০৪. জুন,১৯৭১

২ জুন,বুধবার ১৯৭১

সকালে একরাম ভাইয়ের ট্রাংকল পেলাম। ভালোমত বরিশালে পৌঁছেছেন।

গতকাল বিকেলের রকেট পি, আর,এস-য়ে বরিশাল রওনা হয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল বড় ছেলে আবু আর ভাস্তে আঞ্জু।

এখন ট্রাংকল পেয়ে খবরটা লিলিবুকে দেবার জন্য বেরোলাম। ওখানে খানিকক্ষণ বসে মার বাসা গেলাম।

গতকাল থেকে সর্দি লেগেছে, সেই সঙ্গে অল্প জ্বরজ্বর ভাব। আজ বিছানায় শুয়ে থাকলে ভালো হত। কিন্তু একবার বেরিয়ে যখন পড়েছিই, তখন সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হলো না। মার সঙ্গে আমার এক খালার বাড়ি বেড়াতে গেলাম। সেখান থেকে মাকে আবার ৬ নংয়ে পৌঁছিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেড়টা।

সর্দি সারানোর দেশী টোটকা কঁচাপেঁয়াজ কুচি, শুকনো মরিচ পোড়া আর খাটি সর্ষের তেল গরম ভাতে মেখে খেলাম।

এত হাঙ্গামা করে এতবড় লেবু গাছটা এনে এত কষ্ট করে পুঁতলাম, কিন্তু কোনো কাজ দিল না। আজ দেখছি, এর পাতাগুলো মরতে শুরু করেছে। রুমী বলল, যে কেউ দেখে বুঝে ফেলবে এর তলায় কিছু লুকোনো আছে। গাছটা তুলে ফেলে দিতে হবে।

এতবড় গাছ তুলে ফেলা কি চাট্টিখানি কথা? ডালগুলো ছোট ছোট টুকরো করে কেটে, কাণ্ডটাও টুকরো করে কেটে গোড়াটা তুলে ফেলা হলো। তারপর গাড়ির বুটিতে নিয়ে দূরের একটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসা হলো। খুব কষ্ট লাগল গাছটা এভাবে কসাইয়ের মতো টুকরো করে কাটতে। ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি–ফলের গাছ নষ্ট করতে নেই। কিন্তু কি করব, জান বাঁচানোর তাগিদে গাছ কেটে ফেলে দিতে হলো।

এখন আবার নতুন করে চিন্তা করো আর কোথায় কিভাবে গহনা লুকিয়ে রাখা যায়।

আজ সর্দিটা খুব বেড়ে গেছে। জ্বরটাও যেন। সর্দি সারার একমাত্র ওষুধ বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম। দুটো নোভালজিন গিলে শুয়ে রইলাম। একটু পরেই রেবার ফোন : টাট্ট আমাদের বাসায় এসেছে কি না।

কি ব্যাপার?

খুব উদ্বেগেও রেবার গলা সহজে কাঁপে না। রাগ হলেও সে চেঁচিয়ে কথা বলতে পারে না। খুবই ঠাণ্ডা মেজাজের মেয়ে। কিন্তু আজ ফোনে তার গলায় কাঁপন বুঝতে পারলাম।

দুপুরে আরো দুটো নোভালজিন খেয়ে জ্বরটা দাবালাম। বিকেল হতে না হতেই রুমী, জামী, শরীফসহ গুলশানের দিকে ছুটলাম। গিয়ে দেখি রেবা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছে, চারপাশে তার আত্মীয়স্বজন বিষন্ন বদনে বসে আছে। মিনিভাই, রেবা ও জাহিরের মুখে টুকরো টুকরো করে পুরো ঘটনাটা শুনলাম : সকালে টাট্রু দেরি করে ঘুমোয়। নাশতা হলে ডেকে তুলতে হয়। আজো ডাকাডাকি হচ্ছিল, কিন্তু আজ আর তার সাড়া পাওয়া যায় না। শেষে রেবা ঘরে ঢুকে দেখে মশারি ফেলাই আছে কিন্তু টাট্রু ভেতরে নেই। প্রথম দিকে হৈ চৈ না করে টাট্রুর বড় ভাই জাহির খুব সন্তর্পণে টার্টুর বন্ধুদের কাছে খবর নেয়। না, টাট্রু তাদের কারো কাছে যায় নি। তবে টাট্রুর দুই বন্ধুকেও তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পাওয়া যায় নি। জাহির একটু আধটু আঁচ পেত টাট্ট কিছু একটার সঙ্গে জড়িত আছে। কিন্তু টাট্রু কোনোদিন খোলাখুলি বড় ভাইয়ের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করে নি। তবে সবাই ধারণা করছে টাট্রু লুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে। আবার ভয়ও হচ্ছে, পথে কোথাও খানসেনাদের হাতে

ধরা পড়ল কি না? ধরা পড়লেওতো জানবার কোন উপায় নেই।

রেবাকে এই প্রথম আকুল হয়ে কাঁদতে দেখলাম। মিনিভাই ও খুব বিচলিত, তবে বাড়ির কর্তা বলেই বোধহয় শান্তভাবটা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে, ভেতরটা তার ভেঙে যাচ্ছে।

সন্ধ্যের মুখে বাসায় ফিরে এলাম। কিন্তু কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছি না। টাট্রু একলাইনের একটা চিঠি রেখে গেলেও তো পারত।

আজ স্বাধীন বাংলা বেতারেও তেমন মন লাগাতে পারলাম না। সেই কে যেন, আজো চরমপত্র পড়লেন। রোজই পড়েন। কে পড়ছেন, নাম শোনার জন্য প্রথম কদিন কান খাড়া করেছিলাম। কিন্তু না, কোনো নাম বলা হয় নি।

ঘুরেফিরে খালি টাট্রুর কথাইমন এলোমেলো করছে। জামীরমুখ চুন। টাট্রু তাকেও কিছু বলে নি। বন্ধুর এই বিশ্বাসঘাতকতায় জামী খুবই মর্মাহত। আমি হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললাম, চল নিচে যাই। মুড়ির মোয়া বানাব। একটা কিছু কাজ করা দরকার।

৩ জুন, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

আজ বিছানায় সটান। বেশ জ্বর। গত তিনদিন ধরে আদার রস দিয়ে বারবার চা খাওয়ার ফলে সর্দি বসে গিয়ে কষ্ট আরো বেড়েছে। বুকে ব্যথা, নিঃশ্বাস নিতে হাঁপ ধরে।

লুলু বিকেলে এসে বলল, মামী, পাঁচশো আর একশো টাকার নোট নাকি অচল করে দেবে?

কে বলল? কোথায় শুনলি?

সবাই তো বলাবলি করছে।

গুজব। কোন রিলায়েবল, সোর্স আছে কি না, খোঁজ নে।

নোট অচল হলে তোমুশকিল। ঘরে দুতিন হাজার টাকা রাখা আছে। বেশির ভাগই পাঁচশো আর একশো টাকার নোট।

রাতে শরীফ ঢাকা ক্লাব থেকে ফিরলে ওকে নোট অচলের গুজবটা বললাম। ও বলল, ঢাকা ক্লাবেও অনেকে এ কথা নিয়েই আলোচনা করছে। আমি বললাম, কালই আমাদের ঘরের টাকাগুলো ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে দিও।

আরে অত ব্যস্ত হবার কি আছে? কথাটা গুজবও তো হতে পারে।

তা হোক। আমাদের টাকা পয়সা বেশি নেই। কালকে জমা দিয়ে দাও তো তারপর না হয় আবার তুলে রাখা যাবে।

শরীফ একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে ড্রেসিং রুমের দিকে চলে গেল কাপড় বদলাতে। অর্থাৎ কথাটা তার মনঃপুত হয় নি।

৫ জুন, শনিবার ১৯৭১

আজো শরীর খুব খারাপ। তবে গত দুদিন যেমন উঠতেই পারি নি, সেরকম নয়। জ্বর বন্ধ হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছি। আজ একটু-আধটু উঠে হেঁটে বেড়াতে পারছি।

সকালে খবরের কাগজ দেখিয়ে শরীফ বলল, শুধু শুধু খাটালে। এই দেখ।

দেখলাম কাগজে হেডলাইন : কোন কারেন্সি নোট অচল নয়। গুজব ভিত্তিহীন।

খবরে বলা হয়েছে : পাকিস্তান সরকারের সকল কারেন্সি নোট চালু থাকবে। জনসাধারণের কাছে আইনসম্মত মুদ্রা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা অব্যাহত থাকবে। কোন কোন কারেন্সি নোট অচল করা হয়েছে বলে যে গুজব ছড়িয়েছে, এবং কোন কোন খবরের কাগজে যে লেখা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন এবং তার পেছনে কোনো সত্যতা নেই।

চুপ করে রইলাম। গতকাল আমার জেদেশরীফকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাকা জমা দিতে হয়েছে। কেবল আমারই নয়, মায়েরও। শুক্রবার এগারোটা পর্যন্ত ব্যাঙ্কিং–নটাতেই রুমীকে মার বাড়ি পাঠিয়ে মার একশো টাকার পাঁচটা নোট আনিয়ে আমাদের পুরো তিন হাজার টাকা শরীফের হাতে তুলে দিয়েছি জমা দেবার জন্য। দিলকুশা কমার্শিয়াল এরিয়াতে শরীফের অফিসের পাশেই ব্যাঙ্ক। ঘন্টাখানেক পরে আবার ফোন করে জেনেছি–শরীফ টাকা জমা দিয়েছে কিনা!

কাসেম এসে বলল, আম্মা, আর অ্যাক ব্যালার মতন চাউল আছে। চাউল কিনন লাগব। রেশনের চালে আমাদের সপ্তাহ যায় না। ভোলাবাজার থেকেও কিনতে হয়।

ধমক দিয়ে বললাম, দুতিনদিন আগে থেকে বলতে পারিস না? তোদের সব সময় বলি না সব জিনিস ফুরোবার দুতিনদিন আগে থেকে বলবি? তা যদি মনে থাকে। মাত্র তিনদিন বিছানায় পড়ে আছি

শরীফ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

আমি কাঁচুমাচু মুখে বললাম, চাল কেনার জন্য।

শরীফ সঙ্গে সঙ্গে বলল, এখন তো সাভার যাচ্ছি বাঁকার সঙ্গে, ফিরতে ফিরতে একটা বেজে যাবে। কালকে টাকা তুলব। বেশ খুশি মুখ নিয়ে বেরিয়ে গেল।

আমি কাসেমকে ধমক দিয়ে বললাম, যা, বেরো সামনে থেকে, হতচ্ছাড়া। চালে কুলোয়, রুটি বানাবি।

শরীফের ফিরতে ফিরতে তিনটে হলো। উদ্বিগ্ন হয়ে দোতলার বারান্দায় পায়চারি করছিলাম। এত দেরি হওয়া তো উচিত নয়। কি জানি কিছু হলো নাকি?

না, ঐ যে গাড়ি এসে থেমেছে গেটে। শরীফ হাকডাক করে ডাকল কাসেম বারেককে। ওপর থেকে দেখলাম, ড্রাইভার ও কাসেম ধরাধরি করে একটা চালের বস্তা নামাচ্ছে! বারেক নামাচ্ছে দুজোড়া মোরগ!

৮ জুন, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজকের কাগজে দুই ইঞ্চি মোটা আট কলামজুড়ে হেডিং ছাপা হয়েছে :

পাঁচশো ও একশো টাকার নোট অচল ঘোষণা।

গত রাতেই টিভিতে অবশ্য এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দেওয়া হয়ে গেছে। স্তম্ভিত যা হবার, লোকে গতকাল রাতেই হয়েছে। সে সময়টা আমি খুব পরিতৃপ্ত মুখ নিয়ে চুপ করেছিলাম। শরীফও চুপ করে ছিল, তবে জ কুঁচকানো অবস্থায়। অবশ্য আমার এ পরিতৃপ্তি বেশিক্ষণ বজায় থাকে নি, রুমী একটা কথায় বেলুন ফুটো করে দিল, আম্মা, আমার প্যান্টের মুড়িতে পাঁচটা একশো টাকার নোট সেলাই করা আছে।

বিকেলে নজলু আর কলিম এসেছে। নোট অচল ঘোষণা করার ফলে কি যে হৈচৈ পড়ে গেছে সারা শহরে। সেই সব কথাই শুনলাম ওদের মুখে। কতোজন যে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীরা যারা কখনো ব্যাঙ্কের ধার ধারে না, নগদেই সব সময় কারবার করে, তাদের মাথায় বাড়ি। যে বুড়ো লোকটা আজ তার মেয়ের বিয়ের বাজার করার জন্য গতকাল ব্যাঙ্ক থেকে কয়েক হাজার টাকা তুলেছিল তার কি উপায় হবে? কতোজনে কত জরুরী পেমেন্ট আজ সকালেই করবার জন্য গতকাল টাকা তুলেছে, তাদেরমহাসর্বনাশ। পাওনাদারের কাছে তাদের মুখ নষ্ট। কারো কারো বাড়িতে বাজার করার মতো টাকা পর্যন্ত নেই। এক কথায় নোট অচল করে সামরিক সরকার দেশের সমগ্র জনজীবন স্থাণু করে দিয়েছে।

৯ জুন, বুধবার ১৯৭১

আজ শরীর একদম ভালো। গোসল করে সাড়ে এগারোটাতে তৈরি হয়ে নিলাম। নজলু আসবে এখুনি। ওকে নিয়ে মার বাসায় যাব। গহনা রাখার বন্দোবস্ত অবশেষে হয়েছে। মার বাড়ির একতলায় সিঁড়িঘরে সিঁড়ির নিচে ছোট্ট একটা বাথরুম আছে। কয়েক মাস আগেই বাথরুমটা করা হয়েছে, এখনো প্যান বসানো হয় নি। এই প্যান বসানোর খালি জায়গাটায় গহনার বাকস রেখে সিমেন্ট করে দেওয়া হবে। রাজমিস্ত্রির কাজটা আমরাই করব। বালি, সিমেন্ট মার বাড়িতেই রয়েছে। নজলুর বাড়িতে তার বউয়ের ছাড়াও কয়েকজন আত্মীয়ের গহনাও আছে। পরের আমানত নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। নজলুও সেসব গহনা মার বাড়িতে পুঁতে রাখবে। নজলু এলে রিকশা করে মার বাড়ি গেলাম। আমার গহনা মার গহনা, নজলু এবং তার আত্মীয়ের গহনা–সবগুলো একটা বড় বিস্কুটের চ্যাপটা টিনে রাখা হলো। সব গহনার লিস্ট করে তার তিনটে কপি করা হলো। একটা লিস্ট গহনার বাকসে থাকবে বাকি তিনটে তিনজনের কাছে।

যার কাজ তারে সাজে, অন্য লোকে লাঠি বাজে। রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে তিনজনে মিলে একেবারে গলদঘর্ম হয়ে গেলাম। বিস্কুটের বাকস প্রথমে তিন-চার পরত প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে দড়ি বাঁধলাম। যাতে বাকসের ভেতর পানি না ঢোকে। বাকসটা গর্তে বসিয়ে তার চারপাশে ছোট ছোট ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে তারপর বালি বিছিয়ে ওপরটা সমান করলাম। তারপর সিমেন্ট করতে গিয়ে একেবারে হয়রান। যাই হোক, কাজ শেষ করে তিনজন খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারিফ করলাম। খুব খারাপ হয় নি। মাকে বললাম, আপনি কাল থেকে রোজ দুবেলা এটা পানি দিয়ে। ভেজাবেন চার/পাঁচ দিন। তারপর আমরা আবার এসে বাড়ির যত ড্রাম, টিন, মটকা, কলসি হাবিজাবি জিনিস আছে, সব এখানটায় ঠেসে এটাকে স্টোররুম বানিয়ে ফেলবো।

নজলু হেসে বলল, আশা করি তার আগেই খানসেনারা এসে হামলা করবে না।

আমি ধমকে উঠলাম, বালাই ষাট। অকথা কুকথা কেন বলছ?

মা বললেন, কোন ভয় কোরো না। রোজ আমি দোয়া-দরুদ পড়ে বাড়ি বন্ধ করি। আল্লার রহমতে কোন খানসেনা কি বিহারি এ বাড়িতে আসতে পারবে না।

মার প্রত্যয়ে আমরাও অনেকখানি ভরসা পেলাম।

১০জুন, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

দুপুরে খেয়ে কেবল একটু শুয়েছি, অমনি ফোন বেজে উঠল। একটু বিরক্তই হলাম। কে এমন অসময়ে–

ফোনে রেবার গলা : আপা, টাট্রু ফিরেছে। এই একখুনি।

ফোন রেখে তড়াক করে উঠে হাঁক পাড়লাম, রুমী, জামী, শিগগির তৈরি হয়। গুলশান যাব। টাট্ট ফিরেছে।

পনের মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে চারজনে বেরিয়ে পড়লাম গুলশানের পথে।

রুমী বলল, আম্মা, তুমি যেন মেলাই প্রশ্ন কোরোনা। ও নিজে থেকে যেটুকু বলবে, সেইটুকু শুনে সন্তুষ্ট থেক।

একটু রাগতস্বরে বললাম, ঠিক আছে, মুখে তালা এঁটে রাখলাম।

রেবার বিছানার ওপর টাট্রু বসে আছে–এলোমেলো চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গর্তে বসা লাল চোখ। এমনিতেই সে রোগা-পাতলা, মুখটা চিকন। এখন মনে হচ্ছে কতদিন না খেয়ে খেয়ে মুখ দড়িপানা হয়ে গেছে।

টাট্রু অসম্ভব ক্লান্ত। এর আগে নিশ্চয় বাড়ির সবাইকে বলতে হয়েছে তার উধাও হবার কাহিনী। তবু আমাদেরকে আবার সব বলল সে।

দুজন বন্ধুর সঙ্গে টাট্রু দাউদকান্দিতে নদী পেরিয়ে পর্যায়ক্রমে বাসে, রিকশায় ও পায়ে হেঁটে বর্ডার ক্রস করে। ওপারে নগরদা বলে একটা জায়গায় যে ক্যাম্পটা ছিল, সেখানে ওরা ওঠে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের এক অধ্যাপক ওখানে এই ক্যাম্পটা অর্গানাইজ করেছেন। প্রতিদিনই নতুন নতুন ছেলে গিয়ে হাজির হচ্ছে। অধ্যাপক তাদেরকে রিক্রুট করে, বাছাই করে কোম্পানি গঠন করে তারপর পাটুনে ভাগ করে দিচ্ছেন। একজন ল্যান্স নায়েক ছেলেদেরকে ট্রেনিং দেন। তাকে সবাই ওস্তাদ বলে, নাম তোফাজ্জল মিয়া। প্রত্যেক দলের চারদিন করে ট্রেনিং। একেবারেই এলিমেন্টারি ট্রেনিং। টাট্রুরা যাবার পরদিন ওদের ট্রেনিং শুরু হলো। প্রথমদিকে গুলিগোলা বুলেট গ্রেনেড এসব কম ছিল বলে ট্রেনিং পাবার পর সব দলই অপারেশনে যেতে পারত না। টাট্রুর কপাল ভালো, সেই সময় কিছু গুলিগোলা গ্রেনেড পাওয়া গিয়েছিল। তাই টাট্রু দুএকটা অপারেশনে যেতে পেরেছিল।

রুমীর নিষেধ ভুলে মুখ ফসকে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে এল, এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে?

টাট্ট বলল, আমাকে ঢাকাতেই কিছু কাজের ভার দিয়ে পাঠিয়েছে। ওখানে ক্রমেই ছেলেদের ভিড় বাড়ছে। থাকার জায়গার অভাব, খাবার অভাব। খাওয়া শুধু ভাত আর ডাল। তাও সব সময়ই চাল যোগাড়ের ধান্দায় থাকতে হয়। তার ওপর বৃষ্টি। সে যে কি কষ্ট। ভাতের কষ্ট তো ছিলই, বৃষ্টিতে ভিজে, সেঁতসেঁতে মাটিতে শুয়ে বহু ছেলের জ্বর হয়ে গেল। আর পেটের অসুখ। ওষুধেরও অভাব। তাই অধ্যাপক একেক দলকে একেক দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন দিকে পাঠাতে লাগলেন।

আমি আবার একটা প্রশ্ন করে ফেললাম, একদিন ঘুম-খাওয়া কিছুই হয়নি নাকি?

টাট্রু হাসল, খাওয়া মোটামুটি হয়েছে। ঘুমোনোর সময় একেবারেই পাইনি। একে যাওয়ার পরিশ্রম, গিয়েই ট্রেনিং, তারপর অপারেশনের ধকল, আবার ফিরে আসা টেনশনও তো ছিল। তাছাড়া ওখানে যাবার চারদিন পর ক্যাম্প সরাবার অর্ডার হলো। সবভেঙেচুরে নিজেরাই মাথায় বয়ে তিন মাইল দূরে গিয়ে নতুন ক্যাম্প করা হল।

আমি আর থামতে পারলাম না। আবার প্রশ্ন : কি ভেঙে নিয়েছিলি?

ঘরের বেড়া, তাঁবু, বাঁশ, চাটাই। হাঁড়িকুড়ি, অন্যান্য জিনিসও মাথায় বইতে হয়েছে। সে খাটনিটাও কম ছিল না। তবে একটা সান্ত্বনা ছিল, নতুন ক্যাম্পে এসে একটা ফ্রেশ পুকুর পাওয়া গেল।

ফ্রেশ পুকুর মানে?

টাট্রু হেসে ফেলল, সাধারণত ক্যাম্প করা হয় পুকুর বা নদীনালার পাশে যাতে পানি পাওয়া যায়। নগরদা ক্যাম্পের পাশে একটা পুকুর ছিল, সেটার পানি নাওয়া খাওয়া, ঘোয়াপাখলা সব কাজ করতে করতে একেবারে পচে যাবার মতো হয়েছিল। তাই তিন মাইল দূরে যে পুকুরটার পাশে নতুন ক্যাম্প করা হলো, সেটার পানি তখনো ফ্রেশ ছিল। অবশ্য এটাও জানতাম–এতগুলো ছেলে ব্যবহার করতে করতে কয়েকদিনের মধ্যে সেটাও পচিয়ে ফেলবে।

আমরা উঠলাম। এতদিনে মুক্তিযুদ্ধের একটা বাস্তব ছবি মনের চোখে ফুটে উঠল। এর আগে বহুবার শুনেও যেন বিশ্বাস হতে চাইত না। মুক্তিযুদ্ধ সত্যি সত্যি হচ্ছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের একটি ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা একটি ছেলের মুখে শুনে মনে হলো সত্যি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে। এবং দলে দলে ছেলে যুদ্ধ করতে ছুটে যাচ্ছে।

ঘর থেকে বেরোবার আগে রুমী বলল, এক কাজ কর। খুব ভালো করে সাবান ঘষে গোসল করে পেট ভরে ডাল-ভাত খাও। তারপর দরজা বন্ধ করে কষে একটা ঘুম দাও।

সারাটা সময় জামী একটাও কথা বলে নি।

১১ জুন, শুক্রবার ১৯৭১

ইয়াহিয়া সরকার বেশ ভালো ফ্যাসাদেই পড়ে গেছে মনে হচ্ছে। বিশ্বব্যাঙ্ক ও জাতিসংঘকে ভালোমতো বুঝিয়ে উঠতে পারছে না যে, পূর্ব পাকিস্তানে যা চলছে, তা বিচ্ছিন্নতাবাদী কতিপয় দুষ্কৃতকারীর নাশকতামূলক কাজের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ মাত্র। এবং সে ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে আইন ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পর পাকিস্তানের সশস্ত্র সেনাবাহিনী এখন রিলিফ ও পুনর্বাসনের কাজে প্রাদেশিক সরকারকে সাহায্য করছে। প্রদেশের সর্বত্র এখন স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ সব পুরোদমে চলছে। কল-কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন চলছে। বাস, কোচ, ট্রেন, স্টিমার সব পুরোদমে চলছে। জনপ্রিতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি ইয়াহিয়া মোটেও ভোলেন নি। পূর্ব পাকিস্তানের ঐ বিচ্ছিন্নতাবাদী দুষ্কৃতকারীদের নাশকতামূলক আন্দোলনের জন্যই তার ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনাটি একটুখানি পিছিয়ে গেছে মাত্র। কিন্তু তার লক্ষ্য অভ্রান্ত রয়েছে :তিনি নির্বাচন বিফলে যেতে দেবেন না। জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা তিনি অতিশীঘ্রই ঘোষণা করবেন। তবে হ্যাঁ, জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গিয়ে তিনি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে দিতে পারেন না। সেই জন্যই একটুখানি দেরি হচ্ছে।

পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্যদের খুঁজে বের করার জন্য ইয়াহিয়া বেগম আখতার সোলায়মানকে ঢাকা পাঠিয়েছে তার ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণার পর পরই। বেগম আখতার ঢাকায় এসে ইতোমধ্যেই অনেক আওয়ামী লীগ এম.এল.এ ও এম.পি.এ-র সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছেন। খবরের কাগজে প্রকাশ : তিনি ১০৯ জনের স্বাক্ষর যোগাড় করে ফেলেছেন! (খুবই নিবেদিতপ্রাণ করিতকর্মা মহিলা, বোঝা যাচ্ছে।)।

বার বার এসব কথা বলে, রেডিও-টিভি খবরের কাগজের প্রচার মাধ্যমে এত সব সাফাই গেয়েও পাকিস্তান সরকার বিশ্বব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে ভোলাতে পারছে না। চলতি বছরের বৈদেশিক ঋণের মে-জুন মাসের কিস্তি ৩ কোটি ডলার শোধ দেওয়া পাকিস্তানের পক্ষে এখনই সম্ভব নয় বলে এইড কনসর্টিয়ামের কাছে পাকিস্তান ছয় মাসের সময় চেয়েছিল গত মাসের পয়লা তারিখেই। সে সময় দেওয়া হবে কি না, এখনো পর্যন্ত তার কোন সুরাহা হয় নি। গত মাসের শুরুতেই এসব বিষয়ে সরজমিনে তদন্ত (পাকিস্তানি প্রচার মাধ্যমের ভাষায় আলোচনা!) করার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের এইড-টু-পাকিস্তান কনসর্টিয়াম-এর চেয়ারম্যান মিঃ পিটার কারগিল একদল সহকর্মী নিয়ে ইসলামাবাদে হাজির। কয়েকদিন সেখানে খোদ প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে তার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম.এম. আহমদ পর্যন্ত অনেক বড় বড় কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে কি হলো, আল্লা জানে। কদিন পর এম.এম. আহমদ দৌড়ালেন ওয়াশিংটনে, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারার কাছেদরবার করতে। তারপরও তো মাস কাবার হয়ে গেল। মরিয়া হয়ে ইয়াহিয়া ২৪ মে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথাও ঘাষণা করলেন। কিন্তু কোথায় কি? বিশ্বব্যাঙ্ক মিশন এখন দশদিন ধরে পূর্ব পাকিস্তান সফর করছে।

ওদিকে উ থান্ট পূর্ব পাকিস্তানকে সাহায্য দিতে সম্মত হয়েছে, তবে সে সাহায্য জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে। পাকিস্তান তাতে রাজি নয়। পাকিস্তান সরকার জোর গলাতে মাথা নেড়ে বলছে–পাকিস্তানের নিজস্ব রিলিফ সংস্থা এসব সাহায্যসামগ্রী বিতরণের কাজে যতেষ্ট পটু। কিন্তু উ থান্ট-ভবী তাতে ভুলছে না!

জাতিসংঘের হাইকমিশনার ফর রিফিউজীজ প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খানও এখন ঢাকায়। তাকে বোধহয় মুশকিল আসান হিসেবে ইয়াহিয়া জাতিসংঘ থেকে ডেকে এনেছেন।

পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক গোলযোগের সময় যেসব প্রকৃত পাকিস্তানি, বিদ্রোহী ও দুষ্কৃতকারীদের ভীতি ও হুমকি প্রদর্শনের মুখে পাকিস্তান ত্যাগে বাধ্য হয়ে সীমান্তের অপর পারে গমন করেছেন তাদের সকলকে সাদরে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসিত করবেন এই মর্মে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এক বিবৃতিতে আশ্বাস প্রদান করেছেন। এবং এর প্রেক্ষিতে গত সপ্তাহেই ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথের ওপর অভ্যর্থনা শিবির খোলা হয়েছে।

ঢাকায় আসার আগে প্রিন্স সদরুদ্দিন ইসলামাবাদে কয়েকদিন ছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যথাযোগ্য ব্রিফিং নেবার জন্যই। গতকাল ঢাকায় পৌঁছেই প্রিন্স ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, খাটি পাকিস্তানিদের পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন সম্পর্কে গভর্নর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে। তিনি আজই চুয়াডাঙ্গা আর বেনাপোলের কাছে দুটো অভ্যর্থনা কেন্দ্র পরিদর্শন করে এসেছেন।

(কি নিষ্ঠা! কি উদয়াস্ত পরিশ্রম!)

ওদিকে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত তিনদিন আগেই উথান্টকে জানিয়েছেন যে, আমেরিকান সরকার আরো অতিরিক্ত পনের মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছেন ভারতে পূর্ব পাকিস্তানি উদ্বাস্তুদের সাহায্যের জন্য। আরো খবর-মিসর ভারতে পাঠাচ্ছে। প্রচুর পরিমাণে কলেরা ভ্যাকসিন।

কল্পনার চোখে দেখলাম ইয়াহিয়া এ খবর পেয়ে মাথার চুল ছিড়ছেন। আর উদ্বাস্তু সংক্রান্ত হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিনকে কোন কম্মের নয় বলে গাল দিচ্ছেন!

আজ থেকে ঢাকায় সান্ধ্য আইন সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।

১২ জুন, শোনিবার ১৯৭১

শহরে কলেরার প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। দেশের অন্যান্য জায়গায় কলেরার কথা আগেই কানে এসেছে। কলকাতার শরণার্থী শিবিরে কলেরা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। মজার কথা, দেশের প্রচার মাধ্যমগুলোতে কলকাতার কলেরার কথা যতটা ফলাও করে বলা ও লেখা হচ্ছে, দেশের কলেরার ব্যাপার ততটাই চেপে যাওয়া হচ্ছে। কলেরা এখন ঢাকাতেও। সবাই সবাইকে বলছে মাছ খেয়ো না। মাছতো কবে। থেকেই খাওয়া ছেড়েছি। সেই নদীতে লাশের বহর ভেসে থাকার পর থেকেই।

টি.এ.বি.সি. ইনজেকশান নেওয়া দরকার। মিয়াকে ফোন করা হয়েছিল গতকাল। সে আজ দুপুর বারোটা নাগাদ আসবে বাসায়। মিয়া অর্থাৎ ডাঃ জহুরুল হক রেবার বড় বোনের দেবর। হেলিফ্যামিলি হাসপাতালে কর্মরত।

দশটার দিকে নিউ মার্কেটে গিয়ে ইনজেকশানের জন্য ওষুধ কিনে মার বাসায় গেলাম। টি.এ.বি.সি. দেবার জন্য মা আর লালুকে নিয়ে এলাম।

পাঁচটার সময় রুমী বলল, গাড়িটা একটু নেব আব্দু।

শরীফ বলল, আমাকে ক্লাবে নাবিয়ে দিয়ে যা।

রুমী গাড়িতে ওঠার আগে আস্তে করে বললাম, সাবধানে।

রুমী একটু হাসল আমার দিকে চেয়ে।

সন্ধ্যার আগ দিয়ে মনু এল, বললাম, রুমীততা একটু বেরিয়েছে। এসে পড়বে এক্ষুণি। যাও, ওপরে ওর ঘরে গিয়ে বস। মনু দোতলায় উঠতে না উঠতে রফিক এল। শরীফ নেই শুনে বেশিক্ষণ বসল না, আমিও চাপাচাপি করলাম না। এখন মনুর সঙ্গে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি।

রফিককে বিদায় দেবার জন্য দরজা খুলতেই দেখি ওয়াহেদ সাহেব ঢুকছেন শরীফের এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু! বলে উঠলাম, শরীফ যে এক্ষুণি ক্লাবে গেল। আপনারও নাকি যাবার কথা?

ভদ্রলোক থতমত খেয়ে বললেন, তাই নাকি? তাহলে ক্লাবেই যাই।

উনি চলে যেতেই দরজা বন্ধ করে আমি দুদ্দাড় ওপরে উঠে এলাম। মনু আর জামী বসে বসে গল্প করছে। আমাকে দেখে মনু একটু উঠে দাঁড়িয়ে আবার বসল। বললাম, কি খবর বল।

খবর আর কি! এই চলছে। বিভিন্ন গেরিলা গ্রুপ ঢাকায় আসছে, আলাদাভাবে নির্দেশমত কাজ সেরে আবার চলে যাচ্ছে। আমরা ইচ্ছে করেই একদল আরেক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি না। অবশ্য দেখা-সাক্ষাৎ হয়েই যায় বন্ধুবান্ধব সব গ্রুপেই আছে।

মনু চুপ করল। আমি আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। প্রশ্ন করা নিষেধ। বেশি জানা বিপজ্জনক। আমি অন্য প্রসঙ্গ তুললাম। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা তো খুব খারাপ।

মনু সপ্রশ্ন চোখ তুলে তাকাল। বললাম, তিন মাস থেকে উৎপাদন বন্ধ। রপ্তানি বন্ধ। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের লোন শোধ করার ক্ষমতা নেই, নতুন লোন পাবার কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাজেট তৈরির সময় এসে গেল। এত ঢাকঢাক করার পরেও গভর্নমেন্ট এতটুকু কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে–মার্চ-এপ্রিলে প্রদেশের। উৎপাদনে যা ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করা কঠিন হবে। গত বছর রপ্তানি খুব ভালো হয়েছিল। এবার একেবারে গোল্লা।

মনু বলল, অথচ পাকিস্তান সরকার কি রকম দুকান কাটা নির্লজ্জ দেখুন, বলছে জাপানের কাছে যে তিন কোটি ডলার ধার পাওয়ার কথা ছিল, সেটা জাপান দেয় নি বলেই পাকিস্তান এখন ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের ধার শোধ করতে পারছে না। মনু দেখছি, দেশের হালচালের বেশ ভালো খবর রাখে।

হঠাৎ একটা আওয়াজে চমকে উঠলাম। দূরে কোথাও বোমা ফাটল বোধহয়। প্রথমটার রেশ মিলাতে না মিলাতেই আরেকটা শব্দ, তারপর আরো একটা।

আমি ছটফট করে উঠে দাঁড়ালাম। ঘড়িতে দেখলাম আটটা বাজে। কথায় কথায় এতটা সময় চলে গেছে।রুমী এখনো ফিরছেনা কেন। ঐ এক দোষ, গাড়ি হাতে পেলে হয়। সময়জ্ঞান তখন আর থাকে না। জামী রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার ধরল। আমি স্থির হয়ে শুনতে পারছিলাম না। তোমরা শোনো বলে ছাদে উঠে গেলাম।

একটু পরেই গাড়িটাকে গেটে ঢুকতে দেখলাম। তরতর করে নিচে নেমে গিয়ে নিজেই দরজা খুললাম। রুমীর মুখে কাঁচুমাচু হাসি। ধমক দিয়ে বললাম, গাড়ি হাতে পেলে হুশ থাকে না, না? ওদিকে মনু এসে বসে আছে সেই সন্ধ্যে থেকে। কোন রাস্তা দিয়ে এলি? কোনো শব্দ পেয়েছিস?

পেয়েছি। ঠিক বঝুতে পারলাম না কোথায়।

একটু পরে শরীফ বাড়ি ফিরল। বলল, ওরা ঢাকা ক্লাব সুইমিং পুলের বারান্দায় বসেছিল। উত্তরদিকে বোমা ফাটার শব্দ পেয়েছে। খুব সম্ভব রেডিও স্টেশনে ফেটেছে। কারণ ঢাকা ক্লাবের উত্তরেই রেডিও স্টেশন।

রুমী হঠাৎ বলে উঠল, না, না, রেডিও স্টেশনে না, রেডিও স্টেশনে না। নিশ্চয় ইন্টারকনে। ওখানে এখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংঙ্ক মিশনের লোকজন আর ইউনাইডেট নেশনস এর প্রিন্স সদরুদ্দিন আছে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি–বোমা ওখানেই ফেটেছে।

আমাদেরও তাই মনে হলো। ওখানে বোমা ফাটানোর যৌক্তিকতাই সবচেয়ে বেশি।

মনু উঠে দাঁড়াল, রুমীর দিকে চেয়ে, ধীর শান্ত গলায় বলল, আমরা পরশুদিন সকালে রওনা দেব।

১৩ জুন, রবিবার ১৯৭১

দুপুর হতে হতে বহুজনের মুখে বিস্তারিত খবর জানা গেল। তিনটে গ্রেনেড গতকাল ইন্টারকনের পোর্চেই বিস্ফোরিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের কাজ এটা। বিশ্বব্যাঙ্ক মিশনের লোকজন ও উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিনকে একটুখানি জানান দেওয়া যে পূর্ব পাকিস্তান আর নেই। এটা এখন যুদ্ধরত বাংলাদেশ।

রুমী আগামীকাল যাবে। ওর প্যান্টের মুড়ি খুলে একশো টাকার নোট বের করে জমা দিতে হয়েছে। এখন আবার পঞ্চাশ টাকার নোট ভাঁজ করে সেলাই করলাম। আগের মতো অত দেওয়া গেল না। মুড়ি বেশি মোটা দেখায়। খানসেনারা সার্চ করার সময় কোমর হাতিয়ে দেখে।

সন্ধ্যার পর রুমী নাদিমকে বাসায় নিয়ে এল। মেজর (অবঃ) কাজি নুরুজ্জামানের ছেলে। মেজর জামান ক্র্যাকডাউনের সঙ্গে সঙ্গেই ওপারে চলে গেছেন। বর্ডার সংলগ্ন কোনো এক রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে রত আছেন। ওঁর স্ত্রী সুলতানা জামান এবং দুই মেয়ে নায়লা এহমার ও লুবনা মরিয়ম মে মাসে চলে গেছে ওপারে। বাকি শুধু নাদিম। এখন রুমীর সঙ্গে যাবে। আজ রাতটা এখানেই থাকবে।

রাত নটার দিকে নাদিমের মামা এলেন ওর সঙ্গে দেখা করতে। আর এল সাদ আন্দোলিব। রুমীর অভিন্নহৃদয় বন্ধু। সাদ আবার নাদিমের ফুফাত ভাইও বটে। ওরা খানিকক্ষণ থেকে তারপর চলে গেছে।

১৪ জুন, সোমবার ১৯৭১

আবার সেই সকালে উঠে যন্ত্রচালিতের মত তৈরি হওয়া, নাশতা খাওয়া, গাড়িতে নিয়ে মাঝপথে কোথাও নামিয়ে দেওয়া।

নাদিম আর রুমী চলে গেল।

সারাটা দিন বাগানে কাটালাম। কাসেমকে রান্নাঘরে আর জামীকে বাবার কাছে রেখে বারেককে নিয়ে সারাদিন ধরে আগাছা নিড়ালাম। সেই সঙ্গে বারেককে বকুনি তোকে না রোজ বিকেলে আগাছা নিড়াতে বলেছি? কদ্দিন খুরপি লাগাস নি? দাঁড়িয়ে দেখলে কাজ করবি না? তাহলে বলে দে, এক্ষুণি মাইনেপত্র দিয়ে বিদায় করে দি।

কে যেন গেট দিয়ে ঢুকে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। মুখ তুলে দেখি খুকু। ডাঃ এ. কে খানের মেয়ে। ওরা কিছুদিন থেকে রাজশাহীতে। ডাক্তার এখন ওখানকার হাসপাতালে পোস্টেড।

বললাম, খুকু কবে এলে? কার সঙ্গে? ডাক্তার এসেছে? চল, ঘরে চল।

খুরপি ফেলে খুকুকে নিয়ে ঘরে গেলাম। নিচের বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে বসলাম।

খুকু, তার ভাই খোকন আর খালা মঞ্জু, এই তিনজনে মার্চের মাঝামাঝি পাবনার এনায়েতপুরে নানার বাড়িতে চলে যায়। এতোদিন ওরা গ্রামেই ছিল। ক্র্যাকডাউনের পর প্রায় তিন সপ্তাহ রাজশাহীর কোনো খবর পায় নি। তারপর বাপের চিঠিতে জানে সবাই বেঁচে আছে।

তোমাদের গ্রামে মিলিটারির কোনো উৎপাত হয়েছিল?

না, আমাদের গ্রামে মিলিটারি যায় নি। তবে খবর পেতাম অন্যদিকে অনেক গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। টেলিফোন টেলিগ্রাফ লাইন সব নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চিঠিপত্রও অনেকদিন যায় নি।

ঢাকায় এলে কার সঙ্গে?

সারওয়ার মামার সঙ্গে।

খোকন, মঞ্জু কোথায়?

ওরা এনায়েতপুরেই আছে। পরে আসবে। এক সঙ্গে সবাই আসতে সাহস পেলাম। পথঘাট কিরকম আছে, কিছুই তো জানা ছিল না। খালাম্মা, আব্বাকে ফোন করতে হবে।

নিশ্চয়।

তক্ষুণি ট্রাঙ্কল বুক করলাম রাজশাহীতে। খুকুকে বললাম, ফোন না পাওয়া পর্যন্ত তুমি এখানেই থাক। চা-নাশতা খাও, কাগজ পড়। টিভির সময় হলে টিভি দেখ। তারপর স্বাধীন বাংলা রেডিও শুননা। গ্রামে শুনতে স্বাধীন বাংলা?

শুনতাম খালাম্মা। গ্রামে ট্রানজিস্টার ছাড়া আর তো কিছু ছিল না। তাই সবসময় রেডিওই শুনতাম। ২৫ মার্চের পরে তো খালি আকাশবাণী আর বিবিসি শুনতাম। তারপর স্বাধীন বাংলা রেডিও শুনতে পেলাম।

অনেক রাত পর্যন্তও লাইন পাওয়া গেল না। শেষে খুকু বলল, এখন বাসায় যাই খালাম্মা। কাল সকালে আবার চেষ্টা করব।

১৫ জুন, মঙ্গলবার ১৯৭১

সকালে উঠেই ডাঃ এ. কে. খানকে আবার ফোন বুক করলাম। খুকুর পৌঁছানোর খবরটা দেওয়া দরকার। খুকুকে বললাম, তুমি ওপরে থাক। জামীর সঙ্গে গল্প কর। ফোন এলে আমার বেডরুমে ধোরো। আমি নিচে একটু সংসারের কাজ করি।

এগারোটার সময় বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং লেখক। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় একদিন বাংলা একাডেমীতে স্বাধীন বাংলার রূপরেখা বলে একটা দুঃসাহসী প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। আগেও চিনতাম কিন্তু ঐ প্রবন্ধ পাঠের পর থেকেই যোগাযোগটা বেড়েছে।

চা-নাশতা দিয়ে জিগ্যেস করলাম, হাসান হাফিজুর রহমানের কোনো খবর জানেন?

বোরহান চমকে বললেন, না। কেন, কিছু শুনেছেন?

না, না, ভয় পাবার কোন কারণ নেই। ওঁর কোনো খবর জানি না কি-না-তাই—

আমিও জানি না। লুকিয়ে আছেন কোথাও। হয়তো কোনো গ্রামে।

ওর খবর পেলে আমাকে জানাবেন।

জানাবো। বোরহান খুব কম কথা বলেন। দুটো কাজের ভার দিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক মনসুর মুসার স্ত্রী শামসুন্নাহার মুসা মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের মহিলা শাখায় কাজ করেন। বলাকা বিল্ডিংয়ে ব্যাঙ্ক। ওঁর কাছে গিয়ে কিছু কথা বলতে হবে। আর বাংলা একাডেমীর ডিরেক্টর কবীর চৌধুরীকে একটা চিঠি দিতে হবে।

ঠিক আছে। কালকে যাব।

রাজশাহীর লাইন পেলাম দেড়টায়। খুকু তার আব্বা, মার সঙ্গে কথা বলল। আমিওদুচারটে কথা বললাম। এ. কে. খান জিগ্যেস করলেন, আপনারা সবাই ভালো তো? শরীফ? রুমী-জামী? শরীফের আব্বা?

হ্যাঁ, সবাই ভালো।

জবাব দেবার সময় বুকে ব্যথা লাগল। রুমী ভালো আছে কি? জানি না তো।

১৬ জুন, বুধবার ১৯৭১

কবীর চৌধুরী বারুদের স্কুপের ওপর বসে আছেন। বাংলা একাডেমিতে চিঠি সঙ্গে নিয়ে ঢোকা ঠিক হবে না। বোরহানও সেই কারণে নিজে যায় নি। দশটার সময় ফোন করলাম কবীর চৌধুরীকে। ওর ফোন ট্যাপ হয়। কথাবার্তা সাবধানে বলতে হবে। নামটাম কিছু না বলে শুধু বললাম, আপনার বন্ধুর যে খুব অসুখ। আজই একবার আসবেন।আমার যা মার্কামারা গলা, নাম না বললেও কারোরই চিনতে অসুবিধা হয়। উনি বললেন, সত্যি খুব অন্যায় হয়ে গেছে এতদিন খবর না নিয়ে। যাব।

ফোন সেরে হেঁটে হেঁটে গেলাম বলাকা বিল্ডিংয়ের নিচতলায় মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের মহিলা শাখায়। বিরাট একটা ঘর, ম্যানেজারের জন্য কাচের দেয়ালঘেরা আলাদা কোন কিউবি নেই। একেবারে হার্ট যেন। ম্যানেজার মিসেস শামসুন্নাহার মুসার টেবিল ঘিরেই একগাদা মহিলা। ঘরময় মহিলা থইথই করছে।

ওঁর কাছে দাঁড়িয়ে বললাম, একটা একাউন্ট খুলব। জাহানারা ইমাম নাম।

উনি খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, একটু বসতে হবে। যারা আগে এসেছেন, তাদের কাজগুলো আগে সেরে নিই।

দেয়াল ঘেঁষে একটা চেয়ার খালি হতেই সেখানে গিয়ে ঝুপ করে বসে পড়লাম।

বসে বসে মিসেস মুসাকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। শ্যামলা, স্বাস্থ্যবতী, খুব স্মার্ট চেহারা, তীক্ষ্ণ মিষ্টি গলার স্বর। মনে হয় একই সঙ্গে দশ হাতে কাজ সারতে পারেন। অন্তত এই মুহূর্তে তার কাজ করার ধরন দেখে তাই মনে হলো।

টেবিলের সামনের তিন-চারটে চেয়ার খালি হলে তবে উনি আমাকে ডাকলেন। গিয়ে বসলাম। নতুন একাউন্ট খোলাম ফরম ইত্যাদি বের করে বললেন, একটা লকারও নেবেন নাকি? গহনাপত্র দলিল এসব রেখে দিলেন নিশ্চিন্ত। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, হ্যাঁ, নেব।

কি সাইজের নেবেন? একটু দেখে নিন। ছোট, বড়, মাঝারি সব সাইজের আছে। আসুন, স্ট্রংরুমে গিয়ে দেখে নিন।

স্ট্রংরুমের দিকে যেতে যেতে বললেন, খুবই নিরাপদ এই লকারগুলো। অনেকেই নিচ্ছে। একদম নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

স্ট্রংরুমের ভেতর ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিতে দিতেই নাহারের মুখ-চোখের ভাব বদলে গেল, ফিসফিস করে বললেন, বোরহান ভাই আমাকে ফোন করে বলেছেন আপনার কথা। ওখানে ভিড়ে কথা বলা যেত না। তাই লকার দেখার নাম করে। তা আপনিও দেখি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলেন। এবার বলুন কি কথা?

আমি মনে মনে একটু গুছিয়ে নিয়ে বললাম, মুক্তিযুদ্ধ ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, সে তো বুঝতেই পারছেন। গেরিলারা এখন ঢাকায় ঘনঘন আসছে, অপারেশন করছে। তাদের শহরে থাকা-খাওয়া প্রোটেকশনের জন্য কিছু কিছু বাড়িদরকার, জখম হয়ে গেলে লুকিয়ে চিকিৎসার জন্য ডাক্তার আর ক্লিনিক দরকার, ওষুধপত্র, কাপড় চোপড়ের জন্য টাকা দরকার। এসব কাজে আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন কি?

নিশ্চয় পারব। এবং করবও। এতো আমাদেরই বাঁচা-মরার প্রশ্ন। শুধু বলে দিন, কিভাবে সাহায্য করতে হবে।

বোরহান আপনাকে দরকারমত জানাবে।

স্ট্রংরুম থেকে বেরিয়ে এসে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা একাউন্ট খুললাম।

বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় বারোটা।

কবীর চৌধুরী এলেন একটায়। মিনিট দশেক বসে, উঠলেন। চিঠিটা আমি প্যান্ট্রিতে একটা মুড়ির টিনের নিচে চাপাদিয়ে রেখেছিলাম। সেখান থেকে এনে কুণ্ঠিত হয়ে বললাম, ময়লা লেগে গেছে। কিছু মনে করবেন না।

উনি হেসে ফেললেন।

১৭ মে খবরের কাগজে যে বিবৃতি বেরিয়েছিল সেইটাতেই সই নেবার জন্য কবীর চৌধুরীর কাছেও লোক গিয়েছিল। উনি সই করেন নি, অফিসেও নিয়মিত যাচ্ছেন।

বোরহান বলছিলেন, আমিও বলছি, একটু সাবধানে থাকবেন।

কবীর চৌধুরীর আপাত স্র বিনীতভাবের অন্তরালে একটা ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা লুকানো আছে, ওঁর হাসিতে সেটা যেন ঝলসে উঠল, মরার আগে আর মরতে পারি নে।

কবীর চৌধুরী যেতে না যেতেই ফকির এসে ঢুকল, শরীফ কই?

এখনো আসে নি। বসুন, এখুনি চলে আসবে। খেয়ে যাবেন কিন্তু।

শরীফ এলে আমরা চারজনে খেতে বসলাম। ফকির চারদিকে তাকিয়ে বললেন, রুমী কই?

ও হো, বলা হয় নি বুঝি। ওর বন্ধু খুরশীদ–ওই যে আমাদের সামনের বাড়িতে থাকে ওকে দেশে যেতে হলো। কি একটা জরুরি দরকার। একা যেতে ভয় পেল, তাই রুমীকে সঙ্গে নিয়ে গেল।

ও। ফকির চোখ নামিয়ে খাওয়ার মন দিলেন। ফকির জানেন রুমী মুক্তিযুদ্ধে গেছে। কিন্তু সে কথা মুখে উচ্চারণ করা বারণ। বাঁকার ভাগনে খালেদ মোশাররফ ক্র্যাকডাউনের সঙ্গে সঙ্গে ডিফেক্ট করে বর্ডার ক্রস করে গিয়েছিল। বহুদিন তার কোনো খবর ছিল না। সবাই ভেবেছিল হয়তো মেরেই ফেলেছে পাকসেনারা। এখন জানা গেছে সে আগরতলার দিকে বর্ডার রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। কিন্তু আমরা কখনো তার কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করি না। আমরা যে জানি, বাঁকা সেটা জানেন। বাঁকা যে জানেন আমরা সেটা জানি। কিন্তু আমরা আর বাঁকারা একত্র হলে কখনো তার সম্বন্ধে কোনো আলোচনা করি না। এইটাই নিয়ম। ফকির বুঝিবা ভুলে জিগ্যেস করে ফেলেছিলেন।

ঢাকাকে জাতে ওঠানোর জন্য সামরিক সরকার উঠেপড়ে লেগেছে। ঢাকার রাস্তাগুলোর নাম বদলানো হয়েছে। আজকের কাগজে লম্বা ফিরিস্তি বেরিয়েছে। লালমোহন পোদ্দার লেন হয়েছে আবদুল করিম গজনভী স্ট্রিট। শাঁখারিবাজার লেন গুলবদন স্ট্রিট, নবীন চাঁদ গোস্বামী রোড–বখতিয়ার খিলজি রোড, কালীচরণ সাহা রোড–গাজি সালাউদ্দীন রোড, এস. কে. দাস রোড–সিরাজউদ্দিন রোড শশীভূষণ চ্যাটার্জী লেন–সৈয়দ সলিম স্ট্রিট। খানিক পড়ার পর হয়রান হয়ে গেলাম। এত নাম পড়া যায় না। পড়তে পড়তে চোখে ধাধিয়ে ওঠে।

জামী বলল, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ মা, লেনগুলো সব স্ট্রিট কিংবা রোড হয়ে গেছে।

শরীফ হেসে ফেলল, ঢাকার অলিগলিগুলো এতদিনে একটু মান-মর্যাদার মুখ দেখল! কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, আরেকটা খবর দেখেছ? বহু বই বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

কাদের কাদের বই? কি ধরনের বই? দেখতো, আমাদের বাড়িতে কোন বই আছে কি না।

শরীফ পড়তে পড়তে বলল, সব ধরনের বই-ই তো দেখছি। রাজনীতি, সঙ্গীত, নাটক–তবে অনেক লেখকেরই নাম আগে শুনেছি বলে মনে হচ্ছেনা। শরীফনীরবে পড়ে চলল, আমি খানিক তাকিয়ে শেষে অধৈর্য হয়ে বলে উঠলাম, জোরে পড়না কেন, আমরাও শুনি। শরীফ লিস্টের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতেই বলল, আমিও তোমার মত হাঁপিয়ে পড়ব তাহলে। শুধু দেখছি, কোন বই আমাদের বাড়িতে আছে কি না। খানিক পরে, এই যে, প্রবোধকুমার স্যান্যালের হাসু বানু কে. এম. ইলিয়াসের ভাসানী যখন ইয়োররাপে এই বই দুটো আমাদের বাসায় আছে। এ দুটো সরিয়ে ফেলতে হবে।

ভাসানী যখন ইয়োরোপে বইটা অনেক আগে থেকেই তো বাজেয়াপ্ত হয়ে আছে। আমরা তো সেই কবেই বইটা ড্রেসিংরুমে ওয়ার্ডরোবের তলায় লুকিয়ে রেখেছি।

কি জানি! মাঝখানে বোধহয় বইটা ছেড়ে দিয়েছিল। এখন তো অত মনে নেই। এবার কিন্তু বাসার ভেতর লুকিয়ে রাখা চলবে না। বাইরে কোথাও সরাতে হবে, না হয় পোড়াতে।

রুমী বাউন্ডারি ওয়ালের যেখানটায় মাওয়ের রচনাবলি রেখেছে, সেইখানে রেখে  দেব।

জামী অনেকক্ষণ থেকেই খবরের কাগজের ওপর হুমড়ি খেয়ে আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে কি যেন গুণছে মনে হলো। তাকিয়ে দেখলাম, ঢাকার রাস্তার নাম পরিবর্তনের তালিকার ওপর দিয়ে আঙুল বুলোচ্ছে আর মুখে বিড়বিড় করে গুণছে। অনেকক্ষণ পরে মাথা তুলে  বলল, উঃ! একশো পঞ্চাশটা রাস্তার নাম বদলেছে, তাও শেষে লেখা আছে অসমাপ্ত। তার মানে আরো নাম বদলানো হয়েছে। খবরের কাগজওয়ালারাও এত নাম ছাপিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। আর যাদের ওপর ভার ছিল এতগুলো মুসলমানি নাম যোগাড় করার, তাদের অবস্থা কি রকম ছ্যারাব্যারা হয়েছে, তা বোঝাই যাচ্ছে।

জামী ছ্যারাব্যারা কথাটা শিখেছে চরমপত্র শুনে। আরো একটা শিখেছে গ্যাঞ্জাম। আমাদের শুনতে বেশ মজাই লাগে।

২০ জুন, রবিবার ১৯৭১

বিশ্বব্যাঙ্কমিশন এসে তদন্ত করেফিরে গেছে। প্রিন্স সদরুদ্দিন এসে দেখেশুনে ফিরে গেছেন। চারদিন আগে তিন সদস্যের ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদলও এসে ঘুরে গেলেন। এরা খুলনা, যশোর, সিলেট, চট্টগ্রাম টুর করলেন, চটকল দেখলেন, চা বাগান দেখলেন, মিল-কারখানা দেখলেন, বেনাপোল সীমান্তে গেলেন, ঝিকরগাছায় অভ্যর্থনা কেন্দ্রও পরিদর্শন করলেন। তারপর গতকাল তারাও ফিরে গেছেন।

এঁরা সবাই ফিরে গিয়ে সন্তোষজনক রিপোর্ট না দিলে বোধহয় কোনো পশ্চিমী দেশ থেকেই এইড-ফেইড আর পাবে না ইয়াহিয়া সরকার। কিন্তু সন্তোষজনক রিপোের্ট দেবার উপায় আছে কি কারো। কদিন ধরে, আকাশবাণী, বি.বি.সি., স্বাধীন বাংলা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া–সবখান থেকেই কে এম এন্থনী মাসকারেনাসের রিপোর্ট সম্বন্ধে খুব শোনা যাচ্ছে। এই সাংবাদিকটি নাকি পাকিস্তানি নাগরিক, করাচির মর্নিং নিউজের এসিস্ট্যান্ট এডিটর। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ইয়াহিয়া সরকার তাঁকে একদল সাংবাদিকের সঙ্গে পূর্ব বাংলায় পাঠায়। সব দেখেশুনে করাচি ফিরে গিয়ে প্রথমে বউ ছেলেমেয়ে লন্ডনে পাঠিয়ে দেন। তারপর নিজে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের সানডে টাইমসে প্রকাশ করেন তার রিপোর্ট।

এই রিপোর্ট বেরোনোর পরপরই ইয়োরোপ-আমেরিকায় হৈচৈ পড়ে গেছে। এতদিনে সত্যি সত্যিই সবার প্রত্যয় হয়েছে যে পূর্ব বাংলায় ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী যা করেছে, তাকে গণহত্যা ছাড়া অন্য কোন কিছু বলা যায় না।

শরীরটা কেন জানি ভালো ঠেকছে না। শরীরের চেয়ে মনই বেশি বেঠিক। লোহার সাঁড়াশি দিয়ে দুই পাঁজর চেপে ধরলে যেমন দম আটকানো ব্যথা হয়, সেই রকম ব্যথা। ধরছে পাজরে মাঝে মাঝেই। রুমী কি বর্ডার ক্রস করতে পেরেছে? পথে কোথাও খানসেনাদের সামনে পড়ে নি তো? কি করে জানব? জানার কোনো উপায় নেই। শুধু সহ্য করে যাওয়া।

ঘরের ভেতরে শরীফ, জামী, আর বাইরে থেকে সাদ এলে কেবল তার সঙ্গে ছাড়া আর কারো সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলে মন হালকা করার কোন উপায় নেই। অন্য সবার সঙ্গেই সপ্রতিভ হাসিমুখে অভিনয়। এমনকি মার সঙ্গে, লালুর সঙ্গে। মা একটু চেষ্টা করেছিলেন জেরা করে জানবার। তাকে কঠিন, গম্ভীর মুখে বলেছি, রুমী তার বন্ধুর সঙ্গে দেশের বাড়িতে গেছে।

মোতাহার সাহেব প্রায় প্রায়ই আসেন। আমরাও যাই। ওঁর বড় ছেলে শামীমকেও কদিন থেকে দেখি না। একদিন বেভুলে জিগ্যেস করতেই মোতাহার সাহেব খুব সপ্রতিভ মুখে বললেন, ও শামীম ও তো দেশে গেল সেদিন। এসে পড়বে দুচারদিনের মধ্যেই। বুঝলাম। শামীমও মুক্তিযুদ্ধ গেছে।

২৭ জুন, রবিবার ১৯৭১

সকাল থেকে শরীর খারাপ। সেই সঙ্গে থেকে থেকে পাঁজরে ব্যথা। লোহার সাঁড়াশি দিয়ে পাজর চেপে ধরার ব্যথা। নিঃশ্বাস নিতে পারি না।

ডি.সি.জি.আর-এ (ঢাকা ক্লাব জিমখানা রেসেস) কি যেন কাজ পড়েছে, শরীফ নাশতা করে সেখানে গেছে। আমার কিছু ভালো লাগছে না, তাই একটা নতুন কাজ নিয়ে বসেছি। বাড়ির যত তালা–নতুন, পুরনো, ছোট, বড়, জংধরা, বিকল–সব নিয়ে বসেছি। প্রায়, প্রায়ই গুজবের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে–মোহাম্মদপুর-মিরপুর থেকে বিহারিরা দলে দলে বেরিয়ে পড়ে এদিকপানে আসবে। একটা তাৎক্ষণিক হৈচৈ পড়ে যায় চারপাশে। বন্ধুবন্ধব, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ফোন করা বেড়ে যায়, সবাই নিজ নিজ বাড়ির দরজা-জানালার হুক-হুড়কো দেখে, ঠিক না থাকলে মিস্ত্রি ডেকে মেরামত করায়। আমাদের বাড়ির দুটো সদর দরজার পাল্লাই বেশ পলকা ওগুলো ফেলে ভারি পাল্লা বানানো দরকার। আমাদের পুরনো কাঠমিস্ত্রি চৈতন্যকে খবর দেওয়া হয়েছে কিন্তু তার কোনো হদিস নেই। মনেহচ্ছে নিউ মার্কেট থেকে মুসলমান কাঠমিস্ত্রি এনে কাজ করাতে হবে। এখন তালাগুলো নিয়ে বসেছিল। জংধরা তালায় তেল দিয়ে, চাবি ঠিকঠাক করে, ডুপ্লিকেট চাবি আলাদাকরেসব হিসাবমতো বিভিন্ন রিঙয়ে লাগিয়ে সিজিল করে রাখলাম।

শরীফ ফিরল সন্ধ্যা পার করে। এসেই বলল, তৈরি হও। বাঁকার বাসায় যেতে হবে।

কেন, কি ব্যাপার?

বাঁকা ফোন করেছিল। কি যেন জরুরি ব্যাপার। ফোনে বলা যায় না।

বাঁকার বাসায় গেলাম। খালেদ মোশাররফের চিঠি নিয়ে দুটি মুক্তিযোদ্ধা ছেলে গতকাল বিকেলে বাঁকার বাসায় এসেছিল। সিগারেটের প্যাকেটের ভেতর যে পাতলা কাগজের মোড়ক থাকে, সেই কাগজ বের করে তাতে ছোট্ট একটা চিঠি লিখে আবার সেটা প্যাকেটের মধ্যে রেখে সিগারেট ভরে রাখা হয়েছিল। এই রকম সাবধানতার সঙ্গে ছেলে দুটি খালেদের চিঠি নিয়ে এসেছিল।

শরীফ জিগ্যেস করল, হাতের লেখা চিনেছেন?

বাঁকা বললেন, হ্যাঁ, মণিরই হাতের লেখা।

কি লিখেছে মণি?

বাঁকা চিঠিটা দেখালেন। মাত্র দুটো লাইন, পত্রবাহক দুজনকে দরকার হলে কিছু সাহায্য করবেন। আমি ভালো আছি।-মণি।

শরীফ আবার জিগ্যেস করল, কি ধরনের সাহায্য চায় ওরা?

আপাতত টাকা-পয়সা।

দিয়েছেন কিছু?

না, কাল সন্ধ্যেয় এসেছিল। আজ তো রোববার। তাছাড়া তোমার সঙ্গে পরামর্শ করাও দরকার।

শরীফ বলল, মণির হাতের লেখা যখন চিনেছেন, তখন ওদের বিশ্বাস করা যায়। টাকার তো খুবই দরকার এখন ওদের।

আমি কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করলাম, ওরা দেখতে কি রকম? বয়স কত হবে? কেমন পোশাক পরে ছিল?

একজন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের মনে হলো। আরেকজন একটু কম বয়সী। সাধারণ প্যান্ট-সার্ট পরা। লম্বা-লম্বা চুল, জুলফি, গোফ।

নাম বলেছে।

বলেছে। একজনের নাম শাহাদত চৌধুরী। সে আরেকটা হোট স্লিপ দেখাল, তাতে মণি তাকে অথরিটি দিয়েছে–সেক্টর টু-এর তরফ থেকে সে ঢাকায় প্রয়োজনমত সব ধরনের যোগাযোগ করতে পারবে। স্লিপটাতে আবার খালেদের সিল মারা আছে। কমবয়সী ছেলেটার নাম আলম।

শরীফ বলল, তাহলে তো সন্দেহ করার কোনো অবকাশই নেই। কিছু টাকার যোগাড় রাখতে হবে। যখনই আসে, দিয়ে দেবেন।

বাড়ি ফিরে সারারাত ঘুম হলো না। সেক্টর টু থেকে দুজন মুক্তিযোদ্ধা এসে বাঁকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে! খালেদ মোশাররফ সেক্টর টুতে যুদ্ধরত। মনে হচ্ছে–এতদিনে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আমাদেরও একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়ে গেল।

৩০ জুন, বুধবার ১৯৭১

রাজশাহী থেকে ডাঃ এ. কে. খানের ট্রাঙ্কল পেলাম। উনি আগামীকাল ঢাকায় আসছেন।

সাতক্ষীরা থেকে আইনু ঢাকা এসেছে। ওর বড় ভাই শামু অর্থাৎ ডাঃ শামসুল হক আমেরিকার মিশিগানে থাকে। শামু আইনুকেমিশিগানে নিয়ে যাবার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছে।

আইনুর কাছে সাতক্ষীরার এবং ঢাকা আসার পথের বিভিন্ন জায়গায় পাক আর্মির নৃশংস অত্যাচারের অনেক কাহিনী শুনলাম। নতুনত্ব কিছু নেই–সেই ঠাঠাঠাঠা করে মেশিনগান চালিয়ে নিরীহ গ্রামবাসীকে খুন করা, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে মারা, মেয়েদের অসম্মান করা, ঘরবাড়ি, গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া। কাহিনী পুরনো হলেও আইনুর কাছে তা অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য। নিজের চোখে এসব দেখে আইনুর স্তম্ভিত, উদ্ভ্রান্ত ভাব এখনো কাটে নি।

এগারোটার দিকে বদিউজ্জামানের ফোন পেলাম, আপা, আপনি মেহের আপাকে চেনেন তো?

মেহের আপা? মানে–

ঐ যে মিসেস দেলোয়ার হোসেন, ধানমন্ডি ছনম্বর রোডে বাসা।

হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি, মোটামুটি জানাশোনা আছে। ওঁর মেয়ে তো ইয়াসমিন, ছেলে নাসিম–

হ্যাঁ উনিই। উনি আপনাকে খবর দিতে বলেছেন–আপনি যেন আজ সময় করে ওঁর সঙ্গে দেখা করেন।

দেখা করব? কি ব্যাপার।

রুমীর খবর! এটুকু বলে বদিউজ্জামান ফোন রেখে দিল।

রুমীর খবর!আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। এক্ষুণিযাব?নাকি বিকেলে? ঘড়ির দিকে তাকালাম–এখন সাড়ে এগারোটা বাজে। নাঃ, বিকেল পর্যন্ত থাকা যাবে না

এখুনিই যাই। জামীকে ডেকে দাদার কাছে থাকতে বলে, বারেক-কাসেমকে রান্নাঘরের সব বুঝিয়ে দিয়ে তক্ষুণিই একটা রিকশায় করে মিসেস হোসেনের বাড়ি চলে গেলাম।

মিসেস হোসেন দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। কেমন আছেন, কি ইত্যাদি কুশল প্রশ্নাদি শেষ হবার আগেই হঠাৎ তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। দ্রুত উঠে দাড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন, আপা, শিগগির আমার সঙ্গে ও ঘরে চলুন। বলেই হাত ধরে টান দিলেন।

কিছুই না বুঝে হতভম্বের মতো ওঁর টানে টানে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। এ ঘরে ওঁর ছেলেমেয়েরা রয়েছে, দেখলাম। উনি ঘরের অন্য প্রান্তে ছোট ড্রেসিং রুমটায় আমাকে ঢুকিয়ে বললেন, এইখানে খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি গেট দিয়ে এক ভদ্রমহিলাকে ঢুকতে দেখেছি। উনি আপনাকে দেখলে মুশকিল হবে। পরে সব বলব। বলেই আবার দ্রুত পায়ে বসার ঘরে চলে গেলেন।

আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কি ব্যাপার? রুমীর খবর জানতে এসে কোন বিপদে পড়লাম না তো?

দশ-পনের মিনিট পরে মিসেস হোসেন এসে আমাকে ডেকে নিয়ে মেয়েদের এই শোবার ঘরটাতেই খাটে বসলেন। খুলে বললেন সব ব্যাপার।

তখন গেট খুলে মিসেস এম. ঢুকছিলেন। ভাগ্যিস, মিসেস হোসেন যেখানে বসেছিলেন, সেখান থেকে জানালা দিয়ে গেটটা দেখতে পেয়েছিলেন, তাই সময়মতো রক্ষা পাওয়া গেছে। মিসেস এম. আমার উপস্থিতি টের পান নি।

মিসেস এম. মিসেস হোসেন এবং ঢাকার আরোকিছু মহিলার অনেক দিনের পুরনো বান্ধবী। তবে গত বছর দুয়েক তেমন যাতায়াত ছিল না। হঠাৎ মাস দুই থেকে উনি আবার সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরনো বন্ধুত্ব ঝালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু একটা মুশকিল হয়েছে, উনি ইদানীং যে সব বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছেন, তার পরপরই সে সব বাড়ির কোনটাতে পাক আর্মির হামলা হচ্ছে বা কোন বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা পড়ে যাচ্ছে। এতে এদের সবার সন্দেহ হচ্ছে যে, মিসেস এম. হয়ত গোপনে পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে কোনভাবে সহযোগিতা করছেন।

মিসেস হোসেন বললেন, বুঝলেন আপা, উনি আমি বহুবছরের পুরনো বন্ধু, অথচ আপনি নন। তাই আপনাকে আমার বাসায় দেখে উনি আসল ব্যাপারটা ঠিক বুঝে ফেলতেন। আপনার ছেলে যে মুক্তিযুদ্ধে গেছে–এটা উনি বের করে ফেলতেন।

মিসেস হোসেনের অনেক আত্মীয়ের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে গেছে। এক বোনের দেওরের এক ছেলে সম্প্রতি ঢাকায় এসেছে। সে বলেছে রুমী আগরতলার কাছাকাছি এক ক্যাম্পে আছে, ট্রেনিং নিচ্ছে, ভালো আছে।

এইটুকুমাত্র খবর? যে ছেলে খবর এনেছে, তাকে পর্যন্ত দেখলাম না, তার মুখ থেকে নিজে কিছু শুনলাম না! মনটা ভীষণ দমে গেল। সেই ছেলের কাছে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলাম। মিসেস হোসেন বললেন, সে ছেলে এখন খুব অসুস্থ অসুস্থ বলেই ঢাকা ফিরে এসেছে। এখন সেখানে যাওয়ার অসুবিধে আছে।

আমি খুব নিরাশ, খুব অতৃপ্ত মনে বাড়ি ফিরে এলাম।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *