০৬. অবচেতন মন এবং অভ্যাস

অবচেতন মন এবং অভ্যাস
SUBCONSCIOUS MIND AND HABITS
ইতিবাচক অভ্যাস ও চরিত্রগঠন
অধ্যায় : ৬

Forming positive habits and character আমরা সবাই জীবনে সাফা লাভের বাসনা করি। কিন্তু আমাদের পারিপার্শি অসাফল্যের দিকে নিয়ে যায়। আমরা জয়ের জন্য জন্মাই। কিন্তু এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে জীবনে অসফল হতে হয়। মাঝে মাঝে আমরা এ রকম কথা শুনি যে, লোকটি পুন ভাগ্যবান, ধুলোমুঠি করলে সোনামুঠি হয়ে যায়; অথবা লোকটি খুব দুর্ভাগা, যে কাজই করতে যায় সেই কাজই মাটি হয়ে যায়; এরকম ভাগ্য নির্ভরতা ঠিক নয়। যদি বিশ্লেষণ করে দেখেন, তাহলে দেখবেন যে, সফল ব্যক্তিরা প্রত্যেক কাজেই বেশ কিছু সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন, আর অসফল ব্যক্তিরা প্রত্যেক বারই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন। স্মরণ রাখবেন অনুশীলনের দ্বারাই মানুষ ত্রুটিহীন হয় না, কেবল ত্রুটিহহীন অনুশীলনের দ্বারাই ত্রুটিহীন হতে পারে। কিছুলোক কটি বিচ্যুতি গুলোকে অনুশীলন করে পাকাপাকি ভাবে সেইগুলিকে এমন ভাবে আত্মস্থ করে যে তারা আপনা থেকেই সেই ক্রটিগুলিকে পুনরাবৃত্তি করে।

পেশাদাররা তাদের কাজের মূল বিষয়গুলি এমনভাবে আয়ত্ত করে যে কাজটি তাদের কাছে সহজ হয়ে যায়। অনেকেই কাজে পদোন্নতির দিকে লক্ষ রেখে ভালো কাজ করে; কিন্তু যারা অভ্যাসের বশেই ভালো কাজ করে তারা আরও বেশি মোগ্য। একটি অভ্যাস তৈরি করা জমি চাষ করার মতো এতে সময় লাগে এবং এর জন্য অন্তরের প্রেরণা দরকার। এক অভ্যাস থেকে আর এক অভ্যাস তৈরি হয়। মানুষ অনুপ্রেরণা পেলে কাজ শুরু করে, কর্মোদ্যমের ফলে সে কাজ করে যায় এবং অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে কাজ আপনার থেকেই হয়।

বাধা-বিপত্তির মুখে সাহস দেখানোর ক্ষমতা, প্রলোভনের মুখে আত্ম-সংযম, আঘাত পেয়েও সুখী থাকার চেষ্টা, হতাশার সম্মুখে চরিত্রের শক্তি দেখানো, বাধার মধ্যে দিয়েও সুযোগ খুঁজে নেওয়া-মানুষের এই গুণগুলি কাকতালীয় ব্যাপার নয়। এগুলি শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের ফল। বাধার সম্মুখে আমাদের ব্যবহার আমাদের অনুশীলন করে থাকি, যেমন ছোটখাট বিষয়ে অসততা বা কাপুরষতা দেখিয়ে থাকি, তাহলে আমাদের পক্ষে জীবনের বড় বিষয়গুলির ইতিবাচক ভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। কারণ সেই ভাবে আমাদের অভ্যাস গড়ে তুলিনি।

যখন আমরা কোন বিষয়ে একটা মিথ্যা কথা বলি, দ্বিতীয় য়িবার মিথ্যা বলা সহজ হয়ে যায় ও পরে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়।

সাফল্যের জন্য কিছু বিষয় মেনে চলা দরকার এবং কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকার দরকার।

সেইলি মেনে চলা দরকার যেগুলি ইতিবাচক এবং সুফলদায়ী আর যেগুলি নেতিবাচক সেগুলির থেকে বিরত থাকা দরকার। এইভাব দুটি অভ্যাসই তৈরি করা প্রয়োজন। মানুষ যতটা না যুক্তিবাদী তা থেকেও বেশি ভাবাল। সততা এবং সর্বাঙ্গীণ ন্যায়পরায়ণতা, আমাদের বিশ্বাস এবং অনুশীলনের ফলশ্রুতি। অনেকদিন ধরে যা আমরা অনুশীলন করি, তা আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, এবং সেটি হয় আমাদের অভ্যাস। যে মানুষ সব সময় সত্য কথা বলে, সে প্রথম মিথ্যা বললে ধরা পড়ে যায়। আর যে মানুষ সব সময়েই অসৎ এবং মিথ্যা বলে, সে প্রথমবার সত্য বললে ধরা পড়ে যায়। সুতরাং সততা এবং অ-সততা দুটোই আমাদের অভ্যাস হয়ে দাড়াতে পারে।

আমাদের চিন্তার ধারাও আমাদের অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আমরা যেমন আমাদের অভ্যাস তৈরি করি, তেমনি অভ্যাস আমাদের চরিত্র গঠন করে। প্রকৃতপক্ষে আপনি বোঝবার আগেই অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। সেইজন্য সঠিক চিন্তা করে ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করা দরকার।

জনৈক ব্যক্তি বলেছিলেন-আমরা আমাদের চিন্তা করি, এবং কাজ অনুযায়ী আমাদের অভ্যাস তৈরি হয় এবং অভ্যাস আমাদের চরিত্র গঠন করে; আর চরিত্র আমাদের ভাগ্য গঠন করে।

সু-অভ্যাস তৈরি করা (Form good habits)

আমাদের ব্যবহার আমাদের অভ্যাসের ফলশ্রুতি। অভ্যাসের ফলে আমাদের কিছু কিছু ব্যবহার আপনা-আপনিই হয়ে যায়। চরিত্র আমাদের অভ্যাসের যোগফল। যদি কোন ব্যক্তির। ইতিবাচক অভ্যাস থাকে, তার চরিত্রও ইতিবাচ হয়। আবার নেতিবাচক অভ্যাসের ফলে নেতিবাচক চরিত্রের মানুষ হয়। যুক্তি এবং বিচারের থেকে অভ্যাস আরও শক্তিশালী। প্রথমে অভ্যাস এত দুর্বল থাকে তা বোঝা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে এত দৃঢ় হয়ে যায় যে সে অভ্যাস ত্যাগ করা কঠিন হয়। সু-অভ্যাস তৈরির জন্য দৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন।

বাল্যকালে আমার বাবা, মা আমাকে বলতেন-তোমার সু-অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন, কারণ অভ্যাস চরিত্র গঠন করে।

কিভাবে অভ্যাস তৈরি হয়? (How do we form habits)

আমরা যা পুনঃ পুনঃ করি, তা অভ্যাসে পরিণত হয়। কাজ করেই আমরা শিক্ষা লাভ করি সহসিকতার সঙ্গে কাজ করলে আমরা সাহসী হই। আমরা যদি সততা ন্যায় পরায়ণতা অভ্যাস করি তাহলে এই গুণগুলি আমাদের চরিত্রে অধিগত হয়। সেই ভাবে যদি আমরা নেতিবাচক গুণ-যেমন অ-সততা, অন্যায় ব্যবহার অথবা শৃঙ্খলা বোধের অভাব অভ্যাস করি, তাহলে সেগুলিই আমাদের চরিত্রে প্রকট হয়।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও অভ্যাসের দ্বারা তৈরি হয়। অভ্যাসই আমাদের মানসিক অবস্থার এবং বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (Conditoning)

আমাদের অনেক ব্যবহারই আপেক্ষিক অর্থাৎ অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে এই অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল আমরা যদি কোন কাজ ভালো করে করতে চাই, তবে তা স্বয়ংক্রয় ভাবেই হওয়া উচিত। যদি আমরা সচেতনভাবে চিন্তা করে সঠিক জিনিসটি করতে চাই তাহলে অনেক সময়ে ভালোভাবে করা যায় না। অর্থাৎ ভালোভাবে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরি করা দরকার।

আমরা সবসময়েই এবং সকলেই ক্রমাগত পরিবেশ এবং সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই এবং অনেক সময় আমরা রোবটের মত ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের ইতিবাচক অবস্থায় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত।

আমি যখন সামরিক বিদ্যার ছাত্রছিলাম, তখন আমি লক্ষ্য করেছি যে, যারা সর্বোচ্চ দক্ষতা দেখিয়ে ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছেন, তারাও ঘুসি মারার অথবা প্রতিপক্ষের ঘুসি থেকে বাঁচার ন্যায় প্রাথমিক বিষয়গুলিও অনুশীলন করেছেন। কারণ এরূপ অনুশীলনের ফলে তাদের দক্ষতা বাড়ে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মত এগুলি ব্যবহার করতে পারেন।

সু-অভ্যাস তৈরি করা মুসকিল। কিন্তু একবার তৈরি হলে, জীবন যাত্রা সহজ হয়ে যায়। বদ অভ্যাস খুব সহজেই তৈরি হয়। কিন্তু তারা জীবনকে দুর্বিষহ করে।

আমরা কিভাবে পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই? (How do we get conditioned?)

হাতির শক্তির কথা ভাবুন। শুড়ের দ্বারাই ১টনের বেশি ওজন তুলে ফেলতে পারে। তাহলে কিভাবে এই হাতিকে একটি সামান্য দড়ির সাহায্যে একটি খুঁটিতে বেঁধে রাখে। বাচ্চা অবস্থায় হাতিকে শক্ত শিকল ও মোটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। বাচ্চা তখন দুর্বল কিন্তু শিকল ও গাছ তখন খুব শক্ত। বাচ্চা আবার বাধা থাকাতে অভ্যস্ত নয় সুতরাং তখন শিকল টানা-টানি করে। কিন্তু সব সময়েই বিফল হয়। পরে একদিন বুঝতে পারে যে ঐ ভাবে টানাটানি করে কিছু হবেনা, তখন চুপ করে দাড়িয়ে থাকে, কারণ ততদিনে তার অভ্যাস তাকে নিয়ন্ত্রিত করে ফেলেছে।

বাচ্চা হাতি যখন বিরাট শক্তিশালী হাতিতে পরিণত হয় এবং তাকে যখন অশক্ত দড়ি এবং ছোট্ট কুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়, তখন কিন্তু এক ঝটকাতেই হাতি নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারে। কিন্তু তা করে না। কারণ ততদিনে অবস্থা তাকে নিয়ন্ত্রিত করে ফেলেছে।

মানুষ ও ক্রমাগত সচেতন কিম্বা অচেতন ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় তখন যখন সকল মানুষ নিম্নলিখিত উপায়ে প্রভাবিত হয়ঃ

  • কোনও বিশেষ ধরনের চলচিত্র বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান।
  • বিশেষ ধরনের গান শোনা।
  • বিশেষ ধরনের সংসর্গ।

গাড়িতে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় যদি কয়েকদিন ধরে প্রত্যেকদিনই একই ধরনের গান শুনি, তবে যেদিন গাড়িতে টেপরেকর্ডার বাজবেনা, অনুমান করুন সেদিন কী গানের সুর গাড়িতে যাওয়ার সময় আমরা ভাজবো? অবশ্যই যে সুর প্রত্যেক দিন শুনেছি সেই সূরই।

বলা হয়ে থাকে যে একই কাজ বার বার করা এবং প্রত্যেক বারই পৃথক ফল আশা করার নামই পাগলামি। যে কাজ বার বার করছেন, বার বার একই ফল লাভ করবেন। অভ্যাস পরিবর্তন করা খুবই কষ্টকর কারণ যা শেখা হয়েছে তা ভুলে যাওয়াও কষ্টকর।

GIG0 পদ্ধতি (The GIG0 principle)

কম্পিউটারের ভাষা GIG0 (Garbage in garbage out) খুব একটা ভালো নীতি।

আমরা যা যোগান দিই। উৎপাদনও তার সমান হয়। আমাদের অবচেতন মন যোগান বা উৎপাদনের গুণ নিয়ে ভেদাভেদ করে না।

আমাদের অবচেতন মনে যা আসে, আমাদের ব্যবহারের ওপর তার প্রভাব পড়বে। টেলিভিশন আমাদের নীতিবোধ ও চিন্তা এবং সৎ সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। অনেক সময়ে ভালো প্রভাব বিস্তার করে আবার অনেক সময় খারাপ প্রভাবও। টেলিভিশণ অনেক প্রয়োজনীয় খবর আমাদের দেয় কিন্তু এই সঙ্গে আমাদের রুচিকে অবনমিত করে। আমাদের নীতিবোধকে বিকৃত করে এবং অল্প বয়স থেকে অপরাধ প্রবণ করে। বাক স্বাধীনতা অথবা টেলিভিশনের -এর স্বাধীনতার জন্য আমাদের যথেষ্ট কঠিন মুল্য দিতে হয়। একটি তরুণ ১৮ বৎসর বয়সের মধ্যে টেলিভিশনে অন্তত ২ লক্ষ হিংসাত্মক ঘটনা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করে থাকে। (Source As in selling powe, National Times, March 1906. p.40.)

বিজ্ঞাপন দাতারা তাদের দর্শকদের বিভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রিত করে। বিজ্ঞাপন উৎপন্ন দ্রব্যের বিক্রি বাড়িয়ে দেয়, তা না হলে কোম্পানী গুলি বিজ্ঞাপন দেবে কেন? যখন আমরা টিভিতে কিংবা রেডিওতে বিজ্ঞাপন দেখি বা শুনি, আমরা সচেতন ভাবে না দেখলে অথবা

শুনলেও আমাদের অবচেতন মনে যা দেখানো হচ্ছে অথবা যা শুনছি তা সঞ্চিত হয়ে যায়। আমরা তো আর টিভি/ রেডিওর সঙ্গে তর্ক করতে পারি না।

আমরা যখন সিনেমা দেখি আমরা হাসি কিম্বা কাঁদি, তার কারণ চলচ্চিত্র থেকে আমরা যে ভাবাবেগের যোগান পাই, তা তাৎক্ষণিকভাবে এক অন্যধরনের ভাবাবেগ উৎপন্ন করে। যোগানের পরিবর্তন করুন, উৎপাদিত বস্তৃরও পরিবর্তন ঘটবে।

সচেতন এবং অবচেতন মন। (The conscious and subconscious mind)

স্মরণ রাখবেন আমাদের সচেতন মনের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। সচেতন মন গ্রহণ বা বর্জন করতে পারে। কিন্তু অবচেতন মন কেবলমাত্র গ্রহণ করে। এবং যা গ্রহণ করে তার ভালো মন্দ নিয়ে বাছ-বিচার করে না। যদি আমরা মনকে সন্দেহ ও ঘৃণা দিয়ে ভরে দিই, তাহলে স্বাভিভাবের ফলে ঐ চিন্তাগুলি বাস্তব বলে মনের মধ্যে গৃহীত হবে। অবচেতন মন কম্পিউটারের ডেট-এর মতো। কিন্তু আরও বেশি শক্তিশালী। অবচেতন মন মটর গাড়ির এর মতে, সচেতন মন চালকের মতো। চালিকা শক্তি মটরের এর মতই আছে, কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চালকের।

অবচেতন মন, আমাদের পক্ষে কিম্বা বিপক্ষে কাজ করে। এই মন যুক্তিবাদী নয়। যখন আমরা অসফল হই, তখন অবচেতন মনে নতুন ভাবে নতুন জিনিস যোগানের প্রয়োজন হয়।

অবচেতন মন একটি বাগানের মতো, কী গাছ লাগাচ্ছেন তাতে কিছু যায় আসে না। এই বিষয়ে বাগান নিরপেক্ষ, তবে কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। যদি ভালো বীজ লাগান, তাহলে ভালো বাগান পাবেন আর তা না হলে বাগান জংলা গাছে ভরে উঠবে। আমি এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলব যে ভালো বীজ পুতলেও আগাছা জন্মাবে! সুতরাং আগাছা উপরে ফেলার চেষ্টা ক্রমাগত করে যেতে হবে। এর সঙ্গে মানুষের মনের কোন তফাৎ নেই। স্মরণ রাখবেন ইতিবাচক ও নেতিবাচক চিন্তা একই সময়ে এবং একই সঙ্গে মনকে অধিকার করতে পারে।

বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি টেলিভিশনে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেখানোর সময় যে বিজ্ঞাপন দেয় সেই সব ৩০ সেকভের বিজ্ঞাপনের জন্য ২০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত খরচ করে। আমরা অনেক সময়ে বিপন দেখে ঠান্ডা পানীয় কি দাঁতের মাজন কিনি। আমরা আসলে দাঁতের মাজন চাই না। বিজ্ঞাপনে যে সংস্থার মাজনের কথা বলেছে তাই চাই। ঐ বিজ্ঞাপন আমাদের অবচেতন মনে যে কাজ করেছে তাতে প্রভাবিত হই। সফল হওয়ার জন্য আমাদের ইতিবাচক ভাবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

কিভাবে মনকে পূর্বপরিকল্পনায় অভ্যস্ত করতে হয়? (How do we get programmed?)

স্মরণ করুন কিভাবে আমরা সাইকেল চড়া শিখেছি। এই শেখার বিরাট ধাপ আছে। প্রথম ধাপে সাইকেল চড়ার যোগ্যতা এই বিষয়টিও জানা নেই। অর্থাৎ অজ্ঞতা সম্পর্কেও অসচেতন। বালক যেমন জানে না সাইকেল চড়া জিনিসটা কী, এবং সে চড়তেও পারে না। এই সমস্যারই নাম অজ্ঞতা বিষয়ে অসচেতন।

দ্বিতীয় অবস্থাকে বলে সচেতন ভাবে অজ্ঞ। বালকটি একটু বড় হয়ে বুঝতে পারে সাইকেল চড়া বলতে কী বোঝায় কিন্তু এটাও জেনে যায় যে, সে সাইকেল চড়ার পদ্ধতি জানে না। তার অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন।

শিখতে শুরু করার পর তৃতীয় অবস্থা- যাকে বলে সচেতন ভাবে সাইকেল চালনায় সময় তার বিদ্যাকে এতবার প্রয়োগ করেছে যে সাইকেল চালানোর সময় আর তাকে পদ্ধতি সম্পর্কে ভাবতে হবে না। তার কাছে এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মতো। সাইকেল চালাতে চালাতে সে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে পারে কিংবা অন্যের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে পারে। এর মানে এই যে সাইকেল চড়ার সে অবচেতন দক্ষতা লাভ করেছে। এই অবস্থায় চিন্তা করে অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগাবার প্রয়োজন হয় না। এই দক্ষতা স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসের মতো হয়ে গিয়েছে।

আমাদের সমস্ত ইতিবাচক অবস্থাকে এই পর্যায়ে উন্নীত করতে চাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আমরা কয়েকটি নেতিবাচক অভ্যাসও অবচেতন ভাবে আয়ত্ত করে ফেলি এবং সেগুলিই আমাদের আত্মোন্নতির অন্তরায় হয়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ ধুমপায়ী ২১ বৎসর বয়সে ধূমপায়ী হয়ে যায়। যদি কেউ ২১ বৎসর বয়সে ধূমপায়ী না হয় তবে বাকি জীবন ধূমপানে অভ্যস্ত হওয়া কঠিন হবে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে অবচেতন ভাবে আমরা ধূমপানের অভ্যাস আয়ত্ত করি এবং অল্প বয়সেই অবচেতন ভাবে অভ্যস্ত হওয়া যায়।

প্রকৃত শূন্যতা বরদাস্ত করে না (Nature abhors a vacuum)

আমার টেনিস পাগল ১২ এবং ১৪ বৎসর বয়সের দুই ভাইপো আছে। একদিন তাদের বাবা অনুযোগ করছিলেন এই বলে যে, ছেলে দুটির টেনিস খেলার ব্যয় বেশি হচ্ছে। র্যাকেট বল, টেনিসকোর্টের ফী ছাড়া ইদানীং একটি কোচ রেখেছে। সব মিলিয়ে বেশ খরচার ব্যাপার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিসের সঙ্গে তুলনা করে ব্যয়বহুল বলে মনে হচ্ছে। ছেলে দুটির টেনিস খেলা নিশ্চয়ই বন্ধ করে দেওয়া যায় এবং তাতে কিছু টাকার সাশ্রয়ও হতে পারে। কিন্তু ছেলে দুটি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সারা বিকেলটা তাদের অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে কি করবে? দাদা কিছুক্ষণ ভাবলেন তারপর বললেন, আমার মনে হয় ওরা টেনিস খেলা চালিয়ে যাক, এতে বরং আখেরে কম খরচই হবে।ছেলে দুটিকে কোনও ইতিবাচক কাজে নিযুক্ত করাই তিনি সঠিক বলে মনে করেছিলেন। তা না হলে ওরা কিছু নেতিবাচক কাজ কর্মের দিকে আকৃষ্ট হোত, কারণ মানুষের প্রকৃতি তাকে নিষ্কর্মা থাকতে দেয় না। হয় কিছু ইতিবাচক করতে হবে কিংবা নেতিবাচক-মাঝামাঝি আর কোনও জায়গা নেই।

অভ্যাসের থেকেই চরিত্র গঠন হয়। যদি আমরা একটি মনোরম ব্যাক্তিত্ব গঠন করতে চাই, তাহলে আমাদের অভ্যাসগুলিকে খুব খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা দরকার। কোনও একটি অভ্যাস সাময়িক বিচ্যুতি হিসাবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা স্থায়ী বিচ্যুতিতে পরিণত হয়। নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করুন

১. নিজের কাজের মান নিম্নগামী হতে দিচ্ছেন।

২. খোশগল্পে সময় কাটাবার অভ্যাস আছে।

৩. ঈর্ষা ও আত্মম্ভরিতা কি আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী?

৪. আপনার সহমর্মিতা কি কম?

এই ভাবে আরও অনেক বলা যেতে পারে। আমরা অভ্যাসের দাস। এটি একদিকে ভালো এই জন্য যে যদি কোনও কাজ করার আগে সর্বদাই চিন্তা করতে থাকি, তাহলে কোনও কাজই করতে পারব না, আমাদের এত সময় নেই। আমরা আমাদের চিন্তাকে সু-শৃখল করে আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করি। এই জন্য আমাদের অবচেতন মনের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে হয়। শৈশবে আমাদের অভ্যাসগুলিকে তৈরি করতে হয়, ফলে পূর্ণ বয়সে চরিত্র গঠন সহজ হয়। এই জন্যই প্রথম জীবনে সঠিক অভ্যাস তৈরি করা দরকার, কিন্তু দেরি হলেও সবসময় শুরু করা যায়। ইতিবাচক এবং নেতিবাচক অভ্যাস তৈরির মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। নতুন অভ্যাস তৈরি করতে সময় লাগে, কিন্তু ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করলে জীবনে এক নতুন অর্থ বহন করে। আশাবাদী হওয়া কিংবা নিরাশাবাদী হওয়া এক ধরনের অভ্যাস। আমাদের অভ্যাসগুলি কষ্ট এবং আনন্দের ভিত্তিতে তৈরি হয়। আমরা যে কাজ করি তা কষ্ট এড়াবার জন্য এবং আনন্দ পাবার জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত কষ্টের থেকে আনন্দ বেশি, আমরা ঐ কাজের অভ্যাস বহাল রাখি।।

কিন্তু যদি আমাদের আনন্দের থেকে কষ্ট বেশি হয়, তাহলে তা পরিত্যাগ করি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যখন ডাক্তার ধুমপায়ীকে ধূমপান বন্ধ করার কথা বলেন, সে বলে, আমার অভ্যাস হয়ে গেছে, আমি পারব না। ধূমপান আমার ভালোলাগে এবং সে ধূমপান চালিয়ে যায় এখানে ধূমপানের আনন্দ কষ্টের থেকে বেশি। তারপর যখন একদিন জটিল সমস্যা দেখা দেয় তখন ডাক্তার বলেন, আপনি যদি বাঁচতে চান তাহলে এখনই ধূমপান বন্ধ করুন। তখন সে ধুমপান বন্ধ করে। কারণ ধূমপানের ফল, আনন্দ পাওয়ার থেকেও অনেক বেশি গুরুতর।

পরিবর্তন প্রতিরোধ করার ইচ্ছা (Resistance to change)

মানুষ যখন নেতিবাচক অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হয় তখন সে পরিবর্তনের অভ্যাস করে না কেন? কারণ পরিবর্তনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায় না।

তা ছাড়া ঐ অভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার যে আনন্দ সেই অভ্যাস পরিবর্তনের কষ্টের থেকে বেশি। কারণ অভ্যাস না পরিবর্তন করার কারণ হোল

  • পরিবর্তন করার ইচ্ছা নেই।
  • পরিবর্তনের জন্য যে শঙ্খলার দরকার তা নেই।
  • অভ্যাস পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সচেতনতার অভাব।

এই সব কারণে অনেক সময় আমরা আমাদের নেতিবাচক অভ্যাস ছাড়তে পারি না। এ বিয়য়ে আমাদের একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয় এই নেতিবাচক ব্যবহারকে আমরা অগ্রাহ্য করব এবং আশা করব যে একদিন লুট আপনা আপনি শুধরে যাবে অথবা সচেতন চেষ্টার দ্বারা এই নেতিবাচক অভ্যাসকে জয় করবে। ব্যবহারের পরিবর্তন অযৌক্তিক ভয়কে জয় করতে পারলেই এবং গতানুগতিকতার স্বাচ্ছন্দ্যকে ত্যাগ করলে ব্যবহারের পরিবর্তন আসে। স্মরণ রাখা দরকার আমরা বুঝে শুনেই ভয় পাই। সুতরাং ভয়কে বুঝে শুনেই ত্যাগ করা যায় এবং বোধ শক্তিকে বাড়িয়ে ভয়কে জয় করা যায়।

নেতিবাচক অভ্যাস পরিবর্তন না করার পক্ষে নিম্নলিখিত অজুহাতগুলি হয়ে থাকে।

(১) আমরা সব সময়েই এই ভাবে কাজ করে থাকি।

(২) আমরা কখনও অন্যভাবে করিনা।

(৩) এটি আমার কাজ নয়।

(৪) আমার মনে হয় না ব্যবহার পরিবর্তন করলে কোন তফাৎ হবে।

(৫) এই ভাবে ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য আমার সময় নেই।

ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করা (Forming positive habits)

পরিবর্তনের কোনও সময় সীমা নেই। আমাদের বয়স যাই হোক না কেন এবং যতদিনের অভ্যাস হোক না কেন, আমরা সচেতন ভাবে ব্যবহার পরিবর্তনের পদ্ধতি প্রয়োগ করে তা বদলাতে পারি।

অনেক সময়েই শোনা যায়, একটি বয়স্ক কুকুরকেও নতুন কলা-কৌশল শিক্ষা দেওয়া যায়। আমরা তো মানুষ, কুকুর নই। তাছাড়া আমরা কলা-কৌশল দেখাচ্ছি না-আমরা শুধুমাত্র নিজের ক্ষতিকারক ব্যবহারকে পরিবর্তন করে ইতিবাচক ব্যবহার শিখতে চাই।

জীবনে সফল ব্যক্তিদের গোপন রহস্য এই যে তারা এমন অভ্যাস তৈরি করে, যাতে অ-সাফল্যের কোন স্থান থাকে না। যারা অ-সফল হয়, তারা অনেক জিনিস করতে চায় না। অনেক সময় সফল ব্যক্তিরাও করতে চায় না; কিন্তু অনেক সময় অভ্যাসের বশে করতে থাকে। যেমন অ-সফল ব্যক্তিরা কঠোর শ্রম, শৃঙ্খলাবোধ, দায়বদ্ধতা পছন্দ করে না। সফল ব্যক্তিরাও পছন্দ করে না। কিন্তু যেহেতু তাদের অভ্যাস তৈরি হয়েছে, সেগুলি তারা স্বাভাবিক ভাবেই করে থাকে। অভ্যাস তৈরি খুব সামান্য ভাবে শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অভ্যাস ত্যাগ করা মুশকিল হয়।

আমদের দৃষ্টিভঙ্গিও এক ধরনের অভ্যাস এবং তারও পরিবর্তন করা যায়। এখানে বিষয়টি হচ্ছে যে পুরাতন নেতিবাচক অভ্যাসকে নতুন ইতিবাচক অভ্যাসের দ্বারা পরিবর্তিত করা যায়।

বদ অভ্যাসকে জয় করার থেকে বদঅভ্যাস তৈরি করা আপেক্ষাকৃত সহজ। প্রলোভন জয় করার থেকে সৎ অভ্যাস শুরু হয়। সূখী হওয়া এবং অসুখী হওয়া এগুলিও মানসিক অভ্যাস।

কাজের উৎকর্ষ হচ্ছে ক্রমাগত সচেতন প্রচেষ্টার ফল এবং শেস পর্যন্ত এটি অত্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। এটিকে অভ্যাসে পরিণত করতে হলে যথেষ্ট অনুশীলনের প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু নেতিবাচক অভ্যাস আছে, যা আমাদের অধঃপাতের দিকে নিয়ে যায়।

 

১৫ মিনিট সময় নিয়ে-একা একা শান্তচিত্তে, যে সমস্ত নেতিবাচক অভ্যাস আপনাকে অধঃপাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তার একটি তালিকা তৈরি করুন।

… … …

আরও ১৫ মিনিট সময় নিয়ে একা শান্তচিত্তে আপনি যে সমস্ত ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করতে চান,তারও একটি তালিকা তৈরি করুন।

… … …

২১ দিনের মধ্যে ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি (21.Day formula to form positive habits)

স্বাভিভাব (Auto suggestion)

স্বাভিভাব কী? অর্থ কী? অর্থ আপনি যা হতে চান তার একটি রূপরেখা। স্বাভিভাবের অর্থ আপনার নিজের সম্পর্কে একটি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের মত, যা কেবল আপনিই দেখবেন। এটি আপনার সচেতন ও অবচেতন মনকে প্রভাবিত করবে, ফলে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহারের ওপরেও প্রভাব পড়বে।

স্বাভিভাব আপনার অবচেতন মনে নিদিষ্ট পরিকল্পনা তৈরির একটি পদ্ধতি। এই পরিকল্পনা কখনও নেতিবাচক অথবা ইতিবাচক হতে পারে। নেতিবাচকের স্বাভিভাবের কয়েকটি উদাহারণ

  • আমি ক্লান্ত।
  • আমি খেলোয়াড় নই।
  • আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল।
  • আমি অঙ্কে কাঁচা।

যখন আমরা এই রকম নেতিবাচক স্বভাব গুলিকে নাড়া-চাড়া করি, তখন অবচেতন মনে এই বিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়। এটি ভবিষ্যৎবাণীর মত আমাদের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে।

যেমন কারো সঙ্গে কথা বলার সময়, তাকে যে কথা বলার ছিল, তা ভুলে গিয়ে আমি অন্য লোককে বলি, দেখুন আমি যা করতে চেয়েছি, তা ভুলে গিয়েছি, আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল।

মানুষ যখন প্রথম অপরাধ ঘটতে দেখে তখন তার মনে একটা ঘৃণার উদ্রেক হয়। যদি ক্রমাগত এই রকম অপরাধ দেখতে থাকে তাহলে ঘৃণা ধীরে ধীরে অপসারিত হয়ে এই

অপরাধে অভ্যাস হয়ে যায় এবং শেষপর্যন্ত হয়তো অপরাধীও হয়ে যায়।

এইভাবে নিজের দুর্ভাগ্য নিজেই তৈরি করে। যখন কোন ব্যক্তি অনেকদিন ধরে একটি বিশ্বাস মনের মধ্যে লালন পালন করে, সেই বিশ্বাস ধীরে ধীরে তার কাছে সত্য বলে প্রতিভাত হয়। একটি মিথ্যার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি অনেকদিন ধরে করলে তা সত্য বলে গৃহীত হয়।

ইতিবাচক স্বাভিভাব ক্রীড়াএবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে বহু ব্যবহিত। এই দুই ক্ষেত্রে ইতিবাচক আশ্বাস দেওয়া হয় কেন? কারণ আমরা আমাদের মনে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করতে চাই, যা আমাদের আসার সঙ্গে সঙ্গতি রাখে। আমরা সব সময়েই আশা করি য়ে এই বিশ্বাসটি সত্যে পরিণত হবে। স্বাভিভাব এক ধরনের পুনরাবৃত্তিও বটে। কোন ব্যক্তি যদি নিজের সম্পর্কে বার বার পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা অবচেতন মনে গেথে যায়।

স্বাভিভার কখনো নেতিবাচক ভাবে অভ্যাস করা উচিত নয়। আমি উত্তেজিত নই, কিংবা আমি ক্রুদ্ধ নই। এরকম মনোভাবে বিশেষ লাভ হয় না। ইতিবাচক ধারনাই অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে, কারন ইতিবাচক ধারনা একটি বিশেষ ছবি তৈরি করে।

যখন বলি নীল হাতির সম্পর্কে চিন্তা করতে তখন মনে যে চিন্তা আসে নীল হাতির। মায়ের কথা যখন মনে করি তখন মনে মা-এর ছবি ফুটে ওঠে। সেই সময় কেউ অন্য চিন্তা করে না।

স্বাভিভাবের মধ্যে যদি একটি নেতিবাচক শব্দে আসে তাহলে মনের মধ্যে একটি নেতিবাচক চিত্র তৈরি হয়, আমরা তা এড়িয়ে যেতে চাই।

আমরা বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করি কেন? তার কারণ আমাদের মন একটি প্রকৃত অভিজ্ঞতা এবং কল্পিত অবস্থার মধ্যে তফাৎ সহজে বুঝতে পারে না। যেমন ধরুন ৯ টার সময় ছেলে ফিরবে বলে বাবা-মা অপেক্ষা করছে, রাত ১ টা বেজে গেল কিন্তু ছেলে ফিরলো না তখন তাদের মনের অবস্থা কিরূপ হবে? তারা স্বভাবতই আশা করবেন সব ঠিক আছে, কিন্তু ছেলে কোনও দুর্ঘটনায় পড়েনি। এদিকে কিন্তু উৎকণ্ঠায় তাদের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। এটি তাদের অভিজ্ঞতা, কারণ- বাস্তব তারা জানেন না। বাস্তবে হয়তো দেখা যাবে যে ছেলেটি একটি পার্টিতে মজা করছে এবং দায়িত্ব-জ্ঞানহীন ভাবে বাড়ি আসার সময় ভুলে গেছে।

অবস্থাটিকে উল্টে দিন, ধরুন ছেলেটি বাড়ি ফিরছিল এবং এক দুর্ঘটনায় পড়ে ১টা পর্যন্ত বাড়ি এলো না। এতেও উৎকণ্ঠায় বাবা-মায়ের রক্ত চাপ বেড়ে যাবে।

প্রথম অবস্থায় ছিল একটি কল্পিত অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়টি সত্য।

দুই ক্ষেত্রেইবাবা-মায়ের শারীরিক প্রতিক্রিয়া একই রকম। আমাদের মন একটি এবং কল্পিত অভিজ্ঞতার তফাৎ বুঝতে পারে না।

অবেচেতন মনকে তৈরি করুন (repare the subsconcious)

কিভাবে ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করার জন্য এবং নেতিবাচক অভ্যাস ত্যাগ করার জন্য স্বাভাবিক ব্যবহার করা যায়। আমরা সকলেই অচেতন ভাবে স্বাভিভাবকে ব্যবহার করি। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়-যখন খুব ভোরের এরোপ্লেন ধরতে হয়, তখন নিজেই বলি যে খুব ভোরে উঠতে হবে এবং সব সময়েই এমনকি অ্যালাম্ ঘড়ি ছাড়াই তোরে উঠে পড়ি। আমাদের অবচেতন মনের প্রস্তুতি এইভাবে আমাদের তৈরি করে দেয়। স্বাভিভাব মনকে পরিকল্পনা মাফিক তৈরি করে এবং সেই পরিকল্পনাকে কাজে পরিণত করার জন্য নিজেকে তৈরি করে। একটি ইতিবাচক বক্তব্যকে বার বার পুনরাবৃত্তি করে আমাদের অবচেতন মনকে প্রস্তুত করার এবং তাকে বাস্তবে রুপায়িত করার নামই স্বাভিভাব।

পুনারাবৃত্তি একটি বক্তব্য বা চিন্তাকে কেবল পুনরাবৃত্তি করলে চলবে না, সেটিকে আবেগও অনুভূতির সঙ্গে চিন্তা করতে হবে, তবেই সম্ভব হবে বাস্তবে রূপায়ণ। দুরদৃষ্টি ছাড়া স্বাভাবিক ফলপ্রসূ হবে না। প্রথম যখন আমাদের মনে স্বাভিভাবের উদয় হয়, তখন আমরা

এটিকে পরিত্যাগ করি। কারণ এটি তখন আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাফল্য নির্ভর করবে আমাদের মনঃসংযোগ ক্ষমতা এবং পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তির উপর।

স্বাভিভাব অনুসরণ করার পদ্ধতিঃ

(১) এমন একটি জায়গায় যান যেখানে কেউ বিরক্ত করবে না।

(২) নিজের পরিকল্পনা লিখে ফেলুন।

(৩) যা শুরু করেছেন, তা শেষ করার জন্য আত্ম-শৃবলার প্রয়োজন। স্বাভিভাব চরিত্র গঠনে একটি ক্ষমতাশীল যন্ত্র।

স্বাভিভাবকে বাস্তবে রূপায়ণ(Translating auto-suggestion into reality)

১. বর্তমানের জন্য আপনার স্বাভিভাবের একটি তালিকা তৈরী করুন।

২. দিনে অন্তত ২ বার স্বাভিতাব ওলিকে উচ্চারণ করুন।

প্রথমে সকালবেলায় তারপর দিনের শেষে। সকালে মন থাকে সজীব এবং গ্রহণ উন্মুখ। রাত্রে আপনার ইতিবাচক চিত্রটিকে অবচেতন মনের গভীরে জমা করে দিন।

২১ দিন এই ভাবে পুনরুচ্চারণ করুন যতক্ষণ পর্যও তা অভ্যাসে পরিণত না হয়। ৪. শুধু স্বাভিভাবে কাজ হবে না দরকার দুরদৃষ্টির।

দূরদৃষ্টি (Visualization)।

এর অর্থ আপনি যা পেতে চান। যা করতে চান এবং যে রকম মানুষ হতে চান, তার একটি মানসিক চিত্র তৈরি করা। দুরদৃষ্টি স্বাভিভাবের সঙ্গে হাত ধরে চলে। দুরদৃষ্টি ব্যতিত স্বাভিভাব একটি যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি মাত্র। তা কখনও কার্যকরী হবে না।

ফলপেতে হলে সব-সময়েই আবেগ ও অনুভূতিকে স্বাভিতাবের সঙ্গে একাত্ম করে রাখতে হয়।

একটি সর্তক বাণীঃ

স্বাভিভাব হয়ত মনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা-এবং প্রথমে এটিকে অন্য ধরনের চিন্তা বলে মনে হবে।

উদাহরণ দিয়ে বলি, বিগত কয়েক দশক ধরে আমি বিশ্বাস করেছি যে আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল। কিন্তু এখন হঠাৎ আমি নিজেকে বললাম, আমার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো। আমার মন এটি গ্রহণ করল না- বললোতুমি মিথুক, তোমার স্মৃতিশক্তি খারাপ কারণ এতদিন ধরে মন বিশ্বাস করেছে যে, আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। এই ধারণা দুর করতে ২১ দিন সময় লাগবে। ২১দিন কেন? কারণ অন্ততপক্ষে ২১ দিন সচেতন এবং বার বার অনুশীলনে একটি অভ্যাস তৈরী হয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ২১ দিনের সচেতন চেষ্টার কি এমনই গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যা দিয়ে জীবনকে সুপথে পরিচালিত করা যায়? ব্যাপারটি খুব সরল মনে হলেও সহজ নয়। আমি খুব আশ্চার্য হব না, যদি কেবল মুষ্টিমেয় কিছু লোক এই কর্মসূচী মেনে চলে।

 

কাজের পরিকল্পনা (Action plan)

১. স্বাভিভাবের একটি তালিকা তৈরি করুন।

২. ২১ দিনের কার্যক্রম-দূরদৃষ্টির সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *