০৪. আত্মসম্মান-বোধ

আত্মসম্মান-বোধ
SELF.ESTEEM
ইতিবাচক আত্মসম্মান বোধ ও ভাবমূর্তি গঠন
Building positive self-esteem and image
অধ্যায় – ৪

রেল ষ্টেশনে একটি ভিক্ষুক ভিক্ষা করছিল। তার সামনে ভিক্ষার ঝুলিতে ছিল এক বান্ডিল পেন্সিল। এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ট্রেনে ওঠার আগে তার ঝুলিতে একটি ডলার ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে কী ভেবে কয়েকটি পেন্সিল তুলে নিয়ে বললেন, এক ডলারে এই কয়টা পেন্সিলই পাওয়া যাবে। তুমিই বা এমনি ডলারটা নেবে কেন, আমি বা দেব কেন? এই বলে লোকটি ট্রেনে উঠে চলে গেলেন।

ছয়মাস পরে সেই কর্মকর্তার সঙ্গে ভিক্ষুকটির আবার দেখা হলো একটি পার্টিতে। এবার ভিক্ষুকটি স্যুট-টাই পরে রীতিমত এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। সেই কর্মকর্তাকে চিনতে পেরে তার কাছে গিয়ে বললেন, সম্ভবত আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না। তারপর স্টেশনের ঘটনাটি বলতে কর্মকর্তা পূর্বতন ভিক্ষুককে চিনতে পারলেন। জিঙ্গেসা করলেন, আপনি এখানে কি করছেন? পূর্বতন বিক্ষুকটি জবাব দিলেন, আপনি সম্ভবত বুঝতে পারেননি আপনি আমাকে কি শিক্ষা দিয়েছেন। আমার আত্নমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি বলেছিলেন, পেন্সিল গুলোর দাম এক ডলারেই হবে, তাই একডলার দিয়ে পেন্সিল গুলি নিয়েছিলেন। এই কথাগুলো শুনে আমি ভাবলাম ভিক্ষা করে আত্মসম্মান নষ্ট করে আমি কি লাভ করছি! এর থেকে জীবনের গঠনমূলক কিছু করা ভালো। ভিক্ষার ঝুলি গুটিয়ে নিয়ে আমি কাজ করতে শুরু করলাম। তার ফলে আজ এই অবস্থায় পৌঁছেছি। আপনাকে ধন্যবাদ আপনি আমার আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন: ফলে আমার জীবন পরিবর্তন এসেছে।

ভিক্ষুকটিকে আত্মমর্যাদা বোধ উদ্দীপ্ত হল বলেই তার চিন্তা, কর্মপন্থা ও কর্মদক্ষতাতেও পরিবর্তন এল। জবিনে আত্মমর্যাদাবোধ ম্যাজিকের ন্যায় কাজ করে।

সহজ কথায়, নিজেদের সম্পর্কে আমরা যা ভাবি সেইটিই হোল আত্মমর্যাদা বোধ। নিজেদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমাদের সমস্ত কাজকর্মকে, পারস্পরিক সম্পর্ককে, মাতাপিতা হিসাবে আমাদের দায়িত্ববোধকে এমনকি জীবনে চরিতার্থতা লাভ পর্যন্ত সমস্ত কিছুকেই প্রভাবিত করে। উন্নত আত্মসম্মান বোধ সুখী, পরিতপ্ত এবং অভীষ্ট লাভে উদ্যোগী জীবন যাপন সম্ভব করে। নিজের যথার্থ গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন না হলে আত্মসম্মানবোধ বাড়ে না। ইতিহাসের মহান বিশ্বনেতা ও আচার্যরাও এই কথাই বলেছেন যে অন্তরের প্রেরণা ব্যতীত সফল হওয়া যায় না।

আমরা অজ্ঞাতসারে নিজেদের সম্পর্কে যে সমীক্ষা করি, সেইটিই অন্যের নিকট ব্যক্ত করি এবং তারাও সেইভাবেই আমাদের প্রতি তাদের মনোভাব গড়ে তোলেন।

উন্নত আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষের বিশ্বাস যোগ্যতা ও দায়িত্ব নেয়ার ইচ্ছাও উন্নত হয়। তারা আশাবাদী, সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখেন এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করেন। তাদের থাকে কর্মপ্রেরণা ও উচ্চাশা এবং তারা সংবেদনশীলও হয় অনেক বেশি। আত্মসম্মান বোধ কাজকর্মের মানকে উন্নত করে এবং ঝুঁকি নেয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। তাদের সামনে নতুন নতুন সুযোগের সম্ভাবনার দরজা যেমন খুলে যায়, তেমনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মানসিকতাও তৈরি করে। স্বচ্ছন্দ কুশলতার সঙ্গে তারা সমালোচনা ও অভিনন্দন দুই-ই মেনে নিতে পারেন। কোন কাজটি কল্যাণকর এই বিষয়ে সচেতনতা এবং সেই কাজ সুসম্পাদন করার পরিতৃপ্তি থেকেই আত্মসম্মান বোধের জন্ম।

আত্মসম্মানবোধ হল আমাদের নিজের সম্পর্কে ধারণা (Self-esteem is our selfconcept)।

গল্পে আছে, একজন কৃষক তার ক্ষেতে কুমড়ো ফলিয়েছিলেন। কুমড়ো যখন খুব ছোট তখন মাচার একটি ছোট কুমড়োকে একটি কাঁচের জারের মধ্যে ভরে জারটি মাচা থেকে ঝুলিয়ে দিলেন। কুমড়ো যখন তোলার মত হল তখন দেখা গেল অন্য কুমড়ো বেশ বড় এবং বিভিন্ন আকৃতির হলেও কাঁচের জারের মধ্যে রাখা কুমড়োটি কাঁচের জারের আকৃতি পেয়েছে; তার বেশি বাড়তে পারে নি। মানুষও তার নিচের ধারণা ও চিন্তার সীমার মধ্যেই বাড়ে। তার বাইরে যেতে পারে না।

উন্নত আত্মমর্যাদাবোধের কয়েকটি সুফল (Some advantages of high self-esteem)

মানুষের ধ্যানধারণা ও তার উৎপাদনশীলতার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ যোগ আছে। যারা নিজের প্রতি ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মাতাপিতা, আইন-কানুন ও ধন-সম্পদকে সমীহ করেন এবং নিজের দেশকে ভালোবাসেন তারাই উন্নত আত্মসম্মান বোধের অধিকারী। এর উল্টোটাও সমান সত্য।

আত্মসম্মানবোধ :

  • বিশ্বাসকে দৃঢ় করে।
  • দায়িত্বগ্রহণে ইচ্ছুক করে।
  • আশাবাদী মনোভাব গড়ে তোলে।
  • মানুষের সঙ্গে উন্নততর সম্পর্কে সৃষ্টিতে এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপনে সাহায্য করে।
  • অন্যের প্রয়োজন সহজে অনুধাবন করে, তার প্রতি একটি সযত্ন সাহায্যের মনোভাব প্রদর্শন করে।
  • নিজের মধ্যথেকেই নিরন্তর কর্মপ্রেরণা লাভ করে এবং মানুষকে উচ্চাকাঙক্ষী করে।
  • নতুন সুযোগ গ্রহণের এবং কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মানসিকতা তৈরি করে।
  • কাজের মাননান্নয়ন ঘটে এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বেড়ে যায়।
  • মানুষকে কৌশলী স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সমালোচনার মুখোমুখি হতে এবং অভিনন্দন গ্রহণ করতে সাহায্য করে।

নিম্নমানের আত্মসম্মান বোধ কিভাবে চিহ্নিত করা যায়? এই ধরনের ব্যক্তি কিরূপ ব্যবহার করেন? এরূপ ব্যবহারের একটি তালিকা নীচে দেওয়া হোল। এটি সম্পূর্ণ তালিকা নয়-এতে কয়েকটি চারিত্রিক লক্ষণ নির্দেশ করা হয়েছে মাত্র।

  • এরা সাধারণত ও গুজবপ্রিয়।
  • সমালোচনা করার প্রবৃত্তি প্রখর। এমন তীব্রতার সঙ্গে সমালোচনা করেন যেন তারা কোনও প্রবল প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর পুরস্কারের প্রত্যাশা করছেন।
  • তারা মানসিক দিক থেকে সীমাবদ্ধ এবং আত্মকেন্দ্রিক।
  • তারা সব সময়েই অজুহাত দেখিয়ে ব্যর্থতাকে ঢাকবার চেষ্টা করে।
  • কখনো দায়িত্ব নেয় না এবং সবসময় অপরকে দোষ দেন।
  • তাদের অহংবোধ বেশি, তারা উদ্ধত ও সবজান্তা। নিম্নমানের আত্মমর্যাববাধ সম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করা মুস্কিল। তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাবার জন্য অপরকে ছিন্নভিন্ন করেন।
  • তারা ভাগ্যবাদী-এই বিশ্বাস করেন যে উদ্যোগ ছাড়াই সব কিছু আপনা থেকে ঘটবে।
  • তাদের প্রকৃতিই বিদ্বেষপূর্ণ।
  • কোনও সদর্থক সমালোচনা প্রহণ তারা অক্ষম। সমসময়েই আত্মরক্ষায় ব্যাপৃত।
  • একাকী থাকলে তারা একঘেয়েমি- জনিত বিরক্তি ও অস্বস্তি বোধ করেন।
  • আত্মসম্মান বোধ না থাকলে শালীনতাবোধ ও নষ্ট হয়। এরা শালীন ব্যবহার ও অমার্জিত ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য জানেন না। প্রায়ই দেখা যায় সামাজিক মেলামেশার আসরে কোনও কোনও ব্যক্তি যত বেশি মদ্যপান করেন ততই তাদের কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা গুলি বেশি নোংরা ও অশ্লীল হয়ে ওঠে।
  • তারা নিজেরা ব্যবহারে অকৃত্রিম নন বলে তাদের কোনও অকৃত্রিম বন্ধু থাকে না।
  • তারা রাখতে পারবেন না জেনেও প্রতিশ্রুতি দেন। বিক্রি বাড়াবার জন্য অনেক বিক্রেতা প্রায় হাতে চাঁদ এনে দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা না কররে বিশ্বাস-যোগ্যতা নষ্ট হয়। উন্নত আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন ব্যক্তি ব্যবসায়ে ক্ষতি স্বীকার করেও বিশ্বাস যোগ্যতা রক্ষা করেন, কারণ বিশ্বাস যোগ্যতা অমূল্য।
  • তাদের ব্যবহার যুক্তিহীন ও খামখেয়ালি। তাদের মতিগতি ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মধ্যে দোদুল্যমান। আজ যদি মধুর ব্যবহার করেন, কালই প্রায় গলা কাটতে উদ্যত হন। তাদের কোনও মানসিক ভারসাম্য নেই।
  • তারা সবাইকে বিদ্রুপ করেন, তাই এককিত্বই তাদের সঙ্গী।
  • তারা স্বভাবে অতি-অভিমানী-অর্থাৎ তাদের থাকে ভর অহংবোধ। সামন্য কথাতেই তাদের অহংবোধ আহত হয়, ফলে তারা সমস্ত বিষয়েই বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন।

অতিঅভিমানী ও স্পর্শকাতর হওয়ার মধ্যে তফাৎ কী? অভিমান ক্যাকটাসের মতো কাটায় ভর্তি। স্পর্শ করলেই কাঁটার আঘাত খেতে হবে। স্পর্শকাতরতা একটি ইতিবাচক মনোভাব, যা সহমর্মী করে। কিন্তু অনেক বলেন, ওর সঙ্গে কথা বলার সময় সাবধান, ও বড় স্পর্শকাতর। কিন্তু তিনি যা বলতে চান তা হোল, লোকটি অতিঅভিমানী। এই অতিঅভিমানী ব্যক্তিরা।

  • নিজেদের ও অন্যের সম্পকে নঞর্থক আশা পোষণ করেন, তাদের আশা কখনও পূরণ হয় না।
  • তাদের আত্মবিশ্বাস নেই।

১. সবসময়েই তারা অপরের অনুমোদন ও স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী। অনেক সময় কোনও ব্যক্তি কোনও বিষয়ে অন্যমতামত নেওয়ার জন্যও আলোচনা করেন। আত্মবিশ্বাসহীন ব্যক্তিরা অন্য মতামত নেওয়ার চেষ্টাই করেন না।

২. নিজের কাজকর্ম সম্পর্কে অহংকার করেন, এবং এর অর্থ হোল আত্মবিশ্বাসের অভাব।

৩. এরা ভীরু স্বভাবের। সব সময়েই ক্ষমাপ্রার্থীর মনোভাব নিয়ে চলেন। এরূপ বিনতির ফলে তারা নিজেদের এত নীচে নামিয়ে আনেন যে সেই অবস্থাকে কখনও বিনয় বলা চলে না। বিনয় আসে আত্মবিশ্বাস থেকে, কিন্তু আত্মঅবনমন হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের অভাব।

৪. নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতার অভাব।

স্বল্প আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ নিজের বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতেও দ্বিধা করেন। আবার যখন সামান্য কারণে মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তখন তা আত্মমর্যাদাবোধের অভাব বলেই চিহ্নিত হয়। যেখানে সহমর্মিতার প্রয়োজন, সেখানে আক্রমণাত্মক হলে তাকে বিশ্বাসের দৃঢ়তা বলে মনে করা যায় না।

৫. আত্মবিশ্বাসের অভাবের ফলে সমযোতা করে চলার প্রবণতা দেখা দেয়। মনকে এই বলে শান্ত করেন,সবাই যখন করছে আমিই বা করব না কেন। প্রায়ই দেখা যায়, অনেকেই উপরওয়ালার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন, যদিও জানেন যে এর ফলাফল ভালো হবে না। তা সত্ত্বেও করে, কারণতাহলে উপরওয়ালার সুনজরে থাকবে। এই ভাবে মানিয়ে চলেন খুব স্বল্প আত্মসম্মান সম্পন্ন ব্যক্তিরা। নিজের উপর বিশ্বাস নেই বলেই তারা বাইরের সমর্থন পায়।

৬. সমাজের উচ্চকোটির মানুষের সঙ্গে এক গোষ্ঠীভুক্ত এরূপ ভান করাও আত্মর্যাদাবোধের অভাবের লক্ষণ। তখন তারা যে অর্থ খরচ করে তা হয়ত নিজের উপার্জিত নয়, যে জিনিসের প্রয়োজন নেই খরিদ করে এমন কী যে মানুষকে পছন্দ করেন না তাকে ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।

দৃষ্টি আকর্ষণকারী উদ্ভট ব্যবহার। নজরে পড়ার জন্য আত্মমর্যাদা বোধহীন ব্যক্তিরা অর্থহীন কাজ করতে পারেন। এরূপ বিকৃতিতে তারা আনন্দ পান এবং নিজেদের কেউকেটা মনে করেন। অনেকে অন্যের সঙ্গে তফাৎ বোঝাবার জন্য এবং নজরে কাজের মাত্রাতিরিক্ত বড়াই করেন, কিংবা সকলের সামনে ভাঁড়ামি করেন।

  • তারা দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তের মানুষ এবং দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক। সাহসের অভাব এবং সমালোচনা ভায়ে তারা সবসময়েই দোলাচল চিত্ত।
  • তারা হয়ত কখনও কখনও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করেন: কিন্তু নিজের দৃঢ়বিশ্বাস অবিচল থাকার ফলশ্রুতি হিসাবে যে বিদ্রোহ এবং নিজের আত্মমর্যাদাবোধের অভাবের ফলে যে বিদ্রোহ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজন। মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং ও আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো বিশ্ব নেতারাও বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও সাহস ছিল বলেই তারা কর্তৃপক্ষের নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু স্বল্প আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। কর্তৃপক্ষ সঠিক কাজ করলেও তা এদের নিকট বিবেচ্য নয়।
  • তারা সমাজবিরোধী এবং সব সময়েই নিজেদের গুটিয়ে রাখে।
  • তাদের জীবনে লক্ষ্যের কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই এবং তারা ব্যবহার আমি গ্রাহ্য করিনা এরূপ ভাব প্রকাশ করে থাকে।
  • অন্যের প্রতি প্রশংসা বাক্য ব্যবহারে তারা কৃপণ আবার অপরের নিকট প্রশংসা প্রাপ্তিতে তারা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তারা মনে করেন, অন্যের প্রশংসা করলে তার ভুল ব্যাখ্যা করা হবে, আবার কেউ তাদের প্রশংসা করলে সেটা তাদের প্রাপ্য নয় বলে মনে করেন। একে বিনয় বলা যায় না। দুর্বল চিত্ততা বলে মনে করলেই ঠিক হবে।
  • সাধারণ পার্থিব বিষয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরত্ব আরোপ করেন। তারা গুনাবলী দিয়ে নয়, কী কী বিষয় সম্পত্তি আছে তাই দিয়ে মানুষের বিচার করেন। কি গাড়ি চড়েন, কি রকম বাড়িতে বাস করেন, কি ধরনের পোশাক পরিচ্ছদ, মনিমুক্তা পরিধান করেন তার উপরই সব সময় দৃষ্টি দেন। ভুলে যান যে মানুষই সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সৃষ্টি করে, উল্টোটা নয়। এরা মানুষের অন্তরের ঐশ্বর্যের থেকে বাইরের বস্তুর ঐশ্বর্যের উপর বেশী জোড় দেন। এদের জীবন তাই বিজ্ঞাপিত পণ্যের চাকচিক্য ও নিজেদের খেয়ালখুশিকে দিয়েই আবর্তিত হয়। এরা এদের পোশাক-আসাক, জিনিসপত্রের গায়ে সাঁটা বিখ্যাত ডিজাইনারদের পরিচয় লিপিকেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার ছাড়পত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। এসব জিনিসপত্র হস্তচ্যুত হলে তারা লজ্জায় মরে যান। এই ইদুর দৌড়ে তারা অংশগ্রহণকারী। ইদুর দৌড়ের সমস্যা হচ্ছে, জিতলেও ইদর থেকে যেতে হয়।
  • নিজেদের সম্পর্কে তাদের কোনও গর্ববোধ নেই। সাধারণত তারা পোশাক পরিচ্ছেদে অবিন্যস্ত বলে উপস্থিতিও অশোভন বলে মনে হয়।
  • তারা নিতেই জানেন, দিতে জানেন না।

স্বল্প আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা ভারসাম্য হারিয়ে শেষ সীমারেখা পর্যন্ত চলে যেতে পারেন। একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি নির্জনতা পছন্দ করেন বলেই একাকী থাকতে চান: আর অপর দিকে যার আত্মসম্মান বোধ কম তিনি মানুষের সান্নিধ্যে অস্বস্তি বোধ করেন বলেই একাকী থাকতে চান।

এই দুই শ্রেণীর মানুষের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নীচে উল্লেখ করা হল।

উন্নত আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন — স্বল্প আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন

পরিকল্পনা বিষয়ে আলোচনা করেন — মানুষের সম্পর্কে আলোচনা করেন

সহানুভূতিশীল দৃষ্টি — সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি

বিনয়ী — উদ্ধত স্বভাব

কর্তৃত্বকে মান্য করেন —  কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেন

বিশ্বাসে অবিচল থাকার সাহস আছে — সমঝোতা করে চলেন

আত্মবিশ্বাসে আছে — চিন্তায় বিশৃঙ্খলা আছে

নিজেদের চারিত্রিক উন্নতির বিষয়ে — নিজেদের সম্পর্কে মানুষের ধারনায়

চিন্তা করেন  — উদ্বিগ্ন

নিজেদের মতামত দৃঢ়ভাব — আক্রমণাত্বকভাবে নিজের মতামত

প্রতিষ্ঠা করেন — ব্যক্ত করেন

স্বয়ং দায়িত্ব গ্রহণ করেন — সারা বিশ্বকে দায়ী করেন

নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন – স্বার্থপর

আশাবাদী — ভাগ্যবাদী

বোধশক্তি সম্পন্ন – লোভী

জানতে আগ্রহী — সবজান্তা

স্পর্শকাতর — অতি-অভিমানী

নির্জনতা বিলাসী — নিঃসঙ্গতার ভারে ভারাক্রান্ত

আলোচনা করেন — তর্ক করেন

নিজের মূল্য সম্পর্কে সচেতন — কেবল মাত্র পূর্ণ আর্থিক মূল্যে বিশ্বাসী

সঠিক পথে পরিচালিত — ভুল পথে পরিচালিত

শৃঙ্খলার গুরত্ব জানেন — স্বাধীনতার সংজ্ঞা বিকৃত করেছেন

অন্তরের প্রেরণায় কাজ করেন — বাইরের প্রলোভনে কাজ করেন

অপরকে সম্মান করেন — অপরকে অবজ্ঞা করেন

শালীনতা উপভোগ করেন — কদর্যতা উপভোগ করেন

সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন — সব কিছু করার চেষ্টা করেন

অপরকে দিতে প্রস্তুত — অপরের থেকে নিতে প্রস্তুত

অপরাধবোধ জাগ্রত করা এই তালিকার উদ্দেশ্য নয়, আত্মমূল্যায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই এর লক্ষ্য। মানুষের সবগুণাবলী থাকার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য বেশী বা কম মাত্রায় মানুষের চরিত্রে থাকতে পারে। যদি আমরা সেই গুণ গুলিকে চিহ্নিত করতে পারি তা হলে আমরা নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে পারি।

মুখুশের আড়ালে (The put on a mask)

মুখখাশের আড়ালে আত্মমর্যাদাবোধহীন একজন তরুন কর্মকর্তা উঁচুপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বটে কিন্তু তার নতুন পদের মর্যাদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। একদিন দরজায় আওয়াজ শুনে ভাবলেন যে তিনি কত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ তা আগন্তুককে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। তিনি আগন্তুককে ভিতরে আসতে বলে ফোনটা তুলে নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। আগন্তুক অপেক্ষা করছেন, কিন্তু তিনি ফোনে কথা বলেই চললেন। ফোনে তিনি শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, না না ওসব কোনও সমস্যাই হবে না; আমি ঐ বিষয়টা নিজেই দেখব। কয়েক মিনিট পরে তিনি ফোন নামিয়ে রেখে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি তার জন্য কি করতে পারেন। আগন্তুক বললেন, আমি আপনার টেলিফোনটি চালু করে দিতে এসেছি।

এরূপ ব্যবহারের অর্থ কী?

এরূপ চাতুরী কেন? এর দ্বারা কী প্রমাণ হয়। এতে লাভই বা কী হয়? মিথ্যা বলার দরকার কী? মিথ্যা গর্বের জন্য এত আকাবা কেন? এগুলি আসে নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা বোধের অভাব থেকে।

ছল-ছাতুরীর প্রয়োজন কী?

আমরা যা করি বা করিনা, আমরা যা কিছু পছন্দ করি বা করিনা তাই দিয়েই আমাদের চরিত্রের বিচার হয়। যেমন,

* যে ধরনের সিনেমা আমরা পছন্দ করি

* যে ধরনের গান আমরা শুনি

* যে সঙ্গ আমরা পছন্দ করি বা এড়িয়ে চলি

* যে ধরনের ঠাট্রা আমরা করে থাকি বা যে ধরনের ঠাট্রয় আমরা হানি

* যে ধরনের বই আমরা পড়ি।

আমাদের প্রত্যেকটি কাজেই আমাদের চরিত্র প্রকাশিত, সুতরাং ভান করার কোনও প্রয়োজন নাই। আমি বিশ্বাস করি যদি কারুর দৃঢ় বিশ্বাস থাকে স্পর্শকাতরতা থাকে এবং সবার সহযোগীতা নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা থাকে তবে তিনি অন্যের উপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। সেই মানুষের আত্মসম্মানবোধ প্রগাঢ়।

ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ — নেতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ

১. আত্মসম্মান বোধ — ১. নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা

২. আত্ম- বিশ্বাস — ২. আত্ম- সন্দেহ

৩. নিজের যোগ্যতায় বিশ্বাস — ৩. আত্ম অবমাননা

৪. আত্মস্বীকৃতি — ৪. নিজেকে অপব্যবহার

৫. নিজেকে ভালোবাসা — ৫. আত্মকেন্দ্রিকতা

৬. নিজেকে অনুধাবন করা — ৬. আত্ম প্রতারণা

৭. আত্ম-শৃঙ্খলা — ৭. প্রশ্রয়

বেশি অহংবোধ থাকার অর্থ আত্মসর্যাদা বোধ নয়। কেউ যদি নিজের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে না পারে তবে অন্যের সঙ্গেও শান্তিতে থাকতে পারবেনা। আমাদের যা নেই তা নিয়ে আমরা অন্যদের দিতে পারিনা। যদি আত্মসম্মানবোধের উপাদান আমাদের না থাকে। তবে আমরা তা অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবনা। এর জন্য আমাদের আত্মানুসন্মান করে বিতি গুলি দুর করতে হবে। এবোপ্লেনেও নিরাপত্তার নির্দেশনাবণীতে ও আছে আগে নিজে অক্সিজেনের মাসক পরে পরে সঙ্গের বাচ্চাকে পরাবে। এটি বাচ্চার নিরাপত্তার জন্যই নিজেকে আগে বাঁচাবার স্বার্থে নয়।

আমরা নিজেদের সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করি সেটিই হোল আত্মমর্যাদবোধ। নিজেদেরকে যে ভাবে আমরা দেখি সেই দেখার মধ্যে দিয়েই আমাদের আত্ম-প্রতিচ্ছবি তৈরি হয় এবং সেগুলি অন্যের সংস্পর্শে এসে দৃঢ় হয়।

নিম্নমানের আত্মমর্যাদাবোধের উৎস (Causes of low self esteem)

জন্মের দিন থেকেই আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদবোধের সুজনা হয় তা সে ইতিবাজক আত্মমর্যাদাবোধই হোক কিংবা নেতিবাচক। নিজের সম্পর্কে অনুভুতি গুলি ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং সেগুলি অন্যের সংস্পর্শে এসে দৃঢ় হয়।

নেতিবাচক আত্মকথন ( Nagative self-talk)

কখনও কখনও জাতে অজ্ঞাতে এই রকম কথা বলে থাকি,

  • আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল
  • আমি অকে কাঁচা
  • আমি ভাল খেলোয়াড় নই
  • আমি ক্লান্ত

এরূপ বক্তব্যে নেতিবাচক মানসিকতা এবং আত্ম-অবমাননা প্রকাশ পায়। বারবার এইরকম কথা বললে মনও তাই বিশ্বাস করে বসে আমাদের ব্যবহার ও সেই সঙ্গে পালটে যায়। এই বক্তব্যগুলি নিজেদের সম্পর্কে তা ভবিষ্যত্ত বাণী হয়ে ওঠে।

পরিবেশ (Environment)

পারিবারিক পরিবেশ

বাবা-মা সন্তানকে একটি পারিবারিক মূল্যবোধ ও আচরণ বিধির মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেন। পারিবারিক বৃক্ষের শাকা প্রশাখা সেই মুল থেকেই জীবনরস আহরন করে। একটি বাচ্চা মেয়ের ভদ্র ও বিনয় ব্যবহার লক্ষ্য করে তার শিক্ষক তাকে জিজ্ঞেস করলেন,  কে তোমাকে এরূপ আচরণ শেখিয়েছেন? মেয়েটি জবাব দিল, কেউ নয়। আমাদের পরিবারের সবাই এরূপ আচরণই করেন।

সন্তানের লালন-পালন (Unbringing)

সক্রেটিস তার স্বদেশীবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ভাই সব, তোমরা সম্পদ আহরণের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করে প্রত্যেকটি পাথর উলটিয়ে আঁচড়ে দেখছ; কিন্তু। যাদের জন্য তোমরা সমস্ত জীবনের কঠোর শ্রমের ফল রেখে যাবে, সেই সন্তানদের যথার্থ ভাবে মানুষ করার জন্য কতটুকু সময় ব্যয় করছ?

সন্তানদের যথার্থভাবে মানুষ করার জন্য আমাদের দ্বিগুণ সময় ব্যয় করা উচিত; অর্থব্যয় অর্ধেক করে দিলেও চলবে। তরুন বয়সে শিক্ষালাভ করা কষ্টসাধ্য নয়, কিন্তু পরিনত বয়সে মুর্খ থাকা বেদানাদায়ক।

আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন পিতামাতা সন্তানের মধ্যেও বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে  তোলেন। তাদের বিশ্বাস, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ থেকে সন্তানেরা শিক্ষা নেয়। এর উন্টোটিও সত্য।

কসৎ পিতামাতা, একটি মহৎ প্রাপ্তি। যে পিতামাতার ব্যবসায়িক লেনদেনে শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করেন দুর্ভাগ্যক্রমে তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যান একটি অনৈতিক ও মন্দ দৃষ্টান্ত।

রপিতামাতা, কোন আত্মীয় কিংবা শিক্ষক যার প্রতি প্রভুত শ্রদ্ধা আছে তিনিই অনুকরণীয় ব্যক্তি বা উপযুক্ত পরামর্শদাতা হিসাবে উপযুক্ত। বেড়ে ওঠার বছর গুলিতে ছেলেমেয়েরা প্রভাবশালী বয়স্ক ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তস্থল হিসাবে গ্রহণ করে। এমনকি বয়স্করা তাদের ম্যানেজার বা উচ্চপদস্থ অধিকারিকদের অনুকরণীয় ব্যক্তি হিসাবে গ্রহণ করে।

অনেক চোখ তোমাকে দেখছে ( Little eyes upon you)

দিন রাত্রি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অনেক চোখ তোমাকে দেখছে অনেক ছোট ছোট কৌতূহলী চোখ। তুমি যা বলছ তার প্রতিটি শব্দ দ্রুত শশাষণ করে নিচ্ছে অনেক ছোট ছোট উৎসুক কান তুমি যা করছ। তাই করার জন্য উন্মুক হয়ে আছে অনেক ছোট ছোট হাত; এবং ঐ ছোট ছেলেটি স্বপ্ন দেখতে সে একদিন তোমার মত হবে। তুমি ঐ ছোট ছেলেটির উপাস্য, তার কাছে তুমিই বিজ্ঞতম, তার অনভিজ্ঞ মনে তোমার সম্পর্কে সন্দেহের কোনও ছায়াপাত ঘটেনি। গভীর বিশ্বাস আছে তোমার প্রতি, তোমার প্রতিটি বাক্য ও কর্মকে সে গ্রহণ করে; যখন সে বড় হবে, তখন তোমার মতই কথা বলবে আর কাজ করবে এই বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকা সরল বালকটি বিশ্বাস করে, তুমি সব সময়েই সঠিক। তাই সে দিন রাত্রি তোমাকে লক্ষ্য করে। প্রতিদিন তোমার কাজে এই ছোট ছেলেটির জন্য তুমি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছ। অপেক্ষা করে আছে, কবে বড় হয়ে সে তোমার মতো হবে।

আত্মবিশ্বাস নির্মাণ (Building confidence)

এক তরুণ দম্পতি তাদের বাচ্চা মেয়েকে একটি বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জায়গা রেখে দিয়ে নিজের নিজের কাজে যেত। বাচ্চাটিকে ছেড়ে যাওয়ার সময় বাবা-মা বা হাতে চুমু খেত এবং বাচ্চাটিও বাবা-মাকে চুমু দিত। তার পর তারা হাত পকেটে ঢুকিয়ে যেন চুমুকে পকেটে রেকে দিচ্ছে এরূপ ভাব করত। বাবা-মাকে ছেড়ে বাচ্চাটি যখন নিঃস্ব বোধ করত তখন পকেট থেকে হাত বের করে গালের উপর চেপে ধরত–এবং তাতেই সে বাবা-মায়ের স্পর্শ পেত। এই ভাবে তারা পরস্পরের সান্নিধ্য ভোগ করত, যদিও সারাদিন তার কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেতনা। কী সান্তনাদায়ী চিন্তা!

বাচ্চাদের অপরাধের প্রতি ঝোক দেখা দেয় কেন?

  • যদি বাচ্চাকে শেখানো হয় পৃথিবীতে সব কিছুই মুল্য দিয়ে কেনা যায়, তবে তারা মনে করবে যে সততা ও মুল্যদিয় কেনা যায়, ফলে তাদের নিকট সততার কোনও মুল্যই থাকেনা।
  • নির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়ার অভ্যাস না শেখালে, কোনও বিষয়েই দৃঢ় অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকবে।
  • অল্প বয়সেই শেখানো উচিত যে জয়লাভ করাটাই সবথেকে বড় কথা নয়। এই টিকেই একমাত্র লক্ষ্য করে সে যেনতেন প্রকারে জয়লাভের চেষ্ঠা করবে।
  • শৈশব থেকেই বাচ্চারা যদি প্রয়োজন মত সব পেয়ে যায় তবে ধারনা জন্মাবে যে সব জিনিস সে সহজেই পেয়ে যাবে। এই ধারনা তার আত্ম বিশ্বাস বাড়তে সাহায্য করবেনা।
  • যখন খারাপ ভাষায় কথা বলবে তখন যদি মজা পেয়ে থাকেন তবে বাচ্চার ধারনা জন্মাবে যে সে যেন চালাক চতুর হয়ে উঠেছে।
  • তার নৈতিক মূল্যবোধ জন্মাবার চেষ্টা করিবেন না। ২১ বৎসর বয়স হলে তাকে তার নিজস্ব মুল্যবোধ নির্ধারন করতে দিন।
  • সঠিকভাবে পথ নির্দেশ না করে তার সমানে কতকগুলি পছন্দের তালিকা তুলে ধরুন। একখা কখনও তাকে বলবেন না যে প্রত্যেকটি পছন্দের কতকগুলি নির্দিষ্ট ফলাফল আছে।
  • ভুল ধরিয়ে দিলে তার মানসিক বিকার ঘটতে পারে এই আশখায় ভুল শোধরাবার চেষ্ঠা করবেন না। ফলে ভুল করার জন্য যখন সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হবে তখন সে মনে করবে যে সমস্ত সমাজই যেন তার বিরুদ্ধাচরণ করছে।
  • জিনিসপত্র যেমন বই, জুতো, কাপড় চোপড় ইত্যাদি যখন এখানে ওখানে ফেলে রাখে সেগুলিকে যথাস্থানে তুলে রাখুন। ফলে তার মনে এই ধারনা গড়ে উঠবে যে সমস্ত দায়িত্বই যে অপরের উপর চাপিয়ে দিতে পারে।
  • সে যা পড়তে, শুনতে বা দেখতে চায় তাই করতে দিন। খাওয়ার দিকে নজর দিন, কিন্তু সে নিজের ইচ্ছামত আবর্জনা দিয়ে মন ভরে ফেলুক।
  • সমবয়সী বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য যা করা দরকার তাই করতে দিন।
  • তার উপস্থিতিতেই নিজেরা ঝগড়া করুন। ফলে পরিবারে যখন ভাঙ্গন ধরবে তখন সে আর আশ্চর্য হবে না।
  • যত টাকা প্রয়োজন তত টাকাই দিন। অর্থের মূল্য সম্পর্কে সচেতন করবেন না আপনাকে যে কষ্টের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে, ওকে যেন সেই কষ্ট পেতে না হয়।
  • ইন্দ্রিয় তৃপ্তির উপাদান যেমন খাদ্য,পানীয়, স্বাচ্ছন্দ্য সব সময় বলা মাত্র যোগান দিন। এই সব না পেলে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে।
  • তার বিরুদ্ধে প্রতিবেশী, শিক্ষক ইত্যাদি কিছু অভিযোগ করলে তারই পক্ষ সমর্থন করুন; কারণ তারা সবাই তার বিরুদ্ধে প্রতিকূল ধারণা পোষণ করবে।
  • যখন সত্যিকারে বিপদে পড়বে তখন এই অজুহাত খাড়া করুন যে আপনি সাধ্যমত চেষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু বিশেষ কিছুই করতে পারেন নাই।
  • শৃংখলা মেনে চরলে স্বাধীনতা খর্ব হয় এই যুক্তিতে কখনও শৃংখলা মানতে বাধ্য করবেন না।
  • স্বাধীনতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দুর থেকে নিয়ন্ত্রণ করুন; পিতার অধিকারে নিজের কাছে রেখে নিয়ন্ত্রণ করবেন না।
  • বাচ্চারা অল্প বয়সে যা পায়, বড় হয়ে তাই সমাজকে প্রতিদান দেওয়ার চেষ্ঠা করে।

(বাচ্চারা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে)
(Children leam what they live)

শিশু যদি কেবল নিন্দা শুনতে শুনতে বড় হয়, তবে নে নিন্দা- মন্দ করতেই শিখবে। আবার যদি প্রশংসা শুনে বড় হয়, তবে প্রকৃত মুল্য উপলব্দি করতে শিখবে। যদি সে বেড়ে হয়ে উঠে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তবে সে লড়াই করার শক্তি যাবে বেড়ে। আর যদি তার পরিবার হয় সহনশীল, সেও হয়ে উঠবে ধৈয্যশীল।। শৈশব থেকে যদি কেবল উপহাসই পায় তবে সে হবে লাজুক। আর যদি পেয়ে থাকে ক্রমাগত উৎসাহ তবে তার আত্মবিশ্বাস যাবে বেড়ে। যদি বড় হয়ে উঠে লজ্জাজনক আবহাওয়ায় তাহলে সে নিজেকে ভাববে দোষী, আর যদি পায় সকলের সমর্থন, তবে সে নিজের উপরেই আস্থা রাখতে পাররবে।। শৈশবে যদি সুবচার পায়, তবে সে ন্যায় বিচার করতে শিখবে। নিরাপত্তার মধ্যে বাস করলে, সে শিখবে বিশ্বাস করতে। শিশু যদি পায় বন্ধুত্ব ও স্বীকৃতি, তবে সে পৃথিবীতে ভালবাসার সন্ধান করবে।

  শিক্ষা (Education)

অজ্ঞতার থেকে শিখার অনিচ্ছাই লজ্জাজনক। অনুকরনীয় ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তের সাহায্যে শিক্ষা দেন। বাড়ন্ত বয়সে শিশুদের সততার মূল্য সম্পর্কে যে শিক্ষা দেওয়া হয় সে শি? কখনও নষ্ট হয়না। এটি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। সব পেশাতেই, তা সে ঠিকাদারী, আইন ব্যবসায়ী, হিসাব রক্ষক, রাজনীতিবিদ, পুলিশ অফিসার, অথবা বিচারক যাই হোক না কেন সততার গুরুত্ব রক্ষিত থোক হা সকলেই চাই। নৈতিক শক্তি সততার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। বস্তুতপক্ষে নৈতিক বিশুদ্ধতা হচ্ছে সততার ভিত্তি তুমি।

তরুনদের মনকে সহজে প্রভাবিত করা যায়। যখন তারা দেখে যে তাদের শিক্ষাগুরুরাই যেমন পিতা মাতা, শিক্ষক কিংবা রাজনৈতিক নেতারা লোককে ঠকিয়ে আত্মশ্লাঘা অনুভব করছেন, কিংবা হোটেল থেকে তোয়ালে চুরি করে কিংবা রেস্তোরা থেকে কাটা চামচ চুরি করে একটা খুব গৌরবজনক কাজ করেছেন বলে ভাব দেখাচ্ছেন তখন কিন্তু বাচ্চাদের মনে নিম্ন লিখিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়:

  • তারা হতাশ হয়।
  • তারা তাদের শিক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।
  • অনেককে এরূপ করতে দেখলে, তারা এই অসৎ ব্যবহারকেই স্বীকতি দিতে শুরু করে, অর্থাৎ এই ব্যবহারকেই স্বাভাবিক মনে করে তাই অনুসরণ করে।

নিম্নমানের আদর্শ (Poor role models)

একদিন স্কুলে এক শিক্ষক একজন অল্পবয়সী ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন তার বাবা কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। বালকটি জবাব দিল, আমি ঠিক জানিনা, তবে অনুমান করি যে তিনি কলম, পেন্সিল, ছোট বালব, টয়লেট পেপার ইত্যাদি তৈরি করেন; কারণ প্রতিদিনই বাড়ি ফিরে এলে তার টিফিনের বাক্স থেকে এ জিনিসগুলি বেরোয়। ধরে নেওয়া হয় ঐ জিনিস গুলি লোকটা চুরি করে।

অসম তুলনা করার প্রবণতা ( Making unfair comparison)

ন্যায্য তুলনা করলে তা ঠিক আছে, কিন্তু যদি অসম ব্যক্তির মধ্যে অন্যায্য তুলনা করা হয় তবে তুলনীয় ব্যক্তির হীনম্মন্যতার শিকার হয়। নিরপেক্ষ তুলনার ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব জন্মায়, এবং একজন অন্যজনের থেকে সবসময়ে ভাল করার চেষ্টা করে। উচ্চ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিরা অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন না, তারা নিজেদের কাজকে উন্নত করার চেষ্ঠা করেন। তাদের প্রতিযোগিতা নিজেদের সঙ্গেই। তারা তুলনা করেন তাদের সামর্থ্য এবং সেই সামর্থ্য কতটা কাজ করতে পেরেছেন তার সঙ্গে।

ব্যর্থতা ও সাফল্য ( Failure or success A ripple effect)

সাফল্য আরও সাফল্যের জন্ম দেয়, ব্যর্থতা জন্ম দেয় আরও ব্যর্থতার. এই কথাটির মধ্যে অনেকটাই সত্য। খেলাধুলার ক্ষেত্রে দেখা যায় যখন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের মনোবল খুবই দুর্বল থাকে- কোন ও না কোনও সময় এরকম হতেই পারে, তখন তার শিক্ষক কখনই তাকে কোন লড়াকু প্রতিযোগীতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে দেবেন না। কারণ যদি খেলোয়াড়টি আবার পরাস্থ হয় তবে তার আত্মবিশ্বাস আরও কমে যাবে। আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য তার শিক্ষক তাকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী করতে বলেন। এতে জিতলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। পরের প্রতিদ্বন্দ্বী আরও একটু বেশী শক্তিশালী; এবং এতে সাফল্য লাভ করলে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। এই ভাবে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তাকে শেষ প্রতিদ্বন্দীতার জন্য প্রস্তৃত করা হয়।

প্রত্যেকবারের সাফল্যের ফলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং পরবর্তী প্রতিদ্বন্দীতায় জয়লাভ সহজ হয়। এই কারণে, যে কোনও ভালো প্রশিক্ষক তা তিনি পিতা মাতাই হোন, শিক্ষক বা পরিদর্শক যেই হোন না কেন প্রথমে শিক্ষার্থীকে সহজ কাজ দিয়ে তাকে তৈরি করা শুরু করান। প্রতিবার সাফল্যের সঙ্গে তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বোধ উন্নতা হয়। এর সঙ্গে যদি উৎসাহ দেওয়া যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোদ দৃঢ় হয়ে উঠবে। আমাদের দ্বায়িত্ব হচ্ছে ক্রমাগত ব্যর্থতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে আমদের সন্তানদের সাফল্যের পথ ধরিয়ে দেওয়া।

একটি বিষয়ে ব্যর্থতার সঙ্গে সার্বিক ব্যর্থতাকে মিশিয়ে ফেলা।

একটি বিষয়ে ব্যর্থ হলেই বেশিরভাগ ব্যক্তি নিজেদেরকে সব বিষয়েই ব্যর্থ বলে ভাবতে শুরু করেন। তারা ঠিক বুঝতে পারেন না যে একটি বিষয়ে ব্যর্থতা সার্বিক ব্যর্থতা নয়। আমাকে বোকা বানানো হতে পারে, কিন্তু আমি তো বোকা নই। পিতামাতা, শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়করা সম্পূর্ণরুপে নিখুঁত কাজের অবাস্তব প্রত্যাশা করেন (Unrealistic expectations of perfection by parents, teachers and supervisors)

ধরুন, একটি ছেলে তার পরীক্ষার ফলাফলে পাঁচটি এ পেয়েছে ও একটি বি। তার বাবা মা তাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবেন সে বি পাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। কিংবা তার বাবা মা কি বি পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানাবে? মোটেই না।

ছেলেটি শুধু চায়, সে যে পাঁচটা এ পেয়েছে সেটা যেন স্বীকৃতি ও প্রশংসা পায়। বাবা মা ছেলের পাচটা এ পাওয়ার জন্য প্রশংসা ও স্বীকৃতি দেওয়ার পর অবশ্য তাদের প্রত্যাশার কথা বলতে পারেন। বলতে পারেন যে ছয়টি এ পাওয়া তারা আ করেন এবং তার জন্য কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হরে তারা তা দিতে প্রস্তুত। যদি প্রত্যাশা কম থাকে তবে ছেলের কৃতিত্বও বাবা-মায়ের প্রত্যাশার সঙ্গে তার রেখে কমে আসবে।

সেই রকম কর্মক্ষেত্রেও একজন কর্মী ১০০টি কাজ ঠিকঠাক করে, একটিতে ভুল করে। উর্ধবতন ব্যক্তি যদি ভুলটিকে বাড়িয়ে দেখেন তবে কর্মচারীর মনোবল ঠিক থাকবে

। কৃতিত্বের জন্য প্রাপ্য প্রশংসা দেওয়া হোক, কিন্তু বিচ্যুতিকে অগ্রাহ্য করে প্রশংসা করলে কাজের মান কমে যাবে। তা ঠিক হবে না।

শৃঙ্খলাবোধের অভাব (Lack of discipine)

শৃঙ্খলাবোধ কী?

কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে বা কোনও সমস্যা দেখা দিরে যে সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাকেই কি শৃঙ্খলা বলে? কিংবা একজন মানুষের ইচ্ছামত কাজ করার স্বাধীনতা কি শৃঙ্খলা বোধ? এরূপ স্বাধীনতা কি ফলাফল নিরপেক্ষ? শৃঙ্খলা কি উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়? শৃঙ্খলা নামে কি অন্যায় ব্যবহার হয়? শৃঙ্খলা কি স্বাধীনতা খর্ব করে?

এর কোনওটিটই ঠিক নয়। শৃঙ্খলার অর্থ এই নয় যে, একজন বাচ্চাদের মারধর করূক। এ রকম করার অর্থ পাগলামি। শৃঙ্খলা হচ্ছে স্নেহসিক্ত দৃঢ়তা। এটি কোনও সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই তাকে বাধা দেওয়ার উপায়।

শৃঙ্খলার দ্বারা কর্মোদ্যমকে সংহত করেও নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করে মহৎ কাজ সম্পাদন করা যায়। শুধু শৃংখলা রক্ষার জন্য আপনি কাজ করেন না। আপনি কাজ করেন যাদের ভালোবাসেন তাদের জন্য।

শৃঙ্খলা আসলে ভালোবাসার কাজ। কখনও কখনও দয়ালু হওয়ার জন্য নির্দয় হতে হয়। সব ঔষধ সুস্বাদু হয় না, অস্ত্রোপচার যন্ত্রণাবিহীন হয় না। কিন্তু আমাদের এখলি সং। করতেই হয়। প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। জিরাফ বৃহৎ আকারের জন্তু। মা জিরাফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাচ্চা প্রসব করে। হঠাৎ বাচ্চাটি মাতৃগর্ভের আরাম থেকে শুধু মাটির উপর পড়ে যায়। মাটিতে পড়েই থাকে উঠতে চায় না। মা জিরাফ তখন বাচ্চাটি। পিছনে গিয়ে জোড়ে লাথি মারে। বাচ্চাটি উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু তার পা তখনও দুর্বল, টলমল করে, ফলে বাচ্চাটি পড়ে যায়। মা জিরাফ কিন্তু আবার কাছে গিয়ে জোরে লাথি মারে। বাচ্চাটি উঠে দাঁড়ায় কিন্তু আবার পড়ে যায়। মা আবার লাথি মারে। এইভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত বাচ্চাটি চলতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মা তাকে লাথি মেরে চলে। কেন? কারণ মা জিরাফ জানে যে পায়ের উপর দাঁড়িয়েই বাচ্চাটিকে বেঁচে থাকতে হবে তা না হলে জঙ্গলের শ্বাপদরা তাকে খেয়ে ফেলবে: অচিরেই সে হবে মাংসাশী জানোয়ারদের খাদ্য।

এখন প্রশ্ন মা জিরাফ কি ভালোবেসে লাথি মেরেছে? অবশ্যই তাই। যে বাচ্চারা স্নেহশীল এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ পরিবেশে মানুষ হয়, তারা বাবা-মায়ের প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়, এবং আইনমান্যকারী নাগরিক হয়। উল্টোটাও সমান সত্য। J. Edger Hoover বলেছেন, যদি প্রত্যেক পরিবারে শৃঙ্খলা মেনে চলা হয় তবে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অপরাধ প্রবণতা শতকরা ৯৫ ভাগ কমে যাবে।

সুবিবেচক পিতামাতা শৃঙ্খলারক্ষার জন্য ছেলেমেয়ের সাময়িক অসন্তোষকে ভয় করেন না।

শৃঙ্খলাবোধই স্বাধীনতার আনন্দ দেয়।

কোনও বাচ্চাকে তার ইচ্ছামত পুরো এক বাক্স চকোলেট খেতে দিলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু যদি দৈনিক একটি দুটি করে চকোলেট উপভোগ করতে পারবে এবং বেশ কিছুদিন ধরে আর অসুস্থও হবে না। ফলাফলের প্রতি নজর না দিয়ে খুশিমত কাজ করতে আমাদের প্রবৃত্তি আমাদের প্ররোচিত করে।।

আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভোগের মধ্যে স্বাধীনতা নেই, স্বাধীনতা আছে আকাভাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।-Epictetus

নিজের মত করে নিজের নিজের কাজ করাকেই স্বাধীনতা বলে, এরূপ ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। মানুষ যা চায় সব সময়ে তা পায় না। অনেক সময় উচ্চমূল্যবোধ ও শৃঙ্খলাবোধের সুবিধাগুলি উপলব্ধি করা সহজ হয় না। মনে হতে পারে যে উল্টোটা করাই বোধহয় বেশী লাভজনক, সুবিধাজনক ও উপভোগ্য। কিন্তু অসংখ্য উদাহরণ আছে যখন মানুষ শৃঙখলার অভাবে সাফল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

শৃঙ্খলা মেনে চলতে গিয়ে মনে হতে পারে যে এটি যেন আমাদের টেনে নামাচ্ছে। যখন প্রকৃতপক্ষে এটি আমাদের উপরে উঠিয়ে দিচ্ছে। শৃঙ্খলার কাজই তাই।

একটি ছেলে তার বাবার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। ছেলেটি বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ঘুড়িটি কিসের জোড়ে উপরে উঠেছে। বাবা জবাব দিলেন, সুতোর জোরে। ছেলেটি বলল, কিন্তু বাবা, সুতো তো ঘুড়িটিকে নীচের দিকে টেনে রেখেছে?বাবা তখন ছেলেকে ভালো করে লক্ষ্য করতে বলে, সুতোটি ছিড়ে দিলেন।

ঘুড়িটির কী হল? অবশ্যই মাটিতে নেমে এল। জীবনের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। কখনও কখনও যা আমাদের নীচের দিকে টেনে নামাচ্ছে বলে মনে হয়, সেইটিই কিন্তু আমাদের উড়তে সাহায্য করছে। শৃঙ্খলাবোধও একই কাজ করে।

মুক্তি চাই

সব সময়েই এই আক্ষেপ শোনা যায়, মুক্ত হতে চাই। রেল লাইনের গেলেই ট্রেন মুক্ত: কিন্তু তারপর যাবে কোথায়? যদি প্রত্যেকেই নিজের সুবিধা মত গাড়ি চালায়, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে তবে তাকে কি স্বাধীনতা বলা যাবে, না বলা হবে বিশৃঙ্খলা? আইন মেনে আমরা আসলে স্বাধীনতা ভোগ করছি।

আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী অনেককেই আমি এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি: আপনার ছেলের ১০৫ ডিগ্রী জ্বর, কিন্তু সে ডাক্তারের কাছে যেতে চাইছেনা। আপনি কী করবেন? সবাই এক উত্তর দিয়েছেন, অবশ্যই ডাক্তার ডাকতে হবে, তা ছেলে যাই বলুক না কেন। কারণ ছেলের ভালোর জন্যই ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন।

বাবা-মার কর্তব্য ছেলে-মেয়েদের নিকট জনপ্রিয় হওয়া নয়।

রাহাজানির জন্য এক আসামিকে জেলবাসের আদেশ দেওয়ার পর জজ জিজ্ঞেস করলেন, আসামির কিছু বলার আছে কিনা। আসামি বলল, আমার অনুরোধ আমার বাবামাকেও জেলে পাঠিয়ে দিন। জজের প্রশ্নের উত্তরে আসামি জবাব দিল, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন স্কুলে একজনের একটি পেন্সিল চুরি করেছিলাম। আমার বাবা-মা এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলেন নি। পরে একটা পেন চুরি করলাম, তখনও তারা চুপ করে থাকলেন। তারপর আমি স্কুল থেকে এবং প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে অনেক জিনিস চুরি করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত এটি একটি অভ্যাসে পরিনত হল। বাবা-মা সবই জানতেন, কিন্তু এ বিষয়ে তারা কখনো কিছু বলেননি। আমার সঙ্গে যদি কারুর জেলে যাওয়া উচিত বলে মনে হয় তবে তাদেরই যাওয়া উচিত।

ছেলেটি ঠিক কথাই বলছে। বাবা-মা তাদের কর্তব্য পালন না করার জন্য ছেলের কৃত কর্মের জন্য তারাও সমান ভাবে দায়ী, যদিও ছেলেটির দায় কম নয়।

ছেলেমেয়েদের পছন্দমত বেছে নেওয়ার দায়িত্ব দিতে হবে কিন্তু সেই সঙ্গে তারা যেন সঠিক পথে চলার নির্দেশও পায়। তা নাহলে বিপদে পড়বে। সম্পূর্ণ মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি আত্মশৃংখলা ও আত্মত্যাগের উপর নির্ভর করে। আমেরিকান ফ্যামেলি এ্যাশোসিয়েশনের জার্নালে লেখা হয়েছিল, বাবা-মা সপ্তাহে গড়পড়তা ১৫ মিনিটের মত সময় ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ কথাবার্তায় ব্যয় করে – তারপর ছেলেমেয়েরা তাদের বন্ধু-বান্ধব ও টি. ভি থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা পায়।

নিজেকে প্রশ্ন করুন: শৃঙ্খলা ব্যতীত

  • একজন জাহাজের ক্যাপ্টেন দক্ষভাবে জাহাজ চালনা করতে পারেন?
  • একজন এ্যাথলিট কি প্রতিযোগিতায় জিততে পারেন?
  • একজন বেহালাবাদক কি কোনও কনসার্টে ভালোভাবে বাজাতে পারেন?

উত্তর হবে, কখনই নয়। তাহলে আর আমরা শৃঙ্খলার প্রয়োজন আছে কিনা এই প্রশ্ন করি কেন। শৃংখলা ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে, কাজে কৃতিত্ব দেখানোর জন্য অপরিহার্য ভাবে প্রয়োজন।

আজকে এক ধরনের মনোভাব দেখা যাচ্ছে, যা ভালো মনে কর, তাই কর। অনেক সময় বাবা- মায়েরা নিরীহভাবে বলে, আমার বাচ্চারা কী করছে তাতে আমার আগ্রহ নেই, তারা সুখে থাকুক এই-ই আমরা চাই। সেইটিই বড় কথা। আমার প্রশ্ন, আপনি কি জানতে চাইবেন না, তারা কিসে সুখী হবে? রাস্তায় লোকজনকে মেরে তাদের জিনিস পত্র কেড়ে নেওয়ার মধ্যেও এক ধরনের বিকৃত সুখ উপভোগ করে থাকে কোনও কোনও ব্যক্তি। সুতরাং কিসে সুখ পাওয়া যায় সেই বিষয়টিও গুরত্বপূর্ণ। মূল্যবোধ, শৃঙ্খলাবোধ ও দায়িত্ববোধের উপর সুখ ও সুখ পাওয়ার উপায়গুলি নির্জ করে।

যা ইচ্ছা তাই কর-এই রকম কথা প্রায়ই শোনা যায়। উল্টো করে বললে বলা যায় যে কাজ করছ সেই কাজ পছন্দ কর। অনেক সময়েই আমরা পছন্দ করি বা না করি আমাদের যা করা উচিত তাই করতে হয়।

যে মা বাইরে কাজ করেন, তিনি সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরে এসেও ঘরকন্নার কাজ, বাচ্চার দেখাশুনার কাজ করে ক্লান্ত হয়ে শুতে যান। মাঝ রাত্রে বাচ্চা কাঁদলে ওঠার ইচ্ছা হয়না ঠিকই, কিন্তু তবুও উঠতে হয়। কেন ওঠেন? তিনটি কারণে তাকে উঠতে হয়:

* বাচ্চার জন্য ভালবাসা

* কর্তব্যবোধ

* দায়িত্ব বোধ

আমরা কেবল ভাবাবেগ সম্বল করে বাঁচতে পারি না। বয়স যাই হোক না কেন, আমাদের শৃঙ্খলা বোধ আনতেই হয়। জীবনে সফল হতে গেলে আমাদের যে কাজ করতে ইচ্ছা হয় সে কাজ না করে যে কাজ করা উচিত সেই কাজ করাই বাঞ্চনীয়। এইভাবে ইচ্ছাকে নির্দিষ্ট পথে চালিত করতে শৃঙ্খলার প্রয়োজন।

বাবা-মা, শিক্ষক এবং তদারককারীরা বাচ্চাদের লেবেল দিয়ে দেন কিংবা তাদের সম্ভাবনাকে খর্ব করেন। (Lebelling and put-downs by parents, teachers and supervisors )

বাবা-মা কখনও কখনও বাচ্চাদের সম্পর্কে লঘুভাবে অথবা স্নেহের সঙ্গে, অপদার্থ, বোকা ইত্যাদি অভিধা প্রয়োগ করে থাকেন। এই ধরনের অভিধা বা লেবেল জীবনের মতো ছেলেটির গায়ে সেঁটে যায়। আর এই ভাবে মার্কামারা হয়ে গেলে অবচেতন মনে তারা বাবামায়ের কথাকেই সত্য বলে মেনে নিয়ে জীবনে তাই প্রমাণ করে। ভারতে বর্ণ বিভাগ এই রূপ অভিধা দিয়েই উঁচু নীচু মানসিকতার সৃষ্টি করেছে এবং উচ্চ ও নীচ বর্ণ এইভাবেই ভাগ হয়ে গেছে।

বাবা-মা বাচ্চাদের সম্পর্কে কিছু কিছু মন্তব্য করে তাদের অবনমিত করে রাখেন। মন্তব্য গুলি হল:

* তুমি বোধশক্তি হীন।

* তুমি কোনও কাজই ঠিকমত বরতে পার না।

* তোমার মধ্যে কোনও সার পদার্থ নেই।

যথার্থ মূল্যবোধে শিক্ষিত করা (Teaching the right values)

অনেক সময় আমরা আমাদের পরিবারে কিংবা সংস্থায় নিতান্ত নির্দোষভাবে কিংবা বেখেয়ালে সঠিক মূল্যবোধ শেখাতে গিয়ে ভুল শিখিয়ে ফেলি।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা বাড়িতে ছেলেমেয়েদের কিংবা অফিসে ব্যক্তিগত কর্মচারীদের মিথ্যে বলতে বলে থাকি।

* বলে দাও, আমি এখানে এখন নেই।

* ডাকে চেক পাঠিয়ে দিয়েছি।

আমরা আমাদের বাবা-মা, শিক্ষক এবং কর্মক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়কদের নিকট চারিত্রিক ও ব্যবহারিক সততা শিখতে চাই। কিন্তু অনেক সময়েই হতাশ হতে হয়। এরূপ ছোটখাট মিথ্যা বলতে বলতেই লোকে পেশাদার মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। অন্যকে মিথ্যা বলতে শেখানোর সময় আমাদের খেয়াল থাকে না যে একদিন ওরা আমাদের কাছেই মিথ্যা বলবে। যেমন, একজন সেক্রেটারী তার উপরওয়ালাকে অসুস্থ বলে ছুটি নিয়ে বাজার করতে গেলেন। হতেই পারে যে উপরওয়ালার নির্দেশে মিথ্যে বলা অভ্যাস করে সে এখন মিথ্যা বলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে।

একটি ইতিবাচক আত্মসম্মান বোধ গড়ে তোলার পদ্ধতি (Steps to building a positive self-esteem)

দুভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করা (Turn scars into stars)।

যারা জীবনের নেতিবাচক অবস্থাকে ইতিবাচক করেছেন প্রতিকূল অবস্থাকে অনুকূল অবস্থায় রূপান্তরিত করেছেন, পথের অবরোধকে উন্নতির সোপানে পরিবর্তিত করেছেন তাদের জীবনকাহিনী পাঠ করা প্রয়োজন। হতাশা এবং ব্যর্থতা তাদের নীচে নামিয়ে দিতে পারে নি।

বেঠোভেন কিছু শ্রেষ্ঠ সুর সৃষ্টি করেছেন। তার অসুবিধা কী ছিল? তিনি ছিলেন বধির। প্রকৃতিকে নিয়ে কিছু শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখেছেন মিলটন। তার বাধা কী ছিল? তিনি ছিলেন অন্ধ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেতাদের একজন। তার অসুবিধা ছিল, তিনি চাকাওয়ালা চেয়ারে বসেই ঘোরাফেরা করতেন। তিনি ছিলেন খঞ্জ!

উইলমা রূডলফের কাহিনী (The wilma Rudolph story) (Adapted from Star Ledger, November 13, 1994)

টেনেসীর এক গরীব পরিবারের মেয়ে উইলমা। চার বৎসর বয়সে স্কারলেট ফিভারের সঙ্গে ডবল নিউমোনিয়া এবং শেষে পোলিওর আক্রমনে তার পা দুটি হয়ে গেল অকেজো। পায়ে লোহার জুতো পরে থাকতে হত। ডাক্তার বলল জীবনে আর মাটিতে রাখতে পারবে না উইলমা।।

কিন্তু উইলমার মা তাকে উৎসাহিত করতেন। বলতেন, ভগবান প্রদত্ত ক্ষমতা, অধ্যবসায় ও বিশ্বাস থাকলে সে যা চায় তাই করতে পারবে। উইলমা বলল, আমি দৌড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মেয়ে হতে চাই। নয় বছর বয়সে ডাক্তারের উপদেশ অগ্রাহ্য করে পায়ের লোহার জুততা খুলে সে মাটিতে পা রাখল। ১৩ বছর বয়সে প্রথম দৌড় প্রতিযোগীতায় নামল এবং এল সবার শেষে। তারপর তার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দৌড় প্রতিযোগীতাসবগুলিতেই সে স্থান পেল শেষের দিকেই। শেষ পর্যন্ত একদিন এল যখন সে হল প্রথম।

১৫ বছর বয়সে টেনেসী সেন্ট ইউনিভারসিটিতে এড টেম্পল নামে কোচের দেখা পেল। উইলমা তাকে বলল, আমি দৌড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মেয়ে হতে চাই। টেম্পল বলল, তোমার এই উদ্দীপনা, তোমাকে কেউ থামাতে পারবে না। তাছাড়া আমি তোমাকে সাহায্য করব।

তারপর একদিন উইলমা অলিম্পিকে প্রতিদ্বন্দিতার জন্য এল। যারা সব থেকে ভালো তারাই অলিম্পিকে সুযোগ পায়। উইলমার প্রধান প্রতিদ্বন্দি ছিল জুট্টা হাইনেনামে একজন মহিলা যে কখনও কারুর কাছে পরাস্ত হয়নি। প্রথমে ছিল ১০০ মিটার দৌড়। উইলমা জুট্টাকে হারিয়ে প্রথম স্বর্ণপদকটি জিতে নিল। দ্বিতীয় প্রতিযোগীতা ছিল ২০০ মিটার দৌড়: এটিতেও উইলমা জুট্টা হাইনকে হারিয়ে দ্বিতীয় স্বর্ণপদক জিতে নিল। তৃতীয় প্রতিযোগীতা ৪০০ মিটার রিলে দৌড়। এখানেও তার প্রতিদ্বন্দ্বি জুট্টা হাইনে। রিলে দৌড়ে সবচেয়ে দ্রুত যে দৌড়ায় সে শেষের ৪০০ মিটার দৌড়ে থাকে এবং তাদের উপরেই তাদের দলের ভাগ্য নির্ভর করে। প্রথম তিনজন ঠিকমত দৌড়াল এবং ব্যাটন হস্তান্তরও সহজভাবে হল। কিন্তু উইলমার সময় যখন এল, তখন ব্যাটন নিতে গিয়ে সেটি তার হাত থেকে পড়ে গেল। উইলমা দেখল জুট্টা তীরের মত বেরিয়ে গেল। উইলমা ব্যাটনটি কুড়িয়ে নিয়ে যন্ত্রচালিতের ন্যায় দৌড়াল এবং জুট্টাকে তৃতীয় বার পরাস্ত করে তৃতীয় স্বর্ণপদক জয় করল। উইলমার কৃতিতু ইতিহাস হয়ে গেল। ১৯৬০ সালের অলিম্পিকে একটি পক্ষাঘাগ্রস্ত মেয়ে পৃথিবীর দ্রুততম মহিলা রূপে স্বীকৃত হল।

উইলমার কাহিনী থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে, সফল ব্যক্তিরা বাধা-বিপত্তি নেই বলে সাফল্য অর্জন করেন না, তারা বাধা-বিপত্তি সত্তেও সফল হন।

যারা প্রতিকূলতাকে সুযোগে রূপান্তরিত করতে পারেন তাদের কাহিনী শুনে বা পড়ে আমরা কি অনুপ্রাণিত হইনা? নিয়মিতভাবে যদি আমরা এই ধরনের জীবনী বা আত্মজীবনী পড়ি তাহলে কি আমরা অনুপ্রেরণা পাব না।

বুদ্ধিমানের অজ্ঞতা (Leam intelligent ignorance)

আমরা কী করতে পারি এবং কী করতে পারি না সে বিষয়ে আমাদের শিক্ষা আমাদের অবহিত করে। হেনরী ফোর্ড এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমি সেই রকম লোক খুঁজছি যাদের কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার অফুরন্ত ক্ষমতা আছে।

হেনরী ফোর্ডই প্রথম v৪ ইঞ্জিন তৈরি করেছিলেন। তার বিশেষ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল, এবং ১৪ বছর বয়সের পরে আর স্কুলে যান নি। তিনি বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারছিলেন যে v৪ ইঞ্জিনের যথেষ্ট প্রয়োজন, কিন্তু তিনি জানতেন না কিভাবে ইঞ্জিন তৈরি করতে হবে। তিনি তার উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন এবং শিক্ষিত কর্মীদের ডেকে ঐ ইঞ্জিন তৈরি করার কথা বললেন। কিন্তু তারা বললেন v৪ ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব না। কিন্তু হেনরী ফোর্ড জোর দিয়ে বললেন যে তার v৪ ইঞ্জিন চাই। কয়েকমাস পরে হেনরী ফোর্ড আবার তার লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন যে v৪ ইঞ্জিন তৈরি হয়েছে কিনা। তারা জবাব দিলন, আমরা জানি কী করা যেতে পারে, এবং কি করা যাবে না। v৪ তৈরি করা অসম্ভব। এইভাবে কয়েকমাস চলল কিন্তু তা সত্ত্বেও হেনরী ফোর্ড জিদ ধরে রইলেন, আমার v৪ ইঞ্জিন চাই। এর কিছুদিন পরেই সেই লোকেরাই v৪ ইঞ্জিন তৈরি করে দিল। কী করে সম্ভব হোল। পুথিগত শিক্ষা কতদুর করা যায় তা জানিয়ে দেয়, কিন্তু কখনও কখনও এই সীমারেখা ঠিক হয় না।

ভ্রমর (The bumblebee)

প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। বিজ্ঞানীরা বলেন ভ্রমরের শরীর বেশ ভারী এবং তুলনায় ডানার বিস্তার অনেক ছোট। বায়ুগতিশাস্ত্র অনুসারে ভ্রমর উড়তে পারার কথা নয়। কিন্তু ভ্রমর এই তত্ত্ব জানে না এবং দিব্যি উড়ে বেড়ায়।

নিজের সীমাবদ্ধতা না জেনে কাজ করতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে যাবেন নিজের কৃতিত্বে। পিছনে ফিরে তাকিয়ে বিশ্বাসই করতে চাইবেন না যে আপনার কোনও সীমাবদ্ধতা ছিল। মানুষ সীমাবদ্ধতার ধারনা নিজেই তৈরি করে। শিক্ষা যেন সীমাবদ্ধতা আরোপ না করে।

যারা টাকা বা জিনিসপত্র দিয়ে প্রতিদান দিতে পারবে না তাদের জন্য কিছু করুন (Do something for others who cannot repay you in cash or kind)

ডাঃ কার্ল মেনিনজার (Dr karl Menninger) নামে একজন বিশ্ববিখ্যাত মনোরাগ বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, স্নায়বিক বৈকল্য হতে যাচ্ছে এই রকম একজন ব্যক্তিকে আপনি কী উপদেশ দিবেন? শ্রোতারা আশা করেছিলেন যে ডাঃ মেনিনজার একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলবেন। কিন্তু তিনি তা বললেন না। তিনি বললেন, আমি পরামর্শ দেব যে ভদ্রলোক যেন বাড়িতে তালা দিয়ে শহরের অন্য প্রান্তে গিয়ে যাদের সাহায্যের প্রয়োজন এরকম মানুষদের সাহায্য করেন। এই ভাবেই আমরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে পারব। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা অধিকাংশ সময় নিজেরই নিজেদের অসুবিধা সৃষ্টি করি।

প্রত্যেকেরই সেচ্ছাসেবী হওয়া উচিত। এর দ্বারা নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস তৈরি হয়। অপরের নিকট যেমন আমরা সাহায্য প্রত্যাশা করি তেমনি অন্যকে সাহায্য করলে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। এই বোধ থেকেই আত্মসম্মান বোধ জন্মায়। প্রতিধানে কিছু প্রত্যাশা না পাওয়া যায়। এই বোধ থেকেই আত্মসম্মান বোধ জন্মায়। প্রতিধানে কিছু প্রত্যাশা করে অপরকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আত্বসম্মান বোধ উন্নত হয়।

শুধু পাওয়া নয়, দেওয়ার মধ্যেও আছে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের লক্ষন।

প্রশংসা করার ও গ্রহণ করার শিক্ষা দরকার (Learn to give and receive compliments)

আন্তরিকভাবে প্রশংসাসূচক কথা বলার কোনও সুযোগ হারাবেন না। স্মরন রাখবেন, এবানে মূল কথা হল আন্তরিকতা। অন্যে যখন আপনাকে প্রশংসাসূচক কিছু বলেন তখন সৌষ্ঠবপূর্ণ মাধুর্য ও ঔদার্যের সঙ্গে বলুন ধন্যবাদ। এটিই বিনয়ের লক্ষন।

দায়ভার গ্রহণ করুন (Accept responsibility)

আমাদের ব্যবহার ও কাজের সমস্ত দায়িত্বই গ্রহণ করা দরকার এবং কোনও অজুহাত দেখানো থেকে বিরত থাকাই উচিত। বিষয়টি ভাল লাগেনা বলে যে ছেলে পরীক্ষায় ফেল করেছিল, তার মত যেন না হতে হয়। এই অজুহাত দিয়ে ছেলেটি কার বেশী ক্ষতি করছে? আমাদের কাজের দায়ভার নিতেই হবে এবং অপরের উপর দোষারোপ করা বন্ধ করতে হবে। তা হলেই আমাদের উৎপাদনশীলতা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

জন, এফ. কেনেডি (Jhon F Kennedy) বলেছেন, আমাদের অধিকার দায়বদ্ধতার থেকে বেশি হতে পারেনা। নাগরিকের দায়িত্ব পালিত না হলে অধিকারের রক্ষাও মুস্কিল হয়ে পরে।

অজুহাত খাড়া করলে সমস্যাটি জটিল হয়ে ওঠে। আমাদের দায়িত্ব আছে:

  • নিজের প্রতি
  • পরিবারের প্রতি
  • কাজের প্রতি
  • সমাজের প্রতি
  • পরিবেশ সম্পর্কে

আমরা সবুজায়নে সাহায্য করতে পারি, ভূমিক্ষয় রোধে সাহায্য করতে পারি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করতে পারি।

আমরা এমন বেপরোয়া ভাবে বাস করতে পারিনা যেন মনে হয় যে আমদের জন্য আর একটা পৃথিবী আছে, যেখানে চলে যেতে পারি। আমাদের প্রতিদিনই কিছু করা উচিত যা পৃথিবীকে ভালোভাবে বাসোপযোগি করে তুলতে পারে। আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মের তত্ত্বাবধাযক। আমরা যদি দায়িত্বশীল না হই তবে কেমন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে?

যদি মানুষের গড়পড়তা আয়ু হয় ৭৫ বৎসর এবং আপনার বয়স এখন হয় ৪০ বৎসর তবে বাকি ৩৫ বৎসরের প্রত্যেকটি দিন আপনি কী করবেন? অবশ্যই দায়িত্বশীল মানুষের মত কাজ করে নিজেদের উপযোগিতা প্রমাণ করা প্রয়োজন।

শখলার মধ্যে জীবন যাপন করলে আনন্দ নষ্ট হয়না বরং আরও আনন্দের ভিত্তি তৈরি হয়। প্রতিভা এবং সামর্থ থাকা সত্ত্বেও অনেককে ব্যর্থ হতে দেখা যায়। তাদের নৈরাশ্য ব্যবসা, স্বাস্থ্য এবং অপরের সঙ্গে সম্পর্ককেও ব্যাহত করে। তারা তাদের অবস্থার জন্য ভাগ্যকে দোষ দেয়, কিন্তু বোঝে না যে শৃঙ্খলার অভাবের ফলেই অনেকগুলি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

লক্ষ্য স্থির করুন (Set goals)।

সুনিদিষ্ট লক্ষ্য থাকলে পথের নিশানা করা সহজ হয়, এবং লক্ষ্যে পৌঁছালে একটি কাজ সুসম্পাদনের আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্যের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধনে দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কল্পনাশক্তি। এগুলিই জীবনকে আর্থপূর্ণ করে এবং পরিপূর্ণতার আনন্দদান করে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে আমরা কি লাভ করলাম, তার থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কতটা পারদর্শী হলাম। এই শোবনতার সঙ্গে উপযুক্ত হয়ে উঠা একটি সুন্দর অনুভুতির সৃষ্টি করে। এই অনুভূতি আমাদের আত্মমর্যাদা বোধ। লক্ষ্যস্থির করার জন্য বাস্তববাদী হওয়া প্রয়োজন। অবাস্তব লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যায়, ফলে আমাদের আত্বসম্মান ক্ষুন্ন হয়। বাস্তবানুগ লক্ষ্য উৎসাহ বর্ধন করে এবং আত্বসম্মানের ভিত্তি নির্মান করে।

দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন (Associate with people of high moral character)

জর্জ ওয়াশিংটন (George washington) বলেছেন, সগুন সম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করলে সুনাম বাড়বে। কুসংসর্গের থেকে একলা থাকা অনেক ভালো।

বন্ধুত্বের পরীক্ষা

বন্ধুত্বের চাপে অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক সময় আপনি আমার বন্ধু নন? ইত্যাদি কথা আমাদের দুর্বল করে দেয়। কিন্তু সত্যি যারা বন্ধু তারা কখনো চাননা যে বঙ্কর ক্ষতি হোক। আমি যদি কোন বন্ধুকে বেশী মদ্যপান করতে দেখি তা হলে তাকে সেই সময় কিছুতেই গাড়ি চালাতে দেবনা। আমি বন্ধুত্ব হারাতে রাজি আছি, কিন্তু বন্ধু হারাতে নয়।

আমরা প্রায় দেখি নিজের মতো অন্যদের নিকট গ্রায্য হবে এই আশায় অনেকে ভুল জিনিসকেও সমর্থন করে। এতে আত্ব-মর্যাদাবোধের অভাবই সূচিত হয়।

বন্ধুত্বের চাপ অনেক সময় বন্ধুত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়। যে বন্ধুরা চাপ সৃষ্টি করে, বিপদের সময় তাদের পাওয়া যায় তো? আপনাকে সাহায্য করার জন্য তারা কতদূর যেতে পারে? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, চাপ দেওয়ার সময় যদি তাদের চরিত্রে বন্ধুর প্রতি দাযিত্ববোধ না থাকে আপনি বিপদে পড়লে সেই দায়িত্ববোধ জাগবে একথা কি বলা যায়? তাই দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের মানুষের সংস্পর্শে থাকলে নিজের আত্মমর্যাদা বোধও তৈরি হয়।

বন্ধুত্বের চাপ

দলের মধ্যে থাকলে অন্যের চাপে সৎ ও ন্যায়ের পক্ষে দাড়ানোর ইচ্ছা কমে যায়। কারণ স্পষ্টতাই তখন সাহস ও চরিত্র থাকেনা – অনেকের ইচ্ছার সঙ্গে আপস করে নিতে হয়। এই রকম আপস করে নিলে ঝামেলাও কম। সবার ইচ্ছার সঙ্গে সহমত হতে পারলে বন্ধুত্বেরও খুশি রাখা যায়, আর উপহাসাম্পদ হওয়ার ঝুঁকিও থাকে না। এখানেই আতৃমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেদের পৃথক করে একটি গণ্ডী টেনে দেন। সবার সঙ্গে একসাথে চলার প্রবনতাই বালক ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে।

উদাহরন :

  • স্কুলের বাচ্চারা একসঙ্গে একরকম কাজ করে কারন একজন আলাদা হলে সে উপহাসাম্পদ হবে।
  • অনেক সময় জানা থাকলেও জবাব দেয় না, কারন অন্যেরা তাকে নিয়ে মজা করবে।
  • সহকমীদের খুশি রাখতে কারখানার ভালো কর্মীরাও তাদের উৎপাদন কম রাখে। আধিক্যহীনতা।

অনেকে বলেন, বেশি না হলে, ঠিক আছে। একটু পরীক্ষা করে দেখি, তারপর না হয় ছেড়ে দেব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কম পরিমাণে হলে কি সেটা ভাল?

উদাহরন দেওয়া যায়,

  • অনধিক মাত্রায় ঠকানো ভাল?
  • মিথ্যা বলা।
  • চুরি করা?
  • মাধক গ্রহণ করা?
  • কেলেঙ্কারিতে জড়িত হওয়া

অনেকে আবার প্রায়ই দাবি করেন, যখনই মনে করব তখনই ছেড়ে দিতেপারি। কিন্তু তারা বোঝেন না যে এই ছেড়ে দিতে পারি কিন্তু দিচ্ছি না একটি নেতিবাচক মনোভাব, এটি ইচ্ছাশক্তির থেকে ক্ষমতাশালী।

বাইরের শক্তি নয়, অন্তরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত হোন (Become internally driven, not externally driven)

একদিন সকালে কোনও এক ব্যক্তি প্রসন্নচিত্তে ঘুম থেকে উঠে ফোন করে আমাকে বললেন, আরে, আপনি পৃথিবীর মহান ব্যক্তিদের একজন। আপনি খুব ভালো কাজ করছেন, এবং আপনাকে আমার বন্ধু বলে পরিচয় দিতে পারলে আমি খুব সম্মানিত বোধ করব। এই কথা শুনে আমার কী মনে হবে? খুব ভালো। কিন্তু যদি পরের দিন ভদ্রলোকের কর্মপ্রেরণা অন্নচিত্তে ঘুম ভাঙ্গে এবং টেলিফোন করে বলে, তুমি একটা দুর্বত্ত, একটা জোচ্চোর, একটা বদমাশ। তুমি শহরের সবথেকে বড় ধাপ্পাবাজ। তাহলে আমি কিরকম বোধ করব? ভীষণ খারাপ।

ব্যাপারটা এই রকম দাঁড়াচ্ছে যে যখন ভদ্রলোক বললেন আপনি অতি উত্তম ব্যক্তি তখন আমি খুব ভালো বোধ করলাম, আর যখন বললেন আমি একজন বদমাশ তখন আমার ভীষণ খারাপ লাগল। আমার মানসিক অবস্থা তাহলে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? অবশ্যই ঐ ব্যক্তি। এইভাবে অপরের কথায় কি আমার জীবন নিয়ন্ত্রিত হবে? তা হওয়া উচিত নয়। একেই বলে বাইরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত।

আমি অন্তরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত হতে চাই। ভদ্রলোক টেলিফোনে যখন বললেন যে আমি অতি উত্তম ব্যক্তি, তখন ঐ কথা শুনতে অবশ্যই ভালো লাগে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ঐ সমস্ত কথা যদি নাও বলেন তবুও আমার নিজস্ব বিচারেও আমি একজন ভালো মানুষ। পরের দিন ঐ ব্যক্তিই যখন টেলিফোনে প্রায় ছিন্নভিন্ন করেন, তখনও তার কথা মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই; কারণ আমার নিজের বিচারে আমি একজন সজ্জন ব্যক্তি। লোকে যখন বলে, আপনি আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছেন তখন রাগের উৎস হচেচ্ছ বাইরের কিন্তু যদি আমি বলি,  আমি রেগে গেছি  তখন কিন্তু রাগের উৎস আমার অন্তরের মধ্যেই।

এই প্রসঙ্গেই এলিনর রুজভেল্ট (Eleanor Roosevelt) বলেছেন হীনম্মন্যতাবোধের দায়িত্ব মানুষের নিজের।

এক প্রাচীন ভারতীয় ঋষির গল্প আছে। তাকে একজন পথচারী অনেক কুংসিত অভিধায় ভূষিত করছিল। ইষ অবিচলিত ভাবে তা শুনলেন। অবশেষে লোকটির সমস্ত খারাপ কথা শেষ হয়ে গেল। তখন ঋষি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, দেবতার নিকট যে অঘ্য দেওয়া হয় তা গৃহীত না হলে কার প্রাপ্য হয়? লোকটি উত্তর দিল, যে অর্ঘ্য দিয়েছে তারই প্রাপ্য। ঋষি উত্তর দিরেন,  আমি তোমার অর্ঘ্য গ্রহণ করছি না, এবং এই বলে লোকটিকে হতভম্ব করে দিয়ে ঋষি চলে গেলেন। ঋষির শক্তি তার অন্তরের শক্তি।

যে পর্যন্ত আমরা বাইরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত হব, সে পর্যন্ত আমাদের দুঃখের অবসান হবে না, এবং আমরা অসহায় বোধ করব। আমাদের অনুভূতি ও ব্যবহারের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমাদের কোনও পরিবর্তন হবে না। প্রথমেই নিজেকে এই প্রশ্ন করা প্রয়োজন,

  • আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম কেন?
  • রেগে গিয়েছিলাম কেন?
  • মানসিক অবসাদ এসেছিল কেন?

প্রশ্নের জবাব থেকেই এই অবস্থাকে জয় করার সূত্র পেয়ে যাব। সুখ ইতিবাচক আত্মমর্যাদার ফলশ্রুতি। কিসে সুখী হবেন, এই প্রশ্নের অনেক রকমের জবাব পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন বস্তুগত; কিন্তু তাতে প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় না। সুখ মানুষের অন্তরের ব্যাপার, সুখ বস্তুর মালিকানার বিষয় নয়। জীবনযাত্রার প্রয়োজনের প্রত্যেকটি জিনিস থাকলেও সুখী নাও হতে পারে। এর উল্টেটাও সত্য অর্থাৎ অনেক জিনিসপত্র না থাকলেও সুখী হতে পারে।

সুখ অন্তরের জিনিস, সুখ প্রজাপতির মতো ধরতে যান, উড়ে বেড়াবে; স্থির হয়ে দাঁড়ান, প্রজাপতি উড়ে এসে আপনার উপর বসবে।

মনে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করুন যাতে আপনি সুখী হন।

আমাদের স্বাভাবিক আবেগ ব্যাহত হলে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। ফলে অন্যের ভালো করার ইচ্ছা ও অসাড় হয়ে যায়। সেই জন্য নিজের সম্পর্কে একটি একটি মানদন্ড স্থির করা উচিত। নিজের কাছে সৎ থাকুন এবং নিজের নেতিবাচক প্রবণতা ওলিকে জয় করার চেষ্টা করুন। নিম্নলিখিত কাজগুলি করুন।

  • প্রত্যেক মানুষের ও প্রত্যেক ঘটনার ইতিবাচক দিকেই দৃষ্টি দিন।
  • সুখী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিন।।
  • সুবিবেচনার সঙ্গে নিজের মানদন্ড নিজে নির্ধারণ করুন।
  • নেতিবাচক সমালোচনায় আবিচলিত থাকুন।
  • প্রত্যেক ছোটখাট বিষয়েও আনন্দ পাওয়ার শিক্ষা নিন।
  • স্মরণ রাখবেন, সময় সমান যায় না। ভালো, খারাপ জীবনের অঙ্গ।
  • প্রত্যেক অবস্থাকে পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করুন।
  • নিজেকে গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখুন।
  • আপনার থেকে যারা কম সৌভাগ্যবান তাদের সাহায্য করুন।
  • প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ওটার শিক্ষা নিন। দুশ্চিন্তা করবেন না।
  • নিজেকে এবং অপরকেও ক্ষমা করুন। মানুষের ত্রুটি বিচ্যুতি গুলিকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন না, কিংবা কারুর বিরদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করবেন না।

অবচেতন মনে কিছু ইতিবাচক সঙ্কেত তৈরি করুন (Give yourself positive auto-suggesions)

নিজের সঙ্গে ইতিবাচক কথাবার্তা বলার অভ্যাস আয়ত্ত করুন। এর ফলে আমাদের ধারণা ও বিশ্বাস পরিবর্তিত হবে। আমাদের ব্যবহার আমাদের বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সেই জন্য অবচেতন মনের ইতিবাচক সঙ্কেত আমাদের ব্যবহারকেও প্রভাবিত করে। এই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত সকল ভবিষ্যবাণী হয়ে যায়।

উদাহরণঃ

  • আমি কাজটি করতে পারি।
  • আমি যথাযথ পরিচালনা করতে পারি।
  • আমি অঙ্কে ভালো।।
  • আমার স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ।।

আমাদের শক্তিই আমাদের দুর্বলতা হতে পারে (Our greatest strength can become our greatest weakness)

কোনও শক্তিকেই বেশি প্রয়োগ করলে তা দুর্বলতাতে পর্যবসিত হয়।

যেমন, ব্যবসাতে বিক্রয়ের ব্যাপারে ভালো করে কথা বলার ক্ষমতা একটি গুণ।

অনেকে সময় দেখা যায় যে সেলসম্যানরা ভালো কথা বলার গুনে বিক্রি বাড়িয়ে ফেলে। তারপর কথা বলতে বলতে জিনিসপত্র বিক্রির বাইরেও অনেক কথা বলে ফেলে। সুবিন্যস্ত বাচনভঙ্গি তাদের যে শক্তি দিয়েছিল, বেশি ব্যবহারের ফলে তার ফল হল বিপরীত-বিক্রি কমে গেল।

মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শোনা একটি ক্ষমতা। কিন্তু যখন কোনও ব্যক্তি কেবল শুনেই যান, কোনও প্রতিক্রিয়া জানান না তখন এটি একটি দুর্বলতা।

আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমাদের কি হয়ে যেতে পারে (Our greatest weakness can become our greatest strength)

ক্রোধ একটি দুর্বলতা। একে কিভাবে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে?

মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে এক মহিলা, অনেক মায়েদের একত্র করে বিক্ষোভ দেখিয়ে ছিলেন এবং মাতাল গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে মায়েদের সংগঠন (Mothers against Drink Driving) নামে একটি সংস্থা গঠন করেছিলেন। তার কারণ তার সন্তান মাতাল গাড়িচালকের গাড়িতে চাপা পড়েছিল। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে সমাজের এই অভিশাপকে দূর করার জন্যে আমেরিকার জনমত সংগঠিত করতে উদ্যোগ নিলেন। আজ তার সংগঠন আমেরিকার একটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন যার লক্ষ্য হল আইনের পরিবর্তন করে মদ্যপায়ীদের গাড়ি চালানো বন্ধ করা। এইভাবে ক্রোধ নামে একটি নেতিবাচক ভাবাবেগ একটি ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত হোল।

ধৈর্য ধরুন (Hast patience)

অনেকে বলেন একবার কোনও ইতিবাচক বা নেতিবাচক বস্তুর সংস্পর্শে এলে তার কোনও প্রভাব পড়ে না। একথা সত্য নয়। পার্থক্যটা হয়ত দৃশ্যমান নয়; কিন্তু কিছু ঘটেই।

চীনে একধরনের বাঁশ আছে যাদের লাগানোর পর প্রথম চার বৎসর জল, সার দিতে হয়। কিন্তু বাঁশ গাছটি বাড়ে না। কিন্তু পঞ্চম বছরে শ গাছটি হঠাৎ ছয় সপ্তাহে ৯০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। তাহলে কি বলা যাবে যে, বাঁশগাছ ট ডুতে পাঁচ বছরই লেগেছে। বাইরে অবশ্য কোনও দৃশ্যমান পরিবর্তন ছিল না। কত? কড় চালিয়ে শক্তি সংগ্রহ করেছে তা দেখা যায়নি, আবার জর এবং সার না দিলেও গাছ বাঁচত না। প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ধৈর্য ধরুন, বিশ্বাস রাখুন এবং সঠিক কাজ করে যান। কশাল দৃশ্যমান না হলেও, কিছু ঘটবেই।

আপনার ক্ষমতা ও দুর্বলতার তালিকা তৈরি করুন (Take inventory: make a list of all your strengths and weaknesses)

সফল ব্যক্তিরা তাদের সীমাবন্ধতা বুঝতে পারেন, কিন্তু তারা তাদের ক্ষমতার উপর নির্ভর করেন। যদি আমরা দুর্বলতা ও ক্ষমতা গুলি সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে না পারি তবে কিসের ওপর নির্ভর করে আমরা ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব? আপনি কী করতে চান বা কী হতে চান তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন।

ক্ষমতা

দুর্বলতা

আত্মসম্মানবোধের মূলকথা আব্রাহাম লিঙ্কণের নিমউদ্ধৃত লেখাটিতে যে ভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার থেকে ভালো করে প্রকাশ করা যায় না।

পৃথিবী, আজ আমার ছেলে প্রথম স্কুলে যাচ্ছে (World, my son starts school today!) (Adapted from Pulpit Helps February 1991, quoted in Apple Seeds. volume 10, No. 1, 1994)

হে পৃথিবী, আমার সন্তানের হাতধর, সে আজ তার স্কুলের পাঠ শুরু করল। কিছুদিন তার কাছে সবই নতুন ও বিস্ময়কর মনে হবে, এবং আমার আশা তুমি তার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করবে। দেখ, এ পর্যন্ত সে কাটিয়েছে এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই, মুরগীর ঘর গুলিতে ছিল তার আধিপত্য, বাড়ির পিছনের বাগানের সে ছিল মালিক। তার ক্ষতে ওষুধ লাগাতে আমি সব সময়েই কাছাকাছি ছিলাম, এবং যখন সে মনে আঘাত পেয়েছে, আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়েছি।

কিন্তু এখন অবস্থা অন্য রকম হবে। আজ সকালেই বাড়ির সামনের সিড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে পিছন ফিরে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়বে, তারপর শুরু হবে সেই মহৎ

অভিযান, যা তাকে নিয়ে যাবে অনেক যুদ্ধ, বিচ্ছেদ এবং দুঃখের মধ্য দিয়ে।

পৃথিবীতে বাঁচতে হলে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সাহসের প্রয়োজন। সুতরাং হে পৃথিবী, আমার বাসনা তুমি তার তরুণ হাতে ধরে এগিয়ে নিয়ে চল, এবং জীবনে যা শেখার প্রয়োজন তা তাকে শিখিয়ে দাও-কিন্তু যদি পার সহৃদয়তার সঙ্গে শিখিয়ে দিও।

আমি জানি, ওকে জানতে হবে যে সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব নারী পুরুষই সৎ নয়, তাকে শিখিয়ে দিও যে সংসারে মন আছে তেমনি বিরচিত গুণাবলীর মানুষও আছে; শত্র যেমন আছে, তেমনি মিত্রও আছে। প্রথমদিকেই তাকে শিখিয়ে দিও যে উৎপীড়নকারীরা সহজেই পদানত হয়।

বইয়ের পাতায় যে অত্যাশ্বর্য ভাণ্ডার আছে তা ওকে চিনিয়ে দিও। ওকে কিছু নির্জনতা দিও, যখন ও আকাশে পাখির ওড়া, সূর্যের আলোয় মৌমাছিদের ঘোরাফেরা কিংবা সবুজ

পাহাড়ে ফুলের সমারোহ দেখে ভাবতে পারবে। ওকে শিখিয়ো, অসৎ উপায় অবলম্বন করার থেকে অসফল হওয়া অনেক সম্মান জনক। ওকে শিক্ষা দিও, যদি অন্য সকলে বলে যে ওর ধারণাগুলি ভুল তবুও যেন ও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকে। আমার ছেলেকে শক্তি দিও, অন্য সকলে যখন ঠেলাঠেলি করে কোনও প্রত্যাশায় গাড়িতে ওঠে, তখন ও যেন

জনতাকে অনুসরণ না করে। শিক্ষা দিও যেন অন্যের কথা শোনে, কিন্তু যা শোনে তা যেন সত্যের ভঁকুনিতে হেঁকে নিয়ে যে সার টুকু থাকে তাই গ্রহণ করে।

শিক্ষা দিও, যেন কখনও নিজের হৃদয় ও আত্মাকে বিক্রয় যোগ্য না করে। শিক্ষা দিও যেন উচ্ছল জনতার চিৎকারে কান না দিয়ে নিজে যা সঠিক মনে করে তার জন্য লড়াই করতে পারে।

সহৃদয়ভাবে শিক্ষা দিও, পৃথিবী, কিন্তু অধিক প্রশ্রয় দিওনা; কারণ আগুনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেলেই উত্তম ইস্পাত তৈরি হয়।

এটি খুবই দীর্ঘ প্রত্যাশা, কিন্তু দেখো কতটা করা যায়। ও এত ভালো ছেলে। স্বাক্ষর ও আব্রাহাম লিঙ্কন

 

কাজের পরিকল্পনা (Action plan)

১. যারা নেতিবাচক অবস্থাকে ইতিবাচক অবস্থায় রূপান্তরিত করেছেন তাদের জীবন কাহিনী পাঠ করুন। ভালো বই পড়া কিংবা অনুপ্রেরণা দায়ী বাণী অডিও টেপে শোনা আপনার দৈনন্দিন কর্মসূচীর অন্তর্ভূক্ত করুন।

২. আর্থিক বা বৈষয়িক কোনও রূপ প্রতিদানের প্রত্যাশা না রেখে, নিয়মিত ও বিধি অনুযায়ী আপনার সময় এবং অথবা অর্থের একটি অংশ কোনও দাতব্য কর্মে দান করার জন্য দায়বদ্ধ হোন।

৩. নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকুন। সহকর্মী বন্ধুদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না।

৪. আন্তরিক প্রসংসাসূচক বাক্য ঔদার্যপূর্ণ ভাবে গ্রহণ করা ও বিতরন করা অভ্যাস করুন।

৫. নিজের ব্যবহার ও কাজের জন্য দায়িত্ব গ্রহণে বিমুখ হবেন না।

৬. স্বস্তি বোধ না করলেও, আত্মশ পালন করুন।

৭. নীতি-শিষ্ট উন্নত চরিত্রবান ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা করুন।

৮. সৃজনশীল হওয়ার চেষ্টা করুন এবং দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করুন।

৯. ধৈর্য অভ্যাস করুন; ফলাফল দৃশ্যমান না হলেও অধ্যবসায়ী হবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *