০৫. ব্যক্তি বিষয়ে দক্ষতা

ব্যক্তি বিষয়ে দক্ষতা
INTERPERSONAL SKILLS
একটি আনন্দময় ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার উপায়
Building a pleasing personality
অধ্যায় – ৫

পৃথিবীতে অন্য কোনও যোগ্যতার চেয়ে মানুষ নিয়ে কাজ করার যোগ্যতার অন্য আমি বেশি মাইনে দিতে পারি। একথা বলেছিলেন জন রকফেলার।

ব্যবসাতে আর কোনও সমস্যা নেই; প্রধান সমস্যা হোল কমাদের সমস্যা।

কর্মীদের সমস্যার সমাধান হলেই ব্যবসায়ের অন্য সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। কর্মীদের সম্পর্কে জ্ঞান সংস্থায় উপাদন সম্পর্কিত কোনও বিষয়ে জ্ঞানের থেকে বেশি গুরুত্ত্বপূর্ণ।

সফলব্যক্তিরা মধুর ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং এই জন্যই তারা মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ করার শক্তি লাভ করেন। মধুর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষকে সহজে চেনা যায়, কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্বকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাদের হাঁটাচলা, কথাবার্তা, গলারস্বর, ব্যবহারের উষ্ণতা এবং নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস তাদের ব্যক্তিত্বকে অনন্যতা দিয়েছে। বয়স যাইহোক না কেন, কোনও ব্যক্তি তাদের মুখমণ্ডলের ও হৃদয়ের আকর্ষণীয়তা হারান। একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার এবং প্রকাশভঙ্গি মিলিতভাবে একটি মধুর ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি করে। চোখ-মুখের প্রসন্নতা ভালো পোশাক পরিচ্ছদের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আকর্ষণীয় আদব কায়দার দ্বারা দুর্বল চরিত্রকে আড়াল করে রাখা যায় কিন্তু সে কেবল অল্পদিনের জন্য-শীঘ্রই সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। চরিত্র বিহীন দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের উপর যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা জীবনকে দুঃখময় করে তোলে। যে ব্যক্তির সহকর্মীকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতা আছে তার যদি চরিত্র না থাকে তবে তা হয় নিণ সুদর্শন মানুষের মতো। এ বিষয়ে শেষ কথা হল, জীবনে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন চরিত্র এবং সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করার শক্তি-এই দুইয়ের সংমিশ্রন। জর্জ-ওয়াশিংটনের একটি উপদেশ এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। সবার প্রতি ভদ্র শচরণ কর, কিন্তু মাত্র কয়েক জনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবে, এবং তার আগে তারা তোমার বিশ্বাসভাজন হওয়ার যোগ্য কিনা তা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে নেবে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব একটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা চারা গাছের মত। বেড়ে উঠতে গিয়ে চারা গাছটিকে সমস্ত প্রতিকূলতার ধাক্কা সামলাতে হবে, তবেই সেটি হবে একটি বৃক্ষ। -George Washington, January 15, 1783

জীবন একটি প্রতিধ্বনির মত (Life is an echo)

একটি বালক তার মায়ের উপর রাগ করে চেঁচিয়ে বলল, আমি তোমাকে ঘৃণা করি। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। মায়ের বকুনির ভয়ে সে বাড়ি থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। একটু দূরে একটি পাহাড় ৫ উপত্যকায় গিয়ে সে আবার চেঁচিয়ে বলর, আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি তোমাকে ঘৃণা করি। পাহাড় থেকে প্রতিধ্বনি ফিরে এল আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি তোমাকে ঘৃণা করি। ছেলেটি জীবনে এই প্রথম প্রতিধ্বনি শুনল। ভয় পেয়ে সে দৌড়ে মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে মাকে বলল, মা, পাহাড়ে একটা খারাপ ছেলে চেঁচিয়ে বলছে,  তোমাকে ঘৃণা করি। মা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ছেলেকে উপত্যকায় ফিরে গিয়ে চিৎকার করে বলতে বললেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, ছোট ছেলেটি ফিরে গিয়ে উচ্চস্বরে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্রতিধ্বনি ফিরে এল। বাচ্চা ছেলেটির শিক্ষা হোল, আমাদের জীবন প্রতিধ্বনির মতঃ যা দিই তাই ফিরে পাই।

বেজ্ঞামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, আমরা যখন অপরের নিকট ভালো হই, তখন আমরা নিজেদের কাছে সর্বোত্তম।

জীবন যেন একটি ব্যুমেরাং (life is a boomerang)

আমাদের চিন্তা, কাজকর্ম, ব্যবহার যাই হোক না কেন সেগুলি আজ হোক, কাল হোক আমাদের কাছে নির্ভুল লক্ষ্যে ফিরে আসবে। জীবনে উন্নতির পথে পথে যাদের সঙ্গে হবে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন, কারণ যখন নীচে নামবেন তখন আবার তাদের সঙ্গেই দেখা হবে। নীচের গল্পটি The best ……………of bits and pieces (Economics Press, Fairfiedl, NJ, 1994, pp. 84-85) থেকে নেওয়া।

অনেক বছর আগে দুটি ছেলে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কষ্ট করে পড়াশুনা করত। তাদের টাকা পয়সা যখন খুব বিপজ্জনক ভাবে কমে এল তখন তাদের মাখায় এক ফন্দি এল। তারা ঠিক করল ইগন্যাসি প্যাডারেউস্কিকে (Ignacy Paderewski) দিয়ে একটি পিয়ানো বাজানোর আসর বসিয়ে কিছু টাকা-পয়সা তুলে তাদের থাকার খরচ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দেবে।

বিখ্যাত পিয়ানোবাদকের ম্যানেজার দুহাজার জলারের গ্যারান্টি চাইলেন। দুহাজার ডলার সেই সময় অনেক টাকা; কিন্তু তবুও ছেলেদুটি রাজি হয়ে গেল। এবং পিয়ানো বাজানোর আসরের উদ্যোগ আয়োজন করতে শুরু করল। অনেক চেষ্টা করেও কিন্তু তারা ১৬০০ ডলারের বেশি তুলতে পারল না।

আসর শেষ হলে ছেলে দুটি সেই মহান শিল্পীকে খারাপ খবরটি শোনাল। শিল্পীকে তারা ১৬০০ ডলার এবং ৪০০ ডলারের একটি প্রতিজ্ঞাপত্র লিখে দিয়ে বলল যে তারা যথ তাড়াতাড়ি সম্ভব বাকি ৪০০ ডলার যোগাড় করে দেবে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ হয়ে গেল বরেই মনে হল।

প্যাডারেউস্কি তাতে রাজি হলেন না। তিনি সেই প্রতিজ্ঞাপত্র ছিড়ে ফেলে দিয়ে টাকাটাও তাদের হাতে দিলেন এবং বললেন, এই টাকা থেকে তোমাদের খরচখরচা মেটাও। যা বাকি থাকবে তার থেকে তোমরা দুজনে ১০ শতাংশ হারে তোমাদের জন্য রাখ। বাকি টাকাটা আমার।

তারপর অনেক বছর কেটে গেল। প্রথম মহাযুদ্ধও শেষ হোল। প্যাডারেউস্কি তখন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তার দেশের হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের আনুসংস্থানে ব্যস্ত। হার্বাট হুভার তখন আমেরিকার খাদ্য ও সাহায্য বিভাগের প্রধান। তিনি প্যাডারেউস্কির আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েক হাজার টন খাদ্য পোল্যান্ডে পাঠিয়ে দিলেন।

খাদ্যাভাব প্রশমিত হলে প্যাডারেউস্কি নিজেই প্যারিসে এলেন ইভারকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য। হুভার বললেন, ঠিক আছে, মিঃ প্যাডারেউস্কি, আপনার হয়ত মনে নেই, আমি যখন ছাত্র ছিলাম এবং বিপদে পড়েছিলাম, আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন।

র্যালফ ওয়ালডো এমারসন (Ralph waldo emerson) বলেছেন, জীবনের সুন্দরতম প্রাপ্তি হচ্ছে, আন্তরিকভাবে অপরকে সাহায্য করা। ফলে প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরই সাহায্য করি।

যা কিছু সুন্দর ও ভালো তা নিজস্ব নিয়মে ফিরে আসে। প্রতিদান পাওয়ার বাসনায় ভালো করার প্রয়োজন হয় না-প্রতিদান আপনিই পাওয়া যায়।

আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে দেখি, প্রকৃত অবস্থা দেখিনা (We see things not the way they are but the way we are)

গল্প আছে, এক জ্ঞানী ব্যক্তি যখন গ্রামের বাইরে বসেছিলেন তখন একজন পথিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি আমার গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে চাই,

এখন আপনি বলুন, এই গ্রামে কী ধরনের লোক বাস করেন? জ্ঞানী ব্যক্তিটি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনার গ্রামে কী ধরনের মানুষ বাস করেন? পথিক জবাব দিলেন, তারা সকলেই নীচ, নিষ্ঠুর এবং দুর্ব্যবহারী, জ্ঞানী ব্যক্তিটি তখন বললেন, এই গ্রামে একই ধরনের লোক বাস করেন। কিছুক্ষণ পরে আর একজন পথিক এসে জ্ঞানী ব্যক্তিকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। উত্তরে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনি যে গ্রাম থেকে চলে আসতে চান সেখানে কী ধরনের লোক বাস করেন। পথিক জবাব দিলেন,  সেখানে মানুষ খুব দয়াল, বিনয়ী, ভদ্র এবং সৎ। জ্ঞাণী ব্যক্তিটি বললেন, এই গ্রামেও আপনি ঐ ধরনের লোক দেখবেন।

এই গল্পটির নীতিশিক্ষা কী? অনেক সময়েই আমরা সংসারকে আমাদের মত করে দেখি। অনেক সময় অন্যের ব্যবহার আমাদের ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া মাত্র।

আস্থা (Trust)

আমার বিশ্বাস, সমস্ত সম্পর্কই পারস্পরিক আস্থার উপর নির্ভরশীল, যেমন মালিককর্মচারী, মাতাপিতা ও সন্তান, স্বামী ও স্ত্রী, ছাত্র ও শিক্ষক, ক্রেতা ও বিক্রেতা, খরিদ্দার ও বিক্রয়কারী। সার্বিক সততা ব্যতীত আস্থা জন্মায় না। আস্থার সংকট মানেই সত্যের সংকট।

অন্যের উপর আস্থা স্থাপন করলে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ে।

কী কী উপাদান বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়?

  • বিশ্বস্ততা-এর ফরে কোনও ব্যক্তির ব্যবহার সম্পর্কে আগেই ধারণা করা যায়। কাজ দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হলেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা যায়।
  • সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবহার ও কাজকর্মের দ্বারা বিশ্বাস অর্জন করা যায়।
  • শ্রদ্ধা-নিজেকে এবং অন্যকে শ্রদ্ধা করলে মর্যাদাবোধ তৈরি হয় এবং একটি সহানুভূতিশীল মনোভাবও তৈরি।
  • নিরপেক্ষতা -সততা ও ন্যায়বিচারের উপর নির্ভর করে সামঞ্জস্য-কাজ ও কথার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। আপনি কি সেই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করতে পারেন যে মুখে এক রকম কথা বলে, কিন্তু কাজে অন্য রকম করে?
  • কর্মদক্ষতা-সামর্থ্য ও ইচ্ছা, এই দুইয়ে মিলে তৈরি হয় কর্মদক্ষতা।
  • সততা-বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার মূল উপাদান।
  • গ্রহণ যোগ্যতা- যদিও আমাদের সব সময়ে কর্মক্ষমতাকে উন্নত করার চেষ্টা করা উচিত, তবুও পরস্পরকে ভালো মন্দ সহ গ্রহণ করা উচিত।
  • চরিত্র-সমস্ত যোগ্যতা সত্ত্বেও চরিত্রহীন ব্যক্তিকে কেউ গ্রহণ করতে পারে না। ভালোবাসার থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি মহৎ গুণ। অনেকেই ভালোবাসতে পারে, কিন্তু আমরা তাদের উপর আস্থা রাখতে পারিনা। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাঙ্কের হিসাবের মতো টাকা জমা পড়লে তা বেড়ে যায় এবং আমরাও সেখান থেকে টাকা তুলতে পারি। কিন্তু যদি কিছু জমা না দিয়ে শুধু তুলে নিতে থাকি তাহলে শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়।

অনেক সময় মনে হতে পারে যে, হয়ত বেশি তুলে নিয়েছি, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বেশি জমাই পড়েনি।

পারস্পরিক খারাপ সম্পর্ক ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবের কয়েকটি ফলাফল নীচে উল্লেখ করা হোল।

  • মানসিক চাপ
  • স্বাস্থ্যভঙ্গ
  • পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব অবিশ্বাস
  • বিরক্তি
  • ক্রোধ
  • মানসিক সীমাবদ্ধতা
  • সংস্কার
  • ইচ্ছার অভাব।
  • আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে পড়া
  • বিশাসযোগ্যতার অভাব
  • অসহযোগিতা
  • আত্মসম্মানবোধের অভাব
  • সংঘাত
  • সন্দেহ।
  • হতাশা
  • উৎপাদনশীলতা নষ্ট
  • অসুখী হওয়া
  • নিঃসঙ্গতা

কী কারণে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করা ও রক্ষা করা যায় না? (What are some factors that prevent building and maintaining positive relationhips?)

অনেক গুলি কারণ সহশবোধ্য, আর কয়েকটি এই অধ্যায়ের শেষে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

স্বার্থপরতা

  • ভদ্রতাবোধের অভাব
  • অবিবেচক ব্যবহার
  • অঙ্গীকার রক্ষা না করা।
  • রূঢ় ব্যবহার
  • সততা ও ঋজু নৈতিকতার অভাব
  • আত্মকেন্দ্রিকতা-নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে মানুষ একটি ছোট মোড়কের মধ্যে নিজেকে মুড়ে ফেলে।
  • ঔদ্ধত্য-উদ্ধত ব্যক্তি তার নিজের শিক্ষা ও মতামতেই সীমাবদ্ধ। ফলে তার অজ্ঞতা চিরস্থায়ী।
  • আত্মগর্ব-প্রকৃতিতে শুন্যতা থাকে না বলে শূন্য মস্তিস্ক আত্মগর্বে পূর্ণ হয়।

জন অহংকার করে বলল, আমার ছেলে দেখছি আমার বুদ্ধিটা পেয়েছে। তার স্ত্রী জবাব দিল, আমারও তাই বিশ্বাস, কারণ আমার বুদ্ধি দেখছি আমারই রয়ে গেছে।

  • নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
  • বদ্ধ মানসিকতা
  • অপরের বক্তব্য শোনায় অনিচ্ছা
  • সন্দেহ প্রবণতা
  • মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব (নীতিবোধ হীন)
  • শৃঙ্খলার অভাব।
  • সহমর্মিতার অভাব (নিষ্ঠুরতা দুর্বলতার চিহ্ন)
  • দৈর্যহীনতা।
  • ক্রোধ-উমেজাজ মানুষকে বিপদে ফেলে, এবং অহংবোধের ফলে বিপদ থেকে উদ্ধার পায় না।
  • কূট কৌশলী ব্যবহার
  • পলায়নী মনোভাব ও ব্যবহার
  • অতি অভিমানী প্রকৃতি
  • অসংগতি সত্য স্বীকারে অনীহা। অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা
  • উদাসীন মনোভাব-উপেক্ষিত হলে মন প্রসন্ন হয় না। এর দ্বারা সংযুক্ত না হওয়ার মনোভাবই প্রকট হয়।
  • লোভ-সমূদ্রের নোনা জলের মত। যতই পান করা যায় ততই তৃষ্ণা বেড়ে যায়।

এটি সম্ভবত সম্পূর্ণ তালিকা নয়। আমাদের অনেকের মধ্যে উপরি-উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি পরিলক্ষিত হবে। অনেকের মধ্যে আবার একটি অন্যটির চেয়ে বেশি থাকতে পারে। বৈশিষ্ট্যগুলির মূল্যায়ন করে তাদের মধ্যে একটি সঙ্গতি আনাই তালিকার উদ্দেশ্য।

অহংবোধ ও গর্ববোধের মধ্যে পার্থক্য (The difference between ego and pride)

পরস্পরের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে সব চেয়ে বড় বাধা হোল অহংবোধ। অহংবোধ আত্মউত্তেজক। এই নেতিবাচক গর্ববোধের ফলশ্রুতি হোল ঔদ্ধত্য। সার্থক ভাবে কোনও কাজ সম্পাদন কররে যে আনন্দ পাওয়া যায় সেই আনন্দের সবিনয় প্রকাশই স্বাস্থ্যকর গর্ববোধ। অহংবোধ মানুষকে আত্মম্ভরি করে কিন্তু গর্ববোধ মানুষের হৃদয়কে দরাজ করে। আত্মম্ভরিতা অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে, কিন্তু দরাজ হৃদয় মানুষকে দেয় নম্রতা।

কাজে যত বড় সাফল্য অর্জন করুন না কেন, আত্মম্ভরি হওয়ার কোনও কারণই থাকতে পারে না। গর্ববোধ থাকতে পারে, আত্মম্ভরিতা নয়।

অহংবোধ-সবজান্তা মনোভাব (Ego-The Lknow It all attitude)

যে সমস্ত মানুষের অহংবোধ বেশি তাদের পৃথিবীটা নিজেদের মধ্যেই আবর্তিত হয়। একজন অহংবোধী মানুষ তাদের সীমাবদ্ধতা হেতু মাঝে মাঝে মজার অবস্থার সৃষ্টি করে। এক উপরওয়ালা একদিন তার এক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি সত্যিই কোনও পদোন্নতি চান কিনা। কর্মচারীটি উত্তর দিলেন, সত্যিই আমি পদোন্নতি চাই আমি তার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি। উপর -ওয়ালা জবাব দিলেন, তুমি প্রমোশন পাবে না, কারণ তুমি আমাকে পাশ কাটিয়ে আর একজনের নিকট প্রমোশনের জন্য তদ্বির করছ। এই প্রসঙ্গে নট রোকটি (Knutc Rockne) এর কথাটি স্মরণ যোগ্য, অহংবোধ অনুভূতি নাশক ওষুধের মতো, বোকামির যন্ত্রণাকেও অসাড় করে দেয়।

স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য কী? (What is the difference between selfidhness and self-interest)

এই দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্যটি অনুধাবন করা দরকার।

স্বার্থপরতা নেতিবাচক ও ক্ষতিকারক। নেতিবাচক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। সব সময়েই স্বার্থপর ব্যক্তিরা জয় কিংবা পরাজয়ের আশা করে থাকে। কিন্তু নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে প্রয়াস তা যেমন নিজের জয় প্রত্যাশা করে, তেমনি অপরের জয়েও ক্ষুন্ন হয় না। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

দ্বেষ/ ঈর্ষা-কাকড়ার মনোবৃত্তি (Envy? Jealousy – Crab mentality)

কাঁকড়ার মনোবৃত্তি কী? কেমন করে কাঁকড়া ধরা হয় জানেন? যার ঢাকনা নেই, এমন একটা বাক্সের একটা দিক খুলে কাঁকড়া আছে, এমন জায়গায় রেখে দেওয়া হয়। কাঁকড়া ঢুকে গেলে বাক্সের সেই দিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাক্সের কোনও ঢাকনা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কাঁকড়ারা বাক্সের গা বেয়ে উপরে উঠে পালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কেউ পালাতে পারে না। কারণ একটা কাঁকড়া যখন গা বেয়ে উপরে উঠতে যায় তখন আর একটা তার পা ধরে টেনে নামায়। ফলে সবগুলোই বাক্সে থেকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত রান্নাঘরে তাদের রান্না করা হয়।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকেদেরও একই অবস্থা। তারা নিজেরাও জীবনে বেশিদূর যেতে পারে এবং অন্যদেরও যেতে দেয় না। ঈর্ষাপরায়ণতা আত্মসম্মান হীনতার লক্ষণ। শুধু মানুষ নয়, দেশের ও জাতির মধ্যেও এই ঈর্ষাপরায়ণতা দেখা যায়। ঈর্ষাপরায়ণতার ফলে অবনমন শুরু হয়, এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফল খারাপ হয়, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পক্ষে। ঈর্ষা মানুষকে নষ্ট করে।

খালিমন নয়, খোলা মন থাকা উচিত (One should have an open mind rather than an empty mind)

খোলামন ও খালিমনের মধ্যে তফাৎ কী? খোলা মনের মানুষ নমনীয় চরিত্রের হয়, কোনও মতামত বা ধারণার প্রকৃত মূল্য বিচার করে তা গ্রহণ করা বা বর্জন করার মত ক্ষমতা তাদের আছে। বারি মন যাদের তারা মূল্যায়ন না করেই গ্রহণ করেন, ফলে, তাদের মন অলো খারাপ সমস্ত কিছুরই জমায়েতের জায়গা হয়ে ওঠে।

ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠনের পদ্ধতি (Steps to building a positive personality)

প্রথম পদ্ধতিঃ দাযিত্ব গ্রহণ করুন। (Step! : Accept responsibility)।

এলবার্ট হুবার্ড (Elbert Hubbard) বলেছেন, দায়িত্ব তাদের উপরেই ন্যস্ত হয়, যাদের দায়িত্ব বহনের ক্ষমতা আছে। যখন কেউ অতিরিক্ত দাযিত্বভার গ্রহণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তাদের পদোন্নতি হয়।

দায়বদ্ধতা স্বীকার করে নিলেই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ পায়। এবং এর দ্বারাই মানুষের মানসিক পূর্ণতার প্রকাশ ঘটে। ভালো কাজের জন্য কৃতিত্ব দাবী করার লোকের অভাব হয় না; কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটরে তার দায়িত্ব নেওয়ার লোক পাওয়া যায় না। দায়িত্ব না নিলে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হওয়া যায় না। সুতরাং দায়িত্ব গ্রহণের অনুশীলন করা উচিত। বাল্যকাল থেকেই দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া উচিত, কিন্তু অবাধ্য হলে এই শিক্ষা দেওয়া যায় না।

দোষ দেওয়ার অভ্যাস বর্জন করুন নিম্নরূপ বাক্যাংশ ব্যবহার করবেন না, যেমন

  • প্রত্যেকেই আপনার মত কাজ করে থাকে
  • অথবা কেই তো আপনার মতো করে না, অথবা
  • এ সমস্তই তোমার দোষে

যারা দায়িত্ব নেয় না, তারা সব সময়েই বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বংশ, ঈশ্বর, ভাগ্য, কপাল অথবা গ্রহ নক্ষত্রকে দোষারোপ করে। জনি বলল, মা, জিমি জানালার কাঁচ ভেঙ্গেছে। মা জিজ্ঞেস করলেন,  কেমন করে ভাঙ্গল। জনি উত্তর দিল, আমি ওর দিকে একটা পাথর ছুড়েছিলাম। ও সরে যেতেই জানালাম লাগল।

যে সমস্ত ব্যাক্তিরা দায়িত্ব না নিয়ে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তারা শেষ পর্যন্ত ঐ সমস্ত সুযোগ সুবিধা হারান। দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ সুচিন্তিত কার্যক্রম গ্রহণ করা।

ক্ষুদ্রতা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন করে

এই মন্তব্যটি নিয়ে চিন্তা করুন। ক্ষুদ্রমনের ব্যক্তিরা সব সময়েই নিজের দায়িত্ব অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের কর্তব্য এড়িয়ে যেতে চান।

সামাজিক দায়িত্ব

প্রাচীন ভারতের শিক্ষা হচ্ছে যে আমাদের প্রথম দায়িত্ব আমাদের সমাজের প্রতি, দ্বিতীয়ত আমাদের পারিবারের প্রতি, এবং তৃতীয়ত আমাদের নিজের প্রতি। কিন্তু যদি এই ক্রম বিপরীত হয়ে যায় তবে আমাদের সমাজের অবক্ষয় শুরু হয়। সামাজিক দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য হওয়া উচিত। দায়িত্ব ও স্বাধীনতা পরস্পর হাত ধরে চলে। একজন সত্নাগরিকের লক্ষণ হচ্ছে যে তিনি নাগহরিক হিসাবে তার দায়িত্ব পালন করতে সব সময়েই ইচ্ছুক থাকবেন।

উইনস্টন চার্চিলের (Winston Churchill) এর মন্তব্য, দায়িত্ব গ্রহণ ও পালনের মধ্যদিয়েই মহত্বের মূল্য দিতে হয়। দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের দুষ্কর্মের জন্য সমাজ ধ্বংস হয় না; সৎ মানুষের অকর্মণ্যতার জন্য সমাজের ক্ষতি হয় বেশি। কথাটিকে পরস্পর বিরোধী মনে হতে পারে। যদি অকর্মণ্য থেকে সমাজকে নষ্ট করে তারে তারা সৎ হলেন কিভাবে? তারা কি তাদের সমাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন?

এই প্রসঙ্গেই এডমান্ড বার্ক (Edmund Burke) বলেছেন যদি সত্ব্যক্তির কিছুই না করেন তা হলে সমাজে দুষ্কৃতীরাই প্রাধান্য লাভ করবে।

দ্বিতীয় পদ্ধতি ও সুবিবেচনা (Step 2 : Consideration)।

একটি দশ বছরের বালক আইসক্রীমের পরিচারিকাকে একটি আইসক্রীম কোনের দাম জিজ্ঞেস করল, পরিচারিকা জবাব দিলে, ৭৫ সেন্ট। ছেলেটি তার কাছে যে পয়সা ছিল তা গুণতে আরম্ভ করল। তারপর জিজ্ঞেস করল, একটা ছোট আইসক্রীম কাপের কত দাম। পরিচারিকা একটু অসহিষ্ণুভাবে জবাব দিল, ৬৫ সেন্ট, ছেলেটি একটি ছোট আইসক্রীম কাপ নিল। আইসক্রীমটি শেষ করে দাম চুকিয়ে দিয়ে চলে গেল। পরিচারিকা যখন প্লেটটি তুলতে এল, তখন দেখন প্লেটের নীচে দশ সেন্ট রাখা আছে তার বকশিশ হিসেবে। বাচ্চা ছেলেটি নিজে আইসক্রীম খাওয়ার আগে পরিচারিকার কথাও ভেবেছে। নিজের কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে অপরের কথা চিন্তা করে সে দেখিয়েছে তার সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা।

এই ছেলেটির মত যদি সকলেই চিন্তা করেন তবে পৃথিবীটা বাস করার উত্তম জায়গা হয়ে উঠবে। অপরের প্রতি সুবিবেচনা সৌজন্য ও বিনম্রতা প্রদর্শন করুন। সৃচিন্তিত ব্যবহারের মধ্যেই সহমর্মিতা প্রকাশ পাবে।

তৃতীয় পদ্দতি ও সকলের লাভ হোক এই চিন্তা করুন (Step 3: Think win। win)

মৃত্যুর পর এক ব্যক্তি সেন্ট পিটারের নিকট গেল, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন স্বর্গ ও নরকের মধ্যে কোথায় তিনি যেতে চান। সেই ব্যক্তি বেছে নেওয়ার আগে জায়গা দুটি দেখে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেন্ট পিটার তাকে প্রথমে নরকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি বড় টেবিল ঘিরে সারি সাবি লোক, টেবিলের উপর অজস্র খাদ্যসম্ভার, গান বাজছে, কিন্তু লোকগুলির শুকনো মলিন মুখ, দুঃখীদুঃখী ভাব। তাদের মুখে কোনও হাসি নেই, এবং সকলেই ক্ষুধার্ত। তাদের হাত দুটি ৪ ফুট লম্বা কাঁটা ও ছুরির সঙ্গে বাঁধা। তাবা টেবিলের মাঝখান থেকে খাবার নিয়ে মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।

তারপর সেন্ট পিটার সেই ব্যক্তিকে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। সেখানেও বড় হলঘরের মাঝখানে টেবিল এবং টেবিলের মাঝখানে অনেক খাবার। গান বাজছে, টেবিলের দুই দিকে অনেক লোক, এবং তাদেরও হাতে ছুরি-কাটা বাধা। কিন্তু সেখানে দেখা গেল লোকগুলির মুখে হাসি। তারা স্বাস্থ্যবান এবং ক্ষুধার্ত নয়। দেখা গেল, তারা ছুরি-কাটা দিয়ে খাবার তুলে টেবিলের অন্যদিকে যারা আছে তাদের মুখে দিচ্ছে। ফলে প্রত্যেকেই খেতে পারছে। ফলে তারা তৃপ্ত স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ খুশি ও সন্তুষ্ট। কারণ তারা শুধু নিজেদের কথা ভাবছে না; তারা শুধু নিজেরাই খেতে চাইছেনা, অন্যেরাও খেতে পারুক, তাও চাইছে। এটি আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা যখন খরিদ্দারদের, পরিবারের, নিয়োগকর্তার এবং কর্মচারীদের প্রয়োজন মেটাই, তখন আমরা লাভই করি।

চতুর্থ পদ্ধতি ও সতর্কতার সঙ্গে শব্দ চয়ন করুন (Step 4: choose your words carefully)

যে ব্যক্তি মনে যা আসে তাই বলেন, শেষ পর্যন্ত তাকে তাই শুনতে হয় যা তিনি পছন্দ করেনা। বাক্য ব্যবহারে সুতরাং কৌশলী হওয়া দরকার। কৌশলের অর্থ ব্যবহারের আগে শব্দ সতর্ক ভাবে চয়ন করা প্রয়োজন, এবং কতটা বলা প্রয়োজন তাও নির্ধারণ করা দরকার। কী বলা দরকার তা আগেই অনুধাবন করা প্রয়োজন, কী না বলা ভালো তাও। যাদের সহজাত কর্মদক্ষতা আছে তাদের পক্ষেও কৌশলী হওয়া বাঞ্ছনীয়। কথাবার্তাতে মনোভাব প্রকাশ পায়। কথাতেই মানুষ আঘাত পায়, এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যত মানুষ আহত হয়েছে তার বেশি লোক অশোভন ভাষা ব্যবহারের ফলে আঘাত পেয়েছে। যা বলতে পছন্দ করেন সেই কথা বলার থেকে বিবেচনা করে ভাষা প্রয়োগ করুন। প্রজ্ঞা ও মৃধতার মধ্যে তফাৎ এইখানেই। বেশি কথা বললেই ভাবের প্রকাশ ঘটে না। কম কথা বলেও বেশি প্রকাশ করুন। মুখ না ভেবে কথা বলে, বিজ্ঞ ব্যক্তি চিন্তা না করে কিছু বলেন না।

তিক্ত মনোভাব নিয়ে কথা বললে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, তার দ্বারাই অনেক সময় তাদের ভবিষ্যৎ বির্ধারিত হয়ে যায়।

কথা একবার বললে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না (Spoken words cant be retrieved)

এক কৃষক তার প্রতিবেশী সম্পর্কে নিন্দামন্দ করেছিল। ভুল বুঝতে পেরে সে গেল এক ধর্মউপদেষ্টার কাছে ক্ষমা চাইবার জন্য। ধর্ম উপদেষ্টা তাকে

একবস্তা পালক নিয়ে গিয়ে শহরের মাঝখানে ঢেলে দিয়ে আসতে বললেন। কৃষক কথামত কাজ করল। তারপর ধর্ম উপদেষ্টা কৃষককে শহরের মাঝখানে গিয়ে পালকগুলি পুনরায় বস্তায় ভরে আনতে বললেন। কৃষক চেষ্টা করল-কিন্তু দেখা গেল সব পালকই হাওয়ায় উড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। খালি বস্তা নিয়ে যখন কৃষক ফিরে এল, তখন ধর্ম উপদেষ্টা তাকে বললেন, তোমার কথাগুলিও ঐ পালকের মতো। তুমি সহজেই বলে ফেলেছ, কিন্তু তারপরে, আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। সুতরাং সতর্কতার সঙ্গে বাক্য ব্যবহার করবে।

পঞ্চম পদ্ধতি : সমালোচনা এবং অভিযোগ করবেন না (Step 3: Dont criticize and complain)।

এখানে নৈতিবাচক সমালোচনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সমালোচনা কেন করা হবে? কাউকে সমালোচনা করলেই সে আত্মরক্ষায় উদ্যোগী হয়। তার অর্থ কী এই যে আমরা কখনও কারুর সমালোচনা করব না। অথবা ইতিবাচক সমালোচনা করতে পারব না? সমালোচক যেমন কালকের পিছনে বসে গাড়ি চালাচ্ছে-নান সমালোচনায় গাড়ির চালককে পাগল করে দিচ্ছে।

ইতিবাচক সমালোচনা

গঠনমূলক সমালোচনা কী? কাউকে নিরস্ত করার জন্য নয়, তাকে সাহায্য করার জন্য সমালোচনা করুন। সমালোচনায় সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দিন। ব্যবহারের সমালোচনা করুন, ব্যক্তির নয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমালোচনায় আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। সাহায্য করার আগ্রহ থেকেই সমাল্লোচনা করার অধিকার জন্মে। সমালোচনা করে সমালোচক যদি আনন্দ না পান, তবে সেই মানসিকতাই সঠিক। আর যখন সমালোচনা করার আনন্দেই সমালোচনা করা হয় তখন সব রকমের সমালোচনাই বন্ধ করে করে দেওয়া উচিত।

আনুপ্রাণিত করতে পারে এমন সমালোচনা কিভাবে করতে হয় সে বিষয়ে কয়েকটি সূত্র নির্দেশ?

  • প্রশিক্ষকের মতো সাহায্য করার দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা করুন। ক্রীড়া প্রশিক্ষকরা খেলার উন্নতি করার জন্যই খেলোয়াড়ের ভুল-ত্রুটি নির্দেশ করেন।
  • যার সমালোচনা করা হয় তার অবস্থা সম্যকরূপে অনুধাবন করলেও তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করলে তাকে অনুপ্রাণিত করা হয়।
  • সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি হবে সংশোধন করার, শাস্তি দাতার নয়।
  • সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সমালোচনা না করে, সবসময় বা কখনও ইত্যাদি কথা ব্যবহার করলে শুধু ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
  • নির্ভুল তথ্য উপেক্ষা করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। আমাদের সকলেরই নিজস্ব মতামত থাকার অধিকার আছে: কিন্তু ভুল তথ্যের উপর নির্ভর করার অধিকার নেই। তাই চটজলদি সমালোচনা করা উচিত নয়।
  • মাথা ঠাণ্ডা রাখুন, কিন্তু নিজের বক্তব্যে অনড় থাকুন।
  • বোঝাবার জন্য সমালোচনা করুন, ভয় দেখাবার জন্য নয়।
  • যথার্থ সমালোচনা হলে, পুনরুল্লেখের প্রয়োজন কম হয়।
  • জনসমক্ষে নয়, নিজেদের মধ্যে সমালোচনা করুন; কারণ তাতে পারস্পরিক সম্পর্ক খারাপ হবে না। জনসমক্ষে সমালোচনা অপমানজনক।
  • সমালোচিত ব্যক্তিকে তার বক্তব্য রাখার সুযো দিন।
  • ভুল সংশোধন কররে তারা কিভাবে উপকৃত হবে তা দেখিয়ে দিন।
  • কাজকর্মের সমালোচনা করুন, ব্যক্তির নয়।
  • ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ করবেন না।
  • ভুল কাজের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা দেখিয়ে দিন, এবং সংশোধন না করলে কী কুফল হবে না উল্লেখ করুন।
  • উন্নত কর্মপন্থার জন্য কী সূত্রনির্দেশ করতে পারেন তা জানতে চান।
  • বিশেষ প্রেক্ষিতেই সমালোচনা সীমাবদ্ধ রাখুন। সমালোচনার মাত্রা ছাড়াবেন না।
  • সমালোচনা ওষুধের মতো-সঠিক সংমিশ্রণ ও ঠিক মাত্রায় হওয়া দরকার। মাত্রা বেশি হলে খারাপ প্রতিক্রিয়া হবে; আবার কম হলে কোনও কাজ হবে না। সেই রকম সময়ে সঠিক মাত্রায় সমালোচনা হলে আশ্চর্য ফল পাওয়া যায়।
  • সমালোচতি ব্যক্তিরা যদি ভুল বুঝে ইতিবাচক মনোভাব দেখান তবে তাদের অভিনন্দন জানান।
  • ভালো কাজের প্রশংসা করে একটি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বক্তব্য শেষ করুন। সমালোচনা গ্রহণ করার রীতি

কখনও কখনও ন্যায় সঙ্গতভাবে, কখনও বা অন্যায় ভাবে আমরা সমালোচিত হই। পৃথিবীর মহত্তম ব্যক্তিরাও সমালোচিত হয়েছেন। ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা অনেক সাহায্য করে, তাই এরূপ সমালোচনাকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করা উচিত। অন্যায্য সমালোচনা প্রকৃত পক্ষে প্রশংসা হিসাবেই গণ্য করা যায়। গড়পড়তা মানুষ সফলতাম ব্যক্তিদের ঘৃণা করে তাই অন্যায্য সমালোচনার শিকার হতে হয়। যারা সফল হতে হতে পারেন না, সমালোচকদের তাদের সম্পর্কে কিছুই বলার থাকে না।

যদি আপনি কিছু না করেন, কিংবা কিছু না বলেন কিংবা আপনার কিছু না থাকে তা হলে আপনার কেউ সমালোচনাও করবে না। আপনার জীবনও শেষ হবে কিছু না করেই।

অন্যায্য সমালোচনার উৎস দুটিঃ

১. অজ্ঞতা : যখন অজ্ঞতা হেতু সমালোচনা করে তখন সেই অজ্ঞতা দূর করতে পারলে অন্যায্য সমালোচনাও বন্ধ করা যায়।

২. ঈর্ষা ও ঈর্ষজাত সমালোচনাকে ছদ্মবেশে প্রশংসা বলেই গ্রহণ করা উচিত। সমালোচক আসলে আপনি যেখানে উঠেছেন সেখানে পৌঁছাতে চান; পারেন নি বলেই সমালোচনা। যে গাছে বেশি ফল ফলে সেই গাছকেই পাথরের আঘাত সহ্য করতে হয় বেশি।

গঠন মূলক সমালোচনা গ্রহণ করার অক্ষমতা আত্মমর্যাদা বোধের অভাবই সূচীত করে। কিভাবে এই সমালোচনা গ্রহণ করা উচিত সে সম্পর্কে কিছু সূত্র নির্দেশ করা যেতে পারে?

  • যথার্থ মানসিকতা নিয়ে সমালোচনা গ্রহণ করুন। ঔদার্যের সঙ্গে গ্রহণ করুন, ক্ষোভের সঙ্গে নয়।
  • সমালোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।
  • খোলা মনে সমালোচনাকে গ্রহণ করুন, সমালোচনার মূল্যায়ন করুন এবং সারবত্তা থাকলে সেই অনুসারে সংশোধন করুন।
  • গঠনমূলক সমালোচককে ধন্যবাদ জানান কারণ তিনি ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই সাহায্য করতে চেয়েছেন।
  • উচ্চ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি ইতিবাচক সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে উন্নতর করা চেষ্টা করেন, কখনও তিক্ত মনোভাব পোষণ করেন না।

অধিকাংশ মানুষই অবশ্য মনে করেন যে লোকে তাদের প্রশংসা করুক, তাতে শেষপর্যন্ত তাদের ক্ষতি হলেও যায় আসে না।

অভিযোগ

কিছু লোক আছেন যাদের স্বভাবই হোল অভিযোগ করার। যদি গরম পড়ে তবে খুব গরম, যদি ঠান্ডা হয় তবে খুব ঠান্ডা। প্রত্যেক দিনই খারাপ দিন। যদি সমস্ত ঠিক ঠাক চলে তবুও তারা অভিযোগ করেন। কিন্তু অভিযোগ করা ভালো পদ্ধতি নয় কেন? কারণ শতকরা ৫০ ভাগ লোক আপনার সমস্যা সম্পর্কে মোটেই চিন্তিত নয়, আর বাকি ৫০ ভাগ খুশি কারণ আপনি সমস্যায় পড়েছেন। সুতরাং অভিযোগ করে লাভ কী? শেষে তো কোনও সুরাহা হয় না। শেষে অভিযোগ করাটা অভ্যাসে দাড়িয়ে যায় তার মানে অবশ্য এই নয় যে কখনও অভিযোগ জানাবেন না, বা কারুব অভিযোগ আছে কিনা তা জানতে চাইবেন না। সমালোচনার মতই, যদি অভিযোগও আছে কিনা তা জানতে চাইবেন না। সমালোচনার মতই, যদি অভিযোগও ইতিবাচক হয় তাহলে অভিযোগে সুফল পাওয়া যেতে পারে। গঠনমূলক অভিযোগ হোলঃ

(ক) যখন অভিযোগকারী যথেষ্ট দায়িত্বশীলভাবে অভিযোগ করেন।

(খ) অভিযুক্তকে সংশোধন করার জন্য দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া হয়।

যষ্ঠ পতি প্রসন্ন এবং সদয় হোন (Step 6: Smile and be kind)

হাসি (Smile) From The Best of  Bits & Pieces, Economics Press, Fairfield, NJ.1994., p.170

একটু মৃদু হাসির কোনও দাম লাগে না, কিন্তু এই হাসি হেসে কেউ দরিদ্র হয়ে যায় না, লাভবান হয় এক পলকের এক টুকরো হাসির স্মৃতি হয়ত অমলিন থাকবে চিরকাল। পৃথিবীর কেউই এত ধনী নয় যে ক্ষণেকের হাসি ছাড়াই দারিদ্রের কিছুটা অবসান হবে। হাসি পরিবারে আনে সুখ। ব্যবসাই তৈরি করে সদিচ্ছার সুস্থ বাতাবরণ। হাসি বন্ধুত্বের নিশ্চিত স্বাক্ষর, শ্রান্তর বিশ্রাম, হতাশের আশা, ব্যথিরে ব্যথার প্রলেপ এবং বিপত্তির শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক। এই ধন কিন্তু ভিক্ষা করে, ধার করে, কিনে বা চুরী করে পাওয়া যায়না। কারণ এই অমুল্যধন কেউ সদিচ্ছায় না দিলে তার কোন মূল্যই নেই। সারাদিনের কাজের ক্লান্তিতে তোমার পরিচিতেরা হয়ত হাসতে ভুলে যাবে। তুমি ভুলো না। যাদের সহানুভূতি দেখাবার কেউ নেই তাদেরই হাসিমুখে সম্ভাষণ করা প্রয়োজন বেশি।

প্রসন্নতা আসে মানুষের শুভবোধ থেকে। হাসি নকল হতে পারে আবার আন্তরিকও হতে পারে। আন্তরিক হাসির প্রসন্নতাই বিবেচ্য। বস্তুতপক্ষে জটি করার থেকে হাসি শরীরের পেশীর প্রক্রিয়া হিসেবে সহজতর। হাসিমুখ সবসময়েই আকাক্ষিত। কেই বা গোমড়া মুখের সান্নিধ্য চায়? আরও বেশি গোমড়া মুখ-ওয়ালার উষ্ণ আন্তরিক হাসি যেমন হৃদয়কে প্রকাশ করে তেমনি কপট হাসিও মনকে চিনিয়ে দেয়।

সপ্তম পদ্ধতি : অপরের ব্যবহারের ইতিবাচক ব্যাখ্যা করুন (Step 7: Put positive interpretation on other peoples behaviour)

অনেক সময় উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই লোকে অন্যের কাজকর্মের নেতিবাচক ব্যাখ্যা করে থাকে। অনেকে আত্মসর্বস্ব চিন্তায় ভোগেন, এবং মনে মনে ভাবেন যে সারা পৃথিবী তাদেরকেই লক্ষ্য বস্তু করে রেখেছে। এটা সত্য নয়। ইতিবাচক মনোভাব থাকলে একটি আনন্দময় ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে এবং তার ফলস্বরূপ ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা কাউকে ফোন করে না পেরে, আশা করি যে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি সুযোগ মত ফোনে যোগাযোগ করবে। দিন দুই ফোন না পাওয়া গেলে আমরা ধরে নিই যে, ভদ্রলোক ফোন করার কোনও আগ্রহ দেখান নি, কিংবা তিনি উপেক্ষা করেছেন। এগুলি নেতিবাচক চিন্তা। এমন হতে পারে যেঃ

  • চেষ্টা করেছিলেন, লাইন পান নি।
  • কোনও বার্তা রেখেছিলেন, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি।
  • কোনও জরুরী কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।
  • কোনও টেলিফোনের কথাই জানেন না।

এরূপ অনেক কারণ থাকতে পারে। সুতরাং তাকে সন্দেহের সুবিধা দিয়ে একটি ইতিবাচক অবস্থান থেকেই অগ্রসর হওয়া উচিত।

অষ্টম পদ্ধতি : ভালো শ্রোতা হোন (Step 8: Be a good listener)

নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করুন। আপনার নিজের কি মনে হবে যখন আপনি কাউকে কিছু বলতে চান, এবং

  • তিনিই বেশি কথা বললেন, আপনার কথা বিশেষ কিছুই শুনলেন না।
  • আপনার প্রথম বক্তব্যের সঙ্গেই একমত হতে পারলেন না।
  • প্রতিপদে আপনাকে বাধা দিলেন।
  • অধৈধভাবে আপনার প্রতিবার্কের তিনিই পাদপূরণ করলেন।
  • মন দিয়ে শুনলেন না।
  • কানে শুনলেন, কিন্তু অন্তরের গ্রহণ করার মতো একাগ্রচিত্তে শোনেন নি। তাই একই বিষয় তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করতে হয়েছে।
  • তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্তে এসেছেন।
  • চপলমতি এবং অন্যদিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।
  • স্বাভাবিক ভাবেই শোনেননি ও মানোযোগ দেননি।

এরূপ ব্যবহার বিষয়টিতে বা বক্তার সম্পর্কে আগ্রহহীনতা প্রকাশ করে, সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রতাবোধের অভাব প্রকাশ পায়।

যে ব্যক্তিব্য বক্তব্য শোনা হল না, তার মনোভাব কি নীচের শব্দগুলি প্রকাশ করতে পারে?

  • উপেক্ষিত
  • মর্যাদাহানি
  • বাতিল হয়ে যাওয়া
  • বিরক্ত
  • অবসাদগ্রস্থ
  • মুখতা
  • কথার খেলাপ করা

অপদার্থতা

  • গুরুত্বহীনতা
  • লজ্জাজনক অবস্থা
  • ছোট হয়ে যাওয়া
  • প্রেরণাহীনতা
  • অবহেলিত
  • নৈরাশ্য

অবস্থাটিকে উল্টো করে দেখা যাক। আপনি কি রকম মনে করবেন যখন আপনার বক্তব্য যাদের মনোযোগ সহকারে শোনার কথা, তারা

  • আপনাকে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বক্তব্য রাখতে দেয়।
  • তাদের অখন্ড মনোযোগ দিয়ে শোনে।
  • যথাযথ ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে।
  • আপনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। নীচের কথাগুলি কি বক্তা হিসেবে আপনার মনোভাব বর্ণনা করবে?
  • গুরুত্বপূর্ণ
  • শুভ
  • খুশি
  • সুখী।
  • সন্তুষ্ট
  • প্রশংসিত
  • সময়োপযোগী
  • উৎসাহিত
  • পছন্দসই
  • অনুপ্রাণিত

কার্যকর ভাবে বক্তব্য শোনার পথে কী কী বাধা?

বাইরের বাধা

অন্তরের বাধা

বাহ্যিক কারণে মনঃসংযোগ ক্ষুন্ন মনে অন্যচিন্তা কিংবা অন্যমনস্কতা হওয়া।

গোলমাল — কুসংস্কার এবং মানুষ সম্পর্কে আগেই ধারণা করা।

ক্লান্তি — বক্তা কিংবা বিষয় বস্তুকে কোনও আগ্রহ নেই।

এছাড়া কিছু বুদ্ধি বা বোধ শক্তিগত বাধা থাকতে পারে যেমন ভাষা, অনুধাবন ক্ষমতা ইত্যাদি। অপরকে বক্তব্যে অনুপ্রাণিত করতে হলে, একজন ভালো শ্রোতা হওয়া দরকার।

শোনা মানেই পছন্দ হওয়া। যখন কোনও ব্যক্তির প্রতি বিশেষ পছন্দের মনোভাব দেখান তখন সেই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ফলে তিনি বেশি অনুপ্রেরণা লাভ করেন এবং নতুন নতুন ভাবধারা গ্রহণে সক্ষম হয়ে ওঠেন।

খোলা কান উক্ত হৃদয়ের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য লক্ষণ। -ডেভিড অগসবার্গার

ভালো শ্রোতা হওয়ার জন্য,

  • বক্তাকে কথা বলতে উৎসাহিত করুন।
  • প্রশ্ন করুন। এতে ঔৎসুক্য বোৰা যায়।
  • মাঝপথে বাধা দেবেন না।
  • বিষয়বস্তু বদলাবেন না।
  • সম্মান দেখান ও সমঝদারীর পরিচয় রাখুন।
  • মনোযোগ দিন, মনঃসংযোগ করুন।
  • বিক্ষিপ্ত চিত্ততা পরিত্যাগ করুন।
  • সহমর্মিতা দেখান।
  • ভোলা মন নিয়ে চলুন। পূর্বতন ধারাণা বা সংস্কার যেন শোনা থেকে বিরত না করে।
  • বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থে মনঃসংযোগ করুন-উপস্থাপনের পদ্ধতিতে নয়।
  • বাচনিক যোগাযোগের বাইরে, যেমন মুখের অভিব্যক্তি, দৃষ্টির সঙ্গে সংযোগ ইত্যাদি লক্ষ্য করুন। এই গুলির দ্বারা বাচনিক বক্তব্যের অতীত অন্য একটি বক্তব্য হয়ত ইপস্থাপন করা হয়।
  • বক্তার অনুভূতিগুলিও অনুধাবন করার চেষ্টা করুন, কেবল কথাগুলি নয়।

নবম পদ্ধতি – উদ্যমী হোন (Step 9: Be cnthusiastic)

উদ্যম ব্যতীত কোনও মহৎ কাজ সিদ্ধ হয় না। -Ralph waldo Emerson

উদ্যম ও সাফল্য হাত ধরাধরি করে চলে। কিন্তু প্রথমে প্রয়োজন উদ্যমের। উদ্যম আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, মনোবল উন্নত করে, আনুগত্য তৈরি করে এবং বলা যায় এটি একটি অমূল্য সম্পদ। উদ্যম ছোঁয়াচে-একজন থেকে অপরজনে সঞ্চারিত হয়। একজন মানুষের কথাবার্তা, চলাফেরা এমনকি তার সঙ্গে করমদন থেকে তার উদ্যম অনুভব করা যায়। উদ্যম একটি অভ্যাসের মতো-এটি আহরণ করা ও অনুশীলন করা যায়।

অনেক দশক আগে চার্লস সোয়াব (Charles Schwab) বছরে এক মিলয়ন ডলার বেতন পাচ্ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ইস্পাত তৈরিতে বিরল দক্ষতার জন্যই কি তাকে এত মাইনে দেওয়া হয়? চার্লস সোয়ব জবাব দিলেন, আমার মনে হয় আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হোল মানুষকে উদ্যমী করে তোলার ক্ষমতা এবং মানুষের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ শক্তি আছে তাকে প্রশংসা ও উৎসাহের দ্বারা জাগ্রত করে তোলা।

জীবনে বাঁচার মত করে বাঁচতে হয়। মরার আগে মরে বেঁচে থাকা বাঞ্চনীয় নয়। উদ্যম এবং আকাথা মানুষকে উৎকর্ষে পৌঁছে দেয়। এক ডিগ্রি উত্তাপের তফাতেই জল বাম্প হয় এবং সেই বাষ্প পৃথি র বৃহত্তম ইঞ্জিন চালাতে পারে। উদ্যমত্ত আমাদের জীবনে এই কাজ করতে পারে।

দশম পদ্ধতিঃ সৎ ও আন্তরিকভাবে কাজের মূল্য উপলব্ধি করে প্রশংসা করুন (Step 10 Give honest and sincere appreciation)

মনোবিদ উইলিয়াম জেমস বলেন, মানুষের মনের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে তার কাজের যথার্থ রূপে মূল্যায়ন এবং সেই অনুসারে প্রশংসা পাওয়া। নিজেকে অবাঞ্চিত মনে হলে মনে গভীর আঘাত পায়।

বহুমূল্য জহরত প্রকৃত উপহার নয়, তারা আসলে ত্রুটি বিচ্যুতি আড়াল করার অজুহাত মাত্র। অনেকসময় প্রিয়জনদের সান্নিধ্যের অভাব ভোলাবার জন্য উপহার দিয়ে থাকি কিন্তু সান্নিধ্যের অভাব মেটে না।

আন্তরিকভাবে কোন ব্যক্তির কাজের প্রশংসা করলে, সেইটিই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কার। এতে তার গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং কাজেও প্রেরণা পায়।

মাদার টেরেসা এই প্রসঙ্গে বলেছেন, আজকের দিনে কুষ্ঠ বা যক্ষারোগই সর্বাপেক্ষা জঘন্য রোগ নয়; সমাজে অবাঞ্চিত এই ধারণাটাই সর্বাপেক্ষা জঘন্য অসুখ।

কাজের মূল্য অনুধাবন কার্যকর ভাবে করতে হলে কয়েকটি নীতি মেনে চলা উচিত:

১. নির্দিষ্ট কারণে প্রশংসা করুন। যদি কাউকে বলা যায়, আপনি ভালো কাজ করেছেন, তা হলে সে প্রথমটা একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, কারণ কী ধরনের ভালো কাজ সে সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যখন বলা হবে যে আপনি খুব দক্ষতার সঙ্গে খুঁতখুঁতে খদ্দের সামলেছেন, তখন আর কোনও অস্পষ্টতা থাকছে না। কেন প্রশংসা করা হচ্ছে তা তার কাছে পরিষ্কার।

২. প্রশংসা কাজের সঙ্গে সঙ্গেই করা উচিত। প্রশংসা যোগ্য কিছু করার ছয়মাস পরে প্রশংসা করলে তাতে প্রশংসার মূল্য অনেক কমে যায়।

৩. প্রশংসা আন্তরিক হওয়া উচিত। এটি অন্তর থেকে আসা উচিত এবং প্রতিটি বাক্যই সচেতন ভাবে ব্যবহার করা হবে। কাজের প্রশংসা ও স্তাবকতার মধ্যে তফাৎ কী? তফাৎ হচ্ছে আন্তরিকতা। একটি অন্তর থেকে উৎসারিত, অপরটি মুখের বাক্যে সীমাবদ্ধ। একটি আন্তরিক, আর অন্যটির গুপ্ত উদ্দেশ্য আছে। স্তাবকতা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি স্তাবকতার শিকার হওয়াও উচিত নয়।

স্কুলে একটি পুরাতন নীতি কথা চালু আছে। বোকাদের খাদ্য হচ্ছে স্তাবকতা; কিন্তু মাঝে মাঝে যারা বুদ্ধিমান তারাও ঐ খাদ্যের অংশ বিশেষ খেয়ে থাকেন। -Jonathan Swift

৪. প্রশংসা বাক্যকে কিন্তু ইত্যাদি কথার দ্বারা সীমিত করবেন না। বরং এবং, এ ছাড়াও ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে দুটি বাক্যকে যোগ করুন। যেমন ধরুন, আমি আপনার প্রয়াসের প্রশংসা করি, এবং আপনি যদি………… ইত্যাদি বললে, যার প্রশংসা করা হোর তার মনে আঘাত লাগবে না। কিন্তু যদি বলা হয়, আপনার কাজের প্রশংসা করি, কিন্তু  তবে প্রশংসার ফল নষ্ট হয়ে যায়।

৫. প্রশংসা করার পর তার জন্য প্রশংসা প্রাপকের নিকট থেকে কোনও স্বীকৃতি পত্র নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ আবার প্রতিদানে প্রশংসা আশা করেন। কাজের গুণাগুণা উপলব্ধি করার জন্য এই সবের প্রয়োজন নেই।

সৌজন্য পূর্ণ  ধন্যবাদ এই কথার সঙ্গে প্রশংসাসূচক বাক্য গ্রহণ করুন।

আন্তরিকতাবিহীন প্রশংসার থেকে সৎ প্রত্যাখ্যানও ভালো। তারফলে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সন্দেহ থাকে না। আন্তরিকতাবিহীন প্রশংসা বাক্যে শুধু ভুলধারণার সৃষ্টি হয়।

একাদশ পদ্ধতি : ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছায় ভুল স্বীকার করে নেওয়া উচিত (Step 11: When we make a mistake, we should accept it immediately and willingly)

যখন আমি ভুল করি তখন আমাকে সহজে সংশোধন করতে দিন; আর ঠিক করলে। সঠিক কাজের সুফল ভোগ করতে দিন। এটিই সহজ জীবন দর্শন।

কিছু লোক জীবন থেকে শিক্ষা নেন, কিছু লোক কোনও শিক্ষাই নিতে পারেন না। ভুর থেকেই শিক্ষা নেওয়া যায়। ভুলের পুনরাবৃত্তিই হচ্ছে সব থেকে বড় ভুল। ভুলের জন্য কোনও অজুহাত দেখাবেন না বা অন্য কাউকে দোষ দেবেন না। এই ভুল নিয়ে বেশি চিন্তাও করবেন না। ভুল বুঝতে পারলে, স্বীকার করে নিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিন। কারণ ত্রুটি স্বীকার করলে অপর পক্ষের আর বলার থাকে না।

দ্বাদশ পদ্ধতিঃ যখন কেউ ভুল স্বীকার করে তখন তা মেনে নিন, এবং তার মুখরক্ষার সুযোগ দিন। (Step 12: When the other person realizes and admits that he has made a mistake, congratulate him and give him a way out to save face)

ভুল যে স্বীকার করেছে তাকে মুখ রক্ষার সুযোগ না দিলে তার আত্মসম্মান বোধ আঘাত পাবে।

ত্রয়োদশ পদ্ধতি আলোচনা করুন, তর্ক করবেন না (Step 13: Discuss but dont argue

কিছু কিছু ব্যক্তিত্বকে বলা যায় তর্কবাগীশ; তাদের ব্যবহারে ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই তর্কপ্রবণতাই প্রকাশ পায়।

একটু সতর্ক হলে তর্ক এড়িয়ে যাওয়া যায়, ফলে অনেক মানসিক যন্ত্রণা এড়ানো যায়। তর্কে জিততে হলে তর্ক এড়ানোই ভালো। তর্কে কখনও জেতা যায় না। জিতলেও আপনি হারবেন, আবার হারলেও হারবেন। তর্কে জিতলেন, কিন্তু হারালেন ভালো চাকরি, খরিদ্দার, বন্ধু, বিবাহের সম্পর্ক, তাহলে কি রকম জয় হোল? শূন্য বিজয়। স্ফীত অহংবোধ তর্ককে উদ্দীপ্ত করে।

তর্ক করার অর্থ হোল হেরে যাওয়া যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। জিতলেও জয়ের কোনও মূল্য পাওয়া যায় না। তর্ক যখন ভাবাবেগের যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।

তখন তর্কটা মিটলেও মনের মধ্যে একটা অপ্রীতিকর ঘটনার রেশ থেকেই যায়।।

তর্কে দুপক্ষই শেষ কথাটি বলতে চায়; কিন্তু কেউ কাউকে জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। শে পর্যন্ত বাগযুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় অহংবোধের যুদ্ধ এবং চিৎকার চেঁচামেচিতে শেষ হয়।

যত তর্কে জিতবেন বন্ধুর সংখ্যা তত কমবে। যদি বক্তব্য ঠিক হয় তবু কি তর্কের কোনও প্রয়োজন আছে? উত্তর হচ্ছে বড় আকারের না। তার মানে কি যথার্থ বক্তব্যকে কেউ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে না? নিশ্চয় করবে, তবে শান্তভাবে এবং কৌশলের সঙ্গে। কথাটা এমন ভাবে প্রকাশ করবেন যেন নিরপেক্ষ মত প্রকাশের মত শশানায়। যেমন, আমি যে সমস্ত সূত্র পেয়েছি, সেই অনুসারে…………। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি যদি তর্কবাজ হয় তবে সে তর্ক করেই চলবে। কারণ মন বদ্ধ, এবং যে বক্তব্যের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় না-ার নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোনও সামাজিক সম্মেলনে কয়েক পাত্র মদ্যপানের পর, কেউ হঠাৎ বলতে পারেন, এই বৎসরের রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমান ৫০ বিলিয়ন ডলার। আপনি জানেন এই সংখ্যাটি ঠিক নয়-এটি ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আপনি হয়ত সকালবেলার খবরের কাগজে পড়েছেন, অথবা রেডিয়োতে শুনেছেন, অথবা কোনও বুলেটিনে দেখেছেন। আপনি তার মন্তব্যের জবাবে বললেন,  আমার জানা মতে রপ্তানির পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অন্য ব্যক্তিটি হয়ত প্রতিক্রিয়া জানাল, আপনি কি বলছেন কিছুই জানেন না, আমি ঠিক জানি এটি ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই ক্ষেত্রে আপনার কয়েকটি বিকল্প আছেঃ

১. আপনার বক্তব্য পুনরায় দৃঢ়ভাবে বলে একটি তর্ক শুরু করতে পারেন।

২. গাড়ি থেকে বুলেটিন এনে ভদ্রলোককে দেখিয়ে ভুল প্রমাণ করে দিতে পারেন।

৩. কথা না বাড়িযে চুপ থাকুন।

৪. আলোচনা করুন, তর্ক করবেন না। তিন নম্বরই হবে সঠিক বিকল্প।

যদি জীবনে কোনও মহৎ কাজ সম্পন্ন করতে চান তবে জীবনে পরিপক্কতা অর্জন করতে হবে। পরিপক্কতা হচ্ছে জীবনের ছোটখাট গুরুতুহীন বিষয়ে এবং তুচ্ছ বিতর্কে জাড়িয়ে না পড়া।

বিতর্ক ও আলোচনার মধ্যে তফাৎ কী?

  • বিতর্ক উত্তাপের সৃষ্টি করে, আলোচনা বিষয়ের উপর আলো ফেলে।
  • বিতর্ক তৈরি হয় অহংবোধ থেকে এবং বদ্ধ মানসিকতা থেকে আলোচনায় মন থাকে উন্মুক্ত।

ব্যক্তি বিষয়ে দক্ষতা

  • বিতর্কে অজ্ঞতার আদান-প্রদান হয়, আলোচনায় জ্ঞানের আদান প্রদান হয়।
  • বিতর্কে মেজাজ প্রকাশ পায়, আলোচনায় যুক্তিনিষ্ঠা প্রকাশ পায়।
  • বিতর্কে কে সঠিত এই বিচার বড় হয়: আললাচনায় বিষয়টি সঠিক কিনা তাই নির্ণং করা হয়।

সংস্কার-দুষ্ট মনের সঙ্গে যুক্তিপূর্ণ কথা বলে তর্ক করা নিস্পযোজন। সংকীর্ণ মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক অর্থহীন।

আলোচনা করার সময় অপর পক্ষকে তার বিষয়টি বিনাবাধায় বলতে দিন-তার অবরুদ্ধ বাষ্প বেরিয়ে যাক। প্রতিটি বিষয়ে তাকে ভুলে প্রমাণের চেষ্টা করবেন না। প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখান, সৌজন্যমূলক ব্যবহার করুন। এর ফলে তারা বিভ্রান্ত হবে।

আলোচনার তিক্ততা কমিয়ে আনার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?

১. ধৈর্যে সঙ্গে বক্তব্য শুনুন।

২. লড়াই করার মনোভাব ত্যাগ করুন, প্রত্যাখাত করবেন না। ফরে প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত হবে।

৩. আশা করবেন না যে অপর পক্ষ ক্ষমা চাইবে। ভুল করলেও কিছু লোক ক্ষমা চাইতে অভ্যস্ত নন।

৪. ছোট বিষয়ে বৃহৎ তর্কের অবতারণা করবেন না।

আলোচনার সময় সঠিক বক্তব্য সঠিক সময়ে বলা প্রয়োজন, কিন্তু যা বলার প্রয়োজন নেই তা অনুক্ত রাখাই ভালো।

বাচ্চাদেরও কথা বলার কলাকৌশল শেখানো উচিত, কিন্তু মুখের উপর জবাব দেওয়ার অভ্যাস শেখানো উচিত নয়। বয়স্কব্যক্তি হিসেবে কোনও অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি না করে মতের বিরুদ্ধাচরণ করার কৌশল আমাদের আয়ত্ত করা উচিত। বিতর্ককে যে ভাবে পরিচালনা করেন তার দ্বারা একজন মানুষের বড় হয়ে ওঠার পরিশ্রক্ষিতটি অনুধাবন করা যায়।

সাইরাস চিং (Cyrus Ching) বলেছিলেন, অনেকদিন আগেই আমি বুঝেছি যে শুয়োরের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে নেই। শরীর নোংরা হয়ে যাবে এবং শুয়োরটি এইটিই পছন্দ করবে।

আলোচনা শু করার পদ্ধতি :

১. খোলা মন নিয়ে শুরু করুন।

২. তর্কে যোগ দিতে প্রলুব্ধ হবেন না।

৩. মাঝপথে বাধা দেবেন না।

৪. নিজের মতামত দেওয়ার আগে অপরের মতামত শুনুন।

৫. বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন-অন্য পক্ষকেও চিন্তা করতে সাহায্য করবে।

৬. অতিশয়োক্তি করবেন না।

৭. অপরকে বোঝাবার জন্য উদ্যমী হোন, কিন্তু বল প্রয়োগ নয়।

৮. হার স্বীকার করতে রাজি থাকুন।

৯. সামান্য বিষয়ে নমনীয় হোন, কিন্তু মতাদর্শের ক্ষেত্রে নয়।

১০. তর্ক আত্মমর্যাদা হানিকর মনে করবেন না।

১১. প্রতিপক্ষকে সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের সুযোগ দিন। এতে তার গর্ব আঘাত পাবে না। প্রত্যাখ্যান তাকে আঘাত দেবে।

১২. মোলায়েম কথা কিন্তু কঠোর যুক্তি ব্যবহার করুন।

অজ্ঞ ব্যক্তিকে তর্কে হারানো মুস্কিল। তার কঠিন ও তিক্ত বাক্য বিষয়ের দুর্বলতা প্রকাশ করে। আলোচনার সময় নিম্নলিখিত বাক্যাংশের ব্যবহার ভালো ধারণার সৃষ্টি করে।

  • আমার মনে হয়……….
  • আমার ভুলও হতে পারে……..

বিতর্কের তীব্রতা কমিয়ে আনার জন্য অনেক সময় অজ্ঞতার ভান করা কিংবা নিম্নলিখিত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা দরকার :

  • আপনি এরকম মনে করছেন কেন?
  • বিষয়টা কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারেন?
  • আর একটু নির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারেন?

যদি কিছুতেই কাজ না হয় তবে সৌজন্যপূর্ণভাবে, নম্রভাবে এবং ভদ্রতার সঙ্গে প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিমত হতে সম্মত হওয়াই উচিত।

চতুর্দশ পদ্ধতি : খোশ গল্প করবেন না (Step 14: Doni, gossip)

স্মরণ রাখবেন, যারা আপনার নিকট খোশগল্প করে বা গুজব রটায়, তারা আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সম্পর্কেও খোশগল্প করবে।

খোশগল্পে কুৎসা রটানো হয়, চরিত্র হনন করা হয়। যারা খোশগল্প শোনে, পোশ গল্প করে গুজব রটানোর মতই তারা দোষী। খোশগল্প ও মিথ্যার পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। খোশগল্প তাড়াতাড়িতে শোনা হয়, কিন্তু পরে ধীরেসুস্থে পুনরাবৃত্তি করা হয়। আসলে যা শোনা হয় তা নয়, যা আড়ি পেতে শোনা হয় তাকেই বাড়িয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনও কথাই স্পষ্ট করে বলা হয় না, আবার এমন ইঙ্গিত করা হয় যাতে কোনও কথা না বলা থাকে না।

খোশগল্পে কোনও ন্যায় নীতি বোধ নেই। এই সমস্ত গল্প মানুষের অন্তঃকরণে গভীর আঘাত দেয়, জীবন বিনষ্ট করে, ক্রতা ও বিদ্বেষ প্রসূত এই গল্পগুলি সিহায় ব্যক্তিকে অনেক সময় লক্ষ্যবস্তু করে। অনেক সময় এর উৎস খুজে বের করা খুব মুস্কিল, কারণ কোনও এক ব্যক্তি এর শ্রষ্ঠা নয়। এ খ্যাতিনষ্ঠ করে, প্রকারের পতন ঘটায়, বিবাহ ধ্বংস করে, কর্মজীবনকে নষ্ট করে, নিরীহ মানুষকে কাঁদায়, মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে এবং দ্রিাহীন রজনী যাপন করতে বাধ্য করে। যখন এই ধরনের খোশগল্পে আনন্দ পাবেন তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করুনঃ

  • এই গল্প কি সত্য?
  • এই গল্প কি মানুষের স্রতা ও দয়ার্দ্র হৃদয়ের সৃষ্টি।
  • এই গল্প কি কোনও কারণে প্রয়োজনীয়?
  • আমি কি গুজব ছড়াতে সাহায্য করছি?
  • আমি কি অপরের সম্পর্কে ইতিবাচক বক্তব্য বলেছি?
  • আমি কি অন্যকে গুজব ছড়াতে উৎসাহিত করি এবং তা উপভোগ করি?
  • কাউকে বলবেন না-এই বলে কি আমি বাক্যালাপ শুরু করি?
  • আমি কি গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারি?

খোশগল্প শোনা ও প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন। যারা বেশি কথা বলে তারাই নিন্দামন্দ করতে সিদ্ধ হস্ত।

পঞ্চদশ পদ্ধতি : প্রতিজ্ঞাকে অঙ্গীকারে পরিণত করুন (Step 15: Turn your promises into commitments)

প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের মধে তফাৎ কী? প্রতিশ্রুতি হচ্চে ইচ্ছায় বর্ণনা,

আর অঙ্গীকার হোল যে কোনও মূল্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা। যে কোনও মূল্যের অর্থ অবশ্য বেআইনী বা অনৈতিক কাজ নয়। চরিত্রবান ব্যক্তিই অঙ্গীকারবদ্ধ হয় এবং অঙ্গীকারই দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি করে।

যদি কেউ কারুর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ না থাকে তবে সংসারের অবস্থা কী হবে কল্পনা করতে পারেন?

কী হবে এই সমস্ত সম্পর্কের?

  • স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক?
  • নিয়োগকর্তা ও কর্মচারীর?
  • মাতাপিতা ও সন্তানদের?
  • ছাত্র ও শিক্ষকের?
  • ক্রেতা-বিক্রেতাদের?

অঙ্গীকারহীন সম্পর্ক খুবই ফাঁপা ও অগভীর। সেই সম্পর্কে পারস্পরিক সুবিধার জন্য তৈরি এবং স্বল্প কালের অঙ্গীকার ব্যতিরেকে কোনও চিরস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয় না। অঙ্গীকারবদ্ধতা ভবিষ্যতকে অনেক স্বচ্ছ ও নিশ্চিত করে। অনেকে মনে করেন অঙ্গীকারবদ্ধতা মানে প্রতিশ্রুতির জালে জড়িয়ে পড়ে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া। প্রকত পক্ষে অঙ্গীকারবদ্ধতায় স্বাধীনতা খর্ব হয় না, বরং নিরাপত্তার আশ্বাস থাকে বলে বেশি স্বাধীনতা পাওয়া যায়।

আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকারবদ্ধতা মূল্যবোধের প্রতি। সেই জন্য উপযুক্ত মূল্যবোধের সুসংবদ্ধ রীতি তৈরি করে নেওয়া দরকার। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যদি একজন নেতার প্রতি বিশ্বস্ত থাকি এবং পরে যদি দেখা যায় সেই নেতা মাদক দ্রব্যের ব্যবসায়ে লিপ্ত, তা হলে তার প্রতি বিশ্বস্ততার অঙ্গীকার থাকতে পারে কি? কিছুতেই না। অঙ্গীকার থেকেই স্থায়ী সম্পর্কের সৃষ্টি, যা জীবনের সুখ-দুঃখের মধ্যেও টিকে থাকে। মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সম্পর্কের গভীরতা নির্ভর করে অঙ্গীকারবদ্ধতার উপর।

ষোড়শ পদ্ধতি ও কৃতজ্ঞাত প্রকাশ করুন, অন্যের নিকট কৃতজ্ঞতা আশা করবেন না।

(Step 16 : Be grateful but do not expect gratitude)

কৃতজ্ঞতা একটি সুন্দর শব্দ। এটি একটি অনুভূতি যা আমাদের ব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধি ঘটায় ও চরিত্র গঠন করে। আমাদের বিনয়ী করে-অপরের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপক মনোভাবের সৃষ্টি করে। আমাদের ব্যবহারেই এই মনোভাব প্রকাশ পায়। কৃতজ্ঞতা দান-প্রতিদানের বিষয় নয় কিংবা ভালো কাজের বিনিময়ে কিছু ভালো কাজ করা নয়। দয়া, সহমর্মিতা, ধৈর্য ইত্যাদির ঋণশোধ করা যায় না। কৃতজ্ঞতা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? পারস্পরিক বোঝাপড়াও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কৃতজ্ঞতা আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। সামান্য ধন্যবাদ কথাটিও মাধূর্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু অনেকসময় আমাদের নিকটের লোকদের এই সামান্য কথাটি বলতেও ভুলে যাই-যেমন স্ত্রী বা স্বামীকে, আত্মীয়স্বজনদের, বন্ধুদের। চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন করে এমন গুণাবলীর মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ প্রধান। অহংবোধ কৃতজ্ঞতাবোধকে নষ্ট কা,। সহজ সৌজন্যের মনোভাব আমাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়। কৃতজ্ঞতাবোধ ও বিনয় থাকলে বিভিন্ন সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।

কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের জীবনযাত্রার অঙ্গ স্বরূপ হওয়া উচিত।

জীবনে যে সমস্ত মানুষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন তাদের কথা চিন্তা করুন। আপনার মাতাপিতা, শিক্ষক কিংবা অন্য কেউ যারা আপনাকে সাহায্য করার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেছেন। তারা সম্ভবত তাদের কর্তব্য করেছেন-কিন্তু আসলে তারা তার থেকেও বেশি কিছু করেছেন। তারা তাদের সময়, অর্থ, প্রয়াস এবং আরও অনেক কিছু আপনার জন্য স্বেচ্ছায় ব্যয় করেছেন। তারা তা করেছেন আপনাকে ভালোবেসে, আপনার ধন্যবাদের জন্য বা কৃতজ্ঞতাবোধের জন্য নয়। কোনও এক সময় একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে তার ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য কতখানি সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল। সেই কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কখনও বেশি দেরি হয় না। ভালোবাসার জন্য ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয়।

খ্রীষ্টের গল্প

খ্রীষ্ট এক সময় দশজন কুষ্ঠরোগীকে রোগমুক্ত করলেন, এবং তিনি পিছন ফিরতেই দেখলেন একজন ছাড়া সকলেই চলে গেছে। সেই একজন খ্রীষ্টকে ধন্যবাদ জানাল। খ্রীষ্ট বললেন, আমি তো কিছু করিনি। এই গল্পটির নীতি শিক্ষা কী?

১. মানুষ অকৃতজ্ঞ।

২. কৃতজ্ঞ ব্যক্তি অসাধারণ ব্যক্তি।

৩. খ্রীষ্ট তাদের নবজীবন দান করলেন, এবং বললেন, আমি কিছুই করিনি।

৪. খ্রীষ্টের মত আমাদেরও কৃতজ্ঞতা আশা করা উচিত নয়।

মানুষ উপকার করলে কিভাবে তা ব্যক্তিত্বে ও চরিত্রে প্রভাব ফেলে? একজনকে কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় ও আহার দেওয়া হোল। তারপর তিনি বলবেন, দেখুন এই লোকটির জন্য আমি কত করলাম! আমরা মাত্রা ছাড়িয়ে আমাদের নিজেদের ঢাক নিজেরাই পেটাই। এই রকম প্রায়ই শোনা যায়, আমি না থাকলে লোকটা রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। কী অহংবোধ!

প্রসঙ্গত

অপরের নিকট কোনও কাজ করিয়ে নিতে হলে, সাধারণত বলা হয়, প্রসঙ্গত, এই কাজটা আপনি আমার জন্য করতে পারেন? এই কথা বলে বস্তৃত পক্ষে কাজের শুরুটা লাগব করার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে কারুর জন্য কিছু করতে হলে তা প্রসঙ্গত নয়, তা নির্দিষ্ট সূচীর বাইরে গিয়েই করতে হয়।

এভাবে যিনি উপকার করেন তাকে আনুকুল্য দেখানো হয় না। যদি অপরকে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু না করেন তবে তা দুঃখের বিষয়। এটা ঠিক যে অপরের জন্য কিছু করতে হলে তা প্রসঙ্গত নয় তা প্রচলিত অবস্থার বাইরে গিয়েই করতে হয়, এবং তা করা যথার্থ।

সপ্তদশ পদ্ধতি ও নির্ভরযোগ্য হোন এবং আনুগত্য অনুশীলন করুন
(Step 17 : Be dependable and practice loyalty)

পুরাতন আপ্তবাক্যটি, এক আউন্স আনুগত্য এক পাউন্ড চাতুর্যের থেকে বেশি মূল্যবান, সার্বজনীন ও চিরন্তন।।

কার্যক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নির্ভরযোগ্যতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনও ব্যক্তি তার অনেক কর্মক্ষমতা স্বত্ত্বেও নির্ভরযোগ্য না হন তবে কি আপনি তাকে আপনার দলের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবেন? না, কখনও নয়।

আমি জানতাম, তুমি আসবে (I knew you would come)

ছেলেবেলার দুই বন্ধু এক সঙ্গে স্কুল-কলেজের পড়া শেষ করার পর এক সঙ্গে সৈন্যদলে যোগ দিল। যুদ্ধ শুরু হোল, ওরা দুজনে একই সঙ্গে লড়াই করছিল। একদিন তাদের ইউনিট অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়ল। অন্ধকারে চারিদিকে বুলেট বৃষ্টি। এমন সময় অন্ধকার ভেদ করে একটি স্বর শোনা গেল, হ্যারি, আমাকে সাহায্য কর। এটি হ্যারির ছেলেবেলার বন্ধু বিলের গলা। হ্যারি বিলকে সাহায্য করার জন্য ক্যাপ্টেনের অনুমতি চাইল, কিন্তু ক্যাপ্টেন অনুমতি দিল না। ক্যাপ্টেন বলল, না আমি তোমাকে যেতে দিতে পারি না, কারণ আমার লোক কমে গেছে। তা ছাড়া বিলের গলা শুনে মনে হচ্ছে ও বাঁচবে না। অন্ধকারে আবার শোনা গেল,  হ্যারি, আমাকে বাচাও। শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে হ্যারি ক্যাপ্টেনকে বলল,ক্যাপ্টেন, ও আমার ছেলেবেলার বন্ধু, আমাকে ওকে সাহায্য করতেই হবে।  ক্যাপ্টেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুমতি দিতে হ্যারি বুকে হেঁটে অন্ধকারে বিলের কাছে পৌঁছাল, এবং টেনে তাকে ট্রেঞ্চে নিয়ে এল। বিল কিন্তু মারা গেল। ক্যাপ্টেন রাগ করে বলল,  বলেছিলাম না, বিল মারা যাবে, তুমিও মারা যেতে পারতে এবং আমার একজন লোক কমে যেত। কাজটা ঠিক হয়নি। হ্যারি বলল,  ক্যাপ্টেন, আমি ঠিকই কছি। আমি যখন ওর কাছে পৌঁছালাম, বিল বেঁচে ছিল, এবং ওর শেষ কথা ছিল, হ্যারি, আমি জানতাম তুমি আসবে।

পারস্পরিক সুসম্পর্ক সহজে পাওয়া যায় না, একবার যদি তা তৈরি হয় তবে তা লালন করা উচিত।

প্রায়ই বলা হয়, তোমার স্বপ্ন সফল করার জন্য সচেষ্ট হও। কিন্তু অপরের ক্ষতি করে তুমি তোমার স্বপ্ন সফল করতে পারবে না। যারা বিবেকবোব শূন্য তারাই তা করতে পারে। আমাদের পরিবার, বন্ধু এবং যারা আমাদের ভালোবাসে ও আমাদের উপর নির্ভর করে তাদের জন্য আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

অষ্টাদশ পদ্ধতি : বিদ্বেষ পোষণ করবেন না, ক্ষমা করুন এবং ভুলে যান। (Step 18: Avoid bearing grudges, Forgive and forget)

জঞ্জাল সংগ্রহকারী হবেন না। অনেকে বলেন, আমি ক্ষমা করছি, কিন্তু আমি ভুলব না। ফলে মনে অনেক জঞ্জাল জমে ওঠে।

যখন কেউ ক্ষমা করতে চায় না, সে তখন মনের দরজা বন্ধ করে দেয় যে দরজা একদিন হয়ত খুলতে হতে পারে। যখন আমরা বিদ্বেষ পোষণ করি, ক্ষোভ পষে রাখি তখন আমরা কাকে আঘাত করি? আমাদের নিজেদেরকেই।

জিম এবং জেরী ছেলেবেলার বন্ধু; কিন্তু কোনও কারণে তাদের সম্পর্কে খারাপ হয়ে যায় এবং তারা ২৫ বছর ধরে কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলেনি। জেরী যখন মৃত্যুশয্যায় তখন ভাবল যে এরূপ গভীর দুঃখ নিয়ে স্বর্গে যাব না। জিমকে ডেকে সে মাপ চে… নিয়ে বলল, এস আমরা পরস্পরকে ক্ষমা করি, এবং অতীতকে ভুলে যাই। জিম ভাবল মন্দ প্রস্তাব নয়, এবং সে জেরীকে হাসপাতালে দেখতে যেতে মনস্থ করল।

তারা ২৫ বৎসরের অদর্শনের পর নিজেদের মনোমালিন্য মিটিয়ে নিল এবং ঘণ্টা দুই এক সঙ্গে কাটাল। জিম যখন চলে আসছিল তখন জেরী পিছন থেকে বলল, জিম, যদি আমি মারা না যাই তাহলে এই ক্ষমার কোনও মূল্য থাকবে না জীবণ বিদ্বেষ পোষণ করার মতো দীর্ঘ নয়। বিদ্ধেষ পোষন অর্থহীন।

উনবিংশ পদ্ধতি : সততা, সার্বিক ন্যায় পরায়নতা ও আন্তরিকতা অনুশীলন করুন (Step 19 Practice honesty, intigrity and sincerity)

অনেক সময় সত্যের। ঔজ্জ্বল্য আলো দেয় না, অশুভশক্তিকে অন্ধ করে দেয়। সততার অর্থ প্রকৃত ও আসলের সঙ্গে নকল ও ভেজালের সংঘাত। বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে খ্যাতি তৈরি করুন। সার্বিক সততা পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক জীবনে সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করে। অঙ্গীকারে বিচ্যুত হলেই তাকেই বলে অসৎ ব্যবহার।

সততা খোলা মন, নির্ভর যোগ্যতা ও মুক্ত চিত্তকে সমৃদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব সৃষ্টি করে। সততা বাহ্যিক প্রদর্শনের বস্তু নয় – সততা নিজের চরিত্রের গুণ। মিথ্যা হয়ত দ্রুত প্রসারিত হয়, কিন্তু সত্য চিরস্থায়ী, সার্বিক সততা কোম্পানির প্রচার প্রত্রে দেখা যায় না, এটি দেখা যায় মানুষের চরিত্রে।

সহজ রাস্তায় জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নিজের সার্বিক সত তাকে ক্ষুন্ন করা উচিত কী। সত্যকে বিসর্জন দিয়ে জয়লাভ সুখের হয় না। জয়লাভ করার থেকে সৎ মানুষ হওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এই পাউন্ড মাখন (A pound of butter)

এক কৃষক এক রুটি ওয়ালাকে এক পাউন্ড মাখন বিক্রি করেছিল। একদিন রুটিওয়ালা মাখন ওজন করে দেখল যে সেটি এক পাউন্ডের কম।

রেগে গিয়ে সে চাষীর নামে কোটে নালিশ করল। জজ কৃষককে জিজ্ঞেস করল সে কোনও দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করেছে কিনা। কৃষক জবাব দিল, হুজুর, আমি পুরোনো দিনের লোক, আমার দাড়িপাল্লা নেই, কিন্তু আমার একটা ওজন যন্ত্র আছে। জজ জিজ্ঞেস করল, তা হলে তুমি মাখন পলে কী করে? কৃষক জবাব দিল, হুজুর, আমার কাছ থেকে মাখন নেওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি রুটিওয়াল্লার কাছ থেকে এক পাউন্ড রুটি নিই। রুটিওয়ালা রুটি আনলে আমি দাঁড়িপাল্লার একদিকে রুটি চাপিয়ে অন্যদিকে মাখন চাপাই এবং রুটির পরিমান মত মাখন দিই। যদি কম ওজনের জন্য কেউ দায়ী হয় তবে রুটিওয়ালাই দায়ী। এই গল্পটির নীতি বাক্য কী? অপরকে যা দিই আমরা জীবনে তাই ফিরে পাই। যখনই কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় তখনই এই প্রশ্ন করা উচিত, আমি যা প্রত্যাশা করি তার যথার্থ মূল্য দিচ্ছি কি না।

সততা ও অসততা কালক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়। কোনও কোনও ব্যক্তি অসততা অভ্যাস করে এবং মুখ বিকৃতি না করে মিথ্যা কথা বলে। আবার অনেকে এত মিথ্যা কথা বলে যে সত্য-মিথ্যার ভেদ রেখা মুছে যায়। কিন্তু তারা কাকে ছলনা করে? নিজেদেরকেই-অন্যদের নয়।

সততা খুব শান্তভাবে তুলে ধরা দরকার। কোনও কোনও ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে বেশ নির্মম ভাবে সৎ। মনে হয় তারা সততা অপেক্ষা নির্মমতার জন্যই বেশি আনন্দ পেয়ে থাকে। সততা প্রকাশের জন্য শব্দ চয়ন ও কুশলী হওয়া প্রয়োজন।

যা শুনতে চান সত্য সব সময় তা নাও হতে পারে?

নিষ্ঠুর না হয়েও সত্যবাদী হওয়া যায়, কিন্তু সব সময় তা হয়ত সম্ভব হয় না। একজন সৎ বন্ধুর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হোল সত্যবাদী হওয়া। কিছু ব্যক্তি বেদনাদায়ক সত্য এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এমন বন্ধু নির্বাচন করেন যারা তারা যা শুনতে চান তাই বলবেন। তারা শুধু নিজেদের ছলনা করেন, কারণ তারা মনে মনে জানেন যে তারা সত্য কথা বলছেন না। সৎ সমালোচনা কষ্টদায়ক হতে পারে। যদি অনেক পরিচিত এবং খুব স্বল্প সংখ্যক বন্ধু থাকে তাহলে স্থির চিত্তে সম্পর্ক পুনবিচার করা প্রয়োজন।

অনেক সময় সততার অভাবকে কৌশল, জনসংযোগ বা রাজনীতি বলে চালানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু তাতে কি কিছু সিদ্ধ হয়?

মিথ্যা বলার সমস্যা হচ্ছে, যে বক্তা কখনও ভুলে যায় না যে সে মিথ্যা বলেছে। সততার জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তা এবং অঙ্গীকারবদ্ধতা। কতবার আমরাই দোষী হয়েছি

  • ছোট্টখাট মিথ্যা বলার জন্য?
  • স্তাবকতার জন্য?
  • ঘটনা গোপন করে অর্ধসত্য পরিবেশন করার জন?
  • চুপচাপ থেকে সব চেয়ে বড় মিথ্যা বলার জন্য?

মিথ্যার ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কেই থমাস কাইল (Thomas Carlyle) বলেছিলেন, নিজেকে সম্মানুষ হিসেবে তৈরি করুন, আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে সংসারে অন্তত একটা দুর্বত্ত কম আছে।

বিশ্বাসযোগ্যতা

আমরা সেই মেষ পালকের গল্প জানি যে নেকড়ে বলে চিৎকার করে গ্রামের লোককে ডেকেছিল। সে আসলে গ্রামবাসীদের নিয়ে মজা করতে চেয়েছিল। তার ডাক শুনে গ্রামবাসীরা তার সাহায্যের জন্য এসে দেখল, নেকড়ে নেই, এবং ছেলেটি তাদের দেখে উপহাস করল। গ্রামবাসীরা ফিরে গেল। পরদিনও ছেলেটি একই মজা করল।

তারপর একদিন যখন সত্যিই নেকড়ে বাঘ দেখল তখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করল। গ্রামের মানুষ শুনল কিন্তু কেউ সাহায্যে জন্য এগিয়ে এল না। তারা এটি ছেলেটির একটি কৌশল বলে মনে করল, এবং ছেলেটিকে আর কেউ বিশ্বাস করল না। ছেলেটি জেগে বসে রইল, ঘুমোতে পারল না। এই গল্পটির নীতি শিক্ষা কী?

নীতিশিক্ষা এইঃ

  • মিথ্যা বললে বিশ্বাস যোগ্যতা নষ্ট হয়।
  • একবার বিশ্বাস যোগ্যতা নষ্ট হলে, সত্য বললেও কেউ বিশ্বাস করে না।

সততা সচ্চরিত্রের গুণ

সত্যকে দুভাবে বিকৃত করা যেতে পারে–

১. অসম্পূর্ণ ঘটনা অথবা তথ্যের মাধমে।

২. অতিরঞ্জিত করার মাধ্যমে।

 

অর্ধসত্য অথবা ভুলভাবে বর্ণিত সত্য থেকে সাবধান (Beware of half –truths or misrepresentation of truths)

একজন নাবিক যে তিনবছর ধরে একই জাহাজে কাজ করত, একদিন রাত্রে হঠাৎ মদ খেয়ে মাতাল হল। কর্মজীবনে তার প্রথম এরূপ ঘটনা ঘটল। ক্যাপ্টেন এটি লক্ষ্য করে খাতায় নথিভুক্ত করলেন যে, নাবিক আজ রাত্রে মাতাল হয়ে পড়েছিল। নাবিক এই মন্তব্য জানতে পারল, পাছে এই মন্তব্য তার কর্মজীবনের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়— এই ভেবে সে ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইল। এবং তাকে অনুরোধ করল তিনি যেন ঐ মন্তব্যের সঙ্গে নাবিক যে তিনবছরের কর্মজীবনের মধ্যে মাত্র একবার মদ্যপান করেছে – তা যুক্ত করেন। ক্যাপ্টেন নাবিকের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন  আমি খাতায় যা লিখেছি তাই সত্য। এর পরের দিন ঐ নাবিকের পালা ছিল খাতায় দৈনন্দিন দিনের ঘটনা নথিভুক্ত করার। সে লিখল, ক্যাপ্টেন আজ রাত্রে মিতপায়ী ছিলেন। ক্যাপ্টেন এটি পড়ে নাবিককে মন্তব্যটি পরিবর্তন করতে বা এটির সঙ্গে আরো কিছু মন্তব্য যোগ করতে বললেন। কারণ এই মন্তব্যটি এই অর্থপ্রকাশ করে যে ক্যাপ্টেন রোজই মাতাল হয়, ব্যতিক্রম আজ রাত্রি। কিন্তু নাবিকও ক্যাপ্টেনের

এই অনুরোধ প্রত্যাখান করল।

উক্ত দুটি মন্তব্যই সঠিক কিন্তু তা ঘটনাকে ভুল পথে নির্দেশিত করেছে।

অতিরঞ্জন অতিরঞ্জন দুভাবে কাজ করে –

১) এটি কোন ব্যক্তির অবস্থানকে দুর্বল করে তোলে এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে হাস করে।

২) এটি নেশার মত যা ক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়। কিছু ব্যক্তি অতিরঞ্জিত ব্যতীত সত্য বলতে পারে না।

আন্তরিক হোন

আন্তরিকতা ইচ্ছার ব্যাপার, এবং প্রমাণ করা মুশিকল। অপরকে সাহায্য করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি।

ভান করা থেকে দূরে থাকুন

বন্ধু বিপদে পড়লে তাকে যদি বলেন, আমি তোমার জন্য কি কিছু করতে পারি, তবে তা বিরক্তিকর শোনাবে। এটা এক ধরনের ভান করা বা কথার প্যাঁচ। যদি আপনি আন্তরিকত ভাবে সাহায্য করতে চান তবে অবস্থা অনুসারে ব্যবস্থা নিন।

অনেকে আন্তরিকতার একটা ছদ্ম আবরণে তাদের স্বার্থপরতা আড়াল করে রাখে। আশা রাখে এই ছদ্ম আবরণে তাদের পরবর্তী কালে সাহায্য পাওয়ার অধিকার জন্মাবে।

অর্থহীন বাক্যবিন্যাস করবেন না। আন্তরিকতা দিয়ে সৎবিচার বুদ্ধিকে মাপা চলে না। আন্তরিক হলেও অনেক সময় অবস্থা বিচারে ভুল হয়ে যেতে পারে।

কথার থেকে কাজ অনেক বেশি প্রকাশ করে (Actions speak louder than words)

কে বেশি ভালোবাসে? (Which loved best)

আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা, ছোট্টজন বলল। তারপর কাজ ভুলে বাগানের দোলনায় দোল খেতে লাগল। এদিকে মা আনল জলতুলে আর কাঠ কেটে। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা বলল গোলাপী রংয়ের মেয়ে, নেল আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না, তোমাকে কত ভালোবাসি তারপর সে অর্ধেক দিন কেবল অজস্র বক বক করে মাকে বিরক্ত করল; শেষ পর্যন্ত মা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যখন সে খেলতে চলে গেল। ছোট্ট ফ্যান বলল, মা, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আজ তোমাকে আমি যা পারি তাই করে সাহায্য করব, আজ আমার স্কুল নেই। সে দোলনা ঠেলে ছোট্ট বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল, তারপর হালকা পায়ে ঝাটা নিয়ে পরিষ্কার করল মেঝে, গুছিয়ে রাখল ঘর। এইভাবে সে ব্যস্ত রইল সারাদিন, মনের আনন্দে করল ঘরের কাজ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা, আবার তিন জনেই বলল, শুতে যাওয়ার আগে। মা তো জানেন, তিনজনের কোনজন তাকে সত্যিই ভালোবাসে।-Joy Allison
The Book of Virtues, edited by Willian J. Bennett, Simon & Schuster. New Youk, 1993, p.24

সার্বিক ন্যায়পরায়ণতা পালন করুন

প্রাচীন প্রজ্ঞা বলে, কোনও বস্তু ক্রীত বা বিক্রিত হলেই তা মূল্যবান হয় না তাতে সেই গোপন, অমূল্য উপাদানটি থাকার দরকার, যা দিয়ে ব্যবসা করা যায় না। সেই উপাদানটি কী? সেই গোপন, অমূল্য উপাদানটি হোল, বিশ্বস্ততা, যিনি তৈরি করেন তার সম্মান ও সার্বিক সততা। এটি গোপনীয় নয় কিন্তু এটি অমূল্য।

বিংশতিতম পদ্ধতি – বিনম্রতা অনুশীলন করুন (Step 20 – Practice humility)

বিনম্রতা ছাড়া আত্মবিশ্বাস আত্মম্ভরিতার নামান্তর। বিনম্রতা বা বিনয় সমস্ত গুণের আধার! এটি মহত্তের লক্ষণ। আন্তরিক বিনয় আকর্ষণ করে, কপট বিনয় বিকর্ষণ করে।

অনেক বছর আগে একজন অশ্বারোহী দেখল কয়েকজন সৈন্য একটি ভারী কাঠের শুড়ি সরাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কর্পোরাল পাশেই দাঁড়িয়ে সৈন্যদের কাজ কর্ম লক্ষ্য করছেন। অশ্বারোহী কর্পোরালকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি সৈন্যদের সাহায্য করছেন না কেন। কর্পোরাল জবাব দিলেন, আমি কপোল, আমি হুকুম করি। অশ্বারোহী তখন ঘোড়া থেকে নেমে সৈন্যদের কাছে গিয়ে কাঠের গুড়িটি তুলতে সৈন্যদের সাহায্য করলেন। তার সাহায্যে সৈন্যরা গুড়িটি সরাতে সক্ষম হোল। অশ্বারোহী তখন ঘোড়ায় উঠে কর্পোরালের নিকট গিয়ে বললেন, পরে যখন আবার তোমার সৈন্যদের সাহায্যের প্রয়োজন হবে, তখন প্রধান সেনাপতিকে খবর পাঠিয়ে।  অশ্বারোহী চলে যাওয়ার পর কপেরািল ও তার সৈন্যগন বুঝতে পারলেন যে লোকটি ছিলেন স্বয়ং র্জ ওয়াশিংটন।

গল্পটির বার্তা খুব পরিষ্কার। সাফল্য ও বিনয় হাত ধরে চলে। অপরে যখন আপনার প্রশংসা করে তখন অনেক লোক তা শোনে। সারল্য ও বিনয় মহত্ত্বের লক্ষণ। বিনয়ের অর্থ আত্ম-অবমাননাকর ব্যবহার নয়। এতে নিজেকে ছোট করা হয়।

একবিংশতিতম পদ্ধতি : অপরকে বোঝবার চেষ্টা করুন এবং তার সম্পর্কে মনোযোগ দিন। (Step 21 : Be understanding and earing)

পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্র আমরা অনেকসময় ভুল করি, আবার কখনও কখনও যারা আমাদের ঘনিষ্ঠ তাদের প্রয়োজন সম্পর্কে অমনোযোগী হয়ে উঠি। এতে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হতাশাকে দুর করতে হলে অপরকে বোঝবার চেষ্টা করা উচিত।

মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার কারণ হোল মানুষ পরস্পরকে বুঝতে চায়। পারস্পরিক সহানুভূতিই সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি।

অপরের প্রতি বিশেষ আগ্রহশীল হলে এবং তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে যে পরিতৃপ্তি পাওয়া যায় সেটা কেবল একজন ভালোমানুষ হলে পাওয়া যায় না। অপরের প্রতি আগহী ও যত্নশীর ব্যক্তি এমন একটা সুনাম সুষ্টি করেন যে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এবং এতে তার কিছু খরচ হয় না।

কিছু কিছু ব্যক্তি মনে করেন অর্থ মানুষের সঙ্গে বোঝাপড়ার এবং যত্ন ও আগ্রহের সম্পর্কের প্রতিকল্প। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক অর্থের থেকে অনেক বেশিগুরুত্ব পূর্ণ। অপরকে যথার্থরূপে বুঝতে পারলেই নিজেকে অপরের নিকট বোঝানো যায় এবং এই বোধ পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ঔদার্য অনুশীলন করুন

ঔধার্য ভাবগত পরিপক্কতার লক্ষণ ও চিন্তাশীল ও বিবেচক ব্যক্তিরাই উদার হতে পারেন। উদার ব্যক্তিরা জীবনের ঐশ্বর্য উপভোগ করতে পারেন, যা একজন স্বার্থপর ব্যক্তির কল্পনার বাইরে।

বিবেচক হোন, স্বার্থপরতা প্রতিহিংসা আহ্বান করে। অপরের অনুভুতির প্রতি সংবেদশীল হোন।

কৌশলী হোন।

যেকোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রেই কৌশল প্রয়োজন। কৌশল এর অণু-হচ্ছে অন্যদের সহানুভূতি না হারিয়ে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা।।

দয়া

টাকা দিয়ে একটি ভালো কুকুর কিনতে পারেন কিন্তু তার প্রতি দয়া না দেখালে সে লেজ নাড়বে না। অপরের প্রতি করুণা প্রদর্শনে দেরি করা উচিত নয়। করুণা এমন একটি ভাষা যা বধিরও শুনতে পায়, অন্ধও দেখতে পায়। জীবতাবস্থায় একজন বন্ধুকে করুণা দেখানো প্রয়োজন, মৃত্যুর পর তার সম্মানে ফুল দিয়ে করুণা দেখানো অর্থহীন। কোনও দয়ার কাজ গ্রহণকারীকে প্রফুল্ল করে। সহৃদয় কথাবার্তায় জিহ্বা আহত হয় না।

দ্বাবিংশতিতম পদ্ধতি ও প্রতিদিনের ব্যবহারে সৌজন্যমূলক আচরণ অনুশীলন করুন। (Step 22: Practice courtesy on a daily basis)

ভ্রদ্রতার অর্থ হোল অপরের জন্য বিবেচনা বোধ। ভদ্রতা এমন সব দরজা খুলে দেয় যা হয়ত অন্যভাবে খোলা যেত না। একজন দ্রব্যক্তি, যিদি খুব তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন নন, জীবনে অনেক উন্নতি করবেন–, যা হয়ত একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি।

সম্পন্ন কিন্তু অদ্র ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। ছোট খাট ব্যাপারেই অনেক তফাৎ ঘটে যায়। হাতি কি কখনও আপনাকে কামড়েছে? স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর হচ্ছে না। মশা আপনাকে কামড়েছে। অনেককেই কামড়েছে। এই ছোটখাট উদ্ৰবই আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা করে। ভদ্রতা ছছাট ছোট আত্মত্যাগের সমাহার।

ছোট ছোট দ্র ব্যবহার চতুরতার থেকে জীবনে অনেক বেশি সাহায্য করে। ভদ্ৰব্যবহার আমাদের নৈতিক চরিত্রের প্রকাশ। এতে কোনও ব্যয় হয় না, কিন্তু ভালো প্রতদান পাওয়া যায়।

যত বড় মানুষই বা যত ব্যস্ত মানুষই হোন না কেন, দ্র ব্যবহার সবার পক্ষেই সম্ভব। ভদ্রতা মানে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে আপনার জায়গা ছেড়ে দেওয়া, অথবা একটু আন্তরিক হাসি, কিংবা ধন্যবাদ। খুবই সামান্য বিনিয়োগ, কিন্তু প্রতিদান অনেক বেশি। ভদ্র ব্যবহার যে পায় তারও আত্মমর্যাদা বেড়ে যায়। ভদ্রতার জন্য বিনয়ের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যের বিষয় অনেক সময় মানুষ ইচ্ছাকৃত ভাবে বিরক্তি উৎপাদক ব্যবহার করে। আমি দু-একজনকে বলতে শুনেছি,  আমি খুবই বিরক্তিকর ব্যবহার করতে পারি।

ভদ্রতার বীজ ছড়িয়ে দিন, কিছু নিশ্চয়ই চারা হয়ে শিকড় চালিয়ে দেবে, এবং অপরের চোখে আপনাকে উন্নত মানুষ রূপে প্রতিভাত করবে।

আদব কায়দা

সৌজন্যবোধ ও আদবকায়দা হাত ধরাধরি করে চলে। বাড়িতেও আদবকায়দা অনুশীলন করা দরকার, কেবল বাইরের মানুষদের ক্ষেত্রেই নয়। ভালো আদবকায়দা ও সুবিবেচনার দ্বারা হৃদয়ের উষ্ণতা টেনে আনা যায়। ভালো আদবকায়দার অনুশীলনই সৌজন্যবোধ।

আত্মতৃপ্তি ছাড়াও ভদ্রতা সৌজন্যবোধর অনেক সুবিধা আছে, যা কঠোর ব্যবহারে সম্ভব নয়। এই সমস্ত দেখে মনে হয় লোকে কেন সৌজন্যবোধ অনুশীলন করে না। রূঢ় ও অদ্র লোকেরা হয়ত প্রাথমিক কিছু সুবিধা পেতে পারে; কিন্তু বেশিরভাগ লোকই এদের এড়িয়ে চলে, এবং অবেশেষে কচু ব্যক্তিদের সকলেই অপছন্দ করে। বাচ্চাদেরও অল্পবয়সে সৌজন্যবোধ শিক্ষা দেওয়া উচিত, একবার শিখলে তা সারা জীবন থাকবে।

স্মরণ রাখা দরকার, ভদ্র ব্যবহার অন্যকেও ভদ্ৰব্যবহারে অনুপ্রাণিত করে। সেইজন্য ভদ্রব্যবহার অনুশীলন করা দরকার। সৌজন্য বিনয়ের লক্ষণ।

সৌজন্যবোধ ভালো লালন পালনের লক্ষণ

অনেক উজ্জ্বল এবং প্রতিভাবান ব্যক্তি তাদের সাফল্য নষ্ট করে ফেলেছেন কারণ তাদের সৌজন্যবোধ ও আদবকায়দার অভাব ছিল। ভদ্রতা বোধ এবং সৌজন্যবোধ মার্জিত ও পরিশীলিত ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। রূঢ়তা ও অভদ্রতা এর অভাব সূচীত করে। মানুষের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে ব্যবহার করুন।

রূঢ়তা দুর্বল মানুষের সবলকে অনুকরণ করার চেষ্টা।–এরিক হফার (Eic Hoffer)

ত্রিবিংশতি পদ্ধতি ও হাস্যরস বোধকে উন্নত করুন (Step 23: Develop a sense of humor)

হাস্যরসবোধ থাকলে নিজেকে নিয়ে কৌতুক করার ক্ষমতা আয়ত্তে আসবে। হাস্যরসবোধ মানুষকে আকর্ষণীয় এবং পছন্দসই করে। অনেক মানুষ হাস্যরসের মোটেই ধার ধারে না।

নিজেকে নিয়েই কৌতুক করতে শিখুন, কারণ সেটাই সব থেকে নিরাপদ কৌতুক। তাছাড়া নিজেকে নিয়ে হাসতে জানলে সমস্ত বিমর্ষতাকে কাটিয়ে ওঠার শক্তি পাওয়া যাবে। হাসি মানুষকে শাস্তি দেয়। হাস্যরস হয়ত সমন্ত অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না; কিন্তু অবস্থার যন্ত্রণাকে অনেকটা লাঘব করার চেষ্টা করে।

হাস্যরসের আরোগ্যকর ক্ষমতা (The healing power of humor)

ডাঃ নরম্যান কুজিনস্ (Dr Norman Cousins) যিনি Anatomy of an liness নামক একটি বইয়ের গ্রন্থকার, নিজেই কিভাবে নিজেকে একটি মারাত্মক অসুখ থেকে সারিয়ে তুলতে পারেন তার উদাহরণ হয়ে আছেন। তার ৫০০ ভাগে একভাগ বাচার সাবনা ছিল; কিন্তু কুইজিনস প্রমান করতে চাইলেন যে মন বস্তুর উপর আধিপত্য করে এবং তিনি তা প্রমাণ করলেন। যদি নেতিবাচক ভাবাবেগ আমাদের শরীরে নেতিবাচক রাসায়নিক ক্রিয়া তৈরি করে, তবে উল্টোটাও সত্য। ইতিবাচক ভাবাবেগ, যেমন সুখ, হাসি ইত্যাদি, শরীরে ইতিবাচক রাসায়নিক ক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। তিনি হাসপাতাল থেকে হোটেলে উঠে, অনেক কৌতুকতর ছায়াছবি দেখার ব্যবস্থা করলেন, এবং আক্ষরিক অর্থে হাসির সাহায্য নিজেকে সুস্থ করে তুললেন। অবশ্য ওষুধ খাওয়া বন্ধ করেন নি, কিন্তু রোগীর পক্ষে বাঁচার ইচ্ছাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৌতুক জীবনের প5 অপরিহঃ, জ্বনের বিপর্যয়কে সহজে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।

চতুর্বিংশতি পদ্ধতি ও বিদ্রুপাত্মক বাক্য পরিহার করুন এবং অন্যকে দমন করবেন না।

(Step 24 : Dont be sarcastic and put others down)

নেতিবাচক ব্যক্তি অপরকে জ্রিপ করে কৌতুক করে। তাদের দমন করে রাখতে চায় কিংবা তাদের আঘাত করে মন্তব্য করে। যে কোনও কৌতুক যা ক্ৰিপাত্মক, এবং পরকে নিয়ে মজা করে খুবই নিম্ন রুচির পরিচায়ক। শারীরিক আঘাত মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু অপমান কখনও ভোলে না।

যখন কেউ না পায়, যখন কোনও ব্যক্তি মনের মধ্যে একটি বেদনা বহন করে, যখন কোনও কিছু পবিত্রকে সাধারণ বস্তুতে রূপান্তরিত করা হয়, যখন কারুর দুর্বলতা হাসির খোরাক হয়, যখন পবিত্রতাকে অবজ্ঞা করে মজা করা হয়, যখন কোনও শিশুর চোখে জল এসে যায়, কিংবা যখন সকলে

হাসিতে যোগ দিতে পারে না, এরপ কৌতুককেই বলে নিশ্রেণীর কৌতুক।–ক্লিফ থমাস (Cliff Thomas)

একজন মর্ষকামীর নিকট যা তাকে আঘাত করে না কিন্তু অন্যকে আঘাত করে, তা কৌতুককর। প্রায়ই দেখা যায় ছেলেরা ব্যায়ের উপর ইট ছুঁড়ছে – মজা করার জন্য। ছেলেদের মজা মানে ব্যাঙগুলির মৃত্যু। ব্যাঙয়েদের পক্ষে তা মজা নয়।

কৌতুক ভালোও হতে পারে আবার বিপজ্জনকও হতে পারে। এটি নির্ভর করে আপনি কারোর সঙ্গে হাসছেন কিংবা কারুকে উপলক্ষ্য করে হাসছেন তার উপর। হাস্যরস যখন কাউকে জিপ করার জন্য তখন তা নিম্ন রুচির পরিচয় দেয়। এটি তখন নিতান্ত নিরীহ বলেও বলা চলে না। অপরের অনুভূতিকে আঘাত করা নিষ্ঠুরতার কাজ। অপরকে অবদমিত করে অনেকে মজা করেন। পি বা এই ধরনের মজা মানুষকে বিদ্বিষ্ট করে তোলে। কৌতুক বা হাস্যরসের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকি না নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

পঞ্চবিংশতি পদ্ধতি ও ব লাভের জন্য বন্ধু হোন (Step 25 to have a friend, be a friend)

আমরা সব সময়েই সঠিক নিয়োগকর্তা, সঠিক কর্মী স্ত্রী, মাতাপিতা, সন্তান ইত্যাদি চাই; কিন্তু ভুলে যাই যে আমাদের সঠিক্ত ব্যক্তি হলো প্রয়োজন। অভিজ্ঞতায় জানি যে সর্বসম্পূর্ণ মানুষ নেই, সর্বাঙ্গ সুন্দর চাকার, স্ত্রী কিছু ব নয়। সর্ববিষয়ে সার্থক কোনও কিছুই পাওয়া যায় না। কিছু না কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি খেই যায়। ২০ বৎসর পশ্চিম দেশে বাস করে জানি যে এদেশে বিবাহ-বিচ্ছেদ অনেক বেশি। প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয় বিবাহে আগের ত্রুটি গুলি থাকে না বটে কিন্তু কিছু নতুন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। সেইভাবে লোকে চাকরি বদলায় কিংবা নতুন কর্মচারী নিয়োগ করে। কিন্তু দেখা যায় তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। একধরনের সমস্যার বদলে অন্য ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা গুলির মোকাবিলা করা দরকার-চাকরি বা কর্মচারী বদলানো একেবারে শেষ বিকল্প হিসাবে নেওয়া উচিত।

আত্মত্যাগ

বন্ধুত্বের জন্য আত্মত্যাগ করতে হয়। শুধু বন্ধুত্ব নয় মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্কের জন্যও আত্মত্যাগ করতে হয়। আত্মত্যাগ মানে প্রাসঙ্গিক ভাবে কিছু করা নয়, নিজের স্বাভাবিক কাজের বাইরে গিয়ে কিছু করা, স্বার্থপরতা বন্ধুত্ব ধ্বংস করে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব তৈরি হতে সময় লাগে, এবং সচেতন চেষ্টায় বন্ধুত্ব রাখতে হয়। পরীক্ষার মধ্যদিয়ে গেলেই বন্ধুত্ব সুদুঢ় হয়। সত্যকারের বন্ধুত্ব বন্ধুকে আঘাত দেয় না, যা পায় তার থেকে বেশি দেয়, এবং বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়।

সুদিনের বন্ধু

সুদিনের বন্ধু সে লোকটির মতো যে রোদ উঠলে ছাতা ধার দেয় আর বৃষ্টি শুরু হলেই ছাতা নিয়ে নেয়। দুই ব্যক্তি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি ভালুক আক্রমণ করতে, একজন অন্যজনকে সাহায্য করার চেষ্টা না করে তাড়াতাড়ি একটি গাছে উঠে পড়ল। অন্যজনকে উপায় না দেখে মাটির উপর মরার মত শুয়ে পড়ল। ভালুকটি এসে লোকটির মুখ চোখ খুঁকে চলে গেল। গাছের উপরের লোকটি নীচে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল,  ভালুকটি কী বলল? লোকটি জবাব দিল,  যে বন্ধু বিপদে ফেলে পালায় তাকে কখনও বিশ্বাস কোরো না। এই গল্পটির নীতিবাক্য দিনের আলোর মত পরিষ্কার।

পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা সমস্ত বন্ধুত্বের ভিত্তিভূমি।

বিভিন্ন উদ্দেশ্যে লোকে বন্ধুত্ব করে

বন্ধুত্বকে এইভাবে ভাগ করা যেতে পারে :

১. সুদিনের-বন্ধু : দুজনের সম্পর্ক যখন পরস্পরের নিকট মজাদার মনে হয় ততদিনই বন্ধু, অর্থাৎ সুদিনের বন্ধু।

২. সুবিধা পাওয়ার বন্ধুত্ব : আনুকূল্য লাভের জন্য বন্ধুত্ব করা হয়। অন্য ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা যতদিন থাকে ততদিনই বন্ধুত্ব থাকে। এই বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী নয়।

৩. সত্য বন্ধুত্ব : এই বন্ধুত্ব পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও পরস্পর সম্পর্কে উচ্চ ভাবনার উপর নির্ভরশীল। তারা কাজেও পরস্পরের প্রতি সৎ। ভালো কাজ করলে ভালো বন্ধু লাভ হয়। দুপক্ষেই আছে সৎ মনোভাব। চরিত্র ও অঙ্গীকারের উপর নির্ভরশীল এই বন্ধুত্ব।

ঐশ্বর্য বন্ধু আকর্ষন করে, কিন্তু বিপদে সেই বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয়। নীচের কবিতাটিতে সুদিনের বন্ধুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে।

যখন তোমার আনন্দের দিন, তখন অনেকে তোমার কাছে আসবে আর দুঃখের দিনে তারা তোমাকে ত্যাগ করবে তারা তোমার আনন্দের পূর্ণ অংশীদার হতে চায়, কিন্তু তোমার দুঃখে তারা তোমার কেউ নয়।

যখন তুমি সুখী তখন তোমার বন্ধু অনেক, যখন তুমি দুঃখী, তখন কেউ নেই পাশেকেউ তোমার অমৃতময় পানীয় প্রত্যাখ্যান করবে না, কিন্তু জীবনের গরল তোমাকে একাকেই পান করতে হবে।

-এলা দুইলার উলকক্স*

সত্যকারের বন্ধু যারা তারা পরস্পরকে সাহায্য করে। কিন্তু সে সাহায্য অনুগ্রহ দেখানো নয়। সে সাহায্য বন্ধুত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যদি এই রকম সাহায্য না পাওয়া যায় তা হলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকে না।

সম্পর্ক তৈরি হতে সময় লাগে। সম্পর্ক তৈরি হয় সহমর্মিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আত্মত্যাগের উপর–দ্বেষ, স্বার্থপরতা, অহংবোধ বা রূঢ় ব্যবহারের উপর নয়।

একবার বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হলে তাকে ক্রমাগত লালন পালন করতে হয়। বন্ধুত্বের বিষয়ে একটি কথা স্মরণ রাখা দরকার যে কোনও মানুষই সবদিক থেকে সুসম্পূর্ণ নয়। এই মত আশা করতে গেলে হতাশ হতে হয়।

বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা

অন্যের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ব্যতীত সাফল্য অর্জন করা মুস্কিল। আনন্দময় ব্যক্তিত্ব সবসময়েই নমনীয়, এবং নিজের স্থৈর্য না হারিয়ে অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম। নমনীয়তার অর্থ এই নয় যে ব্যবহারে চাপল্য থাকবে। এর অর্থ অবস্থা বুঝে সেই অবস্থানুসারে যথাযথ ব্যবহারের নামই নমনীয়তা। নমনীয়তা কখনই আদর্শ বা মূল্যবোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

ছাব্বিশতম পদ্ধতি সহমর্মিতা দেখান (Step 26: Show empathy)

অপরের প্রতি আমরা যা অন্যায় করি এবং নিজেরা যে অন্যায় সহ্য করি তা আমাদের মনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সহমর্মিতা ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ঠ্য। সহমর্মী ব্যক্তিরা নিজেদের এই প্রশ্ন করে,  কেউ আমার সঙ্গে অন্যায়

ব্যবহার করলে আমি কি রকম বোধ করতাম?

কুকুরছানা (A puppy)

এক বালক একটি কুকুর ছানা কিনতে দোকানে গেল। চারটি ছানার প্রত্যেকটির দাম ৫০ ডলার। এক কোনে আর একটি কুকুর ছানা একা বসেছিল। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল ঐ বাচ্চাটিও এক মায়ের বাচ্চা কিনা, এবং ঐ বাচ্চাটিও বিক্রির জন্য আছে কিনা। দোকানের মালিক বলল ঐ বাচ্চাটিও অন্যগুলির সঙ্গে একই মায়ের বাচ্চা; কিন্তু ঐ বাচ্চাটির অঙ্গহানি আছে বলে ঐটি বিক্রির জন্য নয়।

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল বাচ্চাটির কি ধরনের অঙ্গ হানি আছে। দোকানদার বলল যে বাচ্চাটির কোমরের কাছে চামড়া নেই এবং একটি পা নেই। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,  এটিকে নিয়ে আপনি কী করবেন? জবাব এল একে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হবে। ছেলেটি বাচ্চাকুকুরটির সঙ্গে একটু খেলতে চাইলে দোকানদার মত দিল। ছেলেটি তখন কুকুরটিকে কোলে নিতেই, কুকুরটি তার কান চেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি ঠিক করল যে সে কুকুর বাচ্চাটি কিনবে। দোকানদার বলল,  এটা বিক্রির জন্য নয়। কিন্তু ছেলেটি জেদ ধরল সে ওটি কিনবেই।

শেষ পর্যন্ত দোকানদার রাজি হল। ছেলেটি দুডলার পকেট থেকে বার করে দোকানদারকে দিয়ে আরও ৪৮ ডলার মায়ের কাছ থেকে আনবার জন্য দৌড়াল। দরজার কাছে যখন পৌঁছেছে তখন দোকানদার চিৎকার করে বলল,  তুমি এই বিকলাঙ্গ কুকুর ছানাটির জন্য একটি ভালো কুকুর ছানার দাম দেবে কেন? ছেলেটি কিছু না বলে তার ট্রাউজারের কিছুটা তুলে দেখাল-সে একটি নকল পা পরে আছে। দোকানদার বলল,  আমি বুঝেছি। তুমি এই বাচ্চাটি নাও। একেই বলে সমমর্মিতা।

সহানুভূতিশীল হও

যখন তুমি কারুর সঙ্গে দুঃখ ভাগ করে নাও তখন দুজনের দুঃখই কম হয়; যখন সুখ ভাগ করে নাও তখন সুখ বেড়ে যায়।

সহানুভূতি ও সহমর্মিতার ধ্যে তফাৎ কোথায়?

সহানুভূতি হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি তুমি কী অনুভব করছ আর সহমর্মিত হচ্ছে তুমি কী অনুভব করছ তা আমিও অনুভব করতে পারছি।  সহানুভূতি ও সহমর্মিতা দুইই গুরুত্বপূর্ণ; এই দুইয়ের মধ্যে সহমর্মিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

যখন আমরা আমাদের খরিদ্দার, নিয়োগকর্তা, কর্মচারী এবং পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা দেখাই তখন আমাদের সম্পকে কিরূপ হয়? অবশ্যই সম্পর্ক ভালো হয়। ফলে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে, আনুগত্য শান্তি এবং উৎপাদনশীলতা ও বুদ্ধিপায়।।

একজন ব্যক্তি মানুষের, কিংবা একটি সম্প্রদায়ের বা একটি জাতির চরিত্রে কিভাবে বিচার করবে?

খুব সহজ। কেবল লক্ষ্য কর, সেই সম্প্রদায় বা জাতি কিভাবে এই তিন প্রকারের মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করে।

১. বিকলাঙ্গদের প্রতি

২. বয়স্কদের প্রতি

৩. অধিনস্থ ব্যক্তিদের প্রতি

এই তিন শ্রেনীর মানুষ তাদের অধিকার রক্ষার সমানতালে লড়াই করতে পারে না।

ভালো মানুষ হোন (Be a better person)

সংকল্প করুন যে আপনি তরুণদের প্রতি নরম হবেন, রয়স্কদের প্রতি করুণাপূর্ণ ব্যবহার করবেন, সংগ্রামীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন এবং যারা দুর্বল ও ভুল করেছে তাদের প্রতি হবেন সহনশীল। কারণ আমাদের জীবনে কোনও না কোনও সময়ে আমরাও ঐ অবস্থায় মধ্য দিয়ে গিয়েছি। —Lloyd Shcarer, 1986

 

কাজের পরিকল্পনা (Action plan)

১. নিজের কাজের ফলাফলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হোন।

২. প্রত্যেক বিভাগের একটি ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করুন, যেখানে আপনি আরও বেশি দায়িত্ব নেবেন।

(ক) পরিবার…..

(খ) কর্মস্থল…..

(গ) সামাজিক ক্ষেত্র…………………

৩. এই অধ্যায়টি পড়ার পর আপনি কোন তিনটি বিষয় অনুশীলন করার জন্য বদ্ধপরিকর।

(১) ………

(২) ……..

(৩) ……

আপনার মন্তব্য লিখুন এবং পরবর্তী ২১ দিন প্রতিদিন একবার করে পড়ুন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *