের চেষ্টা করতে লাগল, বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি চিনে জোঁক কথাটা প্রত্যাহার করলাম। আমি বরং বলি আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করছেন।

ফারিহা মুখ শক্ত করে বলল, থ্যাংকু।

ছোটাচ্চু আবার আকবর হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা ভালো কাজ করতে গিয়ে আমি বিপদের মাঝে পড়ে গেছি। সাংবাদিকেরা পত্রিকায় রিপোর্ট করার সময় আমার নাম দিয়ে দেবে, সবাইকে বলবে আমি টাকার বিনিময়ে মেধাবী বিজ্ঞান পিপাসু একটা ছেলেকে তার নিষ্ঠুর বাবার হাতে তুলে দিয়েছি। ভবিষ্যতে আমার একটা খারাপ পাবলিসিটি হয়ে যাবে। আমি সেটা চাই না।

আকবর হোসেন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী চান?

আপনি এই সাংবাদিকের বোঝান তারা যেন এই স্টোরিটা না করে।

ফারিহা মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করে বলল, আপনার ধারণা আপনারা ঢাইলেই আমরা সাংবাদিকেরা সত্যি প্রকাশ করা বন্ধ রাখব? আপনি কি জানেন আমাদের দেশে বাচ্চাদের তাদের বাবা মায়েরা কী পরিমাণ যন্ত্রণার মাঝে রাখে? তাদেরকে কী পরিমাণ চাপ দেয়? কী রকম ভয়ংকর প্রতিযোগিতার মাঝে ঠেলে রাখে? এটা তো শুধু একটা স্টোরি না—এরকম অনেক স্টোরি আমাদের কাছে আছে। আমরা একটা একটা করে প্রকাশ করব।

ফারিহা কথা বলছিল একটু ঢং করে, ভাবটা ছিল একটা ন্যাকা ন্যাকা। এর আগেও সে একবার ফোনে আকবর হোসেনের সাথে কথা বলেছিল, সে খুব সতর্ক যেন আকবর হোসেন গলার স্বর শুনে তাকে চিনে না ফেলে।

সুমনের ছোট বোনটি এতক্ষণ কোনো কথা না বলে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবার কথা শুনছিল। এই প্রথম সে কথা বলার চেষ্টা করল, তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আব্ব, আমি একটা কথা বলি?

কী কথা?

তুমি ভাইয়াকে বল তার যেটা ইচ্ছা সে পড়তে পারবে। তুমি বল ভাইয়া যদি সায়েন্টিস্ট হয় তাহলে তুমি খুব খুশি হবে। তাহলেই এই সাংবাদিকেরা কিছু লিখবেন না। মেয়েটি ফারিহার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই না আপু?

ফারিহা বিভ্রান্ত হয়ে যাবার খুব চমৎকার একটা অভিনয় করল, তারপর বলল, হ্যাঁ, তাহলে এই কেসটা নিয়ে অবশ্যি লিখতে পারব না। কিন্তু আমাদের অন্য অনেক কেস আছে। সেগুলো নিয়ে লিখব।

মেয়েটা বলল, সেগুলো নিয়ে লিখেন, বেশি বেশি করে লিখেন। তারপর আবার তার আব্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, চল আব্ব আমরা সবাই গিয়ে ভাইয়াকে নিয়ে আসি।

সুমনের আম্মু আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। আকবর হোসেন গলা পরিষ্কার করে বললেন, আসলে কাজটা আমি বেকুবের মতোই করেছি। নিজের ছেলেকে বুঝতে পারি নাই এরকম একটা বাবা কেমন করে হলাম? চল সবাই মিলে যাই। গিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে আসি।

 

উত্তরার সাতাশ নম্বর বাসাটির (তেতাল্লিশ নয়!) ছয় তলায় একটা ছোট রুমে সুমন আর আরো দুজন ছেলে যখন ফ্লোরে খবরের কাগজ বিছিয়ে আলুভর্তা আর সেদ্ধ ডিম দিয়ে ভাত খাচ্ছিল ঠিক তখন আকবর হোসেন তার স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। তাদেরকে দেখে সুমন প্রথমে চমকে উঠল, তারপর তার ছেলেমানুষী মুখটা হঠাৎ করে কঠিন হয়ে গেল।

আকবর হোসেন বললেন, বাবা! আমার উপর রাগ করিস না। বাসায় চল। আমি কথা দিচ্ছি তোর যেটা ইচ্ছা তুই পড়বি। তুই চাইলে তোকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্সে পি. এইচ. ডি করতে পাঠাব।

সুমন কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে সবার দিকে তাকাল। আকবর হোসেন বললেন, চল বাবা। বাসায় চল।

সুমন খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, আমাকে কেমন করে খুঁজে পেলে?

ছোটাচ্চু টুনির হাত ধরে বাইরে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে থেকেই বলল, আমরা খুঁজে বের করেছি।

সুমন বাইরে উঁকি দিয়ে ছোটাচ্চুকে দেখে অবাক হয়ে বলল, বিজ্ঞান লেখক?

ছোটাচ্চু বলল, আসলে আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি।

ডিটেকটিভ? সত্যি?

ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। সত্যি।

সুমনের মা সুমনের পাশে বসে তার মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, বাবা চল বাসায় গিয়ে খাবি। তারপর অন্য দুজনকে বললেন, তোমরাও চল, আজ আমার বাসায় খাবে। সর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশ মাছ বেঁধেছি। ইলিশ মাছ খাও তো?

একজন বলল, জি খাই। কিন্তু এখানে কী হচ্ছে? কিছুই বুঝতে পারছি না।

সুমনের বোন বলল, বাসায় চল, যেতে যেতে বলব। অনেক লম্বা স্টোরি। তোমরা শুনলে অবাক হয়ে যাবে। একেবারে উপন্যাসের মতো।

 

সুমন দরজা দিয়ে বের হতেই টুনি তার দিকে একটা খাম এগিয়ে দিল, বলল, সুমন ভাইয়া, এটা তোমার জন্যে।

আমার জন্যে?

হ্যাঁ।

কী আছে এখানে?

বাসায় গিয়ে দেখো।

সুমন বাসায় গিয়ে দেখল খামের ভেতর চুয়ান্ন টাকা। কেন এখানে চুয়ান্ন টাকা, ছোট মেয়েটা কে, কেন এই ছোট মেয়েটা তার হাতে চুয়ান্ন টাকা ধরিয়ে দিল সে কিছুই বুঝতে পারল না! বোঝার কথাও না।

Share This