নতুন কেনা সুটকেসটার দিকে চেয়ে ছিল বীণাপাণি। দেখতে হুবহু চামড়ার জিনিস। কিন্তু বীণাপাণি জানে জিনিসটা পিচবোর্ডের। ওপরটা ঠিক চামড়ার মতো রং করা। সস্তার জিনিস। নিমাই তাতে পাটে পাটে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে নিচ্ছিল।

বীণাপাণির খুব অম্বলের রোগ আজকাল। সকালবেলাতেও টক জল বমি হয়েছে খানিকটা। বুক এখনও ঢাক ঢক। করছে তেলগোলার মতো অম্বলে। মাথাটা ঠিক থাকছে না। শরীরটা দুর্বল লাগছে। বিছানায় বসে সে একদৃষ্টে নিমাইয়ের সুটকেস গোছানো দেখছে। শুধু স্যুটকেস নয়, নিমাই গোছাচ্ছে তার আখের। এ দেশে মেয়ে হয়ে জন্মানো যে কত বড় পাপ তা বীণাপাণির চেয়ে ভাল আর কে জানে! মাথাটা ধরে আছে খুব। চোখ ঝাপসা বোধহয় চোখের জলেই হবে। কিন্তু কান্না নয়। বরং বুকে উথলে উঠছে রাগ। রাগের সাপ ছোবলাচ্ছে। বিষ ঢালছে শরীরময়।

বীণাপাণির রাগটা নিমাইও টের পাচ্ছে। তাই চোখে চোখ রাখছে না। মাথা নিচু করে খুব মন দিয়ে সুটকেস গোছাচ্ছে। তিনখানা ধুতি আর জামায় পাঞ্জাবিতে গোটা চারেক, সাকুল্যে এ কখানাই সম্বল। ওপরে দুখানা লুঙ্গি আর একখানা গামছা পাট করে রাখতে যত সময় লাগা উচিত তার চেয়ে বেশী সময় নিচ্ছে। এই শেষ সময়টাতে বীণাপাণি কিছু বলবে, আস্কারা-দেওয়া, লাই-দেওয়া কোনও কথা, সেইজন্যই কি অপেক্ষা করছে? আগে, অর্থাৎ বিয়ের পর পর ওই বেঁটে রোগা কালো এবং অপদাৰ্থ লোকটার মান ভাঙাতে পায়ে অবধি পড়েছে বীণাপাণি। তখন দুনিয়াটা একরকম ছিল, আজ সেই দুনিয়াটারই রং চটে, পলেস্তারা খসে বেড়ানো চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। কত কী ভাল লাগত তখন। এখন সবই বিষাদ।

এই মেনীমুখো মানুষটাকেই তার বাবা খুঁজে এনে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। বাবার মতে বড়ই ভাল ছেলে। শান্তশিষ্ট, স্থিরবুদ্ধি, চরিত্রবান। সবচেয়ে বড় কথা, মা-বাপের প্রতি ভক্তি আছে। ভগবানে বিশ্বাস আছে। চমৎকার কীর্তন গায়। শুধু পয়সাটারই যা অভাব। বড় জাগুলিয়ায় এক ঠিকাদারের গুদাম পাহারা দেয়। চাকরি পাকা নয়, তবে ঠিকাদারবাবুটি ভাল, স্নেহ করেন। চাকরির মেয়াদ বাড়তে পারে। পালপাড়ায় নিজেদের একখানা মেটে বাড়ি আছে, তিনচার বিঘে জমি। সুতরাং মেয়েকে একেবারে জলেফেলা হচ্ছে না। অন্তত অগাধ জলে নয়।

বীণাপাণি তখন কতটুকুই বা মেয়ে? বুদ্ধিটুদ্ধি কিছু পাকেনি, মা-বাপের ওপর নির্ভর। তবে বিয়ে নিয়ে একটা সুখের ভাবনা ছিল বড়। মিথ্যে বলবে না বীণাপাণি, বিয়ের পর সুখ হয়েছিল কিছুদিন। তার বুঝি তুলনা নেই। বীণাপাণি এ কথাও বুকে হাত রেখে বলতে পারবে না যে, নিমাই লোকটা খারাপ। যদি মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবে তাহলেই বুঝতে পারে, এ লোকটার মনের জোর নেই বটে, কিন্তু দোষঘাটও বিশেষ নেই। নরম মনের মানুষ। সবসময়েই বিনয়ী বিগলিত ভাব। সেই কারণেই লোকে নিমাইকে ভালবাসে। ঠিকাদার নিরঞ্জনবাবুও বাসতেন। তবে তাঁর কাজটাই নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে। জাগুলিয়ার কাছে একটা রাস্তা তৈরির কাজশেষ করে তিনি আসামে গেলেন আরও বড় কাজে। নিমাইকে নিতে চেয়েছিলেন, তবে বুড়ো মা-বাপ, ক্ষেতি-গেরস্তি, নতুন বউ ছেড়ে তিন চারশ টাকার ভরসায় অতদূর যাওয়ায় গা-ও বিশেষ নেই। জাগুলিয়ায় একখানা ফলের স্টল খুলেছিল নিমাই। তখনই তার ব্যারাম শুরু হয়। জুর, কাশি, বুকে ব্যথা। জল জমেছিল বুকে। এমন কিছু সাতিক রোগ নয়। আজকাল কত ওষুধ বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই রোগের চিকিৎসা করতে গিয়েই দুবিঘে জমি বেচে দিতে হল। হাঁড়ির হাল।

যেসব ড্যাকরারা বক্তৃতা দিয়ে দেশ চালাচ্ছে, মানুষকে ন্যায়-অন্যায় নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে, তারা কি জানে গাঁয়ে গঞ্জে মাঠে ঘাটে লোকে রোগ-ভোগ খিদে-তেষ্টা বিপদ-আপদ নিয়ে কিরকম ভাবে বেঁচে আছে। আর কেমনতরো বেঁচে-থাকাটাই বা এটা? এই মলাম কি সেই মলাম বলে এই যে শ্বাসটুকু চালু রাখা—এর মধ্যে আবার ধৰ্ম-অধৰ্ম পাপ-পুণ্য ঢোকানোর কোনও মানে হয়? আকাশে যে আর কোন এক ড্যাকরা থাকে তার ততা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোনো ছাড়া আর কোনও কাজ দেখতে পায় না বীণাপাণি। পাপ-পুণ্য কোলে করে বসে থাকলে কি ভাত জুটবে? বীণাপাণির ঘরের পাশ দিয়েই পেটকেঁচড়ে পিস্তল নিয়ে এইটুকুন-টুকুন ছেলেরা প্রাণ হাতে করে যেসব কাজ করতে যায় তা পাপ না পুণ্য তা কে বলে দেবে? পেট-ভাতের জোগাড় থাকলে যেত ওসব করতে? বেকারে ভরা দেশ, বাপে খেদায় মায়ে খেদায়, চা-বিস্কুট খাওয়ার, দাড়ি কামানোর অবধি পয়সা জুটতে চায় না, তা করবেটা কি? কোন ভগবান দেখবে তাদের কোন সরকার। আছে নাকি তারা এদেশে?

নদেরচাঁদদ লোকটা গঙ্গাজলে যোয়া তুলসীপাতা যে নয় সবাই জানে সে কথা। তার নামে লোকে দু-গাল ভাত বেশী খায়। নানা দোষ আছে তার, কিন্তু ওই বিপদের দিনে লোক বাছতে গেলে কি চলত? বিপদে যে পাপ-পুণ্য ভেসে যায়। ভগবানের যদি বিচার থাকত তাহলে পাপ-পুণ্যের নিক্তিখানা ধরার আগে কুলোর বাতাস দিয়ে আপদ-বিপদ রোগ-ভোগ তাড়িয়ে মানুষকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে দিত। না বচলে পাপ-পুণ্য করবেটা কি?

ভগবানের কাজ ভগবান না করে যদি এক পাপীতাপী লম্পট এসে করে তবে সেই লম্পটই তখন বীণাপাণির ভগবান। নদেরাদ তো ভগবানের মতোই এসে দাঁড়াল একদিন। তখন মেটে স্যাঁতসেঁতে ঘরে পুঁকছে নিমাই। অ্যালোপ্যাথির পয়সায় টান পড়ায়, হোমিওপ্যাথি চলছে। পথ্যের জোগাড় নেই। জ্যেঠতুতো দেওরের বন্ধু নদেরাদ উদয় হয়ে বলল বনগাঁর দিকে আমার কাকার একটা ব্যবসা আছে। তাতে একজন লোক দরকার। তবে পুরুষমানুষ হলে চলবে না। মেয়েছেলে চাই।

বীণাপাণি ডগমগ যুবতী। সে জানে মেয়েছেলে হয়ে জন্মানোর কিছু জনগত পাপ আছে। তবে শরীরটা যে সব পুরুষেরই ভক্ষ্যবস্তু। যদি একটু দেখনসই হয় তাহলে তো কথাই নেই। ছেলে-বুড়ো সকলেই নরখাদকের মতো মনে মনে ঠোঁট চাটবে। এই হালুম-খালুম ভাবটা চারদিকে বড় টের পায় বীণাপাণি। কপালের দোষই হবে, সে দেখতে ভাল। লম্বাটে গড়ন, রংখানাও ফর্সার দিকে, মুখের ডৌলটি নিখুঁত, দুটি টানা চোখ। নিজেকে কখনও আড়াল করেনি সে।

কথা হচ্ছিল নিমাইয়ের সামনে বসেই। বোেকা শাশুড়িটাও ঘরে ছিল। এরা দুনিয়ার হালচাল কিছুই জানে না, বোঝেও না। লোকে অচেনা কথা বললে হ করে চেয়ে থাকে। বোকা মাথায় কোনও ভাল বা মদের ঢেউ ওঠে না। এতদিন দুনিয়াতে কাটিয়েও দুনিয়াটা বড় অচেনা এদের কাছে। বীণাপাণিরও তো এর চেয়ে ভাল অবস্থা নয়। তবে সে নদেরচাদের চোখে একটা লোভানি দেখতে পেয়েছিল।

নিমাই বলল, ব্যবসাটা কিসের?

নানান জিনিসের। চালানি ব্যবসা। মাল আনা, চালান দেওয়া। পয়সা আছে।

শাশুড়ি বলে উঠল, বউমাকে দিয়ে হয়, ও বাবা নদেরচাঁদ?

খুব হয়। বউদি তো দিব্যি চটপটে মেয়ে। কাকা এরকমই খুঁজছে।

দেখবে নাকি বউমা?

বীণাপাণি জানে, এর মধ্যে একটা চক্কর আছে। তাকে গভীর জলে টেনে নামানোর জন্য কুমীর এসে ডাঙায় উঠেছে।

বাপের বাড়ির অবস্থা একটু ভাল হলে বীণাপাণি দুর্দিনে গিয়ে বাপ-ভাইয়ের ঠ্যাং ধরত। কিন্তু সে সুবিধে নেই। বউদিরা দাঁতে বিষ নিয়ে ফণা তুলে আছে। বাপ-মায়ের অবস্থা শোচনীয়।

বীণাপাণি সভয়ে বলল, কেমনধারা কাজ গো! আমি কি পারব।

নদেরচাঁদ উদাস গলায় বলল, মেয়েছেলেরই কাজ।

বোকা শাশুড়িটা নেচে উঠে বলল, দে বাবা নদেরাদ, কাজটা করে দে। সবাই মিলে দুটি খেতে পাই তাহলে।

ভয়-ভাবনা-অনিশ্চয়তা নিয়েই একদিন নদেরষ্টাদের সঙ্গে বনগাঁয় এল বীণা। কাকার সঙ্গে কথা বলে বিকেলেই ফিরে যাবে। বাসে বসেই নদেরাদ বলে ফেলল, শোনো বউদি, নিমাইদা অবুঝ তোক বলে তার সামনে বলিনি। যে কাজে তোমাকে নামাতে চাইছি তা একটু অন্যরকম।

বীণা চমকে উঠে বলল, কিরকম?

খুব মজার। চাকরির একঘেয়েমি নেই। রংদার কাজ।

 

বনগাঁয়ে বিশ্ববিজয় অপেরা সবে ডানা মেলতে শুরু করেছে। বিশ্ববিজয় অপেরার স্বত্বাধিকারী বিজয় সাহাকে কেউ তার আসল নামে ভাল চেনে না। সবাই জানে কাকা বলে। পঁয়ত্রিশ-চত্রিশ বছর বয়স, কালো, লম্বা, ছিপছিপে চেহারা। অভিনয় তার নেশা। কলকাতার থিয়েটার পাড়া, যাত্রাপাড়া, ফিলমের স্টুডিওতে এতকাল ঘুরঘুর করেছে। সুযোগ পেয়েছিল কয়েকটা, কিন্তু সুযোগ এক কথা, উন্নতি আর এক জিনিস। শেষে একটা যাত্ৰাদলের চাকরি পেয়েছিল সামান্য মাইনের। বনল না। তখন মাথায় রোধ চাপল, কলকাতায় আর নয়। দেশে বনগাঁয়ে ফিরে গিয়ে যাত্ৰাদল খুলবে। কলকাতার পেশাদারদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তবে ছাড়বে।

কিন্তু ভাবা আর করা তো এক কথা নয়। টাকা-পয়সার বন্দোবস্ত নেই, ভাল পালাকার কোথায় পাবে, গানবাজনার লোকই বা কোথা থেকে জুটবে, নটনটী জোটানোও কি সোজা কথা। কিন্তু সবার আগে দরকার টাকা।

নাটকের নেশাই কাকাকে পথ দেখাল। কাছেই বাংলাদেশ বর্ডার। চোরাইচালানের ব্যবসায়ে লোকে টাকা লুটছে। যাত্ৰাদল করতে হবেই, সুতরাং কিছু না ভেবেই সে চোরাইচালানের কাজে নেমে গেল। কাজটা বড় সহজ নয়। প্রথম প্রথম বিপদে পড়ত, মারধর খেত, অ্যারেস্টও হয়েছে। কিন্তু লেগে রইল। ধীরে ধীরে দল তৈরি হল, চোরাই ব্যবসার অলিগলি মুখস্থ হল, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পাকা ব্যবস্থা হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় কথা, টাকা আসতে লাগল হাতে।

টাকা ওড়াত না সে। নেশাভাঙ ছিল না, জুয়া খেলত না, মেয়েমানুষের দোষ নেই! দিনত শুধু যাত্রার ভাবনা তাব মাথায়। কলকাতার নাম-করা অপেরাগুলোর খোতা মুখ সে ভোতা করে ছাড়বে। মফস্বলের দল নিয়ে সে কাপিয়ে দেরে দেশ।

বিশ্ববিজয় অপেরা খুলেছে বছর দুই। গুটি কয়েক পালা করে একটু নামও হয়েছে। তবে সেটা কিছু নয়। বিরূপ চৌধুরীর হাতে পায়ে ধরে দুখানা পালার বায়না করেছে। ঐতিহাসিক পালায় বিরূপবাবুর জুড়ি নেই। গানের জন্য আকাশবাণীর পুরোনো এক গায়ককে ধরেছে। নিমাই পাল। কেউ পৌঁছে না, কিন্তু নিমাইবাবুর অগাধ জ্ঞান। এইসব ফেলে দেওয়া লোককেই দরকার কাকার। কার ভিতর থেকে কোন প্ৰতিভা বেরিয়ে আসবে কে জানে!

প্রতিভা খুঁজবার নেশোটা ছিল বলেই কাকা নদের চাঁদের আনা মেয়েটাকে প্রথম দর্শনেই ভাগিয়ে দিল না। নদেরচাঁদকেও সে একটু খাতির করে। তিন চারখানা বায়না করে দিয়েছে ছেলেটা।

মেয়েটা দেখতে ভাল। ছোটোখাটো পার্টে চলবে। তবে এখনও বড্ড গেয়ো আর জড়োসড়ো। ভয়ে আধখানা হয়ে আছে।

নদেরচাঁদ ধরে পড়ল, একে কাজ না দিলেই নয় কাকা।

 

বলতে নেই, প্রথম দর্শনেই এই কাকা লোকটিকে ভাল লেগেছিল বীণাপাণির। জন্মে সে অভিনয় করেনি। আসার-ভরা লোকের সামনে সে হয়তো কেন্দেই ফেলবে পার্ট করতে উঠে। তবে এই কাকা লোকটি যে আর পাঁচটা মতলবীবাজাদের মতো নয়, এ যে যাত্ৰা-পাগল মানুষ, অন্য ধান্দা নেই, তা দশ-পনেরো মিনিট কথাবার্তার মধ্যেই বুঝতে পারল বীণাপাণি।

তবে বোকা-মাথার বুঝ, সেই বুঝকে তো আর বিশ্বাস নেই। এই তো নদেরচাঁদ চাকরির নাম করে নিয়ে এল। তাকে, বুঝতে পেরেছিল কিছু বীণাপাণি?

শুধু একটা জিনিসই স্পষ্ট বোঝে সে, তার শরীরখানার দিকে সকলের নজর। মেয়েদের চারদিকে পাপের হাজারো পথ। যেদিকেই পা বাড়াও, পথ পায়ের নিচে হাজির হয়ে যায়।

সে বলেই ফেলল, এ কাজ আমি পারব না।

কাকা তার দিকে চেয়ে নিরাসক্ত গলায় বলল, ইচ্ছে না হলে জোর তো কেউ করছে না। জবরদস্তির কাজও নয় এটা। এসব আর্ট, ভালবাসার জিনিস। যদি টান না থাকে তাহলে পারবেও না। তবে এসব কাজ মানুষই করে, অভিনয় করতে তো আর স্বৰ্গ থেকে আসে না। চেষ্টা করলে পারা কঠিন নয়।

আমি ঘরের বউ, এসব যাত্রাপালায় নানা খারাপ ব্যাপার হয়, শুনেছি। মেয়েমানুষের ধর্ম থাকে না।

ধর্ম যে যার নিজের কাছে। আগেই তো বলেছি, জবরদস্তির কিছু নেই। বহু ছেলেমেয়ে ঘুরঘুর করে একটা পার্টের জন্য। এ বাজারে একটা সুযোগ পাওয়াই যে বড্ড কঠিন। কত মানুষকে ফিরিয়ে দিতে হয় রোজ। তোমাকে যে প্রথম চোটেই ফিরিয়ে দিইনি। সেটা কিন্তু মস্ত ব্যাপার। তুমি চাইলে করতে পারো। শিখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, কষ্ট করতে হবে। এ লাইন খুব কঠিন। বাড়ি গিয়ে দেখ। রাজি থাকলে এসো। সামনের মাসেই পালা নামবে।

প্রথম দিন এর বেশী কথা হয়নি। কাকা ব্যস্ত লোক। সবসময়ই তার ঘরে ভিড়।

বাইরে এসে নদেরচাঁদ বলল, দিলে তো ড়ুবিয়ে! ওরকম বেঁকে বসলে কেন বলো তো! সারাক্ষণ যে পাখি-পড়া করে শিখিয়ে আনলুম।

শেখালেই হল! এক কথা বলে নিয়ে এলে, পরে দেখি আর এক ব্যাপার। তুমি ভীষণ খারাপ লোক।

এ বাজারে এ এক মস্ত সুযোগ তা জানো? কত বিদ্যোবুদ্ধি নিয়ে বেকার ছেয়েমেয়েরা বসে আছে তা দেখছ না?

আমি এসব পারব না।

সে তো বুঝতেই পারছি। আমার বাসভাড়াটাই জলে গেল।

শেষ অবধি জলে গেল না। বাড়ি ফিরে সকলের নানা প্রশ্নে ভাসা-ভাসা জবাব দিয়ে সে গভীর রাত অবধি নিবিষ্ট হয়ে ভাবল। সামনে তার অনেক বিপদ। তার মধ্যেই যেন একটু ডাঙা জমি হল ওই কাকা।

পরের সপ্তাহে ফের বনগাঁয়ে নদের চাঁদকে নিয়ে হাজির হল বীণাপাণি। কাকার সামনে সতেজে দাড়িয়ে অকম্পিত গলায় বলল, পার্ট দিন, করব।

তাহলে রোজ রিহার্সালে আসতে হবে। কঠিন কাজ। তোমার কোনও ট্রেনিং নেই। শিখতে সময় লাগবে, খাটতে হবে খুব।

আমাকে কত মাইনে দেবেন?

মাইনে! দল না দাঁড়ালে মাইনে আসবে কোথা থেকে? এ কি কলকাতার পেশাদার দল! শুধু পয়সার লালচ থাকে এসো না, তাতে লাভ নেই। অভিনয় অন্য জিনিস।

অন্য জিনিস তো বটেই। সিনেমা থিয়েটার কিছু দেখেছে বীণাপাণি। সিনেমার হিরো হিরোইনদের অনেক পয়সা আছে বলেও শুনেছে কিন্তু এই লাইন তার চেনাজানা জগতের বাইরে।

পারবে?

বীণাপাণি কাদো কাদো হয়ে বলল, আমার বরের খুব অসুখ। বাড়িতে হাঁড়ি চড়ছে না। আমার একটা ব্যবস্থা না করে দিলে কি করে পারব?

কাকা মৃদু হেসে বলে, সকলের গল্পই একরকম, বুঝলে? এদেশে কেউ সুখে নেই। সকলেরই নানা বিপদ। তবে সেসব সয়ে বয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

কিন্তু নদেরচাঁদ আমাকে বলেছিল। আপনি চাকরি দেবেন।

নদেরচাঁদ জানে না বলেই বলেছে। তবে তোমাকে আমি ঠিকাব না। যদি লেগে থাকো, দল যদি দাঁড়ায় তবে ভালই পাবে। এখন অবশ্য থোক টাকা না দিলেও খাওয়া-পরা পাবে, থাকার জায়গা দেবো। কিছু হাতখরচ।

বীণা হাত পেতে কাকার দেওয়া পঞ্চাশটা টাকা প্ৰায় ভিক্ষে হিসেবে নিল। সেই টাকা পেয়ে শ্বশুরবাড়ির সকলেই খুশি। তাকে বনগাঁয়ে রহস্যময় চাকরিতে পাঠাতে কারও কোনও আপত্তি হল না। শুধু ধুকতে ধুকতে নিমাই বলল, বনগাঁ যে অনেক দূর!

নদেরচাঁদ বলল, কিসের দূর! দুনিয়াটা কি আর আগের মতো আছে নিমাইদা? লোকে কলকাতায় ঘুম থেকে উঠে রাত্তিরের খাবার আমেরিকায় খায়, তা জানো? দুনিয়াটা এই একটুখানি হয়ে এসেছে। পালপাড়া থেকে বনগাঁ যদি দূর তাহলে নাক থেকে কানটাও দূর।

ডাঙা থেকে কুমীরটা শেষ অবধি তাকে বিপদসঙ্কুল জলে টেনে নামালই। হাবুড়ুবু কিছু কম খেয়েছে বীণাপাণি! তবে না শক্তিপোক্ত হয়েছে! বনগাঁয়ে তাকে আসতে হয়েছিল একা। যাত্ৰাদলের আর একটা মেয়ের বাড়িতে কাকা তার থাকবার ব্যবস্থা করে দিল। তিন মেয়ে নিয়ে বিধবা মায়ের সংসার। বুড়ি একটু ভাল মানুষ গোছের। বড় মেয়ে একটা স্কুলে পড়ায়, সংসার তারই কাঁধে। মেজো একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে বসে চলে গিয়েছিল, ফেরত এসেছে। ছোটো মেয়ে সীমা যাত্ৰাদলে ঢুকে পরে সিনেমায় নামবার স্বপ্ন দেখছে।

প্রথম প্রথম লজ্জা, ভয়, অনভ্যাস আর অস্বস্তিতে রিহার্সালের পর রিহার্সালে বকুনির পর বকুনি খেত বীণাপাণি। রাতে শুয়ে কাদত আর সীমা তাকে সান্তুনা দিত। একমাস তাকে খাঁটিয়ে জেরবার করে দিল কাকা। তারপর ভরাভর্তি আসরে একটা ছোটো রোলে সত্যিই নেমে পড়ল বীণাপাণি। কোনওরকমে পার্ট মুখস্থ বলে যেতে পারল।

কাকা তার মধ্যে কী দেখেছিল কে জানে! এর পরও তাকে দল থেকে তাড়ায়নি, বরং উঠে-পড়ে লাগল তাকে তৈরি করতে। শুরু হল বেদম খাটুনি। কাকা বলতে লাগল, এবার বড় রোল দিচ্ছি, কিন্তু দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই রোলটা। ভাববে। ভাববে। তুমি দময়ন্তী, তুমিই দময়ন্তী, দময়ন্তী ছাড়া আর কেউ নও।

তাই ভেবেছিল বীণাপাণি। দ্বিতীয়বার একই পালায় অন্য ভূমিকায় নেমে তার আর বিশেষ ভয় হল না। খানিকটা সহজভাবে পার্ট করে গেল। নল-দময়ন্তী দিয়ে চাঁদপাড়া, চাকদা, বড় জাগুলিয়া, কাঁচড়াপাড়ায় বেশ লোক টানল বিশ্ববিজয় অপেরা। ততদিনে পাকাপোক্ত হয়ে উঠল বীণাপাণি। নেশা ধরল অভিনয়ের।

সবচেয়ে বড় কথা হাতে টাকা আসতে লাগল। আর বেনোজলে ভেসে আসতে লাগল যতেক কামট কুমীর। ডাঙা থেকে তাকে জলে টেনে নামানোর অপেক্ষায় যারা ছিল। তাদের কাছে মেয়েছেলে মানে মেয়েছেলেই। তার বেশি আর কিছু নয়। কে আর্ট করে, কে লেখাপড়ায় ভাল, কার গানের গলা আছে বা লেখার হাত আছে সে সব নিয়ে বেশির ভাগ পুরুষেরই মাথাব্যথা নেই। মেয়েমানুষের গুণকে তারা মোটেই দাম দিতে চায় না। তাদের কাছে শরীরটাই আসল কথা।

শরীর বাঁচাতে বীণাপাণিকে কম কূটবুদ্ধি খাটাতে হয়নি। দু-একজন তো খুন করারও হুমকি দিয়েছিল।

শরীরের জন্য একজন পাহারাদার দরকার ছিল। সে চৌকিদার স্বামীর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে? নিমাই যতই সামান্য মানুষ হোক, তবু কলেরা-বসন্তের টীকার মতো স্বামীরও কিছু উপকার আছে। যাত্রায় নামবার ছমাস বাদে নিমাইকে আনতে গিয়েছিল বীণাপাণি। সে বনগাঁয়ে একখানা ঘর ভাড়া করেছে, নতুন চৌকি কিনেছে।

বীণাপাণির টাকায় ওষুধ-পথ্য করে নিমাই তখন শক্ত অসুখ থেকে খাড়া হয়েছে। ফলের দোকানে বসেছেও। বীণাপাণিকে দেখে তার অভিমান আকাশে উঠল বুঝি। বাকা গলায় বলল, আমাকে আর তোমার কিসের দরকার।

বীণাপাণি অবাক হয়ে বলে, দরকারের কথা ওঠে কেন? আমি তোমার বিয়ে-করা বউ, নাকি?

সে ছিলে কোনওদিন।

আজ নয়?

নিমাই মাথা নিচু করে বলল, আজ আর আমি কে! তোমার কত মোসাহেব জুটেছে।

মোসাহেব অত সস্তা নয়। যাত্রায় নামলেই বুঝি মোসাহেব জোটে? এখনও আমাকে কেউ পাত্তাই দেয় না। সবে তো একটু-আধটু শিখেছি, আড় ভাঙছে।

যাত্রায় নামলে কেন? আমি তো বেঁচে ছিলুম।

বাঁচতে না। ঠিক সময় ওষুধপত্র না পড়লে মরতে হত। ভাগ্যিস পালা দুটো ভাল চলল, তাই কাকা খুশি হয়ে মাস কয়েক হল তিনশো টাকা মাইনে দিচ্ছে।

এই কাকাটি কে বলো তো! খুব শুনছি। তার কথা।

কাকার কথা বলার সময় কেমন যেন ভক্তিতে গদগদ হয়ে পড়ে বীণাপাণি। ভারী গলায় বলল, ওরকম মানুষ দেখিনি। নাটক আর অ্যাকটিং নিয়ে সারাক্ষণ বুদ হয়ে আছে। অন্য কোন দিকে মন নেই।

কিন্তু আমি শুনেছি লোকটা স্মাগলার।

সেটাও মিথ্যে শোনোনি। কাকা নাটকের জন্য বুঝি সব করতে পারে। এই যেমন তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি হায়া লজ্জা বিসর্জন দিয়ে যাত্রায় নামলুম, ঠিক তেমনি। ভালবাসার জিনিসকে বাচাতে মানুষ সব করতে পারে। কাকা স্মাগলিং করেছে। যাত্রার দল বানাবে বলে।

তাহলে তাকে কি ভাল লোক বলা যায়?

একবার চলো না বনগাঁয়ে, দেখা হোক, কথাবার্তা হোক, তারপর নিজেই বুঝতে পারবে কেমন লোক।

আমি এই বেশ আছি বীণা।

বোকা শ্বশুর আর শাশুড়ি ছেলে আর ছেলের বউয়ের আড়াআড়ি দেখে ভয় খেল। খুব স্বাভাবিক। বউ টাকা রোজগার কুরুন্টু ভুৱা সেই টাকায় দুটি খেতে পরতে পাচ্ছে। ছেলে আর বউতে আড়াআড়ি ছাড়াছাড়ি হলে তাদেরই বিপদ। পেটে টান পড়বে।

দুই বুড়োবুড়ি তখন ছেলেকে নিয়ে পড়ল, কাজটা খারাপ কেন হবে? সিনেমা থিয়েটারে আজকাল কত বাবুঘরের মেয়েরা নামে। পাশ-টাশ করা সব মেয়ে। ওসব এখন আর কেউ ধরে না।

শাশুড়ি গোপনে তাকে এমন কথাও বলল, মনিবকে খুশি রেখো। মনিব অন্নদাতা ভগবান। শরীর যদি ঐটোকাটা হয়ে পড়ে তো গঙ্গায় ড়ুব দিয়ে এলেই সব পাপ ধুয়ে ফর্সা।

গুণ একখানা ছিল নিমাইয়ের। মা-বাপের ওপর ভক্তি। শেষ অবধি যে সে বনগাঁয়ে বউয়ের ঘর করতে এল সে। ওই মা-বাপের জন্যই। তাদের কথায় বা আদেশে ততটা নয়, যতটা তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

শ্বশুরমশাইয়ের খুব ইচ্ছে, বনগাঁয়ে গিয়ে ব্যাটা-বউয়ের সঙ্গে থাকে। সেটা হতে দিল না নিমাই। বলল, আগে আমি গিয়ে সব বুঝে আসি, তারপর দেখা যাবে।

বনগাঁয়ে এসেই যে নিমাই সব বুঝতে পারল, এমন নয়। তবে বীণাপাণি যে ভারী ব্যস্ত মানুষ এবং তাকে যে সেই গ্ৰাম্য সরল বোকা বিউটির মতো আর পাওয়া যাবে না সেটা টের পেতে তার দেরী হল না। এতে তার অভিমান হতে লাগল, সে বেকার লোক, সারাদিন কাজ নেই বলে বসে থাকে, আর তার বউ সকাল-বিকেল রিহার্সাল দিতে যায় নাওয়াখাওয়ার সময় নেই-এটা ভাল লাগার কথাও নয়। তার ওপর পালা নিয়ে বাইরে যাওয়া তো আছেই। হয়তো দু রাত্তির তিন রাত্তির ফেরেই না। বউয়ের রেশ নামডাক হচ্ছে চারদিকে। লোকে পথে-ঘাটে বাজারহাটে নিমাইকে টিটকিরি দেয়। তাই থেকেই বোঝা যায় যে, বউয়ের নামডাক হচ্ছে।

নাম হচ্ছিল বিশ্ববিজয় অপেরার। বারাসতে নিখিল বঙ্গ যাত্ৰা উৎসবে বিশ্ববিজয় অপেরার দুখানা পালা হল, দুখানাই মুকুট, কলকাতার দলগুলোর মতো অত হ্যান্ডস নেই তাদের, নামডাকের অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই, তবু বিশ্ববিজয় ফাটিয়ে দিল।

বীণাপাণি সবে তার ঘরবন্দী নারীত্বের খোলস ছেড়ে হাজার মানুষের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার অদ্ভুত মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে, এরকম সময়ে ঘরে ফিরে সে রোজ একখানা বিমর্ষ অন্ধকার মুখ দেখে খুশি হবে কেন? দেখে দেখে তেতো হয়ে যেতে লাগল।

কী হয়েছে তোমার বলো তো? আমন গোমড়া মুখ করে থাকো কেন?

নিমাই ঝগড়া করত না। ঝগড়াঝাঁটি, খিটিমিটি তার মোটে আসেই না। সে হল পান্তা-পুরুষ। জলে ভেজা, ঠাণ্ডা। শুধু ডাইনে বাঁয়ে মাথা নেড়ে একটা নেতিবাচক ভঙ্গি করে। তার বেশি কিছু নয়। মাঝে মাঝে কাতরভাবে বলত, আমার যে এখানে করার কিছুই নেই। একটু কিছু না করলে কী হয়?

যাত্রার দলে লোকলঙ্কর লাগে। সে-কাজে ঢোকাতে চেয়েছিল বীণাপাণি, নিমাই রাজি হচ্ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।

কিসের বাড়াবাড়ি তা আর ভাঙল না।

বছর দুই এইভাবে চলল। বীণাপাণি জমি কিনে ফেলল বনগাঁয়ে। দুখানা ঘর। নিমাই নিজেই তত্ত্বাবধান করল, কিন্তু উদাসীনভাবে। বীণাপাণির যে হচ্ছে তাতে যেন ওর কিছুই না। বীণা ভারী বিরক্তি বোধ করে নিমাইয়ের ওপর।

ওর কিছুই কি ভাল লাগে না বীণার। লাগে। যখন খুব ভোরবেলা ঘুমচোখে সে শুনতে পায়, নিমাই উঠে বারান্দায় বসে সুরেলা গলায় প্রভাতী গাইছে। ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ শুনতে শুনতে গায়ে কাটা দেয়। নিমাইয়ের আর একটা ব্যাপারও ভাল লাগে বীণার। তার বাবার সঙ্গে নিমাইয়ের আবছা একটা মিল আছে। দুজনেই ভারী নিরীহ।

বাইরে আজ মেঘলা দিন। গুড়ো বৃষ্টির একটা আবছায়া চারদিকে। এইসব দিন বীণাপাণির পক্ষে খারাপ, বিশ্ববিজয় অপেরার পক্ষে খারাপ। বর্ষাকালে বায়না নেই-ই প্রায়। এবারের ভারী বর্ষায় কয়েকটা বুঝায়না কেঁচেও গেছে। আজকাল আর হাত পা ঠুটো করে ঘরে থাকা তার ভাল লাগে না। ঘর যেন গারদ। আর এমন দরকচা-মারা দিনে ওই লোকটা বাক্স গুছিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পায়তাড়া কষছে। দুধকলা দিয়ে কাল-সাপ পোষারই সামিল হল বোধহয় ব্যাপারখানা।

অথচ এমন কি ব্যাপারটা ছিল? কাকার দলের ছেলেদের সঙ্গে বীণাপাণির চেনাজানা অনেকদিনের। যাত্রার দলে তারাও মাঝে মাঝে ভিড়ে যায়। আবার বর্ডার পেরিয়ে মালও নিয়ে আসে রাতবিরেতে। তারা কে কেমন লোক অত জেনে দরকার নেই। বীণার। তবে তারা মাঝে মাঝে জিনিসপত্র গচ্ছিত রেখে যায় তার কাছে। একবেলা আধবেলা পর নিয়ে যায়। এদের একজন পগা। বীণা তাকে বেশ একটু পছন্দ করে। ভারী মিষ্টি তার কথাবার্তা। চোখ দুখানা বড্ড ভাবালু। তার কাছে অনেক টাকা থাকে, ডলার থাকে, পাউন্ড থাকে। সে টাকারই কারবারি। সোনার বিকিকিনিও করে বলে শুনেছে বীণাপাণি। তবে সে কারোরই হাঁড়ির খবর নিতে যায় না। বন্ধুর মতো সম্পর্ক রেখে চলে। পগা মাঝে মাঝে তার কাছে মস্ত এক-একটা প্যাকেট জিম্মা রেখে যায়। সন্ধের পর সে যায় জুয়া খেলতে আর মদ খেতে। সঙ্গে বেশি টাকা থাকলে চোট হয়ে যেতে পারে। বীণাপাণি রেখে দেয়, কোনও কৌতূহল প্রকাশ করে না।

এ ব্যাপারটা নিয়েই নিমাইয়ের বড় অশান্তি। বারবার বলে, ওসব ছোকরাদের জিনিস গচ্ছিত রাখা ঠিক হচ্ছে না। কোনটা কী জিনিস কে জানে। হয়তো অন্ত্রটন্ত্রই রেখে গেল একটা ন্যাকড়ায় মুড়ে, বা বোমা।

অস্ত্ৰও থাকে, তবে সেটা আর নিমাইকে বলেনি বীণা। সে শুধু বলল, এ জায়গায় থাকলে হলে এদের সঙ্গে ভাব রেখেই থাকতে হয়। এরা বন্ধু থাকলে ভয় নেই।

এ ব্যাপারটা আমার বড় অশান্তির কারণ হচ্ছে।

বীণাপাণি এই ঘ্যানঘ্যান শুনে শুনে পরশু আর সহ্য করতে পারেনি। খুব এক তরফা ঝেড়েছে নিমাইকে। মুখে কোনও কথা আটকায়নি। শেষ অবধি বলেছে, তুমি এ বাড়ি থেকে বিদেয় হও। এখানে আর জায়গা হবে না।

কথাটা বলার সময় খেয়াল হয়নি যে, নিমাইকে সে যেচে নিয়ে এসেছিল।

এখন নিমাই ওই বাক্স গোছানো শেষ করে চুপচাপ বসে আছে। চোখ দুটো ছলছলে। কিছু বলবে বলে মনে করছে, কিন্তু কথা আসছে না মুখে। এত রাগারগি করল সেদিন বীণাপাণি, একটিও জবাব দেয়নি। বড় নিরীহ।

আর এত নিরীহ বলেই রেগে যায় বীণাপাণি। সে শুধু চেয়ে আছে এখন। নিমাই চলে গেলে এ বাড়িতে একা থাকবে বীণাপাণি। একটু একা লাগবে। তা লাগুক।

এখন দুজনে ঝুম হয়ে বসে আছে। বীণা তাকিয়ে আছে নিমাইয়ের দিকে। চোখে জ্বালা, রাগ আক্রোশ; নিমাই চোখ নিচু করে বসে আছে মেঝোয়। ঘরে ছুচ পড়লে শোনা যায়। লোকটার কোনও দাম নেই বাইরের দুনিয়ায়। শুধু বীণাপানির কাছে কিছু আছে। এক কানাকড়ি হলেও আছে। তবু আস্পর্ধা দেখ।

চোখে জল আসছিল বীণাপাণির। আঁচলটা চোখে তুলতে যাবে, ঠিক এই সময়ে জানলা দিয়ে একটা মুখ উঁকি দিল। পাড়ার একটা ছেলে।

বীণাদি, খবর শুনেছো? পগা কাল রাতে বটতলায় খুন হয়েছে।

অ্যাঁ!

লাশ ঘিরে দারুণ ভিড়। পুলিশ এসেছে। বলেই ছেলেটা চলে গেল।

নিমাই মুখ তুলে বীণার দিকে চাইল।

কাল রাতে পগা মস্ত একটা প্যাকেট রেখে গেছে বীণার কাছে। তাতে অনেক টাকা।

Share This