০২. নিষ্পাপ পবিত্রতা ইত্যাদি

যাক এসব, যে কারণে ভাবছিলাম, সেটা হল, নিষ্পাপ পবিত্রতা ইত্যাদির সঙ্গে, চেহারা, শরীরের লক্ষণ, এসব টেনে না আনাই ভাল। তা হলে আর এসব ওসব প্রবাদের ছড়া লোকে বলেছিল কেন, ঘোমটার মধ্যে খ্যামটা নাচে। আসলে শরীর বা মনের পবিত্রতা, কথাটা অর্থহীন।  মানুষের মনের ভেতরে ওই শব্দগুলো একেবারে অকেজে। নীতার পিঠে নাক ডুবিয়ে গন্ধটা শুকতে শুকতেই এসব মনে হল। আজ বিকেলে বোধহয় ওর সেই পার্টটাইম ছুকরি ঝি-টা মিঠে ক্রীম মাখিয়ে দিয়েছিল। কী নাম যেন মেয়েটার, অলকাই তো বোধহয়। ঠিক মনে করতে পারছি না, মোটের ওপর নামটা মোটেই ঝিয়ের মত নয়। অশোকা অনীতা যা হোক একটা কিছু হবে, যে নামটা হয়তো ওকে ধার করে নিতে হয়েছে। সে যেমন তার দিদিমাকে চেনে, দিদিমণিও তাকে তেমনিই চেনে। তাই ঝি আর মণিরাণীর থেকে, দুজনের মধ্যে বেশ একটা সখী সখী ভাব আছে। অলকা (কিংবা অশোকা অনীতা) দক্ষিণ বাংলার কালো মেয়ে একটি, চেহারাটা মন্দ নয়, বয়সও ওর কর্ত্রীর মতই প্রায়, এবং শরীরের দিক থেকে আরো মজবুত। সে-ই হয়তো আজ ক্রীম লেপে, সরে পাউডার বুলিয়ে দিয়েছিল। তার জন্য মেয়েটার হাতকে আমার হিংসে কর কিছু নেই, বরং কে জানে, ওই মেয়েটাই কোনদিন পিঠ পেতে দাঁড়ালে, আমিই হয়তো ক্রীম মাখিয়ে দিতাম। নীতার মুখেই শুনেছি, সেই মেয়েটারও অনেক প্রেমিক আছে এবং তারা কেউ চাকর নয়, ভদ্দরলোকেরাই তার সাঙাত্‌। ভদ্দরলোক। (আমি ছাড়া কে নয়। মেয়েটার হয়তো সেটাই সান্ত্বনা, ভদ্রলোকদের সঙ্গে তার আশনাই চলে।

নীতার বুকের পাশ ঘেঁষে হাত দিয়ে টেনে একে আবার চিত করতে ইচ্ছে করল। কিন্তু শক্ত লাগল। তুলতে গিয়ে মনে হল ও যেন একটা পাথরের মুক্তি। অথচ একটা শব্দ যেন শুনতে পেলাম। আটকানো নিশ্বান হঠাৎ একটু গলা দিয়ে বেরিয়ে গেলে যেমন শব্দ হয়, অনেকটা সেইরকম। আমি ভুরু কুঁচকে, নীতার কাত করা মুখের দিকে তাকালাম। না, বেঁচে থাকার কোন চিহ্ন নেই, কোন অভিব্যক্তিই নেই, যার থেকে মনে করা যেতে পারে ওর গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুল। আমি আয়নার, আমার দিকে তাকালান, ভুরু নাচিয়ে, মনে মনেই জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার? ঠিক শুনেছি তো? না কি খাটের শব্দ? কিন্তু সে বিষয়ে খাটটা যথেষ্ট ভদ্র বলেই জানি, দাপাদাপি করলেও কোনরকমা সাড়াশব্দ করে না।

শরীর দুলিয়ে গদীটাকে দোলালাম কয়েকবার, ডবল গদীর ওপরে, আমার এবং নীতার, দুজনের শরীরটাই কয়েকবার, দোল খেল, অথচ শব্দ হল না। কোন শব্দই নেই, তবে শব্দটা কি আমি শুনিনি। সত্যি বলতে কি, আমার একটু অস্বস্তি হতে লাগল, মানে, বড় বড় কথা বলে ্তো লাভ নেই, প্রেতাত্মা ট্রেতাত্মার ব্যাপারটা ঠিক কী, আমার জানা নেই। হাতে। রাস্তাই থাকলে, ব্যাপারটাকে এক কর গুলি মেরে উড়িয়ে দিতাম। এমন কি এ ঘরেও, যদি নীত জীবিত থাকত। এখন সে একা কী রকম, কী জানি বলা যায়, একটা কিছু যদি দেখতে হয়। মরেছে। এখন যদি এই উপুড় হয়ে থাকা মূর্তিটা। অবিকল এমনি উঠে দাঁড়ায়, ঠিক যে ভাবে কোমরটা বেঁকে রয়েছে, একটা হাত মাথার পাশ দিয়ে ওপরের দিকে, আর একটা হাত কনু মুড়ে, চোখটা যে রকম রয়েছে, সেই রকমই আধবোজার মত, আর মুখটা যে রকম রায়েছে, ঠিক সেই রকম, একটা ভাব অভিব্যক্তিহীন মূর্তির মত উঠে দাঁড়ায় তাহলে তো বড় বেকায়দা। বিশ্রী, ওরকম দেখা যায় নাকি।

কথাটা ভাবতে ভাবতে আমি বাঁ হাত দিয়ে নীতাকে চেপে ধরলাম, বলতে গেলে, প্রাণপণ জোরে চেপে ধরলাম, যেন বাইচান্স, উঠে পড়লে ধরে রাখতে পারি। ঘরের চার পশে একবার তাকালাম, ওয়ারড্রব, বইয়ের আলমারি, দুটো সিঙ্গল শোফা, টেবিলের ওপরে একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিন, রেড়িওগ্রাম, যার। মাথার ওপর মেলাই পুতা এবং ডু সিং টপিল আর আয়না। আয়নায় নিজেকে দেখে, অস্বস্তিটাকে মুখ কুঁচকে দূর করতে চাইলাম, নিজকে খানিকটা সান্ত্বনা অথচ বকুনি দেবার সুরেই বলে উঠলাম, যাঃ মাইরি। মনে মনে বললাম, কিছুই শুনতে পাইনি আমি। হয়তো শব্দটা আমার নিজের গলা থেকেই হয়েছে, হাতের জোর দিয়ে যখন ওকে তুলতে গিয়েছিলাম, তখনই শব্দটা বেসিয়ে থাকবে।

মুখ ফিরিরে বাথরুমের দরজাটার দিকে তাকালাম, বই আছে। পাশের ছোট ঘরটার কমজোরের আলো জ্বলছে, খাট পর্দাটার পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে এবং সেখানে যে কেউ নেই, অর্থাৎ কোন ওই সব বাজে জিনিষ, ছায়া-টায়া, বা কোন শব্দ, তাতে সন্দেহ নেই। বইয়ে লেখা আর লোকে বলে বলেই কি এসব সত্যি আছে নাকি। এ ঘরের আলো তো বেশ জোরই। একটু-আধটু ছোটখাটো অন্ধকার আছে, ওয়ারড্রব বা ষ্টীল আলমারিটার পাশে। তবু সেখানে সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এ ঘরের এই জোরালো আলোটা নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল নীতা, যে কারণে আয়নাটার জন্যে ও একটু সঙ্কোচ করেছিল। আলো না থাকলে, আয়নাটাও সঙ্গে সঙ্গে উধাও! কিন্তু আমি নেভাতে দিই নি। আমার জাবান, অন্ধকারে ভূতের মত কিছু দেখালাম বা শুনলাম না, এবং বুঝলাম না, সেরকম ভাল লাগে না। অবিশ্যি, মাথায় থেকেই, কে আছে না আছে, তবু চোখে দেখার ব্যাপারটা আলাদা। যে কারণে অনেক কিছু দেখতে পাই আমরা।

যাই হোক, শব্দটা যে হয়নি, শুনিনি, তাতে কোন সন্দেহ নেই, এবং নীতা ওভাবে উঠে দাঁড়াবেই বা কেন। দাঁড়াতে পারবে কেন? শুনছি, মৃতেরা অনেক সময় নড়ে চড়ে ওঠে, হয়তো। বেঁকে থাকা হাতটা খট করে সোজা হয়ে গেল, কিন্তু সেটা বেঁচে থাকা নয়। আর আচমকা মরলে বোধহয় অনেক সময় গলার নালীর কাছে শব্দ আটকে থাকে, কিংবা বুকের কাছে। চাপ খেয়ে সেটা হেঁচকি ওঠার মত বেজে উঠতে পারে। গলা-কাটা ছাল-ছাড়নো মুরগীর বেলায় আমি তা দেখেছি। গলা কাটা ছাল-ছাড়ানো মুরগীর পেট টিপে দেখেছি, বক্‌ বক্ শব্দ হয়, ঠিক যেমন করে মুরগী ডাকে। একবার পিকনিক গিয়ে, তাই দেখে তো আমার এক বন্ধুপত্নী ভিরমি গিয়েছিল আর কী। ওই রকম একটা মাংসপিণ্ডের ভেতর থেকে যদি জ্যান্ত ডাক শোনা যায়, তা হলে হঠাৎ একটু চমকে যেতে হতে পারে। তবে আর সেই বন্ধুপত্নী যেমনটি করেছিল, ও মা! ও কী! বলেই সেখান থেকে দৌড়, সেটা একটু বেশী বাড়াবাড়িই হয়েছিল। মাংসও খাবে না বলেছিল, তারপয়ে খেয়ে ছিল ঠিকই। এক এক জন আছে, সব কিছুতেই ভয়, বোধহয় ওর মধ্যেই তাদের সুখ। ও মা গো, না না না সম্ভবত আ হা গো, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। এই শব্দই বাজে।

কিন্তু যাই হোক, মরা মুরগীর এই শব্দটার কথা আমার জানা আছে, এবং হয়তো নীতার বুকের পাশে, পাঁজরায় আমার হাতের চাপ পড়েই একটা শব্দ বেরিয়ে থাকবে, যদি সত্যি বেরিয়ে থাকে এবং আমি শুনতে থাকি। তা হলেও, একটা অস্বস্তি যখন ইচ্ছেই, কয়েকবার রাম রাম বললে কেমন হয়। কিংবা, ভূত আমার পুত, পেত্‌নি আমার ঝি…। (আমার দিকে তাকিয়ে হাসলাম) শা–!

অবিশ্যি একটা কথা আমার মনে হচ্ছে, নীতার ভূত যদি উদয় হয়, তা হলে আমার ভয় করবে না। কেন, তা আমি বলতে পারি না, বোধহয় যে কারণে ওর শবের পাশে থেকে, আমার গা ঘিনঘিনিয়ে উঠছে না, সেই কারণেই। সঙ্গে কাউকে না নিয়ে এলেই হল, কেন না, ভুতের জগতের কথা তো বলা যায় না, কাছেই গড়ের মাঠ, হয়তো লাইনটিনথ্‌ সেঞ্চুরির কোন সাহেব ডাকাতের ভূতকে সঙ্গে নিয়ে এল! তা ছাড়া নীতা যদি একলাই আসে, জানি না ভূতের চেহারা যেমন হয়, হয়তো ছায়া হয়ে আসবে, বা একেবারে সরাসরি মূর্তি ধরেই আসল, তাতে আমার ভন্ন লাগবে না। তবে একথা ঠিক, এখন যদি ও এসে জিজ্ঞেস করে, তুমি আমাকে হঠাৎ ওরকম গলা টিপে ধরলে কেন, আমাকে মেরে ফেললে কেন, তা হলে আমি সত্যি কোন জবাব দিতে পারব না।

সত্যি, আমি এখন ভালভাবে সব কথা ভেবেই উঠতে পারছি না, কী করে সেই ওর গলাটা টিপে ধরলাম। ও কী সব বলছিল, আমিও কী সব বলছিলাম, কথাগুলো…। না, এ ভাবে ভাবলে, সারারাত্রেও আমি ঠিক মনে করতে পারব না, ঠিক কোন কথাটার সময় আমি ওর গলাটা—আচ্ছা, তখন তো, তখনো ও চিত হয়েই শুয়েছিল, আমার বাঁ হাতটা ওরই গায়ের ওপর এলানো, ওর মুখটা আমার দিকে একটু ফেরানো, এবং দুজনেরই একটা আলস্য, আমি এর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এমনভাবে তাকিয়েছিলাম, যেন তখন কোন কারণেই আমি চোখ ফেরাতে পারতাম না। ঠিক মত বলতে গেলে ওর সুন্দর মুখে, তাৎক্ষণিক যে সুখের সুখজনিত আলস্যে ও অনুভূতির রেশ মাখানো ছিল, সেই মুখের দিক থেকে চোখের পলক ফেলতে পর্যন্ত পারছিলাম না, যেন পলক ফেলতেই ওকে হারিয়ে ফেলব (পেটে তেমন খুব মাল ছিল না যে, খোয়াব দেখব।) এবং ওর মুখটা দু হাতে ধরে একটা চুমো খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল, আথচ একটা কী রকম ঘৃণায় আর রাগে, আর বোধহয় ঈর্ষার হঠাৎ থু থু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু এই ইচ্ছাগুলো যে আজই নতুন করে হচ্ছিল, তা নয়, আরো অনেক দিন হয়ছে। এর কারণ যে ঠিক কী, তা আমি কোনদিনই বুঝতে পারিনি। যে কারণে নীতার কাছে প্রায় রোজই আসবার ইচ্ছে থাকলেও (ইচ্ছে থাকলেও যদি রোজই আসা সম্ভব ছিল না, কারণ এর আরো বন্ধুবান্ধব আছে এবং রোজ আসবার চেষ্টা করলে বাগড়া তো নিশ্চই হত, এমন কি বেশী জোরজবরদস্তি করলে, ওর পক্ষে পুলিশের শরণাপন্ন হওয়াও অসম্ভব ছিল না। আর এই যে প্রায়ই, প্রায়ই মানে মাসের হিসেবে তিন চার দিন হতে পারে, আমি আসি, তার জন্যে আগে খবর দিই, বা নীতা খবর দেয়। মন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করি। জানি না, এটাও সেকস্‌ এ্যাটাচমেণ্ট-এর মত ব্যাপার কিনা, এবং সেকস্‌ এ্যাটাচমেন্টের সঙ্গে ওরকম রাগ বা ঘৃণার কোন সম্পর্ক আছে কি না, তবে একথা তো ঠিকই যে, নীতার কাছে খুবই আসতে ইচ্ছে করে। যে কারণে দেখেছি, অন্য মেয়ের সংসর্গের সময়েও, নীতার কথা আমার মনে পড়ে গিয়েছে, হঠাৎই মনে পড়ে গিয়েছে, আর তাতে বিরক্ত বোধ করেছি এবং বিকৃত আচার আচরণ করেছি।

এটা একটা কী ধরনের ব্যাপার, আমি ব্যাখ্যা করতে পারি না। মদের নেশার মত একটা আসক্তি কি না এটা, কে জানে। যেমন আসক্তির ঝোকে প্রচণ্ড টানলাম, এবং তারপরে গলায় আঙুল দিয়ে, হড়হড়িয়ে থু থু করে তাই ফেলে দিলাম।

অর্থাৎ নীতার কাছে আসার জন্যে যতটা উদগ্রীব হই, সত্যি বলতে কি, প্রায় ততটাই অনাসক্তি বোধ করি। এ আবার কী রকম কথা। এরকম কি হতে পারে না কি, যেন যাহ বাহার, তাহ। তিপপার। অনাসক্তিটা আসলে কী ঘৃণা? রাগ? আর রাগই যদি কুরব, তা হলে ওর কাছে আসার জন্যেই বা মন মনে উদগ্রীব হয়ে হকিব কেন। আচ্ছ, যেমন ধরা যাক, এরকম অনেকদিন হয়েছে, নীতাকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করে চুমো খাচ্ছি, খেতে খেতে চোখ বুজে এসেছে, আবার তাকিয়েছি, এবং ওর আবেশ মাখানো মুখটা দেখতে দেখতে, হঠাৎ একেবারে হঠাৎই মনে হয়েছে, ওইভাবেই ওর নাকের ছিদ্র দুটো সুদ্ধ চেপে ধরে, শাসন করে মেরে ফেলি। অবিশ্যি, আজ কার্যত প্রায় তাই ঘটে গিয়েছে, তবে আদর করতে করতে না। যদিও তার একটু আগেই, এমন কি মুখ দিয়ে ওর পায়ের নখটা পর্যন্ত ছুঁয়েছি। এর মানে কি, আমি ঠিক কী যে চাই, বা চাইছিলাম বা চেয়ে এসেছি এতকাল ধরে, সেটাই তো বুকে পারছি না। মারতে তো অনেককেই চেয়েছি, মারিনি বা মারতে পারিনি, এবং আজ ওকে মারব বলেও আসিনি, বা কোনদিন বাগে পেলে ওকে খুন করব, এসব কথা আমি কখনো চিন্তা করিনি। একমাত্র একমাত্র তখনই আগার, কোন কোন সময়ে মনে হয়েছে, ওকে যেন আমি সহ্য করতে পারছি না, অসহ্য একটা ঘৃণা বমির মত উঠে আসতে চাইছে, রাগ ফুঁসে উঠতে চাইছে, যখন ওকে খুবই নিবিড় করে পাই। ব্যাপারটা কেমন যেন মামদোবাজী মামদোবাজী লাগছে, তবু সত্যি বলতে কি, এ ছাড়া, বিষয়টাকে আমি কোন রকমভাবেই আর ব্যাখ্যা করতে পারি না।

অবিশ্যি আজ যখন ওইরকম একটা ভোজবাজীর মত (ভোজবাজী ছাড়া একে আর আমি কী বলব, তা জানি না। মনের অবস্থা, অ্যাঁ-ও না, ওঁ-ও নয়, মানে এটাও আছে, ওটাও আছে, খুব আদর করে ওর ঠোঁট দুটোকে মুখ ভরে শুষে নিতে ইচ্ছে করছিন, অথচ ঘৃণায় আর রাগে তৎক্ষণাৎ থু থু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল, ঠিক তখনই আমরা দুজনেই কথা বলে উঠেছিলাম। কথাগুলো প্রথম থেকে ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল…। না, এভাবে মনে করতে গেলে, মনে করতে পারব না। অথচ পূর্বাপর সমস্ত ব্যাপারটা একবার ভেবে নিতে চাই, কারণ আমাকে এবার প্রস্তুত হতে হবে, যা করেছি, তার হাত থেকে বেরিয়ে যাব কেমন করে।

আচ্ছা, বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে, আমি রুবি দত্তর কাছে যাব বলেই সিদ্ধান্ত করেছিলাম। আমার এক বন্ধুর চাকরির জন্য, পিছনের দরজাটা খোলা, যায় কি না, তারই চেষ্টায় রুবি দত্তকে ধরাই একমাত্র পথ বলে আমি জানতাম। কারণ পিছনের ঢাবির কিছু গোছা রুবি দত্তর আঁচলে আছে।

কিন্তু রুবি দত্তর কাছে যাওয়া হয় নি। এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, সে আমাকে বলল, এমন ভাল ছেলের মত কোথায় যাওয়া হচ্ছে চাঁদের। ভাল ছেলের মত! বন্ধুটি যে কোম্পানীতে চাকরী করে সেই কোম্পানীর গাড়িতেই যাচ্ছিল। একটা ভাল পোষ্টেই সে চাকরী করে। আমি ব্যাস্ত হয়ে একটা ট্যাক্‌সী খুঁজছিলাম, তাই তখন বোধহয় আমাকে ভাল ছেলের মত দেখাচ্ছিল। অন্যান্য দিন, অফিস থেকে বেরিয়ে, কোথাও না কোথাও আড্ডা মারতে বাসে গাই। বন্ধুটি গাড়ীর দরজা খুলে দিয়ে বলেছিল, উঠে আয়।

আমার তখন আশা, ওর সঙ্গে গেলে, কোম্পানীর গাড়িতেই হয়তো রুবি দত্তর বাড়ী পৌঁছে যেতে পারব। আমি বলেছিলামও সে কথা, যে, দেখা হয়ে ভালই হয়েছে, ওর সঙ্গেই তানি চলে যেতে পারব। বন্ধুটি ঘাড়ের ওপর চাপড় মেরে, চোখ টিপে বলছিল, অফিস থেকে বেরিয়েই যেভাবে ছুটেছিস, তোর রুবিদি কি ইয়ে করে বসে বসে আছে নাকি?

আমি বলেছিলাম, না না, অন্য একটা দরকার, মানে একজনের–

বন্ধুটি আমার কথাই শেষ ফুরতে দেয়নি। হেসে উঠেছিল, বলেছিল, ওরে শালা ভাদ্দুরে, (ভাদুরে কুত্তা, ভাদ্র মাসে যারা—যাকগে) যাবি যাবি, তোকে আটকাব না। যাবার আগে একটু মুখে দিলে যাও আমার শাহেন শা দু পাত্তর চড়িয়ে গেলে জমবে ভাল।

বন্ধুটি কোন কথাই শোনেনি, একটা বার-এ টেনে নিয়ে গিয়ে ছিল। অবিশ্যি আমি যে কখনো এক-আধ ঢোক গিলে রুবি দত্তর সামনে যাইনি, তা নয়। কিংবা রুবি দত্তদের ডেরায় বসেও দু-একবার পান করেছি। যদিও, যেন বেশী খেতে পারি না বা সর্বসমক্ষে যেন খেতে একটু দ্বিধা বোধ করি, এরকম ভাব বজায় রাখতে চেষ্টা করেছি। (আয়নায় একবার চোখ টিপলাম, কত রঙ্গই জানিস।) উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, রুবি দত্ত একটু সাধাসিধি করবে, অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে, প্রশ্রয় দিয়ে হাসবে এবং আমার সম্পর্কে একটা পেশাদার মাতলের কথা যেন না ভাবে।

বন্ধুটি হুইসকি গিলতে গিলতে, ওর অফিসের ষ্টেনোর গল্পই বেশী বলেছিল। মেয়ে স্টেলো, এবং আজও তার সঙ্গেই দেখা করতে চলেছিল। তাই আগে থেকেই দু পাত্তর চড়িয়ে নিচ্ছিল। তার অসুবিধে হচ্ছে, বউটা নাকি বড্ড গোলমান করছে, সে নাকি ছায়ার মত ওকে অনুসরণ করবে, বলা যায় না, হয়তো অফিস থেকে বেরিয়ে ও কোথায় যায়, কোন অদৃশ্য থেকে বউ সবই লক্ষ্য করছে, অতএব আপাতত কোন বার-এ ঢুকে পড়াই ভাল। প্রায় পাঁচটার সময় বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পেগ তিনেক খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, আর বন্ধু ঘড়ি দেখে, হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠেছিল, বেয়ারাকে ডেকে তৎক্ষণাৎ বিল মিটিয়ে দিয়ে বলেছিল, এসকিউজ মী, পরে দেখা হবে, চললাম।

শালা।

আমি মনে মনে বলেছিলাম। আমি ভাদ্দুরে, আর উনি—কিন্তু রুবি দত্তর কাছে যাবার কথাটা তখনো ভুলিনি, এবং যাবার জন্যেই রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলাম, এবার একটা ট্যাক্সি। ইতিমধ্যে কখন অন্ধকার পুরোপুরি নেবে গিয়েছে, চারদিকে আলো জ্বলে উঠেছে, যদিও জঘন্য ধোঁয়ার গ্রাসে শহরটা যেন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। অবিশ্যি আমি যখন অফিস থেকে বেরিয়েছিলাম, তখনই অন্ধকার নামবে নামবে করছিল। এখন বেলা ছোট, পাঁচটাতেই সুর্য ওস্ত চলে যায়। আলো জ্বললে কী হবে, ধোঁয়া নরক করে তুলে। এ তো তার উত্তর কলকাতা নয়, মধ্য কলকাতার সব থেকে শ্রেষ্ঠ জায়গারই কাছাকাছি, তবু এত ধোঁয়া এখানে কোথা থেকে এল! আমার যেন নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল, সবই অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল। আমি ট্যাক্সির মাথায় আলো লক্ষ্য করছিলাম, জলন্ত আলো দেখতে পেলেই চিৎকার করব। জঘন্য! অঘ্রাণের কুকুরের বাচ্চার মত কতগুলো ছেলে, খালি ট্যাক্‌সির পেছনে ছুটছে, যাত্রীদের ধরে দিচ্ছে, আর পয়সা নিচ্ছে। কলকাতা! আজ যেন মাসের কত তারিখ! মনে করতে পারছিলাম না। অথচ আমিও তে চাকরি করি, আমার তারিখের কথা মনে থাকা উচিত ছিল। তারিখটা মনে করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম, এবং নিজেকেই গালাগাল দিয়েছিলাম। তারিখটা মনে করতে না পারলে, কী করে বুঝব যে, সহজে ট্যাক্সি পাব। মাসের দু তিন তারিখ হলে হয়তো আমার ঘরের বেয়ারাটাই আজ ট্যাক্সি চেপে বাড়ি যাবে। আর অন্যান্যদের তো কথাই নেই। মাসের সাত তারিখ পর্যন্ত, তোমার বাবার ক্ষমতা নেই, সন্ধাবেলায় বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলাতেই তুমি ট্যাক্সি পাবে। তাও আবার এসপ্লানেড চৌরঙ্গি এলাকায়। শুধু তাই নয়, দুটার সিনেমা ভেঙ্গেছে, ম্যাটিনি শো, সন্ধ্যার শো শুরু হতে চলল। তখন ট্যাক্সি পাওয়া লটারির বাজী জেতার মতই তার ওপরে, ওই উচ্চিংড়েগুলো, এক-আধটা ভারী বড় বড় বাসের তলায় চেটে যেতে পারে না। অবিশ্যি আমাকেও শেষ পর্যন্ত হয়তো এদেরই সাহায্য নিতে হবে, নয়তো এ জায়গা থেকে ট্যাক্সি পাওয়া অসম্ভব। কারণ, ট্যাক্সিওয়ালাগুলোকেও দেখেছি, এই উচ্চিংড়েগুলোর ওপর একটা কেমন সমর্থন আছে, সমবেদনা যাকে বলে। এর। ট্যাক্সি ধরে দিলে, এদের পয়সা না দেওয়া পর্যন্ত গাড়ি স্টার্ট দিতে চায় না। সব দয়ালু, সবাই সবাইকে একটু দয়া দেখাবার জন্যে যেন মুখিয়ে আছে। আর এই পোকাগুলো সাব, মেমসাবদের, দিকেই আগে ট্যাক্‌সি এগিয়ে দেবে। সে বিষয়ে আমার অবিশ্যি দূর্বলতা ছিল না, কেননা, আমি পাসের থেকে মাথা পর্যন্ত সাব। কিন্তু ওফ! আশ্চর্য, তারিখটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না, সাত ন। আট না দর্শ। তবে মাসের প্রথম দিকই হবে, ভিড় দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। সিনেম। অফিস এবং টাক। সবকিছুরই ভিড়, এবং (কে যাচ্ছে মেয়েটা, তাকাল যেন দুবার?) ক্রমেই তা বাড়ছে, রাত্রি আটটা অবধি এই অবস্থাই চলতে থাকবে? অবিশ্যি, রুবি দত্তর ওখানে যে আর যাওয়া হবে না, আমি তখনই বুঝতে পারছিলাম, আর যার চাকরির জন্যে হঠাৎ রুবি দত্তর কাছে যাব ভেবেছিলাম, তার ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। কোথায় সে, একটা ট্যাকসি ধরিয়ে দিয়ে তখন সাহায্য করতে পারছিল না। আমার কী দায় কেঁদে গিয়েছে, নিকুচি করেছে। সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারছিলাম, আবার বার-এর দিবেই আমাকে টানছিল। যে বন্ধুটি টেনে নিয়ে গিয়েছিল, (ও বোধহয় ফাগুন মাসের নিষ্কাম কুত্তা।) তার ওপরেও রাগ হচ্ছিল। গোপন আশয়ের গর্তে এতক্ষণ বোধয় স্টেনোকে লটে নিয়ে বসে গিয়েছিল। আসলে, একটু ড্রিংক করার দরকার ছিল, আর সেটা নিতান্ত একলা করবে? তাই পথে যে কোন একজন পরিচিতকে পেলেই হত। সেই যে-কোন-একজন আমিই চোখে পড়ে গিয়েছিলাম। নিকুচি করেছে। বলিহারি লোকগুলোকে, এক-একটা খালি ট্যাক্সির ওপরে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, যেন কোন আততায়ীর উপর পড়ছিল। দরকার হলে প্রত্যেকটা লোকই প্রত্যেকের সঙ্গে হাতাহাতি করতে পর্যন্ত রাজী ছিল। আজ ঠিক তখনই সময় বুঝে, আমার তলার ব্লাডার টনটন করছিল। কাছে-পিঠে কোথাও কোন ইউরিনাল ছিল না, বার-এ গেলেও (হুম! মেয়েটার নির্ঘাৎ পাছায় প্যাড আছে, নইলে অত নেত্য কেন।) হাঁটতে হত। ব্যাপারটা বার-এ সেরে আসতে পারতাম, কিন্তু তখন একেবারেই খেয়াল ছিল না। তখনো পরোপকারে (পরোপকার? না রুবি দত্তর সান্নিধ্য, এবং তার কাছে নিজেকে প্রমাণ কর যে, তুমি বন্ধুবান্ধবের জন্যে কিছু করে থাক। যা সত্যি নয়, সব সময়েই তা বলতে এত অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি যে, নিজেরই এক-এক সময় সন্দেহ হয়, মিথ্যেটাই সত্যি।) ঝোঁকটা ছিল, মাথায় ছিল ট্যাক্সি। ট্যাক্সি, টনটনানি, আর কলকাতা, সন্ধ্যার কলকাতা বরি থেকেও খারাপ। ইচ্ছে করছিল, বোতাম খুলে দাঁড়িয়ে যাই, কিন্তু মুশকিল, কাছে-পিঠে সেরকম দেওয়াল ছিল না একটাও, যদিও ধোঁয়ায় অস্পষ্ট, তবু চারপাশেই গা ঘেঁষে লোকের ভিড়।

শেষ পর্যন্ত যখন বার-এর দিকেই যাব বলে পা বাড়াতে যাচ্ছিলাম, সে সময়েই একটা ট্যাক্সি সামনে দাঁড়িয়ে গেল। উচ্চিংড়েগুলো আর কয়েকজন অপেক্ষমান যাত্রী এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল এসে। ড্রাইভারটা চিৎকার করে উঠে ছিল, আরে ভাড়া হ্যায়। ট্যাক্সির ভেতর থেকে নীতা আমাকে ডেকেছিল, উঠে এস।

আঃ, সেই মুহূর্তে, একটা ট্যাক্সির কোটর (নীতার জন্য নয়, বা রুবি দত্তর কাছে যাবার জন্য নয়, ভিড় এবং অপেক্ষমান জনতার মাঝখান থেকে নিজেকে ছিঁড়ে নেওয়া।) যে কী সুখের আশয়, অগাধ, স্বস্তি, বলে বোঝাবার, নয়। গাড়িটা চুলতে আরম্ভ করেছিল, তৎক্ষণাৎ সান্ধ্যকালীন হুইস্কি আমার পেট থেকে জানান দিয়েছিল, আমেজের রেশটা তখনো আছে। প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে তিনটি বড় পেগ, আমার পেটে ঢুকে রয়েছে। ধরেই নিয়েছিলাম, নীতা কোথাও নিজের দকারে চলেছে, পথের মাঝে দেখতে পেয়ে একটা লিফট্‌ (যদি নিজের পথে পড়ে) দেবার ইচ্ছে হয়তো হয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, কোথায় চলেছ?

বলেছিলাম, আপাতত একটা ইউরিনাল বা ল্যাভেটরি, নয়তো কোন অন্ধকার ঘুঁজিতে ছেড়ে দিলেই হবে।

নীতা হেসে উঠেছিল, এবং কে জানে, ও হয়তো কোন অভিসারে চলেছিল, আর সেই পথেই আমাকে লিফট দিচ্ছে, ভাবতে ভাবতেই মেজাজটা বিগড়ে যাচ্ছিল। প্রায় গায়ে গায়েই বসেছিলাম, কনুইটা ও বুকের কাছেই ঠেকেছিল, অথচ কোন আকর্ষণ বোধ করছি না, এটা বোঝার জন্যে, একটু সরিয়ে রাখবার চেষ্টা করছিলাম, আর বাইরের দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম, ঠিক কোন জায়গাতে নামলে আমার সুবিধে হবে। সন্ধ্যা বা রাত্রের আড্ডাগুলো সবই তো কোন না কোন বার-এ জমে, এবং বন্ধুদের কোন দল কোন বার-এ বসে, মোটামুটি একটা ছক করাই আছে। গাড়ি থামিয়েই, সোজা যেটাতে ঢুকে পড়া যাবে, সেরকম একটা জায়গাতে নেমে পড়ার মনস্থ করেছিলাম।

নীতা আবার বলেছিল, অফিসের জীপ কোথায়?

দেরী হবে বলে ছেড়ে দিয়েছি, মিঃ চ্যাটার্জিকে সেই দমদমে নামিয়ে আসতে হবে তো আগে।

এটা কিন্তু অন্যায়, উনি সেকেণ্ড গ্রেড-এর অফিসার, আর তুমি থার্ড গ্রেড-এর বলে, কাছেই তোমাকে আগে না নামিরে, সেই দমদমে আগে যেতে হবে, এর কোন মানে হয় না।

মানে হয় না, নীতা বলছিল। এটা অন্যায়, নীতা বলছিল। কে? না নীতা। কাকে? না আমাকে। সত্যি, মরে যেতে ইচ্ছে করে কথা শুনলে। (মাইরি!) আমি যে তখন একটা ট্যাক্সিসহ নীতার দেখা পেয়ে গিয়েছিলাম, আর তখনই আমার নিচে টনটন করছিল, এবং নীতার গায়ে হাত রাখার ইচ্ছে হওয়া সত্ত্বেও, যেন আমি অন্য বিষয়েই বেশী ব্যস্ত বা ভাবিত ছিলাম; যেটুকু স্পর্শ -মানে ছিল, সেটুকুও নিতান্ত গাড়ির দোলনিতেই, এই অনুমানটাকেই বজায় রাখতে চাইছিলাম; নীতা কোথায় চলেছে এই জানবার কৌতূহল হওয়া সত্ত্বেও, (কোথায় আর, শেষ পর্যন্ত কোন পুরুষের সংসর্গের লোভে) না জিজ্ঞেস করার নিহভাব দেখাচ্ছিল, বা রাস্তায় কেন এত ভিড়, কোনটারই কিছু মনে আছে নাকি। মিঃ চ্যাটার্জি, (একটি বুড়ে ঘড়ি, বক্‌না দেখলেই খ্যাপে, অথচ শরীর অচল।) আমার ওপরেই, সুপিরিয়র, দপ্তরের নিয়মানুসারে, একটা জীপেই যখন দুজন অফিসারকে যাতায়াত করতে হবে, তখন উনি বজবজে থাকলেও, আমাকে আগে তাই নামতে হবে। এই নিয়মটা অফিস থেকে ফেয়ার বেলায়, আসবার সময় অবিশ্যি, মিঃ চ্যাটার্জির ইচ্ছানুসারে, (প্রায় আমার শ্যালকের ইচ্ছানুসারে, খচ্চর!) ড্রাইভার আগে আমাকেই তুলতে যায়, সেখান থেকে দমদম, তারপরে অফিস। যার অর্থ হল, উনি বাড়িতে থাকার সময়টা বেশী পান। এসব হচ্ছে নিয়মকানুনের ব্যাপার। সেকেণ্ড গ্রেডের আর একজন অফিসার, চ্যাটার্জিরই সমবয়সী, প্রায়ই খিস্তি করে বলেন, চাটুজ্যেটা ছুঁড়ি সামলাতে সামলাতেই গেল। একথা অবিশ্যি সবাই জানে, চ্যাটার্জি বাইশ বছর বয়সের প্রথম বিয়ের পর থেকে, প্রতি দশ বছরে একটি করে বউ খেয়েছেন। একটি খেয়েছেন বত্রিশ, এবং বত্রিশেই আবার বিয়ে করেছেন, তারপরে বিয়াল্লিসে আর একটি খেয়ে, এবং বিয়াল্লিসে যাকে গিলেছেন, তখন সেটি নাকি ছিল আঠানো উনিশের। এখন চ্যাটার্জির একান্ন, সেটির বোধহয় সাতাশ আটাশ, (তা বেশ মাখো মাখো-ই হবে বোধহয়। কিন্তু ওদিকে প্রথম পক্ষের বড় ছেলেটিকে নাকি সামলানো দায় হয়ে উঠেছে, সে কোথায় একটা চাকরী-বাকরী করে, তবে ব্যাটা অফিস পালিয়ে নাকি বাড়ি যায়, এমনি সব অফিসার্স চেম্বারের গুলতোনি। কেরাণীদের টেবিলেই কি আর বাদ যায়? অফিসের জেনারেল ইউরিনালের ছবি এবং চ্যাটার্জি সম্পর্কে মন্তব্য লেখা দেখলেই তো বোঝা যায়। আচ্ছা অফিসারদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আর এইসব আঁকাজোকা লেখার যোগাযোগটা কীরকম, আমি ঠিক বুঝতে পারি না। অধস্তনদের অসহায় বিক্ষোভ এইরকম বলতে হবে নাকি? অবিশ্যি আমি যদি অধস্তন হতাম তা হলে চ্যাটার্জির সম্পর্কে এই কীর্তি গুলে নিজেই নির্ঘাত করতাম। এখনো ইচ্ছে করে, কিন্তু ওই যে থার্ড গ্রেড! আমি জেনারেল ইউরিলালের লোক নয়, যদিচ আমি অবসর বুঝে ওগুলো দেখে বেশ তারিয়ে তারিয়ে মজা ভোগ করি। অবিশ্যি আমার নামেও আছে, যেমন, লোচ্চা বা নামের পরে শালা ঘণ্টাকুমার। কুমার বলার মধ্যে আমার চেহারা পোষাক ইত্যাদির ওপরে কটাক্ষ করে আজকালকার সিনেমার হেরোদের সঙ্গে মিলিয়ে বিদ্রূপ করতে চেয়েছ কি না জানি না, কিংবা ঘণ্টা, একমাত্র নেহাত খিস্তির অর্থেই ঘণ্টাকুমার, তা আমি বুঝতে পারি না। আর একটা জিনিস আমাকে করতে চেয়েছে, যাতে আমাকেই সমকামিতার শিকার করতে চেয়েছে, ব্যাপারটা আমাকে কল্পনায় অনুভব করার চেষ্টা করতে হয়েছে এবং তারপর না হেসে উঠে পারিনি? যে লিখেছে, সে একটা চলতি গালাগাল হিসেবেই নিশ্চয় লিখেছে, কারণ আমার ধারণা সেই বয়সটা পেরিয়ে এসেছি, সে বয়সে সত্যি সত্যি আমাকে আমার এক কলেজের লেকচারার দাদারই শিকার হতে হয়েছিল। তা ছাড়া পুরুষদের এরকম জুটি তো আখচারই দেখা যায়, এলিটস্‌দের মধ্যেও নাকি অনেকের এই বাতিক আছে, যাদের অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়, বোধহয় স্বভাবটাই ওইরকম কিংবা কে জানে এরাও আবার সবাই দা ভিঞ্চির মত প্রতিভা হয়ে ওঠার জন্যে এরকম করে কি না।

—জেনারেল ইউরিনালের দেয়ালে প্রায়ই চুণের পেছড়া দিয়ে এগুলো মুছে দেওয়া হয়, এমনকি স্পাইং করে ধরবারও চেষ্টা হয়েছে, ধরা যায়নি। তবে কথাগুলোর মধ্যে অনেক সত্যি আছে, আমার ধারণা, যতই ভাল্‌গার লাগুক, কারন অধস্তনদের রক আমার অচেনা নয়। আমি এই রক থেকেই চা সিগারেট আর সস্তা কফি হাউস পেরিয়ে, অন্য রকে এসেছি, বার-হোটেল ক্যাবারে-এর রকে, শুড়িখানা তার নাচঘর যাকে বলে আর কি। আমি পেরিয়ে এসেছি, ওরা পারেনি, কারণ এ ব্যাপারে আমি ওদের চেয়ে ঘুঘু, কী করে আসতে হয়, সে সব পথঘাট আমার বাবাই আমাকে চিনিয়ে দিয়েছে, (পুত্রের উন্নতিকল্পে বাবা হয়ে একটু যদি অন্যায়-টন্যায় করতে হয়, কী করা যাবে, সেটাকে পাপ মনে করলে চলবে না। হ, নিজেরই পোলা ত!) বাবার মারফতই লোক-চেনাচিনি এবং কাকে কোথায় ধরতে হবে, সে সব সুলুক সন্ধান পেয়েছি। ওরা পারেনি, ওদের বাবারাও পারেনি, আর সেইজনেই (অফিসারের অন্যান্য আচরণ ছাড়াও আমার জুতোর শক্ত গোড়ালির ঠক ঠক শব্দ উঠলেই, বুঝতে পারি, প্রথম যে কথাটা উচ্চারিত হয়, লোচ্চাটা এল। (ভাবলেই কী রকম একটা বেশ মেজাজ এসে যায়।) তবু দেওয়ালের কথাগুলোর মধ্যে সত্যতা আছে এবং চ্যাটার্জির বিষয়ে ও তার তৃতীয় পক্ষের ও ছেলের বিষয়ে যা লেখা হয়, তার মধ্যেও সত্য আছে! সেই লোক যদি আমাকে আগে ভবানীপুরে নামিয়ে দমদম যান, তাহলে তার দম কোতল হয়ে যাবেই। অফিসের কাজের মধ্যে যার সব সময় দুশ্চিন্তা, এবং কল্পনার মানসপটে নিজের বাড়ীর যে ছবিটা তিনি দেখতে পান, (স্ত্রী এবং অফিস-পালানো ছেলে) ছুটির পরে তিনি যে বাঘের মত ছুটে যাবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক, যদিচ জানা কথা, তখন নিশ্চয় বাড়ির চেহারা আলাদা! আমি এতবার গিয়েছি চাটজির বাড়িতে, কারণ বর্তৃপক্ষের নিয়মানুযায়ী একই জীপ আমাদের দুজনে জিম্মায়, এবং এতবার ভেবেছি তৃতীয় পক্ষটিকে দেখবার, কিন্তু কখনো দেখা পাওয়া যায়নি। মিঃ চ্যাটার্জির মুখে তো কখনোই তার স্ত্রীর কথা শুনিনি। অতএব, মানে সব কিছুরই কোথাও আছে, পৃথিবীর সব মানুষই তা জানে, তবে তখন নীতা যেভাবে বলছিল, এর কোন মানে হয় না, সেটা অনেকটা আমাদের অধিকাংশ কথার মতই অবিশ্বাস্য, যার সঙ্গে ভেতরের কোন মিলই নেই। নীতা যেভাবে বলছিল, সেটাও, যেন আমার বান্ধবী, তার এভাবেই বলা উচিত এরকম একটা অভ্যস্ত মন থেকেই বলেছিল। অনেকটা খুসমেজাজের সোহাগী সুরে বলা, কারণ আমার প্রতি অবিচারের ওর কোন মাথাব্যথা ছিল না।

অবিশ্যি ছুটির পরে অধিকাংশ দিনই আমি চ্যাটার্জির সঙ্গী হই না, কারণ দমদম বা ভবানীপুর তখনও আমার গন্তব্য থাকে না; আজ তো আরোই ছিল না, কারণ জীপ নিয়ে ফিরে রুবি দত্তর ওখানে যাব, সেটা সম্ভব ছিল না, এবং আমি যে রুবি দত্তর ওখানে যাব ভেবেছিলাম, সে-কথাও নীতাকে বলিনি। তখন সমূহ একটা টনটনানি দমানো আর একই সঙ্গে নীতার চিন্তাই আমার মাখায় ঘুলোচ্ছিল, ও কোথায় যাবে, কোন তল্লাটে, কার কাছে, কোথা থেকে এল, এবং কাছাকাছি ছোটখাটো ছোঁয়াছুয়ি, অথচ আমার গন্তব্য লক্ষ্য রাখতে হচ্ছিল, কোথায় নেমে যাব, যে কারণে সেই দেখা হওয়াটা মহাপাপ বলে বোধ হচ্ছিল, বিতৃষ্ণায় মনটা ভরে উঠছিল, আর তবু নীতাকে টের পেতে দিতে চাইছিলাম না যে ওর কথাই ভাবছি। ফোন আশা হয়তো ছিল না, না হয় তা কোন মেয়ের সন্ধানেই যাব, যদি খুব ইচ্ছে করে। নীতার জন্যে অত রূপোট এখন সইবে না।

কিন্তু দোহাই, গাড়িটা যেন বেশী ঝাঁকানি না খায়, খেলেই টনটনানিটা বেড়ে উঠছিল মনে হচ্ছিল, একটা বিশ্রী কাণ্ডই ঘটে যাবে। এমনিতেই একটু কিডনির ট্রাবল আছে, তার ওপরে মিউকাসের দৌরাত্ম্য বারো মাস, আর ঐ দৌরাত্মাটা এমন জঘন্য একটু বাড়াবাড়ি হলে, এমনিতেই মনে হয়, সব সময়ে যেন ব্লাডারের টনটনানি লেগেই আছে, অথচ পরিষ্কার হতে চায় না। তার ওপরে যদি বেশীক্ষণ চাপতে হয়, সেটা আরো দুর্বিসহ।

একটা বার-এর সামনেই, আমি বলে উঠেছিলাম, তোমার লিফটের জন্যে ধন্যবাদ, আমাকে এখানেই নামিয়ে দাও। নীতা বলেছিল, কেন, আর পারছ না?

বলে ও হেসেছিল। এ রকম ব্যাপারে সবাই হেসে থাকে, নীতা হেসেছিল, অন্যের ব্যাপার হলে আমিও হাসতাম। ও ধনের যে কোন প্রাকৃতিক ব্যাপারে মানুষকে অস্থির হতে দেখলে, সত্যি কেন যেন হাসি সামলানো দায় হয়ে ওঠে, অথচ সমস্ত ব্যাপারটা যে অত্যন্ত মর্মন্তুদ, সেটা যাকে দেখে হাসি পায়, তখন সে-ই একমাত্র অনুভব করতে পারে। এই হাসির অবিচারে, দাঁতে দাঁত পিষলেও আশ্চর্য এই, তখন রেগে কিছু বলা যায় না। বলেছিলাম, না, সত্যি। তা ছাড়া আমাকে তো নামতেই হবে।

এখানে নামবে তো আড্ডা দিতে।

হ্যাঁ। তবে বলা যায় না একটা কাজও রয়েছে, করে উতে পারব কি না জানি না।

ভবী ভাবার নয়। কথাটা আমি নিজেকেই মনে মনে বলেছিলাম। আসলে নীতার কাছে প্রমাণ করতে চাইছিলাম, (নীতা কি আর একটু চেপে বলেছিল নাকি আমার গায়ের কাছে, স্পর্শটা যে, আমার পাতলা সার্জের স্বাধীন ইচ্ছার ওপরে জেগে ওঠে, কে বলতে পারে। আমিও হতে পারতাম, অসম্ভব নয়. আমার পক্ষেও এরকম হওয়াটা বিচিত্র ছিল না। রাত্রি দশটার পর হঠাৎ যে কী স্থির করে বসতাম, তা আমি সন্ধ্যায় কিছুই জানতাম না।

নীতার সঙ্গে দেখা না হয়ে, গেলে, এড়ে-লাগা খোকনের মাই খাবার ঝোঁকের মত যে কাকে টেলিফোনে ডাকতাম বা কার দরজায় গিয়ে হাজির হতাম, কিছুই জানতাম না, হতে নীতাকেও রিঙ করতাম, হ্যালো, আছ নাকি? কী করছ, গেলে একটু কফি খাওয়াবে? (কফি খেতে চাও বটে!) জনাব যাই আসুক, এরকম ক্ষেত্রে জবাব অবিশ্যি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শরীর খারাপ বা শুয়ে পড়েছি, প্লীজ রাগ করো না হবারই সম্ভাবনা, তার ওপরে, এত রাজে আর বাইরে থেকো না, বাড়ি চলে যাও লক্ষ্মীটি, (মনে হয় গদান করে একটা লাথি বসাই পেছনে।) এমনি সব উৎকণ্ঠিত ভালাবাসার কথাও শুনতে পাওয়া আশ্চর্য নয়, কারণ যদি সতি। হকচকিয়ে গিয়ে উঠতাম, তা হলে হয়তো দেখা যেত, এ্যাঞ্জেল লাকসারির ম্যানেজার কান ডাইরেক্টর নীরেশ দাশ, (নমশুদ্দুর, বলে কায়স্থ, একটি শুয়োরের বাচ্চা, কারণ, মধ্যযুগীর মিথ্যে কথা বলে।) এদের টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে, নীতার দাঁত দেখানো হাসির ছবিটার প্রশংসা করতে গিয়ে, একটুস একটুস অন্য রকমের কথা বলছে, আর জোয়ান কালো ঘোড়র মত (অনেক টাকার মালিক বটে।) নীরেশের দিকে তাকিয়ে নীতা মিঠে মিঠে হাসছে। কিংবা কাশী ব্যানার্জি–গায়ক, দলজিৎ–সেই পাঞ্জাবী ছোকরা, এমন কী হীরেন—মহত্ত্বসন্ধানী শিল্পী কোন গুণীকে যে সেই সুন্দরী যুবতী সমঝদারের অ্যাপার্টমেন্টে দেখতে পেতনা, কে জানে।

মোটের ওপর, আমরা কেউ-ই কিছু জানি না, কখন কী ধরল, কোন্‌টা ধরব, এবং ছাড়ব, কেবল নিজের কাজ মিটিয়ে, অর্থাৎ নিজে যেটা আসলে চাই, সেটা মিটবে জানলে, সেটাই ধরব। তবে, কেন জানি না, একটা বদরোগই বলতে হবে বোধহয়, কিংবা সেকস্‌ অ্যাটাচমেণ্ট!) মেয়েমানুষের ব্যাপারে, নীতার দরজা খোলা থাকলে, তখন আর অন্য কোন মেয়ের কাছে আমার বড় একটা যেতে ইচ্ছে করে না। অবিশ্যি কোনদিনই যে যাইনি, তা বলা যাবে না, যেমন অনেক টাকা ঘুষ পাব সেই দিন সেই সময়ে, (হ্যাঁ, আমার চাকরিটাতে ঘুষের মালকড়ি কিছু আছে, নইলে আর থার্ড গ্ৰেড অফিসারের এত ফুটানি কিসের!) বা নতুন টোপ-ফেলা মেয়ে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, কিংবা অফিসের বড়কর্তা (হাঙরের মত নির্দয় অ লোভী শয়তান।) কোন কাজ চাপিয়ে দিলে, মাঝে মধ্যে যেটা দিয়ে থাকে, সেরকম ক্ষেত্র, যোগাযোগ কয়েকবার নষ্ট হয়েছে। অন্যথায়, নীতার খোলা দরজা ফেলে আমি বড় একটা যাই না, যার কারণটা ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারি না। জানি না, প্রেমে পড়ার প্রথম হৃদাবেগ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো যেহেতু ওকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল বলেই কি না, এবং মোহভঙ্গের, একেবারে চিরদিনের জন্যই মোহভঙ্গজনিত, যন্ত্রণকোতর হতাশা দিনগুলো কেটেছিল বলে, এখন আমি হতাশ প্রেমিকের মত, ব্যথায় কথা যায় ডুবে যায়-এর মত একেবারে ভাঙ্গা হৃদয় অকর্মণ্য এক ধরনের নির্জীব ঘেয়ো কুকুরের মত যাদের মনে হয় আমার।) হয়ে পড়েছিলাম।

যাই হোক, ট্যাক্সিটা যখন নীতার অ্যাপার্টমেন্ট-এর, অর্থাৎ এই বড় বাড়িটা, যার মধ্যে নীতার এই কোটর (অ্যাপার্টমেন্ট) রয়েছে, তার লন-এ এসে ঢুকল, তখন আবার আমার টনটনানিটা বেড়ে উঠেছিল। সম্ভবত এই কারণে যে, আমি তখন মোটামুটি নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিলাম, নীতার ঘরেই আমি যাচ্ছি। দোতালায় উঠে, কেবল নীতার ল্যাচ্‌ কী খোলবার যা একটু সময় লেগেছিল, আমি ঠেলে ঢুকে পড়েছিলাম, এবং মেজাকের মেঝেতে অসাবধানে জুতো পেছলাতে পেছলাতে, অন্ধকারেই বাথরুমে চেনা দরজাটার ওপরে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। বাথরুমের সুইচটা আমার জানা ছিল, সেটা যদি বা টিপে দিতে ভুলিনি, তবু বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করার কোন তাগিদই অনুভব করিনি। নীতা শোবার ঘরের আলো জ্বেলে বাথরুমের দরজার কাছে এসে বলেছিল, অসভ্য, দরজা বন্ধ করা যায় না। তখন যে আমার শরীর জুড়ে কী ব্যাপারটা ঘটছিল, তা নীতাকে বোঝানো সম্ভব ছিল না। না, খুব যে একটা স্বস্তির ব্যাপার, তা কিন্তু ঠিক নয়। বরং ক্রনিক অ্যানিব্যাসিস-এর প্রকোপে, আমাকে দরজা বা করে একেবারে নগ্ন হতে হবে কি না, শরীরের অভ্যন্তরে আসলে তখন সেই লড়াইটাই চলছিল। কারণ, আমি চাইছিলাম, তা যেন আমাকে করতে না হয়। তার জন্যে দাঁতে দাঁতে পিষে, দেহাই মাইরি ইত্যাদি সব মনে মনে বলেছিলাম, এবং প্রায় গোঙানোর মত স্বরে নীতাকে বলেছিলাম, থাক না ক্ষতি কী।

না।

নীতা ধমক দিয়ে বলে হাওয়া ঠাসা সরিয়ে দরজাটা জোরে টেনে দিয়েছিল। যেন ওটা অসভ্যতা, সেই রকম একটা ভাব নিয়ে ও দরজাটা টেনে দিনেছিল, আসলে দুগন্ধ ইত্যাদির জন্যে ওর হয়তো ঘেন্নাই হচ্ছিল, যদিও বাথরুম এবং সারা অ্যাপার্টমেন্ট জুড়েই যথেষ্ট সুগন্ধ ছিল। আমি শেষ পর্যন্ত লড়াইতে জিতে ফ্ল্যাশ টেনে বাইরে এসেছিলাম। নীতা তখন পাশের ঘরে, (কেন, আমাকে লজ্জা? মরে যাই।) হয়তো একটু ইজি হওয়ার জন্যেই চুলের আটন, বা বুকের কষণ একটু ঢিলেঢালা করছিল, আমিও কোটটা খুলে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম সোফার ওপর। টাইটার ফাঁস টেনে বড় করে তুলে নিয়েছিলাম মাথার ওপর দিয়ে, কোটের ওপর ফেলে দিয়ে, পাশের ঘরে গিয়েছিলাম নীতার কাছে, যেখানে ও ছোট আয়নাটার সমানে দাঁড়িয়েছিলে, আমি নিচু হয়ে, শব্দ করে ওর গালে একটা চুমো খেয়েছিলাম এবং ও আমার খুশির কারনটা বুঝতে পেরে, ভুরু টেনে বলেছিল, কী কাজ আছে যেন বলছিলে?

 

‘এই কাজ’ বলে টেনে ধরে ঠোঁট চুষে দিয়েছিলাম এবং নীতা উম্‌ শব্দে আপত্তি করে, আঁচল দিয়ে আলতো করে চেপে চেপে ঠোঁট মুছেছিল, কারণ তখলো লিপসিটকে রংটা একেবারে মুছে ফেলতে চায়নি যে, জোরে ঘষে দেবে, আর আমার দিকে ফিরে বলেছিল, ফাজিল, কেন, যাও কোথাও বসে এসে গেলো গে।

কোট থাকা সত্ত্বেও স্পষ্ট ও নিবিড় যোধ হচ্ছিল। আমি নিজেকে নিয়েই, অর্থাৎ নিজের নানান ব্যাপারে চিন্তিত বস্তু, যে চিন্তা-ভাবনার তল্লাটে নীতা-টীতা কেউ নেই? অথচ সত্যি বলতে কি, এখন একমাত্র নীতাই আমার মগজে, এমন কি মগজ জুড়ে নীতা এতটাই ফাঁপিয়ে ফুলিয়ে বসেছিল সে, ঠনটনানির তীব্র অনুভূতিটা পর্যন্ত অনকখানি দমে যাচ্ছিল। শরীরটার কাণ্ডকারখানা সব বোঝা দায়। এই মনে হচ্ছিল, অসম্ভব, যে কোন উপায়ে একটা রিলিজের দরকার, আবার পরমুহূর্তেই নীতা, শরীরের প্রত্যেকটি অংশেই কেবল নীতা।

নীতা বলেছিল, কী কাজ?

নেকী। কথাটা আমি মনে মনে না বলে পারিনি, কারণ ওর গলার একটা অবিশ্বাসের, শুধু অবিশ্বাসের নয়, অবিশ্বাস আর মজা করার সুর ছিল যেন। যে কারণে গাড়িটা দাঁড় করাবার কোন কথাই ও বলেনি, ড্রাইভারটা যেন গন্তব্য জেনেই, পিঁপড়ের মত ছুটেছিল। পিঁপড়ের মতই, কারণ সন্ধ্যাবেলায় ভিড়ে কোন গাড়িই জোরে ছুটতে পারে না, প্রতি পদে পদে বাধা, তাতে তোমার টাকা। গাবার সময় বা প্রেমিকার দেখা পাবার সময় উতরে গেলেও উপায় নেই। এই পুলিশের হাত, এই লাল আলো, যাবতীয় বাধা তোমাকে আটকে রাখবেই। কুৎসিত! আমি নীতার দিকে ফিরে তাকিয়েছিলাম, মুখটা দেখবার জন্যে, কী ছিল ওর মুখে, হাসি না বিদ্রূপ! আমাকে এত বেশী চেনে ও, যেন আমি ওর একটা কুকুর, যেমন প্রভু তার কুকুরের চোখের দৃষ্টি, কান নাড়া ল্যাজ নাড়া, সবগুলোরই সব মানে বুঝতে পারে। হাতের পাঁচ যেমন বলে, আঁচলে বাধা বললে যেরকম বোঝায়, কিংবা এও ঠিক হল না, ও যদি কোমর বেঁকিয়ে, পা দেখিয়ে বলে, ও আমার এখানকার লোক তা হলেই বোধহয় ঠিক বলা হয়। আর সেই জন্যেই রাগ আর ঘৃণায়, ইচ্ছা করছিল, ওর চুলের মুঠি ধরে টেনে দিই। মনে মনে বলেছিলাম, ছেনালী হচ্ছে। কিন্তু গম্ভীর মুখেই বলেছিলাম, সেটা জেনে তোমার বিশেষ ভাল হবে। তুমি কোথায় চলেছ?

আমি পালটা তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিয়েছিল, আমার ঘরে।

প্রায় এটা থাপ্পরের মতই কথাটা বলেছিল ও, যে কারণে আমি মনে মনে আবার বলেছিলাম, হারামজাদী। এবং সেই হারামজাদী বলার মধ্যে রাগ বা ঘৃণা ততটা ছিল না, যতটা প্রশংসাসূচক আদুরে ভাব ছিল, অনেকটা আমার। নিজেকেই আদর করে ঘিস্তি করার মত। ওর কন্যার থেকে আলো বেশী করে প্রমাণ হয়েছিল, আমাকে, ঐ পুরুষটাকে ও আপাদমস্তক টেনে, অর্থাৎ আমার জিজ্ঞাসাটাই শুধু নয়, কী শুনলে আমার মুখের মত (জুতো) হবে, সেটাও ও জানত। কারণ ও নিশ্চয়ই আমার মনের ব্যথা বুঝতে পেরেছিল, ওঁর সম্পর্কে আমি কী ভাবছি, কোন অভিসার বা কোথাও কোন রমজানি করতে চলেছে ও, আমার এই মনোভাবট ও পরিষ্কার বুঝতে পারছিল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ আমার মনে আবার ঈর্ষা ও রাগ ফুঁসে উঠেছিল এই ভেবে যে, এত তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার মানেই, সেখানে অন্য কেউ কেউ আসবে, জমবে, র‍্যালা হবে। নিজের ঘরে গিয়ে ও একলা থাকবার পাত্রী নয় নিশ্চয়। তাই ঘুরিয়ে বলেছিলাম, কেন, কে আসছে?

কেউ না।

সে কি, কেউ না অথচ এত তাড়াতাড়ি?

কেন, আমি কি আমার ঘরে একল। সন্ধ্যাবেলা থাকি না?

হ্যাঁ, তোমার তো আবার একলারই গেরস্থালি। তবে সন্ধ্যাবেলা, ঘরের। মধ্যে, নীতা রায়…।

একলা কোথায়, এই তো তোমাকে পেয়ে গেলাম।

আর একটা থাপ্পর কষিয়েছিল। হারামজাদী। (এই সেই একই প্রশংসাসূচক আদুরে ভাবে। তারপরে মনে মনে শব্দ করেছিলাম, হুম! এবং ওর দিকে ফিরে তাকিয়েছিলাম আবার, ও তাকিয়েছিল আমার দিকে। হয়, ঠোঁটের কোণ টেপা, আর সেই হাসি, যা বুঝেও ঠিক বোঝা যায় না এবং চকচকে চোখের ছাউনিও সেই রকম, যা দেখলে মনে হয়, ও-ও আমার মুখে খুঁজে দেখছে, কথাটা আমি কী ভাবে নিচ্ছি। যাতে দরকার হলে, ওর ইচ্ছেমত এক কথায় আমাকে নাকচ করতে পারে। সাধারণত এর সঙ্গে তো আমার সম্পর্কটা আবার প্রেমের, (পীরিতের করাত প্রাণ কাটে চিরে চিরে, মালিনী এমন করাত কোথায় পেলি।) তাই সময় সুযোগ বুঝে ও আমাকে টেলিফোনে বা অন্যভাবে খবর দেয়, কী হল, সত্যি ভুলে গেলে নাকি? কতদিন দেখা দাওনি বল তো আজ কিন্তু আসতেই হবে। তার মানে, ওর ইচ্ছানুযায়ী সেই দিনটা আমার। কিংবা এর স্বাধীন ইচ্ছার সঙ্গী আমি। তখন আমি বলি, তুমি তো জাল, ভুলি না। কী করব, তোমার তো আবার এ সে নানানরকম, (কসবী। মনে মনে বলি।)  তা থাকুক গে, তুমি আজ ঢলে এস, একটুও ভাল লাগছে না। (আঃ প্রাণে আর সসয়া সসখী) কিন্তু তুমি তো জান, আমি কী রকম হিংসুটে, কেউ থাকলে আমি সইতে পারি না, তোমাকে এবা না পেলে আমার ভাল লাগে না, তাই হবে গো, তাই হবে। (ইয়া।) এই রকম প্রেমের সম্পর্ক যেখানে, সেখানে একলা ঘরে ফিরে যাবার সঙ্গে আমাকে পেয়ে যাবার কথাটা যখন বলে ফেলতে পেরেছ, তখন নাকচ নাও করতে পায়ে।

তবু আমাকে বলতে হয়েছিল, আর টেনে নিয়ে যেও না, আমাকে নামিয়ে দাও তাড়াতাড়ি।

ও বলেছিল, আর একটু তো আমার ডের তো এসে গেলাম।

কিন্তু তোমার সোস্যাল কন্টাক্ট, লোকজন আমার ভাল লাগবে না।

লোকজন থাকলে তোমাকে যেতে বলতে পারি?

কারণ একটি মেয়ে, দশজনের সামনে তার প্রেমিককে কখনো যেতে বলতে পারে! আমি যে ওরা প্রেমিক-প্রেমিকপ্রবর। রাস্তার যখন পেয়েই গেল, তখন (এ সময়ে মনে হয়, সেই কল্পিত যন্ত্রটা পেলে মন্দ হত না, যেটা দিয়ে মনের খবর সব জানা যায়।) ঘরে গিয়ে টালিফোন করে এমন কাউকে আর ভাকতে হবে না, যাকে নিয়ে হয়তো সন্ধ্যা, রাত্রিটা কাটাবার একটা পরিকল্পনা করেছিল। কিংবা বিল। গব্রিকল্পনাতেই, হঠাৎ মাকে মনে আসত, সে যে কখন তার মানে, ও বলতে চাইছিল, আমি তো কোন বার-এ বসে তথন বন্ধুদের সঙ্গে মদ গিলতাম, এবং ট্যাক্সিতেই কেন, ওর হাতেপায়ে ধরে বলেন, তোমার সঙ্গে যা বা সেই জাতীয় কিছু, যাতে ওর মেয়ে-মন (সব মেয়েমানুষের মতই।) খুশি হতে পারত, ও সদর হয়ে আমাকে নিয়ে আসত, (যদিও তাই এনেছিল।) অরি একে পেয়ে তখন চুমো খেয়ে যে খুশিতে উপছে পড়ছিলাম, এই সব মিলিয়ে ওর স্বভাবজাত খোঁচা দিচ্ছিল, যার মানে, যা-কিছুই দেবে, তার সবটার মধ্যেই এই কথাটা ভুলতে দিতে নারাজ যে, দেখ তোমাকে দিচ্ছি।

কিন্তু ওসব কথার জবাব দেওয়া খুব জরুরী মনে করছিলাম না আমি, বরং জিজ্ঞেস করেছিলাম, বের কর না, কী আছে?

ও বলেছিল, কিছু নেই।

আমি বলেছিলাম, শরীরটরীর খারাপ হলে তো, একটু আধটু চলে। (একটু-আধটু? ইচ্ছে হলে পঞ্চাশ লিটার।

আজ শরীন খারাপ করেনি।

বলে ও ঠোঁট টিপে হেসেছিল, যার অর্থ দাঁড়ায়, ইচ্ছে হলে সেরকম শরীর খারাপ করতে পারে। যদিও এসব কোন কথাই সত্যি নয়, কারণ ড্রিংক করতে ও অনভ্যস্ত না, অথচ হাফগেরস্থ চালের কথাগুলো ঔ কেন বলে বুঝি না, কারণ ঠিক হাফগেরস্থ বলতে যা বোঝায়, সংসারে থাকে, ঠিক সময় বেঁধে দিনের একটা সময়ে বেশ্যাবৃত্তি করতে চায় বাইরে, আবার এসে বাপ-ভাইয়ের, মা-বোনের বা বিবাহিতা হলে স্বামী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজেকর্মে সংসারে দিনযাপন করে, অর্থাৎ গেরস্থ ঘরের মেয়ে বা বউ, অথচ গেরস্থালির। ৩ জন্যেই দেহ বিক্রী করে, অতএব সে হাফগেরস্থ, (অর্ধেক বেশ্যা, তাই না? এর চেয়ে সহজ ও চিন্তাশীল বিশ্লেষণ আর কী হতে পারে!) নীতাকে তা বলতে পারি না, যাদের মদ খেতে কোন বাধা নেই, খেতেও ভালই বাসে, অথচ সোজাসুজি সেটা কবুল করতে গররাজি, নীতাকে ঠিক সে রকমও বলা যাবে না, তবে দেখা যায় ড্রিংকের কথা হলেই, না, না থাক, এরকম কিছু না বলে পারে না, এবং খেলে আজ শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে, একটু খাওয়া যাক, এমনি একটা অছিলা করবে। কিংবা মেয়ে বলেই হয়তো মদ খাওয়াটা সহজে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে একটা সহজাত বাধা থাকে, এই সমাজে মেয়েদের মূল আকর্ষণটাই নষ্ট করে দিতে পারে। ভয়ের এই সহজাত বাধার কথা বলছি।

বলেছিলাম, একটু খারাপ কর না শরীরটা।

নীতা তখন শোবার ঘরের দিকে চলছিল, আমিও ওর পাশে পাশে, গারে সঙ্গে গা ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে শোবার ঘরে এসেছিলাম। ও ড্রেসিং-টেবিলটার কাছে দাঁড়িয়ে মুখটা একবার দেখে নিতে নিতে বলেছিল, ওসব না হলে চলে না, না? তাহলে বার-এ গেলেই পারতে।

আমি যে যেতে পারি না, কুকুরটা যে যেতে পারে না, এই জেনেই মনিবের অত ধমক-ধামক শাসন, এবং বুলিট সহজে ও ছাড়বে না জানতাম, তাই বলেছিলাম, না হলেও চলবে, পেটে তো কিছু আছে, তবে আর একটু জমত।

না, জমানো-টমানো কিছু হবে না

বলে, আমার দিকে একবার চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে (শত হলেও প্রেমিক তে তাকে মদ খাওয়ানোটা একটা নৈতিক অন্যায় নয়?) শোবার ঘরেই পাশে একটা ছোট পার্টিশনের মধ্যে, রেফ্রিজারেটর থেকে আধ্য জিন-এর বোতল বের করে নিয়ে এসেছিল। জিন। মদ ধরবার সময় সেই যে ভেটেরেনস্‌দের মুখ থেকে শুনেছিলাম, মদ নয়, ঘোড়ার মুত বা মেয়েদের ড্রিংকস, (একখানি পাঁট খেয়ে তারপর যা বলবার বলো যাদু, ঘোড়ার মুত না মেয়েদের ড্রিংকস,) সেই থেকে বেশ ভাল নেশা হওয়া সত্ত্বেও, জিন দেখলেই ঠোঁট ওলটাবার অভ্যাসটা যায়নি। যেন সব মাঠে মারা গেল আর কি। জানতাম, কেউ হয়তো, নীতার বন্ধু বা বান্ধবীরা, নিয়ে এসেছিল, এবং আমি এখানেই সঠিক আসছি কি না বুঝতে পারলে, নিশ্চয়ই পথে আসতে একটা হুইস্কি কিনে নিয়ে আসতাম, তবু বলেছিলাম, নিজের জন্যে এনেছিলে বুঝি?

হ্যাঁ, আমি খেয়ে উলটে যাচ্ছি।

বলবেই, ও কথাটা বলবেই জানতাম, এবং ও বিষয়ে আর কিছু বলে, কিন্তু মিথ্যে কথা শোনার থেকে, বোতলটা আমি ওর হাত থেকে নিয়েছিলাম। ও গিয়ে আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, আমি কাঠের পার্টিশনে ঢুকে নিজেই দুটো গেলাস আর লাইম-এর বোতলটা বের করে নিয়ে এসেছিলাম। ও আয়নায় সবই দেখছিল, এবং চুলগুলো খুলে দিয়ে, মোটা চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে নিচ্ছিল। আমি জিন আর লাইম ঢেলে, ওর গেলাসে জল ঢেলে দিয়েছিলাম, আমারটায় ঢালিনি, কারণ এই শীত শীত সন্ধ্যা রাত্রে খানিকটা ঠাণ্ডা জলে স্বাদ গ্রহণের ইচ্ছে আমার ছিল না। লাইম একটু মিশিয়েছিলাম নিতান্ত মুখরোচক করবার জন্যে, তাও ভাল লাগে না, বিটার থাকলে তাই মেশাতাম। অন্যথায় অভাবে, জিন, আমার নীট্‌ খেতেই ভাল লাগে। অনেকটা ছেলেবেলায় হোমিওপ্যাথিক লিকুইভ ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেয়।

গেলাস দুটো নিয়ে নীতার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, চিরুনী চালানো থামিয়ে ও ফিরে তাকিয়েছিল, বলেছিল, আমার জন্যে ঢাললে কেন?

একটুখানি, আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ার অনারে।

আমার গলার স্বর বেশ, গদগদ শোনাচ্ছিল, আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। নীতাও তাকিয়েছিল, যেন (আমার ধারণা) ভাবতে চেষ্টা করছিল, আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে হঠাৎ দেখা না হয়ে গেলে, কার সঙ্গে হত, বা ও কী করত, কোথায় থাকত। তারপরে, ও যেন মুগ্ধ হয়ে উঠেছিল, আমার দিকে তাকিয়ে, আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে, আমার সঙ্গে যখন থাকে, সেই সব দিন ও সময়গুলোর কথা বোধহয় ওর মনে পড়ছিল, এবং আমাকে এই সন্ধ্যার পেয়ে যাওার মধ্যে যদি বা কোরকম অসন্তুষ্টি অনিচ্ছা দ্বিধা ছিল, সেগুলো সম্ভবত কেটে যাচ্ছিল, আর তারপরেই সমূহ আবেগবশত তাই বোধহয় বলেছিল, সত্যি, তোমাকে যে এ সময়ে ওরকম জায়গায়। দেখতে পাব, ভাবতেই পারিনি। একবার ভেবেছিলাম, ডাকব না।

কেন?

জানি তো, এলেই খালি এসব খেতে চাইবে, আর—

বাকীটা ও উচ্চারণ করেনি, যা উচ্চারণ না করেই, একটু ভুরু কুঁচকে, ঠোঁটের কোণ টিপে, অথচ ঠোঁটে চোখে, একটা, যাকে বলে স্পষ্ট ইশারার হাসি ফুটে উঠেছিল, সবই পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল, আমি আর কী চাইব বা করব। আমি তখন ওর গায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, এবং দু হাতে গেলাস না থাকলে, সেই মুহূর্তেই নিশ্চিত হাত দিতাম। অবিশ্যি, এ রকম অবস্থায়, না-বলা কাজটা বা চাওয়াটা যে কী, সে তো মেয়েমানুষ মাত্রই ভাল করে সকলের জানা, আর সকলেরই টেকনিক এক, উনিশ আর বিশ। গেলাসটা বাড়িতে দিয়েছিলাম, নাও, ধর।

ও চিরুনীটা রেখে, কাঠের পার্টিশনের আড়ালে চলে গিয়ে ছিল, একটু হাসি ছিল মুখে, যেন বুঝতে পেরেছিল, হাত খালি হলেই আমি কোন দিকে বাড়াব। গেলাস দুটো রেখে, আমিও পার্টিশনের আড়ালে গিয়েছিলাম, দেখেছিলাম, ও হিটারটা জ্বালিয়ে দিয়েছে, রেফ্রিজারেটর থেকে সস্‌পেনে রাখা রান্না মাংস তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করছ?

ও কোন জবাব না দিয়ে, একটা প্লেট আর চামচ টেনে বের করছি, বুঝতে পেরেছিলাম, একটু খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, যাকে বলে মদের সঙ্গে চাটা আমি সেই অবস্থাতেই পেছন থেকে ওকে আলগোছে জড়িয়ে ধরেছিলাম, তখন এ বলেছিল, জানি, অফিস থেকে বেরিয়ে খালি পেটেই এসব চালাচ্ছ।

কেন জানি না, এ ধরনের কথা শুনলে আমি বুঝতে পারি না, এগুলো মেয়েদের সহজাত কথা কি না, হয়তো ওর অন্যান্য বন্ধুদের এমনি করেই বলে থাকে, আমকেও বলে, আজও বলেছিল, তবু, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, এরকম করে বললে বেশ ভালই লাগে। মনে হয়, প্রায় প্রেম-প্রেম ভাবেরই কথা, খালি পেটে ড্রিংক করলে, লিভারের (যে বস্তুটাকে আমি ইতিমধ্যেই অনেকখানি লড়িয়ে শুইয়ে বসে আছি।) ক্ষতি হবে, সে জন্যে ওর দুশ্চিন্তা, এবং আমার লিভারের জন্যে ওর দুশ্চিন্তা–মানে আমার ভালর জন্যে, এই রকম একটা চিন্তা থেকে এই রকম ধারণা জন্মায় ও আমাকে ভালবাসে, কিংবা আসলে হয়তো ও কিছু না ভেবেই বলেছে, একটা চলতি ধারণার বশেই বলেছে, মদ খেলে একটু মাংস-টাংস তার সঙ্গে খাওয়ার দরকার, যেমন চায়ের সঙ্গে লোকে বিস্কুট দিয়ে থাকে বা ওর নিজেরই প্রয়োজনে, ওর পেটও খালি থাকতে পারে; যে ভাবেই হোক, কথাটা বিশেষ করে নীতার মুখ থেকে শোনার জন্যেই, আমার কানে হয়তো অন্যভাবে বাজে, যে কারণে আমার মনটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠতে চায়, গম্ভীর, মানে সীরিয়স, একটা কিছু, (কেন? প্রেম। দেখে বাবা, একেবারে হেঁদিয়ে যেও না।) মানে যাকে বলা যায় ভাবাবেশ।

আমি ওকে একটু বুকের কাছে চেপে ধরে বলেছিলাম, কিন্তু তুমি রাত্রে কী খাবে, তোমার খাবারটা এভাবে—(যেন এ পাড়ার রাত্রে আর খাবার পাওয়া যাবে না, কী দুশ্চিন্তা!)

কথাটা শেষ না করেই আমি চুপ করেছিলাম। নীতা বলেছিল, সে হবে এখন একটা কিছু।

আমি বলেছিলাম, তা হবে না, তা হলে, রাত্রে দুজনেই কোথাও যেতে যাব।

কিন্তু চিত্রাকে কিছুই বলা নেই, ওর ফিরতে তো সেই রাত দশটা, সাড়ে দশটা।

চিত্রা, ঝিয়ের নাম, সেই মেয়েটা, যার নামটা আমি কত কী ভেবেছিলাম। অলকা, আশোক, অনীতা, যে নামটা ও ধার করে জুড়েছে নিশ্চয়, সে নামটা চিত্র, এবং সেটা নিশ্চয়ই ধার করা। বলেছিল, এত রাত হবে?

হ্যাঁ, রোজই তাই আসে, সন্ধ্যাবেলা চলে যান, ওর তো আবার অনেক গণ্ড। সব আছে।

এসে না হয় একটু বাইরে বসে থাকবে।

তা অবিশ্যি অসুবিধে নেই। রত্রি এগারোটার মধ্যে ফিরে আসব আমি।

যার অর্থ হল, চিত্রা প্রায়ই ওরা বাইরে বসে থাকে, আর নীতা অনেক রাত্রে ফেরে। তখন একবার আমি ঘড়ি দেখেছিলাম, পৌনে সাতটার মত। মাংসটা প্লেটে ঢেলে পাটি শনের বাইরে টেবিলের ওপর রেখেছিল নীতা। আমি নিজেই আবার ওর গেলাসটা বাড়িতে দিয়েছিলাম, হাতে নিয়ে চুমুক দিয়েছিল, আমিও দিয়েছিলাম, তারপরে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমম খেয়েছিলাম, এবং প্রতিদানের জন্য ওর ঠোঁটের কাছে ঠোঁট রেখে, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, ও হেসেছিল একটু আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিল, আলতো করে একটু ছুঁইয়ে দিয়েছিল। আমি আরো আশা করেছিলাম, বুকের কাছে টেনে ধরে আবার চেয়েছিলাম, আর ও একটু দাঁত বসিয়ে দিয়ে, চোখ কুঁচকে, যেন শাসাচ্ছে, এমনিভাবে সরে গিয়েছিল। সরে গিয়ে রেডিওগ্রামের রেকর্ড বাজাবার খোপটা খুলে, রেকর্ড বাছতে আরম্ভ করেছিল, যদি তখন গেলাসটা সঙ্গে নিতে ভোলেনি, চুমুক দিতে দিতে রেকর্ড বেছে নিচ্ছিস, আর আমি আমার গেলাস এক ঢোকে শেষ করে, নতুন করে ঢালতে ঢালতে, গুনগুনিয়ে উঠেছিলাম, এ পীস্‌ফুল পোর্ট আন্‌ডেসেজেড্‌ বাই দি স্টর্ম…। কেন ওই গানটা গুনগুন করেছিলাম, জানি না, ঝড়ে অক্ষত এবং শান্ত বন্দর, নাবিক হয়ে যেখানে যাবার ইচ্ছে ছিল গায়কের, এই রকমের গান। ঝড়ে অক্ষত শান্ত বন্দর বলতে কী বোঝায়, আমি অবিশ্যি জানি না, ভার্জিন বোঝায় না নিশ্চয়, যদি সেরকম ভেবেই কিছু গানটা লিখে থাকে, বা এমন যদি কল্পনা করা হয়ে থাকে, যাকে কোন আঘাতেই দমাতে পারেনি কোন আঘাতেই যে ভেঙে পড়েনি, পবিত্রতা হারায়নি (বন্দরে আবার পবিত্রতা, বেশ্যার আবার আঘাতে ভেঙে পড়ার ভয়, যেন কলকাতা বন্দরকে আমরা চিনি না, জনি কীপ অ্যাসাইড ইওর লিরিক, শালুক চিনেছে…।) কারণ, গানটার বক্তব্য প্রায় সেইরকম, একটি শান্ত অক্ষত বন্দরে সে নোঙর করতে চেয়েছে। মহত্ত্বসন্ধানী হীরেনই একমাত্র এর মর্ম উদ্ধার করতে পারে। আমি আসলে সুরের জন্যেই গুনগুনিয়ে উঠে ছিলাম, তালের জন্য, যাতে পায়ের তাল আর কোমরের দোলা লাগে।

তারপরে রেকর্ড বেজে উঠেছিল, প্রথম গান, অ্যান্‌ এণ্ডলেস্‌ কিস। নীতা গেলাস নিয়ে সরে এসেছিল, এবং রেকর্ডের সঙ্গে গলা মিলিয়ে নিজেও গুনগুন করে উঠেছিল, গেলাসটা গালে চেপে, আমার দিকে তাকিয়ে, মন্থর তালে একটু একটু দুলেছিল। নতুন করে ঢালা গেলাসে আমি চুমুক দিয়েছিলাম, নীতার কাছে গিয়ে, ওর গেলাসে ওকে চুমুক দিয়েছিলাম, গেলাসটা ও শেষ করে দিয়েছিল। আবার ঢেলে দিয়েছিলাম, এবং ওকে কুক্ষিগত করে, ওয়াল্‌জ-এর মন্থর তালে নাচতে আরম্ভ করেছিলাম। একটার পর একটা গান বেজে চলছিল, হোয়েন আই ওয়াজ অন দি ওয়ে টু মাই গ্যাল… এ সফট্‌ আণ্ডি লিকুইড জয় ফ্লোড… একটার পর একটা গান বেজে চলছিল, আমি নাচছিলাম, আমি অসবুর হয়ে বারে বারে চুমো খাচ্ছিলাম। এক-একটা রেকর্ড শেষ হচ্ছিল, আর-একটা শুরু হবার কয়েক সেকেণ্ডের ফাঁকে গেলাসে চুমুক দিচ্ছিলাম, দুজনেই। এক পিঠের রেকর্ডগুলো যখন শেষ হয়েছিল, আমি তখন বাকীগুলো উলটে দিয়েছিল, এবং নীতা ঠিক হিসেব করেই রেকর্ড বেছেছিল ও চালিয়েছিল। নতুন সুর ও তাল বেজে উঠছিল নতুন গানে, আমরা টুইস্ট নাচতে আরম্ভ করেছিলাম! নীতার বুক এবং কোমর-দোলানি দেখে, আমার মেজাজ খারাপ (খারাপ মানে, যাকে বলে উল্‌সে ওঠা।) হয়ে উঠছিল, নীতা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরছিল, চোখ এক লাল হয়ে উঠেছিল, সেই লাল চোখ দিয়ে আমাকে যেন কিছু ইশারা করছিল, কিছু একটা, যেটা আসলে টুইস্টের চলতি ঢং-এর মধ্যেই পড়ে, এবং আমার সস্‌ সস্‌ শব্দের সময়ে, পাক খেয়ে খেয়ে, উ-য়া-ই-খ্যাঃ শব্দ (সেটাকে আর বর্ষার রাত্রে একলা কুকুরীর কাম-কুহরর মত মনে হল।) করছিল, আর খিল খিল করে হেসে উঠছিল, যা দেখে, নাছ-টাচ চুলোয় যাক ভেবে, (বোধহয় ডাক শুনে ক্ষ্যাপা কুকুরটা তখন ঝোপঝাড় ডিঙিসে ছুটছিল।) ওকে সাপটে ধরতে ইচ্ছে করছিল। ধরেছিলামও তাই, যেমন গান শেষ হয়েছিল, নাচ থেমেছিল, আমি হাততালি দিলে, ওকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম, ওর শাড়ির আঁচলটা খসে গিয়েছিল, আমি ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম খাটের ওপর, এবং আসন্ন ব্যাপারটা অনুমান করেই তখন বাতি নেভানো বা আয়নার কথা উঠেছিল, আমি বাধা দিয়ে (দর্শনের ঐশিয্যি) ওর গা খালি করে দিয়েছিলাম। তখনই জুতো খোলার কথা উঠেছিল, স্বভাবতই সে সব উৎসাহ তখন তামার ছিল না, বরং উৎসাহবশে যা যা করছিলাম, যা বলছিলাম, তাতে নীতা ক্রমেই আমার বুকের তলায় (যেন বিছের কামড়ের বিষে) টেউয়ের মত দলে, মুচড়ে মুচড়ে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছিল, এবং শুধু মাঝে মাঝে ‘না’ ‘কেন’ (আহা, একেই কি প্রেম বলে না, খাঁটি প্রেমের এই তো সর্বোচ্চ শিখর, বল বাবাজী, নীতা রায় মেপ্র, নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তার।) বা তোমার তো রুবি দত্ত আছে ইত্যাদি বুলি বা শক্ত ছাড়ছিল।

তারপরে প্রেম যখন শেষ হল, তখন খোয়ারির পালা, এবং তখনই টুকরো আর ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে কথাগুলো শুরু হয়েছিল। নীতা তখনো প্রায় আমার বুকের কাছে যদিও আমার সর্বাঙ্গের ভার ছিল না, ওর খালি গায়ের ওপর দিয়ে আমার বাঁ হাতটা এলিয়ে পড়েছিল, বাঁ পা-টা ওর কোমরের ওপর দিয়ে, আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, আর আমার সেই ঘৃণাটা জেগে উছিল, রাগ এবং ঘৃণা, যেটাকে আমি বলতে চেলেছিলাম, একটা ভীষণ আকর্ষণ অথচ সেইরকম অনাসক্তি, প্রায় মামদোবাজীর মতই যেটা মনে হয়, সে কারণে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, নীতাও অলস আধবোঝা চোখে তাকিয়েছিল, জানি না, আমার মত ওরও আমাকে ঘৃণা হচ্ছিল কি না, রাগ হচ্ছিল কি না; তখন এইভাবে কথা শুরু হয়েছিল :

যদি আজ দেখা না হয়ে যেত–

মনে মনে বলেছিলাম, কার কাছে এখন এভাবে থাকতে কে জানে। ওর মুখে আমার থুথু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল।

হয়তো অন্য কারুর কাছে ছুটতে, না?

আমি না তুমি?

কেন, কী ভাব তুমি আমাকে?

আমাকে তুমি কী ভাব?

পুরুষরা যা।

তোমাকেও আমি একটা মেয়ে ভাবি। মেয়েরা যা, ঠিক তাই।

মেয়েরা কী?

সব চাওয়াতেই যে গলে, যে মনে করে, সবাই আমাকে চাক্‌।

আর তোমরা? চেয়ে বেড়াও।

হুঁ।

আর ভালবাসা?

যে বাসার ভাল ল্যাভেটরি আছে।

আমি হেসেছিলাম, নীতা বলেছিল, সে তো তোমাকে গোড়া থেকেই দেখে বুলেছি।

তৎক্ষণাৎ ওর মুখে থুথু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল, দিইনি, কেবল ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, আর আমার প্রথম প্রেমের কথা মনে পড়ছিল, যে কারণে এখন আমার সন্দেহ হয়, তখন আমি আদতে হতাশ বা নিরাশ ছিলাম না, দাঁত আর নখকেই শানাচ্ছিলাম সম্ভবত। বলেছিলাম, কারণ তুমি গোড়ায় আমার সঙ্গে প্রেম করেছিলে।

তোমার চোখ ভীঘণ লাল দেখাচ্ছে।

মাল টেনেছি।

উঃ, লাগছে বুকে, ছাড়।

এরকম লাগতে বেশ লাগছে।

তার মানে, তুমি এই, এই রকমই বীস্ট্‌, তুমি কখনোই ভালবাসতে পার না।

আর তুমি এ্যাঞ্জেল, তুমি পার।

জীবনে কোন মেয়েকে কখনো সত্যি বলনি। এ সময়ে তোমাকে আমার ভীষণ ঘেন্না করে।

আর তুমি সতী, চিরদিন সত্যি বলেছ। তোমার মুখে আমার থুথু দিতে ইচ্ছে করে।

আমারও করে। ছাড়, আর গলা জড়িয়ে ধরতে হবে না।

না, ছাড়ব না।

গলা জড়িয়ে ধরিনি, আমার কনুইটা ওর গলার, টুঁটির কাছে চেপে বসছিল। তখন আমি দেখছিলাম, ওর চোখ ফেটে পড়ছিল, ও বলতে চাইছিল, তুমি–আমি আমার শরীরে সব শক্তি দিয়ে চাপছিলাম বলেই বোধহয় আমার গলা চাপা আর মোটা শোনাচ্ছিল, বলেছিলাম, কোন কথা নয়, এবং ওর গলাটা যে এত নরম, আগে তা কখনো মনে হয় নি, যে একটা গর্তের মধ্যে কনুইটা ঢুকে যাচ্ছিল, আর নীতার হাত দুটো যেহেতু ওর দু পাশে এলিয়ে পড়ছিল, সেই হেতুই, আমার ধারণা, ওর হাত দুটো আমার পেটের কাছে, হঠাৎ খামচে ধরেছিল। আমার কনুই ছাড়বার উপায় না থাকায় এমন জোরে ধরেছিল যে, পেটটা ছিঁড়েই ফেলার প্রায়। তাই আমি হ্যাঁচকা দিয়ে আমার নিচের দিকটা টেনে তুলে নিতেই পড়্‌ পড়্‌ শব্দে শার্টটা ছিঁড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল, আর, হ্যাঁচকা দিয়ে ওঠবার দরুনই সম্ভবত গলায় কনুয়ের চাপটা আরো জোরে পড়েছিল, যে কারণে ও কারণে ও পা-দুটো শূন্যে ছুঁড়ছিল। কোমরসুদ্ধ (অন্য কথা মনে করিয়ে দেয়) উঁচুতে তুলে ফেলছিল, আর আমার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছিল। তারপর আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়া যাকে বলে, তেমনিভাবে হাত-পা এলিয়ে পড়ে স্থির হয়ে গিয়েছিল। একে নিশ্চয়ই খুন করাই বলে। সত্যি রাগ জিনিসটা একেবারে চণ্ডাল, অথচ ওকে আমি খুন করতে চাইনি, (মাইরি) কারণ ওকে যদি খুন করতে হয়, তা হলে তো আমায় নিজেকেও খুন করতে হয়। কিন্তু ওরে বাবা, অসম্ভব, তা আমি ভাবতেই পারি না যে, আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আর আমি সতি। মরে যাচ্ছি, যদিচ একই ঘTয় ও রাগে নীতাও আমাকে গলা টিপে মারতে পারত। ওর কম্বার থেকে যেন মনে হচ্ছিল, ঠিক আমার যেরকম, আসক্তি আনাসকিই না কি জানি না, ভীষণ পেতে ইচ্ছে করে, অথচ ঘৃণায় আর রাগে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে, ওর ঠিক সেই রকমই হয়েছিল। আমি যেমন ঝগড়া করলেও, এতটা বাড়াবাড়ি করি না, নীতাও তেমনি আজকের মত এতটা রেগে কথাবার্তা বলে না। বরাবরই মোটামুটি মানিয়ে নেওয়া গিয়েছে।

কে জানে হয়তো এই কারণেই আমার এই কথা মনে হচ্ছিল, যেন কোন তুখোড় শিকারী, একটা মানুষখেকো বাঘকে মারবার জন্যে, গাছের তলায় একটা নধর ছাগলকে বেঁধে রেখেছে, এবং বাদটা তার নিজের শিকারের সাড়া পেয়ে, গন্ধ পেয়ে, অন্ধকারে বন চড়ে চড়ে এসেছে। ব্যাপারটা যেন সেই রকমই নয় খানিকটা। যদি এরকম একটা কথা একেবারেই হাস্যকর, কারণ সে শিকারীটা কে? ক্যালকাটা পুলিশ কমিশনার? তিনি জানবেন কেমন করে, এরকম একটা বাঘ দিব্যি কলকাতার লোকজনের মধ্যে, একজন বেশ সুটেড বুটেড, আবার দায়িত্বশীল, ভদ্রলোক সেজে বেড়াচ্ছিস? কিংবা আমাকে খতম কার জন্যে, কোন ভংকর আততায়ী (সে কোথায় থাকে।) এরকম একটা ফাঁদ পেতেছে। দূর, যত বাজে চিন্তা, সবাই শিকারী, সবাই ফাঁদ পাতে।

যাই হোক, আমি থেমে গিয়েছিলাম প্রায়, এবং নীতার ঘাড়-ভাঙা মত সেই চেহারাটা দেখতে ভাল লাগছিল না বলে, ওকে উপুড় করে দিয়েছিলাম। তারপরে—।

মোট ব্যাপারটা ঘদি এইরকম দাঁড়ায়, তা হলে এখন আমার কী করা উচিত, সেইটা ভাবা দরকার। নীতা যখন নরই গিয়েছে, এটাকে যখন খুন হিসেবেই দেখা হবে, তখন আমার নিশ্চয় উচিত, এখান থেকে কেটে পড়া, (কটা বেজেছে? ওরে বাবা, পৌনে দশ। ঝি-মেয়েটার প্রেম বোধ হয়। এতক্ষণে শেষ হল, এখুনি এসে পড়লে)। কিন্তু বইয়েতে যেসব কথা লেখে, অপরাধীরা কোন-না-কোন চিহ্ন রেখে যায়, সেরম কিছু আবার পেছনে ফেলে যাব না তো। তারপরে চট করে হাতে হাতকড়া, চুল শ্রীঘর, সেরেছে।

আমি উঠে বললাম, আয়নার দিকে তাকিয়ে, তাড়াতাড়ি প্যাণ্টটা চেপে ধরলাম, বোতাম খোল। চোখে পড়ল, শাটের নিচের অংশটা যেন টেনে মুচড়ে ছিঁড়েছে, সাংঘাতিক শক্তি বলতে হবে, নতুন টেরেলিনের শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, এমন কি নীতার নখের রঙ পর্যন্ত ছেঁড়া জাগার কাছে একটু-আধটু লেগে গিয়েছে। জামাটা প্যান্টের মধ্যে গুঁজে নিয়ে, খাট থেকে নেমে, বোতাম আঁটলাম। খাটের চাদরটা টেনে টেনে ঠিক করে, ওরই ব্লাউজ ব্রেসিয়ার ও শায়া দিরে ঝেড়ে দিলাম, ওর গোটা-গাটাও মুছে দিলাম, কেন না, এই যে-সব কী বলে, ছাপ-টাপ থেকে যেতে পারে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাকে বলে। গেলাস ডিস ছামত সবই পটিশনের আড়ালে, বেসিনের মধ্যে রেখে, জল ঢেলে দিলাম। তারপরে আয়নার সামনে দাঁড়িঙ্গে, টাই বাঁধতে বাঁধাতে মনে হল, যথেষ্ট হয়েছে, জামা ছেঁড়াটা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ও যাব, পায়ের ছাপটা কী করব? ঝাঁট দেব ঘরটা? একি ফ্যাচাং রে বাবা, শেষে ঝাঁটা হাতে ঘর পরিষ্কার করতে হবে, এত মজুরি পোষায় না। খুনীরা এত ঝামেলা নিয়ে এ-সব করে কী করে, আমি তো তাই বুঝতে পারছি না। তবু পার্টিশনের আড়াল থেকে ঝাঁটাটা নিয়ে এলাম। শোফার ওপর রেখে কোর্টটা গায়ে দিলাম, আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, (চোখ টিপে খচ্চর) নিজেকে দেখে হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে, একটু পরে আবার নীতাকে দেখলাম, কিন্তু আয়নার থেকে কাছে গিয়ে দেখতে ইচ্ছে করল। কাছে গেলাম (যেমন রাগিয়ে দিলে, তাই মরলে।) এবং মনে হল, নীতাকে আর কখনো পাওয়া যাবে না, ঘৃণা করেও চুমো খাওয়া হবে না, আর আজ ও সত্যি যেভাবে নাচল, মনে হয় বেশ খুশিই ছিল। খেতে বলে কথা ছিল, আমি তো এমন কি কোন হোটেলে খাব, সেটাও ভেবে রেখেছিলাম, যে-হোটেলে গিয়ে আবার একটু ড্রিংক করে নাচা যাবে, সেই রকম হোটেলই ভেবে রেখে ছিলাম, এমন কি, গোটা রাস্তাটা ওর কাছে কাটাতে পারব কি না, তা-ও ভেবে ছিলাম, মাঝখান থেকে, দেখ তো কী হয়ে গেল! যাচ্ছেতাই। কিন্তু আমি সত্যি বলতে কি, একটা শান্তিও যেন বোধ করছি, সেটা আবার কীরকম শান্তি, সে মা-ভগাই জানে, তবু কেনো একটা প্রশান্তি (প্রশান্তি?) যেন জড়িয়ে ধরছে আমাকে।

আমি ওর গায়ে হাত না দিয়ে, নিচু হয়ে এক চুমো খেতে ঢাইলাম, (নাটক মনে হচ্ছে, তবু ইচ্ছেই সত্যি হচ্ছে। যদিও ওকে না ধরে চুমো খাওয়া অসম্ভব। কারণ মুখটা যেভাবে রয়েছে, ঠোঁটটা বড় বেকায়দা জায়গায় পড়ে গিয়েছে, অত দূর এগোনই মুশকিল। তবু যতটা পারা যায়, নিচু হলাম, আর তখনই চোখে পড়ল, ওর ঠোঁটের কষে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আশ্চর্য, আগে দেখিনি তো, এবং সেই প্রায়-শুকিয়ে যাওয়া মোটা রক্তের দরানি দেখে, চুমো খাওয়ার ইচ্ছেটা আমার কেটে গেল, মনে মনে বললাম, থাক, শুধু শুধু ঠাণ্ডা মার ঠোঁটে কী দরকার আর চুমো খেয়ে, ও বেঁচে থাকতে তো অনেকবারই খাওয়া হয়েছে, এই ভেবে উঠে পড়লাম, এবং মনে মনে চুমোটা অনুভব করলাম, আর নীতাও আজ সত্যি বেশ মেজাজেই ছিল, আমার তলার ঠোঁটটা তো এখনো বেশ মালুম দিচ্ছে। খাবার খাওয়ার সময় আরো দেবে। না, আর দেরি না, এবার কেটে পড়া যাক, ঝিটা এসে পড়বে।

সোজা হয়ে দাঁড়াতে যাব, আর কি এ সময়ই টেলিফোনটা বেজে উঠল, মনে হল, বুকটা একবার ধক করে উঠল, কারণ প্রায় একটা মানুষের অস্তিত্বে মতই যেন শব্দটা তীরের মত এসে বিঁধল, এবং তেমনি ভাবেই শত্রু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, যাতে প্রমাণ করা যায়, নো রিপ্লাই, যার মানে পঞ্চাশ মিনিটে, এখন এ ঘরে কেউ নেই। কিন্তু পাশের এ্যাপার্টমেন্টের লোকেরা যদি শুনতে পায়, গাড়লটা থামবে কখন, (কিংবা, খ্যাপা ষাড় বলাই ভাল, কারণ রিঙটা এমন ভাবে বাজছে যেন, সেরকম ভাবেই নীতাকে ডাকছে, নীতা, কোথায়? আমি রাত্রে তোমায় এ্যাপার্টমেন্টে যাব, নী-তা, নী-তা! কিন্তু চাঁদ, যে-ই হও, হাপিস।) আনি যে শক্ত হয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুটকি মাছ হয়ে গেলাম। অবিশ্যি টেলিফোনের ও পাশের লোকটার হয়তো আজ আসবার কথা ছিল, হয়তো ভাবছে, নীতা বাথরুমে গিয়েছে রিঙ্‌ শুনে… যাক্, থেমেছে, আঃ, হরিবল্‌ হঠাৎ যেন সব শূন্য মনে হচ্ছে এখন। এতটা, যাকে বলে শুদ্ধ, এর আগে মনে হয় নি। কিন্তু না তার দেরি না, ঝিটা এসে পড়বে।

সরে গিয়ে ঝাঁটাটা নিয়ে এলোমেলো বোলালাম মেঝেয়, আর পিছিয়ে গেলাম দরজার দিকে, তারপর ঝাঁটাটা ছুঁড়ে ফেলতে গিয়ে মনে হল, ঝাঁটার হাতায় হাতের ছাপ থেকে যাবে না তো আবার। ভেবে তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে হাতটা মুছে খাটের নিচে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিলাম। দিয়ে রুমাল সহই দরজার হাতলটা ধরে টেনে দিলাম, জানি, অটোমেটিক দরজার ভিতর থেকে চাবি পড়ে গেল, বাইরে থেকে কেউ খুলতে পারবে না। একটা কমজোর আলোয় লক্ষ্য করলাম, সিঁড়ির কাছে কেউ নেই, তাড়াতাড়ি নেমে গেলাম। রাস্তার লো ডেন কুমে গিয়েছে, সেই শীত পড়ছে তো, কিন্তু আমার আর একটু ড্রিংক চাই, যদিচ রাত্রি দশটা বেজে গিছে, মধ্যরাত্রের শুঁড়িখানা ছাড়া উপায় নেই সেদিকেই পা বাড়ালাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *