০৬. আগস্ট, ১৯৭১

১ আগস্ট, রবিবার ১৯৭১

তিনজন মার্কিন নভোচারী, অ্যাপোলো-১৯ নভোযানে চড়ে কোটি কোটি মাইল মহাশূন্য পাড়ি দিয়ে চাঁদের পিঠে নেমে আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আহা, আমি যদি কোন রকম একটা টুটাফুটা আকাশযান পেতাম, যেটায় চড়ে, মাত্র কয়েকশো মাইল দূরে মেলাঘর বলে একটা জায়গায় নেমে, মাত্র একপলকের জন্য আমার রুমীকে চোখের দেখা দেখে আসতে পারতাম!

রুমী গেছেআজ আটচল্লিশ দিন হলো। মনে হচ্ছে আটচল্লিশ মাস দেখি নি। একেক সময় মনে হয় রুমী বলে কেউ কি আছে? রুমী নামের কেউ কি ছিল কোনকালে? নাকি রুমী একটা অলীক মায়া?

আজ থেকে ডাঃনূরুল ইসলামের ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ খেতে শুরু করেছি। উনি প্রথমে দেখে, রক্ত থেকে শুরু করে একত্স-রে পর্যন্ত যত ধরনের পরীক্ষা আছে, সব করাতে বলেন। সে সবের রিপোর্ট দেখে তারপর ওষুধ দিয়েছেন। দিয়েছেন তো বটে কিন্তু আমি জানি ওসব ওষুধে কোন কাজ হবে না। আমার আসল ওষুধ আছে মেলাঘরে। সেই ওষুধ কে এনে দেয়!

বিকেলে কলিম এসেছে। তারও খুব মন খারাপ। নীলফামারী থেকে তার ছোট শালা পাওয়ার (লতিফুর রহমান প্রধান) ঢাকায় এসেছে সপ্তাহখানেক হল। সে খবর এনেছে পাক আর্মি তার বড় দুলাভাইকে মে মাসের শেষ সপ্তাহে মেরে ফেলেছে। এই খবর শুনে কলিমের বউ সেলিনা খুব কান্নাকাটি করছে। সেলিনার বড় দুলাভাই মকবুল হোসেন চিলাহাটিতে থাকতেন। খুবই সজ্জন প্রকৃতির লোক ছিলেন। সেলিনার বাবা মা, পাওয়ারসহ অন্য দুই ছেলে নিয়ে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত নীলফামারীতে নিজেদের বাড়িতেই ছিলেন। সে সময় নীলফামারীতে ই.পি.আর., ই.বি.আর, আনসার, মুজাহিদ ও স্থানীয় যুব সম্প্রদায় মিলে যে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাতে সেলিনার বড় ভাই আবু (রাশিদুর রহমান প্রধান) একজন থানা কমান্ডার হিসেবে কাজ করছিল। এপ্রিলের সাত তারিখে পাক আর্মি নীলফামারী দখল করে নিলে এই প্রতিরোধ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আরো অনেকের সঙ্গে আবু ইন্ডিয়ায় চলে যায়। পাওয়ার তার মাকে নিয়ে কাছাকাছি এক গ্রামে চলে যায়। বাবাও আলাদাভাবে ইন্ডিয়া চলে গিয়ে তিন মাস পরে নীলফামারীতে ফিরে আসেন। মাকে নিয়ে পাওয়ারও নীলফামারীতে চলে আসে। নীলফামারী থেকে ইন্ডিয়াতে প্রায় প্রায় লোক যাতায়াত করে। লোকমুখে পাওয়ার খবর পেয়েছে যে আবু এখন স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করছে।

ডাক্তার এ. কে. খান এক মাসের ছুটি নিয়ে রাজশাহী থেকে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন আজ সন্ধ্যায়।

৪ আগস্ট, বুধবার ১৯৭১

আজকাল দিনরাতগুলো একেবারে ঠাসা–ঘটনা দিয়ে, মেহমান দিয়ে, নানারকম পিলে-চমকানো শব্দ দিয়ে। ঐ পিলে-চমকানো শব্দগুলো কানে না এলে আমাদের ভালোই লাগে না। রাতে ঐ শব্দ শুনলে তবে আমাদের আরামে ঘুম আসে। এটা শুধু আমার কথা নয়। দাদাভাই বলেন একথা, মোর্তুজা বলেন একথা, বাঁকা বলেন, ফকির বলেন, পরিচিত বন্ধুবান্ধব অনেকেই হাসতে হাসতে বলেন, ভ্যালিয়ামের বিক্রি কমে গেছে। ঐ শব্দই আজকাল চমৎকার ঘুম আনে।

কোন রাতে ঐ শব্দ না শুনতে পেলেই বরং আতঙ্ক জাগে–তবে কি ওরা—

 না, ওরা ধরা পড়ে নি। সন্ধ্যারাতে যদি কোন কারণে মিস যায়, তো মাঝরাতে হঠাৎবু-মমম্ করে বিরাট এক শব্দ চারদিক কাঁপিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন স্নায়ুতে আরামের স্নিগ্ধ প্রবাহ বইয়ে দেয়।

ঢাকায় বিন্দুদের কাজ-কারবার ক্রমেই দুঃসাহসিক হয়ে উঠছে। এই তো গতকাল সন্ধ্যার আগে দিয়ে স্টেট ব্যাঙ্কের গেটে, মিলিটারি পুলিশের নাকের ডগায়, পথচারীদের চোখের সামনে, কয়েকজন বিচ্ছু বোমা ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে। একটাকেও ধরতে পারে নি মিলিটারিরা। ছেলেগুলোর জানের ভয় বলতে কিছু নেই। গ্রেনেডের মতই জানটাকেও হাতের মুঠোয় নিয়ে চলে ওরা। স্বাধীন বাংলা বেতারে শুনি যুদ্ধক্ষেত্রে যারা যুদ্ধ করছে, তারাও এমনি অসম সাহসী। মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী–জানের কোন পরওয়া নেই, জীবন-মৃত্যু, সত্যি সত্যিই ওদের পায়ের ভৃত্য।

স্বাধীন বাংলা বেতারে গান বাজছে :

তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে।
আমরা কজন নবীন মাঝি হাল ধরেছি শক্ত করে রে।
জীবন কাটে যুদ্ধ করি
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করি
জীবনের সাধ নাহি পাই।।
ঘরবাড়ির ঠিকানা নাই
দিন-রাত্রি জানা নাই।
চলার ঠিকানা সঠিক নাই।।
জানি শুধু চলতে হবে
এ তরী বাইতে হবে
আমি যে সাগর মাঝি রে।।

ঘরবাড়ির ঠিকানাবিহীন, দিন্ রাত্রির বোধবিহীন, অথই সাগরে দিচিহ্নহীন জানবাজ ঐ নবীন মাঝিদের কথা মনে করে আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।

৬ আগস্ট, শুক্রবার ১৯৭১

আজ আমার জ্বর এসেছে। পরশু থেকেই একটু একটু ঠাণ্ডা লেগেছিল, ঠিক কেয়ার করি। নি, রোজকার মতই ঘরের কাজ, বাইরের ছুটোছুটি–সব করে গেছি, শরীর তা সইবে কেন? দুপুরে খুকু এসে গোশত আর একটা নিরামিষ বেঁধে দিয়ে গেছে, বারেক কোনমতে ভাতের ফ্যান গালতে পেরেছে। আমি সারাদিন ডাইনিং রুমে আমার চৌকিটাতে। বিকেলে মা এসেছিলেন। এত ঘনঘন অসুখ হচ্ছে–তার আর দোষ কি-এই ধরনের কিছু একটা বিড়বিড় করে বলে কথা শেষ না করে চুপ করে গেলেন। মা সহজে মনের ভাব চাপতে পারেন না, মুখে খৈ ফোটে! কিন্তু আজ তিনি যেন নিজেই। জোর করে নিজের মুখ বন্ধ করে রাখলেন। তবে কুঁচকানো ভুরু, টেপা ঠোট আর সর্ব অবয়বের কাঠিন্য থেকে আমার প্রতি তার অসহনীয় অথচ নীরব অভিযোগ ও অভিমান ফুটে বেরুতে লাগল। তার পেটের মেয়ে হয়ে তাঁর কাছে রুমীর কথা গোপন রেখে ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছি, তার সঙ্গে আলাপ করে মনের ভাব হালকা করছি। না, এটা তিনি চোখের সামনে দেখে যেন আর সইতে পারছেন না। আবার কিছু বলতেও পারছেন না আমার কঠিন নীরবতার কারণে।

৬ আগস্ট, রবিবার ১৯৭১

আজ জ্বর নেই কিন্তু শরীর এখনো বেশ দুর্বল। সকাল থেকে মেহমানের ভিড় বাড়িতে। একে একে এসেছেন দাদাভাই, মোর্তুজা, ফকির, নূরজাহান, মান্নান, শরীফের আরো দুই ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু ওয়াহিদ ও মিকি, লালু, ডাক্তার, সানু, খুকু, অ্যাডভোকেট মোল্লা, চিশতী। এতগুলো মেহমান, সকাল নটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত কিন্তু আলোচ্য বিষয় একটাই। গতকাল সন্ধ্যার পর ফার্মগেটের মিলিটারি চেকপোস্টে গেরিলা অপারেশন।

ফার্মগেটের মিলিটারি চেকপোস্টটা বেশ বড়সড়। ওখানকার ট্রাফিক আয়ল্যান্ডের মধ্যখানে দুটো তাঁবুতে অনেকগুলো মিলিটারি পুলিশ। কাছাকাছি ফুটপাতে লাইট মেশিনগান হাতে মিলিটারি। একটু দূরেগ্রীন রোডে ঢোকার মুখে মোড়ে একটা সিনেমা হল তৈরি হচ্ছে, সেটার মাথাতেও লাইট মেশিনগান হাতে এক মিলিটারি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এলাহি ব্যাপার-স্যাপার। এই রকম মারাত্মক বিপজ্জনক জায়গায় বিন্দুরা যে কাণ্ডটি করল, সেটাও এলাহি কাণ্ড-কারখানাই বটে।

মোর্তুজা চোখ বড় বড় করে বললেন, কি কাণ্ড দেখুন তো, কি বুকের পাটা! ওই রকম কড়া সিকিউরিটির মধ্যে দশ-বারোটা খানসেনা মেরে দিয়ে চলে গেল!

দাদাভাই খুশির হাসি হাসতে হাসতে বললেন, তাও চোখের পলকে! এক মিনিটও লেগেছে কি না সন্দেহ।

ফকির বললেন, ওদের কাছে নিশ্চয় মেশিনগান ছিল।

মিকি–অবশ্যই। ব্রাশ ফায়ার ছাড়া অত অল্প সময়ে অতগুলো শেষ করে পালানো যায়?

শরীফ মুচকি হাসল, তা নইলে আর বিচ্ছু বলেছে কেন ওদের।

নূরজাহান ধরা পড়েনি তো কেউ?

মান্নান প্রায় ধমকে উঠলেন, কি যে বল তুমি? ওদের ধরা যায়?

আমি বললাম, ওদের চোখেও দেখা যায় না। কদিন আগে চরমপত্রে এই নিয়ে বলেছে–জামী ব না।

জামী বেশ ভালো ক্যারিকেচার করতে পারে, ওর স্মরণশক্তিও খুব তীক্ষ। মাঝে মাঝেই ও চরমপত্র দুচার লাইন আওড়ায়। এখন এতগুলো চাচা-চাচীর সামনে প্রথমে একটু লজ্জা পেল, তারপর চরমপত্রের গলা নকল করে বলতে লাগল : চাইর মাস ধইরা পাইট করনের পর হানাদার সোলজাররা তাগো কমান্ডার গো জিগাইছে মুক্তিবাহিনীর বিন্দুগুলো দ্যাখতে কি রকম? এই বিচ্ছুগুলা কি রকমের কাপড় পেদে? এই সব না জানলে কাগো লগে পাইট করমু? আর দুশমনগো খালি চোখে দ্যাখতে পাই না ক্যান?

মনটা বেশ ফুরফুর করছে। সন্ধ্যার মুখে বাগানে বসে শরীফ, ফকির, আমি গল্প করছিলাম। ফকির দুপুরে আর বাড়ি যান নি। আমাদের সঙ্গেই খেয়েছেন। গেটের সামনে রিকশা থেকে নামল লালু। একটু অবাক হলাম, সকালেই বেরিয়ে গেল, আবার এসেছে–কি ব্যাপার? কোন খারাপ খবর নয়তো? মনে হয় না, কারণ মুখ তার চাপা হাসিতে উদ্ভাসিত। রিকশা থেকে নেমে দাঁড়াল না। বুবু একটু ভেতরে এসো বলে সোজা ঘরে চলে গেল। আমি পিছু-পিছু উঠে এলাম। লালু খুব আস্তে বলল, রুমী এসেছে আমাদের বাড়িতে। শরীফ ভাইকে গিয়ে নিয়ে আসতে বলেছে।

হঠাৎ যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। চেয়ারে বসে পড়লাম। বাইরে ফকির রয়েছেন শরীফের সাথে। মিনিট খানিক ঝিম মেরে বসে রইলাম, তারপর বাইরে বেরিয়ে বললাম, মার হঠাৎটাকার দরকার হয়ে পড়েছে, তাই লালুকে পাঠিয়েছেন। ওকে টাকা দিলাম। তুমি একটু গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে এসো। সন্ধ্যে হয়ে গেছে।

জামী হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে বলল, সারাদিন বাড়ি বসে আছি, আব্দু, আমিও একটু ঘুরে আসি তোমার সঙ্গে।

ওরা দুজনে লালুকে নিয়ে চলে গেল। আমি স্থির হয়ে বসতে পারছি না, মনে হচ্ছে একশো তিন ডিগ্রি জ্বর গায়ে। কান, গলা, চোখ সব যেন গল্প করছে। ফকির বোধ হয় কিছু আঁচ করে বললেন, সারাদিন বাড়ি ছাড়া আমিও যাই এবার। সঙ্গে সঙ্গে হেলিয়ে হাত কপালে তুলে বললাম, আচ্ছা, খোদা হাফেজ।

সদর দরজা বন্ধ করে একবার রান্নাঘরে উঁকি মেরে দেখলাম বারেক কি করছে। সে নিবিষ্টমনে চুলোর সামনে কিছু একটা করছে। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখে একটা দরজা আছে, এটা দিয়েও বাইরে বেরোনো যায়। এই দরজার কাছে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম, হেঈশ্বর। এখন যেন কেউ বেড়াতে বা ফোন করতে না আসে। বুক দুরদুর করছে। রুমী সোজা বাড়ি চলে এলেই তো পারত। এই প্রতীক্ষার উদ্বেগ আর তো সহ্য হয় না।

গাড়ির শব্দ পেলাম। গাড়ি এসে পোর্চে থামল। নিঃশব্দে দরজাটা খুলে দিয়েই দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় বেড রুমে চলে গেলাম।

রুমী এসে ঢুকল ঘরে। রুমীর মুখভর্তি দাড়ি, চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা, তামাটে গায়ের রঙ রোদে পুড়ে কালচে, দুই চোখে উজ্জ্বল ঝকঝকে দৃষ্টি, গোঁফের জঙ্গল ভেদ করে ফুটে রয়েছে সেই ভুবন ভোলানো হাসি। রুমী দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলো, ওকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। রুমী ফিসফিস করে বলল, আম্মা, আম্মা, থামো। দাদা শুনতে পাবে। তোমার কান্না শুনলে ঠিক সন্দেহ করবে। দরজার পর্দা পেরিয়েই সিঁড়ির সামনের চারকোণা মাঝারি হল–সেখানে ইজিচেয়ারে বাবা শুয়ে থাকেন। শরীফ আর জামী একদৃষ্টিতে রুমীর দিকে চেয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। রুমী একবার আমার, আরেকবার শরীফের দিকে তাকিয়ে বলল, দেখলে? কেমন তোমাদের বিবাহবার্ষিকীর আগের দিনটাতে এসে গেলাম!

একটু সামলে নিয়ে বললাম, সোজা বাড়িতে এলি না কেন? আবেগের উচ্ছ্বাস কমতেই কল্পনার চোখে ভেসে উঠল মায়ের মুখের বিজয়িনীর হাসি, সেই সঙ্গে না-বলা উচ্চকিত বাণী–কেমন, এবার হল ত? আমাকে বলা হয় নি। এখন তো সব ফাঁস হয়ে গেল।

রুমী বলল, কি জানি, ভয় পেলাম রিস্ক নিতে। যদি গলির মোড়ে কোন মিলিটারির সামনে পড়ে যাই, যদি সন্দেহ করে?

মাসুম বাসায় ছিল না, সে যখন ফিরল, তখন আমাদের আবেগ প্রশমিত, রুমী দাদার সাতকাহন প্রশ্নের অলীক সব জবাব দিয়ে বাথরুমে ঢুকেছে গোসল করতে।

আমরা স্থির করলাম মাসুমের কাছে সত্য গোপন করব না। করা সম্ভবও নয় এক বাড়িতে থেকে।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের বিছানায় সবাই গোল হয়ে বসলাম। বললাম, এবার বল তোর কাহিনী।

রুমী একটু হাসল কাহিনী যা, তা প্রায় রূপকথার মতই। মেলাঘরে গিয়ে দেখি ঢাকার যত কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা, ধানমন্ডি-গুলশানের বড়লোক বাপের গাড়ি হাকানো ছেলেরা, খেলার মাঠের চৌকস ছেলেরা, ছাপোষা চাকুরে বাপের ছেলেরা, সবাই ওখানে জড়ো হয়েছে। সবাই যুদ্ধ করবার জন্য গেছে। ওখানে গিয়ে আমার আগের চেনা কতো ছেলেকে যে দেখলাম! ঢাকা থেকে আগরতলার দিকের এই বর্ডারটা সবচেয়ে কাছে বলে ঢাকার প্রায় সব ছেলেই এই রাস্তা দিয়ে বর্ডার ক্রস করে। তারপর সেক্টর টুর ওপর দিয়েই অনেকে অন্য সেক্টরে চলে যায়। ঢাকা জেলা কিন্তু সেক্টর টুর আন্ডারে, তাই আমরা বেশিরভাগ ঢাকার ছেলেরা সেক্টর টুতেই আছি। দেশের চারদিকের বর্ডার ঘিরে যুদ্ধ চলছে, বর্ডারের ঠিক ওপাশেই ভারতের মাটিতে আমাদের সেক্টরগুলোর হেড কোয়ার্টার্স। রেগুলার বাংলাদেশ আর্মির পাশাপাশি আমরা আছি গেরিলা বাহিনী।

স্বাধীন বাংলা বেতার, আকাশবাণী, বি.বি.সি. থেকে এ সবই শুনে আসছি, কিন্তু সে যেন নেহাৎ শোনা কথা ছিল। বিশ্বাস করতাম, সত্য বলে জানতাম কিন্তু তবু যেন মন ভরত না। এখন রুমীর মুখে শুনে সমস্তটাই যেন একেবারে বুকের ভেতরে গেঁথে গেল।

খানিক পরে একটু উসখুস করে রুমী বলল, আম্মা, আমি কিন্তু সিগারেট ধরে ফেলেছি। তোমাকে প্রমিস্ করেছিলাম না, যে ধরবার আগে জানাব? তা আর হলো না।

মনে পড়ল, রুমী যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখনই বলেছিলাম, দ্যাখ, সিগারেট যদি ধরিস তো বলে-কয়ে ধরবি। নইলে লুকিয়ে সিগারেট খাবি, আমি জানব না, তারপর আমার বান্ধবী এসে বলবে, রুমীকে সিগারেট খেতে দেখলাম সে আমার সইবে না।

রুমী বলেছিল, আম্মা, আব্ব যখন খায় না, খুব সম্ভব আমিও ধরব না। তবে যদি ধরিই, অবশ্য তোমাকে আগে জানাব।

এখন রুমী হাসতে হাসতে বলল, ওখানে সিগারেট না ধরে উপায় নেই আম্মা। খাওয়া-দাওয়ার কোন ঠিক-ঠিকানা থাকেনা অ্যাকশানে গেলে, অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়, কাছে-ভিতে কোন খাবারই জোটে না। এই সিগারেটটাই একমাত্র জিনিস, যা সঙ্গে রাখা যায়। আম্মা, তোমাদের সামনে খাব, না আড়ালে যাব।

আমার চোখ পানিতে ভরে গেল। ফেব্রুয়ারি মাসে–মাত্র ছমাস আগে আমাদের এই বাড়িতেই আমার সামনে সিগারেট ধরাবার অপরাধে ইশরাককে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। বন্ধুর অপরাধে রুমীকেও কম বকুনি খেতে হয় নি। এখন ধরা গলায় বললাম, না, সামনেই খা। অল্প কদিনের জন্য এসেছিস। সিগারেট খাবার সময়টুকুও তোকে চোখের আড়াল করতে চাই নে।

রুমী একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, আম্মা, ডককে তোমার মনে আছে? সেই যে গত বছর ডিসেম্বরে আমরা বরিশালের চরে রিলিফ ওয়ার্ক করতে গিয়েছিলাম–

মনে আছে। সেই যে নতুন পাস করা, নতুন বিয়ে করা ডাক্তারটা, আসল নাম। আখতার আহমদ। তার কি হয়েছে?

সেই ডক সেক্টর টুতে আছে। তার বউ-ও।

বলিস কি? অদ্ভুত যোগাযোগ তো!

শুধু কি এইটুকু? আরো আছে। লুলু আপা, টুলু আপাও ওখানে।

ওরাও? ওরা ওখানে কি করছে?

সেক্টর টুতে একটা হাসপাতাল করা হয়েছে। ডক ওখানে ডাক্তার, খুকু ভাবী, লুলু টুলু আপারা ওখানে নার্স।

শুনে আমি চমকৃত। রুমীর কপালটা নেহাৎ ভালো বলতে হবে। অচেনা জায়গায় গিয়ে ওর কয়েকজন প্রিয় পরিচিত মানুষকে পেয়েছে। গত বছর নভেম্বরের গর্কির পর বেগম সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে একটি রিলিফের দল বরিশালের কয়েকটি বিধ্বস্ত চরে রিলিফ ওয়ার্ক করতে যায়। সে দলে ছিল সদ্য পাস করা ডাক্তার আখতার আহমদ (ডক), রুমী, সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে লুলু ও টুলু, কাজী নূরুজ্জামানের স্ত্রী সুলতানা জামান ও দুই মেয়ে নায়লা এহমার ও লুবনা মরিয়ম, রেবা-মিনি ভাইয়ের বড় ছেলে জাহির এবং আরো অনেকে। এই রিলিফ ওয়ার্কের সময় থেকেই রুমী ওদের সকলের সঙ্গে, বিশেষ করে ডক, তার বউ খুকু, লুলু ও টুলুর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

রুমী বলল, আরো কি মজা জানো আম্মা? আমি ঢাকা থেকে যাই ১৪ জুন, লুলু টুলু আপারা অনেকে মিলে একটা বিরাট দল যায় ১৫ জুন। ১৩ জুন আমি ওদের বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ কাউকে যাওয়ার কথা বলি নি। আমরা যাই মনু ভাইদের সঙ্গে, ওদের দলকে নিয়ে যায় শাহাদত ভাই। ওরা সোনামুড়ার হাসপাতালে যায়। তিন-চারদিন পরে আখতার ভাই ওদেরকে নিয়ে মেলাঘরে বেড়াতে আসে, তখন নাটকীয়ভাবে ওদের সঙ্গে আমার দেখা?

আখতার কোন সময় ওদিকে যায়?

ক্র্যাকডাউনের পরপরই। আখতার ভাইয়ের কাহিনী তো আরো রোমাঞ্চকর। আখতার ভাই এ বছর জানুয়ারি মাসে আর্মিতে ডাক্তারের চাকরি পেয়েছিল। কুমিল্লায় ফোর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ওর পোস্টিং হয়েছিল। মার্চের মাঝামাঝি ঐ ফোর্থ ইস্ট বেঙ্গলের দুটো কোম্পানিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি করা হয়। মেজর শাফায়াত জামিল, আখতার ভাই এঁরাওব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যান। আসলে এই বদলি করাটা পাকিস্তানিদের একটা ষড়যন্ত্র ছিল। খালেদ মোশাররফকেও মার্চের শেষে কুমিল্লায় ঐ ফোর্থ ইস্ট বেঙ্গলে বদলি করা হয়। তার আগে খালেদ ভাই ঢাকায় কোন এক ব্রিগেডে, ব্রিগেড মেজর ছিলেন। ক্র্যাকডাউনের ঠিক আগে আগে খালেদ ভাইকে তার কম্যান্ডিং অফিসার একটা ছুতো করে সিলেটের শামসেরনগরে পাঠিয়ে দিল। ওখানে নাকি নকশালরা ভারত থেকে ঢুকে উৎপাত করছে। তাদের দমন করার জন্য এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে তাকে যেতে বলা হয়। খালেদ ভাই ঠিকই সন্দেহ করেছিলেন পাকিস্তানিরা কিছু একটা সাংঘাতিক ষড়যন্ত্র আঁটছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই কোম্পানি সৈন্য পাঠানো হয়েছে। আবার তাকে এখন আরেক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে শামসেরনগর যেতে বলা হয়। খালেদ ভাই বুঝতে পারছিলেন এভাবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে কোম্পানি এদিক-ওদিক সরিয়ে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। খালেদ ভাই একটুখানি সাবধান হয়েছিলেন। যার জন্য তাঁর জীবন বেঁচে যায়। তিনি মেইন রোড দিয়ে না গিয়ে অন্য একটা কাঁচা রাস্তা ধরে শামসেরনগর যান। গিয়ে দেখে কোথায় কি। নকশালদের চিহ্নমাত্র নেই। পরে জানতে পারেন মৌলভীবাজারের কাছে মেইন রোডের পাশে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সৈন্য লুকিয়ে ছিল খালেদ ভাইদের অ্যামবুশ করার জন্য।

এদিকেব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হয়েছে কি–মেজর শাফায়াত জামিল, আখতার ভাই আর অন্য যারা ছিলেন, সবাই জেনে গেছেন ঢাকায় কি হয়েছে, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কি হয়েছে। রাগে, উত্তেজনায় তাদের রক্ত টগবগ করে ফুটছে। কাজেই ২৭ মার্চ সকালেই শাফায়াত জামিলের সঙ্গে আখতার ভাই আর অন্য সবাই রিভোল্ট করে ওখানকার পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেপ্তার করে ফেলেন। শাফায়াত জামিল আগেই আখতার ভাইকে একটা স্টেনগান ইস্যু করে দিয়েছিলেন লুকিয়ে কারণ ডাক্তারদের অস্ত্র দেবার কোনো নিয়ম ছিল না। ওদিকে মেজর খালেদ মোশাররফও শামসেরনগর থেকে ফেরত এসে শাফায়াত জামিলদের সঙ্গে যোগ দেন। জানো আম্মা, আখতার যখন ওঁদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে থাকে, তখন কিন্তু সে খুকু ভাবীর

কোন খবরই জানত না। খুকু ভাবী কুমিল্লায় ছিল। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে আখতার ভাই সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় চলে যায়। সেখানকার চা-বাগানে খালেদ ভাই ঘাটি করে। সেখানে নিত্যনতুন ছেলেরা জড়ো হতে থাকে ট্রেনিং নেবার জন্যে। খালেদ মোশাররফ আখতার ভাইকে বলে, তোমার তো এখন কোন কাজ নেই, তুমি আপাতত এই ছেলেদেরকে ট্রেনিং দিতে শুরু কর। ট্রেনিং কোম্পানি করা হল, আখতার ভাই তার কমান্ডার। ক্যাপ্টেন হায়দারও কিন্তু ওইরকম সময়েই কুমিল্লা থেকে পালিয়ে তেলিয়াপাড়ায় চলে যায় পায়ে হেঁটে। তেলিয়াপাড়ায় সেকেন্ড বেঙ্গল আর ফোর্থ বেঙ্গলের বহু বাঙালি মিলিটারি অফিসার পালিয়ে গিয়ে জড়ো হয়। নাদিমের আব্বাও প্রথমে পালিয়ে এই তেলিয়াপাড়াতেই যান। মেজর জিয়াও তেলিয়াপাড়ায় গিয়েছিলেন খালেদ ভাইদের সঙ্গে মিটিং করার জন্য।

কিছুদিন পর খালেদ মোশাররফ যখন ভারতের ভেতরে সোনামুড়ায় তাঁর ঘাটি সরিয়ে নিয়ে যায়, তখন আখতার ভাইও সেখানে যায়। খালেদ ভাই এবার তার ক্যাম্প হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নিতে বলে। ততদিনে বর্ডারে যুদ্ধটুদ্ধ বেশ হচ্ছে। দুএকজন করে মুক্তিযোদ্ধা জখমও হচ্ছে।

সোনামুড়ায় একেবারে বর্ডার ঘেঁষে শ্ৰীমন্তপুর বলে একটা বর্ডার আউট-পোস্ট আছে। সেইটার কাছে একটা স্কুলঘরে খালেদ মোশাররফ তার ক্যাম্প করেছে। পাশেই একটা গোয়ালঘর আখতার ভাইকে দেওয়া হল রুগী দেখার ব্যবস্থা করার জন্য। আখতার ভাই দুটো লম্বা তক্তা যোগাড় করে ঘরের দুপাশে খুঁটির ওপর পাতল, একটা হল রুগীর বেড, অন্যটায় ওষুধপাতি, গজ ব্যান্ডেজ সাজিয়ে রাখল। সেইটাই হলো সেক্টর টুর সর্বপ্রথম এক বেডের ক্যাম্প হাসপাতাল।

পরে সোনামুড়া ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা বড় ডাকবাংলোয় হাসপাতাল সরিয়ে নেয়া হয়। এখন হাসপাতাল আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। আরো অনেক ডাক্তার-নার্স এসে যোগ দিচ্ছে।

খুকু কবে গেল?

আখতার ভাই শ্ৰীমন্তপুরে থাকার সময়ই কুমিল্লায় মুক্তিযোদ্ধা পাঠিয়ে খুকু ভাবীর খবর বের করে। তারপর তাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে। সেটা এপ্রিলের মাঝামাঝি কি তার একটু পরে হবে।

আমি নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, সত্যিই। রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর এসব কাহিনী। শুনে বড় ভালো লাগছে। তুই যে ওখানে গিয়ে আপনজন পেয়েছিস, তাতেই আমার শান্তি। তা সোনামুড়া মেলাঘর থেকে কতদূর? প্রায়ই যাস্ নাকি?

হাসপাতাল এখন আর সোনামুড়ায় নেই তো। জায়গাটা বর্ডারের খুব কাছে ছিল, ওখান থেকে দারোগা বাগিচা বলে একটা জায়গায় সরানো হয়। এখন বিশ্রামগঞ্জ বলে আরেকটা জায়গায় সরানো হয়েছে। এখানেই স্থায়ীভাবে থাকবে বলে ঠিক হয়েছে। মেলাঘর থেকে মাইল আষ্টেক দূরে। আমি মাঝে-মাঝে ছুটি নিয়ে যাই ওখানে।

কি রকম হাসপাতাল? বেড়ার ঘরে বাঁশের মাচার বেড়, তাতে খড়ের গদি। ডাক্তার, নার্সদের থাকার জায়গাও ওইরকম বেড়ার ঘরেমাচায় বেড। আখতার ভাই শুধু ডাক্তারিই করেনা, ফাঁক পেলেই স্টেনগান হাতে অ্যাকশনে বেরিয়ে যায়। একবার হলো কি, হাসপাতালে ওষুধপত্র নেই, আখতার ভাই একটা জীপে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে এক জায়গায় বর্ডার ক্রস করে ইস্ট পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে এক হাসপাতাল লুট করলো। ফ্রিজ থেকে শুরু করে ওষুধপত্র, অপারেশনের যন্ত্রপাতি, গজ-ব্যান্ডেজ সব একেবারে সাফ তুলে নিয়ে এলো। আবার, মজা করে একটা রসিদ লিখে রেখে এলো–বাংলাদেশের সৈন্যদের ব্যবহারের জন্য এসব জিনিস নেয়া হলো।

মেলাঘরে তোরা কিভাবে থাকিস? কি খাস? জায়গাটা কি রকম? গ্রাম? না আধাশহর?

গ্রামও না, আধাশহরও না, একেবারে পাহাড়ী জঙ্গুলে জায়গা। টিলার ওপরে বেড়ার ঘরে, তাঁবুতে আমরা সবাই থাকি। খাওয়া-দাওয়ার কথা আর জিগ্যেস করো না। ওইটার কষ্টই সবচেয়ে বেশি।

জামী ফোড়ন কাটল, হ্যাঁ, তুমি তো আবার একটু খেতে ভালোবাস!

কি খাবার দেয় সাধারণত?

ভাত আর ডাল। কখনো লাবড়া, কখনো মাছ। সকালের নাশতা রুটি আর ঘোড়ার ডাল।

আমি আঁতকে উঠলাম, ঘোড়ার ডাল? সে আবার কি?

চোকলা-মোকলাসুদ্ধ এক ধরনের গোটা গোটা ডাল, নর্মাল টাইমে বোধ হয় ঘোড়াকে খাওয়ানো হয়। আর রুটি? জানো আম্মা, কতোদিন সে রুটির মধ্যে সেঁকা পোকা পেয়েছি।

পেয়ে কি করতিস? রুটি ফেলে দিতিস?

ফেলে দেব? তুমি কি পাগল হয়েছে আম্মা? সেঁকা পোকাটা নখে খুঁটে ফেলে দিয়ে রুটি খেয়ে নিতাম।

আমি একটা নিঃশ্বাস চাপলাম। এই রুমী! যে প্লেট বা গ্লাস আমার চোখে ঝকঝকে পরিষ্কার মনে হত, তার মধ্যেও সে এককণা ময়লা আবিষ্কার করে ফেলত। আবার ধোয়াত। তার জন্য গমের আটা দুবার করে চেলে নিতে হত। ডাল ধুতে হত যে কতবার, তার হিসাব নেই, কারণ রান্না ডালে একটা খোসা দেখলে সেই ডাল আর খাবে না।

কিন্তু যাই বলো আম্মা, ঐ খাবার যে কি অমৃতের মতো লাগত। ওই খাবারও তো

সব দিন জুটত না। কতদিন গাছ থেকে কাঁঠাল পেড়ে খেয়ে থেকেছি। মাঠ থেকে তরমুজ, বাঙ্গী, আনারস এসব তুলে খেয়ে থেকেছি।

যুদ্ধ মানুষকে কি রকম বদলে দেয়। নইলে তোর মতো খুঁতখুঁতে পিপিতে ছেলে—

রুমী একটু দুষ্টু হেসে বলল, সত্যিই যুদ্ধ মানুষকে বদলে দেয়। নইলে তোমার মতো কট্টর মা ও–

আমি হেসে ফেললাম, থাম!হয়েছে। এখন বল্ মেলাঘরে কি কি ট্রেনিং নিয়েছিস?

উঁহু, ওইটি বলা যাবে না। শুধু এটুকু জেনে রাখ ক্যাপ্টেন হায়দার আমাদের। কম্যান্ডো-টাইপ গেরিলা ট্রেনিং দিয়েছে। এবং আমরা কিছু নির্দিষ্ট কাজের ভার নিয়ে ঢাকা এসেছি। এর বেশি আর কিছু জানতে চেয়ো না।

জামী আর মাসুম ঢুলছে। শরীফ হাই তুলে বলল, রাত তিনটে। এখন শোয়া যাক। বাদবাকি আগামীকাল শোনা যাবে।

৯ আগস্ট, সোমবার ১৯৭১

আজ আমাদের বিয়ের তারিখ। ২৪ বছর হলো। প্রতি বছর আমরা বিবাহবার্ষিকীটা ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে উদযাপন করি। আমি তাকিয়ে আছি সামনের বছরের দিকে, আমাদের বিয়ের পঁচিশ বছর পুরবে। রজতজয়ন্তী উৎসবটা খুব ধুমধাম করে পালন করব।

সকাল থেকে বেশ বৃষ্টি, দুপুরে খিচুড়ি রাঁধলাম। সঙ্গে গোশতের কাড়ি আর শেষে ফজলী আম। এবার আর কাউকে দাওয়াত নয়–নিজেদের মধ্যেই। উদ্যাপনের মতো মন নেই। উচিতও নয়। তবে রুমী এসেই যেভাবে বলেছে দেখলে, তোমাদের বিবাহবার্ষিকীর আগের দিনটাতে কেমন এসে গেলাম–তাইতেই একটু কিছু করা।

রুমী দুপুর বারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে উঠে গোসল সেরে খাবার টেবিলে এসে খুশি হয়ে গেল।

খেয়ে উঠেই রুমী বেরিয়ে যাচ্ছিল, আগের অভ্যাসবশে ডেকে ফেললাম, কোথায় যাচ্ছিস? রুমী ফিরে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কুটি করে তাকাল, আম্মা নো কোয়েশ্চেন এনিমোর। তবে এবারের মতো বলছি –সেলুনে যাচ্ছি দাড়ি কাটতে। তারপর অন্য কাজ আছে।

আমি বলে উঠলাম, দাঁড়া, দাঁড়া, ক্যামেরাটা নিয়ে আসি। একটা ছবি তুলে রাখি।

রুমী হাসিমুখে মাথা নাড়তে নাড়তে ননা ওয়ে বলে বেরিয়ে গেল।

রুমীর এই এক দোষ। কিছুতেই ছবি তুলতে চায় না। গেরিলা হবার অনেক আগে থেকেই ওর শখ–গেরিলা হবে। একবার তো প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন আর্মিতে যাবার জন্য খুব ঝোঁক ধরেছিল। ওর মত হল, গেরিলাদের কোন ছবি থাকা উচিত নয়। তাহলে ওদের ধরা সহজ হয় না।

রুমী ফিরল সন্ধ্যার পরে। ডাইনিং টেবিল ঘিরে আমি, শরীফ, দাদাভাই, মোর্তুজা, ডাক্তার, ফকির–সবাই বসে খুব লো-ভলমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনছিলাম। বেল বাজতেই শরীফত হাতে স্টেশনের কাঁটা ঘুরিয়ে দিল। দরজা খুলতে রুমীকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার কাঁটা যথাস্থানে নিয়ে গেল। রুমীকে দেখে মোর্তুজা বলে উঠলেন, কি রুমী, তোমার যে দেখাই পাওয়া যায় না? যখনি আসি, শুনি তুমি ছাদের ঘরে জুডো প্র্যাকটিস করছ, না হয় বন্ধুর বাসায় গিয়েছে। এত ঘোরাঘুরি করা কি ভালো?

রুমী সবাইকে সালাম দিয়ে চৌকিটাতে বসল, হেসে মৃদুস্বরে বলল, বেশি তো ঘুরি না চাচা। ছাদের ঘরেই বেশি সময় কাটাই। জুডো কারাতে প্র্যাকটিস করি, বই পড়ি, ড্রয়িং করি।

মোর্তুজা হেসে বললেন, তোমার ছাদের ঘর একদিন দেখায়ো।

আমি বললাম, হ্যাঁ, দেখা উচিত আপনার। ওর খেয়াল মেটাতে কত খরচ করতে হয়েছে আমাদের, দেখবেন। পুরো ঘরের মেঝে জুড়ে তিন ইঞ্চি পুরু ছোবড়ার গদি বসাতে হয়েছে–ওনারা ধড়াম ধড়াম আছাড় খাবেন, তার জন্য। এককোণে ছাদে আংটা লাগিয়ে আর মেঝেতে তিনমণি কংক্রিট স্ল্যাব বসিয়ে পাঞ্চিং ব্যাগ ঝোলানো হয়েছে–ওনারা ঘুষি মেরে বক্সিং প্র্যাকটিস করবেন বলে।

দাদাভাই বললেন, খুব ভালোকথা তো। কলেজ, ইউনিভার্সিটি বন্ধ, বাইরে বিপদ, বাড়িতেই যদিব্যস্ত থাকার ব্যবস্থা করা যায়, তবে তার চেয়ে আর কি ভালো হতে পারে? আমাদের ছেলেগুলো তো ঘরে বসে বসে বোরড় হয়ে গেল। বাইরে বেরোতে দিতেও ভয় লাগে।

১২ আগস্ট, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

গত তিনদিন থেকে রুমীর দেখা পাওয়াই দুষ্কর। কখন যাচ্ছে, কখন আসছে, তার ঠিক নেই। পরশুদিন দুপুরে বাসায় খেল দুজন গেরিলা বন্ধুকে নিয়ে–বদি আর জুয়েল। বদি ইকনমিকসে এম. এ. পড়ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্র জুয়েলও নামকরা, তবে ক্রিকেটের মাঠে। খাওয়ার পরপরই ওদের নিয়ে রুমী বেরিয়ে গেল, বলে গেল রাতে ফিরবে না।

গতকাল ধলুরা দুপুরে খেল আমাদের বাড়িতে। চিশতীর ছুটি প্রায় শেষ, ওরা ১৫ তারিখে ইসলামাবাদ ফিরে যাবে। খেতে বসে ধলু জিগ্যেস করেছিল, রুমী কই? খাবে না? বলেছিলাম এসে যাবে এক্ষুণি। আমরা শুরু করে দিই।

কিন্তু রুমীর আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেল। ততক্ষণে ধলুরা চলে গেছে। বললাম, রুমী, একবার সময় করে খালা-খালুর সঙ্গে দেখা করে আসিস। কালকেও ঘণ্টাখানেক বাড়িতে থেকেই আবার বেরিয়ে গেল। বলল, রাতে ফিরবে না।

কিছুই বলছিনা, বলবার উপায় তো নেই। কিন্তু রাতে ঘুম হচ্ছে না। জামীর আবার জ্বর দুদিন থেকে। ডাক্তার দেখে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছে।

আমারও শরীরটা খুব দুর্বল লাগে। সব সময় বুক ধড়ফড় করে। রুমী সব কথা খুলে বললে মনে হয় এতটা অসুস্থ লাগত না।

আজ দুপুরে খাওয়ার পর টেবিলে রুমীর খাবার ঢাকা দিয়ে চৌকিটাতে শুয়েছিলাম। রুমী এল বিকেলে। এসেই বলল, আম্মা, খেতে দাও। বডেড়া খিদে পেয়েছে টেবিলের দিকে তাকিয়ে–বাঃ আগে থেকেই খাবার রেডি! গুড ওল্ড মাম্।

আমি উঠে ঢাকনা খুলে রুমীর প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললাম, কাল বিকেলে ইন্টারকনে ভীষণ কাণ্ড হয়েছে। একেবারে ভেতরে একটা ঘরে বিচ্ছুরা বোমা মেরেছে। জানিস?

জানি। ঘরে নয়, একতলার লাউঞ্জের পাশের একটা বাথরুমে।

তুই ছিলি নাকি?

না।

যারা ছিল, তাদের চিনিস?

আম্মা। রুমীর গলায় অসহিষ্ণু রাগ।

আমিও হঠাৎ রেগে গেলাম। ঠিক আছে, তোকে আর কিছুই জিগ্যেস করব না। তবে জেনে রাখ, আমাদের ম্যালাই সোর্স আছে। এই ঢাকাতে খবর জেট প্লেনের স্পীডে যাতায়াত করে বুঝলি?

রুমী হেসে ফেলল, কিন্তু আমি দুমদুম করে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে গেলাম।

খানিক পরে রুমী এসে ঢুকলো বেডরুমে, পাশে বসে বলল, ইন্টারকনের ভেতরে বোমা মারে নি ওটা প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ সংক্ষেপে বলে পি.কে।

আমি কথা বললাম না। রুমী বলল, যারা করেছে, তাদের তুমি আগে দেখ নি। আমিও আগে চিনতাম না। মেলাঘরে গিয়ে আলাপ হয়েছে।

আমি চুপ। রুমীও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বলল, ঐ যে পি.কে., এটা না, দেখতে একদম পুটির মতো। হলদে রঙের। বড়ই নিরীহ চেহারার। দেখে মনে হবে ফার্নিচারের দোকানের পুটি-ই।

তবুও কথা বললাম না। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। রুমী যতটুকু বলার ঠিক ততটুকুই বলবে। তার বেশি একটুও না। আমার জিগ্যেস করা বৃথা।

রুমী খানিকক্ষণ আপনমনে শিস দিল, তারপর মৃদুস্বরে আবৃত্তি করতে লাগল :

দেখতে কেমন তুমি? কি রকম পোশাক আশাক
পরে করো চলাফেরা? মাথায় আছে কি জটাজাল?
পেছনে দেখাতে পারো জ্যোতিশ্চক্র সন্তের মতন?
টুপিতে পালক গুঁজে অথবা জবরজং, ঢোলা
পাজামা কামিজ গায়ে মগডালে একা শিস দাও
পাখির মতই কিংবা চা-খানায় বসো ছায়াচ্ছন্ন?
দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে
কুলুজি তোমার আতিপাতি! তোমার সন্ধানে ঘোরে
ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্ন তন্ন
করে খোঁজে প্রতি ঘর।

আমি উঠে বসে জিগ্যেস করলাম, কার কবিতা এটা?

ঢাকার এক বিখ্যাত কবির। নামটা ভুলে গেছি। শাহাদত ভাই আর আলম মাঝে মাঝে ওঁর কাছ থেকে নিয়ে যায় ওপারে। মেলাঘরে আমরা কবিতাগুলো পড়ি। ভালো লাগলে দুএকটা কপি করে রাখি, তারপর ওগুলো কলকাতায় কার কাছে যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এটা তো তোদের নিয়েই লেখা বলে মনে হচ্ছে।

হ্যাঁ, এটার নাম গেরিলা–বাকিটা শোন :

পারলে নীলিমা চিরে বের
করতো তোমাকে ওরা, দিতো ডুব গহন পাতালে।
তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া।
তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।

আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে বললাম, ঐ শাহাদত আর আলম আর আসে না ঢাকায়?

আসে, আবার চলে যায়। এবার আসেনি?বলেই সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে আবার বললাম, মানে এরপর এলে কবির নামটা জিগ্যেস করে নিস।

রুমী হেসে ফেলল, আম্মা ইউ আর সিম্পলি ইনকরিজিবল। ঐ কবি ঢাকাতেই বাস করছেন। আমি যে নামটা ভুলে গেছি সেটা ওঁর জন্য মঙ্গল। তুমি আবার জানতে চাও কেন? এতে তোমারও বিপদ, কবিরও বিপদ।

এই এক লুকোচুরি খেলা চলছে। রুমী বলছে, সব কথা জানতে চেয়ো না, ধরা পড়লে টর্চারে বলে ফেলতে পার। আমি কখনো লক্ষ্মী মেয়ের মতো, কখনো অভিমানে, রুমীর কথা মেনে নিয়েও খানিক পরে আবার ভুলে গিয়ে প্রশ্ন করে ফেলেছি।

এবার আর রাগ করলাম না। হেসে বললাম, সত্যি, কি জ্বালা। খালি ভুলে যাই। বুড়ো বয়সে সব উলটপুরাণ হয়ে গেছে। এখন তুই বাবা হয়েছিস, আমি তোর ছোট মেয়ে। তাই খুব মনের সুখে বকে নিচ্ছি।

১৫ আগস্ট, রবিবার ৯৭১

আমাদের সবার মন খুব খারাপ। গতকাল ভোর ছটায় জুবলী ফোন করে জানাল যে, রাত দেড়টার সময় মিলিটারি এসে রফিককে ধরে নিয়ে গেছে। কোনমতে মুখ-হাত ধুয়ে এককাপ চাপ খেয়ে জুবলীদের বাসায় গেলাম। ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে থাকলাম। বসে ছিল আরো অনেকে–আতিক, বুলু, রেণু, চামু, প্রতিবেশী কয়েকজন। জুবলী মেঘলা, বর্ষণকে কোলের কাছে নিয়ে শূন্য চোখে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। কারো মুখে কথা ছিল না।

আজ ধলুরা ইসলামাবাদ ফিরে গেল।মা ও লালুকে নিয়ে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। একটি বোনের সঙ্গে তবু দেখা হলো, আরেকটি বোন বেলু, তার স্বামী আজিজ, তিনটি ছেলেমেয়ে ইসলামাবাদে রয়েছে। তাদের এখন ছুটিতে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। তাদের সঙ্গে কবে দেখা হবে, কে জানে। আদৌ হবে কি না তাই বা কে জানে?

এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার পথে জুবলীদের বাসায় গেলাম। রফিকের সাথে একই রাতে আরো তিনজন অধ্যাপককে ধরেছে, তারা হলেন–গণিত বিভাগের শহীদুল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাদউদ্দিন, আর ইতিহাসের আবুল খায়ের।

মা আর লালুকে জুবলীদের বাসায় রেখে আমি আর শরীফ নিউ মার্কেটে গেলাম।

কদিন থেকে সময় পেলেই বিভিন্ন দোকানে একটা জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছি ওয়াটার প্রুফ সিগারেট কেস। ওয়াটার প্রুফ ঘড়ি বাজারে পাওয়া যায় কিন্তু ওয়াটার প্রুফ সিগারেট কেস আজ পর্যন্ত কোন কোম্পানি বানিয়েছে বলে শুনি নি। কদিন আগে রুমী বলেছিল,

আম্মা দেখো তো এমন একটা সিগারেট কেস পাও কি না, যেটার ডালা খুব চেপে লেগে থাকে। মানে পানিতে পড়লে যাতে পানি না ঢোকে। আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, কেন, এরকম সিগারেট কেস কেন?

আমাদের না, অ্যাকশানে গেলে পাক আর্মি বা রাজাকারদের তাড়া খেয়ে অনেক সময় দৌড়ে পালাতে হয়। কখনো পুকুরে বা নদীতে ঝাপ দিতে হয়, কখনো পানির মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে শত্রুর দিকে এগোতে হয়, তখন সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই ভিজে গেলে বড় কষ্ট হয়–তাই। কয়েকটা লাইটারও কিনো। তবে দেখো, কোনটাই যেন বেশি চকে বা ফ্যান্সি চেহারার না হয়। তাহলে লোভে পড়ে কোন ছেলে নিয়ে নিতে পারে।

অতএব, আমরা কদিন থেকে ওয়াটার প্রুফ আর পুরনো ঘটা চেহারার সিগারেট কেস আর লাইটার খুঁজে বেড়াচ্ছি। জিন্না এভিনিউতে এক দোকানে একটা পেয়েছিলাম, ডালাটা বেশ শক্ত হয়ে লেগে থাকে কিন্তু চেহারা বড় চর্চকে। তাই নিই নি। নিউ মার্কেটে পেলাম না। বললাম, জিন্না এভিনিউরটাই নিয়ে নেব কালকে। ঝামা দিয়ে ঘষে বাইরেটা ম্যাটমেটে করে নেব। আজ আর ভাল্লাগছে না। বাড়ি চল।

ফেরার পথে এক কার্টন ৫৫৫ সিগারেট কিনে নিলাম পাড়ার রশীদের দোকান থেকে। বিকেলে রুমী বলল, আম্মা, চল তোমাকে এক বাসায় নিয়ে যাই। তোমার মন একদম ভালো হয়ে যাবে।

কোথায়?

আগে থেকে বলব না। সারপ্রাইজ।

মগবাজার চৌমাথা থেকে তেজগাঁও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার দিকে একটু এগিয়েই রেললাইন পার হয়ে গাড়ি খানিক সামনে গিয়ে ডাইনে একটা গলিতে ঢুকল। আরো একটুখানি গিয়ে আবার ডাইনে ঢুকে থামল একটা একতলা বাড়ির সামনে–২৮ বড় মগবাজার। দুধাপ সিঁড়ি উঠেই ছোট্ট একটা বারান্দা-রেলিংঘেরা। বারান্দায় চেয়ারে বসে আছে স্বাস্থ্যবান একটি যুবক। উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে আদাব দিল। রুমী বলল, মা, এহলো আজাদ। একেতুমি ছোটবেলায় দেখেছ। অনেক বছর আগে এদের বাসায় আমরা অনেক দাওয়াত খেয়েছি।

মনে করতে পারলাম না কিন্তু ঘরে ঢুকে তার মাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলাম। অনেক বছর আগে–তা দশ-বারো বছর তো হবেই–এঁদের বাড়িতে কতো গিয়েছি, কতো খেয়েছি। আজাদের বাবা মিঃ ইউনুস আহমদ চৌধুরী ব্যবসায়ী ছিলেন, তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল আমাদের এক ভাগনে মেহেরের মাধ্যমে। আজাদের মা খুব ভালো রাধতেন। আমরা প্রায় প্রায়ই ছুটির দিনে ওঁদের বাড়িতে দাওয়াতে যেতাম আর আজাদের মার হাতের অপূর্ব রান্না খেয়ে খুব উপভোগ করতাম। ওঁরা প্রথমদিকে পুরনো ঢাকায় থাকতেন। তারপর মিঃ চৌধুরী নিউ ইস্কাটন রোডে বাড়ি বানালেন। বিরাট বাড়ি–আগাপস্তলা মোজাইক, ঝকঝকে দামী সব ফিটিংস, আজাদের মায়ের ড্রেসিং রুমটাই একটা বেডরুমের সমান বড়। সামনে অনেকখানি ভোলা জমি–বাগানের জন্য। এক পাশে হরিণের ঘর, সেখানে চমৎকার এক হরিণ। আজাদ তখন দশ-বারো বছরের ছেলে। তারপর মাঝখানে বেশ কয়েক বছর কেমন করে জানি যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। লোকমুখে শুনেছিলাম মিঃ চৌধুরী আরেকটা বিয়ে করেছিলেন।

এখন আজাদের মা নিজেই পুরো ব্যাপারটা বললেন, স্বামী আবার বিয়ে করাতে উনি একমাত্র সন্তান আজাদকে নিয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে আসেন বেশ কবছর আগে। আজাদ গত বছর এম.এ পাস করেছে। অনেক দুঃখধান্দা করে ছেলেকে মানুষ করেছেন। এখন আজাদ চাকরি করবে, এখন আর কোন দুঃখকষ্ট থাকবে না।

আজাদের মার দিকে চেয়ে রইলাম। বরাবরই দেখেছি বাইরে স্র মৃদুভাষিণী এবং ভেতরে ভেতরে খুব দৃঢ়চেতা কিন্তু এতটা একরোখা তা জানতাম না। এখন অনেক শুকিয়ে গেছেন, পরনে সরু পাড়ের সাদাসিদে শাড়ি, গায়ে কোন গহনা নেই। আগে দেখেছি–ভরাস্বাস্থ্যে গায়ের রং ফেটে পড়ছে, হাতে-কানে-গলায় সোনার গহনা ঝকমক করছে, চওড়া পাড়ের দামী শাড়ির আঁচলে চাবি বাধা, পানের রসে ঠোট টুকটুকে, মুখে সবসময় মৃদু হাসি, সনাতন বাঙালি গৃহলক্ষ্মীর প্রতিমূর্তি। সেই মিসেস চৌধুরী স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের প্রতিবাদে তীব্র আত্মসম্মানবোধে এককথায় প্রাচুর্য ও নিরাপত্তার ঘর ছেড়ে চলে এসেছেন।

একটা নিঃশ্বাস চাপলাম। ইস্কাটনের বাড়িটা আজাদের মায়ের নামে। সেই বাড়ি তিনি ফেলে এসেছেন ছেলের হাত ধরে। থাকছেন ভাড়াবাড়িতে।

ছেলেটিকে দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। স্বাস্থ্যবান সুদর্শন যুবক মায়ের মতই সবসময় হাসিমুখ।

আমরা থাকতে থাকতেই একটি ছেলে এল সেখানে, রুমী মৃদুস্বরে পরিচয় করিয়ে দিল, কাজী কামাল উদ্দিন, প্রভিন্সিয়াল বাস্কেটবল টিমের নামকরা খেলোয়াড়। মেলাঘরে পরিচয় হয়েছে। জানো আম্মা, কাজী ভাইকে এবার ন্যাশনাল বাস্কেটবল টিম ক্যাম্পে ডেকেছিল, কিন্তু কাজী ভাই যায় নি।

১৮ আগস্ট, বুধবার ১৯৭১

সকাল থেকে অঝোরে পানি ঝরছে। কদিন থেকেই বেশ ভালো বৃষ্টি হচ্ছে। তবে মাঝে-মাঝে থামে। আজ আর থামাথামির লক্ষণ নেই। এরই মধ্যে শরীফ ড্রাইভার আমিরুদ্দিকে সঙ্গে নিয়ে বাজার করে এনে দিয়েছে। রুমীর কয়েকজন বন্ধু দুপুরে খাবে।

২৮ নম্বর রোডের যে বাড়িটাতে ওদের প্রধান আস্তানা, সেখানে কদিনে অনেক গেরিলা ছেলে এসে গেছে। বড়ো গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি। রুমীদের কয়েকজনের আলাদা নিরিবিলি বসে কিছু প্ল্যান করা দরকার। আমাদের ছাদের ঘরটা এ কাজের জন্য একেবারে আইডিয়াল। সারা মেঝে জুড়ে জাজিম পাতা, রুমী জামীর জুডো কারাতে প্র্যাকটিসের জায়গা। সকালে তার ওপর কয়েকটা চাদর বিছিয়ে ঢেকে দিয়েছি, দোতলা থেকে কতকগুলো বালিশ আর অ্যাশট্রে নিয়ে রেখে দিয়েছি। আর কয়েক প্যাকেট ৫৫৫ সিগারেট।

ছেলেগুলো দশটার মধ্যে এসে ছাদের ঘরে দরজা এঁটে মিটিংয়ে বসে গেছে। মাঝখানে একবার রুমী এসে নিজের হাতে চা-নাশতার ট্রে নিয়ে গেছে।

দেড়টা বেজে গেছে। ওদের নামবার নাম নেই। টেবিলে খাবার দিয়ে নিজেই ছাদের ঘরের সামনে গিয়ে বন্ধ দরজায় টোকা দিলাম। ঘরের মধ্যে কথা শোনা যাচ্ছিল, টোকার শব্দে হঠাৎ সব চুপ হয়ে গেল। আমি একটু চেঁচিয়ে বললাম, খাবার রেডি। একটু পরে দরজাটা একটু ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে রুমী বলল, তুমি যাও, আমরা দুমিনিটের মধ্যে আসছি। ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ল সারা ঘর ধোয়ায় আচ্ছন্ন। মনে মনে একটু হেসে নেমে গেলাম। ছাদের ঘরের দরজা-জানালা সব সেঁটে সব পর্দা টেনে ওরা কথা বলছিল।

একটু পরে নিচে খেতে এল ওরা। ওদের মধ্যে কাজী, আলম, বদিকে আগেই দেখেছি। এখন রুমী পরিচয় করিয়ে দিল স্বপন আর চুলুর সঙ্গে। এর মধ্যে আলম ছাড়া বাকি সবাই রুমীর চেয়ে কয়েক বছরের বড়। আগে থেকেই রুমীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠত তার চেয়ে বয়সে বড় ছেলেদের সঙ্গে। আর এখন তো যুদ্ধে তের থেকে তিরিশ সবাই এক বয়সী।

ছেলেগুলো একেবারে মুখ বুজে খাচ্ছে। আমি বললাম, একটু মেলাঘরের কথা বল শুনি।

২০ আগস্ট শুক্রবার ১৯৭১

রাত প্রায় দুটো। ঘুম আসছে না। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এবারের বর্ষাটা একেবারে পচিয়ে দিল। ঢাকার কতকগুলো নিচু এলাকা আবার পানিতে ডুবে গেছে। বুড়িগঙ্গার পানি বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় খুব বন্যা হচ্ছে। বিশেষ করে পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর আর রাজশাহী জেলার অবস্থা খুব খারাপ। রোজই কাগজে বেরোচ্ছে কোন্ কোন্ নদীর পানি বাড়ছে, কোন্ কোন্ জেলার কতগুলো থানা বন্যায় ডুবে গেছে।

অতিরিক্ত বর্ষা আর বন্যা নিয়ে সামরিকজান্তা খুব উদ্বিগ্ন, বিব্রত আর আতঙ্কিত। শুকনো এলাকার পাকিস্তানি সৈন্যরা এই রকম বৃষ্টি, বন্যা, কাদার মধ্যে একেবারে লেজেগোবরে হয়ে পড়েছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর জন্য সুবিধে। নদী-হাওড়-বিলের সাঁতার জানা দামাল ছেলেরা পাকসেনাদের খুব জব্দ করেছে। সবাই বলছে আল্লার রহমত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। তাই এ বছর এই রকম অতিরিক্ত বর্ষা আর বন্যা।

রুমী গতকাল দুপুরেই চলে গেছে বাড়ি থেকে, বলেছে দুদিন পরে আসবে। ঢাকা আসার পর থেকেই দেখছিলাম কি অস্থিরতায় ভুগছে রুমী। এতদিনে কারণটা একটুখানি বলেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ওড়াবার দায়িত্ব নিয়ে ওদের দলটা ঢাকা এসেছে। কিন্তু এসে দেখে সে পাওয়ার স্টেশন একেবারে দুর্ভেদ্য দুর্গ। আগে যেখানে স্টেশনের ভেতরে এক প্লাটুনের মতো সৈন্য পাহারা দিত, এখন সেখানে এক কোম্পানির মতো সৈন্য। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডে মিলিটারি সৈন্য রিকয়েললেস রাইফেল নিয়ে এমুড়ো থেকে ওমুড়ো পর্যন্ত টহল দিচ্ছে। টহল দিচ্ছে নদীর বুকেও। নৌকায় চেপে। উলান, গুলবাগ, ধানমন্ডির অ্যাকশানের পর থেকে পাকিস্তান আর্মি ইনটেলিজেন্স দারুণ সতর্ক হয়ে গেছে। ফার্মগেট, ইন্টারকন অ্যাকশানের পর সামরিকজান্তা একেবারে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো হয়ে রয়েছে। বস্তুত সারা ঢাকা শহরেই এখন সিকিউরিটির ভয়ানক রকম কড়াকড়ি। সুতরাং সিদ্ধিরগঞ্জের ব্যাপারে ওদের সময় নিতে হচ্ছে, নতুন করে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জ ছাড়াও অন্য যেসব অ্যাকশানের নির্দেশ ওদের ওপর আছে, সেইগুলোর দিকে ওরা এখন মনোেযোগ দিচ্ছে।

গেরিলাদের অনেক কটা দল এখন ঢাকায়। তারা প্রতিদিনই সর্বত্র কিছু না কিছু অ্যাকশান করেই চলেছে। ওদের ওপর নির্দেশই আছে : প্রতিনিয়ত ছোটবড় নানা ধরনের অ্যাকশান করে সামরিক জান্তা এবং পাক আর্মিকে সদাসর্বদা ব্যতিব্যস্ত, বিব্রত ও আতঙ্কিত রাখতে হবে। শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত এমনভাবে অ্যাকশান করবে, যাতে পাক আর্মি মনে করে সারা শহর জুড়ে হাজার হাজার বিচ্ছু কিলবিল করছে।

এবং ওরা করছেও তাই।

এখন রুমীরা কোথায় কি করছে, কে জানে। কোনো বাড়িতে ঘুমিয়ে আছে? নাকি এই বৃষ্টিতেই কোথাও বেরিয়েছে কারফিউর মধ্যে? রাস্তায় গাড়িতে? না, নদীতে নৌকায়? কে জানে।

সাত সতেরো ভেবে ভেবে বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে যাচ্ছে। শুয়ে থাকতে পারলাম। উঠে রুমীদের ঘরে গেলাম। বাবার ঘরে বাবা আর মাসুম দুটো খাটে। রুমীর ঘরে জামীর খাটে জামী ঘুমে অচেতন। রুমীর খাটের ওপর নিঃশব্দে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম।

মেলাঘরেও কি এখন বৃষ্টি হচ্ছে? বেড়ার ঘরের ফোকর দিয়ে, তাঁবুর নিচ দিয়ে পানি ঢুকে মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে? পরশুদিন কাজী আর আলমের মুখে মেলাঘরের অনেক গল্প শুনেছি। ওরা প্রথম বর্ডার ক্রস করে এপ্রিলের মাঝামাঝি। মেলাঘরে সেক্টর টুর হেডকোয়ার্টার হয়েছে জুনের প্রথম দিকে। তার আগে ওরা ছিল মতিনগরে। প্রথমদিকে ওদের অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়েছে। প্রায় কিছুই ছিল না। একেবারে শুরুতে গিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নিচে ঘাসের ওপর শুয়েছে কতোদিন। গায়ের ওপর দিয়ে কেঁচো, বিছে, কত কি চলে গেছে। তারপর তাঁবু যোগাড় হয়েছে, তার মধ্যে স্রেফ চাটাই পেতে। ভাত খেয়েছে মাটির সানকিতে, গ্রেনেডের খালি বাকস আড়াআড়ি কেটে তার মধ্যে। ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার পান্ডে যখন ওদের ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন, তখন সানকি আর গ্রেনেডের বাক্স দেখে, ওদেরকে বাসন-প্লেট দেবার হুকুম দেন। ছেলেরা বলে আমরা বাসন প্লেট চাই না, তার বদলে আমাদের বুলেট দিতে বলুন। কি ধাতুতে গড়া এই ছেলেগুলো বাসনের বদলে বুলেট চায়। আর খাওয়া? কতোদিন শুধু ডাল আর ভাত, মাঝে মাঝে তরকারির ঘাট, কখনো সখনো মাছ। তাও নুন ছিল না বহুদিন, প্রথম যেদিন ডাল, তরকারিতে নুন দেওয়া হয়েছিল সেদিন খাবার কম পড়ে গিয়েছিল। আলম বলছিল হেসে হেসে, আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। খাওয়ার পানির অভাব ছিল, ছোট একটা খালমতো ছিল, সেই খালের পানি দিয়েই সব কাজ হত, খাওয়া পর্যন্ত।

মতিনগর থেকে মেলাঘর যাত্রা–ক্যাপ্টেন হায়দারের হুকুমে ক্যাম্প ভেঙে সব গুছিয়ে ঘাড়ে তুলে একরাতে রওনা–সারারাত হেঁটে ভোরবেলা যেখানে থামল, সেটাই মেলাঘর। মতিনগর থেকে ১০/১২ মাইল দূরে। আগের রাতে কোন খাবার জোটে নি, ঘাড়ে মাথায় বিরাট বোঝা নিয়ে রাতভর হাঁটা, সকালে গাছের কাঁঠাল পেড়ে তাই দিয়ে নাস্তা!তারপর টিলার ওপর ক্যাম্পতৈরি, সবকাজ নিজের হাতে। দোতলা সমান টিলা নিচে থেকে মাটি কেটে কেটে সিঁড়ি বানানো, সঙ্গে সঙ্গে গাছের ডাল কেটে পুঁতে দেওয়া, যাতে মাটিটা ভেঙে পড়ে না যায়।

রাতের বেলা ঘুম না এলে ভাবনাচিন্তাগুলো খুব তীক্ষ্ণরূপ নেয়। মনে হচ্ছে, মেলাঘর এখন আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। তিন-চারদিন আগে এক দুপুরে খাওয়ার পর রুমী বলছিল মেলাঘরের জীবনের কথা। রুমী যখন যায়, তখন ক্যাম্পের জীবনযাপনের মান অনেকখানি উন্নত হয়েছে। অনেক তাবু, বেড়ার তৈরি লম্বা ব্যারাক, বাঁশের মাচায় খড়ের গদিতে চাদর, বালিশ। ট্রেনিং ও অ্যাকশানের জন্য অনেক অস্ত্র, গুলি, গ্রেনেড, বিস্ফোরক।

একরাতে রুমীর সেন্ট্রি ডিউটি পড়েছিল কয়েকজন সহযোদ্ধার সঙ্গে। অনেক রাতে টিলার মাথায় রুমী দাঁড়িয়েছিল। চারধারে ছোটবড় আরো কয়েকটা টিলা, এদিক-ওদিক বড় বড় গাছ।

রুমী বলছিল, জানো আম্মা, ওখানে তো সন্ধ্যে সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া হয়ে যায়। সারা দিনের প্রচণ্ড খাটনিতে সবাই এ্যাতো টায়ার্ড থাকে যে আটটানটার মধ্যে বেশির ভাগ ছেলে ঘুমিয়ে যায়। দুএকটা তাবুতে হয়ত কেউ কেউ আরো খানিকক্ষণ জেগে গানটান গায় কিংবা আড্ডা দেয়। সে রাতে টিলার মাথায় দাড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি কি, একটা তাবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর :

হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ।

বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গানের গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। সেদিন সেই রাতে চারদিক ভীষণ অন্ধকার, অন্যসব ব্যারাক আর তার সবাই বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। নটা-দশটাতেই মনে হচ্ছে নিশুতি রাত। ঐ একটা তাঁবুর ভেতর হারিকেনের আলো ছড়িয়ে সাদা রঙের পুরো তাবুটা যেন ফসফরাসের মতো জ্বলছে। উঁচু থেকে দেখে মনে হচ্ছিল বিশাল অন্ধকার সমুদ্রে যেন একটা আলোকিত জাহাজ। আর আজম খানের গানের সুর, মনে হচ্ছিল যেন চারদিকের ইথারে ভেসে ভেসে হাজার হাজার মাইল ছড়িয়ে পড়ছে। তখন আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।

এখন এই বৃষ্টি ঝরা গভীর রাতের অন্ধকারে আমিও যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম নির্জন পিলার মাথায় কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা ৩০৩ রাইফেল হাতে সেন্ট্রি ডিউটিতে সমস্ত ইন্দ্রিয় টান করে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের চারপাশ দিয়ে বায়ুমণ্ডলে ভেসে ভেসে যাচ্ছে আজম খানের উদাত্ত গলার গান :

হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,
যে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।
হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান
গত আকালের মৃত্যুকে মুছে
আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।
… … … …
শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়!
জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।

২১ আগস্ট, শনিবার ১৯৭১

সকালে রুমীর ফোন পেলাম রেবাদের বাসা থেকে। রুমী ওখানে রয়েছে, ওকে নিয়ে আসতে হবে।

গেলাম। রুমী ঢাকা আসার পর থেকে গাড়িটা বাড়িতেই থাকে, কখন লাগে–তার জন্য। শরীফ, বাঁকা কিংবা মঞ্জুরের গাড়িতে অফিসে যাওয়া আসা করে।

গিয়ে দেখি, রুমীর চেহারার অবস্থা করুণ। দুদিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উষ্কখুষ্ক চুল, রাতজাগা লাল চোখ, কুঁচকানো কাপড়-চোপড়। রুমী বলল, এই চেহারা-সুরত নিয়ে বেবিতে যেতে সাহস পেলাম না। গুলশান লেকের ঘাট থেকে মিনিমামার বাসাটা একদম কাছে, তাই এদিক দিয়ে এলাম।

বুঝলাম নদীর ওপারে যে গ্রামে ওদের ক্যাম্প আছে, সেইখান থেকে এসেছে।

বাড়ির দিকে গাড়ি চালিয়ে বললাম, ঠিক আছে। অসুবিধে তো কিছু নেই আমার। কিন্তু চেহারা-সুরত এরকম হলো কি করে, বলা যাবে?

যাবে বলে রুমী বিষন্ন হাসি হাসল, পেছনে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে আস্তে আস্তে বলল, পরশু রাতে দুটো নৌকায় করে আমরা কয়েকজন সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের আশপাশটা একটু দেখতে বেরিয়েছিলাম। সামনের নৌকায় কাজী ভাই, বদি আর জুয়েল ছিল। অন্ধকার রাত, কিছু দেখা যায় না। আমরা পেছনের নৌকায় একটু দূরে। আসলে কাজী ভাইরা কি যেন একটা চেক করে দেখার জন্য এগিয়ে গেছে, আমাদের একটু পেছনে থাকতে বলেছে। হঠাৎ শুনি ভয়ানক গুলির শব্দ। কিছুই বুঝতে পারি না। অন্ধকারে শুনলাম চিল্কার, পানিতে ঝাপিয়ে পড়ার শব্দ। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। একটু পরে কাজী ভাইদের নৌকা কাছে এলে সব জানতে পারলাম। কাজী ভাইরা একটা মিলিটারি ভর্তি নৌকার সামনে পড়েছিল। মাঝিটা ছিল রাজাকার। সে বাংলায় শুধিয়েছিল কে যায়, মিলিটারিগুলো একদম চুপ করে ছিল। কাজী ভাই একটু ঘুরিয়ে জবাব দেয় সামনে। নৌকাটা একদম কাছে আসতেই ওরা দেখে নৌকাভর্তি মিলিটারি। কাজী আর জুয়েল তাদের স্টেনগান নৌকার পাটাতনে লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বদি তা রাখে নি। সে কোলের মধ্যে রেখেছিল। ভাগ্যিস রেখেছিল। তাই আমরা সবাই বেঁচে গেছি। বদি সঙ্গে সঙ্গে স্টেন তুলে ওদের নৌকার ওপর ব্রাশফায়ার করে। পুরো ম্যাগজিন একেবারে খালি করে দেয়। মিলিটারিরাও গুলি চালিয়েছিল, তবে বদির ব্রাশের মুখে একদম সুবিধে করতে পারেনি। কেবল জুয়েলের আঙ্গুলে গুলি লেগেছিল। মিলিটারিদের কয়েকটা মরে, বাকিরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদের নৌকাটা উল্টে যায়। বদিও পানিতে পড়ে গিয়েছিল। ওকে পরে তুলে আমরা সবাই পিরুলিয়া গ্রামে ফিরে যাই। জুয়েলকে নিয়ে যা বিপদে পড়েছিলাম। সে রাতে কোনমতে ফার্স্ট এইড দিয়ে রাখা হলো। গতকাল কাজী বদি, জুয়েলকে ঢাকা নিয়ে এসেছে। ওর আঙ্গুলে অপারেশন করতে হবে।

আমার গা শিরশির করতে লাগল। একটু হলেই সবাই গুলি খেয়ে মরতে পারত, জখম হয়ে নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে পারত। কোনোদিন জানতেও পারতাম না। ছেলেগুলোর কি হলো?

রুমীকে সে কথা বলতে সে হাসল, আমাদের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কি বলেন, জান? তিনি বলেন, কোন স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না; চায় রক্তস্নাত শহীদ। অতএব মা মণি, আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব–এই কথা ভেবে মনকে তৈরি করেই এসেছি।

আমার হঠাৎ দুচোখে পানি এসে গেল। গাড়ি চালাতে অসুবিধে হবে, তাই আর কথা না বলে মাথা উঁচু করে চোখের পানি আবার ভেতরে পাঠাবার প্রয়াসে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগলাম। রুমী বুঝতে পেরে কথা ঘুরিয়ে দিল, জান আম্মা, জুয়েল জখম। হওয়াতে আমাদের তৎপরতা একটু ঢিলে পড়ে যাবে। জুয়েলকে সাবধানে লুকিয়ে রাখতে হবে। আমাদেরও একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। আসলে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনটা এখনো ওড়াতে পারা গেল না, তাই মনে একদম শান্তি নেই। অথচ এই সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ওড়াবার জন্য মেলাঘরে হায়দার ভাই আমাদের দলকে স্পেশাল ট্রেনিং দিয়েছে। কাজী ভাই এই দলের লিডার। এই কাজের জন্য আমরা সঙ্গে এনেছি প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। একটা ৩.৫” রকেট লাঞ্চার, সেটা চালাবার জন্য আর্টিলারি থেকে একজন গানারকেও আমাদের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আটটা রকেট শেল, কি যে ভারি, বয়ে আনতে আমাদের জান বেরিয়ে গেছে। এ ছাড়া দুটো এস.এল.আর উইথ অ্যানাগালঞ্চার। প্রত্যেকের জন্য একটা করে স্টেনগান, চারটে করে ম্যাগজিন, অসংখ্য বুলেট, দুটো করে হ্যান্ড গ্রেনেড়। এখানে এসে দেখা গেল, যা হেভি সিকিউরিটি, তাতে শুধু বাইরে থেকে রকেটশেল মেরে কিছু করা যাবে না, মেরে দিয়ে পালানোও যাবে না। তখন ভেতর থেকেও স্যাবোটাজ করার কথা চিন্তা করা হলো। কাজী ভাই, আলম, শাহাদত ভাই, আরো কয়েকজন একত্রে বসে প্ল্যান অব অ্যাকশান ঠিক করা হলো। সেইমত আলম আর শাহাদত ভাই এখন কাজ করছে। পাওয়ার স্টেশনের ভেতরের দুজন কর্মচারীকে, বিস্ফোরক কিভাবে নাড়াচাড়া করতে হয়, সে বিষয়ে কিছু ট্রেনিং দিয়ে তাদের সাহায্যে একটু একটু করে পি. কে. স্টেশনের ভেতরে পাচার করা হচ্ছে। সবসুদ্ধ ৮০/৯০ পাউন্ড পি. কে, লাগবে। একেকবারে ৮/১০ পাউন্ড পি, কে, রুটির মতো বেলে গাড়ির দরজার ভেতর দিকের হার্ডবোর্ড কভার খুলে তার মধ্যে সেঁটে, আবার কভার এঁটে পাওয়ার স্টেশনের ভেতরে নিয়ে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। এই কাজে সময় বেশি লাগছে। তাছাড়া এত পি. কে. ঢাকাতে মজুত নেই। ওগুলোও আনাতে হচ্ছে। সব পি. কে. স্টেশনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া শেষ হলে, তখন একটা তারিখ ঠিক করা হবে ভেতর থেকে ব্লাস্ট করানোর। এবং ঐ একই দিনে একই সময়ে আমরা বাইরে থেকে রকেটশেল মেরে খানসেনাদের ব্যতিব্যস্ত রাখব। এই প্ল্যান যদ্দিন কার্যকর না হয়, তদ্দিন আমরা অন্যসব অ্যাকশান চালিয়ে যাব।

রকেট লঞ্চার, এস.এল.আর, উইথ অ্যানাগালঞ্চার কি জিনিস বুঝলাম না। কিন্তু জিগ্যেস করতেও সাহস হল না। আমার চোখের পানি থামানোর জন্য রুমী গড়গড় করে এত কথা বলে গেল, যা সে কখনো করে না, তার ওপর আবার প্রশ্ন করে তার মুড নষ্ট করতে চাই না। পরে এক সময় জেনে নেব।

বাড়ি পৌঁছেই রুমী বলল, আম্মা, নাশতা রেডি কর। আমি শেভ, গোসল সেরে আসছি।

ধোপদুরস্ত কাপড় পরে নাশতা খেয়ে বলল, যাই, জুয়েলের খবর নিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি ফিরিস। আমিও জুয়েলের খবর জানবার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকব।

কোথায় তাড়াতাড়ি ফেরা! ফিরল একেবারে সন্ধ্যা পার করে। সঙ্গে বদি। রুমী টুকেই বলল, আম্মা, এই দুর্দান্ত সাহসী ছেলেটাকে ভালো করে খাইয়ে দাও তো। ওর

জন্যই আমরা সেদিন সবাই প্রাণে বেঁচে গেছি।

বদি বিব্রত মুখে রুমীকে মৃদু ধমক দিল, খালি বেশি বকে।

আমি জিগ্যেস করলাম, জুয়েলের খবর কি?

জুয়েল ভালো আছে। কাল সন্ধ্যায় কাজী আর বদি জুয়েলকে ডাঃ রশীদউদ্দিন আহমদের চেম্বারে নিয়ে গিয়েছিল। কাজীর এক বন্ধু আছে, কুটু, ওর বাবা শামসুল আলম ডাঃ রশীদের বন্ধু। ঐ আলম সাহেবের গাড়িতে করে ওরা যায়। তবে ডাঃ রশীদের চেম্বারে অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। তাই ডাঃ রশীদ জুয়েলকে ডাঃ মতিনের ক্লিনিকে নিয়ে যান। ওখানে অপারেশন থিয়েটার আছে। সেখানে গিয়ে ডাঃ রশীদ জুয়েলের আঙ্গুলে অপারেশন করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। কয়েকদিন পরে আবার দেখাতে নিয়ে যেতে বলেছেন।

বদিবলল, ডাঃমতিনের ক্লিনিক কোথায় জানেন? রাজারবাগ পুলিশ স্টেশনের ঠিক উল্টো দিকে। তাই ডাঃ রশীদ তার ডক্টর লেখা ভোকসওয়াগনে জুয়েলকে বসিয়ে নিয়ে গেছেন। উনার সাহস আছে বলতে হবে। কিন্তু জুয়েলকে দেখবার জন্য আমরা আর যাচ্ছি না ওইখানে।

রুমী বলল, এই এলিফ্যান্ট রোডেই আজিজ মামার পলি ক্লিনিক আছে, সেখানে নিয়ে গেলেই হবে।

২৪ আগস্ট, মঙ্গলবার ১৯৭১

দিনগুলো যেন কি একরকম নেশার ঘোরে কেটে যাচ্ছে। রুটিনটা অনেকটা এরকম: আমি সকালে উঠেই একগাদা রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিই, রুমী প্রায় প্রায়ই দুএকজন বন্ধু সঙ্গে নিয়ে আসে। কখনো খায়, কখনো খায় না; তবু খাবার সব সময় মজুত রাখি–যদি এসেই বলে খিদে লেগেছে, খেতে দাও। মাঝে মাঝে দুএকটা রাত বাসায় থাকে, তখন আমাদের মধ্যে আনন্দের ধুম পড়ে যায়। খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের বেডরুমে বড় বিছানায় সবাই গোল হয়ে বসে আড্ডা দিই, বেশির ভাগ সময় রুমীই বক্তা, আমরা প্রশ্নকর্তা।

আলম, বদি, স্বপন, কাজী, চুলু আরো দুএকবার বাসায় এসেছে, এখনো খেয়েছে, কখনো খায় নি। ওরা খেলে আমি খুশি হই, কারণ শুধু ঐ সময়টাতে খাবার টেবিলে ওদের পাই, মুক্তিযুদ্ধ, মেলাঘর, খালেদ মোশাররফ, হায়দার বিভিন্ন বিষয়ে দুচারটে কথা শুনতে পাই। খালেদ মোশাররফকে এতদিন বাঁকার ভাগনে মণি হিসেবেই চিনতাম, এখন মেলাঘরের এই গেরিলাদের মুখে শুনে শুনে তার একটা অন্য ভাবমূর্তি মনের মধ্যে গড়ে উঠেছে। যে হায়দারকে কোন দিন চোখে দেখি নি, সেও যেন একটা চেহারা নিয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। এস.এস.জি, অর্থাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল-সার্ভিস গ্রুপের অর্থাৎ কম্যান্ডো গ্রুপের ক্যাপ্টেন এ.টি.এম. হায়দার যে কি না পাকিস্তানের আটাকফোর্টে স্পেশাল কম্যান্ডো ট্রেনিংপ্রাপ্ত, যাকে বলা হত জেনারেল মিঠঠা খানের হাতে গড়া কম্যান্ডো সেই দুর্ধর্ষ হায়দার এই ছেলেগুলোকে কম্যান্ডো ট্রেনিং দিয়ে থাকে। এদের মুখে শুনে শুনে সেই হায়দারও যেন আমার অতি চেনা, অতি আপন হয়ে উঠেছে।

চেনা হয়ে উঠেছে ডঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাঃ এম এ মোবিন। এরা দুজনে ইংল্যান্ডে এফ.আর.সি.এস পড়ছিল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস. পাস করে বিলেতে চার বছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যখন এফ.আর.সি.এস. পরীক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিল, পাকিস্তানি নাগরিকত্ব বর্জন করল, ভারতীয় ট্রাভেল পারমিট যোগাড় করে দিল্লিগামী প্লেনে চড়ে বসল। উদ্দেশ্য ওখান থেকে কলকাতা হয়ে রণাঙ্গনে যাওয়া। প্লেনটা ছিল সিরিয়ান এয়ারলাইনস-এর। দামাস্কাসে পাঁচ ঘন্টা প্লেন লেট, সব যাত্রী নেমেছে। ওরা দুজন আর প্লেন থেকে নামে না। ভাগ্যিস নামে নি। এয়ারপোর্টে এক পাকিস্তানি কর্নেল উপস্থিত ছিল ঐ দুজন পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করার জন্য। প্লেনের মধ্যে থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না, কারণ প্লেন হলো ইন্টারন্যাশনাল জোন। দামাস্কাসে সিরিয়ান এয়ারপোর্ট কর্মকর্তা ওদের দুজনকে জানিয়েছিল–ওদের জন্যই প্লেন পাঁচ ঘন্টা লেট। এমনিভাবে ওরা বিপদের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত মে মাসের শেষাশেষি সেক্টর টু রণাঙ্গনে গিয়ে হাজির হয়েছে।

চেনা হয়ে উঠেছে ডাঃ নাজিমও। সে সদ্য এম.বি.বি.এস পাস করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ইন-সার্ভিস ট্রেনিংয়ে ছিল। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মুক্ত ছিল। তারপর পাকিস্তানিরা শহর দখল করলে, নাজিম কোনমতে পালিয়ে পায়ে হেঁটে, নৌকায়, ট্রাকে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তর পেরিয়ে, মে মাসের প্রথমদিকে বর্ডারের ওপারে গিয়ে দাঁড়ায়। খোঁজখবর করে আগরতলা হয়ে মতিনগরে যায়। সেখানে ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের লোকেরা তাকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় কেউ ঠিকমত রেফারেন্স দিতে না পারলে বি.এস.এফ-এর লোকেরা তাকে ধরত পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে। শাহাদতের ছোট ভাই ফতেহ চৌধুরীও প্রথম মতিনগরে গিয়ে বি.এস.এফ এর লোকের হাতে পড়েছিল। সে তার আগের চেনা পাড়ার ছেলে ডাঃ আখতার আহমদের নাম বলেছিল। তারপর আর কোন অসুবিধে হয় নি। ডাঃ নাজিমও আগরতলার এক পরিচিত লোকের নাম বলে পার পেয়েছিল। তারপর সোনামুড়ার হাসপাতালে কাজে লেগে যায় সে। সবচেয়ে নাটকীয় ব্যাপার হল–পাঁচ মে নাজিমও মতিনগরে গেল, আর তার পরপরই এগারো মে পাকিস্তানি সৈন্যরা বিবিরবাজার আক্রমণ করে দখল করে নিল। পূর্ব বাংলার বর্ডারের ঠিক ভেতরেই এই বি.ও.পি-টা এতদিন মুক্তিবাহিনীর দখলে ছিল। বিবিরবাজার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর বেশ কজন জখম হয়। শ্ৰীমন্তপুর বি.ও.পি. ভারতীয় বর্ডারের ঠিক ভেতরেই, প্রায় বিবিরবাজারের মুখোমুখি। পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত শেল শ্রীমন্তপুরেও এসে পড়ছিল। ডাঃ আখতার আহমদ তার এক বেডের ক্যাম্প হাসপাতালটি সরাতে ব্যস্ত ছিল। ওখানে রুগী রাখা মোটেও নিরাপদ ছিল না। তাই যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সোনামুড়ার ভারতীয় হাসপাতালে পাঠানো হতে থাকে। ঐ একই সময়ে খালেদ মোশাররফ ডাঃ নাজিমকে সোনামুড়ায় পাঠায়। সেখানে ফরেস্ট ডাকবাংলোটা দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। ডাঃ নাজিম ওইখানেই আহতদের চিকিৎসায় লেগে যায়। ইতোমধ্যে আখতারও এসে পড়ে শ্রীমন্তপুর থেকে।

ডালিয়া সালাহউদ্দিন ঢাকায় ডাক্তারি পড়ত, বাফার নাচের স্কুলের ছাত্রী ছিল। ভালো নাচে বলে বেশ নামও ছিল। সেই ডালিয়া আর তার হবু স্বামী শামসুদ্দিন এখন সেক্টর টুর হাসপাতালে। শামসুদ্দিনও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শেষ বর্ষের ছাত্র ছিল।

চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে তৈয়ব আলীর চেহারা। তাকে কখনো দেখি নি, কিন্তু রুমীর মুখে শুনে শুনে মনে হয় তৈয়ব আলী এসে দাড়ালেই আমি তাকে চিনতে পারব। ঢাকার উপকণ্ঠে মাদারটেকে বাড়ি তৈয়ব আলীর। লেখাপড়া করেছে ক্লাস সিক্স-সেভেন পর্যন্ত। আম কলা লিচু ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করত ক্র্যাকডাউনের আগে। কিন্তু বুকের ভেতরে ছিল দেশপ্রেম।মার্চের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।ক্র্যাকডাউনের পর চলে যায় দুনম্বর সেক্টরে। তৈয়ব আলীর সাহস আর উপস্থিত বুদ্ধি আশ্চর্য রকম। তার স্পষ্টবাদিতার কারণে মেলাঘরে সে খুব জনপ্রিয় ছিল না; কিন্তু এই গুণের জন্যই রুমী তাকে বিশেষ চোখে দেখত। ক্রমে সেও রুমীর খুব ভক্ত হয়ে ওঠে। ক্যাম্পের অন্য ছেলেদের কথা তৈয়ব আলী তেমন শুনত না। তাকে দিয়ে কোন কাজ করাতে হলে ছেলেরা রুমীকে গিয়ে ধরত। রুমী বললে তৈয়ব আলী বিনা প্রতিবাদে সব কাজ করে দিত। তৈয়ব আলী তার সাহস আর নিষ্ঠার জন্য খুব তাড়াতাড়িই সেক্টর টুতে সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

তৈয়ব আলী এখন পিরুলিয়া ক্যাম্পে রুমীদের দলের সঙ্গেই রয়েছে। সেখানে সে সকালে নাশতা বানিয়ে রুমীদেরকে খাওয়ায়। দুপুরে, রাতে রান্না করে রাখে, সারা দিনের পর রুমীরা ক্লান্ত হয়ে ফিরলে তাদের যত্ন করে খাইয়ে শুইয়ে দেয়।

রুমীর বন্ধুরা খেতে এলে সাধারণত মেলাঘরের কথাই জিগ্যেস করি। আজ সাহস করে ঢাকার কথা জিগ্যেস করে ফেললাম। অবশ্য ঘুরিয়ে। কদিন আগে গ্রীন রোডে এক দুঃসাহসিক অ্যাকশান হয়ে গেছে। কয়েকজন বিচ্ছু মিলিটারি ট্রাকে বোমা ছুঁড়েছে, গুলি করেছে। নানা লোকের মুখে যে আশ্চর্যজনক ঘটনাটা শুনতে পেয়েছি, তাহল–ট্রাকের পাকিস্তানি সৈন্যগুলো বিচ্ছুদের প্রতিআক্রমণ করার কোন চেষ্টা না করে পালিয়ে যায়। সেই কথার সূত্র ধরে বললাম, সত্যি সাহস বটে বিন্দুগুলোর আর আওয়াজ যা হয়েছিল না, সারা পাড়া কেপে উঠেছিল। আমার মা ধানমন্ডি ছয় নম্বর রোডে থাকেন। তিনিও আওয়াজ পেয়েছিলেন। সত্যি বলতে কি, আমরা আজকাল দিনরাতের প্রায় সব সময়ই এত ধরনের আওয়াজ শুনি যে, ভেবেই পাই না তোমরা কি করে এত আওয়াজ কর। তবে মজা কি জাননা, আজকাল ঐসব আওয়াজ না শুনলে আমাদের ঘুমই হয় না।

আলম ছেলেটি কথা কম বলে (হয়তোবা আমার সামনে!), সে বেশ ধীরে-সুস্থে গম্ভীর গলায় আস্তে করে বলল, আপনাদের ঘুমানোর জন্য আওয়াজটা খুবই দরকার বলে মনে করছেন। কিন্তু ঢাকার মানুষের ঘুম পাড়ানোর ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য আমাদের মোটেও নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হল, খানসেনাদের দিনের আরাম, রাতের ঘুম হারাম করা, এদেরকে সব সময় মুকুতের ভূত দেখানো। খালেদ মোশাররফ এগুলোকেই সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বলেন।

আমি আড়চোখে রুমীর দিকে তাকালাম, সে ওদিকে মুখ ফিরিয়ে চুলুর সঙ্গে কি যেন বলছে। আমি গলা নামিয়ে আলমকে প্রশ্ন করে ফেললাম, বল না, তোমরা কিভাবে এগুলো কর।

আলম বলল, এগুলো ছোট ছোট অ্যাকশান। এর কোনো ধারাবাহিকতা বা পূর্ব নির্ধারিত প্ল্যান থাকে না। এটা যে যার সুবিধেমত চলতে ফিরতে করে যাচ্ছে। নানা রকম জিনিস দিয়ে এগুলো করা হয়ে থাকে, তবে এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী যে জিনিসটা, তা হচ্ছে এ্যান্টি পার্সোনাল মাইন। এগুলো খুব ছোট্ট সাইজের বিস্ফোরক, প্যান্টের পকেটে বা গাড়ির গ্লাভ-কম্পার্টমেন্টে সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়।

কথা বলতে বলতে আলম দেয়ালের পাশে কাপ-ডিস রাখার ছোট আলমারির দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, ওটা কিসের কৌটো?

তাকিয়ে দেখলাম, খাটো আলমারিটার মাথায় গ্লাস, ওষুধের শিশি-বোতলের সঙ্গে একটা ছোট কৌটো। বললাম, ওটা ওরিয়েন্টাল বাম বলে একটা মলমের কৌটো! কপালে লাগালে মাথা ধরা ছেড়ে যায়।

আলম হেসে বলল, ঐরকম ছোট টিনের কৌটোর চেয়ে একটু বড় দেখতে এই মিনি মাইনগুলো। বলতে পারেন ডবল ওরিয়েন্টাল বাম। এগুলো বিচ্ছুরা সুযোগ সুবিধেমত গাড়ির চাকার নিচে বসিয়ে দেয়। যে রাস্তা দিয়ে মিলিটারির কনভয় যাবে, আগে থেকে জানতে পারলে সেই রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে আসে। জীপ বা ট্রাকের চাকা মাইনের ওপর পড়লেই বিকট আওয়াজে চাকা ফাটে। বেশির ভাগ সময়ই গাড়ি উল্টে যা।

জামী হেসে বলল, ঐ ওরিয়েন্টাল বামে খানসেনাদের মাথাধরা ছাড়ে না, আরো বেড়ে যায়।

২৫ আগস্ট, বুধবার ১৯৭১

রুমী বলল, আম্মা, আমাকে একটু ২৮ নম্বর রোডে নামিয়ে দেবে?

সাড়ে ছটা প্রায় বাজে। পশ্চিম আকাশে সূর্য লালচে হয়ে এসেছে। যেতে যেতে জিগ্যেস করলাম, কখন ফিরবি? নিতে আসব? রীম অন্যমনস্কভাবে বলল, কখন ফিরব? কি জানি। ঠিক বলতে পারছি না। তা, আধঘন্টা পরে এসো না হয় একবার।

রুমীকে একটু যেন কেমন কেমন লাগছে। গতকাল দুপুরে খাওয়ার পর চলে গিয়ে আজই বিকেল পাঁচটার দিকে বাড়ি ফিরেছে। কি এক চাপা উত্তেজনায় ও চনমন করছে। মুখচোখ লালচে। ভেতরে ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে, সেটা চাপতে ওর কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে কিছু জিগ্যেস করতে সাহস হলো না।

ধানমন্ডির ২৮ নম্বর রোডের যে বাড়িটায় ওদের আস্তানা সেটার মালিক দিলারা হাশেম। সে তার স্বামী-সন্তান নিয়ে করাচিতে থাকে। বাড়িটা ভাড়া দিয়েছে রাইকার ল্যাবরেটরিজকে। চুল্লু অর্থাৎ মাসুদ সাদেক ঐ কোম্পানির ফিল্ড ম্যানেজার। বাড়িটা রাইকার ল্যাবরেটরিজ-এর অফিস, তাই অফিস বন্ধের পর দারোয়ান আর নাইটগার্ড ছাড়া আর কেউ ও বাড়িতে থাকে না।

রুমীকে নামিয়ে দিয়ে তক্ষুণি বাড়ি ফিরলাম না। আধঘন্টা পরে তাকে নিয়ে আসতে বলেছে। তাহলে ধরে নেওয়া যায় সে রাতে বাড়িতেই থাকবে। সুতরাং কিছু স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা করা যায় আজ। রুমী খেতে ভালোবাসে। ঢাকা ক্লাবে চলে গেলাম। স্মােকড় হিলশা আর টিকেন ক্র্যাম্ব চপ কয়েক প্লেট নিলাম। নিতে নিতে আধঘন্টা কেটে গেল। সুতরাং আবার চলে গেলাম ২৮ নম্বর রোডের বাড়িটায়। গেটের কাছে পৌঁছতেই দেখি একটা ফিয়াট ৬০০ বেরোচ্ছে। আমাকে দেখে গাড়িটা আমার ডানপাশে থামল। চালক হ্যারিস, রুমীর বন্ধু। ওকে দেখে আমিও থামলাম; কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ না করেই জিগ্যেস করলাম, রুমী আছে ভেতরে? হ্যারিসও গাড়ির ভেতর থেকেই বলল, না চাচী, রুমী তো এই পাঁচ মিনিট আগে বেরিয়ে গেল। আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, ও, আচ্ছা, বেস্ট অব লাক।

বাড়ি ফিরে এলাম। এখন সমস্ত ব্যাপারটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল। রুমী বাডিফিরবে কি ফিরবে না, খাবে কি খাবে না, কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবু খাবারগুলো গুছিয়ে রেখে ভাবলাম, ফ্রিজে কিমা রান্না করা আছে, কয়েকটা মোগলাই পরটা বানাই। রুমীর ভীষণ প্রিয়। আজ না আসে, কাল খাবে।

আধঘন্টাও কাটে নি, দরজায় ঘন ঘন বেল। বেল টিপে আর যেন ছাড়েই না; শরীফ, জামী ওপরে বাবার কাছে। আমিই রান্নাঘর থেকে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢকুল রুমী, কাজী আর অচেনা একটি অল্প বয়সী ছেলে। আমি অবাক। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে। তিনজনেরই মুখ লাল। ঠোট টিপে শান্ত হয়ে রয়েছে, কিন্তু আমার মনে হল ওদের ভেতরে চাপা উল্লাস আর হাসি ফুলে ফুলে উঠছে। রুমী ঢুকেই দরজা বন্ধ করে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে বলল, আম্মা, ওপরে চল, কথা আছে।

দোতলায় রুমীর ঘরে এসে সবাই ঢুকলাম। হলে বসা শরীফ আর জামী আমার হাতের ইশারায় পিছুপিছু এল। রুমী চাপা আনন্দ আর উত্তেজনায় ফিসফিস করে বলল, আম্মা, আব্ব, আমরা একটা অ্যাকশান করে এলাম এই মাত্র। সাত-আটটা খানসেনা মেরে এসেছি।

আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল, বলিস কিরে?

আনন্দ-ডগমগ গলায় কাজী বলল, হ্যাঁ চাচী, ১৮ নম্বর রোডে। ওখানে একটা বাড়ির সামনে আমরা সবাই গাড়ি থেকে গুলি করে খানসেনা মেরে পাঁচ নম্বর রোড দিয়ে আসছিলাম। মিলিটারি জীপ পিছু নিয়েছিল। রুমী তাই দেখে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে গুলি চালায়। ওর দুই পাশ থেকে স্বপন, বদিও গুলি করে। জীপ উল্টে সবগুলো মরেছে।

রুমী বলল, আম্মা দেখ, আমার ঘাড়ে কাঁধে স্টেন থেকে আগুনের ফুলকি ছুটে কি রকম ফোসকা পড়ে গেছে। রাস্তায় মিলিটারি ধরলে এইটার জন্যই ফেঁসে যাব।

রুমীর সার্টের কলার সরিয়ে দেখলাম ঘাড়ে-গলায়-কাধে অনেকগুলো কালো। কালো ছোট ছোট ফোসকা। সার্টও ফুটো ফুটো হয়ে গেছে। জিগ্যেস করলাম কি করে হল?

রুমী বলল, স্টেনগান ফায়ার করার সময় তার গা দিয়ে আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোয়। আমার ঘাড়ের দুপাশ থেকে বদি ভাই, স্বপন ভাই ফায়ার করেছে তো, তাই আগুনের ফুলকিগুলো আমার গায়েই পড়েছে। তারপর হাসতে হাসতে বলল, উঃ। কানে এমন তালা লেগে গেছে, কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

ডেটল-তুলো দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করতে করতে বললাম, এত অল্প সময়ের মধ্যে কি কাণ্ড? কি করে করলি?

বলব পরে। পাশের গলিতে এক বাড়িতে অস্ত্র রেখে এসেছি। এক্ষুণি নিয়ে আসতে হবে। তোমাকে যেতে হবে গাড়ি নিয়ে। মহিলা ড্রাইভার দেখলে ওরা গাড়ি থামাবে না–আশা করা যায়। আমি যাব তোমার সঙ্গে। কাজী ভাই, সেলিম, তোমরা ছাদের ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক। আমরা অস্ত্র নিয়ে আসছি। আম্মা, দুটো ছালা নিয়ে নাও। আব্ব, আমরা যাবার পর পোর্চের বাতি নিভিয়ে রেখ। যদি মেহমান আসে, তাহলে জ্বালিয়ে রেখ। পোর্চে বাতি দেখলে আমরা ঢকুব না।

নিচে নেমে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বারেককে বললাম, ভাত আর ডাল চড়াও।স্টোর থেকে দুটো বস্তা বের করে নিলাম।

গাড়ি ব্যাক করে রাস্তায় নামলাম। রুমী পেছনে বসল। পাশের গলিটা একেবারে পাশেই। মেইন রোডে উঠে দুটো বাড়ির পরেই। গলিতে ঢোকার মুখে রুমী চাপা স্বরে বলল, একদম গলির শেষ মাথায় চলে যাও। বলাবাহুল্য, এ গলিটাও কানা, আমাদের গলির মতই।

আমিও ফিসফিসিয়ে বললাম, শেষ মাথার বাড়িটা হাই সাহেবের যে! ওই বাড়িতে?

না। ঢুকে দুটো বাড়ির পরে, ডান-হাতি। কিন্তু গাড়িটা শেষ মাথায় নিয়ে আগে দেখব কেউ ফলো করছে কি না।

গলির শেষ বাড়িটা ইঞ্জিনিয়ার হাই সাহেবের। ডান-হাতি। গেট খোলা ছিল। গাড়ি ভেতরে ঢোকালাম। হাই সাহেব দোতলায় থাকেন। একতলাটা ভাড়া পোর্চ বেশি বড় নয়। গাড়ি ঢুকিয়ে বের করতে হলে ব্যাক করে রাস্তায় নামতে হয়। আমরা গাড়ি থেকে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে নামলাম। একতলার সামনের দিকের ঘরের জানালার পর্দা। বাতাসে উড়ছে। ভেতরে উজ্জ্বল আলো। খাটে বসে চারজন লোক তাস খেলছে। পাশে চেয়ারে তিন চারজন মহিলা, পুরুষ কথা বলছে। সবাই খেলা আর আড্ডা নিয়ে এমনিই মগ্ন যে মাত্র চার ফুট দূরে বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল, কেউ একবার চোখ তুলেও তাকাল না। আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেটের মুখে দাঁড়ালাম। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। রুমী বলল, তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি হেঁটে গিয়ে দেখে আসি ও বাসায় বাইরের লোক কেউ আছে কি না।

আমি বৃষ্টির ফোঁটা এড়াবার জন্য একতলার ঐ জানালাটার পাশেই দেয়াল ঘেঁষে একবার দাঁড়াই, আবার অস্থির হয়ে গেটের কাছে যাই। বাতাসে জানালার পর্দা উড়ছে, ভেতরে উজ্জ্বল আলোয় বসে সাত-আটটি নরনারী তাস খেলছে, কলকন্ঠে কথা বলছে, তুমুল হাসিতে ভেঙে পড়ছে, ভয় হচ্ছে এই বুঝি কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে কে, কে? বলে চেঁচিয়ে ওঠে, কিন্তু কেউ একবারও ভুলেও জানালার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার খুব স্বস্তি লাগছে, আবার আশ্চর্যও লাগছে। এমন দিনকাল, একতলার জানালার বাইরেই গাড়ি থামছে, লোকনামছে, কেউ কেউ আবার সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরাও। করছে, তারা একবার খেয়ালও করবে না? মনে হচ্ছে আমি অনন্তকাল ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি, লোকগুলোও অনন্তকাল ধরে ঐ রকম হাসি-গল্প-আড্ডা-খেলায় মেতে রয়েছে। যেন কার অভিশাপে ওরা বিশ্বসংসার ভুলে ওইরকম কলবল করছে।

রুমী ফিরে এসে চুপি চুপি বলল, চল। আস্তে চালাবে।

গাড়ি ব্যাক করে আবার গলিতে। নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে এসে রুমী থামতে বলল। এবার বাঁয়ে গাড়িটা। আমি গেট ঘেঁষে গলিতেই গাড়ি পার্ক করে গাড়িতে বসে রইলাম। রুমী বস্তা দুটো নিয়ে ভেতরে চলে গেল। তার ফিরে আসার সাড়া পেতেই আমি গাড়ি থেকে নেমে পেছনের বুটি খুলে দিলাম।

এ গলি থেকে পাশের গলি–কতটা পথ পোয়া মাইল? তাও হবে কি না সন্দেহ। কিন্তু বুকে এমন ধুকপুকুনি, হাতে-পায়ে এমন গিট-ছাড়া ভাব, মনে হচ্ছে পঞ্চাশ মাইল চালিয়ে এসেছি।

পোর্চের বাতি নেভাননা। শরীফ, জামী বুঝিবা দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়েছিল। গাড়ি থামতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল। রুমী বুটি খুলল। সঙ্গে সঙ্গে গেট দিয়েও কে যেন ঢুকল। আমরা আঁতকে উঠলাম। কিন্তু না, বাইরের কেউ নয়, মাসুম। শরীফ, জামী টুক করে বস্তা দুটো তুলে ঘরে ঢুকে গেল।

সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ছাদের ঘরে। এতক্ষণে আমার হাতে-পায়ে জোর ফিরে এসেছে, ধুকপুকুনির বদলে বুকে এখন উত্তেজনার জোয়ার। বললাম, বের কর তো, দেখি তোদের কি রকম অস্ত্র।রুমী, কাজী বস্তা খুলে সাবধানে অস্ত্র বের করে জাজিমের ওপর রাখল। পাঁচটা স্টেনগান, একটা পিস্তল, দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড। জীবনে এই প্রথম দেখলাম। আমি, শরীফ, জামী, মাসুম–চারজনে হুমড়ি খেয়ে বসে অস্ত্রগুলো হাতে তুলে উল্টেপাল্টে দেখলাম, সেগুলোর গায়ে হাত বুলোলাম, হ্যান্ড গ্রেনেড দুটোও একটু ছুঁয়ে দেখলাম। রুমীরা এগুলোকে বলে পাইন অ্যাপল আনারস। যতই আনারস বলুক, এগুলো মোটেই আনারসের মতো নিরীহ নয়।

আমি আবার বলতে যাচ্ছিলাম, বল দেখি কি করে কি করলি কিন্তু শরীফ থামিয়ে দিয়ে বলল, ওসব পরে শুনব। এগুলো কোথায় লুকিয়ে রাখব, তাই ঠিক কর আগে।

অনেক চিন্তাভাবনা করে ঠিক হলো, নিচের উঠোনে পানির যে বিরাট হাউজটা আছে, সেটার ভেতরে একটা টুল বসিয়ে তার ওপর অস্ত্র রাখা হবে। হাউজটা চওড়ায় আট ফুট, লম্বায় দশ ফুট, উঁচুতে তিন ফুট। তার এ মাথার এক কোণে লোহার তৈরি গোল একটা ম্যানহোল, এইটে দিয়ে হাউজটার ভেতরে নামা যায়। হাউজটা এখন কানায় কানায় ভর্তি। আমাদের প্যান্ট্রিতে কয়েকটা টুল আছে, সেগুলো সোয়া দুফুট উঁচু। হাউজের নিচের ট্যাপটা খুলে দেওয়া হল খানিকটা পানি বেরিয়ে যাবার জন্য। একটা টুল ভেতরে বসালো যেন তার বসার জায়গাটা পানির ওপর জেগে থাকে। বারেককে কিছু একটা কিনতে রশীদের দোকানে পাঠানো হল। জামী হাউজের ভেতরে নেমে টুলটা দূরতম কোণে নিয়ে বসাল। অস্ত্রগুলো ছালা দুটোতে ভরে ভালো করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঐ টুলের ওপর রাখা হল। যদি রাতে মিলিটারি আসেও, এই পানিভর্তি হাউজের ঢাকনা খুলে তাকায়ও, তাহলে টলটলে পানি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাবে না। কারণ এখান থেকে উঁকি দিয়েও ওই কোণার টুল দেখা যায় না। টুল আবিষ্কার করতে হলে কাউকে হাউজের ভেতর নামতে হবে।

একটু পরে কাজী আর সেলিম চলে গেল। সেলিম ছেলেটিকে এই প্রথম দেখলাম। শুনলাম, ও শাহীন স্কুলের ছাত্র এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার কথা ছিল। এপ্রিলেই মেলাঘরে চলে গিয়েছিল।

খাওয়া-দাওয়ার পর রুমীকে ঘিরে আমরা চারজনে বসলাম। ওদের এই চমকপ্রদ অ্যাকশানের কথা শুনবার জন্য আর তর সইছিল না। রুমী যা বলল, তা হলো এই :

ধানমন্ডির বিশনম্বর রাস্তার একটা বাড়িতে চাইনিজ এমব্যাসির কোন বড় কর্তা বাস করে। সে বাড়ির সামনে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি মিলিটারি পুলিশ পাহারা দেয়। আঠার নম্বর রোডের একটা বাড়ির সামনেও বেশ সাত-আটজন মিলিটারি পুলিশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনুমান হয়, ও বাড়িতে কোন ব্রিগেডিয়ার থাকে। কয়েকদিন থেকেই বদি, আলমের মাথায় চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। গতকাল হঠাৎবদি, আলম, শাহাদত এরা মিলে প্ল্যান অব অ্যাকশান ঠিক করে ফেলে। ২৫ আগস্ট সন্ধ্যা রাতে কয়েকটা অ্যাকশান হবে–বদি, আলম, কাজী, রুমীরা একটা গাড়িতে, হ্যারিস, মুক্তার, জিয়ারা আরেকটা গাড়িতে। পাঁচ মাস আগে এই ২৫ তারিখের রাতেই বিবেকহীন বর্বর হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বিচ্ছুরা উপলব্ধি করে এই তারিখে এমন কিছু করা দরকার, যাতে সামরিক জান্তা ভালোমত নাড়া খায়।

রুমীরা পিরুলিয়া গ্রামে ওদের ক্যাম্প থেকে দরকারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসে আজকেই দুপুরে। হ্যারিস আর জাহির গুলশান লেকের ঘাট থেকে রুমীদেরকে দুটো গাড়িতে তুলে ২৮ নম্বর রোডের বাড়িতে নিয়ে যায়। তারপর বদি, আলম একদিকে, হ্যারিস, মুক্তার অন্যদিকে এই দুদল দুদিকে বেরিয়ে যায় দুটো গাড়ি হাইজ্যাক করতে। বদি, আলম, ধানমন্ডি চার নম্বর রোড থেকে একটা মাজদা গাড়ি হাইজ্যাক করে। গাড়িটা ছিল আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের বড় ছেলে মাহবুব আনামের। হ্যারিসরা একটা ফিয়াট ৬০০ হাইজ্যাক করে ধানমন্ডি ২২ নম্বর রোডের মোড় থেকে।

ঠিক হয় : আলম, বদি, কাজী, রুমী, স্বপন ও সেলিম প্রথমে ধানমন্ডিতে অ্যাকশান। করবে। হ্যারিস, জিয়া, মুক্তার, আনু ও আরো দুটো ছেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করবে। আমরা গিয়ে ওদের সঙ্গে জয়েন করবে। তারপর দুগাড়ি মিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের গেটে এবং তারপর শহরের অন্যান্য দিকে সুযোগ-সুবিধেমত আরো কিছু অ্যাকশন করবে।

রুমীটা যখন বেরোয়, শাহাদত জিগ্যেস করে, হোয়াট আর ইয়োর টার্গেটস? কোন দিকে যাচ্ছ? আলম জবাব দেয়, ডেস্টিনেশান–আননোন। টার্গেট মোবাইল।

রুমীরা সন্ধ্যা ৭-২৫ মিনিটে ২৮ নম্বর রোড থেকে বেরিয়ে ৩২ নম্বর দিয়ে পুল পেরিয়ে ডাইনে ও বাঁয়ে ঘুরে ২০ নম্বর রোডে পড়ে। গাড়ি চালাচ্ছিল আলম, তার বা পাশের প্রথমে সেলিম ও তারপরে কাজী। পেছনের সিটে মাঝখানে রুমী, তার ডান পাশে (অর্থাৎ আলমের ঠিক পেছনে) স্বপন, বাঁ পাশে বদি। চাইনিজ ডিপ্লোম্যাটের বাসার সামনে গিয়ে দেখে পুলিশগুলো নেই। ওরা হতাশ হয়। আলম বলে তাহলে ১৮ নম্বরে যাই। ১৮ নম্বর রোডে নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে গিয়ে দেখে সাত-আটজন মিলিটারি পুলিশ বেশ মৌজ করে গল্প করছে, সিগারেট খাচ্ছে।

আলম বলল, ব্রিগেডিয়ার সাহেব বাড়ি নেই নিশ্চয়, তাই খুব হেলে-বেঁকে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে। অলরাইট বয়েজ, ইউ হ্যাভ থ্রিমিনিটস। আমি সামনের সাত মসজিদের মোড় থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসছি।

এখন বাড়িটা ডান হাতে রয়েছে। গাড়ি ঘুরিয়ে আনলে বাড়িটা বাঁয়ে পড়বে। তাহলে গাড়ির বাঁদিকে বসা কাজী ও বদি সামনের-পেছনের দুই জানালা দিয়ে ফায়ার করতে পারবে। গাড়ি ঘুরিয়ে আনতে আনতে আলম নির্দেশ দিল কাজী, সেলিম আর বদি গুলি করবে, রুমী ও স্বপন নজর রাখবে, ও তরফ থেকে কেউ অস্ত্র তোলে কি না, তুললে তাদের শেষ করার ভার রুমী আর স্বপনের।

গাড়ি ধীরগতিতে বাড়িটার সামনে দিয়ে যাবার সময় আলমের চাপা গলার কম্যান্ড শোনা গেল : ফায়ার। অমনি গাড়ির দুই জানলা দিয়ে ঝলকে ঝলকে ছুটে গেল স্টেনগানের গুলি। দুটো স্টেন থেকে দুই লেভেলে গুলি গেল–বদির স্টেন থেকে ওদের পেটের লেভেলে, কাজীর স্টেন থেকে ওদের বুকের লেভেলে। সেলিমও কাজীর সামনে দিয়ে বাঁয়ে ঝুঁকে গুলি করল। পুলিশগুলো গল্পের মৌজে ছিল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপাধপ পড়ে গেল সাত-আটটা তাগড়া শরীর। সমস্ত ব্যাপারটা ঘটতে সময় লাগল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তার পরই গাড়িটা হঠাৎ যেন জেটের গতিতে গিয়ে ঢুকল ২০ নম্বরে, তাদের আগের টার্গেটে। কিন্তু ওদের কপাল মন্দ। চীনা ডিপ্লোম্যাটের বাসার সামনে এখনো কোন প্রহরী নেই। কি হতে পারে? কিন্তু আলমদের দেরি করার উপায় নেই। অ্যাকশনটা মনোমত হল না। কিন্তু কি করা?

এরপর আলম ধানমন্ডির ভেতরের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে এসে সাত নম্বর রোডের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে মিরপুর রোডে পড়ে। ডাইনে মোড় নেয় নিউ মার্কেটের দিকে মুখ করে। পাঁচ নম্বর রোডের মুখ বরাবর আসতেই ওরা দেখে কি –সামনে লাইন ধরে গাড়ি দাড়িয়ে গেছে। তার মানে ওখানে মিলিটারি চেকপোস্ট বসে গেছে, গাড়ি চেক হচ্ছে। তার মানে, ১৮ নম্বর রোডের বাড়ির সামনে এম.পি. মারার খবর এর মধ্যেই ওরা জেনে গেছে।

মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল আলম। সামনের রাস্তায় ব্যারিকেড। দুটোট্রাকমিরপুর রোড় জুড়ে এদিকপানে মুখ করে দাড়িয়ে আছে। একটা জীপ রাস্তার ডানদিকে, সেটার মুখও এদিকেই ফেরানো। আরেকটা জীপ, রাস্তার বাপাশে পেট্রল পাম্পটার সামনে নিউ মার্কেটের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো। এবং মাটিতে, রাস্তার ওপর দুজন শুয়ে–এল.এম.জি. নিয়ে।

আলম যেমন ভেবে রেখেছিল, দুজন এম.পি, হাত উঠিয়ে চেঁচিয়ে গাড়ি থামাতে বলতেই সে হেডলাইট অফ করে ডানদিকে টার্ন নেবার ইনডিকেটার দিয়ে সামান্য ডানদিকে ঘুরবার ভাব দেখাল। এম.পি. দুটো চেঁচিয়ে একটা গাল দিয়ে বলে উঠল, কিধার যাতা হ্যায়? সঙ্গে সঙ্গে আলম তীব্রগতিতে বাঁয়ে টার্ন নিল। বদি আর রুমী এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, ও-ই এলেমজি নিয়ে শুয়ে আছে মাটিতে। ফায়ার!আলমও চেঁচিয়ে উঠল, ফায়ার! ঠাঠা ঠাঠা করে স্বপন ও বদির স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলি ছুটে গেল। রুমী স্টেন হাতে সিটের ওপর হাঁটু চেপে উল্টো হয়ে বসে পেছনের কাচের ভেতর দিয়ে এদিক-ওদিক দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে দেখতে থাকল–ওদিক থেকে কারো হাতের অস্ত্র উদ্যত হচ্ছে কিনা। আশ্চর্যের ব্যাপার ওদিক থেকে একটাও গুলি ছুটে এল না। তার মানে মাটিতে শোয়া আর্মি দুজন খতম, অন্যরা ঘটনার দ্রুততা ও আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেছে। এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আলম গাড়ি পাঁচ নম্বর রোডে ঢুকিয়ে ফেলেছে। রোডটা অল্প একটুখানি গিয়েই গ্রীন রোডে পড়েছে। প্রায় গ্রীন রোডে গাড়ি পৌঁছে গেছে, এমনি সময় হঠাৎ রুমীর চোখে পড়ে একটা মিলিটারি জীপ তাদের পিছু নিয়েছে। সে সেই তখন থেকেই পেছনের সিটে উল্টো বসে কাচের ভেতর দিয়ে রাস্তার দিকে চেয়েছিল। সে চেঁচিয়ে ওঠে, লুক, লুক, আ জীপ ইজ ফলোয়িং আস। এবং সঙ্গে সঙ্গে তার স্টেনের বাট দিয়ে আঘাত করে পেছনের কাচ ভেঙে ফায়ার শুরু করে জীপটার ওপর। একই সঙ্গে রুমীর দুই পাশ থেকে বদি এবং স্বপনও ফায়ার শুরু করে। ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে। কজন মরল তার হিসেব না পেলেও জীপের ড্রাইভার যে প্রথম চোটেই মরেছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেলব্রাশ ফায়ারের সঙ্গে সঙ্গেই জীপটা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোড়ের ল্যাম্পপোস্টে গিয়ে ধাক্কা খেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে উল্টে গেল। সেই মুহূর্তে আলম আরেকটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। বাদিকে টার্ন নেবার ইনডিকেটার লাইট জ্বালিয়ে বাঁয়ে গ্রীন রোডের দিকে একটু ঘুরেই শাঁ করে তীব্রগতিতে ডাইনে ঘুরে আবার নিউ মার্কেটমুখো হলো। এবং ঝড়ের গতিতে সেই পেট্রল পাম্পটার অন্য পাশ দিয়ে নিউ এলিফ্যান্ট রোডের দিকে গাড়ি ছোটাল। আলম ছাড়া বাদ বাকি সবাই পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল, যেমনটি আলম ভেবেছিল-ট্রাক দুটো, বাকি জীপটা গ্রীন। রোডের দিকে উধ্বশ্বাসে ছুটছে বিচ্ছু গাড়িটাকে ধরবার জন্য!

এতক্ষণে গাড়ির ভেতরের সবাই স্বস্তির প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়ল। নিউ এলিফ্যান্ট রোডে ঢুকে তবে আলম আবার হেড লাইট জ্বালল।

এবার ওরা চিন্তা করতে লাগল অস্ত্রগুলো কোথায় রাখা যায়। গাড়িটা তাড়াতাড়ি ডাম্প করা দরকার।ঝিরঝির করে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। আমাদের গলির পরের গলিতে আলমদের পরিচিত ঐ ভদ্রলোকের বাড়িতে অস্ত্র রেখে রুমী, কাজী, সেলিমকে মেইন রোডে নামিয়ে আলম, বদি আর স্বপন গাড়ি নিয়ে চলে গেছে সুযোগমতো কোথাও গাড়িটা ফেলে রেখে বাড়ি চলে যাবে।

২৭ আগস্ট, শুক্রবার ১৯৭১

খাওয়ার টেবিল ঘিরে সবাই বসেছে–বদি, আলম, কাজী, স্বপন, চুলু, রুমী, জামী, মাসুম। শুধু শরীফ নেই, তার আজ ডি.সি.জি, আর-এ লাঞ্চের দাওয়াত। টেবিলের ওপর সাজানো পোলাও, কাবাব, চপ, রোস্ট, কোর্মা, পটল-ভাজি, সালাদ। রুমীর আবদারে আজ এই ভোজের আয়োজন। সবাই খেতে খেতে গত পরশুর কথাই আলোচনা করছে। গাড়িটা আলমরা ভূতের গলিতে একটা বাড়ির সামনের ভোলা লনে পার্ক করে রেখে এসেছে। বৃষ্টি পড়ছিল বলে রাস্তায় লোক ছিল না, ফলে ওদের কেউ দেখে নি। রিকশাও ছিল না, বৃষ্টির মধ্যেই বেশ খানিকটা হেঁটে হাতিরপুল বাজার পর্যন্ত এসে তারপর রিকশা পায়।

কানে এল আলম রুমীকে বলছে, উঃ! খুব সময়ে তুই কাচ ভেঙে গুলি করেছিলি, নইলে কেউই বাঁচতাম না আমরা।

রুমীও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, আর তুইও অমন চালাকি করে গ্রীন রোডের সিগনাল দিয়ে এলিফ্যান্ট রোডে না ছুটলে ওদের হাতে ঠিক ধরা পড়ে যেতাম। থ্যাংকস ফর টেকিং দ্য রাইট ডিসিশান অ্যাট দ্য রাইট মোমেন্ট।

বদি হাসতে হাসতে বলল, চাচী, এই দুর্দান্ত সাহসী ছেলে দুটোকে খুব ভালো করে খাইয়ে দ্যান তো। ওদের জন্যই আজ আমরা জানে বেঁচে পালিয়ে আসতে পেরেছি।

আমি বললাম, সাহসী তোমরা সবাই। তোমাদের রিফ্লেক্স নিখুঁত। অপূর্ব তোমাদের টিমওয়ার্ক। তোমরা সবাই দুর্দান্ত।

কাজী আফসোস করে বলল, জুয়েলটার বড় মন খারাপ। সে আমাদের আজকের অ্যাকশনে থাকতে পারল না। আগে কতগুলো অ্যাকশনে সে ছিল। চল আলম, আজ ওরে দেখতে যাই।

জুয়েল আছে আলমদের বাড়িতে, ওর বোনেদের হেফাজতে।

খাওয়া শেষ হলেও গল্প শেষ হতে চায় না। দেয়ালে ঝোলানো কোকিল ঘড়ির কোকিলটা তার ছোট্ট ঘরের দরজা খুলে মুখ বের করে চারবার কুকুটুকু করে ডাকল।

বাইরে পোর্চে গাড়ি থামার শব্দ পাওয়া গেল। গাড়ির দরজা খোলার শব্দের সঙ্গে তিন-চারজনের গলার স্বর। ওরা সবাই চকিত হয়ে একই সঙ্গে কথা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল এবং পায়ের আগার ওপর ভর দিয়ে নিঃশব্দে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।

জামী গিয়ে দরজা খুলল। আমিও পিছুপিছু গেলাম বসার ঘরে। শরীফের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন দাদাভাই, মোর্তুজা, ফকির। ঢুকেই মোর্তুজা চোখ বড় বড় করে বলে উঠলেন, শুনেছেন ভাবী কি কাণ্ড? পরশু সন্ধ্যা রাতে ১৮ নম্বর রোডে বিচ্ছুরা এক সাংঘাতিক অ্যাকশন করেছে। এক ব্রিগেডিয়ারের বাড়ির সামনে আট-দশটা এম.পি.কে মেরে দিয়ে চলে গেছে। তারপর পাঁচ নম্বর রোডের মোড়ে আরেক সাংঘাতিক কাণ্ড। ঐ রাতেই আরেকদল বিছু একটা জীপে গুলি মেরে একেবারে উল্টে দিয়েছে। জীপে যারা ছিল, সবাই মারা গেছে।

আমাকেও চোখ বড় বড় করতে হল, বলেন কি? এই রকম বেপরোয়া কাণ্ড কারখানা? ওদের সাহস আছে বলতে হয়! কি করে যে করে। কারাই বা করে? কোথায় থাকে বিচ্ছগুলো? ধরা পড়েছে নাকি কেউ?

না ভাবী, কাউকেই ধরতে পারা যায় নি। ওরা কি মানুষ, না জীন? চোখের সামনে দিয়ে নাকি উধাও? সারা শহরে একেবারে হুলস্থুল পড়ে গেছে।

ফকির খুব আত্মতৃপ্তির সঙ্গে বলল, সারা শহরে কি যে হচ্ছে আজকাল। যখন-তখন আসাদগেটে, মোহাম্মদপুরে, গুলিস্তান, নবাবপুরে সবখানে গাড়ি, বাস, চাকা ফেটে উল্টে যাচ্ছে। আজ সকালে দেখি কার্জন হলের কোণের চৌমাথায় বাংলা একাডেমির দিকের যে চৌমাথাটা ওই খানের আয়ল্যান্ডটার পাশে এক ডবল ডেকার উল্টে পড়ে আছে। বারো চোদ্দজন বিহারি, রাজাকার, মিলিশিয়া ওটাকে তুলে সারাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।

জামী আস্তে করে বলল, ডবল ওরিয়েন্টাল বাম।

ফকির চমকে বলল, কি বললে বাবা?

কিছু না চাচা। মাথা ধরেছিল। ওরিয়েন্টাল বাম দিয়েছিলাম। ছাড়ে নি, উল্টো মাথাধরা বেড়ে গেছে।

২৮ আগস্ট, শনিবার ১৯৭১

২৫ আগস্ট রাতের অ্যাকশনের গল্প আর ফুরোচ্ছেনা, মানে আমিই ফুরোতে দিচ্ছি না।

এর আগে ঢাকায় যত অপারেশন, অ্যাকশান হয়েছে, সবগুলোর বিবরণ লোকমুখে শোনা। এই প্রথম আমি প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রত্যক্ষকর্মীর মুখে জানতে পারছি অ্যাকশানের বিস্তারিত বিবরণ।

অন্যদিকে একটা অসুবিধাও হচ্ছে। আগের মত বন্ধুবান্ধব ও পড়শীদের সঙ্গে শোনা কথায় অংশ নিতে পারছিনা, মানে শুধু শুনেই যাচ্ছি, নিজের অনুমান কিছু যোগ করতে পারছি না। কি জানি যদি কেউ সন্দেহ করে বসে! তাই মোর্তুজা ভাইরা, বাঁকারা, ফকিররা যখন ২৫ রাতের অ্যাকশান সম্বন্ধে ডাল-পালা বিস্তারিত নানা কথা বলতে থাকেন, তখন শরীফ, জামী, আমি শুধু মাথা নেড়ে নেড়ে অবাক হই আর চুপ করে শুনি!

আজ হ্যারিস এসেছে দুপুরে খাওয়ার সময়। রুমীর অনেকদিনের বন্ধু। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় থেকেই বন্ধুত্ব। একটা শখে দুজনের মিল আছে–তবলা বাজানোতে। হ্যারিসের বাবা হাসিব সাহেবও ইঞ্জিনিয়ার, শরীফের কয়েক বছরের সিনিয়র।

২৫ তারিখ সন্ধ্যায় হ্যারিসদের অ্যাকশানের কি হয়েছিল, আজ তা শুনলাম ওর মুখে।

সেই সন্ধ্যায় হ্যারিসরা তাদের হাইজ্যাক করা ফিয়াট ৬০০তে ছয়জন ছেলে গাদাগাদি করে বসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের চারপাশের রাস্তা দিয়ে কয়েকবার চক্কর দেয়। কিন্তু আলমদের গাড়ির কোনো পাত্তা দেখতে পায় না। তারা তো আর জানে না, আলমরা কি ঘাপলার মধ্যে পড়েছে। খানিক পরে গাড়ির ইঞ্জিন গরম হয়ে গেছে, পানি দিতে হবে, কোথায় পানি পাওয়া যায় এই চিন্তাভাবনা করতে করতে ওরা শাজাহানপুর বাজারের কাছে মুক্তারের চেনা একটা পানের দোকানে গিয়ে পানি চাইল। ছেলেগুলো গাদাগাদি করে বসেছিল, নিজেরাও গাড়ি থেকে নামল একটু হাত-পা ছাড়িয়ে নেবার জন্য। স্টেন হাতে ওদের নামতে দেখে মুহূর্তে বাজারের লোকজন খালি। ওরা গাড়িতে পানি ভরে আবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনের চারপাশের রাস্তা ধরে কয়েকটা চক্কর দিল। শেষে আলমদের না পেয়ে হতাশ হয়ে নিজেরাই কিছু একটা করবে বলে কাকরাইলের দিকে রওনা দেয়। কাকরাইলের মোড়ে কয়েকজন বাঙালি পুলিশ হল্ট বলে ওদের থামায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হ্যারিসরা বাঙালি পুলিশ মারব

বলে সিদ্ধান্ত নেয়, একই সঙ্গে বাঙালি পুলিশরাও ওরে বাবা! মুক্তিবাহিনী বলে ওদের দিক থেকে চোখ উঠিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। হ্যারিস দ্রুত গাড়ি চালিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে দারুল কাবাবের দিকে যায়। দারুল কাবাবে মাঝে-মাঝে পাঞ্জাবি আর্মি অফিসাররা টিক্কা তন্দুরী কাবাব এসব খেতে আসে। ওরা গিয়ে একটা আর্মি জীপ দাড়ানো দেখে। জিয়া বলে, গাড়িটা ইউটার্ন দিয়ে ঘুরিয়ে আন। তাহলে জীপটা মেরে মগবাজারের দিকে পালিয়ে যেতে সুবিধে হবে। হ্যারিসদের লাক খারাপ, ওরা ইউটার্ন করে ঘুরে দারুল কাবাবের সামনে এসে দেখে জীপ উধাও!

কথার মাঝখানে রুমী হাসতে হাসতে বলল, শুধু স্কিল হলেই হয় না, লাকও লাগে। লাক ফেভার না করলে হাজার স্কিলও ভণ্ডুল।

হ্যারিস বলল, তা ঠিক। কাউকে মারতে পারলাম না বটে কিন্তু লাক খুব খারাপ ছিল না। তাইতো দুই নম্বর রোডে ফেরার সময় মিলিটারি চেকপোস্টে ধরা পড়ি নি।

হ্যারিসরা দারুল কাবাব থেকে পিজি হাসপাতালের মোড় হয়ে এলিফ্যান্ট রোড দিয়ে দুই নম্বর রোডে ঢোকার আগের ট্রাফিক পোস্টটার কাছে আসে। বাদিকে দুই নম্বর রোডেরমুখে একটা জীপনজরে পড়ে। হ্যারিস বলে লেটস অ্যাটাক দ্যাট জীপ। সঙ্গে সঙ্গে জিয়া বলে ওঠে, থাম থাম্। জীপটার পেছনে লাইট নেভাননা কয়েকটা ট্রাক দেখা যায় যেন। তখন ওরা ঠাহর করে দেখে জীপটার পেছনে লাইট নেভানো বেশ কয়টা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। আরো খেয়াল হয় সোজা সামনে মিরপুর রোডেও যেন অনেক গাড়ি, লোকজন। ওরা তখনো বোঝে নি যে মাত্র বিশ পনের মিনিট আগেই ওইখানে আলমরা অ্যাকশন করে গেছে। ওরা বায়ে ঘুরে দুই নম্বর রোড দিয়ে সাতমসজিদ রোড পেরিয়ে ২৮ নম্বরে যায়।

আলমরা কথামত রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যায় নি বলে হ্যারিরা প্রথমে রাগ করেছিল, কিন্তু পরদিন দুপুরে যখন জানতে পারে যে কি রকম সাক্ষাত্মত্যুর ছোবল থেকে ওরা বেঁচে বেরিয়ে এসেছে, তখন আর রাগ থাকে না। এরকম দুঃসাহসিক অ্যাকশানের জন্য সবাই আলমদের ধন্য ধন্য করতে থাকে।

হ্যারিস বলল, চাচী, রুমী তো হিরো হয়ে গেছে। ও যেভাবে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে গুলি করেছে, সে রকম কাহিনী আমরা এতদিন কমিক বইতে পড়েছি, বিদেশী সিনেমায় দেখেছি। আমারই বন্ধু এরকম একটা কাজ করেছে ভেবে আমারও খুব গর্ব হচ্ছে।

চেয়ে দেখলাম, রুমীর মুখ গর্বে, লজ্জায়, খুশিতে লাল হয়ে উঠেছে। কদিন থেকে বন্ধুদের মুখে ও এইসবকথাই শুনছে। আমি বললাম, এরকম কোনো একটা অ্যাকশানে কোন একজনকে কিন্তু হিরো বলা যায় না। আসল হিরো হচ্ছে পুরো টিমটাই। প্রত্যেকটি সদস্যের নির্ভুল রিফ্লেক্স আর পারফেক্ট সেন্স অব টাইমিং থাকলে যে নিখুঁত টিমওয়ার্ক হয় তার ফলেই অ্যাকশানে সাফল্য আসে।

হ্যারিস বলল, চাচী গতকাল আমি তুর্যদের বাড়িতে গেছিলাম। রুমীরা যে বাড়ির সামনে খানসেনা মেরেছে, তার উল্টোদিকের বাসায় তুর্যের বাবা-মা থাকে। তুর্যতো ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে রয়েছে। তুর্যকে চেনেন কি? ঐ যে খুব ভালো ফুটবল খেলে। সালাউদ্দিন ভালো নাম। আমার বন্ধু।

চিনি। শুধু তুর্য নয়, তুর্যের মা সিমকিকেও চিনি একেবারে ছোটবেলা থেকে। তুর্যের এক চাচা শুকুর সাহেব রুমীর আব্বার বন্ধু।

রুমীরা আসলে কতগুলো মারতে পেরেছে, সেটা জানবার জন্যই ওখানে গেলাম। কিন্তু মুখে বললাম, কেমন আছেন খালাম্মা? আপনাদের খোঁজ নেবার জন্য এলাম। তুর্যের মা বললেন, আর বোলো না বাবা, দুদিন আগে সন্ধ্যার মুখে একটা গাড়িতে মুক্তিবাহিনী এসে সামনের বাসার সবকটা গার্ডকে মেরে দিয়ে গেছে। তুর্যের মা সেই সময় সামনের বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলেন। গাড়ি থেকে গুলির শব্দ হতেই উনি তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে চুপিচুপি দোতলায় উঠে একটা জানালার ফাঁক দিয়ে সব দেখেন। বাড়ির সামনে যতগুলো গার্ড ছিল, সবকটা মরেছে।

বিকেল হতেই হ্যারিস চলে গেল। রুমী রেকর্ড প্লেয়ারে জিম রিভসের একটা রেকর্ড চড়িয়ে চৌকিতে আমার পাশে এসে বসল। আমি বললাম, তুই দেখছি এবার জিম রিভস বেশি শুনছিস!

রুমীর স্বভাবটা বরাবরই এরকম। যে শিল্পীর গান ওর ভালো লাগে, পারলে তার সবগুলো রেকর্ড কিনে ফেলে। এবং একেক সময় একেক শিল্পী ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে ওঠে। এভাবেই গত কয়েক বছরে আমাদের বাড়িতে জমে উঠেছে শচীন দেব বর্মনের, ফিরোজা বেগমের, টম জোনসের, জিম রিভসের যতগুলো রেকর্ড ঢাকায় পাওয়া যায় সবগুলো। বইয়ের ব্যাপারেও তাই।

রুমী বলল, এই রেকর্ডটা আজ চুলু ভাইয়ের বাসা থেকে নিয়ে এসেছি। কালই ফেরত দিতে হবে।

আমি বললাম, আজ চু, আলম, ওরা কেউ আসে নি।

আলম ঢাকায় নেই। আজ ভোরে শাহাদত ভাইয়ের সঙ্গে মেলাঘরে গেছে।

হঠাৎ?

ওরা গেল ঢাকায় কিছু ভারি অস্ত্র আনা যায় কিনা, তার খোঁজ খবর করতে। তাছাড়া এখানে এখন প্রচুর টাইম-পেনসিল আর পি. কে. দরকার। সেগুলোও আনবে ওরা।

ভারি অস্ত্রটা কি?

এল.এম.জি,। ঢাকার গেরিলাদের এখনো পর্যন্ত হালকা অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে–স্টেন, এস.এম.জি, গ্রেনেড, বিস্ফোরক–এইসব। এল.এম.জি, ভারিও বটে, দামীও বটে। একটা ধরা পড়লে বহুত লস্। তবে ঢাকায় এখন যেরকম উন্নত ধরনের গেরিলা অ্যাকশান হচ্ছে, তাতে আমাদের খুব বিশ্বাস ভারি অস্ত্র এলে আরো বড় বড় টার্গেট হিট করতে পারব। তাই ঢাকার গেরিলাদের ইচ্ছে কয়েকটা এল.এম.জি, আসুক। আলম, শাহাদত ভাই, খালেদ মোশাররফ, হায়দার ভাইয়ের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য গেছে। জান আম্মা, যদি এল.এম.জি. আসে ঢাকায়, তাহলে প্ল্যান আছে ছয় সেপ্টেম্বর ঢাকায় একটা বড় ধরনের অ্যাকশান করা হবে।

কেন, ছয় সেপ্টেম্বর কি জন্য?

পাকিস্তান সরকার ঐদিন প্রতিরক্ষা দিবস পালন করার আয়োজন করছে। সব যদি ঠিকঠাকমত চলে, তাহলে ঐদিন ঢাকার সমস্ত গেরিলা কয়েকটা গ্রুপে ভাগ হয়ে একই সময়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটা পয়েন্ট হিট করতে পারে –রাজারবাগ পুলিশ লাইনের প্যারেড গ্রাউন্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ কেন?

ওখানে যে প্রতিরক্ষা দিবসের জন্য খুব প্যারেড, পিটির প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে, তাই। জান আম্মা, ঢাকায় এখন নয়টা গেরিলা গ্রুপ রয়েছে। ছয় তারিখের প্ল্যানটা যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে আরো অনেক গেরিলা এর মধ্যে ঢাকা চলে আসবে।

আর তোদের সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের প্ল্যানটা?

ওটাও আছে। ওটার জন্যও পি. কে. আনবে ওরা।

জিম রিভসের গলা থেমে গেল। রুমী উঠে রেকর্ডের পিঠ পাল্টে দিয়ে এসে আবার বসল, আচ্ছা আম্মা, তোমরা ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পার না?।

আমি চমকে বললাম, কেনরে?

তোমরা ঢাকায় না থাকলে আমার পক্ষে অ্যাকশান করতে আরো সুবিধে হত।

কোথায় যাব? আর যাবার জায়গা যদিবা পাই,খুঁজলে হয়ত পেয়েও যাব, তাহলেও তোর দাদাকে নিয়ে যাবই বা কি করে?

দাদাকে কিছুদিন ফুপুর বাড়িতে রেখে দিলে হয় না?

তাহলে তো আরো তুলকালাম লেগে যাবে। তোর দাদা তা হলে আসল ব্যাপার সব বুঝে যাবে, তখন আপসেট হয়ে তার ব্লাড প্রেসার ভীষণ বেড়ে যাবে। স্ট্রোক হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। না রুমী, তা হয় না।

রুমী একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল। জিম রিক্স বেজে বেজে এক সময় থামল। রুমী উঠে আরেকটা রেকর্ড লাগাল, বলল, আম্মা গানটা শোন মন দিয়ে।

টম জোনসের গ্রীন গ্রীন গ্রাস গানটা বেজে উঠল। বহুবার শোনা এ গান। রুমী এটা প্রায়ই বাজায়। শুনতে শুনতে সুরটা আমারও প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে, যদিও ইংরেজি গানের কথা বিশেষ বুঝি না। তিন মিনিটের গানটা শেষ হলে রুমী আস্তে আস্তে বলল, গানটার কথাগুলো শুনবে? এক ফাঁসির আসামী তার সেলের ভেতর ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল সে তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছে। সে ট্রেন থেকে নেমেই দেখে তার বাবা মা আর প্রেয়সী মেরী তাকে নিতে এসেছে। সে দেখল তার আজন্মের পুরনো বাড়ি সেই একই রকম রয়ে গেছে। তার চারপাশ দিয়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে সবুজ সবুজ ঘাস। তার এত ভালো লাগল তার মা-বাবাকে দেখে, তার প্রেয়সী মেরীকে দেখে। তার ভালো লাগল গ্রামের সবুজ সবুজ ঘাসে হাত রাখতে। তারপর হঠাৎ সে চমকে দেখে সে ধূসর পাথরের তৈরি চার দেয়ালের ভেতরে শুয়ে আছে। সে বুঝতে পারে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল।–

আমি বলে উঠলাম, চুপ কর রুমী,চুপকর। আমার চোখে পানি টলমল করে এল। হাত বাড়িয়ে রুমীর মাথাটা বুকে টেনে বললাম, রুমী। রুমী। এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো দেখলি না। জীবনের কিছুই তো জানলি না।

রুমী মুখ তুলে কি একরকম যেন হাসি হাসল, মনে হল অনেক বেদনা সেই হাসিতে। একটু চুপ করে থেকে বলল, বিন্দুতে সিন্ধু-দর্শন একটা কথা আছেনা আম্মা? হয়তো জীবনের পুরোটা তোমাদের মত জানি না, ভোগও করি নি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য-তিক্ততা-বিষ-সবকিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যেই পেয়েছি আম্মা। যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না।

২৯ আগস্ট, রবিবার ১৯৭১

আজ হাফিজ ঢাকায় এসেছে তার গ্রামের বাড়ি থেকে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি হাফিজ গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল মাকে নিয়ে। ঢাকার বাসায় শুধু ওর বড় ভাই ওয়াহিদ ছিল। তা সেও তো এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে চিংকুর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল।

বিকেলে হাফিজ এ বাসায় এল রুমীর কাছে এ কয় মাসের সব ঘটনা শুনবে বলে। কিন্তু কোথায় রুমী? সে সকালে নাশতা খেয়ে জিম রিভসে রেকর্ডখানা হাতে করে বেরিয়েছে, বলে গেছে–দুপুরে ওদের মিটিং আছে, তারপর ও যাবে চুলুর বাসায়।

হাফিজকে বললাম, কি জানি কোথায় গেছে। ওকি কিছু বলে আমাকে? কি যে করে। বেড়ায়, আল্লাই জানে। সব গোল্লায় গেছে। হাফিজ কাঁচুমাচু মুখে বলার চেষ্টা করল, যা খুশি যা-তা করে বেড়াবার মত ছেলে রুমী নয়।

রুমী এল সন্ধ্যারও পর। হাফিজকে দেখে খুশিতে জড়িয়ে ধরে ছাদের ঘরে চলে গেল নিরিবিলি কথা বলার জন্য।

রাত নটায় খেতে ডাকলাম। নেমে রুমী বলল, আম্মা হাফিজ রাতে থাকবে এখানে। আমাদের গল্প শেষ হয় নি।

রুমী-জামীর ঘরের এক পাশে একটা ক্যাম্পখাট পেতে হাফিজের জন্য বিছানা। পাতল রুমী-জামী মিলে। তারপর রুমী বলল, আম্মা মাথাটা কেন জানি খুব দপদপ্ করছে। ভালো করে বিলি করে দাও তো।

আমি রুমীর মাথার কাছে বসে ওর চুলে বিলি কাটতে লাগলাম, জামী, হাফিজ নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে খুব নিচুস্বরে কথা বলতে লাগল। মাসুম পাশের ঘরে শোয়–সে উঠে এসে জামীর খাটে বসল। দুঘরের মাঝের দরজাটা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিল। কথার শব্দ যেন বাবার কানে না যায়।

সাইড টেবিলে রেডিওটাও খোলা রয়েছে। একের পর এক বাংলা গান হচ্ছে। খুব সম্ভব কলকাতা। হঠাৎ কানে এল খুদিরামের ফাঁসির সেই বিখ্যাত গানের কয়েকটা লাইন।

একবার বিদায় দেয় মা ঘুরে আসি।
ওমা হাসি হাসি পরব ফঁসি
দেখবে জগৎবাসী।

রুমী বলল, কি আশ্চর্য আম্মা! আজকেই দুপুরে এই গানটা শুনেছি। রেডিওতেই, কোন স্টেশথেকে –জানি না। আবার এখনো –রেডিওতে। একই দিনে দুবার গানটা শুনলাম, না জানি কপালে কি আছে।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ নিচে গেটে ধমাধম শব্দ আর লোকের গলা শুনে চমকে জেগে উঠলাম। বাড়ির সামনের পুবদিকের জানালার কাছে উঁকি দিয়ে দেখি–সর্বনাশ! সামনের রাস্তায় মিলিটারি পুলিশ। রাস্তার উজ্জ্বল বাতিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দৌড়ে রুমীদের ঘরে গিয়ে দেখি ওরা চারজনেই পাথরের মূর্তির মত ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ঘরের পশ্চিমের জানালায় উঁকি দিয়ে দেখলাম পেছনে বজলুর রহমান, সাত্তার ও কাসেম সাহেবদের বাড়িগুলোর সামনের রাস্তাতেও অনেক মিলিটারি পুলিশ। দক্ষিণের জানলা দিয়ে দেখলাম ডাঃ এ. কে. খান ও হেশাম সাহেবের বাড়ির সামনের জায়াগটাতেও পুলিশ। উত্তর দিকের জানালা দিয়ে দেখলাম আমার পুরো বাগান ভরে মিলিটারি পুলিশ দাড়িয়ে আছে। অর্থাৎ বাড়িটা একবারে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে।

আবার রুমীদের ঘরে গেলাম। রুমী দুএকবার অস্থিরভাবে পায়চারি করে বলল, কোনদিক দিয়েই পালাবার ফাঁক নেই। মনে হয় হাজারখানেক পুলিশ এসেছে। রাস্তার বাতিগুলোও এমন জোরালো, একেবারে দিনের মত করে রেখেছে।

আমি উদ্ভ্রান্তের মত ঘরের চারদিকে তাকিয়ে ভাববার চেষ্টা করলাম, কোনোখান দিয়ে কোনোভাবে রুমীকে পার করে দেয়া যায় কিনা! না, কোন দিক দিয়েই কোন ফাঁক নেই। পুরো বাড়িটার যতো জানালা সবকটাতে গ্রিল, পুরো বারান্দা কঠিন গ্রিলে আবদ্ধ। সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে পেছনের উঠানে নামবে, তারও উপায় নেই। পেছনের বাউন্ডারি ওয়াল খুব নিচু। পেছনের রাস্তার বাতি আর অসংখ্য পুলিশের চোখ। এড়িয়ে উঠান দিয়েও পালানো সম্ভব নয়।

ওদিকে সামনের গেটে অসহিষ্ণু হাতের ধমাধম বাড়ি আর ক্রুদ্ধ কণ্ঠের হাঁকডাক ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আমি আর শরীফ পরস্পরের দিকে তাকালাম। এই মুহুর্তে আমার মনের ভেতরে কোন অনুভূতি আমি টের পাচ্ছি না। ভয়-ভীতি-উদ্বেগ সব ফ্রিজ হয়ে আমি যেন পুতুলনাচের পুতুল হয়ে গেছি। কেউ দড়ি দিয়ে যেন আমাকে ঘোরাচ্ছে, ফেরাচ্ছে, চালাচ্ছে। শরীফের দিকে তাকিয়ে বললাম, চল, সামনের বারান্দায় বেরিয়ে জিগ্যেস করি, কি চায়।

দুজনে পুবদিকের ছোট বারান্দায় বেরোলাম। শরীফ বলল, কে ডাকেন? কি চান?

নিচে থেকে কর্কশ গলায় উর্দুতে কেউ বলল, নিচে এসে দরজা খুলুন। এত দেরি করছেন কেন?

শরীফ আবার বলল, ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে। এত রাতে কি দরকার?

এবার অন্য একজন একটু মোলায়েমভাবে উর্দুতে বলল, বিশেষ কিছু নয়। দরজা খুলুন।

আমি আর শরীফ দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলাম। দেয়ালে ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখলাম বারোটা বেজে দশ মিনিট।

সদর দরজা খুললেই পোর্চ। রাতে সামনে-পেছনে কোলাপসিবল গেট টেনে নিলে ওটা গ্যারেজ হয়ে যায়। শরীফ দরজা খুলে কোলাপসিবল গেটের ভেতর থেকে লাগানো তালা খুলে গেট ফাঁক করল। একজন খুব অল্পবয়সী আর্মি অফিসার দাড়িয়ে আছে, তার পাশে ও পেছনে তাগড়া চেহারার অনেকেই। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, হোয়াট ক্যান উই ডু ফর ইউ?

অফিসারটি হাত তুলে সালাম দেবার ভঙ্গি করে ইংরেজিতে বলল, আমার নাম ক্যাপ্টেন কাইয়ুম। তোমাদের বাড়িটা একটু সার্চ করব।

আমি বললাম, কেন, কি জন্য?

এমন কিছু না। এই রুটিন সার্চ আর কি। তোমাদের বাড়িতে মানুষ কয়জন? কে কে থাকে?

আমি বললাম, আমি, আমার স্বামী, শ্বশুর, দুই ছেলে, ভাস্তে—

ছেলেদের নাম কি?

রুমী, জামী–

ওরা এগিয়ে এল। আমি একটু পাশ কেটে দাঁড়িয়ে বললাম, দ্যাখো, আমার শ্বশুর বুড়ো, অন্ধ, হাই ব্লাড প্রেসারের রুগী। তোমাদের প্রতি অনুরোধ, তোমরা শব্দ না করে বাড়ি সার্চ কর। উনি যেন জেগে না যান।

ক্যাপ্টেন কাইয়ুমকে দেখলে মনে হয় কলেজের ছাত্র। ফর্সা, পাতলা গড়ন, খুব মৃদুস্বরে ধীরে কথা বলে। তার সঙ্গের সুবেদারটি দোহারা, মধ্যবয়সী। উর্দু উচ্চারণ শুনে বোঝা যায় বিহারি।

ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের সঙ্গে ঐ সুবেদার আর তিন-চারজন সশস্ত্র এম.পি. ঘরের ভেতরে ঢুকল। এবংমুহূর্তে কয়েকজন একতলায়, কয়েকজন দোতলায় ছড়িয়ে পড়ল। অভ্যস্ত নিপুণতার সঙ্গে ওরা প্রত্যেকটি ঘরের আলমারি, দেরাজ চেক করে দেখল, পেছনের দরজা খুলে উঠানে উঁকি মারল, বাবার ঘরে পা টিপে টিপে হাঁটল, রুমীদের সবাইকে নাম জিগ্যেস করে নিচে নেমে যেতে বলল। আমি প্রায় সব সময়ই ওদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিলাম। জিগ্যেস করলাম, কেন, ওদের নিচে যেতে বলছ কেন?

ক্যাপ্টেন কাইয়ুম বলল, কিছু না, একটুখানি রুটিন ইন্টারোগেশান করব। শরীফের দিকে তাকিয়ে বল, আপনিও নিচে আসুন। ওদের সঙ্গে সঙ্গে আমিও নিচে নেমে এসে দেখলাম রুমী, জামী, মাসুম আর হাফিজ পোর্চে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম পোর্চে এসে শরীফকে বলল, এটা আপনার গাড়ি চালাতে পারেন? শরীফ ঘাড় নাড়লে সে বলল, আপনি গাড়ি চালিয়ে আমাদের সঙ্গে আসুন।

আমি ভয় পেয়ে বলে উঠলাম, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শান্ত মৃদুস্বরে বলল, এই তো একটু রমনা থানায়। রুটিন ইন্টারোগেশান। আধঘন্টা পৌঁনে একঘন্টার মধ্যেই ওরা ফিরে আসবে।

ক্যাপ্টেনের ইঙ্গিতে কয়েকজন পুলিশ গাড়ির পেছনে উঠে বসল। আমিব্যাকুল হয়ে বলে উঠলাম, আমিও যাব আপনাদের সঙ্গে।

শরীফ এতক্ষণ একটাও কথা বলে নি, এবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, তুমি থাক। বাবা একলা।

তবু আমি বলতে লাগলাম, না, না, আমি যাব। বিহারি সুবেদারটি ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, মাইজী, আপুনি থাকেন। এনারা এক ঘোন্টার মধ্যে ওয়াপস আসে যাবেন।শরীফ এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বোধ হয় নীরবে কিছু বলবার চেষ্টা করছিল। আমি হঠাৎ যেন সম্বিত পেয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। তাকিয়ে দেখলাম কয়েকজন পুলিশ রুমী, জামী, মাসুমদের হটিয়ে রওনা হয়ে গেল। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শরীফের পাশের সিটে উঠে বসল। শরীফ গাড়ি ব্যাক করে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি খানিকক্ষণ স্তম্ভিতের মত দাঁড়িয়ে রইলাম সেই শূন্য পোর্চে। তারপর বাড়ির ভেতর ঢুকে সব ঘরের সবগুলো বাতি একে একে জ্বালিয়ে দিতে লাগলাম। সদর দরজা হাট করে খোলা রইল, আমি দোতলায় উঠে গেলাম। বাবার ঘরে ঢুকে দেখলাম তিনি অঘোরে ঘুমোচ্ছন। যে বাতিগুলো অফ ছিল, সেগুলো সব জ্বেলে দিলাম। তারপর ছাদে গেলাম। ছাদের ঘরের ও বাইরের বাতি দুটোও জ্বেলে দিলাম। তারপর আবার একতলায় নেমে পোর্চে গিয়ে দাঁড়ালাম। একবার গলির মাঝখানে দাঁড়াই, আবার পোর্চে ফিরে আসি, মাঝে-মাঝে বারান্দায় বসি। আধঘন্টা গেল, একঘন্টা গেল, দেড়ঘন্টা গেল। ওরা ফিরে আসে না।

আমি ঘর-বার করতে লাগলাম। আমাদের গলির বিহারি নাইটগার্ডটা মাঝে-মাঝে এসে আমাকে বলতে লাগল, মাইজী, আপনি আন্দরে যান। আমি তার কথায় কান। দিলাম না। সদর দরজা খোলা রেখে আবার দোতলায় গেলাম, ছাদে গেলাম, আবার নিচে নেমে এলাম। এবার নাইটগ বলল, মাইজী, আপনি দরজা খুলা রেখে আন্দরে যাবেন না। দরবাজা বন্দ করিয়ে দেন। আমি এবারও তার কথায় কান দিলাম। গলি দিয়ে হেঁটে মেইন রোডের মুখ পর্যন্ত গেলাম, আবার ফিরে এলাম।

নাইটগার্ডটা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, মাইজী, আপনি নিন্দ যাবেন না?

নিন্দ? ওকি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছে? ওরা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার চোখে ঘুম কি নামবে?

৩০ আগস্ট, সোমবার ১৯৭১

ভোর হয়ে আসছে। ওরা এখনো ফেরে নি। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম বলেছিল আধঘন্টা পৌঁনে একঘন্টা পরে ফিরবে। আমিও সে বিশ্বাসে ঘর-বার করে পাঁচ ঘন্টা কাটিয়ে দিলাম? ওরা তো সোজাসুজি ধরে নিয়ে যেতে পারত কিছু না বলে। ক্যাপ্টেন কাইয়ুম মিথ্যে কথা বলল তাহলে?

ক্যাপ্টেন কাইয়ুম গাড়িতে উঠার আগে ওর ফোন নম্বরটা জিগ্যেস করেছিলাম। কেন জিগ্যেস করেছিলাম? তাহলে কি অবচেতন মনে আমারও সন্দেহ ছিল যে ওরা অত তাড়াতাড়ি ফিরবে না?

ঘড়িতে ছটা বাজল। জুবলীর বাসায় ফোন করলাম। জুবলীর ভাইয়ের ছেলে হাফিজ আমাদের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে–তাকে খবরটা আগে জানানো দরকার। একটা আশার কথা, জুবলীর বড় ভাই ফরিদ এখন ঢাকার ডি.সি। উনি হয়তো এ ব্যাপারে কোনো সাহায্য করতে পারবেন।

তারপর ফোন করলাম মঞ্জুরকে, মিকিকে।

আধঘন্টার মধ্যে জুবলী, মাসুমা আমাদের বাসায় এসে গেল। ওদের দেখে এতক্ষণে এই প্রথম আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। ওরা আমাকে গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরে চুপ করে রইল। সান্ত্বনার ভাষা কারো মুখে নেই। ওরাও তো সমান দুঃখে দুঃখী। একজনের স্বামী, অন্যজনের ভাই বর্বর পাকবাহিনীর বন্দিশালায়।

একটু পরে নিজেকে সামলে বাবার ঘরে গেলাম ওঁকে উঠিয়ে মুখ-হাত ধুইয়ে হলে ইজিচেয়ারে বসাতে। জুবলী, মাসুমা রান্নাঘরে গেল বারেককে নিয়ে কিছু চা-নাশতার ব্যবস্থা করতে।

বাবাকে তুলতেই উনি বিস্মিত স্বরে বলে উঠলেন, মাগো, তুমি কেন? মাসুমা কই?

আমি প্রাণপণে গলা স্বাভাবিক রেখে বললাম, ওরা চারজনেই ভোরবেলা উঠে সাভার গেছে। আজ ওখানে হাটবার কিনা, সস্তায় কিছু বাজার করে আনবে।

বাবা আর কিছু বললেন না।

ওঁকে চা-নাশতা খাইয়ে নিচে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসলাম। শুধু এক কাপ চা ছাড়া আর কিছু খেতে পারলাম না, মাসুমা, জুবলীর পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও।

হঠাৎ গেটের কাছে গাড়ির শব্দ হল। দৌড়ে পোর্চে বেরোলাম। একটা সাদা গাড়ি। শরীফরা ফিরে আসছে। আমাকে দৌড়ে গেটের কাছে যেতে দেখেই কিনা জানি না গাড়িটা ঘঁাচ করে গলিতেই থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নিরাশায় মন ভরে গেল। গাড়িতে মাত্র একজন আরোহী –সে-ই চালাচ্ছে। গাড়িটাও টয়োটা, আমাদের হিলম্যান মিংকস্ নয়। দরজা খুলে চালক নামতেই দেখলাম স্বপন! তার গায়ে টটকে লাল একটা জামা, চুল উস্কখুস্ক, চোখ লাল, মুখে উদভ্রান্ত ভাব। সে কিছু বলার আগেই আমি দৌড়ে তার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, শিগগির পালাও স্বপন। রুমী ধরা পড়েছে। কাল রাতে আর্মি এসে বাড়িসুদ্ধ সবাইকে নিয়ে গেছে। শিগগির চলে যাও এখান থেকে। এভাবে গাড়িতে একা ঘুরো না। কোথাও লুকিয়ে থাক।

স্বপনের মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরোল না। সে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসতেই আমি একপাশে সরে দাঁড়ালাম। সে গেটে গাড়ি ঢুকিয়ে ব্যাক করে বেরিয়ে চলে গেল। আমি শূন্য মন নিয়ে ঘরে এসে বসলাম। দশ মিনিট যেতে না যেতেই দরজায় খুব আস্তে ঠুকঠুক নক। আমি লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখি দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে-শুকনো মুখ, চোখের চাউনিতে চাপা ভয়। ওরা ঘরে ঢুকলে বললাম, তুমি শাহাদত চৌধুরীর ছোট ভাই ফতে না? আর তুমি জিয়া। তোমরা কেন এসেছ? শিগগির পালাও। কাল রাতে রুমীকে নিয়ে গেছে, ঐ সঙ্গে বাড়ির সবাইকে।

ফতে অস্পষ্ট স্বরে বলল, আমাদের বাড়িও রেইড হয়েছে। আর্মি আমার সেজো দুলাভাইকে ধরে নিয়ে গেছে।

আর কাউকে নিয়েছে?

না, আমি কাল বিকেলেই খবর পেয়েছিলাম, সামাদকে ধরেছে। আমি আমার ছোট দুই বোনকে নিয়ে হাটখোলার বাড়ি থেকে অন্যখানে চলে গেছিলাম, সেজো দুলাভাই কদিন আগেই গ্রাম থেকে ঢাকা এসেছিলেন। তাই উনি আব্বা-মার সঙ্গে বাড়িতেই ছিলেন।

তোমরা আর দাঁড়ায়ো না। তাড়াতাড়ি চলে যাও।

ফতে আফসোস আর দুঃখভরা স্বরে বলল, আমি এ বাড়ি চিনতাম না। কাল রাতে আন্দাজে এ গলি সে গলি অনেক খুঁজেছি–যদি রুমীকে খবরটা দিতে পারি–আজ সকালে জিয়াকে পেয়ে–জিয়া এ বাসা চেনে–তা কোন লাভ হল না–

কথা অসমাপ্ত রেখেই ফতে আর তার পাশে পাশে মাথা নিচু করে জিয়া বেরিয়ে গেল।

পড়শীরা একে একে আসতে শুরু করেছেন। তারা সবাই রাতে জেগে উঠে নিজ নিজ ঘরের মাঝখানে কাঠ হয়ে দাড়িয়েছিলেন, কিন্তু কেউ দরজা খুলতে সাহস পান নি। সানু, মঞ্জ, খুকুর হেফাজতে আমাকে রেখে মাসুমা, জুবলী পরে আবার আসবে বলে বিদায় নিল।

আটটার সময় থেকে আর্মি এক্সচেঞ্জে ফোন করতে লাগলাম ক্যাপ্টেন কাইয়ুমকে চেয়ে। কিন্তু কোন হদিস করতে পারলাম না। একবার বলে উনি এখনো আসেন নি। আরেকবার শুনি এই একসটেনসান ওনার নয়। অন্য একসটেনশান নম্বর দেয়–সেখানে চাই, তারা আবার অন্য একটা নম্বর দেয়।

নটার সময় মঞ্জুর, মিকি বাসায় এলেন। বাঁকা ঢাকায় নেই, চাটগাঁয়। মঞ্জুর মিকি সব শুনে বললেন, অফিসে গিয়ে খোঁজখবর করি। দেখি কি করা যায়।

সাড়ে নটার সময় দরজায় কলিং বেল বাজল। দৌড়ে গিয়ে খুলে দেখি, হাফিজ। একা।

হাফিজকে টেনে ঘরের ভেতর এনে বুকে জড়িয়ে ধরলাম, হাফিজ! তুই এসেছিস বাবা। তুই একা কেন? তোর খালু কই? রুমী, জামী, মাসুম?

হাফিজের পরনে লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি দলামোচড়া, ধুলোময়লা মাখা। চোখে মুখে গভীর যন্ত্রণার ছাপ। সে এমনিতেই খুব আস্তে কথা বলে, এখন গলার স্বর প্রায় শোনাই গেল না, জানি না।

ওর উদ্ভ্রান্ত চেহারা দেখে ওকে আগে বসালাম। প্রথমে ও পানি খেল দুই গ্লাস। তারপর ওকে চা এনে দিলাম এককাপ। ও একটু সুস্থির হয়ে বলল–ওদেরকে প্রথমে মেইন রোড়ে নিয়ে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে সামনে একটা জীপের হেডলাইট জ্বালিয়ে সবাইকে সনাক্ত করে। তারপর রুমীকে আলাদা করে নিয়ে ওদের জীপে ওঠায়। হাফিজ, মাসুম, জামীকে শরীফের গাড়িতে উঠতে বলে। শরীফকে বলে তাদের জীপটাকে ফলো করতে। কয়েকজন পুলিশও রাইফেল হাতে শরীফের গাড়িতে ওঠে। মেইন রোডে ঐ জীপটা ছাড়াও আরো কয়েকটা জীপ ও লরি দাঁড়িয়েছিল। ওরা জীপ ফলো করে এয়ারপোর্টের উল্টোদিকে এম.পি.এ. হোস্টেলে যায়। সেখানে ওদের সবাইকে নিয়ে একটা ঘরে রাখে। সেখানে সারারাত ধরে ওদের সবার ওপর খুব মারধর করা হয়েছে।

বলতে বলতে হাফিজের ঠোট কেঁপে গেল। আমি বললাম, ঠিক আছে, এখন আর বলতে হবে না। তুই হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা খেয়ে একটু বিশ্রাম কর। তোর চাচাকে ফোন করি।

হাফিজের খুব ইচ্ছে নয় চাচাকে ফোন করার। এই চাচার সঙ্গে ওদের বিশেষ সম্পর্ক নেই। ও বলল, জেবিসকে জানালেই হবে।

জুবলীকে ফোন করে বললাম, হাফিজকে ছেড়ে দিয়েছে। হাফিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার চাচা ফরিদকে ফোন করে জানালাম সমস্ত ব্যাপারটা। এই বিপদে আত্মীয়ের ওপর অভিমান রাখতে নেই।

মিকি, মঞ্জরকেও ফোন করে হাফিজের কাছ থেকে পাওয়া খবরগুলো জানালাম।

হাফিজ ওপরের ঘরে বিছানায় শুয়ে খানিক বিশ্রাম করে জুবলীদের বাসায় চলে গেল।

আমি খানিক পরপরই আর্মি এক্সচেঞ্জে ফোন করে চলেছি। সেই বিহারি সুবেদার তার নাম বলেছিল সফিন গুল। কাইয়ুম নেই বললে গুলকে দিতে বলি। তাকেও পাওয়া যায় না।

ওপরে বাবা খুব অস্থির হয়ে উঠেছেন–শরীফরা এখনো ফিরছে না কেন?

আতাভাইকে ফোন করেছি, বাদশাদের এবং অন্য আত্মীয়দের খবর দিতে। ভাবছি আতাভাই বা ইলা-বাদশারা এলে তারপর বাবাকে আসল কথাটা বলতে হবে।

সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। এখনো পর্যন্ত শরীফদের কোন খবর নেই। মঞ্জুর-মিকি ওরা সারাদিন এই ব্যাপার নিয়েই দৌড়োদৌড়ি করছে। কিন্তু এখনো কোন হদিস লাগাতে পারে নি।

আমি সারাদিনে ক্যাপ্টেন কাইয়ুম বা সুবেদার সফিন গুল কাউকেই ফোনে ধরতে পারি নি। ভাবছি ব্যাপারটা কি? ওরা মিছে নাম বলে যায় নিত?

সারাদিন ধরে বাসায় লোকজন আসছে –আতাভাইরা, ইলা-বাদশারা, কলিম, হুদা, নজলু, মা, লালু, আতিক, বুলু। পেছনের রাস্তার বজলুর রহমান সাহেবের স্ত্রী, কাসেম সাহেব, সাত্তার সাহেব। এ রাস্তার সব পড়শী, মাসুমা, জুবলী আবার বিকেলে মিনি ভাই, রেবা, লুলু, চাম্মু। আমার হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, এদের প্রাণে কি ভয়ডর নেই? এরা যে এত আসছে? মেইন রোডের মুখে নিশ্চয় সাদা পোশাকে আই.বির লোক নজর রাখছে। এদের তো বিপদ হতে পারে।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় হঠাৎ কপাল খুলে গেল, ফোনে সুবেদার সফিন গুলকে পেয়ে গেলাম। সফিন গুল খুবই বিনয়ের সঙ্গে জানাল ইন্টারোগেশানে কুছু দেরি হোচ্ছে, আপুনি কুছু ফিকির কোরবেন না। উনারা ইন্টাররোগেশান শেষ হোলেই বাড়ি চলে যাবেন।

আমি বললাম, ওরা কেমন আছে? কি এত ইন্টারোগেশান? আমি কি আমার স্বামী কিংবা ছেলে কারো সঙ্গে কথা বলতে পারি।

সফিন গুল একটু দ্বিধা করে বলল, ঠিক আছে। ডাকছি কোথা বোলেন।

একটু পরে জামীর গলা শুনতে পেলাম মা–আমি জামী–

আমি একেবারে উচ্ছসিত ব্যাকুল হয়ে উঠলাম, জামী, কি ব্যাপার তোদের এখনো ছাড়ে নি কেন? কেমন আছিস তোরা?

জামী থেমে থেমে বলল, ছাড়বে। ভালো আছি।

রুমী কেমন আছে? তোর আব্ব? মাসুম?

জামী সেই রকম ছাড়া ছাড়া ভাবে বলল, ভালো।–এখন ছাড়ি।

জামী–-জামী, তোরা খেয়েছিস কিছু?

না।

বলিস কি? এখনো কিছু খেতে দেয় নি? দে তো সুবেদার সাহেবকে ফোনটা

ফোনে সুবেদারের সাড়া পেয়ে আমি বললাম, এখনো পর্যন্ত ওদের কিছু খেতে দেন নি? কাল রাত বারোটায় নিয়ে গেছেন এখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা–এতক্ষণ পর্যন্ত ওরা

খেয়ে রয়েছে? আপনার দোহাই সুবেদার সাহেব, ওদের কিছু খেতে দিন। না হয় ওদের কাছ থেকেই টাকা নিয়ে কিছু কিনে এনে দিন।

সুবেদার ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়, আভি দেতা হ্যায় বলে ফোন রেখে দিল। আমি খানিকক্ষণ থম ধরে বসে বসে ফুললাম। তারপর হঠাৎ কান্নায় মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়লাম।

৩১ আগস্ট, মঙ্গলবার ১৯৭১

আরো একটা ঘুমহারা রাত পার হয়ে এলাম। কাল থেকে অবশ্য লালু আর মা এ বাড়িতে রয়েছেন। সাড়ে দশটায় মঞ্জুর আর মিকি আসবেন, আমাকে নিয়ে এম.পি.এ. হোস্টেলে যাবেন। সকালে উঠেই মা আর লালুকে নিয়ে স্যান্ডউইচ বানাতে বসেছি। বেশকিছু স্যান্ডউইচ আর ওদের সবার জন্য একপ্রস্থ করে কাপড় নেব। পরশু রাত থেকে শোবার কাপড় পরে আছে। কি মনে করে শরীফের শেভিং সেটটা কাপড়ের প্যাকেটের মধ্যে ভরে নিলাম। কি জানি, যদি আরো কয়েকদিন না ছাড়ে।

বেলা এগারোটার দিকে এম.পি.এ. হোস্টেলে পৌঁছলাম। মঞ্জুর গাড়ি চালাচ্ছিলেন, আর পাশে মিকি। আমি প্যাকেট দুটো হাতে নিয়ে পেছনের সিটে বসেছিলাম। ড্রাম ফ্যাক্টরির রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঢুকল ডানে–এম.পি.এ. হোস্টেলের গেটে পুলিশ দাড়িয়ে রাইফেল হাতে। একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিল। ঢুকেই সামনে চওড়া খোলা লন, বায়ে বিরাট এম.পি.এ. হোস্টেল, সার সার ঘর। সামনে চওড়া টানা বারান্দা। বিভিন্ন ঘরে ইউনিফর্ম পরা লোকজন ব্যস্তভাবে চলফেরা করছে বিভিন্ন ধরনের ইউনিফর্ম। বোঝা যায় সাধারণ সেপাই থেকে বিভিন্ন র্যাঙ্কের অফিসার সবাই রয়েছে ওর মধ্যে।

মিকি বললেন, তুমি গাড়িতেই বসে থাক। আমরা আগে খোঁজ নিয়ে আসি। মিকি, মঞ্জুর সিড়ি দিয়ে উঠে বারান্দায় লোেকদের জিজ্ঞাসা করতে করতে বিভিন্ন ঘরে ঢুকতে লাগলেন। আমি বসে বসে চারদিকে তাকাতে লাগলাম। এইখানেই ওদেরকে এনেছে। এই ঘরগুলোর কোন একটাতে রেখেছেনাকি? ইয়া আল্লা, কোনগতিকে কারো মুখ যদি একঝলক দেখতে পেতাম! তাহলে এক্ষুণি গাড়ি থেকে দৌড়ে ওদের কাছে চলে যেতাম।

মিকি, মঞ্জুর ফিরে এসে বললেন, এখানে না। এর পেছন দিকের আরেকটা বাড়িতে যেতে বলল।

মঞ্জুর আবার গাড়ি ঘুরিয়ে রাস্তায় নামলেন। এম.পি.এ. হোস্টেল পেরিয়ে আরো খানিক গিয়ে আবার ডাইনে একটা গলিতে ঢুকলেন। একটুখানি গিয়ে বয়ে একটা দোতলা বাড়ির সামনে থামলেন। এবার গলিতেই গাড়ি রেখে আমরা তিনজনেই নামলাম। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে একে ওকে জিগ্যেস করতে করতে এঘর-ওঘর করতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি একটু দূরে বারান্দা দিয়ে সফিন গুল যাচ্ছে। আমি সুবেদার সাহেব, সুবেদার সাহেব বলতে বলতে দ্রুত পা চালিয়ে তাকে ধরলাম। গুল আমাকে দেখে চমকে গেল। আমি এক নিশ্বাসে বললাম, সুবেদার সাহেব আমি ওদের খবর নিতে এসেছি। ওদের সঙ্গে দেখা করতে চাই। ওদের জন্য কিছু খাবার আর কাপড় এনেছি। সুবেদার সাহেব, আমাকে ওদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিন।

সুবেদার গুলের মুখ দেখে মনে হল সে ফাপরে পড়েছে। গম্ভীর মুখে বলল, ওরা তো এখানে নেই। অন্য জায়গায় আছে। আচ্ছা আপনি আসুন আমার সঙ্গে। মিকি, মঞ্জুরের দিকে তাকিয়ে বলল, ওনারা এখানেই অপেক্ষা করুন।

আমি সুবেদার সফিন গুলের পেছন পেছন একটা ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। সেখানে টেবিলের পেছনে চেয়ারে এক অফিসার বসে আছেন, ঘরের ভেতরে এবং দরজার কাছাকাছি তিন-চারজন সশস্ত্র মিলিটারি পুলিশ। সুবেদার গুল উর্দুতে অফিসারটিকে কি কি যেন বলল, আমি ঠিকমত বুঝলাম না, যেন বোঝার চেষ্টাও করলাম না। আমার চোখ খালি জানালা দিয়ে, দরজা দিয়ে বাইরে খুঁজে বেড়াচ্ছিল–যদি হঠাৎ শরীফকে দেখতে পাই। একটু পরে গুল আমাকে সম্বােধন করে বলল, মাইজী, ওনারা তো এখন এখানে নাই। ওনারা ক্যান্টনমেন্টে আছেন। এখন তো দেখা যাবে না। আপনি বাড়ি চলে যান।

আমি মরিয়া হয়ে বললাম, আমি এখানে অপেক্ষা করি? ওরা এখানে ফিরবে তো?

সুবেদার সফিন গুল গম্ভীর মুখে বলল, মাইজী, আপনি বাড়ি চলে যান। এখানে অপেক্ষা করার সুবিধা নাই। আপনি পরে খবর নেবেন। নিজে আসবেন না। অন্য লোক দিয়ে খবর নেবেন।

আমি নিরুপায় হয়ে বললাম, তাহলে এই প্যাকেট দুটো রাখেন। ওদের কাপড় আর কিছু খাবার।

সুবেদার গুলও যেন নিরুপায় হয়ে প্যাকেট দুটো নিল। বলল, আপনি আর আসবেন না, ওনারা ঠিক বাড়ি ফিরে যাবেন। চিন্তা করবেন না।

মলিন মুখে মিকি-মঞ্জরের সঙ্গে গাড়িতে উঠলাম। বাড়ি যখন পৌঁছলাম, বেলা পৌঁনে দুটো। মা, লালু অধীর আগ্রহে নিচের ঘরে অপেক্ষা করছিলেন। লালু বলল, খালুজান খুব বেশি অস্থির হয়ে গেছেন।

আমি ডাইনিং রুমে চৌকিটার ওপর শুয়ে পড়ে বললাম, মা, আপনি গিয়ে বাবাকে সামলান। আমি এখন ওর সামনে দাঁড়াতে পারব না।

মা দোতলায় উঠে গেলেন। লালু আমার পাশে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দ কান্নায় আকুল হল।

কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল কে জানে। হঠাৎ পোর্চে গাড়ির শব্দ। আমি লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুললাম। দেখি আমাদের সেই সাদা হিলম্যান মিংকস। গাড়ি থেকে নামছে শরীফ, জামী, মাসুম। শুধু রুমী নেই।

আমার গলা চিরে একটা আর্তস্বর বেরোল, রুমীকে ছাড়ে নি?

কেউ কোন উত্তর দিল না। একে একে ঘরে এসে ঢুকল। আমি তখন সম্বিত ফিরে পেয়ে তিনজনকেই জড়িয়ে ধরলাম। তারপর হঠাৎ চেতনায় ধাক্কা লাগল। ওদের পরনের লুঙ্গি, পাঞ্জাবি দলা-মোচড়া হেঁড়া, ধুলো-ময়লা লাগা, ওদের মুখে-চোখে গভীর যন্ত্রণা, দুঃখ আর অপমানের ছাপ, ওদের শরীর ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ওরা যেন দাঁড়াতে পারছে না। তাড়াতাড়ি ওদের বসিয়ে ঠাণ্ডা পানির বোতল আর গেলাস নিয়ে এলাম। লালুকে বললাম চা বানাতে, মাকে বললাম বাবাকে গিয়ে খবর দিতে।

ওরা একেকজনে দুতিন গেলাস করে পানি খেল, ওদের পিপাসা যেন মিটতেই চায় না। আমি বললাম, বেলা দেড়টা পর্যন্ত আমি মিকি আর মঞ্জর এম.পি.এ. হোস্টেলে ঘোরাফেরা করেছি। সুবেদার গুল বলল, তোমাদের নাকি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেছে।

শরীফ বলল, না, আমাদের ক্যান্টনমেন্টে নেয় নি তো! আমরা ঐ এম.পি.এ. হোস্টেলেই ছিলাম।

বল কি! সুবেদার তাহলে ডাহা মিথ্যে কথা বলেছে? কখন ছেড়েছে তোমাদের? আমাদের ঐ দেড়টার দিকেই ছেড়েছে। গাড়ির চাবি ওরা নিয়ে নিয়েছিল। সেইটা খুঁজে পেতে খানিক দেরি হল।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম আড়াইটা বাজে।

আমি তাজ্জব হয়ে বললাম, কি রকম নিপাট মিথ্যে কথা বলে ওরা! আমি আবার তোমাদের জন্য এক প্যাকেট স্যান্ডউইচ, সবার জন্য একসেট করে কাপড় গুলের কাছে দিয়ে এলাম। ওগুলো আবার রাখলও সে। তখনি তো বলে দিতে পারত, তোমাদের ছেড়ে দিয়েছে। তাহলে এক সঙ্গেই ফিরতে পারতাম।

ওরো তিনজনেই কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে নীরবে চেয়ে রইল। আমি একটু অস্বস্তিতে পড়ে বললাম, কি? তোমরা সব অমন করে তাকিয়ে আছ কেন?

জামী বলল, মা, তুমি এখনো তোমার মান্ধাতা আমলের ধারণা নিয়ে বসে আছ। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে ব্রিটিশরা রাজবন্দীদের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করত। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে দিত, খাবার, কাপড় পাঠাতে দিত, তারপর ফাঁসি দিয়ে লাশটা আত্মীয়দের ফিরিয়ে দিত। ভাবছ এখনো ব্যবস্থা ওইরকমই আছে? জেনে রাখ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর এই পাঁচ মাসে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এ বিষয়ে পাঁচশো বছর এগিয়ে গেছে। ওদের কীর্তিকলাপ শুনলে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীও মাথা হেঁট করবে। তার প্রমাণ আমরা এই দুদিন দুরাতে দেখে এসেছি। ইনফ্যাক্ট, আমরা সশরীরে, সজ্ঞানে হাবিয়া দোজখ ঘুরে এসেছি। সব বলব। শুনে শেষ করতে তোমার দুদিন লাগবে।

ওপর থেকে বাবার ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে ও শরী! রুমী। জামী। মাসুম। আমি দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললাম, বাবার কাছে যাও আগে। উনি একেবারে উতলা হয়ে রয়েছেন। আমি ততক্ষণে ফোন করে সবাইকে খবরটা দেই।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *