০৩. মে, ১৯৭১

১ মে, শনিবার ১৯৭১

চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা লোকজনকে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, নদীতে চোখ-হাত বাধা বুলেটবিদ্ধ লাশ ভেসে যাওয়া এসব খবরের পাশাপাশি আরেকটা রক্ত হিম-করা খবরও মাঝে-মাঝে শুনছিলাম। দুএকজনের কাছে, অবিশ্বাসযোগ্যভাবে, অল্প-স্বল্প শুনতে শুনতে এখন সে খবরটাই সবার মুখে মুখে দ্রুত ছড়াতে ছড়াতে সারা শহরময় কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান আর্মি যুবা ও বয়স্ক লোকদের ধরে নিয়ে এখন আর গুলি করে মেরে ফেলছে না, তাদের শরীর থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত রক্ত বের করে নিয়ে তারপর লাশ ফেলে দিচ্ছে। এত রক্ত কেন দরকার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের যে যুদ্ধ হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে, তাতে প্রচুর সংখ্যায় পাকিস্তানি সৈন্য জখম হচ্ছে। তাদের চিকিৎসার জন্য প্রচুর রক্ত দরকার। এত রক্ত ব্লাড ব্যাঙ্কে নেই। তাই এভাবেই তারা রক্ত সংগ্রহ করছে।

প্রথম খবরটা কিভাবে বেরিয়েছিল? গুলি করে, ছুরি মেরে লাশ ফেললে বোঝা যায়, রক্ত বের করে নিয়ে লাশ ফেললে কিভাবে লোকে বুঝবে? শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, অথচ মৃত। প্রথমে লোকে বুঝে পায় নি কি করে মরল। দুএকজন ফেলে দেওয়া লোক মরে নি। তারা কোনমতে বেঁচে উঠে যখন এই খবর ছড়াল, তখন লোকে বুঝতে পারল কোনরকম আঘাতের চিহ্ন ছাড়াই মরে যাবার রহস্যটা কি।

সারা ঢাকা শহরে এখন ভয়ানক আতঙ্ক। অথচ কোন হাসপাতালের কোন ডাক্তার বলতে পারছে না কোথায় এসব কাণ্ড হচ্ছে। কারণ রক্ত বের করে নিতে হলে একটা টেবিল, একজন ডাক্তার বা কম্পাউন্ডার, রক্ত বের করার সিরিঞ্জ, রবারের নল, রক্ত ভরবার বোতল বা প্লাষ্টিক ব্যাগ–এসব দরকার। কোন হাসপাতালে এসব যত গোপনেই করা হোক, ব্যাপারটা জানাজানি হবেই। কোন হাসপাতালেই এসব হচ্ছে না, পরিচিত বহু ডাক্তার বলেছেন। তাহলে? পাকিস্তানিরা নিশ্চয় গোপন ক্লিনিক বসিয়ে ফেলেছে এসব কাজের জন্য। আমাদের জানাশোনা অনেক ডাক্তার ব্যাপারটা স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দিলেন। আমরাও তো তাই চাই। কিন্তু আতঙ্ক যে ছাড়ে না।

রঞ্জু একটা রক্ত হিম-করা খবর আনল। মহাখালি থেকে যে রাস্তাটা টঙ্গী জয়দেবপুরের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তার বাঁদিকে বেশ কতকগুলো দোকানপাট আছে। মাঝে-মাঝে সরু গলি চলে গেছে বাঁদিকে ভেতরে। সেদিকে বাড়িঘর-পাড়া আছে। অন্যদিকে তো গুলশান। এই রকম জায়গায় একটা ওষুধের দোকানে রঞ্জুর এক বন্ধু এল.এম.এফ ডাক্তার রোজ সন্ধ্যায় বসে, দুচারটে রুগী দেখে। কদিন আগে সন্ধ্যার পরে দুজন পাকিস্তানি সৈন্য আর দুজন বিহারি বন্দুকের মুখে ডাক্তারটিকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। ওরা প্রথমে ডাক্তারকে জিপে তুলে একটু এগিয়ে বাঁয়ে এক গলিতে ঢোকে, সেই সময় পেছন থেকে একজন ওর চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে দেয়। তারপর মিনিট দশেক চলার পর জীপ থামলে ডাক্তারকে লোকগুলো ধরে ধরে একটা বাড়ির ভেতর নিয়ে তারপর চোখ খুলে দেয়। ডাক্তার দেখে, একটা টিনের ছাদওয়ালা বেড়ার ঘর। একপাশে একটা সরু লম্বা টেবিল, সেটার মাথার কাছে আরেকটা চৌকো ঘোট টেবিলে অনেক কয়টা বোতল, সিরিঞ্জ, রবারের নল ইত্যাদি সাজানো। আরেক পাশে লম্বা বেঞ্চে চোখ বাঁধা অবস্থায় বসা তিনটে লোক। সশস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্য আর বিহারিদের নির্দেশে ডাক্তারটিকে ঐ লোক তিনটির শরীর থেকে রক্ত বের করতে হয়। রঞ্জুর বন্ধুটি কিন্তু এই রকম ভয়াবহ অবস্থাতেও বুদ্ধি হারায় নি। কাজ শেষে পাকিস্তানি সৈন্য আর বিহারিরা যখন তর্ক করছিল ডাক্তারটিকে মেরে ফেলা হবে কি না, তখন ডাক্তারটি ওদেরকে বলে : ওরা যখনই বলবে, সে এভাবে এসে ওদের কাজ করে দেবে। ডাক্তারটির কপাল ভালো ওরা তাকে বিশ্বাস করে। ছাড়া পাওয়া মাত্রই ডাক্তারটি ঊর্ধ্বশ্বাসে রঞ্জুর বাসায় এসে তাকে সব বলে সেই রাতেই পালিয়েছে বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাবার জন্য।

রঞ্জ চলে যাবার পরেও আমরা বহুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। অনেকক্ষণ পরে আমি বললাম, আমার ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। রঞ্জুর বন্ধু যে বানিয়ে বলে নি, তার প্রমাণ কি?

রুমী রেগে উঠল, আম্মা সবটাতেই তোমার অবিশ্বাস। সবকিছুতেই তোমার প্রমাণ চাই।

শরীফ ধীর গলায় বলল, বিশ্বাস হতে চায় না এই জন্যে যে এত সুপরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা মানুষের পক্ষে সম্ভব বলে ধরে নিতে কষ্ট হয়।

কেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলারের গেষ্টাপোবাহিনী কি করেছে কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে বন্দীদের ওপর, পড় নি? বাড়িতে কমপক্ষে দশটা বই রয়েছে এই বিষয়ে।

রুমীর মেজাজটা আজকাল খুব ভালো যাচ্ছে না। এখানো ও যুদ্ধে যেতে পারে নি। সঠিক যোগাযোগের লোক পাচ্ছে না। প্রায় প্রায় গজগজ করে, প্রথম চোটে আমার যে সব বন্ধুরা গেছে তাদের সঙ্গে গেলে কত সহজে বর্ডার ক্রস করতে পারতাম। তখন নিরাপদও ছিল। বর্ডার ঘেঁষে বহু জায়গা মুক্ত ছিল। এখন তো পাকিস্তানি সৈন্য বেশির ভাগ জায়গাই আবার দখল করে নিয়েছে। এখন যাতায়াতের রাস্তায় বিপদ অনেক বেড়ে গেছে।

আমি চুপ করে থাকি। এখন যেন মনে হয়, অনেক আগে যেতে দিলেই হতো। এই যে জলজ্যান্ত মানুষ ধরে নিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায়, সাবধানে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে সবটুকু রক্ত বের করে নিয়ে মেরে ফেলছে–এই রকম আতঙ্কময় রটনার মাঝে রুমীর মতো তাগড়া ছেলে নিয়ে বসবাস করতে দম আটকে আসে। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বিছানায় উঠে বসে থাকি।

২ মে রবিবার ১৯৭১

ধানমন্ডি ১৩ নম্বর রোডে মকু অর্থাৎ মাহবুবুল হক চৌধুরীর বাড়ি। ভিখু চৌধুরীর বড় ভাই। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রাক্তন ল সেক্রেটারি। ভিখুর বোন, মা ও মেয়েরা করটিয়া থেকে ফিরে এসেছে কয়েকদিন হল। দেখা করতে গেলাম ওদের সঙ্গে। বজ্রাহতের মতো বসে আছে সবাই। কেবল খালাম্মা অর্থাৎ ভিখুর মা কথা বলছেন, মাঝে-মাঝে কাঁদছেন। ভিখুর বোন বুলু অর্থাৎ মাসুদার স্বামী শরফুল আলম পোলান্ডে পাকিস্তান দূতাবাসে রয়েছেন। বুলু ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসে এই কাণ্ড। তার ডান কাঁধের নিচে গুলি লেগেছিল। ভিখুর মার মুখে পুরো ঘটনাটা শুনলাম।

ওদের বিরাট একটা দল ঢাকা থেকে গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। করটিয়ায় জাহাঙ্গীরের (ইঞ্জিনিয়ার নূরুর রহমানের ডাক নাম) ফুফার বাড়িতে আশ্রয় নেবার পর এই দুর্ঘটনা ঘটে। সকালবেলা নাশতা তৈরি হচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠে সবাই মুখ-হাত ধুচ্ছিল, এমন সময় পাক আর্মি এসে সে বাড়ি ঘেরাও করে গুলি চালাতে থাকে। ভিখুর মা ব্যাপার বুঝে ওঠার আগেই দেখেন গুলিবিদ্ধ ছেলে ও পুত্রবধূর দেহ বাড়ির পুকুরপাড়ে। মিলির পা দুটো পুকুরের পানিতে, মাথা পুকুরের পাড়ে। গুলি লাগে তার তলপেটে, বুলুর কাঁধের নিচে। জাহাঙ্গীরের ফুফা ঘরের মধ্যে ছিলেন, তিনি সেখানেই গুলি খেয়ে ঢলে পড়েন। গুলি খেয়ে ঢলে পড়ে জাহাঙ্গীর। আরো অনেকে মারা পড়ে, বাকিরা চিকার করে দৌড়ে পালাতে থাকে। আর্মি খানিকক্ষণ গুলি চালিয়ে মেরে-ধরে চলে যায়। ভিখুর মা তলপেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভিখুর মেয়ে দুটিকে খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে ইয়েন ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে চলে যাচ্ছে অন্য কতকগুলো লোকের পেছন পেছন। ভিখুর মা ঐরকম আহত অবস্থাতেই একহাতে তলপেট চেপে ধরে ছুটে গিয়ে অন্য হাতে নাতনীকে টেনে আনেন। মিলিটারি চলে যাবার পর সেই গ্রামের একটি সহৃদয় ছাত্র অনেক কষ্টে বুলু ও তার মাকে মির্জাপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ওরা প্রায় তিন সপ্তাহ থাকেন। তারপর আত্মীয়বন্ধুর সহায়তায় ঢাকা এসেছেন। বুলু ও তার মার দেহে তখনো গুলির টুকরো রয়ে গিয়েছিল, ধানমন্ডিতে ডাঃমনিরুজ্জামনের ক্লিনিকে খুব গোপনে, খুব সাবধানতার সঙ্গে এদের দুজনের শরীর থেকে গুলির টুকরো বের করা হয়েছে।

আমি সব শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে ভাবতে লাগলাম। সমস্ত দেশের ওপর কি মহা সর্বনাশের প্রলয় ঝড় নেমে এসেছে। ভিখু, মিলি, হামিদুল্লাহ, সিদ্দিকা, খোন্দকার সাত্তার, রঞ্জুর কলিগ, নুরুর রহমান কি এদের অপরাধ ছিল? শান্তিপ্রিয় নাগরিক, নিজের দেশকে ভালোবাসতো। ভিখু প্রেস চালিয়ে স্বাধীন ব্যবসা করে খেত, আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ছিল। এই তার এতবড় অপরাধ? হামিদুল্লাহ, শান্ত নিরীহ মানুষ, পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম এবং একমাত্র ষোলআনা বাঙালি মালিকানার ব্যাঙ্ক, ইস্টার্ন ব্যাঙ্কিং করপোরেশনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। এই অপরাধে তার এতবড় শাস্তি? নিষ্ঠুর হত্যাকারীদের গোলার আঘাতে একমাত্র সন্তানকে চোখের সামনে মরতে দেখল, ভয়ানক আহত বউও কয়েকদিন পরে তার কোলেই শেষ নিশ্বাস ফেলল। নূরুর রহমান ইঞ্জিনিয়ার–স্বাধীন ব্যবসা করে খেত, বিয়ে করেনি বলে কোন পিছুটান ছিল না। দেশের ও দশের উপকার করে বেড়াত। সেই অপরাধে তাকে প্রাণ দিতে হল?

৩ মে, সোমবার ১৯৭১

আজ আমার জন্মদিন।

২৯ মার্চ রুমীর জন্মদিনে তবু ভাবতে পেরেছিলাম কিছু স্পেশাল রান্না করা দরকার। কারণ তখনো ২৫ মার্চ কালরাত্রির আকস্মিকতার আঘাত মনকে পুরোপুরি ধরাশায়ী করতে পারে নি; কারণ তখনো এই নিষ্ঠুর মারণযজ্ঞের ব্যাপকতা বুঝে উঠতে পারি নি। তাই তখনো স্বাভাবিক চিন্তাধারা, গতানুগতিক মনমানসিকতা যেন একেবারে মরে যায় নি। কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞের পাঁচ সপ্তাহ পর এখন মনমানসিকতা, চিন্তাধারা কিছুই আর চিরাচরিত, গতানুগতিক খাতে বইছেনা। যে জীবন এতকাল যাপন করে এসেছি, তা বড়ই অর্থহীন মনে হচ্ছে। ভিখু, মিলি, সিদ্দিকা, নূরুর রহমানের অনর্থক হত্যা মনকে একেবারে অসাড় করে দিয়েছে।

তবু প্রতিবছরের অভ্যাসমততা, রুমী-জামী যখন আজ সকালে আমাদের ঘরের দরজার ওপাশ থেকে বলল, আম্মা আসি? তখন চোখ ভরা পানি নিয়ে বললাম, এসো।

ওরা প্রতিবছরের অভ্যাসমতই ঘরে ঢুকল, কিন্তু প্রতিবছরের মতো হাসিমুখে নয়, সুন্দর প্যাকেটে মোড়া হাতভর্তি সারপ্রাইজ প্রেজেন্ট নিয়েও নয়। ওদের মুখও মেঘাচ্ছন্ন, তবে তাতে পানি নেই, বজ্রের আভাস আছে–টের পেলাম। রুমীর হাতে একটা পুরনো বই, জামীর হাতে বাগান থেকে তোলা একটি আধা-ফোটা কালো গোলাপ যার নাম বনি প্রিন্স।

রুমী বইটা আমার হাতে দিয়ে বলল, আম্মা এই বইটা তুমি পড়লে মনে অনেক জোর পাবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুতে জার্মানি অতর্কিত আক্রমণ করে পোলান্ড দখল করে নেবার পর সেখানে পোলিশ ইহুদীদের ওপর নাৎসী বাহিনীর অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে পোলিশরা যে অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে তারই কাহিনী এটা। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কিভাবে তারা লড়াই করে গেছে, লড়াই করে মরেছে, তবু মাথা নোয়ায় নি, তারই কাহিনী এটা। এই বইটা পড়লে তোমার মনের সব ভয় চলে যাবে, সব দুঃখ তুচ্ছ হয়ে যাবে। জার্মানরা ইহুদীদের মানুষ বলে গণ্য করত না। পশ্চিম পাকিস্তানিরাও আমাদের মানুষ বলে গণ্য করে না, মুসলমান বলেও গণ্য করে না। অথচ ওদের চেয়ে আমরা বহুগুণে খাটি মুসলমান। পড়লে তুমি বুঝতে পারবে, এই বইতে যা লেখা আছে, দেশ আর জাতির নাম বদলে দিলে তা অবিকল বাংলাদেশ আর বাঙালির দুঃখের কাহিনী, প্রতিরোধের কাহিনী, বাঁচা-মরার লড়াইয়ের কাহিনী বলে মনে হবে।

চেয়ে দেখলাম লিয়ন উরিস-এর লেখা মাইলা-১৮। রুমীর নিজস্ব লাইব্রেরিতে এক্সোডাস-এর বিখ্যাত লেখক লিয়ন উরিস-এর সবগুলো বই-ই আছে। আগে দেখেছি, তবে পড়া হয়ে ওঠে নি।

জামী কালো গোলাপের আধফোটা কলিটি আমার হাতে দিল, রুমী বলল, আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। এই রকম রঙের রক্ত ঝরিয়ে তবে স্বাধীনতার রাজপুত্র আসবে।

বনি প্রিন্স-এর পাপড়িগুলো কালচে ঘন মেরুন রঙের, জমাট বাঁধা কালচে রক্তের মতো। এখনো পুরো ফোটে নি, মখমলের মতো মসৃণ, পুরু পাপড়িগুলো মুঠি বেঁধে আছে। আমাদের স্বাধীনতার এখনো অনেক দেরি।

রুমী বলল, তোমার জন্মদিনে একটি সুখবর দিই আম্মা। সে একটু থামল, আমি আগ্রহে তাকিয়ে রইলাম, আমার যাওয়া ঠিক হয়ে গেছে। ঠিকমত যোগাযোগ হয়েছে। তুমি যদি প্রথম দিকে অত বাধা না দিতে, তাহলে একমাস আগে চলে যেতে পারতাম।

আমি বললাম, তুই আমার ওপর রাগ করিস নে। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তুই হুজুগে পড়ে যেতে চাচ্ছিস, না, সত্যি সত্যি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যেতে চাচ্ছিস।

হুজুগে পড়ে? রুমীর ভুরু কুঁচকে গেল, বাঁচা-মরার লড়াই, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে যেতে চাওয়া হুজুগ?

না, না, তা বলি নি। ভুল বুঝিস নে। বন্ধুরা সবাই যাচ্ছে বলেই যেতে চাচ্ছিস কি না, যুদ্ধক্ষেত্রের কষ্ট ও ভয়াবহ অবস্থা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করতে পেরেছিস কি না সেসব যাচাই করবার জন্যই তোকে নানাভাবে বাধা দিচ্ছিলাম। তুই-ই তো বলেছিস, তোর কোন কোন বন্ধু যুদ্ধের কষ্ট সইতে না পেরে পালিয়ে এসেছে।

তা এসেছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম। কোটিতে দুজনার বেশি হবে না।

কবে যাবি? কাদের সঙ্গে?

তিন-চারদিনের মধ্যেই। কাদের সঙ্গে নাম জানতে চেও না, বলা নিষেধ।

লোহার সাঁড়াশি দিয়ে কেউ যেন পাঁজরের সবগুলো হাড় ছেপে ধরেছে। নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে, চোখের বাইরে, নিঃশর্তভাবে ছেড়ে দিতে হবে। জানতে চাওয়াও চলবে না–কোন পথে যাবে, কাদের সঙ্গে যাবে। রুমী এখন তার নিজের জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তার একান্ত নিজস্ব ভুবন, সেখানে তার জন্মদাত্রীরও প্রবেশাধিকার নেই।

মনে পড়ল, খালীল জিবরান তাঁর প্রফেট বইতে এদের সম্পর্কেই লিখে গেছেন:

তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের নয়,
… …. …. …. …. ….
তারা জীবনের সন্তানসন্ততি
জীবনের জন্যই তাদের আকুতি।
তারা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছে।
তবু তারা তোমাদের নয়।
তারা তোমাদের ভালোবাসা নিয়েছে
কিন্তু নেয় নি তোমাদের ধ্যান-ধারণা,
কেননা তারা গড়ে নিয়েছে
তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা।
তাদের শরীর তোমাদের আয়ত্তের ভেতর
কিন্তু তাদের আত্মা কখনই নয়
 কেননা, তাদের আত্মা বাস করে
ভবিষ্যতের ঘরে,
যে ঘরে তোমরা কখনই পারবে না যেতে
এমনকি তোমাদের স্বপ্নেও না।
… … …. ….. …..
তাদেরকে চেয়ো না তোমাদের মত করতে
কারণ তাদের জীবন কখনই ফিরবে না
পেছনের পানে।

৪ মে, মঙ্গলবার ১৯৭১

সামরিক সরকার নিজেদের অপকর্ম ঢেকে দেশের সবকিছু স্বাভাবিক দেখাবার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠে-পড়ে লেগেছে। আজকের কাগজে একটা হাস্যকর খবর ছাপা হয়েছে। কবি সুফিয়া কামালের ছবিসহ। এক রেডিও কথিকায় পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট কবি ও সমাজকর্মী বেগম সুফিয়া কামাল বলেছেনযারা তাকে ভালোবাসেন তারা জেনে সুখী হবেন যে তিনি ভালোই আছেন এবং সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ছবিটাতে দেখা যাচ্ছে অতিশয় বিষবদন কবির সামনে রেডিওরমাইক ধরে আছে একটি অদৃশ্য হাত। মাইকটাকে মনে হচ্ছে যেন উদ্যত সঙ্গীন।

ভারতীয় বেতার তার মৃত্যুর খবর বের করেছিল, সেই প্রেক্ষিতে তাঁর এই ফটো তোলা হয়েছে। কবির মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে তার পিছে যেন বেয়নেট ঠেকানো রয়েছে। কাগজে আরো ফলাও করে বেরিয়েছে :

গতকাল বাংলা একাডেমির ডিরেক্টর কবীর চৌধুরী ঢাকা রেডিও থেকে মুনশি মেহেরুল্লাহ সম্পর্কে এক কথিকা প্রচার করেন।

সম্প্রতি কতিপয় মার্কিন সংবাদপত্রে একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনাব কবীর চৌধুরীর পরিবারবর্গকে সাহায্যের জন্য আবেদন ছাপিয়ে, তিনি সাম্প্রতিক গোলযোগে মারা গেছেন–একথা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়।

গত পরশুর কাগজেও ঠিক এই একই ধরনের খবর ছাপা হয়েছে : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যক্ষ ডঃ মফিজুল্লাহ কবির ১ মে শনিবার ঢাকা টিভিতে মুসলিম বাংলার দুজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী হাজি শরিয়তউল্লাহ ও দুদু মিয়ার জীবন ও অবদানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইতিহাস বিভাগের রিডার ডঃ মোহর আলী।

ডঃ কবীর সাম্প্রতিক গোলযোগে মারা গেছেন–এই গুজবের অবসানকল্পে তাঁকে। টিভিতে হাজির করা হয়েছে।

আমাদের মত অখ্যাত রেডিও টকার ছাড়াও ওরা এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত বিখ্যাত লোকদের ধরে ধরে রেডিও-টিভিতে হাজির করে সবাইকে জানাতে চাচ্ছে–ওঁরা সামরিক জান্তার হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় নি। খুব ভালো কথা। তা সামরিক জান্তা দর্শন বিভাগের অধ্যক্ষ ডঃ জি. সি. দেব, জগন্নাথ হলের প্রভোষ্ট ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, স্ট্যাটিস্টিক্স বিভাগের অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান, ভূতত্ত্ব বিভাগের সিনিয়র লেকচারার জনাব মুকতাদির, সয়েল সায়েন্সের সিনিয়র লেকচারার ডঃ এফ. আর, খান, গণিত বিভাগের লেকচারার জনাব শরাফত আলী, ফিজিক্স-এর জনাব খাদেম, অ্যাপ্লয়েড ফিজিকসের মিঃ ভট্টাচার্য, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের মিঃ সাদেক ও ডঃ সাদত আলী–এদেরকেও একে একে এনে রেডিও-টিভিতে হাজির করুক না। বলুক না সারা দুনিয়ার লোককে–এঁদেরকে ওরা ২৫ মার্চের কালরাত্রে গুলি করে মেরে ফেলে নি।

৫ মে, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

রুমী আগামীকাল রওনা হবে। ওর প্যান্টের কোমরের কাছে ভেতর দিকের মুড়ির সেলাই খুলে সেখানে কয়েকটা একশো টাকার নোট লম্বালম্বি ভাঁজ করে রেখে আবার মুড়ি সেলাই করে দিলাম। পকেট ওয়ালেটে শদুয়েকের বেশি রাখবে না, কারণ পথে খানসেনারা হাতিয়ে নিতে পারে।

কাপড়-জামা রাখার জন্য রুমী সঙ্গে নিচ্ছে একটা ছোট আকারের এয়ারব্যাগ। তাতে দুসেট কাটাকাপড়, তোয়ালে, সাবান, স্যান্ডেল আর দুটোবই–জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা ও সুকান্ত সমগ্র

যে বন্ধু দুজনের সঙ্গে যাবে, তাদের নাম অবশেষে বলেছে রুমী–মধু আর শিরাত। সেই সঙ্গে এটাও বলেছে যে, নাম দুটো কাল্পনিক।

রাতে শোবার সময় রুমী বলল, আম্মা আজকে একটু বেশি সময় মাথা বিলি করে দিতে হবে কিন্তু।

জামী বলল, মা, আজ আর আমার মাথা বিলি করার দরকার নেই। ওই সময়টাও তুমি ভাইয়াকেই দাও।

ছোট বয়স থেকে ঘুমোবার সময় দুভাইয়ের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে হয়। মাঝে-মাঝে এনিয়ে দুভাইয়ে ঝগড়াঝাটিওবাধে। রুমী বলে আম্মা তুমি জামীর কাছে

বেশিক্ষণ থাকচ্ছ। জামী বলল, মা তুমি ভাইয়ার মাথা বেশি সময় বিলি দিচ্ছ।

আমি রুমীর মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলাম, রুমী একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি গানটার সুরে আস্তে আস্তে শিস দিতে লাগল।

৭ মে, শুক্রবার ১৯৭১

সকালে নাশতা খাওয়ার সময় রুমী বলল, আম্মা, আমাকে সেক্রেটারিয়েট সেকেন্ড গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে। জামী, তুই এয়ারব্যাগটা আগেই গাড়িতে রেখে আয়। পায়ের কাছে রাখবি, যেন দেখা না যায়।

নাশতা খেয়ে রুমী তার দাদার পাশে বসে তার হাতটা ধরল। বাবা চোখে দেখেন, তাই যে-ই আসুক, আগে তার হাত ধরে। হাত ধরতেই বাবা আস্তে বললেন, কে?

আমি রুমী, দাদা।

খানিক একথা সেকথার পর রুমী বলল, দাদা, আমি দিনকতকের জন্য বাইরে যাচ্ছি-এককারসনে।

একসকারসনে? কি–তোমাদের কলেজ থেকে?

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তো বন্ধ। ঠিককলেজ থেকে নয়; তবে কলেজেরই কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মানে, বাড়ি বসে বসে একেবারে ঘেঁতিয়ে গেছি–কোন কাজকর্ম তো নেই, তাই–

বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তারপর তার স্বভাবসিদ্ধ মৃদু গলায় থেমে থেমে। বললেন, এক্সকারসন খুব ভালো জিনিস। আমাদের সময়ও হত; তবে ছুটির সময়। তা সাবধানে থেক, এখন তো সব জায়গায় খুব গোলমাল শুনি।

দাদা, গোলমাল আর নেই। সব জায়গা এখন তো শান্ত—

শান্ত? জামীদের স্কুল তাহলে এখনও বন্ধ কেন? তোমার কলেজ খোলে না কেন?

বাবাকে নিয়ে এই এক সমস্যা। চোখে না দেখলে কি হবে, চিন্তা ও ধারণাশক্তি। এখনও টনটনে। সবকিছু জানতে চান, একটু কোথাও উনিশ-বিশ হলেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ব্লাড প্রেসার ধাই করে চড়ে যায়। সেই জন্য ওঁকে সবকিছুর খবর বেশ ভালোমত সেন্সসার করে বলতে হয়। তবে বাবার একটা পরিমিতিবোধ জন্মে গেছে। আগে যেমন অনেক ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করতেন, এখন আর তা করেন না। সবই মেনে নেন।

কদিন থেকেই মাঝে-মাঝে বিকেলে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। লেট কালবৈশাখী। আজ আবার সকাল থেকেই আকাশে মেঘ। ইয়া আল্লা, আজ যেন ঝড়বৃষ্টি না আসে।

জামীকে পাশে বসিয়ে আমি স্টিয়ারিং হুইল ধরলাম। ড্রাইভারকে গতকালই বলে দেওয়া হয়েছে, আজ তাকেলাগবেনা। পেছনে শরীফ আর রুমীবসল। শরীফের হাতে খবরের কাগজ। খুলে পড়ার ভান করছে।

রুমী বলল, সেকেন্ড গেটের সামনে আমি নেমে যাওয়া মাত্র তোমরা চলে যাবে। পেছন ফিরে তাকাবে না।

তাই করলাম। ইগলু আইসক্রিমের দোকানের সামনে গাড়ি থামালাম। রুমী আধাভর্তি পাতলা ছোট এয়ারব্যাগটা কাঁধে ফেলে নেমে সামনের দিকে হেঁটে চলে গেল। যেন একটাকলেজের ছেলে বইখাতানিয়ে পড়তে যাচ্ছে। আমি হু করে এগিয়ে যেতে যেতে রিয়ারভিউ-এর আয়নায় চোখ রেখে রুমীকে এক নজর দেখার চেষ্টা করলাম। দেখতে পেলাম না, সে ফুটপাতের চলমান জনস্রোতের মধ্যে মিশে গেছে।

৯ মে, রবিবার ১৯৭১

একটা লোহার সাঁড়াশি যেন পাঁজরের দুই পাশ চেপে ধরে আছে। মাঝে-মাঝে নিঃশ্বাস আটকে আসে। মাঝে-মাঝে চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। মাঝে-মাঝে সব কাজ ফেলে ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মাছের মাকে নাকি শোক করতে নেই। চোরের মাকে নাকি ডাগর গলায় কথা বলতে হয়। রুমী যাবার পর উঁচু ভমে ক্যাসেট বাজানো হয় প্রায় সারাদিনই। সন্ধ্যে হলেই সারা বাড়িতে সব ঘরে বাতি জ্বেলে জোরে টিভি ছেড়ে রাখা হয়। অর্থাৎ বাড়িতে বেশ একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ। বেশ গান বাজনা, হৈচৈ, কলকোলাহল। আশেপাশে কোন বাড়ির কেউ যেন সন্দেহ না করে যে এ বাড়ির লোকগুলোর বুক খাখা করছে, ব্যথায় কলজেয় টান ধরছে।

আকাশের বুকেও অনেক ব্যাথা। তার কিন্তু আমার মতো চেপে রাখার দায় নেই। তাই সেও কদিন থেকে মাঝে-মাঝে অঝোরে ঝরাচ্ছে। না জানি রুমীদের কি কষ্ট হচ্ছে এই বৃষ্টিতে। জামীও আবদার ধরেছিল সে রুমীর সঙ্গে যাবে। তাকে অনেক করে বুঝিয়েছি, দুভাই একসঙ্গে গেলে পাড়ার লোকে সন্দেহ করবে। সবচেয়ে বড় কথা বাবাকে কি কৈফিয়ত দেব? ওঁকে তো কিছুতেই বলা চলবে না মুক্তিযুদ্ধের কথা। তাহলে উদ্বেগে, উত্তেজনায় ব্লাড প্রেসার বেড়ে স্ট্রোক হয়ে যাবে। তাছাড়া আমিই বা থাকব কি করে?

কাল সারারাত ঘুম হয় নি। সারারাত জোরে জোরে মাইকে হামদ, নাত, দরুদ, মিলাদ, মওলানা সাহেবদের ওয়াজ-নসিহত এসব শোনা গেছে। এ বছর ঈদ-ই মিলাদুন্নবী অনেক বেশি শান-শওকত ধুম-ধড়াক্কার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। চার-পাঁচদিন আগে থেকে খবরের কাগজ, রেডিও-টিভিতে ঢোল-শোহরতের কি ঘটা! ইসলামকে পুরো গলা কেটে জবাই করে এখন তাকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা!

সকালে উঠে চোখ করকর করছিল, শরীরও ম্যাজম্যাজ। ভাবলাম গোসল করলে ঝরঝরে লাগবে। গোসল করে নাশতা খেয়েও স্বস্তি লাগছে না। শরীফ বলল, বিষ্টি নেই, চল লিলিবুদের বাড়ি যাই। ওখান থেকে নারিন্দা।

কোথাও বেরোতে ইচ্ছে করে না, আবার ঘরে বসে থাকলেও ফাপর লাগে। তাই জোর করেই বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক আছে, সব আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেই বেড়াব আজ। লিলিবুদের বাসায় খানিক বসে লিলিবু ও একরাম ভাইকে সঙ্গে নিয়ে নারিন্দায় গেলাম আতাভাইদের বাসায়। ওখান থেকে কাছেই নওয়াব স্ট্রিটে খোকাদের বাসায়। গিয়ে দেখি খোকার বোন আনা তার স্বামী পুত্র শাশুড়িসহ এ বাড়িতে। আমাদের বাড়িও কাছেই ক্যাপ্টেন বাজারে। ওদের বাড়ির পেছনে বিহারিদের বস্তি। সামনে রেললাইন পেরিয়ে আওয়ামী লীগের অফিস। ২৫ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগের অফিস আগুনে পোড়ানো হয়। ২৭ তারিখ সকালে কারফিউ উঠলে আনারা ভাইয়ের বাসায় চলে আসে। খোকা ও আনার বড় বোন মীরা আমার চাচাত দেবর আনুর স্ত্রী। আনু ও মীরা এখন করাচিতে রয়েছে। ওদের জন্যেও খোকারা সবাই খুব উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে খোকার আম্মা। খানিকক্ষণ পরস্পরের জানা খবর বিনিময় করে আমরা উঠলাম। ফেরার পথে একরাম ভাই বললেন, মকু মিয়ার বাড়ি চল ক্যানে একবার? ভিখুর ছেলেমেয়েরা, মা, বোন সবাই ফিরেছে শুনলাম। দেখে আসি।

আমি বললাম, ভিখুর ছেলে রুবেল ফেরে নি। ও নাকি আগেই রাজশাহী দিয়ে ইন্ডিয়া চলে গেছে। ভিখুর দুই মেয়ে লীরা, ইয়েন মকু মিয়ার বাড়িতে আছে। বুলু, তার মাও আছেন।

মকু চৌধুরী বাড়ি গিয়ে বুলুর দেখা পেলাম না: ও আজ ভোরের প্লেনে পোলান্ডের পথে করাচি রওনা হয়ে গেছে। তবে আরো অনেক আত্মীস্বজনের সঙ্গে দেখা হলো–তনজিম, তার বউ ডলি, বুলুর ছোট বোন গুলু অর্থাৎ মওদুদা। তনজিম, ডলি, গুলুর মুখেও খানসেনাদের বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন রকমের নিষ্ঠুরতার কাহিনী শুনলাম। এ ছাড়া অন্য কোন কথা নেই কারো মুখে। কানু ছাড়া গীত নেই।

বাসায় ফিরে ঘরে পা দিয়েই চমকে গেলাম। বসার ঘরে সোফায় বসে এক রোগাপাতলা লোক, চুলদাড়ি সব সাদা, গর্তে ঢোকা চোখ, কপালে গভীর ভাঁজ। চিনতে না পেরে তাকিয়ে রইলাম। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সালাম আলায়কুম, আমি রসুল। চিনতে পারেন নি, না?

লজ্জিত হেসে বললাম, ওয়ালায়কুম সালাম। কি করে চিনব! এত রোগা হয়ে গেছেন! চুলদাড়ি সাদা হলো কি করে? বসুন।

রসুল সাহেব আমার এক ছাত্রীর স্বামী। ছাত্রী মানে সেই ১৯৫২ সালে আমি যখন প্রথম সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে চাকরি করতে যাই, সেই বছরের ক্লাস টেনের ছাত্রী। মাত্র বছরখানেক পেয়েছিলাম তাকে, তাতেই পরবর্তী সময়ে যখনই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, আমাদের বড় আপা বলে উচ্ছসিত হয়েছে। বিয়ের পরে স্বামীকে সঙ্গে এনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। রসুল সাহেব সরকারি চাকুরে। বদলির চাকরি। বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়ান। যখনি ঢাকা আসেন, একবার আমাদের বাসায় আসবেনই। ধর্মভীরু পরহেজগার মানুষ। কালো চাপদাড়ি, মাথায় কালো জিন্না টুপি–এইভাবে তাকে দেখে আসছি গত পনের-ষোল বছর ধরে। সেই মানুষের একি চেহারা হয়েছে!

আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, বয়েস হচ্ছে, একটু-আধটু পাক ধরেছিল আগেই, কিন্তু গত দেড় মাসে হঠাৎসব সাদা হয়ে গেল ভয়ে, দুর্ভাবনায়, ছুটোছুটিতে।

আমি বারেককে চার কথা বলে এসে বললাম, বলুন তো কি ব্যাপার? এবার প্রায় চার বছর পর এলেন। কোথায় পোস্টেড ছিলেন? কিভাবে কাটালেন এই দেড় মাস?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি হয়েছিলাম মাত্রছমাস আগে। ভালোই ছিলাম।ক্র্যাকডাউনের পরেও ওখানেই ছিলাম। প্রথম কিছুদিন এলাকাটা জয় বাংলার দখলেই ছিল। তারপর যখন প্লেন থেকে বোমা ফেলা শুরু হলো, তখন জানের ভয়ে সব ফেলে বউ ছেলেমেয়ের হাত ধরেগ্রামের দিকে পালিয়েছিলাম। সে যে কি কষ্ট। কোন একটা গ্রামে থিতু হয়ে থাকতে পারি নি। আমার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। এদিকের কোন গ্রামে কোন আত্মীয়স্বজন, চেনাজানা কেউ নেই। কিন্তু গ্রামের লোকেরা এত ভালো ব্যবহার করেছিল যে কি বলব। খেতে দিয়েছে, শুতে দিয়েছে। কিন্তু হলে কি হবে, পাকিস্তান আর্মি যেভাবে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছিল, তাতে ওরা নিজেরাই একগ্রাম ছেড়ে আরেক গ্রামে দৌড়াচ্ছিল, সেই সাথে আমরাও।

শরীফ জিগ্যেস করল, আচ্ছা, কোন সময় বম্বিং করে, মনে আছে?

মার্চের শেষে হবে। তারিখ ঠিক মনে নেই।

শরীফ বলল, ওই সময় আমরা প্রায় প্রায়ই দেখতাম বম্বার প্লেনগুলো এদিক-ওদিক উড়ে যাচ্ছে। ঘরে বসে বুঝতে পারতাম না, কিন্তু সন্দেহ করতাম–যেসব এলাকা তখনো জয়বাংলার দখলে রয়েছে, সেইসব এলাকায় বোমা ফেলতে যাচ্ছে। আচ্ছা, আপনি কি বলতে পারবেন ওই অঞ্চলে কি রকম যুদ্ধ হয়েছিল?

রসুল মাথা নেড়ে বলল, না। আমাদের বাড়িটা যে পাড়ায় ছিল, সেখানে বোমা পড়ে নি, তবে কাছেই বোমা পড়েছে, বিকট শব্দ, লোকজনের চিৎকার শুনেছি, আগুন দেখেছি। আর তখুনি একবস্ত্রে ছুটে পালিয়েছি পাশের এক গ্রামে। কিন্তু সেখানে একরাত থাকার পরই শুনলাম মিলিটারি আসছে। যাদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলাম তারাসুদ্ধ পালালাম। দুদিন পরে ফিরে এসে দেখি–পুরো গ্রাম আগুনে পুড়ে ছাই। বহুলোক–যারা পালাতে পারে নি মরে পড়ে আছে। গরু, ছাগল মরে ফুলে ঢোল হয়ে আছে। দুর্গন্ধে টেকা যায় না। সে যে কি বীভৎস দৃশ্য।

রসুল সাহেব দম নেবার জন্য থামতেই আমি বলে উঠলাম, তারপর কি আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে এলেন?

না, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর তার আশপাশে তখনো প্রায় রোজই বম্বিং হচ্ছিল। আমরা অন্যদিক দিয়ে অন্য একটা গ্রামে চলে গেলাম। সেখানেও শান্তি নেই। মিলিটারির তাড়া।

আপনার ফ্যামিলি কোথায়?

অনেক কষ্টে সবসুদ্ধ ঢাকায় এসে পৌঁছেছি। ভূতের গলিতে আমার এক আত্মীয় আছেন, তাঁর বাড়িতে উঠেছি। গ্রামে দৌড়ে পালাতে গিয়ে সালেহার পায়ের তলায় হাড়ের টুকরো ফুটেছিল। প্রথমে কেউ খেয়াল করি নি, একটু আধটু ব্যথা করত। খেয়াল করব কি করে? সে সময়টুকু ছিল নাকি? একটু চুন-হলুদ দিয়ে বেঁধে রাখলেই ভালো হয়ে যেত, সেটাই বা কে করে! এখন ফুলে-পেকে যা-তা অবস্থা হয়েছে।

আমি ব্যস্ত হয়ে উঠলাম, কি সর্বনাশ। ডাক্তার দেখিয়েছেন?

সেই জন্যই আপনার কাছে এসেছি। সালেহা বলল বড় আপার কাছে যাও। উনার সঙ্গে অনেক ডাক্তারের চেনাজানা আছে।

আমাদের পাড়াতেই ভালো সার্জন আছেন। মেইন রোড ধরে পুবদিকে খানিক গেলেই পলি ক্লিনিক, ওখানে ডাঃ আজিজ আমার চেনা, খুব ভালো সার্জন।

তখুনি ফোনে আজিজের সাথে কথা বলে রসুলকে বললাম, আজিজ ক্লিনিকেই আছে। এক্ষুণি পেসেন্টকে নিয়ে যেতে বলল। আপনি সালেহাকে নিয়ে যান। আমি আধঘন্টা পরে ক্লিনিকে যাচ্ছি। এখন যাবার সময় ডানদিকে তাকাতে তাকাতে যাবেন, পলি ক্লিনিকের সাইনবোর্ড চোখে পড়বে।

আধঘন্টা পরে পলি ক্লিনিকে গিয়ে দেখি রসুলরা তখনো এসে পৌঁছায় নি। ডাঃ আজিজের স্ত্রী সুলতানাও ডাক্তার। পাশাপাশি দুটো বাড়ি ভাড়া নিয়ে ওরা এই ক্লিনিক করেছে। একটা বাড়ির নিচে এমার্জেন্সি, অপারেশন থিয়েটার, দোতলায় রুগীদের কেবিন। পাশের বাড়ির দোতলায় ওরা নিজেরা থাকে, নিচে রুগীর কেবিন।

সুলতানা-আজিজ দুজনেই খুব হাসিখুশি, সবসময় চারপাশটা মাতিয়ে রাখতে পারে। ক্র্যাকডাউনের পর কয়েকটা দিন স্তম্ভিত, হতবাক হয়েছিল। মাঝখানে বেশ কয়েকদিন দেখা হয় নি। আজ দেখলাম, আগের মতই। বললাম, কি খুব যে হাসিখুশি মনে হচ্ছে।

সুলতানা হিহি করে হেসে বলল, হ্যাঁ বুবু, প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠেছি। আমরা ডাক্তার তো, গোলায় নিজের পা উড়ে গেলেও যদি হাত দুটো ঠিক থাকে, তাহলে ওই অবস্থাতেই আরেকজনের ট্রিটমেন্ট করতে হয়। আর এখন তো ক্যাজুয়ালটির সংখ্যা অনেক বেশি, গোপনে ট্রিটমেন্ট করার টেনসানও বেশি, তাই চাঙ্গা থাকার জন্যই হাসতে হয়।

সুলতানা অবশ্য এমনিতেই হাসে বেশি। সেজন্য ওকে আমরা আদর করে পাগলি বলি। সে আমার হাত ধরে পাশের বাড়িটায় নিয়ে গেল। এটার দোতলায় ওরা থাকে। গেটটা এক পাশে। গেট বরাবর পোর্চ পেরিয়ে সোজা এগিয়ে গ্যারেজ–পাশের ও পেছনের বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে। সুলতানা নিজের হাতে গ্যারেজের দরজা খুলে দিতেই দেখা গেল ভেতরে একটা গাড়ি। গাড়ির পাশ দিয়ে পেছনে নিয়ে গেল আমায়। দেখলাম মেঝের কাছাকাছি দেয়াল ভেঙে একহাত বাই দেড় হাত একটা ফোকর। বাড়ির দিকে গ্যারেজের যে দেয়াল, তাতে একহাত চওড়া একটা কাঠের দরজা। অর্থাৎ মেইন বাড়ির যে খিড়কি দরজাটা এ পাশে আছে, সেটা দিয়ে বেরিয়ে এই ছোটদরজাটা দিয়ে গ্যারেজে ঢুকে ওই ফোকর দিয়ে পালিয়ে যাওয়া খুবই সহজ। বাড়ির সামনে মেইন গেটের কাছে দাড়ানো লোকন মোটেই টের পাবে না।

বুঝলেন বুবু, এ গাড়িটা নষ্ট। কখনো বের করা হয় না। তারপরই আবার হিহি হাসি–আর বের করলেইতো বিপদ। ফোকরটা দেখা যাবে যে!

আজিজ ধমক দিল, এত কথা বল কেন? সুলতানা আগের মতই হাসতে হাসতে আমার হাত ধরে আবার মেইন ক্লিনিকে চলল।

একটু পরেই সালেহাকে নিয়ে রসুল পৌঁছে গেল। আমাকে দেখে সালেহা কান্নায় ভেঙে পড়ল, বড় আপা গো, আমাদের সব গেছে। ফকির হয়ে গেছি। মরে গেছি একেবারে।

সুলতানা হৈ-হৈ করে উঠল, আরে আরে! কাঁদে কেন? কান্নার কি হয়েছে? হাসুন, হাসুন, হাসলে আদ্দেক অসুখ সেরে যাবে। আসুন আগে একজামিন করি। দেখি কত তাড়াতাড়ি সারানো যায় আপনাকে।

সালেহাকে ভর্তি করতে হলো ক্লিনিকে। ওকে বেডে শুইয়ে ওর পাশে বসে রইলাম, রসুল আবার বাসায় গেল সালেহার কয়েকটা জিনিসপত্র আনতে। সালেহা আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, বড় আপা, খানসেনারা কি মানুষ নয়? ওরা কি মুসলমান নয়? হিন্দু খুঁজে খুঁজে মেরেছে তো বটেই, কলমা জানা মুসলমানকে পর্যন্ত ওরা কাফের মনে করে মেরেছে। বড় আপা, বাড়িঘর, জিনিসপত্র, সব ফেলে পালিয়ে এসেছি। পা পচে গেছে। আমি আর বাচবনা। বড় আপা, আমি মরে গেলে কে আমার বাচ্চাগুলোকে দেখবে?

রুবেল, লীরা, ইয়েনের কথা মনে হয়ে আমার বুকে কান্না উথলে উঠল। বললাম, সালেহা আল্লার কাছে হাজার শুকুর কর তোমার পরিবারের সবাই বেঁচে আছে। তোমাদের কারো গায়ে আর্মির গুলি লাগে নি। তুমি খুব ভাগ্যবতী, তাই তোমার পায়ে হাড় বিঁধেছে, আর্মির গুলি বেঁধে নি। সামান্য একটু অপারেশন করে তোমার পা ভালো হয়ে যাবে দুচারদিনে। জিনিসপত্র গেছে, তার জন্য এত শোক কেন? জিনিসপত্র, টাকাপয়সা আবার হবে। জান যদি চলে যেত। তাহলে আর কি জান ফিরে পেতে?

ওকে ভিখু, মিলি ও তাদের তিনটি নাবালক বাচ্চার কথা বললাম। শুনে সালেহা আরেক দফা কাঁদল, তারপর বলল, না বড় আপা আমার আর কোন দুঃখ নেই।

১০ মে, সোমবার ১৯৭১

বেশ কিছুদিন বাগানের দিকে নজর দেওয়া হয় নি। আজ সকালে নাশতা খাবার পর তাই বাগানে গেলাম। বাগানে বেশ কটা হাইব্রিড টি-রোজের গাছ আছে। এই ধরনের গোলাপ গাছের খুব বেশি যত্ন করতে হয় যা গত দুমাসে হয়নি। খুরপি হাতে কাজে লাগার আগে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম। মাখনের মতো রঙের পিস অর্থাৎ শান্তি। কালচে-মেরুন বনি প্রিন্স আর এনা হার্কনেস। ফিকে ও গাঢ় বেগুনি রঙের সিমোন আর ল্যাভেন্ডার। হলুদ বুকানিয়ার, সাদা পাস্কালি।

বনি প্রিন্স-এর আধফোটা কলিটি এখনো আমার বেড-সাইড টেবিলে কলিদানিতে রয়েছে। কলি অবশ্য আর নেই, ফুটে গেছে এবং প্রায় ঝরে পড়ার অবস্থা। পিস-এর গাছটায় একটা কলি কেবল এসেছে–যদিও সারাদেশ থেকে পিস উধাও।

বাগান করা একটা নেশা। এ নেশায় দুঃখ-কষ্ট খানিকক্ষণ ভুলে থাকা যায়। গত কয়েক মাস ধরে নেশাটার কথা ভাববারই অবকাশ পাই নি। এখন ভয়ানক বিক্ষিপ্ত মনকে ব্যস্ত রাখার গরজেই বোধ করি নেশাটার কথা আমার মনে পড়েছে।

১১ মে, মঙ্গলবার ১৯৭১

দুপুরে ভাত খেতে বসেছি, হঠাৎ জোরে কলিংবেল বাজল। বাজল তো বাজল আর থামে না। কে রে কলিংবেলে আঙুল চেপে দাঁড়িয়ে আছে? আমি রেগে হাঁক দিলাম, এ্যাই বারেক, দেখ ত কোন বেয়াদব এরকম বেল টিপে ধরে রেখেছে।

বারেক দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকল রুমী! চমকে দেবার দুষ্টু চাপা হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত। আমি খুশিতে চেচিয়ে উঠলাম, রুমী তুই?

রুমী কাধের ব্যাগটা নামিয়ে টেবিলে বসল, হ্যাঁ আম্মা, ফিরে আসতে হলো।

বারেক ইতোমধ্যেই একটা প্লেট এনে রুমীর সামনে রেখেছে, তাকে বলতেও হয় নি। রুমী প্লেটে ভাত তুলতে তুলতে বারেকের দিকে তাকিয়ে বলল, বারেক রান্নাঘর থেকে দুটোশুকনো মরিচ পুড়িয়ে আনতে। দেখবি বেশি পুড়ে যায় না যেন। সাবধানে অল্প আঁচে সেঁকবি আস্তে আস্তে বুঝলি?

বারেক চলে গেলে রুমী নিচু গলায় বলল, আমাদের যে রাস্তা দিয়ে যাবার কথা ছিল, সেখানে ঘাপলা হয়েছে। আমার কনট্যাকট অন্য রাস্তা জানে না। তাই কটা দিন অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।

রুমীর মুখে হাসি নেই, কিন্তু আমার হাসি আর ধরে না।

খাওয়ার পর সবাই বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুনলাম রুমীদের যেতে না পারার কাহিনী। মবু আর শিরাতের আসল নামও রুমী আজ বলতে আপত্তি করল না। মধু অর্থাৎ মনিরুল আলম, সংক্ষেপে মনু আর ইশরাক। ইশরাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সের ছাত্র, মনু এম.এর। দুজনেই বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মনু আবার গানও গায়।

মনু-ইশরাকের দলে রুমী ছাড়াও ছিলেন কামাল লোহানী, প্রতাপ হাজরা, বাফার কিছু হিন্দু কর্মচারী ও শিল্পী তাঁদের পরিবার-পরিজন, আর একজন আহত হাবিলদার। রুমীরা সদরঘাট দিয়ে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে প্রায় সাত-আট মাইল পথ হেঁটে যায়। আহত হাবিলদারটিকে প্রায় চ্যাংদোলা করে নিতে হয়েছিল। কিছুদূর এগিয়ে তাকে তার জানা এক গ্রামে পৌঁছে দেয়। বিকেলের দিকে ঝড়বৃষ্টি হয়, ফলে গ্রামের কাঁচা রাস্তা কাদায় প্যাচপেচে হয়ে যায়। এই ভাবে অনেক কষ্টে ওরা ধলেশ্বরীর পাড়ে পৌঁছায়। ধলেশ্বরী পার হয়েই সৈয়দপুর। সেখান থেকে আট মাইল দূরে শ্রীনগর। শ্রীনগর থানা তখনো মুক্তাঞ্চল। সেখানে প্রতিদিন ঢাকা থেকে বহুলোকে পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটে যাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। মনুরা স্পীডবোটে করে সৈয়দপুর থেকে শ্রীনগর পৌঁছায় সন্ধ্যারাতে। ওখান থেকে আধমাইল দূরে নাগরভাগ গ্রামে ডাঃ সুকুমার বর্ধনের বাড়ি। রুমীদের দল সে রাতটা ডাঃ বর্ধনের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরদিন যাত্রার তোড়জোড় শুরু হয়। শ্রীনগর থেকেই নৌকা ভাড়া করে বর্ডারের উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। কিন্তু নানা লোকের মুখে খবর পেতে থাকে যে, পাক আর্মি ধলেশ্বরী পার হয়ে সৈয়দপুর দিয়ে বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রবেশ করছে। তখন সবাই মিলে চিন্তাভাবনা করতে বসে কি করা যায়। নাগরভাগ থেকে সিকিমাইল দূরে আরেকটা গ্রাম–বাসাইল ভোগ–সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের বাড়ি। ২৫ মার্চের রাতে ঢাকায়। প্রেসক্লাবে পাক আর্মির শেলের ঘায়ে তিনি বাম উরুতে আঘাত পান। এখনো ভালো করে সেরে ওঠেন নি। কামাল লোহানীসহ কয়েকজন ফয়েজ আহমদের বাড়িতে যান পরামর্শের জন্য। নানারকম চিন্তাভাবনা-সলাপরার্শের পর ঠিক হয়–পাক আর্মি পুরো অঞ্চল ঘেরাও করে ফেলার আগেই ওদের দলকে যে করেই হোক, ওখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। সে অনুযায়ী ১০ তারিখ ভোররাতে ওরা ফয়েজ আহমদসহ তার বাড়ি থেকে রওয়ানা দেয় কুমিল্লার শ্রীরামপুরের পথে। ঐদিক দিয়ে বর্ডার ক্রস করতে হবে। কিন্তু পথে জানা গেল শ্রীরামপুরে ইতোমধ্যেই পাক আর্মি এসে গেছে। তখন ওরা দিক পরিবর্তন করে ঢাকার দিকে আসা সাব্যস্ত করে। এই আসাটা খুব বিপদসঙ্কুল ছিল। কারণ সৈয়দপুর তখন মিলিটারিকবলিত। সেদিন বিকেলে ঝড়বৃষ্টিও প্রচুর হয়েছিল। রুমীরা অনেক ঘুরপথে একবার এগিয়ে, একবার পিছিয়ে, কখনো স্পীডবোটে, কখনো ভাঙা বাসে, কখনো কাদাভরা পথে পায়ে হেঁটে প্রাণ হাতে নিয়ে ঢাকা পৌঁছায় রাত নটার দিকে। রাতটা সবাই কামাল লোহানীর বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকে। আজ সকালে সবাই একসঙ্গে ও বাড়ি থেকে বেরোয় নি। দুতিনজন করে খানিক পর পর বেরিয়েছে যাতে পাড়ার লোকে সন্দেহ করতে না পারে। তাও রুমী সোজা বাড়ি আসে নি। দুপুর পর্যন্ত ইশরাকের সঙ্গে থেকে তারপর এসেছে।

১২ মে, বুধবার ১৯৭১

জামীর স্কুল খুলেছে দিন দুই হলো। সরকার এখন স্কুল-কলেজ জোর করে ভোলার ব্যবস্থা করছে। এক তারিখে প্রাইমারি স্কুল খোলার হুকুম হয়েছে, নয় তারিখে মাধ্যমিক স্কুল।

জামী স্কুলে যাচ্ছে না। যাবে না। শরীফ, আমি, রুমী, জামী–চারজনে বসে আলাপ-আলোচনা করে আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম স্কুল খুললেও স্কুলে যাওয়া হবে না। দেশে কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে না, দেশে এখন যুদ্ধাবস্থা। দেশবাসীর ওপর হানাদার পাকিস্তানি জানোয়ারদের চলছে নির্মম নিষ্পেষণের স্টিমরোলার। এই অবস্থায় কোন ছাত্রের উচিত নয় বই-খাতা বগলে স্কুলে যাওয়া।

জামী অবশ্য বাড়িতে পড়াশোনা করছে। এবার ও দশম শ্রেণীর ছাত্র। রুমী যতদিন আছে, ওকে সাহায্য করবে। তারপর শরীফ আর আমি–যে যতটা পারি।

জামী তার দুতিনজন বন্ধুর সাথে ঠিক করেছে–ওরা একসঙ্গে বসে আলোচনা করে পড়াশোনা করবে। এটা বেশ ভালো ব্যবস্থা, পড়াও হবে, সময়টাও ভালো কাটবে। অবরুদ্ধ নিস্ক্রিয়তায় ওরা হাঁপিয়ে উঠবে না।

১৬ মে, রবিবার ১৯৭১

রোজ তিন-চারটে খবরের কাগজ না দেখলে আমার ভালো লাগে না। ওদের মিথ্যে বানোয়াট খবরের ভেতর থেকে আসল খবর বের করে আনতে আমার খুব মজা লাগে। যেমন গত পরশুর কাগজে দেখলাম : খ অঞ্চলের সামরিক শাসনকর্তা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম.এ.জি. ওসমানীকে ২০ মের মধ্যে এক নম্বর সেক্টরের উপসামরিক শাসনকর্তার সমীপে হাজির হবার নির্দেশ দিয়েছে।

তার মানে, কিছুদিন থেকে যে স্বাধীন বাংলা বেতারে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি. ওসমানীর নাম শোনা যাচ্ছে, তারই সমর্থনে পূর্ব পাকিস্তানি কাগজে এই খবর!

কাজে যোগদান সংক্রান্ত সামরিক আদেশের ব্যাখ্যা এখনো কাগজে প্রকাশিত হয়ে চলছে। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র অফিস-আদালতে, কলে-কারখানায় নাকি সব দলে দলে যোগ দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। সে সবের ছবিসহ খবরও অনেক ছাপা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। তাহলে এখনও কাজে যোগদান সংক্রান্ত বিষয়ে এত আদেশ–আবার সে আদেশের ব্যাখ্যা এসব কেন? বোঝাই যাচ্ছে সিকিভাগ লোক ওরা মেরে ফেলেছে, সিকিভাগ বর্ডার পেরিয়ে গেছে, আরেক সিকি ভাগ গ্রামেগঞ্জে লুকিয়ে আছে, বাকি সিকিভাগ লোক নিয়ে অফিস-আদালত কল-কারখানা ভরাতে ওদের রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সান্ধ্য আইনের মেয়াদ আরো হ্রাস করা হয়েছে। এখন রাত বারোটা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত।

কদিন আগে শরীফ খবর এনেছেটাইম নিউজউইক-এর কয়েকটা কপি নাকি কোন বিদেশীর ব্রিফকেসে আত্মগোপন করে, এয়ারপোর্টে কাস্টমসের শকুনদৃষ্টি এড়িয়ে ঢাকা এসেছে। তাতে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিকজান্তার বর্বরতা সম্বন্ধে অনেক খবর উঠেছে। শরীফ চেষ্টা করছে কপিগুলো যোগাড় করার। আমরাও সবাই উদগ্রীব হয়ে আছি একনজর দেখার জন্য। খুব গোপনে, খুব সাবধানতার সঙ্গে কপিগুলো হাতে হাতে ঘুরছে। আমাদের হাতে আসতে কতদিন লাগবে, কে জানে!

১৭ মে, সোমবার ১৯৭১

রেডিও-টিভিতে বিখ্যাত ও পদস্থ ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে প্রোগ্রাম করিয়েও কর্তাদের তেমন সুবিধা হচ্ছে না বোধ হয়! তাই এখন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের ধরে ধরে তাদের দিয়ে খবরের কাগজে বিবৃতি দেওয়ানোর কূটকৌশল শুরু হয়েছে। আজকের কাগজে ৫৫ জন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর নাম দিয়ে এক বিবৃতি বেরিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন টিচার, রেডিও-টিভির কোন কর্মকর্তা ও শিল্পীর নাম বাদ গেছে বলে মনে হচ্ছে না। এদের মধ্যে কেউ কেউ সানন্দে এবং সাগ্রহে সই দিলেও বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী যে বেয়নেটের মুখে সই দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। আর যে বিবৃতি তাদের নামে বেরিয়েছে, সেটা যে তারা অনেকে না দেখেই সই করতে বাধ্য হয়েছেন, তাতেও আমার সন্দেহ নেই। আজ সকালের কাগজে বিবৃতিটি প্রথমবারের মতো পড়ে তারা নিশ্চয় স্তম্ভিত হয়ে বসেরইবেন খানিকক্ষণ! এবংবলবেন, ধরণী দ্বিধা হও! এরকম নির্লজ্জ মিথ্যাভাষণে ভরা বিবৃতি স্বয়ং গোয়েবলসও লিখতে পারতেন কিনা সন্দেহ। এই পূর্ব বাংলার কোন প্রতিভাধর বিবৃতিটি তৈরি করেছেন, জানতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে।

২২ মে, শনিবার ১৯৭১

আজ সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত মেহমানের যা ভিড়। ভাগ্যিস দুদিন আগে কাসেম ফিরে এসেছে। চারদিনের ছুটিতে, ছাব্বিশ দিন কাটিয়ে এসেছে। তবু তো এসেছে। সকালে পাশের বাড়ির হেশামউদ্দিন খান সাহেবের বড় দুই মেয়ে খুকী ও খুকুমণি বেড়াতে এসেছিল। ওরাও গ্রামের দিকে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওদের কারো কোনরকম ক্ষতি হয় নি। ওদের কপাল ভালো মিলিটারির তাড়া খেয়ে দৌড়োতে হয় নি, সম্পূর্ণ অচেনা গ্রামের লোকেরা খুব যত্ন করেছে ওদের। গ্রামের লোকজনের মানসিকতা এই রকম : শহরের লোকজন গ্রামে তো আসে না বেশি, বিপদে পড়ে এসেছেন, তাদের ঠিকমত খাতির-যত্ন করা উচিত খুঁকী আরো বলল, কি বলব খালাম্মা অনেক গ্রামে বুড়ো মানুষরা পথের ধারে খানিক দূরে দূরে গুড় আর মটকাভর্তি পানি নিয়ে বসে থেকেছে। লোকজন হেঁটে যেতে যেতে যাতে মাঝে-মাঝে পানি খেয়ে নিতে পারে। অনেক বাড়িতে রাতদুপুরে মুরগি জবাই করে বেঁধে খাইয়েছে। মাচায় ভোলা ভালো কাঁথা-বালিশ পেড়ে শুতে দিয়েছে।

সত্যিই ওদের কপাল ভালো। সকলের বেলায় এরকম আতিথেয়তা জোটে না। আতিথেয়তা জুটলেও মিলিটারির গুলি থেকে রেহাই মেলে না।

খুকুমণিরা থাকতে থাকতেই রেবা এল। ঘন্টাখানেক গল্প করে তারপর গেল।

রেবা চলে যাবার পর গোসল করবার উদ্যোগ করছি, এমন সময় হঠাৎ দেখি রেণু আর চাম্মু এসে হাজির। ওরা রইল আড়াইটে-তিনটে পর্যন্ত। শরীফ দুটোয় অফিস থেকে ফিরলে সবাই খেতে বসলাম। অনেক পীড়াপীড়ি করার পর রেণু আমাদের সাথে খেতে বসল, কিন্তু চামুকে কিছুতেই বসাতে পারলাম না। সে শুধু-দুবার দুকাপ চা খেল, ব্যস।

ওরা যেতে, সাড়ে তিনটেয় আবু আর নজু এল। গতকাল বিকেলে নিউ মার্কেটে আবুর সঙ্গে দেখা–সে রাজশাহী থেকে ঢাকা টুরে এসেছে। তখনই তাকে বাসায়। আসতে বলেছিলাম। উদ্দেশ্য : রাজশাহীর খবর জানা। কেননা এ মাসের প্রথমদিকে ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের কাছে গিয়ে রাজশাহী সম্বন্ধে জানতে চেয়ে প্রায় কিছুই জানতে পারি নি। ওসমান গণি স্যার একদিন ফোন করে বললেন, ডঃ সাজ্জাদ হোসেন রাজশাহী থেকে ঢাকা এসেছেন। ডঃ হোসেন বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর! ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় অল্প, তবু গনি স্যারকে বললাম, স্যার ওঁর ঠিকানাটা বলুন, আমি যাব ওঁর কাছে। ওসমান গনি স্যার একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, যেতে চাচ্ছ, যাও। তবে বেশি খোঁচাখুচি কোরো না।

বুঝলাম। তবে রাজশাহীতে আমাদের আত্মীয়বন্ধু অনেক রয়েছে, রাজশাহীর খবর একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে শোনার জন্য মন উদ্গ্রীব হয়ে আছে। কিন্তু ডঃ হোসেন গম্ভীর গলায় সংক্ষিপ্ত বাক্যে বললেন, রাজশাহীতে সবকিছু ঠিকঠাক আছে, প্রথমদিকে উচ্ছল প্রকৃতির কিছু লোকজন জনসাধারণের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুললেও এখন সব শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। ওসমান গনি স্যারের উপদেশ মনে করে ডঃ হোসেনকে বেশি প্রশ্ন করি নি।

এখন আবুকে পেয়ে ওকে মনের সুখে জেরা করতে শুরু করলাম।

রাজশাহী তো প্রথমদিকে জয় বাংলার দখলে ছিল, তাই না?

হ্যাঁ, তবে মার্চের শেষ কয়দিন ই.বি.আর, ই.পি.আর ও পুলিশদের সঙ্গে পাকি আর্মির খুব যুদ্ধ হয়। তাদের সঙ্গে যোগ হয় স্থানীয় অনেক লোকজন। তারপর পাক আর্মি ক্যান্টনমেন্টে ঘেরাও হয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর লোকেরা ক্যান্টনমেন্টের চারপাশ দিয়ে ট্রেঞ্চ খুঁড়ে ওদেরকে এমনভাবে ঘেরাও করে রাখে যে ওরা খাবার কেনার জন্যও বেরোতে পারত না। মুক্তিবাহিনীর প্ল্যান ছিল না–খাইয়ে পাক আর্মিকে ঘায়েল করা।

পাক আর্মি এমনি চুপচাপ বসে থাকত? গোলাগুলি ছুঁড়ত না?

হ্যাঁ ছুঁড়ত। কিন্তু তাতে মুক্তিবাহিনীর বিশেষ ক্ষতি হত না। তারপর ঢাকা থেকে প্লেন এসে মুক্তিবাহিনীর ওপর যখন বম্বিংশুরু করল, তখন একটু বেকায়দা হয়ে গেল।

কত তারিখে বম্বিং শুরু হয়?

তারিখ তো মনে নেই মামী। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে হবে।

তোমাদের পাড়ায় বোমা পড়েছিল?

না, আমরা ছিলাম মালোপাড়ায়। সেটা শহরের মাঝখানে। প্রথমে ক্যান্টনমেন্টের দিকে বম্বিং হয়, সেটা শহর থেকে তিন মাইল দূরে। প্রথমদিন বম্বিংয়ের খবর পেয়েই আমরা শহর ছেড়ে ১২/১৪ মাইল দূরে একটা গ্রামে চলে যাই আমার এক বন্ধুর সঙ্গে। ওই গ্রামে তার বাড়ি।

গ্রামে কতদিন ছিলে?

তা প্রায় মাসখানেক। অনেকে নদী পেরিয়ে বর্ডার ক্রস করে যাচ্ছিল। কিন্তু মামী, আমার ছোট বাচ্চাটা তখন মাত্র দুমাসের। ওকে নিয়ে নদী পার হওয়া যেত না। তাই বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে গেলাম। পরে শুনেছি, ক্যান্টনমেন্টের চারপাশে মুক্তিবাহিনীর ওপর বম্বিং করে পাক আর্মি হেলিকপ্টারে করে সৈন্যদের জন্য খাবার নামিয়ে দেয়। আর দুএকদিন দেরি হলে সৈন্যগুলো না খেয়ে মারা যেত। তারপর শোনা গেল ঢাকা থেকে আর্মি আসছে রাজশাহী শহর দখল করতে। তখন আরো বহু লোক শহর ছেড়ে পালালো।

রাজশাহীতে আর্মি কবে ঢোকে?

সঠিক বলতে পারব না–খুব সম্ভব ১২/১৩ তারিখে।

তোমরা রাজশাহী ফিরে কি দেখলে?

দেখলাম, সারা শহর লণ্ডভণ্ড। বহু জায়গা আগুনে পোড়া। শুনলাম, বহু লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছে।

শহরে ফিরে এসে অফিসে যোগ দিলে?

আমার অফিস আর বাড়ি একই বিল্ডিংয়ে। একতলায় অফিস, দোতলায় বাসা। কি আর করব?

সে তো বটেই। তা অফিসে জয়েন করার পর তোমার ওপর কোন ঝামেলা করে নি?

না, আসলে গভর্নমেন্ট অফিস নয় বলেই বোধহয় কোন ঝামেলা হয় নি।

আবু জীবন বীমা কোম্পানিতে চাকরি করে।

ঢাকা এলে কিসে করে?

কোচে।

রাস্তায় কি দেখলে?

রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত পুরো রাস্তার দুপাশে সমস্ত গ্রাম পোড়া। ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার সময় সৈন্যরা রাস্তার দুপাশের সমস্ত গ্রাম জ্বালাতে জ্বালাতে গেছে। লোকজন যারা পালাতে পারে নি, তারা গুলি খেয়ে মরেছে। গরু-ছাগল মরে প্রায় সাফ হয়ে গেছে।

শরীফ বলল, রাজশাহী বর্ডারে মুক্তিযুদ্ধ কি রকম হচ্ছে, খবর-টবর পাও?

পাই মামা। শুধু রাজশাহী বর্ডারে নয় দেশের চারদিকেই বর্ডার ধরে যুদ্ধ হচ্ছে।

আমি বললাম, দেশের ভেতরেও কিন্তু গেরিলা তৎপরতা শুরু হয়েছে।

শরীফ বলল, আমরা যারা বর্ডার ক্রস করে যুদ্ধে অংশ নিতে পারি নি, তাদের কিন্তু দেশে বসেও অনেক কিছু করার আছে। তুমি ছোট বাচ্চা নিয়ে নদী পেরিয়ে যেতে পার নি বলে আফসোস করছিলে। আফসোস করার কিছু নেই। তুমি রাজশাহীতে ঘরে বসেই যুদ্ধে অংশ নিতে পার।

আবু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল, বললাম, শহরে যেসব গেরিলা আসবে, তাদের বাড়িতে লুকিয়ে আশ্রয় দেবে, তাদের খাওয়াবে। একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় খবর পৌঁছে দেবে। পারলে টাকা-পয়সা যোগাড় করে তাদের সাহায্য করবে।

আবু খুব ধীর স্বরে বলল, আপনাদের কথা আমি মেনে চলব। যতটা সাধ্যে কুলায়।

২৩ মে, রবিবার ১৯৭১

দেশের অন্যান্য জেলা থেকে ঢাকায় আসা লোকদের সঙ্গে যত বেশি দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে, তত বেশি বেশি খারাপ খবর শুনতে পাচ্ছি। মেয়েদের অপমান ও অত্যাচারের কথা, বিশেষ করে বাপ, ভাই, স্বামী বা ছেলের সামনে তাদের বেইজ্জতি করে মেরে ফেলার কথা প্রায়ই কানে আসত। এখন আরো বেশি করে তাদের অপহরণের কথা শোনা যাচ্ছে।

এখন আরো বেশি পাকিস্তানি সৈন্য ও বিহারি তাঁবেদাররা যখন-তখন লোকের বাড়িতে ঢুকে টাকা-পয়সা, সোনাদানা লুটেপুটে নিচ্ছে। দোকানপাটে ঢুকেও যেটা খুশি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কাজগুলো, লোকমা তুলে ভাত মুখে দেওয়ার চেয়েও সহজ। যেকোন বাড়িতে ঢুকে রাইফেল উঁচিয়ে সবাইকে সার বেঁধে দাড় করালেই হলো। গুলি খরচ না করলেও চলে, মারারও দরকার হয় না। ভয়ের চোটেই টাকা-পয়সা, সোনাদানা সবাই বের করে দিয়ে দেয়। অনেক বাড়িতে গৃহস্থ নিজেই টাকা-পয়সা, সোনাদানা আগ বাড়িয়ে বের করে দেয়–এইনাও সব দিচ্ছি, জানে মেরোনা। আজকাল ওরা নিজেও একটু কম জানে মারছে, টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি নিয়ে চলে যাচ্ছে। ঢাকাতেও কোন কোন অঞ্চলে এগুলো নাকি হচ্ছে। যদিও আমাদের চেনাজানার মধ্যে কারো এখনো হয় নি।

আমার গহনাগাটি বেশি নেই কিন্তু যেটুকু আছে, সেটুকু গেলে আর তো কোনদিন করতে পারব না। মাও উদ্বিগ্ন, তাঁর গহনাপত্রগুলো রেখেছেন দুই ছেলের বউকে দেবার জন্য। ছেলেরা বিদেশে কবে দেশে আসবে আর বিয়ে করবে, তার ঠিক নেই। তবু গহনাগুলো রক্ষা করার ব্যবস্থা তো করা দরকার।

অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম উঠোনে গর্ত করে পুঁতে রাখব। তবে শুনেছি–ওরা অনেক বাড়ির উঠোন খুঁড়ে দেখে।গ্রামে নাকি কাঁচাঘরের মেঝে পর্যন্ত খুঁড়ে দেখে। তাহলে?

রুমী বলল, জিনিসগুলো পুঁতে তার ওপর একটা লেবুগাছ লাগিয়ে দাও। তবে ছোট গাছ লাগালে ওরা সন্দেহ করতে পারে। বেশ একটা বড় গাছ আনতে হবে। দেখে যেন মনে হয় দুতিন বছরের পুরনো গাছ।

বড় গাছ তুলে আনলে কি বাঁচবে?

চারপাশে অনেক বেশি মাটি নিয়ে খুঁড়ে তুলতে হবে যাতে শেকড় কাটা না যায়।

তাই ঠিক হলো। শরীফের জানাশোনা এক নার্সারী থেকে বড় একটা লেবুগাছ আনানোর ব্যবস্থা করা হলো।

আমি বললাম, চল, মার বাসায় যাই। গহনা রাখার বন্দোবস্ত হয়েছে, বলে আসি।

মার বাসা যেতেই দেখি উনি বাইরে যাবার জন্য রওনা হচ্ছেন। কি ব্যাপার? খবর এসেছে রাজশাহীতে তারার ভাইকে বিহারিরা মেরে ফেলেছে। তারা মায়ের মামাতো ভাইয়ের মেয়ে, আসাদ গেটের কাছে নিউ কলোনিতে থাকে। বললাম, চলুন আপনাকে তারার বাসায় নামিয়ে দিই। আমরাও একটু দেখা করে আসি ওদের সঙ্গে।

নিউ কলোনিতে আমরা একটুক্ষণ বসে রইলাম। মা এখন খানিকক্ষণ ও বাড়িতে থাকবেন। ওখান থেকে গেলাম রাজারবাগ এলাকায় আউটার সার্কুলার রোডে মান্নান ও নূরজাহানের বাড়ি। ইঞ্জিনিয়ার মান্নান শরীফের বন্ধু ও সহকর্মী। ক্র্যাকডাউনের আগে মান্নানের চাচাতো ভাইয়ের বিয়েতে চাটগাঁ গিয়ে ওরা ছেলেমেয়ে সুদ্ধ সবাই আটকা পড়েছিল। সপ্তাহখানেক হলো ঢাকা ফিরেছে। ওদের বাসায় গিয়ে নূরজাহান আর মান্নানের মুখে শুনলাম ওদের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু লোমহর্ষক কাহিনী।

চাটগাঁর ও. আর. নিজাম রোডে ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের অফিস ও রেস্ট হাউস। মান্নানরা সপরিবারে ওখানেই ছিলেন। ২৬ মার্চ সকালে বাইরোডে গাড়িতে ওদের ঢাকার পথে রওয়ানা হবার কথা। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে মান্নানের বন্ধু আরেক ইঞ্জিনিয়ার জামান সাহেব ফোনে ঢাকায় তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ঢাকার গোলমালের কথা জানতে পারেন। পরে আরো এর-ওঁর কাছ থেকে খবর পেয়ে ওরা ক্র্যাকডাউনের ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। ফলে ওরা চাটগাঁতেই থেকে যেতে বাধ্য হলেন। ২৬ ও ২৭ মার্চ অবশ্য মান্নানরা চাটগাঁতে রাস্তায় বেরোতে পেরেছিলেন, যদিও ২৬ মার্চ রাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ছোঁড়া ট্রেসার হাউইয়ের আলো দেখতে পেয়েছিলেন এবং গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। ক্যান্টনমেন্টটা ওদের রেস্ট হাউস থেকে বেশিদূরে ছিল না। ২৮ তারিখ সকালে বাধল বিপত্তি। রেস্ট হাউসের পেছনে প্রবর্তক সংঘের পাহাড়, সামনে পুলিশ লাইনের পাহাড়। ওই দিন সকালে হঠাৎ প্রবর্তক সংঘের পাহাড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পজিশন নিয়ে পুলিশ লাইনের দিকে গুলিগোলা ছুঁড়তে শুরু করে। পুলিশরাও ওদের দিকে গুলিগোলা ছুঁড়তে থাকে। নূরজাহান বলল, সে যে কি অবস্থা আপা। রেস্ট হাউসের মাথার ওপর দিয়ে সামনে গুলিগোলা ছুটে যাচ্ছে। ভাবলাম, আর রক্ষে নেই। এইবার শেষ। ছুটে সবাই দোতলা থেকে নেমে নীচের অফিস ঘরের মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে রইলাম। মাঝে-মাঝে উঠে ঘুলঘুলি দিয়ে উঁকি মেরে দেখি। বেলা দুটো পর্যন্ত এই রকম চলল। দুটোর পর মাথার ওপর দিয়ে গুলি করছে। তখন মনে হলো, আমাদের বাড়িতে নিশ্চয় আসবে, আর গুলি ছোটা বন্ধ হল। তারপর শব্দ শুনে মনে হলো খানসেনারা পাহাড় থেকে নেমে বাড়ি বাড়ি ধাক্কা দিয়ে দরজা ভেঙে সব গুলি করে মারবে। শেষ পর্যন্ত কপাল ভাল, ওরা আর আসেনি। তিনটের দিকে সব শান্ত হতে আমরা ঠিক করলাম, এখানে আর নয়। যে করেই হোক, নন্দনকাননে বাঁকা সাহেবের বাড়িতে গিয়ে উঠতে হবে। সদর রাস্তা দিয়ে যাওয়া রিস্কি, তাই ঠিক করলাম ডানদিকে এলিট পেইন্টের মালিকের বাড়ির পাশ দিয়ে যে গলি রাস্তা আছে, ওই দিক দিয়ে লুকিয়ে-ছাপিয়ে যেতে হবে। খানিক দূরে যেতেই একটা বাড়িতে দেখি এক দম্পত্তি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আমাদেরকে দেখে গলিতে নেমে এলেন। আমরা এদিক দিয়ে নন্দনকানন যাবার চেষ্টা করছি শুনে বললেন, পাগল হয়েছেন! নন্দনকানন। পর্যন্ত পৌঁছতেই পারবেন না। পাকসেনারা সব জায়গায় টহল দিচ্ছে। একবার দেখতে পেলে আর রক্ষে নেই। তার চেয়ে আমাদের বাসায় থাকুন। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক দম্পতির এই রকম আন্তরিক ব্যবহারে খুব মুগ্ধ হলাম। পরে জেনেছিলাম ভদ্রলোকের নাম আবদুল হাই। আমাদের জোবেদা খানম আপার ভাই।

ওদের বাসায় ৪/৫ দিন ছিলাম। তারপর ৩০ তারিখ দুপুরের পর বম্বিং হলো–আমরাও বাসার জানালা দিয়ে দূরের আকাশে পরিষ্কার প্লেনগুলো দেখতে পেলাম। ওঁদের বাসায় ৪/৫ দিন থাকার পর আবার আমরা রেস্ট হাউসেই ফিরে গেলাম।

স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে পেয়েছিলাম। প্রথম কবে শুনেছিলে?

২৬ তারিখ রাতেই। জামান সাহেবের রেডিও ছিল, উনি ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ পেয়ে যান। তারপর রোজই শুনতাম। আমাদের ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর তো কোন কাজ ছিল না, তাই রেডিওটাই শোনা হত বেশি। আকাশবাণী, বিবিসি, রেডিও অস্ট্রেলিয়া, স্বাধীন বাংলা বেতার–সবই শুনতাম। তবে ৩০ তারিখে বম্বিংয়ের পর তিন-চারদিন স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে পাই নি। তারপর যখন চাটগাঁ-ঢাকা প্লেন সার্ভিস শুরু হলো, তখন প্লেনে সিট পাবার চেষ্টা করতে লাগলাম। দুসপ্তাহ পরে সিট পেয়ে এইতো গেল সপ্তাহে ঢাকা এসেছি। এই দুসপ্তাহ কি করতাম জানেন? সকালে কারফিউ উঠলে নাশতা খেয়েই ছেলেমেয়ে, বোঁচকাকুঁচকি নিয়ে এয়ারপোর্ট যেতাম, ফিরতাম বিকেলে কারফিউ শুরু হবার আগ দিয়ে।

বল কি? দুপুরের খাওয়া-দাওয়া?

প্রথমদিনের পর থেকে স্যান্ডউইচ, ফ্লাস্কে চা, পানি এসব নিয়ে যেতাম।

কেন সারাদিন বসে থাকতে হত কেন?

প্লেনে মিলিটারির লোকজন আগে সিট পেত। অল্প কটা সিট সিভিলিয়ানদের দেয়া হত। এয়ারপোর্টে গিয়ে লাইন করে দাঁড়াতে হত। কবেকটাসিট সিভিলিয়ানদের দেবে, তার কোন স্থিরতা ছিল না। আর লাইন ছিল লম্বা।

পতেঙ্গা এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে বসে অপেক্ষা করার সময় একটা সাংঘাতিক দৃশ্য নূরহাজান এবং নিশ্চয় বাকি সবারও চোখে পড়ত। সবাই সেটা না দেখারই ভান করত। এখন বলতে নূরজাহান শিউরে উঠল, একদিন হঠাৎ দেখি কি বেশ দূরে একটা দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে ট্রাক থেকে লোক নেমে লাইন করে ভেতরে ঢুকছে।ট্রাকের সামনে মেশিনগান হাতে মিলিটারি দাঁড়িয়ে। দোতলার জানালা খোলা ছিল। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম ঘরের ভেতরে খানসেনারা চাবুক দিয়ে লোকগুলোকে মারছে।

বল কি! চিৎকার শুনতে পেতে?

না, বিল্ডিংগুলো বেশি দূরে ছিল। তবে মাঝখানটা ফাঁকা মাঠ বলে দেখা যেত। ঘরের মধ্যে জানালাগুলো ওরা বন্ধ করে নেয়াও দরকার মনে করত না। দিনের বেলা রোদের আলোতে এত দূর থেকেও ঘরের ভেতরের সব দেখা যেত। দূর বলে চিৎকার শুনতে পাইনি, তবে চাবুকের ওঠানামা বুঝতে পারতাম।

রোজ রোজ ট্রাকে করেলোক নিয়ে আসত?।

যে কয়দিন এয়ারপোর্ট বসে থেকেছি, প্রায় রোজই দেখেছি। যা ভয় লাগত আপা, গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত ভয়ে। কিন্তু কিক করব, না দেখার ভান করে বসে থাকতাম। আবার ওদিকে না তাকিয়েও পারতাম না।

২৫ মে, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী। বেশ শান-শওকতের সঙ্গে পালিত হচ্ছে ঢাকায়। এমনকি ইসলামিক ফাউন্ডেশন পর্যন্ত একটা অনুষ্ঠান করছে।

সন্ধ্যার পর টিভির সামনে বসেছিলাম, জামী সিঁড়ির মাথা থেকে মুখ বাড়িয়ে ডাকল, মা শিগগির এস। নতুন প্রোগ্রাম।

দৌড়ে ওপরে গেলাম, স্বাধীন বাংলা বেতারে বাংলা সংবাদ পাঠক করছে নতুন এক কণ্ঠস্বর। খানিক শোনার পর চেনা চেনা ঠেকল কিন্তু ঠিক চিনে উঠতে পারলাম না। সালেহ আহমদ নামটা আগে কখনো শুনি নি। রুমী বলল, নিশ্চয় ছদ্মনাম।

বললাম, হতে পারে। তবে ঢাকারই লোক এ। এই ঢাকাতেই এই গলা শুনেছি। হয় নাটক, নয় আবৃত্তি।

এইসব গবেষণা করতে করতে বাংলা সংবাদ পাঠ শেষ।

আজকের প্রোগ্রামেও বেশ নতুনত্ব। কণ্ঠস্বরও সবই নতুন শুনছি। একজন একটা কথিকা পড়লেন–চরমপত্র। বেশ মজা লাগল শুনতে, শুদ্ধ ভাষায় বলতে বলতে হঠাৎ শেষের দিকে এক্কেবারে খাটি ঢাকাইয়া ভাষাতে দুটো লাইন বলে শেষ করলেন।

অদ্ভুত তো। কিন্তু এখানে আলটিমেটামের মতো কিছু তো বোঝা গেল না।

শরীফ বলল, ঐ যে বলল না একবার যখন এ দেশের কাদায় পা ডুবিয়েছ, আর রক্ষে নেই। গাজুরিয়া মাইরের চোটে মরে কাদার মধ্যে শুয়ে থাকতে হবে, ঐটাই আলটিমেটাম।

কি জানি।

জামী জানতে চাইল গাজুরিয়া মাইর কি জিনিস?

রুমী বলল, জানি না। আমার ঢাকাইয়া বন্ধু কাউকে জিগ্যেস করে নেব।

ঐ যে মুক্তিফৌজের গেরিলা তৎপরতার কথা বলল–ঢাকার ছজায়গায় গ্রেনেড ফেটেছে, আমরা তো সাত আটদিন আগে এরকম বোমা ফাটার কথা শুনেছিলাম, কিন্তু ঠিক বিশ্বাস করি নি। ব্যাপারটা তাহলে সত্যি? আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। ব্যাপারটা তাহলে সত্যি! সত্যি সত্যি তাহলে ঢাকার আনাচে-কানাচে মুক্তিফৌজের গেরিলারা প্রতিঘাতের ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে শুরু করেছে? এতদিন জানছিলাম বর্ডার-ঘেষা অঞ্চলগুলোতেই গেরিলা তৎপরতা। এখন তাহলে খোদ ঢাকাতেও?

মুক্তিফৌজ! কথাটা এত ভারি যে এই রকম অত্যাচারী সৈন্য দিয়ে ঘেরা অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে বসে মুক্তিফৌজ শব্দটা শুনলেও কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়। আবার ঐ অবিশ্বাসের ভেতর থেকেই একটা আশা, একটা ভরসার ভাব ধীরে ধীরে মনের কোণে জেগে উঠতে থাকে।

২৬ মে, বুধবার ১৯৭১

আজ লেবুগাছ আনতে যাবার কথা ছিল, কিন্তু শরীফ দুপুরে অফিস থেকে ফিরে জানাল বিকেলে মিনিভাইদের বাসায় যেতে হবে। রেবার খালাতো বোনের স্বামীকে গোপালপুরে মেরে ফেলেছে–খবর এসেছে। ওদের খুব মন খারাপ।

সাড়ে চারটেয় গুলশান গেলাম। রেবার খালাতো বোন শামসুন্নাহারের স্বামী আনোয়ারুল আজিম রাজশাহী জেলার গোপালপুর সুগার মিলের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিল। তাকে এবং সেই সঙ্গে মিলের আরো অনেক বাঙালি অফিসার ও শ্রমিককে পাক আর্মির লোকেরা গুলি করে মেরে ফেলেছে। আজিমের বউ-বাচ্চার কি হয়েছে, কেউ জানে না। রেবা-মিনিভাইয়ের দ্বিগুণ মন খারাপ আরো একটি কারণে। শামসুন্নাহারের ছোট ভাই সালাহউদ্দিনও বোনের কাছে ছিল। সেসুদ্ধ পুরো পরিবারের কোনো খোঁজখবর নেই।

আমরাও মন খারাপ করে চুপচাপ বসে রইলাম অনেকক্ষণ। তারপর এক সময় উঠে বাড়ি ফিরে এলাম।

বাসায় ঢুকে দেখি একরাম ভাই, লিলিবু এসেছেন। বাবার সঙ্গে আলাপ করছেন। একরাম ভাই বরিশালের এডিসি হয়ে বদলি হয়েছেন।

এই রকম সময় ঢাকা থেকে সুদূর বরিশালে বদলি হওয়াতে একরাম ভাইয়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। একি দুর্দৈব! কিন্তু না গিয়েও তো উপায় নেই। ক্র্যাকডাউনের পরে কঠিন মার্শাল ল শাসন। এসময় বদলি ক্যানসেলের কোনো রকম তদবিরেরই অবকাশ নেই। তবে একটা সান্ত্বনা বদলিটা প্রমোশনের।

একরাম ভাই প্রথমে একাই যেতে চান। কিন্তু লিলিবু গো ধরে বসেছেন তিনিও সঙ্গে যাবেন। আমরা লিলিবুকে বোঝালাম–এই রকম দুর্দিনে তাঁর প্রথমে না যাওয়াই ভালো। একরাম ভাই দুএকটা ছেলে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে যান, পরে অবস্থা বুঝে লিলিবু যাবেন। এখানেও তো ছেলেমেয়েরা সবাই রয়েছে–বাবা-মা দুজনেই একসঙ্গে গেলে ওরাও তো মুষড়ে পড়বে। তাছাড়া এখানে অনেক কাজও রয়েছে। একরাম ভাই বদলি হলেন, ঢাকার সরকারি বাসা রাখতে পারবেন না, বাসা খোজা, সেখানে পুরো সংসার উঠিয়ে নিয়ে গোছানো–লিলিবুর এখানে এখন থাকাটা খুবই জরুরি।

২৮ মে, শুক্রবার ১৯৭১

আজ উঠোনে বিরাট ও গভীর গর্ত করে লেবুগাছ লাগানো হলো। গতকাল বিকেলে অফিসের একটা পিক-আপ নিয়ে অনেক হুজ্জত করে গাছটা আনা হয়েছে। আনতে আনতে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছিল বলে গতকাল আর পোঁতা হয় নি, গ্যারেজের পাশে রেখে দেওয়া হয়েছিল। এমনইযত্ন করে বিরাট পরিধিনিয়ে মাটি কেটে তোলা হয়েছিল এবং আজকে এমনই নিখুঁত, অনড় অবস্থায় গাছটা লাগানো গেছে যে আশা হচ্ছে, গাছটার একটা পাতাও মরবে না।

অবশেষে শরীফ নিউজউইক, টাইম ম্যাগাজিনের সেই দুর্লভ সংখ্যাগুলোর টাইপ করা কপি বাড়ি আনতে পেরেছে। আমরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। তিনটে কপি দুটো নিউজউইকের ৫ এপ্রিল আর ১২ এপ্রিল সংখ্যা। টাইম ম্যাগাজিনের ৩ মে সংখ্যা। পাতলা টাইপ–কাগজে টাইপ করা ম্যাগাজিনে নিশ্চয় ছবিটবি ছিল, টাইপ কাগজে তার স্বাদ পাওয়া গেল না। তবু যে পড়তে পারছি, এটাই বা কম কি?

পাঁচ এপ্রিলের নিউজউইকের প্রবন্ধটার শিরোনাম হলো–পাকিস্তান প্লাঞ্জেস ইন টু সিভিল ওয়ার–পাকিস্তান গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ভেতরে রয়েছে নিউজউইকের সাংবাদিক লোরেন জেংকিনসের রিপোর্ট। পড়ে অবাক হলাম, হোটেল ইন্টারকনে গৃহবন্দি থাকা অবস্থাতেও লোরেন জেংকিনস ঢাকার আর্মি ক্র্যাকডাউনের পুরো ঘটনা কি করে জেনে সেগুলো হুবহু তার কাগজে তুলে দিয়েছে সারা বিশ্বকে জানাবার উদ্দেশ্যে। এই ঘটনা জানার পর তো আর কোনো দেশের বলা উচিত নয় যে পূর্ব বাংলায় যা ঘটেছে, তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার; কিংবা পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী রাষ্ট্রদ্রোহী দলকে সামরিক সরকার যোগ্য শাস্তি দিয়েছে?

বারো এপ্রিলের সংখ্যায় লোরেন জেংকিনস আরো চমৎকার করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। শিরোনাম দিয়েছে দি অ্যাওয়েকনিং অব এ পিপল একটি জাতির জাগরণ। টাইম ম্যাগাজিনের কপিটা আরো পরের, ৩ মে তারিখের। টাইমের সংবাদদাতা ড্যান কোগিন তার প্রবন্ধের নাম দিয়েছে, ঢাকা, সিটি অব দ্য ডেড লাশের শহর ঢাকা।

সবাই মিলে ভাগাভাগি করে এইগুলো পড়তেই আজ সারা দিন কাবার!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *