০২. সাফল্য : সাফল্যের চাবিকাঠি

সাফল্য : সাফল্যের চাবিকাঠি
অধ্যায় – ২

সাফল্য কোনও আকস্মিক ব্যাপার নয়। এটি আমাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গির ফল এবং সেই মনোভাব আমরা নিজেরাই নির্বাচন করি। সুতরাং সফলতা আমাদের নিজেদের নির্বাচনের উপর নিশীল কোন আকস্মিকতার উপর নয়।

অনেকই জীবনে একটা বড় ধরনের লটারি জেতার আশা করে, কিন্তু লটারি জেতাকেই কি সফলতা বলে?

একজন ধর্মযাজক একটি ফসলে পরিপূর্ণ ক্ষেতের পাশ দিয়ে গাড়িতে যাচ্ছিলেন, সুন্দর ফসল দেখে তিনি গাড়ি থামিয়ে ফসলের প্রশংসা করলেন এবং সেই ক্ষেতের মালিক ধর্মযাজককে দেখে তার ট্রাক্টর চালিয়ে তার কাছে এল। ধর্মযাজক যখন জিজ্ঞেস করলেন, ভগবান তোমাকে ক্ষেতভরা ফসল দিয়েছেন তুমি কি তার কাছে কৃতজ্ঞ। ক্ষেতের মালিক জবাব দিল,  হ্যাঁ, ভগবান আমাকে এই ক্ষেতটি দিয়েছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু এই ক্ষেতভরা ফসল আমার পরিশ্রমের ফল।

এটা ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে কোনও কোনও ব্যক্তি জীবনে একের পর এক সফলতা লাভ করে আবার কেউ কেউ কেবল কাজের জন্য প্রস্তুত হয়। এটাও খুব আশ্চর্যের বিষয় যে একজন মানুষ তার জীবনে একটার পর একটা বিপত্তি কাটিয়ে তার লক্ষ্যে পৌঁছায়, আর একজন একটামাত্র বিপত্তি অতিক্রম করতেই হিমসিম খায় এবং লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। উপরের দুটি প্রশ্ন যদি স্কুল-কলেজে শিক্ষাসূচীর অন্তর্ভূক্ত হত এবং তার যথার্থ উত্তর যদি ছাত্রদের শেখানো হত তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নতুনরূপ নিত। যারা অসাধারণ ব্যক্তি তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন না, আর যারা সাধারণ ব্যক্তি তারা জীবনে নিরাপত্তা খোজেন। আমরা জীবনে যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই তার প্রতি স্থির দৃষ্টি রাখা উচিত। আমরা যা চাই না তার প্রতি নজর না দিলেও চলে।

সাফল্য কি? (What is success?)।

সাফল্য এবং অসাফল্য নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমরা যখন সফল ব্যক্তিদের জীবনকাহিনী পড়ি তখন দেখতে পাই যে ইতিহাসের যে যুগেই তারা আবির্ভূত হোন না কেন তাদের একই রকমের অনেকগুলি গুণ থাকে। যে গুণাবলী তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল, সেগুলিকে চিহ্নিত করতে পারলে এবং যথাযথ অনুসরণ করতে পারলে আমরাও সফল হতে পারি। অনুরূপভাবে সমস্ত অসাফল্যের ও কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে। যদি সেই বৈশিষ্ট্যগুলিকে এড়িয়ে চলি তাহলে আমরা বিফল হব না। সাফল্যের মধ্যে কোন রহস্য নেই। সাফল্য কেবলমাত্র কয়েকটি মূল আদর্শকে নিয়মিতভাবে প্রয়োগ করার ফলশ্রুতি। উল্টোটাও একইরকম ভাবে সত্যি। বিফলতা হচ্ছে কয়েকটি ভুলের ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি, এগুলি সরলীকরণ মনে হতে পারে কিন্তু আসল কথা হচ্ছে যে সমস্ত সত্যই খুব সরল একথা বলার উদ্দেশ্য নয় যে মূল আদর্শগুলি খুব অনায়াসে পালন করা যায়, কিন্তু এটা ঠিক যে এগুলি খুব জটিল বা অসাধ্য নয়।

তুমিও জিতবে

যারা প্রায়ই হাসতে জানে এবং ভালোবাসতে জানে,

যারা জ্ঞানী লোকের কদর পায়,

আর পায় বাচ্চাদের আদর,

সমঝদার সমালোচকের প্রশংসা পায়,

আর যারা মিথ্যা বন্ধুত্বের বেইমানি সহ্য করতে পারে,

যারা সৌন্দর্যের পূজারী,

যারা মানুষের মধ্যে মহত্ত্ব খুঁজে বেড়ায়

যারা প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে

নিজেদের উজাড় করে দেয়;

যারা অনাবিল হাসিতে হয়ে উঠতে পারে উচ্ছ্বসিত,

গান গেয়ে যারা আত্মহারা হয়

যারা পৃথিবীতে জমেছে বলে,

পৃথিবীর বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া সহজ হয়েছে;

যদি জানে যে অন্তত একটি জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে

তারই চেষ্টায়,

তাহলে তাই হবে জীবনের সার্থকতা, সাফল্য।

–অজ্ঞাত পরিচয় কবি

সফলতার সংজ্ঞা কী? (How do we define success?)

একজন ব্যক্তি কিভাবে সফল হয়? সাফল্যকে আমরা কিভাবে চিনতে পারি? কেউ কেউ মনে করে সাফল্যের অর্থ, ধনবান হওয়া, কারোর নিকট সাফল্যের অর্থ সামাজিক স্বীকৃতি, সুস্বাস্থ্য, সুন্দর পরিবার, সুখ-সন্তুষ্টি এবং সামাজিক শান্তি। এগুলির নিহিতার্থ হচ্ছে সাফল্য প্রকতপক্ষে নিজ নিজ ধারণার উপর নির্ভরশীল, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে এর অর্থ বিভিন্ন। একটি সংজ্ঞা যাতে সফলতাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা যায় তা হলো,  একটি যথার্থ উদ্দেশ্য উত্তরোত্তর উপলব্ধির নামই সফলতা,-আর্ল নাইটিংগেল (Earl Nightingale)

এই সংজ্ঞাটিকে সযত্নে বিচার করা যাক, উত্তরোত্তর এই কথাটির অর্থ হলো সফলতা একটি গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, এটি একটি সফল। আমরা কখনোই গন্তব্যে পৌঁছই না। একটি লক্ষ্যে পৌঁছবার পর আমরা দ্বিতীয়টির দিকে যাত্রা করি সেখান থেকে পরবর্তী লক্ষ্যে, পরে তার পরবর্তী লক্ষ্যে। উপলব্ধি হল একটি অভিজ্ঞতা। বাইরের কোন শক্তি আমাকে সাফল্যের অনুভূতি দিতে পারবে না, এটা আমাকে নিজের মধ্যে অনুভব করতে হবে। সাফল্যের অনুভূতি আন্তরিক, বাহ্যিক নয়। মূল্যবোধ বোঝাতে আমার অনেকসময় যথার্থ শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক?  যথার্থ এই কথাটির দ্বারা পদ্ধতির ও লক্ষ্যের গুণমান নির্ধারিত হচ্ছে এবং এর সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট আছে লক্ষ্যের অর্থ এবং আত্মিক পূর্ণতা দান করা। আত্মিক পূর্ণতা ব্যতীত সমস্ত সাফল্যই শূন্য মনে হয়।

কেন?  লক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ স্থির লক্ষ্যস্থলে পৌঁছবার পথ নির্ধারণ সহজ নয়।

সাফল্যের ফলে যে প্রত্যেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে তা নয়। কোন কোন গোষ্ঠীর কাছে আমি গ্রহণযোগ্য হতে চাইব না। বুদ্ধিহীনের সমালোচনা সহ্য করা যায় কিন্তু অসৎ চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তির প্রশংসা অনেকের নিকট অসহ্য। আমাকে সাফল্যের সংজ্ঞা দিতে বললে আমি বলব যে সাফল্য হচ্ছে এমন একটি সৌভাগ্য যার মূল্যে ক্রমান্বয়ে আছে অনুপ্রেরণা, উচ্চাশা, তীব্র ইচ্ছ, কঠিন পরিশ্রম।

সাফল্য এবং সুপ পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলে। আপনি যা চেয়েছেন তা পাওয়াই সাফল্য, আর সূখ হচ্ছে আপনি যা পেয়েছেন তার মধ্যেই পাওয়ার ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ রাখা। শুধু টিকে থাকাই সাফল্য নয়। এটি তার চেয়েও বেশি।

ও জীবনধারণের থেকে বেশি কিছু মানুষের মত বাচা।

স্পর্শের থেকে বেশি কিছু অনুভব করা।

দেখার থেকে বেশি কিছু নিরীক্ষণ করা।

পড়ার থেকে বেশি কিছু -হৃদয়ঙ্গম করা।

শোনার থেকে বেশি কিছু অনুধাবন করা। -John H, Rhoades

সাফল্যের পথে কিছু বাধা (প্রকৃত বা কল্পিত) (Some obstacles to success (Real or Imagined)

* আত্মকেন্দ্রিকতা

* বিফলতার আশঙ্কা / আত্মমর্যাদার অভাব

* পরিকল্পনার অভাব

* নির্দিষ্ট কাঠামোগত লক্ষ্যের অভাব

* জীবন পরিবর্তনশীল

* দীর্ঘসূত্রতা

* পারিবারিক দায়িত্ব

* আর্থিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা

* নির্দিষ্ট লক্ষ্যের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে তালগোল পাকিয়ে ফেলা

* আশু আর্থিক লাভের আশায় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করা

* একাই অনেক কাজের ভার নেওয়া

* সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায় গ্রহণ

* দায়বদ্ধতার অভাব

* প্রশিক্ষণের অভাব

* অধ্যবসায়ের অভাব

* গ্রাধিকারের অভাব।

বিজয়ীর প্রাধান্য—(The winning edge)

বিজয়ীর সুবিধা পেতে হলে আমাদের কাজের উস্কর্ষের জন্য চেষ্টা করা উচিত; কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নিখুত হওয়ার জন্য নয়। যারা সম্পূর্ণরূপে নিখুত হওয়ার চেষ্টা করে যায় তারা মানসিক বিকারগ্রস্ত। যারা উৎকর্ষের জন্য চেষ্টা করে তারাই অগ্রগতির পথে যায়। প্রয়োজন হলো সামান্য একটু সুবিধা বা প্রাধান্য পাওয়া। ঘোড়দৌড়ে বিজয়ী ঘোড় পাঁচ ও একের অনুপাতে বা দশ ও একের অনুপাতে জেতে, তার অর্থ কি এই যে বিজয়ী ঘোড়াটি পরাজিত ঘোড়াটি থেকে পাচ বা দণ বেশি জোরে ছোটে? নিশ্চয়ই না, ঘোড়াটি হয়ত একের ভগ্নাংশের দূরত্বে জতে পাঁচগুণ বা দশগুণ বেশি পুরস্কার লাভ করে, অন্যগুলি কিছু পায় না।

এটা কি সুবিচার হয়ত নয় কিন্তু কেউ তার তোয়াক্কা করে না। এইটাই এই খেলার নিয়ম এবং সেইজন্যই ঘোড়দৌড়ে ঘোড়া দৌড়ায়। আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও এই কথা সত্য। সফল ব্যক্তিরা অসফলদের থেকে দশগুণ ভালো নয়, তারা হয়ত ভগ্নাংশ মাত্র ভালো কিন্তু তাদের পুরস্কার দশগুণের থেকেও বেশি।

তাই আমাদের কোন একটি বিশেষ ক্ষেত্রে শতকরা এক হাজার ভাগ উন্নতি করার দরকার নেই। যা করা দরকার তা হলো এক হাজারটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক শতাংশ উন্নতি করা। এটি আরও সহজ। এখানেই হল বিজয়ীর প্রাধান্য।

সংগ্রাম (Struggle)

জীবন সগ্রামে জয় অথবা পরাজয় দুয়েরই সম্ভাবনা আছে। কোন জয় সগ্রাম ছাড়া আসে না।

জীববিজ্ঞানের এক শিক্ষক তার ছাত্রদের শেখাচ্ছিলেন, শুয়োপোকা, প্রজাপতিতে কিভাবে রূপান্তরিত হয়। তিনি ছাত্রদের বললেন যে পরবর্তী দুঘন্টার মধ্যে খুঁয়োপোকার গুটি থেকে প্রজাপতি বেরিয়ে আসবে কিন্তু কেউ তাড়াহুড়ো করে প্রজাপতিকে গুটি থেকে বের করার চেষ্টা করবে না। এই বলে তিনি ক্লাশ থেকে চলে গেলেন।

ছাত্ররা গুটির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রজাপতি গুটি থেকে বের হওয়ার জন্য নড়েচড়ে চেষ্টা করছিল। একটি ছাত্র দয়াপরবশে শিক্ষকের উপদেশ অমান্য করে গুটি ভেঙে প্রজাপতিকে বাইরে আসতে সাহায্য করল। ফলে প্রজাপতিকে বাইরে আসার জন্য আর বেশি চেষ্টা করতে হল না কিন্তু অল্প পরেই প্রজাপতিটি মারা গেল।

শিক্ষক ফিরে এলে অন্য ছাত্ররা ঘটনাটি তাকে জানাল। তিনি ব্যাখ্যা করে বোঝালেন যে প্রজাপতিকে সাহায্য করতে গিয়ে ওই ছাত্রটি প্রজাপতিকে মেরে ফেলেছে। কারণ প্রাকৃতিক নিয়মে গুটি থেকে বেরনোর সময় তাকে যে সংগ্রাম করতে হয় তার ফলে প্রজাপতির ডানা দুটি বেড়ে ওঠে এবং শক্ত হয়। বালকটি প্রজাপতিকে সগ্রাম করতে না দিয়ে তাকে বাঁচবার শক্তি সংগ্রহ করতে দেয়নি। ফলে প্রজাপতিটি মারা গেল।

এই তত্ত্বটি মানুষের জীবনেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। সংগ্রাম ছাড়া মানুষ জীবনে কিছুই লাভ করতে পারে না। পিতামাতা হিসাবে আমরা যখন সব থেকে স্নেহের সন্তানকে সংগ্রাম, থেকে আড়াল করে রাখি তখন তার শক্তি বৃদ্ধি না হতে দিয়ে তার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করি।

বাধা অতিক্রম করা (overciming obstacles)

যারা কোন বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়নি তাদের থেকে যারা বাধা অতিক্রম করে এসেছে তাদের ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। সমস্যার সম্মুখে আমরা কখনো কখনো নিরুৎসাহ বা হতাশ হয়ে পড়ি কিন্তু বিজয়ীদের কখনো মনোবল নষ্ট হয় না। এই মনোবল নষ্ট না হওয়ার জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়।

একটি ইংরেজি প্রবাদে বলে, শান্ত সমুদ্রে কখনো দক্ষ নাবিক হওয়া যায় না। প্রথমে সমস্ত সমস্যাই কঠিন মনে হয় কালক্রমে তা সহজ হয়ে আসে। আমরা আমাদের সমস্যা থেকে পালিয়ে যেতে পারি না কেবল বিজিতরাই রনে ভঙ্গ দেয়, এই প্রসঙ্গে Abigail van Buren-এর একটি বাক্য শরণযোগ্য। আত্মহত্যা একটি সাময়িক সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান।

কিভাবে সাফল্যের পরিমাপ করা যায় (How do we Measure Success?)

কোন কাজ সুসম্পন্ন হলে এবং অভীষ্ট সিদ্ধি হলে যে অনুভূতি হয়, সেই অনুভূতিই সাফল্যের মাপকাঠি। জীবনে আমাদের অবস্থান দিয়ে সাফল্য বিচার হয় না। সেই অবস্থায়নে পৌঁছতে গিয়ে যে সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে হয় সেই বাধা অতিক্রমের ক্ষমতা দিয়েই সাফল্যের পরিমাপ করা হয়। আমরা অপরের তুলনায় কিভাবে কাজ করছি তাই দিয়ে সাফল্য বিচার করা যায় না। আমরা আমাদের শক্তি ও সামর্থ্যের কতটা ব্যবহার করতে পেরেছি তাই দিয়েই সাফল্য নির্ধারিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে সফল ব্যক্তিরা নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে। তারা তাদের নিজেদের কাজের মান ক্রমাগত উন্নততর করার চেষ্টা করে চলে। জীবনে কত উপরে ওঠা গেছে সাফল্য তাই দিয়ে বিচার করা যায় না বরং কতবার বিফলতা সত্ত্বেও হতাশা অতিক্রম করে সাফল্যের পথে এগিয়ে গেছে সেই ক্ষমতা দিয়েই সাফল্য নির্ধারিত হয়।

সব বড় সাফল্যের কাহিনীর পিছনে আছে বড় ব্যর্থতার কাহিনী(Every success story is a story of great failure)

ব্যর্থতা সাফল্যের শিখরে পৌঁছবার পথ। সিনিয়র টম ওয়াটসনের কথায়, যদি সফল হতে চাও তবে ব্যর্থতার হার দ্বিগুণ করে দাও। ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে, সমস্ত সাফল্যের কাহিনীর সঙ্গে আছে ব্যর্থতার কাহিনীও। কিন্তু সফলতা লাভের পর ব্যর্থতা মানুষের নজরে পড়ে না। সবাই ছবির একদিক দেখে মনে করে লোকটি ভাগ্যবান:  ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ছিল বলেই সফল হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে একজনের জীবনকাহিনীর উল্লেখ করি। তিনি ২১ বছর বয়সে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হন, ২২ বছর বয়সে আইন সভার নির্বাচনে পরাস্ত হন। ব্যবসায় আকার অসফল হলেন ২৪ বৎসর বয়সে। ২৬ বৎসর বয়সে তার প্রিয়তমা মারা গেলেন। কংগ্রেসের নির্বাচনে পরাস্ত হলেন ৩৪ বৎসর বয়সে। ৪৫ বৎসর বয়সে হারলেন সাধারণ নির্বাচনে। ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হলেন ৪৭ বৎসর বয়সে। সিনেটের নির্বাচনে আবার হারলেন ৪৯ বৎসর বয়সে। প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হলেন ৫২ বত্সর বয়সে।

এই ব্যক্তির নাম আব্রাহাম লিঙ্কন। একে কি ব্যর্থ বলবেন? তিনি রাজনীতির পথ ছেড়ে দিতে পারতেন। কিন্তু লিঙ্কনের নিকট পরাজয় মানেই সমাপ্তি নয়, যাত্রা একটু দীর্ঘ হওয়া মাত্র।

১৯১৩সালে ট্রায়োড টিউবের আবিষ্কর্তা, Lee De Forest -কে ডিসট্রিকট অ্যাট্যারনি আদালতে অভিযুক্ত করলেন। অভিযোগ ছিল তিনি জনসাধারণকে ভুল বুঝিয়ে তার কোম্পানীর শেয়ার বিক্রি করেছেন। ভুল বুঝিয়েছিলেন এই বলে যে তিনি মানুষের কণ্ঠস্বরকে আটল্যানটিক মহাসাগরের অপর পারে পৌঁছে দিতে পারেন। এইজন্য তিনি সর্বসমক্ষে অপমানিত হলেন। আজকে আমরা জানি যে তার দাবি আদৌ মিথ্যা ছিল না। তার আবিষ্কার না থাকলে মানুষের সভ্যতাই কি পিছিয়ে পড়ত না?

১৯০৩ সালের ১০ই ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল., কারন তারা বাতাসের থেকে ভারী একটি যন্ত্র তৈরি তুমিও জিতবে করে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করছিলেন। এক সপ্তাহ পরে কিটি হক থেকে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তাদের অবিস্মরণীয় আকাশ যাত্রা শুরু করেন।

কর্নেল স্যান্ডার্স নামে এক ব্যক্তি ৬৫ বৎসর বয়সে একটি ঝরঝরে গাড়ি এবং সরকারের মাসজিক সুরক্ষা বিভাগ থেকে দেওয়া ১০০ ডলার নিয়ে একটি ব্যবসা শুরু করেন। তার মায়ের কাছে শেখা রন্ধন প্রণালী অনুযায়ী কিছু খাবার তিনি ফিরি করতে বের হলেন। কতগুলি বাড়ি ঘোরার পর তিনি তার প্রথম খদ্দের পেয়েছিলেন? গননা করে দেখা গেছে যে প্রায় ১০০০টি বাড়ি ঘোরার পর তিনি তার প্রথম খদ্দের পান। আমাদের মধ্যে কতজন এরকম অধ্যবসায় দেখাবেন। অনেকেই ৩টি বাড়ি, ১০টি বাড়ি কিংবা ১০০টি বাড়ি ঘোরর পর হতাশ হয়ে বলবেন যে আমরা প্রচুর চেষ্টা করেছি।

অল্প বয়সে বিখ্যাত ব্যচিত্রকর ওয়াল্ট ডিসনে অনেক খবরের কাগজের সম্পাদকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন যে ডিসনের কোন প্রতিভা নেই। একদিন গির্জার এক পাদ্রী তাকে কিছু ব্যঙ্গচিত্র আঁকার ফরমাশ করেন। ভিসনে গির্জার কাছে একটা ছোট চালাঘরে বাসা বেঁধেছিলেন, যেখানে অনেক উঁদুর ঘোরাফেরা করত। একটি ছোট ইদুর দেখে তার ভালো লাগে এবং সেটি শেষপর্যন্ত তার বিখ্যাত মিকি মাভসএ পরিণতি লাভ করে। এইটি অবলম্বন করে ওয়াল্ট ডিসনেও বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

সফল মানুষেরা খুব বিরাট কিছু কাজ করেন না। তারা সামান্য কাজকেই তাদের নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে বৃহৎ করে তোলেন। একদিন কানে আংশিকভাবে কালা ৪ বৎসরের একটি বাচ্চা ফুল থেকে বাড়িতে ফিরল তার মাষ্টারমশাইয়ের একটি ছোট চিঠি নিয়ে। মাষ্টারমশাই তার মাকে লিখেছেন,  আপনার টমি এত বোকা যে তার পক্ষে লেখাপড়া শেখা সব নয়। তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিন। বালকটির মা প্রতিজ্ঞা করলেন,  আমার টমি মোটেই বোকা নয় আমি তাকে নিজেই পড়াব এবং সেই টমি পরবর্তীকালে বিখ্যাত টমাস এডিসন হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেন। এডিসন মাত্র ৩.মাস স্কুলের শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন আংশিকভাবে বধির।

হেনরি ফোর্ড যে প্রথম গাড়িটি তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি পিছিয়ে যাওয়ার গিয়ার দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। এই মানুষগুলি কি জীবনে অসফল! তাদের সমস্যা ছিল না তা নয় কিন্তু তারা সমস্ত সমস্যাকে জয় করে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু বাইরের লোকের কাছে মনে হতে পারে যে তারা কেবলমাত্র ভাগ্যবান বলেই সফল হয়েছিলেন।

সমস্ত সাফল্যের পিছনেই আছে ব্যর্থতার কাহিনী। একটিই শুধু তফাৎ যে প্রতিটি ব্যর্থতা সাফল্য লাভের জন্য উজ্জীবিত করে। একেই বলে পরাস্ত হয়েও সামনে এগিয়ে যাওয়া, পরাস্ত হলেও পিছিয়ে পড়া নয়। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

১৯১৪ সালে ৬৭ বৎসর বয়সে টমাস এডিসনের কয়েক মিলিয়ন ডলারের কারখানা আগুনে বিনষ্ট হয়। কারখানাটির বিমা করা ছিল না। বয়স্ক এডিসন দেখলেন তার জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি ভস্মে পরিণত হল এবং মনে মনে বললেন, বিপর্যয়ের মধ্যে একটা মহৎ শিক্ষা আছে, আমাদের সমস্ত ক্রটি বিচ্যুতি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমরা আবার নতুন করে শুরু করব। এই বিপর্যয় সত্ত্বেও ৩ সপ্তাহ পরে তিনি Phonograph যন্ত্র আবিষ্কার করেন। কী অসাধারণ গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।

নীচে জীবনে সফল ব্যক্তিদের ব্যর্থতার আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া হল

* টমাস এডিসন যখন বৈদ্যুতিক বা তৈরির জন্য চেষ্টা করছিলেন তখন কমবেশি ১০০০০ বার ব্যর্থ হয়েছিলেন।

* হেনরি ফোর্ড ৪০ বৎসর বয়সে দেউলিয়া হন।

* লী আইয়াকোক্কাকে ৫৪ বৎসর বয়সে দ্বিতীয় হেনরি ফোর্ড চাকরি থেকে বিতাড়িত করেন।

* তরুণ বেটোভেনকে অনেকে বলেছিলেন যে তার কোন প্রতিভা নেই, কিন্তু এই ব্যক্তি কয়েকটি সর্বশ্রেষ্ঠ সুর সৃষ্টি করেছেন।

 

জীবনের পথে চলতে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া অবশ্যম্ভাবী। এরূপ বাধা আমাদের এগিয়ে চলার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিতা ও শেখায়। দুঃখের মধ্যে দিয়েই বাধা বিপত্তিকে জয় করার সাহস এবং আত্মবিশ্বাস পাওয়া যাবে। আমাদের বিজয়ী হওয়ার শিক্ষাই নেওয়া উচিত বিজিত হওয়ার নয়। ভয় এবং সন্দেহ মনকে হতাশার অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়।।

প্রত্যেকেরই বিপত্তির পর নিজেকে এই প্রশ্ন করা উচিত: এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি কী শিখলাম? কেবলমাত্র আত্মবিশ্লেষণের ফলে বাধার অবরোধকে উন্নতির সোপানে পরিণত করা যাবে।

যদি মনে কর (If you think) পরাজয়কে মেনে নিলেই তুমি পরাজিত। মনে যদি তোমার সাহস না থাকে, তবে জেতার আশা কোরোনা। যদি মনে দ্বিধা থাকে তুমি পারবে কিনা, তাহলে মনে রেখো তুমি হেরেই গেছ। হারবে ভাবলে, হার তোমার হবেই। কারণ, সাফল্য থাকে মনের ইচ্ছাশক্তিতে, মনের কাঠামোতে।। যদি ভাব অন্যদের তুলনায় তোমার কাজের মান নিচু, তাহলে তুমি নীচেই থাকবে। যদি তুমি ওপরে উঠতে চাও তাহলে নিজের মনে সংশয় রেখো না। কারণ সংশয় থাকলে প্রত্যাশা পূরণ হয় না। জীবন যুদ্ধে সব সময় বলবান ও দ্রুতগামীরা জেতে না, যে আত্মবিশ্বাসে অটল, সে আজ হোক, কাল হোক, জিতবেই।

সর্বোত্তম দান (The greatest gift)

সমস্ত জীবজন্তুর মধ্যে শারীরিকভাবে মানুষই সবচাইতে অসহায়। মানুষ পাখির মতো আকাশে উড়তে পারে না; একটি হোট কীটও তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে, নেকড়ের মতো দৌড়াতে পারে না, কুমীরের মতো সাঁতার কাটতে জানে না, বানরের মতো গাছে চড়তে পারে না, বেড়ালের মতো চোখের দৃষ্টি নেই। বুনোবেড়ালের মত থাবা এবং দাঁত নেই। শারীরিক দিক দিয়ে খুবই অসহায় এবং অরক্ষিত, কিন্তু প্রকৃতি যথেষ্ট বিবেচক এবং দয়াশীল বলে মানুষকে দিয়েছেন চিন্তা করার ক্ষমতা। তাই সে নিজেই তার পরিবেশ তৈরি করে নিতে পারে। অন্য জীবজন্তুদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। দুঃখের বিষয় খুব কম লোকই প্রকৃতির এই মহৎ দান, চিন্তার ক্ষমতা সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে থাকে।

আসফল মানুষেরা সাধারণত দুরকমের: যারা চিন্তা না করে কাজ করে অসফল হয়েছে দ্বিতীয়ত, যারা চিন্তা করে কিন্তু কখনো কোন কাজ করেনি। জীবনের পথে চলতে গিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতাকে ব্যবহার না করা, লক্ষ্যস্থির না করে গুলি ছোড়ার মত অর্থহীন।

জীবন একটি কাফেটরিয়ার মতো। একটি ট্রে হাতে নিয়ে বাবার পছন্দ করে নিন তারপর দাম মিটিয়ে দিন। যদি আপনি খাবারের দাম দিতে প্রস্তুত থাকেন, আপনি যে কোন খাবারই নিতে পারেন। কাফেটরিয়াতে যদি আপনি অপেক্ষা করেন যে ওয়েটার এসে আপনাকে খাবার দিয়ে যাবে, আপনি অপেক্ষাই করবেন, খাবার পাবেন না। জীবনও এই রকম, আপনি পছন্দ করুন এবং দাম মিটিয়ে আপনার প্রাপ্য জিনিস নিয়ে নিন।

জীবনে পছন্দ করতে হয় এবং আপসও করতে হয়। (Life is full of choices and compromises)

উপরের কথাটিতে পরস্পর-বিরোধিতা আছে। জীবনে যদি আপনি পছন্দমত পথ বেছে নেওয়ার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবকাশ থাকে তাহলে সমঝোতা করার প্রশ্ন কোথায়? এখানে স্মরণ রাখা দরকার পছন্দ বা নির্বাচন করতেও আপস করতে হয়। বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা যাক।

জীবন কিভাবে পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়া যায়? (Howis life full of choices?)

যখন আমরা বেশি খাই, তখন আমরা জানি আমরা মোটা হবই। যখন বেশি মদ খাই তখন নিশ্চিত জানি পরদিন সকালে মাথা ধরবেই। যখন মদ্যপান করে গাড়ি চালাই, তখন আমরা বেছে নিই যে দুর্ঘটনায় হয় নিজে মারা যাব কিংবা কাউকে চাপা দিয়ে মারব। যখন অপরের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি তখন জানি যে সেও সুযোগ পেলে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে। যখন আমরা অন্য মানুষের তোয়াক্কা করি না, তখন আমরা বুঝেই নিই যে তারাও আমাদের তোয়াক্কা করবে না।

কোন বিশেষ ধরনের জীবন বেছে বা পছন্দ করে নেওয়ার কিছু ফলাফল অাছে। স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়া যায়, কিন্তু একবার বেছে নেওয়ার পর যে কারণে বেছে নিয়েছি সেই কারণগুলি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। নিজ নিজ জীবনযাত্রা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সমান সুযোগ আছে, কিন্তু আমাদের নির্বাচিত জীবনযাত্রা অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা একে অন্যের থেকে ভিন্ন হয়ে পড়ি। জীবন কুমোরের কারখানার মতো, মাটি থেকে অনেক আকারের হাঁড়ি, কলসী, পাত্র তৈরি করতে পারা যায়। একইভাবে আমরা যেভাবে চাই সেভাবেই জীবন গড়ে তুলতে পারি। কিন্তু বিভিন্ন পাত্র তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কৌশলের প্রয়োজন।

জীবনে বাস করতে হয় কেন? (How is lic full of compromises?)

জীবন কেবল আনন্দ আর হৈ হুল্লোড় নয়, জীবনে অনেক ফণা ও হতাশা আছে। অনেক অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে। অনেক সময় সববিষয় ওলটপালট হয়ে যায়। ভালো লোকেরাও অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েন। কোন কোন ঘটনা মানুষের ক্ষমতার বাইরে যেমন শারীরিক অক্ষমতা কিংবা জন্মগত ত্রুটি। আমরা আমাদের মাতাপিতা নির্বাচন করতে পারি না কিংবা জন্মের উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই ক্ষেত্রে যদি কোনও দুর্ভাগ্যের কারণ ঘটে তবে তা দুঃখজনক নিশ্চয়ই। কিন্তু তার জন্য কি আমরা কেবল আক্ষেপ করব, না যা আছে তাই নিয়ে সাধ্যমত চেষ্টা করব? এই সিদ্ধান্তই নিতে হবে।

একটি পরিষ্কার দিনে লেকের জলে শত শত নৌকা বিভিন্ন দিকে ঘুরে বেড়ায়। যদিও বাতাস একদিকেই বয় তবুও পালতোলা নৌকাগুলি ভিন্ন ভিন্ন দিকে যাতায়াত করে। কিভাবে করে। এটা নির্ভর করে কিভাবে তাদের পালগুলি লাগানো হয়েছে তার উপর। এবং যিনি নৌকা চালান তিনি পালগুলিকে নির্দিষ্ট দিকে যাবার জন্য সেইভাবে ঘুরিয়ে ধরেন। এই অবস্থা আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা বাতাসের গতিপথ বদলাতে পারি না কিন্তু আমরা জীবনের পালকে কিভাবে লাগাব যাতে বাতাসের গতির সুবিধা নিতে পারি, তা আমরা নির্ধারণ করতে পারি।

আমরা পছন্দমত পারিপার্শ্বিক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারি না, কিন্তু আমাদের মনোভাবকে আমাদের পছন্দমত কাজের উপযোগী করে নিতে পারি। সেই মনোভাব হবে সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বিজয়ীর মনোভাব, পরাজিতের মনোভাব নয়। আমাদের মনোভাবই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

মেঘ ও রৌদ্র এই দুইয়ে মিলেই তৈরি হয় রামধনু। আমাদের জীবনও কোন ব্যতিক্রম নয়। সেখানেও আছে সুখ এবং দুঃখ, ভালো এবং মন্দ, অন্ধকার এবং আলো। আমরা যদি প্রতিকূলতাকে উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অতিক্রম করতে পারি তাহলে আমাদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। জীবনে যেসব ঘটনা ঘটে তাদের সবগুলিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। কিন্তু আমরা কিভাবে ঐ ঘটনার মোকাবিলা করব, সেই পদ্ধতিটি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। রিচার্ড ব্লেসনীডেন (Richard Bicchnyden) ১৯০৪ সালে সেন্টলুই বিশ্ব মেলায় ভারতের চাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চা খাওয়াতে গিয়ে দেখলেন যে গরম বলে কেউ বিশেষ চায়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। বরং অন্য ঠাণ্ডা পানীয়গুলি বেশ জাঁকিয়ে ব্যবসা করছে। তখন তিনি ঠিক করলেন যে চাকেও ঠাণ্ডা পানীয়রূপে বিক্রি করা যায়। তিনি ভাবে চা বিক্রি শুরু করলেন এবং লোকে তা পছন্দ করল। এইভাবে পৃথিবীতে ঠাণ্ডা চা পানীয় হিসাবে প্রথম প্রচলিত হল। (Adapted from The Best of … Bits & Reces, Economic Pres, Fairfield, NJ, 1994, p-98.)

জীবনে যখন কোন বিপর্যয় ঘটে তখন আমরা হয় দায়িত্বশীলভাবে কিংবা ক্ষোভের সঙ্গে তার মোকাবিলা করতে পারি। ওক বৃক্ষের ফলের যেমন কোন বেছে নেওয়ার শক্তি নেই, মানুষ কিন্তু সেরকম নয়। ওক বৃক্ষের বীজ ঠিক করতে পারে না সে দৈত্যাকার ওক গাছ হবে না কাঠবিড়ালির খাদ্য হবে। এ সম্পর্কে বীজ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মানুষের  বেছে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। প্রকৃতি যদি আমাদের হাতে একটি পাতিলেবু দেয় তাহলে আমরা বেছে নিতে পারি, প্রকৃতির কৃপণতায় হা হুতাশ করব, না পাতিলেবুটিতে লেমোনেড তৈরিতে ব্যবহার করব।

যে সব শালী মানুষকে সফল হতে সাহায্য করে (Qualities that make a person successful)

১. আকাঙক্ষা (Desire)।

সাফল্যের চালিকাশক্তি আসে সিদ্ধিলাভের জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে। নেপোলিয়ন হিল লিখেছেন, মানুষের মন যা কল্পনা করে এবং বিশ্বাস করে, মানুষ তা অর্জন করতে পারে।

এক তরুণ সক্রেটিসকে জিজ্ঞাসা করেছিল, সাফল্য লাভের রহস্য কি; সক্রেটিস তাকে পরে দিন নদীর ধারে দেখা করতে বললেন। দৈখা হবার পর দুজনে জলের দিকে এগোতে থাকলেন এবং একগলা জলে গিয়ে দাড়ালেন। হঠাৎ কিছু না বলে সক্রেটিস ছেলেটির গাড় ধরে জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন। ছেলেটি জলের উপরে মাথা তোলবার যতই চেষ্টা করে সক্রেটিস ততই তাকে শক্তহাতে জলের নীচে ডুবিয়ে রাখলেন। বাতাসের অভাবে নীল হয়ে গেল ছেলেটির মুখ। সক্রেটিস তখন তার মাথাটি জলের উপর তুললেন। ছেলেটি হাঁসফাস করে বুকভরে নিশ্বাস নিল। সক্রেটিস জিজ্ঞেস করলেন, যতক্ষণ জলের নীচে ছিলে ততক্ষণ তুমি সবচেয়ে আকুলভাবে কি চাইছিলে? ছেলেটি জবাব দিল বাতাস। সক্রেটিস বললেন এটিই সাফল্যের রহস্য। তুমি যেভাবে বাতাস চাইছিলে সেইভাবে যখন সাফল্য চাইবে তখন তুমি সাফল্য পাবে। সাফল্যের কোন গঢ় রহস্য নেই।

কোন কাজ সুসম্পন্ন করতে হলে শুরু করতে হয় একটি জ্বলন্ত আকাঙক্ষা দিয়ে। অল্প আগুন যেমন অনেক উত্তাপ দিতে পারে না তেমনি দুর্বল ইচ্ছাশক্তি কোন মহৎ সিদ্ধিলাভ করতে পারে না।

২. অঙ্গীকার (Commitment)।

কোনও কাজ নিষ্পত্তি করার দৃঢ় অঙ্গীকার নির্মাণ করতে হয় দুটি স্তম্ভের উপর। সেদুটি হল সততা এবং বিজ্ঞতা। একজন ম্যানেজার তার কর্মচারীদের এই কথাটি বেশ সুন্দর করে বলেছিলেন, যদি তোমার আর্থিক ক্ষতিও হয় তবু তোমার অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকার নামই সততা এবং বিজ্ঞতা হচ্ছে, যেখানে ক্ষতি হবে সেইরকম বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ না হওয়া।

সাফল্য ও সমৃদ্ধি আমাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কী কী চিন্তা আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করবে। সাফল্য কোন আকস্মিক ব্যাপার নয়, এটি আমাদের মনোভাবের ফলশ্রুতি।

খেলার জয়লাভের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধতা আবশ্যক।

জেতার জন্য খেলা এবং না হারার জন্য খেলা-এই দুয়ের মধ্যে একটি বিরাট পার্থক্য আছে। যখন আমরা জেতার জন্য খেলি তখন আমরা বিশেষ উৎসাহ এবং অঙ্গীকার নিয়ে খেলি; কিন্তু যখন না হারার জন্য খেলি তখন জেতার উৎসাহ ও অঙ্গীকার থাকে না বলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মনোভাব নিয়ে খেলে থাকি। যখন আমরা না হারার জন্য খেলি তখন আমরা অসাফল্যকে এড়িয়ে যাবার জন্য খেলি। আমরা সকলেই জিততে চাই, কিন্তু। অনেকেই জেতার জন্য যে মূল্য দিতে হয় তা দিতে প্রস্তৃত থাকে না। জয়ীরা জেতার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। জেতার জন্য খেলার মধ্যে থাকে অনুপ্রেরণা আর না হারার জন্য খেলার মধ্যে থাকে বেপরোয়াভাব।

কোন আদর্শ অবস্থা বলে কিছু নেই, কখনো থাকবে না। কোন জায়গায় পৌঁছতে হলে আমরা কেবল লক্ষ্যহীনভাবে চললেই হবে না আবার নোজরে বাধা থাকলেও চলবে না। কখনো অনুকূল বাতাসে পাল তুলে চলতে হবে। কখনো বাতাসের বিপরীতে চলতে হবে, কিন্তু আমাদের পরিকল্পনামাফিক বা করতেই হবে।

কোন প্রশিক্ষক বা কোন অ্যাথলিটুকে যদি জিজ্ঞেস করা যায় খেলাধূলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে খারাপ দলের মধ্যে পার্থক্য কতটা তাহলে জানা যাবে যে তাদের শারীরিক গঠন, ক্ষমতা এবং দক্ষতায় খুব বেশি পার্থক্য নেই। সবচেয়ে বেশি তফাৎ দেখা যাবে দুই দলের আবেগের ক্ষেত্রে। বিজয়ী দলের আছে একান্তভাবে নিয়োজিত করার প্রেরণা, যার ফলে তারা অতিরিক্ত প্রয়াসে সক্ষম। বিজয়ীর কাছে

* প্রতিযোগিতা যত কঠিন জয়ের প্রেরণা তত বেশি।

* উদ্দীপ্ত মনোভাবও তত বেশি।

* দক্ষতাও উন্নততর।

* জয়ও মধুরতর।

নতুন সংকট সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে। অনেক অ্যাপলেই তাদের সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখিয়েছেন যখন তার প্রতিদ্বন্দিরা ও প্রতিকূলতা ছিল অনেক বেশি। সেই সময়ই তারা তাদের অন্তনিহিত শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগ করেছেন।

আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং অনুশীলন থামাতে চাই তখন ভাবি যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কি করছে। যখন দেখি সেও অনুশীলনে ব্যস্ত তখন আমিও নিজেকে অনুশীলনে ব্যাপৃত করি। যখন আমি দেখি যে সে অনুশীলন ছেড়ে স্নান করছে তখন আমি আরও বেশি কিছুটা অনুশীলন করে নিই। –Dan Gable. কুস্তিতে অলিম্পিকের স্বর্ণপদক বিজয়ী।

কেবলমাত্র লক্ষ্যে পৌঁছানোই সাফল্য নয়। পৌঁছানোর জন্য যে প্রচেষ্টা ও সাফল্যের অন্তর্ভুক্ত। অনেকে হেরে যাবার ভয়ে কখনো চেষ্টাই করে না। আবার অনেকেই নিজেদের অবস্থানে স্থির থাকতে পারে না, এই ভয়ে যে অন্যেরা এগিয়ে গেলে তারা নীচে নেমে যাবে। দুদিকেই একটা ঝুঁকি আছে। যে জাহাজ মহাসমুদ্রে যাত্রা করে তাদের ঝড়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। কিন্তু যে জাহাজ বন্দরে থাকে সে জাহাজও ধীরে ধীরে মরচে ধরে নষ্ট হয়ে যাবার ঝুঁকি থাকে। এইটিই হচ্ছে জয়ের জন্য খেলা এবং না হারার জন্য খেলা এ দুয়ের মধ্যে তফাৎ! জয়ী হবার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হলে তাকে ঝুঁকি নিতেই হবে। যে সব মানুষ জয়ের জন্য খেলে তারা সংকট এবং চাপের মুখে নিজেদের প্রকাশিত করতে পো আর যারা না হারার জন্য খেলে তারা জানে না কিভাবে জিততে হয়।

জয়ের জন্য যারা খেলে, তারা জয়ের বাসনাতেই কঠিন প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। যারা হারার জন্য খেলে চাপ তাদের শক্তিক্ষয় করে। তারা কখনোই তাদের সুপ্ত ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারে না। তারা হেরে যাবার সম্ভাবনায় শক্তি ক্ষয় করে। জেতার জন্য তাদের প্রচেষ্টাকে সংহত না করে হেরে যাবার দুর্ভাবনায় তারা শক্তি ক্ষয় করে।

বিজিতরা চান নিরাপত্তা, জয়ীরা চান সুযোগ। বিজিতরা মৃত্যুর থেকে জীবনকে বেশি ভয় করেন। অসফল হওয়া দোষের কিছু নয় কিন্তু চেষ্টার অভাব একটি বড় ধরনের বিচ্যুতি। জীবনের যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন, একজন মানুষের জীবনযাত্রার মান। উৎকর্ষের প্রতি অঙ্গীকারের সঙ্গে।–Vince Lombardi

দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই অঙ্গীকারবদ্ধতা জন্মায়

উৎকর্ষ বিচার করে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা ও দৃঢ় বিশ্বাস-এই দুয়ের মধ্যে তফাৎ আছে। উক্কর্ষের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া ঘটনাচক্রে পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু দৃঢ়বিশ্বাস অপরিবর্তিত থাকে। চাপ বা বিপত্তির সম্মুখে অগ্রাধিকার ওল্টপালট হয়ে যায় কিন্তু দৃঢ়বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়, এইজন্য আমাদের একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যবোধের চেতনা খুবই প্রয়োজনীয়। এর ফলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাসগুলি মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় এবং এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে আমাদের অঙ্গীকারবদ্ধ করে।

৩. দায়িত্ববোধ (Responsibility)

যে কর্তব্য আকাঙক্ষায় পরিণত হয় তা শেষপর্যন্ত আনন্দের উৎস হয়।–George Gritter

চরিত্রবান লোকেরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারিত করেন। দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ ঋকি নেওয়া এবং জবাবদিহির দায় নেওয়া। এটি অনেক সময় অস্বস্তিকর। বেশির ভাগ লোকই কোন দায়িত্ব না নিয়ে স্বস্তিতে নিরূদ্রব জীবন যাপন করতে চান। তারা লক্ষ্যহীনভাবে জীবনে এগিয়ে চলেন এবং জীবনে ভালো কিছুর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা না করে আপনা থেকে ঘটবে এইজন্য অপেক্ষা করেন। দায়িত্ব নিতে হয় বোকার মত নয়, বিচার বিবেচনা করেই। ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব নেবার অর্থ সমস্ত খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কার্যক্রম তৈরি করা। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মনে করেন না যে তাদের বাঁচার ব্যবস্থা করে দিতে পৃথিবী দায়বদ্ধ।

মিতব্যয়ী না হয়ে আপনি সম্পদশালী হতে পারেন না। শক্তিমানকে দুর্বল করে আপনি দুর্বলকে শক্তিমান করতে পারেন না। ধনীদের দরিদ্র করে, দরিদ্রকে ধনী করতে পারেন না। ঋণের টাকায় উন্নত আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন না। যারা মজরি দেয়, তাদের অবস্থায় উন্নতি ঘটিয়ে যারা মজুরি উপাজর্ন করে তাদের সাহায্য করা যাবে না। মানুষের স্বাধীনতা এবং উদ্যোগ নষ্ট করে চরিত্র এবং মনোবল গঠন করা যাবে না, শ্রেণীঘৃণা জাগ্রত করে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধের উন্নতি করা যাবে না, আয়ের থেকে ব্যয় বেশি করে সংকট এড়ানো যাবে না। মানুষ নিজে যা করতে পারে বা মানুষের করা উচিত তা করে দিলে মানুষকে স্থায়ীভাবে সাহায্য করা যায় না। -Abraham Lincoln

একটি কোম্পানীল প্রেসিডেন্ট যথারীতি বিদায় সম্ভাষণের পর নতুন প্রেসিডেন্টকে দুটি ক নম্বর ও দুই নম্বর মার্কা খাম দিয়ে বললেন,  যখন কোন পরিচালনা-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেবে, যা তুমি নিজে মোকাবিলা করতে পারবে না, তখন ১ নম্বর খামটি খুলবে। পরবর্তী সংকটকালে দ্বিতীয় ধামটি খুলবে। কয়েক বছর পর একটি গুরুতর সংকট উপস্থিত হল। প্রেসিডেন্ট তার আলমারি খুলে প্রথম খামটি বার করলেন। এতে লেখা ছিল,  সংকটের জন্য তোমার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের ঘাড়ে দোষ চাপাও। কয়েক বছর পর দ্বিতীয় সংকট দেখা দিলে প্রেসিডেন্ট তখন দ্বিতীয় খামটি খুললেন, এতে লেখা ছিল, পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য এরূপ দুটি খাম তৈরি কর অর্থাৎ তোমার দিন শেষ।

দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাদের ভুলত্রুটি স্বীকার করে নেন এবং ক্রটি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন। কোন কোন লোক কখনোই কিছু শেখেনা।

সাফল্য ভুল হলে আমরা তিনটি জিনিস করতে পারি।

* ভুলগুলিকে অগ্রাহ্য করতে পারি।

* ভুল অস্বীকার করতে পারি।

* ভুল মেনে নিয়ে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি।

তৃতীয় বিকল্পটি অনুসরণ করার জন্য সাহস দরকার। এর মধ্যে ঝুঁকে আছে, কিন্তু এটি সুফলপ্রদত্ত। যদি আমরা ভুল স্বীকার না করি তাহলে যে দুর্বলতার জন্য ভুল হয়েছে তবে সেই দুর্বলতাগুলিকেই আমরা সমর্থন করব এবং শেষ পর্যন্ত সেই দুর্বলতাগুলোই বড় হয়ে আমাদের সমস্ত জীবনকে প্রভাবিত করবে। এই দুর্বলতাগুলোকে শোধরাবার আর কোন সুযোগ থাকবে না।

৪. কঠোর পরিশ্রম (Hard work)

আকস্মিকভাবে বা দৈবক্রমে কোন সাফল্য পাওয়া যায় না। এরজন্য প্রস্তুতি ও চরিত্রবল দরকার। প্রত্যেকেই বিজয়ী হতে চায় কিন্তু কতজন প্রস্তুতির জন্য সময় দিতে ও পরিশ্রম করতে ইচ্ছুক?এই প্রস্তুতির জন্য শৃংখলাবোধ ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন। কঠিন পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই। হেনরী ফোর্ড বলেছিলেন, যত বেশি পরিশ্রম করবে তত বেশি ভাগ্যবান হবে। পৃথিবীতে অনেক ইচ্ছুক কর্মী আছেন তাদের মধ্যে কিছু কাজ করতে ইচ্ছুক আর অন্যেরা চায় তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিক।

আমি অর্ধেক দিন কাজ করতে চাই তা সে প্রথম ১২ ঘণ্টাই হোক বা দ্বিতীয় ১২ ঘণ্টাই হোক।–Kammons Wilson, CEO of Holiday Inn.

অভিধানের উপর বসে থাকলে যেমন বানানা শেখা যায় না তেমনি কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ কোন কিছু করার ক্ষমতা অর্জন করে না। পেশাদার ব্যক্তিরা তাদের কাজকর্মের মূল বিষয়গুলি আয়ত্ত করেছে বলে কাজকে সহজে আয়ত্ত করতে পারে। এ প্রসঙ্গে মাইকেল অ্যানজেলো বলেছেন, লোকে যদি জানতো, আমার কাজে দক্ষতা অর্জনের জন্য আমাকে কি কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাহলে আমার কাজ এত বিস্ময়কর মনে হতো না। কোনও কোম্পানীর এক কর্মকতা একজন প্রার্থী সম্পর্কে খোঁজ খবর করছিলেন। তিনি প্রার্থীর উর্ধ্বতম কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন,  কতদিন ওই ব্যক্তি আপনার কাছে কাজ করেছে? সেই ভদ্রলোক জবাব দিলেন, তিন দিন, কর্মকর্তা বললেন, কিন্তু প্রার্থী বলল যে আপনার কাছে তিনবার কাজ করেছে! ভদ্রলোক বললেন, ঠিক কথা, কিন্তু সে প্রকৃতপক্ষে কাজ করেছে মাত্র তিন দিন।

একজন গড়পড়তা লোক তার উৎসাহ ও ক্ষমতার শতকরা ২৫ ভাগ কাজের জন্য ব্যয় করে। যারা শতকরা ৫০ ভাগ এর বেশি ক্ষমতা ও উৎসাহ ব্যয় করেন তারা বিশ্বসুদ্ধ মানুষের অভিনন্দন পান। এবং যারা শতকরা ১০০ভাগ ব্যয় করেন তাদের জন্য থাকে সারা পৃথিবীর মানুষের উচ্ছ্বসিত কৃতজ্ঞতাবোধ। -Andrew Carnegie

যারা সফল হয় তারা জিজ্ঞেস করে কতটা বেশি কাজ করতে হবে। তারা জানতে চায় কত কম কাজ করতে হবে; তারা জানতে চায় কতঘণ্টা বেশি সময় লাগবে, কত কম সময় নয়। শ্রেষ্ঠ গায়কেরা প্রত্যেকদিন অনুশীলন করেন বিজয়ীদের সবাইকে পরাস্ত করে জয়ী হবার জন্য, কৈফিয়ত দেওয়ার কারণ নেই, কঠোর এবং দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের ফলেই সাফল্য এসেছে। আমরা যা কিছু ভোগ করি তো কারোর না কাহোর কঠিন পরিশ্রমের ফল। কিছু কাজ দৃশ্যমান আর কিছু অগোচরেই থেকে যায়। কিন্তু দুইই সমান হর্ণ। কিছু কিছু ব্যক্তি নির্দিষ্ট মাইনের পাকা চাকরি পেলেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়। বেকারের সংখ্যা যতই বেশি হোক ভালোভাবে কাজ করে এইরকম সচরাচর দেখা যায় না। অনেক মানুষই অলস সময় এবং অবসর সময় এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য জানে না। অলস সময়ের অর্ধ সময়ের অপচয় আর অবসর সময় হল প্রাপ্য সময় না পরিশ্রম করে উপার্জন করতে হয়। দীর্ঘসূত্রতা কাজ না করার সমান। কাজে উৎকর্ষ কোন ভাগ্যের ব্যাপার নয়। এটি কঠিন পরিশ্রম ও অনুশীলনের ফল। যে কাজই হোক না কেন কঠিন পরিশ্রম এবং অনুশীলন কাজে উৎকর্ষ আনে।

যারা অপেক্ষা করে তারা হয়ত কিছু পায়, কিন্তু তারা সেইটুকুই পায় যা পরিশ্রমীদের পুরস্কার দেওয়ার পর উদ্ধৃত্ত থাকে।-Abraham Lincoln

কঠোর পরিশ্রমের শুরু ও সমাপ্তি দুই সার্থক।

যত কঠিন পরিশ্রম করে ততই ভালো বোধ করে আর যত ভালো বোধ করে ততই কঠিন পরিশ্রমের আগ্রহ হয়। সর্বোত্তম চিন্তাগুলি কার্যে পরিণত না করলে সেগুলি চিন্তাই থেকে যাবে। অনেক মহৎ প্রতিভাও ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। হাঁস জলের তলায় নিরলস পদচালনা করে চলেছে কিন্তু উপরে সবসময় মসৃণ ও শান্ত-তার পরিশ্রম বোঝা যায় না।

একদিন মহান বেহালাবাদক ফ্রিটস ক্রিসলার (Fritz Kreisler) তার বাজনা শেষ করলে একজন স্টেজের উপর এসে বললেন,  আপনার মতো বাজনা শিকতে পারলে আমি জীবন দিয়ে দিতাম। ক্রিসলার বললেন, হ্যাঁ, আমি জীবনই দিয়েছি!।

সাফল্য লাভের জন্য কোন জাদু দণ্ড নেই। বাস্তব জগতে যারাকাজ করে তাদেরই সাফল্য আসে। যারা শুধু দেখে তাদের নয়। যে ঘোড়া গাড়িটানে, সে লাথি মারতে পারে না। আবার যে ঘোড়া লাথি মারে সে গাড়িটানতে পারে না। গাড়ি টানাটা দরকার, লাথি মারা নয়। কঠিন শ্রম ছাড়া কোনও সাফল্য নেই। প্রকৃতি পাখিদের খাবার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এগুলি তাদের বাসায় পৌঁছে দেয়নি। খাবার সংগ্রহের জন্য পাখিদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কোন কিছুই সহজে আসে না। মিলটন প্রত্যেকদিন ভোর ৪টেতে উঠতেন, প্যারাডাইস লস্ট লেখার জন্য। ওয়েবস্টারের অভিধান সংকলন করার জন্য নোয়া ওয়েবস্টারের ৩৬ বছর লেগেছিল। এমনকি ছোট ছোট কাজেও কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় এবং ছোট ছোট কাজ বাগাড়ম্বরের থেকে অনেক ভালো।

৫. চরিত্র (Character)

চরিত্র মানুষের মূল্যবোধ বিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়। আমাদের কাজেও ব্যবহারে চরিত্র প্রতিফলিত হয়। সবচেয়ে মূল্যবান রত্নের থেকেও সযত্নে চরিত্রকে রক্ষা করা দরকার। জয়ী হতে হলে চরিত্রের প্রয়োজন। জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন,  আশা করি আমার এমন দৃঢ়তা ও সদ্গুন আছে যার দ্বারা আমি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, সৎ মানুষের চরিত্রকে রক্ষা করতে সমর্থ হব।

নির্বাচন কিংবা জনমত নয়, দেশ নেতার চরিত্রই ইতিহাসের জাতি নির্ধারণ করে। সততার ব্যাপারে কোন অস্পষ্টতা না থাকাই ভালো সাফল্যের পথে অনেক বাধা-বিপত্তি আছে। পদস্খলনের সম্ভাবনা রোধ করার জন্য চরিত্রের শক্তি এবং চেষ্টা প্রয়োজন হয়। চরিত্রবল সমালোচকদের আক্রমণে নিসাহ হওয়া থেকে রক্ষা করে।

কেন বেশিরভাগ মানুষ সাফল্য পছন্দ করে কিন্তু সফল মানুষকে ঘৃণা করে?

যখনই কোনও ব্যক্তি গড়পড়তা মানুষের উপরে উঠে যাবেন তখনই কিছু লোক তাকে ছিড়ে ফেলতে চেষ্টা করবে। পাহাড়ের চূড়ায় যে ব্যক্তি উঠেছেন তিনি অনায়াসে সেখানে পৌঁছে যাননিতাকে কষ্ট সহ্য করে উপরে চড়তে হয়েছে। জীবনেও এর ব্যতিক্রম হয়না। যে কোনও পেশায় সফল ব্যক্তিকে অসফল ব্যক্তিরা নিশ্চতভাবে ঈর্ষা করবেন। সমালোচনা যেন লক্ষ্যে পৌঁছাবার অনন্যচিত্ততাকে পূন্ন না করে। পড়পড়তা মানুষ সমালোচনা এড়িয়ে চলতে চান। কিছু না করলে সমালোচনারও সুযোগ থাকে না। যত বেশি লক্ষ্য সিদ্ধির পথে এগোবেন, ততই সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। মনে হয় সাফল্যও সমালোচনার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। সাফল্য যতবেশি সমালোচনাও ততবেশি।

সমালোচকরা সবসময় কাছাকাছিই থাকেন। তারা আংশিক সফল ব্যক্তিদের আরও ভালো করার উপদেশ দেন। স্মরণ রাখা দরকার যে সমালোচকরা জননেতা নয় কিংবা কর্মীও নয়, তাদেরকে বলা উচিত সমালোচকের আসন থেকে কর্মক্ষেত্রে নেমে আসতে।

যারা প্রত্যেক বস্তুরই দাম জানেন কিন্তু কোনও বস্তুরই প্রকৃত মূল্য জানেন না তারাই সমালোচক।-Oscar Wilde

আর এক জাতের মানুষ আছেন, যারা যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্যরা স্বনির্ভর হচ্ছে। ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্য করতে প্রস্তুত। কিন্তু স্বনির্ভর হওয়া মাত্রই সাহায্যকারীরা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে দেন। এটি সংসারের নিয়ম এবং জীবনে সাফল্য লাভ করতে হলে এই সমস্ত বুদ্রমনা মানুষদের অত্যায় করতে হবে এরকম ব্যবহার ঈর্ষার ফল।

চরিত্র কতকগুলি গুণের সমন্বয়

চরিত্র সততা, নিঃস্বার্থপরতা, সংবেদনশীলতা, দৃঢ়বিশ্বাস, সাহস, আনুগত্য এবং শ্রদ্ধার সময়।

মুধুর ব্যক্তিত্ব কিরূপ হয়। এরা একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত।

* আত্ম-নিয়ন্ত্রণে সক্ষম।

* ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি সমতাবোধ আছে।

* ব্যক্তিত্বে আছে দৃঢ়প্রত্যয়ী মনোভাব এবং নুদ্ধত আত্মবিশ্বাস।

* সুবিবেচক।

* কখনো অজুহাত দেখাতে অভ্যস্ত নয়।

* ভদ্রতা রক্ষায় এবং সুব্যবহারের খাতিরে এরা অনেক ছোটখাটো ত্যাগধীকারে কুণ্ঠিত নয়।

* অতীতের ভুল থেকে এরা শিক্ষাগ্রহণ করতে জানে।

* এই ধরনের ব্যক্তিত্ব বংশমর্যাদা কিংবা সম্পদের দম্ভ করে না।

* অপরকে বিনষ্ট করে এরা নিজেদের উন্নত করে না।

* এই ব্যক্তি কেবল বাইরের আবরণ নয়, অন্তনিহিত ক্ষমতারও প্রকাশ।

* উচ্চশ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংস্পর্শ রক্ষা করেন।

* এরা মৃদভাষী, সহানুভূতিশীল দৃষ্টি এবং সরলতাপূর্ণ হাসিতে উজ্জ্বল।

* এরা অন্তনিহিত গর্ববোধের জন্য অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।

* এরা নিজের সঙ্গে এবং অন্যের সঙ্গেও স্বচ্ছন্দ।

* এদের আভিজাত্য বিজয়ীর প্রাধান্য দেয়।

* এরা আশ্চর্যজনকভাবে কার্যসিদ্ধি করতে পারে।

* এরা দুঃসাধ্য কাজও সম্পন্ন করতে পারে।

* এদের সহজে চেনা যায় কিন্তু ব্যাখা করা সহজ নয়।

* এরা সবসময়ই বিনয়ী।

* জয়ে কিংবা পরাজয়ে সবসময়ই ঔদার্যপূর্ণ।

* খ্যাতি কিংবা সম্পদ এরূপ ব্যক্তিত্বের লক্ষণ নয়।

* এদের পরিচয় তাদের তকমার দ্বারা হয় না।

* এদের ব্যক্তিত্ব চিরন্তন।

* বংশবদ না হয়েও এরা বিনয়ী ও সুভদ্র।

* এরা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।

* আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও জ্ঞান এরূপ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

* এরা আত্মনির্ভরশীল। এরা জয়ে ঐদার্যপূর্ণ ব্যবহার করেন পরাজয়েও বোধশক্তিকে বিসর্জন দেয় না।

সাফল্য অর্জনের থেকে কিভাবে সফল হওয়ার পর সাফল্যকে ব্যবহার করতে হবে সেটাই অধিকতর কঠিন বিষয়। অনেকেই কিভাবে সফল হতে হয় তা জানেন কিন্তু জানেন না সফল হবার পর তার সাফল্যকে কিভাবে ব্যবহার করবেন। সাফল্য অর্জনের ক্ষমতা এবং সফল ব্যক্তির চরিত্র একে অপরের পরিপূরক। যোগ্যতা সাফল্য এনে দেবে এবং চরিত্র সেই সাফল্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

আমরা নিজেদের প্রকাশ বা আবিষ্কার করি না। আমরা নিজেরা যা হতে চাই সেই ভাবে পরিকল্পনা করি ও গড়ে তুলি।

চরিত্রগঠন শৈশব থেকেই শুরু হয়, এবং মৃত্যু পর্যন্ত চলে। সফলতা চরিত্রের উপাদান নয়, বস্তুতপক্ষে চরিত্রই সফলতা। একজন মালি যেমন বাগানকে আগাছামুক্ত রাখতে সর্বদাই বাগানের আগাছা পরিষ্কার করে তেমনি আমাদের চরিত্র গঠন এবং উন্নতি করতে সবসময় আগাছাকে নির্মূল করা প্রয়োজন।

প্রতিকূলতা চরিত্রগঠন করে ও চরিত্রের গুণাবলী প্রকাশ করে।

প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কোন কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে, আবার কেউ কেউ মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ে। না মার্জনা করলে কোনও বস্তুকে উজ্জ্বল করা যায় না। আগুনে পরিশোধিত না করলে সর্বোত্তম ইস্পাত পাওয়া যায় না। সেইভাবে প্রতিকুলতা মানুষের চরিত্রকে প্রকাশ করে, এবং নিজের কাছে নিজেকে পরিচিত করায়।

রাশিয়াতে একটি প্রচলিত কথা আছে,  হাতুড়ি কাঁচ ভাঙে, কিন্তু ইস্পাতের পাত তৈরিতে হাতুড়ির দরকার। এই কথাটির মধ্যে অনেক সত্য আছে। আমরা কাঁচ না ইস্পাত? হাতুড়ি কিন্তু একই থাকে। কার্বন যেমন ইস্পাতের মান নির্ণয় করে তেমন চরিত্র মানুষের মান নির্ধারণ করে।

৬. ইতিবাচক বিশ্বাস (Positive believing)

ইতিবাচক চিন্তা ও ইতিবাচক বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? আপনার নিজের চিন্তা ভাবনা যদি নিজেই শুনতে পেতেন, তাহলে কি বুঝতে পারতেন তা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক চিন্তা? আপনি আপনার মনকে সাফল্যের অথবা অসাফল্যের জন্য প্রস্তুত করেছেন? আপনার চিন্তাই আপনার কাজের উপর প্রগাঢ় প্রভাব বিস্তার করে।

প্রত্যেক সকালেই আমরা একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি কিংবা কর্মপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকি।

সর্বক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনযাপন করা সহজ হয়। সেইরকম আবার সর্বক্ষেত্রে নেতিবাচক জীবনযাপন সহজ নয়। যদি বেছে নিতে দেওয়া হয় তবে আমি ইতিবাচক জীবনযাপনই গ্রহণ করব।

ইতিবাচক চিন্তা নেতিবাচক চিন্তার থেকে ভালো এবং এই চিন্তা আমাদের সামর্থ্যকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।

ইতিবাচক বিশ্বাস ইতিবাচক চিন্তার থেকেও অনেক ব্যাপক। ভাবনাগুলিকে কার্যকর করা সম্ভব। এই বিশ্বাস যখন জন্মায় তকেই বলে ইতিবাচক বিশ্বাস। কাজটি সম্পন্ন করার জন্য আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হবে, এইটিই ইতিবাচক বিশ্বাস। প্রস্তুতি না নিয়েই যদি ভাবা যায় যে কার্যসিদ্ধি হবে তবে তা হবে অলীক স্বপ্নের মতো। নীচের কাহিনীটি ইতিবাচক বিশ্বাসের একটি উদাহরণ।

Lockheed সংস্থায় ইতিবাচক বিশ্বাসের কারণ আছে কি? কয়েক বছর আগে Lockheedr L-1011 Tristar নামে একটি বিমান তৈরি করেছিল। এই জেট বিমানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শক্তি পরিমাপের জন্য কোম্পানী ১৮ মাস ধরে কঠোরভাবে পরীক্ষা করল, এই পরীক্ষায় খরচ হলো ১.৫ বিলিয়ন ডলার। বিমানটির হাইড্রোলিক জ্যাক, ইলেকট্রনিক সেনসর এবং কম্পিউটর এটিকে ৩৬০০০ এর বেশি নকল উড়ান করিয়েছিল। এই উড়ানলিকে সত্যকারের উড়ান হলে প্রায় ১০০ বছর সময় লাগত। এতগুলি উড়ানে একটিও যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েনি। অবশেষে আরও অনেক পরীক্ষার পর বিমানটিকে উড়ানোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। (Adapted from Daily Motivations for African-American Success by Dennis Kimbro, June 29, 1993, Fawcett Press, New York)

এখন বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে যে এই বিমানটি নিরাপদে আকাশে উড়তে পারবে। কারণ বিমানটিকে সাফল্যের সঙ্গে উড়ানের জন্য সকল প্রকারের প্রস্তুতি করা হয়েছিল।

৭. যা পাওয়া যায় তার থেকে বেশি দিতে হয় (Give more than you get)

একবার সফল হওয়া সহজ। যদি জীবনে সবার আগে চলতে চান তাহলে অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। এই অতিরিক্ত পথ চলতে কোন প্রতিযোগিতা নেই। যে কাজের জন্য মাইনে পান তার থেকে অল্প বেশি কাজ করতে কি আপনি তৈরি আছেন? এমন কতজন লোক আছেন যারা মাইনের জন্য যা কাজ করে তার থেকে একটু বেশি কাজ করতে প্রকৃত ব বেশি নয়। অধিকাংশ লোকই যে কাজের জন্য মাইনে পান তার থেকে বেশি কাজতে চান না। বিতীয় শ্রেণীর একদল আছেন যার যতটুকু কাজ না করলে নয় সেইটুকুই করেন। তারা ততটুকুই কাজ করেন যারা রা চাকরি বলায় রাখা যায়। খুব একটি ক্ষুদ্র অংশ যে কাজের জন্য মাইনে পান তার থেকে কিছু বেশি করতে ইক। তারা বেশি করেন কেন? যদি আপনি এই সর্বশেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে প্রতিযোগিতা কোথায়? যে কাজের জন্য মাইনে পাওয়া যায় তার থেকে বেশি কাজ করার সুবিধে এইগুলি

* নিজেকে অন্যদের থেকে বেশি প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য করে তোলা যায়।

* আত্মবিশ্বাসা বেড়ে যায়।

* পাশাপাশি যারা কাজ করেন তারা কাজের বিষয়ে আপনার নেতৃত্ব স্বীকার করে নেন।

* অন্যদের কাছে বিশ্বাস ভাজন হওয় যায়।

* ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা সম্মান করতে শুরু করেন।

* অধস্তন এবং ঊর্ধ্বতন, দুই তরফেই একটা আনুগত্যের সৃষ্টি হয়।

* সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়।

যদি আপনি কোনও একজন মানুষের জন্য কাজ করেন তাহলে, দোহাই আপনার, তার জন্যই কাজ করুন। –Kim Huvvard

বয়স, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাই হোক না কেন, নিম্নবর্ণিত গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের সর্বদাই চাহিদা আছে। যারা কঠোর পরিশ্রমী এবং তদারকি ছাড়াই কাজ করেন; যারা নিয়মানুবর্তী এবং বিবেচক; যারা যত্ন সহকারে শোনেন এবং সঠিকভাবে নির্দেশাবলী পালন করেন; যারা সত্য কথা বলেন; যারা সংকটের মুহূর্তে কাজ করতে ডাকলে নানা অজুহাত দেখান না, যারা কাজের থেকে ফলাফলের দিকে বেশি নজর দেন; যারা সবসময়ই প্রসন্ন এবং আচরণে সুন্দ্র।

সবসময়ই চিন্তা করুন, খরিদ্দার, বন্ধু স্ত্রী মাত-পিতা, কিংবা সস্তান-যেই হোক না কেন, যখন কাউকে কিছু দিতে চান তখন যেন প্রকৃত মূল্যের থেকে কিছু বেশি দিতে পারেন। যখন কিছু কাজ করেন তখন চিন্তা করুন, আমি কিভাবে যে কাজ করছি তাতে কিছু অতিরিক্ত মূল্য যোগ করতে পারি? অথবা অন্যকে আমি অতিরিক্ত কিছু কিভাবে দিতে পারি।

সাফল্যের সূত্রটিকে চারটি শব্দে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, এবং আরও কিছু বেশি…….। সফল ব্যক্তিরা প্রত্যাশিত কাজতো করেই এবং তারপর আরও কিছু বেশি করেন। তারা তাদের কর্তব্য করেন এবং তারপর আরও কিছু বেশি করেন। তারা দ্র এবং উদার এবং তার চেয়ে কিছু বেশি। তাদের উপর আরও বেশি নির্ভর করা যেতে পারে। তাদের শক্তি সামর্থ্যের সমস্তটাই কাজে নিয়োগ তো করেনই এবং আরও কিছু বেশি করেন।

নির্ভরশীলতা, দায়িত্বশীলতা এবং চরিত্রের নমনীয়তা ছাড়া কার্যক্ষমতা বোঝা-স্বরূপ হয়।

কেন কোনও কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাদের চমকপ্রদ শিক্ষাগত যোগ্যতা সত্ত্বেও বফলতার জীবন্ত প্রতীক হয়ে থাকেন। অথবা খুব বেশি হলে মামুলীভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন। কারণ তারা সমস্ত বিষয়ের নর্থক দিকগুলি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে দক্ষ হয়েছেন এবং একটি নেতিবাচক শক্তির ভাণ্ডার তৈরি করেছেন। তারা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক পান সে কাজটা করতে চান না অথবা যতটুকু কাজ না করলে নয় ততটুকুই করেন। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে তারা বিফলতার জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠবেন। যখন আমরা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাই তার থেকে বেশি কাজ করি তখন আমাদের কোন প্রতিদ্বন্দী থাকে না। প্রকৃতপক্ষে তখন আমাদের প্রতিযোগিতা নিজেদের সঙ্গে। মেধা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্ব অনেক বেশি।

৮. অধ্যবসায়ের শক্তি (the power of persistence)।

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। যাদের সহজাত দক্ষতা আছে তাদেরও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে সহজাত দক্ষতা ছিল, অথচ সফল হতে পারেননি। এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। প্রতিভাবানদেরও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন কথায় আছে, সাফল্যবিহীন প্রতিভা অর্থাৎ প্রতিভা থাকলেই সফল হওয়া যায় না। শিক্ষাও অধ্যাবসায়ের বিকল্প নয়। শিক্ষিত, অথচ অসফল মানুষে পৃথিবী ভর্তি। অধ্যবসায় ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মানুষেরাই সর্বশক্তিমান। -Calvin Coolidge

আপনার ক্ষমতা সর্বোত্তমরূপে প্রকাশ করা সহজ নয়। পথে অনেক বাধা-বিপত্তি। বিজয়ীরা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আরও কঠোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তনের ক্ষমতা রাখেন।

পলায়ন নয় (Dont quit)

যখন কোনও কিছুই ঠিকমতো হয় না, এবং কোনও না কোনও সময় এরকম হবেই, যখন সামনে চলার পথ কেবল খাড়া চড়াই যখন সম্বলহীন, কিন্তু ঋণের বোঝা ভারী, যখন হাসতে গেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, যখন দুশ্চিন্তার ভার চেপে বসেছে মনে, তখন, যদি একান্তই ইচ্ছা হয়, তবে বিশ্রাম নাও; কিন্তু রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যেও না। আমরা জানি জীবনের পথে অনেক মোড়, অজস্র পাকদণ্ডী, এই সবের জন্যই জীবনের বৈচিত্র্য। অনেক সময় পরাজয় এনেছে হতাশা, যদি থাকত অধ্যবসায় তবে অনেকগুলিই হয়তো সাফল্যে রূপান্তরিত হোত। তাই, ক্লান্তি যদি চলার গতি মন্থর করে দেয়, তবুও হার মেনে থেমে যেও না। আর একবার প্রাণপণ চেষ্টায় এগিয়ে চল, এবার হয়ত জিতে যাবে। বিফলতার অনন্য পিঠেই সাফল্য। সন্দেহের কালো মেঘ যখন আশার রূপালী রেখাকে আড়াল করে দেবে, তখন জানতেও পারবে না সাফল্য কত নিকটে। যখন দূরে মনে হবে, তখন হয়ত সত্যিই খুব কাছে। তাই যদি কঠিনতম আঘাতও আসে, তবু যুদ্ধ চালিয়ে যাও,অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠলেও পলায়নের চিন্তা কোরো না।

প্রসিদ্ধ বেহালাবাদক ফ্রিটস ক্রিসলার (Fritz Kreisler) কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি কী করে এত ভালো বাজাও? এটা কি ভাগ্যের জোরে? ক্রিসলার জবাব দিলেন,  অনুশীলন করি বলেই ভালো বাজাতে পারি। আর কিছু ব্যাপার নেই এর মধ্যে। যদি একমাস অনুশীলন না করি তবে আপনিই তফাৎ বুঝতে পারবেন। এক সপ্তাহ না করলে আমার স্ত্রী বুঝতে পারবেন। আর একদিন অনুশীলন না করলে আমার কাছে তফাৎ ধরা পড়বে।

অধ্যবসায় বা হার স্বীকার না করে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সঙ্কল্প। দীর্ঘদিন ব্যাপী পরিশ্রম করার মধ্যে আনন্দ আছে। অ্যাথলিটরা অনেক বৎসর ধরে শ্রমসাধ্য অনুশীলন করেন কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের প্রতিযোগিতার জন্য। অধ্যবসায়ের জন্য সঙ্কল্প প্রয়োজন। যে কাজ শুরু করা হয়েছে তা শেষ করার অঙ্গীকারই অধ্যবসায়। পরিশ্রমে বিধ্বস্ত হয়ে হয়ত মাঝপথে ছেড়ে দেবার ইচ্ছা হবে। কিন্তু বিজয়ীরা কষ্ট সহ্য করে এগিয়ে চলেন। বিজয়ী অ্যাথলিটদের প্রশ্ন করুন কত কঠোর পরিশ্রমের যন্ত্রণা সহ্য করে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। অনেক অসফল ব্যক্তিও শুরুতে কঠোর পরিশ্রম করেন, কিন্তু তাদের ক্রমাগত শ্রমসাধ্য অনুশীলনের সহনশীলতা নেই বলে শেষ করতে পারেন না। লক্ষ্য স্থির থাকলে অধ্যবসায়ী হওয়া যায়। লক্ষ্যবিহীন হলে জীবনে ইতঃস্তত ভেসে বেড়ানো ছাড়া গতি নেই, যে মানুষের জীবনে কোন লক্ষ্য নেই, তিনি কখনো অধ্যবসায়ী হতে পারেন না, এবং জীবনে পূর্ণতা লাভ করেন না।

৯. কাজ সম্পন্ন করার গৌরব (Pride of performance)

আজকাল একটি নির্দিষ্ট কাজ সুসম্পন্ন করার মধ্যে যে আত্মগরিমা আছে তা সাধারণ নজরে পড়ে না। কোন কাজই আপনা থেকে সম্পন্ন হয়না। তাকে অনেক পরিশ্রম ও চেষ্টার দ্বারা সম্পন্ন করতে হয়। অনেকে ফাকি দিয়ে কাজ

সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এটি এড়িয়ে চলাই উচিৎ। যথোচিত পরিশ্রম ও দক্ষতার দ্বারা কাজটি সম্পন্ন করলেই আত্মগৌরব জন্মায়, এটি অন্তরের জিনিস এবং সাফল্যের সোপান। এই আত্মগৌরব কিন্তু অহংবোধ নয়। আত্মগৌরবে আছে কাজ সুসম্পন্ন করার আনন্দ এবং বিনয়। কর্মের মান কর্মীর গুণমানের সঙ্গে যুক্ত। অমনোযোগী ও আন্তরিকতাহীন কাজে কোন সাফল্য আসে না।

তিনজন শ্রমিক ইট গাথছিলেন। একজন পথিক তারা কি করছেন জানতে চাইলেন। প্রথমজন জবাব দিলেন, দেখছেন না আমি মজুরির জন্য কাজ করছি, দ্বিতীয়জন বললেন, দেখছেন না আমি ইট গাঁথছি, তৃতীয়জন বললেন, আমি এটি সুন্দর সৌধ তৈরী করছি, তিনজন একই কাজ করছেন, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জবাব দিলেন। এটি পরিষ্কার যে কাজের প্রতি

তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের কাজকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে।

করণীয় কাজের জন্য গর্ববোধ থাকলে সেই কাজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেক কাজের ধ্যে কর্মীর দক্ষতা ও মনোভাবের ছায়া থাকে- তা সে গাড়ি ধোয়া, ঘর মোছা কিংবা বাড়ি রং করা ইত্যাদি যে কোন ধরনের কাজই হোক না কেন।

শুধু প্রথমবারই নয় প্রত্যেক বারই কাজটি ভালোভাবে করা দরকার। আজকের কাজটি ভলোভাবে করলে কারকের জন্য নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

মাইকেল এঞ্জেলো বেশ কিছুদিন ধরে একটি মূর্তি তৈরীতে ব্যস্ত ছিলেন। মূর্তিটির ছোট ছোট অংশগুলিও তিনি পূখানুপুঙ্কভাবে বারবার মার্জনা করছিলেন। একজন দর্শকের এটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল। এই বিষয়ে মাইকেল এঞ্জেলাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, অকিঞ্চিৎক্তর বিষয়ে নজর দিয়েই সম্পূর্ণতা আনতে হয়; কিন্তু সম্পূর্ণতা মোটেই অকিঞ্চিতকর নয়। কত দ্রুত কাজটি নিষ্পন্ন হয়েছিল অনেকেই তা মনে রাখেন না, কিন্তু কাজটি ভালেভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কিনা তা সকলেই মনে রাখেন। ভালোভাবে কাজ সুসম্পন্ন করাই বড় কথা।

একজন রাস্তার ঝাড়দারও তার কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারেন, যেমন নিষ্ঠার সঙ্গে মাইকেল এঞ্জেলো ছবি একেছেন। কিংবা বেটোভেন সুর সৃষ্টি করেছেন। কিংবা শেক্সপিয়র কবিতা লিখেছেন। তিনি রাস্তা এমনভাবে পরিষ্কার করবেন যে সকলে থমকে দাঁড়িয়ে বলবেন, এখানে এমন একজন ঝাড়ুদার ছিলেন যিনি তার কাজ খুব দক্ষতার সঙ্গেই করেছেন। -Martin Luther King, Junior

কাজের ও পরিষেবার মান নিয়ে কোনও আপস চলে না, ম্যাকডোনাল্ড নামক বিখ্যাত কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা রয় ব্রুক একটি দোকান পরিদর্শনকালে খাবারে একটি মাছি দেখেছিলেন, দুসপ্তাহ পরে ওই দোকানের ভারপ্রাপ্ত কাচারী তার চাকরি হারালেন, রয় ক্ৰক তাকে বললেন,  করণীয় কাজের জন্য গৌরববোধ ও জটি সুসম্পন্ন করার ইচ্ছা নিয়ে কাজ করবে। আমি কর্ম জীবনের প্রথমেই বুঝে গিযেছি য কাজের পুরষ্কার পাওয়া যায় শেষে।

কাজ সুসম্পন্ন করার তৃপ্তিই বড় পুরস্কার। অনেক বড় কাজ খাপছাড়াভাবে সম্পন্ন করার থেকে ছোট কাজ ভালোভাবে করা অনেক ভালো।

১০. শিক্ষার্থী হওয়ার ইচ্ছা থাকা উচিত – একজন পথ প্রদর্শকও প্রয়োজন (Be willing to be a student – get a mentor)

যদি একসঙ্গে ঈশ্বর আর শিক্ষক সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তবে কাকে প্রথমে নমস্কার করবেন? ভারতীয় সংস্কার অনুসারে শিক্ষককে, কারণ শিক্ষকের নিদের্শ ও সাহায্য ব্যতিরেকে ছাত্রের ঈশ্বরপ্রাপ্তি ঘটবে না।

যিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে ছাত্রের দুরদৃষ্টিকে প্রসারিত করতে পারেন তিনি একজন শিক্ষক বা পতপ্রদশর্ক। এমনই একজন ব্যক্তিকে আপনার শিক্ষক হিসেবে বেছে নিন। একজন ভালো শিক্ষক নিদের্শ দিয়ে আপনাকে পরিচালনা করবেন, একজন খারাপ শিক্ষক আপনাকে ভুল পথে পরিচালনা করবেন। শিক্ষককে শ্রদ্ধা করুন, আগ্রহী ছাত্র হোন। শিক্ষকরা ছাত্রদের কৌতূহল পছন্দ করেন।

উত্তম শিক্ষকরা তৃষ্ণা মেটাবার পানীয় সরবরাহ করেন না, তৃষ্ণাকে বাড়িয়ে দেন। তারা প্রশ্নের উত্তর পাবার সঠিক রাস্তা ধরিয়ে দেন। পুরাকালে এক রাজা সম্পর্কে গল্প আছে। সমাজের কল্যানে যার সবচেয়ে বেশি অবদান তাকে তিনি সম্মানিত করতে চেয়েছিলেন। রাজসভায় সবরকমের লোক এসে প্রত্যেকেই সম্মান লাভের আশায় তাদের অবদানের কথা বিশদভাবে উল্লেখ করল। কিন্তু রাজা খুব সন্তুষ্ট হলেন না। অবশেষে একজন বয়স্ক ব্যক্তি উদ্ভাসিত মুখে রাজসভায় প্রবেশ করলেন। নিজের পিরচয় দিলেন শিক্ষক বলে, আর কিছু বলতে হল না। রাজা সিংহাসন থেকে নেমে এসে নত মস্তকে শিক্ষককে অভিবাদন করলেন। সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশী।

সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সব গুন কি আমাদের আছে -(Do we have what it takes to be successful?)

অনেক মনে করেন সাফল্যের জন্য উপযুক্ত গুণাবলী তাদের নেই। তারা সকলেই গড়পড়তা লোক এবং অনেক সময়ই কাজে ব্যর্থ হন। কিন্তু এরকম হওয়া উচিত নয়, সাফল্যের জন্য না প্রয়োজন সমস্ত গুনাবলীই আমাদের আছে হয়ত সেই গুনাবলী যেভাবে চর্চা করলে সাফল্যের স্তরে নিয়ে যেতে পারত সেইভাবে চর্চা করা হয়নি, অনেক সময় আমরা হয়ত সচেতন নই যে আমাদেরও ওই গুনাবলী আছে। কিন্তু এই গুণগুলি যে আছে তা জানা থাকলে আমাদের কর্মদক্ষতার অনেক উন্নতি ঘটে।

ব্যাপারটা যেন বাড়ির উঠোনে ১০ লাখ ডলার পোঁতা আছে কিন্তু আপনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না, সুতরাং আপনি তা বের করতে পারবেন না। কিন্তু যে মুহূতে আপনি সেই সম্পদের সন্ধান পাবেন আপনার চিন্তা ও ব্যবহার বদলে যাবে। মানুষের সম্পকেও এই কথা সত্যি। আমাদের সকলেরই এইরকম গুপ্তধন আছে। প্রয়োজন হল তাকে প্রকাশ্যে এনে যথাযথরুপে ব্যবহার করা।

কী আমাদের পিছনে টেনে রেকেছে? (What is holding us back?)

আমরা যদি ব্রেক চেপে ধরে গাড়ি চালাই তবে কি রকম হবে? গাড়ি কখনোই পূর্ণ গতিতে চলবে না কারণ ব্রেক বাধা দেবে। ফলে গাড়ি অতিরিক্ত গরম হবে ও ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাবে। যদি একেবারে খারাপ নাও হয়, ইঞ্জিনের অনেক সমস্যা দেখা দেবে। এখানে দুটি বিকল্প আছে হয় অ্যাকসেল্যাটের জোরে চেপে দিন এবং গাড়িটি অচল হয়ে যাবার ঝুঁকি নিন অথবা ব্রেকের উপর থেকে চাপ তুলে নিন এবং গাড়িকে দ্রুত ছুটতে দিন। জীবনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকমরা ভাবাবেগে ব্রেক দিয়ে জীবনের গতিবেগ মন্থর করতে চাই ফলে। অনেক সময় ভাবাবেগ আমাদের সাফল্য লাভের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এই ভাবাবেগকে সংযত রাখার জন্য আমাদের উচিত একটি ইতিবাচক মনোভাব, উঁচু পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ তৈরী করা এবং দায়িত্ব গ্রহনের ক্ষমতাকে উন্নত করা।

অসাফল্যের কারণ (Reasons for failure-why we dont achieve excellence) কেন আমরা কাজে উকর্ষ লাভ করতে পারিনা, জীবন যেন একটি দশ-গতির বাই-সাইকেল, আমাদের অনেকেই কখনো গিয়ার ব্যবহার করি না।-Charles Schultz

১. ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছা-(Unwillingness to take risks)

সাফল্যের জন্য বিচার বিবেচনাপূর্বক ঝুঁকি নিতে হয়। ঝুঁকি নেওয়া মানে বোকার মত জুয়ার বাজি ধরা নয় কিংবা দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবহার নয়। অনেকে কখনও কখনও দায়িত্বজ্ঞানহীন হঠকারিতাকে ঝুঁকি বলে ভুল করেন এর ফলে যখন উল্টো ফল ফলে তখন ভাগ্যকে দোষ দেন। ঝুঁকি নেওয়া একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। খুঁকির অর্থ ভিন্ন ভিন্ন প্রশিক্ষণের ফলে ঝুঁকি নেওয়ার বিপদকে কমিয়ে দেওয়া যায়। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্বতারোহী এবং একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তি-দুজনের ক্ষেত্রে পর্বতারোহণের দুরকম ঝুঁকি আছে। কিন্তু যিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তার কাছে এই ঝুঁকি বিবেচনাহীন ঝুঁকি নয়। যখন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, জ্ঞান-অর্জন, নিজের আত্মবিশ্বাস ও মোগ্যতা তৈরি করার পর ঝুঁকি নেওয়া হয়, তখন তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ঝুঁকি বলা যায় না। যে ব্যক্তি কখনো কোন কাজ করে না তার ভুলও হয় না। তার কাজ না করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। সিদ্ধান্তহীনতার জন্য অনেক সুযোগ নষ্ট হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষমতা ক্রমে ক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়। সুতরাং ঝুঁকি নেওয়া উচিত কিন্তু জুয়ার বাজির মতন অযৌক্তিক খুঁকি নয়। কাজে যারা ঝুঁকি নেয় তারা চোখ কান খোলা রাখে। কিন্তু জুয়াড়িরা অন্ধকারে গুলি ছোড়ে।

এক ব্যক্তি এক কৃষককে জিজ্ঞেস করল সে গমের চাষ করেছে কিনা, কৃষক জবাব দিল, না, কারণ আমার মনে হচ্ছে এ বছর বৃষ্টি হবে না। লোকটি তখন জিজ্ঞেস করল, এ বছর ট্টা লাগিয়েছ? কৃষক বলল, না আমার মনে হচ্ছে এ বছর পোকার উৎপাত বেশি হবে। তখন লোকটি জিজ্ঞেস করল, তাহলে তুমি কী লাগিয়েছ? কৃষক জবাব দিল, কিছুই না, আমি কোন ঝুঁকি নিইনি।

ঝুঁকি (Risks)

হাসলে মনে হবে বোক বনবার ঝুঁকি নিচ্ছে কাঁদলে লোকে ভাববে ভাবালু, কারুর সঙ্গে মেলামেশা করলে জড়িয়ে পড়বার ঝুঁকি থাকে, নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেও নিজের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশের ঝুঁকি থেকে যায়, নিজের স্বপ্ন, নিজের চিন্তা, যদি সবাইকে জানানো যায়, তাহলে ঝুঁকি থেকে যায়-সেগুলি কেউ আত্মসাৎ করবে, তুমি ভালোবাসলে ঝুঁকি থাকে-প্রতিদানে ভালোবাসা পাবে কিনা। জীবনটা মৃত্যুর জন্য ঝুঁকি। আশা থাকলেই ঝুঁকি থাকে ব্যর্থ হতাশার, চেষ্টা করতে গেলে ঝুঁকি থাকে ব্যর্থ হওয়ার। কিন্তু ঝুঁকিতে নিতেই হবে, জীবনে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ঝুঁকি না নেওয়া। যে মানুষ কোন ঝুঁকি নেয়না, তার কিছু নেই, এবং তার অস্তিত্বই নেই। তারা হয়ত দুঃখ এবং যন্ত্রণাকে এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু তারা কিছু শেখে না, অনুভব করে না, পরিবর্তন করে না, উন্নত হয় না, ভালোবাসে না। এবং শেষপর্যন্ত বাঁচে না। এই নেতিবাচক মনোভাব তাদের শিকলে বেঁধে রাখে, তারা ধীরে ধীরে ক্রীতদাস হয়ে যায়, তারা তাদের স্বাধীনতা হারায়। যারা ঝুঁকি নেয় তারাই মুক্ত।

২. অধ্যবসায়ের অভাব (Lack of persistence)

সমস্যা যখন অনতিক্ৰমণীয় তখন পেছিয়ে আসাই শেষ পন্থা বলে মনে হয়। এটি চাকরি, বিবাহ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সত্য। বিজয়ীরা আঘাত পায় কিন্তু তাদের মনোবল নষ্ট হয় না। প্রত্যেক মানুষই তার জীবনের লক্ষ্যের পথে প্রতিহত হয়েছে। কিন্তু একবার প্রতিহত হবার অর্থ এই নয় যে সে সবসময়ের জন্য অসফল হয়েছে। জ্ঞান বা দক্ষতার অভাবের জন্য নয় কেবল অধ্যবসায়ের অভাবে বারবার চেষ্টা করা থেকে বিরত হয় বলে অনেক মানুষ অসফল হয়। সাফল্যের গুঢ় রহস্য দুটি কথায় প্রকাশ করা যায় অধ্যবসায় এবং প্রতিরোধ। সাফল্যের লক্ষ্যে যা অবশ্যই করতে হবে তারজন্য বারবার চেষ্টা করুন এবং যা করা উচিত নয় তা করার ইচ্ছাকে প্রতিরোধ করুন।

কেবল অপরের থেকে সাহসী বলে নয়, অপরের থেকে দশ মিনিট বেশি সাহস দেখিয়েছিল বলেই একজন লোক বীর বলে পরিচিত হয়ে যায়।-Ralph Waldo Emerson

৩. তাৎক্ষণিক পুরস্কার (Instant gratification)।

আমরা স্বল্পমেয়াদী চিন্তা করি দীর্ঘমেয়াদী নয়। এতে অদূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমরা তাৎক্ষণিক ফলাফলে উৎসাহী! সবকিছুর তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার জন্য ঔষধ আছে। তাড়াতাড়ি জাগিয়ে দেওয়ার জন্য, তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে দেবার জন্য ঔষধ পাওয়া যায়। এই তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে সমস্ত সমস্যার দ্রুতসমাধান চায়। যখন মানুষ দ্রুত লক্ষপতি হতে চায় স্বাভাবিকভাবেই তাকে সন্দেহজনক রাস্তা নিতে হয়, এবং সততার সঙ্গে আপস করতে হয়, রাতারাতি লক্ষ টাকার মালিক হবার আশাতেই লটারি ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। স্মরণ রাখা দরকার যে তাৎক্ষণিক পুরস্কার ফলাফল্যের চিন্তা করে না। কেবল ক্ষণিকের আনন্দের উৎস হয়। আজকের প্রজন্ম যে আহারে ৫ পাউন্ড ওজন কমবে তাকেই আদর্শ আহার বলে মনে করে, এরাই জন্মদিনের উপহারগুলি চায় কিন্তু জন্মদিনের অতিথি সৎকারের দায় নিতে চায় না।

৪. অগ্রাধিকারের ধারণার অভাব (Lack of priorties)

অনেক মানুষ এমন বিকল্প গ্রহণ করেন যা গ্রহণ করা উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে কোন কোন মানুষ অর্থ কিংবা উপহার দিয়ে সময় ও মেহের অভাব পূরণ করতে চান। কেউ কেউ আবার স্ত্রী, পুত্র, কন্যার জন্য যথেষ্ট উপহার কিনে দেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটান না।

আমরা অগ্রাধিকারগুলিকে যদি সঠিকভাবে বিন্যস্ত না করি, তাবে সময়ের অপচয় হবে। এবং সময়ের অপচয় মানে জীবনের অপচয়। অগ্রাধিকারের তালিকা করতে গেলে প্রথমেই দরকার করণীয় কাজের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আনা এবং খেয়ালখুশিমতো কাজ না করা। অনেকে আসল কাজ ভালোভাবে সুসম্পন্ন করার থেকে সাফল্য ও ব্যর্থতার চিন্তাতেই অনেক সময় ব্যয় করেন।

কিভাবে বিভিন্ন সমস্যা এবং কোন কোন ব্যর্থতার মোকাবিলা করবেন? এই প্রশ্নটির জবাবের মধ্যেই আপনার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি জানা যাবে। সাফল্যের রহস্যের চাবিকাঠি হচ্ছে অনুধাবন ক্ষমতা। কোন কোন ব্যক্তি অর্থ, ক্ষমতা। যশ বা সম্পত্তির উপর তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন। এই বিষয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিষয়গুলি হৃদয়ঙ্গম করা দরকার।

যে সব আদর্শ সাফল্যের পথ প্রকাশ করে সেগুলি সম্পর্কে কেবল পড়লে বা মুখস্ত করলেই সাফল্য আসে না; সেগুলি যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করলে এবং কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেই সাফল্য আসে।

৫. সহজ পথের সন্ধানে (Looking for shortcuts)

বিনামূল্যে দুপুরে খাবার নয়।

এক রাজার সম্পর্কে গল্প আছে। তিনি একদিন তার উপদেষ্টাদের ডেকে বিভিন্ন যুগের জ্ঞানগর্ভ বাণীগুলিকে সংকলন করতে বললেন যাতে তিনি সেগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারেন। অনেক পরিশ্রমের পর উপদেষ্টারা বেশ কয়েকটি খন্ডে জ্ঞানগর্ভ বাণীগুলিকে সংকলন করে রাজার নিকট উপস্থিত করলেন। রাজা উপদেষ্টাদের বললেন যে এগুলি এত বিরাট যে লোকে পড়বে না, তখন তারা এগুলিকে সংক্ষিপ্ত করা শুরু করলেন। পরে উপদেষ্টারা মাত্র একটি খণ্ডে সংক্ষিপ্ত করে রাজার কাছে পেশ করলেন। রাজা আবার একই কথা বললেন। তখন তারা প্রথমে এক অধ্যায় এক পরে এক পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত করে দিলেন। কিন্তু রাজা এতেও সন্তুষ্ট হলেন না, শেষপর্যন্ত উপদেষ্টারা একটি বাক্যে সমস্ত জ্ঞানকে সংক্ষেপিত করে রাজার নিকট উপস্থিত হলেন। রাজা সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বললেন এই একটি জ্ঞানগর্ভ বাক্যই তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান।

বাক্য হল, বিনা পয়সায় দুপুরের খাবার পাওয়া যায় না।

প্রত্যেক সংস্থায় ও সমাজে বিনা পয়সায় পানভোজনের সুবিধাভোগী ব্যক্তি আছে। বস্তুতপক্ষে কোন না কোন সময় আমরা সকলেই বিনা পয়সায় পানভোজনের আশা করেছি। এটা সাধারণত বিভিন্ন সামাত ও সংগঠনেই বেশী দেখা যায়। এরপ সংস্থার বেশিরভাগ সদস্যরাই অকর্মণ্য। তারা কর্মী সদস্যদের পরিশ্রমের সুফল ভোগ করতে চায়। অনেক সময় ভোগ করেও থাকে।

সহজতর পথটি প্রকৃতপক্ষে কঠিনতর পথ হয়ে উঠতে পারে।

একদিন বনে একটি ভরত পাখি গান করছিল। একটি কৃষক একটি কেঁচো ভর্তি বাক্স নিয়ে বনের পথ দিয়ে যাবার সময় ভরত পাখি তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার বাক্সে কী

আছে এবং তুমি কোথায় যাচ্ছ? কৃষকটি জবাব দিল যে সে বাজারে এই কেঁচো বিক্রি করে কিছু পালক কিনবে। ভরত পাখি বলল, আমার অনেক পালক আছে আমি সেগুলির থেকে কয়েকটি তোমাকে দেব, তুমি আমাকে ওই কেঁচোগুলি দিয়ে দাও, তাহলে আমাকে আর খাবার খোঁজ করতে হবে না।  কৃষকটি কেঁচোগুলি ভরত পাখিকে দিয়ে দিল এবং ভরত পাখিটি প্রতিদানে তার ডানা থেকে কয়েকটি পালক দিল, পরের দিন একই রকম লেনদেন হল এবং তার পরের দিনও। তার কিছুদিন পরে দেখা গেল যে ভরত পাখির সমস্ত পালক কৃষকটি নিয়ে নিয়েছে। পালকের অভাবে ভরত পাখিটিকে দেখতে হল কুৎসিত। সে উড়তে পারে না এবং তার কেঁচো খোঁজার সামর্থ্য নেই। এই অবস্থায় পাখিটি গান করতে ভুলে গেল। এবং কিছুদিনের মধ্যে মারা গেল। এই গল্পটির নীতিশিক্ষা কী? নীতিশিক্ষা খুব স্পষ্ট। ভরত পাখিটি খুব সহজে খাবার চেয়েছিল কিন্তু এই সহজ পথটি শেষ পর্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে নিয়ে গেল। এই শিক্ষাটি কি আমাদের জীবনেও সত্য নয়? অনেক সময় আমরা সহজ পথের সন্ধান করি, কিন্তু অবশেষে পথটি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বিজিতরা দ্রুত কার্যকরী পন্থার অনুসন্ধান করে।

উঠোনে আগাছা মারার দুটি উপায় আছে -প্রথমটি হল সহজ উপায় এবং দ্বিতীয়টি তত বেশি সহজ নয়। সহজ উপায় হচ্ছে ঘাহঁটা যন্ত্র দিয়ে উঠোনের আগাছাগুলিকে ছোট করে কেটে দেওয়া। এতে উঠোনটি কিছুদিনের জন্য ভালো দেখাবে। এবং আগাছা সমস্যার সাময়িকভাবে সমাধান হবে। কিন্তু আগাছাগুলি আবার বেড়ে উঠবে। আর খুব সহজ নয় যে উপায়টি সেটি হলো হাতে পায়ে কাদা মেখে আগাছাগুলিকে শেকড়সুদ্ধ টেনে তোলা। এটি সময়সাপেক্ষ এবং কার্যকর পদ্ধতি। এর ফলে অনেকদিন ধরে উঠোনে আগাছা জন্মাবে না। প্রথম পদ্ধতির সমাধান সহজ কিন্তু এর ফলে সমস্যাটির পূর্ণ সমাধান করা যায় না। দ্বিতীয় সমাধানটি খুব সহজ নয় কিন্তু মুলে গিয়ে সমস্যাটিকে উৎপাটন করে। মোদ্দা কথা হচ্ছে সমস্যার মূলে যাওয়া প্রয়োজন। জীবন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারেও এই কথা সত্য। কোন কোন ব্যক্তি তিক্ততার ও অসহিষ্ণুতার মনোভাব এমনভাবে ছড়িয়ে দেন যে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিক্ততা ও অসহিষ্ণুতা বিস্তার লাভ করে। অনেকেই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান চায়। তাৎক্ষণিক কফির মতো তারা চায় তাৎক্ষণিক সুখ। কিন্তু এই সমস্যার কোন তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ফলে হতাশা বেড়ে যায়।

৬. স্বার্থপরতা ও লোভ (selfishness and greed)

যে সমস্ত ব্যক্তি ও সংস্থা পরস্পরের প্রতি এবং পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করে, তাদের উন্নতি আশা করার কোন অধিকার থাকতে পারে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে যে অপরের মঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য না রেখে দায়িত্বটি অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া। লোভ সবসময়ে বেশি চায়। প্রয়োজনে মেটানো যেতে পারে কিন্তু লোভকে কখনো তৃপ্ত করা যায় না। এটি আর ক্যান্সার বিশেষ। লোভ মানসিক সম্পর্ককে নষ্ট করে। লোভকে পরিমাপ করার কি কোন পদ্ধতি আছে? তার জন্য আমরা আমাদেরকে তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞেসা করতে পারি।।

*এই জিনিসটি কি আমর সামর্থ্যের মধ্যে আছে?

* এটি কি সত্যি আমার দরকার?

* জিনিসটি যদি আমর থাকে তবে এর থেকে কী আমি মানসিক শান্তি পাব?

দুর্বল আত্নসম্মানবোধ থেকে ই লোভের জন্ম। লোভ মিথ্যা অহংকারের মধ্যে এবং অন্যদের সঙ্গে সমতা রক্ষার চেষ্টায় নিজেকে প্রকাশ করে। লোভের হাত থেকে পরিত্রান পাবার জন্য নিজের সামধ্যের মধ্যে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা উচিত এবং নিজের সামর্থ্যে সন্তুষ্ট থাকা উচিত, অবশ্য সন্তুষ্ট থাকার অর্থ এই নয় যে জীবনে কোন উচ্চাক্ষা থাকবে না।

শেষ কোথায়? ( where does it end?)।

এক ধনী কৃষকের গল্প আছে। একবার তাকে এই প্রস্তাব দেওয়া হল যে, সে একদিন যতদূর পর্যন্ত হেঁটে সূর্যাস্তের আগে শুরুর জায়গায় ফিরে আসতে পারবে ততটা জমি তাকে দিয়ে দেওয়া হবে। পরের দিন খুব ভোরে কৃষকটি দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। কারণ যতটা দূর হাঁটতে পারবে ততটা জমি সে পাবে। ক্লান্তি সত্ত্বেও সে সমস্ত দুপুর হাঁটল কারণ অনেক জমি পাবার এই সুযোগ সে হারাতে চাইছিল না। একবারে শেষ বেলায় এসে তার খেয়াল হল যে জমি পাবার জন্য তাকে যাত্রা শুরুর জায়গায় সূর্যাস্তের আগে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু তার লোভ তাকে অনেকদূর পর্যন্ত তাড়া করে নিয়ে গেছিল। ফেরবার পথে সূর্যের দিকে চোখ রেখে সে শেষপর্যন্ত দৌড়াতে শুরু করল। ক্লান্ত হয়ে সে হাঁপিয়ে উঠেছিল কিন্তু তবুও সে নিজেকে তাড়না করে নিয়ে গেল জমির লোভে। শেষ পর্যন্ত যখন সে শুরুর জায়গায় পৌঁছল তখন তার দেহও সহ্যের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে এবং সূর্য ও অস্তাচলমুখ। এই স্থানে এসে সে ক্লান্তিতে লুটিয়ে পড়ল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই সে মারা গেল। অনেকটা জমি সে পেয়েছিল বটে কিন্তু কবরের জন্য জায়গাটুকু ছাড়া বাকি জমে তার ভোগেই লাগল না।

এই গল্পে অনেক সত্য আছে এবং আহে শিক্ষণীয় বিষয়। যে কোনও লোভী লোকের শেষে পরিণাম এমনই হয়।

৭. দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব (Lack of conviction)

যাদের দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব আছে তারা মধ্যপন্থী আর যারা মাঝ রাস্তা দিয়ে চলে তাদের কি হয়? গাড়ি চাপা পড়ে।

দৃঢ় বিশ্বাস ছাড়া মানুষ কোনও নীতি ও আদর্শগত অবস্থান নিতে পারে না। বিশ্বাস এবং সাহস নেই বলে তারা গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যায়। ভুল জেনেও অন্যের হাত দিয়ে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে, তারা এমনভাবে ব্যবহার করে যেন তারা পশুর পালের একটি অংশ, কেউ কেউ নিজেদের অপেক্ষাকৃত উন্নত মনে করেন। কারণ তারা অন্যায়কে সমর্থন করেন না। কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো আত্নবিশ্বাস তাদের নেই। তারা অবশ্য বুঝতে পারেন না যে প্রতিবাদ না করা প্রকৃতপক্ষে সমর্থন করারই সামিল।

সাফল্য লাভের একটি গোপন কথা হল, কোনও বিষয়ের বিরোধী হওয়ার থেকে কোনও একটি বিষয়কে সমর্থন করা ভালো। তার ফলে সমস্যাটির অঙ্গ না হয়ে সমাধানের অংশ হওয়া যায়। কোনও অবস্থান নেওয়ার জন্য দৃঢ় বিশ্বাসের প্রয়োজন।

দৃঢ় বিশ্বাস

যদি বিশ্বাসের সঙ্গে কাজের সংযোগ না ঘটে তবে সে বিশ্বাস একধরনের ভ্রান্তি। বিশ্বাস অলৌকিক ঘটনার ফলশ্রুতি নয়: বিশ্বাস অলৌকিক ফলাফল সৃষ্টি করে।

যদি মনে কর তুমি পারবে, কিংবা মনে কর তুমি পারবে না, দুই ক্ষেত্রেই তোমার বিশ্বাস সঠিক। -Henry Ford

যখন আমরা আঘাত পাই, তখন আসে আমাদের মানসিক অবসাদের মুহূর্ত। আমাদে; এমন সময় আসে যখন আমরা নিজেদের অবিশ্বাস করি এবং আত্মগ্লানিতে ভেঙে পড়ি। এরূপ ভাবপ্রবণতা জয় করতে হবে এবং আত্নবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে।

পৃথিবীতে তিন প্রকারের মানুষ আছেন—

১. যারা ঘটনা ঘটান।

২. যারা ঘটনা ঘটতে দেখেন।

৩. যারা ঘটনা ঘটতে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। আপনি কোন দলে পড়েন।

 

৮. প্রাকৃতিক নিয়মগুলি সম্পর্কে বোধ শক্তির অভাব (lack of understanding of natures laws)

সাফল্য নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এই নিয়মগুলি প্রাকৃতিক নিয়ম। পরিবর্তন প্রাকৃতিক নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। আমরা হয় এগিয়ে যাচ্ছি নতুবা পিছিয়ে পরছি, হয় আমরা সৃষ্টি করছি, নতুবা ধীরে ধীরে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছি।

প্রকৃতিতে স্থিতাবস্থা নেই।

নতুন গাছের জন্য যদি একটি বীজকে অনেকদিন মাটিতে পোঁতা না হয়, তবে সেই বীজ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, আমরা চাই বা না চাই যা ঘটবার তা ঘটবেই। সমস্ত প্রগতিই পরিবর্তন আনে; কিন্তু সমস্ত পরিবর্তন প্রগতিমূলক নয়। আমরা সমস্ত পরিবর্তনের মূল্যায়ন করব এবং পরিবর্তন যদি প্রগতিপন্থী না হয় তবে তা আমাদের অনুমোদন লাভ করবে না। মূল্যায়ন ছাড়া গ্রহণ করলে তা হবে সমঝোতামূলক ব্যবহার। এরূপ ব্যবহার বিশ্বাসের ও আত্মবিশ্বাসের অভাব সৃচিত করে।

পরস্পর সম্পর্কে অনেক কিছু বলা যায়। ক্যান্সারের কোষগুলিই কেবল বাড়ার জন্যই বেড়ে যায়। যখন নাস্তিবাচক চিন্তার প্রসার ঘটে তখনও ধবংসই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। ইতিবাচক চিন্তার বৃদ্ধিই অর্থপূর্ণ বৃদ্ধি।

সাফল্য ভাগ্যের বিষয় নয়, সাফল্য প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন।

কার্যকারণ সম্পর্কের নিয়মাবলী

সাফল্য লাভের জন্য কার্যকারণ ও সম্পর্ক — সংক্রান্ত নিয়মগুলি এবং কার্য ও ফলাফলের মধ্যে যোগসূত্র আমাদের বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। সব ফলাফলের কারণ আছে। ফসল রোপণ ও আহরণ যে নিয়মে হয় সেই নিয়মে কারণ ও কার্য ঘটে। ফসল রোপণ ও আহরণের পাঁচটি পর্ব আছে।

১. রোপণের আকাঙক্ষা থাকবে। এই আকাঙক্ষাই শুরু।

২. আমরা যে রকম বীজ বুনব সেই রকম ফসলই কাটব। আলু লাগালে আলুই পাওয়া যাবে, টমেটো নয়।

৩. কিন্তু ফসল কাটার আগে ফসল বুনতে হবে। পাওয়ার আগে দিতে হবে। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলার ইন্ধন না দিয়ে উত্তাপ আশা করতে পারি না। কিছু লোক কিছু দেওয়ার আগেই প্রাপ্তি চান, কিন্তু তা হয় না।

৪. জীবনের ক্ষেত্রে আমরা একটি বীজ বপন করে একটি ফল পাইনা-আমরা অনেক ধরনের ফসল তুলতে পারি। যদি আমরা অনেক ইতিবাচক ফসল তুলতে পারব। যদি নেতিবাচকবীজ বপন করি তাহলে অনেক প্রকারের নেতিবাচক ফসলই উঠবে। তবুও লোকে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করে।

৫. চাষী জানে বীজ বুনেই একই দিনে ফসল পাওয়া যায় না। সব সময়েই ফসল জন্মাবার সময় লাগে।

পদার্থবিদ্যার নিয়ম হচ্ছে প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত ও সমান প্রতিক্রিয়া আছে অধিকাংশ সময় মানুষ কারণগুলিকে অপরিবর্তিত রেখে কর্মফলগুলিকে পরিবর্তন করতে চায়। যদি আমাদের মনকে ইতিবাচক চিন্তায় সর্বদা ব্যাপৃত না রাখি তাহলে নেতিবাচক চিন্তা মননের শ্যতা স্বাভাবিকভাবেই পূরণ করবে। জেমস অ্যালেন তার বইAs a man Thiketh এ যা বলেছেন সেরূপ কথা অনেক ঋষিরাও বলেছেন। মানুষের মন বাগানের মতো ভালো গাছের বীজ লাগালে ভালো বাগান হবে যদি কিছুই না লাগাই তবে আগাছা জন্মাবে। এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম।

এই কথা মানুষের জীবনেও সত্য। আমি আর একটু এগিয়ে বলব, ভালো বীজ লাগলেও আগাছা জন্মাবে। আগাছা নিড়ানোর কাজ সব সময়ই চলতে থাকবে।

শূন্যের নীচে তাপমান নেমে গেলে, গ্লাসে জল ঢাললে তা জমে বরফ হবে। আশ্চার্যের কিছু নেই এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম। বস্তুত পক্ষে, এরে কোনও অন্যথা হয়না।

আমাদের চিন্তাই সব কিছুর মূল, চিন্তার বীজ বপন করুন, আপনি কর্মের ফসল তুলবেন। সাফল্য কর্মের বীজ বপন করুন, অভ্যাসের ফসল তুলবেন, অভ্যাসের বীজ বুনলে পাবেন চরিত্ররূপ ফসল, আর চরিত্ররূপ বীজ বপন করলে সৌভাগ্যের ফসল পাবেন। সবকিছুই চিন্তা থেকে শুরু।

আকর্ষণের নিয়ম

আমাদের পছন্দমত ব্যক্তিকে আমরা নিকটে আকর্ষণ করতে পারি না -কেবল আমাদের স্বধর্মী ব্যক্তিকেই পারি। পুরানো প্রবচনটিই সত্য – এক ধরনের পালকের পাখি এক জায়গায় জড়ো হয়। যারা নেতিবাচক চিন্তা করেন তারা বিপজ্জনক। তারা অনেক নেতিবাচক মনোভাবের মানুষকে আকর্ষণ করেন। তাদের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক এবং সমসবয় খারাপটাই প্রত্যাশা করেন।

লক্ষ্য করেছেন অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে কিভাবে সফল ব্যক্তিরা সফল ব্যক্তিদের আকর্ষণ করেন। অসফল ব্যক্তিরাও একত্রিত হন এবং তারা একসঙ্গে হা হুতাশ করেন, এবং অভিযোগ করেন।

আমাদের বন্ধুরা আমাদের পছন্দসই ব্যক্তি নন, তারা আমাদেরই স্বধর্মী ব্যক্তি। ৯. কাজের পরিকল্পনা ও প্রকৃতিতে অনিচ্ছা (Unwillingness to plan and prepare)।

প্রত্যেক মানুষের জয়ী হবার ইচ্ছা আছে কিন্তু খুব কম লোকের জয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ইছে আছে। -Vince Lombardi.

অনেকই একটি পাটি দেওয়ার জন্য কিংবা ছুটি কাটাবাির জন্য যত পরিকল্পনা করেন তাদের জীবন সম্পর্কে তা করেন না।

প্রস্তুতি।

প্রস্ততি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। প্রস্তুতির অর্থ পরিকল্পনা ও অনুশীলন। বিজয়ীরা নিজেদের চাপের মধ্যে রাখেন – সে চাপ জয়ের জন্য দুশ্চিন্তা নয়, সে চাপ প্রস্তুতির।

যদি অনুশীলন খারাপ হয় খেলাও খারাপ হবে কারণ আমরা যেরূপ অনুশীলন করি সেই মতই খেলি সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে তফাৎটি হোল সফল ব্যক্তিরা সঠিক কাজটি করেন আর বিফল ব্যক্তিরা করেন প্রায় সঠিক কাজ।

পূর্ণ মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন আত্মশৃঙ্খলা ও ত্যাগ। গড়পড়তা হওয়া সহজ কিন্তু সর্বোত্তম হওয়া খুব কঠিন। তাই গড়পড়তা লোকেরা সহজ রাস্তাই বেছে নেয়।

প্রস্তুতি জীবনে যে কোনও ক্ষেত্রে সাফল্য লাভের পথে অনেকটাই এগিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য+আদর্শ + পরিকল্পনা + অনুশীলন +অধ্যবসায় + ধৈর্য+আত্মগৌরব = প্রস্তুতি।

প্রস্তুতি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়:

প্রস্তুতির অর্থ ব্যর্থতাকে সহ্য করা কিন্তু কখনও মেনে নেওয়া নয়। এর অর্থ পরাজিতের মানসিকতাকে ত্যাগ করে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার সাহস, একবার ব্যর্থ মনোরথ হয়েও নিরুৎসাহিত না হওয়া।

প্রস্তুতি অর্থ ভুল গুলি থেকে শিক্ষাগ্রহণ। আমরা সকলেই ভুল করি ভুল করা কোনও অন্যায় নয়। একজন নিবোর্ধই একই ভুল দুবার করে। ভুল করে যে সংশোধন করে না সে আরও বড় ভুল করে।

ভুল হলে ভুলের মোকাবিলা করার শেষ্ঠ উপায় হোল

  • দ্রুত ভুল স্বীকার করা।
  • ভুলের জন্য অনুতাপ না করা।
  • ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
  • ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা।

ভুলের জন্য কাউকে দোষ না দেওয়া বা কোনও অজুহাত সৃষ্টি না করা। প্রতি না থাকলে মনের উপর চাপ বাড়ে। বস্তৃত পক্ষে প্রস্তুতি, অনুশীলন ও কঠিন শ্রমের কোনও বিকল্প নেই। আকাঙক্ষা ও অল্প চিন্তাতে কোন কাজ হবে না। প্রস্তুতর ফলেই কেবল প্রতিযোগিতায় প্রাধান্য পাওয়া যায়।

প্রস্তুতির না থাকলে মানসিক চাপে বিপর্যস্ত হতে হয়। জল যেমন নীচের দিকে গড়িয়ে চলে, তেমনি সাফল্যও, যারা উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়েছে, তাদের দিকে ধাবিত হয়। যাদের চেষ্টা দুর্বল তাদের ফলাফলও ভালো হয় না।

অধ্যবসায় প্রকৃতপক্ষে নীচের গুণগুলির সমাহার।

  • একটি উদ্দেশ্য
  • একটি পরিকল্পনা
  • প্রস্তুতি
  • মূল্য
  • ধৈর্য।
  • অনুশীলন।
  • আদর্শ
  • আত্মগরিমা
  • ইতিবাচক মনোভাব

নিজেকে প্রশ্ন করুন :

  • একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কি আছে?
  • কাজের পরিকল্পনা আছে?
  • প্রস্তুতির জন্য কিরুপ পরিশ্রম করা হচ্ছে?
  • কি মূল্য দিতে রাজি আছেন? আপনি সাফল্য অর্জনের জন্য কতদূর যেতে প্রস্তুত।
  • আশা ফলবতী হওয়ার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন সে সময় অপেক্ষা করার ধৈর্য আপনার আছে?
  • উৎকর্ষ লাভের জন্য অনুশীলনে কি আপনি ইচ্ছুক আছেন?
  • আপনি কি আপনার আদর্শে দৃঢ় থাকতে পারবেন?
  • আপনার কাজের জন্য আপনি কি গর্ববোধ করেন?
  • কাজটি আমি করতে পারি-এই ধরনের মনোভাব কি আপনার আছে? ১০. যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলা (Rationalizing)

বিজয়ীরা ফলাফলের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করেন-কিন্তু সেগুলিকে যুক্তি হিসাবে গ্রহণ করেন না। অসফল ব্যক্তিরা তাই করে থাকেন। তারা সব সময় কেন সফল হতে পারেন নি সেই সম্পর্কে অজুহাতের তালিকা তৈরি রাখেন। আমরা অনেক রকমের অজুহাত শুনি, যেমন–

  • আমার ভাগ্য খারাপ।
  • আমার বয়স কম।
  • আমার বয়স বেড়ে গেছে।
  • আমার অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে।
  • আমি খুব চটপটে নই।
  • আমি যথেষ্ট শিক্ষিত নই।
  • আমি দেখতে ভালো নই।
  • আমার ভালো যোগাযোগ নেই।
  • আমার যথেষ্ট টাকা নেই।
  • আমার অনেক সময় নেই।
  • অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ।
  • যদি আমি সুযোগ পেতাম।
  • যদি পারিবারিক দায়িত্ব না থাকত।
  • যদি আমার ভালো বিয়ে হত।
  • এই তালিকা বেড়েই চলবে। ভারতে কিভাবে বানার ধরে (How they catch monkeys in India)

বানর শিকারী একটা গোল ছিদ্র যুক্ত বাক্স ব্যবহার হাত অনায়াসে ঢুকে যায়। ভেতরে। কিছু বাদাম রেখে দেয়। বানরের একটা হাত অনায়াসে ঢুকে যায়। ভেতরে কিছু বাদাম রেখে দেয়। বানর বাদাম নিয়ে হাত বন্ধ করলে, হাতের মুঠিটাই হয়ে যায় বড় এবং যে ফাক দিয়ে হাতটা ঢুকিয়েছিল সেই ফাঁক দিয়ে বার করতে পারে না। বানর অবশ্য বাদামগুলি ফেলে দিয়ে হাত বের করে নিতে পারে, কিংবা বাদামগুলি হাতে রেখে ধরা পড়তে পারে। আন্দাজ করুন বানর কী করে? প্রায় সব সময়ই বাদামগুলি ধরে রাখে, ফলে মানুষের হাতে ধরা পড়ে।

অনেক সময় বানরের সঙ্গে মানুষেরও তফাৎ থাকে না। আমরাও ওই কয়েকটা বাদাম ছাড়তে চাইনা বলে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে পারি নি। এই অক্ষমতাকে যুক্তিসহ করে তুলতে চেষ্টা করি। আমি কাজটা করতে পারিছি না কারণ-  যুক্তি হচ্ছে ঐ বাদাম, ঐ বাদাম আঁকড়ে আছি বলেই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে।

সফল ব্যক্তিরা সব কিছু যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে চান না। দুটি জিনিস মানুষের সাফল্য নির্ধারণ করে। একটি হোল যুক্তি, দ্বিতীয়টি হোল কাজের ফলাফল। যুক্তি গণনা করা যায় না, এই ফলাফল গণনা করা যায়। ব্যর্থ হওয়ার জন্য উপদেশ মেনে চলাই যথেষ্ট। চিন্তা করবেন না, প্রশ্ন করবেন না, কিছু শুনবেন না, শুধু যা করছেন তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিন।

১১. অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া (Not leaming from past mistakes)

যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যদি সঠিক দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে বিচার করি তাহলে ব্যর্থতা আমাদের শিক্ষকের কাজ করে। ব্যার্থতা একটু ঘুরপথ, পথের শেষ নই। এর ফলে সাফল্যে। বিলম্ব ঘটে। কিন্তু পরাজয় ঘটে না। আমাকের তুলগুলি আমাদের অভিজ্ঞতাকেই সমৃন্দ করে থাকে।

কেউ কেউ যতদিন বাঁচেন ততদিনই শিখে থাকেন। কেউ আবার শুধুই বাঁচেন। জ্ঞানি ব্যক্তিরা নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করেন, বিজ্ঞাত ব্যক্তিরা অপরের ভুল থেকে শিক্ষা নেন। জীবন এত দীর্ঘ নয়, যে কেবলমাত্র নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করলেই চলে, অপরের ভুল থেকেও শিক্ষা নিতে হয়।

১২. সুযোগ চিনে নেওয়ার অক্ষমতা (Inability to ricognize opportunity)

সুযোগ অনেক সময় বিপত্তির ছদ্মবেশে আসে, ফলে অনেকেই বুঝতে পারেনা। মনে রাখবেন বাধা যত বেশী, সুযোগও তত বেশী।

১৩. আশঙ্কা(Fear)

আশঙ্কা কখনো প্রকৃত, কখনো কাল্পনিক হতে পারে। এর ফলে অনেকে উট কাজ করে বসেন। এর প্রধান হেতু, আশঙ্কার কারনগুলিকে সম্যকভাবে অনুধাবন করতে না পারা, সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকলে এক প্রকার ভাবাবেগের জালে জড়িয়ে পড়তে হয়।

ভয় থেকে আসে নিরাপত্তার অভাব, আত্মবিশ্বারে অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতা, ভয় আমাদের সম্ভাবনাও ক্ষমকাকে নষ্ট করে। আমরা সহজ ভাবে চিন্তা করতে পারি না এবং ভয়ের ফলে আমাদের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও স্বার্থ নষ্ট হয়,

সাধারনভাবে ভয় নিম্নপ্রকারের

  • ব্যর্থতার ভয়।
  • অজানার ভয়
  • প্রস্তুত না থাকার ভয়
  • ভুল সিদ্বান্ত নেওয়ার ভয়
  • প্রত্যাখ্যাত হবার ভয়

কতকগুলি ভয়কে ব্যাখ্যা করে বলা যায়, অন্যগুলি মনে মনে অনুভব করা যায়, ভয়ের ফলে উদ্বেগ ও তজ্জনিত অযৌক্তিক চিন্তা মনকে গ্রাস করে। ফলে সংকটের সমাধান ব্যাহত হয়, ভয়ের ফলে সাধারন প্রতিক্রিয়া হল পলায়নী মনোভাব। এই মনোভাবের ফলে হয়তো সাময়কি স্বস্তি পাওয়া যায় এবং সমস্যাজনিত দুশ্চিন্তা কম হয় কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। কাল্পনিক ভয় সমস্যাকে অনেক বড় করে আমাদের সামনে উপস্থিত করে। এরূপ আশঙ্কা বাড়তে বাড়তে মানসিক শান্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে।

ব্যর্থতার আশংকা ব্যর্থতার থেকেও খারাপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। জীবনে ব্যর্থতাই সবচেয়ে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা নয়। যে সমস্ত মানুষ চেষ্টা করেন না, তারা প্রথম থেকেই ব্যর্থ। বাচ্চারা যখন হাঁটতে শেখে তখন তারা মাঝে মাঝেই পড়ে যায়, কিন্তু সেই পড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা হাঁটতে শিখবে না। তারা উঠে দাঁড়ায় এবং চেষ্টা করে। যদি তারা নিরাশ হয়ে চেষ্টাই ছেড়ে দিত তবে তারা কোনদিন হাঁটতে শিখত না। ব্যর্থতার ভয়ে হাঁটা, শেখার চেষ্টা না করে হাঁটমুড়ে চিরজীবন কাটানোর থেকে হাঁটা শেখার চেষ্টা করে নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে মরাও ভাল।

১৪. প্রতিভা ব্যবহারের ক্ষমতা (Inability to use talent)

এ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, আমার মনে হয় আমার মেধার প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ আমার জীবনে কাজে লাগাতে পেরেছি। উইলিয়াম জেমস মনে করেন মানুষ তার সম্ভাবনার কেবলমাত্র শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ ব্যবহার করে। বেশিরভাগ মানুষের জীবনেই সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো যে তাদের জীবনে সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকতেই তারা মৃত্যুমুখে পতিত হন। তারা জীবদ্দশায় যথাযথভাবে বাঁচার চেষ্টা করেননি। তাদের ক্ষমতা মরচে ধরে নষ্ট হয়, প্রয়োগের ফলে নষ্ট হয় না। আমি চাইব যে আমার ক্ষমা ক্রমাগত প্রয়োগের ফলে নষ্ট হোক, তাতে যেন অব্যবহারের মরচে না পড়ে। জীবনের সবচেয়ে নিদারুণ আফশোস হল, আমার করা উচিত ছিল কিন্তু করিনি।

Willian James MDR Timeless Treasur, The whole Person, P. 162

আলস্যে নিজের ক্ষমতায় মরচে ধরিয়ে দেওয়া এক জিনিস আর ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা নিজের ক্ষমতাকে সংহত করে রাখা অন্য জিনিস। মরচে ধরে তখনই যখন আলস্য এবং নিফর্ম অবস্থায় সময় কাটানো যায়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত; এর ফলে কর্মশক্তি ও অধ্যবসায় বেড়ে যায়।

কোন এক ব্যক্তি একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞাসা করল, জীবনের সবচেয়ে গুরুভার কি? বয়স্ক ব্যক্তিটি বিমর্ষভাবে জবাব দিলেন, যদি বহনের জন্য কোন বোঝাই না থাকে তবে সেইটিই সবচেয়ে গুরুভার।

১৫. শৃঙ্খলাবোধের অভাব (Lack of discipline)।

কখনো ভেবে দেখেছেন, কোন কিছু লোক তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেন না? কেন তারা সবসময় সংকট ও বিপর্যয়ের মুখে নিরাশ হয়ে পড়েন? কেন কোন কোন ব্যক্তি একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখেন? আবার কিছু লোক ক্রমাগত ব্যর্থ হন? খেলাধুলা, শরীরচর্চা, শিক্ষাদীক্ষা অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য যে কোন ক্ষেত্রে হোক না কেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে হলে শৃঙ্খলা ব্যতীত কিছুই করা যায় না।

শৃঙ্খলাহীন ব্যক্তি অনেক কিছু একসঙ্গে করতে চায়। কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারেন। কোন কোন তথাকথিত উদার চিন্তাবীদ শৃঙ্খলাহীনতাকে স্বাধীনতা বলে ব্যাখ্যা করেন। আমি যখন এরোপ্লেনে ভ্রমণ করি, তখন অবশ্যই আশা করব যে পাইলট, তার যা যা করণীয় সেগুলি নিয়মমাফিক নির্দেশ অনুযায়ী করবেন, তার ইচ্ছামতো কিছু করবেন না। তারা যে এই রকম উদার বিশ্বাস না করে বসেন, আমি মুক্ত, কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশ মানতে আমার ইচ্ছা নেই।

সংগতির অভাব শৃঙ্খলহীনতার লক্ষণ। শৃঙ্খলার অর্থ আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মত্যাগ, মনসংযোগ এবং প্রলোভনকে এড়িয়ে চলা। শৃঙ্খলার অর্থ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখা। বাষ্পকে যদি সংহত করে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা না যায় তবে তা ইঞ্জিনকে চালাতে পারে না। নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে কোন জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে না যদি তার স্রোতের শক্তিকে শৃঙ্খলিত করা না যায়।

কচ্ছপ এবং খরগোশের গল্প আমরা সবাই জানি। খরগোশ তার দৌড়াবার ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করত এবং কচ্ছপকে দৌড় প্রতিযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল, শেয়াল ছিল প্রতিযোগিতার বিচারক। দৌড় শুরু হওয়ার পর খরগোশ দ্রুত দৌড়ে কচ্ছপকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল, দৌড়ে জেতার সম্পর্কে এতই নিশ্চিত ছিল যে মাঝপথে তার একটু ঘুমিয়ে নেবার ইচ্ছা হল। যখন জাগল এবং দৌড় প্রতিযোগিতার কথা স্মরণ করে দৌড়তে শুরু করল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কচ্ছপ তখন প্রতিযোগিতার সমাপ্তি সীমায় পৌঁছে গেছে এবং প্রতিযোগিতায় বিজয়ী বলে ঘোষিত হয়েছে।

কাজের সংগতি রক্ষাই শৃঙ্খলা এবং এই সংগতিপূর্ণ কাজ খেয়াল খুশিমতো চেষ্টা করার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের জন্য স্বাধীনতাকে খর্ব করতে হয়। সেটি যেমন কষ্টদায়ক, তেমনি বিশৃঙ্খল জীবনের যে পরিণাম সেটি ও বেদনায়ায়ক। এই দুইয়ের মধ্যে শৃঙ্খলাপরায়ণতাই কম কষ্টদায়ক।

সাধারণত যেসব বাচ্চারা অজস্র স্বাধীনতার এবং শৃঙ্খলাহীনতার মধ্যে বড় হয় তারা তাদের পিতামাতা, সমাজ, এমনকি নিজের উপরেও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কোনওরূপ দায়িত্বগ্রহণে তাদের বিশেষ কষ্ট হয়।

১৬. আত্মমর্যাদাবোধের অভাব (Poor self-esteem)

আত্মসম্মান এবং নিজের যোগ্যতার অভাববোধ থেকে জন্মায় মর্যাদাবোধের অভাব। এটি ক্রমাগত আত্ম অবমাননার দিকে নিয়ে যায়। যুক্তিহীন অহংবোধ মানুষকে পরিচালনা করে। কোন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নয় কেবল অহংবোধকে সন্তুষ্ট করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যাদের মর্যাদাবোধ কম তারাই ক্রমাগত অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অভিন্নতা খোজে। কিন্তু নিজের আত্মস্বাতন্ত্র্যবোধ খোজার জিনিস নয়-তাকে তৈরি করতে হয়।

আলস্য ও কর্মবিমুখতা নগন্য আত্মমর্যাদাবোধের ফলশ্রুতি। যাদের আত্মমর্যাদাবোধ নেই তারাই কেবল অজুহাত দেখায়। কর্মবিমুখতা মরচের মতো, তা সবচেয়ে উজ্জ্বল ধাতুকেও ক্ষয় করে।

১৭. জ্ঞানের অভাব (Lack of knowledge)

নিজের অজ্ঞানতা সম্পর্কে ধারণা থাকলেই জ্ঞান অর্জন সহজ হয়। একজন মানুষ যতই জ্ঞান অর্জন করেন ততই বুঝতে পারেন যে কোন কোন বিষয় তার জ্ঞানের অভাব আছে। যে ব্যক্তি ভাবে যে সে সব কিছু জানে তার অনেক জিনিসই জানতে বাকি আছে।

অজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেনা যে তারা অজ্ঞ। তারা যে জানে না সেই তথ্যটিও তাদের অজানা। বস্তুতপক্ষে, অজ্ঞতা নয়, বড় সমস্যা জ্ঞানের মোহ। এই মোহ মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।

১৮. অদৃষ্টবাদী মনোভাব (Fatalistic attitude)

অদৃষ্টবাদী মনোভাব থাকলে মানুষ জীবনে দায়িত্বগ্রহণ করতে পারে না। তারা সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য দায় ভাগ্যের উপর চাপিয়ে দেয়। তারা ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তারা কোষ্ঠীতেওঁ গ্রহন ক্ষত্রের বিচারে পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যতে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে যে তাদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যা ঘটবার তা ঘটবেই। সেইজন্য তারা কোন চেষ্টাই করে না এবং সমস্ত বিষয়ে গা এলিয়ে দেয়। তারা ঘটনা ঘটার জন্য অপেক্ষা করে নিজেরা কোন কিছু ঘটাতে চায় না। যে কোন ব্যর্থ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলে বলবে যে সাফল্য ভাগ্যের ব্যাপার। দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিরা ভবিষ্যৎ বভা, কোষ্ঠী বিচারককারী এবং স্বাঘোষিত সন্ন্যাসীদের সহজ শিকার হয়। এই ব্যক্তিরা সাধারণত কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং আচার বিচার পালনে উৎসাহী।

লঘুচিত্ত ব্যক্তিরাই ভাগ্যে বিশ্বাস করেন। শক্তিমান এবং দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিরা বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাস করেন। কেউ কেউ খরগোশের পা সৌভাগ্যদায়ক বলে মনে করেন— কিন্তু এই বিশ্বাস কি খরগোশের পক্ষে সৌভাগ্যদায়ক?

কিছু লোক ভাবেন তারাই কেবল ভাগ্যহীন

এই ধরনের চিন্তা থেকে অদৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গি জন্মায়। যারা সবচেয়ে দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তে কাজ করেন তারা বলেন—

  • আমি একবার চেষ্টা করব;
  • আমি দেখব এতে কাজ হয় কিনা;
  • আমার তো হারাবার কিছুই নেই;
  • যাইহোক আমি এটার জন্য খুব চেষ্টা করিনি।

এই ধরনের লোক নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হয়, কারণ তারা দৃঢ়সংকল্প হয়ে এবং সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করেন না। তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং কার্যসিদ্ধির জন্য কোদায়বদ্ধতা নেই। তারা উদাসীনভাবে কাজ শুরু করেন। আর ব্যর্থ হলে বলেন তার ভাগ্যহীন। একজন লোক একটি ঘোড়দৌড়ের ঘোড় কিনেছিল। তাকে ঘোড়াশালে রেখে সে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিল পৃথিবীর দ্রুততম ঘোড়া, মালিক ঘোড়াটাকে কোন ব্যায়াম করাতন কিংবা কোন ট্রেনিংও দিত না। এই অবস্থায় ঘোড়াটিকে একদিন ঘৌড়দৌড়ে নামিয়ে দিল। ঘোড়াটি এল সবার শেষে। মালিক সাইনবোর্ডটি তাড়াতাড়ি খুলে ফেলল। শুধু অকর্মণ্যতার ফলে কিংবা যা করা উচিত ছিল তা না করার জন্য লোকে ব্যর্থ চেষ্টাই হয় এবং ভাগ্যকে দোষ দেয়।

দূরদৃষ্টি, সাহস এবং গভীরতা না থাকলে জীবন লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে। সংকীর্ণচিত্ত, দুর্বল এবং অলসমনা ব্যক্তিরা সবসময় নির্বিরোধিতার পথই বেছে নেয়। অ্যাথলিটরা ১৫ বছর ধরে ট্রেনিং করে কেবল ১৫ সেকেন্ডের প্রতিযোগিতার জন্য। প্রতিযোগিতা সমাপ্তির পর যদি কোনও অ্যাধূলিট বলে যে তার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে তবে বুঝতে হবে যে সে তার সমস্ত শক্তি ও দক্ষতা উজার করে দিয়েছে। যদি তা না হয় তবে তার সম্পূর্ণ দক্ষতা ও শক্তি সে ব্যবহার করেনি।

যারা পরাজিত হন তাদের কাছে জীবন ন্যায়বিচারহীন কারণ তারা নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথাই মনে করেন। তারা বিবেচনা করেন না যে, যে ব্যক্তি ভালো প্রস্তুতি নিয়েছে এবং পারদশী তারও খারাপ সময় এসেছিল। কিন্তু সে সেই সময়ে ভেঙে না পড়ে তা পার হয়ে আসতে পেরেছে। দুজনের মধ্যে এইটির তফাৎ। যে জেতে তার কষ্ট সহ্য করার শক্তি অনেক বেশি এবং সবশেষে ক্রীড়াদক্ষতা অপেক্ষা চরিত্রের শক্তি অনেক বেশি।

যারা আত্মনির্ভরশীল ভাগ্য তাদের সাহায্য করে (Luck favors those who help themselves)

একটা ছোট শহর যখন বন্যাকবলিত হল এবং প্রত্যেকেই নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে শুরু করল, তখন একজন লোক কোথাও যেতে রাজি হল না। সে বলল, ভগবান বাচাবেন, আমার ভগবানে বিশ্বাস আছে। জল আরও বাড়তে একটি জীপ এসে তাকে উদ্ধার করতে চাইল কিন্তু লোকটি যেতে রাজি হল না। সে আবার বলল, আমি ভগবানে বিশ্বাস করি, আমার ভগবান আছেন। জল যখন আরও বাড়ল তখন সে বাড়ির দোতলায় উঠল, একটি নৌকা এসে তাকে সাহায্য করতে চাইল কিন্তু তার একই কথা, ভগবান আমাকে বাচাবেন। জল আরও বাড়তে লোকটি ছাদে উঠে গেল। তখন একটি হেলিকপ্টার এসে তাকে উদ্ধার করতে চাইল। কিন্তু তখনও লোকটি বলল, আমার ভগবানে বিশ্বাস আছে। জল আরও বাড়তে সে জলের স্রোতে ডুবে মারা গেল। তার পর ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর পর সে কাতর স্বরে ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করল, তোমার উপর আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমার প্রার্থনা অগ্রাহ্য করে আমায় ডুবে মরতে দিলে কেন? ঈশ্বর জবাব দিলেন, তোমাকে বাঁচানোর জন্য জীপ, নৌকা, হেলিকপ্টার কে পাঠিয়েছিল?

অদৃষ্টবাদী মনোভাবকে জয় করার জন্য কার্যকারণের প্রাকৃতিক নিয়মে বিশ্বাস করা দরকার এবং দায়িত্বগ্রহণের যোগ্যতা থাকা দরকার। জীবনে কোন কাজ সম্পূর্ণ করতে হলে দরকার কর্মকুশলত, প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা।

যোগ্য ব্যক্তির প্রতি ভাগ্য প্রসন্ন হয়।

আংশিকভাবে বধির স্ত্রীর জন্য একটি শ্রুতি সাহায্যকারী যন্ত্র আবিষ্কারে চেষ্টা করছিলেন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। তিনি ক্রতিসাহায্যকারী যন্ত্র উদ্ভাবন করতে পারেন নি কিন্তু তার গবেষনার ফলে টেলিফোন যন্ত্রের মূল সূত্রটি আবিষ্কার হয়েছিল। এই ব্যক্তিকে কি আপনি ভাগ্যবান বলবেন না?

যখন প্রস্তুতি ও সুযোগ একত্রে মিলিত হয় তখন ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। চেষ্টা এবং প্রস্তুতি ছাড়া ভাগ্যের প্রসন্নতা অর্জন করা যায় না।

ভাগ্য (Lack)

সে দিনের বেলা কাজ করেছে এবং রাতেও বিশ্রাম নেয়নি। খেলাধুলাও ছেড়ে দিয়েছে, এবং তার সঙ্গে মজলিশী আনন্দের ঘটাও বইয়ের শুকনো পাতায় চোখ রেখে নতুন জিনিস শেখার চেষ্টায় আরও আসে এগিয়ে গিয়ে চাইছে অর্জন করতে সাফল্য, সাহস এবং বিশ্বাসকে সঙ্গী করে, সে চলেছে এগিয়ে, এবং যখন সে সফল হোল লোক বললে, লোকটির ভাগ্য বটে।

-অনামা কবি

১৯. উদ্দেশ্যহীনতা (Lack of purpose)।

যে সকল ব্যক্তি অনেক গুরুতর অসম্পূর্ণতাকে জয় করেছেন, তাদের জীবনকাহিনীতে দেখি যে সাফল্য লাভের এক জ্বলন্ত আকাঙক্ষা তাদের চালনা করে নিয়ে গেছে। তাদের জীবনের একটিই লক্ষ্য ছিল। সমস্ত বাধা সত্ত্বেও তারা কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন-এই কথাই তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন এবং করেও ছিলেন।

এই আকাঙক্ষাই পক্ষাঘাতগ্রস্ত উইলমা রুডলফকে দৌড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মহিলা হিসাবে ১৯৬০ সালে অলিম্পিকে তিনটি স্বর্ণপদক জিতিয়েছিল। প্লেন কানিংহামের কথায়, পুড়ে যাওয়া পা নিয়ে একটি ছেলে একমাইল দৌড়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছিল কেবল তীব্র আকাঙ্ক্ষার তাড়নায়।

পাঁচ বছরের পোলিও রোগগ্রস্ত একটি মেয়ে শক্তি ফিরে পাবার জন্য সাতার শুরু করে। ক্রমে সাঁতারে সাফল্য অর্জনের জন্য তার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মে। শেষ পর্যন্ত সাঁতারের তিনটি বিভাগে মেয়েটি রেকর্ড সৃষ্টি করে এবং ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক পায়। তার নাম শেলী ম্যান।

যখন লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে তখন মানুষ কোনও সুযোগেরই সন্ধান পায় না। যদি কার্যসিদ্ধির আকাঙক্ষা থাকে, লক্ষ্য ঠিক থাকে। অভীষ্ট কাজে সাধনা থাকে। কঠোর শ্রমের জন্য যদি প্রয়োজনীয় খিলাবোধ থাকে তাহলে অন্যান্য বাধা সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু ঐ মেস্ত গুণাবলী যদি না থাকে, আর যাই থাকুক না কেন তাতে কিছুই লাভ হবে না।

চরিত্রের ভিত্তির উপরই সব কিছু নির্মাণ করতে হয়। তবেই তা স্থায়ী হয়।

২০. সাহসের অভাব (Lack of courage)

সফল ব্যক্তিরা অলৌকিক ঘটনা বা সহজে কার্যসিদ্ধির জন্য অপেক্ষা করেন না। তারা সাহস ও শক্তি দিয়ে বাধা দূর করার প্রয়াস পান। যা পাওয়া যাবে না তার জন্য অপেক্ষা না করে যা আছে তাই দিয়ে কাজ শুরু করেন। অলস ইচ্ছা পূরণ হয় না। কিন্তু সংকর, প্রত্যাশা কিংবা দৃঢ় বিশ্বাস যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে তা সফল হয়। প্রার্থনার সঙ্গে সাহসী কাজ করলে প্রার্থনা পূরণ হবার সম্ভাবনা থাকে। সাহস ও চরিত্রবলের সম্মিলন ঘটলে সাফল্য নিশ্চিত। এই সম্মিলনই সাধারণ ও অসাধারণের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে। মনে সাহস থাকলে ভয় ভুলে সংকট অতিক্রম করা সহজ হয়। সাহস মানে ভয়ের অভাব নয়, সাহস মানে ভয়কে জয় করা। চরিত্র, সততা ও ন্যায়বোধের সংমিশ্রণ, এবং চরিত্রের দৃঢ়তা ছাড়া সাহস কার্যকর হয় না। আর চরিত্র বিনা সাহস অত্যাচার বিশেষ।

সাফল্যের প্রণালী (A recipe for success)

সাফল্য কেক তৈরির মতো। যদি কেক তৈরির প্রণালী যথার্থ না অনুসরণ করা হয়, তাহলে কেক হবে না, উপাদানগুলি ভালো গুণমানের হবে এবং যথার্থ অনুপাতে মেশাতে হবে। ওভেনে বসিয়ে বেশি বা কম সময় রান্না হলে চলবে না। রান্নার পদ্ধতি ঠিক থাকলে, দু

একবার খারাপ হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক জিনিসটি উৎরে যাবে।

অধ্যাবসায় ও গোয়ারতুমি এক জিনিস নয়। অধ্যবসায়ে আছে দৃঢ় সংকল্প, কিন্তু গোঁয়ারতুমিতে আছে সংকল্পের অভাব। সাফল্য লাভের পদ্ধতি আপনি এখন জানে, সেগুলি প্রয়োগ করবেন কিনা, সে সিদ্ধান্ত আপনার।

সাফল্যের জন্য জরুরী শিক্ষাক্রম

  • জেতার জন্য খেলবেন, হাবার ভন্য নয়।
  • অন্যের ভুল থেকে মিক্ষাগ্রহণ করুন।
  • উন্নত নৈতিক চরিত্রের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন।
  • যা অপরের নিকট পান, তার থেকে বেশি দিন।
  • উদ্দেশ্যহীনভাবে কোন জিনিসের সন্ধান করবেন না।
  • দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করুন।
  • নিজের শক্তি যাচাই করে তার উপর ভরসা রাখুন।
  • সিদ্ধান্ত নেওয়া সময় বড় লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখবেন।
  • সততার বিষয়ে কোনওভাবে আপস করবেন না।

 

কাজের পরিকল্পনা (Action plan)

১. প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজে গর্ববোধ তৈরি করুন।

২. ভালো কাজ পুরস্কৃত করুন।

৩. সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ লক্ষ্য স্থির করুন।

৪. উচ্চ আশা রাখুন।

৫. মূল্যায়নের জন্য স্বচছ ও পরিমাপ যোগ্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করুন।

৬. অপরের প্রয়োজন সঠিকভাবে যাচাই করুন।

৭. আপনার বৃহৎ পরিকল্পনায় প্রত্যেকের যথার্থ অংশ নির্দিষ্ট করুন।

৮. একটি ইতিবাচক অনুকরণযোগ্য ব্যক্তি হিসাবে অন্যের নিকট দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।

৯. অন্যের আত্মসম্মান বোধ জাগ্রত করুন।

১০. শৃঙ্খলার অভাবে জীবনের যে যে ক্ষেত্রে আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, সে ক্ষেত্রগুলির তালিকা তৈরি করুন। ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করুন।

১১. পরবর্তী বিপত্তির মুখোমুখি হবার সময় নিজেকে এই দুটি প্রশ্ন করুন : এই বিপত্তির মোকাবিলা থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করব? এবং সেই শিক্ষা কিভাবে জীবনে উন্নতির জন্য প্রয়োগ করতে পারি?

১২. আপনার মতে সাফল্যের সংজ্ঞা কী?

১৩. আপনার জীবনের লক্ষ্য বর্ণনা করুন?

১৪. এইগুলি গুরুত্বপূর্ণ কেন?

১৫. পিছনে ফিরে তাকিয়ে চিন্তা করুন গত দশ বছরে আপনার জীবনের লক্ষ্য কি বদলেছে? যদি বদলে থাকে তবে কেন বদলেছে?

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *