০৩. কর্মপ্রেরণা

কর্মপ্রেরণা – MOTIVATION
প্রতিদিন কিভাবে নিজেকে ও অন্যদের অনুপ্রাণিত করবেন
Motivating yourself and others everyday.
অধ্যায় : ৩

দুটি ধারণা পরীক্ষিত সত্য (১) অধিকাংশ লোকই ভালো লোক, তারা আরও ভালো করতে পারেন। (২) অধিকাংশ লোকই জানেন কী করা দরকার; কিন্তু তারা করেন না।

যে জিনিসটা কর্মীদের মধ্যে অনুপস্থিত তা হল একটা স্ফুলিঙ্গ অনুপ্রেরণা।

কোন কোন স্বশিক্ষার বইয়ে কী করা প্রয়োজন এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। আমরা একটি ভিন্ন পদ্ধতি নিতে চাই। এই প্রশ্নটি প্রথমেই করি, কাজটি আপনি করছেন না কেন? রাস্তার পথচলতি মানুষদের ও কাজের ক্ষেত্রে কী করা অতি প্রয়োজন জিজ্ঞেস করলে তারাও ঠিক ঠিক জবাব দিয়ে দেবেন। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা যায় তারা সেই মতো কাজ করেছেন কি? তাহলে জবাব হবে না। যে জিনিসটি অনুপস্থিত তা হলো কাজ করার ইচ্ছার অভাব। মানুষের বিশ্বাসের মধ্যেই থাকে কর্মপ্রেরণার উৎস। এর অর্থ, যে কাজ করবে সেই কাজের পদ্ধতি ও ফলাফলের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখবে এবং কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্বগ্রহণ করবে। এই ক্ষেত্রে কর্মপ্রেরণাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ যখন তার কর্মের ও ব্যবহারের দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন জীবনের প্রতি তার দৃষ্টি ভঙ্গি হয় ইতিবাচক। তখনই ব্যক্তিজীবনে এবং কর্মজীবনে তারা গঠনমূলকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়। জীবন অনেক অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে এবং জীবনে পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া যায়।

মানুষের শারীরিক প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হলে ভাবাবেগের প্রয়োজনীয়তাই হয় মানুষের বৃহত্তর চালিকাশক্তি। মানুষের কর্মোদ্যোগ ক্ষতি অথবা লাভ এই দুই উদ্দেশ্যের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। যদি প্রাপ্তি ক্ষতির থেকে বেশি হয় তবে সেইটিই হয় চালিকাশক্তি। আর যদি প্রাপ্তির থেকে ক্ষতি বেশি হয় তবে তা কর্মোদ্যোগকে ক্ষুন্ন করে।

প্রাপ্তি পার্থিব এবং বাস্তব হতে পারে যেমন আর্থিক পুরস্কার, ছুটি উপহার ইত্যাদি। আবার প্রাপ্তি অপার্থিবও হতে পারে যেমন কাজের স্বীকৃতি ও প্রশংসা উপলব্ধি, অভীষ্ট লাভের আনন্দ, পদোন্নতি, সার্বিক উন্নতি, দায়িত্বশীলতা, চরিতার্থতা, আত্মশক্তি অর্জন, দক্ষতা অর্জন এবং বিশ্বাস।

উদ্বুদ্ধ হওয়া ও কাজে প্রেরণা পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? (What is the difference between inspiration and motivation)

আমি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সেমিনার সংগঠন করে থাকি; অনেকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন আমি অপরকে অনুপ্রাণিত করতে পারি কিনা। আমার জবাব, না, আমি পারি না। মানুষ নিজেই নিজেকে অনুপ্রাণিত করে। আমি যা করতে পারি তা হলো, অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারি। আমরা অনুপ্রেরণা হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হলে তাদের প্রয়োজন ও অভাবগুলিকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা দরকার। অনুপ্রেরণা এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। যারা কেবলমাত্র চাকরি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কাজটুকুই করেন তারা সংস্থার পক্ষে কখনই অপরিহার্য বলে গণ্য হবেন না।

উদ্বুদ্ধ হওয়ার অর্থ চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, আর প্রেরণা হচ্ছে কাজের গতি ও পদ্ধতির পরিবর্তন। অনুপ্রেরণা খানিকটা আগুনের মতো-যদি ইন্ধন জোগানো না যায় তা হলে নিভে যায়। খাদ্য ও ব্যায়ামজাত পুষ্টি যেমন চিরকাল থাকে না। তেমনি কর্মপ্রেরণাও চিরস্থায়ী নয়। তবে মূল্যবোধের গভীরতর বিশ্বাস যদি কর্মপ্রেরণার উৎস হয় তাহলে কর্মপ্রেরণা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কী কী বস্তু সবচেয়ে বেশি কর্মপ্রেরণা জোগায়? অর্থ? স্বীকৃতি।

জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন? যাদের পছন্দ করি সেই সমস্ত মানুষের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা? এর সবগুলিই কর্মপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

অভিজ্ঞতায় দেখা যায় মানুষ অর্থের জন্য অনেক কিছু করতে পারে, একজন ভালো নেতার জন্য আরো বেশি করতে পারে, আবার নিজের বিশ্বাসের প্রেরণায় অনেক বেশি করতে পারে। পৃথিবীতে এরূপ ঘটনা প্রত্যেকদিন উদ্দেশ্য এই যে যখন আমরা বিশ্বাস করব যে আমরাই আমাদের জীবনযাত্রা ও ব্যবহারের জন্য দায়ী তখন আমাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টি ভঙ্গিও উন্নততর হবে।

কর্মপ্রেরণার নতুন সংজ্ঞা (Lets redefine motivation)

এরপরের যুক্তি-সম্মত প্রশ্ন হোল, কর্মপ্রেরণা কী? কর্মপ্রেরণা হচ্ছে সেই মনোভাব যা কর্মে ও কর্মচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে। কর্মপ্রেরণার অর্থ কর্মে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা পাওয়া। তাছাড়াও প্রেরণা মানুষের কর্মদক্ষতাকে উজ্জীবিত ও কর্মচিন্তাকে প্রজলিত করে। কর্মপ্রেরণা শক্তিদায়ী। মনে বিশ্বাস উৎপাদন করে, দৃঢ় প্রত্যয়ী করে, চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে। এক কথায় বলতে গেলে, কর্মপ্রেরণার সংজ্ঞাই হচ্ছে কাজের জন্য গভীর আগ্রহের সৃষ্টি। এটি এমনই এক শক্তি যা আক্ষরিক অর্থে জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।

আমরা কর্মপ্রেরণা পেতে চাই কেন?

কর্মপ্রেরণাই জীবনের চালিকা শক্তি। সাফল্যের অদম্য আকাঙক্ষা থেকেই কর্মপ্রেরণার জন্ম। সাফল্য ছাড়া জীবনে কোনও গৌরব নেই, কাজও উপভোগ্য হয় না, কাজে উত্তেজনা থাকে না আর পরিবারেও থাকে না আনন্দ। জীবনটাকে একটা অসম চাকার গাড়ি বলে মনে হয় যা কেবল ধাক্কা খেতে খেতে চলে। কর্মপ্রেরণার চরম শত্রু হচ্ছে আত্মতুষ্টি। আত্মতুষ্টির ফলে আসে নৈরাশ্য এবং নৈরাশ্য কর্মবিমুখ করে, কারণ কোন কাজটি গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণ করার বোধশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

কর্মপ্রেরণা কিভাবে কাজ করে? (Motivation-how does it work?)

কর্মপ্রেরণার মূল উপাদনাগুলিকে যদি অনুধাবন করা যায় তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্যকেও অনুপ্রাণিত করা যায়।

নিজের অন্তরের কর্মপ্রেরণাই চালিকাশক্তি, এবং এই প্রেরণাই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। বস্তুতপক্ষে এই মনোভাব এমনভাবে সঞ্চারিত হয় যে অন্যান্য সহকর্মীদেরও একই প্রেরণা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে উদ্বুদ্ধ করে। কিভাবে কোন ব্যক্তি তার কর্মপ্রেরণা বজায় রাখে এবং লক্ষ্যে স্থির থাকে?

এই উদ্দেশ্যে অ্যাথলিটরা অনেকদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেনতার নাম অবচেতন মনের ইঙ্গিত পাওয়ার চেষ্টা বা স্বাভিভাব। এই স্বাভিভাব ইতিবাচক অতীত বা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত নয়; বর্তমানে কিভাবে পারদর্শিতা বাড়ানো যাবে তার ইঙ্গিত। বারবার এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক কথায় এটি একটি ইতিবাচক আত্মকথন।

কর্মপ্রেরণা দুই প্রকারের বাহ্যিক ও আন্তরিক।

বাহ্যিক কর্মপ্রেরণা (External motivation)।

অর্থ, সামাজিক স্বীকৃতি, খ্যাতি কিংবা ভয় এগুলি হল বাহ্যিক কর্মপ্রেরণা। যেমন বাবা মায়ের হাতে মার খাবার ভয়ে কোন কাজ করা বা কোন কাজ থেকে বিরত থাকা, চাকরি থেকে বিতাড়িত হবার ভয়ে কাজ করা, এগুলি হলো বাহ্যিক কর্মপ্রেরণার উদাহরণ।

একটি কোম্পানী কর্মীদের জন্য পেনসন পরিকল্পনা চালু করল। কিন্তু জন নামক এক কর্মী ছাড়া সবাই সেই পরিকল্পনায় যোগ দিল। পরিকল্পনাটি কর্মচারীদের স্বার্থের পক্ষে উত্তম। জন কিন্তু একলাই এই পরিকল্পনায় অংশ নিল না, যদিও তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং বন্ধুরা অনেক বোঝাল তবুও জন্ তার সিদ্ধান্ত বদলাল না।

একদিন কোম্পানীর মালিক জনকে ডেকে বলল, তোমার সমানে আছে কাগজ ও কলম, হয় তুমি পেনসন পরিকল্পনায় যোগ দাও নয়, তুমি এই মুহূর্তে ছাটাই। জন্ সঙ্গে সঙ্গে সই করল। মালিক যখন জিজ্ঞেস করল, সে এতদিন পরিকল্পনায় সেই করেনি কেন। জন বলল, পরিকল্পনাটি আপনি যেভাবে ব্যাখ্যা করলেন সেভাবে আর কেউ আমাকে ব্যাখ্যা করেননি।

ভয়ের ফলে কাজের আগ্রহ (Fear mitivation) কর্মস্থলে ভীতি কখনো কখনো কার্যসিদ্ধির পক্ষে সুবিধেজনক।

  • ভয়ে তাড়াতাড়ি কাজ নিষ্পন্ন হয়।
  • ভয়ের ফল তাৎক্ষণিক।
  • কর্মীর মনে ভীতি থাকলে ক্ষতি কম হয় কারণ কাজটি সময়ের মধ্যে নিষ্পন্ন কর যায়।
  • সাময়িকভাবে কর্মীর কর্মদক্ষতার উন্নতি হয়। কাজের গতি বৃদ্ধি পায় (Performnce goes up)

প্রায়ই দেখা যায় যে শিকার শিকারীর থেকে বেশি জোরে দৌড়ায় কারণ শিকারী দৌড়া খাদ্যের প্রয়োজনে আর শিকার দৌড়ায় প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে।।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ক্রীতদাসেরা পিরামীড তৈরি করেছে সর্বদাই তাদের উপর নজর রাখতে হতো এবং শাসন করতে হতো। কাজ করবার জন্য কর্মপ্রেরণার উৎস হিসাবে ভীতির কতকগুলি সীমাবদ্ধতা আছে:

  • ভয় বাহ্যিক ব্যাপার। যতক্ষণ পর্যন্ত মালিক বা উপরওয়ালা উপস্থিত থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ভয় থাকে। তারা চোখের আড়াল হলে ভয় চলে যায়।
  • ভয় মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
  • কাজের পরিধি নির্দেশটুকু মানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
  • সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয়।
  • ভয় কর্মপ্রেরণার উৎস হলে এই প্রেরণা বজায় রাখতে ভয়কে ক্রমাগত বাড়াতে হয়।

এক খদ্দের একজন কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কবে থেকে এখানে কাজ শুরু করেছ? কর্মচারীটি বলল যেদিন থেকে মালিক আমাকে তাড়িয়ে দেবে বলে ভয় দেখিয়েছে, ভয় এখানে কাজের প্রেরণা।

আর্থিক অনুদানজনিত কমপ্রেরণা (Incentive motivation)

বোনাস, লভ্যাংশ, স্বীকৃতি ইত্যাদি উৎসাহ বর্ধন করেও বাহ্যিক অনুপ্রেরণা জোগায়।

এই ধরনের উৎসাহবর্ধক অনুপ্রেরণার কতকগুলি সুবিধে আছে। প্রধান সুবিধে হলো, যে যতক্ষণ পর্যন্ত উৎসাহ বর্ধনের কারণটি বর্তমান থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত কর্মপ্রেরণাও অটুট থাকে। গাধার সামনে গাজর ঝুলিয়ে রাখলে সে গাজরে লোভে গাড়ি টেনে চলবে। কিন্তু এই কৌশল সফল হবে তখনই যতক্ষণ পর্যন্ত গাধাটি ক্ষুধার্ত থাকবে, গাজর খাবার উপযোগী হবে এবং গাড়িটির ভার থাকবে গাধার বহন ক্ষমতার মধ্যে। মাঝে মাঝে গাধাকে গাজর খেতেও দিতে হবে, নইলে গাধা উৎসাহ পাবে না। আবার গাধার পেট যদি ভরে যায় তখন পুনরায় ক্ষুধার্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের ব্যবসার জগতে এই রকমই দেখা যায়। সেলসম্যানরা যখন দেখে যে তাদের বিক্রির জন্য নির্ধারিত মাল বিক্রি হয়ে গেছে তখন তারা আর কাজ করে না। তাদের কাজের প্রেরণা কেবলমাত্র নির্ধারিত জনিসগুলি বিক্রি করা তার বাইরে কিছু করার প্রেরণা তাদের নেই। এটি বাহ্যিক প্রেরণা মান্তরিক নয়।

আমাদের সবারই ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কর্মপ্রেরণা আছে। (we are at motivated either positively or negatively)

টরেন্টোতে আমি দুই ভাইয়ের গল্প শুনেছিলাম, একজন মাদকাসক্ত ও মদ্যপ। স্ত্রী ও পরিবারের অন্যদের প্রায়ই মারধোর করত। অন্যজন সফল ব্যবসায়ী। সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী পরিবার। কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে উঠত যে একই বাবা-মায়ের দুই ছেলে একই আবহাওয়াতে মানুষ হয়েও তাদের মধ্যে এত তফাৎ হল কেন?

প্রথম ভাইকে জিজ্ঞেস করা হল যে সে কেন মাদকাসক্ত ও মদ্যপ। এবং কেন স্ত্রীকে মারধোর করে? লোকটি উত্তর দিল, আমার বাবা ছিলেন মাদকাসক্ত, মধ্যপ এবং সে তার স্ত্রী ও আমাদেরও মারধোর করত সুতরাং আমি আর অন্য কী হতে পারি?।

অন্য ভাইকে একই প্রশ্ন করতে জবাব দিলেন যে তার সাফল্যের কারণও তার বাবা। তনি বললেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাবাকে দেখেছি মদ খেয়ে অনেক খারাপ কাজ করতে। আমি স্থির করলাম যে আমি এরকম হবে না। তাই আমি মাতাল নই, মাদকাসক্তও নই। আমি একজন সফল ব্যবসায়ী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে একই দৃষ্টান্তকে একজন সদর্থকভাবে অনুসরণ করেছে আর একজন নঞর্থক মনোভাব নিয়ে অনুসরণ করেছে।

বিভিন্ন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন বিষয় থেকে কর্মপ্রেরণা পায় (Different things motivate different people)

অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণার উৎস অন্তরের মধ্যেই থাকে। যেমন গর্ববোধ, স্বীয় কৃতিত্বের সম্পর্কে ধারণা; দায়িতুবোধ এবং গভীর বিশ্বাস।

একটি তরুণ নিয়মিত অনুশীলন করত কিন্তু সবসময় অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের দলেই থাকত। কখনো ১১ জনের ফুটবল দলে সুযোগ পায়নি। যখন অনুশীলন করত, তার বাবা দূরে বসে দেখত।

একবার চারদিন ফুটবল প্রকিযযাগিতা চলল। কিন্তু একদিনও ছেলেটিকে দেখা গেল। সে অনুশীলনেও এল না। হঠাৎ ফাইনালের দিন এসে হাজির। কোচের কাছে গিয়ে ছেলেটি বলল, আপনি সবসময় আমাকে অতিরিক্ত খেলোয়ার হিসাবে রেখেছেন এবং কখনো ফাইনাল খেলতে দেননি। আজ আমাকে খেলতে দিন।কোচ জবাব দিলেন, তাই আমি দুঃখিত তোমাকে খেলতে দিতে পারিনা। তোমার থেকেও ভাল খেলোয়ার আছে আর তাছাড়া আজকে ফাইনাল খেলা, ফুলের সম্মানের ব্যাপার। এখানে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাইনা। ছেলেটি অনুনয় করে বলল, আমি কথা দি আমি আপনার মুখ রাখব। দয়া করে আজকে খেলতে দিন। কোচ ছেলেটির এত অনুনয় বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, ঠিক আছে, আজ তুমি খেলবে কিন্তু মনে রাখবে সবদিক বিচার করে দেখলে তোমাকে আজ খেলানো উচিত নয়। তাছাড়া স্কুলের সম্মানের বিষয়টিও আছে। দেখ ভাই আমার নাম ডুবিও না।

খেলা শুরু হলে ছেলেটি উদ্দীপ্ত হয়ে খেলল। পায়ে বল পড়লেই গোল লক্ষ্য করে দৌড়াল ও গোল করল। দেখা গেল সেই হলো প্রতিযোগিতার সর্বোত্তম খেলোয়ার। তার দলও দর্শনীয়ভবে জিতল।

খেলার শেষে কোচ তাকে বললেন,ভাই, জীবনে আমি এত ভুল করিনি। তোমাকে এত ভাল খেলতে আমি কখনো দেখিনি। কী ব্যাপার বলতো এতো ভাল খেললে কী করে? ছেলেটি বলল, মনে আছে, আমার বাবা যে আমার খেলা দেখতেন। কোচ মুখ ফিরিয়ে দেখল ছেলেটির বাবা যেখানে বসতেন সেখানে কেউ নেই। তিনি বললেন, কোথায় তোমার বাবা? যেখানে বসে খেলা দেখতেন সেখানে আজ কেউ নেই। ছেলেটি জবাব দিল, একথা আপনাকে আগে আমি বলিনি, আমার বাবা ছিলেন অন্ধ। মাত্র চার দিন আগে তিনি মারা গেছেন। আজই প্রথম তিনি উপর থেকে আমার খেলা দেখছেন, তার বাবা খেলা দেখছেন এই ধারনাতেই ছেলেটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণা (Intemal motivation)

অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণা হচ্ছে আমাদের অন্তরের তৃপ্তি। এই সন্তষ্টি কেবলমাত্র সাফল্য থেকেই আসে না, এটা আসে কোন কাজ সুসম্পন্ন করার চরিতার্থতার অনুভূতি থাকে। কেবলমাত্র উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে এই অনুভূতি আসে না। কোন অসৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে এই ধরনের সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণা যেহেতু অন্তরের জিনিস সেহেতু এটি একটি স্থায়ী চালিকাশক্তি।।

কর্মপ্রেরণাকে চিহ্নিত করা এবং তাকে ক্রমাগত শক্তিশালী করা সাফল্যের পক্ষে প্রয়োজনীয়। লক্ষ্যকে সামনে রেখে দিবারাত্র সেই চিন্তা করাই উচিত।

যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কর্মপ্রেরণা জোগায় সেই দুটি হলো, (১) কাজের স্বীকৃতি, (২) উন্নততর দায়িত্ব সম্পাদনের আহ্বান।

সম্পাদিত কাজের যখন মূল্যায়ন হয় তখনই আসে স্বীকৃতি। তখন কর্মী পায় শ্রদ্ধা এবং সম্মান। ফলে সংস্থার সঙ্গে একাত্মবোধ দৃঢ় হয়।

দায়িত্ববোধও এই একাত্মবোধের ধারণাকে এবং সংস্থার এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। উত্তরোত্তর দায়িত্ববৃদ্ধি না ঘটলে কর্মপ্রেরণা কমে যায়।

অনুপ্রেরণা হিসাবে আর্থিক পুরস্কার ক্ষণস্থায়ী। শেষ পর্যন্ত এর ফলে মানসিক সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। বিপরীত দিক থেকে দেখলে কোন ধারণা বা চিন্তাকে যখন কাজে পরিণত করা হয় তখন মানসিক দিক থেকে অনেক পরিতৃপ্তি পাওয়া যায়। তখন গৌরবময় কাজের অংশীদার হিসাবে আনন্দ পাওয়া যায়। সঠিক কাজ করার যে আনন্দ সেই আনন্দই জোগায় কর্মপ্রেরণা।

কর্মোদ্যম এবং কর্মে অবসাদের মধ্যে চারটি অবস্থা (The four stages from motivation to demotivation)

১. কাজে আগ্রহী কিন্তু সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে অক্ষম। (Motivated inffective)

সমস্ত চাকরি জীবনে কখন একজন কর্মচারীর বেশি কর্মোদ্যম থাকে। যখন যে সংস্থার প্রথম যোগ দেয় কেন সেইসময় তার কর্মোদ্যম বেশি থাকে। কারণ সে দেখাতে চায় যে তাকে নিয়োগ করে সংস্থা ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু তার এই কর্মোদ্যম থাকলেও নতুন পরিবেশের মধ্যে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যে তাকে ঠিক কী করতে হবে। সেইজন্য সে কাজে খুব দক্ষ হতে পারে না।

এই অবস্থাতে কর্মীর মন নতুন ভাগ্রহণে সমর্থ থাকে। কাজ শেখার আগ্রহ থাকে এবং সহজেই তাকে সংস্থার আদব কায়দার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি করে নেওয়া যায়। এই অবস্থাতেই প্রশিক্ষণ এবং পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে পরিচিতি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে।

অপেশাদারী সংস্থাগুলিতে সঠিক মানসিক প্রবণতা তৈরির কোনও কর্মসূচী নেই। কাজে যোগদানের প্রথম দিনেই উপরওয়ালা নতুন কর্মচারীকে তার কাজের জায়গা দেখিয়ে দিয়ে এবং কাজ সম্পর্কে দুই একটি কথা বলে বিদায় নয়। ফলে নতুন কর্মচারী উপরওয়ালার কাজকর্ম দেখেই শেখে। তার ভালোটাও যেমন কিছু কিছু শেখে তেমনি তার ভুলগুলিও কিছু কিছু শিখে যায়। কর্মচারীটিকে কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলার যে সুযোগ ছিল সেই সুযোগ নষ্ট হয়।

অন্যান্য বিষয় ছাড়াও তারা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি বিশদভাবে বুঝিয়ে দেয়

  • সংস্থার ক্রমোচ্চ কাঠামো
  • বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের নিকট পারস্পরিক প্রত্যাশা
  • নীতিগত লক্ষ্য এবং নির্দেশাবলী
  • সংস্থার পক্ষে কী কী গ্রহণযোগ্য এবং কী কী নয়
  • সংস্থার সম্পদ ও সংস্থান

সংস্থার দিক থেকে প্রত্যাশা যদি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা না হয় তাহলে কাজের উন্নতি আশা করা যায় না। নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ যথার্থভাবে হলে অনেক সুপ্ত সমস্যায় মাথা চারা দিয়ে উঠতে পারে না।

২. কাজে প্রণীত এবং দক্ষ কর্মী (Motivated effective)

এই পর্যায়ে কর্মচারীদের তাদের কাজ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাছাড়া আগ্রহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে কর্তব্য সম্পাদন করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের ফলাফল তার কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।

৩. কাজে প্রেরণাহীন কিন্তু কাজ করার দক্ষতা আছে (Deinotivated effective)

কিছুদিন পরে কর্মোদ্যম ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং কর্মচারী কাজের কলাকৌশল শিখে যায়। এই প্রর্যায়ে কর্মচারীর কর্মোদ্যম থাকে খুম কম। শুধু সেইটুকুই মাত্র কাজ করে

যা না করলে সে চাকরি হারাবে। কিন্তু তার কোন স্বকীয় কর্মপ্রেরণা থাকে না।

এই অবস্থাটি কাজের উন্নতির পক্ষে বিপজ্জনক। বেশিরভাগ কর্মচারী এই তৃতীয় পর্যায়ে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে একজন প্রকৃত কর্মোদ্যোগী পেশাদারী কর্মী কাজটি ভালো দেয়, একজন কর্মোদ্যোগহীন কর্মচারী সংস্থায় অন্তর্ঘাত শুরু করে। তার কাজের মান কেবলমাত্র চাকরি বাচাবার পক্ষেই যথেষ্ট। যারা ভালো কাজ করে তাদের সে পি করে, নতুন ধ্যানধারণাকে সে আমল দেয় না এবং সহকর্মীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে।

আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই ধরনের কর্মচারীদের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মপ্রেরণা জাগ্রত করা। কোন কর্মচারীদের দ্বিতীয় পর্যায়ে বেশিদিন থাকলে সে কোন দিনই দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের উপযোগী হবে না। অথবা অবধারিতভাবে চতুর্থ পর্যায়ের দিকে যাবে।

৪. কর্মচারীরা যখন কাজে প্রেরণাহীন ও দক্ষতাহীন (Demotivated ineffective)

এই পর্যায়ে কর্মচারীকে ছাঁটাই করা ছাড়া নিয়োগকারীর আর কোন বিকল্প থাকে না। এই অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে ছাটাই যথাযথ উপায়।

স্মরণ রাখা দরকার নিয়োগকারী এবং কর্মচারী দুজনেরই লক্ষ্য এক, দুজনেই চায় যে ব্যবসায় সাফল্য আসুক এবং ব্যবসা বাড়ক, কর্মচারী যদি এই উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে সাহায্য করে তা হলে সংস্থার কাছে তার দাম বেড়ে যায় এবং নিজেও জীবনে সফল হয়।

প্রেরণাহীনতার কারণ (Demotivating factors) নিম্নলিখিত কারণে কাজে আগ্রহের অভাব দেখা দেয়

  • অন্যায় সমালোচনা
  • নেতিবাচক সমালোচনা
  • জনসমক্ষে অবমাননা
  • কাজ না করেও একজন যদি পুরস্কার পায় তবে যারা কাজ করে তাদের কাজে উৎসাহ নষ্ট হয়ে যায়
  • ব্যর্থতা ও ব্যর্থতার আশঙ্কা।
  • সাফল্যের ফলে আত্মসন্তুষ্টি এলে, কর্মীকে কর্মবিমুখ করে
  • দিশাহীনতা
  • নির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাব।
  • স্বল্প আত্মসম্মানবোধ
  • অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করার ক্ষমতার অভাব
  • নেতিবাচক আত্মচিন্তা
  • কর্মস্থলের চক্রান্ত
  • অন্যায় ব্যবহার
  • ছল-চাতুরীপুর্ণ ব্যবহার
  • নিম্নমান
  • ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন
  • কর্তৃত্ববিহীন দায়িত্বভার

কোন কর্মী সন্তুষ্ট হলেই যে তার কাজে প্রেরণা আছে তা মনে করা ঠিক নয়। কেউ কেউ খুব অল্পেই সন্তুষ্ট হন ফলে তারা কাজের ক্ষেত্রেও আত্নসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। কাজের মধ্যে যথেষ্ট উত্তেজনা খুজে পেলেই কাজে প্রেরণা আসে। আর যদি কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে তবে কাজে উত্তেজনা পাওয়া যায় না।

কাজে অবসাদ আনে যে উপাদানগুলি সেইগুলিকে দূর না করলে কাজে উদ্বুদ্ধ করার উপায়গুলি কার্যকর করা যাবে না। অনেক সময় অবসাদের উপাদানগুলি দূর করলেই কর্মপ্রেরণা উজ্জীবিত হয়ে উঠে।

কর্মপ্রেরণার উপাদান (Motivators)

যে প্রেরণা মানুষের অন্তর থেকে আসে, এবং যখন কর্মীরা তাদের নিজেদের যুক্তিতেই কাজ করে, অন্যের প্রয়োজনে নয়, এই অবস্থাই আমাদের লক্ষ্য। এই কর্মপ্রেরণাই দীর্ঘস্থায়ী।

স্মরণ রাখা দরকার যে আমাদের বিশ্বাসই সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দেয়। আমরা যে আমাদের কাজ ও ব্যবহারের জন্য দায়ী এই বিশ্বাস গভীর হওয়া দরকার। সচেতনভাবে দায়িত্বগ্রহণ করলে কাজের গুণগতমান, উৎপাদনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক যৌথ কাজের মান সমস্তই উন্নত হয়।

অপরকে কাজে উদ্বুদ্ধ করার কয়েকটি পদ্ধতি

  • কর্মীকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দিন
  • সম্মান করুন
  • কাজকে আকর্ষণীয় করুন
  • প্রতিযোগিতায় আহ্বান করুন
  • অপরকে সাহায্য করুন, কিন্তু তিনি নিজে যা করতে সক্ষম তাকে তা করতে দিন।

মানুষ তার নিজের প্রয়োজন কাজ করে-আপনার প্রয়োজনে নয়। র্যালফ ওয়ালডো এমার্সনের সম্পর্কে একটি গল্প এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। র্যালফ ও তার ছেলে একদিন একটি বাছুরকে গোয়ালে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন। বাবা ও ছেলে মিলে অনেক টানাটানি ধাক্কাধাক্কি করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, বাছুর অনড়। একটি ছোট্ট মেয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে

এসে তার ছোট্ট আঙ্গুলগুলি ধীরে ধীরে বাছুরটির মুখে বুলিয়ে দিল এবং বাছুরটিও স্নেহাত হয়ে মেয়েটিকে অনুসরণ করে গোয়ালে গিয়ে ঢুকল।

 

কাজের পরিকল্পনা (Action plan)

১.নিজের কাজ অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে, দ্রুততার সঙ্গে এবং অধিকতর কার্যকরীভাবে করতে পারেন। তার জন্য তিনটি দিন

ক……………………
খ…………………….

গ…………………….

।২.সাফল্য লাভের মুল মন্ত্রগুলিকে জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার তিনটি পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করুন

ক. কর্মক্ষেত্রে——–

খ.পারিবারিক ক্ষেত্রে——-

গ. সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে———-

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *