০৬. গাঁধীবাদ দিয়ে শুরু

॥ ছয় ॥

গাঁধীবাদ দিয়ে শুরু করে সন্ত্রাসবাদ দিয়ে যে শেষ করতে চায়, তাকে কী বলা যায় বলো তো! পাগল? আমি কিন্তু মিশ্রজিকে পাগল বলি না। আমি বলি ও ছিল চঞ্চলমতি, সবসময়ে জীবন নিয়ে নানা পরীক্ষা করত। কী বলল তাকে তোমরা? গবেষণা? তাই হবে। উনি বোধহয় জীবন নিয়ে সবসময়ে রিসার্চ করতেন।

ঘরটা একটু অন্ধকার। একটা স্ট্যান্ডের ওপর শেড দেওয়া একটা মাত্র আলো। ভজনা দেবীর মুখ দেখা যাচ্ছে না। সাদা থানের ঘোমটাটা আজ বোধহয় উনি একটু বেশিই টেনে দিয়েছেন কপালের ওপর। একটা ভাগলপুরি সুতির চাদরে গা ঢাকা। পাটনায় একটু শীত পড়ে গেছে। আজ ভজনা দেবী কোনও মক্কেল নেননি। তার মুখোমুখি লম্বা সোফায় পাশাপাশি অজিত আর বিশ্বরূপ।

ঈষৎ ভাঙা ধীর গলায় চোস্ত হিন্দিতে বিশ্বরূপ বলে, ওঁর ওই রিসার্চ কি আপনি পছন্দ করতেন না?

তা কেন? যে লোকটা বুড়ো বয়সেও নিজেকে ভাঙচুর করে ফের গড়তে চাইছে সে তো জ্যান্ত লোক। মিশ্রজিকে বার্ধক্য স্পর্শও করেনি। না, তার বাইরের জীবন আমাকে কখনও ডিস্টার্ব করেনি।

আপনাদের ডিভোর্স হয় বেশ পরিণত বয়সেই, সাধারণত যে বয়সে স্বামী-স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি আমরা বড় একটা দেখতে পাই না।

খুব ঠিক কথা। তবে আইনের ছাড়াছাড়ি হওয়ার অনেক আগেই মিশ্রজির সঙ্গে আমার আত্মার বন্ধন ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তুমি নিশ্চয়ই সেসব ব্যাপার জানতে চাইবে না!

আমি শুধু জানতে চাই, মিশ্রজি কি অত্যাচারী পুরুষ ছিলেন!

সব পুরুষই খানিকটা অত্যাচারী। মিশ্ৰজিকে একা দোষ দিয়ে লাভ কী? মেয়েরা তা মেনে নিয়েই স্বামীর ঘর করে। আমার বিয়ে হয় আট বছর বয়সে, আর গাওনা হয় যখন আমার বয়স আঠারো। এই আট থেকে আঠারো বছর বয়স অবধি আমাকে শেখানো হয়েছিল কী করে স্বামীর মনোরঞ্জন করে চলতে হবে, রাগী-খেয়ালি বাইরের কাজে ব্যস্ত ভি আই পি স্বামীকে কী রকম করে তোয়াজ করতে হবে। তোমরা তো জানোই মিশ্রজি ছাত্রজীবনেই ভি আই পি হয়ে গিয়েছিলেন আন্দোলন করে আর জেল খেটে, গাঁধীবাবার সঙ্গেও তার কানেকশন ছিল।

আমরা মিশ্রজির ব্যাকগ্রাউন্ড জানি মাতাজি।

মাতাজি! না, তুমি আমাকে মাতাজি বলে ডেকো না। অজিতের মতো তুমিও মা ডেকো। আজকাল অনেকে আমাকে গুরু বানিয়ে ফেলেছে, তাই মাতাজি ডাকটা চাউর হয়ে যাচ্ছে। পাঁচজনে ডাকুক, আমি তা ঠেকাতে পারব না। কিন্তু তোমরা ডেকো না।

মিজির সঙ্গে আপনার কোথাও প্রফেশন্যাল জেলাসি ছিল কি? শুনেছি উনি জ্যোতিষ টোতিষ মানতেন না।

ওঁর সঙ্গে আমার অনেক বিষয়েই নটখট ছিল। জ্যোতিষও তার মধ্যে একটা। তবে বাবা তোমাকে বলি জ্যোতিষ কিন্তু আমি টাকা রোজগারের জন্য করি না। আমার আগ্রহ ছিল, তাই প্রথম নিজে নিজে শিখেছিলাম। টের পেতাম, আমি অনেক অদেখা জিনিস অনুমান করতে পারি, অনেক অজানা কথা টের পাই। বিদ্যেটা আমি ভালবাসি। তোমরা হয়তো বিশ্বাস করো না, না করাই স্বাভাবিক, কিন্তু আমার কাছে এটা লোক-ঠকানোর কায়দা নয়। অজিতকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো, ও আমাকে অনেকটাই জানে।

জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি।

ভজনা দেবী যে একটু হাসলেন তা বোঝা গেল ঘোমটার অন্ধকারেও তার ঝকঝকে দাত ঝিকিয়ে ওঠায়। বললেন, বিশ্বাস করো?

বিশ্বরূপ এ প্রশ্নটার জবাব দিল না।

ভজনা দেবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পুলিশরা সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। একজন পুলিশ অফিসারের তো এমনও সন্দেহ হয়েছিল যে, আমিই নাকি ভাড়াটে খুনি পাঠিয়ে মিশ্রজিকে খুন করিয়েছি। তার কারণ মিজির দ্বিতীয় বিয়ে।

কথাটা বলে ভজনা দেবী একটু আনমনা হয়ে বসে থেকে একটু ধরা গলায় বললেন, না হয় তাই হল, কিন্তু আমি কি পারি লালুয়া আর মহেন্দ্রকে খুন করতে? লালুয়াকে যে এইটুকু বেলা থেকে মানুষ করেছি। আমাকে গাল ভরে মা ডাকত।

আমি মিজির দ্বিতীয় বিয়েটা সম্পর্কে জানতে চাই। উনি বিয়েটা করলেন কেন? হয়তো ওটাও জীবন নিয়ে ওর রিসার্চ। তোমরা পুরুষমানুষেরা বাবা, এমনিতেই একটু নির্লজ্জ। বুড়ো বয়সেও কামকামনা সব দগদগ করে। আর তার জন্য না করতে পারো এমন কাজ নেই।

কিছু যদি মনে করেন, মিশ্রজি কি ওইরকমই ছিলেন?

ভজনা দেবী আবার একটু চুপ করে থাকেন। তারপর ধীর গলায় বলেন, সেটা বললে মিথ্যে কথা বলা হবে বাবা। মিশ্রজি গাঁধীবাবার শিষ্য। মেয়েছেলে নিয়ে ওঁর কোনও দুর্নাম কখনও ছিল না। কিন্তু এই বিয়েটা করেছিলেন আমার ওপর প্রতিশোধ নিতেই।

আপনি জেলাসি ফিল কেন করতেন না?

আমার বয়স কত জানো? আর ন’মাস পর পাক্কা ষাট হবে। এ বয়সে আর জেলাসির কী থাকে বাবা?

জেলাসির কি বয়স আছে?

তুমি অনেক মানুষ ঘেঁটেছ, তোমাকে আর কী বোঝাব বলো! এই বয়সের যে জেলাসি তার রকম আলাদা।

শুনেছি, আপনি মিশ্রজিকে ডিভোর্স দেননি!

ঠিকই শুনেছ। যদিও আমাদের সম্পর্ক আলগা হয়ে গিয়েছিল, তবু বিয়েটা আমি মানতুম। এখনও মানি। যদি কুসংস্কার বলতে চাও তো বোলো। আমাদের পরিবারের শিক্ষা অন্যরকম। আমরা দেওঘরের ঠাকুরজির শিষ্য। ঠাকুরজি ডিভোর্স পছন্দ করতেন না। মিশ্রজি সেটা ভালই জানতেন। ঠাকুরজি যতদিন দেহে ছিলেন, মিশ্রজি তার কাছে যেতেন। উনি দীক্ষা নেননি, কিন্তু শ্রদ্ধা ছিল। মিশ্রজি জানতেন, আমি ডিভোর্সের মামলা মরে গেলেও করব না। কিন্তু উনি করলেন।

আপনি মামলা লড়েননি?

লড়ে কী হবে? যেখানে আমিই ওঁর দু’ চোখের বিষ সেখানে আইনের লড়াই তো পণ্ডশ্রম। লোকে খোরপোশের কথা বলে। লোকেরা আহাম্মক। খোরপোশ নিতে যাব কেন বলো তো। আমি কি ভিখিরি? মিশ্ৰজি অবশ্য দিতে চেয়েছিলেন, আমি পরিষ্কার বলে দিয়েছি, নেব না। তাতে ওঁর পৌঁরুষে লেগেছিল। উনি হয়তো ভেবেছিলেন, ভজনার আমার খোরপোশ বেঁচে থাকা মানেই ডিভোর্সের পরও একরকম বশ্যতা স্বীকার করা।

জ্যোতিষচর্চা থেকে আপনার আয় তা হলে ভালই হয়!

এখন হয়। আগে কষ্ট গেছে খুব।

চাকর কফি দিয়ে গেল। সঙ্গে বিস্কুট।

মেহসিক্ত কণ্ঠে ভজনা বললেন, তুমি তদন্তে এসেছ বলে শক্ত হয়ে থেকো না। আমার ছেলেপুলে থাকলে হয়তো তোমার বয়সিই হত। ভাল ডালমুট আছে, খাবে?

না।

আর সিগারেট খেতে চাইলে খেতে পারো। কিছু মনে করব না।

কফির কাপটা তুলে নিয়ে বিশ্বরূপ বলে, মিশ্রজির দ্বিতীয় স্ত্রী মিঠিয়া সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন?

কিছুই জানি না। তাকে চোখেও দেখিনি। অজিতের কাছে শুনেছি সে নাকি দেহাতের মেয়ে। গরিবের মেয়েরা লোভে পড়েই তো এরকম বিয়ে করে।

একটা গভীর শ্বাস ফেলে বিশ্বরূপ বলে, মিঠিয়া সম্পর্কে আমরা তেমন কোনও খবর সংগ্রহ করতে পারছি না।

কেন বাবা, তার গায়ে খোঁজ করলেই তো হয়।

অজিত এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, একটিও কথা বলেনি। এবার হঠাৎ বলল, না মা, মিঠিয়ার কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় বাড়ি, কার মেয়ে কিছুই কেউ জানে না।

ভজনা দেবী খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, অদ্ভুত কথা।

বিশ্বরূপ ধীর গলায় বলে, ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া কোনও মানুষ তো নেই। রুট তো একটা থাকতেই হবে।

সে তো বটেই। তোমরা ভাল করে খুঁজেছ?

লোকাল পুলিশ খুঁজছে। পায়নি। কোনও অজ্ঞাতকুলশীলকে বিয়ে করার মতো অ্যাডভেঞ্চারাস মিশ্ৰজি ছিলেন কি?

ভজনা দেবী মাথা নেড়ে বললেন, ও মানুষ সম্পর্কে কিছুই বলা যায় না। কখন যে কী করবেন তার কিছু ঠিক ছিল না। তবে অগাধ বুদ্ধিমান ছিলেন। আবার বোকার মতো কাজও করতেন।

বিশ্বরূপ আচমকা প্রশ্ন করে, বেশ কিছুদিন আগে আপনার বাড়িতে মিরচি নামের একটা মেয়ে কাজ করত কি?

ভজনা দেবী একটু অবাক হয়ে বললেন, মিরচি? ওঃ হ্যাঁ, মিরচি বলে একটা মেয়ে ছিল তো! কেন বাবা?

এমনিই। কীভাবে সে ঢুকেছিল এ বাড়িতে তা মনে আছে?

ভজনা আবার ভাবিত হলেন, খুব সম্ভবত লালা রামবিলাসজি ওকে পাঠিয়েছিলেন।

মেয়েটা কেমন ছিল?

ওর কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। খুব বেশিদিন ছিলও না আমার বাড়িতে। মেয়েটা ভাল ছিল না। আড়ি পেতে কথা শুনবার অভ্যাস ছিল। আমার মক্কেলরা যখন বাইরের ঘরে অপেক্ষা করত তখন ও গিয়ে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করত। লালাজি পাঠিয়েছিলেন বলে প্রথমে তাড়াইনি। লালাজি মিশ্ৰজির বন্ধু ছিলেন। আমাকে এখনও স্নেহ করেন। পাটনায় আমাকে সেটল হতে উনি অনেক সাহায্য করেছেন। ওঁর খাতিরে মিরচিকে কিছুদিন রেখেছিলাম। তারপর তাড়িয়ে দিই।

মেয়েটিকে মনে আছে?

আছে। দেহাতি মেয়ে। খুব ভাল স্বাস্থ্য। মুখখানাও খারাপ নয়। হঠাৎ মিরচির কথা কেন বাবা? তোমরা যারা পুলিশ তাদের আমি একটু ভয় পাই। এমন সব অদ্ভুত প্রসঙ্গ তোলো

যে অস্বস্তিতে পড়তে হয়।

মিরচির ব্যাকগ্রাউন্ডও কিছু জানেন?

না। লালাজি হয়তো জানবেন।

লালাজি কবুল করেছেন যে, তিনিও জানেন না।

মিরচিকে নিয়ে এত কথা উঠছে কেন?

আমাদের যতদূর জানা আছে, মিরচিই মিঠিয়া।

ভজনা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, বলো কী?

বিশ্বরূপ একটা ফোটো বের করে সেন্টার টেবিলে রেখে বলে, এ ছবিটা প্রেস ফোটোগ্রাফারের তোলা। বিহারের অনেক কাগজে এ ছবি এবং আরও অনেক ছবি রসালো ক্যাপশন সহ ছাপা হয়। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা। খবরের কাগজে এরকম ছবি আপনি দেখেননি!

ভজনা কুষ্ঠিত হাতে ছবিটা তুলে নিয়ে অল্প আলোয় ঝুঁকে দেখলেন।

চিনতে পারছেন?

মিশ্রজির পাশে এ তো মিরচিই মনে হচ্ছে।

আপনার বাড়িতে খবরের কাগজ নিশ্চয়ই আসে!

ভজনা মাথা নেড়ে বলেন, আমি খবরের কাগজ পড়ি না বাবা। রাখিও না। খুন জখম পলিটিকস আমার ভাল লাগে না। তবে নিউ পাটনা টাইমস পাই কমপ্লিমেন্টারি হিসেবে।

অজিত বলল, তা হলে আপনার দোষ নেই, নিউ পাটনা টাইমসের ছাপা এত খারাপ যে বাপের ছবি ছেলে চিনতে পারে না।

ভজনা দেবী হাসলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই রহস্যময়। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই কিছু জানো বাবা। কিছু একটা আঁচ করেই কথাটা তুলেছ! তবে সত্যি কথাটা হল, মিরচিই যে পরে মিঠিয়া হয়েছে এটা আমার আজ অবধি জানা ছিল না।

লোকাল পুলিশ কিন্তু কথাটা বিশ্বাস করবে না।

কেন বাবা?

তাদের এমন সন্দেহ হতে পারে যে, মিরচিকে ষড়যন্ত্র করে আপনিই ভিড়িয়ে দিয়েছেন মিশ্রজির সঙ্গে, যাতে মিশ্ৰজির হাঁড়ির খবর আপনার নলেজে থাকে।

ভজনা শান্ত কণ্ঠেই বলেন, এরকমও হয় নাকি? শত হলেও মিশ্ৰজি আমার স্বামী, আমি নিশ্চয়ই চাইব না তিনি আবার বিয়ে করে আমার অপমান করুন। তোমার মতও কি লোকাল পুলিশের মতোই? তোমাকে দেখে যে বুদ্ধিমান বলে মনে হয়েছিল!

বিশ্বরূপ একটু হাসল।–বুদ্ধিমান নই, তবে লজিক্যাল। আপনি যদি মিরচিকে মিজির বাড়িতে প্ল্যান্ট না করে থাকেন তা হলে মিশ্রজিই তাকে প্ল্যান্ট করেছিলেন আপনার বাড়িতে।

অবাক ভজনা বলেন, কেন বাবা, তা উনি কেন করবেন?

আপনার হাঁড়ির খবর জানার জন্য। ইন ফ্যাক্ট লালাজির কাছে উনিই মিরচিকে পাঠান যাতে লালাজি মিরচিকে আপনার বাড়িতে বহাল করতে সাহায্য করেন। কথাটা গোপন রাখতেও বলা হয়েছিল।

তোমরা কী করে জানলে?

লালাজি সবই কবুল করেছেন। তিনি নিরপরাধ।

ভজনা দেবী অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর বললেন, মিশ্রজি এতটা করতে গেলেন কেন? আমার তো গোপন করার মতো কিছু নেই।

হতে পারে, আউট অব জেলাসি। আপনার কাছে কার কার যাতায়াত সে বিষয়েও হয়তো কৌতূহল ছিল।

তুমি কি বলতে চাও উনি আমাকে সন্দেহ করতেন? বিশ্বরূপ একটু চুপ করে থেকে বলে, সন্দেহ নানারকম আছে। উনি হয়তো আপনার নৈতিক চরিত্রে সন্দেহ করতেন না। কিন্তু পলিটিকসের লোকদের আরও নানা সন্দেহ থাকে। উনি হয়তো সন্দেহ করতেন যে, আপনি লোকের কাছে ওঁর কুৎসা রটান এবং ওঁর পলিটিক্যাল কেরিয়ারের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন।

সেটা তো অন্য কথা।

সেটাই কথা। আপনিই অন্যরকম ভয় পাচ্ছেন।

ভজনা দেবী একটা নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলে বললেন, বাঁচালে বাবা। মরার আগে যে অন্তত চরিত্রের দোষের কথা শুনে যেতে হচ্ছে না এটা মস্ত কথা। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

দোষটা আমারই। কিছু মনে করবেন না। কিন্তু আমাদের প্রবলেমটা রয়েই গেল। তা হল মিঠিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড।

আমি জানলে তোমাকে সাহায্য করতাম।

একটু মনে করে দেখবেন যে কখনও তার দেশ বা গ্রামের কথা আপনাকে বলেছিল কি! কথাচ্ছলেও তো মানুষ কত কথা বলে!

ভজনা দেবী মাথা নাড়লেন, না বাবা, তার সঙ্গে ওসব কথা কিছু হয়নি। লালাজির লোক বলে আমি কখনও কিছু জিজ্ঞেসও করিনি। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, তুমি মিরচি বা মিঠিয়াকে নিয়ে খুব চিন্তিত।

হ্যাঁ। মিঠিয়াই হয়তো মিশ্রজির নিয়তি। তাকে বিয়ে করার আগে অবধি মিশ্রজি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। বিয়ের পর উনি এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আপনি বোধহয় জানেন না যে, মিশ্রজি একটা এ কে ফটি সেভেন রাইফেলও জোগাড় করেছিলেন।

জানি বাবা, অজিত বলেছে। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছো বাবা, সন্ত্রাসবাদীরা মিঠিয়াকেও মেরেছে।

ক্লান্ত স্বরে বিশ্বরূপ বলে, আমি কিছুই সহজে ভুলি না।

তুমি খুব এফিসিয়েন্ট অফিসার, তাই না বাবা?

হঠাৎ এ কথা কেন বলছেন?

অন্য পুলিশদের মতো তুমি কাঠ-কাঠ নও, কড়া কথাও বলতে চাও না। সুরিন্দরের সঙ্গে পাল্লা নিতে তুমি একা এসেছ, তাতেই বুঝতে পারছি সরকার তোমার ওপর ভরসা করেন।

মাথা নেড়ে বিশ্বরূপ বলে, কথাটা ঠিক নয়।

অজিত তোমার কথা আগে কখনও বলেনি। তোমরা কি ছেলেবেলার বন্ধু?

হ্যাঁ, বনগাঁর কাছে একটা গ্রামে আমরা থাকতাম। আমরা খুব গরিব ছিলাম। অজিতরাও।

গাঁয়ে কে আছে?

কেউ নেই। আমি বড় হয়ে কখনও সেখানে যাইনি।

কেন যাওনি বাবা?

অজিত হাসল, ও মনে করে গাঁয়ে গেলে ছেলেবেলার মুখগুলি সব হারিয়ে যাবে। ও ছেলেবেলাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।

এ তো অদ্ভুত কথা!

মা, ও যে কত অদ্ভুত তা আপনি জানেন না। হার্ডকোর টেররিস্ট সুরিন্দর একসময়ে ওর দারুণ বন্ধু ছিল। জিগির দোস্ত। দু’জনে এক টিমে হকি খেলত।

বলো কী? একটা খুনির সঙ্গে।

তখন সুরিন্দর খুনি ছিল না, টেররিস্টও নয়। কাকার সঙ্গে ব্যাবসা করতে কানাডা গেল। কিছুদিন বাদেই ফিরে এল টেররিস্ট হয়ে। বিশ্বরূপের আরও হিস্টরি আছে মা, তবে সেগুলো বলা যাবে না। ও রিটায়ার করার পরও যদি আমি বেঁচে থাকি তবে ওর ওপর একটা স্টোরি লিখব। তখন দেখবেন।

বিশ্বরূপ উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, সন্ত্রাসবাদীরা অনেক সময়ে নিজের লোককেও মারে বিপদ বুঝলে। মিঠিয়ার মৃত্যুটা সেরকমই কিছু। তবে আমাদের ওর ব্যাকগ্রাউন্ডটা দরকার।

হঠাৎ ভজনা দেবী মুখ তুলে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন, সুরিন্দরকে পেলে তুমি কী করবে বাবা?

বিশ্বরূপ চুপ করে রইল।

মারবে তো! অজিত আমাকে বলছিল, তাকে সরকারের চাই-ই, ডেড অর অ্যালাইভ। কিন্তু জ্যান্ত অবস্থায় তাকে ধরা অসম্ভব। তাই না?

বিশ্বরূপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এ প্রশ্নের কি জবাব হয়?

ভজনা দেবী একটু ভেজা গলায় বলেন, সে তোমার বন্ধু ছিল, তোমাদের ভালবাসা ছিল। এটা খুব খারাপ সময় বাবা, এ যুগে ভালবাসা বড্ড তাড়াতাড়ি মরে যায়। তোমার হাতটা একটু আমাকে দেখাবে?

বিশ্বরূপ অবাক হয়ে বলে, হাত!

ভজনা দেবী হাসলেন, আমার কাছে যে-কেউ যে-কোনও কাজেই আসুক, সকলেই একবার হাত বা কোষ্ঠী দেখিয়ে নিয়ে যায়। সত্যি হোক মিথ্যে হোক, সকলেরই নিজের ভবিষ্যৎ জানার কৌতূহল আছে। এটা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। তুমি মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রমের একজন। তোমার কোনও কৌতূহল নেই?

বিশ্বরূপ একটু যেন লজ্জা পেয়ে বলে, ভবিষ্যৎ জানবার কিছু নেই আমার।

এইটুকু বয়সেই তোমার মুখখানা ভারী মলিন আর হতাশ কেন বাবা?

আমার মুখটাই ওরকম।

তোমার হাতটা আমি দেখতে চাই। তোমার কৌতূহল না থাকতে পারে, আমার আছে। লাজুক একটু হাসি হেসে বিশ্বরূপ তার ডান হাতখানা কুণ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে দিল। ভজনা দেবী হাতের কাছেই একটা সুইচ টিপে একটা ছোট স্পটলাইট জ্বাললেন। একখানা ভারী আতস কাচ দিয়ে হাতখানা দেখলেন মন দিয়ে। প্রথমে ডান, পরে বাঁ হাতও।

দেহে মনে তুমি খুব শক্তিমান মানুষ।

পুলিশে চাকরি করি বলে বলছেন?

তা কেন? তুমি যেরকম তোমার হাতও সেই রকমই বলবে।

ভজনা দেবী আরও কিছুক্ষণ হাত দেখে চোখ বুজে একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর। ফের সেই অদ্ভুত প্রশ্নটা করলেন, তুমি সুরিন্দরকে মারবে?

বিশ্বরূপ গভীর বিষাদগ্রস্ত গলায় বলে, মারব না মরব তা তো জানি না। এ হল “জয়হীন চেষ্টার সংগীত”। আমাদের শুধু চেষ্টা আছে। ফল জানি না।

এ তো গীতার কথা। পড়েছ? পড়েছি। বারবার পোডড়া। তোমার যা জীবন, গীতা সবসময়ে তোমার পকেটে থাকা উচিত। দাঁড়াও, আমার কাছে একটা ছোট্ট গীতা আছে তোমাকে দিই। দেবনাগরী তো পড়তেই পারো।

হিন্দি আমার দ্বিতীয় মাতৃভাষা। কিন্তু গীতার দরকার নেই।

আছে। এই মায়ের এ কথাটা শুনো। সঙ্গে রেখো।

বাইরের ঘরেই বুক-শেলফ। ভজনা দেবী উঠে ছোট্ট একখানা পকেট গীতা এনে বিশ্বরূপের হাতে দিয়ে বললেন, এটা তোমাকে আমার উপহার।

তা হলে আজ চলি।— গীতাটা বুকপকেটে রেখে বিশ্বরূপ বলে।

এসো বাবা, জয়ী হও।

বিশ্বরূপ একটু হাসে, আমার জয়ী হওয়া মানে কিন্তু সুরিন্দরের মৃত্যু।

ভজনা দেবী সামান্য শিহরিত হয়ে চোখ বুজলেন।

চোখ বুজে থেকেই ভজনা দেবী গাঢ় স্বরে বললেন, কত মারবে তুমি? মেরে মেরে কি শেষ করতে পারবে ওদের? একজন মরছে তো দশজন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

আপনি তো গীতা মানেন। যা ঘটবার তা ঘটেই আছে। আমি নিমিত্ত মাত্র।

অস্ফুট কণ্ঠে ভজনা দেবী বললেন, ভুল হচ্ছে। কোথাও বড় ভুল হচ্ছে আমাদের।

তাই হবে হয়তো। কে জানে! দুর্বল পুরুষকার, দৈব বলবান।

তারা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এল তখনও নিথর হয়ে চোখ বুজে বসে আছেন ভজনা দেবী।

ফ্যাক্স মেশিনে মিঠিয়ার ছবি পাঠানো হয়েছিল দিল্লিতে। পরদিনই জবাব এল, নাম সুন্দরী। পদবি নেই। দেহাতি মেয়ে, তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ধানবাদে একটা ঠেক আছে। বন্দনা শর্মা হয়তো কিছু জানে। কিন্তু বন্দনা বড়লোকের মেয়ে, প্রভাবশালী। হ্যান্ডল উইথ এক্সট্রিম কেয়ার…

দু’দিন বাদে এক সন্ধ্যায় ধানবাদের এক অফিসার্স ক্লাবে একটি সুন্দরী মেয়ে বিলিয়ার্ড খেলছিল। আচমকাই টেবিলের ওপর একটা অচেনা ছায়া এসে পড়ল।

হু আর ইউ?

দি ল!

গো টু হেল।

উই আর ইন হেল ম্যাডাম।

বন্দনা নির্বাক মুখে বিষাদগ্রস্ত মুখখানার দিকে চেয়ে রইল। এত স্পর্ধা সে কারও দেখেনি। কিন্তু সে বুদ্ধিমতী। লোকটার পিছনে সে তিন-চারজন লোককে দেখতে পেল, যাদের এখানে দেখার কথাই নয়। সে জানে, স্পর্ধার কাছে কখনও কখনও নত হতে হয়।

বন্দনা মুখ নামিয়ে নিল।

বিশ্বরূপ ইংরিজিতে বলল, আমি খুব বেশি সময় নেব না। কিন্তু একটু নিরিবিলিতে কথা বলতে চাই।

বন্দনা ঈষৎ রক্তাভ মুখে বলে, বাইরে আমার গাড়ি আছে।

চলুন।

ক্লাবের চমৎকার পার্কিং লটে একখানা নতুন মারুতি দাঁড়ানো। সবুজ রঙের ওপর ফ্লাডলাইট পিছলে যাচ্ছে। ভিতরে ঢুকে বন্দনা ইঞ্জিন আর এয়ারকন্ডিশনার চালিয়ে দিল।

নাউ শুট, হি-ম্যান।

বিশ্বরূপ তার ঘুম-ঘুম ঠান্ডা গলায় ইংরিজিতে বলে, আপনি যে কোনওরকম চেঁচামেচি রাগারাগি বা জোর জবরদস্তি না করে লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমার সঙ্গে চলে এলেন তার জন্য ধন্যবাদ।

মোটেই তা নয়, মিস্টার সুপারম্যান। আমি অতটা সহজ লোক নই। আপনার সঙ্গে চার পাঁচজন প্লেনড্রেস পুলিশ অফিসার ছিল, তাদের সবাইকে আমি চিনি। ডি এস পি চৌধুরী সাহেবকে আমি কাকা বলে ডাকি, উনি চোখ টিপে ইশারা করায় আমি রেজিস্ট করিনি। বুঝলেন, মিস্টার জিরো জিরো সেভেন? এখন দয়া করে বলুন তো ক্লাবে এসে হামলা করার মতো এমন কী জরুরি ব্যাপার।

বিশ্বরূপ ক্লান্ত গলায় বলে, ক্লাবে না এলে আপনাকে আজ ধরা যেত না। আজ রাতে আপনার বাড়িতে বিরাট পার্টি আছে।

আপনি চালাক হলে সেই পার্টিতেই কৌশলে ঢুকে যেতে পারতেন। সিন ক্রিয়েট করতে হত না।

আমি আজ রাতেই ধানবাদ ছেড়ে যাব মিস শর্মা। আমার হাতে সময় ছিল না।

একটা ফোটোগ্রাফ বের করে বন্দনার হাতে দিয়ে বিশ্বরূপ বলে, দেখুন তো একে চেনেন কি না?

বন্দনা বাতিটা জ্বেলে এক পলক দেখেই বলল, সুন্দরী।

আমরা এর ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে চাই।

সেটা আমি আপনাকে জানাব কেন? আমার কী দায়?

সামনের দিকে অর্থহীন দৃষ্টিতে চেয়ে আনমনে স্বগতোক্তির মতো মৃদু স্বরে বিশ্বরূপ বলে, আপনার কোনও দায় নেই মিস শর্মা।

বন্দনা শ্লেষ মেশানো গলায় বলে, নাউ মে আই গো ব্যাক টু মাই গেম, মিস্টার সেক্সঅ্যাপিল?

তেমনি আনমনে বিশ্বরূপ স্বগতোক্তির মতো করে বলে, গেম মিস শর্মা?

চাপা তীব্র গলায় বন্দনা বলে, মিস্টার বিশ্বরূপ সেন, উইল ইউ প্লিজ গেট আউট অফ মাই হেয়ার নাউ?

বিশ্বরূপ তার ক্লান্ত বিষণ্ণ চোখ দুখানা ধীরে ফেরাল বন্দনার মুখের ওপর, আপনি আমার নাম জানেন। জানার কথা নয় কিন্তু।

বন্দনা বিষ-হাসি হেসে বলে, আই হেট ইউ স্মার্ট আলেক। আই হেট ইয়োর গাটস।

কথাটা যেন শুনতেই পায়নি এমন নির্বিকারভাবে বিশ্বরূপ বলে, উই কুড টক অ্যাবাউট গেমস। হোয়াট ইজ ইয়োর গেম মিস শর্মা?

সেটা আমি আপনাকে বলব কেন? আপনি আপনার খেলা খেলবেন, আমি আমার খেলা খেলব।

বন্দনার গলার ঝঝ এবং তীব্র রাগ বা ঘেন্না স্পর্শও করল না বিশ্বরূপকে। আপনমনে মাথা নেড়ে সে বিড়বিড় করে বলল, ইট ওয়াজ নট সুরিন্দরস গেম আইদার। সুরিন্দর নেভার কিলড এ উয়োম্যান।

ঝাঁঝালো মার্কিন ইংরিজিতে বন্দনা বলে, কী সব যা-তা বলছেন! প্লিজ! আমি আর সময় দিতে পারছি না।

বিশ্বরূপ একটু হাসে, সময়টা কাকে দেবেন মিস শর্মা? যখন হাতে অনেক সময় পাবেন, কিন্তু বিলিয়ার্ড টেবল থাকবে না, ক্লাব থাকবে না, পার্টি থাকবে না, গাড়ি থাকবে না, বন্ধু থাকবে না, এমনকী এক চিলতে আকাশ বা সামান্য ঘাসজমিটুকুও থাকবে না, থাকবে শুধু গরাদের অবরোধ, তখন সময়টা কাকে দেবেন?

বন্দনা চিড়চিড়িয়ে উঠতে যাচ্ছিল।

বিশ্বরূপ শান্ত গলায় বলে, অযথা আনপ্রফিটেবল রাগ করতে নেই। ইউ আর নট বিয়িং লজিক্যাল।

আপনি আমাকে অ্যারেস্ট করবেন? অন হোয়াট গ্রাউন্ড?

এ কথাটাও যেন শুনতে পেল না বিশ্বরূপ। বিড়বিড় করে বলে, কারও হাতে অঢেল সময়, কারও হাতে একটুও সময় নেই।

কী বলছেন?

আই অ্যাম টকিং অ্যাবাউট এ গেম মিস শর্মা। এ ডেডলি গেম। তাতে কেউ হারে না, কেউ জেতে না। শুধু লড়াই হয়।

ননসেন্স।

বিশ্বরূপ তেমনই বিড়বিড় করে, একদিন আমি আপনাকে আমার ছেলেবেলার গল্প শোনাব, যদি সময় আমাদের দয়া করে।

আমি শুনতে চাই না।

গাড়ি স্টার্ট দিন মিস শর্মা।

কেন?

উই আর গোয়িং ফর এ রাইড।

হোয়াট রাইড?

প্লিজ! স্টার্ট দি কার। ড্রাইভ।

বন্দনা গাড়িতে স্টার্ট দিল। ঝাঁঝালো স্টার্ট।

আস্তে মিস শর্মা। উই আর নট গোয়িং টু কমিট সুইসাইড। আই হ্যাভ প্রমিসেস টু কিপ অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।

হ্যাকনীড।

মিস শর্মা, যে-কোনও অন্ধকার নির্জন জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করান।

কেন?

আমি নেমে যাব।

তার মানে?

আমার কাজ শেষ হয়েছে। আর-কোনওদিনই আমাদের দেখা হবে না। গাড়িটা দাঁড় করান।

বন্দনা স্তিমিত গলায় বলে, আর ইউ লিভিং?

হ্যাঁ। ওই সামনে একটা গাছের ছায়া আছে। ওখানেই দাঁড় করান।

বন্দনা গাড়ি দাঁড় করায়। বাঁ দিকের দরজাটা খুলতে হাত বাড়িয়েছিল বিশ্বরূপ।

এক মিনিট মিস্টার সেন।

বিশ্বরূপ ধীরে হাতটা তুলে নিজের কোলের ওপর ফিরিয়ে আনে। অস্ফুট গলায় বলে, বলুন।

সুন্দরী আমাদের আয়া ছিল। তারপর সন্ত্রাসবাদীদের দলে যোগ দেয়। প্রথমে নকশাল ছিল। পরে অন্য কোনও ফ্যাকশনে জয়েন করে। অ্যাকটিভিস্ট, হার্ডলাইনার। পীতাম্বর। মিশ্রর সঙ্গে কী ভাবে যোগাযোগ হয় জানি না। তারপর খুন হয়ে যায়।

আপনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের লিয়াজোঁ কে ছিল? সুন্দরী?

বন্দনার মাথাটা একটু ঝুঁকে পড়ে স্টিয়ারিং-এর ওপর। দুর্বল গলায় সে বলে, হ্যাঁ।

সন্ত্রাসবাদ একটা রোমান্স, তাই না? একটা বেটার সিস্টেম আনার স্বপ্ন দেখা। নকশালরাও দেখেছিল। দুনিয়ার সব সন্ত্রাসবাদীরাই স্বপ্ন দেখে।

সময় আসবে, স্মার্ট আলেক। সন্ত্রাস কেউ চায় না, তবু সন্ত্রাসের ভিতর দিয়েই পথ। করতে হয়। যে জগদ্দল সিস্টেম আমাদের বুকের ওপর চেপে বসে আছে তাকে ধাক্কা দেব কী করে?

বিশ্বরূপ বিড়বিড় করে, সবাই এ কথাই বলে, অল টেররিস্টস।

আপনি সিস্টেমের প্রতিনিধি, আপনি বুঝবেন না।

বিশ্বরূপ আনমনে চেয়ে থাকে সামনের দিকে। তারপর বিড়বিড় করে, আই হ্যাভ কাম এ লং ওয়ে টু কিল এ ম্যান।

বন্দনা তীব্র চাপা গলায় বলে, হোয়াট ম্যান?

যেন সামান্য সচকিত হয়ে বিশ্বরূপ বলে, আমারও সেই প্রশ্ন। হোয়াট ম্যান!

বন্দনা সামান্য ঝুঁকে পড়ে তেমনই তীব্র গলায় বলে, এটা ইয়ার্কি নয় মিস্টার সেন। আমি জানতে চাই লোকটা কে। আপনি যাকে মারতে এসেছেন?

ক্লান্ত চোখে চেয়ে বিশ্বরূপ তার ভাঙা ধীর গলায় বলে, কখনও হৃদয়বৃত্তিকে সন্ত্রাসের সঙ্গে মেশাতে নেই মিস শর্মা। সন্ত্রাসবাদীরা বরাবর ওই ভুল করে।

কী বলছেন?

বিশ্বরূপ মাথা নেড়ে তার স্বগতোক্তি করতে থাকে, একটা আনপড়, সরল দেহাতি মেয়েকে বিনা অপরাধে ওরকম ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া উচিত কাজ হয়নি।

সুন্দরীকে কারা মেরেছে তা আমি জানি না।

সুন্দরীর কথা হচ্ছে না।

তবে কার কথা?

সুন্দরীর বদলে যাকে মারা হয়েছিল।

তার মানে?

বিশ্বরূপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সুন্দরী মারা যায়নি মিস শর্মা। কিন্তু তার মৃত্যু দেখানোর জন্য একজন দেহাতি মেয়েকে তুলে আনা হয়েছিল পীতাম্বরের বাড়ির মধ্যে। তাকে মারা হয়েছিল এমনভাবে যাতে চেনা না যায়। মেয়েটাকে মেরেছিল সুন্দরীই।

বডি আইডেন্টিফাই করা হয়নি?

কে আইডেন্টিফাই করবে? কেউ তাকে ভাল করে দেখেনি। লোকাল লোকেরা তাকে চেনেও না। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে নিহত মেয়েটা মিঠিয়া অ্যালিয়াস মিরচি অ্যালিয়াস সুন্দরী।

উত্তেজনায় ঠোঁট কঁপছিল বন্দনার, সুন্দরী বেঁচে আছে? আর ইউ সিয়োর?

ভেরি মাচ।

মাই গড!–-বলে একদম নিশ্ৰুপ পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল বন্দনা।

বিশ্বরূপ তার স্বপ্নময় কণ্ঠে খুব ধীরে বলল, আপনার জীবনের আনন্দটাই মরে গেল বোধহয় আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী বেঁচে আছে শুনে!

আই ডোন্ট বিলিভ ইউ।

নো ম্যাটার, সুরিন্দর আর সুন্দরী বোধহয় এখন একসঙ্গে থাকে। কোথায় থাকে তা জানেন?

কথাটার জবাব দিল না বন্দনা। চুপ করে বসে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর একসময়ে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল বিশ্বরূপের দিকে। আপনাকে এক ঘণ্টা পর কোথায় পাওয়া যাবে?

পাওয়া যাবে না মিস শর্মা।

প্লিজ! আমার জরুরি কথা আছে।

বিশ্বরূপ ঘড়ি দেখল। তারপর বলল, রেস্ট হাউসের ফোন খুব আনসেফ। তবু নম্বরটা লিখে নিন।

নোটবইতে নম্বরটা টুকে নিয়ে বন্দনা বলে, আপনি নিশ্চয়ই আর এক ঘণ্টার মধ্যে ধানবাদ ছাড়বেন না?

বোধহয় না। আমি নেমে যাচ্ছি মিস শর্মা। এক ঘণ্টা— ঠিক এক ঘণ্টা পর কথা হবে।

বিশ্বরূপ নেমে দাঁড়াল। আড়মোড়া ভাঙল। তারপর ধীরে হাঁটতে শুরু করল। অনেকক্ষণ অবধি বন্দনার গাড়ি স্টার্ট নিল না, টের পেল সে। তারপর স্টার্ট নিল। চলে গেল হু হু করে।

মৃতের মতো মুখ নিয়ে রেস্ট হাউসে ফিরে এল বিশ্বরূপ। যন্ত্রের মতো ঘর খুলল। দরজা বন্ধ করল। তারপর পোশাক ও জুতোসুষ্ঠু বিছানায় চিতপাত হয়ে পড়ে রইল খানিকক্ষণ। ঘাসের উঁটি বেয়ে একটা পিঁপড়ে উঠছে। খামোখা। আবার নামছে। তাও অর্থহীন।

এই বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্রে কার উত্থান, কার পতন তা কে বলবে? সে শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। নিমিত্তের ভাগী। খড়ের পুতুল। কাজটুকু শুধু করে যাওয়া। ফললাভে তার অধিকার নেই। সে মেডেল পাবে না। যে দেশে সবাই চোর সে দেশে চোর ধরা পড়লে অন্য চোরেরা তাকে জোট বেঁধে পেটায়। চোরেরাই তাকে ধরে, তার বিচার করে চোরেরা, তাকে বন্দি করে পাহারা দেয় অন্য সব চোর। এর চেয়ে হাস্যকর সিস্টেম আর কী আছে? চোরেরা আইন বানায়, চোরেরাই তা ভাঙে। বিশ্বরূপ এই সিস্টেমের দালাল, বেতনভুক খুনি। প্রতি সন্ধেবেলা তার দাদুর কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের পাপের কথা বলতে ইচ্ছে করে।

দাদু নেই। মা নেই। বাবা নেই। কেউ নেই। কেউ কোথাও নেই।

ফোনের প্রথম রিং হতেই সতর্ক তন্দ্রা ভেঙে প্রস্তুত-হাতে রিসিভার তুলে নিল। বিশ্বরূপ।

বন্দনা দূর-গলায় বলল, মিস্টার সেন?

হ্যাঁ।

জিৎ হোটেল। রুম সতেরো।

ধন্যবাদ। পার্টি কেমন চলছে?

এখনও শুরু হয়নি। লেট-নাইট পার্টি অফ ইয়ং পিপল। রাত নটায় শুরু হবে, চলবে সারা রাত। আসবেন? আমি নেমন্তন্ন করছি আপনাকে। মিউজিক, ড্যান্স, ড্রিঙ্কস, আসবেন?

বিশ্বরূপ মৃদু হাসে, নেমন্তন্ন নিলাম, তবে যেতে পারব কি না কে জানে, জীবন এত অনিশ্চিত।

গড সেভ ইউ। অপেক্ষা করব কিন্তু।

আচ্ছা। বাই।

বাই।

আর-একটা অতি সংক্ষিপ্ত ফোন করল বিশ্বরূপ। একটু অপেক্ষা করল, তারপর বেরোল।

ফটকের সামনে দাঁড়াতেই একটা ধীরগতি পেট্রল পুলিশ-ভ্যান এসে তুলে নিল তাকে। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে চোখ বুজে রইল বিশ্বরূপ। সে জানে, বন্দনা শর্মা তার সঙ্গে তঞ্চকতা করছে না, তার দেওয়া খবর একশো ভাগই ঠিক আছে। সুরিন্দর যদি তাকে একটু নাচিয়ে থাকে তবে সুরিন্দরের দোষ নেই। এই সব ফ্যানসি সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে কি সুরিন্দরের চলে? এরা তার কাজে লাগে, এদের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় হয়। প্রয়োজনে এদের প্রভাব ব্যবহার করা যায়, অসময়ে আশ্রয় পাওয়া সম্ভব হয়, এদের। উচ্চকোটির বন্ধুবান্ধবদেরও কিছু সমর্থন মেলে, এই পর্যন্ত। বিশ্বস্ত, জান-কবুল সাথিয়া তো এরা নয়। তার জন্যই সুরিন্দরের লাগে সুন্দরীর মতো মেয়েদের, যারা যে-কোনও কষ্ট স্বীকার করতে পারবে, কখনও ছেড়ে যাবে না, কখনও অবাধ্যতা প্রকাশ করবে না, কেটে ফেললেও মুখ থেকে কোনও কথা কেউ যার বের করতে পারবে না। সুন্দরীর পরিচয়টা সেই জন্যই জানা দরকার ছিল বিশ্বরূপের। পীতাম্বর মিশ্র বুঝতেও পারেননি তিনি কোন আগুন নিয়ে খেলছেন। নিজের স্ত্রী ভজনা দেবীর ওপর প্রতিশোধস্পৃহায় তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। শেষ অবধি সুন্দরীর প্রভাবে হয়ে পড়েছিলেন উগ্রবাদের সমর্থক। হয়তো একটা সময়ে ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়ে চৈতন্যোদয় হয়েছিল তার, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। গুনাগার অনেক দিতে হল তাকে।

ভজনা দেবী বলছিলেন, সায়নমতে পীতাম্বরের সূর্যরাশি হল বৃশ্চিক। বৃশ্চিকের জাতকেরা বুড়ো বয়সে হয় পাগল হয়ে যায়, নয়তো অপঘাতে মরে।

বিশ্বরূপের সূর্যরাশিও তাই। স্কোর্পিও বৃশ্চিক।

স্টেশনের কাছেই জিৎ হোটেল, নতুন ঝকঝকে ঝলমলে। প্রায় দুশো গজ দূরে গাড়ি থেকে নামল বিশ্বরূপ। হাতে সুটকেস।

তার পায়ে পায়ে উচ্চারিত হচ্ছে একটি শ্লোক, হতো বা প্রাপ্তসি স্বর্গং, জি বা ডোক্ষসে মহীম। তার বুকপকেটে ভজনা দেবীর দেওয়া গীতা। কিন্তু এ লড়াইতে কি হারজিত আছে?

আই ওয়ান্ট এ রুম।–রিসেপশন কাউন্টারে অকম্পিত হাত রেখে একটু ঝুঁকে বলে বিশ্বরূপ। ঠান্ডা গলায়। বাঁ দিকে মস্ত রেস্তরাঁ। অনেক লোক খাচ্ছে।

ইয়েস স্যার।— বলে বিনীত স্মার্ট সুবেশ অবাঙালি রিসেপশনিস্ট তার রুমচার্ট দেখতে দেখতে বলে, এ সি অর নন এ সি স্যার?

নন এ সি৷ ইটস অলরেডি কোল্ড ইন ধানবাদ।

ইয়েস স্যার।

একটু সময় লাগে। তারপর ঘরের চাবি হাতে আসে। হোটেল বয় তার সুটকেস তুলে নিয়ে পথ দেখিয়ে নিতে থাকে।

ঘরে এসে ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দেয় সে। এই ফ্লোরেই কোণের দিকে সতেরো নম্বর ঘর। ঘরের আলো নিভিয়ে দেয় বিশ্বরূপ। একটু বসে থাকে চুপচাপ। হঠাৎ তার মনে পড়ল, সুরিন্দর তাকে ডাকত রূপা বলে। খেলার মাঠে ছুটতে ছুটতে চেঁচিয়ে উঠত, আরে রূপা, গেন বাঢ়া রে!

এতক্ষণে নীচের রেস্তরাঁয় অন্তত ডজন খানেক সাদা পোশাকের পুলিশ ঢুকে পড়েছে খদ্দের হয়ে। তারা সশস্ত্র, প্রস্তুত। অন্ধকারেই ঘড়ি দেখল বিশ্বরূপ। একটা পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে করিডোর দিয়ে।

বিশ্বরূপ উঠে দরজা চুল-পরিমাণ ফাঁক করে দেখল। ঘর থেকে বেরোনোর আগে সুরিন্দরের লোক আগে দেখে নেবে, রাস্তা পরিষ্কার কি না। এ সেই অগ্রদূত, লম্বা, ফিট, চটপটে।

দরজাটা আর-একটু ফাঁক করে দাঁড়ায় বিশ্বরূপ। লোকটা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখে নেয়। তারপর নেমে যেতে থাকে।

সতেরো নম্বরের দরজা ধীরে খুলে গেল। বুকটা হঠাৎ খাঁ খাঁ করে ওঠে বিশ্বরূপের। অতীত থেকে একটা কণ্ঠস্বর চেঁচিয়ে উঠল কি ‘রূপা, গেন বাঢ়া রে…’?

সুরিন্দর বেরিয়ে এল। ফেটে পড়ছে স্বাস্থ্য। ফেটে পড়ছে আত্মবিশ্বাস। ফেটে পড়ছে অন্তর্নিহিত ক্রোধ।

নিঃশব্দে দরজা খুলে মুখোমুখি করিডোরে দাঁড়াল বিশ্বরূপ।

বিদ্যুৎস্পর্শে কেঁপে গেল সুরিন্দর। তার ক্রুর চোখ স্থাপিত হল বিশ্বরূপের চোখে। কে জানে কেন হঠাৎ কোমল হয়ে এল সেই চোখ।

করিডোরের বাতাসে একটা তরঙ্গ তুলে গভীর একটা কণ্ঠস্বর বেজে ওঠে, রূপা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *